Sunday, July 5, 2026
খামেনির জানাজা দেখিয়ে দিল পৃথিবী ভাগ হয়ে গেছে by কুরনিয়াওয়ান আরিফ মাসপুল
জনসমুদ্রের মাঝখানে কালো পোশাকের ঢেউয়ের ওপরে উঠে আসছে লাল মুষ্টিবদ্ধ হাত—এই শেষযাত্রার প্রতীক। এই হাত শুধু শোকের নয়, এটি প্রতিবাদেরও। চারপাশে একটাই স্লোগান—আমাদের দাঁড়াতেই হবে।
এটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার দৃশ্য। টানা ৩৬ বছরের শাসন, নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একসময়ের অবসান। ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলাতেই নিহত হন তিনি। কিন্তু এই জানাজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি একধরনের ভূরাজনৈতিক বার্তা, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক অস্তিত্বগত রায়।
সাত দিন ধরে দুই দেশের পাঁচটি শহরজুড়ে চলবে এই শেষযাত্রা। ইরানের হিসাবে, দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ এতে অংশ নেবেন। শতাধিক দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হাঁটছিলেন তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পাশে।
আর্মেনিয়া ও জর্জিয়ার নেতারাও এসেছেন শ্রদ্ধা জানাতে। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কর্মীরাও হাজির হয়েছেন কোনো সরকারি আমন্ত্রণ ছাড়াই। তাঁদের দাবি, তাঁরা ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়াতে এসেছেন। কফিনটি যাবে কুম শহর থেকে, তারপর ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষ পর্যন্ত মাশহাদে দাফন করা হবে—ইমাম রেজার মাজারের পাশে।
পশ্চিমা বিশ্ব এই দৃশ্য দেখছে বিভ্রান্তি আর অবজ্ঞা নিয়ে। ফক্স নিউজ বলছে, এই জানাজায় পশ্চিমা নেতাদের অনুপস্থিতিই নাকি ইরানের একঘরে হয়ে পড়াকে প্রমাণ করছে। তারা এই বিশাল আয়োজনকে শাসকগোষ্ঠীর প্রচারযন্ত্রের কারসাজি বলছে। এটিকে তারা একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মরিয়া বৈধতা খোঁজার চেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছে।
কিন্তু এই ব্যাখ্যা বড় ভুল। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কাছে খামেনির এই শেষযাত্রা অন্য অর্থ বহন করে। এটি এমন এক ইতিহাসের স্মরণ, যা পশ্চিমা বিশ্ব ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে গেছে। এ ঘটনা ১৯৫৩ সালে অপারেশন অ্যাজ্যাক্স-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন সিআইএ ও এমআই সিক্স মিলে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে পশ্চিমা তেলের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি আশির দশকে সাদ্দাম হোসেনকে অস্ত্র দেওয়া, ২০০৩ সালে ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইরাক আক্রমণ, লিবিয়ার ধ্বংস, সিরিয়ার বিপর্যয়—এসব ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয়। কারণ, এসব ঘটনা আলাদা ঘটনা নয়; বরং আধিপত্য বিস্তারের একটানা কাঠামো।
ইরানের সাবেক এক ডেপুটি স্পিকার এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে বলেছেন—খামেনির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৈশ্বিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সেই আধিপত্যকে ভেঙে দেওয়ার বাস্তব প্রমাণ। পশ্চিমা বিশ্ব ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখের হামলাকে দেখছে একটি কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে। তারা এটিকে দেখছে শত্রুদেশের নেতার মাথা কেটে ফেলার মতো নিখুঁত আঘাত হিসেবে। তবে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনও স্বীকার করেছে, ইরানের নেতৃত্ব এত বিস্তৃত যে কেবল শীর্ষ ব্যক্তিকে সরিয়ে দেশকে অচল করা যাবে না।
সার্বভৌমত্বের বিষয়টি পশ্চিমা দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত একটি আনুষ্ঠানিক বিষয়। তাদের কাছে বিচার মানে প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত প্রক্রিয়া। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের কাছে সার্বভৌমত্ব হলো বাইরের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা, যা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়। এখানে বিচার মানে ঐতিহাসিক ও পুনর্বণ্টনমূলক ন্যায়, যা এখনো অর্জিত হয়নি। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি একে অন্যের সঙ্গে মেলে না। খামেনির জানাজা সেই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। এক পক্ষের কাছে এটি ‘প্রচার’, অন্য পক্ষের কাছে এটি সত্য।
এই শেষযাত্রার বিশেষত্ব এখানেই, এখানে শোককে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা হয়। পশ্চিমা হামলা যেখানে নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, সেখানে এই জনসমুদ্র দেখাচ্ছে, সমাজ নিজেই নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের এই সমাবেশ যেন এক জীবন্ত ঘোষণা—অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এটি যেন উল্টো একধরনের জীবরাজনীতি। সাম্রাজ্য হত্যা করে মানুষকে ভীত ও অনুগত রাখতে চায়। আর প্রতিরোধ শোককে শক্তিতে পরিণত করে মানুষকে একত্র করে, প্রতিবাদী করে তোলে। ফলে প্রতিটি শোকাহত মানুষই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অংশ। এই জানাজা তাই একধরনের সংহতির শক্তি।
এখানেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কী অপরাধ, কী অন্যায়—তা নিয়েই যখন সবাই একমত নন, তখন নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা টিকতে পারে না। গ্লোবাল সাউথ মনে করে, এই ‘নিয়মভিত্তিক’ ব্যবস্থা পক্ষপাতদুষ্ট, তাই তাদের আস্থা কমে যায়। অন্যদিকে পশ্চিম সেই অভিজ্ঞতাকে ভুল বা বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দেয়। ফলে নিজেদের ভুল ঠিক করার সুযোগও থাকে না। এ কারণে আলাপ–আলোচনার সুযোগ কমে, বিভাজন বাড়ে। প্রত্যেক পক্ষ নিজের মতো করে যুক্তি দাঁড় করায় নিজের মানুষদের বোঝানোর জন্য। খামেনির জানাজা তাই এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এটি দেখিয়ে দেয়, আমরা একই গ্রহে আছি, তবে আমরা আর একই দৃষ্টিভঙ্গির পৃথিবীতে বাস করছি না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার যে সামরিক শিল্প জোটের কথা বলেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল সংঘাত চালিয়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্য বহুদিন ধরেই তাদের পরীক্ষার জায়গা ও লাভের ক্ষেত্র। এই জানাজা যেন সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগের সুরে বলছে—সাম্রাজ্যবাদীদের শান্তির চেয়ে শত্রু বেশি দরকার। আর খামেনির ইরান সেই প্রয়োজনীয় শত্রুর ভূমিকাই পালন করেছে। তাই এই শোক শুধু একজন মানুষের জন্য নয়। এটি একটি সম্ভাব্য পৃথিবীর জন্য, যেখানে সার্বভৌমত্ব মানে সত্যিকারের স্বাধীনতা।
পাকিস্তানের উপস্থিতি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ও জুনের সমঝোতা স্মারক তৈরিতে তারা সাহায্য করেছে। অথচ সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীই এখন তেহরানে দাঁড়িয়ে সেই নেতাকে সম্মান জানাচ্ছেন, যাঁকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করেছে। এটি দ্বিচারিতা নয়; বরং বহুমুখী বিশ্বের বাস্তবতা।
ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষযাত্রার পথও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় রাজনীতিকদের অনুরোধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুভূতি নয়; বরং একটি বার্তা—প্রতিরোধ কোনো এক জায়গার ওপর নির্ভর করে না। একজন নেতা চলে গেলেও নেতৃত্ব থেমে যায় না।
* কুরনিয়াওয়ান আরিফ মাসপুল, গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক লেখক
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| খামেনির জানাজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি ভূরাজনৈতিক বার্তা। ছবি: রয়টার্স |
Monday, June 29, 2026
সলিলের গানের ভেতরেই ছিল মিছিলের স্লোগান
আলোচনা, গান, কবিতা ও নৃত্যে সজ্জিত এই আয়োজন ছিল একাধারে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও চেতনার পুনর্জাগরণ। সভাপতিত্ব করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম। আলোচনায় অংশ নেন লেখক–গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়েম রানা এবং উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সহসাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খান।
সলিল চৌধুরী সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আলোচকেরা বলেন, জাতির যে ঐতিহাসিক ধারাক্রম রয়েছে, সেই ধারার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের একজন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন সলিল চৌধুরী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলার মানুষের প্রতিটি লড়াই–সংগ্রামে গণসংগীত মানুষের রক্তে আগুন জ্বেলেছে, মানুষকে উজ্জীবিত করেছে, মানুষকে তার মুক্তির পথ দেখিয়েছে। সলিল চৌধুরী ছিলেন সেই গণসংগীতের একজন কিংবদন্তি কারিগর। তাঁর হাত ধরে গণসংগীত পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। তিনি কবিতাকে, মিছিলের স্লোগানকে যেমন গানে রূপান্তর করেছেন, তেমনি তাঁর রচিত সংগীত হয়ে উঠেছে মিছিলের স্লোগান। বক্তারা আরও বলেন, ‘গণমানুষের মুক্তির বাণী নিয়ে যে গান, তা আমাদের যুগে যুগে রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসকশ্রেণি থেকে শুরু করে অনেকেরই পছন্দের নয়। তাই হয়তো আমাদের সমাজে গণসংগীত যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু তারপরও মানবমুক্তির প্রতিটি লড়াইয়ে, প্রতিটি সংগ্রামে গণসংগীত আমাদের শক্তি জোগায়, সাহস জোগায়। বাংলা আধুনিক গানের অবিস্মরণীয় সুরস্রষ্টা ও গণসংগীতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তি সলিল চৌধুরীর তৈরি করা গণসংগীত সর্বকালের জন্য প্রাসঙ্গিক।’
আলোচনা শেষে আয়োজন মাতিয়ে তোলে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বৃন্দগান পরিবেশন করে উদীচী সংগীত বিভাগ ও ‘কোরাস’। একক গান করেন তানভীর আলম সজীব এবং মনসুর আহমেদ। বৃন্দনৃত্য পরিবেশন করে স্পন্দন; একক নৃত্যে অংশ নেন আদৃতা আনোয়ার প্রকৃতি। আবৃত্তিতে অংশ নেয় উদীচী আবৃত্তি বিভাগ; একক আবৃত্তি করেন শাহেদ নেওয়াজ।
১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার গাজীপুর গ্রামে জন্ম গণসংগীতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব সলিল চৌধুরীর। পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সুর থেকে অসমিয়া লোকগান—বহুমাত্রিক সঙ্গীতভুবনে বেড়ে ওঠা সলিল মাত্র ২২ বছর বয়সে রচনা করেন অমর গান ‘গাঁয়ের বধূ’।
আইপিটিএতে সক্রিয় কাজের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন গণমানুষের শিল্পী। তাঁর ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘দো বিঘা জমিন’-এর সংগীত পরিচালনা করেন তিনিই, যা আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। বাংলা, হিন্দি, মালয়ালামসহ বিভিন্ন ভাষার ১৫০টির বেশি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন তিনি। কবিতা, স্লোগান ও লোকসুরের সঙ্গে পাশ্চাত্য অর্কেস্ট্রেশনের অপূর্ব সংমিশ্রণে তাঁর সৃষ্টি আজও আন্দোলনের গান, মানবমুক্তির গান। আজ সলিলের শতবর্ষে শহীদ মিনারের ওপর আজ যেন ভেসে উঠেছিল তাঁর গান-মানুষের সাহস, সংগ্রাম আর মানবমুক্তির চিরন্তন সুর।
![]() |
| আলোচনা, গান, কবিতা ও নৃত্যে সজ্জিত এই আয়োজন ছিল একাধারে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও চেতনার পুনর্জাগরণ। উদীচী |
Wednesday, September 10, 2025
বদরুদ্দীন উমর নিজ বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করেননি by মহিউদ্দিন আহমদ
বদরুদ্দীন উমরের লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭০ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর। তাঁর তিনটি বই সাম্প্রদায়িকতা, সংস্কৃতির সংকট ও সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা পড়ে আমাদের প্রজন্ম সেক্যুলার ধ্যানধারণার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। আমরা ঋদ্ধ হয়েছি। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে পাকিস্তানবাদের মোড়কে প্রতিক্রিয়াশীলতার যে আফিম আমাদের গেলানো হচ্ছিল, তার নিপুণ একাডেমিক ব্যবচ্ছেদ দেখেছি এই সব বইয়ে। তরুণ বয়সে বইগুলোর সঙ্গে পরিচয় না হলে আমি অনেক কিছুই জানতাম না।
এর পরপরই ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হলো ভাষা আন্দোলন নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি বইয়ের প্রথম খণ্ড। এ দেশে একাডেমিক ধাঁচের ইতিহাস গবেষণা তাঁর হাত দিয়েই শুরু, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এ ক্ষেত্রে তিনি তো পথিকৃৎ।
আমাদের দেশে অনেকেই লেখেন। অনেকেই রাজনীতি করেন। বদরুদ্দীন উমরের মধ্যে এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটেছিল। বলা যায়, রাজনীতি আর লেখালেখি এক মোহনায় মিশে গিয়েছিল তাঁর জীবনে। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন। তিনি একই সঙ্গে রাজনীতির অ্যাকটিভিস্ট ও বুদ্ধিজীবী। এ ধরনের ব্যক্তিকে বলা হয় ‘অরগানিক ইন্টেলেকচুয়াল’। এটা আমাদের দেশে বিরল।
বদরুদ্দীন উমর একসময় পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। একই সঙ্গে নিয়মিত লিখেছেন গণশক্তি, হলিডে ও গণকণ্ঠ পত্রিকায়। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ গণকণ্ঠ পত্রিকার সুবাদে। আমি তখন ওই পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা। গণকণ্ঠ পত্রিকায় তাঁর উপসম্পাদকীয় ছাপা হতো প্রতি রোববার। আমি তাঁর শান্তিনগরের বাসা থেকে লেখা নিয়ে আসতাম শুক্রবার। সম্মানীর চেক হাতে করে পৌঁছে দিতাম বাসায়। তারপর দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ ছিল না।
বছর দুই আগে তাঁর সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয় এক বন্ধুর মাধ্যমে। আমার বেলা-অবেলা বইটি পড়ে তিনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তারপর তাঁর রূপনগরের বাসায় গেছি অনেকবার। গণকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত উপসম্পাদকীয় আর প্রবন্ধের একটা সংকলন তৈরি করেছিলাম বাতিঘরের জন্য। সেখানে বদরুদ্দীন উমরের ৯টি লেখা ছিল। তাঁর অনুমতি নিতে গিয়েছিলাম। আমার চেহারা দেখেই তিনি রাজি হয়ে যান। আমি তাঁকে ঢাউস সাইজের বেশ কয়েকটি বই দিলাম। তিনি বললেন, ‘আপনি এত লেখেন?’ জবাবে বলেছিলাম, ‘আপনাকে বিট দেব।’
বদরুদ্দীন উমর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার নিরাপদ চাকরি ছেড়ে দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) মুখপত্র গণশক্তির সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বেতন-ভাতার ঠিক ছিল না। পার্টির কাজে গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ‘শ্রেণিচ্যুত’ হওয়া বলতে যা বোঝায়, তিনি সেটি হয়েছিলেন। গরিব চাষির বাড়িতে থাকা-খাওয়া, রাস্তার ধারে প্রাতঃকৃত্য সারা। বিচিত্র তাঁর সে সময়ের অভিজ্ঞতা। তাঁকে বলেছিলাম, ‘আমি এখন ডি-ক্লাসড, গ্রামে থাকি।’ বাড়ির ছবি দেখালাম। ছবি দেখে তিনি খুবই উচ্ছ্বসিত। বললেন, ‘আমি যাব।’ পরে শরীর-স্বাস্থ্য বিবেচনা করে ক্ষান্ত হন।
বদরুদ্দীন উমরের বয়স হয়েছে। আমি এক বন্ধুর মাধ্যমে অনুরোধ জানালাম, সাক্ষাৎকার নিতে চাই। তিনিও জানালেন, কখন কী হয়, বলা যায় না। কিছু কথা বলে যেতে চান। তো গেলাম তাঁর বাসায়। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু মুহাম্মদ কাইউম। ঝাড়া তিন ঘণ্টা সাক্ষাৎকার নিলাম। কাইউম ভিডিও করলেন। কথা তখনো ফুরায়নি। পরদিন আবার গেলাম। আবারও তিন ঘণ্টা। ছয় ঘণ্টার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি হলো পাণ্ডুলিপি। প্রথমা প্রকাশন এটি ছাপল ২০২৪ সালের আগস্টে। বইয়ের নাম ‘বামপন্থার সুরতহাল: বদরুদ্দীন উমরের ইতিহাস পরিক্রমা’।
