Sunday, August 23, 2026
ত্রিপোলি পতনের ১৫ বছর পরও লিবিয়া ছাড়ছে মেধাবীরা
শনিবার (২২ আগস্ট) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।
৩২ বছর বয়সী স্থপতি সারাহ মিজরান ত্রিপোলির পতনের সময় কিশোরী ছিলেন। আট বছর আগে তিনি শহরটি ছেড়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। দক্ষিণ ইংল্যান্ডে স্থাপত্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পাশাপাশি তিনি টেকসই স্থাপত্য নিয়ে কাজ করছেন। ত্রিপোলির বিভিন্ন স্থাপনা নিয়েও গবেষণা করছেন তিনি।
মিজরান বলেন, তরুণ পেশাজীবীরা দেশ ছাড়লে লিবিয়া শুধু দক্ষতাই হারায় না, সম্ভাবনার ভিত্তিও হারায়। একটি প্রজন্ম যদি মনে করে ভবিষ্যৎ গড়তে হলে দেশ ছাড়তেই হবে, তাহলে নিজের দেশ নিয়েও তাদের আশা কমে যায়।
২৪ বছর বয়সে বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান মিজরান। সেখানে তাকে ভিন্ন পেশাগত সংস্কৃতি ও কাজের ধরন সম্পর্কে নতুন করে শিখতে হয়েছে।
তবে মিজরান একা নন। লিবিয়ার আরও বহু তরুণ পেশাজীবী দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে বসবাস করছেন।
৩৬ বছর বয়সী নাদের এলগাদি ২০১৪ সালের শেষ দিকে ত্রিপোলিতে নিজের একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছিলেন। ওই সময় লিবিয়ার দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় তীব্র লড়াই ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনিও স্নাতকোত্তর পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যে যান।
পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও অধিকারকর্মীদের ওপর হুমকি বাড়তে থাকায় তিনি যুক্তরাজ্যেই থেকে যান। এলগাদি বলেন, লিবিয়ায় নিজের ব্যবসা চালিয়ে স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন করা থেকে যুক্তরাজ্যে এসে তাকে শূন্য থেকে জীবন শুরু করতে হয়েছে। প্রথম দুই বছর তার জন্য খুব কঠিন ছিল।
২০১৮ সালে এলগাদি ‘লিবিয়া ইন দ্য ইউকে’ নামে একটি সাংস্কৃতিক দাতব্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। লিবীয় প্রবাসীদের নিয়ে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে তারা নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লিবিয়া সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
ত্রিপোলির পতনের ১৫ বছর পর মিজরান ও এলগাদি দুজনই যুক্তরাজ্যকে নিজেদের ঘর হিসেবে দেখছেন। তবে লিবিয়ার প্রতি তাদের টান এখনো রয়েছে।
মিজরান বলেন, ঘর এমন কিছু নয়, যা একবার খুঁজে পেলেই চিরদিনের জন্য পাওয়া যায়। বরং এটি বারবার নতুন করে তৈরি করতে হয়।
এলগাদি নিজেকে এখন একজন ‘যাযাবর’ হিসেবে দেখেন। স্থায়ীভাবে লিবিয়ায় ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশাও আর করেন না। তবে তার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এখনো লিবিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে।
দক্ষ জনশক্তি বিদেশে চলে যাওয়ায় লিবিয়ার শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে কতটা ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ে অবশ্য মতভেদ রয়েছে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ভিজিটিং ফেলো তারেক মেগেরিসি বলেন, লিবিয়ার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে এখনো কয়েক হাজার দক্ষ ও কারিগরিভাবে যোগ্য মানুষ কাজ করছেন। তবে তাদের অনেকেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারণে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।
তার মতে, ২০১১ সালের বিপ্লবের পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। বিপ্লবের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক লিবীয় দেশে ফিরেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেক দক্ষ তরুণ পেশাজীবীও ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পদে থাকা অনেকেই নিজেদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার তুলনায় বেশি প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। শেষ পর্যন্ত তাদের অনেকে গাদ্দাফি সরকারের মতোই আচরণ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মেগেরিসির মতে, দুর্নীতিও দেশটির বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ২০১১ সালের পর বেড়ে ওঠা উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ দেশ ছাড়তে চাইছে।
তিনি বলেন, লিবিয়ায় যদি সত্যিকারের, বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে বিদেশে থাকা এই দক্ষ জনশক্তি খুব দ্রুত দেশে ফিরে আসবে।
তবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিআরআই মেনাসের সহযোগী টবি চিতায়াত মনে করেন, লিবিয়ার মেধাপাচারের প্রভাব নিয়ে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, পূর্ব ও পশ্চিমে দেশটির বিভক্তি, অস্থিতিশীল তেল রাজস্ব এবং ব্যাপক দুর্নীতির তুলনায় দক্ষ জনশক্তি বিদেশে চলে যাওয়ার প্রভাব দেশটির শাসনব্যবস্থা বা বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর তুলনামূলকভাবে কম।
তবে তিনিও মনে করেন, লিবিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের পুনঃসম্পৃক্ততার সম্ভাবনা নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি।
সূত্র : আল জাজিরা
![]() |
| লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি। ছবি : গেটি ইমেজেস |
সোমালি জলদস্যুদের হাতে জিম্মি ৬ ভারতীয় নাবিক
সোমালিয়ার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাহাজটিতে তুরস্কের জন্য পাঠানো অস্ত্র ও বিভিন্ন যোগাযোগ সরঞ্জাম ছিল। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভারত ও তুরস্কের কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করেনি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার পুন্টল্যান্ডের ইয়েল জেলার মারাইয়া উপকূল থেকে প্রায় সাড়ে ৩ নটিক্যাল মাইল দূরে জাহাজটি দখল করা হয়। সংবেদনশীল তথ্যের কারণে ওই কর্মকর্তা নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
জাহাজটিতে ৬ জন ভারতীয় নাবিক ছাড়াও একজন তুর্কি ও একজন জর্জিয়ান নাগরিক ছিলেন। এ ছাড়া দুইজন সার্বিয়ান নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন।
ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, আটজন জলদস্যু জাহাজটি দখল করে। পরে তারা জাহাজটি পুন্টল্যান্ডের দাঙ্গোরয়ো জেলার গারমালের কাছাকাছি উপকূলের দিকে নিয়ে যায়।
কর্মকর্তার ধারণা, জলদস্যুরা এর আগে গত ২৬ এপ্রিল ‘সোয়ার্ড’ নামের আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজও ছিনতাই করেছিল।
জাহাজে ছিল অস্ত্র ও যোগাযোগ সরঞ্জাম
সোমালিয়ার ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘লুতুফ’ জাহাজে মোগাদিশুর একটি তুর্কি সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জন্য পাঠানো অস্ত্র ছিল। এর পাশাপাশি যোগাযোগ ও স্যাটেলাইট সরঞ্জামও ছিল।
জাহাজটির মালিক ‘পোলার মুভমেন্ট শিপিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
জাহাজটি ছিনতাইয়ের পর নাবিকদের কী অবস্থায় রাখা হয়েছে বা তাঁদের বিষয়ে জলদস্যুরা কোনো দাবি জানিয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় ভারত ও তুরস্কের সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
![]() |
| ছবি: এএফপি |
Sunday, August 2, 2026
তিউনিসিয়ায় জনরোষ তীব্র, দানা বাঁধছে আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা
২০১১ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার প্রায় সব অর্জনই এখন ম্লান হয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নতুন সংবিধান ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে জনগণের অংশগ্রহণের যে প্রত্যাশা ছিল, তা কার্যত বিলীন হয়ে গেছে। একসময় টেলিভিশন ও গণমাধ্যমে রাজনৈতিক বিতর্কের যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, তার জায়গা নিয়েছে খেলাধুলা ও বিনোদনভিত্তিক অনুষ্ঠান।
সম্প্রতি রাজধানী তিউনিসে হাজারো মানুষ প্রেসিডেন্ট সাইদের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং জীবনযাত্রার অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেন। একই সময়ে সাইদের সমর্থকরাও পাল্টা সমাবেশ করে বিরোধীদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে তাদের কারাবন্দি করার দাবি জানান।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তিউনিসিয়া পরিচালক সালসাবিল শেল্লালি বলেন, সরকারবিরোধী যেকোনো সমালোচনা এখন কার্যত অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, পাঁচ বছর আগে কাইস সাইদ তিউনিসিয়ার গণতান্ত্রিক যাত্রাকে সমাপ্ত করে দেশকে আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে ফিরিয়ে নিয়েছেন। আইনের শাসন দুর্বল করা, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। তার শাসনে কোনো সমালোচকই নিরাপদ নন।
তাপপ্রবাহে উন্মোচিত অব্যবস্থাপনা
তীব্র তাপপ্রবাহ ও দাবানলে তিউনিসিয়ায় প্রায় ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। ইতালি ও আলজেরিয়ার সহায়তা সত্ত্বেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস কোম্পানি এসটিইজি এ পর্যায়ক্রমিক লোডশেডিং চালু করেছে। এতে কৃষিজ ফসল নষ্ট হচ্ছে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অনেক এলাকায় টানা ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তিউনিসীয় বিশ্লেষক বলেন, গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা বাড়বে এটা সবাই জানে। কিন্তু তিউনিসিয়ায় নেই প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, নেই বিনিয়োগ, নেই অর্থ। তিনি আরো বলেন, সমস্যা শুধু অবকাঠামোর নয়; জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পরিকল্পনারও চরম অভাব রয়েছে।
বিরোধীদের কারাবন্দি, গণমাধ্যমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ
দেশটির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সরকারবিরোধী নেতা হয় কারাগারে, নয়তো নির্বাসনে রয়েছেন। একসময়কার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল এন্নাহদার অধিকাংশ শীর্ষ নেতা বন্দি। দলটির ৮৫ বছর বয়সী নেতা রাশেদ ঘানুশিও কারাগারে রয়েছেন। গত মাসে অসুস্থ হয়ে কারাগারে অজ্ঞান হওয়ার পর থেকে তার অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে ‘ভুয়া খবর’ দমনের নামে প্রণীত কঠোর আইনের মাধ্যমে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ব্যঙ্গবিদ হাইথেম এল মেক্কিকে তিন বছর আগের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের কারণে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের গবেষক হামজা মেদদেব বলেন, সবখানেই সেন্সরশিপ চলছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে গবাদিপশু মারা যাচ্ছে, রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অসুস্থ মানুষ কষ্ট পাচ্ছেন, এমনকি বয়স্কদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
তার মতে, মানুষের ক্ষোভ কখনও রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ও পানি কোম্পানির দিকে, কখনও সরকারের দিকে গেলেও, প্রকৃত ক্ষমতাকেন্দ্র প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে দায়ী করতে মানুষ ভয় পাচ্ছে।
সংস্কারের আশা ক্ষীণ
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট সাইদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সমর্থনের কারণে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইস্যুর চেয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও তিউনিসিয়া সরকারের সঙ্গে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে তারা।
প্রতিবেশী আলজেরিয়া ও লিবিয়াও সীমান্তে অস্থিতিশীলতা এড়াতে সাইদ সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুন সম্প্রতি তিউনিসিয়ার স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক রিকার্দো ফ্যাবিয়ানি বলেন, প্রেসিডেন্ট সাইদ এমন একটি মানসিকতায় পরিচালিত হচ্ছেন, যেখানে দেশের সব সমস্যাকেই তিনি নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেন। তার মতে, তিউনিসিয়ার প্রায় সব আন্তর্জাতিক অংশীদারই এখন দেশটির সংস্কারের আশা ছেড়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সূত্র: আল জাজিরা
![]() |
| চলতি বছরের শুরুতে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের বিরুদ্ধে একনায়কতন্ত্রের অবসান ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক বিরোধীরা বিক্ষোভ করেন |
Tuesday, July 7, 2026
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পর এবার লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা করছে পাকিস্তান
দুটি পাকিস্তানি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। পূর্বে অপ্রকাশিত পাকিস্তানের এই উদ্যোগ সফল হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির কূটনৈতিক ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে।
২০১১ সালে ন্যাটো সমর্থিত অভ্যুত্থানে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়া পূর্ব ও পশ্চিম—এ দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসনে বিভক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের এই বিভক্তি দূর করতে কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে। এর মধ্যেই পাকিস্তানের এই সম্পৃক্ততার খবর সামনে এলো।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পৃথক মধ্যস্থতায় পাকিস্তান কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনও বারবার পাকিস্তানের এই ভূমিকার প্রশংসা করেছে।
একটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, লিবিয়ায় ইসলামাবাদের এই ভূমিকা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ‘পূর্ণ অবগত এবং এতে জড়িত’ রয়েছে।
উদ্যোগটিতে সৌদি আরব সমর্থন দিচ্ছে বলে উভয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। গত বছর ইসলামাবাদের সঙ্গে সৌদি আরবের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। সৌদি আরবও দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে আসছে।
উভয় পাকিস্তানি সূত্র জানায়, গত বছরের শেষের দিকে এই প্রচেষ্টা শুরু হয় এবং লিবিয়ার উভয় পক্ষই পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা অনুরোধ করেছিল।
