Thursday, August 9, 2018

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ মোকাবিলায় ইরান একা নয়

যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা কঠোর অবরোধের মধ্যেও ইরান তার বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। ইরান বুঝাতে চায় যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় তার সর্বত্রই মিত্র রয়েছে। সমপ্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ইয়োং-হো’র সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হওয়া বৈঠকের উভয় পক্ষই যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের শিকার। এ সময়ে, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে এ বৈঠক তাই কাকতালীয় কিছু নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আরোপ করা নতুন অবরোধকে সব থেকে আগ্রাসী (মোস্ট বাইটিং এভার) বলে অভিহিত করেছেন। মঙ্গলবার ডনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে যে দেশ বাণিজ্য করবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার কোনো বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকবে না। আল-জাজিরা সাংবাদিক কিম্বার্লি হালকেট হোয়াইট হাউজ থেকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প মূলত তার মিত্র দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করতে এ হুমকি দিয়েছেন। তবে এর বিপরীতে ইরানও বসে নেই। তারাও যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে একটা বার্তা দিতে চাচ্ছে যে ইরান একা নয়। মঙ্গলবার রাতে একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জারিফ লেখেন, বিশ্ব এখন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত ও ক্লান্ত। কোনো দেশই আর ওই আবেগপ্রবণ টুইটকারীকে অনুসরণ করবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, চীন ও আমাদের সব বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলোকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। আন্তর্জাতিক সংকট গ্রুপের ইরান বিষয়ক পরিচালক আলি ভায়েজও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ আগের অবরোধগুলোর তুলনায় অনেক কম প্রভাব ফেলবে ইরানের ওপরে। অবরোধ তখনই কার্যকর হয় যখন আন্তর্জাতিকভাবে তা সবাই গ্রহণ করে। কিন্তু এবার সেরকম কিছু হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র মূলত বিশ্বকে তার সামনে মাথানত করতে তর্জন গর্জন করছে। বিশ্বে এখন চীন ও রাশিয়ার মতো অনেক দেশই আছে যারা যুক্তরাষ্ট্রের কথায় উঠবস করবে না। এ কারণেই গতবারের অবরোধের মতো এটি তেমন কার্যকর হবে।
এছাড়া এ অবরোধ প্রকৃতপক্ষে ফলপ্রসূ হওয়ার পথে আরো কিছু বাধা রয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের এখনো সমঝোতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কেউই ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেনি ও তাদের সবাই যুক্তরাষ্ট্রের এরকম আচরণে ক্ষুব্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণী বিভাগের প্রধান ফেডেরিকা মোঘেরিনি ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে ইরানের সঙ্গে আরো বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান সমঝোতা অনুযায়ী তার পরমাণু কার্যক্রম সীমিত করেছে। মঙ্গলবার নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটন যাত্রাকালীন সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নেরই এখন ঠিক করা উচিত তারা কার সঙ্গে ব্যবসা করতে চায়। আমরা ইরানকে চুক্তিতে ধরে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইরানের অর্থনীতি ও মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনার মতো একটা চুক্তি এটি। ইরান শুধু এ অঞ্চলে না, সমগ্র বিশ্বজুড়েই নিরাপত্তাজনক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সঠিক কাজটি করছে না। ইরান চুক্তিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুধু এ অঞ্চলের জন্যই নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যই। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পুনরায় ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ করা অত্যন্ত হতাশাজনক। রাশিয়া এ চুক্তি ধরে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে। চীনও জানিয়ে দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কথামতো চলবে না।

'দ্রুতই পরিবর্তন হবে' -ড. কামাল হোসেন

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার দ্রুতই পরিবর্তন হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান প্রণেতা ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া- এর আয়োজনে ‘কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দেশের মালিক জনগণের করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ব্রিটিশ মন্ত্রী আমাকে বলেন- তোমার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করে এসেছি। তিনি বললেন- আরো ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকবেন। আমি তখন বললাম, আমি তো তাকে ১৫ সপ্তাহও ক্ষমতায় দেখিনা। তখন সেপ্টেম্বর মাস ছিল। আল্লাহর রহমতে ১৫ সপ্তাহের মধ্যেই আমরা মুক্ত হলাম। আমি ১৯৯১ সালে আমি লন্ডনে গেলে ব্রিটিশ ফরেন মিনিস্টার আমাকে দেখে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন- তুমি কিভাবে ভবিষ্যদ্বাণী দিলে- ১৫ সপ্তাহও এরশাদ ক্ষমতায় থাকবে না। আর সেটাই হল! তখন মনে মনে হেসে বললাম, মনের জোরে বলেছিলাম। ড. কামাল বলেন, বাঙালিদের মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। অন্যায় যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায় তখন আমরা দাঁড়িয়ে যাই যে, আর মেনে নেয়া যায় না। পরিবর্তন আনতে হবে। এটা একবার না। বার বার আমরা প্রমাণ করেছি। আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি বলে পেরেছি। সেটা সেই আশির দশকেও পেরেছি। তার আগেও পেরেছি। এখনো পারার মতো সেই অবস্থা আছে। আমরা যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে চেষ্টা করি তাহলে হবে। একবার নয় বহুবার পরিবর্তন হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, আবার হবে এবং দ্রুতই হবে। তিনি বলেন, কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া হবে- এই নামটা বলার দরকার নেই। কিসের কামাল হোসেনের নেতৃত্ব। আপনি নিজেই একটা নেতৃত্ব। আপনারা সবাই একজন নেতা। নামটা বলার অর্থ কি? আমি মরে গেলে কি তাহলে ঐক্য হবে না। তখন কি সবাই পরাধীন থাকবেন? আমি আপনাদের সহকর্মী হিসেবে যতদিন জীবিত আছি আপনাদের সঙ্গে থাকব। না থাকলে আপনাদেরই জাতীয় ঐক্য করতে হবে। একক নেতা খোঁজার সমালোচনা করে তিনি বলেন, একক নেতা খোঁজা খুব ভুল জিনিস। এটা থেকে মুক্ত হতে হবে। আজকে আমি সুযোগ পেয়েছি, এটা ভেঙে বলব। সবারই নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা আছে। কারো বেশি কারো কম। কিন্তু সকলের মধ্যেই উদ্যোক্তা হয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। দেশ তো আমাদের সকলের। বাংলাদেশ কোন ব্যক্তির না, গোষ্ঠির না; কোন পরিবারেরও না। এই কথাটা আমাদের সকলের অন্তর থেকে বিশ্বাস করতে হবে। এটা বিশ্বাস করেছিলাম বলে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছি। এটা বিশ্বাস করেছিলাম বলে কতো দুর্ঘটনা ঘটলো। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটলো। হত্যাকারীদের কি আমরা হ্যান্ডশেক করে ছেড়ে দিয়েছি? না। তাদের বিচার করেছি। এছাড়া, ২০০৫ সালে আমরা জাতীয় ঐক্য করে দেখিয়েছি। আবার ২০০৫ সালের মতো ঐক্য করা সম্ভব। গণফোরাম সভাপতি বলেন, আপনারা সবাই দেশের মালিক। মালিক হিসেবে নিজেকে মূল্যায়ন করেন। নিজে নিজের জায়গা থেকে কে-কি অবদান রাখতে পারবেন সেটা ভাবেন। উদ্যোগ নেন। আশেপাশে সমমনা যাদের পান তাদের বলেন, দেশের পরিবর্তন আনা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা ও যারা, উল্টো পথে আছে তাদের থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। এভাবে যদি আমরা মুভ করি, তাহলে আমি মনে করি- বাংলাদেশের মতো আর কোন দেশ পাবেন না, যেখানে এরকম সাড়া পাওয়া যায়।
ড. কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন জেলে আটকা পড়লেন তখন কি জনগণ বসে ছিল যে- উনি জেল থেকে বের হোক তারপর আমরা তার নেতৃত্বে যুদ্ধ করব। বঙ্গবন্ধুরও নির্দেশ ছিল- ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ো’। ওই কথাটা সবাই রক্ষা করেছে। প্রবীণ এ নেতা বলেন, কয়েকদিন আগে স্কুলের দুইটা ছেলে-মেয়ে মারা যাওয়ার পর কিভাবে ছেলে-মেয়েরা নেমে গেল। ওরা কি বলেছিল অমুকের নেতৃত্বের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি? উনি এসে নেতৃত্ব দিলে আমরা রাস্তা ঠিক করবো। তা করেনি। সবাই নেমে গিয়েছে। তিনি বলেন, এখনে কোনো শক্তি নেই যে, আমাদের এতো কোটি বাঙালীকে মেরে পরাধিন রাখবে। আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখবে। এই শক্তি পৃথিবীতেও কোথাও নেই। আমাদের দেশে তো নেই-ই। জনগণকে মেরে কোন লাভ হবে না। এই দেশ আমাদের। তাই আমাদের দেশকে গড়ার জন্য কারো অনুমতি লাগবে না। তিনি বলেন, আমরা ১৯৪৭ সাল থেকে লড়াই করছি। আইয়ুব খান বলেছিল আমরা অস্ত্রের ভাষায় জবাব দেব। আজকে কোথায় অস্ত্র, আর কোথায় আইয়ুব খান? এদেশের মানুষ ভাষা আন্দোলন করেছে। বলা হল বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবে না। কয়েকজন ছেলে বললো হবে না মানে? বাংলাই তো রাষ্ট্র ভাষা হবে। তারপর কয়েকজনকে জীবন দিতে হল। আর পাকিস্তান থাকতেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হল।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, গণতন্ত্র আনতে হলে সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ড. কামালকে সামনে আসতে হবে। অনেক কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো করতে হবে। তিনি বলেন, যখন মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম তখন স্বপ্ন ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এখন জনগণের সঙ্গে সরকার সব ক্ষেত্রে চালাকি করছে। গোয়েন্দা বাহিনী ও পুলিশ দিয়ে দেশ শাসন করছে। কেই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনী দিয়ে তুলে নেয়া হচ্ছে। এটা ভুল কাজ হচ্ছে। সরকার ভুল করছে। এসব করে লাভ হবে না। তার চেয়ে জনগণকে কথা বলতে দিন। কথা বলতে দিয়ে গুজব ছড়াবে না। কথা বলতে না দিয়ে গুজব ছড়াবেই। 
আলোচনা সভায় আরো জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তফা আমিন, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য মিলু চৌধুরী, হাবিবুর রহমান, যুব ঐক্যের আহ্বায়ক মুহাম্মদ হানিফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিলো কলম্বিয়া

স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে কলম্বিয়া। বুধবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ খবর নিশ্চিত করেছে। বলেছে, ৩রা আগস্ট ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতির আনুষ্ঠানিক চিঠি হস্তান্তর করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে মিডলইস্ট আই।
খবলে বলা হয়, ৭ই আগস্ট ইভান ডিউকি নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই কলম্বিয়া ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দেয়া চিঠিতে কলম্বিয়া বলেছে, ‘কলম্বিয়া সরকারের পক্ষ থেকে আপনাদেরকে অবহিত করতে চাই যে, প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল স্যান্তোস ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন, স্বনির্ভর ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ নতুন প্রেসিডেন্ট ইভান ডিউকি তার পূর্বসুরীর নেয়া পদক্ষেপ অনুমোদন করেছেন।
প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। শুধু ইসরাইল ও এর ঘনিষ্ঠ মিত্ররা ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বের বিরোধিতা করে। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস তার দেশকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য বরাবরই বিশ্ববাসীর প্রতি আহবান জানিয়ে আসছেন। তার দাবি, ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ওই অঞ্চলে শান্তি ফিরে আনতে সহায়তা করবে।

ঢাকায় যে প্রাসাদটি বিক্রি হল ৩৩২ কোটি টাকায়

বাইশ বিঘা জমির ওপর ১৯৩১ সালে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন ঢাকার ধনী ব্যবসায়ী হৃষিকেশ দাস। করিন্থীয়-গ্রিক শৈলী অনুকরণে সাত হাজার বর্গফুটের মূল বাড়িটির দোতলায় রয়েছে একটি বিরাট জলসাঘর, যার মেঝে দামী শ্বেত পাথরের, সিলিংয়ে সবুজ কাচ দিয়ে তৈরি ফুলের নকশা। সামনে শান বাঁধানো পুকুরে শ্বেত পাথরের ঘাট। বিদেশ থেকে আনা পাথরের ভাস্কর্য ও ফোয়ারা দিয়ে সাজানো বাগান। তবে ফোয়ারা নয়, সে বাগানের আসল আকর্ষণ তার কয়েক হাজার গোলাপ গাছ— ইরাকের বসরা ছাড়া হল্যান্ড, বেলজিয়ামের নানা শহর থেকে বাছাই করে এনে বসানো হয়েছিল সেগুলো। শীত পড়লে আজও রংয়ের উৎসব। আর সেই কারণেই এই বাড়ির নাম ‘রোজ় গার্ডেন’।
এই বাড়ি-ই কিনে নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। বর্তমান মালিককে এ জন্য ৩৩১ কোটি ৭০ লক্ষ ২ হাজার ৯০০ টাকা দিতে হবে বলে বুধবার জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। তবে স্থাপত্য ও গোলাপ বাগান ছাড়াও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে ‘রোজ় গার্ডেন’-এর, আর সে জন্যই সরকারের এই সিদ্ধান্ত। ১৯৪৯-এর ২৩ জুন এই বাড়িতেই শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুসলিম লিগ ভেঙে গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামি মুসলিম লিগ’। ১৯৫৫-এ নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে সেই দলই পরিণত হয় আওয়ামি লিগ-এ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল যারা।
তবে শখের বাড়িটি তৈরির পরেই ব্যবসায় মন্দা নামে হৃষিকেশের। এক সময়ে দেউলিয়াই হয়ে যান। পুস্তক ব্যবসায়ী কাজি আব্দুর রশিদ ১৯৩৬-এ বাড়িটি কিনে প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি গড়ে তোলেন। ১৯৬৬–তে মালিকানা পান তাঁর ভাই কাজি হুমায়ুন বশির। ১৯৭০-এ ‘বেঙ্গল স্টুডিয়ো ও মোশান পিকচার্স’ নামে একটি সংস্থা ‘রোজ় গার্ডেন’ প্যালেস ইজারা নিয়ে চলচ্চিত্রের শুটিং স্পট তৈরি করে। কিন্তু ১৯৮৯-এ বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রাসাদটিকে ‘সংরক্ষিত ভবন’ ঘোষণা করায় সে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এর পরে ১৯৯৩-এ ফের ‘রোজ় গার্ডেন’-এর দখল ফিরে পান কাজি আব্দুর রশিদের ছেলে কাজি আব্দুর রকিব।
তাঁর বিধবা স্ত্রী লায়লা রাকিবের কাছ থেকেই সরকার বাড়িটি কিনবে। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বুধবারের বৈঠকে এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে।
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িবহর ও আমার বাড়িতে হামলা: ঘটনার বিবরণ -ড. বদিউল আলমের বিবৃতি

