Monday, November 4, 2013

অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধ করুন by হাসান কামরুল

প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে চক্রান্তে মেতে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সরকার কিছুতেই তাদের বাগে আনতে পারছে না। বিশেষ করে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জকে ঘিরে চক্রটি মরিয়া হয়ে উঠেছে। চলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। আর অবৈধ সংযোগ দেয়ার নামে সাধারণ গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। প্রতিটি সংযোগের জন্য ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জে ২৫ হাজার অবৈধ সংযোগ দেয়ার জন্য আড়াই ইঞ্চি ব্যাসার্ধের গ্যাস পাইপলাইন বসানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২০ হাজারের বেশি বাসাবাড়িতে গ্যাস পাইপলাইন বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঈদের আগে বাড়ি বাড়ি গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও এখনও অধিকাংশ বাড়িতে গ্যাস সাপ্লাই দেয়া হয়নি। এ নিয়ে গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। স্থানীয় প্রভাবশালী সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের রোষানলের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে না চাইলেও শিগগির এ নিয়ে জনবিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড, বাপেক্স, সিলেট গ্যাসফিল্ডের অনেক কর্মকর্তাই এ অবৈধ সংযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। যার কারণে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় থেকেও তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। চলতি মাসে পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ২ হাজার ৩১০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। তারপরও শিল্প-কারখানায় কৃত্রিম গ্যাস সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। অনেক কারখানা গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। কারখানার মালিকরা বলছেন, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান। আবার কোনো কোনো কারখানা তাদের উৎপাদন টার্গেট ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। এ অবস্থায় শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ হওয়া তো দূরে থাক, চলমান কারখানাগুলোই আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে পারছে না। অনেক বিদেশী ক্রেতা ঠিক সময়ে ডেলিভারি না পাওয়ায় সাপ্লাই অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে।
পেট্রোবাংলা বলছে, বর্তমানে ২৩টি গ্যাসক্ষেত্রের ৮৪টি কূপ থেকে প্রতিদিন গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে ২ হাজার ৩১০ মিলিয়ন ঘনফুট। শিল্প কারখানার মালিকরা বলছেন, বর্তমানে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ২ হাজার ৫০০ ফুট। উৎপাদন ও চাহিদার বিপরীতে শর্টেজ মাত্র ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, দেশব্যাপী গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার কারণ কী? শিল্প-কারখানার পাশাপাশি গ্যাসের চাপ কমে গেছে গৃহস্থালী রান্নার চুলা ও সিএনজি স্টেশনে। ফলে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যায় দিনভর।
তিতাসে রয়েছে শক্তিশালী এক সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের এত ক্ষমতা যে, তারা দিনকে রাত আর রাতকে দিন করতে পারে। তিতাসের এ সিন্ডিকেটের কাছে সরকারও যেন অসহায়। বিভিন্ন সময়ে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েও শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি। তিতাসের একজন মিটার রিডারের ঢাকায় সাতটি বাড়ির গল্পও সবার জানা। ১/১১-পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনেকে ট্রুথ কমিশনে গিয়ে স্বীকারোক্তি দিলেও শেষ পর্যন্ত দৃশ্যত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়নি।
এ সরকার আসার পর জুন ২০১০ থেকে জুন ২০১৩ পর্যন্ত নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ঠিক রাখতেই এ নিষেধাজ্ঞা। তিন বছর পর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে বাসাবাড়িতে নতুন সংযোগ প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু অফিসিয়ালি নিষেধাজ্ঞা পিরিয়ডে চলে অবৈধ সংযোগ। পেট্রোবাংলার অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে ভয়ংকর এক রাজনৈতিক প্রভাবশালী বলয়ের অস্তিত্ব। যাদের নেতৃত্বে এমবারগো পিরিয়ডে প্রায় ৮৭ হাজার অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এ অবৈধ গ্যাস দিয়ে প্রভাবশালী মহলটি পকেটস্থ করে কয়েক হাজার কোটি টাকা। পেট্রোবাংলার তদন্তে তিতাসের সাবেক এমডি ও একজন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের নাম উঠে এসেছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ায় সরকার তার বিরুদ্ধে কঠোর হতে পারেনি। যদিও তিতাসের এমডিকে চাকরি থেকে বহিষ্কারসহ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। যতটুকু জানা গেছে, দুদকের টেবিলে এ মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান সংবাদ সম্মেলনে তার ক্ষোভের কথা জানালেও তিতাসের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর হতে পারেননি। এখনও অবৈধ গ্যাস সংযোগের রমরমা ব্যবসা চলমান। সর্বশেষ এ সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ঢাকার আশপাশে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগের নামে অবৈধ অর্থ কামানোর মহোৎসব শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই মহলটি গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগের নামে হাতিয়ে নিয়েছে শত কোটি টাকা। তিতাসের দুর্নীতিবাজদের সহযোগিতায় শিল্প-কারখানাগুলোতে ছোট ছোট কমপ্রেসার বসিয়ে অবৈধভাবে গ্যাস টেনে নিয়ে নিচ্ছে। অনুমতি না থাকার পরও সিএনজি স্টেশনগুলো যানবাহন ছাড়াও বোতলজাত করে গ্যাস বিক্রি করছে।
কিন্তু তিতাস বরাবরের মতো এবারও নীরব ভূমিকা পালন করছে। তিতাসের অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে যে তুলকালাম চলছে, তা বর্তমান এমডির কাছে জানতে চাইলে তিনি অপারগতার কথা জানান। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় লোকবল ও ম্যাজিস্ট্রেটের অভাবে অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো যাচ্ছে না।
তবে গ্যাস সংকট নিয়ে বিশেষজ্ঞদের রয়েছে ভিন্নমত। তাদের মতে, হঠাৎ করে দেখা দেয়া এ সংকট কৃত্রিম। এটা দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রেরই অংশ। বাংলাদেশের শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দেয়ার ষড়যন্ত্র। গ্যাসের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সরকার যেখানে বাসাবাড়িতে সংযোগ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে গ্যাসের সংকট নিছকই ষড়যন্ত্র। বর্তমান সরকারের আমলে এ পর্যন্ত সাড়ে ৬ কোটি ঘনফুটেরও বেশি গ্যাস উৎপাদন হয়েছে। পাইপলাইনে আরও বিপুলসংখ্যক গ্যাসের জোগান রয়েছে। তাহলে গ্যাসের চাপ কমবে কেন?
শিল্প-কারখানার মালিকরা বলছেন, প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় তারা কারখানার জেনারেটর চালাতে পারছেন না। যেখানে মেইন লাইনে ১৫০ থেকে ২৫০ পিএসআই পর্যন্ত চাপ থাকে, সেখানে মাঝে মাঝে মাত্র ৮ থেকে ১০ পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বহাল থাকে। ফলে কারখানার প্রডাকশন মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাসাবাড়িতে অবৈধ গ্যাস সংযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাহক হয়রানির আশংকাকে অমূলক বলে অভিহিত করেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাদের মতে, এখন এ সংযোগ অবৈধ হলেও একবার বাসাবাড়িতে গ্যাস পৌঁছে গেলে তা বন্ধ করার সুযোগ থাকবে না। তখন হয়তো গ্রাহকদের অবৈধ সংযোগ বৈধ করার জন্য অতিরিক্ত ফি দিতে হবে। তবে তাদের এ কথার সত্যতা পাওয়া গেছে ৮৭ হাজার অবৈধ সংযোগের ঘটনায়। কারণ ৮৭ হাজার অবৈধ সংযোগকে বৈধ করার জন্য সরকার জরিমানা আদায়সহ নির্দিষ্ট টাইমফ্রেম বেঁধে দিয়েছিল এবং অনেকেই অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধে অবৈধ সংযোগকে বৈধ করে নিয়েছে।
দেশের অর্থনীতি গ্যাসনির্ভর। অর্থনীতির চাকা ঠিক রাখতে হলে গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। অবৈধ সংযোগ পুরো গ্যাস সেক্টরকে ভয়াবহ হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। কঠিন নজরদারি ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণই পারে অবৈধ সংযোগ প্রতিরোধ করতে। নইলে এ সেক্টর নিয়ে জনমনে নানা সংশয় দেখা দেবে।
হাসান কামরুল : জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিতর্ক আর কতদিন? by ইকতেদার আহমেদ

বাংলাদেশ অভ্যুদয়-পরবর্তী বিগত ৪২ বছরে ৯টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। অতঃপর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এবং ৬ষ্ঠ ও ৭ম সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ৮ম সংসদ নির্বাচন ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ ৫টি নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা দু-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে একটি সরকারের মেয়াদ অবসান-পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কী পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেটি মীমাংসিত বিষয়। আমাদের দেশে মীমাংসিত হওয়ার প্রয়াস নেয়া হলেও মীমাংসিত হল না কেন এর উত্তর খুঁজতে গেলে যে চিত্র পাওয়া যায় তা হল- ১৯৯১ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৫ম সংসদ নির্বাচন, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৭ম ও ৮ম সংসদ নির্বাচন এবং ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৯ম সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিজিত দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
মূলত ৮ম জাতীয় সংসদের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী ২০০৬ সালের শেষদিকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর পেছনে ছিল সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী। এ সংশোধনীর মাধ্যমে উদ্দেশ্যমূলকভাবে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসরের বয়স না বাড়ানো হলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ অনেক সীমিত হয়ে আসত।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আদালতের দোহাই দিয়ে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির তীব্র আন্দোলনের ফলে বিএনপি নিয়ন্ত্রণাধীন ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হলে রাজনৈতিক বিষয় আদালতে মীমাংসিত হওয়ার ক্ষেত্র প্রশস্ত হয়। এর আগে ১৯৭৪ সালে সংবিধানের ৩য় সংশোধনীর মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত ছিটমহল বিনিময় চুক্তি কার্যকর করার জন্য সংবিধান সংশোধন করা হলে সে সংশোধনী বাতিল চেয়ে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা দায়ের করা হয়। ৭২’র সংবিধানের ৪৪নং অনুচ্ছেদে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে উল্লিখিত মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার জন্য সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের কাছে মামলা রুজু করার অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ-ভারত সম্পাদিত ছিটমহল বিনিময় চুক্তি আদালতে নিয়ে আসা হলে তা বঙ্গবন্ধু সরকারের জন্য বিব্রতকর অবস্থা সৃষ্টি করে একং তা অনুধাবন করেই সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনী প্রণয়নকালে বঙ্গবন্ধু সংবিধানের তৃতীয় ভাগে প্রদত্ত অধিকারগুলো বলবৎ করার জন্য ৪৪নং অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনপূর্বক সুপ্রিমকোর্টে মামলা দায়েরের অধিকার ক্ষুণ্ন করে সাংবিধানিক আদালত, ট্রাইব্যুনাল অথবা কমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান প্রণয়ন করেছিলেন। কিন্তু পঞ্চম সংশোধনী দ্বারা সে বিধানটি রহিত করে এ বিষয়ে ৭২’র সংবিধানে বর্ণিত ৪৪নং অনুচ্ছেদের বিধান পুনঃপ্রবর্তিত হলেও পরবর্তীকালে এ বিষয়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত রায়ে কোনো ধরনের আলোকপাত করা হয়নি। সংবিধানে যদিও বলা হয়েছে, সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন বাতিল হবে, কিন্তু কোন আদালত কী পদ্ধতিতে সে আইন বাতিল করবে সে বিষয়ে সংবিধান নিশ্চুপ। তাছাড়া সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে একজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত একজন ব্যক্তির আইন দ্বারা অনুমোদিত নয় এমন কার্যের প্রতিকার চাওয়ার যে অধিকার দেয়া হয়েছে, তা সংসদ প্রণীত আইনকে একজন ব্যক্তির কার্য হিসেবে আকৃষ্ট করে কি-না, ভেবে দেখা প্রয়োজন।
সংবিধানে সংসদের কার্যধারার বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপনের অধিকার দেয়া হয়নি। সংসদ কর্তৃক প্রণীত কোনো আইন সংসদের কার্যধারার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পায়। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের বৈধতা সম্পর্কিত আদালতে উত্থাপিত প্রশ্ন সংসদের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি-না? এর পাশাপাশি যে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন তা হল, উচ্চ আদালতের একজন বিচারক বিচারকের সাংবিধানিক পদে নিয়োগ লাভ পরবর্তী শপথবাক্য উচ্চারণপূর্বক ঘোষণা করেন যে, তিনি বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। তাই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, উচ্চ আদালতের একজন বিচারক শপথ গ্রহণ করাকালীন সংবিধান ও দেশের প্রচলিত যে কোনো আইন যে অবস্থায় ছিল, তিনি তা থেকে ভিন্নধর্মী কোনো অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন কি-না বা সংবিধানের কোনো অংশ বা কোনো আইন বাতিল করতে পারেন কি-না?
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল-পরবর্তী সংবিধানের বর্তমান যে অবস্থান তাতে প্রতীয়মান হয়, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীরা তাদের উত্তরাধিকারীরা কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। তাছাড়া বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী বা অপর কোনো মন্ত্রী নিয়োগের প্রশ্ন দেখা দিলে সংসদ ভেঙে যাওয়ার অব্যবহিত আগে যারা সংসদ সদস্য ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেয়া হয়েছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ে মন্ত্রিসভা অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে স্বল্পসংখ্যক সদস্য নিয়ে শুধু সরকারের দৈনন্দিন কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে এবং কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। আমাদের সংবিধানে একজন প্রধানমন্ত্রী যে ক্ষমতা ভোগ করেন, তা রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার একজন রাষ্ট্রপতির সমরূপ। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী একই সময়ে দলীয় ও সরকারপ্রধান হওয়ার কারণে তার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির চেয়ে অধিক। তাছাড়া একাদিক্রমে হোক বা না হোক, দু’মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতির পদে কোনো ব্যক্তি সাংবিধানিকভাবে অধিষ্ঠিত থাকতে পারেন না, যদিও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। সংবিধানের বর্তমান ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় দলীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা নিজ নিজ পদে বহাল থাকায় আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট এবং অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, এ ব্যবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে যদিও দাবি করা হচ্ছে, তাদের অধীনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি কর্পোরেশনসহ অন্য সংসদ সদস্যদের উপনির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনগুলো নিরপেক্ষ হয়েছে, তাই তাদের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে না- কিন্তু এ বিষয়ে দেশবাসীর প্রশ্ন, দলীয় সরকারের অধীনে বর্ণিত নির্বাচনগুলোর জয়-পরাজয়ের সঙ্গে সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন জড়িত ছিল না, যা জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রবলভাবে জড়িত। এ বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বলতে গেলে একেবারে অনড়। অপরদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্দলীয় অথবা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচিত অনুষ্ঠানে অনড়।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল-পরবর্তী যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর অবস্থান দুটি ভিন্ন মেরুতে। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের যে রূপরেখা দিয়েছেন তাতে দেখা যায়, ১১ সদস্যবিশিষ্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নিজেই থাকবেন এবং মন্ত্রিসভার ১০ জন সদস্যের পাঁচজন সরকারি দলের এবং অপর পাঁচজন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী নেয়া হবে। অপরদিকে বিরোধীদলীয় নেত্রী যে রূপরেখা দিয়েছেন তাতে তিনি বলেছেন, দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য একজন সম্মানিত ব্যক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হবেন এবং ১০ জন উপদেষ্টা ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে নেয়া হবে, যার পাঁচজন সরকারি দল এবং অপর পাঁচজন বিরোধী দলের সুপারিশে নিয়োগ লাভ করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত রূপরেখা পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, সমরূপ রূপরেখা ১৯৯৫ সালে সাবেক কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল স্যার নিনিয়ান এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু তখন তা তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই দেশবাসী প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে পারেন, যে রূপরেখা আপনার কাছে ১৯৯৫ সালে গ্রহণযোগ্য হয়নি, সে রূপরেখা এখন কী করে একই প্রশ্নে বিরোধী দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? এ রূপরেখাটির বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর যে অবস্থান তা হল- পরিস্থিতি অনুকূলে থাকাবস্থায় গ্রহণযোগ্য আর প্রতিকূলে থাকাবস্থায় অগ্রহণযোগ্য।
প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান রূপরেখা ১৯৯৬ সালে কার্যকর না হওয়ার কারণেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্ম। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর জাতির সামনে বর্তমানে সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দল উত্থাপিত যে দুটি রূপরেখা রয়েছে, উভয়ের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন যে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারবে না, সে বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তবে তা আলোচনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এর সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান আবশ্যক। উভয় রূপরেখা পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, মধ্যবর্তী যে কোনো অবস্থায় উপনীত হতে হলে সংবিধান সংশোধনীর আবশ্যকতা দেখা দেবে। কিন্তু সে সংশোধন অবশ্যই একটি নির্বাচনকে উপলক্ষ করে নয়। এটা অনস্বীকার্য যে, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, দৃঢ়, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হলে সে নির্বাচন কমিশন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু অনির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, তাকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও এর জোটভুক্ত দলগুলো এবং জাতীয় পার্টি এরই মধ্যে মেরুদণ্ডহীন, আজ্ঞাবহ, অথর্ব ও অনভিজ্ঞ আখ্যা দিয়েছে। এ বিষয়ে দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর অভিমত বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সমরূপ। তাই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনায় বর্তমান নির্বাচন কমিশন যে অক্ষম, সে প্রশ্নে বিতর্কের সুযোগ খুব কম।
আমরা নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে প্রতিটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় আমাদের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে, যা গণতান্ত্রিক পথচলার ক্ষেত্রে অন্তরায়। তাই আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের দু’নেত্রীসহ দুটি দলের অন্য নেতারা এবং অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতাদের দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এমন একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে উপনীত হতে হবে, যা নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্থায়ী সমাধানের পথ নিশ্চিত করবে। সে সমাধান বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতে সংবিধান সংশোধন ছাড়া সম্ভব নয়। তবে এর জন্য চাই সংকীর্ণ দলীয় মনোবৃত্তি হতে উত্তরণ। একমাত্র এটিই বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

রাজনীতি- বিএনপি আর কী করতে পারে? by ইনাম আহমদ চৌধুরী

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যেকোনো উপায়ে একটি লোক দেখানো নির্বাচনের মহড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।

সহিংসতা- হাত কার পুড়ে যায়! কে হারায় চোখ! by কাবেরী গায়েন

১০ বছরের শিশু মুরাদের দুই হাত ঝলসে গেছে। পান্থপথে গত শুক্রবার সে কুড়িয়ে পেয়েছিল যে ককটেল, সেই ককটেলের বিস্ফোরণেই ঝলসে গেছে তার দুই হাত।

সময়ের প্রতিবিম্ব- আলো, আমার আলো by এবিএম মূসা

সকালবেলায়ই মেজাজটি তিরিক্ষে হয়ে গেল। উৎসটি হলো প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার একটি খবরের বিন্যাস; অথবা পরিবেশনে অসামঞ্জস্য কিংবা শিরোনামে অসংগতি।

খোলা হাওয়া- জাগাতে হবে তারুণ্যকে by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আজ ৪ নভেম্বর প্রথম আলোর ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আমার বিবেচনায় এই ১৫ বছরের পথচলায় কাগজটা সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছে দেশের তরুণ সমাজের।

হিন্দু-মুসলমান-দলিত- ভারতে মৌলবাদের উত্থান by কুলদীপ নায়ার

মৌলবাদ আবারও তার জঘন্য মাথা তোলা শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) খোলাখুলি জানিয়েছে যে তারা সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করবে।

কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দুই নেত্রী by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

অনিবার্য বাস্তবতায় আশির দশকে রাজনীতিতে আগমন ঘটে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত দুই শীর্ষ নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার। বহু চড়াই-উতরাই ও ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝেও দীর্ঘ প্রায় তিন যুগ ধরে দুই নেত্রী বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। জনগণের কাছে তারা যে কত জনপ্রিয়, তা কিছুটা অনুধাবন করা গেছে ১/১১’র জরুরি শাসনের সময়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দুই নেত্রী বহুবার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন এবং এ চ্যালেঞ্জ থেকে বেরিয়েও এসেছেন। নেতৃত্বের এ গোধূলি বেলায় এসেও চ্যালেঞ্জ তাদের পিছু ছাড়ছে না। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর সামনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে তারা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে। সারা জাতি তাকিয়ে আছে দুই নেত্রীর দিকে; তারা আলোচনায় বসবেন এবং একটি পক্ষপাতহীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ বের করবেন, যা এ দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের দাবি। আশা করি, পরিপক্বতা ও বিচক্ষণতা দিয়ে এ চ্যালেঞ্জ থেকেও তারা বেরিয়ে আসবেন এবং গণতন্ত্রের দীর্ঘ পথচলায় সৃষ্টি করবেন ইতিহাস। দুই নেত্রীর শাসনের সবচেয়ে বড় দিক হল, বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীর বুকে গর্ব করে বলতে পারে, আমরা চারটি নির্বাচিত সরকার পেয়েছি এবং নির্বাচিত সরকার দ্বারাই আমরা শাসিত হচ্ছি। ১৯৯১ সালের পর জনগণের ভোটে চারটি নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়েছে, যা তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে একটি অনন্য রেকর্ড। এর ফলে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯১’র নির্বাচিত সরকার কৃষি ও শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। ওই সময় জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তাতে গ্রামে-গ্রামে কাঁচা স্কুল পাকা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হয়; শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি চালু হয়, চালু হয় মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি। ফলে নারী শিক্ষায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। অন্যদিকে কৃষককে উৎপাদনে উৎসাহিত করতে আসল ও সুদসহ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি লোন মওকুফ করে দেয়া হয়। পাশাপাশি সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম কমানো হয়; তাছাড়া বাজেটে ব্যাপকভাবে কমানো হয় কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর আমদানি শুল্ক। ফলে কৃষি উৎপাদন আশাতীতভাবে বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে এনজিও কর্মকাণ্ডকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়। ফলে ক্ষুদ্রঋণ, স্বাস্থসেবা, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনসহ গ্রামীণ অবকাঠামোর অভূতপূর্ব উন্নতি হয়।
উল্লিখিত সুযোগ-সুবিধা পরবর্তী সব নির্বাচিত সরকার অব্যাহত রাখে। ফলে বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যবস্থা বদলে গেছে, বদলে গেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি উৎপাদনের চিত্র। নারী শিক্ষায় উপমহাদেশে বাংলাদেশ আজ উদাহরণ। উদাহরণ ক্ষুদ্রঋণ ও শিশুমৃত্যু হারের ক্ষেত্রেও। এটি শুধু কথার কথা নয়, নজর কেড়েছে বিশ্বের। এর কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে দুই নেত্রীর দুই যুগের গণতান্ত্রিক শাসন। এ ধারা অব্যাহত রাখার দায়িত্ব দুই নেত্রীর; বস্তুত এখানেই তাদের রাজনৈতিক সাফল্য লুক্কায়িত। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন পক্ষপাতহীন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, যা কেবল দলনিরপেক্ষ সরকারের দ্বারাই সম্ভব।
কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে বলে মানুষ মনে করে। শুধু তাই নয়, দেশ আজ চরম সংকটে দাঁড়িয়ে। এ সংকট এখন প্রান্তসীমায় এসে পৌঁছেছে; দেশে এক অস্থির, অশান্ত ও বেদনাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঝরছে রক্ত, মরছে মানুষ; ধ্বংস হচ্ছে সম্পদ, বিধ্বস্ত হচ্ছে অর্থনীতি। ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি ও শিক্ষাসহ জনজীবনের অন্যসব কর্মকাণ্ড। ২৫ অক্টোবরের পর আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে অন্তত ২০ জন মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে! রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, রাষ্ট্রের ভিত্তিও জনগণ; জনগণকে হত্যা করে কোনো নেতৃত্ব টিকে থাকতে পারে না। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে দুই নেত্রী! এ খাদে পড়লে ওঠা অসম্ভব। সময় এখনও আছে- বৃহৎ স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম করতে ত্যাগ করতে হবে ক্ষমতা। পদ আঁকড়ে থাকার চেয়ে ইতিহাসের অংশ হওয়া শ্রেয়। একতরফা কোনো নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হবে চরম আত্মঘাতী। জীবনে যা অর্জিত হয়েছে, সব যাবে। একজনের গেলে অন্যজনেরও যাবে স্বাভাবিক নিয়মে। কারণ যতই আদর্শগত পার্থক্য থাকুক, নেতৃত্ব একে অপরের পরিপূরক; একজনকে ছাড়া অন্যজনের জীবন অর্থহীন।
একতরফা কোনো নির্বাচনের পরিবেশ দেশে এখন আর নেই। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় দেশে অনেক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। মানুষ যার যার ভোট নিজে দিতে শিখেছে। প্রায় ৯ কোটি ভোটারের ছবিসহ পরিচয়পত্র তৈরি হয়েছে, যা দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে এক মাইলফলক। এখন ইচ্ছা করলেও একজনের ভোট আরেকজন দিতে পারেন না বা দেয়ার পরিবেশ নেই। তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যম বহুদূর এগিয়েছে। বলা যায়, একটি বিশ্বমানের গণমাধ্যম বাংলাদেশে কাজ করছে, যা মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট। একে ফাঁকি দেয়ার ক্ষমতা কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির নেই।
তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে মুহূর্তের মধ্যেই যে কোনো খবর সম্প্রচার হয়ে যায় বিশ্বজুড়ে। তাই নির্বাচনে জালিয়াতি বা ভোট ডাকাতি করে কেউ পার পাবে না। ফুটেজ থেকে যাবে গণমাধ্যম কর্মীদের হাতে; এ ভয়ে নির্বাচনে জালিয়াতি বা ভোট ডাকাতি করতে কেউ উৎসাহিত হবে না। সুতরাং একতরফা নির্বাচনের কোনো চিন্তা থাকলে তা মাথা থেকে ঝেরে ফেলুন। ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিন। মনে রাখবেন, একজন সাধারণ মানুষ ভুল করলে এর খেসারত তিনি নিজে অথবা তার পরিবার দিয়ে থাকে। কিন্তু একজন রাজনীতিক যদি ভুল করেন বা ভুল সিদ্ধান্ত নেন, এর খেসারত দিতে হয় একটি জাতি অথবা রাষ্ট্রকে। তাই রাজনীতিকদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় ভেবেচিন্তে, ঠাণ্ডা মাথায়।
আগামী জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনের ওপর দেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নির্ভরশীল। বাংলাদেশ বিশ্বে কোন মর্যাদায় আসীন হবে, তা নির্ভর করছে আগামী নির্বাচনের ওপর। এ নির্বাচন একতরফা করার চিন্তা করা প্রকারান্তরে দেশের অসীম সম্ভাবনা ধ্বংস করার শামিল। দেশ ও জনগণের ভালো চাইলে সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের চিন্তা করতে হবে।
সংবিধানের দোহাই দেয়া কোনো নেতৃত্বের জন্য মানানসই নয়। কেননা সংবিধান মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। সংবিধান, আইন সব কিছুই পরিবর্তন সম্ভব হয়, যখন নেতৃত্ব এক হয়। মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা নেতৃত্বের কাজ নয়। এখন দুই নেত্রীর এক হওয়ার সময়, সময় দেশপ্রেম জাগ্রত করার; সময় বিশ্বকে দেখিয়ে দেয়ার। বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘ এগিয়ে এসেছে, আমেরিকা এগিয়ে এসেছে; এগিয়ে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব বিশ্ব, চীন, ভারত, কানাডা ও অন্য সব রাষ্ট্র। এক কথায়, এসব দেশ বাংলাদেশের ভালো চায়; বাংলাদেশের শান্তি ও স্থিতি অব্যাহত রাখার স্বার্থেই রাজনৈতিক সংকট সমাধানে এসব দেশ এগিয়ে এসেছে। এসব দেশের উপলব্ধিতে হয়তো এসেছে, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব দেশ একটি পক্ষপাতহীন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিকদের পরামর্শ দিয়েছে। সুতরাং দুই নেত্রীর উচিত এসব দেশের আবেগের মূল্য দেয়া এবং দ্রুত সংলাপে বসে সংকটের সমাধান করা।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সন্ত্রাসী-রাজনীতির মরণ ছোবল হাসিনা সরকার কী করবেন? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বিএনপি ও জামায়াতের এখন ডেসপারেট অবস্থা মনে হয়। ১৮ দলীয় জোটের নামে তারা আবার হরতালের ডাক দিয়েছে। তিন দিনের হরতাল। আজ ৪ নভেম্বর থেকে বুধবার ৬ নভেম্বর। বাংলাদেশের মাটিতে সদ্য সমাপ্ত হরতালের রক্ত না শুকাতেই আবার হরতালের ডাক দেয়া হল। এই হরতাল ভারতের গান্ধী যুগের জনসমর্থিত এবং জনগণের অংশ নেয়া হরতাল নয়। এই হরতাল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালের হরতালে সারাদেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অচল হয়ে যাওয়া নয়। শান্তিপূর্ণ অথচ অপ্রতিরোধ্য জনসমাবেশের বিশাল তরঙ্গ নয়। বিএনপি-জামায়াতের এই হরতাল জনগণকে ভয় দেখিয়ে ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখা, গাড়ি-বাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, নিরীহ পথচারী হত্যার হরতাল। এটা আন্দোলন নয়, সন্ত্রাস। এই সন্ত্রাসের বলি সাধারণ মানুষ। এই হরতালের ডাক দেয়ার আগেই বিএনপিকে জানানো হয়েছিল, তাদের হরতালের সময়সীমার মধ্যে ২০ লাখের মতো স্কুল ছাত্রছাত্রীর পরীক্ষা। হরতালের ফলে এই বিশাল শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে না পারলে তাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হবে। বিএনপি নেতারা তার তোয়াক্কা করেননি। বলেছেন, পরীক্ষা হরতালের আওতামুক্ত রাখা হল। এটা দেশের ২০ লাখ ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে নিষ্ঠুর প্রতারণা। পরীক্ষার হল না হয় হরতালের আওতামুক্ত রাখা হল কিন্তু পরীক্ষার হলে যাওয়া-আসার পথ? শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে যাওয়া-আসার পথে আক্রান্ত হবে না, গুণ্ডাদের বোমাবাজির শিকার হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
যত বড় কারণেই হরতাল ডাকা হোক না কেন, অ্যাম্বুলেন্স, মৃতদেহ বহনকারী গাড়ি, ডাক্তার ও সাংবাদিকদের গাড়ি ইত্যাদি হরতালের আওতা থেকে মুক্ত রাখা হয়। কিন্তু বিএনপি ও জামায়াতের ডাকা হরতালে সভ্য জগতের এসব চিরাচরিত নিয়মকানুন কোনোটাই পালন করা হয় না, মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছুটছে হাসপাতালে, সেটিকে গতিরোধ করা হয়েছে। মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচানো যায়নি। বস্তির কিশোরী মজুর বাপের জন্য ভাতের থালা হাতে তার কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছে। হরতালকারীদের বোমায় তার চোখ নষ্ট হয়ে গেছে, একটা হাত জখম হয়েছে। বাসের নিরীহ কন্ডাক্টর থামানো বাসের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। অটোরিকশাচালক জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মরেছে। টেলিভিশনের সংবাদকর্মীর পা বোমায় উড়ে গেছে। এসব আমার বানানো কথা নয়। বিএনপির ডাকা বিভিন্ন হরতালের সময়ের বিভিন্ন ঘটনা। সবই মিডিয়ায় এসেছে। এসব বীভৎস ঘটনারই পুনরাবৃত্তি যে আজ সোমবার থেকে আগামী বুধবার পর্যন্ত ঘটানো হবে তাতে সন্দেহ নেই। হয়তো গতকাল থেকেই তা শুরু হয়ে গেছে, বিএনপি ও জামায়াতের তো এখন নিয়ম হচ্ছে, হরতাল ডাকবে যেদিন থেকে তার আগের দিন থেকে গাড়ি-বাড়ি ভাঙতে শুরু করে অপ্রস্তুত সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালায়। এ ধরনের বর্বরতা সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে বিরল।
