Friday, June 19, 2026

লেবাননে হামলা নিয়ে ইসরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি ভ্যান্সের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা ইরান চুক্তি (সমঝোতা স্মারক) মেনে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।

একই সঙ্গে জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দিয়েছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রই তাদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র হিসেবে অবশিষ্ট আছে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক ব্রিফিংয়ের শেষভাগে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার একমাত্র যে শক্তিশালী মিত্রটি টিকে আছে, অন্তত তাকে আক্রমণ করতাম না।’

প্রায় চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক যে কতটা তিক্ত হয়ে উঠেছে, ভ্যান্সের এই মন্তব্য তারই সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য প্রমাণ।

ভ্যান্স তাঁর ব্রিফিংয়ের বেশির ভাগ সময়জুড়ে ইরানের সঙ্গে করা চুক্তির পক্ষে সাফাই গান। এ চুক্তিতে ইসরায়েল সরাসরি কোনো পক্ষ ছিল না। তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে হবে।

চুক্তির বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দেশটির অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে যুক্তরাষ্ট্র। বিপরীতে ইরান বন্ধ করে দেওয়া হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে রাজি হয়েছে এবং কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ৬০ দিনের একটি আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলারের একটি পুনর্বাসন তহবিল গঠনের দিকে যেতে পারে।

মার্কিন সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট এক্সিওস জানায়, ইসরায়েলের কর্মকর্তারা এই চুক্তি নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একজন উপদেষ্টা বলেছেন, সমঝোতা স্মারকের লেবানন–সংক্রান্ত অংশটি মেনে চলতে ইসরায়েল কোনোভাবেই বাধ্য নয়।

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজে এ পর্যন্ত চুক্তিটি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর অনুগত ও সমমনা ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দলের তীব্র সমালোচনা করছে। তারা ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ইসরায়েলকে ‘বিক্রি’ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

এসব আক্রমণের জবাবে জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দেন যে ইসরায়েলের ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা অস্ত্রের তিন-চতুর্থাংশই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এবং এর খরচও তারাই জুগিয়েছে। ফলে ইসরায়েলের সমস্যাটি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প নন’।

ভ্যান্স আরও বলেন, ‘ইসরায়েলের যাঁরা মনে করছেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তাঁদের এবার ঘুম থেকে ওঠা উচিত এবং বাস্তব পরিস্থিতিটা বোঝা দরকার।’

ভ্যান্স জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েল সরকারের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গেও ‘প্রায় প্রতিদিনই’ কথা বলছে। তবে ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর নিজের যে আলাপ হয়েছে, সেখানে তিনি এমন কোনো উদ্বেগের কথা শোনেননি।

ইরান চুক্তির আলোচনায় যখন যুক্তরাষ্ট্র এক বড় ধরনের সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলা চালানোর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, ওই হামলায় নিহত হওয়া বহু মানুষের সঙ্গে হিজবুল্লাহর কোনো সম্পর্কই ছিল না। অথচ ইসরায়েল দাবি করেছিল, তারা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটির আস্তানা লক্ষ্য করেই হামলাটি চালিয়েছে।

ভ্যান্স বলেন, ‘ইসরায়েলিদের প্রতি আমাদের মূল বার্তাটি হলো, যেমনটা আমরা অন্য সবার ক্ষেত্রেও বলছি—মূলত আমরা চাই এই শান্তিপ্রক্রিয়া আপনাদের জন্য কল্যাণকর হোক। আমরা চাই না, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালাক। কিন্তু সেটি নিশ্চিত করতে হলে আমাদের আসলে এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা হিজবুল্লাহর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করতে পারে এবং একই সঙ্গে সব পক্ষ যাতে লেবাননের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা দেখায়, তা নিশ্চিত করতে পারে।’

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ছবি: এএফপি ও রয়টার্স

লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হওয়ায়-ই কি আলোচনা স্থগিত করেছে ইরান

যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ শুক্রবার ভোরে নিশ্চিত করেছে, দেশটিতে বার্গেনস্টক নামের পার্বত্য অবকাশকেন্দ্রে নির্ধারিত ওই বৈঠক হচ্ছে না। আলোচনা স্থগিত হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের চলমান অভিযানকে কেন্দ্র করে ইরান তাদের প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে। দুই দেশ গত বুধবার ভার্চ্যুয়ালি যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছিল, তার কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য এই প্রতিনিধিদলের সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল।

খবরে আরও বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে লেবাননে ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ওই এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষের কথা জানিয়েছে।

ইরান যুদ্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ক্রমাগত সমর্থন হারাচ্ছেন ট্রাম্প। এমন অবস্থায় ইরান বুঝতে পেরেছে, যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ বাড়ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তেহরান কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং বলেছে, পরিকল্পনায় সম্মতি জানালেও তাদের কিছু আপত্তি আছে।

ইরানের আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আজ শুক্রবার বলেন, যেকোনো আলোচনা তেহরানের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। তিনি বলেন, এই চুক্তিসংক্রান্ত আলোচনায় ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করা।

গালিবাফ আরও বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করেছি, শত্রু যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে আমাদের আঙুল ট্রিগারে থাকে এবং শত্রুকে কঠিন জবাব দিতে আমরা কোনো দ্বিধা করি না।’

চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক আগামী রোববার মিসরের আলামিন শহরে বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছে। কায়রো ও ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সুইজারল্যান্ডের মধ্যাঞ্চলে লুসার্ন শহরের কাছে অবস্থিত বার্গেনস্টক অবকাশকেন্দ্রে একটি আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিনিধিদলগুলোর মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। এই অবকাশকেন্দ্রটি কাতারের সরকারি বিনিয়োগ তহবিলের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানি কাতারা হসপিটালিটির মালিকানাধীন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানেরও ভূমিকা আছে।

আজ বার্তা সংস্থা এএফপিকে পাঠানো এক বার্তায় সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যকার নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে।

সুইজারল্যান্ড আরও বলেছে, তারা এখনো এ আলোচনাকে এগিয়ে নিতে প্রস্তুত আছে। বার্গেনস্টকে সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতিমূলক কাজ চলমান। তবে আলোচনার জন্য নতুন কোনো তারিখ জানানো হয়নি।

লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে ইরান সুইজারল্যান্ডে তাদের প্রতিনিধিদল পাঠাতে দেরি করছে বলে সংবাদমাধ্যম আল মায়াদিনে খবর প্রকাশের পর এ ঘোষণা এসেছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রয়োজন’ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইসরায়েলের সেনাবাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চলে’ অবস্থান করবে।

ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ এ চুক্তির সঙ্গে নেই। তবে ইরান জোর দিয়ে বলছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে দখল করে রাখা একটা বড় অংশ থেকে ইসরায়েলকে সরে যেতে হবে।

ক্রমবর্ধমান বিভাজন

১৪ দফার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার মাত্র দুই দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু করার উদ্যোগটি ধাক্কা খেয়েছে।

জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য অবকাশকেন্দ্রে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে রওনা করার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। তাঁর সহকর্মী এবং কয়েকজন সাংবাদিক ওয়াশিংটনের কাছে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সে সফরের অপেক্ষায় জড়োও হয়েছিলেন।

একই সময়ে হোয়াইট হাউসের কয়েক ডজন কর্মকর্তা, অগ্রবর্তী প্রস্তুতি দল এবং সাংবাদিকেরা ভ্যান্সকে স্বাগত জানাতে আগে থেকে সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন।

তবে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই সফরটি বাতিল করা হয়।

হোয়াইট হাউস বলেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যাঁকে মনোনীত করেছেন—সেই ভ্যান্স ও তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকলেও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটনেই থাকবেন।

লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে ইসরায়েলের অস্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, এটি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইসরায়েলের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা বলেছেন, তাঁদের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য নয়। এমন বক্তব্যের পর ভ্যান্স গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত হওয়ার আগের ঘটনা এটি।

ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েলি সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তাহলে হয়তো আমি বিশ্বের মধ্যে আমার একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকে আঘাত করতাম না।’

ইরানের তেহরান শহরের একটি সড়ক
ইরানের তেহরান শহরের একটি সড়ক। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

বাংলাদেশের পাটপণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বহাল রাখছে ভারত by প্রতীক বর্ধন

বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যে আরোপিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আপাতত প্রত্যাহারের পক্ষে নয় ভারত। দেশটি এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলেছে, এই শুল্ক বহাল রাখা বা প্রয়োজন হলে সংশোধন করা হবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যের ওপর আরোপিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের মধ্যবর্তী পর্যালোচনা করেছে ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর)। ১৭ জুন প্রকাশিত ৮৮ পৃষ্ঠার ডিসক্লোজার স্টেটমেন্টে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া না হলেও তদন্তকারী সংস্থা তাদের প্রাথমিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে পাটপণ্য রপ্তানিতে এখনো ডাম্পিং অব্যাহত আছে। স্বাভাবিক মূল্যের তুলনায় কম দামে এসব পণ্য ভারতে বিক্রি হচ্ছে। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ শিল্পে চাপ তৈরি হচ্ছে।

মধ্যবর্তী পর্যালোচনায় ভারতীয় পাটশিল্পের ক্ষতির কয়েকটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়, ভারতীয় উৎপাদকদের বাজার অংশীদারত্ব কমেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানির অংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে মুনাফা ও নগদ মুনাফা কমেছে, বেড়েছে মজুত। এতে উন্মুক্ত বাজারে ভারতীয় উৎপাদকেরা আরও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন। বাংলাদেশের অতিরিক্ত উৎপাদনসক্ষমতা ঝুঁকি হিসেবে দেখছে ভারত।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের পাটকলগুলোর বার্ষিক উৎপাদনসক্ষমতা প্রায় ৬ লাখ ৩৬ হাজার টন হলেও প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন। অর্থাৎ প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার টন সক্ষমতা অব্যবহৃত আছে।

ভারতের আশঙ্কা, এই অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে ভবিষ্যতে ভারতে বাংলাদেশি পাটপণ্য রপ্তানির চাপ আরও বাড়তে পারে। ডিজিটিআরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক তুলে দিলে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে কম দামে আরও বেশি পাটপণ্য ভারতে প্রবেশ করতে পারে। এতে ভারতীয় উৎপাদকেরা দাম কমাতে বাধ্য হবেন। অর্থাৎ তাঁরা আরও বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির আজ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আমি এখনো অবহিত নই। তবে আমরা আশা করি না যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ ভারত সরকার নেবে। ভারত যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকে আমরা তাদের অনুরোধ করব, তারা যেন সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে’।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ভারত যদি এই নীতিতে অটল থাকে, তাহলে আরও দেশ আছে; আমাদের ব্যবসায়ীরা সেই সব দেশের বাজারে পণ্য বিক্রির সম্ভবনা খতিয়ে দেখতে পারেন। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি ভর্তুকির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থার মতে, পাট খাতে দেওয়া নগদ সহায়তা বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় তাদের এগিয়ে রেখেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক। ৯ বছর ধরে ভারত বাংলাদেশের পাট পণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে রেখেছে। এটা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম মেনে করা হচ্ছে কি না বা এত দিন ধরে তা করা যায় কি না, তা আমরা জানি না। সরকারের উচিত, বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করা।

ভারতের অভিযোগ অমূলক আখ্যা দিয়ে তাপস প্রামাণিক আরও বলেন, দেশের পাট পণ্য রপ্তানিতে ভর্তুকি অনেকটা কমে গেছে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাংলাদেশের ঘাটতি অনেক বেশি। এই অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক না থাকলে ব্যবসা আরও বাড়ত, কিন্তু এই বাস্তবতায় তা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন ও সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকেরা ২৪ জুন পর্যন্ত মতামত দিতে পারবেন। সেই মতামত বিবেচনায় নিয়েই ভারত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।

তবে বর্তমান ডিসক্লোজার স্টেটমেন্ট বলছে, আপাতত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বহাল রাখার সম্ভাবনাই বেশি।

২০১৭ সাল থেকে চলছে

উৎপাদন মূল্যের তুলনায় কম দামে বাংলাদেশের পাটকলমালিকেরা ভারতে পাটপণ্য রপ্তানি করছেন—ভারতীয় ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত সরকার প্রথম অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। ওই সময় প্রতি টন পাটপণ্য রপ্তানিতে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক নির্ধারণ করা হয়।

এরপর ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কারোপের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বৃদ্ধি করে ভারত। নতুন ঘোষণায় ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যে ভিন্ন ভিন্ন হারে অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়। সেবার প্রতি টনে ৬ ডলার থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টিং ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়। ২০২৭ সালের আগে এবার মধ্যবর্তী পর্যালোচনা করল তারা।

রপ্তানির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পাটপণ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ যায় ভারতে। ২০১৭ সাল থেকে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের পর থেকে রপ্তানি কমতে শুরু করে।
পাটকলে কাজ করছেন শ্রমিকেরা।
পাটকলে কাজ করছেন শ্রমিকেরা। ফাইল ছবি

ইসরায়েল বেপরোয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি অসম্ভব by হুসেইন চোকর

বিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত দুটি বড় শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল। ওই চুক্তি দুটিতে ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতের অবসানের চেষ্টা হয়েছিল। এমনকি সিরিয়ার সঙ্গেও একটি তৃতীয়, নির্ধারক চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল ওয়াশিংটন।

এই চুক্তিগুলোর পেছনে ছিল কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এগুলো ছিল—১৯৫৬ সালের ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসন, ১৯৬৭ নাকসা, ১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধ, ১৯৭৮ সালে লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন এবং ১৯৮২ সালে বৈরুত আক্রমণ।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সেই শান্তির পথে এগোনোর প্রচেষ্টা থেকে সরে এসেছে। বরং উল্টো পথে গিয়ে তারা ইসরায়েলকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে, যেখানে সামরিক শক্তির জোরে গোটা অঞ্চলে আধিপত্য কায়েম করাই হয়ে উঠেছে মূল লক্ষ্য। ফলে এখন যখন ওয়াশিংটনের প্রয়োজন একটি কার্যকর শান্তিচুক্তি করা এবং তা ধরে রাখা, তখন তারা তা করতে পারছে না। কারণ, তারা নিজেরাই বহুদিন ধরে ইসরায়েলের আগ্রাসনকে উৎসাহ দিয়ে এসেছে।

ইসরায়েলের রাষ্ট্রচিন্তার ভেতরে শুরু থেকেই একধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করেছে। আরব অধ্যুষিত এবং ইসলামপ্রধান একটি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন করে রাষ্ট্র গড়ার প্রকল্পে তারা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত ছিল। এই শঙ্কা মোকাবিলায় তারা দুটি ভিন্ন পথ তৈরি করে।

প্রথম পথটি ছিল শক্তি ও সামরিক নিষ্ঠুরতার ওপর নির্ভরশীল। এই ধারণা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন জিয়েভ জাবোটিনস্কি, যিনি ফিলিস্তিনে ইরগুন নামে একটি সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। ১৯২৩ সালে লেখা তাঁর ‘লোহার দেয়াল’ প্রবন্ধে তিনি বলেন, জায়নবাদী উপনিবেশ স্থাপন হয় থেমে যাবে, না হলে স্থানীয় জনগণকে উপেক্ষা করেই চলবে। আর তা সম্ভব কেবল এমন এক শক্তিশালী সুরক্ষার আড়ালে, যা স্থানীয়দের পক্ষে ভাঙা অসম্ভব; আর সেটিই হলো লোহার দেয়াল।

ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নও একইভাবে বিশ্বাস করতেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতাকেই শক্তির মাধ্যমে বদলে ফেলতে হবে।

বহু বছর পর লিকুদ পার্টির নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১৯৯৩ সালে লেখা তাঁর বইয়ে লিখেছিলেন, ইসরায়েলকে টিকে থাকতে হলে তাকে অবশ্যই সামরিকভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকতে হবে এবং সেই অনুযায়ী অঞ্চলকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও তিনি এই নীতিতেই অটল থেকেছেন। এর ফল হয়েছে মৃত্যু, ধ্বংস এবং অস্থিতিশীলতা।

দ্বিতীয় পথটি তৈরি হয় ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর। তখন ইসরায়েল নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়ে। তখন ‘শান্তির মাধ্যমে অস্তিত্ব’ ধারণাটি সামনে আসে। এই ধারণা অনুযায়ী, ইসরায়েল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে টিকে থাকতে পারে। এর ভিত্তি ছিল ‘ভূমির বিনিময়ে শান্তি’—অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে দখল করা ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিয়ে স্বীকৃতি ও শান্তি অর্জন।

এই পথ দ্রুত কিছু ফলও এনে দেয়। ১৯৭৮ সালে মিসরের সঙ্গে চুক্তি করে সিনাই উপদ্বীপ ফিরিয়ে দেয় ইসরায়েল। ১৯৯৪ সালে জর্ডানের সঙ্গে চুক্তি হয়। সেখানেও কিছু দখল করা জমি ফেরত দেওয়া হয়।

ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার সঙ্গে অসলো চুক্তিও এই ধারার অংশ ছিল। এমনকি প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন সিরিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির বিনিময়ে পুরো গোলান মালভূমি ফেরত দিতেও প্রস্তুত ছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু ১৯৯৫ সালের শেষে তিনি জায়নবাদী উগ্রপন্থীদের হাতে নিহত হন।

এর পর থেকে ধীরে ধীরে ইসরায়েল আবার আগের ‘লোহার দেয়াল’ নীতিতে ফিরে যায় এবং বর্তমানে তা সবচেয়ে চরম আকার ধারণ করেছে।

ইসরায়েলের এই আগ্রাসী পথে ফিরে আসা শুধু তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফল নয়, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের সরকার ও সেনাবাহিনীর আচরণের ওপর কোনো সীমা আরোপ না করে ওয়াশিংটন এমন আচরণ করেছে, যেন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রের স্বার্থই বৈধ নয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই মেয়াদে এই সমর্থন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর্থিক সহায়তা, কূটনৈতিক সুরক্ষা, দখল করা ভূখণ্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সামরিক সহযোগিতা—সবকিছুর বাইরে গিয়ে তিনি ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেন। দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির বিপরীতে গিয়ে তিনি আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি প্রশ্নকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই চুক্তিগুলো মূলত ‘ভূমির বিনিময়ে শান্তি’ ধারণাকে সরিয়ে দিয়ে ‘হত্যা-ধ্বংস-যুদ্ধ না হলেই শান্তি’—এমন একটি নতুন সূত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

ট্রাম্প ইসরায়েলকে এমন সুযোগও দেন, যাতে তারা পুরো অঞ্চলে নির্বিচার সামরিক অভিযান চালাতে পারে। গত বছর মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ছয়টি আরব দেশে ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়। এমনকি কাতারের মতো দেশও রেহাই পায়নি, যেখানে মার্কিন সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের অগ্রবর্তী ঘাঁটি রয়েছে।

এর চেয়েও বড় উদাহরণ হলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এই যুদ্ধ মূলত ইসরায়েলের স্বার্থেই পরিচালিত হয়েছে। এমনকি এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ কিংবা তাদের আরব মিত্রদের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।

এই নীতির কারণে আরব দেশগুলো ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়েছে। আগে তারা নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভাবত, কিন্তু এখন তাদের মতামত তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। বরং এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা আসলে ইসরায়েলের স্বার্থে তৈরি—আরব দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা বা স্বাধীনতার জন্য নয়।

এই পরিস্থিতিকে বাইরে থেকে ‘শান্তি’ বা ‘স্থিতিশীলতা’ বলা হলেও বাস্তবে এটি আরও অস্থিরতা তৈরি করছে। যেমন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করেছিল, ইসরায়েল সেটি মানতে চায়নি। এতে বোঝা যায়, যখন কোনো দেশ নিঃশর্ত সমর্থন পায়, তখন সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। সোজা কথা, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি চায়, তাহলে তাকে তার নীতি বদলাতে হবে। শুধু চুক্তির নাম ‘শান্তি’ রাখলেই আসল শান্তি আসে না।

হুসেইন চোকর, বৈরুতভিত্তিক নীতিনির্ধারণ বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

ইরান চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিতে গৃহদাহ

ইরানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুক্তিকে কেন্দ্র করে তার নিজের দল রিপাবলিকানের মধ্যেই নতুন করে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। কয়েক মাসের ব্যয়বহুল ও অস্বস্তিকর যুদ্ধের পর ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সুবিধা আদায় করতে পেরেছে কি-না, তা নিয়ে ক্যাপিটল হিল ও দলের ভেতরে-বাইরে প্রশ্ন উঠেছে।

বুধবার ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তির অনুলিপি প্রকাশ করার পর বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর তীব্র সমালোচনা, সংশয় ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কংগ্রেসের বাইরে থাকা দলের পুরনো নেতারাও এই চুক্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এমনকি রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমে ট্রাম্পের মিত্ররাও উদ্বেগ জানিয়েছেন।

লুইজিয়ানার রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এই চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা রোধ করা যায়নি।’

তিনি এই যুদ্ধকে গত কয়েক দশকের মধ্যে ‘সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্র নীতিগত ভুল’ বলে আখ্যা দেন।

আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পাঁচ মাস আগে ট্রাম্প এই যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে নিজের দলের ভেতরে বিভিন্ন মতামতের মুখোমুখি হচ্ছেন।

এই প্রাথমিক চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আটকে থাকা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া হবে। এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক সহযোগীরা ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠন করবে।

তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এতে কোনো বিনিয়োগ করবে না।

টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ তার এক পডকাস্টে প্রশ্ন তোলেন, ‘এই চুক্তি কি ইরানের আয়াতুল্লাহকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে দিচ্ছে? আমি আশা করি এমনটা হবে না।’

তবে তিনি ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ইরানের সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস করেছেন।

ট্রাম্পের সাবেক তীব্র সমর্থক এবং জর্জিয়ার সাবেক প্রতিনিধি মার্জোরি টেলর গ্রিন এই যুদ্ধকে ‘সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়’ বলে সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, জাতিসংঘে ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি বলেন, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সাইটে আঘাত করা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তবে যে হুমকি আমরা ধ্বংস করেছি, তা পুনর্গঠনের জন্য অর্থ প্রদান করা একটি বিশাল ভুল।

ডানপন্থি ট্যাবলয়েড ‘দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট’ তাদের প্রথম পাতায় একটি জ্বলন্ত আমেরিকান পতাকার ছবিসহ লিখেছে, ট্রাম্প ইরানকে ধ্বংস করেছিলেন, আর এখন তাদের ‘ক্যাশ এবং কোনো নিষেধাজ্ঞা ছাড়া’ সুবিধা দিচ্ছেন।

তবে ট্রাম্প তার এই সমালোচকদের ‘বোকা ও খারাপ লোক’ বলে তীব্র আক্রমণ করেছেন। ফ্রান্সের জি-৭ সম্মেলনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট হতো, কিন্তু সেটি করা ভুল হতো।

রিপাবলিকান দল এই যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে চায়। কারণ দেশটিতে গত বছরের তুলনায় জ্বালানি তেলের দাম প্রায় এক ডলার বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি সূচক অনুযায়ী, জ্বালানির দাম আগের বছরের চেয়ে ২৩.৫ শতাংশ বেড়েছে। ডেমোক্র্যাটরা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য যুদ্ধকে দায়ী করছে। দোদুল্যমান আসনগুলোর রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারাও দ্রুত যুদ্ধের অবসান চেয়েছিলেন।

অবশ্য অনেক রিপাবলিকান নেতা এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর টিম স্কট একে মার্কিন নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি ‘বড় বিজয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। সিনেটর জন কর্নিন এবং লিন্ডসে গ্রাহামও চুক্তির বিষয়ে কিছুটা ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

ইরান চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিতে গৃহদাহ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

যেভাবে কূটনৈতিক চালে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি করাল কাতার

দীর্ঘ কয়েক মাসের ধৈর্যশীল ও পুঞ্জীভূত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর গত বুধবারে ফ্রান্সে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সব ফ্রন্টে লড়াই স্থগিতের ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এই চুক্তির পেছনে মূল মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের পাশাপাশি কাতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বহুপক্ষীয় এই মধ্যস্থতায় প্রথম থেকে ধারাবাহিক ও স্পষ্ট নেতৃত্ব দিয়েছে পাকিস্তান। তারা তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিশরকে নিয়ে একটি কূটনৈতিক ফ্রন্ট গঠন করে। তবে এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান মূলত কাতারের অনুসৃত নীতিই ব্যবহার করেছে। কাতার দুই পক্ষের সঙ্গেই তার অনন্য সম্পর্ক ও যোগাযোগের মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে একটি কার্যকর সংযোগকারী হিসেবে কাজ করেছে।

কাতারের বাস্তবসম্মত উদ্যোগ

গত এক সপ্তাহে কাতারি প্রতিনিধিদল দুইবার তেহরান সফর করেছে। সেখানে গত রোববার টানা ১৭ ঘণ্টার তীব্র আলোচনার পর এই চুক্তি চূড়ান্ত রূপ পায়। চলতি সপ্তাহেও দোহায় পরবর্তী আলোচনার সূচি রয়েছে। বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাতারের ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হলেও এই চুক্তিতে তাদের সম্পৃক্ততা অনেক পর্যবেক্ষককে অবাক করেছে।

বর্তমান যুদ্ধের আগে ওমান এবং কাতার যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনার আয়োজন করেছিল। তখন ওমান সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করলেও কাতার মূলত দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের কাজ করত। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর একযোগে হামলা চালালে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

ক্ষয়ক্ষতি ও অবস্থান পরিবর্তন

যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরীয় দেশগুলো অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই সংঘাতের সামনে চলে আসে। কাতার এতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। ইরানি হামলায় দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যায়, যা পুনরুদ্ধার করতে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।

দিনের পর দিন ইরানি হামলার মুখে গত ২৪ মার্চ কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। তারা তখন ইরানের হামলার মুখে নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।

কূটনীতিতে ফেরা

গত ৮ এপ্রিল স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি সাম্প্রতিক সপ্তাহে ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হলে কাতার আবারও আলোচনায় ফিরে আসে। মে মাসের শেষের দিকে একটি ইরানি প্রতিনিধিদল দোহা সফর করে। পাকিস্তান মূল প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে থাকলেও কাতার আগের মতোই দুই পক্ষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের (শাটল ডিপ্লোম্যাসি) কাজ শুরু করে।

নিজেদের সম্পদ ধ্বংস হওয়ার পরও কাতারের আবারও আলোচনায় ফিরে আসা সমালোচকদের জন্য একটি বড় বার্তা। অনেকে চেয়েছিলেন কাতার ইরানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে সামরিক পথ বেছে নিক। কিন্তু মাসব্যাপী যুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো চূড়ান্ত ক্ষতি করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে ছোট উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক শক্তি বৃদ্ধি কোনো কাজে আসত না।

কাতারের জন্য সবসময়ই কূটনীতি ও মধ্যস্থতা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী তাস। যুদ্ধের বিশাল খরচ ও মানবিক বিপর্যয়ের তুলনায় কূটনৈতিক পদক্ষেপের খরচ একেবারেই সামান্য। কাতার যদি ইরানের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করত, তবে তারা মধ্যস্থতাকারীর যোগ্যতা হারাত। একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে কাতারের জন্য এই কূটনীতি কোনো অসহায়ত্ব ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

যেভাবে কূটনৈতিক চালে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি করাল কাতার
১৬ জুন ফ্রান্সে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

ভারত থেকে পালালেন ইসরাইলি সেনা, নেপথ্যে কী

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ দায়েরের পর ভারত থেকে পালিয়েছেন এক ইসরাইলি সেনা। তিনি ভারতের ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধপরাধের অভিযোগ মামলা দায়ের করেছে হিন্দ রজব ফাউন্ডেশন (এইচআরএফ)। বৃহস্পতিবার মিডল ইস্ট আইকে একথা জানিয়েছেন এই মামলার সঙ্গে যুক্ত এক আইনজীবী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই আইনজীবী জানান, ইসরাইলের ২৭১তম কমব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের সদস্য ইতান গিলবোয়া অভিযোগ দায়েরের কয়েকদিন পরেই ভারত ছেড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ব্রাসেলস-ভিত্তিক এইচআরএফ গাজায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গিলবোয়াকে গ্রেপ্তারের দাবিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে।

সংস্থাটি জানায়, গিলবোয়া গাজায় আবাসিক এলাকা হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এসব ঘটনার ভিডিও ধারণ ও ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছিলেন গিলবোয়া।

তাদের দাবি, গিলবোয়া বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের একাধিক ঘটনায় অংশ নিয়েছিলেন। এই কাজগুলো ১৯৬০ সালের জেনেভা কনভেনশন আইনের অধীনে যুদ্ধাপরাধের শামিল।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

ভারত থেকে পালালেন ইসরাইলি সেনা, নেপথ্যে কী

পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত: ইসরাইলি মন্ত্রী

ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির বলেছেন, পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত। শুক্রবার রাতে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর হামলায় চারজন ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি মন্তব্য করেন।

সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে গভির বলেন, ‘একজন ইসরাইলি মায়ের প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর জন্য, হাজারো লেবাননি মায়ের কাঁদা উচিত। পুরো লেবানন পুড়ে যাওয়া উচিত।’

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলকে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানালেও বেন গভির বারবার লেবাননে আরো তীব্র হামলা হামলার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন।

বেন গভির বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, ইসরাইলকে সমগ্র বিশ্বের কাছে এটা স্পষ্ট করে দিতে হবে যে আমাদের সন্তানদের রক্ত ​​এবং আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা কোনো বলিদানের বিষয় নয়।’

কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচও লেবাননে কঠোর হামলার আহ্বান জানিয়েছেন। এক্সে তিনি লেখেন, ‘এখন আগুন জ্বালিয়ে কথা বলার সময়। নরকের দরজা খুলে দেওয়ার সময়।’

ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের একটি বিশাল ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সেখান থেকে সরে আসার কোনো ইচ্ছা তার নেই।

সূত্র: সিএনএন

পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত: ইসরাইলি মন্ত্রী
ছবি: সিএনএন

স্ত্রীর মাথা ন্যাড়া করে প্রস্রাব পান করানোর অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে

ভারতের ছত্তিশগড়ের কোরিয়া জেলায় এক নারীর ওপর স্বামীর চরম নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে হাত-পা বেঁধে, মাথা ন্যাড়া করে, মুখে কালি ও ইঞ্জিন অয়েল মেখে নির্মমভাবে মারধর করে এবং সন্তানদের সামনে তাকে জোরপূর্বক প্রস্রাব পান করাতে বাধ্য করে। এমনকি ওই ঘটনায় সন্তানদেরও অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী নারী জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে প্রেমের সম্পর্ক থেকে জিতেন্দ্র ঘাসিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের চার সন্তান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ, নির্যাতন ও আর্থিক সংকটের কারণে তিনি সন্তানদের নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন এবং সংসার চালাতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৪ জুন স্বামী জিতেন্দ্র তাকে খুঁজে বের করেন, যেখানে তিনি এক পরিচিত ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই ডেকে নিয়ে গিয়ে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় বলে তিনি দাবি করেন। ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বাইরে ডেকে এনে গালাগাল ও চরিত্র নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের পর হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আমার চুল কেটে দেয়, মাথা ন্যাড়া করে, মুখে কালি ও তেল মেখে দেয়, মারধর করে এবং আমাকে প্রস্রাব পান করাতে বাধ্য করে। আমাকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়।

নারীর দাবি, এই নির্মম ঘটনার সময় তাদের সন্তানদেরও ব্যবহার করা হয়েছে। সন্তানদের দিয়ে মাকে চড় মারানো হয় এবং এক সন্তানকে দিয়ে তাকে জোরপূর্বক অপমানজনক কাজ করানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভিডিও ফুটেজে অভিযুক্তকে স্ত্রীকে চরিত্র নিয়ে অভিযুক্ত করতে শোনা যায়। তার দাবি, স্ত্রী আগে তার আত্মীয়দের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং সংসার ছেড়ে অন্য সম্পর্কেও জড়িয়েছিলেন।

তবে ভুক্তভোগী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই তাকে সন্দেহ করা হতো এবং নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। তিনি বলেন, বিয়ের পর থেকেই আমাকে সন্দেহ করা হতো। দাম্পত্য নির্যাতন চলছিল। আমি ন্যায়বিচার চাই এবং অভিযুক্তের কঠোর শাস্তি চাই।

প্রথমে নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) একাধিক ধারায় মামলা নথিভুক্ত করে, যার মধ্যে ছিল স্বামীর নির্যাতন, ইচ্ছাকৃত আঘাত, অশ্লীল আচরণ এবং ফৌজদারি হুমকি সংক্রান্ত ধারা। পরে ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পর তদন্তে আরও গুরুতর অভিযোগ যুক্ত করার কথা জানায় পুলিশ।

কোরিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুরেশা চৌবে জানান, প্রাথমিক অভিযোগে শুধু নির্যাতন ও মদ্যপ অবস্থায় মারধরের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ভিডিও সামনে আসার পর ঘটনাটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখে অতিরিক্ত ধারা যুক্ত করা হচ্ছে এবং অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেওয়া হবে।

এই ঘটনার পর স্থানীয় এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে এবং সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ঘিরে ব্যাপক নিন্দা ও বিচার দাবি উঠেছে।

সূত্র: এনডিটিভি

স্ত্রীর মাথা ন্যাড়া করে প্রস্রাব পান করানোর অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে
ছবি সংগৃহীত।

গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ: ট্রাম্পের অযৌক্তিক যুদ্ধ আর অবাস্তব স্বপ্নের ফসল ইরান চুক্তি

কথায় আছে, শত্রুর সঙ্গে প্রথম সংঘর্ষের পর কোনো যুদ্ধই আর পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা, দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং হিজবুল্লাহ, হামাসসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনের অবসান ঘটানো।

ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত তাঁর এসব উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থেকে সরে যেতে হয়েছে এবং তিনি এমন অবস্থায় সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে ইরান কেবল তাঁকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে না এবং ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও আলোচনা করবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) এমনকি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কোনো উল্লেখ নেই।

অন্যদিকে এমওইউতে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার উল্লেখ থাকায় হিজবুল্লাহ এটিকে তাদের ‘বিজয়’ হিসেবে উদ্‌যাপন করছে; যদিও ইসরায়েল এখনো লেবাননের একটি অংশকে ‘বাফার জোন’ হিসেবে দখল করে রেখেছে।

এ যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। নৌপথে বিশ্ববাণিজ্যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক জলপথ।

ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে যুদ্ধ নিয়ে প্রায় সব কটি সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণে এ নিয়ে পূর্বাভাস দিয়ে বলা হয়েছিল, যুদ্ধ শুরু হলে ইরান খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।

এ প্রণালি আবার খুলে দিতে এখন ট্রাম্প প্রশাসনকে তাদের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলো থেকে সরে আসতে বাধ্য হতে হয়েছে, নয়তো ট্রাম্পের ভাষায় একটি ‘বিশ্বব্যাপী মহামন্দা’ মোকাবিলা করতে হতো।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট কূটনৈতিক ফেলো বারবারা লিফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধ শুরু করেছিল শাসনব্যবস্থার (ইরানের) স্থিতিশীলতা সম্পর্কে অবাস্তব মূল্যায়ন নিয়ে; পাশাপাশি তারা ইরানের হরমুজ প্রণালি দখল বা বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা এবং উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের স্থাপনায় তেহরানের আক্রমণ করার প্রস্তুতিকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি।

বারবারা লিফ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই বুঝতে পারে, তারা এমন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে, যারা চার দশক ধরে অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশলে উন্নতি করেছে, দক্ষতা অর্জন করেছে। এমন প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি পরাজিত করার প্রস্তুতি তাদের ছিল না।

অন্যদিকে যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ক্ষতি দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও গিয়ে পড়ে। এতে তাদের কাছে যুদ্ধটি আরও বেশি অযৌক্তিক হয়ে ওঠে।

বারবারা লিফ বলেন, ট্রাম্প এখন একটি কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি আবার যুদ্ধ শুরু করতে চান না। কিন্তু যুদ্ধ যদি প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহেই শেষ হয়ে যেত, তাহলে যে পরিমাণ কৌশলগত চাপ দেওয়ার সুযোগ বা সুবিধা তিনি পেতে পারতেন, তার অনেকটাই তিনি এরই মধ্যে হারিয়ে ফেলেছেন।

কয়েক দিন ধরেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে চায় না বা এ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। অবশেষে গত বুধবার একজন মার্কিন ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা একটি ব্রিফিং কলে এটি পড়ে শোনান; যদিও হোয়াইট হাউস এখনো এর কোনো অনুলিপি অনলাইনে প্রকাশ করেনি।

এর কারণটিও স্পষ্ট। ট্রাম্পের নিজের দলের অনেকেই এই চুক্তিকে পছন্দ করছেন না। লুইজিয়ানার বিদায়ী মার্কিন সিনেটর বিল ক্যাসিডি এটিকে ‘গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি–সংক্রান্ত ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন।

ক্যাসিডি লিখেছেন, ‘রিগ্যান কবরের ভেতরও এ নিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছেন। ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বরং তারা শিখেছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি খুবই কার্যকর। ভবিষ্যতেও তারা অবশ্যই এটিকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। এখন এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান নতুন করে সম্পূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগও পাচ্ছে।’

নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস বলেছেন, বুধবার প্রকাশিত ১৪ দফা তাঁর কাছে ‘একটি ভালো চুক্তি’ বলার জন্য যথেষ্ট মনে হয়নি।

ট্রাম্প বহু বছর ধরে বারাক ওবামার আমলে করা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা যৌথ সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনার (জেসিপিওএ) সমালোচনা করে আসছেন। তিনি বলতেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানকে পারমাণবিক বোমা বানানো থেকে বিরত রাখতে ঘুষ হিসেবে ‘বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ’ পাঠিয়েছিলেন।

কিন্তু যখন ট্রাম্পের নিজের ইরানের সঙ্গে শান্তি স্থাপনের সময় এল, তখন তিনি নিজেকে এমন অবস্থানে পেলেন, যেখানে তাঁকে আরও অনেক বড় পরিসরের সম্পদের সম্ভাব্য হস্তান্তরকে যুক্তিসংগত বলে ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে। পাশাপাশি আরও কিছু আর্থিক প্রণোদনা, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননে যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরান ও ওমানকে আলোচনা করার অনুমতি দিতে হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে জব্দ করা ইরানি সম্পদ সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা আমাদের অর্থ নয়, এটা তাদেরই অর্থ এবং আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে সেটা স্থগিত করেছি। আমার মনে হয়, আমাদের এটা তাদের ফেরত দিতে হচ্ছে।’

বুধবার কিছু সময়ের জন্য তাই মনে হয়েছিল, ট্রাম্পের কণ্ঠে প্রায় ইরানের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি হচ্ছে। ট্রাম্প বলছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকে, তাহলে সেই যুক্তিতে ইরানেরও সেগুলো থাকা উচিত।’

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটা একটু কঠিন বিষয়, যখন অন্য দেশগুলোর কাছে এটি আছে, আশপাশের দেশগুলোর কাছেও আছে। আর আপনি কেবল তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও এ ধরনের লক্ষ্যে এটি ব্যবহার করতে দিচ্ছেন না। এখানে কিছুটা বাস্তব বুদ্ধি ব্যবহার করতে হবে।’

তবে যত কথাই বলা হোক, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের এই সমঝোতা স্মারক একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। এর রাজনৈতিক মূল্য যা–ই হোক না কেন, সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে।

বারবারা লিফ বলেন, এই ভুলভাবে পরিকল্পিত যুদ্ধ শেষ হতে যাচ্ছে দেখে তিনি গভীর স্বস্তি অনুভব করছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে না—এটা নিশ্চিত করার মতো নিশ্চয়তা এখানে খুব একটা নেই।

বারাক ওবামার আমলের জেসিপিওএ আলোচনায় অংশ নেওয়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা রবার্ট ম্যালি লিখেছেন, এই দুই চুক্তির তুলনা করা খুব একটা অর্থবহ নয়। কারণ, এগুলো মৌলিকভাবে ভিন্ন দুটি চুক্তি, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে হয়েছে।

ম্যালি আরও লিখেছেন, ‘মূল কথা হলো, এই সমঝোতা স্মারক বর্তমানে যেকোনো বিকল্প প্রস্তাবের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।’

এই সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেন, ‘এটাই চূড়ান্ত কথা।’

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দিনও দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলার পর আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ১৭ জুন ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দিনও দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলার পর আকাশে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ১৭ জুন ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

এক আঘাতেই দুটি শান্তিচুক্তি নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু by ত্রিতা পার্সি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একবার ইসরায়েলি সাংবাদিক বারাক রাভিদকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘কোনো আক্কেলজ্ঞান নেই’। তবে এটি বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আসলে খুব ভালো করেই জানেন, তিনি কী করছেন।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় এক গুচ্ছ বিমান হামলা চালিয়ে নেতানিয়াহু মূলত দুটি শান্তিচুক্তি একসঙ্গে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছেন। এর একটি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তিচুক্তি (গত বুধবার ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেছেন)। অন্যটি হলো, এ চুক্তির হাত ধরে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে হতে যাওয়া ভঙ্গুর শান্তিপ্রক্রিয়া (সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি)।

এ হামলার পেছনে নেতানিয়াহুর আরও একটি কৌশলগত সুদূরপ্রসারী লাভ রয়েছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ‘প্রতিরোধ সমীকরণ’ তৈরি করতে চাইছে। এ সমীকরণ অনুযায়ী, বৈরুত বা লেবাননের যেকোনো জায়গায় ইসরায়েল হামলা চালালে ইরান সরাসরি দেশটির ওপর পাল্টা আঘাত হানবে। নেতানিয়াহু মূলত ইরানের এ চেষ্টাকে শুরুতেই রুখে দিতে চাইছেন।

এখনই এ হামলা চালিয়ে নেতানিয়াহু শুধু তাঁর এক শত্রুকে নিশানা করছেন না; বরং তিনি মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করছেন, যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের স্বাধীনতাকে সংকুচিত বা সীমাবদ্ধ করে দেবে।

এমনকি নেতানিয়াহু নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে এ হামলার বড়াই করে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন।

গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিনিময় শুধু প্রতিশোধ নেওয়ার লড়াই ছিল না, এর পেছনে ছিল গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইসরায়েল যখন বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় হামলা চালায়, তখন ইরান সরাসরি ইসরায়েলে আঘাত হেনে এর জবাব দেয়।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান সরাসরি ইসরায়েলের ভেতরেই আঘাত হানল, এমন ঘটনা এটিই প্রথম। এরপর ইসরায়েল আবারও ট্রাম্পের নির্দেশ উপেক্ষা করে ইরানের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও আবার আক্রমণ করে।

ইরান এ দফায় পাল্টা আঘাত করার পর ইসরায়েল কিছুটা পিছু হটে। তারা তাদের পরের হামলাটি বৈরুতের মূল শহরতলিতে না করে দক্ষিণ লেবাননে সীমাবদ্ধ রাখে।

এ সংঘাতের চক্র মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করার চেষ্টাকেই ফুটিয়ে তোলে। এই সমীকরণ অনুযায়ী, লেবাননে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল আর পার পাবে না; বরং সেখানে আঘাত করলেই ইরানের সরাসরি পাল্টা হামলার ঝুঁকি তৈরি হবে।

গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম এ অঞ্চলের কোনো বড় শক্তি (ইরান) ইসরায়েলের নিজ সীমানার বাইরে তার সামরিক অভিযান চালানোর স্বাধীনতার ওপর বলপ্রয়োগে লাগাম টানার চেষ্টা করছে।

নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর তেহরান এখন তার সহযোগী দেশ ও গোষ্ঠীগুলোর জন্যও এ নিরাপত্তাবলয় বিস্তার করতে চাইছে। এটি মূলত ইরানের অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষানীতিকে শক্তিশালী করার একটি বড় প্রচেষ্টা। তবে ইসরায়েল স্বভাবতই একে তাদের দীর্ঘদিনের অবাধ সামরিক অভিযানের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। তাই এ নতুন নীতি যেন প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে, সে জন্য তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।

অবশ্য শুধু একবারের পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে এমন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা যায় না। নতুন এ পরিস্থিতিকে উভয় পক্ষ মেনে নেওয়ার আগে কমপক্ষে আরও কয়েক দফা সংঘাত ও পাল্টা সংঘাতের প্রয়োজন হবে। আর তা হলেও এটি যে শতভাগ সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তেহরান খুব ভালো করেই বোঝে যে তাদের উদ্দেশ্য শুধু লেবাননে ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ করা নয়; বরং এমন একটি চড়া মূল্য নির্ধারণ করা, যেন লেবাননে হামলার নির্দেশ দেওয়ার আগে ইসরায়েলি নেতারা দুবার ভাবতে বাধ্য হন। আর সেই মূল্যটি হলো, ইরানের সরাসরি পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা।

তাই এটি স্পষ্ট ছিল যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই লড়াই থেকে পিছু হটেননি। তবে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সঙ্গে কয়েক দিন ধরে মুহুর্মুহু গোলাগুলি চললেও নেতানিয়াহু বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলিতে হামলা চালানো থেকে বিরত ছিলেন। তিনি মূলত ইরানের নতুন ওই ‘লাল দাগ’ বা সতর্কবার্তা পরীক্ষা করে দেখা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার কথা ছিল শুক্রবার (নানা বাধা পেরিয়ে এরই মধ্যে সই হয়েছে)। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় ছিলেন, ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগেই তেহরান ও ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ‘রেডলাইন’ বা চূড়ান্ত সীমানা পার হলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এই রেডলাইনটি ছিল চলমান সংঘাত থেকে লেবাননের রাজধানী বৈরুতকে মুক্ত রাখা।

নেতানিয়াহু খুবই হিসাব-নিকাশ করে এ হামলার সময় বেছে নিয়েছেন, যেন এর প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। এক আঘাতেই তিনি একসঙ্গে দুটি লক্ষ্য পূরণ করতে চেয়েছেন। প্রথমত, ট্রাম্পের বহুল প্রতীক্ষিত শান্তিচুক্তিটি ভন্ডুল করা। দ্বিতীয়ত, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ওপর লাগাম টানতে ইরান যে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চেয়েছিল, তা শুরুতেই রুখে দেওয়া।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একজন কূটনীতিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে বলেছেন, ‘এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চুক্তি নস্যাৎ করার জন্য ইসরায়েলের একটি স্পষ্ট চেষ্টা। তারা মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও যুদ্ধের মধ্যে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে চায়।’

এদিকে এ ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও নেতানিয়াহুর ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, বৈরুতে এ হামলা ‘হওয়া উচিত হয়নি’। হিজবুল্লাহর সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইসরায়েলের এ পদক্ষেপ কতটুকু যৌক্তিক ছিল, তা নিয়েও তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন।

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের নিজের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু হিজবুল্লাহর যে হামলার জবাবে ইসরায়েল এটি করল, সেটি ছিল অত্যন্ত ছোট ও অর্থহীন। ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। তাই এত বড় একটি শান্তি প্রক্রিয়াকে এ হামলার মাধ্যমে ব্যাহত করা ঠিক হয়নি।’

ট্রাম্পের এ বক্তব্য শুধু নেতানিয়াহুর সমালোচনার কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং এর ভেতরে একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতও রয়েছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তির যখন একদম দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব, তখন ইসরায়েলের এ হামলা সামরিক বা কূটনৈতিক—কোনো দিক থেকেই বুদ্ধিমানের মতো কাজ হয়নি।

ওয়াশিংটন এখন দুই দিক (ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তেহরানের চাপ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি নস্যাৎ করতে তেল আবিরের অপচেষ্টা) থেকেই চরম অস্বস্তিতে রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরান নিজে হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলেও ট্রাম্প যেন ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তেহরান ক্রমাগত সেই দাবিই করে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের বড় ক্ষোভের জায়গা হলো, ইরানের সঙ্গে তারা যে চুক্তি করতে মরিয়া চেষ্টা করেছে, সেটি ইসরায়েলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ইসরায়েলকে থামানোর জন্য খোদ ইরানই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করেছে। কারণ, তেহরান শুরু থেকে জোর দিয়ে আসছে, যেকোনো যুদ্ধবিরতি হতে হবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এবং সেখানে এমন ব্যবস্থা থাকবে যেন ইসরায়েল নতুন করে আর যুদ্ধ শুরু করতে না পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ কূটনৈতিক হতাশা পুরোপুরি যৌক্তিক। তবে ওয়াশিংটনকে একটি মৌলিক বাস্তবতা অবশ্যই মেনে নিতে হবে। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতের হাত থেকে রক্ষা করা। এটির একমাত্র উপায়, ইসরায়েলের বারবার সামরিক উত্তেজনা তৈরির প্রবণতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেকে পুরোপুরি আলাদা করে নিতে হবে। যত দিন পর্যন্ত ইসরায়েলের হাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার যুদ্ধে টেনে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে, তত দিন তেহরানের কাছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার কূটনৈতিক আলোচনাকে আলাদা বিষয় মনে করার কারণ থাকবে না। ইসরায়েল নিজের ইচ্ছেমতো যুদ্ধ শুরু করবে আর সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে নেবে—এটি ইরান মেনে নেবে না।

প্রকৃতপক্ষে, তেহরান যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য এতটা জোর দিচ্ছে, তার মূল কারণও এটিই। তারা চায় না যে ইসরায়েল এমন কোনো সুযোগ পাক, যার মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে খোদ ইরানের বিরুদ্ধে আরও একটি নতুন যুদ্ধে নামিয়ে দিতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি এখন পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেন, ইসরায়েলের কোনো অযৌক্তিক সামরিক উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে না ও তাদের রক্ষাও করবে না, তবে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তখন তেহরানও হয়তো একটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন দেখবে না।

ইসরায়েলের কাছ থেকে হিসাব-নিকাশ করে এমন দূরত্ব বজায় রাখা যেকোনো বিচারে মার্কিন স্বার্থই রক্ষা করবে। আর এ দূরত্বের প্রয়োজনীয়তা আজকের মতো এত স্পষ্ট আর কখনো ছিল না।

* অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্
- {নিবন্ধের লেখক ত্রিতা পার্সি মার্কিন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট’-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং একজন পুরস্কারজয়ী লেখক। ‘ওয়াশিংটনিয়ান ম্যাগাজিন’ তাঁকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ওপর সবচেয়ে প্রভাবশালী ২৫ কণ্ঠস্বরের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বখ্যাত ভাষাবিদ ও চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি তাঁকে ‘ইরানবিষয়ক সবচেয়ে বিশিষ্ট গবেষকদের একজন’ বলে অভিহিত করেছেন।}

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি

ট্রাম্প যেভাবে নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নষ্ট করে দিলেন by ডেভিড হার্স্ট

গত ২৫ বছরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র যত সামরিক ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে, তার মধ্যে ইরান যুদ্ধ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া কিংবা সিরিয়ায় চালানো সামরিক হস্তক্ষেপের মতো ছিল না। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান শুধু আরেকটি মার্কিন সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা থেকে টিকে যায়নি; যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধ কখনোই কেবল একটি সরকারের ভাগ্য নির্ধারণের লড়াই ছিল না।

ইরানকে বশে আনতে ব্যর্থ হওয়ায় আরও বড় একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা থমকে গেছে কিংবা ভেঙে পড়েছে—মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুনভাবে সাজানোর সেই প্রকল্প, যার নেতৃত্বে থাকত পুনর্জন্ম পাওয়া ও শক্তিশালী হয়ে ওঠা তথাকথিত ‘গ্রেটার ইসরায়েল’। এই কৌশলগত লক্ষ্যই ছিল আব্রাহাম চুক্তির মূল উদ্দেশ্য। আর যখন সৌদি আরব এতে স্বাক্ষর করতে পিছিয়ে যায়, তখন বিকল্প হিসেবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।

পরিহাস হলো, হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পই শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নষ্ট করে দিলেন।

খরগোশের গর্তে পতন

ট্রাম্পের জন্য নেতানিয়াহুর তৈরি করা রাজনৈতিক ‘ফাঁদ’ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কঠিন কিছু ছিল না। কিন্তু নেতানিয়াহুর জন্য ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তন ছিল এক ভয়াবহ বিপর্যয়, যার প্রভাব কয়েক প্রজন্ম ধরে অনুভূত হতে পারে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমে আসে। নিজের দলেও বিরোধিতা বাড়তে থাকে। উপসাগরীয় অর্থনীতির অচলাবস্থা ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থেও আঘাত হানে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন—যেখানে তিনি সহজেই কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন।

ট্রাম্প চেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলা ধাঁচের দ্রুত বিজয়। কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে ইরান সহজে আত্মসমর্পণ করবে না, তখন ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট কার্যত মানসিকভাবে যুদ্ধ থেকে সরে যান। ইসরায়েলি যুদ্ধ সংবাদদাতারাও একই মত দেন। চ্যানেল থার্টিনের সামরিক প্রতিবেদক অ্যালন বেন ডেভিড বলেন, এই যুদ্ধ পুরো পরিস্থিতি উল্টে দিয়েছে। যুদ্ধের আগে আমেরিকার সমর্থনে ইসরায়েলকে অঞ্চলের প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যেত। যুদ্ধের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে ইরান।

হারেৎজের সামরিক বিশ্লেষক অ্যামোস হারেল লিখেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা ছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা। ডানপন্থী শক্তিগুলো তখন ‘ইসরায়েলকে একাই এগোতে হবে’ ধারণা নিয়ে আলোচনা শুরু করে, যা মন্ত্রিসভাতেও তোলা হয়।

এই ক্ষতে আরও নুন ছিটিয়ে ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইসমকে বলেন, নেতানিয়াহুর তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ, ‘ইরানের যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, ইসরায়েল দুই ঘণ্টাও টিকত না।’ ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে ইসরায়েল বলে কিছু থাকত না।’

কৌশলগত ধাক্কা

ডানপন্থী বিরোধী দল ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগডর লিবারম্যান বলেন, ইসরায়েলের উচিত নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গঠন করা এবং মোসাদকে শুধু ইরানের সরকার উৎখাতের কাজে নিয়োজিত করা। অতি ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ঘোষণা দেন, সরকার উৎখাতের অভিযান ‘নিজেদের ও সৃজনশীল উপায়ে’ চালিয়ে যাওয়া হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, যিনি ভবিষ্যতে নেতানিয়াহুর উত্তরসূরি হতে পারেন, তিনি সাংবাদিক ও লেখক পিয়ার্স মরগানকে বলেন: ‘ইরানের সরকারকে বলতে চাই, আমি হব তোমাদের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন।’

নেতানিয়াহুর এই কৌশলগত ব্যর্থতার পরও ইসরায়েলের আঞ্চলিক কৌশলের কিছু অংশ টিকে আছে। এর মধ্যে রয়েছে গাজা, দক্ষিণ লেবানন ও সিরিয়ার দখল করা ভূখণ্ড, আবুধাবির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং সোমালিল্যান্ডকে কে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার। এই প্রকল্প আবারও চালু করা সম্ভব। কিন্তু নেতানিয়াহু যা হারিয়েছেন তা হলো বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন। আর শিগগিরই এমন আরেকজন প্রেসিডেন্ট আসার সম্ভাবনা কম।

বিষাক্ত জোট

গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যা যদি পশ্চিমা বিশ্বে ইসরায়েলকে শান্তিকামী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখার ধারণা ভেঙে দিয়ে থাকে, তবে ইরানের ওপর হামলা ওয়াশিংটনে সামরিক মিত্র হিসেবে ইসরায়েলের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও বড় ধাক্কা দিয়েছে। মতামত জরিপে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি রাজনৈতিক প্রচারণার ভাষাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ আইপ্যাক এখন ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে উঠছে। কম সংখ্যক নতুন রাজনীতিক এখন ইসরায়েলের অর্থ নিতে আগ্রহী। রিপাবলিকানদের মধ্যেও এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে যে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, যা আগে শুধু ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হিসেবে দেখা হতো।

এই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ইসরায়েলি লবি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক ও গোয়েন্দা জোটকে আইনের মাধ্যমে আরও স্থায়ী করার চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আইনত ইসরায়েলের ‘গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব’ নিশ্চিত করতে হয়। এখন ইসরায়েলি লবি কংগ্রেসে এমন দুটি নতুন ব্যবস্থা যুক্ত করতে চাইছে, যা মার্কিন নীতিনির্ধারণে ইসরায়েলকে অগ্রাধিকার দেবে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্টে এমন একটি ধারা যোগ করা, যা মার্কিন সরকারের সব বিভাগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমন্বয়ের জন্য একটি নির্বাহী কাঠামো তৈরি করবে। আরেকটি আইন ইনটেলিজেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে ইসরায়েল ও যেসব আরব দেশ তার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে, তাদের মধ্যে ব্যাপক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

তৃতীয় কৌশল হলো এমন অস্ত্র ও প্রযুক্তি সরবরাহের ব্যবস্থা তৈরি করা, যা মার্কিন কংগ্রেকে পাশ কাটিয়ে করা যাবে।

এসবই মূলত এমন একটি সামরিক সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা, যা এখন যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল—ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয়ের কাছেই নজরদারি ও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

হেরে যাওয়ার টিকিট

আবারও দেখা গেল, ইসরায়েলকে সমর্থন করা এখন এক ধরনের চাপ প্রয়োগের রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, যেসব বিষয় মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা, সেখানে সামরিক অভিযানের যুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। ইসরায়েলকে সমর্থনের রাজনৈতিক দায় যত বাড়ছে, আমেরিকাকে নিজের পাশে রাখতে ইসরায়েলের জবরদস্তির প্রয়োজনও তত বাড়ছে। কিন্তু যেভাবেই দেখা হোক, ইসরায়েল এখন ‘হেরে যাওয়ার টিকিটে’ উঠে বসেছে।

ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে এবং তার কৌশলগত সক্ষমতা আরও বেড়েছে। তারা তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ধরে রাখতে পেরেছে, যদিও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশ ছাড়তে হয়েছে। যেহেতু ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কখনোই পারমাণবিক বোমা তৈরির কর্মসূচি ছিল না এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বারাক ওবামার আমলে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যান, তার পরেই ইরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত শুরু করে। তাই এটি ইরানের জন্য বড় কোনো ছাড় নয়।

ট্রাম্প হয়তো বারবার দাবি করবেন যে তিনিই তেহরানকে পারমাণবিক বোমা অর্জন করা থেকে থামিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প বা মোসাদ কেউই কখনো ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে থামাতে পারবে না। প্রতি বছর যে সংখ্যক পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ইরান তৈরি করছে, তা এমন এক শক্তি, যাকে আর ‘বোতলে ভরা জ্বীনের’ মতো আটকে রাখা সম্ভব নয়। ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারও ধরে রেখেছে, যা প্রতিরোধের ক্ষমতা হিসেবে কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ও নির্ভুল বোমা হামলাও এই সক্ষমতাকে ধ্বংস করতে পারেনি।

ইরানের আঞ্চলিক অ-রাষ্ট্রীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক এখন সম্ভবত আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী। যুদ্ধ এই জোটকে আরও কার্যকর যুদ্ধ ইউনিটে পরিণত করেছে, যারা সমন্বিতভাবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালাতে সক্ষম। নিরস্ত্রীকরণ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্ন। কিন্তু লেবাননের ক্ষেত্রে তা বাস্তবতা থেকে ততটাই দূরে, যতটা দূরে ইরান নিয়ে ট্রাম্পের ধারণা ছিল।

ইরান দেখিয়েছে, তাদের মিত্ররা কেবল ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার নয়, যাদের তেহরানের নির্দেশে চালু বা বন্ধ করা যায়, বরং ইরান তাদের মিত্রদের রক্ষায় সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইরান ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ক পারস্পরিক। এই সপ্তাহে দক্ষিণ বৈরুতের দাহিয়া এলাকায়, যা হিজবুল্লাহর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানে বড় করে লেখা ‘ধন্যবাদ’ বার্তাসহ আলী খামেনির পোস্টার টানানো হয়েছে ।

উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অনিশ্চয়তা

এসবের ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। তাদের সম্পদ ও অজেয় থাকার যে বুদবুদ ছিল, তা ফেটে গেছে। গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল এখন কার্যত অর্থহীন। উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো—যেখানে সামরিক ঘাঁটি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে নিরাপত্তার গ্যারান্টর হিসেবে তুলে ধরেছিল, তা ইরানি ড্রোনের বিরুদ্ধে খুব সীমিত প্রতিরক্ষা দিতে পেরেছে। এখন মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লাভের চেয়ে বোঝা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

যুদ্ধের সময় কাতারে বিতর্ক শুরু হয়েছিল দুই মেরুতে– মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান তদারককারী মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, নাকি হামাসকে বের করে দেওয়া হবে। তবে ট্রাম্পের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতারের ভূমিকা আপাতত এই কঠিন সিদ্ধান্তের আশঙ্কা কমিয়েছে। দেখা গেছে, কাতারের জন্য ইরানকে আক্রমণ না করার বিনিময়ে মূল্য দেওয়া অনেক সহজ ছিল—যে পথ বেছে নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরতা।

ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া উপসাগরীয় সব রাষ্ট্রকেই বাস্তবতায় ফিরিয়ে এনেছে। বাহরাইন ও কুয়েতে আরব বসন্ত আমলের মতো বৈধতার সংকট এখনো রয়েছে। বিশেষ করে তাদের নিজস্ব শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে। ইরানের পুনরুত্থান এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ওমান ও কাতারের মতো কিছু দেশ, যারা এই চুক্তির মধ্যস্থতা করেছে, তারা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। কিন্তু সবার একই কৌশলগত দুশ্চিন্তা—এখন তারা কার দিকে ঝুঁকবে? চীন, ভারত নাকি পাকিস্তান? তাদের বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি এখন নির্ভর করছে ইরানের সদিচ্ছার ওপর, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার বিষয়ে।

সব নজর এখন গাজায়

যদি ট্রাম্প নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন অথবা ইসরায়েল আবার হামলা চালায়, তাহলে ইরান খুব সহজেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে বিশ্বের তেল, গ্যাস ও জ্বালানি পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ পথের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ইরান তার মূল্য আদায় করবেই। অনেক কিছু নির্ভর করবে ইরান কীভাবে তার প্রতিবেশীদের ওপর এই শক্তি প্রয়োগ করে। তাদের জন্য ভালো হবে যদি তারা ইসরায়েলের মতো ‘বিজয়ীই সব পাবে’ নীতি অনুসরণ না করে।

হতাশ নেতানিয়াহু আঞ্চলিক ক্ষমতা হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও তীব্র করতে পারেন। ফিলিস্তিনের জনগণ ইতিমধ্যেই ভয়াবহ বর্ণবাদী আচরণের শিকার। যেখানে ইসরায়েলি সেনারা ইচ্ছামতো চেকপয়েন্টে তাদের হত্যা করছে। ফলে নেতানিয়াহু তার ভূমি খালি করার প্রকল্প আরও নির্মমভাবে এগিয়ে নিতে পারেন।

ইসরায়েল এখন ফিলিস্তিনিদের ধারাবাহিক হত্যাকারীতে পরিণত হয়েছে এবং যত বেশি হত্যা করছে, তত বেশি হত্যার চক্রে আটকে যাচ্ছে। ট্রাম্প কিংবা ব্যঙ্গাত্মকভাবে নাম দেওয়া তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ কেউই নেতানিয়াহুকে গাজা উপত্যকার আরও বড় অংশ দখল করা থেকে থামাতে পারবে না।

হামাস যেমন নিরস্ত্র হবে না, তেমনি হিজবুল্লাহ বা ইরানও হবে না। এমনকি ইসরায়েল পুরো গাজা পুনর্দখল করলেও মূল সমস্যা একই থাকবে। গাজা দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের সামাজিক বন্ধন এতটাই শক্তিশালী যে নজিরবিহীন দমন-পীড়নও তা ভাঙতে পারেনি। গাজা ভেঙে পড়বে না। প্রতিটি পরিবার এখন তাদের দাফন না হওয়া স্বজনদের কবরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁরা এই ভূমি ছাড়বে না। যদি নেতানিয়াহু আবার গাজায় হামলা শুরু করেন, তাহলে বিশ্ব জনমত আবারও বিস্ফোরিত হবে। ইসরায়েলের অর্থনীতি বৈশ্বিক ব্যবসায়িক বয়কট মোকাবিলার মতো অবস্থায় নেই।

মধ্যপ্রাচ্য সত্যিই বদলে গেছে। কিন্তু নেতানিয়াহু যেমন চেয়েছিলেন, তেমনভাবে নয়। ইরানের ওপর হামলা গত ২৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইসরায়েল ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বড় কৌশলগত বিভাজন তৈরি করেছে। এর ফলে ইরানের ‘সফট পাওয়ার’ বেড়েছে। ফিলিস্তিন, লেবানন এবং পুরো অঞ্চলে প্রতিরোধের মনোভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে, যদিও সিরিয়া আর ইরানের বলয়ে নেই।

অনন্ত যুদ্ধ ও সম্প্রসারণবাদী মতাদর্শ নিয়ে ইসরায়েল খুব দ্রুতই একা নিজের সামরিক শক্তির সীমায় পৌঁছে যাবে। তখন পিছু হটা অনিবার্য হবে—সিরিয়ায় যেমন, শেষ পর্যন্ত লেবাননেও তেমন। এমন একটি প্রকল্পে যাত্রা শুরু করাটাই হয়তো শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে প্রমাণিত হবে।

* ডেভিড হার্স্ট, মিডলইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক।
- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত এবং কিছুটা সংক্ষেপিত।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী পর্যন্ত দখল করে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী পর্যন্ত দখল করে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন। ফাইল ছবি

চিকিৎসা আছে, তবু রোগটি গোপন রেখে যন্ত্রণায় ভোগেন মায়েরা by মানসুরা হোসাইন

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে নিজের শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মর্জিনা বেগম। বসতে রাজি নন তিনি। মুখে অস্বস্তির ছাপ। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, ‘এখন বসন যাইব না, এই জায়গা তো ভিইজ্যা যাইব।’

মর্জিনার বয়স প্রায় ৬০। ২০ বছর ধরে তাঁর অনবরত প্রস্রাব ঝরছে। এ কারণে কোথাও যাওয়া, মানুষের পাশে বসা তিনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন।

বাড়িতে সন্তান জন্ম দিতে গিয়েই এই স্বাস্থ্যগত জটিলতার মধ্যে পড়েন মর্জিনা। তখন তিনি তাঁর প্রথম সন্তান হারান। একই সঙ্গে হারান স্বাভাবিক জীবনও।

লজ্জা, অপমান আর একাকিত্ব নিয়ে বছরের পর বছর মর্জিনার মতো প্রায় ঘরবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন দেশের অসংখ্য নারী। তাঁদের এই নীরব যন্ত্রণার নাম—প্রসবজনিত ফিস্টুলা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে গত ১৩ মে কথা হয় খাগড়াছড়ির মর্জিনার সঙ্গে। তিনি বলেন, সব সময় ন্যাকড়া পরা ঝামেলার। অনেক চুলকায়। আবার বারবার কাপড় ধুতে হয়। এই সমস্যার কারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার ভয়ে মানুষের বাড়িতে যান না। কারও পাশে বসেন না।

ফিস্টুলা সেন্টারে আসার পর ডায়াপার পেয়েছেন মর্জিনা। এতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে তাঁর। তবে দীর্ঘক্ষণ ডায়াপার না পাল্টানোয় সেটিও ভিজে গিয়েছিল। এখন তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় আছেন।

ফিস্টুলা সেন্টারে ভোলার ৩৫ বছর বয়সী কুলসুম বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ১৬ বছর বয়সে। তৃতীয় সন্তানের জন্মের পর থেকে তিনি মল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। মূত্রনালি দিয়ে মল চলে আসে। গত সাড়ে ছয় বছর ধরে তিনি এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন।

কুলসুম বলেন, ‘কারও সঙ্গে মিশতে পারি না। পায়খানা ধরলে দৌড়ে যেতে হয়।’

তবে এই কঠিন সময়েও স্বামী ছেড়ে যাননি—এ কথা বলতে গিয়ে কুলসুমের চোখ ভিজে ওঠে।

সিরাজগঞ্জের বিলকিস বেগম বাড়িতে প্রসব করতে জটিলতায় পড়েন। তাঁর সন্তানটি মারা যায়। তখন থেকে তিনি প্রসবজনিত ফিস্টুলায় ভুগছেন। তাঁর স্বামী তাঁকে তালাক না দিলেও আরেকটি বিয়ে করেছেন। এখন এক ছেলে তাঁর দেখাশোনা করেন।

মর্জিনা, কুলসুম, বিলকিস—সবার জীবনই কাটছে এই প্রসবজনিত ফিস্টুলার ভয়াবহ যন্ত্রণা নিয়ে। নিরাপদ প্রসবসেবা না পাওয়ার খেসারত দিচ্ছেন তাঁরা বছরের পর বছর।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা কী?

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও ফিস্টুলা সার্জন বিলকিস বেগম চৌধুরী বলেন, তলপেট ও কোমরের নিচের হাড়গুলোকে একত্রে শ্রোণিচক্র বা পেলভিস বলে। প্রসূতির শ্রোণিচক্র তুলনামূলক ছোট হলে বা গর্ভের শিশুর মাথা বড় হলে প্রসবপথে শিশুর বের হতে বাধা সৃষ্টি হয়, যাকে বাধাগ্রস্ত প্রসব বলা হয়। বাধাগ্রস্ত প্রসবের কারণে দীর্ঘ সময় শিশুর মাথা প্রসবপথে আটকে থাকলে আশপাশের নরম টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে সেই অংশে পচন ধরে। কয়েক দিনের মধ্যে টিস্যু খসে পড়ে। যোনিপথের সঙ্গে মূত্রাশয় বা মলদ্বারের অস্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়। এতে অনবরত মল বা মূত্র বা উভয়ই বের হতে থাকে। এ অবস্থাই হলো প্রসবজনিত ফিস্টুলা।

চিকিৎসকেরা বলছেন, সঠিক সময়ে চিকিৎসার আওতায় এলে প্রসবজনিত ফিস্টুলা পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু নিরাপদ প্রসবসেবা না পাওয়ার কারণে এখনো বহু নারী ফিস্টুলার ভুক্তভোগী।

হাজারো নারী যন্ত্রণায়

দেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নিয়ে কোনো স্বতন্ত্র জাতীয় জরিপ হয়নি। তবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশসহ ৫৫টি দেশে একটি বৈশ্বিক গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ৩৫ জন প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত। এ হিসাবে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৩৩।

২০২২ সালে ‘বাংলাদেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলা: ক্লিনিক্যাল যাচাইকরণভিত্তিক সংশোধনসহ একটি জাতীয় জরিপের প্রাক্কলন’শীর্ষক গবেষণা ‘দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ’–এ প্রকাশিত হয়। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ১৭ হাজার ৪৫৭ জন নারী প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত।

গবেষণাগুলো বলছে, ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীদের একটি বড় অংশ বহু বছর চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় থাকে। অনেকের বয়স ৫০ বা ৬০ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁরা এখনো এই যন্ত্রণা বহন করে চলেছেন। ভুক্তভোগী নারীর প্রায় ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে নবজাতক মৃত অবস্থায় জন্ম নেয়।

ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারের প্রধান অধ্যাপক মুনা সালিমা জাহান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীর সংখ্যাটা হয়তো কম। তবে আক্রান্ত কোনো কোনো নারী ৩০ বছর ধরে যন্ত্রণা ভোগ করছেন। কাপড় বা ন্যাকড়া পরতে পরতে সংক্রমণ হচ্ছে। মূত্রপথে ঘায়ের মতো হয়ে যাচ্ছে।

মুনা সালিমা জাহান আরও বলেন, আক্রান্ত নারীর শরীর থেকে সারাক্ষণ মলমূত্রের গন্ধ, স্বামীর পরিত্যাগ, পরিবারের অবহেলা, প্রসবের সময় সন্তান হারানোর বেদনা—সব মিলিয়ে এই সব নারী এক কঠিন ও দুর্বিষহ জীবন পার করছেন।

লজ্জা ও গোপনীয়তার দেয়াল

প্রসবজনিত ফিস্টুলাকে বৈশ্বিকভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীকে সুস্থ করে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো, রোগটি লুকিয়ে রাখা।

খাগড়াছড়ির মর্জিনার ছেলে আবদুল হালিম বলেন, তাঁর মা এই স্বাস্থ্য সমস্যার বিষয়টি সব সময় গোপন রাখার চেষ্টা করেছেন। এ কারণে এত দিন তাঁর চিকিৎসা হয়নি। সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী তাঁর মাকে খুঁজে বের করেন। এখন তাঁকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে।

ইউএনএফপিএর মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট চিকিৎসক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ফিস্টুলা রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলে রোগের নিরাময় সম্ভব।

এই চিকিৎসক বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ও ইউএনএফপিএর সহায়তায় বাংলাদেশের ৩৫টি জেলা হাসপাতালে ‘ফিস্টুলা কর্নার’ চালু আছে। ফিস্টুলার উপসর্গ থাকা রোগীদের সেখানে বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠান মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা। রোগ নিশ্চিত হলে উন্নত চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারসহ সরকারি-বেসরকারি ২০টি ফিস্টুলা সেন্টারে পাঠানো হয়। রোগীদের যাতায়াত, পুনর্বাসনেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে প্রসবজনিত ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসার জন্য ১৬টি শয্যা নির্ধারিত আছে বলে জানান অনিমেষ বিশ্বাস। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১১৬ জন মিডওয়াইফ নিয়োগ দিয়েছে ইউএনএফপিএ।

বাল্যবিবাহ ও বাড়িতে প্রসবের খেসারত

চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধে বাড়িতে প্রসব কমিয়ে নিরাপদ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু দেশে এখনো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রসব বাড়িতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন না।

২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩’ অনুযায়ী, এখনো বাড়িতে প্রসবের হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। বড় একটা অংশের প্রসব অদক্ষ দাইয়ের হাতে হয়ে থাকে। চার বা ততোধিক প্রসবপূর্ব সেবা নেওয়ার হার মাত্র ৩৯ শতাংশ। প্রতি এক হাজার জীবিত নবজাতকের মধ্যে ২০ জন মারা যায়। প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১৩৬ জন মা মারা যান।

একই বছরে পিএলওএস গ্লোবাল পাবলিক হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ৫৩ দশমিক ১৮ শতাংশ প্রসব কোনো দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধান ছাড়াই বাড়িতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহেরও দায় রয়েছে।

দেশে প্রতি দুজন মেয়ের মধ্যে একজন বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। বিবিএস ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫–শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদন বলছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়েছে ৪৭ শতাংশের। ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৫৬ শতাংশ। কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার হার প্রতি হাজারে ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২ হয়েছে।

জাতীয় প্রসূতি ফিস্টুলা বার্ষিক প্রতিবেদনের (২০১৯-২০২৪) তথ্য বলছে, এই সময়ে শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৮৫ শতাংশই বাল্যবিবাহের শিকার ছিল। ৮৮ শতাংশের প্রথম সন্তান জন্ম হয়েছিল কিশোরী বয়সে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় অর্ধেকের শেষ প্রসব হয়েছিল বাড়িতে। আর ৪৮ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রসবে সহায়তা করেছিলেন অদক্ষ দাই বা স্বজনেরা। ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কুসংস্কার বা সনাতন বিশ্বাস হাসপাতালে না যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল। ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রসবের সঙ্গে সঙ্গেই ফিস্টুলা হয়েছে। আক্রান্ত নারীদের অধিকাংশই দীর্ঘ সময় চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় এই যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। ২৩ শতাংশ নারী ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিস্টুলায় ভুগছিলেন।

চিকিৎসায় সাফল্য ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূলের বৈশ্বিক উদ্যোগে যুক্ত হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ফিস্টুলামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউএনএফপিএ, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও সুইডিশ সিডার সহায়তায় সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।

সরকারের তৃতীয় জাতীয় কৌশলপত্রে (২০২৩-২০৩০) প্রসবজনিত ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীর সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং সব আক্রান্তকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্প্রসারণ, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদার, তৃণমূল পর্যায়ে মিডওয়াইফ নিয়োগ, জেলা হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রসূতি ও অস্ত্রোপচার সেবা নিশ্চিত করাসহ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ৩ হাজার ৮০৭ জন ফিস্টুলা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এই সময় ৩ হাজার ২৭ জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৭৯৫ জন সুস্থ হয়েছেন। অস্ত্রোপচারে সাফল্যের হার ৯২ শতাংশের বেশি।

অন্যদিকে জাতীয় ফিস্টুলা সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এখানে (সেন্টার) ৩৬৬টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। এর মধ্যে ৩০৭ জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। ১৬ জন আংশিক সুস্থ হয়েছেন। রোগীদের হাসপাতালে অবস্থানের গড় সময় ছিল ৫০ দিন।

‘কোনো মা যেন এই ভুল না করে’

চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক জীবন পেয়েছেন শেরপুরের জুলেখা বেগম। গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় শেরপুরে জুলেখার বাড়িতে বসে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বাড়িতে প্রসব করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন তিনি। অদক্ষ দাইয়ের টানাহেঁচড়ায় নবজাতকের মাথা আটকে গিয়েছিল। এরপর শুরু হয় অনবরত মলমূত্র ঝরার যন্ত্রণা।

সন্তান জন্মের পর সাত মাসের বেশি সময় ফিস্টুলার যন্ত্রণা সহ্য করেন ২৬ বছর বয়সী জুলেখা। মলমূত্র ধরে রাখতে না পারায় দিনে কয়েকবার তাঁকে গোসল করতে হতো। এই সমস্যার কারণে কখনো কখনো গভীর রাতেও গোসল করতে বাধ্য হতেন তিনি। মানুষ ভয় দেখাত, স্বামী তাঁকে তালাক দেবেন বা দ্বিতীয় বিয়ে করবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তেমনটা ঘটেনি।

জুলেখা বলেন, তাঁর মেয়ের জন্ম হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবেই হয়েছিল। ছেলের জন্মের সময় ভেবেছিলেন, বাড়িতে প্রসবে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। এই ভুলের খেসারত তাঁকে দিতে হয়। তিনি ফিস্টুলায় আক্রান্ত হন।

জুলেখা আরও বলেন, ‘লজ্জায় কারও বাড়িতেও যেতাম না। শুধু কাঁদতাম। আমি যে ভোগা ভুগছি, আর কোনো মা যেন এই ভুল না করে।’

স্থানীয় এক স্বাস্থ্যকর্মীর (‘শারমীনা আপা’) মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিস্টুলা সেন্টারের খোঁজ পান জুলেখা। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর এক মাস চিকিৎসা নিয়ে এখন তিনি সুস্থ। পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় তিনি একটি ছাগল পেয়েছেন।

ইউএনএফপিএর সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) গত বছর থেকে শেরপুরে ফিস্টুলা প্রতিরোধ ও রোগী শনাক্তকরণে কাজ করছে।

শেরপুরের সিভিল সার্জন মুহাম্মদ শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, গত এক বছরে জেলার নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতি উপজেলায় ৩১ জন ফিস্টুলা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২২ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। ১৭ জনকে সেলাই মেশিন ও ছাগল দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে নালিতাবাড়ীকে ফিস্টুলামুক্ত উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি মাসের সভার আলোচ্যসূচিতে ফিস্টুলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অনেকটা সুস্থ জামেনা-জোমেলা

শেরপুরের দুই বোন জামেনা ও জোমেলা দীর্ঘদিন ফিস্টুলায় আক্রান্ত ছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর এখন তাঁরা উভয়ে অনেকটা সুস্থ।

জামেনা বলেন, প্রস্রাব আটকে রাখতে পারতেন না বলে একসময় তাঁকে সবাই বিদ্রূপ করত। তবে এখন প্রায় স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছেন।

জোমেলা ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিস্টুলার যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। তিনি বলেন, সারাক্ষণ প্রস্রাব ঝরার কারণে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ পেলেও বারবার চাকরি হারাতে হয়েছে। তাঁর প্রথম সন্তান মৃত জন্ম নেয়। পরে যমজসহ আট সন্তানের জন্ম দিলেও বেঁচে আছে দুজন।

জুলেখার মতো এই দুই বোনও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন ‘শারমীনা আপা’–কে। তিনি সিআইপিআরবির জেলা সমন্বয়কারী (ফিস্টুলা) শারমীনা পারভীন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীদের খুঁজে বের করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, হাসপাতালে পাঠানোর কাজ চলছে।

বাড়ছে সচেতনতা

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে দেখা হয় ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মেহের বানুর সঙ্গে। ভাতিজা সাইফুল ইসলামের বাড়িতে তিনি থাকেন।

সাইফুল বলেন, তাঁর ফুফুর বিয়ে হয়েছিল ছোটবেলায়। প্রথম সন্তানের জন্মের পর থেকেই তিনি ফিস্টুলায় ভুগছেন। ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টারে তাঁর অস্ত্রোপচার হয়। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি।

ফিস্টুলা নিয়ে এখন মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে বলে মনে করেন সাইফুল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম বাড়িতে হয়। জন্মের পর নবজাতক মারা যায়। এর পরে তাঁর দুই সন্তান হয়। উভয় ক্ষেত্রে প্রসবের জন্য তিনি তাঁর স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।

খাগড়াছড়ির মর্জিনার ছেলে আবদুল হালিমও বলেন, মায়ের দীর্ঘদিনের কষ্ট দেখে তিনি সচেতন হয়ে যান। এই সচেতনতা থেকেই তিনি তাঁর স্ত্রী ও বোনকে প্রসবের সময় হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।

জুলেখা, জামেনা, জোমেলা, মেহের বানুরা জানালেন, অনিরাপদ প্রসবের কারণে নিজেদের দুর্বিষহ ভোগান্তির কথা তাঁরা নিজেদের চেনা-জানা প্রসূতিদের বলছেন। সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি করার পর প্রশ্ন উঠছে—এ যুদ্ধ ঠিক কিসের জন্য ছিল

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর যে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি ফুটে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে।

এ যুদ্ধের কারণে মানুষের কত বড় ক্ষতি হয়েছে, তা এরই মধ্যে স্পষ্ট। ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই সাধারণ নাগরিক।

কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং সেই সঙ্গে ইসরায়েল বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে। তেহরান সরকার তার সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হয়েছিল। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের ‘পরাশক্তি’ ইসরায়েল মিলে ইরানকে পঙ্গু বা ধ্বংস করার জন্য যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। কিন্তু ইরান সরকার শুধু টিকেই থাকেনি, বরং আগের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে।

ইরানে হামলার পর হরমুজ প্রণালি আটকে দেওয়ার কৌশল নিয়েছিল তেহরান। ফলে বিশ্বের মোট তেল-গ্যাস সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এ কৌশল ট্রাম্পকে একে একে এমন সব ছাড় মেনে নিতে বাধ্য করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর ইরানবিরোধী অংশ এবং ইসরায়েল সরকারকে ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

এই সমঝোতা স্মারক বা এমওইউতে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল বলছে, তা হতে পারে না। তারা লেবাননে স্বাধীনভাবে অভিযান চালাতে চায়। আর এ বিষয়টি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতভেদ আরও তীব্র করতে পারে। পাশাপাশি এটি ইরানের সেসব কট্টরপন্থীকে সুযোগ করে দিতে পারে, যাঁরা মার্কিনদের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির ঘোর বিরোধী।

চুক্তির ভাষা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের পাল্টা অবরোধ তুলে নেবে (এরই মধ্যে তুলে নিয়েছে)। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে, যাতে ইরান তেল রপ্তানি করে শত শত কোটি ডলার আয় করতে পারে। এ ছাড়া বিদেশে আটকে থাকা ইরানের আরও শত শত কোটি ডলারের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়ায় আসতে কঠিন আলোচনায় বসার আগেই এসব ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার আগের দিন, অর্থাৎ গত ২৭ ফেব্রুয়ারির অবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্যই এ মূল্য চোকাতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। ওই দিন জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খোলা ছিল। আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকেরা একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

এই সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার অর্থ হলো, আলোচকেরা আবার নিজেদের কাজে ফিরবেন এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজগুলো আবার চলাচল করতে পারবে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এই যুদ্ধবিরতির একমাত্র অর্জন হলো সম্ভবত হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগেই এটা খোলা ছিল। আর এ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য আমরা এখন উল্টো ইরানকে টাকা দেব!’

যুদ্ধটা ঠিক কিসের জন্য ছিল—এ প্রশ্ন এড়ানোর কোনো উপায় নেই এবং প্রশ্নটি থেকেই যাবে। এটিকে এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে ধরা যায়।

এ চুক্তির ফলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনও শেষ হয়ে যেতে পারে। আগামী অক্টোবরে দেশটিতে নির্বাচন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পরিকল্পনা ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল দেশটির অহংকারী সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনী। এটি ছিল ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার কারণে নির্বাচনে তাঁকে ইসরায়েলি ভোটারদের হিসাব দিতে হবে। নেতানিয়াহুর কঠোর সামরিক নীতি গ্রহণ ও কূটনীতিকে পাত্তা না দেওয়ার অন্যতম একটি কারণ ছিল, ইসরায়েলের ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ (নিরাপত্তার রক্ষক) হিসেবে নিজের হারানো সম্মান অন্তত কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে তেহরান সব সময়ই জানত। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, তাদের কূটনীতিক ও গুপ্তচরেরাও এ বিষয়ে ভালোভাবে অবগত ছিলেন।

কিন্তু ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন একজন সতর্ক ও প্রবীণ নেতা। তিনি এ প্রণালিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ঝুঁকি নিতে চাননি।

যুদ্ধের প্রথম দিকেই ইসরায়েলের বোমা হামলায় খামেনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা নিহত হন। এরপর তাঁর উত্তরসূরিরা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁরা টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছেন। তাই তাঁরা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে একটুও দ্বিধা করেননি।

বিশ্ব অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরার এ ক্ষমতার জোর ইরান এখন আবিষ্কার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরে শত শত কোটি ডলার খরচ করে ইরান যেসব মিত্র ও অনুগত গোষ্ঠী তৈরি করেছিল, তার চেয়ে এ প্রণালি বন্ধ করার কৌশল অনেক বেশি কার্যকর ও সস্তা অস্ত্র তাদের (তেহরান)।

২০২৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল–আসাদ সরকারের পতন হয়। এটি ছাড়া ইরানের কথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেসিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয় কোনোমতে টিকে আছে। কিন্তু ইসরায়েল এ বলয়ের এতটাই ক্ষতি করেছে যে এরা আর কোনো ‘প্রতিরোধ’ গড়তে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

পারমাণবিক কর্মসূচির পেছনেও প্রচুর টাকা ঢেলেছে ইরান। যদিও তারা সব সময় দাবি করে এসেছে যে পরমাণু অস্ত্র তৈরি তাদের লক্ষ্য নয়। তবে নিঃসন্দেহে এটি তেহরানকে একটি বড় ক্ষমতা ও হুমকি দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু এ কারণেই একটি যুদ্ধ শুরু হয়। যদিও এ যুদ্ধে ইরান সরকার টিকে গেছে, তবে দেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করাটা ছিল বেশ সহজ। এর প্রভাবও ছিল খুব দ্রুত ও ভয়াবহ। এর ফলে আরবের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমানবাহিনী একের পর এক সামরিক সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু কৌশলগত পরাজয় এড়ানোর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। কারণ, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের নেওয়া কৌশল ছিল কিছু ভুল ও দুর্বল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে।

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ভেবেছিল, সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করলেই সরকারের পতন হয়ে যাবে। কিন্তু প্রায় গত ৫০ বছর ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে তারা ধ্বংসের সব ধরনের চেষ্টা রুখে দিতে পারে।

ইরান ভেনেজুয়েলার মতো লাতিন আমেরিকার দুর্নীতিগ্রস্ত একনায়কতান্ত্রিক দেশ নয় যে তার নেতাকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করার পরই দুর্বল হবে। ইরান সরকার নিঃসন্দেহে ‘নিপীড়নমূলক’। গত জানুয়ারিতে ইরানের রাস্তায় শাসকগোষ্ঠীর লোকজন কঠোর হাতে বিক্ষোভকারীদের দমন করেছেন। কিন্তু এ সরকার তার মতাদর্শ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও জাতীয় নিরাপত্তার ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৮০-র দশকে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আত্মত্যাগ এবং টিকে থাকার যে মানসিকতা তৈরি হয়েছিল, তার ওপরই এ সরকার নির্ভরশীল।

যখন ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়, ট্রাম্প বলেছিলেন, তেহরান সরকারের পতন হবে। তিনি ইরানের জনগণকে তাঁদের দেশ ফিরিয়ে নেওয়ার এ বিরল সুযোগের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছিলেন। কিছুদিন পরই তিনি ইরান সরকারকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের আগে যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁদের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর জন্য বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন নেতানিয়াহু। কী ঘটতে যাচ্ছে, তা বোঝাতে তিনি বাইবেলের ভাষাও নিজের মতো করে ব্যবহার করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যৌথ বাহিনীর এই জোট আমাকে সেই কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে, যার জন্য আমি ৪০ বছর ধরে অপেক্ষা করেছি। এই “সন্ত্রাসী” সরকারকে আমরা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেব।’

সমঝোতা স্মারক কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এটি মূলত তাদের মধ্যকার সবচেয়ে বড় সমস্যা—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করার একটি সমঝোতা। তবে এ চুক্তির শুরুতেই ইরানের জন্য বেশ কিছু বড় সুবিধার কথা বলা হয়েছে। আলোচনা সামনে এগোলে যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে বলে জানিয়েছে।

পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে সামনের ৬০ দিনের আলোচনা কতটা সফল হবে, তার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে। এ সময়সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে। সম্ভবত তা বাড়ানো হবেও। কারণ, বিষয়গুলো খুবই জটিল। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। অনেক কিছুই ভুল পথে চলে যেতে পারে। ওয়াশিংটন, তেহরান ও ইসরায়েলের কট্টরপন্থীরা কেউই চায় না এ চুক্তি সফল হোক।

আগামী আলোচনায় ইরান হয়তো অতিরিক্ত দাবিদাওয়া করে বসতে পারে। ফলে তারা সেই অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো হারাতে পারে, যা তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে বাঁচাতে পারত।

তারপরও যে যুদ্ধ হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার হুমকি তৈরি করেছে, তার চেয়ে এ চুক্তি বহুগুণে ভালো।

যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মনের মতো একটি পারমাণবিক চুক্তি হয় এবং উভয় পক্ষ নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। তবে এটি একটি বিশাল ‘যদি’, যা দীর্ঘ ও কঠিন এক আলোচনার শেষ প্রান্তের ওপর নির্ভর করছে।

* লেখক: জেরেমি বোয়েন, বিবিসির আন্তর্জাতিক–বিষয়ক সম্পাদক

ডোনাল্ড ট্রাম্প, মোজতবা খামেনি ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মোজতবা খামেনি ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কোলাজ ছবি

রিগ্যান থেকে ট্রাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের পতন ও চীনের উত্থানের গল্প by মুহাম্মদ তাসনীম আলম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দুই পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের এক নম্বর শক্তি। কিন্তু তাদের সেই স্থান দখল করতে যাচ্ছে চীন। সিঙ্গাপুরের সাবেক কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ এবং ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ কিশোর মাহবুবানি ‘দ্য এশিয়ান টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ে বিশ্বশক্তি হিসেবে ওয়াশিংটনের পতন এবং বেইজিংয়ের উত্থানের গল্প বলেছেন। সেই বই নিয়ে আমাদের এই পর্যালোচনা।

চলতি শতাব্দীর শুরুটা কেমন ছিল, তা গভীরভাবে ভাবলে আমাদের অনেকের মনে হয়তো ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার কথা মনে পড়ে। কিন্তু ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর নীরবে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল, যার ফলাফলকে ভূরাজনীতির অনেক বিশেষজ্ঞ নাইন–ইলেভেনের হামলার ঘটনার চেয়েও বেশি সুদূরপ্রসারী বলে মনে করেন। তা হলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) চীনের পদার্পণ।

অবশ্য ডব্লিউটিওর সদস্য হওয়ার আগে থেকে কিছুটা বড় পরিসরে চীনের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক পরিসরে উন্মুক্ত হতে শুরু করেছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সদস্য হওয়ায় তাতে রীতিমতো হাইপারসনিক গতি যুক্ত হয়। ২০২০ সাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ৪০ বছরে দেশটির প্রায় ৮০ কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উঠে আসে।
এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম মধ্যবিত্ত শ্রেণির দেশে পরিণত হয়েছে কমিউনিস্ট (সিপিসি) শাসিত চীন। এই বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোক্তা গোষ্ঠী নিয়ে দেশটির খুচরা বাজার যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। এই সুবিশাল ভোক্তা গোষ্ঠীই চীনের অর্থনীতির প্রাণভোমরা।

তবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে চীনের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এখনো ছোট। ২০২৪ সালে চীনের মোট জিডিপি (নমিনাল) ছিল ১৮ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের মোট জিডিপি ছিল ২৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু বর্তমানে যে গতিতে বেইজিংয়ের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে, তাতে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে মার্কিন অর্থনীতিকে টপকে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি হয়ে যেতে পারে চীন।

মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য এন্ড অব হিস্টোরি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান’ বইয়ে একটি বাঁক পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তিনি দাবি করেন, সোভিয়েত রাশিয়ার বিলুপ্তি এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা সভ্যতা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের শেষ ধাপে পৌঁছেছে। তাই পশ্চিমা সমাজের নতুন বিশ্বের সঙ্গে বড় ধরনের কাঠামো ও কৌশলগত বোঝাপড়া করার কোনো দরকার নেই; বরং পশ্চিমা বিশ্বের বাইরের সমাজকেই প্রতিনিয়ত সমন্বয় ও সমঝোতা করতে হবে।

কিন্তু এই ‘একগুঁয়ে’ ও ‘দাম্ভিক’ সিদ্ধান্ত পশ্চিমাদের পতন ডেকে আনে। পশ্চিমাদের আত্মতুষ্টির ‘মহাঘুমের’ এই কালে চীন ও ভারত ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। পুরোনো এই দুই শক্তি চলে আসতে শুরু করছে বিশ্বমঞ্চের কেন্দ্রে।

সিঙ্গাপুরের বিশিষ্ট কূটনীতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ কিশোর মাহবুবানির ‘দ্য এশিয়ান টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ের পাতায় পাতায় এ রকম তথ্য-উপাত্তের অনেক সরস বিশ্লেষণ দেখা যায়। তাঁর মতে, চলতি শতাব্দী এশিয়ার। এশিয়ার নেতৃত্বেই আগামী ১০০ বছর বিশ্ব, বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতি পরিচালিত হবে।

চীন হবে এই বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান চালক। ভারত হবে দ্বিতীয় প্রধান নিয়ামক। কোয়াডের মতো সামরিক কোনো জোট নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় আঞ্চলিক জোট (আসিয়ান) এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিস্তৃত ও প্রগতিশীল অংশীদারত্ব চুক্তির (সিপিটিপিপি) মতো অর্থনৈতিক জোট হবে নতুন শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক শক্তি।

২০২১ সালে সিঙ্গাপুরের প্রকাশনা সংস্থা ‘স্প্রিঙ্গার নেচার’ থেকে প্রকাশিত মাহবুবানির কিছু ছোট-বড় প্রবন্ধ ও সাক্ষাৎকারের সংকলন ‘দ্য এশিয়ান টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ে তাঁর একটি প্রধান অনুসিদ্ধান্ত হলো: চলতি শতাব্দীর অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির নেতৃত্ব এশিয়ার হাতে, এর ব্যত্যয় হওয়ার তেমন একটা সুযোগ নেই। তাই পুরো বিশ্বের কল্যাণের কথা চিন্তা করে পশ্চিমাদের এই বাস্তবতা মেনে নেওয়াই শ্রেয়। ‘হ্যাজ দ্য ওয়েস্ট লস্ট ইট?’ কিংবা ‘হ্যাজ চায়না ওআন?’ বইয়ে মাহবুবানি নিজের ধারণাগুলোর আরও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

গত বছর প্রকাশিত মাহবুবানির আত্মজীবনী ‘লিভিং দ্য এশিয়ান সেঞ্চুরি: অ্যান আনডিপ্লোমেটিক মেমোয়ার’ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ২৪ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে একটি অভিবাসী সিন্ধিভাষী হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। নিজের আত্মজীবনীতে শৈশব-কৈশোরের দারিদ্র্যের বেড়াজাল ছিন্ন করে কীভাবে দেশ-বিদেশের অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাঁর জীবনের সঙ্গে এশিয়ার উত্থান-পতন কীভাবে যুক্ত, সেসবের মুগ্ধকর বর্ণনা দিয়েছেন মাহবুবানি।

মাহবুবানির মতে, খ্রিষ্টাব্দ ১ থেকে ১৮২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলো ছিল এশিয়ায়—কখনো চীন, কখনো ভারত। কিন্তু ঘটনাক্রমে পরবর্তী ২০০ বছরের নেতৃত্ব পশ্চিমাদের হাতে চলে যায়। নেতৃত্ব পেয়ে পশ্চিমারা চীন ও ভারতের মতো কয়েক হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতার ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছে, বিভিন্নভাবে তাদের অপমানিত করেছে। সুখবর হলো, এই দিন শেষ হতে চলেছে।

পশ্চিমাদের নেতৃত্ব কীভাবে অস্তগামী হতে চলেছে, তার প্রাঞ্জল বর্ণনা দেওয়ার পাশাপাশি গত ২০০ বছরে কতটা চমকপ্রদভাবে তারা উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল, সেটারও হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা দিয়েছেন মাহবুবানি। তিনি বলেন, ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা ঘোষণার পর গত আড়াই শ বছরে অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মানব জাতির ইতিহাসে এমনটি আর কখনো দেখা যায়নি।

পশ্চিমাদের দান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ঘিরে নিয়মনীতি-ভিত্তিক যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সেটার প্রায় সবকিছু পশ্চিমা সভ্যতার দান—এ কথা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেন মাহবুবানি। তিনি মনে করেন, পশ্চিমাদের এসব প্রতিষ্ঠানের কারণেই মানব জাতি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে রক্ষা পেয়েছে।

তবে নিজেদের অসংগতি, দ্বিচারিতা ও কপটতা উন্মোচনে পশ্চিমা পণ্ডিত ও সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তা ভয়ংকর বলে মনে করেন ২০০১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০২ সালের মে মাস পর্যন্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী সিঙ্গাপুরের সাবেক এই কূটনীতিক।

তবে জর্জ এফ কেনান ও হেনরি কিসিঞ্জারের মতো প্রয়াত ঝানু মার্কিন কূটনীতিক এবং জন এফ কেনেডি ও বিল ক্লিনটনের মতো প্রেসিডেন্টের প্রশংসা করে থাকেন মাহবুবানি। আলোচ্য বইটির অসংখ্য জায়গায় তিনি বলেছেন, সোভিয়েত রাশিয়াকে বন্দুকের একটি দানাও খরচ না করে ভেঙে দেওয়ার বড় কৃতিত্ব জর্জ কেনানের। কারণ, সোভিয়েত রাশিয়াকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়নে ওয়াশিংটনকে তিনিই সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছিলেন।

জর্জ কেনান (১৯০৪-২০০৫) ১৯৪৭ সালে তাঁর ‘দ্য সোর্সেস অব সোভিয়েট কন্ডাক্ট’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে বিশ্ববাসীর মধ্যে কিছু প্রয়োজনীয় ধারণা তৈরি করতে পারছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ধারণাগুলো হলো, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ, যেটি জানে তার কী দরকার, যে নিজের সমস্যাগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করতে এবং বিশ্বশক্তি হিসেবে অর্পিত দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করতে পারছে। যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ, যার এমন একটি “আধ্যাত্মিক জীবনীশক্তি” রয়েছে, যার মাধ্যমে দেশটি সমসাময়িক প্রধান মতাদর্শগুলোর মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে।’

‘আধ্যাত্মিক সংকটে’ পশ্চিমা বিশ্ব

মাহবুবানির মতে, জর্জ কেনান ‘আধ্যাত্মিক জীবনীশক্তি’ বলতে মার্কিন নাগরিকদের ধর্মভাবকে বোঝাননি; বরং তিনি দেশটির সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সামর্থ্যের কথা বুঝিয়েছেন।

মাহবুবানি মনে করেন, নিজ দেশের ধনী-গরিব বৈষম্য, দেশে দেশে সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ বা সরকার পতনের নেতৃত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র জাতি হিসেবে আধ্যাত্মিক সংকটের মুখে পড়েছে।

এই কূটনীতিকের ধারণা, কেনান জীবিত থাকলে টুইন টাওয়ারে হামলার প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৫ লাখ কোটি ডলার যুদ্ধের বিরোধিতা করতেন। এর বদলে এই অর্থ মার্কিন নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয়ের পরামর্শ দিতেন। এমনকি মৃত্যুর দুই বছর আগে ২০০৩ সালে ইরাকে হামলারও বিরোধিতা করেছিলেন জর্জ কেনান।

মধ্যপ্রাচ্যে ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র যখন ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ লাখ লাখ কোটি ডলার ব্যয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখন নজিরবিহীন গতিতে নিজেদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করে চলেছে চীন। ২০২০ সাল পর্যন্ত আগের ৪০ বছরে চীন অর্থনৈতিকভাবে যতটা এগিয়েছে, প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতাটির ইতিহাসে এমনটি আর কখনো ঘটেনি।

অন্যদিকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী ৩০ বছরে বিশ্বে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিম্ন আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষের আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। কিন্তু একই সময়ে দেশটির ধনী ও অতিধনী ১ শতাংশ মানুষের আয় লাগামহীনভাবে বেড়েছে। ফলে মার্কিন শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সীমাহীন অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

২০১৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী মার্কিন অধ্যাপক অ্যাংগাস ডিটন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে ‘হতাশার সাগর’ সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী দেশটির আরেক অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই. স্টিগলিৎস ও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান পল ভল্কারের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রে এখন আর গণতন্ত্র নেই, যা চলছে তা প্লুটোক্রেসি বা ধনিক শ্রেণির শাসন।

রিগ্যানবাদের খেসারত

এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ধনকুবের ব্যবসায়ী প্রথমবারের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পতন শুরু হয়েছিল আরেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের (১৯৮১-১৯৮৯) হাত ধরে। রিগ্যান প্রশাসনের কর হ্রাস, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং বাজার সংস্কারের ফলে উচ্চ আয়ের মানুষ ও করদাতাদের সুবিধা বৃদ্ধি পেলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থার অবনতি ঘটে, আর্থিক বৈষম্য বৃদ্ধি করে।

১৯৮১ সালে অভিষেক অনুষ্ঠানে রিগ্যান বলেছিলেন, ‘সরকার আমাদের সমস্যার সমাধান নয়, বরং খোদ সরকারই সমস্যা।’ তাঁর সরকারের গৃহীত নীতি রিগ্যানবাদ নামে পরিচিত।

প্রায় একই সময়ে যুক্তরাজ্যে একই ধরনের নীতি শুরু করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার। রিগ্যান-থ্যাচারের নীতির কারণে বাজারের ‘অদৃশ্য হাতের’ জোরের কাছে সরকারের ‘দৃশ্যমান হাত’ দুর্বল হতে থাকে। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনামের মতো চীনও অদৃশ্য ও দৃশ্যমান হাতের মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যেতে থাকে।

মাহবুবানি মনে করেন, রিগ্যান নতুন উদারনৈতিক অর্থনীতির যেসব চরম বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা যুক্তরাষ্ট্র কখনো আন্তরিকভাবে পুনর্বিবেচনা করে দেখার গরজ বোধ করেনি। তার বদলে পশ্চিমা পণ্ডিতেরা বলতে শুরু করেন, বিশ্বায়নের দিন শেষ। কিন্তু পশ্চিমা পণ্ডিতদের এই মনোভাব কপটতা ছাড়া কিছু নয়।

রিগানের মাধ্যমেই পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শেষের শুরু। কিন্তু সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের কৃতিত্বের কারণে তাঁর এসব ব্যর্থতা তেমন একটা আলোচিত হয় না। রিগ্যান যা শুরু করেছিলেন, সেটার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকছেন ট্রাম্প।

বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ, করোনা ব্যবস্থাপনায় চীন ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাফল্যের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা, বাইডেনের কাছে হারার পর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলাকে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের পতনের কয়েকটি শীর্ষবিন্দু।

ওয়াশিংটনের অভিযোগ নাকচ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেইজিংয়ের উত্থান নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ প্রধানত দুটি। প্রথমটি অর্থনৈতিক। ওয়াশিংটনের দাবি, বেইজিংয়ের অন্যায্য নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্বিতীয়তটি রাজনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক। মাহবুবানির মতে, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক ও রাজনীতিকদের এই দুই দাবির কোনোটি সঠিক নয়।

মাহবুবানি যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিতে না পেরেই মূলত সোভিয়েত রাশিয়ার পতন হয়েছিল। ইতিহাস থেকে চীন এই শিক্ষা ভালোভাবে নিয়েছে। তারা এই ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে বদ্ধপরিকর। তাই চীন কৌশলী নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতিকে অব্যাহতভাবে চাঙা রাখছে, পরিবেশ-পরিস্থিতির নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংকট উতরাতে চেষ্টা করছে।

চীন অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারিত করে নিজ দেশে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি সমানতালে রপ্তানিও বৃদ্ধি করে চলেছে। চীনের আত্মবিশ্বাসী অগ্রযাত্রার মুখে নীতিগত দুর্বলতার কারণে চাপ বোধ করছে যুক্তরাষ্ট্র।

চীনের উত্থানকে রাজনৈতিকভাবে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা যেভাবে হুমকি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে, সেটার ভিত্তি নেই বলে মনে করেন মাহবুবানি। তাঁর মতে, পরাশক্তি মাত্রই স্বার্থপর, নিষ্ঠুর। তারা সব সময় নিজেদের জাতীয় স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে।

সিঙ্গাপুরের সাবেক এই কূটনীতিক মনে করেন, অতীতের যেকোনো পরাশক্তির মতো চীনও তা–ই। কিন্তু লক্ষ্য অভিন্ন হলেও চীনের ধরন আলাদা। তাঁর মতে, চীন আত্মবিশ্বাসী (এসার্টিভ) হলেও আক্রমণাত্মক (এগ্রেসিভ) নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানকাল

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের পরাশক্তির রাজনীতি বিশেষজ্ঞ গ্রাহাম অ্যালিসন সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিয়ত চীনকে উপদেশ দেওয়া বেশ উপভোগ করে। ওয়াশিংটন হরদম বলে যাচ্ছে, আপনারা আমাদের মতো হোন। কিন্তু তাঁদের খেয়াল রাখা দরকার, প্রেসিডেন্ট থিয়োডর রুজভেল্টের আমলে (১৯০১-১৯০৯) গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের শুরুর দিনগুলোতে ওয়াশিংটন স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

অ্যালিসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পুয়ের্তো রিকো, গুয়াম, ফিলিপাইন অধিগ্রহণ করেছিল, নিজেদের শর্তে চুক্তিতে সম্মত না হলে জার্মানি ও যুক্তরাজ্যকে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছিল, নতুন দেশ পানামা তৈরি করতে কলম্বিয়ায় বিদ্রোহে সহায়তা দিয়েছিল।

চীনের উত্থান

উদীয়মান শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানকালের এসব কাজকে যদি স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে সেই তুলনায় চীন গত চার দশকের বেশি সময়ে তেমন কিছুই করেনি। ১৯৮৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে সামুদ্রিক সংঘর্ষের পর থেকে সীমান্তের বাইরে একটিও গুলি চালায়নি চীন। অর্থাৎ জাতিসংঘের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের মধ্যে চীনই একমাত্র দেশ, যেটি গত ৪৫ বছরে কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি।

অবশ্য ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চীন ও ভারতের সেনারা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ভয়াবহ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তা কারও সহায়তা ছাড়া নিজেরাই দ্রুত বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে এমন সংঘাতে না জড়ানোর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছিল।

প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বেইজিংয়ের দ্বন্দ্ব আছে। উইঘুরে মুসলিম নিপীড়ন, তাইওয়ানের বাক্‌স্বাধীনতার সংকোচন বা তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসনের আশঙ্কা আছে। এসব বিষয়সহ চীনের ‘এক দেশ এক নীতি’ তথা গণতন্ত্রহীনতা নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ ও অভিযোগ আছে।

এসব বিষয় মাহবুবানি নানা যুক্তিতর্ক দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি চীনের মতো প্রাচীন সভ্যতার উত্থানকে উদ্যমের সঙ্গে সমর্থন করেন। তাঁর বিশ্লেষণে যথেষ্ট ফাঁকফোকর আছে, যা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে কাউকে তেমন একটা বেগ পেতে হবে না।

মাহবুবানির একটি সাধারণ যুক্তি, চীন রাজনৈতিকভাবে কর্তৃত্ববাদী হলেও সে কিন্তু তা অন্য দেশে রপ্তানি করছে না। তাদের মনোযোগ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকেই বেশি নিবদ্ধ। বেইজিং কী পরিমাণে পুঁজিবাদী, তা পশ্চিমাদের ঠিকমতো জানা আছে কি না সন্দেহ! চীনে গণতন্ত্র না থাকলেও মেধাতন্ত্র (মেরিটোক্রেসি) আছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে চলছে ধনিক শ্রেণির (প্লুটোক্রেসি) শাসন। সবচেয়ে বড় কথা, চীনের শাসনব্যবস্থা ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে, মানবাধিকার নিয়েও তারা নিজেদের মতো করে বিভিন্ন বিষয় ভাবছে। মাহবুবানির এসব বক্তব্য বাগাড়ম্বরের মতো শোনালেও পশ্চিমাদের চোখে বিশ্বস্ত সিঙ্গাপুরের সাবেক এই প্রাজ্ঞ কূটনীতিকের এসব কথার যথেষ্ট গুরুত্ব আছে।

মাহবুবানির পর্যবেক্ষণ, ট্রাম্প যেভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (ডব্লিউএইচও) নানা আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন, তা পক্ষান্তরে চীনকে শক্তিশালী করেছে। তবে তিনি মনে করেন, আগামী এক থেকে দেড় দশকের মধ্যে চীন বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হলেই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র বা তার পশ্চিমা মিত্ররা মুখ থুবড়ে পড়বে, তা কিন্তু নয়।

ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন একটি মহাশক্তির উত্থান হয়, তখন পতনশীল শক্তির সঙ্গে প্রায় সময় উদীয়মান শক্তির রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও ইতিহাসে এর কিছু চমৎকার ব্যতিক্রম আছে। মাহবুবানির মতে, নিজেদের পতনশীল অবস্থা এবং চীন-এশিয়ার উত্থানকে মেনে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উচিত নতুন এই মহাযাত্রা থেকে উপকৃত হওয়া।

ওয়াশিংটনে কি নতুন হাওয়া বইছে

ওয়াশিংটনের প্রতি মাহবুবানির বিনম৶ উপদেশ, দয়া করে চীনের উত্থানকে ঠেকানো বা আটকানোর চেষ্টা না করে এই পণ্ডশ্রমে ‘মুলতবি’ দেন। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে ওয়াশিংটন মাহবুবানির কথা কিছুটা হলেও শুনতে শুরু করেছে। কিন্তু এটা কত দূর গড়াবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে আগের মেয়াদের বাণিজ্যযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় সারা বিশ্বের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধ শুরু করেন। তবে চীনের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত এই নিষ্ফল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘মুলতবি’ দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠিক ‘মুলতবি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এর কিছুদিন পর বাহরাইনে অনুষ্ঠিত বার্ষিক নিরাপত্তা সম্মেলন ‘মানামা সংলাপে’ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড বলেন, ওয়াশিংটন ‘সরকার পরিবর্তন (রেজিম চেঞ্জ) বা রাষ্ট্রগঠনের’ নীতি থেকে সরে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার এই দুই ঘোষণায় মাহবুবানির এক দশকের বেশি সময়ের লেখালেখির স্পষ্ট প্রতিধ্বনি রয়েছে।

সতীর্থদের প্রতি ক্লিনটনের উপদেশ

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (১৯৯৩-২০০১) হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর ২০০৩ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি রাজনৈতিক সতীর্থদের উদ্দেশে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে সে চিরদিন এক নম্বর বিশ্বশক্তি থাকবে, তাহলে তাকে অব্যাহতভাবে একতরফা আচরণ করতে হবে।

ক্লিনটন বলেন, আর যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্বিতীয় হওয়াটাকে মেনে নিতে পারে, তাহলে তাকে দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হয়, এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে বিধিবিধান, অংশীদারত্ব ও শৃঙ্খলাবদ্ধ আচরণের চর্চা থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি বিশ্ব গড়তে হবে, যেখানে সে দ্বিতীয় হলেও তার জীবনযাত্রা নিজের পছন্দ অনুযায়ী থাকবে।

মাহবুবানির মতে, মার্কিন পণ্ডিত ও নীতিপ্রণেতারা যত তাড়াতাড়ি ক্লিনটনের কথা আমলে নেবেন, ততই তাঁদের মঙ্গল। ওয়াশিংটনের উচিত কিসিঞ্জারের পরামর্শ অনুযায়ী, উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সঙ্গে কীভাবে চলতে হবে, সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন করা।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান থেকে গোপনে চীন সফরের মাধ্যমে কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিলেন কিসিঞ্জার।

সিঙ্গাপুরের সাবেক এ কূটনীতিক মনে করেন, চীন জাতিসংঘসহ পশ্চিমাদের প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ও সংগঠনগুলো ধ্বংস করতে চায় না; বরং উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে এসব সংস্থায় নতুন উদ্দীপনা যুক্ত করতে চায়। তাই ‘খাটো’ না করে পশ্চিমাদের উচিত চীনের শান্তিপূর্ণ উত্থানকে স্বাগত জানানো, তার সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে আচরণ এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

বৈশ্বিক গ্রাম থেকে ক্রমশ একটি বড় ‘জাহাজে’ পরিণত হওয়া পৃথিবীতে করোনার মতো মহামারি কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সংকট মোকাবিলায় পশ্চিমাদের উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ না করে উপায় নেই বলে মনে করেন মাহবুবানি।

কিন্তু চীনের শান্তিপূর্ণ উত্থান কি আদৌ সম্ভব হবে? নাকি আগামী এক থেকে দেড় দশকের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রক্তগঙ্গা বইবে, সেটা বেশ জটিল এক প্রশ্ন।

সিঙ্গাপুরের সাবেক কূটনীতিক কিশোর মাহবুবানি শিক্ষাবিদ হিসেবেও সুপরিচিত। তিনি চীন, পশ্চিমা বিশ্ব ও ভূরাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন
সিঙ্গাপুরের সাবেক কূটনীতিক কিশোর মাহবুবানি শিক্ষাবিদ হিসেবেও সুপরিচিত। তিনি চীন, পশ্চিমা বিশ্ব ও ভূরাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। ছবি: কিশোর মাহবুবানির ফেসবুক পেজ থেকে