Monday, February 2, 2015

প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকান্ড- গুরুতর বিপর্যয়ের সতর্কতা সংকেত

রাজধানীর মিরপুরে শনিবার একটি প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ অগি্নকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে ১৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ও অন্তত ১০ জনের আহত হওয়া যেমন বেদনার, তেমনই ক্ষোভসঞ্চারী। আমরা মনে করি, দাহ্য পদার্থবহুল প্লাস্টিক কারখানাটির অবস্থান জনাকীর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় না হলে এবং নিরাপত্তাবিধি মানা হলে হতাহতের সংখ্যা এত বেশি হতো না। রোববার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে যা জানা যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে কারখানাটি স্থাপনে নূ্যনতম বিধিবিধান মানা হয়নি। মিরপুর ১ নম্বর সেকশন এলাকার 'নাসিম প্লাজা' নামের পাঁচতলা ভবনটির চারতলা পর্যন্ত কারখানা এবং পঞ্চমতলায় শ্রমিকদের থাকার জায়গা। অথচ কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থান আলাদা থাকবে_ এটা যে কোনো কারখানা স্থাপনেরই প্রাথমিক শর্ত। তার চেয়েও গুরুতর অসঙ্গতি হচ্ছে, এভাবে বাণিজ্যিক এলাকায় কারখানা স্থাপন। তার ওপর দাহ্য পদার্থ নিয়ে কারবার! আমাদের মনে আছে, ২০১০ সালের জুন মাসে রাজধানীর নিমতলী এলাকায় একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের পর গোটা এলাকা ভস্মীভূত এবং অন্তত ২১৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সাধারণ অগি্নকাণ্ড এমন বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনারও প্রধান কারণ ছিল ওই এলাকায় থাকা দাহ্য পদার্থের দোকান ও গুদাম। তখন জনাকীর্ণ এলাকায় দাহ্য পদার্থ না রাখার ব্যাপারে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু আমরা যে নিমতলী ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করিনি, মিরপুরের দুর্ঘটনা তার প্রমাণ। তাজরীন ফ্যাশনস এবং রানা প্লাজা ধস থেকেও সংশ্লিষ্ট সবাই শিক্ষা নেয়নি। মন্দের ভালো বলতে হবে যে আগুন আশপাশের ভবনেও ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। কিন্তু প্রধান ফটকের মুখে পিকআপ দাঁড় করিয়ে মালামাল তোলায় অগি্নকাণ্ডের সময় অনেক শ্রমিক আটকা পড়ে। ওই 'কারখানায়' অগি্ননির্বাপক ব্যবস্থা ছিল কি-না, তা অবশ্য জানা যায়নি। আমরা মনে করি, এই অগি্নকাণ্ড আরও বড় বিপর্যয়ের সতর্কতা সংকেত। জনবহুল এলাকায় দাহ্য পদার্থের কারবার বন্ধ করা না গেলে আরও ব্যাপক মাত্রায় প্রাণ ও সম্পদহানি হতে পারে। কেবল ভবন ব্যবহার নয়, আবাসিক এলাকার জন্য নির্ধারিত বিদ্যুৎ ও গ্যাস শিল্প বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারও আধুনিক যে কোনো নগরে নিষিদ্ধ। কিন্তু আমাদের এখানে এমন অপকর্ম অহরহই হচ্ছে। আমরা দেখি, অগি্নকাণ্ড বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার পর আবাসিক, বাণিজ্যিক বা শিল্প এলাকার বিভাজন কার্যকর করার কথা উচ্চারিত হয় বটে, বাস্তবায়ন হয় না কখনও। এমনকি নিমতলী ট্র্যাজেডির পরও ওই এলাকা থেকে দাহ্য পদার্থের দোকান ও গুদাম পুরোপুরি অপসারণ সম্ভব হয়নি বলে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আমরা মনে করি, মিরপুরের এই দুর্ঘটনার পর আরও বড় বিপর্যয়ের জন্য হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা হবে আত্মঘাতী। কর্তৃপক্ষের উচিত, অবিলম্বে আবাসিক এলাকা থেকে এ ধরনের দোকান ও ব্যবসা কেন্দ্র সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা। তারও আগে উচিত হবে দুর্ঘটনাটি নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যকারিতা প্রমাণ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি গ্রহণ। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পরিবার ও স্বজন যাতে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং আহতরা চিকিৎসা পায়, তাও নিশ্চিত করতে হবে কর্তৃপক্ষকে।

ঘটনার নয় দিন পর হামলা-আক্রান্ত আদিবাসী গ্রামে গণশিক্ষামন্ত্রী

(দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হামলা-আক্রান্ত আদিবাসীদের হাবীবপুর চিড়াকুটা গ্রাম পরিদর্শন করেছেন আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাস কমিটির সদস্যরা। এলাকার সাংসদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনার নয় দিন পর ওই দলের সঙ্গে গ্রামটিতে আসেন। ছবি: প্রথম আলো) দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হামলা-আক্রান্ত আদিবাসীদের হাবীবপুর চিড়াকুটা গ্রাম পরিদর্শন করেছেন আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাস কমিটির সদস্যরা। কমিটির আহ্বায়ক সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি আজ সোমবার বিকেলে চিড়াকুটা গ্রামে যায়। গত ২৪ জানুয়ারি হাবীবপুর চিড়াকুটা গ্রামে হামলার ঘটনা ঘটে। এদিকে এলাকার সাংসদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনার নয় দিন পর ওই দলের সঙ্গে গ্রামটিতে আসেন। হামলায় বিধ্বস্ত আদিবাসীদের হাবীবপুর চিড়াকুটা গ্রামে এক সমাবেশে তিনি বলেন, জমির মালিকানা বিষয়ে আদালত থেকে ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত পার্বতীপুর উপজেলার হাবীবপুর মৌজার বিরোধপূর্ণ জমিতে আদিবাসী বা বাঙালি মুসলমান কোনো পক্ষই চাষ করতে যাবে না। জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে জমি চাষ হবে। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে গত ২৪ জানুয়ারি দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার বড়দল সরকারপাড়া গ্রামে সাঁওতাল ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে আদিবাসীদের ছোড়া তিরের আঘাতে শাফিউল ইসলাম (২০) নামের এক তরুণ নিহত হন। এ ঘটনার পর হাজারো নারী-পুরুষ আদিবাসীদের বাড়িঘরে ব্যাপকভাবে অগ্নিসংযোগ করে ও লুটপাট চালায়।
ককাসের সদস্য পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদ নাজমুল হক প্রধান, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সাংসদ মনোরঞ্জন শীল গোপাল, ককাসের টেকনোক্র্যাট কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক মেজবাহ কামাল চিড়াকুটা গ্রামে আসেন। তবে সেখানকার সমাবেশে আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাস দলের কোনো সদস্য বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান‌নি। গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান একাই ৩৫ মিনিট বক্তব্য দেন। তিনি আদিবাসী এবং মুসলমান বাঙালিসহ উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, কাগজ ও দলিলপত্রে জমির প্রকৃত মালিক আদিবাসীরা হলে অবশ্যই ওই জমি আদিবাসীদের ছেড়ে দিতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, ২৪ জানুয়ারি এখানে যে ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও দুঃখজনক। ঘটনায় উভয় পক্ষের দায়ের করা মামলা প্রসঙ্গে বলেন, ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষে ২৮ জন আদিবাসীকে আসামি করে মামলা হয়েছে। কিন্তু নিশ্চয়ই ২৮ জনের তিরের আঘাতে সে মারা যায়নি। অন্যদিকে আদিবাসীদের পক্ষে তিন হাজার ৭৪ জনকে আসামি করে যে মামলা হয়েছে, এটাও অতিরঞ্জিত। এ অবস্থায় ঘটনার সঙ্গে প্রকৃত জড়িতরা ছাড়া কোনো নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে মন্ত্রী পুলিশকে নির্দেশ দেন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে মন্ত্রী অন্য একটি মিটিংয়ে যাবেন বলে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করলে আদিবাসী নারীরা সমস্বরে তাঁদের বিধ্বস্ত বাড়িঘর সরেজমিন ঘুরে দেখার দাবি জানান। এ সময় মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, টেলিভিশন ও খবরের কাগজে বড় বড় করে খবর প্রকাশ হয়েছে। সকলে দেখেছেন। নতুন করে দেখার কিছু নেই বলে সংসদীয় ককাস দলের সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
ককাসের কেউ বক্তব্য না দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফজলে হোসেন বাদশা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসলে কিছু করার ছিল না। তবে ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলব।’ মেজবাহ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, পার্বতীপুরে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে একজন নিহত এবং আদিবাসীদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নির্যাতনের ঘটনার বিষয়ে তিনি সভার ফাঁকে অনেক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাতে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন অত্যন্ত জরুরিই শুধু নয়, অপরিহার্য। তা ছাড়া এই অঞ্চলের আদিবাসীদের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ সময় দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক আহমদ শামীম আল রাজী, পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, আদিবাসীদের উন্নয়নে কর্মরত বেসরকারি সংগঠন গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, ওয়ার্কার্স পার্টি দিনাজপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হবিবর রহমান, গণশিল্পী সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মইন উদ্দিন চিশতী, দিনাজপুর উদীচীর সহসভাপতি রেজাউর রহমানসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

পর্দার আড়ালে নানামুখী তৎপরতা by আলী রাবাত

চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে পর্দার আড়ালে নানামুখী তৎপরতা চলছে। হার্ডলাইন তো আছেই। খালেদাও তার অবস্থানে অনড়। একচুলও নড়বেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান তো সবার জানা। তিনি এটাকে রাজনৈতিক সঙ্কট মানতেই নারাজ। তার পরামর্শকরা ক্রমাগতভাবে বলে চলেছেন ডান্ডা মেরে সব ঠান্ডা করা সম্ভব। আর ক’টা দিন সবুর করেন। বিএনপি-জামায়াত ক্লান্ত হয়ে পড়বে। রাজপথে ওদের কোন লোকই থাকবে না। পেট্রলবোমা মারার লোকও হারিকেন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না। জনবোমার কথা অবশ্য তারা বলছেন না। তাদের কথায়, জনগণ নীরব দর্শক হয়ে চুপচাপ বসে থাকবে। জনগণ বাড়িতে বসে কি ভাবছে এটা তাদের কাছে পৌঁছবে না। একদল আছেন তারা সারাক্ষণই বলছেন নেত্রী সব ঠিক, উদারতা দেখিয়ে আপনি তো খালেদার কার্যালয় পর্যন্ত গিয়েছিলেন অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে। কি লাভ হলো। ওরা তো আপনাকে কোন সম্মানই দেয়নি। জনমনে প্রতিক্রিয়া ছিল সাময়িক। যারা আপনাকে সেখানে যেতে বলেছিল তাদের উদ্দেশ্য কি তা ভেবে দেখতে হবে। এক পর্যায়ে এই গ্রুপ সামনে চলে আসে। তারা কোকোর দাফন বনানীর সামরিক গোরস্তানে না করার পরামর্শ দেয়। যথারীতি তাদের কথামত সিদ্ধান্ত হয়। এতে কি হলো? প্রধানমন্ত্রী খালেদাকে দেখতে গিয়ে যেটুকু উদারতা দেখিয়েছিলেন তা নিমিষেই হারিয়ে গেল। তখন জনমনে প্রশ্ন উঠলো, এটা কি তাহলে লোক দেখানো ছিল? এরপর কি ঘটলো। খালেদার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলো। যেখান থেকে খালেদা এখন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হলো দেশ-বিদেশে। এক পর্যায়ে চাপের কারণে ১৯ ঘণ্টা পরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হলো। লাভের মধ্যে লাভ এটাই হলো, বাংলাদেশে একটা খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো হাসিনার সরকার। এখনও খালেদার কার্যালয়ে ডিশ নেই। ইন্টারনেট নেই। মোবাইল কানেকশনও নেই। টিঅ্যান্ডটি সংযোগও নীরব। হার্ডলাইনাররা খালেদাকে গ্রেপ্তারের যুক্তি দিয়ে চলেছেন। তারা বলছেন, তাকে গ্রেপ্তার করা হলে সব নীরব হয়ে যাবে। মানুষ রাজপথে নেমে যাবে। সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে নিমিষেই। শনিবার বসলো এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। যেখানে হাজির উচ্চ পর্যায়ের সব প্রশাসনিক কর্মকর্তা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষে বল প্রয়োগের মাধ্যমে সঙ্কটের সমাধান খোঁজার পক্ষে সবাই একমত হলেন। কিন্তু যারা ভিন্নমত পোষণ করেছেন তারা একমত হলেন না। তারা বলতে থাকলেন সঙ্কট যেহেতু রাজনৈতিক তাই সমাধানও রাজনৈতিকভাবে খুঁজতে হবে। এদের ভয়েস অবশ্য দুর্বল। ভয়ে ভয়ে তারা আওয়াজ তুলেছেন। এর মধ্যেই পাশের বাড়ি থেকে পরামর্শ এসেছে। যে করেই হোক খালেদার সঙ্গে এনগেজমেন্টে যেতে। খবরটা আচমকা মনে হলেও ঠিক তা নয়। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসেই জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ অস্থিতিশীল থাকুক তার সরকার তা চায় না। আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান দিল্লিতে। বোঝানোর চেষ্টা করেন বাংলাদেশ পরিস্থিতি। যতটুকু জানা যায়, প্রণব জানিয়ে দেন তার কিছুই করার নেই। মোদি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তারা চায় বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের পক্ষে তারা। এ খবরে সরকারের ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। দিল্লি ছুটে যান দু’জন উপদেষ্টা। ফলাফল একই। এর মধ্যে বারাক ওবামার সফর সবকিছু পাল্টে দেয়। সুজাতা সিং চাকরি হারান। যিনি রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনাকে রীতিমতো অপমান করেছিলেন দিল্লিতে। মজিনা তাকে বোঝাতে গিয়েছিলেন সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হলে বাংলাদেশে স্থিতি আসবে না। এই যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে সুজাতা তাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কেন বাংলাদেশ নিয়ে নাক গলাচ্ছে। মজিনা হতাশ হয়েই ঢাকা ফিরেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে জানিয়ে দেন ভারতের মনোভাব। কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের ব্যাপারে একচোখা নীতি গ্রহণ করেছিল। আওয়ামী লীগ সরকারও ছিল কংগ্রেসের ব্যাপারে অন্ধ। বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারে এটাও তাদের ভাবনার মধ্যে ছিল না। নির্বাচনের সময় কংগ্রেসের প্রতি এমনভাবে হাত বাড়িয়ে দেয় যা শুনে মোদি রীতিমতো তাজ্জব হয়ে যান। থাক গে, ওসব অতীত। সুজাতাকে বরখাস্ত করে জয়শঙ্করকে পররাষ্ট্র সচিব নিযুক্তির পরে বাংলাদেশ অনেকটাই ভেঙে পড়ে। তাকে অভিনন্দন জানাতে কূটনৈতিক রীতিও অনুসরণ করেনি। পর্দার আড়ালে আসলে কি হচ্ছে? সংলাপ না আলোচনা? নানা কথাই শোনা যাচ্ছে। অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করবেন না এক ধরনের যোগাযোগ চলছে দুইদিকে। কিভাবে সেটা। অনেকেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া, মোসাদ্দেক আলী ফালুর গ্রেপ্তারের মধ্যে মিল খুঁজে পাচ্ছেন। তারা বলছেন, ফালু জেনেশুনে খালেদার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন কেন? তিনি কি জানেন না ওখানে গেলেই শ্রীঘরে যেতে হয়। অনেকটা নাটকীয়ভাবে মির্জা ফখরুলকে কাশিমপুর থেকে ডিবি অফিসে আনা হলো কেন? রাজনৈতিক যোগাযোগ আগেও এভাবে হয়েছে। প্রস্তাবটা কি? দুই পক্ষের মুখরক্ষা করে সমাধানের সূত্রইবা কি? জরুরি অবস্থা জারি করে আলোচনা। এতেও ভরসা নেই শাসককুলের। তারা জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে নন। তারা মনে করেন, এতে খেলাটা তাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই সম্ভবত দশ দিন আগে জরুরি শাসনের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা বাতিল করে দেয়া হয়। প্রকাশ্য আলোচনার প্রস্তাবেও ঝুঁকি রয়েছে। মানুষ রাজপথে নেমে যাবে। কোকোর জানাজার সময় গুলি হবে না- এমনটা আঁচ করে লাখো লোক জমায়েত হয়েছিল। এটাও পর্যালোচনা করে দেখা হয়েছে। জবাব মিলেছে নেতিবাচক। বরং এমন গোয়েন্দা রিপোর্টের সমালোচনা হচ্ছে শাসক দলের বিভিন্ন কোরামে। বিএনপি অগোছালো, জামায়াত ম্যানেজ হয়ে আছে এমন রিপোর্টই তারা দিয়েছিলেন। যার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ নেতারা প্রায়শই বলতেন, বিএনপির আন্দোলন করার মুরোদ নেই। খালেদার জনসভাগুলোতে জনসমাগম দেখে অন্য চিন্তা আসে সরকারের ভেতর। গাজীপুরের জনসভা বাতিল করার সিদ্ধান্ত এসেছিল গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে, ছাত্রলীগের বাড়াবাড়িতে। ক্রমশ বলাবলি হচ্ছে, জনসভা করতে দিলে এতটা হতো না। ৪ঠা জানুয়ারি সরকারইবা কেন অবরোধ করতে গেল। খালেদাকে ৫ জানুয়ারি জনসভা করতে দিলে তিনি কি করতেন? বসে যেতেন লোকজন নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা বলেন, এমন কোন পরিকল্পনাই ছিল না তাদের। তাহলে প্রধানমন্ত্রী কিসের ওপর ভিত্তি করে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন? তাহলে কি বলা যায়, খালেদা ক্ষমতায় থাকাকালে শেষদিকে যে পথে হেঁটেছিলেন সে পথেই তিনি হাঁটতে শুরু করেছেন?

দগ্ধদের সেবক মণি খালার গল্প... by মানসুরা হোসাইন

(দুর্ঘটনায় পুড়ে গিয়েছিল মণি বিবির মুখ-হাত। পোড়ার যন্ত্রণা তাই ভালো করেই বুঝেন তিনি। সেই উপলব্ধি থেকে এখন কাজ করছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে, বিনা বেতনে। ছবি: মনিরুল আলম) ‘পুড়ার যন্ত্রণা আছে বইন। বহুত যন্ত্রণা। আমার মুখ আর হাত পুড়ছে, তাই যে যন্ত্রণা! আর যাগোর সারা শরীল পুড়ছে, তাগোর যে কী যন্ত্রণা তা আমি বুঝি। তাই ড্রেসিং করার সময় রোগীরে ব্যথা দিই না। বাবারে, সোনারে কইয়া ডাকি। আমি যে রোগীর ড্রেসিং করি, সেই রোগী চিক্কুর দেয় না।’ কথাগুলো বলছিলেন মণি বিবি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে সবার কাছে তিনি মণি খালা হিসেবেই পরিচিত। তাঁর সঙ্গে বার্ন ইউনিটের সম্পর্ক ২০০৩ সাল থেকে, বলতে গেলে বার্ন ইউনিটের জন্ম থেকেই। আগুনে পুড়ে মণি বিবির মুখ, বুক, দুই হাত দগ্ধ হয়। তখন তিনি এখানে এসেছিলেন রোগী হিসেবে। এখন তিনি অন্য রোগীদের ড্রেসিং করানো, নাশতা এনে দেওয়া, অক্সিজেন সিলিন্ডার এগিয়ে দেওয়া, রোগীর ট্রলি ঠেলে নেওয়াসহ বহু কাজ করেন। অনেক সময় রোগী মারা গেলে তাঁর গোসলও করান তিনি। বলতে গেলে তাঁর দিন-রাত কাটে এখানেই। দগ্ধ হয়ে মণি বিবির নাক ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে। মুখ বেঁকে গেছে। দুই হাত বেশ খানিকটা কুঁকড়ে গেছে। দুই চোখে আবার দেখতে পাবেন, তা চিন্তাও করতে পারেননি। সেই তাঁর এখন দম ফেলার ফুসরত নেই। তিনিসহ মোট ৭৫ জন বার্ন ইউনিটে কাজ করছেন বিনা বেতনে। মাঝখানে দুই বছর কিছু বেতন পেয়েছিলেন, তবে এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। আজ সোমবার সকালে বার্ন ইউনিটে গিয়ে মণি বিবির খোঁজ করতেই খোঁজ মিলল ড্রেসিং রুমে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ-হরতালের সময় নাশকতায় দগ্ধ রোগীদের ড্রেসিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। জানালেন, রাতে নাইট ডিউটি করে দুপুর হয়ে গেলেও সকালের নাশতা খাওয়ার সময় পাননি। এ ছাড়া দগ্ধ রোগীদের ড্রেসিং করার পর খেতেও পারেন না সেভাবে। একেবারে বাসায় ফিরে ভাত খান। মণি বিবি ওয়ার্ডে রোগীর স্বজনদের ভিড় দেখেই গজগজ শুরু করলেন, ‘এখানে এত ভিড় কিসের? বের হন, বের হন। এই রোগীর ইনফেকশন হইব না তো কার হইব?’ একজন নার্স অক্সিজেন সিলিন্ডার আনতে বললেন। শুনেই তিনি ছুটলেন। মণি বিবি বললেন, ১২ বা ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয় তাঁর। এখন বয়স কত তা তাঁর জানা নেই। তিনি কীভাবে পুড়েছিলেন, সে ইতিহাসের ভেতর ঢুকে গেলেন। বললেন, ‘তখন মাইয়্যা মাত্র বওয়া (বসা) শুরু করছে। জামাই মারছিল। তাই রাগ কইরা কয়দিন ভাত খাই নাই। ধান সিদ্ধ কইরা বড় পাতিল কেবল নামাইছি। মাথাডা ঘুইরা গেল। গিয়া পড়লাম চুলার মধ্যে। স্বামীই এই মেডিকেল ভর্তি করাইল। জামাই আমারে ফালাইয়া গেছে গা। পরে ভাইরা চিকিৎসা করায়।’
মণি বিবির স্বামী আর তাঁকে ঘরে নেননি। স্বামী আবার বিয়ে করেছিলেন। তবে দুই ছেলে ও এক মেয়ের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর ঘাড়েই। দুই ছেলে এখন দরজির কাজ করে। মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। মেয়ের ঘরে পাঁচ বছরের নাতিও আছে। রাজধানীর হোসনি দালানের কাছে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে মণি বিবি তাঁর দুই ছেলে নিয়ে থাকেন। তাঁর ভাষায়, ‘আল্লাহর ৩০ দিনই কাটে বার্ন ইউনিটে। ঈদের দিনও।’ রোগীর স্বজনেরা খুশি হয়ে যা দেন, তাই দিয়ে চালাতে হয় সংসার। তাঁর বাড়ি শরীয়তপুরে। জানালেন, কারও কাছে হাত পেতে কিছু চান না, লজ্জা লাগে। আর হরতাল-অবরোধে নাশকতার শিকার রোগীদের কাছে তো কিছু চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। হরতাল-অবরোধের কারণ কী? জানতে চাইলে মণি বিবির কণ্ঠে ক্ষোভ জমে। তিনি বলেন, ‘দুই জনের পাল্লাপাল্লিতে দেশের লাখ লাখ মানুষ মরতাছে। দেশটারে কানা কইরা দিতাছে। দুইজনরে কই, আপনেরা হ্যান্ডশেক কইরা একসঙ্গে বন (বসেন)।’ হরতাল-অবরোধের কারণে মণি বিবির মনে অজানা আশঙ্কা কাজ করে। দুই ছেলে কাজের জন্য ঘর থেকে বের হয়। সেদিনই ছেলে যে জায়গায় কাজ করে সেখান থেকে একজন দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়। তিনি বলেন, ‘ছেলেরে ফোন দিয়া কাছে আনছি। তারপর শান্তি। মা বাইচ্যা থাকতে যদি পুলা মইরা যায়, তার মতোন কষ্ট আর কী আছে। কতজনের পুলা, ভাই মরতাছে। একজন কইরা ভর্তি হয় আর চাইয়্যা দেহি। মনে হয়, এর চেহারাও তো আমার ভাই বা পুলার মতন।’
বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক, নার্সদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন মণি বিবি। বিশেষ করে বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সামন্ত লাল সেনের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। মণি বিবি বলেন, ‘সেন স্যাররাই তো আমার চিকিৎসা করছে। একটা টাকাও লাগে নাই অপারেশন করাইতে। তারপর এখনো অনেক আদর করে।’ বার্ন ইউনিটের যে রোগীরা ভালো হয়ে বাড়ি ফিরে যান, তারাও হাসপাতালে ফলোআপে এলে একবার হলেও তাঁর সঙ্গে দেখা করে যান। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক উপদেষ্টা সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মণি বিবিসহ অন্যরা বিনা বেতনে কাজ করছেন। সবার মধ্যে মণির ঘটনাটা একটু অন্য রকম। তাঁর জন্য কিছু করা যায় কি না, তার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’

আমাদের দেশ কি শান্তির জনপদ হবে by রুহুল খান

নটিংহাম শহরের একটি পার্ক
নটিংহামের এক মহাসড়ক
আমার জীবনের তিনটি বছর কাটিয়েছি ইউরোপে। সময়টা ছিল ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। সে সময়টা ইউরোপ ছিল এক শান্তির জনপদ। শান্তির সে সময়টা যে কীভাবে চলে গিয়েছিল বুঝতেই পারিনি । সুখের দিনগুলো মনে হয়, একটু তাড়াতাড়িই চলে যায়। মনে পড়ছে খুবই সাধারণ একটা ঘটনা। তখন আমি নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রবিনহুডের শহর নটিংহাম থেকে বেড়াতে বেরিয়েছিলাম মহাবিজ্ঞানী নিউটনের শহর লিংকনশায়ারে। নিউটন জন্মেছিলেন ২৫ ডিসেম্বর ১৬৪২ সালে ইংল্যান্ডের লিংকনশায়ারের ওলসথোর্প গ্রামে। যদিও তিনি ঘুমিয়ে আছেন লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে৷ তিনি বিশ্বের মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত এক মহাবিজ্ঞানী হিসেবে। নটিংহাম থেকে বাসে করে যাচ্ছিলাম লিংকনশায়ার। সড়কপথে নটিংহাম থেকে লিংকনশায়ারের দূরত্ব ৫২ কিলোমিটার। সামারের দিনগুলোতে ইংল্যান্ড দেখতে অসম্ভব সুন্দর৷ চারিদিকে সবুজের সমারোহ। গাছে গাছে সবুজ পাতা, হালকা বাতাস। সত্যিই ইংল্যান্ডের সামার এক অসাধারণ। বাস ছুটে চলেছে নিউটনের শহরে। রাস্তার দুধারে সবুজ ভুট্টাখেত, পাশেই ছোট নদী, মানুষজন তেমন দেখা যায় না। হাঁসগুলো আপন মনে ভেসে চলেছে ছোট নদীতে। পাখিগুলো উড়ছে আকাশে। তখন মন চাইত, এই পৃথিবীর কোলাহল ছেড়ে যদি ছোট এই জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতাম ইংল্যান্ডের কোনো একটি গ্রামে, হোক সেটা বিংহাম বা ফ্লিন্টহাম। পথিমধ্যে বাস থামল গ্রামের ছোট একটা স্টেশনে। সেখান থেকে উঠলেন একজন বয়স্ক লোক, আনুমানিক ৭০ থেকে ৭৫ বছর হবে। হাতে একটা বড় ব্যাগ। চালক বাস ছাড়লেন। বয়স্ক লোকটা আমার পাশের ফাঁকা আসনে বসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে গেলেন। দেখলাম, একদিকে পড়ে আছে তাঁর ব্যাগ আর অন্য দিকে অসহায়ভাবে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছেন তিনি । কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে গেলেন না। চালক বাস থামিয়ে দিলেন। মনে মনে ভাবলাম, এটা হতে পারে না। এটা তো আমাদের আদর্শ না। আমি এক মুহূর্ত চিন্তাভাবনা না করে বুড়ো মানুষটাকে কোলে তুলে নিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর ইউ অলরাইট?’ বুড়ো মানুষটা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বিড়বিড় করে বললেন, ‘আই অ্যাম ওকে।’ দেখলাম, নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে বুড়ো লোকটার আর কাঁপছে শরীরটা, তেমন কথা বলতে পারছিলেন না। আমি খেয়াল করলাম, পুরো বাসের সব যাত্রী আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভাবটা এমন যে, আমি বিরাট একটা অন্যায় করে ফেলেছি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে এল প্যারামেডিকের গাড়ি আর অ্যাম্বুলেন্স। নামলেন দুজন লোক। ধরাধরি করে বুড়ো লোকটাকে টেনে ওঠালেন অ্যাম্বুলেন্সে। আমি তাকিয়ে ছিলাম অসহায় বুড়ো মানুষটার দিকে। তার দুই চোখ বন্ধ। বুঝতে পারছিলাম না, লোকটা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। এদিকে আমার ভয় লাগছে, আমি না আবার আসামি হয়ে যাই! আমিতো ইংল্যান্ডের নিয়মকানুন তেমন জানি না। যা করেছি, তা আমার বিবেকের তাড়নায় করেছি। আমি যে দেশের মানুষ, সে দেশের মানুষ অন্যের বিপদে এগিয়ে যায় কোনো কিছু চিন্তা না করেই। অনেক সময় নিজের বিপদের কথা জেনেও অন্যের সাহায্যে এগিয়ে যায়। এমন সময় দেখলাম, রক্তাক্ত বয়স্ক লোকটি হাত দিয়ে আমাকে ডাকছেন, আমি অবাক হলাম, খুশিও হলাম যে মানুষটা বেঁচে আছে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি এগিয়ে গেলাম, লোকটা আমাকে বিড়বিড় করে বললেন, ‘তোমার দেশ কোথায়?’ আমি জানালাম বাংলাদেশ। তিনি আমাকে বললেন, ‘যে দেশের মানুষ অন্যের বিপদে এগিয়ে যায়, সে দেশটা নিশ্চয় এক শান্তির জনপদ, যদিও সেই দেশটা দেখার সৌভাগ্য হলো না এই জীবনে।’ আমি বিশ্বাস করি, অবশ্যই বাংলাদেশ এক শান্তির জনপদ, অশান্তির কালো মেঘ বাংলাদেশের আকাশে বেশি দিন থাকতে পারবে না ।
(রুহুল খান, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, ভ্যানকুভার, কানাডা)

প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন না মিট রমনি হিলারি ক্লিনটনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল

যুক্তরাষ্ট্রের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেবেন না রিপাবলিকান দল থেকে এর আগে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থী মিট রমনি। ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি হেরে যান বারাক ওবামার কাছে। সে দেশে আগামী বছরের শেষের দিকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। তার অনেক আগে থেকেই জল্পনা শুরু হয়ে গেছে কে হচ্ছেন প্রধান দুই দল ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান দলের প্রার্থী। এরই মধ্যে মিট রমনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণা দিলেন। এতে তার দলের অন্য সম্ভাব্য প্রার্থী জেব বুশের প্রার্থিতার সম্ভাবনা বেড়ে গেল। উল্লেখ্য, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেব বুশের পিতা জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ, বড় ভাই জর্জ ডব্লিউ বুশ। পিতা এইচ ডব্লিউ বুশ ও ছেলে জর্জ ডব্লিউ বুশ ক্ষমতায় থাকাকালে দুজনেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু করেছেন। এবার সেই পরিবারের ছোট ছেলে জেব বুশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে জোর আলোচনা চলছে। মিট রমনি ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে রিপাবলিকান দলের চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাইয়ের সময় হেরে গিয়েছিলেন জন ম্যাককেইনের কাছে। প্রভাবশালী এ ব্যবসায়ী এবারও রিপাবলিকান দলের সম্ভ্যাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় ওপরের দিকে ছিলেন। কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন পুনরায় নির্বাচনে লড়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তবে সব গুঞ্জন থামিয়ে দিয়ে নিজেই জানিয়ে দিলেন আগামী নির্বাচনে প্রার্থিতার জন্য লড়বেন না। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ৬৭ বছর বয়সী মিট রমনি বলেছেন, পরবর্তী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য দলের অন্য নেতাদের সুযোগ দেয়াটাই ভাল হবে বলে মনে করেন তিনি। তার সিদ্ধান্তের ফলে অন্য রিপাবলিকানদের সহায়তা করতে পারবেন দলের সমর্থক ও দাতারা। রিপাবলিকান দলের অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন জেব বুশ, নিউ জার্সির গভর্নর ক্রিস ক্রিস্টি, সিনেটর র‌্যান্ড পল। অপরদিকে ডেমোক্রেটিক দলে একেবারে প্রথম সারিতে রয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। তবে নিজের প্রচারণার বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা তিনি দেননি। এর আগে ডেমোক্রেটিক দলের চূড়ান্ত প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে তিনি লড়েছিলেন। তবে সেবার বারাক ওবামার কাছে হেরে যান তিনি। যদিও বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তার সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন হিলারি। অবশ্য ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদ থেকে তিনি নিজেই সরে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০১৬ সালের সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের তালিকায় সবচেয়ে ভাল অবস্থায় রয়েছেন জেব বুশ। তবে তার জন্য বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াতে পারেন নিউ জার্সির গভর্নর ক্রিস ক্রিস্টি। আরেকজন রয়েছেন টি-পার্টি সমর্থিত ও টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ। তিনি কিছুটা কট্টরপন্থি বলে পরিচিত। উদারপন্থিদের তালিকায় রয়েছেন এলিজাবেথ ওয়ারেন, যার প্রশংসা অনেক ডেমোক্রেটরাও করেছেন। আরেক উদারপন্থি র‌্যান্ড পলের সমর্থক যেমন আছে রিপাবলিকান দলে, তেমনি শত্রুরও অভাব নেই। অপরদিকে ডেমোক্রেট মাঠ বলতে গেলে একাই দখল করে আছেন হিলারি ক্লিনটন। ২০০৮ সালের ব্যর্থ নির্বাচনী লড়াইয়ে অনেক কিছুই তিনি শিখেছেন। ২০১২ সালের নির্বাচনে মিট রমনি ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অঙ্কের তহবিল গঠনে সক্ষম হয়েছিলেন। তবুও তিনি হেরে গিয়েছিলেন ওবামার কাছে। তার দাতাদের সঙ্গে ফোনালাপের পর দেয়া এক বিবৃতিতে রমনি বলেছেন, তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তিনি হয়তো প্রার্থিতা পেতে পারেন দলের। কিন্তু দলের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো ডেমোক্রেট প্রার্থীকে পরাজিত করতে বেশি সামর্থ্য বহন করে। তিনি বলেন, তার এবং তার স্ত্রী অ্যানের জন্য এ সিদ্ধান্ত বেশ কঠিন ছিল। তবে তার ভাষায়, তিনি বিশ্বাস করেন এটাই তার দল ও জাতির জন্য সেরা সিদ্ধান্ত। মিট রমনিকে দেখতে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের মতোই মনে হয়েছে সবসময়। কিন্তু নির্বাচনে জিততে গিয়েই সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। ২০০৮ সালে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন লাভে। কেন না তিনি ছিলেন একজন উদারপন্থি রিপাবলিকান, যিনি উদারপন্থি রাজ্য বলে পরিচিত ম্যাসাচুসেটসের গভর্নর ছিলেন। ২০১২ সালে তিনি মনোনয়ন পান। কিন্তু বারাক ওবামাকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হন। তার ধনকুবের ইমেজই হয়তো তার সবচেয়ে নির্বাচন জয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একই সঙ্গে নির্বাচনের ঠিক আগে আগে একটি ভিডিও ফাঁস হয়ে যায়, যেটি তার মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। সেখানে তাকে সরকারের ওপর নির্ভরশীল ৪৭ শতাংশ ভোটারদের উদ্দেশ্য করে অপমানজনক মন্তব্য করতে দেখা যায়। মজার বিষয় হচ্ছে, তিনি নির্বাচনে পেয়েছিলেন ৪৭% ভোট! অপরদিকে বারাক ওবামা পেয়েছিলেন ৫১%। আসন্ন নির্বাচনে ধারণা করা হচ্ছে আয় বৈষম্যের শিকার মধ্যবিত্তরাই পার্থক্য গড়ে দেবে। তাই এ নির্বাচনে নিজের ইমেজ নতুন করে ফুটিয়ে তোলাটা তার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। এদিকে বার্তা সংস্থা এপির খবর অনুযায়ী, মিট রমনি মূলত সম্ভাব্য নির্বাচনী লড়াই থেকে নিজের ছিটকে পড়াটা আবিষ্কার করেন তিন সপ্তাহ আগে। কেননা, তার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ তহবিল সংগ্রহকারী জেব বুশকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত  নেন। জেব বুশ গত ডিসেম্বরে নিজের প্রার্থিতার বিষয়ে ইঙ্গিত দেন। তার বাবা ও বড় ভাইও ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মধ্যপন্থি বলে বিবেচিত জেব বুশের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা তার বড় ভাই জর্জ ডব্লিউ বুশের ভাবমূর্তি। নির্বাচনে না লড়ার ব্যাপারে মিট রমনির ঘোষণার পর এক টুইট বার্তায় জেব বুশ লিখেছেন, মিট রমনি একজন দেশপ্রেমিক। অন্য অনেকের মতো আমিও আশা করছি দেশ ও আমাদের দলকে তার সেবা করাটার ইতি ঘটবে না।

দৃষ্টিহীনদের পর্বতারোহণ

বরফ আচ্ছাদিত দুর্গম পাহাড়ে নির্বিঘ্নে উঠে যাচ্ছে দৃষ্টিহীনরা। চক্ষুষ্মানদের কাছেও যা কল্পনাতীত, তাই করে দেখাচ্ছে কলকাতার এসব স্কুল শিক্ষার্থী। পর্বতারোহণে অভ্যস্ত করাতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয় ভারতের ভয়েস অব দ্য ওয়ার্ল্ড স্কুলটি। স্কুলটির অধ্যক্ষ সুকুমার চক্রবর্তী যিনি নিজেও দৃষ্টিহীন। তিনি বলেন, অনেক দুর্গম পাহাড়ে চড়েছে তার স্কুলের ছেলে-মেয়েরা। যার মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার ফুট উচ্চতার ইউনাম শিখরও। সেটাই ছিল ভারতে প্রথম দৃষ্টিহীনদের শিখরে চড়ার অভিযান। দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ চলে সল্টলেক স্টেডিয়ামের কৃত্রিম পাহাড়ে। কখনোবা পুরুলিয়াতে কখনও আবার দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে। এবারের অভিযাত্রী দলে রয়েছেন জয়ন্ত সিং সর্দার।
দৃষ্টিহীন এ ছেলেটি এবারই প্রথম পর্বতারোহী হিসেবে। শিক্ষকরা আগেই বলে দিয়েছেন, কী কী জিনিস সঙ্গে রাখতে হবে। সেসব গোছানোর মধ্যে একটু ভয়ও রয়েছে জয়ন্ত সিংয়ের। ওই স্কুলের সাবেক ছাত্র সোমনাথ পানি বলে, ‘আমাদের সঙ্গে একজন এসকর্ট বা পথপ্রদর্শক থাকেন। তিনি সব সময় বলতে থাকেন কোথায় উঁচু, কোথায় নিচু, কোথায় চড়াই বা কোথায় পা পড়লে বিপদ হতে পারে। তার কথা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলতে হয় আমাদের।’ পথপ্রদর্শকদের চোখ দিয়ে কীভাবে নতুন জায়গাগুলো চেনে- এ প্রশ্নের জবাবে আরেক ছাত্র বিল্বমঙ্গল সর্দার বলে, ‘পাহাড়ে চড়ার সময় পাথরে হাত দিয়ে চিনে নিই আমরা। নদী বা ঝরনার পানির শব্দ তো শুনেই নিতে পারি। সুযোগ থাকলে গাছের গায়ে বা পাতাতেও হাত দিয়ে চিনিয়ে দেন এসকর্টরা আর কোনো অচেনা পাখি ডেকে উঠলে তারাই বলে দেন ওটা কি পাখি।’ বিবিসি।

সাক্ষাৎকার: জনগণ আম আদমি পার্টিকে জয়ী দেখতে চায় -অরবিন্দ কেজরিওয়াল

প্রশ্ন :গত বছরের নির্বাচনের সঙ্গে এবারের নির্বাচনের পার্থক্য কী?
উত্তর :গতবার আমাদের দল নতুন ছিল। আম আদমি পার্টি কী তা জনগণের বোধের মধ্যে আনা প্রয়োজন ছিল। তখন জনগণকে সচেতন করা ও আমরা যে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে সক্ষম তা বোঝানোরও প্রয়োজন ছিল। এখন মানুষ জানে আমরাও রাজনীতির হিসাবের মধ্যে এসে গেছি।
প্রশ্ন : আপনাদের অবস্থা কেমন?
উত্তর :বিভিন্ন জরিপের ফলে দেখা গেছে, আমাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা রয়েছে এবং আমরা অন্যান্য দল থেকে এগিয়ে রয়েছি। দিলি্লতে দলের (এএপি) ৪৯ দিনের সরকার পরিচালনার সময় আমাদের পারফরম্যান্সকে মানুষ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। আমাদের তখনকার সরকার সম্পর্কে বিরূপ সমালোচনা করে দেওয়া বিজ্ঞাপন বারবার প্রচার করা নিয়ে সাধারণ মানুষ অস্বস্তি অনুভব করছে। মানুষ এখন সেসবকে পেছনে ফেলে দিয়ে আমরা যাতে আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হই তাই চাইছে।
গেলবার কেউ বিশ্বাস করেনি, দিলি্লর বিধানসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির পক্ষে একটা জনস্রোত সৃষ্টি হয়েছে এবং সবাই আমাদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিততে পারি বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। শেষ পর্যন্ত ওই নির্বাচনে আমরা দিলি্ল বিধানসভার মোট ৭০টি আসনের মধ্যে ২৮টি আসন লাভ করতে সক্ষম হই। এবারের নির্বাচনে ইত্যবসরে আম আদমি পার্টির পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং এবার আমাদের ভোটার জনগণ ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনবেই।
প্রশ্ন :বিজেপি যখন তাদের দিলি্লর ভাবি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জনপ্রিয় কিরণ বেদিকে উপস্থাপন করছে, তখন আপনারা তার প্রভাবকে কীভাবে মোকাবেলা করবেন?
উত্তর :এটা হলো তাদের সর্বশেষ প্রচেষ্টা, যেটা ইতিমধ্যে বুমেরাং হয়েছে।
প্রশ্ন :আপনি আম আদমি পার্টির এক সময়কার নেত্রী সাজিয়া লিমিসহ আরও যারা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন বা দিচ্ছেন সে ব্যাপারে কী বলবেন?
উত্তর :কিছু লোক আমাদের দলত্যাগ করে অন্য দলে চলে যাওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। তবে নতুন করে নির্বাচনের আগে দিলি্লর ৩০ হাজার মানুষ আম আদমি পার্টিতে যোগ দিয়েছে, যেটাকে আমি সুখবর হিসেবে অভিহিত করতে পারি। আমাদের দলের সংগঠন আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং আমাদের দলের সমাবেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিজেপির সমাবেশগুলোতে এমনকি বড় নেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সমাবেশগুলোতেও আমাদের সমাবেশগুলোর কাছাকাছি সংখ্যক মানুষকেও উপস্থিত হতে দেখা যাচ্ছে না।
প্রশ্ন :প্রার্থিতা নিয়ে দলের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ রয়েছে!
উত্তর :এসবই হলো পরিকল্পিত কাহিনী। আমরা প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যাবতীয় প্রক্রিয়া যথাযথ অনুসরণ করেছি। প্রার্থিতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে চরিত্র, অপরাধ ও দুর্নীতি বিষয়ে কোনো আপস করা হয়নি।
প্রশ্ন :আসন্ন নির্বাচনে আপনার দল যদি জয়লাভ করে তাহলে দিলি্লবাসীকে আপনারা কী উপহার দেবেন?
উত্তর :আমরা দিলি্লর জনগণকে ঘুষ ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি থেকে মুক্ত করব। আমাদের একটা যোগ্য টিম রয়েছে, যারা দিলি্ল সংলাপের মাধ্যমে ভালো পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। নারীদের নিরাপত্তা এবং জলবিদ্যুৎ, অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা হলো আমাদের অগ্রাধিকারের বিষয়।
প্রশ্ন :বিজেপি এবার কোনো মেনিফেস্টো দিচ্ছে না নির্বাচনের সময়...
উত্তর :কারণ তাদের কোনো কর্মসূচিই নেই।
প্রশ্ন : লোকপাল, দুর্নীতি ও কালো টাকার মতো আপনার ইস্যুগুলো বিজেপি হাইজ্যাক করেছে...
উত্তর :এসব বিষয়ে কেবল কথা বলা বা লেখাই যথেষ্ট নয়। তারা এসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। বিজেপি বলেছে, তারা মূল্যস্ফীতি হ্রাস করবে কিন্তু এ ব্যাপারে ভোটে জেতার মতো কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। তারা বিদ্যুৎ চার্জ ৩০ শতাংশ হ্রাস করবে বলেছে। পক্ষান্তরে তারা দু'বারে বিদ্যুৎ চার্জ ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। এখন মানুষ বলা শুরু করেছে যে, বিজেপি জাতীয় নির্বাচনের আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; কিন্তু নির্বাচনে জয়লাভ করার পর তারা এর কিছুই বাস্তবায়ন করেনি বরং এর উল্টোটাই করছে। এখন বিজেপির ওপর মানুষের আস্থা নেই এবং আম আদমি পার্টির ব্যাপারে তারা আস্থাবান। কারণ তারা জানে যে, এই দল যা প্রতিশ্রুতি দেয় তা বাস্তস্নবায়ন করে।
প্রশ্ন :লোকসভা নির্বাচনের পর বিজেপি যে ক'টা রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন হয়েছে তার সবক'টাতেই বিজয়ী হয়েছে ...
উত্তর :জাতীয় নির্বাচনে তারা দিলি্লতেও বিজয়ী হয়েছে। এখন তাদের ২০০ সংসদ সদস্য দিলি্লতে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। সব মন্ত্রী তাদের মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম বাদ দিয়ে দিলি্লর নির্বাচনের জন্য কাজ করছেন। তাদের জনসভাগুলোতে এখনও লোকসমাগম তেমন হচ্ছে না।
প্রশ্ন :দিলি্লতে আম আদমি পার্টির সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে সে সরকারকে কি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারকে সহযোগিতা করবে?
উত্তর :এর আগে দিলি্লতে কংগ্রেস সরকার ছিল এবং কেন্দ্রীয় সরকারে ছিল ইউপিএ। ওই উভয় সরকারই দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল। কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের বা জোটের সরকার হওয়া কখনোই উচিত নয়। এখানে প্রতিযোগিতা থাকা উচিত। কোনো দলকেই রাজ্যে ও কেন্দ্রে একই সঙ্গে নির্বাচিত করা উচিত নয়, এটা এখন মানুষও বলাবলি করছে। এটা বাস্তবিক পক্ষে গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
প্রশ্ন : বিজেপি নেতারা আপনাকে নৈরাজ্যবাদী বলছে।
উত্তর :তাদের বলার আর কিছুই নেই। তাদের কোনো কর্মসূচি নেই। আমরা নির্বাচিত হলে দিলি্লতে নতুন স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। তারা বলছে, কেজরিওয়াল একজন নৈরাজ্যবাদী, আমরা দিলি্লকে সিসিটিভি ক্যামেরার চাদরে মুড়িয়ে দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। তারা বলবে, কেজরিওয়াল একজন নকশালবাদী; আমরা নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছি; তারা কেজরিওয়ালকে জঙ্গলে পাঠাবে বলছে; মোবাইলে জরুরি কলসেবা চালু করার কথা বলেছি আমরা; তারা বলেছে কেজরিওয়াল একটা বাঁদর (বিজেপি প্রার্থী নূপুর শর্মা এ কথা বলেছেন)। তারা আসলে কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি করে। আমরা উন্নয়নের রাজনীতি করি। আমাদের কর্মসূচিতেই এটা স্পষ্ট।
আমরা সরকারি স্কুলগুলোকে উন্নত করার কথা বলি আর তারা মেয়েদের জিন্স পরা এলাউ করবে না বলে; গ্রামীণ এলাকাগুলোয় বাস, মেট্রো চালুর মাধ্যমে আমরা যোগাযোগের কথা বলি; তারা নারীদের চারটি সন্তান গ্রহণের কথা বলে।
প্রশ্ন :আপনারা যখন ক্ষমতায় থাকবেন তখন বিক্ষোভ, সংঘাতের রাজনীতি করবেন না_ এ ব্যাপারে কি নিশ্চয়তা দেবেন?
উত্তর :যখন যা কিছু প্রয়োজন পড়বে আমরা তাই করব। দিলি্লর জনগণের প্রতি যদি কোনো অবিচার করা হয় তাহলে এ ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ হতে যা কিছু করার দরকার আমরা তাই করব। সংবিধানেই ধর্ণাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটা কি সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হবে?
প্রশ্ন :একজন মুখ্যমন্ত্রীকে ধর্ণায় বসতে হলে কেমন দেখা যাবে?
উত্তর :নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনিসহ ৩০ জন মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে ধর্ণায় বসেছেন।
প্রশ্ন : বিজেপি তাদের লাভ হবে বিবেচনা করে কংগ্রেস দিলি্লতে শক্তিশালী হোক চায়? কংগ্রেস দিলি্লর নির্বাচনে জয়লাভ করুক বিজেপি চায় না। তারা কেবল আপনাদের ভোটের হিস্যা কমাতে চায়। নির্বাচনে যদি কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তাহলে আপনি কাদের সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করবেন?
উত্তর :এবার নির্বাচনে অবশ্যই ভাঙা রায় হবে না।
দ্য হিন্দু থেকে ভাষান্তর সুভাষ সাহা

রাজনীতিতে বিদেশী হস্তক্ষেপ ও আওয়ামী লীগ by ওয়ালিউল হক

গত বছরের (২০১৪ সাল) ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশী হস্তক্ষেপের ব্যাপারে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু কঠোর কথাবার্তা বলেছেন, যা কিনা অনেকের মতে শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘দু’আনার মন্ত্রী’ আর রাষ্ট্রদূতকে ‘কাজের মেয়ে মর্জিনা’ ও ‘বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য’ ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করার বিষয়টিকে অনেকেই মনে করছেন আওয়ামী লীগের কোল্ডওয়ার যুগে প্রত্যাবর্তনের প্রচেষ্টা। আসলে আওয়ামী লীগ এখনো সত্তর দশকের প্রথমার্ধকে আঁকড়ে থাকতে চায়। কারণ, সেটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের সোনালি সময়। যে কারণে আওয়ামী লীগ কোনো বিষয়ে কথা উঠলেই ওই সময়ে ফিরে যায় এবং দুনিয়াকে ওই অবস্থান থেকেই বিচার করতে চায়। যদিও দুনিয়া আগের থেকে অনেক বদলে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ কি আসলেই দেশের রাজনীতিতে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরোধী? এই প্রশ্নের উত্তর, আওয়ামী লীগ যদি আসলেই দেশের রাজনীতিতে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরোধী হতো তাহলে তার উচিত ছিল নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ সফরকারী ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বিভিন্ন বক্তব্য ও তৎপরতার বিরোধিতা করা। কিন্তু তা দলটি করেনি। আওয়ামী লীগের এই অবস্থানদৃষ্টে মনে হতে পারে দলটি ভারতবান্ধব এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী। আওয়ামী লীগ কি আসলেই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে এর অতীত রাজনৈতিক তৎপরতার ইতিহাসে। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের কাছে শোচনীয় পরাজয় বরণ করার পরও গণসমর্থনহীন মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকেন এবং পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। সে সময় তাদের বক্তব্য ছিল যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচন একটি ‘প্রাদেশিক নির্বাচন’ মাত্র, সে কারণে কেন্দ্রে মন্ত্রিসভার রদবদলের প্রয়োজন নেই। পাকিস্তানে তদানীন্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিলড্রেথ কূটনৈতিক শালীনতা বিসর্জন দিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনের ফলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় রদবদলের প্রয়োজন নেই। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৩৮)। এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছিল কি না সে ব্যাপারে সরকার কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী সম্পাদিত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ : প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও শ্যামলী ঘোষের আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১ গ্রন্থে কোনো কিছু পাওয়া যায়নি।
এ দিকে ড. শ্যামলী ঘোষ তার ওই গ্রন্থে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দেয়া একটি বিবৃতির কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, এনডিএফ তার ন্যূনতম কর্মসূচিকে যখন পূর্ব পাকিস্তানে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য দেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য ইস্যুকে স্থগিত রাখার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে, তখন পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঢাকায় দেয়া কথিত এক বিবৃতি দেশের উভয় অঞ্চলের রাজনৈতিক মহলে বেশ বড় রকমের আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই মার্কিন রাষ্ট্রদূত নাকি এ কথা বলেন যে, তিনি তার দেশ ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতার চেষ্টা করবেন আর আমেরিকানদের সাথে পূর্ব পাকিস্তানিদের বৃহত্তর সমঝোতা থাকা উচিত। তিনি বিশেষ করে বলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানিদের আরো বেশি সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্র সফর করা উচিত। তিনি এ কথাও বলেন, য্ক্তুরাষ্ট্র বরাবরই পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ দেখবে এবং এ অঞ্চলে উন্নয়নকার্যক্রম গ্রহণের উদ্যোগকে উৎসাহিত করবে। পিপিএ এবং এপিপির খবরে বলা হয়, পাকিস্তান সরকার বিষয়টি গুরুতর বলে গণ্য করছে এবং একই খবরে কেন্দ্রীয় সরকারের যোগাযোগমন্ত্রীর বরাতে বলা হয়, প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। ওই সময়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বিবৃতিকে ‘গোলমেলে, দুরভিসন্ধিমূলক’ বলে অভিহিত করে বিরক্তি প্রকাশ করেন।
সামান্য ব্যতিক্রম বাদে বিষয়টি নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষণীয়ভাবেই ভিন্ন। পশ্চিম পাকিস্তানে এমন মনোভাব লক্ষ করা যায় যে, যার সার বক্তব্য হলো : যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবির নেপথ্যে রয়েছে (পশ্চিমাঞ্চলে একে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী উদ্যোগ’ বলে অভিহিত করা হয়)। লাহোরের জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন ও করাচি মুসলিম লীগের (কনভেনশন) মতো কিছু সংগঠন এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথিত প্রস্তাব দেয়ার জন্য এ বিবৃতির নিন্দা জ্ঞাপন করে এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। এ দিকে পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকা হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এবং ঢাকা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের মতো সমিতি-সংগঠনগুলোর বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তানের বিশেষ প্রয়োজনের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ রাখার বিষয়টির প্রশংসা করা হয়।
পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিকদের মধ্যে তৎকালে নিষ্ক্রিয় পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ আলী পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর জন্য মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সমালোচনা করেছিলেন। অবশ্য আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। ওই সময়ে নিষ্ক্রিয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুদ্দিন বলেছিলেন, মার্কিন সরকার সব ক্ষেত্রে এ যাবৎ অবহেলিত পাকিস্তানের ‘পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে সাহায্য-সহায়তা করার ব্যাপারে যে আগ্রহ ও উদ্বেগ ব্যক্ত করেছে, তা প্রশংসনীয়।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, যেখানে মার্কিন ও অন্যান্য সাহায্য-সহায়তার ৭০ শতাংশ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করার বিষয় অবিসংবাদিত, ‘সেখানে মার্কিন সরকার পাকিস্তানের পার্লামেন্টের ভেতরে-বাইরে সমালোচনার আলোকে যদি পূর্ব পাকিস্তানে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় সাহায্য-সহায়তা বিলিবণ্টন সমস্যার সমীক্ষার চেষ্টা করে থাকে’ তাতে দোষের কিছু নেই। তিনি আরো উল্লেখ করেন, পূর্ব পাকিস্তানের কথা কোনো বিবেচনায় না রেখেই পশ্চিম পাকিস্তানের বিশেষ বিশেষ প্রকল্পের জন্য সাহায্য চাওয়া হয়েছে। তার মতে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বিবৃতির ব্যাপারে যে আপত্তি, তা ‘রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত, যা অনভিপ্রেত মনে করা যায়।’
গোটা বিষয়কে ‘চায়ের পেয়ালার তুফান’ হিসেবে বর্ণনা করে ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বিবৃতিকে যৌক্তিকতা দেয়ার প্রয়াস পায়। পত্রিকায় বলা হয়, সাহায্য-সহায়তা দাতাসংস্থা পাকিস্তান সরকার প্রণীত প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ও বাঞ্ছনীয়তার বিষয়ে খোঁজখবর নেবে, সেটা নতুন কিছুই নয়। এ কাজ আগেও করা হয়েছে, তখন কোনো কথা ওঠেনি। পত্রিকায় ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, ‘যে কৃত্রিম উত্তেজনা’ সৃষ্টি করা হয়েছে তার মতলব মিশ্র। একটি মতলবের জন্ম সেই কট্টর মহল থেকে, যাদের ‘মার্কিন বিরোধিতা সাধারণভাবে তাদের পূর্ব পাকিস্তানের জন্য দরদের চেয়ে বেশি’ আর দ্বিতীয়টি তাদের ‘যেসব পূর্ব পাকিস্তানি তাদের প্রদেশের জন্য বরাবরই অর্থনৈতিক সুবিচারের দাবি জানিয়ে আসছে, তাদের যারা দাবিয়ে রাখতে চায়।’
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যের যে উদ্দেশ্যই থাকুক, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা সেটিকে পূর্ব পাকিস্তানের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরার কাজে লাগিয়েছিলেন। (আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১, পৃষ্ঠা- ৭৪ ও ৭৫)। এখানে একটি বিষয় পাঠকদের অবগতির জন্য উল্লেখ করা যেতে পারে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ওই বিবৃতির পর ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সের (পিআইডিই) পরিচালক নিযুক্ত হন আমাদের এ অঞ্চলের প্রফেসর নুরুল ইসলাম। তিনি তার বাংলাদেশ জাতি গঠনকালে এক অর্থনীতিবিদের কিছু কথা বইয়ে জানিয়েছেন, মার্কিন প্রতিষ্ঠান ফোর্ড ফাউন্ডেশনের বিদেশী অর্থনীতিবিদদের চাপেই তাকে পরিচালক নিযুক্ত করা হয় এবং ওইসব বিদেশী অর্থনীতিবিদ আঞ্চলিক ইস্যুগুলো বিশ্লেষণে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। ওই বই পড়ে বোঝা যায়, আইডিইর দেশী-বিদেশী অর্থনীতিবিদদের গবেষণালব্ধ তথ্য ও উপাত্ত বাঙালি অর্থনীতিবিদেরা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সরবরাহ করতেন, যাতে তারা জনগণকে সংগঠিত করতে পারেন। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ৬ দফা পেশ করেন এবং পরবর্তীকালে ওইসব বাঙালি অর্থনীতিবিদ ৬ দফার ব্যাখ্যাদাতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

কোটি টাকা ব্যয়ে সমালোচনা by কাজী সোহাগ

সংসদে শুধু বিরোধী জোটের সমালোচনা করেই ব্যয় হচ্ছে কোটি টাকা। বিএনপি, বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে এ টাকা ব্যয় হচ্ছে সংসদ সচিবালয়ের। ১৯শে জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ১০ম জাতীয় সংসদের ৫ম অধিবেশনে এ পর্যন্ত  ৯টি কার্যদিবস শেষ হয়েছে। প্রতিটি কার্যদিবসেই প্রায় ৩০ মিনিট ধরে সমালোচনায় অংশ নিয়েছেন সরকার দলীয় ও শরিক দলের এমপিরা। গত কয়েক দিনের সংসদ অধিবেশন পর্যালোচনা করে দেখা যায় ৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে প্রায় ১০ জন এমপি সমালোচনায় অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ হয়েছে পয়েন্ট অব অর্ডারে। আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী সংসদ অধিবেশনে প্রতি মিনিটের জন্য ব্যয় হয় প্রায় ৮৫ হাজার টাকা। এ হিসেবে ৪ ঘণ্টায় সংসদের ব্যয় ২ কোটি ৪০ হাজার টাকা। পয়েন্ট অব অর্ডারের নামে দলীয় ও ব্যক্তিগত বক্তব্য দেয়ায় এ গচ্চা।  নিয়ম অনুযায়ী সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি লঙ্ঘন হয় এমন বিষয় নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রাখতে পারেন এমপিরা। কিন্তু ঘটছে উল্টোটা। বিষয় হিসেবে উঠে আসছে, বিএনপি, খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের কঠোর সমালোচনা। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৩০১ ধারায় বলা হয়েছে ‘কোন বৈধতার প্রশ্নকে এই বিধিসমুহের ও সংসদের কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণকারী সংবিধানের অনুচ্ছেদসমূহের ব্যাখা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে এবং স্পিকারের ক্ষমতার আওতাভুক্ত হইতে হইবে।’ দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে ‘কেবল সংশ্লিষ্ট সময়ে সংসদের বিবেচনাধীন বিষয়ের উপর বৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইতে পারে।’ কাগজে-কলমে পয়েন্ট অব অর্ডার নিয়ে এ বিধান থাকলেও মানছেন না কেউ। হাত তুলে সিনিয়র মন্ত্রী ও এমপিরা দাঁড়ালে অনেকটা অসহায় অবস্থায় পড়েন স্পিকার। বিধান উপেক্ষা করে রেওয়াজ মানতে মাইক দেন তাদের। কয়েকটি অধিবেশন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হাতে গোনা কয়েক এমপি ঘুরে ফিরে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রাখেন। এ তালিকায় আছেন, আমির হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তোফায়েল আহমেদ, হাসানুল হক ইনু, মাঈনউদ্দিন খান বাদল, হাজী সেলিম, আবুল কালাম আজাদ ও রুস্তম আলী ফরাজী। সংসদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এর আগে বিষয়টি নিয়ে মানবজমিনকে বলেন, সংসদ হচ্ছে সর্বশীর্ষ আইন প্রণেতাদের স্থান। সেখানে বিধি লঙ্ঘন করে আবার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়াটা কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা একটি অনৈতিক কাজ। তিনি বলেন, এ বিষয়ে স্পিকারের আরও শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। পাশাপাশি সকল সংসদ সদস্যদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তারা জানেন কোন পয়েন্টে কোন কথা বলা যায় আর কোনটা বলা যায় না। ২০শে জানুয়ারি পয়েন্ট অব অর্ডারে হরতাল অবরোধের নামে বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা বন্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিরা। তারা বলেন, সন্ত্রাস সহিংসতা কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হতে পারে না। তাই দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অপারেশন ক্লিন হার্ট অথবা যৌথবাহিনী নামিয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করে মানবতা বিরোধী অপরাধে বিচার করার দাবি করেন। একই সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে কোন সংলাপ বা আলোচনা না করারও দাবি জানান তারা। বিএনপি জামায়াতকে জঙ্গি সংগঠন উল্লেখ করে এ দল দু’টিকে নিষিদ্ধ করারও দাবি জানান তারা। ২২শে জানুয়ারি একই পয়েন্টে এমপিরা বলেন, জনগণের জীবন রক্ষায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতেই হবে, এক্ষেত্রে কোন দয়া-মায়ার সুযোগ নেই। একজন অপরাধীর (খালেদা জিয়া) স্থান কোন কার্যালয় বা অন্য কোথাও নয়, একমাত্র স্থান হচ্ছে জেলখানা। আর খালেদা জিয়া যে সহিংস ও নিষ্ঠুর পথে হাঁটছেন, সেই পথেই একদিন তিনি নিঃশেষ হয়ে যাবেন। জনবিচ্ছিন্ন খালেদা জিয়া আজ দেশের ১৬ কোটি মানুষকে অবরোধ করেছেন, জনগণকে মুক্তিপণ হিসেবে ব্যবহার করছেন। জনসমর্থনহীন সন্ত্রাসী-জঙ্গিদের দিয়ে খালেদা কোনদিন কোনকিছু আদায় করতে পারবে না। আগেও খালেদা জিয়া পরাজিত হয়েছেন, এবারও হবেন।

গার্লফ্রেন্ডের কান কামড়ে বিচ্ছিন্ন

ক্ষুব্ধ হয়ে গার্লফ্রেন্ডের কান কামড়ে খানিকটা অংশ বিচ্ছিন্ন করেছিলেন ৫১ বছর বয়সী মাইকেল ট্রুডো। এ ঘটনার তিন সপ্তাহ আগে তিনি পৃথক এক ঘটনায় তার গার্লফ্রেন্ডের প্রিয় পোষ্য বিড়ালটিকে পুড়িয়ে মারার পর কাঁচির সাহায্যে তার মুন্ডুপাত ঘটান। আর এহেন পাগলামির মাশুল গুণতে ট্রুডো এখন রয়েছেন শ্রীঘরে। তাকে গ্রেপ্তারের পর ১০ লাখ ডলার জামিন ধার্য করা হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন মিড-ডে। ঘটনাটি ঘটেছে গত সপ্তাহে। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা ট্রুডো তার ৪২ বছর বয়সী গার্লফ্রেন্ডের কান কামড়ে দেন। ঘরোয়া হয়রানির অভিযোগে পুলিশ একটি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে গিয়ে আতঙ্কে জড়সড় হয়ে ঘরের এক কোনায় বসে থাকা গার্লফ্রেন্ডকে উদ্ধার করেন। তার শরীর ছিল রক্তে ভেজা। কান দিয়ে তখনও ঝরছিল রক্ত। তিনি জানান, গত ২ বছর ধরে তার সঙ্গে সম্পর্ক ট্রুডোর। ভদকা (জনপ্রিয় রুশ অ্যালকোহল) পানের সময় নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে তারা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় তাদের মধ্যে। পুলিশ জানায়, ট্রুডো তার গার্লফ্রেন্ডের গলা টিপে ক্ষণিকের জন্য শ্বাসরোধ করেছিলেন, সজোরে মেঝের সঙ্গে তার মাথা ঠুঁকে দেন এবং জোর করে গলার মধ্যে একটি ছাতা ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। ট্রুডো তার গার্লফ্রেন্ডকে বলেছিলেন তিনি নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য। ট্রুডো তাকে বলেন, শত্রুকে হত্যার জন্য আমি প্রশিক্ষিত। তুমি আমার শত্রু। এ সময় নিজেকে বাঁচাতে ট্রুডোর আঙুলে কামড়ে দেন তার গার্লফ্রেন্ড। ট্রুডো গার্লফ্রেন্ডের কান সজোরে কামড়ে একটি অংশ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। চিকিৎসকরা বলছেন, তাদের পক্ষে কানের বিচ্ছিন্ন অংশ জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। গ্রেপ্তারের সময় ট্রুডো মাথার ওপর তার হাত রাখতেও রাজি হননি। পুলিশ কর্মকর্তাদের ট্রুডো বলেন, তিনি চান তারা তাকে গুলি করে হত্যা করুক। হামলা, সন্ত্রাসী হুমকি ও পশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর আগে ২০১২ সালে স্ত্রীর ওপর হামলার অভিযোগে ২ বছর জেল দেয়া হয়েছিল ট্রুডোকে। ২০০৬ সালে একটি কুকুরের বাচ্চাকে মেরে ফেলার অভিযোগ তার স্ত্রীকেও ৩০ দিনের কারাদন্ড দেয়া হয়েছিল।

তিতাসের বুক ভারী ৫ শ’ ঘেরে by জাবেদ রহিম বিজন

শান্ত নদীর বুকে যেন সবুজের পাটি। দীর্ঘ পথে ঘেরের সমারোহ। যা স্থানীয় ভাবে ‘খেও’ নামে পরিচিত। তিতাস নদীর বুক ভারী করে রেখেছে এমন প্রায় ৫শ’ মাছের ঘের বা খেও। দেখতে নয়নাভিরাম হলেও এই ঘের বা খেও অস্তিত্ব সঙ্কটে ফেলেছে তিতাসকে। ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। মাছের অবাধ বিচরণে বড় বাধা এই ঘের। মাছের বংশ বিনাশও হচ্ছে ঘেরের সবুজ ছায়াতলে। ব্যাহত হচ্ছে নৌ চলাচল। নবীনগর এলাকায় তিতাস নদী ছাড়াও পাগলিনী নদী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পূর্বাংশে তিতাস নদীতে আছে এমন আরও অসংখ্য ঘের।  সরজমিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণঘাট থেকে নবীনগর পর্যন্ত তিতাস নদীর দীর্ঘ প্রায় ১৭ কিলোমিটার পথের দু’-ধারে এই ঘেরের অবস্থান চোখে পড়ে। মধ্যাংশের সামান্য ফাঁক গলিয়ে চলে লঞ্চসহ অন্যান্য নৌযান। উপজেলা মৎস্য  অফিস সূত্রে জানা গেছে, নদীটির এই অংশেই  তারা প্রায় ৪শ’ ঘেরের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। এসব ঘের মালিকদের নাম-ঠিকানাও সংগ্রহ করেছেন তারা। জানা গেছে-জলাশয় নীতিমালা অনুসারে নদী সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে মাছ ধরার সুযোগ রয়েছে সবার। মাছও অবাধ বিচরণ করবে এখানে।  কিন্তু এর কোনটাই হচ্ছে না। নদীবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী লোকজন এই ঘের বানিয়ে নদীর মাছের নিয়ন্ত্রণ করছেন। মাছ লুটে নিচ্ছেন। দেশী প্রজাতির মাছের বংশ শেষ করছেন। সচেতন মানুষ ও মৎস্য অফিসের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুসারে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে এই খেওয়ের মাধ্যমে নদীর ব্যাপক ক্ষতি করা হচ্ছে। কিন্তু অবৈধ ঘেরে তারা ভাল লাভবান হচ্ছেন। লাখ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করছেন। চাউর আছে  স্থানীয় থানা পুলিশ ও প্রশাসন ঘেরের সজীব-সুস্বাদু মাছে তুষ্ট হয়ে এ নিয়ে আর ভাবেন না। নবীনগরের একজন পরিবেশ সচেতন মানুষ শামসুল হক বলেন- মূল তিতাস নদী অনেক দূর পর্যন্ত ভরাট হয়ে গেছে। কোন কোন জায়গায় দু’টি লঞ্চ একসঙ্গে পারাপার হতে পারে না। তার মতে গত ৫০ বছরে তিতাস  নদীর যে এই অবস্থা হলো, নদী জীর্ণশীর্ন হলো এর পেছনে অনেক কারণ আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে কারণ তা হচ্ছে মাছের এই অবৈধ ঘের। ঘের করার জন্য নদীর পানিতে প্রচুর পরিমাণ গাছের ডালপালা ফেলা হয়। আর উপরে থাকে কচুরিপানা-কলমিলতা ইত্যাদি। এর নিচেই মাছের আশ্রয়স্থল। এখান থেকে বিশেষ জালে সব ধরনের দেশী মাছ নিঃশেষ করা হয়। ওদিকে ঘের ভাঙার পর গাছপালাগুলো নদীর তলদেশে পড়ে থাকে। তাছাড়া বছরের ২/৩ মাস ছাড়া সারা বছরই এই ঘের থাকে। এতে নদীর পানির সঙ্গে প্রবহমান বালি এসব গাছের ডালপালায় আটকে নিচে স্তূপ হয়। এভাবে পলি ভরাট হয়ে নদী সঙ্কুচিত হচ্ছে। ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। যেখানে এখন চাষাবাদ হচ্ছে ইরি ফসল। স্থানীয় ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রফাদফায় এই জমিও ভোগদখল করছে প্রভাবশালীরা। অবৈধ ঘের মালিকদের একজন বিল্লাল মিয়া জানান, নদীর বুকে কমপক্ষে ১৫০ শতাংশ জায়গা নিয়ে একেকটি ঘের হয়। একটি ঘের করতে খরচ পড়ে আড়াই তিন লাখ টাকা। এসব ঘের প্রায় সারা বছরই থাকে নদীর বুকে। ঘের থেকে শৈল, গজার, পাবদা, পুটা, চিংড়িসহ নানাজাতের দেশী মাছ আহরণ করেন তারা। বলেন এসব করতে প্রশাসনের কোন অনুমতি লাগে না। আগে নবীনগরে গিয়ে স্যারদের মাছ দিয়ে আসতাম। বিল্লাল মিয়া ঘেরে লাভ হন না বলে দাবি করেন। তবে ওয়াকিবহাল একজন জানিয়েছেন এসব ঘের থেকে প্রতিদিন মণের মণ মাছ আহরণ হয়। ৩ লাখ টাকা খরচ করে ঘের দিয়ে লাভ হয় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলাম বলেন- এসব ঘেরকে আমরা বলি মিনি অভয়াশ্রম। এখানে মা মাছ ডিম পাড়তে পারে নির্বিঘ্নে। ছোট মাছ আশ্রয় পায়। এটা ঠিক আছে। কিন্তু ঘেরের নিচে আশ্রয় নেয়া সবমাছই ধরে ফেলে ঘের মালিকরা। এতে  দেশী প্রজাতির নানারকম মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। তিনি আরও বলেন,  ২০ একরের ঊর্ধ্বে জলাশয় দেখভালের দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। এখানে আমাদের কোন কর্তৃত্ব নেই। এসব জলাশয় সবার জন্য উন্মুক্ত। এসব ঘের উচ্ছেদে তিতাস নদীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগর অংশে ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে তারা অভিযান চালিয়েছেন বলে জানান। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে ৫টি। নবীনগর উপজেলা মৎস্য অফিস এ পর্যন্ত প্রায় ৪শ’ ঘেরের অস্তিত্ব পেয়েছে তিতাস নদীর ওই অংশে। সেগুলো উচ্ছেদের চিন্তা-ভাবনা করছে তারা। এই তালিকা অনুসারে অবৈধ ঘের মালিকদের কয়েকজন হচ্ছেন- ভৈরবনগরের হাজী সিরাজুল ইসলাম, ধন মিয়া, মনিপুরের ওয়াহেদ মিয়া, আক্তার মিয়া, উরখুলিয়ার আবদুল খালেক, ওয়াহেদ মিয়া, নারুইয়ের সুধীর চন্দ্রদাশ, শিবনগরের হরিধন চন্দ্র বর্মণ, নাটঘরের ঝাড়ু সর্দার,  মোহল্লার মো. ফুলন মিয়া,  সোনাপাড়ার পরেশ চন্দ্র দাশ, চান্দেরচরের বিল্লাল মিয়া, ধোপাকান্দার কানু মিয়া, হুরন আলী, মেরাতলীর সাবেক চেয়ারম্যান আবুল বাশার, মো. আবুল কাশেম, গোসাইপুরের আলীম, আশিক মিয়া, চর গোসাইপুরের বিল্লাল মিয়া, কৃষ্ণনগরের আলাল উদ্দিন ও তাজুল ইসলাম মেম্বার। নবীনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, অবৈধ ঘেরের মালিকের নামসহ একটি তালিকা আমরা করেছি। তিতাস ছাড়াও পাগলিনী নদীতে আরও কিছু ঘের রয়েছে। শিগগিরই এ ব্যাপারে অভিযান চালানো হবে। উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের বিভাগের পক্ষে একা এই অভিযান চালানো সম্ভব নয়। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় ঘের উচ্ছেদে আমরা ৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি। এসব মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে প্রতিবার খরচ হয়েছে ৬/৭ হাজার টাকা।
এ টাকা সংস্থানেরও একটি ব্যাপার আছে। তিনি জানান, বর্ষাকাল ছাড়া প্রায় ৮ মাসই এই ঘের থাকে নদীতে। নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু শাহেদ চৌধুরী বলেন- নদীর কি ক্ষতি হচ্ছে না হচ্ছে- সেটা আমার জানার বিষয় নয়। এগুলো অবৈধ এটাই বড় বিষয়। অবৈধ যেহেতু এর বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেবো। এসব ঘের মুক্ত মৎস্য প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে বলে জানান ইউএনও।

কবির ও কুলসুমের পথে বসার উপক্রম by আরিফুল হক

চলমান রাজনৈতিক সংকট আর অবরোধ-হরতাল বড় রকমের ধাক্কা দিয়েছে তরুণ উদ্যোক্তাদের। ব্যবসায় ক্রমাগত লোকসানে তাঁদের অনেকেই এখন পথে বসার জোগাড়। ৬ বিভাগের ১৫ তরুণ উদ্যোক্তা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, হতাশা ও শঙ্কার কথা বলেছেন। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধানের অনুরোধ জানিয়েছেন প্রতিদিন যেভাবে লোকসান হচ্ছে, এ লোকসান কাটিয়ে ওঠা মোটেই সম্ভব নয়। এভাবে আর কত দিন চলবে। এভাবে চলতে থাকলে এই ব্যবসায় লোকসানের বোঝা শুধু বাড়তেই থাকবে। দেশে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা নিজ উদ্যোগে কাজ করছেন। এ অবস্থায় তাঁদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। টানা অবরোধ-হরতালে আক্ষেপের সুরে এসব কথা বলেছেন রংপুর নগরের দুই তরুণ উদ্যোক্তা শাহাজাহান কবির ও উম্মে কুলসুম।
বছর চারেক আগে নগরের বাহার কাছনায় ‘গোল্ডেন হ্যান্ডিক্রাফটস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলে ব্যবসা শুরু করেন শাহাজাহান কবির। পাটের তৈরি ব্যাগ, টেবিল ম্যাট, ওয়াল ম্যাট, সুতার তৈরি পাপোশ তৈরি হয় তাঁর প্রতিষ্ঠানে। তাঁর কারখানায় কাজ করেন ৩৫০ জন শ্রমিক। এসব হস্তশিল্প তৈরির জন্য সুতাসহ কাঁচামাল ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আনতে হয়। টানা অবরোধে এসব মালামাল পরিবহন করা যাচ্ছে না। যেখানে প্রতিদিন তাঁর কারখানায় প্রায় দুই হাজার ম্যাটসহ অন্যান্য পণ্য উৎপাদিত হতো, সেখানে এখন কোনো রকমে কারখানা চালু রাখা হয়েছে। হংকংয়ে পাটের তৈরি ব্যাগ, টেবিল ম্যাট, ওয়াল ম্যাটের পাঁচ কোটি টাকার কার্যাদেশ পাওয়ার পরও অবরোধের কারণে তা বাতিল হয়ে গেছে।
দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শাহাজাহান বলেন, ‘এই একটানা অবরোধে আমার ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি আর পুষিয়ে নেওয়া মোটেই সম্ভব নয়।’ তিনি প্রধান দুই দলকে উদ্দেশ করে বলেন, ব্যক্তিস্বার্থ ভুলে গিয়ে জনগণের স্বার্থে উভয় দলকে অবশ্যই বসতে হবে। নমনীয় হতে হবে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে হবে। আন্দোলনের গতি-প্রকৃতিও পরিবর্তন করতে হবে। জ্বালাও-পোড়াও, পেট্রলবোমা এগুলো আন্দোলনের ভাষা হতে পারে না।
উম্মে কুলসুমের বাড়ি নগরের ধাপ এলাকায়। ‘সূচি শিল্প বুটিকস’ নামে প্রতিষ্ঠান দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন ১০ বছর ধরে। তাঁর নিজ বাড়ি ও বাসা ভাড়া নিয়ে হস্তশিল্পের এ কাজ করে আসছেন। শাড়ি, থ্রি-পিস, বিছানার চাদর, টেবিল কভার, পর্দায় নকশা, বাটিক ও ব্লক প্রিন্টের কাজ করা হয় তাঁর এই প্রতিষ্ঠানে। নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে ৫০ জন নারী কাজ করেন। এ ছাড়া প্রতি সপ্তাহে এসব কাজ শেখাতে ১০০ নারীকে প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকেন। প্রতিষ্ঠানটি দাঁড় করাতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। তিন-চার বছর ধরে তাঁর এ ব্যবসার একটা পরিচিতিও পেয়েছে। রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় থ্রি-পিসসহ অন্যান্য হস্তজাত শিল্প মানুষজন কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু এবারের টানা অবরোধ ও হরতালে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কুলসুম বলেন, ‘খুবই খারাপ অবস্থা। এ কাজের সঙ্গে নারীদের প্রতিদিন পেমেন্ট করাও সম্ভব হচ্ছে না। মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। ঢাকা থেকে যে কাপড়সহ অন্যান্য মালামাল নিয়ে আসব, তাও পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন রোজগারপাতি একেবারে জিরোতে নেমে এসেছে। অবরোধের এ কয়েক দিনে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এ লোকসান মানে লোকসানই। কেননা নভেম্বর মাস থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এসব মালামালের সিজন থাকে।’ তিনি বলেন, ‘মানুষজন বাইরে বেড়াতে যেতে পারছে না। আমার এখানে বানানো থ্রি-পিস মহিলারা কিনে নিয়ে বাইরে বেড়াতে যান। এবার টানা অবরোধে তাই কোনো বিক্রি নেই। আবার অনেকেই আমার হস্তজাত পণ্য কিনে দেশের বাইরে আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠান। এসবও বন্ধ হয়ে গেছে।’

প্রেসিডেন্ট অধ্যাদেশ জারি করে ঐকমত্যের সরকার গঠন করতে পারেন -এমাজউদ্দীন আহমদ

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। বুধবার তার দেয়া একটি প্রস্তাব ঔৎসুক্য তৈরি করেছে সমাজের নানা মহলে। ওই দিন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে এক আলোচনায় তিনি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। তার এই প্রস্তাবে এরই মধ্যে নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবীদের একটি অংশ সমর্থন জানিয়েছে। গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে ওই প্রস্তাবের ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, চলমান সঙ্কটের সুরাহা করতে হলে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কোন বিকল্প নেই। ওই সরকারের প্রধান কাজ হবে দুটি। প্রথমত, যেসব প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের সঙ্গে সংযুক্ত ওই সব প্রতিষ্ঠানে সংস্কার করা। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠান যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে তা সংস্কার না করে কখনও অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠিত হবে। ওই সরকারের যারা প্রতিনিধি হবেন তারাই ঠিক করবেন কে ওই সরকারের প্রধান হবেন। জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের মেয়াদ দীর্ঘ হবে না। সর্বোচ্চ ৯০ দিন ওই সরকারের মেয়াদ হতে পারে। এ সময়ের মধ্যেই তারা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আনবে এবং নির্বাচন আয়োজন করবে। জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধন করে তা করা সম্ভব। আবার সংবিধান সংশোধন না করেও তা করা সম্ভব। যদিও আমাদের সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা একেবারেই সীমিত। কিন্তু জাতির অভিভাবক হিসেবে প্রেসিডেন্টের একটা ভূমিকা রয়েছে। জাতির এই ক্রান্তিকালে প্রেসিডেন্টই এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে পারেন। প্রেসিডেন্ট একটি অধ্যাদেশ জারি করে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করবেন। পরবর্তীকালে যে সংসদ গঠিত হবে ওই সংসদ প্রেসিডেন্টের অধ্যাদেশকে অনুমোদন দেবে। তিনি বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ওই সংশোধনীতে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় সংসদ ভেঙে দিয়েই নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। বৃটেন, জার্মানি, জাপান সবখানেই এ ব্যবস্থা। সংসদ বহাল থাকলে নির্বাচনের সময় একজন প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ ক্ষেত্রে কিছুতেই লেভেল প্লেইং ফিল্ড হবে না। এ অবস্থা বহাল থাকলে অবাধ নির্বাচন হবে না। এজন্য সংসদ ভেঙে দিতে হবে। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, যদি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠা না করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা না হয় তবে গণতন্ত্র শব্দটি ব্যবহারের অধিকার আমাদের থাকবে না। চার হাজার বছরের মধ্যে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চেতনা ছিল গণতন্ত্র। সে গণতন্ত্রকে আমরা ভূলুণ্ঠিত হতে দিতে পারি না। গত বছর নভেম্বরে এক অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে ২০১৫ সালের মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তনের ব্যাপারে আশার কথা জানিয়েছিলেন অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। সেসময় তিনি বলেছিলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যদি যথার্থতা থাকে, আমার চিন্তাভাবনা যদি ঋজু হয়, তাহলে মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে দেশের চেহারা এমন থাকবে না। মাঝখানের সময়টাতে আন্দোলনে মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়বে। সম্প্রতি কয়েকটি সাক্ষাৎকারে তিনি প্রয়োজনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বহাল রেখেও নির্বাচনের কথা বলেন।

কেমন কাটছে খালেদার দিন by কাফি কামাল

টানা ৩০ দিন গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার নেতৃত্বেই চলছে ২০ দলের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি। প্রথম ১৬ দিন ছিলেন পুলিশি ব্যারিকেডে অবরুদ্ধ। তারপর পুলিশি অবরোধ তুলে নেয়া হলেও কৌশলগত কারণে কার্যালয় ছাড়েননি তিনি। এরই মধ্যে অকালে মৃত্যুবরণ করেছেন বিদেশে অবস্থানরত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। কার্যালয়ের সীমিত চলাফেরার মধ্যে যোগ হয়েছে শোক। পুত্রশোকে কাতর ও বিপর্যস্ত তিনি। এ অবস্থায় সর্বশেষ তার কার্যালয়ে বিদ্যুৎ, টেলিফোন, টিভি, ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ ছিন্ন করা হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হলেও অন্যান্য সংযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন। যেকোন সময় গ্রেপ্তারের ঝুঁকিও রয়েছে। কার্যালয়ে শোকার্ত পরিবেশে আত্মীয়স্বজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় দিন কাটছে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর। দিনের বেশির ভাগ সময়ে তার চারপাশে থাকেন স্বজনরা। চেয়ারপারসন কার্যালয় সূত্র জানায়, বড় ছেলে তারেক রহমানের শ্বশুর বাড়ি থেকে খালেদা জিয়ার প্রতিদিন খাবার আসে। নিজের বাসার একজন লোক সে খাবার নিয়ে আসে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জিয়া পরিবারে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া কখনও কখনও দুই ভাই সাঈদ এস্কান্দর ও শামীম এস্কান্দরের পরিবার থেকে খাবার আসে। তবে সে সব খাবার দুই ভাইয়ের বউ নিজেরা নিয়ে আসেন। খাবারের ব্যাপারে অনেক বেশি যাচাই-বাছাই ও নিয়ম রক্ষা করে চলেন খালেদা জিয়া। খাবার খান খুবই পরিমিত। সামান্য একটু ভাত এবং তার দ্বিগুণ সবজি, মাছ বা এক টুকরো মাংস। তবে বেশির ভাগ দিন তার খাবার মেন্যুতে থাকে করলা ভাজি। সবজির মধ্যে এটি তিনি খুবই পছন্দ করেন। তিনি প্রায়ই পেঁপের জুস ও তাজা ফলমূল খান। ফলমূলের মধ্যে থাকে- ডালিম, কালো আঙুর, পেয়ারা ও কমলা। তবে কোনটিই খুব বেশি নয়। সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন থেকেই তিনি নিজের মতো করে একটি জীবনযাপন প্রণালী তৈরি করে নিয়েছেন। রাতে ঘুমোতে যান দেরিতে। সকালের নাস্তা ও চা খেয়ে তিনি কিছুক্ষণ দিনের পত্রপত্রিকাগুলোতে চোখ বোলান। এ সময় দলের কাজকর্মের কিছু কাগজপত্রও দেখেন। বেলা ১১টার দিকে তিনি ফের ঘণ্টা তিনেকের জন্য ঘুমান। বিকালে আবার বিভিন্ন কাগজপত্র দেখেন। বিকাল থেকে সন্ধ্যার পর দলের লোকজনের সঙ্গে নানা সাংগঠনিক বিষয়ে কথাবার্তা বলেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া দলের সিনিয়র নেতা ও বিশিষ্টজনদের তিনি সাক্ষাৎ দেন। তাদের কাছে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নানা তথ্য জানতে চান এবং আলোচনা করেন। অনেক সময় নেতাদের বিভিন্ন পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন। গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার জন্য কোন রান্নাবান্না হয় না। কিন্তু সেখানে অন্যদের জন্য রান্নার ব্যবস্থা রয়েছে। কার্যালয় সূত্র জানায়, ৩রা জানুয়ারি অন্যান্য দিনের মতো কার্যালয়ে এসেছিলেন খালেদা জিয়া। ফলে সেখানে তার ঘুমানোর জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থা ছিল না। কার্যালয়ের সামনে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়ার পর সেখানে আসবাবপত্র নেয়া যায়নি। খালেদা জিয়া নিজেও এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখাননি। অবরুদ্ধ হওয়ার পর থেকে নিজের কক্ষে একটি জাজিমের ওপর ঘুমোচ্ছেন তিনি। তার কক্ষে অ্যাটাচড বাথরুম থাকলেও বাসার মতো সেগুলো বড় নয়। এ নিয়ে কিছুটা অসুবিধায় রয়েছেন তিনি। গুলশানের বাসায় দিনের কিছু সময় দোতলার বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতেন খালেদা জিয়া। এছাড়া, বাসার কক্ষগুলো ছিল বড়। কিন্তু কার্যালয়ে তার কক্ষটি অনেক ছোট। ওই একটি কক্ষের মধ্যেই তার চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে।
ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর আগের অবরুদ্ধ দিনগুলো খালেদা জিয়ার জন্য ছিল একরকম। কিন্তু ছেলের মৃত্যুর পর থেকে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন দিনের অনেকটা সময় তিনি জায়নামাজে পার করেন। আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর তিনি খাবার নিয়ে বেশ অনিয়ম করেছেন। দুইদিন ভাতই মুখে তুলেননি। অনেক সান্ত্বনা দিয়ে ও বুঝিয়ে এ সময় তাকে কিছু হালকা খাবার ও পানীয় দিয়েছেন স্বজনরা। এতে তিনি শারীরিকভাবেও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। অনেকটা শুকিয়ে গেছেন। গত ৮ বছর ধরে একের পর এক বিপর্যয় পার করছেন তিনি। কারাবন্দি থাকাকালে মাকে হারিয়েছেন। দুই ছেলে ও তাদের সন্তানরা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বাইরে। ভাই সাঈদ এস্কান্দরের পর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে হারিয়েছেন। ছেলের শোক তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
কার্যালয় সূত্র জানায়, ৩রা জানুয়ারি রাত থেকেই গুলশান কার্যালয়ে তার সঙ্গে অবস্থান করছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল ও কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। খালেদা জিয়াকে সহায়তা করার জন্য তার গৃহকর্মী কুলসুম রয়েছেন প্রথমদিন থেকেই। দিনের বেশির ভাগ সময় খালেদা জিয়ার কক্ষে তার সঙ্গে সময় কাটান আরাফাত রহমান কোকোর দুই মেয়ে, সাঈদ এস্কান্দর ও শামীম এস্কান্দরের স্ত্রী। মাঝে মধ্যে তাদের সঙ্গে যোগ দেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের বড় বোন শাহীনা খান বিন্দুসহ জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরা। কোন কোন দিন শামীম এস্কান্দরের স্ত্রী রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে অবস্থান করতেন। এখন দুই নাতনিই সে স্থান পূরণ করছেন। তবে বেশির ভাগ দিন আত্মীয়স্বজনরা সকালে গুলশান কার্যালয়ে যান, সারাদিন সঙ্গ দিয়ে রাতে বাসায় ফিরে যান। বেশির ভাগ সময় জরুরি প্রয়োজনে সেলিমা রহমান, শিরিন সুলতানা ও শিমুল বিশ্বাস তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় তাকে নানা তথ্য সম্পর্কে অবহিত করে, পরামর্শ ও নির্দেশনা নেন। কার্যালয়ের সামনে থেকে পুলিশ ব্যারিকেড তুলে নেয়ার পর দলের অনেক নেতাই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সেখানে গেছেন। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাননি। বিএনপি চেয়ারপারসনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, গ্রেপ্তার নিয়ে শঙ্কিত নন খালেদা জিয়া। কারণ তিনি অতীতে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন। আটক অবস্থায় দিন কাটিয়েছেন। এখনও এক অর্থে তিনি বন্দিজীবনই পার করছেন।

বন্ধ হয়ে গেল ৫০ বছরের পুরনো মাদরাসা by অমর ডি কস্তা

প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পরেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে বড়াইগ্রাম উপজেলার পারবাগডোব দাখিল মাদরাসা। দীর্ঘদিনেও সরকারি অনুদানভুক্ত (এমপিও) হতে না পারায় শিক্ষকরা হাল ছেড়ে দেয়ায় মাদরাসাটি বন্ধ হয়ে গেল। ফলে এলাকার ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্য মাদরাসায় ভর্তি হয়েছে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। এ ক্ষেত্রে বেশি বিপাকে পড়েছে জেডিসির নিবন্ধনকৃত ১৫ শিক্ষার্থী। মাদরাসা সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে স্থানীয় সমাজসেবক নওশের আলী এলাকার শিক্ষা বিস্তারের জন্য নিজ উদ্যোগে নিজের জমিতেই প্রতিষ্ঠা করেন পারবাগডোব ইবতেদায়ি মাদরাসা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্থানীয়দের অনুদানেই চলতো এর শিক্ষাব্যয়। ৩৬ বছর পরে ২০০০ সালে দাখিল শাখা খোলা হয়। এরপর শুরু হয় এমপিওভুক্তির উদ্যোগ। ২০০৬ সালে মাদরাসা বোর্ডের নিবন্ধন (স্বীকৃতি) লাভ করে। কিন্তু এমপিওভুক্ত না করতে পারায় এবং স্থানীয়দের অনুদানও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চলতি বছর জানুয়ারি থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে পাঠদান বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে বিদায় নিয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।
মাদরাসার অফিস সহকারী শের মাহমুদ বলেন, মাদরাসাটি বন্ধ হওয়ার সময় দ্বিতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ২৩৭ শিক্ষার্থী ছিল। সুপারিনটেনডেন্টসহ ১১ শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ১ দশমিক ৪৯ একর জমিতে খেলার মাঠ ও ১৩ কক্ষবিশিষ্ট দুটি আধাপাকা ঘর রয়েছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র রয়েছে। স্থানীয় অভিভাবক আবদুস সালাম বলেন, হঠাৎ মাদরাসাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছি আমরা। নিজ এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক মাওলানা আবদুস সামাদ বলেন, শিক্ষকতাকে মহান পেশা ভেবে বিনা বেতনেই সারাজীবন পড়িয়ে গেলাম। আগামী বছর আমার অবসরে যাওয়ার কথা। ভেবেছিলাম অবসরে যাওয়ার আগে হয়তো বেতন পাবো, কিন্তু সে আশা আর পূর্ণ হলো না।
সহকারী শিক্ষক মাহাববুর রহমান বলেন, এমএ পাস করার পর অনেক ভাল চাকরির সুযোগ পেয়েও বাড়ির কাছের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এখানেই ছিলাম। কিন্তু দীর্ঘ বছর অপেক্ষার পর এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হলো। আর একই সঙ্গে একটি স্বপ্নেরও করুণ মৃত্যু হলো।
মাদরাসার সুপার নিজামউদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এবং স্থানীয়রা সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়ায় প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা সম্ভব হলো না। গত ১০টি ব্যাচে এখানের শিক্ষার্থীরা জেডিসি ও দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভাল ফল করেছে। এলাকার অনেক দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা বাড়িসংলগ্ন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় লেখাপড়া করতো। এখন হয়তো সেটা বন্ধ হয়ে যাবে।
মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক সরকার বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সব দিক থেকেই ভাল ছিল। অবকাঠামোও মোটামুটি ঠিক ছিল। তবে একে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ ছাড়া আপাতত আর বিকল্প কিছু দেখছি না। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান ভাল ছিল। আমরা ওই মাদরাসাটি এমপিওভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছিলাম। ২০১০ সালের পর সরকার কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেনি। এর ফলে এমপিওভুক্তির বিষয় নিয়ে আর যোগাযোগ করা হয়নি। তবে মাদরাসাটি বন্ধ না করে এমপিওভুক্ত করার জন্য সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করলে হয়তো ভাল কোন ফল আসতে পারতো।

পুলিশ দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না -বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, কোন বিশৃঙ্খল অস্ত্র দিয়ে কোন শুভ কাজ হয় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, জনগণ আপনার পাশে না থাকলে পুলিশ দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। দেশের চলমান সঙ্কটে শান্তি ফিরিয়ে আনার দাবিতে মতিঝিলের দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থানের ৫ম দিনে আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আপনাকে নাকে খত দিতে বলি নি। আলোচনায় বসতে বলেছি। দেশের প্রয়োজনে আপনাকে চাড়ালের সঙ্গেও বসতে হবে। এসএসসি পরীক্ষার সময়ে হরতাল-অবরোধের সমালোচনা করে বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের সময় শেষ। এখন যারা এসএসসি পরীক্ষা দেবে তারা দেশের ভবিষ্যৎ। দয়া করে দেশের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না। টানা ৫ দিন অবস্থান করে কাদের সিদ্দিকী গতকাল প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। এ সময় তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখানে বসতে বাধা দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আমাকে বসার জন্য যেখানে জায়গা দেবে সেখানেই বসবো। দেশের শান্তি ফিরিয়ে আনার দাবিতে প্রয়োজনে মেথরপট্টিতে গিয়েও বসতে রাজি আছি। বঙ্গবীর বলেন, আমার অন্তরের সামান্য বেদনা দেশবাসীকে পৌঁছে দেয়ার জন্য এখানে সাংবাদিকদের আহ্বান করেছি। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে তিনি দলীয় কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আমি গত ২৮ তারিখ থেকে এখানে অবস্থান করছি। কিন্তু ভাবতে পারি নাই দেশের প্রয়োজনে ওরা এত কষ্ট শিকার করতে পারবে। বঙ্গবীর বলেন, আমার জীবন কখনও মসৃণ ছিল না, এখনও নয়। আমার অনেক সাথী মন্ত্রী হয়েছেন, ভবিষ্যতেও মন্ত্রী হবেন। কিন্তু আমি কখনও ফুল বিছানো মসৃণ পথে হাঁটি নি। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ২৫ বছর বয়সে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে লড়েছি, তখন আমার যা সামর্থ্য ছিল আমি করতে পেরেছি। আল্লাহ আমার সে তৌফিক দিয়েছিলেন। তবে এখন আমি আর অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধে যাবো না। কোন বিশৃঙ্খল অস্ত্র কোন শুভ কাজ করতে পারে না। আমি যখন মুক্তিযুদ্ধ করেছি তখন আমার যোদ্ধাদের হাজারো গুলি থাকার পরও একটা পিঁপড়া মারারও ক্ষমতা ছিল না। তিনি বলেন, এখন অনেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলেন। মুক্তিযুদ্ধ কোন ছেলেখেলা ছিল না। যাত্রাগানের আসর ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ ছিল মানবতার, সততার, ত্যাগ-তিতিক্ষার। আজকে আরেকটি যুদ্ধ হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ যুদ্ধ সততা-অসততার যুদ্ধ, সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের যুদ্ধ। পার্থক্য না বোঝার যুদ্ধ। আমি মনে করি এ যুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ অবশ্যই জয়ী হবে। কাদের সিদ্দিকী অবস্থানের উদ্দেশ্য নিয়ে বলেন, বিবেকের তাড়না থেকে এখানে সমবেত হয়েছি। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনাকে নাকে খত দিতে বলিনি, সঙ্কট সমাধানে আলোচনায় বসুন। সব রাস্তা বন্ধ করবেন না, কেয়ামত পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন না। দেশের মালিক জনগণ। তাই তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি সম্মান দেখান। প্রয়োজনে চাড়ালের সঙ্গেও আলোচনায় বসবেন।
এ সময় তিনি আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সমালোচনা করেন তিনি। খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুকে আল্লাহর গজব অভিহিত করে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বক্তব্য প্রসঙ্গে কাদের সিদ্দিকী বলেন, আপনি ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের নেতা। এমন কথা কেউ বলে? পাগলও বলে না। এসব বলে পার পাবেন না। কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরীর উদ্দেশে বঙ্গবীর বলেন, একসময় তিনি বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজাতেন। তার সঙ্গে আমি কথাও বলি না। কারণ হাসি মুখে তিনি কথা বলতে শেখেননি। তিনি আজকে আমার বোনের (প্রধানমন্ত্রীর) পাশের ছায়া।’ তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সমালোচনা করে বলেন, সারাজীবন তিনি আওয়ামী লীগের ধ্বংস চেয়েছেন। এখন তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের মুখপাত্র। বঙ্গবন্ধু মহান ছিলেন বলেই তিনি এখনও বেঁচে আছেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে কাদের সিদ্দিকী বলেন, তিনি মায়ের মতো মানুষ। কিন্তু তার পাশে শয়তানগুলো মনে হয় ভুলভাল বোঝাচ্ছে। আপনি বুকে হাত দিয়ে, আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে বলুন তো ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পেরেছে কিনা? ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আপনারা জিতেছেন। আপনি বৈধ হন আর অবৈধ হন, দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। আলোচনায় বসুন। এদিকে খালেদা জিয়া ও বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজনীতি একদিনের ব্যাপার না। অবরোধ তুলে নেন। বাচ্চাদের এসএসসি পরীক্ষা। তাদের পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেন। যত দিন সম্ভব হয় দুই নেত্রীকে আলোচনায় বসাতে মতিঝিলে অবস্থান করবেন বলে জানান কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ছাড়া সবার জন্য আমার দরজা খোলা। জামায়াতে ইসলামীও যদি দলীয়ভাবে জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাহলে তাদের জন্যও বিবেচনা করে দেখবো আমার দরজা খোলা যায় কিনা।
আল্লাহর দুনিয়াতে কে কখন রাজা আর কখন প্রজা বলা যায় না। তিন মাস আগেও আমার ভাই (লতিফ সিদ্দিকী) মন্ত্রী ছিলেন। এখন তিনি কারাগারে। আজকে যারা মন্ত্রী আছেন তাদেরও যে মন্ত্রিত্ব থাকবে সে কথা বলা যায় না। ‘আওয়ামী লীগের সবাইকে কেনা যায় একজনকে ছাড়া’ প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বঙ্গবীর বলেন, আপনি এখানে এসে দেখেন, মতিঝিলের একজন রিকশাওয়ালাকেও কিনতে পারবেন না। কোকোর মৃত্যুর খবরে প্রধানমন্ত্রীর সবেদনা জানাতে যাওয়ার পর খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে না দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) অচেতন হতেই পারেন, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা গেটে তালা লাগিয়ে দিয়েছিলেন কেউ কেউ বলেন তারা আওয়ামী লীগের এজেন্ট।
তার অবস্থানস্থল থেকে পুলিশ বাঁশ এবং কাঠ নিয়ে গেছে উল্লেখ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আমার বাসা থেকে যেসব জিনিসপত্র নিয়ে গেছিল তারও একটা সিজার লিস্ট দিয়েছিল। একমাত্র চোরেরাই কোন সিজার লিস্ট দেয় না। রাতে পুলিশও ওগুলো চুরি করে নিয়ে গেছে, কারণ তারাও সিজার লিস্ট দেয়নি। তিনি পুলিশ বাহিনীকে বেশি বাড়াবাড়ি না করারও পরামর্শ দেন। সংবাদ সম্মেলনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান খোকা বীর-প্রতীক, সহ-সাধারণ সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার, কেন্দী্রয় নেতা ফরিদ আহমেদ, অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম, যুব আন্দোলনের আহ্বায়ক হাবিব-উন-নবী সোহেল, ঢাকা মহানগরী যুব আন্দোলনের সমন্বয়ক ফারুক আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

জনগণের টাকায় ‘উল্লাস’ বন্ধের নির্দেশ

গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানী লিমিটেড (জিটিসিএল)-কে ফাইভ স্টার হোটেলে এজিএম অনুষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। গ্যাসের মূল্য পরিবর্তনের শুনানি চলাকালে বিইআরসি চেয়ারম্যান এ আর খান এ নির্দেশ দেন। কোম্পানির প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, আপনারা নিজের পকেটের টাকায় হোটেল রুপসী বাংলায় কয়দিন খেয়েছেন? আমি তো কখনও খাইনি। জনগণের টাকায় এধরণের ‘উল্লাস’ করার অধিকার কে দিয়েছে? আজ থেকে এ উল্লাস রহিত করা হল। এ আর খান আরও বলেন, এখন থেকে জিটিসিএল এধরনের কোন ব্যয় করলে তা কমিশনের অনুমতি নিয়ে করতে হবে। জিটিসিএল’র কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা আনার নির্দেশও দেন বিইআরসি চেয়ারম্যান। সোমবার সকালে বিইআরসি কার্যালয়ে গ্যাসের মূল্য পরিবর্তন সংক্রান্ত গণশুনানি শুরু হয়েছে। এতে গ্যাসের সঞ্চালন ট্যারিফ বাড়ানোর জন্য বিইআরসি কাছে প্রস্তাব করেছিল জিটিসিএল। প্রস্তাবে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের সঞ্চালন ট্যারিফ ৩২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৭ পয়সা করার কথা বলা হয়। জিটিসিএল’র এ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে গ্যাসের সঞ্চালন ট্যারিফ কমিয়ে ১৩ পয়সা করার সুপারিশ করে বিইআরসির মূল্যায়ন কমিটি।  শুনানি গ্রহণ করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান এ আর খান, সদস্য ড. সেলিম মাহমুদ, প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন, রহমান মুরশেদ ও মো. মাকসুদুল হক। শুনানিতে পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও ভোক্তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

পর্নো ভিডিও বানিয়ে গ্রেপ্তার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির পঞ্চম তলার লাইব্রেরিতে বসে নিজের পর্নো ভিডিও বানিয়ে রীতিমতো ঝড় তুলেছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ছাত্রী। এখানেই শেষ নয়। ৩১ মিনিটের ওই পর্নো ভিডিওটি তিনি পোস্ট করেছেন পর্নোগ্রাফির ওয়েবসাইট পর্নহাব এবং ইউটিউবে। ৪ দিনের মধ্যেই ইউটিউবে প্রায় ৭ লাখ বার দেখা হয়েছে তার ভিডিওটি। পর্নো ওয়েবসাইটগুলোতে বেশ কয়েক লাখ বার দেখা হয়েছে এটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি লাইব্রেরি ফাঁকা পেয়ে এ কাণ্ড ঘটান ১৯ বছর বয়সী কেন্ড্রা সান্ডারল্যান্ড নামের ওই ছাত্রী। ওরেগনের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ায়নি ঘটনাটি। ভ্যালি লাইব্রেরিতে পর্নো ভিডিও ধারণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাকে। জনসমক্ষে অশ্লীলতার দায়ে কেন্ড্রার বিরুদ্ধে একটি মামলা করার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন মেইল। ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মুখে ঘুরেফিরে একটাই আলোচনা ও সমালোচনা। কোন কোন শিক্ষার্থী বিষয়টিকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। বিপরীত চিত্রও রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পড়েছেন বিব্রতকর অবস্থায়। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো থেকে যখন ভিডিওটি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয় আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, তার আগেই সেটি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে এক ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইসে। এদিকে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ পড়েছে বিপাকে। শিক্ষার্থীবহুল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে আধ-ঘণ্টা ধরে পর্নো ভিডিও ধারণ করায় বিস্মিত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র স্টিভেন ক্লার্ক বলছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পর্যবেক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন। কিন্তু, তাদের পক্ষে একই সঙ্গে একই সময়ে সব জায়গায় যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলছিলেন, কল্পনা করুন ৬টি তলা, ৩ লাখ ৪০ হাজার বর্গফুট জায়গা। প্রতি সপ্তাহে এখানে ৩০ হাজার মানুষের আনাগোনা।

ওবামা ও হনুমান by হামিদ মীর

হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহ:-এর ওপর দিল্লির শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক নাখোশ ছিলেন। কেননা শাসকের দরবারে এই বুজুর্গ সুফি যাওয়া-আসা করতেন না। সর্বসাধারণের মাঝে হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহ:-এর গ্রহণযোগ্যতা তুঘলকের ভালো লাগত না। একবার তুঘলক বঙ্গ অঞ্চলে যুদ্ধবিগ্রহ শেষে দিল্লি ফিরে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি দ্রুতগতির দূতের মাধ্যমে হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহ:-এর কাছে পয়গাম পাঠালেন, আমার পৌঁছার আগেই আপনি অন্য কোথাও চলে যাবেন। দিল্লিতে হয় আপনি থাকবেন, নয় আমি থাকব। যদি আপনি শহর ত্যাগ না করেন, তাহলে পরিণাম ভালো হবে না। হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহ:কে ওই ধমকমিশ্রিত পয়গাম শোনানো হলে তার পবিত্র মুখ দিয়ে আপনাআপনি এই বাক্য বেরিয়ে এলো, ‘হনুয দিল্লি দূর অস্ত’ (দিল্লি এখনো দূরে)। সুলতান গিয়াসউদ্দিন বঙ্গবিজয় করে ফিরে আসছেন। এ উপলে তার অভ্যর্থনার জন্য পুরো শহরকে সাজানো হলো। শহর থেকে কিছু দূরে তুঘলকাবাদে একটি অস্থায়ী মহল নির্মাণ করা হলো, যাতে বিজয়ী সুলতান এখানে এসে কিছু সময় বিশ্রাম নেবেন। অতঃপর ফুরফুরে তরতাজা হয়ে শান-শওকত নিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করবেন। তুঘলক ওই অস্থায়ী মহলে খাবার খাচ্ছেন। এ দিকে দিল্লিতে হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহ:-এর মুরিদরা চিন্তা করছেন, সুলতান শহর থেকে সামান্য কয়েক মাইল দূরে রয়েছেন। যখন তিনি শহরে প্রবেশ করবেন, না জানি কী ঘটবে! ও দিকে সুলতান খাবার শেষ করে হাত ধুচ্ছিলেন। ওই সময় আকাশে বজ্রপাত হলো। সেই সাথে অস্থায়ী মহলের ছাদ দড়াম করে মাথার ওপর ভেঙে পড়ল। সুলতান তার পাঁচজন সঙ্গীসহ মারা গেলেন। দিল্লিতে তার লাশ পৌঁছল। এরপর ‘হনুয দিল্লি দূর অস্ত’ ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়ে গেল। কয়েক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ভারত সফরে এসেছিলেন। নরেন্দ্র মোদির সাথে তার যৌথ প্রেস কনফারেন্সের সময় হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহ:-এর বিখ্যাত উক্তিটি এই অধমের বারবার মনে পড়ছিল। দিল্লিকে বর্তমানে দেহলি বলা হয়। আজ তা নরেন্দ্র মোদির রাজধানী। মোদি কয়েক বছর আগ পর্যন্ত মার্কিনিদের কাছে অত্যন্ত অপছন্দের মানুষ ছিলেন। তাকে আমেরিকার ভিসা প্রদানে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল। ওবামার সাথে বারবার আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে মোদি এ কথা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, তারা দু’জন ছোটবেলার বন্ধু। মোদি ও ওবামার যৌথ প্রেস কনফারেন্সে এর প্রভাব দেখা গেছে। ওবামা ভারতকে দণি এশিয়ার রক বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু যখনই ওবামা বললেন, তিনি ভারতকে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হতে সহায়তা করছেন, তখন আমার মনে হলো, নিরাপত্তা পরিষদের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ ভারতের জন্য ‘হনুয দিল্লি দূর অস্ত’-এর মতো। ওবামা এমনই এক বক্তব্য ২০১০ সালে তার ভারত সফরে দিয়েছিলেন। পাঁচ বছর পর ২০১৫ সালে ওবামা পুরনো বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করলেন, যা শুনে ভারত সরকার ও মিডিয়া আনন্দে দেওয়ানা হয়ে গেছে। তারা এ কথা ভুলে গেছে, যে শহরে ওবামা ভারতকে লবডঙ্কা দেখালেন, ওই শহরে গালিব নামের এক কবিও শায়িত আছেন। তিনি বলেছিলেন- আমাদের জানা আছে জান্নাতের বাস্তবতা, কিন্তু গালিব, মনকে খুশি রাখতে এ কল্পনা যে ভালো। ভারতীয়দের খুশি রাখতে ওবামা বারবার এমন এক কল্পনা পেশ করছেন, যার বাস্তবরূপ দেয়া বেশ কঠিন। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্যের মধ্যে আমেরিকা ছাড়া ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও চীন রয়েছে। আমেরিকা শুধু ভারতকে নয়, বরং জাপানকেও এ টোপ দিয়ে রেখেছে যে, সে তাকে নিরাপত্তা পরিষদের পূর্ণাঙ্গ সদস্য বানাবে। জাপান ও ভারতের মাঝে একটি মিল রয়েছে। তা হচ্ছে উভয়েরই চীনের সাথে সীমান্ত বিবাদ রয়েছে। সম্প্রতি আমেরিকা জাপান ও ভারতের সাথে যৌথভাবে চীনের নিকটবর্তী সমুদ্রে নৌমহড়াও করেছে। ওবামা ভুলে গেছেন, নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্যেরই ভেটো শক্তি রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য জাতিসঙ্ঘের সনদে সংশোধনী প্রয়োজন, যার জন্য জাতিসঙ্ঘের মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আবশ্যক। যদি এ সংশোধনী হয়েও যায়, তারপরও চীন ভারতের সদস্যপদ লাভে ভেটো দিতে পারবে। নিরাপত্তা পরিষদের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভের প্রার্থীদের মধ্যে শুধু জাপান ও ভারত নয়, বরং জার্মানি ও ব্রাজিলও রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকা মহাদেশের কোনো প্রতিনিধি নেই। জাপান বা ভারতকে নিরাপত্তা পরিষদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টায় আফ্রিকার দেশগুলোতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ওবামা ও তার স্ত্রী মিশেল নিজেদের আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিনিধি বলে থাকেন। অথচ ভারত সফরে ওবামা যা কিছু বলেছেন, তার উদ্দেশ্য শুধু ভারতের বাজারে মার্কিন পণ্য বিক্রি করা। ভারতীয়দের খুশি করার জন্য শুধু চীন-পাকিস্তান নয়, বরং পুরো আফ্রিকাকেও নারাজ করতে বিন্দুমাত্র চিন্তা করা হয়নি।
এবারের ভারত সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা নরেন্দ্র মোদির চায়ের বেশ প্রশংসা করেছেন। কিছু হিন্দি বলারও চেষ্টা করেছেন। এ সফরে আরো একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, যার ওপর পাকিস্তানি ও পশ্চিমা মিডিয়াতে বেশি আলোচনা হয়নি। ভারত সফরে ওবামা হিন্দুদের এক ভগবান হনুমানের ডঙ্কাও বাজিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তিনি শুধু হনুমানজিকেই ভক্তি করেন তা নয়, বরং তিনি সর্বদা তার একটি ছোট মূর্তি নিজের কাছেও রাখেন। এ খবরটি আমরা এভাবে পেয়েছিÑ মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় আমরা ওবামার সফরের ওপর জিও নিউজ এবং ভারতের হিন্দি চ্যানেল আজতক টিভির এক যৌথ প্রোগ্রাম সূচনার আগে ইসলামাবাদের স্টুডিওতে বসে দিল্লি থেকে আজতক টিভির হেডলাইন শেষ হওয়ার অপো করছি। হঠাৎ ভারতীয় টিভির সংবাদপাঠিকার এ শব্দগুলো আমার কানে এলো, ‘ওবামাও হনুমানভক্ত। তিনি হনুমান মূর্তি সর্বদা সঙ্গেই রাখেন।’ অতঃপর আমাদের প্রোগ্রাম শুরু হলো। প্রোগ্রাম শেষ হলে আমি দিল্লিতে ফোন করে ওবামা ও হনুমান সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করি। জানা গেল, ওবামা এল কে আদভানির কন্যা প্রতিভা আদভানির সাথে সাাৎকালে বলেছেন, তিনি হনুমানকে ভক্তি করেন। তার মূর্তিও সঙ্গে রাখেন। অতঃপর ওবামা তার পকেট খোলেন এবং হনুমানের ছোট্ট একটি মূর্তি বের করে প্রতিভাকে দেখান। হনুমান হিন্দুদের রামায়ণ ও মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। হিন্দু বর্ণনা মতে, হনুমানের আকৃতি বানরের সাথে মিলে যায়। হনুমান রাম-রাবণের লড়াইয়ে রামের প নেন এবং সীতাকে লঙ্কা থেকে খুঁজে নিয়ে আসেন। ওবামা প্রতিভাকে জানান, তিনি হনুমানকে নিজের জন্য বেশ সৌভাগ্য মনে করেন। ২০০৮ সাল থেকে তিনি হনুমানের মূর্তি নিজের সাথে রাখছেন। ওবামার ভারত সফরের সবচেয়ে বড় খবর এটাই যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এক হিন্দু ভগবানকে ভক্তি করেন। এটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। তিনি যাকে ইচ্ছা ভক্তি করবেন, যাকে ইচ্ছা ভক্তি করবেন না। কিন্তু মনে রাখবেন, তার বক্তব্য ও পলিসি দ্বারা দণি এশিয়ায় যেন উত্তেজনা বৃদ্ধি না পায়। এমনিতেই তিনি তো পাকিস্তানকে বেশ ভালো সবক দিয়েছেন, আমেরিকা কারো বন্ধু নয়, শুধু নিজের বন্ধু। কিন্তু ওবামার ভারত সফরের পর ওবামার অবস্থা পাকিস্তানের শাসকদের চেয়ে ভিন্ন কিছুই নয়Ñ
না মিলল খোদা, না প্রেমিকার মিলন
না রইল একূলের কিছু, না রইল ওকূল।
পাকিস্তানের দৈনিক জং থেকে
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জলাভূমি by জিয়াউর রহমান লিটু

আজ আন্তর্জাতিক জলাভূমি দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জলাভূমির আয়তন হ্রাসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ ও জলাভূমির জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থান সংরক্ষণে জাতিসংঘের আয়োজনে ইরানের রামসার শহরে ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি একটি কনভেশন অনুষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতিবছর ২ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক জলাভূমি দিবস পালিত হয়ে আসছে সারাবিশ্বে। মূলত জলাভূমির গুরুত্ব এবং এর মূল্য সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করতে রামসার সচিবালয় থেকে প্রত্যেক বছর আলাদা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয় প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ওপর। এই বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'জলাভূমি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য'।
মানব জীবনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে জলাভূমির ওপর। জলাভূমি আমাদের বহুমাত্রিক সুবিধা প্রদান করে থাকে। আমাদের পানি পরিশোধন ও চাহিদা পূরণ, খাদ্য উৎপাদন, উপকূল রক্ষা করার জন্য প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে ও জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবস্থাপনায় জলাভূমি কাজ করে থাকে। দুর্ভাগ্যবশত, জলাভূমির সুবিধাগুলো আমাদের ব্যাপকভাবে জানা না থাকায় ১৯০০ সাল থেকে বিশ্বে জলাভূমি ৬৪ ভাগ হ্রাস পেয়েছে।
আজকের তরুণ ভবিষ্যতের নেতা এবং আগামী দিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। তাই তারা পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্ব জলাভূমি দিবস ২০১৫ তরুণ ও যুবকদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জলাভূমির অস্তিত্ব ও গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে যে জলাভূমি পৃথিবীর ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য।
জলাভূমি আমাদের সুপেয় পানি নিশ্চিত করে। বিশ্বে ৩ ভাগ সুপেয় পানি রয়েছে। এর মধ্যে ১ ভাগ পানি ব্যবহার উপযোগী, বাকি ২ ভাগ পানিই বরফ। তবুও প্রত্যেক মানুষের মৌলিকভাবে প্রতিদিন ২০-৫০ লিটার পানি প্রয়োজন খাওয়া, রান্নাবান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য। জলাভূমি এসব পানি সরবরাহ করে থাকে। এছাড়াও জলাভূমি ভূগভস্থ পানি পরিশোধন ও রিচার্জ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জলাভূমি থেকে সরাসরি মৎস্য, কৃষিকাজ, প্রাকৃতিক পানি সঞ্চালন, নৌ-যাতায়াত, বিনোদনের সুবিধা আমরা পাই। পরোক্ষভাবে জলাভূমি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টির পানি ধারণ, পানি-বাতাস ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ঘটায়। এগুলো সংরক্ষণের মাধ্যমে উলি্লখিত সুবিধাগুলো আগামী প্রজন্মের জন্য নিশ্চিত করতে পারি। দিন দিন জলাভূমি সংকোচনের ফলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে পানি ধারণ করার মতো পর্যাপ্ত জলাভূমি না থাকায় শহর এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। জলাভূমি কমে যাওয়ায় ভূগর্ভে পানি স্তর ক্রমেই নিচে চলে যাচ্ছে। যে কারণে সবার দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটানোর জন্য সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন ও আবাসনের কারণে একের পর এক দখল এবং ভরাট হয়ে গেছে ঢাকা মহানগরের জলাভূমিগুলো। ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগরীর মোট জলাভূমির ৩৩ শতাংশ নগরায়নের জন্য নিঃশেষ হয়ে গেছে। সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন। এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলাধার সংরক্ষণ আইনেও সুস্পষ্টভাবে জলাভূমি সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা শহরে জলাভূমি হ্রাসের ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই বেশি দায়ী। যা আছে তা সংরক্ষণে মাঝে মধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হলেও এ ধারাবাহিকতা না থাকায় পরে আবার দখল হয়ে যায়। এজন্য জলাশয় রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা ছাড়াও বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা সর্বাধিকভাবে জলাভূমি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আরেকটি রক্তাক্ত দিন - ভাষান্তর by সুভাষ সাহা

শুক্রবার জুমার নামাজের সময় পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের শিকারপুর লাখিদার এলাকার একটি মসজিদে শক্তিশালী বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। গত ডিসেম্বরে সেনা স্কুলে হামলার পর পাকিস্তানে এটাই বড় ধরনের হামলার ঘটনা। এতে নিহত হয়েছেন ৫০ জনের বেশি এবং আহতের সংখ্যাও ৫০-এর অধিক। এ প্রাণঘাতী হামলা নিয়ে পাকিস্তানের ডন ও দি নিউজ পত্রিকার দুটি সম্পাদকীয় ভাষান্তর করেছেন সুভাষ সাহা >> যখন নওয়াজ শরিফ করাচিতে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অ্যাকশন প্ল্যান নিয়ে প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনারত ছিলেন তখন জঙ্গিবাদ যে কতটা ভয়াবহ আকার নিয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া গেল একটি বর্বরোচিত ঘটনা সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে। এতে জঙ্গিবাদ দমন যে এখন কেবল অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়নে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না তাও স্পষ্ট হলো। শিকারপুরে ইমামবাগে এক শিয়া মসজিদে শুক্রবারের নামাজ চলাকালে ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আমাদের সুনি্নদের মতো পবিত্র জুমাবারে নামাজে এ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় কমপক্ষে ৫০ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এতে আমরা কবে এ ধরনের বোমা হামলায় হতাহতের ঘটনা বা একই ধরনের সম্প্রদায়গত বিদ্বেষজাত হামলায় হতাহতের মতো ঘটনা থেকে মুক্তি পাব সেটাই এক বিরাট জিজ্ঞাসা চিহ্ন হয়ে উঠেছে। এ ধরনের ভয়ানক জঙ্গিবাদ যা আমাদের সমাজকে বিদীর্ণ করছে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনো সাফল্য এখনও পর্যন্ত আসেনি। বছরের পর বছর ধরে আমরা সম্প্রদায়গত সহিংসতার শত শত ঘটনায় অনেক মানুষের হতাহত হওয়া দেখে আসছি। লাখিদার এলাকার কারবালা মওলা ইমামবাগের হামলা এর সঙ্গে নতুন সংযোজন। ইসলামের পবিত্রতম সপ্তাহের এ দিনটি দেশের বিরাট অংশের কাছে শোকের দিনে পরিণত হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত আরও ৫০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের কাছে বা যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের কাছে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি ও সিন্ধু সরকারের সদস্যদের এ সহিংস ঘটনার তীব্র নিন্দা কোনো সান্ত্বনাই বয়ে আনবে না। এসব পরিবারের ক্ষতি কোনো মতেই পূরণ হওয়ার নয়। আমরা জাতি হিসেবে এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারি না তাই বোঝা যায়। পুলিশ বলেছে, বোমা প্লাস্টিকে মোড়ানো ছিল এবং এটি মসজিদের ভেতরে রাখা হয়। এটি বিস্ফোরণেই মসজিদের ছাদের একটি অংশ বিধ্বস্ত হয় এবং এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে হতাহত হয়। এই সর্বশেষ হামলার ঘটনাটির দায় জাদুল্লা জঙ্গিবাদী সংগঠনটি ঘটিয়েছে বলে দাবি করেছে এবং সংগঠনটির মুখপাত্র শিয়াদের তাদের শত্রু বলে উল্লেখ করে। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে এই সংগঠনটি ইতিমধ্যে একাত্মতা ঘোষণা করে এবং মনে হয় এরা আইএসের মতো একই হত্যার দর্শনে বিশ্বাসী। আমরা যখন অসহায়ভাবে এসব পর্যবেক্ষণ করছি তখন এ সংগঠনটির প্রভাব আমাদের দেশেও বিস্তৃত হয়ে চলেছে। বাস্তবতা হলো, এ ধরনের ধ্বংসাত্মক তৎপরতাকে মেনে নেওয়ার মতো সুযোগ আমাদের নেই। গত ডিসেম্বরে পেশোয়ারে সামরিক স্কুলে হামলার ঘটনার পর সরকার জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নিয়েছে তা অনেকটা কসমেটিক প্রকৃতির। এটা সুস্পষ্ট যে, কেবল ফাঁসি দিয়ে জঙ্গিদের প্রতিরোধ করা যাবে না। ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে একের পর এক বক্তব্য দিয়ে বা কিছু কট্টরপন্থি মৌলভীকে আটক করে আমরা যে অবস্থার মধ্যে রয়েছি, তার পরিবর্তন ঘটানো যাবে না। বাস্তবতা হলো নারকীয়। জঙ্গিবাদী যোদ্ধারা সবাই এখন বেরিয়ে পড়েছে যাদের শত্রুজ্ঞান করে তাদের হত্যা করার জন্য। এখন আমরা দেখতে চাই, ঘৃণা ছড়ানো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় মৌলভীদের আটক করে এবং আমাদের ছোট-বড় শহরে হামলার সুযোগ যেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোর যোদ্ধা বা কর্মীরা না পায় তার ব্যবস্থা করা। সরকার কি এসব সংগঠনের তৎপরতাকে স্তিমিত করতে পারে? যতদূর মনে হচ্ছে, এই ফ্রন্টে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। আমরা সরকারের বারবার ব্যর্থতা দেখতে চাই না।

সম্প্রসারমান এক যুদ্ধ - ভাষান্তর by সুভাষ সাহা

শুক্রবার জুমার নামাজের সময় পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের শিকারপুর লাখিদার এলাকার একটি মসজিদে শক্তিশালী বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। গত ডিসেম্বরে সেনা স্কুলে হামলার পর পাকিস্তানে এটাই বড় ধরনের হামলার ঘটনা। এতে নিহত হয়েছেন ৫০ জনের বেশি এবং আহতের সংখ্যাও ৫০-এর অধিক। এ প্রাণঘাতী হামলা নিয়ে পাকিস্তানের ডন ও দি নিউজ পত্রিকার দুটি সম্পাদকীয় ভাষান্তর করেছেন সুভাষ সাহা >> পাকিস্তানে একই ধরনের ধ্বংসাত্মক ঘটনা বারবার সংঘটিত হয়েছে। এবার শিকারপুরে শুক্রবারের নামাজের সময় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন, আহত হয়েছেন আরও অনেকে। তাদের মধ্যে অনেকের আঘাত গুরুতর। বোমা বিস্ফোরণটি কতটা ভয়াবহ ছিল তা আঁচ করা যায় ভবনের ছাদ ধসে পড়ার ঘটনা থেকে। অনেকে সে সময় ভবনে বিধ্বস্ত ছাদের নিচে চাপা পড়েন। এ বছরের শুরুর পর থেকে এটি সম্প্রদায়গত দ্বিতীয় বড় হামলার ঘটনা। এর আগেরটির দায়িত্ব স্বীকার করেছিল তেহরিক-ই তালেবানের (টিটিপি) একটি অংশ। রাওয়ালপিন্ডির ওই হামলায় তখন ৭ জন নিহত হয়েছিলেন, আহত হন ২০ জন। তবে শিকারপুরের হামলার ঘটনাটি নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রথম সিন্ধু প্রদেশের দূরবর্তী এলাকায় বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটল। আর এই ছোট্ট শহরটি সুফি ইসলামের ঐতিহ্যগত স্থান। ফলে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইটা পাহাড়ি এলাকা ছাড়াও সিন্ধুসহ ছোট-বড় শহরেও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা মূর্ত হয়েছে। এতে সরকারের অপশাসন রাষ্ট্রের অসামর্থ্যতার সঙ্গে মিলে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী প্রভাবকে কীভাবে বিস্তৃত করে তারও প্রমাণ পাওয়া গেল। কয়েক বছরে সিন্ধু প্রদেশ ক্রমশ রেডিক্যালাইজেশনের দিকে নেমে যাওয়া ও ধর্মীয় বিভেদ বৃদ্ধির বিষয়কে অগ্রাহ্য করে আসা হয়েছিল। সেখানে বেশ কয়েকটি হিন্দু মন্দির ধ্বংস বা অপবিত্র করা ও হিন্দু মেয়েদের বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করার ঘটনা ঘটেছিল। দেওবন্দি সাম্প্রদায়িক গ্রুপ এসব কাজে ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করে চলেছে। প্রথাগত শিক্ষা অবহেলা করার কারণে এখানে-সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো মাদ্রাসার বিস্তার ঘটেছে। এসব মাদ্রাসায় গরিব পরিবারের ছেলেদের ভর্তি করিয়ে ধর্মীয় কট্টরপন্থি গ্রুপ তাদের রক্ষণশীল মানসিকতায় অনড় কর্মী গড়ে তোলে। সিন্ধুতে সুশাসনের অভাবের কারণে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তাতে করে প্রদেশের সরকারের পক্ষে মৌলবাদী এসব জঙ্গি গ্রুপকে মোকাবেলা করা বা তাদের বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। এই শাসনশূন্যতার কারণেই শিকারপুরের শিয়া মসজিদে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটাতে পেরেছে দুর্বৃত্তরা।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক রিপোর্টে পাকিস্তান সরকারকে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ ও তাদের রক্ষা করার ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের অশুভ বিস্তার সম্পর্কে সরকার জনগণের মধ্যে সচেতনতামূলক ঐকমত্যকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। আর সরকারের এ অক্ষমতার কারণে দেশে সাম্প্রদায়িক ও সহিংস ঘটনার বিস্তার রোধের আশা করা যায় না। দেশের পরিস্থিতিরও এতে ইতরবিশেষ ঘটবে বলে মনে হয় না। শিকারপুরের ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, সে সময় প্রধানমন্ত্রী করাচিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করছিলেন। পেশোয়ারে সামরিক বাহিনী পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলার পর কয়েকজন জঙ্গিকে দ্রুত ফাঁসি দেওয়ার মতো ঘটনা আমরা দেখতে পেয়েছি। এখন শিকারপুরের ঘটনার পর বেশি কিছু ঘটবে বলে আশা করাটা বাতুলতা মাত্র। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অ্যাকশন প্ল্যান কোথায়? ধর্মীয় উগ্রপন্থিরা যখন শার্লি এবদোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা জোরদার ও তাদের রাস্তার শক্তির জানান দিয়েছে তখন সরকার পিছু হটেছে বলেই দৃশ্যত মনে হচ্ছে। এসব উগ্রবাদীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের পরিবর্তে সরকার নমনীয় অবস্থান নিয়েছে।