Tuesday, January 6, 2026

ইরান কেন নিজের ‘সেরা লোকদের’ উপর চড়াও হয়েছে by ববি ঘোষ

শুক্রবার ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত নার্গিস মোহাম্মদিকে চুল ধরে টেনে একটি গাড়িতে তুলে নেয়। তাঁর অপরাধ কী? উত্তর-পূর্ব ইরানের শহর মাশহাদে সম্প্রতি রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মৃত এক মানবাধিকার আইনজীবীর স্মরণসভায় অংশ নেওয়া। প্রত্যক্ষদর্শীরা বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার দৃশ্য বর্ণনা করেছেন—টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ, পালাতে গিয়ে শোকাহত মানুষের মারধর।

গত দুই দশকের বড় অংশ যাঁর কাটেছে তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারে যাতায়াতের মধ্যে, সেই মোহাম্মদিকে অন্তত আরও ৯ অধিকারকর্মীর সঙ্গে আটক করা হয়। তিনি এক বছর ধরে চিকিৎসার কারণে কারাগার থেকে সাময়িক মুক্তিতে ছিলেন এবং ধারাবাহিকভাবে ইরানি জনগণের অধিকতর স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের পক্ষে কথা বলছিলেন। টাইমে সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে নার্গিস মোহাম্মদি লিখেছিলেন, ‘সহিংসতা বাইরে থেকে আরোপিত হোক বা ভেতর থেকে, কোনোটাই সমাধান নয়।’

নার্গিস মোহাম্মদি একমাত্র লক্ষ্যবস্তু নন। ডিসেম্বরের শুরুতে তেহরানের একটি আদালত প্রখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহিকে তাঁর অনুপস্থিতিতে এক বছরের কারাদণ্ড, দুই বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘প্রচারমূলক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যপদে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

দণ্ডাদেশের খবর ছড়িয়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘স্বর্ণপাম’জয়ী পানাহি গথাম অ্যাওয়ার্ডসে তাঁর চলচ্চিত্র ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’-এর জন্য সেরা পরিচালক, সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য এবং সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতেন। দুবার গ্রেপ্তার ও চলচ্চিত্র নির্মাণে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া পানাহি তাঁর সর্বশেষ ছবির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস প্রচারণা শেষ করে ইরানে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।

তেহরানে আতঙ্ক

জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানি কর্তৃপক্ষ হাজার হাজার মানুষকে, যাঁদের তারা গুপ্তচর সন্দেহ করেছে, গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে বহু অধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিক রয়েছেন। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, তেহরান এক হাজারের বেশি মানুষকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। ইন্টারনেট বন্ধ রাখা এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

শক্তিশালী বলে নয়, বরং আতঙ্কিত বলেই ইরানের নিরাপত্তাযন্ত্র অতিরিক্ত চাপে কাজ করছে। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধটি ইরানের তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর শক্তি প্রদর্শনের কথা ছিল। বাস্তবে ইসরায়েলের নিখুঁত হামলায় বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ কমান্ডাররা নিহত হন, পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর তেহরানের বহুল প্রচারিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যে মূলত ব্যয়বহুল প্রদর্শনী, তা উন্মোচিত হয়।

হিজবুল্লাহ থেকে হামাস—ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সিগুলো কার্যত গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। কয়েক দশকে নির্মিত প্রতিরোধের কাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
ইরানের অর্থনীতি, রাজনীতি ও পরিবেশের অবস্থাও সমানভাবে ভয়াবহ। মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৪০ শতাংশে ঘোরাফেরা করছে। মাংস হয়ে উঠেছে বিলাসপণ্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ১ বছরে ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পানিসংকট। অন্তত অর্ধশতকে ইরান সবচেয়ে ভয়াবহ খরার মুখে। রাজধানী তেহরানের আশপাশের জলাধারগুলোর ধারণক্ষমতা ১০ শতাংশের নিচে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি সতর্ক করেছেন, বৃষ্টি না এলে তেহরান খালি করে দিতে হতে পারে। গত সপ্তাহে কিছু বৃষ্টি হলেও তা পর্যাপ্ত নয়।

দমনের এক নির্মম ইতিহাস

এই সবকিছুর ওপর ভর করে রয়েছে উত্তরাধিকার প্রশ্ন। ১৯৮৯ সাল থেকে ইরান শাসনকারী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এখন ৮৬ বছর বয়সী। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে বহু বছর ধরেই জল্পনা রয়েছে। ২০১৪ সালে তিনি প্রোস্টেট ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছিলেন। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর যখন তিনি লক্ষ্যবস্তু ছিলেন, তাঁকে জনসমক্ষে খুব কমই দেখা দিয়েছেন। কথিত রয়েছে, ধর্মীয় নেতাদের একটি কমিটি উত্তরসূরি খোঁজার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে। সম্ভাব্য নামের তালিকায় ঘুরছে খামেনির ছেলে মোজতবা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনির নাম।

শাসনব্যবস্থাটি সেই রূপান্তরের আগেই মরিয়া হয়ে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়। ক্ষমতার মসৃণ হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজন একটি নিশ্চুপ জনগোষ্ঠী; ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা সমাজ নয়। ৪৬ বছরের ইতিহাসে ইরান মাত্র একবার উত্তরাধিকার বদল সামলাতে পেরেছে; তা–ও তুলনামূলকভাবে অনেক কম উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে। খামেনির আশপাশের লোকজন জানে, অন্তর্বর্তী সময়টাই হবে সর্বোচ্চ ঝুঁকির মুহূর্ত।

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে দেখা যায়, দেশটি যখনই নিজেকে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে মনে করেছে, তখনই ইচ্ছাকৃতভাবে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও অধিকারকর্মীদের নিশানা করেছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর অস্থির সময়ে হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে শাহবিরোধী আন্দোলনে শুরুতে সমর্থন দেওয়া বামপন্থী গোষ্ঠীর সদস্যরাও ছিলেন।

১৯৮৮ সালের জুলাইয়ে ইরান-ইরাক যুদ্ধের যুদ্ধবিরতির পর ইরাক থেকে পরিচালিত সশস্ত্র বিরোধী সংগঠন মুজাহিদিন-ই-খালক (এমইকে) ইসলামি প্রজাতন্ত্র উৎখাতের ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। এমইকের ওই অনুপ্রবেশের পরপরই হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দীকে হত্যা করা হয় এবং গোপন গণকবরে দাফন করা হয়।

২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলনের বিক্ষোভ দমন করতেও আবার ব্যাপক দমন-পীড়নের আশ্রয় নেওয়া হয়। নির্বাচনী জালিয়াতির বিরুদ্ধে লাখো মানুষ রাস্তায় নামলে সরকার লাঠি, গুলি ও কণ্ঠরোধের মাধ্যমে জবাব দেয়। চলচ্চিত্রকার, লেখক ও শিক্ষাবিদদের গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, কিছু ক্ষেত্রে হত্যা পর্যন্ত করা হয়।

২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের পর দমন আরও তীব্র হয়, যার সূত্রপাত হয়েছিল নীতি পুলিশের হেফাজতে তরুণ কুর্দি নারী মাসা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে। বিক্ষোভকারীদের রাস্তায় গুলি করা হয়। বিশিষ্ট অধিকারকর্মীদের দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর শাসনব্যবস্থা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের টার্গেট করে—র‍্যাপার তুমাজ সালেহিকে মৃত্যুদণ্ড (পরে সাজা কমানো হয়) দেওয়া হয়, চলচ্চিত্রকারদের কাজ করতে নিষেধ করা হয় আর অভিনেত্রীদের হিজাব ছাড়া জনসমক্ষে হাজির হওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

আমরা এই নির্মম ঐতিহ্যেরই সর্বশেষ পুনরাবৃত্তি দেখছি; তবে এমন এক তীব্রতায়, যা ইঙ্গিত দেয় যে শাসনব্যবস্থা বর্তমান হুমকিকে অস্তিত্বগত বলে মনে করছে। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও মোহাম্মদির গ্রেপ্তার ও পানাহির দণ্ডাদেশ কূটনৈতিক মূল্য বহন করে।

আসন্ন সংকট

প্রশ্ন হলো, এভাবে আর কত দিন চলতে পারে। ভয়ভিত্তিক শাসন বিস্ময়করভাবে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—উত্তর কোরিয়ার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। কিন্তু ইরান উত্তর কোরিয়া নয়। এর জনগোষ্ঠী শিক্ষিত, নগরায়িত এবং শাসনব্যবস্থার সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত। বারবার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তরুণেরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁরা ধর্মতান্ত্রিক শাসন প্রত্যাখ্যান করে। ২০২২ সালের বিক্ষোভ দমন করা হলেও সেই আন্দোলনের জ্বালানি ক্ষয় হয়নি।

* ববি ঘোষ, টাইম সাময়িকীর সাবেক বিদেশ সংবাদদাতা ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক; ভূরাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক
- টাইম থেকে নেওয়া। সংক্ষেপিত আকারে অনুবাদ।

নার্গিস মোহাম্মদি  ও                                 জাফর পানাহি
নার্গিস মোহাম্মদি ও জাফর পানাহি

চীনের পাতা ফাঁদে যেভাবে সরাসরি পা দিচ্ছেন স্টারমার by সাইমন টিসডাল

যুক্তরাজ্য জিমি লাইকে মুক্ত করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে। জিমি লাই একজন সংবাদপত্রের মালিক, ব্রিটিশ নাগরিক এবং হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের পরিচিত নেতা। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা লোকজনও তাঁর মুক্তির দাবি জানিয়েছে। তবে এসবের পরও বেইজিংয়ের নিয়োগ দেওয়া হংকংয়ের উচ্চ আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেন। গত সপ্তাহে আদালত জানান, তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। এ অভিযোগটি আসলে মিথ্যা। তবু চীনের শাসক সি চিন পিংয়ের চোখে এর চেয়ে বড় অপরাধ আর কিছু নেই।

চীনের রাষ্ট্রদূতের কাছে প্রতিবাদ জানিয়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রসচিব ইভেট কুপার এই বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নিন্দা করেন। কিন্তু তাঁর এই কঠোর কথায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। চীনের কাছে ব্রিটেনের মতামতের কোনো মূল্য নেই—এটা যেমন স্পষ্ট, তেমনি স্পষ্ট চীনের উদ্ধত আচরণের সামনে যুক্তরাজ্যের দুর্বলতা ও সিদ্ধান্তহীনতা। ১৯৯৭ সালে চীনের কাছে হংকং হস্তান্তরের পর অঞ্চলটির স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা ভেঙে ফেলা সি চিন পিংয়ের কমিউনিস্ট পার্টির ঔদ্ধত্য ও অবিশ্বাসযোগ্যতারই প্রমাণ।

জানুয়ারিতে কিয়ার স্টারমারের বেইজিং ও সাংহাই সফরের আগে জিমি লাইয়ের এ করুণ ঘটনাটি এক অন্ধকার ও অশুভ পটভূমি তৈরি করেছে। ওই সফরের মূল লক্ষ্য বাণিজ্য ও ব্যবসা। কোনো চীনা ভাগ্যগণক হয়তো এটিকে অমঙ্গলজনক বলে মনে করত এবং স্টারমারকে বাড়িতেই থাকতে পরামর্শ দিত। কিন্তু এই মাসে লন্ডনের এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্টারমার বলেন, সেখানে যাওয়া তাঁর দায়িত্ব। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা দরকার, কারণ দেশটি প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক শাসনে একটি নির্ধারণী শক্তি। যদিও তিনি স্বীকার করেন যে চীন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে, তবু তিনি সেই হুমকির গুরুত্ব কিছুটা কমিয়ে দেখান।

ব্রিটেনের নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র, বৈশ্বিক ব্যবস্থা এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার দিক থেকে দেখলে, এই শোষণমূলক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সঙ্গে ব্যবসা করার মূল্য খুবই বেশি। ভবিষ্যতে কিছু অর্থনৈতিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত লাভ হবে এই অনিশ্চিত আশায় এমন সম্পর্ক গড়ে তোলা ব্রিটেনকে নির্ভরশীল করে তুলতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের সার্বভৌমত্বকেও দুর্বল করতে পারে। স্টারমার বেইজিংয়ে গিয়ে এমন এক ফাঁদে পা দেওয়ার ঝুঁকিতে আছেন, যেমনটি তিনি এ বছর ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাতানো ফাঁদে পড়েছিলেন। ট্রাম্পও একজন শক্তিশালী স্বৈরাচার ও দাদাগিরিপূর্ণ নেতা।

চীনের শাসকগোষ্ঠী বাস্তবে ব্রিটেনের অঘোষিত শত্রু। তারা যে হুমকি তৈরি করছে, তার রূপ নানা ধরনের। গুপ্তচরবৃত্তি, সাইবার হামলা এবং বিদেশে থাকা ভিন্নমতাবলম্বীদের ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনই সতর্কবার্তা শোনা যায়। শুক্রবার আরও একটি হ্যাকিংয়ের ঘটনা প্রকাশ পায়, এবার পররাষ্ট্র দপ্তরে, যা নাকি চীন করেছে। এমআই ফাইভ জানিয়েছে, চীনা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সংসদ ও এমপিদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তবু হোয়াইটহলে একধরনের অদ্ভুত নিষ্ক্রিয়তা চোখে পড়ে।

যেমন ধরুন, কেন এই শরতে চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত দুই ব্রিটিশ নাগরিকের মামলা হঠাৎ ভেঙে পড়ল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। সংসদের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কমিটি গত সপ্তাহে অভিযোগ করেছে, সরকার চীনকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে ঘোষণা দিতে গড়িমসি করছে। আর বেশ রাজনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে জনসমক্ষে প্রথমবার হাজির হয়ে এমআই সিক্সের নতুন প্রধান ব্লেইজ মেট্রেওয়েলি কৌশলে চীন প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান।

মেট্রেওয়েলি যা বলেননি, সেটাই আসল কথা। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে ব্রিটেনের মূল্যবোধ ও স্বার্থকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করছে। হংকং, শিনজিয়াং ও তিব্বতে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন, খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, আগ্রাসী বাণিজ্যনীতি যেমন বিরল খনিজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং ভর্তুকিপ্রাপ্ত স্টিল সস্তায় বাজারে ছাড়ার কৌশল, জাপান, তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের প্রতি সামরিক হুমকি, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং ইউক্রেনে মস্কোর অবৈধ যুদ্ধকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমেই এই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে।

স্টারমার নিশ্চয়ই এসব জানেন। তবু তিনি একসঙ্গে দুই দিক সামলাতে চান। তিনি রাজনীতি ও নিরাপত্তাকে ব্যবসা ও বাণিজ্য থেকে আলাদা করতে চান, ঠিক যেমন অনেকেই রাজনীতিকে খেলাধুলা থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। স্টারমারের যুক্তি হলো, ‘আমাদের নিরাপত্তা রক্ষা করাই আমাদের প্রথম দায়িত্ব। আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিলে অন্য ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়।’ এ কারণেই কর্মকর্তারা কৃত্রিমভাবে চীনের হুমকিকে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখান। তাঁরা আশঙ্কা করেন, সময়ের আগেই সমালোচনা করলে স্টারমারের লক্ষ্য ভেস্তে যেতে পারে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি সরল ও অবাস্তব। বেইজিং যা কিছু করে, তার সবকিছুর সঙ্গেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির হাত জড়িত। চীনের নিরাপত্তাব্যবস্থা, অর্থনীতি ও বাণিজ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং শেষ পর্যন্ত আলাদা করা যায় না। আগের এক ব্রিটিশ সরকার বিষয়টি বুঝেছিল বলেই হুয়াওয়েকে ব্রিটেনের ফাইভ–জি টেলিকম নেটওয়ার্ক থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো এভাবেই কাজ করে। সি চিন পিংয়ের অধীন কেন্দ্রীভূত পার্টির নিয়ন্ত্রণ আরও স্পষ্টভাবে বেড়েছে। স্টারমার যেকোনো চুক্তি করলে তার প্রভাব জাতীয় নিরাপত্তার ওপর পড়বেই।

বেইজিং ইতিমধ্যেই অগ্রিম মূল্য চাইছে। তারা টাওয়ার ব্রিজের কাছে একটি বিশাল দুর্গসদৃশ দূতাবাস নির্মাণ করতে চায়। জানুয়ারির মাঝামাঝির মধ্যে যদি অনুমতি না দেওয়া হয়, তবে স্টারমারের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হওয়া চীন সফর বাতিল হয়ে যেতে পারে। তা হলে সেটি হবে অত্যন্ত অপমানজনক এক প্রত্যাখ্যান। আর এতে স্পষ্ট হয়ে যাবে, চীনে রাজনীতি ও নিরাপত্তা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

সাইমন টিসডাল, দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-21%2F19dozw4s%2Ftrump-lll.JPG?rect=0%2C3%2C643%2C429&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সি চিন পিং ও কিয়ার স্টারমার। ফাইল ছবি : রয়টার্স

দুর্ভিক্ষ দূর হলেও গাজাবাসীর ক্ষুধার কষ্ট দূর হয়নি

দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, অবরোধ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে গাজাবাসী দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়েছিল। তবে বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) জানিয়েছে, গাজা এখন আর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দুর্ভিক্ষ’ অবস্থায় নেই। ১০ অক্টোবর শুরু হয়েছে যুদ্ধবিরতি। তবে সেটা মাঝেমধ্যেই ভঙ্গ হচ্ছে বলে বিভিন্ন পক্ষ অভিযোগ করছে। এ অবস্থায় গাজায় মানবিক ও বাণিজ্যিক খাদ্যসহায়তার প্রবেশ কিছুটা বেড়েছে। যে কারণে পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি হয়েছে বলে আইপিসির সর্বশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে সতর্কবার্তাও রয়েছে। এই অগ্রগতি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

চার মাস আগে আইপিসি জানিয়েছিল, গাজা উপত্যকার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখে। সংখ্যায় প্রায় ৫ লাখ ১৪ হাজার মানুষ। ইসরায়েল তখন সেই মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছিল। এবার নতুন প্রতিবেদনে আইপিসি বলছে, দুর্ভিক্ষের শর্ত পূরণ না হলেও গাজার পরিস্থিতি এখনো ‘গুরুতর ও সংকটাপন্ন’। যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয় এবং মানবিক ও বাণিজ্যিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরো গাজাই আবার দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, দুর্ভিক্ষ আপাতত ঠেকানো গেছে। কিন্তু এই অর্জন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজন বাড়ছে এমন গতিতে, যা সহায়তার দিয়ে সামলানো যাচ্ছে না।

গাজার সব কটি প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েল। ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় ঢুকছে, যার ৭০ শতাংশই খাদ্যসামগ্রী। হামাস এই দাবি মানতে চায় না। তাদের বক্তব্য, দিনে ৬০০ ট্রাক তো দূরের কথা, তার চেয়ে অনেক কম ঢুকতে পারছে। শুক্রবার আইপিসির মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে কোগাট অভিযোগ করে, প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং তথ্য সংগ্রহে বড় ফাঁক রয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানায়, প্রতিবেদনে দেখানো সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি সহায়তা গাজায় যাচ্ছে এবং জুলাইয়ের পর থেকে সেখানে খাদ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

অন্যদিকে ত্রাণ সংস্থাগুলো বারবার বলছে, গাজায় প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা এখনো খুবই কম এবং অনেক জরুরি সামগ্রী ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলের দাবি, খাবারের ঘাটতি নেই; সমস্যা হচ্ছে গাজার ভেতরে বিতরণব্যবস্থায়।

আইপিসি মনে করিয়ে দিয়েছে, গত ১৫ বছরে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে এমন দুর্ভিক্ষ বিশ্বে ঘটেছে মাত্র পাঁচটি। ২০১১ সালে সোমালিয়া, ২০১৭ ও ২০২০ সালে দক্ষিণ সুদান, ২০২৪ সালে সুদান এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের আগস্টে গাজা। কোনো অঞ্চলকে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করতে হলে অন্তত ২০ শতাংশ মানুষকে চরম খাদ্যসংকটে থাকতে হয়, প্রতি তিন শিশুর একজনকে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগতে হয় এবং প্রতিদিন প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত দুজনকে অনাহার বা অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যেতে হয়।

শুক্রবারের প্রতিবেদনে আইপিসি বলেছে, বর্তমানে গাজার কোনো এলাকাই আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ শ্রেণিতে নেই। তবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে নিয়মিত, বিস্তৃত ও নিরবচ্ছিন্ন মানবিক এবং বাণিজ্যিক সহায়তার ওপর। দুর্ভিক্ষের মানদণ্ড পূরণ না হলেও আইপিসি ‘বিপর্যয়কর পরিস্থিতি’ নির্ধারণ করতে পারে। এমন জায়গার জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি নির্ধারণ করা হয়, যেখানে পরিবারগুলো চরম খাদ্যাভাব, অনাহার এবং অপুষ্টি ও মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।

এ মুহূর্তে গাজায় এক লাখের বেশি মানুষ এমন বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে আইপিসি। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ এই সংখ্যা কমে প্রায় ১ হাজার ৯০০-এ নামতে পারে। তবে পুরো গাজা উপত্যকাই এখনো ‘জরুরি’ পর্যায়ে রয়েছে, যা বিপর্যয়কর অবস্থার ঠিক এক ধাপ নিচে।

গাজায় শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। আইপিসির হিসাব অনুযায়ী, আগামী এক বছরে গাজায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ১ লাখ ১ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগবে এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে ৩১ হাজারের বেশি হবে মারাত্মকভাবে অপুষ্ট। একই সময়ে ৩৭ হাজার গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীও তীব্র অপুষ্টির শিকার হবেন।

দক্ষিণ গাজার নাসের হাসপাতালে চিকিৎসকেরা শঙ্কায় আছেন ৪ বছরের আরজওয়ান আল-দাহিনি ও ছয় বছরের ইয়াসের আরাফাতকে নিয়ে। দুজনই মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, ক্ষুধার সবচেয়ে ভয়ংকর স্তরে আছে এরা। আরজওয়ানের মা হানিন বলেন, খাবারের সংকটে মেয়েটি হাঁটা বন্ধ করে দিয়েছে, বেড়ে ওঠা থেমে গেছে এবং শরীরের প্রায় অর্ধেক ওজন কমে গেছে। ইয়াসের আরাফাতের ভাই ইতিমধ্যেই অপুষ্টিতে মারা গেছে বলে জানান চিকিৎসক আহমেদ আল-ফাররা। তাঁর বাবা নিজেও অসুস্থ ও অপুষ্ট, আর মা ইমান বলেন, পরিবারটি ডিম বা অন্য কোনো উচ্চ প্রোটিন খাবার কিনতেই পারছে না।

গাজার আল-শিফা হাসপাতালের প্রধান মোহাম্মদ আবু সেলমিয়া জানান, অপুষ্টি এখনো ব্যাপক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষায় ছয় হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় এক হাজার অপুষ্টিতে ভুগছে, যার মধ্যে ১০০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির গাজা ও পশ্চিম তীরের প্রধান কর্মকর্তা আন্তোয়ান রেনার্ড বলেন, উন্নতির কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এখন গাজার বেশির ভাগ মানুষ দিনে দুই বেলা খাবার পাচ্ছে। কিন্তু গাজায় সহায়তা প্রবেশ সহজ করা এখনো ‘নিরন্তর সংগ্রাম’। জাতিসংঘ ও ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, ইসরায়েল যদি বাধা না তোলে, তবে মানবিক কার্যক্রম ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

গুতেরেস আবারও বলেন, টেকসই যুদ্ধবিরতি ছাড়া সমাধান নেই। আরও প্রবেশপথ খুলতে হবে, জরুরি সামগ্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলতে হবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে, গাজার ভেতরে নিরাপদ চলাচলের পথ নিশ্চিত করতে হবে, স্থায়ী অর্থায়ন দরকার এবং বাধাহীন প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটি সতর্ক করে বলেছে, এই অগ্রগতিকে যেন সংকট শেষ হয়ে গেছে বলে ভুল না করা হয়। তাদের ভাষায়, গাজায় ক্ষুধা এখনো বিপর্যয়কর পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুত, পর্যাপ্ত এবং নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা না পেলে দুর্ভিক্ষ ও প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঝুঁকি খুব দ্রুতই ফিরে আসতে পারে।

গাজায় দুর্ভিক্ষ হয়তো আপাতত দূর হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষুধা, অপুষ্টি আর অনিশ্চয়তা।

সূত্র: র‌য়টার্স

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-11%2Fkmwrjhez%2F1.JPG?rect=0%2C0%2C2100%2C1400&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর গাজায় প্রবেশ করেছে ত্রাণবাহী ট্রাক। ফিলিস্তিনিরা সংগ্রহ করছেন জরুরি ত্রাণসহায়তা। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে। ছবি: রয়টার্স

‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’: ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন চালিয়ে যেভাবে পুরোনো রূপে ফিরছে যুক্তরাষ্ট্র

দ্য গার্ডিয়ানঃ দুই শতক ধরে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বোমাবর্ষণ এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়া। কিন্তু সর্বশেষ ঘটনা একটি নজিরও গড়েছে। কারণ, দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশে এটিই প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলা।

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নের মুখে পড়বে না।’

কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তার মহাদেশীয় প্রতিবেশীদের ওপর কেবল অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেই নয়, সামরিকভাবেও হস্তক্ষেপ করে আসছে। এ দীর্ঘ তালিকায় আগ্রাসন, দখলদারত্ব এবং বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে ১৯৮৯ সালে পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটকের বিষয়টিও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোপন তৎপরতা ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাতে এবং সামরিক স্বৈরশাসনের পথ প্রশস্ত করতে সহায়তা করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সামরিক অভিযানগুলো ঐতিহাসিকভাবে মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের তুলনামূলক নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর স্টেট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মাউরিসিও সান্তোরো বলেন, ‘দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশের ওপর প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলা পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশিত নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এ অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছিল।’

ওই কৌশলপত্রে এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ‘সম্প্রসারণের’ আহ্বান জানানো হয়েছে এবং একে মনরো ডকট্রিনে ‘ট্রাম্প করোলেরি’ বা সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মনরো ডকট্রিন হলো ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষিত ‘আমেরিকানদের জন্য আমেরিকা’ নীতি, যা পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় মার্কিন-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের বৈধতা দিতে ব্যবহৃত হয়।

টেম্পল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক এবং ‘আ শর্ট হিস্ট্রি অব ইউএস ইন্টারভেনশনস ইন লাতিন আমেরিকা অ্যান্ড দ্য ক্যারিবিয়ান’ গ্রন্থের লেখক অ্যালান ম্যাকফারসন বলেন, শনিবারের এই পদক্ষেপ অতীতের অনেক অভিযানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও তা অবাক করার মতো। কারণ, ১৯৮৯ সালের পর এ ধরনের কিছু আর ঘটেনি।

এই ইতিহাসবিদ আরও বলেন, ‘কেউ কেউ হয়তো ভেবেছিলেন, শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে লাতিন আমেরিকায় নিজেদের পছন্দমতো রাজনৈতিক ফলাফল আদায়ের এই নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী যুগের অবসান একুশ শতকে ঘটবে, কিন্তু স্পষ্টতই তা ঘটেনি।’

গত দশকগুলোতে এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দেশই প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো না কোনোভাবে মার্কিন হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। নিচে এর কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো:

মেক্সিকো

মেক্সিকোর ভূখণ্ড টেক্সাসকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত বিরোধ দেখা দেয়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোতে আগ্রাসন চালায়। ১৮৪৭ সালে মার্কিন সেনারা রাজধানী মেক্সিকো সিটি দখল করে নেয়।

১৮৪৮ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। তবে ওই চুক্তির ফলে মেক্সিকো তাদের মোট ভূখণ্ডের ৫৫ শতাংশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এই বিশাল এলাকার মধ্যেই বর্তমান ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা ও ইউটা অঙ্গরাজ্যসহ অ্যারিজোনা, নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো এবং ওয়াইমিংয়ের কিছু অংশ রয়েছে।

কিউবা

১৮৯৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে কিউবার স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র। এই বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র পুয়ের্তো রিকোর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে এবং ১৯০২ সাল পর্যন্ত কিউবা দখল করে রাখে। সে বছর একটি চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন নৌবাহিনীকে গুয়ানতানামো বের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে মার্কিন সেনারা ১৯০৬ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত এবং আবার ১৯১৭ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত দ্বীপটি দখলে রাখে। ফিদেল কাস্ত্রোর ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ১৯৬১ সালে ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ আগ্রাসনে সমর্থন দেয়।

হাইতি

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জেরে হাইতির নেতারা বারবার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় দেশটিকে ‘স্থিতিশীল’ করা এবং মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ১৯১৫ সালে হাইতিতে আগ্রাসন চালায়। ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত তারা দেশটির শুল্ক ও অর্থ দপ্তর এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে।

১৯৫৯ সালে একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা স্বৈরশাসক ফ্রাঁসোয়া ‘পাপা ডক’ দুভালিয়েরকে হুমকির মুখে ফেলে। তখন সিআইএ তাঁকে ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবা বিপ্লবের প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে একজন মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাঁর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পর্দার আড়ালে কাজ করে।

ব্রাজিল

১৯৬৪ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থী প্রেসিডেন্ট জোয়াও গোলার্টকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ দেখা দিলে হস্তক্ষেপের জন্য ব্রাজিলের উপকূলে একটি মার্কিন নৌ টাস্কফোর্স অবস্থান নিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করা হয়নি।

সত্তরের দশকে ‘অপারেশন কন্ডর’ নামে পরিচিতি পাওয়া এক কর্মসূচির অধীন সিআইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনার মতো দেশের স্বৈরশাসনের নিপীড়ক সংস্থাগুলোকে ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতন ও গুপ্তহত্যায় সরাসরি পরামর্শ দিত।

পানামা

যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সামরিকভাবে সমর্থন দিলে ১৯০৩ সালে কলাম্বিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায় পানামা। স্বাধীনতার পর ওয়াশিংটন মধ্য আমেরিকার এ দেশটির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বজায় রাখে।

১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ প্রায় ২৭ হাজার সেনা নিয়ে পানামায় আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দেন। এর লক্ষ্য ছিল স্বৈরশাসক নরিয়েগাকে আটক করা। সিআইএর এই সাবেক মিত্রের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

এই আগ্রাসনে পানামার প্রায় ৩০০ সেনার পাশাপাশি আনুমানিক ২০০ থেকে ৫০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এই হামলার কয়েক ঘণ্টা পর নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষিত গিয়েরমো এন্দারাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসায় যুক্তরাষ্ট্র।

তবে ভেনেজুয়েলায়ও একই পরিণতি ঘটবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প বলেছেন, ‘যথাযথ ক্ষমতা হস্তান্তর’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ‘পরিচালনা’ করবে।

ইতিহাসবিদ ম্যাকফারসন বলেন, এই অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপের পর ‘শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন ঘটনা ‘খুবই বিরল’। তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন হস্তক্ষেপগুলো প্রায় সব ক্ষেত্রেই ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করে।’

একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমানের ভেতর মার্কিন এজেন্টদের হাতে আটক পানামার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা। ৪ জানুয়ারি, ১৯৯০
একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমানের ভেতর মার্কিন এজেন্টদের হাতে আটক পানামার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা। ৪ জানুয়ারি, ১৯৯০ ছবি: ইউএস আর্মির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

ট্রাম্প তাঁর ভূ-অর্থনৈতিক যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন by হ্যারল্ড জেমস

আমরা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন বিশ্বরাজনীতির ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। অনেক দেশ এখন নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল শিখছে। রাশিয়া ও চীন এই খেলায় কিছুটা সফল হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই খেলা খেলতে গিয়ে উল্টো নিজের বিপদ ডেকে আনছে।

রাশিয়া মনে করেছিল, ইউরোপ যেহেতু তার জ্বালানির ওপর নির্ভর করে, সেহেতু তারা রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ মেনে নিতে বাধ্য হবে। এ ধারণা আংশিকভাবে সঠিকও ছিল, কারণ ইউরোপ এখনো রুশ তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।

তা ছাড়া জ্বালানি-বাণিজ্যই এখন রাশিয়ার সঙ্গে ভারত ও চীনের সম্পর্ক দৃঢ় করার মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে। আর এই জ্বালানি–বাণিজ্যই নতুন এক আমেরিকান জোটবিরোধী অর্থনৈতিক ভিত তৈরি করছে।

চীনও সমান শক্ত অবস্থানে আছে। কারণ, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, বিশেষ করে রেয়ার আর্থ বা দুষ্প্রাপ্য খনিজ এবং অন্যান্য ক্রিটিক্যাল মিনারেলস উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের নিয়ন্ত্রণ প্রায় পুরোপুরি চীনের হাতে।

গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়াম শুধু সবুজ জ্বালানিপ্রযুক্তির জন্য নয়, এলইডি, ফাইবার অপটিকস ও উচ্চ ক্ষমতার ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি তৈরিতেও অপরিহার্য। আবার অ্যান্টিমোনি (যার বেশির ভাগই চীন থেকে আসে) উচ্চমানের সামরিক সরঞ্জাম ও অগ্নিনিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

গত এপ্রিল মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘লিবারেশন ডে’ নামে পরিচিত নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর চীন সাতটি অতিরিক্ত রেয়ার আর্থের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এগুলো হলো, সামারিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, লুটেটিয়াম, স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম।

আগে এদের কৌশলগত গুরুত্ব সম্পর্কে তেমন ধারণা না থাকলেও এখন যুক্তরাষ্ট্র তার ভুল বুঝতে পারছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত একাধিক ফ্রন্টে বাণিজ্যযুদ্ধে পিছু হটতে হয়েছে।

এবার যুক্তরাষ্ট্রও রাশিয়া ও চীনের মতো কৌশল নকল করার চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে তারা নিজেদের জ্বালানি উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং তারা রেয়ার আর্থের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি অর্থ ঢালছে। কিন্তু দুটি উদ্যোগই জটিল সমস্যায় ভুগছে।

স্বল্প মেয়াদে তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে নতুন খনন ও পাইপলাইন বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু যেহেতু নন-কার্বন এনার্জির খরচ দ্রুত কমছে, তাই কোম্পানিগুলো ফসিল জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই তৎপরতা দীর্ঘস্থায়ী নয়, বরং ক্ষণস্থায়ী এক উত্থান হবে।

কিন্তু কথা হলো, রেয়ার আর্থ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে সম্ভব, কিন্তু তাতে সময় লাগবে। ষাট থেকে নব্বইয়ের দশকের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন পাস খনি ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এই খাতের বিনিয়োগকারীরা একের পর এক দেউলিয়া হয়েছেন।

২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নতুন মার্কিন কোম্পানি এমপি ম্যাটেরিয়ালস কিছুটা ভিন্ন পথে হেঁটেছে। তারা মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরকে ৪০ কোটি ডলারের শেয়ার দিয়েছে এবং খননকৃত উপকরণ কেনার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু এই ‘ট্রাম্পীয় রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ’ দেউলিয়াত্ব রোধ করতে পারলেও অলৌকিক কিছু ঘটাতে পারবে বলে মনে হয় না। টেন এক্স ফ্যাসিলিটি নামের তাদের প্রধান প্রকল্প ২০২৮ সালের আগে উৎপাদন শুরু করতে পারবে না।

ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এখন এমন কিছু করতে চাইছে, যার ফল পাওয়া যাবে তাড়াতাড়ি। আর সে কারণেই তারা ডলারের ব্যবহারকে অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগাতে চেয়েছে।

ষাটের দশকে ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী ভ্যালেরি জিসকার দেস্ত্যাঁ বলেছিলেন, বিশ্বের প্রধান মুদ্রা হিসেবে ডলারের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ দিয়েছে। এখন ট্রাম্প মনে হচ্ছে, এই সুবিধার সীমা পরীক্ষা করতে চাইছেন। যদিও একই সঙ্গে তিনি ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলছেন, যা ডলারের অবস্থানকে অনেক দুর্বল করে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রার ইতিহাসে দেখা গেছে, কোনো মুদ্রার আধিপত্য কখনোই স্থায়ী নয়। যেমন দ্য ইকোনমিস্টের সম্পাদক ওয়াল্টার বাজেট উনিশ শতকে বলেছিলেন, ব্রিটেনের অর্থব্যবস্থা ছিল ‘অর্থনৈতিক শক্তি ও ভঙ্গুরতার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ’। আজ সে কথা ডলারের ক্ষেত্রেও হুবহু প্রযোজ্য।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডলার এখনো বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। তবে বাণিজ্য ও অর্থনীতি সমান গতিতে চলে না। বাণিজ্য নির্ভর করে উৎপাদনের ওপর। আর অর্থনীতি অনেকটাই প্ল্যাটফর্মভিত্তিক। ইতিহাসে যেমন জেনোয়া, অ্যান্টওয়ার্প বা আমস্টারডাম তাদের অবস্থান হারিয়েছে, তেমনি চাইলে বিশ্বের অন্য দেশগুলোও ডলারের বিকল্প তৈরি করতে পারে।

চোখ খুললেই দেখা যায়, এখন এমন অনেক মুদ্রা আছে, যেগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঋণ ও ঘাটতির বোঝা নেই।

ফেসবুকের লিবরা প্রকল্পের কথাই ধরা যাক। এটি একটি ব্লকচেইনভিত্তিক মুদ্রা তৈরি করার উদ্যোগ, যা একাধিক মুদ্রার ঝুড়ির (বাস্কেট) সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। এটি তৎক্ষণাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাধার মুখে পড়ে। তবে প্রযুক্তিগতভাবে এটি সম্পূর্ণ সম্ভব ছিল।

আগে ডলারের বিকল্প হিসেবে ইউরো বা রেনমিনবিকে (চীনা মুদ্রা) অবাস্তব মনে হলেও ব্লকচেইন প্রযুক্তি এখন এক বিশ্বমুদ্রার ধারণাকে বাস্তব করে তুলতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বাস করে, মার্কিন ডলারে সমর্থিত স্টেবলকয়েন তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা বাড়বে। আর এতে সহজেই বিশাল জাতীয় ঋণ পরিশোধ করা যাবে। কিন্তু বিপদ হলো, আজ প্রায় সব স্টেবলকয়েনই ডলারনির্ভর।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বড় আর্থিক সংকট দেখা দিলে বা শুধু তার আভাস পেলেও নতুন ধরনের মুদ্রা আসতে পারে, যা হবে অস্ট্রেলিয়ান, কানাডিয়ান ও হংকং ডলার; নরওয়েজিয়ান ও সুইডিশ ক্রোন এবং সুইস ফ্রাঙ্কসহ বিভিন্ন শক্তিশালী মুদ্রার মিশ্রণ। একজন উদ্ভাবনী ইস্যুকারী চাইলে এর সঙ্গে কিছু ক্রিপ্টোকারেন্সি যোগ করতে পারেন। পাশাপাশি তাঁকে অবশ্যই মজুত রাখতে হবে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সম্পদ—সোনা।

তবে ট্রাম্প একজন অধৈর্য নেতা। তিনি দ্রুত ফল চান এবং পরাজয় সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যতই মেধাবী ও সৃজনশীল হোক না কেন, ট্রাম্প এমন এক অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছেন, যেখানে তাঁর জেতার সম্ভাবনা প্রায় নেই।

ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যের ওপর যে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি রয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেটিই ট্রাম্পের পরাজয় নিশ্চিত করবে।

* হ্যারল্ড জেমস, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-07%2Fue6l8psj%2FTrump.jpg?rect=0%2C0%2C600%2C400&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ছবি: রয়টার্স


ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর ট্রাম্পের নজর কেন, কী আছে সেখানে by প্রতীক বর্ধন

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার নিকোলা মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অস্ত্র পাচার করছে। এ নিয়ে ভেনেজুয়েলার ওপর নানা রকম চাপ প্রয়োগের পর শেষমেশ যুক্তরাষ্ট্র অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে। তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

কিন্তু ভেনেজুয়েলা সরকার এই দাবি অগ্রাহ্য করেছে। তারা বলছে, দেশের তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র এ হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, ভেনেজুয়েলায় এ রকম ন্যক্কারজনক অভিযানের পেছনে আছে দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলসম্পদ দখলের পাঁয়তারা।

গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে নিকোলা মাদুরোকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় তিনি আরও যা বলেন, তাতেও বিষয়টি স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প দখলের জন্য এ কাণ্ড করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেলে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প ‘অনেক টাকা আয় করতে পারবে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় তেল কোম্পানিকে (বিশ্বের সবচেয়ে বড়) ভেনেজুয়েলায় পাঠাব। তারা হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে; ভেঙে পড়া তেল অবকাঠামো ঠিক করবে। এই তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার হয়ে আয় করবে’।

ট্রাম্প আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’; অনেক দিন ধরেই তাদের এ অবস্থা। তাঁর ভাষায়, ‘যতটা তেল তারা তুলতে পারত, সে তুলনায় তারা প্রায় কিছুই তুলতে পারেনি।’

ভেনেজুয়েলার তেল কেন প্রয়োজন

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক—এ ক্ষেত্রে অন্য সবার চেয়ে তারা অনেকটাই এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র যে তেল উৎপাদন করে, তা মূলত হালকা ও অপরিশোধিত ধরনের। কিন্তু তাদের বেশির ভাগ তেল পরিশোধনাগারের যে সক্ষমতা, তাতে তাদের ভারী ও অপরিশোধিত তেল প্রয়োজন।

অন্য কথায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের দেশের রাস্তায় চলাচল করা গাড়িগুলোয় নিয়মিত পেট্রল সরবরাহ করতে চায়, তাহলে তাদের এই থিকথিকে ও ভারী অপরিশোধিত তেলের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

এ–ই হচ্ছে বাস্তবতা। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন হবে হাজার হাজার কোটি ডলার। এ কারণে নিকট ভবিষ্যতে কেউই তা করতে বিশেষ আগ্রহী নয়।

কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ভূখণ্ড থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করলেও ভারী তেলের চাহিদা মেটাতে দেশটিকে এখনো পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অধিকাংশ হালকা অপরিশোধিত তেল বিদেশে রপ্তানি করা হয়। অথচ টেক্সাস ও লুইজিয়ানার পরিশোধনাগারগুলো চালু রাখতে তাদের প্রতিদিন ছয় হাজার ব্যারেলের বেশি ভারী তেল আমদানি করতে হয়।

এ বাস্তবতা মাথায় রাখলেই সমীকরণ মেলানো সম্ভব। এ সমীকরণ অনিবার্যভাবে ভেনেজুয়েলার দিকেই নিয়ে যায়। কেননা, কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভারী তেলের মজুত ভেনেজুয়েলায়।

কত মজুত আছে ভেনেজুয়েলায়

এনার্জি ইনস্টিটিউটের হিসাব বলছে, বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ ভেনেজুয়েলার হাতে, যার পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল।

একসময় ভেনেজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা জারির পর সেই সম্পর্ক বদলে গেছে। এখন দেশটির তেলের প্রধান গন্তব্য চীন।
একসময় বৈশ্বিক তেলবাজারে প্রভাবশালী ছিল ভেনেজুয়েলা। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় আগে সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটে—দেশটির তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের শাসনামলে। নিকোলা মাদুরোর শাসনে সেই পরিস্থিতি আরও গভীর হয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ তেলশিল্প কার্যত ভেঙে পড়েছে, ফলে বৈশ্বিক সরবরাহের হিসাবে ভেনেজুয়েলা এখনো ঠিক ‘শূন্যের কোঠায়’ না পড়লেও বাস্তবে তারা প্রায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

১৯৭০-এর দশকে প্রতিদিন সাড়ে ৩ মিলিয়ন বা ৩৫ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল উত্তোলন করত দেশটি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই উৎপাদন নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। দেশটির দৈনিক উৎপাদন কমতে কমতে ২০২০ সালে মাত্র পাঁচ লাখ ব্যারেলে এসে ঠেকে।
এরপর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও বর্তমানে ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন ১০ লাখ ব্যারেলের সামান্য বেশি। এর বড় অংশই দেশটির নিজস্ব চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় বৈশ্বিক বাজারের ১ শতাংশের কম, যে বাজারের আকার এখন দৈনিক ১০ কোটি ব্যারেলের বেশি।

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের বর্তমান অবস্থা

হুগো চাভেজ ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে জনগণের কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। তাঁর সময় পিডিভিএসের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং বিদেশি চুক্তি পুনর্বিন্যাস করা হয়। তখন থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাসের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।

চাভেজের আমলে তেল থেকে আয়ের বড় অংশ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় করা হয়। এতে দেশটি সামাজিক সূচকে প্রাথমিকভাবে উন্নতি করে।

চাভেজ তেলশিল্প জাতীয়করণ করেন। এতে কিছু মার্কিন কোম্পানি ভেনেজুয়েলা থেকে বেরিয়ে যায়, যদিও শেভরনের মতো কোম্পানি সীমিত অংশীদারি রেখে ব্যবসা চালিয়ে যায়। চাভেজের নীতির কারণে দেশটির তেলক্ষেত্র থেকে অভিজ্ঞ কর্মী ঝরে পড়ে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ থমকে যায়। উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে তেলশিল্পের কাঠামোগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। নিকোলা মাদুরো একই নীতি বজায় রাখেন।

বিপুল তেলের মজুত থাকলেও ভেনেজুয়েলার উৎপাদন যে নগণ্য, তার কারণ বুঝতে এই পটভূমি জানা প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো, দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসের হাতে উৎপাদন বাড়ানোর মতো প্রয়োজনীয় পুঁজি ও দক্ষতার ঘাটতি আছে।

গবেষণা সংস্থা এনার্জি অ্যাসপেক্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের পর বছর পর্যাপ্ত খনন না হওয়া, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, ঘন ঘন বিদ্যুৎ–বিভ্রাট ও যন্ত্রপাতি চুরির কারণে তেলক্ষেত্রগুলোর অবস্থা শোচনীয়।

চাভেজের আমলে অনেক পশ্চিমা তেল কোম্পানি ভেনেজুয়েলা ছেড়ে যায়। বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় কাজ করা একমাত্র বড় পশ্চিমা তেল কোম্পানি হচ্ছে শেভরন। দেশটির মোট তেল উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই শেভরনের মাধ্যমে হয়। তাদের উৎপাদিত তেলের প্রায় অর্ধেক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তেলশিল্প

এ বাস্তবতায় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর হাতে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প চলে যাবে—এমনটা মনে করা মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কাগজে-কলমে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেলের বেশি হিস্যা পেলে তারা দেশটির তেলশিল্পকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। তবে এনার্জি অ্যাসপেক্টসের ভূরাজনীতি বিভাগের প্রধান রিচার্ড ব্রোঞ্জ বলেন, ‘বিষয়টি মোটেও সহজ কিছু নয়।’

বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির খরচ অনেক বেশি। এনার্জি অ্যাসপেক্টস হিসাব করেছে, দৈনিক তেল উৎপাদন আরও ৫ লাখ ব্যারেল বাড়াতে অন্তত ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এতে সময় লাগবে প্রায় দুই বছর।

এ থেকেই বোঝা যায় চ্যালেঞ্জ ঠিক কতটা। উৎপাদন আরও বেশি হারে বাড়াতে হাজার হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। সময় লাগবে কয়েক দশক।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার সরকার পতনের কারণে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে; যদিও তাদের সামনে বন্ধুর পথ। সেখানে গিয়ে তারা জটিল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের পণ্যবিষয়ক প্রধান হেলিমা ক্রফট বিনিয়োগবিষয়ক নোটে এক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি লিখেছেন, ট্রাম্পের চাপের কারণে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ‘অনেকটা সরকারি দায়িত্বের মতো করে অবকাঠামো উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে নামতে হতে পারে’।
ট্রাম্প ব্যবসায়ী মানুষ। সবকিছুকেই তিনি ব্যবসায়িক স্বার্থে দেখেন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থাকে অগ্রাহ্য করে তিনি বিশ্বায়নকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছেন; যদিও এই বিশ্বায়নব্যবস্থা গড়ে তোলায় যুক্তরাষ্ট্রই একসময় নেতৃত্ব দিয়েছে।

ভেনেজুয়েলায় সামরিক আগ্রাসনও সেই ব্যবসায়িক স্বার্থ বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। সেই সঙ্গে ট্রাম্প জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিশ্বাস করেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ নেই। এ প্রসঙ্গে তাঁর সেই বিখ্যাত স্লোগান মনে রাখা যেতে পারে, ‘ড্রিল বেবি, ড্রিল’। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়াও। এ স্লোগান মনে রাখলে অনেক কিছুর উত্তর পাওয়া সম্ভব।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, স্কাই নিউজ, বিবিসি

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিকোলা মাদুরো
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিকোলা মাদুরো। ছবি: রয়টার্স

