Monday, November 30, 2015

ভারতে জাতীয় সংগীতে উঠে না-দাঁড়ানোয় রোষের শিকার মুসলিম পরিবার

ভারতের মুম্বাইতে একটি সিনেমা হলের ভেতর যখন জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হচ্ছিল – তখন উঠে না দাঁড়ানোয় একটি মুসলিম পরিবারকে হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। সিনেমা হলের অন্য দর্শকরা ওই পরিবারটিকে ঘিরে ধরে শাসানি দিতে থাকেন – তারপর তারা যখন বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন তখন হলভর্তি দর্শক হাততালি দিয়ে ওঠে। মোবাইল ফোনে ধারণ করা এই গোটা ঘটনার ভিডিও পরে সোশাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় উঠে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানানোর রীতি চালু থাকলেও কেউ যদি না-ওঠেন তবে তার জন্য কোনও শাস্তির বিধান নেই। কি ঘটেছিল? এই ঘটনাটি মুম্বইয়ের কুরলা অঞ্চলে বিলাসবহুল পিভিআর মাল্টিপ্লেক্সের ভেতরে ঘটেছে এই সপ্তাহান্তে। চার সদস্যের একটি মুসলিম পরিবার ওই থিয়েটারে দেখতে এসেছিলেন সদ্য মুক্তি পাওয়া বলিউড ব্লকবাস্টার ‘তামাশা’। রণবীর কাপুর ও দীপিকা পাডুকোনে অভিনীত ওই ছবিটি শুরু হওয়ার আগে হলে বাজানো হচ্ছিল ভারতের জাতীয় সঙ্গীত জনগণ মন অধিনায়ক – তখন কোনও কারণে ওই পরিবারটি উঠে দাঁড়ায়নি। কিন্তু তার পরই তাদের ওপর যা শুরু হয় – সেটাও এক করুণ তামাশা ছাড়া কিছুই নয়! হলের বেশ কয়েকজন দর্শক উত্তেজিতভাবে ঘিরে ধরে তাদের কৈফিয়ত তলব করতে থাকেন। একজনকে স্পষ্ট থাপ্পড় মারার হুমকি দিতেও শোনা যায়। দু’চার মিনিট ধরে এই শাসানি চলার সময় ওই পরিবারটি বসে বসেই কিছু জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তবে তাদের কথা রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়নি। শেষে মাল্টিপ্লেক্সের কর্মীরাও এসে তাদের উঠে যেতে বললে চারজন হল থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন। বাকি হল তখন একসঙ্গে করতালি দিয়ে ওঠে। পক্ষে ও বিপক্ষে এই ঘটনার ভিডিও ফেসবুক-ইউটিউবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরই ওই পরিবারটির পক্ষে ও বিপক্ষে ভারতীয়রা কার্যত দু’ভাগ হয়ে গেছেন। কেউ কেউ বলছেন, জাতীয় সঙ্গীতের অমর্যাদা করার অধিকার কারও নেই। পাশাপাশি অনেকেই আবার যুক্তি দিচ্ছেন, তারা দাঁড়ান বা না-দাঁড়ান, হল থেকে তাদের বের করে দেওয়াটা কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। ভারতে অসহিষ্ণুতা নিয়ে এই মুহূর্তে যে বিতর্ক চলছে, তাতেও এই ঘটনাটা আলাদা মাত্রা পেয়ে গেছে। বিজেপি-র মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুখতার আব্বাস নাকভি বলেছেন তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে না জেনে কোনও মন্তব্য করবেন না, তবে জাতীয় সঙ্গীতের যারা অবমাননা করেন তাদের ভারতে থাকারই অধিকার নেই। আইন কী বলে? তবে ভারতের ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় উঠে না দাঁড়ালে কোনও শাস্তির উল্লেখ নেই – যদিও আদালতের বিভিন্ন রায়ে নানা সময়ে বলা হয়েছে জাতীয় সঙ্গীতকে মর্যাদা দেয়াটা নাগরিকদের নৈতিক কর্তব্য। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মীরা ভাটিয়া বিবিসিকে বলছিলেন এই ঘটনায় আসলে ‘দুটো অন্যায়’ হয়েছে। তিনি বলছেন, ‘‘জাতীয় সঙ্গীতের সময় উঠে দাঁড়ানোটা খুব স্বাস্থ্যকর একটা প্রথা। কিন্তু যারা সেটা করেননি, তাদের যদি কেউ হেনস্থা করে বা শাসানি দেয়, সেটাও তো একটা অপরাধ। ইচ্ছেমতো আইনের ব্যাখ্যা করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকারও কিন্তু কারও নেই।’’ তবে মুম্বইয়ের পুলিশ জানিয়েছে, হেনস্থা হওয়া পরিবারটি বা হলের অন্য দর্শকদের কেউই তাদের কাছে কোনও অভিযোগ জানায়নি, ফলে তারা এর কোনও তদন্তও করছে না। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন সিনেমা হলে জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় উঠে দাঁড়ানোর বিষয়টি যে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে, এই ঘটনায় তা আরও একবার প্রমাণ হলো।  -বিবিসি

তেজগাঁওয়ে হামলাকারীদের খবর হয়ে যাবে : আনিসুল হক

তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকালে যেসব নেতাদের উস্কানিতে হামলা হয়েছে তাদের খবর হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। তিনি বলেন, তেজগাঁওয়ের রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেছে, সেখানে আর কখনো ট্রাক থাকবে না। কেউ বাধা দিতে আসলে তাকে হেভি পেটানো হবে।
আজ রাজধানীর কারওয়ানবাজারের একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র এ কথা বলেন। এ সময় স্থানীয় কাউন্সিলর শামীম হাসান, সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর শামীমা রহমান, ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বি এম এনামুল হকসহ ডিএনসিসির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আনিসুল হক বলেন, প্রভাবশালী নেতাদের কারণে তেজগাঁওয়ে ঝামেলা হয়েছে। যারা ওখানকার দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসায়ের সাথে জড়িত তারাই রোববার অভিযানে ঢিল ছুড়েছে।
যারা হামলা করেছে তাদের ধরার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশকে অনুরোধ করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ ছাড় পাবে না। যারা এখন শক্তি দেখানোর চেষ্টা করছে, তাদের শক্তি থাকবে না।
মেয়র বলেন, দখলদাররা তার সাথে পলিটিকস খেলছে। তিনি তাদের কিছু বলেননি। সেখানে পুলিশ ছিল, তারা কিছুই করেনি। চাইলে অনেক কিছু করা যেত। কারণ, তার সাথে অনেক ফোর্স ছিল, তারা নীরব থেকেছে।
মেয়র আরো বলেন, শ্রমিকদের কারা ভুল বুঝিয়েছে তিনি জানেন। তিনি কোনো রাস্তা জবরদখল হতে দেবেন না। রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখতে দেবেন না।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, কার সাথে নেগোসিয়েশন হবে? কারো সাথে হয়নি। আমরা একটা মডার্ন ট্রাক স্ট্যান্ড করব। সেজন্য ঢাকার বাইরে জমি খুঁজছি।
রোববারের সহিংসতায় সিটি করপোরেশনের ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে মেয়র বলেন, আমাদের সাতটি গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে। এতে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া করপোরেশনের চালক, হেলপার ও উচ্ছেদকর্মী সহ পাঁচজন আহত হয়েছেন।
এ সময় মেয়র সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে ২০ হাজার বিলবোর্ড অপসারণ করেছি। ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে সব বিলবোর্ড অপসারণ করা হবে। আগামী জুনের মধ্যে গুলশান বনানী বারিধারায় আরো এক হাজার সিসি ক্যামেরা বসবে। এর পর অন্যান্য এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসবে।
আনিসুল হক বলেন, আমি রাজধানীর পরিবহন মালিকদের সাথে বসেছি। তারা আমাকে কমিটমেন্ট দিয়েছেন, তিনশ’ কোম্পানির মধ্য থেকে ৫-৭টি কোম্পানিতে নামিয়ে আনবেন। এদের মাধ্যমে আমরা করপোরেশনের সহায়তায় তিন হাজার নতুন গাড়ি নামাব।
কারওয়ানবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা ৩৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে এদের জন্য একটি মার্কেট তৈরি করেছি। এদের সেখানে সরিয়ে নেয়া হবে। ফলে এ এলাকায় আর কোনো যানজট থাকবে না।

অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন: পাঠকের ওপর ছেড়ে দিন by শরিফুজ্জামান

কমবেশি ১০ হাজার অনলাইন পত্রিকা! সংখ্যাটা শুনলেই চমকে উঠতে হয়। উপজেলা থেকে রাজধানী পর্যন্ত এসব পত্রিকার ছড়াছড়ি। সংখ্যাটি ১০ হাজার তা কেউ গুনে বলেছেন, এমনটি নয়। এ নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছেও কোনো হিসাব নেই। তবে এটি একটি ধারণা, যা অনেকেই বিশ্বাস করেন, কেউবা করেন না। সরকারের দৃষ্টিতে এসব পত্রিকার অধিকাংশতেই অপসাংবাদিকতা হচ্ছে। তাই নিয়মনীতির আওতায় আনতে এবং এগুলোকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিতে নিবন্ধন করতে হবে।
এগুলোর পাশাপাশি সরকার ছাপা পত্রিকার অনলাইন সংস্করণেরও নিবন্ধন চায়। এ নিয়ে এক নতুন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন পত্রিকার প্রকাশকেরা। তাঁরা সরকারের সব ধরনের নিয়ম মেনেই পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি পেয়েছেন। এসব পত্রিকা নিয়মকানুনের মধ্যে চলছে কি না, তথ্য মন্ত্রণালয় মাঝেমধ্যে তা দেখভাল করে।
এখন সরকারের যুক্তি হচ্ছে, যেহেতু অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন করতে হবে, সেহেতু ছাপা পত্রিকাগুলোকেও তাদের অনলাইন সংস্করণের নিবন্ধন নিতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয় ও তথ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার কাছ থেকে এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা বোঝার চেষ্টা করেছি। তাঁদের অনেকেই মনে করেন, এর আদৌ প্রয়োজন নেই। তবে যেহেতু ‘ওপরের’ নির্দেশ, তাই অপ্রয়োজন মনে করলেও তাঁরা এটা বাস্তবায়ন করতে চান।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে ছাপা পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকা, টিভি ও রেডিওর জন্য অভিন্ন সম্প্রচার নীতিমালা রয়েছে। পাকিস্তানে ছাপা পত্রিকা ও অনলাইন পত্রিকার জন্য একটি এবং রেডিও-টিভির জন্য আরেকটি নীতিমালা রয়েছে। আর আমাদের দেশে রেডিও, টিভি ও পত্রিকার জন্য যতগুলো আইন ও নীতি আছে, সেগুলো একত্র করলে এক ডজনের বেশি হবে। অনেক আওয়াজ দিয়ে একটি সম্প্রচার নীতিমালা তৈরি এবং তার আলোকে কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া চললেও বিতর্কের মুখে পড়ে এটি এখন কচ্ছপের গতিতে হাঁটছে।
অনলাইন নীতিমালা করার উদ্যোগটি ২০১১ সালের। ২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনা (খসড়া) নীতিমালা ঘোষণা করা হয়। এরপর ফেসবুক, বিভিন্ন ব্লগ ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে এর কঠোর সমালোচনা হয়। পাশাপাশি শুরু হয় গোলটেবিল বৈঠক, মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষরের মতো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন। প্রাথমিক সেই খসড়া ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর বাতিল করে ১৩ সদস্যের একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি অনলাইন নীতিমালার খসড়া ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। সেই খসড়া নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময় শেষে নীতিমালাটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু তথ্য অধিদপ্তর গত ৯ নভেম্বর অনেকটা আকস্মিকভাবে সংবাদমাধ্যমে তথ্যবিবরণী পাঠিয়ে অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেয়।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী আদেশে এই নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর ঘোষণাকে স্ববিরোধী ও উদ্দেশ্যমূলক বলে মন্তব্য করেছে সংবাদপত্রের প্রকাশক ও মালিকদের সংগঠন নোয়াব। প্রস্তাবিত নীতিমালায় কমিশন গঠন করলেও তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওপরই ওই কমিশনকে নির্ভর করতে হতো। কারণ, ওই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা না থাকায় ওটা এমনিতেই দুর্বল থাকত। এখন সেই কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া থেকেও মন্ত্রণালয় সরে গেল।
এর ফলে কী হতে পারে, সেই আভাস দিয়ে নোয়াব জানিয়েছে, সরকার অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন বা পরিচালনার বিষয়গুলো নিজ এখতিয়ারে রাখলে এ ধরনের সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ কঠোর হবে, যা মুক্ত সাংবাদিকতার অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। তা ছাড়া এই নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে দলীয় পরিচয় দেখা, হয়রানি বা আর্থিক লেনদেনের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ ওঠাও দেশে আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অসম্ভব ব্যাপার নয় বলে মত দিয়েছেন তাঁরা।
প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ দেশেও ছাপা পত্রিকাগুলোর অনলাইন সংস্করণ রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে দেশের পাঠকই শুধু নয়, প্রবাসী বাংলাভাষীরাও দেশের তাৎক্ষণিক খবরাখবর জানতে পারছেন। প্রচলিত সব নিয়মকানুন মেনে যাঁরা ছাপা পত্রিকা প্রকাশ করছেন, তাঁদের অনলাইন সংস্করণের জন্য আলাদা নিবন্ধন কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলোরও অনলাইন সংস্করণ রয়েছে। বিবিসি বাংলাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোরও অনলাইন সংস্করণ আছে। কয়েকটি ইন্টারনেট টেলিভিশন চালু হয়েছে, যেগুলোর সংখ্যা তথ্য মন্ত্রণালয়ও জানে না। এমনকি বিভিন্ন জেলা ও থানা সমিতির ওয়েবসাইট আছে, ব্যাংক-বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ওয়েবসাইটে খবরাখবর প্রকাশ করে। প্রশ্ন উঠেছে, এসব অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধন করতে হবে কি না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেউ দেশের বাইরে ওয়েবসাইট খুলে সেখানে নিউজ আপলোড করলে তা সরকার ঠেকাতে পারবে কি না। এমন অনেক ওয়েবসাইটও আছে, যেগুলো বিদেশ থেকে পরিচালিত হয়।
অনলাইন পত্রিকা নিবন্ধনের হলফনামায় কমপক্ষে ১০ ধরনের তথ্য দিতে হবে, যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যেমন চাওয়া হয়েছে; তেমনি চাওয়া হয়েছে চারিত্রিক সনদ, পেশাসম্পর্কিত সনদ, অভিজ্ঞতার সনদ, আর্থিক সচ্ছলতার সনদ, টিআইএন সনদ ইত্যাদি। ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাবসহ টুকিটাকি আরও অনেক বিষয় থাকবে নিবন্ধন ফরম পূরণের ক্ষেত্রে। নতুন নিবন্ধন যাঁরা নেবেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এগুলো প্রযোজ্য ধরা হলেও যাঁরা পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি নিয়েছেন, তাঁরা এগুলো ছাড়াও গোয়েন্দা ছাড়পত্র পেয়েছেন, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতিও তাঁদের নিতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইনে (ঘোষণা ও নিবন্ধীকরণ) ৪১টি ধারা ও কয়েক শ উপধারায় পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক কঠিন বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা সত্ত্বেও নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ৪২ বছর ধরে এই শিল্প চলছে। কেবল ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়, যার ফলে সরকার যখন-তখন পত্রিকার প্রকাশনা বাতিল করতে পারে না।
ছাপা পত্রিকার সঙ্গে একই প্রকাশক ও মালিক অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করছেন বিধায় তাঁকে আবার নিবন্ধন করতে বলা রীতিমতো হয়রানি। ছাপা পত্রিকার জন্য কঠিন যেসব নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হয়, তারপর অনলাইনের জন্য আবারও নতুন শর্ত আরোপ করা কার্যত একধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা ছাড়া অন্যকিছু নয়। এমনকি, ছাপা পত্রিকাগুলোর অনলাইন চালুর বিষয়টি যদি কেবল অবগতির জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে জানানোর কথা বলা হয়, সেটিও পত্রিকাগুলোর ওপর বাড়তি ঝামেলা চাপিয়ে দেবে। এটা না জানালে যে সরকারের ক্ষতি হয়ে যাবে, বিষয়টি এমনও নয়।
গত কয়েক মাসে অনলাইন পত্রিকা বিষয়ে সরকারের প্রথম সমালোচনার বিষয় ছিল এগুলোর সংখ্যা নিয়ে, দ্বিতীয় সমালোচনা এ ধরনের পত্রিকার অপসাংবাদিকতা নিয়ে। কিন্তু সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগের কারণ দেখি না। ২৫ নভেম্বর জাতীয় সংসদে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, দেশে দৈনিক, সাপ্তাহিকসহ বিভিন্ন পত্রিকার সংখ্যা ২ হাজার ৮১০টি। এ ছাড়া দেশে টেলিভিশন, বেতার, এফএম রেডিও ও কমিউনিটি রেডিওর সংখ্যা প্রায় ১৫০। ১৬ কোটি মানুষের দেশে এবং যে দেশের অর্ধেক মানুষ শিক্ষিত, সেখানে এতো গণমাধ্যমের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছে জোরেশোরে। ফকিরাপুলে একই ঠিকানায় একাধিক পত্রিকার কার্যালয় যেমন আছে, তেমনি একই ছাপাখানায় অনেকগুলো পত্রিকাও ছাপা হচ্ছে। দেয়ালপত্রিকা নামে পরিচিত এসব ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ পত্রিকা যদি টিকে থাকতে ও সরকারের সুবিধা পেতে পারে, তাহলে অনলাইন পত্রিকাগুলোর সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ দেখি না।
সরকার নিবন্ধন করার যুক্তি হিসেবে যেচে অনলাইন পত্রিকাগুলোকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটিও রক্ষার সক্ষমতা ও বাস্তবতা কতটা রয়েছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ সুযোগ-সুবিধার সুষম বণ্টন যেমন নেই, তেমনি সরকারি বিজ্ঞাপনের বাজারও ছোট। এর মধ্যে কয়েক হাজার অনলাইন পত্রিকাকে নিবন্ধন দিয়ে তাদের কী ধরনের সুবিধা এবং কতটুকু দেওয়া যাবে, সেটি সহজেই আন্দাজ করা যায়।
আবার অনলাইন পত্রিকায় অপসাংবাদিকতা যে হচ্ছে না, এমনটি নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের নিবন্ধিত বা অনুমতি পাওয়া গণমাধ্যমগুলো কি হলুদ সাংবাদিকতা করছে না? তবে কেউ এটা করলেও তার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান প্রচলিত আইনে রয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন অনলাইন পত্রিকাগুলোর জন্য একধরনের হুমকি বলেও সমালোচনা রয়েছে।
২৭ নভেম্বর সংসদে অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো অনলাইন পত্রিকা অপসাংবাদিকতা করলে অথবা সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকলে ‘তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (সংশোধন) আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। মন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকেও স্পষ্ট যে অপসাংবাদিকতা রোধ করার শক্ত আইন আছে।
নোয়াব ২৩ নভেম্বরের বিবৃতিতে বলেছে, অনলাইন পত্রিকা প্রকাশ করলেও কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যদি কেউ নিয়ম লঙ্ঘন করে থাকে, তাহলে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সব রকম সুযোগ রয়েছে।
পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক যা-ই থাকুক না কেন, অনলাইন পত্রিকাগুলো গণমাধ্যমের কুটির শিল্প হিসেবে কাজ করছে। এ ধরনের পত্রিকাগুলো যে স্বাধীন মত প্রকাশে কাজ করে যাচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর দেশে অসংখ্য অনলাইন পত্রিকা থাকায় রাষ্ট্র, সরকার বা জনগণের ক্ষতি হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।
ছাপা পত্রিকার জগৎ দুনিয়াজুড়ে একদিকে ছোট হয়ে আসছে, অন্যদিকে এ ধরনের পত্রিকায় প্রতি কপিতে আয়ের চেয়ে ব্যয় হয় কয়েক গুণ। সে ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলোর টিকে থাকার অন্যতম উপায় বেসরকারি বিজ্ঞাপন। আর বেসরকারি বিজ্ঞাপনদাতা ওই প্রতিষ্ঠানকেই বিজ্ঞাপন দেবে, যার পাঠকপ্রিয়তা আছে। তাই চূড়ান্ত বিচারে পাঠক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর যেকোনো পত্রিকার অস্তিত্ব নির্ভর করবে এবং সেই বিচারের জন্য অপেক্ষা করা উচিত।
তথ্য মন্ত্রণালয় অনলাইন পত্রিকার বিষয়গুলো এতটাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, যাতে মনে হয়, এটা বড় কোনো জাতীয় সমস্যা। যে প্রশ্ন চেপে রাখতে পারি না, তা হলো মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত তিনটি সংবাদমাধ্যমের অবস্থার কোনো গুণগত পরিবর্তন কি এসেছে? বরং বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এগুলোর আয় কমছে, মানও পড়ছে। এটা প্রমাণের জন্য কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ওই সব প্রতিষ্ঠানের মান ও আয় যেখানে ধরে রাখা যাচ্ছে না, সেখানে ব্যক্তি উদ্যোগের খুদে এসব অনলাইন প্রতিষ্ঠানের ওপর অহেতুক নজরদারির প্রয়োজন আছে কি?
শেষে একটি কথাই বলব, আইন মেনে যার যা ইচ্ছা করার সুযোগ দেওয়া হোক। নিবন্ধন, নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ—কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই। পাঠকই বিচার করবে কোনটি টিকে থাকবে বা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।
শরিফুজ্জামান: সাংবাদিক।
pintu.dhaka@gmail.com

উন্নয়নে স্বাধীন গণমাধ্যম-নাগরিক সমাজ জরুরি: জার্মান রাষ্ট্রদূত

প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে
মতবিনিময় করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত
জার্মানির রাষ্ট্রদূত টমাস প্রিনজ। সোমবার
প্রথম আলোর পঞ্চম তলার সভাকক্ষে
ওই মতবিনিময় সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর
সম্পাদক মতিউর রহমান। ছবি: মনিরুল আলম
ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত টমাস প্রিনজ বলেছেন, একটি দেশের উন্নয়নের স্বার্থে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ জরুরি। কারণ গণমাধ্যম অবাধ ও শক্তিশালী হলে তা সরকারকে উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও বেসরকারি সাহায্য সংস্থার ওপর সরকারের চাপ নিয়ে দেশটি উদ্বিগ্ন।
আজ সোমবার প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় টমাস প্রিনজ এ মন্তব্য করেন। প্রথম আলোর পঞ্চম তলার সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ওই মতবিনিময় সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। মতবিনিময়ের শুরুতে ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির এই রাষ্ট্রদূত সূচনা বক্তব্যে দেন। এরপর তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
সূচনা বক্তব্যে টমাস প্রিনজ বলেন, ‘আমি মনে করি, একটি দেশের জন্য স্বাধীন ও সরকারের কাজের ইতিবাচক সমালোচক গণমাধ্যম থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমাজের রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোথায় কী করা দরকার, সেটি গণমাধ্যমই আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয়। একটি অবাধ ও শক্তিশালী গণমাধ্যম থাকলে তা সরকারকে উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।’
টমাস প্রিনজ বলেন, ‘দুই দেশের চমৎকার সম্পর্কের পরও বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া আমাদের কিছুটা উদ্বিগ্ন করছে। এ ছাড়া গণমাধ্যমের ওপর চাপ, কার্যত কোনো বিরোধী দল না থাকা, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি সংস্থা বিষয়গুলো আমাদের উদ্বিগ্ন করে। আমরা আশা করব সরকার এ বিষয়গুলোর নেতিবাচক দিকটিকে বিবেচনায় নেবে।’
জার্মানিতে আইএসের ঝুঁকি কতটা, জানতে চাইলে টমাস প্রিনজ বলেন, ‘আমাদের দেশেও আইএসের ঝুঁকি আছে। প্যারিসের হামলার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জার্মানির সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ ছিল। সুখকর ব্যাপার হচ্ছে, আমরা তাদের প্রতিহত করতে পেরেছি। আইএস এখন শুধু পশ্চিমা নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং সব মুসলিম দেশে অবস্থান করছে। তাই এদের বিরুদ্ধে লড়াইতে আমাদের শক্তি সমবেত করার বিকল্প নেই।’
ঢাকায় ঘুরতে ঝুঁকি বোধ করেন কি না, জানতে চাইলে জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বিদেশিদের ওপর হামলার আগে ঢাকায় চলাফেরার ক্ষেত্রে আমি বেশ স্বাভাবিক ছিলাম। এখন আমি বেশ সতর্ক। তবে সরকার নিরাপত্তা জোরদার করার পর গুলশান-বারিধারায় আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি।’
জার্মান রাষ্ট্রদূত জানান, তিন দশক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় ১৯৮৩ সালে শিক্ষানবিশ হিসেবে তিন মাসের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন। ওই সময় তিনি ঢাকা ও টাঙ্গাইলে তৎকালীন জিটিজেডে (জার্মানির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা) শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেছেন।

ধর্ষণের জন্য পোশাকই দায়ী!

মুম্বইয়ে মহিলাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে ধর্ষণের কারণ নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিমত জানতে চাইল বম্বে হাইকোর্ট। সেই সাধারণ মানুষ চন্দ্রকান্ত পালভ দাবি করলেন, ধর্ষণের জন্য মেয়েদের আঁটসাঁট পোশাকই দায়ী!
মুম্বইয়ে মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে একগুচ্ছ মামলার শুনানি হাইকোর্টে চলছিল শনিবার। বর্ষীয়ান চন্দ্রকান্ত একটি মামলার আবেদনকারী। বিচারপতি নরেশ পাটিল এবং বিচারপতি এস বি সুক্রের ডিভিশন বেঞ্চে তিনি জানান, মেয়েদের পোশাকই ধর্ষণের জন্য দায়ী। তাঁর কথায়, ইদানীং মেয়েরা জিনস, কুর্তা বা শর্ট স্কার্টের মতো আঁটসাঁট পোশাক পরে বাইরে বেরোন। সে কারণেই ধর্ষণের ঘটনা এত বেড়ে যাচ্ছে।
চন্দ্রকান্তের বক্তব্য শোনামাত্র প্রতিবাদ করেন আইনজীবীরা। সরকারপক্ষের দুই আইনজীবী তো বটেই, এমনকী, চন্দ্রকান্তের আইনজীবী রাজীব চহ্বাণও বলেন, একজন মহিলার পোশাকের সঙ্গে তাঁর উপর অত্যাচারের সম্পর্ক কী? এই যুক্তির প্রতিবাদ করছি আমরা। যিনি অত্যাচারের শিকার, এর ফলে তাঁর উপরেই দোষ চাপানো হচ্ছে।  তাঁদের থামিয়ে দিয়ে বিচারপতি পাটিল বলেন, ওঁকে থামাবেন না। আমরা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাই।  তারপর এ বিষয়ে তাঁর মতামত বিস্তারিত জানান চন্দ্রকান্ত। 
চন্দ্রকান্তের বক্তব্য জানার পরে রাজীবই তাঁর মক্কেলের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, ধর্ষণের জন্য যদি পোশাকই দায়ী হয়, তাহলে তিন-চার বছরের শিশুদের ধর্ষণ করা হচ্ছে কেন? এর পরে শুনানি স্থগিত রাখেন বিচারপতি।
ধর্ষণের জন্য মেয়েদের পোশাক এবং আচরণকে দায়ী করে এর আগে বিতর্কে জড়িয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। এবার জানা গেল এক সাধারণ মানুষের একই দৃষ্টিভঙ্গি’র কথাও। প্রসঙ্গত, ওই সাধারণ চন্দ্রকান্ত মুম্বইয়ে মেয়েদের নিরাপত্তা চেয়ে বম্বে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। সেইসঙ্গে দাবি করেছিলেন, মেয়েদের পোশাকবিধি চালু করার জন্য নির্দেশ দিক আদালত।

প্যারিস এবং আইসিস by হামিদ মীর

খুব বেশি দিন হয়নি। ২ নভেম্বর সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর পক্ষ থেকে ফ্রান্সের ১২টি মহাসড়কের নাম এমন সাংবাদিকদের নামে নামকরণ করা হয়েছে, যাদের গত কয়েক বছরে হত্যা করা হয়েছে বা কারাগারে বন্দী করা হয়েছে। প্যারিসের একটি স্ট্রিটের নাম দেয়া হয়েছে সালিম শাহজাদ স্ট্রিট। এটি ওই স্ট্রিট যেখানে পাকিস্তানি দূতাবাস অবস্থিত। সালিম শাহজাদকে ২০১১ সালে ইসলামাবাদ থেকে অপহরণ করা হয় এবং ঝিলামের একটি শাখা নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার হত্যাকারী আজ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস সালিম শাহজাদসহ ১২ জন সাংবাদিকের নামকে প্যারিসের ইতিহাস ও ভূগোলের অংশ বানিয়ে সাংবাদিকদের অন্য সংগঠনকে জোরালো ধাক্কা দিয়েছে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও ব্রাজিলের কিছু সাংবাদিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ২৭ নভেম্বর প্যারিসে একটি বৈঠক ডাকা হবে। ৩০ নভেম্বর থেকে প্যারিসে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হবে এবং সারা বিশ্বের সাংবাদিক প্যারিসে সমবেত হবেন। ২৭ নভেম্বর বৈঠকের উদ্দেশ্য ওই সম্মেলন উপলক্ষে আগত সাংবাদিকদের এ কথা জানানো যে, সোমালিয়া, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া ও মেক্সিকোর পর বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও ব্রাজিলেও সাংবাদিকদের হত্যা করা হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের হত্যা বন্ধের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডাকা খুবই প্রয়োজন। ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসকে ধন্যবাদ দেয়ার কথা ছিল, কেননা এ সংগঠনের কেন্দ্রীয় দফতর প্যারিসে। ওই প্রতিনিধিদলে আমাকেও রাখা হয়েছিল। ১৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় কলম্বো থেকে এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে ফোনে অবহিত করলেন, ২৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠক স্থগিত করে দেয়া হয়েছে। ৩০ নভেম্বর প্যারিসের আসন্ন জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে আনুষঙ্গিক আরো অনেক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৪ নভেম্বর প্যারিসে ঘটিত হামলার পর কিছু অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।
১৪ নভেম্বরের হামলা ফ্রান্সের নাইন-ইলেভেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা মুসলমানদের জন্য সঙ্কট তৈরি করেছিল। ২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বরের হামলাও মুসলমানদের জন্য ইউরোপের ভেতর ও বাইরে বেশ জটিলতা সৃষ্টি করবে। নাইন-ইলেভেনে একজন পাকিস্তানিও জড়িত ছিলেন না। তারপরও নাইন-ইলেভেনের ধ্বংসযজ্ঞে পাকিস্তানের উপজাতীয় গোত্রীয় অঞ্চলগুলো ও খায়বারপাখতুনখাওয়া তছনছ হয়ে যায়। প্যারিসে ১৪ নভেম্বরের হামলাতেও কোনো পাকিস্তানি জড়িত ছিলেন না। কিন্তু পাশ্চাত্য গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, হামলাকে পুঁজি করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক নতুন অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আলজাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত এক প্রামাণ্য চিত্রে আফগান সেনাবাহিনী ও আফগান তালেবানের প্রতিনিধিদের বলতে দেখা গেছে যে, আফগানিস্তানে দাঈশ বা আইসিস বা আইএসের তৎপরতা এমন লোকেরা শুরু করেছে, যারা অতীতে নামসর্বস্ব লস্করে তইয়েবার সাথে যুক্ত ছিল। আশ্চর্য কাহিনী। পাশ্চাত্য শক্তিগুলো আগে ইরাক ও সিরিয়াতে আইএসকে নিজেদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। এখন তালেবান ও ইরানবিরোধীদের বিরুদ্ধে আইএসকে ব্যবহার করতে প্রস্তুত। একটা সময় পশ্চিমারা ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে নিজেদের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করেছে। এরপর সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটিয়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলায়। সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসির পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। সাদ্দাম হোসেন ও উসামা বিন লাদেনের শরীরী অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। এখন আইসিসের অস্তিত্ব দাঁড় করানো হয়েছে। যাদের উগ্রতায় আলকায়েদার চেয়ে দশ কদম অগ্রসর দেখা যাচ্ছে।
আইএস প্যারিস হামলার দায় স্বীকার করে পাশ্চাত্য শক্তিগুলোকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে বেশ কিছু মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর হামলার বৈধতা তৈরি করে দিয়েছে। প্যারিস হামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। পাকিস্তানের উচিত মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসির মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোকে এক যৌথ কর্মসূচি গ্রহণে আকৃষ্ট করা।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ১৬ নভেম্বর, ২০১৫ হতে
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
* হামিদ মীর : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক

তাঁর চলে যাওয়ার পর by মইনুল ইসলাম জাবের

কাইয়ুম চৌধুরী। ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম
বাবা ‘না’ বলতে পারতেন না। এ নিয়ে বিপদের অন্ত ছিল না। প্রায়ই নানা মানুষ আমাদের বাড়ির দরজায় টোকা দিতেন, টেলিফোনে রিং দিতেন আর রাস্তাঘাটে দেখা হলে পথ আগলাতেন—‘কাইয়ুম ভাই, এই কাজটি কিন্তু পরশুর মধ্যে চাই।’ কিংবা ‘আমাদের এই অনুষ্ঠানে কিন্তু আপনি প্রধান অতিথি।’ বাবা স্বভাবসুলভ হ্যাঁ বাচক উত্তর দিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত খেটে সবার মন রক্ষার চেষ্টায় প্রায় ব্যর্থ হয়ে অনেককেই শেষমেশ বলতে বাধ্য হতেন, ‘আজ নয়, কাল।’ বাবার কাছ থেকে কাজ পেতে অনেককেই তাই বেগ পেতে হয়েছে। কেউ বুঝেশুনে ‘কাইয়ুম ভাইকে’ সময় দিয়েছেন, কেউ কেউ আবার দ্বারস্থ হয়েছেন অন্য কোনো শিল্পীর। তবে যাঁরা থেকেছেন, তাঁরা বুঝেছেন কাইয়ুম চৌধুরীকে সময় দিলে কী অসাধারণ কাজ তিনি করে দিতে পারেন। আর যাঁরা এই সময়টুকু দিতে পারতেন না, পরবর্তী সময়ে তাঁরা আফসোস করেছেন কি না, জানি না।
বাবা তড়িঘড়ি কাজ করার লোক ছিলেন না। একটি কাজ তা গ্রাফিক ডিজাইন কিংবা পেইন্টিং কিংবা চারু ও কারুকলায় অন্য যেকোনো মাধ্যমেরই হোক—সে কাজে হাত দেওয়ার আগে অসংখ্য ‘লে আউট’ করা তাঁর প্রথম কাজ ছিল। এই ‘লে আউট’গুলো মূল কাজের আসল রূপ তৈরির কাজটি করত। একেকটি লে আউট মাঝে মাঝে একেকটি দিনের কাজ হতো। আর চিন্তার সাগরে ভাসতে ভাসতে এই ‘লে আউট’গুলোকে নিয়েই বাবা মূল কাজের দ্বীপটিতে তরি ভেড়াতেন। তাই সময় তো লাগতই। ছবি আঁকার প্রায় পুরোটাই যে ‘ভাববার’ বিষয়, আর কিছুটা ‘করবার’—এমন মতের শিল্পী ছিলেন বাবা। ছয় দশকের শিল্পসম্ভার আর গ্রাফিক ডিজাইনের প্রায় প্রতিটি শাখার কাজকে একবারে যদি বিশ্লেষণ করতে হয়, তবে বলতেই হবে—কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্প সৃষ্টির সম্পূর্ণটাই ছিল ভাবনার, একটি বিষয়কে বারবার নানাভাবে দেখার, বোঝার এবং তারপর দেখানোর। শিল্প সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এই দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন তিনি জীবনভর। শেষ মুহূর্তের বক্তৃতায়ও এই দর্শনেরই দিশা দিয়ে সবাইকে একসঙ্গে বিদায় দিয়ে চলে গেছেন পৃথিবীর পাট চুকিয়ে। বাবার প্রস্থান হয়েছে, তবে তাঁর দর্শনের প্রস্থান হলে এ দেশের শিল্পকলার মহা বিপদ হবে। ভাববার লোক এ দেশ থেকে বিদায় নিচ্ছেন অতি দ্রুত।
দশকওয়ারি শিল্প সাজালে বুঝতে পারা যায় কাইয়ুম চৌধুরী কীভাবে প্রায় প্রতি দশকেই নতুন করে নিজেকে, নিজের শিল্পকে এবং শিল্পদর্শনকে বদলেছেন। আমার আর বাবার শিল্পসংক্রান্ত আলোচনার প্রায় একটা বড় অংশই জুড়ে থাকত বাবার অতৃপ্তিবোধের কথা। অসম্ভব পরিবর্তনপ্রিয় মানুষ ছিলেন তিনি। সেই ষাটের দশক থেকে বাংলার রং, রূপ আর চারপাশের প্রকৃতি থেকে নানা কিছু নিয়ে তিনি যে নকশাময়ী নৌকা, সূর্য, গাছ, পশু-পাখি, নদী, মানুষের রূপ তৈরি করেছেন, তাদের প্রত্যেকেই প্রতি দশকেই বদলেছে। আর এই বদলের মধ্য দিয়েই যেন তাঁর সৃষ্টি এই মোটিফগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আমার ছোট্ট রোহিনা বলে, আকাশে আমার সূয্যি মামা আর ছবিতে দাদার সূয্যি মামা! স্টাইলাইজড যে সূর্য, যে গাছ, যে লতাগুল্ম বাবা সৃষ্টি করেছেন, এসব তো একান্ত এই বাংলার। বাবার শেষ জীবনের পেইন্টিংগুলো বাংলার লোকজ সম্ভারের দিকে এমনভাবে শিল্পালোক ছাড়াচ্ছিল, যেন তিনি চাইছিলেন বাংলার বুননশিল্পের, বাংলার নকশিকাঁথার প্রতিটি ‘সেলাই’কে ছুঁয়ে দেখবেন, তাঁর ক্যানভাসে ছেঁকে তুলবেন। ষাটের দশকের শুরু থেকেই লোকজ কলাকে আধুনিক দৃষ্টিতে দেখার যে দর্শন তিনি লালন করেছেন, শেষকালের কাজে তারই পূর্ণাঙ্গ রূপ তিনি দিয়েছেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের শিল্পকলা যদি এর গণ্ডির ভেতর থেকে বিশ্বে কিছু দিতে চায়, তবে তাকে কাইয়ুম চৌধুরীরই কাছে ফিরতে হবে।
বাবার গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে যদি কিছু বলা হয়, তবে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের গ্রাফিক ডিজাইনেরই ইতিহাস বলা হবে। তাঁর আগে কী ছিল, আর তিনি কী করেছেন—এ বয়ান অনেকগুলো বিশ্লেষণধর্মী বইয়ের উপাদান। ইলাস্ট্রেটেড প্রচ্ছদের চলকে ভেঙে প্রথমে ইলাস্ট্রেটেড ও ক্যালিগ্রাফিক প্রচ্ছদের দিকে চোখ ফেরান এবং তারপর ক্যালিগ্রাফি আর টাইপোগ্রাফির খেলায় আমাদের চোখকে নাচিয়ে তোলার কাজটি কী সন্তর্পণে তিনি করেছেন। পোস্টার চিত্রে বাবা যে অসাধারণ আধুনিকতার কাজটি করেছেন, তার রূপ খুঁজতে কষ্ট করার প্রয়োজন হবে না—‘এশিয়ান বিয়েনাল’-এর পোস্টারগুলো দেখলেই তা বোঝা যাবে। যখন যেমন দরকার, তখন তেমনভাবে টাইপ, রং, ছবি কিংবা অলংকরণের মধ্য দিয়ে ‘কমিউনিকেটিভ’ পোস্টারে বাংলাদেশের গ্রাফিক ডিজাইনকে মাতিয়েছেন তিনি। এরপর লোগো কিংবা পত্রিকার নামলিপি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ম্যাগাজিন এবং দৈনিকের ‘মেকআপ’ পর্যন্ত করেছেন বাবা। প্রতিটি কাজে তিনি নিজেই ছিলেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী। বারবার বদলে নিয়েছেন অতীতের করা কাজ। ছোট একটা উদাহরণ দিই, প্রথম আলোর সহযোগী ‘প্রতিচিন্তা’ জার্নালটির প্রতিটি সংখ্যার নামফলকের প্রতিবর্তন ঘটিয়ে প্রচ্ছদ করেছেন বাবা। হাতে নিয়ে দেখলে অবাক হতে হয়, মাত্র চারটি অক্ষরকেই কী করে একজন মানুষ এতভাবে দেখতে পারেন? দেখাতে পারেন? আমাদের শহীদ মিনারটিকে প্রচ্ছদে, পোস্টারে, ক্যানভাসে বাবা এমনই অসংখ্যবার অসংখ্যভাবে দেখিয়েছেন। দেখার চোখ তাঁর ছিল, দেখানোর হাতটাও ছিল অসাধারণ। তবে দেখার লোকেরা তা কেমন দেখেছে, তা বলা দুষ্কর।
বাংলাদেশের শিল্পজগতে বাবার এত যে বিস্তর অবদান, এ সবকিছুই কিন্তু হয়েছে তাঁর সেই অকৃত্রিম ‘না’ বলতে না পারার কারণেই। নানা মানুষের নানা কাজ করতে গিয়ে নানাভাবে তিনি শিখেছেন, পরোক্ষভাবে সবাইকে শেখাতে চেয়েছেন। জোর করে পড়িয়ে শেখানোর মানুষ তিনি ছিলেন না। কাজ করে যেতেন। বুদ্ধিমানেরা সেখান থেকেই শিখে নেবে—সেটাই ভাবতেন। এ দেশে এমন শিল্পীকে কেবল শিল্পের মাঝেই আবদ্ধ থাকলে তো চলে না; নানা সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংগঠনিক কাজেও জড়াতে হয়। বাবাও তেমনভাবে জড়িয়েছিলেন। কখনো ইচ্ছায়, কখনো অনিচ্ছায়। সেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে শিল্পীসমাজের একজন নেতা কাইয়ুম চৌধুরী হলেও সাংগঠনিক কাজের ঘোরপ্যাঁচ বোঝার মানুষ তিনি ছিলেন না। শেষ জীবনে সে জন্য বেশ মানসিক কষ্টে ভুগতে হয়েছে তাঁকে। তবু দেশকে এবং মানুষকে ভালোবাসার যে দর্শন তিনি লালন করেছিলেন, সেই তরুণ জীবনে তা থেকে একচুলও নড়েননি। শেষকালের বক্তৃতায় এই ভালোবাসার কথা আশাভরা বুকে বলে গেছেন তিনি।
লেখাটির শেষ পর্যায়ে এসে পড়েছি। বাবা যে নেই, সেটি এখনো মানতে পারি, তা নয়। নিজের কর্মক্ষেত্রে দেশে কিংবা বিদেশে যত কিছুই করি, শেষমেশ মানুষ আমার বাবার জন্যই আমাকে ভালোবাসে। কিছুদিন আগে ইউরোপের এক দেশে কিছু বিজ্ঞানীর মাঝে যখন একজন পরিচিত আমার বাবার কথা ওঠালেন, তখন সবার দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দেখেছি; শিল্প ও শিল্পীকে ওরা কতটা মর্যাদা দিতে শিখেছে। বাংলাদেশে তার রেশমাত্র যদি দেখতে পেতাম, তবে বেশ ভালোই লাগত। এখানে শিল্পীর সামাজিক মর্যাদা হয়তো আছে। তবে শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা এখনো নেই। শিল্পের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যই জনে জনে ‘শৈল্পিক চোখ’ খুলে দেওয়ার লক্ষ্যেই আমার বাবা তাঁর ‘শেষ মুহূর্ত’ পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন। জনমানুষের বিশাল আড্ডায় শিল্পীকে নয়, বরং শিল্পকে বাঁচানোর আহ্বান জানিয়েই চিরবিদায় নিয়েছেন কাইয়ুম চৌধুরী। আজ ৩০ নভেম্বর, বাবার চলে যাওয়ার একটি বছর পর এই রইল কামনা—এ দেশ যেন তাঁর শিল্পকলাকে ভালোবাসতে শেখে।
মইনুল ইসলাম জাবের: প্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর ছেলে।

আমাদের কাইয়ুম ভাই: প্রথম প্রয়াণবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা by মতিউর রহমান

জীবনের শেষ ছবি। গত বছর ৩০ নভেম্বর
আর্মি স্টেডিয়ামে উচ্চাঙ্গসংগীতের মঞ্চে
কী যেন বলার ছিল তাঁর। বক্তৃতা শেষ করে মাইকের সামনে থেকে ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর আসনে। তারপরেই মনে পড়েছিল কথাটি। ‘আমার আরেকটি কথা আছে’ বলে ফিরে এসেছিলেন মঞ্চে। কথাটি আর বলা হলো না। ঢলে পড়লেন দেশের সেরা শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। গত বছর এই দিনে, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের চতুর্থ দিনের আসরে।
দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল একটি বছর। আবার সেই আর্মি স্টেডিয়ামে জমে উঠেছে রাগ-রাগিণীর আসর। শিল্পী ও শ্রোতায় উৎসবমুখর হেমন্তের রাত। না থেকেও তিনি আছেন। উৎসবটি উৎসর্গ করা হয়েছে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে।
সে রাতে আমি উৎসব প্রাঙ্গণে ছিলাম না। কাইয়ুম ভাইয়ের দুঃসহ মৃত্যুসংবাদ পাই পরদিন সকালে ব্যাংকক বিমানবন্দরে। ঢাকায় ফিরে এসে এক গভীর শূন্যতায় বারবার তাঁর কথা মনে পড়েছে। এখনো প্রতিদিন তাঁকে স্মরণ করি। আগামী দিনগুলোতেও তিনি এভাবেই আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, আমাদের প্রিয় ‘কাইয়ুম ভাই’ তাঁর দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময়ের শিল্পসাধনায় দেশের চারুকলার জগৎকেই সমৃদ্ধ করেননি, দেশের সংস্কৃতি ও জনজীবনকেও রাঙিয়ে দিয়েছেন। জনরুচির নির্মাণে রেখেছেন তাৎপর্যপূর্ণ অবদান। ক্যানভাসে, কাগজে, হাজার পাঁচেক বইয়ের প্রচ্ছদে, অগণিত পোস্টার, নিমন্ত্রণপত্র, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংবাদপত্রের লোগো, অলংকরণের ভেতর দিয়ে তিনি এক আশ্চর্য সুন্দর জগতের দরজা উন্মোচন করেছেন আমাদের জন্য। সেখানে আমরা অভিভূত হয়ে দেখি লাল, নীল, সবুজ, হলুদের চোখজুড়ানো সন্নিবেশ। লতাপাতা, ফুল, পাখি, নৌকা, মাছ, তালপাতার পাখা, দিগন্তবিস্তৃত মাঠের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদী, অবারিত আকাশ, বাংলার চিরশ্যামল প্রকৃতি। কবি জীবনানন্দ দাশ যেমন তাঁর পঙ্ক্তিমালায় তুলে এনেছেন রূপসী বাংলার প্রকৃতি, তেমনি করে রংতুলিতে বাংলার লাবণ্যমাধুরী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্লান্তভাবে তুলে ধরেছেন কাইয়ুম চৌধুরী। তাই বিদগ্ধজনেরা তাঁকে বলেছেন রংতুলির জীবনানন্দ। ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীনালায় ঘুরে বেড়াতে আমার খুব ভালো লাগে। এখান থেকে আমি ছবির বিষয়বস্তু আহরণ করি।’
কাইয়ুম ভাইয়ের সত্তর বছরে পা রাখা উপলক্ষে ২০০৪ সালের ৬ মার্চ বেঙ্গল গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাঁর চতুর্থ একক চিত্র প্রদর্শনী। নাম ছিল ‘আবহমান’। সে সময়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার ঐতিহ্য, আমার শিল্পের পশ্চাদ্ভূমি আমাকে জানতে হয়েছে। এ অঞ্চলের পাল যুগের শিল্পকর্ম, সেন যুগের ভাস্কর্য ও লোকশিল্পের যে আবহমান ধারা আমরা দেখি, সেটিই আমাদের ঐতিহ্য।’ এই শিল্পবোধ নিয়েই কাজ করেছেন তিনি। একসময় সুদিন ছিল এই দেশে। আঁকতে চেয়েছেন সেই সময়ের ছবি। তেলরং, জলরং, গোয়াশ, প্যাস্টেল, অ্যাক্রেলিক, কালি-কলম, ছাপচিত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এক পরিশীলিত নিজস্ব শিল্পভাষা বিনির্মাণ করেছিলেন তিনি।
ছবি আঁকার বাইরে সুকুমার শিল্পকলার প্রতিটি ক্ষেত্রেই গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর। নেশা ছিল বই পড়া ও গান শোনার। সিনেমার প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। বই, গানের রেকর্ড ও ভিডিওর বিপুল সংগ্রহ গড়ে তুলেছিলেন তাঁর সারা জীবনের চেষ্টায়। সুকুমারকলার প্রতি এই অনুরাগ অনেকটা উত্তরাধিকারসূত্রেই পেয়েছিলেন। বাবার কলের গান ছিল। গ্রামোফোন রেকর্ডের সংগ্রহও ছিল ভালো। বাবার কোলে বসে দেখেছিলেন প্রথম সিনেমা। সেই অনুরাগ আমৃত্যু লালন করে গেছেন কাইয়ুম চৌধুরী।
শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন সমাজ ও সমকাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিল্পচর্চার বিপরীত মেরুতে। ছিলেন অত্যন্ত সমাজ-সচেতন, রাজনীতি-সচেতন মানুষ। ১৯৩৩ সালে তাঁর জন্ম নোয়াখালীতে। ১৯৪৯ সালে এসএসসি পাস করে তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠিত ঢাকা আর্ট কলেজে দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হয়েছিলেন। পাস করে বের হন ১৯৫৪ সালে। ছাত্রজীবনের সময়টি কেটেছে গৌরবময় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনে। সে সময় দেশের প্রধান কবি-সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে জহির রায়হানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নিবিড়। তাঁর প্রথম বই শেষ বিকেলের মেয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন। পরে তাঁর সিনেমার পোস্টারও এঁকেছেন। প্রবন্ধ, কবিতা, শিশুতোষ ছড়া লিখেছেন। তাঁর ছড়ার বই প্রকাশিত হয়েছে তিনটি।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে কাইয়ুম ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমার। সে বছর ফেব্রুয়ারির এক সকালে বন্ধু আসাদুজ্জামান নূরকে সঙ্গে নিয়ে আজিমপুরে কাইয়ুম ভাইয়ের বাড়িতে হাজির হয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদের একুশের কবিতা সংকলনের প্রচ্ছদ আঁকিয়ে নেওয়ার জন্য। বজ্রে বাজে বাঁশী নামের সেই সংকলনের তিনরঙা প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন তিনি। অভ্যুত্থানের সেই দিনগুলোতে কাইয়ুম ভাইকে দেখেছি ছাত্র-শিক্ষক-শিল্পীদের মিছিলে অংশ নিতে। মুক্তিযুদ্ধের আগে চারু ও কারুশিল্পীদের যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল, তার যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন তিনি ও শিল্পী মুর্তজা বশীর।
কাইয়ুম ভাইয়ের সঙ্গে সেই যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়েছিল। অটুট ছিল তাঁর মৃত্যু অবধি। তাঁকে সেই ১৯৬৯-৭০ সালে যেমন উদ্যমী দেখেছি, যেমন অনুপ্রেরণা পেয়েছি তাও অব্যাহত ছিল বরাবর। বিশেষ করে প্রথম আলোর সঙ্গে তাঁর বন্ধন ছিল নিবিড়। ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি আমরা যখন প্রথম আলো বের করার উদ্যোগ নিই, তখন প্রতিটি কাজে কাইয়ুম ভাইয়ের পরামর্শ নিয়েছি। অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে তিনি প্রথম আলোর লোগো, বিভিন্ন পৃষ্ঠাসজ্জা, ক্রোড়পত্রের লোগো—সবকিছুই করে দিয়েছেন। পরেও তাঁর পরামর্শ ছাড়া আমরা এসবের কোনো পরিবর্তন বা সংযোজন করিনি। এখনো তাঁর অভাব বোধ করি প্রতিদিন, তাঁকে অনুভব করি সকল কাজে।
কাইয়ুম চৌধুরীর অপ্রকাশিত কবিতা
অনেক কথা বলার ছিল
অনেক স্বপ্ন জমিয়ে রেখেছি
আঁকব বলে দু’জনে মিলে
চিত্রপটও সাজিয়ে তুলেছি।

সময় তোমার হয় না যখন
শুনবে কখন আমার কথা
স্বপ্ন আমায় দেখবে কখন
রং ছড়ানো যাবেই বৃথা?

এসো না আজ শুরু করি
রঙের খেলা চিত্রপটে
হাত বাড়িয়ে দাও না তুমি
নকশা করি শূন্য ঘটে।

রুশ যুদ্ধবিমানের নিহত পাইলটের লাশ তুরস্কে

রাশিয়ার যে যুদ্ধবিমানটিকে গত সপ্তাহে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তের কাছে গুলি করে ভূপাতিত করেছে - তার একজন পাইলটের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
তুর্কী প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতুলু বলেছেন, নিহত রুশ পাইলট লে. কর্নেল ওলেগ পেশকফের মৃতদেহ তাদের কাছে রয়েছে। সিরিয়ার সাথে সীমান্তের একটি প্রদেশ হাতাইয়ে মৃতদেহ নিয়ে আসা হয়েছে। এখন তা রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে প্রস্তুতি চলছে। তিনি জানান, তুরস্কের একজন সামরিক কর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে রাশিয়ার একজন কর্মকর্তা খুব শীঘ্রই সেখানে যাবেন এবং ওই পাইলটের মৃতদেহ গ্রহণ করবেন।
তুর্কী মিসাইলের আঘাতে বিমানটি বিধ্বস্ত হলেও পাইলট প্যারাশুট দিয়ে নেমে আসার সময় সিরিয়ার বিদ্রোহীরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে মস্কোর কর্তৃপক্ষ গত শুক্রবার থেকে তুরস্কের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
শুরু থেকেই আঙ্কারা বলে আসছে, তুরস্কের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ার পরেই সামরিক বাহিনী রুশ বিমানটিকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মাটিতে নামিয়ে আনে। এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে রাশিয়া। বিমান থেকে দু'জন পাইলট প্যারাশ্যুটের মাধ্যমে বাঁচার চেষ্টা করলে তাদের একজন সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরোধী বিদ্রোহীদের গুলিতে প্রাণ হারান। তুরস্ক এই বিদ্রোহীদের সহযোগিতা করছে।
গত সপ্তাহের এই ঘটনার পর থেকেই তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে বড়ো ধরনের উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। দু'দেশের নেতারাই পরস্পরের বিরুদ্ধে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করছেন। এর মধ্যে তুরস্কের বিরুদ্ধে রাশিয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও ঘোষণা করেছে।
বেঁচে যাওয়া আরেকজন রুশ পাইলটকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে উদ্ধারের পর ইতোমধ্যেই তাকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি সিরিয়ায় তার কাজে ফিরে যেতে চান। কারণ হত্যাকারীদেরকে তার সহকর্মীর জীবনের মূল্য ফেরত দিতে হবে।
এই ঘটনায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান প্রথমে রাশিয়ার কাছে দুঃখ প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান। বরং তার অভিযোগ- আগুন নিয়ে খেলছে রাশিয়া। এই খেলা বন্ধ করার জন্যে তিনি প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি আহবান জানান। কিন্তু একদিন পরেই এরদোয়ান রুশ বিমানটি ভূপাতিত করার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন।
সূত্র : বিবিসি

কাইয়ুম চৌধুরী: একজন আনন্দময় মানুষ by সাজ্জাদ শরিফ

আত্মপ্রতিকৃতি: কাইয়ুম চৌধুরী
একটি বছর চলে গেল, কাইয়ুম চৌধুরী আমাদের মধ্যে নেই—এ কথা কেমন অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়! গত বছরের এই দিনটিতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবের মঞ্চে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে!
শিল্পী ছিলেন তিনি। তাঁর প্রধান পরিচয়ই এই যে তিনি রূপের অনুসন্ধানী ছিলেন। এই দেশ, দেশের মানুষ—তাদের যাপনের প্রহর, বেঁচে থাকার আনন্দ ও স্বপ্ন নিজের কল্পনায় রঞ্জিত করে রঙে ও রেখায় তিনি আজীবন রূপ দিয়ে এসেছেন। কিন্তু এটুকুই তাঁর সবটা নয়। শিল্পী হিসেবে কাইয়ুম চৌধুরীর বিচিত্র কৌতূহল ও সক্রিয়তা কেবলই চারুশিল্পের সীমানার মধ্যে আটকে থাকেনি। সেই সুনির্দিষ্ট সীমানাটি ছাপিয়ে তা বেরিয়ে এসেছিল মানুষের জীবন যাপনের আঙিনার ভেতরে। গ্রন্থসজ্জা, পোস্টার-পরিকল্পনা, লোগো বা নেমোনিক রচনা, কোনো সাংস্কৃতিক মেলার পরিসর-ভাবনা বা স্টল নির্মাণ, পরিধেয়-পরিকল্পনা ইত্যাদি ব্যবহারিক জীবনের নানা দৃশ্যবস্তু তাঁর হাতের ছোঁয়ায় রুচিময় হয়ে উঠত। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে কাইয়ুম চৌধুরীর ছিল প্রত্যক্ষ অবদান। বলতে গেলে, বাংলাদেশের নাগরিক দৃশ্য রুচির বিকাশে তাঁর ভূমিকাই ছিল প্রধান।
রঙিন মুদ্রণযন্ত্র প্রসারের আগে, সেই ব্লক তৈরি করে প্রচ্ছদ ছাপানোর যুগে, শুধু সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তির জোরে সীমিত উপকরণ ও আয়োজনের মধ্যেও অপূর্ব সব মার্জিত পুস্তক তাঁর হাত দিয়ে বেরিয়েছে। বাংলা অক্ষর চিত্রণে তাঁর পটুত্ব ছিল অসামান্য। শুধু অক্ষর চিত্রণের বৈচিত্র্যেই তিনি একেকটি প্রচ্ছদের আলাদা আলাদা চরিত্র গড়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু বই তাঁর কাছে প্রচ্ছদমাত্র ছিল না, ছিল একটা সমগ্র। ফলে প্রচ্ছদের পাশাপাশি বইয়ের বাঁধাই, পুস্তানি, পুট বা মেরুদণ্ড, ইনার বা প্রারম্ভিক কয়েকটি পৃষ্ঠা, তাতে হরফের ধরন, আকার, সজ্জা—সবই ছিল তাঁর বিশেষ মনোযোগের বিষয়।
কাইয়ুম চৌধুরী রূপ অনুসন্ধান করেছেন এবং বিচিত্র রূপবন্ধ রচনা করেছেন। রূপের এই অন্বেষণের পেছনে ছিল তাঁর রসের জন্য তৃষ্ণার্ত একটি মন। রূপের সাধক ছিলেন বলে এই রস তিনি কেবল চারুশিল্প থেকে আহরণ করেননি। এ ক্ষেত্রে তাঁর মন ছিল একেবারে উন্মুক্ত। সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র—প্রতিটি বিষয়েই তিনি ছিলেন তীব্রভাবে উন্মুখ।
শিল্প-সাহিত্যের কল্পনামুখর জগতের দিকে কাইয়ুম চৌধুরীর কৈশোর উন্মিলিত হওয়ার পেছনে তাঁর বাবা আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর ভূমিকা ছিল। কলকাতা থেকে তাঁদের বাড়িতে আসত বিচিত্র পত্রপত্রিকা এবং সিগনেট প্রেস, দেবসাহিত্য কুটিরসহ অন্যান্য রুচিশীল প্রকাশনীর বই। সেসব বইপত্রের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ হিসেবে মুদ্রিত উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সমর দে বা প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা ছবি তাঁর মধ্যে শিল্পী হওয়ার বাসনা জাগিয়ে তোলে। এগুলোতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধকুমার সান্যাল, হেমেন্দ্রকুমার রায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত বা বুদ্ধদেব বসুর মতো লেখকের গল্প-উপন্যাসও তাঁর চিত্তের উদ্বোধনে মোটেই কম ভূমিকা রাখেনি।
সংগীতের প্রতিও তাঁর ভালোবাসা ছিল দুর্বার। ১৯২১-২২ সালে কাইয়ুম চৌধুরীর বাবা যখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র, তখন ত্রিপুরার জমিদার-নন্দন ও বাংলা গানের প্রবাদপুরুষ শচীন দেববর্মন ছিলেন তাঁর সহপাঠী। সেই সূত্রে বালক বয়স থেকেই শচীনকর্তার গানের পথ ধরে ধীরে ধীরে বিচিত্র ধরনের গানে কাইয়ুম চৌধুরীর আগ্রহ গভীর হয়ে ওঠে। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ছিল গানের এক বিচিত্র ও বিপুল সম্ভার। গানের প্রতি এই তীব্র আবেগ বাংলাদেশে সংগীতের নানা উদ্যোগের সঙ্গেও তাঁকে গভীরভাবে যুক্ত করেছিল।
বাংলা অক্ষর চিত্রণে তাঁর পটুত্ব ছিল অসামান্য। শুধু অক্ষর চিত্রণের বৈচিত্র্যেই তিনি একেকটি প্রচ্ছদের আলাদা আলাদা চরিত্র গড়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু বই তাঁর কাছে প্রচ্ছদমাত্র ছিল না, ছিল একটা সমগ্র চলচ্চিত্রের প্রতিও তাঁর ছিল দারুণ টান। ছবি দেখতেন বিচিত্র রকমের। হলিউডের ১৯৫০-৬০ দশকের স্বর্ণযুগের ছবি খুবই ভালোবাসতেন। পশ্চিমের চিত্রশিল্পীদের জীবন অবলম্বনে তৈরি চলচ্চিত্র সংগ্রহ করতেন আগ্রহ নিয়ে। তাই বলে চলচ্চিত্রের নিছক দর্শক তিনি ছিলেন না। ঢাকায় চিত্রনির্মাণের প্রায় আদিপর্ব থেকেই—সেই মাটির পাহাড়-এর চিত্রায়ণের সময়—তিনি এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। কাজও করেছেন চিত্রনির্মাণের নানা অংশে—সহকারী পরিচালক হিসেবে, শিল্পনির্দেশনায়, এমনকি চিত্রনাট্য রচনার প্রক্রিয়াতেও।
ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সূচিত ১৯৫০-এর দশক ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথরেখার অমোচনীয় চিহ্নটি আঁকতে শুরু করে। এ সময় থেকে আমাদের আত্মপরিচয় হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে চরিত্রটি রূপায়িত হতে শুরু করে, দ্রুতই তা বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠবে। চিত্রকর, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী, চলচ্চিত্রকার হিসেবে এই দশকের যে তরুণ দলের হাতে আত্মপরিচয়ের এ চিহ্ন আঁকা হচ্ছিল, কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন তাঁদের একজন।
মুক্তিযুদ্ধ ও তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয়ের সেই রাজনৈতিক লড়াই একটি ঐতিহাসিক পরিণতি পায়। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ তার এক সফল পরিণাম। কিন্তু সাংস্কৃতিক নির্মাণের তো সফল পরিণতি বলে কিছু নেই। এ এক অন্তহীন প্রবাহ। সেই সজীব প্রবাহের সঙ্গে কাইয়ুম চৌধুরীর যোগ কখনোই শিথিল হয়নি।
নানা শিল্পমাধ্যমের প্রতি কাইয়ুম চৌধুরীর আগ্রহ তাঁকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর আর যে গুণের কথাটি বলা দরকার, সে তাঁর লেখালেখি। শেষ জীবনে, খেলাচ্ছলে প্রায় যেন বা পাবলো পিকাসোর মতো, নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেছিলেন কবিতায় ও ছড়ায়। কাইয়ুম চৌধুরী সে অর্থে কখনো সাহিত্যিক হওয়ার সাধনা করেননি। কিন্তু বিক্ষিপ্তভাবে তিনি লিখে গেছেন আজীবন। নানা প্রসঙ্গ নিয়ে লেখা সেই সব গদ্যের বিষয়, এককথায় বলতে গেলে, তাঁর বিচিত্র শিল্প উপভোগ। তিনি লিখেছেন চিত্রকলা, সাহিত্য, গান, চলচ্চিত্র নিয়ে; লিখেছেন এসব শিল্পমাধ্যমে যাঁরা আমাদের মন গড়ে তুলেছেন, আমাদের সাংস্কৃতিক আকুতিকে ভাষা দিয়েছেন, যাঁরা আমাদের নায়ক, তাঁদের নিয়ে; লিখেছেন আমাদের নানা সাংস্কৃতিক উদ্যোগ, আয়োজন ও সংগ্রামের মর্ম নিয়ে।
এসব লেখায় কাইয়ুম চৌধুরীর গদ্য কেবল অনুপম নয়, বিষয় ছাপিয়ে সে গদ্য পড়ারও একটা আলাদা আনন্দ আছে। এ গদ্যের স্বাদ আলাদা। সেখানে তিনি নিজের একটি স্বাতন্ত্র্য পরিচয় রেখেছেন।
প্রকাশনার শুরু থেকে প্রথম আলো আর কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন অবিচ্ছেদ্য। প্রথম আলোর তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এর পাতায় পাতায় তাঁর সৃষ্টিশীল হাতের স্পর্শ লেগে আছে। তিনি এর মূল লোগো এঁকেছেন, পৃষ্ঠাসজ্জার টেম্পলেট তৈরি করেছেন, এর অজস্র লোগো ও নেমোনিক তাঁর হাতে গড়া। তাঁকে ছাড়া প্রথম আলোর কোনো ঈদসংখ্যার প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠাসজ্জার কথা কল্পনাও করা যেত না। প্রথম আলো ও প্রথমা প্রকাশনের নানা প্রচ্ছদ, স্টল, নিমন্ত্রণপত্র, স্টিকার, প্রচারপত্র ইত্যাদিতে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা।
কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে প্রথম আলোর ঋণ কখনোই শোধ হওয়ার নয়। আজ তাঁর মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকীতে তাঁকে জানাই অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।
সাজ্জাদ শরিফ: কবি, সাংবাদিক৷

ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রচার করছেন মোদি : অরুন্ধতী

ভারতে নরেন্দ্র মোদির সরকার ‘ব্রাহ্মণ্যবাদে’র প্রচার করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বুকার জয়ী লেখিকা ও মানবাধিকার কর্মী অরুন্ধতী রায়। তিনি বলেন, ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যে রকম আতঙ্কের পরিবেশে রয়েছে, তার জন্য ‘অসহিষ্ণুতা’ শব্দটি যথেষ্ট নয়। মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলে সমতা পরিষদের ‘ফুলে সমতা পুরস্কার’ নেওয়ার সময় দেশের পরিস্থিতি নিয়ে এমনই মন্তব্য করলেন তিনি৷
তাঁর অভিযোগ, মোদি সরকার হিন্দুত্ববাদের নামে ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রচার করছে৷ তিনি আরও বলেন, সমাজ সংস্কারকদের ‘মহান হিন্দু’ হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে৷ যাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ডঃ বিআর আম্বেদকর৷ যদিও হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন তিনি৷ অরুন্ধতীর এই মন্তব্যের পরেই শুরু হয় কট্টরপন্থীদের বিক্ষোভ৷ অরুন্ধতী দেশবিরোধী ও দেশের মানুষের জাতীয় চেতনায় আঘাত করেছেন বলে অভিযোগ তুলে সভাস্থলের বাইরেই প্রতিবাদ করতে শুরু করে বিজেপি’র ছাত্র সংগঠন এবিভিপি’র ছাত্ররা৷ তবে পুলিশি তৎপরতায় বড় কোনও ঘটনা ঘটেনি৷

সংঘর্ষ-গুলি অবরুদ্ধ মেয়র

তেজগাঁওয়ে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদে গিয়ে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ সময় পার করে বিকালে এলাকা ত্যাগ করেন তিনি। অভিযানের শুরুতে পুলিশের সঙ্গে ট্রাকশ্রমিকদের ধাওয়া-পালটা ধাওয়া একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। শ্রমিকরা অভিযান পরিচালনাকারীদের ওপর ইটপাটকেল ছুড়ে চড়াও হয়। এ সময় পুলিশ পালটা ছররা গুলি ছুড়ে বলে অভিযোগ করেন শ্রমিকরা। এতে অন্তত তিনজন আহত হন। এরপর শ্রমিকরা পুরো এলাকায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। তারা মেয়রের প্রটোকলে থাকা একটি গাড়িও ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় উচ্ছেদ অভিযান। বেলা দেড়টা থেকে বিকাল ৪টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের অফিসে আটকে থাকতে হয়। বিকালে উপস্থিত শ্রমিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন মেয়র। তিনি একটি উন্নত ট্রাক টার্মিনাল স্থাপনের আশ্বাস দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রহরায় এলাকা ত্যাগ করেন। পরে সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। গত মে মাসে দায়িত্ব নেয়ার পরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গতকালই বড় অভিযানে নামেন আনিসুল হক। তেজগাঁও সাতরাস্তা এলাকা থেকে কাওরান বাজার  রেলক্রসিং পর্যন্ত টার্মিনালের বাইরে অবৈধভাবে ফেলে রাখা পুরনো ট্রাক ও বিভিন্ন স্থাপনা সরাতে বেশ কিছুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। গত ৮ই নভেম্বর ভ্রাম্যমাণ আদালত পাঠিয়ে অভিযান চালানোর পর অবশিষ্ট স্থাপনা সরাতে ২৭শে নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেন তিনি। ওই সময়  পেরিয়ে যাওয়ায় রেলমন্ত্রী মুজিবুল হককে সঙ্গে নিয়ে বেলা ১টার দিকে সাতরাস্তা এলাকায় যান আনিসুল হক। র‌্যাব ও পুলিশের প্রহরার মধ্যে সিটি করপোরেশনের বুলডোজার অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করে। ট্রাক শ্রমিকরা বেলা দেড়টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে ঢিল ছুড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। অল্প সময়ের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে মেয়র আনিসুল হক ও রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ড্রাইভার্স ইউনিয়নের কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। কিছুক্ষণ পর রেলমন্ত্রী চলে গেলেও মেয়র সেখানেই অবস্থান করেন। যদিও আগের দিন সিটি করপোরেশন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়ে ছিল অভিযানে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল উপস্থিত থাকবেন। তবে অভিযান শুরুর সময় এ দুই মন্ত্রী ছিলেন না।
এদিকে শ্রমিকদের রোষে পড়লেও মেয়র দৃঢ়ভাবে বলেন, কয়েকজন মানুষের স্লোগানে ভয় পেয়ে যাবো- এমন ভাবার কিছু নেই। নগরবাসী যাতে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারেন সেই কাজ করছি। কেউ উত্তেজিত করলেন আর আমি আমার লোক নিয়ে দৌঁড়ে চলে গেলাম; না এটা হবে না। এদিকে জসিম উদ্দিন নামে এক শ্রমিক মারা গেছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকরা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারা রাস্তায় কভার্ডভ্যান দাঁড় করিয়ে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। বাইরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলার মাঝেই পাশের একটি মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা আসে- ‘মেয়র শ্রমিকদের দাবি মেনে নিয়েছেন। মাইকের ঘোষণায় বলা হয়, পুলিশের গুলিতে আহত শ্রমিকের চিকিৎসার ভার নেবেন মেয়র। পাশাপাশি বিকল্প ট্রাকস্ট্যান্ড না হওয়ার আগে বর্তমান স্ট্যান্ড থেকে ট্রাক সরাতে চাপও দেয়া হবে না। এই ঘোষণার পর শ্রমিকরা অনেকটা শান্ত হয়ে আসে। কিছুক্ষণ পর চালক সমিতির কার্যালয় থেকে  বেরিয়ে এসে হ্যান্ডমাইকে শ্রমিকদের উদ্দেশে কথা বলতে শুরু করেন মেয়র। তিনি বলেন, নিজের জন্য তিনি এই ট্রাকস্ট্যান্ড সরানোর কাজ করছেন না। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে জনগণের চলাফেরা নির্বিঘ্ন করতে। এ বিষয়ে তিনি ভোটার ও সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মেয়রের বক্তব্য চলাকালে শ্রমিকদের মধ্যে আবারও উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আনিসুল হক বার বার বলেন- ‘আমার কথা শুনুন, আমার কথা শুনতে হবে’। এই এলাকায় আজ যে সমস্যা সেটা ছোট্ট একটা সমস্যা। রাস্তায় ট্রাক পার্কিং না করে ভেতরে টার্মিনাল বানাব আমরা। চারজন মন্ত্রী আমার এই উদ্যোগের সঙ্গে ছিলেন। রাস্তাটা ভালোভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। দুইমাস ধরে আমি এটা নিয়ে কথা বলছি। মলিকপক্ষ আমাকে বলেছে টার্মিনালের ভেতরের অংশটা যাতে তাদের পরিষ্কার করে দেয়া হয়। সেজন্যই ভেতরের নষ্ট অকেজো ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন সরানো হচ্ছে।
যারা এই জায়গা অবৈধভাবে দখল করে আছেন, আপনাদের সবার সুবিধার জন্য টার্মিনালের ভেতরে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা গাড়িগুলো সরানো হচ্ছে, আমার সুবিধার জন্য নয়। বক্তব্য শেষ করার আগে মেয়র বলেন, তাহলে আমরা ঠিক করলাম এই জায়গায় যেসব গাড়ি আছে এগুলো ভেতরে থাকবে। আপনাদের আমরা একটা ভালো ট্রাক স্ট্যান্ড উপহার দেবো। বেলা পৌনে ৫টার দিকে র‌্যাব ও পুলিশ বেষ্টিত হয়ে গাড়িতে ওঠে ফার্মগেইটের দিকে চলে যান মেয়র। পরে রাস্তা আটকে থাকা শ্রমিকদেরও পুলিশ সরিয়ে দেয়। সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে তিন প্লাটুন পুলিশ, রায়টকার, জলকামান ও র‌্যাব’র সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির কারণে শ্রমিকরা রাস্তা ছেড়ে দেন। এদিকে সংঘর্ষের সময় আহত জসিম উদ্দীন (৪০), মো. বদরুদ্দোজা (৫৫) ও মাসুম বিল্লাহ (২৫)কে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।
বাংলাদেশ ট্রাক ও কার্ভাড ভ্যান ড্রাইভার ইউনিয়নের সদস্য ট্রাক চালক সাগর হোসেন জানান, ১৫ দিন আগে মেয়র আনিসুল হক আমাদের অফিসে আসেন। তিনি বাংলাদেশ ট্রাক মালিক সমিতি ও ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে মিটিং করেন। তিনি আরও জানান, ওই মিটিং তেজগাঁও টার্মিনালের আশপাশের সকল অবৈধ স্থাপনার উচ্ছেদের করা হবে বলে তিনি জানান। প্রতিশ্রুতি দেন, অফিসের পেছনের রেলের সম্পত্তি ৩৯ একর জমিতে তিনি আধুনিক একটি ট্রাক টার্মিনাল করে দিবেন।
আরেক সদস্য মানিক নিয়াজী দাবি করে জানান,  ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে টার্মিনালে কোন স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়নি। ওই বৈঠকে ইউনিয়নের নেতারা মেয়রকে জানিয়েছিলেন যে, একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে তারা বৈঠক করে বিষয়টি জানাবেন। কিন্তু, তিনি তাদের সিদ্ধান্ত না মেনে সকাল বেলায় স্থাপনা উচ্ছেদ করতে এলে মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুলিশের তেজগাঁও জোনের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার জানান, পুলিশ ও শ্রমিকের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিতে ওই ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ কোন গুলি ছুড়েনি। ইটের আঘাতে তিনজন আহত হয়েছেন। মেয়রের আশ্বাসের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। শ্রমিকরা একপর্যায়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেন। পুলিশের পক্ষ থেকেও ধৈর্যের পরিচয় দেয়া হয়েছে।

Sunday, November 29, 2015

নেপালে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ

নেপালের কেবল টিভি ব্যবসায়ীরা সেখানে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। ফেডারেশন অফ নেপাল কেবল টেলিভিশন অ্যাসোসিয়েশন শনিবারই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।
ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারত-নেপাল সীমান্তে পণ্য নিয়ে ঢোকার ক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, তার প্রতিবাদেই অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতীয় চ্যানেলগুলির প্রদর্শন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে নেপালে।
এদিকে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্কের মধ্যে ২ ভারতীয় এসএসবি জওয়ানকে নেপাল পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। নেপাল প্রশাসন সূত্রে দাবি, অস্ত্র নিয়ে সেদেশে ঢোকার জন্যই গ্রেফতার করা হয়েছে দুই এসএসবি জওয়ানকে।
ভারত-নেপাল সীমান্তে পণ্য নিয়ে ঢোকার ক্ষেত্রে প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু করে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মাধেশি ফ্রন্ট। এই সংগঠন মূলত নয়া সংবিধানের সাতটা প্রদেশের মডেল নিয়েই আপত্তি তুলেছে।
নেপালে এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কিছু দিন আগেই সেখানে নিয়োজিত ভারতের রাষ্ট্রদূত রঞ্জিত রাই বলেন, সে দেশে ভারতবিদ্বেষী মনোভাব তৈরি হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই ধরণের মানসিকতা তৈরির পিছনে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে রয়েছে। ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এধরণের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া দুই দেশের কারোর পক্ষেই ভাল নয় বলে মতপ্রকাশ করেন তিনি।
নেপালে বেড়ে চলা অসন্তোষ নিয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বলেন, ভারতের এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। সেই সমস্যাকেই ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে কিছু সংখ্যক মানুষ ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে। সেই সমস্যার মোকাবিলা করতে অবিলম্বেই আলোচনায় বসা উচিত্ বলে মন্তব্য করেন রঞ্জিত রাই।

আকাশপথে হামলার আশঙ্কায় নয়াদিল্লী

আকাশপথে আইসিস হামলার লক্ষ্য হতে পারে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। সম্প্রতি এমনই সতর্কবার্তা জারি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে রাজধানীর ১৫টি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। ড্রোন অথবা প্যারা মোটর থেকেই হামলা হতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ভারতীয় বিমান বাহিনী 'সন্দেহজনক' আখ্যা দিলেই, এই ধরনের যে কোনও উড়ন্ত বস্তুকে গুলি করে নামানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা কর্মীদের।
এ বিষয়ে সম্প্রতি নর্থ ব্লকে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে দিল্লি পুলিশ, সেন্ট্রাল ইনডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স, কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রণালয় এবং ভারতীয় বিমান বাহিনীর আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে জঙ্গি নিশানায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপ-রাষ্ট্রপতির বাসভবন, রাজপথ ও ইন্ডিয়া গেটের পার্শবর্তী এলাকা এবং সিবিআই, সিআইএসএফ ও বিএসএফ-এর হেডকোয়ার্টার যেখানে রয়েছে সেই সিডিও কমপ্লেক্স।
সরকারি এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের কথায়, "দেশের সব শহরের মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর হল দিল্লি। বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের নিশানায় রয়েছে দেশের রাজধানী। তার মধ্যে আইসিসও রয়েছে। এখন আকাশপথে হামলার বিষয়টি নতুন। কীভাবে এর মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে কথাবার্তা চলছে।" দিল্লির আকাশে কোনও উড়ন্ত বস্তুকে বিমান বাহিনী 'সন্দেহজনক' আখ্যা দিলেই গুলি করে তা নামানোর জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তা এজেন্সিগুলিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে বলে জানানো হয়।
সূত্র : এই সময়

নেপালে ১৩ ভারতীয় জওয়ান আটক

নেপালে ঢুকে পড়া ১৩ ভারতীয় জওয়ানকে আটক করেছে নেপাল সীমান্ত পুলিশ বাহিনী।
ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, সশস্ত্র সীমা বলের (এসএসবি) দুই জওয়ানকে আটক করা হয়েছিল। তবে অন্যান্য মিডিয়ার খবরে বলা হয়, নেপালের ভেতরে ঢুকে পড়ায় এসএসবির ১৩ সদস্যকে আটককরা হয়েছিল।
ভারতীয় সূত্র জানায়, রোববার সকালে চোরাচালানিদের ধাওয়া করার সময় বিহারের কিষাণগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে তারা নেপালে ঢুকে পড়ে।
এসএসবি ডিজি বিডি শর্মা বলেন, ভারতীয় জওয়ানদের নিরাপদে ফিরিয়ে দেয়া নিয়ে এসএসবি ও নেপাল সীমান্ত পুলিশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এরপর বিকেলে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়।
নেপাল বৃহস্পতিবার তাদের নাগরিকদের ওপর গুলি করার জন্য এসএসবিকে দায়ী করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারত পরে স্বীকার করে, চোরাচালানি ও তাদের বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গোলা বিনিময় হয়েছে।
এদিকে ক্ষমতাসীন নেপালি সিপিএন (ইউএমএল)-এর সিনিয়র নেতা প্রদীপ গাইওয়ালি রোববার বলেছেন, তার দেশ ভারতের বড়ভাইসুলভ আচরণ মেনে নেবে না।
তিনি বরেন, নরেন্দ্র মোদি সরকারের উচিত নেপালের সাথে তার দেশের বর্তমান জটিলতা 'অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মিটিয়ে' ফেলা।
তিনি বলেন, আমরা ভারতের সাথে সম্পর্ক চাই সমতার ভিত্তিতে, ঠিক যেমন তা প্রযোজ্য চীনের ক্ষেত্রে। আমরা বড়ভাইসুলভ মনোভাব মেনে নেব না।
নেপালে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে আরো অধিকার দাবি করে ভারতীয় বংশদ্ভূত মধেশীরা আন্দোলন করছে। এর জের ধরে নেপালের ওপর ভারত অঘোষিত অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। এর ফলে নেপালে নিত্যপণ্যের মারাত্মক সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে

বাইরে কলঙ্কমোচন আর ভেতরে কালিমালেপন! by মলয় ভৌমিক

ছবিটি ছাপা হয়েছে ২২ নভেম্বর প্রথম আলোর বিশাল বাংলা পাতায়। সাদা-কালোয় চার কলামজুড়ে প্রকাশিত ওই ছবিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরের চেহারাটা ধরা পড়ে।
কী আছে ছবিতে? যাঁরা দেখেননি, তাঁদের উদ্দেশে ছবির বিষয়বস্তু তুলে ধরছি। নাটোর শহরের জিরো পয়েন্টের সড়কদ্বীপে সরকারি উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ। এতে রয়েছে নাটোর অঞ্চলের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা। রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছবিসংবলিত বিলবোর্ড-পোস্টারে গোটা চত্বরটি এমনভাবে ঢেকে ফেলা হয়েছে যে ভেতরের স্মৃতিস্তম্ভটির কোনো নিশানাই বাইরে থেকে আর অনুমান করা যায় না।
বিলবোর্ড আর পোস্টারগুলো দেখে বোঝা যায়, ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই কাজটি করেছেন। সবার জানা যে যেদিন ওই ছবি ছাপা হয়েছে, অর্থাৎ ২২ নভেম্বর প্রথম প্রহরেই কার্যকর হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি। প্রত্যাশিত রায় কার্যকর হওয়ায় দেশবাসী সেদিন স্বস্তি প্রকাশ করেছে এবং আওয়ামী লীগসহ অনেক রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা রাস্তায় নেমে বিজয় মিছিল করেছেন। আমরা নিশ্চিত যে যেসব নেতা ব্যক্তিগত অভিলাষ পূরণের জন্য নাটোরের জিরো পয়েন্টে বিলবোর্ড-ব্যানার ঝুলিয়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ ঢেকে ফেলেছেন, সেসব নেতাও সেদিন রাস্তায় নেমেছিলেন। অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস ও আদর্শের বৈপরীত্যের এই চিত্র কেবল নাটোর নয়, সারা দেশের নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রেই কম-বেশি দৃশ্যমান।
প্রকাশিত ছবিতে আরও একটি চরম পরিহাসের নমুনা লক্ষ করা যায়। শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ ঢেকে ফেলা একটি বড় ব্যানারে লেখা আছে ‘শহীদদের মৃত্যু নেই’। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে বীর শহীদদের প্রতি কেবল লোকদেখানো শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নয়, প্রজন্মপরম্পরায় শহীদদের বীরত্বগাথা তুলে ধরার জন্য। সেই স্মৃতিস্তম্ভ যদি ঢেকেই রাখা হয়, তাহলে শহীদদের বীরত্ব মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে কীভাবে? এ ক্ষেত্রে ‘শহীদদের মৃত্যু নেই’—এই বাণী দিয়ে শহীদদের প্রতি পরিহাস করা হলো নাকি?
স্মৃতিস্তম্ভ ঢেকে ফেলা ব্যানার-পোস্টারে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনের জন্য দোয়া-শুভেচ্ছা চাওয়ার বিষয়টি চিত্রিত হয়েছে। আগস্টের পোস্টার থেকে বোঝা যায়, কমপক্ষে চার মাস আগে ঢাকা পড়েছে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি। জিরো পয়েন্টের সড়কদ্বীপ নাটোরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। এর পাশ দিয়েই গেছে ঢাকা ও বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক। এই চার মাসে এসব সড়ক দিয়ে নিশ্চয়ই ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই যাতায়াত করেছেন। শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ঢেকে ফেলার ঘটনাটি তাঁদের চোখে পড়েনি—এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন। এমনও হতে পারে, ওই সড়কদ্বীপে তাঁদের আগমনকে কেন্দ্র করে ‘শুভেচ্ছা-স্বাগতম’ গোছের ব্যানার দেখে তাঁরা বরং খুশিই হয়েছেন। সব নেতা-কর্মীর ক্ষেত্রে এ কথা হয়তো প্রযোজ্য নয়, কিন্তু আজকের গড় চিত্রটা এমনই। স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী বা নাগরিক সমাজও কিন্তু এ ব্যাপারে ছিল নির্বিকার। আসলে ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষা, ভোগ-লোভ-দুর্নীতি ইত্যাদি আজ আদর্শ ও দেশপ্রেমকে ছাপিয়ে দৃষ্টিকটুভাবে সামনে চলে এসেছে। ক্ষমতাবলয়ের মধ্যে এমন লোকজন ঢুকে পড়েছে যে চারদিকে তাকালে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে আজ বড়ই অচেনা মনে হয়।
সব থেকে ভয়াবহ হলো, পূর্বসূরিদের এই বিচ্যুতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে উত্তরসূরিরা। বাইরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে ভেতরে কালিমালেপনের মতো আরেকটি ঘটনার খবর ছাপা হয়েছে আলোচ্য ছবিটি প্রকাশের ঠিক পরদিনই। ২৩ নভেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত ওই খবর থেকে জানা যায়, আগের দিন শহীদ হবিবর রহমান হল মাঠে ছাত্রলীগের হল সম্মেলনের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক খালিদ হাসান ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে ছাত্রশিবিরকে প্রশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারটি দৃঢ় হাতে মোকাবিলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বক্তৃতা করেন। এর কিছু সময় পরই কাজলা গেটে একদল দুর্বৃত্ত তাঁর ওপর ককটেল নিক্ষেপ করে। খালিদ হাসানের বক্তব্য ও তাঁর ওপর হামলার ঘটনা থেকে দুটি সত্য বেরিয়ে এসেছে। প্রথমত, ছাত্রলীগে যে শিবির প্রশ্রয় পাচ্ছে, এই সত্যটি খালিদ হাসান স্বীকার করেছেন। দ্বিতীয়ত, প্রশ্রয় পাওয়া শিবিরের কর্মীদের প্রভাব সেখানে এত বেশি যে তাঁরা খোদ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদককে আক্রমণ করতেও দ্বিধা করছেন না। এ কথা প্রচলিত যে নানাভাবে বিভক্ত উপদলীয় নেতারা নিজেদের দল ভারী করতে ছাত্রশিবিরকে দলে ভেড়াচ্ছেন। পাশাপাশি এ কথাও প্রচলিত যে এই প্রক্রিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে কোণঠাসা শিবিরের কর্মীদের কাছ থেকে মাসোয়ারা আদায় করছেন একশ্রেণির ছাত্রনেতারা। আমরা এ ব্যাপারেও একমত হতে পারি যে এই কালিমা নিয়েই সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির পর ২২ নভেম্বর ক্যাম্পাসে কলঙ্কমোচনের মিছিল করা হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ শামসুজ্জোহা হলের পেছনে রয়েছে একটি বধ্যভূমি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় জোহা হল ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। প্রতিদিন এই ক্যাম্পে শত শত নিরপরাধ বাঙালিকে ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো। এরপর জোহা হলের পেছনের বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে রাখা হতো লাশগুলো। মনে করা হয়, এটিই বাংলাদেশের সব থেকে বড় গণকবর। কয়েক বছর আগে এই স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। স্তম্ভের স্থানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চত্বর থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিরিবিলি। এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে একজন প্রবাসী বাঙালিকে স্থানটি দেখানোর জন্য আমি স্মৃতিস্তম্ভে নিয়ে যাই। স্তম্ভের বেদিতে জুতা পায়ে উঠে আড্ডায় মেতে থাকতে দেখা যায় অন্তত এক ডজন তরুণ-তরুণীকে। স্মৃতিস্তম্ভের পাশে পুলিশের দুজন কনস্টেবল দায়িত্বরত ছিলেন। বিষয়টি নজরে আনলে কনস্টেবলরা তাঁদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, এঁরা নিজেদের ছাত্রলীগ হিসেবে পরিচয় দিয়ে উল্টো চোটপাট দেখান। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও নাকি বিষয়টি অবগত করেছেন তাঁরা। ফল হয়নি। ঘটনাটি আমি ওই দিনই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক খালিদ হাসানকে জানাই। যথারীতি বিষয়টি দেখার আশ্বাসও দেন তিনি। কিন্তু এতে অবস্থার হেরফের হবে বলে মনে হয় না। কেননা, তিনি নিজেই দুর্বৃত্তদের দ্বারা আক্রান্ত।
আমার বিশ্বাস, কেবল ছাত্রলীগের কর্মীরাই এমনটি ঘটান, তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্থানেও তরুণদের মধ্যে আগের মতো সেই চেতনা আজ আর কাজ করে না। মুক্তমনা লোকদের একের পর এক হত্যার ঘটনার পরও চোখে পড়ে না সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে কোনো প্রতিবাদ। বরং এর পরিবর্তে নানা অপপ্রচারের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখা যায় অনেককেই। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে যখন মিথ্যা গুজব ছড়ানো এবং সেই গুজবে বিশ্বাস করার লোকের অভাব হয় না, তখন সাধারণের অবস্থাটা অনুমান করা যায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও উচ্চশিক্ষার মান যে প্রশ্নবিদ্ধ, তাতে আর সন্দেহ কী।
আসলে দোষ আমাদের তরুণ ছাত্রসমাজের নয়, আমরা শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীরা, রাজনীতিবিদেরা, ক্ষমতার ভাগ নিয়ে নানা স্থানে জেঁকে বসা মানুষেরা নিজেদের কৃতকর্ম দ্বারাই তাঁদের বিপথে পরিচালিত করে চলেছি। সাম্প্রতিক সময়ে আমি বেশ কয়েকবার রাজশাহী রেলস্টেশনে ছাত্রলীগের শত শত কর্মীকে ট্রেন থেকে নেমে আসা একজন স্থানীয় নেতার পেছনে ‘অমুক ভাই এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে’ বলে স্লোগান দিতে দেখেছি। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ভালোবাসা থেকে ছাত্ররা সেখানে যাননি, গেছেন নির্দেশিত হয়ে। অর্থাৎ, এখন কোনো ছাত্রসংগঠনের নেতা হওয়ার প্রধান যোগ্যতাই হয়েছে ওপরের নেতাদের তোয়াজ করা এবং তাঁদের বন্দনাগীত গাওয়া।
এই ১৫ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে মুঠোফোনে হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনার পরদিন কেবল ছাত্র ইউনিয়ন হাতে গোনা কয়েকজন কর্মী নিয়ে রাস্তায় প্রতিবাদ জানিয়েছিল। শিক্ষক সমিতি দিয়েছিল একটি বিবৃতি। অন্য কোনো কর্মসূচি তারা দেয়নি। ছাত্রলীগসহ অনেকেই রাস্তায় নামেনি। আমি ছাত্রলীগের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেনেছি, তারা হল সম্মেলন নিয়ে ‘ব্যস্ত’ ছিল। হাসান আজিজুল হক একসময় যে সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ছিলেন, সেই জোটকে রাস্তায় নামাতে সময় লেগেছিল তিন দিন। তা-ও মাত্র শ খানেক কর্মী সমবেত হয়েছিলেন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে। গত কয়েক বছরে এই কথাশিল্পীকে অতিথি করে যে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান-সংগঠন নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে, তাদের কাউকেই ঘটনার পর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমরা জানি, ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে হুমকি দেওয়ার পরের চিত্রও ছিল প্রায় একই।
সামগ্রিক এই অবস্থা থেকে এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভবিষ্যৎটা সহজেই আঁচ করা যায়।
মলয় ভৌমিক: অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; নাট্যকার।

শান্তিরক্ষী শিবিরে হামলায় নিহত ৩

রাজধানী বামাকোর র্যাডিসন ব্লু হোটেলে জঙ্গি হামলায় ২০ জন নিহত হওয়ার মাত্র আট দিনের মাথায় মালিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর শিবিরে রকেট হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। শান্তিরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মালির জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর (মাইনুসমা) এক কর্মকর্তা বলেছেন, নিহত দুই সদস্য গিনির নাগরিক। বাকি একজন স্থানীয় ঠিকাদার। গতকাল শনিবার সকালে কাইডালে শিবিরে সন্ত্রাসীরা রকেট হামলা চালায়। হামলা চালিয়েই ওরা পালিয়ে যায়।’
এএফপি

বৈষম্যহীনতা ও সাম্যের বার্তা নরেন্দ্র মোদির

কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পরদিন বৈষম্যহীনতা ও সাম্যের আহ্বান জানালেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে ‘দিওয়ালি (দীপাবলি) মিলনে’ গতকাল শনিবার এ আহ্বান জানান ‘অসহিষ্ণুতা’ ইস্যুতে চাপে থাকা মোদি। খবর দ্য হিন্দুর। দিল্লিতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় দীপাবলি-পরবর্তী এই অনুষ্ঠান। এতে মোদি বলেন, ‘আলোর উৎসব (দীপ প্রভা) এই উৎসবের একটি অংশ। এখানে কোনো বৈষম্য নেই। এর মাধ্যমে সাম্যের চেতনা উজ্জীবিত হয়।’ মোদি ভারতীয় উৎসবগুলোতে জনমানুষের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘আমাদের সমাজে উৎসবের একটি বড় শক্তি আছে। এটি মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি করে, নতুন শক্তিতে বলীয়ান করে তোলে।’ বক্তব্য দেওয়ার পর মোদি মঞ্চ থেকে নেমে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে হাত মেলান। অনুষ্ঠানে মোদি চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলেননি। তবে সেখানে উপস্থিত বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ লোকসভার চলমান অধিবেশনে সংবিধান গৃহীত হওয়ার দিবস ও বি আর আম্বেদকারের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ বিতর্কের প্রসঙ্গ তোলেন। অমিত বলেন, ‘পার্লামেন্ট দল-মতনির্বিশেষে দেশের সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্বকে অক্ষুণ্ন রেখেছে। আমাদের প্রচেষ্টা হবে এই চেতনাকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। যার মাধ্যমে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও তার সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে জানতে পারে।’ দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে এর আগে শুক্রবার পার্লামেন্টে ভাষণ দেন মোদি। ধারণা করা হচ্ছিল, অসহিষ্ণুতা বিতর্ক নিয়ে মোদি সরাসরি কিছু বলবেন। তবে এ নিয়ে সেদিন সরাসরি একটি কথাও বলেননি তিনি।

এমপিদের জন্য সু চির কঠোর ‘আচরণবিধি’

শৃঙ্খলা রক্ষায় দলীয় আইনপ্রণেতাদের আচরণবিধি বাতলে দিলেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি। সম্প্রতি দেশটিতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়ী হয়েছে। খবর এএফপির।সু চি গতকাল শনিবার দলের নবনির্বাচিত এমপিদের সতর্ক করে বলেন, শৃঙ্খলার ঘাটতি বা কোনো ত্রুটি তিনি সহ্য করবেন না।নির্বাচনে বিপুল বিজয় লাভের পর এনএলডির কাছে মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। এ প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টার অংশ হিসেবেই সু চি এমন নির্দেশনা দিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।গতকাল এনএলডির এমপিরা বলেন, সু চি এক দলীয় বৈঠকে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে এমপিদের শৃঙ্খলা ও আচরণগত ঘাটতি বা ত্রুটিতে সাজার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দেন।দলটির প্রভাবশালী নেতা ও এমপি থেট থেট খাইন বলেন, সু চি চান না, দলের মধ্যে কেউ ছোট আরেকটি দল গড়ে তুলুক।

আয়লানের স্বজনদের নিচ্ছে কানাডা

মা-বাবার সঙ্গে গ্রিসে পাড়ি জমাতে গিয়ে সাগরে ডুবে মারা যাওয়া সেই সিরীয় শিশু আয়লান কুর্দির স্বজনদের অভিবাসী হিসেবে গ্রহণ করছে কানাডা। দেশটি থেকে আয়লানের ফুফু সিবিসি টেলিভিশনকে এ কথা জানিয়েছেন। খবর বিবিসির।আয়লানের ফুফু তিমা কুর্দি অনেক আগে থেকেই কানাডায় বাস করছেন। তিনি সিবিসিকে বলেন, আয়লানের চাচা (তিমার ভাই) মোহাম্মদ, চাচি ঘুসুন এবং তাঁদের পাঁচ ছেলেমেয়ে অভিবাসন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। এ মাসের গোড়ার দিকে তাঁদের আবেদন মঞ্জুর হয়েছে বলে কানাডা সরকারের পক্ষ থেকে ই-মেইল করে জানানো হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা সিবিসিকে জানিয়েছেন, আয়লানের স্বজনদের অভিবাসন-প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে এগোচ্ছে। হাফিংটন পোস্ট জানিয়েছে, আয়লানের চাচা কানাডায় অভিবাসনের জন্য আবেদন করলেও তার শোকাহত বাবা আবদুল্লাহ সেখানে যাচ্ছেন না। আবদুল্লাহ তাঁর স্ত্রী, আয়লানসহ দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে তুরস্ক থেকে নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু সাগরে নৌকাটি ডুবে গেলে আবদুল্লাহ ছাড়া বাকি তিনজনই মারা যান। আয়লানের লাশের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ওঠে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কানাডার বাড়তি সহায়তা

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার অংশ হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করতে অতিরিক্ত ২৬৫ কোটি ডলার দিতে চেয়েছে কানাডা। মাল্টার রাজধানী ভ্যালেট্টায় শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর বার্ষিক সম্মেলনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এই ঘোষণা দেন।এদিকে সম্মেলনে কমনওয়েলথের নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন ব্রিটিশ আইনজীবী ব্যারোনেস প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড। তিনি এ সংগঠনের ৬৬ বছরের ইতিহাসে প্রথম ব্রিটিশ মহাসচিব। এ পদে প্রথম নারীও তিনি। খবর দ্য ইনডিপেনডেন্ট ও হাফিংটন পোস্ট-এর।
এবারের কমনওয়েলথ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর আলোচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ কমনওয়েলথ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। আগামীকাল সোমবার থেকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শুরু হতে যাওয়া জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের প্রাক্কালে কানাডার প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা এল। আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তন তহবিলে ২০২০ সাল নাগাদ বছরে ১০ হাজার কোটি ডলার করে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্মেলন উদ্বোধনের পর জাস্টিন ট্রুডো অতিরিক্ত অর্থ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিলে উপস্থিত নেতারা তাঁকে অভিবাদন জানান। আগামী পাঁচ বছরে এই অর্থ দেওয়া হবে। ট্রুডো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিজের ভূমিকা রাখার জন্য কানাডা প্রস্তুত রয়েছে। বিশ্বের দরিদ্রতম ও অরক্ষিত দেশগুলোর সহায়তায় তাঁর দেশ পাশে থাকবে। ২০০৯ সাল থেকে কানাডা জাতিসংঘের জলবায়ু তহবিলে প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। বৈশ্বিক উষ্ণতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে তিনি তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেন।
তরুণদের ভূমিকাটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে রাখা হয় কমনওয়েলথভুক্ত ৫৩টি দেশের একজন করে শিশুকে। সাবেক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে কমনওয়েলথ গঠিত। এই দেশগুলো বিশ্বের মোট আয়তনের এক-চতুর্থাংশ এবং মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে। আজ এ সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা।

তুরস্কের ওপর রাশিয়ার অবরোধ আরোপ

সিরিয়ায় রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার জের ধরে তুরস্কের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে মস্কো। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার চার দিনের মাথায় গতকাল শনিবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করেন। এ ছাড়া ভূমধ্যসাগর দিয়ে সিরিয়ার উপকূল অভিমুখে একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পাশাপাশি দেশটিতে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে রাশিয়া। এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গতকাল বলেছেন, রুশ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় তিনি ‘ব্যথিত’। পশ্চিমাঞ্চলীয় বালিকশেহির শহরে এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘এটি না ঘটলেই ভালো হতো। তবে এটা ঘটে গেছে। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে আর এমনটি ঘটবে না।’ এর আগে এরদোয়ান এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছিলেন। খবর বিবিসির। খবরে বলা হয়, ‘মস্কোভা’ যুদ্ধজাহাজের দূরপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটসহ (আইএস) প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে রুশ বিমান হামলায় অংশগ্রহণকারী যুদ্ধবিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এ ছাড়া যুদ্ধবিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত বৃহস্পতিবার সিরিয়ায় অত্যাধুনিক এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র পাঠায় রাশিয়া। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মোতায়েন করা হয় সেখানকার হেইমিম বিমানঘাঁটিতে। তুরস্ক সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে এই ঘাঁটির অবস্থান। বাশারবিরোধীদের ওপর হামলা চালাতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে রাশিয়ার যুদ্ধবিমান এই বিমানঘাঁটি ব্যবহার করছে। গত মঙ্গলবার তুরস্কের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সিরিয়ার ভেতর রুশ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। দুই পক্ষের মধ্যে চরম বাগ্যুদ্ধ চলছে। এর আগে গত শুক্রবার টেলিভিশন ভাষণে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ‘আগুন নিয়ে না খেলার জন্য’ রাশিয়াকে সতর্ক করে দেন। সিরিয়ায় চলা রুশ অভিযানকে কেন্দ্র করে এ কথা বলেন তিনি। একই দিন তুর্কি নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত সুবিধা আগামী ১ জানুয়ারি থেকে স্থগিতের ঘোষণা দেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। তিনি বলেন, তুরস্ক কোনো কোনো বিষয়ে গ্রহণযোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। রুশ বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা তুরস্কের জাতীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থ ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করে দেন। ভিসামুক্ত ভ্রমণসুবিধা স্থগিত রাখার ওই ঘোষণার আগে পুতিন নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে তাঁর দেশের নাগরিকদের তুরস্ক ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তুরস্কে যাওয়া বিদেশি পর্যটকদের এককভাবে সবচেয়ে বড় অংশ রাশিয়ার। গত বছর তুরস্ক ভ্রমণ করেন ৩০ লাখেরও বেশি রুশ পর্যটক। সে কারণে রাশিয়ার এই মনোভাব দেশটির পর্যটনশিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দুই দেশের সম্পর্কে এমন তীব্র টানাপোড়েন চলার মধ্যে প্রেসিডেন্ট পুতিন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে কোনো কথা বলার আগে তাঁর যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় তুরস্কের ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এরদোয়ান তা প্রত্যাখ্যান করেন। তবে তিনি প্যারিসে শুরু হতে যাওয়া বিশ্ব জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের অধিবেশনের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আর এ জন্য ক্রেমলিনের কাছে সময় চেয়ে ইতিমধ্যেই চিঠি পাঠিয়েছে আঙ্কারা।

ইয়াজিদিদের আরেকটি গণকবরের সন্ধান

ইরাকের উত্তরাঞ্চলে আরও একটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এতে দেশটির সংখ্যালঘু ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের অন্তত ১১০ জনের লাশ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, এই গণকবরটি সিনজার শহরের কাছে।চলতি মাসের শুরুর দিকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের কাছ থেকে শহরটি পুনর্দখল করা হয়। ২০১৪ সালের আগস্টে সিনজার দখল করে আইএস। সেখানে গণহত্যা ছাড়াও ইয়াজিদি নারী-মেয়েদের ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও সিনজার ও এর আশপাশে গণকবর পাওয়া গেছে। সবশেষ পাওয়া এই গণকবরটি সিনজার থেকে ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। সিনজারের মেয়র মাহমা খলিল বলেছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া গণকবরের মধ্যে যথাসম্ভব এটাই সবচেয়ে বড়। আরও গণকবর পাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে রকেট হামলা, নিহত ৩

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে রকেট হামলা চালিয়েছে বন্দুকধারীরা। এতে শান্তিরক্ষী বাহিনীর দুই সদস্য ও একজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন। আজ শনিবার স্থানীয় সময় ভোরের দিকে দেশটির উত্তরাঞ্চলের কিদাল এলাকার একটি ঘাঁটিতে ওই হামলা চালানো হয়। বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।  জাতিসংঘের সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, শান্তিরক্ষী বাহিনীর নিহত দুই সদস্য গিনির নাগরিক। আর বেসামরিক ব্যক্তি একজন ঠিকাদার। পৃথক সূত্রের বরাত দিয়ে এএফ​পি জানায়, ওই হামলায় অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছেন। মালিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের মুখপাত্র ওলিভিয়ার সালগাদোরের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ভোর চারটার দিকে এই হামলার ঘটনা ঘটে। বন্দুকধারীদের ছোড়া চার থেকে পাঁচটি রকেট ঘাঁটির অভ্যন্তরে এসে পড়ে। এতে ওই হতাহতের ঘটনা ঘটে।  ইসলামি কট্টরপন্থীদের ঠেকিয়ে মালিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দেশটিতে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠিয়েছে জাতিসংঘ। ফ্রান্সও তার সাবেক উপনিবেশ এই দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সেনা পাঠিয়েছে। এর মধ্যেও বিভিন্ন সময় কট্টরপন্থীদের হামলা চলছে।  ২০ নভেম্বর মালির রাজধানী বামাকোর র‍্যাডিসন ব্লু হোটেলে বন্দুকধারীদের গুলিতে অন্তত ২০ জন নিহত হন। দেশটিতে আল-কায়েদা ইন ইসলামিক মাগরেব (একিউএমআই), আল-মুরাবিতুন ও ম্যাসিনা লিবারেশন ফ্রন্টসহ (এমএলএফ) বেশ কয়েকটি কট্টরপন্থী সংগঠন অত্যন্ত সক্রিয়।  ২০১২ সালে অধিকাংশ সময় কট্টরপন্থীরা মালির উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পরে ফরাসি সামরিক বাহিনী তাদের হটিয়ে দেয়। তারপরও ওই সব এলাকায় কট্টরপন্থীদের প্রভাব রয়ে গেছে।

বৈঠকে উপস্থিত হতে দেরি করায় ছয় কর্মকর্তার দণ্ড

বৈঠকের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না হওয়ায় তানজানিয়ার ছয়জন সরকারি কর্মকর্তাকে কারাদণ্ড ​দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ওই কর্মকর্তাদের ছয় ঘণ্টা করে কারাবাস করতে হয়। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়েছে।তানজানিয়ার উহুরু সংবাদপত্রের বরাত দিয়ে এএফপি জানায়, শুক্রবার জেলা কমিশনারের নির্দেশে ওই কর্মকর্তাদের ছয় ঘণ্টা করে কারাবাস করতে হয়। সংবাদপত্রটি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বিষয়টি সম্পাদকীয় আকারে প্রকাশ করে।তানজানিয়ার প্রধান শহর দারুস সালামের শহরতলির কমিশনার তাঁর সহকর্মী ওই ছয় কর্মকর্তাকে কারাদণ্ডাদেশ দেন। পাশাপাশি পরদিন নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা আগে নিজ নিজ দপ্তরে উপস্থিত হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কমিশনার ওই কর্মকর্তাদের ‘দায়িত্বহীন’ বলেও আখ্যা দেন। স্থানীয় সময় সকাল আটটায় বৈঠকের সময় নির্ধারিত থাকলেও ওই ছয় কর্মকর্তা তিন ঘণ্টারও বেশি সময় দেরিতে উপস্থিত হন। জনগণের জমিজমা নিয়ে সৃষ্ট হাজারো বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে ওই বৈঠক ডাকা হয়েছিল।তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট জন মাগুফুলি চলতি মাসের শুরুর দিকে জনগণের জমিজমা নিয়ে সৃষ্ট হাজারো বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নিতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশ দেন। এসব বিরোধ অনেকাংশেই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদেরই তৈরি বলে অভিযোগ রয়েছে। ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভের পর চলতি মাসেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন মাগুফুলি। দায়িত্ব নিয়েই তিনি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও ব্যয় সংকোচনের ঘোষণা দেন।

এরদোয়ানের ‘মন খারাপ’

তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে গুলি করে রাশিয়ান বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ‘মন খারাপ’ হয়েছে। এরদোয়ান বলেন, এমন ঘটনা ঘটবে বলে আশা করেননি তিনি। ভবিষ্যতেও যেন তা আর না ঘটে। আজ শনিবার বিবিসি অনলাইনের এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়।এ ঘটনায় এরদোয়ান রাশিয়ার কাছে দুঃখ প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান। বরং সিরিয়া অভিযানে রাশিয়া ‘আগুন নিয়ে খেলছে’ বলে অভিযোগ করেন।এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মস্কোতে তুর্কি দূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজ দেশের জনগণকে ‘যতক্ষণ না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়’ ততক্ষণ পর্যন্ত রাশিয়া সফরে না যেতে সতর্ক করেন।গতকাল শুক্রবার রাশিয়া তুরস্কের সঙ্গে ভিসামুক্ত যাতায়াত-ব্যবস্থা স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে দেশটি তুরস্কের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ভাবছে।

ব্রিটিশ মন্ত্রীর পদত্যাগ

যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক কো-চেয়ারম্যান গ্র্যান্ট শ্যাপস আন্তর্জাতিক উন্নয়নমন্ত্রীর পদ থেকে গতকাল শনিবার পদত্যাগ করেছেন। দলের একজনকে হুমকি প্রদর্শনের অভিযোগের ব্যাপারে তিনি যথাযথ পদক্ষেপ নেননি, এমন অভিযোগ ওঠায় পদত্যাগ করেন শ্যাপস। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন নিক হার্ড।
রয়টার্স

যুদ্ধবিমান সংগ্রহ

দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মিত দুটি অত্যাধুনিক এফএ-৫০ যুদ্ধবিমান গতকাল শনিবার গ্রহণ করেছে ফিলিপাইন। সমুদ্রসীমা নিয়ে শক্তিশালী প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে এসব যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করল দেশটি। এর মাধ্যমে প্রায় এক দশক পর শব্দের চেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন যুদ্ধবিমান পেল ম্যানিলা। ফরমায়েশ করা ১২টি যুদ্ধবিমানের মধ্যে প্রথম দুটি গ্রহণ করল ফিলিপাইন। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে মূলত ম্যানিলার সামরিক কর্তৃত্ব প্রদর্শনের প্রস্তুতির ইঙ্গিত মিলছে।
এএফপি

আমিরের সমর্থনে পাকিস্তানি শিখরা

এবার পাকিস্তানের শিখ সম্প্রদায়ের নেতারা বলিউড অভিনেতা আমির খানের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ভারতে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা নিয়ে আমিরের অবস্থান সমর্থন করেছেন তাঁরা। খবর ডন পত্রিকার।ওয়ার্ল্ড শিখ-মুসলিম ফেডারেশনের প্রধান সরদার মনমোহন সিং গত শুক্রবার লাহোরের গভর্নরস হাউসে গুরু নানকের বিভিন্ন উপদেশ নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে বলেন, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে ভারত কখনোই মেনে নেয়নি। সেখানে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য উগ্রপন্থী শিবসেনা দায়ী। মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা নানা রকম উসকানি দিচ্ছে।শিখ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যুক্তরাজ্য থেকে লাহোরে এসেছেন শিখ নেতা মনমোহন। তিনি বলেন, এটা স্পষ্ট যে ভারতে সরকারের কিছু নীতির কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও বিভিন্ন ব্যক্তি মনঃকষ্টে রয়েছেন। গোমাংস খাওয়া বাদ দিতে না পারলে মুসলিমদের ভারত ছেড়ে যেতে বলা হচ্ছে। চলচ্চিত্র তারকা শাহরুখ খান ও আমির খান চরমপন্থার শিকার হচ্ছেন।শিখ তীর্থযাত্রী সংগঠনের উপপ্রধান সরদার অমরজিৎ সিং বলেন, ‘ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অসহিষ্ণুতাকে মদদ দিয়ে নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থন পেতে চাইছে।’তীর্থযাত্রী সংগঠনটির নেতা সরদার গুরুমিৎ সিং শিবসেনা এবং তালেবানের সন্ত্রাসবাদ ও অসহিষ্ণুতার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সহাবস্থানের পক্ষে।’আমিরের বিজ্ঞাপনমূল্য বৃদ্ধি: বিজ্ঞাপনের জগতে আমির খানের মূল্য গত এক বছরে ৪৪১ শতাংশ বেড়েছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক অনলাইন বাজার স্ন্যাপডিল এ তথ্য দিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, আরেক তারকা সালমান খানের পরেই বিজ্ঞাপন থেকে সবচেয়ে বেশি আয় করেন আমির।এদিকে ভারতের গণমাধ্যম বলছে, চিকিৎসার জন্য শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে নয়াদিল্লি ত্যাগ করেছেন অভিনেতা আমির খান।

যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গুলিতে নিহত ৩

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের একটি পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে গত শুক্রবার বন্দুকধারীর হামলায় পুলিশের এক সদস্য এবং দুজন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে। এতে নয়জন আহতও হয়েছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালানোর পর ওই বন্দুকধারী পুলিশের কাছে ধরা দেন। খবর এএফপির।স্থানীয় পত্রিকা দ্য ডেনভার পোস্ট জানায়, কলোরাডো স্প্রিংস এলাকায় ওই হামলা চালানো ব্যক্তির নাম রবার্ট লুইস ডিয়ার (৫৭)। তাঁর বাড়ি সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যে।
পুলিশ ভেবেছিল, বন্দুকধারী ডিয়ারের কাছে বিস্ফোরকও থাকতে পারে। তাই সতর্কতার সঙ্গে পুরো স্বাস্থ্যকেন্দ্র এলাকাটি ঘিরে ফেলে তল্লাশি চালানো হয়। ডিয়ার প্রথমে বন্দুকযুদ্ধ শুরু করলেও একপর্যায়ে আত্মসমর্পণ করেন।
গোলাগুলির সময় বেশ কয়েকজন মানুষ প্ল্যানড প্যারেন্টহুডের ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে ছিলেন। আচমকা হামলার পর তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার শুরু করেন। হামলার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। প্ল্যানড প্যারেন্টহুডের ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মূলত নারীদের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক সেবা দেওয়া হয়। পাশাপাশি সেখানে গর্ভপাত করানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ধর্মীয় রক্ষণশীলরা প্ল্যানড প্যারেন্টহুডের কার্যক্রমের বিপক্ষে। তাঁদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী। তদন্ত কর্মকর্তারা ওই বন্দুকধারীর একটি মোটরগাড়ি উদ্ধার করেছেন। বিবিসি জানায়, নিহত পুলিশ সদস্যের নাম গ্যারেট সোয়াসে (৪৪)। তিনি বিবাহিত ও দুই সন্তানের বাবা। কলোরাডো স্প্রিংসের পুলিশপ্রধান পিটার কেয়ারি বলেন, হামলায় আহত ব্যক্তিরা আশঙ্কামুক্ত। তাঁদের মধ্যে পুলিশের পাঁচ সদস্য রয়েছেন। তাঁরা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির প্রধান নির্বাহী ভিকি কাওয়ার্ট সিএনএনকে বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানটি হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল বলে মনে হয় না। ডেনভার এলাকায় প্ল্যানড প্যারেন্টহুডের আরও তিনটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। সেগুলোর সুরক্ষার জন্য বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন আলোচনায় বহুল ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ

জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আগামীকাল সোমবার শুরু হচ্ছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ২০১৫। সম্প্রতি সন্ত্রাসী হামলায় রক্তাক্ত প্যারিসে অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা প্রায় ২০০ দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের। দশকের পর দশক এমন পরিবেশসংক্রান্ত সম্মেলন ও আলোচনায় বহুল প্রচলিত হয়ে উঠেছে কিছু শব্দ। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এ রকম কিছু শব্দ তুলে ধরা হলো:ইউএনএফসিসিসি: দ্য ইউনাইডেট নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ। ১৯৯২ সালে সই হওয়া একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি এটি। বিশ্ব জলবায়ুব্যবস্থাকে মানুষের বিপজ্জনক তৎপরতা থেকে রক্ষা করাই এর লক্ষ্য।কপ-২১: সিওপি বা কপের পূর্ণাঙ্গ রূপ দ্য কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস। ইউএনএফসিসিসির সর্বোচ্চ সংস্থা এটি। কপের প্রথম বৈঠক হয় জার্মানির বার্লিনে ১৯৯৫ সালে। কপ-২১ বা কপের ২১তম বার্ষিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে প্যারিসে। নানা কারণেই এ বছর অনুষ্ঠেয় এ বৈঠককে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।এডিপি: দ্য অ্যাডহক ওয়ার্কিং গ্রুপ অন দ্য ডারবান প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাডভান্সড অ্যাকশন। পরিবেশবিষয়ক একটি সহায়ক সংস্থা। গঠিত হয় ২০১১ সালে। ২০১৫ সালের মধ্যে একটি নতুন জলবায়ু চুক্তিতে উপনীত হতে কাজ করছে এটি। যে চুক্তিটি কার্যকর হবে ২০২০ সাল থেকে।মিটিগেশন অ্যান্ড অ্যাডাপটেশন: বায়ুমণ্ডল থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস অপসারণ বা এর নিঃসরণের উৎস দূর করতে মানুষের তৎপরতা বোঝায় মিটিগেশন। আর জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গৃহীত পদক্ষেপকে বোঝায় অ্যাডাপটেশন।আইএনডিসিএস: একটি পরিকল্পনা। যার পূর্ণ রূপ ইনটেনডেড ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কনট্রিবিউশনস। এর অধীন কপ ২১ বৈঠককে সামনে রেখে প্রকাশ্যে বিশ্বনেতাদের এক রূপরেখা ঘোষণা করতে হয়েছে। যে রূপরেখায় নতুন বৈশ্বিক চুক্তির আওতায় ২০২০ সালের পর তাঁরা পরিবেশগত কী কার্যক্রম নিতে ইচ্ছুক, সে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।অ্যানেক্স ১, অ্যানেক্স ২, নন-অ্যানেক্স ১: ১৯৯২ সাল পর্যন্ত শিল্পোন্নত দেশ বলে বিবেচিত দেশগুলো বোঝাতে ব্যবহৃত হয় অ্যানেক্স ১। গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের জন্য প্রধানত এসব দেশকে দায়ী করা হয়ে থাকে। অ্যানেক্স ১-ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যারা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) সদস্য, তাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয় অ্যানেক্স ২। আর নন-অ্যানেক্স বলতে প্রধানত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বোঝায়।এওএসআইএস, আমব্রেলা: কোনো আলোচনায় একই রকমের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পোষণকারী দেশগুলোর জোট বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ। এর মধ্যে এওএসআইএস হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশগুলোর জোট।
সূত্র: রয়টার্সআ