Monday, June 23, 2025

‘মানুষ ট্রাম্পের ওপর বিরক্ত, তিনি যা বলেন তা করেন না’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলা করার পর রিপাবলিকান দলে বিভক্তি দেখা গেছে। সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা উপসচিব ল্যারি কর্ব বলেন, ট্রাম্প ইরানকে উসকে দিয়েছে। এখন ইরান হয়তো অঞ্চলের মার্কিন সেনাদের ওপর আক্রমণ করতে পারে।

আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘মানুষ ট্রাম্পের ওপর বিরক্ত, কারণ তিনি যা বলেন তা করেন না। তিনি বলেছিলেন, তিনি দুই সপ্তাহ সময় দিতে চান যাতে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকে। কিন্তু মাত্র দুই দিন পরই তিনি হামলা চালান।’

তবুও, বেশিরভাগ রিপাবলিকান নেতারা ট্রাম্পকে সমর্থন করে যাচ্ছেন। ল্যারি কর্ব বলেন, ‘অনেকে তার সঙ্গে একমত না হলেও সমর্থন করছেন, কারণ তিনি তাদের প্রেসিডেন্ট এবং তারা পরবর্তী নির্বাচনের চিন্তায় আছেন।’

কর্ব আরও বলেন, ট্রাম্প ইরানের সরকার ফেলার ব্যাপারে দ্বিধায় আছেন।

তিনি বলেন, ‘তিনি দুই দিকেই যেতে চান। তিনি ইরানে হামলা করেছেন, এখন সেই হামলা কতটা সফল হয়েছে তা বোঝার চেষ্টা করছেন। আবার বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আরও কিছু করবেন, কিন্তু কী করবেন তা স্পষ্ট করছেন না। তার উপদেষ্টারা বলছেন, তারা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ধ্বংস করে সফল হয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প থামতে চান না, কারণ এখন তিনি এগিয়ে আছেন। তিনি আরও এগোতে চান।’

এদিকে ইরানে মার্কিন বিমান হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। বাজার খোলার পরপরই ব্রেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল চুক্তি ডব্লিউটিআই- উভয়ের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে যায়।

এএফপির খবরে বলা হয়, পরে কিছুটা কমলেও সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ২০ ডলার, যা ২ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। আর ডব্লিউটিআই ছিল ৭৫ দশমিক ৯৮ ডলার, যা ২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

জাপানের এমইউএফজি ব্যাংকের অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, এ যুদ্ধ কতদিন চলবে বা কী পরিণতি হবে— সে অনিশ্চয়তা থেকেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আরও ১০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

ট্রাম্পের ইরান আক্রমণ: নেতানিয়াহুর অনন্ত যুদ্ধের মূল্য হবে চড়া by আবেদ আবু শাদেহ

ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্তকে কোনো যুক্তি দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায় না। এই আক্রমণ ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সামরিক নীতির সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক। এত দিন ধরে ইসরায়েলের সামরিক নীতির লক্ষ্য ছিল, স্বল্পকালীন, নিষ্পত্তিমূলক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সুস্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করা। ইসরায়েলের এই সামরিক নীতির পেছনে কাজ করেছে দেশটির ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও জনমিতিক নাজুকতা।

এখন আমরা দেখছি যে ইসরায়েল তার আগের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। কৌশলগত বাস্তবতাকে পরিত্যাগ করে ইসরায়েল এখন একটি ধর্মচালিত যুদ্ধের পথে হাঁটছে, যে যুদ্ধের কোনো শেষ নেই।

এই পরিবর্তন অত্যন্ত স্পষ্ট। পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট উপনিবেশবাদী প্রকল্প থেকে ইসরায়েল এখন ধর্মীয় ত্রাতাবাদী উপনিবেশিক শক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথ খুঁজছে। আর এই প্রকল্পের অস্তিত্ব নির্ভর করছে চিরস্থায়ী যুদ্ধের ওপর। যুদ্ধের যুক্তিতে ক্রমবর্ধমানভাবে ধর্মীয় ভাষার ব্যবহার এবং সৃষ্টিকর্তাকে পক্ষ হিসেবে বারবার টেনে আনা, সেই কাঠামোগত পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়।

আজ রোববার যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে তারা ইরানের ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান—এই তিন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব হামলাকে ‘অত্যন্ত সফল’ বলে বর্ণনা করেছেন।

ইরানি কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছেন যে হামলায় ফর্দোসহ কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফর্দো হলো ইরানের কুম শহরের কাছে পাহাড়ের নিচে আধা কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত একটি গোপন পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ট্রাম্পের বোমা হামলাকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ বলেছেন। তিনি বলেছেন, এটি ‘ইতিহাসকে বদলে দেবে’।

এই হামলার পর নিজ দেশেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন নেতানিয়াহু। তাঁর সেক্যুলার বিরোধী পক্ষ যারা আগে তাঁর বিভিন্ন সামরিক অভিযানকে সমর্থন দিয়েছিল, তারাই এখন প্রশ্ন তুলছে, অন্তহীন সংঘাতের জন্য কেন তারা তাদের ভালো জীবনমানকে উৎসর্গ করবেন।

একই সঙ্গে, সামরিক এজেন্ডা টিকিয়ে রাখার জন্য নেতানিয়াহু ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করেছেন। ইরান নয়, বরং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধক্ষেত্রই এখন নেতানিয়াহুর সবচেয়ে কঠিন লড়ইয়ের ময়দান।

একটি অদ্ভুত কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো ইসরায়েলি নাগরিকদের চলাচলের স্বাধীনতার নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এর মধ্যে রয়েছে বেঞ্জুরিয়ন বিমানবন্দর দিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সম্প্রতি জর্ডান বা মিসর হয়ে ইসরায়েলি নাগরিকদের ফেরার ব্যাপারেও সতর্কবার্তা দিয়েছে।

যদিও এখনো ইসরায়েল থেকে কিছু ফ্লাইট ছেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু বেশির ভাগই পর্যটক ও বিদেশি বাসিন্দাদের জন্য সংরক্ষিত। ফলে ইসরায়েলি নাগরিকেরা কার্যত দেশের ভেতরে আটকে পড়েছেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে স্পষ্ট একটি রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। এই সিদ্ধান্তে মধ্যবিত্তদের মধ্যে বিরোধী দলের যে ভোটার ভিত্তি আছে, তাদের ওপরই এর প্রভাব পড়বে। কেননা, দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশভ্রমণের সামর্থ্য তাদের রয়েছে। অন্যদিকে লিকুদ পার্টির মূল ভোটব্যাংক মূলত প্রান্তিক এলাকার শ্রমজীবী মানুষ। এই সিদ্ধান্তের কারণে তাদের ওপর প্রভাব পড়বে সামান্যই।

এদিকে, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে (এমনকি তারও আগে ইসরায়েলের বিচার বিভাগীয় সংস্কারের সময় থেকে) অনেক ইসরায়েলি তাঁদের অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিচ্ছেন। গত মার্চ মাসে একটি আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ইসরায়েল থেকে বিদেশে টাকা স্থানান্তরের জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল থেকে অন্য দেশে অর্থ স্থানান্তরের হার সাত গুণ বেড়েছে। ওই বছরই প্রায় ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বাইরে পাঠানো হয়েছে।

নেতানিয়াহুর জন্য এই বাস্তবতা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বছরের পর বছর ধরে তিনি প্রচার চালিয়ে আসছেন যে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির মাধ্যমে ইসরায়েল তার অত্যাধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত সামরিক বাহিনী পুষতে পারবে। তাঁর অতি-দক্ষিণপন্থী জোটসঙ্গীরা অর্থনীতিতে খুব সামান্যই অবদান রাখেন। অথচ সেই ধর্মান্ধ মিত্ররাই আরও যুদ্ধ ও ভূমি দখলের চাপ দিয়ে চলেছে।

কূটাভাস এই যে ইসরায়েলের সমাজের যে অংশটি অর্থনীতিতে জোরালো অবদান রাখে, তারা নেতানিয়াহু সরকারের বিরোধী পক্ষ। কিন্তু তারা এত দিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধের বিরোধিতা করেনি। বরং তারা ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা পশ্চিমা মানের জীবনযাপন বজায় রাখতে চায়।

জায়নবাদী মূল্যবোধের সমালোচনা করার সক্ষমতা তাদের নেই। কারণ, তাদের শেখানো হয় যে বিশ্ব জন্মগতভাবেই সেমেটিকবিরোধী, তাই বাঁচতে হলে তরবারি হাতে নিয়েই বাঁচতে হবে। এই ব্যর্থতা কিংবা অনীহার সুযোগটাই নিয়েছেন নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা। ফলে ইসরায়েলের একটি শ্রেণির অর্থনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা ইসরায়েলকে দ্রুততার সঙ্গে একটি ধর্মীয় ত্রাতাবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করছে। এর ভিত্তি হলো বর্ণবাদী নীতিমালা ও ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শ।

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে এই প্রবণতা আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় ইহুদি ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনি নাগরিকদের, এমনকি বিদেশি শ্রমিকদেরও আশ্রয়কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দিয়েছেন।

নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে এমন একটি জাতিগত ধর্মীয় ও মুক্তবাজারি রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করাতে চান যে রাষ্ট্র চিরস্থায়ীভাবে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত থাকবে। যত ধ্বংসযজ্ঞই হোক না কেন, তাতে কিছু যায়–আসে না। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, ইরানের প্রতি ইসরায়েলের সমালোচনার যুক্তি কিন্তু এটাই।

যেসব ইসরায়েলি এই যুদ্ধের পরিণতি বুঝতে পারছেন, তাঁরা ইতিমধ্যেই বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছেন। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ধ্বংস হওয়ার চেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ আরও ব্যাপক। ইসরায়েলের বেসামরিক অর্থনীতি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। দেশটি এখন জরুরি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কেবল অত্যাবশ্যকীয় ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখা হচ্ছে।

একদিকে এ পরিস্তিতি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে মানসিক চাপও বাড়ছে। কেননা, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়টি এখন বাস্তব।

* আবেদ আবু শাদেহ, জাফার রাজনৈতিক কর্মী
- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে

ইসরায়েলের বেইত শেইন শহরে ইরানি হামলায় বিধ্বস্ত একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করছেন ইসরায়েলি সেনা সদস্য ও জরুরি উদ্ধারকর্মীরা। ইসরায়েল, ২১ জুন ২০২৫
ইসরায়েলের বেইত শেইন শহরে ইরানি হামলায় বিধ্বস্ত একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করছেন ইসরায়েলি সেনা সদস্য ও জরুরি উদ্ধারকর্মীরা। ইসরায়েল, ২১ জুন ২০২৫ ছবি: এএফপি

এক সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ফাঁদে যেভাবে পা দিলেন

নির্বাচিত হওয়ার পর ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে একটি নতুন সম্পর্ক স্থাপন করতে আগ্রহী। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদের ১৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার পর মনে হচ্ছে ট্রাম্প তার পূর্বসূরীদের মতো একই ফাঁদে পড়েছেন এবং ইরানের উপর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন নেতানিয়াহুর সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে- ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোতে সরাসরি হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলে ব্যবহার করেছেন। এমনকি ওয়াশিংটন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকেও ইরানের ওপর সামরিক হামলা করা থেকে প্রতিহত করতে পারেনি। ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের কয়েকদিন আগে, মধ্যপ্রাচ্যে তার রাষ্ট্রদূত স্টিভ উইটকফ ইসরাইলে প্রবেশ করে শাব্বাতে নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করার দাবি জানান, যাতে তিনি গাজায় হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। সেই সময়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এটিকে ‘ট্রাম্প ফ্যাক্টর’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। অনেকেই সেইসময়ে বলেছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিচক্ষণতা এবং চুক্তি করার দক্ষতা প্রভাবশালী ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে একটি নির্ণায়ক সুবিধা প্রদান করতে পারে।

নেতানিয়াহু যদিও পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলোকে এই অঞ্চলে তার সামরিক অভিযানকে সমর্থন করার জন্য কৌশলে ব্যবহার করেছিলেন। ইসরাইলের কিছু সমালোচক নেতানিয়াহুর এই কৌশল প্রতিহত করার জন্য ট্রাম্পের প্রশংসা করতেও শুরু করেছিলেন। কিন্তু শনিবারের ঘটনার পর যখন প্রথমবারের মতো মার্কিন বি-২ বোমারু বিমান ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে তখন এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ট্রাম্পের অন্তর্দৃষ্টি পরিবর্তিত হয়েছে। এমনকি তার অভ্যন্তরীণ দলের সদস্যরাও পররাষ্ট্রনীতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ট্রাম্পের যুদ্ধের প্রতি জনসমক্ষে বিতৃষ্ণা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনও সংঘাতে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি পুনরায় ক্ষমতায় আসার ২০০ দিনেরও কম সময়ের মধ্যে উধাও হয়ে গেছে। জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়ার পর ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে ওঠা গুজবকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। শনিবারের হামলার পর ট্রাম্পকে বলতে শোনা গেছে, 'আমি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানাতে চাই। আমরা এমন একটি দল হিসেবে কাজ করেছি যা সম্ভবত আগে কোনও দল কখনও করেনি এবং আমরা ইসরাইলের সামনে এই ভয়াবহ হুমকি মুছে ফেলার জন্য অনেক দূর এগিয়ে গেছি।

ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে ইসরাইলি বোমা হামলার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া থেকে শতহস্ত দূরে ছিল। কারণ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হামলাগুলোকে  ‘একতরফা’ বলে অভিহিত করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে ‘আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত হবে না এবং আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এই অঞ্চলে আমেরিকান বাহিনীকে রক্ষা করা।’

বলা বাহুল্য, এক সপ্তাহে অনেক কিছুই বদলে গেলো। এখন মনে হচ্ছে আমেরিকা ইসরাইলি হামলাকে পুরোপুরি সমর্থন করেছে এবং আক্রমণে যোগ দিয়েছে, যা সম্ভাব্যভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাতে পারে এমন ধারাবাহিক উত্তেজনার ক্ষেত্র তৈরি করছে। ভবিষ্যতের জন্য এর অর্থ কী? ট্রাম্প প্রকাশ্যে এবং ব্যক্তিগতভাবে দাবি করেছেন যে ফোর্দো, নাতানজ এবং এসফাহানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাইটগুলোতে মার্কিন হামলা এককালীন অভিযান ছিল এবং এটি নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীকে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে এবং ট্রাম্প তেহরানকে বলেছেন যে, সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হলে আমেরিকাও আরও হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত। তবুও ট্রাম্পের নিজস্ব প্রশাসনের কর্মকর্তারা যার মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও রয়েছেন, সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তেহরান প্রতিশোধ নিলে ইরানে দীর্ঘমেয়াদী মিশনের সম্ভাবনা রয়েছে। আপাতত, ট্রাম্প মধ্যম পন্থা অবলম্বনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে তিনি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে পরিচালিত করে এমন উত্তেজনা রোধ করতে আগ্রহী।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র নেতানিয়াহু একটি ভিডিও বিবৃতিতে বলেছেন, ‘অভিনন্দন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসাধারণ ও ন্যায়নিষ্ঠ শক্তি দিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার আপনার সাহসী সিদ্ধান্ত ইতিহাস বদলে দেবে।’

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরান-ইসরাইলের যুদ্ধে জড়ালো যুক্তরাষ্ট্র

ভোরের আলো তখনো ঠিকমতো ফোটেনি। অনেক মানুষ গভীর ঘুমে। ঠিক এমন সময় বিকট শব্দ। বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে রাজধানী তেহরান, কোম নগরী আর ইস্ফাহান। তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় থর থর করে কেঁপে ওঠে চারদিক। সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য তো অবশ্যই, তার বাইরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এক হিম শিহরণ। এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে সবাইকে। অপারেশন মিডনাইট হ্যামার নামের হামলার মধ্যদিয়ে ইরান যুদ্ধে ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়লো যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলায় ইরান আক্রান্ত  হলেও সেই ইরানকেই পাল্টা জবাব দেয়ার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছে বৃটেন। প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেয়া হবে না। তাদেরকে সংযত থেকে কূটনৈতিক ব্যবস্থায় সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের ডেপুটি চেয়ারম্যান দমিত্রি মেদভেদেভ বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র দিতে প্রস্তুত একাধিক দেশ। একই সঙ্গে রাশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা লিওনিদ স্লুটস্কি বলেছেন, সহিংসতার পরিণতি এ অঞ্চলের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। দেখা দিতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এ অবস্থায় আজ সোমবার রাশিয়া সফরে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। পরিস্থিতি প্রতি মুহূর্তে পাল্টে যাচ্ছে। ফলে যেকোনো একটি ছোট্ট ভুলের কারণে মধ্যপ্রাচ্য জ্বলে ছারখার হয়ে যেতে পারে। বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে উদ্বেগ, সতর্কতা দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া মিশ্র। তারা অবস্থান পরিষ্কার করছে না।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা যখন আক্রান্ত তখন সৌদি আরব থেকে প্রতিক্রিয়া দেয়া হয়- ইরানে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ফলে তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করা যায়নি। মুসলিমদের মোড়ল হিসেবে এটাই কী তাদের জন্য যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া! এমন জিজ্ঞাসা জনে জনে। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন অভিযানের। বলেন, শত্রুদের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। ইরানে আরও স্থাপনা আছে। ইরান যদি দ্রুত চুক্তিতে না আসে তবে সেগুলোকে টার্গেট করা হবে। তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূয়সী প্রশংসা করেন। হামলায় ব্যবহার করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টিলথ যুদ্ধবিমান। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আছে এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত যুদ্ধ এখন একটি দেশের বিরুদ্ধে- তারা ইরান। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশের আক্রমণের মুখে পড়ে মাথানত না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইরানি নেতারা। পক্ষান্তরে তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন আহ্বানের অনুরোধ করেছেন। বিশ্বনেতারা এ আতঙ্কে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। রাশিয়া সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার এক বিবৃতিতে বলেছে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন।

এ হামলার পেছনে যে যুক্তিই দেয়া হোক না কেন- আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবগুলোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এই হামলা। আমরা আগ্রাসন বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছি। চীনও কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি আবার ইরাকের সেই একই ভুল করছে ইরানে? ২০০৩ সালে তাদের ইরাক আক্রমণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও অস্থিতিশীলতা এনেছে। ইতিহাস বার বার তা প্রমাণ করেছে। পরিস্থিতি নিয়ে জাপান সহ বিভিন্ন দেশ জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক আহ্বান করেছে। এখন ইরান কী জবাব দেবে- সেটা দেখার বিষয়। আগে থেকেই তারা সতর্ক করেছে। বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত হয় তাহলে তাদের ঘাঁটি টার্গেট করা হবে। একই সঙ্গে ইসরাইলকে যেসব প্রতিবেশী দেশ সহযোগিতা করবে তাদের পরিণতিও একই হবে। তবে তাদেরকে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। বলেছেন, ইরান কোনো হামলা চালালে তার ভয়াবহ জবাব দেয়া হবে। তাদের অভিযানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। ইরান অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সামরিক জবাব দেয়নি। তবে তারা আক্রান্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ইসরাইলে বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসেবে ইসরাইল এর ফলে ক্ষয়ক্ষতিকে কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করে। অন্যদিকে তারাও ইরানে হামলা চালায়। গতকাল দফায় দফায় এ হামলা ও পাল্টা হামলা হতে থাকে।

ট্রাম্পের ঘোষণা: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের  ফরদোসহ ৩টি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এগুলো হলো ফরদো, নাতানজ ও ইস্ফাহান। তিনি একে ‘অত্যন্ত সফল’ অভিযান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেন, ফরদো স্থাপনাটিতে ‘পূর্ণ ক্ষমতার’ বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। তবে ইরান জানিয়েছে, হামলার আগেই ওইসব স্থাপনা থেকে তারা পারমাণবিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে। ওদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও ফরদো স্থাপনাটিতে ‘শত্রু পক্ষের আক্রমণ’ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা সম্পর্কে এখনো কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি। বিশ্ব নেতারা ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

‘ইসরাইলের পাশে যুক্তরাষ্ট্র, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস’- ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প টেলিভিশন ভাষণে জানিয়েছেন, ইরানের ফরদো, নাতানজ ও ইস্ফাহানে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর চালানো বিমান হামলা ছিল ‘চমৎকার সামরিক সাফল্য’। তিনি বলেন, এসব স্থাপনা সম্পূর্ণরূপে এবং একেবারে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষণ ছিল সংক্ষিপ্ত- মাত্র চার মিনিট। কিন্তু তাতে ছিল বিস্ফোরক বার্তা, যুদ্ধের হুমকি এবং একটি স্পষ্ট অঙ্গীকার-  ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করেছে। ইরানকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এই ভয়ঙ্কর হুমকি মুছে ফেলতে হবে। ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরানের কুদ্‌স বাহিনীর সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলায়মানি হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছেন। আমি অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমি আর এটা চলতে দেবো না। এটা এখন থেমে যাবে। তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আমরা একটি টিম হিসেবে কাজ করেছি। এই অভিযান ছিল ইসরাইলের জন্য একটি ঐতিহাসিক বিজয়। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আজকের আক্রমণ ছিল সবচেয়ে কঠিন ও সম্ভবত সবচেয়ে বিধ্বংসী। কিন্তু যদি দ্রুত শান্তি না আসে, তাহলে পরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আরও নিখুঁত, দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে হামলা হবে। তিনি বলেন, রোববার ভোরের হামলা কেবল শুরু। আমাদের হাতে এখনো অনেক লক্ষ্য আছে। এ সময় তার পাশে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা।’

ট্রাম্পকে অভিনন্দন নেতানিয়াহুর, বললেন ‘ইতিহাস বদলে যাবে’: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলার পর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এক ভিডিও বার্তায় তিনি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘দুর্ধর্ষ ও ইতিহাস বদলানো’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন। নেতানিয়াহু বলেন- ‘অভিনন্দন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায়সঙ্গত ও ভয়ঙ্কর শক্তিতে আঘাত হানার যে সাহসিক সিদ্ধান্ত আপনি নিয়েছেন, তা ইতিহাস বদলে দেবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘অপারেশন রাইজিং লায়নে  ইসরাইল অসাধারণ কিছু করেছে। কিন্তু শনিবার রাতে আমেরিকার অভিযান তুলনাহীন।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানের সকল বিকল্প উন্মুক্ত: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে চালানো বিমান হামলাকে ভয়াবহ উস্কানি বলে অভিহিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেছেন এই হামলার স্থায়ী পরিণতি থাকবে। ইরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সকল বিকল্প উন্মুক্ত রেখেছে। তিনি শনিবার এক্সে দেয়া এক পোস্টে লিখেছেন, রোববারের ঘটনাগুলো চরমভাবে উদ্বেগজনক এবং তা বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের এখনই সজাগ হওয়া উচিত। আরাঘচি আরও বলেন, যে দেশ নিজেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য, সেই যুক্তরাষ্ট্রই আজ জাতিসংঘ সনদের চরম লঙ্ঘন করেছে। তিনি এটিকে আইনবহির্ভূত, অপরাধমূলক এবং বিশ্বশান্তির জন্য সরাসরি হুমকি বলে আখ্যায়িত করেন। ‘সকল বিকল্প উন্মুক্ত’ রাখার ঘোষণা ইঙ্গিত করছে যে, ইরান প্রতিশোধমূলক সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারে বা মিত্রদের মাধ্যমে প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার ঘটাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা: যুদ্ধের সমাপ্তি, না কি নতুন ধ্বংসযুদ্ধের শুরু?: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর নতুন করে উত্তেজনার আগুন জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্যে। প্রশ্ন এখন একটি- এটা কি যুদ্ধের শেষ পর্বের সূচনা, না কি আরও ভয়াবহ একটি অধ্যায়ের দরজা খুলে গেল? ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে এসেছে, তারা এককভাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু এটাও সবার জানা, বিশেষ করে ফরদোর মতো মাটির অনেক গভীরে নির্মিত স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ঙ্কর শক্তিশালী বোমাগুলোর- যা কেবল আমেরিকারই রয়েছে। এখন যদি সত্যিই ফরদো, নাতানজ ও ইসফাহানের স্থাপনাগুলো অকার্যকর হয়ে যায়, তাহলে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার মূল লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলে ঘোষণা দিতে পারেন। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়- এই অভিযান কি শেষ না নতুন শুরু?

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক চাইলো ইরান: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের দাবি জানিয়েছে ইরান। এই দাবির কথা জানিয়েছে আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি। জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী মিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের চরম লঙ্ঘন। এটি একটি স্পষ্ট ও বেআইনি আগ্রাসন। ইরানি মিশন জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, এই বর্বর হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া ভাষায় নিন্দা জানানো হোক এবং জাতিসংঘ সনদের আওতায় পরিষদের দায়িত্ব অনুযায়ী সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে এই অপরাধের নায়ক দায়মুক্তি না পায় এবং পূর্ণ জবাবদিহির আওতায় আসে। ইরান এই হামলাকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন এবং জাতিসংঘ সনদের ২ (৪) ধারা অনুযায়ী ‘অবৈধ শক্তি প্রয়োগ’ হিসেবে চিহ্নিত করছে।

হামলার বিরুদ্ধে কিউবা, চিলি, মেক্সিকো ও ভেনেজুয়েলা: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো বিমান হামলায় বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ এই হামলার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও মানবতার জন্য বিপজ্জনক হুমকি বলে অভিহিত করেছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল হামলাকে ‘বিপজ্জনক উস্কানি’ এবং জাতিসংঘ সনদের সরাসরি লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই হামলা মানবতাকে এমন এক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যার পরিণতি হতে পারে অপরিবর্তনীয়। এই ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু যুদ্ধ নয়, সারা বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি। চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বরিচ এক পোস্টে লিখেছেন, চিলি এই হামলার নিন্দা জানাচ্ছে। কেবল শক্তি থাকার অর্থ এই নয় যে, আপনি তা ব্যবহার করবেন মানবতার নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘন করে- এমনকি আপনি যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও হন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ‘বেআইনি’ বলে আখ্যায়িত করেন। মেক্সিকোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, সংবিধানভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির নীতিমালা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতির আলোকে, আমরা অঞ্চল জুড়ে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানাচ্ছি। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল টেলিগ্রামে দেয়া বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনী ইসরাইলের অনুরোধে এই বোমা হামলা চালিয়েছে- আমরা এই হামলার দৃঢ় ও পরিষ্কার নিন্দা জানাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, আমরা অবিলম্বে সকল ধরনের শত্রুতার অবসান দাবি করছি। এ অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্বার্থে এটাই একমাত্র যৌক্তিক পথ।

তেহরানের নির্দেশ ছাড়াই হামলা করতে পারে ইরানের মিত্ররা: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সম্পূর্ণ আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ফোরামের পরিচালক শাহরাম আকবরজাদেহ আল-জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বর্তমানে যে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত, তা হলো- এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় পুরো অঞ্চল জুড়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ইরান এই হামলার বিরুদ্ধে জবাব দেবে- এটা স্পষ্ট করেছে। তবে তেহরানের মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই হয়তো কোনো আনুষ্ঠানিক আদেশের অপেক্ষা না করে নিজেরাই পদক্ষেপ নিয়ে ফেলবে। আকবরজাদেহ আরও বলেন, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য ঘাঁটি, সামরিক স্থাপনা ও কূটনৈতিক কেন্দ্র রয়েছে। হিজবুল্লাহ, হুতি, শিয়া মিলিশিয়া কিংবা অন্য কোনো ইরানপন্থি গোষ্ঠী সহজেই এসবকে টার্গেট করতে পারে।

ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে নিজ দেশেই সমালোচিত ট্রাম্প: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে যুদ্ধ চালানোর অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।  বলেছেন, এই পদক্ষেপ একটি দীর্ঘমেয়াদি, বিধ্বংসী যুদ্ধের সম্ভাবনাকে ভয়াবহভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। শুমার এক বিবৃতিতে বলেন, কোনো প্রেসিডেন্টেরই এককভাবে জাতিকে এমন একটি ভয়ঙ্কর যুদ্ধে টেনে নেয়ার অধিকার থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে যখন তার হুমকিগুলোর ধরন এলোমেলো এবং কোনো সুসংগঠিত কৌশল নেই। তিনি আরও বলেন, ইরানের সন্ত্রাসবাদ, পারমাণবিক উচ্চাকাঙক্ষা ও আঞ্চলিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে শক্তি, দৃঢ়তা এবং কৌশলগত স্বচ্ছতা প্রয়োজন। অথচ এই পদক্ষেপে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী, বিস্তৃত ও আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এর প্রেক্ষাপটে শুমার ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ আইনের আওতায় প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ক্ষমতা সীমিত করতে একটি তাৎক্ষণিক ভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি সিনেট নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানাচ্ছি- এই আইনটি দ্রুত সিনেটের ভোটের জন্য উপস্থাপন করুন। আমি এই আইনের পক্ষে ভোট দেব এবং উভয় দলের সিনেটরদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারাও ভোট দিন। ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট এমন একটি আইন, যা প্রেসিডেন্টের বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষমতা সীমিত করে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। শুমার বলেন, আমেরিকান জনগণ ও কংগ্রেসের সামনে প্রেসিডেন্টকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে- আজকের হামলার উদ্দেশ্য কী, এবং এর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক প্রভাব কী হতে পারে।

ডেমোক্রেটদের কড়া নিন্দা: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে চালানো বিমান হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা এই পদক্ষেপকে ‘কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া যুদ্ধ শুরু করায় গুরুতর সংবিধান লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করছেন এবং প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট দাবি তুলছেন। নিউ ইয়র্কের কংগ্রেসওম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, এই পদক্ষেপ মার্কিন সংবিধান এবং কংগ্রেসের যুদ্ধক্ষমতা আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। এটি ইমপিচমেন্টের স্পষ্ট ও নির্ভুল ভিত্তি। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প একপেশে, অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি যুদ্ধ শুরু করার ঝুঁকি নিয়েছেন। যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আটকে দিতে পারে। মিশিগানের কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালিব বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ‘নিরস্ত্র ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের মিথ্যা’ অপবাদ দিয়ে আমরা যে অন্তহীন যুদ্ধ পেয়েছি, তার পরিণতি দেখেছি। আমরা এবার সেই ফাঁদে পা দেবো না। তিনি কংগ্রেসকে ‘তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের’ আহ্বান জানিয়েছেন। ম্যাসাচুসেটসের কংগ্রেসম্যান জিম ম্যাকগভার্ন পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘পাগলামি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই ইরানকে বোমা মেরেছেন। আমাদেরকে অবৈধভাবে আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছেন। আমরা কি কিছুই শিখিনি?
এই ঘটনার পর রিপাবলিকানদের একাংশ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘সাহসী পদক্ষেপ’ বলে প্রশংসা করলেও, ডেমোক্রেটদের মধ্যে প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে এটিকে সংবিধান লঙ্ঘন, যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের অগ্রাহ্য এবং স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত বলে নিন্দা জানানো হচ্ছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- কংগ্রেস কি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট প্রয়োগ করবে? ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হবে কি? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- যুক্তরাষ্ট্র কি এখন একটি যুদ্ধের ভেতরে ঢুকে পড়েছে, কংগ্রেসের ইচ্ছার বিরুদ্ধে?

যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আন্তর্জাতিক শান্তিতে সরাসরি হুমকি:
জাতিসংঘ, ইরাকের ভুল ইরানেও -চীন: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কঠোর বিবৃতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন দেশের নেতারা। তারা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আরব নিউজ। জাতিসংঘ মহাসচিব বিবৃতিতে বলেছেন, এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর বাস্তবতায় এক বিপজ্জনক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই সংঘাত যেকোনো মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে- যার পরিণতি সাধারণ মানুষ, পুরো অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য হবে ভয়াবহ। গুতেরেস জোর দিয়ে বলেন, এই সংকটময় সময়ে যুদ্ধ নয়, শান্তিই একমাত্র পথ। কূটনীতি ছাড়া কোনো সমাধান নেই।

নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স বলেন, এই সংকট আমার দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ কূটনৈতিক পরিস্থিতিগুলোর একটি। এখন আলোচনায় ফিরে যাওয়াটাই একমাত্র টেকসই পথ। তিনি হামলার সরাসরি সমর্থন বা বিরোধিতা না করলেও কূটনৈতিক সমাধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিজিটিএন মন্তব্য করেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি আবার ইরাকে করা ভুল ইরানেও করছে? তারা ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও অস্থিতিশীলতা এনেছে-  ইতিহাস তা বারবার প্রমাণ করেছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা রোববার জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠক ডেকেছেন। দেশের শীর্ষ সংবাদপত্র ইওমিউরি শিমবুন এই হামলার ওপর একটি বিশেষ সংস্করণ প্রকাশ করেছে, যা সচরাচর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেই দেখা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, এই হামলার ফলে নিরাপত্তা ও অর্থনীতির উপর প্রভাব নিয়ে জরুরি আলোচনা চলছে। তেহরানে অবস্থিত নিজেদের দূতাবাস আগেই বন্ধ করা অস্ট্রেলিয়া সরকার বলেছে, আমরা শুরু থেকেই বলছি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য হুমকি। তবে এই মুহূর্তে দরকার উত্তেজনা প্রশমন ও সংলাপ।

ইরান  থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে জড়ো হয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। ১৯ জুন, ইসরায়েলের তেল আবিবের রামাত গান এলাকায়
ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে জড়ো হয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। ১৯ জুন, ইসরায়েলের তেল আবিবের রামাত গান এলাকায়। ছবি: রয়টার্স

ইরান–ইসরায়েল সংঘাত: এই হামলা ‘ক্ষমার অযোগ্য’ -ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ইরান–ইসরায়েল সংঘাতে এবার সরাসরি যোগ দিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে ওয়াশিংটন। এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে তেহরান। হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এই হামলা ‘ক্ষমার অযোগ্য’। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট আরও জটিল হওয়ার শঙ্কা দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

ইরানের ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয় গত শনিবার রাতে। এ হামলার খবর প্রথম সামনে আনেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি জানান, খুব সফলতার সঙ্গে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান। এর মধ্যে ফর্দো ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে। ইরানকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, তেহরান যদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্ত না হয়, তাহলে আরও হামলা চালানো হবে।

এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বি–২ বোমারু বিমান অংশ নেয় বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন মার্কিন দুই কর্মকর্তা। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের ‘শেন হ্যানিটি’ নামের অনুষ্ঠানে ট্রাম্প জানান, ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনায় ছয়টি ‘বাংকার ব্লাস্টার’ বোমা ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। আর ৩০টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পরমাণু স্থাপনা লক্ষ্য করে।

ইরানে হামলার জন্য ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে অভিযান চালানো হয় বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। গতকাল রোববার মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এই হামলায় সাতটি বি–২ বোমারু বিমান অংশ নিয়েছিল। সব মিলিয়ে অভিযানে অংশ নেয় সামরিক বাহিনীর ১২৫টি উড়োজাহাজ।

বি–২ বোমারু বিমান স্টেলথ বা রাডার ফাঁকি দিতে পারে। একমাত্র এই উড়োজাহাজেরই ১৩ হাজার ৬০০ কেজি ওজনের ‘জিবিইউ–৫৭’ বাংকার ব্লাস্টার বোমা বহনের সক্ষমতা রয়েছে। ইরানে ভূগর্ভস্থ ফর্দো পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালাতে এই বোমা ব্যবহার করা হতে পারে বলে আলোচনা ছিল। এরই মধ্যে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে একাধিক বি–২ উড্ডয়নের খবর সামনে আসে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার শঙ্কা বেড়েছে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডেভিড ফিলিপস। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, এই হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হলো। এখন তেহরান প্রতিশোধ নিতে পারে। মধ্যপ্রাচের বিভিন্ন ঘাঁটিতে থাকা প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনার ওপর পাল্টা হামলা চালাতে পারে তারা। এমনটি হলে এই সংঘাত হয়তো আরও দীর্ঘ মেয়াদে চলবে।

তেজস্ক্রিয়তা বৃদ্ধির আলামত নেই

তিনটি পরমাণু স্থাপনায় চালানো মার্কিন হামলার কথা স্বীকার করেছে ইরান। দেশটির কোম এলাকায় পার্লামেন্ট সদস্য মানান রাইসি জানিয়েছেন, হামলায় ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনার ‘মারাত্মক কোনো’ ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালাতে পারে, এমন অনুমান থেকে স্থাপনাটি ‘অনেক আগেই’ খালি করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ।

ইরানি নেতাদের এমন ভাষ্যের সত্যতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি মহাকাশপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাক্সারের ধারণ করা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ১৯ ও ২০ জুন ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনার প্রবেশপথে ১৬টি পণ্যবাহী ট্রাক অবস্থান করছিল। এ সময় সেখানে কিছু বুলডোজারও দেখা যায়। তবে ট্রাকগুলোতে করে কী পরিবহন করা হয়েছে, তা জানা যায়নি।

ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইরানের আণবিক সংস্থা। হামলার পর তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েনি বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বাড়েনি বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থাও (আইএইএ)। হামলার পর আজ সোমবার জরুরি বৈঠকে বসার কথা রয়েছে সংস্থাটির। সৌদি আরব ও কুয়েতও জানিয়েছে, দেশ দুটিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বৃদ্ধির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

‘দ্রুত শান্তি প্রতিষ্ঠা না হলে আরও হামলা’

ইসরায়েল ১৩ জুন ইরানে হামলা চালালে চলমান সংঘাত শুরু হয়। ওই হামলার পাল্টা জবাব দেয় ইরান। এর পর থেকে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছিল। এরই মধ্যে ইরানে হামলার মার্কিন পরিকল্পনায় ট্রাম্প অনুমোদন দিয়েছেন বলে বৃহস্পতিবার জানায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। সেদিন রাতে হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়, ইরানে হামলা শুরুর সিদ্ধান্তের জন্য দুই সপ্তাহ সময় নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর মাত্র দুই দিনের মাথায় ইরানে হামলা চালাল দেশটি।

ইরানে হামলার পর হোয়াইট হাউসে ভাষণ দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, যদি শান্তি দ্রুত প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে ইরানের আরও লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে দ্রুততা ও দক্ষতার সঙ্গে হামলা চালানো হবে। এই হামলা চালাতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সমন্বিতভাবে কাজ করেছে বলেও উল্লেখ করেন ট্রাম্প। এ জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘অভিনন্দন’ জানান তিনি।

হামলা নিয়ে শনিবার তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটন যোগাযোগ করে বলে সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে জানিয়েছেন ট্রাম্প। সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে এ হামলা চালানো হয়নি বলে ইরানকে জানানো হয়। পরে পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনে একই কথা বলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তাঁর ভাষ্য, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যু্ক্তরাষ্ট্রের হুমকি ঠেকানো।

ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাতে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াতে চাইছিলেন নেতানিয়াহু। পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ইসরায়েলের জনগণের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান তিনি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ট্রাম্পের নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস লেখা হয়েছে। এই ইতিহাস মধ্যপ্রাচ্যকে সমৃদ্ধ ও শান্তিময় একটি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

ইরানের হুঁশিয়ারি

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শত্রুতা চলছে। এরই মধ্যে পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর হুঁশিয়ারি দিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়েছে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের নজিরবিহীন লঙ্ঘন। ইরানের এ ধরনের হামলা প্রতিহত করার অধিকার রয়েছে। এ জন্য সর্বশক্তি ব্যবহার করবে তেহরান।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে অবস্থান করছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সেখানে দেওয়া এক বক্তৃতায় হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ইরান কখনো নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে আপস করবে না। এই হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনের যে লঙ্ঘন হয়েছে, তা ক্ষমার অযোগ্য।

গতকাল ইস্তাম্বুল থেকে মস্কো যাওয়ার কথা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। সেখানে আজ সোমবার ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার’ জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা রয়েছে আরাগচির। ইসরায়েলের হামলার পর গতকাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ফোনালাপ হয় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের। এ সময় দ্রুত সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানান মোদি।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আবার বৈঠকের আহ্বান জানায় ইরান। গতকাল ওই বৈঠক বসার কথা ছিল। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়েছে ইরানের পার্লামেন্ট। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।

ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দিতে চায়, তাহলে তারা একাধিক পথে এগোতে পারে বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সান ফ্রান্সিসকোর মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা বিভাগের পরিচালক স্টিফেন জুনস। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটি ও স্থাপনাকে সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু করতে পারে ইরান। এতে করে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল, জ্বালানি তেলের দাম—এমনকি পুরো বিশ্বের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানপন্থী যেসব সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে, তাদের মাধ্যমেও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে তেহরান।

ইরান–ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলা

গতকাল ছিল ইরান–ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলার দশম দিন। তিন পারমাণবিক স্থাপনা হামলার শিকার হওয়ার পর ইরান এদিন ইসরায়েলের তেল আবিব, হাইফাসহ অন্তত ১০টি স্থানে হামলা চালায়। এতে রামাত আবিবসহ তেল আবিবে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। শহরটির মেয়র রন হুলদাই বলেন, শহরের বাড়িঘরগুলোতে তীব্র হামলা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।

ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) গতকাল জানায়, ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গবেষণা ও সামরিক বাহিনীর স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তারা। আর ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, গতকাল দুই দফায় ২৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। এদিন ইসরায়েল সরকারের তথ্যমতে, ইরানের হামলায় এ পর্যন্ত দেশটিতে ২৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হন ১ হাজার ২১৩ জন।

গতকাল ইরানের বিভিন্ন এলাকায় হামলার দাবি করেছে ইসরায়েলও। দেশটির সামরিক বাহিনী জানায়, ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়ে। এতে কুজেস্তান প্রদেশে ইরানের দুটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। হামলায় ইরানের তাবরিজ শহরে দুজন আহত হয়েছেন বলে জানায় দেশটির সংবাদমাধ্যম। এদিন বুশেহর ও ইয়াজদ প্রদেশেও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়।

পরে ইরানের কর্মকর্তাদের বরাতে বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ জানায়, ইয়াজদে হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনীর নয়জন সদস্য নিহত হন। তাঁদের মধ্যে সাতজন আইআরজিসির সদস্য। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন চার শতাধিক। এ সময় আহত হয়েছেন তিন হাজারজনের বেশি।

এদিকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদস্য অভিযোগে গতকাল ইরানে আরও একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম মিজান অনলাইন। তাঁর নাম মাজিদ মোসায়েবি। এর আগে ইসরায়েলি গুপ্তচর সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল ইরান সরকার।

হামলার নিন্দা–সমালোচনা

ইরান–ইসরায়েল সংঘাত বন্ধে আগে থেকেই আহ্বান জানিয়ে আসছিল বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। এরই মধ্যে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত হওয়ায় নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন দেশ। এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াবে বলে উল্লেখ করেছে চীন। নিন্দা জানানো অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, মিসর, লেবানন, কিউবা, চিলি, মেক্সিকো ও ভেনেজুয়েলা। হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। সংঘাত থামিয়ে, সমঝোতার পথে এগোতে বলেছেন পোপ চতুর্দশ লিও।

যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন রাজনীতিকও এই হামলার বিরোধিতা করছেন। মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতা থমাস ম্যাসি। একে ‘অসাংবিধানিক’ বলেছেন তিনি। সমালোচনাকারীদের মধ্যে আরও রয়েছেন মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, জন থুন, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হাকিম জেফরিসসহ অনেকে।

এ হামলা ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের আলোচনায় ফেরার পথে বাধা বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ১৩ জুন ইরানে ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ওই আলোচনা স্থগিত করেছিল তেহরান। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদি আল–জাজিরাকে বলেন, পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পরবর্তী ধাপের আলোচনার আগেই ইসরায়েল হামলা শুরু করে। এ হামলাকে ‘অসাধারণ’ বলেছিলেন ট্রাম্প। এবার ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পে হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র। এসব পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের পারমাণবিক আলোচনায় ফেরার পথে বাধা।

ইস্পাহানের পারমাণবিক স্থাপনা। স্যাটেলাইট ইমেজটি ১৪ জুন, ২০২৫–এর
ইস্পাহানের পারমাণবিক স্থাপনা। স্যাটেলাইট ইমেজটি ১৪ জুন, ২০২৫–এর। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের আগ্রাসন যেভাবে ভীতিকর বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করছে by জোনাথন কুক

(মিডলইস্ট আইয়ে প্রকাশিত জোনাথন কুকের মতামতটির বাংলায় অনুবাদ প্রকাশিত হয় রোববার প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে। যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণের মধ্য দিয়ে ইরান–ইসরায়েল সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে লেখাটি প্রকাশিত হয়।)

ইসরায়েলের স্পষ্টতই আক্রমণাত্মক যুদ্ধকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে পশ্চিমা রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যম এক অসম্ভব কিছুকে বাস্তব হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টায় জট পাকিয়ে ফেলছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় গণহত্যা চালানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলের পক্ষে যেমন যুক্তি বা অজুহাত ছিল, এবার তেমন কিছু ছিল না।

কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব আবারও আনন্দের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সেই পুরোনো দাবি ফিরিয়ে আনল, ইসরায়েল নাকি বাধ্য হয়েছে হামলা চালাতে। কারণ, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্তে ছিল। অথচ এই দাবি তিনি ১৯৯২ সাল থেকেই করে আসছেন এবং তার কোনোটিই বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি।

ইসরায়েল ইরানকে আঘাত করে ঠিক তখনই, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে আশা প্রকাশ করেছিলেন যে তেহরানের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি সম্ভব হতে পারে এবং যখন দুই দেশের আলোচকেরা আবার আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গত মার্চের শেষ দিকে ট্রাম্পের জাতীয় গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ড মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার বার্ষিক মূল্যায়নের অংশ হিসেবে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন: ‘ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না এবং সর্বোচ্চ নেতা (আলী) খামেনিই ২০০৩ সালে যে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত করেছিলেন, তা আবার অনুমোদন দেননি।’

এই সপ্তাহে সিএনএনকে দেওয়া তথ্যে এই মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত চারটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান কোনো বোমা তৈরি করছে না, তবে তারা যদি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে, তাহলেও তাদের একটি পারমাণবিক ‘ওয়ারহেড’ তৈরি ও লক্ষ্যে পাঠাতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে। তবু ট্রাম্প ইসরায়েলের হামলায় যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি প্রকাশ্যে নিজের গোয়েন্দাপ্রধানের মূল্যায়নকে অস্বীকার করেন, যুক্তরাজ্য ও স্পেন হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধবিমান পাঠান, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন এবং খামেনিকে হত্যারও আভাস দেন।

ইরানে হামলার জন্য ইসরায়েল যে অজুহাত তৈরি করেছে, সেটা ১৯৪৫ সালের ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে ‘সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমানে যেসব আলোচনা চলছে, সেগুলোর প্রয়োজনই হতো না, যদি না প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রথম মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি চাপের মুখে পড়ে তেহরানের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল না করতেন।

ওই চুক্তি তাঁর পূর্বসূরি বারাক ওবামা করেছিলেন। যার উদ্দেশ্য ছিল, ইসরায়েলের ধারাবাহিক চাপ ও হামলার আহ্বানকে স্তিমিত করা। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এমন মাত্রায় সীমিত করা হয়েছিল, যা একটি বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই বাধা দিত, একে বলা হতো ‘ব্রেকআউট পয়েন্ট’।

এর বিপরীতে ইসরায়েলকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে কমপক্ষে ১০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড মজুত করে রাখার, যদিও তারা ইরানের মতো নয়; ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্র নিষেধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের প্রবেশও অস্বীকার করে আসছে।

পশ্চিমা দেশগুলোর এই ভণ্ডামিপূর্ণ সহযোগিতা, যেখানে তারা ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রকে একটি ‘গোপন বিষয়’ হিসেবে দেখায়, যা ইসরায়েলের ভাষায় ‘অস্পষ্টতা’ নীতি; এর একমাত্র কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশকে সামরিক সহায়তা দিতে পারে না, যদি সেই দেশ পারমাণবিক অস্ত্র থাকার ঘোষণা দিয়ে থাকে। অথচ ইসরায়েল মার্কিন সহায়তার সবচেয়ে বড় গ্রহীতা।

কট্টর বর্ণবাদী ছাড়া কোনো বিবেকবান মানুষ কখনোই বিশ্বাস করেন না যে যদি পারমাণবিক অস্ত্র থেকে থাকেও ইরান এমনকি আত্মঘাতী হয়েও ইসরায়েলের দিকে তা ছুড়ে মারবে। ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের আসল উদ্বেগের জায়গা এটি নয়। সত্যি কথা হলো, এই দ্বিমুখী নীতিমালা বলবৎ রাখা হয়েছে যেন ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে থেকে যায়, যাতে তারা নির্বিঘ্নে তাদের সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে পারে। বিশেষ করে এই তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলটিকে যেকোনো মূল্যে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় পশ্চিমা বিশ্ব।

ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার দেশটিকে একরকম অপ্রতিরোধ্য ও জবাবদিহিহীন করে তুলেছে। এর ফলে তারা তাদের প্রতিবেশীদের ভয় দেখাতে পারে এমন হুমকি দিয়ে, অস্তিত্বগত হুমকির মুখে পড়লে তারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গেভির এ সপ্তাহে ইরানের উদ্দেশে এমন এক হুমকির ইঙ্গিত দিয়েছেন: ‘ভবিষ্যতে আরও কঠিন দিন আসছে, কিন্তু হিরোশিমা ও নাগাসাকির কথা সব সময় মনে রাখবেন।’

বুঝতে হবে, ইসরায়েল সরকার যেকোনো হুমকিকে ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করে, এমনকি সেটা যদি হয় তাদের বর্তমান উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ বা ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে ফিরে আসার চেষ্টা। এ পারমাণবিক অস্ত্রই ইসরায়েলকে আঞ্চলিকভাবে যা খুশি তা–ই করার স্বাধীনতা দিয়েছে, যার মধ্যে গাজায় গণহত্যা চালানোও রয়েছে এবং তা কোনো জবাবদিহি বা পাল্টা আঘাতের ভয় ছাড়াই।

ইসরায়েল যে ইরানে হামলা চালিয়ে ‘নিজেকে রক্ষা করছে’—এই দাবি ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জি-৭ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সমর্থন পেয়েছে; এটা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলোর ওপর আরও একটি আঘাত হিসেবে দেখা উচিত।

দাবিটি দাঁড় করানো হয়েছে এই যুক্তির ওপর যে ইসরায়েলের হামলাটি ছিল ‘প্রতিষেধকমূলক’ (প্রিএমটিভ); অর্থাৎ এটা তখনই আইনসম্মত হতে পারে, যদি ইসরায়েল প্রমাণ করতে পারে যে ইরান থেকে একটি আসন্ন, বিশ্বাসযোগ্য ও গুরুতর হামলার হুমকি ছিল এবং যেটা অন্য কোনো উপায়ে ঠেকানো যেত না।

এমনকি যদি আমরা ধরে নিই, ইসরায়েলের এমন কোনো প্রমাণ আছে (যা আদতে নেই), তবু এটা সত্য যে ইরান তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত ছিল। এটা সেই ‘প্রতিষেধকমূলক’ হামলার যুক্তিকে অকার্যকর করে তোলে। এর বদলে ইসরায়েলের যে দাবি, ইরান ভবিষ্যতে কখনো হুমকি হয়ে উঠতে পারে এবং সেই হুমকি এখনই নিরস্ত করতে হবে, এটা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে নিঃসন্দেহে অবৈধ।

ইসরায়েলের ইরানে হামলা আরও নানাভাবে আন্তর্জাতিক আইনের নির্লজ্জ লঙ্ঘন। নেতানিয়াহু, যিনি এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চোখে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য পলাতক, গাজার জনগণকে ক্ষুধার মাধ্যমে হত্যা করার দায়ে অভিযুক্ত, তিনি এখন সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক অপরাধের দায়েও অপরাধী।

তবে এসব কিছুই জানা যাবে না, যদি কেউ শুধু পশ্চিমা রাজনীতিক কিংবা ধনকুবেরদের মালিকানাধীন গণমাধ্যমের কথা শোনেন। সেখানে আবারও একই পুরোনো কাহিনি: ‘একটি সাহসী ইসরায়েল, একা লড়ছে; এক অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলা করছে; বর্বর সন্ত্রাসীদের দ্বারা হুমকির শিকার হচ্ছে; ইসরায়েলি জনগণের অনন্য দুর্ভোগ আর মানবতা; আর নেতানিয়াহু একজন শক্তিশালী নেতা, যুদ্ধাপরাধী নন।’

বাস্তবতা বা প্রেক্ষাপট যা–ই হোক না কেন, এই একই নাটকীয় গল্প বারবার চালানো হয়। আর এটিই যথেষ্ট প্রমাণ যে পশ্চিমা দর্শকেরা প্রকৃত সত্য জানতে পারছেন না; বরং তাঁরা নতুন এক যুদ্ধপ্রচার অভিযানের শিকার।

ইসরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধের ভিত্তি বা অজুহাতগুলো একটি চলমান লক্ষ্য, যা ধরা কঠিন। কারণ, তা বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে। যদি নেতানিয়াহু শুরুতে দাবি করেন যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি একটি আসন্ন হুমকি, তবে তিনি দ্রুতই যুক্তি দেন যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সম্ভাব্য হুমকি দূর করাও ইসরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধের কারণ ছিল।

সর্বোচ্চ অহংকারের এক দৃষ্টান্ত হিসেবে, ইসরায়েল প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে যে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের জবাব দিচ্ছে, যা তেহরান থেকে ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে চালানো হয়েছে। ইসরায়েলের নাগরিকদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার ব্যাপারে তাদের আপত্তি দুটি অস্বস্তিকর সত্যকে উপেক্ষা করেছে, যা ইসরায়েলের দ্বিচারিতাকে স্পষ্ট করে তুলত, যদি পশ্চিমা মিডিয়া তা লুকিয়ে রাখতে এত চেষ্টা না করত।

প্রথমত, ইসরায়েল তার নিজের বেসামরিক জনসংখ্যাকে ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। কারণ, তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রতিষ্ঠান, যেমন গুপ্তচর সংস্থা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঘনবসতিপূর্ণ তেল আবিবের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং তারা শহরের ভেতর থেকে রকেট প্রতিরক্ষা চালাচ্ছে। স্মরণ করুন, গত ২০ মাসে ইসরায়েল হামাসকে দায়ী করেছে গাজার অসংখ্য ফিলিস্তিনির মৃত্যুর জন্য; এটি মূলত একটি প্রমাণহীন দাবি যে হামাসের যোদ্ধারা জনসাধারণের মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন। এখন সেই একই যুক্তি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা যেতে পারে ও সেটা করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল স্পষ্টভাবে নিজেই ইরানের আবাসিক এলাকাগুলো লক্ষ্যবস্তু করছে, ঠিক যেমন আগে গাজার প্রায় সব বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেকারিগুলো ধ্বংস করেছিল। নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প—উভয়ই ইরানিদের তেহরান শহর তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন, যা প্রায় এক কোটি মানুষের জন্য খুব কম সময়ে অসম্ভব। তাদের এই দাবি একটি প্রশ্ন তোলে: যদি ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা বন্ধ করতে চায়, তাহলে কেন তারা তেহরানের আবাসিক এলাকাগুলোয় এত বেশি হামলা করছে?

সাধারণভাবে ইসরায়েলের যুক্তি, তেহরানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বঞ্চিত করতে হবে। এর মানে, শুধু ইসরায়েল ও তার মিত্রদেরই কোনো ধরনের সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা থাকার অনুমতি রয়েছে। এ থেকে মনে হচ্ছে, ইরানকে শুধু পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহে বাধা দেওয়া হয় না, ইসরায়েল যখন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র তেহরানের দিকে ছুড়ছে, ইরানকে তা তখন প্রতিহত করার সুযোগও দেওয়া হবে না।

ইসরায়েল কার্যত চাচ্ছে ইরানকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বড় সংস্করণে পরিণত করতে: একটি আনুগত্যশীল, হালকা সশস্ত্র শাসনব্যবস্থা, যা সম্পূর্ণরূপে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এটাই মূলত ইসরায়েলের বর্তমান ইরান হামলার লক্ষ্য: তেহরানে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো।

খামেনির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ২০০৩ সালে একটি ধর্মীয় ঘোষণা জারি করেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। তিনি এটিকে ইসলামিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করেন। এ কারণেই ইরান বোমা তৈরি করতে অনিচ্ছুক ছিল বলে ধারণা করা হয়।

ইরান এর পরিবর্তে দুটি কাজ করেছে, যা আসলেই ইসরায়েলের আগ্রাসন যুদ্ধের মূল কারণ। প্রথমত, ইরান নিজেকে ইসরায়েলি ও পশ্চিমা আগ্রাসন থেকে রক্ষার জন্য সব থেকে উন্নত বিকল্প সামরিক কৌশল তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, শিয়া নেতৃত্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিসেবে ইরান লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং অন্যান্য জায়গায় থাকা একই সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে এটি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

ইরানের নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁরা লক্ষ্যবস্তু। ইরানের প্রচুর তেল ও গ্যাস মজুত রয়েছে। কিন্তু প্রতিবেশী আরব অঞ্চলের শাসক দলের মতো এটি পশ্চিমের পুতুল নয়। তারা হরমুজ প্রণালির প্রধান প্রবেশদ্বার বন্ধ করার ক্ষমতাও রাখে, যার মাধ্যমে তেল ও গ্যাস পশ্চিমা বিশ্ব ও এশিয়ায় সরবরাহ করা হয়।

ইসরায়েলের আরেকটি উদ্বেগ ছিল, ইরান ও তার মিত্ররা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি ইসরায়েলের কয়েক দশকের দখল ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দৃঢ় সমর্থন প্রকাশ করেছে। ইরান অবরুদ্ধ গাজায় হামাসকে সাহায্য প্রদান করেছিল, যা এখনো ইসরায়েলের বর্ণবৈষম্যমূলক শাসন ও জাতিগত উৎখাতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে প্রস্তুত প্রধান ফিলিস্তিনি সংগঠন।

ইসরায়েলের অবরোধে দমবন্ধ হয়ে হামাস এক দিনের জন্য গাজার কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বের হয়ে শক্তির প্রদর্শনী করে। ইসরায়েল এই সুযোগে দুটি কাজ সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়: এক. জাতি হিসেবে ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করা এবং তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে শেষ করে দেওয়া; দুই. শিয়া ভ্রাতৃত্ববোধকে পিছিয়ে দেওয়া, যেমনটি পেন্টাগন ২০ বছর আগে পরিকল্পনা করেছিল।

ইসরায়েল শুরু করে গাজা ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে, সেখানকার জনগণকে হত্যা ও দুর্ভিক্ষপীড়িত করার মধ্য দিয়ে। এরপর ইসরায়েল লেবাননের হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার দিকে এগোয়। সিরিয়ার বাশার আল-আসাদশাসনের পতনের পর ইসরায়েল সিরিয়ার কিছু অংশ দখল করতে সক্ষম হয়; সামরিক অবকাঠামোর অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করে এবং ইরানে বিমান হামলার পথ পরিষ্কার করে। এ সবই ছিল ইরানের বিরুদ্ধে চলমান আগ্রাসন যুদ্ধ শুরু করার পূর্বশর্ত।

ইসরায়েলের সফলতা আসতে পারে দুটি উপায়ে: তেহরানে একটি নতুন কর্তৃত্ববাদী শাসককে ক্ষমতায় বসানোর মাধ্যমে, যেমন শাহের ছেলে, যিনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আদেশ পালন করবেন। অথবা ইসরায়েল ইরানকে এতটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে যে সেখানে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধি পাবে, দেশটি গৃহযুদ্ধের আবর্তে নিমজ্জিত থাকবে এবং তখন তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির বা প্রতিরোধ সংগঠনের জন্য শক্তি ব্যয় করতে পারবে না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র শুধু নতুন করে আঁকার বিষয় নয় এবং কেবল তেহরানের শাসকদের উৎখাতের বিষয়ও নয়, এটি পেন্টাগনের ‘বিশ্বব্যাপী পূর্ণাঙ্গ আধিপত্য’ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি এমন একটি বিশ্ব, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে; যদি আপনি মানবাধিকার, ক্ষমতার জবাবদিহি, সামরিক আগ্রাসনের আগে কূটনীতির ব্যবহার ও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হন, তাহলে এই ‘নতুন বিশ্ব’ আপনার জন্য নিশ্চিতভাবে ভীতিকর হবে।

- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া
* জোনাথন কুক, সাংবাদিক ও ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে তিনটি বইয়ের লেখক।
- সংক্ষিপ্তকরণ ও অনুবাদ মনজুরুল ইসলাম

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এই ছবি দেখিয়ে দাবি করেছেন, ইরানের ইস্পাহানে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। ইরান, ২১ জুন, ২০২৫
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এই ছবি দেখিয়ে দাবি করেছেন, ইরানের ইস্পাহানে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। ইরান, ২১ জুন, ২০২৫ ছবি: সামরিক বাহিনীর মুখপাত্রের এক্স পোস্ট থেকে

ইরানে হামলার পর এখন ট্রাম্পের সামনে যে তিন অনিশ্চয়তা by নিকোলাস ক্রিস্টোফ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ইরানে তিনটি স্থাপনা ধ্বংস করে ‘অসাধারণ সামরিক সাফল্য’ অর্জন করেছেন। ট্রাম্পের এই দাবি আদৌ ঠিক কি না, তা হয়তো পরে বোঝা যাবে।

তবে এটি স্পষ্ট, তিনি আমেরিকাকে সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছেন। এই যুদ্ধ আরও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে এবং সে আশঙ্কা ট্রাম্প নিজে স্বীকারও করে নিয়েছেন।

ইরানে বোমা হামলার আইনি ভিত্তি আছে কিনা তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। তবে আমি যেটিকে এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে ভাবছি, তা হলো—এখানে তিনটি বড় অনিশ্চয়তা আমেরিকার সামনে ঝুলছে, যেগুলোর ওপর আমেরিকা ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

ইরান কীভাবে আমেরিকার ওপর পাল্টা আঘাত হানবে তার ওপর প্রথম অনিশ্চয়তার বিষয়টি নির্ভর করছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে এই সংঘাতে নামে, তাহলে তারা যে ক্ষতির মুখে পড়বে, তা কখনোই পূরণ করা সম্ভব হবে না।’

ইরানের সামনে অনেক পথ খোলা আছে। তারা ইরাকে, বাহরাইনে কিংবা অন্য কোথাও অবস্থিত আমেরিকান ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাতে পারে।

তারা সাইবার হামলা করতে পারে, আমেরিকান দূতাবাসে আক্রমণ করতে পারে, অথবা কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে দিয়ে সন্ত্রাসী হামলা করাতে পারে।

আরেকটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হতে পারে হরমুজ প্রণালি আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। তারা তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ চালাতে পারে, বা সামুদ্রিক মাইন পেতে দিতে পারে।

এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে, কারণ বিশ্বের মোট তেলের এক-চতুর্থাংশ এই প্রণালি দিয়ে আনা-নেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা আমাকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত প্রণালিটি পুনরায় উন্মুক্ত করতে পারবে বটে, কিন্তু তার জন্য অর্থনৈতিক ও অন্যান্য দিক থেকে মূল্য দিতে হতে পারে।

১৯৮৮ সালে যখন ইরান এই প্রণালিতে মাইন পেতে দিয়েছিল, তখন একটি মাইন আমেরিকার যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস স্যামুয়েল বি. রবার্টসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করেছিল, তখন ইরান আমেরিকার ইরাকের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। সেই উত্তেজনার সময় ভুলবশত একটি ইউক্রেনীয় যাত্রীবাহী বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। সে বিমানে থাকা ১৭৬ জন আরোহীর সবাই নিহত হন।

আমার ধারণা, ইরান এবার আগের চেয়েও জোরালোভাবে পাল্টা হামলা চালাতে পারে। এর একটা কারণ হতে পারে—তারা চায় যেন যুক্তরাষ্ট্র আবার এমন আক্রমণ চালাতে সাহস না করে। অর্থাৎ তারা প্রতিরোধ শক্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে।

তবে ইরানের সেই সক্ষমতা আগের চেয়ে সীমিত হয়ে থাকতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ইসরায়েলি হামলায় হয়তো তাদের হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এমন কাজ করলে ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হবে।

বিশেষ করে চীনে ইরানের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হবে। এটি ইরানের বন্ধু রাষ্ট্র চীনকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা মনে রাখা দরকার যা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলেছিলেন: ‘কোনো যুদ্ধ তখনই শেষ হয়, যখন শত্রু বলে এটি শেষ হয়েছে। আমরা ভাবতে পারি যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু শত্রুরও তো মতামত রয়েছে।’

দ্বিতীয় অনিশ্চয়তার বিষয়টি হলো, ইসরায়েল ও আমেরিকার হামলা কি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আসলেই বন্ধ করতে পেরেছে, না কি এটি উল্টো আরও গতি এনে দিয়েছে।

ফোরদো ও অন্যান্য স্থাপনায় বোমাবর্ষণ কতটা সফল হয়েছে, তার ওপর ওই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে। আসলে ট্রাম্প যে দাবি করছেন, তা কতটুকু সত্য, তা বুঝে উঠতে সময় লাগবে।

আমেরিকার ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা দিয়েও ফোরদো স্থাপনাটি ধ্বংস করা যাবে কি না তা নিয়ে এর আগে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

কারণ স্থাপনাটি গভীর পাহাড়ের পাথরের নিচে নির্মিত। এ ছাড়া ইরানের আরও কোনো গোপন স্থানে অতিরিক্ত সেন্ট্রিফিউজ আছে কি না তাও আমাদের জানা নেই।

বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ একমত, যদি ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে থাকে, তাহলে তা পুরো অঞ্চলের জন্য ভয়ংকর পরিণতি বয়ে আনতে পারে। তাদের হাতে পরমাণু অস্ত্র গেলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি চালু করতে চাইতে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ড এই বছরের বসন্তে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাচ্ছে না। তিনি এই বিষয়টিকে তিনি তখন খুব একটা গুরুত্ব দেননি।

এখানে মূল ঝুঁকি হলো, ইসরায়েল ও আমেরিকার হামলার ফলে ইরান এখন এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে যে, তাদের সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র দরকার। কারণ, যদি তাদের পরমাণু অস্ত্র থাকত, তাহলে ইসরায়েল হয়তো এত সহজে ইরানে বোমা ফেলতে সাহস করত না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ইতিমধ্যে এত পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি করে ফেলেছে যা দিয়ে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা বানানো সম্ভব।

ধারণা করা হয়, এই উপাদানগুলো ছিল ইরানের ইস্পাহান শহরে। ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকা ইস্পাহানেও হামলা করেছে। কিন্তু সেই স্থাপনাটি ধ্বংস হয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা হলো: এটি কি সংঘাতের শেষ, না কি নতুন এক যুদ্ধের শুরু?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন, তিনি এবং আমেরিকা মিলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং এমনকি তাদের সরকারকেও শেষ করে দিতে পারেন। তবে মনে রাখা দরকার, নেতানিয়াহু ইরাক যুদ্ধেরও জোর সমর্থক ছিলেন এবং ভেবেছিলেন সেটার ফলেও ইরানে পরিবর্তন আসবে। বাস্তবে, ইরাক যুদ্ধ ইরানকেই আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল।

ইরানের সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে—এ কথা যদি ধরেও নেওয়া হয়, তাহলেও এটি পরিষ্কার, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়।

অর্থাৎ, যদি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, তাহলে এ ঘটনাকে হয়তো পরমাণু কর্মসূচির শেষ না বলে সাময়িক একটি ধাক্কা বলা যেতে পারে।

অনেকে ভাবছেন, বোমা মেরে ইরানের সরকারকে ফেলে দেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, তেমন লক্ষণ খুব একটা নেই। কারণ ইরানের বিরোধীরাও বাইরের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ সমর্থন করছেন না। যেমন সরকারবিরোধী নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত নাগরিক অধিকারকর্মী নারগেস মোহাম্মদি গত সপ্তাহে ইরানে বোমা হামলার নিন্দা করেছেন। তিনি ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছেন যেন তিনি এই হামলা বন্ধ করেন এবং এতে যুক্ত না হন।

আমি যখন ইরান ভ্রমণ করেছি, তখন দেখেছি সেখানকার সাধারণ মানুষদের মধ্যে সরকারের জনপ্রিয়তা কতটা কম। আমার কাছে সাধারণ ইরানিদের বরাবরই ‘আমেরিকান-অনুকূল’ বলে মনে হয়েছে।

এর মূল কারণ হলো, তাঁরা তাঁদের সরকারকে ঘুষ, ভণ্ডামি আর অর্থনৈতিক ব্যর্থতার জন্য ভীষণ অপছন্দ করেন।

এই জনগণের মধ্যকার আমেরিকা-প্রীতি দেখে মনে হয়েছিল, যদি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মারা যান, তাহলে দেশটির ভবিষ্যৎ হয়তো আমেরিকার সঙ্গে আরও ভালো সম্পর্কমুখী হবে। কিন্তু যদি আমরাই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করি, তাহলে সেখানে আমেরিকাপন্থী সরকার গঠনের সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে।

বাস্তবে, তখন ‘সরকার পরিবর্তন’কে তখন কট্টরপন্থী কোনো গোষ্ঠীর অভ্যুত্থান বলে মনে হতে পারে।

ফলে এখানে সম্ভাবনার পরিসর যেমন অনেক বড়, তেমনি এখানে অনেক কিছুই আছে যা বেশ ভীতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।

ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান এই ঝুঁকিগুলো এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন: ‘আমরা সবাই একমত যে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়। কিন্তু ট্রাম্প এই লক্ষ্য অর্জনে কূটনৈতিক পথ ছেড়ে দিয়েছেন এবং তার বদলে এমন কিছু করেছেন যা অপ্রয়োজনে আমেরিকান নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে, আমাদের সেনাবাহিনীকে আরও বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং আমেরিকাকে আবারও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ এক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার বলেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাচ্ছে না। কূটনৈতিক সমাধানের জন্য আরও সময় ছিল।’

এই কথাগুলো আমার কাছে ঠিকই মনে হয়। ট্রাম্পের ভাষণ ছিল বিজয়ের সুরে ভরা। কিন্তু এখনই উদ্‌যাপনের সময় আসেনি। কারণ সামনে যে কী হবে, তা নিয়ে এখনো অনেক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

* নিকোলাস ক্রিস্টোফ, নিউইয়র্ক টাইমস–এর কলাম লেখক
- নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
- অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ইরানের ইস্পাহান শহরে পারমাণবিক প্রযুক্তি কেন্দ্রের বিভিন্ন ভবন। স্যাটেলাইট ছবিতে ধারণকৃত, ১৭ মে ২০২৫
ইরানের ইস্পাহান শহরে পারমাণবিক প্রযুক্তি কেন্দ্রের বিভিন্ন ভবন। স্যাটেলাইট ছবিতে ধারণকৃত, ১৭ মে ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

নেতানিয়াহুর ফাঁদে পা দিলেন ট্রাম্প by অ্যান্ড্রু রথ

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন নির্বাচিত হয়েছিলেন, তখন তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী যা করতে চান, সেটা হোয়াইট হাউসকে সঙ্গে নিয়ে করতে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু মাত্র ১৫০ দিনের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর মনে হচ্ছে ট্রাম্পও তাঁর পূর্বসূরিদের মতো একই ফাঁদে পড়েছেন। কয়েক প্রজন্মের মধ্যে তিনি ইরানের ওপর এমন এক হামলা চালিয়েছেন, যার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে থাকবে।

প্রথম দিকে ধারণা ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন নেতানিয়াহুর সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে সরাসরি হামলা চালাতে কৌশলে টেনে আনতে পেরেছেন।

এর আগে একের পর এক চালানো সামরিক হামলা থেকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে নিবৃত্ত করতে পারেনি ওয়াশিংটন। এখন যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি প্রতিশোধমূলক হামলা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, যা সহজেই একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের কয়েক দিন আগে তাঁর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ নেতানিয়াহুর সঙ্গে শাব্বাতের দিন (ইসরায়েলে শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন) দেখা করার দাবি নিয়ে ইসরায়েলে যান। এর উদ্দেশ্য ছিল গাজায় হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনার জন্য নেতানিয়াহুকে চাপ দেওয়া।

ওই সময় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এটিকে ‘ট্রাম্প ফ্যাক্টর’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, যা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধোঁয়াশা রেখে দেওয়া এবং চুক্তি করার দক্ষতার প্রতি ইঙ্গিত করে। এ ট্রাম্প ফ্যাক্টর ক্ষমতাধর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে সামলানোর ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট সুবিধা দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছিল।

নেতানিয়াহু এর আগে বিভিন্ন সময় মার্কিন প্রশাসনকে এ অঞ্চলে তাঁর সামরিক অভিযানকে সমর্থন দিতে রাজি করাতে সক্ষম হলেও ইসরায়েলের কিছু সমালোচক ট্রাম্পের প্রশংসা করতে শুরু করেছিলেন যে তাঁর নেতানিয়াহুর প্রভাব প্রতিহত করার সক্ষমতা রয়েছে।

কিন্তু শনিবার মার্কিন বি-২ বোমারু বিমানগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে, ট্রাম্পের নিজের উপলব্ধিতে পরিবর্তন এসেছে। ইসরায়েল গত সপ্তাহে ইরানে হামলা শুরু করার পর এই প্রথম দেশটিতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলও বিদেশনীতিতে ‘মাগা বিচ্ছিন্নতাবাদী’ অবস্থান থেকে আরও যুদ্ধবাজ অবস্থানে চলে আসেন।

ট্রাম্পের যুদ্ধের প্রতি প্রকাশ্য বিতৃষ্ণা ও বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো সংঘাতে না জড়ানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, আবার দায়িত্ব গ্রহণের ২০০ দিনের কম সময়ের মধ্যে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

জনসমক্ষে এসে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের গুজব দূর করতে চেয়েছিলেন। তিনি এটা দেখানোরও চেষ্টা করেন যে মার্কিন নীতি ইসরায়েলের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলছে। এর মাধ্যমে মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকটা অন্ধকারে রেখেই যে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী বোমা হামলা চালিয়েছে, সে ধারণা নাকচের চেষ্টা করেন ট্রাম্প।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ট্রাম্প বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী বিবি নেতানিয়াহুকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাতে চাই। আমরা এমন একটি টিম হিসেবে কাজ করেছি, যা সম্ভবত এর আগে অন্য কোনো টিম করেনি। ইসরায়েলের প্রতি এ ভয়ানক হুমকি মুছে ফেলতে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি।’

এক সপ্তাহেই পাল্টে গেল দৃশ্যপট

ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলের বোমা হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রথম যে প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছিল, সেটা থেকে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের অনেক পার্থক্য রয়েছে। ওই সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হামলাগুলোকে ‘একতরফা’ বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় যুক্ত নয়। আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো এ অঞ্চলে আমেরিকান বাহিনীকে রক্ষা করা।’

সেখানে এক সপ্তাহে কী এমন পরিবর্তন ঘটল। যুক্তরাষ্ট্রকে এখন মনে হচ্ছে, তারা ইসরায়েলি হামলাকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করেছে এবং হামলায় যোগ দিয়েছে। এটি সম্ভবত এমন এক ধারাবাহিক উসকানির জন্ম দিতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে একটি নতুন যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এটা ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে? ট্রাম্প প্রকাশ্যে ও ব্যক্তিগতভাবে দাবি করেছেন, ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনায় মার্কিন হামলা ছিল এককালীন অভিযান এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীগুলোকে ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। ট্রাম্প তেহরানকে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তাহলে তারা আরও হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত।

এরপরও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ ট্রাম্পের নিজের প্রশাসনের কর্মকর্তারা সতর্ক করে আসছেন যে তেহরান যদি পাল্টা হামলা চালায়, সেটা সীমিত হামলা হলেও তা ইরানে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আপাতত ট্রাম্প মধ্যপন্থা অবলম্বন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। হামলা চালিয়ে বলেছেন, তিনি একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে মোড় নেওয়া থেকে পরিস্থিতিকে আটকাতে পারবেন।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ট্রাম্পের এ হামলায় আরও সাহসী হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। নেতানিয়াহু এক ভিডিও বিবৃতিতে বলেছেন, ‘অভিনন্দন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প! যুক্তরাষ্ট্রের অসাধারণ ও ন্যায়সংগত শক্তি দিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর আপনার এই সাহসী সিদ্ধান্ত ইতিহাস বদলে দেবে।’

image-s3-key
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েল। রয়টার্সের ছবিতে তেল আবিবের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা