Thursday, September 6, 2018

আমি অসুস্থ ন্যায়বিচার পাবো না যত ইচ্ছা সাজা দিন: হুইল চেয়ারে করে এজলাসে খালেদা ,বাম হাত-পা প্রায় প্যারালাইজড

হুইল চেয়ারে বসা। পরনে গোলাপি শাড়ি। পায়ে সাদা জুতা। ঊর্ধ্বাঙ্গ থেকে পা পর্যন্ত সাদা চাদরে ঢাকা। চেহারায় অসুস্থতা আর যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট। কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন বারবার। দৃশ্যত বাম হাত একেবারেই নাড়াতে পারছিলেন না। এই অবস্থাতেই গতকাল দুপুর সোয়া ১২টায় নাজিম উদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে হাজির করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। এ সময় তার পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না।
ছোট একটি ব্যাগ নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন তার গৃহকর্মী ফাতেমা। আদালতের কার্যক্রম যতক্ষণ চলেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত হুইল চেয়ারেই বসেছিলেন ৭৩ বছর বয়সী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। কারাগারে এজলাস স্থাপন করায় খালেদা জিয়ার অসন্তোষও ছিল স্পষ্ট। আইনজীবীদের বক্তব্যের একপর্যায়ে সেই অভিব্যক্তিও  প্রকাশ করেন তিনি। অসুস্থতার বিষয়টি তুলে ধরে আদালতের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আপনারা যতদিন ইচ্ছা সাজা দিন, আমি এ অবস্থায় বারবার আসতে পারবো না। এই আদালত চলতে পারে না। এই আদালতে ন্যায়বিচারও হবে না। আদালতের কার্যক্রম শেষে চলে যাওয়ার সময় উপস্থিত সাংবাদিকদেরও তিনি জানান, তিনি খুবই অসুস্থ। বাম হাত দেখিয়ে বলেন, এই হাত নাড়াতে পারেন না। বাম পা বাঁকাতে পারেন না। প্যারালাইজডের মতো হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বার বার তিনি আদালতে আসতে পারবেন না।  
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নতুন এই এজলাসে বিচার কার্যক্রম শুরুর পর খালেদা জিয়াসহ এ মামলার অন্য দুই আসামিকে হাজির করা হলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা কেউ আসেননি। ফলে, এ মামলায় অসমাপ্ত যুক্তিতর্কের শুনানিও শুরু করা যায়নি। প্রায় ২৫ মিনিটের মতো আদালতের কার্যক্রম চলার পর ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান আগামী ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর শুনানির জন্য নতুন দিন ধার্য করেন। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার কার্যক্রম এতদিন চলছিল বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতের বিশেষ এজলাসে। তবে, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে মঙ্গলবার আইন  মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, এখন থেকে এই মামলার বিচারকাজ হবে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের ৭  নম্বর কক্ষে স্থাপিত আদালতে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৫ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে এই কারাগারের ভেতরে আরেকটি ভবনে।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া মানবজমিনকে মুঠোফোনে জানান, এই মামলায় আদালত পরিবর্তনের বিষয়ে তাদেরকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। বুধবার শুনানির দিনেও তাদের এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি। আদালত থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের অবহিত করা না হবে ততক্ষণ তারা কারাগারের ওই আদালতে আসবেন না। এরপর জানা যায়, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা অবস্থান করেন বকশীবাজারের ওই আদালতে। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতে বলেন, এ সংক্রান্ত আইন মন্ত্রণালয়ের গেজেট মঙ্গলবারই প্রকাশিত হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীদেরও অবগত করা হয়েছে। মিডিয়াতেও বিষয়টি প্রচার হয়েছে। কিন্তু তারা আসেননি।
নতুন এই আদালতের পরিবেশ
নাজিম উদ্দিন রোডের ওই কারাগারের মূল ফটক পেরিয়ে ডানদিকে প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় ৭ নম্বর কক্ষে সাজানো হয়েছে অস্থায়ী এই আদালতের এজলাস। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫০ ফুট এবং প্রস্থে প্রায় ২০ ফুট এজলাস কক্ষের প্রবেশমুখের ডানদিকের একটি কক্ষকে বিচারকের খাস কামরা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। বিচারকের এজলাসের বাঁ পাশে তৈরি করা হয়েছে আসামির কাঠগড়া। গতকাল সেই কাঠগড়ার সামনে খালেদা জিয়ার জন্য রাখা ছিল একটি চেয়ার ও  সাদা কাপড়ে মোড়া একটি ছোট টেবিল। উল্টোদিকে সাক্ষীর জন্য রক্ষিত জায়গা। আদালতের এজলাসের ডানপাশে প্রসিকিউশনের বসার ব্যবস্থা এবং  এজলাসের সামনের দিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বসার ব্যবস্থা ও ডায়াস রাখা হয়েছে। 
গতকাল রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের আইনজীবীরা সকাল ১০টার কিছু পরে আদালতকক্ষে এসে হাজির হন। তবে, আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে আসেননি। ঢাকা বারের সভাপতি ও বিএনপিপন্থি আইনজীবী গোলাম মোস্তফা খান আদালতকক্ষে উপস্থিত ছিলেন। আদালতে তিনি তার বক্তব্যও পেশ করেন। তিনি আদালতকে জানান, অবজারভার হিসেবে তিনি এই আদালতে এসেছেন। এই মামলার আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খানকে আদালতের কার্যক্রম শুরুর আগেই আসামির কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। এরপর সোয়া ১২টার দিকে খালেদা জিয়াকে আদালত কক্ষে নিয়ে আসা হয়। এ সময় গোলাম মোস্তফা এগিয়ে গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন। পরে খালেদা জিয়াকে উদ্ধৃত করে গোলাম মোস্তফা সাংবাদিকদের বলেন, তিনি বলেছেন, ‘তার অবস্থা খুব ক্ষীণ। শরীর খুব খারাপ। সিনিয়র আইনজীবীরা না এলে তিনি আর আসবেন না।’
একপর্যায়ে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল এই মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি ও নতুন এই আদালতের স্থান  নির্ধারণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে জানান, এই মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। মামলার অন্য দুই আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খানের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্যেই কয়েকমাস ধরে শুনানি হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের এই স্থানে অস্থায়ী আদালত ঘোষণা করে গতকাল এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার আইনজীবীর কাছেও প্রজ্ঞাপনের কপি পাঠানো হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবেও আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়াকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে খবর প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত নেই।’ একপর্যায়ে শুনানি শুরুর আর্জি জানান দুদকের এই আইনজীবী। এ সময় আদালতের বিচারক বলেন, যেহেতু তারিখ নির্ধারিত ছিল, কিন্তু আইনজীবীরা উপস্থিত হননি। তাদের উপস্থিত হওয়ার জন্য আদালতের কার্যক্রম এক ঘণ্টা মূলতবি করা হচ্ছে।
এ সময় ঢাকা বারের সভাপতি এডভোকেট গোলাম মোস্তফা খান বলেন,  প্রজ্ঞাপন রাতে জারি হয়েছে। এর আগে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা অবহিত ছিলেন না। আমরাও টেলিভিশনের স্ক্রলে দেখেছি। তিনি বলেন, আইনজীবীরা যেহেতু সঠিকভাবে অবহিত হননি সেহেতু তারা হয়তো জানেন-ই না যে এখানে বিচারকাজ হচ্ছে। এ কারণেই তারা বকশীবাজারের আদালতে গেছেন।
বিচারক বলেন, ‘আজকে যে তারিখ এটাতো তারা জানেন।’
গোলাম মোস্তফা বলেন, তারিখ জানলেও গেজেট যে প্রকাশিত হয়েছে এটাতো জানেন না। এ সময় আদালত কক্ষের পরিবেশ নিয়ে আপত্তি তুলে তিনি বলেন, একটি যৌক্তিক সময় দেয়া হোক।
বিচারক বলেন, ‘তারিখ দিতে হলেও তো আইনজীবীদের পিটিশন লাগবে। জামিনের দরখাস্তও দিতে হবে।’
গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘৫০ ফুট বাই ২০ ফুটের এই ছোট জায়গার অবস্থাও তেমন ভালো নয়। আইনজীবী, সাংবাদিকদের সবার বসার জায়গা নেই। আমাদের মোবাইল ফোনও বাইরে রেখে আসতে হয়েছে। আমার মনে হয় এমন পরিস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম শুরু করা সমীচীন হবে না।’ এ সময় মোশাররফ হোসেন কাজল শুনানি শুরুর পক্ষে মত ব্যক্ত করে আবারো বক্তব্য দেন।
একপর্যায়ে বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়া আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমার সিনিয়র আইনজীবীদের কেউ এখানে নেই। আমার শারীরিক অবস্থাও ভালো  না। এভাবে এখানে বসে থাকলে আমার পা ফুলে যেতে পারে। হাতেও প্রচণ্ড ব্যথা। এ অবস্থায় আদালত চলতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় বার বার আদালতে আসা সম্ভব না, আপনাদের যা মন চায় যতদিন ইচ্ছা সাজা দিন। আমি বার বার আসতে পারবো না। এখানে প্রসিকিউশনের ইচ্ছায় সব হয়। এখানে ন্যায় বিচার হবে না।’
একপর্যায়ে আদালতের বিচারক দুদকের আইনজীবীর কিছু বক্তব্য শুনে আদেশে জানান, আগামী ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে এবং খালেদা জিয়াসহ অন্য দুই আসামি ওই সময় পর্যন্ত জামিনে থাকবেন। এ সময় মহানগর দায়রা আদালতের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) আবদুুল্লাহ আবু উপস্থিত ছিলেন। 
আদালতের কার্যক্রম শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা দেখতেই পারছেন। ‘এখানে আদালত হওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে সাতদিন আগে। কিন্তু গেজেট কালকে (মঙ্গলবার) জারি করা হলো কেন? গেজেটের কপি আমার আইনজীবীরা পায়নি। আদালত বসল, আমার সিনিয়র আইনজীবীরা জানেন না। তাহলে আদালত চলে কীভাবে? এখানে ন্যায় বিচার হবে না।’ নিজের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। বা পা ঠিকমতো বাঁকাতে পারি না,  প্যারালাইজডের মতো হয়ে গেছে। বাঁ হাতও নাড়াতে পারি না। আমি খুবই অসুস্থ। আমি এখানে বার বার আসতে পারবো না। এখানে ন্যায়বিচার নেই। যা খুশি তাই করুক।’     
প্রসঙ্গত, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ই  আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় এ মামলাটি দায়ের করে দুদক। এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন- খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী,  বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক পুলিশের সাবেক পরিচালক জিয়াউল ইসলাম ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সাবেক একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।
পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার ঘিরে কড়া নিরাপত্তা
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিশেষ জজ আদালত-৫ এ বিচারাধীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার শুনানিকে ঘিরে ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চকবাজার মোড় থেকে শুরু করে বকশীবাজার মোড় এবং কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে নাজিম উদ্দিন রোড পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। সকাল থেকে পুলিশ, র‌্যাব এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অবস্থান নেন সেখানে। আশপাশের এলাকায় বন্ধ করে দেয়া হয় সকল ধরনের গণপরিবহনসহ ব্যক্তিগত পরিবহন চলাচল। মানুষের চলাচলেও আনা হয় নিয়ন্ত্রণ। কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনের রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী ব্যক্তিদের তল্লাশি করে পুলিশ। ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ আদালতের পেশকার তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে আসামিপক্ষের ৫ জন আইনজীবীকে প্রবেশ করতে দেয়া হবে। আসামিপক্ষ, রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদক মিলিয়ে সর্বমোট ১২ জন আইনজীবীকে প্রবেশ করতে দেয়া হবে। এছাড়া, প্রতিটি গণমাধ্যম থেকে একজন করে সাংবাদিক ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের মোবাইল ফোন বা রেকর্র্ড করার মতো যন্ত্র নিতে দেয়া হবে না।
খালেদার আইনজীবীদের অভিযোগ
বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মামলার শুনানি পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে স্থাপিত বিশেষ আদালতে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি অফিসিয়ালি জানানো হয়নি তার আইনজীবীদের। তাই কারাগারের ভেতরে অবস্থিত আদালতে না গিয়ে তারা বকশীবাজার আলীয়া মাদরাসায় স্থাপিত আদালতে যান। কারাগারের ভেতরে স্থাপিত বিশেষ আদালতে মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আলীয়া মাদরাসা মাঠের আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান করেন। বিএনপির আইন সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া সেখানে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বকশীবাজার আলীয়া মাদরাসায় অবস্থিত বিশেষ জজ আদালতে অবস্থান করছি। কারণ আমরা এখনো জানি আদালত এখানেই বসবে। নাজিম উদ্দিন রোডের কারাগারের আদালত থেকে অবহিত করলে আমরা ওই আদালতে যাবো। এখন পর্যন্ত আমাদের অবহিত করা হয়নি। অন্যদিকে দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, আদালত স্থানান্তরের বিষয়টি আমাদের যদি নোটিশ দিয়ে জানানো হয় তাহলে সকলে বসে সিদ্ধান্ত নেবো সেই আদালতে অংশ নেবো কিনা। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মামলার জন্য আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার জন্য আমরা যথারীতি আলীয়া মাদরাসা প্রাঙ্গণে গিয়েছিলাম। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত আমরা সেখানে অবস্থান করেছি। কিন্তু এই আদালত আলীয়া মাদরাসা থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে সেটা আমাদের নোটিশ দিয়ে অবহিত করা হয়নি। সে কারণে আমাদের আলীয়া মাদরাসা মাঠে যেতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান ও ফৌজদারি কার্যবিধিতে কারাগারের ভেতর আদালত বসানোর বিষয়ে বারণ করা আছে। আদালত বসবে প্রকাশ্যে। যেখানে সাংবাদিকরাসহ সাধারণের প্রবেশাধিকার থাকবে। জেলখানার মধ্যে যে আদালত বসানো হয়েছে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেটা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই ধরনের আদালত বসানোর কোনো সুযোগ নেই। সেই কারণে আজ আমরা জেলখানার ভেতরের আদালতে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া যে কারাগারে থাকে সেটাকে আপনি বলবেন সাবেক কারাগার? যেখানে ২০ হাজার বন্দিকে রাখা হতো সেখানে একজনকে রাখা হয়েছে সলিটারি কনফাইন করে। আর আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন সেটা কারাগার কিনা। কাগজপত্রে কতকিছু থাকতে পারে। এটার প্রতিক্রিয়া নেই কোনো। বাস্তবতা বলছি। এই সরকার খালেদা জিয়াকে মোকাবিলা করতে না পেরে আগামী নির্বাচনে পাস করার জন্য যতো অপকৌশল করেছে। জেলখানার ভেতরে বিচারও সেই অপকৌশলের অংশ।

কারাগারে আদালত স্থানান্তরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া, চ্যালেঞ্জ করবেন আইনজীবীরা

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচারকাজ চলবে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের কারাগারে। সেখানে একটি কক্ষে এজলাস স্থাপন করা হয়েছে। মামলার নির্ধারিত শুনানি হবে এ এজলাসে। নিরাপত্তার কারণে আদালতের স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে বলে গতকাল আইন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সংবিধান পরিপন্থি দাবি করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল সন্ধ্যায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে কারাগারে এজলাস স্থাপনকে ক্যামেরা ট্রায়াল বলে উল্লেখ করেন। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা আইনি চ্যালেঞ্জে যাবেন।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এখন থেকে এই বিশেষ মামলার বিচারকাজ পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের কক্ষ নম্বর-৭ এ অনুষ্ঠিত হবে। তবে, আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের আগেই বিকালে এ তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল। তিনি জানান, আজ বুধবার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে। প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় অসমাপ্ত যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য আজ দিন ধার্য রয়েছে। এর আগে এই মামলার কার্যক্রম চলতো বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতে।
এই মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ছাড়াও আরো ৩ আসামি রয়েছেন। বকশীবাজারের বিশেষ আদালতে খালেদা জিয়ার আরো কিছু মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছর এবং অন্য আসামিদের ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। রায়ের পর থেকেই খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাটি এখন যুক্তিতর্কের পর্যায়ে রয়েছে। এই মামলায় বেশ কয়েকটি ধার্য দিনে খালেদা জিয়াকে বকশীবাজারের আদালতে হাজির করা হয়নি। শুনানির দিনে আদালতকে এই বলে অবহিত করা হয়েছে যে, অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করা হচ্ছে না।
এদিকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়া নির্ধারিত তারিখে হাজিরা না দেয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। গতকাল নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয়  কারাগারের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার এই মামলায় (জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা) গত ফেব্রুয়ারি থেকে ছয় মাস হয়ে গেলেও কোনো কার্যক্রম করতে পারছি না। এই মামলায় খালেদা জিয়া উপস্থিত হচ্ছেন না। এ কারণে আমরা বলেছি, খালেদা জিয়া যেখানে আছেন সেখানেই আদালত বসানো প্রয়োজন।
এক প্রশ্নের জবাবে মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ কিনা, তা আমি জানি না। যে রেকর্ড আছে সেখানে তিনি  গুরুতর অসুস্থ, তা উল্লেখ নেই। আমরা জানি তিনি আসার জন্য অনুপযুক্ত ছিলেন।’ মোশাররফ হোসেন কাজল জানান, কারাগারের ভেতরে আদালত হলেও এটি প্রকাশ্য আদালত। এখানে আদালতের কার্যক্রমের সময় জনগণ, আইনজীবী, সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হবে।  ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানমতে এ আদালত হচ্ছে বলে জানান তিনি। এর আগে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ ভিডিও কনফারেন্সের ক্যামেরা ট্রায়ালে করার প্রস্তাব করেছিলেন দুদকের এই আইনজীবী। গতকাল তিনি বলেন, আমরা আদালতকে বলেছিলাম, সাক্ষ্য আইন সংশোধন করে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচার করার জন্য। আমরা আদালতে এও বলেছিলাম, এটি একটা পরিত্যক্ত জেলখানা। এখানে অনেক জায়গা আছে। জনগণের উপস্থিতিতে এখানে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।’
এদিকে কারাগারের ভেতরে আদালতের কার্যক্রম চলার এই সিদ্ধান্তকে সংবিধান, আইনবহির্র্ভূত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল বলে মনে করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। এ বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হবে বলে জানান বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী নওশাদ জমির। খালেদা জিয়ার আইনজীবী আব্দুর রেজাক খান মানবজমিনকে বলেন, ‘এ ধরনের সিদ্ধান্ত আমাদের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। কেন না সংবিধানে বলা আছে যে, প্রকাশ্য আদালতে (পাবলিক ট্রায়াল) বিচারকাজ হতে হবে। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি।’ তিনি বলেন, ‘জেলখানা কখনো পাবলিক ট্রায়াল হতে পারে না। জেলখানায় কখনো আদালত বসতে পারে না।’ খালেদা জিয়ার অন্য আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, যেনতেন কারণ দেখিয়ে খালেদা জিয়ার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সরকার এই পন্থা অবলম্বন করেছে। খালেদা জিয়াকে রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে এটি আরো একটি নীল নকশা। সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণেই এসব করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কারাগার হচ্ছে কারাগার। এখানে বিচারকাজ চলতে পারে না। আমরা মনে করি এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনের পরিপন্থি। সানাউল্লাহ মিয়া আরো বলেন, বাংলাদেশের জুডিশিয়ারির ইতিহাসে এ ধরনের নজির নেই। অতীতে জেলখানার বাইরে বিচারকাজ হয়েছে। কিন্তু জেলাখানার ভেতরে-এটি হয় না। প্রসঙ্গত, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ই  আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় এ মামলাটি দায়ের করে দুদক। এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন- খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী,  বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক পুলিশের সাবেক পরিচালক জিয়াউল ইসলাম ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সাবেক একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।
উল্লেখ্য, এর আগে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করে সংসদ ভবন এলাকায় সাব-জেলে রাখা হয়েছিল। তাদের বিচারে সাব-জেলের পাশেই সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষ জজ আদালত স্থাপন করে বিচারকাজ চালানো হতো।
কারাগারে আদালত স্থাপন সংবিধান বিরোধী: বিএনপি
পুরনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে আদালত বসিয়ে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার কার্যক্রম শুরু করার সরকারি সিদ্ধান্তকে সংবিধানের পরিপন্থি আখ্যায়িত করেছে বিএনপি। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিগগিরই রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়ার কথা বলেছে তারা। গতরাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে  দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। মির্জা আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়ার মামলা এতদিন একটি বিশেষ আদালত তৈরি করে ঢাকা আলিয়া মাদরাসা প্রাঙ্গণে চলছিল। আমরা জানতে পেরেছি- সরকার একটা বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে আদালতটি স্থানান্তর করে নেয়া হচ্ছে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে। সেটা কাল থেকে শুরু হবে। মির্জা আলমগীর বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই- সরকারের এই সিদ্ধান্ত সংবিধান বিরোধী। সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সংবিধানের আর্টিক্যাল ৩৫(৩) ধারা মতে, এই ধরনের মামলার বিচার প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হতে হবে। এখানে ক্যামেরা ট্রায়াল করার সুযোগ নেই। আমরা তাদের এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং অসুস্থ দেশনেত্রীর খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। মির্জা আলমগীর বলেন, আমরা মনে করি- এটি ক্যামেরা ট্রায়াল। আমরা রাজনৈতিকভাবে এ বিষয়টাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছি। দেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা সর্বোপরি তিনি একজন  প্রবীণ নাগরিক।
এখন সংবিধান লঙ্ঘন করে তার অধিকার হরণ করা হচ্ছে। এর চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে! এটাকে কোনোভাবেই হালকা করে নেয়ার সুযোগ নেই। বিএনপি মহাসচিব অভিযোগ করে বলেন, অন্যায় ও বেআইনিভাবে উচ্চতর আদালতে খালেদা জিয়ার জামিন হওয়ার পরও বিভিন্ন কারসাজির মধ্য দিয়ে তাকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এই গণবিরোধী সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারবিভাগকে নিজেদের লোক দিয়ে প্রভাবিত করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে দেশনেত্রীকে হয়রানি ও নির্যাতন করার উদ্দেশ্যে অন্যায়ভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মির্জা আলমগীর বলেন, আসন্ন নির্বাচনকে প্রভাবিত করা এবং একদলীয় শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার হীন উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আমরা অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম ঘোষণা করবো। পরবর্তী কার্যক্রম কী হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা রাজনৈতিক কর্মসূচি দেবো। সিআরপি’র ধারা ব্যাখ্যা করে সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ বলেন, একটি দেশ চলে সংবিধানের অধীনে।
সংবিধানের অধীনে অন্য কোনো আইন নেই বাংলাদেশে। অনেকেই মৌলিক অধিকারের কথা বলেন, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের কথা বলেন। দেশের মূল সংবিধান এখন পর্যন্ত যতবারই সংশোধন করা হয়েছে, ৩৫ ধারা কোনদিন সংশোধন হয়নি। ৩৫(৩)-এ স্পষ্ট করে বলা আছে যেকোনো ফৌজদারি মামলার বিচার প্রকাশ্যে হতে হবে। তিনি বলেন, আজকে জেলখানার অভ্যন্তরে বিচার করার অর্থ হলো ক্যামেরা ট্রায়াল। এটা আমাদের দেশে সংবিধান সম্মত নয়। সিআরপিসি তো প্রায় দেড়শ’ দুইশ’ বছর আগের। সেখানে দেখবেন ৩৫২ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে এই ধরনের বিচার প্রকাশ্যে হতে হবে। এখন যেটা সরকার করছে এটা সম্পূর্ণভাবে সংবিধান পরিপন্থি। ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, আমরা এই ব্যাপারে কথা-বার্তা বলবো। পর্যালোচনা করবো। কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া যায় কিনা সে ব্যাপারে চিন্তা করবো। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আইন সম্পাদক সানাউল্লাহ মিয়া, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, মাসুদ আহমেদ তালুকদারসহ খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

এক মঞ্চে বিরোধী নেতারা: একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চাই না

নাগরিক ঐক্য আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, চলমান রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের প্রয়োজনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বক্তারা আগামী নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহারের বিরোধিতা করেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘ইভিএম বর্জন, জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক জোট’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে বিকল্প ধারার সভাপতি সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, এখন বলা হচ্ছে উন্নয়নের গণতন্ত্র। উন্নয়ন থাকলে গণতন্ত্র থাকবে না। এটা কী। আমরা উন্নয়ন ও গণতন্ত্র একসঙ্গে চাই। আজ ঘরে বা রাজপথে কোথাও নিরাপত্তা নেই। কখন ধরে নিয়ে হাতুড়ি পেটা করা হবে তার ঠিক নেই। গণতন্ত্রহীনতা দেশের মানুষ অনেক সহ্য করেছে। আর নয়। আমরা স্বৈরাচারকে বিদায় করবো। তবে এক স্বৈরাচারকে বিদায় করে অন্য স্বৈরাচারকে আমরা আনব না। তা নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন,  প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য মানুষ আশা নিয়ে শুনে। কিন্তু তার কথায় অবহেলা, অবজ্ঞা রয়েছে। তা শুনে মানুষ দুঃখ পায়। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসলে জিয়াউর রহমানকে ঘৃণা করতে হবে কেন? শ্রদ্ধা করে কেউ ছোট হয় না। আবার ঘৃণা করে কেউ বড় হয় না। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তলোয়ার ও লাঠি দিয়ে নিরাপদ সড়ক ও কোটা আন্দোলনকারীদের মারা হয়েছে। এটা কী রাজনীতি? আশ্চর্য হই। প্রধানমন্ত্রী বার বার গণতন্ত্রের কথা বলেন। সে গণতন্ত্র অবশ্য তার দলে আছে। তার মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, নেতাকর্মীরা কথা বলতে পারে। গালিগালাজ করতে পারে। তার দলেই গণতন্ত্র আছে। বিরোধী দলের জন্য গণতন্ত্র নেই। তাদের চাপাতি আছে, লাঠি আছে। ইভিএম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন নির্বাচনে ইভিএম হবে না। তাহলে আপনার কথা ছাড়া, অনুমতি ছাড়া কি তা কেনার বন্দোবস্ত হয়েছে? ইভিএম হবে না। ইভিএম নেভার। দেশের মানুষ রাজশাহী ও খুলনার মতো নির্বাচন আর মেনে নেবে না। সরকারি দল ও দলের নেতাকর্মীরা দুর্নীতি না করলে দুর্নীতি ৯০ ভাগ কমে যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আলোচনায় সংবিধান প্রণেতা ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, যখন জাতি সংকটের মধ্যদিয়ে অতিক্রম করে তখন ঐক্যের প্রয়োজন হয়। দলমত নির্বিশেষে দেশের জন্য সবাই কাজ করে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছতাসহ আমরা আগেই সাত দফা দাবির কথা জানিয়েছি। সেই দাবিগুলো নিয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। সংবিধানে জনগণকে সরকারের মালিক বলা হয়েছে। জনগণ ক্ষমতার মালিক মানে এখানে আর কোনো বিভেদ থাকার কথা নয়। ঐক্যের ডাক দিয়ে ড. কামাল বলেন, আমরা ঐক্যে বিশ্বাস করি। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চাই না। ঐক্য হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আসুন সংবিধানের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হই। সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বাংলাদেশ চাই। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যের আন্দোলনে জাতি মুক্তি পাবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণের অধিকার হরণ করেছে। আবার অবৈধভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নীল নকশা এঁকেছে। যে কারণে বিতর্কিত ইভিএম চালু করার চেষ্টা করছে। ইভিএম পৃথিবীর সব দেশে বাতিল করা হয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশেই এখন ইভিএম পদ্ধতিতে নির্বাচন হয় না। এই সরকার এখন ইভিএম দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। এটা কিছুতেই হতে দেয়া যাবে না। দেশের প্রয়োজনে জাতির প্রয়োজনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আসুন আমরা ন্যূনতম কর্মসূচির মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারকে রুখে দিই। তারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে তার মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করছে। এটা সম্পূর্ণ সংবিধান বহির্ভূত।  
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আব্দুর রব বলেন, রাজনৈতিক দলের বক্তব্য হলো, যা জনগণ বলতে না পারে তা তুলে ধরা। জনগণ চায় এই সরকার ক্ষমতায় না থাকুক। তাই এ সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামাতে হবে। সব পেশাজীবীসহ সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদেরকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। তিনি বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র হয়েছিল সেনানিবাসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি সংবিধান মানেন তাহলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা কারাগারে চালাতে হবে কেন। তা তো সংবিধানের ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। শুধু হিংসা, ক্ষোভে এসব করা হচ্ছে। ইভিএম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সারা বিশ্বে বর্জন হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে বর্জন হয়েছে। গরু, ছাগল, ঘোড়া যে মার্কায় চাপ দেবেন সব নৌকায় যাবে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কোনো সরকার কি কখনও বলে যে, বিরোধী দল আন্দোলন করতে পারে না। কোনো সরকার কি আন্দোলন করতে বলে?
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ১০০ বছরের পরিকল্পনা করছেন কেন। আর কত দিন বাঁচবেন। এখন ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগে জনসভা করার জন্য অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। সংবিধানে তো সমাবেশ করার জন্য অনুমতি নেয়ার বিধান নেই। অনুমতি নিতে হবে কেন। স্বৈরাচারের পতনের জন্য আর বিলম্ব না করে মাঠে নামার আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এই সরকার জুলুমবাজ, চোর। সব লুটেপুটে খাচ্ছে। শেয়ারবাজার দিয়ে শুরু। একে একে ব্যাংক, কয়লা, গ্যাস, পাথর, পানি সব খেয়েছে। আমি আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রীকে দেখে কাঁদি। এক সময় গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছিলাম। কিন্তু এখন টাকার পর ভোট চুরি করছে। ভোটের নামে একটি নাটক করে আমি তো ক্ষমতায় থাকতে পারি। তাই ধরে নিয়েছে। সিটি করপোরেশনে ভোট চুরি করেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, সবাই এখন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। এই দাবি নিয়ে সবাই একসঙ্গে রাজপথে নামব। শক্তিধর বাহিনীও এক সময় ধীরে ধীরে ফনা নামাবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর যে ক্ষমতা মোঘল সম্রাট বা রাশিয়ার জারেরও তত ক্ষমতা ছিল না। চলমান অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিগগিরই বৃহত্তর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, ইভিএম অত্যন্ত বিতর্কিত বিষয়। বিশ্বে ইভিএম গ্রহণের চেয়ে বর্জন হয়েছে বেশি। জার্মানি এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ইভিএমে দুর্নীতি ধরা কঠিন। ইভিএম মানে ভোট গুম। যন্ত্রের পেছনের মানুষগুলো নিরপেক্ষ না থাকলে ইভিএমের ফল নির্ভুল হবে না। ইভিএমে মানুষকে আরো উস্কে দেয়া হচ্ছে। আমার ভোট যেন কাউন্ট না হয় সে ব্যবস্থা হচ্ছে। ১৯৭১ সালের সবচেয়ে বড় চেতনা হচ্ছে মানুষের সরকারই ক্ষমতায় থাকবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, অপজিশন না থাকলে গণতন্ত্র হয় না। ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছিল। আমরা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। একটি ইস্যুতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সব অপচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে।

সড়কে সেই এলোমেলো চিত্রই by হাফিজ মুহাম্মদ

নৈরাজ্য। বিশৃঙ্খলা। সড়কজুড়ে স্টপেজ। রেসিং। একের পর এক দুর্ঘটনা। মৃত্যুর মিছিল। কোনো কিছুই থেমে নেই। রাজধানীর সড়কে গত কয়েকদিন নিয়ম-শৃঙ্খলা কিছুটা ফিরতে শুরু করেছিল। তবে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলা ফিরতে না ফিরতেই আবারও সড়কে পুরনো চেহারা। যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা। বাসের দরজা বন্ধ না করা। পাল্লা দেয়া। সবই চলছে। এর প্রেক্ষিতে রাজধানীতে এখন দেখা দিয়েছে গণপরিবহন সংকট। অধিকাংশ বাসের বৈধতা না থাকায় সেগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জাবালে নূর পরিবহনের বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। পরে হঠাৎ করেই শুরু হয় ট্রাফিক সপ্তাহ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নিরাপদ সড়কের জন্য দেয়া হয় বেশ কিছু নির্দেশনা। বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট তারিখ বেঁধে দেয়া হয়। এতকিছুর পরেও সড়কে ফিরেনি শৃঙ্খলা। আবার নিরাপদ সড়কের জন্য শুধু গণপরিবহনের ক্ষেত্রে নির্দেশনার কথা বলা হচ্ছে। অন্য যেসব ছোট-বড় পরিবহন এবং নন-ইঞ্জিনচালিত বাহন রয়েছে তাদের জন্য নেই কোনো নির্দেশনা। গত মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২০১৮-১৯ বাজেটে ৩০টি বাস স্টপেজ নির্মাণের কথা উল্লেখ করে। কিন্তু তার কোনোটাই এখনো চোখে পড়ছে না। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যে কয়টি নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ রয়েছে সেখানেও থামছে না যানবাহন। মূল সড়কের ওপর থেকেই যাত্রী উঠানামা করছে। তবে অন্যান্য পরিবহন কোথায় দাঁড়াবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও দেখা যাচ্ছে না। গতকাল সরজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায় এসব বিশৃঙ্খলার চিত্র। তবে কিছু কিছু স্থানে নির্দিষ্ট স্টপেজের চিহ্ন লাগাতে শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। কিছু বাস দরজা বন্ধ করেই চলছে। নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যাত্রী তুলছে না। কিন্তু তার সংখ্যা অনেক কম। রাজধানীর মিরপুর এক নম্বর গোলচত্বর। এখানে সড়কের উভয় পাশে রয়েছে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ। তবে তা সড়কের কতটুক অংশ জুড়ে এর কোনো চিহ্ন নেই।
যে যেখানে পারছে সেখানেই বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তুলছে। অনেক যানবাহন আবার সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করাচ্ছে। মিরপুর এক নম্বর হয়ে দারুসসালাম রোডের কোনো স্ট্যান্ডে নির্দিষ্ট স্টপেজ না থাকায় যে যেখানে পারছে সে সেভাবে যাত্রী উঠানামা করাচ্ছে। কিন্তু টেকনিক্যাল মোড়ের চিত্রটা একটু ভিন্ন। এখানে বাস স্টপেজের একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। তবে তা মানছে না কেউই। টেকনিক্যাল মোড় থেকে তালুকদার পরিবহন নামের একটি বাসে যাত্রী হয়ে সড়কের অবস্থা দেখা হয়। বাসটি রাজধানীর চিড়িয়াখানা-যাত্রাবাড়ী রুটে চলাচল করে। টেকনিক্যাল মোড় থেকে চেকার যাত্রী সংখ্যা লিখে ছেড়ে দেয়। এরপর বাসটির দরজা বন্ধ করে দেয়ার কথা থাকলেও চালক এবং তার সহকারী বন্ধ করেননি। এ ছাড়া কল্যাণপুর, শ্যামলীতে এসে সড়কের মাঝখান থেকেই যাত্রী তুলে শিশুমেলা মোড়ে এসে সড়কে কিছুটা যানঝট লাগে। এখানে বাসটি চলন্ত অবস্থায় চার পাঁচজন নারী যাত্রী তোলে। এভাবে প্রায় প্রতি স্ট্যান্ড এবং মোড় থেকে যাত্রী উঠানামা করায়।
তবে এ বাসটি ফার্মগেট এসে নির্দিষ্ট স্টপেজের ভিতরে থামে। বাসটির চালকের সহকারী জাকিরের কাছে জানতে চাওয়া হয় কেন বাসটি সড়কের মাঝখান থেকে লোক তুলছে। জাকির বলেন, দেখেন দুই বাসের মাঝখান থেকে তারা এসে উঠছেন। আমি কি করবো। দরজা কেন বন্ধ করা হয়নি জানতে চাইলে বলেন, যে কয়টি সিট খালি রয়েছে সে কয়জন লোক তুলছি। দরজা বন্ধ করার নির্দেশনা থাকলেও কেন বন্ধ করছে না এটার উত্তরে থমকে যান তিনি। পরবর্তীতে ফার্মগেট বাস স্টপেজে অনুসরণ করা হয় গণপরিবহনের বর্তমান অবস্থা। নামে মাত্র কিছু বাস স্টপেজের ভিতরে ঢুকে। বাকিগুলো মূল সড়ক থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করায়। এছাড়াও টেক্সি, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য পরিবহনই থামছে মূল সড়কে। একই অবস্থা সড়কের বিপরীত পাশে আনন্দ সিনেমা হলের পাশের স্টপেজেও। এখানে হাতেগোনা কয়েকটি বাস নির্দিষ্ট স্টপেজে প্রবেশ করছে। বাকিগুলো মূল সড়কেই থামছে। এখানে কিছুদূরে পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকলেও তারা যেন দর্শক। এরপরে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের কাওরানবাজার অংশে সড়কের পূর্ব পাশে নির্দিষ্ট স্টপেজ থাকলেও সেখানে বাস ঢুকছে না।
যাত্রী উঠানামা করছে মূল সড়ক থেকেই। অন্যদিকে এ সড়কের পশ্চিম পাশে ফুটপাথের ওপরেই প্রাইভেটকার, ভ্যানগাড়ি পার্কিং করে রাখতে দেখা যায়। ফুটপাথ বন্ধ করে গাড়ি পার্কিং করে রাখছে কেন জানতে চাইলে এক ড্রাইভার বলেন, সড়কে গাড়ি রাখলেই পুলিশ মামলা দেয়, তাই ফুটপাথে রাখছি। এরপরে তারা গাড়ি নিয়ে সটকে পড়েন।
নগরীর সড়কে পরিবহন বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে সর্বত্র। তবে কয়েকটি স্থানে সড়ক বিভাজক চিহ্ন, নির্দিষ্ট স্টপেজ চিহ্ন লাগাতে শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। ফুটপাথ এবং ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে নগরবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে দেখা যায়। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা করে তাদের সচেতন করা হচ্ছে। ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো গাড়িই তারা চলতে দিচ্ছে না। টার্গেট সিস্টেম বাস বন্ধ করতে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনোভাবেই টার্গেট সিস্টেম চলতে দেয়া হবে না। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এবং টার্গেট সিস্টেমমের কারণে ইতিমধ্যে পাঁচটি পরিবহন তারা বন্ধ করে দিয়েছেন। ঢাকা পরিবহন সমিতির পক্ষ থেকে আরো জানান, তারা সরকারের কাছে পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরাতে কয়েকটি দাবি তুলে ধরছেন। এ ছাড়াও দুই সিটি করপোরেশনের কাছে কাউন্টার চালু করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। এজন্য নির্দিষ্ট স্টপেজ নির্ধারণ করতেও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
মালিক সংগঠন থেকে আরো বলা হয়, সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যত্রতত্র বাসে না উঠলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র মো. জামাল মোস্তাফা বলেন, নগরীর শৃঙ্খলা ফিরাতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। উত্তর সিটির যেসব স্থানে বর্তমানে স্টপেজ রয়েছে সেগুলো আধুনিকায়ন করা হবে। আর বাকি স্থানগুলো নির্ধারণ করে খুব শিগগিরই আধুনিক স্টপেজ করা হবে। দুই সিটি করপোরেশন মিলে দ্রুত একটি সমন্বয় সভা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

চাঙ্গাভাব ফিরছে আবাসন খাতে

টানা কয়েক বছর সংকটে থাকা দেশের আবাসন খাতে চাঙ্গাভাব ফিরছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায়, ব্যাংক ঋণের সুদহার কমে আসা, ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের স্বল্প সুদে গৃহঋণ পাওয়া এবং বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) বাড়ি নির্মাণ ও ফ্ল্যাট কেনার  ক্ষেত্রে দেয়া ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনছে। এ ছাড়া নির্বাচন সামনে রেখে দেশব্যাপী নগর দরিদ্রদের জন্য ৪০ লাখ পরিবারকে ফ্ল্যাট প্রদানের প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এসব কারণে আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা। আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) ও বিএইচবিএফসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, ২০১০ সালে নতুন আবাসিকে গ্যাস সংযোগ না দেয়ার ঘোষণার পর পরতে শুরু করে আবাসন খাতের বাজার। এরপর শেয়ারবাজারে ধস, ক্রেতাপর্যায়ে ঋণের অভাবসহ নানা কারণে আবাসন খাতের বিক্রি আরো কমে যায়। তবে ব্যাংকঋণের সুদহার হ্রাস ও ফ্ল্যাট কিনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ চালুর সুবাদে আবাসন খাতে আবার সুদিন ফিরছে। অ্যাপার্টমেন্টের বাজার ক্রমান্বয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালের পর থেকে আবাসন ইউনিট বিক্রি ২০ শতাংশ বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলেন, ২০১৭ সালে পরিস্থিতি অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে এবং আগের কয়েক বছরের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে। চলতি বছর এ খাতের পরিস্থিতি আরো ভালো হবে বলে তারা আশা করছেন। তারা জানান, অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রিতে বেশ ছাড় দিয়েছেন। কয়েক বছর ধরে জমির মূল্য একই রকম আছে। এদিকে অ্যাপার্টমেন্টের দামও বাড়েনি। এ কারণেই আবাসন খাতে বিক্রি ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে।
রিহ্যাব সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের তুলনায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অ্যাপার্টমেন্টের দাম প্রতিষ্ঠানভেদে ৩০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। দাম সবচেয়ে বেশি কমেছে বারিধারা, বনানী, গুলশান, ধানমন্ডি, লালমাটিয়ার মতো এলাকায়। রিহ্যাব জানিয়েছে, ২০০৮ সালে আবাসন খাতকে ঘিরে ২০ লাখের মতো কর্মসংস্থান ছিল। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ২৮ লাখের মতো। ২০২০ সাল নাগাদ এ খাতে প্রায় ৩৩ লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। জিডিপিতে আবাসন খাতের অবদান প্রায় ১৫ ভাগ। রিহ্যাবের হিসাব মতে, ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে ২০৯টি প্রতিষ্ঠানের ১১ হাজার ১৬৫টি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। ২০১৪ সালে ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৭৪৯টি।
রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন জানান, রাজধানীতে ফ্ল্যাটের দাম এখনো যৌক্তিক। আবাসনে বিনিয়োগের এখন উপযুক্ত সময়। আমাদের ব্যবসাও এখন তুলনামূলক বেশ ভালো চলছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আবাসন খাত আবারো ঘুরে দাঁড়াবে।
রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি ও শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. তৌফিক এম সেরাজ বলেন, ২০১৩-১৫ সাল পর্যন্ত অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি ছিল খুবই কম। তবে আশার কথা হচ্ছে, ২০১৭ সালে অনেক পরিবর্তন এসেছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় বিক্রি শতকরা প্রায় ২০ ভাগ বেড়েছে। আশা করা যায়, আগামীতে পরিস্থিতি আরো ভালো হবে।
বিএইচবিএফসি সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবর থেকে সরকারি কর্মচারীরা ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে গৃহঋণ পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। বাড়ি নির্মাণ ও ফ্ল্যাট কেনার ঋণের সুদহারে এত দিন সামান্য যে পার্থক্য ছিল, তা তুলে দিচ্ছে সংস্থাটি। বিএইচবিএফসির এক কর্মকর্তা বলেন, ৯ই আগস্টের মধ্যে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে সরকার যে নির্দেশনা দিয়েছে, সেটি মানতেই সুদের হার কমানো হচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অনুমোদন পেলেই প্রজ্ঞাপন জারি হবে। স্বল্পবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসন স্বপ্ন পূরণে বিএইচবিএফসির নতুন গৃহঋণের সুদের হার কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সূত্র জানায়, ঋণ ছাড়ে অর্থমন্ত্রণালয়ের অর্থবিভাগ এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। দেশের ১২ লাখ কর্মচারীর হাতে এ ঋণের অর্থ তুলে দিতে সরকারের পক্ষ থেকে জোর তাগিদ রয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই সরকার এ কার্যক্রমের বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
এদিকে গত ৩০শে জুলাই অর্থমন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সরকারি কর্মচারীদের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গৃহ নির্মাণ ঋণ প্রদান নীতিমালা’ ২০১৮ প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে অর্থ বিভাগ, যা ১লা জুলাই থেকে কার্যকরের কথা বলা হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী, গৃহনির্মাণে ৫ শতাংশ সরল সুদে ঋণ নেয়ার যোগ্যতা হিসেবে কর্মচারীদের বয়সসীমা করা হয় চাকরি স্থায়ী হওয়ার পর সর্বনিম্ন ৫ বছর এবং সর্বোচ্চ ৫৬ বছর। সে হিসেবে প্রায় ১২ লাখ কর্মচারী এ ঋণ সুবিধা পাবেন, যা বাস্তবায়নে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, রাষ্ট্র মালিকানাধীন তফসিলি ব্যাংক ও বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন সরকারের এ ঋণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য গৃহনির্মাণ ঋণ প্রদান কার্যক্রম পরিচালনা করবে। নীতিমালার আওতায় জাতীয় বেতন স্কেলের গ্রেড ভেদে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ এবং সর্বনিম্ন ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেয়া যাবে।
সূত্র মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের সহজ শর্তে গৃহঋণ দিতে চলতি মাসে দেশের চারটি সরকারি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে। যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গৃহ নির্মাণ ঋণ দেয়া হবে সেগুলো হচ্ছে- সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী এবং বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (বিএইচবিএফসি)।
বাংলাদেশে ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারি কর্মচারীদের গৃহঋণ প্রদান নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগের আওতায় অন্যদেরও আনার চেষ্টা রাখতে হবে। আবার  ব্যাংকগুলোকেও এ ঋণ প্রদানে স্বচ্ছতার বিষয়টি গুরুত্বে রাখতে হবে।
রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নূরন্নবী চৌধুরী শাওন এমপি বলেন, স্বল্প সুদে ঋণের এ পরিপত্রের কারণে এরই মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে গৃহনির্মাণ বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের আগ্রহ জন্মেছে। যা আবাসন শিল্পের জন্য খুবই সুখের খবর। এর মাধ্যমে আবাসন শিল্পে ১৩ লাখ নতুন বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, আবাসন খাত অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে কিছুটা ভালো অবস্থায় আছে। আগের তুলনায় এ খাতে বর্তমানে ক্রেতাদের আস্থার সংকট কেটেছে। ১৯৯২ সালে সাতটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে যাত্রা শুরু করে রিহ্যাব। বর্তমানে এ সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ১১৫১টি।

শতাধিক খুঁটি গিলে খেয়েছেন তিনি by মাহবুব খান বাবুল

আলোচনায় সরাইল পিডিবি’র নির্বাহী প্রকৌশলী। ইতিমধ্যে গিলে খেয়েছেন শতাধিক বৈদ্যুতিক খুঁটি। এক জায়গার মালামাল দিয়ে কাজ করছেন অন্য জায়গায়। কাজ করার আগেই বিল নিয়ে গেছেন ঠিকাদার। কোনো দরপত্র ও ওয়ার্ক অর্ডার ছাড়াই দেদারছে চলছে খুঁটি বসানোর কাজ। ভেস্তে যাচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্প (এপিপি)। ব্যাংকে জমা ছাড়াই মাসোহারায় দিচ্ছেন কানেকশন। চলছে অবৈধ বিদ্যুতায়ন। শুধুমাত্র এক ব্রিক মিলের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য দেয়া হয়েছে ২৪টি খুঁটি ও ৪ কিলোমিটার ক্যাবল। প্রি-পেইড মিটার লাগানোর নামে টাকার বিনিময়ে লক্ষ লক্ষ বকেয়া ইউনিট গায়েব করা হচ্ছে। এমন সব অভিযোগ ওঠেছে সরাইল পিডিবি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন জুয়েলের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক প্রকৌশলী বিদ্যুতের সকল ধরনের খুঁটি ও ট্রান্সফরমার অফিসে মজুত রাখতেন। যেকোনো দুর্যোগ বা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারতেন দৃঢ়তার সঙ্গে। পদোন্নতিজনিত কারণে তিনি চলে গেছেন। যাওয়ার আগে তিনি ২০০টি ভিন্ন ধরনের খুঁটির বরাদ্দ অনুমোদন করিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ছিল ৫০ কিলোমিটার ক্যাবল। গোটা উপজেলায় সিস্টেম লস রেখে গিয়েছিলেন শতকরা ৪ ভাগ। শাহবাজপুর ইউনিয়নের ধীতপুর গ্রামের লো-ভোল্টেজ সমস্যা সমাধানের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। সেখানে কাজ শুরুর প্রস্তুতিও ছিল। ২৬শে মে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন জুয়েল। তার যোগদানের পর থেকেই পাল্টে যেতে শুরু হয়েছে সরাইল বিদ্যুতের ধরন। থমকে দাঁড়িয়েছে লো-ভোল্টেজ সমাধানের কাজ। নড়েচড়ে বসেছেন অফিসের কিছু অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কর্মচারী। জনৈক বড় কর্তার চাচাত ভাই পরিচয়ে কালিকচ্ছ এলাকার এক ব্যক্তি দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন অফিস। ইচ্ছেমতো চুক্তি করে নিজ এলাকায় দিচ্ছেন খুঁটি। ৮ই জুন ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী চলে যান চট্টগ্রামে। ৪ দিন পর ফিরে আসেন। ২৭ ও ২৮শে মে ৩৩ কেভি লাইনের খুঁটি পড়ে গিয়ে সারারাত সরাইল ছিল অন্ধকারে। তিনি ছিলেন অনুপস্থিত। দ্বিতীয়বার গত ১৭ই জুলাই সরকারি গাড়ি নিয়ে ৩-৪ দিনের সফরে যান চট্টগ্রামে। এপিপি’র তালিকাভুক্ত ধীতপুর গ্রামের কাজ না করেই ঠিকাদার উত্তোলন করে ফেলেছেন বিল। আর সেখানকার বরাদ্দকৃত খুঁটিগুলো এপিপি’র তালিকার বাইরে ১৫-২০ হাজার টাকা দরে বিক্রি করে দিয়েছেন অন্যত্র। ক্যাবল তো আছেই। লো-ভোল্টেজ সমাধানের কাজের জন্য পূর্বের বরাদ্দের ৮৮টি এলটি (৯ মিটার) ও এইচটি ৪৪টি (১২ মিটার) খুঁটির সবগুলোই তিনি পছন্দের জায়গায় বিক্রি করে দিয়েছেন। এরমধ্যে নিয়ম না থাকলেও  নোয়াগাঁও ইউনিয়নের একটি ব্রিক মিলেই তিনি ২৪টি খুঁটি ও ১টি ১০০ কেভিএ ট্রান্সফরমার বিক্রি করে বিদ্যুতের লাইন দিয়েছেন। এর মধ্যে ১৮টি খুঁটিই নতুন। আর ক্যাবল দিয়েছেন ৪ কিলোমিটার। এপিপি’র বাইরে মটখলায় ১২টি, কালিকচ্ছ এলাকায় ৬টি, বাড়িউড়ায় ৬টি, ছান্দের বাড়ি ও দেওড়ায় ৮টি খুঁটি ক্যাবলসহ বিক্রি করেছেন। ৫ হাজার টাকা বেতনে একজন পিএ রেখেছেন তিনি। কোরবানির ঈদের আগের দিন সরকারি গাড়ি নিয়ে চলে যান চট্টগ্রামে নিজের বাসায়। যাওয়ার আগে সরাইল সদরের সৈয়দটুলায়, শাহবাজপুর সহ ৬৫ হাজার টাকায় ৩টি ট্রান্সফরমার দিয়ে গেছেন। তারই ইশারায় দরপত্র আহ্বান ছাড়াই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দেদারছে এপিপি’র বহির্ভূত কাজ করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী।
ওদিকে প্রি-পেইড মিটার সংযোগ দিতে গিয়ে গ্রাহকের কাছে পিডিবি’র পাওনা লক্ষাধিক ইউনিটে নিজেদের পকেট ভারী করে। আর বিদ্যুতের কাছে গ্রাহকের পাওনা ইউনিটগুলো কারেকশনের আশ্বাস দিয়ে কিছু টু-পাইস কামিয়ে নেন। ফলে জুন মাসের শেষের দিকে সরাইল পিডিবি’র সিস্টেম লস দাঁড়ায় ৪৪ ভাগে। সিস্টেম লস কমানোর জন্য ব্রিকমিলগুলোর দিকে নজর দেন। কৌশলে পরে বিল কমিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে বেশ কয়েকটি ব্রিকমিলের বিল বাড়িয়ে দেন। মিলগুলো হচ্ছে- শিরিন ব্রিকস, লিজা ব্রিকস, আমানত ব্রিকস, আজম ব্রিকস, রূপালী ব্রিকস, নিউ সমতা ব্রিকস, দেশ ব্রিকস, কল্যাণ ব্রিকস ও দয়াল বাবা লাকড়ি মিল।
ডিজিটাল মিটার বাদ দিয়ে লাগানো হচ্ছে প্রি-পেইড মিটার। নির্ধারিত পরিমাণ টাকা ব্যাংকে জমা দেয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। নগদ ৫ শ’ টাকা করে গ্রহণ করছেন এক্সেন। দিন শেষে এ টাকা অফিসে বসেই হচ্ছে ভাগ-বাটোয়ারা। শাহবাজপুর আতকা বাজার ‘রমিছ উদ্দিন রাইস মিল’। মালিক বিল্লাল মিয়া। কাস্টমার নং-৩৫৪১১৪৭৯। মিটার নং-০১০১৩০০১৫৩৮৮। ২৫শে জুলাই নগদ ৫ শ’ টাকায় লোড বৃদ্ধি করেন। বাড়ি গিয়ে দেখেন কাজ হয়নি। পরের দিন ২৬শে জুন এক্সেনের কাছে আসেন বিল্লাল। আবার ৫ শ’ টাকা নিয়ে ১৮ কিলোওয়াট থেকে ২৫ কিলোওয়াট করে দেন। এভাবে নিয়মিত চলছে কিলোওয়াট বৃদ্ধি বাণিজ্য।
গ্রাহকদের বকেয়া রিডিং টাকার বিনিময়ে গিলে খাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে স্বাক্ষর জাল করতেও দ্বিধা করছেন না। পূর্বের বিল থেকে রিডিং সমন্বয় করে সরকারের রাজস্ব আত্মসাৎ করছেন। কিছু ক্ষেত্রে রিডিং বকেয়া রেখেই রফাদফার মাধ্যমে বন্ধ করে দিচ্ছেন পোস্ট পেইড হিসাব। কালিকচ্ছের গলানিয়া গ্রামের মো. সুমন মিয়া। বই নং-৭০৭। হিসাব নং-এ-১৬৩২১। মিটার নং-৩৬২২০২। জুন ২০১৮-এ শূন্য ইউনিট দেখিয়ে বিল ধরিয়ে দিয়েছে ৮ হাজার ২২৮ টাকা। বিলটিতে পূর্বে ও বর্তমানের রিডিং লেখা ১০৯৬০। আর কাস্টমারের ব্যবহৃত ইউনিট-০। জমা দেয়ার শেষ তারিখ ছিল ২৯শে জুলাই। পিডিবি’র লোকজন স্বাক্ষর জাল করে ৮ হাজার টাকার বিলটি কেটে হাতে লিখে দেন ৪ হাজার টাকা। ২৬শে জুলাই সরাইল কৃষি ব্যাংকে বিলটি জমা হয়। আর ২৯শে জুলাই তারিখে ডিসি আরসি চার্জ ৬ শ’ টাকা জমা দিয়ে ওই সংযোগটিকে বিচ্ছিন্ন দেখানো হয়। এক বিল থেকেই গায়েব হয়ে গেছে সরকারের ৪ হাজার ২২৮ টাকা। প্রি-পেইড মিটার লাগানোর সুযোগে শত শত গ্রাহকের সঙ্গে জমে ওঠেছে বকেয়া বিল গায়েব বাণিজ্য।
বছর দুই আগে শেষ হয়েছে সরাইল পিডিবি অফিসের দ্বিতীয় তলার কাজ। নিচ তলা থেকে দ্বিতীয় তলায় স্থানান্তরিত হয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষ। পাশেই রয়েছে উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও প্রধান অফিস সহকারীর কক্ষ। সেইসঙ্গে অফিসের জন্যই তৈরি একটি কক্ষে দেড় বছর ধরে বসবাস করছে ঠিকাদারের ১৫-২০ জন শ্রমিক। ওই কক্ষটি এখন যেন আবাসিক হোটেল। একাধিক ঠিকাদার বলেন, পূর্বের এক্সেনের বরাদ্দকৃত খুঁটি ও ক্যাবল দিয়েই বাণিজ্য চলছে। এখন আর কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। দরপত্র ছাড়াই ২/১টি কাজ করেছি। বিল কবে পাবো জানি না। সরাইল পিডিবি’র নির্বাহী প্রকৌশলী (বিক্রয় ও বিতরণ) মো. মাঈন উদ্দিন জুয়েল সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণ করার সময় সিস্টেম লস ছিল ২৪ ভাগ। বর্তমানে ১৭ ভাগ। নিজেকে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, লোড বৃদ্ধির সময় চুক্তি পরিবর্তন বাবদ ১৫০ টাকা ব্যাংকে জমা দিতে হয়। এরপর কেউ যদি ইচ্ছে করে কিছু দেয়। সেটা তো নিতে হয়। আর খুঁটি বসাতে লেবারদের কিছু টাকা সবাই দিয়ে থাকে। ব্রিকমিলে ২৪ খুঁটি ও ১টি ট্রান্সফরমার প্রধান প্রকৌশলীর বরাদ্দ। এপিপি’র তালিকাভুক্ত ধীতপুর গ্রামের কাজ হচ্ছে নতুবা হবে। ব্যক্তিগত নয় অফিসিয়াল কাজে সরকারি গাড়ি নিয়ে যেকোনো জায়গায় যাওয়া যায়।

ডিএসই’র মালিকানায় যুক্ত হলো চীনা জোট

চীনা কনসোর্টিয়াম সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তর করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। একই সঙ্গে ডিএসই’র একাউন্টে ৯৪৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা জমা হয়েছে। সাংহাই ও সেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জের বিও (বেনিফিসিয়ারি ওনার্স) একাউন্টে শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তারা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে শেয়ারের মূল্য পরিশোধ করেছেন। এখন থেকে চীনা কনসোর্টিয়ামের একজন প্রতিনিধি হিসেবে সেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জের আইটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল সি ওয়েনহাই ডিএসই’র পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেছেন। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে ডিএসই’র পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়। এ সময় ডিএসই’র পরিচালক বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া, সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান, মিনহাজ মান্নান ইমন, শরীফ আতাউর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএসই চেয়ারম্যান আবুল হাসেম বলেন, পুঁজিবাজারের জন্য এই দিনটি ঐতিহাসিক। কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ আন্তর্জাতিক শেয়ার মর্কেটে পরিণত হতে যাচ্ছে। ডিএসই’র ২৫% শেয়ার চীনা কনসোর্টিয়াম শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে ডিএসই। একই সঙ্গে ডিএসই’র একাউন্টে ২৫ শতাংশ শেয়ারের সমপরিমাণ টাকা জমা হয়েছে। এর মাধ্যমে চীনা কনসোর্টিয়াম এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে।
সি ওয়েনহাই বলেন, বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জের মান উন্নয়ন এবং অনান্য সব ধরনের সহযোগিতা করবে চীনের সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম। তিনি বলেন, আমরা ডিএসই’র প্রযুক্তিকে আরো শক্তিশালী করতে চাই। এর মাধ্যমে উন্নয়নের এক ধাপ এগিয়ে যাবে ডিএসই। একই সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট শক্তিশালী না হওয়া পর্যন্ত সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। সি ওয়েনহাই বলেন, চীনা কনসোর্টিয়াম গভীর গবেষণা ও পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে একটি আন্তরিক, সহযোগিতামূলক ও উভয়ের জন্য উপকারি কাজ করবে। এছাড়া দরপত্রে ব্যবসা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ভিশন নিয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়েছে।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান বলেন, গত ৩রা সেপ্টেম্বর চীনা কনসোর্টিয়াম অর্থ দিয়েছে এবং ৪ঠা সেপ্টেম্বর শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ডিএসই আরো এগিয়ে যাবে। চীনা কনসোর্টিয়াম থেকে প্রাপ্ত অর্থ স্টেকহোল্ডাররা বাজারে বিনিয়োগ করলে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি জানান, চীনা কনসোর্টিয়াম থেকে প্রায় ৯৬২ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। এরমধ্যে স্ট্যাম্প ডিউটিবাবদ সরকারকে ১৫ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। বাকি ৯৪৭ কোটি টাকা স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। যা স্টেকহোল্ডাররা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, গত ২৬শে আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক চীনের সাংহাই ও সেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ জোটকে নিটা একাউন্ট খোলার অনুমতি দেয়। এর আগে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে গত ১৪ই মে চীনা জোটের সঙ্গে চুক্তি সই করে ডিএসই। এর আগে ৩রা মে চীনা কনসোর্টিয়ামকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। চুক্তি অনুযায়ী, কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনা জোট ডিএসই’র ২৫ শতাংশ বা ৪৫ কোটি ৯ লাখ ৪৪ হাজার ১২৫টি শেয়ার কিনেছে তারা। এজন্য প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ২১ টাকা দরে মোট ৯৬২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সাংহাই ও সেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ জোট। ডিএসইর শেয়ারের বিপরীতে চীনা জোটের দেয়া অর্থ ডিএসইর সদস্য ব্রোকারদের ভাগ করে দেয়া হবে। এর আগে অর্থ পরিশোধ এবং ডিএসই’র শেয়ার নিতে চীনা কনসোর্টিয়ামের ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছে।