Showing posts with label ভোরের কাগজ. Show all posts
Showing posts with label ভোরের কাগজ. Show all posts

Wednesday, August 5, 2020

প্রফেসর অনুপম সেন: মানুষের অধিকার আদায়ের অগ্রসৈনিক by ড. আতিউর রহমান

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন বর্তমান সময়ের এক বিরল মেধাবী শিক্ষক, গবেষক এবং সমাজ পরিবর্তনের সক্রিয় পণ্ডিত ব্যক্তি। ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রফেসর সেনকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জানি এ দাবি আমি করবো না। তবে বেশ কয়েকবার দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। কথাও হয়েছে। কিন্তু তাঁর লেখালেখির সাথে আমি পরিচিত। সমাজতত্ত্ব ও সাহিত্য-শিল্পকলার নানা দিক নিয়ে তাঁর মৌলিক লেখা আমি পড়েছি। বিশেষ করে বিশ্ববিখ্যাত প্রকাশনী সংস্থা রৌটলেজ (জড়ঁঃষবফমব) থেকে তাঁর পিএইচডি থিসিস নির্ভর গ্রন্থটি গভীর মনোযোগের সাথে পড়েছি। ভারতীয় রাষ্ট্র, শিল্পায়ন ও শ্রেণিসংগঠন বিষয়ে তাঁর এই গবেষণাধর্মী বইটি মার্ক্সীয় ধারার গবেষকদের জন্য একটি আকর গ্রন্থ বললে ভুল হবে না। আমিও মার্ক্সীয় অর্থনীতি বিষয়ে পিএইচডি থিসিস লিখেছি। সেই থিসিস লন্ডনের জেড বুকস থেকে ‘পেজেন্টস অ্যান্ড ক্লাসেস’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। তাই আমি তাঁর এই গবেষণার মর্ম কিছুটা হলেও বুঝতে পারি। প্রফেসর সেন পরবর্তী সময়ে অন্য যেসব প্রকাশনা ও বক্তৃতা করেছেন সেগুলো ঐ মৌলিক গবেষণার সূত্র ধরেই এগিয়েছে। তাঁর দেয়া গণবক্তৃতাগুলো একদিকে যেমন ঐতিহাসিক শ্রেণি-প্রেক্ষাপটে লেখা, অন্যদিকে সমসাময়িক অর্থনীতি ও সমাজের সাথে সম্পর্কিত করার এক আন্তরিক প্রচেষ্টার ফসল। ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ’ বিষয়ে তাঁর বইটিও এই প্রেক্ষাপটেই লেখা। আমি মূলত এই তিনটি বইয়ের আলোকেই তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান বিষয়ে কিছু বলার চেষ্টা করবো। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের চেয়ে তাঁর লেখালেখি বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমেই তাঁর পঞ্চাশ বছরের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের জন্য শ্রদ্ধা জানানো বেশি প্রাসঙ্গিক হবে বলে আমার বিশ্বাস। তাঁর ‘ঞযব ঝঃধঃব, ওহফঁংঃৎরধষরুধঃরড়হ ধহফ ঈষধংং ঋড়ৎসধঃরড়হ রহ ওহফরধ’ বইটি মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা হলেও এতে নয়া-মার্ক্সবাদী ভাবনার সংযোজন বেশ স্পষ্ট। তবে বুদ্ধিবৃত্তিক পাটাতনটি তিনি ধ্রুপদী মার্ক্সীয় ভাবনাতেই উপস্থাপন করেছেন। এর ওপর যে কাঠামো গড়েছেন তাতে সমকালীন নয়া-মার্ক্সবাদীদের ভাবনা বেশ মুন্সিয়ানার সাথেই তিনি সংযোজন করেছেন।
এক সময় ভারত বৃটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সম্পদশালী উপনিবেশ ছিল। স্বাধীন ভারত গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক পথের দিশা দেয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। দেশটি দীর্ঘ দিন দারিদ্র্য ও স্থবিরতার প্রতীকে পরিণত হয়। অবশ্যি, সম্প্রতি ভারতের অর্থনীতি পুঁজিবাদী পথে হাঁটতে শুরু করেছে। তবে দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনা এখনো তীব্র। বৈষম্যও প্রকট। অনেকেই ভারতের এই স্বাধীনতা-উত্তর স্থবিরতাকে তার সংস্কৃতির বন্ধ্যত্বের মাঝে খুঁজছেন। কিন্তু ড. অনুপম সেন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মার্ক্সীয় ধ্যাণধারণা থেকে এ বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। শ্রেণি বিন্যাসের আলোকে তিনি দেখিয়েছেন যে ভারতে পরম্পর স্বার্থবিরোধী শ্রেণিগুলোর পূর্ণ বিকাশ বা দখল সম্ভব হয়নি। এর প্রভাব ভারতীয় রাষ্ট্রের চরিত্রের ওপর পড়েছে। এশীয় উৎপাদন পদ্ধতির রেশ স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে এখনো বজায় রয়েছে। ফলে ভারতে সামাজিক রূপান্তর সেভাবে গতিময় হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে দেশটিতে ইউরোপের মতো ধ্রুপদী বুর্জোয়া রূপান্তর ঘটেনি। কিছু কিছু রাজ্যে (যেমন পাঞ্জাব ও হরিয়ানায়) আধুনিক কৃষির উদ্ভব ঘটলেও সারা দেশে তার বিস্তার সেভাবে ঘটেনি। শিল্পায়নও এতটা ঘটেনি যে গ্রামীণ মানুষগুলো শিল্পাঞ্চলে কাজের সন্ধানে যাবেন। সে কারণে ভারতের অনেক রাজ্যেই দারিদ্র্য খুবই প্রকট। তা ছাড়া, ভারতে এমন কোনো সমাজ বিপ্লবও ঘটেনি যে শহরের খেটে খাওয়া মানুষগুলো গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের সাথে জোট বেঁধে সংগ্রাম করে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করতে পেরেছেন।
ভারতীয় সমাজের এই স্থবিরতা কেন ঘটেছিল সে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন মার্ক্স ও এঙ্গেলস তাঁদের মৌলিক লেখায়। ড. সেন সেসব কথার সূত্র ধরেই বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। তবে সেখানেই থেমে যাননি তিনি। আধুনিক কালের মার্ক্সীয় চিন্তকদের বিশ্লেষণও তিনি একই সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। পুরো আলোচনায় এই মেধাবী সমাজতাত্ত্বি¡ক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত শ্রেণিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের ফসল হিসেবে কোন ধাঁচের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে তার ইঙ্গিত করেছেন। সেই আলোকেই তিনি কেন নেহেরুর স্বাধীনতা-উত্তর ভারত স্থবিরতার শিকার হলো তার ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে জার্মানিতে বিসমার্কের শাসনামলে শক্তিশালী আমলাতন্ত্রের সহযোগিতায় পুঁজিবাদী সামাজিক বিবর্তনের ফলে শিল্পায়ন কি করে ঘটল সে ব্যাখ্যাও যুক্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর গবেষণার সৌন্দর্য এই যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ফেলে যে কোনো দেশের আর্থসামাজিক বিকাশের ধারাটি বোঝা সম্ভব। বিশ্লেষণের এই সর্বজনীন কাঠামোর কারণেই তিনি প্রশংসার দাবিদার।
এই ধারাবাহিকতায় ড. সেনের এই মৌলিক গ্রন্থে ভারতীয় রাষ্ট্রের চরিত্র এবং এ অঞ্চলের অর্থনীতি তথা শিল্পায়নের ধারাকে কীভাবে সেই রাষ্ট্র প্রভাবাম্বিত করেছে তার সন্ধানও মেলে। ড. সেন যথার্থই বলেছেন যে, সদা পরিবর্তনশীল সামাজিক প্রক্রিয়া অথবা উৎপাদন পদ্ধতির গভীরতা/স্থিতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ণিত হয়। উৎপাদন শক্তি ও সম্পর্কের উন্নয়নের ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে শ্রেণির গঠন ও বিন্যাস। আর এসবই একেক সমাজে একেক রকম হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক ও মানবিক কারণেই এই হেরফের হয়ে থাকে। তাই সমাজ ভেদে রাষ্ট্রের ধরনও বদলে যেতে পারে। মার্ক্সীয় ধারায় তাই রাষ্ট্র শুধু রাজনৈতিক একটি বিষয় নয়। এটি সামাজিকও বটে। সেই আলোকেই ড. সেন ভারতীয় রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ণয়ের সময় উৎপাদনের উপায়গুলোর রূপান্তরের ঐতিহাসিক ধারাকে ধরবার চেষ্টা করেছেন। এঙ্গেলস মনে করতেন সমাজে শ্রম বিভক্তি যেমন থাকে তেমনি যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তাঁদের ভেতরও বিভাজন থাকে। তাঁদের স্বার্থ আর যাঁরা তাঁদের রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে বসিয়েছেন তাঁদের স্বার্থ এক নাও হতে পারে। এভাবেই রাষ্ট্র তার স্বাধীন সত্তা নির্মাণ করে। এভাবেই দুটো শক্তির মাঝে সংঘর্ষের উৎপত্তি হয়। যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা এই সাংঘর্ষিক পরিবেশে ব্যাহত হতে পারে। উভয়ের স্বার্থ এক হলে অর্থনৈতিক উন্নতি দ্রুতও হতে পারে। কোনো কোনো দেশে অর্থনীতি যারা চালায় তারাই নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রের পরিচালকদের। যেমন শুরুতে ব্রিটেনে টোরি বা অভিজাত শ্রেণি বুর্জোয়াদের স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিল বলে তিনি লিখেছেন। তবে রাষ্ট্র বরাবরই আরো স্বাধীনতা লাভের চেষ্টা করে। বাস্তবে কতটা স্বাধীনতা ভোগ করে রাষ্ট্র তা নির্ভর করে উৎপাদন পদ্ধতির বিকাশ ও সামাজিক গঠন প্রক্রিয়ার ওপর।
ভারতের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এক সময় বরং বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ব বাজারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্র স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের বেড়ে উঠতে সাহায্য করেনি। ফলে ভারতে পুঁজিবাদী উন্নয়ন পদ্ধতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। পুরনো এশীয় উৎপাদন পদ্ধতিকে পুরোপুরি কাবু করে ভারতের পক্ষে নয়া উৎপাদন পদ্ধতি স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। মার্ক্স ও এঙ্গেলস যে ধারার বিপ্লবাত্মক রূপান্তরের কথা বলতেন ভারতে সেটি সম্ভব হয়নি। সেই অর্থে মার্ক্সীয় তত্ত্বের আলোকে সকল সমাজ একই ধারায় রূপান্তরিত হবে সেটি আশা করা ঠিক নয়। রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সম্পর্ক বহুমুখী ও দ্বান্দ্বিক হতেই পারে। তাই বলে এটা ঠিক হবে না যে অর্থনৈতিক ক্ষমতা থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎপত্তি হয়। বরং রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর ভর করেই অর্থনীতির বিকাশ ঘটে। আর সে কারণেই মার্ক্সীয় তত্ত্বে রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ক্ষমতা তীব্র শ্রেণি দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে পরিণত হয়ে থাকে।
ড. সেনের গবেষণায় ধরা পড়েছে যে ভারতের রাষ্ট্র এশীয় উৎপাদন পদ্ধতির ফসল। ফলে বুর্জোয়াদের বিকাশের পথে এই রাষ্ট্র বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সতেরো ও আঠারো শতকে যে বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ দ্রুত ঘটছিল তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের কারণে বুর্জোয়াদের আধিপত্যে নিশ্চিত করা যায়নি। ভারতের পুঁজিবাদী রূপান্তরও সে কারণে বাধাগ্রস্থ হয়। ঔপনিবেশিক আমলে ভারতের সমাজ আংশিক এশীয়, আংশিক সামন্ততান্ত্রিক এবং আংশিক পুঁজিবাদী হওয়ায় রাষ্ট্র অনায়াসে ভারত থেকে ঔপনিবেশবাদী কেন্দ্রে (লন্ডন, ম্যানচেস্টার) সম্পদ স্থানান্তর করতে পেরেছিল। ফলে ভারতের অর্থনীতি উন্নত হতে পারেনি। তার শ্রমের উৎপাদিকা শক্তিও তাই বিকশিত হয়নি। অন্যদিকে স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্র তার স্বাধীনতা রক্ষার তাগিদ থেকে ব্যক্তি খাতের ওপর প্রবল নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। ফলে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যে শিল্পায়ন গড়ে ওঠে তার সহযোগী হয় ক্ষুদে শিল্প ও কারিগরবৃন্দ। কৃষিতেও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার সব অঞ্চলে বাড়েনি। ফলে পুঁজিবাদী বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ সেভাবে ঘটেনি। অসম উন্নয়নের এই ধারা চলার ফলে অর্থনীতি তার স্বাভাবিক গতিময়তা হারিয়ে ফেলে। তাই অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দেয় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ দরিদ্রই থেকে যান। পরবর্তী সময়ে অবশ্যি অর্থনৈতিক সংস্কার ঘটিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি আনতে সক্ষম হয়েছে দেশটি। এর প্রভাবে দারিদ্র্যও কমেছে ভারতের অনেক রাজ্যে।
ড. সেন এখানেই থেমে যাননি। তিনি এরপর রাল্ফ মিলিবান্ড ও নিকোলাস পোলানৎজার ভাবনার আলোকে পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা বিষয়ে গবেষণা করেছেন। ড. সেন লিখেছেন যে নয়া-মার্ক্সবাদী রালফ্ মিলিবান্ড মনে করেন যে আধুনিক রাষ্ট্র শ্রেণি শাসনের এক নির্মম/আদর্শিক হাতিয়ার। আমলাতন্ত্র, পুলিশ, বিচার বিভাগ, সেনাবাহিনী ইত্যাদি এই রাষ্ট্রকে চালায়। এরা ব্যক্তি পুঁজিরও অধ:স্তন সমর্থক। পোলানৎজা মনে করেন রাষ্ট্রের প্রধান কাজই হলো পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখা। অর্থনৈতিকভাবে অধিপতি শ্রেণির আকাক্সক্ষা মতোই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে থাকে। তবে রাষ্ট্রের আবার অধিপতি শ্রেণিগুলো থেকে স্বাধীনতারও প্রয়োজন হয় তার ঐক্য রক্ষার জন্য। পুঁজিবাদী শ্রেণির সাধারণ স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যই রাষ্ট্র এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
