Saturday, July 19, 2025
আল মাহমুদের কাব্যচিন্তা ও গ্রামে প্রত্যাবর্তনের অর্থবহতা by সুহৃদ সাদিক
আল মাহমুদের সময়কাল ছিল এক গভীর সংকটের সময়-স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে একদিকে রাজনৈতিক দিশাহীনতা। অন্যদিকে ছিল সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ তথা ইউরোপকেন্দ্রিক কিংবা কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিকতার প্রাবল্য। তিরিশের কবিদের নাগরিকতা ও ইউরোপীয় নিঃসঙ্গতাবাদকে অনুসরণ করে বাংলা কাব্যে যে ভঙ্গুর, আত্মবিচ্ছিন্ন এবং নির্জীব নগরজীবনের অনুরণন তৈরি হয়েছিল, আল মাহমুদ তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জোরের সঙ্গেই। শহুরে নাগরিকতার বিপরীতে তিনি ‘গ্রামে ফেরা’-এই কাব্যিক অভিপ্রায়কে রচনা করেছেন এক সাংস্কৃতিক আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রকল্প হিসেবে। তার ভাষায়: “আমি আমার কবিতায় প্রথম থেকেই গ্রামকে উত্থাপন করতে চেয়েছি... গ্রামকেই প্রাধান্য দিয়েছি; কারণ যাকে বলে ধনতান্ত্রিক নাগরিক জীবন... আমি তেমন পরিবেশে বেড়ে উঠিনি।” এই বক্তব্য কেবল জীবনবোধের ভিন্নতা নয়, এটি মূলত ঔপনিবেশিক আধুনিকতার একচেটিয়া সাংস্কৃতিক প্রতিমূর্তি বা মেট্রোপলিটন মডেলের প্রতিবাদী প্রকল্পও বটে। আল মাহমুদের কবিতায় গ্রাম কেবল একটি ‘স্থান’ নয়, এটি একটি ‘ঐতিহাসিক চেতনার ক্ষেত্র’ যেখানে লুকিয়ে আছে জাতির আত্মপরিচয়, লোকজ স্মৃতি, নৈতিক চর্চা, প্রেম, দ্বন্দ্ব এবং শৌর্যের উপাখ্যান। তিনি আধুনিকতার বয়ানে বিস্মৃত ‘সাবঅল্টার্ন’ গ্রামীণ জীবন ও লোকায়ত ঐতিহ্যকে দৃশ্যমান করে তোলেন। ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত নাগরিক শ্রেণির দৃষ্টিতে যা ‘আধুনিকতার অন্তরায়’, আল মাহমুদের কাছে তা ‘ঐতিহ্যগত শক্তি’। তার কবিতায় দেখা যায়: “কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী... কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিংবা নাড়ার দহন।” এই কবিতার চিত্রকল্পগুলো সাংস্কৃতিক আত্মোন্মোচনের গূঢ় কৌশল। এখানে কবি একটি বিকল্প জগৎ রচনা করছেন যা আধুনিক, পুঁজিবাদী ও শহুরে সংস্কৃতির বিরুদ্ধ ধারায় প্রবাহিত। ঔপনিবেশিক শক্তি কেবল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নয়, তা সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিকেও সচেষ্ট থাকে। তারা স্থানিক সংস্কৃতিকে ‘লোকাচার’ বা ‘প্রাক-আধুনিক’ আখ্যা দিয়ে পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষানীতি ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক জীবনবোধ চাপিয়ে দেয়। আল মাহমুদের কবিতায় এই প্রক্রিয়ার বিপরীতে প্রবল আপত্তি পাওয়া যায়। ‘খড়ের গম্বুজ’ কিংবা ‘পলাতক’ কবিতায় তিনি দেখান নগরজীবনের অন্তঃসারশূন্যতা এবং তার কদর্যতা-যা গ্রামীণ আত্মপরিচয়ের বিপরীত।
নগরের ‘নিভাঁজ পোশাক’, ‘সেলাই’, ‘কঠিন প্যান্ট’ ইত্যাদি কবিতার চিত্রকল্পের পরতে পরতে আধুনিকতা ও ঔপনিবেশিক জীবনচর্চার কৃত্রিমতা এবং দাসত্বপ্রবণতা স্পষ্ট। আল মাহমুদের ‘প্রত্যাবর্তন’ নিছক বাস্তব ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়; এটি আধুনিকতা ও ঔপনিবেশিক বিশ্বদৃষ্টির একটি কাব্যিক পাল্টা আঘাত। ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ কবিতায় দেখা যায় গ্রামে ফেরার জন্য কবি মোটেই লজ্জিত নন; বরং নাগরিক কৃত্রিমতা ত্যাগ করে নিজ শেকড়ে ফিরে যাওয়ার জন্য তিনি আনন্দিত। তিনি লেখেন: “আমার প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে ঘষে ঘষে তুলে ফেলবো।”এই পঙ্ক্তিটি সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে আত্মমুক্তির প্রতীক। এই ‘ফেরার ইচ্ছা’ উপনিবেশবাদবিরোধী লেখকদের এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যেখানে তারা পশ্চিমা আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির পরিবর্তে নিজেদের ভাষা, মাটি ও ঐতিহ্যে আত্মপরিচয় নির্মাণ করতে সচেষ্ট হন।
আল মাহমুদের কবিতায় ‘গ্রাম’ একটি সক্রিয়, প্রতিরোধী, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কাঠামো। তিনি বলেন: “গ্রাম বলতে আমি যূথবদ্ধ আদিম মানবজীবনকে বুঝি না... ধনতান্ত্রিক নগরসভ্যতার বিরুদ্ধে গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেছেন... তারা আসলে গ্রামেরই লোক।” এখানে গ্রাম প্রতিরোধের প্রতীক, এক বিপ্লবী চেতনার ঘাঁটি। এটি গভীরভাবে উপনিবেশায়নবাদী অবস্থান। ইউরোপকেন্দ্রিক বয়ানে ‘গ্রাম’ যে পশ্চাৎপদতা বা অনুন্নয়নের প্রতীক, আল মাহমুদ তা প্রত্যাখ্যান করে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার অবস্থান পুনর্গঠন করেন। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সাংস্কৃতিক অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ স্থাপন করে থাকে-যেখানে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ‘নগর’-কে প্রাধান্য দেয়, আর ‘গ্রাম’-কে প্রান্তিক করে তোলে। আল মাহমুদ তার কবিতায় এই সাংস্কৃতিক উপনিবেশের বিরুদ্ধে জাতিগত আত্মপরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে ‘গ্রাম’, ‘লোকজ সংস্কৃতি’, ‘ভাষা’ এবং ‘ঐতিহ্য’-কে পুনঃস্থাপন করেন। তার কবিতা ‘স্বপ্নের সানুদেশে’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক স্বপ্নরাজ্য নির্মাণ করে যেখানে নগরের স্থানে গ্রাম উঠে আসে: “স্বপ্নের সানুদেশে আমরা শস্যের বীজ ছড়িয়ে দেবো...”এটি রূপক মাত্র নয়, এটি কবির সংস্কৃতিচেতনার রাজনৈতিক রূপায়ণ।
আল মাহমুদের কবিতায় গ্রামে প্রত্যাবর্তনের আকুতি নস্টালজিক রোমান্টিসিজমের প্রকাশ না হয়ে একটি সুগভীর ঔপনিবেশিক কাব্যচেতনার বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছে। তিনি ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ছাঁচে কবিতা লেখেননি, বরং গ্রামীণ লোকজীবনের ভাষা, ছন্দ, অনুভব ও বাস্তবতার ভেতর থেকে নির্মাণ করেছেন নিজের কাব্যভাষা-যা নগরভিত্তিক আধুনিকতার কৃত্রিমতা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তার কবিতায় ‘গ্রাম’ শুধুমাত্র ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি আত্মপরিচয়ের এক শক্তিশালী অনুঘটক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ক্ষেত্র। এই লোকজ-গ্রামীণ সংস্কৃতিই তার কবিতায় হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক। ফলে আল মাহমুদের কবিকণ্ঠ হয়ে উঠেছে উপনিবেশোত্তর বাংলার সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদবিরোধী সাহিত্যধারার এক বলিষ্ঠ ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। জীবনানন্দের প্রতীকী নিঃসঙ্গতা বা জসীমউদ্দীন লোকগাথার নান্দনিক অভিব্যক্তিকে ছাড়িয়ে আল মাহমুদ গ্রামকে দেখেছেন প্রতিরোধ, সংগ্রাম ও পুনর্নির্মাণের সম্ভাবনায়। এই ভাবনাই তাকে আধুনিক বাংলা কবিতায় ‘লোকায়ত রাজনৈতিক কবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে তার কবিতা হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক মুক্তির জ্বলন্ত ও ভারবাহী ভাষ্য।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Saturday, February 15, 2025
আল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘আমি একজন কবি ছাড়া এক সুতোও ওপরে কিছু নই’ by সালেহ উদ্দিন আহমদ
১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সাল। আল মাহমুদ মারা গেলেন। আমি তখন ঢাকায়। চোখ রাখলাম পত্রিকার পাতায়, কে কী লিখলেন এবং কে কী শোকবার্তা দিলেন। না, কেউ তেমন কিছু করলেন না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি—কারও কোনো বাণী দেখলাম না।
তখন ঢাকায় একুশের বইমেলা চলছিল। বইমেলায় গেলাম। সেখানেও আনুষ্ঠানিকভাবে আল মাহমুদের জন্য তেমনভাবে কোনো শোক প্রকাশ চোখে পড়ল না। একটা জায়গায় প্যান্ডেল টানিয়ে সভা হচ্ছে। গিয়ে দেখলাম, একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনদর্শন নিয়ে কেউ একটা বই লিখেছেন, তারই মহরত। আল মাহমুদের একটা ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন’ কিনে ফিরে এলাম। ভাবলাম, আমি আর কী করতে পারি? রাতে বাড়িতে এসে আনাড়ি হাতে একটা কবিতা লিখলাম। তারপর আল মাহমুদের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সংকলন খুলে বসলাম। একজন কবিকে শ্রদ্ধাতে তাঁর কবিতা পড়া ছাড়া উপায় কী!
