Friday, January 30, 2026

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় রয়েছে: সামরিক মুখপাত্র

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইরানকে সময় বেঁধে দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইজিআরসি) ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এসব ঘটনায় ইরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, যেকোনো হামলার জবাবে তারা সরাসরি মার্কিন ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজে হামলা চালাবে।

ইরানের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর অনেক ‘দুর্বলতা’ আছে। এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা অসংখ্য মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ইরানের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যেই রয়েছে।

এদিকে তেহরান থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক আলী হাশেম জানিয়েছেন, আঞ্চলিক দেশগুলো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে, যাতে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যায়; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো নিয়ে সমস্যা রয়ে গেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন ইরান যেন পুরোপুরি পারমাণবিক কার্যক্রম এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে। সেই সঙ্গে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও পাল্লা কমিয়ে ফেলে।

এসব বিষয় ইরানের জন্য ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমা, যা তারা কোনোভাবেই মানতে রাজি নয়।

ফলে দুই পক্ষ আলোচনার কথা বললেও তাদের শর্তের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। বর্তমানে সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে কোনো সমঝোতায় আসার সম্ভাবনা খুব কম দেখা যাচ্ছে।

ওই অঞ্চলের ভয়াবহ সংকট এড়াতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আবার পরমাণু আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

কাতার নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ফোনে কথা বলেছেন। তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: এএফপি

ট্রাম্প যে কারণে ইরানিদের ‘ত্রাতা’ হতে চান by বেলেন ফার্নান্দেজ

ইরানজুড়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভের প্রায় দুই সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পছন্দের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথে একটি বার্তা দেন। তিনি লেখেন, ‘ইরান এমন এক স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে, যা (ইরান) আগে কখনো দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প।’

বরাবরের মতোই ট্রাম্পের লেখাটিতে ছিল বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার আর অতিরিক্ত বিস্ময়সূচক চিহ্ন, যা কোনো পরাশক্তির নেতার চেয়ে বরং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর লেখাই বেশি মনে হয়। কিন্তু এর চেয়ে গুরুতর সমস্যা হলো তাঁর ‘সাহায্য’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ‘সাহায্য’ খুব একটা গৌরবের বিষয় নয়, বিশেষ করে সেই ব্যক্তির নেতৃত্বে, যিনি গত গ্রীষ্মেই ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছিলেন। ক্ষমতায় ফেরার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন।

এর ওপর ট্রাম্পই ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা বজায় রেখেছেন, যা দেশটিতে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে এবং বর্তমান বিক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ফলে সাধারণত সবচেয়ে বেশি ভোগে সাধারণ মানুষ, অভিজাত শ্রেণি নয়। ইরানেও তা–ই হয়েছে।

এটি যেমন ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তেমনি ইরানকে ঘিরে তাঁর বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একধরনের পরিবর্তন। আগে ট্রাম্পের ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল পারমাণবিক অস্ত্র ও রাসায়নিক কিংবা জীবাণু অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা। এসবকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেমন হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হতো, তেমনি ইসরায়েলের জন্যও বিপজ্জনক বলে প্রচার করা হতো।

কিন্তু এখন ট্রাম্প নিজেকে ‘ত্রাতা’ হিসেবে তুলে ধরছেন। চলতি মাসে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় এবং সহিংসভাবে হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানিদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে।

মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘সাহায্য আসছে।’ তবে এই সাহায্য কী ধরনের, সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী গণমাধ্যমগুলো উৎসাহব্যঞ্জক শিরোনাম দিয়ে বিষয়টি আরও উসকে দিয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন বলেছেন, ইসরায়েল ইরানের বিক্ষোভকারীদের স্বাধীনতাসংগ্রামকে সমর্থন করে এবং নিরপরাধ বেসামরিক মানুষদের ‘গণহত্যা’র তীব্র নিন্দা জানায়। কথাটি এসেছে এমন একজন মানুষের মুখ থেকে, যিনি নিজে দুই বছরের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই সাহায্যের প্রতিশ্রুতি শুনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তিনি কি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের পুরোনো নীতির বই থেকেই পাতা ওলটাচ্ছেন না! বুশ ছিলেন তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর মুখপাত্র। তিনি এমন এক প্রশাসনের প্রধান, যারা নব্য রক্ষণশীল মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে নিবেদিত ছিল। ট্রাম্প ওই মতাদর্শের বিরোধিতা দীর্ঘদিন ধরে করে এসেছেন।

নব্য রক্ষণশীলদের লক্ষ্য হলো গণতন্ত্র প্রচার কিংবা জুতসই অজুহাত বানিয়ে বিশ্বজুড়ে সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো এবং সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার ঘটানো। ট্রাম্প একসময় বহু মার্কিন ভোটারকে আকৃষ্ট করেছিলেন এই বলে যে তিনি দূরদেশের এমন অভিযান ত্যাগ করবেন এবং পুরো মনোযোগ দেবেন ‘আমেরিকাকে আবার মহান’ বানানোর কাজে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নব্য রক্ষণশীল প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা এত সহজ নয়।

সত্যি বলতে, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সঙ্গে বুশের সময়ের মিল একাধিক জায়গায় পাওয়া যায়। দুজনেরই আচরণ অনেকটা ভাঁড়ামিপূর্ণ। ইংরেজি ব্যাকরণ ও বানানের সঙ্গে তাঁদের অদ্ভুত সম্পর্কও আছে। এসব বিষয় হাস্যকরই লাগত, যদি না তাঁদের শাসনামলে এত ব্যাপক রক্তপাত ঘটত। একইভাবে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ঈশ্বরকে নিজের পক্ষে টানার প্রবণতাও দুজনের মধ্যেই অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখা গেছে।

শাসন পরিবর্তনের নীতির এবং ইরাক ও আফগানিস্তানে বুশ আমলের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা ট্রাম্প বহুবার করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে প্রথম বছরেই তিনি একের পর এক দেশে বোমা হামলা চালিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণ করার ঘটনাও তিনিই ঘটিয়েছেন।

এদিকে ফ্লোরিডার কংগ্রেসম্যান র‍্যান্ডি ফাইন সম্প্রতি ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড দখলের অনুমতি দেওয়ার একটি বিল উত্থাপন করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের হয়তো খামেনিকে মাদুরো করা উচিত।’ এখানে ‘খামেনি’ বলতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে বোঝানো হয়েছে, আর ‘মাদুরো’ শব্দটি কার্যত একটি নতুন ক্রিয়াপদে পরিণত হয়েছে, যার অর্থ কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাকে অপহরণ করা।

এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প যখন আবার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সাহায্য করতে ‘প্রস্তুত’, তখন ইরানে মার্কিন ‘সাহায্যে’র অতীত উদাহরণগুলো মনে করা জরুরি। যেমন ১৯৫৩ সালে সিআইএ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। ওই ঘটনার ফলেই নির্যাতনপ্রবণ ইরানের শাহর দীর্ঘ শাসনের পথ খুলে যায়, যার অবসান ঘটে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবে।

