Thursday, August 13, 2026

কেমন আছে রাজবাড়ী জেলার নদীগুলো by তুহিন ওয়াদুদ

রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা পদমদী গ্রাম। সেখানেই শায়িত আছেন বাংলা ভাষার বিখ্যাত লেখক নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, গদ্যশিল্পী মীর মশাররফ হোসেন। তাঁর ১৭৮তম জন্মবার্ষিকী স্মরণে ১৩ নভেম্বর ২০২৫ বাংলা একাডেমির আয়োজনে পদমদীতে মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্রে আলোচনা অনুষ্ঠান ছিল। আমি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির সচিব, পরিচালক, কয়েকজন উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, রাজবাড়ীর ডিসি, বালিয়াকান্দির ইউএনও উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় বেশ কয়েকজন কবি-লেখক-সাহিত্যিকের সঙ্গে দেখা হলো।

অনুষ্ঠান শেষে ইউএনওকে বললাম চত্রা নদী দেখতে যাব। নদীতে যাওয়ার একটি ব্যবস্থা করার অনুরোধ করি তাঁকে। দুটি মোটরসাইকেল প্রয়োজন। ইউএনও উপজেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি। চত্রা নদীর কথা বলতে মনে হলো তিনি চিনতে পারলেন না। হয়তো নতুন এসেছেন। তবে দুজন ব্যক্তিকে সঙ্গে দিলেন নদী দেখানোর জন্য। অপূর্ব রায় ও তপু আহমেদ।

চত্রা নদী রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার সিরাজপুর হাওর নদীর শাখানদী। দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ কিলোমিটার। নদীটি দেখতে গেলাম নারুয়া ইউনিয়নে। যে স্থানে চত্রা নদী দেখতে গেলাম, সেই স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি স্লুইসগেট আছে। ওই বাজারের নামও স্লুইসগেট বাজার। স্লুইসগেট–সংলগ্ন নদীর ভেতরে একটি টিনের চালাঘর। এখনই যদি টিনের চালাঘরটি তুলে দেওয়া না যায়, তাহলে দখল আরও বাড়তে থাকবে।

স্লুইসগেট থেকে তিন-চার শ মিটার ভাটিতে গড়াই নদে চত্রা নদী মিলিত হয়েছে। মিলিত স্থান দেখতে গেলাম। গড়াই নদে অনেক পানি আছে। যে স্থানে চত্রা নদী মিলিত হয়েছে, সেখানে নারী-শিশু-বৃদ্ধ গোসল করছেন, কাপড় পরিষ্কার করছেন। শিশুদের লাফালাফি দেখতে ভালোই লাগছিল।

দুটি নদীর মিলিতস্থলে একটি নৌকা ভেড়ানো। একজন মাঝি জাল থেকে মাছ নামাচ্ছেন। জেলে কী মাছ পেয়েছেন, তা দেখতে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম ইলিশ মাছ ধরছেন। মাঝির নাম রেজাউল ইসলাম। বয়স ৪০-৪৫ বছর। ছোটবেলা থেকে ইলিশ মাছ ধরেন। কোনো কোনো দিন একাই ১৫-২০ কেজি ইলিশ মাছও পান। তবে এ রকম দিন কম। তিন জানালেন, এ বছর গড়াই নদে পৌনে দুই কেজি ওজনের ইলিশ অনেক পাওয়া গেছে। দিনে–রাতে ইলিশ ধরা চলে। যাঁদের জাল আছে, তাঁরাই মাছ ধরতে পারেন।

গড়াই নদে ভাঙন আছে। দেখলাম ‘গড়াই কফি হাউস অ্যান্ড ফুড ভ্যালি’ নামক দোকান প্রায় ভাঙনে পড়েছে। পাকা সড়কে চলে আসছে নদী। অপূর্ব রায় জানালেন, নদীর বাঁ তীরে কয়েক শ মিটার ভেঙেছে। নদী–লাগোয়া বাড়িওয়ালা এক চাচা ভাঙন বন্ধের দাবি জানাচ্ছিলেন। বাড়ি ভেঙে গেলে কোথায় যাবেন জানেন না।

চত্রা নদী দেখে আমরা গেলাম বাটিখাল নদী দেখতে। এই নদীতেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইসগেট আছে। স্লুইসগেট যেহেতু নদীর প্রস্থের চেয়ে ছোট প্রস্থের, তাই স্লুইসগেটকে নদীর প্রস্থ হিসেবে ধরে দখলপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই স্থানটি বকচর স্লুইসগেট নামে পরিচিত। এই নদীটিও বালিয়াকান্দি উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত। নদীটি গড়াই নদের উপনদী।

রাজবাড়ীর একটি নদীর নাম চন্দনা। কী সুন্দর নাম! নদীটি বালিয়াকান্দি উপজেলা শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। তপু আহমেদ জানালেন, এই নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যায়। তাঁর কাছে জানলাম গত বছর বড়শি দিয়ে অনেকেই প্রচুর ট্যাংরা মাছ ধরেছেন। ডাহুক এবং ছোট পানকৌড়ি দেখলাম। নদীটিতে দূষণ আছে। প্লাস্টিক-ময়লা-আবর্জনা ফেলছে অনেকে।

চন্দনা নদী দেখার পর আমরা যাচ্ছিলাম হড়াই নদ দেখতে। হড়াই নদে যাওয়ার আগে বহরমপুর নিমতলা বাজারের কাছে আরেকটি প্রবাহ চোখে পড়ল। দেখতে নদী মনে হচ্ছিল। কচুরিপানায় ভর্তি। তপু আহমেদের কাছে জানলাম এর নাম মরাচন্দনা। এর প্রবাহ কোথাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে হলো।

এখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে লিজ দেওয়া হয়। যারা লিজ নিয়েছিল, তারা ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে পলাতক। সে জন্য মাছ চাষও নেই, কচুরিপানাও সরানো হয়নি। নদীটির পুরোনো প্রবাহ ফেরানো যায় কি না, উপজেলা কিংবা জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি সরেজমিন দেখতে পারেন।

কবি সালাম তাসির নিজের লেখা একটি বই ওই দিন উপহার দেন। বইটিতে একটি কবিতা আছে। কবিতার নাম ‘হড়াই নদীর বাঁকে’। হড়াই নদ রাজবাড়ী এবং বালিয়াকান্দি উপজেলাকে আলাদা করেছে। দেখলাম ছিমছাম হড়াই নদ বয়ে গেছে। সন্ধ্যায় দেখতে গেলাম পদ্মা নদী। পদ্মা এই জেলায় গোয়ালন্দে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

রাজবাড়ী জেলায় কতগুলো নদী আছে, তা জানার চেষ্টা করলাম। সরকারি তালিকায় রাজবাড়ী জেলার নদ–নদীর সংখ্যা মাত্র ৯। চত্রা, চন্দনা, হড়াই, গড়াই, পদ্মা, যমুনা, সিরাজপুর হাওর, মরাকুমার ও কৈজুরী খাল। এই তালিকায় নেই বাটি খাল কিংবা মরাচন্দনা। মরাকুমার ও সিরাজপুর হাওর নদী ছাড়া অন্য নদীগুলো আমার দেখা।

রাজবাড়ী জেলার নদীগুলোর সব কটিকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। দখল-দূষণসহ অন্য যেসব ক্ষতিকর দিক এ জেলার নদীগুলোতে আছে, তা দূর করা সম্ভব। অনেক জেলায় নদীবিষয়ক সংগঠন আছে। এ রকম একটি কার্যকর সংগঠন রাজবাড়ীতে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যারা রাজবাড়ীর নদীগুলোর সংকট চিহ্নিতকরণ ও সুরক্ষায় কাজ করবে। সরেজমিন অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে তালিকার বাইরে আরও নদী রয়েছে।

আমাদের দেশে নদীগুলোর সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা লাগবেই। কিন্তু বারবার বদলি আর নানাবিধ কাজের কারণে যাঁদের নদী সুরক্ষায় কাজ করা প্রয়োজন, তাঁরা নদীগুলোই চেনেন না। এ জন্য সামাজিক সংগঠনগুলোর একটি বড় দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন।

* তুহিন ওয়াদুদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক

রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলায় চত্রা নদী। নদী দখল তৈরি করা হয়েছে টিনের ঘর।
রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলায় চত্রা নদী। নদী দখল তৈরি করা হয়েছে টিনের ঘর। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

গাজার তাঁবুগুলোতে হাজারো বিধবা নারী

একাকী জীবনের নির্মম লড়াইঃ উত্তর গাজার তীব্র তাপদাহের মধ্যে একটি অস্থায়ী জীর্ণ তাঁবুর ভেতরে বসে আছেন মোনা আল-মাসরি। প্রতিটি নতুন দিনে বেঁচে থাকার পরিকল্পনা করার চেষ্টা করছেন তিনি। মোনা চার সন্তানের জননী, যাদের বয়স দুই থেকে নয় বছরের মধ্যে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলি সামরিক হামলায় তার স্বামী মোহাম্মদ নিহত হন। কাপড়ের তৈরি একটি পাতলা দেয়ালের ভেতর পুরো পরিবারের জীবনের তীব্র অনিশ্চয়তা ও বোঝা এখন তার একার নাজুক কাঁধে। মোনা জানান, গাজার বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু মানবেতর জীবনযাপনই নয়, সবচেয়ে বড় মানসিক ও শারীরিক কষ্টের বিষয় হলো প্রতিদিনের বেঁচে থাকার প্রতিটি ক্ষুদ্র লড়াইয়ে তাকে সম্পূর্ণ একা মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সন্তানকে একবেলা খাবার দেয়া, পানের উপযুক্ত একটু পানির ব্যবস্থা করা এবং যেকোনো মুহূর্তে ওপর থেকে নেমে আসা বোমা হামলার আতঙ্ক থেকে ছোট ছোট সন্তানদের আগলে রাখার এই দীর্ঘ যুদ্ধ তিনি একা লড়ে যাচ্ছেন। আকুল কণ্ঠে মোনা বলেন, এই যুদ্ধ কেবল আমাদের মাথা গোঁজার ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে সমস্ত সুরক্ষা, সম্মান ও স্থিতিশীলতা। এখানে জীবন বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। প্রতিদিন সকালে উঠে একটাই চিন্তা থাকে, কীভাবে এই তীব্র কষ্ট ও ক্লান্তি এড়িয়ে সন্তানদের নিয়ে আরেকটা দিন বেঁচে থাকা সম্ভব হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

গাজায় মোনার মতো এমন হাজার হাজার অসহায় নারী রয়েছেন, যাদের মাথার ওপর থেকে উপার্জনের একমাত্র অভিভাবক ও জীবনের সঙ্গী হারিয়ে গেছেন। গাজার সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পুরো গাজা ভূখণ্ডে বর্তমানে মোট বিধবা নারীর সংখ্যা বেড়ে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কেবল চলমান যুদ্ধে ইসরাইলি আগ্রাসনের কারণে ২৮,২২৪ জন নারী তাদের স্বামীকে হারিয়ে নতুন করে বিধবা হয়েছেন। এর বাইরে আরও ২২,৫০০ জন নারী যুদ্ধের আগেই নিবন্ধিত বিধবা হিসেবে বসবাস করছিলেন। তবে গাজার সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আজিজা আল-কাহলৌত জানান, অবরুদ্ধ পরিবেশ, তীব্র যুদ্ধক্ষেত্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণে এখনও বহু বিধবা নারীর তথ্য নথিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাস্তবে এই সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি বলে তারা ধারণা করছেন। মুখপাত্র আরও বলেন, উপার্জনের একমাত্র মানুষকে হারিয়ে এই নারীরা এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানবিক জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগটুকুও তাদের নেই। এদের দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অভাব থেকে মুক্ত করতে হলে কেবল সাময়িক খাদ্য সাহায্য দিয়ে হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।

বাস্তুচ্যুত এসব নারীদের জীবনযুদ্ধের গল্প কেবল খাদ্য বা আশ্রয় সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে এক গভীর মানবিক ও মানসিক ট্রমা। গাজার বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী আসিল আবু শাওয়িশ বিষয়টি নিয়ে বলেন, যুদ্ধের মাঝে হঠাৎ করে স্বামী হারানো এক চরম মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। এসব নারীকে একদিকে যেমন নিজের জীবনসঙ্গীকে হারানোর তীব্র কষ্ট চেপে রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে পরিবারের একমাত্র প্রধান হিসেবে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। গাজার বিধবা নারীদের এমন এক পরিবেশে বাস করতে হচ্ছে যেখানে প্রতিনিয়ত মৃত্যু ও আতঙ্কের ছায়া রয়েছে। অনেক নারী তাদের ভেতরের মানসিক কান্না ও ভেঙে পড়ার অনুভূতি সন্তানদের সামনে প্রকাশ করতে পারেন না, যাতে ছোট শিশুরা পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে। কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও শোকাচ্ছন্নতা তাদের মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

একই সাথে যেসব শিশু তাদের পিতাকে হারিয়েছে, তাদের মানসিক অবস্থা আরও সংকটজনক। বাবার অনুপস্থিতি এবং তার সাথে ক্রমাগত বাস্তুচ্যুতি ও মানবেতর পরিবেশ শিশুদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেক শিশুর মধ্যে প্রতিনিয়ত আতঙ্ক, রাতে ঘুম না হওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ এবং মানসিক ট্রমার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলছেন, গাজার এই অসহায় নারীদের টিকিয়ে রাখতে হলে জরুরি খাদ্য ও আর্থিক অনুদানের পাশাপাশি নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্বাসন এবং আইনগত সহায়তা দেয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি এখন কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং মানবজাতির জন্য এক বিরাট দায়িত্ব।

গাজার তাঁবুগুলোতে হাজারো বিধবা নারী

মক্কা চুক্তি ঘিরে সৌদি-আরব আমিরাত উত্তেজনা, তীব্র বাকযুদ্ধ

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে রিয়াদ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সম্পর্কে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) বাইরে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে রিয়াদ এগোচ্ছে কিনা- এ নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্কে জড়িয়েছেন সৌদি ও আমিরাতি বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তিটি নিয়ে কয়েকজন প্রভাবশালী আমিরাতি ভাষ্যকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাদের প্রশ্ন, সৌদি আরব কি জিসিসির বাইরে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে?
জিসিসি হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয়টি জ্বালানি-সমৃদ্ধ রাজতন্ত্র- বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিয়ে গঠিত একটি আঞ্চলিক জোট।
সমালোচনার সামনে রয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাবেক উপদেষ্টা আবদুলখালেক আবদুল্লাহ। তিনি একাধিক পোস্টে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

একটি পোস্টে আবদুল্লাহ লিখেন, নতুন জোট গঠনের জন্য অভিনন্দন। তবে তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং ‘উপসাগরীয় ঐক্য’ সুসংহত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান-ইসরাইল হুমকি মোকাবিলায় বিশ্বাসযোগ্যতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে- এমন দেশগুলোকে নিয়ে আঞ্চলিক সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতায় বিনিয়োগের চেয়ে এটিই বেশি জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, যেকোনো জোট সফল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো অভিন্ন শত্রু নির্ধারণ করা। তাহলে এই জোটের দেশগুলোর শত্রু কে?

তার মন্তব্যের দ্রুত জবাব দিয়েছেন সৌদি প্রিন্স আবদুর রহমান বিন মুসাইদ। তিনি বলেন, চুক্তিটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয় এবং রিয়াদের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন ইউএইর শিক্ষাবিদ মহল এতটা উদ্বিগ্ন- তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এক্সে দেয়া এক পোস্টে প্রিন্স আবদুর রহমান লিখেন, এটি জোট, চুক্তি কিংবা অন্য যে নামেই হোক- সমস্যা কোথায়? তার প্রশ্ন, এটি কীভাবে ‘উপসাগরীয় ঐক্য’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে? কোনো দেশ তার জাতীয় স্বার্থে অন্য কোনো দেশ বা একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তি করার অধিকার রাখে না কি?
আসবার সেন্টার ফর স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের চেয়ারম্যান ফাহাদ আল-আরাবি আল-হারথিও চুক্তিটির পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, মক্কা চুক্তি কারও বিরুদ্ধে গঠিত কোনো ‘জোট’ নয়। কারণ, এর ভিত্তি কোনো অভিন্ন শত্রু নির্ধারণ করা নয়; বরং যেকোনো পক্ষের সম্ভাব্য হুমকির মুখে সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন সৌদি ব্যবহারকারী আরও কড়া ভাষায় আমিরাতের সমালোচনা করেন। এক মন্তব্যে প্রশ্ন করা হয়, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের আগে ইউএই কি উপসাগরীয় দেশগুলোকে জানিয়েছিল?
ওই মন্তব্যে বলা হয়, ইসরাইলের সঙ্গে ইউএইর সম্পর্ক স্থাপনের আগে তারা কি উপসাগরীয় দেশগুলোকে অবহিত করেছিল?

বিতর্ক তীব্র হওয়ার পর আবদুল্লাহ আরও এক ধাপ এগিয়ে এমন একটি বক্তব্য দেন, যা অনেকেই প্যান-ইসলামিক বা ত্রিপক্ষীয় জোটের পরিবর্তে কেবল জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ার সরাসরি বার্তা হিসেবে দেখেছেন।
তিনি লিখেন, যার কাছে তার সম্প্রদায় তার মাতৃভূমির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তার নিরাপত্তা নেই। আর যার কাছে আরব বা ইসলামি পরিচয় তার মাতৃভূমির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তারও নিরাপত্তা নেই। তার ভাষায়, আনুগত্য, বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকতা কেবল মাতৃভূমির জন্যই হওয়া উচিত- এর কোনো অংশীদার থাকা উচিত নয়।
আবদুল্লাহর এই পোস্টের জবাবে ইসলামিক ওয়ার্ল্ড এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশনের (ইসেস্কো) সাবেক প্রধান আবদুলআজিজ আল-তুওয়াইজরি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

তিনি লিখেন, ‘যে ব্যক্তি জায়নবাদীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে সহযোগিতা করে, সে কখনো নিরাপত্তা পাবে না।’
অন্য এক পোস্টে আল-তুওয়াইজরি ইউএইর নিজেদের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের বিষয়ও তুলে ধরেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ভারতের সঙ্গে আমিরাতের প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ইসরাইলের সঙ্গে তাদের ব্যাপক সহযোগিতা যদি গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কেন?
পোস্টের শেষে তিনি একটি আরবি প্রবাদ ব্যবহার করেন- ‘যাদের লজ্জা আছে, তারা মৃত’- যার মাধ্যমে তিনি চুক্তিটির সমালোচকদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেন।
চুক্তিকে ঘিরে এই প্রকাশ্য পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার আঞ্চলিক কৌশল ও নিরাপত্তা নীতি নিয়ে বিদ্যমান মতপার্থক্যকে নতুন করে সামনে এনেছে।

মক্কা চুক্তি ঘিরে সৌদি-আরব আমিরাত উত্তেজনা, তীব্র বাকযুদ্ধ

বুলডোজারের পর কৃত্রিম দাবানল—দক্ষিণ লেবাননে যেভাবে বসতি ও ইতিহাস মুছে দিচ্ছে ইসরায়েল

দ্য গার্ডিয়ানঃ ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে বনাঞ্চল পুড়ে ছারখার হওয়ার পাশাপাশি দেশটির সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে দক্ষিণ লেবাননে ইচ্ছাকৃতভাবে দাবানল সৃষ্টি করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, জরুরি সেবা বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ছড়িয়ে পড়া এ আগুন লেবাননের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংস করার দীর্ঘদিনের ইসরায়েলি অভিসন্ধিরই অংশ।

গতকাল মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননের খিয়াম এলাকার বাইরের একটি বনাঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ফ্লেয়ার বা অগ্নিগোলক নিক্ষেপ করলে সেখানে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়।

লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলের সিভিল ডিফেন্সের প্রধান হুসেইন ফাকিহ জানান, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁদের খুব কাছে একটি ড্রোন হামলা চালানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হন।

পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে হুসেইন ফাকিহ বলেন, ‘আমাদের এখনকার বেশির ভাগ অভিযানই আগুন নেভানোর কাজের সঙ্গে যুক্ত। বিশাল এলাকার বন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে সীমান্ত বা যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি এলাকাগুলোর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জমি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

গত ১৭ জুন লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর দুই পক্ষের লড়াই অনেকটাই কমে এসেছে। তবে প্রথম সারির উদ্ধারকারীদের দেওয়া সাক্ষ্য ও ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, এ দুই মাসের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে, বিশেষ করে জলপাইবাগান ও কৃষিজমিতে ক্রমাগত আগুন লাগিয়ে চলেছে।

দাবানল সৃষ্টির এসব ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

হুসেইন ফাকিহ বলেন, যুদ্ধবিরতির পরপরই তারা এ কাজ শুরু করেছে। এখন প্রতিদিন সেখানে অগ্নিবোমা ফেলা হচ্ছে। ছোট ছোট ড্রোন এসে ওপর থেকে দাহ্য পদার্থ ছড়াচ্ছে, বনাঞ্চল লক্ষ্য করে সাদা ফসফরাস শেল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এমনকি দিনের বেলাতেও তারা ইলুমিনেশন ফ্লেয়ার বা আলো উৎপাদনকারী অগ্নিগোলক ফেলছে, যাতে গাছপালায় সহজে আগুন ধরে যায়।

দক্ষিণ লেবাননের অন্যান্য এলাকার ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও বাসিন্দারা একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, ইসরায়েলি ড্রোন ও গোলাবারুদের আঘাতে শুষ্ক ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। গত শুক্রবার ইসরায়েলি গোলায় ঘন বনাঞ্চল পরিবেষ্টিত দুটি বড় এলাকায় ভয়াবহ দাবানল সৃষ্টি হয়। এর একটি সীমান্তসংলগ্ন কাফরশুবা এলাকায় এবং অন্যটি জেজ্জিন ও পশ্চিম বেকা উপত্যকার মধ্যবর্তী অঞ্চলে।

কাফরশুবা এলাকার সিভিল ডিফেন্স স্টেশন প্রধান সমীর হারদান বলেন, গত শুক্রবার বিকেলে একটি বনাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন থেকে গোলাবারুদ ফেলার পর আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সারা রাত লড়াই করে গত শনিবার সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

সমীর হারদান আরও জানান, এরপর গত রোববার আরেকটি ড্রোন এসে ওই এলাকায় নতুন করে আগুন লাগিয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে আগুন নেভানোর কাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের যেকোনো অভিযানের আগে লেবানন সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। সেনাবাহিনী এ অনুরোধ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীসহ গঠিত একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন’ বা সংঘাত নিরসন কমিটির কাছে পাঠায়। সেখান থেকে অনুমতি পাওয়ার পরই শুধু ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করতে পারেন।

তবে লেবাননের বিশাল বনাঞ্চলজুড়ে আগুন জ্বলতে থাকলেও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের মাত্র দুটি সুনির্দিষ্ট জায়গায় আগুন নেভানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এ আগুন লেবাননের পরিবেশের ওপর ইসরায়েলি আক্রমণের একটি ধারাবাহিক রূপ। এটি দেশটির বনাঞ্চল এবং এর ওপর নির্ভরশীল জীববৈচিত্র্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

লেবাননের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন ‘গ্রিন সাউদার্নার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিশাম ইউনেস বলেন, ‘এগুলো বহু বছরের পুরোনো প্রাচীন বন। সেখানে ওকগাছের পাশাপাশি মূলত বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনশীল পাইনগাছের প্রাধান্য রয়েছে। এই বনাঞ্চল পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া এ বিশাল এলাকাটি পরিযায়ী পাখিদের যাতায়াত ও বিশ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।’

হিশাম ইউনেস এ ইসরায়েলি হামলাকে ‘ইকোসাইড’ বা ‘পরিবেশগত হত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, গোলাবারুদ, আগুন ও রাসায়নিক ব্যবহার করে দক্ষিণ লেবাননের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম ধ্বংস করার যে পদ্ধতিগত সামরিক ছক ইসরায়েলের রয়েছে, এটি তারই অংশ।

হিশাম ইউনেস আরও বলেন, এটি শুধু কোনো একটি একক আগুন বা হামলার ঘটনা নয়, বরং ধ্বংসযজ্ঞের এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা ধীরে ধীরে পরিবেশের জীবন ধারণ, পুনরুৎপাদন এবং টিকে থাকার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।

হিশাম ইউনেস বলেন, এ ধ্বংসের প্রভাব যখন মানুষের জীবিকাকে সংকটে ফেলে এবং নিজ ভূমিতে ফিরে আসার বা টিকে থাকার পথ বন্ধ করে দেয়, তখন এ ধ্বংসযজ্ঞ আর প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পুরো ভূখণ্ডের অস্তিত্ব বদলে ফেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পরদিন, অর্থাৎ ৮ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে হিজবুল্লাহ। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে শুরু করা ওই লড়াইয়ের পর থেকেই ইসরায়েল ক্রমাগত লেবাননের বনাঞ্চলগুলো লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আসছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা নিজেদের লুকিয়ে রাখতে এবং তাঁদের সুড়ঙ্গ বা টানেলগুলো আড়াল করতে বনাঞ্চলগুলো ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। তবে পরিবেশবিদ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই অগ্নিকাণ্ড ও ব্যাপক পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে সাধারণ বেসামরিক জনগণের ওপর।

২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ইসরায়েলি সেনারা লেবানন সীমান্তে মধ্যযুগীয় একধরনের গুলতি ব্যবহার করে দেয়ালের ওপার থেকে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ ছুড়ে মারেন। অন্যদিকে, লেবানন সেনাবাহিনী এমন কিছু ইসরায়েলি ড্রোনের ছবি প্রকাশ করে, যেগুলোতে লাগানো পাইপের সাহায্যে বনাঞ্চলে দাহ্য পদার্থ ছিটানো হচ্ছিল।

গত ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ লেবাননের খামারগুলোতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে আগাছানাশক রাসায়নিক ছিটানো হলে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কারণ, এই রাসায়নিকের সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।

এ আগুনের কারণে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতির বাইরেও দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দারা শৈশবের চেনা সেই সবুজ গ্রাম ও প্রকৃতি হারিয়ে ফেলার শোকে গভীরভাবে মর্মাহত। ১ আগস্ট সীমান্তবর্তী গ্রাম ইয়ারুনের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা জানতে পারেন যে দখলদার ইসরায়েলি সেনারা তাঁদের ঘরবাড়ির পাশাপাশি জলপাই ও ফলের বাগানগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন।

কাছাকাছি খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত শহর রমিশ ও আইন ইবেলের বাসিন্দারাও সেই আগুনের বেশ কিছু ছবি পাঠিয়েছেন। ইসরায়েল সীমান্তসংলগ্ন হাতে গোনা যে কয়েকটি গ্রাম ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এখনো খালি করতে বলেনি, এ দুটি সেগুলোর অন্যতম।

ইয়ারুনের মেয়র হাফেজ ঘাসাম বলেন, ‘তারা (ইসরায়েলি বাহিনী) ইতিমধ্যে আমাদের গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এরপর গাছগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এই অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় শুধু জলপাইগাছগুলো টিকে ছিল, সেগুলো ছিল বিশাল বাগান ও গাছগুলো অনেক পুরোনো। তারা সেখান থেকেই আগুন লাগানো শুরু করে, যা পরে গ্রামের পুরো সীমানায় ছড়িয়ে পড়ে।’

গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হওয়া ইয়ারুনের বাসিন্দারা এর আগে নিজেদের অর্থ জোগাড় করে আকাশচুম্বী মূল্যে স্যাটেলাইট বা উপগ্রহের ছবি কিনে দেখেছিলেন কীভাবে ইসরায়েলি বাহিনী তাঁদের গ্রামের ৯০০টি বাড়ির মধ্যে ৮৮০টি বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে।

মেয়র হাফেজ ঘাসাম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘এ গাছগুলোর বেশির ভাগই আমাদের দাদা-দাদি আর মা–বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি আমরা। এগুলোর সঙ্গে আমাদের গভীর আবেগ জড়িত। এ ছাড়া এ গাছগুলো গ্রামের মানুষের আয়েরও একটি বড় উৎস ছিল।’

মেয়র আরও বলেন, ‘তারা আসলে এ ভূমিকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে চাইছে। তারা আমাদের পুরো ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সব স্মৃতি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। হয়তো তাদের পরিকল্পনা হলো কিছুদিন পর যাতে মনেই না হয় যে এ মাটিতে কখনো কোনো মানুষের বসতি ছিল।’

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা হামলার পর ৫ আগস্ট দক্ষিণ লেবাননের কফরশুবা গ্রামের উপকণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে দাবানল
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনীর বোমা হামলার পর ৫ আগস্ট দক্ষিণ লেবাননের কফরশুবা গ্রামের উপকণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে দাবানল। ছবি: এএফপি

সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা থেকে রেহাই পেতে যে আইন জানা প্রয়োজন by তাকবির জাহান

বাংলাদেশে যত ধরনের বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা বা প্রতারণার ঘটনা ঘটে, তার বড় অংশই জমি বা সম্পত্তিকে ঘিরে। কারণ স্পষ্ট যে সম্পত্তি মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, আর এই সম্পদের সঙ্গে যুক্ত আইন সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই অসচেতন। অথচ সম্পত্তি–সংক্রান্ত লেনদেনে আমাদের সবচেয়ে শক্ত সুরক্ষাবলয় হলো সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২। এই আইন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা থাকলে দীর্ঘদিনের ঝামেলা, প্রতারণা, আদালতের ঘোরপ্যাঁচ ইত্যাদি বেশির ভাগই এড়ানো যায়।

প্রথমত, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়ের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে। ধারা ৫৫ অনুযায়ী, একজন বিক্রেতা সম্পত্তি সম্পর্কে কোনো ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করতে পারবেন না। মালিকানা ত্রুটি, মামলাজট, দখল সমস্যা, পাওনাদারির বিষয় সম্পর্কে ক্রেতাকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। অন্যদিকে ক্রেতারও আইন অনুযায়ী দলিল যাচাই, রেকর্ড পরীক্ষা এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার দায় রয়েছে। এই মৌলিক নীতিগুলো না জানার কারণেই বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হন।

অনেকেই মনে করেন, জমি কেনা মানেই শুধু চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করা। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। এই আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতি নির্দিষ্ট করা হয়েছে—বিক্রয়, বন্ধক (মর্টগেজ), লিজ, বিনিময়, দান (গিফট) এবং নালিশযোগ্য দাবি (অ্যাকশনেবল ক্লেইম)। এগুলোর প্রতিটির আলাদা ধারা ও শর্ত আছে। উদাহরণস্বরূপ, ধারা ৫৮-১০৪ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বন্ধকের নিয়ম দেওয়া আছে। এগুলোর নিয়ম না বুঝে কোনো চুক্তিতে সই করলে পরে দেখা যায় চুক্তি বাতিল, ক্ষতি বা দীর্ঘ মামলা ছাড়া আর কিছুই নেই।

দানপত্রের ক্ষেত্রেও ভুল ধারণা প্রচুর। অনেকে মনে করেন, মৌখিক দান করলেই যথেষ্ট, যা সম্পূর্ণ ভুল। ধারা ১২২-১২৯ স্পষ্টভাবে বলে, দান অবশ্যই লিখিত, রেজিস্ট্রি করা, স্বেচ্ছায় প্রদান এবং গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এসব শর্ত না মানলে দানপত্র আদালতে টিকবে না।

সম্পত্তি–সংক্রান্ত প্রতারণা আমাদের দেশে ক্রমে বাড়ছে। নকল দলিল, একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি বা রেকর্ডে জালিয়াতির মতো অপরাধগুলো সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আইন জানলে অনেক প্রতারণা আগেই চিনে ফেলা যায়। জমি কেনার আগে খতিয়ান, পর্চা, রেকর্ড, দখল—সব যাচাই করেই ক্রয় করা উচিত। এতে প্রতারণার সুযোগ অনেক কমে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জমি নিয়ে প্রতারণা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ধারা ৪২০ অনুযায়ী, প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি হাতিয়ে নিলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে। নকল বা জাল দলিল তৈরি করলে দণ্ডবিধির ধারা ৪৬৭ ও ৪৬৮ অনুযায়ী কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হতে পারে। আবার কারও সম্পত্তি গোপনে বিক্রি করলে বিক্রেতা ধারা ৪০৬ ও ৪০৯ অনুযায়ী অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। অর্থাৎ সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার মতো বিষয় নয়।

এ ছাড়া রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুসারে স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয় অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হয়। রেজিস্ট্রি ছাড়া কোনো দলিল আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকেই রেজিস্ট্রি না করে অগ্রিম টাকা নেওয়া বা মৌখিক চুক্তির ওপর ভিত্তি করে জমি বিক্রি করেন, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ জটিলতা সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের আদালতগুলোতে জমি বা সম্পত্তি–সংক্রান্ত মামলাই সবচেয়ে বেশি। এর বড় কারণ হলো অজ্ঞতা ও অসচেতনতা। আইন সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান থাকলে, সঠিক কাগজপত্র যাচাই করলে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে বিরোধ ও মামলা বহুলাংশে কমে যাবে।

সম্পত্তি মানে শুধু জমি বা বাড়ি নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ, পরিবারের নিরাপত্তা, সন্তানের উত্তরাধিকার এবং অর্থনৈতিক স্থিতি। তাই সম্পত্তি নিয়ে সচেতন থাকা মানে নিজের স্বপ্নকে সুরক্ষিত করা। আর এই সুরক্ষার প্রথম শর্ত হলো আইন জানা। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন জানলে শুধু নিজে প্রতারিত হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না; বরং অন্যের প্রতারণা চিহ্নিত করা, ভুল চুক্তি এড়ানো এবং ঝুঁকির জায়গা চেনা সহজ হয়।

অতএব, আমাদের সবার উচিত এই আইনের কমপক্ষে মূল ধারাগুলোর ধারণা রাখা। এতে কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি এড়ানো যায় না; বরং সমাজে জমি-সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের হার কমে আসে। সচেতনতা বাড়লে প্রতারণা কমবে, আইনি জট কমবে আর মানুষের আস্থা বাড়বে।

যদি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে চান, তবে আইনের জ্ঞানই আপনার সবচেয়ে শক্ত ঢাল।

* তাকবির জাহান, শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

চিঠি