Tuesday, April 1, 2025
নজরুল-প্রমীলার প্রেমের সাক্ষী যে বাড়ি by রিপন আনসারী
জমিদার বাড়ির সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনেক স্মৃতি বিজড়িত থাকলেও তা সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। এ জমিদার বাড়ির পাশেই ছিল নজরুলের প্রিয়তমা স্ত্রী প্রমীলা দেবীর বাড়ি। প্রমীলা দেবীর বাবা বসন্ত সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র বীরেন সেনের সঙ্গে কবি নজরুল ইসলামের পরিচয় ঘটে এবং তাদের বন্ধুত্বের সৃষ্টি হলে নজরুল মাঝে মধ্যেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বীরেন সেনের সঙ্গে তাদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। এরই মাধ্যমে বসন্ত সেনের পরমা সুন্দরী কন্যা প্রমীলা দেবী দুলির সঙ্গে আলাপ পরিচয়ে এক পর্যায়ে নজরুলের প্রেমের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। প্রমীলা নজরুলকে কবিদা বলে ডাকতেন।
জনশ্রুতি রয়েছে, নজরুল যখন প্রমীলা অনুরক্ত, তখন একদিন জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের পুকুরে স্নানরত প্রমীলার অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রেমিক নজরুল গান গেয়ে ওঠেন, তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ। এরপর প্রেম প্রণয়ের অনেকটা জায়গা জুড়েই আছে জমিদার বাড়ি, পুকুর ঘাট, নাটমন্দির ও নবরত্ন মঠ।
এক সময়কার সৌন্দর্যমণ্ডিত তেওতা জমিদার বাড়িটি সম্পর্কে এলাকার বয়োবৃদ্ধের মুখে মুখে এখনো কিংবদন্তির মতো অনেক অজানা কাহিনী, যা এক সময় মানুষকে অবলীলায় বিস্ময়ের আবর্তে টেনে নেয়।
জানা গেছে, পঞ্চদশ শতকের প্রারম্ভে পাচুসেন নামক এক পিতৃহীন যুবক তার সততা ও আন্তরিক চেষ্টায় তামাকের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ-সম্পদের মালিক হন। পাচুসেন দিনাজপুর অঞ্চলে প্রথম জমিদারী ক্রয় করে তার পাচু নাম পরিবর্তন করে পঞ্চনন্দ সেন নাম গ্রহণ করেন। পঞ্চনন্দ সেনের পুত্র শঙ্কর রায় বাহাদুর ১৬৭০;এর দশকে (বাংলা ১০৮০) তৎকালীন নাগপুরের নীলকুঠির ম্যানেজার উডীন সাহেবের কাছ থেকে কিনে নিয়ে তেওতা জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।
সৌন্দর্যমণ্ডিত এ জমিদার বাড়ির নবরত্ন মঠটির শিলালিপি থেকে জানা যায়, এ মঠটি ১৭০২-১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত। এই হিসাবে প্রায় ৩০০ বছর পূর্ব থেকে তেওতা জমিদার বাড়ি সমৃদ্ধিশীল ছিল। জমিদার বাড়ির উত্তর দিকের ভবনগুলো নিয়ে হেম শংকর এস্টেট এবং দক্ষিণ দিকের ভবনগুলো নিয়ে জয় শংকর এস্টেট গঠিত। প্রতিটি এস্টেটের সামনের অংশে যে অট্টালিকা আছে তা বর্গাকৃতির এবং এর মাঝখানে আছে দৃষ্টিনন্দন নাট মন্দির। এ মন্দিরে পূজা ও নাচ গানের আসর হতো। এস্টেটের পূর্ব দিকে ছিল অন্দরমহল। দক্ষিণ দিকে ভবনের নিচে ভূগর্ভে আজও একটি চোরা কুঠি রয়েছে। যা এ এলাকার অন্ধকূপ নামে পরিচিত ছিল। এটি ক্রমান্বয়ে ভরে গেছে। সেখানে বর্তমানে সাপ বিচ্ছুদের আস্তানা। জমিদার বাড়ির সামনের একটি ভবনে রয়েছে দুটি কয়েদখানা। সাধারণ প্রজারা খাজনা দিতে বিলম্ব করলে তাদের কয়েকখানার ভেতরে বন্দি করে নির্যাতন চালানো হতো। কয়েদখানাটি এখন আর নেই। সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। জমিদার বাড়ির সামনে টলমলে দিঘিতে ছিল বাঁধানো ঘাট। ঘাট সংলগ্ন প্রায় ৮০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট সেই নবরত্ন মঠ। চারতলাবিশিষ্ট এই নবরত্নের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার চারদিকে ক্ষুদ্রাকৃতির মঠ বা রত্ন এবং মাথার মঠ বা রত্ন নিয়ে মোট আটটি মঠ থাকায় একে নবরত্ন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল বলে সেখানকার মানুষজনের কাছ থেকে শোনা গেছে।
এ নবরত্ন মঠটিতে সে সময় জাঁকজমকপূর্ণ দোল পূজা অনুষ্ঠিত হতো।
তেওতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শরৎচন্দ্র জমিদার বাড়ি প্রসঙ্গে বলেন, তেওতা জমিদার বাড়ি মূলত জমিদারদের সময় থেকেই ঐতিহ্য বহন করে আসছে। এরপর আমরা ছোট থেকে আস্তে আস্তে জেনেছি এখানে প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমাদের এলাকার আশালতা সেনগুপ্তা প্রমীলা দেবীর একটা প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রমীলা দেবীর বাড়ি জমিদার বাড়ির পাশেই ছিল। আমরা যতটুকু জেনেছি প্রমীলা দেবীর সঙ্গে নজরুলের পরিচয়ের যে ব্যাপারটা ছিল সেটা মূলত তার বাবা বসন্ত সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র বীরেন সেন। বীরেন সেনের সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটা সখ্যতা ছিল। তিনিও সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন এবং কবিতা ভালোবাসতেন। এই সূত্রে কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কয়েকবার তেওতা জমিদার বাড়িতে আসা। এখানে প্রমীলা দেবী দুলির সঙ্গে নজরুলের পরিচয় ঘটে। বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি বিশেষ করে ছোট হিটলার কবিতায় তেওতার কথাটা নজরুল তার কবিতায় লিখেছিলেন। সেখানে তিনি একটা লাইন লিখেছিলেন, ভয় করি না পুলিশদের, জার্মানির ওই ভাঁওতাকে কাঁপিয়ে দিতে পারি আমার মামার বাড়ি তেওতাকে।’ এ ছাড়া লোকমুখে শোনা গেছে আরও বেশ কয়েকটি গান, আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী এ কোন সোনার গাঁয় অথবা তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ। এটা শুনেছি প্রমীলা দেবীকে দেখেই নজরুলের গান লেখা।
এই শিক্ষক জানান, প্রতিনিয়তই দেশি-বিদেশি অনেক দর্শনার্থী আসেন, দেখেন- তাদের ভালো লাগে। এটা আসলেই ভালোলাগার একটা জায়গা। কারণ এটা কাজী নজরুল ও প্রমীলার স্মৃতি বিজড়িত এলাকা। যত দিন যাচ্ছে আর দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে-বিদেশে পর্যন্ত তেওতা জমিদার বাড়ির নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে এখানকার জমিদাররা পরবর্তীতে ইন্ডিয়া চলে যায়। ইন্ডিয়া থেকে অনেকেই মায়ার টানে, নাড়ির টানে এখানে ছুটে আসেন।
এদিকে, বিপন্নপ্রায় তেওতা জমিদার বাড়ির কিছু অংশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা গবেষণার জন্য ব্যবহার করছেন। জমিদার বাড়ির প্রায় আট একর জমির বেশির ভাগ অবৈধ দখলদারদের কব্জায়। ইটপাথরে গাঁথা অতি প্রাচীন অট্টালিকাগুলো আজ রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ধসে পড়ছে।
তবে জমিদার বাড়ির সম্মুখ রাস্তার পাশে নজরুল এবং প্রমীলার স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ইট পাথরে গাঁথা ছবি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়েছে। দর্শনার্থীরা জমিদার বাড়ির প্রবেশের আগেই নিজেদের সঙ্গে নজরুল-প্রমীলার ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন। বিভিন্ন দিবসের মধ্যে বিশেষ করে ঈদের আগে-পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে জমিদার বাড়িটি।

Monday, March 10, 2025
মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে হেলিকপ্টারে উড়লেন জুলহাস by রিপন আনসারী
সরজমিন প্রতিভাবান যুবক জুলহাসের গ্রামে গিয়ে দেখা গেল অন্যরকম এক চিত্র। বিমান তৈরি করে ইতিহাস সৃষ্টি করা জুলহাসের গ্রামের বাড়ির ঠিকানা নিজ এলাকার বেশির ভাগ মানুষেরই অজানা ছিল। কিন্তু তার এই কারিশমা প্রকাশ পাওয়ায় ছোট্ট শিশুটিও এক বাক্যে বলে দিতে পারে জুলহাসের বাড়ির ঠিকানা। ৮০ বছরের ওসমান মোল্লা বলেন, আমি অবাক হয়ে গেছি ছোট্ট একটি ছেলে কীভাবে একটি বিমান আবিষ্কার করতে পারলো। আমার ৮০ বছরের জীবনে আমি এমনটা কখনোই দেখিনি। তেওতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শরৎচন্দ্র হালদার বলেন, এমন মেধাবী ছেলে আমাদের এলাকায় লুকিয়ে ছিল সেটা এতদিন জানতাম না। সামান্য এসএসসি পাস করা জুলহাসের অবিশ্বাস্য এই আবিষ্কার নতুন প্রজন্মকে আরও বেশি উৎসাহিত করবে। আসলে প্রতিভা কখন কার ভেতর ফুটে ওঠে সেটা নির্ভর করে আল্লাহর ওপর। জুলহাসের বিমান আবিষ্কার এবং আকাশে উড্ডয়নের কথা শুনে শুধু আশপাশের এলাকার মানুষজনই নন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসে।
স্বপ্ন পূরণ হলো জুলহাসের: অবশেষে সত্যিকারে বিমানে ওঠার স্বপ্ন পূরণ হলো যমুনা নদীর পাড়ঘেঁষা ষাটঘর তেওতা গ্রামের তরুণ উদ্ভাবক জুলহাসের। রোববার দুপুরে তার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন বিমান বাহিনীর সাবেক পাইলট ক্যাপ্টেন আব্দুল আল ফারুক। শুধু জুলহাসই নন তার মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে কিছু সময়ের জন্য আকাশে উড্ডয়ন করেন ক্যাপ্টেন আব্দুল আল ফারুক। এ সময় হাজার হাজার উৎসুক মানুষ যমুনার পাড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এ সময় বিমান বাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ আল ফারুক সাংবাদিকদের বলেন, এই মুহূর্তে জুলহাসের কোনো ঝুঁকি নেয়া যাবে না। আপাতত ছোট ছোট ফ্লাই সে করতে পারে। প্রথমে তার টেকনিক্যাল জ্ঞান দরকার। তা না হলে এটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তাই আবিষ্কারটা নিয়ে তাকে সিস্টেম ওয়েতে এগিয়ে যেতে হবে। জুলহাস যেহেতু বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেছে। সে তো প্রাইভেট পড়াশোনার মাধ্যমে বিমান চালানোর লাইসেন্স পেতে পারে। এ সময় তরুণ উদ্ভাবক জুলহাস মোল্লা বলেন, আমি প্রথমে রিমোট কন্ট্রোল বিমান বানিয়েছিলাম। এরপর আমার ইচ্ছা হলো আরসি বিমান আবিষ্কার করার। টানা চার বছর গবেষণা করেছি। মাঝে একটি বিমান বানিয়ে ছিলাম কিন্তু সেটি সফল হয়নি। তারপরও হাল ছাড়িনি। টানা এক বছর চেষ্টার পর আমার স্বপ্নের আরসি বিমানটি আবিষ্কার করি এবং আকাশে উড্ডয়ন করতে সক্ষম হই। এ বিমানটি তৈরি করতে নগদ দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বিমানটি সর্বোচ্চ ৫০ ফিট উপরে উঠতে পারে। এর চেয়ে বেশি উড়তে গেলে ঝুঁকিপূর্ণ হবে। জুলহাস বলেন, আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে আরও গবেষণা করে জ্ঞান অর্জন করা। দেশের মানুষের জন্য এমন কিছু আবিষ্কার করতে চাই; যা মানুষের কাজে লাগবে।

Wednesday, March 5, 2025
জুলহাসের উড়োজাহাজ নিয়ে মানিকগঞ্জে হৈচৈ by রিপন আনসারী
পরীক্ষামূলকভাবে প্লেনটি নিয়ে আকাশে উড্ডয়নের জন্য বেলা ১১টার দিকে ২৮ বছর বয়সী জুলহাস প্লেনের স্টিয়ারিং সিটে বসে পড়েন। চারদিকে তখন উৎসুক মানুষের ভিড়। যমুনায় জেগে ওঠা চড়ে প্লেনটি রানওয়ের মাধ্যমে নিমিষের মধ্যেই আকাশে উড়ে যায়। প্লেনটি ৪০ থেকে ৪৫ ফুট উচ্চতায় অবস্থান করে প্রায় দুই মিনিট। আকাশে উড়ার দৃশ্য দেখে অনেকেই হতবাক হয়ে যান। অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন অনেকেই। হইহুল্লোড় ও করতালি দিয়ে জুলহাসের এই কারিশমাকে অভিবাদন জানান উৎসুক মানুষ। নিজের তৈরি প্লেন চালিয়ে আকাশে উড্ডয়নের পর জুলহাস তার এই কারিশমার গল্প তুলে ধরেন সাংবাদিকদের কাছে। তিনি বলেন, ছয় ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আমি পঞ্চম। ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে বর্তমানে কাজ করছি ঢাকায়। ২০১৪ সালে এসএসসি পাস করার পর অর্থাভাবে লেখাপড়া করতে পারেননি। প্লেন তৈরি করে সেই প্লেন চালিয়ে আকাশে উড়বো- এমন ইচ্ছা জেগেছিল ছোটবেলা থেকেই। সেই ইচ্ছা আল্লাহ আমার পূরণ করেছেন।
জুলহাস বলেন, সম্পূর্ণ নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমি প্লেনটি তৈরি করেছি। প্লেন তৈরি করতে গিয়ে আমাকে তিন বছর গবেষণা করতে হয়েছে। এরপর পুরোপুরি এক বছর লেগেছে প্লেনটি তৈরি করতে। মোট চার বছরের পরিশ্রমে এই প্লেনটি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এটা তৈরিতে যে মেটেরিয়াল আছে সেগুলো কিনতে প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। আর এটা তৈরির জন্য যে জ্ঞানটা প্রয়োজন সেই জ্ঞান অর্জন করতেও ৮/১০ লাখ টাকা লেগেছে।
এই প্লেনে অ্যালুমিনিয়াম, এসএস পাইপ, লোহা সবই ব্যবহার করছি। যেখানে যেটা পারফেক্ট হয় সেখানে সেটা লাগানো হয়েছে। আর আমার সামর্থ্য অনুযায়ী মাত্র ১৩ হাজার টাকা দিয়ে একটি পানির পাম্পের সাতঘোড়া ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্লেনটি চেষ্টা করলে মেঘের উপর থেকেও ঘুরানো সম্ভব। যেহেতু এটা একটা প্রশিক্ষণ বিমান সেহেতু এটাকে বেশি উঁচুতে উঠানো ঝুঁকিপূর্ণ বলে আমি মনে করি। আমি কখনোই ৫০ ফুটের উপরে ওঠানোর চেষ্টা করিনি এবং ভবিষ্যতেও করা হবে না। তবে এটাকে যদি ডেভেলপ করা হয় তাহলে এটার লিমিট বাড়ানো যেতে পারে। মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. মনোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, জুলহাসের প্লেন তৈরি এবং মেধা দেখে আমি মুগ্ধ। তাকে গবেষণা কাজে সরকার সহযোগিতা করবে। প্রাথমিকভাবে কিছু আর্থিক সহযোগিতা করে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। তবে ওর মধ্যে যে মেধা রয়েছে সে যদি ধরে রাখতে পারে তাহলে বহুদূর এগিয়ে যেতে পারবে।

Tuesday, March 4, 2025
‘আমাগো কপালে ভালো খাবার দিয়ে ইফতারি করার ভাগ্য নেই’ by রিপন আনসারী
সরজমিন বেড়িবাঁধ এলাকায় দেখা যায়, কোনো বাড়িতেই ইফতারির বাড়তি কোনো আয়োজন নেই। বাঁধের দু’ধারে ৩ শতাধিক হতদরিদ্র পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বসবাস করে আসছে। তাদের বেশির ভাগ পরিবারই দিনমজুর। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে রমজান মাসে ভালো-মন্দ ইফতার তাদের ভাগ্যে জোটে না। দীর্ঘদিন ধরেই রোগে-শোকে জর্জরিত আফজাল ফকিরের বাড়ি গিয়ে দেখা গেল রমজানের প্রথম রোজার ইফতারির ন্যূনতম কোনো আয়োজন নেই। এ বিষয়ে ফাতেমা বেগম জানান, কয়েক বছর ধরে ভালো কোনো খাবার দিয়ে ইফতারি করার সৌভাগ্য হচ্ছে না তার। স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় মেয়েকে নিয়ে দিনমজুরি করে কোনোরকমে সংসার চালান। সংসারে চাল ডাল লবণ কিনতেই হিমশিম খেতে হয়।
পাশের বাড়ির বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম বলেন, ইফতারি কি জিনিস স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে সেটা বুঝি না। ডাল ভাত খেয়ে রোজা রেখেছি এবং পানি আর ভাত দিয়ে ইফতার করবো। একটা খেজুর কেনার মতো সামর্থ্য নেই। কষ্টের কথা কাউকে বুঝাতে পারবো না। রিকশা চালক সুমন বলেন, পরিবারে বৃদ্ধ মা, বোন ও স্ত্রী রোজা রেখেছে। সকাল থেকে সারাদিন রিকশা চালাতে পারি নাই। হাতে কোনো টাকা-পয়সাও নেই। তাই ইফতারি কেনার মতো সামর্থ্য না থাকায় নিয়মিত রান্না করা খাবার দিয়েই রোজা ভাঙতে হবে। তার বৃদ্ধা মা বেদেনা বেগম বলেন, অভাবের সংসারে কখনোই ভালো কোনো খাবার দিয়ে ইফতার করতে পারি না। প্রথম রোজায় অনেকে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু ভালো মন্দ খাবার দিয়ে ইফতার করে। কিন্তু আমার কপালে তা নেই। মেয়ে এবং নাতনি নিয়ে কোনোরকমে ডাল ভাত খেয়েই রোজা ভাঙবো।
কাজলী বেগম বলেন, ছয় ছেলে, এক মেয়ে ও নাতি-নাতনি নিয়ে বড় সংসার আমার। স্বামী মারা গেছে চার বছর আগে। পরিবারের কয়েকজনই রোজা। ব্রয়লার মুরগির দোকান থেকে পা, গিলা, মাইটা কিনে এনে তা রান্না করে রাতে সেহরি খাই, সেহরি খেয়েছি। ইফতারের খাবার বলতে যা বোঝায় তার কোনো কিছুই কেনার মতো সামর্থ্য নেই। দু’বেলা খাবার জোগাড় করাই যখন কঠিন তখন রমজান মাসে ইফতার নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখি- সেটাই বড় কথা। আজ মাছ মাংস কেনার অর্থ নেই তাই ইফতারির জন্য শুধু খিচুড়ি রান্না করেছি। নুরুল্লাহ বলেন, বাড়িতে ছোট-বড় সবাই রোজা রেখেছি। ইফতারির জন্য বাড়তি কোনো খাবার কেনার মতো সামর্থ্য নেই। সাধারণ যে খাবার প্রতিদিন খেয়ে থাকি সেটা দিয়েই ইফতার করবো।
এদের মতো প্রায় প্রত্যেকটি পরিবারই অসহায়। প্রথম রমজানে ইফতারের বাড়তি কোনো আয়োজন কোনো পরিবারের মাঝেই দেখা যায়নি। প্রতিনিয়ত তারা তিন বেলা যা দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে তা দিয়েই ইফতার ও সেহরি করছেন। এলাকার অনেকেই জানান, বেশির ভাগ পরিবারই ভালো নেই। বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি অর্থকষ্টে জীবনযাপন করছেন। পকেটে টাকা না থাকলেও কারও কাছে লোকলজ্জায় হাত পাততে পারছেন না। তাদের এই কষ্টের কথা শুধুমাত্র ঘরের লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

Tuesday, October 29, 2024
তৃতীয় সংসারও টিকছে না মমতাজের by রিপন আনসারী ও আতাউর রহমান
সংরক্ষিত আসনসহ টানা তিনবারের সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের তৃতীয় স্বামী হচ্ছেন তারই চক্ষু হাসপাতালের (মমতাজ চক্ষু হাসপাতাল) চিকিৎসক ডাক্তার চঞ্চল। সুদর্শন চেহারার অধিকারী ডাক্তার চঞ্চল যেদিন মানিকগঞ্জ মমতাজ চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পান সে থেকেই মমতাজ বেগমের দৃষ্টিতে পড়ে যান। তখনো মমতাজ মানিকগঞ্জ পৌর মেয়র মো. রমজান আলীর স্ত্রী। মমতাজ-রমজানের ঘরে তখন ছিল দুই কন্যা সন্তান। রমজানের সঙ্গেও তখন মমতাজের দাম্পত্য কলহ চলছিল। তারই মধ্যে ডাক্তার চঞ্চলের সঙ্গে মমতাজের ভালোবাসা আদান-প্রদান চলতে থাকে। ২০০৯ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ ১০ বছরের অধিক সময় বেশ সুখেই চলছিল মমতাজ-চঞ্চল দম্পতির সাংসারিক জীবন। রমজান-মমতাজের ঘরের দুই সন্তানকে নিজের সন্তানের মতোই আদর সোহাগ দিয়ে বড় করেছেন ডাক্তার চঞ্চল।
সূত্রমতে, ২০২০ সালের পর থেকেই মমতাজ- চঞ্চলের দাম্পত্য জীবনে কলহ দেখা দেয়। দুজনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বনিবনা হচ্ছিল না। কোনো এক রমজান মাসে তাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদের সৃষ্টি হলে মমতাজের স্বামী চঞ্চলের বাসা থেকে চলে আসেন। এরপর থেকেই টানা তিন বছরেরও অধিক সময় তাদের মধ্যে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় মমতাজ চক্ষু হাসপাতাল ছেড়ে দেন ডাক্তার চঞ্চল। এসবের সত্যতা মানবজমিনের কাছে নিশ্চিত করেছেন ডাক্তার চঞ্চল। চঞ্চল এবং মমতাজের জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক অজানা তথ্য উদ্ঘাটন করেছে মানবজমিন। ২০২২ সালের ২৩শে আগস্ট সিংগাইর থেকে ঢাকা যাবার পথে ডাক্তার চঞ্চলের গাড়িতে আকস্মিক হামলা চালায় মমতাজের অনুসারীরা।
ডাক্তার চঞ্চল তার পেছনের ইতিহাস টেনে মানবজমিনকে বলেন, মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া অবস্থায় এক সহপাঠীকে বিয়ে করেছিলাম। দুজনেই লন্ডনে ছিলাম। সেখানে দেড় বছর সংসার করার পর আমাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায়। এরপর ২০০৪ সালে আমি লন্ডন থেকে বাংলাদেশে চলে আসি। ২০০৫ সালের জুলাই মাসে মানিকগঞ্জ শহরের মমতাজ চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করি। যোগদানের পরপরই মমতাজ আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তখনো আমি মমতাজের পেছনের সব ইতিহাস খুব ভালো জানতাম না। যখন দেখলাম একটা সংসার ছেড়ে বাচ্চাদের নিয়ে মমতাজ আমার সঙ্গে সংসার করতে চায় তখন আমার মধ্যে ইমোশন কাজ করতে শুরু করে। ফাইনাল সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমরা দুজন দীর্ঘদিন সময় নেই। তারিখটা এই মুহূর্তে মনে না পড়লেও ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। আমিও ওর দু’টি শিশু সন্তানদের নিজের সন্তানের মতোই দেখতাম। ওরা আমাকে বাবা বলে ডাকতো। আমাকে সন্তান নেয়ার কথাও সে বলেছিল। কিন্তু আমি ওর দুই শিশু সন্তানের দিকে তাকিয়ে সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। এরপর মমতাজ সংরক্ষিত আসনের সংসদ সহ আরও দুইবার এমপি হলেন। বেশ ভালো মতোই চলছিল সংসার। আমিও সারা জীবন ওর সঙ্গে সংসার করতে চেয়েছিলাম। দেশ-বিদেশে ওর গানের অনুষ্ঠানের সবখানেই আমাকে নিয়ে যেত।
এরপর নানা কারণেই সাংসারিক কলহ শুরু হতে থাকে। বছর তিনেক আগে আমাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। সময়টা ছিল কোনো এক রমজান মাস। আমি সেদিন এক কাপড়ে ওর বাসা থেকে বের হয়ে যাই। এরপর থেকেই মমতাজের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। এরই মাঝে অনেক কিছুই শুনেছি, সেগুলো নিয়ে আমি কাউকে বিতর্কে জড়াতে চাই না।
ডিভোর্সের বিষয়ে চঞ্চল জানান, আমরা কেউ কাউকে ডিভোর্স দেইনি। পরবর্তীতে বিয়ে নিয়ে কোনো ভাবনা আছে কিনা- এ বিষয়ে চঞ্চল বলেন, নাকে খত দিয়েছি আর বিয়ে করবো না। পেরেশান থেকে মুক্ত হয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ এখন ভালো আছি। হাসপাতাল ও রোগীদের নিয়েই ব্যস্ত সময় কেটে যাচ্ছে।
এদিকে এলাকায় গুঞ্জন উঠেছে মমতাজ বেগমের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত এপিএস মাহমুদুল হাসান জুয়েলের একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তাকে নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন কণ্ঠশিল্পী মমতাজ। এ বিষয়ে চঞ্চল বলেন, এ নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। সেটা আপনারা সবই জানেন।
মমতাজ বেগমের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯০ সালের পর রশিদ সরকার মমতাজকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী মিলে বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে বেড়াতেন। মমতাজ ও রশিদের ঘরে রয়েছে এক বাকপ্রতিবন্ধী ছেলে। গ্রাম থেকে উঠে এসে মমতাজ যখন গানের জগতে দেশে খ্যাতি অর্জন করতে থাকেন তখন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়। ওই সময় মমতাজের সঙ্গে মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. রমজান আলীর সম্পর্ক গড়ে ওঠায় ২০০০ সালের পরে রশিদ সরকারের সঙ্গে বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। সেই সময় মমতাজের জীবনে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভাব হন মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. রমজান আলী। ২০০১ সালে রমজান ও মমতাজ বেগম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পৌর মেয়র রমজান আলীও বিবাহিত ছিলেন। সে ঘরেও একাধিক সন্তান রয়েছে। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সাবেক সংসদ সদস্য ও কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাবেক মেয়র মোহাম্মদ রমজান আলীও আত্মগোপনে রয়েছেন।