আমি সত্তরের দশকের গোড়ায় কলকাতায় নকশাল সন্ত্রাসের মধ্যে বাস করেছি। আবার একই দশকের মাঝামাঝি সময়ে লন্ডনে এসে বেশ কয়েক বছর আইআর বা আইরিশ সন্ত্রাসের মধ্যে বাস করেছি। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে যা ঘটছে এমন বর্বরতা ও অমানবিকতা দেখিনি। আবার এসব ঘটানো হচ্ছে গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনীতির নামে। কলকাতায় চোখের সামনে নকশাল ও পুলিশের যুদ্ধ দেখেছি। এই যুদ্ধের ক্রসফায়ার থেকে বাঁচতে ট্রাম থেকে লাফ দিয়ে নেমে দৌড়ে পালিয়েছি। কিন্তু নকশালরা যাত্রীবাহী বাস কিংবা ট্রামে আগুন দেয়নি। প্রাইভেট কারে হামলা চালায়নি। যুদ্ধ চলেছে পুলিশ ও নকশালের মধ্যে।
একবার কলকাতার মানিকতলায় বাড়ির ছাদের ওপর দাঁড়ানো নকশালদের কাটা রাইফেল হাতে নিচে স্টেনগানধারী সিআরপির (সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ) যুদ্ধ দেখেছি। দু’একজন পথচারী তাতে আহত হয়নি তা নয়। কিন্তু পথচারীদের ওপর কোনো হামলা চালানো হয়নি। লন্ডনে আইআরএ সন্ত্রাসীরা তো যুদ্ধের নিয়মকানুন মানত। রাস্তায় ট্রেনে বা শপিংমলে বোমা রাখলে সঙ্গে সঙ্গে তারা তা টেলিফোনে কোনো সংবাদপত্র অফিসকে জানিয়ে দিত। সংবাদপত্র অফিস জানাত পুলিশকে। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে অকুস্থল থেকে লোকাপসরণ শুরু করত। বোমা ফেটে দোকানপাটের ক্ষতি হতো। কোনো প্রাণহানি ঘটত না।
বাংলাদেশে জামায়াতি রাজনীতিতে মানবতা, শিশু ও নারীর প্রতি দায়িত্ববোধ, মসজিদ-মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষা, ধর্র্মীয় সহিষ্ণুতা ও নৈতিকতা ইত্যাদির কোনো বালাই আছে বলে মনে হয় না। জামায়াতের সঙ্গে মিতালি হওয়ার পর বিএনপির রাজনীতিতেও এসব নীতি-নৈতিকতা এখন অনুপস্থিত। আন্দোলনের নামে তাদের যৌথ সন্ত্রাসে বাংলাদেশে মানবতা এখন আর্ত। প্রতিপক্ষের রগকাটা, শিরকাটা ইত্যাদি নানা বর্বরতা এখন যুক্ত হয়েছে রাজনীতিতে। চলছে অবাধে নারী ও সংখ্যালঘু নিগ্রহ। ভাঙা হচ্ছে হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধবিহার। মসজিদও অবমাননার হাত থেকে বাঁচছে না। অনেক মসজিদকেই রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ট্রেনিং কেন্দ্র বানানো হয়েছে। পীর-আউলিয়ার মাজারে (যেমন সিলেটের হজরত শাহজালালের মাজার) বোমা ফেলা হয়েছে। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলেও যা হয়নি। পবিত্র রমজান মাসেও হরতাল ডাকা হয়েছে। ঈদের নামাজে বোমা ফাটানো হয়েছে। নামাজি হত্যা করা হয়েছে। গত মে মাসে হেফাজতি তাণ্ডবের সময় তো ঢাকার বায়তুল মোকাররমে দোকান পোড়াতে গিয়ে পবিত্র কোরআন শরিফ পোড়ানো হয়েছে। এটা গণআন্দোলন নয়, জনগণের অধিকার আদায়েরও যুদ্ধ নয়। এটা জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের যদি বিচার ও দণ্ড হতে পারে, তাহলে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের জন্য বর্তমান বিএনপি এবং জামায়াত নেতাদেরও বিচার ও দণ্ড হওয়া উচিত। জওয়াহের লাল নেহেরুকে বলা হয় গণতান্ত্রিক ভারতের নির্মাতা। তিনি বলেছেন, ‘গণতন্ত্রকেও টিকে থাকার জন্য কখনও কখনও যুদ্ধের পোশাক পরা দরকার, নইলে গণতন্ত্র কখনও কতগুলো নীতিবাক্য দ্বারা বাঁচতে পারে না।’
এ জন্যই নেহেরু উদার গণতান্ত্রিক পদ্ধতির অনুসারী হয়েও ভারতে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি যখন ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হায়’ স্লোগান দিয়ে দেশটিতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে সশস্ত্র পন্থায় সরকার উচ্ছেদের জন্য ভয়াবহ সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, তখন তিনি বিনাদ্বিধায় কমিউনিস্ট পার্টির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন এবং ব্যাপক ধরপাকড় দ্বারা শীর্ষ কমিউনিস্ট নেতাদের জেলে পুরেছিলেন।
এই নেহেরুই আবার কমিউনিস্ট পার্টি যখন ‘সশস্ত্র শ্রেণী সংগ্রামের’ নামে সন্ত্রাসের পথ অনুসরণের বদলে গণতান্ত্রিক পন্থায় (এমনকি সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ নিয়ে) রাজনীতি করার ঘোষণা দেয়, তখন তিনি শুধু কমিউনিস্ট পার্টির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেননি, বরং কমিউনিস্টদের নির্বাচনে জিতে কেরল, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় সরকার গঠন করতে দিয়েছিলেন। বিশ্বের ইতিহাসে একটি ধনতান্ত্রিক কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কমিউনিস্টদের ক্ষমতায় বসতে দেয়া এই প্রথম। এর কোনো দ্বিতীয় উদাহরণ নেই।
বাংলাদেশে বর্তমানে যা চলছে তা জনগণের দাবি-দাওয়া আদায়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন নয়। এটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ের বাহানায় সরকার উচ্ছেদের সশস্ত্র প্রচেষ্টা। এখানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে হিন্দুদের দুর্গাদেবীর মতো কল্যাণমূর্তির সঙ্গে অসুরনাশিনী মূর্তিও ধারণ করতে হবে। হাসিনা সরকার আর কত গণতান্ত্রিক সংযম ও ধৈর্যের পরীক্ষা দেবে? জনগণকে আর কত অসুরদের হাতে নিত্য নির্যাতিত ও বধ হতে দেবে? জনগণের ধন-প্রাণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে না পারলে এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার অধিকার ও প্রয়োজন আছে কিনা সেই প্রশ্ন উঠবে। আমি কোনো রাজনৈতিক দলকে, এমনকি জামায়াতকেও নিষিদ্ধ করার ঘোর বিরুদ্ধবাদী। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে হলেও (অন্তত ১০ বছরের জন্য) জামায়াতকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং তাদের সব সন্ত্রাসী নেতাকে গ্রেফতার করা প্রয়োজন বলে মনে করি। এটা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধাচরণ হবে না। হবে গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জরুরি পদক্ষেপ। অতীত ভারতে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণে নেহেরু দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখাননি। বর্তমান বাংলাদেশে হাসিনা যেন এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব না দেখান। পঁচাত্তরের ট্রাজেডি থেকে তিনি শিক্ষা নিন।
এর পর জামায়াত যদি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং নেপালের মাওবাদীদের মতো প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে সন্ত্রাসের পথ ত্যাগ করে, সংসদীয় রাজনীতিতে আস্থা প্রকাশ করে সংসদীয় পদ্ধতিতে দেশে তাদের ইসলামের শাসন প্রবর্তন করতে চায় এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে তাহলে অবশ্যই তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণের এমনকি ক্ষমতায় বসার সুযোগ দিতে হবে। তবে হিংসাত্মক পন্থা ত্যাগ করার আগে নয়।
খালেদা জিয়ার বিএনপিকেও সরকারের কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দেয়া উচিত। জামায়াতকে বেআইনি ঘোষণার পরপরই বিএনপিকে এই বলে সতর্ক করে দেয়া উচিত যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটির সঙ্গে যদি তারা কোনো ধরনের সংস্রব রাখেন এবং তাদের অনুসৃত পন্থায় হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির চর্চা করতে চান, তাহলে তাদের রাজনীতিও নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে সরকারকে চিন্তাভাবনা করতে হবে।
সরকার অবিলম্বে এ ব্যাপারে সজাগ ও সক্রিয় হোন এবং জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত জানমাল ধ্বংসকারী এই দস্যুবৃত্তি বন্ধ করার পন্থা উদ্ভাবনের জন্য সব দলমতের, পেশার মানুষ এবং তাদের শীর্ষনেতাদের নিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে বসুন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচন ও সর্বদলীয় সরকার গঠনের ব্যাপারে স্বতন্ত্রভাবে বিভিন্ন দলের নেতাদের ডেকে বৈঠক করছেন। তা তিনি করুন। কিন্তু নানা বাহানায় নিত্যনিয়ত নিরীহ জনজীবনে যে ‘বর্গির হামলা’ চালানো হচ্ছে, তা বন্ধ করার পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার জন্য সব দল ও সব পেশায় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে বসুন।
এই বৈঠকে সুশীল সমাজ, মিডিয়াসহ সব পেশার শীর্ষনেতা এবং শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক নেতাদেরও ডাকুন। এমনকি ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রমুখকেও। তাদের কাছে স্পষ্ট করে তুলে ধরুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি দাবি আদায়ের পথ তো গণতান্ত্রিক আন্দোলন, টেরোরিজম নয়। এই টেরোরিজমের আসল উদ্দেশ্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির গণতান্ত্রিক খোলসের আড়ালে সশস্ত্র সন্ত্রাসের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার উচ্ছেদ। এই সরকার উচ্ছেদেরও আসল লক্ষ্য ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড বানচাল করা। দেশের সুশীল সমাজ, গণসমাজ কি চায়, দাবি আদায়ের আন্দোলনের খোলসের আড়ালে গণশত্র“রা সেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূরণে সফল হোক?
হাসিনা সরকার কঠোর হোন। তোয়াজের রাজনীতি (চড়ষরপু ড়ভ ধঢ়ঢ়বধংবসবহঃ) ত্যাগ করুন। হেফাজতিদের তোয়াজ করে কি লাভ হয়েছে, তা তো চোখের সামনে প্রত্যক্ষ। আগেই বলেছি, বিএনপি-জামায়াত জোট এখন ডেসপারেট। বারবার হুমকি দিয়ে, চক্রান্ত চালিয়ে, আলটিমেটাম দিয়ে, টেরর ট্যাকটিস গ্রহণ করে তারা সফল হয়নি। বারবার পরাজিত হতে হয়েছে। সুতরাং শেষবারের মতো তাদের এই মরণ ছোবল। চার থেকে ছয় নভেম্বর পর্যন্ত হরতাল ডেকে নাগরিক জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি ছাড়া তারা যে অশ্বডিম্ব পাবেন, তা নিজেরাও জানেন। তারপর?
তারপর তারা দেশে অবরোধের ডাক দেবেন, অসহযোগ আন্দোলনে নামবেন এসব হুমকিও দিচ্ছেন। সরকারের তাতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বিএনপি-জামায়াতের ডাকে দেশে অসহযোগ হবে, এ কথা পাগলে শুনলেও হাসবে। বিএনপি-জামায়াত নেতারাও এ কথা জানেন। তাই আলোচনার ডাক শুনেও তারা বেসামাল কথা বলেন। আবার কঠোর কর্মসূচির ডাক আসলে চূড়ান্ত পরাজয়ের আগে তাদের মরণ ছোবল। মনে ক্ষীণ আশা, যদি এই শেষ আঘাত দিয়ে ব্যর্থতা ও পরাজয় এড়ানো যায়। প্রাণী জগতেও দেখা যায়, কোনো হিংস্র প্রাণীও শিকারির হাতে বধ হওয়ার আগে আহত শরীর নিয়েও শিকারির ওপর শেষ মরণ আঘাত হানে।
সবশেষে একটি কথা আমার সহৃদয় পাঠকদের নিবেদন করছি। ‘নিরপেক্ষ’ তওবা সম্পাদকের পর নাকি তার দোসর তারকা সম্পাদক তার কাগজে জনমত সমীক্ষার ফল প্রকাশ করে দেখিয়েছেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঠেকায় কে? আমার কথা, আগে বিএনপি-জামায়াত জোট তাদের ‘আন্দোলনে’ জয়ী হয়ে দেখাক! তারপরে তো নির্বাচনে জয়!

মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে খুশি হব : লতা

নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে খুশি হব। ঠিক এভাবেই মোদির প্রতি সমর্থন জানালেন ভারতের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী লতা মুঙ্গেশকর। ভারতে বোদ্ধা মহলে সমালোচিত হলেও লতার মন গলাতে পেরেছেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদি। বিজেপি নেতার সঙ্গে শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে কৃষ্ণপ্রেমে সমর্পিত লতা বলেছেন, ‘আমি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে চাই, নরেন্দ্র মোদিই যেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন।’
লতার বাবা দীননাথ মুঙ্গেশকরের নামে পুনেতে নির্মিত হাসপাতালের ৬০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন করেন নরেন্দ্র মোদি। সেই অনুষ্ঠানেই নিজের ভবিষ্যৎ যাত্রায় কণ্ঠশিল্পীর সমর্থন পান তিনি। গুজরাট দাঙ্গার জন্য ‘দায়ী’ মোদিকে ‘ভাই’ সম্বোধন করে লতা বলেন, ‘তার সাফল্য কামনা করি আমি। প্রধানমন্ত্রী পদে তাকে দেখা আমাদের সবার চাওয়া।’

বিএনপি আর কী করতে পারে?

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যেকোনো উপায়ে একটি লোক দেখানো নির্বাচনের মহড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। কথা ছিল, সংলাপ বা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে সর্বদলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পদ্ধতি প্রণীত হবে। কিন্তু একটি অফলপ্রসূ ফোনালাপ এবং ক্ষমতাসীন দলের মুখপাত্রদের কয়েকটি ঘোষণা সে আশার প্রদীপকে ঢেকে দিয়েছে ভিজে কম্বল দিয়ে। তার ওপর জুটেছে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। ফোনালাপ নিয়ে বহু আলোচনা-বিতর্ক হয়েছে। তার পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। তবে একটি বিষয় খোলাসা করা খুবই প্রয়োজন। একটি অকেজো লাল ফোন (যা পূর্ব-পরিজ্ঞাত না থাকার কোনো কারণ নেই) দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘দীর্ঘকালীন’ বিফল প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনার সূচনাতেই একটি ‘অবিশ্বাস’ বা ‘অভিসন্ধি-উপস্থিতি’র জন্ম দিয়েছিল। লাল ফোন ওঠালেই সংশ্লিষ্ট বিশেষ ‘এক্সচেঞ্জে’ একটি সতর্কধ্বনি হয়। আর কথোপকথন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই (যদি বারণ না থাকে) রেকর্ডকৃত হয়। কখনো যোগাযোগ স্থাপিত না হলে তা সঙ্গে সঙ্গেই এক্সচেঞ্জের জানার কথা।
তা ছাড়া, উৎসস্থল হচ্ছে যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ফোন। দ্বিতীয়ত, রেড ফোন চালু রাখার দায়িত্ব সরকারেরই (অর্থাৎ সরকারাধীন টেলিফোন কর্তৃপক্ষের)। তা ছাড়া, বিরোধীদলীয় নেতার লাল ফোনের অকার্যকর অবস্থা নিয়ে রিপোর্ট করাও হয়েছিল। রিপোর্ট না করলেও তা কর্তৃপক্ষের জানার এবং কার্যকর রাখার কথা। ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, তা কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের একটি গুরুতর কর্তব্য-বিচ্যুতি। আর এ জন্যই হয়তো বিরোধীদলীয় মাননীয় নেত্রী শুরুতেই ভেবেছেন, তাঁকে কোণঠাসা করার জন্যই ‘আপনি ফোন ধরছেন না’—এ ধরনের অভিযোগ সমন্বিত কথোপকথনের সূচনা। এখানে আন্তরিকতার অভাবও পরিলক্ষিত হতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত, এর রেশ সারা ৩৭ মিনিটের ফোনালাপেই থেকে গেল। হলো না কোনো ফলাফল। এই ফোনালাপের পরবর্তী পদক্ষেপ যখন মহাগুরুত্বপূর্ণ তখন দেখা যাক, ‘সংলাপ’ নিয়ে কী আলোচনা হলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব ছিল (ক) ২৮ তারিখ সন্ধ্যাকালীন আলোচনা ও নৈশভোজ। (খ) হরতাল প্রত্যাহার। দুটোতেই অপারগতা জানিয়ে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেন (ক) হরতাল প্রত্যাহার করে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ তারিখের প্রস্তাবিত আলোচনা ও ভোজে যোগদানে তিনি অসমর্থ; (খ) কিন্তু সংলাপে তিনি আগ্রহী এবং তার জন্য ৩০ তারিখ বা এর পরবর্তী যেকোনো দিন সংলাপের জন্য তিনি প্রস্তুত।
অর্থাৎ ২৮ তারিখের জন্য না হলেও অন্য যেকোনো দিনের জন্য তিনি এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন এবং তদনুসারে আলোচনায় আগ্রহী। সুতরাং বিএনপি সংলাপে রাজি নয় বলে যে একটি বিভ্রান্তিমূলক মিথ্যাচার হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অনভিপ্রেত। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, গণভবন প্রস্তুত, বিরোধীদলীয় নেত্রী সংলাপে আসতে পারেন। কিন্তু সেটা কবে? আসল কথাটাই-বা কেন বলছেন না? দিনক্ষণ স্থির না হলে কি বেগম খালেদা জিয়া গণভবনের দ্বারে সঙ্গী-সাথি নিয়ে উপস্থিত হয়ে ঘোষণা করবেন—‘আমি অতিথি এসেছি তোমারি দ্বারে, খোলো খোলো দ্বার ওগো... ফিরায়ে দিয়ো না মোরে?’ আওয়ামী কর্তৃপক্ষ বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে জিজ্ঞাসা—সংলাপে সরকারি দলের বিন্দুমাত্র অভিলাষ থাকলে বহু অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁরা কোনো দিনক্ষণ কেন জানাচ্ছেন না? এটা যদি না হয়, তাহলে জাতির মনে এই ধারণাই যদি বদ্ধমূল হয় যে ফোনালাপের প্রচেষ্টা ছিল একটি প্রহসনমূলক নাটক, তা কি অসংগত হবে? তা ছাড়া, ফোনালাপের বিবরণ সাধারণ্যে প্রকাশ (তাতে যদিও বিএনপির কোনো ক্ষতি হয়নি) একটি অভিসন্ধির উপস্থিতির সন্দেহের উদ্রেক করেছে। বেগম খালেদা জিয়ার বিনা অনুমতিতে এই ফোনালাপ রেকর্ড করা এবং তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা নিঃসন্দেহে অনৈতিক ও শিষ্টাচারবিবর্জিত হয়েছে, সম্ভবত বেআইনিও।
৩১ অক্টোবরের দৈনিক বণিক বার্তায় সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম সংগত কারণেই প্রশ্ন তুলেছেন—‘অনেকের মনে আছে, কয়েক মাস আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সাবেক প্রধান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের স্কাইপে করা আলাপচারিতা প্রকাশ করেছিল একটি পত্রিকা। সেটি ছিল তাদের ব্যক্তিগত কথাবার্তা। এ যুক্তি দেখিয়ে দেশের প্রচলিত আইনে অপরাধ হিসেবে আমলে নিয়ে মামলা করা হয় ওই পত্রিকার সম্পাদকের বিরুদ্ধে। দুই নেত্রীর এই আলাপচারিতা (যেখানে ব্যক্তিগত ব্যাপারও ছিল) প্রকাশ কি একই অপরাধের আওতায় পড়ে না?’ ৩০ অক্টোবর প্রথম আলোয় সাংবাদিক সোহরাব হাসান লিখেছেন ‘মনে হয়েছে এক পক্ষের কাছে আমন্ত্রণ জানানোর চেয়ে আমন্ত্রণের বার্তাটি দেশবাসীর কাছে প্রচার করাই মুখ্য ছিল। অপর পক্ষ সেই সুযোগে মনের মতো রাগ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।’ তা ছাড়া, এর পরবর্তীকালীন সরকারের আচরণ, মন্ত্রীসহ আওয়ামী নেতাদের বিবৃতি, বিএনপি ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সংকল্প ঘোষণা, নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড—এসব কিছুই সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টির যে শুধু প্রতিকূলই নয়, মনে হচ্ছে সংলাপ যাতে কিছুতেই না হতে পারে, তারই নিশ্চয়তা বিধান করা হচ্ছে। এবং তা বিএনপিকে অনিবার্য কারণেই করে তুলছে আন্দোলনমুখী। কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি ও ১৮ দল এবং তাদের সমর্থকেরা।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের যে বক্তব্য—‘নির্বাচন সর্বদলীয় হবে’ বা ‘নির্বাচনকালীন সরকার সর্বদলীয় হবে’—তা সম্পূর্ণ নিরর্থক। বিএনপি ও এর অনুসঙ্গীরা নির্বাচনে না এলে সে নির্বাচন কিছুতেই সর্বদলীয় এবং কোনো অবস্থাতেই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে না। এটা শুধু বিএনপি বা ১৮ দলের বক্তব্য নয়—গণফোরাম, বিকল্পধারা, গণঐক্য ফোরাম, বাম মোর্চা, বিদেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সর্বোপরি দেশের জনগণ (জরিপ অনুযায়ী) এই একই কথা বলছেন। বাম মোর্চা (দৈনিক সমকাল, ২ নভেম্বর) বলেছে—‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলে একক নির্বাচন করার কোনো অবকাশ নেই। বিরোধী দলগুলোকে সাইড লাইনে বসিয়ে রেখে সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠানের পাঁয়তারা দেশবাসী গ্রহণ করবে না। সরকারি দলের পক্ষে এ ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভবও হবে না।’ (দৈনিক সমকাল, ২ নভেম্বর)। তাই চেষ্টা করতে হবে বিকল্প সমাধানের। এ প্রসঙ্গে নাগরিক সমাজে সংগঠন ‘সুজন’ দুটি সম্ভাব্য প্রস্তাব রেখেছে, যা প্রণিধানযোগ্য। আমি দেখে খুবই আশ্চর্যান্বিত হয়েছি যে ১ নভেম্বরের প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে একজন প্রবীণ শিক্ষাবিদ বলেছেন— ‘কোনো কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি এবং গণমাধ্যম প্রায়ই বলে থাকেন, উচ্চ আদালত নাকি আগামী দুটি নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। এটা অর্ধসত্য।’ এটা কি ঠিক হলো?
আদালতের বক্তব্য উদ্ধৃতি দিলেই তো কোনো ‘অর্ধসত্য’ থাকছে না। পূর্ণ বিচারাদেশে বলা হয়েছে—‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সাময়িকভাবে শুধুমাত্র পরবর্তী দুটি সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে থাকিবে কি না সে সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র জনগণের প্রতিনিধি জাতীয় সংসদ লইতে পারে।’ এখানে তো এটাই বলা হচ্ছে যে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা, যা ছিল একটি সর্বদল স্বীকৃত চালু ব্যবস্থা, তা আগামী দুই সাধারণ নির্বাচনের জন্য জাতীয় সংসদ চালু রাখতে পারে। তা না করে জাতীয় সংসদ সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এককভাবে পছন্দমতো একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে ভূতপূর্ব প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনে দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে বলেছেন যে তাঁর বিচারাদেশে আগামী দুই সাধারণ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার সুযোগ সংসদের ছিল। তাঁর বিচারাদেশের অজুহাতে সেটার অন্যথা করা তো অসংগত হয়েছে। বিচারাদেশের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিরোধী দল যে কিছু বলছে না, তা বিচারপতি খায়রুল হকের বিবৃতি পড়লেই বোঝা যাবে। তা ছাড়া মোদ্দা কথা হচ্ছে, বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারাধীন দলীয় নির্বাচন বিরোধী দলগুলো ও জনগণ কিছুতেই মেনে নেবে না।
ওই প্রবন্ধে আরও মন্তব্য করা হয়েছে—‘এসব দুর্বৃত্তপনা আর নৈরাজ্যের দায়িত্ব অবশ্যই বিরোধী দলকে নিতে হবে।’ কেন? বর্তমানের এই রাজনৈতিক সংকট, অচলাবস্থা এবং সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি কে করেছে? প্রশাসনের দুর্বৃত্তায়ন ও দলীয়করণ কে করেছে? এ নির্বাচনের একটি সর্বদল স্বীকৃত ব্যবস্থা রাখার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা পাল্টে দিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা কে সৃষ্টি করেছে? প্রধানমন্ত্রীকে গদিনশিন রেখে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন যে হবে না, জনগণের এই দৃঢ় মনোভাব জেনেও তার একগুঁয়ে বিরুদ্ধাচরণ করে কে এই রক্তক্ষয়ী সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি করেছে? হাজার হাজার বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীকে কে হয়রানি ও গ্রেপ্তার করে গণতন্ত্রের কণ্ঠ রুদ্ধ করার চেষ্টা করছে? নির্বাচনের সময়েও সব ধরনের সভা-সমাবেশ, এমনকি ঘরোয়া সমাবেশ, মানববন্ধন, শোভাযাত্রা ইত্যাদি নিষিদ্ধ করে গণতন্ত্রবিরোধী স্বৈরাচারী আদেশ কে জারি করেছে? এসব প্রশ্নের একটিই উত্তর। এবং তা হচ্ছে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। ওই প্রাবন্ধিক আরও বলেছেন ‘বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে শুধু কাগজে-কলমে বিএনপির প্রধান।’ তাঁর শঙ্কা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি বিএনপির স্বার্থের প্রাধান্য দিচ্ছেন না। তাঁর জ্ঞাতার্থে বিনীত নিবেদন—বেগম খালেদা জিয়া যে শুধু কাগজে-কলমে নন, বাস্তবিক পক্ষেই বিএনপির (এবং ১৮-দলীয় জোটেরও) প্রধান, তা কোনো প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। তা প্রভাতকালীন সূর্যোদয়ের মতোই অবিসংবাদিত সত্য। দলের স্বার্থ এবং জনগণের মঙ্গলচিন্তাই তাঁর সিদ্ধান্তের নিয়ামক।
ইনাম আহমদ চৌধুরী: উপদেষ্টা, বিএনপির চেয়ারপারসন।

ভারতে মৌলবাদের উত্থান

মৌলবাদ আবারও তার জঘন্য মাথা তোলা শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) খোলাখুলি জানিয়েছে যে তারা সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করবে। অন্যদিকে, উদারমনা জামায়াতে উলামা-ই-হিন্দ মুসলিম ভোটের কথা তুলেছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচন হয়তো রাজনৈতিক দলগুলোকে চাপে ফেলেছে। তারা চাইছে হিন্দু-মুসলিমের সহাবস্থানের পরিবেশ নষ্ট করে উভয় পক্ষের মেরুকরণ ঘটাতে। আরএসএসের কথাই প্রথমে আসুক। আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা বিজেপির কাজকর্ম নিয়ে অসন্তুষ্ট। আরএসএস মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে সামনে নিয়ে আসছে। এবং এ ব্যাপারে আরএসএস হয়তো বিজেপির মধ্যে অপেক্ষাকৃত উদারমনা হিসেবে পরিচিত এলকে আদভানি, সুষমা স্বরাজ ও অরুণ জেটলির ব্যাপারে ক্ষুব্ধ। রাজনীতিতে যোগ দিয়েই বিজেপি ভারত ভাগ হওয়ার পরের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার প্যাটেলকে সামনে নিয়ে আসছে। আরএসএস তাদের গঠনতন্ত্রে প্রতিশ্রুতি দিয়ে লিখেছিল যে তারা কখনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে না। মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর নিষিদ্ধ হয়েছিল দলটি। সে সময় রাজনীতিতে যোগ না দেওয়ার শর্তে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ওঠানো হয়।
গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের সঙ্গে আরএসএসের যোগাযোগ ছিল। সরদার প্যাটেল হিন্দুত্বপন্থী হিসেবে পরিচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন না যে গান্ধী হত্যার সঙ্গে আরএসএস জড়িত। ১৯৪৮ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে লেখা এক চিঠিতে তিনি এমন দাবিই করেছিলেন। তবে প্যাটেলের বিশ্বাস ছিল, গান্ধীর নিহত হওয়ার বাস্তবতা তৈরিতে আরএসএসের সহিংস কাজের ধরনের সম্পর্ক ছিল। সে সময়ের সংঘের প্রধান মাধব সদাশিব গোলওয়াকার দোষী সাব্যস্ত হননি। তার পরও সংঘকে সে সময় তাদের গঠনতন্ত্রে লিখতে হয়েছিল যে, তাদের মনে কোনো ‘রাজনীতি’ থাকবে না; তারা ‘সম্পূর্ণভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত’ থাকবে। এত কিছুর পর আরএসএসের বর্তমান প্রধান মোহান ভাগতের রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার সিদ্ধান্ত প্যাটেলের কাছে দেওয়া সেই পুরোনো প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ। তাহলেও ব্যাপারটা দেখার দায়িত্ব এখন নির্বাচন কমিশনের। কীভাবে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এক লাফে রাজনৈতিক বৃত্তে ঢুকে পড়ে? এমনকি আরএসএস যদি তাদের গঠনতন্ত্রও বদলায়, নিষিদ্ধকরণ প্রত্যাহারে দেওয়া মুচলেকাকে তাহলে তারা কীভাবে জায়েজ করবে? জামায়াতে উলামা-ই-হিন্দের প্রধান মাহমুদ মামদানির কথাই ধরা যাক, তিনি সেক্যুলার নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তাঁরা নরেন্দ্র মোদির জুজু দেখিয়ে মুসলিম ভোটারদের ভীত করা না হয়। তিনি বরং দাবি করেছেন, যাতে দলগুলো যার যার আমলে পালিত প্রতিশ্রুতি এবং ভবিষ্যতে কী তারা করবে, তার ইশতেহারের ভিত্তিতে ভোট চায়। মাদানি যা বলেছেন তার সবকিছুর সঙ্গেই আমি একমত।
তবে ‘মুসলিম ভোট’ কথাটা ব্যবহার নিয়ে কথা আছে। হিন্দু বা মুসলিম ভোট বলে কিছু নেই, সবই ভারতীয় ভোট। এক সম্প্রদায়ের জন্য যা ভালো, তা অন্য সম্প্রদায়ের জন্যও ভালো। মুসলিমদের আলাদা করে চিহ্নিত করা হলো সেটাই, যা আরএসএস হিন্দুদের বেলায় করে। কংগ্রেস বলেছে, ‘আমরা কোনো ব্যক্তিকে মাথায় রেখে আমাদের কৌশল ঠিক করিনি। আমাদের কৌশল আমাদের দলের নীতি ও কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত।’ কিন্তু কার্যত কংগ্রেস মোদিকে আলাদাভাবে আক্রমণ করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে কংগ্রেস উন্নয়নের মতো সারবত্তাসম্পন্ন কোনো ইস্যুকে সামনে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং তারা মোদির হাতেই খেলছে। আর মোদিও দারুণভাবে ২০১৪-এর নির্বাচনকে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে ফেলতে পেরেছেন। পাশাপাশি, নিজের হিন্দু মৌলবাদী চেহারা ঢাকতে আশ্রয় নিয়েছে উন্নয়নের বুলির। কংগ্রেসের দুর্বলতা হলো তাদের দুর্বল শাসন এবং মেয়াদ ফুরানোর সময়কার সমালোচনা। আমি চেয়েছিলাম যাতে আগাম নির্বাচন হয় এবং যাতে করে নতুন সরকার দীর্ঘ মেয়াদে দেশের জন্য কোনো কর্মসূচি হাতে নিতে পারে। কিন্তু এখন থেকে নির্বাচনে আগের ছয় মাসে আসলে তেমন কিছুই করা যাবে না। এদিকে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ। তবে সবচেয়ে খারাপ কাজটি অযোধ্যায় করছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজেপি। তারা বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং হাজারো মুসলিমকে হত্যার জন্য দায়ী।
তারা এবারও সে রকম পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য রথযাত্রার পরিকল্পনা করেছিল, যা কেন্দ্রীয় সরকার সঠিকভাবেই বাতিল করে দিয়েছে। আমি চেয়েছিলাম, এই দুটি দল দলিতদের অধিকারের জন্য কাজ করুক। কিন্তু তাদের মনে সেই চিন্তা আছে বলে মনে হয় না। দলিতরা এমনকি আদালতের কাছেও কোনো সুবিচার পায় না। সম্প্রতি বিহারের ভূমিহারে ভূমিহার সম্প্রদায়ের লোকেরা ২৭ জন নারী, ১০ শিশুসহ ৫৮ জন দলিতকে হত্যা করেছে। উচ্চবর্ণের বিচারক অভিযুক্ত ১৬ জনকেই কোনো প্রমাণ না থাকার কথা বলে মুক্তি দিয়ে দিয়েছেন। এটা ন্যায়বিচারের পরিহাস। অথচ নিম্ন আদালত এই অভিযুক্ত ১৬ জনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। উচ্চ আদালতের বিচারক যদি পর্যাপ্ত প্রমাণ না পেয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর উচিত ছিল বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করা। এই দলের কাজ করার কথা উচ্চ আদালতের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে নতুন করে তদন্ত করা। তা না করে বিচারক রায়ে বলেছেন, দলিতরা তাদের চৌদ্দ পুরুষের আবাসস্থল ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। অর্থাৎ কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি! ভূমিহারের লক্ষ্মণপুরে দলিতদের যে অবস্থা, সেই একই অবস্থা সারা দেশে। আইনের সমানাধিকারের যে বুলি সংবিধানে মহিমান্বিত হয়ে আছে, তা আসলে এক পরিহাস।
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

নথি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব

[আমেরিকার আন্তর্জাতিক আর্কিভিস্ট ট্রুডি হাসকাম্প পিটারসন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আমন্ত্রণে অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি জাতীয় জাদুঘরে আর্কাইভস ও নথি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তিন দিনের ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেন। বর্তমানে তিনি আইসিআইয়ের হিউম্যান রাইটস ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ারপারসন। ট্রুডি যুদ্ধাপরাধের বিচার, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়ের আর্কাইভস ও নথি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশে অবস্থানকালে তিনি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যে নথি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং বিচার শেষে এসব নথির ভবিষ্যৎ বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশ করেছেন। রচনাটি তিনি প্রথম আলোর জন্য লিখেছেন।] ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। এই মাসে সিয়েরা লিওনের বিশেষ আদালতের আপিল প্যানেল ১৯৯১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সিয়েরা লিওনের যুদ্ধে লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরকে অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।
১৯৯০ সালে পেরুতে একজন অধ্যাপকের জবরদস্তি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় জেনারেল কার্লোস আলবার্তো পাজ ফিগুএরাওয়াকে একই সময়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এ ছাড়া ১৯৮৪ সালে গুয়াতেমালায় একজন ছাত্র ও শ্রমিকনেতাকে জোরপূর্বক নিখোঁজ করে দেওয়ার জন্য সাবেক জাতীয় পুলিশ-প্রধান হেক্টর বল দ্য লা ক্রুজকেও এই মাসে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। টেইলরকে ৫০ বছর, পাজ ফিগুএরাওয়াকে ১৫ বছর এবং বল দ্য লা ক্রুজকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ও অভিযুক্ত ব্যক্তির অ্যাটর্নিদের দ্বারা ব্যবহূত নথিপত্র এবং মামলা চলাকালীন আদালত কর্তৃক সৃষ্ট নথিপত্র উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেট ডয়লে, যিনি বল দ্য লা ক্রুজ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, লেখেন, ‘(গুয়াতেমালা জাতীয় পুলিশের) নথিগুলো রাষ্ট্রপক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ছিল।’ টেইলরের মামলায় নথিপত্র অনেক বেশি ছিল। এসব নথি লাইবেরিয়া, যেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং সিয়েরা লিওন, যেখানে তিনি অপরাধ সংঘটনে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন—উভয়কে ঐতিহাসিক তথ্য প্রদান করছে। অন্যদিকে পাজ ফিগুএরাওয়াকের বিরুদ্ধে মামলায় আদালতকে মৌখিক সাক্ষ্যের ওপর খুব বেশি নির্ভর করতে হয়েছিল।
জো-মারি বার্ট, যিনি পাজ ফিগুএরাওয়াকের মামলা সম্পর্কে অনেক লিখেছিলেন; তাঁর মতে, ‘সাধারণভাবে সামরিক বাহিনী গৃহযুদ্ধকালীন নথিপত্রের অস্তিত্ব নিয়মিতভাবে অস্বীকার করে আসছিল, যদিও রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগের সপক্ষে বেশ কিছু নথি সংগ্রহ করেছিল এবং বিবাদীরাও তাদের নির্দোষত্ব প্রমাণ করতে আদালতে নথি উপস্থাপন করেছিল।’ এ কারণে অর্থাৎ নথিপত্রের অভাবে মৌখিক সাক্ষ্য বিচারিক তথ্যপ্রমাণের অংশ হয়ে পড়ছে এবং ভবিষ্যৎ মামলাসমূহে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একটি ঘটনা যেটি এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো থেকে অনেক কম গুরুত্ব পেয়েছে, সেটি হলো জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সেপ্টেম্বর অধিবেশনে পাবলো দ্য গ্রিফের প্রতিবেদন। পাবলো দ্য গ্রিফ জাতিসংঘের সত্য, ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনরাবৃত্তি-সম্পর্কিত বিশেষ প্রতিবেদক। তিনি লিখেছেন যে, সফল ট্রুথ কমিশন ‘ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সত্য পক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, নাগরিকের আস্থাকে লালন করে এবং আইনের শাসন জোরদার করতে ভূমিকা রাখে।’ তিনি বিশেষভাবে আর্কিভিস্টদের উদ্দেশে ট্রুথ কমিশন দ্বারা ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় নথি ও ট্রুথ কমিশনের সৃষ্ট নথির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার শর্ত মেনে ট্রুথ কমিশন এবং জাতীয় আর্কাইভস সত্য জানার অধিকার এবং আরও অনেক বিচারিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। আর্কাইভিংয়ে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে নথির অংশবিশেষ গোপন রাখা সম্ভব—এই কৌশলটি এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের উপযুক্ত নিয়মগুলো প্রয়োগ করতে হবে। বিশেষ প্রতিবেদক আর্কাইভিংয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অর্জনের কথা বলেন এবং এ ধরনের উদ্যোগকে জোরালোভাবে সমর্থন দেন। বিশেষ প্রতিবেদকের নির্দেশনা ট্রুথ কমিশনের পরিধিকেও ছাড়িয়ে যায় এবং দ্য গ্রিফ জোর দেন যে, ‘সত্য একক বা যৌথভাবে ন্যায়বিচার,
ক্ষতিপূরণ এবং পুনরাবৃত্তি রোধের নিশ্চয়তার বিকল্প হতে পারে না।’ এ বিষয়ে মেনে চলার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বাধানিষেধ রয়েছে, যা বাস্তব, নৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে তা বাস্তবায়নে বাধ্য করে। উপরন্তু বিশ্বাসযোগ্য বাস্তব প্রমাণ বিচারিক আদর্শ হিসেবে সর্বোত্তম ফলদায়ক হবে, যদি তা বিচ্ছিন্নভাবে প্রয়োগ না করে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা ও কার্যকর করা হয়। এসব বিষয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টেইলরের বিচার এবং জাতীয় পর্যায়ে পেরু ও গুয়াতেমালার বিচারের দিকে পুনরায় আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সাধারণভাবে বিবাদী অ্যাটর্নির নথিপত্র হয় ব্যক্তিগত উপাদান আর সরকারপক্ষ এবং আদালতের নথিপত্র হয় সরকারি নথিপত্র। এগুলো দেশ এবং আন্তর্জাতিক বিচারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এসব দলিল সংরক্ষণ করা দেশের অন্যতম প্রধান আর্কাইভাল দায়িত্ব। এটি বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং এ জন্য যে মামলার একটি অংশ উন্মুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হয় না। সেপ্টেম্বর মাসে মানবাধিকারের সামগ্রিক লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক মানবকল্যাণের বিচ্যুতি নিয়ে তিনটি আদালতে যথোপযুক্ত রায় হয়েছে। এখন আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, যেন বিষয়টি এখানেই সীমিত না থাকে এবং সামনের মাসগুলোতে সিয়েরা লিওনের বিশেষ আদালত বা পেরু ও গুয়াতেমালার বিচারব্যবস্থাকে ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের সব কটি আদালতে দ্রুত এবং পেশাগতভাবে আর্কাইভাল ব্যবস্থাপনার সাহায্য নিয়ে নথিপত্র উপস্থাপন করা হয়।
ট্রুডি পিটারসন: আন্তর্জাতিক আর্কিভিস্ট, যুদ্ধাপরাধের বিচার, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়ের আর্কাইভস ও নথি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ।