Tuesday, June 12, 2018

বাংলাদেশের পারমাণবিক কেন্দ্রে ‘স্বার্থ’ ভারতেরও

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব সীমান্ত থেকে দুই ঘন্টারও কম সময়ে পৌঁছা যায় বাংলাদেশের রূপপুরে। সেখানেই উচ্চপ্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মানের কর্মযজ্ঞ চলছে। এই কেন্দ্র থেকে যেই বিদ্যুত উৎপাদিত হবে, তার ভাগ ভারত পাবে না বটে। তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতেরও স্বার্থ আছে। ভারতের এনডিটিভি’র এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, বহু বছর ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক পারমাণবিক বাণিজ্যে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে আসছে ভারত। তবে পারমাণবিক সরবরাহকারী গোষ্ঠী বা এনএসজি’র সদস্য না হওয়ায়, ভারত তেমন সফলতা পায়নি এতদিন। কিন্তু রাশিয়া, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় একটি চুক্তির মধ্য দিয়ে এই লোভনীয় খাতের দ্বার ভারতের সামনে এখন উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
রূপপুর বিদ্যুতকেন্দ্র হবে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারে বাংলাদেশের প্রথম পদক্ষেপ। এতে থাকবে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনে সক্ষম একাধিক চুল্লী। ঢাকা এসব চুল্লী কিনছে রাশিয়ার কাছ থেকে।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়, রূপপুরে যেসব চুল্লী ব্যবহৃত হবে, তা অনেকটাই তামিলনাড়ু অঙ্গরাজ্যের কুদানকুলামে ভারতের নির্মিত চুল্লীর মতোই। এ কারণে ভারত ও বাংলাদেশ এখন একটি প্রকল্পে একযোগে কাজ করছে যেখানে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ। সব ঠিকঠাক থাকলে, বিভিন্ন যন্ত্র-সরঞ্জাম সরবরাহ করা ছাড়াও রূপপুর বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মানে সহায়তা করবে ভারত। বাংলাদেশ ২০২৩ সালের মধ্যে প্রথম চুল্লী নির্মান সম্পন্ন করতে চায়।
বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ, রাশিয়া ও ভারত সরকারের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর আগেও ভারত সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে একটি চুক্তি করি আমরা। ভিভিইআর প্রযুক্তি ব্যবহার করে কুদানকুলামে ভারত দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি উৎপাদন করছে। তাদের এ নিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশও এই অভিজ্ঞতা ধার করতে চায়, কারণ আমরা পারমাণবিক জ্বালানির দিক দিয়ে বেশ নবীন।’
তাকে প্রশ্ন করা হয়, যেহেতু রূপপুর ভারতীয় সীমান্তের কাছেই অবস্থিত, সেহেতু বাংলাদেশ কিছু বিদ্যুত ভারতেও সরবরাহ করবে কিনা। জবাবে সচিব বলেন, ‘না, আমরা এ নিয়ে এখনও ভাবিনি। বাংলাদেশ নিজেই জ্বালানি চাহিদার দেশ।’
ভারতের মুম্বাই-ভিত্তিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার নির্বাহী পরিচালক গৌতম বিশ্বাস বলেন, [ভারতের সঙ্গে] বাংলাদেশ ও রাশিয়ার সহযোগিতা ত্রিদেশীয় সহযোগিতার উত্তম নজির।

অবশেষে গুডবাই

ঐতিহাসিক আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন একে অন্যকে গুডবাই জানালেন। এর মধ্য দিয়ে দৃশ্যত দুই দেশের মধ্যে সিঙ্গাপুরের বহুল প্রতীক্ষিত সামিটের শেষ হতে যাচ্ছে। আজই স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় এয়ারফোর্স ওয়ানে করে সিঙ্গাপুর থেকে উড়াল দেয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। অন্যদিকে তার সঙ্গে আলোচনা শেষে এরই মধ্যে সিঙ্গাপুরের সেন্তোসা দ্বীপ ত্যাগ করেছে কিম জং উনকে বহনকারী গাড়িবহর। এর আগে দু’নেতা একটি ‘কমপ্রিহেনসিভ’ ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করেন। এতে কি আছে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায় নি। তবে স্থানীয় সময় দুপুর আড়াইটায় এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। তাতে কিম উপস্থিত থাকবেন না বলেই মনে হচ্ছে। এদিন দু’নেতা শীর্ষ পর্যায়ের উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। সব মিলিয়ে এ আলোচনা হয়েছে প্রায় ৫ ঘন্টার মতো। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন। ডকুমেন্টে স্বাক্ষরের পর পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি কিম জং উনকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানাবেন। আরও বলেছেন, কিম জং উনের সঙ্গে তিনি একটি অত্যন্ত স্পেশাল বন্ড তৈরি করেছেন। তাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনার সঙ্গে এখানে উপস্থিত হতে পারা সম্মানের। ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করার পর তারা দু’জনেই যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার পতাকার সামনে দাঁড়ান। এ দিনে শেষবারের মতো আবার তারা করমর্দন করেন। এ সময় সমবেত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেন, তিনি (কিমের) চমৎকার একজন সমঝোতাকারী। তার দেশের মানুষের পক্ষে এই সমঝোতা।  সাংবাদিকরা এ সময় তার কাছে জানতে চান উত্তর কোরিয়ার নেতার কাছ থেকে তিনি কি শিক্ষা পেলেন? জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমি শিখেছি যে, তিনি একজন অত্যন্ত মেধাবী মানুষ। আমি আরো শিখেছি, তিনি নিজের দেশের মানুষকে খুবই ভালবাসেন। ট্রাম্প আবার আশস্ত করেন তারা আবারও সাক্ষাতে মিলিত হবেন। উত্তর কোরিয়া খুব দ্রুততার সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্তকরণ প্রক্রিয়া অবলম্বন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। এ ইস্যুতে কি কিম রাজি হয়েছেন? সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমরা এ প্রক্রিয়া খুব, খুব দ্রুততার সঙ্গে শুরু করছি।

বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানে লাশের সংখ্যা বাড়ছে by স্বাতী গুপ্তা ও সুগাম পোখারেল

একটি বন্দুকের শব্দ। একজন নারী কাঁপতে কাঁপতে প্রার্থনা করতে লাগলেন। একটি গুলি বেরিয়ে গেল। এক দলা বেদনা ছড়িয়ে পড়লো। দ্বিতীয় গুলির শব্দে ছড়িয়ে পড়লো বাতাসে আর্তনাদ। পাশেই সাইরেন বেজে উঠলো। শোনা গেল একজন পুরুষের ফিসফিসানি শব্দ। গত সপ্তাহে প্রকাশিত দু’সন্তানের মা আয়েশা বেগমের ধারণ করা রেকর্ডিংয়ের অংশ এটুকু। তবে এ বিষয়ে যাচাই করতে পারেনি সিএনএন। আয়েশা বেগম বলেছেন, কক্সবাজারে গত ২৭শে মে তার স্বামী আকরামুল হকের শেষ সময়টাকে তিনি ১৫ মিনিটের ওই রেকর্ডিংয়ে ধারণ করেছেন। কর্তৃপক্ষ বলছে, তিনি মাদকের ব্যবসায়ী ছিলেন। তার পরিবার বলছে, তিনি ছিলেন জেলা পর্যায়ের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে কথা বলতেন। বাংলাদেশে যখন মাদকের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন চলছে তখন জাতিসংঘ বলছে, বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো গত তিন সপ্তাহে ১৩০ জনকে হত্যা করেছে। তার মধ্যে অন্যতম আকরামুল হক। নিজের স্বামী হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছেন আয়েশা বেগম। তিনি বলেন, আমার মেয়েরা তাদের পিতাকে হারিয়েছে।
অনেক বছর ধরে বাংলাদেশ মাদকের সমস্যা মোকাবিলা করছে। এখানে অ্যামফেটামিনে বাজার সয়লাব এবং ডিলাররা যুব সমাজকে টার্গেট করছে। অপ্রত্যাশিতভাবে ১৫ই মে বাংলাদেশ সরকার মাদকের ডিলার ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তা সাহেলি ফেরদৌস সিএনএনকে বলেছেন, গত তিন সপ্তাহে সারাদেশে এ অভিযানে প্রায় ১৫০০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতের্তে মাদকের বিরুদ্ধে যে নৃশংস লড়াই করেছেন বাংলাদেশের এই অভিযানকে তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারের বিরুদ্ধে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ। তারা চাইছে, মাদকের বিরুদ্ধে এই অভিযোন স্থগিত করুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এবং প্রতিটি নাগরিককে তার যথাযথ আইনি সহায়তা দিক। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, এসব মানুষের মানবাধিকারের বিষয়টি অবশ্যই দেখতে হবে যাতে কোনো নিরাপরাধ মানুষ ভিকটিমে পরিণত না হন। যেসব মানুষ মাদকের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে বিষয়টি মানবাধিকারের দৃষ্টিতে দেখা উচিত। এটা করা উচিত সংবিধান অনুযায়ী।
নতুন মাদকাসক্তদের মধ্যে প্রিয় হলো অ্যামফেটামিন ও ক্যাফেইনের সমন্বয়ে তৈরি ইয়াবা। মুসলিম এ দেশটিতে এলকোহল নিষিদ্ধ। তবে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে, যদিও তা বিপজ্জনক। সরকারের ২০১৬ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে কমপক্ষে ২ কোটি ৯০ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে। অথচ ২০১১ সালে তা ছিল মাত্র ১৩ লাখ। এর বেশির ভাগই আসছে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে। ওই এলাকায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ফলপ্রসূ হয় নি।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কড়া নিন্দা জানিয়ে একটি বার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার জায়েদ রাদ আল হোসেন। তিনি বলেছেন, সরকারের মাদক বিরোধী অভিযান বিপদজনক এবং এতে আইনের শাসনের মোটেও তোয়াক্কা করা হচ্ছে না বলেই ইঙ্গিত মেলে। যেহেতু ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাই এক্ষেত্রে খেয়ালখুশিমতো অনেক লোককে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের মানবাধিকারের বিষয়টি মাথায় রাখা হয় না। বুধবার একটি বিবৃতি দিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্রাড এডামস বলেছেন, যতক্ষণ না এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হজেচ্ছ এবং জনসাধারণকে রক্ষার বিষয়টিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এই অভিযান স্থগিত করা উচিত। এক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের গুরুত্বের কথা বলেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাটও। গত সপ্তাহে তিনি বলেছেন, আমাদের সমাজে যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা দোষী প্রমাণিত না হচ্ছি ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিরপরাধী। তাই সবারই এই অধিকার থাকা উচিত। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ বলছে, এই অভিযান স্থগিতের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। গত সপ্তাহে তিনি প্রকাশ্যে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এতসব ঘটনার মধ্যে আপনি কি আমাকে এমন একজন নিরপরাধ মানুষ দেখাতে পারবেন যিনি এর মধ্যে পড়ে শিকারে পরিণত হয়েছেন?
এ সপ্তাহে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সিএনএনকে বলেছেন, যতক্ষণ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না আসবে ততক্ষণ মাদক বিরোধী অভিযান চলবে। বুধবার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে এক র‌্যালিতে অংশ নিয়েছিলেন কয়েক ডজন মানুষ। ঢাকার শাহবাগে একটি মানববন্ধন করার চেষ্টাকালে উচ্চ পর্যায়ের অধিকারকর্মী ইমরান এইচ সরকারকে সাত ঘন্টা আটক করে রাখে পুলিশের বিশেষ বাহিনী। 
আরেকটি পরিবার বিপর্যস্ত: ২৫শে মে গুলি করে হত্যা করা হয় কামরুল ইসলামকে (২৫)। তিনি ছিলেন উচ্চ পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ীর তালিকায়। মাদক ও অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে তার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা আছে। তবে তিনি অভিযুক্ত হয়ে শাস্তি পান নি। তিনি ঢাকায় একটি বাস টার্মিনালের কাছে রাস্তার পাশে খাবারের ব্যবসা করতেন। তিনি ছিলেন তার সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার স্ত্রী তাসলিমা স্বীকার করেন, তিনি মাদকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু ১০ বছর আগে তার প্রথম মেয়ের জন্মের পর তা বাদ দিয়েছেন। তার ভাষায়, তারপর থেকে আমাদের ছিল সুখী দাম্পত্য জীবন। আরো দুটি কন্যাকে নিয়ে আমরা সুখী ছিলাম। এখন আমরা একেবারে অসহায়। আমাদেরকে কেউই কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি।
(গত ৯ জুন ২০১৮ অনলাইন সিএনএন-এ প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

মানব কঙ্কাল বাণিজ্যে শতাধিক চক্র by শুভ্র দেব

সারা দেশে মানব কঙ্কাল নিয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য। কবরস্থান থেকে কঙ্কাল চুরি করে বিক্রি হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের কাছে। এসব কঙ্কাল  বিক্রি করা হয় চড়া দামে। কঙ্কাল বিক্রি করে অনেকেই রাতারাতি কামিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অভিযোগ আছে বিদেশেও পাচার করা হয় কঙ্কাল। সরকারি মেডিকেলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর যোগসাজশে এই কাজে শতাধিক চক্র জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মূলত প্রত্যন্ত গ্রামের বিভিন্ন কবর থেকে গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা কঙ্কাল চুরি করে। পরে প্রক্রিয়াকরণ করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জেলা শহরের ও ঢাকার বিভিন্ন মেডিকেল পাঠানো হয়। প্রতিটা কঙ্কাল অন্তত ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। শুধু কঙ্কাল নয়, মানুষের মরদেহ পর্যন্ত চুরি করে বিক্রি করে এই চক্র।
চলতি বছরের মার্চ মাসে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভাঙ্গনামারী ইউনিয়নের কুলিয়ারচর ও গজারিয়া গ্রাম থেকে ২৭টি কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটে। ২রা মে গভীর রাতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার জৈনসার ইউনিয়নের চম্পকদি কবর স্থান থেকে ১০টি কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছে। চম্পকদির বাসিন্দা ইমরান হোসেন পরের দিন ওই কবর স্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি কয়েকটি কবর খোঁড়া দেখতে পান। পরে গ্রামবাসীকে বিষয়টি জানালে কঙ্কাল চুরির ঘটনা নিশ্চিত হয়। ৭ই জানুয়ারি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের বানিয়ারার একটি কবরস্থান থেকে ৯টি কবর খোঁড়ে ৫টি কঙ্কাল চুরি হয়েছে। গত বছরের ৫ই ডিসেম্বর শ্রীপুরের ধনুয়া গ্রামের ইন্নছ আলী নজর আলীর পারিবারিক কবরস্থান থেকে কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটে। এর আগে ২১শে নভেম্বর একই ইউনিয়নের নিজ মাওনা গ্রাম থেকে এক ব্যক্তির মরদেহ চুরি হয়েছিল। কঙ্কাল চুরি হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও কারা চুরি করে বা কঙ্কাল চুরির দায়ে ধরা পড়েছে এ ধরনের খবর  খুব বেশি না। দুর্বৃত্তরা অনেকটা গোপনেই রমরমা এই ব্যবসা করে যাচ্ছে। গত বছরের ৮ই নভেম্বর পুলিশের হাতে ধরা পড়ে দুই কঙ্কাল চোর। তাদের কাছ থেকে জানা যায় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।
গাজীপুরের টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকাতে বাসে তল্লাশি চালিয়ে দুই যুবককে আটক করেছিল পুলিশ। তারা হলেন- শেরপুরের নকলা এলাকার ওমর আলীর ছেলে এরশাদ (২৬) ও গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার তাইজুল ইসলামের ছেলে মোতা্বে (২২)। এরশাদ গাজীপুরের শফিপুর এলাকা থেকে দু’টি কঙ্কাল চুরি করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে বিক্রির জন্য যাচ্ছিলেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এরশাদ জানায়, তারা চুরি করে আনা প্রতিটি কঙ্কাল ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে। কিন্তু যাদের কাছে বিক্রি করে তারা আরো বেশি দামে বিক্রি করে। মেডিকেল কলেজগুলোতে কঙ্কালের অনেক চাহিদা রয়েছে। সিন্ডিকেটরা বিদেশেও কঙ্কাল পাচার করছে বলে তারা জানায়। তারা গ্রামেগঞ্জের কবর থেকে কঙ্কাল চুরি করে। নির্দিষ্ট একটি দামে তুলে দেয় মেডিকেল কলেজের দালালদের কাছে। ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে রাজধানীর কাফরুলের ইটখোলা এলাকার একটি বাসা থেকে ৪০টি মানব কঙ্কাল উদ্ধার করেছিল পুলিশ। ওই সময় বাসা থেকে নুরুজ্জামান নামের এক মেডিকেল শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। সে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নুরুজ্জামান জানিয়েছিল, সিনিয়র ভাইদের  কাছ থেকে কঙ্কাল কিনে সে জুনিয়র শিক্ষার্থীর কাছে বিক্রি করে।
স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মিডফোর্ডের এমবিবিএস শেষ বর্ষের ফল প্রত্যাশী শিক্ষার্থী মাঈনুল হাসান মানবজমিনকে বলেন, আমরা মূলত দুইভাবে কঙ্কাল পেয়ে থাকি। প্রথমত সিনিয়র ভাইদের কাছ থেকে তাদের পুরাতন কঙ্কাল ক্রয় করি। আর তা না হলে সিনিয়র ভাইয়েরা নতুন কঙ্কাল কিনে দেন। তবে তারা কিভাবে এটা সংগ্রহ করেন তা আমরা জানি না। পুরাতন কঙ্কাল আমরা সাধারণত ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকায় কিনি। আর নতুন কিনলে তার চেয়ে বেশি খরচ হয়। তিনি বলেন, আমি যতটুকু জানি কঙ্কাল সাধারণত ভারত থেকে আনা হয়। কিন্তু ভারত থেকে আনা কঙ্কালের খরচ অনেক বেশি পড়ে। তাই দেশের কঙ্কাল দিয়েই সাধারণত মেডিকেল শিক্ষার্থীদের চাহিদা মেটানো হয়। শুনেছি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আনা কঙ্কাল রাজশাহী ও চাঁপাই নবাবগঞ্জের পদ্মার পাড়ে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কবর থেকে কঙ্কাল চুরির পাশাপাশি সরকারি মেডিকেল কলেজের অসাধু কর্মচারীরা কঙ্কাল সংগ্রহ করে। এক্ষেত্রে মেডিকেলের মর্গে আসা বেওয়ারিশ মরদেহকে কাজে লাগানো হয়। বেওয়ারিশ মরদেহের যদি কিছুদিন ওয়ারিশ খুঁজে পাওয়া না যায় তবে একজন নকল ওয়ারিশ তৈরি করা হয়। ওই ওয়ারিশকে দিয়েই লিখিতভাবে মরদেহটি দান করানো হয়। পরে মরদেহটি দুই থেকে তিন লাখ টাকা দামে বিক্রি করা হয়। মেডিকেল শিক্ষার্থীরা কিছুদিন তাদের শিক্ষণ প্রশিক্ষণে ব্যবহার করার পর কঙ্কাল তৈরি করা হয়। বিক্রি করা হয় মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে। অনেক সময় সরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থী ছাড়া বেসরকারি মেডিকেলে বিক্রি করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি মেডিকেল কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী মানবজমিনকে বলেন, এমবিবিএস-এর প্রথম দেড় বছর এনাটমি বিভাগে কঙ্কালের প্রয়োজন হয়। তখন প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে কঙ্কাল সংগ্রহের হিড়িক পড়ে। সিনিয়র ভাইদের কাছ থেকে ছাড়া যে যার মতো কঙ্কালের ব্যবস্থা করে। এক্ষেত্রে গুনতে হয় বড় অংকের টাকা। বাজারে প্লাস্টিকের কঙ্কাল পাওয়া গেলেও সেটা দিয়ে ভালো শেখা যায় না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এনাটমি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. লায়লা আনজুমান বানু মানবজমিনকে বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের জন্য স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই কোনো ব্যক্তির দানকৃত মরদেহ ও বেওয়ারিশ মরদেহ থেকে কঙ্কাল সংগ্রহ করা হয়। একসময় চিকিৎসকরাই মরদেহ থেকে কঙ্কাল প্রক্রিয়া করত। কিন্তু এখন মেডিকেল কলেজের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা এই কাজ করছে।
বিএসএমএমইউ’র এই চিকিৎসক মনে করেন বাংলাদেশে কঙ্কাল বহন, বিক্রি বা এর কোনো মূল্য নেয়া হবে কিনা, যদি নেয়া হয় কত নেয়া হবে এর কোনো নীতিমালা নেই। তাই কঙ্কাল নিয়ে অনেক বাণিজ্য হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ নিয়ে অনেক বলা হয়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো নীতিমালা করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমি ভীষণভাবে চাইছি একটা নীতিমালা হোক। তা না হলে অনেকেই মরদেহ ও কঙ্কাল নিয়ে ব্যবসা করবে। কারণ অন্য কোনো দেশ থেকে আমাদের কঙ্কাল আমদানি করার প্রয়োজন হয় না। বরং আমাদের দেশ থেকেই হয়তো কোনো না কোনো ভাবে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।