Tuesday, January 26, 2016

প্রধান বিচারপতির সমালোচনায় সুরঞ্জিত

অবসরের পর রায় লেখা অসাংবিধানিক-প্রধান বিচারপতির এস কে সিনহার এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেছেন, সংবিধানে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগকে সুন্দরভাবে বিন্যস্ত করা আছে। এই তিনটি অঙ্গ একটি অপরটির পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রধান বিচারপতি বলে বসলেন, জুডিশিয়ারির ক্ষমতাকে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। এটা বলা যায় না। এ বক্তব্যে শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আবার উনি বলে বসলেন, অবসরের পর রায় লেখা হলে তা হবে অসাংবিধানিক। এটা অসাংবিধানিক হলে রাষ্ট্রের সকল ভিত্তিই তো অসাংবিধানিক হয়ে যায়, প্রধান বিচারপতি নিজেও অসাংবিধানক হয়ে যান।
আজ সংসদে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এ ধরণের কোন বক্তব্য জুডিশিয়ারির হেড থেকে আসা মানেই হচ্ছে দেশটা অস্থিতিশীল হোক। সাবেক বিরোধী দল সঙ্গে সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে লুফে নিয়ে বলে বসল, সরকারের নাকি ভূকম্পন হয়ে গেছে। কোথায় ভূমি আর কোথায় কম্পন আমি তো খুঁজে পাই না। তিনি বলেন, এই সংবিধান অনুযায়ী আমরা চলছি। প্রধান বিচারপতি একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি বলা শুরু করল- এই সরকার অবৈধ! এটা নিয়ে হঠাৎ করে কথা এসেছে যখন বাংলাদেশের রাজনীতি স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, আমরা মনে করি, সুপ্রিম কোর্টের মত প্রতিষ্ঠানকে নির্বাহী ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে। সেইখান থেকে যদি এ ধরণের একটি মন্তব্য চলে আছে যে এটা অসাংবিধানিক, এটি অবৈধ, তা সত্যিই দুঃখজনক। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, কারও কথায় সংবিধান অসাংবিধানিকও হয় না, সাংবিধানিকও হয় না। সুতরায় যে রেওয়াজ চলে আসছে, সেই রেওয়াজ চলবে। আর যদি প্রধান বিচারপতি মনে করেন এই রেওয়াজটি খারাপ, এই রেওয়াজটি বন্ধ করে অন্য কিছু করতে চান- তাহলে তাকে রিট্টো রেসপেকটিভ কিছু করা যাবে না অর্থাৎ পশ্চাতে ফিরে যাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, যেটা হয়ে গেছে সেটা নিয়ে কারও কোন প্রশ্ন তোলার অধিকার নেই। তাহলেই মানুষ মনে করবে আপনার (প্রধান বিচারপতি) কোন এজেন্ডা আছে। আমরা ঘর পোড়া গরু। নিশ্চয়ই কোন অসাংবিধানিক শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে সাংবিধানিক শক্তি এই কথা বলছে। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি এটাও করতে পারেন অবসর গ্রহণের তিন মাস আগে বিচারকরা কোন জাজমেন্ট ঘোষণা করবেন না। এটা তিনি করতে পারেন। কিন্তু পিছনে গিয়ে যেটা হয়ে গেছে সেটা নিয়ে কথা বলে অকারণে এই দেশে রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টির কোন কারণ নেই। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টকে জাতি সম্মানের সঙ্গে দেখে। এখানে দু-একজন বিচারকের ব্যক্তিগত কাঁদা-ছোঁড়াছুড়ি নিয়ে এই পবিত্র স্থানকে বিতর্কিত করা যাবে না। কারণ এটা সব বিচারের আশ্রয়স্থল। তাই এই বিষয়টি এখানেই নিষ্পত্তি হওয়া দরকার।

প্রধান বিচারপতির বক্তব্য লুফে নিয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা -আইনমন্ত্রী আনিসুল হক

