Tuesday, March 24, 2026

গ্যাঁড়াকলে মধ্যপ্রাচ্য: কী করবে সৌদি ও আরব আমিরাত? by ডন অ্যাভিভ ও স্যাম ওরবি

প্রকাশ ১৬ মার্চ ২০২৬ঃ যে যুদ্ধ ঠেকাতে উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বিপুল বিনিয়োগ করেছিল, শেষ পর্যন্ত সে যুদ্ধই শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্যোগে শুরু হওয়া সংঘাতের অভিঘাত এখন সরাসরি পড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর। প্রতিদিনই তাদের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা চলছে।

গত কয়েক মাসে সুদান ও দক্ষিণ ইয়েমেনের সংঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব কার্যত বিপরীত পক্ষকে সমর্থন করছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইরানের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উপসাগরের দেশগুলো একধরনের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও ক্ষুব্ধ। কারণ, তাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই এই সংঘাত শুরু হয়েছে। সামনে কী ঘটবে, তা নিয়েও রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।

উপসাগরজুড়ে অবকাঠামো ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলা কোনো আকস্মিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৯১ সালের আগে কুয়েত ছিল দ্রুত উত্থানশীল একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র। কিন্তু উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সেই অবস্থান আর পুরোপুরি ফিরে পায়নি দেশটি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে ইরান শুধু জ্বালানিবাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে চায় না, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইছে।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয়টি দেশের সামনে এখন সহজ কোনো পথ নেই। দ্রুত কূটনীতির পথে হাঁটলে এমন এক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ক্ষুব্ধ করার ঝুঁকি রয়েছে, যিনি যুদ্ধে পূর্ণ বিজয় চান। আবার এতে এমন এক শাসনব্যবস্থাকেও বৈধতা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা নজিরবিহীন মাত্রায় জিসিসি দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে। ফলে নিজেদের অঞ্চলেই বড় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা হারানোর হতাশা বাড়ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে।

এই হতাশা থেকেই জল্পনা উঠেছে—সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব বা কাতারও সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রায় প্রতিদিনই, বিশেষ করে ইসরায়েলি সূত্রে এমন দাবি শোনা যাচ্ছে, যদিও তা দ্রুত অস্বীকার করা হচ্ছে। এই জল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরানি হামলা প্রতিহত করে তারা শক্ত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাই কেউ কেউ মনে করেন, আমিরাত চাইলে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হেনে নতুন করে প্রতিরোধের বার্তা দিতে পারে। তবে ঝুঁকি বিবেচনায় দেশটির নেতৃত্ব এখনো সতর্ক।

সৌদি আরব তুলনামূলকভাবে কম হামলার শিকার হয়েছে এবং তথ্য প্রকাশেও সংযত থেকেছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের জিসিসির নেতৃত্বস্থানীয় শক্তি মনে করায় তারা সেই ভূমিকা প্রতিষ্ঠার সুযোগ খুঁজতে পারে। আদর্শ পরিস্থিতিতে তাদের উদ্যোগ কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলতে পারে। কিন্তু সৌদি সামরিক শক্তির ব্যাপ্তি বিবেচনায় বোঝা যায়, কেন ইসরায়েল তাদের এই যুদ্ধে দেখতে আগ্রহী।

যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও আবার মাথাচাড়া দিতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় অংশীদার হতে চায়। ট্রাম্প যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় উপসাগরীয় অংশগ্রহণ চান, তাহলে কোনো কোনো নেতা এটিকে প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবেও দেখতে পারেন। একটি দেশ হামলা শুরু করলে অন্যদের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে এ মুহূর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর অগ্রাধিকার হলো ইরানের হামলা থামানো, বাণিজ্যিক পথ খুলে দেওয়া এবং জ্বালানি উৎপাদন স্বাভাবিক করা। একই সঙ্গে তাদের আশঙ্কা—যদি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এই সংঘাত থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসে, তবে তা আরও সাহসী হয়ে উঠতে পারে এবং পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নিতে পারে।

এ কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব এমন কোনো সমাধানই সমর্থন করবে, যা ভবিষ্যতে ইরানের হামলার ঝুঁকি বাস্তবভাবে কমাবে। কূটনীতি ব্যর্থ হলে তারা এককভাবে বা সম্মিলিতভাবে অন্য বিকল্পও বিবেচনা করতে পারে। নিকট ভবিষ্যতে সবচেয়ে সম্ভাব্য কৌশল হলো ‘কৌশলগত ধৈর্য’। পরিহাসের বিষয়, এই পথ বহুদিন ধরে ইরানই অনুসরণ করেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব যুদ্ধের গতিপথ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং দেখবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোনো সুসংগঠিত কৌশল আছে কি না।

যদি মনে হয় নির্ণায়ক বিজয় কাছাকাছি, তবে তারা আকাশশক্তি বা অন্য সামরিক সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটে যোগ দিতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় গড়ায়, তবে উপসাগরীয় দেশগুলো কূটনৈতিক মধ্যস্থতার পথে এগোবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র মুখ রক্ষা করে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে উপসাগরীয় অঞ্চল একটি স্থিতিশীল বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে যে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছিল, তা ক্ষয়ে যাবে। আবার জিসিসি দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনীতির দিকে ঠেলে দেয়, সেটিও বিপজ্জনক নজির হতে পারে। কারণ, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইরান তখন জিসিসি দেশগুলোতে হামলাকেই হাতিয়ার করতে পারে।

অন্য একটি বিকল্পও রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আংশিকভাবে শিথিল করা। অতীতে উপসাগরীয় দেশগুলো চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে এমন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছে। বেইজিংও বর্তমান সংকট সমাধানে আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে চীনের মূল লক্ষ্য জ্বালানি আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। বড় নিরাপত্তা বিনিয়োগ বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ভূরাজনৈতিক সংঘাতে না গিয়েও সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। ফলে আঞ্চলিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে না পড়া পর্যন্ত চীন তার অবস্থান বদলাবে—এমন সম্ভাবনা কম।

এ মুহূর্তে তাই উপসাগরীয় দেশগুলোর সরাসরি সামরিক আক্রমণ বা দ্রুত শান্তি চুক্তি—দুটোরই সম্ভাবনা সীমিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট কৌশল না থাকলে উপসাগরীয় দেশগুলো ধীরে ধীরে নিজেরাই পরিস্থিতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে।

* ডন অ্যাভিভ, ইন্টারফর ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং * স্যাম ওরবি, একই প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি
আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি ফাইল ছবি: রয়টার্স

নতুন বিশ্বব্যবস্থা: রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন প্রস্তাব’ কি সত্য হতে চলেছে by ওয়েন জোন্স

যুক্তরাষ্ট্রের বোমায় যখন ভেনেজুয়েলার আকাশ জ্বলে উঠছিল, তখন আমরা এক ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের রোগলক্ষণ দেখতে পাচ্ছিলাম। এর মধ্যেই আমরা প্রতাপশালী দেশটির দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছিলাম।

কথাটা শুনতে হয়তো উল্টো মনে হতে পারে। কারণ, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তো তার ক্ষমতাই দেখিয়েছে, দুর্বলতা দেখায়নি। তারা একটি দেশের নেতাকে অপহরণ করেছে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ভেনেজুয়েলা ‘চালাবেন’।

এই দৃশ্য কি নিজ শক্তিতে মাতাল পরাশক্তির ক্ষমতার নেশার আড়ালে থাকা অবক্ষয়কেই প্রকাশ করে না?

ট্রাম্পের বড় গুণ (যদি একে গুণ বলা যায়) তাঁর অকপটতা। আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা নগ্ন স্বার্থকে ‘গণতন্ত্র’ আর ‘মানবাধিকার’-এর মুখরোচক ভাষায় ঢেকে দিতেন। ট্রাম্প সে ভব্যতার মুখোশই পরেন না। ২০২৩ সালে তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, ‘আমি যখন ক্ষমতা ছাড়ি, ভেনেজুয়েলা তখন ভাঙনের মুখে ছিল। আমরা যদি তখন ওটা দখল করে নিতাম, তাহলে একদম পাশের বাড়িতেই দরকারি সব তেল পেতাম।’

এটি ট্রাম্পের হঠাৎ বলে ফেলা কোনো কথা নয়। তেল দখলের যুক্তি ট্রাম্পের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রেই স্পষ্টভাবে লেখা আছে। কৌশলপত্রের সেই নথি ওয়াশিংটনে দীর্ঘদিন অস্বীকার করা যে সত্যকে মেনে নেয়, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের অবসান হয়েছে।

কৌশলপত্রে বিদ্রূপের সুরে বলা হয়েছে, শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির শীর্ষ মহল নিজেদের বোঝাতে শুরু করেছিল, সারা পৃথিবীর ওপর স্থায়ী মার্কিন আধিপত্যই দেশের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে। কিন্তু এখন তারা স্বীকার করছে, গ্রিক পুরাণের দেবতা অ্যাটলাসের মতো গোটা বিশ্বকে কাঁধে তুলে রাখার দিন যুক্তরাষ্ট্রের শেষ হয়ে গেছে। বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে যুগ ছিল, তার ইতি টানার ঘোষণাই কৌশলপত্রে দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যমান ব্যবস্থার জায়গায় আসছে এমন এক বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে একাধিক শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের মতো করে আলাদা আলাদা এলাকা দখলে রাখবে এবং প্রভাব খাটাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই এলাকা হবে পুরো আমেরিকা মহাদেশ।

কৌশলপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বহুদিন অবহেলার পর যুক্তরাষ্ট্র আবার পশ্চিম গোলার্ধে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং সে জন্য তারা মনরো নীতিকে (প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষিত একটি নীতি, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ রোধ করার কথা বলা আছে) নতুন করে কার্যকর করবে।

মনরো নীতি উনিশ শতকের শুরুতে তৈরি হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, ইউরোপ যেন আমেরিকা মহাদেশে উপনিবেশ না গড়ে। কিন্তু বাস্তবে এই নীতির ফল হয়েছে ভিন্ন। এর মাধ্যমে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

ওয়াশিংটনের সহায়তায় লাতিন আমেরিকায় সহিংসতা নতুন কিছু নয়। আমার মা–বাবা চিলির ডানপন্থী স্বৈরতন্ত্র থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের পরই ডানপন্থী স্বৈরশাসক ক্ষমতায় বসেন।

তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘নিজেদের মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে কোনো দেশ কমিউনিস্ট হয়ে যাচ্ছে—এটা আমরা বসে বসে দেখব কেন?’ এই একই যুক্তি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া এবং মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয়জুড়ে হত্যাযজ্ঞ চালানো শাসনগুলোর প্রতি মার্কিন সমর্থনের ভিত্তি ছিল।

