Sunday, September 13, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের গভীর চোরাবালিতে আটকে গেছেন ট্রাম্প

ইয়েমেন-ইরাকেও ইরান সমর্থিতদের জোরালো তৎপরতাঃ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের ছয় মাসের বেশি সময় পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি; বরং ইয়েমেন ও ইরাকে ইরান সমর্থিতদের সাম্প্রতিক তৎপরতায় সংকট আরো জটিল হয়ে উঠেছে। সংঘাত থেকে বের হওয়ার স্পষ্ট কোনো পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের গভীর চোরাবালিতে যেন আটকে গেছেন ট্রাম্প।

শুক্রবার বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ—পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের মুখে বাব আল-মান্দাব প্রণালি—বড় ধরনের বাধার মুখে ছিল। হরমুজ ইরানি নিয়ন্ত্রণে এবং বাব আল-মান্দাব ইয়েমেনের হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

একই দিনে ইরান সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালির বাধা এড়িয়ে সৌদি আরব এই পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহনের চেষ্টা করছিল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প এই সরবরাহপথেও নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমাবর্ষণ শুরুর আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের কিছু বেশি ছিল। শুক্রবার তা সাময়িকভাবে ১১০ ডলারে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দামও যুদ্ধ শুরুর সময়ের ২ দশমিক ৯৮ ডলার থেকে বেড়ে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ৩০ ডলারে উঠেছে।

মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো নিয়মিত হামলার ঝুঁকিতে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে আর্থিক চাপ প্রয়োগের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’।

তবে মার্কিন নৌ অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করলেও দেশটির শাসনব্যবস্থায় এখনো বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। ইরানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, মুদ্রার মূল্য কমেছে এবং জ্বালানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এরপরও দেশটির সরকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। একই সময়ে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্য তেহরানের প্রভাব আরো বাড়িয়েছে।

ইয়েমেনে হুথিদের মোখা দখল এবং ইরাকভিত্তিক ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সৌদি তেল অবকাঠামোয় হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরো বিস্তৃত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর ফলে শুধু সামরিক সংঘাত নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যপথও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা সক্রিয় থাকায় ওয়াশিংটনের জন্য সংকট আরো কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং সৌদি আরবের বিকল্প তেল পরিবহন ব্যবস্থায় হামলা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দ্রুত শেষ করার যে লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অভিযান শুরু করেছিল, ছয় মাসের বেশি সময় পর পরিস্থিতি তার বিপরীত দিকে যাচ্ছে। সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক মিত্রদের তৎপরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সংকট আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

মধ্যপ্রাচ্যের গভীর চোরাবালিতে আটকে গেছেন ট্রাম্প

এক দেশ, বহু শক্তির লড়াই: ইয়েমেন কীভাবে বারবার যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে by অনিন্দ্য সাইমুম

বিস্তীর্ণ আরব উপত্যকার একেবারে দক্ষিণ–পশ্চিম কোণের দেশ ইয়েমেন। আয়তনে বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বড়। ভূপ্রকৃতি, পাহাড় আর মরুভূমি ঘেরা। দেশটিতে চার কোটির কিছু বেশি মানুষের বসবাস। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাজধানী সানা।

ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান আলাদা করে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। দেশটির দুদিকে স্থলভাগ, দুদিকে সাগর। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, উত্তরে সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির বিশাল সীমানা। পূর্বে ওমান। পশ্চিমে লোহিত সাগর। দক্ষিণে এডেন উপসাগর ও আরব সাগর হয়ে ভারত মহাসাগরের সুনীল জলরাশি।

লোহিত সাগর আর এডেন উপসাগর হয়ে আরব সাগরে চলাচলের জন্য ইয়েমেন ঘেঁষে সরু একটি করিডর রয়েছে। এ জলপথকে বাব আল–মানদেব প্রণালি নামে ডাকা হয়। প্রণালির এক পাশে ইয়েমেন, অন্য পাশে আফ্রিকার জিবুতি। এই সরু জলপথ দিয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের দিকে জাহাজ চলাচল করে।

লোহিত সাগর থেকে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বাব আল–মানদেব প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। আর এমন বাণিজ্যিক গুরুত্ব ইয়েমেনের ভূরাজনৈতিক আবেদন বহু গুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে আফ্রিকা ও আরবের (বৃহত্তর এশিয়ার) অন্যতম সংযোগস্থল বলা হয় ইয়েমেনকে।

সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ইয়েমেনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ, হাজারো বছরের পুরোনো। অর্থনৈতিকভাবে সম্পদশালী ভূখণ্ড ছিল ইয়েমেন। প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে সাবা, মাইন ও হিময়ারের মতো রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ভারত মহাসাগর, পূর্ব আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যকার বাণিজ্যপথে অবস্থানের কারণে ইয়েমেন সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ধূপ, সুগন্ধি দ্রব্য ও মসলার বাণিজ্য ছিল এ সমৃদ্ধির বড় উৎস।

সপ্তম শতাব্দীতে ইয়েমেন মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় বিভিন্ন স্থানীয় রাজবংশ ও ধর্মীয় নেতা দেশটির বিভিন্ন অংশ শাসন করেন। নবম শতাব্দীর শেষ দিকে উত্তর ইয়েমেনে ‘জায়দি’ শিয়া ইমামদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান হুতি আন্দোলনের সামাজিক ও ধর্মীয় ভিত্তি বুঝতে এই জায়দি ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন গ্রিসের খ্যাতিমান ভূগোলবিদ টলেমি একসময় ইয়েমেনকে ‘সুখী আরব’ বলেছিলেন। রোমানরাও ইয়েমেনকে ‘সুখী অঞ্চল’ বলেই চিনত। সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সম্পদশালী অর্থনীতি, সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে ইয়েমেনিরা বরাবরই বিশ্ববাসীর মনোযোগ কেড়েছে।

যদিও আধুনিক ইয়েমেন অনেকটা আলাদা। দেশটির সমৃদ্ধির ইতিহাস ফিকে হয়ে এসেছে। এখন ইয়েমেন বলতে বিশ্বের মানুষ বোঝে, গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ও সংঘাতকবলিত এক ভূখণ্ড; যেখানে অর্থের বদলে অস্ত্রের ঝনঝনানি এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