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, অবসরের পর বিচারপতিদের রায় লেখা অসাংবিধানিক বা বেআইনি নয়। অবসরের পর রায় লেখা অসাংবিধানিক বলে প্রধান বিচারপতি যে মন্তব্য করেছেন তা দুঃখজনক। এই বক্তব্য দিয়ে তিনি বিতর্ক তৈরি করেছেন। ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁর বক্তব্য লুফে নিয়েছে।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আইন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুও একই কথা বলেছেন।
অবসরে যাওয়ার পর কোনো বিচারককে রায় লিখতে দেবেন না, বলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, ‘অবসরে যাওয়ার পর আমি কোনো পাবলিক ডকুমেন্টে হাত দিতে দেব না। অবসরে যাওয়ার পর বিচারকের রায় লেখার জন্য কেন ব্যক্তিগত ইন্টারেস্ট থাকবে? এটা কোর্ট দেখবে। এখানে একটা ভুল নীতি চলে আসছে। আমি এই ভুল করতে দেব না। আমাদের সংশোধন হতে হবে।’
সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিধি উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতি বলেছেন অবসরের পর রায় লেখা অসাংবিধানিক ও বেআইনি। কিন্তু সংবিধানের কোথাও নেই যে অবসরের পর রায় লেখা যাবে না। সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টেও বিধিতে বলা আছে, রায় আদেশের অংশ উন্মুক্ত আদালতে দিতে হবে। যত দূর সম্ভব এজলাসে বসে দিতে হয়। কিন্তু কোনো বিচারপতি যদি মামলার চাপে সময় মতো না দিতে পারেন সে ক্ষেত্রে তিনি অবসরের পরও দিতে পারেন। এটি বিশ্বব্যাপী রেওয়াজ। সুতরাং অবসরের পর রায় দেওয়া বেআইনি নয়।
আনিসুল হক বলেন, রায় দ্রুত লেখা প্রয়োজন। কারণ বিলম্বে রায়ের কারণে মামলার বাদী-বিবাদীরা ভোগান্তির শিকার হন। এ ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি নির্দেশনা দিতে পারেন যে ভবিষ্যতে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে মামলার রায় দিতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলো তাঁর বক্তব্য ষড়যন্ত্রকারীরা লুফে নিয়েছে। যারা পেট্রলবোমা মেরে মানুষ মেরেছে, তারা বলতে শুরু করেছে অতীতের সব রায় অবৈধ। যদিও প্রধান বিচারপতি বলেছে, তাঁর বক্তব্য অতীতের রায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। প্রধান বিচারপতি সম্ভবত রায় লেখার কাজে বিলম্বেও কারণে দুশ্চিন্তায় আছেন।
আবদুল মতিন খসরু বলেন, অবসরের পর মামলার রায় লেখার সুযোগ থাকাটা রেওয়াজ। তাঁর বক্তব্য বিতর্কেও সৃষ্টি করেছে। এভাবে কথা বলা তাঁর ঠিক হয়নি। একই কথা তিনি বারবার বলে যাচ্ছেন। তিনি যা ইচ্ছা তা বলতে পারেন না। তবে তাঁর বক্তব্য ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা হতে পারে। কারণ রায় লেখার ক্ষেত্রে একজন বিচারপতি দু–তিন মাস সময় নিতে পারেন। দেড় বছর, দুবছর, ১৩ বছর লাগাতে পারেন না।

বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচনে অযোগ্য খোমেনির নাতি

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচনের জন্য নিবন্ধন করতে
দেখা যায় হাসান খোমেনিকে (ডানে)। ছবি: এএফএপি
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি ‘যোগ্যতার অভাবে’ আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদের’ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন না। পর্যাপ্ত ধর্মীয় দক্ষতা না থাকার কথা উল্লেখ করে তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে দেশটির সাংবিধানিক নজরদারি কর্তৃপক্ষ ‘অভিভাবক পর্ষদ’ (গার্ডিয়ান কাউন্সিল)। খবর এএফপির।
‘বিশেষজ্ঞ পরিষদের’ কাজ হলো ইরানের বর্তমান ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা এবং তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচন করা। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন হাসান খোমেনি (৪৩)। তিনি নির্বাচিত হলে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর এই প্রথম তাঁর পরিবারের কেউ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শীর্ষ পর্যায়ে স্থান পেতেন। মঙ্গলবার হাসানের ছেলে আহমেদ তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘বিভিন্ন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সমর্থন থাকার পরও’ তাঁর বাবাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ৮৮ সদস্যের ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’ ও ২৯০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণ জনগণের ভোটে তাঁরা নির্বাচিত হবেন।
পরিষদের প্রার্থী হতে হলে প্রথমে তাঁদের গার্ডিয়ান কাউন্সিলের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে পাস হয়ে আসতে হয়। এরই মধ্যে ৮০০ জন প্রার্থী গার্ডিয়ান কাউন্সিলে আবেদন করেছেন।
সেন্ট্রাল ইলেকশনস সুপারভাইজিং কমিটির মুখপাত্র সিয়ামাক রাহ-পেক রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, বাদ পরা ব্যক্তিরা আগামী শনিবার পর্যন্ত আপিল করতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ পরিষদ নির্বাচনের জন্য ১৬৬জন প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন। ১১১জন অনুমোদন পাননি, ২০৭ জনকে অযোগ্য ও ৫৮জন নিজেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন।
সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির সঙ্গে হাসান খোমেনি সুসম্পর্ক থাকায় তাঁর প্রার্থিতা বিতর্কের মুখে পড়তে পারে বলে আগেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল। কেননা গার্ডিয়ান কাউন্সিল রক্ষণশীলদের দ্বারা প্রভাবিত।
চলতি মাসের ৫ তারিখ গার্ডিয়ান কাউন্সিলের এক সদস্য বলেছিলেন, হাসান খোমেনি বাদ পড়তে পারেন। কেননা তিনি গার্ডিয়ান কা​​উন্সিলের পরীক্ষায় অংশ নেননি।
তবে হাসান খোমেনির একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তাঁর কাছে পরীক্ষা দেওয়ার কোনো চিঠি বা খুদে বার্তা আসেনি। পরীক্ষার সময় তিনি ধর্মশাস্ত্র বিষয়ে এক জায়গায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন।

এক বিছানায় স্ত্রী ও বাংলাদেশী প্রেমিক

বাংলাদেশী এক প্রেমিককে সঙ্গে নিয়ে বিছানায় স্ত্রী। এ দৃশ্য দেখে ভারতীয় এক নাগরিকের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। তিনি কিছু স্থির করতে না পেরে দাঁড়িয়ে রইলেন ঘরের দরজায়। বিছানা ছেড়ে যাতে দু’জনের কেউই উঠতে না পারে সে ব্যবস্থা করে তিনি ফোন দিলেন পুলিশকে। পুলিশ না আসা পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান নিলেন। এরপর যখন পুলিশ এলো তিনি তাদেরকে ধরিয়ে দিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে এসেছেন ভারতে। এ ঘটনা ঘটেছে কুয়েতে। সেখানে কাজ করতে গিয়েছিলেন ওই ভারতীয়। সস্ত্রীক তিনি থাকতেন সেখানে। কিন্তু সেখানে এক বাংলাদেশীর সঙ্গে তার স্ত্রীর প্রেম জমে ওঠে। শুধু প্রেমই নয়, তা গড়ায় শারীরিক সম্পর্কে। এমনই এক ঘটনায় ধরা পড়ে যায় ওই প্রেমিক, প্রেমিকা। এ অবস্থায় কুয়েত ছেড়ে ভারতে ফিরে আসেন ওই ব্যক্তি। তবে তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে যে স্ত্রী, তার কাছে শেষ বারের মতো বলেও আসেন নি। আরবী ভাষার দৈনিক পত্রিকা আল আনবা বলেছে, স্ত্রী ও তার প্রেমিককে এক বিছানায় দেখতে পেয়ে ওই ভারতীয় চিৎকার করে প্রতিবেশীদের জড়ো করেন। খবর যায় পুলিশে। পুলিশ গিয়ে ওই প্রেমিক প্রেমিককে কাপড় পরার সুযোগ করে দেয়। তারপর তাদেরকে গ্রেপ্তার করে।

৩৬ যুদ্ধবিমান কিনছে ভারত- ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তি

সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে আলোচিত ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি গতকাল সোমবার সই হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের ভারত সফরের দ্বিতীয় দিনে ৬০ হাজার কোটি রুপির এ চুক্তি হলো। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভির।
আজ মঙ্গলবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। এ উপলক্ষে তিন দিনের সফরে গত রোববার তিনি ভারতের চণ্ডীগড়ে অবতরণ করেন। তবে ভারতের মাটিতে পা রেখেই ওলাঁদ বলেছিলেন, রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তির আগে আরও আলোচনা প্রয়োজন। এতে করে গুঞ্জন শুরু হয়, চুক্তি শিগগিরই হচ্ছে না।
বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে ভারত ফ্রান্সের কাছ থেকে ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান কিনতে চায়। ২০১২ সালে এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তিও হয়। কিন্তু পরে তা আর বিশেষ এগোয়নি। গত বছরের এপ্রিলে মোদির ফ্রান্স সফরে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরপর ওলাঁদের এই সফর ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, এ দফাতেই ভারতের প্রত্যাশিত যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি হয়ে যাবে।
চণ্ডীগড় থেকে গতকাল দিল্লিতে পৌঁছান ফরাসি প্রেসিডেন্ট। এরপর দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে তাঁকে স্বাগত জানান মোদি। সেখানে দুই নেতার বৈঠকের পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, দুই দেশ রাফাল যুদ্ধবিমান-সংক্রান্ত আন্তরাষ্ট্রীয় চুক্তিতে পৌঁছেছে, যার আর্থিক মূল্য ৬০ হাজার কোটি রুপি। ওলাঁদ বলেন, কিছু আর্থিক বিষয় এখনো রয়ে গেছে। সেগুলো দুই দিনের মধ্যেই ঠিক করা হবে। কিন্তু এরই মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এর বাইরে দুই দেশ আরও ১৩টি চুক্তি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রেলওয়ে ইঞ্জিন, মহাকাশ প্রযুক্তি, স্মার্ট শহর এবং সৌর ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুক্তি।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা: এমন এক সময়ে এই সফর, যখন জঙ্গিবাদ ফ্রান্স ও ভারত উভয়কেই সজোরে নাড়া দিয়েছে। প্যারিসের গত ১৩ নভেম্বরের সন্ত্রাসী হামলায় ১৩০ জনের প্রাণহানি ঘটে। আর ওলাঁদ যেদিন ভারতে পা রাখলেন, ঠিক সেদিনই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ভয়াবহ সেই হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এদিকে পাঞ্জাবের পাঠানকোটে বিমানঘাঁটিতে গত ২ জানুয়ারির সন্ত্রাসী হামলার ক্ষত এখনো শুকাতে পারেনি ভারত। এরই মধ্যে আবার ভারত প্রজাতন্ত্র দিবসে আইএস জঙ্গিদের হামলার কথিত পরিকল্পনা নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দুই নেতাই গতকাল কড়া বার্তা দিলেন।
হায়দরাবাদ হাউসে বৈঠকের পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্যারিস থেকে পাঠানকোট—সবগুলোই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। সন্ত্রাসবাদ মানবতার বিরুদ্ধে। এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
এদিকে এএফপির খবরে বলা হয়, আইএসের ভিডিও প্রকাশের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এর আগে ফরাসি প্রেসিডেন্টও একই ধরনের বার্তা দেন। গত রোববার ছাড়া ওই ভিডিওতে নভেম্বরের প্যারিস হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন নয় আইএস জঙ্গিকে দেখানো হয়। এতে ফ্রান্সসহ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আইএসবিরোধী জোটভুক্ত দেশগুলোকে হুমকিও দেওয়া হয়।
ওলাঁদ সাংবাদিকদের বলেন, এই ভিডিও ফ্রান্সকে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘কোনো কিছুই আমাদের রোধ করতে পারবে না। কোনো হুমকিই ফ্রান্সের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে টলাতে পারবে না।’

৬৮ ভাগ মানুষ চায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার

দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হওয়া বাঞ্ছনীয়। তারা ব্যবস্থার পক্ষে মত দিয়েছেন। আর এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ২৩ শতাংশ। মার্কেটিং গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়েলসেন-বাংলাদেশ এর এক জরীপে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি গত বছরের ৩০ অক্টোবর থেকে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত এই জরিপটি পরিচালনা করে। তত্ত্বাবধান করে গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারস ও ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)। গতকাল সোমবার জরিপের ফলাফল সম্পর্কে জানা যায়। কয়েকটি অনলাইন মিডিয়ায় জরিপটি প্রকাশ করা হয়। সংস্থাটির দাবী এই জরিপে বহুস্তরে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। দেশের ৭টি বিভাগে, জেলা অনুযায়ী এবং গ্রাম ও শহরে ব্যক্তি পর্যায়ে ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। জরিপে অংশ নেন ২৫৫০ জন। তারা সবাই ভোটার এবং বয়স ১৮ বছরের ওপরে। সব বিভাগের ৬৪ জেলায় ২৫৫টি প্রাথমিক নমুনা ইউনিট (পিএসইউ) থেকে তথ্য/নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। গ্রামে এ ইউনিটকে মৌজা ও শহরে মহল্লা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রোব্যাবিলিটি প্রপোরশনাল টু সাইজ (পিপিএস) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম বাড়ি নির্বাচনের জন্য ডেট মেথড ও যথাযথ গৃহস্থালি বাছাইয়ের জন্য পদ্ধতিগত দৈব নমুনায়ন ব্যবহৃত হয়েছে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী দলে নারী ও পুরুষ ছিলেন। ভুলের (মার্জিন অব এরোর) ঝুঁকি দুইয়ের বেশি বা কম হবে না বলে জানানো হয়েছে। জরিপে একটি প্রশ্ন ছিল, আগামী সংসদ নির্বাচনে আগে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনা কি উচিত? জবাবে ৬৮ শতাংশ মানুষ জবাব দেন ‘হ্যাঁ’ এবং ২৩ শতাংশ উত্তর দেন ‘না’। আর ৯ শতাংশ মানুষ কোনো উত্তর দেননি বা এ বিষয়ে তারা জানেন না বলে জানিয়েছেন। এ হিসাব ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসের। অবশ্য ২০১৫ সালের জুনে একই প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ জবাব ছিল ৬৭ শতাংশ। ‘না’ জবাব ছিল ২২ শতাংশ। কোনো উত্তর দেননি বা এ বিষয়ে তারা জানেন না বলে জানান ১১ শতাংশ। জরিপে একটি প্রশ্ন ছিল, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ সঠিক পথে যাচ্ছে নাকি ভুল পথে? এর উত্তরে ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে ৬৪ শতাংশ মানুষ মনে বাংলাদেশ সঠিক পথে যাচ্ছে এবং ৩২ শতাংশ মনে করেন দেশ ভুল পথে আছে। এতে বলা হয়, ২০১৩ সালে একই সময় ৬২ শতাংশ মানুষ মনে করত দেশ ভুল যাচ্ছে। কেন সঠিক বাংলাদেশ? এতে সাড়া দেন এক হাজার ৬৭৯ জন। উত্তরে ৭২ শতাংশ মনে করেন শিক্ষায় উন্নতি একটা বড় কারণ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কথা বলেছেন ১৮ শতাংশ। এ ছাড়া মাত্র ৬ শতাংশ ভালো অর্থনীতির কথা বলেছেন। দেশ ভুল পথে যাচ্ছে কেন? এর উত্তর দেন ৮০৪ জন। এদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ মানুষ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ৩০ শতাংশ মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে দায়ী করেন। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে ২৯ শতাংশ বলেন খুব ভালো, ৫১ শতাংশের মন্তব্য কিছুটা ভালো এবং ৯ শতাংশ বলেন খুব খারাপ ও ১১ শতাংশ জানান কিছুটা খারাপ। একই সময়ের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্নে ২১ শতাংশ জানান খুব স্থিতিশীল ও ৪৯ শতাংশ জানান কিছুটা স্থিতিশীল। ১৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন খুব অস্থিতিশীল ও ৯ শতাংশ মানুষের বিবেচনায় কিছুটা অস্থিতিশীল। রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপের কারণ জানতে চাইলে ৩৫ শতাংশ মানুষ বলেন মারামারি, ২১ শতাংশ সহিংসতা বৃদ্ধি, ২০ শতাংশ একতরফা নির্বাচন, ২০ শতাংশ হরতাল, ৯ শতাংশ গণতন্ত্রের অভাব, ৯ শতাংশ বিরোধী দল দমনকে দায়ী করেন। আসন্ন বছরে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়- পরিস্থিতি উন্নত হবে, খারাপ হবে নাকি একই রকম থাকবে? ২০১৫ সালের নভেম্বরে ৫০ শতাংশ মানুষ জবাবে বলেন পরিস্থিতি উন্নত হবে এবং ১৩ শতাংশের বিবেচনায় একই থাকবে। মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষের মতে পরিস্থিতি খারাপ হবে এবং ২০ শতাংশের কোনো উত্তর নেই বা জানা নেই। বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন? এর উত্তরে ৩০ শতাংশ মানুষের মতে খুব ভালো এবং ৪৯ শতাংশ বলেন কিছুটা ভালো। এ ছাড়া ৭ শতাংশ বলেন খুব খারাপ এবং ১২ শতাংশ বলেন কিছুটা খারাপ। ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়- গত বছরের তুলনায় আপনার বা আপনার পরিবারের ব্যক্তিগত আর্থিক উন্নতি হয়েছে, খারাপ হয়েছে নাকি একই রকম আছে? এর উত্তরে ৬৫ শতাংশ মানুষ বলেন উন্নতি হয়েছে, ১৮ শতাংশ বলেন খারাপ হয়েছে এবং জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৭ শতাংশের মতে খারাপ হয়েছে। আগামী বছরে আপনার বা আপনার পরিবারের ব্যক্তিগত আর্থিক উন্নতি হবে, খারাপ হবে নাকি একই রকম থাকবে? জবাবে ৭২ শতাংশ বলেন উন্নত হবে, ১০ শতাংশ মনে করেন একই রকম থাকবে এবং ৫ শতাংশ আশঙ্কা করেন খারাপ হবে। এ ছাড়া ১২ শতাংশ কোনো উত্তর দেননি। নিত্যপণ্য (চাল, ডাল, দুধ, ডিম, মাছ) কেনার জন্য আপনি ও আপনার পরিবারের কি পর্যাপ্ত আয় হয়? এর জবাবে ৯০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ সুচক এবং ১০ শতাংশ ‘না’ সুচক জবাব দেন। আপনি কি মনে করেন এখন (২০১৫ নভেম্বর) থেকে আগামী ৬ মাসে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে নাকি কমবে? ১২ শতাংশ মনে করেন খুব বাড়বে, ৪৯ শতাংশের মতে কিছুটা বাড়বে, ১২ শতাংশের বিবেচনায় একই রকম থাকবে। কয়েকটি বিষয়ে আপনি জাতীয় সরকারের কর্মদক্ষতাকে মূল্যায়ন করবেন? শিক্ষা ঃ ৮৪ শতাংশ বলেন ভালো, ১৩ শতাংশ বলেন খারাপ। স্বাস্থ্যসেবা ঃ ৭৮ শতাংশের মতে ভালো, ১৭ শতাংশের মতে খারাপ। অবকাঠামো উন্নয়ন ঃ ৭৩ শতাংশ বলেন ভালো, ২৫ শতাংশ বলেন খারাপ। লৈঙ্গিক সমতা ঃ ৭২ শতাংশ ভালোর পক্ষে, ১৭ শতাংশ খারাপ। এ ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে ৪৭ শতাংশ মনে করছেন সরকার ভালো করছে, আর ৪৯ শতাংশ মনে করছে খারাপ করছে। এই বক্তব্যগুলোর প্রতিটি কোন রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে কেমন প্রযোজ্য? এর উত্তরে ৪৮ শতাংশ মনে করেন আওয়ামী লীগের ওপর আস্থা রাখা যায়, আর ২৪ শতাংশের আস্থা বিএনপির ওপর। ৫৯ শতাংশ মানুষ মনে আওয়ামী লীগে শক্তিশালী নেতৃত্ব রয়েছে। ১৯ শতাংশের মতে বিএনপিতে এ নেতৃত্ব রয়েছে।

