Friday, April 29, 2022

২০২২-এর গ্রীষ্মে কোথায় দাঁড়িয়ে কাশ্মীর by শুভজিৎ বাগচী

পরপর দুই বছর—২০১৬ ও ২০১৭ সালের গ্রীষ্মে কাশ্মীরে বড় ধরনের আন্দোলন হয়েছিল। ২০১৬ সালে আন্দোলন হয়েছিল জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিনের তরুণ সেনাধ্যক্ষ বুরহান ওয়ানির বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুতে। ২০১৭ সালে হিজবুলের পরবর্তী কমান্ডার সবজার বাটের একইভাবে মৃত্যুর কারণে আন্দোলন হয়েছিল। এই দুই বছরে কাশ্মীরে থেকে আমি দেখেছি, কীভাবে স্কুল–কলেজের ছেলেমেয়েদের নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সেই আন্দোলন সামাল দিতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়েছিল ভারতের ত্রিস্তরীয় (সেনাবাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী, পুলিশ) নিরাপত্তাব্যবস্থাকে। দুই বছরেই ছররা বন্দুক (শটগান) বা শক্তিশালী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীর বড় একটা অংশ আহত হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের ভাবমূর্তি ধাক্কা খেয়েছে।

এরপরেই আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের কায়দাকানুন পাল্টে ফেলে ভারত। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পর দেখেছি, সামান্য উত্তেজনা দেখা দিলেই স্থানীয় ছেলেদের একটা অংশকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, গুলি চালানোর প্রয়োজন হচ্ছে না। ছাত্রছাত্রীদের সমর্থনকারী আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, মানবাধিকারকর্মীদের বড় অংশকে গ্রেপ্তার করা হয়। পত্রপত্রিকায় সরকারবিরোধী খবর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া দিল্লি ও কাশ্মীরের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করত যেসব রাজনৈতিক দল (প্রধানত ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি) এবং নেতা–নেত্রী, তাঁদের প্রায় সবাইকেই গ্রেপ্তার করে ভালো হোটেলে বা তাঁদের বাসায় রাখা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে রাজ্যটিকে যখন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করলেন, তখনো মনে করা হয়েছিল ২০১৬ সালের মতোই মানুষ রাস্তায় নামবে। কিন্তু তা হয়নি। ফলে গত পাঁচ বছরে ভারত সরকার যে কাশ্মীরকে প্রায় বিনা রক্তপাতে দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, তা অনস্বীকার্য।

প্রশ্ন হলো, এর পরের ধাপ কী? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বুঝে নেওয়া জরুরি যে অন্য রাজ্যের মতো কাশ্মীরের সমস্যা ও বিবাদ, শুধু কাশ্মীরেরই নয়। এর সঙ্গে গোটা ভারতের রাজনীতি জড়িয়ে আছে। হয়তো পুরো উপমহাদেশের রাজনীতিও। কাশ্মীরে ভারতের সরকার কী অবস্থান নিচ্ছে, এর ওপর অন্য রাজ্যে, বিশেষত উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ক্ষমতাসীন দলের জেতা-হারা অনেকটাই নির্ভর করছে। কাশ্মীরে কড়া অবস্থান নিলে ক্ষমতাসীন দলের অন্য রাজ্যে নম্বর বাড়ে। পাকিস্তানেও এই রাজনীতি চলে। কাশ্মীরে ভারতবিরোধী অবস্থান না নিলে ইসলামাবাদে ক্ষমতায় থাকা মুশকিল। কাশ্মীর নিয়ে কড়া অবস্থান তাই দুই দেশেই জরুরি। বর্তমানে পাকিস্তানে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা চলছে। অর্থনৈতিকভাবেও পাকিস্তান বিপর্যস্ত। তাই কাশ্মীরের দিকে তারা খুব একটা নজর দিতে পারছে না বলে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই মনে করেন। তবে ভারতের অবস্থা ভিন্ন।

ভারতে আগামী দুই বছরের মধ্যে জাতীয় লোকসভা নির্বাচন। সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে এটা বোঝা যায়, কেন্দ্রে এবং বড় রাজ্যে উন্নয়ন, শিক্ষা, কাজ, স্বাস্থ্য—এসবের ভিত্তিতে নির্বাচন হচ্ছে না। নির্বাচন প্রায় পুরোপুরিভাবে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ ও তার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া মেরুকরণ ঘিরে হচ্ছে। এ নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই, ২০২৪ সালে যখন বিজেপি তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার জন্য লড়বে, তখন এই মেরুকরণের রাজনীতি একটা চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছাবে। অথচ ২০১৯ সালের মতো বিজেপির হাতে রামমন্দির নির্মাণের ইস্যু নেই, যা দিয়ে ধর্মীয় ভাবাবেগ জাগিয়ে তোলা যাবে। তাই কাশ্মীর নতুন করে নির্বাচনের আগে ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের অনেকেই মনে করছেন।

তাঁদের বক্তব্য, এই লক্ষ্যেই দ্য কাশ্মীর ফাইলস-এর মতো একটি ছবি তৈরি করা হয়েছে, যার প্রচার করেছেন স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নব্বইয়ের দশকে সংঘাতের জেরে কাশ্মীরের হিন্দু পণ্ডিতদের বিতাড়ন ছবির বিষয়। কাশ্মীরের মানুষের ধারণা, বিষয়টি এখানে থেমে থাকবে না। ভারতের জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই কাশ্মীর ছেড়ে যাওয়া পণ্ডিত এবং ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা অংশকে কাশ্মীরে স্থায়ীভাবে বসানোর চেষ্টা শুরু হবে। কাশ্মীরে যদি পুনর্বাসনের বিরোধিতা হয়, তবে বিষয়টি ধরে ভারতের অন্য প্রান্তে—বিশেষত উত্তর ও পশ্চিম ভারতে মেরুকরণের একটা হাওয়া উঠবে। তবে কাশ্মীর প্রশ্নের এটা একটা দিক।

অন্য দিকগুলো আরও জটিল। এ সময়ে দাঁড়িয়ে, কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে। একপক্ষ মনে করে, এখন যেভাবে চলছে, অর্থাৎ মানুষের যাবতীয় অধিকার অগ্রাহ্য করে, শক্তি প্রয়োগ করেই কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করতে হবে। এর কারণ, সুশীল সমাজ এবং কাশ্মীরের রাজনৈতিক দলকে কথা বলতে দিলেই সমস্যা বাড়বে।

অপর পক্ষের বক্তব্য, আপাতত যথেষ্ট হয়েছে। এখন কিছুটা চাপ কমিয়ে মানুষ, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক নেতাদের কথা বলার অধিকার দিতে হবে। তাঁরা এটাকে বলছেন ‘প্রেশার কুকার থিওরি’। টানা চাপ বাড়িয়ে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হয় না, বরং আন্দোলনের তীব্রতা বেড়ে যায়। কিছুটা কথা বলার অধিকার দিয়ে যদি মানুষের ক্ষোভ খানিকটা কমিয়ে ফেলা যায়, তবে আন্দোলনের তীব্রতা কমে যায়। কোন তত্ত্ব টিকবে, তা নিয়ে অবশ্য শেষ কথা বলবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

একটা তৃতীয় দৃষ্টিকোণও রয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ভূকৌশলগত রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে। গত বছরের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ—এ দুই ঘটনার পরবর্তী পর্যায়ে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বড় অবনতি না হলেও উন্নতি হয়নি। ভারত এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেমন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে একটা স্থিতাবস্থা বজায় রাখা বা ইউরোপের দেশের সঙ্গে (যেমন ফ্রান্স) সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে উন্নত করা, যা যুক্তরাষ্ট্রকে বলতে বাধ্য করেছে যে ভারত সঠিক পথে এগোচ্ছে না।

এর কারণ: এক, এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার। দুই, পারমাণবিক চুক্তি সই হওয়ার ১৫ বছর পরও ওয়াশিংটনের ‘বন্ধুদেশ’ ভারতকে পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন সাবমেরিন বিক্রি না করে অস্ট্রেলিয়াকে করা। অন্যদিকে ফ্রান্সের ক্ষোভের কারণ, অস্ট্রেলিয়া তাদের থেকে সাবমেরিন কিনবে বলে চুক্তি করে শেষ পর্যন্ত তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিনেছে। ফলে ভারত ও ফ্রান্স দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অসন্তুষ্ট। এই অসন্তোষ থেকেই তাদের বন্ধুত্ব বেড়েছে। ভবিষ্যতে ভারত যুদ্ধবিমান ফ্রান্স, রাশিয়া না যুক্তরাষ্ট্র—কার থেকে কেনে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ১০ বছর আগের মতো ভালো অবস্থায় নেই।

এর পাশাপাশি কাশ্মীর নিয়ে চীনের অবস্থান কী হবে, তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। এর কারণ, ১৯৭২ সালে সই হওয়া সিমলা চুক্তির পরবর্তী পর্যায়ে পাকিস্তান ও ভারত মেনে নিয়েছিল, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান দ্বিপক্ষীয় স্তরে করতে হবে, কাশ্মীরিদের সঙ্গে নিয়ে। অর্থাৎ কাশ্মীর আন্তর্জাতিক ইস্যু নয়। কিন্তু ২০১৯ সালে অমিত শাহ ভারতের সংসদে দাঁড়িয়ে চীন অধিকৃত আকসাই চীন জম্মু-কাশ্মীরের অংশ বলে দাবি করার পর তৃতীয় পক্ষ হিসেবে চীন কাশ্মীরের ‘ওয়ার থিয়েটারে’ প্রবেশ করেছে। অবিভক্ত জম্মু-কাশ্মীরের ৪৫ শতাংশ ভারতনিয়ন্ত্রিত (জম্মু, কাশ্মীর, লাদাখ), ৩৮ শতাংশ পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত (গিলগিট-বালতিস্তান, আজাদ কাশ্মীর) এবং ১৭ শতাংশ চীন অধিকৃত (আকসাই চীন)।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার পর সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চীনের সঙ্গে ভারতের সংঘাত বেড়েছে। অর্থাৎ তাঁর ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাশ্মীরকে একটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করেছেন। যদিও আজ থেকে এক বছর আগে যেখানে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হবে বলে লেখালেখি হচ্ছিল, সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। না হলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত মাসে ভারতে এসে বৈঠক করতেন না।

ভারতের জাতীয় নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই ২০২২-এর গ্রীষ্মে কাশ্মীরের চিত্র পাল্টে যাবে বলে মনে হচ্ছে।

শুভজিৎ বাগচী প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা

নির্বাচনের আগে নতুন করে ইস্যু হয়ে উঠতে পারে কাশ্মীর। সম্প্রতি দ্য কাশ্মীর ফাইলস নামে একটি সিনেমা আলোচনায় এসেছে, যার প্রচার করেছেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি
নির্বাচনের আগে নতুন করে ইস্যু হয়ে উঠতে পারে কাশ্মীর। সম্প্রতি দ্য কাশ্মীর ফাইলস নামে একটি সিনেমা আলোচনায় এসেছে, যার প্রচার করেছেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এএফপি

Wednesday, April 20, 2022

ভারতের রাজনীতি: কাশ্মীর শান্ত, তবে শান্তি ফেরেনি by শুভজিৎ বাগচী

আড়াই বছর পর আবার পর্যটক-বিস্ফোরণ দেখল ভারতশাসিত কাশ্মীর। রাজধানী শ্রীনগরে সাধারণত যে হোটেলে আমি উঠি, সেখানে আগামী কয়েক মাসে কোনো কক্ষ পাওয়া যাবে না বলে জানাল হোটেল কর্তৃপক্ষ। কলকাতা ও বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বেড়াতে গিয়েছেন, এদের মধ্যে যাঁরা থাকার জায়গা ঠিক করে যাননি, তাঁদের হোটেলে কক্ষ পেতে বেশ অসুবিধা হয়েছে।

গত মার্চের মাঝামাঝি শ্রীনগর ও জম্মুতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেল। কাশ্মীরে পর্যটন সংস্থাগুলোর সমিতি টিএএকের সভাপতি ফারুখ কুথো বলেন, কাশ্মীরে হোটেলের ৯০-৯৫ শতাংশ কক্ষে পর্যটক রয়েছেন। তাঁর কথায়, বাম্পার ব্যবসা হচ্ছে। দৈনিক ৩০-৪০ হাজার মানুষ আসছেন। পর্যটকদের মধ্যে বেশির ভাগ আসছেন মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে।

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা রদ করেছিল। এর মধ্য দিয়ে দুই টুকরা হয় জম্মু-কাশ্মীর। লাদাখকে বের করে তৈরি করা হয় নতুন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, যার কোনো বিধানসভা থাকবে না। জম্মু-কাশ্মীরকেও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। তবে তার বিধানসভা থাকবে। এর কিছুদিন পর শুরু হয় নির্বাচনী কেন্দ্রের পুনর্বিন্যাসের (ডিলিমিটেশন) প্রক্রিয়া।

জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের সময়ও এ রকম ভিড় ছিল উপত্যকায়। পাইন গ্রোভ নামে একটি বড়সড় হোটেলের মালিক আবদুল লতিফ বলেন, হয়তো এর চেয়ে কিছু বেশিই ছিল। তারপরে দুই বছর ধরে চলল কখনো কারফিউ, কখনো করোনা। পর্যটন কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল।

কিসের আশঙ্কায় মানুষ?

পর্যটকেরা ফিরে আসায় খুশি কাশ্মীরের হোটেল মালিকেরা। খুশি পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের ব্যবসায়ী ও দোকানিরাও। কিন্তু আশঙ্কাও কম নয়।

শ্রীনগরের দক্ষিণে রিগাল চকে খান নিউজ এজেন্সি নামে পত্রিকা বিক্রির একটি বড় দোকান রয়েছে। শ্রীনগরে থাকলে, স্থানীয় পত্র-পত্রিকা উল্টে পাল্টে দেখতে এই দোকানে মাঝেমধ্যে যাই। দোকানের মালিক হিলাল বাটকে কাশ্মীরের একজন অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষক বলা যায়। তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পরে। তখন শ্রীনগরে কারফিউ ছিল, অলিগলিতে ছিল আধা সামরিক বাহিনীর টহল। হিলাল সে সময় বলেছিলেন, এভাবে জবরদস্তি করে কাশ্মীরের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মাটির নিচের গরম পানির মতো মানুষ ফুঁসছে। যেকোনো মুহূর্তে ফেটে বেরিয়ে আসবে।

কাশ্মীরের অলিগলিতে এখনো আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। যদিও মানুষের ক্ষোভের তেমন বহিঃপ্রকাশ নেই। খোলা চোখে কাশ্মীরের অবস্থা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক, পর্যটকেরা আসছেন, দোকান খুলছে, হোটেল-রেস্তোরাঁয় জায়গা পাওয়াও মুশকিল। তাহলে কি কাশ্মীরের মানুষের মধ্যে আর কোনো ক্ষোভ নেই? এমন প্রশ্নে হিলাল বললেন, ‘এই মুহূর্তে মানুষের বিশেষ কিছু করার নেই। তাদের মুখ বুজে থাকতে হবে। মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে, সেই ক্ষোভ চেপে তারা সরকারের নির্দেশ পালন করে চলেছে। এভাবে কত দিন চলে, সেটাই দেখার বিষয়।’

কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে?

হিলালের কথা কতটা সত্য, তা বুঝতে আরও কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁদের একজন জি এন শাহীন। তিনি কাশ্মীর হাইকোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশনের সাতবারের নির্বাচিত সচিব।

গোড়াতেই শাহীন বললেন, তিনি আর সচিব নেই। কারণ, দুই বছর ধরে করোনার কারণ দেখিয়ে বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন করতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন সকালে কয়েক শ নিরাপত্তারক্ষী এখানে মোতায়েন করা হয়। বলা হয়, এবার নির্বাচন হবে না। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে ঠিক কতটা স্বাধীনভাবে কাশ্মীরে আইনজীবীরা কাজ করছেন।

একটি মামলার শুনানির দিন ছিল শাহীনের। তিনি যাওয়ার আগে একটি মামলায় পুলিশ করা একটি অভিযোগপত্র দিয়ে গেলেন। অভিযোগপত্রে আসা অভিযুক্তের নাম ব্যবহার না করার অনুরোধ করে শাহীন বললেন, ‘কী ধরনের ভুয়া অভিযোগের ভিত্তিতে মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তা অভিযোগপত্র পড়লেই বুঝবেন। বিশেষ সন্ত্রাসবাদ দমন আইনেও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এ আইনে জামিন পেতে বহু বছর লাগে।’

অভিযোগপত্রে কাশ্মীরের পুলওয়ামা অঞ্চলের ২৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য বলে চিহ্নিত করে নানা অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু সবই ‘বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা’ বা ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া সূত্রের’ খবরের ওপর ভিত্তি করে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পুলিশ ‘অনেক কষ্ট করে, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিযুক্তের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদী দলের যোগাযোগ চিহ্নিত করতে পেরেছে’। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি কোথায়, কীভাবে অপরাধ করেছেন, যে কারণে তাঁকে বিশেষ সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে (পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট) গ্রেপ্তার করা হলো, তা অভিযোগপত্রে বলা হয়নি।

শুনানি শেষে আধঘণ্টা পর শাহীন ফিরে এসে বলেন, এটাই কাশ্মীরের বৈশিষ্ট্য। তিনি বলেন, এখানে কার্যত যাঁকে যখন খুশি গ্রেপ্তার করা যায়। সাধারণ আইনের পাশাপাশি সরাসরি বিশেষ সন্ত্রাসবাদ দমন আইন—আনলফুল অ্যাকটিভিটিস (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট এবং পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট ব্যবহার করে গ্রেপ্তার করা হয়। এর ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য এরা জেলে থাকেন। যেকোনো সময় আপনি কাশ্মীরে ১০ থেকে ১২ হাজার লোক পাবেন, যাঁরা একাধিক জেলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন। মামলার বিচার শুরু হতে সময় লাগছে, জামিন পাচ্ছেন না, মামলার শুনানির তারিখ ধার্য হচ্ছে না—এমন নানা কারণে বছরের পর বছর কাশ্মীরের কিছু মানুষ জেলের ভেতর দিন কাটাচ্ছেন। একটা অংশ বেরোচ্ছে, তো আর একটা অংশ ঢুকছে। নানা বিষয় নিয়ে সরকারের কাজের প্রতিবাদ করা হলো এদের প্রধান ‘অপরাধ’।

শাহীন আরও জানান, অনেকে এমনও আছেন, যারা কিছুই করেননি, কিন্তু গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি একটা উদাহরণও দিলেন। কাশ্মীরের বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী খুরম পারভেজ কিছু মামলা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করছিলেন। সরকারের কাছে এমন কাজ ‘অপরাধ’। সে কারণে তাঁকে সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে গ্রেপ্তার করে দিল্লি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সবাই যেন ‘অধিকৃত’ অঞ্চলের

কাশ্মীরে নাগরিক সমাজের অবস্থা করুণ বললেও কম বলা হয়। কোথাও কোনো কিছু নিয়ে মুখ খোলার পরিবেশ নেই। তিনি আইনজীবীই হোন কি ব্যবসায়ী, কি শিক্ষক—সবার প্রায় একই অবস্থা। সরকারবিরোধী কথা বলার অধিকার নেই, দৈনন্দিন সমস্যার কথা তুলে ধরার অধিকারও খুব একটা নেই। এর জন্য সাংবাদিকেরা সবচেয়ে বেশি হয়রানি, নির্যাতন ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হয়েছে যে এখন কাশ্মীর নিয়ে নিজেদের নাম প্রকাশ করে কথা বলতে নারাজ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সম্পাদকেরা।

সম্প্রতি বিশেষ সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে গ্রেপ্তার হয়েছেন ফাহাদ শাহ। বয়সে তরুণ এই সাংবাদিক আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত। তাঁর পত্রিকা ‘কাশ্মীরয়ালা’ কার্যত বন্ধ। পত্রিকাটির একজন সাংবাদিক বলেন, এত খারাপ অবস্থার মধ্যে কাশ্মীর কখনো পড়েনি। ফিলিস্তিনিদের মতো এখানেও সবাই যেন অধিকৃত অঞ্চলের বাসিন্দা।

এরপরও কাশ্মীরে এখনো অন্তত ২০টি পত্র-পত্রিকা নিয়মিত বেরোচ্ছে। তবে দুই সপ্তাহ ধরে সংবাদপত্রে সরকারবিরোধী একটি লেখাও খুঁজে পেলাম না। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে, কাশ্মীরে বাইরে থেকে কত হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আসছে বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটির উন্নতির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মনোজ সিনহা কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তা নিয়ে।

মোটা দাগে তিন ধরনের সাংবাদিক কাশ্মীরে এই মুহূর্তে রয়েছেন বলে স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানান। এক. যাঁরা পুরোপুরি সরকারের হয়ে লেখেন। দুই. যাঁরা অল্পবয়স্ক এবং কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে বিদেশের বা কাশ্মীরের বাইরের পত্রিকায় ফ্রিল্যান্সিং করেন। এদের অধিকাংশই কাশ্মীর ছেড়ে দিল্লিতে গিয়ে থাকতে শুরু করেছেন। তিন. যাঁরা এখনো কাশ্মীরে থেকে লেখার চেষ্টা করছেন। এই শ্রেণি খুবই ক্ষুদ্র এবং এদের হয় থানায়, না হলে আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে। এদের অনেকেরই ল্যাপটপ এবং ফোন পুলিশের হেফাজতে রয়েছে বলে কয়েকজন সাংবাদিক জানান। এদের বাইরে চাপের মুখে যাঁরা আর লিখতে চান না, তাঁদের অনেকেই পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা হয় বহুজাতিক একটি ওষুধ কোম্পানির বিপণন বিভাগের সাবেক প্রধান আবদুল হামিদের সঙ্গে। শ্রীনগর শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত লাল চকে ঘুরতে ঘুরতে বললেন, এটার একটা ভালো দিক আছে। এই পরাধীনতার মধ্যে থাকতে থাকতে, মানুষের রুখে দাঁড়ানোর খিদেটা আরও বাড়ছে। এই অঘোষিত সামরিক ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের ভয় ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এ কারণে আড়াই বছর ধরে কাশ্মীরের তেমন বড় ধরনের কোনো সংঘাত না হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনীর আয়তন কমাতে ভয় পাচ্ছে দিল্লির সরকার। লাল চকের বিভিন্ন অংশে মোতায়েন করা নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘মোটামুটি এক বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে রয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার নিরাপত্তারক্ষী। কিন্তু আমরা ধরে নিচ্ছি, কাশ্মীর স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, কাশ্মীর স্বাভাবিক হলে শুধু লাল চকে এই ফৌজ ভারত সরকারকে রাখতে হচ্ছে কেন?’

কেন ভারত নিজেকে কাশ্মীরে ‘সফল’ মনে করছে

বস্তুত কাশ্মীরের অবস্থা যে স্বাভাবিক নয়, তা স্বীকার করে নিচ্ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বোচ্চ স্তরের কর্মকর্তারাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, কাশ্মীরে অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড কমেছে, রাস্তায় বেরিয়ে প্রতিবাদের ঝোঁকও নেই। তার মানে এই নয় যে যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। যেকোনো সময়ই জঙ্গিবাদ বাড়তে পারে। তবে বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করছে পাকিস্তানের ভূমিকার ওপর।

ভারতের কাশ্মীরের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বক্তব্য, যেসব মাপকাঠির ওপর ভিত্তি করে কাশ্মীরে বেসামরিক স্তরে আন্দোলন বা সশস্ত্র জঙ্গিবাদ বাড়ে বা কমে, তার অনেক কিছুই ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যেমন আন্তর্জাতিক স্তরে পাকিস্তানের ওপর জঙ্গিবাদ দমনে চাপ বাড়ায় তারা কাশ্মীরে জঙ্গি পাঠাতে পারছে না। যদিও পাকিস্তান বরাবরই এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক বছরে কাশ্মীরে ৭০-৮০ জনের বেশি বিদেশি জঙ্গি ছিল না। এদের মধ্যে অন্তত ৬০ জন পাকিস্তানের নাগরিক এবং অন্তত ১০ জন পেশোয়ারের পাঠান সম্প্রদায়ের। এ ছাড়া ৩০-৪০ জন স্থানীয় জঙ্গি সক্রিয় ছিল এবং এখনো আছে।

অতীতে বিভিন্ন ধরনের সশস্ত্র এবং বেসামরিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের মধ্যে একটা যোগসূত্র হিসেবে কাজ করত ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামি, কাশ্মীর। ২০১৯ সালে কাশ্মীরে জামায়াতে ইসলামি নিষিদ্ধ হয়েছে।

ভবিষ্যতে আল–কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব–কনটিনেন্ট (একিউ-আইএস) কাশ্মীরসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় জামায়াতের জায়গা নিতে পারে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

জঙ্গি হামলায় এখনো সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তাকর্মী নিহত হচ্ছে। যে কারণে অনেক আড়ম্বর করে ‘কাশ্মীর ফাইলস’ সিনেমা বানানো হলেও, কাশ্মীরি পণ্ডিতেরা এখনো সেখানে ফেরেননি। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির পরিবর্তনের কারণে কাশ্মীরের অবস্থা রাতারাতি পাল্টে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন কাশ্মীর নীতি-নির্ধারকেরা। অর্থাৎ কাশ্মীর সমস্যা মিটে গেলেও মেটেনি।

এই অবস্থায় ‘ডিলিমিটেশনের’ কাজ শুরু হয়েছে। অর্থাৎ কোন বিধানসভা অঞ্চল হিন্দুপ্রধান জম্মুর সঙ্গে থাকবে এবং কোন কেন্দ্র মুসলিমপ্রধান কাশ্মীরের সঙ্গে জুড়বে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর বিতর্ক। এই বিতর্কের শেষে জম্মু–কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা এই বছরের শেষে। কিন্তু ‘ডিলিমিটেশন’ নিয়ে বিতর্ক যদি আরও বাড়ে (কারণ, ভবিষ্যতে মুখ্যমন্ত্রী একজন হিন্দু হবেন না মুসলিম এই প্রশ্ন জড়িত), তবে শান্ত জন্মু–কাশ্মীর অশান্ত হয়ে উঠতে যে বেশিক্ষণ লাগবে না, তা স্বীকার করছে সব পক্ষই। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল করার প্রশ্নও আপাতত উঠছে না।

কাশ্মীরের ডাল লেকের পাড়ে টহল দিচ্ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা
কাশ্মীরের ডাল লেকের পাড়ে টহল দিচ্ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: এএফপি

গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা

রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে (তারা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার চার শতাংশ) বিশ্বের সবচেয়ে বন্ধুহীন হিসেবে অভিহিত করা হয়, বিশ্বজুড়ে তাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা বর্তমান সময়ে তথাকথিত ‘মানবাধিকার’ কতটা তামাশার বস্তুতে পরিণত হয়েছে, তাই দেখাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের ভয়াবহ সহিংসতা আমাদের সামনে আরো দেখাচ্ছে যে যারা একসময় নির্যাতিত হয়েছিল, তারা অবশেষে মানবাধিকারের প্রবক্তা হবে, এমনটা নিশ্চিত নয়। এ ব্যাপারে উদাহরণ হলেন স্টেট কাউন্সিলর (প্রধানমন্ত্রীর সমতুল্য) আং সান সু চি। একসময় তিনি মিয়ানমারের সামরিক জান্তার হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন। সামরিক স্বৈরাচারের হাতে নির্যাতিত সু চি ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত নির্যাতন নিয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। এসব লোক যে বর্বরতার শিকার হয়েছে, তারা যে অসহায় অবস্থায় থাকতে বাধ্য হয়েছে, তা বিশ্বের সচেতনতায় এখনো প্রবেশ করেনি। এ দিক থেকে শ্রীলঙ্কার প্রবীণ সাংবাদিক লতিফ ফারুক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। অর্ধ শতাব্দির পেশাজীবনে তিনি মানবতার সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন। আর তা করেছেন সাংবাদিক এবং ১৯৭০-এর দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সম্পাদক ও গ্রন্থকার হিসেবে। তার বইগুলো তার জন্মস্থান শ্রীলঙ্কায় (তিনি বর্তমানে এখানেই বাস করেন) মুসলমানদের জন্য অবশ্য পাঠ্য। তার সর্বশেষ গ্রন্থ হলো ‘দি জেনোসাইড অব রোহিঙ্গা মাইনোরিটিস’। এতে রোহিঙ্গা জনসাধারণ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর পাশাপাশি বিশ্লেষণও স্থান পেয়েছে।
ফারুক প্রায় ৩০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদ সংস্থাগুলোর সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি নতুন করে ইংরেজি ভাষার গালফ নিউজে কাজ শুরু করেন, পরে সাত বছর খালিজ টাইমসে কাজ করেন। ১৯৮৭ সালে আবার গালফ নিউজে যোগ দেন। ২০০৩ সালে দেশে ফিরে তিনি ৫টি বই লিখেছেন: ওয়ার অন টেরোরিজম – দি আনটোল্ড ট্রুথস, নোবডিস পিপলস; দি ফরগোটেন প্লাইট অব শ্রীলঙ্কান মুসলিমস, আমেরিকাস নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার; এক্সপোর্টিং ওয়ার্স। আর তার সর্বশেষ গ্রন্থ হলো দি জেনোসাইড অব রোহিঙ্গা মাইনোরিটিস। তার গ্রন্থটি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মোহাম্মদ, নোবেল পুরস্কারজয়ী হ্যারল্ড পিন্টার, নোবেলজয়ী তাওক্কুল কারমান, আমেরিকান সাংবাদিক পল ক্রাইগ রবার্টসের প্রশংসা পেয়েছে।
ফারুক বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে মুসলিমসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর দিকে নজর দেন তার গ্রন্থগুলোতে। অবহেলার শিকার কিংবা অযৌক্তিক যেসব অভিযোগ তাদের ওপর আনা হয়, সেগুলো অপনোদন করেন। পরাশক্তিগুলোর সম্পর্ক মুসলিমদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তার ওপরও আলোকপাত করেন তিনি। রোহিঙ্গাদের নিয়ে তার বই লেখার কারণ হলো তিনি রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারে যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, সেব্যাপারে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। এর মধ্যেই তার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলো, তিনি নিজের খরচে বই প্রকাশ করে বিনামূল্যে বিতরণ করে চলেছেন।
দি জেনোসাইড অব রোহিঙ্গা মাইনোরিটিস গ্রন্থে তিনি ১৯৪৮ সাল থেকে মিয়ানমারে মুসলিমরা যে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সে দিকে আলোকপাত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৭৫ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর ১৩বার সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। তারা অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ আর ভূমি দখলের শিকার হয়েছে। তিনি আরো জানিয়েছেন, মিয়ানমারে মুসলিমরা বাস করছে সেই প্রথম খ্রিস্টাব্দ থেকে।
রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ও পরিক্রমা নিয়ে প্রায় দেড় শ প্রতিবেদন সমৃদ্ধ গ্রন্থটি মিয়ানমার ও বাংলাদেশে বসবাসরত রাষ্ট্রহীন এই জনগোষ্ঠীটির দুর্দশার মূল কারণ অনুসন্ধান করেছে। এতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ওপর বর্তমানে যে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালানো হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন। এতে রোহিঙ্গাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এরা এসেছে ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে, তারা মূলত বাঙালি। বইটিতে রোহিঙ্গাদের আবাসিক বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদেরকে দুই সন্তানের বেশি গ্রহণ করতে না দেয়া, সরকারি অনুমোদন ছাড়া অন্য কোথাও যেতে না দেয়ার মতো ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।
মিয়ানমারের বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যকার অতি সাম্প্রতিক প্রক্সি যুদ্ধে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার নিহত হওয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে। আরো আছে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের গণ-অভিবাসন। তাছাড়া ২০১৫ সালে মিয়ানমারের মুসলিমমুক্ত নির্বাচনের কথাও বলা হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘ দিন ধরে নির্যাতন চললেও বিশ্ব কেন এ দিকে নজর কেন দিচ্ছে না, সে ব্যাপারেও আলোকপাত করা হয়েছে বইতে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে জাতিসঙ্ঘের প্রতিক্রিয়া, রোহিঙ্গাদের ক্ষুধা নিয়ে জাতিসঙ্ঘ প্রতিবেদনও তুলে ধরা হয়েছে এতে।
দি জেনোসাইড অব রোহিঙ্গা মাইনোরিটিস বইটির পাঠক এতে থাকা তথ্যে আতঙ্কিত হবেন। বিশেষ করে গার্ডিয়ানের যে প্রতিবেদনটি এখানে পুনঃমুদ্রিত করা হয়েছে, তাতে শিউরে উঠার মতো তথ্য রয়েছে। মিয়ানমার সরকারের অনুরোধে জাতিসঙ্ঘ বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদন প্রত্যাহার করার ঘটনাও প্রকাশ করা হয়েছে। পুরো বইতেই এমন এক বিশ্বের ছবি ফুটে ওঠেছে যেখানে মানবাধিকার কার্যত প্রহসনে পরিণত হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, একমাত্র যে অধিকার আছে তা হলো জুলুমতন্ত্র। কায়েমি স্বার্থবাদী আর শক্তিশালীদের রক্ষা করার ব্যবস্থাই আছে বিশ্বজুড়ে।
বইটির একটি প্রতিবেদন প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ইন্টার প্রেস সার্ভিস নিউজ এজেন্সিতে। লিখেছিলেন তালিফ দিন। তিনি দেখিয়েছেন যে রাশিয়া, ইসরাইল ও চীনের সামরিক সম্ভার পেয়েই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বেপরোয়া হয়ে পড়েছে।
বইয়ের প্রতিবেদনগুলোতে একটি বিষয় পরিষ্কার। তা হলো, মিয়ানমারের ধর্ম বৌদ্ধ মতবাদে অহিংসার কথা বলা হলেও সন্ন্যাসী বিরাথু বৌদ্ধের সহানুভূতি, সহমর্মিতার কথা প্রচার করছেন না। তিনি মিয়ানমারের মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচার করছেন।
এই গ্রন্থটি বৌদ্ধধর্মকে সত্যিকারের অর্থে জানে, এমন কোনো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পড়েন, তবে মিয়ানমারের সন্ন্যাসী অশ্বিন বিরাথুর প্রচার করা গণহত্যা পড়ে খুবই কষ্ট পাবেন। এই সন্ন্যাসী তার ক্যারিয়ারের প্রায় ৫০ বছর ধরে প্রচার করে আসছেন যে রোহিঙ্গা মুসলিমেরা ‘কুকুর’ ও ‘সাপ।‘ তিনি রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে মাগুর মাছ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। তার মতে, এসব মাছ যেমন দ্রুত বৃদ্ধি পায়, অন্যান্য প্রজাতিকে সমূলে শেষ করে দেয়, পরিবেশকে ধ্বংস করে দেয়, রোহিঙ্গারাও তেমন করে। ফারুক নিজে শ্রীলঙ্কার লোক হওয়ায় দেশটিতে বৌদ্ধ চরমপন্থীদের উত্থানের পরিণতি সম্পর্কে অবগত। বিরাথু নিজে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। ওই সময়ের দিকে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী গনানসারা থেরো। তিনি কুখ্যাত বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী সংগঠন বদু বালা সেনার (বিবিএস) সাধারণ সম্পাদক।
বইয়ের একটি প্রতিবেদনে নিকো হিনেসের অভিযানের কথাও বলা হয়েছে। এতে বর্ষীয়াণ এই মুভি পরিচালকের ক্যামেরায় জঙ্গলে বিরাথুর অপকর্মের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তিনি দুজন সহকারী, ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে জঙ্গলে ঢুকেছিলেন বিরাথুর ভয়াবহ কর্মকাণ্ড সচিত্রভাবে তুলে ধরার জন্য। তার ক্যামেরায় এত দিন লোকচক্ষুর অগোচরে থাকা অনেক কথাই প্রকাশিত হয়েছে।
বইটিতে আবেগগত এমন অনেক ভাষ্য দেয়া আছে যার ফলে কয়েকটি অধ্যায় পাঠ করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর যৌন সহিংসতার ভাষ্য স্নায়ুকে বিকল করে দেয়। এই যৌন সহিংসতার রেশ ধরেই ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পালিয়ে আসা লোকজন সাথে করে ভয়াবহ নির্যাতনের নানা কাহিনীও সাথে করে নিয়ে আসে। এসব কাহিনীর ভয়াবহতা যেকোনো লোককে নাড়া দিয়ে যায়।
এই বইটি পাঠ করার সময়ই সশস্ত্র গ্রুপ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) সৃষ্টির নেপথ্য কাহিনী উঠে আসে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সক্রিয় এই গ্রুপটি। মিয়ানমার সরকার অভিযোগ করছে, বিদেশী ইসলামপন্থীরা আরসাকে তহবিল দিচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার বুঝতে চাচ্ছে না যে নির্যাতনের কারণেই এই গ্রুপের সৃষ্টি।
বইটিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদনও সংযোজন করা হয়েছে। এতে উত্তর রাখাইনকে রোহিঙ্গা মুসলিমশূন্য করার মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
লতিফ ফারুকের বইটি গবেষকদের জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে। বিভিন্ন ক্যাম্পে অসহায়ভাবে অবস্থান করা লাখ লাখ রোহিঙ্গা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে এই গ্রন্থে। বইতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যার শেষ ধাপটি শেষ হলেও তাদের দুর্ভোগ কিন্তু শেষ হয়নি এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অবিচারের মুখে পড়ার জন্য বিশ্বও অপরাধী।

১৮৭২ সালে ‘বেগম’ বন্দি হয় লন্ডনে

আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে গন্ডার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পৃথিবীতে বুনো পরিবেশে পাঁচ প্রজাতির গন্ডারের বাস। যার দু’টি ছিল আফ্রিকায় ও তিনটি ছিল এশিয়ায়। এশিয়ার তিনটি গন্ডার প্রজাতির সবই ছিল বাংলাদেশে। কালের বিবর্তনে বসতি হারিয়ে, শিকারির শিকার হয়ে সব গন্ডার বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
অতীত নথিপত্র, জেলাভিত্তিক গেজেটিয়ার, ব্রিটিশ শাসনামলের বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের উত্তরে তিস্তা অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তিন প্রজাতির গন্ডারের বসতি। সর্বশেষ জীবিত গন্ডারটিকে অর্থের লোভে তৎকালীন বৃটিশ সরকার পাঁচ হাজার পাউন্ডে লন্ডন চিড়িয়াখানায় বিক্রি করে দেয় ১৮৭২ সালে।
গন্ডার একপ্রকার স্তন্যপায়ী তৃণভোজী প্রাণী। এটি রাইনোসেরোটিডি পরিবারের অন্তর্গত। বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত তিন প্রজাতির গন্ডারের বসতির বিস্তৃতি ছিল যথাক্রমে: একশিঙ্গি বড় গন্ডার নেপাল সিকিম থেকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত। সুন্দরবন, যশোর থেকে বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত। সুন্দরবন ও যশোর থেকে শিকার করা এমন ১১টি একশিঙ্গি ছোট গন্ডার কলকাতা, বার্লিন ও লন্ডন জাদুঘরে তখন নিয়ে যাওয়া হয়। দুইশিঙ্গি গন্ডারের আবাস কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পর্যন্ত ছিল।

সুন্দরবনে আদি সভ্যতার প্রত্নস্থলের আবিষ্কারক ইসমে আজম ঋজু গন্ডারের বিলুপ্তি এবং তার সর্বশেষ বসবাসের অবস্থান নিয়ে জাগো নিউজকে জানান, ১৮৭৬ সালে কুমিল্লায় একটি দুইশিঙ্গি গন্ডার গুলি করে মারা হয়। ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম থেকে একটি গন্ডার ধরা হয়। যেটি ছিল দুইশিঙ্গি গন্ডার। এটি বাংলাদেশের শেষ জীবিত গন্ডার ‘বেগম’। ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের দক্ষিণের কোন একস্থানে এটি মানুষের হাতে বন্দি হয়। চোরাবালিতে আটকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল গন্ডারটি। স্থানীয় লোকজন গন্ডারটিকে চোরাবালি থেকে তুলে আটকে রেখে প্রশাসনকে জানায়। ব্রিটিশ সরকারের ক্যাপ্টেন হুড ও মি. উইকস আটটি হাতি নিয়ে ১৬ ঘণ্টা কঠোর চেষ্টার পর এটিকে বন্দি করে। অর্থের লোভ সামলাতে পারেনি ব্রিটিশ কর্মকর্তা। ১৮৭২ সালে বাংলাদেশের জীবিত শেষ গন্ডারটিকে ৫ হাজার পাউন্ডে কিনে লন্ডন চিড়িয়াখানা বিক্রি করেন। নিজ বসতভিটা ছেড়ে বেগম বন্দি হলো লন্ডনের খাঁচায়। এই গন্ডারের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছে আমাদের গন্ডার প্রজাতি।
গবেষক ইসমে আজম ঋজু আফসোস করে বলেন, ‘এত বড় বাংলায় আমরা ‘বেগমের’ জন্য একটু জায়গা করে দিতে পারিনি। আমাদের লোভ, প্রভুদের খেতাব পাওয়ার আশা হয়তো সেদিন ভিজেছিল ‘বেগমের’ চোখের পানিতে। আজও সে লোভ-নিষ্ঠুরতা ভিজে ধুয়ে যেতে পারেনি হাজারও বন্যপ্রাণীর চোখের পানিতে।’
লন্ডন চিড়িয়াখানায় তার নাম দেওয়া হল ‘বেগম’। লন্ডনে মি. কিউলমান নামের এক আঁকিয়ে আঁকলেন মানুষের নজরে আসা বাংলাদেশের জীবিত শেষ গন্ডারের ছবিটি।

‘বেগম’কে বাংলাদেশের শেষ গন্ডার উল্লেখ করলেও গবেষক ইসমে আজম ঋজু সুন্দরবনে গবেষণা করে পেয়েছেন আরও কিছু তথ্য। সেই তথ্য অনুসারে, ১৮৬৮ সালের দিকে বাংলাদেশের শেষ গন্ডারের কথা বলা হলেও সুন্দরবনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮০০ সালের শেষ দিকে বা ১৯০০ সালের প্রথম দিকে সুন্দরবনের নলিয়ান থেকে একটি গন্ডার শিকার করের কালাচাঁদ নামের এক শিকারি। খুলনার রায়সাহেব নলিনীকান্ত রায়চৌধুরী শেষ ১৮৮৫ সালে সুন্দরবনে গন্ডারের পায়ের চিহ্ন দেখেছিলেন। তারপর সুন্দরবনে বা বাংলাদেশের কোথাও গন্ডারের উপস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রমের সুবাদে সমগ্র সুন্দরবন ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছি কয়েকবার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫-১৬ সালে বাঘবিষয়ক একটি গবেষণা কার্যক্রমের অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। মাঠপর্যায়ের সেই গবেষণাকালে আমার দলের নাম দিয়েছিলাম টিম রাইন (গন্ডারের দল)। এই নামের উদ্দেশ্য ছিল সুন্দরবন থেকে গন্ডারের মতো প্রাণীর বিলুপ্তির কথা মনে রেখে বাঘ সংরক্ষণে এগিয়ে চলা। সেইসঙ্গে এত বড় একটি বনে বাঘের স্থান হলেও গন্ডারের বিলুপ্তির কারণ যাচাই করা। বনভূমি ও ইতিহাস অনুসন্ধানে বুঝেছিলাম, সম্ভবত সুন্দরবনে তৃণাঞ্চলের ঘাটতি ও অবাধ শিকারই গন্ডার বিলুপ্তির কারণ।
ইতিহাস ও সদ্য আবিষ্কৃত প্রত্নস্থল ঘেঁটে তার সত্যতাও পেয়েছিলাম। একসময় সুন্দরবনে চামড়া, শিং ও মাংসের জন্য ব্যাপক আকারে গন্ডার শিকার করা হতো। প্রাচীনকালে সুন্দরবন অঞ্চলের আদিবাসীরা গন্ডারের মাংস খেত। সুন্দরবনের প্রাচীন প্রত্নস্থলে তারই নমুনাস্বরূপ একটি গন্ডারের দাঁতের জীবাশ্ম-প্রমাণ পাওয়া যায়। পাশাপাশি অবশ্য অন্যান্য প্রাণীর হাড়ের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। অন্য আরেক প্রত্নস্থলে পাওয়া যায় পায়ের হাড়, যা দেখে অনুমান করা যায় হাড়ের ভেতরের মজ্জা বের করার জন্য ভাঙা হয়েছিল হাড়টি।
সুন্দরবনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সেকেন্দার ডাক্তার তাঁর জীবদ্দশায় একটি পুকুর খননের সময় মাটির গভীরে দুটি গন্ডারের কঙ্কাল পান। এছাড়া সুন্দরবনসংলগ্ন হরিণগড় গ্রামে এফাজতুল্লা সরদার পুকুর খননের সময় একটি গন্ডারের কঙ্কাল, ধূমঘাট দিঘি খননের সময় ছয়টি গন্ডারের কঙ্কাল ও ঈশ্বরীপুর মাখন লাল অধিকারীর বাড়িতে ‘সুন্দরবনের ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক এ এফ এম আবদুল জলিল ছয়টি গন্ডারের কঙ্কাল দেখেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘প্রায় একশত বৎসর পূর্বে বৃদ্ধ লোকেরা শ্রীফলাকাঠি ও খেগড়াঘাটের জঙ্গলে স্বচক্ষে গন্ডার দেখিয়াছেন।’
সুন্দরবন অঞ্চলে বসবাসরত ঢালী পদবির লোকজন সুন্দরবনে গন্ডার শিকার করে তার চামড়া দিয়ে যুদ্ধের জন্য ঢাল প্রস্তুত করত। ঢাল থেকে পেশাগত কারণে ঢালী পদবির উৎপত্তি। এই ঢালীরা মহারাজ প্রতাপাদিত্যর হয়ে যুদ্ধ করত। পরবর্তী যুগে এসে ইংরেজ শিকারিদের ব্যাপক শিকারের ফলে অবশিষ্ট গন্ডার সুন্দরবন থেকে বিলীন হয়ে যায়।

ইতিহাসের সাক্ষী: পুঁজিবাদের পথে রাশিয়ার মানুষের দুঃসহ অভিজ্ঞতা

সমাজতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদের পথে রাশিয়া
লাস্ট আপডেট- ১১ এপ্রিল ২০১৯: কমিউনিজমের পতনের পর রাতারাতি যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়লো, তার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এক চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল রাশিয়া। পুঁজিবাদের পথে যাত্রা শুরুর জন্য যেসব সংস্কার করা হচ্ছিল তার ফলে জিনিসপত্রের দাম চলে গিয়েছিল মানুষের নাগালের বাইরে, তৈরি হয়েছিল তীব্র খাদ্য সংকট। সেই ঘটনা নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বটি তৈরি করেছেন বিবিসির ডিনা নিউম্যান। প্রতিবেদনটি পরিবেশন করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন:
১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর। সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলো। সর্বশেষ সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ পদত্যাগ করলেন আনুষ্ঠানিকভাবে।
মিখাইল গর্বাচেভের জায়গায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হলেন বরিস ইয়েলৎসিন। তিনি যে নতুন সরকার গঠন করলেন সেখানে অনেক তরুণ এবং উচ্চাকাঙ্খী গবেষককে নিয়ে আসলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সংস্কার করে বাজার অর্থনীতির পথ খুলে দেওয়া।
এদের একজন আন্দ্রে নিচায়েভ। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তাঁকে করা হয়েছিল রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী। এর আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির প্রভাষক।
"আমাদের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের এটা ছিল এক দারুণ সুযোগ। যে কোন বিচারেই আমাদের মিশনটা ছিল বেশ অভূতপূর্ব। এর আগে এত বিশাল একটা কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রকে একটি কার্যকর বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটানোর চেষ্টা এর আগে হয়নি।"
রাজনীতিতে কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না আন্দ্রে নিচায়েভের। । রাশিয়ার যে অর্থনীতিকে ঠিক করার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে, সেটার তখন করুণ অবস্থা!
"সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর রাশিয়ার কোন সরকারী প্রশাসনযন্ত্র বলতে কিছু ছিল না। কিছুই না। না ছিল কোন সেনাবাহিনী, কোন সীমান্ত, কোন কাস্টমস। না ছিল কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা মূদ্রা।"
সোভিয়েত কমিউনিজমের যুগে মস্কোতে থাকা আমলাদেরই দায়িত্ব ছিল সারা দেশে কাঁচামাল থেকে শুরু করে সব কিছু সরবরাহ করা। তখন সব কিছুই পুরোপুরি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির অধীনে।
কিন্তু ১৯৯২ সালের শুরুতে কমিউনিস্ট আমলের এই সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়লো। দেশ-বিদেশের সব পর্যবেক্ষকরাই তখন হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন যে, রাশিয়া হয়তো সেবারের শীত মৌসুমেই ভেঙ্গে পড়বে। এটাকে ভীতি বা আতংক ছড়ানোর চেষ্টা বলা যাবে না। এই বিপদ ছিল একেবারেই বাস্তব।
মস্কোর হাজার হাজার আমলা তখন সামনে অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছু দেখছেন না। তারা তখন কার জন্য কাজ করছেন, সেটাই তাদের কাছে পরিষ্কার নয়। রাশিয়া - নাকি সোভিয়েত ইউনিয়ন যেটি এখন বিলুপ্ত?
আন্দ্রে নিচায়েভ বলছিলেন, "সব বিদেশি ঋণ তখন আটকে দেওয়া হয়েছে। আমাদের হাতে তখন কোন বৈদেশিক মূদ্রার নগদ তহবিল নেই।"
"বড় বড় নগরীতে তখন খাদ্য সংকট, ক্ষুধার সংকট দেখা দিয়েছে। সেই সব নগরীতে, যেখানে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে হতো।"
তিনি বলছেন, "বিশ্বের একসময়ের পরাশক্তি এই দেশটির বৈদেশিক মূদ্রার রিজার্ভ কোন কোন দিন নেমে আসছিল মাত্র আড়াই কোটি ডলারে! তখন আমাদের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ যেখানে এগারো হাজার আটশো কোটি ডলার!"
রাশিয়া তখন প্রবেশ করছে এক অনিশ্চিত সময়ে, একদিকে পেছনে রাখা পুরনো ব্যবস্থা, সামনে বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্যের আশংকা। যে আশংকার কথা গর্বাচেভ বার বার বলেছেন।
তখন কী করছিলেন অর্থমন্ত্রী আন্দ্রে নিচায়েভ?
"সবাই জানতো যে এ অবস্থায় কিছু জরুরী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। দেশ তখন ভেঙ্গে পড়ছে। ক্ষুধার সংকট বাস্তবেই দেখা দিয়েছে।"
"তখন আমাদের সামনে বিকল্প কী? দেশ অচল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা? নাকি জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাটা তুলে নেওয়া?"
আন্দ্রে নিচায়েভ বৈপ্লবিক সংস্কারে বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্যে তিনি অজনপ্রিয় পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত ছিলেন। এর পরিণতি যাই হোক না কেন।
"আমরা যখন সরকারে যোগ দেই, তখন আমাদের ধারণা ছিল, হয়তো বড় জোর এক বা দুই মাসের জন্য থাকবো, এরপর আমাদের বরখাস্ত করা হবে।"
"আমরা সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা বা সবচেয়ে অজনপ্রিয় পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত ছিলাম। আমাদের পর অন্যরা এসে হয়তো একটা যথাযথ বাজার অর্থনীতি গড়ে তুলবে।"
প্রথম সংস্কারবাদী সরকার যেন তাই বেশ কিছুটা তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিল। খাদ্য এবং অন্যান্য জিনিসের ওপর থেকে কমিউনিস্ট যুগের ভর্তুকি রাতারাতি তুলে নেওয়া হলো।
১৯৯২ সালের পহেলা জানুয়ারি রাশিয়ার মানুষ দোকানে গিয়ে দেখলেন, এক রাতেই সব জিনিসের দাম আকাশচুম্বী। সেসময় মস্কোতে নিযুক্ত বিবিসির সংবাদদাতা নিজের চোখে দেখেছেন রুশ অর্থনীতিতে এই 'শক থেরাপি কিভাবে কাজ করেছে।
ডাক্তার এবং নার্সরা তাদের বেতন দশগুণ বাড়ানোর দাবিতে মিছিলে নামে রাস্তায়
তার দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, দশকের পর দশক ধরে চলা কৃত্রিম ভর্তুকি তুলে দেওয়ার পর দোকানে গিয়ে রাশিয়ার লোকজনের চোখ যেন ছানাবড়া। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তারা দেখছিলেন, কিভাবে একেবারে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীর দাম পর্যন্ত তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
এক কেজি হ্যাম বা শুকরের মাংসের দাম তখন দাঁড়িয়েছে এক হাজার রুবলে, যা কিনা সেসময় রাশিয়ায় একজন গড়পড়তা মানুষের দু'মাসের বেতনের সমান। সসেজের দাম একশো রুবল, বা প্রায় এক সপ্তাহের বেতনের সমান।
লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি যে রাশিয়ার মানুষকে রাতারাতি দারিদ্রসীমার কাছে নামিয়ে আনলো। অনেকেই তাদের ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করতে রাস্তায় নামলেন।
কেউ কেউ তখন মজুতদারির ব্যবসায় জুটে গেল। তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস মজুত করে এক বা দু'সপ্তাহ পরে অনেক উচ্চ মূল্যে বিক্রি করছিল। বৃদ্ধা মহিলারা বাড়িতে বসে টুপি বা হাতমোজা বুনে সেসব বিক্রি করছিলেন রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু এই নিদারুণ দৃশ্য দেখেও তার মধ্যে নাকি আশার আলো দেখতে পাচ্ছিলেন সেসময়ের অর্থমন্ত্রী আন্দ্রে নিচায়েভ।
"আপনাকে বুঝতে হবে, যে দেশটা কার্যত ভেঙ্গে পড়েছে, যে দেশ দেউলিয়া হয়ে গেছে, আপনি যদি সেই দেশের সরকার চালানোর দায়িত্বে থাকেন, যদি বৃদ্ধ লোকজনকে আপনি অবসর ভাতা পর্যন্ত দিতে না পারেন, তখন তারা যে এভাবে জীবনধারণের একটা উপায় খুঁজে বের করেছে, নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগাচ্ছে, সেটা কী ভালো নয়?"
"তারা যে হাতমোজা বুনে রাতের খাবার কেনার মতো কিছু আয় করছিল, সেটা কী ভালো নয়?"
তবে রাস্তায় যারা এরকম ব্যবসায় নেমেছিলেন, তাদের সবাই আমদানি করা বিদেশি পণ্য অনেক চড়া মূল্যে বিক্রি করছিলেন। এ অবস্থায় দারিদ্রক্লিষ্ট হাজার হাজার রুশ নাগরিক রাস্তায় নামলেন বিক্ষোভ করতে।
কিন্তু এই বিক্ষোভ সত্ত্বেও সরকার তাদের সংস্কার অব্যাহত রাখলো। এর ফলে সাধারণ মানুষের দু:খ দুর্দশা আরও বাড়লো। মাত্র এক বছরের মধ্যেই রাশিয়ার শিল্পোৎপাদন বিশ শতাংশ কমে গেল।
রাশিয়ার শিল্প এবং সামরিক যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবসায় ধস নামলো। তবে সেসময়ের অর্থমন্ত্রী আন্দ্রে নিচায়েভ বলছেন, এটি এড়ানোর কোন উপায় তাদের সামনে ছিল না।
"সামরিক যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করা ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। আমি আপনাকে একটা উদাহারণ দেব।"
"একবার আমি সাইবেরিয়ার ওমস্কে গেলাম একটি ট্যাংক তৈরির কারখানা দেখতে। আমি কারখানার পরিচালককে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম, এই কারখানাটি এখন বেসামরিক কাজের উপযোগী কিছু তৈরির কারখানায় রূপান্তর করা দরকার। কিন্তু তিনি আমাকে অনুনয় বিনয় করছিলেন, দয়া করে দেখুন, আমরা কী চমৎকার ট্যাংক তৈরি করি।"
রাশিয়ার বড় বড় শহরে তখন তীব্র খাদ্য সংকট। দোকানগুলিতে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন
আন্দ্রে নিচায়েভ বলছিলেন, "এই কারখানার কর্মীরা আসলেই চমৎকার ট্যাংক তৈরি করেন। নাম দ্য ব্ল্যাক ঈগল, বা কালো ঈগল। এটি একটি দারুণ অস্ত্র, একই সঙ্গে এটি লাফাতে পারে, এবং গোলা ছুঁড়তে পারে।"
ট্যাংক দেখে তিনি বিমোহিত হয়ে গেলেন। কিন্তু কারখানা ঘুরে কাছের জঙ্গলে গিয়ে দেখলেন, সেখানে মাইলের পর মাইল শত শত সাধারণ ট্যাংক তুষারের নীচে ঢাকা পড়ে আছে।
"আমাদের দেশ তখন প্রচন্ড খাদ্য সংকটের মুখে। আর এই লোকগুলো তখনো পর্যন্ত ট্যাংক বানানো ছাড়া আর কিছু করতে পারছে না।"
"আমাদের তৈরি ট্যাংক হয়তো সেসময়ের বিশ্ব সেরা। কিন্তু আমাদের বাজেটের অবস্থা তখন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। আমি তখন নির্দেশ দিলাম ঐ কারখানায় একেবারে অত্যাধুনিক তিন ধরণের ট্যাংক ছাড়া আর সবধরণের ট্যাংক তৈরি বন্ধ করে দিতে হবে।"
এই সংস্কারের জের ধরে বহু দশকের মধ্যে রাশিয়ায় এক বিরাট সম্পদ বৈষম্য তৈরি হতে লাগলো। এক নব্য ধনিক শ্রেণী তৈরি হলো।
আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন মানের অবনতি ঘটতে থাকলো। অনেক মানুষের কোন রকমে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকাই দুস্কর হয়ে পড়লো। এরপর ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার কংগ্রেস অব ডেপুটিজ বা জনপ্রতিনিধিদের কংগ্রেসে সংস্কারবাদী সরকারের পদত্যাগের দাবি উঠলো।
সংস্কারের গতি ধীর করে আনার জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকলো। প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন প্রথমে তার সংস্কারবাদী প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করলেন। এরপর বরখাস্ত করলেন অর্থমন্ত্রী আন্দ্রে নিচায়েভকে।
রাশিয়ার প্রথম সংস্কারবাদী সরকার টিকেছিল এক বছরেরও কম সময়। তারা যা আশা করেছিল, তার চেয়ে অনেক দীর্ঘ সময়। আন্দ্রে নিচায়েভ অবশ্য গর্বিত তাদের কাজ নিয়ে।
"লোকে বলাবলি করে, নব্বই এর দশকটা তাদের জন্য কত কঠিন ছিল, যেসব ভুল তখন করা হয়েছে, ক্ষমতার যে অপব্যবহার হয়েছে।"
"কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেই প্রথম রাশিয়ার মানুষ ব্যবসা শুরু করেছে। একটা বাজার সৃষ্টি করার জন্য, তাদের ক্রেতাদের কাছে খাবার বা কাপড় বিক্রির জন্য।"
"তারা কিন্তু নিজেদের উদ্যোগে এটা করেছেন। কোন কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ছাড়া। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমি যা করেছি তার জন্য আমি গর্বিত। আমি এদেশ থেকে জিনিসপত্রের ঘাটতি দূর করেছি।"
রাশিয়ার এই চরম অর্থনৈতিক সংকট অব্যাহত ছিল পুরো নব্বই এর দশকের প্রথম ভাগ জুড়ে। মূদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তীব্র সংকট আর রাজনৈতিক অস্থিরতা -- সব মিলিয়ে সমাজতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদের পথে রাশিয়ার প্রথম কয়েক বছর ছিল দেশটির মানুষের জন্য এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা।
টেলিভিশনে পদত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছেন মিখাইল গর্বাচেভ

শুধু খাবারে সীমাবদ্ধ নয় ভারতের ঐতিহ্য

ভাবিকা গোভিলঃ
পাহাড়গঞ্জের টাইপোগ্রাফি থেকে কাশ্মীরের পাশমিনা তৈরি – ভারতের এই জিনিসগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে গেলে অভিজ্ঞতাটা আপনাকে অতীতে টেনে নিয়ে যাবে।
যদিও বলা হয়ে থাকে যে জীবনে খাবারের চেয়েও অনেক বেশি কিছু রয়েছে, তবে এটা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই যে খাবারের সংস্কৃতির বাইরেও বহু ঐতিহ্য রয়েছে। ভারতে ঐতিহ্য বলতে বোঝায় স্মৃতিস্মম্ভ, স্থাপত্যগুলো ঘুরে দেখা অথবা বিভিন্ন এলাকার খাবারের বৈচিত্র। এখানে ভিন্ন রকমের কিছু ঐতিহ্য তুলে এনেছি আমরা যেগুলোর মধ্যে রয়েছে দোকানের সাইন, স্ট্রিট আর্টসহ অন্য রকম কিছু বিষয়।
বুকওয়ার্মিং সফর, দিল্লী ও মুম্বাই
সাউথ বোম্বের ক্যাফে মোন্ডেগার
‘বিয়ন্ড বোম্বে’র প্রতিষ্ঠা করেছে স্মৃতি কে টায়াগি। এই কোম্পানিটি ভারতের ঐতিহ্যগুলো ঘুরিয়ে দেখায়। তাদের পছন্দের সফরগুলোর মধ্যে একটি হলো বুকওয়ার্মিং ট্যুর। কিছু রেস্টুরেন্টে যাওয়া হয় যেখানে কল্পনা আর বাস্তব এক হয়ে মিশে গেছে। মুম্বাইয়ে যারা আছেন, তারা শান্তারামে যেতে পারেন। মুম্বাইয়ে এ ধরণের যাওয়ার আরেকটি জায়গা হলো সুকেতু মেহতার বই আর ম্যাক্সিমাম সিটি।
টাইপোগ্রাফি, দিল্লী
পাহাড়গঞ্জের বিল্ডিংগুলোতে এ ধরণের চমৎকার সাইন নজরে পড়বে
দিল্লী-ভিত্তিক টাইপফেস ডিজাইনার পূজা সাক্সেনা পশ্চিম দিল্লীর শহরতলীর মূল মার্কেট এলাকার সাইনবোর্ডগুলো ঘুরে দেখেছেন। এগুলোর মধ্যে ফন্ট, ডিজাইন আর ইতিহাসকে একসাথে খুঁজে পেয়েছেন তিনি।
শুধু একটি ভাষা নয়, এই সব সাইনবোর্ডে পাওয়া যাবে ডজনখানিক ভাষা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কোরিয়ান, বাংলা, হিব্রু, তামিলসহ দিল্লীর বিভিন্ন এলাকার ভাষা।
স্ট্রিট আর্ট
রাস্তার পাশে দেয়ালে ইন্টারেকটিভ আর্ট
স্টার্ট (St+art) ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশান শহরের দেয়ালগুলোতে প্রমাণ সাইজের ম্যুরাল ও চিত্রকর্ম এঁকেছে। এগুলোর মাধ্যমে সড়কগুলোকে আরও ইন্টারেকটিভ করে তুলতে চায় তারা। তাদের এই প্রচেষ্টার কারণে শহরের বিভিন্ন জায়গা জীবন্ত যাদুঘর হয়ে উঠেছে।
নিজেদের তৈরি শিল্পকর্মগুলো ঘুরে দেখানোর আয়োজনও রয়েছে তাদের। দিল্লীর লোধি আর্ট ডিস্ট্রিক্টে সাধারণত এই ঘুরে দেখানোর আয়োজন রয়েছে।
মধ্যরাতের কলকাতা
রাতের হাওড়া ব্রিজ
ঘড়িতে রাত ১২টা বাজার পর কলকাতার জটিল সড়কগুলো ঘুরে দেখতে বের হোন। এই সফরের আয়োজন করে ‘লেট আস গো’। দিনের ট্রাফিকের জঞ্জালে যাদের ঐতিহাসিক জায়গাগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ নেই, তাদের জন্যই এ আয়োজন।
ইডেন গার্ডেন পার হয়ে যাবেন আপনি। বিধান সভা দেখবেন। সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ আর লাল বাজার দেখবেন। আর দেখবেন হাওড়া ব্রিজ – রাতের আলোতে কেমন ঐশ্বর্যময় হয়ে আছে।
সাহাপেডিয়া’র সাথে ঘোরাঘুরি
জয়পুরের নীল দেয়ালের শহরে পসরার আয়োজন
সাহাপেডিয়া ওয়াকস অ্যান্ড টকস বিভিন্ন শহরে ঘুরিয়ে দেখায়। কলকাতার পুরনো চায়নাটাউন, জয়পুরের নীল শহর, হায়দ্রাবাদের সেন্টেনারি মিউজিয়াম বা বিকানারের কূপ আর তালাব – সব খানেই আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাবে এরা।
আর্টস, মুম্বাই
মুম্বাইয়ের গ্যালারিতে চিত্রকর্ম প্রদর্শনী
হেরিটেজ ওয়াক বলতে আমরা সাধারণ স্থাপত্য আর ভবনগুলোকেই বুঝি। কিন্তু এর ভেতরের জিনিসগুলোর কি হবে? ‘আর্টস ওয়াক মুম্বাই’ দর্শনার্থীদের বিভিন্ন গ্যালারি ও যাদুঘরের ভেতরে ঘুরিয়ে দেখায়।
কাশ্মীরের শৈলী
শ্রীনগরের জায়নাকাদালের স্থানীয় বাজারে পসরা বিছিয়ে বসেছে দোকানিরা
কাশ্মীর বলতেই আমরা বুঝি তুষারে ঢাকা পর্বতচূড়া, সবুজ প্রান্তর আর বিশাল ডাল লেক। কিন্তু দেখার আরও অনেক কিছু রয়েছে সেখানে। শ্রীনগরে এ ধরণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে ‘ব্রেকঅ্যাওয়ে’।
তাদের সাথে সফরে আপনি স্থানীয় ওয়ার্কশপগুলো ঘুরে দেখতে পারবেন। দেখবেন চমৎকার সব পাশমিনা তৈরি করা হচ্ছে। কানি বয়ন দেখতে পারবেন যারা দুই মিটার দীর্ঘ জামাভার শাল হাতে তৈরি করে। এর সাথে স্থানীয়দের ঘরে তৈরি খাবার খাবারও সুযোগ হবে আপনার। এরা আপনাকে শ্রীনগরের সবচেয়ে পুরনো ব্রিজটিও দেখাতে নিয়ে যাবে। সফর শেষ হবে স্থানীয় বাজারে এসে।

Monday, April 18, 2022

ডোম অফ দ্য রক ও মসজিদ আল-আকসা

Dome of the Rock
৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমরা বাইজেন্টাইন অধীনস্থ জেরুজালেম নগরী জয় করে। ইসলামের প্রথম কিবলা এবং মি’রাজের সাথে সম্পর্কিত জেরুজালেম (আরবী নাম আল-কুদস القدس al-Quds – The Holy One) ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। পুরনো জেরুজালেমে অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘ডোম অফ দ্য রক’ এবং ‘মসজিদ আল আকসা’ নিয়ে মুসলিম বিশ্বে কিছু বিভ্রান্তি আছে যা নিয়ে এ লেখাটির অবতারণা।
ডোম অফ দ্য রক – Dome of the Rock (Arabic قبة الصخرة‎, Qubbat as-Sakhrah)
উপরের স্থাপনাটি মুসলিম বিশ্বে সচরাচর আল আকসা মসজিদ হিসেবে পরিচিত হলেও এ স্থাপনাটির সুনির্দিষ্ট আরবী নাম قبة الصخرة‎ (Qubbat As-Sakhrah), ইংরেজিতে Dome of the Rock, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘পাথরের (উপর নির্মিত) গম্বুজ’। ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ববাহী বিবিধ কারণে পুরনো জেরুজালেমের পবিত্র ‘টেম্পল মাউন্ট’ (Temple Mount – আরবী الحرم الشريف al Haram ash-Sharif – The Noble Sanctuary) চত্বরের কেন্দ্রস্থলে এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত অষ্টভুজাকৃতির এই স্থাপনাটির নকশা ও অলংকরণে সমসাময়িক বাইজেন্টাইন স্থাপত্যশৈলী এবং উদীয়মান স্বতন্ত্র ইসলামিক ট্র্যাডিশনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় যাতে টেক্সচুয়াল ও আর্কিটেকচারাল ন্যারেটিভ একে অপরকে জোরদার করে।
Dome of the Rock interior
এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ যে এই স্থাপনাটি মূলত: মসজিদ হিসেবে নির্মিত হয়নি (মূল অংশে কোন মিম্বর নেই), বরং মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী হাদিসে বিশদভাবে বর্ণিত যে পবিত্র পাথরের উপর থেকে রাসূল(সা:) মি’রাজে (Ascension to Heaven) গমন করেছিলেন বলে ধারণা, জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট চত্বরের কেন্দ্রস্থিত সেই Foundation Stone বা ভিত্তিপ্রস্তরকে ঘিরে একটি shrine (মাজার) হিসেবে এই স্থাপনাটি নির্মিত। জুডিও-ক্রিস্টিয়ান ট্র্যাডিশন অনুযায়ী এই সেই স্থান যেখানে ইব্রাহীম(আঃ) তাঁর সন্তানকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন এবং যেখানে পরবর্তীতে সোলায়মান(আঃ) এর টেম্পল ছিল। স্থানটির ধর্মীয় তাৎপর্যের স্মারকচিহ্ন হিসেবে স্থাপনাটি নির্মিত যা তার আভ্যন্তরীণ নকশা দেখলে বোঝা যায় –
গম্বুজের ঠিক নিচে স্থাপনার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পবিত্র পাথর (Foundation Stone) যা পারিপার্শ্বিকতার অংশ হিসেবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে ৯০ মিলিয়ন বছরের পুরনো (Upper Turonian Stage, Late Cretaceous karsted limestone) –
The Holy Rock at the center of the interior
পাথরটি পুরোপুরি নিরেট নয়, বরং এর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি গর্ত আছে যা দিয়ে পাথরের নিচে অবস্থিত আংশিক প্রাকৃতিক ও আংশিক মানবসৃষ্ট একটি গুহায় (cavern) প্রবেশ করা যায়। Well of Souls (আত্মার কূপ) নামে পরিচিত এই গুহার অভ্যন্তরে রয়েছে নামাজের জায়গা –
বাহ্যিক নকশা (Exterior Design)
অটোমান সম্রাট সুলেমান (Suleiman the Magnificent) এর শাসনামলে ডোম অফ দ্য রকের বাইরের দেয়াল সুদৃশ্য টাইল দিয়ে আচ্ছাদিত হয়। ১৯৫৫ সালে জর্ডানের সরকার অন্যান্য আরব রাষ্ট্র ও তুরস্কের সহায়তায় প্রবল বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাটির মেরামত কাজ শুরু করে। এই পুনরুদ্ধার কাজের অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে এর সীসা (Lead) আচ্ছাদিত গম্বুজটি ইটালিতে তৈরি অ্যালুমিনাম-ব্রোঞ্জ সংকর ধাতু দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে জর্ডানের কিং হুসেইন প্রদত্ত ৮.২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৮০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ দিয়ে গম্বুজটি পুরোপুরি আচ্ছাদন করা হয়। জেরুজালেমের যে কোন প্রান্ত থেকে ডোম অফ দ্য রকের উজ্জ্বল সোনালী গম্বুজটি চোখে পড়ে।
আভ্যন্তরীণ নকশা (Interior Design)
স্থাপনাটির অভ্যন্তরে রয়েছে মোজাইক, মার্বেল, ও চীনেমাটির সুদৃশ্য অলংকরণ যা বিভিন্ন শাসনামলে নতুন করে যোগ করা হয়েছে।
স্থাপনাটির ভেতরের এবং বাইরের দেয়ালে রয়েছে এর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থানের সাথে সঙ্গতি ও তাৎপর্যপূর্ণ সুরা ইয়াসিন, সুরা মারিয়াম ও সুরা ইসরা সহ কুর’আনের বিভিন্ন আয়াতের কারুকার্যময় ক্যালিগ্রাফি –
মসজিদ আল আকসা
জেরুজালেমের টেম্পল মাউন্ট চত্বরে উপরোল্লিখিত ‘ডোম অফ দ্য রক’ স্থাপনাটির ২০০ মিটার দক্ষিণে রয়েছে ধূসর সীসায় (lead) আচ্ছাদিত গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ যা সুনির্দিষ্টভাবে ‘মসজিদ আল-আকসা’ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা:) ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম বিজয়ের পর পবিত্র পাথরের দক্ষিণে একটি ছোট মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক এই মসজিদটির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেন যার কাজ শেষ হয় ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ছেলে আল-ওয়ালিদের শাসনামলে। কালের পরিক্রমায় বহুবার মসজিদটি সংস্কার ও পুনর্গঠন করা হয় – যোগ করা হয় গম্বুজ, মিম্বর, মিনারত।
Prayer area inside the cave under the Holy Rock
১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করার পর মসজিদটি একটি প্যালেস এবং চার্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অবশেষে সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে জেরুজালেম পুনর্দখল করেন এবং পুনরায় স্থাপনাটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন। সালাহউদ্দীনের পূর্বসূরি সেলজুক আমির নূরউদ্দীন জঙ্গি ১১৬৮ সালে মসজিদটির জন্য সিরিয়া থেকে আইভরি (হাতির দাঁত) ও কাঠের কারুকাজ করা একটি সুদৃশ্য মিম্বর তৈরির নির্দেশ দেন যার কাজ শেষ হয় তাঁর মৃত্যুর পর। জেরুজালেম পুনর্দখলের পর ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দীন মিম্বরটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৯ সালে একজন অস্ট্রেলীয় পর্যটকের সন্ত্রাসমূলক অগ্নিসংযোগে মসজিদের দক্ষিণপূর্ব অংশসহ দ্বাদশ শতাব্দীর কারুকার্যপূর্ণ মিম্বরটি পুড়ে যায়, তার জায়গায় এখন রয়েছে একটি Replica বা অনুকৃতি।
নামের বিভ্রান্তি
মুসলিম বিশ্বে আলোচ্য স্থাপনা দুটির নাম ও উৎপত্তি নিয়ে বেশ কিছু বিভ্রান্তি ও Conspiracy Theory প্রচলিত আছে। নিচের ছবিতে জেরুজালেমের হারাম শরীফে স্থাপনা দুটির তুলনামূলক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে যা এদের ভিন্নতা বুঝতে সহায়ক হবে।
Dome of the Rock: Interior decoration
এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে কুর’আনে সুরা ইসরায় (বনী ইসরাঈল) মক্কার ‘মসজিদ আল হারাম’ থেকে ‘মসজিদ আল আকসা’ বা দূরবর্তী মসজিদে রাসূল(সা:) এর ইসরা বা রাত্রিকালীন ভ্রমণের (The Night Journey) বিষয়টি যখন নাজিল হয়, তখন তা বিশেষভাবে একটি জায়গাকে নির্দেশ করে, আজকের আল আকসা মসজিদ ভবনটিকে নয়। জেরুজালেম সেসময় রোমানদের শাসনাধীন ছিল।
Masjid al-Aqsa
  • *“সকল মহিমা তাঁর যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম (পবিত্র মসজিদ) থেকে মসজিদে আকসা (দূরবর্তী মসজিদ) পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” আল কুর’আন – ১৭ঃ১”
  • *“Exalted is He who took His Servant by night from al-Masjid al-Haram to al-Masjid al-Aqsa, whose surroundings We have blessed, to show him of Our signs. Indeed, He is the All-Hearing, the All-Seeing.” Al Qur’an – 17:1
Masjid al-Aqsa: hypostyle prayer hall
রাসূলের(সা:) মৃত্যুর পর ৬৩৭/৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় খলিফা উমরের(রা:) সময় মুসলিমরা জেরুজালেম জয় করে। এরপর হাদিসের বিশদ বর্ণনা অনুসারে টেম্পল মাউন্টের কেন্দ্রে অবস্থিত পবিত্র পাথরটিকে রাসূলের মি’রাজে গমনের স্থান হিসেবে নিরূপণ করা হয় এবং এর কিছু দক্ষিণে একটি মসজিদ স্থাপন করা হয়। পরবর্তী বহু শতাব্দী পর্যন্ত পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত মসজিদ ভবন এবং ডোম অফ দ্য রক স্থাপনা সহ পারিপার্শ্বিক পুরো টেম্পল মাউন্ট এলাকাটিই মুসলিমদের কাছে কুর’আনে বর্ণিত ‘মসজিদ আল আকসা’ নামে এবং মসজিদ ভবনটি ‘আল-জামই আল-আকসা’ নামে পরিচিত ছিল। ষোড়শ শতকে অটোমান শাসনামলে মসজিদের লাগোয়া টেম্পল মাউন্ট চত্বরটির ব্যাপক নির্মাণ ও সংস্কার কাজ সাধন করে এলাকাটিকে আল-হারাম আশ-শরীফ (the Noble Sanctuary) নামকরণ করা হয়। অন্যদিকে মসজিদ ভবনটি তখন থেকে ‘মসজিদ আল-আকসা’ নামে পরিচিত হয়। অধুনা এই পরিচয়টিই বহুল ব্যবহৃত। সামগ্রিকভাবে একই চত্বরে অবস্থিত Qubbat as-Sakhra বা ডোম অফ দ্য রক নামে পরিচিত স্থাপনাটি ঠিক মসজিদ হিসেবে নির্মিত নয়, যদিও এর ভেতরেও নামাজ পড়া হয়। শুক্রবারের জুম্মার নামাজে ইমাম মসজিদ আল-আকসাতে দাঁড়ান, ডোম অফ দ্য রকের অভ্যন্তরে তুলনামূলক স্বল্প-পরিসর স্থানে এসময় সাধারণত মহিলারা নামাজ আদায় করেন। স্বতন্ত্র হলেও এটা জানা জরুরী যে প্রায় ১৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য সম্বলিত গুরুত্বপূর্ণ এ দু’টি স্থাপনাই মুসলিমদের তৈরি এবং পুরো এলাকাটিই তাদের জন্য পবিত্র স্থান (الحرم الشريف – the Noble Sanctuary) হিসেবে গণ্য।
Masjid al-Aqsa: Interior
জেরুজালেমের হারাম শরীফের ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলীর উপর আরও বিশদ ভাবে জানতে চাইলে দেখুন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজের এমারিটাস প্রফেসর ও প্রখ্যাত ইসলামের ইতিহাস, স্থাপত্য ও কলা বিশারদ ডঃ ওলেগ গ্রাবারের (Dr. Oleg Grabar) ধারাবিবরণীতে একটি তথ্যবহুল ভার্চুয়াল প্যানোরামিক অডিও-ভিস্যুয়াল ট্যুর।
Dome of the Rock and Masjid al-Aqsa in al-Haram ash-Sharif

Friday, April 15, 2022

গল্প- বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা by লিডিয়া ডেভিস

অনুবাদ : মেহেদী হাসান। পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে চলা রাস্তাটা থেকে আমাকে জমিটা দেখানো হল। আর সাথে সাথেই আমি জমিটা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। জমির দালাল তখন যদি আমাকে জমিটির খারাপ দিক সম্পর্কে অবগত করত, তাহলে সেই মুহূর্তে আমি তার কথায় কর্ণপাত করতাম না। আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আমি মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম : লম্বা উপত্যকা জুড়ে গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে খানিকটা তলিয়ে যাওয়া লাল টকটকে আঙ্গুরের ক্ষেত; বেশ দূরে বুনো হলুদ রঙের লতাপাতা এবং কাঁটাগাছের ঝোপঝাড়ে ভরা ক্ষেত এবং এগুলোর পেছনে জঙ্গলে আচ্ছাদিত পাহাড়ের ঢালু; উপত্যকার মাঝখানে সামান্য উঁচু জায়গায় একটা খামার বাড়ির ধ্বংসস্তূপ : এটার বাগানের প্রাচীরের ভাঙা পাথরের ভেতর থেকে একটি তুন্ত গাছ গজিয়েছে এবং পাশেই মাটির উপর বিছিয়ে থাকা বাদামী রঙের পঁচে যাওয়া নাশপাতিগুলোর উপর প্রাচীন নাশপাতি গাছটির ছায়া পড়েছে।

গাড়ির উপর ঝুঁকে পড়ে দালালটি বলল, ‘এখনও একটা কক্ষ অটুট আছে। কক্ষটি ময়লা আবর্জনায় ভরা। অনেক বছর ধরে এখানে নানা ধরনের জীব-জন্তুর বাস’। আমরা পায়ে হেঁটে বাড়িটাতে ঢুকলাম। মেঝের টাইলসের উপর জীব-জন্তুর নাদা জমে ঘন হয়ে আছে। পাথরগুলোর মাঝখান দিয়ে বাতাস এসে গায়ে লাগল এবং সুউচ্চ ছাদের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক দেখতে পেলাম। তবে এগুলোর কোন কিছুই আমাকে দমাতে পারল না। আমি সেই দিনই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করিয়ে নিলাম।

এক টুকরো জমি খুঁজে পাওয়া এবং সেই জমির উপর বাড়ি বানানোর জন্য আমি এত বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি যে, মাঝে মাঝে মনে হয় এই পৃথিবীতে আমার আগমনের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। এই আকাঙ্ক্ষা আমার ভেতরে জন্ম নেয়ার পর থেকে আমার সকল শক্তি-সামর্থ্য এটা পূরণে নিয়োজিত : স্কুলের পাঠ চুকানোর সাথে সাথেই পাওয়া চাকরীটি খুবই ক্লান্তিকর এবং জঘন্য, তবে চাকরীটিতে আমার কাজের বোঝা বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বেতন বাড়তে থাকে। খুব কম টাকায় দিনাতিপাত করতে আমি খুবই সাদামাটা জীবন-যাপন করি এবং নিত্য নতুন বন্ধু-বান্ধব জোটানো এবং নিজেকে উপভোগ করার হাতছানি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখি। চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে নিজেকে জমি খোঁজার কাজে নিয়োজিত করার মত টাকা-পয়সা সঞ্চয় করতে আমার অনেক বছর সময় লেগে যায়। রিয়েল এস্টেটের দালাল আমাকে এক জমি থেকে আরেক জমিতে নিয়ে যেতে থাকে। জমি দেখতে দেখতে আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি এবং আসলে কী যে খুঁজছি তার দিশা হারিয়ে ফেলি। অবশেষে এই উপত্যকা আমার নজরে আসার সাথে সাথেই আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার মাথা থেকে একটা বিশাল বোঝা নেমে গেল।

গ্রীষ্মের উষ্ণতা যখন বাড়িটির উপর ঝুলে থাকে, কালি-ঝুলি মাখা আমার এই রাজকীয় কক্ষের ভেতরে আমি বেশ মজেই থাকি। ঝাড়পোছ করে নানা ধরনের আসবাবপত্র দিয়ে কক্ষটি সাজাই এবং কোনার দিকে একটা ছবি আঁকার বোর্ড স্থাপন করি, যেখানে আমি বাড়িটাকে নতুন করে বানানোর পরিকল্পনার কাজ শুরু করি। কাজ থেকে চোখ তুলে জলপাই’র পাতায় সূর্যের আলো দেখে বাইরে যাওয়ার জন্য মন আনচান করে ওঠে। বাড়ির পাশে ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়ানোর সময় আমি সারা জীবন শহরে কাটানো ক্লান্ত ও উৎসুক চোখে লতাগুল্মের ভেতর দিয়ে উড়ে বেড়ানো ম্যাগপাই এবং দেয়ালের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া টিকটিকির দিকে তাকিয়ে থাকি। ঝড়ো বাতাসে আমার জানালার পাশের সাইপ্রেস গাছগুলো নুয়ে পড়ে।

এরপর আসে শরতের কনকনে শীত এবং শিকারীরা আমার বাড়ির আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করতে শুরু করে। তাদের রাইফেলের গুলির শব্দে আমি আতঙ্কিত হয়ে উঠতে থাকি। পার্শ্ববর্তী ক্ষেতে সুয়ারেজ-ট্রিটমেন্ট চত্বরের একটা পাইপ ফেটে যায় এবং ভয়ানক দুর্গন্ধে চারপাশের বাতাস ভরে ওঠে। ফায়ারপ্লেসে আগুন ধরানোর পরও আমার রুম কখনই গরম হত না।

একদিন আমার জানালার কাছে এক তরুণ শিকারীর শরীরের ছায়া দেখতে পাই। লেদারের জ্যাকেট পরা লোকটির কাঁধে রাইফেল। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে আমার দরজার নিকটে এসে কড়া না নেড়েই ধাক্কা দিয়ে দরজাটি খুলে ফেলে। দরজার ছায়ায় দাঁড়িয়ে সে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার চোখজোড়া ছিল কোমল নীল এবং পাতলা লালচে দাড়িতে তার ত্বক কোনমতে ঢাকা পড়েছিল। তৎক্ষণাৎ তাকে আমার আধা-পাগল মনে হয় এবং আমি আতঙ্কিত হয়ে উঠি। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে : তারপর রুমের ভেতরে কী আছে সেসব বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখার পর দরজা বন্ধ করে চলে যায়।

আমার ভেতরটা রাগে গজ গজ করতে থাকে। এমনভাবে লোকটি আমার ছোট্ট পাথুরে কলমটি নাড়াচাড়া করে এবং এমন রূঢ়ভাবে আমাকে নিরীক্ষণ করে, মনে হয় যেন সে চিড়িয়াখানা দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমি ভয়ানক ক্রুদ্ধ হয়ে রুমের ভেতরে পায়চারী করতে থাকি। তবে এই অজপাড়া গায়ে আমার এই নিঃসঙ্গ জীবনে সে কৌতুহল জাগিয়ে তোলে। এবং বেশ কিছুদিন পর তাকে দেখার জন্য আমি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি।

সে আবার আসে এবং এবার সে আর দরজার সামনে ইতস্তত করে না, সোজা হেঁটে ঘরের ভেতরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে। তবে তার মুখের ভাষা আমি বুঝতে পারি না। সে একটা শব্দ দুই-তিন বার করে বলে এবং তা সত্ত্বেও সে কী বলতে চাচ্ছে, তা কেবল ধারণা করতে পারি। এবং যখন আমি তার কথার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি, আমার শহুরে ভাষা বুঝতে তার একই ধরনের সমস্যা হয়। তার সাথে কথাবলা বন্ধ করে আমি তাকে এক গ্লাস মদ এনে দেই। তবে সে তা ফিরিয়ে দেয়। সে অদ্ভুতভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এবং খুব কাছ থেকে আমার জিনিসপত্র নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করে। দেয়ালের পাশে আমার বইয়ের তাক থেকে সে দেখা শুরু করে। বইয়ের তাকটি ঢাকা ছিল এমন একটা কাপড় দিয়ে, যার উপর ছিল আমার বিশেষ পছন্দের বিভিন্ন স্থাপত্যের বাড়ির প্রিন্ট— বাড়িগুলোর কিছু ছিল প্যারিসের প্লাস দি ভোস (Place des Vosges)-এর রাজকীয় বাড়িগুলোর মতো এবং কিছু ছিল মোনপাহনাস (Montparnasse)-এর পেছনে দরিদ্র লোকদের কোয়ার্টারগুলোর মতো। অবশেষে সে আমার ছবি আঁকার বোর্ডের নিকট আসে, যেখানে সে কিছুক্ষণের জন্য থেমেবোর্ডের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে ব্যাপারটা কী তা জানার জন্য অপেক্ষা করে। আমি একটা বাড়ির বানানোর পরিকল্পনা করছি এই সত্যটি বুঝতে তার বেশ সময় লাগে এবং বুঝতে পারার পর সে প্রতিটি কক্ষের দেয়ালের কয়েক ইঞ্চি ওপর দিয়ে আঙুল ঘোরাতে থাকে। পরীক্ষা করে দেখা এবং আঙুল ঘোরানো শেষে সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। এরপর সে একপাশে এমন ব্যঙ্গাত্মকভাবে তাকায়, যার অর্থ আমি ধরতে পারি না এবং এরপর সে চলে যায়।

আমি আবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি এই ভেবে যে, সে আমার রুমে অনধিকার প্রবেশ করে আমার গোপনীয়তা জেনে গেল। তা সত্ত্বেও আমার রাগ পড়ে যাওয়ার পর চাই যে, সে ফিরে আসুক। এই ঝড়ো বাতাসের মধ্যেও সে পরের দিন এল। এবং কয়েকদিন পর আবারও এল। আমি তার প্রতীক্ষায় বসে থাকতে শুরু করি। সে প্রতিদিন অনেক ভোরে শিকারে বের হত এবং সপ্তাহে বেশ কয়েকবার শিকারের পর মাঠ থেকে হেঁটে আমার এখানে চলে আসত, মাঠের সাদা মাটির ওপর রোদ পড়ে চকচক করত। তার মুখ আনন্দে ঝলমল করত এবং সে প্রাণ শক্তিতে এতটাই ভরপুর থাকত যে, তা ভেতরে আটকে রাখতে পারত না : কয়েক মিনিট পরপর চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দ্রুত হেঁটে দরজার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাত, বেসুরো ভাবে শিষ বাজাতে বাজাতে রুমের মাঝখানে ফিরে এসে চেয়ারে বসে পড়ত। ধীরে ধীরে তার শক্তি ফুরিয়ে আসত এবং এক পর্যায়ে সব শক্তি শেষ হয়ে গেলে সে চলে যেত। সে কখনই কোন কিছু খেত না এবং খেতে বললে সে অবাক হয়ে যেত—যেন খাবার বা পানীয় ভাগ করে খাওয়া অন্তরঙ্গতার প্রকাশ।

আমাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করা তেমন সহজ ছিল না, তবে একত্রে করার মতো অনেক কাজ আমরা জুটিয়ে নিয়েছিলাম। দেয়ালের ফাটল বন্ধ করা এবং ফায়ারপ্লেসের জন্য কাঠ জড়ো করে দিয়ে সে শীতকালের জন্য প্রস্তুতি নিতে আমাকে সাহায্য করে। কাজ করার পর আমরা ক্ষেতে ও জঙ্গলে বেড়াতে যেতাম। আমার বন্ধুটি আমাকে তার পছন্দের জায়গাগুলো দেখায়—কাঁটাগাছের কুঞ্জ, খরগোশের আস্তানা এবং পাহাড় গায়ে একটা গুহা। তাকে দেখানোর মত একটা জিনিসই আমার ছিল এবং আমার মতই তার কাছেও এটাকে রহস্যাবৃত এবং চিত্তাকর্ষক মনে হয়েছে।

সে আমার সাথে দেখা করতে এলেই আমরা প্রথমে নীলনকশাটির কাছে যেতাম, যেখানে আমি আরেকটি কক্ষ যুক্ত করেছি অথবা আমার পড়ার কক্ষের পরিধি বাড়িয়েছি। তাকে দেখানোর জন্য সেখানে সবসময় কোন না কোন পরিবর্তন থাকত, কারণ পরিকল্পনার উন্নতিকল্পে আমি কখনও থেমে থাকি নি এবং সার্বক্ষণিক কাজ করে গিয়েছি। মাঝে মাঝে সে আমার পেন্সিল তুলে নিত এবং এলোপাতাড়ি এমন কিছু আঁকত যা আমার মনে কখনও আসে নি—একটি ধূমপান কক্ষ অথবা আলু রাখার ভূগর্ভস্থ ভান্ডার।

তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে ব্যস্ত থাকা এবং বন্ধুর সাথে সময় কাটানো একটা ভয়ঙ্কর সত্য থেকে আমার চোখ ফিরিয়ে রাখে : আমি যতই আমার এই বাড়িটাতে বাস করতে থাকি এবং সময় যতই গড়িয়ে যেতে থাকে আমার বাড়ি বানানোর সম্ভবনা ততই ফিকে হয়ে উঠে। টাকা-পয়সা হাত গলে বেরিয়ে যেতে থাকে এবং আমার স্বপ্নও এটার সাথে সাথে উবে যেতে শুরু করে। আশেপাশে কোন বাজার না থাকা এই গ্রামটিতে খাবারের দাম ছিল শহরের চেয়ে দ্বিগুন। ভাল রাজমিস্ত্রি এবং ছুতার, এমনকি গরীবরাও ছিল দুষ্প্রাপ্য এবং তাদের মজুরী এখানে অনেক বেশী : কয়েক মাসের জন্য তাদের কাজে লাগালে আমার কাছে চলার মত আর তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। এসব জানার পরও আমি হাল ছাড়ি নি, তবে আমাকে জর্জরিত করে রাখা এইসব প্রশ্নের কোন উত্তর আমার জানা ছিল না।

শুরুতে বাড়ির নীলনকশা আমার সকল সময় এবং মনোযোগ কেড়ে নিত কারণ এই নীলনকশা থেকেই আমি আমার বাড়ি তৈরী করতে চেয়েছি। ধীরে ধীরে এই নীলনকশাটি আমার কাছে সত্যিকারের বাড়ির চেয়েও বেশী জীবন্ত হয়ে ওঠে : পেনসিলে আঁকা রেখাগুলোর মাঝে আমি কল্পনায় আরো বেশী সময় কাটাতে থাকি, যে রেখাগুলো আমি আমার খুশী মত পরিবর্তন করতাম। তবে আমি যদি খোলাখুলি স্বীকার করতাম যে, বাড়িটি তৈরীর আর কোন সম্ভাবনা নেই তাহলে নীলনকশাটা তার আবেদন হারাত। সুতরাং বাড়ি তৈরীতে আমি বিশ্বাস হারাই নি যদিও আমার এই বিশ্বাসের তলা থেকে বাড়ি তৈরির সম্ভাবনা ক্রমান্বয়ে ধ্বসে যেতে থাকে।

গ্রামটির আশেপাশে কয়েক মাস অন্তর অন্তর নতুন বাড়ি গজিয়ে ওঠা আমার পরিস্থিতিকে আরো বেশী নাজুক করে তোলে। জমিটা কেনার সময় এই উপত্যকায় একমাত্র যে স্থাপনাগুলো ছিল, তা হল মাঠের মধ্যে চষা জমির উপর উবু হয়ে বসে থাকা পাথরের কুঁড়েঘর যেগুলোর ভেতরটা গুহার মতই অন্ধকার। দলিলে সাক্ষর করার পর আমি এখানে দাঁড়িয়ে একরের পর একর পরিত্যক্ত আঙুর এবং ফসলের ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এরপর চোখ চলে গিয়েছিল দিগন্তে যেখানে গ্রামটি একটি ছোট্ট পাহাড়ের উপর জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। দুর্গের মত দেখতে গ্রামটির গীর্জার বুরুজগুলো উপরে গুচ্ছবদ্ধ। আর এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এই এলাকাটির এখানে সেখানে লাল মাটির উপরে ক্ষত চোখে পড়ে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই ক্ষতের উপর থেকে খোস-পাঁচড়ার মত জেগে উঠে নতুন বাড়ি। এইসব পরিবর্তন মানিয়ে নেয়ার মত সময় এই অঞ্চলটির ছিল না : এক বাড়ির কাজ শেষ হতে না হতেই আরেকটা বাড়ির তৈরীর জন্য ওক গাছ কাটা শুরু হয়ে যেত।

আমি ভয় এবং সন্দেহের সাথে একটা বাড়ি কাজ এগিয়ে যেতে দেখি, কারণ আমার বাড়ি থেকে এটার দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটাপথ। যে পরিকল্পিত গতিতে এটার কাজ এগোতে থাকে তা আমাকে নাড়িয়ে দেয় এবং মনে হয় যেন এটা আমার পরিস্থিতিকে বিদ্রুপ করছে। পান্ডুর বর্ণের দেয়াল এবং জানালায় সস্তা লোহার গ্রিলের বাড়িটা দেখতে কুৎসিত।

বাড়িটার কাজ শেষ হওয়ার এবং বাড়িটির পাশে শেষ চারা গাছটি রোপন হওয়ার সাথে সাথে বাড়ির মালিক পরিবার নিয়ে শহর থেকে গাড়ি চালিয়ে এসে পুরো সেইন্টডে এখানে কাটিয়ে যায়। এরা বারান্দা থেকে উপত্যকার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন তারা বক্সসিটে বসে অপেরা উপভোগ করছে। আবহাওয়া ভাল থাকলে প্রত্যেক সাপ্তাহিক ছুটিতে তারা বাড়িটাতে আসে এবং এই প্রত্যন্ত অঞ্চলটাকে তাদের রেডিও’র শব্দে ভরিয়ে ফেলে। আমি গোমড়া মুখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে তাদের কাজকর্ম দেখি।

সবচেয়ে খারাপ ঘটনাটা হল, সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে আমার বন্ধুটি আমার সাথে দেখা করতে আসা বন্ধ করে দিল। আমি জানতাম যে আমার প্রতিবেশীরা তাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। একদিন দূর থেকে উঠানের মধ্যে তাদের মাঝখানে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আমার নিজেকে খুব অসহায় লাগে। অবশেষে আমাকে মনে মনে স্বীকার করতে হল যে, আমার পরিস্থিতি কতটা নাজুক। মনে হল জমিটা বিক্রি করে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাই।

আশা করলাম যে, শহুরে লোকদের কাছ থেকে জমিটির ভাল দাম পাব। তবে যখন আমি রিয়েল এস্টেটের দালালের শরণাপন্ন হলাম, সে আমাকে খোলাখুলি বলল, যেহেতু পাশের জমিতে একটা সুয়ারেজ ইয়ার্ড আছে এবং আমার বাড়ি বসবাসের অযোগ্য তাই, এই জমি বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব। সে আরো বলল যে, আমার প্রতিবেশীরাই কেবল এই জমি কেনার ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে। যারা সত্যিকার অর্থে এখানে আমার উপস্থিতিতে বিরক্ত এবং আমাকে এখান থেকে বিদায় করার জন্য নামমাত্র একটা মূল্য দিতে রাজী। তারা এই দালালকে জানিয়েছে যে তাদের বাহির উঠানের সামনে আমার বাড়িটি একটা চক্ষুশূল এবং তাদের বন্ধু-বান্ধব বেড়াতে এলে এটা তাদের জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়ায়। এটা শুনে আমি খুবই মর্মাহত হলাম। আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে, এই জমি কখনই আমার প্রতিবেশীদের নিকট বিক্রি করব না। কখনই আমার উপর দিয়ে তাদেরকে টেক্কা দিতে দিব না। আমি কোন কথা না বাড়িয়ে দালালটির কাছ থেকে চলে আসি। যখন আমি বিষন্ন মনে দরজার বাইরে পা রাখি তখন তার অন্য রুমে হেঁটে যাওয়ার এবং তার বউয়ের সাথে কথা বলার এবং উচ্চস্বরে হাসার শব্দ শুনতে পাই।

এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়।

কয়েক সপ্তাহ পর আমার বন্ধুটি যখন কোন কিছু না জানিয়ে আমার এখানে আসা একবারে বন্ধ করে দেয় তখন আমার তিক্ততা কানায় কানায় ভরে উঠে। আমি হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হই এবং সিদ্ধান্তে আসি যে, বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা বাদ দিয়ে শহরে গিয়ে আমার পুরাতন চাকরীতে ফিরে যাব। আমার প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিরা আমার জায়গায় নেয়ার মত এমন কাউকে খুঁজে পায় নি যে, এই দীর্ঘ কর্ম ঘন্টা হাসি মুখে সহ্য করবে এবং নিজেকে এই অন্তহীন জটিলতার মধ্যে নিক্ষেপ করবে। তারা বেশ কয়েকবার চিঠি লেখে আমাকে ফিরে আসতে বলেছে এবং বেশী বেতনের প্রস্তাব দিয়েছে। আমার মনে হল আমি খুব সহজেই আমার পুরাতন জীবনে ফিরে যেতে পারি। তাহলে এই গ্রামাঞ্চলে আমার এই থাকাটাকে একটা দীর্ঘ ছুটি কাটানো বলে চালিয়ে দেয়া যায়। এমনকি কিছুক্ষণের জন্য আমার মধ্যে এই উপলব্ধি আসে যে আমি শহুরে জীবন এবং অফিসে আমার পরিচিতদের অভাব অনুভব করছি, যারা আমাকে বিশেষ করে কর্মক্লান্ত দিন শেষে পানীয় কিনে খাওয়াত। জমির দালালটিকে আমার প্রতিবেশীদের কাছে জমি বিক্রির প্রস্তাব দিতে বলি এবং নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে আমি সঠিক কাজটিই করছি। তবে এই কাজে আমার হৃদয় টানে নি। জিনিসপত্র বাঁধার সময় এবং বাড়ির ক্ষুদ্র চৌহদ্দির মধ্যে শেষবারের মত হেঁটে বেড়ানোর সময় নিজেকে একজন বদলে যাওয়া মানুষ মনে হতে থাকে।

প্রথম সূর্যালোকে আমার সুটকেস দরজার বাইরে আসে এবং আমার ভাড়া করা ট্যাক্সিটি ধুলো-ধূসরিত রাস্তা দিয়ে হেলেদুলে আমার কাছে চলে আসে। এবং আমি সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছিলাম। মনে হল আমি বোধ হয় একটু তাড়াহুড়া করে ফেলছি। তরুণ বন্ধুটির কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে যাওয়াটা বোধ হয় ঠিক হবে না, যে বন্ধুটির নামও আমি জানি না। ট্যাক্সি চালককে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে পরের দিন ঠিক এই সময়ে আসতে বলি। সে আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। ট্যাক্সির পেছনে ধুলো ঘূর্ণি হয়ে উঠে গাড়ির পেছন পেছন যেতে থাকে। আমি সুটকেসগুলো রুমের ভেতরে নিয়ে এসে বসে থাকি। আমার বন্ধুটিকে কিভাবে খুঁজে বের করা যায় তা ভেবে কিছুটা সময় ব্যয় করার পর আমার মনে হল যে, বোকার মত কাজ করে ফেলেছি। এরকম শোচনীয় পরিস্থিতিতে নিজেকে আরেকটা দিন ধরে রাখার কোন মানে হয় না এবং তাকে খুঁজে পাওয়াও সম্ভব নয়। অফিসের কর্তাব্যক্তিরা যখন দেখবে যে আমি অফিসে এসে উপস্থিত হই নি তখন বিরক্ত হয়ে উঠবে। তারা আমার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে আমার খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করবে। এবং খোঁজ নিতে না পেরে পুরোপুরি হতাশ হয়ে যাবে। সকাল গড়িয়ে যেতে থাকে এবং আমি আরো বেশী অস্থির ও নিজের প্রতি রেগে উঠি। আমার মনে হয় যে, বিশাল ভুল করে ফেলেছি। তবে এটা ভেবে একটু স্বস্তি পাই যে, পরের দিন সবকিছু পরিকল্পনা মাফিক হবে এবং শেষমেষ মনে হবে যে এই দিনটি আমাকে কখনও পার করতে হয় নি।

সেই দীর্ঘতপ্ত বিকেলে ছোট ছোট পাখিরা কাঁটাময় ঝোপঝাড়ে ডানা ঝাপটাতে থাকে এবং মাটি থেকে মিষ্টি গন্ধ ভেসে ওঠে। আকাশ ছিল মেঘশূন্য এবং সূর্য জমিনের বুকে কালো ছায়া ফেলছিল। আমি চারপাশের সৌন্দর্য থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে কাচারী ঘরের দেয়ালের পাশে বসে থাকি। আমার মন পড়ে থাকে শহরে এবং গ্রামের এই বন্দীদশা একঘেয়ে লাগতে শুরু করে। ঘরে রাতের বেলায় খাওয়ার মত কিছু ছিল না, তবে গ্রামের দিকে হেঁটে যেতেও ইচ্ছা করছিল না। ঠান্ডায় এবং ক্ষুধায় কাতর হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় নির্ঘুম শুয়ে থাকি।

সূর্যাদয়ের আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ি। আমি এমন ভয়ঙ্কর ক্ষুধার্ত ছিলাম যে, মনে হল যেন পেটে পাথর গজিয়েছে। ভাবলাম ট্রেন স্টেশনে গিয়ে সকালের নাস্তা সারা যাবে। জানালার বাইরে সবকিছু অন্ধকারে ঢাকা। অন্ধকার জঙ্গলের ওপাশে পুবের আকাশ ফর্সা হয়ে এলে দমকা হাওয়া এসে গাছের পাতা নাড়িয়ে দিল। ধীরে ধীরে গাছের পাতারা সবুজ রঙ ফিরে পেল। জঙ্গলে এবং বাড়ির পাশে পাখ-পাখালির কলকাকলী জেগে উঠে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। আমি খুব মনযোগ দিয়ে পাখিদের কল-কাকলী শুনলাম। অবশেষে যখন ট্যাক্সিটি চলে এল তখন এখানে এতই ভাল লেগে গেল যে, এখান থেকে চলে যেতে মন সায় দিল না। ট্যাক্সি চালক রাগারাগি করে চলে গেল।

পুরো সকালবেলা এবং বিকেল অব্দি আগের দিন ঠিক যেমনভাবে বসে ছিলাম সেভাবে আমি কাচারী ঘরে বসে রইলাম, তবে আজকে আমি অধৈর্য হয়ে পড়ি নি বা অন্য কোথাও যেতে মন উৎসুক হয় নি। আমার সামনে যা ঘটে চলে তাতে আমি মগ্ন হয়ে পড়ি—জঙ্গলের ভেতরে পাখদের হারিয়ে যাওয়া, পোকা-মাকড়দের পাথরের গা বেয়ে হেঁটে বেড়ানো—যেন আমি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছি, যেন আমি নিজের অনুপুস্থিতে সবকিছু চেয়ে চেয়ে দেখছি। অথবা এমন জায়গায় আছি যেখানে আমার থাকা উচিত নয়, যেখানে আমাকে কেউ চায় না, কিছুক্ষণের জন্য আলোর পেছনে পড়ে গিয়ে আমি নিজের ছায়া হয়ে উঠেছি; স্যুটকেসের ফিতা শীঘ্রই আটোসাটো হবে এবং আমি চলে যাব নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে : আমি আবার স্বাধীন হয়ে উঠব।

সন্ধ্যা নামার সময় আমি বুঝতে পারি নি যে, আমি ক্ষুধার্ত। বেশ হালকা বোধ হতে থাকে। আমি বসে বসে কিসের জন্য যেন অপেক্ষা করতে থাকি। প্রচণ্ড শীত এবং অন্ধকার তাড়িত হয়ে ঘরের ভেতরে এসে শুয়ে পড়ি এবং নানা ধরনের দুঃস্বপ্ন দেখি।

পরের দিন সকালবেলায় সবচেয়ে কাছের ক্ষেতটির দূর প্রান্তে ধীরে ধীরে হেঁটে আসতে থাকা একটা অবয়ব চোখে পড়ে। আমার মনে হল যেন একটি বিশাল শূন্যতা ভরে উঠল। শূন্যতাটির কথা না জেনেই আমি সেই কবে থেকে আমার বন্ধুর প্রতীক্ষায় বসে আছি। তাকে দেখার সাথে সাথে তার দ্বিধা অস্বাভাবিক মনে হতে শুরু হল এবং এটা আমাকে ভয় পাইয়ে দিল। সে হলরেখার ওপর দিয়ে হেলেদুলে আসছে, সে তার নাকটি এমনভাবে উপরে তুলে রেখেছে যেন স্প্যানিয়েল কুকুরের মত বাতাসের গন্ধ শুকছে এবং মনে হল কোথায় যাচ্ছে তা সে জানে না। তাকে এগিয়ে আনার জন্য তার দিকে দৌড়ে যাই এবং কাছাকাছি এসে দেখতে পাই যে, কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা এবং মুখ ভয়ানক ফ্যাকাসে। কাছে আসতেই সে হতচকিত হয়ে যায় এবং আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন আমি তার অপরিচিত। আমি তাকে ধরে ধরে নিয়ে আসি। বাড়িতে ঢোকা মাত্রই সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। ক্লান্তিতে সে থরথর করে কাঁপছিল। সে এত বেশী শুকিয়ে গেছে যে তার গালে গর্ত পড়ে গেছে এবং তার হাত হয়ে উঠেছে নখরের মত, চোখ জ্বরে জবা ফুলের মত লাল। আমি ডাক্তার ডাকতে গ্রামে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। তবে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হওয়ার পর সে অনেকটা ধীর-স্থির ভাবে কথা বলতে শুরু করে। অনেকক্ষণ ধরে সে কিছু একটা বলে এবং আমি কিছু না বুঝেই বিছানার পাশে বসে শুনে যাই। সে তার হাত দিয়ে বেশ কয়েকটা অঙ্গভঙ্গি করল এবং অবশেষে আমি বুঝতে পারি যে, শিকার করার সময় সে কোন একটা দূর্ঘটনার শিকার হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যখন আমি তাকে মনে মনে গালাগাল দিচ্ছি তখন সে কোন এক হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে।

সে অবিরত কথা বলতে থাকে এবং সে কী বলছে সেদিকে মনযোগ দেয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে উঠে। আমি অধৈর্য হয়ে উঠি। কিছুক্ষণ পর আমি এটা আর নিতে না পেরে উঠে দাঁড়িয়ে রুমের ভেতরে পায়চারি করতে শুরু করি। অবশেষে সে চুপ করে এবং রুমের এক কোনে জানালার নীচে আঙুল নির্দেশ করে। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না কারন সেখানে জানালা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। হঠাৎ আমি বুঝতে পারলাম যে, সে ছবি আকার বোর্ডের দিকে আমার মনযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে যা ওখান থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মানে, সে আমার বাড়ির নীলনকশাটা দেখতে চায়। মোড়ক খুলে নীলনকশাটা তার হাতে দিলাম। তারপরও তাকে অসন্তুষ্ট মনে হল। পকেট হাতড়ে একটা পেনসিল বের করে তাকে দিলাম। সে নীলনকশার উপর আঁকতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে সে পুরো কাগজটি কিনারা পর্যন্ত জটিল সব চিত্র দিয়ে ভরে ফেলল। তার দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে কাগজটির দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে আমি একটি টাওয়ারের ছবি চিনতে পারলাম এবং এমন একটা কিছু যাকে এই সব আঁকিবুঁকির মধ্যে একটা দরজা বলে বোধ হল। পৃষ্ঠাটি ভরিয়ে ফেললে আমি তাকে আরো পৃষ্ঠা এনে দিলাম এবং সে আঁকতে থাকল। আঁকার সময় তার হাত থামে নি বললেই চলে এবং যা সে এঁকেছে তার মধ্যে এমন জটিলতা আছে যা, বহু নিঃসঙ্গ দিনের চিন্তা এবং অনুশীলনের ফলেই কেবল আয়ত্ত করা সম্ভব। যখন সে এতই ক্লান্ত হয়ে পড়ল যে, পেনসিল নড়ানোর মত শক্তিও আর অবশিষ্ট রইল না, তখন সে ঘুমিয়ে পড়ল। সেই সন্ধ্যায় আমি তাকে রেখে গ্রামে খাবারের খোঁজে গেলাম।

ক্ষেত-খামার পাড়ি দিয়ে বাড়িতে ফেরার সময় লাল রঙের ভূ-দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে মনে হল যে আমি এটার সাথে গভীরভাবে পরিচিত, যেন এখানে আসার অনেক আগে থেকেই এটা আমার। এটাকে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তাকে তাৎপর্যহীন মনে হল। কয়েক দিনের মধ্যে আমার ক্ষোভ এবং হতাশায় ভাটা পড়ে, এখন সেই শুরুর দিককার মত যে জিনিসের দিকেই তাকাই না কেন, মনে হয় যেন একটা খোলস অথবা একটা খোসা যা ফেঁটে গিয়ে একটা নিখুঁত ফল বের হয়ে পড়বে। ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও, আমার মন সম্মুখ পানে ধাবিত হল : আমি বাড়ির পাশের এক ফালি জমি পরিষ্কার করে নিয়ে একটা আস্তাবল তৈরী করে সাদা-কালো গাভীদের নিয়ে এসে সেখানে ঢোকালাম আর ভীত-সন্ত্রস্ত মুরগীরা এগুলোর চারপাশে হেঁটে বেড়াতে লাগল। প্রতিবেশীর বাড়িটাকে আড়াল করার জন্য বাড়ির সীমানা দিয়ে একসার সাইপ্রেস গাছ লাগালাম। ধ্বসে পড়া দেয়ালটি ভেঙ্গে ফেলে একই পাথর দিয়ে আমার নিজস্ব খামার বাড়ি তৈরী করে ফেললাম। শেষ হওয়ার পর মনে হল এটা যার চোখে পড়বে তারই ঈর্ষা জাগ্রত হবে। আমার স্বপ্ন সত্যি হবে, প্রথমে যেমনটা হওয়ার কথা ছিল।

আমি সম্ভবত প্রলাপ বকছিলাম। ব্যাপারটির এমন পরিণতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তবে আমি যখন ক্ষেতের উপর হলরেখার গভীরে এক পা দিয়ে এবং আরেক পা দিয়ে হলরেখার চূড়া অতিক্রম করে হেঁটে আসছিলাম, এই আশঙ্কায় আমি খুবই খুশী হয়ে উঠি যে, যেকোন সময় আমার হতাশা এবং নৈরাশ্য পঙ্গপালের মত আকাশ অন্ধকার করে দিয়ে আমার উপর নিমজ্জিত হবে। সন্ধ্যাটা স্নিগ্ধ, আলো নরম ও কমনীয়, পৃথিবীটা পক্ষাঘাতগ্রস্থ এবং আমি, অনেক নীচে, একমাত্র সচল প্রাণী।