আল মাহমুদ মনে করতেন, কবিতাঙ্গনে তাঁর কাজের জন্য তিনি যথেষ্ট স্বীকৃতি পাননি। তিনি তাঁর কবিতাতেই এ নিয়ে অভিযোগ করে গেছেন:
‘ধৈর্য ধরে থেকেছি বহুকাল
খাতির ধাপে উঠল বুঝি পা,
ভিতর থেকে বিমুখ মহাকাল
বলল, নারে, এখনো নয়, না।’
—‘ধৈর্য’: আল মাহমুদ
আল মাহমুদের কবিতার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় সমকাল–এর সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে। তখন আমি ঢাকা কলেজে পড়ি। নিয়মমাফিক যেতাম নিউমার্কেটের নলেজ হোম নামের বইয়ের দোকানে বইয়ের চেয়ে পত্র–পত্রিকার আকর্ষণে। ছোট– বড় সব পত্রিকাই রাখতেন এ দোকানের স্বত্বাধিকারী মজলিশ সাহেব। যাঁরা তাঁর দোকানে যেতেন, কেনাকাটার চেয়ে ঘাঁটাঘাঁটিই করতেন বেশি, কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ পড়তেন, যেন এদিনের ‘ব্যারনস অ্যান্ড নোবলেস’। মজলিশ সাহেব কখনো বাধা দিতেন না, পুনরায় ম্যাগাজিনগুলো ঠিকঠাক করে রাখতেন।
আমার বড় আকর্ষণ ছিল সিকান্দর আবু জাফরের সম্পাদনায় সাহিত্য পত্রিকা সমকাল। তখন প্রতি মাসেই নিয়মিত বের হতো, ঝকঝকে প্রচ্ছদ, তিন পাশে আধা ইঞ্চি বাড়তি মলাট ভেতরের লেখাগুলোর লজ্জা ঢেকে রাখত, খুললেই নতুন কাগজের গন্ধ অদ্ভুত অনুভূতি জাগাত। পত্রিকাটি একজন কবির অনেকগুলো কবিতা একই সংখ্যায় প্রকাশ করে কবিকে নিবিড়ভাবে পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করে দিত। সিকান্দর আবু জাফরের কথা বলতে গেলে আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। তাই তাঁকে নিয়ে আলোচনা অন্য সময়ের জন্য সরিয়ে রাখলাম। তো সেদিন সমকাল খুলে আল মাহমুদের কবিতাগুলো পড়লাম, একবার–দুইবার নয়, অনেকবার। পরিচয় হলো আমার অপরিচিত এক কবির সঙ্গে। সেই থেকে আল মাহমুদ হয়ে গেলেন আমার প্রিয় কবি এবং আরও অনেকের প্রিয় কবি। বাংলাদেশের শীর্ষ এক কবি।
কবিতা ও প্রেমের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেননি তিনি।
‘আধুনিক কবিতা বলতে আপনি কী বোঝেন?
আমি বলি, সে তো লালমাটিয়া মহিলা কলেজে
এখন মেয়েদের বাংলা পড়ায় আর পরীক্ষার খাতা দেখে
নিজের নৈসঙ্গ যাপন করছে।’
—‘আধুনিক কবিতা’: আল মাহমুদ
আল মাহমুদ বেঁচে থাকতেই বাংলাদেশে হাজারবার প্রশ্ন উঠেছে, ‘সোনালি কাবিন’–এর এই কবি কি রাজনীতি করতেন? তিনি কি জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন? তিনি কি ইসলামিক রাজনীতির সপক্ষে কাজ করেছিলেন? তিনি কি টাকা নিয়ে ফরমায়েশি লেখা লিখতেন? এসব প্রশ্ন যাঁরা করতেন, তাঁদের বলা যায়, আপনারা কি কখনো এ প্রশ্নও করেছিলেন, আল মাহমুদ অনেক ভালো কবিতা লিখতেন কি না?
একজন কবির পোশাকের কোনো দাম নেই। তিনি চে গুয়েভারার পোশাক পরলেই বিপ্লবী বনে যাবেন না, কিংবা আচকান টুপি পরলেই যে তিনি ধর্মে ঝুঁকবেন, এমনও নয়। তিনি জামা বদলাবেন, মত বদলাবেন, মোদ্দাকথা তিনি তাঁর অধিকার চর্চা করবেন। কিন্তু তিনি তাঁর কবিতা বদলাবেন না। আপনি কি দেখেছেন, ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যগ্রন্থের কবিতার দ্বিতীয় সংস্করণ? হ্যাঁ, এই বইয়ের সংস্করণ হয়েছে, কিন্তু কবিতার নয়।
একজন কবির কাছে জীবনটাই একরকম এক্সপেরিমেন্ট। যেমন একটা গাছ তার পাতার রং বদলায় বারবার আপন সৌন্দর্য ছড়াতে, আবার কখনোবা নিজের বাঁচার প্রয়োজনে; কিন্তু গাছটা শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে নিজের শিকড় আঁকড়ে। কবি আল মাহমুদও তেমন।
আল মাহমুদ চিরদিনই থাকবেন প্রেম, সুন্দর ও আনন্দের কবি হিসেবে। তিনি কবিতা লিখেছেন ইসলামের নবী (সা.)–কে নিয়ে, মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে লিখেছেন ‘ভাসানী স্মৃতি’, লিখেছেন ‘কৃষ্ণকীর্তন’। কিন্তু আধুনিকতাই তাঁর কবিতার মূল প্রতিপাদ্য।
মুক্তিযুদ্ধের পরপর ১৯৭২ সালে কয়েকজন যুবক কবিকে বের করে এনেছিল পত্রিকার বেজমেন্ট থেকে, হয়তোবা নিজেদের প্রয়োজনে। আল মাহমুদকে যখন জসদের গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক বানানো হলো, তিনি মনের আনন্দে ফিদেল কাস্ত্রোর পোশাকে ঘুরে বেড়াতেন। সবাই বলতেন, তিনি বিপ্লবী হয়ে গেছেন। সম্ভবত গণকণ্ঠ পত্রিকায় যোগ দেওয়ার পর তিনি রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। সমাজতন্ত্র, মার্ক্সবাদ, কমিউনিজম, ইসলামি রাজনীতি, বুর্জোয়া গণতন্ত্র—এসব নিয়ে নানা সময়ে তিনি বিভিন্ন কথা বলেছেন। খুব গভীর চিন্তা থেকে রাজনীতি নিয়ে কথাবার্তা বলেছেন, সব সময় এমন না–ও হতে পারে। তিনি তো নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি অত রাজনীতি–সচতেন নই।’ তবে পরিতাপের বিষয় হলো, তাঁকে নিয়ে ‘রাজনীতি’ করার জন্যই অনেকে এ কবির কথাবার্তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
চিরদিন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন আল মাহমুদ। নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘খুব দুঃখপূর্ণ জীবন। একটা দরিদ্র লোকের জীবন যেমন হয়।’ শেষ বয়েসে তিনি হয়তো চেয়েছিলেন একটা সুন্দর ছোট্ট ঘর, যেখানে ভোরের রোদ উষ্ণতা ছড়াবে আর বসন্তের বাতাস হাওয়া দেবে। আরও থাকবে একটা টেবিল ও চেয়ার। এখানে বসে তিনি কবিতা লিখবেন। এ জন্য তাঁকে অনেক প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল। একজন কবিকে কে লালন করবে? কবিতা লিখে একজন কবি কি বেজমেন্ট থেকে খোলা ছাদে উঠতে পারবেন? রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’ কবিতায় দেখেছি কবির স্ত্রীর বিড়ম্বনা:
‘রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়ো,
রচিতেছ বসি পুঁথি বড়ো বড়ো,
মাথার উপরে বাড়ি পড়ো-পড়ো,
তার খোঁজ রাখো কি!’
