Saturday, November 12, 2016

আপস করছেন ট্রাম্প?

আপসের পথে হাঁটতে শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জানিয়েছেন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা পুরোপুরি বাতিল করবেন না। বরং এর কিছু অংশ সংশোধন করবেন। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালকে আজ শনিবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ কথা বলেছেন। নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন, দায়িত্বগ্রহণের পর ওবামাকেয়ার বাতিল করাই হবে তাঁর প্রথম কাজ।
হোয়াইট হাউসে গত বৃহস্পতিবার বারাক ওবামার সঙ্গে দেখা করেন ট্রাম্প। ওই বৈঠক এবং ওবামার পরামর্শ নিয়ে ওয়ালস্ট্রিটের সঙ্গে আলোচনা করেছেন ট্রাম্প। তিনি জানান, বৈঠকে স্বাস্থ্যবিমা পুরোপুরি বাতিল না করতে ওবামা পরামর্শ দিয়েছেন। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালকে ট্রাম্প জানান, ওবামার পরামর্শ তিনি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন। তিনি আরও বলেন, ওবামার স্বাস্থ্যবিমার বৈষম্য দূর করাসংক্রান্ত বিষয় ও মা-বাবার স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত রাখার বিষয়গুলো তাঁর পছন্দ। তিনি দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে চান। এমন দেশ চান, যেখানে সবাই একে অন্যকে ভালোবাসবে।

কয়েদির অভাবে বন্ধ হচ্ছে কারাগার

নেদারল্যান্ডসের একটি কারাগার। এএফপি।
যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ যেখানে কারাগারে কয়েদিদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নেদারল্যান্ডসের সমস্যাটা ঠিক বিপরীত। কারাগারে ভরে রাখার মতো কয়েদির বড়ই অভাব। এ জন্য গত কয়েক বছরে ১৯টি কারাগার বন্ধ হয়ে গেছে। আগামী বছর বন্ধ হবে আরও কয়েকটি। এমন অবস্থা হলো কীভাবে? সম্প্রতি বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে নেদারল্যান্ডসের একটি কারাগারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কারাগারটি দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নরগারহেভেনে। সেখানে রয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। সেখানে কারাকক্ষের দরজার ওপাশ থেকে পেঁয়াজ ভাজার সুবাস আসছিল। রান্নাঘরে কয়েদিরা তাঁদের রাতের খাবার তৈরি করছেন। একজনকে ছুরি দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে সবজি কাটতে দেখা গেল। তিনি বলেন, ‘আমি ছয় বছর ধরে এই কাজ করছি। দিন দিন এ কাজে দক্ষতা বাড়ছে।’ ছুরিগুলো শিকল দিয়ে আটকে রাখায় কাজ করার সময় শব্দ হচ্ছিল। এ ব্যাপারে নরগারহেভেনের ডেপুটি গভর্নর জ্যান রয়েলফ ভ্যান দের স্পয়েল বলেন, ‘আটকানো থাকায় এই ছুরিগুলো কয়েদিরা নিয়ে যেতে পারে না। তবে পাস থাকলে তারা ছোট ছুরিগুলো ধার নিতে পারে। এতে বোঝা যায়, কার কাছে ছুরি রয়েছে।’ কয়েদিদের কেউ কেউ সহিংসতার দায়ে কারাগারে বন্দী। তাই ছুরি বহন করার বিষয়টিকে সতর্কভাবে দেখা হয়।
নরগারহেভেন কারাগারের লাইব্রেরি। এএফপি
রান্নাবান্না করার মতো কাজ মুক্তির পর বন্দীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সহায়তা করে। ডেপুটি গভর্নর রয়েলফ বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকের দিকেই আলাদা নজর দিই। কেউ যখন মাদক সমস্যা নিয়ে আসে, তখন তার আসক্তির চিকিৎসা করি। যখন কেউ ক্ষুব্ধ থাকে, আমরা তা দমানোর চেষ্টা করি। কারও অর্থসংক্রান্ত অপরাধ থাকলে তাকে ঋণ-বিষয়ক পরামর্শ দিই। দের অপরাধের কারণগুলো আমরা দূর করার চেষ্টা করি। সংশোধন হতে কয়েদিদের নিজেদের ইচ্ছাও থাকতে হবে। আর আমাদের সংশোধন প্রক্রিয়াগুলো খুব কাজে আসে। গত ১০ বছরে আমাদের কাজ দিনে দিনে আরও উন্নত হয়েছে।’ কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই লোকদের নিজেদের কর্মস্থলে রেখে, পরিবারের সঙ্গে রেখে অন্যভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। একই এলাকার এসারহেমে কারাগারে গেলে দেখা যায়, সেখানে প্রচুর খোলামেলা জায়গা। শরীরচর্চার জায়গাটি অনেক বড়। সেখানে আছে ওকগাছ, পিকনিক টেবিল ও ভলিবল খেলার নেট। ডেপুটি গভর্নর রয়েলফ বলেন, খোলা বাতাস কয়েদি ও কারাগারের কর্মীদের দুশ্চিন্তা কমিয়ে আনে। বন্দীরা একা পাঠাগার, ক্লিনিক বা ক্যানটিনে যেতে পারেন। এই স্বাধীনতা কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সাহায্য করে। এক দশক আগেও বন্দীর সংখ্যার দিকে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি ছিল নেদারল্যান্ডস। কিন্তু এখন সেটা সর্বনিম্ন বলে দাবি করা হয়।
নেদারল্যান্ডসের একটি কারাগার। এএফপি।
প্রতি এক লাখে ৫৭ জন সেখানে বন্দী রয়েছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সেখানে প্রতি লাখে ১৪৮ জন বন্দী। ২০০৫ সালে নেদারল্যান্ডসে ১৪ হাজার ৪৬৮ জন বন্দী ছিল। এখন তা আট হাজার জনে নেমে এসেছে, যা আগের চেয়ে ৪৩ শতাংশ কম। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর লিডেনের অপরাধ আইন-বিষয়ক অধ্যাপক পলিন স্কুয়াটের মতে, শুধু পুনর্বাসন কর্মসূচির কারণেই নেদারল্যান্ডসে কারাবন্দীর সংখ্যা কমে আসেনি। ২০০৫ সালের দিকে কোকেনসহ মাদকদ্রব্য বহনকারীদের ব্যাপকভাবে ধরার পর তা কার্যকরভাবে কমে আসে। পুলিশ এখন মাদকদ্রব্যের দিক থেকে নজর সরিয়ে মানব পাচার ও সন্ত্রাসবাদ রোধের দিকে মনোযোগ বাড়িয়েছে। এর বাইরে নেদারল্যান্ডসে বিচারকেরা অপরাধীদের বিকল্প শাস্তির ব্যবস্থা করে থাকেন। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কমিউনিটির বিভিন্ন কাজে লাগানো হয়, জরিমানা করা হয় এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হয়।

মানুষ মেরে খুঁটিতে লাশ ঝুলিয়েছে আইএস

ইরাকের মসুল শহরে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিরা অন্তত ৪০ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে গত মঙ্গলবার গুলি করে হত্যা করেছে। এরপর তাদের লাশ বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলিয়েছে। জাতিসংঘের বরাত দিয়ে গতকাল শুক্রবার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। সূত্রের বরাত দিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক কমিশনারের দপ্তর জানায়, ওই ৪০ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে গুলি করে হত্যা করে আইএস। হত্যার পর বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটিতে তাদের লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ ছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবহারে আইএসের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার অভিযোগে মসুলের কেন্দ্রস্থলে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার খবর পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইএসের নিজস্ব আদালতের নির্দেশে ওই বেসামরিক ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। নিহত ৪০ ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা ও ইরাকি বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগ আনে আইএস। জাতিসংঘ বলছে, পরদিন বুধবারও অন্তত ২০ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে আইএস। মসুলের উত্তরাঞ্চলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ আনা হয়। জাতিসংঘ বলছে, আইএস তাদের সামরিক কাজে শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করছে। এ ঘটনায় জাতিসংঘ উদ্বিগ্ন। আইএসের কাছ থেকে মসুল পুনর্দখলে অভিযান চালাচ্ছে ইরাকি বাহিনী। তাদের এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট সহায়তা দিচ্ছে।

গায়ক ও কবি লিওনার্ড কোহেন আর নেই

লিওনার্ড কোহেন
মাত্র গত মাসেই বের হয়েছিল তাঁর ১৪ নম্বর অ্যালবাম ইউ ওয়ান্ট ইট ডার্কার। শ্রোতাদের পাশাপাশি সমালোচকদেরও প্রশংসা কুড়ায় এটি। দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা অ্যালবামটিকে বর্ণনা করেছিল ‘বিমর্ষ মাস্টারপিস’ হিসেবে। সেই নন্দিত শিল্পকর্মের স্রষ্টা কানাডার বিখ্যাত গায়ক, গীতিকার ও কবি লিওনার্ড কোহেন ৮২ বছর বয়সে চলে গেলেন। শোক প্রকাশ করতে গিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো তাঁকে আখ্যায়িত করেছেন এক কিংবদন্তি বলে। লিওনার্ড কোহেনের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ এক বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ করেছে। তবে এ ব্যাপারে মৃত্যুর সময় বা বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন জন্মসূত্রে কানাডার নাগরিক কোহেন। ফেসবুক পেজে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গভীর শোকের সঙ্গে আমরা জানাচ্ছি যে কিংবদন্তিপ্রতিম কবি, গীতিকার ও শিল্পী লিওনার্ড কোহেন মারা গেছেন। অসংখ্য গানের স্রষ্টা সংগীতের পরম শ্রদ্ধেয় এক স্বপ্নদ্রষ্টাকে আমরা হারালাম।’ ছেলে অ্যাডাম সংবাদমাধ্যমকে বলেন,
জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কলম থামেনি লিওনার্ড কোহেনের। তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা লস অ্যাঞ্জেলেসের বাড়িতে শান্তিতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। হৃদয়ে যা অনুভব করতেন, তা তাঁর শ্রেষ্ঠ একটি গানের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়েছে।’ লিওনার্ড কোহেনের কানাডার মন্ট্রিলের বাড়ির সামনে ভক্তরা মোমবাতি জ্বালিয়ে ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শিল্পীর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘কিংবদন্তি লিওনার্ড কোহেনের মৃত্যুর খবরে আমি গভীরভাবে শোকাহত। বিষণ্ন কণ্ঠ, গানের শক্তিশালী কথা ও বিনয়ী রসবোধ কয়েকটি প্রজন্মের কাছে তাঁকে ভালো লাগা ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।’ কোহেনের সবচেয়ে বেশি পরিচিত গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘হালোলুইয়াহ’ ও ‘ড্যান্স মি টু দ্য অ্যান্ড অব লাভ’। জীবনজুড়ে প্রায় সদা বিষণ্ন থাকলেও তাঁর লেখা গানের কথায় ফুটেছে আকর্ষণীয় রসবোধ ও বিনয়ী মনোভাব। এ গুণই তাঁকে শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। তাঁরই গানের কথায় ভক্তরা এখন বলে উঠতেই পারেন, ‘হেই, দ্যাটস নো ওয়ে টু সে গুডবাই’—এভাবে কি চলে যেতে হয়!

হুমকির মুখে ওবামার সাফল্য

ওবামার দুঃস্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তাঁর উত্তরসূরি হয়ে হোয়াইট হাউসে আসছেন এমন একজন, যিনি অঙ্গীকার করেছেন ওবামা প্রশাসনের অধিকাংশ অর্জন প্রথম দিন থেকেই বাতিল করার কাজে লেগে যাবেন। এই তালিকায় প্রথমেই আছে ওবামার প্রধান কৃতিত্ব নতুন স্বাস্থ্যবিমা, যা ‘ওবামাকেয়ার’ নামে পরিচিত। জলবায়ু চুক্তি ও আন্তপ্রশান্ত মহাসাগরীয় সহযোগিতা চুক্তি বাতিলেরও অঙ্গীকার করেছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া তিনি অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কারের অঙ্গীকার করেছেন, ওবামা প্রায় সাড়ে সাত লাখ বৈধ কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীর স্বল্পকালীন স্বস্তির যে ব্যবস্থা করেছিলেন, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তাও বাতিল করার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। আপাতত সেই উদ্বেগ নিয়ে সময় ব্যয় করতে আগ্রহী নন ওবামা। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে তিনি প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হন তাঁর এই উত্তরসূরির। মুখে বেদনার ছাপ নেই, ক্রোধ বা ঘৃণা তো নয়ই।
ওভাল অফিসে তাঁরা দুজনে নিভৃতে বসলেন, কথা বললেন। কথা ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎকার বড়জোর ১৫ মিনিট থেকে আধা ঘণ্টা স্থায়ী হবে। সেই সাক্ষাৎকার গড়াল দেড় ঘণ্টায়। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ওবামা বললেন, ‘নির্বাচন শেষ হয়েছে, এখন দলীয় আনুগত্য ত্যাগ করে আমাদের উচিত হবে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থনের হাত বাড়ানো। কারণ, ডোনাল্ড ট্রাম্প সফল হলে আমরা সবাই সফল হব।’ ওবামার এই মন্তব্যকে অনেকেই ব্যক্তি হিসেবে ওবামার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বলে উল্লেখ করেছেন। এটি ছিল তাঁদের প্রথম বৈঠক। ট্রাম্প ও বিনয় শব্দটি কেউ এক নিশ্বাসে উচ্চারণ করে না। কিন্তু ওবামার পাশে ট্রাম্পকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি বিনীত বোধ করছেন। এ কথা বলেছেন সিএনএনের এক বিস্মিত প্রতিবেদক। সাংবাদিকদের সামনে কিছুটা হকচকিত ট্রাম্প বলেন, ‘আমার বিপুল শ্রদ্ধা রয়েছে।’ এ শ্রদ্ধা যে ওবামার প্রতি, এই অসম্পূর্ণ বাক্য থেকে তা বোঝা সম্ভব নয়, যদিও তিনি হয়তো সে কথা বুঝিয়ে থাকবেন। ট্রাম্প এমন কথাও বললেন, তাঁদের সবিস্তার আলোচনায় ওবামা তাঁকে এই প্রশাসনের সাফল্যের বিবরণ দিয়েছেন এবং আগামী চার বছর তাঁকে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, সে সম্পর্কেও অবহিত করেছেন। ট্রাম্প এমন কথাও বললেন, ওবামার কাছ থেকে সময় সময় পরামর্শ পাওয়ার আশা তিনি করেছেন। ওবামার ঠিক কোন কোন কাজকে তিনি সাফল্য বলে মনে করেন, তা অবশ্য নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট খোলাসা করে বলেননি। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভের মুখে এই দুই নেতার শ্রদ্ধামিশ্রিত বৈঠক আশার জন্ম দিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের উসকে দেওয়ার পরিবর্তে ওবামা ও হিলারি উভয়েই ট্রাম্পের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা ও সমর্থনের কথা বলেছেন, সে জন্য বিভিন্ন মহলে তাঁরা প্রশংসিত হয়েছেন। তবে ওবামা বা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক খুব শান্তিপূর্ণ হবে না—এ কথা মনে করেন অধিকাংশ ভাষ্যকার। কংগ্রেসের উভয় কক্ষ এখন রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে, ফলে ট্রাম্পের পক্ষে তাঁর অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে তেমন বেগ পেতে হবে না। সুপ্রিম কোর্টে এখন একটি পদ শূন্য রয়েছে, ওবামা যে মধ্যপন্থী বিচারককে এই পদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন, রিপাবলিকানরা তাঁর সেই প্রস্তাব আমলে আনেননি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর পছন্দমতো কঠোর রক্ষণশীল এমন একজন বিচারককে এই পদে মনোনয়ন দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ডেমোক্র্যাটরা জানিয়েছেন, বিনা যুদ্ধে যেকোনো রক্ষণশীল বিচারকের মনোনয়ন প্রস্তাব তাঁরা মেনে নেবেন না। নতুন সিনেটে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে ৪৮টি পদ, এই সংখ্যা নিয়ে অধিকাংশ আইনি প্রস্তাব আটকানো তাঁদের পক্ষে সম্ভব হবে না। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির প্রশ্নে বিতর্ক ঠেকাতে ৬০ সদস্যের সমর্থনের যে বিধান রয়েছে, যা ‘ফিলিবাস্টার’ নামে পরিচিত ডেমোক্র্যাটরা সেই আইনের প্রয়োগ করে বাধা সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন। তবে সেই চেষ্টা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক কি না, সে প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটরা দ্বিধাবিভক্ত। রিপাবলিকানরা গোড়া থেকেই ওবামা প্রশাসনের সব প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এসেছেন, যে কারণে তাঁরা সব মহলে সমালোচিত হয়েছেন। ডেমোক্র্যাটরা সেই পথ অনুসরণ করলে একই সমালোচনার মুখে তাঁরাও পড়তে পারেন। এই বৈরী পরিস্থিতিতে ওবামা প্রশাসনের প্রধান অর্জন ‘ওবামাকেয়ার’ বিষয়ে সুখবর এসেছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত স্থান থেকে। ট্রাম্প প্রশাসন এই স্বাস্থ্যবিমা বাতিল করে দিতে পারে—এই ভীতি থেকে লাখ লাখ মানুষ নতুন করে ওবামাকেয়ারে যোগ দিচ্ছেন। ওবামাকেয়ারের অধীনে সরকারি সাহায্য থাকায় সবচেয়ে লাভবান হয়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষেরা। এখন তাঁরা উদ্বিগ্ন, ট্রাম্প তাঁদের সেই সুযোগ কখন বাতিল করেন। বুধবার ট্রাম্পের বিজয় নিশ্চিত হওয়ার এক দিন পর সরকারি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এই বিমা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন এক লাখ নতুন বিমাকারী—হোয়াইট হাউস থেকে এ কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।

নির্বাচন হলো আমেরিকায়, ঝগড়াটা বাংলাদেশে! by সোহরাব হাসান

সারা বিশ্বকে চমকে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হলেন রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী চার বছর বিশ্বরাজনীতি আরও অস্থির ও বেসামাল হবে কি না, আমেরিকান সমাজের বিভেদ বাড়বে কি না, সেটি নির্ভর করবে তাঁর গৃহীত নীতি ও কর্মসূচির ওপর। বলতে হবে, ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের কপাল খারাপ।
ট্রাম্পের চেয়ে লক্ষাধিক ভোট বেশি পেয়েও এই সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ফার্স্ট লেডিকে হার মানতে হয়েছে। মার্কিন নির্বাচন–পদ্ধতিতে পপুলার বা গণভোট দিয়ে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় না। তিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, যিনি ইলেকটোরাল কলেজের ভোট বেশি পান। ৫৩৮ ইলেকটোরাল কলেজের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন ২৯০ এবং হিলারি ক্লিনটন ২২৮। যুক্তরাষ্ট্রের এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনটি অনেক দিক দিয়েই ব্যতিক্রমী। নতুন প্রেসিডেন্ট একজন সফল ব্যবসায়ী হলেও রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ। তিনি একটি জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য যখন দলীয় মনোনয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন অধিকাংশ মার্কিন ভাবতে পারেননি যে ট্রাম্পই মনোনয়ন পাবেন। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালেও তিনি অনেক নাটক করেছেন। কখনো ভোট কারচুপির আশঙ্কা করেছেন, কখনো তাঁর সমর্থকদের দুটি করে ভোট দিতে বলেছেন। যৌন কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর একবার তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহারেরও গুঞ্জন উঠেছিল। আমেরিকার প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো তাঁকে উপস্থাপন করেছিল একজন খলনায়ক হিসেবে। সেই খলনায়ক এখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর দেশটির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তবে আমেরিকার গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, নির্বাচনের আগে দলীয় প্রচারকালে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন যতই বাদানুবাদ করুন না কেন, নির্বাচনের পর তাঁরা পরস্পরকে সম্মান দিয়ে ও সমীহ করে কথা বলেছেন। ফল প্রকাশের পরপরই হিলারি টেলিফোনে ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বুধবার স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে পাশে নিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন,
‘আমাদের দেশ আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আমাদের উচিত ট্রাম্পকে দেশ পরিচালনার সুযোগ দেওয়া।’ হিলারি বলেন, ‘এটা কষ্টদায়ক। কিন্তু আমি মনে করিয়ে দিতে চাই যে আমাদের প্রচার কখনো এক ব্যক্তি বা একটি নির্বাচনের জন্য ছিল না। আমি ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছি এবং একসঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছি। আশা করি, সব আমেরিকানের জন্য তিনি একজন সফল প্রেসিডেন্ট হবেন।’ অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ের পর নিউইয়র্কে দলের প্রচার সদর দপ্তরের সামনে সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি মাত্রই পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারির কাছ থেকে ফোন পেয়েছি। তিনি আমাদের জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কঠিন লড়াইয়ের জন্য আমিও তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে ধন্যবাদ জানিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘হিলারি দীর্ঘ এবং কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে কাজ করেছেন এবং দেশের জন্য কাজ করায় তাঁর কাছে আমাদের অনেক ঋণ।’ রিপাবলিকান, ডেমোক্রেটিক ও ইনডিপেনডেন্ট পার্টির সবার প্রতি একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমেরিকার বিভক্তির ক্ষত জোড়া দেওয়ার, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এখন সময়। প্রত্যেক নাগরিকের কাছে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমি সব আমেরিকানের প্রেসিডেন্ট হব এবং এটা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
যুক্তরাষ্ট্রের যে নাগরিকেরা তাঁকে সমর্থন করেননি, তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে কাজ করতে এবং আমাদের এই মহান দেশকে একতাবদ্ধ করতে পথনির্দেশনা এবং সহায়তার জন্য আমি আপনাদের দিকে হাত বাড়াচ্ছি।’ নির্বাচনী প্রচারের সময়ে নানা মন্তব্যের কারণে আলোচিত-সমালোচিত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়-উত্তর ভাষণ ছিল একদমই আলাদা। কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প নির্বাচনে জয়ের জন্য যত অপকৌশলই নিন না কেন, বিজয়ের পর পাল্টে যাবেন। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি বাস্তবমুখী পদক্ষেপই নেবেন। অনেকে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে ভারতের বিগত লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির ভাষাভঙ্গির তুলনা করে সান্ত্বনা খুঁজেছেন। মোদিও নির্বাচনী প্রচারে কথিত অভিবাসী খেদাও স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি কংগ্রেসকে তুলাধোনা করেছিলেন। এখন তিনি অভিবাসী প্রশ্নে নীরব এবং কংগ্রেসের সঙ্গে সহাবস্থানের নীতি নিয়েছেন। এবার দেখা যাক আমেরিকার নির্বাচনী উত্তাপটা প্রশান্ত মহাসাগর পার হয়ে বুড়িগঙ্গার তীরে কেমন অভিঘাত সৃষ্টি করল। আমরা সবাই জানি, বুড়িগঙ্গার পানি অত্যন্ত ময়লাযুক্ত, ব্যবহারের অনুপযোগী। কিন্তু আমাদের রাজনীতিকদের মনটা বর্ষার টলটলে পানির মতো পরিষ্কার, তা বলা যাবে না। এ কারণে আমেরিকায় যখন নির্বাচনী ঝগড়া মিটমাট হয়ে গেল (যদিও বিভিন্ন শহরে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ চলছে), তখন সেই নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ঝগড়াটা চাঙা হয়ে উঠল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী,
স্পিকার ও বিএনপির চেয়ারপারসন—সবাই অভিনন্দন জানিয়েছেন। এটাই রীতি। হিলারি জিতলেও তাঁরা অভিনন্দন জানাতেন। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ট্রাম্পকে কেবল অভিনন্দন জানাননি; তিনি নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণও জানিয়েছেন। আমরা এত দিন জানতাম, উদার ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গেই আওয়ামী লীগের এবং রক্ষণশীল রিপাবলিকানদের সঙ্গে বিএনপির একটি আদর্শগত মিল আছে। এখন দেখা যাচ্ছে উল্টোটাই ঘটছে। রক্ষণশীলদের আওয়ামী লীগ কাছে টানছে এবং উদারপন্থীদের ঠেলে দিচ্ছে বিএনপির দিকে। বিএনপির নেতা রুহুল কবির রিজভী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আছে ডেমোক্রেটিক পার্টি, জিতেছেন রিপাবলিকান প্রার্থী। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মতামতেরই প্রতিফলন হয়েছে। বুধবার নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন থেকে যদি প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা নেন, তাহলে তিনি সত্য কথা বলবেন। তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ের কথা বলেন। আমার মনে হয়, এসব বলার ক্ষেত্রে ওনার মধ্যে কিছুটা লজ্জা আসবে।’ (প্রথম আলো, ১০ নভেম্বর ২০১৬) পরদিনই এর কড়া জবাব দিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ।
বৃহস্পতিবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপিকে নীতিহীন ও নীতিবিবর্জিত দল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচন থেকে আপনারাও শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করুন। এটাই শিক্ষা নিন যে জনগণই সব ক্ষমতার মালিক। জনগণের বাইরে ষড়যন্ত্র করে কিছু হয় না।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের এই নেতা আরও যোগ করেন, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সব সময় জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কে নির্বাচিত হবেন, তা নির্ধারণ করবেন সেই দেশের ভোটাররা। বিএনপি কখনো জনগণের প্রতি আস্থাশীল নয়। তারা সব সময় ষড়যন্ত্রে বিশ্বাসী। যেসব দেশের আন্তর্জাতিকভাবে একটা প্রভাব আছে, তারা সব সময় সেসব দেশের নির্বাচনের দিকে চেয়ে থাকে। আগবাড়িয়ে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। এগুলো করে যে কোনো লাভ হয় না, তা সম্প্রতি আমাদের দেশের পার্শ্ববর্তী দেশের নির্বাচনের ফলাফলে তাঁরা বুঝতে পেরেছেন।’ হানিফ ও রিজভী—দুজনই দুই দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। সাধারণ সম্পাদক বা মহাসচিবের অনুপস্থিতিতে তাঁরা নিজ নিজ দলের মুখপাত্র হিসেবে কথা বলেন। সেই দুই নেতা যখন পরস্পরকে আমেরিকার নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিতে বলেন, তখন সেটি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হয় বৈকি। ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় থাকতে রিপাবলিকান প্রার্থীর বিজয় থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন রিজভী সাহেব। কিন্তু সে জন্য তো নির্বাচনে আসতে হবে, নির্বাচন বর্জন করে কিংবা লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি পালন করে শিক্ষা নেওয়া যাবে না। আবার হানিফ সাহেব তাঁর প্রতিপক্ষকে জনগণ যে ক্ষমতার মালিক, সে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ কথার অর্থ হলো, জনগণ যাঁকে চাইবে, তিনিই ক্ষমতায় থাকবেন বা আসবেন। কথা হলো, বাংলাদেশে সেই সুযোগ কতটা আছে?
২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও পরবর্তী স্থানীয় সরকারের সব কটি নির্বাচনে তারা অংশ নিয়েছে। কিন্তু সেখানে কি জনগণের প্রতিফলন ঘটেছে, সে কথা আওয়ামী লীগের নেতারাও বলতে পারবেন না। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এতটাই বিশৃঙ্খল ও সংঘাতপূর্ণ ছিল যে, তাঁরাও বিব্রত বোধ করেছেন। তাই আমরা মনে করি, আমেরিকার নির্বাচন থেকে দুই পক্ষেরই শিক্ষণীয় আছে। সেখানে যে দলই জয়ী হোক না কেন, কেউ ভোট কারচুপির অভিযোগ আনেনি। সেখানে নির্বাচনী প্রচারের সময় যতই কাদা-ছোড়াছুড়ি হোক না কেন, নির্বাচনের পর বিজয়ী ও বিজিত—উভয়ই একযোগে কাজ করার কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন রিপাবলিকান দল থেকে। সিনেট ও কংগ্রেসেও তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর মানে এই নয় যে তাঁরা দেশ পরিচালনায় ডেমোক্র্যাটদের কোনো কথাই শুনবেন না। আর ডেমোক্র্যাটরাও নির্বাচনের পরদিন থেকে মানি না মানব না বলে মাঠ গরম করবেন না। আমেরিকায় নির্বাচনে হারলে বিজিত পক্ষ যেমন জনগণের রায় মেনে নেয়, তেমনি বিজয়ী পক্ষ বিজিতদের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে না। এই শিক্ষাটুকু আমাদের দেশপ্রেমিক আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা মনে রাখলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত।
পাদটীকা: লেখাটি যখন শেষ করেছি, তখনই পত্রিকায় দেখলাম, সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিএনপি সমর্থন করেছে বলেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন হেরেছেন। খবরটি পড়ে এক বন্ধু মন্তব্য করলেন, তাহলে তো আগামী নির্বাচনে বিএনপির উচিত হবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা। অন্য কোনো উপায়ে আওয়ামী লীগকে হারানোর উপায় আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার উৎসের সন্ধানে by হায়দার আকবর খান রনো

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ঘটে যাওয়া জঘন্য ঘটনার জন্য নতুন করে নিন্দা জানাতে আমি কলম ধরিনি। দেশব্যাপী তো নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের যেতে হবে সমস্যার অনেক গভীরে। প্রথম আলোর ৫ নভেম্বরের সংখ্যায় কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান এক নিবন্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ওপর বিস্তারিত আলোচনার পর শেষ বাক্যে একটি বিরাট প্রশ্ন রেখেছেন। ‘এর (সহিংসতা) পেছনে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মনস্তাত্ত্বিক কারণটাই বা কী?’
এর পরিপূর্ণ উত্তর আমার জানা নেই। তবে যেটুকু উত্তর হয় বলে মনে করি, তা-ও খবরের কাগজের সীমাবদ্ধ পরিসরে দেওয়া সম্ভব নয়। আমি কিছু পয়েন্ট ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। তবে মূল একটা জায়গায় আমি জোরের সঙ্গে বলতে পারি যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ অসাম্প্রদায়িক, উদারপন্থী ও গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন। আহার, বিবাহ, ছেলেমেয়েদের নাম রাখা ইত্যাদি ব্যাপারে পার্থক্য থাকলেও তারা সবাই একত্রে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে আসছে। এই দেশে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তন হয়েছিল সুফিবাদী ধর্ম প্রচারকদের দ্বারা। সুফি মতবাদের মধ্যে ছিল মানবতাবাদ ও উদারনৈতিক মনোভাব। অন্যদিকে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের আগেই এ দেশে সহজিয়া মতবাদ নামে একটি বেদবিরোধী লোকায়ত দর্শন ও সংস্কৃতির প্রভাব ছিল। এই লোকায়ত মতবাদের শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা ছিলেন মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্য, কবি চণ্ডীদাস এবং বাউল সাধকেরা, যাঁদের গান ছিল রবীন্দ্রনাথের ভাষায় গ্রামীণ গরিব জনগণের আদরের ধন। ঐতিহাসিক সুজিত আচার্য প্রমাণসহ দেখিয়েছেন যে, মধ্যযুগে বাংলার নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তাঁদের লোকায়ত দর্শন ও সংস্কৃতির সঙ্গে সুফি মতবাদী ইসলাম প্রচারকদের চিন্তাধারার ও জীবনাচরণের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন বলেই তাঁরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। উচ্চবর্ণ হিন্দু ও তথাকথিত আশরাফ বা সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের মধ্যে যে ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণা ছিল, তা সাধারণ গরিব হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কখনোই ছিল না। তবে ধর্মীয় পার্থক্য ও আচার-আচরণে কিছু পার্থক্য যে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে রেখেছে, তা রবীন্দ্রনাথের পর্যবেক্ষণেও ধরা পড়েছিল। তিনি লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষের এমনি কপাল যে, এখানে হিন্দু-মুসলমানের মতো দুই জাত একত্র হয়েছে;
ধর্মমতে হিন্দুর বাধা প্রবল নয়, আচারে প্রবল, আচারে মুসলমানের বাধা প্রবল নয়, ধর্মমতে প্রবল।’(কালান্তর) এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়েছিল ইংরেজ শাসকেরা। তবে তারা কেবল উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণ হিন্দু ও তথাকথিত সম্ভ্রান্ত মুসলমানের মধ্যেই পারস্পরিক বিদ্বেষ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। কখনো কখনো তা গরিব শ্রেণির মধ্যে প্রসারিত হলেও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। উদাহরণস্বরূপ অষ্টাদশ শতাব্দীর ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, যা ছিল বস্তুত কৃষক বিদ্রোহ। অথবা ঊনবিংশ শতাব্দীর সিপাহি বিদ্রোহ (১৮৫৭) অথবা প্রজা বিদ্রোহ ও নীলচাষি বিদ্রোহ—সবই ছিল হিন্দু-মুসলমানের মিলিত লড়াই। এর সঙ্গে বাংলার রেনেসাঁর মহাপুরুষদের অথবা নবাব আবদুল লতিফের মতো মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্র যখন হিন্দু পুনর্জাগরণের প্রবক্তা হয়ে উঠেছিলেন, তখন ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী ইংরেজের দেওয়া নবাব উপাধিধারী আবদুল লতিফ বাংলা ভাষাবিদ্বেষ ও হিন্দুবিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের উৎস খুঁজছেন বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষের বাইরে আরব, ইরান ও তুরস্কে। ওয়াহাবি ও ফরায়েজি আন্দোলন ছিল ব্রিটিশবিরোধী ও জমিদারবিরোধী জনপ্রিয় আন্দোলন এবং সে জন্য মহৎ। কিন্তু তার মধ্যে ধর্মীয় রং ছিল। যেমন ফরায়েজি নেতারা বললেন, ধুতি নাকি হিন্দুর পোশাক। ওয়াহাবি আন্দোলনের বীর নেতা শহীদ তিতুমীরও মুসলমানদের জন্য আরবি-ফারসিতে নাম রাখা ও আকিকা করার জন্য তাগিদ দিতেন। এসব প্রভাবে মুসলমানদের মধ্যে পোশাক-পরিচ্ছদ, সাংস্কৃতিক উৎসব (যথা নবান্ন) ইত্যাদি বিষয়ে হিন্দুদের থেকে পার্থক্য সৃষ্টি এবং অদ্ভুত ধরনের স্বাতন্ত্র্যবোধ তৈরির প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। কবি সোহরাব হাসান যে ধর্মীয় মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন, তার ঐতিহাসিক উপাদানের কিছু কিছু এসবের মধ্যে পাওয়া যাবে। তবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মূল কারণ সন্ধান করতে হবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের মধ্যে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে কাজে লাগিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। ১৯০৬ সালে একই বছর ব্রিটিশ শাসকদের সরাসরি মদদে সৃষ্টি হলো দুটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল—মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভা। পাকিস্তান আন্দোলনও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মদদে তৈরি হয়েছিল।
যদিও তা বিভিন্ন কারণে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট বাংলার মুসলিম লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও সহযোগিতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। পরে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের দাঙ্গাবাজেরা তাতে অংশ নেয়। অথচ সেই বছরই ফেব্রুয়ারি মাসে সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক নৌবিদ্রোহ, ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান নাবিকদের সশস্ত্র অভ্যুত্থান। আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের বিচার শুরু হলে রশীদ আলী দিবসকে কেন্দ্র করে কলকাতায় যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, তাতে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষ ছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ উপন্যাস চিহ্ন-এর নায়ক-নায়িকাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক দেখতে পাই। তারপর আগস্ট মাসে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এর মাত্র কয়েক মাস পর ১৯৪৬-এর নভেম্বর মাস থেকে শুরু হলো গ্রামবাংলা-কাঁপানো তেভাগা আন্দোলন—আবার হিন্দু-মুসলমানের মিলিত লড়াই। পাকিস্তান আন্দোলন ছিল সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল। কিন্তু মুসলমান মধ্যবিত্ত ও কৃষক এতে সমর্থন দিয়েছিলেন নিজ নিজ শ্রেণিস্বার্থের বিবেচনা থেকে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প পরেই তাঁদের মোহভঙ্গ ঘটে এবং তাঁরা ক্রমান্বয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদে দীক্ষা লাভ করেন। ষাটের দশকে এই দীক্ষা পূর্ণতা লাভ করেছিল। ১৯৬৪ সালে তদানীন্তন আইয়ুব-মোনায়েম সরকারের সরাসরি উদ্যোগে ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, যাতে বহু হিন্দু নাগরিক নিহত হন। কিন্তু তখন বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সংবাদ ও ইত্তেফাক এই দুটি দৈনিকে একই সম্পাদকীয় লেখা হলো ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’। শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বায়ক এবং কমিউনিস্ট পার্টির আলী আকসাদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়েছিল,
যার কার্যালয় ছিল ভাসানী ন্যাপের সাইদুল হাসানের (যিনি ১৯৭১ সালে শহীদ হয়েছিলেন) তোপখানা রোডের অফিসে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একধরনের জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল। দাঙ্গা প্রতিরোধ করতে গিয়ে যে আমীর হোসেন চৌধুরী জীবন দিয়েছিলেন, সে কথা সোহরাব হাসান তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ যত বিকশিত হবে, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা তত অপসারিত হবে। আর শ্রেণিসংগ্রাম যত তীব্র হবে, সাম্প্রদায়িকতা তত পরাভূত হবে। ষাটের দশকে শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল। আর জাতীয়তাবাদের যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তা-ই পাকিস্তানি ভাবাদর্শকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল। অন্যথায় একাত্তর সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ হতেই পারত না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কীভাবে আবার সাম্প্রদায়িকতা বিস্তার লাভ করল, সেটাই দেখার বিষয়। ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের উত্তাপ থাকতে থাকতেই যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, তাতে ধর্মনিরপেক্ষতা অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান ক্ষমতা সংহত করার জন্য আপস করলেন পাকিস্তানি ভাবাদর্শের সঙ্গে। মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি দলকে রাজনীতি করার সুযোগ দিলেন; নিজের দলে ও মন্ত্রিসভায় তাঁদের স্থান দিলেন। এভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তি পুনর্জীবিত হলো। সাম্প্রদায়িকতাও ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করল।
জাতীয়তাবাদী শক্তির বিশ্বাসঘাতকতা ও বাম শক্তির ব্যর্থতাও এর জন্য দায়ী। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবিদার আওয়ামী লীগেও ইতিমধ্যে ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। হিন্দু সম্পত্তি দখলের প্রবল আকাঙ্ক্ষা এই দলের বহু নেতা-কর্মীকে সাম্প্রদায়িকতার জায়গায় নিয়ে গেছে। সোহরাব হাসান তাঁর লেখায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আর্থসামাজিক কারণ জানতে চেয়ে যে প্রশ্ন করেছেন, আমার মনে হয় সম্পত্তি দখলের প্রবণতার মধ্যে সেই প্রশ্নের কিছুটা উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত অভিযোগ করেছেন, কয়েক বছর ধরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা জড়িত ছিলেন। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির বলেছেন, আওয়ামী লীগে জামায়াতীকরণ হয়েছে (প্রথম আলো, ৫ নভেম্বর ২০১৬)। সরকারদলীয় জনৈক মন্ত্রী ও জনৈক সাংসদ নাকি হিন্দুদের সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। রামুর ঘটনাতেও আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত সবাই জড়িত ছিল। নাসিরনগরে পুলিশ ও প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ছিল। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ জড়িত নয়।
কিন্তু স্বার্থান্বেষী লোক ভুয়া অজুহাতে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে সম্পত্তি দখলের মতলব করে। আর এই দখল করার প্রবণতা উৎসাহ পায়, আশ্রয় পায় ক্ষমতাসীন মহল থেকে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্য ভাবাদর্শগত সহায়তা পায় শাসকগোষ্ঠীর আদর্শহীনতার রাজনীতির কাছ থেকে। সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম রেখে দেওয়া তেমনি আদর্শহীনতা ও আপস-আত্মসমর্পণের রাজনীতির বড় উদাহরণ। সরকারের মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন পর্যন্ত বলেছেন, ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে রাজনীতি। তিনি যথাযথই বলেছেন, ওই সংবিধানে ফিরে না গেলে রামু, সাঁথিয়া ও নাসিরনগরের মতো সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটতেই থাকবে। ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে বাধা কোথায়? বঙ্গবন্ধু যে সাহস দেখিয়ে ’৭২-এর সংবিধান রচনা করেছিলেন, শেখ হাসিনার পক্ষে সেখানে ফিরে যেতে বাধা কোথায়? অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন করার মতো যে সাহস দেখিয়েছেন শেখ হাসিনা, সেই সাহস তিনি কেন দেখাচ্ছেন না এ ক্ষেত্রে? বাধাটা আসলে কোথায়? বাধাটা কি তাঁর দলের মধ্যেই? বাধাটা কি সেই লুটপাটকারী শ্রেণির মধ্যেই, যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছে তাঁর দল?
হায়দার আকবর খান রনো: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।