অবশ্য পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সামরিক গণমাধ্যম শাখা, লিবিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলীয় কর্মকর্তা এবং কাতার, তুরস্ক, সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
ঐক্য পরিকল্পনা
বিশ্লেষকেরা বলছেন, লিবিয়াকে পুনরেকত্রীকরণের যেকোনো সফল পরিকল্পনার জন্য বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি পদ, নির্বাচনী নিয়ম এবং তেল রাজস্ব নিয়ে বিরোধের সমাধান করতে হবে, যা অতীতের প্রচেষ্টাগুলোকে ব্যর্থ করেছিল।
সম্পাদকীয়পরিষেবা
ব্রিটেনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট থিঙ্ক ট্যাঙ্কের গবেষক জালেল হারশাউই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ায় কঠোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে তারা যে কাঠামোটি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তা এখনো শিথিল ও অস্পষ্ট।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা একটি প্রস্তাবিত ‘লিবিয়া পুনরেকত্রীকরণ পরিকল্পনা’র সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল কনসেনসাস অ্যান্ড প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল’ নামক একটি সংস্থার অধীনে ৩৬ মাসের একটি অন্তর্বর্তী ক্ষমতা অংশীদারত্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, জাতিসংঘ স্বীকৃত ও পশ্চিমাঞ্চলভিত্তিক লিবিয়ান গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটির আবদুলহামিদ দ্বীবাহ প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। অন্যদিকে, পূর্বাঞ্চলভিত্তিক লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) ডেপুটি কমান্ডার সাদ্দাম হাফতার প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হবেন।
তবে একটি পাকিস্তানি সূত্র সতর্ক করে বলেছে, এই প্রস্তাবের বিস্তারিত নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
সাদ্দাম হাফতারের বাবা এবং এলএনএ-র কমান্ডার-ইন-চিফ খলিফা হাফতারের গোষ্ঠীটি লিবিয়ার অনেক বড় বড় তেলক্ষেত্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় তাকে বাজেটের ওপর কর্তৃত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
একটি পাকিস্তানি সূত্র জানায়, এই পুরো ব্যবস্থাটি যেন কার্যকর থাকে, তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান ‘সক্রিয় ভূমিকা’ পালন করবে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা
গত মাসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির রাওয়ালপিন্ডিতে সাদ্দাম হাফতারের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর কয়েক দিন পর সাদ্দাম হাফতার ওয়াশিংটন সফর করেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট তখন এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, রুবিও লিবিয়ার নেতাদের বিভেদ দূর করার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং লিবিয়ার ঐক্যের প্রতি মার্কিন সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বিশ্লেষকেরা লিবিয়ায় পাকিস্তানকে একটি গৌণ পক্ষ হিসেবে দেখেন। কারণ সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউএই, তুরস্ক ও মিসর বছরের পর বছর ধরে প্রভাব বিস্তারের লড়াই করছে।
তবে লিবিয়ার উভয় পক্ষের সঙ্গেই ইসলামাবাদের এমন সম্পর্ক রয়েছে, যা অন্য আঞ্চলিক শক্তির হয়তো নেই।
রয়টার্সের গত ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা পূর্বাঞ্চলীয় এলএনএ-র সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের চেষ্টা চালিয়েছেন। এর মধ্যে জেএফ-১৭ ফাইটার জেট এবং সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান বিক্রির সম্ভাবনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে, রয়টার্সের দেখা একটি অপ্রকাশিত নথি অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বী পশ্চিমাঞ্চলীয় জিএনইউ-ও সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত দুটি পাকিস্তানি সূত্র জানায়, কাতার এবং জিএনইউ-এর অন্যতম বড় সমর্থক তুরস্কও পাকিস্তানকে এই মধ্যস্থতায় জড়াতে উৎসাহিত করেছিল।
তবে ভূরাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনফর্মমি-র পরিচালক তারেক মেগেরিসি সতর্ক করে বলেছেন, কোনো চুক্তি সই হলেই যে তা টিকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তিনি গত বছর রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের নেতাদের মধ্যে হওয়া চুক্তির উদাহরণ দেন, যা কয়েক মাসের মধ্যেই ভেঙে পড়েছিল।
![]() |
| ২০১১ সালে ন্যাটো-সমর্থিত গণঅভ্যুত্থানে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ছবি: সংগৃহীত ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, June 23, 2026
সুদানের যুদ্ধ ও গণহত্যার পেছনে কারা by নাসরিন মালিক
সেখানে নির্বিচার গণহত্যা চলছে। একটি হাসপাতালেই প্রায় ৫০০ মানুষ হত্যা করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রোগী ও তাদের পরিবারের লোকজনও আছে। যাঁরা পালাতে পেরেছেন তাঁরা জানিয়েছেন, সেখানে একেবারে সাধারণ নাগরিকদের বাছবিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে।
আরএসএফ এত নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করছে যে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকেও জমিতে জমে থাকা রক্ত দেখা গেছে। আল ফাশের পতনের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার গণহত্যার গতি ও তীব্রতাকে রুয়ান্ডার গণহত্যার প্রথম ২৪ ঘণ্টার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
আল ফাশের ছিল সুদানের সেনাবাহিনীর দারফুর শেষ শক্তিকেন্দ্র। আর গত সপ্তাহটি সুদান যুদ্ধে একটি গুরুতর পরিবর্তনের সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এখন এই যুদ্ধে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী এসএএফ এবং মিলিশিয়া বাহিনী আরএসএফ দেশের নিয়ন্ত্রণের জন্য নিষ্ঠুর ও অবিরাম লড়াই চালাচ্ছে।
এই দুই পক্ষ আগে একসঙ্গে সরকারে অংশীদার ছিল। ২০১৯ সালে এক জনপ্রিয় বিপ্লবের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তারা বেসামরিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে এক অস্বস্তিকর জোট সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু পরে তারা প্রথমে বেসামরিকদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয় এবং এরপর একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে।
এই দুই গ্রুপে যে সংঘাত শুরু হয়, তা ছিল ভয়াবহ। এই সংঘাতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, বশিরের গড়ে তোলা আরএসএফ বাহিনী (বশিরকে রক্ষা করা ও দারফুর তাঁর হয়ে লড়ার জন্য মূলত জানজাউইদ যোদ্ধাদের নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল) গোপনে কতটা শক্তি ও সম্পদ সংগ্রহ করে ফেলেছিল।
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে যে যুদ্ধ শুরু হয়, সেটি কেবল সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোনো ছোটখাটো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ ছিল না। এটি ছিল দুই পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনীর মধ্যকার যুদ্ধ। কারণ, উভয় পক্ষের হাতেই অস্ত্রভান্ডার, অর্থের উৎস, হাজার হাজার সেনা এবং বিদেশি জোগানদাতাদের সহায়তা—সবকিছু ছিল।
এর পর থেকে সেখানে কয়েক কোটি মানুষ ভিটেছাড়া হয়েছে এবং আনুমানিক দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। সেখানে এখন তিন কোটির বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন। কিন্তু এই ভয়াবহ সংখ্যাগুলোও সুদানের আসল দুর্দশার পুরোটা চিত্র দেয় না।
দেশটা খুব দ্রুত ভেঙে পড়ছে। সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আর দারফুর আরএসএফ যে ভয়ংকরভাবে মানুষ হত্যা করেছে, তা এসব পরিসংখ্যানের বাইরের টাটকা নিষ্ঠুর বাস্তবতা।
প্রকাশ্যে আসা এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে স্থানীয় মানুষ মিলিশিয়াদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছেন। এক ব্যক্তিকে একজন কমান্ডার বলছিলেন, ‘কেউ বাঁচবে না।’ এরপর তাঁকে গুলি করা হয়। কমান্ডার বলছিলেন, ‘আমি তোমাদের প্রতি কোনো দয়া দেখাব না। আমাদের কাজ শুধুই হত্যা করা।’
সবকিছুই আগে থেকে অনুমান করা গিয়েছিল। কোনো কিছু একদমই অপ্রত্যাশিত ছিল না। মাসের পর মাস ধরে গণহত্যা ও নৃশংসতার আশঙ্কা নিয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছিল। প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত দারফুরবাসী (যাঁরা অন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন) আল ফাশের শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধ বাড়তে থাকায় কেউ কেউ সেখান থেকে আবার পালিয়ে যান। অনেকেই শহরটিতে আটকা পড়ে যান।
এই দৃশ্য শুধু ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার প্রথম দিকের দিনগুলোকেই মনে করিয়ে দেয় না; বরং ২০ বছর আগের দারফুরের সেই ভয়ংকর গণহত্যাকেও আবার জীবন্ত করে তোলে। তবে এবার তা ফিরে এসেছে আরও ভয়াবহ ও ঘনীভূত আকারে।
আজকের আরএসএফ আসলে সেই পুরোনো জানজাওয়িদেরই নতুন রূপ। তবে এবার তারা আরও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত, শক্তিশালী বিদেশি মিত্রদের সমর্থনপুষ্ট এবং আবারও তারা অনারব জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার প্রবল ইচ্ছা নিয়ে এগোচ্ছে। এখন তারা উট বা ঘোড়ায় চড়ে আসে না। তারা আসে চার চাকার ‘টেকনিক্যাল’ গাড়িতে। সেই গাড়িতে মেশিনগান বসানো থাকে। তাদের সঙ্গে আরও থাকে ভয়ংকর শক্তিশালী ড্রোন।
দারফুর ও আল ফাশের অঞ্চলে যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চলছে, তার পেছনে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বড় ভূমিকা রাখছে। ইউএই অনেক দিন ধরেই আরএসএফ-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র। আরএসএফ মিলিশিয়াদের ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে ইউএই এর আগে ইয়েমেনের যুদ্ধে পাঠিয়েছিল। এখন তারা আরএসএফের হাতে প্রচুর টাকা ও অস্ত্র দিচ্ছে। এর ফলে সুদানের যুদ্ধ আরও ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়েছে।
ভূরি ভূরি প্রমাণ থাকার পরও ইউএই এখনো দারফুরে নিজের ভূমিকা অস্বীকার করে যাচ্ছে। বিনিময়ে তারা সুদানের মতো বড়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর দেশে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে। এ ছাড়া আরএসএফের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর খনি থেকে তোলা সোনার বেশির ভাগ অংশও ইউএই পাচ্ছে।
এদিকে আরও কিছু দেশ ও গোষ্ঠী এই সংঘাতে নিজেদের স্বার্থে জড়িয়েছে। ফলে যুদ্ধটি এখন একধরনের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বা পরোক্ষ শক্তির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এর ফল এক ভয়াবহ অচলাবস্থা, রক্তক্ষয় ও এমন এক পরিস্থিতি, যার ইতি টানা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, অথচ সবকিছুই সবার চোখের সামনে ঘটছে।
সুদানের যুদ্ধকে অনেকে ‘ভুলে যাওয়া যুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এটি বিশ্বশক্তিগুলোর চুপ থাকা ও অবহেলার ফসল। কারণ, সুদানের ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া মানে হচ্ছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির ভণ্ডামির মুখোমুখি হওয়া।
● নাসরিন মালিক, দ্য গার্ডিয়ান–এর কলাম লেখক।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত
![]() |
| গাড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন সুদানের সেনাবাহিনীর সদস্য। পেছনে জ্বলছে তেল পরিশোধনাগার। সুদানের উত্তর বাহরি প্রদেশ। জানুয়ারি, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, June 16, 2026
মাদাগাস্কারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাসের জীর্ণ দশাই কি বিক্ষোভ উসকে দিয়েছিল
শিক্ষার্থী উলরিক সাম্বিজাফি এএফপির সংবাদকর্মীদের ছাত্রাবাসের অবস্থা দেখানোর জন্য ডাকেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের থাকার জায়গাগুলো দেখে যান।’ গত ২৫ সেপ্টেম্বর মাদাগাস্কারে শুরু হওয়া যে বিক্ষোভ ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তাতে অংশ নেন এই শিক্ষার্থীও।
সাম্বিজাফির থাকার কক্ষের পেছনের দরজায় গিয়ে দেখা গেল, মাত্র দুই মিটার (৬ দশমিক ৫ ফুট) দূরের একটি খোলা নর্দমা দিয়ে আবর্জনা ভেসে যাচ্ছে।
২৪ বছর বয়সী সাম্বিজাফি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। এএফপিকে তিনি তাঁর পায়ের গোড়ালি ও হাঁটুর মাঝ বরাবর দেখিয়ে বলেন, ‘বর্ষায় নর্দমার পানি এই পর্যন্ত উঠে আসে। এগুলোই প্রমাণ করে যে আমাদের বিদ্রোহ ন্যায্য।’
সাম্বিজাফির বাড়ি মাদাগাস্কারের পূর্বাঞ্চলে। তিনি দেশটির সেসব শিক্ষিত তরুণের একজন; যাঁরা দেশটিতে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন দেশে হওয়া ‘জেন–জি’ আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় এ বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গতকাল মঙ্গলবার মাদাগাস্কারের পার্লামেন্টে ভোটাভুটি হয়েছে। এতে প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা অভিশংসিত হয়েছেন। এরপর সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিট রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
রাজধানী আন্তানানারিভোর আঙ্কাতসো এলাকায় অবস্থিত এ ভবনটি ২০২৩ সালে চালু হয়েছে। তবে এখনই সেখানে ফাটল দেখা দেওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, এটির নির্মাণে বড় ত্রুটি রয়েছে।
‘তাঁরা তরুণদের কথা ভাবেননি’
সাম্বিজাফি বলেন, ‘মাদাগাস্কারের তরুণদের কথা কেউ ভাবেন না। কারণ, এই দেশের নেতাদের সন্তানেরা আন্তানানারিভো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন না। তাঁরা বর্দো, এমআইটি, হার্ভার্ড ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েন।’
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ মাদাগাস্কারে বিদ্যুৎ ও পানির সংকটকে কেন্দ্র করে এ বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল। পরে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
গত সপ্তাহে রাজোয়েলিনা তাঁর দেশের তরুণ, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও তাঁদের আবাসন পরিস্থিতির দিকে গভীরভাবে নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
সম্প্রতি নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেজর জেনারেল রুফিন ফরচুনাত দিম্বিসোয়া জাফিসাম্বোর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করবেন, যা সব শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণ করবে।
এ নিয়ে সাম্বিজাফি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসেন। তিনি বলেন, মাদাগাস্কারে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, ‘নিজের থালার খাবার শেষ হওয়ার খবর নেই, পাত্রে কী রাখা আছে তার খোঁজ’।
ছাত্রাবাসের এ ভবন ও কক্ষগুলোই যে আঙ্কাতসো এলাকায় শিক্ষার্থীদের থাকার সবচেয়ে খারাপ জায়গা, তা নয়। পাশের হলুদ চারতলা ভবনেরও একই দশা। ৪০০ জনকে রাখার উপযোগী করে এটি বানানো হয়েছে। তবে সেখানে অনেক বেশি শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকেন। প্রায় ১০ বছর আগে ভবনটিতে শিক্ষার্থীরা থাকতে শুরু করেন। পুরোনো বাসিন্দাদের কেউই মনে করতে পারেন না যে কমিউনিটি কিচেনের প্লাগ বা নল কখনো কাজ করত কি না।
৩০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইয়ানদোহারিলালা রাকোতন্দ্রিনা নিচতলার একটি কক্ষে রাখা দুটি দুই চাকার যান দেখিয়ে বলেন, এটি স্কুটারের জন্য গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
তৃতীয় তলার বাথরুম ও লন্ড্রিতে দেখা গেল ট্যাপ থেকে অল্প অল্প করে পানি পড়ছে। পানির চাপ নেই সেখানে।
দেয়ালে একটি কাগজ সাঁটানো। কোন শিক্ষার্থী কোন দিন এগুলো পরিষ্কার করবেন, তার রুটিন দেওয়া। তবে কিছু শৌচাগারের অবস্থা এতটাই খারাপ যে তার স্বাভাবিক রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। পানির সংকটের কারণে এগুলো আরও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
রাকোতন্দ্রিনা বলেন, ‘আমরা আক্ষরিক অর্থে আবর্জনার মধ্যে বসবাস করছি।’ তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন আশপাশ থেকে প্রস্রাবের তীব্র দুর্গন্ধ আসছিল।
মেঝেতে বিছানা
ইজেকিয়েল লেডি নামের ওই ছাত্রাবাসে রাজধানীর বাইরে থেকে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ নেই। চারজনের জন্য তৈরি কক্ষে ছয়জনকে থাকতে হচ্ছে।
১৮ বর্গমিটার (১৯৪ বর্গফুট) মাপের ছোট কক্ষে ছাত্রদের কয়েকজনকে মিলে এক বিছানায় বা মেঝেতে তোশক বিছিয়ে ঘুমাতে দেখা যায়।
এক শিক্ষার্থীকে দেখা গেল ভাঙা আয়নার সামনে চুল কাটার সেবা দিচ্ছেন। চুল কাটার জন্য প্রতিজনের কাছ থেকে দুই হাজার আরিয়ারি (দশমিক ৪০ ইউরোর কম) নিচ্ছেন তিনি, যা শহরে চুল কাটার খরচের অর্ধেক।
লেডি নামে এক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী বলেন, ‘মাদাগাস্কারের তরুণেরা সব পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে পারদর্শী। সম্ভবত এ জন্যই নেতারা মনে করেন, তাঁদের সাহায্য করার প্রয়োজন নেই।’
![]() |
| আঙ্কাতসো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসের দৃশ্য। ছবি: এএফপি |
Monday, June 15, 2026
কেনিয়ায় কারা এই ‘ম্যাডাম’, কীভাবে শিশুদের বিপদগামী করেন তাঁরা
কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউতে দিনরাত ট্রাক ও লরি চলাচল করে। পণ্য ও মানুষ নিয়ে এসব যানবাহন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, এমনকি উগান্ডা, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও কঙ্গো গণপ্রজাতন্ত্রের মতো অন্য দেশ পর্যন্ত যায়।
শহরটির অবস্থান নাইরোবি থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার (৩১ মাইল) দূরে। এই গুরুত্বপূর্ণ শহরটি আগে থেকেই যৌন ব্যবসার জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন এটি শিশুদের যৌন নিপীড়নের জায়গাও হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের শুরুতে বিবিসি আফ্রিকা আইয়ের দুজন নারী অনুসন্ধানী প্রতিবেদক যৌনকর্মী সেজে ওই শহরের যৌন ব্যবসা চক্রের ভেতরে ঢুকে পড়েন। ওই দুই অনুসন্ধানী সাংবাদিক এমন ভাব করছিলেন, যেন কীভাবে ‘ম্যাডাম’ হওয়া যায়, তা তাঁরা শিখতে চান।
ওই দুই সাংবাদিক গোপনে কিছু ভিডিও ধারণ করেছেন। ভিডিওতে অন্য দুজন নারীকে কথা বলতে শোনা যায়। তাঁরা বলছিলেন, এটা যে বেআইনি কাজ, তা তাঁরা জানেন। এরপর ওই দুই নারী বিবিসির সাংবাদিকদের সঙ্গে যৌন পেশায় জড়িত কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের পরিচয় করিয়ে দেন।
বিবিসি ওই ভিডিও এবং তাদের পাওয়া সব তথ্য গত মার্চে কেনিয়ার পুলিশকে দেয়। বিবিসির ধারণা, এরপর ‘ম্যাডামরা’ তাঁদের জায়গা বদলে ফেলেছেন। পুলিশ বলেছে, যেসব নারী ও মেয়েদের ভিডিওতে দেখা গেছে, তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
কেনিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। মামলায় জিততে হলে পুলিশের ও সংশ্লিষ্ট শিশুর সাক্ষ্য দরকার হয়। কিন্তু বেশির ভাগ সময় শিশুরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়।
বিবিসির রাতের আঁধারে গোপনে ধারণ করা ঝাপসা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এক নারী নিজেকে ‘নিয়ামবুরা’ নামে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি হেসে হেসে বলছেন, ‘তারা তো এখনো বাচ্চা। তাই একটু মিষ্টি দিলেই সহজে কাবু করে ফেলা যায়।’
নিয়ামবুরা নামের ওই নারী বলেন, ‘মাই মাহিউতে যৌনবৃত্তি যেন নগদ ফসলের মতো। ট্রাকচালকেরাই এর মূল চালিকাশক্তি। আমরা সেখান থেকেই মুনাফা করি। মাই মাহিউতে এটা এখন একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে।’
নিয়ামবুরা বলেন, তাঁর কাছে মাত্র ১৩ বছর বয়সী একটি মেয়ে আসে। সে ছয় মাস ধরে যৌন পেশায় কাজ করছে।
নিয়ামবুরা আরও বলেন, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে কাজ করাটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আপনি তাদের শহরে খোলাখুলি আনতে পারেন না। আমি শুধু গভীর রাতে, চুপিসারে তাদের বাইরে নিয়ে আসি।’
কেনিয়ার জাতীয় আইনে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের নিজেদের সম্মতিতে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে অনেক পৌরসভায় স্থানীয় আইন অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাই মাহিউ শহরটি নাকুরু কাউন্টির অন্তর্ভুক্ত। সেখানে এটা নিষিদ্ধ নয়।
তবে কেনিয়ার দণ্ডবিধি অনুযায়ী, যৌনবৃত্তি থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে জীবন যাপন করাটা বেআইনি। হোক তিনি যৌনকর্মী নিজে বা কোনো দালাল। ১৮ বছরের কমবয়সী কোনো শিশুকে যৌন বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বিক্রি বা পাচার করার অপরাধে ১০ বছর থেকে শুরু করে আমৃত্যু কারাদণ্ড হতে পারে।
আরেকটি সাক্ষাতে নিয়ামবুরা গোপনে অনুসন্ধানকারী সাংবাদিককে একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তিনজন কিশোরী একটি সোফায় বসে ছিল। আরেকজন বসে ছিল একটি কাঠের চেয়ারে। এরপর নিয়ামবুরা ঘর থেকে বের হয়ে যান। আর এতে অনুসন্ধানকারী একা একা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।
মেয়েরা জানায়, তাদের দিনে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়।
একজন মেয়ে বলে,‘ অনেক সময় এক দিনেই অনেক লোকের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে হয়। খদ্দেররা এমন সব কাজ করতে বাধ্য করেন, যা কল্পনাও করা যায় না।’
কেনিয়ায় কতজন শিশুকে জোর করে যৌন ব্যবসায় যুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো হালনাগাদ পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১২ সালে কেনিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছিল, প্রায় ৩০ হাজার শিশু তখন যৌনকাজে জড়িত ছিল।
কেনিয়ার তৎকালীন সরকার এবং বর্তমানে বিলুপ্ত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ইরাডিকেট চাইল্ড প্রস্টিটিউশন ইন কেনিয়া’র দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি করা হয়েছিল।
২০২২ সালে গ্লোবাল ফান্ড টু অ্যান্ড মডার্ন স্লেভারি নামের এনজিও প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কিলিফি ও কোয়ালে কাউন্টিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিশুকে জোর করে যৌনকর্মে যুক্ত করা হয়েছে।
বিবিসির আরেক অনুসন্ধানী সাংবাদিক যৌনপল্লির অন্য এক নারীর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেন। ওই নারী নিজের নাম চেপ্টু বলে উল্লেখ করেন।
বিবিসির সাংবাদিককে চেপ্টু বলেন, তিনি কমবয়সী মেয়েদের বিক্রি করে জীবিকা উপার্জন করেন এবং আরামদায়ক জীবন যাপন করতে পারেন। বেআইনি হওয়ায় এ ধরনের ব্যবসা খুব গোপনে করতে হয়।
চেপ্টু আরও বলেন, ‘যদি কেউ ছোট মেয়ের চাহিদা জানান, আমি তাঁদের কাছে অর্থ চাই। আমাদের নিয়মিত কিছু খদ্দেরও আছেন, যাঁরা বারবার তাদের জন্য ফিরে আসেন।’
চেপ্টু গোপন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে একটি ক্লাবে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর অধীন কাজ করা চারজন মেয়ে ছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স ১৩ বছর। বাকিরা বলেছে, তাদের বয়স ১৫।
কমবয়সী মেয়েদের থেকে কত আয় হয়, সে বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলেন চেপ্টু। তিনি বলেন, মেয়েরা প্রতি ৩ হাজার কেনিয়ান শিলিং (প্রায় ২৩ ডলার বা ১৭ পাউন্ড) আয় করলে, তাতে তার নিজের ভাগের পরিমাণ হয় ২ হাজার ৫০০ শিলিং (প্রায় ১৯ ডলার বা ১৪ পাউন্ড)।
আরেক সাক্ষাতে মাই মাহিউ শহরের একটি বাড়িতে চেপ্টু অনুসন্ধানকারী সাংবাদিককে দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে একা রেখে চলে যান। ওই মেয়েদের একজন বলে, সে গড়ে প্রতিদিন পাঁচজন পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে বাধ্য হয়।
কেনিয়ার যৌনবৃত্তি এক জটিল ও অন্ধকার জগৎ। সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ উভয়ই শিশুদের যৌনবৃত্তিতে নিয়ে আসার সঙ্গে জড়িত।
মাই মাহিউ শহরে ঠিক কতজন শিশুকে জোর করে এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের এই ছোট্ট শহরে তাদের খুঁজে পাওয়া খুব সহজ।
‘বেবি গার্ল’ নামে পরিচিত এক সাবেক যৌনকর্মী এখন মাই মাহিউ শহরে যৌন নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা মেয়েদের আশ্রয় ও সহায়তা দেন। বর্তমানে ৬১ বছর বয়সী এ নারী ৪০ বছর যৌনকাজে জড়িত ছিলেন। তাঁর বয়স যখন ২০-এর কোটায়, তখন তিনি পারিবারিক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে স্বামীর ঘর থেকে পালিয়ে এসে পথে বসেন। তাঁর সঙ্গে তিন সন্তান ছিল এবং তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে তিনি যৌন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।
বাড়ির সামনের অংশে একটি আলো ঝলমলে ঘরে কাঠের টেবিলে বসে এই নারী বিবিসির সাংবাদিককে চারজন তরুণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই চারজনকে শৈশবে মাই মাহিউ শহরের কিছু ‘ম্যাডাম’ জোর করে যৌনবৃত্তির পথে ঠেলে দিয়েছিলেন।
প্রত্যেক তরুণীই বলেছেন, হয় তাঁদের মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল অথবা মা-বাবা বেঁচে ছিলেন না, নয়তো বাড়িতে তাঁদের নির্যাতনের শিকার হতে হতো। তাঁরা নিজেদের বাড়ি থেকে পালিয়ে নিরাপত্তা পাওয়ার আশায় মাই মাহিউতে এসেছিলেন। কিন্তু সেখানে আবারও নিপীড়নের শিকার হন তাঁরা।
মিশেল নামের এক তরুণী বলেন, ১২ বছর বয়সে তিনি মা–বাবাকে এইচআইভির কারণে হারিয়েছিলেন। তারপর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। রাস্তায় এক লোকের সঙ্গে দেখা হয়। ওই লোক তাঁকে থাকার জায়গা দেন। কিন্তু তাঁর ওপর যৌন নিপীড়ন শুরু করেন।
দুই বছর পর মাই মাহিউর এক ‘ম্যাডাম’ তাঁর কাছে এসে তাঁকে যৌনকর্মে যুক্ত হতে বাধ্য করেন।
লিলিয়ান নামের ১৯ বছর বয়সী আরেক তরুণী বলেন, ছোটবেলাতেই তিনি মা–বাবাকে হারিয়েছেন। তিনি তাঁর চাচার কাছে ছিলেন। ওই চাচা তাঁকে গোসলের সময় গোপনে ভিডিও করেন এবং সেই ভিডিও বন্ধুদের কাছে বিক্রি করেন। এভাবে পরে তিনি ধর্ষণের শিকার হন।
ঘটনার সময় লিলিয়ানের বয়স ১২ বছর ছিল। তিনি তখন পালিয়ে যান। এরপর আবার এক ট্রাকচালকের হাতে ধর্ষণের শিকার হন। ওই ট্রাকচালকই তাঁকে মাই মাহিউতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে এক নারী তাঁকে সেখানে যৌনকর্মের সঙ্গে যুক্ত করেন।
এই তরুণীরা এখন ‘বেবি গার্ল’-এর আশ্রয়ে আছেন। তাঁদের দুজন এখন ফটোগ্রাফি স্টুডিওতে আর দুজন সৌন্দর্য চর্চাকেন্দ্রে কাজ করছেন।
তাঁরা সমাজে সচেতনতা বাড়ানোর কাজে ‘বেবি গার্লকে’ সহযোগিতা করেন।
লিলিয়ান ফটোগ্রাফি শেখা এবং অতীতের নির্যাতনের ক্ষত থেকে সেরে ওঠার ওপর মনোনিবেশ করেছেন।
লিলিয়ান বলেন, ‘আমি আর ভয় পাই না। কারণ, “বেবি গার্ল” আমার পাশে আছেন। তিনি আমাদের অতীতকে ভুলে যেতে সাহায্য করছেন।’
![]() |
| কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউ যৌন ব্যবসার এলাকা হিসেবে পরিচিত। ছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে |
Thursday, June 11, 2026
যুদ্ধক্ষেত্র পালানো নারীর ডায়েরি: ‘প্রার্থনা করেছিলাম, পেটের সন্তান যেন এই পৃথিবীতে না আসে’
গত মে মাসে আমিরা সুদানের অন্যতম সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র পেরোনোর সময় এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই কথা রেকর্ড করা অডিও ডায়েরিতে বলেছেন তিনি।
ওই সময় আরএসএফ এন নাহুদ দখল করে নেওয়ায় শহরটি থেকে বেরোনোর রাস্তা ছিল বিপৎসংকুল। তবু নিজে বাঁচতে, অনাগত সন্তানকে বাঁচাতে তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না। সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের যুদ্ধ দুই বছরের বেশি সময় ধরে সাধারণ নাগরিকদের ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এখন কোরদোফানের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে উঠেছে সম্মুখসমর। সেই পথ দিয়েই পালিয়ে যান আমিরা।
পালানোর সময় আমিরা একটি অডিও ডায়েরি রেকর্ড করেন। এই ডায়েরি গ্লোবাল ক্যাম্পেইন গ্রুপ আভাজ (এভিএএজেড) বিবিসির কাছে সরবরাহ করেছে। পরে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় ফোনে তাঁর সঙ্গে বিবিসির কথা হয়। সেখানে সন্তান জন্ম দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি।
পালানোর পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে আমিরা বলেন, ‘শহরে আর কোনো হাসপাতাল নেই, নেই কোনো ফার্মেসি। আমার ভয় হচ্ছিল, যদি আরও দেরি করি, তাহলে হয়তো কোনো গাড়ি পাওয়া যাবে না। যানবাহন চলাচল তখন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যেটুকু ছিল, তা–ও অবিশ্বাস্য রকম কঠিন আর ভীষণ ব্যয়বহুল।’
বন্দুকের মুখে যাত্রা শুরু
যাত্রার শুরু থেকেই ঝামেলা হচ্ছিল আমিরার। বলেন, যাতায়াতের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিল আরএসএফ ও তাদের সহযোগীরা।
এন নাহুদ থেকে পালানোর জন্য আমিরার স্বামী কোনো রকমে একটি ট্রাক ভাড়া করেছিলেন। সেই ট্রাকে চড়তেই বিপত্তি শুরু। চালক ছিলেন আরএসএফের সদস্য। তিনি ট্রাকটি আরেক তরুণের কাছে একই সময়ে ভাড়া দিয়েছিলেন। এ নিয়ে চালক ও ওই তরুণের মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়।
আমিরা বলেন, ‘চালক সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক বের করে ওই তরুণকে গুলি করার হুমকি দিলেন। সবাই তাঁকে থামানোর চেষ্টা করছিলেন, এমনকি তাঁর সঙ্গে থাকা আরএসএফের সঙ্গীও। তরুণের দাদি আর মা কাঁদতে কাঁদতে চালকের পা ধরে গুলি না করার অনুরোধ করেছিলেন। আমরা যাত্রীরা ভয়ে হিম হয়ে গিয়েছিলাম।’
আমিরা আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছিল, যদি তিনি গুলি চালান তবে একজনকে নয়, অনেককেই মেরে ফেলবেন। কারণ, তিনি গাঁজা খাচ্ছিলেন, মাতাল ছিলেন।’
শেষমেষ চালক বন্দুক সরিয়ে রাখলেও ওই তরুণকে পরিবারসহ এন নাহুদেই নামিয়ে দেন। তাঁদের রেখেই আমিরাদের যাত্রা শুরু হলো। এরপরও যাত্রা ছিল শঙ্কায় পূর্ণ। খানাখন্দে ভরা রাস্তা, ট্রাকভর্তি লাগেজ আর গাদাগাদি করা ৭০ থেকে ৮০ জন, বারবার ছোট ছোট ঝিরি পেরোনোর ঝক্কি আর মাথার ওপর প্রখর রোদ্র—সব মিলিয়ে অস্থির যাত্রা। মায়েরা এক হাতে আঁকড়ে ধরছেন গাড়ি, আরেক হাতে আগলে রাখছেন সন্তান।
আমিরা বলেন, ‘যাত্রার পুরোটা সময় ভয়ে ছিলাম। প্রার্থনা করছিলাম, যেন পেটের সন্তান এ সময় পৃথিবীতে না আসে। শুধু চেয়েছিলাম, সব ঠিকঠাক হয়ে যাক।’
ভয়ের শেষ নেই
অবশেষে আমিরারা পশ্চিম কোরদোফানের রাজধানী এল-ফুলায় গিয়ে পৌঁছান। কিন্তু এ শহরেও ঢুকে পড়ছেন সেনারা। এ কারণে আমিরা সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে চাননি।
অডিও ডায়েরিতে আমিরা রেকর্ড করেছিলেন, ‘সেনারা এল-ফুলায় ঢুকলে কী হবে, আমি জানতাম না। কারণ, সেনারা, বিশেষ করে বাগারা, রিজেইগাতসহ কিছু নির্দিষ্ট জাতিগত গোষ্ঠীর লোকদের নিশানা বানানো শুরু করেছেন। সেনাদের ধারণা ছিল, এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা আরএসএফের সঙ্গে যুক্ত।’
অডিও ডায়েরিতে আমিরা বলেন, তাঁর স্বামী এমন সম্প্রদায়ের একজন। যদিও আরএসএফের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি সরকারি চাকরি করেন, আইন পড়েছেন। কিন্তু এখন কিছুই আর বিবেচনা করা হচ্ছে না। শুধু জাতিগত কারণেই মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ বলেছে, সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে বন্দী বেসামরিক লোকদের বিচারবহির্ভূত হত্যা করার মতো অভিযোগগুলো বিশ্বাসযোগ্য। সেনাবাহিনী এসবকে কিছু সদস্যের ‘ব্যক্তিগত’ অপরাধ বলে দায় এড়ায়। চলতি বছরের শুরুর দিকে সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছেন।
চেকপোস্ট, ঘুষ আর ভাঙা গাড়ি
তিনটি রাজ্য নিয়ে গঠিত কোরদোফান এখন প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সুদানের যুদ্ধের জন্য এ অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র ও প্রধান পরিবহন রুটের এক কৌশলগত কেন্দ্র।
আরএসএফের পাশাপাশি অন্যান্য মিলিশিয়াদের সম্পৃক্ততা, বিশেষ করে শক্তিশালী এসপিএলএম-এন সহিংসতাকে তীব্র করে তুলেছে। এতে গুরুতর মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে সহায়তাদানকারী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে ত্রাণ সরবরাহ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এল-ফুলা থেকে দক্ষিণ সুদান সীমান্তে পৌঁছাতে আমিরার তিন দিন লেগেছিল। এ সময়ে তাঁদের একাধিকবার গাড়ি পাল্টাতে হয়েছে। আর পথে পথে ছিল বাধা।
আমিরা বলেন, ‘আরএসএফের চালকেরা নিজের ইচ্ছেমতো ঠিক করতেন কে যাবেন, কোথায় বসবেন, কত ভাড়া দেবেন। কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না। আর তাঁরা সবাই ছিলেন সশস্ত্র।’
আমিরা বলেন, পথে প্রতি ২০ মিনিট পরপর তল্লাশিচৌকি। প্রতি চৌকিতে বাধ্যতামূলক ঘুষ দিতে হতো। অথচ তাঁরা আগে থেকেই আরএসএফের সদস্যদের অর্থ দিয়ে সঙ্গী হিসেবে নিয়েছিলেন।
সেখানে খাবারের দাম ছিল অনেক বেশি। ছিল পানির সংকট। এল-হুজাইরতা নামের একটি গ্রামে তাঁরা আরএসএফের স্টারলিংক ডিভাইস ব্যবহার করে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে পেরেছিলেন, কিন্তু তা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
আমিরা বলেছেন, ‘অনলাইনে ফিরলেই সতর্ক থাকতে হয়। যদি আরএসএফের সদস্যরা শুনতে পান আপনি সেনাবাহিনীর কোনো ভিডিও দেখছেন, কোনো গান বাজাচ্ছেন, এমনকি শুধু কথায় আরএসএফকে উল্লেখ করেছেন, তাহলেই আপনাকে গ্রেপ্তার করা হবে।’
আমিরাদের যাত্রাপথের রাস্তাঘাট ছিল ভাঙাচোরা। গাড়ি বারবার বিকল হয়ে যাচ্ছিল। যাত্রাপথে মোট তিনবার গাড়ি বিকল হয়ে যায়। একবার জঙ্গলের ভেতর গাড়ির চাকা ফেটে যায়। সে সময় সবচেয়ে ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এমনিতেই পানি নেই। এর ওপর আশপাশের কেউ সাহায্য করতেও রাজি নন।
আমিরা বলেন, ‘আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, আর কোনো দিন কোথাও পৌঁছাতে পারব না। এখানেই মরে যাব। হাল ছেড়ে দিলাম। শুধু একটা কম্বল ছিল, সেটি মাটিতে বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেদিন সত্যিই মনে হয়েছিল, এটাই আমার শেষ।’
কিন্তু শেষ হয়নি। একটি সবজিবোঝাই পিকআপে চড়ে অবশেষে সামনে এগোতে থাকেন আমিরা ও তাঁর স্বামী।
সীমান্ত পেরোনোর সংগ্রাম
অবশেষে পরদিন আমিরারা পৌঁছালেন দক্ষিণ সুদানের সীমান্ত আবেইতে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কাদায় ভরে গেছে পথ। তাঁরা তখন তেলের ব্যারেলবোঝাই গাড়িতে। গাড়ি বারবার কাদায় ডুবে যাচ্ছিল।
বৃষ্টি আর কাদায় যাত্রা থমকে যায় বারবার। ব্যারেলবোঝাই গাড়ি কাদায় আটকে যায়। জামাকাপড় ভিজে একাকার। ব্যাগ ধুলো আর গরমে আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, এবার পুরো ভিজে গেছে। ঠান্ডায় কাঁপছিলেন আমিরারা। প্রার্থনা করেছিলেন, যেন নিরাপদে পৌঁছাতে পারেন।
শেষমেশ আমিরা ও তাঁর স্বামী এন নাহুদ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবায় পৌঁছালেন। সেখান থেকে বাসে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা। হাজার মাইলের দুঃসহ যাত্রা শেষে সাময়িক আশ্রয় পান তাঁরা।
আশ্রয় উগান্ডায়, মন সুদানে
আমিরার স্বজনেরা এখনো সুদানে। সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর। পাশাপাশি তিনি প্রথমবার মা হওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্ন।
আমিরা বলেন, ‘সন্তান জন্ম দেওয়ার বিষয়টা নিয়ে আমি খুব ভয় পাচ্ছি। কারণ, এটাই প্রথমবার, আর আমার মা পাশে থাকবেন না। শুধু স্বামী আর এক বান্ধবী থাকবে। সবকিছু এত অগোছালো, এত বিশৃঙ্খল—আমি সামলাতে পারছি না।’
আমিরা একজন নারী অধিকারকর্মী ও গণতন্ত্রপন্থী কর্মী। যুদ্ধের সময় তিনি জরুরি সহায়তা দলের সঙ্গে কাজ করেছেন। সেনারা তাঁদের সন্দেহের চোখে দেখতেন, কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
আমিরা বলেন, ‘সেনাদের ভয় পেতাম। কারণ, তাঁরা তরুণদের ধরে নিয়ে যেতেন। আরএসএফ এসেও পরিস্থিতি ভালো হয়নি। তারা লুট করে, ধর্ষণ করে। সেনারা যা করে, এরাও কম কিছু নয়। দুই পক্ষই একই রকম।’
আরএসএফ অবশ্য বলেছে, তারা সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে না। জাতিগত নিধনের অভিযোগ তারা অস্বীকার করে বলেছে, এগুলো গোষ্ঠীগত সংঘাতমাত্র। দুই পক্ষই (সরকারি সেনা ও আরএসএফ) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আমিরার জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর আনন্দ হলো—মা হওয়া। কিন্তু তিনি কি সন্তানকে নিয়ে আবার কখনো সুদানে ফিরতে পারবেন?
আমিরা বলেন, ‘আশা করি, একদিন সুদানের যুদ্ধ থামবে, পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে আগের মতো সব হবে না। কিন্তু অন্তত এভাবে মানুষ অকাতরে মরবে না।’
![]() |
| আমিরাদের যাত্রাপথের রাস্তাঘাট ছিল ভাঙাচোরা। যাত্রাপথে মোট তিনবার গাড়ি বিকল হয়। ছবি: বিবিসি থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট |
Monday, April 6, 2026
মরক্কোয় আবিষ্কার হওয়া ডাইনোসরের কঙ্কাল ভাবাচ্ছে বিজ্ঞানীদের
যে ডাইনোসরটির কঙ্কালের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেটির বৈজ্ঞানিক নাম স্পাইকোমেলাস আফার। এর সন্ধান পাওয়া গেছে উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোয়। এই আবিষ্কার বর্মধারী ডাইনোসরের বিবর্তন নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে বিজ্ঞানীদের। যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড বাটলার বলেন, এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হওয়া সবচেয়ে অদ্ভুত ডাইনোসরগুলোর একটি।
মরক্কোর বোউলেমান শহরে স্পাইকোমেলাস আফার-এর কঙ্কালের সন্ধান পান একজন কৃষক। তবে কঙ্কালের পুরো অংশ পাওয়া যায়নি। তাই ডাইনোসরটির পুরোপুরি গড়ন কেমন ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন গবেষকেরা। তবে তাঁদের ধারণা, এই ডাইনোসরের দৈর্ঘ্য ছিল চার মিটার। উচ্চতা ছিল এক মিটার। আর ওজন ছিল দুই টনের মতো।
নতুন এই ডাইনোসরটি নিয়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অধ্যাপক রিচার্ড বাটলার। আরেকজন গবেষক হলেন লন্ডনের ন্যাশনাল হিস্টোরি মিউজিয়ামের অধ্যাপক সুসানাহ মেইডমেন্ট। তাঁরা বলেন, এটা অবাক করার বিষয় যে ডাইনোসরটি কাঁটাগুলো সরাসরি হাড়ের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এখনো টিকে থাকা বা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কোনো প্রাণীতেই এমনটা দেখা যায় না।
দুই অধ্যাপকের গবেষণাটি সম্প্রতি বিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক সুসানাহ মেইডমেন্ট বলেন, ‘স্পাইকোমেলাস আফার-এর পিঠজুড়ে অদ্ভুত কাঁটা এবং উঁচু অংশে ঢাকা ছিল। ঘাড়ের পাশে ছিল হাড়ের তৈরি বর্ম। লেজের শেষের মাথায় ছিল অস্ত্রের মতো দেখতে কাঠামো। এ কারণে এটি ছিল পুরোই অস্বাভাবিক একটি ডাইনোসর।’
এই প্রাণী এমন সময় টিকে ছিল, যখন পৃথিবীতে ডাইনোসর যুগের শেষ সময় চলছিল। সে সময় টিরানোসরাস রেক্সের মতো বিশাল মাংসাশী ডাইনোসরের আবির্ভাব হয়েছিল। অধ্যাপক বাটলার বলেন, সে সময় এই ডাইনোসরগুলোর কবল থেকে বাঁচতে বর্মযুক্ত অ্যানকিলোসরাসের প্রজাতির বিবর্তন হয়। এটি ধারণা করা হয় যে এই প্রজাতির প্রথম দিকের ডাইনোসরগুলোর গড়ন সাধারণ ছিল। তবে এখন দেখা যাচ্ছে যে বেশ শক্তিশালী আকার নিয়েই সেগুলোর আবির্ভাব হয়েছিল।

Thursday, March 26, 2026
বিরল অর্ধগোলাপি হীরার খোঁজ by জাহিদ হোসাইন খান
হীরা বিশেষজ্ঞ ও ডায়মন্ড কাটিং প্রতিষ্ঠান এইচবি অ্যান্টওয়ার্পের সহপ্রতিষ্ঠাতা ওডেড মানসোরি বলেন, ‘এ পাথরটি পলিশ করার পর এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত গোলাপি হীরার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। এর গাঢ় রং করোয়ে খনির ভূতাত্ত্বিক অনন্যতার সাক্ষ্য বহন করছে।’
এ ধরনের রঙের হীরা অত্যন্ত বিরল। হীরা গঠনের জন্য তাপমাত্রা ও চাপের সঠিক শর্ত পূরণ করা বেশ জরুরি। এ হীরাটি প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর গভীরে পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২০০ কিলোমিটার নিচে তীব্র তাপ ও চাপে কার্বন পরমাণুর শক্ত ল্যাটিসে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে এটি পৃষ্ঠে উঠে আসে। অন্যান্য হীরা ভেতরের অপদ্রব্যের মাধ্যমে রং ধারণ করে। আর গোলাপি হীরা তৈরি হয় কাঠামোগত বিকৃতির ফলে। ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর কাঠামো পরিবর্তিত হলে গোলাপি রং তৈরি হয়। অবশ্য অতিরিক্ত বিকৃতি হীরাকে বাদামি করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভবত গোলাপি অংশটি প্রথমে গঠিত হয়েছিল এবং বর্ণহীন অংশটি পরে বিকাশ লাভ করে। যদিও এটি প্রথম আবিষ্কৃত অর্ধগোলাপি হীরা নয়। জেমোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট অব আমেরিকার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এর আগে যেসব গোলাপি হীরা পরীক্ষা করা হয়েছে, তা দুই ক্যারেটের (শূন্য দশমিক ৪ গ্রাম) বেশি ছিল না।
যে বতসোয়ানা করোয়ে খনি থেকে এ হীরাটি পাওয়া গেছে, তা এর আগেও বেশ কয়েকটি দর্শনীয় রত্নের উৎস ছিল। এর আগে ১ হাজার ৭৫৮ ক্যারেটের সেওয়েলো, ৫৪৯ ক্যারেটের সেথুনিয়া আর সম্প্রতি আবিষ্কৃত ২ হাজার ৪৮৮ ক্যারেটের মটসওয়েদি রয়েছে। কানাডীয় খনি প্রতিষ্ঠান লুকারা উন্মোচিত মটসওয়েদি বিশ্ববিখ্যাত কুল্লিনান হীরা আবিষ্কারের পর গত ১২০ বছরে দেখা সবচেয়ে বড় হীরা। ১৯০৫ সালে প্রতিবেশী দক্ষিণ আফ্রিকায় আবিষ্কৃত ৩ হাজার ১০৬ ক্যারেটের কুল্লিনান পাথরটি ৯টি আলাদা পাথরে কাটা হয়েছিল; যার মধ্যে অনেক টুকরা এখন ব্রিটিশ ক্রাউন জুয়েলসের অংশ।
নতুন অর্ধগোলাপি হীরাটির মূল্য এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে এর মূল্য নির্ধারণের সময় এর ওজন, কাট, রং, স্বচ্ছতাসহ বিভিন্ন কারণ বিবেচনা করা হবে। বর্তমানে এটি এইচবি অ্যান্টওয়ার্পের কাছে রয়েছে। ২০২২ সালে সবচেয়ে মূল্যবান ও উজ্জ্বল গোলাপি হীরা হিসেবে বিবেচিত একটি বিরল গোলাপি হীরা নিউইয়র্কের সোথেবিসের ৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার দামে বিক্রি হয়েছিল।
সূত্র: ডেইলি মেইল
![]() |
| অর্ধগোলাপি হীরা। ছবি: এইচবি অ্যান্টওয়ার্প |
Sunday, February 8, 2026
গাদ্দাফির ছেলের মৃত্যুর চেয়ে বড় বিস্ময় ছিল তাঁর বেঁচে থাকা by কারাম নামা
গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস একবার বলেছিলেন, লিবিয়া থেকে সব সময় নতুন কিছু আসে। এটি কোনো বিস্ময়ের প্রতিশ্রুতি ছিল না। বরং ছিল সতর্কবার্তা। লিবিয়া এমন এক অঞ্চল, যেখানে বিশৃঙ্খলা বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে। আজকের লিবিয়ায় যা দেখা যাচ্ছে, সেটিও পুরোনো ট্র্যাজেডিরই পুনরাবৃত্তি।
সাইফ আল ইসলামের মৃত্যুর চেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো তিনি এত দিন বেঁচে ছিলেন কীভাবে!
সাইফের বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফি, ভাই মুত্তাসিম নিহত হয়েছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ২০১১ সালের পর থেকে লিবিয়া যা দেখেছে, তা ছিল পূর্বানুমেয়। একটি সমাজকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলার পর তাঁকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে সবাই খুব ছোট ছোট টুকরার জন্য লড়াই করছে।
সাইফ আল ইসলামের বেঁচে থাকা কোনো ব্যক্তিগত শক্তি বা রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ফল ছিল না। তিনি টিকে ছিলেন একটি ভঙ্গুর শক্তির ভারসাম্যের কারণে। সাইফ ছিলেন একটি সম্ভাবনা, কোনো বাস্তব বিকল্প নন। দেশীয় ও বিদেশি নানা পক্ষ তাঁকে একটি তুরুপের তাস হিসেবে ধরে রেখেছিল। চাপ সৃষ্টি, দর-কষাকষি কিংবা ব্ল্যাকমেলের কাজে এই তাস ব্যবহৃত হয়েছে; কোনো জাতীয় রাজনৈতিক প্রকল্পের জন্য নয়।
২০১১–পরবর্তী লিবিয়ার কখনোই একজন প্রেসিডেন্ট দরকার ছিল না। তাদের দরকার ছিল আরও কিছু তাস। বিশৃঙ্খল খেলায় যত বেশি তাস, তত সুবিধা। একটি তাসের কাজ শেষ হয়ে গেলে তাকে সরিয়ে ফেলা খেলাটিরই অংশ।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সাইফ আল ইসলামের হত্যাকাণ্ড ২০১১ সালের পর থেকে লিবিয়ায় চলমান সহিংসতার ধারার সঙ্গেই মিলে যায়। যে রাষ্ট্র শক্তি বা বৈধতার একচেটিয়া মালিক হতে পারেনি, সেখানে স্থায়ী সুরক্ষা নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা যে কেউই ঝুঁকির মুখে থাকে। রাজনৈতিক প্রতিশোধ, গোত্রগত প্রতিহিংসা কিংবা অন্যদের উদ্দেশে বার্তা পাঠানো—সবকিছুই এখানে ভূমিকা রাখে।
একসময় সাইফকে হত্যা করতে কেউ আগ্রহী ছিল না। কারণ, তাঁর মৃত্যুর প্রভাব বহন করতে কেউ রাজি ছিল না। সেই ভারসাম্য বদলে যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যু একটি জটিল সমীকরণের বাস্তব সমাধান হয়ে ওঠে।
গাদ্দাফির শাসন লিবিয়ার সমাধান ছিল না। আবার ২০১১ সালের পর যারা ক্ষমতা দখল করেছে—মিলিশিয়া ও রাষ্ট্র লুটেরারাও কোনো সমাধান নয়। আসলে তারা সমাধান হতে চায়ওনি। ব্যক্তিগত, আঞ্চলিক ও গোত্রগত স্বার্থ সব সময়ই লিবিয়ায় জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। লিবিয়া আজ অনেকটা রোমান দার্শনিক এমিল সিওরানের উক্তির মতো অবস্থায় আছে। তিনি বলেছিলেন, যে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে না, তাকে শাস্তি হিসেবে নিজের অতীত বারবার পুনরাবৃত্তি করতে হয়।
২০২১ সালে সাবহা থেকে যখন সাইফ আল ইসলাম প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন, তখন সেটি ছিল একধরনের স্বীকারোক্তি। লিবিয়া আর এমন দেশ নেই, যেখান থেকে রাজধানী ছেড়ে পালানো যায়। ত্রিপোলি তাঁর জন্য ছিল না, বেনগাজিও আর নিরাপদ ছিল না। তাই তিনি বেছে নেন মরুভূমি। সেখান থেকেই তাঁর বাবার উত্থান হয়েছিল এবং সেখানেই তাঁর পতন ঘটে। সাবহা কোনো সাধারণ শহর নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ভূগোল। লিবিয়ানরা একে ‘নরকের রাস্তা’ বলে।
সাইফ আল ইসলাম এ জায়গাকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ বানাতে চেয়েছিলেন। এটি ছিল তাঁর বাবার শেষ প্রচেষ্টার পুনরাবৃত্তি। কিন্তু বাস্তব লিবিয়া অবস্থান করছে জিনতান ও সাবহার মাঝখানে। লিবিয়া এমন একটি ভাঙা দেশ, যেখানে কেবল ছোট ছোট আনুগত্য টিকে আছে। পূর্ণ বৈধতা নেই কারওই।
যাঁরা লিবিয়ার জাতীয় ভবিষ্যতে বিশ্বাস করেন, সাইফ আল ইসলামকে পছন্দ করুন বা না করুন, তাঁরা জানতেন—তিনি তাঁর বাবার মতো একই ভুল আবার করতেন। জাতির বদলে গোত্রের ওপর ভরসা করতেন।
সাইফ আল ইসলামকে গাদ্দাফি হিসেবে নয়, মরুভূমির মানুষ বা সির্তের সন্তান হিসেবেও নয়, বরং একজন লিবিয়ান হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে হতো। কিন্তু লিবিয়ায় জাতি গঠনের পথ শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায়।
২০০০–এর দশকের শুরুতে সাইফ আল ইসলাম নিজেকে পশ্চিমা রাজধানীগুলোতে শাসনের গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি লকারবি মামলা নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখেন। বুলগেরীয় নার্সদের মুক্তি নিশ্চিত করেন। লন্ডন, প্যারিস ও রোমে ঘুরে বেড়ান সংস্কারপন্থী হিসেবে। তাঁর বাবা তাঁকে চলাচলের কিছু স্বাধীনতা দিলেও প্রকৃত পরিবর্তনের ক্ষমতা দেননি।
একসময় যেসব লিবিয়ান অভিজাত তাঁর ওপর আশা রেখেছিলেন, তাঁরাও সরে দাঁড়ান। তাঁরা বুঝতে পারেন, সাইফের জাতীয় প্রকল্প কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২০১১ সালে পূর্ব লিবিয়ায় বিদ্রোহ শুরু হলে গাদ্দাফি ঘোষণা দেন, সাইফ আল ইসলাম বেনগাজিতে গিয়ে আলোচনা করবেন। কিন্তু তিনি কাউকেই বিশ্বাস করাতে পারেননি। যেমনটি তাঁর বাবা নিজের পতনের সময়টিও বুঝতে পারেননি।
সাইফের ভাই মুত্তাসিম যুদ্ধ করে মারা যান; তাঁর বাবা যেমনটি চেয়েছিলেন। আরেক ভাই সাদি নাইজারে পালিয়ে যান। পরে তাঁকে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং কারাভোগের পর ২০২১ সালে মুক্তি পান। সাইফ আল ইসলাম যুদ্ধ নয়, বেঁচে থাকাকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি মৃত্যু এড়াতে পেরেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক শূন্যতা থেকে বেরোতে পারেননি।
মৃত্যুর আগে লিবিয়ার নির্বাচনী মানচিত্র ছিল খুবই স্পষ্ট। ত্রিপোলিতে তাঁর কোনো ভোট ছিল না। মিসরাতায় তাঁর উপস্থিতি ছিল না। বেনগাজিতে ছিল সামান্য সমর্থন। বাকি ছিল দক্ষিণাঞ্চল ও কিছু শহর, যেগুলো এখনো গাদ্দাফি আমলের রাজনীতির প্রতি অনুগত। ধরুন তিনি যদি দক্ষিণে জিততেনও, তাতেও তিনি লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট হতেন না। বরং বিভাজনই আরও পুনরুত্পাদিত হতো। ২০১১ সালের পর অন্য সবার মতো তিনিও একই ফাঁদে পড়েছিলেন। সেটি হলো একটি একীভূত জাতীয় প্রকল্পের অনুপস্থিতি।
সাইফ আল ইসলামের কাছে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির জন্য প্রয়োজনীয় হাতিয়ার, সমর্থন ও বৈধতা ছিল না। ইতিহাস তাঁর বিপক্ষে ছিল। ভূগোল তাঁর প্রতি নির্মম ছিল। বিশ্বও তাঁকে কখনো গ্রহণ করেনি। যেসব রাষ্ট্র আরও কম বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে, তারা তাঁর ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি।
১৯১১ সালে লিবিয়া নিয়ে ইতালীয় ইতিহাসবিদ লুইজি ভিলারি লিখেছিলেন, এই ভূমি কাউকে ক্ষমতা দেয় না। কেবল নিয়ন্ত্রণের একটি ভ্রম দেয়। সেই ভ্রম আজও টিকে আছে। সাইফ আল ইসলাম লিবিয়ার সমস্যার উত্তর ছিলেন না। যেমন উত্তর নন আবদুল হামিদ দবেইবা, খলিফা হাফতার, ফাতি বাশাঘা, আলি জেইদান বা আরেফ আল নায়েদ। তবে তাঁর মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যখন লিবিয়ানরা এখনো নির্বাচন আয়োজনেই একমত হতে পারেনি, তখন ফলাফল নিয়ে তারা কীভাবে একমত হবে?
সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্রদের একজন সরে যাওয়ায় অনিশ্চয়তা কমেনি, বরং বেড়েছে। লিবিয়ায় অতীতে ঐক্য কঠিন ছিল। আজও কঠিন। আগামীকাল তা আরও কঠিন হবে।
* কারাম নামা, ব্রিটিশ-ইরাকি লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
![]() |
| সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Friday, February 6, 2026
লিবিয়ায় বাড়ির ভেতরে কীভাবে খুন হলেন গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল–ইসলাম
গাদ্দাফি পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সৌদি আরবের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম আল–আরাবিয়াকে জানায়, গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হামলাকারীরা সাইফ আল-ইসলামের বাসভবনের বাগানে তাঁকে গুলি করে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
আল–আরাবিয়ার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বন্দুকধারীরা হামলা চালানোর আগে গাদ্দাফির বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরাগুলো অকেজো করে দিয়েছিলেন। তারপর বন্দুকধারীরা তাঁর মুখোমুখি হন এবং তাঁকে গুলি করেন। স্থানীয় সময় গভীর রাতে তিনি নিহত হন।
সাইফ আল–ইসলামের প্রাণহানির ঘটনায় এখনো বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি। তবে সাইফ আল-গাদ্দাফির একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী একে একটি ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
সাইফ আল–ইসলামের রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের একজন আবদুল্লাহ ওসমান ফেসবুকে এক পোস্টে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা আল্লাহর এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব। মুজাহিদ সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি আল্লাহর হেফাজতে আছেন।’
আবদুল্লাহ ওসমান ২০২০-২১ সালে রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।
বাবা গাদ্দাফির শাসনামলে সাইফ
সাইফ আল-ইসলামের জীবন নাটকীয়তায় ভরা। বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির উত্তরসূরি ভাবা হতো তাঁকে। লিবিয়ার ক্ষমতা থেকে তাঁর বাবা উৎখাত হওয়ার পর এক দশকের বন্দিজীবন, প্রত্যন্ত এক পাহাড়ি শহরে অজ্ঞাতবাস, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা—যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছিল।
কোনো আনুষ্ঠানিক পদ না থাকা সত্ত্বেও চার দশকের বেশি সময় লিবিয়া শাসন করা তাঁর বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পরে তাঁকেই দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি মনে করা হতো।
বাবা গাদ্দাফি ক্ষমতায় থাকাকালে সাইফ আল-ইসলাম লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতেন। গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। তিনি লিবিয়ার গণবিধ্বংসী অস্ত্র ত্যাগের আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকার্বিতে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ১০৩ বোমা হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও তিনিই আলোচনা করেছিলেন।
লিবিয়াকে বিশ্ব থেকে একঘরে অবস্থা থেকে মুক্ত করতে সংকল্পবদ্ধ সাইফ আল-ইসলাম পশ্চিমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি নিজেকে একজন সংস্কারক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। সংবিধান প্রণয়ন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে অন্যদের প্রতি আহ্বান জানাতেন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়াশোনা করা এবং ইংরেজিতে সাবলীল কথা বলতে পারায় অনেক দেশের সরকার তাঁকে লিবিয়ার গ্রহণযোগ্য এবং পশ্চিমাবান্ধব মুখ হিসেবে দেখত।
গাদ্দাফির পতন এবং সাইফের ফেরার চেষ্টা
২০১১ সালে যখন সাইফের বাবার দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়, তখন তিনি তাঁর অনেক বন্ধুত্ব বিসর্জন দিয়ে পরিবার ও বংশের প্রতি অনুগত থাকাকেই বেছে নেন। বিদ্রোহীদের তিনি ‘ইঁদুর’ বলে সম্বোধন করেন এবং তাঁদের দমনে কঠোর অভিযানের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী হয়ে ওঠেন।
বিদ্রোহের সময় বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা লিবিয়াতেই লড়াই করব, লিবিয়াতেই মরব।’
বিদ্রোহীরা রাজধানী ত্রিপোলি দখল করার পর সাইফ আল-ইসলাম বেদুইন উপজাতির ছদ্মবেশে প্রতিবেশী দেশ নাইজারে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তার বাবাকে বিদ্রোহীরা খুঁজে বের করে গুলি করে হত্যার প্রায় এক মাস পর, ‘আবু বকর সাদিক ব্রিগেড’ নামের একটি মিলিশিয়া বাহিনী মরুভূমির রাস্তা থেকে তাঁকে বন্দী করে পশ্চিমের শহর জিনতানে নিয়ে যায়।
পরের ছয় বছর সাইফ আল–ইসলাম গাদ্দাফি জিনতানে বন্দী ছিলেন, যা তাঁর বাবা গাদ্দাফির আমলের বিলাসবহুল জীবন থেকে ছিল একেবারেই ভিন্ন। সে সময় তাঁর পোষা বাঘ ছিল, তিনি বাজপাখি দিয়ে শিকার করতেন এবং লন্ডন সফরের সময় যুক্তরাজ্যের উচ্চবিত্ত সমাজের সঙ্গে মেলামেশা করতেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জিনতানে সাইফের সঙ্গে দেখা করেছিল। সেই সময় তাঁর একটি দাঁত ভাঙা ছিল। সাইফ তাঁদের জানিয়েছিলেন, তিনি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁকে কারো সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না।
যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২০১৫ সালে ত্রিপোলির একটি আদালত সাইফ আল-ইসলামকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায় দেন ।
পরে ২০১৭ সালে সাধারণ ক্ষমা আইনের আওতায় মিলিশিয়াদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর প্রাণহানির আশঙ্কা থেকে জিনতানে কয়েক বছর আত্মগোপনে ছিলেন।
২০২১ সালে লিবিয়ার ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও পাগড়ি পরে সাইফ আল–ইসলাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দিতে লিবিয়ার দক্ষিণের শহর সাভায় নির্বাচনী কার্যালয়ে উপস্থিত হন।
আশা করা হয়েছিল, ২০১১ সালে ন্যাটোর সহায়তায় হওয়া যে বিদ্রোহ তাঁর বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত এবং দেশকে অস্থিতিশীলতায় নিমজ্জিত করেছিল, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি জনগণের সমর্থন আদায় করে নেবেন।
তবে সাইফের প্রার্থিতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তাঁর বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনামলে যাঁরা নির্যাতিত হয়েছিলেন, তাঁরা সাইফের প্রার্থিতার তীব্র বিরোধিতা করেন। ২০১১ সালের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো থেকে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সশস্ত্র দলগুলোও তাঁর প্রার্থিতাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
২০২১ সালের শেষ দিকে নির্বাচনের নিয়মাবলি নিয়ে কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছিল। তখন সাইফ আল-ইসলামের প্রার্থিতা অন্যতম প্রধান বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৫ সালের দণ্ডাদেশের কারণে তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল।
সাইফ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার চেষ্টা করলে লিবিয়ার যোদ্ধারা আদালত ঘেরাও করে ফেলেন। এই ধারাবাহিক বিবাদ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেয় এবং লিবিয়া আবার রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ফিরে যায়।
![]() |
| সাইফ আল–ইসলাম ২০২১ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে নির্বাচন কার্যালয়ে গিয়ে নিবন্ধন করেন। ফাইল ছবি–এএফপি |
Wednesday, February 4, 2026
মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম নিহত
লিবিয়ায় দায়িত্বরত আল-জাজিরার প্রতিনিধি আহমেদ খলিফা জানান, গত এক দশক ধরে সাইফ আল-ইসলাম দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জিনতানে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৫৩ বছর বয়সী সাইফ আল-ইসলামের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমান। তবে কারা এই হামলা চালিয়েছে বা কোন পরিস্থিতিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা এখনো অস্পষ্ট। লিবিয়া সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।
পাশ্চাত্যে শিক্ষিত ও সুবক্তা হিসেবে পরিচিত সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি তাঁর বাবার শাসনামলে লিবিয়ার দমনমূলক শাসনের একটি প্রগতিশীল মুখ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ২০০০ সালের শুরুর দিক থেকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে লিবিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সাইফ ২০০৮ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (এলএসই) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বিশ্ব শাসনের সংস্কারে নাগরিক সমাজের ভূমিকা।
২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের আগে সাইফ আল-ইসলামকে দেশটির দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ২০১১ সালে বিদ্রোহীরা গাদ্দাফিকে হত্যার পর সাইফ জিনতানে বন্দী হন। পরে সাধারণ ক্ষমার আওতায় ২০১৭ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পান। তবে মুক্তির পরেও তিনি জিনতান এলাকাতেই বসবাস করছিলেন। লিবিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত এই নেতার মৃত্যু দেশটির অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
![]() |
| সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি। ছবিটি ২০১১ সালের ২৩ আগস্ট লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে তোলা। রয়টার্স |
Sunday, February 1, 2026
ইসরাইলি দূতকে বহিষ্কারের নির্দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার, অবাঞ্ছিত ঘোষণা
দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ইসরাইলি দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স এরিয়েল সাইডম্যানকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়তে বলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, সাইডম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার বিরুদ্ধে অপমানজনক আক্রমণ চালিয়েছেন। পাশাপাশি, উচ্চপর্যায়ের ইসরাইলি কর্মকর্তাদের কথিত সফর সম্পর্কে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহিত না করার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের আচরণ কূটনৈতিক সুবিধার গুরুতর অপব্যবহার এবং ভিয়েনা কনভেনশনের মৌলিক লঙ্ঘন। এসব কর্মকাণ্ড দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য অপরিহার্য আস্থা ও প্রটোকলকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ভবিষ্যতে ইসরাইল যেন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নীতিমালা ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, সে আহ্বান জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ঘোষণার পর দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় ইসরাইল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক শন এডওয়ার্ড বাইনেভেল্টকে পারসোনা নন গ্রাটা ঘোষণা করেছে এবং তাকেও ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়তে বলা হয়েছে। ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রয়োজনে আরও পদক্ষেপ নেয়া হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বাইনেভেল্ট ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে নিযুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রদূত, যিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

ডিআর কঙ্গোতে খনি ধসে নিহত দুই শতাধিক মানুষ
উত্তর কিভুর গভর্নরের মুখপাত্র লুমুম্বা কাম্বেরে মুইসা সাংবাদিকদের জানান, বুধবার রুবায়া শহরের ওই খনিটি ভারী বৃষ্টির কারণে ধসে পড়ে। দুর্ঘটনার সময় হতাহতের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
ধসে পড়া খনিটিতে কলটান খনিজ উত্তোলনের কাজ চলছিল। কলটান স্মার্টফোন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ তৈরিতে ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত মূল্যবান খনিজ। দুর্ঘটনার সময় নারী, শিশু এবং খনিতে কাজ করা শ্রমিকরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
খনিটির এক সাবেক তত্ত্বাবধায়ক বিবিসিকে জানান, খনিটি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো না, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল অত্যন্ত বেশি। উদ্ধারকাজেও চরম অসুবিধা দেখা দেয়। তিনি আরও বলেন, এলাকার মাটির গঠন অত্যন্ত ভঙ্গুর হওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
ধসে পড়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ জন জীবিত উদ্ধার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Saturday, January 31, 2026
মিসরে বিপ্লবীরাই এখন কারাগারে
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, আজ ২৫ জানুয়ারি ২০১৫ মিসরে মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনের চার বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু গত চার বছরে মিসরে কিছু বদলায়নি। বিফলে গেছে সাড়াজাগানো ‘বিপ্লব’।
২০১১ সালে আরব বসন্তের অন্যতম ঘটনা ছিল মিসরে মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলন। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ওই গণ-আন্দোলনে পতন ঘটে এক সময়ের লৌহমানব মোবারকের। নিহত হন আট শতাধিক বিক্ষোভকারী।
বিপ্লব শেষে বন্দী হন মোবারক ও তাঁর বেশ কয়েকজন সহযোগী। বিক্ষোভকারীদের হত্যা, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁদের বিচার শুরু হয়। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে এখন মিসরের শাসন ক্ষমতা এসেছে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির হাতে। তিনি ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান। মোবারকের শাসনামলের এই সেনা কর্মকর্তা উর্দি ছাড়লেও স্বৈরশাসনের দুর্গন্ধ থেকে মুক্ত নন। বরং তাঁর কর্মকাণ্ডে যেন মোবারকের অপচ্ছায়াই মূর্ত হয়ে উঠছে। হত্যা ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ থেকে মোবারকের একের পর এক খালাস পাওয়ার ঘটনাকে এখন অনেক বিশ্লেষকই বাঁকা চোখে দেখছেন।
বিক্ষোভকারীদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ২০১১ সালের ২৪ মে মোবারককে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর আদেশ দেওয়া হয়। বিচারে ২০১২ সালের ২ জুন তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয়। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে আপিল কোর্ট মোবারকের ওই দণ্ডাদেশ প্রত্যাখ্যান করে মামলাটির পুনর্বিচার করার নির্দেশ দেন। গত বছরের নভেম্বরে ওই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে মোবারক ও তাঁর সাতজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রীয় তহবিলের অর্থ আত্মসাতের একটি মামলায় ২০১৪ সালে মিসরের একটি আদালত মোবারককে কারাদণ্ডাদেশ দেন। কিন্তু আপিল আদালত ওই দণ্ড বাতিল করে পুনর্বিচারের আদেশ দেন।
দিন কয়েক আগেই মোবারকের দুই ছেলে কারাগার থেকে বেরিয়েছেন। মোবারকসহ তাঁদের বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলা পুনর্বিচারাধীন রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব হিউম্যান রাইটসের অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের অব্যাহতি এবং রাজনৈতিক কর্মীদের কারাদণ্ড দিয়ে মিসরের বিচার বিভাগ দ্বৈতনীতি প্রদর্শন করছে।
বিপ্লবে অংশ নেওয়া জিয়াদ আল-এলাইমি বলেন, মোবারকের রায় আমাদের এই বার্তা দেয় যে কর্তৃপক্ষ যতই দুর্নীতি ও নিপীড়ন করুক না কেন, তা কোনো বিষয় নয়। তাঁরা সব সময় শাস্তির বাইরে থাকবেন। এটা খুবই কষ্টদায়ক।’
এলাইমি বলেন, ২০১১ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হলে আমাদের ফাঁসি হতো। এখন আমরা আমাদের সেই রাজনৈতিক অবস্থানের মূল্য দিচ্ছি।
বিপ্লবীরা বলছেন, ২০১১ সালে তীব্র গণ-আন্দোলনে তিন দশকের শাসক মোবারকের পতনের আনন্দ এখন নিরানন্দে পরিণত হয়েছে। মিসরের এখনকার শাসক মোবারকের চেয়েও বেশি স্বৈরাচারী। বিনা অনুমতিতে বিক্ষোভ করার অভিযোগে মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক বিপ্লবী এখন কারাগারে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মোবারক-বিরোধী আন্দোলনের নেতা আহমেদ মাহের ও মোহাম্মদ আদেল। এ দুজনকে তিন বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।
মোবারকের পতনের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি। ২০১৩ সালে সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান সিসি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মোবারকের চেয়েও নিপীড়নমূলক শাসন প্রবর্তন করেছেন। দমন-পীড়নে সাবেক স্বৈরশাসককে ছাড়িয়ে গেছেন এই নব্য শাসক। সিসির আমলে নৃশংস অভিযানে মুরসি-সমর্থক ও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে কারাবন্দী করা হয়েছে। গণহারে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ।
মোবারক-বিরোধী বিপ্লবী জিয়াদ আল-এলাইমির ভাষ্য, ‘গত চার বছরে কিছুই বদলায়নি। আমরা এখনো একই স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ দেখছি। দেখছি একই দুর্নীতি, স্বাধীনতা হরণ।’
![]() |
| মিসরে হোসনি মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনের চার বছর পূর্ণ হয়েছে আজ ২৫ জানুয়ারি। গত চার বছরে দেশটিতে কিছুই বদলায়নি। বরং আরও বেশি স্বেচ্ছাচারী শাসন কায়েম হয়েছে। ছবি: এএফপি |
Wednesday, January 28, 2026
‘বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ’ যৌন সহিংসতার শিকার সুদানের নারীরা
সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ। ব্যাপক যৌন সহিংসতা ঘটছে এই সংঘাতের মধ্যে।
সেনা-সমর্থিত সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী সুলাইমা ইশহাক আল-খলিফা বলেন, লুটপাট ও হামলার সঙ্গে নারী নির্যাতন ঘটছে অহরহ। ধর্ষণের ঘটনাগুলো প্রায়ই ‘পরিবারের সামনেই’ সংঘটিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
‘বয়সের কোনো বাছ–বিচার হচ্ছে না। ৮৫ বছর বয়সী একজন নারীও ধর্ষিত হতে পারেন, এক বছরের শিশুও ধর্ষিত হতে পারে,’ বলেন তিনি।
পেশায় মনোবিদ এই নারী পোর্ট সুদানে তাঁর বাসভবনে এএফপির সঙ্গে কথা বলেন। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরে সরব সুলাইমা ইশহাক সম্প্রতি সরকারে যুক্ত হয়েছেন।
সুলাইমা ইশহাক বলেন, নারীদের যৌনদাসী বানানো হচ্ছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া লজ্জা এড়াতে তাঁদের জোর করে বিয়েও দেওয়া হচ্ছে।
যুদ্ধরত দুই পক্ষ থেকেই নারীরা আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানান সুলাইমা ইশহাক। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আরএসএফ এটি ‘পরিকল্পিতভাবে’ করছে। তাঁর দাবি, আরএসএফ জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা নিয়ে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে একে ব্যবহার করছে।
তাঁর মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ১ হাজার ৮০০টির বেশি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এই পরিসংখ্যানে পশ্চিম দারফুর ও পার্শ্ববর্তী কর্দোফান অঞ্চলে অক্টোবরের শেষভাগ থেকে নথিভুক্ত হওয়া নৃশংসতার ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য হলো... মানুষকে অপমানিত করা, তাদের ঘরবাড়ি, এলাকা ও শহর ছাড়তে বাধ্য করা। এবং একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি... ভেঙে দেওয়া।’
‘যখন আপনি যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, তার মানে আপনি... যুদ্ধকে চিরস্থায়ী করতে চান,’ বলেন তিনি।
‘যুদ্ধাপরাধ’
হর্ন অব আফ্রিকায় নারীদের ওপর নির্যাতন পর্যবেক্ষণকারী মানবাধিকার সংস্থা এসআইএইচএ নেটওয়ার্কের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যৌন সহিংসতার নথিভুক্ত হওয়া ঘটনাগুলোর তিন-চতুর্থাংশের বেশি ধর্ষণের, যার ৮৭ শতাংশের জন্য দায়ী আরএসএফ।
সুদানের দারফুরে অনারব সম্প্রদায়গুলোর ওপর পরিকল্পিত হামলা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে জাতিসংঘ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) উভয় পক্ষের দ্বারা সংঘটিত ‘যুদ্ধাপরাধের’ আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।
আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খান জানুয়ারির মাঝামাঝিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, তদন্তকারীরা দারফুরে সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি এল-ফাশেরে একটি ‘সংগঠিত ও পরিকল্পিত অভিযানের’ প্রমাণ পেয়েছেন, যা অক্টোবরের শেষে আরএসএফ দখল করে নেয়।
তিনি বলেন, এই অভিযানের মধ্যে ছিল ‘ব্যাপক হারে’ গণধর্ষণ ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, যা অপরাধীরা কখনো কখনো ‘ভিডিও ধারণ করে উদ্যাপন করেছে’ এবং ‘সম্পূর্ণ দায়মুক্তির বোধ থেকে’ এসব কাজ করতে উৎসাহিত হয়েছে।
২০০০-এর দশকের শুরুতে দারফুরে এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চলেছিল। সম্প্রতি জানজাওয়িদ মিলিশিয়ার (যেটি পরে আরএসএফে রূপান্তরিত হয়) একজন সাবেক কমান্ডারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ধর্ষণসহ একাধিক যুদ্ধাপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে।
সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘এখন যা ঘটছে, তা আরও অনেক বেশি কুৎসিত। কারণ, এখন গণধর্ষণের ঘটনা ঘটছে এবং তা নথিভুক্তও হচ্ছে।’
এই নারী আরও বলেন, হামলাকারী আরএসএফ যোদ্ধারা ‘এসব কাজ খুব গর্বভরে করে এবং তারা এটিকে অপরাধ হিসেবে দেখে না।’
‘আপনার মনে হবে, তাদের যেন যা খুশি করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে,’ বলেন তিনি।
দারফুরে বেঁচে ফেরা বেশ কয়েকজন নারী বলেছেন, আরএসএফ যোদ্ধারা তাদের নিচু জাতের মানুষের তকমা দিয়ে ‘দাস’ বলে সম্বোধন করত এবং বলত, আমি যখন তোমাকে আক্রমণ করছি, যৌন নির্যাতন করছি, তখন আমি আসলে তোমাকে ‘সম্মানিত’ করছি, কারণ আমি তোমার চেয়ে বেশি শিক্ষিত বা তোমার চেয়ে বেশি বিশুদ্ধ রক্তের অধিকারী।’
‘নির্যাতন অভিযান’
খার্তুম ও দারফুরের (এল-ফাশেরসহ) নারীরা বিভিন্ন বিদেশি নাগরিকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।
সুলাইমা ইশহাক বলেন, এদের মধ্যে ছিল পশ্চিম আফ্রিকার ফরাসিভাষী ভাড়াটে সেনারা, যাদের মধ্যে মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া, শাদ, কলম্বিয়া ও লিবিয়ার নাগরিকেরা ছিল, যারা আরএসএফের পক্ষে লড়াই করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই নারী বলেন, নির্যাতিতদের একটি অংশকে অপহরণ করে যৌনদাসী হিসেবে আটকে রাখা হয়েছে, আবার অন্যদের সুদানের অরক্ষিত সীমান্তজুড়ে সক্রিয় পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেঙে পড়ার কারণে এসব ঘটনার বেশির ভাগই নথিভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রক্ষণশীল সমাজে কলঙ্কের ভয়ের কারণেও প্রকৃত চিত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্ত্রীর মতে, ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণের মতো ঘটনা ঘটলে পরিবারগুলো প্রায়ই তা চাপা দিতে নির্যাতিতকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে।
সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘আমরা একে টর্চার অপারেশন (নির্যাতন অভিযান) বলি।’ তিনি ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরীদের জোরপূর্বক বিয়েতে বাধ্য করার ঘটনাগুলোকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন।
![]() |
| সুদানের গেদারেফ প্রদেশের আবু আল-নাগা আশ্রয়শিবিরে ত্রাণের অপেক্ষায় বাস্তুচ্যুত নারীরা। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। ছবি: এএফপি |
Sunday, January 4, 2026
বিশ্বের কোন দেশে কে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হবেন, ট্রাম্প কি সেটারও নিয়ন্ত্রক হতে চান
রিপাবলিকান পার্টিকে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আদর্শে রূপান্তর করা ট্রাম্পের কাছে রাজনীতি মানেই হলো প্রভাব খাটানোর এক মোক্ষম হাতিয়ার। আর এই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা তিনি কেবল নিজ দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ রাখছেন না।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথা ভাঙার আরও একটি নজির গড়ে ট্রাম্প এখন প্রকাশ্যে তাঁর পছন্দের প্রার্থীদের সমর্থন দিচ্ছেন। এমনকি তাঁদের অনুকূলে সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক ও বিচারব্যবস্থাকে নমনীয় করার চেষ্টাও করছেন।
ট্রাম্পের এমন সমর্থন যে কেবল মৌখিক নয়, তার প্রমাণ মেলে হোয়াইট হাউসের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে। সেখানে নথিপত্রেই মিত্রদেশের নেতাদের হটিয়ে কট্টর ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী নেতাদের ক্ষমতায় আনার প্রচ্ছন্ন সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প যেন এক বিশ্বজনীন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, হন্ডুরাস, দক্ষিণ কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আটলান্টিকের ওপারের দেশগুলোর রাজনীতিকেও তিনি নিজের ছাঁচে গড়তে চাইছেন।
মূলত যেসব নেতা তাঁর মতো জনতুষ্টিবাদী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, যাঁরা তাঁর স্তুতি করেন কিংবা যাঁরা তাঁর মতোই আইনি লড়াইয়ে জর্জরিত, তাঁদের ভাগ্য বদলাতেই ট্রাম্প বেশি আগ্রহী।
গত সোমবার ট্রাম্প আবারও ইসরায়েলের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। দেশটিতে তিনি বেশ জনপ্রিয় এবং আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনের আগে সেখানে তাঁর ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বর্তমানে ঘুষ ও জালিয়াতির অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, নেতানিয়াহুর জন্য তিনি যে ক্ষমাপ্রার্থনা অনুরোধ করেছেন, সেটি ‘প্রক্রিয়াধীন’। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের সঙ্গে তাঁর এ বিষয়ে কথা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ট্রাম্পের ভাষায়, তিনি (যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ওঠা নেতানিয়াহু) একজন যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বীর। তাঁকে কেন ক্ষমা করা হবে না?
অবশ্য হারজোগের দপ্তর দ্রুতই এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে এমন কোনো আলাপ হয়নি এবং যেকোনো সিদ্ধান্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনেই নেওয়া হবে।
নেতানিয়াহুকে যদি ফৌজদারি বিচার থেকে রক্ষা করা যায়, তবে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা লাঘবের পাশাপাশি নির্বাচনী বৈতরণী পার হতেও সাহায্য করবে। বিনিময়ে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কাছে ব্যক্তিগতভাবে ঋণী হয়ে থাকবেন।
ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো রিসোর্টে গত সোমবার নেতানিয়াহুর দেওয়া স্তুতির জবাবে ট্রাম্পও যেভাবে তাঁর প্রশংসা করেছেন, তাতে এই সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনার সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ। এটি আমার হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে আসা।’ সেই সঙ্গে যুদ্ধবাজ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ট্রাম্পই প্রথম বিদেশি হিসেবে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘ইসরায়েল প্রাইজ’ পেতে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ‘শান্তি’ বিভাগে এই পুরস্কার ট্রাম্পের জন্যই প্রথমবারের মতো প্রবর্তন করা হয়েছে।
ট্রাম্পকে খুশি করার কৌশলে নেতানিয়াহু বেশ পারদর্শী। এর আগে এক সফরে তিনি ট্রাম্পের বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘নোবেল শান্তি পুরস্কারের’ জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন।
যদিও গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে ইসরায়েলের গড়িমসিতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজনেরা নেতানিয়াহুর ওপর কিছুটা বিরক্ত বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য সমর্থন নেতানিয়াহুর জন্য এক অমূল্য রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
ট্রাম্পের ভাষায়, নেতানিয়াহুর জায়গায় অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রী থাকলে ইসরায়েল হয়তো আজ অস্তিত্ব হারাত। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে ইসরায়েলকে টেনে তুলতে তাঁর মতো একজন বিশেষ মানুষেরই প্রয়োজন ছিল। মাত্র কয়েক বাক্যে ট্রাম্প যেন নেতানিয়াহুর পরবর্তী নির্বাচনের প্রচারপত্রই লিখে দিলেন।
কূটনৈতিক শিষ্টাচার
ঐতিহাসিকভাবেই মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বিদেশি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধাবোধ করেন। প্রথমত এটি একধরনের ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার’। কোনো প্রেসিডেন্টই চাইবেন না, অন্য দেশ এসে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সাহায্য করে সেই শিষ্টাচার লঙ্ঘনের প্রতিশোধ নিক।
এটি গণতন্ত্রের এক মৌলিক নীতি যে ভোটাররাই ঠিক করবেন তাঁদের নেতা কে হবেন। (যদিও ২০২০ সালের পরাজয় মেনে নিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্বীকৃতিই বলে দেয় যে তিনি এই নীতিতে কতটা বিশ্বাসী)।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো নেতাকে সমর্থন দেওয়ার নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশে মার্কিনবিরোধী মনোভাব তৈরি হতে পারে কিংবা নতুন কোনো নেতা ক্ষমতায় এলে শুরুতেই তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিদেশি রাজনীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা থেকে খুব কমই বিরত থাকে।
উদাহরণস্বরূপ, গত সপ্তাহে হন্ডুরাসের রক্ষণশীল ন্যাশনাল পার্টির প্রার্থী নাসরি আসফুরাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ ভোট গণনার পর আসফুরা জয়ী না হলে এর ফল ‘খুবই ভয়াবহ’ হবে বলে আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিলেন ট্রাম্প।
পরাজিত মধ্য ডানপন্থী প্রার্থী সালভাদর নাসরল্লার দাবি, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপই তাঁর পরাজয়ের মূল কারণ। এর মধ্যে মাদক পাচারের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫ বছরের জেল খাটা হন্ডুরাসের এক সাবেক প্রেসিডেন্টকে ট্রাম্পের ক্ষমা করে দেওয়ার ঘটনাটিও অন্তর্ভুক্ত।
পশ্চিম গোলার্ধের রাজনীতিকে নিজের ভাবমূর্তিতে ঢেলে সাজাতে ট্রাম্প বারবার মার্কিন ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। বন্ধু ও ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার অভিযোগে বিচার শুরু হওয়ায় ব্রাজিলীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প।
এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ট্রাম্প আমদানি শুল্ককে কেবল বাণিজ্যের অনুষঙ্গ নয়; বরং পররাষ্ট্রনীতির ‘অস্ত্র’ হিসেবেও ব্যবহার করছেন।
বর্তমানে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিশাল এক নৌবহর মোতায়েন করে চাপ প্রয়োগ করছেন। যদিও এর প্রকাশ্য অজুহাত হলো মাদক ব্যবসা বন্ধ করা। মাদুরোর বিদায় হয়তো দারিদ্র্যপীড়িত লাখ লাখ ভেনেজুয়েলানের জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আসল উদ্দেশ্য কারাকাসে নিজের আদর্শের অনুসারী সরকার বসিয়ে ক্ষমতা বাড়ানো।
আগামী বছর কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ওপরও ট্রাম্পের কড়া নজর রয়েছে। ক্রিসমাসের ছুটিতে তিনি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সোজাসাপটা ভাষায় ‘সাবধান’ হওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। পেত্রো অবশ্য সিএনএনকে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার ওপর ট্রাম্পের এই চাপ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য নয়; বরং তেলের নিয়ন্ত্রণের জন্য।
আর্জেন্টিনার রাজনীতিতেও ট্রাম্প তাঁর অর্থনৈতিক প্রভাব খাটাচ্ছেন। দেশটির ২০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সহায়তা প্যাকেজের শর্ত হিসেবে তিনি তাঁর বন্ধু ও ‘মাগা হিরো’ হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করতে চান।
দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ কোরিয়া
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দাবার চাল কেবল পশ্চিম গোলার্ধেই সীমাবদ্ধ নয়। গত মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা যখন ওভাল অফিসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন ট্রাম্প একটি বিতর্কিত ভিডিও দেখিয়ে তাঁকে নিজ দেশেই অস্বস্তিতে ফেলার চেষ্টা করেন।
ভিডিওটিতে দাবি করা হয়েছিল যে দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গরা গণহত্যার শিকার হচ্ছে, যা দেশটিতে বর্ণবাদী উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালার শামিল ছিল।
একইভাবে আগস্ট মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ুং যখন ওভাল অফিসে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি উসকানিমূলক বার্তা দিয়ে বসেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় গির্জায় তল্লাশির অভিযোগ তুলে তিনি দেশটিকে অস্থিতিশীল বলে ইঙ্গিত দেন।
যদিও লি জে মিয়ুং চাতুর্যের সঙ্গে ট্রাম্পকে দুটি ‘মাগা’ কাউবয় হ্যাট এবং একটি ব্যক্তিগত গলফ পুটার উপহার দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। তবে এই ঘটনা ছিল এক সতর্কবার্তা। অন্য নেতাদের মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করতে ট্রাম্প যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে পারেন, এটি তারই প্রমাণ।
ইউরোপের স্থিতিশীলতায় হানা
ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইউরোপের মধ্যপন্থী ও মধ্য বামপন্থী সরকারগুলোকে অস্থিতিশীল করতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছে। নতুন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, মুসলিম অভিবাসনের কারণে ইউরোপীয় সংস্কৃতি তার নিজস্ব অস্তিত্ব হারানোর হুমকিতে রয়েছে।
এই কৌশল ইউরোপের তথাকথিত ‘দেশপ্রেমিক দলগুলো’র (কট্টর ডানপন্থী) ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সমর্থন করে। মার্কিন নীতির লক্ষ্য এখন ইউরোপীয় দেশগুলোর বর্তমান ধারার বিরুদ্ধে একটি ‘প্রতিরোধ’গড়ে তোলা।
ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের নেতারা মনে করেন, ট্রাম্প–সমর্থিত কট্টর ডানপন্থী দলগুলো, যেমন ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি, জার্মানির এএফডি এবং যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে-উদারনৈতিক গণতন্ত্রের কাঠামোর জন্য বড় হুমকি।
৮০ বছর ধরে যারা ইউরোপের স্বাধীনতার গ্যারান্টার ছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্রই এখন তাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।
হস্তক্ষেপের পুরোনো খাসলত
অবশ্য অন্য দেশের রাজনীতিতে নাক গলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পই একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই কাজ করে আসছে, যদিও আগে তা করা হতো গোপনে বা অন্য কোনো ছদ্মবেশে। ট্রাম্পের সমর্থকেরা ১৯৮০-র দশকে রোনাল্ড রিগ্যান এবং মার্গারেট থেচারের মধ্যকার সেই আদর্শিক বন্ধুত্বের উদাহরণ দিতে পারেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতিহাস অনেক সময় ছিল বেশ কলঙ্কিত। ১৯৫৩ সালে ইরানে সিআইএয়ের মদদে অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৬১ সালে কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোকে হটাতে ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ আক্রমণ—সবই ছিল সেই ছক।
লাতিন আমেরিকার চিলি, নিকারাগুয়া, পানামা ও গুয়াতেমালায় যুক্তরাষ্ট্র বারবার শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়েছে, যার অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত সামরিক একনায়কতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। এমনকি ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র না পেয়ে সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে তথাকথিত ‘ফ্রিডম এজেন্ডা’ চালানো হয়েছিল।
সম্প্রতি বারাক ওবামাকেও এই খেলায় দেখা গেছে। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট ভোটের আগে তিনি ব্রিটিশদের সতর্ক করেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়লে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যকে ‘পেছনের সারিতে’ অপেক্ষা করতে হবে। ওবামার সেই মন্তব্য হিতে বিপরীত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ব্রেক্সিট জয়ী হয়, যা ছিল ট্রাম্পের পরবর্তী জয়েরই এক আগাম সংকেত।
ওবামাসহ আগের অনেক প্রেসিডেন্টই বিদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছেন, তবে ট্রাম্পের মতো এত প্রকাশ্য কেউ ছিলেন না। পূর্বসূরিদের শুরু করা নীতিকেই ট্রাম্প এক চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সবখানে একই সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারের এই কৌশল তাঁর কর্তৃত্ববাদী চরিত্র এবং তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলনের বিশ্বজয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষাই প্রতিফলিত করে।
![]() |
| ট্রাম্প বরাবরই প্রকাশ্যে বর্ণবাদী কথা বলেছেন। এতে অনেক শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান নিজেদের বর্ণবাদী মনোভাব প্রকাশে সাহস পেয়েছে। ছবি: এএফপি |
Friday, January 2, 2026
সোমালিল্যান্ডকে কোন মতলবে ইসরায়েল স্বীকৃতি দিচ্ছে, এতে আরব বিশ্বের ঝুঁকি কতটা
ইসরায়েল গত শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিতর্ক সৃষ্ট করেছে। এ দিন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরাহমান মোহামেদ আবদুল্লাহির সঙ্গে স্বীকৃতির একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন।
সোমালিল্যান্ড ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার কাছ থেকে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে। এরপর তিন দশক পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশ তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। তাই অঞ্চলটি সব সময় একধরনের কূটনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। ইসরায়েলের স্বীকৃতির মাধ্যমে তা কিছুটা কমল।
ইসরায়েলের স্বীকৃতিকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন আবদুল্লাহি। সোমালিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অঞ্চলটিকে ইসরায়েল সরল কোনো বিবেচনা থেকে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং স্বীকৃতির পর্দার আড়ালে সাবধানী হিসাব-নিকাশ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনীতির সমীকরণ কাজ করেছে।
স্বীকৃতি না দিলেও যুক্তরাজ্য, ইথিওপিয়া, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো কিছু দেশ সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। রাজধানী হার্গিসায় এসব দেশের লিয়াজোঁ অফিস রয়েছে।
স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে সোমালিল্যান্ড নিয়ে কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক সংযম ভাঙল ইসরায়েল। দেশটি বুঝেশুনেই এটি করেছে। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ইসরায়েল নিজেকে এমন একটি স্বঘোষিত দেশের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে হাজির করেছে, যেটি অনেক দিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের আসন দাবি করে আসছিল।
সোমালিল্যান্ডকে জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের স্বীকৃতি নিয়ে আরব নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন সৌদি আরবে নিযুক্তত জিবুতির রাষ্ট্রদূত দিয়া-এদ্দিন সাইদ বামাখরামা। তাঁর মতে, এ পদক্ষেপ গভীরভাবে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
বামাখরামার ভাষায়, ‘একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা শুধু একটি আইনি পদক্ষেপ বা বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা নয়। বরং এর কাঠামোগত গভীর প্রভাব রয়েছে। এ ধরনের প্রভাবের মধ্যে একই জাতির নাগরিকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি, রাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে ক্ষয় করা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দ্বার উন্মুক্ত করা অন্যতম।’
সমালোচকেরা মনে করেন, ইসরায়েল অনেক দিন ধরে নানা ছদ্মবেশে এ অঞ্চলে আরও ভাগাভাগি করার পক্ষে লবিং করে আসছে।
অনেক আরব দেশ মনে করে, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া ইসরায়েলের পুরোনো এক কৌশলের ধারাবাহিকতার অংশ। ইসরায়েলের কৌশলটি হলো—শক্তিশালী কেন্দ্রশাসিত আরব ও মুসলিম দেশকে দুর্বল করতে সীমান্তবর্তী বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উসকে দেওয়া।
সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সোমালিয়ার ফেডারেল সরকারের কাঠামোর মধ্যে গৃহীত জাতীয় সমঝোতার চেষ্টাকে ক্ষুণ্ন করার উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জিবুতির রাষ্ট্রদূত বামাখরামা বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সব সময় এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কারণ, তারা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতার বিপদ এবং এর ভয়াবহ মাশুলের চেয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য দিয়েছে।’
সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক নজির লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি ‘স্বীকৃতি দেওয়াকে’ আঞ্চলিক সংহতি ভাঙার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে—বিভিন্ন পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ উঠেছে।
ইসরায়েল এর আগেও বিভিন্ন রাষ্ট্রবহির্ভূত শক্তি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছে। এ সমর্থনকে তাঁরা ঝুঁকিতে থাকা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে হেফাজত করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে। উদাহরণ হিসেবে লেভান্ট (সিরিয়াসহ ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরবর্তী) অঞ্চলের দ্রুজ এবং লেবাননের ম্যারোনাইট সম্প্রদায়ের কথা বলা যায়।
ইসরায়েলের এই ‘পেরিফেরি ডকট্রিন’ বা প্রান্তীয় নীতির মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে দুটি উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। একদিকে ইসরায়েলের আঞ্চলিক মিত্র তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জাতিগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর স্বশাসনের ধারণার স্বীকৃতি মেলে। এটা ইসরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্র হওয়ার বৈধতাকেও সমর্থন করে।
তবে সোমালিল্যান্ডের ক্ষেত্রে স্পষ্টত ভিন্ন নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়ার যুক্তি নেই। কারণ, সোমালিল্যান্ড প্রধানত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল। এখানে যুক্তিটি আগাপাশতলা ভূরাজনৈতিক।
ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত অবস্থানকে গভীর করতে চাইছে। কারণ, অঞ্চলটিতে দেশটি ঐতিহাসিকভাবে নিঃসঙ্গ। সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতিকে ‘আব্রাহাম চুক্তির চেতনার’ সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন নেতানিয়াহু। এর অর্থ হলো—হর্ন অব আফ্রিকার স্বঘোষিত দেশটির জনসংখ্যা নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তা, সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহই ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য।
সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের প্রথম বড় অর্জন—কূটনৈতিক বলয়ে প্রভাব বিস্তার। ইসরায়েলের দাবি, আব্রাহাম চুক্তিতে সোমালিয়ার যোগ না দেওয়া কৃত্রিম বাধা হিসেবে কাজ করছিল। এখন তা দূর হলো।
ইসরায়েলের দাবি, স্বাধীনভাবে কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসম্পন্ন প্রায় ৬০ লাখ মানুষের দেশ সোমালিল্যান্ড আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিতে খুব আগ্রহী ছিল।
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহি জানান, ‘আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তির পথে একটি পদক্ষেপ’ হিসেবে তাঁর দেশ আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেবে। তবে, এই শান্তি এমনিতে আসেনি, এসেছে সম্পূর্ণ বিনিময়ের মধ্য দিয়ে, তা হলো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
ইসরায়েল এখন ‘সোমালিল্যান্ড মডেল’-কে সামনে এনে নানা যুক্তি দিতে পারবে। দেশটি হয়তো বলবে, সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত স্বার্থ পূরণ হলে আরও অনেক আরব ও মুসলিম দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ইচ্ছুক।
ইসরায়েলের এ যুক্তি আরব লিগ ও ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। বিভিন্ন আরব ও মুসলিম দেশের সংস্থা দুটির দীর্ঘদিনের অবস্থান ছিল—ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান না করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যাবে না। কিন্তু এখন তা আরও বেশি নাজুক হয়ে পড়েছে।
সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরায়েলের দ্বিতীয় বড় অর্জন—হর্ন অব আফ্রিকায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা। এডেন উপসাগরের কৌশলগত স্থান এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে সোমালিল্যান্ডের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপথের নজরদারি করার জন্য এটি বেশ উপযুক্ত।
সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের উপস্থিতি ক্রমশ ঝুঁকি বৃদ্ধি করবে। কারণ, অঞ্চলটির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ছোট সাগরের ওপরে ইয়েমেন। ইয়েমেনের ভূখণ্ডের একটি বড় অংশ হুতিরা নিয়ন্ত্রণ করে। হুতিরা এমন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী যারা ‘ইসরায়েলের ধ্বংস’ কামনা করে।
ইসরায়েল হয়তো দাবি করবে, সোমালিল্যান্ডে তাদের সামরিক বা গোয়েন্দা উপস্থিতি হুতি হামলার হুমকি মোকাবিলায় সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে। কিন্তু অঞ্চলটির অন্যান্য দেশ তা মনে করে না। তারা মনে করে, এতে করে উত্তেজনা বরং বাড়তে পারে।
সৌদি আরবে নিযুক্ত জিবুতির রাষ্ট্রদূত বামাখরামা সতর্ক করে বলেন, সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি এই অঞ্চলকে কার্যত ‘বারুদভর্তি বিস্ফোরকের কূপে’ পরিণত করবে।
এই কূটনীতিক বলেন, ‘ইসরায়েল ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল স্থানটিতে যদি সামরিক ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে...তাহলে তা লোহিত সাগরের তীরবর্তী দেশ মিসর, সৌদি আরব, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও জিবুতির বিরুদ্ধে তেল-আবিবের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে।’
জিবুতির রাষ্ট্রদূত যুক্ত করেন, লোহিত সাগর একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ। এর ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে কোনো ধরনের পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া এ অঞ্চলে ভয়াবহ ফল বয়ে আনবে।
![]() |
| সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া–সংক্রান্ত নথিতে সই করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁকে মুঠোফোনে কিছু দেখাচ্ছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার। ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি |
Thursday, January 1, 2026
সোমালিল্যান্ডে যে কোনো ইসরাইলি উপস্থিতিই হবে লক্ষ্যবস্তু: হুতি নেতা
শুক্রবার ইসরাইল ঘোষণা করে যে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। ১৯৯১ সালে সোমালিয়া থেকে একতরফা বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা দেয়ার পর এটিই হলো স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্রটির জন্য প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। হুতি নেতা সতর্ক করে বলেন, এই সিদ্ধান্ত ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে। তার ভাষায়, এই স্বীকৃতি হলো ‘সোমালিয়া ও তার আফ্রিকান পরিবেশ, তেমনি ইয়েমেন, লোহিত সাগর এবং লোহিত সাগরের উভয় তীরবর্তী দেশগুলোর বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক অবস্থান।’
দশক ধরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য চাপ দিয়ে আসা সোমালিল্যান্ডের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আদেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত এবং তাদের নিজস্ব মুদ্রা, পাসপোর্ট ও সেনাবাহিনী রয়েছে। আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ইসরাইলের জন্য লোহিত সাগরে আরও শক্তিশালী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে। ফলে তারা ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর অভিযান চালাতে পারবে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলের বিধ্বংসী হামলা শুরু হওয়ার পর হুতি গোষ্ঠী ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইল একাধিকবার ইয়েমেনে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। হুতিরা বলেছিল, এই হামলাগুলো গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির অংশ। তবে গাজায় অক্টোবর থেকে যে নাজুক যুদ্ধবিরতি চলছে, তার পর থেকে হুতিরা তাদের হামলা স্থগিত রেখেছে।
সোমালিল্যান্ড ১৯৯১ সালের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূলত বিচ্ছিন্নই রয়ে গেছে। যদিও সোমালিয়ার তুলনায় অঞ্চলটি তুলনামূলক বেশি স্থিতিশীল, সেখানে রাজধানী মোগাদিশুতে আল-শাবাব জঙ্গিরা প্রায়ই হামলা চালায়।
ইসরাইলের এই স্বীকৃতির সমালোচনা করেছে আফ্রিকান ইউনিয়ন, মিশর, তুরস্ক, ছয় জাতির উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) এবং সৌদি আরবভিত্তিক ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। ইউরোপীয় ইউনিয়নও জোর দিয়ে বলেছে, সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাতেই হবে।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...