তবে গত তিন দশকে সেই আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তথাকথিত ‘পিঙ্ক টাইড’—ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভার নেতৃত্বে প্রগতিশীল সরকারগুলো আঞ্চলিক স্বাধীনতা জোরদার করতে চেয়েছিল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন এ সময়ে মহাদেশজুড়ে তার শক্তি বাড়িয়েছে।

এ অবস্থাকে উল্টিয়ে দেওয়ার চেষ্টার প্রথম চালই ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি আসলে কথার মানুষ—বেশি চেঁচামেচি করেন, কিন্তু কাজের বেলায় তেমন কিছু করেন না। বাস্তবে তখন তিনি রিপাবলিকান দলের পুরোনো ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর সঙ্গে একধরনের অঘোষিত সমঝোতায় ছিলেন।

শর্তটা ছিল: তিনি অভিজাতদের ওপর থেকে কর কমাবেন, বড় ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবেন; আর এর বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইচ্ছেমতো উত্তেজক কথা বলবেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর মার্কিন অভিজাতরা নিজেদের সামরিক অজেয়তা আর অর্থনৈতিক মডেলকে মানব উন্নয়নের চূড়ান্ত গন্তব্য ভেবে নিয়েছিলেন। সেই অহংকারই সরাসরি বিশ্বকে ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ার বিপর্যয়ে এবং ২০০৮ সালের আর্থিক ধসে নিয়ে যায়। তাঁরা নিজেদের মানুষকে স্বর্গীয় স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তারপর একের পর এক দুর্যোগে টেনে নিয়েছেন। সেই হতাশা থেকেই জন্ম নেয় ট্রাম্পবাদ।

যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয় সবার সামনে আসে, তা থেকেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারণাটি আসে। আর এ ধারণার মূল সুর হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক আধিপত্য ছেড়ে গোলার্ধভিত্তিক সাম্রাজ্য কায়েম করতে হবে।

উনিশ শতকের শেষে যুক্তরাষ্ট্র যখন স্পেনকে হারিয়ে ফিলিপাইন দখল করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই অনেকে এর বিরোধিতা করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী নাগরিকেরা মিলে গড়েছিলেন ‘আমেরিকান অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট লীগ’। তাঁদের কথা ছিল পরিষ্কার—সাম্রাজ্যবাদ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যায় এবং দেশকে ধীরে ধীরে সামরিক শাসনের দিকে ঠেলে দেয়।

কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে সেই সমঝোতা আর নেই। এবারকার ট্রাম্প আর শুধু কথায় সীমাবদ্ধ নন, তিনি পূর্ণ শক্তিতে একটি চরম ডানপন্থী শাসন কায়েম করতে চাইছেন।

এ কারণে ট্রাম্প যখন কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টদের হুমকি দেন, তখন তা বিশ্বাস করুন। যখন তিনি বলেন, ‘কিউবা ধসে পড়ার মুখে’, তখন তাঁর কথা বিশ্বাস করুন। তিনি যখন বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড অবশ্যই আমাদের দরকার’—বিশ্বাস করুন। এটাও বিশ্বাস করুন, ইউরোপের ২০ লাখের বেশি বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড দখলের ইচ্ছা তিনি সত্যিই পোষণ করেন।

যদি বা যখন গ্রিনল্যান্ড ট্রাম্পীয় সাম্রাজ্যের মুঠোয় যায়, তখন কী হবে? ভেনেজুয়েলার ওপর তাঁর প্রকাশ্য বেআইনি হামলায় ইউরোপ যে মিনমিনে দুর্বল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তিনি নিশ্চয়ই তা লক্ষ করেছেন। এখন ডেনমার্কের সার্বভৌম ভূখণ্ড দখল হলে যৌথ প্রতিরক্ষার নীতিতে গড়ে ওঠা ন্যাটোর অবসান অনিবার্য হয়ে উঠবে। আন্দাজ করা যায়, রাশিয়া যেভাবে প্রকাশ্যে ইউক্রেনের জমি কেড়ে নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও একইভাবে ডেনমার্কের জমি চুরি করবে। এর বিরুদ্ধে লন্ডন, প্যারিস বা বার্লিন থেকে মৃদু আওয়াজ হয়তো উঠবে। কিন্তু ততক্ষণে পশ্চিমা জোট শেষ।

এর কিছুদিন পর বিশ শতকের শুরুতে ডেমোক্রেটিক পার্টিও সতর্ক করে বলেছিল—কোনো দেশ একসঙ্গে অর্ধেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আর অর্ধেক সাম্রাজ্য হয়ে টিকে থাকতে পারে না। বিদেশে সাম্রাজ্য গড়তে গেলে শেষ পর্যন্ত দেশের ভেতরেও স্বৈরতন্ত্র ঢুকে পড়ে।

আজ এসব পুরোনো সতর্কবাণীকে আর অতিরঞ্জন বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ, বাইরে অন্য দেশগুলোর ওপর যা করা হয়, তার প্রভাব দেশের ভেতরেও পড়ে। মার্তিনিকের লেখক এমে সেজেয়ার একে বলেছেন সাম্রাজ্যের ‘বুমেরাং’। তাঁর মতে, উপনিবেশবাদ বাইরে গিয়ে যা সৃষ্টি করে, তা একসময় ঘুরে এসে নিজের দেশকেই আঘাত করে। ইউরোপে যেমন উপনিবেশবাদ শেষে ফ্যাসিবাদ ফিরে এসেছিল।

আমরাও দেখেছি ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর বুমেরাং। বিদেশে যুদ্ধের ভাষা ও যুক্তি এখন দেশের ভেতরে দমননীতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ট্রাম্পের উপপ্রধান স্টাফ স্টিফেন মিলার পর্যন্ত বলেছেন, ডেমোক্রেটিক পার্টি নাকি একটি ‘ঘরোয়া চরমপন্থী সংগঠন’। আফগানিস্তান বা ইরাকে একসময় যেভাবে সেনা পাঠানো হয়েছিল, ডেমোক্র্যাট–শাসিত শহরগুলোতে সেভাবেই ন্যাশনাল গার্ড নামানো হচ্ছে, যেন সেগুলো শত্রু এলাকা।

এই দৃষ্টিতে দেখলে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিষয়ে ট্রাম্পের নরম মনোভাবও আর রহস্যজনক থাকে না। ২০১৯ সালে শোনা গিয়েছিল, রাশিয়া প্রস্তাব দিয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেন থেকে সরে আসে, তাহলে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন প্রভাব মেনে নেওয়া হবে। এমন কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা অবশ্য জানা নেই।

কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে। সেখানে ক্ষমতাধর, কর্তৃত্ববাদী দেশগুলো জোর খাঁটিয়ে প্রতিবেশীদের নিয়ন্ত্রণ করবে এবং তাদের সম্পদ দখল করবে, যা একসময় কল্পনার দুঃস্বপ্ন মনে হতো, আজ তা বাস্তব হয়ে চোখের সামনে ঘটছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো—এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো উপায়, ইচ্ছা আর শক্তি কি আমাদের আছে?

* ওয়েন জোন্স, গার্ডিয়ানের কলাম লেখক।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
[৭ জানুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা সংক্ষিপ্তাকারে ট্রাম্প নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ছেন, ভেনেজুয়েলা দিয়ে শুরু—এ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-07%2Fwqwv59a4%2Ftrumpmaduroputin.jpeg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ডোনাল্ড ট্রাম্প, বন্দী নিকোলা মাদুরো ও ভ্লাদিমির পুতিন। কোলাজ: প্রথম আলো

ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন সৌদি যুবরাজ

ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি যুবরাজ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুক্তি দিচ্ছেন, মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠনের এক ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ সুযোগ এনে দিয়েছে।

গত সপ্তাহে বেশ কয়েকবার ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে সৌদি যুবরাজের। এসব ফোনালাপ বিষয়ে জানেন—এমন সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস এ কথা জানিয়েছে। সৌদি যুবরাজ যুক্তি দিয়েছেন, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী হুমকির মুখে রেখেছে, যা ইরান সরকারকে নির্মূল করার মাধ্যমে দূর করা যেতে পারে।

তবে সৌদি কর্মকর্তারা যুবরাজের এমন অবস্থানের কথা অস্বীকার করেছেন।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-05-13%2Fcy3aaxna%2FTrump-speaks-with-Saudi-Arabias.png?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ফাইল ছবি: রয়টার্স


যৌনতার দ্বীপে অভিজাতদের ক্ষমতা–চরিত্রের নগ্ন চেহারা by প্রতাপ ভানু মেহতা

এপস্টেইন কেলেঙ্কারির ভয়াবহতায় একটি দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা সম্ভবত কাকতালীয় কিছু নয়। এই কেলেঙ্কারি এখন আমেরিকার অভিজাত শ্রেণির বিস্তৃত অংশকে জড়িয়ে ফেলেছে। এটি আধুনিকতার একটি কল্পনা ও তার অন্যতম নৃশংস নৈতিক বিভীষিকাকে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।

ইতিহাসে নানা সময়ে দ্বীপকে কল্পনা করা হয়েছে এমন এক জায়গা হিসেবে, যেখানে আধুনিক সমাজ নিজের সবচেয়ে বিপজ্জনক কল্পনাগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারে।

আলোকপ্রাপ্ত যুগে ধারণা ছিল—দ্বীপ মানে মূল সমাজের বাইরে থাকা একটি নিরাপদ এলাকা। সেখানে নৈতিক নিয়ম, সামাজিক শালীনতা বা যৌন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে রাখা যায়। মানুষ ইচ্ছেমতো ভোগে মেতে উঠতে পারে, কিন্তু তাতে মূল সমাজের নৈতিক কাঠামো নষ্ট হবে না। কারণ, সবকিছুই ঘটছে ‘ব্যতিক্রমী’ এক জায়গায়, ‘অফশোরে’, মানে সমুদ্রের ওপারে।

এই একই যুক্তি পরে শুধু যৌনতার ক্ষেত্রে নয়, আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো হয়েছে। ‘অফশোরিং’ মানে হলো অপরাধ বা অনৈতিক কাজকে এমন জায়গায় সরিয়ে নেওয়া, যেখানে মনে হয় তা মূল ব্যবস্থাকে স্পর্শ করছে না। যেন কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং বা আর্থিক প্রতারণা কোথাও দূরে ঘটছে, তাই পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষতি হচ্ছে না।

এভাবে অপরাধ, যৌন সহিংসতা, লাগামছাড়া ভোগ আর আর্থিক বিশ্বাসঘাতকতাকে ‘সমুদ্রের ওপারে’ পাঠানো একদিকে ভয়ংকর, আবার অন্যদিকে ক্ষমতাবানদের মনে একধরনের স্বস্তিও দেয়। তাঁদের মনে হয়, সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে না। কারণ, তা নাকি কেন্দ্রের ভেতরে নয়। কিন্তু এই স্বস্তিই আসলে এক মারাত্মক ভ্রান্তি।