সাহিত্যিক রাজু আলাউদ্দিন ২০১৩ সালের এক সাক্ষাৎকারে খুবই ভদ্রভাবে অনেক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন আল মাহমুদকে। আল মাহমুদ কোনোটার উত্তর দিয়েছেন, কোনো কোনোটাতে ছিলেন খুব আত্মরক্ষামূলক, আবার কোনোটাতে বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন না করাই ভালো…।’ সত্যি তো, কী আর বলবেন তিনি? রাজু তো তাঁকে আধুনিক কবিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেননি। বলার বিষয় হলো, এসব আবার নিজের কবিতাতেও এনেছিলেন পঞ্চাশের দশকের এই শক্তিমান কবি:
‘প্রশ্নকারীরা আজকাল আমাকে খুব উত্ত্যক্ত করে মারে।
ভদ্রতার খ্যাতির আমি তাদের সব প্রশ্নের জবাব দিতে থাকি।
আধুনিক কবিতা বলতে আপনি কী বোঝেন?’
—‘আধুনিক কবিতা’: আল মাহমুদ
অথবা তিনি কি সেই ‘সোনালি কাবিন’–এর মধ্যে তো দিয়ে গেছেন সব প্রশ্নের উত্তর:
‘আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনোকালে সঞ্চয় করিনি
আহত বিক্ষত করে চারিদিকে চতুর ভ্রুকুটি।’
আল মাহমুদকে কেউ কেউ দুই ভাগ করেছেন, যেমন তাঁর ১৯৭০ পর্যন্ত কবিতাগুলো তাঁরা স্বীকার করেন, পরেরগুলো নয়। তবে আমার মতে, কবিতা হলো কবিতাই, কবিতার সঙ্গে ভাব ও মতের লেবেল লাগিয়ে তা স্বীকার-অস্বীকারের বিষয় নয়। প্রথমত কবিতা হলো ভালো লাগার, ভালোবাসার। সচরাচর রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা আমরা খুলি না, যেগুলো ভালো লাগে, সেগুলোই বারবার পড়ি। কমিউনিস্ট না হয়েও অনেকে নাজিম হিকমত আর সুকান্তের কবিতা পড়েন। কেন? ওই যে ভালো লাগার খাতিরে।
রাজু আলাউদ্দিনের নেওয়া সাক্ষাৎকারটিতে আল মাহমুদ নিজেই বলেছেন, ‘আমি একজন কবি ছাড়া এক সুতোও ওপরে কিছু নই।’
আল মাহমুদ সম্বন্ধে এটাই শেষ কথা। আজ তাঁর প্রায়াণদিবসে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
![]() |
| কবি আল মাহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬—১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) ছবি: নাসির আলী মামুন |
Wednesday, July 12, 2023
আল মাহমুদ যেভাবে ‘আমাদের’ by আলতাফ শাহনেওয়াজ
সারা দিন চলে গেল...সারাটা দিন। কাল আমার খুব উচাটন লেগেছে দিনভর। সারা দিন নেট ঘেঁটে ঘেঁটে তাঁর অনেক কবিতা পড়লাম। শতবার পড়া কবিতা, তবু পড়লাম, ‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুল খোলা আয়েশা আক্তার.... ’—এসব পড়তে পড়তে কত স্মৃতি যে মনে পড়ল! ফিরে দেখলাম, নিজের জীবন।
নিজের কথা বলতে গিয়ে এ লেখার শিরোনামে ‘আমাদের’ শব্দটি ব্যবহার করা হলো কেন? এমনটা কেউ ভাবতেই পারেন। এ প্রশ্নও তুলতে পারেন যে ‘আমাদের’–এর মতো সাধারণ শব্দকে এখানে উদ্ধৃতিচিহ্নের মোড়কে বিশেষায়িত করার কারণ কী! তা–ও আবার কবি আল মাহমুদ প্রসঙ্গে। তিনি যে আমাদের—অর্থাৎ বাংলাদেশের সবার, তা নিয়ে তো সন্দেহ নেই। তবে শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো, ‘আমাদের’ শব্দটি এতে সচেতনভাবে বিশেষ অর্থেই বসানো হয়েছে।
আমিত্বের মধ্যে লীলা করতে করতে কবি সাধারণত নিজের আনন্দেই কাব্য লেখেন। কিন্তু কোনো কোনো কবি জনসংস্কৃতির নাড়ির মধ্যে প্রবেশ করে মানুষের দৈনন্দিকতাকে, একেক মানুষের অনুভূতিকে আলাদা আলাদাভাবে স্পর্শ করেন। তখনই তাঁকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করার দায় থাকে। আর এ সময়ই পাঠকের মনে হয়, আশ্চর্য, এখানে তো আমার মুখই দেখা যাচ্ছে! কালে কালে এভাবেই ‘আমার’ থেকে ধীরে ধীরে ‘আমাদের’ হয়ে ওঠেন গুটিকতক কবি।
আল মাহমুদের কবিতা পড়তে গেলেই এসব মনে হয় আমার। শুধু আমার কেন, আরও কারও কি মনে হয় না? ‘সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণী/যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দুটি’—‘সোনালি কাবিন’–এর এই অমর পঙ্ক্তি চিরকুট হিসেবে প্রেমিকাকে পাঠিয়েছেন—বিভিন্ন প্রজন্মে এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। অথবা ওই একই সনেট–কাব্যের ‘আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,/পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ’—এই যুগল চরণকে স্লোগান করে, সাম্যবাদে আস্থা রেখে একদা কি অনেকে স্বপ্ন দেখেননি নতুন ভোরের!
গতকাল ১১ জুলাই আল মাহমুদের জন্মদিনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে তাঁর কবিতা ছড়িয়ে পড়ল, তা দেখে মনে পড়ল, এসব পঙ্ক্তির ছন্দ–অনুভব যেন আমার জীবনের মোহনায়ও মিলে গেছে, খোলা বইয়ের মতো প্রকাশ্য হয়ে উঠছে স্মৃতির পৃষ্ঠাগুলো।
কথাগুলো আমার ব্যক্তিজীবনের। তবু খুব কুণ্ঠিত চিত্তে এই ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণাই মেলে ধরা; তা এই আকাঙ্ক্ষায় যে সামষ্টিক যৌথ অনুভবে ব্যক্তিস্মৃতি কিছু যদি যোগ করে!
একজন মানুষ—আল মাহমুদ—বাংলা ভাষার এই একজন কবি—প্রথমবার যাঁর মুখোমুখি হয়ে আক্ষরিক অর্থেই আমি একদা কেঁপে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল, আমি সত্যিই আল মাহমুদের সামনে বসে আছি! আল মাহমুদ!
কেন জানি না, সব সময় আমি আল মাহমুদের মতোই হতে চেয়েছি। তাঁর কবিতা আমাকে আক্রান্ত করার ফলেই হয়তো। অথবা এমনও হতে পারে, মফস্সল থেকে ঢাকায় এসে তিনি যেভাবে যুদ্ধ করেছেন—সেই পঞ্চাশের দশক থেকে পরবর্তী অনেক দিন—বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সেসব পড়ে আমি ভেবেছি, আমিও তো মফস্সলের, আমাকেও এভাবে যুদ্ধ করতে হবে। যেতে হবে শহর ঢাকায়। কারণ, আমি তো কবিই হতে চাই। একজন মফস্সলবাসী কবিযশপ্রার্থীর অনুপ্রেরণা হিসেবে সে সময় আল মাহমুদই ছিলেন আমার একমাত্র আদর্শ—‘আইডল’।
গেল শতকের শেষ ভাগের শেষ বছর। মাধ্যমিক পাস করার পর কবিতা যখন আমাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে, তখন হঠাৎ মনে হলো, আরে, এত বিদ্যাশিক্ষা করে কী হবে! আল মাহমুদ ক্লাস এইট পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন, সেই তুলনায় আমি তো দুই ক্লাস বেশিই পড়ে ফেলেছি। এমন ভাবনা থেকে একাডেমিক লেখাপড়ার পাট সিঁকেয় উঠল আমার এবং ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে আমি বাড়িছাড়া হয়ে গেলাম। যদিও এখন বুঝতে পারি, কতটা ছেলেমানুষি ও শিশুতোষ ব্যাপার ছিল এসবের ভেতর। ‘...কেবলই আমার মধ্যে এক শিশু আর পশুর বিরোধ’—এ চরণ তো আল মাহমুদেরই। ‘শিশু আর পশুর বিরোধ’ নিয়ে শুরু থেকেই পথ চলছি। তাকে এড়ানোর সাধ্য কী আমাদের!
তাই হয়তো একসময় আমার মনে হতো, স্কুলজীবনে আল মাহমুদ যেভাবে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন (এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা আছে কবির ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ নামের আত্মজৈবনিক উপন্যাসে), আমিও চলে যাব সেভাবে। ঘর ছেড়ে বেরিয়েও পড়েছিলাম—নিজের জন্মশহর ঝিনাইদহ থেকে প্রথমে ফরিদপুর, তারপর ঢাকা—সেসব বেহিসেবের বোহেমিয়ান দিন ছিল বটে!
পরে ঢাকায় থিতু হওয়ার পর নানা কাজের সূত্রে অনেকবার গিয়েছি মগবাজারে, আল মাহমুদের বাসায়। যাওয়া–আসার ঘনঘটায় তত দিনে এই বয়োবৃদ্ধ লোক ‘মাহমুদ ভাই’ হয়ে উঠেছেন আমার কাছে। তাঁর সঙ্গে দেখা হলেই বলতেন, ‘সিগারেট এনেছ?’
আমি পকেট থেকে বের করে দিতাম একপ্যাকেট সোনালি বেনসন। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যেদিন তিনি মারা যান, এই ঘটনা তার মাস ছয়েক আগেও ঘটেছে।
মাহমুদ ভাইয়ের বাড়িতে যেতে আমার ভালো লাগত। কবির সঙ্গে তর্ক–বিতর্কও চালানো যেত দেদার। তাঁর অনেক কিছুর সঙ্গে আমি একমত পোষণ করিনি। তাতে অবশ্য মাহমুদ ভাইয়ের কবিতার আস্বাদ নেওয়া বা তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক—কোনোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। নিজের মত জারি রেখেই এই কবির সঙ্গে মেশা যেত, এ ছিল এক মস্ত সুবিধার ব্যাপার।
এখন আমার স্ত্রী যিনি—ফাতেমা আবেদীন নাজলা—মনে আছে, ২০১৩ সালে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম আল মাহমুদের বাসায়। আমার আর নাজলার মধ্যে তখন কেবল নিরেট বন্ধুত্ব, অন্য কোনো কিছু নয়। তো, ঘণ্টাখানেক কথাবার্তা শেষে কবি আমাদের বললেন, ‘তোমরা দুজন দুজনকে পছন্দ কর, না?’
নাজলার কথা জানি না। তবে আমি বেশ লজ্জা পেয়েছিলাম এ কথায়; এবং এ–ও অস্বীকার করব না যে তখনই আমার প্রথম মনে হয়েছিল, এই মেয়েকে কি আমি পছন্দ করি?
নিজের কাছে নিজের উত্তর ছিল, করি হয়তো।
নাজলার সঙ্গে ভাবনাচিন্তায় আমার অনেক অমিল। কিন্তু প্রথম থেকে একটা জায়গাতেই মিল প্রচণ্ড—সেটা হলো আল মাহমুদ। তিনি আল মাহমুদে অবসেসড, আমিও।
আল মাহমুদের অজস্র কবিতা—‘সোনালি কাবিন, ’ ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’, ‘বাতাসের ফেনা’ ‘খড়ের গম্বুজ’, ‘ফররুখের কবরে কালো শেয়াল’, ‘কবিতা এমন’—এসব পড়লে আমি আমার আম্মাকে দেখতে পাই, ফেলে আসা আমার বাড়িঘর দেখতে পাই, গ্রামকে দেখতে পাই, দেখতে পাই মফস্সলকে। সব মিলিয়ে ভূপ্রকৃতি, মানুষজনসমেত গোটা বাংলাদেশই তো হাজির আল মাহমুদের কবিতায়।
যদিও তিনি বলেছেন, ‘শহর ছাড়লে সুখ নাই। আসলে সুখ হলো শহরে’, তারপরও দেখাশোনা থেকেই এ কথা বলতে চাই যে কবিতা এবং নিজের জীবনাচরণেও আল মাহমুদ ছিলেন গ্রামজনপদের বাসিন্দা। গ্রামের মানুষ যেমন অতটা আদবকেতার ধার ধারে না, তাদের মধ্যে যেমন কুটিলতার পাশাপাশি নির্মল স্নিগ্ধ এক সরলতা বিরাজমান, মাহমুদ ভাইও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কখনো বা তাঁর ভেতরে শতভাগ খাঁটি গ্রাম্যতাও প্রত্যক্ষ করেছি। আর এই ‘গ্রাম্যতা’ এবং সারল্যের কারণেই বোধ করি, কবিতায় মুগ্ধ হওয়ার পরও শহুরে নাগরিক সমাজ তাঁকে অভিজাতরূপে গ্রহণ করতে অনীহা দেখিয়েছে, তাঁর সময়ের অন্য কবিদের তুলনায়।
মাহমুদ ভাইকে আমার ‘আলাদিনের গ্রামে’ সনেটগুচ্ছের কয়েকটি সনেট শোনাতে পেরেছিলাম। তখন তিনি ‘কানা মামুদ’, চোখে একেবারেই দেখেন না। তাই আমাকেই পড়তে বললেন। পড়লাম। আবারও পড়তে বললেন। পুনরায় পড়লাম। পড়া শেষে দেখি, কবির চোখে পানি। আমাকে শুধু বললেন, ‘ছন্দে তোমার হাত ভালো। তোমার কবিতায় বাংলাদেশ আছে।’
কেউ যখন কারও কবিতাকে ভালো বলে, তখন ওই কবিতারচয়িতার ভালো না লাগার কোনো কারণ নেই। স্বাভাবিকভাবেই কেউ আমার কবিতার প্রশংসা করলে আমারও ভালো লাগে। তবে সেই ২০১২ সালে মাহমুদ ভাই আমার কবিতা নিয়ে যা বলেছিলেন এবং তাতে আমি যতটা খুশি হয়েছিলাম, আর কোনো প্রশংসায় এত আনন্দিত হইনি।
পারি বা না পারি, হোক বা না হোক, সব সময় আমি বাংলাদেশের কবিতাই লিখতে চেয়েছি। আর এ ক্ষেত্রে আবারও অনুপ্রেরণা ওই আল মাহমুদই!
আমার মতো অসংখ্য তরুণ কবিকে স্বপ্ন দেখিয়ে, লড়াইয়ের ময়দানে ঠেলে দিয়ে তিনি কেবল পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের নয়, ‘আমাদের’ হয়ে উঠেছেন।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে কাল সকাল থেকে গুগল খুঁটে খুঁটে তাই আল মাহমুদেরই কবিতা পড়ছি, ‘ভোলো না কেন ভুলতে পারো যদি/চাঁদের সাথে হাঁটার রাতগুলি/নিয়াজ মাঠে শিশির-লাগা ঘাস/পকেটে কার ঠান্ডা অঙ্গুলি।’
‘খড়ের গম্বুজ’–এর কবির লিখে যাওয়া ঠান্ডা আঙুলই কি আনমনে বারবার বলছে:
‘কে যেন ডাকল তাকে; সস্নেহে বলল, বসে যাও,
লজ্জার কী আছে বাপু, তুমি তো গাঁয়েরই ছেলে বটে,
আমাদেরই লোক তুমি। তোমার বাপের
মারফতির টান শুনে বাতাস বেহুঁশ হয়ে যেত।
পুরোনো সে কথা উঠলে এখনো দহলিজে
সমস্ত গায়ের লোক নরম নীরব হয়ে শোনে।
সোনালি খড়ের স্তুপে বসতে গিয়ে প্রত্যাগত পুরুষ সেজন
কী মুশকিল দেখল যে নগরের নিভাঁজ পোশাক
খামচে ধরেছে হাঁটু। উরতের পেশি থেকে সোজা
অত দূর কোমর অবধি
সম্পূর্ণ যুবক যেন বন্দী হয়ে আছে এক নির্মম সেলাইয়ে।’
নাগরিক পোশাকে বন্দী হয়ে ‘গ্রামীণ’ আল মাহমুদের একটার পর একটা কবিতা পড়ে চলেছি আর এসব কবিতার পঙ্ক্তির দোলায় স্মৃতিরা ঘিরে ধরছে আমায়। সবাই দেখছে, অফিসের কাচঘেরা ঘরে বসে আছি আমি। কিন্তু আমি জানি, ততক্ষণে আমি চলে গিয়েছি ঝিনাইদহের সিটি কলেজ মাঠে অথবা পোড়াদাহ রেলস্টেশনে, কখনো বা শ্মশানঘাটে। ফরিদপুরের আলিপুরেও কি বসে ছিলাম না?
এখনো যখন ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ কবিতাটা পড়ি, এবং ওই জায়গাটা পড়ি, ‘আসার সময় আব্বা তাড়া দিয়েছিলেন, গোছাতে গোছাতেই তোর সময় বয়ে যাবে, তুই আবার গাড়ি পাবি।/আম্মা বলেছিলেন, আজ রাত নাহয় বই নিয়েই বসে থাক,/কত রাত তো অমনি থাকিস।’ লাইনগুলো পড়ি আর আম্মাকে মনে পড়ে আমার। আব্বার চোখটা ভাসে।
এখনো যখন বাড়ি থেকে ঢাকায় ফিরে আসি, তার আগের দিন, আম্মা আমাকে বলেন, ‘আরেকটা দিন থেকে যা, বই–টই পড়।’ আর আব্বা বলেন সেই কথা—গ্রামের, লোকেরা যা বলে!
এই মওকায় চলুন ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ কবিতাটিতে আবার চোখ ফেরানো যাক। আল মাহমুদের সামনে কেউ এই কবিতা পড়লে মাহমুদ ভাই হাউমাউ করে কাঁদতেন। সে এক মর্মান্তিক দৃশ্য বটে, মনোহরও।
প্রত্যাবর্তনের লজ্জা
আল মাহমুদ
শেষ ট্রেন ধরব বলে একরকম ছুটতে ছুটতে স্টেশনে পৌঁছে দেখি
নীলবর্ণ আলোর সংকেত। হতাশার মতন হঠাৎ
দারুণ হুইসেল দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।
যাদের সাথে শহরে যাবার কথা ছিল, তাদের উৎকণ্ঠিত মুখ
জানালায় উবুড় হয়ে আমাকে দেখছে। হাত নেড়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
আসার সময় আব্বা তাড়া দিয়েছিলেন, গোছাতে গোছাতেই
তোর সময় বয়ে যাবে, তুই আবার গাড়ি পাবি।
আম্মা বলেছিলেন, আজ রাত নাহয় বই নিয়েই বসে থাক,
কত রাত তো অমনি থাকিস।
আমার ঘুম পেল। এক নিঃস্বপ্ন নিদ্রায় আমি নিহত হয়ে থাকলাম।
অথচ জাহানারা কোনো দিন ট্রেন ফেল করে না। ফরহাদ
আধঘণ্টা আগেই স্টেশনে পৌঁছে যায়। লাইলি
মালপত্র তুলে দিয়ে আগেই চাকরকে টিকিট কিনতে পাঠায়।
নাহার কোথাও যাওয়ার কথা থাকলে আনন্দে ভাত পর্যন্ত খেতে পারে না।
আর আমি এদের ভাই
সাত মাইল হেঁটে এসে শেষ রাতের গাড়ি হারিয়ে
এক অখ্যাত স্টেশনে কুয়াশায় কাঁপছি।
কুয়াশার সাদা পর্দা দোলাতে দোলাতে আবার আমি ঘরে ফিরব।
শিশিরে আমার পাজামা ভিজে যাবে। চোখের পাতায়
শীতের বিন্দু জমতে জমতে নির্লজ্জের মতন হঠাৎ
লাল সূর্য উঠে আসবে। পরাজিতের মতো আমার মুখের ওপর রোদ
নামলে, সামনে দেখব পরিচিত নদী। ছড়ানো–ছিটানো
ঘরবাড়ি, গ্রাম। জলার দিকে বকের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে। তারপর
দারুণ ভয়ের মতো ভেসে উঠবে আমাদের আটচালা।
কলার ছোট বাগান।
দীর্ঘ পাতাগুলো না না করে কাঁপছে। বৈঠকখানা থেকে আব্বা
একবার আমাকে দেখে নিয়ে মুখ নিচু করে পড়তে থাকবেন,
ফাবি আইয়ে আলা ই-রাব্বিকুমা তুকাজ্বিবান...।
বাসি বাসন হাতে আম্মা আমাকে দেখে হেসে ফেলবেন।
ভালোই হলো তোর ফিরে আসা। তুই না থাকলে
ঘরবাড়ি একেবারে কেমন শূন্য হয়ে যায়। হাত–মুখ
ধুয়ে আয়। নাশতা পাঠাই।
আর আমি মাকে জড়িয়ে ধরে আমার প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে
ঘষে ঘষে
তুলে ফেলব।
আদতে আল মাহমুদের কবিতা পড়লে আমি আমার কাছে, নিজের জীবনেই কাছেই ফিরি। বড় কবিদের কবিতা পড়লে এমন হয়, মনটা কেন জানি উচাটন হয়ে ওঠে।
মাহমুদ ভাই, প্রিয় কানা মামুদ, আপনাকে দেখতে কোনো একদিন ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় যাব চুপি চুপি। তবে ঢাকায় ফেরার সময় কি আর ট্রেন মিস করতে পারব, করা হবে?—হা জীবন!
![]() |
| আল মাহমুদ। ছবি: নাসির আলী মামুন |
Monday, February 10, 2020
আল মাহমুদের কবিতা : সত্তার ভারমুক্ততার ভাষ্য by মহীবুল আজিজ

দ্রম্নতধাবমান তরঙ্গ হয়ে ছুটতে থাকে কবিতা, অজস্র কবিতা – আল মাহমুদকে তাঁর প্রয়াণের পরে মনে করতেই কতকাল আগেকার সেসব কবিতা ভিড় করে। কবিতারা জ্বলে আর নেভে কিন্তু একেবারে নির্বাপিত হয় না। বরং কবিতাগুলো উপলক্ষের অপেক্ষাতেই থেকে যায় ফের জেগে ওঠার জন্য। দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুঃসময়’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’, জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’, অমিয় চক্রবর্তীর ‘চিরদিন’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘যযাতি’, বুদ্ধদেব বসুর ‘ধৃতরাষ্ট্রের বিলাপ’, বিষ্ণু দে-র ‘ঘোড়সওয়ার’, দিনেশ দাশের ‘কাস্তে’, জসীম উদ্দীনের ‘কবর’, ফররুখ আহমদের ‘ডাহুক’, আহসান হাবীবের ‘আমি কোনো আগন্তুক নই’, আবদুল গনি হাজারীর ‘কতিপয় আমলার স্ত্রী’, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘মে-দিনের কবিতা’, শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘ভালোবাসা ছাড়া’, শহীদ কাদরীর ‘উত্তরাধিকার’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখে নি’, রফিক আজাদের ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’, মোহাম্মদ রফিকের ‘সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে’, মহাদেব সাহার ‘চিঠি দিও’, নির্মলেন্দু গুণের ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসি নি’, হুমায়ুন আজাদের ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’, আবুল হাসানের ‘উদিত দুঃখের দেশ’, হুমায়ুন কবিরের ‘এ কেমন শহর’, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আমি কিংবদমত্মীর কথা বলছি’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘নৈশভোজে রক্তপাত’ এসব কবিতার সঙ্গে একজোটে ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করছে আল মাহমুদের ‘কালের কলস’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘ভারতবর্ষ’। হ্যাঁ, ক্যালভিনো যেমনটি বলেছিলেন, কবি আল মাহমুদ সত্তাকে ভারমুক্ত করার প্রচেষ্টায় আকুল –
লোকালয় থেকে দূরে, ধোঁয়া অগ্নি মশলার গন্ধ থেকে দূরে
এই দলকলসের ঝোপে আমার কাফন পরে আমি কতকাল
কাত হয়ে শুয়ে থেকে দেখে যাবো সোনার কলস আর বৃষের বিবাদ।
(‘কালের কলস’, কালের কলস)
একদিক থেকে বিবেচনা করলে কবিতা এক বিশেষ ধরনের ভাষিকতা, যেখানে বিন্যাস আর সজ্জার সীমানায় স্বয়ং কবি অধীশ্বরের মতো বিরাজমান। একমাত্র কবিতাতেই ঘটতে পারে রচয়িতা ‘আমি’র আত্মম্ভর প্রক্ষেপ। কিন্তু কবিতা কেবল ভাষা নয়, নয় কেবল আঙ্গিকও। কবিতা সংস্কৃতিও বটে। কবিতা সেই সংস্কৃতি যেটির অভ্যন্তরে বয়ে চলে এক জীবনপ্রবাহ। সেখানে থাকে মানুষ, প্রকৃতি, সময়, সমকাল, ইতিহাস এবং এসবের অতিরেক বহু কিছু। কবির সুচয়নে সেই জীবনের প্রবাহ স্ফূর্ততা পায়। কবিতা-অভ্যন্তরীণ এসব উপাদানের মধ্যে কোন কোন উপাদান কবির সংবেদনা ও মনোযোগের কেন্দ্র সেটা অনুভব করা যায় কবিকে পাঠ করলে। এসব উপাদানকে অবলম্বন করে কবি হয়ে ওঠেন এক জীবন-প্রতিনিধি এবং তাঁর শব্দজগৎও তখন সংযোগ রক্ষাকারী সেতু হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি সেই জগতের কবি যদি হন তথাকথিত সভ্যতার মানদ–র অক্ষরজ্ঞানবিহীন কোনো বেদুইন তবু তাঁর উচ্চারণ অর্থপূর্ণ। লেখা নয়, শুধু শব্দের উচ্চারণই তাঁর পৃথিবীকে করে তোলে প্রতিনিধিত্বপূর্ণ। লায়লা আবু-লুঘোড তাঁর বেদুইন সমাজবিষয়ক গ্রন্থে তাই জানান, বেদুইনদের কবিতা গোত্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক, দূরত্ব, ঐতিহ্য, বর্তমান সবকিছুকে প্রকাশ করে। অথচ, বেদুইনদের সেসব কবিতা লিখিত হয়নি, হয়েছে গীত। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে রচিত কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে থাকে চিন্তা, পরিকল্পনা এবং দর্শনের সুস্পষ্ট স্বাক্ষর। আর সেই কবিতা যদি হয় আল মাহমুদের ক্ষীণকায় একটি নমুনা তবু তার মুকুরে ঘটে নির্বিশেষের প্রতিফলন – ‘ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/ শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে/ দুয়োর বেঁধে রাখ।/ কেন বাঁধবো দোর জানালা/ তুলবো কেন খিল?/ আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে/ ফিরবে সে মিছিল।/ ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/ ট্রাকের মুখে আগুন দিতে/ মতিয়ুরকে ডাক।/ কোথায় পাবো মতিয়ুরকে/ ঘুমিয়ে আছে সে!/ তোরাই তবে সোনামাণিক/ আগুন জ্বেলে দে।’ (‘উনসত্তরের ছড়া-১’, পাখির কাছে ফুলের কাছে)। কবি আল মাহমুদ এখানে একই সঙ্গে সমকাল, ইতিহাস, দেশ ও জাতির প্রতিনিধি। কিংবা আরো স্পষ্টভাবে বললে এক ঐতিহাসিক জীবনপ্রবাহের প্রতিনিধি। দীর্ঘকালীন কাব্যিক পর্যটনের পটভূমিতে আল মাহমুদের কবিতা জাগিয়ে তোলে নানামাত্রিক বিচিত্রতা ও দ্বান্দ্বিকতার আভাস।
বাংলাদেশের সাহিত্যে পূর্ববঙ্গ-সচেতনতার দুই সার্থক রূপকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ এবং আল মাহমুদ। একজন কথাসাহিত্যে এবং অন্যজন কবিতায় প্রয়োগ ঘটান সেই সচেতনতার। মানিক-তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণের সূত্রে বাংলা কথাসাহিত্য জনজীবনের গভীর প্রদেশসঞ্চারী হলেও বাংলাদেশের এই পূর্ব প্রান্তিকতায় যেখানে জাতিত্ব প্রতিষ্ঠার মতো বিশাল সংগ্রামে মানুষ একদিন জোটবদ্ধ হবে, সেই জনপদের স্পন্দন থেকে যায় অশ্রম্নত। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র উপন্যাসে উঠে এলো পূর্ব প্রামেত্মর সমষ্টিবদ্ধ মানুষের কাহিনি, যে-মানুষেরা একেবারে মৃত্তিকাসংলগ্ন এবং যাদের দিনানুদিনের বাস্তবতার প্রতি নজর ছিল না কারো। ওয়ালীউল্লাহ্ তাদের রোজকার জীবনের কাহিনিই শুধু উপস্থাপন করলেন না, অনুসন্ধান করলেন তাদের বর্তমানতার নেপথ্যে থাকা সুদীর্ঘ পরম্পরার ঐতিহাসিক বাস্তবতা। পরবর্তীকালে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র অনুসন্ধান সমষ্টি থেকে ক্রমে ব্যক্তিসত্তার সামাজিক চৈতন্যের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। সেটা করতে গিয়ে তিনি অস্তিত্ববাদ এবং চৈতন্যপ্রবাহরীতির আশ্রয় নেন। তবে সমষ্টিবদ্ধ জীবনের আয়তনটিকে তিনি কখনো ছেড়ে যান না। বাংলা কাব্যভুবন তিরিশের পাঁচ কবির পদচারণায় জাগিয়েছিল এক নতুন মুখরতা। তাঁদের কাব্যচেতনা পরিস্নাত হয়েছিল ইউরোপীয় নান্দনিকতার প্রেক্ষণাভিজ্ঞতায়। যদিও জীবনানন্দ দাশ (এবং খানিকটা বিষ্ণু দে) তাঁদের কাব্যে পূর্ব প্রান্তিকতায় থাকা মানুষদের সমষ্টিবদ্ধ জীবনকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন। জীবনানন্দ দাশকে বাদ দিলে বাংলা কাব্যে নিম্নবঙ্গের দৈশিক চেতনার উপস্থিতি খুব ঝাপসা আর অস্পষ্ট। সেই ঝাপসা আর অস্পষ্ট আভাস উজ্জ্বলতা পেতে শুরু করল যখন একে-একে প্রকাশিত হতে লাগল লোক লোকান্তর, কালের কলস ও সোনালি কাবিন। অবশ্য আল মাহমুদই আবার তাঁর উপর্যুক্ত ত্রয়ী-কাব্যের সামষ্টিকতার চেতনা ছেড়ে কালক্রমে যাত্রা করবেন এক ব্যক্তিক-দার্শনিক অনুসন্ধানের দিকে। এমনকি তাঁর কাব্যচেতনা যে তাঁরই সচেতন কবিতাকর্মের পরিণতিতে ক্ষেত্রবিশেষে প্রসারণের পরিবর্তে গ্রহণ করবে সংকোচনকে, সেই দর্পিত স্বাক্ষরও তিনি রেখে যান তাঁর পাঠকদের জন্য।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ যেমন তাঁর সৃষ্ট মহববতনগর গ্রামের অবলম্বনে মৃত্তিকাসংলগ্ন মানবম-লীর জীবনকে ধারণ করেন, তেমনি কবি আল মাহমুদ সেই জীবনকে ধারণ করেন তাঁর তিতাস-বিধৌত পরিক্রমায়। মহববতনগর একমাত্র ওয়ালীউল্লাহ্রই এবং তিতাস আল মাহমুদের। (অদ্বৈতর তিতাসকে আমরা ভুলি না – সেই তিতাস কাব্যের নয়, কথাসাহিত্যের।) বাংলাদেশের মানুষ, প্রকৃতি এবং ঘটনাপুঞ্জ আল মাহমুদের কাব্যবিশ্বের মৌল উপাদান। অন্তত তাঁর প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থের। প্রকৃতি তাঁর কাব্যে আরো পূর্ববঙ্গময় হয়ে উঠেছে নদীর মুহুর্মুহু আবির্ভাবে। এবং প্রথম থেকেই
প্রকৃতি-আঁকিয়ে কবি শক্তিমান এবং অতুলনীয়। তাঁর তিতাসের সক্রিয়তা তাঁর কবিতাকে করে সজীব, নবপলিময় ও গতিগৌরবী। তাঁর ‘তিতাস’ (লোক লোকান্তর) শিরোনামের কবিতা থেকে কবির অসাধারণ সেই জীবনোপলব্ধির দেখা মেলে – ‘এ আমার শৈশবের নদী এই জলের প্রহার/ সারাদিন তীর ভাঙে, পাক খায় ঘোলা স্রোত টানে/ যৌবনের প্রতীকের মতো অসংখ্য নৌকার পালে/ গতির প্রবাহ টানে। মাটির কলসে জল ভরে/ ঘরে ফিরে সলিমের বউ তার ভিজে দুটি পায়।/ অদূরের বিল থেকে পানকৌড়ি, মাছরাঙা, বক/ পাখায় জলের ফোঁটা ফেলে দিয়ে উড়ে যায় দূরে;/ জনপদে কি অধীর কোলাহল মায়াবী এ নদী/ এনেছে স্রোতের মতো, আমি তার খুঁজিনি কিছুই।’ অনন্তর এই তিতাস নামে-বেনামে বয়েই যেতে থাকে তাঁর কবিতার জনপদ ধরে। আল মাহমুদের এই নদীই স্বতন্ত্র এক চরিত্র হয়ে ওঠে এবং তা ‘বাংলাদেশের কবিতা’চিহ্নিত মানচিত্রে। দিনেশ দাশের কাস্তে যেমন তেভাগার স্থানিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে সর্বজনীনতায় উত্তীর্ণ হয়, তেমনি আল মাহমুদের তিতাস বাংলা কাব্যের নদীমাতৃকতায় এর স্থানীয়তাকে সংযুক্ত করে চিরন্তনতার স্রোতে। এমনকি আল মাহমুদের নদী-প্রকৃতিকে ইংরেজ কবি টিএস এলিয়টের নদীর কাব্যিক সন্দর্শনের চাইতেও অনেক বেশি বাঙ্ময় মনে হয়। এলিয়টের যেমন টেমস আল মাহমুদের তেমনই তিতাস। এলিয়টের ওয়েস্ট ল্যান্ড কাব্যে ঘুরেফিরে আসে টেমস নদী। মধুর সুরের রিফ্রেনে (‘মধুর টেমস, ধীরে বয়ে যায়, যতক্ষণ আমি গেয়ে যাই গান’) টেমস দেখা দেয়। দেখাই দেয় কেবল এবং কবিও অবলোকন করতে থাকেন সেই নদীকে; কিন্তু তা আল মাহমুদের তিতাসবহতার মতো স্পন্দিত হয় না। তিতাস বয়ে চলে যেন কবির সত্তার মধ্য দিয়ে, সুদূর অতীত থেকে বর্তমান হয়ে হয়তো অনাগত কালের দিকে। আর সেই বহমানতায় একা কবি নন, স্পৃষ্ট হতে থাকে এক বিপুল জীবনজঙ্গমতা।
আল মাহমুদের কবিতার এই জীবনজঙ্গমতার অঙ্গীকার সময়ের খাতে বিবর্তিত হতে থাকে। জনজীবনের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ কবির আত্মতায় ছাপ পড়ে সময়ের ও সমকালের। সেই ছাপ রূপান্তরিত হয় তাঁর কাব্যাভিজ্ঞতায়। লোকজীবনের বার্তাবাহক কবি তাঁর সময়, সমকাল এবং পরিপার্শ্বকে পর্যবেক্ষণ করেন এক দর্শনোত্তীর্ণ অবস্থান থেকে। প্রথমদিককার কাব্যালোকনে যা ছিল দর্শন বা দেখা, বিশেষ করে সমষ্টির জীবনকে দেখা, পরের দিককার কাব্যালোকনে তা হয়ে উঠল জীবনদর্শন বা তাঁর নিজের জীবনের অবস্থান থেকে দেখা। এখানে প্রসঙ্গত তাঁরই এক কাব্য-সহযাত্রী শামসুর রাহমানের সঙ্গে তুলনা করলে দেখব, রাহমান তাঁর প্রথমদিককার আধেয়বদ্ধতাকে অতিক্রম করে যেতে থাকেন ক্রমপ্রসারণের মাধ্যমে। সেই প্রসারণে আল মাহমুদের বিপরীত ধরনে শামসুর রাহমান তাঁর নগরাবদ্ধ জীবনচেতনা থেকে ছড়িয়ে পড়তে থাকেন বৃহত্তর জনচেতনা, হয়তোবা জাতিগত চেতনার দিকে। তাঁর সেই কাব্যপরিক্রমায় বিশেষ ভূমিকা রাখে তাঁর কাব্যে সমকালীন জীবনোদ্যাপন। সমকালীন জীবনপ্রবাহের বিচিত্র সব ঘটনা কাব্যিক উপাদানে পরিণত হয়ে শামসুর রাহমানের কবিতাবিশ্বকে দেয় আশ্চর্য এক সম্প্রসারণ। সেখানে থাকে মানুষের সংগ্রাম, লড়াই, প্রতিরোধ যার একটি বিশাল চিত্রণ ঘটে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাধারার মধ্য দিয়ে। ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই প্রেক্ষাপট ছাড়িয়ে অনন্তর বাঙালির স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন, গণতন্ত্রের লড়াই এসব বিষয়ের কাব্যিক নির্মাণ শামসুর রাহমানের কবিতাভুবনকে বাঙালির ইতিহাসের সমান্তরাল সৃজনকল্পে পৌঁছে দেয়। শুধু শব্দের মাধ্যমে একজন কবির পক্ষেও যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর হয়ে লড়াই করা সম্ভব শামসুর রাহমানের অসংখ্য কবিতা তার প্রমাণ। সমকালীন ঘটনার প্রতিক্রিয়াজাত কাব্যনির্মাণের দিক থেকে শামসুর রাহমান কেবল আল মাহমুদ নন, ছাড়িয়ে যান তাঁর সমকালীন অন্য অনেক কবিকেও।
সমকালীন ঘটনার প্রতিফলনজাত কাব্যনির্মাণই কাব্যবিচারে উৎকৃষ্টতার মাপকাঠি নয়। একই সমকালীন দুজন কবির পারস্পরিক অবস্থানের বাস্তবতা বোঝানোর জন্যেই সে-প্রসঙ্গের অবতারণা। কবিতা নিশ্চয়ই এক নিতান্ত ব্যক্তিগত কর্মকা- কিন্তু কবি কখনোই এমন কোনো অমত্মঃপুরবাসী নন যেটি সমস্ত রকম সামাজিকতার স্পর্শশূন্য। বরং কবিদের ‘মানব জাতির আইনসংগত প্রতিনিধি’ বলে অভিহিত করেন কবি মিলটন। যে-ব্যক্তি একটি জাতিত্বের প্রতিনিধি হয়ে তাঁর কর্মতৎপরতা চালাবেন তা যতই নিভৃতচারী হোক না কেন তার থাকে বৃহত্তর চেতনামুখী আত্মপ্রকাশ। এটি হয়তো শেষ পর্যন্ত তর্ক-প্রতর্কেরও বিষয়। মার্কিন লেখক টনি মরিসন বলেছেন, কল্পনার ব্যক্তিগত অনুশীলন বলে কিছু নেই, লেখা ব্যাপারটাই হলো রাজনৈতিক। মরিসন দেখান যে, আত্মজৈবনিক রচনার রীতিও প্রবলভাবে সামাজিক চেতনার পরিবাহী হতে পারে। মরিসনের দৃষ্টিতে মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ লেখকদের অনেক রচনাই আত্মজৈবনিক ধরনের; কিন্তু আত্মজৈবনিক সেসব রচনাই হয়ে উঠেছে বহুস্বর-‘প্রতিনিধিত্বপূর্ণ’। এসব রচনায় প্রতিফলিত ব্যক্তির জীবন একই সঙ্গে নিজস্ব নির্জনতা এবং পরস্ব প্রতিবেশিতায় খচিত। বলা যায় মার্কিন কবি অ্যালেন্স গিন্সবার্গের কথা, যাঁর কাব্যের শিরোনামই (হাউল) তাঁর ধরন বলে দেয়। প্যারিস রিভিউকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ব্রিটিশ কবিদের কাব্যভঙ্গিকে ‘কাপুরুষোচিত ভঙ্গি’ বলে অভিহিত করেন। বস্ত্তত ব্রিটিশ কবিদের ‘আপারটোন’ ‘হাই ক্লাস’ ধরনের স্বর তাঁর অপছন্দ ছিল। বৈরী প্রতিপক্ষতাকে একমাত্র উচ্চকণ্ঠ ভঙ্গিতেই প্রকাশ করা যায় – গিন্সবার্গ তাঁর কাব্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আক্রমণ করবার জন্যে প্রচুর খিস্তিখেউড়-শব্দ ব্যবহার করেন যেগুলোকে ‘গালাগাল’ আখ্যা দেওয়া যায়। শামসুর রাহমানের অনেক কবিতা আছে যেগুলোর বিষয়বস্ত্ত আন্দোলন-সংগ্রাম এবং যেগুলো স্বভাবত উচ্চকণ্ঠ বা ঘোষণাধর্মী। আবার, আল মাহমুদের তেমন কবিতা প্রায় দুর্লভ, যদিও তিনি ‘শুয়োরমুখো’র মতো খিস্তি-শব্দের দারুণ ব্যবহৃতি দেখিয়েছেন।
তবে ঘোষণাধর্মী কবিতা আল মাহমুদও লিখেছেন এবং সেই কবিতার সূত্র ধরে প্রথমে খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে তারপর আবার সামনের দিকে আসা যেতে পারে। এক অর্থে গোটা বিশ্বই কবির বিষয়। কবি তাঁর স্থানগত সীমাবদ্ধতাকে পেরিয়ে যান তাঁর অভিজ্ঞতার আয়তন দিয়ে। ফলে, প্যালেস্টাইনে, আফ্রিকায়, মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে কিংবা বিশ্বের যেখানেই মানুষের বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় তা-ই অনুপ্রেরণা জোগায় কবিকে। অচেনা, একেবারে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতার বিষয়বস্ত্তও হতে পারে কবির উপজীব্যতার লক্ষ্য। সুইডেনের কবি টমাস ট্রান্সটোমার যখন ইজমির, সাংহাই কিংবা আফ্রিকা নিয়ে কবিতা লেখেন অথবা হাঙ্গেরীয় কবি জর্জ ফালুদি লেখেন তাঞ্জিয়ের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাজাত তাঁর ‘কসবাহ্’ নামক কবিতা, তখন কবির বিষয়বস্ত্তর অসীমতাই প্রমাণিত হয়। এমনকি অদেখা উপাদানও অভিজ্ঞতার বিষয়ে পরিণত হতে পারে। গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার জেলেদের বলতেন, মাছেদের সম্পর্কে কোনো বিশেষ আকর্ষণীয় বা বিবেচনাযোগ্য কিছু লক্ষ করলে তারা যেন তা অ্যারিস্টটলকে জানায়। শামসুর রাহমান যখন আগামেমনন বা ইলেক্ট্রার প্রতীকে কাব্য রচনা করেন তখন তাঁর সেই গ্রিসমুখিতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না। কেননা, কবিরা এক সম্প্রসারিত বিশ্বের নাগরিক। বেঞ্জামিন মলয়ঁসের ফাঁসি হলে কি কেন্ সারউইয়ার মৃত্যুদ- হলে বাঙালি কবির কাব্যিক সাড়া প্রাসঙ্গিকতা পায়। তুরস্কের কামাল আতাতুর্ককে বাংলা কবিতায় অমর করে রাখেন কাজী নজরুল ইসলাম। বিষয় ছাড়াও বলা যায়, সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের কাব্যাঙ্গিক বা কাব্যভাবনাও হতে পারে কবির সৃজনশীলতার অনুপ্রেরণা। ইংরেজ কবি টিএস এলিয়ট বলেছিলেন, এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ডের রুবাইয়াৎ পাঠই ছিল তাঁর চার পঙ্ক্তির ‘কোয়ার্টেট’ (‘ফোর কোয়ার্টেট’) কবিতা রচনার অনুপ্রেরণা। কবি এজরা পাউন্ড জানান, চৈনিক দার্শনিক কনফুশিয়াসের
চিন্তা-দর্শনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে তিনি তাঁর ক্যান্টোজ-কবিতাবলি রচনা করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলামের পরে কবি ফররুখ আহমদ এবং সৈয়দ আলী আহসানের কথা বলা যায়, যাঁদের কবিতায় আরবি-ফারসি বিষয় ও আঙ্গিকের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর নানান দেশের বিষয়বস্ত্ত আল মাহমুদের কবিতাতেও উপজীব্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সক্রেটিস, গোর্কি, হজরত মুহাম্মদ, বখতিয়ার, বেঞ্জামিন মোলয়েসি, ঈশপ, ইকবাল, বেদুইন, লায়লা – এইসব বিষয় নিয়ে কবিতা লিখেছেন তিনি। অর্থাৎ বিশ্বদৃষ্টির আয়ত অন্বেষণে ব্যাপৃত থেকে আল মাহমুদ তাঁর কাব্য-উপাদান সংগ্রহ করেছেন। তা সত্ত্বেও অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাব্যপাঠের অভিজ্ঞতা ঘটাতে পারে ভিন্ন আলোকসম্পাত।
১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় আল মাহমুদের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না। এ-গ্রন্থের একটি কবিতা ‘ইহুদিরা’। পঁচিশ পঙ্ক্তির কবিতাটির দশটি পঙ্ক্তির উদ্ধৃতি অনুসরণ করি –
অনিষ্টকর অন্ধকারে যখন পৃথিবী
আচ্ছন্ন হয়ে যায়। চারদিকে ডাইনীদের
ফুৎকারের মতো হাওয়ার ফিসফাস,
আর পাখিরা গুপ্ত সাপের আতঙ্কে
আশ্রয় ছেড়ে অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়
ঠিক তখুনি, ইহুদিরা হেসে ওঠে। …
ইহুদিরা হাসুক,
তবু সম্পদের সুষম বণ্টন অনিবার্য।
ইহুদিরা নাচুক, তবু
ধনতন্ত্রের পতন আসন্ন।
কবিতার সর্বশেষ পঙ্ক্তি ‘মানুষ মানুষের ভাই’ হলেও কবি আল মাহমুদের উপর্যুক্ত কাব্যিক স্বীকারোক্তি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে তিনি সমগ্র মানবজাতির প্রতিনিধি নন। কেননা, কবিতাটিতে মূল প্রতিপক্ষ ‘ইহুদিরা’ আর ধনতন্ত্র এবং ‘ইহুদিরা’ হয়ে পড়ে সমার্থক। এমনও মনে হওয়াটা স্বাভাবিক, বিশ্বে সম্পদের সুষম বণ্টন হওয়ার পথে বাধা ইহুদিরাই। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন নয়। গবেষক অ্যান্থনি জুলিয়াস তাঁর কবি টিএস এলিয়ট বিষয়ক গবেষণাকর্মে (১৯৯৫ সালে প্রকাশিত) দেখান, এলিয়টের কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে স্পষ্ট জাতিবিদ্বেষ। তাঁর অনেক কবিতায় এলিয়ট প্রত্যক্ষভাবে ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা-অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। ‘বারব্যাংক উইথ আ ব্যাডেকার : বস্ন্যাইস্টাইন উইথ আ সিগার’, ‘সুইনি অ্যামাং দ্য নাইটিংগেইলস্’ কিংবা ‘আ কুকিং এগ’ প্রভৃতি কবিতার বিশেস্নষণে এলিয়টের জাতিবিদ্বেষ ধরা পড়ে। কবির ধর্মাশ্রয় বা ধর্মাশ্রিত ভাবধারানির্ভর কবিতারচনা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। স্বয়ং এলিয়টই বলেছেন (প্যারিস রিভিউ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে), বাইবেলের কাব্যিকতা ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সমান্তরালে আসাটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে, এলিয়টের মতে, বাইবেলের ‘সাম’ কিংবা ‘ইসাইয়াহ্’ অংশ তেমন অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। এলিয়ট অবশ্য এমনও বলেন যে, বাইবেলকে সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা না করে বরং সেটিকে শব্দের অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু বাইবেলের অভিজ্ঞতাকে জাতিবিদ্বেষের লক্ষ্যে পরিচালনা করাটা সৃজনশীল কবিস্বভাবের জন্যে বেমানান। গবেষক অ্যান্থনি জুলিয়াসের গবেষণাকর্ম সেরকম ধারণাই দেয় আমাদের। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় আল মাহমুদের ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বখতিয়ারের ঘোড়া। গ্রন্থের একটি কবিতায় (‘হত্যাকারীদের মানচিত্র’) কবি জানান, ‘আফগানিস্তান আমার দেশ আমার/ ভালোবাসা …/ আফগানিস্তান আজ কার দেশ নয়? আফগানিস্তান/ সব স্বাধীন মানুষের অপহৃত মাতৃভূমি।’ কবিতাটিতে তখনকার আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপস্থিতি ‘সাম্রাজ্যবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত এবং তখন এমন কবিতা বাংলা ভাষা ছাড়াও বিশ্বের বহু ভাষার কবিরা রচনা করেছিলেন। আবার ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত আল মাহমুদের একাদশ কাব্যগ্রন্থের ‘রাফাতের লাশের ওপর জুঁইফুল’ কবিতাটি পাঠ করলে দেখব কবি ভাবছেন ‘ইসলামকে কবর দিতে’ হত্যা করা হয়েছে ‘রাফাত মাহমুদ ও তার উনত্রিশ সহযাত্রী’কে। এই কবিতাটাই এক সরব ঘোষণা হয়ে দাঁড়ায় অন্তিমে যখন কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে –
খুঁড়ে ফ্যালো গোটা আফ্রিকা কালো মহাদেশ। কায়রোর
কবরখানায় পবিত্র কোরআনকে পুঁতে ফেলে
যারা হোটেলগুলোতে মদের গস্নাস হাতে উদর নৃত্যে মশগুল
এখন পশ্চিম আফ্রিকা তাদের বিভীষিকা দেখাচ্ছে।
মহাদেশের মাটি চৌচির করে আলজেরিয়ায় বেরিয়ে এসেছে
আল্লার এই অদ্ভুত কিতাব।
আপন বিশ্বাসে স্থির আল মাহমুদকে আমরা সবশেষে এমন নির্দ্বান্দ্বিকভাবে পাই।
আল মাহমুদের কবিতা পাঠ করি। একদা ১৯৬৩ সালে তিনি প্রত্ন-মহেঞ্জোদারোর মৃৎপাত্রে গাঁথা অক্ষরের দিকে দৃষ্টিপাত করেছিলেন। যদিও ‘মানুষের শিল্প’কে তাঁর কাছে ‘নির্বোধের নিত্য কারিগরি’ মনে হয়েছে, তবু শব্দশিল্পের গায়ে তিনি তাঁর স্বাক্ষর রেখে যান। তিতাস নদী বেয়ে চলে তাঁর ‘সোনার বৈঠার ঘায়ে পবনের নাও’। কিন্তু আসে দুর্দিন আর খরাগ্রস্ততা, তাই তাঁর ‘সমস্ত গন্তব্যে একটি একটি তালা’ ঝোলে। কবির অন্তরের সর্বত্র বাসা বাঁধে প্রবল অবিশ্বাস। সেটা ছিল প্রত্যাশিতই। পাকিস্তানি সামরিক শাসনামলের বন্ধ্যত্বকে তিনি বিদ্ধ করেছিলেন দারুণ করণ-কুশলতায় – ‘শুনুন, রবীন্দ্রনাথ আপনার সমস্ত কবিতা/ আমি যদি পুঁতে রেখে দিনরাত পানি ঢালতে থাকি/ নিশ্চিত বিশ্বাস এই, একটিও উদ্ভিদ হবে না/ আপনার বাংলাদেশ এ রকম নিষ্ফলা, ঠাকুর!’ আবার, দেশ মুক্ত-স্বাধীন হলেও কবি আল মাহমুদ দেখতে পান ‘বন্দুকের নল’ তাঁর ‘মাথার দিকেই তাক করা’। এবং ১৯৮৫ সালে বাঙালি কবি আল মাহমুদের সোৎসাহী কণ্ঠে ধ্বনিত হয় নতুন এক প্রণোদনা এবং কবিকে তখন সেই উৎসাহ প্রকাশ করার জন্য আশ্রয় নিতে হয় বাংলার পরিবর্তে বিদেশি ভাষার –
আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা
মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।
বারুদই বিচারক। আর
স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠা।
(‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, বখতিয়ারের ঘোড়া)
উপর্যুক্ত উচ্চারণে আমরা সংশয়ে পড়ি – এ-কবির বিশ্বাস নাকি অবিশ্বাসের প্রকাশ!
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2002)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