Thursday, September 26, 2024
মানিকগঞ্জের ছায়ামন্ত্রী আফসার শতকোটি টাকার মালিক by রিপন আনসারী
সরজমিন গড়পাড়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ হাটে প্রবেশ করার মুখেই চোখে পড়ে আফসার সরকারের পাঁচ তলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়িটি। আলিশান এই ভবনটি বেশির ভাগ কক্ষই ভাড়া দিয়েছেন। এরপর বাংলাদেশ হাট থেকে কিছু দূরে গ্রামের বাড়ি ডাউলি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় তৃতীয় তলাবিশিষ্ট আরেকটি বাড়ি। বাড়িটি কয়েক বিঘা জায়গার উপর। বাড়ির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। তাছাড়া গ্রামের বাড়ির চারপাশে তার রয়েছে অঢেল সম্পদ। শুধু গ্রামের বাড়িতেই সম্পদের পাহাড় নয়; গড়পাড়া ইউনিয়নের আরও বেশ কিছু এলাকায় রয়েছে তার শত শত বিঘা সম্পত্তি। তিনি কতো বিঘা সম্পত্তির মালিক সেটা স্পষ্ট করে কেউ বলতে পারেননি। জেলা শহরের কালীবাড়ি এলাকায় বহুতল ভবনে রয়েছে কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট। সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের আশপাশে এবং সদর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে তার কোটি টাকা মূল্যের নিজস্ব জায়গা।
অভিযোগ রয়েছে গড়পাড়া এলাকায় বাংলাদেশ হাট সংলগ্ন তার পাঁচতলা ভবনের জায়গা নিয়ে। কয়েক বছর আগে এলাকার ৯০ বছরের বৃদ্ধ অসহায় সাহাম উদ্দিনের স্ত্রী আছিয়া খাতুনের নামে ৭ শতাংশ জায়গার মধ্যে সোয়া ৪ শতাংশ তিনি লিখে নেন। বাজারদর অনুযায়ী প্রতি শতাংশ ১০ লাখ টাকার উপরে বিক্রি করার স্বপ্ন ছিল ওই বৃদ্ধের। কিন্তু ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তার করে লামছাম টাকা দিয়ে জায়গাটি লিখে নেয়া হয়। বৃদ্ধ সাহাম উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, ওই সময় অনেকেই বেশি দামে আমার জায়গা নিতে চেয়েছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান আমাকে বিক্রি করতে দেয়নি। যারা কিনতে এসেছিল তাদেরও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।
এলাকার নুরে আলম বলেন, বাংলাদেশ হাটে আমাদের বাপ- চাচার নামে লিজ নেয়া ১১০ শতাংশ জায়গার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গা আফসার চেয়ারম্যানের লোকজন জবর দখল করে দোকানপাট তুলেছে। শুধু তাই নয়, আমাদের নিজস্ব একটি জায়গায় অন্যকে দিয়ে মামলা করিয়ে জায়গাটি স্টে অর্ডার করে রাখা হয়েছে। এসব করেছে জাহিদ মালেকের শেল্টারে। মূলত মন্ত্রীর কাঁধে ভর করে চেয়ারম্যান আফসার অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। এলাকার হিন্দু সমপ্রদায়ের এক ব্যক্তি মানবজমিনকে বলেন, শুধু মানিকগঞ্জেই নয় আফসার সরকারের ভারতেও বাড়ি রয়েছে। সেটা এলাকার অনেকে জানে।
এলাকাবাসী জানান, এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে মাদকের অভয়াশ্রম হিসেবে গড়পাড়া ইউনিয়নকে কলঙ্কিত করেছেন আফসার সরকারের মেয়ের জামাই মহব্বত হোসেন। মাদক বেচাকেনার ভাগও পেতেন আফসার। প্রধান শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা না থাকলেও শ্বশুরের বদৌলতে তাকে জাহিদ মালেকের নামে গড়পাড়া জাহিদ মালেক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। একজন শিক্ষক হয়েও তার এই অপকর্ম এলাকার মানুষ ভালো দৃষ্টিতে দেখেনি। তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করারও সাহস পায়নি। মাসের বেশিদিনই অনুপস্থিত থেকেছেন। শুধুমাত্র মাস শেষে সাইন করে বেতনের টাকা উত্তোলন করেন। শুধু মাদকই নয় এলাকার বিচার- সালিশ, বাণিজ্যসহ নানান অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন মহব্বত। আফসার সরকারের একমাত্র ছেলে ঝিনুক সরকার গড়পাড়া এলাকায় নিজস্ব বাহিনী তৈরি করে স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেট ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাছাড়া ব্যাংক এশিয়ার এজেন্টও ছেলের নামে আনা হয়েছে। পিতার অপকর্মের বিরুদ্ধে যাতে কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে না পারে তার জন্য এলাকায় তৈরি করেছিলেন নিজস্ব বাহিনী।
আফসার সরকারের অর্থ বাণিজ্যের আরেকটি খাত ছিল নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার ব্যবসা। এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন মেহেদি হাসান সম্রাট নামের এক আত্মীয়। সম্রাট ১২ হাজার টাকার বেতনে চাকরি করলেও এলাকায় তার ডুপ্লেক্স বিল্ডিংয়ের পাশাপাশি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার রয়েছে নিজস্ব গাড়ি। আফসার সরকারের জমি সম্পর্কিত বিষয়াদি দেখতেন গড়পাড়া এলাকার দু’জন ব্যক্তি। তাছাড়া মানিকগঞ্জের জয়রা এলাকায় সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পিতার নামে কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জায়গা কেনাবেচা এবং মাটি ভরাটের দায়িত্বে ছিলেন আফসার সরকার। সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন। তাছাড়া কর্নেল মেডিকেল কলেজ হসপিটালে ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জামাদিসহ সব কিছুই কেনাবেচা আফসার সরকারের মাধ্যমে করতো কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় থেকে শুরু করে খণ্ডকালীন যে সমস্ত শ্রমিককে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে ৩-৪ লাখ টাকা করে উৎকোচ নিয়েছে।
জাহিদ মালেক দুই মেয়াদে মন্ত্রিত্ব থাকায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন তদবির, চাকরি, বদলিসহ ওই মন্ত্রণালয়ের এমন কোনো বাণিজ্য ছিল না যা আফসার সরকার নিয়ন্ত্রণ করতো না। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাকে দিয়েই মূলত অবৈধ এসব বাণিজ্য করাতেন। এসব বাণিজ্যে মন্ত্রীর পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা বাগিয়ে নিতেন আফসার সরকার। এমনও অভিযোগ রয়েছে দেশের বড় বড় সরকারি হসপিটালের ঠিকাদারি কাজ পেতে অনেক প্রভাবশালীরা ছুটে আসতো আফসার সরকারের কাছে। তাকে ম্যানেজ করেই মন্ত্রীর কাছ থেকে কাজ বাগিয়ে নেয়া হতো। এতে মন্ত্রী ও আফসার সরকার দু’জনেরই পকেট ভারী হতো।
মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড টার্মিনালে গণপরিবহন থেকে মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকার চাঁদাবাজির একটা অংশ আফসার সরকারকে দেয়া হতো। পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির দায়িত্বে ছিলেন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান জাহিদ। এ ছাড়া আফসার সরকার মন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে মানিকগঞ্জ সদর এবং সাটুরিয়া থানা নিয়ন্ত্রণ করতেন। বিরোধী পক্ষসহ বিভিন্ন মানুষজনকে যখন খুশি মামলার জালে আটকে দিতেন। তার কথাতেই থানা পুলিশ চলতো। সেখান থেকেও নানাভাবে অর্থ বাণিজ্য করতো আফসার সরকার। মানিকগঞ্জে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডার থেকেও আফসার সরকারকে ভাগ দিতে হতো। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত নেতাদেরও কোণঠাসা করে রাখার পেছনে আফসার সরকারের ভূমিকা ছিল। তার অর্থবিত্ত শুধু মানিকগঞ্জকেন্দ্রিকই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পার্শ্ববর্তী ভারত ও মালয়েশিয়ায় বাড়ি ও ব্যবসা রয়েছে এমন তথ্য মানিকগঞ্জের অনেকেই অবগত রয়েছেন। এদিকে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের গড়পাড়ায় বিশাল বাগান বাড়ি এবং ছেলের নামে শুভ্র সেন্টার দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন আফসার। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন সেক্টর থেকে আসা টাকার ভাগবাটোয়ারা তিনি নিজে করতেন। বড় একটি অংশ যেত মন্ত্রীর পকেটে। এ ব্যাপারে আফসার উদ্দিন সরকারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে। এদিকে আফসার সরকারের বিরুদ্ধে নাশকতার দায়ে ইতিমধ্যে মানিকগঞ্জ সদর থানায় মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

Saturday, September 14, 2024
পদ্মার দুর্গম চরে বিল্লালের রাজত্ব টর্চারসেলে চলতো নির্যাতন by রিপন আনসারী
সরজমিন মানবজমিনের অনুসন্ধানে এমন চিত্র পাওয়া গেল আজিমনগর ইউনিয়নে। চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন ও তার বাহিনীর নির্যাতন ও অপকর্মের রাজসাক্ষী হিসেবে মানবজমিনের কাছে তুলে ধরেন স্বয়ং তার পরিষদের একজন গ্রাম পুলিশ শেখ মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান বিলাল হোসেন ও তার বাহিনী চরে এমন কোনো অপকর্ম নেই যে করেনি। আমি তার অপকর্মের প্রত্যক্ষদর্শী। আমাকে দিয়েও অনেক অন্যায় অবিচার কাজ করিয়েছেন। বাড়িতে একটি টর্চার সেল বানিয়ে তার অবাধ্য চরাঞ্চলের নিরীহ মানুষজনকে শারীরিক প্রহার করা হতো। আমি সবই নিজ চোখে দেখেছি কিন্তু ভয়ে কিছু বলতে পারিনি। তিনি বলেন, প্রকল্পের ঘর দেয়ার নাম করে মানুষজনের কাছ থেকে ৪০-৫০ হাজার টাকা নিয়েছে আমি সেটার রাজসাক্ষী। তাছাড়া ভূমি দেয়ার কথা বলে ৩০০ মানুষের কাছে ১০ হাজার করে টাকা নিয়েও কাউকে জমি দেয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের মাধ্যমে সেই টাকাগুলো নিয়েছে। সেখান থেকে সচিব ভাগ পেয়েছে। তার কাছে সেই তালিকা এখনো রয়েছে। চোখের সামনে তার এই অপকর্ম দেখে আমি চাকরি করবো না বলে তাকে জানিয়ে দিই। তখন চেয়ারম্যান ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে বলে, ‘তুই করবি না, তোর বাপে চাকরি করবে’। পরে আমার দুই মাসের বেতন আটকে দেয়া হয়। উপজেলার নাজিমুদ্দীন স্যারকে বলে আমাকে চাকরি থেকে বাদ দেন। সরকার পতনের পর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আমাকে ডেকে বলে, ‘তোমার চাকরি কেউ খায়নি।’
আজিমনগর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীর শিকদারের ক্ষোভের শেষ নেই। তার অপরাধ সে বিএনপি করে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, গত ইউপি নির্বাচনে এলাকার জনগণ আমাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু গত আড়াই বছরে একদিনও আমাকে ইউনিয়ন পরিষদে ঢুকতে দেয়নি চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন ও তার লোকজন। যার কারণে আমার ওয়ার্ডের জনগণের জন্য আমি কিছুই করতে পারিনি। তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে আমার জায়গা জমি দখল করে নিয়েছে। আমার জমিতে আবাদ করা ৩০০ মণ ভুট্টা লুট করেছে। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে এভারেজে আমি ৮ বছরও বাড়িতে থাকতে পারিনি। কয়েকটি মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাকে বাড়িছাড়া করেছে। ভূমি দখল থেকে শুরু করে মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেয়া, নির্যাতনসহ এমন কোনো কাজ নেই যা বিল্লাল চেয়ারম্যান ও তার লোকজন করেনি। চেয়ারম্যানের ভাই মোশারফ হোসেন এলাকার নিরীহ মানুষের শত শত বিঘা জমি দখল করেছে। ভূমিহীনদের কাছ থেকে জায়গা জমির কাগজ করে দেয়ার কথা বলে ১০ হাজার ২০০ টাকা করে প্রায় ৬০০ জনের কাছ থেকে নিয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বাবদ একেকজনের কাছ থেকে ৭০-৮০ হাজার করে টাকা লুটে নিয়েছে। চেয়ারম্যানের প্রধান ক্যাডার বাহিনীদের মধ্যে তার ভাই মোশাররফ, আতি মতি, আতোর আলীসহ আরও অনেকে। এনায়েতপুর গ্রামের বৃদ্ধ লাল মিয়া বলেন, বছর তিনেক আগে চেয়ারম্যান তার লোকজন দিয়ে আমার ছয় বিঘা জমি দখল করে নিয়েছে। প্রশাসনের কাছে গিয়েও কোনো বিচার পাইনি। আমার মতো এলাকার অনেক মানুষকেই সে অত্যাচার করেছে। এলাকার মহিলারাও তার ভয়ে বাড়ির বাইরে বের হতে সাহস পেত না। রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা সোবহান খান।
৩০ বছর ধরে তিনি তার জায়গা জমিতে বসবাস করছিলেন। বিল্লাল চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর আমার জমিতে তার চোখ পড়ে। মাস তিনেক আগে আমাকে হুমকি দেয়। বলেন, ‘জমিতে থাকতে হলে তোকে ৬ লাখ টাকা দিতে হবে। তা না হলে রাতারাতির মধ্যে বাড়িঘর ভেঙে তোকে চলে যেতে হবে।’ পড়ে বাধ্য হয়ে ৫ লাখ টাকা বিল্লাল চেয়ারম্যানের হাতে তুলে দিই। যুবক সোহেল রানা মানবজমিনকে বলেন, বিল্লাল হোসেনের বাবা ছিলেন একজন সামান্য ইউপি সদস্য। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পদ-পদবি ভাগিয়ে নিয়ে নেয়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মারধর ও হামলা চালিয়ে এলাকা থেকে বিতাড়িত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর আগে তাদের গ্রামে তেমন অস্তিত্ব ছিল না। চেয়ারম্যান হওয়ার পর সে এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। চরের ভেতর বিলাসবহুল ৩ তলা বাড়ি। বাবার নামে রেকর্ডভুক্ত কোনো সম্পত্তি না থাকলেও তারা ১০-২০ হাজার মণ ভুট্টা পায়। রয়েছে বড় বড় ছয়টি গাড়ি। ঢাকার কেরানীগঞ্জে ২০ কাঠা জমির উপর ছয় তলাবিশিষ্ট ভবন রয়েছে। তিনি বলেন, চেয়ারম্যানের ছোট ভাই মোশারফ হোসেন স্থানীয় যুবলীগের সভাপতি। তিনি ও তার লোকজন এলাকার মাদকের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এলাকার অনেক পরিবারের সন্তান মাদকে আক্রান্ত হয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। শিকারীপুরের সৌদি প্রবাসী আলহাজ মোল্লা বলেন, ২০২১ সালে আমার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের দাওয়াত করায় বিল্লাল চেয়ারম্যানের লোকজন আমার বাড়িতে ঢুকে হামলা চালিয়ে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়।
এরপর আমাকে চৌকিদার দিয়ে ধরে তার বাড়িতে নিয়ে আয়নাঘরের মতো একটি রুমে নিয়ে ইচ্ছেমতো মারধর করে। চেয়ারম্যান নিজে এবং তার বাহিনীরা মারতে মারতে আমাকে অচেতন করে ফেলে। পরে আমার আত্মীয়স্বজন উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল নিয়ে যায়। আমার মতো এলাকার যারা বিএনপি করে তাদের ধরে মারধর করতো। এলাকার মোহাম্মদ আলী বলেন, আমি একজন ব্যবসায়ী। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ফরিদপুর জেলার কোতোয়ালি থানা, মানিকগঞ্জ সদর থানা, হরিরামপুর, সাটুরিয়া ও সিংগাইরসহ বিভিন্ন থানায় এ পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধশত মামলা দিয়েছে। রাজনৈতিক, চাঁদাবাজিসহ এমন কোনো মামলা নেই যেটা বিল্লাল চেয়ারম্যান ও তার লোকজন দেয়নি। গত ১৫ বছরে হামলা মামলা দিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি করা হয়েছে। কৃষক সেকেন খাঁ বলেন, জমি দেয়ার কথা বলে চেয়ারম্যানের নির্দেশে এনায়েত মেম্বার আমার কাছ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে। অল্প কিছু জমি দিলেও কথা অনুযায়ী বাকি জমি দেয়নি। এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি হান্নান মৃধা মানবজমিনকে বলেন, আমি পরপর দু’বার চেয়ারম্যান ছিলাম আজিমনগর ইউনিয়নে। জবরদখল করে বিল্লাল চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকেই ইউনিয়নে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে। এলাকার মানুষের স্বাধীনতা ও শান্তি সবটুকুই কেড়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমি আমার এলাকায় ঢুকতে পারিনি। চেয়ারম্যান ও তার লোকজন আমাকে ঢুকতে দেয়নি। তাছাড়া বিএনপি’র নাম শুনলেই অত্যাচার নির্যাতন করতো। চরে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে একটি বাহিনী তৈরি করেছিল। টর্চারসেল বানিয়ে সেখানে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। এখনো চরে তার লোকজন প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। তাছাড়া সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর খানও বর্তমান বিল্লাল চেয়ারম্যানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চরে অশান্তি সৃষ্টি করছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহরিয়ার রহমান মানবজমিনকে বলেন, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ শোনার পর আমরা এসিল্যান্ড এবং কৃষি কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছিলাম। আশ্রয়ণ প্রকল্পের কয়েকটি ঘরে সার এবং ভুট্টা পাওয়া গেছে। সেগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য বলা হয়েছে। তাছাড়া ভূমি দেয়ার অধিকার চেয়ারম্যানের নেই। মানুষজন যদি কোনো টাকা পয়সা দিয়ে থাকে তা যদি প্রমাণিত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম রয়েছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইউনিয়নটি দুর্গম চরাঞ্চল হাওয়ায় সেখানে যাওয়া আসায় এক ধরনের সমস্যা। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকায় প্রশাসনিকভাবে সেখানে তেমন কোনো তৎপরতাও চালানো সম্ভব হয় না। চরে একটি পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থাকলেও সেটি এখনো চালু হয়নি।

Monday, September 23, 2019
একজন সফল নারী উদ্যোক্তা by রিপন আনসারী

বাবা নেই, তবে বাবাকে অনুকরণ করেই পথ চলছেন তিনি। ১৯৬১ সালের ৪ঠা এপ্রিল হারুনার রশিদ খান মুন্নু ও তার সহধর্মিণী হুরুন নাহারের ঘর আলোকিত করে এসেছেন আফরোজা খান রিতা। সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে, প্রথম সন্তান যদি মেয়ে হয়, তবে সে সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে আসে। অর্থাৎ বাবার কাছে আফরোজা খান রিতা ছিলেন সৌভাগ্যের প্রতীক। আর ছোটবেলা থেকেই বাবার সততা আর আদর্শে মুগ্ধ ছিলেন। তার বাবা ছিলেন তার অহঙ্কার। বাবাকে হারানোর পর তার মাথার উপরের বটগাছটি যেন সরে গেছে। এতে ছায়াহীন রিতার দায়িত্ব আরো বেড়ে গেছে বহুগুণ। বাবাকে হারানো দুই বছর পেরিয়ে গেছে। তবে বাবা হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন নিরন্তর। মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফরোজা খান রিতার শিক্ষা জীবনে সবচেয়ে বড় সফলতা আসে এইচএসসি পরীক্ষায়। সে পরীক্ষায় মেধা তালিকায় সারা দেশে অষ্টমস্থান অধিকার করেন। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমকম পাস করেন। লেখাপড়ার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আর ঘরে বসে থাকেননি। বাবার ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। আর খুব অল্প সময়ে হয়ে উঠেন একজন পরিপক্ব ব্যবসায়ী। ফলে বৃদ্ধ বাবাকে জীবদ্দশায় ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে টেনশনে থাকতে হয়নি। মেয়ের প্রতি বাবার আস্থা ও ভরসা পুরোটাই ছিল। বাবা নেই তাই বাবার স্বপ্নের সঙ্গে নিজের স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করাটাই তার মূল লক্ষ্য। তাই তো বাবার আদর্শ, কর্ম উদ্দীপনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিজের ভেতর ধারণ ও লালন করেছেন। সেই আদর্শের দীক্ষাতেই আফরোজা খান রিতা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাবার প্রতিষ্ঠিত মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মুন্নু ফেব্রিক্স, মুন্নু অ্যাটেয়ার, মুন্নু জুটেক্স, মুন্নু জুট স্টাফলার্স, মুন্নু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মুন্নু নার্সিং কলেজসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া বিপদে আপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে রীতি মরহুম হারুনার রশিদ খান মুন্নু তৈরি করে গেছেন তার সেই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন আফরোজা খান রিতা। শুধু তাই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিকতার পাশাপাশি এক হাতেই সামাল দিচ্ছেন নিজের সংসার। বয়স্ক মা, স্বামী, সন্তানসহ পুরো পরিবারের সকলের মধ্যমণি হচ্ছেন তিনি। এদিকে মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের অন্যতম মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সফলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সিরামিক শিল্পে মুন্নু সিরামিকের নাম-ডাক সারা দুনিয়াতেই রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতা এবং আফরোজা খান রিতার দক্ষ পরিচালনায় ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের জাতীয় রপ্তানি বাণিজ্যে বিশেষ অবদানের জন্য মুন্নু সিরামিক সেরা রপ্তানিকারক ট্রফি (গোল্ড পদক) অর্জন করেছে। মুন্নু সিরামিকের চেয়ারম্যান আফরোজা খান রিতা গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে সেরা রপ্তানিকারক ট্রফি (গোল্ড পদক) গ্রহণ করেছেন। সিরামিক টেবিলওয়্যার পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য এ নিয়ে ১২তম জাতীয় রপ্তানি ট্রফি (স্বর্ণ) অর্জন করেছে মুন্নু সিরামিক। এর আগে বাংলাদেশ সিরামিক শিল্পের অগ্রপথিক আফরোজা খান রিতা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সিরামিক রপ্তানি খাতে সিআইপি (রপ্তানি) ২০১৫ নির্বাচিত হয়েছেন।
Wednesday, August 21, 2019
ভাগ্যরাজকে দিয়ে ভাগ্যের পরিবর্তন হলো না ইতির by রিপন আনসারী

সাটুরিয়া উপজেলার দেলুয়া গ্রামের খান্নু মিয়া এবার কোরবানির ঈদের জন্য তৈরি করেছিলেন হলিস্টিন ফ্রিজিয়ান জাতের গরু ভাগ্যরাজ। ৫০ মণ ওজনের উপরে ভাগ্যরাজকে এবারো কোরবানির ঈদে বিক্রি করতে না পারায় হতাশ তিনি।
এর আগে তার হাতে তৈরি করা দেশের সবচেয়ে বড় গরু রাজাবাবুকে বিক্রি করেছিলেন ১৮ লাখ টাকায়। তার পরের বছর লক্ষ্মীসোনা নামের বিশাল আকৃতির গরু বিক্রি করেছেন ১৬ লাখ টাকা। সেই দুটি গরু বিক্রি করে তিনি লাভবান হতে পারেননি। কিন্তু এবার ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য তৈরি করেছিলেন ভাগ্যরাজকে। তাও বিক্রি করতে পারলেন না।
খান্নু মিয়া বলেন, এর আগের দুই ঈদে রাজাবাবু আর লক্ষ্মীসোনা বিক্রি করে লাভবান হতে পারিনি। তাই বছর খানেক আগে চার লাখ টাকা দিয়ে হলিস্টিন ফ্রিজিয়ান জাতের ষাঁড় তৈরি করেছিলাম। তার নাম দিয়েছি ভাগ্যরাজ। মূলত ভাগ্যের পরিবর্তন করার জন্যই এই নাম রাখা হয়েছে। ওজন ৫০ মণের ঊপরে। এই ভাগ্যরাজকে পরিবারের সন্তানের মতোই লালন পালন করেছি। অনেক আশা নিয়ে এবং ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য ভাগ্যরাজকে গাবতলীর হাটে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি ২২ লাখ টাকা দাম হাঁকিয়েছি। কিন্তু ক্রেতারা আমার এই দামের ধারে কাছেও আসেনি। ৫ লাখ টাকা দাম উঠার কারণে ভাগ্যরাজকে বিক্রি করিনি। ঈদের পরদিন ভাগ্যরাজকে বাড়ি নিয়ে এসেছি। ভাগ্যের পরিবর্তন তো দূরের কথা আমার ভাগ্যের কপালে ছাই।
খান্নু মিয়ার মেয়ে ইতি আক্তার জানান, ভাগ্যরাজের খাবার তালিকায় ছিল আপেল, মাল্টা, কলা, আখের গুড়, ভুট্টা, ভূষি। প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার টাকার খাবার লাগে ভাগ্যরাজের। দিনে শ্যাম্পু দিয়ে ৪-৫ বার গোসল এবং সর্বক্ষণই ফ্যানের বাতাসে রাখা হতো। পরিবারের সদস্যদের যেভাবে লালনপালন করতে হয় ভাগ্যরাজকে আমরা সেই ভাবেই লালন পালন করেছি। তবে কষ্ট হচ্ছে বিক্রি করতে পারলাম। এতদিনের আমাদের ঘাম ঝরানো কষ্ট বিফলে গেল।
এদিকে সাটুরিয়া উপজেলার বিল্লাল হোসেনের বিশাল আকৃতির সিনবাদও বিক্রি হয়নি। ২৫ লাখ টাকা দামের আশায় গাবতলী হাটে নিয়ে গেলে মাত্র ১০ লাখ টাকা দাম উঠে। এত কম দামে সিনবাদকে বিক্রি করতে নারাজ বিল্লাল হোসেন। আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় ঈদের পর দিন সিনবাদকে ফিরিয়ে আনা হয় সাটুরিয়াতে। তার মনেও অনেক কষ্ট।
Thursday, August 1, 2019
‘একটি মুহূর্তের জন্যও বাবাকে ভুলতে পারি না’ by রিপন আনসারী

সাবেক মন্ত্রী ও শিল্পপতি মরহুম হারুনার রশিদ খান মুন্নুর আজ দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। আজকের এইদিনে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন অনন্তকালের ঠিকানায়।
ঘুমিয়ে আছেন তারই হাতে গড়া মানিকগঞ্জের মুন্নু সিটিতে দৃষ্টিনন্দন মসজিদের পাশে। দিন, মাস এবং বছর পেরিয়ে গেলেও বিন্দু পরিমাণ শোক কাটেনি মুন্নু পরিবারে। প্রিয় এই মানুষটির কথা মনে করে সর্বক্ষণই তাদের চোখে পানি ঝরে। মুন্নু সিটিতে সমাহিত বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে প্রায়ই কাঁদতে দেখা যায় পরিবারের বড় কন্যা মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফরোজা খান রিতাকে। তার বাবা ছিলেন তার আদর্শ। ছোট থেকেই বাবার সেই আদর্শ অনুসরণ করেই আফরোজা খান রিতা পথ চলছেন। বাবার কাছ থেকে শিখেছেন কীভাবে ব্যবসা, রাজনীতি, সামাজিকতা আর মানবসেবা করতে হয়। পিতার মতো তিনিও সাধারণ মানুষের কাছে আলোকিত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন অনেক আগে থেকেই। বাবা চলে গেলেও যোগ্য পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তার বাবার রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ হাতেই পরিচালনা করে আসছেন আফরোজা খান রিতা।
একান্ত আলাপচারিতায় আফরোজা খান রিতা মানবজমিনকে তার বাবার সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে বলেন, কি যে হারিয়েছি বোঝাতে পরবো না। একটি মুহূর্তের জন্যও বাবাকে ভুলতে পারি না। তাকে ছাড়া সব কিছুই যেন খাঁ খাঁ করছে। ঘরে বাইরে যে দিকেই চোখ বুলাই শুধুই বাবার স্মৃতি ভেসে উঠে।
বলেন, আমার বাবা ছিলেন একজন আদর্শবান মানুষ এবং আদর্শবান পিতা। তিনি ছিলেন আমাদের অহঙ্কার, আমার আদর্শ এবং আমার পরিবারের বটবৃক্ষ। শিশুকাল থেকেই যার শীতল ছায়ায় একটু শান্তির নীড় খুঁজে পেতাম। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের পুরো পরিবারকে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু বড় অসময়ে চলে গেলেন।
আফরোজা খান রিতা বলেন, সেই ছোট কাল থেকেই আমরা দুই বোন তার কাছ থেকে অসম্ভব ভালোবাসা পেয়েছি। আমাদেরকে ‘মা’ ছাড়া কোনো সময় ডাকতেন না। সর্বক্ষণ বাবার সেই ‘মা’ ডাক আমার কানে ভেসে বেড়ায়। খাবার সময় হলেই বাবা-মা খাবার নিয়ে টেবিলে বসে অপেক্ষায় থাকতেন আমি কখন আসবো। আমি এলেই তারা খাবার শুরু করতেন। কিন্তু আজ দু’টি বছর খাবার টেবিলে বাবাকে পাশে পাই না। বাবার অভাব আর স্মৃতিগুলো সর্বক্ষণ আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। একটি মুহূর্তের জন্য আমি তাকে ভুলতে পারি না। আজ দু’টি বছর ধরে আব্বা বলে ডাকতে পারি না। হৃদয়ের ভেতর কি যে কষ্ট হয় তা কাউকে বোঝাতে পারবো না।
রিতা বলেন, আমি দেখেছি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার বাবা তার সততা থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটেননি। একজন আদর্শবান পিতার সন্তান হয়ে তাই আমি গর্বিত। তিনি জীবদ্দশায় স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন। তার স্বপ্ন ছিল মানিকগঞ্জের বুকে একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠা করা। আর মানিকগঞ্জের বুকে প্রথম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন আমার বাবা। স্বপ্ন ছিল গ্রামের বুকে আন্তর্জাতিক মানের স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করা। মুন্নু ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে সে স্বপ্নও তার পূরণ হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অসম্ভব দুর্বল ছিলেন তিনি। তাই তো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। আর গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য কাজ করতে তিনি বেশি পছন্দ করতেন। হরিরামপুরে পদ্মার থাবায় যারা বাড়িঘর হারিয়েছেন, যাদের মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই ছিল না তাদের জন্য তৈরি করে দিয়েছেন রিতা আবাসন প্রকল্প। এছাড়া তার হাতে গড়া মুন্নু সিরামিক, মুন্নু ফেব্রিক্স, মুন্নু অ্যাটেয়া, মুন্নু নার্সিং মেডিকেল কলেজসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে যেখানে হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী মানুষ আমার বাবাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন, ভালো বাসতেন।
পিতার রাজনীতি জীবন সম্পর্কে আফরোজা খান রিতা বলেন, আমার বাবা সারা জীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। মানুষের বিপদ-আপদে সব সময়ই ছুটে বেড়াতেন। কখনো ক্লান্ত হননি। রাজনীতি করতে গিয়ে কখনোই অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল বলেই চার বার হয়েছেন এমপি, হয়েছেন মন্ত্রী। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা চারবার বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-২ ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনে একই সঙ্গে নির্বাচন করে দু’টি আসনেই জয়লাভ করে তার জনপ্রিয়তার কারিশমা দেখান। দলীয় নেতাকর্মীদের আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা ছিল তার প্রতি। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত দলের প্রতি ছিল তার প্রচণ্ড রকম ভালোবাসা। সব মিলিয়ে একজন ক্লিন ইমেজের মানুষ ছিলেন আমার বাবা। তার কর্মগুণের কারণে মানিকগঞ্জের প্রতিটি মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করতেন এবং ভালোবাসতেন। সেই সঙ্গে আমার রাজনীতি, ব্যবসা, সমাজসেবাসহ সব কিছু্র হাতেখড়িই হচ্ছেন আমার বাবা। বাবার সেই আদর্শকে সামনে রেখেই আমি পথ চলছি।
সমস্ত আবেগ ছিল মানিকগঞ্জের মানুষকে ঘিরে:
বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর জীবনী নিয়ে ’আমার জীবন উপাখ্যান’- নামের একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। সেই বইয়ের প্রত্যেকটি অক্ষরে অক্ষরে তুলে ধরা হয়েছে তার জীবন- সংগ্রামের সব গল্প। ২২৪ পাতার এই বইয়ের একজায়গায় মানিকগঞ্জের প্রতি তার সমস্ত আবেগ ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন। সেখানে হারুনার রশিদ খান মুন্নু বলেছেন, আমার সমস্ত আবেগ মানিকগঞ্জের মানুষকে ঘিরে। তাই রাজধানীর অভিজাত এলাকা ছেড়ে এসে আমি সব গড়েছি সোঁদা মাটির গন্ধজুড়ে থাকা প্রাণের মানিকগঞ্জে। মানুষ কিছুটা সচ্ছল হওয়া মাত্রই শহরমুখী হয়। আর আমি আমার ঝলমলে পৃথিবী ছেড়ে চলে এসেছি মাটির কাছাকাছি। আমার অন্য কোনো দায় ছিল না। অন্য কোনো মোহ ছিল না। আমার সমস্ত টান এবং মমত্ববোধজুড়ে মানিকগঞ্জের মাটি ও মানুষ। আমি তাদের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সমগ্র জীবন আমি মানিকগঞ্জেই থাকবো। আমার চলে যাওয়ার সময়-স্থান-প্রেক্ষাপট নিয়ে আমার অগ্রিম কোনো ধারণা নেই। তবুও আমি সবাইকে জানিয়ে রেখেছি, আমার কবরটা যেন এই মাটিতেই হয়। আমার আয়ু ফুরোবার পর এ মানিকগঞ্জের মাটিতে শেষ ঘুম ঘুমাতে চাই। মুন্নু সিটির ভেতরে জামে মসজিদের প্রাত্যহিক আজান যেন আমি শুনতে পাই। এ মাটি ছেড়ে আমি অন্য কোথাও যেতে চাই না। মানিকগঞ্জের প্রতি আমার আবেগের প্রাবল্য এখানেই। বইয়ে লেখা হারুনার রশিদ খান মুন্নুর শেষ চাওয়াটাও পূরণ হয়েছে।
মুন্নুর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে যা থাকছে-
আজ বৃহস্পতিবার নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে মানিকগঞ্জের গিলন্ড এলাকায় মুন্নু সিটিতে মরহুম হারুনার রশিদ খান মুন্নুর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠান পালন করবে মুন্নু পরিবার।
মৃত্যুবার্ষিকীর প্রথম প্রহরে মুন্নু সিটিতে হারুনার রশিদ খান মুন্নুর সমাধিতে প্রথম ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন মুন্নু পরিবারের সদস্যরা। এ সময় উপস্থিত থাকবেন, মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হারুনার রশিদ খান মুন্নুর বড় মেয়ে আফরোজা খান রিতা, মুন্নু ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও মুন্নুপত্নী হুরুন নাহার রশিদ, মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান ও আফরোজা খান রিতার স্বামী মঈনুল ইসলাম স্বপন, মুন্নু সিরামিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আফরোজা খান রিতার বড় ছেলে রাশিদ মাইমুনুল ইসলাম এবং মুন্নু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নির্বাহী পরিচলাক ও আফরোজা খান রিতার ছোট ছেলে রাশিদ রাফিউল ইসলাম। এরপর শ্রদ্ধা জানাবেন মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সকল প্রতিষ্ঠানের সদস্যবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পেশজীবী, সামাজিক,
সাংস্কৃতিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষজন।
সকাল থেকেই হুরুন নাহার রশিদ জামে মসজিদ ও মরহুমের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হবে কোরআন তিলাওয়াত। মুন্নু গ্রুপের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হবে দোয়া মাহফিল। বিকালে মুন্নু ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের আয়োজনে মুন্নু সিটিতে মরহুমের আত্মার মাগফিরত কামনায় অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ মিলাদ ও দোয়া মাহফিল।
এছাড়া হারুনার রশিদ খান মুন্নুর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতবারের ন্যায় এবারও মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা দিনব্যাপী বিনা পয়সায় রোগী দেখবেন। এছাড়া মাসব্যাপী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অপারেশনে থাকছে ২০% ভাগ ছাড়।
Sunday, May 26, 2019
ঈদ সামনে রেখে চলছে লক্করঝক্কড় গাড়ি মেরামত by রিপন আনসারী

সরজমিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ঘেঁষা মানিকগঞ্জের উচুটিয়া এলাকাসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কসপে গিয়ে দেখা গেল লক্করঝক্কড় বাস মেরামতের হিড়িক পড়ে গেছে। ফিটনেসবিহীন ভাঙাচোরা গাড়িগুলো জোড়াতালি দেয়া হচ্ছে ওয়ার্কসপে। মিস্ত্রিরা পুরাতন গাড়ি মেরামতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। কোনো গাড়ির ইঞ্জিন, সড়ক দুর্ঘটনায় দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া, ব্রেকে সমস্যা কিংবা সিটগুলো ছেঁড়া। আবার কোনো গাড়ির বডিতে রং-চং নেই। ঈদের সময় বহু বছরের পুরাতন এসব গাড়িগুলো মেরামত করে নতুন সাজে রোডে নামানোর জন্য আনা হয়েছে ওয়ার্কসপে। ২৫-২৬ রোজার মধ্যে লক্করঝক্কড় এসব গাড়িতে রং- চং মাখিয়ে নতুন সাজে রোডে নামানো হবে। দেখে বোঝার উপায় নেই গাড়িগুলো ফিটনেসবিহীন।
রাব্বি ওয়ার্কসপে গিয়ে দেখা গেল রং মিস্ত্রি উজ্জ্বল পুরনো গাড়িগুলোর বডিতে রং-চংয়ের কাজ করছেন। কাজের ফাঁকে উজ্জ্বল জানালেন, পুরাতন গাড়ি ঈদের সামনে রং করে নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে। যাতে যাত্রীরা আকৃষ্ট হয়। সময় মতো ডেলিভারি দেয়ার জন্য দিন-রাত গাড়িতে রংয়ের কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
রাব্বি মটরসের পরিচালক সানোয়ার মিয়া জানালেন, এবারের ঈদে গাড়ির কাজ কম হচ্ছে। আর বর্তমানে যেসব গাড়ি আমরা মেরামত করছি সেগুলোর বেশির ভাগই রোড পারমিট নেই। ঈদের দুই চার দিন আগে রং চং শেষ করে গাড়িগুলো মানিকদের কাছে ডেলিভারি দিতে হবে।
বাসের চালক কুদ্দুস মিয়া জানালেন, ঈদের সময় প্রত্যেক যাত্রীই চায় রং-চং করা সুন্দর গাড়িতে উঠতে। তাই বাসের ভেতরের সিট ও বডিতে রংয়ের কাজ করার জন্য আনা হয়েছে। ঈদের সময় গাড়ির ফিটনেস না থাকলে পুলিশ ও সার্জেন্টরা বিরক্ত করে। তাই গাড়ি চিকচাক্য করা হচ্ছে। আর সারা বছরের চাইতে ঈদের সময় কিছু বাড়তি টাকা কামানো যায়।
পাশেই সেকেন্দর ওয়ার্কসপ। সেখানে লক্করঝক্কড় কয়েকটি গাড়ি মেরামতের কাজ চলছে বেশ জোরেশোরে। কেউ বাসে রং করছে, কেউ ইঞ্জিন খুলে বসেছে আবার কেউ সিট ও বডির কাজ করছেন। এভাবেই এখানকার কারিগররা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এই ওয়ার্কসপের পুরান গাড়ি মেরামতের কারিগর আলম মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানালেন, ঈদের সময় পুরাতন গাড়ির কাজ সবচেয়ে বেশি থাকে। ইঞ্জিনে ত্রুটি, বডিতে রং-চং নেই, সিট কভার নষ্টসহ নানা সমস্যা নিয়ে মালিকরা তাদের গাড়িগুলো গ্যারেজে নিয়ে আসেন। আমরা সেগুলো মেরামত করে নতুন সাজে সাজিয়ে দিলে বোঝার উপায় নেই গাড়ি পুরাতন ছিল।
ওয়ার্কসপের মালিক সেকেন্দর আলী জানালেন, মাথায় এখন টেনশন পুরনো গাড়িগুলো মেরামত শেষে ২৫-২৬ রোজার মধ্যে কীভাবে ডেলিভারি দেয়া যায়। তাই রাত-দিন কাজ করা হচ্ছে। নতুন-পুরাতন সহ সব ধরনের গাড়ি মেরামতের কাজ আমাদের এখানে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বাসযাত্রীদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, রং-চং মেখে গাড়িগুলো রোডে নামানোর ফলে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। আসলে এই গাড়িগুলো হচ্ছে উপরে ফিটফাট এবং ভেতরে সদরঘাট। লক্করঝক্কড় বাসের পাশাপাশি মহাসড়কে টেম্পো, সিএসজি চলাচল আবারো বেড়ে গেছে। এসব গাড়ি মহাসড়কে চলাচলে বন্ধ না হলে ঈদে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। প্রশাসনের নজরদারি থাকলে ঈদে পুরনো ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো চলাচলে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।
দেখা যায়, ঈদের আগের তিন-চারদিন সময় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের চাপের বিপরীতে যানবাহন সংকট হয়ে পড়ার সেই সুযোগ কাজে লাগায় একশ্রেণির পরিবহন ব্যবসায়ীরা। রাস্তায় তখন ভালো-মন্দ গাড়ির বাছ বিচার না করে মানুষজন হাতের কাছে যা পায় সেসব গাড়িতেই উঠে যাত্রা শুরু করেন। উপরে রং-চং লাগিয়ে লক্করঝক্কড় গাড়িগুলো সড়কে নামানোর সঙ্গে সঙ্গে কোথাও না কোথাও বিকল হয়ে পড়ে। ফলে রং-চং মাখা এই সব গাড়ির কারণে ঈদে ঘরমুখো মানুষজন রাস্তায় রাস্তায় ভোগান্তির শিকার হন। সেই সঙ্গে ঘটে দুর্ঘটনাও। মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামীম বলেন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি যাতে রাস্তায় চলাচল করতে না পারে সে জন্য আমরা প্রতিনিয়তই ব্যবস্থা নিচ্ছি। এখন থেকে সে ব্যাপারে আমরা জোরালো ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। যাতে ঈদের সামনে এসব গাড়ি রোডে চলতে না পারে। এছাড়া মহাসড়কে যাতে তিন চাকার গাড়িগুলো চলাচল করতে না পারে সে দিকেও আমাদের নজরদারি থাকবে। জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ যৌথভাবে কাজ করে যাবে।
Friday, April 19, 2019
‘আমার সবকিছু কেড়ে নেয়ার পর মেয়ের দিকে কু-দৃষ্টি পড়ে যুবলীগ নেতা উজ্জ্বলের’ by রিপন আনসারী

যার কারণে চারটি বছর ধরে আমাকে যখন যেভাবে খুশি সে ব্যবহার করে যাচ্ছে। সে শুধু একাই আমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেনি, তার বন্ধুদের দিয়েও প্রতিনিয়ত আমার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে। আমার ইজ্জত, মান-সম্মান সবকিছু কেড়ে নেয়ার পর ওই পিশাচের কু-দৃষ্টি পড়ে আমার স্কুলপড়ুয়া মেয়ের দিকে। তাই মেয়ের ইজ্জত বাঁচাতে বাধ্য হয়ে থানায় মামলা করতে হয়েছে আমাকে।
লোমহর্ষক এই ঘটনা ঘিওর উপজেলার নালী ইউনিয়নের হেলাচিয়া গ্রামের। ওই ইউনিয়নের প্রভাবশালী ইউপি সদস্য দরবেশ ব্যাপারীর পুত্র ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলী হোসেন উজ্জ্বল। এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার কেঁদে ফেলেন ওই নারী। তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে তার ওপর নির্যাতনের আরো ভয়াবহ কথা। বলেন, চার বছর ধরে আলী হোসেন উজ্জ্বল আমার জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে। আমার দেহ ভোগ করেই সে ক্ষান্ত হয়নি। আমাকে দিয়ে বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে।
তিনি বলেন- ভয়ভীতি, প্রতারণা আর আমার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার কথা বলে যখন খুশি আমাকে ওর বাড়িতে নিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করতো। এই ঘটনা আমার স্বামীকে বলে দেবে কিংবা ইন্টারনেটে সব ছেড়ে দেবে এই বলে সে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতো। এভাবে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও ওর রোষানল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারিনি। এ ছাড়া ওর ব্যবসার জন্য গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, আশা অফিস, জাগরণীসহ বিভিন্ন এনজিও থেকে ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা আমাকে দিয়ে সে তুলে নিয়েছে। প্রথম প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধ করলেও পরে আর করতো না। গেল এক বছর ধরে সে তার বাড়িতে আমাকে ডাকতো না। নিয়ে যেত মানিকগঞ্জের উত্তর সেওতা এলাকার মনিরা বেগম মনোয়ারার ৪ তলাবিশিষ্ট বাসার চিলেকোঠার একটি কক্ষে। এখানে সপ্তাহে ২-৩ দিন আমাকে নিয়ে আসতো। যৌন উত্তেজক ওষুধ সেবন করে আমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক চালানোর পর আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসতো। বাড়ির মালিক মনোয়ারা বিনিময়ে ১ হাজার করে টাকা নিতো উজ্জ্বলের কাছ থেকে। শুধু উজ্জ্বলই নয়, তার বন্ধুদেরও নিয়ে আসতো সেখানে। একেক দিন একেক বন্ধুর সঙ্গে আমাকে শারীরিক সম্পর্ক করাতে বাধ্য করতো উজ্জ্বল। এমনকি ওর স’মিলের কর্মচারীদের দিয়েও আমাকে শারীরিক সম্পর্ক করাতো। সেই সম্পর্কের ভিডিও করতো সে। এভাবে এক বছর ধরে মানিকগঞ্জের ওই বাসায় ওর কথামতো আসতাম।
নির্যাতিতা আরো বলেন, উজ্জ্বল শুধু আমার সঙ্গে সম্পর্ক করেই ক্ষান্ত থাকেনি। ওর কু-নজর পড়ে আমার স্কুলপড়ুয়া মেয়ের দিকে। মেয়েকে না এনে দিলে কিস্তির টাকা না দেয়ার হুমকি, ইন্টারনেটে ভিডিও ছেড়ে দেয়া এবং স্বামীর কাছে সবকিছু বলে দেবে- এমন ভয় দেখাতে থাকে। আমি ওকে বলতাম আমি নিজে মরে যাবো তারপরও আমার মেয়েকে তুলে দিতে পারবো না। তারপরও সে পিছু ছাড়ছিল না। একদিকে কিস্তির টাকার জন্য পাওনাদাররা বাড়ি এসে যা-না তা বলে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভিডিও ফুটেজ ইন্টারনেটে ছেড়ে দেবে আর সবকিছু স্বামীকে জানিয়ে দেবে- এমন নানা জটিলতার জালে আমি আটকা পড়ে যাই।
কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে বাধ্য হয়ে গত মঙ্গলবার মনোয়ারার বাসায় মেয়েকে নিয়ে যাই। প্রথমে মেয়েকে নিচে রেখে আমি ৪ তলা বাসার চিলেকোঠার একটি কক্ষে যাই। সেখানে যৌন উত্তেজক ওষুধ সেবন করে প্রথমে উজ্জ্বল আমার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। এরপর মেয়েকে চিলেকোঠায় নিয়ে আসতে বলে। পরে স্থানীয় লোকজন বিষয়টি টের পেলে উজ্জ্বল তার মোবাইল ফোনটি ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মেয়ের সম্মান বাঁচাতে বাধ্য হয়ে মঙ্গলবার রাতে মানিকগঞ্জ সদর থানায় মামলা করি।
বুধবার মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা সরকারি হাসপাতালে আমার ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়েছে। ওই পশুর উপযুক্ত শাস্তি না হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই নারী।
নালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক দিলসাদ খান দেলোয়ার জানান, বিষয়টি আমরা শুনেছি। তবে আলী হোসেন উজ্জ্বলের নারীঘটিত সমস্যা আছে এটা সত্য।
নালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল কুদ্দুস মধু বিষয়টি শুনেছেন, তবে না জেনে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ রকিবুজ্জামান বলেন, এ ব্যাপারে মো. আলী হোসেন উজ্জ্বল এবং তার এই অপকর্মে সহায়তা করার জন্য ওই বাড়ির মালিক মনিরা বেগম মনোয়ারার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আশরাফুল ইসলাম বলেন, বুধবার ভিকটিমের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে। এ ছাড়া আসামিদের ধরার চেষ্টাও চলছে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া মোবাইলটিকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ওই হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. লুৎফর রহমান বলেন, ভিকটিমের স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। রিপোর্টটি পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারবো।
Sunday, March 24, 2019
বিজ্ঞানী ড. মোজাফ্ফরের মানবেতর জীবন by রিপন আনসারী

একজন কাজের মহিলা আর গ্রামের প্রতিবেশীরাই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। মানুষটি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন দেশের অহঙ্কার বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের প্রিন্সিপাল সাইন্টিফিক অফিসার বিজ্ঞানী ড. মোজাফ্ফর হোসেন। সরজমিন মানিকগঞ্জ শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পেরুলেই নির্জন কান্দা পৌলি গ্রাম। এ গ্রামের অহঙ্কার ছিলেন বিজ্ঞানী ড. মোজাফ্ফর হোসেন। বাড়ি গিয়ে দেখা গেল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একটি ঘরের বারান্দায় চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। জিজ্ঞেস করা হলো কেমন আছেন? কোনো উত্তর নেই। ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে থাকেন। এরপর নিজেই শুরু করলেন এলোমেলো গান আর কবিতা। তার দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন রোকেয়া বেগম নামের এক কাজের মহিলা। প্রতি মাসে ঢাকা থেকে কিছু টাকা পাঠায় ড. মোজাফ্ফর হোসেনের স্ত্রী লিপি। অসুস্থতার জন্য কোনো ওষুধ সেবন করানো হয় না। শুধুমাত্র ২৫ পাওয়ারের একটি করে ট্রিপটি খাইয়ে ঘুম পারানোর চেষ্টা করা হয়। গায়ে ভালো কোনো পোশাক নেই, দুবেলা খাবারও ঠিকমতো জুটে না। তারপরও দায়িত্বে থাকা রোকেয়া বেগম নিজে খেয়ে না খেয়ে তার মুখে খাবার তুলে দেয়ার চেষ্টা করেন। কথা হয় রোকেয়া বেগমের সঙ্গে। ড. মোজাফ্ফর হোসেনের সেবা করতে করতে তিনিও ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। জানালেন, তিন মাস ধরেই বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মতো তার সেবা করতে হচ্ছে। পায়খানা-প্রস্রাবের সবই এক হাতেই করতে হয়। মানুষটির স্ত্রী-সন্তানরা যে এত পাষাণ হয় তা ভাবতে কষ্ট হয়। ঢাকা থেকে যেদিন তাকে গ্রামে দিয়ে গেল- মানুষটির দিকে তাকানো যেতো না। মনে হয় পেটে-পিঠে লেগে গেছে। মুখখানি কালো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তারা যে কয় টাকা দেয় তা দিয়ে একজন রোগীর খাওয়া-দাওয়া ও সেবা-যত্ন করা কঠিন। সব সময়ই খেতে চায়। ওই টাকার মধ্যে আমি যতটুকু পারি তা দিয়েই খাবার জোগাড় করি। মানসিক ভারসাম্য হারালেও মৃত মা-বাবার কথা মনে করে প্রায় রাতেই চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। থামানো যায় না। পাড়া-প্রতিবেশীরা সব সময়ই সহযোগিতা করেন। তা না হলে মানুষটিকে লালন পালন করা যেত না। মানুষটির ভালো চিকিৎসা হলে ভালো হয়ে যেতো। খুব কষ্ট লাগে তার জন্য। তাই নিজের বাবার মতোই দেখার চেষ্টা করি। ড. মোজাফ্ফরের বাল্যবন্ধু ডাক্তার সাঈদ আল মামুন জানান, সম্ভবত মোজাফ্ফর অ্যালজেইমার রোগে আক্রান্ত। এই রোগে আক্রান্তদের স্মরণ শক্তি কমে যায়। অতীত-বর্তমানের কথা ভুলে যায়। কাউকে চিনতে পারে না। অনেক সময় উচ্চস্বরে চিৎকার করে। কিন্তু এভাবে বিনা চিকিৎসায় তাকে নিঃসঙ্গভাবে ফেলে রাখা হলে অবস্থা আরো বেশি খারাপের দিকে যাবে। তাই তাকে পরিবারের সদস্যদের সময় দেয়া উচিত।
পাশাপাশি তাকে ভালো নিউরোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। তবে ড. মোজাফ্ফরের স্ত্রী লিপির সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি ভিন্ন কথা বলেন। তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, মোজাফ্ফর জটিল রোগে আক্রান্ত। ঢাকায় থাকাকালিন অবস্থায় আশেপাশের প্রতিবেশীরা প্রতিদিনই তার পাগলামির বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতো। সে কারণে তাকে গ্রামের বাড়ি রাখা হয়েছে। স্বামীর সেবা- যত্নের জন্য গ্রামের এক নারীকে বেতন দেয়া হয়। চিকিৎসা সেবাও দিয়ে যাচ্ছি। ডাক্তার বলেছে তার স্বামী কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না। সব সময়ই পাগলের মতো আচরণ করেন। ওষুধ কি খাওয়াচ্ছেন এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, মনে হয় ওষুধ শেষ হয়ে গেছে, আমি ঢাকা থেকে দিয়ে আসবো। তিনি জানান, দুই ছেলে লেখাপড়া করছে। তাই সন্তানদের সঙ্গে আমি ঢাকা থাকছি।
জানা গেছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ছিলেন বিজ্ঞানী ড. মোজাফ্ফর হোসেন। পিএইচডি করেন রসায়নের ওপর। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের প্রিন্সিপাল সাইন্টিফিক অফিসার থাকাকালিন অবস্থাতেই তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। ২০১৪ সালে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর মানসিকভাবে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় এককালিন অর্ধ কোটি টাকা পেলেও সবই স্ত্রীর জিম্মায় চলে যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে কিছু দিন চিকিৎসা করানো হলেও সুফল পাননি। বড় ছেলে অর্ণব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছোট ছেলে আরিয়ান এইচএসসিতে লেখাপড়া করছেন। মায়ের সঙ্গে দুই ছেলে ঢাকায় থাকেন। আর গ্রামে অযত্ন-অবহেলা এবং বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরছেন ড. মোজাফ্ফর হোসেন।
Thursday, August 30, 2018
জর্ডানে জেসমিনের ওপর বর্বরতা by রিপন আনসারী

আমার মতো আরো ২০ নারীকে দিয়ে ওই নারী যৌনকাজে বাধ্য করতো। একবার পালিয়ে গিয়েও রক্ষা পাইনি। আবার ধরে নিয়ে আমাকে তার বাসার নিচতলায় ভারতের নাগরিক নির্মাণ শ্রমিক গরজিদের কাছে তুলে দেয়। কোনোভাবেই নিজেকে আর রক্ষা করতে পারলাম না। এক পর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ি। পরে সোনিয়া টের পেয়ে আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। দুই মাস জেল খাটার পর পেটে সন্তান বহন করে ১৮ই এপ্রিল ওই দেশের সরকারের সহায়তায় দেশে ফিরে আসি।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে লোমহর্ষক নির্যাতনের এই কাহিনী তুলে ধরেন জর্ডান ফেরত এক নারী। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বাস্তা গ্রামের দরিদ্র এক রিকশাচালক তারা মিয়ার মেয়ে এখন কন্যা সন্তানের জননী। এ দায় কার, এনিয়ে দিশাহারা পরিবারটি। তাছাড়া, সমাজ এই পরিবারের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। গেল বৃহস্পতিবার সিংগাইরের একটি ক্লিনিকে পিতার নাম অন্য পরিচয়ে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। তার দাবি এই সন্তানের পিতা ভারতীয় নাগরিক গরজিদ।
ওই নারী জানান, ১০ মাস তাকে বাসায় আটকে রেখে যৌনকাজে বাধ্য করা হলেও একটি টাকাও তুলে দেয়া হয়নি তার হাতে। শূন্য হাতেই তিনি বাড়ি ফিরেছেন। তিনি তার জীবনটা নষ্ট করার জন্য সোনিয়া আক্তারের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেন। সেই সঙ্গে এই কন্যা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। সামাজিক ভাবে কি পরিচয় দেবেন এই সন্তানের। প্রতিবেশীরা নানা ধরনের কথা শোনাচ্ছেন তাকে ও তার পরিবারকে। তিনি জানান, শেষমেশ কোনো উপায় না পেয়ে মঙ্গলবার সিংগাইর থানায় মামলা করতে বাধ্য হয়েছি।
কথা হয় তার পিতা তারা মিয়ার সঙ্গে। তিনি পেশায় একজন রিকশাচালক। নিজের জমি নেই। শ্বশুরবাড়িতে ছোট একটি টিনের দোচালা ঘরে বসবাস করেন। তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে এই মেয়ে সবার বড়। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ১৫ বছরের মেয়েকে ২৫ বছর দেখিয়ে পাসপোর্ট করে দেয় স্থানীয় আদম ব্যবসায়ী কাশেম আলী। এরপর ১০ হাজার টাকা ঋণ করে ২০১৬ সালের ২৩শে অক্টোবর জর্ডানে পাঠানো হয়। কথা ছিল তার মেয়েকে নিয়ে বাসাবাড়িতে কাজ দেবেন। কিন্তু জর্ডানে যাওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। দালাল কাশেমের কাছে মেয়ের খোঁজ নিলে সে জানিয়ে দেয় জর্ডানে পাঠানো হয়েছিল কিন্তু সেখান থেকে সে পালিয়ে গেছে। এর দায়িত্ব সে নিতে পারবে না। মেয়ের সন্ধান চেয়ে কাসেমের বিরুদ্ধে একটি মামলাও করা হয়েছিল। দেড় বছর পর জানা যায় সিংগাইর উপজেলার চান্দহুর ইউনিয়নের চরচামটা গ্রামের নিহাজ উদ্দিনের মেয়ে সোনিয়ার কাছে জর্ডানে আছে। সোনিয়ার সঙ্গে মোবাইলফোনে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হই।
তারা মিয়া জানান, অবিবাহিত মেয়ে বিদেশ থেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ফিরেছে। এলাকায় কানাঘোষা হচ্ছে। লজ্জায় বাড়ির বাইরে বের হতে পারি না। নানাজনে নানা কথা বলে। সমাজের মাতবর আলেক উদ্দিন কোরবানি ঈদের আগে জানিয়ে দেন সমাজ থেকে তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। সমাজের মানুষ তাদের পাশে নেই। কিন্তু যাদের জন্য আজ তার মেয়ের এই অবস্থা তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান তিনি। এছাড়া বাধ্য হয়ে জর্ডান প্রবাসী সোনিয়াসহ আরো ৫ জনের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার সিংগাইর থানায় মামলা করা হয়েছে।
তিনি জানান, বড় আশা করে মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ে নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। মেয়ের কন্যা সন্তান কার পরিচয়ে বড় হবে তা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় তিনি।
স্থানীয় দালাল আবুল কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অনেক নারী শ্রমিককে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন। এমন ঘটনা কারো সঙ্গে হয়নি। এর জন্য তিনি দায়ী নন, সোনিয়া নামের নারী তাকে দিয়ে খারাপ কাজ করিয়েছে। তারা মিয়া মামলা করেছিল, পরে বিদেশ থেকে ফেরার পর স্থানীয়ভাবে বসে মামলাটি আপোষ করা হয়েছে।
সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার ইমাম হোসেন জানান, অন্তঃসত্ত্বা হয়ে নারী শ্রমিক দেশে এসে সন্তান প্রসবের ঘটনার খবর শোনার পর মেয়েটির পরিবারকে আইনগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছি। মঙ্গলবার ভুক্তভোগী ওই নারী থানায় ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করলে এদের মধ্যে দুই আসামিকে আটক করা হয়েছে।
Tuesday, August 28, 2018
গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য by রিপন আনসারী

সরজমিন মানিকগঞ্জের ঘাটে পথে ঘুরে দেখা গেছে ঈদ ফের মানুষের দুর্ভোগের করুন দৃশ্য। দৌলতদিয়া ঘাট থেকে ফেরি ও লঞ্চযোগে যাত্রীরা পাটুরিয়া ঘাটে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন গণ-পরিবহনের কাউন্টার গুলোর সামনে। সকাল থেকে দিনভর ঠেলা ধাক্কায় চলে গণ-পরিবহনে ওঠার প্রতিযোগিতা। তাও আবার নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে দ্বিগুণ বেশি ভাড়া গুনে। এছাড়া আরিচা, উথুলী, টেপড়া, বরংগাইল, বানিয়াজুরী, তরা, মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড, গোলড়া, নয়াডাঙ্গিসহ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের প্রত্যেকটি বাস স্টপেজে ঢাকামুখো যাত্রীরা দিনভর চরম ভোগান্তি নিয়ে ফিরছে যে যার গন্তব্যে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের অপেক্ষায় থেকে কেউ গন্তব্যে যেতে পারছে আবার কেউ বাসে উঠতে না পেরে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে পাটুরিয়া ও আরিচা থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত বিআরটিসি’র নির্ধারিত ভাড়া ১৬০ টাকা। কিন্তু ঈদ ফেরত যাত্রীদের কাছ থেকে নেয়া গচ্ছে আড়াইশ’ টাকা করে। এছাড়া পদ্মা লাইন, নবীনবরণ, ভিলেজ লাইন, যাত্রীসেবাসহ লোকাল বাসগুলো একই কায়দায় নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে দ্বিগুণ ভাড়া নিয়ে যাচ্ছে গাবতলী, সাভার, নবীনগরসহ বিভিন্ন প্রান্তে। বাসের ভেতরে সিট না পেয়ে ভেতরে গাদাগাদি করে এমনকি ছাদেও যাচ্ছেন মানুষজন। এছাড়া ঈদকে পুঁজি করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাইরের রোডের গাড়ি চলছে এই রুটে। তারা ভাড়া হাকাচ্ছে দ্বিগুণ। যাত্রীদের অভিযোগ- সাধারণ সময়ে পাটুরিয়া কিংবা আরিচা ঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত ভাড়া ৮০-৯০ টাকা হলেও যাত্রী চাপকে পুঁজি করে ঈদের পর ভাড়া নেয়া হচ্ছে কমপক্ষে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। শুধু তাই নয়, আরিচা-পাটুরিয়া ঘাট থেকে নবীনগর ও সাভারের ভাড়াও একই সমান গুনতে হয়। এতে কম আয়ের মানুষজন সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন।
পাটুরিয়া ঘাটে কথা হয় কয়েকজন বাসযাত্রীর সঙ্গে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ এলাকার রহিম মিয়া তার স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে লঞ্চযোগে আসেন পাটুরিয়া ঘাটে। সকাল ৯টা থেকে বাসের অপেক্ষায় বসে থাকেন পরিবারটি। বেলা ১১টায়ও বাসে উঠতে পারেনি। ভাড়তি ভাড়ার অভাবে তারা কোনো বাসেই উঠতে পারছেন না বলে তাদের অভিযোগ। রহিম মিয়া জানালেন, আমরা নিম্ন আয়ের মানুষ। ঢাকার বাসাবো এলাকায় কাজ করি। ঈদে বাড়ি এসে অধিকাংশ টাকাই খরচ করে ফেলেছি। ফেরার জন্য যে টাকা রেখে দিয়েছি তা দিয়ে বাসের ভাড়াই হচ্ছে না, তার ওপর বাড়তি ভাড়া কোথা থেকে পাবো? দেখি কম টাকায় যাওয়া যায় কিনা তার জন্য অপেক্ষায় আছি।
ফরিদপুরের নারী শ্রমিক রোকেয়া বেগম ও সাহেলা বেগম কাজ করেন নবী নগরের ইপিজেড-এ। ঈদের ছুটি শেষে নবীনগর যাওয়ার উদ্দেশে তিনি পাটুরিয়া ঘাটে আসে। তিনি জানান, গাবতলী যেতেও ২০০ টাকা আর নবীনগর যেতেও একই ভাড়া নেয়া হচ্ছে। অথচ পাটুরিয়া থেকে নবীনগরের ভাড়া মাত্র ৫০-৬০ টাকা দেই। তাই কম ভাড়ার গাড়ির জন্য অপেক্ষায় আছি। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার সাহেব আলী জানালেন, পরিবারের ৫ সদস্য নিয়ে পাটুরিয়া ঘাটে এসে বেকায়দায় পড়ে গেছি। ঢাকা যেতে দ্বিগুণ বেশি ভাড়া চাচ্ছে। তাই সকাল থেকে বসে আছি কম ভাড়ায় যাওয়ার কোনো বাস আছে কি-না।
আরিচা ঘাটের চিত্র একই রকম। সেখানেও পাবনা, বাঘাবাড়ি, কাজিরহাট, সুজানগর, ভেড়াসহ আরো বিভিন্ন এলাকার ঈদ ফেরত মানুষজন ঢাকা ফিরতে বাস ভাড়ার রোসানলে পড়ে বেকাদায় পড়েছেন। যাত্রী সেবা ও নবীনবরণ পরিবহনসহ অনান্য পরিবহনের ভাড়া কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় ক্ষুব্ধ হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। নগরবাড়ীর শফি উদ্দিন জানালেন, সাধারণ সময়ে আরিচা থেকে গাবতলী যেতে বাস ভাড়া লাগে সর্বচ্চ ৮০-৯০ টাকা। কিন্ত ঈদকে পুঁজি করে এখন ৯০ টাকার ভাড়া ২০০ টাকা নিচ্ছে। বিআরটিসি বাসের উঠতে গেলে ভাড়া চাচ্ছে আড়াইশ’ টাকা। পাবনার সুজানগর এলাকার আকমল হোসেন জানালেন, বর্তমানে যে ভাড়া বাসে নেয়া হচ্ছে এটা টাকাওয়ালাদের জন্য। আমাদের মতো গবির মানুষের এটা ওপর বোঝা। ঘাটে প্রশাসনের লোকজন এই অনিয়ম দেখেও দেখে না।
বাস চালকরা জানিয়েছেন, ঈদের পর গাবতলী থেকে খালি গাড়ি নিয়ে তাদের ঘাটে আসতে হচ্ছে। তাই ভাড়া পুষিয়ে নিতে কিছুটা বেশি নেয়া হচ্ছে।
এছাড়া পাটুরিয়া ও আরিচা লঞ্চ ঘাটে ঈদ ফেরত মানুষের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা না করে প্রত্যেকটি লঞ্চে উঠানো হচ্ছে অতিরিক্ত যাত্রী। এসব রুটে ৩৩টি লঞ্চ চলাচল করছে। যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় লঞ্চে গাদাগাদি করে যাত্রী পরাপার হচ্ছে।
এদিকে দৌলতদিয়া ঘাটের যানবাহনের চাপ বেশি থাকায় সেখানে যানজট দেখা দিয়েছে। সকাল থেকেই ঘাট ছাড়িয়ে যানবাহনের লম্বা লাইন কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। এতে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ঈদ ফেরত যাত্রীরা ঘাটে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকছে ফেরির সিরিয়াল পেতে। ফলে যানবাহনের যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ঘাট এলাকায়। পাশাপাশি রয়েছে পদ্মায় তীব্র স্রোতে। স্রোতের কারণে বিলম্ব হচ্ছে ফেরি পারাপার। বিআইডাব্লিউটিসি আরিচা অঞ্চলের এজিএম জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ২০টি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। ঈদের আগে মাওয়া এলাকায় নব্যতা সংকটের কারণে সেখানে ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে যানবাহনের চাপ বেশি ছিল। ঈদের পর মূলত দৌলতদিয়া ঘাটে যানবাহনের চাপ বেশি থাকে। কয়েকদিন ধরেই সেখানে চাপ বেশি। তবে পদ্মায় তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল করছে কিছুটা ধীর গতিতে। যার কারণে টিপও কমে গেছে। পাটুরিয়া ঘাটে কোনো সমস্যা নেই বলে তিনি জানান। পাটুরিয়া ঘাটের ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর (টিআই) একে এম ফজলুল হক বলেন, বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করার অভিযোগ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে যাত্রীরা কোন অভিযোগ করছে না।
Thursday, June 14, 2018
পুরাতন গাড়ি যেভাবে নতুন করা হয় by রিপন আনসারী

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রায় ২১টি জেলায় সড়ক পথে যাতায়াতের অন্যতম পথ হচ্ছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। অত্যন্ত ব্যস্ততম এই মহাসড়ককে এক সময় বলা হতো মৃত্যুর ফাঁদ। তবে কিছুটা কমে এলেও দুর্ঘটনা এখনো কমেনি। আর দুর্ঘটনার অন্যতম কারণই হচ্ছে লক্কর ঝক্কর এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এই গাড়িগুলো বিশেষ করে ঈদের আগে পরে দাপট বেড়ে যায় অনেকাংশে।
ঈদের আগের তিন-চারদিন সময় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ছুটে চলেন যে যার আপনালয়। মানুষের চাপের বিপরীতে যানবাহন সংকট হয়ে পড়ার সেই সুযোগ কাজে লাগায় একশ্রেণির পরিবহন ব্যবসায়ী। রাস্তায় তখন ভালোমন্দ গাড়ির বাছ বিচার না করে মানুষজন হাতের কাছে যা পায় সেসব গাড়িতেই উঠে যাত্রা শুরু করেন। উপরে রং লাগিয়ে লক্কড়-ঝক্কর এসব গাড়ি সড়কের নামানোর সঙ্গে সঙ্গে কোথাও না কোথাও বিকল হয়ে পড়ে। ফলে রং চং মাখা এসব গাড়ির কারণে ঈদে ঘরমুখো মানুষজন রাস্তায় রাস্তায় ভোগান্তির শিকার হন। সেই ঘটে দুর্ঘটনাও।
সরজমিন মানিকগঞ্জের গাড়ি মেরামতের কয়েকটি কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, ফিটনেসবিহীন ভাঙ্গাচোরা গাড়িগুলো জোড়াতালি দেয়া হচ্ছে ওয়ার্কসপে। এই মুহূর্তে গ্যারেজের মিত্রিরা পুরাতন গাড়ি মেরামতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। কোন গাড়ির ইঞ্জিন, ব্রেকে সমস্যা কিংবা সিটগুলো ছেঁড়া। আবার কোনো গাড়ির বডিতে রং চং নেই। ঈদের সময় বহু বছরের পুরাতন এসব গাড়িগুলো মেরামত করে নতুন সাজে রোডে নামানো হবে। বিশেষ করে ২৫-২৬ রোজার পর ওপরে ফিটফাট গাড়িগুলো রোডে নামানো হবে বলে জানিয়েছেন ওযার্কসপের কর্মচারীরা।
মানিকগঞ্জের উচুটিয়া এলাকায় রাব্বি মটর্সের এক শ্রমিক জানালেন, ঈদকে সামনে রেখে তাদের গ্যারেজে পুরাতন গাড়ির কাজ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। গাড়িতে রং চং ও ইঞ্জিনের ত্রুটিগুলো মেরামত করা হচ্ছে বেশি। ২৬ রোজার আগেই এসব গাড়ির কাজ শেষ হবে আর ২৭ রোজায় রোডে নামানো হবে।
রং মিস্ত্রি উজ্জল জানালেন, পুরাতন গাড়ি ঈদের সামনে রং করে নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে। যাতে যাত্রীরা আকৃষ্ট হয়। সময়মতো ডেলিভারি দেয়ার জন্য দিন-রাত গাড়িতে রঙের কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
পাশেই সানি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপের দেখা গেলে সেখানকার লক্কড় ঝক্কর কয়েকটি গাড়ি মেরামতের কাজ চলছে বেশ জোরেশোরে। কেউ বাসে রং করছে আবার কেউ ইঞ্জিন খুলে বসেছে আবার কেউ সিট ও বডির কাজ করছে। এই কারখানায় মেরামত করতে আসা যাত্রী সেবা গাড়ির চালক ইমরান জানালেন, ঈদের সময় প্রত্যেক যাত্রীই চায় রং চং করা সুন্দর গাড়িতে উঠতে। তাই বাসের ভেতরের সিট ও বডিতে রঙের কাজ করাতে আনা হয়েছে। ঈদের সময় গাড়ির ফিটনেস না থাকলে পুলিশ ও সার্জেন্টরা বিরক্ত করে। আর সারা বছরের চাইতে ঈদের সময় কিছু বাড়তি টাকা কামানো যায়।
রং মিস্ত্রি আলিম জানালেন, আমরা এখন পুরো ব্যস্ত সময় পার করছি। ২৭ রোজার মধ্যে গাড়িতে রং চং শেষ করে ডেলিভারি দিতে হবে। আমাদের হাতের যাদুতে গাড়িগুলোকে একদম নতুন সাজে সাজিয়ে দিচ্ছি। দেখে বুঝার উপায় নেই কোনটা পুরাতন আর কোনটা নতুন। এই গ্যারেজের মতো মানিকগঞ্জসহ দেশের আরো সব গ্যারেজে চলছে লক্কড় ঝক্কর গাড়ি মেরামতের কাজ।
এদিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা বলছে, ঈদ এলেই রোডে লক্কর ঝক্কর গাড়ির দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। ফিটনেসবিহীন বহু বছরের পুরাতন গাড়িগুলো রং করে রোডে চলাচল করলেও রোড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো মনিটরিং দেখা য়ায় না।
বাস যাত্রী রফিকুল ইসলাম জানালেন, রং চং মেখে গাড়িগুলো রোডে নামানোর ফলে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। আসলে এই গাড়িগুলো হচ্ছে ওপরে ফিটফাট এবং ভেতরে সদর ঘাট। প্রশাসনের নজরদারি থাকলে ঈদে পুরানো ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো চলাচলে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
মানিকগঞ্জ শহরের বাসিন্দা আব্বাস আলী জানালেন, লক্কড় ঝক্কর বাসের পাশাপাশি মহাসড়কে টেম্পো, সিএসজি চলাচল আবারও বেড়ে গেছে। এসব গাড়ি মহাসড়কে চলাচলে বন্ধ না হলে ঈদে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামীম বলেন, প্রতি বারের মতো এবারের ঈদে মহাসড়কে আমরা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রেখেছি। তিন দিন আগে থেকে মহাসড়কে ট্রাক উঠতে দেওয়া হবে না পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি যাতে আসতে না পারে সেদিকে আমরা ব্যবস্থা রাখবো।
Saturday, June 9, 2018
লেবুর গ্রাম বালিয়াখোড়া by রিপন আনসারী

সরজমিন বালিয়াখোড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার দুই ধারে, বাড়ির আঙ্গিনা ও তার চার পাশে চোখ জুড়ানো লেবু বাগান। এমন কোন বাড়ি নেই যেখানে লেবুগাছ নেই। প্রায় ৩০০ পরিবার এ গ্রামে লেবু চাষ করে আসছে। লেবুর ভরা মওসুমে বাগান থেকে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা লেবু তোলা হচ্ছে। আর এই এখানকার লেবুর বড় চালান যাচ্ছে ঢাকার কাওরান বাজারে। শুধু কাওরান বারই নয় প্রতিদিন পাইকার ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে লেবু ক্রয় করে ট্রাক ভর্তি নিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এলাচি, কাগজি ও কলম্বো জাতের লেবু এখানে বেশি উৎপাদন করা হয়। তবে সারা বছরের চাইতে রমজান মাসে এখানকার লেবুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।
এছাড়া বালিয়াখোড়া গ্রামের লেবু শুধু দেশেই নয় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সৌদি আরব, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করা হয়। চলতি মৌসুমে প্রায় ১৫ টন লেবু রপ্তানি করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে। কথা হয় বালিয়াখোড়া গ্রামের বেশ কয়েকজন লেবু চাষির সঙ্গে।
গ্রামের প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক নারয়ণ চন্দ্র বলেন, আমাদের গ্রামটি লেবু চাষের জন্য বিখ্যাত। এলাকার এমন কোনো বাসাবাড়ি নেই যেখানে লেবু চাষ হয় না। আমি নিজেই ১৫০ শতাংশ জমির ওপর চারটি লেবুর বাগান করেছি। প্রথম আমার পিতা পার্শ্ববর্তী গ্রামের আলী হোসেনের বাড়ি থেকে ১০টি লেবুর চারা নিয়ে লেবু চাষ শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর বাবার সখের লেবু বাগানগুলো পরিচর্যার দায়িত্বে রয়েছি। আমার বাগানগুলোতে এলাচি, কাগজি ও কলম্বো- এই তিন জাতের লেবুর চাষ করছি। লেবু চাষ করে আমার প্রতি বছর লক্ষাধিক টাকা আয় হচ্ছে। বালিয়াখোড়া গ্রামের ব্যাংকার কামরুল হাসান জনি বলেন, আমার বাবা চাচারা প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে লেবু চাষ করে আসছেন। এক সময় এ গ্রামের আমরা ৩-৪ পরিবার লেবু বাগান করেছি। তা বেড়ে এখন ২৫০ থেকে ৩০০ পরিবার লেবু চাষ করে আসছে। আমাদের চার বিঘা বাগানে শুধু কলম্ব জাতের লেবু চাষ করেছি। আগে দাম ভালো পাওয়া গেলেও এখন বাজার একটু মন্দা। প্রতি বছর লক্ষাধিক টাকায় বাগান বিক্রি করে দেই। এলাকার যুবক আতাউর রহমান তোহা বলেন, বালিয়াখোড়া গ্রামটিকে আমরা লেবুর গ্রাম হিসেবে চিনি। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনা, রাস্তার ধার ও তার আশপাশে দেখা যায় শুধু লেবু আর লেবুর বাগান। বাগানের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে কাঁচা লেবুর গন্ধে ম’ম’ করে। লেবু চাষি মফিজুল ইসলাম দীপন বলেন, আমার বাবা প্রয়াত ৩৫ বছর আগে লেবুর বাগান করেন। বাবার মৃত্যুর পর আমরা ভাইয়েরা মিলে এই লেবুর চাষ করে আসছি। বর্তমানে আমার ২৪০ শতাংশ জমিতে লেবুর চাষ হচ্ছে। লেবু চাষ করেই আজ আমরা মোটামুটি স্বাবলম্বী। আমাদের বাগানের লেবু ঢাকার কাওরান বাজার, শ্যামবাজার, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বড় বড় আড়তে পাইকাররা নিয়ে বিক্রি করেন। রমজান মাসের প্রথম দিকে লেবুর দাম অনেক ভালো পেয়েছি। বর্তমানে দাম একটু কম। তারপরও ভালোই লাভ পাচ্ছি।
লেবু চাষি বিলু মিয়া জানান, এখন লেবুর ভরা মওসুম। ঢাকার পাইকাররা আমাদের বাগান থেকে কম দামে লেবু কিনে সেখানে চড়া দামে বিক্রি করেন। শুধু তাই নয়, আমাদের গ্রামের লেবু বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। বর্তমানে ১শ’ লেবু ২৫০-৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রোজার প্রথম দিকে এক হালি লেবু বিক্রি হয়েছে ৩৫-৪০ টাকা পর্যন্ত।
বালিয়াখোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল আওয়াল খান বলেন, আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে লেবু চাষ করে আসছি। এখন আমার প্রায় ৮ বিঘা জমিতে লেবু আবাদ হচ্ছে। লেবু চাষ অত্যন্ত লাভজনক বলেই সেই বাবার আমল থেকে চাষ করে আসছি। বছরে বেশ ভালোই লাভ পাচ্ছি। আমার গ্রামে ছোট বড় প্রায় ১৫০টি লেবু বাগান রয়েছে। এলাকার প্রত্যেক বাড়িতেই কমবেশি লেবুর বাগান রয়েছে। অনেক পরিবার লেবু চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। আবার অনেকেই সারা বছর লেবু চাষ করেই সংসার চালাচ্ছেন। এক কথায় আমার ইউনিয়নটি লেবু চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানকার লেবু দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করছে পাইকাররা।
বিদেশে বিভিন্ন সবজিজাত পণ্য রপ্তানিকারক ঢাকার ব্যবসায়ী মো. ফারুক খান বলেন, চলতি মৌসুমে সৌদি আরব, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৫ টন লেবু রপ্তানি করা হয়েছে। বেশিরভাগ লেবুই তিনি সংগ্রহ করেন মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া গ্রাম থেকে।
ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ উজ্জামান খান জানান, ঘিওরের বালিয়াখোড়া ও সোদঘাটা গ্রামের লেবু চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন অনেক চাষি। এ অঞ্চলের লেবুর কদর রয়েছে সারা দেশে। শুধু তাই নয়, বিদেশেও যাচ্ছে এখানকার লেবু। কৃষি বিভাগ থেকে ওই এলাকার লেবুচাষিদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
Friday, June 1, 2018
‘জিনের বাদশা’ সেজে নারীদের সর্বনাশ by রিপন আনসারী

সরজমিন সদর উপজেলার দিঘি ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা গেল ভণ্ডপীর তাহের আলী (৫৭)কে নিয়ে বসেছে গ্রাম আদালত। এই সালিশে ভুক্তভোগী বেশ কয়েকজন অভিযোগকারী নারীকে দেখা গেল। সকাল ১০টার দিকে চরতিল্লি গ্রামের লুৎফর রহমান ও তার স্ত্রী মিতু আক্তারসহ পরিবারের লোকজন হাজির হয়েছেন ভণ্ডপীরের কু-কীর্তি ফাঁস করে দিতে। পরিবারের অভিযোগ এই আদালতেও ভণ্ডপীরের কেরামতি। বিচার প্রার্থী হিসেবে সাক্ষী দিতে আসা ১৯ বছরের গৃহবধূ মিতু আক্তারের ওপর নাকি জিনের বাদশা তাহের পীর ভর করেছে। সুস্থ সবল ওই গৃহবধূ ইউনিয়ন পরিষদের বিচারিক আদালতের একটি চেয়ারে বসে ছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ ভণ্ডপীর সেখানে উপস্থিত হন। তখন পীরের চোখ পড়ে ওই নারীর দিকে। তাকে দেখেই ওই নারী সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত এবং ছটফট করতে থাকেন। সুস্থ মানুষ অস্বাভাবিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় গ্রামীণ আদালতে উপস্থিত সকলের ভেতর কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। এ খবর পেয়ে সেখানে হাজির হন প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার সংবাদ কর্মীরা।
এরপর বেরিয়ে আসতে থাকে ভণ্ডপীর তাহের আলীর কু-কীর্তির নানা কথা। তাহের আলীর প্রধান টার্গেট থাকে গ্রামে যাদের বিয়ের পর সন্তান হয় না এমন নারীদের প্রতি।
অভিযোগকারীর একজন হলেন লুৎফর রহমান। গ্রামের খেটে খাওয়া সহজ-সরল যুবক। এই লুৎফরের এক সময় ওই ভণ্ডপীরের প্রতি ছিল গভীর বিশ্বাস। সে সুবাদে তার শিষ্য হয়েছেন। বছর আড়াই হলো লুৎফর রহমান বিয়ে করেন সুন্দরী মিতু আক্তারকে। বিয়ের পর সরল মনে স্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দেন ভণ্ড তাহের আলীর সঙ্গে। এতেই ওই গৃহবধূর দিকে শকুনের দৃষ্টি পড়ে ভণ্ড তাহেরের। লুৎফর রহমান বলেন, আমি খুব বিশ্বাস করতাম তাহের আলী পীর সাহেবকে। আমার স্ত্রীর সন্তান হচ্ছিল না। তখন পীরের কাছে নিয়ে যাই। তখন পীর আমাকে জানিয়ে দিলো তোর স্ত্রী বন্ধ্যা। সে সন্তান লাভ করতে পারবে না। তোর স্ত্রীকে একা আমার কাছে (পীরের) পাঠিয়ে দিবি। তারপর বিষয়টা দেখবো। পীরের কথায় সরল মনে স্ত্রীকে তার কাছে পাঠাই। সেখান থেকে এসে আমার স্ত্রী আমাকে বলে তোমার ওই পীর লোক ভালো না। স্ত্রীর কাছে বিষয়টি জানার চেষ্টা করেন স্বামী লুৎফর রহমান। তার স্ত্রীকে তাহের আলী পীর বলে দেয় তুই কখনোই মা হতে পারবি না। তুই বন্ধ্যা। তবে উপায় একটা আছে। তুই যদি আমার (পীর) সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলিশ তবেই তোর গর্ভে সন্তান আসবে। আর এ কথা যেনো কেউ না জানে। এ কাজটা জিন দ্বারা করতে হবে।
লুৎফর রহমান বলেন, আমার স্ত্রী যখন এসব কথা আমাকে বলে সেদিন থেকে ওই পীরের সঙ্গে আমি কথা বলা এবং তার বাড়িতে আসা-যাওয়া বন্ধ করে দেই। এতে সে আমার এবং আমার স্ত্রীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সময় কুফরী কালাম দিয়ে আমার স্ত্রীকে অসুস্থ করে তোলে। ওই পীরের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে আমি চেয়ারম্যানের আশ্রয় নেই। বিচার চাই তার কাছে। বিচারে সাক্ষী দিতে এসেও আমার স্ত্রীকে কুফরী করে জবান বন্ধ করে দেন এবং মুখ-নাক দিয়ে রক্ত বের হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় স্ত্রীকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করি। মিতু আক্তারের মতো গ্রামে আরো বেশ কয়েকজন নারী ওই ভণ্ডপীরের লালসার শিকার হয়েছেন বলে জানা যায়।
আরেক ভুক্তভোগী সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লীর চর গ্রামের আবদুর রহিমের স্ত্রী হানিফা বেগম। তিনিও চেয়ারম্যানের আদালতে ভণ্ডপীর তাহের আলীর বিচারপ্রার্থী। তার বিষয়টা থানা পুলিশ সংক্রান্ত। হানিফা বলেন, তার স্বামী রহিমের বিরুদ্ধে একটি মামলা হওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে রহিমের জামিন করানোর কথা বলে ৩৮ হাজার টাকা নেন পীর তাহের আলী। কিন্তু তার স্বামীর জামিন না করিয়ে দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেন।
ভুক্তভোগী আনোয়ারা বেগম বলেন, ভণ্ডপীর আবু তাহের কুফরি কালাম জানেন, ভয়ভীতি দেখিয়ে সহজ সরল মানুষকে ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেন। কলেজে ভর্তি ও চাকরির কথা বলে মানুষজনের কাছ থেকে টাকা পয়সা নেন। এছাড়া নারীলোভী ওই পীর অনেক নারীর সর্বনাশ করেছে। আমার একটি গরু ও বাছুরকে কুফরি কালাম দিয়ে হত্যা করেছে। দিঘি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মতিন মোল্লা বলেন, ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে দিঘি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম্য আদালতে ভণ্ডপীরের বিরুদ্ধে বিচারের আয়োজন করা হয়। এতে প্রমাণিত হয় তাহের আলী একজন ভণ্ডপীর। গ্রামের সুন্দরী নারীদের প্রতি তার ছিল লোভ লালসা। এলাকার অনেক নারী তার লালসার শিকার হয়েছে। শুধু তাই নয়, চাকরি, জেল থেকে জামিন, কলেজে ভর্তি, রোগ সারিয়ে দেয়া সহ নানা ভাবে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা পয়সা ও নারীদের ইজ্জত লুটে নিতো। এসব অভিযোগ ফৌজদারি হওয়ায় গ্রাম্য আদালতে বিচারবহির্ভূত। উত্তেজিত এলাকার লোকজন একপর্যায়ে তাই ওই ভণ্ডপীর তাহেরকে গণপিটুনি দেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাকে আটক করেন।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুজ্জামান বলেন, ঘটনা জানার পর ভণ্ডপীর তাহের আলীকে আটক করে থানায় আনা হয়। এরপর লুৎফর রহমান নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে ওই ভণ্ডপীরের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছেন। সে এখন জেল হাজতে রয়েছে।
Sunday, May 27, 2018
ছকিনার হাতে ভাজা মুড়ি by রিপন আনসারী
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের নবগ্রাম, ধলাই, উপাজানি ও সরুপাই গ্রামের সাগর মিয়া, তাহের আলী, আকবর, আনোয়ারসহ আরো বেশ কয়েকটি বাড়িতে চলছে হাতে ভাজা মুড়ি তৈরির ধুম। পুরুষদের পাশাপাশি বাড়ির গৃহিণীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছে মুড়ি তৈরির কাজে। রমজান মাস শুরু হওয়ায় তাদের এই ব্যস্ততা বেড়েছে কয়েক গুণ। ওই সব অঞ্চলের গৃহিণীদের হাতে ভাজা স্বাদে ভরপুর ও সুগন্ধ মুড়ির কদর সারা বছরের চাইতে রমজানে অনেক বেশি।
সরজমিন মানিকগঞ্জ-হরিরামপুর সড়ক সংলগ্ন নবগ্রাম ইউনিয়নের ধলাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তাহের আলীর বাড়িজুড়ে হাতে ভাজা গরম মুড়ির অন্যরকম গন্ধ। বাড়ির মাটির চুলোতে মুড়ি ভাজতে দেখা যায় তাহের আলীর স্ত্রী ছকিনা বেগমকে। এখন তার বয়স প্রায় ৬০ বছর। এই বয়সেও ক্লান্তিহীনভাবে তৈরি করেন সু-স্বাদু মুড়ি। তার হাতের যাদুতে ভুষিভাঙ্গা মুড়ির সুনাম রয়েছে জেলা জুড়েই। শুধু মানিকগঞ্জ জেলাতেই নয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এমনকি দেশের বাইরেও যাচ্ছে ছকিনার বেগমের হাতে ভাজা মুড়ি।
ছকিনা বেগম বলেন, সেই ছোট্ট বয়সে স্বামীর সংসারে যেদিন পা রেখেছি সেদিন থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি মুড়ি তৈরিতে। প্রায় ৪৫ বছরের অধিক সময় ধরেই মিশে আছি মুড়ি ভাজার কাজে। আমাদের মুড়ির কদর আছে সবখানেই। সারা বছর মুড়ি ভাজি কিন্তু রমজান মাসে চাহিদা অনকে বেশি। তাই প্রতিদিনই আজানের সময় ঘুম থেকে উঠতে হয়। উঠেই বসে পড়ি চুলার পাড়ে। প্রায় বিকাল পর্যন্ত মুড়ি ভাজতে হয়। সারা দিন আগুনের পাড়ে বসে মুড়ি ভাজতে প্রথম প্রথম কষ্ট হতো কিন্তু এখন আর আগুনের তাপ গতরে লাগে না।
ছকিনা বেগমের স্বামী তাহের আলী বলেন, প্রায় ৪৫ বছর ধরে আমার বাড়িতে মুড়ি ভাজি। কিন্তু এখন আর আগের মতো সুখ নেই। স্বচ্ছলতা নেই সংসারে। পুঁজি না থাকায় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া দামে ধান কিনতে হয়। শুধু তাই নয় কষ্ট করে ভেজে অল্প দামে মুড়িও দিতে হয় তাদের। মোট কথা লাভের অংশ পিঁপড়ায় খেয়ে ফেলে। সরকার যদি আমাদের অল্প সুদে লোন দিতো তাহলে রবিশাল থেকে নিজেরা ধান কিনে মুড়ি ভাজতে পাড়তাম। লাভও বেশি হতো। মহাজনরা বাজারে নিয়ে এক কেজি মুড়ি বিক্রি করে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি। কিন্তু আমাদের কাছ থেকে তারা নিচ্ছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া তারা ১ হাজার টাকা মণে ধান আনে বরিশাল থেকে। আর আমাদের তাদের কাছ থেকে কিনতে হয় ১৪৫০ টাকা মণ। ওরা ধান ও মুড়ি দুটোতেই লাভ করে। আমাদের শুধু কষ্ট আর কষ্ট। তারপর পূর্ব এই পেশাটিকে আমরা এখনো ধরে রেখেছি।
তাহের আলীর বাড়ির পাশে সাগর মিয়া। প্রায় ৩০ বছর ধরে হাতে মুড়ি তৈরি করে আসছেন। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল স্ত্রী রোকেয়া বেগমকে নিয়ে মুড়ি ভাজতে।
সাগর মিয়া জানালেন, প্রতি মণ ধানের দাম পড়ে ১৪৫০ টাকা। তাও আবার সেই ধান বরিশাল থেকে আনতে হয়। আগে আমরা নিজেরাই আনতাম। কিন্তু এখন পুঁজি না থাকায় মহাজনদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হয়। এক মণ ধানে মুড়ি হয় ২২ থেকে ২৪ কেজি। ভোর থেকে শুরু করে সারাদিনই মুড়ি ভাজতে হয়।
তিনি জানান, বাজারে আমাদের তৈরি হাতে ভাজা এই মুড়ির চাহিদা প্রচুর। সারা বছরের চাইতে রমজান মাসে চাহিদা দিগুন থাকে। তবে, খাটা খাটুনি বেশি, লাভ কম আর পুঁজির অভাবে আগ্রহ কমে যাচ্ছে। আগে আমাদের চার গ্রামে শতাধিক পরিবার থেকে কমে এখন মুড়ি তৈরি করছি আমরা মাত্র কিছু পরিবার। সরকারি সহায়তা পেলে নিজেরা ধান কিনে মুড়ি তৈরি করতে পারলে লাভ বেশি হতো।
এলাকার ইউপি সদস্য মো. রশিদ মিয়া জানান, এক সময় এই গ্রামগুলো মুড়ির গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রত্যেকটি বাড়িতে মুড়ি তৈরি করা হতো। কিন্তু বর্তমানে বাজারে আধুনিক মেশিন দিয়ে রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে মুড়ি উৎপাদন করায় এ অঞ্চলের মানুষের হাতে ভাজা মুড়ি তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে গেছে। স্থানীয় নবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাকিব হোসেন ফরহাদ জানালেন, আগে চার গ্রামে ১০০ পরিবারের মুড়ি ভাজার কাজ করতো। এখন কমে হয়েছে ২০ থেকে ২৫ পরিবার। এদের সরকারিভাবে সহযোগিতা দেয়া হলে নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি আবারো ফিরে আসতো এই পেশার লোকবল।
Saturday, March 31, 2018
দুটি স্বপ্নের মৃত্যু: মানিকগঞ্জে আতঙ্কের নাম হ্যালোবাইক by রিপন আনসারী

এই দুর্ঘটনার তিন দিন যেতে না যেতেই হ্যালোবাইকের চাপায় নিভে যায় আরেকটি স্বপ্ন। মঙ্গলবার সকালে প্রতিদিনের মতোই মানিকগঞ্জ শহরের পশ্চিম দাশড়া এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুকের শিশুপুত্র তিতুমীর একাডেমির প্লে গ্রুপের শিক্ষার্থী শোয়েব হোসেন স্কুলে যায়। স্কুল ছুটি শেষে খালার সঙ্গে রাস্তা পার হতে গেলে দ্রুতগামী একটি হ্যালোবাইক শিশুটিকে পেছন থেকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় শোয়েবকে নিয়ে যাওয়া হয় মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে। ঘণ্টাখানেক পর সকলকে কাঁদিয়ে চলে যায় না ফেরার দেশে। নিহত শোয়েবের বাবা ওমর ফারুক ঢাকায় গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত আছেন। আর মা সোমা আক্তার মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের সেবিকা। দুর্ঘটনায় দুটি স্বপ্নের অকাল মৃত্যুতে এখন হ্যালোবাইক আতঙ্কে রয়েছে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। হলি ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. আকরাম হোসেন বলেন, মানিকগঞ্জ শহরে হ্যালোবাইকের উৎপাত অনেক বেড়ে গেছে। বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে এই ক্ষুদে যানবাহন খুবই বিরক্তকর। স্কুলের সামনে দিয়ে যেভাবে দ্রুতগতিতে এই যানগুলো চলাচল করে এতে বাচ্চাদের নিয়ে সবসময়ই আতঙ্কে থাকতে হয়। এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ করা খুবই জরুরি বলে আমি মনে করি।
মানিকগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক লাভলু খান বলেন, স্কুল আর রাস্তার দূরত্ব জিরো মিটার। রাস্তার সঙ্গে স্কুল তারপরও হ্যালোবাইক যেভাবে বেপোরোয়া ভাবে চলাচল করে তা দেখার কেউ নেই। মানিকগঞ্জ শহরের বাসিন্দা সিনিয়র সাংবাদিক খোন্দকার আশরাফুন নবী বলেন, পর পর দুটি দুর্ঘটনায় দুই কোমলমতি শিশু নিহত হওয়ায় হ্যালোবাইক এখন শহরবাসীর কাছে আতঙ্কের নাম। অবৈধ এই যানবাহন শহরে যানজটের পাশাপাশি প্রায় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে নাগরিক জীবন বিষিয়ে তুলেছে। গায়ে গায়ে লেগে থাকা হ্যালোবাইকের জন্য রাস্তায় হাঁটাচলা করাটাই এখন রীতিমতো বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হলিফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, আমার স্কুলের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর থেকে হ্যালোবাইক আমাদের কাছে একটি আতঙ্কের বিষয়। স্কুলের সামনে এবং শহরের মধ্য দিয়ে যেভাবে বেপরোয়াগতিতে হ্যালোবাইক চলাচল করছে তা নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। এদিকে গত কয়েক দিনে হ্যালোবাইকের চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় টনক নড়েছে পৌর কর্তৃপক্ষের। তারা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চালাচ্ছে অবৈধ হ্যালোবাইক শনাক্তে। জানিয়েছেন, পৌরসভার তালিকায় সাড়ে ৫শ’ হ্যালোবাইক অনুমোদন দেয়া আছে। কিন্তু অনুমোদন ছাড়া এখনো অনেক হ্যালোবাইক রোডে চলছে বলে জানিয়েছেন এক পৌর কর্মকর্তা। সেগুলো শনাক্ত করা হচ্ছে।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...