ঔপনিবেশিকতা থেকে স্বাধীনতা

ইয়েমেনকে ঘিরে বিদেশি শক্তিগুলোর আগ্রহের ইতিহাস কয়েক শ বছরের পুরোনো। ষোড়শ শতকের দিকে তখন অটোমান সাম্রাজ্যের জয়জয়কার। ইয়েমেনের একটি অংশে সাম্রাজ্য বিস্তার করে তুর্কিরা; কিন্তু স্থায়ী হয়নি। মোটামুটি এক শতাব্দীর মধ্যে ইয়েমেন থেকে অটোমানরা বিদায় নিতে বাধ্য হয়।

লোহিত সাগরে এরপর অনেক জল গড়িয়েছে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো একে একে আফ্রিকা ও এশিয়ায় ছড়িয়েছে। ইয়েমেনের এডেন (বিখ্যাত বন্দর) ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ শাসনের অধীন আসে। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হয়। তখন এডেন গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র বা রিফুয়েলিং বন্দর হয়ে ওঠে। এর আগে ১৮৪৯ সালে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল আবার নিয়ন্ত্রণে নেয় অটোমানরা। আর দক্ষিণাঞ্চল থাকে ব্রিটিশদের হাতে।

বিংশ শতকের শুরুর দিক। রক্তক্ষয়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি তখনো দগদগে। ১৯১৮ সালে ইয়েমেন থেকে অটোমান সাম্রাজ্য বিদায় নেয় (এ সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে ১৯২২ সালে)। স্বাধীন হয় উত্তর ইয়েমেন। শাসনভার যায় ইমাম ইয়াহিয়া মুহাম্মদ হামিদ এদ্দিনের হাতে। তাঁকে মুতাওয়াক্কিলি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিন দশক দেশ শাসন করেন তিনি। তখন সামন্ততান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে ইয়েমেনে।

১৯৪৮ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন ইমাম ইয়াহিয়া। বিদ্রোহীদের দমন করে উত্তরসূরি হন তাঁর বড় ছেলে আহমদ বিন ইয়াহিয়া। তিনি বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। ১৯৬২ সালে মারা যান। ক্ষমতায় বসেন তাঁর ছেলে মুহাম্মদ আল-বদর। অভিষেকের পরপর সেনা বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়ে তাঁকে ক্ষমতা হারাতে হয়।

অবসান ঘটে ইয়েমেনি রাজতন্ত্রের। সেনা কর্মকর্তাদের হাত ধরে ইয়েমেনে আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এতে সৌদি আরব রাজতন্ত্রপন্থীদের ও মিসর প্রজাতন্ত্রপন্থীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়।

দুই দেশের এক হওয়া

গত শতকের ষাটের দশকে পুরো ইয়েমেন অঞ্চল ছিল বেশ উত্তাল। সশস্ত্র আন্দোলনের মুখে ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশরা দক্ষিণ ইয়েমেন ছেড়ে চলে যায়। ব্রিটিশশাসিত অঞ্চলগুলো এক ছাতার নিচে এনে নতুন নাম রাখা হয় ‘পিপলস রিপাবলিক অব ইয়েমেন’। সেটাও বেশি দিন টেকেনি। দুই বছরের মাথায় (১৯৬৯ সালে) সফল কমিউনিস্ট বিদ্রোহ হলে এটির নতুন নাম রাখা হয় ‘পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব ইয়েমেন’।

নতুন এ দেশ স্পষ্টতই সোভিয়েত প্রভাব বলয়ে ছিল, যা ওই সময় আরব বিশ্বের একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ছিল পরিচিত। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে তখনো রক্ষণশীল প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা। দুই অংশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও আলাদা। চলছিল সীমান্তবিরোধ। এর মধ্যেই দুই অংশকে এক করার একটি প্রচেষ্টা চালু ছিল।

১৯৭৮ সাল। উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ। পরের বছরই উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন সংঘর্ষে জড়ায়। আশির দশকের মাঝামাঝি দক্ষিণ ইয়েমেনে ক্ষমতার লড়াইয়ে হাজারো মানুষ নিহত হন। ফলে দেশটির প্রথম প্রজন্মের নেতাদের বড় অংশ ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।

এমন উত্তাল পরিস্থিতিতে দুই ইয়েমেনকে এক করার প্রচেষ্টা জোরেশোরে শুরু হয়। সেটা আরও জোরালো হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময়ে। সফলতা আসে ১৯৯০ সালে। ওই বছরের ২২ মে দুই ইয়েমেন এক হয়। নতুন রাষ্ট্রের নাম রাখা হয় ‘রিপাবলিক অব ইয়েমেন’। প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ।

একীভূত হলেও দুই অংশের মধ্যে বিরোধ আর উত্তেজনা রয়ে যায়। ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি প্রেসিডেন্ট সালেহ জরুরি অবস্থা জারি করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট আলী সালেম আল-বেইদসহ দক্ষিণের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন তিনি। জবাবে তাঁরা দক্ষিণে নতুন রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেন। তবে সালেহর বাহিনী তাঁদের পরাস্ত করে। দেশটি আবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পায়।

সালেহর দীর্ঘ শাসন ও হুতিদের উত্থান

প্রেসিডেন্ট সালেহ দক্ষিণ ইয়েমেনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু অনেক মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক বঞ্চনা, জমি ও সম্পদ হারানো এবং সরকারি চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের ক্ষোভ রয়ে যায়। এসবই পরে অঞ্চলটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদ ছড়ানোর পেছনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

আলী আবদুল্লাহ সালেহ প্রথমে উত্তর ইয়েমেনের শাসক, পরে দুই ইয়েমেন এক হলে প্রেসিডেন্ট হন। সব মিলিয়ে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন দশকের বেশি ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থা দাঁড়িয়েছিল সেনাবাহিনী, উপজাতীয় নেতা, রাজনৈতিক মিত্র ও পৃষ্ঠপোষকতার জটিল সম্পর্কের ওপর।

সালেহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মিত্র বানিয়েছেন। আবার প্রয়োজন ফুরালে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ কৌশল তাঁকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখে। কিন্তু দেশটিতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। দুর্নীতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, পানি ও সম্পদের সংকট এবং আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়তে থাকে। সঙ্গে বাড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাব।

নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে ‘জায়দি’ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অংশ হিসেবে হুতি আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি। তিনি সালেহ সরকারের বিভিন্ন নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাবের সমালোচনা করতেন। তখন থেকেই হুতিদের সমর্থন জোগায় ইরান।

নতুন শতকে ইয়েমেন

একবিংশ শতকের শুরুতে ইয়েমেনে ব্যাপক রক্তপাত দেখা দেয়। ২০০০ সালে এডেন বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে প্রাণঘাতী হামলা চালায় আল–কায়েদা। পরের বছর নির্বাচন ঘিরে দেশটিতে বড় ধরনের সহিংসতা হয়। ২০০২ সালে আল–কায়েদার বিরুদ্ধে বেশ বড়সড় অভিযানে নামে ইয়েমেন সরকার। আল–কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দেশটি থেকে কয়েক শ ইসলামিক স্কলারকে বহিষ্কার করা হয়।

উত্তরাঞ্চলে ২০০৪ সালের জুন–আগস্টে হুতিদের নেতৃত্বাধীন শিয়া বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে শত শত মানুষ নিহত হন। নিহত হন হুসেইন আল-হুতিও। ২০০৫ সালের শুরুর দিকে হুসেইন আল-হুতির সমর্থকদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

২০০৭ সালের জানুয়ারি–মার্চ মাসে ইয়েমেনের উত্তরে নিরাপত্তা বাহিনী ও হুতিদের সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হন। গ্রীষ্মে বিদ্রোহী নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে সানায় মার্কিন দূতাবাসে আল-কায়েদার হামলায় হামলাকারীসহ ১৬ জন নিহত হন।

২০০৯–১০ সালজুড়েও ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি হামলা দেখা যায়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন বাহিনীর হামলায় দেশটিতে আল–কায়েদার নেতা আনোয়ার আল–আওলাকি নিহত হন। এত কিছুর পরও ইয়েমেনে আল–কায়েদা ও হুতি, কারও প্রভাব কমেনি।

আরব বসন্তের ছোঁয়া

আরব বিশ্ব ২০১১ সালে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয়। তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্ত একে একে আরব দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। বাদ যায়নি ইয়েমেনও। ওই বছর দেশটিতে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা সালেহর পদত্যাগ, দুর্নীতির অবসান ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি জানান।

দীর্ঘ আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার পর সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হন। ২০১২ সালে আবেদরাব্বো মানসুর হাদি ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর নেতৃত্বে একটি জাতীয় সংলাপ শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল, নতুন সংবিধান তৈরি, রাষ্ট্রের কাঠামো সংস্কার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক পক্ষকে ক্ষমতায় যুক্ত করা।

রূপান্তরের এ প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। সরকার অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, নিরাপত্তাহীনতা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরোধ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। নতুন রাষ্ট্রকাঠামো ও ক্ষমতা বণ্টনের প্রস্তাবেও ঐকমত্য হয়নি। এতে হুতিরা অভিযোগ করে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করবে।

এ পরিস্থিতিতে হুতিরা উত্তরাঞ্চল থেকে অগ্রসর হতে থাকে। একসময় পুরোনো শত্রু সালেহ ও তাঁর অনুগত সেনাসদস্যদের সঙ্গে হুতিদের সমঝোতা হয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। ২০১৫ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হাদি সানা ছেড়ে এডেনে চলে যান। এডেনকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। পরে প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।

গৃহযুদ্ধ থেকে আঞ্চলিক সংঘাত

আরব বসন্তের পর থেকে ইয়েমেন টালমাটাল ছিল। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। হুতিরাও একের পর এক এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে। এ অবস্থায় ২০১৫ সালে নতুন করে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে ইয়েমেনে।

হুতিরা এডেনের দিকে অগ্রসর হলে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। জোটের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, হাদি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো। যুক্তরাষ্ট্র জোটকে গোয়েন্দা ও কারিগরি সহায়তা দেয়।

সৌদিরা হুতিদের উত্থানকে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তের জন্য হুমকি এবং ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বিস্তার হিসেবে দেখে থাকে। সৌদি জোটের বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধের মধ্যেও হুতিরা সানা আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। সৌদি আরবের ভেতরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা। পরে যুদ্ধ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে।

২০১৭ সালে হুতি আর সালেহপন্থীদের জোট ভেঙে যায়। সালেহ হুতিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর সংঘর্ষে নিহত হন। এরপরও তাঁর অনুগত বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইয়েমেনের সংঘাতে সক্রিয় থাকে।

শান্তি এখনো আসেনি

ইয়েমেনে সংঘাত শুধু হুতি ও সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে ঘটছে, তা নয়। দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) গড়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এসটিসিকে সমর্থন জোগায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেয় সৌদি আরব।

২০১৯ সালে এসটিসি এডেনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় সরকার ও এসটিসির মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এরপরও বাহিনীগুলো একীভূত করা ও ক্ষমতা ভাগাভাগির অনেক শর্ত কার্যকর হয়নি। চলতে থাকে সংঘাত। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে দুই মাসের অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়। পরে এর মেয়াদ কয়েক দফায় বৃদ্ধি করা হয়।

একই বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট হাদি প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। হুতিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা থেকে পিএলসি গঠন করা হয়। কিন্তু কাউন্সিলের সদস্য ও সমর্থক শক্তিগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য দূর হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত শান্তিও আসেনি।

ফিলিস্তিনের গাজা ও ইরান যুদ্ধ

২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। হুতিরা অসহায় গাজাবাসীর পক্ষে দাঁড়ায়। ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে লোহিত সাগর ও আব আল–মানদেব প্রণালিতে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়।

বসে থাকেনি ইসরায়েল ও এর পশ্চিমা মিত্ররা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে ইয়েমেনে হুতিদের ওপর ব্যাপকভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। ওই দিন ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায় ইরান। স্বাভাবিকভাবে ইরান–সমর্থিত হুতিরা যুদ্ধের বাইরে থাকতে পারেনি। তেহরানের পক্ষে রণাঙ্গনে নেমেছে তারাও।

গত জুলাই থেকে ইয়েমেনে সামরিক উত্তেজনা আবার বাড়তে শুরু করে। হুতিদের লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং উপকূলীয় এলাকায় অগ্রযাত্রা নতুন সংকট তৈরি করে। লোহিত সাগর ও বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরিগুলোর অবাধ চলাচল ব্যাহত করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।

হুতিদের হুমকি ও প্রতিক্রিয়া

জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল–মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলকে তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

হুতিদের এসব সক্ষমতা ইরান যুদ্ধে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারে। মার্কিন রণতরিগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে।

তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াসে আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেক বড় বাধা। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর দখল করে নিয়েছে। এত দিন বন্দরটি ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

জবাবে সৌদি আরব মোখায় বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে হুতিরাও বাব আল–মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আগে থেকেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন হুতিরা বাব আল–মানদেব পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরো বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংকটে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, সংঘাতের বিস্তার ইয়েমেনকে আবার বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেই সঙ্গে দেশটিকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের আরও গভীরে নিয়ে যেতে পারে।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সংঘাত ও গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের অবস্থা শোচনীয়। লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশে–বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। অর্থনীতির অবস্থা তথৈবচ। নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট। ভেঙে পড়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও প্রশাসনব্যবস্থা। খাদ্যসংকটে দেখা দিয়েছে তীব্র মানবিক সংকট।

অপুষ্টি–দুর্ভিক্ষ–মহামারিতে ইয়েমেনে আরও অনেক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও ত্রাণ সরবরাহে বাধা পাচ্ছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইয়েমেনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কার কথা জানিয়ে রেখেছে।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি মূল্য চোকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এখন যদি গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাত আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তবে ইয়েমেন সংকট এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটা ভেবে উদ্বিগ্ন হতেই হয়।

{তথ্যসূত্র: বিবিসি, টাইম, দ্য গার্ডিয়ান, এপি, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, আরব সেন্টার ও ব্রিটানিকা}

টানা সংঘাতে ইয়েমেনের রাজধানী সানার বড় অংশ এখন কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে
টানা সংঘাতে ইয়েমেনের রাজধানী সানার বড় অংশ এখন কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী কারা, কীভাবে উত্থান

এএফপির এক্সপ্লেইনারঃ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালি দখল করেছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হুতিদের শক্ত অবস্থান আরও পাকাপোক্ত হলো।

একসময় হুতিদের তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন একটি ধর্মীয় ও সামরিক সংগঠন হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু তারা এখন ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিয়ন্ত্রণ করছে। পাশাপাশি দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশও হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়

হুতিরা জায়দি সম্প্রদায়ভুক্ত। জায়দিরা শিয়াদের একটি শাখা। ইয়েমেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সুন্নি। আর দেশটিতে জায়দিরা সংখ্যালঘু।

গত শতকের নব্বই দশকে জায়দিদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের অভিযোগ তুলে হুতিরা প্রতিরোধে নামে। জায়দিদের বেশির ভাগই ইয়েমেনের দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলে বসবাস করে।

হুতিরা ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। এর অর্থ ‘আল্লাহর সমর্থক’। প্রয়াত ধর্মীয় নেতা বদরেদ্দিন আল-হুতির নামানুসারে এই সংগঠনের নামকরণ হয়। তাঁর ছেলে হুসেইনও এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর হাতে নিহত হন।

বদরেদ্দিনের আরেক ছেলে আবদুলমালিক পরে সংগঠনের নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন। জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পান। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিচ্ছিন্ন একটি গোষ্ঠী তাঁর নেতৃত্বে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিতে পরিণত হয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেও তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে।

এখন হুতিদের হাজার হাজার যোদ্ধা রয়েছে। ইয়েমেনের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় লড়াইয়ের জন্য তারা প্রশিক্ষিত। দীর্ঘদিনের যুদ্ধেও তারা অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে।

ইয়েমেনের জনসংখ্যার বড় অংশ যে এলাকাগুলোতে বসবাস করে, হুতিরা সেসব এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এখনো দেশটির বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে।

হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইয়েমেনের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের জন্যও তারা হুমকি। ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর হুতিরা বারবার ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে।

কয়েক দশক ধরে উত্থান

২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হুতিরা ইয়েমেনের তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ছয়টি যুদ্ধে লড়েছে। আর ২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের সঙ্গেও তারা লড়াই করে। সে সময় তারা সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবে ঢুকে পড়েছিল।

আরব বসন্তের বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে ইয়েমেনের তৎকালীন শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতে হুতিরা অংশ নেয়। পরে অবশ্য তারা সালেহর সঙ্গে জোট গড়ে। তবে আবার তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ২০১৭ সালে হুতিরা সালেহকে হত্যা করে।

হুতিদের বড় ধরনের উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। সে বছর তারা রাজধানী সানা দখল করে। এর জেরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয়। এরপর ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়। ইয়েমেনে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়।

২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের একটি যুদ্ধবিরতি হয়। তবে দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশ তখনো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

গত জুলাইয়ে আবার সংঘাত শুরু হয়। সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনের আকাশসীমা অমান্য করে হুতিরা একটি ইরানি উড়োজাহাজকে অবতরণের অনুমতি দেয়। এর জবাবে বিমানবন্দরে হামলা হয়। এই হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে হুতিরা।

‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক

হুতিরা তেহরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ। এই অক্ষে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে।

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের ইরানের ‘হাতিয়ার’ হিসেবে দেখে আসছে। তাদের অভিযোগ, তেহরান হুতিদের অস্ত্র সরবরাহ করে। ইরান অবশ্য এই অভিযোগ অতীতে অস্বীকার করেছে।

হিজবুল্লাহর মতো হুতিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে ‘চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে মানে না। তবে বছরের পর বছর ধরে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

২০২৪ সালে হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, এসব জাহাজের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক রয়েছে। গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তারা এসব হামলা চালানোর কথা জানায়।

এই হামলার কারণে অনেক জাহাজকে গন্তব্যে যেতে দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।

গত মার্চে ইরানের সমর্থনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে হুতিরাও যোগ দেয়। তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে। তবে এসব হামলায় ইসরায়েলের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও হুতিরা তাদের সমর্থনদাতা দেশটির কাছ থেকে কিছুটা স্বাধীনতা বজায় রাখতে পেরেছে। সামরিক সহায়তার জন্যই তারা মূলত ইরানের ওপর নির্ভর করে।

বাব আল-মানদেব দখলের লড়াই

লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হামলা চালিয়ে হুতিরা দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে সক্ষম হয়েছে।

সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়াকে যুক্ত করেছে লোহিত সাগর। সৌদি আরবের জন্যও এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে পারস্য উপসাগর থেকে তেল পরিবহন অনেকটাই বন্ধ করে দেয়। এরপর তেল রপ্তানি চালু রাখতে সৌদি আরব এই জলপথের ওপর নির্ভর করছে।

গত জুলাইয়ে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথ অবরোধের ঘোষণা দেয়। এর পর থেকে তারা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের জাহাজে বারবার হামলা চালিয়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আবার সংঘাত শুরুর কিছুদিন পর ৩ সেপ্টেম্বর হুতিরা বাব আল-মানদেব দখলের লক্ষ্যে বড় ধরনের হামলা শুরু করে।

এক সপ্তাহের মধ্যেই হুতিরা পুরো লোহিত সাগর উপকূল এবং প্রণালিটির ভেতর ও আশপাশের কৌশলগত দ্বীপগুলো দখল করে নেয়। এতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণসহ সৌদির তেলবাহী জাহাজে হুতিদের হামলা চালানোর সক্ষমতা আরও বেড়েছে।

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

দিল্লিতে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিন কাশ্মীরি নেতার বৈঠক by শুভজিৎ বাগচী

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করেছেন কাশ্মীরের তিন নেতা। তাঁরা হলেন হুরিয়াত কনফারেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মীরওয়াইজ উমর ফারুক, আগা সৈয়দ হাসান মোসাভি আল সাফাভি ও ইমরান রেজা আনসারি। বৈঠকে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ দেশটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল দিল্লিতে এসেছে।

বৈঠকের পর ভারতের সংবাদ সংস্থাকে মীরওয়াইজ উমর ফারুক বলেন, কাশ্মীর থেকে একটি প্রতিনিধিদল দিল্লিতে এসেছে। তারা ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলা নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁরা সংহতি প্রকাশ করেছেন বলেও জানান তিনি।

মীরওয়াইজ উমর ফারুক বলেন, ‘এই অবিচার বন্ধ হওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ইরানের পাশাপাশি ফিলিস্তিন ও লেবাননে যা ঘটছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে তিনি অন্যায় বলে মন্তব্য করেন।

বৈঠকের মূল বার্তা সম্পর্কে মীরওয়াইজ উমর ফারুক বলেন, ‘সব ধর্মই সত্য ও ন্যায়কে সমর্থন করে। আর সেই কারণেই আমাদের দেখা উচিত কে সঠিক পথে আছে। এই মুহূর্তে ইরান সঠিক পক্ষে রয়েছে; তারা নিজেদের রক্ষা করছে এবং তাদের ওপর একটি যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
ইরানি দূতাবাসের অনুষ্ঠানে কাশ্মীরি নেতারা

মীরওয়াইজ উমর ফারুক ও ইমরান রেজা আনসারি দিল্লিতে ইরান দূতাবাস আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতেও অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের মিনাবে নিহত শিশুদের স্মরণে প্রদর্শনীটি আয়োজন করা হয়।

মীরওয়াইজ উমর ফারুকের এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে জানান, ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মহম্মদ ফাতহালির আমন্ত্রণে কাশ্মীরের নেতারা প্রদর্শনীতে যোগ দেন।
কাশ্মীর নিয়ে ভারত-ইরানের সংবেদনশীলতা

২০১৯ সালে ভারত জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে। এরপর কাশ্মীরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বড় পরিবর্তন আসে। একই সময়ে কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও ইরানের মধ্যে মতপার্থক্যও দেখা দেয়।

ভারত বরাবরই বলে আসছে, পুরো কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাকিস্তান-সংক্রান্ত কাশ্মীরের বিষয়টি ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যেই সমাধানযোগ্য বলে দিল্লির অবস্থান।

অন্যদিকে, ২০১৯ সালে বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পর ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কাশ্মীরের মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ভারত তখন এর প্রতিবাদ জানায়।

খামেনি ২০২০ সালের দিল্লির দাঙ্গা নিয়েও মন্তব্য করেন। ২০২৪ সালে গাজার পাশাপাশি ভারতের মুসলমানদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের মুসলিম বলতে পারি না যদি আমরা মিয়ানমার, গাজা, ভারত বা অন্য যেকোনো স্থানে একজন মুসলিমের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে উদাসীন থাকি।’

তবে এসব মতপার্থক্যের মধ্যেও ভারত ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রয়েছে।

চলতি বছরের গোড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর কাশ্মীর ইস্যুতে তেহরানের অবস্থান নিয়ে ভারতে প্রতিক্রিয়া হয়। ইরানের দূতাবাসকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পোস্ট মুছে ফেলতে হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে দিল্লিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কাশ্মীরি নেতাদের বৈঠক তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একই সময়ে ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পেজেশকিয়ানের সাক্ষাৎও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

ভারত ও ইরানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়, তা পর্যবেক্ষণের বিষয়।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করেছেন কাশ্মীরের তিন নেতা
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করেছেন কাশ্মীরের তিন নেতা। ছবি: মীরওয়াইজ ওমর ফারুকের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে

দেশে প্রি–ডায়াবেটিস থেকে ডায়াবেটিস হওয়ার হার বেশি কেন?

নভেম্বর ডায়াবেটিস সচেতনতা মাস। এ উপলক্ষে ২৪ নভেম্বর ২০২৫ কংগ্রেসিয়া ও প্রথম আলোর আয়োজনে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন দেশের কয়েকজন স্বনামধন্য চিকিৎসক। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘ডায়াবেটিস আমার, দায়িত্বও আমার’। সহযোগিতায় ছিল হেলদি লিভিং ট্রাস্ট। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন। সেখানে আলোচক ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. এম সাইফুদ্দিন। তাঁর বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কোনো লক্ষণ থাকে না। অনেক সময় অনেকে পরিবারে কারও ডায়াবেটিস নেই বলে ডায়াবেটিস পরীক্ষাও করতে চান না। অল্প কিছু ক্ষেত্রে হয়তো পানির পিপাসা, ওজন কমে যাওয়া, বেশি খিদে পাওয়ার মতো লক্ষণগুলো নিয়ে রোগীরা আসেন।

আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের যে চারটি ক্রাইটেরিয়া, রোগী শনাক্তে আমরাও সেটা অনুসরণ করি। খালি পেটে ডায়াবেটিস ৭ অথবা তার চেয়ে বেশি। খালি পেটে (৮ ঘণ্টা) ক্যালরি কন্টেইনিং কোনো খাবার খাওয়া যাবে না। ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খেয়ে দুই ঘণ্টা পর যদি ১১ দশমিক ১ বা তার চেয়ে পয়েন্ট বেশি হয়।

যদিও শিশুদের ক্ষেত্রে ৭৫ গ্রামের জায়গায় ১ দশমিক ৭৫ গ্রাম পার কেজি বডি ওয়েট হয়। এটি ২৫০ থেকে ৩০০ এমএল পানিতে মিশিয়ে খেতে হয়। প্রথমে একবার সুগার দেখা হয়। দুই ঘণ্টা পরে আবার সুগার দেখা হয়।

এইচবিএওয়ানসি বলতে আমরা বুঝি ডায়াবেটিসের গত তিন মাসের গড়। যেটা সাড়ে ৬ বা তার চেয়ে বেশি হলে আমরা ডায়াবেটিস বলি। কিন্তু মনে রাখতে হবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এইচবিএওয়ানসি আপনাকে ভুল ধারণা দিতে পারে।

যেমন গর্ভাবস্থায় বা হিমোগ্লোবিনোপ্যাথির ক্ষেত্রে। হিমোগ্লোবিনোপ্যাথির ক্ষেত্রে রোগীর যদি ব্লাডসুগার ১১ দশমিক ১ বা তার বেশি হয়, তখন হাসপাতালে ভর্তি হবে।

আরেকটা জিনিস আমাদের একটু জানা উচিত, প্রি–ডায়াবেটিস নামে একটা টার্ম আছে। যুক্তরাষ্ট্রে যাঁদের প্রি–ডায়াবেটিস থাকছে, তার মধ্যে ৩৩ শতাংশ প্রি–ডায়াবেটিসই থেকে যাচ্ছে, ৩৩ শতাংশ ডায়াবেটিস হচ্ছে ও ৩৩ শতাংশ স্বাভাবিক হচ্ছে। কিন্তু আমার ধারণা, এ দেশে ৯০ শতাংশের বেশি প্রি–ডায়াবেটিস ডায়াবেটিসে পরিণত হচ্ছে।

প্রি–ডায়াবেটিসের ক্রাইটেরিয়া হচ্ছে, এইচবিএওয়ানসি ৫ দশমিক ৭ থেকে যদি ৬ দশমিক ৪ হয় অথবা খালি পেটে যদি ৫ দশমিক ৬ থেকে ৬ দশমিক ৯ হয় অর্থাৎ গ্লুকোজ খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর যদি ৭ দশমিক ৮ হয়, সেটাকে আমরা প্রি–ডায়াবেটিস বলব।

প্রি–ডায়াবেটিসে কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ডায়াবেটিসের সমান। যাঁরা উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের ওষুধ খাচ্ছেন, অথবা যাঁদের ফ্যাটি লিভার আছে, হৃদ্‌রোগ আছে, পরিবারে ডায়াবেটিস আছে, কায়িক পরিশ্রম অথবা ঘুম কম, তাঁদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আছে।

বয়স ২০ হলে প্রতিবছর ডায়াবেটিস পরীক্ষা করবেন। ১০ থেকে ২০ বছর বয়সী যাঁদের ওজন বেশি, বা পরিবারে ডায়াবেটিস আছে, তাঁদেরও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা উচিত।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম সাইফুদ্দিন
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম সাইফুদ্দিন। ছবি: দীপু মালাকার

রাশিয়ার হামলায় বিপর্যস্ত ইউক্রেন কঠিন শীতের অপেক্ষায়

রুশ হামলায় ইউক্রেনের অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে বাজেট সংকটও। সব মিলিয়ে সামনে কঠিন শীতের আশঙ্কা করছে দেশটি।

শনিবার ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছর রুশ বিমান হামলায় দেশটির অবকাঠামো ও বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষতি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। হামলা এবং কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলো কার্যত বন্ধ থাকায় অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশের সমান।

ইউক্রেনের অর্থমন্ত্রী ওলেক্সান্দর ক্রাভচেঙ্কো বলেন, শীতকাল দেশটির জন্য খুব কঠিন হতে পারে। কারণ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রতিদিনই রুশ হামলার শিকার হচ্ছে। একই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও চাপের মধ্যে রয়েছে।

গত সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে সামনের সারিতে বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও রাশিয়া ও ইউক্রেন এখন একে অপরের সরবরাহব্যবস্থা, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে।

গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাশিয়া প্রায় নিয়মিতভাবে কিয়েভে দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোন দিয়ে হামলা চালাচ্ছে। এতে রাজধানীর স্বাভাবিক জীবন, ব্যবসা ও সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশই বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

রুশ হামলার কারণে ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী বলেন, এর ফলে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় ঝুঁকিতে রয়েছে। ইউক্রেনের প্রধান রপ্তানি পণ্য কৃষিপণ্য এবং লোহা ও ইস্পাত—যার বড় অংশই এসব বন্দর দিয়ে পরিবহন করা হয়।

বাজেটেও বড় ঘাটতি

যুদ্ধের কারণে অবকাঠামো ও শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউক্রেনের সরকারি রাজস্বও কমে গেছে। দেশটির পার্লামেন্টের বাজেট কমিটির প্রধান রোকসোলানা পিদলাসা জানান, বছরের প্রথম আট মাসে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার কম এসেছে। এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ ঘাটতি হয়েছে শুধু আগস্টে।

তিনি বলেন, যুদ্ধের ব্যয় এত বেড়েছে যে ইউক্রেন এখন আর নিজেদের রাজস্ব দিয়ে পুরো প্রতিরক্ষা ব্যয় মেটাতে পারছে না।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউক্রেন প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এর বিপরীতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ও স্থানীয় ঋণ থেকে এসেছে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার।

যুদ্ধের দৈনিক ব্যয়ও বেড়েছে। চলতি বছরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৯ কোটি ডলার খরচ হচ্ছে। ২০২৪ সালে এই ব্যয় ছিল প্রায় ১৪ কোটি ডলার। মূল্যস্ফীতি, সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি, নিহত সেনাদের পরিবারের জন্য বাড়তি সামাজিক সহায়তা এবং বেশি পরিমাণে গোলাবারুদ ব্যবহারের কারণে ব্যয় বেড়েছে।

বছর শেষ হওয়ার আগেই ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খাতে আরও অর্থের প্রয়োজন হবে। এ ঘাটতি পূরণে সরকার সামরিক নয়, এমন কিছু খাতে ব্যয় কমানো বা পিছিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে। পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে আরও আর্থিক সহায়তাও চাইছে কিয়েভ। তবে এখনো দ্রুত সমাধানের কোনো পথ পাওয়া যায়নি।

গত ৮ সেপ্টেম্বর রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কিয়েভে ধ্বংসযজ্ঞ। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি: রয়টার্স
গত ৮ সেপ্টেম্বর রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কিয়েভে ধ্বংসযজ্ঞ। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি: রয়টার্স

হরমুজে জাহাজে হামলার নতুন খবর, তেল সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে হামলার নতুন খবর পাওয়া গেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলার সময় একটি জাহাজে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।

হামলায় জাহাজটির কতটা ক্ষতি হয়েছে এবং এর ক্রুদের কী অবস্থা, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এর এক দিন আগে সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। ইরাক ও সৌদি আরব উভয়েই জানিয়েছে, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে চালানো ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে। ইরাকে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা রয়েছে।

প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিম উপকূলের দিকে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। গত ছয় মাস ধরে হরমুজ প্রণালি যুদ্ধের কারণে অনেকাংশে বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের জন্য এ পাইপলাইনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছিল। এটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান।

সৌদি পাইপলাইনে হামলার দায় এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। হামলার পর স্যাটেলাইট ছবিতে মদিনার দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং পাইপলাইনে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে তেল রপ্তানিতে এর কী প্রভাব পড়েছে, তা জানানো হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হামলার জন্য সম্ভবত ইরান দায়ী। তবে ইরান সরাসরি এ হামলার দায় স্বীকার করেনি।

এদিকে সৌদি আরবের জাজান অঞ্চলে হুতিদের ছোড়া একটি প্রজেক্টাইলে দুজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি সিভিল ডিফেন্স। এতে একটি মসজিদসহ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সৌদি যুবরাজের মার্কিন সহায়তা চাওয়া

পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তিনটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করে ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চান।

তবে আপাতত সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করবে বলে জানানো হয়েছে।

ট্রাম্পও যুবরাজের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, হুথিরাও তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।

এদিকে ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্র জানিয়েছে, হুতিরা শুক্রবার বাব আল-মান্দাব প্রণালির মাঝখানে থাকা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখল করেছে। লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে থাকা এই প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হরমুজ নিয়ে ইরানের শর্ত

এদিকে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে সোমবার ওমানে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে।

তবে বৈঠক থেকে দ্রুত কোনো সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ওমানের উদ্যোগে আয়োজিত বৈঠকে হরমুজসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, তবে সেখানে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

এর আগে ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নতুন পথ নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। তবে ইরানের দেওয়া সাতটি শর্ত পূরণ না হলে প্রণালিটি খুলবে না বলে তাসনিমকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।

ইরান চায়, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে তারা ফি আদায় করতে পারবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি মেনে নিতে রাজি নয় বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

হরমুজ প্রণালি। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালি। ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রায় নতুন সংকটে যুক্তরাষ্ট্র

রয়টার্সের বিশ্লেষণঃ ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের সপ্তম মাসে নতুন এক সংকটে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইয়েমেনের উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর চাপ তৈরির সক্ষমতা বাড়িয়েছে হুতিরা। শুক্রবার তারা ইয়েমেন ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী ওই প্রণালির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র।

বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে গেলে ইরান আরব উপদ্বীপের দুই পাশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব নিয়ে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে নতুন করে বড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দরগুলো দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করছে। বাব আল-মান্দেবও হুমকির মুখে পড়ায় সৌদির বিকল্প এই রপ্তানি পথও অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। তার জনপ্রিয়তা রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে নেমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাও ঝুঁকিতে পড়েছে।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টিফেন ওয়ার্থেইম রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছিলেন, যাতে সামরিক সংঘাত সীমিত রেখে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করা যায়। কিন্তু হুতিদের অগ্রযাত্রা সেই পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি বেশ কঠিন। হুতিরা বাব আল-মান্দেব বন্ধ করে দিলে জ্বালানির দাম ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন চাপ তৈরি হবে। আবার তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালালে ইরানে ইতোমধ্যে ব্যস্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে তিনটি সূত্র। তবে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না বলে তাকে জানানো হয়েছে। এর পরিবর্তে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করা হবে।

শনিবার ট্রাম্পও নিশ্চিত করেছেন, সৌদি যুবরাজের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। একই সঙ্গে হুতিরাও তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর অনুরোধ করেছে বলে জানান তিনি।

ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাসহ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় অংশীদারদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

