Thursday, January 28, 2016

‘ধোলাইখাল থেকে পানি নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর বানাইনি’ -মুসা বিন শমসের

‘আমি ধোলাইখাল থেকে পানি নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর গড়িনি। আর বাংলাদেশ থেকে হুন্ডি করে বিদেশে এত টাকা জমানো সম্ভব নয়। পৃথিবীর ৪০টি দেশের সঙ্গে আমার ব্যবসা, ৪০ দেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে আমার ব্যবসা। সেই সব দেশের সঙ্গে যত বিল সেটেল হয়েছে তা সুইস ব্যাংকে ট্রান্সফার হয়েছে। বরং আমার কোম্পানির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা দেশে এনেছি।’
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জিজ্ঞাসাবাদ শেষে নিজের সম্পদ সম্পর্কে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এসব মন্তব্য করেছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের।
২০১৫ সালের ৭ জুন দুদকে দেওয়া সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে মুসা বিন শমসেরের ১২ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৯৩ হাজার ছয় শ কোটি টাকা), ‘ফ্রিজ’ অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়াও সুইস ব্যাংকের ভল্টে ৯০ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি প্রায় সাত শ কোটি টাকা) দামের অলংকার জমা রয়েছে।
গাজীপুর ও সাভারে তাঁর নামে প্রায় এক হাজার দুই শ বিঘা সম্পত্তি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মুসা। বর্তমান বাজার দরে এসব জমির মূল্য এক হাজার দুই শ কোটি টাকারও বেশি। অধিকাংশ সময় দেশের বাইরে থাকায় এসব সম্পত্তির খাজনা পরিশোধ করে নামজারি করা সম্ভব হয়নি বলে জানান মুসা।
নিরাপত্তারক্ষীদের বাইরে রেখে ভেতরে যেতে
হয়েছে মুসা বিন শমসেরকে। ছবি: হাসান রাজা
সুইস ব্যাংকে ১২ বিলিয়ন ডলার কেন জব্দ অবস্থায় রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইরেগুলার ট্রানজেকশনের কারণে করেছে।’ এ টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে প্রশ্ন করলে মুসা বলেন, ‘এটা একটা বিচারাধীন বিষয়। আমি বাদী হয়ে মামলা করেছি। বিচারাধীন যে কোনো বিষয়ে কথা বলা অবৈধ। আমি মামলায় জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। এ বিষয়ে দুদককে আমি সব তথ্য দিয়েছি।’
বিতর্কিত এ ব্যবসায়ীর কথিত বিপুল পরিমাণ সম্পদের রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে চলতি মাসের ৪ তারিখে তৃতীয়বারের মতো তাঁকে তলব করে নোটিশ দেয় দুদক। পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী স্বাক্ষরিত ওই তলবি নোটিশে তাঁকে ১৩ জানুয়ারি বেলা ১১টায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ১২ জানুয়ারি দুদকের তলবে হাজির হতে পারছেন না বলে মুসা বিন শমসের যে চিঠি পাঠিয়েছেন, তাতে বলা হয়, তিনি মৃত্যু আতঙ্কে (ডেথ ফোবিয়া) ভুগছেন। সেই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসও তাঁকে ভোগাচ্ছে। চিকিৎসকের সনদ যুক্ত করে দুদককে দেওয়া চিঠিতে তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় দুই থেকে তিন মাস পেছানোর আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক ২৮ জানুয়ারি নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্ধারণ করে মুসাকে চিঠি পাঠায়।
অসুস্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডেথ ফোবিয়া হচ্ছে ভয়ংকর মানসিক রোগ। যখন ওই দুর্ঘটনা (সুইস ব্যাংকের টাকা ফ্রিজ করা) হলো তখন থেকে আমি এই রোগে ভুগছি। মাঝখানে শরীরের অবস্থা আরও খারাপ ছিল, এখন একটু ভালো।’
মুসা বলেন, ‘আমাদের দেশের কোনো মানুষ কি এই পরিমাণ টাকা অর্জনের কল্পনা করতে পারবে! আমি এর আগেও বলেছিলাম আগামী ৫০ বছরেও এই টাকা কেউ অর্জন করতে পারবে না। আর এ কারণে আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি।’
এদিকে দুদক মনে করছে, মুসা বিন শমসেরের দেওয়া সম্পদ বিবরণীর তথ্যে গরমিল আছে। মুসার অসহযোগিতার কারণে এ বিষয়ে অনুসন্ধান শেষ করতে দেরি হচ্ছে। দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন আজ এসব কথা বলেন।
মুসার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুদকের এই শীর্ষ নির্বাহী বলেন, ‘কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা মুসার সুইস ব্যাংকের ওই অ্যাকাউন্টের তথ্য পাবো।’ তবে অনুসন্ধানে বেশ অগ্রগতি হয়েছে জানিয়ে দুদক কমিশনার বলেন, এখন আর তেমন সময় লাগবে না। মুসার বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনুসন্ধান শেষে বলা যাবে।
নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ড্যাটকোর একজন
কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে দুদকে ঢুকছেন মুসা
বিন শমসের। ছবি: হাসান রাজা
এদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর বিতর্কিত ভূমিকা সম্পর্কে নানা আলোচনা প্রসঙ্গে মুসা নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি হিসেবে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত আমি বঙ্গবন্ধুর বাসায় ছিলাম। তারপর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নিজ জেলা ফরিদপুরে চলে যাই। ২১ এপ্রিল আমার জেলা ফরিদপুরে পাকিস্তানি আর্মি ঢুকল। ২২ এপ্রিল আমি তাদের হাতে ধরা পড়লাম। আর মুক্তি পেলাম ৯ ডিসেম্বর অর্ধমৃত অবস্থায়। তাহলে আর কি ভূমিকা থাকবে আমার। আমাকে নিয়ে যে অভিযোগ তা ভিত্তিহীন।’
আজ বুধবার সকাল ১১টার কিছু আগে বিশাল গাড়ির বহর আর সুসজ্জিত ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর অর্ধশত সদস্য নিয়ে দুদকে আসেন মুসা। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীদের বাইরে রেখেই তাঁকে ভেতরে ঢুকতে হয়। দুদকের প্রধান ফটক কার্যদিবসে খোলা থাকলেও এদিন বন্ধ রাখা হয়। দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং গণমাধ্যমকর্মী ছাড়া কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। দুদকের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা জানান, বিনা প্রয়োজনে যাতে কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে সে জন্য ফটক বন্ধ রাখার নির্দেশনা রয়েছে।
বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত মুসাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদকের পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে অনুসন্ধান দলের সদস্যরা।
এর আগে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম জিজ্ঞাসাবাদে বিশাল বাহিনী নিয়ে দুদকে প্রবেশ করেছিলেন মুসা। এক বছর এক মাস পর একই কায়দায় এলেও তার সঙ্গে আসা কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।
২০১৪ সালের জুন মাসে বিজনেস এশিয়া নামে একটি সাময়িকীতে মুসাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে ওই বছরের ৩ নভেম্বর তাঁর সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। ১৮ ডিসেম্বর প্রায় ৪০ জন ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর বহর নিয়ে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে হাজির হন তিনি। পরে দুদকের অনুসন্ধান দলটি মুসার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ড্যাটকোতে গিয়ে তাঁকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
ওই জিজ্ঞাসাবাদে মুসা দাবি করেন, দীর্ঘদিন বিদেশে বৈধভাবে ব্যবসার মাধ্যমেই তিনি ১২ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছেন। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, মিসর, সিরিয়া ও পাকিস্তানসহ অনেক দেশের সরকারি প্রতিরক্ষা ক্রয় সংক্রান্ত পাওনা পরিশোধের অর্থ ওই সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সুইস ব্যাংকে তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে।

বিবিসির বিশ্লেষণ : বেসরকারি বিনিয়োগে গতি নেই

অর্থনীতিবিদরা বলছেন বাংলাদেশে গত প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বেসরকারি বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করছে।
নিয়মিত প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বার্ষিক জিডিপির ২০% থেকে ২২%-এর মধ্যেই বেসরকারি বিনিয়োগ আটকে আছে।
বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এর পেছনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব, অবকাঠামো দুর্বলতা, সুদের উচ্চ হার এবং জ্বালানি সংকটসহ সরকারি নীতিকে দায়ী করে থাকেন।
ঢাকার একজন ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক যৌথ উদ্যোগে একটি কিচেন সিঙ্ক বা বেসিন তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছেন। দু`বছর আগে শুরু করে এখনো পণ্যটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে পারেননি।
আব্দুর রাজ্জাক বলছিলেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে বহু রকম প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়।
তিনি বলছেন, ``অনেক চ্যালেঞ্জ। যেমন প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনফ্রাস্ট্রাকচার। জায়গা যেমন একটা বড় সমস্যা। এখানে আসছেন, আসার সময় রাস্তার অবস্থাটা দেখতে পারছেন।``
``এরকম একটা পরিবেশে পৃথিবীর কোথাও এ ধরনের ইন্ডাস্ট্রির কোনও উদ্যোক্তা আপনার বিনিয়োগ করতে আসবে। কিন্তু আমরা লোকাল ইনভেস্টর বা লোকাল অন্ট্রেপ্রেনার যারা আমরা কিন্তু এভাবেই যুদ্ধ করে বিনিয়োগ করছি।``
বিসিক এলাকায় কারখানার জন্য একাধিকবার আবেদন করেও জমি পাননি মি. রাজ্জাক। তিনি বলছিলেন, ``ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক হলে অনেক কিছু লোকাল প্রবলেম সল্‌ভড হয়ে যেতো। যেমন, আমি যদি নিজে একটা জমি নেই বা একটা ভাড়া জায়গা নিয়ে একটা ইন্ডাস্ট্রি করি, সেখানে লোকাল পলিটিকাল লিডার, বিভিন্ন দলের শুধু ক্ষমতায় যারা থাকে তারা না কিন্তু, সব দলের, বা দলের বাইরেও কিছু প্রফেশনাল কিছু মাস্তান থাকে, ওদের কথা চিন্তায় রাখতে হয়, ওদের চাঁদা দিয়ে করতে হয়।``
উৎপাদনমুখী ক্ষুদ্র শিল্পের একজন উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক ৯০-এর দশক থেকে ক্ষুদ্র শিল্পের সাথে জড়িত। স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট তিনি।
রাজ্জাক বলেন, ``আমাদের অ্যাকসেস টু ফাইনান্স এ সেক্টরে নাই বললেই চলে। ৫০ কোটি টাকাও ঋণ নাই, টোটাল সব ঋণ মিলিয়েও ৫০ কোটি টাকা হবে না। তার মানে এই সেক্টরে লোক চিন্তা করে, আমাকে যদি আপনি ঋণ দেন আমাকে ঋণটা পরিশোধ করতে হবে লাভ সহ। কাজেই আমাকে তখন হিসাব কষতে হয় যে আমি সুদসহ এ টাকাটা শোধ করতে পারব কিনা।``
বাংলাদেশে গত প্রায় এক দশক ধরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি প্রায় একই রকম রয়েছে।
পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন ``গত প্রায় পাঁচ ছয় বছর ধরেই প্রাইভেট সেক্টর বিনিয়োগটা একটু গতিশীলতাটা হারিয়ে ফেলেছে। এখানে স্থবিরতাটা দেখা যাচ্ছে। স্থবিরতা ইন দ্য রিলেটিভ টার্মস, অ্যাবসল্যুট টার্মে না।``
গ্রোথ হচ্ছে, ১২-১৩% করে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু জিডিপি একই হারে বাড়ছে। আপেক্ষিকভাবে ব্যক্তিখাতে যে বিনিয়োগ সেটা ২০-২২%-এর মধ্যেই আছে গত প্রায় ৮/১০ বছর ধরে। এবং সেটা থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না বলে তিনি জানান।
সূত্র : বিবিসি

মুসলিম ভূখণ্ড হাতছাড়া হওয়ার ইতিহাস by ড. মুহাম্মদ সিদ্দিক

একসময় আরব, তুর্কি, মুঘল মুসলমানেরা পূর্ব গোলার্ধের অনেক এলাকা দখল করে সভ্যতার বীজ বপন করলেও অষ্টাদশ শতকের পরে বিশেষ করে তুর্কি ও মুঘলদের দুর্বলতার সুযোগে ইউরোপীয়দের হাতে নাস্তানাবুদ হলো। মুসলমানরা যেখানে গেছেন, তারা সে এলাকাকে সভ্য ও উন্নত করেছে। ইউরোপ করেছে ঠিক বিপরীত। তাদের মুখ্য মতলব ছিল উপনিবেশ তৈরি। উপনিবেশবাদীরা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মকে পর্যন্ত উপনিবেশে প্রতিষ্ঠা করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। অন্যত্র শতভাগ সফল হলেও, মুসলিম এলাকায় তারা প্রচণ্ড হোঁচট খায়। অধ্যাপক উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়ার্টের মতে, ইউরোপ মুসিলম বিশ্বে তাদের দেয়া শিক্ষার সিলেবাস কার্যকর করে বশংবদ সামরিক বেসামরিক আমলা ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর সৃষ্টি করে। যারা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মকে এড়িয়ে গিয়ে এমনকি তাদের নব্য প্রভুদের প্রায় সব কিছু গ্রহণ করে। ভারতের প্রখ্যাত গবেষক ড. রফিক জাকারিয়া তার প্রখ্যাত ‘দি স্ট্রাগল উইদিন ইসলাম’ নামক গ্রন্থে মন্তব্য করেন যে, এভাবে সেকুলার ও তথাকথিত মৌলবাদী যে দুই শ্রেণীর মুসলমান সৃষ্টি হয় সে উভয় গোষ্ঠীকে পাশ্চাত্য পরিস্থিতি বুঝে ব্যবহার করে। আমরা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাই ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ও আফগানিস্তানের ইতিহাসে। আসলে পাশ্চাত্য সেকুলার ও তথাকথিত মৌলবাদী মুসলমান কোনো গোষ্ঠীরই বন্ধু নয়, তারা নিজেদেরই বন্ধু। এই খেলাটা ব্রিটিশরাই সর্বপ্রথম শুরু করে ব্যবসার আড়ালে। তার পরে পাশ্চাত্যের অন্যান্য খ্রিষ্টান জাতি। ১৭৫৭ ছিল পাশ্চাত্যের খ্রিষ্টান ব্যবসায়ীদের বিশ্বাসঘাতকতার বছর। ব্যবসায়ী হয়ে যায় শাসক। ১৮৪৯ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা হিন্দুস্তানের প্রায় সব এলাকা দখল করে বার্মা-শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত এগিয়ে যায়। এরপর নেয় মালয় উপদ্বীপ (যা মুসলিমপ্রধান)।
ব্রিটেন আরো দখলে নেয় আফ্রিকার শেষ দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব ওডহোপ। তবে সর্বপ্রথমে এটি পর্তুগালের দখলে ছিল, যখন পর্তুগিজ দিয়াজ এটি আবিষ্কার করেন ১৪৮৬ সালে। ১২০ বছর পর এটি নেয় ডাচরা, যারা ২০০ বছর ধরে রাখে। ১৮০৬ সালে ব্রিটেন এটা দখলে নেয়।
ব্রিটিশ দখলে যাওয়ার পর সেখানকার ডাচ কৃষকেরা (যাদের বুয়ার বলা হতো) উত্তরে সরে গিয়ে দুটো কলোনি বানায় ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট। তবে ১৮৭০ সালে মেসিল রোডস নামক এক ইংরেজ দক্ষিণ আফ্রিকা এলাকায় এসে ধীরে ধীরে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রোডেশিয়া নামে একটি কলোনি বানায়। ১৯০২ সালের বুয়ার যুদ্ধে ইংরেজরা জিতে ট্রান্সভালড অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট কলোনি জিতে নতুন বড় কলোনি ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকা বানায়।
১৭৯৮ সালে মিসর দখল করেছিল ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, কিছু সময়ের জন্য। পরে ফ্রান্স সুয়েজখাল খুঁড়ে মিসরকে লাভবান না করে দেউলিয়া বানায়। ব্রিটিশরা মিসরের শাসক ইসমাইল পাশার শেয়ার কিনে মিসরে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিকভাবে ঢুকে পড়ে। ব্রিটিশরা অর্থনৈতিক সাহায্যের আড়ালে পরে সামরিক বাহিনী নামিয়ে ১৭৫৭-এর বাংলা বিহার উড়িষ্যার মতো মিসরকে ১৮৮২ সালে দখলই করে নেয়।
১৮৭৫ সালের পরে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পরে সেখানকার ধনিক ব্যবসায়ী শ্রেণী সস্তায় কাঁচামাল সংগ্রহ ও তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের জন্য এবার দূরের অপেক্ষাকৃত দেশগুলো সরকারি সহযোগিতায় দখল করার প্রতিযোগিতায় নামে। এর সাথে যুক্ত হয় খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারকেরা।
আফ্রিকার পিঠা ভাগ : ১৮৬৬ সালে ড. লিডিংস্টোন ও পরে হেনরি এস স্টানলি আফ্রিকার ভেতরে ঢুকে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারে নামেন। এর পরে সুযোগ নেন বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড। ১৮৭৬ সালে তিনি রাজধানী ব্রাসেলসে ‘দি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দি এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড সিভিলাইজেশন অব আফ্রিকা’ সম্মেলন ডাকেন। তিনি আফ্রিকায় খ্রিষ্টধর্ম প্রচারক গোয়েন্দা হেনরি এস স্টানলিকে কাজে লাগালেন। বেলজীয় ব্যবসাদারও এতে থাকে। ১৮৭৯ সালে গোয়েন্দা স্টানলিকে কঙ্গোয় পাঠিয়ে রাজা কঙ্গোর বিশাল এলাকা নিজের বলে দাবি করেন।
ফরাসিরা দেখে যে, বেলজিয়াম কঙ্গোর সব নিয়ে নিচ্ছে। তখন ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে কাড়াকাড়ি লেগে যায় পিঠার ভাগ নিতে। ১৮৮৫ সালে বার্নিলে সম্মেলন হয়। রাজা লিওপোল্ড পেলেন আপার কঙ্গো, ফ্রান্স সমুদ্রের ধারের কিছু অংশ পায়। রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলো কঙ্গো। এলাকাটা সম্পূর্ণ জার্মানি, ফ্রান্স, হল্যান্ড ও বেলজিয়ামের সমান। এরপর চলে রাজার ব্যক্তিগত শোষণ। রাজা সৈন্য পাঠিয়ে চালান গণহত্যা। অবশেষে ১৯০৮ সালে এলাকাটি রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে বেলজিয়াম সরকারের কর্তৃত্বে চলে যায়।
এ দিকে মিসরের দক্ষিণে সুদানে ইসলাম ধর্মীয় আন্দোলন শুরু হলে হানাদার ব্রিটিশ জেনারেল গর্ডন নিহত হন ১৮৮৪ সালে। তবে ১৮৯৮ সালে জেনারেল কিচনারের অধীনে ব্রিটিশ বাহিনী মিসরীয় বাহিনীর সাথে মিলে মাহদিকে হত্যা করে।
ব্রিটিশদের ক্ষুধা তাতেও শেষ হয় না। পর্যটক ও খ্রিষ্টধর্ম প্রচারকদের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে নাইজেরিয়া, গোল্ডকোস্ট, সিয়েরালিওন, গাম্বিয়া, উগান্ডা, কেনিয়া ও সোমালিল্যান্ডের এক অংশ দখলে নেয়।
অন্য দিকে, পিঠা ভাগাভাগির টুকরো ফ্রান্সকেও দিতে হয়। ফ্রান্স পায় কঙ্গোর এক অংশ, ডেহোমি, আইভরি কোস্ট, গিনির এক অংশ, সেনেগাল, সোমালিল্যান্ডের এক অংশ, সাহারা মরুভূমির বেশির ভাগ অংশ ও মাদাগাসকার। এমনকি ফরাসি হানাদারেরা তিউনিসিয়াও দখল করে নেয়।
ইটালিও পিঠার অংশ হিসেবে পায় ইরিনিয়া ও সোমালিল্যান্ডের একটি অংশ। জার্মানি কেন বসে থাকবে। তারও চায় পিঠার ভাগ। সে সাধুবেশী খ্রিষ্টধর্ম প্রচারক ও পর্যটক পাঠিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু অংশ ক্যামেরুনস, টোগো ও পূর্ব আফ্রিকার অংশবিশেষ পায়। তবে স্থানগুলো অর্থনীতি বিবেচনায় তেমন মূল্যবান নয়।
খ্রিষ্ট ইউরোপ ১৯০২-১৯০৪ সময়ে নিজেদের কামড়াকামড়ি কমাতে অনেক চুক্তি করে যাতে সহজে ভূখণ্ড ভাগাভাগি করে নেয়া যায়। চুক্তি হয় ফ্রান্স মরক্কো পাবে, ইতালি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে, তবে এর বদলে ইটালি ট্রিপলি নিতে পারবে। এদিকে স্পেন নাখোশ হয় পিঠার ভাগ নিয়ে। তাই মরক্কোর একটা টুকরো তাকে দেয়া হয় মুখ বন্ধ করতে। চুক্তি হয় : ব্রিটেন মিসরে যা খুশি করবে, ফ্রান্স মরক্কোতেও তাই করতে পারবে। এটি আরেক গোপন সাইকস-পিকো চুক্তির মতো। ফ্রান্স পেয়ে গেল মরক্কো ১৯১১ তে। ইটালি মনে করল, এখন তার যে ট্রিপলি পাওয়ার কথা সে এলাকাটা তখন তুরস্কের। হানাদার বাহিনী পাঠিয়ে পোপের দেশ ইতালি ত্রিপলি (আধুনিক নাম লিবিয়া) দখল করে।
১৯১১-সালের পর লন্ডনে এক তথাকথিত শান্তিচুক্তিতে তুর্কির অধীন আলবেনিয়াকে নতুন রাষ্ট্র করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পাশ্চাত্য আরবদের স্বাধীনতা দেয়ার কথা বলে তাদের ব্যবহার করে তুর্কিদের হত্যা করে আরব মুলুকে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা অফিসার লরেন্স আরব পোশাক পরে ধ্বংসাত্মক কাজ করে। ফিলিস্তিনি আরবদের সাহায্যে ব্রিটিশ জেনারেল এডমান্ড এলেনবি জেরুসালেমসহ ফিলিস্তিন দখল করে। ফিলিস্তিনিরা স্বাধীনতা পায়নি। ব্রিটিশ ও ইহুদিদের গোপন বেলফোর চুক্তিতে ফিলিস্তিন চলে গেল ইহুদিদের হাতে। উচিত শিক্ষা পায় আরবেরা।
তুরস্ক টুকরো হলো : তুরস্কে যখন সেকুলার ও ধর্মমুখীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে তখন ইতালি তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত ত্রিপলি দখল করে নেয়। তারপর ইউরোপের দখলি ছাড়া খ্রিষ্টান শক্তিগুলো বলকান লিগ গঠন করে তুরস্কের বলকান এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করতে। এর মধ্যে প্রথম যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় (১৯১৪-১৮)। তুরস্ক পরিস্থিতির কারণে জার্মানির সাথে থাকায়, যুদ্ধ শেষে জার্মানির পরাজয়ে, ব্রিটেন-ফ্রান্স ও তাদের মিত্রদের কাছে বিশাল এলাকা হারায়।
প্যারিস পিস কনফারেন্স : শান্তির নামে পিঠা ভাগের সম্মেলন হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ীদের। অন্যান্য বিষয়ের সাথে সিদ্ধান্ত হলো এজিয়ান সাগরের সমগ্র উত্তর উপকূলসহ কনসটান্টিনোপল পর্যন্ত তুরস্কের কাছে থেকে গ্রিসের অন্তর্ভুক্ত হবে। তুর্কি বাহিনীর নেতৃত্বে সমগ্র বিশ্বের মুসলমান সামরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্ট্যালিপলি থেকে কনসটান্টিনোপল রক্ষা করেছিল পরবর্তীকালে।
এই তথাকথিত শান্তি সম্মেলনে পাশ্চাত্য ইরাক, ফিলিস্তিন, ট্রান্সজর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননকে তুরস্ক থেকে কেটে নেয়া হলো। তবে ওয়াদা মতো স্বাধীনতা না দিয়ে এ দেশগুলোকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ভাগ করে নিলো ম্যানডেটের নামে পিকো সাইকস গোপন চুক্তির আড়ালে।
হল্যান্ড : ১৫৯০-এর দশকের দিকে ডাচ গোল্ডকোস্টের নাম পাওয়া যায়।
শ্রীলঙ্কা দখলে নিতে ব্রিটিশদের কাছে ব্যর্থ হয়ে হল্যান্ড ১৮৪০ সালে ইন্দোনেশিয়ার এলাকা দখল করে। এর ভেতর ছিল মালাক্কা সুমাত্রা, জাভা, বোর্নিও, সেলিবিস ও অন্যান্য দ্বীপ। ১৬১৯ সালে জাভার বাটাভিয়াতে (জার্কাতায়) কুঠি প্রতিষ্ঠা করে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের রাজধানী করে। ১৬৩৮ তারা মরিসাস দখল করে। ১৮৭১ ডাচ গোল্ড কোস্ট বিক্রয় হয় ব্রিটেনের কাছে। দেশ কেনাবেচা দেশের বাইরে!
রাশিয়া : ১৭২২ পিটার দি গ্রেট পারস্যের সাফাভিড রাজ্য থেকে ককেসাস ও কাস্পিয়ান সাগরের নিকটস্থ স্থান দখলে নেয়। এসপ্রেস এনার ওসমানি সুলতানের অধীনস্থ ক্রিমিয়ার খানেট রাজ্য দখলে নেয়। কাথেরিন দি গ্রেট (১৭৬২-১৭৯৬) ওসমানি সুলতানকে পরাজিত করে ব্ল্যাক সি পর্যন্ত সীমানা বাড়ায়। ১৮০২ সালে পারস্য থেকে জর্জিয়া আলাদা করে রাশিয়া ওসমানি সাম্রাজ্য থেকে সলভোভিয়া নেয় ১৮১২ সালে। ১৮০২ সালে পারস্য থেকে মুসলিম দাগেস্তান দখল করে। আজারবাইজানের কিছু অংশও নেয় রাশিয়া। আর্মেনিয়াও চলে যায় রুশ দখলে। সেই সাথে ইগডির। রাশিয়া গ্রিকদের উসকানি ও সাহায্য দেয় তুর্কির বিরুদ্ধে। খ্রিষ্টধর্মীয় দায়িত্বে রাশিয়া তুরস্ক থেকে বুলগেরিয়া ও সার্বিয়াকে আলাদা করে। রুশ স্বেচ্ছাসেবক (সন্ত্রাসী নয় কেন?) খ্রিষ্টবাহিনী সেখানে প্রবেশ করে। রুশ খ্রিষ্টানরা রোমানিয়া ও মন্টিনেগ্রোকেও বিচ্ছিন্ন করে তুর্কি থেকে।
১৮৭৭-৭৮ সালে রুশ-তুর্কি যুদ্ধে জিতে রাশিয়া তুর্কি এলাকার বাটুমি, আরদাহান ও দক্ষিণ ককেশাসের কারস এলাকায় খ্রিষ্টানদের বসতি স্থাপন করে মুসলমান বিতাড়ন করে।
এশিয়ার কিরগিস তৃণভূমি
১৯ শতকের শেষেই রাশিয়া পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগ নিয়ে নেয়, যার বিশাল অংশ মুসলমানদের ছিল। সমগ্র এলাকার রুশভাষী জনগণ ছিল শতকরা পঁয়তাল্লিশ ভাগ। প্রায় একশো জাতিসত্তাকে রাশিয়া দাবিয়ে রাখে। আরো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হলো মধ্য এশিয়ায় কাজখস্তান, কিরগিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান, উসমানি তুর্কি থেকে নেয়া আরদাহান, আর্টভিন, ইগডির, কারস ও এরজুরুমের উত্তর-পূর্ব এলাকাগুলো।
১৮১২ সালে তুরস্কের অধীনস্থ মলদোভিয়া নেয় রাশিয়া। তুরস্ক থেকে বেসারাবিয়াও যায় রাশিয়ার ঘরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুরস্কের অধীনস্থ আর্মেনিয়ার অংশও নেয় রাশিয়া।
১৮৮৯ রাশিয়া উত্তর আফ্রিকার জিবুতির কাছে সাগাল্লোতে কলোনি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নেয়। তবে ফরাসি বাধায় তা ব্যর্থ হয়। সব সাম্রাজ্যবাদী চায় লোহিত সাগরের কাছে ঘাঁটি। আমুর নদীর উত্তরে সব মুসলিম অঞ্চল রাশিয়া দখল করে এক এক করে। প্রতিবেশীই বড় শত্রু প্রমাণিত হয় তুরস্কের।
রাশিয়া ১৮৭৫ সালে বলকানের সার্বিয়া, মন্টিনেগ্রো ও বুলগেরিয়াকে উসকালো তুরস্ক থেকে আলাদা হয়ে যেতে। ১৮৭৮ সালের সান স্টেফানোর অপমানজনক চুক্তি সই করতে বাধ্য হলো তুরস্ক রাশিয়ার সাথে। তুরস্কের সেই পূর্ববর্তী সামরিক শক্তি তখন ছিল না। সার্বিয়া, মন্টিনেগ্রো ও রুমানিয়া বিচ্ছিন্ন হলো। বুলগেরিয়া আরো এলাকা পেয়ে প্রায় বিচ্ছিন্ন হলো। আর রাশিয়া পিঠার ভাগ পেল কারস ও বাটুম শহর, আর কিছু নগদ অর্থ।
পশ্চিমের দেশগুলোর মুসলিম জমি দখলের উৎসবে, রাশিয়া ককেশাস ও মধ্য এশিয়ার মুসিলম এলাকা গিলে খায় ১৮৬৫-১৮৭৩ সালের মধ্যে। রাশিয়ার এই পিঠা ভাগের সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে অস্ট্রেলিয়া ও গ্রেট ব্রিটেন ১৮৭৮ সালে কংগ্রেস অব বার্লিন নামক সভা ডেকে বসনিয়া ও হারজেগোভিনাকে অস্ট্রিয়ার হাতে দিয়ে দেয়। গ্রেট ব্রিটেন তুরস্কের সাইপ্রাস দ্বীপ পায়।
১৯০৭ সালে রাশিয়া মেনে নেয় যে, আফগানিস্তান তার প্রভাব বলয়ের বাইরে অর্থাৎ ব্রিটিশ প্রভাবে থাকবে। আর পারস্যের পিঠাকে তিন টুকরো করা হয়। উত্তর অংশে থাকে রুশ প্রভাব, দক্ষিণ অংশে ব্রিটিশ প্রভাব, আর মধ্যাংশে রাশিয়া-ব্রিটিশ উভয়ের প্রবাব।
রাশিয়া তুরস্কের সাম্রাজ্যের মধ্য এশিয়ার বিরাট তুর্কি এলাকা দখল করে নেয়। রাশিয়া আফগান সরকারকে উৎখাত করে কমিউনিজমের নামে দশ লাখ আফগানকে হত্যা করে।
চীন : কিং ডাইন্যাস্টির শাসনের সময় বিশেষ করে ডুনগান বিদ্রোহ (১৮৬২-১৮৭৭) এবং পানসে বিদ্রোহ (১৮৫৬-১৮৭৩) হয়। পানসে বিদ্রোহে দশ লাখ হুই মুসলিম ও ডুনগান বিদ্রোহে আরো বেশি হুই মুসলিম (কয়েক মিলিয়ন) নিহত হয়।
পূর্ব তুর্কিস্তান দখল করেছিল চীনের মানচু বংশীয় রাজা, ১৮৭৬ সালে। আট বছরের যুদ্ধ শেষে এই তুর্কি মুসলিম এলাকা চীনের সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় জিনজিয়াং (নয়া মুলুক) নাম দিয়ে ১৮৮৪ সালের ১৮ নভেম্বরে। সোভিয়েত ইউনিয়ন চীন থেকে স্বাধীনতা পেতে উইঘুর তুর্কিদের সাহায্য করে, তবে যখন চীনে কমিউনিজম আসে, তখন আবার সেই বিদ্রোহ সোভিয়েত ইউনিয়নই দমন করে।
তুর্কিস্তান এলাকায় নকশাবন্দী সুফিরা চীনের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। এগুলো হয় ১৮২০-২৮, ১৮৩০, ১৮৪৭ ও ১৮৬১ সালে। ইয়াকুব বেগ (১৮২০-৭৭) পুরনো তুর্কিস্তান মুক্ত করে দশ বছর শাসন করে। সুফি দরবেশরা বাংলার ফকির সুফিদের মতো যুদ্ধ করেন চীনের অন্যত্র মুসলিম এলাকায়। এ সময় একজন মহান মুসলিম বীর ছিলেন মা সিং সিন (মৃত্যু ১৭৮১)। পরে আরেক মুসলিম বীর ছিলেন মা মুয়া সিং, যিনি ১৮৬২-১৮৭৭ সালে যুদ্ধ করেন। তবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে নিঃশেষ হয়ে যান সবাই। ইউনান এলাকায় মুসলিম বীর টুওয়েন সিন চীনা সম্রাটের বাহিনীকে পরাজিত করে সুলতান সোলায়মান নাম নিয়ে পনেরো বছর রাজত্ব করেন।
লেখক : ইতিহাসবিদ, গবেষক

অবসরকালীন রায়: বিতর্কেই সমাধান by আসিফ নজরুল

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দায়িত্ব গ্রহণের বছর পূর্তি হলো ১৭ জানুয়ারি। এ উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বাণীতে তিনি বলেন, ‘বিচারপতিদের অবসরের পর রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থী।’
প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক উঠেছে। এই বিতর্ক অবশ্য কতটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। যেমন বিএনপি বলেছে, প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের যে রায় ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় দেওয়া হয়েছিল (চূড়ান্ত রায়টি সংশ্লিষ্ট বিচারপতির অবসরের পর লেখা), তা অবৈধ হয়ে গেছে। এ রায়ের পর ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির ওই বক্তব্যের পর পঞ্চদশ সংশোধনীও ‘বাতিলযোগ্য হয়ে গেছে’।
প্রথমেই বলে রাখি, ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় রায়ের সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনী বৈধতার আসলে কোনো সরাসরি সাংবিধানিক সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সংবিধান সংশোধনী আনা যায়। সে কারণেই (তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে অনেক যুক্তি থাকলেও) এটি বাতিল করা-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী অন্তত আইনগতভাবে বৈধ। এই সংশোধনীর পক্ষে আওয়ামী লীগ যেসব যুক্তি দিয়েছিল, তার অন্যতম ছিল ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার রায় পালনের বাধ্যবাধকতা। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এ রায় যদি না-ও থাকত, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনী আনার সাংবিধানিক সুযোগ ছিল। ‘পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ’—এ ধরনের কোনো রায় উচ্চ আদালতে না আসা পর্যন্ত এটি তাই বৈধ।
প্রধান বিচারপতির বক্তব্য নিয়ে তাই আওয়ামী লীগের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, বিএনপিরও বেশি উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রধান বিচারপতিকে এ জন্য সংযত হয়ে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি প্রধান বিচারপতিকে যে ভাষায় আরও কিছু কথা বলেছেন, তা কতটা শোভনীয়, এ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। তবে তিনি যে প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতিকে সংযত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, তা নিয়ে বরং আরও বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।
এই প্রয়োজন অবসরকালীন রায়ের ফলে সৃষ্ট নানা সমস্যার মধ্যে নিহিত। বাংলাদেশে অনেক বিচারপতি রায় লিখতে বহু সময় নেন, হাইকোর্টে এতে কখনো কখনো তিন-চার বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, এটি আইনমন্ত্রীও বলেছেন। এতে বিচারপ্রার্থী নানা ধরনের ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। কিন্তু অবসরকালে যদি বিচারপতিরা রায় লেখার জন্য বহু মাস সময় নেন, তখন এটি নৈতিকতারও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অবসর-পরবর্তী সময়ে বিচারকেরা তাই আদৌ রায় লিখতে পারেন কি না, পারলে কত দিন পর্যন্ত বিলম্ব গ্রহণযোগ্য হতে পারে, বিলম্বের কারণে কী ধরনের আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হয়, এমন পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা নিয়ে তাই সৎ উদ্দেশ্যমূলক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন রয়েছে অতীত নজিরের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেরও।
২.
সংবিধানের ৯৫ ও ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের দায়িত্ব গ্রহণের আগে সংবিধানসম্মতভাবে একটি শপথ নিতে হয়। এই শপথে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কাজ করার, আইন ও সংবিধানের রক্ষণের এবং অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে আচরণ করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করা হয়। প্রধান বিচারপতির বক্তব্য হচ্ছে অবসরের পর একজন বিচারপতি সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বলে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের সময় গৃহীত শপথ বহাল থাকে না। এ কারণে অবসরের পর আদালতের নথি সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে সই করার অধিকার হারান বিচারপতিরা।
প্রধান বিচারপতির এটি একটি পর্যবেক্ষণ। কিন্তু এটি কোনো বায়বীয় বা মনগড়া পর্যবেক্ষণ নয়। এর সপক্ষে সুপ্রিম কোর্টের জোরালো ও সুস্পষ্ট পূর্বনজির রয়েছে। ১৯৬৪ সালে কাজী মেহারদিন বনাম মুরাদ বেগম মামলায় সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াসের নেতৃত্বে পাঁচজন বিচারক হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের রায়ের বৈধতার বিষয়টি নিষ্পত্তি করেন। বিষয়টি–সম্পর্কিত সব পূর্বসিদ্ধান্ত পরীক্ষা করে সুপ্রিম কোর্ট এই রায় দেন যে অবসর-পরবর্তী সময়ে একজন বিচারপতির লিখিত ও স্বাক্ষরকৃত রায় কোনো রায় নয়।
অবসরের পর বিচারপতি রায় লিখতে পারবেন—এর সপক্ষেও অবশ্য পুরোনো কিছু বিচারিক বিশ্লেষণ রয়েছে। তবে তা সুপ্রিম কোর্টের নয়, হাইকোর্ট বা নিম্ন আদালতের এবং আমার জানামতে, ১৯৬৪ সালের সুপ্রিম কোর্টের পূর্বে উল্লেখিত রায়ের পর এর পরিপন্থী কোনো রায় একই আদালত থেকে কখনো দেওয়া হয়নি।
অবসরের পর শপথ থাকে না বলে বিচারকদের রায় লেখার অধিকার থাকে না—সরল পাঠেও তা-ই মনে হতে পারে। তবে কিছু বিষয় পর্যালোচনা করে কেউ কেউ এমন অভিমত দিতে পারেন যে কোনো যৌক্তিক কারণে (কর্মকালে কাজের অতিরিক্ত চাপ, অসুস্থতা বা অন্য কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে) হয়তো রায় লেখার জন্য অবসরের পর কিছুটা সময় নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কখনো কখনো তা নানা অনভিপ্রেত ও গুরুতর বিতর্কেরও সৃষ্টি করতে পারে। যেমন বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল-সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়।
৩.
বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর অবসরে যাওয়ার কিছুদিন আগে ২০১১ সালের ১০ মে ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়ে যান। সেখানে তিনি সুস্পষ্টভাবে ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে আগামী দুটো সংসদ নির্বাচন করা যেতে পারে বলে অভিমত দেন। ত্রয়োদশ সংশোধনীতে নির্বাচনের সময়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার বিধান ছিল। অথচ সুদীর্ঘ ১৬ মাস পরে প্রকাশিত রায়ের চূড়ান্ত আদেশে তিনি কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যেতে পারে বলে নির্দেশনা দিয়েছেন। নিজের দেওয়া আদেশ থেকে কোনো রকম অতিরিক্ত শুনানি ছাড়া এ ধরনের বিচ্যুতি নজিরবিহীন এবং বিচারদর্শনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে অভিযোগ রয়েছে। আপিল বিভাগের ভিন্নমতপোষণকারী তিনজন বিচারপতিও এই বিচ্যুতিকে চিহ্নিত করেছিলেন।
আপিল বিভাগের বিচারপতি ওয়াহাব মিয়া ও নাজমুন আরা সুলতানার অভিমত ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হলে তা জাতীয় সংসদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠন করতে হবে—এই শর্ত সংক্ষিপ্ত আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিচারপতি ইমান আলী লিখেছিলেন, এই শর্ত সংক্ষিপ্ত আদেশে ছিল না। এই তিনজন বিচারক আরও কিছু বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন, যা সংক্ষিপ্ত আদেশে ছিল না।
বিচারপতি খায়রুল হকের রায়টি ছিল সুদীর্ঘ ৩৪২ পৃষ্ঠার। এতে ছিল অন্তত এক ডজন কাহিনির বিবরণ, বিভিন্ন আইনবিদ ও লেখকের অর্ধশতাধিক কোটেশন, সমাজের বিভিন্ন মহলের প্রতি সমালোচনা ও উপদেশ এবং এমনকি নানান দেশের আইনের ইতিহাস। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা, সংক্ষিপ্ত আদেশ চূড়ান্ত রায়ে বদলে দেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ক্ষমতা একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের আছে কি না, এ ধরনের কোনো নজির বিচারিক ইতিহাসে রয়েছে কি না বা তাঁরই দেওয়া সংক্ষিপ্ত আদেশটির এখন প্রাসঙ্গিকতা কী, এ সম্পর্কে কোনো রকম বিশ্লেষণই এতে নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে অবসরকালে কেউ যদি চূড়ান্ত রায়ে এমন কিছু লেখেন, যা বিচারপতির শপথে থাকা অবস্থায় তাঁরই দেওয়া আদেশের পরিপন্থী বা বহির্ভূত, তাহলে কোনটি বৈধ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত? বিচারকের আদেশ, নাকি ব্যক্তির রায়? এসব প্রশ্নের ব্যাখ্যা আমরা কোথায় পাব অবসরকালের রায়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হলে? এসব প্রশ্নের সুরাহা না করলে অবসরকালে রায় লেখার নামে স্বেচ্ছাচার হলে তা ঠেকানো যাবে কীভাবে?
৪.
চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে অবসরকালীন রায়ে কিংবা বহু বিলম্বে প্রদান করা আরও কিছু রায়ে এ রকম বিচ্যুতি খুঁজে পাওয়া সম্ভব। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলায় এ ধরনের বিচ্যুতি মানুষের মনে বিচার বিভাগ সম্পর্কে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। অবসরকালে, এমনকি কর্মরত থাকা অবস্থায় বিলম্বে রায় অনেক ধরনের জটিলতা বা ভোগান্তিও সৃষ্টি করতে পারে। যেমন সংক্ষিপ্ত আদেশে কেউ জমির পজেশন পেলেও চূড়ান্ত রায়ের কপি না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে দখল ফিরে পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। আদালতে ঘোষিত রায়ে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে এবং এর বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিউ করতে চাইলে লিখিত রায়ের কপি না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর কিছু করার উপায় থাকে না।
আবার অবসরে যাওয়া বিচারকের চূড়ান্ত রায়ে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে আপত্তিযোগ্য মন্তব্য থাকলে তিনি কার কাছে তখন পিটিশন করবেন, তা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। কোনো বিচারক অবসর নিয়েই রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান শুরু করলে বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিলে তাঁর রায় লেখার মতো দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা আদৌ আর আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।
অধিকাংশ বিবেচনায় তাই অবসরের আগে এবং চাকরিকালে যত দ্রুত সম্ভব চূড়ান্ত রায় প্রদান করাই উত্তম। উচ্চ আদালতে বিচারকদের অনেকের কাজের চাপ বেশি, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত লজিস্টিক সুবিধাও নেই। কিন্তু বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে তারপরও দ্রুত রায় লেখার পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। যেমন: সপ্তাহে এক কার্যদিবস রায় লেখার জন্য নির্ধারণ করা, অবসরে যাওয়ার আগে অন্তত ছয় মাস বিচারকদের বিচারকার্য থেকে দূরে রেখে শুধু রায় লেখার সুযোগ দেওয়া, ক্ষেত্রবিশেষে যথোপযুক্ত কারণ থাকলে প্রধান বিচারপতির অনুমতিক্রমে সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অবসরকালে রায় লেখার সুযোগ দেওয়া। কাজের চাপ কমানোর জন্য এমনকি সুপ্রিম কোর্টে অবকাশের মেয়াদ কমানো যেতে পারে। সবার সঙ্গে পরামর্শ করে আরও বহু কিছু করা সম্ভব হতে পারে।
আমাদের প্রত্যাশা, প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ নিয়ে রাজনীতি বা জল ঘোলা করার প্রচেষ্টার অবসান ঘটুক। সূচনা হোক বিচার শেষ হওয়ার পর যৌক্তিক সময়ের মধ্যে দ্রুত রায় লেখার সংস্কৃতির। বিচার বিভাগ, বিচারপ্রার্থী, বিচারক—সবার জন্যই এটি মঙ্গলজনক হবে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশ: অগ্রগতি হবে কি? by ইফতেখারুজ্জামান

২৭ জানুয়ারি ২০১৬ প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণাসূচক ২০১৫ সালের ০-১০০ স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২০১৪-এর মতো ২৫ পেয়ে অপরিবর্তিত রয়েছে। ১৬৮টি দেশের মধ্যে উচ্চক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৩৯তম, যা ২০১৪-এর তুলনায় ছয় ধাপ ওপরে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ১৭৫টি দেশের মধ্যে ১৪৫তম অবস্থান পেয়েছিল। ছয় ধাপ অগ্রগতি কিছুটা সন্তোষজনক মনে হতে পারে, যদিও বাস্তবে তা হয়েছে এ জন্য যে, যে সাতটি দেশ এবার জরিপের আওতাভুক্ত হয়নি, তারা সব সময় বাংলাদেশের তুলনায় বেশি স্কোর পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে এবারও আফগানিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থান বাংলাদেশের। ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশ এবার ২০১৪ সালের ১৪তম অবস্থানের এক ধাপ নিচে ১৩তম, যা ২০১৩ সালের তুলনায় তিন ধাপ নিচে ও দুই পয়েন্ট কম। অর্থাৎ সার্বিক বিবেচনায় এবারও আমাদের অগ্রগতি হলো না।
দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভুটান, ৬৫ স্কোর পেয়ে উচ্চক্রম অনুযায়ী ২৭তম; এরপর ভারত, ৩৮ স্কোর পেয়ে ৭৬তম; শ্রীলঙ্কা ৩৭ পেয়ে ৮৩তম, পাকিস্তান ৩০ পেয়ে ১১৭তম, নেপাল ২৭ পেয়ে ১৩০তম এবং আফগানিস্তান ১১ পেয়ে ১৬৬তম। বৈশ্বিক তালিকায় সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থান পেয়েছে উত্তর কোরিয়া ও সোমালিয়া, ৮ পয়েন্ট। ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশীয় সব দেশেরই স্কোর সূচকের গড় ৪৩-এর নিচে, অর্থাৎ এই অঞ্চলে দুর্নীতির ব্যাপকতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
১৯৯৫ সাল থেকে প্রণীত দুর্নীতির ধারণাসূচক বা সিপিআই সরকারি খাতে, বিশেষ করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণার বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক চিত্র প্রদান করে থাকে। সূচকে ১২টি আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত জরিপের তথ্যের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে এমন জরিপের তথ্যই ব্যবহৃত হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা সম্ভব। টিআইবি বা অন্য কোনো দেশের টিআই চ্যাপ্টারের গবেষণা বা জরিপলব্ধ কোনো তথ্য এ সূচকে বিবেচিত হয় না। অন্যদিকে সূচকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য কোনো দেশ সম্পর্কে কমপক্ষে তিনটি আন্তর্জাতিক জরিপ থাকতে হয়। ফলে প্রায় প্রতিবছরই জরিপে অন্তর্ভুক্ত দেশের সংখ্যার হেরফের হয়। এ কারণে এই অঞ্চলের দেশ মালদ্বীপ গত কয়েক বছরের মতো এবারও সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। একইভাবে ২০১৪ সালে জরিপকৃত যে সাতটি দেশ ২০১৫ সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তারা হলো বার্বাডোজ (২০১৪-এ স্কোর ৭৪), বাহামাস (৭১), সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড গ্রেনাডা (৬৭), পুয়োর্তো রিকো (৬৩), ডোমিনিকা (৫৮), সামোয়া (৫২) ও সোয়াজিল্যান্ড (৪৩)।
সূচকটি টিআইয়ের বার্লিনভিত্তিক সচিবালয়ের গবেষণা বিভাগ কর্তৃক প্রণীত হয়। জার্মান ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক রিসার্চ সূচকের স্কোর পর্যালোচনা ও তথ্যের যথার্থতা যাচাই করে থাকে। পদ্ধতি ও বিশ্লেষণে উৎকর্ষ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর আন্তর্জাতিকভাবে সুখ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন। এ বছর এ রকম পরামর্শ দিয়েছেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের সরকার বিভাগ ও গবেষণা পদ্ধতি ইনস্টিটিউট এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল, ডাও জোন্স ও স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর-এর বিশেষজ্ঞরা।
যে সাতটি সূত্র থেকে বাংলাদেশের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, সেগুলো হলো ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কান্ট্রি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এক্সিকিউটিভ ওপিনিয়ন সার্ভে, বার্টলসম্যান ফাউন্ডেশন ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স, গ্লোবাল ইনসাইট কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস, পলিটিক্যাল রিস্ক সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল কান্ট্রির রিস্ক গাইড, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল অ্যাসেসমেন্ট এবং ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের রুল অব ল ইনডেক্স। তথ্য সংগ্রহের মেয়াদ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ থেকে আগস্ট ২০১৫ পর্যন্ত।
যেসব দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা সবচেয়ে কম বলে নিরূপিত হয়েছে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ৯১ স্কোর পেয়ে পরপর দ্বিতীয়বারের মতো ডেনমার্ক ও ৯০ পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ফিনল্যান্ড। এরপর নিউজিল্যান্ড (৮৯), নেদারল্যান্ডস ও নরওয়ে (৮৭), সুইজারল্যান্ড (৮৬), সিঙ্গাপুর (৮৫), কানাডা (৮৩), জার্মানি, ইউকে ও লুক্সেমবুর্গ (৮১)। এশীয় অঞ্চলে সিঙ্গাপুর ছাড়া তুলনামূলকভাবে উচ্চতর অবস্থানে রয়েছে হংকং ও জাপান (৭৫), কাতার (৭১) ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (৭০)।
কোনো দেশই শতভাগ স্কোর পায়নি। বিশ্বের সর্বোচ্চ উন্নত দেশসমূহের অনেকেই, যেমন অস্ট্রেলিয়া, আইসল্যান্ড, বেলজিয়াম, জাপান, অস্ট্রিয়া, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ইত্যাদি ৮০ শতাংশের কম পেয়েছে। ১৬৮টি দেশের মধ্যে ১১৪টি, অর্থাৎ ৬৮ শতাংশ দেশ ৫০-এর কম স্কোর পেয়েছে। ১০৩টি দেশ সূচকের গড় স্কোর ৪৩-এর চেয়ে কম পেয়েছে। ৫৪টি দেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের মতো ভুটান ও ভারতের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে; শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তানের স্কোর কমেছে। পাকিস্তানের স্কোর ১ পয়েন্ট বেড়েছে। ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫-এর বৈশ্বিক সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ২০১৪ সালে ৯২টি দেশের স্কোর বেড়েছিল, ২০১৫ সালে সেখানে ৬৫টি। অন্যদিকে ২০১৪ সালে ৩৬টির তুলনায় ২০১৫ সালে ৪৯টি দেশের স্কোরে অবনতি হয়েছে। উন্নয়নশীল অনেক দেশের পাশাপাশি যেসব উন্নত দেশে অবনতি হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে নিউজিল্যান্ড, যার তিন পয়েন্ট কমেছে। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, লুক্সেমবুর্গ, এমনকি এবারের শীর্ষ স্থানপ্রাপ্ত ডেনমার্কেরও ১ পয়েন্ট কমেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে ব্রাজিল ও লেসোথো, উভয়েই গতবারের তুলনায় ৫ পয়েন্ট কম পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে কুয়েত ও রুয়ান্ডা (৫) এবং চেক রিপাবলিক, অস্ট্রিয়া, নামিবিয়া, জর্ডান ও নেদারল্যান্ডস (৪)।
সার্বিক বিবেচনায় এটি পরিষ্কার যে দুর্নীতি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যদিও আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে দুর্নীতির চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি উদ্বেগের কারণ। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পরপর পাঁচবার বাংলাদেশ সর্বনিম্ন স্থানে ছিল। সোমালিয়া এ বছরসহ পরপর নয়বার শীর্ষে অবস্থান পাওয়ার ফলে আমাদের সেই গ্লানির কিছুটা লাঘব হতে পারে। পরে বাংলাদেশ ২০০৬ সালে তৃতীয়, ২০০৭ সালে সপ্তম, ২০০৮ সালে দশম, ২০০৯ সালে ত্রয়োদশ, ২০১০ সালে দ্বাদশ, ২০১১ ও ২০১২ সালে ত্রয়োদশ, ২০১৩ সালে ১৬তম এবং ২০১৪ সালে ১৪তম স্থান পাওয়ায় কিছুটা সার্বিক অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়। এবার একদিকে স্কোর অপরিবর্তিত থেকে উচ্চক্রমে ছয় ধাপ ওপরে এবং অন্যদিকে নিম্নক্রমে এক ধাপ অবনতি হওয়ায় ঊর্ধ্বগতি ধরে রাখা সম্ভব হলো না।
যেসব কারণে অগ্রগতি হচ্ছে না, তার মধ্যে রয়েছে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কিছু কিছু দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ সত্ত্বেও প্রয়োগ ও চর্চার ঘাটতির ফলে প্রকটতর হয়েছে কার্যকরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্তের সংকট। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান দুদকের কার্যকরতা ও স্বাধীনতা খর্ব করার অপপ্রয়াস যেমন অব্যাহত রয়েছে, তেমনি দুদকের নিজস্ব সক্রিয়তা, দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষতার ঘাটতি রয়েছে চলমান। সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, শেয়ারবাজার ও ডেসটিনির মতো ‘রুই-কাতলা’ শ্রেণির দুর্নীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সরকারি প্রভাবমুক্ত হয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা যাবে, এমন ধারণা সৃষ্টি হয়নি।
দুর্নীতির অভিযোগের অস্বীকৃতির মানসিকতার প্রসার ঘটেছে। ক্ষমতাবানদের একাংশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাজশে ভূমি-বনাঞ্চল-নদী-জলাশয় দখলসহ আইনের শাসন পরিপন্থী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বেই রয়ে গেছে। জনপ্রতিনিধিদের একাংশের বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন সম্পদের পরিসংখ্যান প্রকাশের ক্ষেত্রে দুদক বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে—এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন। সরকারের দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে প্রকাশ্যেই বলা হয়েছে, ক্ষমতায় থাকলে সম্পদ বাড়বেই, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই; ঘুষ লেনদেনকে দুর্নীতি বলা যাবে না ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য বিদেশি সহযোদ্ধাদের সম্মান প্রদর্শনে উপহার হিসেবে প্রদত্ত স্বর্ণের ক্রেস্ট জালিয়াতির ঘটনায় পদক্ষেপ গ্রহণ স্বার্থের দ্বন্দ্বের হাতে জিম্মি হয়েছে। অবৈধ অর্থের পাচারের বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশিরা প্রাধান্য পেয়েছে। কালোটাকা অর্জনকে পুরস্কৃত করা অব্যাহত রয়েছে। সরকারের নীতি–কাঠামো দুর্নীতি সহায়ক, দুর্নীতিতে লাভবান ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয়দানকারী মহলের করাভূত হওয়ার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে।
তবু আশাবাদী হতে চাই। দুর্নীতিবিরোধী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো সৃষ্টিতে যে অগ্রগতি ইতিমধ্যে হয়েছে, তার চর্চা ও প্রয়োগের ঘাটতি পূরণে সরকারসহ সব অংশীজনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্নীতি যে বাস্তবেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সব প্রকার ভয় বা করুণার ঊর্ধ্বে গিয়ে তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এ জন্য চাই কার্যকর দুদকের পাশাপাশি অন্যান্য জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় পেশাদারি ও দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ। সর্বোপরি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণ, গণমাধ্যম ও বেসরকারি সংগঠনের সোচ্চার ভূমিকা অপরিহার্য, যার পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। জনগণ যত বেশি সোচ্চার ও তাদের চাহিদা যত বেশি সরকার তথা ক্ষমতাবানদের প্রভাবিত করতে পারবে, তত বেশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে অগ্রগতি হবে; দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের উন্নতিও হবে ততটুকুই।
ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

ধর্ম, জীবন, ক্রিকেট, রাজনীতি- মাশরাফির ভাবনা

ক্রিকেটার কেবল নয়; কোন জাতির ইতিহাসে এমন মানুষই আসে শতবর্ষের আরাধনায়। মাশরাফি হলো গ্রিক ট্রাজেডি আর ভারতীয় রোমান্টিকতার মিশেলে এক মহাকাব্য। সে মাশরাফি বিন মুর্তজার জীবনী লিখেছেন সাংবাদিক দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। ‘মাশরাফি’ নামের বইটি এরই মধ্যে তৈরি করেছে বিপুল আলোচনা। মানবজমিনের অনলাইন পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে বইটির বিভিন্ন অংশ। আজ প্রকাশিত হলো বইয়ে মাশরাফির দেয়া সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ-
২০০১ সালের শুরুর দিকে ঢাকায় এলেন অনূর্ধ্ব-১৭ একটা বিভাগীয় প্রতিযোগিতায় খেলতে। তরতর করে পরের কয়েকমাসের মধ্যে টেস্ট দলে চলে এলেন। খুব সোজা ছিল জীবনটা?
জীবন! জীবন নিয়ে এই ভাবনা এখনই ভাবি না; আর সেই বয়সে! আমার জীবন নিয়ে ভাবনাটা কি ছিল জানেন?
কী?
আমি প্রতিদিন ভাবতাম, আজকের ম্যাচ কি টিভিতে দেখাবে? যদি জানতাম দেখাবে, ভাবতাম, আজই তো শেষবার বাসায় বসে সবাই খেলা দেখতে পারবে। আজ সেরাটা খেলি। আজইতো শেষ। আর দেখাবে না। আমি এই ভাবনাটাকে হারাতে দিইনি। এখনো আমি প্রতি ম্যাচের আগে ভাবি, এটাই আমার শেষ ম্যাচ টিভিতে দেখা যাবে। তারপর সব শেষ। এই ম্যাচেই যা করার করে ফেলতে হবে।
আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করেন, ক্রিকেট এখন দেশপ্রেম প্রকাশের একটা জায়গা হয়ে গেছে।
আমি তো নিয়মিত বলছি কথাটা। দেশের তুলনায় ক্রিকেট অতি ক্ষুদ্র একটা ব্যাপার। একটা দেশের অনেক অনেক ছোট ছোট মাধ্যমের একটা হতে পারে খেলাধুলা; তার একটা অংশ ক্রিকেট। ক্রিকেট কখনো দেশপ্রেমের প্রতীক হতে পারে না। সোজাকথা খেলাধুলা একটা বিনোদন।
অথচ বিনোদনটা এখন দেশের প্রধান ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
এটাতো বিস্ময়কর ব্যাপার। খেলা কখনো দেশের প্রধান আলোচনায় পরিণত হতে পারে না। দেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে যা সমাধানের বাকি। সেখানে ক্রিকেট নিয়েই পুরো জাতি, রাষ্ট্র; সবাই এভাবে এনগেজ হয়ে পড়তে পারে না। আজকে আমাদের সবচেয়ে বড় তারকা বানানো হচ্ছে, বীর বলা হচ্ছে, মিথ তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো সব হলো বাস্তবতা থেকে পালানোর ব্যাপার।
তাহলে তারকা কে? বীর কে? আমাদের দেশে তো তারকাও নেই, বীরও নেই।
অবশ্যই আছে। আমাকে প্রশ্ন করুন, তারকা হলেন একজন ডাক্তার।........... তারকা হলো লেবাররা। দেশ গড়ে ফেলছে।  ক্রিকেট দিয়ে আমরা কী বানাতে পারছি? একটা ইটও কি ক্রিকেট দিয়ে তৈরি করা যায়? একটা ধান জন্মায় ক্রিকেট মাঠে? জন্মায় না। যারা এই ইট দিয়ে দালান বানায়, যারা কারখানায় আমাদের জন্য এটা-ওটা বানায় বা ক্ষেতে ধান জন্মায় তারকা হলো তারা।
বীর? আপনি বীর নিয়ে অন্য একটা সাক্ষাৎকারে বলছিলেন?
হ্যাঁ, সব সময় বলি। বীর হলেন মুক্তিযোদ্ধারা। আরে ভাই, তারা জীবন দিয়েছে। জীবন যাবে জেনে ফ্রন্টে গেছেন দেশের জন্য। আমরা কী করি? খুব বাজেভাবে বলি- টাকা নেই, পারফর্ম করি। এটা অভিনেতা, গায়কের মতো আমরাও পারফর্মিং আর্ট করি। এর চেয়ে এক ইঞ্চিও বেশি কিছু না। মুক্তিযোদ্ধারা গুলির সামনে এই জন্য দাঁড়ায় নাই যে, জিতলে টাকা পাবে। কাদের সঙ্গে কাদের তুলনা রে! ক্রিকেটে বীর কেউ থেকে থাকলে রকিবুল হাসান, শহীদ জুয়েল।
ধর্মীয় জীবন যাপনের সঙ্গে এই পেশাগত জীবনকে কীভাবে মেলান?
আমাদের ধর্মে তো এই ব্যাপারে কোন বিরোধ নেই। ইসলাম একটা পরিপূর্ণ জীবনদর্শন। হাশিম আমলা সেটা পুরো অনুসরণ করেই তো ক্রিকেট খেলছে। পরিবার, সংসার, পেশা-সব ক্ষেত্রেই আমাদের ধর্মে পরিষ্কার নির্দেশনা আছে। ধর্ম পালন করে কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয় না, উপকৃত হয়।
আপনি কি নিজে ধর্মের দেখানো সব পথ মেনে চলেন?
সেই দাবি করার সুযোগ নেই। আমার ইচ্ছা আছে। ইচ্ছা আছে হযরত মুহাম্মদ (সা.) যেভাবে জীবন যাপন করেছেন, ধর্মে যা বলা হয়েছে; সেভাবে জীবন কাটানোর। এখনো আমি তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারিনি। তবে ইচ্ছে আছে, চেষ্টা আছে।
এমনিতে রাজনীতি আকর্ষণীয় মনে হয়? অনেকে তো নোংরা জগৎ বলে এড়িয়ে থাকতে চায়।
মোটেও না। রাজনীতি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। আমার কাছে আকর্ষণীয়তো মনে হয়। রাজনীতি আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজনের জায়গা। দেখেন এই দেশটার ভালো কিছু করতে হলে রাজনীতিবিদেরাই পারেন এসব ঠিক করতে। আমার ধারণা হয়তো ঠিক না, হয়তো আমি জ্ঞানী না। আমি এটা বুঝি, দেশটাকে বদলালে রাজনীতিবিদেরাই পারবেন। ক্রিকেট দিয়ে, খেলা দিয়ে দেশ বদলাবে না; এগুলো সৌন্দর্য বাড়াবে। দেশ রাজনীতিবিদেরাই সুন্দর করবেন।
আপনাকে অনেকে রাজনীতিতে দেখতে চায়।
দেখতে চাইলে তো হয়তো চলে আসব। হা হা হা....। না, আবারও বলি, আমি তো আমার ভবিষ্যৎ ঠিক করতে পারি না। সেটা পারলে সবার আগে মৃত্যুকে কিনে রাখতাম। এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে রাজনীতি নয়, মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করতাম। তাই যখন পারে না, বাকি কিছু নিয়ন্ত্রণের আশা করে লাভ নেই।

রোহিঙ্গাদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন ও অং সান সু চি by নিকোলাস ক্রিস্টিন

বিশ্ব শিগগির একটি লক্ষণীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করবে। একজন অতিপ্রিয় নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একবিংশ শতাব্দীর কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বা নির্যাতন শিবিরে সভাপতিত্ব করবেন।
বিশ্বের অন্যতম একজন সত্যিকারের বীর অং সান সু চি তার দেশে গণতন্ত্রের লড়াইয়ে জয়লাভ করেছেন। নভেম্বরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে তার দল ব্যাপক বিজয় অর্জন করেছে। বিজয়ী হিসেবে, অং সান সু চি উত্তরাধিকার সূত্রে নিকৃষ্ট জাতিগোষ্ঠীগত নির্মূল অভিযানের ও অংশীদার। রোহিঙ্গা নামক মুসলিম সংখ্যালঘুদের নির্মূল করার জন্য মিয়ানমার যে কঠোর নির্যাতন চালিয়েছে, যে ধরনের নির্মম নিষ্ঠুরতার কথা কেউ কখনো শোনেনি।
সাম্প্রতিক একটি ইয়ালি সমীক্ষায় ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার ওপর চালানো নৃশংসতাকে গণহত্যা হিসেবে গণ্য করা যায় বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের কাছে পাঠানো জাতিসঙ্ঘের একটি কনফিডেনশিয়াল রিপোর্টে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের আওতায় জাতিসঙ্ঘ ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ বিষয়ে একটি আদালত গঠন করতে পারে। এখন পর্যন্ত মনে হয়, অং সান সু চি মিয়ানমারের জাতিবিদ্বেষ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করছেন। সু চি এখন একজন রাজনীতিবিদ, রোহিঙ্গাদের মতো সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করাটা অধিকাংশ বৌদ্ধ ভোটারের কাছে একটি পপুলার বিষয়।
অপর একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। মিয়ানমারের ওপর তার বিস্ময়কর প্রভাব আছে। তিনি ২০১২ সালে দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দু’বার মিয়ানমার সফর করেন। কিন্তু তিনিও রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ওবামা ও হিলারি ক্লিনটন উভয়ে মিয়ানমারকে গণতন্ত্র এবং পশ্চিমা কক্ষপথে পরিভ্রমণে প্রলুব্ধ করতে সহায়তা করে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছেন। তবে এ ব্যাপারে খুব বেশি হইচই করলে হয়তো তাদের প্রয়াস ক্ষতি হতে পারে। হইচই বা হাড়াহুড়ো করলে হয়তো প্রায় ৬৭টি নির্যাতন শিবিরে বন্দী বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
নির্যাতন শিবিরগুলোর একটিতে আটক ১৪ বছরের কিশোর মুহাম্মদ করীম নিষ্ঠুর নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেছে। মুহাম্মদ একটি বিশাল নির্যাতন ক্যাম্পে হাজার হাজার রোহিঙ্গার সাথে বসবাস করত। সরকার কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং রাষ্ট্রসত্তা কেড়ে নিয়েছে। তাদের মুক্ত ও স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা থেকেও বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। মুহাম্মদ মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানোর জন্য চুপিসারে মানবপাচারকারীদের টাকা দিয়ে নৌকায় করে বেপরোয়াভাবে দেশ ছাড়তে চেয়েছিল। মুহাম্মদের মা সারা খাতুন বলেন, ‘আমরা তাকে যেতে দিইনি। কারণ নৌকা করে মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।’ এরপর একসময় তার পায়ের গোড়ালিতে আঁচড় লাগে। তার পায়ে কিভাবে যে আঘাত পেল কেউ তা জানে না। কিন্তু তার চোয়ালেও দ্রুত সমস্যা দেখা দিলো। চোয়াল খুলতে তার বেশ সমস্যা হচ্ছিল। পরে সে টিটা নামে আক্রান্ত হয়। নির্যাতন শিবিরের বেশির ভাগ শিশুর মতোই তাকেও কোনো টিকা দেয়া হয়নি। এমনকি পায়ে আঘাত তথা পা কাটা যাওয়ার পরও তাকে কোনো টিটেনাস দেয়া হয়নি। সে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর স্থানীয় মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টরা এবং অন অ্যান্ড অফ ক্লিনিক তাকে কোনো চিকিৎসাসেবা দেয়নি। পরিশেষে তার মা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর লক্ষ্যে শিবির ত্যাগ করার জন্য বিশেষ অনুমতি পায়। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। তার মা জানায়, ‘এর দুই দিন পর সে লাশ হয়ে ফিরে আসে।’ তাদের কুঁড়েঘর থেকে একশত ফুট দূরে অপর একটি পরিবারেও চলছে শোকের মাতম। ২০ বছর বয়সী বিলদার বেগম হেপাটাইটিস এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। তার প্রতিবেশীরা এ কথা জানান। সাধারণত হেপাটাইটিস ‘এ’ জীবনহানি করে না। কিন্তু সে প্রয়োজনীয় কোনো চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার কারণে গত বছরের শেষের দিকে মারা যায়। মৃত্যুর সময় সে দুই বছর বয়সী মিরল নামে একটি শিশুসন্তান রেখে যায়।
তার সম্প্রদায়ের নেতা ইউনুস বলেন, ‘সে রোহিঙ্গা না হলে হয়তো এখনো বেঁচে থাকত। আমি শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে এ কথা বলতে পারি।’ এখন হিরল ফুৎ পীড়িত অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। ২৮ মাস বয়সে তার ওজন মাত্র ১৯ পাউন্ড। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বয়সভিত্তিক ওজনশিট অনুযায়ী তার ওজন ও উচ্চতা অনেক কম।
নির্যাতন শিবিরে অবস্থানরত কয়েকটি পরিবারের ব্যাংকে অনেক টাকা জমা আছে। ব্যাংকগুলো শিবির থেকে কয়েক মাইল দূরে সিতুইয়ে অবস্থিত। ২০১২ সাল থেকে এসব পরিবার শিবিরে আটকা পড়ে থাকার কারণে তাদের পরিবারের খাওয়া পরার জন্য ব্যাংকে গিয়ে লেনদেন করতে পারছে না। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুঃখজনকভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। অংশত, এর কারণ হচ্ছে মিয়ানমার বিভিন্ন সাহায্যদাতা সংস্থা এবং সাংবাদিকদের রোহিঙ্গাদের সাথে কার্যত যোগাযোগ করতে দিচ্ছে না। এ কারণে সেখানে রোহিঙ্গাদের তেমন একটা দেখা যায় না।
মিয়ানমারে জাতিসঙ্ঘ কার্যক্রমকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের অপর একটি অভ্যন্তরীণ দলিল থেকে আমি জানতে পারি মিয়ানমারে দায়িত্ব পালনরত জাতিসঙ্ঘের স্টাফ সদস্যরা একে অপরের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে লিপ্ত রয়েছে। দলিলে তাদের হুঁশিয়ার করে দেয়া হয় এবং মানবতার বিরুদ্ধে কার্যকর অপরাধের ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের সম্ভাব্য জটিলতার ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ফর্টিফাই রাইটস এবং ইউনাইটেড টু অ্যান্ড জেনোসাইডের মতো অ্যাডভোকেসি গ্রুপকে সাবাস দিই। এই সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে বর্বরতা ও নৃশংসতা চালানোর বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। মানবাধিকার গ্রুপগুলোর প্রতি সম্মান জানাই। সেখানে তাদের যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তারা সেখানে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপনকারী এসব অসহায় আদম সন্তানের দুঃখদুর্দশা কিছুটা হলেও দূর করার চেষ্টা করেছেন। একটি বড় দ্বীপে আমি নৌকা দিয়ে গিয়ে দেখলাম ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস এবং সেভ দ্য সিলড্রেন অবহেলিত লোকদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। কিন্তু অনেক জায়গায় সহায়তা গ্রুপকে যেতে দিচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের যেভাবে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, সেটা হলো একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম অত্যন্ত অবহেলিত মানবাধিকার বিপর্যয়।
মিয়ানমার সরকার কেবল ব্যক্তিগতভাবে একেকজনের ওপরই নির্যাতন চালাচ্ছে না, তারা রোহিঙ্গাদের একটি জাতিগোষ্ঠীগত গ্রুপ হিসেবে উচ্ছেদ করতে চায়। সরকারের দাবি, মিয়ানমারে তাদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করে না। তাদের দাবি, এরা বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী হিসেবে এসেছে। অথচ রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারের নাগরিক তার ঐতিহাসিক দলিল আছে। গত নভেম্বরে সরকার পাঁচ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। তাদের অপরাধ তারা রোহিঙ্গাদের একটি এথনিক বা গোষ্ঠীগত গ্রুপ উল্লেখ করে ২০১৬ সালের একটি ক্যালেন্ডার ছাপাচ্ছিল।
অং সান সু চিও রোহিঙ্গা বলাটা এড়িয়ে গেছেন। মিয়ানমারের যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস তাদের সরকারি বিবৃতিতে সে দেশের প্রতি নত শিকার করে বক্তব্য দিয়েছে।
মানবাধিকার গ্রুপ ফর্টিফাই রাইটসের ম্যাথি স্মিথ মিয়ানমারের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ওবামা প্রশাসন অবশ্যই আরো অনেক কিছু করতে পারে।’ তার মতে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ব্যাপারে একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত অনুষ্ঠানের প্রতি সমর্থন দান এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহালের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রকাশ্যে ও গোপনে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং রোহিঙ্গাদের সহায়তা করতে সেখানে সাহায্য দাতাসংস্থাকে প্রবেশের অনুমতি দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে ওবামা প্রশাসন পদক্ষেপ নিতে পারে। অন্য রাজনীতিবিদেরা এ ব্যাপারে নীরব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারে অনেক সঠিক কাজও হয়েছে। বিশেষভাবে গণতন্ত্রের উত্থানের বিষয়টি বলতে হয়। কিন্তু একইভাবে গণতান্ত্রিক উত্থানের সাথে সাথে বর্ণবাদীরা ক্ষমতার অধিকারী এবং রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ঘৃণাবিদ্বেষের জন্ম হয়েছে। তাই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা আরো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অং সান সু চির দল একজন মুসলিম প্রার্থীকেও মনোনয়ন দিতে অস্বীকার করেছে। বার্মার অনেক মানুষ অং সান সু চিকে রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে বিবেচনা করে থাকে। কারণ তিনি প্রত্যেকবার রোহিঙ্গাদের নিন্দা করার পরিবর্তে তাদের ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। কিন্তু আমরা যারা তাকে বছরের পর বছর গভীরভাবে শ্রদ্ধা করে আসছি নীতির জন্য তার আত্মত্যাগের ইচ্ছা এখন রাজনৈতিক কৌশলে যেন প্রচণ্ডভাবে মোচড় দিতে দেখছি।
মিয়ানমার এবং অং সান সু চির রক্ষক তথা সমর্থকেরা উল্লেখ করেন, দেশের অনেক সমস্যা আছে। তারা রোহিঙ্গাদের একটি দুর্ভাগা জাতি বলে মনে করেন। তাদের ব্যাপারে যে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয় তারা দেখছেন, সেটা হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং দেশের অনেক স্থানীয় সমস্যার সমাধান করা। তাদের মতে, জাতি যখন অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, সেখানে একটি এথনিক বা গোষ্ঠীগত সমস্যাকে তারা ক্ষীণদৃষ্টিতে দেখে। তারা এটাকে ফোকাস করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।
তবুও একটি সরকার যখন একটি এথনিক বা জাতিগত গোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে, ওই জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের নির্যাতন শিবিরে আটকে রাখে এবং তাদের প্রয়োজনীয় খাবার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে অস্বীকৃতি জানায়- তখন আমার কাছে ওটাকে ভয়ঙ্কর ও আতঙ্কজনক বিষয় বলে মনে হয়। গোষ্ঠীগত কারণে ছোট ছোট নিষ্পাপ শিশুদের নির্যাতন শিবিরে আটকে রেখে অনাহারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এটা বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের যে সমস্যা সে ধরনের কোনো সমস্যা নয়। এটা হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এই নৃশংসতা ও বর্বরতার অবসান ঘটানোর দায়িত্ব গোটা মানবজাতির।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে

ট্যানারি বর্জ্যে তৈরি হচ্ছে মুরগি ও মাছের খাবার : তিন কারখানা বন্ধ

ট্যানারি বিষাক্ত বর্জ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে মুরগি ও মাছের খাবার। একশ্রেণীর অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী এই খাবার তৈরি করে মুরগির খামারি ও মাছ চাষীদের কাছে বিক্রি করছেন। রাজধানীর হাজারীবাগ ট্যানারীর কাছে বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এই খাবার তৈরির কারখানা। বুধবার ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে এরকম তিনটি কারখানার সন্ধান পায়। পরে মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করে কারখানাগুলো সিলগালা করে দেয় ভ্রাম্যমান আদালত। র‌্যাব-২ এর উপ-পরিচালক ড. দিদারুল আলম ও র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে কালোনগরে শিপন ফিড মিল, শোয়েব এন্টারপ্রাইজ এবং খলিলের মাছের আউশ কারখানায় অভিযান চালায় র‌্যাব-২। এ সময় প্রানি সম্পদ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি ডাঃ মোঃ লুৎফর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, মুরগি ও মাছের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রতি কেজির দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা। আর ট্যানারীর বর্জ্যে তৈরি প্রতি কেজি খাবারের দাম মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকা। কম পয়সায় অধিক মুনাফার আশায় লোভী মুরগির খামার মালিক ও মাছ চাষীরা এই বিষাক্ত খাবার কিনে থাকেন।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হেলাল উদ্দিন জানান, বুধবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ওই তিন কারখানায় অভিযান চালিয়ে বিষাক্ত বর্জ্য মিশিয়ে মুরগি ও মাছের খাবার তৈরির অভিযোগে ৭ জনকে আটক করে র‌্যাব। আটককৃতরা তাদের দোষ স্বীকার করায় তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড ও অর্থদণ্ড দেয়া হয়। এক্ষেত্রে জয়নাল আবেদিন ও গোলাম সারোয়াকে তিন মাস করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া জাহাঙ্গীর ও আবুল কালাম আজাদকে পাঁচ হাজার টাকা করে মোট দশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে তিন দিনের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। কালামকে বিশ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ড এবং নাসির উদ্দিন ও সাইদ শেখকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে প্রত্যেককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করে আদালত।
কারখানারমালিক জয়নাল আবেদিন, গোলাম সারোয়ার ও নাসির উদ্দিন জানান, ট্যানারী থেকে চামড়ার বর্জ্য কারখানায় এনে সিদ্ধ করে ছাদে শুকিয়ে শুঁটকি বানান। এ শুঁটকি ১৭ টাকা কেজি হিসেবে পাইকারী বিক্রি করেন এবং নিজেরাই গুড়া করে ফিড তৈরী করেন। তাদের কাছ থেকে শুঁটকি কিনে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ক্ষতিকর ফিড তৈরী করছে।
র‌্যাব জানায়, গত কয়েক বছর ধরে কারখানাগুলোতে এভাবে ফিড তৈরি হচ্ছে। মুরগী বা মাছের খাবারে ৩০ পিপিএম মাত্রার বেশি ক্রোমিয়াম থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ইতিপূর্বে অভিযানকালে উক্ত কারখানাগুলিতে উৎপাদিত ফিডে প্রায় পাঁচ হাজার পিপিএম মাত্রায় ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়। উন্নতমানের ফিড একশত কেজির মূল্য সাড়ে চার হাজার টাকা হলেও ট্যানারী বর্জ্য মিশ্রিত ফিড মাত্র তিন হাজার টাকা। কতিপয় অসাধু খামারী অধিক মুনাফার আশায় এসব কারখানা হতে বিষাক্ত খামারে ব্যবহার করে যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
র‌্যাব-২ এর উপ-পরিচালক ডঃ মোঃ দিদারুল আলম জানান, দুটি কারনে এই ক্ষতিকর ট্যানারী বর্জ্য মৎস ও মুরগির খাবারে ব্যবহৃত হয়। প্রথমত, এটি খাওয়ালে মুরগি বা মাছে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ডিমের আকার বড় হয়। দ্বিতীয়ত, এটি দামে সস্তা। এসব খাবারে প্রচুর পরিমানে ভারী মৌল ক্রোমিয়াম থাকে যা মারাত্মক ক্ষতিকর। বিষাক্ত এ ফিড মাছ বা মুরগি খেলে মলমূত্রের মাধ্যমে খানিকটা বের হযে গেলেও একটা বড় অংশ মাছ বা মুরগির শরীরে জমা হতে থাকে। এমনকি ডিমেও জমা হয়। উক্ত মাছ, মুরগি বা ডিম খেলে মানুষের শরীরে ক্রোমিয়াম প্রবেশ করে এবং মলমূত্রের মাধ্যমে সবটা বের হতে না পেরে শরীরে জমা হতে থাকে এবং নানা রোগ সৃষ্টি করে। যেমন-ক্যান্সার, টিউমার, পাকস্থলি আলসার, এ্যাজমা, শ¡াসকষ্ট, চর্মরোগ ইত্যাদি।

জিকার ভয়ে ২০১৮ পর্যন্ত গর্ভবতী হওয়া বারণ!

মহিলাদের গর্ভবতী হতে নিষেধ করে দিচ্ছে লাতিন আমেরিকার একের পর এক দেশ। জিকা ভাইরাসের প্রকোপে যেভাবে হাজার হাজার মাইক্রোসেফ্যালি আক্রান্ত নবজাতকের জন্ম নিচ্ছে, তার প্রেক্ষিতেই এই বার্তা ওই সব দেশের সরকারের। মহিলাদের সন্তান ধারণ না করতে সরকারের দেওয়া এই বার্তার তীব্র সমালোচনা করেছে লাতিন আমেরিকার নারী সংগঠনগুলি। জিকা ভাইরাসের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে ব্রাজিল, কলম্বিয়া, এল সালভাদোর, হন্ডুরাস, জামাইকায়। ব্রাজিলে গত কয়েক মাসে ৪০০০ শিশু জন্ম নিয়েছে মাইক্রোসেফ্যালিতে আক্রান্ত হয়ে। অর্থাৎ তাদের মাথা শরীরের তুলনায় অস্বাভাবিক রকমের ছোট হচ্ছে। মস্তিষ্কের গঠন অসম্পূর্ণ থাকায় এমন শারীরিক বিকৃতি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, গর্ভবতী মহিলারা জিকায় আক্রান্ত হলে তাঁদের গর্ভস্থ সন্তানের উপর এর প্রভাব পড়ছে। জিকা গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্ক নষ্ট করে দিচ্ছে। তার ফলই হল মাইক্রোসেফ্যালি আক্রান্ত হয়ে নবজাতকের জন্ম। জিকার প্রকোপ ক্রমশ বাড়তে থাকায়, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সরকার মহিলাদের আপাতত সন্তান ধারণ না করার আর্জি জানাতে শুরু করেছে। ব্রাজিলের লাগোয়া কলম্বিয়ায় প্রায় ১৩ হাজার নবজাতক জিকার শিকার। এল সালভাদোরের মতো ছোট দেশেও ৫০০০ নবজাতক জিকার প্রকোপে শারীরিক বৈকল্য নিয়ে জন্মেছে। কলম্বিয়ার সরকার সে দেশের মহিলাদের আর্জি জানিয়েছে, আগামী বেশ কয়েক মাস গর্ভধারণ না করতে। এল সালভাদোরের স্বাস্থ্য মন্ত্রকও একই পথে হেঁটেছে। স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা জারি না করলেও, সে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রক প্রায় নির্দেশ জারি করে বলেছে, দেশের মহিলারা যেন ২০১৮ সাল পর্যন্ত সন্তানের জন্ম না দেন। সরকারের তরফে এই বার্তা মেলার পর, বিভিন্ন লাতিন আমেরিকান দেশে গর্ভপাতের প্রবণতা বেড়েছে। গর্ভনিরোধক ওষুধের বিক্রি বেড়ে যাওয়া এবং গর্ভপাতের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় মহিলাদের স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তাই কলম্বিয়া ও এল সালভাদোরের বেশ কিছু মানবাধিকার সংগঠন এবং নারী সংগঠন সরকারের তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে। জিকা ভাইরাস এমন নিঃশব্দে সংক্রামিত হচ্ছে যে তার প্রকোপ থামানো না গেলে আগামী প্রজন্মের বিরাট অংশ শারীরিক বৈকল্য বা অপরিণত মস্তিষ্ক নিয়ে জন্ম নিতে পারে। একটা গোটা প্রজন্ম এমন ভয়ঙ্কর রোগের শিকার হলে, দেশের ভবিষ্যৎও সঙ্কটে পড়বে। সে কথা মাথায় রেখেই, জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সন্তানের জন্ম দিতে মহিলাদের বারন করছে লাতিন আমেরিকান দেশগুলির সরকার। জিকা সংক্রমণ ক্রমশ মহামারীর আকার নেওয়ার দিকে এগোতে থাকায়, উদ্বিগ্ন বার্বাডোজ, বলিভিয়া, গুয়াতেমালা এবং পুয়ের্তো রিকো-র সরকারও। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশনের সাহায্য চেয়েছে এই দেশগুলি। জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ চিহ্নিত করা যাচ্ছে না বলে, বেশ কয়েকটি দেশ নমুনা পরীক্ষার জন্য আমেরিকার দ্বারস্থ হচ্ছে।– সংবাদমাধ্যম

চট্টগ্রামে স্বামীর অনৈতিক সম্পর্ক ফাঁস করলেন স্ত্রী

২০০৯ সালে ১৩ই মার্চ সুপ্রিয় দে নামের এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে হয় পিংকী বড়ুয়ার। স্বামী স্কুলশিক্ষক। ভদ্র বলেই মনে করেছিলেন সবাই। কিন্তু বিয়ের পর জানতে পারলেন স্বামীর স্থানে থাকা ব্যক্তিটি ছাত্রীদের সঙ্গে অপ্রীতিকর মেলামেশায় লিপ্ত হন। বিষয়গুলো দৃষ্টিগোচর হলে তাকে এসব কুকর্ম থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন পিংকী। আর এতেই খড়গ নেমে আসে তার ওপর। অমানবিক শারীরিক নির্যাতন ও যৌতুক দাবি করে স্বামী। নির্যাতনের ফলে গর্ভাবস্থায় তার একটি সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে গতকাল বুধবার দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই নিজের দাম্পত্য জীবনের কষ্টগাঁথা কাহিনী তুলে ধরছিলেন পিংকী। চোখে তখন তার জল। এই সময় সম্মেলনে পিংকী বড়ুয়া মারধরের পর শিক্ষক স্বামী পুলিশের সহায়তায় হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগ, যৌতুকের দাবিতে মারধরের পর স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতন মামলা দায়ের করার অপরাধে পালটা অপহরণ মামলা দিয়ে তাকে ও তার পরিবারকে হয়রানি করা হচ্ছে। হয়রানির ভয়ে তার পরিবারকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে পিংকি বড়ুয়া বলেন, ২০০৯ সালে ১৩ই মার্চ তৎকালীন খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুপ্রিয় দে খাঁর সঙ্গে বিয়ে হয় তার। যিনি বর্তমানে বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আছেন। বিয়ের পর তিনি ছাত্রীদের সঙ্গে অপ্রীতিকর মেলামেশায় লিপ্ত হন। বিষয়গুলো দৃষ্টিগোচর হলে তাকে এসব কুকর্ম থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করলে সে আমার ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন ও যৌতুক দাবি করে। নির্যাতনের ফলে গর্ভাবস্থায় আমার একটি সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। ২০১৪ সালে পরিবারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা এনে দেই। এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে গত এক জানুয়ারি মারধর করে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। পিংকি বড়ুয়ার বাবা স্বপন বড়ুয়া বলেন, ‘আমি খাগড়াছড়ি সদরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এ ব্যবসার টাকায় আমার পরিবার চলে। মামলা দেয়ার পর থেকে দোকান বন্ধ। ঘরে তালা দিয়ে পরিবার নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’ পিংকি বড়ুয়া বলেন, ৬ই জানুয়ারি নারী ও শিশু ট্রাইবুন্যালে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করি। ২১শে জানুয়ারি আমার বাবা, মা ও ফুফাতো ভাইকে আসামি করে বান্দরবান থানায় একটি অপহরণ মামলা করা হয়। ২৩শে জানুয়ারি রাতে চান্দগাঁও থানার ফরিদারপাড়া এলাকার আমার ছোট ভাইয়ের বাসা থেকে ডিবি পুলিশ মাইক্রোবাসে করে বান্দরবান নিয়ে যায়। একইদিন আমার ফুফাতো ভাই উৎপল বড়ুয়াকেও গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। আমাদের পুলিশ হেফাজতে না রেখে একটি গেস্ট হাউজে নিয়ে যায়। যেখানে অপরিচিত সাত-আটজন লোক বিভিন্ন হুমকিধমকি ও মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগ করে। ২৪শে জানুয়ারি পুলিশ কার্যালয়ে সমঝোতার চেষ্টা করে। ওইদিন বিকালে বান্দরবান আদালতে হাজির করা হয়। আদালত আমার এক আত্মীয়ের জিম্মায় ছেড়ে দেন। আদালত থেকে বের হয়ে আসার সময় সুপ্রিয় দে’র ভাড়াটে লোকজন মামলা তুলে না নিলে বিভিন্ন হুমকিধমকি দিতে থাকে। এরপর থেকে হয়রানির ভয়ে পুরো পরিবার পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

বাংলাদেশে ভিন্নমত প্রকাশ মারাত্নক আক্রমণের মুখে

নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইস ওয়াচ বলেছে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ভিন্নমত প্রকাশের বিষয়টি মারাত্নকভাবে আক্রমণের মুখে পড়েছে।
গত বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন ছিল সেটি নিয়ে হিউম্যান রাইস ওয়াচ তাদের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে একদিকে ধর্মনিরপক্ষে ব্লগার এবং বিদেশী নাগরিকদের হত্যা করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাটি অভিযোগ করছে, আদালত অবমাননার মামলা এবং বিভিন্ন ধরনের অস্পষ্ট মামলা দায়ের করার মাধ্যমে গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের উপর আক্রমণ করা হয়েছে ।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ক্রমেই ‘কর্তৃত্বপরায়ণ’ হয়ে উঠছে বলে হিউম্যান রাইস ওয়াচ মন্তব্য করেছে।
সংস্থাটি বলছে নিরাপত্তা বাহিনী বিরোধী রাজনীতিবিদদের গ্রেফতার করে বিভিন্ন মামলা দায়ের করেছে।
কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ গত বছর কঠিন সময় পার করেছে বলে হিউম্যান রাইস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়।
এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, “ একজন সাংবাদিকের মতামত প্রকাশের অধিকার এবং ন্যায্য সমালোচনার পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে ৪৯ জনকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে।”
কারো নাম উল্লেখ না করা হলেও আদালত অবমাননায় ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের সাজার বিষয়ে স্পষ্টত ইংগিত করা হয়েছে।
কারণ সেই সাজার বিপক্ষে বিবৃতি দেবার কারণে দেশের ৪৯জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আদালত অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
সংস্থাটি বলছে সরকারের সমালোচনাকারী গণমাধ্যমগুলো হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে নতুবা সাংবাদিক এবং সম্পাদকরা মামলার মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
হিউম্যান রাইস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছেন বাংলাদেশের সংসদে কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই কারণ বড় দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
তিনি বলেন মনে হচ্ছে সংসদের বাইরেও শেখ হাসিনার সরকার কোনো বিরোধী কণ্ঠকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিতে চায় না।
গত বছর বাংলাদেশে অন্তত পাঁচজন ব্লগার এবং একজন প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া আরো কয়েকজনকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে যারা হুমকির মুখে ছিলেন তাদের জন্য সরকারের দিক থেকে হয়তো কোন নিরাপত্তা ছিলনা নয়তো সেই নিরাপত্তা অপ্রতুল ছিল।
জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির অনেকে সদস্য গ্রেফতার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আতংকে রয়েছে বলে হিউম্যান রাইস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়।
সূত্র : বিবিসি

ছি ছি এত্তা জঞ্জাল- অবস্থা আগের মতোই by খালিদ সাইফুল্লাহ

২০১৬ সালকে ডিএসসিসি মেয়র পরিচ্ছন্নতা বছর
ঘোষণা করলেও এখনো নগরীর যত্রতত্র ময়লা পড়ে
থাকতে দেখা যাচ্ছে। ছবিটি গতকাল পুরান ঢাকার
দয়াগঞ্জ ব্রিজের নিচ থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত
বর্তমান বছরকে পরিচ্ছন্নতা বছর ঘোষণা করলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়রের আহ্বানে তেমন সাড়া মিলছে না। বিভিন্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন করলেও এলাকার পরিবেশের কোনো হেরফের হয়নি। রাস্তায় রাখা ডাস্টবিনগুলো থেকে এখনো উপচে পড়ছে ময়লা-আবর্জনা। দিনের বেলাতেই চলাচল করছে ময়লাভর্তি গাড়ি। যত্রতত্র ময়লা ফেলার অভ্যাসের কোনো পরিবর্তন নেই। এমনকি সন্ধ্যা ৭টার পর ময়লা ফেলতে মেয়রের অনুরোধের প্রতিও কোনো পাত্তা দিচ্ছেন না নগরবাসী।
গত ২৩ ডিসেম্বর হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘পরিচ্ছন্নতা বছর-২০১৬’ ঘোষণা করেন মেয়র সাঈদ খোকন। সেদিন মেয়র রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে সাত দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর প্রথম দফায় ছিল আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির প্রচলন। তিনি বলেন, প্রধান সড়ক থেকে আবর্জনার কনটেইনার স্থানান্তর এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মোট ৫৭ সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ ও প্রতিদিন সকাল ৭টার মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকার্যক্রম সম্পন্ন করা। তিনি দ্বিতীয় দফায় পরিচ্ছন্নকার্যক্রম গতিশীল করতে জন সম্পৃক্ততা বাড়ানোর কথা বলেন। এ ল্েয অনলাইন মিডিয়াসহ সব গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর কথা বলেন। তৃতীয় দফায় প্রধান জনসমাগম স্থলে ছোট আকারে ৫০টি আধুনিক গণশৌচাগার নির্মাণ করা হবে। চতুর্থ দফায় নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে ঢাকা শহরকে দৃষ্টিন্দন করা হবে এবং পয়লা জানুয়ারি থেকে সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি অনুমতি ছাড়া ব্যানার-ফেস্টুন লাগাতে পারবে না। পঞ্চম দফায় আধুনিক পরিবেশবান্ধব সড়ক বাতি সংযোজন এবং ষষ্ঠ দফায় রয়েছে দখলমুক্ত সড়ক নিশ্চিত করা। শেষ দফায় ডিএসসিসির পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক অভিযোগ গ্রহণের জন্য ২৪/৭ হটলাইন খোলা হবে। পরিচ্ছন্নতার জন্য পুরস্কার এবং তিরস্কারের ব্যবস্থাও থাকবে বলে জানিয়েছেন মেয়র।
ওই ঘোষণার পর এক মাস পার হয়েছে। এর মধ্যে ডিএসসিসি ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে প্রায় প্রতিদিনই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন করেছেন মেয়র। এতে সরকারের মন্ত্রী, বিশিষ্ট নাগরিক, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অংশ নিচ্ছেন। এসব কর্মসূচি থেকে মেয়র নগরবাসীর প্রতি বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন ময়লা ফেলার বিষয়ে সচেতন হতে। সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে রাত ১০টার মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলতে। তিনি প্রত্যেক নাগরিককে মেয়রের ভূমিকা নেয়ারও আহ্বান জানান। কিন্তু নগরী ঘুরে দেখা গেছে, মেয়রের আহ্বানে কোনো সাড়া নেই নগরবাসীর। দিনের বেলাতেই বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহ করে তা ডাস্টবিনে ফেলছে এলাকাভিত্তিক ময়লা সংগ্রহকারীরা। বিভিন্ন সড়কে রাখা ডাস্টবিনে সারা দিনই এসব ময়লা ফেলছে তারা। সকাল ৭টার মধ্যে এসব ডাস্টবিন থেকে সিটি করপোরেশনের গাড়িতে ময়লা নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও দিনের বেলাতেও ময়লা পরিবহন করা হচ্ছে। এ ছাড়া সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে ময়লা ফেলার মেয়রের নির্দেশের বিষয়টি জনগণ বুঝতে পারছেন না। এমনকি বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহকারীরাও বুঝতে পারছেন না তারা কিভাবে রাতে ময়লা সংগ্রহ করবেন। এ ছাড়া চলতি পথে যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলার বিষয়ে জনগণের মধ্যে কোনো সচেতনতা গড়ে উঠছে না। আগের মতোই যেখানে সেখানে ময়লা ফেলছেন মানুষ।
পল্টন এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, বাসাবাড়ি থেকে এখন দিনে ময়লা সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু মেয়র সন্ধ্যা ৭টার পর ময়লা ফেলতে বলছেন। অথচ ময়লা সংগ্রহকারীরা ঠিকই দিনেই ময়লা নিয়ে তা রাস্তার ডাস্টবিনে ফেলছেন। সিটি করপোরেশনের নিজের কাজেই ঠিক নেই তারা কিভাবে জনগণকে মানাবে।
গোপিবাগ এলাকার গৃহবধূ সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, রাতে কিভাবে ময়লা সংগ্রহ করবে বুঝতে পারছি না। রাতে একটা নিরাপত্তার বিষয় রয়েছে।
বাসাবো এলাকার ময়লা সংগ্রহকারী আমিনুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যার পর ময়লা সংগ্রহ করা বিষয়ে আমাদের কিছু বলা হয়নি। আমরা এখনো দিনের বেলাতেই সংগ্রহ করছি এবং দিনেই ডাস্টবিনে রেখে আসছি। রাতে ময়লা আনতে যেকোনো বাড়ি যাওয়ায় সমস্যা আছে। তিনি বলেন, মেয়রের এ নির্দেশ মনে হয় বড় সড়কের জন্য।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন রকিব উদ্দিন ভুঁইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, পরিচ্ছন্নতা বছর সফল করতে মেয়রের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। আশা করছি আস্তে আস্তে মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়বে। সন্ধ্যার পর ময়লা সংগ্রহ করায় নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ডিএসসিসিরও পক্ষ থেকে ভাবা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে মেয়র সাঈদ খোকন নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে নাগরিকদের সচেতনতা সৃষ্টি করতে কাজ করছি আমরা। পরিচ্ছন্নতা বছর উপলক্ষে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ওয়ার্ডে অভিযান চালানো হচ্ছে। ৫৭ ওয়ার্ডে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন তৈরির কাজ চলছে। সন্ধ্যা সাতটার পরে গৃহস্থলীর বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে। সন্ধ্যা ৭টার পরে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য রাখলে তা করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সরিয়ে নেবেন। একটি নিদিষ্ট সময়ে কেউ যদি নিদিষ্ট স্থানে ময়লা না ফেলেন তাহলে জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে।
সাঈদ খোকন আরো বলেন, পরিচ্ছন্ন নগরী পেতে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। এজন্য আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘লাভ ফর ঢাকা’ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। আস্তে আস্তে মানুষ সচেতন হবে। কাজটা শুরু হয়েছে, আমাদের একটু সময় দিতে হবে।

সাংবাদিকদের সাচ্চা বন্ধু by শাহজাহান মিয়া

আলতাফ মাহমুদ
মৃত্যুর মতো অবধারিত সত্য আর কিছু নেই। মৃত্যু অলঙ্ঘনীয়। সব মৃত্যুই স্বজন-আপনজনদের কাঁদায়। কারও অসময়ে মৃত্যু প্রিয়জনদের শোকে মুহ্যমান করে ফেলে। জনপ্রিয় সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদের মৃত্যু পরিবারের সদস্য ছাড়াও দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মরত সর্বস্তরের সাংবাদিকদের কাঁদিয়েছে। ব্যথিত করেছে।
মহান সাংবাদিকতা পেশায় হাতে গোনা যে কজন সাংবাদিক নেতা সর্বস্তরের গণমাধ্যমকর্মীর বন্ধু হতে পেরেছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। অনুজদের কাছে তিনি ছিলেন ‘প্রিয় আলতাফ ভাই।’ সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনে বারবার তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হতেন। তাঁকে বলা হতো ‘সাধারণ সাংবাদিকদের নেতা’। সাংবাদিকদের ন্যায়সংগত দাবিদাওয়া আদায়ে আলতাফ মাহমুদ বরাবর ছিলেন নির্ভীক ও আপসহীন।
সেই আলতাফ মাহমুদ ২৪ জানুয়ারি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সার্ভিক্যাল কম্প্রেসিভ মাইলো রেডিকিউপ্যাথিতে আক্রান্ত হলে ২১ জানুয়ারি তাঁর স্পাইনাল কর্ডে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ২৩ জানুয়ারি রাতে হঠাৎ আলতাফ মাহমুদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরদিন সকালে তাঁর লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
অস্ত্রোপচারের আগের দিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আবেগ-আপ্লুত হয়ে তাঁকে দেখতে যাওয়া সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘সাংবাদিক বন্ধুরা ভালো থাকুক, এটাই আমার প্রত্যাশা।’ জীবনভর সাংবাদিকদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা আলতাফ মাহমুদের এভাবে চলে যাওয়ার বিষয়টি কেউ সহজভাবে মানতে পারেননি। তাঁর আত্মীয়স্বজন ও সহকর্মীদের ধারণা, বিদেশে চিকিৎসা হলে হয়তো তাঁকে বাঁচানো যেত। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখেছি, আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী তাহমিনা মাহমুদও অস্ত্রোপচারের আগের দিন বলেছিলেন, ‘আমার কেন যেন মন টানছে, ব্যাংকক কিংবা সিঙ্গাপুরে নিয়ে অস্ত্রোপচার করালে ভালো হতো।’
উল্লেখ্য, আলতাফ মাহমুদের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছিল।
মৃত্যুর দুই মাস আগে গত বছরের ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নির্বাচনে আলতাফ মাহমুদ সভাপতি নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি এই সংগঠনের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন একাধিকবার।
দৈনিক ডেসটিনির নির্বাহী সম্পাদক আলতাফ মাহমুদ সাংবাদিকতায় আসেন গত শতকের সত্তরের দশকের প্রথম দিকে। দৈনিক স্বদেশ দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু। এরপর সাপ্তাহিক খবর, দৈনিক খবর, সাপ্তাহিক চিত্রবাংলা, দৈনিক কিষানসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন তিনি। সাংবাদিকদের রুটিরুজির আন্দোলনে সব সময় সম্মুখভাগে থাকা আলতাফ মাহমুদ কোনো পত্রিকায় বেতন প্রদান বন্ধ কিংবা কোথাও সাংবাদিক ছাঁটাই হয়েছে শুনলে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে খোঁজখবর নিতেন। তাঁদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর যখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উচ্চারণের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়; তখন যে গুটি কয়েক পত্রিকা শাসকগোষ্ঠীর ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি তুলে ধরে, সেগুলোর মধ্যে সাপ্তাহিক খবর ছিল উল্লেখযোগ্য। আলতাফ মাহমুদ ছিলেন এই পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক। পরবর্তীকালে পত্রিকাটি দৈনিকে রূপান্তরিত হলেও তিনি একই দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি দৈনিক পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদকের দায়িত্ব পালন করে সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেওয়া খুবই কঠিন কাজ। আলতাফ মাহমুদ সেই কঠিন কাজটি করেছেন সুচারুভাবে।
আশির দশকের প্রথম দিকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে আলতাফ মাহমুদের সাংবাদিক ইউনিয়নের কর্মকাণ্ড শুরু। তিনি ১৯৮৭ সালে জনকল্যাণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। পরে সাংগঠনিক সম্পাদকও হয়েছিলেন। বর্তমানে ইংরেজি দৈনিক দ্য অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) তিনবার সভাপতি হওয়ার পর আমিও ১৯৮৯ সালে তৃতীয়বারের মতো সভাপতি হয়ে ইউনিয়ন থেকে একরকম সরে গিয়েছিলাম।
কিন্তু ঐতিহাসিক প্রয়োজনে ইকবাল সাহেব ও অন্যান্য ফোরাম নেতার অনুরোধে ১৯৯২ সালে আমাকে আবার সভাপতি পদে দাঁড়াতে হয়। সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আলতাফ মাহমুদ। আমরা দুজনই প্রতিপক্ষ ফেরামের প্রার্থীদের পরাজিত করে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হই। সেটাই ছিল অবিভক্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের শেষ নির্বাচিত কমিটি। ইউনিয়নে প্রিয় সহকর্মী হিসেবে আলতাফ মাহমুদের মধ্যে যে নিষ্ঠা, সততা, কর্মস্পৃহা ও সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষায় যে আন্তরিক মমত্ববোধ লক্ষ করেছি, তা বিরল। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে প্রেসক্লাবের ভেতরে পুলিশ ঢুকে বেধড়ক লাঠিপেটা করলে বহু সাংবাদিক আহত হন। পুলিশের হামলায় গুরুতর আহত ৩০ জনের বেশি সহকর্মীকে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সেবারও আহত সাংবাদিকদের পাশে থেকে আলতাফ মাহমুদ সবার খোঁজখবর নিয়েছেন। চিকিৎসায় সহায়তা করেছেন। বেশ কয়েকবার সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর আলতাফ মাহমুদ মোট পাঁচবার ডিইউজের সভাপতি হন, সম্ভবত এটি ইউনিয়নের ইতিহাসে একটি রেকর্ড। তিনি ছিলেন সাংবাদিক সমাজের সাচ্চা বন্ধু।
সাংবাদিক ইউনিয়ন করার কারণে অনেক সময় আমরা একসঙ্গে ইউনিয়নের বিভিন্ন ইউনিটে গিয়েছি। সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। মালিকদের সঙ্গে দেনদরবার করেছি। আলতাফ মাহমুদকে কখনো ক্লান্ত বা হতাশ হতে দেখিনি। এমনকি যখন নিজের চাকরি ছিল না, তখনো তিনি সহকর্মীদের সহায়তা করেছেন। তাঁর একসময়ের সহকর্মী ও বন্ধু স্বপন দাশগুপ্তকে প্রেসক্লাবে এখনো বলতে শোনা যায়, ‘আমার দোস্ত আলতাফ ঢাকায় এসেছিল নায়ক হবে বলে। ফাঁসি নামক একটি ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ও করেছিল। নানা কারণে ছবিটি মুক্তি পায়নি।’ তাঁর অভিনীত ছবিটি মুক্তি না পেলেও সিনেমার নায়ক হতে ঢাকায় আসা আলতাফ মাহমুদ ব্যক্তিজীবনে সাংবাদিকদের দাবিদাওয়া আদায়ের আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে সংবাদপত্র জগতের নায়ক হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু সাংবাদিক সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
শাহজাহান মিয়া: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

দুর্নীতি উদ্বেগজনক -টিআই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে গত এক বছরে দুর্নীতি কমেনি। স্কোর ২০১৪ সালের মতোই ২৫ এ অপরিবর্তিত থাকলেও অবস্থানের একধাপ অবনতি হয়েছে। এবারো দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিন্ম হওয়ায় দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা এখনো উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে বার্লিন ভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)। সংস্থা বলছে, দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ বলা না গেলেও সূচকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এখানে দুর্নীতির মাত্রা বেশি বলা যাবে। ১৬৮টি দেশের মধ্যে এবার বাংলাদেশের অবস্থান নিন্মক্রমে ১১৩তম। আর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান। তাদের স্কোর ৬৫ এবং অবস্থান ২৭। এ ছাড়া ভারতের অবস্থান ৩৭তম, শ্রীলঙ্কা ৮৩তম, পাকিস্তান ১১৭তম ও নেপাল ১৩০তম। দুর্নীতি দমনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আরো কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জবাবদিহিমূলক অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
ঢাকাস্থ টিআইবি অফিসে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০১৫তে এসব তথ্য জানানো হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই তথ্যপ্রতিবেদন তুলে ধরেন। টিআইবি ট্রাস্ট্রি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি এম হাফিজউদ্দিন খান এবং উপনির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের। ২০১৫ সালের সিপিআইয়ের জন্য ফেব্রুয়ারি ২০১৩ থেকে আগস্ট ২০১৫ পর্যন্ত সময়ের তথ্য সংগৃহীত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বৈশ্বিক দুর্নীতি পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতির তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, ২০১৫ সালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বৈশ্বিকভাবেই অবস্থার অবনতি হয়েছে। সূচকে কোনো দেশই শতভাগ স্কোর পায়নি। বিশ্বের সর্বোচ্চ উন্নত দেশগুলোর অনেকেইÑ যেমন অস্ট্রেলিয়া, আইসল্যান্ড, বেলজিয়াম, জাপান, অস্ট্রিয়া, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ইত্যাদি ৮০ শতাংশের কম স্কোর পেয়েছে। ১৬৮টি দেশের মধ্যে ১১৪টি অর্থাৎ ৬৮ ভাগ দেশ ৫০-এর কম স্কোর পেয়েছে। ১০৩টি দেশ সূচকের গড় স্কোর ৪৩-এর চেয়ে কম পেয়েছে। এ ছাড়া ২০১৪ সালে যেখানে ৯২টি দেশের স্কোর বেড়েছিল, ২০১৫ সালে সেখানে স্কোর বেড়েছে ৬৫টি দেশের। অন্য দিকে ২০১৪ সালে ৩৬টির তুলনায় ২০১৫ সালে ৪৯টি দেশের স্কোরে অবনতি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ডেনমার্ক গতবার ৯২ স্কোর নিয়ে দুর্নীতির কারণে সবচেয়ে কম তিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে থাকলেও এবার তাদের স্কোর ৯১। এ ছাড়া নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, লুক্সেমবার্গ ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশের স্কোরেও অবনতি হয়েছে।
সিপিআই অনুযায়ী ৯১ স্কোর পেয়ে ২০১৫ সালে দুর্নীতির কারণে সবচেয়ে কম তিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনমার্ক। ৯০ স্কোর পেয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড এবং ৮৯ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সুইডেন। আর সর্বনি¤œ ৮ স্কোর পেয়ে ২০১৫ সালে তালিকার সর্বনি¤েœ যৌথভাবে অবস্থান করছে উত্তর কোরিয়া ও সোমালিয়া। ১১ ও ১২ স্কোর পেয়ে তালিকার সর্বনি¤েœর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দেশ হিসেবে রয়েছে আফগানিস্তান ও সুদান।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উচ্চক্রম অনুযায়ী ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ছয় ধাপ অগ্রগতি কিছুটা সন্তোষজনক মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা এটাতে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। কেননা বাস্তবে তা হয়েছে সাতটি দেশ এবার জরিপের আওতাভুক্ত হয়নি যারা সবসময় বাংলাদেশের তুলনায় বেশি স্কোর পেয়েছে। দণি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এবারো বাংলাদেশের অবস্থান আফগানিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বনি¤œ। নি¤œক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশ এবার ২০১৪ সালের ১৪তম অবস্থানের একধাপ নিচে ১৩তম, যা ২০১৩ সালের তুলনায় ৩ ধাপ নিচে ও ২ পয়েন্ট কম। অর্থাৎ সার্বিক বিবেচনায় এবারো আমাদের অগ্রগতি হলো না।
তিনি বলেন, যেসব কারণে আমাদের অগ্রগতি হচ্ছে না তার মধ্যে রয়েছে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কিছু কিছু দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ সত্ত্বেও প্রয়োগ ও চর্চার ঘাটতির ফলে প্রকটতর হয়েছে কার্যকরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্তের সঙ্কট। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান দুদকের কার্যকারিতা ও স্বাধীনতা খর্ব করার অপপ্রয়াস যেমন অব্যাহত রয়েছে তেমনি দুদকের নিজস্ব সক্রিয়তা, দৃঢ়তা ও নিরপেতার ঘাটতি রয়েছে চলমান। এ ছাড়া সরকারের নীতি কাঠামো দুর্নীতিসহায়ক, দুর্নীতিতে লাভবান ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয়দানকারী মহলের করাভূত হওয়ার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে।
টিআইবি বলছে, সিপিআই সম্পর্কে যথাযথ ধারণার অভাবে বাংলাদেশ বা তার অধিবাসীদের দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করা হয়। বাস্তবে দেশের আপামর জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। তারা দুর্নীতির কারণে তিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী মাত্র। মতাবানদের দুর্নীতি এবং তা প্রতিরোধে দেশের নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতার কারণে দেশ বা জনগণকে কোনোভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত বলা যাবে না। প্রসঙ্গত এ বছর বাংলাদেশের সাথে একই স্কোরপ্রাপ্ত অন্য পাঁচটি দেশ হলোÑ গিনি, লাওস, কেনিয়া, পাপুয়া নিউগিনি ও উগান্ডা।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, সিপিআই র‌্যাংকিংয়ে আমাদের স্কোর গতবারের চেয়ে কমে না যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও আমাদের কিন্তু বসে থাকলে চলবে না। কারণ আমরা এখনো গড় যে স্কোর তার কাছাকাছিও পৌঁছতে পারিনি। তা ছাড়া সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়ন হলেও উন্নয়নের সাথে আমাদের দেখতে হবে দুর্নীতি কমছে কি না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ঠিক আছে কি না। গণতন্ত্রের বিনিময়ে উন্নয়ন কতটা গ্রহণযোগ্য সেটা নিয়েও ভাবার অবকাশ রয়েছে।
এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, যদি সংসদীয় কমিটিগুলো কার্যকর হয়, প্রশাসনযন্ত্র সংসদের জবাবদিহিতার মধ্যে থাকে, বিরোধী দল কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে তাহলে আমাদের অবস্থার আরো উন্নতি হতে পারে।
সিপিআই ২০১৫-এর জন্য বাংলাদেশের েেত্র সূত্র হিসেবে সাতটি জরিপ ব্যবহৃত হয়েছে। জরিপগুলো হলো, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল অ্যাসেসমেন্ট ২০১৪, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এক্সিউকিউটিভ ওপিনিয়ন সার্ভে ২০১৫, বার্টেলসম্যান ফাউন্ডেশন ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স ২০১৬, ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট ‘রুল অব ল’ ইনডেক্স ২০১৫, পলিটিক্যাল রিস্ক সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল কান্ট্রি রিস্ক গাইড ২০১৫, ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস ২০১৫ এবং গ্লোবাল ইনসাইট কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস ২০১৪-এর রিপোর্ট।