সৌদি আরব কি আদৌ পারমাণবিক অস্ত্র পাবে, কেন এতটা মরিয়া তারা by মেহেদি হাসান

সৌদি আরব কি পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চাচ্ছে? গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (এসএমডিএ) সইয়ের পর এই প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে সামনে আসছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এ চুক্তির ফলে রিয়াদের অর্থনৈতিক শক্তি ও ইসলামাবাদের পারমাণবিক ক্ষমতার মধ্যে মেলবন্ধন হয়েছে। এর অর্থ হলো, চুক্তির ফলে ইসলামাবাদকে বিভিন্নভাবে অর্থসহায়তা দেবে রিয়াদ। বিনিময়ে প্রয়োজনীয় পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে রিয়াদের পাশে দাঁড়াবে ইসলামাবাদ।

পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি কিংবা কর্মসূচি চালুর চেষ্টা সৌদি আরবের জন্য এবারই প্রথম নয়। এর আগেও দেশটি চীন ও রাশিয়ার সহযোগিতায় পারমাণবিক কর্মসূচি চালু করতে চেয়েছিল। কিন্তু তা সফল হয়নি। পাকিস্তানের সঙ্গে করা চুক্তির ফল সৌদির আকাঙ্ক্ষা পূরণ হচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

সৌদি আরব কেন হঠাৎ পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে এত মরিয়া হয়ে উঠছে, সেই প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে আসছে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে বলে মনে করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক কারণ

সৌদি আরব বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কার্বন নিঃসরণ কমাতে চান। একই সঙ্গে রপ্তানির জন্য অপরিশোধিত তেল ভবিষ্যতের জন্য মজুত করতে চান। এ জন্য দেশটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে নজর দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের ৬৮ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। অবশিষ্ট ৩২ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। প্রতিবছরের জুনে দেশটিতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে। এ সময় দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘদিন ধরে বেসামরিক ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সৌদি আরব। গত জানুয়ারিতে দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদের বক্তব্যেও এর ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। তিনি বলেন, তাঁরা পারমাণবিক কর্মসূচির মূল উপাদান ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ ও বিক্রি করতে প্রস্তুত।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কিছুটা কমতে পারে। এ ছাড়া দেশটির লোনাপানি বিশুদ্ধ করতে ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণের পেছনেও প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিকল্প জ্বালানি পাওয়া যাবে।

সৌদি–পাকিস্তান ঐতিহাসিক সম্পর্ক ঝালাই করা

দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধারাবাহিকতা থেকে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে এসএমডিএ চুক্তি করা হয়েছে। শুরুটা হয়েছিল ১৯৫১ সালে স্বাক্ষরিত ‘মৈত্রী চুক্তি’ থেকে। ওই চুক্তি দশকের পর দশক দুই দেশের কৌশলগত, রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

পরে ১৯৮২ সালে আরেকটি চুক্তি হয় দুই দেশের মধ্যে। নতুন কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কয়েক দশকের পুরোনো ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

সৌদি–পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে দুই দেশেই ইতিবাচক। সৌদি আরব ইসলামি বিশ্বের নেতা। পাশাপাশি তারা একটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি। ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় বিদেশি অর্থায়নকারী দেশ সৌদি আরব।

বিগত বছরগুলোতে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী বেশ কয়েকবার সৌদি আরবে মোতায়েন করা হয়েছে। তারা উপসাগরীয় অঞ্চল ও পাকিস্তানে সৌদি সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। কিন্তু সারা বিশ্বে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানই একমাত্র দেশ, যার পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম বড় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের। সেনাবাহিনীতে ছয় লাখের বেশি সদস্য আছেন। চুক্তির ফলে পাকিস্তান সৌদি আরবকে নিরাপত্তাসহায়তা দেবে—এটা নিশ্চিত। সৌদিতে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের অল্পসংখ্যক সেনা অবস্থান করছেন। নতুন চুক্তি আরও বড় ধরনের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগেরের মতে, চুক্তিতে পারমাণবিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সময় এখনো হয়নি। তবে শুধু মার্কিন নিরাপত্তার ওপর ভরসা করা উচিত নয়। কারণ, এটারও সীমাবদ্ধতা আছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে তা পরিষ্কার হয়ে গেছে।

চুক্তি অনুযায়ী, কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে সেটাকে দুই দেশের ওপর ‘আগ্রাসন’ হিসেবে দেখবে রিয়াদ ও ইসলামাবাদ।

ইরান ও ইসরায়েলকে ঠেকানো

দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহযোগিতা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচি–সংক্রান্ত চুক্তির কারণে তাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।

ওয়াশিংটন এখনো সৌদি আরবের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত। প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ উদ্যোগ থেকে প্রশিক্ষণ—সব মিলিয়ে সৌদির পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প খুঁজে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার।

তবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুত নিরাপত্তায় কিছুটা ঘাটতির কারণে সৌদি আরবের বিকল্প প্রতিরক্ষা সহযোগী জরুরি হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কাতারে দুই দফায় হামলা ঠেকানো যায়নি। গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনব্যপী যুদ্ধ হয়। ওই সময় কাতারে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। তবে এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

এর তিন মাস পর কাতারের রাজধানী দোহার একটি অভিজাত এলাকায় একটি ভবনে হামলা চালায় ইসরায়েল। সেখানে দূতাবাস, বিপণিবিতান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এতে অন্তত পাঁচজন হামাস সদস্য এবং একজন কাতারি নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন।

দোহায় এ হামলার পর আরব ও ইসলামিক দেশগুলোর একটি জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশ—বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বৈঠকে যোগ দেয়। তারা একটি যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করবে বলেও ঘোষণা দেয়।

এসব ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো যখন তাদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে চাইছে, তখন পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের মতো দেশ স্বাভাবিকভাবেই তাদের অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক তৎপরতা আরও জোরদার করে ইসরায়েল। দেশটির এমন কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবিচল সমর্থন প্রকাশ করায় এমন মনোভাবকে হুমকি হিসেবে মনে করছে সৌদি আরব।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন থেকেই সৌদি আরব বলে আসছে, তাদের চিরশত্রু ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে তারাও একই পথে হাঁটবে। তবে এটা স্পষ্ট, তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতেই সৌদি এ হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) মধ্যপ্রাচ্য নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো হাসান আল–হাসান বলেছেন, সৌদি আরবের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, পারমাণবিক শক্তিধর ইসরায়েলের তুলনায় কৌশলগত ও প্রচলিত সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা দেশটি এ চুক্তির মধ্য দিয়ে শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে।

ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখা

উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীল নিরাপত্তার বিষয়টিও সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালে ইরান–সমর্থিত হুতিরা ইয়েমেনের ক্ষমতায় আসে। সৌদি আরব তখন থেকেই সন্দেহ করতে শুরু করে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা কত দিন টিকবে। সৌদির সেই সন্দেহ কিছুটা সত্য প্রমাণিত হয় ২০১৯-২০২২ সালের মধ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনায়। এ সময় সৌদি আরবে আঘাত করতে পারে, এমন  ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ঘোষণা দেয় হুতিরা। ফলে তারাও সৌদির নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

এর মধ্যে ২০১৯ সালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনায় হামলা হয়। শোনা যায়, ইরান ওই হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু হুতিরা ওই হামলার দায়ভার স্বীকার করে। ধারণা করা হয়, তেহরানের ভূমিকা ঢাকতেই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর সৌদির আস্থা কমে যায়।

২০১৫ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গঠিত আরব জোটে পাকিস্তানকে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সৌদি আরব। কিন্তু ইসলামাবাদ তখন ওই জোটে যেতে রাজি হয়নি। এর ১০ বছর পর গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের নৌবাহিনী সহযোগিতা জোরদার করে। প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়।

হুতিদের বহুমাত্রিক হুমকি এখনো সক্রিয়। এ কারণে ইসলামাবাদের সঙ্গে সৌদি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে ইরানপন্থী হামলাকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।

চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের বক্তব্য

রিয়াদ-ইসলামাবাদের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য চুক্তির পারমাণবিক দিক নিয়ে জল্পনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে খাজা আসিফ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, নতুন চুক্তির অধীনে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা (অস্ত্র ও প্রযুক্তিসহায়তা) সৌদি আরবকে দেওয়া হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের যা আছে এবং যে সক্ষমতা আমরা আয়ত্ত করেছি, তা এই চুক্তির অধীনে (সৌদি আরবকে) দেওয়া হবে।’

তবে খাজা আসিফ জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তান সব সময় একটি দায়িত্বশীল পারমাণবিক দেশ হিসেবে কাজ করেছে।

পরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র এই চুক্তির অংশ নয়। তাঁর ভাষায়, এ চুক্তির ‘আওতায়’ পারমাণবিক অস্ত্র নেই।

সৌদি আরব যা বলছে

চুক্তির মধ্য দিয়ে রিয়াদ পাকিস্তানের পারমাণবিক সহায়তা পেতে যাচ্ছে, এ ধারণা প্রথম প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা।

চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ওই কর্মকর্তা একটি পশ্চিমা সংবাদ সংস্থাকে ইঙ্গিতে বলেছিলেন, চুক্তির অধীনে রিয়াদ পারমাণবিক সুরক্ষা পাবে। পরবর্তী সময়ে সৌদি ভাষ্যকাররা দাবিটি আরও শক্তিশালী করেন।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) ভাষ্য, এই চুক্তি উভয় দেশের নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও বিশ্বে শান্তি অর্জনের যৌথ অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। এর লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করা।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট, আটলান্টিক কাউন্সিল, আল–জাজিরা ও  বিবিসি

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশের নেতারা। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রিয়াদ
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশের নেতারা। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রিয়াদ। ছবি: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

সাবাহ’র নিবন্ধ: বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক নিয়ে নতুন ভাবনা by আসিফ বিন আলী