মজার বিষয় হলো, প্রয়াত শাহর ছেলে এখন ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে বিলাসী নির্বাসিত জীবনে বসে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে ট্রাম্প হয়তো বুঝে ফেলেছেন যে বিদেশে মানুষকে ‘সাহায্য’ করার কথা বলে দেশের ভেতরের কিছু গভীরভাবে অগণতান্ত্রিক বাস্তবতা থেকে মনোযোগ সরানো যায়। যেমন যুক্তরাষ্ট্র কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে অভিবাসন কর্মকর্তারা নির্বিঘ্নে মার্কিন নাগরিকদের হত্যাও করতে পারছেন।

সব মিলিয়ে ট্রাম্প যখন ক্রমেই বুশের ছায়ায় হাঁটছেন, তখন ইরানিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই তথাকথিত ‘উদ্ধার’ সম্ভবত সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর একটি।

* বেলেন ফার্নান্দেজ, লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (ডানে)
ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (ডানে) ফাইল ছবি

রাজার ছেলে রাজা হবে, সেই সংস্কৃতি আমরা পাল্টে দিতে চাই: জামায়াত আমির

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘রাজার ছেলে রাজা হবে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে, সেই সংস্কৃতির ধারা আমরা পাল্টে দিতে চাই।’ আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফেনীতে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জেলা শহরের ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এ জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।

জামায়াতের আমির বলেন, ‘অতীতের বস্তাপচা রাজনীতি ফ্যাসিবাদ উপহার দিয়েছে, একনায়কতন্ত্র উপহার দিয়েছে, দুর্নীতিতে দেশকে চ্যাম্পিয়ন করেছে। ওই রাজনীতিকে আমরা লাল কার্ড দেখাতে চাই। আমাদের কাছে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই সমান। আমরা তাদের সবার অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ইনশা আল্লাহ এই কাজে কেউ বাধা দিয়ে আমাদের আটকাতে পারবে না।’

দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতার দিকে ইঙ্গিত করে জনসভায় জামায়াতের আমির বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় আমরা মাথা গরম দেখতে পাচ্ছি। শীতের দিনে মাথা গরম করলে, চৈত্র মাসে কী করবেন? একটু মাথাটা ঠান্ডা রাখেন। একটু জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান করেন, এতগুলো শহীদের প্রতি একটু শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুলির সামনে যাঁরা বুক পেতে দিয়েছিল, তাদের সম্মান করুন। সেই সম্মানটা করলে মাথা গরমের কোনো সুযোগ নেই।’

নারীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গায় মা-বোনদের ওপর হাত তোলা হচ্ছে। আমরা তাদের অতি বিনয়ের সঙ্গে আহ্বান জানাব, মা-বোন আপনাদেরও রয়েছে। নিজেদের মা-বোনকে সম্মান করুন, তাহলে বাংলার সবগুলা মা ও বোনকে আপনি সম্মান করতে পারবেন।’

১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষে ভোট চেয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লার মার্কা হচ্ছে স্বাধীনতা রক্ষার মার্কা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মার্কা। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মার্কা। এর পক্ষে গোটা দেশে একদম চাষ করে ফেলতে হবে। একটা মানুষও বাদ যাবে না।’

জামায়াতের আমিরের আগমন উপলক্ষে সকাল থেকেই স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয় জনসভাস্থল। বেলা ১১টায় তিনি মঞ্চে ওঠেন। এ সময় তিনি গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন। বেলা ১১টা ১২ মিনিটে তিনি বক্তব্য শুরু করেন। ১১টা ৩৫ মিনিটে বক্তব্য শেষ করে ফেনীর তিনটি আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা ও ঈগল প্রতীক তুলে দেন।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির পরিচালক এ টি এম মাসুম। তিনি বলেন, ‘আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়ে তুলব এর ফয়সালা হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। বৈষম্যমুক্ত, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গড়তে হলে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোটে জয়ী করতে হবে।’

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের কোনো পরিবর্তন আসেনি। গুম-খুনের শাসনের কারণে জুলাই আন্দোলনের প্রয়োজন হয়েছিল। গত দেড় বছরে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনসাফের পক্ষে রায় দিয়েছেন তরুণেরা।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বিএনপির উদ্দেশে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড না দিয়ে চাঁদাবাজি থেকে বেঁচে থাকার কার্ড দেবেন। ইভটিজিং ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধের কার্ড দেবেন। তাহলে মানুষের কাজে লাগবে। রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব কার্ড দেওয়া নয়। এটি ইউনিয়ন পরিষদ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাজ। নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা শুরু হলে আরেকটি ৫ আগস্ট ফেনী থেকে শুরু হবে।’

সমাবেশে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, ‘ফেনীর মেয়ে খালেদা জিয়া, সেই খালেদার আসনে বিএনপি আর নেই। শহীদ জিয়ার বিএনপি আর নেই। বিএনপি এখন চাঁদাবাজের দল। বিএনপির সঙ্গে জোটের সাবেক নেতারা আর কেউ নেই। জোটের সব নেতা বিএনপি ত্যাগ করেছে। বিএনপি এখন অনিবন্ধিত দল নিয়ে জোট গঠন করেছে। কয়েকটি দলের প্রধান বিএনপির হয়ে ভোট করছে৷’

জামায়াতের জেলা শাখার সেক্রেটারি মাওলানা আবদুর রহিমের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সাবেক জেলা আমির এ কে এম শামসুদ্দিন, ফেনী-৩ (দাগনভূঞা ও সোনাগাজী) আসনে জামায়াতের প্রার্থী ফখরুদ্দিন মানিক, ফেনী-১ (ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া) আসনের প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন, জাতীয় শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কবির আহম্মদ প্রমুখ।

ফেনীতে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে
ফেনীতে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। ছবি: প্রথম আলো

তবে কি ইরানকে ভয় দেখাতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

আল-জাজিরা এক্সপ্লেইনারঃ ইরানের উপকূলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটন দেশটির ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে, তাদের এই তৎপরতা সেটারই একটি বড় সংকেত হতে পারে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে যেতে চান। সম্ভাব্য একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে আরও আলোচনা করার পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে।

তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ এই ঘোষণার বেশ আগে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিশাল বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ বর্তমানে আরব সাগরে মোতায়েন করা হয়েছে। গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র যেসব সামরিক সরঞ্জাম ওই এলাকায় পাঠিয়েছে, এটি তার মধ্যে একটি।

তাহলে ট্রাম্পে কি ইরান সরকারকে ভয় দেখাতেই ইরান উপকূলে বড় আকারের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছেন? ট্রাম্প যা–ই করুন, সংঘাত না হলেই এই অঞ্চলের জন্য মঙ্গল। কারণ, ইসরায়েলের নির্বিচার গাজা হামলা এমনিতেই এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে।

যাই হোক, গত বছরের জুনে ১২ দিনব্যাপী ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাদের সামরিক শক্তি এই অঞ্চলে মোতায়েন করেছিল। তখন ওয়াশিংটন তাদের মিত্র ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়েছিল।

এরপর গত বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় সাগরে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করেছিল। এর কয়েক সপ্তাহ পরই তারা ভেনেজুয়েলার নৌযানের ওপর হামলা চালাতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, সেগুলো মাদক পাচারের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অবশ্য এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ তারা দেয়নি।

শেষ পর্যন্ত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে রাজধানী কারাকাসের সেফ হোম থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ শুরু হয়। শুরুতে সাধারণ মানুষ মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে বিক্ষোভে নামলেও পরে তা সরকার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়।

অভিযোগ ওঠেছে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক দমন–পীড়ন চালিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ দূত জানিয়েছেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সুযোগে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘সাহায্য আসছে’। তিনি হুমকি দেন, ইরান যদি বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তবে তিনি সামরিক ব্যবস্থা নেবেন।

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প তাঁর হুমকি কিছুটা কমিয়ে আনেন যখন ইরান সরকার তাঁকে আশ্বাস দেয়, কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না। গত সপ্তাহে যখন বিক্ষোভ পুরোপুরি দমে আসে, তখন ট্রাম্প দাবি করেন তাঁর চাপের কারণেই মৃত্যুদণ্ড বন্ধ হয়েছে, তবে ইরান তাঁর এই দাবি অস্বীকার করেছে।

তা সত্ত্বেও ট্রাম্পের কঠোর কথাবার্তা এবং ইরানের উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই অস্বাভাবিক অবস্থান দেখে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যেকোনো সময় হামলা শুরু হতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ উড়োজাহাজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, এই সামরিক সরঞ্জামগুলো ‘সতর্কতা হিসেবে’ নেওয়া হয়েছে। দরকার পড়লে ব্যবহারের জন্য সেগুলো মোতায়েন করা হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের বিশাল একটি নৌবহর ওই দিকে যাচ্ছে। হয়তো আমাদের এটি ব্যবহার করতে হবে না।’ তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেন, ইরান বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দিলে যুক্তরাষ্ট্র এমন হামলা চালাবে, যা গত জুনের হামলাকেও তুচ্ছ প্রমাণ করবে।

আমেরিকা কোন কোন সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করেছে, সে সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে কোন কোন মার্কিন সামরিক সম্পদ পৌঁছেছে

গত সোমবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে নিশ্চিত করেছে, ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখতে পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে গত নভেম্বরে রওনা দেওয়া এই জাহাজ গত সপ্তাহ পর্যন্ত দক্ষিণ চীন সাগরে ছিল। এটি মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ।

সেন্ট্রাল কমান্ড এই নৌবহর মোতায়েনের সুনির্দিষ্ট কারণ জানায়নি, তবে এটি স্পষ্ট, ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চরম উত্তেজনার সময়েই এই বড় নৌবহর পাঠানো হয়েছে।

গত মঙ্গলবার মার্কিন বিমানবাহিনীও (অ্যাফসেন্ট) তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে (মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ২০টি দেশ যেখানে মার্কিন ঘাঁটি আছে) কয়েক দিনব্যাপী যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে।

বিবৃতিতে বিমানবাহিনী জানায়, এই মহড়া তাদের দ্রুত সরঞ্জাম ও কর্মী মোতায়েনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এবং যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডেরেক ফ্রান্স বলেন, ‘এটি মূলত আমাদের বিমানসেনাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখার একটি প্রক্রিয়া, যাতে যখনই প্রয়োজন হয়, তখনই আকাশপথে শক্তি প্রদর্শন করা যায়। তবে এই মহড়ার নির্দিষ্ট স্থান বা সময় সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।’

২০২৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েই চলেছে। মূলত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের দমন করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। গাজার ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছিলেন হুতি যোদ্ধারা।

২০২৫ সালের জুন নাগাদ এই অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল বলে জানা যায়। বাহরাইন, মিসর, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আটটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

এ ছাড়া ওমান ও তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সামরিক স্থাপনা রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ জুন ইরান কাতারের আল-উদাইদ মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। এর আগের দিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালানোর কারণে তারা এই হামলা চালিয়েছিল। সে হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। কারণ, আগেভাগেই সেখান থেকে মার্কিন বিমান সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ইরানের ওই হামলাকে মূলত নিজেদের মান বাঁচানোর একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের ক্ষমতা কী

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন একটি ভাসমান বিমানঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। এতে ছয় থেকে সাত হাজার সেনা ও নাবিক থাকেন। এটি মার্কিন নৌবাহিনীর ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ৩’-এর প্রধান জাহাজ।

৩৩৩ মিটার লম্বা এই জাহাজ বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজগুলোর একটি। এটি পারমাণবিক শক্তিতে চলে, যার ফলে এটি ডিজেল ছাড়াই দশকের পর দশক চলতে পারে।

বিশাল আকার হওয়া সত্ত্বেও এটি বেশ দ্রুতগতিতে (ঘণ্টায় ৫৬ কিলোমিটারের বেশি) চলতে পারে, যার ফলে এটি দ্রুত আক্রমণ এড়াতে সক্ষম হয়।

এই জাহাজের সঙ্গে অন্তত তিনটি ছোট ও দ্রুতগতির ডেস্ট্রয়ার জাহাজ রয়েছে, যেগুলো এই বড় জাহাজকে পাহারা দেয়। এসব জাহাজ ইস্পাত দিয়ে তৈরি এবং এগুলো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে ও শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম।

এই ডেস্ট্রয়ার জাহাজগুলো হলো

-ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই পিটারসেন জুনিয়র: এতে অত্যন্ত উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

-ইউএসএস স্প্রুয়েন্স: এটি শক্তিশালী রাডার এবং সেন্সর সিস্টেমের জন্য পরিচিত। এটি সাবমেরিনবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে।

-ইউএসএস মাইকেল মারফি: এটি আগের জাহাজটিরই একটি নতুন মডেল।

এই নৌবহরে সাধারণত একটি ক্রুজার জাহাজ, একটি অ্যাটাক সাবমেরিন এবং একটি মালামাল সরবরাহকারী জাহাজও থাকে।

এই রণতরির সঙ্গে থাকা বিমানবাহিনীতে প্রায় ৬৫টি যুদ্ধবিমান থাকে। এর মধ্যে ‘এফ/এ-১৮ই সুপার হর্নেট’ প্রধান, যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে পারে।

২০২৫ সালের জুনের হামলায় কী ঘটেছিল

২০২৫ সালের ২২ জুন রাতে চার হাজার মার্কিন সেনা ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর মাধ্যমে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে (ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান) হামলা চালান।

ওই হামলায় ইরানের ওই কেন্দ্রগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, তারা সফলভাবে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নষ্ট করতে পেরেছে।

ফর্দো পারমাণবিক কেন্দ্রটি পাহাড়ের অনেক গভীরে অবস্থিত। সেটি ধ্বংস করতে ১২টি ‘বাংকার–বাস্টার’ বা বাংকারবিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল, যা মাটির ৬০ মিটার গভীর পর্যন্ত গিয়ে বিস্ফোরিত হতে পারে। এগুলো বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান থেকে ফেলা হয়েছিল।

নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রেও এই বাংকারবিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ইসফাহান গবেষণাকেন্দ্রে একটি মার্কিন সাবমেরিন থেকে ২৪টির বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তখন জানিয়েছিলেন, সে সময় এফ-৩৫ এবং এফ-২২ যুদ্ধবিমানও ইরানের আকাশে ঢুকেছিল। মোট ১২৫টি বিমান সেই অভিযানে অংশ নিয়েছিল এবং ইরান পাল্টা হামলা করার আগেই তারা ফিরে এসেছিল।

এটি ছিল ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি হামলা। এর আগে ২০২০ সালে কাশেম সোলাইমানিকে ইরাকের মাটিতে ড্রোন হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই মার্কিন সেনাদের অস্বাভাবিক তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। যেমন মূলত ইরানকে বিভ্রান্ত করার জন্য ২০ জুন তারা কিছু বোমারু বিমান গুয়াম ঘাঁটিতে পাঠিয়েছিল।

হামলার আগে ইউএসএস কার্ল ভিনসন ও ইউএসএস নিমিটজ নামের দুটি রণতরিও আরব সাগরে অবস্থান নিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও হামলার জন্য প্রস্তুত

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান প্রস্তুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরানে আবারও হামলা হতে পারে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের এলি গেরানমায়েহ মনে করেন, ট্রাম্প হয়তো বলবেন তিনি সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে এই হামলা চালিয়েছেন। তবে এই হামলার ঝুঁকি অনেক বেশি। ইরান যদি মনে করে তাদের অস্তিত্ব সংকটে, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা করতে পারে। এটি ট্রাম্পের জন্য নির্বাচনের বছরে বড় বিপদ হতে পারে।

ইরান পাল্টা আঘাত হিসেবে তেলের খনিগুলোতে হামলা করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ বন্ধ করে দিতে পারে। এ ছাড়া তারা ইসরায়েলের ওপরও হামলা চালাতে পারে।

গেরানমায়েহ আরও বলেন, গত জুনে হামলার পর ইরান বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায়নি। কিন্তু এবার তারা তেমনটা করবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অবশ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ভায়েজ মনে করেন, এখনই হামলা না–ও হতে পারে। কারণ, ইতিমধ্যে বিক্ষোভ ইরান সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এ ছাড়া এ ধরনের হামলা অনেক ব্যয়বহুল। এর উদ্দেশ্যও পরিষ্কার নয়।

ভায়েজ সতর্ক করে বলেন, যেকোনো সামরিক সংঘাতের চূড়ান্ত ফল ভোগ করতে হবে ইরানের ৯ কোটি সাধারণ মানুষকে। এতে দেশটির সরকার টিকে থাকলেও তারা জনগণের ওপর আরও কঠোর হবে এবং এই অঞ্চলে আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। ছবি: ইউএস নেভি

ট্রাম্প যেভাবে আমেরিকাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন by মো. আবু নাসের

২০০৩ সালের ১ মে। সন্ধ্যার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ যুদ্ধজাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, ইরাকে বড় ধরনের যুদ্ধপর্ব শেষ হয়েছে। তাঁর মাথার ঠিক ওপরে ঝুলছিল বিশাল ব্যানার, যেখানে লেখা: ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’।

জাহাজটি ইরাকের ধারেকাছে কোথাও ছিল না। সেটি প্রায় সাড়ে বারো হাজার কিলোমিটার দূরে ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগো শহরের সমুদ্রপাড়ে নিরাপদে অবস্থান করছিল।

টেলিভিশনের পর্দায় আর সংবাদপত্রের পাতায় দিনের পর দিন ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’লেখা হলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অতিরিক্ত শক্তিপ্রদর্শন আর বিজয়োল্লাস বড় ধরনের যুদ্ধ বন্ধ করতে পেরেছিল, কিন্তু ওই ঘোষণা ইরাকের নিরাপত্তা আর দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বৈধতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

বুশের ওই নাটকীয় ভাষণের পর শুরু হয় বিদ্রোহ আর আঞ্চলিক অস্থিরতা। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটা ছিল বড় ধরনের একটা শিক্ষা।

এই শিক্ষা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নিজেকে ‘আয়রনম্যান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছেন। বিভিন্ন দেশ আর ব্যক্তিকে ভয় দেখাচ্ছেন। ব্যবহার করছেন আক্রমণাত্মক ভাষা। অন্যায্য শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যান্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করছেন। বিশ্বে আমেরিকার অবস্থান ক্রমে ক্ষয় হচ্ছে। শক্তি যখন রুক্ষ বা অসংগতভাবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা প্রতিপক্ষকে বশ মানায় না; বরং মিত্রদের দূরে ঠেলে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের শেখায় কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটাতে হয়।

শক্তির সঙ্গে সংযম, আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে শৃঙ্খলা—এ মিশ্রণই হয়ে উঠেছিল আমেরিকান নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য। আজ সেই ঐতিহ্য গভীর চাপের মুখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা টিকে আছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি তা থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। পরিহাস হলো, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামে প্রচারিত এসব নীতি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার গুরুত্বই কমিয়ে দিতে পারে।

বহু দশক ধরে বিশ্বনেতৃত্বের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল প্রশ্নাতীত। অতুলনীয় সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়েছে। শুধু শক্ত আঘাত হানতে পারার ক্ষমতার কারণে নয়, বরং নানা দেশকে নিজের জোটে এনে যুক্তরাষ্ট্র শত্রুদের নিবৃত্ত করেছে। জোটভুক্ত দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভারসাম্য রক্ষা করে চলছিল। কিন্তু শক্তি আর ভীতিপ্রদর্শনকে কৌশলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্প এই ভারসাম্য ভেঙে দিচ্ছেন।

ট্রাম্পের ভাষা প্রায়ই উত্তেজনা বাড়ায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, বিশ্বাসযোগ্যতা শব্দের উচ্চতায় মাপা যায় না। শীতল যুদ্ধের সময় ট্রুম্যান থেকে রিগ্যান পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বুঝেছিলেন যে সংযম অনেক সময় স্থিতিশীলতা আনে। কিউবান ক্ষেপণাস্ত্রসংকট সমস্যার সমাধান হয়েছিল গোপন কূটনীতি ও পারস্পরিক ছাড়ের মাধ্যমে, হুমকির মাধ্যমে নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা হঠাৎ গড়ে ওঠেনি। ১৯৪৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও ন্যাটোর মতো প্রতিষ্ঠান গঠনে নেতৃত্ব দেয়।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে যেমন আমেরিকার প্রভাব নিশ্চিত করে, অন্যদিকে মিত্রদের আশ্বস্ত করে। প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও স্থিতিশীল রাখে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও কূটনৈতিক রীতিনীতি দানশীলতার নিদর্শন নয়; এগুলো ছিল ক্ষমতার হাতিয়ার।

নিয়ম নির্ধারণের মাধ্যমে ওয়াশিংটন নিশ্চিত করেছিল, বৈশ্বিক বাণিজ্য, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা এমন কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হবে, যা তারা মূলত নিয়ন্ত্রণ করে।

ট্রাম্পের নীতিগুলো এই কাঠামোর ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করছে। জোটের প্রতি সন্দেহ, বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি বৈরিতা এবং স্বল্পমেয়াদি, লেনদেনভিত্তিক চুক্তির প্রতি ঝোঁক—এসবই আমেরিকান আধিপত্য টিকিয়ে রাখার দীর্ঘদিনের যুক্তির সঙ্গে তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প যখন ন্যাটোকে ‘খারাপ চুক্তি’ বলে আক্রমণ করেন বা মিত্রদের বোঝা হিসেবে দেখেন, তখন তিনি আসলে সেই নেটওয়ার্কগুলোই দুর্বল করেন, যা আমেরিকার শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একা দাঁড়ানো আমেরিকা শক্তিশালী নয়; সে কেবল বিচ্ছিন্ন।

ট্রাম্প ভীতিপ্রদর্শনকে কূটনীতির বিকল্প বানানোয় আমেরিকার নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি কেবল ধ্বংস করার ক্ষমতা থেকে প্রসূত নয়, বরং আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো আমেরিকাকে শক্তি জুগিয়েছে।

ট্রাম্প যখন শক্তিশালী স্বৈরশাসকদের প্রশংসা করেন, মানবাধিকারসংক্রান্ত উদ্বেগ উড়িয়ে দেন বা আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে যান, তখন তিনি মার্কিন নেতৃত্বের আকর্ষণই কমিয়ে দেন।

ইতিহাস বলে, পরাশক্তিগুলো দুর্বল হয় শক্তি হারিয়ে নয়, বরং শক্তির অপব্যবহার করে। জাহাজ বা সৈন্যের অভাবে ব্রিটেনের পতন ঘটেনি, বরং অতিরিক্ত বিস্তার ও অংশীদারদের দূরে ঠেলে দেওয়ার কারণে পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নও কেবল সামরিক দুর্বলতার জন্য ভেঙে পড়েনি; ভীতিপ্রদর্শন দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষয়কে ঢাকতে পারেনি।

বাণিজ্যের কথাই ধরা যাক। দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্র উন্মুক্ত বাজারের পক্ষে ছিল। অন্য অর্থনীতিগুলোকে আমেরিকার সঙ্গে বেঁধে রাখত। ট্রাম্পের শুল্ক আর বাণিজ্যযুদ্ধ অন্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নিয়ে ভাবছে। এশীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনকে পাশ কাটিয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্য জোরদার করছে। এমনকি দীর্ঘদিনের অংশীদাররাও প্রশ্ন করছে, আমরা কি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারি?

এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্ষমতার শূন্যতা টিকে থাকে না। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ায় অন্যরা সামনে এগিয়ে আসছে। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ থেকে শুরু করে নতুন উন্নয়ন ব্যাংক পর্যন্ত বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে।

পশ্চিমা ঐক্যের ফাটল কাজে লাগিয়ে রাশিয়া কম খরচে নিজের প্রভাব বাড়াচ্ছে। তুরস্ক, ভারত, ব্রাজিলের মতো মাঝারি শক্তিগুলো এমন এক বহুমুখী বিশ্বের পরীক্ষা করছে, যেখানে আমেরিকার পছন্দ-অপছন্দের গুরুত্ব কম।

ট্রাম্প আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে নয়, বরং শূন্যসম প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেন—যেখানে কেউ জেতে, কেউ হারে। এই দৃষ্টিতে নিয়ম মানে শৃঙ্খল, কূটনীতি মানে দুর্বলতা, আর পূর্বানুমেয়তা ঐচ্ছিক। কিন্তু ক্ষমতার এক বড় বৈপরীত্য হলো, আধিপত্য টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপর। মিত্ররা শুধু শত্রুকে ভয় করে, অনুসরণ করে না; তারা অনুসরণ করে, কারণ তারা বিশ্বাস করে, নেতার কথার মূল্য আছে। যখন মার্কিন অঙ্গীকার একক নেতার মেজাজের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে হয়, তখন প্রজন্মের পর প্রজন্মে গড়ে ওঠা বিশ্বাস দ্রুত ভেঙে পড়ে।

ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলেন, পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা এমনিতেই ব্যর্থ হচ্ছিল; বৈশ্বিকীকরণ আমেরিকান সমাজকে ফাঁপা করে দিয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের শক্তিশালী করেছে। তারা সমস্যার বিষয়ে সঠিক, কিন্তু সমাধানের বিষয়ে ভুল। ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার উত্তর সেটিকে পরিত্যাগ করা নয়, বরং সংস্কার করা। টেবিল ছেড়ে উঠে গেলে প্রতিপক্ষ শাস্তি পায় না; বরং তারা চেয়ারগুলো নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ পায়।

এটা ঠিক, ট্রাম্পের পথ যুক্তরাষ্ট্রকে তাৎক্ষণিক পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু তাঁর নীতি দেশটিকে ধীরে ধীরে গুরুত্বহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কৌশলের বদলে দাম্ভিকতা এবং নেতৃত্বের বদলে জবরদস্তি বেছে নিয়ে তিনি আমেরিকার নিরাপত্তার ভিত্তিই দুর্বল করছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি মানে কে কত জোরে হুমকি দেয় তা নয়, বরং কতজন বিশ্বাস করে যে তার পাশে দাঁড়ানো সার্থক।

শেষ পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তা কেবল ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এটি টিকে থাকে বিশ্বাস, বিশ্বাসযোগ্যতা ও সংযত শক্তি ব্যবহারের ওপর। এই মানদণ্ডে ট্রাম্পের কঠোরতার রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চেয়ে কম নিরাপদ—এবং কম সম্মানিত—করে তুলেছে।

* ড. মো. আবু নাসের, চেয়ারপারসন, কমিউনিকেশনস বিভাগ, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ড

https://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2019%2F03%2F25%2Fee9d5c94baa39e9c6bdbb0ebf4e400c8-5c986062b77d6.jpg?rect=61%2C0%2C659%2C439&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র, ২৪ মার্চ ২০১৯। ছবি: রয়টার্স

দেয়াল বেয়ে ১০১ তলা ভবনের চূড়ায় অ্যালেক্স হনোল্ড

প্রকাশ ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ঃ পরিষ্কার আকাশ আর ঝকঝকে রোদের মধ্যে তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে কয়েক হাজার মানুষ টান টান উত্তেজনা আর উদ্বেগ নিয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁরা দেখছেন অ্যালেক্স হনোল্ডকে। হনোল্ড খালি হাতে একটু একটু করে আকাশচুম্বী এক ভবনের দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠছেন।

গতকাল রোববার সকালে হনোল্ড যে ভবনের দেয়াল বেয়ে উঠছিলেন, সেটি তাইপে নগরের বিখ্যাত ‘তাইপে–১০১’। সুউচ্চ এই ভবন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবনগুলোর একটি। শেষ পর্যন্ত এই ভবনের চূড়ায় উঠতে সক্ষম হন তিনি।

হনোল্ড একজন পর্বতারোহী। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি কোনো দড়ি, নিরাপত্তা জাল বা অন্য কোনো সরঞ্জাম ছাড়াই শুধু খালি হাতে তাইপে ১০১ ভবন বেয়ে উঠেছেন। হাত পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া এড়াতে তাঁর সঙ্গে শুধু এক ব্যাগ চকের গুঁড়া ছিল।

রোববার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৪৩ মিনিটে তিনি ১ হাজার ৬৬৭ ফুট (৫০৮ মিটার) উঁচু ভবনের চূড়ায় পৌঁছান, নিচে তাঁর ভক্ত–দর্শকেরা করতালি দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। পুরো ভবন বেয়ে উঠতে তিনি ৯২ মিনিট সময় নেন।

অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই আরোহণের পর এক সংবাদ সম্মেলনে হনোল্ড বলেন, ‘এটা সত্যিই অসাধারণ। আমি নিশ্চিত, অনেক দিন ধরে এ আনন্দ আমার ভেতর জ্বলজ্বল করবে—এটা অবিশ্বাস্য!’

নিজের অনুভূতির বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আপনি এটা নিয়ে দীর্ঘদিন ভাববেন, মনে হবে, এটা অসম্ভব। কিন্তু বাস্তবে যখন আপনি কাজটি করে ফেলবেন, সে সময়ের অনুভূতিটা সত্যিই আলাদা।’

হনোল্ডের বয়স ৪০ বছর। প্রায় দুই দশক ধরে পর্বতারোহীদের মধ্যে তিনি পরিচিত মুখ। তবে ২০১৭ সালে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইওসেমিটি ন্যাশনাল পার্কের ‘এল কেপিট্যান’ বেয়ে উঠে সারা বিশ্বের পরিচিতি পান। তাঁর শ্বাসরুদ্ধকর ওই অভিযানের তথ্যচিত্র ‘ফ্রি সলো’ পুরস্কার জিতেছে। তার পর থেকে তিনি একের পর এক রেকর্ড গড়ে চলেছেন। প্রায় এক দশক ধরে তিনি তাইপে–১০১ ভবন বেয়ে ওঠার পরিকল্পনা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত নেটফ্লিক্স তাঁকে এ সুযোগ করে দেয়।

হনোল্ড গত শনিবার তাইপে–১০১ ভবন বেয়ে ওঠার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেই পরিকল্পনা এক দিন পেছাতে হয়।

হনোল্ডের আগে ২০০৪ সালে ফরাসি পর্বতারোহী আলাঁ রবার্ট তাইপে–১০১ ভবনের দেয়াল বেয়ে উঠেছিলেন, তবে তিনি ভবন বেয়ে উঠতে রশি ব্যবহার করেছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-26%2F8ugfcac8%2FCapture.PNG?rect=0%2C23%2C871%2C581&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কোনো কিছুর সাহায্য ছাড়া খালি হাতে তাইপের আকাশচুম্বী ভবনের দেয়াল বেয়ে উঠছেন অ্যালেক্স হনোল্ড। ছবি: রয়টার্স

কারাগারে দুই খুনির প্রেম, বিয়ে করতে পাচ্ছেন প্যারোলে মুক্তি

খুনের দায়ে কারাগারে সাজা খাটতে গিয়ে দুজনের জানাশোনা, তারপর শুরু হয় প্রেম। এতটুকুতেই শেষ নয়। রীতিমতো বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। বিয়ে সারতে কারাগার থেকে সাময়িক সময়ের জন্য মুক্তিও পাচ্ছেন এ যুগল।

শুনতে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের মতো মনে হলেও ভারতের রাজস্থান রাজ্যের আলওয়ারে ঘটেছে এমন ঘটনা।

প্রিয়া শেঠ (আরেক নাম নেহা শেঠ) নামের এক নারী এবং তাঁর হবু বর হনুমান প্রসাদ বিয়ের জন্য রাজস্থানের হাইকোর্ট থেকে ১৫ দিনের জরুরি প্যারোল পেয়েছেন। আজ শুক্রবার আলওয়ারের বারোদামেভে তাঁদের গাঁটছড়া বাঁধার কথা।

প্রিয়া যেভাবে খুনে জড়ান

প্রিয়া শেঠ পেশায় মডেল ছিলেন। দুশ্যন্ত শর্মা নামের এক তরুণকে খুনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে তাঁর। সাঙ্গানের ওপেন জেল নামে এক উন্মুক্ত কারাগারে সাজা ভোগ করছেন প্রিয়া। এ কারাগারটি প্রচলিত কারাগারের তুলনায় খোলামেলা এবং বন্দীরা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনতা পেয়ে থাকেন। ছয় মাস আগে একই কারাগারে প্রসাদের সঙ্গে প্রিয়ার পরিচয় হয় এবং তাঁরা প্রেমে পড়েন।

যে খুনের মামলায় প্রিয়া শেঠ দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তা ২০১৮ সালের ঘটনা। ওই বছরের ২ মে প্রিয়া শেঠ তাঁর প্রেমিক দীক্ষান্ত কামরা এবং অপর এক ব্যক্তির সঙ্গে মিলে দুশ্যন্তকে হত্যা করেন। দুশ্যন্তের সঙ্গে তাঁর ডেটিং অ্যাপে পরিচয় হয়েছিল।

প্রিয়ার পরিকল্পনা ছিল দুশ্যন্তকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা এবং সে অর্থ দিয়ে তাঁর প্রেমিক দীক্ষান্ত কামরার ঋণ পরিশোধ করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ডেটিং অ্যাপে দুশ্যন্তের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন প্রিয়া। এরপর তাঁকে বাজাজ নগরের একটি ফ্ল্যাটে ডেকে নেন এবং তাঁর বাবার কাছ থেকে ১০ লাখ রুপি মুক্তিপণ দাবি করেন।

দুশ্যন্তের বাবা তিন লাখ রুপি পাঠাতে পেরেছিলেন। তবে একপর্যায়ে প্রিয়া এবং তাঁর প্রেমিক দীক্ষান্তের মনে হলো, তাঁরা দুশ্যন্তকে ছেড়ে দিলে তিনি তাঁদের পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারেন।

গ্রেপ্তার এড়াতে প্রিয়া শেঠ, কামরা ও তাঁর বন্ধু লক্ষ্য ওয়ালিয়া মিলে দুশ্যন্তকে হত্যা করেন। তাঁরা মরদেহ স্যুটকেসে ভরে একটি পাহাড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। দুশ্যন্তকে যেন না চেনা যায়, তা নিশ্চিত করতে তাঁরা তাঁর মুখ ছুরি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিলেন। প্রমাণ ধ্বংসের জন্য ফ্ল্যাটটিও পরিষ্কার করেছিলেন তাঁরা।

পরদিন ৩ মে রাতে পাহাড় থেকে দুশ্যন্তের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শেষ পর্যন্ত প্রিয়া, দীক্ষান্ত ও ওয়ালিয়া ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার হন।

পাঁচ হত্যাকাণ্ডের পেছনে হনুমান প্রসাদ

হনুমান প্রসাদ তাঁর প্রেমিকার স্বামী ও সন্তানদের হত্যার দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। আলওয়ারের তায়কোয়ান্দো খেলোয়াড় সন্তোষ ছিলেন তাঁর প্রেমিকা। ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর রাতে সন্তোষ তাঁর স্বামীকে হত্যা করতে হনুমানকে তাঁর বাড়িতে ডেকেছিলেন। হনুমান একজন সহযোগীকে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। পশু জবাইয়ের জন্য ব্যবহৃত ছুরি দিয়ে সন্তোষের স্বামী বনওয়ারী লালকে খুন করেন তিনি।

সন্তোষের তিন সন্তান ও তাঁদের সঙ্গে থাকা এক ভাতিজা জেগে ওঠে এবং খুনের ঘটনা দেখে ফেলে। ধরা পড়ার ভয়ে সন্তোষ তাঁর সন্তান ও ভাতিজাকেও হত্যা করতে বলেন। হনুমান প্রসাদও তা–ই করেন। সেই রাতে চার শিশু ও এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছিল। এটি আলওয়ারের কুখ্যাত হত্যা মামলাগুলোর একটি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-23%2Flu2zccar%2FUntitled-1.png?rect=53%2C0%2C564%2C376&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বিয়ের প্রতীকী ছবি। ছবি: এএনআই

হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে আরব বসন্তের কথা কি ৩ কোটি মিসরীয় জানেন

প্রকাশ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ঃ মিসরে আরব বসন্ত শুরুর পর ১৫টি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। এর মাত্র ১১ দিন আগে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলীকে ক্ষমতাচ্যুত করেন আন্দোলনকারীরা। সেখানকার সফল গণ-অভ্যুত্থান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মিসরের জনগণও মুক্তি চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন তাঁদের কথাও যেন শোনা হয়।

বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ১৮ দিন ধরে সড়কে অবস্থান নেন মিসরের লাখ লাখ বিক্ষোভকারী। তাঁরা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবি জানান।

মিসরের জনগণের গড় বয়স প্রায় ২৪ বছর। বিশ্বের যেসব দেশে তরুণদের সংখ্যা বেশি, মিসর তার মধ্যে একটি। দেশটির প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের কম। এই শিশুদের জন্য আরব বসন্ত এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যা তারা বড়দের কাছ থেকে জেনেছে।

মিসরের তরুণ জনগণ

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে মিসরের জনসংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৩০ লাখ। বেকারত্বের হার ১২ শতাংশ। মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২ হাজার ৫৯০ মার্কিন ডলার। ওই সময় ১ ডলারে ৫ দশমিক ৮ মিসরীয় পাউন্ড পাওয়া যেত।

১৫ বছর পর মিসরের জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ বেড়ে ১২ কোটি হয়েছে। দেশটির বেকারত্বের হার কমে এখন ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। আর মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৩ হাজার ৩৩৯ মার্কিন ডলার। তবে এ সময় ডলারের বিপরীতে মিসরের মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন হয়েছে। বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারে প্রায় ৪৭ মিসরীয় পাউন্ড পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি অনেক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।

মিসরের জনগণ তুলনামূলক তরুণ। দেশটির অর্ধেকের বেশি নাগরিকের বয়স ২৪ বছরের নিচে, যা বিশ্বের সব দেশের তরুণদের গড় বয়স ৩১ বছরের চেয়ে প্রায় ৭ বছর কম।

ইকোনমিক রিসার্চ ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, মিসরে প্রতিবছর ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান দরকার। কিন্তু গত দুই দশকে দেশটিতে বছরে মাত্র ছয় লাখের কর্মসংস্থান হয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন কারিগরি ইনস্টিটিউটসহ প্রায় ৩৬ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। আধুনিক অর্থনীতির চাহিদা পূরণ করতে ২০৩২ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৫৬ লাখে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

মিসরে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। এর প্রায় পুরোটাই তরুণদের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে মোবাইল সংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার বড় ভূমিকা রাখছে।

মিসরের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থার (সিএপিএমএএস) তথ্য অনুযায়ী, বেকারত্বের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এলেও ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখনো প্রায় ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

আরব বসন্তের সময় ১৮ দিনে মিসরে কী কী ঘটেছিল

২৫ জানুয়ারি ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে মিসরে আরব বসন্তের শুরু হয়, যা ১৮ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। অবশেষে ১১ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগ করে সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেন।

আরব বসন্তের সময় মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মিসরীয়রা তাঁদের লড়াই-সংগ্রামের ছবি ও ভিডিও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।

সে সময়ের ১৮ দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রধান ঘটনা সংক্ষিপ্ত আকারে নিচে তুলে ধরা হলো—

২৫ জানুয়ারি: পুলিশের বার্ষিক অনুষ্ঠানের দিন সারা দেশে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেন। ৩০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবি ওঠে।

২৮ জানুয়ারি: জুমার নামাজের পর হাজার হাজার মানুষ কায়রোর তাহরির স্কয়ারের দিকে রওনা দেন। প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক প্রথমবার টেলিভিশনের সামনে হাজির হন এবং গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

১ ফেব্রুয়ারি: দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা যাতে কায়রো পৌঁছাতে না পারেন, তা ঠেকাতে সব ধরনের ট্রেন পরিষেবা বন্ধ করে দেয় সরকার।

২ ফেব্রুয়ারি: হোসনি মোবারকের সমর্থকেরা কেউ উটে চড়ে কেউ–বা ঘোড়ায় চড়ে কায়রোর বিক্ষোভ দমন করতে নিষ্ঠুর চেষ্টা চালান। তাঁরা ব্যাট ও ছুরি ব্যবহার করে তাহরির স্কয়ারে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু করেন।

১০ ফেব্রুয়ারি: হোসনি মোবারকের পদত্যাগের গুঞ্জন ওঠে। তিনি ওই দিন এক ভাষণে ঘোষণা দেন, তিনি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। এতে তাহরির স্কোয়ারে জনতার ক্রোধ ফেটে পড়েন।

ফেব্রুয়ারি ১১ (মোবারকের পদত্যাগ): ১৮ দিনের ব্যাপক বিক্ষোভের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেইমান ঘোষণা করেন, হোসনি মোবারক পদত্যাগ করে সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন।

আরব বসন্তে অন্যান্য দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী

মিসরের মতো, আরব বসন্তের সময় আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশের সরকারপ্রধানদের উৎখাত করা হয়েছে। সেসব দেশের বড় একটি অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী।

তিউনিসিয়ায় মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ২২ লাখ। তার মধ্যে ২০ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ অর্থাৎ ২৪ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে। অন্যদিকে লিবিয়ায় বর্তমান জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ বা ৭৪ লাখের বয়স ১৫ বছরের নিচে।

সিরিয়ায় আড়াই কোটি মানুষের মধ্যে ৭২ লাখ কিংবা ২৯ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের কম। ইয়েমেনে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশে ৪ কোটি মানুষের মধ্যে ৪১ শতাংশ বা ১ কোটি ৭০ লাখের বয়স ১৫ বছরের কম।

মিসরে হোসনি মোবারকবিরোধী গণ-আন্দোলনের ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে
মিসরে হোসনি মোবারকবিরোধী গণ-আন্দোলনের ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। ফাইল ছবি: এএফপি

অরণ্যের দেবী বনবিবির পূজা: পুঁথির ছন্দে বেঁচে থাকার প্রার্থনা by ইমতিয়াজ উদ্দীন

প্রকাশ ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ঃ
‘বিপদে পড়িয়া বনে যে জনে ডাকে,

মা বলিয়া বনবিবি দয়ার মা তাকে

উদ্ধারিও তারে তোর আপনার গুণে...’

একটানা ছন্দে পুঁথিপাঠ চলছে। চারপাশে গোল হয়ে বসে আছেন বনজীবী নারী-পুরুষ। এটি কেবল তাঁদের কাছে পুঁথিপাঠ নয়, বিশ্বাস, ভরসা ও বেঁচে থাকার প্রার্থনা। সামনে মন্দিরের ভেতর বনবিবির থান (বেদি)। তাঁর নারীমূর্তির পাশে ভাই শাহ জঙ্গলি, গাজী আউলিয়া, শিশু দুঃখে ও বনবিবির দুই চাচা ধনাই ও মনাই। একটু দূরে দক্ষিণ রায়—বাঘের প্রতীকী মূর্তি।

বৃহস্পতিবার খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন চরামুখা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এই দৃশ্য। সুন্দরবন উপকূলের মানুষের বিশ্বাস, বনবিবি অরণ্যের দেবী। বাঘ, কুমিরসহ সব হিংস্র প্রাণী তাঁর অনুগত। তাই প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে কয়রার সুন্দরবনঘেঁষা গ্রামগুলোতে হয় বনবিবির পূজা ও মেলা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কয়রার চরামুখা গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে উৎসবের রং। কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ঘেঁষে বনবিবির মন্দির, সামনে খোলা মাঠজুড়ে মেলার আয়োজন। মন্দিরে নারী-পুরুষের ভিড়। কেউ পুঁথিপাঠ শুনছেন, কেউ প্রসাদ নিচ্ছেন, কেউ নীরবে প্রার্থনায় মগ্ন। প্রার্থনা শেষে মানুষ ঢুকছেন মেলা প্রাঙ্গণে। মন্দিরের সামনের মাঠ আর বেড়িবাঁধের পাশে দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সাজিয়েছেন পসরা—খাবার, খেলনা, মৃৎশিল্পসহ নানা পণ্যে জমজমাট বেচাকেনা।

বনবিবি মন্দিরের সভাপতি ভোলানাথ মাঝি বলেন, চরামুখা গ্রামে ১২৮৩ বঙ্গাব্দ থেকে প্রতিবছর পয়লা মাঘে বনবিবির পূজা ও মেলা হয়ে আসছে। বনবিবি সুন্দরবন উপকূলের বনজীবীদের মনে ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রতীক। বনে গিয়ে যেন নিরাপদে ফেরা যায়, ভালো আয় হয়—এই কামনাতেই আদিকাল থেকে এই পূজা হয়।

মন্দির থেকে বেরিয়ে কথা হয় স্থানীয় বনজীবী সুভাষচন্দ্র মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাঘ-কুমিরসহ সব জন্তু বনবিবির কথা মানে—এইডাই আমাগের বিশ্বাস। জন্মের পর থেইকে আমরা মা বনবিবির পূজা কইরে আসটিছি। তাঁর আশীর্বাদে বিপদ কাটে।’

চরামুখা বনবিবি মেলার অন্যতম আয়োজক স্বরূপ মাঝি বলেন, একসময় এই এলাকায় বাঘের অত্যাচার ছিল। তখন তাদের বংশের পূর্বপুরুষ মধু মাঝি স্বপ্নে বনবিবির নির্দেশ পান পূজা দেওয়ার। সেই থেকেই মন্দির স্থাপন ও মেলার সূচনা। তিনি বলেন, ‘বংশপরম্পরায় আমরা এই আয়োজন করছি। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে যুগ যুগ ধরে এই উৎসব চলছে। মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে এই দিনের জন্য।’

চরামুখা ছাড়াও কয়রার ঘড়িলাল, ১ নম্বর কয়রা, বানিয়াখালী, নয়ানীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে একই চিত্র। গ্রামবাসীরা মণ্ডপ তৈরি করে পুঁথি পাঠের মধ্য দিয়ে বনবিবিকে স্মরণ করছেন। কয়রা নদীর তীরবর্তী নয়ানী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মন্দিরে চলছে বনবিবির পূজার বয়ান। পুরোহিত নীলকণ্ঠ মিস্ত্রি ছন্দে ছন্দে পড়ছেন ‘বনবিবি জহুরানামা’—বনবিবির মায়া, শিশু দুখের উদ্ধারের কাহিনি, বনজীবীদের রক্ষার আখ্যান।

মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে নয়ানী গ্রামের শিবপদ মণ্ডল বলেন, ‘আমাগের গ্রামে ১০০ বছরের বেশি সময় ধইরে এই পূজা হয়ে আসটিছে। আগে সুন্দরবনের ভেতর গিয়ে বনবিবির থান বানায়ে পূজা হুতো। কিন্তু এখন গ্রামেই আয়োজন করা হচ্ছে। শত শত মানুষ নিয়ে বনে ঢোকা এখন বড্ড ঝুঁকির কাজ।’

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁর ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে সুন্দরবন অঞ্চলে বনবিবিসহ আরও কাহিনি প্রচলিত ছিল।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ তাঁর ‘সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার আগমনের মধ্য দিয়েই সুন্দরবনে বনবিবি-সংক্রান্ত কাহিনির বিকাশ ঘটে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বনজীবীদের কাছে বনবিবি হয়ে ওঠেন সুন্দরবনের রানি ও অভিভাবক।

বনবিবির মন্দিরে চলছে পুঁথি পাঠ ও প্রার্থনা। বৃহস্পতিবার খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারিতে
বনবিবির মন্দিরে চলছে পুঁথি পাঠ ও প্রার্থনা। বৃহস্পতিবার খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারিতে। ছবি: সাদ্দাম হোসেন