সাক্ষাৎকারে বদরুদ্দীন উমর অনেক খোলামেলা কথা বলেছেন। আমি সবই লিখে দিয়েছি। এ ধরনের সাক্ষাৎকারে অনেক বৈঠকি আলাপ হয়। কেউ কেউ মনে করেন, সব ছাপানো ঠিক নয়। আমি সে রকম ভাবি না। কে কী মনে করলেন, সেটা নিয়ে ভাবতে গেলে অনেক কিছুই লেখা যায় না। পশ্চিমের দেশগুলোয় এ ধরনের রাখঢাক বা শুচিবাই নেই। আমাদের সমাজে এটা প্রবল-পাছে লোকে কিছু বলে। জীবন তো একটাই। যা মনে আসে, তা বলা দরকার, লেখা দরকার; আমি এমনটাই মনে করি। সমস্যা হলো ‘মব’। দেখা যায়, একটা কিছু লিখলে ভবঘুরে, অর্বাচীন বা মূর্খের দল ঝাঁপিয়ে পড়ে। আবার অন্যদিকে দেখা যায়, ‘সুশীল’রাও ‘মব’ তৈরি করে বলতে থাকে, এটা বলা উচিত হয়নি, ওটা লেখা ঠিক নয় ইত্যাদি।
বদরুদ্দীন উমর সক্রিয় রাজনীতি করেছেন। তাঁর দল কখনোই পাদপ্রদীপের আলোয় আসেনি। সুতরাং তাঁকে অনেকেই এককথায় নাকচ করে দিতে পারেন। এটা নিয়ে তাঁর কোনো দুর্ভাবনা ছিল বলে শুনিনি। এমন তো হয় অনেক সময় যে মানুষ পঙ্গপালের মতো ছুটছে একদিকে, আর অন্য একজন স্থির দাঁড়িয়ে আছে বা অন্যদিকে হাঁটছে। সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করার মানসিকতা দিয়ে আমরা রায় দিতে বসি, কে ঠিক আর কে বেঠিক।
আমরা এমন একটা দেশে বাস করি যেখানে দ্বিধান্বিত, ভণ্ডামি, ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের ছড়াছড়ি। আমি অনেককে জানি, যাঁদের প্রতি রোমকূপ দিয়ে বিপ্লব ফেটে বেরোচ্ছে। তাঁরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বা সরকারি কোনো সংস্থায় চাকরি করেন। কিন্তু তাঁদের চাকরি যায় না। বহাল থাকে। কীভাবে সম্ভব? সেদিক দিয়ে বদরুদ্দীন উমর ব্যতিক্রম। নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে কখনো প্রতারণা করেননি।
উমর বাংলা একাডেমি পুরস্কার নেননি। একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিছুদিন আগে একটি প্রতিষ্ঠান তাঁকে আজীবন সম্মাননা দিয়েছিল। তিনি সেটি গ্রহণ করেননি। তাঁর একটা নীতি ছিল, তিনি সরকার বা করপোরেট জগতের কাছ থেকে কিছু নেবেন না। বলতেন, ‘লেখালেখি আমার প্যাশন। মনের আনন্দে লিখি। সে জন্য পুরস্কার নিতে হবে কেন।’
বদরুদ্দীন উমর ধূমপায়ী ছিলেন। পাইপ ব্যবহার করতেন। তাঁর প্রিয় তামাক ছিল ‘এরিনমোর’। একবার তাঁকে বলেছিলাম, পরেরবার এলে তাঁর জন্য তামাক নিয়ে আসব। বাজারে খুঁজে পাইনি। তিনি বললেন, ‘না এনে ভালো করেছেন। বন্ধুরা কেউ বিদেশ থেকে এলে গিফট করে যায়। এখনো ছয় মাসের স্টক আছে।’ মিষ্টি পছন্দ করতেন। আর এ বয়সেও পড়াশোনা করতেন প্রচুর।
বদরুদ্দীন উমরের অনুযোগ ছিল, অনেক প্রকাশক তাঁকে ঠকিয়েছেন। আমাকে খোলাখুলি বলেছেন, নাম ধরে ধরে। আমার বইয়ে সেসব উল্লেখ করেছি।
শেখ হাসিনা তাঁর ওপর খুবই ক্ষিপ্ত ছিলেন। কারণ, উমর বলতেন, প্রথম পর্যায়ে ১৯৪৮ সালে পাঁচ দিন জেলে থাকা ছাড়া ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো ভূমিকা নেই। এ ধরনের কথা হাসিনার পক্ষে হজম করা সম্ভব ছিল না। উমর এতটাই জানতেন যে হাসিনা তাঁকে ঘাঁটাতে সাহস পাননি। সহ্য করে গেছেন। যা উমর কখনো কারও কাছে বলেননি, তাঁর অনেক কিছুই আমাকে বলেছেন। সময় ও সুযোগ পেলে সেসব প্রকাশ করব।
দাপটের সঙ্গে একটা জীবন কাটিয়েছেন বদরুদ্দীন উমর। অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, তিনি অহংকারী। তাঁর তো তেমন ধন-সম্পদ নেই। ব্যাংকার স্ত্রীর চাকরির সুবাদে মীরপুরের রূপনগরে ছোট একটা বাড়ি তৈরি হয়েছিল। মাথার ওপর ছাদ ছিল। আর ছিল জ্ঞানের, পাণ্ডিত্যের অহংকার। এটা থাকতেই পারে।
আমরা কাউকে বড় করে তুলতে তাঁর নামের সঙ্গে অনেক বিশেষণ যুক্ত করি। বদরুদ্দীন উমরের ক্ষেত্রে এটার দরকার হয় না। তিনি লিজেন্ড, সাহসী, বিদ্রোহী, এসব বলে কী হবে। তাঁর বইগুলোই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে। প্রশ্ন হলো, মূর্খের দেশে প্রবন্ধকারের জীবন খুব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তিনি এখন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আমার প্রার্থনা, তাঁর সাহসের কিছুটা হলেও যেন আমার মধ্যে সঞ্চারিত হয়। আমি সেটাই আগলে ধরে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব আর স্মরণ করব তাঁকে।
* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| বদরুদ্দীন উমর (২০ ডিসেম্বর ১৯৩১–৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫) ফাইল ছবি |
Tuesday, September 9, 2025
বদরুদ্দীন উমর: এক রাজনৈতিক কিংবদন্তির বিদায়
উল্লেখ্য, ১৯৩১ সালের ২০শে ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় বদরুদ্দীন উমরের জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান; যেখানে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি (পিপিই) বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। কিন্তু তিনি কেবল একাডেমিক জীবনেই থেমে থাকেননি। ১৯৬৮ সালে গভর্নর মোনায়েম খানের কর্তৃত্ববাদী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি শিক্ষকতা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং পরে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে লেখালেখিতে নিবেদিত করেন। বিশাল কর্মভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও তার বই ও গবেষণা দেশে খুব কম আলোচিত হয়েছে। তবে, কলকাতায় তার লেখালেখি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। কাজী আবদুল ওদুদ, আনন্দশঙ্কর রায়, সমর সেন, অশোক মিত্র প্রমুখ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা তার বিষয়ে লিখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে তিনি থেকে গেছেন প্রায় অবহেলিত। ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি সংস্কৃতি পত্রিকা প্রকাশ করে এসেছেন। এর মাধ্যমে এবং তার অসংখ্য বইয়ে তিনি লিখেছেন ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজতন্ত্র, বাঙালি মুসলমানের পরিচয়, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সংকট নিয়ে।
তিনি যুক্তি দিয়েছেন, সাম্প্রদায়িকতার প্রকৃত ভিত্তি ১৯৪৭ সালের বিভাজনের সঙ্গে শেষ হয়, পরবর্তীতে মূলত জাতীয়তাবাদকে ঘিরেই সংগ্রাম চলেছে। তার চিন্তাধারা সব সময় লোকপ্রিয় হয়নি, কিন্তু ছিল মৌলিক এবং চিন্তাজাগানিয়া। তারুণ্যে বদরুদ্দীন উমর সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, কৃষক-শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তবে জীবনের শেষ দিকে তিনি অনেকটাই শান্ত জীবনযাপন করেছেন, বিশাল লাইব্রেরির বইয়ের সঙ্গেই কাটতো তার সময়। পড়া আর লেখা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করতেন যে, বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন অনুপস্থিত। বলতেন, এখানে সত্য কথা অবাধে বলা যায় না। তবু তিনি কখনো থেমে থাকেননি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নির্ভীকভাবে লিখেছেন। তার চিন্তা বুঝতে সহায়ক বিশেষ করে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৬), ‘সংস্কৃতির সংকট’ (১৯৬৭), ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৯) তিনটি বই। এই বই লিখেই তিনি ক্ষান্ত হননি। তিনি শাসকদের অধীনে চাকরি পর্যন্ত করবেন না, এ মনোভাব পোষণ করে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।
| বদরুদ্দীন উমর (২০ ডিসেম্বর ১৯৩১–৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫) |
Monday, September 8, 2025
ইতিহাসের আয়নায় বদরুদ্দীন উমর ও বামপন্থা by লাবণী মণ্ডল
আজ রোববার সকাল ১০টার একটু পর রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বদরুদ্দীন উমরের বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
একাধারে শিক্ষক, লেখক, চিন্তক ও রাজনৈতিক কর্মী— বদরুদ্দীন উমর বামপন্থী ধারার এক ব্যতিক্রমী ও গভীরতম প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক চিন্তার অনুপম পাঠ হলো মহিউদ্দিন আহমদের লেখা বামপন্থার সুরতহাল: বদরুদ্দীন উমরের ইতিহাস পরিক্রমা।
প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ১৯২ পৃষ্ঠার এই বই এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও এটি নিছক কথোপকথন নয়। বরং এখানে মিলেছে আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক ইতিহাস, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশের বাম রাজনীতির বহু অজানা অধ্যায়ের প্রাণবন্ত বিবরণ। বইটি যেমন ব্যক্তি বদরুদ্দীন উমরের ভাবনার ভেতর প্রবেশের দরজা খুলে দেয়, তেমনি পাঠককে নিয়ে যায় ইতিহাসের উত্থান-পতনের অভ্যন্তরেও।
এই বই নিয়ে লেখাটি পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যাঁর নাম অবধারিতভাবে চলে আসে, তিনি বদরুদ্দীন উমর। একাধারে শিক্ষক, লেখক, চিন্তক ও রাজনৈতিক কর্মী—তিনি বামপন্থী ধারার এক ব্যতিক্রমী ও গভীরতম প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক চিন্তার অনুপম পাঠ হলো মহিউদ্দিন আহমদের লেখা বামপন্থার সুরতহাল: বদরুদ্দীন উমরের ইতিহাস পরিক্রমা।
প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ১৯২ পৃষ্ঠার এই বই এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও এটি নিছক কথোপকথন নয়। বরং এখানে মিলেছে আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক ইতিহাস, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশের বাম রাজনীতির বহু অজানা অধ্যায়ের প্রাণবন্ত বিবরণ। বইটি যেমন ব্যক্তি বদরুদ্দীন উমরের ভাবনার ভেতর প্রবেশের দরজা খুলে দেয়, তেমনি পাঠককে নিয়ে যায় ইতিহাসের উত্থান-পতনের অভ্যন্তরেও।
‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ হয়ে ওঠার পথে
বদরুদ্দীন উমরের চিন্তাজগৎ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’, যার উৎপত্তি ইউরোপীয় মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকদের ভাবনায়। এই ধারণায় এমন এক বুদ্ধিজীবীর কথা বলা হয়, যিনি কেবল তত্ত্ব নির্মাণ করেন না, বরং বাস্তবেও সেই তত্ত্ব প্রয়োগে সক্রিয় থাকেন। বদরুদ্দীন উমর এ ধারণার বাস্তব প্রতিফলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে তিনি যুক্ত হন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিতে (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী)। যদিও পরবর্তীকালে মতপার্থক্যের কারণে দলীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবু বাম রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সংলগ্নতা অটুট থাকে। গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে আন্দোলন, সভা-সেমিনার, লেখালিখি—সবখানেই তিনি থেকেছেন সক্রিয়।
রাজনীতি, দর্শন ও ব্যক্তি
বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে বদরুদ্দীন উমরের ব্যক্তিজীবনের সংযোগটি এতে যত্নের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কাটানো শৈশব ও কৈশোর, পরিবারের পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসা, ছাত্রজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, শিক্ষকতা, পরবর্তীকালে লেখালেখিতে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ—সবই এসেছে তাঁর নিজস্ব কণ্ঠে। যদিও এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী নয়, তবু তাঁর চিন্তার পেছনের পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা এখানে গভীরভাবে প্রতিফলিত।
বদরুদ্দীন উমর অকপটে জানিয়েছেন, ছাত্ররাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত না থেকেও কীভাবে তিনি বাম রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের চেষ্টাও করেন। তবে পরবর্তীকালে সক্রিয় রাজনৈতিক সংগঠকের চেয়ে তাঁর ভূমিকা বেশি হয়ে ওঠে চিন্তক ও লেখকের। এটি এক অর্থে তাঁর রাজনৈতিকতা ও আত্মজিজ্ঞাসার অনুপম দলিল।
বামপন্থার সুরতহাল
বইয়ের মূল অংশজুড়ে এসেছে বাম রাজনীতির নানা বাঁকবদলের আলোচনা। সেখানে অবধারিতভাবে এসেছে আওয়ামী লীগের জন্ম, শেখ মুজিবের উত্থান, ভাসানীর রাজনৈতিক অবস্থান, ন্যাপ গঠন, পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য, ঊনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তর–পরবর্তী সময়, জাসদের উত্থান, সর্বহারা পার্টির রাজনীতি, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, এমনকি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও।
এ বই কেবল ইতিহাস নয়, দৃষ্টিভঙ্গিরও দলিল। বদরুদ্দীন উমরের বিশ্লেষণ তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দায়বদ্ধতা থেকে উৎসারিত। তিনি কেবল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তাত্ত্বিকতা নয়; বরং জীবনের বাস্তবতায় তার প্রয়োগযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে বইটি হয়ে উঠেছে তত্ত্ব ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব-সন্ধির এক মনস্তাত্ত্বিক দলিলও।
বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়জুড়ে রয়েছে তাঁর পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের গল্প। ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ না করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নিজের তাগিদে, নিজের আনন্দে বই লিখি। এর জন্য কেউ আমাকে পুরস্কার দেবে, এটা আমি গ্রহণ করতে পারি না। এটা একধরনের ইগো বলতে পারেন।’ নোবেল পুরস্কার সম্পর্কেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, নোবেল অনেক সময় সাম্রাজ্যবাদের কূটকৌশলের অংশ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এখানে কেবল প্রশ্নকারী নন; তিনি একধরনের শ্রুতিলেখক, যিনি বক্তার কণ্ঠস্বর ও বয়ানের স্বচ্ছতা বজায় রেখে তাঁর অন্তর্গত চিন্তার বিন্যাসে এক ধ্যানস্থ দক্ষতা দেখিয়েছেন। তাঁর ভাষা সহজ, নির্ভার। রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো কঠিন বিষয়কেও তিনি উপস্থাপন করেছেন কথোপকথনের প্রাণবন্ত ধারায়।
ইতিহাসের আয়নায় একটি চিন্তার পরিক্রমা
এ গ্রন্থ বাংলাদেশের বাম রাজনীতির চূড়ান্ত বা সামগ্রিক সুরতহাল নয়, বরং একজন তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মীর আত্মপ্রবণ যাত্রার দলিল। ষাট-সত্তরের দশকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাস ও অন্তর্দ্বন্দ্ব জানতে আগ্রহী পাঠকের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। তবে এই পাঠ গ্রহণের জন্য প্রয়োজন পাঠকের বিশ্লেষণী মনোভাব। ‘বামপন্থার সুরতহাল’ শুধু ব্যক্তির আত্মকথা নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মূল্যবান অনুরণন।

Sunday, August 24, 2025
মাহবুব তালুকদারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ: বেঁচে থাকলে তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখতে পেতে
তুমি নতুন বাংলাদেশ দেখতে পেতে। নিবিড় তিমির অমানিশা ভেদ করে নতুন সূর্য ছিনিয়ে এনেছে বাংলার ছাত্র-জনতা। আমরা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হলাম! এখন আর রাতের ভোট নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নাই।
যে নির্বাচন নিয়ে হুদা এবং তার দলের সঙ্গে পাঁচটা বছর তুমি একা লড়াই করেছ, সেই নির্বাচন কলুষমুক্ত হবে আশা করি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সমস্ত হিসাব বদলে দিয়েছে। তোমার ভাষায় ‘মূক’ জনতার মুখে ভাষা ফুটেছে। জনগণ সবই দেখে, সবই বোঝে, শুধু একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠির জ্বলে ওঠার অপেক্ষা। তারা অধিকার আদায় করতে রাস্তায় নেমেছে। প্রবল শক্তিধর সিইসি নুরুল হুদাকে প্রকাশ্যে অপমান করেছে। নুরুল হুদা পাঁচটা বছর তোমাকে কী পরিমাণ অপমান করেছে! তুমি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলে, সেটা নিয়েও কতো কটূক্তি করেছে। কিন্তু তোমার শক্তি ছিল দেশের মানুষের ভালোবাসা। তারা তোমাকে গ্রহণ করেছিল।
তুমি তোমার কাজে অটল ছিলে। তুমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলে, তাই একাই লড়াই চালিয়ে গিয়েছ। পাঁচটা বছর নির্বাচন ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে যেভাবে দেখেছ, তাকেই কাগজে কলমে রূপ দিয়েছ। লিখেছ ‘নির্বাচননামা’। এটি একটি দলিল। এতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিক নানা অসঙ্গতি নিয়ে লিখেছ। তুমি আশা করেছ, একদিন এই অমানিশা কেটে যাবে, নতুন সূর্য উঠবে। কবিরা স্বপ্নদ্রষ্টা, তারা ভবিষ্যৎ দেখতে পায়!
বিয়ের পর তুমি একদিন বলেছিলে, ছোটবেলায় তুমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলে, তোমার মরদেহের উপর ফুল দিয়ে ঢাকা। কী আশ্চর্য! তোমার কফিন বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা দিয়ে ঢাকা হলো আর সেই পতাকার উপর ছিল পুষ্পস্তবক! তোমাকে গার্ড অব অনার দেয়া হলো। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, তোমার নির্বাচন কমিশনে কার্যকালের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। ‘নির্বাচননামা’ বইটি লিখতেও তোমার লাগলো পাঁচ বছর, আর ক্যান্সারে আক্রান্ত তোমার জীবন প্রদীপও নিভে গেল পাঁচ বছরেই!
তোমার কবি মন কেমন করে বুঝতে পেরেছিল যে, সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে! তাই তো তুমি লিখেছ, ‘মৃত্যুর পরেও আমার দু’চোখ উন্মীলিত থাকবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। মানুষ নির্বাচনের সাঁকো বেয়ে গণতন্ত্রের আবাসভূমিতে যথাযথভাবে পৌঁছাতে পারছে কিনা, সেটা দেখার জন্য। কেউ তখন আমার চোখের পাতা বন্ধ করে দেবেন না, এই প্রত্যাশা পরিবার-পরিজনের কাছে।’
* নীলুফার বেগম
- সহধর্মিণী এবং মুক্তিযোদ্ধা

Friday, August 15, 2025
শোকাবহ আগস্ট: রাসেল বলল, ‘আমি মার কাছে যাব’
![]() |
| বঙ্গবন্ধুর বুকে শেখ রাসেল |
আবদুর রহমান শেখ (রমা) এর জবানবন্দি
আমি ১৯৬৯ সালে কাজের লোক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর ৫টায় বঙ্গবন্ধু নিহত হন। তখন আমি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে থাকতাম। ওই দিন, অর্থাৎ ঘটনার দিন রাত্রে আমি এবং সেলিম দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের সামনে বারান্দায় ঘুমিয়েছিলাম। আনুমানিক ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ বেগম মুজিব দরজা খুলে বাইরে আসেন এবং বলেন যে, সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে। ওই দিন তিনতলায় শেখ কামাল এবং তাঁর স্ত্রী সুলতানা ঘুমিয়েছিল। ওই দিন শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজী এবং ভাই শেখ নাসের দোতলায় ঘুমিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও তার স্ত্রী এবং শেখ রাসেল দোতলায় একই রুমে ঘুমিয়েছিল। নিচতলায় পিএ মহিতুল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মচারী ছিল।
বেগম মুজিবের কথা শুনে আমি তাড়াতাড়ি লেকের পাড়ে যেয়ে দেখি কিছু আর্মি গুলি করতে করতে আমাদের বাড়ির দিকে আসিতেছে। তখন আমি আবার বাসায় ঢুকি এবং দেখি পিএ/রিসিপশন রুমে বঙ্গবন্ধু তার সঙ্গে কথা বলিতেছে। আমি পিছনের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় এসে দেখি বেগম মুজিব দোতলায় ছোটাছুটি করছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে তিনতলায় যাই এবং আমাদের বাসা আর্মিরা আক্রমণ করেছে বলে কামাল ভাইকে উঠাই। কামাল ভাই তাড়াতাড়ি একটা প্যান্ট ও শার্ট পরে নিচের দিকে যায়। আমি তার স্ত্রী সুলতানাকে নিয়ে দোতলায় আসি। দোতলায় গিয়ে একইভাবে আমাদের বাসা আর্মিরা আক্রমণ করেছে বলে জামাল ভাইকে উঠাই। তিনি তাড়াতাড়ি প্যান্ট, শার্ট পরে তার মার রুমে যান। সঙ্গে তার স্ত্রীও যান। এই সময়ও খুব গোলাগুলি হচ্ছিল।
একপর্যায়ে কামাল ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনতে পাই। একই সময় বঙ্গবন্ধু দোতলায় আসিয়া রুমে ঢোকেন এবং দরজা বন্ধ করে দেন। প্রচণ্ড গোলাগুলি একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তারপর বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে আবার বাইরে এলে আর্মিরা তার বেডরুমের সামনে চারপাশে তাহাকে ঘিরে ফেলে। আমি আর্মিদের পিছনে ছিলাম। আর্মিদের লক্ষ্য করে বঙ্গবন্ধু বলেন, “তোরা কি চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?” তারা বঙ্গবন্ধুকে তখন সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সিঁড়ির ২/৩ ধাপ নামার পর নিচের দিক হতে অনেক আর্মি বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। গুলি খেয়ে সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন।
আমি তখন আর্মিদের পিছনে ছিলাম। তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি কি কর?’ উত্তরে আমি বলি, ‘কাজ করি।’ তখন তারা আমাকে ভিতরে যেতে বলে। আমি বেগম মুজিবের রুমের বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নিই। সেখানে বেগম মুজিবকে বলি বঙ্গবন্ধুকে গুলি করেছে। ওই বাথরুমে শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা, শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজী, শেখ রাসেল, বেগম মুজিব ও বঙ্গবন্ধুর ভাই নাসের এবং আমি আশ্রয় নিই। শেখ নাসের ওই বাথরুমে আসার আগে তার হাতে গুলি লাগে, তার হাত হতে তখন রক্ত ঝরছে। বেগম মুজিব শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে তার রক্ত মুছেন।
এরপর আর্মিরা আবার দোতলায় আসে এবং দরজা পিটাতে থাকলে বেগম মুজিব দরজা খুলিতে যান এবং বলেন, ‘মারলে সবাই একই সাথে মরব।’ এই বলে বেগম মুজিব দরজা খুললে আর্মিরা রুমের ভেতর ঢুকে পড়ে এবং শেখ নাসের, শেখ রাসেল, বেগম মুজিব এবং আমাকে নিচের দিকে নিয়ে আসছিল। তখন সিঁড়িতে বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে বলেন, ‘আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।’ এই কথার পর আর্মিরা তাঁকে দোতলায় তাঁর রুমের দিকে নিয়ে যায়। একটু পরেই ওই রুমে গুলির শব্দসহ মেয়েদের আর্তচিৎকার শুনতে পাই।
আর্মিরা নাসের, রাসেল ও আমাকে নিচতলায় এনে লাইনে দাঁড় করায়। সেখানে সাদা পোশাকের একজন পুলিশের লাশ দেখি। নিচে নাসেরকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি কে?’ তিনি শেখ নাসের বলে পরিচয় দিলে তাহাকে নিচতলায় বাথরুমে নিয়ে যায়। একটু পরেই গুলির শব্দ ও তার মাগো বলে আর্তচিৎকার শুনতে পাই। শেখ রাসেল ‘মার কাছে যাব’ বলে তখন কান্নাকাটি করছিল এবং পিএ মহিতুল ইসলামকে ধরে বলছিল, ‘ভাই, আমাকে মারবে না তো?’ এমন সময় একজন আর্মি তাহাকে বলল, ‘চলো তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাই।’ এই বলে তাহাকে দোতলায় নিয়ে যায়। একটু পরেই কয়েকটি গুলির শব্দ ও আর্তচিৎকার শুনতে পাই।
লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় সেলিমের হাতে এবং পেটে দুইটি গুলির জখম দেখলাম। এরপর দেখলাম কালো পোশাক পরিহিত আর্মিরা আমাদের বাসার সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। তখন ডিএসপি নূরুল ইসলাম এবং পিএ/রিসিপশনিস্ট মহিতুল ইসলামকে আহত দেখি। এরপরে আমাদের বাসার সামনে একটা ট্যাংক আসে। ট্যাংক থেকে কয়েকজন আর্মি নেমে ভিতরের আর্মিদের লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করে ভিতরে কে আছে, উত্তরে ভিতরের আর্মিরা বলে, ‘All are finished.’ অনুমান বেলা ১২টার দিকে আমাকে ছেড়ে দিবার পর আমি প্রাণভয়ে আমার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়া চলে যাই।
স্বাক্ষর—আবদুর রহমান শেখ (রমা)
মো. সেলিমের (আবদুল) জবানবন্দি
আমি বর্তমানে বঙ্গভবনে মশালচি হিসেবে চাকরি করছি। ১৯৭২ সাল হতে এই চাকরি করছি। ১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ ৬৭৭ নং বাড়িতে কাজ শুরু করি। ১৯৭২ সালে চাকরি হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে কাজ করি। চাকরি হওয়ার পূর্বাপর আমি এবং রহমান (রমা) বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে দোতলায় থাকিতাম। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আড়াইতলা, অর্থাৎ তিনতলায় মাত্র ২টা রুম, সেই জন্য আমরা আড়াইতলা বলে থাকি, দোতলায় ৬টা রুম। নিচতলায় ৭টা রুম। বাড়ির উত্তর দিকে রান্নাঘর, গোয়ালঘর ও গ্যারেজ আছে। বাড়ির চারিদিকে অনুমান ৫ হাত উঁচু ওয়াল আছে। ওয়ালের ওপর তারকাঁটা লাগানো আছে। বাড়ির দক্ষিণ দিকে মাত্র একটা গেট আছে। গেট দিয়ে ভিতরে গেলে সামনে একটা করিডর পড়ে। করিডরের দুই পাশে রুম আছে। বাড়ির মাঝখানে একটা এবং বাড়ির পূর্ব দিক দিয়ে একটা মোট দুইটা সিঁড়ি আছে (আপত্তি সহকারে তা রেকর্ড হলো) মাঝের সিঁড়ি দিয়ে পশ্চিম দিকে এবং পূর্ব দিকের সিঁড়ি দিয়ে পূর্ব দিকে মুখ করে ওপরে উঠিতে হয়।
বঙ্গবন্ধুর পরিবারে তিনি, তাঁর স্ত্রী, তিন পুত্র, দুই কন্যা এবং দুই পুত্রবধূসহ মোট ৯ সদস্য ছিল। ঘটনার দিন ৭ জনকে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল ৫টার দিকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংঘটিত হয়। ঘটনার রাত্রে আমি এবং রমা দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের সামনে ঘুমিয়েছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু খুব জোরে দরজা খুললে আমার এবং রমার ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখি বঙ্গবন্ধু গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গিপরা অবস্থায় নিচের দিকে যাচ্ছেন।
ওই রাত্রে তিনতলায় কামাল ভাই ও তার স্ত্রী, দোতলায় জামাল ভাই ও তার স্ত্রী এবং পুত্র রাসেল এক রুমে ছিল। রেহানার রুমে নাসের কাকা ছিল। তখন হাসিনা এবং রেহানা বিদেশে ছিল।
নিচতলায় ডিএসপি নূরুল ইসলাম, পিএ/রিসিপশনিস্ট মহিতুল ইসলাম, টেলিফোন মিস্ত্রি মতিন ও অন্যান্য লোক ছিল।
বঙ্গবন্ধু নিচে যাবার পর বেগম মুজিব আমাকে তাঁর চশমা এবং পাঞ্জাবি দিলে আমি নিচে বঙ্গবন্ধুকে তা দিই। তিনি চশমা-পাঞ্জাবি পরিয়া নেন। আমি বঙ্গবন্ধুর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকি। তখন তিনি বলছিলেন, ‘আমার এবং আমার বোনের বাসা আক্রমণ করেছে, রাজারবাগ ফোন কর।’ এমন সময় বাইর হতে একঝাঁক গুলি ভেতরে আসে। তখন তিনি এবং আমি বসে পড়লাম। তিনি ক্যান্টনমেন্ট, রাজারবাগসহ কোথাও টেলিফোন লাইন না পেয়ে দোতলার দিকে চলে গেলেন। আমি পিছনে পিছনে চলে গেলাম।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় কামাল ভাইকে তিনতলা হতে নিচে নামতে দেখি। এদিকে বঙ্গবন্ধু নিজের বেডরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। তারপর দক্ষিণ দিকে গুলির শব্দ শুনি। আমি দৌড়ে জামাল ভাইয়ের রুমে গিয়ে দরজা দিয়ে দেখি কয়েকজন কালো পোশাক পরিহিত লোক গুলি করতে করতে বাড়ির ভিতরে ঢুকেছে। গুলি লাগিবার ভয়ে আমি জামাল ভাইয়ের বাথরুমে ঢুকে বসে থাকি। তখন জোরে জোরে বলছে ‘যে যেখানে আছ সারেন্ডার কর।’ আমি সিঁড়ির দিকে উঁকি দিয়ে দেখি দুজন কালো পোশাকধারী সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। আমি তখন আবার বাথরুমে ঢুকে পড়ি। তারপর কালো পোশাকধারী দুজন লোক আমার কাছাকাছি এলে আমার কিছু সাহস হয়। এই কারণে যে আর্মি দুষ্কৃতকারীদের খবর পেয়ে এসেছে। এই মনে করে আমি উঠতে গেলে তারা আমাকে গুলি করে। গুলি আমার হাতে-পেটে লাগে (এই পর্যায়ে সাক্ষী তার হাতের ও পেটের জখম দেখায়), তখন আমি সামনের দিকে পড়ে যাই।
পরে আমি সিঁড়ির পাশে হেলান দিয়ে বসে থাকি। বসে থাকা অবস্থায় দেখি যে, ৪-৫ জন আর্মির লোক বঙ্গবন্ধুকে তাঁর রুম থেকে ধরে সিঁড়ির দিকে আনছে। বঙ্গবন্ধু আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে বলল, ‘এই ছেলেটা ছোটবেলা হতে আমাদের এখানে থাকে। একে কে গুলি করল?’ এরপর তিনি বলিলেন, ‘তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি? কি করছি—বেয়াদপি করছ কেন?’ এর কিছুক্ষণ পরে সিঁড়ির দিকে গুলির শব্দ ও চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। একটু পরে দেখি আম্মাকে (বেগম মুজিব), রাসেলকে, নাসের কাকাকে ও রমাকে আর্মিরা নিচের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সিঁড়ির কাছে গিয়েই আম্মা চিৎকার করে উঠে, ‘আমি ওই দিকে যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।’ তারপর নাসের, রাসেল ও রমাকে নিচের দিকে এবং আম্মাকে (বেগম মুজিব) বেডরুমের দিকে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই বেডরুম থেকে গুলির শব্দ এবং চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই।
কিছুক্ষণ পর গুলি বন্ধ হয়ে গেল। আমি বসে থাকা অবস্থায় একজন আর্মি এসে আমাকে বলল, ‘তোমার গুলি লাগছে?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ, লাগছে।’ তারপর আর্মিদের বিভিন্ন রুম খোঁজাখুঁজি করতে দেখি। একটু পরেই আর্মির লোক আমাকে বলল, ‘তুমি হেঁটে নিচে যেতে পারবা?’ আমি বললাম, ‘পারব।’ তখন আমাকে হাত ধরে টেনে উঠিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামাতেই দেখি সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ পড়ে আছে। ওই লাশের ওপর দিয়ে আমাকে নিচে নিয়ে যায়। নিচে বারান্দা দিয়ে গেটের দিকে নিবার সময় কামাল ভাইয়ের লাশ পড়ে থাকতে দেখি। তারপর আমাকে গেটের ভিতরে লাইনে নিয়ে বসায়। সেখানেও একজন সিকিউরিটির লোকের লাশ পড়ে থাকতে দেখি।
লাইনে ডিএসপি নূরুল ইসলাম, মহিতুল ইসলাম, রমা, রাসেল ভাইকে দেখলাম। রাসেল মহিতুল ইসলামের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর আমাকে লক্ষ্য করে একজন আর্মির লোক অন্য একজন আর্মিকে বলল, ‘এর গায়ে গুলি লেগেছে। একে হাসপাতালে নিয়ে যাও।’ একটু পরেই একটা ট্যাংক এবং একটা জিপ এল। ট্যাংক হতে কয়েকজন অফিসার নেমে অন্য আর্মিদের সঙ্গে ইংরেজি ও বাংলায় কী যেন কথাবার্তা বলল। তখন রাসেলকে দোতলায় নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই দোতলা হতে গুলির শব্দ ও চিৎকার শুনলাম। তারপর ট্যাংকের পিছনে আসা জিপে করে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে যাবার পর শেখ সেলিম ও শেখ মারুফের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তারা আমাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির খবর জিজ্ঞাসা করলে আমি জানাই যে, সবাইকে মেরে ফেলেছে।
আমি পড়ালেখা জানি না। তদন্তকারী অফিসারের কাছে আমি জবানবন্দি দিয়েছি।
স্বাক্ষর—মো. সেলিম (আবদুল)
বঙ্গবন্ধুর লেখা চিঠি by সোহরাব হাসান
![]() |
| বঙ্গবন্ধু |
সরকারের গোয়েন্দাদের বাজেয়াপ্ত করা কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর লেখা এবং তাঁকে লেখা চিঠির হদিস সম্প্রতি পাওয়া গেছে সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বইয়ে।
কারাগারে বসেও বঙ্গবন্ধু দেশের কথা ভাবতেন। কারাগারের ভেতরে বা বাইরের যেসব ঘটনা তাঁকে আলোড়িত করত, সে সম্পর্কে তিনি অকপটে তাঁর মতামত প্রকাশ করতেন। বঙ্গবন্ধু দলীয় নেতা-কর্মী ও স্বজনের বাইরে বিদেশি রাষ্ট্রনেতা ও দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদেরও চিঠি লিখেছেন। তাঁর লেখা থেকে বাছাই করা কিছু চিঠি এখানে পত্রস্থ হলো।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেই দুর্নীতির অভিযোগ এনে অনেক রাজনৈতিক নেতাকে জেলে পোরেন। এই প্রেক্ষাপটে বাবা শেখ লুৎফর রহমানকে লেখা বঙ্গবন্ধুর চিঠিটিতে বেদনা ও ক্ষোভ ছিল। আজীবন নিঃস্বার্থভাবে রাজনীতি করেছেন, তাই তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ মানতে পারেননি। পরে বঙ্গবন্ধু আইনি লড়াই করেই অভিযোগ থেকে মুক্তি পান। চিঠিটি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।
জ্যেষ্ঠ কন্যা ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা বঙ্গবন্ধুর চিঠিটি জেলখানার বাইরে থেকে। শেখ হাসিনা তখন স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়াসহ সুইডেন সফরে। ছোট্ট এই চিঠিতে ব্যক্তিগত কুশলাদির পাশাপাশি দেশের দুই কৃতী সন্তান তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও অধ্যাপক আবদুল হাইয়ের মৃত্যুর খবর দেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদকে লিখেছিলেন ব্যক্তিগত কুশল জানতে চেয়ে। চিঠিটি রাজনৈতিক ছিল না।
তবু পািকস্তান সরকার এটি বাজেয়াপ্ত করে। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে অলি আহাদ ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক। বঙ্গবন্ধু তাঁকে লিখেছিলেন করাচি থেকে। তখন গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল।
দৈনিক ইত্তেফাক-এ দুই কিস্তিতে প্রকাশিত লেখক আবুল ফজলের প্রবন্ধ ‘শক্ত কেন্দ্র কেন ও কার জন্য’ প্রকাশের পর বঙ্গবন্ধু তাঁকে দুটি চিঠি লেখেন। প্রথমটি লেখেন ১৯৬৯ সালের ১৭ নভেম্বরে। আবুল ফজল পরে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার কখনো সাক্ষাৎ পরিচয়ের সুযোগ ঘটেনি। তবে ১৯৬৯-এর শেষের দিকে তাঁর কাছ থেকে আমি নিজের হাতে লেখা দু’খানা চিঠি পেয়েছিলাম। তখন তিনি বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও সর্বপ্রধান রাজনৈতিক তথা বিরোধী দলের নেতা।’
চিঠি-১: বাবা লুৎফর রহমানকে
ঢাকা জেল
১২.১১.৫৮
আব্বা
আমার ভক্তিপূর্ণ ছালাম গ্রহণ করবেন ও মাকে দিবেন। মা এবার খুব কষ্ট পেয়েছিল, কারণ এবার তাঁর সামনেই আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল। দোয়া করবেন মিথ্যা মামলায় আমার কিছুই করতে পারবে না। আমাকে ডাকাতি মামলার আসামীও একবার করেছিল। আল্লা আছে, সত্যের জয় হবেই। আপনি জানেন বাসায় কিছুই নাই। দয়া করে ছেলেমেয়েদের দিকে খেয়াল রাখবেন। বাড়ি যেতে বলে দিতাম। কিন্তু ওদের লেখাপড়া নষ্ট হয়ে যাবে। আমাকে আবার রাজবন্দী করেছে, দরকার ছিল না। কারণ রাজনীতি আর নাই, এবং রাজনীতি আর করবো না। সরকার অনুমতি দিলেও আর করবো না।
যে দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে আমি ঘুষ খেতে পারি সে দেশে কোনো কাজই করা উচিত না। এ দেশে ত্যাগ ও সাধনার কোন দামই নাই। যদি কোনদিন জেল হতে বের হতে পারি তবে কোন কিছু একটা করে ছেলেমেয়ে ও আপনাদের নিয়ে ভালভাবে সংসার করব। নিজেও কষ্ট করেছি, আপনাদেরও দিয়েছি। বাড়ির সকলকে আমার ছালাম দিবেন। দোয়া করতে বলবেন। আপনার ও মায়ের শরীরের প্রতি যত্ন নিবেন। চিন্তা করে মন খারাপ করবেন না। মাকে কাঁদতে নিষেধ করবেন। আমি ভাল আছি।
আপনার স্নেহের
মুজিব
গোপালগঞ্জের বাসাটা ভাড়া দিয়া দেবেন। বাসার আর দরকার হবে না।—মুজিব।
সূত্র: পূর্ব পাকিস্তান সরকার, হোম পোল, এফ/এন, ৬০৬-৪৮ পিএফ, খণ্ড ৯
চিঠি-২: জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে
১৩.৬.৬৯
হাছু মনি
আমার স্নেহ ও ভালবাসা নিও। ওয়াজেদের চিঠি পেয়েছিলাম, উত্তরও দিয়েছি বোধ হয় পেয়ে থাকবে। জেল হতে বের হয়ে তোমাকে ভাল করে দেখতেও পারি নাই। শুধু তোমার শরীরের দিকে চেয়ে তোমাকে যেতে দিয়েছি। শরীরের প্রতি যত্ন নিও। ওয়াজেদের শরীর কেমন। আমরা সকলেই ভাল আছি। চিন্তা করে শরীর নষ্ট করিও না। বোধ হয় শুনেছ মানিক ভাই পিন্ডিতে হঠাৎ মারা গিয়েছেন। বুঝতেই পার আমার অবস্থা। প্রফেসর হাই সাহেবও মারা গিয়েছেন। বাংলাদেশের দুইজন কৃতী সন্তান আমরা হারালাম। চিন্তা করিও না। সুইডেন খুব সুন্দর দেশ। তোমাদের খুব ভাল লাগবে। চিঠি দিও।
তোমার
আব্বা
সূত্র: জাতির জনক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ট্রাস্ট, পৃ.২১১
চিঠি-৩: তাজউদ্দীন আহমদকে
ঢাকা জেল
১৯ /৮ / ৬৬ (সিল)
স্নেহের তাজুদ্দিন
আমার স্নেহ ও ভালবাসা নিও। কেমন আছ? খবর জানি না। আমাকে খবর দিও। চিন্তা করিও না। সকলকে ছালাম দিও। শরীরটা বেশী ভাল না তবে কেটে যাচ্ছে। তোমার শরীরের প্রতি যত্ন নিও।
ইতি—
তোমার মুজিব ভাই
সূত্র: পূর্ব পাকিস্তান সরকার, হোম পোল, এফ/এন, ৬০৬-৪৮ পিএফ, খণ্ড ২৬
চিঠি-৪: অলি আহাদকে
সমারসেট হাউস
করাচি
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬
প্রিয় অলি আহাদ,
তোমার চিঠির জন্য ধন্যবাদ। আশা করি, গণপরিষদ হতে আমাদের ওয়াক আউট-এর পর ২ মার্চ ঢাকায় ফিরব। তোমার অসুবিধা সম্পর্কে আমি পুরোপুরি জানি ও অনুভব করি। আমাদের সংগঠনের কিছু টাকা সংগ্রহ করার জন্য আমি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি।
৩ ও ৪ মার্চের প্রস্তাবিত সভা তুমি বাতিল করেছ জেনে আমি খুশি হয়েছি। কারণ তুমি জানো যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এমন একটি বিরাট সভা অনুষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। অবশ্যই একটি কাউন্সিল সভা করা আমাদের দরকার। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির পরই আমরা সভার তারিখ ঘোষণা করব। তুমি আমাদের সংগঠনের জন্য অত্যন্ত উদ্যমের সঙ্গে ও নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছ জেনে আমি অত্যন্ত সুখী। এখানে আমরা গণপরিষদে আমাদের সংগ্রামের ব্যাপারে ব্যস্ত। কারণ আমরা জানি যে, আসন্ন সংগ্রামের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। শহীদ সাহেব ছাড়া আমাদের পার্টির সব সদস্যই ২ ও ৩ মার্চ অথবা কাছাকাছি সময়ে ঢাকার পৌঁছুবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় খবর তোমাকে দেব।
দয়া করে মাওলানা সাহেবকে জানিও যে আমি তাঁর টাকা নিয়ে আসছি। আমাদের সকল কর্মীর প্রতি রইল আমার প্রীতি ও সালাম।
আশা করি তুমি ভালো আছ।
তোমারই
মুজিব ভাই
চিঠি-৫: আবুল ফজলকে
ফোন: ২৪২৫৬১
৬৭৭ ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা
রোড নং ৩২, ঢাকা।
তারিখ: ১৭-১১-৬৯ ইং
জনাব অধ্যাপক সাহেব,
আমার ছালাম গ্রহণ করবেন। আশা করি ছহি-ছলামতে আছেন।
সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত আপনার প্রবন্ধ ‘শক্ত কেন্দ্র কেন ও কার জন্য’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। আপনার সাবলীল লেখনী নিঃসৃত সৃজনশীল এই প্রবন্ধটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে অধিক সংখ্যক মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে হবে বলে আমার স্থির বিশ্বাস। প্রবন্ধটি আমি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করতে মনস্থ করেছি। আপনার অনুমতি পেলে কৃতার্থ হব।
আপনার স্নেহের
শেখ মুজিব
শেখ হাসিনার সেই মুখবন্ধ by পার্থ শঙ্কর সাহা

‘আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমাদের পরিবারের সদস্যদের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা করা হয়। ওই বছরেরই ৩ নভেম্বর হত্যা করা হয় আমার বাবার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ চার রাজনৈতিক সহযোগীকেও। শেখ মুজিব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন। তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ায় ব্রতী ছিলেন। তাঁদের হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এসব মূল্যবোধকে বাতিল করে দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক সমাজ সৃষ্টি করা।
এসব মানুষকে হত্যা করা হয় একটি সামরিক অভ্যুত্থানের অংশ হিসেবে, যার মধ্য দিয়ে শিশু রাষ্ট্রটির গণতান্ত্রিক ধারার অবসান হয় এবং শুরু হয় সামরিক শাসন। এই হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন তৎকালীন সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের শীর্ষ কিছু লোক। আর তাই বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও বাংলাদেশের সরকার একজন হত্যাকারীকেও বিচারের মুখোমুখি করেনি। বস্তুত এসব হত্যাকারী ও তাদের সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীরা সরকারের কাছ থেকে সুরক্ষা এবং সহযোগিতা পেয়ে এসেছে। এদের কাউকে কাউকে বিদেশে কূটনৈতিক মিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যরা দেশেই নানা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। এভাবে অপরাধকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
হত্যার শিকার পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে এর প্রতিকার চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে তাঁরা ও যুক্তরাজ্যে তাঁদের গণতন্ত্রমনা সমর্থকেরা এ বিশ্বাসে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি থেকে সরা যাবে না। তাই তাঁরা বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও জেলখানার ভেতরে বিনা বিচারে আটক চার জাতীয় নেতার হত্যার বিষয়ে অনুসন্ধান করার জন্য একটি কমিশন গঠন করতে প্রথিতযশা কয়েকজন আইনজ্ঞের কাছে আবেদন জানান। ওই আইনজ্ঞদের সুনাম এবং ভাবমূর্তিই বলে দেয়, তাঁরা বিচারের ক্ষেত্রে যথার্থতার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করবেন। আমরা আশা করি, এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও আইনের শাসনের অপব্যবহারের ফলে গত সাত বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারা যেভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে; বিচারকদের তদন্তের ফলাফল সে বিষয়ে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করবে।
সারা বিশ্বের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সমর্থন করা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ লালনকারী বিশ্বের সব সরকার ও জনগণের অধিকার এবং সেই সঙ্গে দায়িত্ব। এসব অধিকার লঙ্ঘিত হলে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য সম্ভাব্য যেকোনো পন্থা তারা ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশের সামরিক শাসক বিদেশি সরকার ও জনগণের সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক ভাবধারা ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্বজনমত এই হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।’
শেখ হাসিনা
সভাপতি
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
লন্ডন, ৩ নভেম্বর ১৯৮২
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেই আগস্টেই লেখা কবিতা
![]() |
| মীর গুল খান নাসির |
মীর গুল খান নাসির
ভোর কোথায়?
চিৎকার, ক্রন্দন আর শশব্যস্ত আহ্বানের মধ্যে
উল্লাস করছে অন্ধ জনতা।
ওরা বলে, ‘এখন ভোর’, কিন্তু জীবনপানে তাকিয়ে
আমি দেখি রাত্রি, ঘোর অমানিশা।
বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতে মনে হয় দূরে বৃষ্টি হচ্ছে,
কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই
রক্তের ধারা বইছে প্রবল।
হে নির্বোধের দল, কোথায় উজ্জ্বল প্রভাত?
এখানে এখনো ক্রুদ্ধ রাত
এজিদরূপী সাম্রাজ্যবাদীরা এখনো চূর্ণ করছে
সাহসী দেশপ্রেমিকের হাড়,
জনবহুল, চিত্রময় বাংলাদেশে আবারও রক্তের ঝড়।
সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা আবারও জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রাম-নগর,
মহান দেশপ্রেমিক মুজিব নিজ রক্তের সাগরে শায়িত
সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত সেবাদাসেরা তাঁকে
রক্তের জামা পরিয়ে দিয়েছে এবং বিদ্ধ করেছে বুলেটে
এজিদের বিরুদ্ধে হোসেনের কাহিনির পুনরাবৃত্তি।
হে সাহসী কমরেডগণ, এজিদ থেকে সতর্ক হও,
তোমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হও, পরাস্ত হবে তারা
তাদের মুখ তাদেরই কিন্তু জবান সাম্রাজ্যবাদীদের।
সেবাদাসেরা ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের পকেট স্ফীতকায়
এবং সাহসী দেশপ্রেমিকদের খতম করে দিতে
সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে জোগান আসতেই থাকবে
তারা পাঠাবে ভাড়াটে লোক ও অস্ত্র
এই কাপুরুষদের কোনো দয়া-মায়া নেই,
এদের কারণেই বিশ্বে এখন ঘোর অন্ধকার।
মুক্তির শিখা কোথাও জ্বলে উঠলে এরা তা নিভিয়ে দেয় দ্রুত
বঙ্গবন্ধু মুজিব সপরিবারে নিহত ওদের হাতে
আবারও স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত।
সাম্রাজ্যবাদীরা আবারও ফিরে গেছে তাদের সেই পুরোনো
চক্রান্তে, বিশ্বাসঘাতকতায়
আবারও দ্বন্দ্বের ফয়সালা হচ্ছে বন্দুকের নলে
আবারও সোনার জমিনে জ্বলছে আগুন
হে বন্ধুরা, এভাবেই সময়ের মুখোমুখি আমরা
আমার মাতৃভূমি বেলুচিস্তানও জ্বলছে এখন
ভয় পেয়ো না হে সাহসী যোদ্ধারা, থেমে যেয়ো না,
কণ্টকিত দুর্গম পথ এখনো অনেক বাকি।
মুজিবের রক্ত কখনোই বৃথা যাবে না,
দেশপ্রেমিকের জন্য এ এক অগ্নিপরীক্ষা।
বেশিক্ষণ নয়, কুয়াশা ও আঁধার সত্ত্বেও
এই ভয়াল রাত্রি দ্রুত কেটে যাবে
হৃদয় দিয়ে নাসির স্পষ্ট দেখতে পায়
বিজয়-পতাকা উড়ছে।
>>>অনুবাদ: রিজওয়ান উল আলম
Wednesday, July 23, 2025
তাজউদ্দীন আহমদ: রোজনামচার মানুষটিকে বোঝা by সেলিম জাহান
বইটি পড়তে শুরু করে এর বিষয়বস্তুর বাইরে পাঁচটি বিষয় আমার মনোযোগ কাড়ল। এক, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে জনাব তাজউদ্দীন আহমদ প্রতিদিনই তাঁর দিনপঞ্জিতে কিছু না কিছু লিখেছেন। এ সময়কালের মধ্যে দিনপঞ্জির কোনো পাতাই ফাঁকা যায়নি। তাঁর এই লেগে থাকার অধ্যবসায় ঈর্ষণীয় পর্যায়ের।
দুই, রোজনামচাগুলো তাজউদ্দীনের শৃঙ্খলামান্য মনের পরিচায়ক। তিনি তাঁর মনকে এমনভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছিলেন যে প্রতিটি দিনের ঘটনা, তা যত সামান্যই হোক না কেন, তিনি তা রোজনামচায় লিপিবদ্ধ করেছেন।
তিন, তাজউদ্দীন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দৈনন্দিন ঘটনাগুলো রোজনামচায় লিপিবদ্ধ করেছেন। সেখানে লোকজনের নামধাম, জায়গার নাম, নানা ঘটনাসহ সব খুঁটিনাটিই লিখেছেন। প্রতিটি বিষয়কেই তিনি নিবিড়ভাবে দেখেছেন এবং ব্যক্ত করেছেন। হয়তো তিনি বাস্তব অবস্থারই বর্ণনা দিতে চেয়েছেন, কোনো গল্প ফাঁদতে চাননি।
চার, রোজনামচার ভাষা এত সহজ যে পড়তে পড়তে মনে হয় যেন পাশে বসে কেউ গল্প করছেন।
পাঁচ, পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত রোজনামচাগুলো ইংরেজিতে লেখা, বাংলায় নয়।
রোজনামচাভিত্তিক বই পড়তে আমার খুব ভালো লাগে। সেই কবে কিশোর বয়সে পড়েছিলাম শহীদ সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারের ‘রাজবন্দীর রোজনামচা’। তবে রোজনামচাভিত্তিক বই পড়তে গিয়ে দেখেছি, এ ধরনের বইয়ের দুটো রকমফের আছে। কোনো কোনো রোজনামচা হয় তথ্যভিত্তিক; এই যেমন, কী ঘটল, কেন ঘটল এবং কেমন করে ঘটল। আমার পছন্দের নিরিখে এ জাতীয় দিনপঞ্জিগুলো বেশ নীরস এবং এগুলো আমি বড় একটা পছন্দ করি না।
অন্যদিকে কোনো কোনো রোজনামচা লেখা হয় গল্পের ভিত্তিতে। সেখানে পর্যবেক্ষণ থাকে, থাকে মানুষের মনের নানান ভাব। আমার পক্ষপাত এই দ্বিতীয় প্রকারের রোজনামচাগুলোর প্রতি। তবে বলা বাহুল্য যে জনাব তাজউদ্দীন আহমদের রোজনামচাগুলো প্রথম প্রকারের। সুতরাং আমি যখন তাঁর রোজনামচার বইটি পড়তে শুরু করি, তখন প্রথম দিকে বইটির বর্ণনা আমার কাছে যান্ত্রিক, বড় শুষ্ক এবং বেশ কিছুটা নীরস মনে হয়েছে। কিন্তু অতি দ্রুতই আমি তাঁর লেখার মধ্যে ডুবে যাই। আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে তাঁর লেখাগুলো শুধু ঘটনার বিবরণ নয়, বরং সেগুলো তখনকার সময়, সমাজ ও রাজনীতির সুস্পষ্ট প্রতিফলন। তবে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, রোজনামচাগুলো এক নেতা, তাঁর চিন্তাচেতনা ও নিজস্ব বিবর্তনের জীবন্ত সাক্ষী।
এই রোজনামচা থেকে বুঝতে পারি যে জন্মভূমি আর তার মানুষদের জনাব তাজউদ্দীন আহমদ কতটা ভালোবাসতেন। রোজনামচার নানা লেখায় জনগণের জন্য তাঁর বিপুল ভালোবাসা নানাভাবে বেরিয়ে এসেছে। কখনো স্থানীয় পর্যায়ে, যেমন জন্মস্থান কাপাসিয়ার মানুষের জন্য, কখনো তাঁর রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র পুরান ঢাকার জন্য, কোনো কোনো সময় অবশ্য পুরো দেশের জন্য।
তাজউদ্দীনের লেখা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে জনগণের অধিকার, তাঁদের কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা, তাঁদের স্বায়ত্তশাসন ও তাঁদের মুক্তির জন্য তিনি ছিলেন এক অক্লান্ত কর্মী। ওই সব প্রশ্নে জনাব তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন অনড় এবং আপসহীন। তিনি জনগণের জন্য একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন। যৌবনে যেসব দেশপ্রেমমূলক ধ্যান-ধারণা তাঁর মধ্যে কাজ করেছে, সেগুলোই বহু বছর পরে যখন তিনি বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তখন তাঁর প্রণীত বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিষয়ে তাঁর চিন্তা-চেতনাকে প্রভাবিত ও উদ্বুদ্ধ করেছে।
তাঁর রোজনামচা থেকে এটা খুব পরিষ্কার যে জনাব তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বিপুলভাবে রাজনৈতিক মানুষ। রাজনীতি ছিল তাঁর রক্তে রক্তে। ব্যক্তিগত কিছু বিষয় ও ঘটনার উল্লেখ ভিন্ন পুরো রোজনামচাতেই তাঁর বন্ধু, সহকর্মী, চেনা-শোনা মানুষের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ এবং আলাপ-আলোচনার বিবরণই বেশি। তাঁরা সবাই কমবেশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
মাঠপর্যায়ের সঙ্গে তাজউদ্দীনের সম্পৃক্ততা ছিল অত্যন্ত নিবিড়, ফলে স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ছিল খুবই গভীর। তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে তাঁর সংযোগ ছিল খুবই শক্ত। তাঁর রোজনামচায় একটি লেখা আছে, যেখানে গ্রাম থেকে আসা এক ছাত্র কর্মীর সঙ্গে তিনি মুখোমুখি একটানা চার ঘণ্টা আলাপ করেছেন। রোজনামচায় তিনি লিখছেন, ‘এই আলোচনা আমাকে ঋদ্ধ করেছে।’
রাজনীতিকে জনাব তাজউদ্দীন আহমদ ক্ষমতায় যাওয়ার পন্থা হিসেবে দেখেননি, গণমানুষের কল্যাণের উপকরণ হিসেবে দেখেছিলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিষয়গুলোয় তিনি সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ ও নিরাবেগ ছিলেন। পুরান ঢাকায় নানা রাজনৈতিক সহকর্মীর সঙ্গে তাঁর আলাপ-আলোচনায় এ সত্য বেরিয়ে আসে।
রাজনীতিবিদ হিসেবে জনাব তাজউদ্দীন আহমদ কথাসর্বস্ব রাজনীতিবিদ ছিলেন না, কিংবা তিনি বৈঠকখানার রাজনীতিবিদও ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাজনীতির সক্রিয় কর্মী। তাঁর রোজনামচা থেকে পরিস্ফুট যে ভাষা আন্দোলনের সময় কীভাবে তিনি আন্দোলন-কৌশলগুলো নির্ধারণ করেছিলেন, কীভাবে তিনি সরকারি যন্ত্রের মোকাবিলার করার কৌশল প্রণয়ন করেছিলেন, কীভাবে তিনি তাঁর বন্ধুদের সংঘবদ্ধ করেছিলেন এবং কীভাবে তিনি নিজে রাস্তায় নেমে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
তাজউদ্দীন আহমদ সারা জীবন যা করেছেন, ঠিক সেভাবেই ভাষা আন্দোলনের সময়ও তিনি গণমানুষের সঙ্গেই ছিলেন। ভাষা আন্দোলনকে তিনি শুধু বাঙালিদের সাংস্কৃতিক আত্মসত্তার আন্দোলন হিসেবে দেখেননি, তিনি এ আন্দোলনকে দেখেছেন বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও মুক্তির সংগ্রাম হিসেবেও। রোজনামচার লেখাগুলো জনাব তাজউদ্দীন আহমদকে শুধু রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করে না, সেই সঙ্গে তাঁকে তাঁর পারিবারিক অঙ্গনে একজন সংবেদনশীল স্বামী, স্নেহপ্রবণ পিতা এবং একজন নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবেও তুলে ধরে।
তাজউদ্দীন আহমদের পুরো রোজনামচায় সেই প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে ফিরেছি যা তাঁর সম্পর্কে বারবার জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘তাজউদ্দীন আহমদ কি সমাজতন্ত্রী ছিলেন?’ তাঁর রোজনামচা পড়ে আমার মনে হয়েছে যে জনাব তাজউদ্দীন আহমদ জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন নিঃসন্দেহে, কিন্তু সামাজিক ন্যায্যতা, জনকল্যাণ, সাম্য ও সমতার প্রতি তাঁর দৃঢ় পক্ষপাত ছিল।
তাজউদ্দীন আহমদ কি মার্ক্সবাদী ছিলেন? আমার নিজের মনে হয় যে প্রথাগত সংজ্ঞার দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি মার্ক্সবাদী ছিলেন না, কিন্তু চিন্তাচেতনার পরিপ্রেক্ষিতে মার্ক্সবাদের প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিল। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মার্ক্সবাদী বা কমিউনিস্ট নই, কিন্তু মার্ক্সীয় শিক্ষাকে আমি আমার জীবনধারায় অনুসরণ করি।’ জনাব তাজউদ্দীন আহমদ মার্ক্সবাদী ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু তিনি অবশ্যই সমাজতন্ত্রী ছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যেসব অর্থনৈতিক নীতিমালা, কৌশল ও পরিকল্পনা অনুসৃত হয়েছিল, তার সবগুলোয় স্বাধীন ও মুক্ত বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদের চিন্তাধারার ছাপ ছিল।
রোজনামচাগুলো পড়ে আমার ধারণা হয়েছে যে জনাব তাজউদ্দীন আহমদ ইতিহাসকে অনুসরণ করেছেন, ইতিহাস তাঁকে টেনে নিয়ে যায়নি। এ প্রসঙ্গে তাঁর কথাগুলো প্রণিধানযোগ্য; ‘তুমি এমনভাবে কাজ করবে যাতে তুমি ইতিহাস গড়তে পারো, কিন্তু তোমাকে যেন সেই ইতিহাসের কোথাও খুঁজে না পাওয়া যায়’।
* সেলিম জাহান, ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
Sunday, June 29, 2025
চলে গেলেন শেষ ঠিকানার কারিগর মনু মিয়া
জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। এর মধ্যে জীবনের সুদীর্ঘ ৪৯টি বছর তিনি নিরবছিন্নভাবে কবর খননের কাজ করেছেন। মানুষের শেষ বিদায়ে হয়ে উঠেছেন ভরসার প্রতীক। শেষ ঠিকানার একজন নিপুণ কারিগর ছিলেন তিনি। কারও মৃত্যু সংবাদ কানে আসামাত্রই খুন্তি, কোদাল, ছুরি, করাত, দা, ছেনাসহ সহায়ক সব যন্ত্রপাতি নিয়ে ছুটে যেতেন কবরস্থানে। মানুষের অন্তিম যাত্রায় একান্ত সহযাত্রীর মতো তিনি বাড়িয়ে দিতেন তার আন্তরিক দু’হাত। নিখুঁত সুদক্ষ গোরখোদক হিসেবে মনু মিয়ার সুনাম রয়েছে দুর্গম হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, শাল্লা, আজমিরীগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে। দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে নিজের ধানিজমি বিক্রি করে বেশ কয়েক বছর আগে কিনেছিলেন ঘোড়াটিকে। আদর করে নাম দিয়েছিলেন, ‘বাহাদুর’। এই ঘোড়ার পিঠে তিনি তুলে নিতেন তার যাবতীয় হাতিয়ার-যন্ত্র। সেই ঘোড়ায় সওয়ার হয়েই শেষ ঠিকানা সাজাতে মনু মিয়া ছুটে চলেন গ্রাম থেকে গ্রামে। ঘোড়াটিই যেন তার বয়সের বাধা অতিক্রম করে দিয়ে তাকে সচল রেখে চলেছিল। নানা জটিল রোগে কাবু হয়ে সমপ্রতি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। এ রকম পরিস্থিতিতে গত ১৪ই মে তাকে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার চিকিৎসা চলার সময়ে নিঃসন্তান মনু মিয়ার সন্তানসম ঘোড়াটি বর্বরতার বলি হয়। তার প্রিয় ঘোড়াটিকে হত্যার ঘটনা মানবজমিন-এ ছাপা হলে দেশ জুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়। সমপ্রতি চিকিৎসা শেষে স্ত্রী রহিমা বেগমকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেও প্রিয় ঘোড়াটির শূন্যতা সব সময় অনুভব করছিলেন তিনি।

Sunday, June 22, 2025
জন্মদিনে স্মরণ- ইরানি সিনেমার কবি আব্বাস কিয়ারোস্তামি by মুমিত আল রশিদ
২০১৬ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী তেহরানে ৩৫তম আন্তর্জাতিক ফজর চলচ্চিত্র উৎসবে কিয়ারোস্তামির ৭৫তম জন্মজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে উৎসব থিম হিসেবে ‘বন্ধুর বসত এখানে’ (খনে দুস্ত ইনজাস্ত) চিত্তাকর্ষক বাক্যটি ব্যবহার করে। আয়োজক কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল কিয়ারোস্তামির ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত?’ (Where Is the Friend’s House? ১৯৮৭ খ্রি.) চলচ্চিত্রটির বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা অনুধাবন ও অনুরণন।
ইরানি চলচ্চিত্রের মহান কবি আশির দশকের শেষভাগে নির্মাণ করেন বিশ্ববিখ্যাত অমর চলচ্চিত্র খনে দুস্ত কোজাস্ত। এর মাধ্যমে শুধু নিজেরই নন, বিশ্ব দরবারে ইরানি চলচ্চিত্রেরও কদর বাড়িয়ে দেন বহুগুণ। সিনেমাটি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দারুণ সাড়া ফেলে। বিশ্বের তরুণ পরিচালকদের মধ্যে তুমুল আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। ইরানের সিনেমার পথচলাও শুরু হয় নতুনভাবে।
আব্বাস কিয়ারোস্তামি আবারও তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন ক্লোজ আপ বা নামায়ে নাজদিক (১৯৯০ খ্রি.) ও মাশক্বে শাব (Homework, ১৯৮৯ খ্রি.) সিনেমা দিয়ে। এ দুটো চলচ্চিত্র প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের আঙিনায়ও তাঁর অনন্য দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। চলচ্চিত্র দুটোর বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে আমরা দেখব, এতে ফারসি সাহিত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্যের একটি দিক ‘রেভায়াত পারদাজি’র সফল প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। রেভায়াত পারদাজি বলতে বোঝায়—গল্পের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ছকে কথা বলা, লেখা, গান, সিনেমা, টেলিভিশনের কোনো কাজ, কম্পিউটার গেম, আলোকচিত্র, থিয়েটার বা কোনো সিকোয়েন্সে সংঘটিত গল্প অথবা অনাগত ভবিষ্যতের কাল্পনিক কোনো গল্প যা এখনো সংঘটিত হয়নি—এ রকম কিছু। আব্বাস কিয়ারোস্তামি উপর্যুক্ত দুটি চলচ্চিত্রের মধ্যে রেভায়াত পারদাজির অত্যন্ত সফল চিত্রায়ণ করেছেন। তাঁর ক্লোজ আপ চলচ্চিত্র বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছে—বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও সিনেমা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপরিহার্য একটি বিষয় হিসেবেও স্থান করে নিয়েছে।
এই চলচ্চিত্র ফ্রান্সের বিখ্যাত প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার, লেখক ও কবি ক্রিস মার্কার ও স্পেনের চলচ্চিত্রকার লুইস বুনুয়েল এবং অন্যান্য প্রসিদ্ধ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকারের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের মতো দর্শকের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—নিগূঢ় সত্য কী? বা বস্তুনিষ্ঠ বিষয় কী? অবশ্য সব বাস্তবতা, যুক্তি-দলিল, আধুনিকতার বিবেচনা আমাদের শেষ পর্যন্ত এই ফলাফলে পৌঁছতে সাহায্য করে যে, বিষয়বস্তু হচ্ছে বিশ্বাস। বিশ্বাসের কোন দিকটি ভয়ংকর? বিশ্বাস কি প্রশান্তি দেয়? কোনো মুক্তি বা উপহারের বার্তা দেয়?
অন্যদিকে আব্বাস কিয়ারোস্তামি তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতায় প্রায় কাছাকাছি গল্পে নির্মাণ করেন মাশক্বে শাব। ‘আভভালি হা’ ও ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত’ চলচ্চিত্র দুটি নির্মাণের মাধ্যমে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন কিয়ারোস্তামি। বিশেষ করে, খনে দুস্ত কোজাস্ত নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে প্রচুর প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করেন। গ্রামের সহজ-সরল শিশুদের চিন্তার সুপ্ত বিকাশমান ধারা, একে-অপরের প্রতি ভালোবাসা, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, কষ্টসহিষ্ণু জীবনধারা, নির্লোভ জীবনের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি দেশকাল ভেদ করে চলচ্চিত্রটির প্রতি দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। উল্লেখ্য, এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের নজির যদিও পূর্বে ছিল না, কিন্তু ‘ইয়েক ইত্তেফাক্বে ছদেহ’ (A Simple Event, ১৯৭৪ খ্রি.) চলচ্চিত্রে ছোট্ট শিশুটির কাস্পিয়ান সাগর-তীরবর্তী এলাকা থেকে মাছের থলে কাঁধে নিয়ে দৌড়ানোর দৃশ্য দেখে, স্কুলের কাজ দেখে, মায়ের প্রতি কর্তব্যবোধ দেখে অনেকেই হয়তো আব্বাস কিয়ারোস্তামির হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস?-এর নায়ক আহমাদের সহপাঠী বন্ধু নেয়ামতযাদেহর কর্তব্যবোধের কারণে বারবার পাহাড়ের একপাশের গ্রাম থেকে অন্যপাশের গ্রামে দৌড়ে ছুটে যাওয়ার কথা স্মরণ করতে পারেন। শুধু কি তাই? ছোট্ট মনের আকুতি-মিনতির এই পার্থিব অর্থকে অনেক বিজ্ঞ চলচ্চিত্র সমালোচক ইহজাগতিক তৃষ্ণা থেকে পরমাত্মার যাত্রার কথাই ইঙ্গিত করেছেন।
হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের নামটি ইরানের কবি সোহরাব সেপেহরির (জন্ম ১৯২৮ খ্রি.- মৃত্যু ১৯৮০ খ্রি.) বিখ্যাত কবিতা ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত?’ থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পর লেখক বেহরুজ তাজুর দাবি করেন যে, সিনেমার গল্পটি তাঁর ছোট গল্প ‘চেরা খানম মোআল্লেম গেরিয়ে কার্দ?’ (নারী শিক্ষক কেন কান্না করেছেন?) থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিয়ারোস্তামি প্রদর্শনীর সময় সিনেমার গল্পটি বেহরুজের গল্প থেকে নেওয়া হয়নি বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।
সিনেমার পটভূমি, লোকেশন, কলাকুশলী নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে যিনি সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিয়েছেন, সেই কিউমারছ পুর আহমাদি চমকপ্রদ কিছু তথ্য দিয়েছেন। কিউমারছ পুর আহমাদি পরবর্তীকালে সিনেমা ও টেলিভিশন মাধ্যমে ইরানিদের মাঝে মাজিদ নামের নস্টালজিক চরিত্রের রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন। তিনি হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের বিহাইন্ড দ্য সিনের বাস্তবচিত্র অঙ্কন করেছিলেন, যা খনে দুস্ত কোজাস্ত নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়। এই সময়ে কিয়ারোস্তামি জেন্দেগি ভা দিগার হিচ (Life, and Nothing More, ১৯৯২ খ্রি.) ও জিরে দেরাখ্তনে জেইতুন (Through the Olive Trees, ১৯৯৪ খ্রি.) নামে আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। দুটি চলচ্চিত্রই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে সকলের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়। বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো হয়্যার ইজ মাই ফ্রেন্ড’স হোম চলচ্চিত্রের পর এই দুইটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয় গিলান প্রদেশে।
সত্তরের দশকের আগে ইরানের শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র যেভাবে যাত্রা শুরু করেছিল, বিপ্লবের পরও তা অব্যাহত ছিল। এ সময় অসাধারণ সব চলচ্চিত্রকারের আগমন ঘটে। শিশু ও কিশোরদের জন্য অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এ ক্ষেত্রে যিনি বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তাঁর আরেকটি বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘তামে গিলাছ’ (‘Taste of Cherry’, ১৯৯৭ খ্রি.)। চলচ্চিত্রটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া অন্য সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘জিরে দেরাখ্তনে জেইতুন’ (‘Through the Olive Trees’, ১৯৯৪ খ্রি.), ‘মেছলে ইয়েক আ’শেক্ব’ (‘Like Someone in Love’, ২০১২ খ্রি.) উল্লেখযোগ্য।
আব্বাস কিয়ারোস্তামি তত দিনে ইরান ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত একজন চলচ্চিত্রকার। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বিশ্বব্যাপী প্রশংসার জোয়ারে ভাসছিল। এই সময়ে নির্মাণ তিনি করেন ‘বদ ম রা খহাদ বোর্দ’ (‘The Wind Will Carry Us’, ১৯৯৯ খ্রি.), ‘তামে গিলাছ’ (‘Taste of Cherry’, ১৯৯৭ খ্রি.), ‘এবিছি আফ্রিকা’ (ABC Africa, ২০০১ খ্রি.) ও ‘দাহ’ (‘Ten’, ২০০২ খ্রি.)। ‘টেস্ট অব চেরি’ এর মধ্যে সবচেয়ে দেদীপ্যমান সিনেমা, যেটির মাধ্যমে কিয়ারোস্তামি আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচিত হন। আব্বাস কিয়ারোস্তামি ফ্রান্স-ইতালিতে নির্মিত ‘কপি বরাবর আছলি’ (‘Certified Copy’, ২০১০ খ্রি.) নিয়ে ২০১০ সালে কান উৎসবে অংশগ্রহণ করেন এবং চলচ্চিত্রটির নায়িকা জুলিয়েত বিনোশ সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। এ সিনেমার মাধ্যমে একটি যুগের অবসান হয়।
আব্বাস কিয়ারোস্তামিও বিশ্বখ্যাত গায়ক জিম মরিসন, ঔপন্যাসিক অস্কার ওয়াইল্ড, ভিক্টর হুগো, দার্শনিক রুশোর মতো— প্যারিসকে অন্তিম যাত্রার জন্য বেছে নেন। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই প্যারিসেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোয় ইরানি চলচ্চিত্রের বিস্তৃত এক বেলাভূমির সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত সারা বিশ্বের দর্শক, সমালোচক, চলচ্চিত্রপ্রেমীরা অবগাহন করছেন। ৮৫তম জন্মদিনে তেহরানের অদূরে লাভাসানের ছোট্ট মফস্বল শহরে ঘুমিয়ে থাকা এ মহান শিল্পীর প্রতি একরাশ মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Wednesday, April 30, 2025
দাউদ আমার বন্ধু by মতিউর রহমান চৌধুরী

Thursday, March 27, 2025
ভাতিজাকে আলিঙ্গন করতে বাদশাহ দুই হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুলি by শেখ নিয়ামত উল্লাহ
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। গভর্নরের প্রাসাদের সামনে হাজির হয়েছেন হাজার দশেক মানুষ। সেখানে আনা হলো সৌদি রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স ফয়সাল বিন মুসাইদকে। পরনে সাদা পোশাক। হাঁটু গেড়ে বসলেন তিনি। কিছুক্ষণ বাদেই নেমে এল জল্লাদের তলোয়ার। হাজারো জনতার সামনে শিরশ্ছেদ করা হলো যুবরাজকে। তারিখটা ১৯৭৫ সালের ১৮ জুন।
এবার কয়েক মাস পেছনে ফেরা যাক। সেদিন ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ, আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে। সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ নিজ কার্যালয়ে কুয়েতের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখনই তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন প্রিন্স ফয়সাল বিন মুসাইদ। সম্পর্কে তিনি বাদশাহ ফয়সালের ভাইপো। ওই হত্যাকাণ্ডের জন্যই তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল।
বাদশাহ ফয়সাল ছিলেন সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ বিন আল সৌদের ছেলে। সৌদি আরবের তৃতীয় বাদশাহ তিনি। তাঁর মৃত্যু সে সময় দুনিয়াজুড়ে সাড়া ফেলেছিল। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টসহ নামীদামি সব সংবাদপত্র এ নিয়ে ফলাও করে খবর ছেপেছিল। শোক জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডসহ বিশ্বনেতারা। তবে কী কারণে চাচাকে হত্যা করতে প্রিন্স ফয়সাল অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, সে রহস্যের আর সমাধান হয়নি।
যেভাবে হত্যা করা হয় ফয়সালকে
বাদশাহ ফয়সালকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তাঁর জ্বালানি তেলমন্ত্রী ছিলেন শেখ আহমেদ জাকি ইয়ামানি। তাঁর মেয়ের নাম মেই ইয়ামানি। পেশায় তিনি লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাদশাহ ফয়সালকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর। এখন বয়স ৬৮। হত্যাকাণ্ডের সময় কী ঘটেছিল, তা বিবিসির সঙ্গে আলাপচারিতায় জানিয়েছিলেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মেই ইয়ামানি বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন তেলমন্ত্রী। তাই তিনি সেদিন বাদশাহ ফয়সালকে এ বিষয়ে আগে থেকে ব্যাখ্যা করতে গিয়েছিলেন। আর যে যুবরাজ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, তিনি বাদশাহর ভাইপো ছিলেন। ভাগ্যের পরিহাস হচ্ছে, তাঁর নামও ছিল ফয়সাল।
মেই ইয়ামানি আরও বলেন, ‘কুয়েতের তেলমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে প্রতিনিধিদল বাদশাহর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, তাদের ভেতরে ঢুকে পড়েন ফয়সাল। বাদশাহ ফয়সাল তাঁর ভাইপোকে আলিঙ্গন করতে দুই হাত বাড়িয়ে দেন। তখনই তাঁর ভাইপো পকেট থেকে একটা ছোট্ট পিস্তল বের করেন। এরপর গুলি করেন বাদশাহ ফয়সালকে। মাথা লক্ষ্য করে পরপর তিনটি গুলি। আমার বাবা তখন বাদশাহ ফয়সালের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।’
এরপর বাদশাহ ফয়সালকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা জানান, তিনি মারা গেছেন। মেই ইয়ামানির বাবা শেখ ইয়ামানি বাদশাহ ফয়সালের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মন্ত্রীদের একজন। বিবিসিকে মেই ইয়ামিন বলেন, ‘আমি সেদিনের কথা কখনোই ভুলব না। সে কষ্ট আমাকে সইতে হয়েছে। আমি এখনো তা মনে করতে পারি। আমার বাবার যে বেদনা, সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন বাদশাহ ফয়সালের পাশে, যিনি ছিলেন তাঁর সব কিছু—গুরু, বন্ধু, পথপ্রদর্শক। অথচ তাঁকে এত কাছে থেকে গুলি করে মারা হলো।’
হত্যাকারী যুবরাজ কি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন
যুবরাজ ফয়সালের চালানো প্রথম গুলিটি লাগে বাদশাহর চিবুকে। দ্বিতীয় গুলিটি তাঁর কান ঘেঁষে চলে যায়। একজন রক্ষী অকস্মাৎ এগিয়ে এসে যুবরাজকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেন। তখন তেলমন্ত্রী জাকি চিৎকার করে ওঠেন, যুবরাজকে হত্যা করা যাবে না। এরপর প্রিন্স ফয়সালকে গ্রেপ্তার করে কারাবন্দী করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর সৌদি রাজপরিবার থেকে দাবি করা হয়েছিল, যুবরাজ ফয়সাল মানসিকভাবে অসুস্থ। তবে তাঁর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য গঠন করা বিশেষজ্ঞদের বরাতে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছিল সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। ওই বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, হত্যার দিন যখন নিরাপত্তারক্ষীদের পেরিয়ে যুবরাজ ফয়সাল বাদশাহের কাছে গিয়েছিলেন, তখন তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন।
যুবরাজ ফয়সাল যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেছিলেন। সে সময় তাঁর মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা জানতে দেশটিতে বিশদ খোঁজখবর নেন তদন্তকারীরা। জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে এলএসডি নামের একধরনের মাদক বিক্রির জন্য একবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল যুবরাজ ফয়সালকে। সৌদি আরবে ফেরার পর রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তখন তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন বলে খবর বের হয়। লেবাননের রাজধানী বৈরুতেও মানসিক চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত চাচাকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পান ২৭ বছর বয়সী যুবরাজ ফয়সাল। ১৯৭৫ সালের ১৮ জুন তাঁকে শিরশ্ছেদের আগে বিকেল সাড়ে চারটায় আদালতের রায় গভর্নরের প্রাসাদের সামনে উপস্থিত জনতাকে জানায় সৌদি সরকার। এরপর শিরশ্ছেদ কার্যকর করা হয়। সাজা দেওয়ার পর কিছুক্ষণ জনসাধারণের সামনে রাখা হয় যুবরাজের খণ্ডিত মাথা। এরপর কবর দেওয়ার জন্য পুরো শরীর অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়।
হত্যার পেছনে রহস্য কী
বাদশাহ ফয়সালকে হত্যার পর কারণ খুঁজতে ১৬ সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন তদন্তকারীরা। শেষ পর্যন্ত তাঁরা জানান, এ হত্যার পেছনে কোনো চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র নেই। যদিও বাদশাহ ফয়সালকে হত্যার পেছনে কী কারণ কাজ করেছিল, তা নিয়ে গুঞ্জন কম ছড়ায়নি।
চাচাকে হত্যার পর যুবরাজ ফয়সালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। যেমন বলা হয়েছিল, রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে নিজের বার্ষিক বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন যুবরাজ। এ ছাড়া তাঁর দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর গ্রেপ্তার-সংক্রান্ত কারণে ওই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যুবরাজ ফয়সাল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদস্য, এমন অভিযোগও আনা হয়েছিল।
বাদশাহ ফয়সালের মৃত্যুর পর তাঁর স্থলে আসেন বাদশাহ খালিদ। তখন সৌদি আরবের গোয়েন্দাপ্রধান ছিলেন যুবরাজ তুর্কি আল ফয়সাল। তাঁকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেন বাদশাহ খালিদ। ২০২০ সালের এপ্রিলে সৌদি রোতানা খালিজিয়া চ্যানেলে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাদশাহ ফয়সালের হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল না। হত্যার পেছনে কাজ করেছিল যুবরাজ ফয়সালের ‘ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা ও বাদশাহর কিছু নীতি’।
বাদশাহ ফয়সালের মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিবিসিকে মেই ইয়ামানি বলেছিলেন, ‘বাদশাহ ফয়সালকে কেন হত্যা করা হয়েছিল, তার আসল কারণ আমরা জানি না। শুধু এটা জানি, বাদশাহকে যিনি হত্যা করেছিলেন, সেই ভাইপো ছিলেন মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত।’
‘ফিলিস্তিনের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত’
আরব উপদ্বীপকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য লড়াই করেছিলেন বাদশাহ আবদুল আজিজ আল সৌদ। ১৯৩২ সালে বাদশাহ হন তিনি। ১৯৫৩ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর ক্ষমতায় বসেন আবদুল আজিজের বড় ছেলে সৌদ বিন আবদুল আজিজ। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত। বড় ভাইয়ের শাসনামলে সৌদি আরবের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ।
১৯৬৪ সালে বাদশাহ হন ফয়সাল। সৌদি আরব তখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ এক দেশ, যদিও আকারে প্রায় ইউরোপের সমান। ফলে ক্ষমতায় বসে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার বিরাট এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন ফয়সাল। সেই চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে দেশের আধুনিকায়নের জন্য সৌদি আরবের সদ্য পাওয়া বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলসম্পদ ব্যবহারের উদ্যোগ নেন তিনি।
বাদশাহ ফয়সাল একজন বিচক্ষণ রাজনীতিক ও ধার্মিক মানুষ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আধুনিক বিচারব্যবস্থা প্রবর্তনের কাজে হাত লাগান তিনি। তাঁর আমলে ষাটের দশকে সৌদি আরবে প্রথম টেলিভিশন স্টেশন চালু করা হয়। মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর উদ্যোগও নেন। সে সময় সৌদি আরবে বহুবিবাহের প্রচলন থাকলেও ফয়সালের একসঙ্গে একটির বেশি স্ত্রী ছিল না।
বিবিসিকে দেওয়া মেই ইয়ামানির সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বাদশাহ ফয়সালের শিক্ষা সংস্কারের কথা। ফয়সালের স্ত্রী রানি এরফাদ মেয়েদের জন্য স্কুলশিক্ষা চালু করেন। বাদশাহ সৌদি আরবের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষকে রাজি করাতে পেরেছিলেন যে শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের ভালো মায়ে পরিণত করতে হবে। রানি এরফাদের স্কুলের প্রথম ৯ মেয়েশিক্ষার্থীর একজন ছিলেন মেই ইয়ামানি।
বাদশাহ ফয়সালের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ ছিল সৌদি আরবের জ্বালানি তেল নীতি। এ নীতির মাধ্যমে নিজেদের তেলসম্পদের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ পায় সৌদি আরব। ফলে আরব বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় দেশটি।
১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় এই তেলসম্পদকে প্রথম রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সৌদি আরব। ইসরায়েলের সমর্থনকারী পশ্চিমা দেশগুলোতে তেল রপ্তানি বন্ধের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় দেশটি। ফলে বিশ্বে রাতারাতি তেলের দাম বহুগুণ বেড়ে যায়।
বাদশাহ ফয়সালের তেলমন্ত্রী শেখ ইয়ামানি তখন পশ্চিমা গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ইসরায়েল সব আরব এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার না করলে তেলের সরবরাহ বাড়ানো হবে না। এ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে দারুণ শোরগোল পড়েছিল। ওই ঘটনার পর প্রভাবশালী টাইম সাময়িকী ১৯৭৪ সালে বাদশাহ ফয়সালকে বছরের আলোচিত ব্যক্তিত্ব ঘোষণা করে।
বাদশাহ ফয়সালের পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পেয়েছিল ফিলিস্তিন। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের দুর্দশাপীড়িত মানুষের পক্ষে। ইসরায়েলের দখলদারির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। ১৯৬৫ সালে এক রেডিও সম্প্রচারে বাদশাহ ফয়সাল বলেছিলেন, ‘ফিলিস্তিন আমাদের কাছে তেলের চেয়ে দামি। প্রয়োজন পড়লে যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসেবে তেলকে ব্যবহার করা যাবে। ফিলিস্তিনিদের অবশ্যই তাদের জন্মভূমিতে ফিরিয়ে নিতে হবে, এ জন্য আমাদের সবার জীবন দিতে হলেও।’
তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, মিডল ইস্ট মনিটর, আনাদুলু এজেন্সি
| বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ। ফাইল ছবি: বাদশাহ ফয়সাল ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া |
Thursday, January 30, 2025
‘বাপু, নমস্কার’ বলেই মহাত্মা গান্ধীকে তিনটি গুলি করেন খুনি by সাইফুল সামিন
খুবই সাদামাটা, অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনীতিক, আধ্যাত্মিক এই মানুষটির নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তিনি ‘মহাত্মা গান্ধী’ নামেই বহুল পরিচিত। এই নামের অর্থ ‘মহান আত্মা’। সম্মান করে অনেকে তাঁকে ‘বাপু’ (বাবা) বলেও ডাকতেন।
ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক মহাত্মা গান্ধী। তবে ভারতের স্বাধীনতার ছয় মাসের কম সময়ের ব্যবধানে নৃশংস গুপ্তহত্যার শিকার হন এই শান্তিকামী নেতা।
ধর্মীয় পরিবারে জন্ম
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জন্ম ১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর, ব্রিটিশশাসিত ভারতের পোরবন্দরের একটি অভিজাত হিন্দু পরিবারে। তাঁর জন্মস্থান এলাকাটি এখনকার ভারতের গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত।
বাবা করমচাঁদ উত্তমচাঁদ গান্ধী। তিনি ছিলেন পোরবন্দরের রাজদেওয়ান (মুখ্যমন্ত্রী)। মা পুতলিবাই গান্ধী। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। ছেলের মধ্যে তিনি ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার সঞ্চার ঘটিয়েছিলেন। নিরামিষ ভোজন, ধর্মীয় সহনশীলতা, সহজ-সাধারণ জীবনযাপন, অহিংসার ওপর জোর দিয়েছিলেন তিনি।
মহাত্মা গান্ধী ১৩ বছর বয়সে মা–বাবার পছন্দে ১৪ বছর বয়সী কস্তুরবা মাখাঞ্জিকে বিয়ে করেন। ১৮ বছর বয়সে ১৮৮৮ সালে আইনশাস্ত্র পড়তে মহাত্মা গান্ধী লন্ডন যান। ১৮৯১ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করেন।
লন্ডনে পড়া শেষে মহাত্মা গান্ধী ভারতে ফিরে আসেন। আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রথম মামলাতেই তিনি হেরে যান। তিনি অপমানিত হন। একপর্যায়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি ভারতীয় ফার্মে কাজের প্রস্তাব পান তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকায় সংগ্রাম
১৮৯৩ সালে মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে ভারত ছাড়েন। পরবর্তী ২১ বছর তাঁর দক্ষিণ আফ্রিকাতেই কাটে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি সাধারণভাবে প্রচলিত বৈষম্যের শিকার হন মহাত্মা গান্ধী। এই আচরণে তিনি হতবাক হন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় অভিবাসীদের অধিকার আদায়ে মহাত্মা গান্ধী সোচ্চার হন। ভারতীয়দের অধিকার আদায়ে ১৮৯৪ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠা করেন নাটাল ভারতীয় কংগ্রেস। দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাত্মা গান্ধীর হাত ধরে বিকশিত হয় অহিংস আন্দোলন ‘সত্যাগ্রহ’।
অহিংস আন্দোলন করতে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাত্মা গান্ধী একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালেই তাঁর পরিচিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানকালে ১৯০৬ সালে ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করেন মহাত্মা গান্ধী। এর পর থেকে তিনি ব্রহ্মচর্য পালনে আরও কঠোর হতে শুরু করেন।
ভারতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ
১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে ভারতে ফিরে আসেন মহাত্মা গান্ধী। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আগে তিনি তিনটি আঞ্চলিক সত্যাগ্রহ—চম্পারণ (১৯১৭), খেদা ও আহমেদাবাদ (১৯১৮) পরিচালনা করেন। কৃষক-শ্রমিকদের সমস্যা-অধিকার নিয়ে করা পৃথক এই সত্যাগ্রহের মাধ্যমে তিনি ভারতজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন।
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল। এর মধ্যে ১৯১৯ সালের গোড়ার দিকে দমনমূলক রাওলাট আইন পাস করে ব্রিটিশ সরকার। এই আইন ব্রিটিশ সরকারকে বিনা কারণে যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করার ক্ষমতা দেয়।
মহাত্মা গান্ধী এই আইনকে ‘কালো আইন’ বলে অভিহিত করেন। তিনি এই আইনের বিরুদ্ধে অহিংস সত্যাগ্রহের ডাক দেন। এই আইনের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলন তাঁকে ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামের মূলধারায় নিয়ে আসে। ভারতীয় রাজনীতিতে মহাত্মা গান্ধী যুগের সূচনা হয়।
অসহযোগ আন্দোলন
রাওলাট আইন ও স্থানীয় দুই জনপ্রিয় রাজনীতিককে (সাইফুদ্দিন কিচলু ও সত্যপল) গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগে অনেক মানুষ জড়ো হন। সেদিন পাঞ্জাবের অন্যতম বৃহৎ উৎসব বৈশাখীর দিন ছিল।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে বিক্ষোভরত নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচার গুলি চালানো হয়। গুলিতে কয়েক শ মানুষ নিহত হন। আহত হন হাজারো মানুষ। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি পরিত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় মুসলমানরা খেলাফত আন্দোলন (১৯১৯-২৪) শুরু করেন। অন্যদিকে রাওলাট আইন থেকে শুরু করে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-২২)।
১৯২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে খেলাফত আন্দোলনের প্রতি মহাত্মা গান্ধী সমর্থন দেন। বিনিময়ে খেলাফত আন্দোলনের নেতারা মহাত্মা গান্ধীর অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।
এভাবে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় একটি সম্মিলিত ফ্রন্ট গড়ে ওঠে। ব্যাপক সহিংসতাসহ বেশ কিছু বড় ঘটনার জেরে ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মহাত্মা গান্ধী তাঁর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ১৯২২ সালের ১০ মার্চ মহাত্মা গান্ধীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচার–সংক্রান্ত স্বাস্থ্যগত কারণে ১৯২৪ সালে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
আইন অমান্য আন্দোলন
ভারতের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন ও তা চূড়ান্তকরণে ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার সাইমন কমিশন গঠন করে। ব্রিটিশ সংসদীয় এই কমিশনকে পুরোপুরি ‘শ্বেতাঙ্গ কমিশন’ অভিহিত করে তা বর্জন করেন ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতারা।
পাল্টা হিসেবে ১৯২৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা মতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারতের জন্য একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। ব্রিটিশ সরকারকে ‘নেহরু রিপোর্ট’ পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করতে চাপ দেয় কংগ্রেস।
ব্রিটিশ সরকার ১৯২৯ সালে ঘোষণা দেয়, শিগগিরই ভারতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে ডোমিনিয়নের মর্যাদা দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে সুভাষচন্দ্র বসু ও জওহরলাল নেহরুর মতো কংগ্রেসের তরুণ নেতারা দাবি করেন, তাঁদের সংগ্রামের লক্ষ্য ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা।
এমন প্রেক্ষাপটে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয় কংগ্রেস। মহাত্মা গান্ধীকে এই আন্দোলন পরিচালনার নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। তিনি অহিংস পন্থায় এই আন্দোলন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৩০ সালে তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় আইন অমান্য আন্দোলন। শিগগির এই আন্দোলন গণ-আন্দোলনের রূপ নেয়। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরুসহ অন্যান্য নেতাকে কারারুদ্ধ করা হয়। মহাত্মা গান্ধীসহ কংগ্রেসের নেতাদের ১৯৩১ সালের জানুয়ারিতে মুক্তি দেওয়া হয়।
১৯৩১ সালের মার্চ মাসে মহাত্মা গান্ধী ও ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড আরউইনের মধ্যে চুক্তি (গান্ধী-আরউইন চুক্তি) হয়। গান্ধী আইন অমান্য আন্দোলনে বিরতি দেন।
ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে আলোচনা করতে কংগ্রেসের একক প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বরে লন্ডনের গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন মহাত্মা গান্ধী। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হয়।
সরকারের দমননীতির জেরে ১৯৩২ সালের জানুয়ারিতে আবার আইন অমান্য আন্দোলন শুরুর সিদ্ধান্ত নেন মহাত্মা গান্ধী। ১৯৩৪ সালের এপ্রিলে এই আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে মুসলিম লীগের সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর দ্বিজাতিতত্ত্বের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। জিন্নাহর ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগের অধিবেশনে উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রসমূহ (স্টেটস) গঠনের রূপরেখার একটি প্রস্তাব (লাহোর প্রস্তাব) উত্থাপন করেন। পরে প্রবল উৎসাহে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
ভারত ছাড় আন্দোলন
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের দাবিতে ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে ভারত ছাড় আন্দোলনের প্রস্তাব পাস হয়। এরপরই অহিংস পথে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত আন্দোলন আর অহিংস থাকেনি। আন্দোলন একপর্যায়ে পরিণত হয় বিদ্রোহে। ভারত ছাড় আন্দোলনকে ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগোর ১৮৫৭ সালের ভারতীয় মহাবিদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করেন।
ভারত ছাড় আন্দোলন স্বাধীনতার দাবিকে মৌলিক দাবিতে পরিণত করে। এই আন্দোলনের পর মহাত্মা গান্ধীসহ ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামীদের আর পেছনে ফেরার কোনো পথ ছিল না।
ভারতের স্বাধীনতা
১৯৪৫ সাল নাগাদ ব্রিটিশরা বুঝে যায়, ভারত ছাড়তে হবে। ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ভারতত্যাগের বিষয়ে একটা ঘোষণা দেন। তিনি ১৯৪৮ সালের জুন মাস নাগাদ ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগ করার অভিপ্রায়ের কথা জানান। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের ১৫ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রণীত হয় ভারতের স্বাধীনতা আইন।
১৯৪৭ সালের ২ জুন রাতে কংগ্রেস, মুসলিম লীগসহ ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তিনি ১৯৪৭ সালের ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং ভারত বিভাজনের ঘোষণা দেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সরকারের কাছে এবং ১৫ আগস্ট ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।
দেশ বিভাজনের পর আরও সহিংসতা, আরও দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে অনশন করে কলকাতাকে দাঙ্গার আগুন থেকে রক্ষা করেন মহাত্মা গান্ধী। পরে তিনি কলকাতা থেকে দিল্লিতে ছুটে যান। মুসলমানদের নিরাপত্তা, অধিকারসহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি অনশন শুরু করেন। ১৯৪৮ সালের ১৩ থেকে ১৮ জানুয়ারি দিল্লিতে এটা ছিল তাঁর জীবনের শেষ অনশন।
অহিংসার পূজারি সহিংসতার শিকার
মহাত্মা গান্ধী দিল্লির বিড়লা হাউসে অবস্থান করছিলেন। তাঁর অনশনভঙ্গের দুই দিন পর বিড়লা হাউসে একটি বোমা হামলা হয়। তবে এই হামলায় তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি।
বিড়লা হাউসে সকাল ও সন্ধ্যায় প্রার্থনাসভা করতেন মহাত্মা গান্ধী। সভায় সব ধর্মের কথা বলা হতো। সভায় প্রতিদিন অংশ নিতেন কয়েক শ মানুষ।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি বিকেল ৫টার কিছু পর দুই আত্মীয় আভা ও মানুর কাঁধে হাত রেখে প্রার্থনাসভায় যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এগোতে থাকেন মহাত্মা গান্ধী। হঠাৎ তাঁর সামনে এসে দাঁড়ান নাথুরাম গডসে নামের এক ব্যক্তি।
নাথুরাম তাঁর হাতজোড় করে মহাত্মা গান্ধীকে বলেন, ‘বাপু, নমস্কার।’ তখন নাথুরামকে সরে যেতে বলেন মানু। মানুকে ধাক্কা দেন নাথুরাম। এরপরই তিনি মহাত্মা গান্ধীর দিকে পিস্তল তাক করে চোখের নিমেষে পরপর তিনটি গুলি চালান। মহাত্মা গান্ধী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। দ্রুত তাঁকে বিড়লা হাউসে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
মহাত্মা গান্ধীর মরদেহ বিড়লা হাউসে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। পরে সেখানে পৌঁছান তাঁর ছোট ছেলে দেবদাস গান্ধী। তিনি মহাত্মা গান্ধীর শরীর থেকে কাপড়টি সরিয়ে দেন। সবার উদ্দেশে বলেন, ‘অহিংসার পূজারির সঙ্গে হওয়া হিংসার ঘটনা দুনিয়া দেখুক।’
নাথুরামের ফাঁসি
নাথুরাম কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল হিন্দু মহাসভার সদস্য ছিলেন। হিন্দু মহাসভায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি আরেক কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্য ছিলেন।
মহাত্মা গান্ধীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন নাথুরাম। তাঁর অভিযোগ ছিল, দেশভাগের জন্য মহাত্মা গান্ধীই দায়ী। মুসলিম সম্প্রদায় ও পাকিস্তানের প্রতি মহাত্মা গান্ধীর মনোভাব ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ ও নমনীয়।
মহাত্মা গান্ধী হত্যা মামলার বিচার চলাকালে আদালতে নাথুরাম বলেছিলেন, ‘গান্ধীজি দেশের জন্য যা করেছেন, এর জন্য আমি তাঁকে সম্মান করি। গুলি চালানোর আগে তাই আমি মাথা নিচু করে তাঁকে প্রণামও করেছিলাম। কিন্তু সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে প্রিয় মাতৃভূমিকে ভাগ করার অধিকার কারও নেই, তিনি যত বড়ই মহাত্মা হোন না কেন। আর এর বিচার করবে—এমন কোনো আইন-আদালত নেই। সে জন্যই আমি গান্ধীকে গুলি করেছিলাম।’
মহাত্মা গান্ধী হত্যা মামলায় নাথুরাম ও তাঁর সহযোগী নারায়ণ আপ্তের ফাঁসির আদেশ হয়। নাথুরামের ভাই গোপাল গডসেসহ ছয়জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ১৯৪৯ সালের ১৫ নভেম্বর নাথুরাম ও নারায়ণের ফাঁসি কার্যকর হয়।
২০০৭ সালের ১৫ জুন জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ২ অক্টোবরকে (মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন) ‘আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, বিবিসি, এমকেগান্ধী ডট ওআরজি।
![]() |
| ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক মহাত্মা গান্ধী। ছবি: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া |
Sunday, December 29, 2024
ভারতের ‘অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’
ড. মনমোহন সিং ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল। এই ১০ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এর আগে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী। সেই সময়েই ভারতের অর্থনীতির উদারীকরণের যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও, সেটির বাস্তবায়ন করেছিলেন পেশা ও শিক্ষায় অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিং। ড. মনমোহন সিং-ই ভারতের প্রথম শিখ প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। জওহরলাল নেহরুর পরে ড. মনমোহন সিংই প্রথম ভারতীয় নেতা, যিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর সম্পূর্ণ মেয়াদ পূর্ণ করার পরে দ্বিতীয়বার আবারো নির্বাচিত হয়ে এসেছিলেন।
আবার ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পরে যে শিখ-বিরোধী দাঙ্গায় প্রায় তিন হাজার শিখ নিধন হয়েছিল, যে দাঙ্গায় অভিযোগের আঙ্গুল ওঠে তারই দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে, সেই ঘটনার জন্য প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনই ক্ষমা চেয়েছিলেন মনমোহন সিং। দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন অবশ্য বারেবারে তার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। কিছুটা সেইসব অভিযোগের কারণেই ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তার দল কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
মনমোহন সিংয়ের জন্ম হয়েছিল ১৯৩২ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর অবিভক্ত পাঞ্জাব প্রদেশের এক ছোট্ট গ্রামে। সেই সময়ে ওই গ্রামে না ছিল বিদ্যুৎ, না ছিল খাওয়ার জলের ব্যবস্থা। এরকমই একটা গ্রাম থেকে উঠে আসা মনমোহন সিং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারপরে ডি ফিল উপাধি পান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তার কন্যা দমান সিং বাবার সম্বন্ধে একটি লেখায় জানিয়েছিলেন কেমব্রিজে পড়াশোনা করার সময়ে অর্থ সংকটে দিন কাটতো পরবর্তীতে ভারতের অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হওয়া মনমোহন সিংয়ের। দমান সিং তার একটি বইতে লিখেছেন, পড়াশোনা আর থাকা-খাওয়ার জন্য বছরে তার ছয় শ’ পাউন্ডের মতো খরচ হতো। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি যে বৃত্তি পেতেন তা ছিল প্রায় ১৬০ পাউন্ড। বাকি খরচের জন্য তার বাবার ওপরে নির্ভর করতে হতো তাকে। তিনি খুব সচেতনভাবে কিপটে হয়ে জীবনযাপন করতেন। ডাইনিং হলে বেশ সস্তায়, দুই শিলিং ছয় পেন্সে খাবার পাওয়া যেত, জানিয়েছিলেন তার কন্যা। তার এটাও মনে আছে যে, তার বাবা বাড়ির ব্যাপারে একদম অসহায় ছিলেন। না পারতেন একটা ডিম সেদ্ধ করতে, না চালাতে পারতেন টেলিভিশন।
শিক্ষায় আর পেশায় অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিং রাজনীতির ময়দানে পরিচিত হন ১৯৯১ সালে, ভারতের অর্থমন্ত্রী হিসেবে। সেই সময়ে ভারতের অর্থনীতির ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল। হঠাৎ করেই মন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি একসময়ে ছিলেন সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা আর ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক-রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নর। এখনো এমন ভারতীয় নোট দেখতে পাওয়া যায়, যদিও খুবই কম, যেখানে রিজার্ভ ব্যাংকের নোটে তার সই থাকতো গভর্নর হিসেবে। একটা সময়ে রিজার্ভ ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে কলকাতাতেও কাজ করেছেন মনমোহন সিং। নরসিমা রাওয়ের মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পরে তার প্রথম ভাষণে তিনি ভিক্টর হুগোর বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, যদি একটি ভাবনা আসার সময় হয়ে গিয়ে থাকে, তাকে পৃথিবীর কোনো শক্তিই আটকাতে পারে না। সেটিই ছিল ভারতের এক উচ্চাভিলাষী এবং অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সংস্কারের শুরুর ইঙ্গিত। এরপরেই শুরু হয় করের হার কমানো, ভারতীয় টাকার অবমূল্যায়ন, সরকারি সংস্থাগুলোর বেসরকারিকরণ আর বিদেশি বিনিয়োগে উৎসাহ দেয়ার মতো কর্মসূচিগুলো। তার সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থনীতি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে, মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব হয় আর গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে প্রবৃদ্ধির হার লাগাতার উঁচুর দিকেই থাকে।
মনমোহন সিং খুব ভালো করেই জানতেন যে, তিনি রাজনীতিবিদ নন। তার কথায়, একজন রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা যায়, কিন্তু সেটা হতে হলে তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটে জিততে হবে! ভারতের সংসদের নিম্ন-কক্ষ লোকসভার ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন ১৯৯৯ সালে। কিন্তু হেরে যান তিনি। এরপরে উচ্চ-কক্ষ রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন আসাম থেকে। এরপর এলো ২০০৪ সালের নির্বাচন। কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলো, কিন্তু কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী পদ নিতে অস্বীকার করলেন। সম্ভবত তিনি যেহেতু জন্মসূত্রে ইতালীয়, তাই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে, এটা ভেবেই সম্ভবত তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চান নি। সমালোচকরা এও বলে থাকেন যে, মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কালে সোনিয়া গান্ধীই ছিলেন আসল ক্ষমতার উৎস। ড. সিংয়ের নিজের কোনো ক্ষমতাই ছিল না বলে মনে করেন সমালোচকরা।
ড. মনমোহন সিংয়ের প্রথম পাঁচ বছরের মেয়াদকালে সব থেকে বড় জয়টা ছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি পাওয়ার জন্য একটি চুক্তি সই করা। তবে ওই চুক্তির জন্য মূল্য চোকাতে হয়েছিল তাকে- ভারতের কমিউনিস্ট দলগুলো ওই চুক্তির বিরুদ্ধে পথে নেমেছিল এবং শেষমেশ সরকারের ওপর থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্যান্য দলের কাছ থেকে সমর্থন জোগাড় করতে হয়েছিল কংগ্রেসকে আর এজন্য ভোট কেনা-বেচার অভিযোগও উঠেছিল দলটির বিরুদ্ধে। মনমোহন সিংকে অবশ্য জোট সরকার চালাতে বারেবারেই বেশ বেগ পেতে হয়েছে। বিশেষ করে গলার জোর তোলা, কখনো কখনো রাজ্যভিত্তিক জোট-সঙ্গী দল এবং তাদের সমর্থকদের উচ্ছৃঙ্খল কার্যকলাপ বারবার বিব্রত করেছে মনমোহন সিং এবং তার সরকারকে। তিনি অবশ্য সবসময়েই ঐকমত্যের ভিত্তিতেই চলার চেষ্টা করেছেন।
তবে তার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ সব সময়েই থেকেছে যে, তিনি খুব নরম প্রকৃতির মানুষ আর সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। তবে তার সততা বা বুদ্ধিমত্তার কারণে সবাই তাকে সম্মান করে এসেছেন। কিছু কিছু সমালোচক বলে থাকেন, তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন অর্থনৈতিক সংস্কার করেছিলেন যে গতিতে, সেটা কিছুটা শ্লথ হয়ে গিয়েছিল তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে।
বিজেপি’র নেতা ও ভারতের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদভানি একবার মনমোহন সিংকে দেশের দুর্বলতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। জবাবে ড. সিং বলেছিলেন যে, তার সরকার যে অঙ্গীকার করেছিল, সেসব পূরণ করতে এবং দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে সর্বতো ভাবে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছে। তবে, তার দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে আগেকার সাফল্যগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা একের পর এক দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হতে থাকেন। সেই সব কথিত দুর্নীতির পরিমাণ লক্ষ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছায়। বিরোধীরা স্তব্ধ করে দেয় পার্লামেন্টের কাজকর্ম। ফলে দেশটির অর্থনৈতিক ঊর্ধ্বগতি কিছুটা থমকে যায়।
তার দুই পূর্বসূরির পথ অনুসরণ করেই এক বাস্তববাদী বিদেশ নীতি নিয়ে চলতেন মনমোহন সিং। পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, যদিও সেই প্রক্রিয়া ভেস্তে দেয়ার জন্য যেসব হামলা চালানো হয়, তার দায়ভার গিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের ওপরে। এই সব হামলা চরম পর্যায়ে পৌঁছায় ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বই হামলার সময়ে। অন্যদিকে তিনি চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে ফেলার লক্ষ্যে নাথু লা দিয়ে তিব্বতের সঙ্গে ৪০ বছর ধরে বন্ধ থাকা পুরনো একটি ব্যবসায়িক রুট ফের চালু করেছিলেন।
আবার আফগানিস্তানকে বাড়তি আর্থিক সহায়তাও দিয়েছিলেন তিনি। তিনিই ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি আগের প্রায় তিন দশকের মধ্যে প্রথমবার আফগানিস্তান সফর করেছিলেন। একজন শিক্ষাবিদ ও প্রাক্তন আমলা মনমোহন সিং নিজের পড়াশোনা নিয়ে থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। কোনো সময়েই তিনি নিজের পরিচয় নিয়ে উচ্চকিত ছিলেন না। তার সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইলে আকর্ষণীয় কোনো পোস্ট যেমন থাকতো না, তেমনই তার ফলোয়ারের সংখ্যাও ছিল খুবই সীমিত। তবে স্বল্প কথার, শান্ত এমন একজন ব্যক্তিকে পছন্দ করতেন বহু মানুষ। বেআইনিভাবে কয়লা খনির বরাদ্দ দেয়া নিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা অর্থমূল্যের কয়লা কেলেঙ্কারি নিয়ে তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি নিশ্চুপ থাকার যুক্তি দিয়েছিলেন এভাবে যে চুপ করে থাকাটা হাজার শব্দ দিয়ে জবাব দেয়ার থেকে ভালো। আবার ২০১৫ সালে যখন আদালত তাকে ডেকে পাঠায় ফৌজদারি ষড়যন্ত্র এবং দুর্নীতির অভিযোগে, দৃশ্যতই মনঃক্ষুণ্ন মনমোহন সিং সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, তিনি ‘আইনি বিচারের জন্য প্রস্তুত’ আর ‘সত্যের জয় হবে।’
প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ থেকে সরে যাওয়ার পরে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা হিসেবে দলের দৈনন্দিন কাজকর্মে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। যদিও বয়স সব সময়ে তার সঙ্গ দিতো না। বিবিসিকে দেয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে ২০২০ সালের আগস্টে ড. মনমোহন সিং বলেছিলেন যে, করোনাভাইরাসের মহামারির প্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে ভারতকে ‘অতি দ্রুত’ তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেছিলেন মানুষের হাতে সরাসরি নগদ সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য মূলধনের জোগান দিতে হবে আর আর্থিক খাতকে পুনর্গঠিত করতে হবে। মনমোহন সিংকে ইতিহাস মনে রাখবে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে যিনি ভারতকে অর্থনৈতিক আর পারমাণবিক একঘরে হয়ে যাওয়ার থেকে উদ্ধার করেছিলেন। যদিও ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন যে, তার বোধহয় আরও আগেই অবসর নেয়া উচিত ছিল। তবে মনমোহন সিং ২০১৪ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি আশা করবো যে, সমসাময়িক গণমাধ্যম এবং সংসদের বিরোধী দলগুলোর তুলনায় ইতিহাস আমার প্রতি বেশি সদয় হবে।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...