বাংলাদেশ ও তুরস্ককে প্রায়ই ‘নতুন অংশীদার’ বলা হয়। কিন্তু শিরোনামের বাইরে তাকালে দেখা যায়- এই সম্পর্কটি অনেক পুরোনো। ১৯০০ সালেই বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধ গভীর আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১৯২১ সালের কবিতা ‘কামাল পাশা’- যেখানে তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে উল্লেখ করা হয়েছে- তাতে তুরস্কের উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সেই মুগ্ধতাকেই ধারণ করে। আজও কবিতাটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচিতেই রয়েছে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির পাশাপাশি জনপরিসরের প্রতীকী উদ্যোগও দেখা যায়। বাংলাদেশ সরকার আতাতুর্কের নামে সড়কের নামকরণ করেছে। এসব সাংস্কৃতিক ইঙ্গিত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো দেখায় যে বাংলাদেশ-তুরস্ক যোগাযোগ কেবল লেনদেনভিত্তিক নয়; এর রয়েছে আবেগী অতীত এবং মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরোধের একটি অভিন্নতা।

আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে, মুসলিম বিশ্বে স্বীকৃতি ও অবস্থান নির্ধারণের রাজনীতির ভেতর দিয়ে। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সম্মেলনে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় তুরস্ক। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় তুরস্ক দূতাবাস খোলে। আর বাংলাদেশ ১৯৮১ সালে আঙ্কারায় মিশন স্থাপন করে। এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় যাত্রাপথের প্রাথমিক পর্যায়েই বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়। পথটি অবশ্য সবসময় মসৃণ ছিল না। কিছু অস্বস্তিকর মুহূর্তও এসেছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রতিধ্বনি তোলে। তবে ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের পর সম্পর্কটি নতুন ধরনের গভীরতা পায়। তুরস্ক কেবল বিবৃতি দেয়নি; স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাপ লাঘবে মানবিক সহায়তাও বাড়িয়েছে।

ভবিষ্যৎ কোন পথে
এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজে লাগানো যায়। বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় নজর দেয়। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের এক সংবেদনশীল অংশে অবস্থান করছে। সেখানে প্রভাব বিস্তারে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা চলছে এবং প্রতিবেশী মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের জন্য বিলাসিতা নয়; এটি এক ধরনের বীমা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য অল্প কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল থেকেছে, যা খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও রাজনৈতিক চাপের মতো ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করেছে। ঢাকা ও আঙ্কারা যদি দূরদর্শী হয়, তবে প্রতিরক্ষা কেনাকাটার হুড়োহুড়ি না বানিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে দেখবে।

উদারবাদী ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের দৃষ্টি টানে বাজার, নীতি ও অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে। বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য বেড়ে ২০২৪ সালে ১ বিলিয়ন ডলার (৪১ বিলিয়ন তুর্কি লিরা) ছাড়িয়েছে। সম্ভাবনার তুলনায় এ সংখ্যা এখনো মোটামুটি মানের। এটি সাফল্যের গল্পের চেয়ে শুরু বিন্দু বলাই ভালো। বাংলাদেশের রয়েছে তরুণ শ্রমশক্তি এবং দক্ষিণ এশিয়া ও তার বাইরের গুরুত্বপূর্ণ বাজারের কাছাকাছি অবস্থান। তুরস্কের আছে উৎপাদন, মধ্যম-স্তরের প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক বাজারে সক্রিয় কোম্পানির নেটওয়ার্কে অভিজ্ঞতা। এই শক্তিগুলো ঠিকভাবে মেলাতে পারলে অংশীদারিত্বটি সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের বাইরে গিয়ে সহউৎপাদনের স্তরে উঠতে পারে।

আরেকটি ক্ষেত্র আছে, যেখানে দুই দেশই ভারী মূল্য দিয়েছে এবং তাই জোরালো কণ্ঠস্বর অর্জন করেছে- শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের রাজনীতি। তুরস্ক বহু বছর ধরে লক্ষ লক্ষ সিরীয়কে আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশ সীমিত আন্তর্জাতিক সহায়তার মধ্যেই রোহিঙ্গা সংকটের বোঝা বহন করছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ ও তুরস্ককে দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে কথা বলার নৈতিক ভিত্তি দেয় এবং জাতিসংঘ ও ওআইসিতে বক্তৃতার বাইরে বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করে।

গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি মনে করিয়ে দেয়- রাষ্ট্র কেবল স্বার্থের যোগফল নয়; রাষ্ট্র হলো সমাজ। তাই কেবল লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে তাকাতে হবে। বাংলাদেশ ও তুরস্ক দুই দেশেরই জনজীবনে ইসলামের ভূমিকা আছে, যা একে অপরের ইতিহাস ও রাজনীতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। বৃহত্তর উম্মাহর অন্তর্ভুক্তির ধারণা আবেগী গুরুত্ব বহন করে। বাংলায় ডাব করা তুর্কি ধারাবাহিক এখন বহু বাংলাদেশির নিয়মিত বিনোদন। ঢাকার তরুণরা তুর্কি খাবারে আগ্রহী। বৃত্তি নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান, বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন; কেউ কেউ একাডেমিক বা পেশাগত ভূমিকায় সেখানেই থেকে যান। বাইরে থেকে এগুলো ছোট মনে হলেও, এগুলো মানুষে-মানুষে এমন এক সেতু গড়ে তোলে, যা কূটনৈতিক স্লোগানের চেয়ে ভাঙা কঠিন। রাজনৈতিক হাওয়া বদলালে- যা বদলাবেই- এই মানবিক বন্ধনগুলো সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।

বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে- বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু কণ্ঠ বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে যেন অন্য কারও বিপরীতে একটি পছন্দ হিসেবে উপস্থাপন করছে; যেন ঢাকাকে তুরস্ক ও ভারতের মধ্যে, কিংবা তুরস্ক ও চীনের মধ্যে বেছে নিতে হবে। শুনতে নাটকীয় হলেও এটি দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক চিন্তা। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ, যার ভিন্ন ভিন্ন কারণে ভিন্ন ভিন্ন অংশীদার প্রয়োজন। অবকাঠামো অর্থায়ন ও নির্মাণে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। ভারত সেই প্রতিবেশী, যার সঙ্গে নদী, সীমান্ত, ট্রানজিট রুট এবং সীমান্তপারের জটিল সামাজিক বন্ধন রয়েছে। তুরস্ক বাংলাদেশের একটি উদীয়মান অংশীদার- প্রতিরক্ষা উৎপাদন, মানবিক কূটনীতি ও বাণিজ্যে যার ওজন বাড়ছে। এসব ভূমিকা পরস্পর বদলযোগ্য নয়। এগুলো তাকের ওপর রাখা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ডও নয়। কোনো সম্পর্ককে কৃত্রিম দ্বৈততার মধ্যে ঠেলে দিলে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। বিকল্প বাড়ালে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ে; কোনো শিবিরে আনুগত্য প্রমাণ করতে সেতু ভাঙলে নয়।

বাংলাদেশ-তুরস্ক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি বাহ্যিক নয়- অভ্যন্তরীণ। বাংলাদেশের রাজনীতি নানা স্রোতে গঠিত- ইসলামপন্থী, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী, বাঙালি জাতীয়তাবাদী- প্রতিটির ইতিহাসপাঠ ও পররাষ্ট্রনীতি পছন্দ আলাদা। মতবৈচিত্র্য সমস্যা নয়। সমস্যা শুরু হয় যখন বিদেশি সম্পর্ককে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করার হাতিয়ার বানানো হয়। তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক যদি বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ের আরেকটি অস্ত্র হয়ে ওঠে, তবে সম্পর্কটি প্রতিক্রিয়াশীল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। গঠনমূলক পথ হলো- সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর মনোযোগ রাখা। যেমন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নিরাপদ অভিবাসন, ন্যায্য বাণিজ্য, বিশ্বাসযোগ্য মানবিক উদ্যোগ এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।

২০২৬ সালের নির্বাচন ও ঢাকায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনার দিকে তাকালে, বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের মূল শব্দ হওয়া উচিত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। সরকার আসে-যায়; রাষ্ট্র থাকে। উভয় পক্ষ যদি সত্যিকারের অংশীদারিত্ব চায়, তবে এমন অভ্যাস ও ব্যবস্থাপনা দরকার, যা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ক্ষমতাসীনদের ওপর নির্ভরশীল নয়। বাংলাদেশ ও তুরস্কের অংশীদারিত্বকে অর্থবহ করতে নাটকীয় গল্প বা অভিন্ন শত্রুর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি।
(তুরস্কের পত্রিকা ডেইলি সাবাহ থেকে অনুবাদ)

https://mzamin.com/uploads/news/main/195407_Abul-1.webp

ভেনেজুয়েলার নতুন নেত্রীকে ট্রাম্পের সতর্কতা, মাদুরোর চেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়েই ক্ষান্ত হননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিতে আরও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার নতুন নেতা ডেলসি রদ্রিগেজকে সতর্ক করেছেন। বলেছেন, তিনি যদি সঠিক কাজ না করেন, তবে তাকে ‘খুব বড় মূল্য দিতে হবে- সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড় হবে তা’। মার্কিন সাময়িকী দ্য অ্যাটলান্টিককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, মাদক পাচার ও অস্ত্র সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থেকে মাদুরো একটি ‘নার্কো-সন্ত্রাসী শাসন’ পরিচালনা করছিলেন। মাদুরো এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, কারাকাসে শনিবারের বিমান হামলার পর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এলেও, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় নেই। যদিও কিছু ডেমোক্রেট নেতার ভাষ্য, এই অভিযান ছিল ‘যুদ্ধ ঘোষণার সামিল’। রবিবার দ্য অ্যাটলান্টিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে রদ্রিগেজের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেন, তিনি যদি সঠিক কাজ না করেন, তবে তাকে খুব বড় মূল্য দিতে হবে। সম্ভবত মাদুরোর থেকেও বড় হবে তা।

ভেনেজুয়েলা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘রেজিম-চেঞ্জ- আপনি যা-ই বলুন না কেন- এখনকার পরিস্থিতির চেয়ে ভালোই হবে। এর চেয়ে খারাপ আর হতে পারে না।’ শনিবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি নিরাপদ, যথাযথ ও সুবিবেচিত রাজনৈতিক পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে।

তিনি আরও বলেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দেশটির অবকাঠামো মেরামতে কাজ করবে এবং দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে। তবে ট্রাম্পের এমন ঘোষণার মাঝেও মাদুরোর মিত্ররা এখনো ক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করছে।

কিউবা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে ৩২ জন সাহসী কিউবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের সমাজতান্ত্রিক মিত্র হিসেবে দেশটি দু’দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে। রবিবার একাধিক টিভি সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, এই সামরিক অভিযান যুদ্ধ নয়, বরং মাদক পাচারকারী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান। তিনি বলেন, আমরা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে নয়, মাদক চক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি। তিনি আরও জানান, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে ‘কোয়ারেন্টাইন’ দিয়েছে, সেটিও চাপ বজায় রাখার কৌশলের অংশ।

মাদুরো ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দল দমন ও সহিংসতা ব্যবহারের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। বহু দেশ তার ২০২৪ সালের নির্বাচনী জয়কে অবৈধ বলে ঘোষণা করে। শনিবার ভোরে রাজধানী কারাকাসে পরিচালিত বিশেষ বাহিনীর অভিযানে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়। এরপর তাদের অস্ত্র ও মাদক মামলায় অভিযুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। মাদুরো অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ও ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে।

ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো দাবি করেছেন, অভিযানে মাদুরোর নিরাপত্তা বাহিনীর বড় অংশ, পাশাপাশি সামরিক সদস্য ও সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন। রুবিও বলেছেন, এ অভিযান আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অপারেশন। তাই কংগ্রেসের অনুমতি প্রয়োজন ছিল না। তিনি বলেন, এ ধরনের গোপন অভিযানের ব্যাপারে কংগ্রেসকে জানানো যায় না। কারণ তাতে তথ্য ফাঁস হয়ে যায়।

মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এখন অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপ্রধান। সেনাবাহিনীও তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সোমবার কারাকাসে তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ পড়ানোর কথা।
মার্কিন গণমাধ্যম রুবিও’র কাছে জানতে চায়, যুক্তরাষ্ট্র কি রদ্রিগেজকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়? তিনি উত্তরে বলেন, এটা বৈধতা নিয়ে নয়, যুক্তরাষ্ট্র পুরো শাসনকেই অবৈধ মনে করে। ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতারা অভিযানে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেন, এ অভিযান ছিল শুধু মাদকবিরোধী অপারেশন নয়। এটা ছিল যুদ্ধের কর্মসূচি। সিনেট সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার বলেন, আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে আরেকটি আইনভঙ্গকে সমর্থন করা যায় না। এমন রেজিম-চেঞ্জের অভিজ্ঞতা আমেরিকানদের রক্ত ও অর্থ- দুই দিকেই ক্ষতি করেছে।

তারা কংগ্রেসে এমন প্রস্তাব আনার ঘোষণা দেন যাতে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ভেনেজুয়েলা সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে না পারে হোয়াইট হাউস। ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, উরুগুয়ে ও স্পেন যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত, যা আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তারা শান্তিপূর্ণ সংলাপ ও আলোচনাভিত্তিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
mzamin

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের আড়াই দশক

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির এ অভিযান সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের টানাপোড়েন একেবারে নতুন নয়। ২৬ বছর ধরেই ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ ও আগ্রাসন দেখিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৯ হুগো চাভেজ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন। তখন থেকে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র–ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক কেমন ছিল, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক।

১৯৯৯ সাল: হুগো চাভেজ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর তিনি আলোচিত ‘বলিভিয়ারা বিপ্লব’ শুরু করেন। ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা সিমন বলিভারের নামে এ বিপ্লব বা আন্দোলনের নাম দেওয়া হয়েছিল। বলিভিয়ারা বিপ্লবের অংশ হিসেবে সংবিধান সংস্কার ও তেল খাতের জাতীয়করণ করেন। তখন থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাসের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।

২০০০ সাল: চাভেজ রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। তাঁর সরকার যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত এনজিও ও কূটনীতিকদের বহিষ্কার করে। যুক্তরাষ্ট্র চাভেজের বিরুদ্ধে স্বৈরাচার ও সংবামাধ্যমের ওপর কড়াকড়ি আরোপের অভিযোগ আনে।

২০০২ সাল: একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টার জন্য চাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এ অভ্যুত্থানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে ভেনেজুয়েলা। কিন্তু ওয়াশিংটন এ অভিযোগ অস্বীকার করে। এরপর দুদেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অবিশ্বাস গড়ে ওঠে।

২০১৩ সাল: হুগো চাভেজের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসেন মাদুরো। তিনি চাভেজের নীতিগুলোই এগিয়ে নেন। তাঁর শাসনের সময় থেকে অর্থনৈতিক দুরবস্থা শুরু হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।

২০১৪–১৫ সাল: যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ে।

২০১৭–১৯ সাল: ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে প্রবেশ বন্ধ করে এবং তেলের কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে। ফলে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যায়।

২০১৮ সাল: মাদুরোর পুনর্নির্বাচন ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়। বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পান।

২০২৪ সাল: এদমুন্দো গোনসালেসকে হারিয়ে মাদুরো বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হন। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সরকার নির্বাচনী ফল নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

২০২৫ সাল: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ নতুন করে বাড়ান। ক্যারিবীয় সাগরে ব্যাপক সেনা ও রণতরি মোতায়েন করেন।

২০২৬ সাল: কারাকাসে ব্যাপক বিস্ফোরণ ও মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নেওয়া হয়।

হুগো চাভেজ
হুগো চাভেজ। ফাইল ছবি রয়টার্স

আমি নির্দোষ, আমি আমার দেশের প্রেসিডেন্ট: নিকোলা মাদুরো

নিকোলা মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মাদক-সন্ত্রাসবাদ মামলায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বিচারককে বলেছেন, ‘আমি আমার দেশের প্রেসিডেন্ট।’ তিনি আরও বলেন, তাঁকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে।

মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও আদালতে মাদক সম্পর্কিত অভিযোগ থেকে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

মাদুরোর মামলার বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পড়ে শোনানোর পর তাঁর বক্তব্য জানতে চান। তখন মাদুরো বলেন, ‘আমি নির্দোষ। এখানে যে অভিযোগগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি আমি করিনি।’

শুনানি নিয়ে আদালত আগামী ১৭ মার্চ মাদুরোর পরবর্তী হাজিরার দিন ধার্য করেন।বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন এ নির্দেশ দিয়েছেন।

আজ সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ম্যানহাটনের আদালতে তাঁদের হাজির করা হয়। গত শনিবার ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।

নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।  আটককেন্দ্র থেকে হেলিকপ্টারে করে নিউইয়র্কে আদালতের কাছের একটি হেলিপোর্টে নেওয়া হয় তাঁদের। সেখান থেকে ভ্যানে তুলে আদালতে নেওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র, ৫ জানুয়ারি
নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আটককেন্দ্র থেকে হেলিকপ্টারে করে নিউইয়র্কে আদালতের কাছের একটি হেলিপোর্টে নেওয়া হয় তাঁদের। সেখান থেকে ভ্যানে তুলে আদালতে নেওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র, ৫ জানুয়ারি। ছবি: রয়টার্স

জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষার উদ্যোগ -উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক

জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিতে অধ্যাদেশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করতে আইন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে আজ সোমবার এ সিদ্ধান্ত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি বৈঠকে উঠে আসে। জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দেওয়া তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে গত ২৫ ডিসেম্বর এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে ৩ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের একদিন পর মাহদী ও ১১ দিন পর সুরভী জামিন পান।

দায়মুক্তি কীভাবে হতে পারে, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। সূত্র জানিয়েছে, এ সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যে কয়বার দায়মুক্তি দিয়ে আইন ও অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়পর্বের ঘটনার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, জুলাই যোদ্ধাদের সেভাবেই দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করা যেতে পারে।

এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৪ জানুয়ারি তিন দফা দাবি তুলে ধরে। এর মধ্যে ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতাকে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত সব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। একটি সূত্র জানিয়েছে, এ দাবি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সৈনিকেরা জীবনবাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছে। তাঁরা অবশ্যই দায়মুক্তির অধিকার রাখে। আমরা আগে থেকেই এ বিষয়ে কাজ করছি।’ তিনি বলেন, আরব বসন্ত বা সমসাময়িককালে বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানে জনধিক্কৃত সরকারগুলোর পতনের পর যেসব দেশে এ ধরনের দায়মুক্তির আইন হয়েছে, সেসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ ছাড়া দেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদের আলোকে এবং অতীতে বাংলাদেশে করা এ ধরনের একটি আইন পর্যালোচনা করে আইন মন্ত্রণালয় খসড়া অধ্যাদেশ তৈরি করবে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে উপদেষ্টা মণ্ডলীর বৈঠকে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মামলা ও গ্রেপ্তার না করতে গত বছর ১৪ অক্টোবর একটি বিবৃতি দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তখন বলা হয়েছিল, গণ-অভ্যুত্থানকে সাফল্যমণ্ডিত করতে ছাত্র-জনতা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনের মাঠে থেকে কাজ করেছে।

এ ছাড়া গত বছরের ৫ আগস্ট জারি করা জুলাই ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সকল শহীদদের জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে শহীদদের পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং আন্দোলনকারী ছাত্রজনতাকে প্রয়োজনীয় সকল আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে।’

‘কোনো ছাড় দেওয়া হবে না’

বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, রাস্তাঘাট বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, সভায় দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি, জুলাইয়ের সম্মুখসারির যোদ্ধা শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার অগ্রগতি, অপারেশন ডেভিল হান্টের দ্বিতীয় পর্যায়, অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার, সীমান্ত ও পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ৭ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) আজ সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ১৯তম সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) আজ সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ১৯তম সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। ছবি: পিআইডি