হামজা আলাভী উপনিবেশ-উত্তর সমাজের রাষ্ট্র নিয়ে গবেষণা করেছেন। ড. সেন নয়া-মার্ক্সবাদী হিসেবে তাঁর ভাবনাগুলো নিয়েও নাড়াচাড়া করেছেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে আলাভী কাজ করলেও মাঝেমধ্যে ভারতীয় রাষ্ট্রের কথাও তিনি বলেছেন। ঔপনিবেশিক পর্বে আলাভীর মতে রাষ্ট্র অতি-উন্নত ছিল। স্থানীয় শ্রেণিসমূহের চেয়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী সামরিক ও বেসামরিক আমলারা অনেক বেশি ক্ষমতাশীন ছিল। উপনিবেশ-উত্তর পর্বেও তাঁর মতে রাষ্ট্রের এই চরিত্র খুব একটা বদলায়নি। রাষ্ট্র স্বাধীনই রয়ে গেছে। কোনো একক শ্রেণি এই অতি-উন্নত রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারেনি। আলাভীর এই রাষ্ট্রভাবনাকে ড. সেন খুবই প্রাসঙ্গিক মনে করেছেন তাঁর গবেষণাক্ষেত্রে। ধ্রুপদী মার্ক্সীয় ভাবনায় অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক উপরিকাঠামো স্থান করে নেয়। কিন্তু উপনিবেশ-উত্তর সমাজে রাষ্ট্র বা উপরিকাঠামো অতি-উন্নত। অর্থনৈতিক পাটাতন ততোটা উন্নত না হলেও রাষ্ট্রের অবস্থান বেশ মজবুত। দেশীয় বুর্জোয়ার এই অস্বাভাবিক বিকাশের সাথে অনুন্নত অর্থনৈতিক অবকাঠামোর গভীর সম্পর্ক নেই। এখানে ঔপনিবেশিক শক্তির বিদায়ের পর কোনো একক শ্রেণি আধিপত্য বিস্তার করে উঠতে পারেনি। ফলে রাষ্ট্র পরিকল্পিত অর্থনীতি গড়বার নামে প্রচুর অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ড. সেন মনে করেন আলাভীর এই মতো অনেকাংশেই সত্যি। ভারতীয় উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রের চরিত্র বিশ্লেষণের সময় ড. সেন এই সত্যি খুঁজে পেয়েছেন। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের রাষ্ট্রের এই চরিত্রের মিল খুঁজে পেলেও ড. সেন তৃতীয় বিশ্বের সব রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক আমলে অতি-উন্নত ছিল সে কথাটি মানতে নারাজ। অনেক দেশের উদাহরণ দিয়ে ড. সেন দেখিয়েছেন যে তৃতীয় বিশ্বের প্রায় রাষ্ট্রই বরং অনুন্নত। সামাজিক বিপ্লব ঘটেনি বলে এসব দেশের দেশজ শ্রেণিগুলো রাষ্ট্রের ওপর সেভাবে আধিপত্য স্থাপন করতে পারেনি। তার কারণ হিসেবে আলাভী দাবি করেন যে রাষ্ট্রই বরং এসব শ্রেণিকে দাবিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অবশ্যি, ড. সেন মনে করেন যে ভারতীয় উপ-মহাদেশের শ্রেণি সংগঠন ঐতিহাসিকভাবেই ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা বা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত। অনেকের ধারণা ঔপনিবেশিক শক্তির উপস্থিতি দেশজ-ভূ-স্বামী ও পুঁজিপতিদের শক্তিকে ঠেকিয়ে একটা ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। ড. সেন মনে করেন এ ধারণারও কোনো বাস্তব প্রমাণ মেলে না। তিনি বরং আলাভীর সাথে একমত যে দেশজ সামাজিক শ্রেণিগুলোর দুর্বল অবস্থানের কারণেই রাষ্ট্র তার স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনের কারণেই সামাজিক শ্রেণিগুলোর এই অনুন্নয়নের কারণ বলে তিনি মনে করেন। এই ধারণার সাথে অন্য আরো কয়েকজন নয়া-মার্ক্সবাদী যথা সামির আমিন, অর্সিরি ইমানুয়েলের ভাবনার সাথে যথেষ্টই মিল খুঁজে পেয়েছেন তিনি। এ দেশগুলো বিশ্বপুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবার কারণেই ঐ শ্রেণিগুলোর উন্নয়ন বা উত্তরণ ঘটেনি। তবে ড. সেন এদের ভাবনার প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও পুরোপুরি একমত হতে পারেননি। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাফল্য যে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর দেশজ শ্রেণিগুলোর অনুন্নয়নের কারণেই সম্ভব হয়েছে সে কথাটি এই নয়া-মার্ক্সবাদীরা তেমন স্পষ্ট করে বলেননি বলে ড. সেন দাবি করেছেন তাঁর গবেষণায়।
তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ তথা ভারতের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিগুলোর সাথে বাইরের পুঁজির সংযোগের ফলে দেশটির উৎপাদন ব্যবস্থা, শ্রেণি বিন্যাস ও রাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক কীভাবে রূপান্তরিত হলো সেই আলোচনাটি উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ দিয়ে ড. সেন তাঁর গবেষণায় তুলে ধরেছেন। সকল অর্থেই তাঁর এই গবেষণাটি মৌলিক এবং তৃতীয় বিশ্বের যে কোনো দেশের সমাজকে বুঝতে চাইলে তাঁর এই ভাবনাগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হবে। প্রাক-ব্রিটিশ ভারতের উৎপাদন ব্যবস্থা ও শ্রেণি সংগঠন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপের ফলে ভারতের সামাজিক শ্রেণির বিন্যাসের রূপান্তর, ভারতীয় সমাজতন্ত্র তথা সমাজ ও অর্থনীতির ওপর রাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার, ভারতের কারিগর ও ক্ষুদে শিল্পের বিন্যাস ও রাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক, রাষ্ট্র ও সরকারি-বেসরকারি খাতের সম্পর্ক, ভারতীয় শিল্পের বিকাশে কৃষির সামাজিক অর্থনীতির প্রভাবসহ প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ের অবতারণা করেছেন ড. সেন এই বইতে। যে কোনো বিচারেই ড. সেনের এই বইটি তাঁর অনন্য মেধা, কঠিন পরিশ্রম এবং প্রগতিশীল অন্তর্দৃষ্টির ফসল। এমন একটি গবেষণা উপহার দিয়ে তিনি শুধু গবেষকদের নয় তাঁর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ও আমার মতো গুণগ্রাহীদের অশেষ কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন।
এই বইটির পর তিনি যদি আর কিছুই না লিখতেন তবুও ড. অনুপম সেন বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অনন্য উচ্চতায় রয়ে যেতেন।
কিন্তু আমাদের বড়ই সৌভাগ্য যে তাঁর এই মৌল গবেষণার পাটাতনের ওপর আরও অনেক লেখাই তিনি লিখেছেন। অনেক গণবক্তৃতাও করেছেন। এসবের পূর্ণ পর্যালোচনা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। তবুও ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ’ এবং ‘বাঙালি মনন, বাঙালি-সংস্কৃতি: সাতটি বক্তৃতা’- এই দুটোর চুম্বক পর্যালোচনার মাধ্যম ড. সেনের গভীর মনন ও অনুসন্ধিতার অনুসন্ধান করতে চাই। প্রথম বইটির প্রথম প্রবন্ধটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় লেখা। ‘বাংলাদেশ-সংগ্রামের সামাজিক পটভূমি’ নামের এই প্রবন্ধে ড. সেন ঔপনিবেশিক ও আধা-ঔপনিবেশিক সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতির বিশ্লেষণ করেছেন। পাকিস্তানের জন্ম এবং সেই রাষ্ট্রের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের চাপে পূর্ব-বাংলার অর্থনীতির ওপর শোষণের জাঁতাকলে এ অঞ্চলের সমাজ কীভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল তার বিশ্লেষণ করেছেন। মূলত পাঞ্জাবের অভিজন শ্রেণির স্বার্থ দেখতে গিয়ে কীভাবে পাকিস্তানের নির্মম রাষ্ট্রটি বাংলাদেশের মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধ্য করেছিল তার পটভূমি তিনি তুলে ধরেছেন। যে বাংলাদেশ ঐ সময় জন্ম নিতে যাচ্ছে তাতে যেন সকল মানুষের সমঅধিকার নিশ্চিত হয় সে আশাও ড. সেন করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘সর্বশ্রেণির মানুষের ত্যাগ ও তিতিক্ষার ফলে যে পূণ্যভূমির সৃষ্টি হচ্ছে সেই পূণ্যভূমির কল্যাণেই কেবল নয়, তার প্রাপ্তিতেও যেন সর্বশ্রেণির মানুষের সমঅধিকার থাকে।’
এর পরের প্রবন্ধে তিনি ‘স্বাধিকার চেতনা ও একুশের আন্দোলন’ বিষয়ে আলোচনার সময় ফরাসি বিপ্লবের অনুরূপ একুশের চেতনার সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা লিখেছেন। একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ যেন ফরাসি বিপ্লবের অমর সঙ্গীত মেহনতি মানুষের বিজয়গাথারই অনুরূপ। বাঙালি জাতির বীজই শুধু বপন করেনি একুশে, সাম্যের অঙ্গীকারেও সম্পৃক্ত করেছিল সকল বাঙালিকে। ‘আমলাতন্ত্র ও আর্থসামাজিক মুক্তি’ প্রবন্ধে তিনি সমাজ জীবনে রাষ্ট্রের অপরিসীম ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। ঐ রাষ্ট্রের প্রশাসন-ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি। তারই উত্তরাধিকারী যে আমলাতন্ত্র বাংলাদেশ কুক্ষিগত করেছে তারাই আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নেতৃত্ব দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এই আমলাতন্ত্রের সে যোগ্যতা নেই। শ্রেণি নেতৃত্ব না থাকায় আমলাতন্ত্রের এই নেতৃত্বের সুযোগ মিলেছে। সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন না আনা গেলে এমনটিই ঘটবে বলে ড. সেন মনে করেন।
এরপর তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রেণি বৈষম্য’ নিয়ে। তিনি যথার্থই লিখেছেন যে, ‘বাংলাদেশ একটি ক্ষীয়মান এশীয়, বিকৃত সামন্ততান্ত্রিক ও বিকৃত ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার যৌগিক সমাহার। এই সমাজের শিক্ষাব্যবস্থাও তাই স্বাভাবিকভাবে বিকৃত, পরভৃত, গণবিরোধী ও শ্রেণিবৈষম্য-দুষ্ট।
উন্নত বিশ্বে শ্রেণি-বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা মোটামুটি সার্বজনীন। শিক্ষাখাতে তারা ব্যাপক হারে সরকারি অর্থ খরচ করেন সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে। এর ফলে ব্যক্তির শ্রমের দক্ষতা বাড়ে এবং পুঁজির ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। কিন্তু আমাদের দেশে যেহেতু স্বাভাবিক ধনতন্ত্রের বিকাশ ঘটেনি তাই সেই মানের শিক্ষা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা যায়নি। সংখ্যায় বাড়লেও মান বাড়েনি শিক্ষা ব্যবস্থায়। তাই ড. সেন মনে করেন এই শিক্ষা আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার হতে পারছে না।
শিক্ষা ব্যবস্থা বিষয়ক প্রবন্ধটির পর পরই তিনি ‘সামাজিক চাহিদা ও বিশ্ববিদ্যালয়-পাঠ্যসূচি’ বিষয়ে এক জ্ঞান-গর্ভ প্রবন্ধ লিখেছেন। এই প্রবন্ধেও তিনি দাবি করেছেন যে ‘মনুষ্যত্বের উদ্বোধিত’ করার মতো উচ্চ শিক্ষা আমরা দিতে পারছি না। পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির ক্রমবিকাশ ও উন্নয়ন তার আর্থসামাজিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত হলেও আমাদের আর্থসামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন সেভাবে ঘটেনি। ফলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা উপযুক্ত মানুষ তৈরিতে কাক্সিক্ষত ভূমিকা রাখতে পারছে না। ‘বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধে ড. সেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশে সাম্যের গুরুত্ব একুশ ও একাত্তরের চেতনায় সিক্ত হতে পারেনি। তাই জনগণের সৃজনশীল ক্ষমতা ও শ্রমকে সংগঠিত করে তাদের বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকের আসনে বসানো সম্ভব হয়নি বলে তিনি উপসংহার টেনেছেন। এর ফলে স্বাধীনতার মূল তাৎপর্য বিঘ্নিত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বিশ শতকের শেষ দিকে লিখেছেন ‘আগামী শতকের বাংলাদেশ’ প্রসঙ্গে। তিনি তাঁর মূল পিএইচডি গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন এই প্রবন্ধে। যে বাংলা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী অঞ্চল তার নিঃস্বকরণের প্রক্রিয়া নানা তথ্য দিয়ে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন এই প্রবন্ধে। লুম্পেন প্রলেতারিয়েতের অভিশাপ থেকে বাঁচার জন্য তিনি নব্য ঔপনিবেশিক প্রভাব ছিন্ন করে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের পথে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন এই প্রবন্ধের উপসংহারে।
সবশেষের প্রবন্ধে তিনি বিশ শতকের শেষ দশকের বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে সেই বিষয়টির অবতারণা করেছেন। সমাজতন্ত্রের পক্ষে নৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় রেখেই তিনি স্বীকার করেছেন ‘এককেন্দ্রিক বিশ্বের বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে সে পথে চলা বর্তমানে সম্ভব নয়।’ তাই বলে স্বদেশের স্থবিরতাও তাঁর কাম্য নয়। ধনতন্ত্রের গতিময়তার বিষয়টিও তাঁর জানা আছে। আর তাই তিনি মনে করেছেন যে, ‘এই মুহূর্তে জাতীয় বুর্জোয়া বিকাশের বিভিন্ন পন্থার সঙ্গে সমাজতন্ত্রের মানুষের অধিকারের সীমা বাড়ানোর যেসব পথ নির্দেশ রয়েছে তার সম্মিলন ঘটিয়ে চলাই বাংলাদেশের কাম্য বলে আমার মনে হয়।’ এই সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেই সমাজ পরিবর্তন ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে মানুষকে সংগঠিত করে অনুন্নয়নের শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান জানিয়েছেন ড. সেন।
আজীবন তিনি স্বপ্ন দেখেছেন সমাজতন্ত্র ও সাম্যের। তাই তাঁর এই আহ্বান মোটেও কথার কথা নয়। তাঁর এই গভীরতম চাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে ‘সাতটি বক্তৃতা’ গ্রন্থে। বাঙালির মনন ও সংস্কৃতির এসব বক্তৃতায় তিনি যে কথাগুলো বলতে চেয়েছেন তার নির্যাস হলো : হাজার বছর ধরে বিকশিত বাঙালির সংস্কৃতি নতুন সহস্রাব্দে আরো ঐশ্বর্যে পরিস্ফুট হবে। ‘আদি-অন্ত বাঙালি’, ‘রেনেসাঁস ও স্বাধীনতা-চিন্তা’, ‘ব্যক্তি ও রাষ্ট্র’, ‘সমাজ-দর্শনের আলোকে’… ‘সুফিয়া কামাল,’ ‘বালাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রেণিবৈষম্য’, ‘বিশ্ববিদ্যালয়-পাঠ্যসূচি’, ‘হাজার বছরের হিসাব-নিকাশ’ শিরোনোমের বক্তৃতাগুলোতে তাঁর মৌলিক গবেষণাধর্মী পিএইচডি থিসিস ভিত্তিক বইটির ব্যাপক প্রভাব চোখে পড়ে। যে সমাজবিন্যাসের আলোকে তিনি গণবক্তৃতাগুলো দিয়েছেন সেসবের বুদ্ধিবৃত্তিক জমিন ঐ বইতেই তিনি কষে রেখেছিলেন। হাজার বছরের পুরনো বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশের কথা বলতে গিয়ে ড. সেন খুব স্বাভাবিকভাবেই মুখ্যত গ্রামীণ সংস্কৃতির স্নিগ্ধ ও গভীর পটভূমির সন্ধান দিয়েছেন। বাঙালি সংস্কৃতি যে হাজার বছর ধরে নানা ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও প্রস্ফুটিত হয়েছে এবং বিশ্ব সংস্কৃতির সাথে সংযোগ রক্ষা করে চলেছে তার নানামাত্রিক বিশ্লেষণ এই বইতে তুলে ধরেছেন ড. সেন। চলিত সময়ের সাথে কীভাবে আমাদের জীবন চলা, চিন্তা, মনন, সৃজনশীলতার পরিবর্তন হয়েছে, সমাজ-বিন্যাসের পরিবর্তন ও জগৎসভার সাথে তার সংযোগের আলোকে বাঙালির চলা ও বলার যে পরিবর্তন ঘটেছে সেসবই নানাভাবে তাঁর বক্তৃতায় ফুটে উঠেছে।
বক্তৃতাগুলোর উপসংহার মূলত আগের দুটো বইয়ের পর্যালোচনার মধ্যেই পড়ে বলে আলাদা আলাদা করে আর বিশ্লেষণ করলাম না।
ড. সেন এক বিরল প্রতিভা। এখনো তিনি আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর মেধার দ্যুতি ছড়িয়ে চলেছেন। পঞ্চাশ বছর ধরেই তিনি তা করছেন। পাশাপাশি তার মৌলিক ভাবনাগুলো গুছিয়ে লিখে বই আকারে আমাদের উপহার দিয়েছেন। আর সুযোগ পেলেই গণবক্তৃতা দিয়ে আমাদের এই নষ্ট ভ্রষ্ট সমাজকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন। শুধু পাণ্ডিত্য ও গবেষণার মাঝেই নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেননি। যখন এ দেশের সমাজ ও রাজনীতি অপশক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে তখনই তিনি তাঁর বৃদ্ধিবৃত্তিক সরব উপস্থিতির মাধ্যমে প্রগতিশীল ও উদারনৈতিক শক্তিকে সাহস জুগিয়েছেন। সেই সুবাদেই তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হয়েছেন। আওয়ামী লীগ প্রকাশিত ‘গণতন্ত্রের বহ্নিশিখা : শেখ হাসিনা’ (২০১৬) লেখাটি পড়লেই তাঁর সমকালীন প্রগতিশীল ভূমিকার ইঙ্গিত মেলে। দুর্দিনে সুদিনে তিনি দলের প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যাকে সুপরামর্শ দিয়ে চলেছেন। আর চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার পাশাপাশি ঐ অঞ্চলের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে গতিময় রাখার জন্য সাধ্যমতো সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যাশা করি আরো অনেক বছর তিনি তাঁর এই মেধা, মনন, দেশপ্রেম বাঙালির সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে আগের মতোই অকাতরে দান করে যাবেন। গত ৫ আগস্ট ছিল ড. অনুপম সেনের জন্মদিন। আপনি দীর্ঘজীবী হোন। সুস্থ থাকুন।

Saturday, July 25, 2020

ঈদ সংস্কৃতির রূপান্তর by স্বকৃত নোমান

বাংলাদেশের মুসলমান সমাজে ধর্মকেন্দ্রিক প্রধান প্রধান উৎসবগুলো হচ্ছে- ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, আশুরা, শবেবরাত প্রভৃতি। দুইশ বছর আগে এসব উৎসবকেন্দ্রিক সংস্কৃতির যে রূপ ছিল তার মৌলিক পরিবর্তন না ঘটলেও কিছু কিছু সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটেছে। ঈদসংস্কৃতির কথাই ধরা যাক। শত বছর আগের ঈদসংস্কৃতির সঙ্গে বর্তমানের ঈদসংস্কৃতির ফারাক একেবারে কম নয়। উদাহরণ হিসেবে গত শতকের আশির দশকের গ্রামীণ ঈদসংস্কৃতির একটা চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে।
রমজানের বিশ তারিখ রাতে যখন গ্রামের দু-একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুসল্লি এতেকাফ আদায়ের লক্ষ্যে দশদিনের জন্য মসজিদে অন্তরীণ হতো, সেদিন থেকেই ঈদের দূরায়ত হাতছানি টের পাওয়া যেত। ঈদের আরো দশদিন বাকি থাকলেও একটা চাপা উত্তেজনা দেখা যেত ছোট-বড় সবার মধ্যে। আসন্ন ঈদের বিশেষ দিনটিকে উদযাপনের জন্য সবার ভেতর দেখা যেত এক ধরনের ব্যস্ততা। ছাব্বিশে রমজান রাতে তো শবেকদর। সাতাশে রমজান থেকে সেই ব্যস্ততা তুঙ্গে উঠত। ঈদকে বরণ করে নেওয়ার জন্য সবাই চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করত। হাতে আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরেই তো ঈদ। শুরু হতো হাটেবাজারে কেনাবেচার ধুম। হাটের মুদি দোকানগুলো ভরে উঠত সেমাই-চিনি-নারিকেল-বাদাম-কিশমিশ ইত্যাদি জিনিসপত্রে। মা-বাবারা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিতো এসব জিনিস। জামাতাকে উপহার দিত পায়জামা-পাঞ্চাবি-টুপি। ছেলেমেয়েদের কিনে দিত নতুন জামা-কাপড়। ঈদের আগের রাত পর্যন্ত চলত ধুম বেচাকেনা। শবেকদরের পরদিন থেকে গ্রামের ফকির-মিসকিনরা গেরস্তবাড়িগুলোতে ধরনা দেওয়া শুরু করত জাকাত-ফিতরার আশায়। ছেলেমেয়েরা পাঁচ-দশ টাকা দামের ঈদকার্ড পাঠিয়ে শুভেচ্ছা ও আমন্ত্রণ জানাতো বন্ধু-বান্ধবদের। ঈদের আগের দিন বিকেলে মেহেদি পাতা সংগ্রহের ধুম পড়ে যেত। ইফতারির সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে ইফতার খাওয়া ফেলে খোলা মাঠেঘাটে চলে যেত ঈদের নতুন বাঁকা চাঁদ দেখার জন্য। পশ্চিমের আকাশে সন্ধ্যাতারার আশপাশে নখাকৃতির বাঁকা চাঁদ দেখা গেলে হৈ-হৈ রৈ-রৈ পড়ে যেত দিকে দিকে। পড়ে যেত মেহেদি বাটার ধুম। গভীর রাত পর্যন্ত হাতে আর নখে নানা আলপনায় মেহেদি লাগাত ছেলেমেয়েরা। সারারাত কাটত উত্তুঙ্গ উত্তেজনায়। পরদিন যথারীতি খুব ভোরে সবার ঘুম ভেঙে যেত। মুয়াজ্জিনের আজানকে প্রতিদিনকার আজানের মতো মনে হতো না। এই বিশেষ দিনের প্রারম্ভের আজানটা দেওয়ার জন্য মুয়াজ্জিন যেন সারা বছর কণ্ঠটাকে প্রস্তুত করে রাখত। কী যে সুরের মূর্ছনা!
তারপর ভোর। গ্রীষ্মকাল হলে তো কথা নেই, পৌষ-মাঘ মাসের কড়া শীত হলেও গ্রামের পুকুর ঘাটে তিল ঠাঁই থাকত না। কসকো কোম্পানির সুগন্ধি সাবান, নতুন লুঙ্গি আর গামছা নিয়ে সবাই ঘাটে হাজির হতো। পুকুরের পানি ঘোলা হয়ে উঠত অসংখ্য মানুষের গোসলের কারণে। কারো মুখে বিষাদের এতটুকু ছাপ থাকত না, সবাই কেমন প্রাণখোলা হাসিখুশি। বিষণ্ন বুড়োদেরও ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকত হাসির রেখা। গোসল করে বাড়ি ফিরে নতুন কিংবা ধুয়ে ইস্ত্রি করে রাখা পুরনো জামা-কাপড় গায়ে দেওয়ার পালা। ঈদ উপলক্ষে গ্রামের দোকান থেকে কেনা দু-চার টাকা দামের সুগন্ধী আতর পায়জামা-পাঞ্জাবিতে লাগাত সবাই। তারপর নকশাদার জায়নামাজ বা নলখাগড়ার তৈরি পাটিটা বগলদাবা করে ঈদগাঁহের দিকে রওনা হতো।
ঈদের আনন্দটা বড়দের চাইতে ছোটদেরই ছিল বেশি। ঈদগাঁহে গিয়ে নামাজ পড়ার চাইতে তারা বেশি ব্যস্ত থাকত বাঁশি, বেলুন আর হরেক রকমের খেলনা নিয়ে। দোকানিরা ঈদের দিন দোকানের বাইরে চাটাই বিছিয়ে নানা খেলনা সামগ্রী নিয়ে বসতো। সেসব খেলনার মধ্যে অন্যতম ছিল বিশেষভাবে তৈরি বাঁশের বাঁশি। এই বাঁশির পেছনের দিকটা রাজা কনডমের ভেতর ঢুকিয়ে সুতা দিয়ে ভালো করে বেঁধে নিতে হতো। তারপর ফুঁ দিয়ে কনডমটাকে ফুলিয়ে লাউ কি কুমড়ার মতো করে বহিরাংশের ছিদ্রটি ছেড়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে শুরু হতো স্টিমারের সাইরেনের মতো ভোঁ-ওঁয়া ভোঁ-ওঁয়া শব্দ। শিশু-কিশোরদের কাছে ঈদের দিনে এই বিশেষ খেলনাটি ছিল খুবই প্রিয়। খেলনার মধ্যে আরো ছিল রেফারি-বাঁশি, প্লাস্টিকের তৈরি প্রাইভেট কার ইত্যাদি। কারটির সামনের সরু ছিদ্রটাতে মোটা একটা সুতা বেঁধে টেনে টেনে চালাতে হতো। অনেকটা দুধের স্বাধ ঘোলে মেটানোর মতো। আর লাটিম তো ছিল খুবই জনপ্রিয় খেলনা। পুরনোটা ফেলে দিয়ে ঈদের দিন কেনা হতো নতুন লাটিম।
ঈদগাঁহে নামাজ শেষে শুরু হতো পারস্পরিক কোলাকুলি। তারপর মুসল্লিরা দলবেঁধে চলে যেত গ্রামের বড় গোরস্তানে। মৃত আত্মীয়-স্বজনদের রুহের মাগফেরাত কামনায় সার বেঁধে পশ্চিমমুখী দাঁড়িয়ে মোনাজাত করত। মোনাজাত শেষে আবার শুরু হতো কোলাকুলি। এরপর দলে দলে ভাগ হয়ে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি বাড়ি সেমাই খেতে যেত। সেমাই বলতে তখন গ্রামের মানুষদের ভাষায় ‘বাংলা সেমাই’ বা ‘আলবা সেমাই’ ছিল প্রধান। চিনি-নারিকেল-বাদাম-কিশমিশ ও দুধ সহযোগে রান্না হতো এ সেমাই। চিনামাটির ছোট ছোট পিরিচে করে পরিবেশন করা হতো মেহমানদের। ছোটরা বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করে শ্রদ্ধা জানাতো। খুশি হয়ে বড়রা দু-চার টাকা বখশিশ না দিয়ে পারত না।
ঈদের দিন বিকেলবেলা কারো হাতে কোনো কাজ থাকত না। পার্থিব যাবতীয় কর্মযজ্ঞ থেকে আজ একেবারেই মুক্ত। অখ- অবসরতা কেবল। গ্রামের চা দোকানে ব্যাটারিচালিত টেলিভিশনে ঈদের সিনেমা দেখার ভিড় লেগে যেত। যাদের বাড়িতে ক্যাসেট প্লেয়ার থাকত তারা চড়া আওয়াজে গান বাজাতো। কিশোররা গ্রামের নির্জন রাস্তাঘাটে পয়সা আর মার্বেল খেলায় মেতে উঠত। মেয়েরা নতুন নতুন জামা-কাপড় পরে ঘুরে বেড়াত সারা গ্রাম। রাতের প্রথম প্রহর পর্যন্ত লেগে থাকত এসব আনন্দ।
ঈদের পরের দিন শুরু হতো অন্য আয়োজন। তরুণ-যুবকরা দলবেঁধে চলে যেত জেলাশহর। ঈদ উপলক্ষে রাজ্জাক-ববিতা বা ইলিয়াস কাঞ্চন-চম্পার নতুন মারদাঙ্গা কি বিরহকাতর সিনেমা মুক্তি পেত। রেডিওতে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ভরাট কণ্ঠে সেসব সিনেমার বিজ্ঞাপন শুনতে শুনতে সিনেমাটি দেখার জন্য তীব্র আগ্রহ তৈরি হতো তাদের মধ্যে। তাই দলবেঁধে জেলাশহরের সিনেমা হলে সেটি দেখতে যাওয়া। সিনেমা দেখা শেষে চলে যেত দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি। মামা-মামি, খালা-খালু, ফুপা-ফুপিদের সঙ্গে দেখা না করলে তো ঈদ-আনন্দ অপূর্ণ থেকে যায়।
এবার আসা যাক সমকালীন ঈদসংস্কৃতি প্রসঙ্গে। কিছু কিছু ব্যাপার আগের মতো থাকলেও অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটে গেছে। উপরে যেমন ঈদের দিন শিশু-কিশোরদের যেসব খেলনার কথা বলা হলো, বর্তমানে সেসব খেলনার গুণগত মান উন্নত হয়েছে। রাজা কনডমের বদলে এখন এসেছে বড় বড় মজবুত সব বাহারি বেলুন। এসেছে ব্যাটারিচালিত নানা খেলনা গাড়ি, প্লাস্টিকের পুতুল, পশু-পাখিসহ কত কি। এখন মেহেদি গাছ থেকে মেহেদি পাতা সংগ্রহ করে কষ্ট করে বেটে হাতে লাগাতে হয় না, বিভিন্ন কোম্পানি এনেছে নানা প্যাকেটজাত মেহেদি। নাগরিক জীবন তো বটেই, গ্রামীণ জীবনেও লেগেছে এই পরিবর্তনের ছোঁয়া। এখনও ঈদকার্ডের প্রচলন আছে বটে, কিন্তু তাতে লেগেছে প্রযুক্তির হাওয়া। এখন নানা ডিজাইনের ঈদকার্ড বাজারে পাওয়া যায়। আবার ঈদকার্ডের মধ্যে বাতিও জ্বলতে দেখা যায়। সুইস অন করলে বেজে ওঠে নানা মিউজিক। এখন ঈদের শুভেচ্ছা পাঠানো হয় মোবাইলে এসএমএস করে, ই-মেইল কিংবা ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসআপ বা ইমোর ইনবক্সে। বিশই রমজানের পর থেকে হাটে-বাজারে এমনকি নগরে টাঙানো হয় ‘ঈদ-শুভেচ্ছা’ লেখা বড় বড় ব্যানার। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বড় বড় তোরণ বানায় জনগণকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে।
ঈদসংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেছে খাবার-দাবারের ক্ষেত্রেও। গত শতকের শেষের দিকে ‘লাচ্ছা সেমাই’ প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আগে এ সেমাই খোলা বিক্রি হতো। এখনো হয়। তবে এখন খোলা লাচ্ছা সেমাইর চাইতে বাহারি প্যাকেটজাত আধুনিক লাচ্ছা সেমাইর কদর বেশি। লাচ্ছা সেমাইয়ের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে নুডুলস। মাংস বা ডিম দিয়ে রান্না করা এ মুখরোচক খাবারটি ঈদের দিন সেমাইর সঙ্গে পরিবেশিত হয়। একটু অবস্থাসম্পন্ন গেরস্তরা আরো একধাপ এগিয়ে। তারা সেমাই বা নুডুলসের পরিবর্তে মাংসে পাকানো খিচুরি পরিবেশন করে থাকে। সকাল বেলায় সেমাই খাওয়া হলেও দুপুরে সামর্থ্য অনুযায়ী মুরগি, গরুর মাংস বা খাসির মাংসের ভোজ চলে। অবস্থাসম্পন্নদের ঘরে তৈরি হয় হালিম, কাবাব, বিরিয়ানি ইত্যাদি।
ঈদসংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রেও। ঈদকে সামনে রেখে নতুন নতুন আদরার কাপড়-চোপড় বাজার আনার প্রতিযোগিতায় নামে ব্যবসায়ীরা। এখন ঈদ উপলক্ষে জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ঈদ এলে যে যেভাবে পারে অন্যকে ঠকিয়ে দুই পয়সা আদায় করে নেওয়ার ধান্দায় থাকে অনেক ব্যবসায়ী। তিনশ টাকার শাড়ি ছয়শ টাকায়, এক হাজার টাকার জামা দুই হাজারে গিয়ে ঠেকে। বিপণি বিতানে গিয়ে কাপড়-চোপড়ের দাম দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না। ঈদ এলে বিক্রেতারা এতই ব্যস্ত থাকে যে, ক্রেতার সঙ্গে ভালোমতো কথা বলারও সময় পায় না। তাই কাপড়ের গায়ে দাম লিখে রাখে। দরাদরি করার কোনো সুযোগ নেই। এক দাম। যার ইচ্ছে হয় সে কিনবে। ঈদকে কেন্দ্র করে পরিবহন ভাড়া বেড়ে যায় দ্বিগুণ। পাড়ায়-মহল্লায় চাঁদাবাজিও কম চলে না। রাজধানী ঢাকা শহরে দ্বিগুণ বেড়ে যায় ছিনতাই। যদিও ঈদের তাৎপর্য এসব নয়। নিঃসন্দেহে এসব মানুষের ভেতর থেকে পারস্পরিক সহমর্মিতা বিনষ্টির ফল।
আজকের ঈদসংস্কৃতি অনেকটা প্রতিযোগিতামুখর। সমাজের সর্বস্তরে চলে এই প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, পরিবারের সঙ্গে পরিবারের এমনকি সমাজের গ-ি পেরিয়ে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। ছাত্র, শিক্ষক, আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীরাও এই প্রতিযোগিতার বাইরে নয়। প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে টিকতে গিয়ে এখন কেউ আর সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দের বাছ-বিচার করে না।
মিডিয়া জগতেও লক্ষ করা যায় এই প্রতিযোগিতা। ঈদসংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে। ঈদকে কেন্দ্র করে টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয় বিশেষ নাটক, টেলিফিল্ম, সিনেমাসহ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। তাও এক-দুদিন নয়, টানা ছয়-সাত দিন ধরে প্রচারিত হয় এসব বিশেষ অনুষ্ঠান। ঈদের পনেরো দিন আগ থেকে শুরু হয় এসব অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার। কে কত ভালো অনুষ্ঠান বানাতে পারে তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। আবার বিজ্ঞাপন দাতারাও নির্মাণ করে ঈদ-কেন্দ্রিক বিশেষ বিজ্ঞাপন। দর্শকরাও এই আয়োজনের সঙ্গে এখন সম্পৃক্ত হয়ে গেছে অনেকটা। সারা বছর যারা টিভি দেখার মতো সময় পায় না, ঈদ এলে তারা প্রাণভরে এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করে।
প্রিন্ট মিডিয়াতেও এসেছে ঈদসংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন। দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করে ঈদ বিশেষ সংখ্যা। সেসব সংখ্যা তিনশ থেকে ছয়শ পৃষ্ঠা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ছাপা হয় নবীন-প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকদের নানা বিষয়ের লেখা, থাকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নানা বিজ্ঞাপন। এর মাধ্যমে তাদের ক্রেতা-গ্রাহকদের ঈদ শুভেচ্ছা জানানো হয়। এই বিশেষ সংখ্যাটি কার আগে কে বাজারে ছাড়বে থাকে সেই প্রতিযোগিতাও। হালে প্রিন্ট মিডিয়ায় ঈদ উপলক্ষে প্রকাশিত হয় ফ্যাশন পাতা বা ফ্যাশন ক্যাটালগও। শহরের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলো তাদের নতুন আদরার কাপড়গুলো জমা দেয় পত্রিকার অফিসে। মডেলদের সেসব পোশাক পরিয়ে ফটোগ্রাফারকে দিয়ে ছবি তোলা হয়, আর সেই ছবি ছাপানো হয় পত্রিকার ফ্যাশন ক্যাটালগে। এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে পত্রিকার বিশেষ রান্না পাতা বা রান্না সংখ্যাও প্রকাশিত হচ্ছে। রন্ধনশিল্পীরা ঈদের বিভিন্ন রেসিপি দিয়ে থাকে এসব সংখ্যায়। ঈদ বিশেষ সংখ্যা ছাড়াও ঈদের ছুটির আগে দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করে পত্রিকার বর্ধিত পাতা। সেখানেও থাকে যথারীতি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি।
বিশ বছর আগের ঈদসংস্কৃতির সঙ্গে বর্তমানের ঈদসংস্কৃতির কত না ফারাক। ভবিষ্যতে যে এই ঈদসংস্কৃতির আরো রূপান্তর ঘটবে তাতে সন্দেহ নেই।

Wednesday, February 12, 2020

রবীন্দ্র-প্রতিভার পরিচয় by হাবিবুর রহমান স্বপন

রবীন্দ্র-কাব্যের মূল সুর প্রকৃতির সৌন্দর্যসম্ভোগ, মানবমহিমাবোধ এবং প্রকৃতি ও মানবের মিলনে অতীন্দ্রিয়ের স্পর্শানুভূতি। কবির কাছে প্রকৃতি জড় নয়, প্রাণময়ী। রবীন্দ্র-কাব্য পরিক্রমা করলে আমরা দেখতে পাই, এই প্রাণময়ী প্রকৃতি তাঁর কাব্যের উৎস, তাঁর আবেগ-সঞ্চারিনী শুধু তাই নয়,

রবীন্দ্র-কাব্যের মূল সুর প্রকৃতির সৌন্দর্যসম্ভোগ, মানবমহিমাবোধ এবং প্রকৃতি ও মানবের মিলনে অতীন্দ্রিয়ের স্পর্শানুভূতি। কবির কাছে প্রকৃতি জড় নয়, প্রাণময়ী। রবীন্দ্র-কাব্য পরিক্রমা করলে আমরা দেখতে পাই, এই প্রাণময়ী প্রকৃতি তাঁর কাব্যের উৎস, তাঁর আবেগ-সঞ্চারিনী শুধু তাই নয়,

রবীন্দ্র-প্রতিভার সামগ্রিক পরিচয় দেয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সৃষ্টিশীল মহৎ ব্যক্তি। বাঙালি কবি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির বিশাল রূপান্তর বা পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজন করেছেন। তাঁর কর্মকুশলতা, চিন্তা-চেতনা ও সৃষ্টিশীলতা এই সংস্কৃতিকে দিয়েছে নানা রূপময়তা, রঙ, গন্ধ ও বৈচিত্র্যমুখিতা। সংস্কৃতির এত বড় সংগঠক প্রাচীন, মধ্য ও বর্তমান আধুনিককালেও বাঙালি সমাজে জন্মগ্রহণ করেনি। তিনি আমাদের আধুনিক সংস্কৃতির প্রধান রূপকার। যদিও এই আধুনিককাল চূড়ান্ত নয়। আমাদের বোধ, মেধা ও মনন যাকে আধুনিক বলে জানতে, বুঝতে চাচ্ছে তা কতটুকু আধুনিক ও উৎকৃষ্ট সে সম্পর্কে এ যুগের মানুষ হিসেবে তার বিচারে আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। রবীন্দ্রনাথের জ্ঞান বা প্রজ্ঞার পরিধি পরিমাপ করার সাধ্য আমার মতো অধমের নেই এটা সত্য, এর পরেও এই স্বল্প পরিসরে কিছু নমুনা উপস্থাপনের চেষ্টা করছি বিজ্ঞ পাঠকদের করকমলে। মহান কবি লিখেছেন-

‘হায় গগন নহিলে তোমারে ধরিবে কে বা!
ওগো তপন, স্বপন দেখি যে, করিতে পারিনে সেবা।’

অন্তরের নিবিড়তম, সত্যতম কথাটি এমন সহজ সুরে কে গাইতে পারে? মানুষের ব্যক্ত-অব্যক্ত, জানা-অজানা, বোঝা-না-বোঝা, চেতন-অবচেতন সব লোকেরই কথা কবি বুঝেছেন এবং তা ব্যক্ত করেছেন। মানুষের মনের বিচিত্র আনন্দ-বেদনা, তৃপ্তি-অতৃপ্তি, পাওয়া-না-পাওয়ার কথা ফুট ওঠে তাঁর প্রতিটি ছন্দে। সর্বমানবের মনের মর্মকথার মূর্ত প্রতীক রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্র-প্রতিভা সূর্যেরই মতো বিরাট বিস্ময়কর ব্যাপার। অফুরন্ত বিচিত্র বিচ্ছুরিত উজ্জ্বল সূর্যরশ্মির যেমন পরিমাপ করা যায় না এবং সমগ্রভাবে তা ধরাও যায় না, রবীন্দ্র-প্রতিভা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা করাও আমাদের পক্ষে তেমনি অসম্ভব। এত বড় বিরাট প্রতিভার সামনে দাঁড়াবে কে? তা ছাড়া আর একটা কথাও অন্তরের মধ্যে বিশেষভাবে নাড়া দেয় যে, যে অতিমানবীয় প্রতিভা বা ক্ষমতা রবীন্দ্রনাথ অধিকার করেছেন সে প্রতিভা বা ক্ষমতা না-কি তাঁর নয়! এ কথা কবি বহুবার বলেছেন যে, কোনো এক অদৃষ্ট শক্তি বা প্রেরণা তাঁকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছেন তিনি তাই করেছেন। কবি বলেছেন-

অন্তর মাঝে বসি অহরহ
মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ,
মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ
মিশায়ে আপন সুরে।
কী বলিতে চাই সব ভুলে যাই,
তুমি যা বলাও আমি বলি তাই,
সঙ্গীতস্রোতে কূল নাহি পাই,
কোথা ভেসে যাই দূরে।

কবি কত কিছু বলেছেন সে তো কবির নিজের কথা নয়, সে তাঁর অন্তরের আদেশ; তাই একে বুঝতে চাওয়া সহজ নয়।
তবুও দুর্নিবার আগ্রহ, অসীম সাহস মানুষের, জানবার। দুঃসাধ্য সাধন করতে চায় মানুষ, দুর্লঙ্ঘকে লঙ্ঘন করতে সাহসী হয় মানুষ, অপ্রাপ্যকে করায়ত্ত করতে চায়- সেও তো মানুষ। অজানাকে জানতে হবে, অপ্রাপ্যকে পেতে হবে, মানুষকে পেতে হবে অমিত, দিতে হবে অমিত, তাকে হতে হবে অমিত মানব। এই সাধনা সহজ নয়, দুঃখের দুর্গম পথেই এর জয়যাত্রা। মানুষ সুখের কাঙাল নয়, দুঃখভীরু নয়, তাই সে এই পথই বেছে নিয়েছে।
রবীন্দ্র-প্রতিভার কোনো একটি দিকের আস্বাদন করতে হলে এই সাধনা ও একান্ত তন্ময়তার প্রয়োজন। একাগ্র ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনা, ধ্যান-ধারণায় মানুষের অন্তরেন্দ্রিয় তীক্ষ্ণ আর আবিলতামুক্ত হয়। তখন যা অজ্ঞেয় রহস্যময়তায় সমাচ্ছন্ন তাকে জানা যায়, বোঝা যায়, উপলব্ধি করা যায়। এই সাধনার বেদনা যে বহন করতে পারে চির-আকাক্সিক্ষত প্রিয় বস্তুটি তার কাছে এসে আপনি ধরা দেয়। যাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসা যায়, তাকেই সত্যরূপে জানতে পারা যায়।
তাই রবীন্দ্র-প্রতিভার কোনো একটি দিকের সমগ্র পরিচয় পাওয়া অসম্ভব হলেও এ কাজে কোনো কোনো দুঃসাহসী অগ্রসর হয়েছেন। তার কারণ ভালোবাসার মধ্যে ঐশ্বর্য-ভয়-ভীতি তো কিছু নেই, সেখানে শুধু অনাবিল মাধুর্য আর চির-পরিচয়ের স্বচ্ছ-আনন্দ। এই দাবিতে আমরাও কবিকে দেখব, জানব, বুঝব, নিবিড় করে কাছে পাব।
রবীন্দ্রনাথ বাংলার কবি, রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের কবি, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের সকল দেশের ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম। রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র বহুমুখী অলোকসামান্য প্রতিভা সকল দেশ ও কালের গণ্ডিকে অবলীলাক্রমে অতিক্রম করে গিয়েছে- সে গৌরব কেবলমাত্র ভারতবর্ষের নয়, সারা বিশ্বেরও। তাঁর বাণী ছিল বিশ্বজনীন, তাঁর প্রেম ছিল সর্বব্যাপী, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ছিল সুগভীর। অনন্তকে আস্বাদন করবার জন্য মানুষের যে আর্তি, তাই ব্যক্ত হয়েছিল তাঁর ভাবধারার মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশে রবীন্দ্র-প্রতিভার অভ্যুদয় পরম বিস্ময়কর এবং আকস্মিক ব্যাপার সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই ঠিকই, কিন্তু একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়। তার প্রধান কারণ রবীন্দ্রনাথ বাংলার তথা ভারতবর্ষেরই কবি, ভারতীয় ভাবসাধনার আদর্শেই তাঁর কবিমানস অনুপ্রণিত ও পরিপুষ্ট।
রবীন্দ্র-সাহিত্য একটি বহু রূপময় বিচিত্র শিল্পসম্ভার; তাতে নব নব রেখা ও বর্ণবিন্যাসের অন্ত নেই। রবীন্দ্রনাথ সঙ্গীতজ্ঞ, নাট্যকার, গল্পরচয়িতা, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার, সমালোচক, চিত্রকর, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক একাধারে সবই, কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠ পরিচয় তিনি কবি।
রবীন্দ্রনাথের কাব্য-প্রতিভা শতমুখী। তিনি নিজের সৃষ্টিকে নিজেই অতিক্রম করে নতুন রূপসৃষ্টির আনন্দে চিরচঞ্চল ছিলেন। কবি নিত্য নতুন ভাব চিন্তা আবেগ কল্পনা ভাষা ছন্দ অলঙ্কার করেছেন এবং তার প্রকাশভঙ্গিমায় কবিমানসের সে একটি অভিনব রূপ তিনি প্রকাশ করেছেন তা জগতের কাছে পরম বিস্ময়ের বস্তু।
রবীন্দ্র-কাব্যে আমরা যেমন ভারতীয় সাহিত্যের ঐতিহ্যের সন্ধান পাই, যেমন মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবিদের রসমাধুর্যের আস্বাদ পাই, বাউলদের মনের মানুষের সন্ধান পাই, তেমনি পাই প্রতীচ্য সাহিত্যের তীব্র আবেগ, তার বাধাহীনতা, দেশকালনিরপেক্ষ মানবিকতা। বিশ্ব-প্রাণের বিচিত্র তরঙ্গমালা রবীন্দ্রনাথের ভাব ও কল্পনাকে আলোড়িত করেছে। এই আলোড়নের অভিব্যক্তি ঘটেছে নানা রূপে, রসে, ছন্দে ও মাধুর্যে। রবীন্দ্র-সাহিত্যে বিশেষ কোনো দেশের, বিশেষ কোনো কালের বা বিশেষ কোনো জাতির নির্দিষ্ট কোনো ছাপ পড়েনি। সব দেশ কাল জাতি, সব বন্ধনমুক্ত, সর্বজনীন ভাব, কল্পনা ও আদর্শের ওপর তাঁর সাহিত্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাই তাঁর কাব্য যুগের হয়েও যুগাতীত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সারাজীবনের সাধনার ধন কাব্য তথা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে দেখেছেন যে, শান্তিময় বিশ্বপ্রেমই মানুষের জীবনের কাম্য বস্তু; বিশ্বজনীন ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ধরা দিয়ে তবে তার বিশেষ অভিব্যক্তি লাভ করে, আবার ব্যক্তিজীবন বিশ্বজীবনের মধ্যে লীলায়িত হয়ে তবেই তার সার্থকতা প্রাপ্ত হয়। এমনি করে সীমায় অসীমে, খণ্ডে পূর্ণে, ব্যক্তিজীবনে ও বিশ্বজীবনে একটি চিরন্তন লীলা চলছে। এই লীলাই সৃষ্টির আনন্দ ও সৌন্দর্য। এই আনন্দ ও সৌন্দর্য রবীন্দ্রনাথ আকণ্ঠ পান করেছেন এবং তাঁর কাব্যে বিচিত্রভাবে প্রকাশ করেছেন।
রবীন্দ্র-কাব্যের মূল সুর প্রকৃতির সৌন্দর্যসম্ভোগ, মানবমহিমাবোধ এবং প্রকৃতি ও মানবের মিলনে অতীন্দ্রিয়ের স্পর্শানুভূতি। কবির কাছে প্রকৃতি জড় নয়, প্রাণময়ী। রবীন্দ্র-কাব্য পরিক্রমা করলে আমরা দেখতে পাই, এই প্রাণময়ী প্রকৃতি তাঁর কাব্যের উৎস, তাঁর আবেগ-সঞ্চারিণী শুধু তাই নয়, যেন তাঁর অন্তর-সত্তার চিরসঙ্গিনী। এই সঙ্গিনীর সঙ্গে কবি নিগূঢ়-আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। প্রকৃতির তুচ্ছতম বস্তুটির সঙ্গে পর্যন্ত কবি আদিজন্মের নাড়ির টান অনুভব করছেন। তাই তাঁর কাছে-

যাহা কিছু হেরি চোখে কিছু তুচ্ছ নয়,
সকলি দুর্লভ বলে আজি মনে হয়।
দুর্লভ এ ধরণীর লেশতম স্থান,
দুর্লভ এ জগতের ব্যর্থতম প্রাণ।

এই পৃথিবীর জল-স্থল, আকাশ-বাতাস, পশু-পাখি, সমস্ত রূপ-রস-স্পর্শ কবির চিত্তবীণায় নব নব রাগ-রাগিনীর সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের সব কিছুর সঙ্গে কবি স্বীয় প্রাণচেতনার স্পন্দন অনুভব করেছেন। তাই তিনি বিশ্বাস করেছেন যে, আদি প্রাণের যে প্রবল জীবনোচ্ছ্বাস পৃথিবীর প্রত্যেক গাছে, শিকড়ে শিকড়ে, শিরায় শিরায়, তৃণের প্রত্যেকটি রোমে রোমে প্রবাহিত হচ্ছে, সেই প্রাণধারা প্রত্যেকটি জীবের মধ্যেই সঞ্চারিত এবং কম্পিত হচ্ছে। তাই এত বড় বিশাল পৃথিবীকে আমাদের অনাত্মীয় বা অদ্ভুত বলে মনে হচ্ছে না। কবি বলেছেন-
“প্রকৃতির মধ্যে যে এমন গভীর আনন্দ পাওয়া যায়, সে কেবল তার সঙ্গে আমাদের একটা নিগূঢ় আত্মীয়তা অনুভব করে। এই তৃণগুল্মতা, জলধারা, বায়ুপ্রবাহ, এই ছায়ালোকের আবর্তন, জ্যেতিষ্কদলের প্রবাহ, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীপর্যায়- এই সমস্তের সঙ্গেই আমাদের নাড়ি-ছন্দের যেখানেই যতি পড়েছে সেখানেই ঝঙ্কার উঠছে, সেখানেই আমাদের মনের ভিতর থেকে সায় পাওয়া যাচ্ছে।’
রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির কবি, রবীন্দ্রনাথ আনন্দের কবি। অতুলনীয় মানবমুখিতা কবির কাব্যে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। রবীন্দ্রনাথ এই পৃথিবীর কবি। তিনি মানুষকে, ধরণীকে ভালোবাসেন। রবীন্দ্র-কাব্যে মানবের অবিনশ্বর অনুভূতির প্রকাশ অতি ব্যাপকভাবেই রয়েছে। কবি বারবার কলেছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’
‘আত্ম-পরিচয়’-এ কবি বলেছেন, “প্রকৃতি তাহার রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ লইয়া, মানুষ তাহার স্নেহ-প্রেম লইয়া আমাকে মুগ্ধ করিয়াছে। সেই মোহকে আমি অবিশ্বাস করি না, সেই মোহকে আমি নিন্দা করি না।”

অবজ্ঞা করিনি তোমার মাটির দান
আমি যে মাটির কাছে ঋণী
জানিয়েছি বারম্বার-

কবি শুধু ঋণ স্বীকারই করেননি, তিনি মানুষকে চরম শ্রদ্ধাও দেখিয়েছেন-

তব প্রয়োজন হতে যে অতিরিক্ত মানুষ-
তারে দিতে হবে চরম সম্মান তব
শেষ নমস্কারে।

মানুষকে কবি কোনোদিনই ছোট পরিধির মধ্যে ছোট করে ভাবতে পারেননি। মহামানবের আবির্ভাব তিনি ক্ষণে ক্ষণে দেখেছেন। মানুষের ক্ষণিক অংশের মধ্যে চিরন্তনের অভিব্যক্তি তাঁকে বারে বারেই বিস্মিত পুলকে অবিভূত করেছে। মানুষের স্নেহ প্রেম দয়া ভক্তি প্রভৃতি সুকোমল চিত্তবৃত্তির ভিতর দিয়ে তিনি চির রসময়ের রসের পরিচয় পেয়েছেন। তাই রবীন্দ্রকাব্য মানুষের জয়গানে মুখরিত। সে মানুষ ব্যক্তিগত পরিধি, দেশ কাল অতিক্রম করে মহামানবে পর্যবসিত। উপনিষদের বাণীঘন মূর্তি রবীন্দ্রনাথ মানুষকে অনন্তের সন্তান রূপেই দেখেছেন, তাই তিনি উপনিষদের বাণীতে বলেছেন, মানুষ মানুষ নয়, মানুষ ব্রহ্ম।
কবির ভগবৎ-উপলব্ধিও মানববিমুখতা নয়। সংসারের মধ্য দিয়েই তিনি তাঁর স্পর্শ লাভ করতে চেয়েছেন। ‘সংসারে বঞ্চিত করি তব পূজা নয়’ অথবা ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি আমার নয়’ -এই উক্তির মধ্য দিয়েই বুঝতে পারা যায় যে, সংসারকে বাদ দিয়ে কবিসংসারাতীতের সন্ধান করেননি। পরন্তু এই জগতের খণ্ড স্নেহ প্রেম প্রীতির মধ্য দিয়েই তিনি পরম প্রিয়তমের স্পর্শ পেতে চেয়েছেন। বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবপ্রকৃতির বিচিত্র রূপকে তিনি আনন্দময়ের অমৃত রূপ বলেই অনুভব করেছেন। সর্বত্রই তাঁর লীলাবিলাস বিকম্পিত- এই উপলব্ধিই রবীন্দ্র-কাব্যের বৈশিষ্ট্য।
রবীন্দ্রনাথ সাধক, তবে সে সাধনা বৈরাগ্য-সাধনে নয়, শিল্পসাধনে, রূপ সাধনে, ভাব সাধনে। নানা রূপের ক্ষুধা, রসের ক্ষুধা তাঁর ভাবকল্পনাকে উদ্বোধিত করেছে। বিশ্বের যেখানে যা কিছু আছে- অণু-পরমাণু পর্যন্ত, তাঁর কাছে রূপ রসে সৌন্দর্যে মাধুর্যে প্রতিভাত হয়েছে। সৌন্দর্যানুভূতিকে কবি একটি বিশেষ সত্তা রূপে দেখেছেন। সেই আদি অখণ্ড সত্তা অন্তরে বাইরে বিরাজিত। বাইরে যিনি বহুবিচিত্র, অন্তরে তিনি একা, অখণ্ড, স্থির-গম্ভীর। এই সৌন্দর্য-রূপিণী নারীকে তিনি বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন ভাবে তাঁর কাব্যে প্রকাশ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্য কল্পনার মধ্যেও সেই একই সুর ধ্বনিত, যে সুর নদী-গিরির ওপার থেকে ভেসে আসছে। রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছেন, বিশ্ব প্রকৃতিতে, মানবপ্রকৃতিতে যে সৌন্দর্য উদ্ভাসিত তা সেই চিরসুন্দরেরই অঙ্গদ্যুতি। বিশ্ব-ভ্রহ্মাণ্ড সেই আদি রূপের ঝরনাধারায় অভিস্নাত। সমস্ত খণ্ড সৌন্দর্যের মধ্যে কবি অলৌকিক ও অখণ্ড সৌন্দর্য দেখেছেন। তাই কবির কাছে কিছুই তুচ্ছ নয়, কিছুই অসুন্দর নয়। অসুন্দর যদি কিছু থাকে তবে তা সুন্দরের খণ্ডিত প্রকাশ মাত্র। পরিপূর্ণতার কবি সব কিছুকেই সমগ্রভাবে দেখেছেন। তাই কোথাও কিছু অসুন্দর তাঁর চোখে পড়েনি, পড়লেও তার সামঞ্জস্য করিয়ে নিয়ে তবে স্বস্তি পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের জীবনসাধনা, কাব্যসাধনার বিরাট সৌধ এই সৌন্দর্যানুভূতির শ্বেত প্রস্তরের উপরেই ভিত্তি স্থাপন করেছে। তাঁর সমস্ত অনুভূতিই সুন্দরের অনুভূতিতে রঞ্জিত।
কবির প্রেমানুভূতির মধ্যেও আছে এই সূক্ষ্ম মহিমাবোধ। তাই তাঁর প্রেমসাধনা একান্ত ভোগবাসনায় পর্যবসিত না হয়ে একটি বিশেষ আনন্দবোধে উপভোগ্য হয়েছে।
সৌন্দর্যানুভূতির সঙ্গে যে একটি ভোগতৃষ্ণা জেগে থাকে তাকে অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু ভোগ সৌন্দর্র্যলাভের শ্রেষ্ঠ উপায় হতে পারে না যদি তার মধ্যে সংযত না থাকে। সেই কথাই কবি বলেছেন- “প্রবৃত্তিকে যদি একেবারে পুরামাত্রায় জ্বলিয়া উঠিতে দিই, তবে যে সৌন্দর্যকে কেবল রাঙাইয়া তুলিবার জন্য তাহার প্রয়োজন, তাহাকে জ্বালাইয়া ছাই করিয়া তবে সে ছাড়ে, ফুলকে তুলিতে গিয়া তাহাকে ছিঁড়িয়া ধুলায় লুটাইয়া দেয়। সৌন্দর্য আমাদের প্রবৃত্তিকে সংযত করিয়া আনিয়াছে।…সৌন্দর্য যেমন আমাদিগকে ক্রমে শোভনতার দিকে, সংযমের দিকে আকর্ষণ করিয়া আনিতেছে, সংযমও তেমনি আমাদের সৌন্দর্যভোগের গভীরতা বাড়াইয়া দিতেছে।” তাই আমরা দেখি, রবীন্দ্রনাথের কাব্যে প্রেমসাধনা দেহকে অস্বীকার করেনি, আত্মা যেমন সত্য দেহও তেমনি, দেহ-আত্মার যে প্রেম তাই পূর্ণ প্রেম। ভোগ-বাসনা কবির কাব্যে যথেষ্ট আছে, কিন্তু সে ভোগ একান্তভাবে দেহের সীমাতেই আবদ্ধ নয়, দেহকে আশ্রয় করে সে প্রেম দেহাতীত এক অপার্থিব সৌন্দর্যলোকে তার নিত্য আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্য ও প্রেমানুভূতির এই যে বৈশিষ্ট্য, একে তিনি প্রকাশ করেছেন এইভাবে- “জীবের মধ্যে অখণ্ডকে অনুভব করারই অন্য নাম ভালোবাসা, প্রকৃতির মধ্যে অনুভব করার নাম সৌন্দর্যসম্ভোগ।”
রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতার রহস্যও এইরকম একটি ভাবানুভূতি বলা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথের সুগভীর অধ্যাত্মবোধের মূলেও আছে এই ভাবানুভূতি। যে অদ্বিতীয় অর্ধপরিচিত দেবতার স্পর্শ তিনি বারংবার হৃয়ের মধ্যে অনুভব করেছেন, যার নিত্যনতুন লীলায় তাঁর কাব্যজীবন নব নব আনন্দরসে সিঞ্চিত পুষ্পিত হয়ে উঠেছে, সেই চিরবাঞ্ছিত হৃদয়দেবতাকেও তিনি লাভ করেছেন তাঁর নিবিড় অনুভূতির মধ্যে নানা রূপে। কখনো সখা রূপে, কখনো দেবতা রূপে, কখনো মানসসুন্দরী রূপে অদৃশ্য এই সত্তার স্পর্শ তিনি জীবনের ঊষালোক থেকেই পেয়ে এসেছেন। এই প্রণয়িনীর স্পর্শে কবি কখনো বেদনায় ব্যাকুল হয়েছেন, কখনো আনন্দে অধীর হয়েছেন। কখনো মিলনে, কখনো বিরহে এই মধুর স্পর্শটি ক্রমশই রসনিবিড় হয়ে উঠেছে। সুখে দুঃখে বিপদে সম্পদে জীবনের সকল অবস্থায় কবি এই জীবন-দেবতার স্পর্শ লাভ করেছেন। নিদারুণ দুঃখেও তিনি দুঃখরাতের রাজাকে অভ্যর্থনা করে নিয়েছেন। এইভাবে সীমা-অসীমের, পূর্ণ-অপূর্ণের, খণ্ড-অখণ্ডের লীলা-অভিসার চলেছে রবীন্দ্র-কাব্যে।
রবীন্দ্রনাথ সত্য-শিব-সুন্দরের একনিষ্ঠ পূজারি। কঠোর দুঃখ, নির্মম কষাঘাতের মধ্য দিয়ে যে শান্তি লাভ করা যায়, সত্য লাভ করা যায় তাই তাঁর কাম্য। তাই অত্যন্ত সহজেই তিনি বলতে পেরেছেন-
‘মনেরে আজ কহ যে,
ভালমন্দ যাহাই আসুক
সত্যেরে লও সহজে।’

সত্যসন্ধানী কবি আরো বলেছেন-

আরাম হতে ছিন্ন করে
সেই গভীরে লও গো মোরে
অশান্তির অন্তরে যেথায়
শান্তি সুমহান।

এইজন্য তাঁর কাব্যে রুদ্র ও শিব সমান পূজা লাভ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের জীবন-দর্শনে মৃত্যু একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মৃত্যুর এত মহিমাময় ঐশ্বর্যময় মাধুর্যময় কল্পনা অন্য কোনো কবির কাব্যে আছে কিনা সন্দেহ। জীবনের সোনালি ঊষাতেই কবি অনুরাগকম্পিত কণ্ঠে বলেছেন- ‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সম।’
মৃত্যু-বরের জন্য জীবন-বধূ উৎসুক হয়ে সর্বক্ষণ প্রতীক্ষা করে থাকে। রবীন্দ্রনাথ জীবনের অনন্ত-অনাদি প্রবাহবোধ স্বীকার করেছেন। জীবন-মরণ তো শুধু ইহলোকের বিষয় নয়। তা লোক-লোকান্তরের একটি সংলগ্ন ঘটনা- এ বিশ্বাস তাঁর দৃঢ় ছিল। তাই তিনি জীবন ও মরণকে স্বতন্ত্র করে দেখতে পারেননি।

বিশ্ববোধ আর সর্বানুভূতি রবীন্দ্র-সাহিত্যের একটি মূল সুর। এই বোধের উদ্ভব হয়েছে তাঁর অতীন্দ্রিয় অনুভূতি থেকে। এই অধ্যাত্ম-অনুভূতিই সমগ্র রবীন্দ্র-জীবন ও সাহিত্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ভারতের অধ্যাত্ম-সাধনায় যে ভূমার আদর্শ ‘ঈশাবাস্যং ঈদং সর্বং কিষ্ণ জগত্যাং জগৎ’- ঈশ্বরের দ্বারা নিখিল জগৎ পরিব্যাপ্ত রয়েছে, সেই সর্বব্যাপিত্বের আদর্শই রবীন্দ্রনাথের জীবন-দর্শনের মূল কথা। তিনি রসো বই সঃ-তিনি রসস্বরূপ, আনন্দানুভূতির তিনিই পরম প্রকাশ। আমাদের কবি এই সর্বানুভূতির কথা, এই আনন্দের কথা অক্লান্ত সুরে নানা ছন্দে রূপে রসে বর্ণে বৈচিত্র্যে প্রকাশ করেছেন। এই অনুভূতির প্রেরণাতেই তিনি লিখেছেন-

“পাগল হইয়া বনে বনে ফিরি আপন গন্ধে মম
কস্তরীমৃগ সম।”

এই প্রেরণাতেই সারা জীবন ধরে তিনি পৃথিবীর নানা পথে প্রান্তরে মরুতে পর্বতে অনন্ত পথ-পরিক্রমায় চলেছিলেন, তিনি চঞ্চলের চিরসহচর ছিলেন। তাঁর কাব্যে চিরদিনই এই আকুতি ধ্বনিত হয়েছে- “আমি চঞ্চল হে আমি সুদূরের পিয়াসী।”
রবীন্দ্রনাথে সুবিপুল, সর্বোতমুখী প্রতিভা ও বিরাট ব্যক্তিত্বের সামনে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। কত বিচিত্র দিকে, কত বিচিত্রভাবে যে তাঁর প্রতিভা বিকাশ লাভ করেছে, কোনটিকে ছাপিয়ে কোন দিকটি যে বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তা সমগ্ররূপে ধারণা করাই দুঃসাধ্য। সৃষ্টি, চিন্তা ও কর্মের সমস্ত দিকে কারও প্রতিভা এমন অম্লান দীপ্তিতে প্রতিভাত হয়েছে পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্তে দুর্লভ বলা যায়। রবীন্দ্র-জীবন ও কর্মের সম্যক ও সত্য উপলব্ধি আজো স্বদেশে-বিদেশে কোনো দেশেই হয়েছে কি-না সন্দেহ। কবি নিজেই তাঁর ‘আত্মপরিচয়’-এ বলেছেন- ‘নিজের সত্য পরিচয় পাওয়া সহজ নয়। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার ভিতরকার মূল সূত্রটি ধরা পড়তে চায় না।… নানাখানা করে দেখেছি, নানা কাজে প্রবর্তিত করেছি, ক্ষণে ক্ষণে তাতে আপনার অভিজ্ঞান আপনার কাছে বিক্ষিপ্ত হয়েছে। জীবনের এই দীর্ঘ চক্রপথ প্রদক্ষিণ করতে করতে বিদায়কালে আজ সেই চক্রকে সমগ্ররূপে দেখতে পেলাম। তখন এটা বুঝতে পেরেছি যে, একটি মাত্র পরিচয় আমার আছে, সে আর কিছুই নয়, আমি কবি মাত্র। আমার চিত্ত নানা কর্মের উপলক্ষে ক্ষণে ক্ষণে নানা জনের গোচর হয়েছে। তাতে আমার পরিচয়ের সমগ্রতা নেই।’
পরিপূর্ণতার প্রতি মানুষের একটা স্বাভাবিক টান আছে, তাই আমরা আমাদের প্রিয়তম কবিকে পরিপূর্ণ রূপেই পেতে চাই। বিশ্বের অমৃত ছবির পরিপূর্ণ সার্থক প্রকাশ রবীন্দ্রনাথ। তাই তাঁর কাব্যের মধ্য দিয়ে আমরা পরিপূর্ণতার স্বাদ পাই।
বিশ্বচিত্তের দূত রবীন্দ্রনাথ, তাঁর শ্রেষ্ঠ পরিচয় তাঁর কাব্যে, তাই তিনি সবার উপরে কবি, তাহার উপরে নাই।

Monday, February 10, 2020

রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা ও ভাবনার নির্মিতি by লিটন মহন্ত

রবীন্দ্রনাথের সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনাই তাকে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করে; তার জীবন দর্শন, মূল্যবোধ ও মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ আর কোনো বাঙালির জীবনে ঘটবে বলে মনে হয় না। সুতরাং এ কথা সহজেই স্বীকার করা যায় যে রবীন্দ্রনাথ তুলনারোহিত এবং বাঙালি কে মননশীলও সাংস্কৃতিক চেতনায় সমৃদ্ধ করতে তাঁর বিকল্প নেই; তাই বাঙালির জাতীয় জীবনে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য।

আজো রবীন্দ্রনাথ আমাদোর জীবনে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক; এই কথা সহজেই অনুমেয় এবং বিবেচ্য কারণ তাঁকে বাদ নিয়ে কেউ সম্পূর্ণ রূপে বাঙালি হয়ে উঠতে পারে না। আমাদের প্রকৃত বাঙালি হয়ে উঠতে গেলে ক্রমশ রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করতে হবে; কোথায় নেই তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথের জাদুকরি হাতের স্পর্শ পড়েনি শুধুমাত্র মহাকাব্য ছাড়া। হয়তো অনেকে আমার সঙ্গে একমত পোষণ করবেন না কিন্তু সত্য হলো এটাই বাঙালি হয়ে বাঙালিত্ব গ্রহণ করতে হলে রবীন্দ্রনাথে আশ্রয় গ্রহণ করতেই হবে। জন্ম থেকে মৃত্যু, মৃত্যু থেকে জন্ম, বিরহ থেকে আনন্দ, বিষাদ থেকে আত্মপ্রকাশ সব কিছুর ভেতরেই আমাদের শ্রেষ্ঠতম আশ্রয় হলেন তিনি; এমনকি বাঙালির আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভাবনা এবং এই উপমহাদেশে প্রথম সমবায় তথা কৃষি ব্যাংকের ভাবনা এবং ক্ষুদ্র ঋণের কথা তিনিই প্রথম ভেবেছেন। তিনি জমিদারি থেকে দূরে গিয়ে দরিদ্র কৃষকের দ্বারে পদচারণা করেছেন এবং উপলব্ধি করেছেন আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভাবনা এবং তাদের মুক্তির কথা; কারণ অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া শুধু শিল্প আর সাহিত্য দিয়ে কখন মানবজাতির মঙ্গল সম্ভব নয়; আর এখানেই তিনি অনন্য এক মহীরুহে পরিণত হন। তিনি জীবনব্যাপী সাধনার মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি ও সাহিত্যের যে নতুন মাত্রা দান করেছেন, তা তুলনাহীন। তাকে ঘিরেই বাংলা সাহিত্যে, শিল্প ও সংস্কৃতির ভুবনে আধুনিকতার সূচনা হয়েছে। পরবর্তী কালে এই ধারার ধারাবাহিকতায় বাংলা সাহিত্য বিষয় বৈচিত্র্যে, জীবন জিজ্ঞাসায় ও মানবিকতায় বিশ্বস্ত হয়ে উঠে। তার কাছে আমাদের অনেক ঋণ। তাঁর একক প্রচেষ্টায় বাংলা সাহিত্যের সকল শাখা আজ সমৃদ্ধ। শুধু সাহিত্যে নয় সংগীতে এবং পরিণত বয়সে চিত্রকলায় বঙ্গীয় চিত্রধারার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তিনি যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন, পরবর্তীতে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আমাদের দেশে রবীন্দ্র চর্চার ইতিহাস আজকের মতো এত সহজ ও সুন্দর ছিল না; তিনি ছিলেন দেশ কাল জাতি বর্ণ নির্বিশেষে এক মহাবৃক্ষের মতো আশ্রয়দাতা; আর তাই ষাটের দশকে যখন তাঁর চর্চার প্রয়াস পূর্ণতা লাভ করছিল ঠিক তখনই নেমে আসে তৎকালীন সামরিক সরকারের বিরোধিতা কিন্তু তা সত্ত্বেও রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালি এক নতুন অভিযাত্রার সন্ধান পায় এবং রবীন্দ্রিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সৃজন করেন বাঙালির জীবনে এক নতুন অধ্যায়। পরবর্তীতে রবীন্দ্র সংস্কৃতির চেতনায় সমৃদ্ধ হয়েই এই অঞ্চলের বাঙালি সব আনন্দ বেদনায়, সংকটে ও স্বপ্নে তাঁকে অবলম্বন করেছে, এমনকি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর গান সৃষ্টি করেছিল এক মহান উৎস, যা প্রেরণাসঞ্চারী হয়ে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। সেই জন্য রবীন্দ্রনাথ আমাদের মননে ও জীবনে নিত্যস্মরণীয় ও প্রাসঙ্গিক। তিনি যে বহুমাত্রিক জ্যেতির্ময় ছিলেন সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না এবং তা আত্মস্থ হয়েছে বাঙালির এক হৃদয়ে থেকে অন্য হৃদয়ে, এই আনন্দের ফল্গুধারা হাজার বছর ধরে বহমান হবে এবং প্রাণ পাবে। এই সে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ, তিনি তাঁর সকল কীর্তি, সকল গৌরব নিয়ে বহু উচ্চের, বহু দূরের একজন হয়ে যাননি, তিনি ইচ্ছা করলে হতে পারবেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও আশ্চর্যজনকভাবে সমগ্র জাতির হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছেন নিজের চির আসন। তাঁকে যেমন আমরা আপন জন ভাবি, তিনিও ঠিক তেমনিভাবে আমাদের আপন ভেবেছেন, এই আত্নীয় বোধটা ছিল পারস্পরিক এবং জন্ম জন্মান্তরের। রবীন্দ্রনাথ জীবনে বহুবার বৃহৎ বিশ্বের পথে পা বাড়িয়েছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত স্বস্তি লাভ করেছেন বাংলার মাটিতে পা রেখে, তাই তো বলেছিলেন
মোর নাম- এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদেরই লোক/ আর কিছু নয়/ এই হোক শেষ পরিচয়!
বিশ্বপথিক রবীন্দ্রনাথ দূরে গেলেও হৃদয়ে সব সময় ধারণ করেছেন দেশের ছবি, দেশ মাতৃকার ছবি। তাইতো ভারতের রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তির প্রয়াসে তার সমর্থন ছিল নিঃশর্ত। এমনকি দাসত্বের গ্লানি তাঁর চিন্তা বা অনুভূতিকে কখন সংকীর্ণ করেনি তিনি প্রাচ্য সভ্যতার, তথা ভারতীয় সভ্যতার শক্তিকে চিত্তে ধারণ করে তারপর দৃষ্টি দিয়েছেন প্রতীচ্যের শক্তি ও সামর্থ্যরে দিকে এ এক অনন্য সমন্বয় সাধন হয়েছে তাঁর জীবনে। সমাজের এমন কোনো উল্লেখযোগ্য দিক ছিল না, যা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ভাবেননি। বিশেষ করে শিক্ষা ও বিজ্ঞান চর্চার ব্যাপারে তার যথেষ্ট আগ্রহ ছিল, এ বিষয়গুলো অল্প বয়স থেকেই তাঁর ভাবনায় ও চিন্তায় দৃশ্যমান হয়। তিনি শিক্ষাবিজ্ঞানী ছিলেন না কিন্তু শিক্ষা নিয়ে তাঁর ভাবনা তাঁর বেড়ে ওঠা প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিস্তৃত। অতি শৈশব থেকেই তিনি এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বিষহ পরিণতি অনুভব করেছেন এবং ব্যক্তিজীবনে সেই পরিণাম কখনই বিস্মৃত হতে পারেননি। ফলে সমাজ-সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর আজীবন ভাবনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শিক্ষা। তাঁর সেই ভাবনা শুধু গ্রন্থাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অধিকন্তু শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি তাঁর স্বপ্নকে ফলপ্রসূ করে তুলতে চেয়েছেন। পৃথিবীর কোনো কবি, শিল্পী তাঁর কাব্য ও শিল্পচর্চাও পাশাপাশি শিক্ষা নিয়ে এমনতর বিপুল ভাবনা ও কর্মযজ্ঞের স্বাক্ষর রাখেননি। উপমহাদেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায়ই শুধু নয়, তাবৎ পৃথিবীর শিক্ষাব্যবস্থা তাঁর শিক্ষা-দর্শনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিচিত্র রীতিতে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শনে অনুসরণ করা হলেও এই দুর্ভাগা দেশে তার কোনো মর্যাদা আজো হয়নি। অধিকন্তু যে দুর্বিষহ ব্যবস্থার ভিতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ব্যর্থ শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেছেন সেই ব্যবস্থা কৌশল পরিবর্তন করে শোচনীয় অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। ফলে এ যাবৎকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা-ভাবনা নিয়ে সুপ্রচুর আলোচনা-পর্যালোচনা ও লেখালেখি হলেও তাঁর আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বরং যতই দিন যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন ততই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। শিক্ষাবিজ্ঞানের পাশাপাশি বিজ্ঞানের প্রতি-ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ। রবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বপরিচয়’ বইটি পাঠ করলে তা সহজে অনুমেয়। তিনি বইটি উৎকর্ষ করেছিলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই আধুনিক বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কার ও উদ্ভাবনসমূহ সেকালের সাধারণ মানুষের চিন্তার জগৎককেও অভাবিতপূর্ব বিস্ময়ে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল। পাশ্চাত্যের শিক্ষাজগতে ও চিন্তাজগতে সে আলোড়নের ছায়াপাত ঘটেছিল অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই, ইউরোপে একাধিকবার ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ তা অনুভব করেছিলেন গভীরভাবে। অন্যদিকে ইংরেজের উপনিবেশ ভারতবর্ষে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে নিবিড় ও ব্যাপক সংযোগ একেবারেই সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ঔপনিবেশিক শিক্ষা-কাঠামোর মধ্যে তা হবার কথাও নয়। এই অনুভবকেই রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেছেন বিশ্বপরিচয়ের সেই ভূমিকাস্বরূপ নিবেদনে :
“বড় অরণ্যে গাছতলায় শুকনো পাতা আপনি খসে পড়ে, তাতেই মাটিকে করে উর্বরা। বিজ্ঞান চর্চার দেশে জ্ঞানের টুকরো জিনিসগুলো কেবলই ঝরে ঝরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাতে চিত্তভূমিতে বৈজ্ঞানিক উর্বরতার জীবধর্ম জেগে উঠতে থাকে। তারই অভাবে আমাদের মন আছে অবৈজ্ঞানিক হয়ে। এই দৈন্য কেবল বিদ্যার বিভাগে নয়, কাজের ক্ষেত্রে আমাদের অকৃতকার্য করে রাখছে। উপায়ে তার মধ্যে একটি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে লেখা রচনাদি পড়া। এ জন্য চাই মনের স্বাভাবিক কৌতূহল এবং বিভিন্ন বিষয় জানার ইচ্ছে। ক্লাসের পড়া হিসেবে যা পড়তে হয় তার প্রতি আকর্ষণের শক্তিটা প্রায়শ কম থাকে- এ কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু কৌতূহল নিবৃত্তির আনন্দ হিসেবে যখন তার আবির্ভাব ঘটে, তখন আনন্দটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের জীবনে বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথাটিও বর্ণনা করেছেন বিশ্বপরিচয়ের বিভিন্ন লেখায়। অতএব রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় ও ভাবনায় বিষয় বৈচিত্র্যেও ব্যাপকতা সম্পর্কে দ্বিমত প্রকাশ করার কোনো কারণ নেই। তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি প্রথম ১৯১৩ সালে নোবেল প্রাইজ পান তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্য গ্রন্থের জন্য। সুতরাং তাঁর মতো এত আধুনিক মনস্ক একজন মানুষ; যিনি আজ থেকে শত বছর আগেই সমান দাবি নিয়ে সব বাঙালির মনের কথা একাই বিশেষ করে তাঁর গান ও কবিতায় উল্লেখ করেছেন। আমরা যখনই মানসিক দ্বন্দ্বে ও টানাপড়েনে সম্মুখিত হই এখনই তাঁর পাঠ আবশ্যকতা লাভ করে। রবীন্দ্রনাথের সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনাই তাকে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করে; তার জীবন দর্শন, মূল্যবোধ ও মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ আর কোনো বাঙালির জীবনে ঘটবে বলে মনে হয় না। সুতরাং এ কথা সহজেই স্বীকার করা যায় যে রবীন্দ্রনাথ তুলনারোহিত এবং বাঙালি কে মননশীলও সাংস্কৃতিক চেতনায় সমৃদ্ধ করতে তাঁর বিকল্প নেই; তাই বাঙালির জাতীয় জীবনে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য। তিনি তার সৃষ্টিশীল সাহিত্যের সব শাখার মধ্য দিয়ে যুগযুগ ধরে বাঙালিকে আলোর দীপশিখা দান করে যাবেন এটাই কাম্য।

Saturday, February 8, 2020

অতৃপ্তির গান by আসাদ মান্নান

অতৃপ্তি আমাকে নিয়ে
উড়ে যাচ্ছে
শূন্যতার
বাহুলগ্না
হাওয়ার ডানায়;
দূরে নদী ভালোবাসা
বিষণ্ন জলের
বিরহের তীরভাঙা
সময়ের গান
গাইতে গাইতে
একা বহে যায় :
আকাশ দুঃখের ভারে
দিগন্তের বাঁকে
ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড
যে চাঁদের মুখ
কখনও বা
অসহায় ধর্ষিতার মতো
তুমুল কান্নায়
মেঘের আড়ালে
চলে যায়
অন্ধকারে
প্রকৃতির অন্দরতলায়
অন্য এক বেদনার
নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেঙে
হাঁটে নিরালয়;
আমি তাকে নিয়ে
দূরগামী ট্রেনের আশায়
জরাজীর্ণ
ঘড়ির হাতল ধরে
আর কতকাল
এ ভুল স্টেশনে বসে থাকবো!

Monday, December 16, 2019

মুক্তিযুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রণোদনা: গান by মুনতাসীর মামুন

মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক নিয়ে লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে, সাংস্কৃতিক প্রণোদনা নিয়ে লেখা হয়েছে কম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নিয়ে কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে বটে কিন্তু সামগ্রিকভাবে সংস্কৃতি কর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে গ্রন্থ রচিত হয়নি, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রবন্ধ হয়ত রচিত হয়েছে। সামগ্রিক শব্দটি ব্যবহার করলাম এ কারণে যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্তবর্তী রাজ্যসমূহের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার সংস্কৃতিকর্মীরা কী করেছিলেন সে সম্পর্কে ধারাবাহিক কোনো বিবরণ নেই। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, শিক্ষক প্রমুখ কী করেছিলেন সে বিবরণ অন্তর্ভুক্ত। যেমন, লেখক/কবি-রা লিখেছিলেন, গায়ক-গায়িকারা গানের জলসা বা বিচিত্রানুষ্ঠান করেছিলেন, গান রেকর্ড করেছেন, শিল্পীরা এঁকেছেন, গণমাধ্যম প্রতিদিন মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ছেপেছে ইত্যাদি। বর্তমান প্রবন্ধ সেই সব কর্মকাণ্ডের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে। বলে রাখা ভালো তথ্যের অভাবে এ প্রবন্ধ সমৃদ্ধ নয়। শুধু পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের প্রয়াসের মধ্যেই এ প্রবন্ধ সীমিত। এখানে শিল্পীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বিচিত্রানুষ্ঠানের বিবরণ দেয়া হয়নি।

গান যে ভালোবাসে না সে খুন করতে পারে- এমন একটি কথার চল ছিল বলে শুনেছিলাম। পরে ভেবে দেখেছি, গান আসলে মানুষকে ভাসিয়ে দিতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের সময় শোনা গানগুলি যখন আজো শুনি তখন সে কথা মনে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধে আমরা ১১টি সেক্টরের কথা বলি। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি সেক্টর ছিল যাকে বলা যেতে পারে বারো নাম্বার সেক্টর- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিবিসি যে ভূমিকা রেখেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রও ১৯৭১ সালে সে ভূমিকা রেখেছিল। স্বাধীন বাংলা বেতারের গানগুলি শোনার জন্য কী আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। এসব গান বারবার মনে করিয়ে দিত, বেঁচে থাকতে হবে। একদিনের কথা মনে আছে। গভীর রাত, নিঃশব্দ, মাঝে মাঝে পাকিস্তানি সৈন্যদের জিপ বা ট্রাকের শব্দ। বিবিসির অনুরোধের আসর শুনছি। হঠাৎ শুনলাম, বাংলাদেশের নোয়াখালী থেকে এক শ্রোতা অনুরোধ করেছেন জোন বায়েজের একটি গানের জন্য। জোন বায়েজ সুরেলা গলায় গাইতে লাগলেন, ‘উই শ্যাল ওভার কাম সাম ডে’। আমার চোখে আচম্বিতে পানি চলে এল কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো- না অতিক্রম আমরা করব- সব করা যাবে, বিজয়ী আমরা হবোই।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র [এরপর থেকে কেন্দ্র] এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গান। কেন্দ্র নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এখানে আমি আর তার বয়ান দেব না এবং এ বিবরণে তা প্রাসঙ্গিকও নয় তেমন। তবুও বলবো, এর ভূমিকা বাদ দিয়ে কোনো রচনা সম্পূর্ণ হবে না।

উনিশ শতকের শেষার্ধ বা বলা চলে বিশ শতকের গোড়া থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত রচিত গানই প্রচারিত হতো কেন্দ্র থেকে। সাদামাটা ভাষায় বলা যায় দেশাত্মবোধক, গণজাগরণমূলক সেইসব গান। সেখানে রবীন্দ্রনাথ তো ছিলেনই, ছিলেন নজরুল, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল থেকে সেই সময়ের গোবিন্দ হালদার পর্যন্ত। সেই সব গান বঙ্গভঙ্গের সময়, চল্লিশের দশকে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের সময় মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই একইভাবে বাঙালিকে প্রণোদনা জুগিয়েছিল এবং তা সামগ্রিকভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের গান হিসেবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এসব পুরনো গানের পাশাপাশি গীতিকাররা বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের লিখলেন নতুন নতুন গান। গাইলেন বিখ্যাত সব শিল্পীরা। সেই সব গান নিয়মিত প্রচারিত হতে লাগল কেন্দ্র থেকে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের বাইরে যে সব গান গাওয়া হয়েছে সেগুলি এ আলোচনায় আসবে না। স্বাধীন বাংলা বেতারের গানগুলি নিয়ে আলোচনা করব। আলোচনা করব প্রধানত : পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীরা কী করেছিলেন তা নিয়ে।

কেন্দ্র থেকে মূলত চার ধরণের গান প্রচারিত হয়েছে- উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত রচিত গান যাকে বলা হতো স্বদেশী সঙ্গীত। এ গানগুলির অধিকাংশ রচয়িতা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল প্রসাদ সেন প্রমুখ। যেমন-

আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি-রবীন্দ্রনাথ
কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট-নজরুল
একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি : অজ্ঞাত
ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা : দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
মোদের গরব মোদের আশা : অতুল প্রসাদ সেন
মায়ের দেয়া মোটা কাপড় : রজনীকান্ত সেন
ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে : মুকুন্দু দাস
মানুষ হ’ মানুষ হ’ আবার তোরা মানুষ; গুরু সদয় গুপ্ত
মুক্তির মন্দির সোপান তলে: মোহিনী সেন

এর দিকে গাওয়া আইপিটিএ বা গণসংস্থার গাওয়া গানগুলি যার মধ্যে সলিল চৌধুরীর সুরারোপিত গানগুলিই বেশি প্রচার করা হতো। যেমন-
মানব না এই বন্ধনে : সলিল চৌধুরী
শোন দেশের ভাই ভগিনী : হেমাঙ্গ বিশ্বাস
বিচারপতি তোমার বিচার : সলিল চৌধুরী
গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা : ভুপেন হাজারিকা

বিশ শতকের শুরু থেকেই এ গানগুলির [ক্রম ১-৯] সঙ্গে বাঙালি পরিচিত। স্বদেশি গান যারা লিখেছিলেন ও সুর করেছিলেন তারা দুটি বিষয়ে খেয়াল রেখেছিলেন।

গানের বাণী
গানের সুর। গানের কথায় যেন দেশের কথা, দেশকে ভালোবাসার কথা মূর্ত হয়। আবেগের সৃষ্টি হয়। বিশ শতকে যে স্বদেশি গানের শুরু হয়েছিল তাতে মার্গ সঙ্গীতের প্রভাব ছিল। রবীন্দ্রনাথ থেকে অতুল প্রসাদ সবাই বাউল, ভাটিয়ালি সারি গানের সুরে জোর দিয়েছিলেন। যে কারণে স্বদেশী গান নি¤œ বর্গের মানুষের কাছেও আদৃত হয়েছিল এবং কালে তা ধ্রুপদী সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছিলেন। লিখেছেন নীহাররঞ্জন রায়- “যে সমস্ত গানকে আশ্রয় করিয়া বাঙালীর মর্মবাণী সেদিন ভাষা পাইয়াছিল, সে সব গান প্রায় সমস্ত রবীন্দ্রনাথের রচনা এবং এই সময়কার রচনা”।

১৯৭১ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখা গানই কেন্দ্র থেকে বেশি প্রচারিত হয়েছে। ষাটের দশকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের যে লড়াই তাই প্রতিফলিত হয়েছে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে। রবীন্দ্রনাথের যেসব গান প্রচারিত হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করা যেতে পারে-

আমার সোনার বাংলা
আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে
ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা
বাঁধ ভেঙ্গে দাও, বাঁধ ভেঙ্গে দাও
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
বাংলার মাটি বাংলার জল
যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক
আমি ভয় করবো না ভয় করবো না
বাংলার মাটি বাংলার জল
শুভ কর্মপণে ধরো নির্ভয় গান
সঙ্কোচের বিহ্বলতা, নিজের অপমান
ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে
নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়
দেশে দেশে ভ্রমি যব দুখ গান গাহিয়ে
এবার তোরা মরা গাঙে বান এসেছে
এবার মরা গাঙে বান এসেছে
এরপর বোধহয় স্থান ছিল কাজী নজরুল ইসলামের। কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর গানের তালিকায় আছে-
এই শিকল পরা ছল
ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
চল চল চল
দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাপার
তোরা সব জয়ধ্বনী কর
মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম
জাগো অনশন বন্দী ওঠরে যতো
জাগো নারী বসীন শিখা
একি অপরূপ রূপে মা তোমার
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে

বিশ শতকের চল্লিশ দশকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গণনাট্য সংঘের অনেকে বিভিন্ন ভাষায় গান রচনা করেছিলেন। সুর দিয়েছিলেন বা লিখেছিলেন যেমন, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিনয় রায়, সলিল চৌধুরী প্রমুখ। তাঁরা বিভিন্ন স্বদেশী গানও কোরাসের মাধ্যমে ‘গণসঙ্গীতে’ রূপান্তর করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের গান তাঁরা অনেক গেয়েছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে খাজা আহম্মদ আব্বাস লিখেছিলেন-
‘‘For through famine or invasion, imperialist oppression or proletarian upsurge, the voice of Tagore remains the voice of Bengal consoling, exhorting the people of great unhappy land.” [অনুরাধা রায়, চল্লিশ দশকে বাংলায় গণসঙ্গীত আন্দোলন]

গণনাট্য সংঘের আন্দোলনের সময় গাওয়া সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস বা ভুপেন হাজারিকার গানই বেশি প্রচারিত হয়েছে বিশেষ করে সলিল চৌধুরীর যেমন
আমার প্রতিবাদের ভাষা
মানব না এই বন্ধনে
বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা
৪. ঢেউ ছুটছে কারা ছুটছে

এ গানের ক্ষেত্রেও তিনি লোকগীতির সুর ভেঙে সুর দেওয়ার কাজ করেছেন। “জীবনে জীবনে, যোগ করার আগ্রহে অধিকাংশ সময় গণসঙ্গীতকাররা লোকগীতির ভাষা ও সুর ধর করতেন।” তবে, সলিল চৌধুরী ছিলেন বিপরীত। “তার সাংগঠনিক শিক্ষার সবচেয়ে প্রভাবশালী উপাদান ছিল পাশ্চাত্য সঙ্গীত। পিতার সংগৃহীত অজস্র সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা ও নিগ্রো স্পিরিচুয়ালের মতো পশ্চিমা লোকসঙ্গীতের রেকর্ড শুনে তিনি বড় হয়েছেন।” [ঐ]

ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত যে সব গান রচিত হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের বিরুদ্ধে সেগুলি পুনঃপ্রচার হয়েছে। এর অধিকাংশ ঢাকা বা চট্টগ্রামের স্টুডিও রেকর্ড বা ঢাকায় প্রকাশিত গ্রামোফোন রেকর্ড। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গাজী মাজহারুল আনোয়ার রচিত সিনেমার গান। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। [সুরকার : আনোয়ার পারভেজ] কেন্দ্রের অধিবেশনের শুরু ও শেষ হতো এই গান দিয়ে। বেলাল মোহাম্মদ এর একটি তালিকা দিয়েছেন [রবীন্দ্র ও নজরুলগীতি বাদে]

কেঁদো না কেঁদো না মাগো
জনতার সংগ্রাম চলবেই : সিকান্দার আবু জাফর, সুরকার : শেখ লুৎফর রহমান
সোনা সোনা সোনা : আব্দুল লতিফ : সুরকার : আবদুল লতিফ, শিল্পী শাহনাজ রহমাতুল্লাহ
সালাম সালাম হাজার সালাম : ফজল-এ- খোদা
ব্যারিকেড বেয়নেট বেড়াজাল : আবু বকর সিদ্দিক, সুরকার: সাধন সরকার
আমার নেতা/ তোমার নেতা শেখ মুজিব : আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সুরকার: সমর দাস
রক্তেই যদি ফোটে জীবনের : শামসুল হুদা
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো : আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সুরকার: আলতাফ মাহমুদ
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্টুডিয়োতে যে সব গান রেকর্ড করা হয়েছিল তারও একটি তালিকা দিয়েছেনÑ
আমি শুনেছি আমার মায়ের কান্না- ফজল-এ-খোদা- শিল্পী মান্না হক
নোঙর তোল তোল সময়- নঈম গরহর সুরকার: নয়ীম গওহর
একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে- গোবিন্দ হালদার-শিল্পী আপেল মাহমুদ
ও বগিলারে কেন বা আলু- হরলাল রায়-শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়
অনেক রক্ত দিয়েছি আমরা- টি এইচ শিকদার
অত্যাচারের পাষাণ কারা- আল মোজাহেদী
সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের-গীতিকার ও সুরকার মোকসেদ আলী সাই-শিল্পী আবদুল জব্বার ও কোরাস
তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর-গীতিকার ও সুরকার, শিল্পী : আপেল মাহমুদ ও রথীন্দ্রনাথ রায়
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে- গোবিন্দ হালদার-শিল্পী স্বপ্না রায়
পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে- গোবিন্দ হালদার- সুরকার সমর দাস
আমি এক বাংলার মুক্তি সেনা- নেওয়াজিস খান
মুক্তির একই পথ সংগ্রাম-শহীদুল ইসলাম
জগৎবাসী বাংলাদেশকে যাও দেখিয়া- সরদার আলাউদ্দীন
রুখে দাঁড়াও- সরদার আলাউদ্দীন
মানুষ হ মানুষ হ- গুরু সদয় দত্ত- কামরুল হাসান- বেলাল মোহাম্মদ প্রমুখ

বলাবাহুল্য তালিকাটি অসম্পূর্ণ। আসলে কেন্দ্রের ইতিহাস লেখা হলেও, কারা কিভাবে গান লিখেছেন, কী কী গান লিখেছেন, তার অভিঘাত কী ছিল, সম্পূর্ণ গানের তালিকা- এ সম্পর্কে তথ্য প্রায় নেই বললেই চলে। বেলাল মোহাম্মদের ঐ তালিকা ছাড়া অন্যান্য তথ্য থেকে কিছু গানের তালিকা পাই। ধরে নিতে পারি তার কিছু কেন্দ্রের স্টুডিওতে রেকর্ড করা হয়েছিল। যেমন-

অনেক ভুলের মাশুল তো ভাই- অনল চট্টোপাধ্যায়, সুর অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়
আমাদের চেতনার সৈকতে- নাজিম মাহমুদ, সুর সাধন সরকার
আজি সপ্ত সাগর ওঠে উচ্চলিয়া-সত্যেন সেন, সুর অজিত রায়
আমরা তো সৈনিক শান্তির সৈনিক-আখতার হোসেন- সুর সেলিম রেজা
উঠলোরে ঝড়- দিন বদলের পালা-ওমর শেখ
একুশ আসে জানাতে বিশে^- লোকমান হোসেন জাকির
এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে- খান আতাউর রহমান [এটি খুব সম্ভব আগে রেকর্ড করা]
ও বাজান চল যাই চল- জসিম উদ্দিন
ওরে ভাইরে ভাই বাংলাদেশে বাঙালি আর নাই- আনিসুল হক চৌধুরী, সুর শেখ লুৎফর রহমান
ও হে কাল চাঁদ-রুহুল আমিন প্রামাণিক, সুর আবদুল আজীজ বাচ্চু
ওরে মাঝি দে নৌকা- শহীদ সাবের, সুর শেখ লুৎফর রহমান
কারখানাতে খেত খামারে- এনামুল হক, সুর আলতাফ মাহমুদ
কে কে যাবি আয়রে- ইন্দ্র মোহন রাজবংশী-ঐ
ঘুমের দেশে ঘুম ভাঙাতে- বদরুল হাসান, সুর আলতাফ মাহমুদ
চলছে মিছিল চলবে মিছিল- দিলওয়ার, সুর অজিত রায়
জলপথ প্রান্তরে সাগরের বন্দরে- মুস্তাফিজুর রহমান, সুর সমর দাশ
ডিম পাড়ে হাঁসে খায় বাগদাসে- ফেরদৌস হোসেন ভুঁইয়া, সুর সুখেন্দু চক্রবর্তী
তারা এ দেশের সবুজ ধানের শীষে – মো. মনিরুজ্জামান, সুর সমর দাশ
দূর হতে আসে ঐ মৃত্যুর পরোয়ানা- চিরঞ্জীব দাশ শর্মা-ঐ
নিষ্ফল কভু হয় না এ ধারায়- নাজিম সেলিম বুলবুল-ঐ
প্রাণে প্রাণ মিল করে দাও- স্বাধীন দাশ গুপ্ত-ঐ
ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য-সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুর শেখ লুৎফর রহমান
মিলিত প্রাণের কলরবে- হাসান হাফিজুর রহমান, সুর শেখ লুৎফর রহমান
মানুষের ভালোবাসি ঐ মোর অপরাধ- সত্যেন সেন-ঐ
মুুজিব বাইয়া যাও রে- মোহাম্মদ শফি
মাগো তোমার সোনার মানিক- রাহাত খান, সুর-সুখেন্দু চক্রবর্তী
যায় যদি যাক প্রাণ- আবু হেনা মোস্তফা কামাল-ঐ
রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি-আবুল কাশেম সন্দীপ-সুজেয় শ্যাম
লাঞ্ছিত নিপীড়িত জনতার জয়-মতলুব আলী, সুর শেখ লুৎফর রহমান
স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে- আখতার হোসেন অজিত রায়

এ তালিকাও অসম্পূর্ণ বলে আমার ধারণা। তবে, একটি বিষয় লক্ষণীয় ১৯০৫-এর পর থেকে স্বদেশী গানের বিষয়ের যে কথা ও সুর, সে ঐতিহ্য মেনেই রচিত হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের গান’ [ কেন্দ্র রেকর্ডকৃত]। কামাল লোহানী বলেছিলেন, সে সময় সব সবকিছুর অভাব ছিল, গীতিকার সুরকার, গায়কের। কিন্তু অভাব বোধ হয়নি। কারণ যার যা সম্বল তাই নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন প্রবল উৎসাহে।
স্বাধীন বাংলা বেতারে পরিবেশিত গান খবরেরও বিষয় ছিল, যেমন-
“স্বাধীন বাঙলা বেতারে ‘আন্তর্জাতিক গণসঙ্গীত’ (স্টাফ রিপোর্টার)-

কলকাতা, ২ জুন- আজ ‘স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে প্রচারিত ‘অগ্নিশিখা’ নামক এক অনুষ্ঠানে ‘আন্তর্জাতিক’ গণ-সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়।
ঐ ‘আন্তর্জাতিক’ সঙ্গীত ছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কৃত ‘ইন্টারন্যাশনাল’-এর বঙ্গানুবাদ। ঐ অনুষ্ঠানেই নজরুলের প্রসিদ্ধ ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ সঙ্গীত এবং সুকান্ত’র ‘বন্ধু তোমার ছাড়ো উদ্বেগ সুতীক্ষ্ম কর চিত্ত’ কবিতাও পরিবেশন করা হয়েছে।” [কালান্তর, ৩.৬.১৯৭১]

সব গানই যে জনপ্রিয় হয়েছিল তা নয়। রাষ্ট্রভাষা, ঊনসত্তরকে ভিত্তি করে কেন্দ্রের স্টুডিও থেকে রেকর্ডকৃত যে সব গান জনপ্রিয় হয়েছিল এবং এখনও জনপ্রিয়, সেগুলি হলো, যেমন-

জয় বাংলা বাংলার জয়
পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে

Tuesday, December 10, 2019

কফিনের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন ‘হ্যাঁ’ by ইজাজ আহ্মেদ মিলন

কোনোভাবেই হিসেবটা মেলাতে পারছিলেন না সৈকত চৌধুরী। মেনে নিতেও কষ্ট হচ্ছে। নানা রকম ভাবনা ভিড় করছে মস্তিষ্কে। কেন এমনটা হলো! আনিকা শেলীর এমন আচরণে খ্যাতিমান লেখক সৈকত চৌধুরী শুধু ভেঙেই পড়েননি- চরম অপমানবোধও কাজ করছে তার ভেতরে। ‘খাঁটো’ উপন্যাসটির জন্য বেসরকারি একটি ব্যাংক প্রবর্তিত সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন কথাশিল্পী সৈকত চৌধুরী। পুরস্কার হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়েছেন। সেই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানেও গিয়েছিলেন আনিকা শেলী। ক্ষোভ আর অভিমানে পুরস্কার পাওয়ার খবরটিও শৈলীকে জানায়নি সৈকত। পত্রিকায় ছবিসহ খবরটি দেখে আনন্দে শেলী সেদিন কেঁদেছিলেন। জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শেষে নীরবে ফিরে আসেন শেলী। সৈকতের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু দেখা করেননি। ভালোবাসার মানুষের এমন প্রাপ্তি শেলীকে সব সময় আনন্দ দেয়-খুশি করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরপরই শেলীর প্রেমে পড়েন সৈকত। গভীর প্রেম। সৈকত চৌধুরী জাতীয় দৈনিকগুলোর সাহিত্য পাতায় নিয়মিত গল্প লেখেন। সৈকতের প্রথম উপন্যাসের নাম ‘ খাঁটো’। বইটি তাকে রাতারাতি পরিচিতি এনে দেয়। ‘খাঁটো’ উপন্যাসটি উৎসর্গ করেন আনিকা শৈলীকে। উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন- ‘আমার ছন্দহীন একটি জীবনকে ছন্দময় করেছে, জীবনের অর্থ খুঁজে নিতে সহযোগিতা করেছে- প্রিয়তমা আনিকা শেলীকে।’ সৈকত চৌধুরীর লেখালেখি মোটেও পছন্দের ছিল না শেলীর। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে বহুবার মান অভিমান হয়েছে। এক পর্যায়ে সম্পর্ক ভেঙেও যায়। সৈকত চৌধুরী লেখালেখি ছাড়তে পারেননি। শেলীর সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তিনি লেখেন ‘খাঁটো’ উপন্যাস।
নীলক্ষেত এলাকার পুরনো বইয়ের দোকান থেকে প্রায় সময়ই প্রয়োজনীয় বই কিনে আনেন সৈকত। কখনো কখনো পল্টন এলাকায়ও যান। সত্যজিৎ রায়ের ‘অ্যাবস্ট্রাকশান’ নামের গল্পের বইটি কেনার জন্য সেদিন নীলক্ষেতের পরিমল বককর্ণারে পুরনো বইগুলো উল্টোচ্ছিলেন সৈকত চৌধুরী। হঠাৎ করেই চোখে পড়ে নিজের লেখা ‘খাঁটো’ উপন্যাস। চমকে উঠেন সৈকত চৌধুরী। বইটি হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে থাকেন। বলপয়েন্টে নিজের হাতের লেখা ‘প্রিয়তমা, আনিকা শেলীকে। তোমাকে এখনো আপনজন ভাবি, স্বপ্ন দেখি-সংসার গড়ার স্বপ্ন। বইটা পড়লে খুশি হবো। -সৈকত চৌধুরী। কপাল ঘেমে উঠছে। হাত কাঁপছে। এই বই এখানে? বিড় বিড় করে নিজেকে প্রশ্ন করেন সৈকত। বছরখানেক আগে সুকৌশলে পুরান ঢাকার বাসায় গিয়ে বইটা তিনি শেলীর হাতে দিয়ে এসেছিলেন। সেই বই এখানে? বইটা কিনে নিলেন তিনি। আটশ টাকা মূল্য। তিনশ দিয়ে কিনলেন। পাশের একটি চা-স্টলে বসে সিগারেট ধরানোর সময় সৈকতের মনে হলো- আমার সঙ্গে বিশ্বনন্দিত আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ এর সঙ্গে দারুণ একটি মিল পেলাম। জর্জ বার্নার্ড শ এর জীবনেও এমন ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনাটা মনে করার চেষ্টা করছিলেন চা-স্টলে বসে। জর্জ বার্নার্ড শ তার লেখা একটি নাটকের বই একবার প্রিয় এক অভিনেত্রীকে উপহার দিয়েছিলেন। বইয়ে নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন ‘নাট্যকারের ভালোবাসাসহ- জর্জ বার্নার্ড শ।’ এরপর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে।
জর্জ বার্নার্ড শ’রও অভ্যাস ছিল পুরনো বইয়ের দোকানে গিয়ে প্রয়োজনীয় বই খুঁজে বের করে সেটা কিনে আনার। একদিন পুরনো বইয়ের দোকানে গিয়েছেন জর্জ বার্নার্ড শ। দুষ্প্রাপ্য কোনো বই খোঁজছিলেন। এমন সময় হঠাৎ তার হাতে উঠে এলো সেই বই, যেটা তিনি প্রিয় অভিনেত্রীকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। জর্জ বার্নার্ড শ’র বোঝতে আর বাকি রইলো না বইটি প্রিয় অভিনেত্রী বিক্রি করে দিয়েছেন। পুরনো দোকান থেকে নিজের লেখা নাটকের বইটি কিনে নিলেন জর্জ বার্নার্ড শ । বইটি আবার পাঠালেন প্রিয় অভিনেত্রীর কাছে। উপহার পেয়ে অভিনেত্রী এবার লজ্জা পান। কারণ, প্রথমবারের লেখার নিচেই জর্জ বার্নার্ড শ এবার লিখেছেন ‘আবার নতুন করে ভালোবাসা জানিয়ে’। জর্জ বার্নার্ড শ’র এই ঘটনা মনে করে সৈকত চৌধুরী খানিকটা হাসলেন। চা বিক্রেতা সৈকতের হাসির দৃশ্য দেখে ফেলেন। জানতে চান- স্যার, আফনে হাসলে ক্যান? আমার লুঙ্গিটা ছেঁড়া দেইখ্যা? সৈকত সাহেব তো হতবম্ব ! চা বিক্রেতার লুঙ্গির দিকে তো দৃষ্টিই পড়েনি। বললেন, আরে না! আমি তো আপনার লুঙ্গির দিকে তাকাই-ই নি। তাকালেই কি ছেঁড়া লুঙ্গি দেখে আমি হাসবো! এমনিতেই হাসলাম। একটা কথা মনে পড়েছে তো !
সৈকত চৌধুরী এবার হাঁটতে থাকলেন। নানা রকম প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার মানে শেলী বইটি খুলেওনি? উপহার দেয়ার পরদিনই হয়তো ফেরিওয়ালার কাছে পুরনো পত্রিকার সাথে হয়তো বিক্রি করে ফেলেছে। বইটা তো অন্তত খুলে দেখা উচিৎ ছিল! ভাঁজও খুলেনি- সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। কী করা যায়! জর্জ বার্নার্ড শ’র মতো আবার কি বইটি শেলীর কাছে পাঠাবেন? নাকি অপমান বুকে জিইয়েই রাখবেন? এমন সব চিন্তা করতে করতে আজিমপুর বাসায় পৌঁছে যান সৈকত চৌধুরী। লেখালেখির কারণে শেলীর সাথে সম্পর্কই টেকেনি। সেই শেলীকে বই দিয়ে আসা এক ধরণে অপরাধ হয়েছিল, আবার পাঠাবো? প্রশ্ন করে নিজেকে। উত্তর আসে- ‘না’।
দুপুরের ঠিক পর বাসায় পৌঁছে ফ্যানটা অন করে বিছানায় গা এলিয়ে ক্লান্ত সৈকত চৌধুরী শুয়ে পড়েন। বের হওয়ার সময় টিভিটা অব করতে খেয়াল ছিল না। শুয়েই টিভির দিকে চোখ রাখেন সৈকত সাহেব। টিভিতে স্ক্রল যাচ্ছে ‘পুরান ঢাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড : বহু হতাহতের আশঙ্কা’। মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে শেলীর নাম্বারে কল করলেন। ফোন বন্ধ। আনিকা শেলী পুরানা ঢাকাতেই জরাজীর্ণ একটি ভবনে থাকেন। বাবা মারা গেছেন দশ বারো বছর আগে। মা আর ভাই থাকেন নওগাঁর রানীনগরের গ্রামের বাড়িত। একমাত্র ছোট ভাই সেলিম সবজির ব্যবসা করে শেলীর পড়াশোনার খবর দেন। পড়াশোনা শেষ হয়েছে কেবল। একটি চাকরি জন্য দৌড়াদৌড়ি করছেন শেলী। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। ভাইভার জন্য অপেক্ষা। তার সব কিছুই ভালো লাগে- শুধু লেখালেখি ছাড়া। ছোট বেলায় স্কুলে এক শিক্ষক তার মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিয়েছেন- লেখকরা ছন্নছাড়া হয়, তারা বেখেয়ালি হয়, জীবনে অনেক কষ্ট করতে হয় তাদের, লেখকরা সংসারী হয় না। সংসার গড়লেও টেকাতে পারে না- এ সব নানা নেগেটিভ ধারণা। শিক্ষকের সেই কথা এখনো মনে আছে শেলীর। এ কারণে ভালোবাসার মানুষ লেখক হবে এবং তার সঙ্গে সংসার হবে এমনটা শেলী কখনো চায়নি। তার চাওয়াই পূরণ হয়েছে। সৈকত চৌধুরীর সঙ্গে তার ছেদ ঘটে।
চৌধুরী সাহেব টিভি চ্যানেলে লাইভে দেখছিলেন সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য। বারবার শিউরে উঠছিলেন। শেলী জীর্ণ ভবনটিতে বাস করতেন সেই ভবনেই আগুন। তার মোবাইলটাও বন্ধ। ওই অবস্থাতেই দ্রুত বের হয়ে পুরান ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন সৈকত। ভবনের সামনে হাজার হাজার মানুষ। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন আগুন নেভাতে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারদিক। স্বজনদের খোঁজছেন কেউ কেউ। সময় যতোই যাচ্ছে ততোই সেখানকার আকাশ ভারি হচ্ছে। পোড়া মানুষের গন্ধ বেরোচ্ছে। সৈকত খোঁজছেন তার প্রিয়তমা শেলীকে। অভিমান বুকে জমা থাকলেও ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। রাত ৩টা দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা একটার পর একটা লাশ বের করে আনতে থাকেন। ইতোমধ্যে শেলীর গ্রামের বাড়িতে টেলিফোন করে ওই ভবনে আগুন লাগার খবরটি জানিয়ে দেন। নওগাঁ থেকে শেলীর মা আর ভাই ঢাকা আসার জন্য গাড়িতে চড়েছেন। শেলীর সঙ্গে থাকতো তার এক প্রতিবেশী। নাম রুবী আক্তার। অনার্স ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। রুমী টেলিফোন করে তার ভাইকে জানিয়ে দিয়েছে শেলী পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। আগুন লাগার সময় রুবী বাইরে ছিলেন বলে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। সৈকত চৌধুরী খোঁজছেন শেলীকে।এরই মধ্যে রুমী তাকেও ফোন দিয়ে জানায় শেলী আর নেই। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশগুলো বাইরে এনে রাখা হচ্ছে। সারিবদ্ধ লাশের দিকে তাকানো যায় না। তবুও সৈকত প্রিয়তমাকে খোঁজছিলেন মানুষের ভিড়ে, কখনো আবার লাশের সারিতে। বাম হাতে একটা কাটা দাগ ছিল শেলীর। গলায় ছিল সোনার চেইন। চেইনটা খুব পরিচিত সৈকতের। এটা দেখে শেলীর অঙ্গার হয়ে যাওয়া নিথর দেহ শনাক্ত করেন তিনি। রাত কেটে যায় বীভিষিকাময় ভবনের সামনে। ভয়াবহ সে আগুনের ঘটনায় ৫১ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয়।
ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে সৈকত চৌধুরী বাসায় ফেরেন। শেলীর নম্বর থেকে আসা ক্ষুদে বার্তাগুলো দেখতে থাকেন। তিনদিন আগে সর্বশেষ ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন শেলী। ক্ষুদে বার্তাটি তার চোখে পড়েনি। বেখেয়ালীপনার কারণেই হয়তো। সেখানে শেলী লিখেছেন ‘মাফ করে দিও। আমি তোমার বইটা ধরেও দেখিনি। অভিমান আর ক্ষোভে। তুমি আমার সঙ্গে জেদ করে লেখক হয়েছো। বিখ্যাতও হয়েছো। আমি খুব আনন্দিত। ভুলটা বোঝতে পেরেছি। আমি আবার তোমার ভালোবাসার আঁচলে জড়াত চাই। তোমার সঙ্গেই সংসার গড়তে চাই। ঠাঁই দিবে তো? বিসিএসে চূড়ান্তভাবে টেকার পরপরই বিয়ে করে ফেলবো।’ এরই মধ্যে শেলীর মায়ের ফোন আসে তার মোবাইলে। ফোন রিসিভ করতেই কান্নার শব্দ ভেসে আসে। কথা বলতে পারছিলেন না কন্যা হারা মা। নির্বাক সৈকত চৌধুরীও। ফোন কেটে দেয়ার পর শেলীর ক্ষুদে বার্তার উত্তর কী লিখবেন ভাবছিলেন। শুধু লিখলেন ‘হ্যাঁ’। কিন্তু এই বার্তা শেলী পাবে কী করে? তার মোবাইল তো পুড়ে গেছে- শেলীও তো অঙ্গার। এক টুকরো কাগজে সৈকত চৌধুরী লিখলেন ‘হ্যাঁ’। এবার মর্গে গিয়ে শৈলীর কফিনের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন সেই কাগজ। কাগজে লেখা শুধু ‘হ্যাঁ’। অ্যাম্বুলেন্সে উঠানো হলো কফিন। সৈকত চৌধুরী অপলক তাকিয়ে রইলেন অ্যাম্বুলেন্সের দিকে। সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছুটছে…।

Friday, November 15, 2019

দুঃস্বপ্ন অথবা নীলচোখের মেয়েটি by মঈন মুরসালিন

বোশেখের অশান্ত বাতাসের ঝাপটা বারবার আছড়ে পড়ছে চোখেমুখে, জানালার রঙিন পর্দাটাও পত্পত্ করে উড়ছে। বোশেখের শেষ দিকে ক্লান্ত দুপুরে বিছানায় গড়াগড়ি আর বুকে জড়ানো শাদা কোল বালিশ নিয়ে এপাশ-ওপাশ করছি। চোখের পাতা ভারি হয়ে যাচ্ছে তবু কেন যেন ঘুমোতে ইচ্ছে করছে না। চারটা বাজতেই আড়মোড়া দিয়ে উঠে বসি, চোখ চলে যায় জানালা গলে পাশের বাড়ির দ্বিতীয় তলার মিলিদের বারান্দায় এবং চোখ আটকে যায় একটি নীলাভ চোখে। হ্যাঁ, সত্যি সত্যি সুন্দরী-রূপসী একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর তাকিয়ে আছে আমার দিকেই, কিন্তু এ মেয়েকে এ বাড়িতে আর কখনো দেখিনি। আমি বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, মেয়েটি তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। আমি গভীরভাবে নির্লোভ চোখে তার দিকে তাকালাম। মনে হলো এমন নীলাভ চোখের মেয়ে বুঝি আর কখনো দেখিনি। তার চোখ আয়নার মতো স্বচ্ছ, সমুদ্রের মতো গভীর, আমার মন তার নাম দিলো নীলিমা। ধীরে ধীরে অন্ধকারের গিলাফ ঢেকে দেয় পৃথিবীকে, নীলিমা চলে যায় ঘরে কিন্তু তার চোখ হৃদয়ের আয়নায় ভেসে উঠলো এবং আমার সাথে কথা বলতে লাগলো, অনেক অনেক কথা…।

দুই....
পরদিন বিকেলে ছাদে উঠলাম, টবে পানি দিতে গিয়ে দেখি পাশের বাড়ির ছাদে মিলির হাত ধরে হাঁটছে সেই নীলাভ চোখের সুন্দর মেয়েটি। যাকে নীলিমা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে। আমি সবগুলো টবে পানি দিয়ে একটি চেয়ারে বসলাম, তাকিয়ে দেখতে লাগলাম নীলিমা ও মিলিকে। মিলি কি যেন বলতেই নীলিমা হাসতে লাগলো, তার চোখের পলক মাঝে মাঝে কেঁপে উঠে, আমি অভিভ‚ত হলাম তার মোহনীয় আকর্ষণীয় চাহনি দেখে। হয়তো ইমরাউল কায়েস উনায়জার এমন চোখকেই বন্য গাভীর নীলাভ চোখের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। মিলির হাত ধরে নীলিমা নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে, আমি তাকিয়ে থাকলাম চলে যাওয়া সিঁড়ির দিকে। আমার মন বলতে লাগলো আমি আজ সত্যি সত্যি তার চোখের প্রেমে পড়ে গিয়েছি।

তিন....
কিছুদিন পর দুপুরে খেয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করছি। বোশেখের আকাশে থমথমে ভাব, গুড়–ম গুড়–ম আওয়াজে মেঘে মেঘে সংঘর্ষ হচ্ছে, ধীরে ধীরে আকাশ কালো হতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরেই ঝিরঝির করে নামলো বৃষ্টি, ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গেল সামনের রাস্তা, বাড়ির বারান্দা এবং জানালার পার্টগুলো।
বৃষ্টিটা হঠাৎ থেমে গেল মেঘ চলে যাচ্ছে দ্রুত উত্তরাকাশে। শীতল বাতাস বইতে লাগলো, খুলে গেল পাশের বাড়ির দরজা নীলিমা বেরিয়ে এল। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে তাকালো নিষ্পলক দৃষ্টিতে। আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি বইতে লাগলো। নীলিমা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে, ভিজে যাচ্ছে তার সর্বাঙ্গ; আমিও ভিজে যাচ্ছি। তবুও তার চোখ আমাকে চুম্বকের আকর্ষণের মতো দাঁড় করিয়ে রাখলো। কত সুন্দর মসৃণ চেহারা, নীলাভ চোখ। তার চোখ দেখে আমার মনে হতো মরুভ‚মিতে সবুজ ঘাস তাকে আমি ইশারা করলাম সরে যেতে বৃষ্টি তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যা হয়ে গেল বলে মা ডাকতে লাগলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘরে চলে এলাম। কারণ দেরি হলে মা বারান্দায় এসে দেখতে পারেন।

চার....
পরেরদিন সন্ধ্যা হয়ে গেল নীলিমা আসছে না, বুকের ভেতর মুচড়ে উঠলো কষ্ট। সন্ধ্যায় আর পড়তে বসতে পারলাম না। শুধু তাকিয়ে থাকলাম বন্ধ দরজার দিকে। বই খুলে তাকিয়ে আছি পড়তে ইচ্ছে করছে না। অনেকক্ষণ খেয়াল করে ছোট বোন লতা বললো, কি ভাবছো ভাইয়া? বই খুলে পড়ছো না যে?
আমি হঠাৎই বলে ফেললাম লতা, মিলিদের বাড়িতে কিছুদিন হলো একটি মেয়ে দেখছি, সে কে রে?

লতা বললো, ও তুমি নীলা আপার কথা বলছো, সেতো মিলিদের খালাতো বোন। জানো ভাইয়া তার মনে অনেক কষ্ট, তার না দুটো চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন পাথরের চোখ লাগানো, এসেছিল বেড়াতে দেশে চলে গিয়েছে, কথাগুলো বলেই লতা থামলো। কথাগুলো শুনতেই আমার হৃদয়ে বোশেখের ঝড়ের চেয়েও প্রচণ্ড বেগে ঝড় বইতে লাগলো। বারবার যেন বজ্রপাত হচ্ছিল, ভেঙে যাচ্ছিল হৃদয়ের খিড়কি দরজা। এত সুন্দর চোখ মিথ্যে হতে পারে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না, তবে কি পৃথিবী এত নিষ্ঠুর?

Friday, August 9, 2019

রবীন্দ্রনাথ, বাঁশি ও বাংলার সুর by সেলিনা হোসেন

কৈশোর এবং যৌবনের এই মধ্যবর্তী সময়ে রচিত ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি একটি বিশিষ্ট উপাদান। এ বাঁশি কৃষ্ণের বাঁশি। তারপরও রবীন্দ্রনাথ একই সূচনায় লিখেছেন, ‘পদাবলী শুধু কেবল সাহিত্য নয়, তার রসের বিশিষ্টতা বিশেষ ভাবের সীমানার দ্বারা বেষ্টিত।

বাঁশি বাংলার সংস্কৃতিতে নিজস্ব সুর। বাঁশির সুর আমাদের জীবনে একটি অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। আমার বিবেচনায় তার কারণ মূলত তিনটি। এক. আমাদের বাঁশির গঠনের বিশিষ্টতা। সাধারণ মানুষের হাতে তৈরি এ বাঁশি একদিকে জীবিকার উপকরণ, অন্যদিকে সাধারণের মধ্যে অসাধারণ। আমাদেরই মাটিতে জন্মানো বাঁশ দিয়ে তৈরি, কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যে ধরনের বাঁশি ব্যবহৃত হয় সেগুলোর মতো নয়। দুই. আমাদের লোকসঙ্গীতে দুটি যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়- বাঁশি ও একতারা। আমাদের লোকসঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারায় বাঁশি প্রাধান্য লাভ করে। সে ধারাটি ভাটিয়ালি গানের ধারা। তিন. আমাদের পুরাণ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বাঁশির যোগ আছে। এর প্রমাণ শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিতে রাধা আকুল হন। সে বাঁশির সুরে নারী-পুরুষের সম্পর্কের অনুষঙ্গ থাকে, আধ্যাত্মিকতার গভীরতা থাকে এবং সে বাঁশির সুর যুগ-যুগান্তর পেরিয়ে এখনো আমাদের মনোজগতে ধ্বনিত হয়।
বাঁশি-সংক্রান্ত যে ঐতিহ্য রবীন্দ্রনাথ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, সে ঐতিহ্যকে তিনি তাঁর নিজস্ব দর্শন, অনুভবের প্রতীকে পরিণত করেন। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি জীবনের অপূর্ণতাকে পূর্ণতার সমান্তরালে স্থাপন করে আমাদের। কবির উপলব্ধির মধ্য দিয়ে এসব কবিতার সত্য মানুষকে জীবন-উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি লৌকিক এবং অলৌকিক অনুভবের আলোছায়ায় সম্পৃক্ত করে আমাদের। আমরা তাঁর রচনায় কখনো দৃশ্যমান বাঁশির সুর শুনি, কখনো অনুক্ত উচ্চারণে সে সুর আমাদের মাঝে জেগে থাকে। তার বাঁশির সুর শুধু ব্যক্তি জীবনকে নয়, ভেঙে দেয় ব্যক্তি জীবনের গণ্ডিকে। সে বাঁশি সমষ্টির হয়। কখনো দিকনির্দেশনারও কাজ করে।
ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি কাব্যগ্রন্থের সূচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বোম্বাইয়ে মেজদাদার কাছে যখন গিয়েছিলুম তখন আমার বয়স ষোলোর কাছাকাছি, বিলাতে যখন গিয়েছি তখন আমার বয়স সতেরো। নতুন-প্রকাশিত পদাবলি নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, সে আরো কিছুকাল পূর্বের কথা। ধরে নেয়া যাক, তখন আমি চোদ্দোয় পা দিয়েছি।’
কৈশোর এবং যৌবনের এই মধ্যবর্তী সময়ে রচিত ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি একটি বিশিষ্ট উপাদান। এ বাঁশি কৃষ্ণের বাঁশি। প্রেমের প্রতীক, জীবনের আর্তি। তারপরও রবীন্দ্রনাথ একই সূচনায় লিখেছেন, ‘পদাবলী শুধু কেবল সাহিত্য নয়, তার রসের বিশিষ্টতা বিশেষ ভাবের সীমানার দ্বারা বেষ্টিত। সেই সীমানার মধ্যে আমার মন স্বাভাবিক স্বাধীনতার সঙ্গে বিচরণ করতে পারে না। তাই ভানুসিংহের সঙ্গে বৈষ্ণবচিত্তের অন্তরঙ্গ আত্মীয়তা নেই। এই জন্য ভানুসিংহের পদাবলী বহুকাল সংকোচের সঙ্গে বহন করে এসেছি। একে সাহিত্যের একটা অনধিকার প্রবেশের দৃষ্টান্ত বলেই গণ্য করি।’
প্রথম গানটি লিখেছিলুম একটা স্লেটের উপরে, অন্তঃপুরের কোণের ঘরে-
‘গহনকুসমকুঞ্জমাঝে
মৃদুল মধুর বংশি বাজে।’
‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি উপস্থাপিত হয়েছে সরাসরি- তার সুর এবং সুরের ব্যঞ্জনা নিয়ে।
যেমন :

ছয় সংখ্যক পদাবলী : ইতি ছিল নীরব বংশীবটতট,
কথি ছিল ও তব বাঁশি?
সাত সংখ্যক পদাবলী : শুন সখি, বাজত বাঁশি
গভীর রজনী, উজল কুঞ্জপথ
চন্দ্রম ডারত হাসি।

এমনকি উনিশ সংখ্যক পদাবলী, যার শুরু : মরণ রে,/ তুহুঁ মম শ্যাম সমান- এই পদাবলীতে বাঁশি এসেছে এভাবে :
দূর সঙে তুহুঁ বাঁশি বজাওসি,
অনুখন ডাকসি, অনুখন ডাকসি
রাধা রাধা রাধা!

আগেই বলেছি শ্রীকৃষ্ণের এই বাঁশি রবীন্দ্রনাথকে অনুপ্রাণিত করেছিল। অন্তঃপুরের কোণের ঘরে বসে স্লেটের উপর লেখা দুটি পঙ্ক্তির মধ্যে যে বাঁশি তিনি বাজিয়েছিলেন, পরবর্তী জীবনে সে বাঁশিকে আরও বিচিত্রতর করেছেন।

‘পুনশ্চ’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা আছে, তার নাম ‘বাঁশি’। এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বাঁশির সুরকে নানা প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ব্যবহার করেছেন। এই ব্যবহার কখনো সরাসরি, কখনো অনুচ্চারিত। তিনি আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির মধ্যে কোনো তফাৎ খুঁজে পাননি। কেননা মৃত্যু নামক সত্যের কাছে বাদশা কিংবা সাধারণ মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। মৃত্যুর বাস্তবতা অভিন্ন। এক বৈকুণ্ঠের দিকে সবাইকেই যেতে হয়। তিনি বলেন : ‘আকবর বাদশার সঙ্গে/হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই/বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে/ছেঁড়াছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে এক বৈকুণ্ঠের দিকে।’
মৃত্যুর সঙ্গে বাঁশির এই যোগ আমাদেরকে অর্ফিয়াসের বাঁশির কথাও মনে করিয়ে দেয়। প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু হলে অর্ফিয়াস পাতালের দেবতাকে খুশি করেছিলেন বাঁশি বাজিয়ে। বাঁশির সুরে মুগ্ধ দেবতা অর্ফিয়াসের স্ত্রীকে মর্ত্যে ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন। শর্ত ছিল পাতালের দরজা পার হওয়ার আগে পর্যন্ত অর্ফিয়াস পেছন ফিরে তাকাতে পারবে না। কিন্তু পাতালের দরজা পার হওয়ার আগে নিজেকে সামলাতে পারেনি অর্ফিয়াস। ভাবে, পিছে পিছে আসছে তো ইউরিডাইস? মুহূর্তে ঘুরে তাকালে শর্ত ভঙ্গের অপরাধে অদৃশ্য হয়ে যায় ইউরিডাইস। বুক-ভাঙা আর্তনাদ নিয়ে ফিরে আসে অর্ফিয়াস। বেদনার এক অদৃশ্য বাঁশির সুর ঘিরে থাকে অর্ফিয়াসকে। ‘বাঁশি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথও বেদনার এক হিম-শীতল অনুভব ছড়িয়ে দিয়ে শেষ করলেন এভাবে :

‘এ গান যেখানে সত্য/অনন্ত গোধূলিলগ্নে/সেইখানে/বহি চলে ধলেশ্বরী; তীরে তমালের ঘনছায়া; আঙিনাতে/ যে আছে অপেক্ষা করে, তার/পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’
এই পঙ্ক্তির মধ্যেও অদৃশ্য বাঁশির করুণ সুর আছে, সেটা অলৌকিক বাঁশি- এ বাঁশি অনন্ত গোধূলিলগ্নে বাজে, যার কাল পরিসীমা নেই, যে বেদনা মানুষের জীবনের চিরসত্য, রবীন্দ্রনাথ বাঁশির সঙ্গে তার যোগ সবচেয়ে বেশি নিবিড় দেখেছেন। ‘ঘরেতো এলো না সে তো, মনে নিত্য আসা যাওয়া/পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’
কেন ‘বাঁশি’ কবিতায় এমন গভীর কষ্ট? বাঁশি ছাড়া কি অন্য নাম হতে পারতো না কবিতাটির? ‘কিনু গোয়ালার গলি’ দিয়ে যে কবিতার শুরু সেটা শেষ হয়েছে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ের একটি গ্রামে একজন অপেক্ষারত নারীর ছবির মধ্যে। বাঁশির সুর যে রূঢ় বাস্তব ভুলিয়ে দিতে পারে এবং এক স্বপ্নময়, ছায়াময়, মোহময় জগতে তার উত্তরণ ঘটাতে পারে, এই বোধই এই কবিতাকে পাঠকের মনের কাছে নিয়ে যায়। এই ‘বাঁশি’ রবীন্দ্রনাথের নিজের।
‘পলাতকা’ কবিতায় একটি পোষা হরিণ এবং পাহাড় থেকে আনা একটি কুকুরছানা এক সঙ্গে খেলে বেড়ায় এবং বড় হতে থাকে। এর মধ্যে হঠাৎ করে একদিন ফাল্গুন মাসে দক্ষিণের পাগল হাওয়া বইতে শুরু করে এবং হরিণ যেন কার উদাস করা বাণী হঠাৎ শুনতে পায়। তারপর একদিন বিকেলবেলায় হরিণ মাঠের পর মাঠ পার হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
‘সম্মুখে তার জীবনমরণ সকল একাকার/অজানিতের ভয় কিছু নেই আর।’
হরিণের বুকে বহু যুগের ফাল্গুন দিনের সুরে বাঁশি বেজে ওঠে এবং কোথায় কোনদূরে তার আপনজন আছে তার খোঁজে সে বেরিয়ে পড়ে এবং কখনো আর ফেরে না। এই কবিতায় বসন্তের সঙ্গে বাঁশি এক হয়ে যায় এবং বসন্তের ডাক প্রেমের যে অনুভব সৃষ্টি করে তা এই কবিতার মুখ্য বিষয় হয়ে যায়। এখানে প্রকৃতির একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। বসন্তের বাঁশি যখন প্রকৃতিতে বেজে ওঠে তখন তা কেবল মানুষকে আকুল করে না, সমস্ত প্রকৃতিকেই বিহ্বল করে দেয়। এই বিহ্বল করে দেয়ার মধ্য দিয়ে বাঁশি এই কবিতায় একটি বিশেষ মাত্রা লাভ করে।
রবীন্দ্রনাথের একটি গান এমন : ‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে/ভরে রইল বুকের তলা, কারো কাছে হয়নি বলা/কেবল বলে গেলেম বাঁশির কানে কানে।’
বাঁশি এখানে মানুষ, তার ওপর ব্যক্তিত্ব আরোপ করা হয়েছে। এ বাঁশির কান আছে। বুকের ভেতরের যে কথাটি অন্য কাউকে বলা যায় না, তা বাঁশিকে বলা যায়, অর্থাৎ বাঁশির সুরে সেই না বলা কথা ঘন যামিনীর মাঝে ফুটে ওঠে। এভাবে একটি ভাবনা থেকে আর একটি ভাবনায় প্রবেশ করা যায়, যেখানে বাঁশি অদৃশ্য। কিন্তু আপাত সরল অর্থের অন্তরালে মনে হয় বাঁশিকে যে ব্যক্তি ভেবে নিজের কথা বলে সে নারী। বাঁশি এ গানে নারী-জীবনের প্রতীক। যেন বাঁশি নিজেই এখানে বাঁশিওয়ালার ভূমিকা পালন করছে।
রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতার নাম ‘বাঁশিওয়ালা’। একে যদি আমি নারীবাদী কবিতা বলি তাহলে কি ভুল বলা হবে? এই কবিতায় বাঁশির সুর শুনে একটি নারীর জেগে ওঠার কথা তিনি জানিয়েছেন। বলছেন : ‘তোমার ডাক শুনে একদিন/ঘরপোষা নির্জীব মেয়ে/অন্ধকার কোণ থেকে/বেরিয়ে এল ঘোমটা খসা নারী।’
এ নারী রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে দেখা মানুষ। তার পরিচয় এমন : ‘আমি তোমার বাংলাদেশের মেয়ে। সৃষ্টিকর্তা পুরো সময় দেননি/আমাকে মানুষ করে গড়তে/রেখেছেন আধাআধি করে।’
যখন বাঁশিওয়ালা বাঁশি বাজায় তখন এই মেয়ে শুনতে পায় তার নতুন নাম। তার বেলা কাটে না। জোয়ার-জলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। মুক্তিপারের খেয়া তার সামনে দিয়ে ভেসে যায়, ভেসে যায় ধনপতির ডিঙা। তার সামনে দিয়ে চলতি বেলার আলোছায়াও ভেসে যায়। তখন সে শুনতে পায় বাঁশির ডাক। বলে, ‘এমন সময় বাজে তোমার বাঁশি/ভরা জীবনের সুরে/মরা দিনের নাড়ির মধ্যে/দবদবিয়ে ফিরে আসে প্রাণের বেগ।’
বাঁশিওয়ালাকে তার প্রশ্ন, ‘কী বাজাও তুমি।’ তার ধারণা সেই সুর অন্যের মনে হয়তো কোনো ব্যথা জাগায়, কিন্তু ও নিজে শুনতে পায় দক্ষিণা হাওয়ার নবযৌবনের গান। শুনতে শুনতে ওর মনে হয়- ‘যে ছিল পাহাড়তলির ঝিরঝিরে নদী/তার বুকে হঠাৎ উঠেছে ঘনিয়ে/শ্রাবণের বাদলরাত্রি।’
বাঁশির সুর এভাবে তাকে সাহসী নারী করে তোলে। সকালে উঠে সে নিজের ভেতর দেখতে পায় ঝিরঝিরে নদীর পরিবর্তন। যে নদীর প্রবল স্রোত পাড় ভেঙে ফেলছে এবং পাথরগুলো ঠেলে সরিয়ে ফেলতে চাইছে। সে বাঁধভাঙা জোয়ারের তাড়নায় অনুভব করে :
‘আমার রক্তে নিয়ে আসে তোমার সুর।/ঝড়ের ডাক, বন্যার ডাক/ আগুনের ডাক/পাঁজরের উপরে আছাড় খাওয়া/মরণসাগরের ডাক/ঘরের শিকল-নাড়া উদাসী হাওয়ার ডাক।’

পর মুহূর্তে পাল্টে যায় বাঁশির প্রতীক- কবি বলেন ‘বজ্রে, তোমার বাজে বাঁশি, সে কি সহজ গান/সেই সুরেতে জাগব আমি, দাও মোরে সেই কান’- একদম ভিন্ন চিত্রকল্প। এ বাঁশি জীবনের ভিন্ন একটি দিককে উদ্ভাসিত করে। ‘অশান্তির অন্তরে যেথায় শান্তি সুমহান’- সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বাঁশি প্রতিবাদী সুরে বেজে ওঠে।
গীতবিতানে অসংখ্য গানে রবীন্দ্রনাথ বাঁশির প্রতীক, বাঁশির চিত্রকল্প নানা ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে জাতি, জাতি থেকে দেশ সর্বত্র রবীন্দ্রনাথের বাঁশির সুর প্রবাহিত হয়ে গেছে। এ বাঁশি বাংলার, এ বাঁশি বাঙালির।
যখন বলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি/চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস/আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’- তখন জগৎ-সংসার তোলপাড় করে। ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে চলে যায় অনুভবের তীব্রতা। মাটি থেকে, প্রকৃতি থেকে, লোকালয় থেকে প্রতিটি মানুষের হৃদয় মথিত হয়ে যে শব্দ বেরিয়ে আসে তার নাম দেশপ্রেম। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি দেশপ্রেমের প্রতীক।
বাঁশিকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা, এমন কি বাঁশির উল্লেখ পর্যন্ত করা, কোনো কবির অবশ্য কর্তব্য হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও এটি অবশ্য কর্তব্য ছিল না। তবু রবীন্দ্রনাথ বাঁশিকে তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন, বাঁশিকে প্রতীক করে তুলেছেন এবং বাঁশির চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে মানব হৃদয়ের গভীর অনুভব ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। বাংলা ভাষায় অন্য যাঁরা কবিতা রচনা করেছেন, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের সমকালে কিংবা তাঁর পরবর্তীকালে, তাঁদের মধ্যে খুব বেশি সংখ্যক কবি বাঁশির এ ধরনের ব্যবহার করেছেন বলে আমার জানা নেই।
রবীন্দ্রনাথ একান্তভাবেই বাংলার ও বাঙালির কবি। বিশ্বের নানা বিষয় অনুভবে ধারণ করা সত্ত্বেও তিনি বিশেষভাবে বাংলারই কবি। অন্যদিকে, বাঁশি বাংলার প্রাণের সুরকে বিশেষভাবে ধারণ করে, এটিই সম্ভবত প্রধান কারণ। যার জন্য রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বাঁশি একটি বিশেষ স্থান লাভ করেছে। অন্য কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বাঁশি বাংলার প্রাণের সুরকে ধরে রাখে।
বাংলার জীবন বাঁশির চিত্রকল্পের ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায়, গদ্য রচনায় বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। বাঁশিকে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বের একটি মূল বিষয় এখানে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। তিনি আবহমানতাকে, ঐতিহ্যকে, আশপাশের পরিচিত জগতকে আত্মস্থ করে নেন এবং তাদের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নিজের কণ্ঠস্বরকে স্থাপন করেন। এ কারণে বাংলার প্রতিদিনের সুর রবীন্দ্রনাথের নিজের সুর হয়েও বাংলার চিরায়ত সুর হয়, আবার রবীন্দ্রনাথের সুর হয়েও স্রোতস্বিনীর মতো বাংলার সুরই থেকে যায়। এজন্য রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে সব সময়ের মতো নতুন হয়ে থাকেন।

রবীন্দ্র ছোটোগল্পে মানবতাবাদ by মাহবুবুল হক

রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ঈশ্বর ও মানুষ দুই-ই বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তার সাহিত্যভাবনায় ইউরোপীয় মানবতাবাদের সুরটি দুর্লক্ষ নয়। দেবতা বা ঈশ্বর মানুষকে রক্ষা করে- এ তিনি মানেননি।

মানুষের ওপর প্রগাঢ় বিশ্বাস ও আস্থা রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রমননের মূল ভিত্তি। তাই রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় ও লেখায় মানবতাবাদী ভাব-ধারণার উজ্জ্বল প্রকাশ লক্ষ করা যায়। তাতে প্রাচ্য মানবতাবাদের প্রভাব যেমন চোখে পড়ে তেমনি পাশ্চাত্য মানবতাবাদের লক্ষণও দুর্লক্ষ নয়।
রবীন্দ্রনাথের চেতনায় যে উপনিষদের প্রভাব পড়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু উপনিষদের মানবিকতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মানবিকতার কিছুটা পার্থক্যও বিবেচ্য। উপনিষদের মানবিকতার ভিত্তি সার্বস্বয়বাদ। রবীন্দ্রনাথ সার্বস্বয়বাদকে স্বীকার করে নিলেও ঈশ্বরের আলাদা অস্তিত্বকেও স্বীকার করে নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে উপনিষদের মানবিকতার ধারণার আধুনিক রূপ দেখা যায় বিবেকানন্দের দর্শনের মধ্যে। সে দর্শনের মূল কথা হলো, সকল জীবের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ ঘটলেও মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের বিশেষ প্রকাশ উপলব্ধি করা এবং বিশ্বমানবের সেবাকে ঈশ্বরের সেবা বলে গণ্য করা। রবীন্দ্রনাথের পরিণত মানবচিন্তার সঙ্গে এই মতের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।
তবে আধুনিককালে মানবতা বলতে আমরা পাশ্চাত্য হিউম্যানিজমকেই বুঝি। চোদ্দো থেকে ষোলো শতকে ইউরোপে যে রেনেসাঁস হয় তখন তা ভাবাদর্শগত আন্দোলনের রূপ নেয়। এর মূল কথা হলো, মানুষের মর্যাদাকে সবার উপরে স্থান দেয়া, মানুষের কল্যাণ, তার সার্বিক বিকাশ, মানুষের সামাজিক জীবনের উপযোগী অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব আরোপ। ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে মানুষের ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে স্বীকার করা, মানুষের ইহজাগতিক প্রয়োজনীয়তা ও আকাক্সক্ষা মেটানোর জন্য মানুষের অধিকারকে সমর্থন, ধর্মের চোখে নয়, মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি, যুক্তি দিয়ে সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ।
রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ঈশ্বর ও মানুষ দুই-ই বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তার সাহিত্যভাবনায় ইউরোপীয় মানবতাবাদের সুরটি দুর্লক্ষ নয়। দেবতা বা ঈশ্বর মানুষকে রক্ষা করে- এ তিনি মানেননি। তাঁর মতে, মানুষই নিজের চিন্তা, কর্ম ও জ্ঞানের শক্তি কাজে লাগিয়ে নিজেকে রক্ষা করেছে এবং করছে। বস্তুত, মানব-বিশ্বাসের রেনেসাঁসধর্মী ঐতিহ্যকেই তিনি তার সাহিত্যকর্মে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এদিক থেকে তিনি পরিপূর্ণ জীবনবাদী। তার রচনা মানবের জয়গানে মুখর। মানব জীবনের সমস্ত বদ্ধ দুয়ার ভেঙে ফেলার প্রেরণা সেখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পেও তার এই মানবতাবাদী ভাবনার আশ্চর্য প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়।
‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবিক চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে। এতে বৃহত্তর মানবতার সুর ধ্বনিত। এই গল্পে মানুষের স্নেহ-মমতাকে সর্বজনীনতামণ্ডিত করে তিনি দেখিয়েছেন, মানবতার মৌল সম্পর্কের ক্ষেত্রটি জাতিধর্ম ও দেশ-কালের ঊর্ধ্বে।
অনেকগুলো গল্পে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী ভাবনা মূর্ত হয়ে উঠেছে সমাজ জীবনে মানুষের অধিকার, স্বাভাবিক জীবন বিকাশ ও অস্তিত্বের সংকটকে কেন্দ্র করে। যেমন বরপণ প্রথার হৃদয়হীনতার ছবি ফুটে উঠেছে ‘দেনা-পাওনা’, ‘ঠাকুরদা’, ‘পণরক্ষা’, ‘হৈমন্তী’, ‘অপরাজিতা’ ইত্যাদি গল্পে।
‘দেনা-পাওনা’ গল্পে বিধৃত হয়েছে নির্ধারিত পণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় শ্বশুর বাড়িতে বধূর ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের ঘটনা।
‘হৈমন্তী’ গল্পে পুরুষ গল্পকথকের জবানীতে রবীন্দ্রনাথ পণপ্রথা-কবলিত নারীর নিষ্ঠুর অবমাননার জ্বলন্ত ছবি এঁকেছেন। পণপ্রথা কীভাবে নারীর জীবনকে তিলে তিলে মৃত্যুও দিকে ঠেলে দেয় হৈমন্তী তারই গল্প।
কন্যাপণ ও অর্থলোলুপতার বশবর্তী একশ্রেণির মানুষের অমানবিক রূঢ়তার ছবি পাওয়া যায় ‘অপরাজিতা’ গল্পে।
মনুষ্যত্বের লাঞ্ছনার বেদনাকে মূর্ত করা হয়েছে ‘রাকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’ গল্পে। এ গল্পে সত্যনিষ্ঠ ধর্মভীরু মানুষের মনুষ্যত্ব লাঞ্ছিত ও উপেক্ষিত হওয়ার অসহায় বেদনাকে রামকানাই চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
সামাজিক বিবেচনাহীনতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়ার পরিচয় রয়েছে ‘বিচারক’ গল্পে। যে পুরুষ নারীত্বের মহিমাকে ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছে তাকে বিচারকের আসনে বসিয়ে বিবেকহীন সমাজের বিরুদ্ধে ও মানবিকতার পক্ষে রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদমুখর হয়েছেন এই গল্পে।
মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ তার কয়েকটি গল্পে জাতীয় চেতনা ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনাকে প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তবে স্মরণীয়, তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবন সমস্ত রাজনৈতিক আলোড়নের ঊর্ধ্বে। সেই জীবনের পূর্ণমূল্য দিয়েই মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ সম্ভব। তার ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পে ইংরেজদের আমলাতন্ত্রের নিষ্ঠুর বর্বরতাকে চূড়ান্ত ধিক্কারে জর্জরিত করা হয়েছে। ইংরেজ শাসক, মালিক-ম্যানেজার ও বিচারকের জুলুম, আইনের প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা, শাসিত জাতির প্রতি জুলুম ও দম্ভ ইত্যাদির বাস্তব ছবি ফুটে উঠেছে। সেই সঙ্গে জমিদার-নায়েবদের বিরুদ্ধে তিনি ধিক্কার জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ‘দুর্বুদ্ধি’ গল্পে দেশি আমলাদের হৃদয়হীনতা ও নির্লজ্জ লোভের জ্বলন্ত ছবি ফুটে উঠেছে। দারোগা ও ডাক্তারের পাপচক্রের স্বরূপ উদঘাটনের সঙ্গে সঙ্গে লাঞ্ছিত অপমানিত জনগণের বেদনাকে তুলে ধরা হয়েছে।
ছোটোগল্পে চিরন্তন মানবের মহিমার প্রকাশ ঘটলেও এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তিনি একান্তভাবে বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবনের অন্ধকার দিকটাই একমাত্র সত্য নয়। তাই তিনি মানুষের জীবন সংগ্রামের কালো দিকটাকে চিত্রিত করাকে তার সাহিত্যিক দায়িত্ব বলে গণ্য করেননি। তিনি সাহিত্যে মানুষের আশা ও আনন্দকে চির জাগরূক করে রাখতে চেয়েছেন।
‘নামঞ্জুর গল্প’ ও ‘সংস্কার’ গল্পে মানুষে মানুষে ভেদাভেদের হীনমন্যতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেইসঙ্গে হীনবর্ণভুক্ত মানুষের প্রতি প্রকাশ করেছেন তার গভীর ভালোবাসা ও তাদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণের দাবি। ‘অনধিকার প্রবেশ’ গল্পে ধর্মের নামে, বর্ণভেদ ও জাতিভেদের সংকীর্ণতার প্রতি প্রচণ্ড বিদ্রুপাত্মক আঘাত ও কঠোর প্রতিবাদ মূর্ত হয়েছে।
জাতিভেদ, বর্ণভেদ, ধর্মহীনতা- সব ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথ সবার উপরে মানুষের মহিমাকেই বড় করে দেখিয়েছেন। তাই ‘রবিবার’ গল্পের অভীককে দিয়ে তিনি বলিয়েছেন : ‘যে দেশে দিনরাত্রি ধর্ম নিয়ে খুনোখুনি সে দেশে সর্ব ধর্মকে মেলাবার পুণ্যব্রত আমার মতো নাস্তিকেরই।’ ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পের নন্দকিশোর সামাজিক অর্থে ধর্মকে স্বীকার করেনি এবং মোহিনীর মতো নিম্নস্তরের মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী করে বর্ণাশ্রয়ী সমাজের মানসিকতার বিরুদ্ধে মানুষের মহিমাকেই বড় করে দেখিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো গল্পে সমাজের নিচুতলার নিপীড়িত, লাঞ্ছিত মানুষের প্রতি ভালোবাসার অসুখী প্রকাশ ঘটেছে। যেমন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নিষ্ঠুরতায় একদিকে জমিদারদের জীবন উৎসবমুখর হলেও দরিদ্র মানুষের জীবনে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে তার মর্মান্তিক ছবি আঁকা হয়েছে ‘শাস্তি’ গল্পে।
‘মুসলমানি গল্পে’ রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর জোর দিয়েছেন। এ ধরনের গল্পে ধর্মনিরপেক্ষ হৃদয়ধর্মের প্রতি তাঁর আজন্ম আকর্ষণ তীব্র ও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ নারীসমাজের মর্যাদা ও মহিমার পক্ষেও কলম ধরেছিলেন। পুরুষ-শাসিত সমাজে নারীর মুক্তিপথের নানা অন্তরায় তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। পণপ্রথা, সহমরণ, বিধবা বিবাহ ও বহুবিবাহের মতো যে সমস্ত সমস্যা সেকালে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর অবস্থানকে অমর্যাদাকর ও সংকটাপন্ন করে তুলেছিল, পাশ্চাত্যের নারীর অবস্থান,অধিকার ও মর্যাদার আলোয় রবীন্দ্রনাথ তাকে বিচার করেছিলেন। স্বভাবতই নারীমুক্তির প্রসঙ্গ হয়েছিল তার ভাবনার বিষয়। আর তাই নারীর পক্ষে পূর্ণ সহানুভূতি লক্ষ করা যায় তার ছোটোগল্পে।
নিষ্ঠুর সমাজ-শাসনে নারীর অসহায় অবস্থ’ার ছবি তুলে ধরে তাই তিনি যেন চাবুক মেরে সমাজের চেতনাকে জাগাতে চেয়েছেন। সন্ন্যাসীর স্ত্রী কুসুমের বঞ্চিত জীবনের হাহাকারকে তিনি বাক্সময় করে তুলেছেন ‘ঘাটের কথা’ গল্পে। ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের দুর্ভাগা কাদম্বিনীকে মরে প্রমাণ করতে হয়েছে যে সে মরেওনি। ‘কঙ্কাল’ গল্পে নারীর রূপ সম্পর্কে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও স্বরূপ তুলে ধরে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন যে, তা নারীর মানবিক জীবন-চেতনার পথে প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ।

‘খাতা’ গল্পের বালিকা বধূ উমা লেখাপড়ায় আগ্রহ দেখাতে গিয়ে বিড়ম্বিত হয়েছে তথাকথিত শিক্ষিত স্বামীর কাছে। ‘পয়লা নম্বর’ গল্পে বুদ্ধিজীবী পুরুষের নিষ্ঠুর নিস্পৃহতা ও কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতা-বলয়ের কবলে পড়া নারীর অবমাননার স্বরূপ ও তার অন্তর্বেদনার রূপটি ফুটে উঠেছে।
এক কথায় সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থায় নারীর প্রতি অন্যায়-অবিচার ও নারীর অধিকারহীনতার স্বরূপ রবীন্দ্রনাথ উদঘাটন করেছেন তার ছোটোগল্পগুলোতে। শুধু তাই নয়, এই অমানবিক সমাজের বেড়াজাল ভেঙেচুরে বের হয়ে আসার প্রেরণাও তাঁর গল্পে রয়েছে। ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ নারীমুক্তির প্রসঙ্গ টেনেছেন ব্যক্তিত্বসচেতন নারী মৃণালের জবানীতে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে। মৃণাল সংসারের অন্যায়-অবিচার, হৃদয়হীনতা ও বৈষম্য সইতে না পেরে অবশেষে বিদ্রোহ করেছে। তার বিদ্রোহী নারী হৃদয় হৃদয়হীন সংসারের শৃঙ্খল থেকে বের হয়ে লাভ করেছে মুক্তির স্বাদ। ‘বদনাম’ গল্পের সৌদামিনীও এমনিভাবে বিদ্রোহী হয়েছে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কাব্যে ও প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ যেমন মানবতার বাণীকে বাক্সময় করে তুলেছেন তেমনি তার ছোটোগল্পেও চিত্রিত হয়েছে তার বহুবর্ণিল ছবি।