Friday, August 30, 2024

২০২৪ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: ডনাল্ড ট্রাম্প ও কমালা হ্যারিসের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই by সিরাজুল আই

২০২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, রাজনৈতিক বৃত্তে  ততই বাড়ছে প্রতিযোগিতা। এই দৌড়ে দুইজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেন আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস। উভয় প্রার্থীই তাদের নিজ নিজ দলের প্রধান প্রতিনিধি এবং বর্তমানে তাদের জনপ্রিয় ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছেন। এই বিশ্লেষণটিতে  সাম্প্রতিক ভোটে তাদের অবস্থান, তহবিল সংগ্রহের প্রচেষ্টা, মূল শক্তি, চ্যালেঞ্জ এবং প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সামগ্রিক সম্ভাবনাগুলো অন্বেষণ করা হয়েছে।

বর্তমান পোলিং ট্রেন্ডস

২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের  লড়াই মূলত  রিপাবলিকান পার্টির  ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ডেমোক্রেটিক পার্টির কমালা হ্যারিসের । উভয় প্রার্থীই নির্বাচনী লড়াইয়ের জন্য  গুরুত্বপূর্ণ  রাজ্যগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করছেন, যেখান থেকে  নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হতে পারে। এই  রাজ্যগুলোতে ট্রাম্প এবং হ্যারিসের পোলিং ট্রেন্ড তুলে ধরা হলো

 

স্টেট      ডনাল্ড ট্রাম্প (রিপাবলিকান)    কমালা হ্যারিস (ডেমোক্র্যাটিক)  

 

মিশিগান        ৪৭ %                                          ৪৫%                                

লিড- ট্রাম্প  +২

উইসকনসিন   ৪৮%                                           ৪৬%                                  

লিড  ট্রাম্প +২

পেনসিলভানিয়া   ৪৬%                                         ৪৭ %                                 

লিড   হ্যারিস +১

অ্যারিজোনা       ৪৮ %                                        ৪৭ %                                     

লিড ট্রাম্প +১

নেভাদা             ৪৬ %                                         ৪৮%                                    

লিড    হ্যারিস +২


মূল নির্বাচনী ক্ষেত্রগুলোর সর্বশেষ পোলিং ডেটা অনুসারে ,ডনাল্ড ট্রাম্প এবং কমালা হ্যারিসের মধ্যে লড়াইটা অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি হতে চলেছে।  উভয় প্রার্থীই বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্র শক্তি প্রদর্শন করছেন। মিশিগান এবং উইসকনসিনে, ট্রাম্প হ্যারিসের চেয়ে ২ পয়েন্টের একটি সূক্ষ্ম  লিড ধরে রেখেছেন, যা সাম্প্রতিক নির্বাচনে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দেয়। হ্যারিস পেনসিলভানিয়ায় সামান্য সুবিধা পেয়েছেন, ১ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন তিনি। সামগ্রিক নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে এই রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অ্যারিজোনায়, ট্রাম্প  নির্বাচনী প্রচারে  রাজ্যের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের উপর জোর দিয়ে ১ পয়েন্টের  ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। বিপরীতভাবে হ্যারিস নেভাদায় ২ পয়েন্টে এগিয়ে, যেখানে একটি তীব্র  প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে ডেমোক্র্যাটিকদের সামনে সুযোগ সাধারণত  কমই  থাকে। নির্বাচনী ক্ষেত্রের সমস্ত রাজ্য জুড়ে এই সংকীর্ণ মার্জিনগুলো ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট  পদের লড়াইয়ে  চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে  ভোটারদের ভোটদান এবং  প্রার্থীদের  প্রচারাভিযানের প্রচেষ্টার  গুরুত্বের উপর জোর দেয়।

প্রার্থীদের সম্পর্কে

ডনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে একজন  শক্তিশালী প্রার্থী  হিসেবে ধারাবাহিকভাবে যেকোনো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছাপিয়ে যাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট পদে তার বিতর্কিত  মেয়াদ  এবং  চলমান আইনি লড়াই সত্ত্বেও , ট্রাম্প তার পছন্দের কেন্দ্রে  জোরালো সমর্থন বজায় রেখেছেন। পোলিং ডেটা ধারাবাহিকভাবে দেখায় যে ট্রাম্প রিপাবলিকান ভোটারদের থেকে  প্রায় ৫০-৬০% ভোট নিয়ে  নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা দলের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা প্রদর্শন করে। যদিও তিনি রক্ষণশীল রিপাবলিকান এবং ডান-পন্থী  ভোটারদের কাছ থেকে দৃঢ় সমর্থন উপভোগ করেন, তবে  স্বতন্ত্রদের মধ্যে তাঁর রেটিং উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রায় সর্বসম্মতভাবে নেতিবাচক। এই মেরুকরণ ট্রাম্পের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তাই তিনি তার মূল সমর্থকদের বাইরে  বিস্তৃত পরিসরের ভোটারদের কাছে তার আবেদন তুলে ধরার  চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে কমালা হ্যারিস ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। পোলিং প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি ধারাবাহিকভাবে ডেমোক্র্যাটিক বৃত্তে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ,  ডেমোক্রেটিক ভোটারদের   ৪০-৫০% ভোট রয়েছে তাঁর ঝুলিতে । সাম্প্রতিক ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির  (ডিএনসি) ইভেন্টগুলোর পরে ডেমোক্র্যাটিক পরিধির মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে । তবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে  বর্তমানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুইং রাজ্যে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছেন হ্যারিস। যদিও  ভোটারদের মধ্যে তার চাহিদা বাড়ছে , কারণ নিজের  প্রচারাভিযানকে জোরদার করেছেন হ্যারিস। জনসাধারণের মধ্যে নিজের উপস্থিতি বাড়িয়েছেন  এবং কার্যকরভাবে দেশের জন্য নিজের  দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছেন। ডেমোক্র্যাটিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে এবং সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য হ্যারিসের ক্ষমতা ট্রাম্পের থেকে  ব্যবধান কমাতে সহায়ক হবে।

বর্তমান পোলিং ট্রেন্ড  ও প্রভাব

ডনাল্ড ট্রাম্প এবং কমালা হ্যারিসের মধ্যে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াই প্রতিযোগিতামূলক হতে চলেছে , বিশেষ করে নির্বাচনী ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে৷ উভয় প্রার্থী  ঘাড়ে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন।  ভোটারদের উপস্থিতি, কৌশলগত প্রচারণা এবং ভোটারদের সাথে প্রতিটি প্রার্থীর  সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতার ওপর ভোটের মার্জিন নির্ভর করে  । নির্বাচনের আগে এখনো হাতে কিছুটা সময় থাকায়  ট্রাম্প এবং হ্যারিস উভয়ের কাছেই  সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সমর্থন পাবার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তহবিল সংগ্রহ ও অনুদান

ডনাল্ড ট্রাম্পের তহবিল সংগ্রহের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে  তৃণমূল স্তরের নেটওয়ার্ককে পুঁজি করে এবং রিপাবলিকান বৃত্তে নিজের  স্থায়ী প্রভাবের কারণে । ট্রাম্প বিভিন্ন PAC এবং প্রচারণা কমিটির মাধ্যমে ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও  বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছেন, এই মোটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছোট-ডলার অনুদান থেকে এসেছে, যা তার সমর্থকদের আনুগত্য প্রতিফলিত করে। তার তহবিল সংগ্রহের প্রচেষ্টাকে হাই -প্রোফাইল ইভেন্ট এবং সমাবেশের দ্বারা আরও জোরদার করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্পের চলমান আইনি চ্যালেঞ্জ তার সমর্থকদের নিরুৎসাহিত করেনি। বরং অনেকেই মনে করছেন ট্রাম্পের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে , যা তার প্রচারাভিযানে বাড়তি এডভ্যান্টেজ জুগিয়েছে।

ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস তার  প্রোফাইল এবং বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সুবিধা নিয়ে শক্তিশালী তহবিল সংগ্রহের ক্ষমতা  প্রদর্শন করেছেন। তার প্রচারণা সফলভাবে ৭৫মিলিয়নেরও বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছোট ভোট  দাতাদের কাছ থেকে এসেছে। এই ভোটাররা  তার প্রার্থীতা সম্পর্কে অত্যন্ত উত্সাহী, বিশেষ করে মূল বিতর্ক এবং জনসাধারণের উপস্থিতির পরে। তৃণমূল স্তরের সমর্থন ছাড়াও হ্যারিস কার্যকরভাবে প্রধান ডেমোক্রেটিক নেটওয়ার্কগুলিতে প্রভাব ফেলেছেন যার মধ্যে রয়েছে সিলিকন ভ্যালি, ওয়াল স্ট্রিট এবং হলিউডের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা। ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটি (ডিএনসি) হ্যারিসের প্রচারণাকে জোরদার করতে, তার দিকে  অনুদান দেওয়ার প্রচেষ্টার সমন্বয় সাধনে,   একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট নিশ্চিত করতে  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

মূল শক্তি ও চ্যালেঞ্জ

ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রার্থীতা বেশ কয়েকটি কারণে শক্তিশালী । তার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তার অনুগত সমর্থকদের শক্তিশালী ভিত্তি, যারা তার প্রতি অত্যন্ত নিবেদিত। প্রাইমারি এবং সাধারণ নির্বাচন উভয় ক্ষেত্রেই  নির্ভরযোগ্য ভোটার ভিত্তি প্রদান করে। ট্রাম্প মিডিয়া সামলাতে  ওস্তাদ।  সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করার এবং সমাবেশের মাধ্যমে ভোটারদের  সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার  ক্ষমতা ট্রাম্পের   শক্তিশালী হাতিয়ার । তিনি নির্বাচনী প্রচারে  ট্যাক্স কমানো এবং শক্তিশালী বাণিজ্য নীতির উপর জোর দিয়েছেন।  বিশেষ করে  সুইং স্টেটের ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে গেলে এই   অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে  মাথায় রাখা উচিত। ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি   ভোটারদের একটি অংশের কাছে তার আবেদনকে শক্তিশালী করেছে । তবে ট্রাম্প বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন যা তার প্রচারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে চলমান আইনি চ্যালেঞ্জ, ফৌজদারি তদন্ত এবং দেওয়ানি  মামলা।

প্রথমে ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং সেইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট  পদের প্রতিযোগী হিসাবে  হ্যারিসের গ্রহণযোগ্যতা বিশেষত নারী , সংখ্যালঘু এবং তরুণ ভোটারদের উত্সাহিত করেছে।   ভাইস প্রেসিডেন্ট, সিনেটর এবং ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে দীর্ঘ  অভিজ্ঞতা তাকে ডেমোক্র্যাট  ভোটারদের একটি বিস্তৃত অংশের কাছে  পৌঁছাতে  শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম প্রদান করে।  বিশেষ করে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার  সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোতে। সেইসঙ্গে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি হ্যারিসের সমর্থনে আরও ঐক্যবদ্ধ বলে মনে হয়, যা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর পথ প্রশস্ত করতে পারে। সেইসঙ্গে হ্যারিসও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন  যা তার প্রেসিডেন্ট পদের  লড়াইয়ে  বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভোটারদের  উপলব্ধি এক্ষেত্রে  একটি বাধা হিসেবে  রয়ে গেছে, কারণ তিনি কম অনুমোদনের রেটিং নিয়ে লড়াই করেছেন। রক্ষণশীল মিডিয়াতে নেতিবাচক চিত্রায়নের পাশাপাশি  মূল বিষয়গুলোতে তাঁর স্পষ্ট বার্তার অভাব রয়েছে। ট্রাম্পের বিপরীতে হ্যারিসের প্রাথমিক প্রার্থী হিসাবে দেশব্যাপী প্রচার চালানোর অভিজ্ঞতা কম। অর্থনৈতিক উদ্বেগ, বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সম্পর্কিত বিষয়ে  যদি তার প্রচারে কার্যকর সমাধান না থাকে  তবে তা উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ  তৈরি করতে পারে।

ভবিষ্যতের প্রভাব এবং বিজয়ের পথ

ডনাল্ড ট্রাম্প এবং কমালা হ্যারিস উভয়ের সামনেই  ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনে জয়ের জন্য আলাদা পথ রয়েছে।  প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভোটারদের ওপর  কৌশলগত ফোকাস এবং জাতীয় ইস্যুতে জোর  দেওয়া প্রয়োজন। ট্রাম্প তাঁর প্রচারণায় অর্থনৈতিক নীতি, অভিবাসন সংস্কার, এবং দেশে একটি শক্তিশালী আইন-শৃঙ্খলার উপর মনোনিবেশ করবেন । চলমান আইনি চ্যালেঞ্জকে কাটিয়ে উঠে  একটি সুশৃঙ্খল, সমন্বিত বার্তা  ভোটারদের  মনোযোগ টানার পক্ষে সহায়ক হতে পারে।

অন্যদিকে, কমালা হ্যারিসকে অবশ্যই  সুইং ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর সময় মূল ডেমোক্র্যাট  সমর্থকদের মধ্যে তার অবস্থান শক্ত করতে হবে। তার প্রচারণায়  সম্ভবত স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, জলবায়ু কর্মসূচি  , জাতিগত ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উপর ফোকাস থাকবে।   সাফল্য অর্জনের জন্য হ্যারিসকে অবশ্যই বিদ্যমান ভোটারদের সংশয় কাটিয়ে উঠতে হবে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে। ভোটারদের কার্যকরভাবে সংগঠিত করার জন্য  তৃণমূল স্তরের প্রচারণাও জোরদার করতে হবে।

উপসংহার: একটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট  নির্বাচন দুটি শক্তিশালী প্রার্থীর মধ্যে একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং গতিশীল লড়াই হতে চলেছে, যা  আমেরিকার ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে। একদিকে ডনাল্ড ট্রাম্প তার দৃঢ় সমর্থন এবং  প্রচারণার সাথে কমালা হ্যারিসের মুখোমুখি। হ্যারিস আবার  ঐক্য এবং প্রগতিশীল সংস্কারের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য  প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন । এই নির্বাচনের ফলাফল মূলত নির্ভর করবে ভোটারদের উপস্থিতি, সমালোচনামূলক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার প্রার্থীদের ক্ষমতা এবং শেষ মাসগুলোতে তাদের প্রচারাভিযানের কৌশলগুলোর কার্যকারিতার উপর। যেহেতু উভয় প্রার্থীই তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করছেন  তাই এই নির্বাচন আমেরিকান রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে চলেছে। এই নির্বাচনের ফলাফল  আগামী বছরগুলোতে দেশের  নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে উলেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে ।

লেখক ডঃ সিরাজুল আই. ভূঁইয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার সাভানা রাজ্যের সাভানা স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক এবং   আমেরিকার বিজনেস অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস একাডেমি (BAASANA) এর প্রাক্তন সভাপতি।

গণ-অভ্যুত্থানের গণচরিত্র ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ! by মাহফুজ আব্দুল্লাহ

গণ-অভ্যুত্থানের গণচরিত্র ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ! ব্যক্তির বদলে সামষ্টিক চিন্তা মোকাবেলা গুরুত্বপূর্ণ! গণ-অভ্যুত্থানের অংশীজন কারা? নির্দিষ্ট করে বললে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিক অংশ। এ নাগরিক বা জনতা যদি বলতে চান- তাদের রূপ আর রঙ বহুত। সব শ্রেণি পেশার দল-মতের লোকেরাই এ অভ্যুত্থানের অংশীজন। এখনই কাউকে বড় করে তোলা কিংবা কাউকে খাটো করে দেখার সময় নয়।

কিন্তু, মনে রাখতে হবে এ গণ অভ্যুত্থানের গাঁথুনিতে আছে আন্দোলনের সমন্বয়কেরা এবং আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের পূর্বেকার অভিজ্ঞতাপ্রসূত চিন্তা। সে চিন্তা সামষ্টিক, কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা সেটার প্রতিনিধিত্ব করছেন। এতটুকু বুঝেন। আন্দোলন ছিল ভ্যানগার্ড পার্টির মতন- এ কথাটাও বুঝেন।

বাঙ্গালি ভক্তি অথবা ঘৃণার মাঝামাঝি থাকতে চায় না বোধহয়। Idea বা চিন্তার বদলে Idolization কি ক্ষতিকর, আমরা বিগত ফ্যাসিবাদে দেখেছি। ফলে, চিন্তা নিয়ে কথা বললে ব্যক্তি কম গুরুত্ব পাবে এবং চিন্তাকে কেন্দ্র করেই বিতর্ক চলবে। এর মাধ্যমেই একটা সৃজনশীল রূপান্তর সম্ভব। সবাই এর মাধ্যমেই উপকৃত হবে।

আমরা চাই, এত দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের ভেতরে গড়ে ওঠা সব চিন্তাকে প্রতিনিধিত্ব করতে। সেটা দুরূহ কাজ। কিন্তু, এরকম না হলে পুরাতন ইডিওলজিকাল ফেসাদে আমরা খাবি খাব। আর, সবাই নিজস্ব খোপে বেহুদা তর্কে ও ব্যক্তি আক্রমণে নিজেদের ক্লান্ত করে তুলবেন।

গণ-অভ্যুত্থান ব্যখ্যার স্বাধীনতা সবার আছে। সেটাই কাম্য। কিন্তু, গণ-অভ্যুত্থানের ভেতরকার চিন্তাগত ডিনামিজম যে গুটিকয় জানবেন, সেটা তো অস্বাভাবিক না। এ গুটিকয় লোক সামষ্টিক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব না করলে এবং সবাইকে ধারণের বিশালতা না রাখলে, প্রতিবাদ ন্যায্য। কিন্তু, এ অন্তর্গত ডিনামিজিম যে গণ-অভ্যুত্থানের জন্য ক্যাটালিস্ট ভূমিকা রাখছে, সেটা ভুলে গেলে মবোক্রেসিই চলবে, তর্ক আর সংলাপ সুদূর পরাহত। আপনাকে তো একটা বিন্দু থেকে শুরু করতে হবে!

আমরা কেবল ভবিষ্যত বাংলাদেশ নিয়ে নোকতা দিয়েছি, শুরুর বিন্দুগুলো বলেছি। এখন আবার আমরা জনগণের কাছে যাব, আরো বিচিত্র চিন্তাকে একোমডেইট করে কিভাবে সেটাকে রাষ্ট্রকল্পে রিপ্রেজেন্টেড করে তোলা যায়, সে চেষ্টা করব। আমরা ভুলতে চাইনা যে, আমরা নেতৃত্ব ও চিন্তার জায়গাতে ছিলাম, নিজেদের শক্তিতে নয় বরং আপনাদের প্রতিনিধিত্বের শক্তিতে।

আমরা ব্যক্তিমানুষ নশ্বর, এই আছি এই নেই।

কিন্তু চিন্তা ও গণচেতনা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটাই আমাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের জীবনীশক্তি তথা আবেহায়াত!

পুনশ্চ: একজন বলছিলেন, যদি রাজনৈতিক শক্তি আকারে সংঘটিত হয়ে নির্দিষ্ট রূপকল্পের ভিত্তিতে এ গণ-অভ্যুত্থান হত, তাইলে এটা বিপ্লবী সরকারে গিয়ে ঠেকত! ফলত, এখানে মাস্টারমাইন্ড জাতীয় কিছু নেই। হইলে আমরাই খুশি হইতাম এবং ঘোষণা দিয়ে সরকার গঠন করে নিজেদের জানান দিতাম। কিন্তু, আমরা আজীবন লড়াই করব, সে পরিপূর্ণ বিজয়ের জন্য। সেদিন এ মুকুট আমরা নিজেরাই ধারণ কিরব। অদ্য নয়!

এ গণ-অভ্যুত্থান বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে বলে আপনারা আমোদিত, বিহবল- সত্য। কিন্তু, এত দ্রুতই কাল্টিজমের দিকে যাইয়েন না। তাইলে আমাদের দীর্ঘ লড়াই বাধাগ্রস্ত হবে। এখন সময় জনগণকে সাথে নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান করার! জনগণই আমাদের মাস্টারপ্ল্যানার!

(ফেসবুক থেকে নেয়া)

চট্টগ্রামে গুলি করে হত্যা: বৈঠকের কথা বলে সকালে বের হন, রাতে এল মৃত্যুর খবর by ফাহিম আল সামাদ

বৈঠকে যাচ্ছেন বলে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন মোহাম্মদ আনিস (৩৮)। দুপুর ও বিকেলে দুবার খোঁজও নেন স্ত্রী এনি আক্তার। তখন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক। আর রাত আটটায় আসে স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ।

গতকাল সন্ধ্যার দিকে চট্টগ্রামের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আনিসকে। একই সঙ্গে গুলিতে খুন হন আনিসের সব সময়ের সহচর মাসুদ কায়সারও (৩২)।

আনিসের স্ত্রী এনি আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি বৈঠকে গেছে, এটা জানতাম। সঙ্গে মাসুদও ছিল। কিন্তু কার সঙ্গে বৈঠক, কারা ছিল সেই বৈঠকে, এসবের কিছুই আমরা জানি না। আমার স্বামীর সঙ্গে এলাকার কোনো বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল বলে আমাদের জানা নেই। কেন আমার স্বামীকে এভাবে মারল? আমি খুনিদের ফাঁসি চাই।’ আজ শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের সীমান্তবর্তী হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের পশ্চিম কুয়াইশ এলাকায় আনিসের বাড়িতে গেলে কথা হয় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে।

পেশায় বালু ও পোলট্রি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আনিস পশ্চিম কুয়াইশ এলাকার ওসমান আলী মেম্বারের বাড়ির মৃত মো. ইসহাকের ছেলে। সেখানে দেখা যায় আনিসের মা সায়রা বেগম বাড়ির সামনে পেতে রাখা সোফায় বসে বিলাপ করছিলেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সায়রা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে মেরে ফেলেছে। দোসরেরা আমার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলেছে।’ তবে কে বা কারা তাঁকে ডেকে নিয়ে গেছেন, তা স্পষ্ট করে বলতে পারেনি পরিবার।

দাদির পাশেই বসা ছিল নিহত আনিসের দুই সন্তান মোহাম্মদ আনাস (৪) ও হুমাইরা আক্তার (৮)। সবার চোখে কান্না দেখে তাদের চেহারায়ও মলিন ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘বাবা আর নেই’—এটুকু বুঝে থেমে থেমে কান্নায় ভেঙে পড়ছে দুজন।

আনিসের সঙ্গে একইভাবে খুন হন একই এলাকার বিল্লাবাড়ির বাসিন্দা মাসুদ কায়সার। তাঁর গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালী উপজেলায় বলে জানা গেছে। তিনি তাঁর নানাবাড়িতে থেকে পড়ালেখা করেছেন এবং সেখানেই থাকতেন। আনিস ও মাসুদ সব সময় একসঙ্গে থাকতেন বলে জানা গেছে। দুজনই স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন।

মাসুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে পুরো বাড়িতে। মাটিতে বসে কান্নায় বিলাপ করেছিলেন তাঁর খালা ইয়াসমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার বোনের ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হলো, আমি এর বিচার চাই। সে রাজনীতি করত, এটা অপরাধ? এর জন্য তাকে মেরে ফেলতে হবে?’—প্রশ্ন ইয়াসমিন আক্তারের।

স্থানীয়রা বলছেন, আনিস ও মাসুদ স্থানীয় রাজনীতিতে হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুস গণি চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তাঁরা। তবে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে তাঁরা জানেন না। এলাকায় সবার সঙ্গে তাঁদের সখ্য ছিল।

কেন এই হত্যাকাণ্ড—জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, আগের বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে।

রাজনৈতিক বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড হয়েছে কি না, তা জানতে স্থানীয় অন্তত পাঁচজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, এলাকায় দুটি পক্ষ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নানা বিষয় নিয়ে বিরোধ ছিল দুই পক্ষের। এর একটি পক্ষে ছিলেন আনিস ও মাসুদ।

আনিস ও মাসুদকে যে স্থানে গুলি করা হয় সেটি নগরের পাঁচলাইশ ওয়ার্ড ও হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকা। এটি নগরের বায়েজীদ বোস্তামী থানার আওতাধীন। নগরের অনন্যা আবাসিক হয়ে কুয়াইশ সড়কের শেষ প্রান্তে এটি। সড়কের এক পাশে নাহার গার্ডেন রেস্তোরাঁ। অপর পাশে কিছু দূরে চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতাল।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের ভাষ্য, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন আনিস ও মাসুদ। নাহার গার্ডেন রেস্তোরাঁ এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাঁদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। দুর্বৃত্তরা দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন গুলিবিদ্ধ দুজনকে উদ্ধার করেন। আনিস ঘটনাস্থলে ও মাসুদকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বায়েজীদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনজয় কুমার সিনহা প্রথম আলোকে বলেন, ময়নাতদন্তের পর লাশ পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এ ঘটনায় মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে।

শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের সামনে এখন যে রাস্তাগুলো খোলা

নয়া দিগন্তঃ গত মাসেও যিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন, সেই শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন তিন সপ্তাহেরও ওপর হয়ে গেল। বেশ গোপনীয়তা ও কড়া সুরক্ষার মধ্যে ভারত সরকার আপাতত তার (সাথে তার ছোট বোন শেখ রেহানার) থাকার ব্যবস্থা করেছে ঠিকই, কিন্তু তার সম্পর্কে কী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছুই জানায়নি।

এরই মধ্যে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার ‘ডিপ্লোম্যাটিক’ বা অফিশিয়াল পাসপোর্ট প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় ভারতে এখন তার অবস্থানের বৈধ ভিত্তিটা কী, সে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।

এই পটভূমিতে দিল্লিতে ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের সাথে কথা বলে যেটা আভাস পেয়েছে, তা হলো এই মুহূর্তে শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের সামনে কার্যত তিনটি ‘অপশন’ বা রাস্তা খোলা আছে।

প্রথম রাস্তাটা হলো, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৃতীয় কোনো দেশে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, যেখানে তিনি নিরাপদে ও সুরক্ষিত পরিবেশে থাকার নিশ্চয়তা পাবেন।

দ্বিতীয় অপশনটা হলো, শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় (পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম) দিয়ে ভারতেই এখনকার মতো রেখে দেয়া।

তৃতীয় পথটার হয়তো এখনই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, কিন্তু ভারতে কর্মকর্তা ও পর্যবেক্ষকদের একটা অংশ বিশ্বাস করেন কিছুদিন পরে উপযুক্ত পরিস্থিতি এলে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ‘রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনে’র জন্যও ভারত চেষ্টা করতে পারে। কারণ দল বা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ এখনো ফুরিয়ে যায়নি এবং দলের সর্বোচ্চ নেত্রী হিসেবে তিনি দেশে ফিরে সংগঠনের হাল ধরতেই পারেন!

এর মধ্যে ভারতের কাছে অপশন হিসেবে প্রথমটাই যে ‘সেরা’- তা নিয়েও অবশ্য কূটনৈতিক বা থিঙ্কট্যাঙ্ক মহলে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ তিনি ভারতেই রয়ে গেলে সেটা আগামী দিনে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

এর পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য ঢাকার কাছ থেকে যদি কোনো অনুরোধ আসে, সেটা যেকোনো না কোনো যুক্তিতে দিল্লি খারিজ করে দেবে তাও একরকম নিশ্চিত।

কাজেই শেখ হাসিনাকে বিচারের জন্য বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়াটাকে ভারতের জন্য কোনো বাস্তবসম্মত ‘অপশন’ বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন না।

সুতরাং অন্যভাবে বললে, শেখ হাসিনাকে নিয়ে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের সামনে ওপরে উল্লিখিত তিনটে রাস্তাই খোলা থাকছে।

এই প্রতিটি অপশনের ভালোমন্দ, গুণাগণ বা সম্ভাব্যতা কী বা কতটা- এই প্রতিবেদনে সে দিকেই নজর দেয়া হয়েছে।

তৃতীয় কোনো বন্ধু দেশে পাঠানো?
ভারতের সর্বশেষ সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার এবারের ভারতে আসাটা ছিল ‘সাময়িক’।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ৬ আগস্ট দেশটির পার্লামেন্টে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে বিবৃতি দিতে গিয়ে এ প্রসঙ্গে ‘ফর দ্য মোমেন্ট’ (তখনকার মতো) কথাটা ব্যবহার করেছিলেন এবং তারপর থেকে ভারত সরকার আর এ বিষয়ে নতুন করে কোনো ভাষ্য দেয়নি।

এর কারণ হলো, শেখ হাসিনাকে নিরাপদ কোনো তৃতীয় দেশে পাঠানোর চেষ্টা এখনো পুরোদস্তুর অব্যাহত আছে। তবে সেটা যদি চট করে সফল নাও হয়, তাহলে দিল্লিও তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে ‘যত দিন খুশি’ ভারতে রাখতে কোনো দ্বিধা করবে না।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার কথায়, ‘উই আর হোপিং ফর দ্য বেস্ট, প্রিপেয়ারিং ফর দ্য ওয়র্স্ট!’

অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ভারত এখনো আশা করছে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালোটাই ঘটবে (তৃতীয় কোনো বন্ধু দেশে তিনি গিয়ে থাকতে পারবেন), কিন্তু সেটা যদি কোনো কারণে সম্ভব না হয় তাহলে সবচেয়ে খারাপটার জন্যও (শেখ হাসিনাকে লম্বা সময়ের জন্য ভারতেই রেখে দিতে হবে) দিল্লি প্রস্তুত থাকবে।

জানা গেছে, শেখ হাসিনার যুক্তরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তাব প্রথমেই বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার পর ইউএই (সংযুক্ত আরব আমিরাত), সৌদি আরব ও ইউরোপের দু-একটি ছোটখাটো দেশের সাথে ভারত এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিল।

যদিও এই সব আলোচনায় তেমন একটা অগ্রগতি হয়েছে বলে খবর নেই। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের আর একটি প্রভাবশালী দেশ কাতারের সাথে ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে কথাবার্তা শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে।

তবে পাশাপাশি এটাও ঠিক, শেখ হাসিনা নিজে এখনো কোনো দেশে ‘লিখিত আবেদন’ করেননি। যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র তো নয়ই, এসব দেশগুলোতেও না। তার হয়ে এবং তার মৌখিক সম্মতির ভিত্তিতে যাবতীয় কথাবার্তা ভারত সরকারই চালাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, যদি তৃতীয় কোনো দেশ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিতে রাজিও হয় তাহলে কোন পাসপোর্টে তিনি দিল্লি থেকে সেখানে সফর করবেন?

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস বলেন, ‘এটা কিন্তু বড় কোনো সমস্যা নয়। বাংলাদেশ সরকার যদি তার পাসপোর্ট বাতিলও করে দিয়ে থাকে, ভারত সরকারের ইস্যু করা ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট বা পারমিট দিয়েই তিনি অনায়াসেই তৃতীয় দেশে যেতে পারবেন। যেমন ধরুন, ভারতে এরকম হাজার হাজার তিব্বতি শরণার্থী আছেন যারা জীবনে কখনো ভারতের পাসপোর্ট নেননি। এই বিদেশীদের জন্য ভারত একটি ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট (সংক্ষেপে টিডি) ইস্যু করে থাকে, সেটা দিয়েই তারা সারা পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছেন।’

অর্থাৎ ধরা যাক, যদি ‘এক্স’ নামক দেশ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়, তাহলে ভারতের জারি করা ট্র্যাভেল ডকুমেন্টে দিল্লিতে ‘এক্স’ দেশের দূতাবাস ভিসা দিলেই তিনি অনায়াসে সেই দেশে যেতে পারবেন এবং থাকতে পারবেন।

রিভা গাঙ্গুলি দাস যোগ করেন, ‘এই নিয়মগুলো সাধারণ ব্যক্তিবিশেষ বা ইন্ডিভিজুয়ালদের জন্য। মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনার সেটা ছাড়াও একটা বিরাট পলিটিক্যাল প্রোফাইল আছে, যেটা তার ক্ষেত্রে নিয়মকানুনগুলোকে অনেক সহজ করে তুলতে পারে!’

রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান?
একান্ত প্রয়োজন হলে শেখ হাসিনাকে ভারতেই রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে রেখে দিতে যে ভারত যে দ্বিধা করবে না, সেই ইঙ্গিতও কিন্তু দিল্লিতে এখন পাওয়া যাচ্ছে।

অতীতে তিব্বতি ধর্মগুরু দালাই লামা, নেপালের রাজা ত্রিভুবন বীর বিক্রম শাহ বা আফগান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর মতো বহু বিদেশী নেতাকে ভারত রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে, এমনকি শেখ হাসিনা নিজেও ১৯৭৫ সালে সপরিবার ভারতের আতিথেয়তা পেয়েছিলেন।

তবে এই পদক্ষেপ যদি একান্তই নিতে হয়, তবে ভারত-বাংলাদেশ দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার প্রভাব কী পড়বে, সেটাও দিল্লিকে খেয়াল রাখতে হবে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৯৫৯ সালে দালাই লামাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়ার পর থেকে ভারত-চীন সম্পর্কে যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল, আজ ৬৫ বছর পরেও কিন্তু তার রেশ রয়ে গেছে।

দালাই লামাকে ভারতে বা আন্তর্জাতিক বিশ্বে যতই শ্রদ্ধার চোখে দেখা হোক, দিল্লি ও বেজিংয়ের মধ্যে সম্পর্কে তিনি বরাবর ‘অস্বস্তির কাঁটা’ হিসেবেই থেকে গেছেন।

ভারতেও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, শেখ হাসিনাকে ভারত যদি আশ্রয় দিয়ে রেখে দেয় তাহলে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেটা অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে।

দিল্লিতে আইডিএসএ-এর সিনিয়র ফেলো স্ম্রুতি পট্টনায়ক যেমন বলছেন, ‘যে আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছে, তাতে একটা স্পষ্ট ভারত-বিরোধী চেহারাও ছিল। সেটা যেমন হাসিনা-বিরোধী আন্দোলন ছিল, তেমনি ছিল ভারত-বিরোধীও!’

তিনি বলেন, ‘এখন যদি সেই ভারতই তাকে আশ্রয় দেয় তাহলে বাংলাদেশে তা একটা ভুল বার্তা দেবে এবং ভারত-বিরোধী সেন্টিমেন্টকে অবশ্যই আরো উসকে দেবে।’

এই সমস্যার কথা ভারত সরকারও খুব ভালোভাবেই জানে। তারপরও প্রথম ‘অপশন’টা যদি কাজ না করে, তাহলে এই দ্বিতীয় ‘অপশন’টার দিকে তাদের বাধ্য হয়েই ঝুঁকতে হবে, কারণ দীর্ঘদিনের বন্ধু শেখ হাসিনার বিপদে তার পাশে না দাঁড়ানো কোনোমতেই সম্ভব নয়!

