Sunday, December 18, 2016

পুতিনকে আগেই সতর্ক করেছিলাম: ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে ই-মেইল হ্যাকিং থেকে বিরত থাকার জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে তিনি গত সেপ্টেম্বরেই সাবধান করে দিয়েছিলেন। গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এটাই তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন। পুতিন নিজে ওই হ্যাকিংয়ের ঘটনা জানতেন—এমন অভিযোগের পক্ষে যুক্তি দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ওবামা বলেন, ‘রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের অগোচরে খুব বেশি কিছু ঘটে না। এই কাজের পরিণাম সম্পর্কে সেপ্টেম্বরে এক সম্মেলনেই আমি তাঁকে হুঁশিয়ার করেছিলাম।’ ওই সম্মেলনের এক মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে, তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনধিকার চর্চা করছে রাশিয়া। সংবাদ সম্মেলনের কিছু আগে ওবামা বলেছিলেন, ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং দলটির পরাজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল হ্যাকিংয়ের ঘটনায় রাশিয়াকে ‘সমুচিত জবাব’ দেওয়া হবে। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ ও প্রেসিডেন্ট ওবামার হ্যাকিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করে রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তর শুক্রবারই বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি ‘অশোভন’। তারা নিজেদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ থাকলে দেখাক বা এ ধরনের কথাবার্তা বন্ধ করুক। ওবামা তাঁর উত্তরসূরি রিপাবলিকান পার্টির ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করে সমালোচনা না করলেও বলেছেন,
রিপাবলিকানরা মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার জড়িত হওয়ার গুরুত্ব বা ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। হিলারি পক্ষের অভিযোগ, রাশিয়ার হ্যাকিং কার্যকলাপ ট্রাম্পকে জিততে সহায়তা করেছে। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে মার্কিন গোয়েন্দারা বলেন, রাশিয়ার হ্যাকাররা ট্রাম্পকে নির্বাচনে জয়ী হতে সাহায্য করেছে। সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, এসব কথা হাস্যকর এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক। হিলারি ক্লিনটন নিজে তাঁর পরাজয়ের জন্য প্রথমবারের মতো রাশিয়ার হ্যাকিংয়ের ঘটনাকে দায়ী করেছেন। শুক্রবার তিনি দলীয় তহবিলদাতাদের উদ্দেশে বলেছেন, রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে পাঁচ বছর আগে অনিয়ম হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন। এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই পুতিন ওই হ্যাকিংয়ের কৌশল নিয়েছেন। হিলারি মন্তব্য করেন, এটা কেবল একজন প্রার্থী বা তাঁর প্রচার কার্যক্রমের ওপর হামলা নয়, বরং গোটা দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ। এটা যুক্তরাষ্ট্রের ঐক্য ও নিরাপত্তার ব্যাপার।

তুরস্কে আবারও আত্মঘাতী হামলা, নিহত ১৩ সেনা

তুরস্কের কায়সেরি শহরে সেনাদের বহনকারী
বাসটিতেবোমা হামলার কিছুক্ষণ পরের দৃশ্য। রয়টার্স
তুরস্কে গাড়িবোমা বিস্ফোরণে কমপক্ষে ১৩ জন সেনা নিহত হয়েছেন। আনাতোলিয়ার কায়সেরি শহরে গতকাল শনিবার সেনাসদস্যদের বহনকারী একটি বাসে আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলা চালানো হয়। এতে আরও ৫৫ জন আহত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তুরস্কের বৃহত্তম নগর ইস্তাম্বুলে জোড়া আত্মঘাতী হামলায় ৩৭ জন পুলিশসহ ৪৪ জন নিহত হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় এই হামলার ঘটনা ঘটল। ১০ ডিসেম্বরের সেই ঘটনার দায় স্বীকার করেছিল কুর্দি বিদ্রোহীরা। তবে গতকালের হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কেউ দায় স্বীকার করেনি। তবে আগের হামলার মতো এই ঘটনার জন্যও কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টিকে (পিকেকে) দায়ী করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গতকালের বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৮ জন সেনাসদস্য। এ ছাড়া কয়েকজন বেসামরিক লোকও আহত হয়েছেন। ওই বাসের যাত্রীরা নবীন সেনা। তাঁরা কমান্ডো ব্রিগেডের সদস্য। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তাঁরা সাপ্তাহিক ছুটিতে যাচ্ছিলেন। আর বাসটি ছিল কায়সেরি পৌরসভা কর্তৃপক্ষের। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, বিস্ফোরণের পর সেনাদের বহনকারী বাসটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং তার ভেতরে আগুন জ্বলছে।
কায়সেরির গভর্নর সুলেমান কামচি বলেন, বোমা বহনকারী গাড়িটি বাসের পাশেই ছিল। হঠাৎ করে সেটি বিস্ফোরিত হয়। উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন। আহত ৫৫ জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১২ জনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাঁদের ছয়জনের অবস্থা সংকটাপন্ন। হামলার পর অনেক বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েন। তাঁরা কায়সেরি শহরে কুর্দিপন্থী রাজনৈতিক দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (এইচডিপি) কার্যালয়ে হামলা করে ভাঙচুর চালান। তবে এ ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল এইচডিপি। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই হামলার জন্য দায়ী। তিনি বলেন, সিরিয়া ও ইরাকে যা হচ্ছে, এ ধরনের হামলা সেটির প্রতিক্রিয়াও বটে। বিচ্ছিন্নতাবাদী বলতে এরদোয়ান মূলত পিকেকে সংগঠনকেই ইঙ্গিত করেন। এটিকে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে মনে করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলায় বেশ অনিরাপদ হয়ে উঠেছে তুরস্ক। পিকেকে ও জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হামলায় প্রায়ই কেঁপে উঠছে বিভিন্ন শহর। এ বছর ইস্তাম্বুল শহরে কমপক্ষে পাঁচটি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। সিরিয়ায় আইএসবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ায় সংগঠনটির হামলার শিকার হতে হচ্ছে দেশটিকে।

সাদ্দাম থাকলেই ভালো হতো

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং হবু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুজনেই মনে করেন, ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলা চালানো উচিত হয়নি। দীর্ঘ ইরাক যুদ্ধের পরিণামেই মধ্যপ্রাচ্যের নানা বিশৃঙ্খলা এখনো মানুষকে ভোগাচ্ছে—এ উপলব্ধি থেকেই দুই নেতার এ ধারণা। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা জন নিক্সন তাঁর লেখা নতুন বইয়ে লিখেছেন, ইরাক শাসনের জন্য দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে বাঁচিয়ে রাখাই উচিত ছিল। ইরাকি স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেন ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর হাতে বন্দী হওয়ার পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন জন নিক্সন। তাঁর নতুন বই চলতি মাসেই প্রকাশিত হবে। বইটির অংশবিশেষ টাইম সাময়িকীর অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি সাদ্দামকে উৎখাতের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। জেরার সময় সাদ্দাম বলেছিলেন, ইরাক দখল করা সহজ হবে না। তবে ওয়াশিংটনের নব্য রক্ষণশীলেরা তখন সেটা সম্ভব বলেই ভেবেছিলেন।
নিক্সনের ভাষ্য: জিজ্ঞাসাবাদে সাদ্দাম বলেছিলেন, ‘তোমরা ব্যর্থ হতে চলেছ। বুঝতে পারবে, ইরাক শাসন করা এত সোজা না। কারণ, তোমরা ভাষাটা জানো না। ইতিহাস জানো না। আর তোমরা আরব মনন-মানসও বোঝো না।’ নিক্সন বইটিতে স্বীকার করেছেন, সাদ্দামের ওই কথা যুক্তিসংগত ছিল। আর ইরাকের মতো বহু জাতিগোষ্ঠীর রাষ্ট্র চালাতে তাঁর মতো কঠোর শক্তিশালী শাসকই দরকার। সুন্নি চরমপন্থা এবং শিয়া নেতৃত্বাধীন ইরাকি ক্ষমতাকাঠামো—দুটোই ছিল সাদ্দামের শত্রু। আর তাদের দমিয়ে রেখেই ইরাক শাসন করতেন তিনি। নিক্সন লিখেছেন, সাদ্দামের নেতৃত্বের ধরন এবং নির্মমতা ছিল তাঁর সরকারের অনেক ত্রুটির একটি। কিন্তু তিনি নিজের ক্ষমতার ভিত্তিতে কোনো ধরনের হুমকি এলে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। সে কারণেই গণবিক্ষোভ বা আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর সরকারের পতন ঘটানো সুদূর পরাহত ছিল। অনুরূপভাবে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো কোনো জঙ্গি সংগঠনের পক্ষে তাঁর শাসনামলে এতটা প্রভাব বিস্তার করার সম্ভাবনাও ছিল না। জন নিক্সনের ভাষায়, ‘সাদ্দামকে আমার মোটেও ভালো লাগেনি। তবে তাঁর প্রতি একপর্যায়ে আমার একধরনের তিক্ত সম্মানবোধও জন্ম নেয়। কারণ তিনি ইরাকি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছিলেন। সাদ্দাম আমাকে একবার বলেন, “আমার আগে ইরাকে কেবলই বাগ্বিতণ্ডা ও ঝগড়া চলত। আমি এসবের অবসান ঘটিয়ে সবাইকে একমত করাতে পেরেছি”।’

ঘটনাচক্রেই ধরা পড়ে অ্যান ফ্রাঙ্করা?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় আমস্টারডামে আশ্রয় নেওয়া ইহুদি বালিকা অ্যান ফ্রাঙ্ককে কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে নাৎসি বাহিনীর কাছে ধরিয়ে দেয়নি। সম্ভবত রেশন প্রতারণা নিয়ে পুলিশি তল্লাশির সময় ঘটনাচক্রেই ধরা পড়ে যান বিশ্বযুদ্ধের সময়কার দিনলিপির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া কিশোরী অ্যান ফ্রাঙ্কদের পরিবারসহ আট ইহুদি। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের অ্যান ফ্রাঙ্ক হাউস মিউজিয়াম একটি গবেষণা শেষে এমন একটি তত্ত্ব দিয়েছে। গবেষকেরা বলেছেন, প্রিনসেনগ্রাখটের গোপন আশ্রয় থেকে ধরে নিয়ে অ্যান ফ্রাঙ্কদেরকে অশউইৎজ ডেথ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁরা বলেছেন, বরাবরই যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খেয়েছে, সেটি হলো অ্যান ফ্রাঙ্ক ও অন্যদের পালিয়ে থাকা কুঠুরির খবর কে বিশ্বাসঘাতকতা করে নাৎসি বাহিনীর কাছে জানিয়ে দিয়েছিল?
এখন ওই গবেষকেরা বলেছেন, ১৯৪৪ সালের ১০ মার্চ থেকে পরের কয়েক দিন ধরে ডায়েরিতে অ্যান ফ্রাঙ্ক তাদের কাছে গোপনে রেশন কুপন সরবরাহ করতেন এমন দুই ব্যক্তির গ্রেপ্তারের কথা বেশ কয়েকবার লিখেছে। প্রিনসেনগ্রাখটের যে বাসায় অ্যান ফ্রাঙ্করা লুকিয়ে ছিল, সেখানে গ্রেপ্তার হওয়া ওই দুই ব্যক্তি বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ১৪ মার্চ অ্যান তার ডায়েরিতে লেখে, ‘বি (মার্টিন ব্রুভার) এবং ডি (পিটার ডাটজিলার) গ্রেপ্তার হয়েছে। তাই আমরা আর কুপনও পাচ্ছি না।’ ডেথ ক্যাম্পে বন্দী থাকা অবস্থায় অ্যান ফ্রাঙ্ক টাইফাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তার বয়স তখন মাত্র ১৫। যে আটজন ইহুদিকে ওই কুঠুরি থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে একমাত্র অ্যানের বাবা অটো ফ্রাঙ্ক জীবিত অবস্থায় ফিরতে পেরেছিলেন। অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরিতে হিটলারের কুখ্যাত নাৎসি বাহিনী অধিকৃত নেদারল্যান্ডসে ইহুদিদের ওপর নির্যাতনের মর্মস্পর্শী বর্ণনা রয়েছে।

রাজনৈতিক দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ায় প্রশ্ন

ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার কালোটাকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেও রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ সুবিধা দিল। পুরোনো ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট সাধারণ মানুষ আর ব্যাংকে জমা দিতে না পারলেও রাজনৈতিক দলগুলো তা পারবে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবং সে জন্য দলগুলোকে কোনো কর দিতে হবে না।
শুক্রবার রাতে সরকারের দেওয়া এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা প্রশ্ন তুলেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সরকার ও শাসক দলের দুরভিসন্ধি প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। আম আদমি নেতা ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলের তহবিল বৃদ্ধি কীভাবে হয় ও হয়ে আসছে তা খতিয়ে দেখতে একটা কমিটি গঠন করা হবে। এত প্রশ্ন ওঠার কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোতে ২০ হাজার রুপি পর্যন্ত কোনো রকম প্রমাণ ছাড়াই চাঁদা দেওয়া যায়। যাঁরা চাঁদা দেবেন তাঁদের কোনো পরিচয় বা প্রমাণপত্রও দাখিল করতে হয় না। রাজনৈতিক দলগুলোকে করও দিতে হয় না। তবে এ ক্ষেত্রে সরকার জানিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর জমা দেওয়া অর্থে অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়লে তাদের জবাবদিহি করতে ডাকা হতে পারে। অতএব দলগুলো যেন তাদের কাগজপত্র ও হিসাব ঠিক রাখে। নির্বাচন সংস্কারের জন্য নির্বাচন কমিশন একাধিকবার এ নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নোটবন্দীর সিদ্ধান্ত নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোকে এই সুযোগ পাইয়ে দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এমনিতেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার আগেই বিজেপি ও তাদের ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিরা বাতিল নোটের উপযুক্ত বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন।
এবার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এই ব্যবস্থা নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করল। যেসব সাধারণ মানুষের কাছে বাতিল নোট এখনো রয়ে গেছে, তাঁরা রাজনৈতিক দলে সেই টাকা জমা দিতে আরও ১৫ দিন সময় পেয়ে যাচ্ছেন। এরই পাশাপাশি একই সঙ্গে সরকার বাড়তি কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগও নতুন করে পাইয়ে দিল। কর না দেওয়া অর্থ যাদের রয়েছে তারা আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তা জমা দিতে পারবে। তবে সে জন্য প্রায় ৫০ শতাংশ কর দিতে হবে। বাকি ৫০ শতাংশের অর্ধেক চার বছর বিনা সুদে জমা থাকবে প্রধানমন্ত্রীর গরিব কল্যাণ প্রকল্পে। চলতি বছরেই এ ধরনের এক প্রকল্পে সরকারের ৬৫ হাজার কোটি রুপি কর বাবদ আয় হয়েছে। তবে সেই প্রকল্পের থেকে এবারেরটি আলাদা। এবার আগে করের টাকা জমা দিতে হবে, তারপর অনলাইনে ছাড়ের আবেদন জানাতে হবে। একের পর এক এ ধরনের প্রকল্পের মধ্য দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ অসাধু ব্যবসায়ীদের পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও সরকারকে সমালোচনা শুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি আয়কর বিভাগ ইতিমধ্যে প্রায় তিন হাজার জনকে নোটিশ পাঠিয়েছে যাদের ব্যাংকের খাতায় ৮ নভেম্বরের পর মাত্রাছাড়া টাকা জমা পড়েছে। নোটবন্দীর গত পাঁচ সপ্তাহে আয়কর বিভাগ ইতিমধ্যে প্রায় ৪০০ কোটি রুপি বাজেয়াপ্ত করেছে।

সরকারকে আর কীভাবে জানাতে হবে? by আলী ইমাম মজুমদার

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার মামলা ছাড়া
আর কোনোটির ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেই
সম্প্রতি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে একটি সেমিনার হয়। এ ধরনের সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম খুবই গতানুগতিক। খবর হওয়ার মতো কিছু থাকে না। তবে আলোচ্য সেমিনারে অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রীর একটি বক্তব্য এটাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি বড় বাধা।’ বক্তব্যটি খুবই মূল্যবান আর এর সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এ প্রসঙ্গে তাঁর পরবর্তী মন্তব্যটি আমাদের জন্য কিছুটা বিস্ময়ের। বিভিন্ন সংবাদপত্রের মতে, তিনি বলেছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যার সঙ্গে কেউ সংশ্লিষ্ট থাকা সম্পর্কে সরকারের নজরে আনা হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিস্ময়টা এ কারণে যে বিচারবহির্ভূত হত্যা সম্পর্কে এত যে অভিযোগ, এগুলো কি সরকারের নজরে নেই? এগুলোর মাঝে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার মামলা ছাড়া আর কোনোটি এমনভাবে তদন্ত করে দেখা হয়েছে?
নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটি সেখানে প্রবল আলোড়ন তুলে প্রশাসনকে প্রায় অকার্যকর করে দেয়। উচ্চ আদালতে বিষয়টি উপস্থাপিত হলে মামলা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে আমলে নিয়ে তদন্ত ও বিচারের আওতায় নিয়ে আসে। এমন কিছু না হলে তা হতো কি না, এ সম্পর্কে অনেকে সন্ধিহান। আর এ ধরনের সন্ধিহান থাকাকে অমূলকও বলা যাবে না। অক্ষত অবস্থায় আসামিকে ধরা হচ্ছে। তাকে বা তাদের নিয়ে সহযোগীদের গ্রেপ্তারের নামে রাতের আঁধারে কোথাও যাওয়া আর দুই পক্ষের মাঝে ‘ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে’ সে হতভাগ্য ব্যক্তিদের মৃত্যুকে আমরা কীভাবে আখ্যায়িত করব! ধৃত আসামিরা হয়তো মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধও করতে পারে। তবে সে দণ্ড দেওয়ার কর্তৃত্ব তো আদালতের। সেদিনই বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের একটি প্রতিবেদনের প্রতি আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি এ বক্তব্য দেন বলে জানা যায়। তাঁদের তথ্যানুসারে গত নভেম্বরে গড়ে প্রতিদিন একজন করে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এর সংখ্যা ১৮৪। সংখ্যাটি গত বছরে একই সময়কালে ছিল ১৭১। আর ২০১৪ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ১৫৪। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সে প্রতিবেদন অনুসারে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়কালে বন্দুকযুদ্ধ ছাড়াও বলপূর্বক অপহরণ,
ধর্মান্ধ ব্যক্তিদের দ্বারা নিহত এবং জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত ব্যক্তির সংখ্যাও দেওয়া হয়েছে। এর সংখ্যা যথাক্রমে ৮ হাজার ৯৪২ এবং ৩৩। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে হতাহত হতেই পারে। এ ছাড়া হামলায় নিহত জঙ্গি ঘাতকদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার দায়িত্বও আইন প্রয়োগকারী সংস্থারই। এ ক্ষেত্রে তারা ঈপ্সিত মাত্রায় সাফল্য দেখাতে পারছে না, এমন অভিযোগ রয়েছে। আর বলপূর্বক অপহরণ! কখনো কখনো অপহৃত ব্যক্তিকে বেশ কিছুদিন পর বিধ্বস্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। বেশ কয়েক দিন পর কাউকে দেখানো হয় গ্রেপ্তার। আর কেউ-বা থেকে যায় অপহৃতই। ধারণা করা হয়, এদের মেরে ফেলা হয়েছে। আরও বেদনাদায়ক যে সরকারি কোনো সংস্থাই এর দায় স্বীকার করে না। যদিও-বা অপহরণের সময় কোনো না কোনো সংস্থার পরিচয় ব্যবহৃত হয়। হতে পারে কোনো সরকারি সংস্থার নাম ব্যবহার করে কোনো ক্ষেত্রে অন্য কেউ অপহরণ করে। কাউকে বিপদে ফেলতে বা নিজের কোনো অপকীর্তিকে আড়াল করতে স্বেচ্ছায়ও কেউ ‘গুম’ হয়ে যায়। আর এগুলোর সবই তো আইন প্রয়োগকারী সংস্থারই তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য বের করার কথা। আর তারাই বেশ কিছু গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, এটা মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও সুশীল সমাজ ব্যাপকভাবে ধারণা করে।
এ ধরনের অভিযোগই অপহৃত ব্যক্তির স্বজনেরা করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর খবর এখন ডাল-ভাত হয়ে গেছে। চাঞ্চল্যকর কিছু না হলে খবরের কাগজের এ-সংক্রান্ত সংবাদের শিরোনামের নিচের অংশ অনেকে পড়েন না। যেমন পড়েন না সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যার নিত্যকার ঘটনাগুলো। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় বিচারবহির্ভূত হত্যা কত দ্রুত আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাব্যবস্থার অঙ্গ হয়ে গেছে। সরকার চাইলে এসব ঘটনার অন্তত কয়েকটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের ব্যবস্থা নিতে পারে। সীমিত কিছু রহস্য উদ্ঘাটিত হলেও আইনমন্ত্রী প্রতিশ্রুত, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। আর এ রকম হলে সর্বত্র সংযমী হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আর প্রকৃত অর্থে বন্দুকযুদ্ধ করে আসামি বা তাদের সহযোগী কারও মৃত্যু হলে কিছু বলারও থাকবে না। তবে বিচারবহির্ভূত হত্যা সম্ভবত ছিল সব সময়ই। অবশ্য সেগুলো ছিল নিতান্তই সীমিত। রাখঢাকও ছিল ওগুলোতে। এ প্রক্রিয়াটি অনেকটা খোলামেলা রূপ পায় অপারেশন ক্লিন হার্ট চলাকালে। এ জন্য তাদের দায়মুক্তিও দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গঠিত হয় র্যাব। এটা পুলিশ বাহিনীর একটি ইউনিট হলেও সামরিক বাহিনী, পুলিশসহ আরও কিছু সংস্থার প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এতে। তারা ভালো কাজ করেছে এবং করছে অনেক।
 তবে ক্রসফায়ার নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা তখনই ব্যাপকতা পায়। ইদানীং এ ধরনের ঘটনা র্যাবের চেয়ে পুলিশের হাতেই ঘটছে বেশি। এটা ভুলে গেলে চলবে না, আইন প্রয়োগ করতে হবে আইনানুগভাবে। বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনায় অনেককে গ্রেপ্তারই দেখানো হয়নি। অথচ বেশ কিছু ক্ষেত্রে স্বজনেরা বলছেন তাঁদের তুলে নিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। সুষ্ঠু তদন্ত হলে এটাও বের করা সম্ভব। আর যাঁরা গ্রেপ্তারকৃত, তাঁদের পূর্ণ নিরাপত্তার দায়িত্ব তো গ্রেপ্তারকারী সংস্থার। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্যও তো ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এগুলো সম্পর্কে সরকার কার্যত নির্বিকার বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। এ নির্লিপ্ততায় এসব বাহিনীর মাঝে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা কী বিপর্যয় ঘটাতে পারে তার নজির আমরা বিভিন্ন স্থানে দেখেছি। এটা লক্ষণীয় যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ততটা দৃঢ় নয়। এর কারণ হিসেবে রয়েছে দলীয়করণসহ আরও কিছু বিষয়। এতে ক্ষেত্রবিশেষে এসব সংস্থার কতিপয় সদস্য বেপরোয়া আচরণ করেন। এর ফলেই বিচারবহির্ভূত হত্যা। তা ছাড়া,
সংস্থাগুলোর মাঝে অভাব রয়েছে সমন্বয়ের। র্যাব পুলিশের অঙ্গ হলেও শীর্ষ পর্যায়ে ছাড়া এর নিচে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নেই। র্যাব গঠন ও পরিচালনা অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো কোনো স্বল্পকালীন ব্যবস্থা নয়। ইতিমধ্যে সংস্থাটি এক যুগ পার করেছে। এর কার্যকারিতাও রয়েছে আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থায়। সে ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য যে বা যারা আইনানুগভাবে মূল দায়িত্বে, তাদের সঙ্গে র্যাবের কার্যক্রম সমন্বয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। আইনমন্ত্রী একজন সফল আইনজীবী। তিনি সজ্জন ব্যক্তি বলেই সবাই বিবেচনা করেন। দায়িত্ব পালনেও যত্নশীল। বিচারবহির্ভূত হত্যা যে আইনের শাসনের জন্য বড় বাধা, তাঁর এ বক্তব্য সময়োচিতও বটে। তবে এ উপলব্ধিটা আনতে হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মাঝে। মানবাধিকার বিষয়ে তাদের কিছু প্রশিক্ষণ কিংবা এ ধরনের কার্যক্রম সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। আনীত অভিযোগগুলো থেকে গুটিকয় বেছে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের ব্যবস্থা করতে পারে সরকার। তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে প্রতিশ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিন। আর চালু রাখুন এ প্রক্রিয়াটি। এতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর ‘ট্রিগার হ্যাপি’ সদস্যরা লাল সংকেত পাবে। আর এ বিষয়ে সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর আবশ্যকতাই-বা কোথায়? সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য প্রাথমিক পর্যালোচনা করে এর ভিত্তিতেই তো ব্যবস্থা নেওয়া যায়। উচ্চ আদালতও তো স্বীয় বিবেচনায় কোনো কোনো ঘটনা আমলে নেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এ প্রতিবেদনটি সরকারের নজর দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নতুন করে সরকারের নজরে আনার প্রয়োজনই-বা কোথায়?
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com