Tuesday, July 7, 2015

বিচারক নুরুল হুদা মডেল সংসদে আলোচিত হোক by মিজানুর রহমান খান

মামলার জট অনেক ক্ষেত্রেই গরিব মানুষের গলার ফাঁস। যুগ যুগ ধরে এটা চলছে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা প্রায় ২৭ লাখ মামলার ভারে জর্জরিত ‘মরচে ধরা’ দেশের বিচারব্যবস্থার গৌরব ফিরিয়ে আনতে যে আহ্বান (প্রথম আলো, ১৪ জুন) জানিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই জট থেকে বেরোনোর উপায় কী? এক বছর আগে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সঙ্গে আলোচনার পর আইন কমিশন এই বিষয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন সরকারের কাছে পেশ করেছিল। এখন প্রধান বিচারপতির হতাশার কথা শুনে মনে হচ্ছে, এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি ঘটেনি। আগের মতোই অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
আমাদের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আকস্মিকভাবে কোথাও কোনো জগদ্দল পাথর সহজে নড়ে না। আইন কমিশনের হিসাব বলছে, নিম্ন আদালেত প্রায় ২৮ লাখ ও হাইকোর্টে প্রায় সোয়া তিন লাখ মামলার জট চলছে (প্রধান বিচারপতি অবশ্য মামলার সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ বলে উল্লেখ করেছেন)। ২৮ লাখ মামলা মাথায় নিয়ে মাত্র ১ হাজার ৭০০ বিচারককে সারা দেশে প্রতিদিন বিচারকার্য পরিচালনা করতে হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে সাপোর্টিং স্টাফসহ তিন হাজার নতুন বিচারক নিয়োগের সুপারিশ করা হলেও এটা পূরণ করা যায়নি। প্রতি জেলা সদরে নতুন এজলাসকক্ষ নির্মাণসহ ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ ছিল। শনিবারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বলেছেন, আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতি জেলায় নতুন এজলাস তৈরি হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি নিজেই বললেন, এটা যে গতিতে এগোচ্ছে, শেষ হতে ২০ বছর লাগবে।
সরকারের ভেতরে সমন্বয়হীনতা কোথায় নেমেছে, তা প্রধান বিচারপতি ও অর্থমন্ত্রীর কথোপকথনে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। ২০১৪ সালের জুনে আইন কমিশন তার রিপোর্টে বলেছে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সমগ্র বিচারব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বিচারকদের নিজ হাতে সাক্ষীর জবানবন্দিও রেকর্ড করার পরিবর্তে কম্পিউটার টাইপ চালু করা দরকার। প্রত্যেক আদালতে প্রিন্টারসহ একটি কম্পিউটার এবং আরও তিনটি মনিটর সরবরাহ করতে হবে। বিচারকাজে স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে সাক্ষীর জবানবন্দি স্টেনোগ্রাফার কম্পিউটারে টাইপ করবেন এবং তা সঠিকভাবে রেকর্ড হচ্ছে কি না, তা অবলোকন করার জন্য বিচারকসহ উভয় পক্ষের আইনজীবীদের সম্মুখে একটি করে মোট তিনটি মনিটর থাকবে।
এটা পরিতাপের বিষয় যে লুট হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তথাকথিত মূলধন হিসেবে যেখানে পাঁচ হাজার কোটি টাকা গোপনে জোগান দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে গোটা বিচার বিভাগকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আদালতকে ডিজিটাল করতে বাজেটে কোনো কথা নেই। আসুন, আমরা ঘটনাটা প্রধান বিচারপতির জবানিতেই শুনি, ‘এক অনুষ্ঠানে আমি অর্থমন্ত্রীকে বললাম, বিচার বিভাগ বাংলাদেশের বাইরে অন্য দ্বীপে আছে কি না। আপনি বাজেট বক্তৃতায় ডিজিটালাইজেশন নিয়ে সারা দেশের রূপরেখা দিলেন, কিন্তু বিচার বিভাগ নিয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেখতে পেলাম না। তখন অর্থমন্ত্রী আমাকে বললেন, “এটা তো ভুল হয়ে গেছে। আপনার আইন মন্ত্রণালয় থেকেও তো আমাকে কিছু বলেনি।”’ শনিবার প্রধান বিচারপতি এই মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রীর সামনে। এখন আমরা আশা করব বর্তমান আইনমন্ত্রী সরষের ভূতটা না তাড়াতে পারেন, সেটা চিহ্নিত করে জনগণকে অবহিত করবেন। ২০১৪ সালের ২৬ জুন আইন কমিশন ডিজিটাল করার সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল।
আমরা যদি ধরেও নিই আইন কমিশনের অবকাঠামোগত সুপারিশ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হবে, তাহলেই যে জট নিরসন হবে, তা ভাবা যায় না। যথা উদ্যোগ নিতে হবে। উপযুক্ত কর্মপরিকল্পনার আওতায় প্রকল্প নিতে হবে। বিদেশিদের শর্তে প্রকল্প করলে তাতে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান বর্ণিত আইসোমরফিক মিমিক্রি বা অর্থহীন নকলকরণের ঝুঁকি থাকবে, কাজের কাজ তেমন কিছু হবে না। একটি একান্ত দেশীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
অন্ধকারে আলোকরেখা হয়ে একজন বিচারক একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, আমাদের প্রধান বিচারপতিরা তাঁকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্বীকৃতিও দিয়েছেন। তাহলে এটা কেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা যাচ্ছে না, তা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। ওই বিচারক মামলার জট নিরসনে জাপানি ব্যবস্থাপনার মডেল অনুসরণ করে সাফল্যের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি নুরুল হুদা, বর্তমানে চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ।
মানিকগঞ্জে থাকাকালে তিনি তাঁর স্থানীয় উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। এর মূল সূত্র হচ্ছে, প্রাচীন আমল থেকে ঝুলতে থাকা মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরসন করা। ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০১১ সালের মধ্যে মানিকগঞ্জে ১৯৬৮ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যবর্তী সব মামলা নিষ্পত্তি করেছিলেন। এরপর ময়মনসিংহে গিয়ে তিনি একটি নীরব বিপ্লব করেছেন। সেখানে তিনি পৌনে তিন বছরে ৫৭ হাজার ৮২৫টি মামলা নিষ্পত্তি করেন। এর মধ্যে এমনও ৪২৫টি মামলা ছিল, যেগুলোর বয়স ওপরে ৪৭ এবং নিচে ৯। গত জানুয়ারিতে তিনি চট্টগ্রামে জেলা জজ হিসেবে বদলি হন এবং সেখানেও তিনি ইতিমধ্যে কতিপয় যুগান্তকারী সংস্কার এনেছেন। রেকর্ড রুম হলো আদালতের হৃদয়। সেখানে তিনি এক সফল ওপেন হার্ট সার্জারি করেছেন। একটি ম্যাপ প্রস্তুত করেছেন, যে কারণে এখন চট্টগ্রামে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো মামলার নকল পাওয়া যাচ্ছে।
প্রচলিত ব্যবস্থার ভেতরে থেকেও যে বদলে দেওয়া যায়, নুরুল হুদা সেই দৃষ্টান্তই স্থাপন করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত পর্যায়ের অনুকরণীয় উদ্যোগের কথা কয়েক বছর ধরে পত্রপত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। প্রথমে এটা অবিশ্বাস্য মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, যে প্রশাসনব্যবস্থায় আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাই ভবিতব্য হয়ে পড়েছে, সেখানে কেবল বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তির আন্তরিক উদ্যোগ দিয়ে কার্যকর পরিবর্তন আনা কতটা সম্ভব? কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে এটা অবাস্তব নয়। সত্যি একজন নুরুল হুদা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি এর স্বীকৃতি পাননি, তা বলা ভুল হবে। আবার স্বীকৃতি পেয়েছেন, সেটাও বলা যাবে না। তবে তাঁকে আমরা জাতি হিসেবে সবচেয়ে বড় সম্মান দিতে পারি, যদি আমরা তাঁর ব্যবস্থাপনা মডেলকে সরকারিভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারি। এঁরাই আমাদের সমাজসংস্কারক। এঁরাই আমাদের জাতীয় বীর, যাঁরা বহু ক্ষেত্রে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন এবং নীরবে-নিভৃতে ভূমিকা রেখে চলেছেন। কেবল বিচার বিভাগে নয়, জনপ্রশাসনের আরও বহু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ভূমি জরিপ ও তাদের ঘুণে ধরা মহাফেজখানার প্রাণসঞ্চারে নুরুল হুদা মডেল চালু করা যায়।
আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এবং আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে ধন্যবাদ যে তাঁরা এই বিচারকের কাজের মূল্যায়ন করেছেন। আইন কমিশন সরেজমিন ময়মনসিংহে গিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। সংসদীয় কমিটিও পরিদর্শন করেছে, আবার কমিটিতে ডেকে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছে।
আইন কমিশন তাঁর সাফল্যের ছয়টি কারণ চিহ্নিত করেছে। জেলা ও দায়রা জজের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, জেলা জজশিপের অন্যান্য বিচারক, বারের সদস্য ও আদালতের কর্মচারীদের সহযোগিতা, দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিধিগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ, নিরীক্ষণ ও তত্ত্বাবধান। টিআইবিসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে অনিয়মগ্রস্ত নিম্ন আদালতের চিত্র বারংবার আসছে। সেসব অভিযোগ অমূলক নয়, আবার সেই পরিবেশ থেকেই মাটি ফুঁড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন একজন নুরুল হুদা।
আমরা মনে করি, তাঁর দেখিয়ে দেওয়া উদ্যোগকে আরও সামনে নিতে হবে। এটা সুখবর যে অর্থমন্ত্রী প্রধান বিচারপতির অম্লমধুর অনুযোগ কবুল করেছেন এবং আদালতে ডিজিটালাইজেশনের বিষয়টি সম্পূরক বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে সম্মত হয়েছেন। আমাদের মনে হয়, সংসদের ফ্লোরে একে কেন্দ্র করেই মামলাজট নিরসনে একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা হতে পারে। আর সেখানে নুরুল হুদা মডেলের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানানো যায়। এটা কোনো ব্যক্তিবিশেষকে উৎসাহিত করার বিষয় হিসেবে নয়, তাঁর প্রবর্তিত নিয়মরীতির প্রতি একটি রাজনৈতিক স্বীকৃতি দরকার। আমরা আমাদের সংসদের ফ্লোরকে এ ধরনের গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করার ধারা চালু করতে পারি।
নুরুল হুদা মডেলের সাফল্য কেন এসেছে, তা আইন কমিশন চিহ্নিত করেছে, এখন সেটা সংসদে আলোচনা করা হলে সারা দেশের বিচারকেরা নুরুল হুদাকে অনুসরণে স্বভাবজাত ও পারিপার্শ্বিক জড়তা ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারবেন। এটাই সব থেকে জরুরি।
সংস্কার করতে গিয়ে নুরুল হুদা বিড়ম্বনা ও মহলবিশেষের ঈর্ষার শিকার হয়েছেন। সে খবর তাঁর সহকর্মীরা জানেন, আর তাই আইন কমিশন ও সংসদীয় কমিটি সাড়ম্বরে তাঁর প্রশংসা করেছে বলেই তারা তাঁকে অনুসরণ করবে, সেটা ভাবার কারণ নেই। তদুপরি কয়েকটি স্থানে জেলা জজরা তাঁকে অনুসরণ করে সুফল পাচ্ছেন বলে জানি। ২০১১ সালের ২৬ জুন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের দপ্তর থেকে একটি চিঠি গিয়েছিল। তাতে নুরুল হুদা মডেল অনুসরণে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লেখা হয়। ৩৫ দিন পরে সে–মতে প্রতি জজশিপে চিঠিও যায়। কিন্তু পরে অনেকের মনে পড়ে যে এটা বিধিমাফিক হয়নি। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়াই চিঠি গিয়েছে। কথাটা পাঁচ কান হতে দেরি হয় না। তাই ওই চিঠি প্রত্যাহার করা না হলেও পরে আর কেউ অনুসরণ করছেন বলে জানা যায় না।
গত ফেব্রুয়ারিতে জেলা জজদের সম্মেলন ডাকেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি। সেখানে নুরুল হুদা তাঁর সংস্কারের বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন। সুতরাং বিষয়টি প্রধান বিচারপতি অবগত আছেন। আশা করতে পারি, সুপ্রিম কোর্ট এটা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন।
তবে আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তাঁর উপস্থিতিতে মামলাজট নিরসনে একটি আলোচনা হওয়া উচিত। এই আলোচনার জন্য আইন কমিশনের তৈরি করা জট নিরসনে ছয় পৃষ্ঠা ও নুরুল হুদার বিষয়ে দুই পৃষ্ঠার রিপোর্ট কার্যপত্র হতে পারে। সংসদের আলাপ-আলোচনায় বিচার বিভাগের ব্যবস্থাপনা সমস্যা যেন নিষিদ্ধ বস্তু হিসেবে রয়ে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক বিশ্ব ক্রমেই সংসদ ও নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের সংলাপও প্রত্যক্ষ করছে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

হযত উসমান (রা:) এর সংহ্মিপ্ত জিবনী...

...ভূমিকা...
খোদায়ী বিধানের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত, দানশীলতায় অগ্রগামী, লজ্জাশীলতায় সর্বকালীন দৃষ্টান্ত, ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত 'ওসমান ইবনে আফফান' ৫৭৩ মতান্তরে ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে (ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান) মক্কার ঐতিহ্যবাহী কোরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
আল ইসতিয়াবের বর্ণনানুসারে 'আমুল ফিল'-এর ছয় বছর পরে অর্থাৎ ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম 'আফফান' ও মায়ের নাম আরওয়া বিনতে কোরাইশ। হজরত ওসমান (রা.)-এর বংশপরম্পরা পঞ্চম পুরুষ 'আবদে মানাফ'-এ গিয়ে রাসুলে করিম (সা.)-এর বংশধারায় মিলিত হন।
তিনি ছিলেন মধ্যমাকৃতির অত্যন্ত সুদর্শন। ইবনে আসাকির আব্দুল্লাহ ইবনে হাজাম মাজেনি থেকে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছেন, 'হজরত ওসমান অপেক্ষা সুদর্শন কোনো পুরুষ আমি দেখিনি।' হজরত ওসমান (রা.)-এর জীবনের প্রাথমিক অবস্থার ইতিহাস খুব সামান্যই সংরক্ষিত আছে। তবে যতটুকু জানা গেছে, জাহিলিয়াতের যুগে জন্ম হলেও জাহিলিয়াতের বীভৎসতা তাঁর চরিত্রকে কলুষিত করতে পারেনি।
ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি ছিলেন হানিফ ঘরানার লোক। যাঁরা নিজের বিবেকের নির্দেশনায় খারাপ কাজ থেকে বিরত থেকেছেন। তিনি ছিলেন আরবের মুষ্টিমেয় শিক্ষিত লোকের একজন। তিনি ছিলেন কোরাইশ বংশের অন্যতম কুস্তিবিদ্যা বিশারদ। কোরাইশদের প্রাচীন ইতিহাস বিষয়েও তিনি ছিলেন গভীর জ্ঞানের অধিকারী। বংশীয় আভিজাত্যের ধারায় যৌবনে তিনি ব্যবসায় নিয়োজিত হন। সর্বোচ্চ সততা ও বিশ্বস্ততার দরুন অল্প সময়েই তিনি অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন।
বিপুল ধন-ঐশ্বর্যের কারণে তিনি 'গনি' উপাধি লাভ করেন। মমতা, সহনশীলতা, আত্দমর্যাদাবোধ, দান ও লজ্জা ছিল তাঁর মহৎ চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও তিনি আশারায়ে মুবাশ্‌শারা'র একজন এবং সেই ৬ জন সাহাবীর মধ্যে অন্যতম যাদের উপর মুহাম্মদ আমরণ সন্তুষ্ট ছিলেন।
...এক নজরে হযরত ওসমান (রাঃ)...
পূর্ননামঃ উসমান ইবনে আফফান
জন্মঃ ৫৭৭ খিস্টাব্দ ।
পেশাঃ ব্যবসায়ী ।
উল্লেখযোগ্য পদবীঃ ইসলামের তৃতীয় খলিফা।
রাজত্বকালঃ ১১ নভেম্বর ৬৪৪ – ২০ জুন ৬৫৬ ।
সমাধিস্থলঃ জান্নাতুল বাকীর পিছনে জিউস (Jewish) কবর স্থানে।
পূর্বসূরিঃ হযরত উমর (সাঃ) ।
উত্তরসূরিঃ হযরত আলী (রাঃ) ।
মৃত্যুঃ ৬৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ২০ জুন ।
...ওসমান (রাঃ) এর পরিবার ও বংশ...
উসমানের কুনিয়া আবু আমর, আবু আবদিল্লাহ, আবু লায়লা। তার উপাধি যুন-নূরাইন এবং যূল-হিজরাতাইন। তার পিতা আফ্‌ফান এবং মাতা আরওরা বিনতু কুরাইয। তিনি কুরাইশ বংশের উমাইয়্যা শাখার সন্তান ছিলেন। তার উর্ধ্ব পুরুষ আবদে মান্নাফে গিয়ে মুহাম্মদের বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। তার নানী বায়দা বিনতু আবদিল মুত্তালিব ছিলেন মুহাম্মদের ফুফু।
ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মদ তার কন্যা রুকাইয়্যার সাথে তার বিয়ে দেন। হিজরী দ্বিতীয় সনে তাবুক যুদ্ধের পরপর মদিনায় রুকাইয়্যা মারা যায়। এরপর নবী তার দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমের সাথে তার বিয়ে দেন। এ কারণেই তিনি মুসলিমদের কাছে যুন-নূরাইন বা দুই জ্যোতির অধিকারী হিসেবে খ্যাত। তবে এ নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। যেমন ইমাম সুয়ূতি মনে করেন ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই ওসমানের সাথে রুকাইয়্যার বিয়ে হয়েছিল। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা এই ধারণা পরিত্যাগ করেছেন।
উসমান এবং রুকাইয়্যা ছিলেন প্রথম হিজরতকারী মুসলিম পরিবার। তারা প্রথম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে তাদের একটি ছেলে জন্ম নেয় যার নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ ইবন উসমান। এরপর উসমানের কুনিয়া হয় ইবী আবদিল্লাহ।
হিজরী ৪র্থ সনে আবদুল্লাহ মারা যায়। তাবুক যুদ্ধের পরপর রুকাইয়্যা মারা যান। এরপর উসমানের সাথে উম্মু কুলসুমের বিয়ে হয় যদিও তাদের ঘরে কোন সন্তান আসেনি। হিজরী নবম সনে উম্মু কুলসুমও মারা যান।
বোনঃ আমেনা (amna)
স্ত্রীঃ
রোকাইয়া বিনতে মোহাম্মদ
উম্মে কুলসুম বিনতে মোহাম্মদ
নায়লা
রামলা বিনতে সোয়াইবাত
ফাতিমা বিনতে আল ওয়ালিদ
ফাখতাহ্‌ বিনতে গাজওয়ান
উম্মে আল-বানিন বিনতে উনাইব
উম্মে আমর বিনতে যুনদুব
ছেলেঃ
আমরো
ওমার
খালিদ
আবান
আব্দুল্লাহ-আল-আসগর
আল-ওয়ালিদ
সাঈদ
আব্দুল মালিক
মেয়েঃ
মরিয়াম
উম্মে উসমান
আয়েশা
উম্মে আমর
উম্মে আবান আল কাবরি
আরবি
উম্মে খালিদ
উম্মে আবাল আল-সাগরী
প্রাথমিক জীবন ও ইসলাম গ্রহন
প্রাথমিক জীবন
অন্যান্য অনেক সাহাবীর মতই ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উসমানের জীবন সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায়নি। জানা যায়, উসমান কুরাইশ বংশের অন্যতম বিখ্যাত কুষ্টিবিদ্যা বিশারদ ছিলেন। কুরাইশদের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে তার অগাধ জ্ঞান ছিল। ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তার এমন বিশেষ কোন অভ্যাস ছিলনা যা ইসলামী নীতিতে ঘৃণিত।
যৌবনেকালে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মত ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা খাতে তার সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। মক্কার সমাজে একজন ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন বলেই তার উপাধি হয়েছিল গনী যার অর্ধ ধনী।
ইসলাম গ্রহন
হজরত ওসমান (রা.) প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর উৎসাহে তিনি দ্বীনে ইসলাম গ্রহণ করেন যৌবনে, যখন তাঁর বয়স ত্রিশের কোটায়। তিনি নিজেই বলেছেন, 'আমি ইসলাম গ্রহণকারী চারজনের মধ্যে চতুর্থ।' হজরত আবু বকর, হজরত আলী ও জায়েদ বিন হারিসের পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
কোরাইশ বংশের অত্যন্ত সম্মানিত ও বিত্তবান ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইসলাম গ্রহণ করার কারণে তাঁকে কাফিরদের অমানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তাঁর চাচা 'হাকাম ইবনে আবিল আস' তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে বেদম প্রহার করত আর বলত, যতক্ষণ পর্যন্ত মুহাম্মদ (সা.)-এর ধর্ম ত্যাগ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোকে ছাড়া হবে না।'
সীমাহীন নির্যাতনের পরও তাঁর ইমান একটুও টলেনি। মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সর্বপ্রথম মুসলমানদের যে দলটি হাবশায় হিজরত করেছিল, হজরত ওসমান ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়াও সে দলের সদস্য ছিলেন। হাবশায় দুই বছর অবস্থানের পর তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনা হিজরতের পর তিনি আবার মদিনায় হিজরত করেন। সে কারণে তাঁকে 'জুল হিজরাতাইন' বলা হয়।
...হুদাইবিয়া সন্ধি ও ওসমান (রাঃ) এর অবদান...
হুদাইবিয়া সন্ধির পটভূমি
কা’বা ছিলো ইসলামের মূল কেন্দ্র। এটি আল্লাহর নির্দেমানুক্রমে হযরত ইবরাহীম (আ) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ) নির্মাণ করেছিলেন। মুসলমানরা ইসলামের এই কেন্দ্রস্থল থেকে বেরোবার পর ছয়টি বছর অতিক্রান্ত হয়েছিলো। পরন্ত হ্‌জ্জ ইসলামের অন্যতম মৌল স্তম্ভ হওয়া সত্ত্বেও তারা এটি পালন করতে পারছিলো না। তাই কা’বা শরীফ জিয়ারত ও হজ্জ উদযাপন করার জন্যে মুসলমানদের মনে তীব্র বাসনা জাগলো।
কা’বা জিয়ারতের জন্যে সফর
আরবরা সাধারণত তামাম বছরব্যাপী যুদ্ধে মেতে থাকতো। কিন্তু হজ্জ উপলক্ষে লোকেরা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে কা’বা পর্যন্ত যাতায়াত করতে এবং নিশ্চিন্তে আল্লাহর ঘরের জিয়ারত সম্পন্ন করতে পারে, এজন্যে চার মাসকাল তারা যুদ্ধ বন্ধ রাখতো। ষষ্ঠ হিজরীর জিলকদ মাসে হযরত (স) কা’বা জিয়ারতের সিদ্ধান্ত নিলেন। এহেন সৌভাগ্য লাভের জন্যে বহু আনসার ও মুহাজির প্রতীক্ষা করছিলো। তাই চৌদ্দ শ’ মুসলমান হযরত (স)-এর সহগামী হলেন। যুল হুলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছে তাঁরা কুরবানীর প্রাথমিক রীতিসমূহ পালন করলেন। এভাবে সবাইকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, মুসলমানদের উদ্দেশ্য শুধু কা’বা শরীফ জিয়ারত করা, কোনোরূপ যুদ্ধ বা আক্রমণের অভিসন্ধি নেই। তবুও কুরাইশদের অভিপ্রায় জেনে আসবার জন্যে হযরত (স) এক ব্যক্তিকে মক্কায় প্রেরণ করলেন। সে এই মর্মে খবর নিয়ে এলো যে, কুরাইশরা সমস্ত গোত্রকে একত্রিত করে মুহাম্মদ (স)-এর মক্কায় প্রবেশকে বাধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন কি, তারা মক্কার বাইরে এক জায়গায় সৈন্য সমাবেশ করতেও শুরু করেছে এবং মুকাবিলার জন্যে সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে আছে।
কুরাইশদের সঙ্গে আলোচনা
এই সংবাদ জানার পরও হযরত (স) সামনে অগ্রসর হলেন এবং হুদাইবিয়া নামক স্থানে পৌঁছে যাত্রা বিরতি করলেন। এ জায়গাটি মক্কা থেকে এক মঞ্জিল দূরে অবস্থিত।৪৫ এখানকার খোজায়া গোত্রের প্রধান হযরত (স)-এর খেদমতে হাযির হয়ে বললো : ‘কুরাইশরা লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা আপনাকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না।’ হযরত (স) বললেন : ‘তাদেরকে গিয়ে বলো যে, আমরা শুধু হজ্জের নিয়্যাতে এসেছি, লড়াই করার জন্য নয়। কাজেই আমাদেরকে কা’বা শরীফ তাওয়াফ ও জিয়ারত করার সুযোগ দেয়া উচিত।’ কুরাইশদের কাছে যখন এই পয়গাম গিয়ে পৌঁছলো, তখন কিছু দুষ্ট প্রকৃতির লোক বলে উঠলো : ‘মুহাম্মদের পয়গাম শোনার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই।’ কিন্তু চিন্তাশীল লোকদের ভেতর থেকে ওরওয়া নামক এক ব্যক্তি বললো : ‘না, তোমরা আমার উপর নির্ভর করো; আমি গিয়ে মুহাম্মদ (স)-এর সঙ্গে কথা বলছি।’ ওরওয়া হযরত (স)-এর খেদমতে হাযির হলো বটে, কিন্তু কোনো বিষয়েই মীমাংসা হলো না। ইতোমধ্যে কুরাইশরা মুসলমানদের ওপর হামলা করার জন্যে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করলো এবং তারা মুসলমানদের হাতে বন্দীও হলো; কিন্তু হযরত (স) তাঁর স্বভাবসুলভ করুণার বলে তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং তাদেরকে মুক্তি দেয়া হলো। এর পর সন্ধির আলোচনা চালানোর জন্যে হযরত উসমান (রা) মক্কায় চলে গেলেন; কিন্তু কুরাইশরা মুসলমানদেরকে কা’বা জিয়ারত করার সুযোগ দিতে কিছুতেই রাযী হলো না; বরঞ্চ তারা হযরত উসমান (রা)-কে আটক করে রাখলো।
রিযওয়ানের শপথ
এই পর্যায়ে মুসলমানদের কাছে এই মর্মে সংবাদ পৌঁছলো যে, হযরত উসমান (রা) নিহত হয়েছেন। এই খবর মুসলমানদেরকে সাংঘাতিকভাবে অস্থির করে তুললো। হযরত (স) খবরটি শুনে বললেন : ‘আমাদেরকে অবশ্যই উসমান (সা)-এর রক্তের বদলা নিতে হবে।’ একথা বলেই তিনি একটি বাবলা গাছের নীচে বসে পড়লেন। তিনি সাহাবীদের কাছ থেকে এই মর্মে শপথ গ্রহণ করলেন : ‘আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো, তবু লড়াই থেকে পিছু হটবো না। কুরাইশদের কাছ থেকে আমরা হযরত উসমান (রা)-এর রক্তের বদলা নেবোই।’ এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা মুসলমানদের মধ্যে এক আশ্চর্য উদ্দীপনার সৃষ্টি করলো। তারা শাহাদাতের প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হয়ে কাফিরদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে প্রস্তুত হলেন। এরই নাম হচ্ছে ‘রিযওয়ানের শপথ’। কুরআন পাকেও এই শপথের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সে সব ভাগ্যবান ব্যক্তি এ সময় হযরত (স)-এর পবিত্র হাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণ করেছিলেন, আল্লাহ তা’আলা তাঁদেরকে পুরস্কৃত করার কথা বলেছেন।
হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তাবলী
মুসলমানদের এই উৎসাহ-উদ্দীপনার কথা কুরাইশদের কাছেও গিয়ে পৌঁছলো। সেই সঙ্গে এ-ও জানা গেলো যে, হযরত উসমান (রা)-এর হত্যার খবর সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। এই পরিস্থিতিতে কুরাইশরা সন্ধি করতে প্রস্তুত হলো এবং এ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্যে সুহাইল বিন্‌ আমরকে দূত বানিয়ে পাঠালো। তার সঙ্গে দীর্ঘ সময়ব্যাপী আলোচনা হলো এবং শেষ পর্যন্ত সন্ধির শর্তাবলী স্থিরিকৃত হলো। সন্ধিপত্র লেখার জন্যে হযরত আলী (রা)-কে ডাকা হলো। সন্ধিপত্রে যখন লেখা হলো ‘এই সন্ধি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর তরফ থেকে তখন কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল প্রতিবাদ জানিয়ে বললো : ‘আল্লাহর রাসূল’ কথাটি লেখা যাবে না; এ ব্যাপারে আমাদের আপত্তি আছে।’ একথায় সাহাবীদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। সন্ধিপত্র লেখক হযরত আলী (রা) কিছুতেই এটা মানতে রাযী হলেন না। কিন্তু হযরত (স) নানাদিক বিবেচনা করে সুহাইলের দাবি মেনে নিলেন এবং নিজের পবিত্র হাতে ‘আল্লাহর রাসূল’ কথাটি কেটে দিয়ে বললেন : ‘তোমরা না মানো, তাতে কি? কিন্তু খোদার কসম, আমি তাঁর রাসূল।’ এরপর নিম্নোক্ত শর্তাবলীর ভিত্তিতে সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষরিত হলোঃ
১. মুসলমানরা এ বছর হজ্জ না করেই ফিরে যাবে।
২. তারা আগামী বছর আসবে এবং মাত্র তিন দিন থেকে চলে যাবে।
৩. কেউ অস্ত্রপাতি নিয়ে আসবে না। শুধু তলোয়ার সঙ্গে রাখতে পারবে: কিন্তু তাও কোষবদ্ধ থাকবে, বাইরে বের করা যাবে না।
৪. মক্কায় সে সব মুসলমান অবশিষ্ট রয়েছে, তাদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। আর কোনো মুসলমান মক্কায় ফিরে আসতে চাইলে তাকেও বাধা দেয়া যাবে না।
৫. কাফির বা মুসলমানদের মধ্য থেকে কেউ মদীনায় গেলে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে। কিন্তু কোনো মুসলমান মক্কায় গেলে তাকে ফেরত দেয়া হবে না।
৬. আরবের গোত্রগুলো মুসলমান বা কাফির যে কোনো পক্ষের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করতে পারবে।
৭. এ সন্ধি-চুক্তি দশ বছরকাল বহাল থাকবে।
হুদাইবিয়া সন্ধির প্রভাব
সন্ধি-চুক্তি সম্পাদিত হবার পর হযরত (স) সেখানেই কুরবানী করার জন্যে লোকদেরকে হুকুম দিলেন। সর্বপ্রথম তিনি নিজেই কুরবানী করলেন। সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের পর হযরত (স) তিন দিন সেখানে অবস্থান করলেন। ফিরবার পথে সূরা ফাতাহ নাযিল হলো। তাতে এই সন্ধির প্রতি ইঙ্গিত করে এতে ‘ফাতহুম মুবীন’ বা সুস্পষ্ট বিজয় বলে অভিহিত করা হলো। যে সন্ধি-চুক্তি মুসলমানরা চাপে পড়ে সম্পাদন করলো, তাকে আবার ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ বলে আখ্যা দেয়া দৃশ্যত একটি বেখাপ্পা ব্যাপার ছিলো। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্টত প্রমাণ করে দিলো যে, ইসলামের ইতিহাসে হুদাইবয়ার সন্ধি ছিলো একটি বিরাট বিজয়ের সূচনা মাত্র। এর বিস্তৃত বিবরণ হচ্ছে নিম্নরূপ :
এতদিন মুসলমান ও কাফিরদের মধ্যে পুরোপুরি একটা যুদ্ধংদেহী অবস্থা বিরাজ করছিলো। উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক মেলামেশার কোনোই সুযোগ ছিলো না। এই সন্ধি-চু্‌ক্তি সেই চরম অবস্থার অবসান ঘটিয়ে রুদ্ধ দুয়ার খুলে দিলো। এরপর মুসলমান ও অমুসলমানরা নির্বাধে মদীনায় আসতে লাগলো। এভাবে তারা এই নতুন ইসলামী সংগঠনের লোকদেরকে অতি নিকট থেকে দেখার ও জানার সুযোগ পেলো। এর পরিণতিতে তারা বিস্ময়কর রকমে প্রভাবিত হতে লাগলো। যে সব লোকের বিরুদ্ধে তাদের মনে ক্রোধ ও বিদ্বেষ পুঞ্জীভূত হয়েছিলো, তাদেরকে তারা নৈতিক চরিত্র, আচার-ব্যবহার ও স্বভাব-প্রকৃতির দিক দিয়ে আপন লোকদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত মানের দেখতে পেলো। তারা আরো প্রত্যক্ষ করলো, আল্লাহর যে সব বান্দাহর বিরুদ্ধে তারা এদ্দিন যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ করে আসছে, তাদের মনে কোনে ঘৃণা বা শত্রুতা নেই; বরং তাদের যা কিছুই ঘৃণা, তা শুধু বিশ্বাস ও গলদ আচার-পদ্ধতির বিরুদ্ধে। তারা (মুসলমানরা) যা কিছুই বলে,তার প্রতিটি কথা সহানুভূতি ও মানবিক ভাবধারায় পরিপূর্ণ। এতো যুদ্ধ-বিগ্রহ সত্ত্বেও তারা বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে সহানুভূতি সদাচরণের বেলায় কোনো ত্রুটি করে না।
এরূপ মেলামেশার ফলে ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের সন্দেহ ও আপত্তিগুলো সম্পর্কে সরাসরি আলোচনা করাও প্রচুর সুযোগ হলো। এতে করে ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমরা কতোখানি ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত ছিলো, তা তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারলো। মোটকথা, এই পরিস্থিতি এমনি এক আবহাওয়ার সৃষ্টি করলো যে, অমুসলিমদের হৃদয় স্বভাবতঃই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে লাগলো। এর ফলে সন্ধির-চুক্তির মাত্র দেড়-দুই বছরের মধ্যে এতো লোক ইসলাম গ্রহণ করলো যে, ইতঃপূর্বে কখনো তা ঘটেনি। এরই মধ্যে কুরাইশদের কতিপয় নামজাদা সর্দার ও যোদ্ধা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো এবং অমুসলিমদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে মুসলমানদের সঙ্গে হাত মিলালো।
হযরত খালিদ বিন্‌ অলিদ (রা) এবং হযরত আমর বিন্‌ আস (রা) এ সময়ই ইসলাম গ্রহণ করলেন। এর ফলে ইসলামের প্রভাব-বলয় এতোটা বিস্তৃত হলো এবং তার শক্তিও এতোটা প্রচণ্ড রূপ পরিগ্রহ করলো যে, পুরনো জাহিলিয়াত স্পষ্টত মৃত্যু-লক্ষণ দেখতে লাগলো। কাফির নেতৃবৃন্দ এই পরিস্থিতি অনুধাবণ করে অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে উঠলো। তারা স্পষ্টত বুঝতে পারলো, ইসলামের মুকাবিলায় তাদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তাই অনতিবিলম্বে সন্ধি-চুক্তি ভেঙে দেয়ার এবং এর ক্রমবর্ধমান সয়লাবকে প্রতিরোধ করার জন্যে আর একবার ইসলামী আন্দোলনের সাথে ভাগ্য পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ তারা খুঁজে পেলো না।
...খলিফা মনোনীত হওয়ার ইতিহাস...
হজরত ওমর (রা.) যখন ছুরিকাহত হয়ে মৃত্যুশয্যায়, তখন তাঁর কাছে পরবর্তী খলিফা মনোনয়নের দাবি উত্থাপিত হলে তিনি বলেন, তোমাদের সামনে এমন একটি দল রয়েছে, যাদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তাঁরা জান্নাতের অধিবাসী। তাঁরা হলেন হজরত আলী, ওসমান, আব্দুর রহমান, সাদ, জুবাইর ও তালহা। তাঁদের যেকোনো একজনকে খলিফা নির্বাচিত করতে হবে। হজরত ওমর (রা.)-এর মৃত্যুকালীন উপরিউক্ত উক্তি থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয়, আদর্শের মানদণ্ডে উন্নীত রাসুল (সা.)-এর জবানে জান্নাতের বাশারাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই খিলাফতের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী। অর্থাৎ উপরিউক্ত ব্যক্তিদের আয়ুষ্কাল পর্যন্তই 'খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়্যাহ' সীমাবদ্ধ।
হজরত ওমর (রা,) উলি্লখিত ছয়জনকে নিয়ে একটি বোর্ড গঠন করে তিন দিনের সময় বেঁধে দিয়ে বললেন, 'আমার মৃত্যুর পর তাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজেদের যেকোনো একজনকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে খলিফা মনোনীত করবেন।' হজরত ওমর (সা.)-এর ইন্তেকাল হলো। বোর্ড সদস্যরা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসলেন, তুমুল তর্ক-বিতর্ক, বাগ্বিতণ্ডা চলল। সময় গড়িয়ে দুই দিন পেরিয়ে গেল। মসজিদে নববি লোকে লোকারণ্য।
শেষদিনে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বললেন, 'আমি আমার খিলাফতের দাবি ত্যাগ করছি। এবার তোমরা তোমাদের মধ্যে যোগ্যতম ব্যক্তি নির্বাচনের দায়িত্ব আমাকে অর্পণ করতে পারো।' সবাই খলিফা নির্বাচনের ক্ষমতা আব্দুর রহমানকে অর্পণ করলেন। তিনি সম্ভ্রান্ত সবার সঙ্গে পরামর্শ করলেন। অতঃপর ওমর (রা.) কর্তৃক বেঁধে দেওয়া সময়ের শেষ দিনে ফজরের নামাজের পর মসজিদে নববিতে সমবেত মদিনাবাসীর উদ্দেশে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণের পর তিনি খলিফা হিসেবে হজরত ওসমান (রা.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন, অতঃপর সবাই। এভাবে মানবতাবাদী, ক্ষুধা-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সদাতৎপর, বিনয় ও ভদ্রতার অবতার হজরত ওসমান (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব লাভ করেন।
...খলিফা হিসেবে হযরত ওসমান (রাঃ)...
দ্বায়িত্ত গ্রহনের পরে হযরত উসমান (রাঃ) তা’লা পুরো রাজ্য জুড়ে বেশ ক’জন নির্দেশকারী তথা দূত নিযুক্ত করেছিলেন। তাদের দ্বায়িত্ব ছিলো হযরত উমর (রাঃ) এর প্রণয়নকৃত আইনসমূহ কে অধিষ্ঠান করা। উসমান (রাঃ) এর রাজত্ব বিস্তৃত করেছিলেন পশ্চিম থেকে পুরো মরোক্কো পর্যন্ত, পূর্ব দক্ষিন পূর্ব তথা বর্তমান পাকিস্তান পর্যন্ত এবং উত্তর আমেরিকা থেকে আজারবাইজান পর্যন্ত।।
উসমান (রাঃ) এর রাজত্বকালে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলামিক নৌবাহিনি গড়ে তুলেছিলেন। উনার রাজত্বকালে তিনি প্রশাসনিক বিভাগ সমূহ কে সংশোধন করেছিলেন এবং অনেক জন-প্রকল্প কে তিনি প্রসারন করেছিলেন, অনেক প্রকল্প কে সম্পূর্ন করেছিলেন নিজের রাজত্বকালেই।
উসমান(রাঃ) অনেক বিশিষ্ট সাহাবাদেরকে উনার নিজস্ব প্রতিনিধি হিসেবে, রাজত্বের অবস্থা, জনগনের সুযোগ সুবিধা, অসুবিধা, অবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, তার বাস্তবায়ন খতিয়ে দেখার লক্ষে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠাতেন। উসমান(রাঃ) বারো বছর যাবৎ খলিফা হিসেবে রাজত্ব করেছিলেন। এই রাজত্বকালের প্রথম ছয় বছর রাজ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করেছিলেন এবং তিনি খুব খলিফা রাসিদিন দের মধ্যে অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, পরবর্তী সময়ে তিনি রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।
ইসলাম ধর্মের সম্প্রসারনের ক্ষেত্রে উসমান (রাঃ) ছিলেন বিশেষভাবে প্রশংসিত। তিনিই সর্বপ্রথম সাহসিকতার সাথে ৬৫০সালে চীনে মুসলিম দূত পাঠিয়েছিলেন ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য। সা’দ ইবন আভি ওয়াক্কাস এর নেতৃত্তে দূতগন চীনের চাংঘান নগরী তে পৌঁছান ৬৫১ সালে এবং এই দীর্ঘ পথযাত্রায় উনারা দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়েছিলেন। চীনের হুই জনগন এই তারিখটিকেই চীনে ইসলাম এর আভির্ভাবের মূল তারিখ হিসেবে প্রতিষ্টা করেছিলেন। চীনের টাং রাজবংশ একটি ঐতিহাসিক আলোচনার আয়োজন করেছিলেন এবং দূতগন টাং নগরীর সম্রাট এর অতিথেয়তা গ্রহন করেছিলেন এবং তাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করেছিলেন।
যদিও সম্রাট নিজে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেননি কিন্তু তিনি সা’দ ইবন আভি ওয়াক্কাস সহ দূতগন দেরকে ইসলাম প্রচারের জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন। সম্রাট রাজধানীতে সর্বপ্রথম মসজিদ স্থাপন করার অনুমতি দিয়ে ইসলাম ধর্মকে সন্মান জানিয়েছিলেন। উসমান (রাঃ) তার রাজত্বকালে শ্রীলংকা তেও ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে দূত পাঠিয়েছিলেন।
...ওসমান (রাঃ) এর শাসনকালে উন্নয়ন...
বিপুল ধন-ঐশ্বর্যের মালিক হজরত ওসমান (রা.) মুসলিম জাহানের খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পরও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। হজরত হাসান (রা.) থেকে বর্ণিত_তিনি বলেন, হজরত ওসমান (রা.) মসজিদে নববিতে মাথার নিচে চাদর দিয়ে শুয়ে থাকতেন। মানুষ তাঁর পাশে এসে বসত। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। মনে হতো তিনি তাদেরই একজন। জুবাইর ইবনে আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন, 'হজরত ওসমান সারা বছর রোজা রাখতেন এবং সারা রাত নামাজ পড়তেন। রাতের প্রথমার্ধে একটু ঘুমাতেন।'
হজরত ওসমান (রা.) তাঁর শাসনামলের প্রথমদিকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভূত সাফল্য অর্জন করেন। তাঁর জনহিতকর কার্যাবলি সমাজের আদল পরিবর্তন করে দিয়েছিল। তিনি মদিনা শহর রক্ষাবাঁধ 'মাহরু' নির্মাণ করেন। খাল খনন করে কৃষিতে প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। পয়ঃপ্রণালী ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করে জনগণের অত্যন্ত প্রিয় খলিফায় পরিণত হন। মসজিদে নববির আধুনিকায়ন করেন তিনি। তাঁর সময় অর্থনৈতিক সচ্ছলতা মদিনার ঘরে ঘরে পেঁৗছে গিয়েছিল।
আগে জনগণকে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য খলিফার শরণাপন্ন হতে হতো। আর হজরত ওসমান (রা.)-এর সময় বাইতুল মালের সম্পদ খরচের জন্য রীতিমতো এলান করে গ্রাহক খোঁজা হতো। হজরত হাসান (রা.) বলেছেন, ওসমান (রা.)-এর ঘোষক ঘোষণা করত, হে লোক সব, সবাই এসে তোমাদের ভাতা নিয়ে যাও। লোকেরা দলে দলে এসে প্রচুর সম্পদ নিয়ে যেত। মানুষ দামি দামি পোশাক পরত। হজরত ওমর (রা.) ইসলামী খিলাফতের সম্প্রসারণে যে অভিযান শুরু করেছিলেন, হজরত ওসমান (রা.)-এর সুযোগ্য নেতৃত্বে তা এগিয়ে যেতে থাকে। তাঁর সময় ইসলামী খিলাফত-পূর্বে কাবুল ও বেলুচিস্তান এবং পশ্চিমে ত্রিপলী পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। তাঁর সময়ই প্রথম নৌবাহিনী গঠিত হয়। নৌ-অভিযানে সাইপ্রাস ও রোডস দ্বীপপুঞ্জ মুসলমানদের অধিকারে আসে। তাঁর সময়ই বাইজান্টাইন ও পারস্য শক্তির ঔদ্ধত্য সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হয়।
হজরত ওসমান (রা.) বিশ্ব মুসলিমের জন্য সব থেকে বড় যে অবদানটি রেখে গেছেন, তা হলো পবিত্র কোরআন সংকলন। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে কোরআন পাঠে ভিন্নতা লক্ষ করে একটি নির্ভুল সংস্করণ তৈরির উদ্যোগ নেন। একটি উপযুক্ত কমিটির তত্ত্বাবধানে হজরত হাফসার (রা.) কাছে সংরক্ষিত কোরআনের কপিকে মূল ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তা সম্পন্ন করে এর কপি মুসলিম সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং মানুষের কাছে থাকা কোরআনের বিচ্ছিন্ন অংশগুলো সংগ্রহ করে তা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
...আল-কুরআন সংকলনে অবদান...
কোন আয়াত বা সূরা নাযিলের পরপর সাহাবাদের মুখস্ত করতে ও লিখে রাখতে নির্দেশ দেয়া হত। এটা বলা ভুল যে হযরত ওসমান (রাঃ) কুরআন সংকলন করেছেন প্রকৃতপক্ষে রাসুল (সাঃ)-এর জীবিতকালে কুরআন সংকলন ও সংরক্ষিত হয়েছিল। যখন কোন আয়াত রাসুল (সাঃ) এর প্রতি নাযিল হতো তিনি অনতিবিলম্বে তা মুখস্ত করে নিতেন এবং সাহাবাদের শোনাতেন এবং তাদেঁর মুখস্ত করতে ও লিখে রাখতে নির্দেশ দিতেন,এবং তিনি সাহাবাদের পড়িয়ে শোনাতে বলতেন শুদ্ধতা যাচাই করতেন অর্থাৎ সাহাবীদের স্মরন শক্তি পরীক্ষা করে দেখতেন । তিনি সাহাবাদের সুরার ধারাবাহিকতা বলে রাখতেন ,যেমন-প্রথম যে সুরা নাযিল হয়েছে সুরা ইকরা যা পবিত্র কুরআনে ৯৬নং সূরা যা তিনি জীবরঈল (আঃ) এর মাধ্যমে জানতে পেরেছেন । বর্তমানে যে পর্যায় ক্রমিক সূরায় কুরআন সংকলিত আছে তার অনুরূপ ‘লাওহে মাহফুজে’ লিপিবদ্ধ রয়েছে। প্রতি রমজানে রাসুল (সাঃ) জীবরাঈল (আঃ) দ্বারা পুনরাবৃত্তি করতেন । তাঁর মৃত্যুকালীন বছরে রমজানের সময় তিনি দুবার পুনরাবৃত্তি করছিলেন।
কুরআন একত্রিকরন:
কুরআন সংরক্ষিত হয়েছিল বিভিন্ন আঙ্গিকে-গাছের বাকলে,চমড়ায় ,উটের সেডলে ,সমতল পাথরে,গাছের পাতায়। ১ম খলীফা আবু বকর (রাঃ) এর খিলাফত কালে ইয়ামামার যুদ্ধে বহু কুরআনে হাফেজ শহীদ হন। হযরত আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) সাহাবীগনের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে যয়িদ-বিন-সাবিদ(রাঃ)-কে কুরআন সংকলনের জন্য দায়িত্ব প্রদান করেন। সব সাহাবীদের একসাথে করে যয়িদ-বিন-সাবিদ (রাঃ) সব কুরআনের আয়াতকে একসাথে করেন। এরপর তা দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রাঃ) এর তত্তাবধানে আসলে তাঁর হাত হতে হযরত হাফসা (রাঃ) এর নিকট পৌঁছায়।
হযরত ওসমান (রাঃ) খিলাফতকাল:
তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (রাঃ)এর সময় ইসলাম যখন প্রসার লাভ করছিল । বিভিন্ন স্থানের মধ্যে উচ্চারনগত সমস্যা দেখা দেয়ায় তিনি বিভিন্ন দেশের কুরআন হাফেজ এবং সংকলকদেরকে ডেকে পাঠান ও হযরত হাফসা(রাঃ) এর নিকট হতে সংরক্ষিত কুরআন লিখে রাখতে বলেন ও তা সম্প্রচার করতে বলেন আর বাকী কুরআন তিনি পুড়িয়ে ফেলতে নির্দেশ দেন, কারন সব সাহাবীদের পক্ষে সমস্ত কুরআনের আয়াত সংরক্ষিত ছিলনা কারো কাছে ছিল ৫০০ আয়াত বা তার কম বা বেশি। পূর্বের কুরআনে হুবহু তুর্কির ফাত্তাকি যাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে ।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন , (সূরা হিজর-১৫,আয়াত-৯)
‘‘আমরা কুরআন অবতীর্ন করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষনকারী।’’
...দানশীলতা...
সমাজের ভুখা-নাঙ্গা মানুষের প্রতি হজরত ওসমান (রা.) ছিলেন সর্বদা দরাজহস্ত। একবার মদিনায় বড় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এমন সময় খবর এল ওসমানের (রা.) ব্যবসার এক হাজার উট বোঝাই খাদ্যশস্য আমদানির পথে। মদিনার ব্যবসায়ীরা এসে ওসমান (রা.)-এর বাড়িতে ভিড় জমান। তিনি তাঁদের সংরক্ষণাগারে নিয়ে গেলেন, যেখানে সারি সারি খাদ্যশস্যভর্তি বস্তা সাজানো ছিল।
তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা আমাকে কী লাভ দেবে?' তাঁরা বললেন, ১০ টাকা ক্রয় মূল্যের ওপর দুই টাকা। তিনি বললেন, 'আমি আরো বেশি লাভ পেতে পারি।' তাঁরা দাম বাড়াতে বাড়াতে ১০ টাকায় পাঁচ টাকা দিতে সম্মত হলো। হজরত ওসমান (রা.) বললেন, 'আমি দশে দশ লাভ পেতে পারি।'
অতঃপর তিনি ঘোষণা করলেন_'তোমরা সাক্ষী থাকো, আমি সব খাদ্যশস্য মদিনার অভাবি লোকদের সদকা করে দিলাম।' এভাবে সমাজের ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূর করতে তিনি তাঁর বিপুল ঐশ্বর্য অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন।
৬৩০ খ্রিস্টাব্দে হিরাক্লিয়াস মদিনার বিরুদ্ধে লক্ষাধিক সৈন্যের এক সুসজ্জিত বাহিনী প্রেরণ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য যুদ্ধ তহবিলে সামর্থ্যানুযায়ী সবাইকে দান করতে বলেন। হজরত ওসমান (রা.) সে সময় এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা, এক হাজার উট ও ৭০টি ঘোড়া সরবরাহ করেন।
রাসুল (সা.)-এর পরিবারের জন্যও তাঁর সম্পদ ছিল উন্মুক্ত। ঘৃণ্য দাসপ্রথা উচ্ছেদে তাঁর ভূমিকা ছিল সর্বাধিক। তিনি প্রতি জুমাবার একটি করে গোলাম অথবা বন্দি মুক্ত করে দিতেন। কারণবশত কোনো শুক্রবার না পারলে পরবর্তী শুক্রবারে দুটি দাস মুক্ত করে দিতেন।
...রাসুল (সঃ) এর বন্ধু...
আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে হজরত ওসমান (রা.)-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মানবতার কল্যাণে জীবন ও সম্পদ উৎসর্গকারী এ সাহাবি সম্পর্কে রাসুলে খোদা (সা.) বলেছেন, 'উসমান হলো তাঁদেরই একজন, যাঁরা আল্লাহ ও রাসুলকে বন্ধু ভাবেন এবং আল্লাহ ও রাসুল তাঁদের বন্ধু ভাবেন।'
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে নিজের মেয়ে হজরত খাদিজার (রা.) গর্ভজাত সন্তান রুকাইয়াকে ওসমান (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ দেন। হজরত রুকাইয়ার ইন্তেকাল হলে তাঁর সহোদরা উম্মে কুলসুমকে হজরত ওসমান (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। রাসুল (সা.)-এর দুই মেয়েকে বিয়ের কারণে তাঁকে 'জিননুরাইন' বলা হয়। উম্মে কুলসুমের ইন্তেকালের পর রাসুল (সা.) বলেন, 'আমার যদি আরো একটি মেয়ে থাকত, তাহলে তাকেও আমি ওসমানের সঙ্গে বিয়ে দিতাম।' তিনি রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে পীড়িত স্ত্রী রুকাইয়ার সেবায় মদিনায় অবস্থানের কারণে একমাত্র বদর ছাড়া সব যুদ্ধেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে অংশ নেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে একাধিকবার জান্নাতের শুভ সংবাদ দিয়েছেন। রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, 'প্রত্যেক নবীরই বন্ধু থাকে, জান্নাতে আমার বন্ধু হবে ওসমান।' তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর কাতেবে ওহি দলের অন্যতম।
...মৃত্যুর পূর্বের পেক্ষাপট ও মৃত্যু...
হজরত ওসমান (রা.) খিলাফতের মসনদে আসীন হয়েই বড় ধরনের এক সমস্যার সম্মুখীন হন। 'উবায়দুল্লাহ ইবনে উমার' হজরত ফারুকে আজমের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে কয়েকজন নাসারা ও মুনাফিক প্রকৃতির মুসলমানকে হত্যা করেন। বিষয়টি খলিফার সামনে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার পূর্বাভাস হিসেবে আবির্ভূত হলো।
হজরত ওসমান (রা.) নিজের সম্পদ থেকে নিহতদের ওয়ারিশদের রক্তপণ দেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করলেন। ফলে মুসলমানদের ভেতরের সব বিভেদের অবসান হয়। হজরত ওসমান (রা.) অত্যন্ত জনপ্রিয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যেতে লাগলেন। কিন্তু খলিফার সরলতা, সহিষ্ণুতা ও উদারতার সুযোগে স্বার্থান্বেষী চক্র হজরত ওসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে।
বনি হাশিম ও বনি উমাইয়ার বিরোধ, কোরাইশ-অকুরাইশ দ্বন্দ্ব, মুহাজির-আনসার সম্প্রীতি বিনষ্ট, ইবনে সাবরে অপপ্রচার, অমুসলিমদের বিদ্বেষ ইত্যাদি কারণে মুসলিম সাম্রাজ্যে এক চরম সংঘাতময় অবস্থার সৃষ্টি হলো। খিলাফতের অষ্টম বছরে এসে হজরত ওসমান (রা.) স্বজনপ্রীতি, কোরআন দগ্ধীকরণ, চারণভূমির রক্ষণাবেক্ষণ, আবুজর গিফারির নির্বাসন, বাইতুল মালের অর্থ অপচয় ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বিরুদ্ধবাদীদের চরম বিরোধিতা ও বিদ্রোহের সম্মুখীন হন।
হজরত আলী (রা.)-এর সমর্থকদের অপপ্রচার বিদ্রোহের আগুনে ইন্ধন হিসেবে কাজ করে। অথচ খলিফার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগই ছিল মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও অবাস্তব। হাম্মাদ ইবনে সালামা বর্ণনা করেন, 'ওসমান (রা.) যেদিন খলিফা নির্বাচিত হন, সেদিন তিনি সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন। আর যখন তাঁকে লোকেরা হত্যা করল, তিনি সেদিন থেকেও উত্তম ছিলেন যেদিন তাঁকে খলিফা বানানো হয়েছিল।' রাসুলুল্লাহ (সা.) বলে গেছেন, 'আল্লাহ পাকের হিকমতানুসারে জিননুরাইনের ওপর মতানৈক্য দেখা দেবে এবং লোকেরা তাঁকে শহীদ করবে। অথচ তিনি তখন হকের ওপরই থাকবেন এবং তাঁর বিরোধীরা থাকবে বাতিলের ওপর।'
শেষ পর্যন্ত মিসর, বসরা ও কুফার বিদ্রোহী গোষ্ঠী একাট্টা হয়ে ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় সমবেত হয়ে খলিফার পদত্যাগ দাবি করে। হজ উপলক্ষে অধিকাংশ মদিনাবাসী মক্কা গমন করায় তারা এ সময়কেই মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। খলিফা পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে তারা হত্যার হুমকি দিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে। হজরত ওসমান (রা.) রক্তপাতের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। বিশাল মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে মুষ্টিমেয় বিদ্রোহীর কঠোর শাস্তিদানের পরিবর্তে তিনি তাদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে থাকলেন। হজরত আলী, তালহা ও জুবাইর (রা.)-এর ছেলেদের দ্বারা গঠিত ১৮ নিরাপত্তারক্ষী বিপথগামী বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় ব্যর্থ হন। অবশেষে তারা ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন হিজরি ৩৫ সনের ১৮ জিলহজ্জ শুক্রবার আসরের নামাজের পর ৮২ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ খলিফাকে অত্যন্ত বর্বরভাবে হত্যা করে। তিনি ১২ দিন কম ১২ বছর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। জুুবাইর ইবনে মুতইম (রা.) তাঁর জানাজায় ইমামতি করেন। জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়।
হজরত ওসমান (রা.)-এর হত্যাকাণ্ডের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। ওয়েল হাউসেন বলেন, 'ইহার ফলে গৃহযুদ্ধের যে কপাট খুলিয়া যায়, তাহা আর কখনো বন্ধ হয় নাই।'

উচ্চশিক্ষার নিম্ন যাত্রা! by সোহরাব হাসান

উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনটি নামকরা সংস্থার তিনটি প্রতিবেদন। যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) শিক্ষার মান, গবেষণাসহ বিভিন্ন মানদণ্ডে ২০১৫ সালে এশিয়ার যে ১০০টি মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে, তার কোথাও বাংলাদেশের নাম নেই। এ তালিকায় জাপান ও চীনের প্রাধান্য রয়েছে। সেই সঙ্গে ভারতের নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ও জায়গা করে নিতে পেরেছে। সাংহাইভিত্তিক একাডেমিক র্যাঙ্কিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি (এআরডব্লিউইউ) ২০১৩ সালে বিশ্বের ৫০০টি মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা দিয়েছে, তাতেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ঠাঁই পায়নি। এটি এশিয়ার টিএইচই নামে পরিচিত। একই সময়ে কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি নামে আরেকটি সংস্থা ৩০০ এশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মানক্রম করেছে, তাতে বাংলাদেশের একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঠাঁই পেয়েছে। অথচ এই তালিকায় ভারতের ১১টি ও পাকিস্তানের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। আর শীর্ষ ১০০-এর মধ্যে চীনেরই আছে ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা পাকিস্তানেরও নিচে নেমে গেলাম!
একটি দেশ কখন বড় হয়? যখন দেশটি শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে যায়। একটি দেশ কখন শিক্ষায় এগিয়ে যায়? যখন সেই শিক্ষা যুগের চাহিদা মেটায়, অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করে এবং মানবিকবোধের বিকাশ ঘটায়। সেই শিক্ষা নতুন নতুন আবিষ্কার করে, প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটায় এবং তৈরি করে একটি সুদক্ষ ও সংস্কৃতিমনস্ক জনগোষ্ঠী। এর কোনো বিচারেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উত্তীর্ণ হয় না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে কেরানি বানানো কিংবা পাকিস্তান আমলে বশংবদ আমলা তৈরির যে শিক্ষা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে তারই অন্ধ ও অক্ষম অনুকরণ চলছে। আমরা একের পর এক শিক্ষানীতি করেছি, কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের জন্য যে নিষ্ঠা ও অনুশীলন দরকার, সেটি করতে আমরা প্রস্তুত নই। অন্যান্য বিষয়ের মতো শিক্ষা-সমস্যারও শর্টকাট সমাধান খুঁজছি।
ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শিক্ষাকে বলা হয় ভবিষ্যতের বিনিয়োগ, যার প্রতি আমরা অমার্জনীয় অবহেলা ও উদাসীনতা দেখিয়ে এসেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রম, বিষয় যে দুনিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, তিনটি সংস্থার জরিপই তার প্রমাণ।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। পাকিস্তান আমলে হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় দেশ-বিদেশের মেধাবীদের আকৃষ্ট করলেও এখন করতে পারছে না। মেধাবী শিক্ষার্থীদের একাংশ পাঠ শেষ হওয়ার আগেই বিদেশে পাড়ি জমায়, আরেক অংশ পাঠ শেষ করে। আবার কেউ বিদেশ থেকে ফিরে এলেও দলীয় ও গোষ্ঠী রাজনীতির কারণে থাকতে পারেন না। কেন এমনটি হলো? একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ছিল বিশ্বব্যাপী। কিন্তু এই দুটো প্রতিষ্ঠানের বর্তমান হাল কী? সেখানে গবেষণায় কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে? একই কথা প্রযোজ্য চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ প্রথম প্রজন্মের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কেও। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, শিক্ষক-প্রশাসনসহ ক্যাম্পাসের গাছপালাকে দিয়েও তাদের বন্দনা গাওয়ানো হয়। তাহলে মেধাবীরা কেন থাকবেন?
বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চার জায়গা। এখানে যুক্তি, তর্ক ও গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন কিছু বেরিয়ে আসবে। বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে স্বপ্ন দেখাবে, পথের দিশা দেবে। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয় রাজনীতির চর্চায় যতটা সক্রিয়, জ্ঞানচর্চায় ততটা উদাসীন। এখানে ছাত্ররাজনীতির নামে হল দখল, ক্যাম্পাস দখলের মহড়া চলে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্ররাজনীতির কারণে কলুষিত ছিল। এখন শিক্ষকদের মধ্যেও সেই রাজনীতি ঢুকে গেছে। আগের আমলে ১০০ অমেধাবীকে জায়গা দিলে পরের আমলে ২০০ অমেধাবীকে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ঢোকানো হয়। এখানে গবেষণার জন্য কোনো তহবিল থাকে না; অথচ বিপুল অর্থ ব্যয় করে নতুন নতুন বিভাগ খোলা হচ্ছে। কেন এসব বিভাগ, উত্তর নেই।
আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কথা বলছি, অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো রয়ে গেছে অ্যানালগ পদ্ধতিতে। স্বাধীনতার পর শিক্ষা নিয়ে আমরা একের পর এক পরীক্ষা করে চলেছি। কিন্তু আসল যে পরীক্ষা, অভিন্ন ধারার একটি শিক্ষাব্যবস্থা, তা গড়ে তুলতে পারিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার প্রসার হয়তো ঘটছে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও হয়তো গড়ে উঠেছে, কিন্তু আমরা মান ধরে রাখতে পারিনি। আমরা পরীক্ষায় পাসের হার বাড়িয়েছি; কিন্তু একটি সম্পন্ন শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি।
২...
ঢাকা শহরের নিউমার্কেট-ধানমন্ডি এলাকায় দুটি পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারি ঢাকা কলেজ ও বেসরকারি ঢাকা সিটি কলেজ। দুটোই রাজধানীর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকের পর দুটোতেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা দেওয়া হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে।
কিন্তু সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এই মর্মে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সব সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো না কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যাবে এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই থাকবে।
এই যে সরকারি ও বেসরকারি ভাগাভাগি, সেটি কিসের ভিত্তিতে হচ্ছে? সরকার কি ধরে নিচ্ছে, সব সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো লেখাপড়া হচ্ছে, সুতরাং সেগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাওয়াই উচিত। আর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান যেহেতু খারাপ, সেহেতু সেগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রেখে দেওয়াই শ্রেয়। সরকারের এই চিন্তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি পুরোনো ও জটিল সমস্যার অতি সরলীকরণ সমাধান বলেই ধারণা করি। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা হয়তো মনে করছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতীত দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ঠিকমতো চলছে। অতএব, তাদের ওপর আরও দায়িত্ব চাপানো হোক। কিন্তু বাস্তবতা হলো কোনোটাই ঠিকমতো চলছে না।
১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল সময়ের প্রয়োজনে। যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কলেজ পর্যায়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে পারছিল না, তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টি দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে। এখানে দলীয় লোকদের বসানো হয়, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন বা মান ধরে রাখার চেয়ে দলবাজিতে ব্যস্ত ছিলেন। খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় শাসনামলে একজন উপাচার্য প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় নানা কেলেঙ্কারি ঘটান। তিনি নতুন নতুন পদ সৃষ্টি করে অপ্রয়োজনীয় লোক নিয়োগ করতে থাকেন। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও তারা ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির খুব উন্নতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। একদা বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষমতার হাতবদলের সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামীপন্থী হয়ে যান। কিন্তু যাঁদের জন্য এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেই লাখ লাখ শিক্ষার্থীর সুবিধা-অসুবিধার কথা কেউ ভাবেননি। একসময় তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মানে তো প্রশ্নপত্র ফাঁস, উত্তরপত্র গায়েব ও অমেধাবী লোকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। তিন বছরের স্নাতক কোর্স কিংবা চার বছরের স্নাতক সম্মান কোর্স শেষ হতে যথাক্রমে পাঁচ ও ছয় বছর লেগে যেত। পরীক্ষা চলত বছরজুড়ে। বর্তমান উপাচার্য সেশনজট কমাতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিলেও পরিস্থিতির খুব উন্নতি হয়নি। এখনো দেড় থেকে দুই বছরের সেশনজট চলছে। অতটা প্রকট না হলেও এই সমস্যা সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই কমবেশি আছে। সময়মতো ভর্তি, সময়মতো কোর্স শেষ করতে পারছে না কেউই।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের অনুধাবন করতে হবে যে উচ্চশিক্ষার সমস্যাটি বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকা না-থাকার নয়। সমস্যাটি হলো মানের, গুণের, মেধার, চিন্তার, যা শিক্ষার কোনো স্তরেই নিশ্চিত করা যায়নি। আমরা উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছি। কিন্তু তাঁরা কী শিক্ষা পেলেন, এই শিক্ষা নিয়ে কর্মজীবনে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন কি না, সেসব বিষয়ে চিন্তাভাবনা আগেও ছিল না, এখনো নেই। একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর কোর্স খোলা হয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ করা হয়নি। এ সমস্যা বেসরকারি-সরকারি দুটোতেই সমভাবে আছে। শিক্ষার মানের ক্রমাবনতির কারণ মেধাবী শিক্ষকের অভাব। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ নেই। ঠিকমতো ক্লাস-পরীক্ষাও হয় না। এ অবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি ভাগ করে তাৎক্ষণিক সমাধান খোঁজা তুঘলকি সিদ্ধান্ত বলেই মনে হয়। আমাদের পূর্বাপর সরকারগুলো শিক্ষানীতি, ইতিহাসের অদলবদল, পাসের হার, সৃজনশীল প্রশ্ন ইত্যাদি নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও শিক্ষার মানের প্রতি কখনোই মনোযোগ দেয়নি।
বর্তমানে উচ্চশিক্ষা (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর) পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখের মতো; যার মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই প্রায় ২১ লাখ। এই ২১ লাখের মধ্যে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আছে সাত লাখ। সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সাত লাখ শিক্ষার্থী একদিকে থাকবেন, ১৪ লাখ অন্যদিকে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি সরকারি কলেজের তুলনায় তো বটেই, খোদ ঢাকা কলেজও ফলাফলে ঢাকা সিটি কলেজ থেকে পিছিয়ে আছে। একইভাবে ঢাকা নটর ডেম কলেজের কথা চিন্তা করুন। সরকারের এই প্রস্তাব কার্যকর হলে সেটিও যাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে, আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজটি সরকারি হওয়ার কারণে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এখন সবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির অবকাঠামো, লোকবল, শিক্ষার্থী, শিক্ষকের সংখ্যা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু কারও মাথাব্যথার অর্থ এই নয় যে মাথা কেটে ফেলতে হবে।
সরকার যখন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপাতে চাইছে, তখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কী? কোনোটিতে উপাচার্য অপসারণের জন্য আন্দোলন চলছে, কোনোটিতে উপাচার্য-সহ-উপাচার্য দ্বন্দ্ব চরমে, কোনোটিতে ছাত্রলীগ নিজেদের মারামারিতে লিপ্ত কিংবা কোনোটিতে প্রশাসন নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। অতএব, তাদের ওপর বাড়তি দায় চাপানো কতটা সমীচীন হবে, তা আরও একবার ভেবে দেখুন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
hsohrab55@gmail.com

মায়া কোন কর্তৃত্ববলে মন্ত্রী, রুলের নির্দেশনা চেয়ে রিট

ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া কোন কর্তৃত্ববলে এখনো মন্ত্রী ও সাংসদ পদে আছেন, তা জানতে চেয়ে রুলের আরজি জানিয়ে রিট আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. ইউনূস আলী আকন্দ।
আজ মঙ্গলবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় তিনি এই রিট আবেদনটি জমা দেন। ইউনূস আলী আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, রিট আবেদনে একইসঙ্গে তাঁর মন্ত্রী ও সাংসদপদে কার্যক্রমের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে।
রিট আবেদনের বিবাদী হলেন ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
গত ৩০ জুন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াকে আইনি নোটিশ পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. ইউনূস আলী আকন্দ। নোটিশে তিনি জানতে চান, দুর্নীতির মামলা থেকে খালাসের রায় সর্বোচ্চ আদালতে বাতিল হওয়ার পর কোন কর্তৃত্ববলে মায়া এখনো মন্ত্রী ও সাংসদ পদে রয়েছেন। ওই দিন ইউনূস আলী আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, রেজিস্টার্ড ডাকযোগে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের ঠিকানায় আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নোটিশের জবাব না পেলে এ বিষয়ে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করবেন।
জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপন করার দায়ে ২০০৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মায়াকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫। ২০০৯ সালে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন মায়া। ২০১০ সালের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট তাঁকে খালাস দেন। পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ১৪ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেওয়া খালাসের রায় বাতিল করে নতুন করে পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন।
আপিল বিভাগের এ রায়ের পর মায়ার মন্ত্রী ও সাংসদ পদে থাকা সমীচীন নয় বলে মন্তব্য করেন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তিনি বলেন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য পদে থাকা সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি নৈতিকতার স্খলনজনিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং আপিলে এখনো তিনি নির্দোষ সাব্যস্ত হননি। অন্যদিকে মায়ার আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার বলছেন, মামলাটি এখনো আপিলে রয়েছে ও বিচারাধীন। সংবিধানে যা বলা আছে, তা চূড়ান্ত রায়ের পর প্রযোজ্য হবে। মায়ার মন্ত্রিত্ব ও সাংসদ পদ নিয়ে এই বিতর্কের মুখে তাঁকে আইনি নোটিশ পাঠান ইউনূস আলী আকন্দ। পরে আজ তিনি রিট আবেদন করেন।

শেখ হাসিনা যা বলেছেন, যা বলেননি by সোহরাব হাসান

বিবিসি ওয়ার্ল্ডে সাক্ষাৎ​কার দিচ্ছেন শেখ হাসিনা
আমাদের নেতা-নেত্রীরা খুব একটা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন না। তাঁরা একতরফা বলতে ভালোবাসেন। আবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও বাংলাদেশের নেতা-নেত্রীদের মুখোমুখি হওয়ার তাগিদ তেমন দেখা যায় না। সেদিক থেকে বিবিসি ওয়ার্ল্ডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বের দাবি রাখে। এখন দেখার বিষয় এই সাক্ষাৎকারে তাঁর দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা তথা বাস্তবতার কতটা অ-মিল বা বে-মিল আছে।
সাক্ষাৎকারের একটি বড় অংশ ছিল জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তাঁর সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা। সেই অনুষঙ্গে এসেছে বাল্যবিবাহ বা মেয়েদের বিয়ের বয়স নিয়ে সরকারের স্ববিরোধী অবস্থান। এসেছে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অগ্রবর্তী অবস্থান, রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা, ইসলামি জঙ্গিদের হাতে মুক্তচিন্তার কয়েকজন লেখক-ব্লগারের খুন হওয়ার ঘটনা। বাদ যায়নি সম্প্রতি ঢাকা সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্তব্য কিংবা প্রধানমন্ত্রীর ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিকের হাউস অব কমন্সের সদস্য নির্বাচিত হওয়া।
জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের সাফল্য ও কৃতিত্ব বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের আগেই আওয়ামী লীগের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী তাঁরা অনেক বিষয়ে কাজ করেছেন, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানিসহ আটটি কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও ২০০১-২০০৮ সালে দেশ পিছু হটতে শুরু করে, অনেক কর্মসূচি বিএনপি সরকার বন্ধ করে দেয়। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সামাজিক খাতে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তাঁর এই দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন না করেও যে কথাটি বলা প্রয়োজন তা হলো, সামাজিক উন্নয়ন খাতের সাফল্যের পেছনে পূর্বাপর সব সরকারেরই কমবেশি ভূমিকা আছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের বড় কোনো কর্মসূচি বিএনপি বন্ধ করেছে বলে জানা নেই। বরং প্রধানমন্ত্রী মেয়েদের শিক্ষার প্রসার নিয়ে যে কৃতিত্ব দাবি করেছেন, তার সূচনাটি হয়েছিল খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে। সেই সময়ই মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের জন্য বৃত্তি চালু হয়। পরবর্তীকালে সেটি উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে উন্নীত হয়। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যে দুস্থ নারী ও বৃদ্ধ ভাতা চালু করা হয়, খালেদা জিয়ার সরকারও সেটি বহাল রাখে।
বাংলাদেশে এখন ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এ অবস্থায় কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও অধিকসংখ্যক নারীর শিক্ষা গ্রহণ করার তাগিদ বোধ করছেন কি না—বিবিসির সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বাহাত্তরের সংবিধানে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার কথা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিশুর ভর্তি, বিনা বেতনে মেয়েদের শিক্ষা, সবাইকে বিনা মূল্যে বই দেওয়া, বিদ্যালয়ে খাবার ও গরিব বাবা–মাকে নগদ অর্থ দেওয়া এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বৃত্তি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
এসব কার্যক্রম সত্ত্বেও এক-তৃতীয়াংশ মেয়েশিশুর ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ার তথ্যটি কিসের ইঙ্গিত—এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মেয়েরা এখন বিদ্যালয়ে, কলেজে যাচ্ছে। তারা লেখাপড়ায় থাকলে আপনাতেই বাল্যবিবাহ কমে যাবে। তাদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা হচ্ছে, কেউ মেয়েদের নাজেহাল করলে আইন অনুযায়ী তার বিচার হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মেয়েদের সুযোগ দিলে ও পরিবেশ নিশ্চিত হলে বাবা-মা ভাববেন, বিয়েটাই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। মেয়েরা এখন অর্থ উপার্জন করতে পারে, তারা পরিবারকে সহায়তা করতে পারে, তারা অনেক কিছু করতে পারে। পাঁচ হাজারেরও বেশি তথ্যসেবাকেন্দ্রে ছেলেরা ও মেয়েরা কাজ করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। কিন্তু এত সব সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ-আয়োজন সত্ত্বেও এক-তৃতীয়াংশ মেয়ের ১৫ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি উদ্বেগজনক।
তাহলে কি সরকারের, বেসরকারি সংস্থাগুলোর কোনো কর্মসূচি এই এক-তৃতীয়াংশের কাছে পৌঁছায় না? তারা কি প্রদীপের নিচে অন্ধকার হয়েই থাকবে? প্রধানমন্ত্রী বলছেন, শতভাগ শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর কি তাদের সবাই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে? তা যে পারছে না তার প্রমাণ সাক্ষরতার হার আমরা ৫৭ শতাংশের ওপরে নিতে পারেনি। শ্রীলঙ্কায় এই হার ৯২, ভারতে ৬১ ও মিয়ানমারে ৯৩ শতাংশ। সমাজের এক-তৃতীয়াংশ মেয়ের ১৫ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যাওয়ার অর্থ তাদের পড়াশোনা, সংসারের বাইরে গিয়ে কাজকর্ম সবই বন্ধ হয়ে যাওয়া। অল্প বয়সে মা হলে প্রসূতি ও সন্তান দুজনই অপুষ্টি ও নানা রোগে ভোগে।
মেয়েদের বিয়ের বয়স নিয়ে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী প্রায় সবটাতেই স্ববিরোধী উত্তর দিয়েছেন। একবার বলেছেন, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছরই থাকবে। আবার বলেছেন, এ ব্যাপারে ইংল্যান্ডের আইন অনুসরণ করা হবে। ইংল্যান্ডে ১৬ বছর স্বীকৃত। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি হলো, যদি কোনো দুর্ঘটনা হয়, অর্থাৎ ১৮ বছরের আগেই কোনো মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে, তাহলে বাবা-মায়ের সম্মতিতে তাকে বিয়ে দেওয়া যাবে। বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ডের সামাজিক অবস্থান এক নয়। সেখানে শতভাগ ছেলেমেয়ে লেখাপড়ার সুযোগ পায়; বিয়ের ব্যাপারেও নিজেরা সিদ্ধান্ত নেয়। আর বাংলাদেশে এখনো সব শিশু পড়াশোনার সুযোগ পায় না, অধিকাংশের বিয়ে হয় পারিবারিক উদ্যোগে। সবার জন্মনিবন্ধনও করা হয় না। আইনে ১৮ বছর থাকলেও অনেক অভিভাবক বয়স বাড়িয়ে দেখিয়ে ১৬ বছরেও মেয়ের বিয়ে দেন। আইন শিথিল করে সেটি ১৬ বছরে নামিয়ে আনলে ১৪ বছরের মেয়েকেও বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হবে ১৬ বছর দেখিয়ে।
বিবিসির প্রশ্ন ছিল, তাহলে কি আপনারা বিয়ের বয়স ১৮ থেকে নামিয়ে ১৬ বছর করার কথা ভাবছেন? প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘না। আপনি আমাকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করছেন।’ এরপর তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়, যদি ১৬ বা ১৭ বছর বয়সে কোনো মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে, সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশে তো অবৈধ শিশুকে গ্রহণ করা হয় না। অতএব, আপনাকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
পদক্ষেপ নেওয়ার অর্থ কোনোভাবেই বিয়ের বয়স কমানো নয়। পদক্ষেপ হলো প্রতিটি মেয়ের অন্তত উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। পদক্ষেপ হলো লেখাপড়ার পর সব মেয়ে যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে, সে জন্য তাদের কাজের ব্যবস্থা করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এ কারণেই এটি আইন অনুযায়ী ১৮ বছরই থাকবে। কিন্তু আইনটি শিথিল করতে হবে।
বিবিসি সাংবাদিক জানতে চান, বাল্যবিবাহের ব্যাপারেই শিথিলতা জরুরি কি না? প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি সামাজিক দাবি। গার্ল সামিটে শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে বিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করার ওয়াদা করেছেন। সেই ওয়াদা পূরণের উপায় হিসেবে বিয়ের বয়স কমানো হবে আত্মঘাতী। বিয়ের বয়স কমিয়ে উন্নয়নের সূচক বাড়ানো যায় নাবরং আর্থসামাজিক ও শিক্ষার পরিবেশটি এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো অভিভাবক ১৫ বছরের নিচে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তাই করবেন না। প্রধানমন্ত্রী সেই পথে না গিয়ে উল্টো সমাধান খুঁজছেন। তিনি ‘দুর্ঘটনার’ কথা বলেছেন। কিন্তু ‘দুর্ঘটনা’ দিয়ে তো আইন হয় না। আইন হয় আর্থসামাজিক বাস্তবতার আলোকে।
দুর্নীতির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সাবেক সামরিক সরকারগুলোর ওপর দোষ চাপিয়েছেন। তাঁর সরকারের আমলে দুর্নীতি কমেছে বলে দাবি করেছেন। কোথায় কমেছে? হল–মার্ক, বেসিক ব্যাংকের মতো ঘটনা কি আগের কোনো সরকারের আমলে হয়েছে? তাঁর দাবি, দেশে ব্যাপক দুর্নীতি থাকলে জিডিপি ৬ শতাংশ হতে পারত না। চীন, রাশিয়াসহ অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের জিডিপি আরও অনেক বেশি। অতএব, প্রধানমন্ত্রীর এই যুক্তিও টেকে না।
তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে আপনার বাবা (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখনো বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা আছে কি না?
প্রধানমন্ত্রীর জবাব, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। ১৯৭৫ সালে আমার বাবাকে হত্যা করে যখন সামরিক শাসকেরা ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন তাঁরা সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা মুছে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে তিনি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সামরিক শাসকদের প্রবর্তিত পঞ্চম সংশোধনী ও অষ্টম সংশোধনীর সংশ্লিষ্ট ধারা কেন বাতিল করলেন না? তিনি যেই দুই সামরিক শাসকের কঠোর সমালোচনা করেছেন, তাদের মধ্যে নিকৃষ্টজনকে নিয়েই তো এখন দেশ শাসন করছেন আওয়ামী লীগ। তাঁর প্রবর্তিত রাষ্ট্রধর্ম রেখে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা হয় না।
এরপর ইসলামি জঙ্গিদের, বিশেষ করে যারা হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি তাদের উৎসাহিত করেছে। তাদের শাসনামলে এই জঙ্গিদের ব্যবহার করে আমাদের দলের দুই হাজারেও বেশি নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে। তাদের হাতে দুজন সাংসদ খুন হয়েছেন। আমার ওপরও হামলা হয়েছে। আমরা সরকার গঠনের পর জঙ্গিবাদ বা যেকোনো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করি। আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। দেশে এখন একটি বা দুটি ঘটনা ঘটেছে এবং আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি, তাদের গ্রেপ্তার করেছি এবং জেলে ঢুকিয়েছি। আমরা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হতে দেব না।’ যেসব বিশিষ্ট নাগরিককে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে, তাঁদের উপযুক্ত নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি হুমকিদাতাদের খুঁজে বের করার কথাও বলেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী যখন জঙ্গি দমনে তাঁর সরকারের সাফল্য বয়ান করছেন, তখন বাস্তব অবস্থা হলো নিহত তিন লেখক–ব্লগার অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান ও অনন্ত বিজয় দাসের খুনিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওয়াশিকুরের ঘটনায় দুই খুনিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা ধরিয়ে দিলেও তার নেপথ্যে কারা আছে, সরকার তাও খুঁজে বের করতে পারেনি। অনেকেই এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জঙ্গিদের তালিকাভুক্ত ৮৫ জনের একজন অনন্য আজাদ, যাঁর বাবা প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আজাদও এক দশক আগে জঙ্গিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, ডিপ্লোম্যাট পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, ‘জীবন বাঁচাতে আমি দেশ ত্যাগ করছি। আমার কাছে দুটি বিকল্প আছে। বিদেশে নির্বাসন অথবা নিহত হওয়া। আমি প্রথমটি বেছে নিতে যাচ্ছি। কিন্তু আমি আমার লেখালেখি বন্ধ করতে পারব না।’
মুক্তবুদ্ধির একজন তরুণের এই অসহায়ত্ব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী কি বলবেন? অনন্য আজাদের মতো আরও যঁারা হত্যার হমকি মাথায় নিয়ে আছেন, তাঁদের সম্পর্কে রাষ্ট্রের কি কিছুই করুণীয় নেই?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

‘পলাতক’ সাংসদ সংসদে, হাজিরা খাতায় সই

আমানুর রহমান খান
টাঙ্গাইল-৪ (ঘাটাইল) আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ আমানুর রহমান খান (রানা) পুলিশের কাছে পলাতক। টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশ তাঁকে খুঁজছে। তাঁকে ধরতে টাঙ্গাইল ও ঢাকায় পুলিশ কয়েক দফা অভিযান চালায় বলে দাবিও করেছিল।
‘পলাতক’ এই সাংসদ গত রোববার সংসদে হাজির হয়ে সদস্যপদ রক্ষার জন্য হাজিরা খাতায় সই করে চলে যান। সংসদে হাজির হওয়ার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সাংসদ আমানুরের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ঘনিষ্ঠ এক আওয়ামী লীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সম্প্রতি উচ্চ আদালতে সাংসদ আমানুর একটি আবেদন করেন। সেখানে তিনি ‘পুলিশি হয়রানি’ থেকে রক্ষা পেতে আদালতের আদেশ চেয়েছিলেন। কিন্তু আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হতে পারেন, এ আশঙ্কায় আর যাননি।
সংসদ সচিবালয় থেকে জানা গছে, আমানুর টানা ৬৫ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিত ছিলেন। আইন অনুযায়ী টানা ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়।
জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের হুইপ আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গত রোববার সাংসদ আমানুরের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। তিনি বলেন, পুলিশের কাছে পলাতক হলেও তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার কাজ সংসদ করবে এমনটা নয়। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে যদি আগেই বিষয়টি সংসদকে জানানো হতো বা স্পিকারের দৃষ্টিতে আনা হতো, তাহলে স্পিকার এ ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণ করতে পারতেন।
টাঙ্গাইলের প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। এ হত্যা ঘটনার সঙ্গে সাংসদ আমানুর সরাসরি জড়িত বলে তারা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে। হত্যাকাণ্ডের সময় সাংসদ ও তাঁর ভাই পৌর মেয়র সহিদুর রহমান খান (মুক্তি) উপস্থিত ছিলেন বলে আসামিরা জানিয়েছে। এ ছাড়া হত্যার পরিকল্পনায় আমানুরের আরও দুই ভাই টাঙ্গাইলের ব্যবসায়ী নেতা জাহিদুর রহমান খান (কাকন) ও সানিয়াত খান (বাপ্পা) যুক্ত ছিলেন বলে আসামিরা উল্লেখ করেছে। এই স্বীকারোক্তির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে চার ভাই পলাতক। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে আমানুরকে আর সংসদে দেখা যায়নি।
টাঙ্গাইল পুলিশের একটি সূত্র বলেছে, আমানুর ও তাঁর ভাই সহিদুল ঢাকায় আছেন বলে তারা জেনেছে। তবে ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করছেন, এ জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেও তাঁদের ধরা যায়নি। তবে অপর দুই ভাই জাহিদুর ও সানিয়াত সম্ভবত দেশে নেই।
ফারুক হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও টাঙ্গাইল গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গত সোমবার সাংসদ আমানুর উচ্চ আদালতে যাচ্ছেন, এমন খবরের ভিত্তিতে তাঁরা হাইকোর্ট এলাকায় নজরদারি বাড়ান। সম্ভবত পুলিশের উপস্থিতি টের পাওয়ায় আমানুর আর আদালতে যাননি।

ছাত্রলীগের গাড়ি ভাঙচুর: রেস্তোরাঁয় ‘ফাউ’ খেতে গিয়ে পিটুনি

‘ফাউ’ খেতে গিয়ে গতকাল মারধরের শিকার হন তিতুমীর
কলেজের ছাত্রলীগের দুই কর্মী। এর জের ধরে তাঁদের তাণ্ডব
প্রতিরোধে রাস্তায় নামেন ব্যবসায়ীরা। কলেজের
সামনে পুলিশি পাহারা (ইনসেটে) l ছবি: প্রথম আলো
রেস্তোরাঁয় ‘ফাউ’ খেয়ে মারধরের শিকার হওয়ার পর তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা রাস্তায় গাড়ি ভাঙচুর করেছেন। ভাঙচুরের প্রতিবাদে স্থানীয় হকার ও দোকানিরাও রাস্তায় নামেন। গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীতে এ ঘটনায় দেখা দেয় যানজট।
কলেজের পাশে একটি ভবনে লাগানো নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধরা পড়ে ভাঙচুরের কিছু দৃশ্য। এতে দেখা গেছে, মহাখালীর তিতুমীর কলেজের ফটক দিয়ে মিছিল নিয়ে ৪০-৫০ জন তরুণ লাঠিসোঁটা হাতে হুড়মুড় করে রাস্তায় নেমে এলেন। এসেই তাঁরা রাস্তার পাশে থাকা দুটি প্রাইভেট কারে লাঠির আঘাত করা শুরু করলেন। ভেঙে ফেলা হলো গাড়ি দুটির সব কাচ। একটি গাড়ির চালককেও গাড়ি থেকে নামানোর জন্য টানাটানি করেন তাঁরা। পথচলতি কয়েকজনকে মারতেও উদ্যত হয় তরুণের দল।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, গতকাল দুপুরে কলেজের কাছে বৈশাখী রেস্তোরাঁয় খেতে যান সানি ও সোহাগ নামের তিতুমীর কলেজের ছাত্রলীগের দুই কর্মী। খাওয়া শেষে বিল নিয়ে রেস্তোরাঁর লোকজনের সঙ্গে তাঁদের বিবাদ শুরু হয়। এ সময় শ্রমিক লীগের স্থানীয় এক নেতার কয়েকজন অনুসারীও রেস্তোরাঁয় ছিলেন। বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে শ্রমিক লীগের নেতার অনুসারীরা ছাত্রলীগের দুজনকে মারধর শুরু করেন, অন্যরাও যোগ দেন। পরে এ দুজন কলেজে চলে যান।
রেস্তোরাঁর এক কর্মীর অভিযোগ, কলেজ ছাত্রলীগের কর্মীরা প্রায়ই খেয়ে বিল না দিয়ে চলে যান। গতকাল সোহাগ ও সানি দুপুরে খেয়ে বিল না দিয়ে চলে যেতে উদ্যত হন। বিল চাইলে তাঁরা উল্টো শাসান, রেস্তোরাঁর কর্মীদের মারধর ও ভাঙচুরেরও হুমকি দেন। বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে তাঁদের মারধর করা হয় বলে স্বীকার করেন রেস্তোরাঁর ওই কর্মী।
এর জের ধরে দুপুরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মহাখালীর আমতলী থেকে গুলশান-১ নম্বর পর্যন্ত সড়কটিতে পথচলতি ও পার্ক করে রাখা যানবাহনগুলোতে এলোপাতাড়ি ভাঙচুর চালান। তাঁরা অন্তত ২০টি যানবাহন ভাঙচুর করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরে পুলিশ এসে লাঠিপেটা করে এবং রাবার বুলেট ছুড়ে তাঁদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর আবার স্থানীয় শ্রমিক লীগের এক নেতার অনুসারী লোকজন রাস্তায় নামেন। পুলিশ তাঁদেরও সরিয়ে দেয়। প্রায় আধা ঘণ্টা ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয় যানজট। সন্ধ্যায়ও রাস্তাটিতে প্রচুর কাচ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মিরাজুল ইসলাম পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, কলেজের বাইরের কিছু বখাটে ক্যাম্পাসের বাইরে সব সময় ছাত্রদের নানাভাবে নিপীড়ন করে। ছাত্রদের মারধর করে পকেটের টাকাপয়সা রেখে দেয়। গতকালও কয়েকজন সানি-সোহাগকে মারধর করে, টাকা কেড়ে নেয়। ছাত্ররা সেটার প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমেছিলেন। এর জন্য মহানগর শ্রমিক লীগের নেতা দেলোয়ার হোসেনের অনুসারীদের দায়ী করেন মিরাজুল।
এ ব্যাপারে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও দেলোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। জানতে চাইলে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মোশতাক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তিতুমীরের দুই ছাত্র একটি রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে তাঁদের মধ্যে সমস্যা হয়। এরপর তিতুমীরের ছেলেরা ক্ষোভে রাস্তায় নামেন। তাঁদের বুঝিয়ে কলেজের ভেতরে ঢোকানোর পরে আবার স্থানীয়রা রাস্তায় বিক্ষোভ করেন। পরে তাঁদেরও রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় স্থানীয় দুটি ছেলে কলেজের ভেতরে ঢুকলে তাঁদের মারধর করেন ছাত্ররা।

গাফফার চৌধুরী এবং লাত, উজ্জা আর মানাত দেবী by আরিফুর রহমান

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছবি বানানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন গাফফার চৌধুরী, অমিতাভ বচ্চনকে কাস্ট করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি রাজী হচ্ছিলেন না । নিউ ইয়র্কের শামীম—এন আর বি সম্মেলনের উদ্যোক্তা, ঢাকাতে আমার সাথে গাফফার ভাইয়ের মিটিং করালো যাতে আমার ভারতীয় ব্যবসায়ী বন্ধুদের দিয়ে অমিতাভকে রাজী করানো যায়। অমিতাভের বিপদের দিনে যারা তার কাছে ছিলেন তার মধ্যে বিনয় মালো একজন। (Vinay Maloo, chairman ENSO group, India) গুজরাটি বিনয়দা কোলকাতা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছেন, অনর্গল বাংলা বলেন। শামীম আমার সাথে বিনয়দার ঘনিষ্ট সম্পর্কের কথা জানতো। তাকে ব্যাপারটি জানালে উনি অমিতাভকে রাজী করিয়ে ফেললেন। কিনতু গাফফার ভাইয়ের তরফ থেকে আর যোগাযোগ হলোনা, শামীমও কিছু জানেনা। বিনয়্দার সাথে কথা হলেই জোক করেন, কি দাদা, আপনার বঙ্গবন্ধু ফিল্মের কি হলো, মুন্না ভাই (অমিতাভের ডাক নাম ) দো দফা পুছাথা, আমি বলেছি, বাঙালিকা বাত সিরিয়াসলি নেহি লেনা। হা হা হা হা— অট্টহাসি । আমি বোকার মতো চুপ করে থাকি।
কিন্তু নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশনের রাষ্ট্রদূত ডক্টর এ কে আব্দুল মোমেনের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে একমাত্র আলোচক আবদুল গাফফার চৌধুরী সাহেব যে কথাগুলি বলেছেন, তা সিরিয়াসলি নিয়েছেন সবাই। লতিফ সিদ্দিকী এই নিউইয়র্কেই ইসলাম সম্মন্ধে যে অজ্ঞতা প্রসূত সমালোচনা করেছিলেন তাতে শারিয়া মতে তিনি মুরতাদ, ইসলামী পণ্ডিতরা তাই মনে করেন। শাস্তিও পেয়েছেন, জেলে গিয়েছেন। এখনো উনি তওবা করেননি, এবং উনি একবার বলেছেন, উনি দুঃখিত নন, যা বলেছেন তা নিয়ে। দুনিয়াতে ওনার কি হবে জানিনা, কিন্তু আখরাতে কঠিন বিচারের সম্মুখীন ওনাকে হতেই হবে।
এই আলোচনাগুলি নিশ্চয়ই গাফফার ভাইয়ের চোখে পড়েছে, তারপরও উদ্ভট সব মন্তব্য করার কি দরকার ছিল? আবার সেই একই জায়গায়,— নিউ ইয়র্কেই?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ‘আজকের আরবি ভাষায় যেসব শব্দ এর সবই কাফেরদের ব্যবহৃত শব্দ। যেমন— আল্লাহর ৯৯ নাম, সবই কিন্তু কাফেরদের দেবতাদের নাম। তাদের ভাষা ছিল আর-রহমান, গাফফার, গফুর ইত্যাদি। সবই কিন্তু পরবর্তীতে ইসলাম এডাপ্ট করেছিল।’
আল্লাহ জাল্লাহ শানুহুর ৯৯ নামের কিছু নাম এসেছে আল্লাহর নিজের পছন্দে যা কোরআনুল করিমে আল্লাহ নিজেকে নিজে অভিহিত করেছেন, কিছু এসেছে জিব্রায়িল ফেরেশতার পরমর্শে। ৯৯ নামের হাদিসটি আবু হোরায়রা (রা) বর্ণিত, এর সনদ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
কাবা শরীফে ৩০০ এর উপরে যে মূর্তিগুলি ছিলো তাদের নামের সাথে আল্লাহর ৯৯ নামের কোনো মিল নেই, লাত, উজ্জা, মানাত, অবগাল, দুল খালসা, হুবাল, মালাকবেল, এল্লাহ, নেব, নের্গাল, সিন সুয়া, নুহা, সুয়া, রুভা ইত্যাদি। শুধু এল্লাহ নামটি আল্লাহর নামের কাছাকাছি, কিন্তু এল্লাহ দেবতার নাম হলেও কাফেররা আল্লাহকে আল্লাহই ডাকতো। কিনতু আল্লাহর গুনবাচকতায় বিভিন্নতা ছিলো।
হজরত আলী (রা)র পিতা আবু তালেব নবী মোহাম্মদ (সা )কে এতিম অবস্থা থেকে পেলেপুষে বড় করেছেন, বিপদের সময় সহায়তা করেছেন। আবু তালেবের মৃত্যুর সময় নবী (সা ) বললেন,— চাচা, এই শেষ সময়ে আপনি বলেন আমি মোহাম্মদের আল্লাহর ওপর ইমান রেখে মরলাম। আবু জাহেল তার দলবল নিয়ে পাশে ছিলো। সে বললো,— ভ্রাত: মরার সময় যদি আপনি আমাদের বাপ দাদার আল্লাহকে অস্বীকার করেন, আরবের মেয়েলোকরা পর্যন্ত হাসবে এই বলে যে, আপনি মরার সময় আসল আল্লাহকে ছাড়লেন। নবী (সা ) বললেন, আপনি আমার কানে কানে ফিস ফিস করে একবার বলেন, আমি মোহাম্মদের আল্লাহর ওপর ইমান রেখে মরলাম, আমি বিচার দিনে আপনার তদ্বির করব জান্নাতের জন্যে। আবু তালেব মরার আগে ঘোষণা করলেন, আমি আমার বাপ দাদার আল্লাহর ওপরে ইমান রেখেই মরলাম। নবী (সা ) জানালেন, আমার চাচা তার বাপ দাদার আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের কারণে জাহান্নামে যাবেন, কিন্তু নবীকে সহায়তা করায় লঘু শাস্তি দেবেন আল্লাহ।
শাব্দিক উচ্চারণে একই আল্লাহ শব্দে আল্লাহকে ডাকতো কাফেররা এবং মুসলমানরা, কিন্তু ৯৯ বা ততোধিক নামের গুনবাচকতার অর্থে মুসলমানদের আল্লাহ আলাদা, দেবতাদের যে নামেই ডাকা হতনা কেন, সেগুলি আল্লাহর নাম ছিলনা। দেবতাদের নাম থেকে আল্লাহর নাম এডাপ্ট করা হয়নি। উনি কোথায় পেলেন এই তথ্য ?
নারীদের বোরকা ও হিজাব নিয়ে গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে এটা হচ্ছে ওহাবিদের লাস্ট কালচারাল ইনভলব। আমি অবাক হচ্ছি। ক্লাস টুয়ের মেয়েরা হায়েজ-নেফাজ পড়বে ! এটা আমাদের ধর্ম শিক্ষা হতে পারে?’ তিনি বলেন, ‘মুসলমান মেয়েরা মনে করে হিজাব, বোরকা হচ্ছে ইসলামের আইডেন্টিটি। আসলে কী তাই? বোরকা পরে যাচ্ছে কিন্তু প্রেম করছে। আবার ইন্টারনেটেও প্রেম করছে। আচরণ ওয়েস্টার্ন কিন্তু বেশভূষা ইসলামিক করে আত্মপ্রতারণা করছে তারা।’
গাফফার ভাই পর্দা আর বোরখাকে গুলিয়ে ফেলেছেন। আল কোরানে আল্লাহ বলেন, ‘‘তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের মুখের ওপর টেনে দেয়। তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে। তারা যা সাধারনত প্রকাশ করে থাকে তা ছাড়া তাদের আভরণ প্রদর্শন না করে, তাদের ঘাড় ও বুক যেন মাথার কাপড়ে ঢাকা থাকে।( ৩৩:৫৯, ২৪:৩০-৩১)।’’
যে হুকুম আল্লাহ দিয়েছেন তা ওহাবিদের ঘাড়ে চাপালেন তিনি অজ্ঞানতা বশত।
শুধু মুসলমান মেয়ে নয়, আসল আহলে কিতাব ইহুদি রমনী, পেনসিলভানিয়ার আমিষ গোত্রের মেয়েরা, ক্রিস্টান নান এরা সবাই বোরখা পরে, এদের কেউ কেউ হয়ত প্রেম করে ইন্টারনেটে, এরা অধিকাংশই ওয়েস্টার্ন দেশে থাকে, শুধু দোষ হলো বাঙালী মুসলমানদের? যে মুসলমান মেয়েরা হেজাব পরে তার অধিকাংশই আল্লাহর হুকুম হিসাবে এটি পালন করে।
গাফফার ভাই কি জানেন আমেরিকান কারিকুলামে সেভেন্থ গ্রেডে সেক্স এডুকেশন দেয়া হয় বাধ্যতামূলক, এবং বিস্তারিত ভাবে। সেই ক্লাসে থাকলে আপনি শরম পাবেন। সেখানে বাংলাদেশে ছাত্রীদের হায়েজ নেফাস পড়ালে ইসলামের দোষ হয়ে গেলো ?
উনি প্রশ্ন করেছেন, ‘‘সৌদি আরবের নাম কেন সৌদি আরব হলো, এর নাম হবে মোহাম্মদিয়া।’’ এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারতো মরহুম বাদশাহ আবদুল আজীজ যিনি যুদ্ধ করে হেজাজ নাজদ দখলে নিয়ে তার দাদার নামে দেশের নাম রেখেছিলেন। তার দাদা এই এলাকার বিতারিত রাজা ছিলেন। সৌদি আরবে বর্তমান রাজারা নিজেদের রাজা বলেন না, তারা পরিচয় দেন দুই হারাম মসজিদের খাদেম বলে, মোহাম্মদ (স) এর বর্ণিত পথেই তারা দেশের শাসন চালায়, কোরানের আইনে। নামে নয় তারা কামে আছেন কোনো না কোনো ধরনে।
গাফফার সাহেব বলেছেন, কাবা শরীফের দরজার নাম বাদশাহের নাম আছে সাহাবাদের নামে নয়। এ পর্যন্ত নাম ওয়ালা আর নাম্বার ওয়ালা গেট আছে ৯৫ + টির। এর মধ্যে দুইজন রাজার নামে দুটি ছিল এখন বাদশাহ আব্দুল্লাহর নামে এর একটি হয়েছে। কাবার সম্প্রসারণ হলে কতশত দরজা হবে, তা এখনো বোঝা যাচ্ছেনা। পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল স্থাপনায় ৩জন রাজার নাম আছে মাত্র, যারা এটির ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ করেছেন। সাহাবীদের নাম কেন রাখা হয়নি জানিনা, কিন্তু করাচী গেট বলে একটি দরজা আছে। নবী (সা ) এর খালা উম্মে হানীর নাম একটি গেট আছে, উম্মে হানীর বাসা থেকে নবী (স) মেরাজে সফর করেছিলেন, পৃথিবীর সর্ব প্রথম এস্ট্রনট যিনি আলোর গতির চেয়ে বেশি বেগে অজানা ইউনিভার্স দেখে এসেছেন। আমরা অন্ধভাবে তা বিশ্বাস করি, তাই আমরা মুমিন।
গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ‘রসুল মানে দূত, অ্যাম্বাসেডর। রসুলে সালাম মানে শান্তির দূত। রসুল বললেই আপনারা মনে করেন হযরত মুহম্মদ (সা), তা কিন্তু নয়। যখন রসুলুল্লাহ বলবেন তখন মনে করবেন আল্লাহর প্রতিনিধি। এখন মোমেন ভাই আমেরিকায় থেকে যদি বলেন কিংবা আমি নিজেকে রসুল দাবি করলে কল্লা যাবে।’
উনি কি জানেন, রসুল তাকে বলা হয়, যার ওপরে রেসালত বা আসমানী বা এলিয়েন গ্রন্থ নাজেল হয় জিব্রাইলের মাধ্যমে। রসুল মাত্র চারজন, দাউদ,মুসা, ইসা (আ) এবং মুহাম্মদ (সা), আর যারা শুধু আল্লাহর তরফ থেকে তার দিকে মানুষদের ডাকেন কোনো বই নাজেল ছাড়া তারা নবী, সব নবী রসুল নন। যেমন নূহ নবী, সালেহ নবী। গাফফার ভাই, আমরা রসুল বললে তাই মুহাম্মদ (সা )কেই বুঝি। আপনি কি ইসলাম বুঝলেন ?
তিনি বলেন, ‘পুরো দেশ এখন দাড়ি-টুপিতে ছেঁয়ে গেছে। সরকারি অফিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টুপি আর দাড়ির সমাহার। অথচ তারা ঘুষ খাচ্ছেন। এত বড় দাড়ি, এত বড় টুপি, কিন্তু ঘুষ না পেলে ফাইলে হাত দেন না- এটা কী ইসলামের শিক্ষা?’
গাফফার ভাই, আমার আপনার প্রিয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে ইউনিফর্ম পরা কতিপয় সেনা সদস্য। এখন কি এই অন্যায়ের জন্যে সামরিক উর্দির দোষ হয়ে যাবে? টুপি দাড়িওয়ালারা ঘুষ খেলে ইসলামের দোষ বা শিক্ষা কেমন করে হয়? কোনো ইউনিফর্মের নাম অথবা যে কেউ দাড়ি লন্বা করার নাম ইসলাম নয়,— টুপি, ক্যাপ, পাগড়ি, হেলমেট দিয়ে মাথা ঢাকলেই মুসলমান হয়না। আল্লাহর ওপর অন্ধ বিশ্বাস, আর আমলের ওপর থাকার নাম ইসলাম।
আপনি বলেছেন, "ফেইথ পরিবর্তনশীল, কিন্তু বাঙালিত্ব চিরস্থায়ী। আমি আব্দুল গাফফার চৌধুরী ধর্ম পরিবর্তন করে হয়ে যেতে পারি গওহর রঞ্জন চক্রবর্তী, কিন্তু বাঙালিত্ব পরবর্তন হতে পারেনা।এটি আমাদের পরিচয়।"
দাদা, এখানেও ভুল করলেন।জন্মগত ভাবে হিন্দু না হলে আপনি এই ধর্মের হতে পারবেন না। হিন্দু বা সনাতন ধর্মের আচার পালন করতে পারবেন, অনেক হিপ্পী আমেরিকানদের মতো, আর চক্রবর্তী ব্রাম্মন হওয়ার তো প্রশ্নই আসেনা। যাই হোক বাঙালিত্বকে মহিমা দিতে গিয়ে আপনার ধর্ম বদলানোর উদাহরণটি না দিলেও চলতো। বঙ্গবন্ধু তার পরিচয়ে কিন্তু বলতেন আমি বাঙালি, আমি একজন মুসলমান। তার চেয়ে বড় বাঙালি প্রেমিক আর কে হতে পারবে ?
আমার খারাপ লাগছে বড় ভাই ডক্টর মোমেনের জন্যে, বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রী দেওয়ান গাজী সাহেবের সঙ্গে যখন উনি চাকুরী করতেন তখন থেকে আমি আর বন্ধু ডাক্তার সাদেক ( প্রিন্সিপাল Drexel Medical School, USA) তার স্নেহ ধন্য। উনি নিশ্চয়ই বিব্রত বোধ করেছিলেন তার এই সভায়। আমি জানি উনি তার স্বভাব সুলভ অমায়িকতায় বলবেন, গাফফার ভাই যা বলতে চেয়েছেন তা হয়ত বোঝাতে পারেননি। কোনো ভুল হলে আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাফ করবেন, আল্লাহ তো রহমানুর রাহীম।
লম্বা হয়ে যাচ্ছে, নাহয় আরো লিখতাম। আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো গান গাফফার চৌধুরীর কলম থেকে বেরিয়েছে। গনতন্ত্রের জন্যে, জাতির পিতার জন্যে আপনার ভালবাসার তুলনা হয়না। এক সময় মাদ্রাসায় পড়েছেন। বরিশালের উলানিয়ার জমিদার ছিলেন আপনার পূর্ব পুরুষ। আমার দাদার কাছে আপনাদের বাড়ির গয়না নৌকার গল্প শুনেছি। আল্লাহর নবীর সুন্নতের মতো আবু তালেবের মত আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি, আল্লাহর কাছে মাফ চান, ইসলামকে বুঝে এর সমালোচনা করুন। কারণ আপনাকে কাছ থেকে দেখেছি, আপনাকে অনেক ভালোবাসি। কামনা করি আপনি তওবা করবেন, আপনার কলম থেকে আল্লাহর জন্যে এমন কথা বেরিয়ে আসুক যা পড়ে মানুষ ইসলামের দিকে চলে আসবে।

আলোচনায় ফিরছে হতবাক ইউরোপ: সরে দাঁড়ালেন গ্রিসের অর্থমন্ত্রী

গ্রিসের গণভোটের রায়ে হতবাক ইউরোপ এবং প্রবল পরাক্রমশালী ঋণদাতা সংস্থাগুলো। এ রায়ে হতভম্ব ঋণদাতারা যেমন নড়েচড়ে বসেছে, তেমনি অজানা ভবিষ্যতের শঙ্কায় পড়েছে গ্রিসবাসী। গণভোটের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ইউরোপের প্রধান দুই অর্থনীতির দেশ জার্মানি ও ফ্রান্সের দুই শীর্ষ নেতা গতকাল সোমবার বৈঠকে বসেছেন। ইউরোজোনের অর্থমন্ত্রীদের শীর্ষ বৈঠক ডাকা হয়েছে আজ মঙ্গলবার। গণভোটের পর বৈশ্বিক মুদ্রা ও পুঁজিবাজারে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির।
রোববারের নির্বাচন যদি হয় এক বড় ভূমিকম্প, তবে এর এক পরাঘাত (আফটার শক) হলো গ্রিসের ‘নাছোড়’ অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারোফাকিসের পদত্যাগ। নির্বাচনের আগে বলেই রেখেছিলেন, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে পদত্যাগ করবেন তিনি। তবে বিপুল বিজয়ে পদত্যাগ কেন? নিজের ব্লগে এর উত্তর দিয়েছেন ভারোফাকিস। বলেছেন, তাঁর মনে হয়েছে তাঁর পদত্যাগে দেশটির ঋণ সমস্যার সমাধানের পথ সহজ হতে পারে। বলেছেন, ‘ইউরোজোনের অন্যরা চায়, আমি পদে না থাকি। তাতেই এই পদত্যাগ।’
ইউরোজোনের অন্য দেশগুলোর বিষয়ে তাঁর বিতৃষ্ণার কথা খোলাখুলিই বলেছেন। গণভোটের আগে ‘ঋণদাতারা সন্ত্রাস’ করছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর কাছে ঋণদাতাদের কৃচ্ছ্রসাধনের প্রস্তাব হলো ‘অসুস্থ গাভির দুধ দোয়ানোর চেষ্টার মতো।’
ঋণদাতাদের এই চাওয়াকে মেনে নেননি ভারোফাকিস, সেই সঙ্গে গ্রিসের সরকার। বিপুল ঋণ থেকে গ্রিসের অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে কঠোর শর্ত দিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার (বেইল আউট) ঘোষণা করে ঋণদাতারাই। এই অর্থ পেতে শর্ত জুড়ে দেয়। সেগুলো ছিল বিক্রয়মূল্যের ওপর কর বাড়ানো, পেনশনে কাটছাঁট ও প্রতিরক্ষা ব্যয় কমানো। ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সে সময় থেকে দফায় দফায় ঋণ নিয়েছিল গ্রিস। এর পরিমাণ ১৬৯ বিলিয়ন ইউরো। ঋণদাতাদের কৃচ্ছ্রসাধনের এসব প্রস্তাব নিয়ে কয়েক মাসের আলোচনা নিষ্ফল হয়ে যায়। এর মধ্যে একপর্যায়ে এসে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাস ঘোষণা দেন, বেইল আউট কর্মসূচি নিয়ে গণরায় চান তিনি। ৫ জুলাইয়ের নির্বাচনের আগেই গত ৩০ জুন শেষ হয়ে যায় ঋণদাতা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১৬০ কোটি ইউরো ফেরত দেওয়ার সময়সীমা। রোববারের নির্বাচনে মোট ভোটারের ৬৩ শতাংশ অংশ নেয়। ৬১.৩১ শতাংশ গ্রিসবাসী জানিয়ে দেয়, দাতাদের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তারা। প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন দেন ৩৯ শতাংশ ভোটার। এই রায়কে ‘অত্যন্ত সাহসী ইচ্ছার প্রতিফলন’ বলে অভিনন্দিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী সিপ্রাস। তিনি বলেছেন, ‘আপনাদের দেওয়া রায়ের অর্থ এই নয় যে আমরা ইউরোপ থেকে বের হয়ে যাব। এই বিজয়ের অর্থ, সমস্যার ন্যায্য সমাধানে আমাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াল।’
তবে গণভোটের আগে নাখোশ ইউরোপীয় প্রতিপক্ষরা বলেই ফেলেছিল, নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ এর অর্থ ইউরোজোন থেকে গ্রিসের নিশ্চিত বিদায়। তবে সিপ্রাস বলেছেন, তিনি আলোচনার টেবিলে আবার ফেরত যেতে চান। তিনি যে আলোচনার দরজা বন্ধ করেননি, তা জানান দিয়ে ফোন করে কথা বলেন গ্রিসের ওপর চরম বিরক্ত জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল, ঋণদাতা সংস্থা ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) প্রধান মারিও দ্রাগিম ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে। সিপ্রাস একাই নন, গ্রিসের প্রেসিডেন্ট প্রোকোপিস পাভলোপউলোস কথা বলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের সঙ্গেও।
ম্যার্কেলের সঙ্গে সিপ্রাসের ফোনালাপে সাব্যস্ত হয়, আজ মঙ্গলবার ইউরোজোনের অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে নতুন প্রস্তাব জার্মানির কাছে তুলে ধরবেন গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী।
এখন গ্রিসের ব্যাংকিং খাত বাঁচাতে একমাত্র ভরসা ইসিবির পরিচালনা পরিষদও গতকাল বৈঠক সারে। এদিকে গ্রিসের জনরায়ের পর স্পেন জানিয়ে দিয়েছে, গ্রিসের নতুন কোনো প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় তারা রাজি। দেশটির আর্থিক খাতবিষয়ক মন্ত্রী লুয়েস দ্য গুন্দেজ বলেন, ‘নতুন কোনো প্রস্তাব চাওয়ার অধিকার আছে স্পেনের।’
গ্রিসের এই বিজয়ে ঋণদাতারা শঙ্কিত নয়, এমনটাই বলেছেন ইউরোপিয়ান কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভালদিজ দমব্রোভসকিস। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি সামলানোর মতো সবকিছুই আমাদের আছে।’
ঋণগ্রস্ত গ্রিস আর ঋণদাতাদের মধ্যে কার্যকর কোনো আলোচনা হবে কি না, এর ফল কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যতের পথনির্দেশে গ্রিসের নির্বাচন বিরাট মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। নির্বাচনের আনন্দের বিজয় অজানা ভবিষ্যতের শঙ্কায় ম্লান হয়ে গেছে যদিও। তবে সদ্য পদত্যাগী অর্থমন্ত্রী ভারফোকিস যেমনটা বলেছেন, ‘এ নির্বাচন ঋণের প্রবল বাধার বিরুদ্ধে ছোট ইউরোপীয় একটি জাতির প্রতিরোধের একটি মুহূর্ত হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।’
গ্রিসের অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। ঋণসঙ্কট থেকে উত্তরণের প্রশ্নে আয়োজিত গণভোটে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ‘না’ ভোট দিয়েছে বেশিরভাগ গ্রিক। গণভোটের ফলাফল নিয়ে যখন নানা জল্পনা কল্পনা চলছে তখনই অর্থমন্ত্রী ইয়ানিসের তরফ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা এলো। এ খবর দিয়েছে আল-জাজিরা। নিজের ব্লগে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইউরোজোনের কিছু সদস্যের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে তাকে স্বাগত নয় বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল। এ কারণেই তিনি অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরে দাড়িয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।

বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পেল শ্যাম্পেন

শ্যাম্পেন উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শিল্পকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করেছে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিকবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। শ্যাম্পেন উৎপাদন ও বিক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আঙ্গুুুরের বাগান, ওয়াইনের সেলার এবং বিক্রয় কেন্দ্রগুলোকে সাংস্কৃতিকভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ইউনেস্কো। বিবিসি জানিয়েছে, শনিবার জার্মানিতে সংস্থটির এক বৈঠকে বিশ্বের ১১টি সাইটের সঙ্গে এটিকেও বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয় ইউনেস্কো। এ মর্যাদা পাওয়ার কারণে এখন থেকে শ্যাম্পেন উৎপাদন ও বিক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো বিশেষ সুরক্ষা পাবে। ইউনেস্কো বলছে,
শ্যাম্পেন উৎপাদন এমন এক শৈল্পিক প্রক্রিয়া, যা কৃষিভিত্তিক শিল্প উদ্যোগের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শ্যাম্পেনের পাশাপাশি ফ্রান্সের বার্গান্ডির আঙ্গুরের বাগানগুলোকেও বিশ্ব ঐহিত্যের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এছাড়া সিঙ্গাপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন, তুরস্কের দিয়ারবকির দুর্গ, ইরানের মেইমান্দ গুহা-গ্রামকেও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করা হয়েছে। বৈঠকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ পেরুর মাচ্চু পিচ্চু, ভারতের তাজ মহল ও চীনের মাহপ্রাচীরকে রক্ষায় অতিরিক্ত অর্থ সহায়তা দেয়ার ও সাইটগুলোতে পর্যটক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন

কুচকাওয়াজ, কনসার্ট আর আকাশভরা আতশবাজির আলোকছটার মধ্য দিয়ে ২৩৯তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করল যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে অবস্থিত জাতীয় পার্ক ন্যাশনাল মলে আয়োজিত আতশবাজি উৎসবে যোগ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তার সঙ্গে ছিলেন ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামাও। তবে ওয়াশিংটনে দিনভর বৃষ্টি থাকার কারণে সামরিক কর্মকর্তা আর তাদের পরিবারের জন্য আয়োজিত ফোর্থ অব জুলাই পিকনিক বাতিল করে হোয়াইট হাউস। ন্যাশনাল মলে উপস্থিত জনগণকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানান ওবামা। একই সঙ্গে এ দিনটি তার বড় মেয়ে মালিয়ার ১৭তম জন্মদিনও। স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হয়েছে ওয়াশিংটনের বাইরেও। ভার্জিনিয়ার মাউন্ট ভার্ননে একশ’ নতুন নাগরিকের নাগরিকত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে মূল বক্তা হিসেবে বক্তব্য রেখেছেন সিআইএ’র মহাপরিচালক জন ব্রেনান।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন এবং তার স্ত্রী মারথা’কে নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এদিকে ২৩৯তম স্বাধীনতা দিবসে সন্ত্রাসী হামলার আশংকায় দেশজুড়ে নেয়া হয় কড়া নিরাপত্তা। ন্যাশনাল মলে আতশবাজি উৎসবে যোগ দেয়ার জন্য জনগণকে পার হতে হয়েছে ১১টি চেক পয়েন্ট। নিউইয়র্কে আতশবাজি উৎসবকে কেন্দ্র করে মোতায়েন করা হয় ৭ হাজার অতিরিক্ত কর্মকর্তা। ১৭৭৬ সালের ২ জুলাই গ্রেট ব্রিটেনের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি উপনিবেশ মুক্ত হয়। এরপর ৪ জুলাই চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়। এছাড়া দিনটি আরও নানাদিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী দু’জন জন এডামস ও থমাস জেফারসন একইদিন অর্থাৎ ১৮২৬ সালের ৪ জুলাই মারা যান। ওই বছর ছিল স্বাধীনতার ৫০ বছর। এছাড়া অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জনক জেমস মনরো, যিনি পরবর্তী সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, তিনি মারা যান ১৮৩১ সালের ৪ জুলাই।

পারলেন না মেসি : চিলি চ্যাম্পিয়ন

আর্জেন্টিনার আশার বাতিটা তখনও টিমটিম করে জ্বলছে। টাইব্রেকারে চিলির পক্ষে চতুর্থ শটটি নিতে এগিয়ে এলেন অ্যালেক্সিস সানচেজ। স্তব্ধ গোটা স্টেডিয়াম। সার্গিও রোমেরোকে স্রেফ বোকা বানিয়ে আলতো শটে বল জালে জড়িয়ে দিলেন সানচেজ। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল সান্তিয়াগোর গ্যালারি। স্তাদিও ন্যাসিওনাল থেকে মুহূর্তেই উৎসবের ঢেউ আছড়ে পড়ল চিলির প্রতিটি প্রান্তে। আর মেসি? সেই একই ছবি। আকাশি-সাদা জার্সিতে আবারও হতাশার পোস্টার আর্জেন্টিনার দুঃখী রাজপুত্র। দেশের জার্সি গায়ে একটি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার আজন্ম সাধ অপূর্ণই রয়ে গেল। শাপমোচনের বদলে আর্জেন্টিনার আরেকটি দুঃখগাথার অংশ হলেন মেসি। অপেক্ষার প্রহর বড্ড দীর্ঘ। একটি শিরোপার জন্য ২২ বছরের সেই দীর্ঘ দগ্ধ প্রহরের ইতি টানতে ব্যর্থ আর্জেন্টিনা। এক বছর আগে মারাকানায় বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের ক্ষত এখনও শুকায়নি। শনিবার রাতে মেসিদের সেই যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিলেন সানচেজরা। ৯৯ বছরের অপেক্ষা ঘুচল তাদের। কোপা আমেরিকা পেল এক নতুন চ্যাম্পিয়ন। গোলশূন্য ফাইনালে আর্জেন্টনাকে ৪-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো কোপা আমেরিকা শিরোপা জিতল চিলি। শুধু কোপা নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলেই এটি তাদের প্রথম শিরোপা। আর্জেন্টিনার সোনালি প্রজন্ম ব্যর্থতার ঘানি টেনে চললেও নিজেদের আঙিনায় চিলির সোনালি প্রজন্ম ঠিকই পেল তাদের সাধনার পুরস্কার। প্রায় ১০০ বছরের খরা ঘুচিয়ে দেশবাসীকে তারা উপহার দিলেন বহু আরাধ্যের এক ট্রফি। চিলির একাদশে ছিলেন- ভিদাল, সানচেজ ও ভার্গাসের মতো সব তারকা। আর আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ তো বিশ্বসেরা। মেসি, আগুয়েরো, হিগুয়াইন, তেভেজ ও ডি মারিয়ার মতো নক্ষত্রের ছড়াছড়ি। অথচ নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও হল না একটি গোল! দু’দলই রক্ষণ সামলে আক্রমণে যাওয়ার নিরাপদ পথে হাঁটায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। স্নায়ুচাপের সেই ভাগ্য পরীক্ষায় ডাহা ফেল আর্জেন্টিনা! গত আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে টাইব্রেকারেই কপাল পুড়েছিল মেসিদের। এবারও পুড়ল।
পেনাল্টি শুট আউটে নিজেদের চারটি শটেই লক্ষ্যভেদ করেন চিলির খেলোয়াড়রা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার পক্ষে গোল করতে ব্যর্থ হল গনজালো হিগুয়াইন ও এভার বানেগা। প্রথম শটে ঠিকই গোল করেছিলেন মেসি। কিন্তু হিগুয়াইনের দ্বিতীয় শট বারের অনেক উপর দিয়ে চলে যায়। আর বানেগার শট ফিরিয়ে দেন চিলির গোলকিপার ক্লদিও ব্রাভো। টাইব্রেকার-ট্রাজেডির আগে নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেয়ার সহজতম সুযোগটাও নষ্ট করেন হিগুয়াইন। মেসির কাছ থেকে বল পেয়ে দারুণ একটি ক্রস বাড়িয়েছিলেন লাভেজ্জি। হিগুয়াইন তাতে পা ছোঁয়াতে পারলেই ঘুচে যেত আর্জেন্টিনার ২২ বছরের শিরোপাখরা। প্রথমার্ধেই চোট নিয়ে মাঠ ছাড়া ডি মারিয়ার অভাব বেশ ভালোভাবেই অনুভব করেছে আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয়ার্ধে চিলির দাপটে রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন মেসিরা। প্রথমার্ধে অবশ্য ভালো দুটি সুযোগ এসেছিল তাদের সামনে। ২০ মিনিটে মেসির ফ্রিকিক থেকে আগুয়েরোর হেড অবিশ্বাস্যভাবে রুখে দেন ব্রাভো। পরে লাভেজ্জিকেও গোলবঞ্চিত করেন চিলির শেষপ্রহরী। সুযোগ পেয়েছিল চিলিও। ১১ মিনিটেই এগিয়ে যেতে পারত স্বাগতিকরা। কিন্তু ভিদালের শট দারুণভাবে রুখে দেন আর্জেন্টিনার গোলকিপার রোমেরো। ২৮ মিনিটে আরেকটি সুযোগ নষ্ট করেন ভার্গাস। ৮২ মিনিটে সানচেজের ভলি পোস্ট ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। অতিরিক্ত সময়েও গোল মিসের মহড়া দিয়েছেন সানচেজ। কিন্তু টাইব্রকারে সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে শেষ হাসি হাসেন সানচেজই। সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থের পাগুলে উদযাপন দেখে বুকটা হয়তো ভেঙে গেছে মেসির। বার্সেলোনার হয়ে ২৪টি শিরোপা জিতলেও দেশের হয়ে এখনও কিছুই জেতা হয়নি তার। টুর্নামেন্টের শতবছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী বছর কোপা আমেরিকার বিশেষ আসর বসবে যুক্তরাষ্ট্রে। কে জানে, কাল থেকেই হয়তো তার কাউন্টডাউন শুরু করে দিয়েছেন মেসি!

গুঞ্জন শুনি

পাকিস্তানি দর্শকদের প্রতি আলাদা দৃষ্টি রয়েছে বলিউড নির্মাতাদের। তাই ছবি মুক্তির তালিকায় পাকিস্তান দেশটির প্রতি মমত্ববোধ যেন একটু বেশিই। যদিও তার পুরোটাই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। শাহরুখ খান, আমির খান ও সালমান খান- তিন সুপারস্টারই পাকিস্তানের দর্শক টানতে ব্যাকুল। সে ধারাবাহিকতায় আসছে ঈদে মুক্তি প্রতীক্ষিত সালমান খানের নতুন ছবি ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ও পাকিস্তানে মুক্তি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তার আগেই বাধে বিপত্তি। পাকিস্তান বলে কথা। সেখানে ছবি মুক্তি দেবেন, আর বিতর্কের আশা করবেন না, এটা ভাবা ভুল। এমনিতেই ছবির নাম নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে আছেন সালমান। তার মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো আরেক পাকিস্তানি গায়ক হুমকি দিয়ে বসল।
পাকিস্তানের জনপ্রিয় কাওয়ালি শিল্পী আমজাদ সাবরি সালমন খানসহ ছবির নির্মাতার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারি দিয়েছেন। সাবারির দাবি, এ ছবিতে ব্যবহৃত ‘ভর দো ঝোলি’ গানটির ওপর তাদের পরিবারের স্বত্ব রয়েছে। সাবরিদের অনুমতি না নিয়েই গানটি ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এজন্য তিনি আইনের আশ্রয় নেবেন বলে জানিয়েছেন। বিষয়টি কিন্তু একেবারে হালকা করে দেখার মতো নয়। সাবারির এ হুমকিতে বেশ টনক নড়েছে বজরঙ্গি ভাইজান পরিবারের। তার দাবি যদি সত্যি হয় তাহলে ব্যাপক অংকের অর্থ গুনতে হবে প্রযোজককে। দেশটি যেহেতু পাকিস্তান, তাই এর শেষ দেখে ছাড়বেনও তারা। এমন উদাহরণ আগেও দেখা গেছে। সালমান অবশ্য এ ব্যাপারে এখনও কোনো মন্তব্য করেননি। বিতর্ক না থাকলে কী আর ছবি জমে। বিষয়টি তাই আপাতত উপভোগ করার চেষ্টা করছেন এ বলিউড লাভবার্ড।

মেগা প্রকল্পে জাপানের সহায়তা অনিশ্চিত by মিজানুর রহমান

বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে জাপানকে এক জোড়া রয়েল বেঙ্গল টাইগার উপহার দিতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত বছর টোকিও সফরে গিয়ে সেই ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর এটি ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে শেখ হাসিনার ওই প্রস্তাব বেশ আলোচিত হয়েছিল। কেউ কেউ এর নাম দিয়েছিলেন ব্যাঘ্র কূটনীতি। দ্বিপক্ষীয় ওই শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ৫টি মেগা প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছিল। টোকিওর বিবেচনায় উপস্থাপন করা প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল- গঙ্গা ব্যারেজ, যমুনা নদীর তলদেশে বহুমুখী টানেল নির্মাণ, একই নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুর সমান্তরাল আরেকটি স্বতন্ত্র রেল সেতু নির্মাণ, বহুমুখী ঢাকা ইস্টার্ন বাইপাস সড়ক এবং ঢাকার চারপাশের চারটি নদীকে স্বাভাবিক অবস্থায় (ইকোলজি) ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া। গত বছরের ২৬শে মে’র সেই আলোচনায় জাপানের তরফে বাংলাদেশকে ৬০০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ দেয়ার ঘোষণা এসেছিল। বাংলাদেশের জন্ম থেকে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পাশে থাকা জাপানের সঙ্গে সমন্বিত অংশীদারিমূলক সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল সেদিন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নের মুখে থাকা শেখ হাসিনা সরকারের লুক ইস্ট পলিসি বিশেষত টোকিওর সঙ্গে সম্পর্ককে ‘উচ্চ মাত্রা’য় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারে কূটনৈতিক অঙ্গনে সফরটি ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। বিশেষ করে জাপানকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার শাবক উপহার দেয়ার অভিপ্রায় প্রশংসাও কুড়িয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক হলেও সত্য, ঢাকার সেই ‘ব্যাঘ্র কূটনীতি’ এক বছরের মাথায় হোঁচট খেয়েছে! টোকিও সেই উপহার নিতে অনীহা দেখিয়েছে। কূটনৈতিক চ্যানেলেই সেই বার্তা পেয়েছেন ঢাকার কর্মকর্তারা। তবুও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, নীতিনির্ধারকরা গাইড লাইন দিয়ে চলেছেন। টোকিওর তরফে এখনও সরাসরি ‘না’ বলা হয়নি, তবে সেই উপহার যে তারা নিচ্ছে না সেটি স্পষ্ট করেছেন এখানে দায়িত্বরত দেশটির কূটনীতিকরা। টোকিওর সাড়া না পেয়ে বাংলাদেশও বনের বাঘ বনে ছেড়ে দেয়ার চিন্তা করছে বলে জানা গেছে। এদিকে ঢাকা ও টোকিওর কূটনৈতিক সূত্রে যে খবরাখবর বের হচ্ছে তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট- দেশটির সঙ্গে গত এক বছরের বাংলাদেশের যে যোগাযোগ হয়েছে, তাতে সম্পর্কে নতুনত্ব কিছু তো আসেনি বরং কোন কোন ক্ষেত্রে গতি কমেছে। প্রধানমন্ত্রী যে ৫টি মেগা প্রকল্প দেশটির বিবেচনায় উপস্থাপন করেছিলেন তাতে টোকিওর তেমন সাড়া নেই। সেই প্রকল্পগুলো এখন অনেকটাই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী পদ্মার ওপর (গঙ্গা) ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়ে আগে দিল্লির ক্লিয়ারেন্স চায় টোকিও। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্পর্শকাতরতার বিষয়টিও জাপান বিবেচনায় নিচ্ছে। তাছাড়া, দিল্লির সম্মতি নিয়েই প্রকল্প নিয়ে এগোতে চায় ঢাকা। জাপান সেই বার্তা পাওয়ার পর ওই প্রকল্প থেকে ফোকাস সরিয়ে নিয়েছে বলে দাবি একটি সূত্রের। দ্বিতীয়ত: যমুনা নদীর তলদেশে বহুমুখী টানেল নির্মাণ। সেখানে এক বছরের বেশি সময় অপেক্ষার পরও জাপানের তরফে কোন সাড়া নেই। গ্লোবালি জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের একটি কোম্পানি সমপ্রতি সেই টানেল নির্মাণের আগ্রহ দেখিয়েছে। তারা দেশটির বিনিয়োগও নিশ্চিত করতে পারবে বলে জানিয়েছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুমুখী একটি টানেল নির্মাণে চীনের সঙ্গে এরই মধ্যে বাংলাদেশ চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। টোকিও সফরের এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেইজিং সফরে গিয়ে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণে দেশটির সহায়তা চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এক বছরের মাথায় বেইজিং সফরে গিয়ে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ সংক্রান্ত চুক্তি সইয়ের কাজ সম্পাদন করেন। বেইজিং সফর শেষে হংকং যান সেতুমন্ত্রী। সেখানে জিজিয়াং কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডের প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। চীনের সরকারি মালিকানাধীন ওই প্রতিষ্ঠানটি জি-টু-জি ভিত্তিতে যমুনায় টানেল নির্মাণ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। মন্ত্রী তাৎক্ষণিক আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের কাছে দেশের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব চেয়েছেন। ওই বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক রুহুল আমিন সিদ্দিক এবং হংকং-এ নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল এম সারওয়ার মাহমুদসহ সরকারের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সেদিন মানবজমিন-এর সঙ্গে আলাপে জাপানের বিবেচনায় থাকা ৫ প্রকল্পের মধ্যে যমুনার টানেলটি ছিল না বলে দাবি করেন। জাপানের সহায়তা নিয়ে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার পাশের চার নদীর স্বাভাবিক অবস্থা ফেরানোর প্রকল্প নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকল্প তৈরিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির ঘাটতি থাকার বিষয়টি এত দিন আলোচনায় থাকলেও গত সপ্তাহে সেখানে তৃতীয় একটি দেশের যুক্ত হওয়ার খবর বেরিয়েছে। ৪টি নদীকে একত্র করে নেয়া প্রকল্প জাপানের বিবেচনায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। সেখানে ঢাকা বহুমুখী ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণের বিষয়টিও ছিল। কিন্তু এবার কেবল বুড়িগঙ্গা এবং এর সঙ্গে ঢাকা বহুমুখী ইস্টার্ন বাইপাসকে যুক্ত করে একটি পৃথক প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। যাতে ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং চীন সরকারের অর্থায়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার দায়িত্ব পেয়েছে চীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (এভিক-ইঞ্জ) ও দি ফার্স্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো অব হেনান ওয়াটার কনসারভেন্সি’র (সিএইচডব্লিউই)। প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে পৃথক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুর সমান্তরাল আরেকটি স্বতন্ত্র রেল সেতু নির্মাণ। এ নিয়ে সরকারের ভেতরেই ভিন্ন চিন্তা রয়েছে বলে জানা গেছে। পদ্মা বহুমুখী সেতুতে রেল সেতু যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সরকারের ভেতরে যমুনার সেই প্রকল্প নিয়ে ভিন্ন চিন্তা এসেছে। জাপানের তরফে এটি নির্মাণে আগ্রহ আছে এখনও। তবে এ প্রকল্পের অগ্রগতি নেই বললেই চলে। প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির ঘাটতিকে দায়ী করেন। খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা যেমন, আমাদের দাতাদেরও সাড়া তেমন।
অন্যান্য অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কতদূর? প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফরের পর প্রকাশিত ২১ দফা ঘোষণায় দুই সরকার প্রধানের পারস্পরিক অঙ্গীকারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন, শান্তি- এই মূল্যবোধের ওপর দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত এবং আগামীদিনে তা আরও এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। মানুষে মানুষে যোগাযোগ আরও বাড়ানো, সংস্কৃতি বিনিময় এবং আঞ্চলিক সংযোগ কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। সমুদ্রসম্পদ বিশেষ করে ব্লু ইকোনমিতে সহায়তা বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষিত গ্রুপের মিটিং প্রস্তাব করেছিলেন। এ নিয়ে ঢাকায় পরবর্তীকালে একটি মিটিং হয়েছে। সেখানে জাপানের অংশগ্রহণ ছিল। ঢাকায় পিস বিল্ডিং সেন্টার নির্মাণে সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে জাপানের। দেশটির হিরোশিমা পার্কে ভাস্কর্য নির্মাণে বাংলাদেশের অঙ্গীকার ছিল। পূর্ত মন্ত্রণালয় এর একটি নমুনা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। বাংলাদেশের দারিদ্র্যদূরীকরণে উন্নয়ন খাতে জাপান সরকার ১.২ বিলিয়ন ইয়েন লোন ছাড় করাসহ আগামী ৪-৫ বছরে মোট ৬০০ বিলিয়ন ইয়েন লোন দেয়ার অঙ্গীকার করেছে। প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এখানে ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি পাওয়ার প্ল্যান এবং সেটি নির্মাণ ও পরিচালনায় গভীর সমুদ্রে একটি জেটি নির্মাণের সুযোগ দেয়ার অঙ্গীকার করে বাংলাদেশ। এটিও চলমান রয়েছে। জলবায়ু ফান্ড বিশেষ করে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে একটি প্যাকেজ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাপান। এ খাতের অগ্রগতি খুব বেশি হয়নি। এ বছর দেশটির সঙ্গে ‘পলিসি ডায়ালগ’ করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিলেন দুই সরকার প্রধান। এটি এখনও হয়নি। বাংলাদেশের নিটওয়্যার খাতে জিএসপি দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে জাপানের। জ্বালানি সহায়তায় এখানে শান্তিপূর্ণ পরমাণু বিদ্যুৎ খাতে সহায়তার অঙ্গীকার রয়েছে টোকিওর। বিশেষত ফুকুসীমা দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা শেয়ারের কথা বলেছিলেন শিনজো আবে। তাও বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশীদের বৃত্তি বাড়ানোর ঘোষণা ছিল, এটি কার্যকর হয়েছে। ১৫ থেকে ২৫-এ উন্নীত হয়েছে। কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের ভিসা উভয় দেশে সহজীকরণে টোকিও সম্মত হলেও অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীদের বিষয়ে এখনও তাদের বিবেচনাধীন রয়েছে। বাংলাদেশের ফুটবল টিমকে প্রশিক্ষণ দেয়ার ঘোষণা ছিল গত বছরের মে মাসে। এ নিয়ে খুব বেশি অগ্রগতি হয়েছে বলে কোন সূত্র নিশ্চিত করতে পারেনি। শেখ হাসিনার সফরের ফিরতি সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ঢাকা সফর করেছেন ৪ মাসের মাথায় গত সেপ্টেম্বরে। শেখ হাসিনা যখন আবে-কে আমন্ত্রণ জানান তখন বলা হয়েছিল- বাংলাদেশে গেলে আবে সুখবর পাবেন। বাংলাদেশ তার কথা রেখেছে। জাতিসংঘের অস্থায়ী সদস্য পদে জাপানকে সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশ তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এটি কার্যকর হয়ে গেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যা বললেন: প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত দেশের ৫ মেঘা প্রকল্পে জাপানের সহায়তার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি বলেন, জাপানের সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েছে। ফিরতি সফরে ঢাকায় এসে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে প্রকল্পগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ‘অগ্রাধিকার’ কোনটি জানতে চেয়েছিলেন। সেই তালিকায় বাংলাদেশ ২টি প্রকল্প উপস্থাপন করেছিল। প্রথমত: গঙ্গা ব্যারেজ, দ্বিতীয়ত: ঢাকার চার পাশের নদীগুলোর পানি বিশুদ্ধকরণসহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রকল্প। জাপান সেই প্রকল্প দু’টিতে সহায়তায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বলে দাবি প্রতিমন্ত্রীর। শিনজে আবের ঢাকা সফরের আলোচনার বিষয়ে গত ৬ই সেপ্টেম্বর প্রায় ১০ পৃষ্ঠার একটি যৌথ ঘোষণা সই হয়েছে। সেখানে ওই নীতিগত অনুমোদনের কোন উল্লেখ নেই। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেটি আবের মৌখিক ঘোষণা ছিল। জাপানের বিবেচনায় উপস্থাপিত প্রকল্পে চীনের আগ্রহ দেখানো সংক্রান্ত অপর এক প্রশ্নের জবাবে নিজ দপ্তরে গতকাল (রোববার) মানবজমিনকে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দিনে দিনে যে অবস্থানে উন্নীত হচ্ছে সেখানে যে কোন প্রকল্পে সহায়তায় একাধিক দেশের আগ্রহ এবং প্রতিযোগিতা দেখানো খুবই স্বাভাবিক। কাকে দিয়ে কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সেটি চূড়ান্ত করবে বাংলাদেশ। ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ উপহার গ্রহণে জাপানের অনাগ্রহের বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।