‘রাজনৈতিক কামব্যাকে’ সাহায্য করা?

ভারতে সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের পর্যায়ে একটা প্রভাবশালী মহল এখনো বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে শেখ হাসিনা মোটেই ‘চিরতরে ফুরিয়ে যাননি’ এবং উপযুক্ত সময় ও পরিবেশ এলে ভারতের উচিত হবে তার ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসনে’ সাহায্য করা।

এই চিন্তাধারায় বিশ্বাস করেন, এমনই একজন কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা অন্তত তিন-তিনবার দুর্ধর্ষ কামব্যাক করেছেন- ৮১তে, ৯৬তে আর ২০০৮-এ! এই তিনবারই অনেকে ভেবেছিলেন, তার পক্ষে হয়তো ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব না। কিন্তু প্রতিবারই তিনি তাদের ভুল প্রমাণ করেছেন!’

তবে এটাও মনে রাখার, তখন কিন্তু তার বয়স অনেক কম ছিল। আর এখন তিনি ৭৬ পেরিয়ে সামনের মাসেই ৭৭ পূর্ণ করতে চলেছেন, সেটা কি কোনো বাধা হবে না?

জবাবে ওই কর্মকর্তা বলছেন, ‘বয়স হয়তো পুরোপুরি তার সাথে নেই, কিন্তু ৮৪ বছর বয়সে মুহাম্মদ ইউনূস যদি জীবনে প্রথম সরকারের প্রধান হতে পারেন, তাহলে তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট শেখ হাসিনা পারবেন না, কেন আমরা এটা ধরে নিচ্ছি?’

আসল কথাটা হলো, শেখ হাসিনা একদিন বাংলাদেশে ফিরে আবার আওয়ামী লীগের হাল ধরতে পারেন- দিল্লিতে একটা অংশ খুব ‘সিরিয়াসলি’ এই কথাটা বিশ্বাস করেন।

এটার জন্য ভারতকে দরকার হলে সে দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর এবং প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর ওপরেও চাপ দিতে হবে বলে তারা যুক্তি দিচ্ছেন।

তারা আরো বলছেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন নয়, সারাদেশে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক আছে- সেই দলের সর্বোচ্চ নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা আগামী দিনে বাংলাদেশে ফিরতেই পারেন।

তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোতেও তিনি বিচারের সম্মুখীন হতে পারেন, হয়তো পরবর্তী নির্বাচনে তার লড়ার ক্ষেত্রেও বাধা থাকতে পারে। কিন্তু তার দেশে ফেরার রাস্তা এবং রাজনীতিতে নতুন করে প্রবেশ বন্ধ করাটা কঠিন বলেই এই মহলের অভিমত।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত আবার মনে করেন, আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করতে ভারত প্রচ্ছন্ন সমর্থন হয়তো দিতেই পারে, কিন্তু শেখ হাসিনাকে পুনর্বাসিত করাটা খুবই কঠিন কাজ হবে।

তিনি বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে শেখ হাসিনাকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আমি মনে করি না। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারবে নিশ্চয়, কারণ তাদের নিশ্চিহ্ন করা অত সহজ নয়, কিন্তু দলের নেতৃত্বে বড়সড় পরিবর্তন আনা ছাড়া কোনো উপায় নেই!’

ফলে বাংলাদেশে পরবর্তী নির্বাচন যখনই হোক, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তাতে লড়ছে এটাকে তিনি অন্তত কোনো বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট (ফিজিবল সিনারিও) বলে মনে করছেন না।

কিন্তু বিগত প্রায় ৫০ বছর ধরে শেখ হাসিনার ওপর ভারত যে পরিমাণ ‘রাজনৈতিক বিনিয়োগ’ করেছে তাতে দিল্লির একটা প্রভাবশালী অংশ তাকে এখনই খরচের খাতায় ফেলতে কিছুতেই রাজি নন!

পাসপোর্ট বাতিলের পর
গত সপ্তাহেই বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, শেখ হাসিনা যখন দেশত্যাগ করেন তখন তার ‘ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট’ বহাল ছিল এবং এটির সুবাদেই তিনি অন্তত ৪৫ দিন বিনা ভিসায় ভারতে থাকতে পারবেন।

বিবিসিতে এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর দিনই তড়িঘড়ি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীর সরকার শেখ হাসিনাসহ বিগত আওয়ামী লীগ সময়ের মন্ত্রী-এমপিদের নামে ইস্যু করা সব কূটনৈতিক পাসপোর্ট ‘রিভোকড’ (প্রত্যাহার) ঘোষণা করে।

তাহলে এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, পাসপোর্ট প্রত্যাহারের পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বৈধ ভিত্তিটা কী?

ভারতের সাবেক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদ পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী দীর্ঘদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রোটোকল ডিভিশনের প্রধান ছিলেন। তিনি কিন্তু জানাচ্ছেন, ভারতে শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান ‘টেকনিক্যালি সম্পূর্ণ বৈধ’।

তিনি বলেন, ‘যে মুহূর্তে তিনি ভারতে পা রেখেছেন, সে তিনি ভিসা-ফ্রি রেজিমেই আসুন বা অন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থায় তার (ওই সময়ের) বৈধ পাসপোর্টে একটা অ্যারাইভাল স্ট্যাম্প তো মারা হয়েছে, নাকি? সেই স্ট্যাম্পটা মারার অর্থই হলো ভারতে তার এই প্রবেশ আর থাকাটা সেই মুহূর্ত থেকেই বৈধ। এরপর যদি তার দেশ তার পাসপোর্ট বাতিলও করে, ভারতের তাতে কিছু আসে যায় না।’

ভারতকে যদি এই পাসপোর্ট বাতিলের কথা কূটনৈতিক চ্যানেলে জানানোও হয়, তার ভিত্তিতে ভারত অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থাও নিতে পারে।

তিনি যেমন বলছেন, ‘এরপরও কিন্তু নরমাল বাংলাদেশী পাসপোর্টের আবেদন করার জন্য শেখ হাসিনার অধিকার থেকেই যাবে। ধরে নিলাম নতুন বাংলাদেশ সরকার সেই আবেদন মঞ্জুর করবে না, কিন্তু একবার আবেদন করলেই ভারতের চোখে অন্তত তার এ দেশে থাকাটা সম্পূর্ণ আইনসম্মত ধরা হবে। আর যদি তর্কের খাতিরে এটাও ধরে নিই, শেখ হাসিনা স্টেটলেস রা রাষ্ট্রহীন হয়ে গেলেন, তাহলেও ভারতের ইস্যু করা ট্র্যাভেল আইডেন্টিটি কার্ড বা ট্র্যাভেল পারমিট দিয়েও তিনি অনায়াসে তৃতীয় কোনো দেশে সফর করতে পারবেন।’

আর ইতোমধ্যে ভারত যদি তাকে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ মঞ্জুর করে, তাহলে তার ভিত্তিতে ‘যত দিন খুশি’ তিনি দেশটিতে থাকতে পারবেন।

সোজা কথায়, শেখ হাসিনার ভারতে থাকার বৈধতা নিয়ে এখনো কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হয়নি, আর পরে তৈরি হলেও সেটাকে পাশ কাটানোর বা বৈধতা দেয়ার অনেক রাস্তা আছে, এটাই সাবেক ওই কূটনীতিবিদের অভিমত।
সূত্র : বিবিসি

যুদ্ধের আড়ালে ফিলিস্তিনিদের ভূমি যেভাবে দখল করছে ইসরাইল

নয়া দিগন্তঃ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মধ্যে একটা হলো ফিলিস্তিনের বাত্তির। সেখানকার জলপাই বাগান এবং আঙুরক্ষেতের জন্য পরিচিত এই গ্রাম। সেখানে প্রাকৃতিক ঝর্ণার পানি ব্যবহার করা হয় সেচের কাজে। কয়েক শতাব্দী ধরে এইভাবেই জীবন বয়ে চলেছে সেখানে।

প্রকৃতির কোলঘেঁষা সেই গ্রামই অধিকৃত ‘ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক’ বা পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনের সর্বশেষ ‘ফ্ল্যাশপয়েন্টে’ পরিণত হয়েছে।

ইসরাইল সেখানে একটা নতুন ইহুদি বসতি স্থাপন বা ‘সেটলমেন্ট’-এর অনুমোদন দিয়েছে। এই নতুন বসতির জন্য কেড়ে নেয়া হয়েছে বহু মানুষের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি। শুধু তাই নয়, অনুমোদন ছাড়াই নতুন ইসরাইলি ফাঁড়িও স্থাপন করা হয়েছে।

যাদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি এই নতুন বসতি স্থাপনের জন্য কেড়ে নেয়া হয়েছে তাদের তালিকায় রয়েছে ঘাসান ওলিয়ান। তিনি বলেন, ‘নিজেদের স্বপ্ন গড়তে আমাদের জমি চুরি করছে ওরা।’

ইউনেস্কো জানিয়েছে, বাত্তিরকে ঘিরে বসতি স্থাপনকারীদের পরিকল্পনা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তবে ওই গ্রাম কিন্তু একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এ জাতীয় ‘সেটলমেন্ট’কে অবৈধ হিসেবে দেখা হয়। যদিও এই বিষয়ে ইসরাইল সহমত পোষণ করে না।

ওলিয়ান বলেন, ‘ওরা আন্তর্জাতিক আইন, স্থানীয় আইন, এমন কী আল্লাহর আইনকেও তোয়াক্কা করে না।’

গত সপ্তাহে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা প্রধান রোনেন বার মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে তাদের সতর্ক করেছিলেন। সেই চিঠিতে রোনেন বার উল্লেখ করেন, পশ্চিম তীরের ইহুদি চরমপন্থীরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী’ কাজ চালাচ্ছে এবং দেশের ‘অবর্ণনীয় ক্ষতি’ করছে।

গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই কিন্তু অধিকৃত পশ্চিম তীরে দ্রুত বসতি স্থাপন হচ্ছে।

ইসরাইল সরকারের থাকা চরমপন্থীরা অবশ্য ‘গর্ব’ করে বলেন এই পরিবর্তন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে বাধা দেবে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, নিজেদের ‘লক্ষ্য’ পূরণের জন্য গাজায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চাইছে এই চরমপন্থীরা।

বসতি স্থাপনের বিষয়ে পর্যবেক্ষণকারী ইসরাইলি সংস্থা ‘পিস নাও’-এর ইয়োনাতান মিজরাহি বলেন, ‘ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের চরমপন্থী ইহুদিরা ইতিমধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরো বাড়িয়ে তুলছে এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান ঘটানোর বিষয়টাকেও কঠিন করেছে।’

তার মতে, ৭ অক্টোবরের হামলা পর ইসরাইলি সমাজে ‘ক্রোধ ও ভয়ের মিশ্রণ’ রয়েছে। ওই হামলার পর থেকে জমি দখল করে বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে ‘গতি এসেছে’ বলেও জানান তিনি। তার কারণ যারা জমি দখল করছেন, তাদের প্রশ্ন করার কেউ নেই।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জুন মাসের একটা সমীক্ষা বলছে ৪০ শতাংশ ইসরাইলের মানুষ বিশ্বাস করেন, এই বসতি স্থাপন তাদের দেশকে নিরাপদ করেছে। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৭ শতাংশ।

অন্যদিকে জুন মাসের ওই জরিপে অংশ নেয়া ৩৫ শতাংশ মানুষ আবার মনে করেন, বসতি স্থাপনের কারণে ইসরাইলের নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগের জরিপে ওই পরিসংখ্যান ছিল ৪২ শতাংশ।

ইয়োনাতান মিজরাহি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, পশ্চিম তীরের ইহুদি চরমপন্থীরা পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। একইসাথে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান ঘটানোর বিষয়টাকেও আগের চেয়ে কঠিন করে তুলছে।

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে ঘৃণা বাড়ছে।’

এই জাতীয় ঘটনায় বৃদ্ধি আগেই দেখা গিয়েছিল। কিন্তু গত ১০ মাসে এমন ১ হাজার ২৭০টা হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে জাতিসঙ্ঘ। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮৫৬।

ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা বেটসেলেমের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের কারণে অন্তত পশ্চিম তীরের ১৮টা গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন ফিলিস্তিনিরা। ইসরাইল ও জর্ডনের মধ্যবর্তী এই ফিলিস্তিনি অঞ্চল ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে সময় দখল করেছিল ইসরাইল। তখন থেকে এই অংশ তাদের দখলেই রয়েছে।

জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের আগস্ট মাসের মধ্যে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে ৫৮৯ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৫৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে ইসরাইলির বাহিনীর হাতে এবং অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বসতি স্থাপনকারীদের হাতে।

জাতিসঙ্ঘের মতে, এদের মধ্যে কেউ কেউ হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে জানা গিয়েছে, আবার এই তালিকায় নিরস্ত্র বেসামরিক লোকজনও রয়েছে।

আবার অন্য দিকে, ওই একই সময়ে ফিলিস্তিনিরা পাঁচজন ‘সেটলার’ বা বসতি স্থাপনকারী ও ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর নয়জন সদস্যকে হত্যা করেছে।

চলতি সপ্তাহে বেথেলহেমের কাছে ওয়াদি আল-রাহেলে বসতি স্থাপনকারী ও ইসরাইলি সেনারা প্রবেশ করে। সেখানে ৪০ বছরের এক ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এর আগেও কাছাকাছি থাকা একটা ইসরাইলি গাড়ি লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়া হয়েছিল।

গত মাসে জিট গ্রামে জায়গা দখলের উদ্দেশ্যে ঢুকে পড়া কয়েক কিছু লোক তাণ্ডব চালালে ২২ বছরের এক ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক স্তরে নিন্দা করা হয়।

ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী এই ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করেছ। তাদের পক্ষ থেকে একে ‘মারাত্মক সন্ত্রাসী ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

কিন্তু এই পদক্ষেপ ‘দায়মুক্ত’ করার জন্য বলেই মনে করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

ইসরাইলি নাগরিক অধিকার গোষ্ঠী ‘ইয়েশ দিন’-এর তথ্য বলছে ২০০৫ থেকে ২০২৩ সালে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্তের পর মাত্র তিন শতাংশ দোষী সাব্যস্ত হয়েছে।

ইসরাইলি গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া রোনেন বারের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল ‘লঘু আইনি পদক্ষেপই’ চরমপন্থী দখলদারদের ‘উৎসাহ’ দিয়েছিল।

‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’
পশ্চিম তীরের কিছু অংশে একচেটিয়াভাবে প্রতিষ্ঠিত ইহুদি সম্প্রদায়ের মাঝেই বাস করছে এই নতুন বসতি স্থাপনকারীরা।

এর মধ্যে অনেক বসতিতেই ইসরায়েলি সরকারের আইনি সমর্থন রয়েছে। অন্য বসতি যা ‘আউট পোস্ট’ বা ফাঁড়ি হিসেবে পরিচিত সেগুলো বেশিভাগই কাফেলা এবং লোহার তৈরি ছাউনির মতো সাধারণ।

এগুলো কিন্তু ইসরায়েলের আইনের চোখেও অবৈধ। কিন্তু চরমপন্থীরা আরো বেশি জমি দখলের করার উদ্দেশ্য নিয়ে এগুলো তৈরি করে।

জুলাই মাসে, যখন জাতিসঙ্ঘের শীর্ষ আদালত প্রথমবার জানতে পারে পূর্ব জেরুসালেম-সহ পশ্চিম তীরে ইসরাইলের দখল অবৈধ, তখন ওই দেশকে বসতি স্থাপন সংক্রান্ত সমস্ত কার্যকলাপ বন্ধ এবং যত দ্রুত সম্ভব সেনা প্রত্যাহার করতে কথা বলা হয়।

ইসরাইলের পাশ্চাত্যের মিত্ররা কিন্তু বারবার এই বসতি স্থাপনকে শান্তি আনার পথে অন্তরায় বলে আখ্যা দিয়ে এসেছে। ইসরাইল অবশ্য এই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, ‘ইহুদিরা তাদের নিজেদের জমিতে কোনোভাবেই দখলদার নয়।’

এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের এই পদক্ষেপকে যাতে কোনোভাবেই বন্ধ না করা যায়, তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে চরমপন্থীরা।

ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে উগ্র-ডানপন্থী সরকারের সমর্থন পেয়ে ওই অঞ্চলে দ্রুত তাদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করেছে।

পশ্চিম তীরে সংযুক্তির পরিকল্পনাকে আরো মজবুত করছে এই চরমপন্থীরা। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে গাজায় বসতি স্থাপনের জন্য প্রকাশ্যে আহ্বানও জানাচ্ছে।

নতুন বসতি স্থাপনকারীদের অনেকেই এখন ইসরাইল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত।

একদিকে পশ্চিম তীরে এই বসতি স্থাপনের বিরোধিতাকারী বিশ্বনেতারা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের জন্য নতুন করে উৎসাহ দিচ্ছেন, শান্তি আনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা বলছেন।

আর অন্যদিকে ইসরায়েলের জাতীয়তাবাদীরা যারা বিশ্বাস করে এই পুরো জমি তাদের (ইসরায়েলের) মালিকানাধীন, তারা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বপ্নকে ‘অসম্ভব’ করে তুলতে সচেষ্ট।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ কারণেই কিছু রাজনীতিবিদ যুদ্ধবিরতি চুক্তি মানতে নারাজ।

টাইমস অফ ইসরাইলের রাজনৈতিক সংবাদদাতা টাল স্নাইডার বলেন, ‘তারা সংঘাতের অবসান ঘটাতে চায় না বা জিম্মি চুক্তিতে যেতে চায় না কারণ তারা বিশ্বাস করে যে ইসরাইলের লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিত যতক্ষণ না তারা গাজার ভেতরে থাকতে পারে। তারা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা পোষণ করেন এবং মনে করে তাদের মতাদর্শ বেশি ন্যায়সঙ্গত। এটা অবশ্য তাদের নিজস্ব যুক্তি।’

ইতোমধ্যে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ পাঁচটা নতুন বসতির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে বাত্তিরের বসতি এবং রাষ্ট্রের জন্য কমপক্ষে ২৩ বর্গ কিলোমিটার ক্ষেত্র।

এর অর্থ হলো ইসরাইল এই জমিকে তাদের নিজেদের বলে মনে করে, তা সে অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলেই হোক বা ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হোক কিংবা দু’টিই।

স্থলভাগে তথ্য পরিবর্তন করে এই দখলদাররা বিপুল সংখ্যক ইসরাইলিদের ওই জমিতে স্থানান্তরিত করতে চায় যাতে তাদের উপস্থিতির জানান দেয়া যেতে পারে। এবং দীর্ঘমেয়াদে এই ভূখণ্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা দখল করবে।

এদিকে, রাষ্ট্র অনুমোদিত ভূমি দখলের বাইরে চরমপন্থীরাও কিন্তু ওই অঞ্চলে দ্রুত বসতি স্থাপন করেছে।

হেবরনের উত্তরে আল-কানুবের একটা স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যে নতুন কাফেলা এবং রাস্তা নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে ওই অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

ইব্রাহিম শালালদা (৫০) এবং তার ৮০ বছর বয়সী চাচা মোহাম্মদের সাথে আমরা আল-কানুবের দিকে রওনা হলাম। তারা আমাদের জানিয়েছিলেন কিভাবে গত বছরের নভেম্বরে বসতি স্থাপনকারীরা তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করে দিয়েছে।

আমরা কাছাকাছি আসতেই একজন চরমপন্থী (ওই অঞ্চলে দখলদারদের মধ্যে একজন) তার গাড়ি নিয়ে আমাদের রাস্তা আটকায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সশস্ত্র ইসরাইলিরা সেখানে পৌঁছে যায়। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) কয়েকজন সৈন্য এবং সেটেলমেন্ট সিকিউরিটি অফিসার হিসেবে পরিচয় দেয়া এক ব্যক্তি তল্লাশির জন্য আমাদের থামায়।

সেটেলমেন্ট গার্ড আমাদের গাড়ির অন্য দুই যাত্রীকে (দুজন ফিলিস্তিনি) গাড়ি থেকে নামিয়ে তল্লাশি করেন। দু’ঘন্টা পরে, আইডিএফ সৈন্যরা বসতি স্থাপনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং আমাদের (গণমাধ্যমকর্মী) গাড়িকে যেতে দেয়া হয়।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় আগে জর্ডনের কাছ থেকে পশ্চিম তীর দখল করার পরপরই সেখানে বসতি স্থাপন শুরু করে ইসরাইল। তারপর থেকে ক্ষমতায় আসা প্রতিটা সরকারই সেখানে ক্রমবর্ধমান বসতি সম্প্রসারণের অনুমতি দিয়েছে।

বর্তমানে সেখানে (ইসরাইল অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেম বাদে) আনুমানিক ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি ৫ লাখ ইহুদি ইসরাইলির সাথে ১৩০টারও বেশি বসতিতে থাকে।

তবে ২০২২ সালে দায়িত্ব নেয়া একজন সুপরিচিত উগ্র-ডানপন্থী সরকারি নেতা এই সংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

উগ্র-ডানপন্থী নেতা বেজালেল স্মোট্রিচ বিশ্বাস করেন, ওই জমিগুলোতে ইহুদিদের ‘সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত অধিকার’ রয়েছে। তিনি দুটি উগ্র-ডানপন্থী বসতি স্থাপনকারী দলের মধ্যে একটার প্রধান। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০২২ সালের নির্বাচনের পরে তাকে ক্ষমতায় আনেন।

স্মোট্রিচ অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করলেও তিনি একইসাথে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদাধিকারী, যা তাকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার সুযোগ করে দিয়েছে।

নতুন রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোসহ এই বসতিগুলোতে রাষ্ট্রের অর্থ থেকে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছেন তিনি। দ্রুত বসতি নির্মাণের জন্য নতুন আমলাতন্ত্রও তৈরি করেছেন।

গোপনে রেকর্ড করা কথোপকথনে তাকে সমর্থকদের কাছে গর্ব করে বলতে শোনা গিয়েছে, তিনি সিস্টেমের ‘ডিএনএ পরিবর্তন’ করেছেন এবং পশ্চিম তীরে সংযুক্তির জন্য তার যে পদক্ষেপ তা ‘আন্তর্জাতিক এবং আইনি প্রেক্ষাপটে’ নিরিখে কার্যকর।

‘আমার জীবনের উদ্দেশ্য’
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা কয়েক দশক ধরে ইসরাইলি রাজনীতির একেবারে প্রান্তে ছিল। কিন্তু তাদের মতাদর্শ ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে এই দলগুলো ১২০টা আসনের ইসরাইলি সংসদে ১৩টা আসন দখল করে। নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটে ‘কিংমেকারে’ পরিণত হয় এই দলগুলো।

যুদ্ধের সময়, বেজালেল স্মোট্রিচ এবং সহকর্মী উগ্রপন্থী ইতামার বেন-গভির, বর্তমানে ইসরায়েলের জাতীয় সুরক্ষা মন্ত্রী, বারবার সামাজিক বিভাজনমূলক মন্তব্য করেছেন যা তাদের পাশ্চাত্যের মিত্রদের উসকে দিয়েছে।

এক ফিলিস্তিনি বন্দীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ‘রিজারভিস্ট’ বা অতিরিক্ত বাহিনীভুক্ত সৈনিকদের গ্রেফতার করার পর বেন গভির বলেন, ‘আমাদের সেরা বীরদের’ গ্রেফতার করার পদক্ষেপ ইসরাইলের জন্য ‘লজ্জাজনক’।

চলতি মাসে স্মোট্রিচ বলেছিলেন, গাজাবাসীকে অনাহারে রাখা ‘ন্যায়সঙ্গত ও নৈতিক’ হতে পারে।

কিন্তু পশ্চিম তীর ও গাজায় উগ্র ডানপন্থীরা স্থায়ী পরিবর্তন আনতে চাইছে।

প্রবীণ ইসরাইলি সাংবাদিক ও দ্য ইকোনমিস্টের সংবাদদাতা আনশেল ফেফার বলেন, ‘ইসরাইলিদের এই গোষ্ঠী ফিলিস্তিনি বা ইসরাইলের অন্যান্য আরব প্রতিবেশীদের সাথে কোনো রকমের সমঝোতার বিরোধী।’

আর গাজায় যুদ্ধের কারণে উগ্র-ডানপন্থীরা নতুন সুযোগ পেয়েছে।

স্মোট্রিচ ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ইসরায়েলিদের জন্য পথ প্রশস্ত হয়।

যদিও নেতানিয়াহু গাজায় ইহুদি বসতি পুনঃস্থাপনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও উগ্র-ডানপন্থী দলগুলোর সাথে তার বর্তমান সমীকরণ লক্ষ্যনীয়। তারা নেতানিয়াহুকে ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছে যে তিনি যদি হামাসের হাতে আটক ইসরাইলি পণবন্দীদের দেশে ফিরিয়ে নিতে ‘বেপরোয়া’ যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তবে এই জোট তারা ভেঙে দেবে।

চরমপন্থীদের যুক্তি হয়তো সংখ্যালঘু ইসরাইলিরাই অনুসরণ করে। কিন্তু এটা যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছে এবং নাটকীয়ভাবে পশ্চিম তীরের দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে- যা শান্তি স্থাপনের পথে বাধা হয়েও দাঁড়াচ্ছে।
সূত্র : বিবিসি

গাজায় তিন দিন যুদ্ধ বন্ধ রাখবে ইসরায়েল : ডব্লিউএইচও

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় তিন দিনের জন্য যুদ্ধ বন্ধ রাখবে ইসরায়েল। গাজায় পোলিওর ভয়াবহ সংক্রমণের ফলে টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বিরতিতে সম্মত হয়েছে তারা।

শুক্রবার (৩০ আগস্ট) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ডব্লিউএইচওর এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ও ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা তিন দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এ সময়ে প্রথম দফায় গাজার ছয় লাখ ৪০ হাজার শিশুকে পোলিও টিকা দেওয়া হবে।

ফিলিস্তিনের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তা রিক পিপারকর্ন বলেন, রোববার (০১ সেপ্টেম্বর) থেকে গাজায় পোলিওর টিকা দেওয়া শুরু হবে। এ তিন দিন স্থানীয় সময় সকাল ৬টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত সময়ে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। এ সময়েই টিকা দেওয়া হবে।

গাজায় পয়োব্যবস্থার অভাব, স্বাস্থ্যসেবায় প্রতিবন্ধকতা ও টিকা সংকটে পোলিওর ভয়াবহ সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি এটি ইসরায়েলেও ছড়াতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন এবং জাতিসংঘের কর্মকর্তারা গাজায় টিকাদান কর্মসূচির জন্য ইসরায়েলের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। তাদের চাপের মুখে এ বিরতিতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল।

এদিকে গাজায় টিকাদানের জন্য যুদ্ধবিরতি কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সংগঠনটির নেতা বাসেম নাইম বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে হামাস আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।

মানবিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ায় এটিকে স্বাগত জানিয়েছেন দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামেদ এলমাসরি। এ ছাড়া তিনি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন।

গাজায় টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে জাতিসংঘের দুই হাজারের বেশি কর্মী প্রস্তুত রয়েছেন। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন দিনের মধ্যে টিকাদান কর্মসূচি শেষ করা সম্ভব না হলে তাদের অতিরিক্ত সময় দেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

তুরস্কের হাতে যাচ্ছে ইউরোপের জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ

পশ্চিমা মদদপুষ্ট ইউক্রেন ও অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়ার মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ময়দানে যেন তুরস্কের ভাগ্য লেখা হচ্ছে। এ যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো প্রকাশ্যে দুই ভাগ হয়ে গেলেও দুই নৌকায় পা দিয়ে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। সবশেষ রুশ জ্বালানি রপ্তানি থেকেও বিপুল সুবিধা পেতে যাচ্ছে তুরস্ক।

তুর্কি সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহর প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাস রপ্তানি নিয়ে ইউরোপিয়ান ভোক্তাদের সতর্ক করেছে রাশিয়া। বলা হচ্ছে, ইউক্রেন যদি রাশিয়ার সঙ্গে গ্যাস ট্রানজিট চুক্তি নবায়ন না করে তবে ইউরোপীয় ভোক্তাদের চড়া মূল্যে গ্যাস কিনতে হবে। রাশিয়া-ইউক্রেনের এ চুক্তি চলতি বছরের শেষ দিন সমাপ্ত হবে।

এদিকে, চলমান যুদ্ধের মধ্যে গ্যাস ট্রানজিট চুক্তি নবায়ন করার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে ইউক্রেন। এমনটা হলে রুশ গ্যাস রপ্তানির অন্যতম ট্রানজিট হয়ে উঠতে পারে তুরস্ক। এমনটা জানিয়েছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। বুধবার (২৮ আগস্ট) নিয়মিত সম্মেলনে পেসকভ জানান, যদি ইউক্রেন চুক্তি বাড়াতে সম্মত না হয় তবে তুরস্কে একটি গ্যাস হাব তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত কার্যক্রম অগ্রগতির দিকে আছে বলেও জানান তিনি।

রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেন বাহিনী ঢুকে পড়ায় হুমকির মুখে পড়েছে রুশ গ্যাস ট্রানজিট। সেখানে গ্যাস ট্রানজিট পয়েন্ট সুডজা অবস্থিত। ফলে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

পেসকভ জানান, ইউক্রেন যদি নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তবে তা ইউরোপীয় ভোক্তাদের জন্য চরম খারাপ খবর ডেকে আনবে। কারণ অন্য বিক্রেতাদের কাছ থেকে জ্বালানি ক্রয়ের জন্য তাদের প্রচুর অর্থ খরচ করত হবে। এমনকি মার্কিন এলএনজি কিনতে চাইলেও তারা সস্তায় তা পাবে না।

২০২২ সালে ইউরোপের হারিয়ে যাওয়া ভোক্তাদের ফিরে পেতে তুরস্কে একটি গ্যাস হাব স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়া। দীর্ঘদিন ধরে আঙ্কারাও চাইছিল জ্বালানি খাতের অন্যতম বিনিময়কারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। এ বিষয়ে এখনো রুশ ও তুর্কি কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানা যায়। তারা বর্তমানে এ প্রকল্পের রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছেন।

‘সংবিধান পুনর্লিখন করতে হবে’ -ড. আলী রীয়াজ

বর্তমান সংবিধান সংশোধনের উপায় সীমিত উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিসটিংগুইশ অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠিক করতে সংবিধান পুনর্লিখন করা জরুরি। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান পুনর্লিখনের কথা বলছি এই কারণে যে সংবিধান সংশোধনের উপায় নেই।  

বর্তমান সংবিধান সংশোধনের উপায় সীমিত। কারণ, সংবিধানের এক-তৃতীয়াংশ এমনভাবে লেখা যে তাতে হাতই দেয়া যাবে না। এর মধ্যে এমন সব বিষয় আছে, যেগুলো না সরালে কোনোকিছুই করতে পারবেন না। এ কারণে পুনর্লিখন শব্দটা আসছে। পুনর্লিখনের পথ হিসেবে গণপরিষদের কথা বলছি। আর কোনো পথ আছে কিনা, আমি জানি না।

সরকার প্রধান হিসেবে একজন সর্বোচ্চ কতো মেয়াদে থাকতে পারবেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দুই মেয়াদ, নাকি তিন মেয়াদ-এই প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সরকার প্রধান হিসেবে একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ থাকতে পারেন।
টিআইবি’র প্রস্তাবিত একই ব্যক্তি দলীয় প্রধান, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না’-এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আলী রীয়াজ বলেন, ক্ষমতা যাতে একহাতে কেন্দ্রীভূত না হয়, সেটাই টিআইবি বলেছে। এসব সংস্কার জরুরি। ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত করার এসব পথ সাংবিধানিকভাবে বন্ধ করা না হলে ভবিষ্যতে আরও একজন স্বৈরাচার তৈরির পথ বন্ধ করা যাবে না।
ভারতীয় গণমাধ্যমের অপতথ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো ৫ই আগস্ট থেকে যেসব অপতথ্য ও ভুল তথ্য প্রচার করছে, সেগুলোর বড় জবাব হচ্ছে সত্য ঘটনা তুলে ধরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। আমি তাদের বলেছি, আপনারা ঢাকায় যান, দেখুন, তারপর তা তুলে ধরুন। একই কথা আপনাদের জন্যও। আপনারা সত্য তথ্য তুলে ধরুন।
তিনি বলেন, টেকসই গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংলাপের আয়োজন করবে সিজিএস। সেগুলোর মাধ্যমে দেশব্যাপী নাগরিক সমাজ, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ সংগ্রহ করা হবে। তার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন সম্ভব হবে, যা গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে সহজতর এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
আলী রীয়াজ বলেন, জাতীয় পর্যায়ের সংলাপের অংশ হিসেবে ঢাকায় ৮টি জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিষয়বস্তুর মধ্যে থাকছে সংবিধান, মানবাধিকার ও গুরুতর আইন লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগীদের বিচার নিশ্চিতকরণ, বিচার ব্যবস্থা, নাগরিক প্রশাসন, সাংবিধানিক সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, অর্থনৈতিক নীতিমালাসহ ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক ঋণ এবং গণমাধ্যম। তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনায় ৪টি আঞ্চলিক সংলাপ হবে। এতে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের প্রত্যাশা, প্রস্তাবনা ও সুপারিশ খোলাখুলি প্রকাশ করতে পারবেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের কারণে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন ব্যবস্থা-সবই পরিকল্পিতভাবে রাজনীতিকরণ হয়েছে।
আলী রীয়াজ বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নীতিমালা জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও জ্বালানি খাতে স্বার্থবাদী একটি নেটওয়ার্ক গঠিত হয়েছিল, যারা নিজেদের স্বার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঋণখেলাপিদের বিচার থেকে রক্ষা করা হয়েছে। বিগত সরকারের সঙ্গে যুক্ত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী জ্বালানি খাতের ভর্তুকি পকেটে ভরেছে। এই সবকিছুর পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজন এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সংবিধানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গণজাগরণের মাধ্যমে তৈরি হওয়া আশা ও প্রত্যাশা পূরণ করতে সরকারের ওপর বিশাল দায়িত্ব আরোপিত হয়েছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত প্রতিটি সংলাপের আলোচনা ও নির্দিষ্ট সুপারিশের সার সংক্ষেপ সিজিএস প্রকাশ করবে এবং গণমাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে তা সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করবে।
সংবাদ সম্মেলনে সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান বলেন, আমাদের অনেক কিছু করার আছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে চাই। সে লক্ষ্যে সিজিএস ধারাবাহিক সংলাপের আয়োজন করেছে।

গুমবিরোধী সনদে স্বাক্ষর

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের বিশেষ নিরাপত্তার বিধান বাতিল, কালোটাকা সাদা করার পথ বন্ধ, হজের অযৌক্তিক ফি কমানো ও নিত্যপণ্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার উদ্যোগসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী দিবসকে সামনে রেখে গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। গতকাল প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে পরিবেশ বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের এসব বিষয়ে ব্রিফ করেন। বলেন, একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, কালোটাকা সাদা করার যে বিধি ও রীতি সেটা বন্ধ করে দেয়া হবে। এখান থেকে সরকার যে টাকা আনতে পারে, সেটা দিয়ে সরকারের যে খুব আগায় তা না। তবে, মূল্যবোধটা বেশি অবক্ষয় হয়। ফলে এটার বিরুদ্ধে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। তিনি বলেন, একটা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছে। আগে যেমন একটা আদেশের মাধ্যমে বলে দেয়া হতো কালোটাকা সাদা করা যাচ্ছে। এখন আর সে রকম বলা হবে না, উল্টো বলা হতে পারে। অতিদ্রুত সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিশেষ নিরাপত্তা বিধান বাতিল: বাতিল হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তায় প্রণীত আইন। যেটি বৈষম্যমূলক নীতি বলেই মনে করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই আইন বাতিল হলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও তাদের সন্তানদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তার সুবিধাটি আর থাকছে না। এ ছাড়াও এই পরিবারের সদস্যদের প্রত্যেকের জন্য নিরাপদ সুরক্ষিত আবাসনের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথাও বলা ছিল। গতকাল উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমাদের এই সরকার হচ্ছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আউটকাম। নিরাপত্তা সংস্থা এরকম বিশেষ নিরাপত্তার দরকার আছে বলে মনে করে না। আর এটাকে বৈষম্যমূলক মনে করা হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে এটা রহিত করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব বৈষম্য দূরীকরণে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়েছে। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কেবল একটি পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা প্রদানের জন্য আইনটি করা হয়েছিল, যা একটি ‘সুস্পষ্ট বৈষম্য’।

গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর: এদিকে আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। গতকাল প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ সনদে স্বাক্ষর করেন। এ সময় অন্যান্য উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন। দেশে গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক হারে গুমের শিকার হয়েছেন নাগরিকরা। আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী দিবসের একদিন আগে বিষয়টি নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গুমবিরোধী সনদে স্বাক্ষর শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটি আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং গুমবিরোধী সনদে স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর আগে সরকার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুমের ঘটনা তদন্তে ইতিমধ্যে হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন করেছে। তদন্ত কমিশন আইন, ১৯৫৬ সালের ক্ষমতাবলে এই কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থা তথা বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বিশেষ শাখা, গোয়েন্দা শাখা, আনসার ব্যাটালিয়ন, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা বাহিনী, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), কোস্ট গার্ডসহ দেশের আইন প্রয়োগ ও বলবৎকারী কোনো সংস্থার কোনো সদস্য কর্তৃক জোরপূর্বক গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানের’ জন্য এ কমিশন। উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পার্সনস ফ্রম ফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ সনদে বাংলাদেশের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সই করেছেন। এটা মানবাধিকারকর্মীদের জন্য মাইলফলক। প্রায় সাতশয়ের ওপর মানুষ গুমের কারণে নিখোঁজ হয়ে আছেন। আর যেন কেউ কখনো নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে কোনো বাহিনীকে দিয়ে, কোনো পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো নাগরিককে গুম করতে না পারে, তার জন্য এ কনভেশনে স্বাক্ষর করেছি। সরকার এ নিয়ে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার করবেন। তিনি বলেন, মানবাধিকার নিয়ে শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। গুম বাংলাদেশে অহরহ ঘটেছিল, যেটা এ যাবতকালে অস্বীকার করা হয়েছিল। সরকারি পর্যায় থেকে ফ্যাসিবাদ কায়েম রাখার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে বিরুদ্ধ মতকে দমন করার জন্য গুম করে ফেলা হতো। সেটাতেও একটা শক্ত বার্তা গেল যে, এসব আর হবে না। গুম তো করার কথা না। সেটা করেছেন (হাসিনা সরকার) বলে আমাকে অবস্থান নিতে হয়েছে। সরকারি বাহিনীর জন্য গুম করার লাইসেন্স নেই। আইনগত এখতিয়ার নেই। যেসব বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ কনভেনশনে অনুস্বাক্ষরের কাগজ জমা পড়ার পর থেকে কার্যকর হবে। আগের গুমের ঘটনা নিয়ে একটা কমিশন হয়েছে। সেখানে কার্যপরিধি বলে দেয়া হয়েছে। কাউকে কোথাও বাদ দেয়া হয়নি।
হজের অযৌক্তি ফি কমাতে উদ্যোগ: বর্তমানে হজের খরচ অযৌক্তিক বলে মনে করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তাই হজের খরচ কমাতে উদ্যোগ নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। গতকাল উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, হজ একটা অনেক বড় ব্যাপার আমাদের বাংলাদেশি মুসলমানদের জন্য। হজের ক্ষেত্রে একটা সিন্ডিকেট দেখতে পাই। যেটা হজের প্যাকেজের মূল্য অনেক বাড়িয়ে দেয়। তাই হজের খরচ সেটি যেন যৌক্তিকভাবে কমানো যায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। কতো কমানো হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ রকম খরচের কোনো কথা হয়নি। তবে প্যাকেজটা যে অনেক বাড়তি এটা যে কমানো সম্ভব এটা দেখা গেছে প্রাথমিক বিশ্লেষণে এবং এ বিষয়ে কাজ করবে মন্ত্রণালয়।
অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে কাজ করছে সরকার: সরকার অর্থক্ষেত্রে সংস্কারের অংশ হিসেবে কতোগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করেছে। উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিতে যা যা করণীয় সরকার তা শুরু করে দিয়েছে। আগে আমাদের একটি পদ্ধতি ছিল জিও-এনজিও সমন্বয়। সেটা পুনরুজ্জীবিত (রিভাইভ) করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমরা দায়িত্বগ্রহণের সময় থেকে একমাসের মধ্যে কোনো কোনো মন্ত্রণালয়, সরকার কী কী কাজ করেছে সেগুলোর ব্যাপারে একটা নোট করে আপনাদের (সাংবাদিক) দিয়ে দেবো।
এ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সুবিধাভোগী অনেক কর্মকর্তা নিজেদের বঞ্চিত দাবি করে এই সরকারের সুযোগ-সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে- এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, বিষয়টা হচ্ছে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকলে তার ব্যাপারে আমরা আমাদের অবস্থান জানাচ্ছি। যেকোনো সরকারকে তার কাজ চালাতে গেলে ভালো কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দরকার পড়ে। যদি আমরা দেখি কারও দক্ষতা আছে, তার ব্যাপারে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের তো কাজটা আগাতে হবে। এখন যদি আগের সময়ের কেউ ভালো পদে থাকে, সেক্ষেত্রে আমরা যদি অন্য কাউকেই নেবো এমন নীতিগত সিদ্ধান্তে চলে যাই, তাহলে কাজ আগাবো কেমন করে? সেটা বড় প্রশ্ন। কারও ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটা জানাবো। এ রেজিম, সেই রেজিম, আগে রেজিম, পরে রেজিম বললে আমাদের সঙ্গে অন্যদের তফাৎটা কী? একটা তফাৎ আমাদের আনতে হবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানাবেন। এ ছাড়াও বন্যা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান। বলেন, বন্য পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বন্যার কারণে রপ্তানিমুখী যেসব শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের যেন শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে, সেই জন্য সরকারের পক্ষে সহায়তার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

ত্রাণ কেউ পাচ্ছে কেউ পাচ্ছে না by মারুফ কিবরিয়া ও নাজমুল হক শামীম

উজান থেকে আসা ঢলে ভেসে গেছে ফেনী। ছয়টি উপজেলার কোনোটিই রক্ষা পায়নি। গত কয়েকদিনে উন্নতি হয়েছে পরিস্থিতি। রাস্তাঘাট শুকিয়েছে। প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের কার্যক্রমও স্বাভাবিক হয়েছে। তবে বন্যাকবলিত অনেক এলাকার মানুষ এখনও পানিবন্দি। এসব এলাকায় ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন অনেকে। গতকাল সকালে ফেনী সদরের পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বিরলী, রতনপুর, জয় নারায়ণপুর, রামচন্দ্রপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সমন্বয়য়ের অভাবেই সর্বত্র ত্রাণ মিলছে না। যদিও জেলা প্রশাসন সমন্বয়হীনতার কোনো অভিযোগ নেই বলেই জানিয়েছে।

ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বিরুলী গ্রামের বাসিন্দা বিবি কুলসুম জানান, নয়দিন ধরে ঘরে পানিবন্দি থাকায় পার্শ্ববর্তী একটি দোতলা ভবনে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি মানবজমিনকে বলেন আধা কেজি চিড়া ও আধা কেজি মুড়ি ছাড়া কোনো কিছু পাইনি।
একই কথা বলেছেন গ্রামের নৌকাঘাট এলাকার তোফাজ্জল হোসেন, আনোয়ার হোসেন, লাইলী বেগম, আবুল খায়ের ও বিবি মরিয়ম । কমবেশি সবার ঘরেই এখনো হাঁটু সমান পানি।  আশ্রয় নিয়েছেন বিরলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে।

রওশন আরা নামে পঞ্চাশোর্ধ এক নারী বলেন, দুপুরে রান্না করা খাবার একবেলা দিয়ে যায়। আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে বাকি দুই বেলা চিড়া মুড়ি খেয়ে থাকতে হচ্ছে । পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি না থাকায় বুক পরিমাণ পানিতে ডুবে উঁচুস্থানের একটি কল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বিরলী গ্রামের নৌকাঘাট এলাকার পপি আক্তার বলেন,  বন্যার পর থেকে গত আটদিনে ছয়টি মোমবাতিও ৫ লিটারের এক বোতল পানি পেয়েছি। এ ছাড়া এর মধ্যে আর কোনো সামগ্রী পাইনি। ঘরে যা শুকনো খাবার ছিল তা খেয়েছি। খাবার শেষ হওয়ার পর পার্শ্ববর্তী দোকান থেকে মুড়ি বিস্কুট কিনে কয়েকদিন ধরে খেয়েছি। রান্নার চুলা পানিতে ডুবে থাকায় এখনো ভাত রান্না করতে পারেননি বলেও জানান তিনি। একই কথা বলেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেয়া আছিয়া খাতুন। চিড়া মুড়ি খেয়ে কয়দিন থাকা যায় আমাদের কেউ চাল ডাল সহযোগিতা করেনি এখনো। এ গ্রামে চাল ডাল নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনকে আসার জন্য অনুরোধ করেছেন ।

রিকশাচালক শাহ আলম বলেন , ঘরে এখনো হাঁটু পরিমাণ পানি । উঠানে বুক পরিমাণ পানিতে ডুবে আছে উপার্জনের একমাত্র বাহন রিকশাটি । ৮-৯ দিন রিকশা চালাতে না পারায় উপার্জন বন্ধ রয়েছে । ওই বাড়ি পেরিয়ে একটু সামনে এগোতে হাতে বালিশ কাঁথা নিয়ে হাঁটছিলেন বৃদ্ধ আমিনুল ইসলাম । তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে তার বাড়িতে হাঁটু পরিমাণ পানি থাকলেও বর্তমানে মেঝেতে পানি রয়েছে। এ সময় ঠিকমতো খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। এদিকে পার্শ্ববর্তী রতনপুর গ্রামে ঘুরে দেখা যায় গ্রামের গ্রামীণ সড়কগুলোতে এখনো হাঁটু পরিমাণ পানি। পানিবন্দি মানুষগুলো ছোট ডিঙ্গি নৌকা ব্যবহার করে যাতায়াত করছে। গ্রামের বাসিন্দা মো. বেলাল হোসেন বলেন, আটদিন ধরে তারা পানিবন্দি রয়েছেন। বাড়িতে থাকা ফ্রিজ টিভিসহ মূল্যবান আসবাব নষ্ট হয়ে গেছে।

স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষক শাহজালাল ভূঁইয়া বলেন, গত বুধবার থেকে টানা নয়দিন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। বাজারে কিছু কিছু জায়গায় জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ায় গ্রামবাসী টাকা দিয়ে লাইন ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে মোবাইলে চার্জ দিচ্ছেন। বন্যাকবলিত এই পরিস্থিতি পার্শ্ববর্তী বক্তারপুর, জয় নারায়ণপুর, রামচন্দ্রপুর, নুরুল্লাহপুর, রাজাপুর ঘোনাসহ আশপাশের গ্রামগুলোতেও বিরাজ করছে।

ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ের অভাব:
ফেনীতে বন্যা শুরুর পর থেকে সারা দেশ থেকে সরকারি বেসরকারিভাবে ত্রাণ আসা শুরু হয়। কিন্তু জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় না থাকায় অনেক জায়গায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাচ্ছে না।  ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ত্রাণ শাখায় দায়িত্বরত এক স্বেচ্ছাসেবক জানান, গত শুক্রবার থেকে টানা ৫দিন ত্রাণ শাখার দায়িত্বে ছিলেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকে করে আসা ত্রাণগুলো জেলা প্রশাসকের কার্যালয় মজুত হলেও সরকারিভাবে বিতরণের সমন্বয়হীনতার কারণে অনেকে ত্রাণ পায়নি। গত বুধবার থেকে প্রতিটি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ত্রাণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়।

টিম ইজিলাইফ’র স্বেচ্ছাসেবক শহিদুল মিশু বলেন, বন্যাদুর্গত এলাকায় রান্না করা খাবার পাঠিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে সাহায্য করা হচ্ছে। বন্যা পরবর্তী সময় মোকাবিলা করার জন্য চাল,ডাল, তেল বিতরণ করে যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি যারা সরকারিভাবে সাহায্য-সহযোগিতা পায়নি তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের একজন মহিউদ্দিন রনি বলেন, ফেনীতে ভয়াবহ বন্যার তথ্য পেয়ে আমিসহ আমাদের টিমের বেশ কয়েকজন ফেনীতে যাই কার্যক্রম পরিচালনা করতে। রাজনৈতিক দলের স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কয়েক দফা আমাদের বিরোধ হয়। পরবর্তীতে ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর অসুস্থতার খবর পেয়ে আমরা টিমসহ ঢাকায় চলে আসি। আমি আবার যাবো ফেনীতে। তবে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সমস্যা হলে সেটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর দায় দেয়া যাবে না।

অবশ্য মহিউদ্দিন রনি গত কয়েকদিনে ত্রাণ কার্যক্রমে এসে ফেসবুক লাইভে বিতরণ করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে ত্রাণ ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগও করেন সেই লাইভে। এ বিষয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক মোছা. শাহিনা আক্তার মানবজমিনকে বলেন, জেলা প্রশাসন ত্রাণ বিতরণে তৎপর রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ত্রাণ ৮৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় হেলিকপ্টার, সড়ক ও নৌপথে আরও সাত হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে ।  বৈষমবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ,  সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছেন। জেলা প্রশাসনে ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ের কোনো অভাব নেই।

তারা এখন কী করছেন? by কিরণ শেখ

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টোপে পা দিয়েছিলেন বিএনপি’র তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর (বীরপ্রতীক) ও কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম (বীরপ্রতীক)। খেতাবপ্রাপ্ত এই দুই মুক্তিযোদ্ধা রাজনীতিক দল ও রাজনৈতিক জোটের বিপরীতে গিয়ে চরম সমালোচিত হয়েছিলেন। নির্বাচন করে এমপি হয়েও খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। নির্বাচনের ঠিক সাত মাসের মাথায় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের সাবেক এমপিদের সঙ্গে এই দুই সাবেক এমপিও বেকায়দায় পড়েছেন। রাজনীতির মাঠছাড়া হয়েছেন। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও আছেন শঙ্কায়। সাবেক দুই এমপি’ মানবজমিন-এর সঙ্গে আলাপে এই শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাদের একজন নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের বাসায় থাকছেন না। অন্যজন ডিওএইচএস এর বাসায় থাকলেও বাইরে বের হচ্ছেন না।

বিএনপি’র সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গত বছরের ২৮শে অক্টোবর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি’র সমাবেশেও অংশও নেন। সেদিন পুলিশের সঙ্গে নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় গাড়ি পোড়ানোর একটি মামলায় তাকে আসামিও করা হয়।

গত ৫ই নভেম্বর ঢাকা থেকে গ্রেপ্তারের ২৪ দিনের মাথায় তিনি জামিনে মুক্তি পান। এরপর তার ভোটে অংশ নেয়ার বিষয়ে গুঞ্জন ছড়ায়। পরদিন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সই করা মনোনয়ন ফরমটির ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। ৩০শে নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার কথা জানান তিনি। জানান, বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঝালকাঠি-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পান।

শাহজাহান ওমর প্রথম সংসদ সদস্য হন ১৯৭৯ সালে। এরপর বিএনপি থেকেই ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের দুটি নির্বাচন এবং ২০০১ সালে ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য হন। ২০০৮ সালে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি, ২০১৮ সালের নির্বাচনে হেরে যান। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০১ সালের ১০ই অক্টোবর থেকে ছয় মাস ভূমি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তিনি। এরপর হন আইন প্রতিমন্ত্রী। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জনসম্মুখে আসেননি শাহজাহান ওমর। তিনি দেশেই আছেন। গ্রেপ্তার এবং জনরোষের ভয়ে তিনি নিজ বাসাতেও থাকেন না। কোথায় আছেন সে বিষয়টি বলতে রাজি হননি তিনি। মানবজমিনকে শাহজাহান ওমর বলেন, এই মুহূর্তে কথা বলা ঠিক হবে না। আর এই সরকার (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) ভালো চালাচ্ছে।

ওদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম জোট ১২ দল থেকে বের হয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে হাতঘড়ি প্রতীকে বিজয়ী হন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। ২০১৮ সালে বিএনপি ভোটে এলে চট্টগ্রামের একটি আসনে ২০ দলীয় জোটের মনোনয়নও পেয়েছিলেন তিনি। তবে জিততে পারেননি।

পরে বিএনপি ২০ দলীয় জোট ভেঙে দেয়ার পর এই জোটের ১২ শরিক মিলে যে জোট গড়ে তোলে, তাতে যোগ দেয় ইবরাহিমের কল্যাণ পার্টি। এই জোট বিএনপি’র সরকার পতন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘একদফা’ দাবির পক্ষে অবস্থান নেয়। বিএনপি’র সঙ্গে মিল রেখে যুগপৎ কর্মসূচিও পালন করতে থাকে। চলমান হরতাল ও অবরোধ তাদেরও কর্মসূচি ছিল। গত ১৫ই নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি’র পাশাপাশি তা প্রত্যাখ্যান করে ১২ দলীয় জোটও। তবে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় শেষ হতে আটদিন বাকি থাকতে চমক দেন ইবরাহিম। জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিলেন নতুন জোট যুক্তফ্রন্টের। সংবাদ সম্মেলনে ছিল বিএনপি’র সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দুই দল জাতীয় পার্টি (মতিন) ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগও।

সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছিল, তার একটি ছিল বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। সে সময় ‘কিংস পার্টি’ নামে যে কয়টি দল আলোচনায় আসে, তার একটি ছিল এই দল। নবম সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে অংশ নিয়ে প্রচারে বেশ মনও দিয়েছিলেন ইবরাহিম। তবে জামানত রক্ষার মতো ভোট পাননি তিনি। এরপর বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে জোটে চলে যায় তার দল।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সরকার পতনের পর সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমও জনসম্মুখে আসেনি। তিনি এখন বাসা থেকেই বের হন না। নেই দলীয় কোনো কার্যক্রমও।

বাংলাদেশ ব্যাংক: অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে by এমএম মাসুদ

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তার একটি তালিকা নবনিযুক্ত গভর্নর আহসান এইচ মুনসুরের দপ্তরে দেয়া হয়েছে। অনৈতিক কাজে জড়িত এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত করে শাস্তি চাওয়া হয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঢাকা, চট্টগ্রাম শাখা ও খুলনা শাখাসহ বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ একটি প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের লুটপাটের ফিরিস্তি উঠে এসেছে। সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারে ছত্রছায়ায় লুটপাটের সিন্ডিকেট গড়েন এসব কর্মকর্তা। এছাড়া দেশের বাইরের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য পাচারসহ নানা কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে গত দেড় দশকে সৎ, বিশ্বস্ত এবং হাইলি টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের ওএসডি করে রাখা হয়েছিল এবং শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক হারায় নিজস্ব ঐতিহ্য।
এ বিষয়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে সাজানোকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ কর্মকতাদের আমলনামা। তালিকায় আছেন যারা:

নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক: বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র। নগদের সকল অনিয়ম ও মানিলন্ডারিংয়ে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র জয় ও আইসিটি মন্ত্রী পলকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রজেক্ট- ‘বিনিময়’, আইডিটিপি’সহ বেশ কয়েকটি প্রজেক্ট নিয়েছেন, যা কোনো কাজে না আসলেও বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং বিদেশ ট্যুর পেয়েছেন। এফএসএসএসপিডি’র পরিচালক থাকাবস্থায় বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের অনুকূলে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ ছাড়করণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন। ওই অর্থে ৪ কোটি টাকায় ধানমণ্ডি লেক-এর পাশে একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন।

নির্বাহী পরিচালক মো. আনারুল ইসলাম: দুর্নীতিবাজ সাবেক ডিজি এস কে সুর চৌধুরী ও ব্যাংক খেকো পিকে হালদার-এর প্রত্যক্ষ সহযোগী। গ্রামীণ ব্যাংকের কথিত দুর্নীতি তদন্তের আদিষ্ট প্রতিবেদন প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ২০২১-২০২৩ সাল পর্যন্ত ডিপার্টমেন্ট অব অফ সাইট সুপারভিশনের দায়িত্বে থাকাকালে এস আলম গ্রুপের সকল ঋণ জালিয়াতিতে সহযোগিতা করেছেন এবং বৃহৎ ঋণ অনুমোদন করেছেন। এস আলম ভেজিটেবল অয়েল মিলসসহ গ্রুপভুক্ত ৩টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণের এনওসি প্রদান করেছেন। এ ছাড়া অবৈধ অর্জিত অর্থে তিনি গাজীপুরে রিসোর্ট ও বাংলো বাড়ি করেছেন।

নির্বাহী পরিচালক দেবদুলাল রায়: বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে ক্ষতিকর ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি দেবদুলাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের যাবতীয় তথ্য তিনিই দেশের বাইরে পাচার করতেন। তিনি প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দার এজেন্ট হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিটি’র নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তিনি অপর নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক’কে সঙ্গে নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র জয় ও আইসিটি মন্ত্রী পলকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রজেক্ট ‘বিনিময়’ হাতিয়ে নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসাইন চৌধুরী: বিএফআইউ’র পরিচালক থাকাকালে তিনি এস আলম, সাদ মুসা-সহ সকল শীর্ষ অপরাধীর অনিয়ম-সম্বলিত অসংখ্য মামলা গায়েব করেছেন। মার্কেন্টাইল ব্যাংক, প্রধান শাখায় কুলিয়ারচর সি ফুড-এর বিপুল পরিমাণ রপ্তানি প্রণোদনা জালিয়াতির মামলাও তিনি গায়েব করেছেন।

নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম: এস আলম কর্তৃক ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের বোর্ড দখলের নেপথ্যের কারিগর তিনি।

খুলনা অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক এস এম হাসান রেজা: ডিএফইআই’র পরিচালক থাকাকালে গ্রুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য জালিয়াতি গোপন করেছেন। খুলনা অফিসের সকল অনিয়ম ও দুর্নীতি তার আদেশে হতো। শেখ হেলালের ক্ষমতার দাপটে তিনি অত্যন্ত ক্ষমতাবান।

পরিচালক মো. আরিফুজ্জামান: এস আলম গ্রুপের আশির্বাদ নিয়ে চট্টগ্রাম অফিসে আগমন এবং পরিচালক (সুপারভিশন) হিসেবে পদায়ন লাভ করেন। পরিদর্শন প্রতিবেদন তার মনমতো না হলে বিভিন্ন ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে তা পরিবর্তন করতে পরিদর্শন দলকে বাধ্য করেছেন। এ কাজে তিনি সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত পরিচালকদেরকে (বিশেষ করে শোয়াইব চৌধুরী, শংকর কান্তি ঘোষ) ব্যবহার করেন। ফরেন এক্সচেঞ্জের বিভিন্ন কেস (বিশেষ করে রি-ফাইন্যান্স, ডিসকাউন্টিং) অনুমোদন করাতে তিনি নির্মলেন্দু পারিয়াল ও মো. সাজ্জাদ হোসাইন চৌধুরীকে ব্যবহার করতেন।

অতিরিক্ত পরিচালক মো. শোয়াইব চৌধুরী: পরিদর্শন প্রতিবেদনে গুরুতর অনিয়ম উল্লেখ করলেও কখনো ক্লাসিফিকেশন ও প্রভিশনিং করেননি। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি প্রদান, বদলি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চট্টগ্রাম অফিসের পোস্টিংও নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্টেশন সিনিয়রিটি অনুযায়ী তার পোস্টিং চট্টগ্রাম অফিসের বাইরে হওয়ার কথা থাকলেও তাকে শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে এস আলম গ্রুপের জন্য চট্টগ্রাম অফিসেই রাখা হয়। চট্টগ্রাম অফিসের সাবেক অফিসার বোরহান উদ্দিন সঞ্চয়পত্রের সূত্রে নগদ ১৩ লক্ষাধিক টাকা ঘুষসহ ধরা পড়লেও সে সময় নির্বাহী পরিচালক জহুরুল হুদার মাধ্যমে ছেড়ে দিতে ভূমিকা রাখেন তিনি।

অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুল আহাদ: চট্টগ্রাম অফিসে নির্বাহী পরিচালকের পিএ হিসেবে বহাল থাকায় এস আলমের খাস দালাল হিসেবে কাজ করে সুবিধা নিতো। কোনো পরিদর্শন প্রতিবেদন এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ব্যাংকের বিরুদ্ধে গেলে তিনি সেটার ছবি তুলে এস আলম গ্রুপের লোক (আকিজ, মিফতা) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা এস আলমের অন্যান্য দালালদের নিকট প্রেরণ করতেন। নিজের স্ত্রী ও অন্যান্য আত্মীয়দের এস আলম গ্রুপের ব্যাংকে চাকরি দিয়েছেন। এজেন্ট হিসেবে এস আলম গ্রুপের লোকদের সঙ্গে সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করতেন তিনি।

অতিরিক্ত পরিচালক নির্মলেন্দু পারিয়াল, যুগ্ম পরিচালক মো. সাজ্জাদ হোসাইন চৌধুরী ও সৈয়দ সাইফুর রহমান: তারা বিভিন্ন ধরনের উপহার ও সুবিধাদি প্রাপ্তি ও প্রেস্টিজিয়াস পোস্টিং পাওয়ার জন্য আব্দুল আহাদ ও শোয়াইব চৌধুরীসহ নির্বাহী পরিচালকদের ফরমায়েশ মোতাবেক ফরেন এক্সচেঞ্জ বিষয়ক মামলাগুলো অনুমোদন দিয়েছেন (বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের রি-ফাইন্যান্স, ডিসকাউন্টিং)। কোনো কর্মকর্তা বিধি বহির্ভূত কাজ না করতে চাইলে তাকে পিএমএস এর ভয় দেখিয়ে কাজ করতে বাধ্য করতেন। এদের মধ্যে সৈয়দ সাইফুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসের অন্যতম দুর্নীতিবাজ ডিজিএম মোহা. সোহরাব হোসাইনের (অবসরের পরে বর্তমানে এস আলম গ্রুপের দালালির পুরস্কার হিসেবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে কর্মরত) ডানহাত ছিলেন এবং এস আলমের জামাতা বেলালের কোম্পানি ইউনিটেক্স গ্রুপের সিএফও আরিফের সঙ্গে যুগ্ম পরিচালক রেজাউল করিমের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে দেন।

যুগ্ম পরিচালক রেজাউল করিম: রেজাউল অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুল আহাদের আত্মীয়। তার শ্বশুর চট্টগ্রাম অফিসের সাবেক উপ-মহাব্যবস্থাপক কাশেমসহ তার স্ত্রী, ভায়রা এবং শ্যালিকাসহ অনেক নিকটাত্মীয় এস আলমের দালালি করে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন। এস আলমের জামাতা বেলালের কোম্পানি ইউনিটেক্স গ্রুপের সিএফও আরিফ এবং এস আলম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত কুমার ভৌমিকের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং এদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসে বিভিন্ন লবিং চালাতেন। এরই সূত্র ধরে এস আলম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত কুমার ভৌমিকের নামে ক্রয়সীমার অতিরিক্ত সঞ্চয়পত্র উদঘাটিত হওয়ার পরেও তিনি বিধি লংঘন করে কোনো সুদ কর্তন না করে পূর্ণ টাকা প্রদান করেন।

সহকারী পরিচালক শান্তনু শাওন: শাওন সহকারী পরিচালক হলেও চট্টগ্রাম অফিসে ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘদিন নির্বাহী পরিচালকের পিএ-এর দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুল আহাদের অন্যতম আশীর্বাদপুষ্ট, যার মাধ্যমে আহাদ আইবিবি’র কার্যক্রম ইচ্ছেমাফিক তার নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়া ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করেন।

পরিচালক চৌধুরী লিয়াকত আলী: সাবেক ডিজি মনিরুজ্জামানের সকল অপকর্মের মূল দোসর লিয়াকত। তিনি অসংখ্য বৃহৎ জালিয়াতির মামলা গোপন করে ফেলেছেন।

পরিচালক আবু হেনা হুমায়ূন কবীর: সকল বৃহৎ শিল্প গ্রুপের বেনিফিসিয়ারি কবীর। তাদের সকল অভিযোগ থেকে সহজ নিষ্পত্তি দিতে তাকে এফআইসিএসডি’তে পদায়ন করা হয়েছে।

পরিচালক আবু সালেহ মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন ও মোহাম্মদ মহসিন হোসাইনি: এই দুইজন বসুন্ধরা, প্রাণ-আরএফএল, সিটি ইত্যাদি গ্রুপকে বিপুল পরিমাণ ওভারসিজ ইনভেস্টমেন্ট করার সুযোগ প্রদান করেছেন। এস আলম, সাদ মুসা, থার্মেক্স, সামিট পাওয়ার, ওরিয়ন’সহ সকল শীর্ষ অর্থপাচারকারীর সহায়তা করেছেন। এ ছাড়া মহসিন এস আলমের ছেলের বিয়েতে অংশগ্রহণ করেছেন। ওই বিয়েতে অংশগ্রহণের জন্য তিনি বিএফআইইউ’র নামে চট্টগ্রামে ট্রেনিং প্রোগ্রাম প্রণয়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের খরচে ভ্রমণ করেছেন।

পরিচালক ইসতেকুমাল হোসাইন: সাবেক গভর্নরের আমলে ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকে বিতরণের অন্যতম শীর্ষ কুশীলব তিনি। এ ছাড়া ঋণ ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট হতে এস আলমের ব্যাংকগুলোতে লিকিউডিটি সাপোর্ট তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দেয়া হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় তথ্য পাচার করতেন। ২০১৪ সালে এডি নিয়োগে প্যানেলভুক্তদের তথ্য প্রকাশ করে চাকরিচ্যুতির পর্যায়ে গিয়েছিলেন। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপে তখন রক্ষা পান।

অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম নুরুন্নবী: বিএফআইইউ’তে থাকা অবস্থায় সাবেক ডিজি মাসুদ বিশ্বাস এবং রাজী হাসানের ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজ করে দিয়ে তাদের আস্থাভাজন ছিলেন। বর্তমানে এফআইসিএসডি’তে বিভিন্ন ব্যাংকের দুর্নীতি আড়াল করার কাজে লিপ্ত রয়েছেন।

অতিরিক্ত পরিচালক গোলাম মহিউদ্দিন: অত্যন্ত ক্ষমতাবান এই কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকে সকল নষ্ট চক্রের কমন বেনিফিসিয়ারি। তিনি প্রতিবাদী এবং সৎ কর্মকর্তাদের শাস্তিমূলক বদলি করে থাকেন। পরিদর্শনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ফোন করে তিনি পরিদর্শনকে প্রভাবিত করতেন। সিনিয়ররাও ভয়ে থাকতো।

অতিরিক্ত পরিচালক মো. সদরুল মুক্তাদির: তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অসংখ্য কর্মকর্তার পোস্টের স্ক্রিনশট নিয়ে ম্যানেজমেন্ট বরাবর উপস্থাপন করে তাদের শাস্তির মুখোমুখি করেছেন।

যুগ্ম পরিচালক মো. রোকন উজ জামান: দেশের চাঞ্চল্যকর সব মানিলন্ডারিং মামলার তদন্তে সাবেক দুই ডিজি’র আমলে এই রোকনকে নিয়োজিত করা হতো। তারপর তিনি ‘উপরের নির্দেশে’ অধিকাংশ মামলা গায়েব করে দিতেন এবং অবশিষ্ট সকল মামলায় মূল দোষীকে আড়াল করেছেন।

অতিরিক্ত পরিচালক শওকত আলী ও অতিরিক্ত পরিচালক শংকর কান্তি ঘোষ, যুগ্ম পরিচালক মেহেদী হাসান ও সুনির্বান বড়ুয়া, মোহাম্মদ আব্দুস সালাম, উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন ও প্রিটুল বড়ুয়া: তারা ডিবিআই-৪ এ কর্মকালীন সময়ে বিভিন্ন সময়ে এস আলম গ্রুপভুক্ত ব্যাংকগুলো পরিদর্শন করে বেনামি ঋণ সৃষ্টিতে প্রশ্রয় দিয়েছেন, অনিয়ম লুকিয়েছেন, বিনিময় গ্রহণ করেছেন ও সৎ কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দিয়েছেন। তারা নিয়ম মেনে ঋণ ক্লাসিফাই করতে দেননি। তারা সিন্ডিকেটের ফরমায়েশি পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এদের মধ্যে মেহেদী হাসান পুরস্কার হিসেবে নিজ স্ত্রীর জন্য ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের চাকরিও বাগিয়ে নিয়েছেন।

যুগ্ম পরিচালক মো. জিয়া উদ্দিন বাবলু: এস আলম গ্রুপের ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসলে তিনি আব্দুল আহাদ-শোয়াইব চৌধুরী সিন্ডিকেটের গ্রিন সিগনাল পেলে উপস্থাপন করতেন।

যুগ্ম পরিচালক রুপেশ বড়ুয়া: আব্দুল আহাদ, শোয়াইব চৌধুরী সিন্ডিকেটের অপরিহার্য হওয়ায় তাকে ডিবিআই হতে ডিএবি-তে ট্রান্সফার অর্ডার করার পরেও তা বাতিল করা হয়েছে। এস আলম গ্রুপভুক্ত বাংকের পাশাপাশি ইউসিবিএল খাতুনগঞ্জ শাখার বিগত কুইক সামারি রিপোর্ট আব্দুল আহাদ, শোয়াইব চৌধুরী সিন্ডিকেটের পছন্দসই হওয়ায় তিনি তার স্ত্রীর জন্য একটি চাকরিও বাগিয়ে নিয়েছেন।

যুগ্ম পরিচালক জোবাইদুল ইসলাম: তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আব্দুল আহাদ ও শোয়াইব চৌধুরীকে প্রটেক্ট করেছেন। গত ৫ই আগস্টের পর আব্দুল আহাদ ও শোয়াইব চৌধুরীকে ট্রান্সফারের দাবি উঠলে তিনি তার সর্বোচ্চ সামর্থ ব্যবহারপূর্বক নগ্নভাবে তা ঠেকাতে সচেষ্ট হন এবং দাবি উত্থাপনকারী কর্মকর্তাদের সি/ডি ক্যাটাগরির কর্মচারী দ্বারা পেটানোর হুমকি প্রদান করেছেন।
যুগ্ম পরিচালক আবু হোসাইন মো. জামশেদ উদ্দিন ও অনির্বাণ চাকমা, উপ-পরিচালক রুবেল চৌধুরী ও

খোরশেদুল আলম: এদের মাধ্যমেই এস আলম গ্রুপের ঋণ ও বেনামি ঋণ রয়েছে- এমন শাখাগুলো পরিদর্শন করানো হয়। সবচেয়ে খারাপ ঋণ আছে- এমন ব্যাংক শাখা পরিদর্শনপূর্বক সবচেয়ে ভালো রিপোর্ট দেয়ার বিষয়ে তাদের মধ্যে একটা নীরব প্রতিযোগিতাও বিদ্যমান ছিল। ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার ডিসেম্বর/২০২৩ ভিত্তিক (কুইক সামারি) পরিদর্শন করার প্রতিযোগিতায় আবু হোসাইন মো. জামশেদ উদ্দিন জয়লাভ করে আব্দুল আহাদ ও শোয়াইব চৌধুরী সিন্ডিকেট তথা এস আলম গ্রুপের মনোনীত নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালকের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হন।

ভারত ছাড়ছেন না হাসিনা, প্রতিবিপ্লবের প্রস্তুতি!

নয়া দিগন্তঃ বাংলাদেশের সদ্য ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী শেখ হাসিনা তার বিশেষ মিত্র ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। গণমাধ্যমের নানা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে তিনি যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেখানে আশ্রয় গ্রহণে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এর অর্থ সম্ভবত তিনি অদূর ভবিষ্যতে ভারতেই থাকবেন।

মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এশিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, তার মায়ের ভারত ছেড়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। এতে ধারণা করা হচ্ছে যে তিনি একটি প্রতি-বিপ্লবের কৌশল নির্ধারণ করছেন।

সূত্রটি আরো জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনা ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তার হিন্দুত্ববাদী সমর্থকদের প্রতি আশাবাদী হয়ে আছে। ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে পারলে তিনি বাংলাদেশে ভারতের জন্য সম্ভাব্য বৃহত্তর রাজনৈতিক সুবিধা প্রদান করবেন।

সূত্র মতে, হাসিনার এই আশাবাদের বাস্তবতা উপলব্ধির জন্য তার শাসনামলের চিত্র জানা দরকার। মূলত ভারত সরকার ধারাবাহিকভাবে হাসিনা এবং তার আওয়ামী লীগ সরকারের রক্ষক হিসেবে কাজ করেছে। অবস্থা এই দাঁড়িয়েছিল যে ভারত বাংলাদেশের কূটনীতিকে রাশিয়া ও বেলারুশের মতো একটি পৃষ্ঠপোষক-ক্লায়েন্ট সম্পর্কের পরিণত করেছে।

২০১৪ সালে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বয়কট করে। ফলে ভোট হওয়ার আগেই হাসিনা কার্যকরভাবে একটি নির্বাচনী বিজয় অর্জন করে। ওই বিতর্কিত নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছিলেন তৎকালীন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। তিনি ওই পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এটি ওই জালিয়াতিপূর্ণ ভোটকে এক রকম বৈধতা পেতে সাহায্য করেছিল।

২০১৮ সালে হাসিনার আওয়ামী লীগ উত্তর কোরিয়ার মতো অবস্থা তৈরি করেছিল। আরেকটি অত্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচনে তারা প্রায় ৯৫ শতাংশের ব্যবধানে জয়লাভ করে। এই জয়টি নজিরবিহীন নির্বাচনী জালিয়াতির একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। তন সরকারি কর্মকর্তারা এবং আইন প্রয়োগকারীরা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেজন্য বিষয়টি সহজ হয়েছিল।

ওই জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনে আন্তর্জাতিক বিশ্ব নিন্দা জানালেও তখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারই প্রথম হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। এতে হাসিনার সরকার গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভ করে। এই সমর্থন তার ক্ষমতার ভিতকে শক্তিশালী করে। ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করে যে ওই সময় ঘটে যাওয়া নির্লজ্জ ভোট কারচুপি সম্পর্কে তারা পুরোপুরি সচেতন ছিল।

২০২৪ সালের নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে পশ্চিমা শক্তিগুলো একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শেখ হাসিনাকে চাপ দিতে শুরু করে। কিন্তু তখনো দিল্লি হাসিনার পক্ষে কাজ করে। পরে ওই শক্তিগুলো, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া প্রশমিত করতে ভারত সরকার সক্ষম হয়েছিল। এতে আরেকটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন এগিয়ে নেয়ার সাহস হয়েছিল হাসিনা সরকারের।

উভয় দেশের সম্পর্কের গভীরতা আরেকটু গভীরভাবে বুঝা যায়। ২০২২ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেন বলেছিলেন যে তিনি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে সম্ভাব্য সবকিছু করার জন্য ভারতকে অনুরোধ করেছিলেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও একই রকম কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “যতদিন দিল্লি আমাদের সাথে আছে, আমরা ক্ষমতায় আছি। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন যে ভারত আওয়ামী লীগের আধিপত্যের জন্য যেকোনো সাংবিধানিক হুমকিও প্রতিরোধ করবে।

আওয়ামী লীগের সংসদীয় প্রার্থীরা এমনকি দিল্লির প্রার্থী হিসাবেও প্রচারণা চালিয়েছিল। এতে প্রকাশ্যে ভারতীয় সমর্থনের উপর তাদের নির্ভরতা প্রতীয়মান হয়। বর্তমানে হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপ দিতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন বলেও জানা গেছে। হাসিনার আকস্মিক ক্ষমতাচ্যুতি ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়।

যাইহোক, এহেন পরিস্থিতির কারণে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বেশ কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশ কার্যক্ষম সরকার ছাড়াই ছিল। এই ক্ষমতার শূন্যতায় ব্যাপক নৈরাজ্য দেখা দেয়।

গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় কার্যালয় ও থানাগুলোকে দমন-পীড়ন, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

বিশৃঙ্খলা শুরু হওয়ার সাথে সাথে স্থানীয়রা বছরের পর বছর ধরে অত্যাচারে বিরক্ত হয়ে শায়েস্তা করার দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেয়। এতে সহিংসতায় শতাধিক থানা ও দলীয় কার্যালয় জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের উপরও হামলা করা হয়। বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ হিন্দু। আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রতিনিধিত্ব করা একটি সংখ্যালঘু জনসংখ্যা। তদনুসারে দলের নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো হিন্দু। যেহেতু জনতা আওয়ামী লীগের হিন্দু ও মুসলিম উভয় নেতাকেই টার্গেট করেছিল, তাই এই হামলাগুলো ধর্মীয় পরিচয় ছাপিয়ে গিয়েছিল।

অধিকাংশ ঘটনা ইঙ্গিত করে যে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতাই হামলার মূল কারণ ছিল। ভারতে বিজেপি-সংলগ্ন মিডিয়া দ্রুত এই পার্থক্যকে আড়াল করে দেয়। মূলত আওয়ামী লীগের মধ্যে মুসলিম শিকারদের উপেক্ষা করে এবং সহিংসতাকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ হিসাবে তারা চিত্রিত করে।

এই চিত্রায়ন হিন্দু নেতা ও কর্মীদের ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হিসাবে নিক্ষেপ করে। অস্থিরতার অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়।

ক্রমবর্ধমান সহিংসতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সংখ্যালঘুদের বাড়ি এবং মন্দির রক্ষা করার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। যদিও এই পদক্ষেপগুলোকে নাগরিক কর্তব্য হিসাবে দেখা যেতে পারে। সেখানে একটি কৌশলগত দিকও রয়েছে। কেউ কেউ হয়তো স্বীকার করেছেন যে আওয়ামী লীগ এবং তার বিজেপি-সংযুক্ত মিডিয়া সংখ্যালঘু নির্যাতনের বর্ণনাকে কাজে লাগিয়ে হাসিনা-পরবর্তী যেকোনো সরকারকে দুর্বল ও অস্থিতিশীল করতে পারে।

বিজেপি-সংলগ্ন ভারতীয় মিডিয়া এবং এক্স (আগের টুইটার) এর প্রভাবশালীরা ডানপন্থী রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলোর সাথে উপযুক্ত এমনভাবে পরিস্থিতি তৈরি করতে বেছে নিয়েছে।

ভুল তথ্য এবং ডক্টর করা ভিডিও ক্লিপগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে মিথ্যা বর্ণনাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, রেস্তোরাঁ ও বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে মন্দিরে আগুন দেয়া হয়েছে বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। মুসলিম আওয়ামী লীগ নেতাদের গণপিটুনি দেয়ার ফুটেজকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

যেমন যখন বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে অংশগ্রহণের কারণে যখন বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, তখন ভারতীয় মিডিয়া এটিকে তার ধর্মের কারণে ক্রিকেটার লিটন দাসের উপর আক্রমণ হিসেবে রিপোর্ট করেছিল।

একইভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন থেকে জলের গান ব্যান্ডের সদস্য রাহুল আনন্দের বাড়িতে যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, আনন্দের ব্যাখ্যা সত্ত্বেও সেটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

বুম, ডিসমিসল্যাব এবং এএফপি-এর মতো স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকাররা ভারত থেকে জাল খবরের উত্থানকে প্রতিরোধ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে। কিন্তু তারা বড় ধরনের চড়াই-উৎরাইয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। একটি ভুল তথ্য চেক করতে করতে আরো অনেকগুলো দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে।

হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তি ভেঙে ফেলা প্রতিবাদকারীদের উল্লেখযোগ্য সমালোচনাও হয়েছে। এই সমালোচনা প্রায়ই উত্তর কোরিয়ার কিম বংশের চারপাশে নির্মিত রূপকথার ব্যক্তিত্বের কাল্টের মতো দেশজুড়ে মূর্তি এবং ম্যুরালসহ মুজিবুর রহমানকে প্রায় পৌরাণিক মর্যাদায় উন্নীত করেছিল। এই সত্যের জন্য এই সমালোচনা প্রায়ই ব্যর্থ হয়।

সামগ্রিকভাবে এক দশকের মধ্যে দলের সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনী পারফরম্যান্সের পরে ভারতে বিজেপি-ঝুঁকিপূর্ণ মিডিয়া তাদের সমর্থন ভিত্তি শক্তিশালী করার এই সুযোগটি ব্যবহার করছে।

হাসিনার ছেলে সজীব ভারতীয় মিডিয়াতে নিয়মিত উপস্থিত হচ্ছেন, পাকিস্তানের আইএসআই এবং আমেরিকার সিআইএ-এর মতো ফ্যান্টম শত্রুদের দোষারোপ করে বিজেপির কথার প্রতিধ্বনি করছেন। তিনি তার টিভি উপস্থিতিতে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বর্ণনাকে সক্রিয়ভাবে ঠেলে দিয়েছেন।

কিন্তু সজীব ও হাসিনাও ভারতীয় মিডিয়ার অসতর্ক প্রতিবেদনের অনাকাঙ্ক্ষিত শিকার হয়েছেন। দ্য প্রিন্ট সম্প্রতি হাসিনাকে দায়ী করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে দাবি করে যে তিনি পদত্যাগ করেছেন। সজীবকে দ্রুত প্রতিবেদনটি মিথ্যা এবং বানোয়াট বলে নিন্দা করতে প্ররোচিত করেছে। ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয় যে আওয়ামী লীগ মরিয়া হয়ে ভিন্ন আখ্যানের চেষ্টা করছে কোনটি ট্র্যাকশন লাভ করে।

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ একটি কল্পিত ইস্যুকে কাজে লাগাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সিলেটে, আওয়ামী লীগ নেতারা হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর মিথ্যা পতাকা হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

উপরন্তু, দলের নেতারা এবং এর ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্যরা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শিকার হিসাবে হাসিনার নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হিন্দুদের শিকার চিত্রিত করে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করছে।

এই সমাবেশগুলো বিজেপির হিন্দুত্ব আন্দোলনের সাথে যুক্ত। কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে অপরিচিত ‘জয় শ্রী রাম’ (লর্ড রামের মহিমা) স্লোগানও গ্রহণ করেছে। হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য হিন্দু জনসংখ্যাকে কারসাজি করার অভিযোগ করেছেন।

মিডিয়ার এসব বর্ণনার প্রতিক্রিয়ায় বিশিষ্ট ডানপন্থী ভারতীয় এমপি সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

একটি ইউটিউব ভিডিওতে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেরাও করা উচিত এবং হাসিনাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সামরিক অভিযান চালানো উচিত।

হাসিনা ভারতের একজন কট্টর মিত্র এবং তার প্রতি বর্তমান সমর্থনকে সেই আনুগত্যের প্রতিদান হিসেবে দেখা হতে পারে। যাইহোক, এই পদ্ধতির কারণে ভারত ও বাংলাদেশ এবং তাদের জনগণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অবশ্য ভারতের মধ্যে অনেক যুক্তিসঙ্গত কণ্ঠস্বর এই ধরনের সমর্থনের বৃহত্তর পরিণতিগুলো স্বীকার করে বাংলাদেশী জনগণের সাথে দৃঢ় সংহতি প্রকাশ করে। এহেন অস্থির পরিস্থিতির আরো ভারসাম্যপূর্ণ এবং নীতিগত পন্থা অবলম্বনের আহ্বান জানায়, যা এখনো আরো অনেক বাঁকবদল দেখতে পারে।

সূত্র : এশিয়া টাইমস

অত্যাধুনিক সাবমেরিন যুক্ত হলো তুর্কি নৌবাহিনীতে

এক সময় ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরে তুর্কি বাহিনীর দাপটে চোখ তুলে চাইতে ভয় পেত অন্যান্য শক্তিগুলো। গেল এক দশকে নিজেদের সেই সামরিক গৌরব আবারও ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে আঙ্কারা।

সেই লক্ষ্যে নেওয়া হচ্ছে একের পর এক উচ্চভিলাষী পরিকল্পনা। তারা জল, স্থল ও আকাশে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে মরিয়া। এ লক্ষ্যেই তুর্কি নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী এক সাবমেরিন।

তুর্কি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, শনিবার (২৪ আগস্ট) দেশটির নৌবাহিনীতে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত রেইস-ক্লাস সাবমেরিনের প্রথমটি কমিশন করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ মুগলা সাবমেরিনের কমিশনিং অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। পরিকল্পনা অনুসারে এই শ্রেণির ৬টি সাবমেরিন তুর্কি নৌবাহিনীতে যুক্ত করা হবে। এ সময় দেশীয় সাবমেরিন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশটির নৌ সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদেয়ান।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট জানান, পিরি-রেইস সাবমেরিন দীর্ঘসময় ধরে পানির নিচে থেকে তার অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। এ সময় তুরস্কের তৈরি এসব সাবমেরিন বিশ্বের অন্যান্য বাহিনীর হাতে থাকা একই ধরনের সাবমেরিনের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত বলেও দাবি করেন এরদোয়ান। তুরস্কের সদ্য কমিশন পাওয়া রেইস-ক্লাস সাবমেরিন পিরি-রেইস সর্বপ্রথম ২০১৯ সালে উন্মুক্ত করা হয়। এটি ২২৪ দশমিক ২৫ ফুট লম্বা। এতে ৪০ জন পর্যন্ত বহন করা যায়। পিরি-রেইসের কমিশনিং অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেওয়া হয় তুর্কি নৌবাহিনীতে ২০২৫ সালে রেইস-ক্লাসের সাবমেরিন হিজির-রেইস ও ২০২৬ সালে মুরাত-রেইস কমিশনিং করা হবে। এরদোয়ান জানান, ২০২৯ সালের মধ্যে রেইস-ক্লাসের ছয়টি সাবমেরিন তুর্কি নৌবাহিনীতে কমিশন করা হবে।

বলা হচ্ছে, তুরস্কের নিজস্ব নকশায় তৈরি এ সাবমেরিনটি পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ তুর্কি অস্ত্র দ্বারা। এতে ব্যবহার করা হবে তুরস্কের তৈরি ‘AKYA’ টর্পেডো এবং অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র। তুর্কি প্রেসিডেন্ট জানান, তুর্কি নৌবাহিনীর কমান্ডকে আরও শক্তিশালী করতে তার দেশ নতুন অ্যাটাক বোট, মাইন হান্টিং শিপ, ইস্টিফ ক্লাস ফ্রিগেট, ওপেন সি টহল জাহাজ এবং নতুন ধরনের ল্যান্ডিং ক্রাফট তৈরির কাজ করে যাচ্ছে।

নাহিদের সঙ্গে ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ম্যারি মাসদুপুই।

বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) সচিবালয়ে উপদেষ্টার কার্যালয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে এই সাক্ষাৎ পর্ব আয়োজিত হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সাক্ষাৎকালে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত কে স্বাগত জানান। ফ্রান্সের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের সব সময় আগ্রহ ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এসময় ফরাসি রাষ্ট্রদূতের উদ্দেশে উপদেষ্টা বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশের কথা শুনলেও এক্ষেত্রে অনেক দুর্নীতি এবং অনিয়ম হয়েছে। যে পরিমাণ অর্থ এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে তার সুফল পুরোপুরিভাবে বাংলাদেশের জনগণ পায়নি।

উপদেষ্টা আরও বলেন, দুর্নীতির জায়গাগুলো প্রাথমিকভাবে তদন্ত করছি। বাংলাদেশের আইসিটি সেক্টরে কাজ করার সুযোগ রয়েছে, দেশের যুবসমাজ তথ্যপ্রযুক্তিতে পারদর্শী এবং তারা এই সেক্টরে কাজ করতে আগ্রহী। প্রণোদনা পেলে তরুনরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অনেক ভালো করবে বলেও মন্তব্য করেন উপদেষ্টা।

রাষ্ট্রদূত ম্যারি সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক বাংলাদেশিদের প্রশিক্ষণ প্রদানের আগ্রহ প্রকাশ করলে উপদেষ্টা ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সাইবার সিকিউরিটি এখন বর্ডার সিকিউরিটির মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে দেশের তরুণরা এবং কর্মকর্তারা যদি এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারে তবে তা দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হবে।

রাষ্ট্রদূত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ৭১ টিভির সাংবাদিক ফারজানা রুপার বিষয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে আমরা খুবই সচেতন। আমরা চাই কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হয়। বিগত সরকারের সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। আমরা চাইনা সামনের বাংলাদেশে এরকম ঘটনা ঘটুক।

অপরদিকে ৭১ টিভি এবং ফারজানা রুপার বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে সেগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি করতে চাচ্ছি যেখানে সবাই তার মতো স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবে।

সাক্ষাতের শেষ সময়ে পারস্পরিক সহযোগিতার আশ্বাসের মধ্য দিয়ে আলোচনা শেষ হয় বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। সাক্ষাৎকালে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব ডা.মো. মুশফিকুর রহমান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. শামসুল আরেফিনসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

‘চিড়া-মুড়ি-বিস্কুট কতক্ষণ চাবান যায়’

আনোয়ারা বেগমের বয়স ৭০ পার হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে বাড়িঘর। রান্নাঘর ও টিউবওয়েলও ডুবে গেছে। চুলায় রান্না হয় না ৮ দিন। মানুষের দেয়া শুকনো মুড়ি-চিড়া-গুড় খেয়ে কোনো রকম দিন পার করছেন তিনি। তার মতো অবস্থা একই বাড়ির ওয়াহেদা বেগম ও শিরিনা বেগমেরও।

গত ৭ দিন ধরে পানিবন্দি তারা। তারা সবাই কুমিল্লার দেবিদ্বারের ফতেহাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ সাইচাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, ত্রাণের জন্য ঘরের দরজায় বসে অপেক্ষা করছে বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম।

ঘরের ভেতরের কিছু মালামাল চৌকির ওপর বস্তায় রাখা। উঠোনে হাঁটু সমান পানি। পানি স্রোতে টিনের ঘরের এক অংশ হেলে পড়েছে পুকুরের দিকে। যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে। রান্না ঘরের চুলায় পানি ভর্তি। টিউবওয়েলের বেশ অর্ধেক ডুবে আছে বন্যার পানিতে।

আনোয়ারা বেগম বলেন, বাইত ৮ দিন ধরে পানি। ঘরে রান্না হয় না, দরজায় বইস্যা রইছি, কেউ যদি বিরিয়ানি দেয় হেললাইগ্যা। মুড়ি-চিড়া-বিস্কিট দেয়, এগুলো কতক্ষণ চাবান যায়, দাঁতেও আর ধরে না। আমরা বুঁড়া মানুষ ভাত খাইতে পারলে জীবনডা বাঁচে।

তিনি আরও বলেন, আমার দুইডা ছেলে আছে, একজন সিএনজি চালায় আর একজন সিএনজির মেকার। তারাও এহন কাজকামে যাইত পারে না। এহন দুশ্চিন্তা পানি কমলে ঘর তো পইরা যাইব। ও বাজান, আমারে এক বান টিনের ব্যবস্থা কইরা দেন না। এক বান টিন অইলে আমার ঘরটা ঠিক করন যাইব।

কালবেলার এই প্রতিবেদকের কাছে অনেকটা আকুতি স্বরেই কথাগুলো বলছিলেন বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম।

ওয়াহেদা বেগম বলেন, ঘরের ধান-চাল-ডাইল সব ভিজ্যা গেছে। কোনো কিছু বাইর করতে পারি নাই। ওহন অসহায় অবস্থায় ঘরে পইড়া আছি। যারা আশ্রয়কেন্দ্রে উঠছে মানুষ তারারে অনেক কিছু দেয়। বাড়ি ঘরের ভেতরে কেউ আসে না। আমি কয়েকবার রাস্তার গিয়ে দাঁড়াই ছিলাম, রাস্তা ডুবে যাওয়ায় এদিকে কোনো ত্রাণের গাড়ি আসতে পারে না। সকালে কিছু লোক চিড়া-মুড়ি-বিস্কিট দিয়া গেছে। এগুলো কোনো রকম চিবাইয়া খাই।

পথে দেখা হয় বৃদ্ধ ওসমান গনির সঙ্গে। তার বাড়িঘরের অবস্থা জানতে চাওয়ায় তিনি কথা বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেলেছেন। ‘ঘরে হাঁটু সমান পানি’ বাইরে ঘোরাঘুরি করতাছি’ কেউ কোনো ত্রাণ দিচ্ছে না’ দূর থেকে দেখছি একটা ত্রাণের গাড়ি থামানো। কোমরসমান পানি দিয়ে গাড়ির কাছে আসছি ভাবছি খুঁজলে হয়ত এক প্যাকেট দিবে। আপনি একটু সুপারিশ করে বলেন না আমাকে এক প্যাকেট ত্রাণ দিতে।

ওসমান গনিও অনেকটা আকুতি করে কথাগুলো বলছিলেন। পরে তিনি লুঙ্গির গোছ থেকে ১০০ টাকা বের করে বলছেন- আমার কাছে ১০০ টেহা আছে আরও ১০০ টেহা হলে আমি কিছু কিনে বাড়ি যাইতে পারমু, ঘরের সবাই না খাইয়া আছে।

এ বিষয়ে ফতেহাবাদ ইউপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন রহুল কালবেলাকে বলেন, ফতেহাবাদ ইউনিয়ন দেবিদ্বার উপজেলার একটি বড় ইউনিয়ন। এখানের ১৮টি গ্রামই বন্যার পানিতে প্লাবিত। সবগুলো গ্রামে শুকনো খাবারের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে চাল দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রচুর খাবার দেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দি যতগুলো ঘর আছে প্রত্যেকটি ঘরেই ত্রাণ পৌঁছানো হবে। রাস্তাঘাট ভাঙা পানি থাকায় যানবাহন সমস্যার কারণে সঠিক সময়ে অনেকটা সমস্যা হচ্ছে।

গণহত্যার বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বান: জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধান দলের সঙ্গে জামায়াতের বৈঠক

বাংলাদেশে গণহত্যার বিষয়ে অনুসন্ধানে আসা জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন টিমের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধি দল। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানস্থ জাতিসংঘের অফিসে এক বৈঠক হয়। এতে ছাত্র-জনতার মহাবিল্পবকে ব্যর্থ করার জন্য তারা নির্বিচারে যে গণহত্যা চালিয়েছিল, সেটা জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধান দলকে অবহিত করেছে জামায়াত। পাশাপাশি এটাকে জেনোসাইড বা গণহত্যা বলছে এবং জেনোসাইড হিসেবে চিহ্নিত করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছে দলটি। এছাড়া এই গণহত্যার বিচারের জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের দলে প্রতিও আহ্বান জানায় তারা।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন টিমের আমন্ত্রণে বৈঠকে জামায়াতের প্রতিনিধি দলে ছিলেন দলের নায়েবে আমীর ডা.  সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ। বৈঠকে নেতৃত্ব দেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার কার্যালয় এশিয়া-প্যাসিফিক সেকশনের প্রধান রোরি মুঙ্গোভেন। প্রতিনিধি দলের অপর সদস্যরা হলেন, এশিয়া-প্যাসিফিক সেকশনের মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকর্তা লিভিয়া কসেনজা এবং আলেকজান্ডার জেমস আমির এই জুঙদি। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ছাত্র-জনতার মহাবিল্পবকে ব্যর্থ করার জন্য তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) নির্বিচারে যে গণহত্যা চালিয়েছিল, সেটাও তাদের অবহিত করেছি। সে সময় হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয় সাধারণ ছাত্র-জনতার উপর। মনে হয়েছিল, বিদেশীদের সঙ্গে লড়াই হচ্ছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজ জনগণের উপর এ ধরনের হত্যাকাণ্ড সারা বিশ্বে নজিরবিহীন। সেখানে দেড় বছরের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আমরা এটাকে বলেছি, জেনোসাইড বা গণহত্যা। এটাকে জেনোসাইড হিসেবে চিহ্নিত করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছি।  

তিনি বলেন, বিচারের জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কতিপয় আইন সংশোধনের মাধ্যমে ক্রাইম এগেইনিস্ট হিউম্যানিটি এই নামে ট্রাইব্যুনাল করে তদন্ত ও সঠিকভাবে এর বিচার নিশ্চিত হতে পারে, সেভাবে বাংলাদেশকে তারা যেন সহযোগিতা করে সেই বিষয়ে আমরা অনুরোধ করে আসছি।

ডা. তাহের বলেন, তারা এই সমস্ত হত্যাকাণ্ডের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছে। বলেছে, এই সব বিষয়ে জানার জন্য তারা এসেছেন। এসব নিয়ে তারা বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করছে। ফ্যাক্টসগুলো নিয়ে তারা রিপোর্ট দিবে। এরপর বিচারে সহযোগিতা, আইন সংশোধনে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞরা আসবেন। তারা বাংলাদেশ সরকারকে সর্বোচ্চভাবে সহযোগিতা করবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামী মাসে মূল টিমটি আসবে। টেকনিক্যাল বিষয়ে তারা সরকারের সঙ্গে মতবিনিময় করবে, তদন্ত শুরু হবে। তারা মূলত আসবে বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য। আমরা তাদের বলেছি, যত দ্রুত সম্ভব বিচারকার্য শুরু করা দরকার। বিচার যেন স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়। প্রয়োজনে বর্তমান আইন সংশোধন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে।
আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, বাংলাদেশে ঐতিহাসিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। বাংলাদেশের মানুষ নতুনভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সেই গণবিপ্লবের সময় সরকার যে হত্যা, জুলুম, নির্যাতন করেছিল, সেবিষয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুরোধে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং টিম বাংলাদেশ সফর করছে। তারা বিভিন্ন দলের সঙ্গে, গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করছে। তারা আগামী শনিবার চলে যাবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকেও তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এসময় কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এটা মূলত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং টিম। এরপর মূল টিম আসবে।

তিনি বলেন, আমরা মূলত বিগত স্বৈরাচারী সরকারের এ দেশের জনগণের উপর নানাবিধ অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ড করেছে, এসব বিষয়ে তারা জানতে চেয়েছিল, আমরা তাদের তথ্য দিয়েছি। তিনি বলেন, আওয়ামী সরকার ১৯৭২-৭৫ সালে ক্ষমতায় ছিল। তখন তারা ৩০ হাজারের মতো মানুষ হত্যা করেছিল। এবার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিডিআরের ঘটনায় ৫৭ সামরিক অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও স্বৈরাচারী জনবিচ্ছিন্ন সরকার জড়িত ছিল। রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে যে গণহত্যা করেছিল, আমরা সেটার কথাও তাদের বলেছি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল: শেখ হাসিনা, সাংবাদিকসহ ৫৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় অভিযোগ করা হয়েছে। এতে সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ২৯ সাংবাদিক, ২ জন অধ্যাপকসহ ৫৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় অভিযোগ করেন এক নিহতের পিতার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ৫ই আগস্ট রাজধানীর শ্যামলীর রিং রোডে নিহত হয় মিরপুরের বিসিআইসি কলেজের এইচএসসি প্রথমবর্ষের ছাত্র নাসিব হাসান (১৭)। নাসিবের বাবা গোলাম রাজ্জাকের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম গতকাল অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, তদন্ত সংস্থা অভিযোগটি গ্রহণ করেছে।
অভিযোগ দায়েরের আবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের বিধান অনুযায়ী আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আবেদনে ঘটনার স্থান হিসেবে সমগ্র বাংলাদেশ উল্লেখ করা হয়েছে। আর ঘটনার তারিখ ও সময় হিসেবে ১৫ই জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত এবং ঘটনার তারিখে আহত হয়ে পরবর্তীকালে বিভিন্ন তারিখে নিহত বলে উল্লেখ রয়েছে।
আবেদনে অপরাধের ধরন বিষয়ে বলা হয়, আসামিদের প্ররোচনা ও উসকানিতে, পরিকল্পনায় ও নির্দেশে অন্য আসামিরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সমূলে বা আংশিক নির্মূল করার উদ্দেশ্যে দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে সাধারণ নিরীহ, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা, নির্যাতন, আটক, গুম করার মাধ্যমে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অপরাধ।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
আবেদনে আসামি হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহ্‌?মেদ পলক, সাবেক তথ্য ও সমপ্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মাদ আলী আরাফাত, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা উত্তর সিটির সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা-সদস্য, র‌্যাব’র সাবেক ডিজি মো. হারুন অর রশিদ ও কিছু অসাধু র‌্যাব কর্মকর্তা-সদস্য, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এনটিএমসি’র সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান, আদাবর থানার সাবেক ওসি মো. মাহাবুব রহমান, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, আইনজীবী নিঝুম মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামালের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনে আসামি হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন, প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একাত্তর টিভি’র সিইও মোজাম্মেল বাবু, এবি নিউজ২৪ডটকমের সম্পাদক সুভাষ সিংহ রায়, সময় টিভি’র আহমেদ জুবায়ের, এখন টিভি’র বার্তাপ্রধান তুষার আবদুল্লাহ, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, সমকালের সাবেক সম্পাদক আবেদ খান, এটিএন নিউজের সাবেক বার্তা প্রধান প্রভাষ আমিন, একাত্তর টিভি’র সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা, একাত্তর টিভি’র সাবেক বার্তা প্রধান শাকিল আহমেদ, ডিবিসি’র সম্পাদক জায়েদুল হাসান পিন্টু, ডিবিসি’র প্রধান সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম, ইনডিপেনডেন্ট টিভি’র প্রধান বার্তা সম্পাদক আশীস সৈকত, এশিয়ান টিভি’র হেড অব নিউজ মানস ঘোষ, ডিবিসি’র প্রণব সাহা, সাবেক তথ্য কমিশনার মাসুদা ভাট্টি, এটিএন নিউজের সাবেক প্রধান নির্বাহী সম্পাদক মুন্নি সাহা, এটিএন বাংলার সাবেক নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুন, জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়, চ্যানেল আইয়ের সোমা ইসলাম, ইত্তেফাকের শ্যামল সরকার, সমকালের অজয় দাশ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন এবং নবনীতা চৌধুরী ও মিথিলা ফারজানার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার উপ-পরিচালক (প্রশাসন) আতাউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এ পর্যন্ত আটটি অভিযোগ এসেছে, যার মধ্যে সাতটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নিহতের ঘটনা নিয়ে। অপরটি হচ্ছে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি ঘিরে গণহত্যার অভিযোগ। অভিযোগগুলোর তদন্ত হচ্ছে, এর মধ্যে সাতটির তদন্ত একসঙ্গে হচ্ছে। হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি ঘিরে গণহত্যার অভিযোগ আলাদা করে তদন্ত করা হচ্ছে।  ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন হলে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির জন্য আবেদন জানানো হবে।