আর্থিক অপরাধকে ‘অফশোরে’ সরিয়ে দিলে তা ছোট বা প্রান্তিক হয়ে যায়, এটা সত্য নয়। বরং এসব অফশোর ব্যবস্থা মূল আর্থিক কেন্দ্রের অপরাধকে আরও বড়, আরও শক্তিশালী করে তোলে। অর্থাৎ অপরাধ দূরে সরে যায় না, উল্টো কেন্দ্রের ভেতরেই তার প্রভাব বাড়ে।

একই ভুল ধারণা ছিল অভিজাতদের মনেও। তাঁরা ভেবেছিলেন, মূল সমাজকে নষ্ট না করেই তাঁরা গোপনে তাঁদের সবচেয়ে বিকৃত ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারবেন। কিন্তু জেফ্রি এপস্টেইনের আশপাশে যাঁরা ঘুরেছেন, তাঁরা কোনো স্বাধীনচেতা বিদ্রোহী ছিলেন না। তাঁরা সামাজিক নিয়ম ভাঙার সাহসী আন্দোলনও করছিলেন না।

আসলে তাঁরা আধুনিকতার এক অন্ধকার দিক বাস্তবে প্রয়োগ করছিলেন। এখানে কল্পনাই হয়ে উঠেছে অশ্লীল পণ্যে ভরা। মানুষকে, বিশেষ করে দেহকে, ব্যবহার করা হয়েছে কেনাবেচার জিনিস হিসেবে। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মানুষ নিজেকে পর্যন্ত অপমান করতে প্রস্তুত হয়েছে।

এই অভিজাত শ্রেণির ভেতরে একই সঙ্গে আছে ভয়ংকর দায়মুক্তির অনুভূতি বা আইনের ঊর্ধ্বে থাকার আত্মবিশ্বাস এবং মানসিকভাবে অপরিণত আচরণ। এখানে ক্ষমতা আছে, কিন্তু সংযম নেই; প্রভাব আছে, কিন্তু নৈতিকতা নেই।

এপস্টেইন ফাইল নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। সব নথি কি সত্যিই প্রকাশিত হয়েছে? ভুক্তভোগীদের অধিকার কি সুরক্ষিত হবে? ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টি—উভয় দলই যখন জড়িত, তখন কার লাভ হবে? এই নথিগুলো আমেরিকার কিছু অভিজাত মানুষের এক নির্মম ‘এক্স-রে’ তুলে ধরে।

যে মানুষগুলো মানসিকভাবে অপরিণত, ভেতরে ভঙ্গুর, কিন্তু বাইরে অসম্ভব ক্ষমতাবান—তাঁরা আসলে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

আসল রহস্য হলো, জেফ্রি এপস্টেইন কীভাবে নিজেকে এমন জায়গায় বসাতে পারলেন, যেখানে বিশ্বরাজনীতির বড় বড় শক্তির পথও যেন তাঁর মধ্য দিয়েই যেত। কেন রাষ্ট্র, ধনকুবের আর ক্ষমতাশালীরা ভাবলেন—এই লোককে ছাড়া কাজ চলবে না?

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঝগড়া হলেও একটা ব্যাপারে তারা প্রায় একমত—এই কেলেঙ্কারিকে ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে দেখাতে হবে। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, এটা কিছু ব্যক্তির বিচ্যুতি, পুরো শাসকশ্রেণির স্বাভাবিক চেহারা নয়। ঠিক যেমন আগে দ্বীপ বা উপনিবেশকে এমন জায়গা ভাবা হতো, যেখানে অভিজাতরা ইচ্ছেমতো নিয়ম ভাঙতে পারে, কিন্তু মূল সমাজ নাকি অক্ষত থাকে। এখানে একই কৌশল চলছে—অভিজাতদের অনৈতিক আচরণকে আলাদা করে দেখানো, যেন কেন্দ্রের নৈতিক ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে না পড়ে।

এখানে আধুনিক রাজনীতির এক গভীর অসুখ ধরা পড়ে। আজ ক্ষমতা আর নৈতিকতা বা ব্যক্তিগত গুণের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। ক্ষমতা টিকে থাকে অস্বচ্ছতা, নির্লজ্জ আচরণ, আইনের জটিল ভাষা, প্রচারণা আর নানা প্রক্রিয়াগত চালাকির ওপর। ভয়াবহ অপরাধ চোখের সামনে থাকলেও সেগুলো নিয়ে কথা না বলে শক্তি খরচ হয় আইনি ফাঁকফোকর আর শব্দের খেলায়।

আধুনিকতাকে এক পুরোনো ভয় এখনো তাড়া করে। এ মুহূর্ত সবচেয়ে ভালো বুঝিয়েছিলেন প্রাচীন রোমান ইতিহাসবিদেরা—ট্যাসিটাস, স্যালাস্ট ও লিভি। তাঁরা বলেছিলেন, ক্ষমতার কেন্দ্রে যখন যৌন অবক্ষয় আর সহিংসতা ঢুকে পড়ে, তখন তা রাজনৈতিক পতনের লক্ষণ হয়ে ওঠে। আমরা ‘আধুনিক’রা অবশ্য নিজেদের আলাদা মনে করি।

আমরা বলি, ব্যক্তিগত জীবন আর রাষ্ট্রীয় কাজ আলাদা। আমাদের কাছে দুর্নীতি মানে নৈতিক পতন নয়, বরং প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করছে কি না, সেই প্রশ্ন।
কিন্তু জে জি এ পোকক মনে করিয়ে দেন একটি বড় দ্বন্দ্বের কথা। আমরা প্রকাশ্যে বলি, যৌন অবক্ষয় সমাজ ভাঙার কারণ নয়; আসল কারণ অর্থনীতি বা রাজনীতি। তবু আমরা ‘গুণ’ বা নৈতিকতার ভাষা পুরোপুরি ছাড়তে পারি না। কারণ, মনে মনে একটা সন্দেহ থেকেই যায়—যদি এসব অবক্ষয় সরাসরি কারণ না–ও হয়, তবু এগুলো ক্ষমতার ভেতরের সত্যটা প্রকাশ করে দেয়।

নিশ্চয়ই এপস্টেইন ফাইলের ভেতরে নানা স্তর আছে, যেগুলো আলাদা করে বুঝতে হবে। কেউ আইনগতভাবে অপরাধ করেছে। কেউ নৈতিকভাবে জঘন্য কাজে জড়িয়েছে। আবার কেউ ব্যক্তিগতভাবে দোষী না হলেও এমন এক ক্ষমতা ও জ্ঞানের কাঠামোকে সমর্থন করেছে, যা লজ্জাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে।

এপস্টেইন ফাইল ব্যক্তিগত অপরাধ বা নির্দোষিতার প্রশ্ন নয়। এটি সমষ্টিগত ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে। আর যখন সেই সমষ্টিগত ক্ষমতা যৌন, আর্থিক, আইনি, রাজনৈতিক, এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকেও লজ্জা ও দায়মুক্তির সঙ্গে সারিবদ্ধ করে, তখন প্রশ্ন জাগে—রোমান ইতিহাসবিদেরা কি ঠিকই কিছু দেখেছিলেন? তাঁরা ভেবেছিলেন, সাম্রাজ্য ভাঙে তখনই, যখন অভিজাতেরা কোনো ক্ষেত্রেই আর আত্মসংযম রাখতে পারেন না।

রোমানরা যে সংকটের কথা জানত, সেটাই আজকের সংকট। এ ধরনের অভিজাতদের আর কোনো নৈতিক কর্তৃত্ব অবশিষ্ট থাকে না। ক্ষমতায় থেকেও তাঁরা ভীত। নিজেদের কুকর্ম ঢাকতে তাঁরা আরও কী ধরনের সহিংসতায় যেতে পারেন, তা কে জানে।

* প্রতাপ ভানু মেহতা, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-31%2Fuxh4nrtc%2FThumn-02.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
(ওপরে বাঁ থেকে ডানে) ডোনাল্ড ট্রাম্প, জেফরি এপস্টেইন, (নিচে বাঁ থেকে ডানে) ইলন মাস্ক, বিল গেটস। ফাইল ছবি: রয়টার্স

‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হতে চেয়ে কেন যুদ্ধের পথে হাঁটলেন ট্রাম্প

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার বিকেলে (যুক্তরাষ্ট্রের সময়) যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন তিনি এয়ারফোর্স ওয়ানে। উড়োজাহাজটি টেক্সাসের কর্পাস ক্রিস্টি শহরের দিকে যাচ্ছিল।

ওই বন্দরনগরীতে ‘যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি আধিপত্য’ শীর্ষক একটি বক্তৃতা দিতে যাচ্ছিলেন ট্রাম্প। প্রায় তিন ঘণ্টার সেই ফ্লাইটে তিনি টেক্সাসের রিপাবলিকান রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা করেন, ইরান নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এ রাজনীতিবিদদের মধ্যে কট্টরপন্থী দুই সিনেটর জন করনিন ও টেড ক্রুজও ছিলেন।

অপারেশন এপিক ফিউরির (ইরানে অভিযান) প্রস্তুতির সময় প্রেসিডেন্টের ওই উড়োজাহাজে আরও একজন ছিলেন। তিনি হলেন প্রবীণ চলচ্চিত্র তারকা ডেনিস কোয়েড।

ফ্লাইটের একপর্যায়ে টেড ক্রুজ একটি ভিডিও ধারণ করেন। সেখানে দেখা যায়, কোয়েড মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশে বসে আছেন। ক্রুজ ওই অভিনেতাকে অনুরোধ করেন, যেন তিনি ২০২৪ সালে যেভাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগ্যানের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, তা যেন এখন সেখানে করে দেখান। ক্রুজ ওই মুহূর্তকে ‘দুই মহান মার্কিন প্রেসিডেন্টের’ সাক্ষাতের মতো করে দেখাতে চাইছিলেন।

কোয়েড তখন রোনাল্ড রেগ্যান চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন; বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প আমার মতোই শক্তিশালী।’ এটি ছিল রিপাবলিকান কট্টরপন্থীদের প্রতীকী নেতা রেগ্যান থেকে তাঁদের বর্তমান নায়ক ট্রাম্পের কাছে ক্ষমতা ও ভাবমূর্তির নাটকীয় হস্তান্তর।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কোয়েড ২০০৬ সালে ‘আমেরিকান ড্রিমজ’ চলচ্চিত্রে জর্জ ডব্লিউ বুশের একটি ব্যাঙ্গাত্মক চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। সেখানে তাঁকে দেখানো হয় এক অজ্ঞ, সরল ধাঁচের প্রেসিডেন্ট হিসেবে, যাঁকে যুদ্ধপ্রবণ ও তেললোভী উপদেষ্টারা ইরাকে আক্রমণ করতে প্ররোচিত করেছিলেন।

গত সপ্তাহের ঘটনাগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে জর্জ ডব্লিউ বুশের কর্মকাণ্ডেরই ছায়া দেখা গেছে, যদিও এ ধরনের তুলনাগুলোকে হোয়াইট হাউস স্বীকার করেনি বা ক্ষোভের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারে নিজেকে এমন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন যে তিনি বুশের শুরু করা আফগানিস্তান, ইরাক ও অন্যান্য স্থানের ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ থামাবেন। তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন গড়েই উঠেছিল বিদেশে হস্তক্ষেপবিরোধী মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে। ২০২৫ সালের বেশির ভাগ সময় ট্রাম্প নিজেই নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

সেই ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ যুদ্ধে জড়ালেন কয়েক মাসের মধ্যে। ট্রাম্প হলেন বুশের পর প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি একটি প্রতিপক্ষ দেশের শাসকগোষ্ঠীকে পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন।

অপারেশন এপিক ফিউরি অভিযানের আগে ট্রাম্পের মনোভাবে এই পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন কারণ আছে। এর মধ্যে ছিল বিদেশি শক্তিশালী নেতাদের কথায় ট্রাম্পের সহজে প্রভাবিত হওয়া, সমস্যা থেকে মনোযোগ সরাতে নাটকীয়তা তৈরি করার সক্ষমতা, একরোখা প্রতিপক্ষ।

ট্রাম্প আসলে আংশিকভাবে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বজায় রেখেছিলেন। তিনি মূলত বিপুলসংখ্যক স্থল সেনা মোতায়েন করে বড় আকারে স্থলযুদ্ধের বিপক্ষে ছিলেন। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদ চলাকালে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করে ইরানের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়েছিলেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে গত জুনে ইরানে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামের অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালানো হয়।

দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প যেন নিজের হাতে থাকা বিশাল সামরিক শক্তি নিয়ে নেশায় মেতেছেন।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল গত ৩ জানুয়ারি। গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। তবে ওই অভিযানে কোনো মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়নি।

অভিযানটি ব্যর্থও হতে পারত। কারণ, বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা যেসব হেলিকপ্টারে করে ভেনেজুয়েলায় গিয়েছিলেন, তার একটির পাইলটের শরীরের নিচের অংশে কয়েকবার গুলি লেগেছিল। তবে তিনি হেলিকপ্টারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। যদি হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হতো, তাহলে এতে থাকা সব আরোহী হয়তো মারা যেতেন। তখন হয়তো অভিযান বাতিল হতো এবং ট্রাম্প হয়তো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইচ্ছা হারাতেন।

মাদুরোকে অপহরণ করার ঘটনাটি ট্রাম্পের কাছে টিভি সিরিজের মতো নাটকীয় ছিল। এটিকে এক বীরত্বগাথা হিসেবে দেখা হলো। এ ঘটনায় অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মনোযোগ গেল সরে। বিশেষ করে, প্রয়াত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যে চাপ ছিল, তা থেকে মানুষের মনোযোগ ঘুরে গেল। নথিগুলোতে ৩৮ হাজার বা তারও বেশিবার ট্রাম্পের নাম এসেছে; যদিও তিনি বারবারই নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে আসছেন।

অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে বিদেশে সামরিক অভিযান চালানো হলেও তা শুধু পারমাণবিক বা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করার লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। তবে এটাই ট্রাম্পের জন্য একটি বিশাল ঝুঁকি হিসেবে থেকে গেল।

যুদ্ধ কখন শুরু হবে, তা কেবল প্রেসিডেন্টই ঠিক করতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা অন্যরাও নির্ধারণ করতে পারবে। বিশেষ করে এখন যুদ্ধ শেষ হওয়া না হওয়ার বিষয়টি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ওপরও নির্ভর করছে।

ইরানে শাসক পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত এ যুদ্ধে ট্রাম্পকে যুক্ত করতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহু ডিসেম্বরের শেষের দিকে যখন মার–এ–লাগোতে ট্রাম্পের কাছে গিয়েছিলেন, তখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে আরও বেশি করে ইসরায়েলি হামলা চালানোর অনুমতি চান। ট্রাম্প তাতে সমর্থন দেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই সমর্থনের পরিসর বেড়ে তা ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের জন্য একটি যৌথ হামলার প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়।

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার অভিযান সফল হওয়ার বিষয়টি ট্রাম্পের সামরিক আকাঙ্ক্ষা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। অর্থনৈতিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে ইরানে যখন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, ট্রাম্প তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন যে ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে চড়া মূল্য দিতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘সহায়তা আসছে’। তখনো ট্রাম্প আসলে এমন প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পূরণ করার অবস্থায় ছিলেন না।

ওই সময় ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরি ছিল না, সেখানে যুদ্ধবিমানের সংখ্যা সীমিত ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা প্রায় ৪০ হাজার সেনা যেসব ঘাঁটিতে রয়েছে, সেগুলোও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মতো অবস্থায় ছিল না।

বিক্ষোভের মাত্রা ও তীব্রতা ইরানের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ধারণা বদলে দেয়। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ইরানের শাসকগোষ্ঠী পতনের দিকে যেতে পারে, এমনও হতে পারে যে এতে ইরানের ক্ষমতা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের জেনারেলদের হাতে চলে যেতে পারে এবং আয়াতুল্লাহদের প্রভাব কমে যেতে পারে। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করেছিল যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত আরও বাস্তবমুখী হবে এবং দরকার হলে কোনো চুক্তিতেও যেতে ইচ্ছুক হবে।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্পকে একাধিকবার ফোন করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছেন। যদিও তিনি প্রকাশ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে ছিলেন।

ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেন। তখন ইরানে শাসনগোষ্ঠীর পরিবর্তনের ধারণাটি সবচেয়ে জুতসই বিকল্প হয়ে উঠল। ইতিমধ্যে কিছু সপ্তাহ ধরে যৌথ পরিকল্পনা চলছিল। দ্বিতীয় মার্কিন রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে পৌঁছার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরও কিছু সময় লাগল।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করতেন যে তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি–সংক্রান্ত হুমকির কূটনৈতিক সমাধান চাইছেন। যদিও ট্রাম্প বলছিলেন যে সেই হুমকি তিনি আগে ‘শেষ’ করে ফেললেও তা আবার গড়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার ফেব্রুয়ারি মাসে তিনবার ইরানের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে দুই পক্ষের প্রাথমিক অবস্থানের ফারাক এতটাই বড় ছিল যে ব্যবধান ঘুচিয়ে আনা সম্ভব ছিল না।

২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় চূড়ান্ত বৈঠকে ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের কর্মকর্তারা তেহরানের নজিরবিহীন ছাড়গুলোর দিকে ইঙ্গিত করেন। যেমন উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দেওয়া। তবে ট্রাম্প চাইছিলেন আরও বেশি কিছু। যেমন তিনি চাইছিলেন যে ইরানের ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধকরণ স্থায়ীভাবে বন্ধ হোক এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ হোক। উইটকফ ফক্স নিউজকে বলেন, তারা কেন তা মেনে নেয়নি, তা প্রেসিডেন্ট বুঝতে পারছিলেন না।

গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার জেনেভায় যখন প্রতিনিধিদলগুলো মিলিত হয়, তত দিনে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে বড় আকারে সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছিল। বুশের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের ২৩ বছর পর এটি ছিল সবচেয়ে বড় আকারের মোতায়েন। শত্রুপক্ষকে শর্ত মেনে নিতে রাজি করানো ছাড়াই যদি কূটনৈতিক সমাধান করা হতো, তবে তা দুর্বলতা বলে গণ্য হতে পারত।

কিছু কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত ২৫ ফেব্রুয়ারি হামলা চালানোর কথা ছিল। তবে জেনেভায় পরবর্তী দিনের বৈঠকের জন্য তা স্থগিত করা হয়। একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা আরও পেছানো হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রীয় কম্পাউন্ডে থাকবেন। তাঁর সঙ্গে থাকবেন প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।

ট্রাম্প এয়ারফোর্স ওয়ানে বসে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বেলা ৩টা ৩৮ মিনিটের দিকে হামলা শুরু করার নির্দেশ দেন। আদেশে লেখা ছিল, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি অনুমোদনপ্রাপ্ত। এটা বাতিল হবে না। শুভকামনা।’

২০ মিনিটের কম সময়ের মধ্যে ট্রাম্প কর্পাস ক্রিস্টিতে অবতরণ করেন। হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে এখন বলতে চাই না। আপনারা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংবাদ পেতে পারেন।’

কর্পাস ক্রিস্টিতে ভাষণের পর প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সফরসঙ্গীরা মার–এ–লাগোতে চলে যান।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ততক্ষণে সিআইএর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ ও জেনারেল ড্যান কেইন (যিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোর যৌথ কমান্ডের প্রধান) ততক্ষণে পাম বিচে পূর্বঘোষণা ছাড়াই অবতরণ করেছিলেন। ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য মার–এ–লাগোতে অস্থায়ীভাবে তৈরি করা একটি পর্যবেক্ষণকক্ষে ছিলেন তাঁরা। সেই একই জায়গায় বসে ট্রাম্প গত মাসে মাদুরো আটকের অভিযানের দৃশ্য দেখেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে সিরিয়ার ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিলেন। তখন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের রিসোর্টে ছিলেন। চকলেট কেক খাচ্ছিলেন তাঁরা। ট্রাম্পের ভাষায়, সেটি ছিল সবচেয়ে ‘সুন্দর চকলেট কেক’। সে কারণে অনেকে মার–এ–লাগোকে ‘ওয়ার–এ–লাগো’ বলে ডাকতে শুরু করেছিলেন।

গত শুক্রবার ফ্লোরিডায় সূর্যাস্তের সময় দাতব্য তহবিল সংগ্রহের একটি অনুষ্ঠানে অতিথিরা নাচছিলেন। গাঢ় স্যুট ও ‘ইউএসএ’ লেখা সাদা টুপি পরে সেখানে হাজির হন ট্রাম্প।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের কারণে তিনি ব্যস্ত, তাই নির্ধারিত দাতব্য নিলাম বাতিল হতে পারে। ট্রাম্প সেখানে উপস্থিত থাকা মানুষদের উদ্দেশে বলেন, ‘ভালো সময় কাটান। আমাকে কাজ করতে হবে।’

এরপর ট্রাম্প নিরাপত্তার স্তর পেরিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকক্ষে ঢোকেন।

হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমের সঙ্গে এ কক্ষের একটি ভিডিও সংযোগ তৈরি করা হয়েছিল। হোয়াইট হাউসের কক্ষটিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড উপস্থিত ছিলেন। এ দুজন দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশে যুদ্ধ পরিচালনা ও শাসকগোষ্ঠীকে পরিবর্তনের চেষ্টার বিরোধী অবস্থানে ছিলেন। তবে যুদ্ধে তাঁদের সম্মতি জানাতে দেখা গেছে।

ফ্লোরিডার সময় অনুযায়ী, রাত ১টা ১৫ মিনিটে অভিযান শুরু হয়। ইরানের সময় অনুযায়ী, অভিযান শুরু হয় শনিবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে। খামেনি ইতিমধ্যেই তাঁর মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন এবং তেহরান ছাড়েননি। তিনি আত্মসমর্পণ না করে জীবন দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে তিনি সম্ভবত সেদিন সকালে হামলা হবে বলে ধারণা করেননি। ইরানি শাসকগোষ্ঠী ভেবেছিল, হামলা হবে রাতের কোনো সময়।

প্রাথমিকভাবে হামলায় ১০০টির বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং সমুদ্র থেকে ছোড়া টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।

ট্রাম্প এই বিশাল হামলাকে ইরানি জনগণের জন্য ৪৭ বছরের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘সময় এখন আপনাদের। সম্ভবত এটি আপনাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের একমাত্র সুযোগ।’

পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের কথা কমিয়ে এনেছে। কিন্তু ট্রাম্প এখনো যুদ্ধ চালাতে অবিচল। তাঁর দাবি, তাঁর কাছে প্রায় অফুরান অস্ত্রভান্ডার আছে। তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ চিরকাল চালানো যেতে পারে এবং অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গেই তা করা যাবে।’

এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট, চিরকালের যুদ্ধের পথ থেকে সরে এসে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হতে চাওয়া ট্রাম্প আবারও চিরকালীন যুদ্ধের পথেই ফিরেছেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-08%2Fbbr2y995%2FTrump-2.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক অভিযানের সময় মার-এ-লাগো রিসোর্টে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধ : পানি কি হয়ে উঠেছে যুদ্ধের অস্ত্র? by নিক এরিকসন

প্রাকৃতিক সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে সংঘাতের মতো দুঃস্বপ্নের কাহিনি সিনেমায় বা গল্পে পড়ি আমরা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের যুদ্ধ যতই নিবিড় হচ্ছে, ততই যেন ওই গল্প বা সিনেমার দৃশ্যগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে রূঢ় বাস্তবটা।

এই যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল তেলকে কেন্দ্র করে। এই অঞ্চলে বহু দিন ধরে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের কারণ হয়ে থেকেছে ওই তেল।

তবে এখন যুদ্ধের পরিধি যত বিস্তৃত হচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও জড়িত হয়ে পড়ছে, এরকম পরিস্থিতিতে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, আরেকটি নাজুক প্রাকৃতিক সম্পদও সংঘাতের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তা হলো জল বা পানি।

বিশ্বের মাত্র ২% মিষ্টি পানির সরবরাহ রয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে। তাই সমুদ্রের পানিকে লবণ-মুক্ত করার ওপরেই এই অঞ্চলকে খুব বেশি নির্ভর করতে হয়। জ্বালানি তেল শিল্প ১৯৫০ সালের পর থেকে যত এগিয়ে গেছে, তার সঙ্গেই চাপ পড়েছে মিষ্টি পানির সীমিত সরবরাহের ওপরে।

ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস্ জানাচ্ছে, কুয়েতের ৯০% পানি আসে লবণ-মুক্ত করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ওমানে ৮৬%, সৌদি আরবে ৭০% আর সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪২% মিষ্টি পানিই ওই প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে আসে।

ওমানের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট, ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার সায়েন্সের ড. উইল লা কেন বিবিসির নিউজডে অনুষ্ঠানে বলেছেন, "উপসাগরীয় অঞ্চলের লবণ-মুক্তকরণ কারখানাগুলি ২০২১ সালে প্রতিদিন মোট দুই কোটি কিউবিক মিটার (এক কিউবিক মিটার, এক হাজার লিটারের সমান) পানি টেনে নিত। এই পরিমাণ পানি দিয়ে অলিম্পিক্স মানের আট হাজার সুইমিং পুল ভর্তি করা যাবে।"

পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে কেন লক্ষ্যবস্তু করছে ইরান?

এই অঞ্চলের কৃষি আর খাদ্য উৎপাদনও লবণ-মুক্তকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরবরাহ করা পানির ওপরে নির্ভর করে, কারণ, যে ভূগর্ভস্থ পানি আগে সেচের কাজে ব্যবহার করা হত, সেই জল-স্তর অনেক নীচে নেমে গেছে।

এজন্যই পানি সরবরাহের পরিকাঠামো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র আর ইরান – উভয়ই চাইছে এটা ব্যবহার করতে।

বিশ্লেষকরা বলছেন যে, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলকে মোকাবিলা করার থেকে বরং সংঘাতের পরিধি নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে তেহরান। পানি সরবরাহের অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভবত ইরানের সেই কৌশলেরই অংশ, যদিও বলা হচ্ছে যে এগুলো প্রতিশোধ নেওয়া।

কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোনস্ বলছেন, "যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের সরকারগুলো দেখে যে তাদের পানি সরবরাহের অবকাঠামোর ওপরে হামলা হচ্ছে, তাহলে এটা খুবই সম্ভব যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপরে যুদ্ধ শেষ করার জন্য চাপ তৈরি করবে। ইরানের হামলাগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে একটা আতঙ্ক তৈরি করা, যাতে বেসামরিক নাগরিকরা "থাকবেন না পালাবেন", সেই সিদ্ধান্তের ওপরে প্রভাব বিস্তার করা যায়।

সমুদ্রের পানি লবণ-মুক্তকরণ কারখানায় হামলা

বাহারাইন ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে তাদের একটি লবণ-মুক্তকরণ কারখানার ওপরে সরাসরি হামলা করা হয়েছে। তবে ইরান পাল্টা জবাবে বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্র আগে হরমুজ প্রণালীর কেশম্ দ্বীপের একটি পানি কারখানায় হামলা চালিয়ে ক্ষতি করে দিয়েছিল।

দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে ইরান যে হামলা চালায়, তার কাছেই অবস্থিত রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সব থেকে বড়ো পানি লবণ-মুক্ত করার কারখানাটি।

আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাতেও একটি পানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে আগুন ধরে গিয়েছিল। যদিও কর্মকর্তারা বলছেন যে ওই কারখানাটি আংশিকভাবে সচল আছে।

কুয়েতের দোহা ওয়েস্ট কারখানাটিরও ক্ষতি হয়েছে, যদিও সেখানে সরাসরি হামলা হয়নি। কাছাকাছি বন্দরে ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হলে সেখানকার ধ্বংসাবশেষ উড়ে এসে কারখানাটিতে আছড়ে পড়ে।

ইউনাইটেড নেশনস্ ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেল্থের প্রধান, অধ্যাপক কাভেহ্ মাদানি বিবিসিকে বলেছেন, "ইরানের জন্য এটা একটা সংকেত দেওয়ার কৌশল।"

ইরান অবশ্য যে কোনো হামলাকেই তাদের ওপরে হামলার জবাব আখ্যা দিয়ে সেগুলিকে 'ন্যায়সংগত' বলে দাবি করছে। বিশেষত কেশম্ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বদলা যে বাহারাইনে তাদের জবাবি হামলা, সেটাও বলেছে ইরান।

গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহের অবকাঠামোর ওপরে চালানো হামলা থেকে বোঝা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের জবাব দিতে ইরান কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে।

তবে অধ্যাপক মাদানি মনে করেন, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু হিসাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের বহুমূল্য পানি সরবরাহ অবকাঠামোর ওপরে দীর্ঘস্থায়ী আক্রমণ করতে পারে, এই আতঙ্ক জিইয়ে রাখাতেই ইরানের শক্তি। এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবে তারা এ ধরনের হামলা চালাবে।

তার কথায়, "ঐতিহাসিকভাবে, পানি সবসময়েই হুমকি দেওয়ার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে।"

মার্কিন ঘনিষ্ঠ দেশগুলিতে পানি-নিরাপত্তা কি নড়বড়ে?

মি. মাদানি বলছিলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে পানি লবণ-মুক্তকরণ কারখানাগুলোতে সরাসরি আর সুস্পষ্ট হামলার ব্যাপারে তেহরান যে দৃশ্যত কিছুটা সাবধানতা আর সংযম দেখাচ্ছে, তা সম্ভবত জেনেভা কনভেনশনের ৪৫ নম্বর ধারার কারণে। আবার তাদের নিজেদের হামলাগুলিকে যাতে জবাবি হামলা বলে চালানো যায়, সেই প্রচেষ্টাও আছে।

"আইন বলছে যে বেসামরিক স্থাপনায় আক্রমণ করা যায় না, তবে শুরু তো ইরান করেনি। আব্বাস আরাঘচির সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে সেটাই তো লেখা হয়েছে," ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গিটা নিজের কথায় বলছিলেন মি. মাদানি।

কেশম্ দ্বীপে হামলার ঘটনাটিকে মি. আরাঘচি "এক বিপজ্জনক প্রচেষ্টা, যার পরিণতি হবে গুরুতর…নির্লজ্জ এবং মরিয়া হয়ে যাওয়া অপরাধ"। তিনি এও লিখেছিলেন যে ওই হামলায় অনেকগুলি গ্রামে পানি সরবরাহ সীমিত হয়ে গেছে।

দীর্ঘস্থায়ী হোক বা না হোক, এই ঘটনাগুলিই প্রমাণ করে যে জল-নিরাপত্তার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলির অবস্থা কতটা নড়বড়ে। দুর্বলতা ইরানেরও আছে, তবে মি. মাদানি বলছিলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিবেশী দেশগুলির তুলনায় ইরানের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র আছে, তারা লবণ-মুক্তকরণ প্রক্রিয়ার ওপরে অনেকটা কম নির্ভরশীল।

তবুও অন্যান্য পর্যবেক্ষকরা বলছেন গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহের পরিকাঠামোর ওপরে উপসাগরীয় অঞ্চলে যে হামলা চালিয়েছে ইরান, এবার তাদের দেশের পরিকাঠামোর ওপরেও পাল্টা আক্রমণের সম্ভাবনা নিজেরাই তৈরি করেছে।

বেশ কিছুদিন যাবৎ ইরান এক 'চূড়ান্ত জলের আকালের' মুখোমুখি হচ্ছে। কম বৃষ্টিপাত, "রাজধানীর শতাব্দী প্রাচীন জল সরবরাহ ব্যবস্থায় ফুটো হয়ে যাওয়া" এবং ইসরায়েলের সঙ্গে গত বছরের '১২ দিনের যুদ্ধ' – সব মিলিয়েই এই ঘাটতি, জানিয়েছেন শক্তি মন্ত্রী আব্বাস আলিয়াবাদি।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাঁধগুলির অবস্থা ইতোমধ্যেই 'উদ্বেগজনক অবস্থায়' আছে, বলছিলেন ইরানের ন্যাশানাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড ড্রট ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের আহমাদ ভাজিফেহ্। যে-সব বড়ো ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরে জল পাওয়া যায়, সেখান থেকে অতিরিক্ত পানি তুলে নেওয়া হয়েছে, জায়ানদেহ্ রু দর মতো নদীগুলি হ্রাস পেয়েছে আর লেক উর্মিয়া ব্যাপকভাবে ছোট হয়ে এসেছে।

ফ্রেড পিয়ার্সের মতো পরিবেশবিদরা বলছেন যে অনেক দশক ধরে বাঁধ নির্মাণ, পানি নির্ভর কৃষিকাজ আর অব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তুলেছে। কোনো এলাকায় তো ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এত বেশি পরিমাণে হয়েছে, যে মাটি বসে যাওয়ার মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে।

সরকারি কর্মকর্তারা তো এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন যে একদিন হয়ত তেহরানেও নিয়ন্ত্রণ চালু করতে হবে বা আংশিকভাবে শহর খালি করে দিতে হবে।

ইরানের সঙ্গে প্রতিবেশীদের পানি নিয়ে যেসব বিবাদ

গবেষকদের একাংশ মনে করেন যে এই সমস্যাটা একদিকে যেমন পরিবেশগত ভাবে, তেমনই জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও হুমকি। এর ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতাবস্থার ওপরে যেমন প্রভাব পড়বে, তেমনই দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও প্রভাবিত হবে। এর ওপরে তো যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহের তুমুল সংঘাত পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলেছে।

যুদ্ধের আগেই পানির অভাব ইরানে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল। খুজেস্তান, ইশফাহান সহ অন্যান্য জায়গায় বিক্ষোভের সময়ে আরও বিভিন্ন বৃহত্তর ইস্যু, যেমন জীবনযাত্রার খরচ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল পানির সংকটও।

পানি নিয়ে ইরানকে যে-সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তার মাঝেই এসেছে আঞ্চলিক উত্তেজনা। হেলমন্দ নদী নিয়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছে, আবার টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীগুলির ওপরে বাঁধ নির্মাণ নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে সমস্যা আছে। অন্যদিকে ইরাকের সঙ্গে অভিন্ন জলপথ নিয়েও ইরানের বিরোধ আছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের পানি সরবরাহ যে কতটা ভঙ্গুর অবস্থায় আছে, তা এই যুদ্ধের ফলে সামনে এলো। এছাড়াও পানি সরবরাহ যে সংঘাতের সময়ে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেই দিকটাও উন্মোচিত হলো। তেল আর গ্যাসের মজুতের মতো কারণগুলির সঙ্গেই পরিবেশগত চাপও এখন সংঘাতের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।

ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের সংঘাতগুলি শুধুই আর তেল বা গ্যাসের পাইপলাইন বা জ্বালানিবাহী জাহাজের ওপরে নির্ধারিত হবে না। তার সঙ্গেই নদী, ভূগর্ভস্থ পানির আধার আর পানি লবণ-মুক্তকরণ কারখানা নিয়েও সংঘাত বাঁধবে। তা চলতি সংঘাতের ক্ষেত্রে যেমন বাস্তব, তেমনটাই ভবিষ্যতেও।

হতে পারে পানি হয়ত তখন তেলের থেকে ভারী হয়ে উঠবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কি এবার পানীয় জলের সংঘাতের দিকে এগোবে?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কি এবার পানীয় জলের সংঘাতের দিকে এগোবে?


ভারতে অসুস্থ যুবকের ‘পরোক্ষ মৃত্যুর’ পক্ষে রায় দিলেন সুপ্রিম কোর্ট

প্রকাশ ১২ মার্চ ২০২৬ঃ নজিরবিহীন রায় দিলেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিছানায় অসাড় শুয়ে থাকা ৩১ বছরের যুবক হরিশ রানার মা–বাবার অনুরোধ মেনে ছেলের ‘নিষ্কৃতি মৃত্যু’ বা পরোক্ষ মৃত্যুর (প্যাসিভ ইউথানেসিয়া) অবেদনে সাড়া দিলেন সুপ্রিম কোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে বি পর্দিওয়ালা ও বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল বুধবার এই রায় দিয়ে জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি মনোযোগী হওয়া। মর্যাদার সঙ্গে নিষ্কৃতি মৃত্যু নিশ্চিত করতে আইন আনা দরকার।

বাইরের জগৎ কিংবা নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে চেতনাহীন কোনো ব্যক্তি, যাঁকে সুস্থ করে তোলার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা চিকিৎসাশাস্ত্রে নেই, কৃত্রিম উপায়ে যাঁর শরীরে প্রাণবায়ুটুকু শুধু অবশিষ্ট রয়েছে, তাঁর নিষ্কৃতি মৃত্যু বা পরোক্ষ মৃত্যুর অধিকার থাকা নিয়ে ভারতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। আইন–আদালত এই অধিকার নিয়ে সহমত হননি। সরকারও আইন প্রণয়ন করেনি। এ বিবেচনায় গতকাল হরিশ রানার মা–বাবার আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের সম্মতিদান নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

রায়ে বলা হয়েছে, হরিশকে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (এইমস) ভর্তি করাতে হবে। সেখানেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় মর্যাদার সঙ্গে তাঁকে দেওয়া জীবনদায়ী ব্যবস্থা (লাইফ সাপোর্ট) সরিয়ে ফেলতে হবে। তা করার আগে চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত বোর্ডকে অবশ্য জানাতে হবে, রোগীর সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

পাঞ্জাবের চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন হরিশ। ২০১৩ সালে ছাত্রাবাসের পাঁচতলা থেকে পড়ে তিনি মাথায় গুরুতর চোট পান। চিকিৎসকদের অক্লান্ত চেষ্টায় প্রাণে বাঁচলেও ক্রমেই তিনি ‘কোয়াড্রিপ্লেজিয়া’ বা সর্বাঙ্গ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। শ্বাস–প্রশ্বাস চালানো, খাওয়াদাওয়া—সবই চলতে থাকে কৃত্রিম উপায়ে। প্রথমে হাসপাতাল, তারপর নিজের বাড়িতে রেখেই চলতে থাকে হরিশের চিকিৎসা।

১৩ বছর ধরে চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে নিজের বাড়িও বিক্রি করে দিতে হয়েছে হরিশের মা–বাবাকে। হরিশের ছোট ভাইয়ের রোজগারে কোনোরকমে সংসার চালানো ওই দম্পতি ছেলের মৃত্যুর অধিকার পেতে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আগেও বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে এসেছেন।

২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট হরিশের পরিবারের আবেদন গ্রাহ্য করেননি। সে সময় শীর্ষ আদালত এই মামলাকে ‘অত্যন্ত কঠিন সমস্যা’ বলেছিলেন। বলেছিলেন, রোগীকে বাড়িতে রাখতে হবে। চিকিৎসকেরা তাঁকে নিয়মিত দেখতে যাবেন।

অবশেষে সর্বোচ্চ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ হরিশের মা–বাবার আবেদন মেনে নিলেন। বৃদ্ধ মা–বাবার আরজি ছিল, তাঁদের অবর্তমানে অসুস্থ ছেলেকে কে দেখবে, কীভাবে আসবে চিকিৎসার খরচ—সেই ভাবনায় তাঁরা অস্থির। দিন দিন অসুস্থতাও বেড়ে চলেছে।

আরজিতে বলা হয়েছিল, এ অবস্থায় ছেলের কষ্ট লাঘবের জন্য মৃত্যুই একমাত্র উপায়। তবে সেই মৃত্যু যেন প্রত্যক্ষ না হয়। অর্থাৎ কোনো ইনজেকশন বা ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নিয়ে মৃত্যুদানের অনুরোধ জানিয়েছিলেন হরিশের মা–বাবা। বিচারপতিরা সেই অনুরোধই মেনে ‘প্যাসিভ ইউথানেসিয়া’র পক্ষে রায় দেন।

ভারতে প্রত্যক্ষ মৃত্যু বা অ্যাকটিভ ইউথানেসিয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ। প্যাসিভ বা পরোক্ষ নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকারও এত দিন আদালত দেননি। গতকাল রায় দিতে গিয়ে বিচারপতিরা বলেন, হরিশের চিকিৎসাব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি ও তাঁর ভবিষ্যৎ এবং রোগীর পক্ষে কোনটা মঙ্গল, তা বিবেচনা করে এই মৃত্যুতে তাঁরা সায় দিয়েছেন।

২০১৮ সালে ‘কমন কজ’ বনাম কেন্দ্রীয় সরকার মামলারও উল্লেখ করেন বিচারপতিরা। সুপ্রিম কোর্ট সেই মামলার রায়ে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

হরিশ রানার শয্যাপাশে বাবা
হরিশ রানার শয্যাপাশে বাবা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই by এম এ আজিজ

গোটা পৃথিবীতে সুন্দরবন আর নেই। এই সুন্দরবন ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো বাদাবনে আজ বাঘও বেঁচে নেই। তাই বাদাবনের এই বাঘ দুনিয়ার বিজ্ঞানীদের কাছে সব সময়ই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁরা সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা করেন। এই বাঘ তুখোড় সাঁতারু, প্রতিদিন ছোট-বড় কয়েকটি নদী পাড়ি দিতে হয় শিকার-প্রাণী কিংবা সঙ্গীর খোঁজে। অন্যান্য বাংলা বাঘের চেয়ে এরা আকারে খানিকটা ছোট। আর সবচেয়ে কম শিকার-প্রাণীর বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে এই বাঘ এখনো টিকে আছে। ফলে এই বাদাবন আর অনন্য বৈশিষ্ট্যের বাঘ রক্ষায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তব্যের পাশাপাশি দেশের আপামর জনগণের ভূমিকা অপরিহার্য।

অতীতে আমাদের দেশের অধিকাংশ বনাঞ্চলে বাঘ ছিল। আমরা আমাদের শালবনের বাঘ হারিয়েছি গত শতকের গোড়ার দিকে, পাহাড়ি বনের বাঘও নির্বংশ হলো আমাদের চোখের সামনে। আজ শুধু সুন্দরবনের কাদাপানিতে কোনোরকমে বাংলার সর্বশেষ বাঘের এক খণ্ডাংশ পপুলেশন টিকে আছে। সুন্দরবনের মতো জলার বনে টিকে থাকা বাঘ প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছে—মানুষের সঙ্গে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে।

মাত্র দুটি শিকার-প্রাণীর ওপর তাদের নির্ভরশীলতা এই বাঘের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে রেখেছে সারাক্ষণ। প্রধান শিকার-প্রাণী চিত্রা হরিণ বাঘের খাবারের ৭৯ শতাংশ জোগান দেয়। অন্যদিকে একশ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত সুন্দরবন থেকে চিত্রা হরিণ শিকার করে। সুন্দরবনের আশপাশের জেলার বাইরেও হরিণের মাংস পাচার হয়। সমাজে মুখোশধারী কিছু লোভী মানুষ এই মাংসের জন্য লালায়িত থাকে সব সময়। এরা সুন্দরবনের হরিণের নিয়মিত ভোক্তা।

সুন্দরবন বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ২০১০-১৫ সময়েও সুন্দরবনের ওপর এমন সংকট নেমে এসেছিল। ওই সময় চোরা শিকারি ও বনদস্যুরা সুন্দরবনের ওপর জেঁকে বসে। হরিণের পাশাপাশি বাঘ শিকারের এক মহোৎসবে নেমে পড়ে বনদস্যু ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা চোরা শিকারিরা। বনজীবীরাও চরম নিপীড়নের মধ্যে পড়ে। ওই সময় অনেক চোরাকারবারি বাঘের চামড়াসহ ধরা পড়ে। এসব বিপর্যয়ের প্রতিফলন পরবর্তী সময়ে আমরা বাঘ জরিপের ফলাফলে দেখতে পাই।

জুলাই বিপ্লবের পর সুন্দরবনের ওপর আবারও নেমে এসেছে তেমন এক বিপর্যয়। অতীতে আত্মসমর্পণকারী অনেক বনদস্যু আবার সুন্দরবনে ফিরে এসেছে, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন বনদস্যু। নিরীহ বনজীবীদের জিম্মি করে অত্যাচার ও মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি নিজেরাও বাঘ-হরিণ শিকারে জড়িয়ে পড়েছে। আর তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ওত পেতে থাকা চোরা শিকারিরা হামলে পড়েছে সুন্দরবনে। ফলে আমরা প্রতিনিয়ত অসংখ্য হরিণের ফাঁদ উদ্ধার হতে দেখছি। সম্প্রতি সেই ফাঁদে আহত বাঘ উদ্ধারের ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এমন নির্মম ঘটনা আমাদের অজান্তে নিশ্চয় আরও ঘটছে।

সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। অন্যদিকে বাঘ আমাদের গৌরবের প্রতীক, আমাদের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এ ছাড়া এই দুই বিরল প্রাকৃতিক সম্পদ বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক। ফলে এদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সবার।

রাষ্ট্র বন বিভাগের ওপর এদের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছে মাত্র। কিন্তু বন বিভাগের রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা, আছে জনবল ও দক্ষতার ঘাটতি। বিপরীতে সুন্দরবনের ওপর জীবিকার জন্য আছে স্থানীয় মানুষের তীব্র চাপ। ফলে সুন্দরবন রক্ষায় আমাদের সবাইকে যেমন সোচ্চার হতে হবে, তেমনি প্রত্যেকের অবস্থান থেকে আমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

সুন্দরবন ও বাঘের এই সংকট মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দ্রুত কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, সুন্দরবনকে অতিসত্বর দস্যুমুক্ত করতে হবে। এটি করতে হলে বন বিভাগের পাশাপাশি সব আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব যৌথ অভিযান পরিচালনা করে সুন্দরবন থেকে বনদস্যুদের নির্মূল করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, হরিণশিকারিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সুন্দরবনে নিয়মিত টহল জোরদার করতে হবে। সুন্দরবনঘেঁষা গ্রামগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে চোরা শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী জেলেদের শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। সেই সঙ্গে তাদের মুখোশ উন্মোচন করে সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে।

* এম এ আজিজ, অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

৪ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের মোংলা উপজেলার শরকির খালসংলগ্ন সুন্দরবনের অংশে হরিণ শিকারে পাতা ফাঁদে আটকে পড়ে বাঘটি। আহত অবস্থায় সেটিকে উদ্ধার করা হয়।
৪ জানুয়ারি ২০২৬ সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের মোংলা উপজেলার শরকির খালসংলগ্ন সুন্দরবনের অংশে হরিণ শিকারে পাতা ফাঁদে আটকে পড়ে বাঘটি। আহত অবস্থায় সেটিকে উদ্ধার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে

রয়টার্সের রিপোর্টঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এমন এক সংকটের মুখে পড়েছেন, যা ক্রমেই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের কাছ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং আরও সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে। যদিও ট্রাম্প আগে বলেছিলেন যুদ্ধটি হবে কেবল একটি ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’। এসব কথা লিখেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকা ট্রাম্প অন্যান্য ন্যাটো দেশের বিরুদ্ধে ‘ভীরুতা’র অভিযোগ তুলেছেন। কারণ তারা হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তিনি দাবি করেন, সামরিক অভিযান পরিকল্পনা অনুযায়ীই এগোচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধটি ‘সামরিকভাবে জয়ী হয়েছে’ শুক্রবার ট্রাম্পের এই ঘোষণা বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষিক দেখা যাচ্ছে। কারণ ইরান এখনো প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করছে এবং পুরো অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
ক্ষমতায় আসার সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বোকামিপূর্ণ’ সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখবেন। কিন্তু এখন তিনি এমন একটি সংঘাতের ফলাফল বা বার্তা- কোনোটিই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, যে সংঘাত শুরু করতে তিনি নিজেই ভূমিকা রেখেছেন।
একটি স্পষ্ট প্রস্থান কৌশলের অভাব তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং তার দলের ভবিষ্যৎ- উভয়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। তাতে রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ট্রাম্প নিজেই নিজেকে ‘ইরান যুদ্ধ’ নামে একটি বাক্সের মধ্যে বন্দি করেছেন। তিনি বুঝতে পারছেন না কীভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসবেন। এটাই তার সবচেয়ে বড় হতাশার কারণ।
তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এই মূল্যায়নের বিরোধিতা করেন। তার মতে, লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় ইরানের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন, তাদের নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়েছে। তিনি বলেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সামরিক সাফল্য।
ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমা
গত এক সপ্তাহে কূটনৈতিক, সামরিক এবং রাজনৈতিক- সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হোয়াইট হাউসের আরেক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প অবাক হয়ে দেখেন যে ন্যাটো মিত্রসহ অনেক বিদেশি অংশীদার তাদের নৌবাহিনী পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ করতে আগ্রহী নয়। প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন দেখাতে না চাওয়ায় হোয়াইট হাউসের কিছু উপদেষ্টা তাকে দ্রুত একটি ‘পিছিয়ে যাওয়ার পথ’ খুঁজে নিতে এবং সামরিক অভিযানের পরিধি সীমিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এসব যুক্তি ট্রাম্পকে কতটা প্রভাবিত করবে তা স্পষ্ট নয়। কিছু বিশ্লেষকের মতে, মিত্রদের অনীহা কেবল এমন একটি যুদ্ধে জড়াতে না চাওয়ার কারণে নয়, যেটি শুরু করার আগে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি; বরং গত ১৪ মাসে ট্রাম্পের ধারাবাহিকভাবে ঐতিহ্যগত মার্কিন জোটগুলোকে ছোট করে দেখার প্রতিক্রিয়াও এতে কাজ করছে।
এদিকে ইসরাইলের সঙ্গেও কিছু মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরাইলের হামলার বিষয়ে তিনি আগাম কিছু জানতেন না। কিন্তু ইসরাইলি কর্মকর্তারা বলেছেন, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই করা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এখন ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের অভিযান নিয়ে এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছেন এবং তিনি কোন পথ বেছে নেবেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি চাইলে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন। যেমন, ইরানের প্রধান তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল করা বা ইরানের উপকূলে সেনা মোতায়েন করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংসের চেষ্টা করা। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা অধিকাংশ আমেরিকানই সমর্থন করবে না।
অন্যদিকে উভয় পক্ষই আপাতত আলোচনায় রাজি না হওয়ায় ট্রাম্প চাইলে বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তবে এতে উপসাগরীয় মিত্ররা ক্ষুব্ধ হতে পারে। কারণ তাদের সামনে তখন আহত কিন্তু শত্রুভাবাপন্ন একটি ইরান থেকে যাবে। যে ইরান এখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করতে পারে এবং উপসাগরের নৌপথ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। যদিও ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার অতিরিক্ত মেরিন ও নাবিক পাঠাচ্ছে। তবে ইরানের ভেতরে সরাসরি সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত এখনো নেয়া হয়নি।
রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে
এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা (মাগা) আন্দোলনের ওপর তার একসময়ের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। আন্দোলনের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রকাশ্যে যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। এ পর্যন্ত তার মূল সমর্থকরা তাকে সমর্থন দিলেও বিশ্লেষকদের মতে, গ্যাসের দাম বাড়তে থাকলে এবং মার্কিন সেনা আরও মোতায়েন করা হলে আগামী সপ্তাহগুলোতে সেই সমর্থন কমে যেতে পারে। রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডেভ উইলসন বলেন, যখন অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হবে, তখন মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করবে- আমি আবার কেন এত বেশি গ্যাসের দাম দিচ্ছি? হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি কেন ঠিক করবে আমি আগামী মাসে ছুটিতে যেতে পারব কি না?
ভুল হিসাব
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ধীরে ধীরে উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে এই সংঘাত এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আগেই আরও বিস্তারিত পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, সামরিক অভিযানটি ব্যাপকভাবে পরিকল্পিত ছিল এবং সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল- ইরান এই সংঘাতকে অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখবে।

ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে

সস্তা ড্রোন আকাশযুদ্ধের ধরনকেই বদলে দিচ্ছে

প্রকাশ ১৮ মার্চ ২০২৬ঃ দশকের পর দশক ধরে আকাশের আধিপত্য মূলত সেসব ধনী দেশগুলোর হাতে ছিল, যারা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কেনা এবং সেগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের খরচ বহন করতে পারত।

এখন সে সমীকরণ বদলে যেতে শুরু করেছে। শত্রুর ওপর আক্রমণের জন্য সস্তায় তৈরি ড্রোন ধনী দেশগুলোর সেই সুবিধাকে ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে, ফলে ছোট ও কম সম্পদশালী বাহিনীগুলোও এখন প্রতিপক্ষের বেশি ক্ষতি করার সক্ষমতা অর্জন করছে।