ইরানের সঙ্গে যুক্ত হুতিরা বাব আল-মান্দেব বন্ধ করতে সক্ষম হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হতো। বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে আরও প্রায় ৭ শতাংশ বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম সরবরাহ এবং প্রায় ১২ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে প্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডেভিড শেনকার রয়টার্সকে বলেন, ইরান যদি হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে বিশ্বের দুটি প্রধান জ্বালানি চোকপয়েন্ট তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এর মাধ্যমে তেহরান বিপুল প্রভাব খাটানোর সুযোগ পাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন ট্রাম্পের সামনে মূলত দুটি পথ; হুতিদের ঠেকাতে মার্কিন সেনা ও সীমিত আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র ব্যবহার করা, অথবা সৌদি আরব, তার মিত্র এবং দক্ষিণ ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে একাই হুতিদের মোকাবিলা করতে দেওয়া।

হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান শুরু হলে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর বড় ধরনের সম্পদ মোতায়েন করতে হতে পারে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সক্ষমতাও ব্যবহার করতে হবে, কারণ গত বছরের তুলনায় হুতিদের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে।

হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানকে সক্রিয় হতে হলে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুতও আরও কমে যেতে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মজুত রয়েছে এবং কৌশলগত সব লক্ষ্য পূরণে সম্পদের ঘাটতি হবে না।

ইয়েমেনে সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত টিম লেন্ডারকিং বলেন, ট্রাম্প সরাসরি সামরিকভাবে হুতিদের বিরুদ্ধে যেতে অনিচ্ছুক হলে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা জোরদার করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন একসময় জানতে চেয়েছিল, ‘ইয়েমেন আমাদের জন্য কী করতে পারে?’ এখন বাস্তবতা হলো, ‘ইয়েমেন আমাদের দিনটাই নষ্ট করে দিতে পারে।’

সূত্র : রয়টার্স

রাইফেল ও আরপিজি লঞ্চার হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধরা। ছবি: এএফপি
রাইফেল ও আরপিজি লঞ্চার হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধরা। ছবি: এএফপি

লিভার সিরোসিস কেন হয়, কীভাবে নিরাপদ থাকবেন by অধ্যাপক ডা. বিমল চন্দ্র শীল

লিভার সিরোসিস হলে লিভারের কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তন্তুময় টিস্যু দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ এই রোগের ঝুঁকিতে। প্রতিবছর দেশে প্রায় ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় লিভার-সংক্রান্ত রোগে।

কেন হয়

হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি ভাইরাসে লিভারে প্রদাহ হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রদাহ লিভারের কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে লিভার সংকুচিত হয়ে যায়। ফ্যাটি লিভার অর্থাৎ লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হলে লিভার কোষে প্রদাহ হয়ে নষ্ট হতে থাকে এবং একসময় সিরোসিস হতে পারে।

সিরোসিস হতে পারে এসব কারণে—

* অতিরিক্ত মদ্যপান

* অটোইমিউন হেপাটাইটিস

* কিছু বংশগত রোগ

* পিত্তথলি বা পিত্তনালির ব্যাধি

* ওষুধের বিষক্রিয়া

লক্ষণগুলো কী

সিরোসিসের শুরুতে তেমন উপসর্গ থাকে না। খাবারে অরুচি, বমিভাব, শরীর দুর্বলতা, ক্লান্তি ও ওজন কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় অন্য রোগের জন্য রক্ত পরীক্ষা, পেটের আলট্রাসাউন্ড বা সার্জারির সময় রোগটি ধরা পড়ে।

রোগের অগ্রসর পর্যায়ে জন্ডিস, পায়ে বা পেটে পানি, রক্তবমি বা কালো পায়খানা হতে পারে। রোগী চেতনা হারিয়ে কোমায় চলে যেতে পারেন।

চিকিৎসাপদ্ধতি

প্রাথমিক সিরোসিসে অন্তর্নিহিত কারণ অনুযায়ী চিকিৎসায় লিভারের ক্ষতি কমানো সম্ভব। মূল কারণ নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টিভাইরাল থেরাপি ( হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি), ওজন কমানো ও ব্যায়াম (ফ্যাটিলিভার), মদ্যপান বর্জন ও ক্ষতিকর ওষুধ বন্ধ করার দরকার পড়ে।

সিরোসিসের কারণে জটিলতা নিয়ন্ত্রণে পায়ে বা পেটে পানি হলে তার ওষুধ দিতে হয়। রক্তবমি হলে খাদ্যনালি এন্ডোস্কপির মাধ্যমে দেখা ও প্রয়োজনে ওষুধ ও রক্তনালি বন্ধনের প্রয়োজন পড়ে। বিভ্রান্তি বা কোমা হলে হাসপাতালে ভর্তি ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে হবে।

জীবাণু সংক্রমণ হলে খেতে হবে অ্যান্টিবায়োটিক। লিভার ক্যানসার পর্যবেক্ষণের জন্য ছয় মাস পরপর আলট্রাসাউন্ড ও রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে। অতি অগ্রসর ক্ষেত্রে লিভার প্রতিস্থাপনের দরকার হতে পারে।

প্রতিরোধের উপায়

● হেপাটাইটিস বি-এর টিকা নিতে হবে।

● হেপাটাইটিস সি স্ক্রিনিং ও চিকিৎসা।

● ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন হলে ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার। শেভিংয়ের সময় অপরের ব্যবহৃত ব্লেড ব্যবহার না করা।

● নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করা ও সুরক্ষিত যৌন জীবনচর্চা।

● সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা।

● অ্যালকোহল বর্জন ও ওষুধ সেবনে সচেতনতা।

* অধ্যাপক ডা. বিমল চন্দ্র শীল, মেডিসিন, পরিপাকতন্ত্র ও লিভার বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ঢাকা

লিভার সিরোসিস হলে লিভারের কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তন্তুময় টিস্যু দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় এবং নষ্ট হয় লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা
লিভার সিরোসিস হলে লিভারের কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তন্তুময় টিস্যু দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় এবং নষ্ট হয় লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা। ছবি: পেক্সেলস