Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts

Friday, July 31, 2026

মাওলানা ভাসানীর ‘খামোশ’ by আনু মুহাম্মদ

‘মাওলানা ভাসানী’ বলে যাঁকে আমরা চিনি, সেই ব্যক্তির প্রকৃত নাম তা নয়। তাঁর আসল নামে এ দুই শব্দের কোনোটিই ছিল না। ‘মাওলানা’ ও ‘ভাসানী’—দুটি শব্দই পরবর্তী সময়ে তাঁর অর্জিত পদবি বা বিশেষণ। ‘মাওলানা’ তাঁর ধর্মবিশ্বাস ও চর্চার পরিচয়, আর ‘ভাসানী’ সংগ্রাম ও বিদ্রোহের স্মারক। তাঁর জীবন ও তৎপরতা এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল, যাতে পদবি ও বিশেষণের আড়ালে তাঁর আসল নামই হারিয়ে গেছে। আসলে তাঁর নাম ছিল আবদুল হামিদ খান। ডাকনাম ছিল চ্যাগা, শৈশবে এই নামই ছিল তাঁর পরিচয়।

প্রাচুর্য, বিত্তবৈভব, বংশের প্রভাব, যেগুলো রাজনৈতিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠায় সাধারণত কাজে লাগে, সেগুলোর কোনোটিই তাঁর ছিল না। জীবনে তিনি যাত্রাদল থেকে শুরু করে দেওবন্দ মাদ্রাসা—সব অভিজ্ঞতাই ধারণ করেছিলেন। এসবের মধ্যে তাঁর সাধারণ যে প্রবণতা তাঁকে পরবর্তীকালে বিশিষ্ট করে তুলেছিল, তা হলো তাঁর গণসম্পৃক্ততা।

এই গণসম্পৃক্ততা তাঁকে নিজের ও চারপাশের সমষ্টির জীবনকে এক করে দেখার ক্ষমতা দান করেছিল। তিনি সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদকে দেখেছিলেন ওপর থেকে নয়, চারপাশের পিষ্ট মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে।

দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব, মানবেতর জীবন যে নিয়তি নয়; নির্দিষ্ট কিছু কারণ, ব্যবস্থা ও ক্ষমতা এগুলোকে সৃজন করে, টিকিয়ে রাখে—এ উপলব্ধি তাঁকে আর সব মাওলানা-পীর থেকে ভিন্ন করে ফেলে। এই কপট জগতে তিনি হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ আর জনতার মধ্যে তিনি পরিণত হন মজলুম জননেতায়। তিনি শুধু মুসলমান নন, হয়ে উঠেছিলেন কথিত তৃতীয় বিশ্বের সব ধর্ম, জাতি ও লিঙ্গের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।

মাওলানা, পীর-মাশায়েখরা আমাদের সমাজে খুবই ক্ষমতাধর। শাসক ও শোষকেরা তাঁদের সব সময়ই পৃষ্ঠপোষকতা দেন নিজেদের ভিত্তি শক্ত রাখার জন্য। অন্যদিকে বহু মানুষ নিজেদের অসহনীয় জীবনকে সহনীয় করার জন্য এই ধর্মীয় নেতা বা পেশাজীবীদের কাছেই হাজির হন। দোয়া, ভরসা, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ দিয়ে অসহায় মানুষ শরীরের অসুখ সারাতে চান, সন্তানের নিরাপত্তা চান, বিপদে-আপদে আল্লাহর আশ্রয় চান, বিভিন্ন কায়দার জালেমের হাত থেকে বাঁচার জন্য কোনো অলৌকিক সহায়তার প্রার্থনা করেন। যেখানে চিকিৎসার পয়সা নেই, ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই; যেখানে মানুষের নিজেদের যে প্রবল শক্তি আছে, সেই বোধ স্পষ্ট নয়; যেখানে নদীভাঙন, জুলুমবাজ, ক্ষমতাধরদের অত্যাচার-শোষণে বর্তমান রক্তাক্ত, ভবিষ্যৎ ভীতিকর সেখানে এই পথ ছাড়া মানুষ আর কোনো উপায় দেখে না।

অধিকাংশ ধর্মীয় নেতা পয়সা নেন, এসব বিষয়ে দাওয়াই দেন এবং মানুষকে ধৈর্য ধরতে বলেন, সবুর করতে বলেন, কপাল আর বরাত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বলেন। কিন্তু নিজেরা নানাভাবে আটকে থাকেন তাঁদের সঙ্গেই, যাঁরা সংখ্যালঘু, কিন্তু জালেম ক্ষমতাধর। জালেমদের ওপর ধর্মীয় নেতাদের নির্ভরতা, আবার ধর্মীয় সার্টিফিকেটের ব্যাপারে তাঁদের ওপর জালেমদের নির্ভরতা এক দুষ্টচক্র তৈরি করে। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা রক্ষা করেন পরস্পরকে।

এভাবেই নিপীড়িত মানুষের সামনে তৈরি হয় এক অচলায়তন। নানা ঝড়ঝাপটা আর আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত মানুষদের কাছে তাঁদের একমাত্র বক্তব্য থাকে ধর্মীয় আচার পালনে, পরকালের অসীম সুখ পাওয়ার জন্য ইহকালের বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করতে। এ ধরনের ধর্মীয় নেতাদের বয়ানে তাই ক্ষমতার তোয়াজ, নারীবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি বিষ থাকে।

মাওলানা ভাসানীও পীর ছিলেন। লাখ লাখ মানুষ তাঁর মুরিদ ছিলেন। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গভেদ না থাকায় তাঁর কাছে কারও আসতে বাধা ছিল না। বিভিন্ন ধর্মের নারী-পুরুষ এবং বলাই বাহুল্য গরিব মানুষ, যাঁরা জমিদার, মহাজন আর মালিকশ্রেণির শোষণ-পীড়নে বিপর্যস্ত ও ক্লিষ্ট, তাঁর কাছে হাজির হতেন। অন্যান্য ধর্মজীবীর মতো এসব মানুষের দুঃখ-দুর্দশা মাওলানা ভাসানীর আয়-উপার্জনের উৎস ছিল না। তিনি দোয়া, পানিপড়া, ঝাড়ফুঁক—সবই দিতেন, কিন্তু অসুখ বেশি হলে পরামর্শ দিতেন ডাক্তার দেখাতে, প্রয়োজনে ওষুধ কেনার জন্য টাকাও দিতেন।

আরও যে জায়গায় এসে মাওলানা ভাসানী অন্যদের চেয়ে শুধু আলাদা নয়, প্রায় বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিলেন নিজেকে, সেটিই এক মাওলানাকে যুক্ত করেছিল এক ভাসানীর সঙ্গে। মানুষ তাঁর কাছে ভরসা চাইতেন আর বলতেন তাঁদের অবর্ণনীয় অন্যায় ও অবিচার ভরা জীবনের কথা।

এ ক্ষেত্রে ভাসানীর অবস্থান ছিল এ-ই যে এই নারকীয় অবস্থা নিয়তি নয়, এটা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বিধান নয় আর সর্বোপরি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে এ অবস্থা পরিবর্তন করা যায়। এই ভিন্ন অবস্থানের কারণেই তিনি জীবনের তরুণকাল থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছিলেন। ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত’, এটি তাঁর জীবনের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মাওলানা ভাসানীর জীবন, উচ্চারণ ও সংগ্রাম, ইসলাম ধর্মের মালিকানায় অধিষ্ঠিত তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্র, সামরিক শাসক, জোতদার, মহাজন, সামন্ত প্রভু এবং তাঁদের প্রিয় ধর্মীয় নেতাদের ক্ষিপ্ত করেছিল। তাঁকে অভিহিত করা হতো ‘ভারতের দালাল’, ‘লুঙ্গিসর্বস্ব মাওলানা’ এমনকি ‘মুরতাদ’ হিসেবে! শাসক-শোষকদের এই ক্ষিপ্ততা আসলে ছিল একটা শ্রেণিগত রোষ। পোশাক, জীবনযাপন, বয়ান, আওয়াজ—সব দিক থেকেই ভাসানী ছিলেন নিম্নবর্গের মানুষ। লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই অভিজাত ইসলামের বিপরীতে তাঁর কাছে ইসলামের নিপীড়িত মানুষের ভাষা তৈরি হয়। ধর্ম যেখানে শাসক-জালেমদের একচেটিয়া মালিকানাধীন নিরাপদ অবলম্বন, সেখানে মাওলানা ভাসানী সেই নিরাপদ দুর্গকেই প্রশ্ন করেন।

অন্যায়-অবিচার তো বিমূর্ত নয়, দুঃখ-দুর্দশাও অজানা গ্রহ থেকে নেমে আসা ব্যাপার নয়। দায়িত্ব আর সংবেদনশীলতা দিয়ে মানুষের এসব অভিজ্ঞতা দেখলে উন্মোচিত হয় এক বিরাট রহস্য। আবিষ্কার করা যায় মানুষের মানবেতর জীবনের কারণ, শনাক্ত করা যায় এর পেছনের সামাজিক ব্যবস্থা, নিয়ম ও বিধি। পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করা যায় সেসব শ্রেণি-গোষ্ঠীকে, যারা এসব ব্যবস্থার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে, এসব ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য যাবতীয় শক্তি প্রয়োগ করে; ধর্মও যা থেকে বাদ যায় না।

এর থেকে সার্বিক মুক্তি লাভের লড়াই তাই অনির্দিষ্ট হতে পারে না, লক্ষ্যহীন হতে পারে না। এর জন্য দরকার এমন একটা সমাজ, এর চিন্তা করা, স্বপ্ন দেখা ও দেখানো, যার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানুষ এই নারকীয় অবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করবে। তাই সৌদি আরবের রাজতন্ত্র নয়, ভাসানী লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন শোষণ-নিপীড়ন-বৈষম্য থেকে মুক্ত সমাজব্যবস্থা। যে সমাজ মানুষকে হাসি দিতে পারে, মানবিক জীবন দিতে পারে, কর্তৃত্ব দিতে পারে, সে রকম সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই-ই তিনি কর্তব্য হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থিত করেছিলেন।

সুতরাং অন্যায়-অবিচার আর দুঃখ-দুর্দশা থেকে মানুষের মুক্তির জন্য দোয়া-দরুদ নয়, দরকার সমষ্টিগত লড়াইয়ের রাস্তা তৈরি—এ উপলব্ধি মাওলানাকে একই সঙ্গে সক্ষম করেছিল সংগ্রামের প্রতীক ভাসানী হয়ে উঠতে। যে ভাসানী সব রকম জালেমদের প্রবল দাপট আর আগ্রাসনের সামনে লাখো মানুষের স্বর নিজের কণ্ঠে ধারণ করে পাল্টা ক্ষমতার প্রবল শক্তিতে রুখে দাঁড়াতেন, এক কণ্ঠে জনতার ভেতর থেকে উঠে আসা অসীম শক্তিকে মূর্ত রূপ দিতেন। ক্লান্ত, বিবর্ণ, ক্লিষ্ট মানুষ শুধু নয়, প্রকৃতিকেও প্রাণবন্ত, তরতাজা করে তুলত জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের হুঁশিয়ারি—‘খামোশ’!

এই উচ্চারণ নিয়ে মাওলানা ভাসানী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তরকালে, স্বপ্নভঙ্গের কালে মানুষের হতাশা ও প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, ভারতের শাসকশ্রেণির পরাক্রমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ফারাক্কার অভিশাপের বিরুদ্ধে সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বামপন্থী নেতাদের ভ্রান্তি ও হঠকারিতায় ভাসানীর ক্ষমতা নানা পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তিনিও হতাশায় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। তাঁর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই তাই আমাদের লড়াইয়ের শিক্ষা।

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে, গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশার বিপরীত যাত্রায়, বাংলাদেশের মানুষ যখন সাম্রাজ্যবাদ ও দেশি-বিদেশি শাসকশ্রেণির নানামুখী আগ্রাসনে বিপর্যস্ত, বিভিন্ন লুটেরা গোষ্ঠীর দখল, লুণ্ঠন, জোরজবরদস্তিতে দিশাহারা, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সম্প্রসারণে বিভ্রান্ত, তখন নিপীড়িত মানুষের ধর্মের মুক্তির ভাষা নিয়ে মাওলানা ভাসানী দেশি-বিদেশি দানবের বিরুদ্ধে বিশ্বমানবের প্রবল আওয়াজ হয়ে বারবার হাজির হন—‘খামোশ’!

আনু মুহাম্মদ, শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-17%2Fhcidyqo2%2FMotamot.jpg?rect=0%2C0%2C718%2C479&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আর্ট: মাসুক হেলাল

Monday, July 20, 2026

৫০০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ করেন মুসলিমরা, জেনে নিন সেই ইতিহাস

আমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্র প্রজাতন্ত্র হিসেবে গড়ে ওঠার অনেক আগেই দেশটির ইতিহাসের অংশ ছিলেন মুসলমানরা। ১৬০৭ সালে ইংরেজদের জেমিটাউন প্রতিষ্ঠা এবং ১৬২০ সালে পিলগ্রিমদের প্লাইমাউথে পৌঁছানোর কয়েক দশক আগেই ১৫২০ ও ১৫৩০-এর দশকে মরক্কোর এস্তেবান দে দোরান্তেস (এস্তেভানিকো নামে পরিচিত) বর্তমান টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো ও অ্যারিজোনার মরুভূমিতে পা রেখেছিলেন।

মরক্কোর আটলান্টিক উপকূলের আজেমমুরে জন্মগ্রহণকারী এস্তেভানিকোকে দাস হিসেবে স্পেনে এবং পরে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়। এক মর্মান্তিক অভিযানে অধিকাংশ মানুষ মারা গেলেও তিনি বেঁচে যান। তিনি বিভিন্ন নেটিভ আমেরিকান ভাষা শেখেন এবং ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল পাড়ি দেওয়া প্রথম প্রাচীন পৃথিবীর অধিবাসীদের একজন হয়ে ওঠেন। তার মরক্কোয় জন্ম ও জীবনীসংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ নিশ্চিত করে যে তিনি একজন মুসলিম ছিলেন।

অধিকাংশ মুসলিম যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন ক্রীতদাস হিসেবে। তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাম্বিয়ান ও সাহেলিয়ান অঞ্চলের, যেখানে শতাব্দী ধরে ইসলামিক চর্চা বিদ্যমান ছিল।

ধারণামতে, তাদের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারেরও বেশি। দাস হিসেবে বন্দি হওয়ার আগেই তাদের অনেকে আরবিতে শিক্ষিত এবং কোরআন ও ইসলামী আইনে দক্ষ ছিলেন। দাসত্ব করা ওমর ইবনে সাইদের আত্মজীবনীর মতো কিছু লিখিত রেকর্ডও রেখে গেছেন তারা।

তাদের গভীর প্রভাব দেখা যায় আমেরিকান সংস্কৃতি ও সংগীতে। গবেষকদের মতে, আমেরিকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ‘জ্যাজ’ সংগীতের বিকাশে মুসলিম আমেরিকানরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে শ্যিক্ষেতে কাজ করার সময় দাসদের গাওয়া ‘ফিল্ড হলার’ গান জনপ্রিয় আমেরিকান সংগীতের অন্যতম ভিত্তি ছিল।

অনেক গবেষক এই গানের সুরের মূল খুঁজে পেয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দাসদের মধ্যে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা ইসলামি প্রার্থনার ঐতিহ্য ক্ষেতে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। ‘ফিল্ড হলার’, আজান ও কোরআন তিলাওয়াতের সুর ও ভঙ্গির মধ্যে স্পষ্ট মিল পাওয়া যায়। ১৬৪০-এর দশকে মিসিসিপির একটি কাজের গানের সঙ্গে আজানের সুরগত মিলের বিষয়টি ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও একজন আমেরিকান মুসলিম বড় ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৪ সালে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ক্যাসিয়াস ক্লে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে মুহাম্মদ আলি রাখেন। তিন বছর পর ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দিতে বলা হলে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এর জবাবে তার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের খেতাব কেড়ে নেওয়া হয়, রিংয়ে নামা নিষিদ্ধ করা হয় এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। টানা তিন বছর (২৫ থেকে ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত) এই সেরা বক্সারকে রিংয়ে লড়তে দেওয়া হয়নি।

পরবর্তীকালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হন। ১৯৭১ সালে ‘ক্লে বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ মামলায় বিচারকেরা সর্বসম্মতিক্রমে তার সাজা বাতিল করেন। আদালত স্বীকার করে যে, অলির এই সিদ্ধান্ত খাঁটি ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে আমেরিকার সাংবিধানিক ধর্মীয় সুরক্ষা কেবল খ্রিষ্টান বা ইহুদিদের জন্য নয়, বরং সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

যুক্তরাষ্ট্র গঠনে মুসলমানদের তৃতীয় অবদান হলো তাদের নাগরিক সম্পৃক্ততা ও দানশীলতা। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম হলো জাকাত, যেখানে নিজের সঞ্চিত সম্পদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ দরিদ্রদের দান করার নিয়ম রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে স্বেচ্ছায় দান বা সদকা।

ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুসলিম ফিলানথ্রপি ইনিশিয়েটিভ’-এর গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ হলেও ২০২০ সালে আমেরিকান মুসলমানরা দানকার্যে প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার (৪.৩ বিলিয়ন) দিয়েছেন। গড়ে প্রতি দাতা দান করেছেন প্রায় ৩ হাজার ২০০ ডলার, যা তাদের অমুসলিম প্রতিবেশীদের (১ হাজার ৯০০ ডলার) চেয়ে অনেক বেশি।

এই অনুদানের প্রায় ৮৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই থাকে। এর বড় অংশ মসজিদ বা মুসলিম প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে দারিদ্র্যবিমোচন, কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যয় হয়। ২০২১ সালে প্রদত্ত প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের জাকাতের বড় একটি অংশ আত্মীয় বা উপাসনালয়ের বদলে দাতব্য অলাভজনক সংস্থায় দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের এই সময়ে জানা যায়, মুসলমানরা কেবল অতিথি নন, বরং দেশটির ইতিহাস গড়ার অন্যতম অংশীদার ছিলেন।

সূত্র: দ্য কনভারসেশন

৫০০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পদার্পণ করেন মুসলিমরা, জেনে নিন সেই ইতিহাস
ছবি: দ্য কনভারসেশন

Tuesday, July 7, 2026

ভারতে এবার কি তাজমহল ভেঙে মন্দির করা হবে

সারা বিশ্বের পর্যবেক্ষক ও ইতিহাসবিদদের জন্য ভারতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য তাজমহলের আয়ু বোধ হয় ফুরিয়ে আসছে। উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্ট গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে (এএসআই) নোটিশ জারি করে উত্তর প্রদেশেরই আগ্রা আদালতের একটি আদেশ সম্পর্কে তাঁদের মতামত জানতে চেয়েছেন।

উত্তর প্রদেশের আগ্রা আদালত অতীতে তাজমহল জরিপের উদ্দেশ্যে এই সৌধের স্থিরচিত্র ও ভিডিওগ্রাফির জন্য অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগে অনুমতি দেননি। অর্থাৎ তাজমহল জরিপ করার যে আবেদন এক আইনজীবী ২০১৫ সালে করেছিলেন, সেই আবেদন অতীতে খারিজ করে দিয়েছিলেন আগ্রা আদালত।

সম্প্রতি সেই মামলার শুনানি করেই সোমবার এলাহাবাদ হাইকোর্ট জানতে চেয়েছেন, কেন তাজমহলের নিচে মন্দিরের অস্তিত্ব খুঁজতে জরিপ করা যাবে না।

আবেদনকারীর পক্ষে উপস্থিত আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের বক্তব্য শোনার পর এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চ জানতে চান, কেন সৌধের জরিপ করা যাবে না। আবেদনকারী আইনজীবী জৈনের দাবি, বিশ্বখ্যাত এই স্মৃতিসৌধটি আসলে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির, যার নাম ‘তেজো মহালয়া’। এটি ভগবান মহাদেবের উদ্দেশে উৎসর্গী করা হয়েছিল।

হিন্দু দেবতা মহাদেবকে মামলাটির মূল পক্ষ করা হয়েছে, যেমন সাধারণ মানুষকে করা হয়। মহাদেবকে মূল পক্ষ করে তাঁর ‘পরম বন্ধু’ আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈন এবং আরও বেশ কয়েকজন ভক্তের মাধ্যমে এই পিটিশন করা হয়েছে।

বিতর্কিত রামমন্দির-বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বছর কয়েক আগে হিন্দুত্ববাদী হরিশঙ্কর জৈনের ছেলে আইনজীবী বিষ্ণুশঙ্কর জৈন এক সাক্ষাৎকারে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, যেসব সৌধের নিচে হিন্দুদের কথিত পবিত্র স্থান রয়েছে, একটি দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাঁরা। এই তালিকা দীর্ঘ।

বিষ্ণুশঙ্কর বলেছিলেন, এসব স্থান বেছে বেছে বের করে মামলা করা হবে। বর্তমানে সেই কাজই করছেন পিতা–পুত্রের এই দল। বিষ্ণুশঙ্কর জৈন এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, তারা হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত।

কেন তাজমহলকে হিন্দু মন্দির বলা হচ্ছে

এলাহাবাদ হাইকোর্টের মামলায় বাদীপক্ষ (আবেদনকারী) একটি ঘোষণামূলক ডিক্রি ও নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছে, যার মূল বক্তব্য হলো—এই স্মৃতিসৌধটি একটি হিন্দু মন্দির। তাই বাদীপক্ষ তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের তাজমহল প্রাঙ্গণের ভেতরে পূজা করার অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন।

বাদীপক্ষের সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এলাহাবাদ হাইকোর্ট সরকার ও এসআই–এর কাছে জানতে চেয়েছেন, বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য কেন জরিপ করা হবে না।

বিতর্কিত রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ ভূমির মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তিতে এই এলাহাবাদ হাইকোর্টই অন্যতম কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের লখনৌ বেঞ্চ ২:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দিয়েছিলেন, অযোধ্যার বিবদমান ২ দশমিক ৭৭ একর জমি হিন্দু দেবতা রাম লালা, রক্ষণাবেক্ষণকারী নির্মোহী আখড়া এবং সুন্নি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের মধ্যে সমান তিন ভাগে ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।

তাজমহলের পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সৌধের ভেতরে ‘দর্শন’ ও ‘পূজা’ করার মৌলিক অধিকার হিন্দুদের রয়েছে। এরপর ২০১৯ সালে তাজমহলে জরিপ করতে একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের আবেদন করা হয়েছিল।

তবে ওই সময় আগ্রার অতিরিক্ত দেওয়ানি বিচারক (সিনিয়র ডিভিশন) ওই আবেদন খারিজ করেছিলেন। আদালত যুক্তি দিয়েছিলেন, বাদীপক্ষ তাজমহলে সুনির্দিষ্ট জায়গা (দাগ নম্বর) নিশ্চিত করার জন্য কোনো রাজস্ব নথি (যেমন খতিয়ান বা খসড়া) দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্পত্তির বর্ণিত সীমানা ও আয়তন (৭৭ বিঘা) বিবাদীপক্ষের নথির সঙ্গে মেলেনি।

এই আদেশের বিরুদ্ধে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে একটি রিভিশন পিটিশন (সংশোধনী আবেদন) রক্ষণাবেক্ষণের অযোগ্য বলে গণ্য করেন আগ্রার অতিরিক্ত জেলা জজ। এই দুটি আদেশকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বাদীপক্ষ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।

আবেদনে বাদীপক্ষ মূল মামলায় করা নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যসংক্রান্ত দাবিগুলো উল্লেখ করে বলেছে, কথিত প্রাচীন তেজো মহালয় মন্দিরটি (তাজমহল), যেখানে দেবতা আগ্রেশ্বর মহাদেব বিরাজ করছেন, সেটি ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব নির্মাণ করেছিলেন।

প্রসঙ্গত, ইউনেস্কো তাজমহলকে একটি ‘হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং বিষয়টি ভারত সরকারের পর্যটনবিষয়ক ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে।

সেই ওয়েবসাইটেই বলা হয়েছে, এটি তৈরি করেছিলেন মোগল সম্রাট শাহজাহান, তাঁর পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে। ওয়েবসাইটে মমতাজ মহল ও শাহজাহানের ছবিও (হাতে বা কম্পিউটারে করা পেন্টিং) রয়েছে।

ইতিহাসবিদদের বক্তব্য, তাজমহল বানানোর কাজ শুরু হয় ১৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে এবং শেষ হয় ১৬৫৩ সালে বা তার আশপাশে। বছর দশেক আগে হিসাব করে দেখা যায়, এই স্মৃতিসৌধটির বাজার মূল্য ৫০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি। এটি ভারতের মুখ্য পর্যটনকেন্দ্র।

হিন্দুত্ববাদীরা ইতিহাস মানতে নারাজ

আবেদনকারী হিন্দুত্ববাদী আইনজীবীরা অবশ্য এই বক্তব্য মানতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্মৃতিসৌধটি রাজা মানসিংহের নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানায় আসে এবং পরবর্তী সময়ে ১৭ শতকে জয়পুরের রাজা জয়সিংহ এই স্থানে অর্থাৎ তাজমহলে অভিষিক্ত হন।

এরপর মোগল শাসক শাহজাহান রাজা জয়সিংহের কাছ থেকে কথিত ‘তেজো মহালয়া’ প্রাসাদটি জোরপূর্বক দখল করেন এবং তাঁর মৃত রানির স্মৃতিসৌধে পরিণত করেন। এই রূপান্তরের জন্য বিতর্কিত সৌধটির কিছু অংশ পরিবর্তন করে ইসলামিক বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়েছিল।

হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা আরও দাবি করেন, অন্তত ১০৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে যা প্রমাণ করে, এই সম্পত্তিটি একটি হিন্দু মন্দির।

মামলার আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, এএসআই ‘বেআইনিভাবে’ মুসলিমদেরকে গত শুক্রবারে তেজো মহালয়া বা তাজমহলে ‘নামাজ’ পড়ার অনুমতি দিয়েছে। এ কারণে দর্শনার্থীদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং ভবন চত্বরের বেশ কয়েকটি তলা তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। বাদীপক্ষের দাবি, হিন্দু ‘পূজা’ ও দেবতার আরাধনা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এই সম্পত্তির ব্যবহার বেআইনি।

আবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, বিতর্কিত সম্পত্তির পরিচয় নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। কারণ, এটি একটি সর্বজনবিদিত প্রাচীন স্মৃতিসৌধ। তা ছাড়া আবেদনকারীদের যুক্তি, সৌধটির শারীরিক বৈশিষ্ট্য, কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য এবং তালাবদ্ধ অংশগুলো ‘কেবল মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে কার্যকরভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়’।

আবেদনে দাবি করা হয়েছে, এএসআই-নিয়ন্ত্রিত এই সৌধটিতে তাদের অবাধ প্রবেশের অধিকার নেই, যার ফলে কার্যকর নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তের জন্য আদালতের নিযুক্ত একজন ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফার নিয়োগ দেওয়া অপরিহার্য।

এই পটভূমিতে আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, হাইকোর্ট যেন আগ্রা আদালতের আদেশ বাতিল করেন এবং ট্রায়াল কোর্টকে (নিম্ন আদালত) গুণাগুণের ভিত্তিতে অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগের আবেদনটি নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেয়।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন একটি স্থগিতাদেশের আবেদনে অনুরোধ করা হয়েছে, হাইকোর্ট যেন এএসআইয়ের পরিচালককে নির্দেশ দেন, আবেদনকারীদের উপস্থিতিতে ভবনের ভেতর ও বাইরের ছবি তোলা হয় এবং তা বর্তমান বিচারিক প্রক্রিয়ায় দাখিল করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে অবগত আইনজীবীরা মনে করছেন, তাজমহল নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল এবং যা ৬ জুলাই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল, তা একটি নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। একইভাবে ভারতে নতুন এক বিতর্কের সূচনা হয়েছিল তিন দশক আগে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে, যা ২০১৯ সালে ভারতে রামমন্দির বলে আদালত চিহ্নিত করেছিলেন। তাজমহলের কপালে কী লেখা আছে, তা বোঝা যাবে আর কয়েক বছরের মধ্যেই।

তাজমহল
তাজমহল। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

Sunday, June 21, 2026

'বাবা' নিয়ে জনপ্রিয় পাঁচটি গানের গল্প by অর্চি অতন্দ্রিলা

'মা'কে নিয়ে যে পরিমাণে গান তৈরি হয়েছে বা যত পরিচিতি পেয়েছে, সে তুলনায় 'বাবা' নিয়ে গান সেভাবে কমই দেখা যায়। তবে আধুনিক সময়ে 'বাবাকে' নিয়ে তৈরি হওয়া বেশ কিছু গানই মানুষের মনে ছাপ ফেলেছে।

জনপ্রিয়তা, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং দীর্ঘ দিন ধরে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নেওয়ার মতো বিষয় বিবেচনায় কয়েকটি গান বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো।

এসব গান তৈরির পেছনের গল্প বা ইতিহাস সম্পর্কে কী জানা যায়?

'বাবা' - জেমস

বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে নগর বাউলখ্যাত জেমসের কণ্ঠে গাওয়া 'বাবা' গানটির অবস্থান অনেক এগিয়ে। "বাবা কতদিন, কতদিন দেখিনা তোমায়, কেউ বলেনা তোমার মত কোথায় খোকা ওরে বুকে আয়" এই গানটিকে বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে বাবাকে নিয়ে সবচেয়ে আবেগঘন আধুনিক গানের একটি হিসেবেও দেখেন অনেকে।

গানটির গীতিকার এবং সুরকার প্রিন্স মাহমুদ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ফারুক মাহফুজ আনাম বা জেমস নাকি এই গানটি গাইতেই আগ্রহী ছিলেন না। শিল্পী ও সুরকার তানভীর তারেকের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে সেটি উল্লেখ করেন তিনি।

"রেকর্ডিং-এ জেমস ভাই গানটি শুনে… এই কয়েকদিন আগে মা বললাম, এখন কী বাবা... কেমন কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে প্রিন্স। তখন আমি বললাম জেমস ভাই, এটা গাইতে হবে। জেমস ভাই বলে কী, আরেকটা গান দে আমারে," সে সাক্ষাৎকারে বলছিলেন মি. মাহমুদ।

তখন স্টুডিওতে প্রয়াত শিল্পী হাসান আবেদুর রেজা জুয়েলও ছিলেন এবং প্রিন্স মাহমুদ তাকে বলার পর তখন তিনি গানটি গাইতে রাজি হন। "জুয়েল ভাই তখন 'বিদায় শব্দটা কেন এত যন্ত্রণাময়' এটা গেয়ে ফেলছে, তখন আমি জুয়েল ভাইকে বললাম আপনি বাবা গানটি গান, জেমস ভাইকে এটা দিয়ে দেই" বলছিলেন তিনি।

পরের দিন আবারও স্টুডিওতে আসেন তারা তিনজন। জেমস তখন 'বিদায় শব্দটা কেন এত যন্ত্রণাময়' গানটা শুনে রেকর্ডিং শুরুর ঠিক আগে আবার বাবা গানটা শুনতে চান। "এদিকে জুয়েল ভাই তো বাবা গানটা মোটামুটি বোধহয় তুলে ফেলছে, কিন্তু জুয়েল ভাই এত ভালো মানুষ ছিল… পরে জেমস ভাই এসে বলে ঠিক আছে এটাই গাই।"

নব্বই দশকের শেষদিকে এসে প্রকাশিত সেই গান এখনও বাবা দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবাকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। বাবাকে হারানোর বেদনা আর স্মৃতিমেশানো সেই গান অনেকের জন্য গভীর আবেগের কারণ হয়।

'আয় খুকু আয়' - হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদার

বাবাকে নিয়ে বাংলা গানের ইতিহাসে বড় সাড়া জাগানো গান 'আয় খুকু আয়'। গানটি প্রকাশের ৫০ বছর হয়েছে।

এর গীতিকার ছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুরকার ছিলেন পণ্ডিত ভি. বালসারা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের কণ্ঠে গানটি জনপ্রিয়তা পায়।

গানটি পরবর্তীতে আরও অনেকেই নতুন করে গেয়েছেন। কিন্তু সত্তরের দশকের সেই গানটিই আবেদন ধরে রেখেছে মানুষের মনে।

গানটি মূলত শ্রাবন্তী মজুমদারের অ্যালবামের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এর সুরকার ভি. বালসারার প্রাথমিকভাবে গানটি পছন্দ হয়নি, কারণ এতে কিছু ইংরেজি শব্দ বা আধুনিক ধাঁচের রূপ ছিল সেটার তেমন প্রচলন সেসময় ছিল না; কলকাতার ডিডি বাংলার এক সাক্ষাৎকারে এভাবে বর্ণনা করেছিলেন মিজ মজুমদার।

তার আগ্রহেই সুরকার বালসারা রাজি হন এবং তিনি চেয়েছিলেন গানটি তার সাথে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইবেন। তারা একসাথে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে যান।

"আমার বুক দুরু দুরু করছে যদি হেমন্তদা বলেন আমি করবো না… হেমন্তদা পড়েই বললেন- আমি গাইবো" বলেন মিজ মজুমদার।

তিনি ভি. বালসারাকে অনুরোধ করেন যেন সুরটা খুব 'সিম্পল ও মনোটনাস' হয় যেন সবাই সহজে গাইতে পারে।

এরপর বাধা হয়ে দাঁড়ালো গানটা লম্বা হয়ে যাওয়া।

"গানটা এত বড়, আমাদের তো তখন সাড়ে ছয় মিনিটের বেশি করা যাবে না। তো মি. বালসারা, আমি আর পুলকদা গেলাম হেমন্তদার কাছে। মি. বালসারা গিয়ে বললেন যে হেমন্তদা, যদি শেষের দুটা ভার্স (লাইন) বাদ দিয়ে দেওয়া যায় তাহলে গানটা ঠিকমতো মিউজিকে আসে"।

এভাবে বেশ অনেকগুলো সাক্ষাৎকারেই বর্ণনা করেন মিজ মজুমদার।

তার ভাষায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন "গানের ওই ভার্স যদি বাদ দাও তাহলে আর গানটা দাঁড়ায় না, তুমি তোমার মিউজিক বাদ দিয়ে দাও, ফেলে দাও। এই দুটো ভার্স থাকতেই হবে"।

পরে সেসব রেখেই মিউজিক কম্পোজ করেন মি. বালসারা।

সেসময় গানের রেকর্ডিং এখনকার মতো বারবার করার সুযোগ ছিল না। সবাই মিলে একসাথে এক-দুইবারে যেমন হয়। এইটা তিনবার রেকর্ড করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে গানটি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে ব্যাপক পরিচিতি পায়।

'বাবার মুখে শুনেছিলাম গান' - এন্ড্রু কিশোর

"আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান, সেদিন থেকে গানই জীবন, গানই আমার প্রাণ" গানটি ১৯৮৪ সালের নয়নের আলো চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

গানটির সুরকার ও গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এবং গেয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর।

নয়নের আলো চলচ্চিত্রের শুধু এই গানটিই না, প্রায় সবগুলো গানই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। যেমন আমার বুকের মধ্যেখানে, আমার সারা দেহ খেও গো মাটি, আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকবো, এমন বেশ কিছু গান।

প্রয়াত আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ২০১৪ সালে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এই চলচ্চিত্রের গানের কাজ পাওয়া 'হিমালয় পর্বতের চূড়ায় ওঠা'র মতো ছিল।

সেসময় অনেকের মাঝে বসিয়ে কড়া মন্তব্যের মুখে তাকে পড়তে হতো বলছিলেন তিনি।

"ঐ সময় তো সাউন্ডপ্রুফ রুম ছিল না, আমার বাসায় বসে বসে টিউন করতাম, ক্যাসেট রেকর্ডারে গানগুলো ধারণ করতাম। তো কখন মুরগি ডাকলো কখন কুকুর ডাকলো সেটা আমি শুনতে পেতাম না। ওরা ঠিকই গান শুনতে গিয়ে বলতো, এই মুরগী ডাকলো কেন, কুকুর ডাকলো কেন? গান আবার ঠিক করে নিয়ে আসো। এটা করতে করতে আমার জীবন বার হয়ে গেছে, এটা আমার মনে পড়ে" বলেছিলেন তিনি। আগে দেশাত্মবোধক গান করলেও নয়নের আলো'র জন্য গান তৈরিকে নিজ ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলে জানান তিনি।

সুরকার ও সংগীত পরিচালক ইমন সাহা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ক্যারিয়ারের প্রথম দিককার সময়ে মি. বুলবুল তার বাবা সত্য সাহার কাছ থেকে নানা ধরনের পরামর্শ নিতেন।

"বাবা বলছে দেখ, যেটাই, করিস না কেন, আমাদের গ্রামীণ অডিএন্সটাকে, মাথায় রাখিস। ফিল্মের অডিএন্স কিন্তু গ্রামের অডিএন্স, ফোক বেজ যদি কিছু করিস তাহলে দেখবি যে জিনিসটা খুব সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। নয়নের আলো ছবির গানগুলি শুনলেই বুঝবেন যে কোথায় জানি, একটা মাটির গন্ধ আছে" বলছিলেন ইমন সাহা।

ব্যক্তিগতভাবে বাবা নিয়ে নয়নের আলো চলচ্চিত্রের গানটি ছোটবেলা থেকেই গুনগুন করে গাইতেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সরাসরি বাবা নিয়ে না, কিন্তু

এমন বেশ কিছু গান রয়েছে যেগুলো ঠিক বাবাকে নিয়ে গান না, কিন্তু মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত। এর মাঝে প্রথমেই থাকবে মান্না দের 'তুই কি আমার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে' যেটি মেয়েকে নিয়ে বাবার গান।

গানটি নিয়ে মান্না দে তার আত্মজীবনী 'জীবনের জলসা ঘরে' বইতে উল্লেখ করেছেন, গীতিকার মিল্টু ঘোষের লেখা গানটি সুপর্ণকান্তি ঘোষকে গানটি সুর করতে বলেছিলেন তিনি সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষের ছেলে সুপর্ণকান্তিকে তিনি খোকা বলতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই খোকার গানটির কথা সেভাবে পছন্দ হয়নি। কিন্তু সেটা অবিবাহিত তরুণ খোকার জন্য স্বাভাবিক বলেই বর্ণনা করেন তিনি।

"মেয়েকে বিদায় দেওয়ার নাড়ী-ছেঁড়া অসহ্য যন্ত্রণার সে অভিজ্ঞতা আমার আছে। দু'-দু'বার সেই নাড়ী-ছেঁড়া যন্ত্রণায় কেঁদেছি আমি। তাই আমি জানি ভাষাটা সত্যিই মনের কথা থেকেই হয়েছে" মান্না দে লেখেন।

দুই জন কন্যাসন্তানের পিতা হিসেবে মান্না দে'র মন ছুঁয়েছিল সেই গান।

আরেকটি 'গান বাবা বলে গেল আর কোনোদিন গান করো না' যেটি লিখেছেন আমজাদ হোসেন, সুর করেছেন আলাউদ্দিন আলীর ও গেয়েছেন শামীমা ইয়াসমিন দিবা। বাবার শাসন থেকে শুরু হওয়া এই গানটির মূল থিম অবশ্য 'গান গাওয়া', বাবা নয়। তবে 'জন্ম থেকে জ্বলছি' চলচ্চিত্রের এই গানটি অনেক বেশি পরিচিত।

বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ - তানভীর ইভান

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব পরিচিত হয়ে ওঠা গান 'বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ, বলো তোমার মতো করবে কে শাসন'। পিরান খানের সুরে গাওয়া এই গানটি মূলত 'আপন' নামের একটি নাটকের জন্য গাওয়া হয়েছিল।

এনিয়ে শিল্পী তানভীর ইভান দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন নাটকটির "পরিচালক অমি ভাই পিরানকে ফোন করে বলেন, বাবাকে নিয়ে একটা গান লাগবে। পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর আমরা বসে গানটা তৈরি করি। তানজিব সৌরভের লেখা কথায় সুর করেন পিরান। মেহেদীবাগের (চট্টগ্রাম) স্টুডিওতে গানটা তৈরি করি"।

এই গানটির ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া ছাড়াও গানটি শুনে মি. ইভানের বাবা-মা আবেগে কেঁদেছেন, সেটা তার জন্য একটা বড় পাওয়া।

আরও অনেক গানই আছে বাবা নিয়ে যেগুলো মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। যেমন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা সৈয়দ আব্দুল হাদীর গাওয়া 'বাবার কথা মনে পড়ে,' আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে 'বাবা তোমার কথা মনে পড়ে' আসিফ আকবরের 'বাবা নেই', গীতিকবি মিল্টন খন্দকারের 'আমি যাচ্ছি বাবা' (গেয়েছেন ঝিনুক) বা 'বাবা তোমার ছেলে আজ বড় হয়েছে' (গেয়েছেন মনির খান), এমন অনেক গানই রয়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে 'জংলি' চলচ্চিত্রে প্রিন্স মাহমুদের পরিচালনায় 'বাবা তোমায় ছাড়া' গানটিও বেশ পরিচিতি পেয়েছে।

বাবা সন্তানের প্রতীকী ছবি

বলশেভিকরা কেন দ্বিতীয় বিপ্লব বেছে নিয়েছিল by মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

১৯১৭ সালে প্রথম রুশ বিপ্লবে জার দ্বিতীয় নিকোলাস পদত্যাগ করেন। রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হয়। কিন্তু রাশিয়ার শ্রমিক, কৃষকসহ শ্রমজীবী জনগণের বড় অংশই শুধু ক্ষমতার হাতবদলে সন্তুষ্ট ছিল না। যে আকাঙ্ক্ষা থেকে আরেকটি বিপ্লব ঘটে, যার মধ্য দিয়ে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। পুরোনো জুলিয়ান পঞ্জিকা অনুযায়ী অক্টোবরে হয়েছে বলে এটি ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামে পরিচিত। বর্ষপূর্তিতে জেনে নেওয়া যাক মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই কেন বলশেভিকরা দ্বিতীয় বিপ্লবের পথে হেঁটেছিল:

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাব সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ঘটনা। এই রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের শুরু হয়েছিল সে বছরের গোড়ার দিক থেকে। এর মধ্য দিয়ে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা দীর্ঘদিনের জার শাসনকে উচ্ছেদ করে নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে। লেনিনের অনুসারী বলশেভিকদের এই বিপ্লব খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন মার্কিন সাংবাদিক জন রিড। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেছিলেন, ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’।

এই বিপ্লবের পর রাশিয়ায় গড়ে ওঠে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর গঠিত হয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রসমূহের ইউনিয়ন—সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল দুই মেরুর আদর্শিক বিশ্বের পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা আর সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। সেই সময় থেকে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন অবধি বলশেভিক বিপ্লবের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও মতাদর্শগত দাপট ছিল বিশ্বজুড়ে।

বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল যেভাবে

কৃষক অসন্তোষ: রুশ কৃষকেরা বিশ্বাস করতেন, জমি কেবল তাঁদেরই হওয়া উচিত, যাঁরা তা চাষ করেন। জার দ্বিতীয় আলেক্সান্দার কর্তৃক ১৮৬১ সালে যদিও ভূমি দাসপ্রথা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তবু গ্রামীণ কৃষকদের মধ্যে এক গভীর ক্ষোভ ছিল। কারণ, তাঁদের সামান্য যে জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল, সে জন্য সরকারকে অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু তাঁরা যে জমিতে কাজ করতেন, সেটার মালিকানা দাবি করতে থাকেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে দুর্বল ভূমি সংস্কারের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ভূমির মালিকানার ক্ষেত্রে ছিল এক চরম বৈষম্য। দেশের মোট জমির ২৫ শতাংশ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশের দখলে।

শ্রমিক অসন্তোষ: উনিশ শতকের শেষের দিকে দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে লাখো মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরাঞ্চলে চলে আসায় নতুন ‘প্রলেতারিয়েত’ বা ‘শ্রমিকশ্রেণি’ তৈরি হয়। শিল্পবিপ্লব রাশিয়ার শ্রমিকদের জন্য অনিরাপদ কাজের পরিবেশ, কম মজুরি এবং সীমিত শ্রমিক অধিকার নিয়ে এসেছিল। পশ্চিম ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকেরা শিল্পবিপ্লবের কারণে যে সম্পদ ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছিলেন, রুশ শ্রমিকদের ভাগ্যে তা জোটেনি। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। কৃষকশ্রেণির তুলনায় এই নতুন শ্রমিকশ্রেণি ধর্মঘটে যাওয়া এবং প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার প্রবণতা বেশি দেখায়। ১৯১৪ সালে যখন রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন যুদ্ধসামগ্রী উৎপাদনের জন্য কলকারখানার ওপর পড়া বিশাল চাপ আরও বেশি শ্রমিক দাঙ্গা ও ধর্মঘটের জন্ম দেয়। যুদ্ধের প্রতি এমনিতেই রাশিয়ার বেশির ভাগ মানুষের বিরোধিতা ছিল। ফলে তারা এই শ্রমিকদের সমর্থন জানায়।

অজনপ্রিয় সরকার: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেও রাশিয়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জার দ্বিতীয় নিকোলাসের স্বৈরাচারী শাসনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাঁর স্লোগান ছিল, ‘এক জার, এক চার্চ, এক রাশিয়া।’ তাঁর বাবা তৃতীয় আলেক্সান্দারের মতোই দ্বিতীয় নিকোলাস একটি অপ্রিয় নীতি—‘রুশিফিকেশন’ বা রুশকরণ নীতি প্রয়োগ করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় বেলারুশ ও ফিনল্যান্ডের মতো অজাতিগত রুশ সম্প্রদায়গুলোকে তাদের নিজ সংস্কৃতি ও ভাষা ত্যাগ করে রুশ সংস্কৃতি গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

গির্জা ও জারতন্ত্র সম্পর্ক: জার ছিলেন রুশ অর্থোডক্স চার্চেরও প্রধান। চার্চ স্বৈরাচারী শাসনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করত। জারের কর্তৃত্বকে আরও সুদৃঢ় করতে চার্চ ঘোষণা করে, জার ঈশ্বর কর্তৃক নিযুক্ত। তাই ‘খুদে পিতা’র প্রতি যেকোনো চ্যালেঞ্জ ঈশ্বরের অবমাননা হিসেবে গণ্য করা হতো। ওই সময়ে রাশিয়ার অধিকাংশ মানুষ ছিল নিরক্ষর। তারা চার্চের বক্তব্য মেনে চলত। জারের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য প্রায়ই পাদরিদের আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে কৃষকেরা পাদরিদের প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে শুরু করেন। কারণ, তাঁরা ক্রমেই পাদরিদের দুর্নীতিগ্রস্ত ও ভণ্ড হিসেবে দেখতে পান। সামগ্রিকভাবে দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনামলে চার্চ এবং এর শিক্ষা প্রত্যেক মানুষের শ্রদ্ধা হারাতে শুরু করে।

সেনা অসন্তোষ:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার দ্বিতীয় নিকোলাসের অধীনে রুশ সেনাবাহিনীর যুদ্ধের ক্ষতি দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯১৬ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যে ৫০ লাখের বেশি রুশ সেনা নিহত, আহত বা বন্দী হয়েছিলেন। এর ফলে সেনাদের মধ্যে বিদ্রোহ ও দলত্যাগ শুরু হয়। খাদ্য, গোলাবারুদ এবং এমনকি অস্ত্রের অভাবে অসন্তোষ আর দুর্বল মনোবল আরও ভয়াবহ সামরিক পরাজয়ের কারণ হয়েছিল। এই যুদ্ধ রুশ জনগণের ওপরও এক বিধ্বংসী প্রভাব ফেলেছিল। এ জন্য সবাই জারকে দুষতে থাকে।

বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা: রাশিয়ায় দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক জার শাসন, রাশিয়া-জাপান যুদ্ধে পরাজয় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্যর্থতা রাশিয়ার মানুষের মনে অসন্তোষ তীব্র হয়। তা ছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মারাত্মক খারাপ হওয়ায় অনেক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে ফেলে। ফলে রাশিয়ায় একটি বিপ্লব অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ সময় কার্ল মার্ক্সের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত লেনিন রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণির প্রথম বিপ্লব ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন।

যেভাবে জারতন্ত্রের পতন

অক্টোবর বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বছরের পর বছর। ১৯০৫ সালে রাশিয়ায় একের পর এক শ্রমিক ধর্মঘট সংঘটিত হয়। ‘রক্তাক্ত রবিবার’-এ জারের প্রাসাদ অভিমুখে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ অভিযাত্রায় হাজারো শ্রমিক নিহত হন। শ্রমিক বিদ্রোহে কেঁপে ওঠে রাশিয়া। স্বতঃস্ফূর্তভাবে কারখানায় কারখানায় গড়ে উঠতে থাকে সংগ্রাম কমিটি তথা সোভিয়েত।

১৯১৭ সালে বিপ্লবের সূচনা হয় জুলিয়ান বা পুরোনো পঞ্জিকা অনুযায়ী ৯ জানুয়ারি (২২ জানুয়ারি/গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা) ‘রক্তাক্ত রবিবার’-এর ১২ বছর পূর্তি উদ্‌যাপনের মাধ্যমে। ১১৪টি শ্রমিক সংগঠন ধর্মঘট আহ্বান করে। পরের মাসে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীরা রাস্তায় নামে খাদ্যের দাবিতে। মাসের শেষ দিকে সশস্ত্র শ্রমিক ধর্মঘটে রূপ নেয়। শ্রমিকেরা পুলিশ ও সেনাদের অস্ত্র কেড়ে নেয়। লেনিন ছিলেন সুইজারল্যান্ডে। জোসেফ স্তালিন ছিলেন সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে। পেত্রোগ্রাদে পার্টির সদর দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন কমরেড মলটভ। সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ প্রচারিত হলো, ‘অভ্যুত্থান চালিয়ে যাও, জারতন্ত্র উচ্ছেদ করো।’

এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি (১২ মার্চ/গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা) সকালে অভ্যুত্থানে যোগ দেওয়া সেনার সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। সন্ধ্যায় তা হয়ে যায় ৬০ হাজার। সাধারণ জনতা, কৃষক ও শ্রমিকেরা পেত্রগ্রাদ দখল নেয়। সেনারা জারের মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করে এবং রাজবন্দীদের মুক্ত করে দেয়। ২ মার্চ (১৫ মার্চ/গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা) জার দ্বিতীয় নিকোলাস পদত্যাগ করেন। জারতন্ত্রের অবসান ঘটে। রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হয়।

কেন দ্বিতীয় বিপ্লব

১৯১৭ সালে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর ক্ষমতায় আসে সাময়িক (অন্তর্বর্তী) সরকার। একপর্যায়ে মেনশেভিক ও কৃষকদের পার্টি সোশ্যালিস্ট রেভ্যলুশনারিরা সেই সরকারে বুর্জোয়াদের সঙ্গে যোগ দেয়। মেনশেভিকরা ছিল অনেকটা পশ্চিমা ভাবধারার। জারতন্ত্রের পতন ঘটানোর বাইরে তেমন রাজনৈতিক এজেন্ডা তাদের সেই অর্থে ছিল না। জারতন্ত্রের জায়গায় পশ্চিমা ভাবধারার একটি উদারনৈতিক শাসনব্যবস্থার মধ্যেই মেনশেভিকদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ ছিল।

বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার বলশেভিকরা সাময়িক সরকারে যোগ দেয়নি। লেনিন রাশিয়ায় ফিরে এসে লেখেন বিখ্যাত ‘এপ্রিল থিসিস’। এতে তিনি লেখেন, বিপ্লবের প্রথম পর্বে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে বুর্জোয়াদের হাতে। এখন দ্বিতীয় পর্বে শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষকদের মেহনতি অংশের ঐক্য গড়ে তাদের কাছে ক্ষমতা দিতে হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সাময়িক সরকারকে কোনো সহযোগিতা নয়, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে। লেনিন ঘোষণা করেন, রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কোনো প্রয়োজন নেই, রাশিয়ার সরকার পরিচালিত হবে শ্রমিক ও কৃষকের দ্বারা।

১৯০৫ সালেই লেনিন সোভিয়েতের বিপ্লবী সক্ষমতা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। মেনশেভিক ও সোশ্যাল রেভল্যুশনারিদের বিপরীতে বলশেভিকদের ‘রুটি, জমি, শান্তি’ এবং ‘সমস্ত ক্ষমতা বুর্জোয়া পার্লামেন্টের বদলে চাই সোভিয়েতের হাতে’ স্লোগান মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। এভাবে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর/গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা) বলশেভিকদের নেতৃত্বে রাশিয়ায় সংঘটিত হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। জুলিয়ান পঞ্জিকা অনুযায়ী অক্টোবরে হয়েছে বলে এটি ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামে পরিচিত। আর লেনিনের কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থকদের বলশেভিক নামে ডাকা হতো। ফলে এই বিপ্লবকে ‘বলশেভিক বিপ্লব’ও বলা হয়ে থাকে।

মার্কিন সাংবাদিক জন রিড তাঁর ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ বইয়ে লিখেছিলেন, মার্চে জারের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটার সময় রাশিয়ার বিত্তশালী শ্রেণিগুলো শুধু রাজনৈতিক বিপ্লব চেয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা চলে আসবে তাদের হাতে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত রাশিয়ার শ্রমিক, কৃষকসহ শ্রমজীবী জনগণের বড় অংশই তাতে সন্তুষ্ট ছিল না। তারা চাইছিল যুদ্ধের সমাপ্তি আর শিল্প এবং কৃষিক্ষেত্রের ব্যাপক গণতান্ত্রিকীকরণ। সেই আকাঙ্ক্ষারই ফল ‘রাজনৈতিক বিপ্লবের’ পরে আরেকটি ‘সামাজিক বিপ্লব’ ঘটে, যার মধ্য দিয়ে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।

১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আঁতুড়ঘর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলেও নানা আদলে বিশ্বের নানা প্রান্তে এখনো এই লাল ঝান্ডা উড্ডীন রয়েছে। এর প্রভাব বাড়ছে খোদ পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও। অর্থনৈতিক বৈষম্য, পরিবেশ ধ্বংস, বিশ্ব উষ্ণায়নসহ যুদ্ধবাজ নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এখন বহুমুখী সংকটে। এই সংকট থেকে বের হতে এবং ভবিষ্যতে একটি স্থিতিশীল ও জনমুখী আর্থসামাজিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে মার্ক্সবাদ প্রভাবিত ‘অক্টোবর বিপ্লব’ সাম্যবাদে বিশ্বাসীদের জন্য যুগের পর যুগ প্রেরণা হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র: থট কো, সাপ্তাহিক একতা, বিবিসি, আনন্দবাজার

১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের সময় ভ্লাদিমির লেনিন
১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের সময় ভ্লাদিমির লেনিন। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

Saturday, June 20, 2026

ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি by আমিন আশরাফ

ছোটবেলা থেকেই মাথায় একটা ভূত চেপেছিল। ইতিহাসের ভূত। নাওয়া-খাওয়া ভুলে হাজার পৃষ্ঠার মোটা মোটা বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকতাম। বই যত বড় হতো, মনে আনন্দ হতো তত বেশি। মনে হতো, বেশ কিছুদিনের খোরাক জুটে গেল। এই নিয়ে বাবা আর চাচার বকা কম শুনতে হয়নি।

দিন ফুরোলো। সময়টা সম্ভবত দু’হাজার পাঁচ কিংবা সাত। এক ঈদের বাজারে মুসলিম জাহানের ঈদসংখ্যায় হাতে এলো শফীউদ্দীন সরদারের ‘বারো ভূঁইয়ার উপাখ্যান’। ঈদের আমেজ শেষ হওয়ার আগেই গোগ্রাসে গিলে ফেললাম পুরো উপন্যাস। আর তা পড়তে গিয়েই চমকে উঠলাম। বুকের ভেতর একটা তীব্র আফসোস মোচড় দিয়ে উঠল। মসনদে আলা ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানীটি নাকি আমাদের বাড়ির একেবারে কাছেই! কালের জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে বয়ে চলা নরসুন্দা নদীর পাড় ঘেঁষেই তার অবস্থান। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো—এত কাছে ইতিহাসের এমন গৌরবময় ঐতিহ্যের সিংহদ্বার, অথচ আমি ছাড়া আর কার তা অজানা ছিল!

কুফা আর মফস্বল শহরের অটো কিংবা সিএনজিচালকদের মুখে ‘জঙ্গলবাড়ি-জঙ্গলবাড়ি’ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যেত রোজ। কিন্তু এই জঙ্গলবাড়ির আড়ালে যে এক হার-না-মানা মহাবীরের নাম লুকিয়ে আছে, তা তখনো জানা ছিল না।

রমজানের এক কুয়াশামাখা ভোর। চারপাশটা কেমন যেন আবছা, রহস্যময়। ঘর থেকে বের হলাম জঙ্গলবাড়ির উদ্দেশে। সঙ্গে জুটে গেল তারাবির নামাজের কজন ছোকরা মুসল্লি।

গাঁয়ের ছেলে হলেও বড় হয়েছি মফস্বল শহরে। অনেক দিন পর এমন মাটির গন্ধমাখা গ্রামের মেঠোপথে পা রাখা। কিশোরগঞ্জ থেকে যে গ্রামটায় তারাবি পড়াতে এসেছি, তার নাম হাত্রাপাড়া। সঙ্গের ছেলেগুলো জানাল—বেশি দূরে নয় হুজুর, হাঁটতে হাঁটতেই ঈশা খাঁর রাজ্যে পৌঁছে যাওয়া যাবে। ভোরের তিরতিরে ঠান্ডা বাতাসে শরীর ও মন কেমন যেন চনমনে হয়ে উঠল। ইচ্ছে করছিল ছোটবেলার মতো আনন্দে একটু দৌড়াদৌড়ি করি। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম, এই পিচ্চিদের সামনে আবার ‘প্রেস্টিজ’ চলে যাবে না তো! নিজেকে সামলে নিলাম।

যতই এগোচ্ছি আমার সঙ্গে ছেলেগুলোর উৎসাহ ততই বাড়ছে। হঠাৎ একজন আঙুল উঁচিয়ে বলল, ‘এই যে দেখুন, হুজুর! এটা কিন্তু সাধারণ রাস্তা ছিল না, রাজপথ ছিল। এই পথ দিয়েই ঈশা খাঁ তার বিশাল বাহিনী নিয়ে আসা-যাওয়া করতেন।’

থমকে দাঁড়ালাম। চেয়ে দেখি, জৌলুস হারানো পথটা আজ আর রাজপথ নেই। ভেঙে যাওয়া ইট-সুরকিগুলো যেন বোবা সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে। এই বুক চিরেই তো ইতিহাসের মহানায়ক এককালে তার তেজি ঘোড়া ছুটিয়েছিলেন! চোখের সামনে যেন একটা সিনেমার দৃশ্য ভেসে উঠল—বুকের ভেতর বেজে উঠল তলোয়ারের ঝনঝনানি, মসনদে আলা ঈশা খাঁর দুর্গজয়ের দৃশ্য।

সে এক ইতিহাস। ১৫৮৫ সাল। মসনদে আলা ঈশা খাঁ বর্তমান কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার এই জঙ্গলঘেরা দুর্গে আক্রমণ করেন। তখন এই দুর্গে রাজত্ব করতেন কোচ রাজা লক্ষ্মণ হাজরা ও রাম হাজরা। ঈশা খাঁ তাদের পরাজিত করে নিজের পতাকায় মুড়ে নেন জঙ্গলবাড়ি দুর্গ।

হাঁটতে হাঁটতে যখন জঙ্গলবাড়ির ঠিক সিংহদ্বারে পৌঁছালাম, মনে হলো সত্যি এক পরিপাটি জঙ্গলরাজ্যে এসে হাজির হয়েছি। প্রকৃতির সবুজ আয়োজন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অপূর্ব, ছায়াঢাকা এক জঙ্গলবাড়ি। ভাবতেই অবাক লাগে, একসময় এই নিঝুম গ্রামটাই ছিল এক জ্যান্ত বীরের রাজত্ব! যেখানে দিনরাত ঘোড়ার খুরের শব্দে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠত। বাতাসের বুকে উড়ে বেড়াত ধূলিঝড়। রাস্তার দুপাশের নাম না জানা গাছগুলো পাতা নাড়িয়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, নেপথ্যে থেকে তারা ফিসফিসিয়ে বলছে, ‘এসো পিচ্চিরা, আমার কাছে এসো। আমিই তোমাদের শোনাব মসনদে আলা ঈশা খাঁর জানা-অজানা সেই সাচ্চা দাস্তান।’

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে চেনা ছবিটা স্পষ্ট হয়। মোগল সম্রাট আর ইংরেজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাংলার অসহায় জমিদাররা গোপনে ঈশা খাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ১৫২৯ সালের ১৮ আগস্ট জন্মেছিলেন এই বীর। বাবা সোলায়মান খাঁ ছিলেন আফগানিস্তানের সোলায়মান পার্বত্য অঞ্চলের এক দলপতির বংশধর। সুলতান নুসরত শাহের রাজত্বকালে তারা বাংলায় আসেন। নিজের একনিষ্ঠ চেষ্টায় ঢাকা ও ময়মনসিংহের উত্তর-পূর্ব অংশ নিয়ে এক স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলেন সোলায়মান খাঁ। কিন্তু নিয়তির খেলা ভিন্ন ছিল। দুবার বিদ্রোহ করার পর ১৫৪৮ সালে তিনি নিহত হন। ঈশা খাঁর বয়স তখন মাত্র ১৯। পিতৃব্য কুতুবউদ্দীনের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন তিনি।

বাংলার জমিদারদের সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ঈশা খাঁ আফগানিস্তান থেকে ১ হাজার ৪০০ অশ্বারোহী, ২১টি যুদ্ধনৌকা আর প্রচুর গোলাবারুদ নিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যে এসে নামেন। সেখান থেকে প্রথমে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি এবং পরে সোনারগাঁও দুর্গ দখল করেন। সোনারগাঁওয়ের প্রাচীন নাম ছিল সুবর্ণগ্রাম। ঈশা খাঁ ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা চাঁদ রায়ের কন্যা এবং কেদার রায়ের বোন স্বর্ণময়ীকে বিয়ে করেন। স্বর্ণময়ী পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তার নাম রাখা হয় সোনাবিবি। আর সেই প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম অনুসারেই বাংলার রাজধানীর নামকরণ করা হয় ‘সোনারগাঁও’।

সম্রাট আকবরের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন ‘মসনদে আলা’ উপাধি। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, দিল্লির রাজসিংহাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী সুলতান দাউদ কররানীকে এক যুদ্ধে সাহায্য করায় তিনি এই উপাধি পেয়েছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীতে মোগলদের আগ্রাসন থেকে বাংলাকে রক্ষা করতে বারো ভূঁইয়াদের নেতা, দূরদর্শী সুশাসক ঈশা খাঁ ১৫৯৭ সালে মোগল সেনাপতি মানসিংহকে পরাজিত করে বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখেন। সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে তিনি স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন বুনেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার প্রথম বীজ বোধহয় তিনিই বুনেছিলেন। তার সাহস আর দেশপ্রেমের গল্প আজও রক্তের ভেতর তরতাজা শিহরন জাগায়।

দুর্গের ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়ল একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। গায়ে তার স্পষ্ট মোগল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ। ৪৪ ফুট দৈর্ঘ্য আর ১৮ ফুট প্রস্থের মসজিদটির ছাদে তিনটি গম্বুজ যেন আকাশপানে চেয়ে আছে। প্রতিটি কোণে একটি করে চোখধাঁধানো মিনার। পুব দিকে ১১ ফুটের একটা খোলা বারান্দা। শুনলাম, স্থানীয় মুসল্লিরা এখনো এখানে নিয়মিত নামাজ পড়েন।

মসজিদের পাশেই পাকা করা কিছু কবর। ছোকরাগুলো এক হাত দেখিয়ে বলল, ‘হুজুর, এখানে কোনো একটা কবর বোধহয় ঈশা খাঁর হবে।’

মনে মনে হাসলাম। বড় হয়ে ইতিহাস পড়ে জেনেছি—এগুলো ঈশা খাঁর আত্মীয়দের কবর। ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়ির এই মাটিতে ঘুমিয়ে নেই। জীবনের শেষ দিনগুলোয় তিনি বিভিন্ন দুর্গে ঘুরে বেড়াতেন। ১৫৯৯ সালে মহেশ্বরী পরগনার অন্তর্গত বক্তারপুর দুর্গে গিয়ে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে বছরই ১৭ সেপ্টেম্বর প্রায় ৭০ বছর বয়সে এই সিংহপুরুষ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার বক্তারপুর গ্রামে আজও তিনি সমাহিত আছেন।

প্রায় ৪০ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই জঙ্গলবাড়ি দুর্গটি ঈশা খাঁ সামন্ত রাজার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার পর নতুন করে সংস্কার করেছিলেন। দুর্গের তিনদিকে পরিখা খনন করে নরসুন্দা নদীর সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, যাতে পুরো জঙ্গলবাড়ি একটা সুরক্ষিত ব-দ্বীপের মতো দেখায়।

আজ সেই জৌলুস আর নেই। ইতিহাস এখানে এক নির্জীব, ক্লান্ত সাক্ষী মাত্র। একটু সামনে এগোতেই উত্তর-দক্ষিণে লম্বা ইটের পাঁচিল দিয়ে ভাগ করা দুটি চত্বর চোখে পড়ল। স্থানীয়রা একে বলে ‘প্রাসাদ প্রাচীর’। দুর্গের দক্ষিণে একটা ভাঙা তোরণ, তার সামনে ‘করাচি’ নামের পূর্বমুখী একতলা ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। তোরণের পেছনে ‘অন্দরমহল’; আর বাড়ির সামনে রয়েছে সেই পুরোনো আমলের খনন করা একটি দীঘি, যার স্থির জল অতীতে ডুব দিতে বাধ্য করে। দুর্গের ভেতরের দরবারঘরটি সংস্কার করে এখন ‘ঈশা খাঁ স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার’ করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে ঈশা খাঁর কিছু ছবি, তার বংশধরদের তালিকা আর টুকরো কিছু নিদর্শন।

দুর্গের বাইরে তাকালে মাটির বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় অসংখ্য প্রাচীন ইটের টুকরো আর মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ। প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন, এগুলো নাকি মুসলমানরা আসারও আগের নিদর্শন। তবে দুর্গের ভেতরে ঈশা খাঁর বাসভবনের ধ্বংসাবশেষ এখনো কালের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। ছাদ ধসে গেলেও দরবার কক্ষের অনেকটাই চেনা যায়। পান্থশালায় এখনো ১০-১২টি কক্ষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

ভগ্নপ্রায় প্রাসাদের ভেতরে ঘুরঘুর করার সময় ভেতরের লোকজন কেমন যেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। বিনয়ের সঙ্গে বললাম, ‘একটু দেখতে এসেছি।’

আমার পরনে হুজুরদের পোশাক দেখে তারা খাতির করে একটা চেয়ার এনে বসতে দিল। গল্পে গল্পে জানতে পারলাম, এই বাড়িতে সর্বশেষ বসবাস করে গেছেন ঈশা খাঁর চতুর্দশ বংশধর দেওয়ান ফতেহ আলী দাদ খাঁ। ২০১৩ সালে তিনি মারা যান। বর্তমানে তার ছেলে দেওয়ান মামুন দাদ খাঁ পরিবার নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের রথখলা এলাকায় থাকেন। মাঝে মাঝে এসে তারা নিজেদের এই আদিপুরুষের দুর্গটি দেখে যান।

যাওয়ার বেলায় শুনলাম, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নাকি আশ্বাস দিয়েছে এই দুর্গটি সংস্কার করার। খুব জলদিই নাকি কাজ শুরু হবে।

ফিরে আসার সময় নরসুন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন জঙ্গলবাড়ির দিকে তাকালাম, গোধূলির আলোয় মনে হলো—ইতিহাস কখনো মরে না; সে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ফিসফিস করে কথা বলে। কেবল শোনার মতো কান থাকা চাই।

ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি

Monday, June 15, 2026

খলিফা আবু বকরের যুগে পারস্য অভিযান: ইরাক অঞ্চলে অন্যান্য বিজয় by মাহমুদ আহমাদ

ইরাকের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় খালিদ ইবনে ওয়ালিদের প্রতি খলিফা আবু বকরের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল—আপার ইরাক দিয়ে অভিযান শুরু করে প্রধান লক্ষ্য হীরার দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে। হীরা অধিকার সম্পন্ন হলে এই স্থানকে কেন্দ্র করে পরবর্তী অভিযানের পরিকল্পনা সাজাবে। জুতসই লোকেশন ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে খলিফা হীরাকে কেন্দ্র করে ইরাক অভিযানের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাই হীরাই ছিল মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রাথমিক টার্গেট। হীরা বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিম সেনাবাহিনী প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন করে নেয়।

খলিফা আবু বকর ইরাক অভিযানে দুজন সেনাপতিকে পাঠিয়েছিলেন। আপার ইরাক দিয়ে অভিযান শুরু করেছিলেন প্রধান সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। আর ইয়াজ ইবনে গানাম ইরাকে প্রবেশ করেছিলেন দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল দিয়ে। একদিকে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ হীরা জয় করে ফেললেও ইয়াজ ইবনে গানাম পারসিকদের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারছিলেন না। দাউমাতুল জানদালে কোনো রকমে শত্রুর মোকাবিলায় টিকে ছিলেন। সেনাপতি খালিদ সিদ্ধান্ত নিলেন—ইয়াজের সাহায্যে তিনি এগিয়ে যাবেন।

আনবার (জাতুল উয়ুন)

আনবার ছিল দজলা নদীর পূর্বতীরে, বর্তমান সাকলাওয়িয়া অঞ্চলের অন্তর্গত এলাকায় অবস্থিত ইরাকের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একটি নগর। প্রাচীনকাল থেকেই এটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পারসিক যুগে আনবার অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক ও সামরিক ঘাঁটি ছিল।

দুমাতুল জান্দালের উদ্দেশে রওনা হয়ে সেনাপতি খালেদ আনবারের প্রতিপক্ষের বাধার মুখোমুখি হলেন। তিনি চাইলে তাদের উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যেতে পারতেন; কিন্তু তাতে বাহিনীর পেছন দিকটা অনিরাপদ রয়ে যেত। এই ঝুঁকি তিনি নিতে চাইলেন না।

মুসলিম বাহিনীর অভিযানের জন্য আনবারবাসী আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। তারা দুর্গের চারপাশে পরিখা খনন করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সুরক্ষিত করল। এরপর দুর্গের ভেতরে ঢুকে বসে থাকল। মুসলিম বাহিনী আনবার দুর্গের চারপাশে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করলেন। মুসলিমরা সঙ্গে থাকা দুর্বল উটগুলো জবাই করে পরিখার সরু অংশ ভরাট করে ফেলল। এরপর দুর্গ নিজেদের দখলে নিয়ে নিলেন। সেনাপতি খালেদ এই দুর্গের দায়িত্বে জাবরকান ইবনে বদরকে নিযুক্ত করলেন।

আইনে তামর

আনবার বিজয়ের খালেদ ইবনে ওয়ালিদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র আইনে তামর। মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে আরব ও পারস্যের সম্মিলিত শক্তি সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়েছিল। তাদের নেতা ছিল উক্কাহ ইবনে আবি উক্কাহ। অন্যদের মতো তারাও খালেদের সামরিক দক্ষতাকে অবমূল্যায়ন করল। উক্কাহ অহংকারভরে ঘোষণা করেছিলে, আরবদের মোকাবিলায় আরবরাই যথেষ্ট; পারস্য বাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন তাদের নেই।

দুই বাহিনী মুখোমুখি হলে খালেদ একটি সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে, যখন উক্কাহ নিজের সৈন্যদের সারিবদ্ধ করতে ব্যস্ত, তখন খালেদ অল্পসংখ্যক অশ্বারোহী নিয়ে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তাকে বন্দি করে নিয়ে আসেন। নেতা বন্দি হওয়ায় আরব খ্রিষ্টান বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে এবং তারা আত্মসমর্পণ করে। এরপর খালেদ আইন তামরের দুর্গ অবরোধ করেন। দুর্গে আশ্রয় নেওয়া লোকদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন। এভাবে আইনে তামরে সম্পূর্ণভাবে মুসলিমদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। আইন তামরের প্রশাসক হিসেবে উয়াইমির ইবনে কাহিল আসলামীর নিযুক্ত করেন।

দুমাতুল জানদাল

আইনে তামর জয় করে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ দুমাতুল জানদালের দিকে এগিয়ে গেলেন। এখানে মুসলিম সেনাপতি ইয়াজ ইবনে গানাম অবরুদ্ধ হয়ে ছিলেন। খালেদের অগ্রযাত্রার সংবাদ পৌঁছাতেই দাউমাতুল-জানদালের শাসকরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল এবং বিভিন্ন গোত্রের সৈন্যদের সমবেত করল।

এদিকে দাউমাতুল-জানদালে পৌঁছে খালেদ দেখতে পেলেন, শত্রুবাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একদল তার মোকাবিলার জন্য এবং অন্যদল ইয়াজ ইবনে গানামের বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আক্রমণ শুরু হলে উভয় বাহিনী মুসলিমদের হাতে পরাজিত হয়। পরাজিত সৈন্যরা দুর্গে আশ্রয় নিতে ছুটে গেলেও ভিড়ের কারণে ভেতরে যেতে পারে না। ফলে তারা মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এরপর খালেদ দুর্গের প্রবেশদ্বার ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং দুমাতুল জানদালের পূর্ণ নিজের হাতে তুলে নেন।

এই বিজয় শুধু সামরিক সাফল্য নয়; কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও এর অনেক গুরুত্ব ছিল। দুমাতুল জানদাল ছিল আরব উপদ্বীপ, ইরাক এবং শামের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে শহরটির অধিকার মুসলিমদের জন্য উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তকে নিরাপদ করে এবং ইরাক ও শামের মধ্যকার যোগাযোগপথকে সুরক্ষিত করে।

হুসাইদ বিজয়

দুমাতুল জানদাল বিজয়ের পরও ইরাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ থেমে যায়নি। খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ অন্য অভিযানে ব্যস্ত থাকায় বহু অমুসলিম আরব ও পারসিক গোষ্ঠী মুসলিম শাসনকে দুর্বল মনে করে আবার সংগঠিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে, আইনুত তামরে নিহত উক্কাহর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা পারসিকদের সঙ্গে জোট করে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ সম্মিলিত বাহিনী প্রস্তুত করে।

এই উদ্দেশ্যে পারসিক সেনানায়করা তাদের বাহিনী নিয়ে বাগদাদ অঞ্চল থেকে হুসাইদ ও খানাফিতে অবস্থানরত আরব মিত্রদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তাদের তৎপরতা মুসলিম গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে যায়। হীরার শাসক কা’কা ইবনে আমর তাদের ওপর নজরদারির ব্যবস্থা করেন।

খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ জানতে পারেন, হুসাইদে বিভিন্ন গোত্রের সৈন্যরা পারসিক সেনাপতি রাওজাবার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। শত্রুকে আরো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ না দিয়ে তিনি কাকা ইবনে আমরের নেতৃত্বে একটি বাহিনী সেখানে পাঠান এবং হীরার দায়িত্ব ইয়াজ ইবনে গনমের হাতে অর্পণ করেন। এদিকে জারমাহারের সহায়তায় রাওজাবাও পারসিক ও আরব বাহিনীকে একত্র করেন। হুসাইদের যুদ্ধে কাকার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী শত্রুপক্ষকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। যুদ্ধে অনেক শত্রুসৈন্য নিহত হয়। এ বিজয়ের ফলে মুসলিমরা ইরাকে তাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা নতুন জোট ও সম্ভাব্য বিদ্রোহের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়।

মুসাইয়াখ বিজয়


হুসাইদে বিজয়ের পর খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ উপলব্ধি করেন, ইরাকের উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আরব ও পারসিক গোষ্ঠীগুলো দ্রুত দমন না করা গেলে তারা আবার একত্র হয়ে মুসলিমদের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে। তাই তিনি তার অধীনস্থ সব কমান্ডারকে মুসাইয়্যাখ নামক স্থানে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। হাওরাতের নিকটবর্তী এ অঞ্চলে নির্ধারিত সময়ে মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন একত্র হলে খালেদ তাদের সমন্বিত আক্রমণের পরিকল্পনা দেন। এরপর তিন দিক থেকে একযোগে অভিযান চালিয়ে তারা স্থানীয় প্রতিরোধশক্তিকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং শত্রুদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়।

ফিরাজের লড়াই

ইরাকে ধারাবাহিক বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিমরা যখন অধিকাংশ প্রতিরোধশক্তিকে দমন করতে সক্ষম হয়, তখন সেনাপতি খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ ফিরাজ অঞ্চলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। শাম, ইরাক ও আরব উপদ্বীপের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ফিরাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্তাঞ্চল। কৌশলগতভাবে এর নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য ছিল।

ফিরাজে মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতি রোমানদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। মুসলিমদের দ্রুত অগ্রযাত্রা থামানোর উদ্দেশ্যে তারা পারসিকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং উভয় পক্ষ তাদের অভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একযোগে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে প্রথমবারের মতো মুসলিম বাহিনী একই যুদ্ধে রোমান, পারসিক ও আরব—এই তিন শক্তির সম্মিলিত বাহিনীর মুখোমুখি হয়।

উভয় বাহিনী ফোরাত নদীর তীরে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। শত্রুপক্ষ মুসলিমদের নদী পার হয়ে আসার আহ্বান জানালে খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ নিজ অবস্থানে অটল থেকে তাদেরই নদী পার হতে দেন। যুদ্ধে রোমান, পারসিক ও আরবদের যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিমরা অসাধারণ সাহস ও শৃঙ্খলার পরিচয় দেয়। তীব্র যুদ্ধের পর শত্রুজোট সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয় এবং বিপুলসংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। বিজয়ের পর খালেদ কয়েক দিন ফিরাজে অবস্থান করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করেন।

হিজরি ১২ সালের জিলকদ মাসে সংঘটিত এই যুদ্ধ মুসলিমদের বিরুদ্ধে গঠিত বৃহত্তম জোটকে ভেঙে দেয় এবং ইরাকে মুসলিম কর্তৃত্বকে আরো সুদৃঢ় করে। ইতিহাসে এটি ইরাক অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। এটি ছিল ইরাকে খালেদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে পরিচালিত শেষ উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ।
ইরাক অঞ্চলে অন্যান্য বিজয়

মধ্যযুগ : বহুমুখী জ্ঞানচর্চার স্বর্ণসময় by ইলিয়াস মশহুদ

বর্তমানে ‘মাদরাসা’ শব্দটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে মাদরাসার ধারণা ছিল অনেক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। সে সময়ের মাদরাসাগুলো শুধু ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল না, সেগুলো আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে ওঠা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। সেখানে ধর্মীয় বিদ্যার পাশাপাশি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং প্রশাসনিক বিদ্যারও চর্চা হতো। এসব প্রতিষ্ঠান ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈশ্বিক বিকাশের প্রধানকেন্দ্র। মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আইয়ুবি শাসকদের (৫৬৯-৬৪৮ হি./ ১১৭১-১২৫০ খ্রি.) অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মিসর ও শামজুড়ে গড়ে ওঠে অসংখ্য মাদরাসা, দারুল হাদিস ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। এসব প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বহুমুখী জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। আইয়ুবি যুগে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মাদরাসা নিয়ে লিখেছেন ইলিয়াস মশহুদ

৫৭২ হিজরিতে (১১৭৬ খ্রি.) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি বৃহত্তর সিরিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি যখন মিসরে ফিরে আসেন, তখন সেখানে শিক্ষার বিস্তার ও সুন্নি ভাবধারার প্রচারের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের বিশেষ উদ্যোগ নেন।

আইয়ুবি শাসনামলে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এবং তার উত্তরসূরিদের তত্ত্বাবধানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও শিক্ষাকাঠামো প্রণয়নে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ফাতেমি আমলের শিয়া মতাদর্শের প্রভাব কাটিয়ে বৃহত্তর সুন্নি মতাদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ক্ষেত্রে এ সময়টি গুরুত্বপূর্ণ।

আইয়ুবি শাসনামলে শিক্ষাবিপ্লবের প্রধান কেন্দ্র ছিল কায়রো, দামেস্ক এবং আলেকজান্দ্রিয়া। ফাতেমিদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব মুছে সুন্নি মতবাদ রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তিশালী করা ছিল এই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। এসব মাদরাসা থেকে বিজ্ঞ আলেম, দক্ষ বিচারক, প্রশাসক এবং আমলা তৈরি হতেন। তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখতেন। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহুমুখী জ্ঞানচর্চার সুযোগ ছিল। কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), সাহিত্য এবং অলংকার শাস্ত্র (বালাগাত); যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ গণিতশাস্ত্রের চর্চাও অব্যাহত ছিল।

সালেহিয়া মাদরাসা

মিসরের কায়রো শহরে ইমাম শাফেয়ির মাকবারার কাছে ৫৭২ হিজরিতে (১১৭৬ খ্রি.) এই মাদরাসার নির্মাণকাজ শুরু হয়। এই মাদরাসার শিক্ষাধারা শাফেয়ি মাজহাব অনুযায়ী পরিচালিত হতো। ইমাম সুয়ুতি বলেন, ‘এই মাদরাসা হচ্ছে সব মাদরাসার তাজ। খ্যাতিমান আলেম নাজমুদ্দিন খুবুশানির তত্ত্বাবধানে এখানে শিক্ষাদান শুরু হয়।’

৫৭৮ হিজরিতে (১১৮৩ খ্রি.) জিলহজের শেষদিকে, যখন এর উন্নয়নকাজ চলছিল, তখন প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে জুবায়ের এই মাদরাসা পরিদর্শন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘এ অঞ্চলে সালেহিয়া মাদরাসার মতো অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়নি। মাঠের বিশালতা এবং নির্মাণশৈলীর অনন্যতার দিক দিয়ে এটি অতুলনীয়। দর্শকের মনে হবে, এ যেন স্বাধীন একটি রাজ্য। এটি নির্মাণে অনেক অর্থ ব্যয় করা হয়। শায়খ খুবুশানি নিজেই এ মাদরাসার পরিচালক ছিলেন। সুলতান সালাহুদ্দিন তাকে এর দায়িত্ব দিয়ে বলেছিলেন, ‘এর সৌন্দর্যবৃদ্ধিতে আপনি ইচ্ছামতো ব্যয় করুন, খরচ বহনের দায়িত্ব আমাদের।’

ইবনে জুবায়েরের এই বক্তব্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, সুলতান সালাহুদ্দিন এসব মাদরাসার জন্য সৎ, যোগ্য, বিজ্ঞ এবং প্রসিদ্ধ আলেমদের শিক্ষক নির্বাচন করতেন।

হুসাইনি মাদরাসা

সুলতান সালাহুদ্দিন কায়রোতে (তথাকথিত) মাশহাদে হুসাইনি তথা হুসাইনের সমাধির পাশে একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন এবং এই মাদরাসার জন্য বিপুল সম্পদ ওয়াকফ করেন। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘সুলতান আন-নাসির (সালাহুদ্দিন) ক্ষমতালাভের পর সেখানে দরস-তাদরিস এবং ফকিহদের অবস্থানের ব্যবস্থা করেন। তিনি বিখ্যাত ফকিহ বাহাউদ্দিন দিমাশকির হাতে এর পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি যে মিম্বরে বসতেন, এর পেছনেই ছিল (তথাকথিত) হুসাইন (রা.)-এর সমাধি।’

সুলতান আল-মালিকুল কামিলের শাসনামলে মুইনুদ্দিন হাসান ইবনে শায়খুশ শুয়ুখ উজিরের দায়িত্ব লাভ করলে তিনি এই মাদরাসার জন্য ওয়াকফ জমা করেন। এর দ্বারা বিশাল শিক্ষাভবন এবং ফকিহদের জন্য (আবাসিক) উঁচু বাড়িগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল।

ফাতেমি যুগে বিস্তার ঘটা শিয়া মতবাদের ইতি টানা এবং সুন্নি মতাদর্শের বিস্তারের লক্ষ্যে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি একাধিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই মাশহাদে হুসাইনিতে মাদরাসা নির্মাণের বিশেষ তাৎপর্য ছিল।

ফাজিলিয়া মাদরাসা

এ সময়ে নির্মিত অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ফাজিলিয়া মাদরাসা। ৫৮০ হিজরিতে (১১৮৪ খ্রি.) কাজি আল-ফাজিল এই মাদরাসা নির্মাণ করেন এবং শাফেয়ি ও মালেকি মাজহাব পাঠদানের জন্য ওয়াকফ করেন। এই মাদরাসার জন্য অসংখ্য গ্রন্থও ওয়াকফ করা হয়েছিল। এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখে পৌঁছে গিয়েছিল। পাশাপাশি এতিমদের শিক্ষার জন্যও জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছিল। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘এই ফাজিলিয়া ছিল কায়রোর সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।’

কামিলিয়া মাদরাসা

আল-মালিকুল কামিল ইবনে আদিল হাদিস শাস্ত্রের প্রতি খুব আগ্রহী ছিলেন। কায়রোতে তিনিই কামিলিয়া মাদরাসা নামে সর্বপ্রথম হাদিসের জন্য বিশেষায়িত মাদরাসা নির্মাণ করেন। ৬২২ হিজরিতে (১২২৫ খ্রি.) এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমে হাদিস শাস্ত্রে অভিজ্ঞ আলেমদের কাছে, পরে শাফেয়ি মাজহাবের ফকিহদের কাছে এর দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। বিখ্যাত হাদিসবিশারদ হাফিজ ওমর ইবনে হাসান আন্দালুসিকে এই মাদরাসার পরিচালক নিযুক্ত করা হয়।

সমন্বয়ধর্মী মাদরাসা

বাগদাদের মুসতানসরিয়া মাদরাসার আদলে আস-সালেহ নাজমুদ্দিন আইয়ুব ইবনে কামিল ফাতেমিদের পূর্ব-প্রাসাদের কাছে ৬৩৯ হিজরিতে (১২৪১ খ্রি.) একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠানে সমন্বিতভাবে চার মাজহাবের পাঠদান করা হতো। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বৃহত্তর মিসরে স্থানে এক ছাদের নিচে চার মাজহাবের শিক্ষা চালু করেছিলেন।’

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা

আইয়ুবি শাসনামলে শিক্ষা ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং রাষ্ট্রীয় বা ওয়াকফ করা সম্পদ দ্বারা পরিচালিত। শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা-খাওয়া এবং মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল। শ্রেষ্ঠ আলেম ও বিজ্ঞদের এসব মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো। তাদের সামাজিক মর্যাদা ও বেতন ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক। সালেহিয়া মাদরাসার অধ্যাপক নাজমুদ্দিন আল খুবুশানিকে মাসিক ভাতা হিসেবে ৪০ দিনার, মাদরাসার ওয়াকফ সম্পদ দেখাশোনার জন্য ১০ দিনার, প্রতিদিন ৬০ রিতিল রুটি এবং দুই মশক নীলনদের পানি বরাদ্দ ছিল। প্রতিটি বড় মাদরাসায় গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ছিল।

আইয়ুবি রাজবংশের নারীরাও শিক্ষাবিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। সালাহুদ্দিনের বোন জুমুররুদ খাতুন এবং পরিবারের অন্য নারীরা দামেশকে বহু মাদরাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আইয়ুবি শাসকদের এই শিক্ষাবিপ্লবের ফলে আড়াই শতাব্দী পর মিসর আবার বাগদাদ ও কর্ডোভার মতো ইসলামি সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

শিক্ষার বিস্তার ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সোনালি অধ্যায়

আইয়ুবি শাসকদের মাদরাসা নির্মাণের প্রচেষ্টা শুধু কায়রোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মিসরের অন্যান্য শহরেও তা বিস্তৃত হয়েছে। ফাইয়ুম শহরে দুটি মাদরাসা নির্মাণ করা হয়। ৫৭৭ হিজরিতে (১১৮১ খ্রি.) আলেকজান্দ্রিয়াতে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন। ওয়াকফ সম্পদের মাধ্যমে এসব মাদরাসার শিক্ষকদের জীবিকার ব্যবস্থা হতো।

ইবনে জুবায়ের বলেন, ‘এ অঞ্চলের (আলেকজান্দ্রিয়া) গর্ব এবং এ অঞ্চলের সুলতানের কৃতিত্বের অনন্য নিদর্শন হচ্ছে, এখানকার মাদরাসাগুলো এবং শিক্ষার্থী ও ইবাদতগুজার ব্যক্তিদের জন্য নির্মিত সরাইখানা।’

তারা দূরদূরান্ত থেকে এখানে আসতেন। তাদের প্রত্যেকেই আশ্রয়ের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা ছিল। বিষয়ভিত্তির শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষকের উপস্থিতি ছিল। একজন কর্মকর্তা সবসময় তদারকি করতেন।

ইবনে জুবায়ের বলেছেন, ‘আলেকজান্দ্রিয়ায় অধিকাংশ মসজিদ ছিল যৌথ (অর্থাৎ, মসজিদ ও মাদরাসার সমন্বয়ে গঠিত)। তার প্রত্যেকটিতেই সুলতানের পক্ষ থেকে ইমাম নিয়োজিত ছিল। তাদের কারো মাসিক বেতন ছিল পাঁচ মিসরি দিনার, আবার কারো এর চেয়ে বেশি বা কম। এ ছিল সুলতানের অন্যতম মহৎ কর্ম।’

সুলতান সালাহুদ্দিন বাইতুল মাকদিসে শাফেয়ি মাজহাবের এবং দামেশকে মালেকি মাজহাবের অনুসারীদের জন্য মাদরাসা নির্মাণ করেছিলেন। তাকিউদ্দিন ওমর এডেসায় একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন। আল-আজিজ ওসমান ইবনে সালাহুদ্দিন দামেশকে ভাই আল-আফজালের মাধ্যমে আজিজিয়া মাদরাসা; মুয়াজ্জম ঈসা মুয়াজ্জামিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একইভাবে সালাহুদ্দিনের ভাই সাইফুল ইসলাম দামেশকে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ শহরেই আল আশরাফ মুসা ইবনে আদিল দারুল হাদিস আশরাফিয়া নির্মাণ করেন।

জামে বনু উমাইয়ার কাছে কাজি আল-ফাজিল দারুল হাদিস ফাজিলিয়া নির্মাণ করেন। সালাহুদ্দিনের বোন সিত্তুশ শাম দামেশকে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এমনিভাবে তার আরেক বোন রাবেয়া খাতুনও দামেশকে একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন।

আলেপ্পো শহরও আইয়ুবিদের প্রচেষ্টায় অনেক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়। আল-মালিকুজ জাহির হানাফি এবং শাফেয়িদের জন্য একটি যৌথ মাদরাসা নির্মাণ করেন। শুধু শাফেয়ি মাজহাবের জন্য ইবনু শাদ্দাদ সালেহিয়া নামে আরেকটি মাদরাসা নির্মাণ করেন।

এভাবে আইয়ুবি আমলে সাম্রাজ্যের নানা প্রান্তে অসংখ্য মাদরাসা নির্মিত হয়েছে। এমনকি ইজ্জুদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ শুধু দামেশকেই চার মাজহাবের ৯২টি মাদরাসা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন।

মধ্যযুগ : বহুমুখী জ্ঞানচর্চার স্বর্ণসময়
১২৩৬ সালে নির্মিত আলেপ্পোর ফেরদৌস মাদরাসা

Tuesday, June 9, 2026

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের হীরা বিজয়ের চুক্তিপত্র by আহমদ ফাহমি

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এই চুক্তিপত্র খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এবং হীরার অধিবাসীদের মনোনীত প্রতিনিধি ও গোত্রপ্রধান আদির দুই ছেলে আদি ও আমর, আমর ইবনে আবদুল মাসিহ, ইয়াস ইবনে কাবিসা ও হাইরি ইবনে আকালের মধ্যে সম্পাদিত হলো। হীরার অধিবাসীরা এ চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন এবং উল্লিখিত প্রতিনিধিদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেদের পক্ষে ক্ষমতা অর্পণ করেছেন।

চুক্তির শর্তাবলি নিচে উল্লেখ করা হলো

১. হীরার অধিবাসীরা প্রতিবছর ১ লাখ ৯০ হাজার দিরহাম দেবেন। এ অর্থ তাদের পক্ষ থেকে পার্থিব নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিনিময়ে জিজিয়া হিসেবে আদায় করা হবে।

২. তাদের সন্ন্যাসী ও যাজকরাও এ জিজিয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকবেন; তবে যে ব্যক্তি পার্থিব সম্পদ ও উপার্জনের অধিকারী নয়, সংসার জীবন পরিত্যাগ করে ধর্মসাধনায় নিবিষ্ট রয়েছে, সে এই দায় থেকে অব্যাহতি পাবে।

৩. যে ব্যক্তি দুনিয়ায় উপার্জনে সামর্থ্যহীন এবং সংসারত্যাগী অথবা ভ্রমণরত সন্ন্যাসী হিসেবে পার্থিব জীবন বর্জন করেছে, সে জিজিয়া দিতে বাধ্য থাকবে না।

৪. মুসলিম পক্ষ তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। যত দিন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে না, তত দিন তাদের ওপর এ অর্থ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কার্যকর হবে না।

৫. তবে তারা যদি কোনো কাজ বা বক্তব্যের মাধ্যমে চুক্তিভঙ্গ বা বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে তাদের প্রদত্ত নিরাপত্তা ও অঙ্গীকার (জিম্মা) বাতিল বলে গণ্য হবে এবং মুসলিম পক্ষ এই দায় থেকে মুক্ত থাকবে।

এই চুক্তিপত্র হিজরি ১২ সনের রবিউল আউয়াল মাসে লিখিত হলো এবং এর লিখিত দলিল তাদের (হীরাবাসীর) কাছে হস্তান্তর করা হলো।

(সূত্র : তারিখে তাবারি, অখণ্ড সংস্করণ, পৃষ্ঠা : ৫৪০)

আরবি থেকে অনুবাদ : আহমদ ফাহমি

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের হীরা বিজয়ের চুক্তিপত্র

নৌপ্রযুক্তিতে মুসলিম সভ্যতার অবদান by মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন

মানবসভ্যতার ইতিহাসে নৌপ্রযুক্তির বিকাশ এক অনন্য মাইলফলক। সমুদ্রপথের আবিষ্কার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিস্তার, সামরিক শক্তির প্রসার এবং ভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নৌপ্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব জাতি সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করেছে, তারাই বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মধ্যযুগীয় মুসলিম সভ্যতা ছিল বিশ্বের অন্যতম অগ্রসর সামুদ্রিক শক্তি।

মধ্যযুগে মুসলিম সভ্যতা নৌপ্রযুক্তিকে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় সামুদ্রিক শক্তির বিকাশেও গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষত আরব ও পারস্যের মুসলিম নাবিক, ভূগোলবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা জাহাজ নির্মাণ, সমুদ্রপথ নির্ধারণ, দিকনির্ণয় এবং মানচিত্রবিদ্যায় অসাধারণ অবদান রাখেন। তাদের উদ্ভাবিত বা উন্নতকৃত বিভিন্ন নৌযন্ত্র, যেমন চৌম্বকীয় কম্পাস, অ্যাস্ট্রোলেব ও সামুদ্রিক মানচিত্র দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রাকে নিরাপদ ও কার্যকর করে তোলে।

সমুদ্রপথে মুসলিমদের আধিপত্য

সপ্তম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম বিশ্ব ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী সামুদ্রিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। মুসলিম নাবিকরা পূর্ব আফ্রিকা, ভারত, মালয় উপদ্বীপ এবং চীন পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রপথে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তাদের এই সাফল্যের পেছনে ছিল উন্নত নৌ-জ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক দিকনির্ণয় পদ্ধতি এবং দক্ষ জাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি। ইতিহাসবিদ George F. Hourani তার ‘Arab Seafaring in the Indian Ocean’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন— ‘আরব নাবিকরা উন্নত নৌদক্ষতা ও দিকনির্ণয় জ্ঞানের মাধ্যমে শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।’

মুসলিম সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল উন্নত জাহাজ নির্মাণ শিল্প। আরবরা ‘ধাও’ (Dhow) নামক বিশেষ পালতোলা জাহাজ নির্মাণ করেছিল, যা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। এই জাহাজে ব্যবহৃত ত্রিভুজাকার ‘লাতিন পাল’ (Lateen Sail) জাহাজকে বাতাসের বিপরীত দিকেও চলতে সক্ষম করত। ফলে মুসলিম নাবিকরা সহজেই দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করতে পারতেন। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় জাহাজ প্রযুক্তিতেও এই পাল ব্যবস্থার গভীর প্রভাব পড়ে। ঐতিহাসিক লিন Lynn White Jr. বলেন— ‘আরবদের উন্নত লাতিন পাল ভূমধ্যসাগরীয় নৌচালনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।’

নৌ-দিকনির্ণয়ের ক্ষেত্রেও মুসলিমদের অবদান ছিল অসামান্য। মুসলিম নাবিকরা চৌম্বকীয় কম্পাস, নক্ষত্র মানচিত্র, অ্যাস্ট্রোলেব এবং সামুদ্রিক চার্ট ব্যবহার করে সমুদ্রপথ নির্ধারণ করতেন। বিশেষত অ্যাস্ট্রোলেবের উন্নয়নে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই যন্ত্রের মাধ্যমে সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করে সমুদ্রযাত্রার দিক নির্ধারণ করা সম্ভব হতো। মুসলিম নাবিকরা রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করে অক্ষাংশ নির্ধারণে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, যা সে সময়ের জন্য অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

মানচিত্রবিদ্যা ও ভূগোলচর্চা

মুসলিম ভূগোলবিদ ও মানচিত্রবিদদের অবদানও নৌপ্রযুক্তির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল-ইদ্রিসি, ইবনে মাজিদ, আল-বিরুনি এবং ইয়াকুত আল-হামাভির মতো মুসলিম পণ্ডিতরা সমুদ্রপথ, উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপ, বন্দর ও বাণিজ্যিক রুটসমূহের বিস্তারিত বিবরণ-সংবলিত মানচিত্র ও দিকনির্দেশিকা তৈরি করেছিলেন। তাদের রচিত গ্রন্থসমূহ শুধু ভৌগোলিক তথ্যের ভান্ডারই ছিল না; বরং তা নাবিকদের জন্য কার্যকর নৌ-নির্দেশিকা হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

দ্বাদশ শতকে আল-ইদ্রিসি রচিত বিশ্বমানচিত্র (Tabula Rogeriana) সে সময়কার সবচেয়ে উন্নত ভূগোলভিত্তিক নৌমানচিত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। সিসিলির রাজা দ্বিতীয় রজারের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই মানচিত্রে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে চিত্রিত হয়েছিল। এতে সমুদ্রপথ, নদী, পর্বত, বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর যে নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায়, তা মধ্যযুগীয় ভূগোলবিদ্যার এক অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।

সামরিক নৌশক্তি ও সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ

মুসলিমদের নৌপ্রযুক্তিগত উৎকর্ষ শুধু বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সামরিক ক্ষেত্রেও এর ব্যাপক প্রভাব ছিল। আব্বাসীয় ও ফাতেমীয় খিলাফতের সময়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে ওঠে, যা ভূমধ্যসাগরে বাইজেন্টাইন শক্তির মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুসলিম নৌবাহিনী উন্নত যুদ্ধজাহাজ, অগ্নিনিক্ষেপকারী অস্ত্র এবং কৌশলগত সমুদ্রঘাঁটি ব্যবহার করত। ফলে বহু শতাব্দী ধরে মুসলিমরা সমুদ্রপথে শক্তিশালী আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

বিশেষত উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে মুসলিম নৌবাহিনী শুধু প্রতিরক্ষামূলক শক্তি হিসেবেই নয়, বরং সাম্রাজ্য বিস্তার ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে। সিরিয়া, মিসর ও উত্তর আফ্রিকার উপকূলে বৃহৎ নৌঘাঁটি নির্মাণ করা হয়, যেখানে যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত, অস্ত্র সংরক্ষণ এবং নৌসেনাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। মুসলিম শাসকরা বুঝতে পেরেছিলেন, সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। তাই তারা নৌবাহিনীকে রাষ্ট্রশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত করেন।

ইউরোপীয় নৌ-অভিযানে মুসলিম প্রভাব

ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও সামুদ্রিক অভিযানের পেছনেও মুসলিম নৌপ্রযুক্তির গভীর প্রভাব ছিল। ক্রুসেড, আন্দালুসিয়া ও সিসিলির মাধ্যমে ইউরোপীয়রা মুসলিমদের কাছ থেকে জাহাজ নির্মাণ, মানচিত্রবিদ্যা, কম্পাস ব্যবহার এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক নৌ-দিকনির্ণয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। পরবর্তীকালে ভাস্কো দা গামা ও কলম্বাসের মতো ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, তার অনেকাংশই মুসলিম বিশ্বের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছেছিল।

নৌপ্রযুক্তির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, মুসলিম সভ্যতা শুধু সমুদ্রযাত্রায় দক্ষ ছিল না; বরং তারা নৌপ্রযুক্তিকে বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল। জাহাজ নির্মাণ, চৌম্বকীয় কম্পাসের ব্যবহার, জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক দিকনির্ণয়, মানচিত্রবিদ্যা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে মুসলিমদের অবদান ছিল যুগান্তকারী। তাদের উদ্ভাবিত ও উন্নতকৃত প্রযুক্তি দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা নিরাপদ, নির্ভুল ও কার্যকর করে তোলে। বিশেষত আরব ও পারস্যের নাবিকরা ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যে নৌ-জ্ঞান ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা মধ্যযুগীয় বিশ্বের সামুদ্রিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নৌপ্রযুক্তিতে মুসলিম সভ্যতার অবদান

খলিফা আবু বকরের শাসনকালে পারস্যের হীরা নগরী বিজয় by মাহমুদ আহমাদ

উল্লাইসের যুদ্ধ শেষ করে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ আমগেশিয়ার দিকে অগ্রসর হলেন। তার আকস্মিক আগমনের কারণে সেখানকার অধিবাসীরা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেল না। তারা নগরী ত্যাগ করে সাওয়াদে (ইরাকের উর্বর কৃষি-অঞ্চল) ছড়িয়ে পড়ল। সে সময় থেকেই তাদের আখক্ষেত ও বাগানগুলো সাওয়াদের কৃষিভূমির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

খালেদ আমগেশিয়া এবং তার আওতাভুক্ত সব স্থাপনা ধ্বংস করার নির্দেশ দিলেন। আমগেশিয়া হীরার মতোই একটি সমৃদ্ধ নগর ছিল। ফুরাত বাদাকলির (ফোরাতের শাখা নদী বা বাদাকলি খাল) একটি শাখা এসে এখানে শেষ হয়েছে। উল্লাইস ছিল আমগেশিয়ার একটি সীমান্ত প্রতিরক্ষাকেন্দ্র। মুসলমানরা সেখানে বিপুল গনিমত লাভ করল। এত পরিমাণ সম্পদ তারা আগে কখনো পায়নি।

জাতুস-সালাসিল থেকে আমগেশিয়া পর্যন্ত যত অভিযানে মুসলমানরা অংশ নিয়েছে, তার মধ্যে আমগেশিয়ার প্রাপ্ত গনিমতের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদত্ত পুরস্কারের বাইরেও প্রতিজন অশ্বারোহী যোদ্ধা ১ হাজার ৫০০ দিরহাম পেয়েছিল।

আমগেশিয়া বিজয়ের সংবাদ মদিনায় পৌঁছালে খলিফা আবু বকর (রা.) কুরাইশদের উদ্দেশে বলেছিলেন—‘কুরাইশগোত্রের লোকরা শোনো! তোমাদের বীর সিংহ আরেক সিংহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং তার গুহায় তাকে পরাস্ত করেছে। নারীরা কি আর খালিদের মতো কাউকে জন্ম দিতে পারবে?’

ফোরাত বাদাকলির মোহনা অবরোধ

কিসরার যুগ থেকে আজাজবে ছিলেন হীরার মারজুবান (সীমান্তপ্রধান)। সেকালে সম্রাটের অনুমতি ছাড়া কোনো সীমান্তপ্রধান অন্যকে সাহায্য করতে পারতেন না। তিনি উচ্চমর্যাদার অধিকারী ছিলেন; তার টুপির মূল্যই ছিল ৫০ হাজার দিরহাম।

খালেদ ইবনে ওয়ালিদ যখন আমগেশিয়া ধ্বংস করে ফেললেন। সেখানকার অধিবাসীরা গ্রামাঞ্চলের দেহকানদের (স্থানীয় ভূস্বামী বা জমিদার) কাছে আশ্রয় নিল। আজাজবে তখন বুঝতে পারলেন, তাকেও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাই তিনি মুসলিম সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।

আজাজবে অগ্রগামী বাহিনী হিসেবে ছেলেকে পাঠালেন, তারপর নিজেও বের হয়ে হীরার বাইরে শিবির স্থাপন করলেন। তিনি ছেলেকে ফোরাত নদীতে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।

অন্যদিকে খালেদ ইবনে ওয়ালিদও আমগেশিয়া থেকে হীরার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। গনিমত ও ভারী মালপত্র নৌকায় বোঝাই করে নদীপথে পাঠালেন। সামনে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ দেখা গেল, পানিস্বল্পতার কারণে নৌকাগুলো আটকে যাচ্ছে। এতে মুসলমানরা বিচলিত হয়ে পড়লেন। নৌকার মাঝিরা বললেন—‘পারসিকরা নদীর গতিপথ বদলে দিয়েছে। পানি অন্য পথে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর মুখ আবার খুলে দেওয়া না হলে এখানে পানি আসবে না।’

মুসলিম সেনাপতি অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে দ্রুত আজাজবের ছেলের মোকাবিলা করার জন্য এগিয়ে গেলেন। আতিক নদীর মোহনায় তার অশ্বারোহী বাহিনীর একাংশ শত্রুদের মুখোমুখি হলো। আজাজবের সৈন্যরা তখন সম্পূর্ণ নির্ভার ছিল; এমন সময়ে মুসলিমদের আকস্মিক আক্রমণের কথা তারা কল্পনাও করেনি। মুসলিম সেনাবাহিনী সেখানে তাদের পরাজিত করলেন। তারপর বিলম্ব না করে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। সংবাদ পৌঁছার আগেই তারা আজাজবের ছেলে ও তার সৈন্যদের কাছে ফোরাত বাদাকলির মোহনায় উপস্থিত হলেন। সেখানে দুই বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হলো। পারসিক বাহিনী পরাজিত হলো। এরপর নদীর বাঁধ খুলে দেওয়া হলো এবং পানি ফোরাত দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করল।

হীরা শহর অবরোধ

ফোরাত মোহনায় আজাজবের ছেলেকে পরাজিত করার পর খালেদ হীরার দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি বিচ্ছিন্ন বাহিনীকে সমবেত করলেন এবং খাওয়ারনাক ও নাজাফের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান নিলেন।

খালেদ যখন খাওয়ারনাকে পৌঁছালেন, তার আগেই আজাজবে যুদ্ধ না করে ফোরাত পার হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তার এই পলায়নের প্রধান কারণ ছিল (পারস্য সম্রাট তৃতীয়) আরদাশীরের মৃত্যু এবং তার ছেলের পরাজয়ের সংবাদ। আলগারবিয়্যাইন ও সাদা দুর্গের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল তার শিবির।

খালেদের সৈন্যরা খাওয়ারনাকে এসে সমবেত হলো। তিনি এগিয়ে গিয়ে আজাজবের পরিত্যক্ত শিবিরে অবস্থান নিলেন। এদিকে হীরার অধিবাসীরা আত্মরক্ষার জন্য বিভিন্ন দুর্গে আশ্রয় নিল।

সেনাপতি খালেদ মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে শহরে প্রবেশ করলেন এবং প্রত্যেক দুর্গ অবরোধের জন্য একজন কমান্ডার নিয়োগ দিলেন। সাদা দুর্গের (আলকাসরুল আসওয়াদ) নেতা ছিলেন ইয়াস ইবনে কুবাইসা, জিরার ইবনে আজওয়ার এই দুর্গ অবরোধ করলেন। আদি ইবনে আদি ইবাদি ছিলেন আদাসিয়্যিন দুর্গের নেতা। এই দুর্গ অবরোধ করলেন জিরার ইবনে খাত্তাব। মাজিন গোত্রের দুর্গের নেতৃত্বে ছিলেন ইবনে আকালের হাতে। এই দুর্গ অবরোধ করেছিলেন জিরার ইবনে মুকাররিন। ইবনে বুকাইলা দুর্গের অবরোধ করেছিলেন মুসান্না ইবনে হারিসা। এখানকার নেতা ছিলেন আমর ইবনে আবদুল মাসিহ।

কমান্ডাররা সবাইকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং আত্মসমর্পণের জন্য এক দিনের সময় দিলেন। কিন্তু হীরাবাসী আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করল। তারা নিজেদের অবস্থানে অনড় রইল। ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ল।

খালেদ ইবনে ওয়ালিদ সেনাপতিদের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনারা প্রথমে তাদের ইসলামের দাওয়াত দেবেন। যদি তারা দাওয়াত গ্রহণ করে, তাহলে ভালো। আর যদি প্রত্যাখ্যান করে, তবে তাদের এক দিনের সময় দেবেন। শত্রুকে আপনাদের অবস্থা জানার সুযোগ দেবেন না, তাহলে আপনাদের দুর্বলতার সুযোগ তারা নেওয়ার চেষ্টা করবে। বরং দ্রুত তাদের মোকাবিলা করবেন। মুসলিমদের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে বিরত রাখবেন না।’

অবকাশের সময় সমাপ্ত হওয়ার পর সর্বপ্রথম যুদ্ধ শুরু করেন জিরার ইবনে আজওয়ার, তিনি সাদা দুর্গ অবরোধের দায়িত্বে ছিলেন। (অবকাশ শেষ হওয়ার) পরদিন সকালে দুর্গের প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘তোমাদের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে : ইসলাম গ্রহণ, জিজিয়া প্রদান অথবা যুদ্ধ।’

তারা যুদ্ধকেই বেছে নিল এবং উচ্চ স্বরে চিৎকার করে বলল, ‘তোমাদের বিরুদ্ধে খাজাজিফ (মোড়ামাটির তৈরি নিক্ষেপযোগ্য গোলা) প্রস্তুত আছে!’

কমান্ডার জিরার সৈনিকদের বললেন, ‘তোমরা একটু সরে তাদের নিক্ষেপিত গোলার সীমানার বাইরে দাঁড়াও। তাতে গোলার আঘাত থেকে বাঁচতে পারবে। দেখি তারা কী বোঝাতে চায়।’

অল্পক্ষণের মধ্যেই দুর্গের দেয়ালে লোকজনে ভরে গেল। তারা ঝুড়িভর্তি খাজাজিফ নিক্ষেপ করতে লাগল। এগুলো ছিল পোড়ামাটির তৈরি গোলাকার শক্ত ঢেলা।

জিরার তখন নির্দেশ দিলেন, ‘তাদের ওপর তীর বর্ষণ করো।’ মুসলমানরা এগিয়ে গিয়ে তীর নিক্ষেপ করলে দুর্গপ্রাচীর শূন্য হয়ে গেল। এভাবে তারা আক্রমণ চালিয়ে গেলেন।

পারসিকদের সন্ধি-প্রস্তাব

অন্য সেনাপতিরাও অবরোধ করে রাখা দুর্গের বিরুদ্ধে একই কৌশল অবলম্বন করলেন। তারা আশপাশের বাড়িঘর ও ছোট ছোট আশ্রম-উপাসনালয় দখল করলেন এবং বহু লোককে হত্যা করলেন। তখন যাজক ও সন্ন্যাসীরা চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, ‘হে দুর্গবাসী! তোমাদের একগুঁয়েমির কারণেই আমরা নিহত হচ্ছি!’

অবশেষে আর কোনো উপায় না দেখে দুর্গের লোকরা মুসলিমদের ডেকে বললেন, ‘আরবের লোকরা, শোনো! তোমাদের দেওয়া তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে একটা আমরা গ্রহণ করতে রাজি। আমাদের তোমাদের নেতার কাছে নিয়ে চলো এবং যুদ্ধ বন্ধ করো।’

তখন ইয়াস ইবনে কাবিসা ভাইকে নিয়ে জিরার ইবনে আজওয়ারের কাছে এলেন। আদি ইবনে আদি ও জায়েদ ইবনে আদি গেলেন জিরার ইবনে খাত্তাবের কাছে। আর আমর ইবনে আবদুল মাসিহ ও ইবনে আকালের একজন গেলেন দিরার ইবন মুকাররিনের কাছে, অন্যজন মুসান্না ইবনে হারিসার কাছে। সবশেষে তাদের সবাইকে সেনাপতি খালেদের কাছে পাঠানো হলো। মুসলিম বাহিনী নিজ নিজ অবস্থানে অবিচল রইল।

প্রথমে সন্ধির প্রস্তাব উত্থাপন করেন আমর ইবনে আবদুল মাসিহ। তিনি ইবনে বুকাইলা নামে পরিচিত ছিলেন। সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের জন্য দুর্গের নেতারা তাকে এবং তাদের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে একজন বিশ্বস্ত প্রতিনিধিকে খালিদের কাছে পাঠালেন। খালেদ দুর্গের সব প্রতিনিধির সঙ্গে আলাদাভাবে অন্যদের উপস্থিতি ছাড়া আলোচনা করলেন। তিনি প্রথমে আদি ও তার সঙ্গীদের দিয়ে আলোচনা শুরু করেন।

তিনি তাদের বললেন, ‘ধিক তোমাদের! তোমরা কি আরব নও? যদি আরব হও, তবে আরবদের বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগ কী? আর যদি অনারব হও, তবে ন্যায় ও ইনসাফের বিরুদ্ধে তোমাদের আপত্তি কী?’

আদি বললেন, ‘আমাদের মধ্যে কেউ বিশুদ্ধ আরব (عرب عاربة), কেউ আবার আরবায়িত আরব (عرب متعربة)।’

খালেদ বললেন, ‘তোমরা যেমন বলছো তেমন যদি হতে, তবে আমাদের বিরোধিতা করতে না এবং আমাদের দাওয়াতকে অপছন্দ করতে না।’

আদি উত্তর দিলেন, ‘আমরা যা বলছি তার প্রমাণ হলো—আরবি ভাষা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো ভাষা নেই।

খালেদ বললেন, ‘তুমি সত্য বলেছ।’

এরপর তিনি বললেন, ‘তোমাদের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে। আমাদের দ্বীনে প্রবেশ করবে। তাহলে তোমরা হিজরত করো বা নিজ ভূমিতেই অবস্থান করো, উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের ও তোমাদের অধিকার এবং দায়িত্ব সমান হয়ে যাবে। জিজিয়া দেবে। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের মোকাবিলার জন্য এমন এক জাতিকে নিয়ে এসেছি, তোমাদের জীবনকে যতটা ভালোবাসো, তার চেয়েও মৃত্যুকে তারা বেশি ভালোবাসে।’

আদি বললেন, ‘আমরা আপনাকে জিজিয়া দেব।’

খালেদ বললেন, ‘ধিক তোমাদের! কুফর হলো এক বিভ্রান্তিকর মরুভূমি। যে এ পথে চলে, সে আরবদের সবচেয়ে নির্বোধ ব্যক্তি। তার সামনে যদি দুজন পথপ্রদর্শক আসে—একজন আরব এবং অন্যজন অনারব আর সে আরবকে ছেড়ে অনারবকে অনুসরণ করে, তবে তার চেয়ে নির্বোধ আর কেউ হতে পারে না!’

অবশেষে বার্ষিক ১ লাখ ৯০ হাজার দিরহামের বিনিময়ে সন্ধিচুক্তি হলো। অন্যরাও তাদের অনুসরণ করলেন। তারা খালেদকে বিভিন্ন উপঢৌকনও দিলেন। খালেদ বিজয়ের সংবাদ এবং উপহারগুলো খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

‘তিনি খালেদকে পত্রে নির্দেশ দিলেন : ‘তারা যে উপহার-উপঢৌকন পেশ করেছে, তা তাদের জিজিয়ার হিসেবে সমন্বয় করো, যদি তা আগে থেকেই জিজিয়ার অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে। এরপর তাদের ওপর যা বাকি থাকে, তা আদায় করে নাও এবং সেই অর্থে তোমার সৈন্যদের প্রয়োজন পূরণ করো ও তাদের শক্তি বৃদ্ধি করো।’

(সূত্র : তারিখে তাবারি, অখণ্ড সংস্করণ, পৃষ্ঠা : ৫৩৮-৫৩৯)

(আরবি থেকে অনুবাদ : মাহমুদ আহমাদ)

খলিফা আবু বকরের শাসনকালে পারস্যের হীরা নগরী বিজয়

Monday, June 8, 2026

এক হবু সম্রাটের হত্যাই কি ডেকে এনেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ by শামিমা নাসরিন

১১১ বছর আগে রৌদ্রোজ্জ্বল এক সকালে বসনিয়ার সারায়েভোর সড়কগুলোতে সাজ সাজ রব। সস্ত্রীক সফরে আসছেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ। সড়কপথে ছাদখোলা বিলাসবহুল গাড়িতে আসছেন তাঁরা। তাঁদের দেখতে সড়কের দুপাশে উপচে পড়া মানুষের ভিড়। কে জানত ওই ভিড়েই লুকিয়ে আছেন আততায়ী।

সেদিন ভিড়ের ভেতর থেকে পিস্তল হাতে বেরিয়ে আসেন গ্যাভরিলো প্রিনসিপ নামের এক যুবক। খুব কাছ থেকে দুটি গুলি ছোড়েন তিনি। একটি লাগে আর্চডিউক ফার্দিনান্দের গলায়, আরেকটি তাঁর স্ত্রী সোফির পেটে। দুজন গাড়িতেই নিথর হয়ে পড়েন। মারা যাওয়ার আগে আর্চডিউকের শেষ কথা ছিল, ‘সোফি, সোফি, মরে যেয়ো না…বাচ্চাদের জন্য বেঁচে থাকো।’ সেদিন ছিল তাঁদের বিবাহবার্ষিকী।

গ্যাভরিলো প্রিনসিপ ছিলেন একজন সার্ব জাতীয়তাবাদী। প্রিনসিপ এবং অন্য জাতীয়তাবাদীরা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ওপর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির শাসনের অবসান ঘটাতে সংগ্রাম করছিলেন। বসনিয়া–হার্জেগোভিনার সামরিক গভর্নর অস্কার পোটিওরেকের অনুরোধে আর্চডিউক ফার্দিনান্দের সারায়েভো সফরে বসনীয় ও সার্ব জাতীয়তাবাদীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তাঁরা এ সফরকে সাম্রাজ্যবাদী দখলের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন।

ভাবী সম্রাটকে হত্যার মাধ্যমে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় শাসনকে ধাক্কা দিয়ে ওই জাতীয়তাবাদীরা স্বাধীনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারেননি, তাঁদের এ কাজ গোটা বিশ্বকে প্রাণঘাতী এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে, সূচনা হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের।

বারুদের গুদামে স্ফুলিঙ্গ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর বহু আগে থেকেই ইউরোপজুড়ে উত্তেজনা দানা বাঁধছিল, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের অশান্ত বলকান অঞ্চলে।

ইউরোপীয় পরাশক্তি, অটোমান সাম্রাজ্য, রাশিয়া ও অন্যান্য পক্ষ বিভিন্ন জোট গঠন করে নিজেদের মধ্যে শান্তি ধরে রাখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বলকান অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা (বিশেষ করে বসনিয়া, সার্বিয়া ও হার্জেগোভিনায়) এসব চেষ্টাকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি হয়ে উঠেছিল। এমন পরিস্থিতিতে আর্চডিউক ফার্দিনান্দের হত্যাকাণ্ড বারুদের গুদামে স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে।

অনেক দেশের মতো অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সার্বীয় সরকারকে দায়ী করে এবং এ ঘটনাকে তারা সার্বীয় জাতীয়তাবাদের আন্দোলন চিরতরে মুছে দেওয়ার একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।

ফার্দিনান্দ হত্যার পর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এ আশঙ্কায় সার্বিয়া সরকার সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয়।

শক্তিশালী রুশ সাম্রাজ্যের সমর্থন যায় সার্বিয়ার দিকে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি তাকিয়ে ছিল জার্মানির দিকে। জার্মানি গোপনে তাদের সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা

২৮ জুলাই ১৯১৪, আর্চডিউক ফার্দিনান্দ হত্যাকাণ্ডের ঠিক এক মাস পর সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। এতে ইউরোপের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে শান্তি টিকিয়ে রাখার নাজুক চুক্তিগুলো দ্রুতই ভেঙে পড়ে।

এক সপ্তাহের মধ্যেই রাশিয়ার মিত্র বেলজিয়াম, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য যুদ্ধে সার্বিয়ার পক্ষ নেয়। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও জার্মানির বিরুদ্ধে তারা প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধ দ্রুত ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

রাশিয়া এ যুদ্ধে জড়ায় কারণ, দেশটির সঙ্গে সার্বিয়ার একটি জোট ছিল। জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, কারণ জার্মানির সঙ্গে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির জোট ছিল।

যুক্তরাজ্য জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কারণ, জার্মানি নিরপেক্ষ বেলজিয়ামে আক্রমণ করেছিল। আর যুক্তরাজ্য বেলজিয়াম ও ফ্রান্সকে রক্ষা করার চুক্তি করেছিল।

ফার্দিনান্দ হত্যাকাণ্ডের জেরেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল—সরলভাবে এমনটা বলা কঠিন; বরং সে সময়ে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের সম্রাটদের সাম্রাজ্য বিস্তারের লোভ এ যুদ্ধের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রেখেছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও রাশিয়া—সব দেশই ছিল সাম্রাজ্যবাদী। এদের প্রতিটিই বিশ্বের নানা প্রান্তে অনেক দেশ শাসন করত।

এসব শক্তি নিজেদের সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী রাখতে চাইত এবং অন্যরা নতুন ভূখণ্ডের দখল নেয় কি না, তা নিয়ে থাকত উদ্বিগ্ন। অন্যদের নতুন ভূখণ্ডের দখলকে তারা নিজেদের সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখত।

ধ্বংসের নেশা

১৯১৪ সালের গ্রীষ্মে যখন মিত্রশক্তি (যার নেতৃত্বে ছিল ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়া) এবং কেন্দ্রীয় শক্তির (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও অটোমান সাম্রাজ্য) মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, তখন অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করেছিল যে যুদ্ধ বড়দিনের (ক্রিসমাস) আগেই শেষ হয়ে যাবে। কেউ কল্পনাও করতে পারেননি, সামনে অপেক্ষা করছে মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞের দীর্ঘ এক পথ।

মেশিনগান, ভারী কামান, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহারে ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র পরিণত হয় এক ভয়ংকর নরকে।

যুদ্ধের প্রথম দিকে জার্মানি একের পর এক সাফল্য লাভ করতে থাকে। প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত জার্মান সেনাবাহিনী বেলজিয়াম ও উত্তর ফ্রান্স অতিক্রম করে দ্রুত অগ্রসর হয়। তবে ১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মিত্রশক্তির ‘প্রথম মার্নের যুদ্ধ’ জার্মানদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে সক্ষম হয়। ফ্রান্সের মার্নে নদীর তীরে এ যুদ্ধ হয়েছিল।

এই যুদ্ধ এক দীর্ঘ ও নিষ্ঠুর ধ্বংসাত্মক লড়াইয়ের মঞ্চ প্রস্তুত করে দেয়। পরের তিন বছর পশ্চিম ফ্রন্ট এক বিভীষিকাময় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। উভয় পক্ষ প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ভাঙার চেষ্টা করে বারবার, কিন্তু সামান্য অগ্রগতি হয়। ভারদাঁ (১৯১৬) ও সোম (১৯১৬)-এর মতো বড় বড় যুদ্ধে লক্ষাধিক সৈন্য নিহত বা আহত হন। অথচ ফ্রন্টলাইনের অবস্থানে খুব সামান্যই পরিবর্তন আসে।

যুদ্ধের সমাপ্তি, ক্ষয়ক্ষতি

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তাতে জড়িয়ে পড়ে ৩০টির বেশি দেশ। ইউরোপ ও রাশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে যুদ্ধের প্রভাবে তখন সারা বিশ্ব ধুঁকেছে। ১৯১৮ সালের নভেম্বরে হঠাৎ করেই বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। কারণ, একের পর এক যুদ্ধক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় শক্তির পতন। ৩ নভেম্বর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি মিত্রশক্তির সঙ্গে অস্ত্রবিরতিতে স্বাক্ষর করে, আর ১১ নভেম্বর আত্মসমর্পণ করে জার্মানি।

অস্ত্রবিরতির শর্তগুলো ছিল কঠোর। মিত্রশক্তির ইচ্ছা ছিল জার্মানি যেন আর কখনো শান্তির জন্য হুমকি হতে না পারে। দখল করা সব অঞ্চল থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে, নৌবহর হস্তান্তর করতে, মিত্রশক্তিকে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে জার্মানিকে বাধ্য করা হয়েছিল। এ অস্ত্রবিরতি পরে ভার্সাই চুক্তির ভিত্তি তৈরি করে; যা ইউরোপের নতুন সীমানা নির্ধারণ এবং জার্মানির ওপর আরও কঠোর শাস্তিমূলক শর্ত আরোপ করেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৯০ লাখের বেশি সৈনিক প্রাণ হারান। ২ কোটি ১০ লাখ সৈনিক আহত হন। বেসামরিক প্রাণহানির সংখ্যাও ছিল বেশি, প্রায় ১ কোটি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল জার্মানি ও ফ্রান্স। দুই দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী পুরুষ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে খরচ হয়েছিল ৩ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার।

এ বিশ্বযুদ্ধকে ঘিরে যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, তা চারটি প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ সাম্রাজ্যের পতন ডেকে আনে। সেগুলো হলো: জার্মান, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়, রুশ ও তুর্কি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সমাপ্তির পর ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন বিজয়ী দেশের প্রধানেরা। তবে ‘ন্যায়ভিত্তিক শান্তির’ কথা বলা হলেও বাস্তবে এ চুক্তি ছিল প্রতিশোধপরায়ণ, অসম ও অপূর্ণাঙ্গ।

পরাজিতদের বাদ দিয়ে চুক্তি রচনার ফলে জার্মানি ও রাশিয়ায় জন্ম নেয় চরম অসন্তোষ। এটি পরে নাৎসিবাদের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ সুগম করে।

অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধের ক্ষত ও চরমপন্থার বিস্তার দেখিয়ে দেয়—শান্তির জন্য শুধু বিজয় নয়, চাই যৌথ অংশগ্রহণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমঝোতা। ইতিহাসবিদদের মতে, যদি ভার্সাই চুক্তি আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও ঐক্যমুখী হতো, তবে বিশ শতকের ইতিহাস হয়তো একেবারে ভিন্ন রূপ পেত।

{তথ্যসূত্র: বিবিসি, হিস্ট্রি ডটকম, হিস্ট্রি টুলস}

অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ
অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ। ছবি: মেরি ইভান্স পিকচার লাইব্রেরি

Wednesday, May 27, 2026

বার্লিনের মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখেন শহরের মাঝখানে উঁচু প্রাচীর by মেহেদি হাসান

১৯৬১ সালের ১৩ আগস্ট। পূর্ব জার্মানির মানুষ গভীর ঘুমে। কিন্তু একদল মানুষ নির্ঘুম। তাঁরা কাঁটাতার দিয়ে প্রাচীর নির্মাণের কাজে ব্যস্ত, যে প্রাচীর পূর্ব জার্মানিকে পশ্চিম জার্মানি থেকে আলাদা করে দেয়। অসংখ্য পরিবারের সদস্যদের মুখ–দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। প্রাণের বন্ধুকে চিরতরে হারাতে হয়। প্রায় ২৮ বছর পর ভাঙা হয় বার্লিন প্রাচীর। আবারও একত্র হন দুই জার্মানির মানুষ।

বার্লিন প্রাচীর কেন নির্মাণ করা হয়েছিল

১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে জার্মানি। মিত্রশক্তির মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়ন।

যুদ্ধ শেষে মিত্রশক্তির দেশগুলো জার্মানিকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিটি দেশ জার্মানির একটি করে অঞ্চলের দায়িত্ব নেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স নেয় পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ, আর পূর্বাঞ্চল দখলে রাখে সোভিয়েত ইউনিয়ন।

জার্মানির রাজধানী বার্লিনের অংশ পড়ে পূর্বাঞ্চলে। তাই শহরটিকে চারটি অংশে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি দেশ বার্লিনের একটি করে অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পশ্চিম বার্লিন চলে যায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের হাতে আর পূর্ব বার্লিনের নিয়ন্ত্রণ নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।

১৯৪৯ সালের মধ্যে জার্মানি দুটি আলাদা দেশে ভাগ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের দখলে থাকা অংশের নামকরণ করা হয় ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি (পশ্চিম জার্মানি)। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে থাকা অংশের নাম হয় জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক (পূর্ব জার্মানি)।

জার্মানি ভাগ হওয়ার পরপরই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ধারণা ছিল সমাজতন্ত্র, যা মিত্রশক্তি বা পশ্চিমা দেশগুলোর ধারণা থেকে একদমই আলাদা।

পশ্চিম জার্মানির শাসনব্যবস্থা ছিল অনেকটা এখনকার যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো। সেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারতেন, নিজের পছন্দমতো গান শুনতেন এবং স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারতেন।

অন্যদিকে পূর্ব জার্মানি কঠোরভাবে শাসন করা হতো। মানুষ কীভাবে আচরণ করবেন, তা নিয়ে ছিল কঠিন নিয়মকানুন। প্রতিটি কাজের ওপর পুলিশের কড়া নজরদারি ছিল।

জার্মানি ভাগের পর প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিমে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে শেষমেষ পশ্চিম বার্লিন ঘিরে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। নাম দেওয়া হয় বার্লিন প্রাচীর।

বার্লিন প্রাচীর যেভাবে তৈরি হলো

তৎকালীন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ ১৯৬১ সালে পূর্ব জার্মানি থেকে মানুষের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মাঝখানে একটি প্রাচীর নির্মাণের আদেশ দেন। তাঁর আদেশ অনুযায়ী ১৯৬১ সালের ১৩ আগস্ট রাতের আঁধারে তৈরি করা হয় প্রাচীর।

প্রাচীরটি এত অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল যে সাধারণ মানুষ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। অনেকে ঘুম থেকে উঠে দেখেন তাঁরা এক পাশে আটকা পড়েছেন। পশ্চিমে থাকা বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। প্রথমে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বার্লিন শহরকে ভাগ করা হয়েছিল।

এরপর ধীরে ধীরে অসংখ্য শক্তিশালী প্রাচীর তৈরি করা হয়। সঙ্গে বসানো হয় কড়া পাহারা ও টহল, যাতে কেউ এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে না পারে।

বার্লিন প্রাচীর কত বড় ছিল

বার্লিন প্রাচীরের দৈর্ঘ্য ছিল ১৫৫ কিলোমিটার (৯৬ মাইল)। উচ্চতা ৪ মিটার বা ১৩ ফুট। ১৯৮৯ সালে ভেঙে ফেলা পর্যন্ত প্রাচীরে ৩০২টি ওয়াচ টাওয়ার (নজরদারি টাওয়ার) ছিল।

দুটি সমান্তরাল দেয়ালের সমন্বয়ে প্রাচীরটি তৈরি করা হয়। দুটি দেয়ালের মাঝখানে একটি ফাঁকা অংশ রাখা হয়। এই অংশে সৈন্য মোতায়েন করা হতো। শুধু তা–ই নয়, কেউ যাতে লুকিয়ে সীমান্ত পার না হতে পারেন, সে জন্য মাইন পুঁতে রাখা হতো।

দ্রুতই এই প্রাচীর ইউরোপের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের বিভেদের প্রতীক হয়ে ওঠে। ‘আয়রন কার্টেন’ বা লোহার পর্দা নামে পরিচিতি পায়।

সোভিয়েত নেতারা বার্লিন প্রাচীরকে বলতেন সুরক্ষার আবরণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কাছে এটি ছিল একধরনের কারাগার, যে কারাগার থেকে পূর্ব জার্মানির মানুষকে বের হতে বাধা দেওয়া হতো।

বার্লিন প্রাচীর থাকার সময় জীবন যেমন ছিল

পূর্ব জার্মানি থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ বার্লিন প্রাচীর টপকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রাচীর টপকানো ছিল অত্যন্ত কঠিন ও খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৬১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ২৮ বছরে এই পথে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে শতাধিক মানুষ নিহত হন।

পূর্ব বার্লিনে মানুষের জীবনযাত্রা ছিল কঠিন। কর্তৃপক্ষ তাঁদের প্রতিটি কাজ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। জীবনযাপনের নিয়মও ছিল অত্যন্ত কঠোর। এ ধরনের নানা কারণে যাঁরা আগে পশ্চিম বার্লিনে কাজ করতেন, তাঁরা চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন।

কড়াকড়ি ও কঠোর বিধিনিষেধের কারণে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানিতে থাকা পরিবারগুলো বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ১৯৮৯ সালে প্রাচীর ভাঙার আগপর্যন্ত অনেকের মধ্যে আর দেখা করার সুযোগ হয়নি।

বার্লিন প্রাচীরের পরিণতি

১৯৮০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপের অনেকে দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। পূর্ব ইউরোপের মানুষেরা আরও বেশি স্বাধীনতা চাইছিলেন। তাঁরা যেখানে খুশি সেখানে যাওয়ার অধিকার চান। এ ছাড়া নিজের পছন্দের গান শোনা এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার চান, যা সোভিয়েত শাসনে সম্ভব ছিল না। একপর্যায়ে দেশ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতির দাবি জোরালো হতে থাকে।

পূর্ব জার্মানি থেকে শত শত মানুষ হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভাকিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশের মাধ্যমে পালিয়ে যেতে থাকেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে পূর্ব বার্লিন সরকারের পক্ষে পশ্চিম জার্মানিতে প্রবেশের দাবি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।

অবশেষে ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদিন পূর্ব জার্মানির নেতা টেলিভিশনে একটি ভাষণ দেন। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সীমান্ত খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর পূর্ব জার্মানি থেকে হাজার হাজার মানুষ বার্লিন প্রাচীরের কাছে জড়ো হন। তাঁরা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের ফটক খুলে দিতে বলেন।

বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে পিছু হটেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। এরপর হাজার হাজার মানুষ পশ্চিম জার্মানিতে প্রবেশ করেন।

বার্লিন প্রাচীর পতন

সেদিন বার্লিন প্রাচীরের পশ্চিম পাশের মানুষ পূর্ব জার্মানির মানুষের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এত বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে সঙ্গে সঙ্গেই উৎসব শুরু হয়ে যায়। কেউ কেউ প্রাচীরের ওপর ওঠে নাচতে থাকেন।

বার্লিন প্রাচীরের পতন হয় ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর। তবে ওই দিন পুরো প্রাচীর একবারে ধ্বংস করা হয়নি।

এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে অসংখ্য হাতুড়ি দিয়ে প্রাচীর ভাঙতে থাকেন মানুষ। তাঁরা প্রাচীরের টুকরাগুলো রেখে দেন। কারণ, প্রাচীরের টুকরাগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। জার্মান সরকার শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালে প্রাচীরটি ধ্বংস করে। তবে দর্শনার্থীদের পরিদর্শনের জন্য প্রাচীরের অনেক অংশ এখনো অবশিষ্ট হয়েছে।

এরপর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বার্লিন প্রাচীর পতনের ১১ মাস পর ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে মিলিত হয়ে আজকের পরিচিত জার্মানি রাষ্ট্র গড়ে তোলে।

তথ্যসূত্র;
১. বার্লিন ওয়াল ফাউন্ডেশন,
২. বিবিসি,
৩. ডয়চে ভেলে,

বার্লিন প্রাচীর তৈরির কাজে ব্যস্ত একজন শ্রমিক
বার্লিন প্রাচীর তৈরির কাজে ব্যস্ত একজন শ্রমিক। ফাইল ছবি: এপি

Thursday, May 21, 2026

’৭০–এর সাইক্লোনের ভয়াবহতা কেন আমরা ভুলে গেলাম by এম আমিরুল হক পারভেজ চৌধুরী

‘মেঘ থম থম করে কেউ নেই নেই; জল থই থই তীরে কিছু নেই নেই; ভাঙনের যে নেই পারাপার; তুমি আমি সব একাকার; মেঘ থম থম করে কেউ নেই নেই।’

১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সীমানা পেরিয়ে’ নামক বাংলাদেশি একটি চলচ্চিত্রে গাওয়া ভূপেন হাজারিকার গানের অংশবিশেষ। চলচ্চিত্রটি একই বছরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতাসহ মোট চারটি বিভাগে এবং দুটি বিভাগে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেছিল। এ ছাড়া ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থানও লাভ করেছিল ছবিটি।

১৯৭০-এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের ধ্বংসলীলার প্রায় তিন মাস পর একজোড়া মানব-মানবীকে বরিশালের দক্ষিণের একটি সামুদ্রিক চরে আদিম পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকতে দেখা গিয়েছিল; তৎকালীন ঢাকার সংবাদপত্রে এমন খবর প্রকাশিত হয়।

চরে একজোড়া নারী-পুরুষের বেঁচে থাকা ও বসবাসের বিষয়টি পরিচালক আলমগীর কবিরের দৃষ্টিতে সবার থেকে আলাদা মনে হয়। সেই থেকে তিনি এ ঘটনাটি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করার কথা ভাবেন এবং ১৯৭৫ সালে তিনি এটির নির্মাণকাজ শুরু করেন।

আজ চলচ্চিত্রটি একটি ইতিহাস। এই ইতিহাসের পেছনে রয়েছে নির্মম আরেক ইতিহাস। সেটি ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর, শুক্রবার। উপকূলের জীবন ইতিহাসের এক ভয়াবহ কালরাত। এদিন প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সাগর, নদী, খাল-বিলে ভেসে ছিল অসংখ্য লাশ আর এক কোটি মৃত গবাদিপশু। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখো মানুষ। উপকূলীয় দ্বীপচরসহ বহু এলাকার ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে বিরান জনপদে পরিণত হয়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়বিধ্বস্ত মনপুরা ঘুরে ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাবকে ২৮ ফুট লম্বা ‘মনপুরা ৭০’ নামে একটি শিল্পকর্ম চিত্রিত করেন। জয়নুল আবেদিন বলেন, ‘মনপুরায় আমরা যখন থার্ড ডেতে নামলাম, সি-প্লেনে আমি আর আমার বন্ধু একা ঘুরতাছি সারা দিন। কয়টা লোক বাঁইচা আছে দেখলাম। দৌড়ায় আসল। দেখলাম জখমওয়ালা। তারা কানতে আরম্ভ করল। আমরাও কানতে আরম্ভ করলাম। আপনারা বিশ্বাস করেন, আমার পেছনে...সমুদ্র...ঠিক সমুদ্র না সমুদ্রের খাঁড়ি, যেখানে যান, খালি গরু-মানুষ শুইয়া রইছে।’

সাগর-নদী-খাল-বিলে ভেসে ছিল অসংখ্য মৃতদেহ। এসব মৃতদেহের সৎকার করাও সম্ভব হয়নি। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখো মানুষ। এই ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতার কথা শুনলে আজও অনেকে শিউরে ওঠেন। প্রবীণেরা বর্ণনা দিতে গিয়ে জয়নুল আবেদিনের মতো হু হু করে কেঁদে ওঠেন। এ রকম হাজারো মর্মস্পর্শী ইতিহাস রয়েছে উপকূলের এ প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ঘিরে। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এই ঘূর্ণিঝড়কে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

উপকূলে যে ভয়াবহতা হয়েছে, তা এই প্রজন্মের মানুষ জানে না। এই দিন দিবস হিসেবে পালন করলে হয়তো এ প্রজন্মের মানুষ মনে রাখত। প্রাথমিকভাবে উপকূল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’-এর দাবি ওঠে। আমরা চাই একটি দিবস, যার নাম হবে ‘উপকূল দিবস’। বাংলাদেশে ‘উপকূল দিবস’ শুরু হলে বিশ্বে প্রথমবারের মতো এ ধরনের একটি দিবস পালন করা হবে। বর্তমান সময়; আগামী দিনের ইতিহাস। আর বিশেষ কোনো ‘দিবস’ মানেই যার মাধ্যমে প্রতিবছর আগের ইতিহাসকে স্মরণ করা। তেমনি একটি দিবস হোক ‘উপকূল দিবস’।

উপকূল দিবসের প্রাসঙ্গিকতাই–বা কেন? দেশের ৭১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঝড়ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক জনপদের নামই ‘উপকূল’। উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯টি জেলা ও ১৪৭টি উপজেলায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ বৈরী প্রতিকূলতা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে ফেরে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বাস করে উপকূলীয় অঞ্চলে। তাদের জীবন-জীবিকা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে মাছ, কৃষি, বন, স্থানীয় পরিবহন, লবণ ইত্যাদির ওপর। বন্যা, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা) আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। খাদ্যচাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশই বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে দেশে; যার সিংহভাগই উপকূলে। জাতীয় অর্থনীতিতে উপকূল জিডিপির কমবেশি প্রায় ২৫ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সমুদ্রের মৎস্য সেক্টর পুরোপুরি উপকূলকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের কলকারখানার পাশাপাশি উপকূলের মৎস্য সেক্টর এবং উপকূলের জনশক্তি দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে।

গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে উপকূলীয় অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষদের ভূমিকাও কম নয়। আর এসব খেটে খাওয়া মানুষদের কথা বিবেচনা করে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত। সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা, এনজিও, গণমাধ্যমসহ সবাই উপকূলের জন্য একটি দিবস প্রত্যাশা করবেন নিশ্চয়ই। উপকূলের সংকট, সমস্যা, সম্ভাবনা ও জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা উপকূলের মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি আদায়ে উপকূলের জন্য একটি বিশেষ দিন অপরিহার্য। ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’ ও ‘বিশ্ব উপকূল দিবস’ দাবি প্রতিষ্ঠিত হলে আরও একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হব আমরা। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ’৭০-এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

ভূপেন হাজারিকার ‘দূরের আর্তনাদের নদীর, ক্রন্দন কোনো ঘাটের, ভ্রুক্ষেপ নেই, পেয়েছি আমি, আলিঙ্গনের সাগর। সেই সাগরের স্রোতেই আছে, নিশ্বাসেরই ছোঁয়া, আছে ভালোবাসা, আদর।’ উপকূলের অবস্থা ঠিক তা–ই। সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। ’৭০-এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় স্রোতের নিশ্বাসের ছোঁয়া, ভালোবাসা ও আদর যুগ যুগ ধরে অবহেলিত। গত ২০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই প্রভাব মোকাবিলা না করা হলে, জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ুর ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে। ৫৬ বছর পর এই দিনটিকেই ‘উপকূল দিবস’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন সূচনা হোক।

* এম আমিরুল হক পারভেজ চৌধুরী, উপকূল গবেষক এবং চেয়ারম্যান, উপকূল ফাউন্ডেশন। ই-মেইল: ahcparvezdu@gmail.com

ভোলা সাইক্লোন, ১৯৭০
ভোলা সাইক্লোন, ১৯৭০ ফাইল ছবি

Tuesday, May 12, 2026

বেলজিয়ামের লুভেন যেন প্রাচীন এক রূপকথার শহর by খলিলউল্লাহ্‌

প্রকৃতির আলিঙ্গনে আবিষ্ট প্রাচীন, তবে আধুনিক এক শহর লুভেন। শহরটি পৃথিবীর অন্যতম গোথিক টাউন হল, ক্যাথেড্রাল আর প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘেরা। গ্রুট বেজিনহজের ছোট ছোট ভবনের মধ্য দিয়ে পথ, যেন অলৌকিক কোনো পুরোনো পরিত্যক্ত শহরের রূপকথার ছবি। তা ছাড়া পুরো শহরটাই যেন এক গা–ছাড়া ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রীষ্মকাল হওয়ায় কিছু পর্যটক আছেন, তবে কারও যেন কোনো তাড়া নেই।

এমন এক শহরে যাওয়ার দিন পড়েছে ভয়াবহ গরম। বেলজিয়ামের আবহাওয়ায় এটা বেশ গরম। এ দেশে সাধারণত গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা থাকে ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। খুব বেশি হলে সেটা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। উত্তর সাগরের প্রভাবে দেশটির দক্ষিণ দিকে তাপমাত্রা থাকে আরও কম। কিন্তু সেদিন তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে!

গায়ে রোদ মাখিয়ে খরতাপেই হেঁটে ঘুরে বেড়ালাম লুভেন ও এর চারপাশে। এত গরমেও অনীহা কাজ করছিল না। মাঝেমধ্যেই তাপের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম। কিন্তু থামতে ইচ্ছে করছিল না।

শহরের পাশেই এক মায়াময় জঙ্গল, যেন চাইলেই হারিয়ে যাওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ। গরম থেকে বাঁচারও একটা উপায়। আমার মতো প্রথমবার এই জঙ্গলে ঢুকলে যথারীতি এক গা ছমছমে ভাব হবে, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার অবারিত সুযোগও পাওয়া যাবে।

বনের ভেতর গিয়ে দেখা পেলাম লুভেনের সুখ-দুঃখের নদী ডাইলির। এই নদী জন্মলগ্ন থেকেই লুভেন শহরকে বন্যা দিয়ে কাঁদিয়েছে। তবে শহরের উন্নয়নে অবদানও রেখেছে অনেক। বনের ভেতর নদীর ধারে সুবিশাল সারি সারি গাছ, এলোমেলো দাঁড়িয়ে। তার নিচে একটা বসার বেঞ্চ। সেখানে বসেই লুভেনের গল্প বলতে এই লেখা লিখতে বসে গেলাম।

প্রাচীন ইতিহাস, আধুনিক জীবন ও প্রকৃতির শহর

লুভেন বেলজিয়ামের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ফ্ল্যান্ডার্স অঞ্চলের একটি শহর। এটি লেউভেন নামেও পরিচিত। ব্রাসেলস থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এই শহর যেন প্রাচীন ইতিহাস আর আধুনিক জীবনের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। এক লাখের বেশি মানুষের এই শহর একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান, একটি প্রাণবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র এবং সংস্কৃতির মিলনস্থল।

লুভেনের গল্প শুরু হয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। এর শত বছর পর প্রতিষ্ঠিত হয় লুভেন ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় (কেইউ লুভেন)। এটি শুধু বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেই অন্যতম নয়, ইউরোপের অন্যতম সম্মানজনক বিদ্যাপীঠও বটে।

১৪২৫ সাল থেকে এই শহর অবিচ্ছিন্নভাবে এক বিশ্ববিদ্যালয় নগরী হিসেবে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। ইউরোপের ভাটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত আধুনিক বেনেলাক্স দেশগুলো, অর্থাৎ বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে লুভেনই সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় শহর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ই লুভেন শহরকে জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।

২০২৫ সালে লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০০ বছর পূর্তি হয়েছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন ১৯২০ সালে, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০০ বছর পর। অন্যদিকে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সময়ে ১৯২১ সালে, অর্থাৎ জন্মলগ্নেই প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হন কমরেড লীলা নাগ।

ঢাকার আরমানীটোলা বালিকা বিদ্যালয়, কামরুন্নেছা গার্লস হাইস্কুল এবং শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এই নারী ১৯২৬ সালে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনীতিচর্চা শুরু করতে ‘দীপালী ছাত্রী সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকের নেত্রী লীলা নাগ বিয়ে করেছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম বিখ্যাত বিপ্লবী অনিল রায়কে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন সহশিক্ষার পরিবেশ ছিল না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য পিজে হার্টগ লীলা নাগের মেধা ও পড়াশোনার প্রতি একাগ্রতা বিচারে বিশেষ অনুমতি দিয়েছিলেন।

বেলজিয়ামের অন্যতম সুন্দর ভবন

মধ্যযুগে লুভেন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও বস্ত্রশিল্পকেন্দ্র। লুইন নামের একধরনের লিনেন কাপড়ের নামকরণ হয়েছে এই শহরের নাম অনুযায়ী। ফলে লুভেন হয়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ নগরী। শহরের স্থাপত্যে আজও সেই সমৃদ্ধির ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শন হলো, লুভেনের টাউন হল এবং সেন্ট পিটার্স চার্চ।

টাউন হলের জটিল নকশা ও অসাধারণ ভাস্কর্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। ১৪৩৯ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে শেষ হয়েছিল ১৪৬৯ সালে। এই অনবদ্য গথিক শৈলীর ভবনে ২৩৬টি ভাস্কর্য আছে। তবে ভাস্কর্যগুলো ১৮৫০ সালের পর যুক্ত করা হয়। টাউন হলকে বেলজিয়ামের অন্যতম সুন্দর ভবন হিসেবে গণ্য করা হয়।

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস থেকে ট্রেনে চেপে একা রওনা দিয়েছিলাম লুভেনের পথে। স্টেশনে নেমে এই টাউন হলের উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগলাম। প্রচণ্ড গরম পড়ায় রোদে বেশিক্ষণ হাঁটা যাচ্ছিল না। পথে একটা ক্যাফেতে বসে কিছু খাব বলে অর্ডার করতে বসলাম। কিন্তু যে তরুণী খাবারের অর্ডার নিতে এসেছিলেন, ভাষাগত জটিলতায় তিনি ও আমি দুজনই বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম। ফরাসি ভাষার লেখা টুকটাক বুঝি, কিন্তু দ্রুত কেউ বলা শুরু করলে আমার দফারফা। এর বাইরে আমার উপায় ছিল ডাচ্‌ বলা। কিন্তু সেটা আমার আসে না। আর ইংরেজিটা সেই তরুণীর পোষাচ্ছিল না।

অগত্যা সেই তরুণী আমাকে ক্যাফের ভেতর নিয়ে গেলেন স্বচক্ষে খাবার দেখাতে। ইউরোপের ছোট শহরে এই সুবিধা আছে। রাজধানী বা বড় শহরের চেয়ে তুলনামূলক ছোট শহরে ঘোড়দৌড় কম। সেই সুবাদেই ওয়েটার তরুণীর হাতে ব্যয় করার মতো এতটা সময় ছিল, বোঝা যায়।

যাহোক, সেই ক্যাফে থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম টাউন হলের সামনে। চত্বরটাজুড়েই রয়েছে টাউন হল, ক্যাথেড্রাল, চার্চ, বেশ কিছু ক্যাফে আর খাবারের দোকান। গ্রোট মার্ক হিসেবে পরিচিত এই জায়গা শহরের প্রাণকেন্দ্র। সব সময় ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও বারে পরিপূর্ণ থাকে। পাশেই লুভেন ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবন।

আজও শিক্ষাগত ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত লুভেন। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এই শহরে আসেন। তাঁদের তারুণ্যের স্পন্দনে শহরটি সব সময় মুখর থাকে। শহরের পাশে বনের মনোরম পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অনুষদ ও গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রকৃতির মাঝখানে জ্ঞানচর্চার এক বিরল সুযোগ করে দিয়েছে।

বেলজিয়ামের অন্যান্য শহরের মতো এখানেও রয়েছে বাইসাইকেলের চমৎকার সংস্কৃতি। হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে গেলাম ‘বিগ ব্যাং বাইসাইকেল রুট’। আধুনিক বিগ ব্যাং তত্ত্ব দিয়ে বিখ্যাত হওয়া জর্জ লোমাট্রা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, পড়িয়েছেন। ১৮৯৪ সালে বেলজিয়ামের শারলেরই শহরে জন্ম নেওয়া এই ক্যাথলিক পাদরি একাধারে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও গণিতবিদ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর স্মরণেই বাইসাইকেলের জন্য এই পথ তৈরি করা হয়েছে, যা লোমাট্রার দুটো ভাস্কর্য্যের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করেছে।

দ্য বেলজিয়ান শিন্ডলার

১৯২৯ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন পড়তে এসেছিলেন কিয়ান ঝাইয়োলিং নামের এক চীনা নারী। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা সুন্দর মানবিক ও সাহসী গল্প। ১৯১৩ সালে চীনের জিয়াংসু প্রদেশে জন্ম নেওয়া এই নারী ‘বেলজিয়ান শিন্ডলার’ নামে পরিচিত। জার্মান শিল্পপতি অস্কার শিন্ডলার নিজে জার্মান নাৎসি দলের নেতা হয়েও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হলোকাস্ট থেকে ১ হাজার ২০০ ইহুদি ধর্মাবলম্বীকে নিজের কারখানায় কাজ দিয়ে তাঁদের জীবন রক্ষা করেছিলেন। ইহুদিদের জীবন বাঁচানোর জন্য তাঁকে নাৎসি দলের লোকদের ঘুষ ও নানা রকম আর্থিক প্রণোদনা দিতে হতো। ১৯৯৩ সালে তাঁর এই মহৎ প্রচেষ্টার গল্প নিয়ে তৈরি হওয়া স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ অস্কারে সেরা সিনেমার পুরস্কারসহ মোট ৭টি পুরস্কার জিতেছিল।

একইভাবে চীনা এই নারী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বহু বেলজিয়ান নাগরিকের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালে বেলজিয়ান এক চিকিৎসককে বিয়ে করে তাঁরা হেরবুমো নামক শহরে স্থায়ী হন। ১৯৪০ সালে বেলজিয়ামের এক তরুণ রেললাইনের নিচে মাইন পুঁতে জার্মানির একটি সামরিক রেলগাড়ি উড়িয়ে দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সে বছর জুন মাসে জার্মান বাহিনী হেরবুমো শহর দখল করে এবং সেই তরুণকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিয়ান ঝাইয়োলিং সেই তরুণকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন।

তখন জার্মান জেনারেল ছিলেন আলেক্সান্ডার ভন ফলকেনহজেন। কিয়ান এই জেনারেলকে চিনতেন; কারণ, চীনে থাকাকালীন তিনি চীনা-জার্মান সহযোগিতার অংশ হিসেবে কাজ করেছেন। আর তখন ফলকেনহজেন ছিলেন চীনা জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাইশেকের উপদেষ্টা। সে হিসেবে কিয়ানের এক ভাইয়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন ফলকেনহজেন। আর সেই সুবাদে কিয়ান মানবতার খাতিরে সেই তরুণকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করে সফল হন।

কিন্তু কিছুদিন পর পাশের আরেক শহরে নাৎসি জার্মানির গোপন পুলিশ বাহিনী গেস্টাপোর তিন সদস্যকে হত্যার দায়ে ৯৭ জন বেলজিয়ানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় জার্মান বাহিনী। কিয়ানের পেটে তখন তাঁর প্রথম সন্তান। সে অবস্থায় তিনি আবারও ফলকেনহজনের কাছে গিয়ে ৯৭ জনের জীবন বাঁচাতে অনুরোধ করেন। শুরুতে রাজি না হলেও জার্মান এই জেনারেলকে শেষমেশ রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন কিয়ান। তবে কিয়ান ঝাইয়োলিংয়ের এই ঘটনা বেশির ভাগ মানুষেরই জানা ছিল না। ২০২১ সালে চীন-বেলজিয়াম কূটনৈতিক সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে ঝু ফেঙ এই সাহসী নারীকে নিয়ে প্রথম কোনো বই প্রকাশ করেছেন। বইয়ের শিরোনাম হলো ‘ফরগেট মি: মাদাম কিয়ান ঝাইয়োলিং-দ্য বেলজিয়ান শিন্ডলার’।

বিখ্যাত দারদেনে ব্রাদার্সও লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। সিনেমায়ও তাঁরা প্রায়ই এই শহরকে তুলে ধরেছেন।

বর্তমানে ইউরোপে পড়াশোনা করতে যাওয়ার জন্য ইরাসমাস মুন্ডাস বৃত্তি খুব পরিচিত। এই বৃত্তির নামকরণ হয়েছে যে পণ্ডিতের নামে, তিনি দেসিদেরিয়াস ইরাসমাস। রেনেসাঁর কালে ১৪৬৬ সালে জন্ম নেওয়া ডাচ্‌ এই মানবতাবাদী পণ্ডিত ছিলেন লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একই সঙ্গে আধুনিক হিউম্যান অ্যানাটমির জনক আন্দ্রিয়াস ভেসালিয়াসও এখানে শিক্ষকতা করেছেন।

অন্যদিকে, শিক্ষার পাশাপাশি লুভেনের রয়েছে একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক জীবন। এখানে রয়েছে বেশ কিছু জাদুঘর, গ্যালারি ও থিয়েটার। সারা বছর নানা উৎসব ও ইভেন্ট স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে।

লুভেনের অন্যতম আকর্ষণ হলো গ্রোট বেজিনার্ড, যা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মধ্যে একটি। এটি মধ্যযুগীয় ‘বেজিন’ অর্থাৎ ধর্মপ্রাণ নারীদের বাসস্থান ছিল, যাঁরা সন্ন্যাসি না হয়েও সম্মিলিত জীবন যাপন করতেন। সুসংরক্ষিত ঐতিহাসিক ভবন ও সরু রাস্তার এই এলাকায় রয়েছে সুনসান উঠান। এখানকার রাস্তায় হাঁটলে মনে হয় যেন কোনো প্রাচীন নগরীতে হারিয়ে গেছি। সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, যা ছবি বা ভিডিওতে তেমন বোঝা যায় না।

সুখ-দুঃখের নদী ডাইলি

লুভেন শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ডাইলি নদী। অতীতে এটি লুভেনের বাণিজ্য ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল। মধ্যযুগে লুভেন যখন বস্ত্রশিল্পের কেন্দ্র ছিল, তখন এই নদীর পানিই কলকারখানার চালিকা শক্তি ছিল। নদীপথেই পণ্য পরিবহন করা হতো। শহরের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দারুণ ভূমিকা রেখেছে এই নদী।

লুভেনের পুরোনো এলাকাগুলোয় ডাইলি নদীর উপস্থিতি শহরের স্থাপত্য ও বিন্যাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। নদীর বাঁকে বাঁকে গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক ভবন। ফলে এই শহর পেয়েছে এক অনন্য চরিত্র।

ঐতিহাসিকভাবে ডাইলি নদীর কারণে লুভেন বারবার বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। তবে লুভেনে গিয়ে দেখলাম, শহর কর্তৃপক্ষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের দেশে শহরের পাশ দিয়ে নদী গেলেই সেটাকে চিপে মেরে ফেলার প্রতিযোগিতা চলে।

যথেচ্ছার দখলের শিকার হওয়া আর ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় হওয়াই যেন আমাদের দেশে শহরের পাশে বয়ে চলা নদীর ‘নিয়তি’। কিন্তু ডাইলি নদীর ক্ষেত্রে দেখলাম ভিন্ন চিত্র। কিছু স্থানে নদীর ওপর নির্মিত পুরোনো কাঠামো ভেঙে নদীকে উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে বন্যার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নদীর আশপাশে মনোরম জনপরিসর তৈরি হয়েছে।

ডাইলি নদী বেলজিয়ামের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। এটি মেখেলেনের কাছে রুপেল নদীর সঙ্গে মিশেছে, যা আবার শ্কেলদে নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে উত্তর সাগরে পতিত হয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, ঐতিহাসিক দলিলপত্রে লুভেনের নাম যখন প্রথম পাওয়া যায়, তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এই নদী। খ্রিষ্টাব্দ ৮৮০-এর দশকে ভাইকিংরা এই নদীর পথ ধরেই লুভেনে ক্যাম্প স্থাপন করে। ধারণা করা হয়, সেই ক্যাম্প স্থাপনই লুভেন শহরের গোড়াপত্তন করেছিল, যদিও শহরটি নগরের মর্যাদা পেয়েছিল বারো শতকে একটি পাথরের দেয়াল নির্মাণের মধ্য দিয়ে। ৮৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভাইকিংদের সঙ্গে পূর্ব ফ্রাঙ্কিয়ার সেই যুদ্ধ ‘ডাইলি নদীর যুদ্ধ’ নামেই পরিচিত।

এই নদীর পাড়ে দীর্ঘক্ষণ বসে এই লেখার খসড়া লিখে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। কিছুদূর হেঁটে পাওয়া গেল অ্যারেনবার্গ দুর্গ। ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে পিকার্ড (ফরাসি) বংশোদ্ভূত ক্রয়স পরিবার এই দুর্গ নির্মাণ করতে শুরু করে। চমৎকার এই দুর্গ তৈরি হয়েছিল গথিক ও রেনেসাঁ পদ্ধতির নির্মাণশৈলীর মিশেলে। কিন্তু বৈবাহিক সূত্রে এই দুর্গের মালিকানা চলে যায় অ্যারেনবার্গ পরিবারের কাছে। এই পরিবার ছিল জার্মান বংশোদ্ভূত। আর তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানিসহ অক্ষশক্তির পরাজয় ঘটলে এই দুর্গ বাজেয়াপ্ত করা হয়। তখন অ্যারেনবার্গ পরিবারের কাছ থেকে মালিকানা চলে যায় লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে।

সেই দুর্গের উল্টো পথ ধরে মূল রাস্তা দিয়ে শহরে চলে এলাম। গথিক নকশার সেই টাউন হলের সিঁড়িতে বসে হালকা নাশতা সেরে ব্রাসেলসের উদ্দেশ্যে সেই লুভেন স্টেশনের দিকে দৌড় দিলাম, যেখানে নেমেই পেয়েছিলাম এমন মনোমুগ্ধকর এক শহর। 

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-11%2Fkmiago5u%2FWhatsApp-Image-2025-08-10-at-10.15.52-PM-1.jpeg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
লুভেন স্টেশন থেকে নেমে টাউনহলে যাওয়ার রাস্তা। ছবি: খলিলউল্লাহ্‌