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ৪ আগস্ট মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িবহর ও আমার বাড়িতে হামলার ঘটনাটি নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল নানাভাবে ষড়যন্ত্র তথ্যের গল্প ফাঁদছে। বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি মনে করি, মহল বিশেষের এমন অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র তথ্যের আশ্রয় নেয়াও অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি সেদিনের ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। বলেন, এই ন্যাক্বারজনক হামলা ও অপপ্রচারের তীব্র প্রতিবাদ ও সকল মহলকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানাই। নিচে  ড. বদিউল আলমের বিবৃতি তুলে ধরা হলো। 
গত ৪ আগস্ট ২০১৮, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট আমার মোহাম্মদপুরস্থ ১২/২, ইকবাল রোডের বাসায় একটি নৈশভোজ শেষে ফেরার পথে বাসার সামনে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত কর্তৃক আক্রমণের শিকার হন। একই সময়ে দুর্বৃত্তরা আমার বাড়িতেও হামলা চালায়। এই হামলার ঘটনাটি নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল নানাভাবে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের গল্প ফাঁদছে এবং বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার এ অপচেষ্টার প্রেক্ষিতে আমি এর বিবরণ নিম্নে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরলাম।
ঘটনার প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাশা বার্নিকাটকে আমি এবং আমার স্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে বহুদিন থেকেই চিনি। গত ৩ জুলাই  যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস পালন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আমি তাঁকে তাঁর বিদায়ের প্রাক্কালে আমার পরিবারের সঙ্গে একটি নৈশভোজে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানাই। রাষ্ট্রদূত তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং তারিখ নির্ধারণের লক্ষে তাঁর প্রটোকল কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে ৯ জুলাই আমি তাঁর প্রটোকল কর্মকর্তাকে  একটি ই-মেইল পাঠাই। একই দিনে আরেকটি ই-মেইলের মাধ্যমে তিনি আমাকে ০৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৭-৩০ টায় নৈশভোজটি আয়োজনের সময় দেন। দূতাবাসের প্রটোকল অনুযায়ী নৈশভোজের স্থান, সময় ও অংশগ্রহণকারীদের তালিকা সবই ইমেইলের মাধ্যমে তাদেরকে পাঠানো হয়। নৈশভোজের সময়, উদ্দেশ্য ও উপস্থিত অতিথিদের তালিকা নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের অপপ্রচার যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও সর্বৈব মিথ্যা তা এই ইমেইলগুলো দেখলেই যে কেউই বুঝতে পারবেন।
০৪ আগস্ট ২০১৮: যা ঘটেছিল :
০৪ আগস্ট ২০১৮, সন্ধ্যায় আমার বাসায় নৈশভোজে যোগ দেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, ড. কামাল হোসনে ও তার স্ত্রী ড. হামিদা হোসেন এবং জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান। এই দুই দম্পতির সঙ্গে পারিবারিকভাবে আমরা বহুদিন থেকেই ঘনিষ্ঠ। অসুস্থতার কারণে জনাব খানের স্ত্রী উক্ত নৈশভোজে যোগ দিতে পারেননি। উপরোক্ত চারজন ছাড়া আমি, আমার স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ ও দুই কন্যাসহ মোট দশজন নিয়ে ছিল এই নৈশভোজের আয়োজন।
রাত আনুমানিক ১১টার সময় রাষ্ট্রদূত যখন আমার বাসা থেকে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন, তখন একদল দুর্বৃত্তÑযাদের সংখ্যা আনুমানিক ৩০-৪০ জন তাঁর গাড়িতে হামলা করে। তারা তাঁর গাড়ি এবং আমার ছেলে, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের কোচ, ড. মাহবুব মজুমদারের ওপর আক্রমণ করে। দুর্বৃত্তরা জনাব বার্নিকাটের গাড়ির পেছন পেছন ধাওয়া করে এবং ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মারে। তারা পিস্তল ও লাঠিসোটা বহন করছিল এবং জনাব রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে আগুন দেওয়ারও উস্কানি দিচ্ছিল।
রাষ্ট্রদূতের গাড়ি দ্রুততার সাথে স্থান  ত্যাগ করার পর দুর্বৃত্তরা দোতলায় অবস্থিথ আমার বাসায় হামলা চালায়। তারা আমার বাসায় ইট-পাটকেল ছুঁড়ে জানালার কাঁচ ভাংচুর করে এবং গেট ভেঙ্গে বাসায় ঢোকারও চেষ্টা করে। যদি তারা আমাদের বাসায় ঢুকতে সক্ষম হত, তাহলে আরও গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো। আমরা সাথে সাথে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস ‘৯৯৯’ নাম্বারে কল করি। দুর্বৃত্তরা প্রায় আধা ঘন্টা আমাদের বাসার সামনে অবস্থান করে ও তা-ব চালায় এবং আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করতে থাকে। তারা দিনের বেলায় আমাদেরকে দেখে নেয়ার হুমকি দিতে থাকে।
আমাদের ‘৯৯৯’ নাম্বারে কল করার প্রেক্ষিতে হামলা শেষ হবার পর পুলিশ আসলেও আমাদের সঙ্গে কথা না বলে এবং আমাদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা না করেই চলে যায়, যদিও আমরা তখণ চরমভাবে আতঙ্কগ্রস্ত ছিলাম।
০৫ আগস্ট ২০১৮: অভিযোগ দাখিল:
০৫ আগস্ট ২০১৮, সকালে  আমি আমার তিনজন সহকর্মীসহ উপরোক্ত ঘটনাটির বিবরণ তুলে ধরে মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করি। আমি তাঁকে জানাই যে, দুর্বৃত্তদের হামলার কারণে আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এছাড়া চিঠিতে ঘটনাটি সম্পর্কে একটি মামলা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানাই এবং একইসঙ্গে আমি এবং আমার পরিবারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদানেরও অনুরোধ করি। থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে তারা জানাবেন যে এ বিষয়ে মামলা হবে, না-কি এটি জিডি হিসেবে গ্রহণ করা হবে। কিন্তু পরবর্তীতে থানা থেকে আমাদেরকে কিছু জানানো হয়নি। যদিও আমরা গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পারি যে, আমার অভিযোগটিকে জিডি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হাজির করার অপচেষ্টা:
যদিও নৈশভোজের বিষয়টি ছিল নিতান্তই একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং এর তারিখ নির্ধারণ করা হয় নিরাপদ সড়কের দাবিতে কিশোর বিক্ষোভ শুরুর ২০ দিন আগে, তথাপিও মহলবিশেষ এটিকে নিয়ে একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হাজির করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। এটিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য গণমাধ্যমগুলোকে তারা ব্যবহার করছে এবং নৈশভোজটিকে ‘ষড়যন্ত্র সভা’, ‘গোপন বৈঠক’ বলে অভিহিত করছে। একইসঙ্গে সেই নৈশভোজের সাথে কোনো ধরনের সংস্রবহীন আরও কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নাম তারা এতে জড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পুলিশের বরাত দিয়ে বিডিনিউজ২৪.কম (৬ আগস্ট ২০১৮) প্রকাশিথ এক প্রতিবেদনে আমার বাসার নৈশভোজে ড. কামাল হোসেন, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, এম হাফিজউদ্দিন খান, বিচারপতি আব্দুর রউফসহ বেশ কয়েকজন উপস্থিত ‘ থঅকার কথা বলা হয়। এটি একটি সর্বৈব অপপ্রচার, কারণ এই পারিবারিক অনুষ্ঠানে ড. হোসেন ও খান দম্পতি ব্যতীত বাইরের অন্য কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এবং কেউ উপস্থিতও ছিলেন না।
প্রসঙ্গত, আমার জানামতে রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখাশোনার দায়িত্ব ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপির) ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি ডিভিশনের। রাষ্ট্রদূত আমার বাাসয় যখন আসেন তখন তাঁর সাথে সিকিউরিটি প্রটেকশনের দুটি সরকারি গাড়ি ছিল এবং তাদের তৎপরতার ফলেই তিনি ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত প্রস্থান করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
রাষ্ট্রদূতের ওপর হামলা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের  জন্যে যেমন ক্ষতিকর, তেমিন এটিকে নিয়ে মহলবিশেষের  অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের আশ্রয় নেয়াও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি এই ন্যাক্কারজনক হামলা ও অপ্রপ্রচারের তীব্র  প্রতিবাদ এবং সকল মহলকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানাই। একইসঙ্গে আমি এ ঘটনার দ্রুত বিাচর চাই এবং আমার ও আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাই।

একজন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক by উৎপল রায়

৪৭/১ পুরানা পল্টন। ‘সুবর্ণা’-ছায়াঘেরা, শীতল, ছিমছাম একটি বাড়ি। এ বাড়ির সঙ্গে রাজধানীর খুব বেশি বাড়িকে মেলানো যাবে না। যেমন মেলানো যাবে না এখানে বাস করা মানুষটাকেও। এ বাড়িতেই বাস করেন খ্যাতিমান আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। প্রখ্যাত এ আইনজীবী এক সময় প্রতিনিয়ত সরব ছিলেন আদালত আর মিডিয়ায়। এখন অনেকটাই নীরব। কেমন আছেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। তার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, বার্ধক্য তাকে কাবু করেছে। অনেকদিন ধরে শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। দিন কাটাচ্ছেন অনেকটা নীরবে, নিভৃতে। বই, পত্রিকা পড়ে, টিভি দেখে সময় কাটে তার। পারতপক্ষে বাসা থেকে বের হন না। বের হলেও হুইলচেয়ারই ভরসা। প্রিয়প্রাঙ্গণ সুপ্রিম কোর্টেও এখন নিয়মিত পা পড়ে না তার। যান কালেভদ্রে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন-পুরনো প্রায় সব মামলাই পরিচালনা করেন তার ছেলে ব্যারিস্টার ফাহিমুল হক ও জুনিয়র আইনজীবীরা। তিনি পরামর্শ দেন। পুরানা পল্টনের ওই বাসার নিচতলায় তার চেম্বার বেশিরভাগ সময়ই নীরব থাকে। চেম্বারে দায়িত্বরত একজন বলেন, ‘স্যার বেশিরভাগ সময়ই বাসার দোতলার কক্ষে থাকেন। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া সেখান থেকে নিচে নামেন না। কথা বলেন কম। চেম্বারেও বসেন না খুব একটা। মাঝে মধ্যে যখন নিচে নামেন, কোথাও যান তখনই তাকে দেখি। তার জুনিয়র আইনজীবীরা মাঝেমধ্যে চেম্বারে আসেন। আগে গাজীপুরের চন্দ্রায় তার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল ও বাগানবাড়িতে যেতেন প্রায় প্রতি সপ্তাহে। এখনও যান তবে, অনিয়মিত।’ সম্প্রতি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক’র পুরানা পল্টনের ‘সুবর্ণা’য় কথা হয় তার সঙ্গে। কেমন আছেন? তিনি বলেন, ‘ভালো নেই। বয়স হয়েছে।’ বর্তমান রাজনীতি ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কী ভাবছেন- রফিক-উল হক বলেন, ‘আমার এখন মরার বয়স হয়েছে। ওসব নিয়ে এখন আর চিন্তা করি না। ভাবিও না। আগে ভাবতাম। কথা বলতাম। এখন আর বলি না। বলতে চাইও না।’
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর বেসরকারি একটি হাসপাতালে তার বাম পায়ে অস্ত্রোপচার হয়। এরপর থেকে তার স্বাভাবিক হাঁটাচলা ব্যাহত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে পায়ে ব্যথা হয়। যে কারণে হুইল চেয়ারে যাওয়া-আসা করতে হয়। তার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, ২০১১ সালে প্রিয়তমা স্ত্রী ডা. ফরিদা হকের মৃত্যুর পর থেকেই নিঃসঙ্গতা অনুভব করতেন তিনি। আর এখন বার্ধক্য যোগ হয়ে সেই নিঃসঙ্গতা আরো বেড়েছে। পুরানা পল্টনের ওই বাসার দোতলায় তাকে দেখাশোনা করেন একাধিক গৃহভৃত্য। তারা জানান, বয়সের কারণে রফিক-উল হকের জীবনযাপনেও অনেকটা পরিবর্তন এসেছে। ঘুম থেকে উঠেন একটু দেরিতে। পরিমিত আহার করেন। খাবারের তালিকায় থাকে কাচা ছোলা, চা, ভাত, আম, দুধ, চিড়া।
রফিক-উল হকের জুনিয়র এক আইনজীবী বলেন, ‘স্যার লোকসমাগম ও গণমাধ্যম এড়িয়ে চলেন। কারো সঙ্গে বেশি সময় নিয়ে কথা বলেন না। সংবিধান, আইন, আদালত, দেশের রাজনীতির প্রতি এখন আর আগের মতো আগ্রহ নেই। আগে যেভাবে এসব নিয়ে সরব ছিলেন এখন তা একেবারেই নেই। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া আদালতেও আসেন না খুব একটা। আদালত সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়েও এখন তার আগের মতো উৎসাহ নেই। স্যারের মামলাগুলো এখন আমরাই পরিচালনা করি। তিনি আমাদের পরামর্শ দেন। আর পুরানা পল্টনের ছায়াশীতল, নিরিবিলি  এই বাড়িটি তার এত প্রিয় যে এখান থেকে কোথাও যেতে চান না তিনি।’
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২রা নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে। ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে  এলএলবি পাস করেন।  ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্য থেকে বার এট ল’ সম্পন্ন করেন  তিনি। ১৯৬৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে এবং ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন তিনি। বর্ণাঢ্য  জীবনে আইন পেশায় দীর্ঘ প্রায় ৬০ বছর পার করেছেন। ব্যারিস্টার  রফিক-উল হক বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজ করেছেন। বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জমানায় দুই নেত্রী যখন কারাগারে তখন তাদের জন্য অকুতোভয়ে আইনি লড়াই করেন তিনি। একই সঙ্গে দুই নেত্রীর সমালোচনা করতেও পিছপা হননি তিনি। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় বরাবরই সোচ্চার রফিক-উল হক। দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করেছেন বর্ষীয়ান এই আইনজীবী। ১৯৯০ সালের ৭ই এপ্রিল থেকে ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রফিক-উল হক। কিন্তু কোনো সম্মানী নেননি। পেশাগত জীবনে তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দল করেননি। তবে, নানা সময়ে রাজনীতিবিদরা সবসময় তাঁকে পাশে পেয়েছেন। রাজনীতিবিদদের সম্মান সবসময়ই অর্জন করেছেন তিনি। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তাঁর জীবনের উপার্জিত অর্থের প্রায় সবই ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণ ও সমাজসেবায়।  আর তার এই উদ্যোগকে বিরল বলে অ্যাখ্যায়িত করেছেন আইন অঙ্গনে তার সমসাময়িকরা।
সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. ফজলুল করিম মানবজমিনকে বলেন, ‘ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় আমার ওকালতি জীবনের শুরু থেকে। সেই ১৯৬৯ সালে। তবে, এর আগে থেকেই তিনি ওকালতি শুরু করছিলেন। আইনজীবী হিসেবে রফিক-উল হক সততা, নিষ্ঠা ও সমতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি একাগ্র চিত্তের মানুষ। দায়িত্বশীলও। কখনো তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দল বিবেচনায় নেননি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষেও তিনি ওকালতি করেছেন। দুজনকেই তিনি সমভাবে ও সমদৃষ্টিতে দেখেছেন। আগ্রহ নিয়ে দুজনের মামলা পরিচালনা করেছেন। বিচারপতি ফজলুল করিম বলেন, আইনের ব্যাপারে তার যেমন অগাদ জ্ঞান, তেমনি আইনকে তিনি আইনের দৃষ্টিতে দেখেছেন সবসময়। কোন দল দেখেননি। বিনে পয়সায়ও তিনি অনেকের মামলা পরিচালনা করেছেন। আদালতে তাকে খুব সামনে থেকে দেখেছি ও শুনেছি। তার যুক্তিতর্ক খুবই স্পষ্ট ও সাবলীল। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক যখন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তখনো তিনি কোনো পক্ষপাতিত্ব করেননি।’ প্রাক্তন এই প্রধান বিচারপতি বলেন, ২০১০ সালে আমি অবসরে যাই। এরপর থেকে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সঙ্গে আর ওইভাবে যোগাযোগ নেই। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা-সাক্ষাৎ হতো। এখন আমি নিজেও অসুস্থ। শুনেছি তিনিও অসুস্থ। আমি উনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। তিনি যেন দীর্ঘায়ু হন। কারণ তার কাছে নতুনদের অনেক কিছু শেখার আছে।
ব্যারিস্টার রফিক-উল সম্পর্কে বলতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, তিনি সমসাময়িককালের একজন অত্যন্ত উঁচুমানের আইনজীবী যাকে বিচারক, আইনজীবীসহ এই পেশার সর্বস্তরের ব্যক্তিগণ শ্রদ্ধা সম্মানের চোখে দেখেন। তিনি এই দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা কোনো না কোনোভাবে পরিচালনা করেছেন। ওই সব মামলায় বিভিন্ন আইনের ইন্টারপ্রিটেশন (বিশদ ব্যাখ্যা) দেয়া হয়েছে এবং আইনের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই  দেশে ডেভেলপমেন্ট অব ল’তে আইনজীবী হিসেবে এক বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ব্যক্তি হিসেবেও তিনি অত্যন্ত সদয় ও স্নেহপরায়ণ। রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, তিনি জীবনে অনেক টাকা উপার্জন করেছেন। আবার সেই অর্থ অনেক জনহিতকর ও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। তার কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান আছে। দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অত্যন্ত বিরল। তিনি বলেন, আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক খুবই অন্তরঙ্গ এবং তিনি আমার শ্রদ্ধাভাজন। শুনেছি তিনি এখন অনেকটাই নিভৃত জীবনযাপন করছেন। তবে, সুপ্রিম কোর্টে মাঝে মধ্যে তার সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। আমি উনাকে উৎসাহ দিয়ে বলি, উনি যেন সুপ্রিম কোর্টে নিয়মিত আসেন। কারণ, উনাকে দেখলে নতুন আইনজীবীরা উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হবেন।
রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আইনজীবী হিসেবে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। ওয়ান ইলেভেন সরকারের বিভিন্ন আদেশ নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে বিভিন্ন মামলা পরিচালনা করেছিলেন। একজন স্পষ্টভাষী ও সাহসী মানুষ হিসেবেও তার সুনাম রয়েছে। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে বেশকিছু বিরল দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। যে দৃষ্টান্তগুলো উনার আগে বা পরে কেউ দেখাতে পারেনি। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি- তখনকার সময়ে অনেককেই স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টে ডিটেনশন দিয়ে কারাগারে আবদ্ধ করে রাখা হতো। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে হেভিয়াস কর্পাস রিট দায়ের হতো। সেসব ফাইল দেখে যদি তিনি বুঝতে পারতেন যে ডিটেনশন বৈধ হয়নি, রাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়া সত্ত্বেও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কার্যতালিকার ওইসব মামলাগুলোর বিষয়ে আদালতকে অপেক্ষায় না রেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আটকাদেশ বৈধ হয়নি উল্লেখ করে তাদের ছেড়ে দেয়ার কথা বলতেন। এরকম স্বচ্ছতা অন্য কোনো অ্যাটর্নি জেনারেল দেখাতে পারেননি। শুধু তাই নয়, অন্যান্য রিট পিটিশনের ক্ষেত্রেও তিনি যদি দেখতেন যে সরকারি আদেশ বেআইনি সেখানেও তিনি আদালতে কোনোরূপ ভনিতা না করে তা স্বীকার করে নিতেন। আমি শুনেছি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তার যে প্রাপ্য বেতন ছিল, তাও গ্রহণ করেননি। এটিও বিরল দৃষ্টান্ত।    
ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি বলেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে আইনজীবী হিসেবে আমি প্রথম দেখি ১৯৬২ সালে। আমার বাবার (ব্যারিস্টার আসরালুল হোসেন) ফরাসগঞ্জের চেম্বারে। বাবার জুনিয়র আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। শুরু থেকেই তাকে একজন মেধাবী মানুষ মনে হয়েছে। একপর্যায়ে আমার বাবা তাকে বেশ কিছু মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেন এবং তিনি তা যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। ১৯৬৬ সালে বাবা মামলার প্রয়োজনে লম্বা সময়ের জন্য জেনেভাতে যান। ওই সময় চেম্বারের সব মামলার দায়িত্ব বর্তায় তার (ব্যারিস্টার রফিক-উল হক) ওপর। সেই থেকে তিনি একজন ভালো আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন শুরু করেন। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও আমি সুপ্রিম কোর্টের একই চেম্বারে দীর্ঘদিন বসেছি। তবে, এখন অসুস্থতা ও বার্ধক্যের জন্য তিনি আদালতে নিয়মিত আসতে পারেন না। তিনি একজন মেধাবী ও পরিশ্রমী আইনজীবী। মামলার প্রয়োজনে প্রচুর পড়াশোনা করেন। মক্কেলদের প্রচুর সময় দেন। মামলা পরিচালনাও করেন খুব নিখুঁতভাবে। আদালতে যখন মামলার শুনানিতে আসেন, পুরোদমে প্রস্তুতি নিয়েই আসেন এবং সময়মতো আসেন, যা এখনকার আইনজীবীদের অনেকের ক্ষেত্রেই খুব একটা দেখা যায় না। আর কাজ এবং দায়িত্বের ব্যাপারে কখনোই তাকে অধৈর্য হতে দেখিনি। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এ কারণে যে তার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। এখনো শিখছি। আজমালুল হোসেন কিউসি বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় একশ গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তিনি অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া যখনই আদালতের বিচারকরা প্রয়োজন মনে করেছেন তখনই তাকে ডাকেন। এমনকি এ-ও দেখেছি যে আদালতে অন্য মামলার শুনানিকালে বিচারকরা তার কাছ থেকে নানা সময়ে সাংবিধানিক ও আইনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা শুনতে চেয়েছেন। তিনি বলেন, একজন সাহসী ও স্পষ্টভাষী মানুষ হিসেবেও তিনি অন্য সবার চেয়ে আলাদা। স্পষ্ট এবং সত্য কথা বলতে কখনো তিনি কাউকে পরোয়া করেননি।

বিকল কিডনি নিয়ে বাঁচার উপায়

মানুষের শরীরে দুটি কিডনি থাকে। মেরুদণ্ডের দুই পাশে। কিডনিদ্বয়কে বলা হচ্ছে আপনার শরীরের অতন্দ্রপ্রহরী। এদের মূল কাজ প্রতিনিয়ত দেহে যে বর্জ্য পদার্থ তৈরি হয়, এগুলোকে প্রস্রাবের আকারে শরীর থেকে বের করে দেওয়া। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লিটার প্রস্রাব তৈরি করে এরা। যদিও কিডনির ওজন আমাদের দেহের ওজনের ২৫০ ভাগের মাত্র ১ ভাগ, কিন্তু দেহের এক-চতুর্থাংশ রক্ত প্রবাহিত হয় এই দুই ক্ষুদ্র অঙ্গের মধ্য দিয়ে। দুটি কিডনি মিলে ২৪  ঘণ্টায় ২০০ লিটার রক্ত পরিশোধন করতে পারে। এ জন্য এদের বলা হয় ‘অ্যামেজিং কিডনি’ বা ‘বিস্ময়কর কিডনি’।
কিডনি বিকল : যে কোনো কারণে কিডনির কার্যকারিতা যদি লোপ পায় তাকে বলে কিডনি বিকল। কিডনি বিকল হয়ে গেলে ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ এবং অতিরিক্ত তরল দেহে জমা হতে শুরু করে, যার মাধ্যমেই কিডনি ফেইলুরের উপসর্গ দেখা দেয়। এই উপসর্গের মধ্যে রয়েছে উচ্চরক্তচাপ, চরম ক্লান্তি, মাথাব্যথা, পায়ের গোড়ালি এবং মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা, বমি, বিনা কারণে গা চুলকানো, রক্ত শূন্যতা দেখা দেওয়া  ইত্যাদি। বেঁচে থাকার জন্য তখন মাত্র দুটি চিকিৎসা পদ্ধতি হাতে থাকে, একটি হলো কিডনি ডায়ালাইসিস অপরটি কিডনি সংযোজন। প্রয়োজনের তুলনায় কিডনি সংযোজনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তাই প্রধান উপায় হলো ডায়ালাইসিস।
কিডনি বিকল ও চিকিৎসা : আগেই বলেছি, কিডনি পুরোপুরি বিকল হয়ে গেলে বা অ্যান্ডস্টেজ রেনাল ফেইলুর দেখা দিলে কিডনি সংযোজন অথবা ডায়ালাইসিস ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় দুই ধরনের ডায়ালাইসিস রয়েছে। এক. হেমো-ডায়ালাইসিস ও দুই. পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস।
হেমো-ডায়ালাইসিস : উভয় কিডনি বিকল হয়ে গেলে, যে যান্ত্রিক ব্যবস্থায় শরীরের রক্ত পরিশোধন করা হয়, তাকে বলে ডায়ালাইসিস। ডায়ালাইসিস একটি জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা- কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতি ত্বরিত এই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব না হলে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে। ডায়ালাইসিস একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে রক্ত পরিশোধন করে বিষ মুক্ত করা হয় ও শরীরের অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া হয়। হেমো- ডায়ালাইসিস ব্যবস্থায় রক্তের বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ একটি যন্ত্রের মাধ্যমে ছেঁকে পরিশোধিত করে বিষমুক্ত রক্ত আবার শরীরে প্রবেশ করানো হয়।
ফিস্টুলা কী?
ডায়ালাইসিস ব্যবস্থাতে শরীরের অভ্যন্তরে ঢোকার একটি পথ প্রয়োজন হয়। হেমো-ডায়ালাইসিসের জন্য রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থায় ঢোকার পথ বাঞ্ছনীয়। একে বলে ফিস্টুলা। একটি শিরা এবং একটি ধমনি চামড়ার নিচে সংযোগ ঘটিয়ে এই পথ তৈরি করা হয়। সাধারণত কব্জিতে বা কনুইয়ের উল্টো দিকে এই ফিস্টুলা তৈরি করা হয়ে থাকে। ছোট্ট অপারেশনের মাধ্যমে ফিস্টুলা তৈরির পর কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়, যাতে করে তা পুরোপুরি তৈরি হওয়ার সুযোগ পায়। এ জন্য প্রায় ১ থেকে ২ মাস সময় লাগে।
ক্যাথেটার কী?
আগেই বলা হয়েছে, হেমো-ডায়ালাইসিসের জন্য শরীরের রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থায় ঢোকার পথ প্রয়োজন। আগে থেকে যদি ফিস্টুলা তৈরি করা না থাকে তবে জরুরি ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিসের জন্য রক্তনালিতে ক্যাথেটার স্থাপন করতে হয়। ক্যাথেটার হলো এক ধরনের বিশেষ নল, যা গলা বা পায়ের কুচকিতে অবস্থিত প্রয়োজনীয় শিরার অভ্যন্তরে স্থাপন করে দ্রুত ডায়ালাইসিস করা হয়। এ ব্যবস্থার কিছু জটিলতা রয়েছে। পাশাপাশি থাকা ধমনি ছিদ্র হলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে। রক্ত নলের ভিতরে জমে গিয়ে পথ বন্ধ করে দিতে পারে, রক্তনালি জমাট রক্ত দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারে, রক্তনালি সরু হয়ে গিয়ে পরবর্তী সময়ের জন্য বিপত্তি ঘটাতে পারে। ক্যাথেটার জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হলে, ডায়ালাইসিসের সময় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। দক্ষ হাতে সতর্কতার সঙ্গে ক্যাথেটার লাগালে তাৎক্ষণিক জটিলতা অনেক কম হয়। এসব জটিলতার কারণে রোগীদের ভোগান্তি অনেক বেড়ে যেতে পারে। এর কারণ হলো আমাদের দেশের রোগীদের ডায়ালাইসিস সম্পর্কে অহেতুক ভীতি। সময়মতো ফিস্টুলা করতে রাজি না হওয়া।
সদ্য সমাপ্ত হলো হেমো-ডায়ালাইসিস ও সিএপিডি নিয়ে সপ্তাহব্যাপী দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন কুয়ালালামপুর ও কোরিয়ায়। এতে ডায়ালাইসিসের উৎকর্ষ সাধনে টেকনোলজিক্যাল উন্নতি হয়েছে। ধীরে ধীরে কমে আসছে জটিলতা, বেড়ে যাচ্ছে ডায়ালাইসিস রোগীদের গড় আয়ু। এই সতর্কবাণী হলো, ডায়ালাইসিস ক্যাথেটারজনিত জটিলতা এড়াতে অবশ্যই আগে থেকে ফিস্টুলা করিয়ে রাখতে হবে। ডাক্তার, নার্স, ডায়ালাইসিস টেকনিশিয়ান ও ভুক্তভোগী রোগীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর, কর্মক্ষম দীর্ঘজীবন উপহার দেওয়া যায় একজন মৃত্যুপথযাত্রী কিডনি বিকল রোগীকে।
কত দিন ডায়ালাইসিস করা লাগতে পারে?
সাধারণত সপ্তাহে তিনবার করে, প্রতিবারে চার ঘণ্টা ডায়ালাইসিস করানো হয়। অনেক সময়ই দেখা যায়, ডায়ালাইসিসের শুরুতে কিছুটা কিডনি কার্যক্রম অক্ষুণ্ণ থাকে, যদিও তা পর্যাপ্ত নয়। এসব ক্ষেত্রে সপ্তাহে দুবার করে ডায়ালাইসিস করলেও চলে। এর মধ্যে অনেকে কিডনি সংযোজন করে নিতে পারেন। সুষম খাদ্য, স্বাস্থ্যকর  লাইফস্টাইল, মানসম্মত ডায়ালাইসিস কিডনি বিকল রোগীদের দীর্ঘায়ু করতে পারে।
ডায়ালাইসিস রোগীর খাদ্য-খাবার : বেশির ভাগ ডায়ালাইসিস রোগীরই খাদ্য-খাবারে পরিবর্তন আনা দরকার। সাধারণত পটাশিয়াম, ফসফেট এবং সোডিয়াম (লবণ) সমৃদ্ধ খাবার যথাসম্ভব কম খেতে হবে। পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ক্যালোরি গ্রহণ করতে হবে। ফল ও টাটকা সবজিসহ সুষম খাবার খেতে হবে।
সবচেয়ে বেশি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হলো পানি বা তরল গ্রহণের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন। প্রত্যেক রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে ডাক্তার তার ২>  ঘণ্টায় পানি খাওয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেবেন, যা এক লিটারের কিছু কম-বেশি হবে।
জীবনধারা : কিডনি বিকল রোগীদের মনে রাখতে হবে যে, ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ রোগের মতো কিডনি বিকল রোগীকেও তাদের কন্ট্রোল করে চলতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক চলতে হবে ও অহেতুক দুশ্চিন্তা পরিহার করে মানসিকভাবে সক্রিয় হয়ে স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি রোগীদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে যোগদান করে মানুষকে সচেতন করার জন্য ‘ভলান্টিয়ার’ হিসেবে কাজ করাতে পারেন। মনের তৃপ্তি তাদের বেঁচে থাকার সাহস জোগাবে।

“পাদ্রি আমাদের নগ্ন হয়ে সাঁতরাতে বাধ্য করেন, তারপর গায়ে হাত দেন"

পাদ্রি আমাদের নগ্ন হয়ে সাঁতরাতে বাধ্য করেন, তারপর গায়ে হাত দেন
চিলির কর্তৃপক্ষ সেদেশের রোমান ক্যাথলিক গির্জার ৩০ জন সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করছেন। বলা হচ্ছে, এই ধর্মীয় নেতারা হয় যৌন নির্যাতন করেছেন, না হয় অভিযোগ ধামা চাপা দিয়েছেন।
২০০০ সাল থেকে রোমান ক্যাথলিক গির্জার এসব নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এখন পর্যন্ত ২৬৬ জন, যাদের ৬৭ শতাংশই শিশু, অভিযোগ করেছে তারা পাদ্রি, বিশপদের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কর্তৃপক্ষ এখন তদন্ত শুরু করেছে।
এমনকি চিলির ক্যাথলিক গির্জার প্রধান কার্ডিনাল রিকার্ডো এজ্জাতির ওপর কলঙ্কের দাগ পড়েছে। সম্প্রতি এক বিচার বিভাগীয় তদন্তে বলা হয়েছে, কার্ডিনাল যৌন নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
এ বছরের গোঁড়ার দিকে চিলির ৩৪ জন বিশপকে রোমে ডেকে এনে পোপ ফ্রান্সিস "নির্যাতন এবং ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতির" তীব্র নিন্দা করেন। পাঁচজন বিশপ তখন পদত্যাগ করেন।
বিবিসির কনস্তানজা ওলা গির্জা স্কুলের দুজন প্রাক্তন ছাত্রের সাথে কথা বলেছেন যারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন। যে পাঁচ বিশপ পদত্যাগ করেছেন তাদের অন্যতম গোনজালো দুয়ার্তের সাথেও কথা বলেন বিবিসির সংবাদদাতা।
মরিসিও পালগার
১৯৯৩ সালে একটি ক্যাথলিক যুব দলের সদস্য ছিলেন মরসিও পালগার। চিলির মধ্যাঞ্চলের একটি ছোট শহরে এক প্রার্থণা সভার জন্য তাকে ডাতা হয়েছিল। ফাদার 'এম' (ছদ্মনাম) সেই অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন।
এক রাতে ঐ পাদ্রি তাদের জামা কাপড় খুলে সুইমিং পুলে নামতে বলেন।
"আমি এবং আমার এক বন্ধু অস্বীকার করি, কিন্তু ফাদার এম আমাদের ওপর জবরদস্তি শুরু করেন, তিনি বলেন, আমরা নগ্ন হচ্ছিনা কারণ আ‌মাদের যৌন রোগ আছে," বিবিসিকে বলেন মরিসিও পালগার।
"এরপর ফাদার এম সুইমিং পুলে নেমে আমাদের গায়ে হাত দেওয়া শুরু করেন। তিনি বলেন, সম্পর্কে আস্থা তৈরির জন্য, মর্যাদাবোধের জন্য এটা ভালো।।"
দুমাস পর, পাদ্রি হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করেন মরিসিও। তিনি বলেন, গির্জার সেই স্কুলেও তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
"তারা পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরতো..বাধা দিলে রেগে যেত।"
"চুম্বন করতে না দিলে তারা গালিগালাজ শুরু করত।"
ফাদার 'এইচ' (ছদ্মনাম) নামে আরেক পাদ্রীর সাথে যন্ত্রনাকর অভিজ্ঞতার কথা বলেন মরিসিওি। কাছেরএকটি শহরে ঐ পাদ্রিকে কিছু কাজে সাহায্য করছিলেন।
"তিনি আমাকে বলেন, কেন আমি সম্পর্ক করতে উদ্যোগী হচ্ছি না? আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না তিনি ঠিক কি বলছেন। তখন তিনি আমাকে বলেন -- আমরা সবাই আসলে সমকামী এবং আমাদের সবকিছু উপভোগের চেষ্টা করা উচিৎ।"
জুন মাসে পদত্যাগের আগে বিশপ দুয়ার্তে বিবিসিকে বলেন, তিনি শুনেছেন ফাদার 'এইচের' "সমকামীতার সমস্যা" সমস্যা রয়েছে, তবে সেসবে নাক গলানোর কর্তৃত্ব তার ছিলনা।
মরিসিও বলেন, "ফাদার এইচ তাকে তার গির্জায় এক রাতে থাকতে বলেন, তিনি আমাকে কিছু পানীয় দিয়েছিলেন এবং তা খেয়ে আমি অসুস্থ বোধ করতে থাকি, তিনি তখন বলেন, 'আমার বিছানায় শুয়ে পড়ো'।"
"আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। পরে ঘনঘন শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দে আমি জেগে উঠে দেখি তিনি আমাকে নির্যাতন করছেন। আমি হাত-পা ছঁড়তে চেয়েও পারিনি। একসময় আমি একটি হাত ছাড়াতে পারি, কিন্তু তিনি তা ধরে ফেলেন এবং..."
কথা বলতে বলতে গলা বুজে আসে মরিসিওর।
"তিনি তখন টাকা ভর্তি একটি ড্রয়ার খোলেন এবং বলেন আমি এখন তার চক্রের অংশ। আমি তাকে বললাম আমি তা হতে চাইনা এবং এরপর আমি বেরিয়ে যাই।"
মরিসিও ঐ স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলেন, তবে কেন ছেড়েছিলেন সে কথা বলতে তার ২০ বছর লেগে গিয়েছিল।
২০১৩ সালে তিনি গির্জা কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন।
বিশপ দুয়ার্তে বলেন, "অবশ্যই তদন্ত হয়েছিল, তবে অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, সমকামিতা 'পাপ' কিন্তু দুজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক এতে যুক্ত হলে তা অপরাধ হয়না।
সেবাস্তিয়ান দেল রিও
১২ বছর বয়স থেকে সেবাস্তিয়ান রিও পাদ্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেনএবং ১৯৯৯ সালে হাই স্কুল শেষ করে তিনি একটি ধর্মীয় স্কুলে ঢুকে পড়েন।
গির্জার ঐ স্কুলের ডিন ছিলেন ফাদার 'এম' যিনি মরিসিওকে নগ্ন হয়ে সাঁতার কাটতে বাধ্য করেছিলেন।
সেবাস্তিয়ান বলেন ফাদার এম তার ব্যপারে অতিরিক্ত উৎসাহ দেখাতেন।
"ছোটোখাটো কথা বলতে তিনি আমার রুমে আসতেন, আমি ভয়ে দরজা খুলে রাখতাম।"
একসময় সেবাস্তিয়ান ঐ স্কুলের দায়িত্বে থাকা বিশপকে বিষয়টি জানান। তখন বিশপের জবাব ছিল, "ঐ পাদ্রীর কিছু ইমোশনাল সমস্যা হয়েছে।" "তিনি আমাকে বলেন ফাদার এম আমার প্রেমে পড়ে গেছেন।"
ফাদার এম কে পরে বদলি করা হয়, তবে সেবাস্তিয়ানের দুর্ভোগ তাতে শেষ হয়ে যায়নি।
পড়াশোনা শেষ করার পর তার পাদ্রি হওয়া নিয়ে কথা বলতে তিনি বিশপ দুয়ার্তের কাছে যান।
"আমরা কথা বলছিলাম, হঠাৎ তিনি (বিশপ) অর্ধ-নগ্ন হয়ে তার পিঠে একটি মলম মালিশ করতে বলেন, আমি অপমানিত হয়েছিলাম।"
বিশপ দুয়ার্তে বলেন, তার কোনো খারাপ মতলব ছিলনা।
২০১০ সালে সেবাস্তিয়ান ফাদার এম এবং বিশপ দুয়ার্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনেন, তবে কোনো জবাব তিনি পাননি।
ফাদার এইচ এবং ফাদার এমের সাথে যোগাযোগ করে এসব অভিযোগের উত্তর চাওয়া হলেও, তারা বিবিসিকে কোনো জবাব দেননি। ফাদার এম এখনো পাদ্রি হিসেবে কাজ করছেন।

বাংলাদেশে গঠনমূলক সমালোচনা অনুপস্থিত, তাই... -টাইমস অব ইন্ডিয়ার নিবন্ধ

বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণ ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার। তারা জনগণের স্বার্থে মাঠে নেমেছে। এটা বিস্ময়কর। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিছু উদ্বেগজনক খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার বিভিন্ন  জায়গায় পুলিশ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়েছে। এ ধরনের বৈরী আচরণ দুঃখজনক। কেননা, কয়েকটি ভাঙচুরের ঘটনা ছাড়া শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবেই বিক্ষোভ করছিল। এমনকি তারা গাড়িচালকদের লাইসেন্স ও ফিটনেস পেপার যাচাই করে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছিল। শিক্ষার্থীদের হস্তক্ষেপে সুশৃঙ্খলভাবে যানবাহন চলাচলের ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। খবরে বলা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে। ঢাকার কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করলে তারাও হামলার শিকার হয়। অথচ পুলিশ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। তবে বাংলাদেশ সরকার এ ধরনের হামলার কথা অস্বীকার করেছে। বলেছে, তারা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবি বিবেচনা করছে। এছাড়া সম্প্রতি সরকার বেপরোয়া বা অসতর্কতামূলক গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু বা গুরুতর আহত করার দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজার বিধান রেখে খসড়া সড়ক পরিবহন আইন প্রস্তাব করেছে।
তবে বেপরোয়া ও অসতর্ক গাড়ি চালনার কারণে কারো মৃত্যু ঘটলে ওই চালকের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দাবি জানিয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এ দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়তে রাজি না। কিন্তু এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকার ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। এটা সত্য যে, কোনো নেতৃত্ব ছাড়াই এ আন্দোলন গড়ে উঠেছে। কিন্তু নির্বাচনের বছরে এমন আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বেশ সতর্ক রয়েছে। মূলত এ কারণেই বাংলাদেশ সরকার আন্দোলন নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে। বলপ্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনার ঘটনা থেকে এটা বোঝা যায়।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বাংলাদেশে এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা ফুটে উঠেছে। বর্তমানে সেখানে গঠনমূলক সমালোচনা অনুপস্থিত। যখন এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন জনসম্পৃক্ত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজের মানুষের চেপে রাখা আকাঙ্ক্ষা ও দাবির বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া, দেশের নির্বাচনে পরাজিত দলের ফল মেনে না নেয়া ও সংসদে হাজির না হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনেই অংশ নেয়নি। এতে আওয়ামী লীগ অনায়াসে জয় পেয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক ইতিহাস থেকেই বর্তমান  পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু এ অবস্থায় টিকে থাকা কঠিন। বাংলাদেশকে অতীতের বিষয় নিয়ে রেষারেষি বন্ধ করে ভবিষ্যতের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই পার্লামেন্টে বিরোধী দলের ভূমিকার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। তখনই তারা পুরো বাংলাদেশি সমাজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। অন্যথায় বাংলাদেশে জনসম্পৃক্ত আন্দোলন হতেই থাকবে। এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্বে এসব আন্দোলনে বহিঃশক্তির ইন্ধন থাকতেই পারে। তাই বাংলাদেশ সরকার এই সমস্যা মেনে নিয়ে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলে এবং পরবর্তী নির্বাচনে সকল বৈধ দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেই ভালো হবে।
(টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত নিবন্ধের অনুবাদ। নিবন্ধটি লিখেছেন রুদ্রনীল ঘোষ। তিনি পত্রিকাটির সহকারী সম্পাদক।)