বহু বছর ধরে বিপুল পরিমাণে সামরিক বাজেটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের হাতে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নাম দিয়ে চালানো আগ্রাসনে তারা সেগুলো মোতায়েন করেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে আকাশযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর যেসব সম্পদ মোতায়েন করেছে, সেগুলো দেখে নেওয়া যাক—

যুক্তরাষ্ট্র মেঘের অনেক ওপর দিয়ে ওড়া প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান এ অভিযানে মোতায়েন করেছে। খরচের সমস্যা ও মোতায়েন করা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা বিলম্বের পর মার্কিন বাহিনী প্রথমবারের মতো কোনো যুদ্ধে এত ব্যাপকভাবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ব্যবহার করছে।

যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে তাদের বি-২ বোমারু বিমানও মোতায়েন করেছে। এই বোমারু বিমানগুলো দীর্ঘপাল্লার, স্টেলথ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা বহন করতে সক্ষম।

রিফুয়েলিং ও নজরদারির জন্য কয়েকটি বৃহৎ আকারের উড়োজাহাজও মোতায়েন করা হয়েছে।

আরেকটি বড় উড়োজাহাজ হলো বি-১ বোমারু বিমান, যার ডাকনাম ‘বোন’। এটি সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার পাউন্ড ওজনের মিশ্র যুদ্ধাস্ত্র ও মিশন সরঞ্জাম বহন করতে পারে এবং একবারে সর্বোচ্চ ২৪টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধরে রাখতে সক্ষম।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ‘রিপার’ ড্রোন ব্যবহার করছে। একটি গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে একজন পাইলট সেটি পরিচালনা করেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো তাদের এফএলএম-১৩৬ লুকাস ড্রোন ব্যবহার করছে। এটি একটি একমুখী আক্রমণ ড্রোন। ইরানের শাহেদ ড্রোনের অনুকরণে সেগুলো তৈরি করা হয়েছে।

ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন

শাহেদ-১৩৬ একটি একমুখী আক্রমণ ড্রোন, লক্ষ্যবস্তুর দিকে উড়ে গিয়ে ধাক্কা লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়। ইরান কয়েক বছর ধরে এই স্বয়ংক্রিয় ড্রোন তৈরি করছে এবং মিত্রদেশগুলোতে সেগুলো সরবরাহ করেছে। এখন নিজেই বড় পরিসরে শাহেদ ড্রোন মোতায়েন করছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ আগ্রাসন শুরু করে। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি আছে, সেগুলো লক্ষ্য করে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র এবং এক হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

যদিও কৌশলগত দিক থেকে এই হামলা নিখুঁত নয় এবং সাফল্য নির্ভর করে এর পরিমাণের ওপর। এই কৌশলে অনেক ড্রোন একবারে নিক্ষেপ করা হয়, সেগুলো ঢেউয়ের মতো একের পর এক আক্রমণ করে আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলে, সেগুলোকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে দিয়ে অতিক্রম করার চেষ্টা করে।

এই ড্রোন তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তায় উৎপাদন করা যায়। স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ সেন্টারের (সিএসআইএস) অনুমান অনুযায়ী, একটি শাহেদ ড্রোন তৈরিতে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের মতো খরচ হয়।

সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত আকাশে কীভাবে আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থার বাধা অতিক্রমের ধরন পাল্টে যাচ্ছে, বার্তা সংস্থা রয়টার্স তার চিত্র তুলে ধরেছে।

রয়টার্স হিসাব করে দেখেছে, শুধু একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর বানাতে যে অর্থ ব্যবহার করা হয়, তাতে কতগুলো ড্রোন তৈরি করা যায়। হিসাব অনুযায়ী, একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের খরচ প্রায় ৪০ লাখ ডলার, যা দিয়ে ১১৫টি একমুখী আক্রমণ ড্রোন তৈরি করা সম্ভব।

সংঘাতের প্রথম সপ্তাহেই ইরান এক হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। অনুমান করা হচ্ছে, ইরান মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন উৎপাদনের ক্ষমতা রাখে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধের প্রযুক্তি দ্রুত বদলে যেতে দেখা গেছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে তা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে ট্যাংক ও আর্টিলারির আধিপত্য দেখা গিয়েছিল, এখন এটি ক্রমেই একটি ড্রোন যুদ্ধ হয়ে উঠছে।

প্রচলিত সমরাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের দিক দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে পিছিয়ে থাকা ইউক্রেন নজরদারি ও হামলা চালাতে সস্তা ড্রোন ব্যবহার শুরু করে। যুদ্ধে রাশিয়ার হতাহতের প্রায় ৭০ শতাংশই হয়েছে ড্রোন আক্রমণের কারণে। ড্রোনের মাধ্যমে দূর থেকে আক্রমণ চালানো যায়, এতে পাইলট ও বিমানকর্মীদের ঝুঁকি অনেক কম।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বিমানগুলো অত্যন্ত প্রশিক্ষিত ক্রুদের ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, দুই আসনের এফ-১৫ যুদ্ধবিমান চালাতে পাইলটদের বহু বছর প্রশিক্ষণ নিতে হয়, যা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। যদি এমন একটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়, তবে শুধু যুদ্ধবিমানই নয় বরং ক্রুদেরও প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে।

বিপরীতে, সস্তা ড্রোনগুলো দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত। ড্রোন ধ্বংস হলেও অপারেটরের প্রাণহানির ঝুঁকি নেই। নতুন ড্রোন মোতায়েনের খরচ মাত্র কয়েক হাজার ডলার।

এই অসাম্য একটি কৌশলগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আক্রমণ করা সহজ ও সস্তা হয়ে গেছে; অন্যদিকে, প্রতিরক্ষার খরচ আকাশছোঁয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কখনো কখনো কয়েক লাখ ডলারের ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে এমন ড্রোন ধ্বংস করছে, যা সাধারণ বাজারের উপাদান দিয়ে অনেক কম খরচে তৈরি করা হয়।

ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের উচ্চ খরচ

একটি থাড বা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের ‘ফুল ব্যাটারি সিস্টেমের’ খরচ ১০০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। ইন্টারসেপ্টর ইউনিটের খরচ কয়েক লাখ ডলার।

২০২৪ সালের মে মাসে সিনেটের বাজেট বরাদ্দ উপকমিটিকে পেন্টাগনের প্রধান অস্ত্র ক্রেতা বিল লা প্লান্তে সতর্ক করে বলেছিলেন, আকাশ প্রতিরক্ষার অর্থনীতি অব্যাহত রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

লা প্লান্তে বলেন, ‘যদি আমরা ৫০ হাজার ডলারের একমুখী ড্রোনকে ৩০ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করি, সেটি ভালো খরচের সমীকরণ নয়।’

এরই মধ্যে এই অসমতা সমুদ্রেও দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী লোহিত সাগরে চলাচল করা জাহাজকে সস্তা হুতি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রক্ষা করতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা তারও বেশি মূল্যের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে।

ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কেবল খরচের একটি অংশ। প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর নির্ভর করে নৌযান ও তাদের সঙ্গী জাহাজের উপস্থিতি, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত ক্রু, গোয়েন্দা ও নজরদারি সরঞ্জাম এবং হুমকি শনাক্ত ও পরাস্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় কমান্ড ও কন্ট্রোল নেটওয়ার্কের ওপর।

এ পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের লুকাস ড্রোনের ব্যবহার প্রমাণ করছে যে তারা ইরানের নতুন রণকৌশলের সঙ্গে তাল মেলাতে চাইছে।

নতুন এ প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটন দ্রুত সময়ের মধ্যে ছোট সামরিক ড্রোন যুদ্ধে ব্যবহার উপযোগী করে তুলেছে। যেমন দেশটি তাদের লো কস্ট আনক্রুড কমব্যাট এয়রিয়াল সিস্টেমের (লুকাস) মতো সিস্টেমগুলোকে প্রচলিত সময়ের চেয়ে দ্রুত অনুমোদন দিয়েছে।

গত বছরের জুলাই মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একটি নির্দেশিকা জারি করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ড্রোন আধিপত্য উন্মোচন’।

এ জন্য পেন্টাগনকে জটিল প্রশাসনিক বাধা কমাতে এবং সশস্ত্র বাহিনীতে ড্রোন মোতায়েন দ্রুততর করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

সে সময় হেগসেথ সতর্ক করে বলেছিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রতিবছর কোটি কোটি ড্রোন তৈরি করছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা পুরোনো ক্রয় প্রক্রিয়ার কারণে ধীরগতির হয়ে গেছে।

শাহেদ ড্রোন বনাম এফএলএম-১৩৬ লুকাস: একই নকশার ড্রোন

এফএলএম-১৩৬ লুকাস ইরানের শাহেদ ড্রোনের অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো একটি একমুখী আক্রমণ ব্যবস্থা। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ব্যাপকভাবে এই ড্রোনের ব্যবহার করেছে।

ইরানের শাহেদ ড্রোন নতুন ধরনের একটি সমরাস্ত্রকে জনপ্রিয় করেছে। এটি প্রায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কাজ করে, অথচ এটি তৈরির খরচ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির খরচের চেয়ে অনেক কম।

বর্তমানে, একদিকে যেমন একমুখী আক্রমণ ড্রোনের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেগুলো সস্তা হয়ে যাচ্ছে, তেমনি ড্রোনপ্রতিরোধী ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়েছে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে।

ড্রোন বিধ্বংসী প্রযুক্তি, যেগুলো ব্যবহার হতে পারে

সামরিক বাহিনী সস্তায় তৈরি আক্রমণাত্মক ড্রোনের বিস্তার প্রতিহত করতে নানা ধরনের প্রযুক্তির উন্নয়ন করছে। যেমন ইলেকট্রনিক জ্যামার, ইন্টারসেপ্টর ড্রোন থেকে শুরু করে এমন উচ্চশক্তির লেজার, যা আলোর গতিতে লক্ষ্যবস্তুকে অক্ষম করতে সক্ষম।

এসব ব্যবস্থা প্রতিরক্ষার খরচ অনেকটাই কমাতে সক্ষম হবে। কারণ, এগুলো ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে বিদ্যুৎ বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে।

কিন্তু এসব প্রযুক্তির বেশির ভাগই এখনো সীমিত পরিসরে ব্যবহার হচ্ছে। পরীক্ষামূলক পরিবেশের বাইরে অতি সম্প্রতি এগুলোর মোতায়েন কেবল শুরু হয়েছে।

ইরানের সেনাবাহিনী ড্রোনের এই ছবিগুলো প্রকাশ করেছে। তেহরান, ১৩ জানুয়ারি ২০২৪
ইরানের সেনাবাহিনী ড্রোনের এই ছবিগুলো প্রকাশ করেছে। তেহরান, ১৩ জানুয়ারি ২০২৪ ছবি: এএফপি