রাতের যে অভ্যাসে আসতে পারে জীবনে উন্নতি

জীবনে উন্নতি করতে ভালো কিছু অভ্যাস থাকা দরকার। কিন্তু তাই বলে ঘুমানোর অভ্যাস? হ্যাঁ, ঠিক তাই। গভীর ঘুমের অভ্যাস আপনাকে করে তুলছে ধনী। কমাচ্ছে আপনার শরীরে জমে থাকা চর্বি। বাড়াচ্ছে আপনার বুদ্ধি। আর আপনাকে করে তুলছে সুখী। ক্যারিয়ারে আনছে উন্নতি।
মাত্র একটি অভ্যাস কীভাবে এত উপকার করতে পারে? আসুন জানার চেষ্টা করি।
অর্থ ও ঘুমের মাঝে সম্পর্ক
দরিদ্র মানুষদের ঘুমের অবস্থাও খারাপ। গবেষণায় দেখা গেছে, দরিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী ৫০ শতাংশ মানুষের আছে অনিদ্রা। আর এ অনিদ্রা কমতে থাকে আয় বাড়ার সাথে সাথেই।
বুদ্ধি বাড়াতে ঘুম
হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল বলছে, প্রয়োজনের চেয়ে ঘুম কম হলে আমাদের মনোযোগ কমে যায়। তথ্য গ্রহন ও প্রক্রিয়াকরণে সমস্যা হয়। আমাদের নিউরনগুলো ক্লান্ত হয়ে যায়। ফলে আমরা অনেক কিছু মনে করতে পারি না। তাই মস্তিষ্ককে কর্মক্ষম রাখতে চাই ভালো ঘুম।
কম ঘুমানোর ফলে মোটা হচ্ছেন আপনি
আপনার যে ধরনের খাদ্যভ্যাসই থাকুক না কেন, দরকার মতো ঘুম না হলে তা কার্যকরী হবে না। ঘুম কম হবার কারণে ক্ষুধা বেড়ে যায়। ঘন ঘন ক্ষুধা লাগার ফলে খাবার খেয়ে ক্যালোরি গ্রহণের পরিমান বাড়তে থাকে।
ঘুমের অভাবে বিষণ্নতা
আপনার জীবনে কখনো বিষণ্ণতা না থাকলেও অনিদ্রা থেকে জন্ম নিতে পারে এটি। আপনার মেজাজ যদি অকারণেই খারাপ হয়, তার পেছনে বড় কারণ হতে পারে কম ঘুম। আর বিষণ্ণতা কারণে হারাতে পারেন কার্যক্ষমতা। এতে পড়তে পারে আপনার ক্যারিয়ারের নেতিবাচক প্রভাব।
গভীর ঘুমের অভ্যাস করবেন যেভাবে
১. স্মার্টফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ ঘুমের ক্ষতি করে। ঘুমাতে যাবার অন্তত এক ঘণ্টা আগে থেকে এসবের ব্যবহার বন্ধ রাখুন। আর বিছানায় ইমেইল বা ফেসবুক চেক করাও বন্ধ করে দিন।
২. রুমটাকে একেবারে অন্ধকার করে নিন। অল্প একটু আলোও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
৩. সন্ধ্যার পর থেকে অ্যালকোহল, ক্যাফেইন এবং নিকোটিন গ্রহন একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ এসব গ্রহন করলে ঘুমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
৪. ঘুমানোর আগে পান করতে পারেন গ্রিন টি, যা ঘুমের জন্য সহায়ক।
৫. ঘুমানোর আগে খেতে পারেন এক গ্লাস গরম দুধ।

অভিনেত্রী আখ্যা পাওয়ায় ক্রুদ্ধ রাজনীতিক রূপা

বিজেপি’তে তাঁর যোগদানের পর ৩৮৩ দিন পার হয়েছে। তিনি দলের নিয়মিত কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত। দলে পদও পেয়েছেন। কিন্তু দলের সকলের কাছে ‘অভিনেত্রী’ তকমা ঘোচাতে পারেননি রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। বরং এখনও ‘অভিনেত্রী’ হিসাবেই তাঁকে দেখছেন রাজ্য বিজেপি’র একাংশ। যার প্রমাণ মিলল সোমবার হাওড়ার ডুমুরজলা ময়দানে।
এদিন ডুমুরজলা ময়দানে সভার আয়োজন করেছিলেন বিজেপি’র হাওড়া জেলা নেতৃত্ব। সেই সভাতে বক্তৃতা করেন রূপা। সঞ্চালক রূপাকে বিজেপি’র রাজ্য মহিলা মোর্চার সভাপতির (সঞ্চালক বলেছিলেন সভানেত্রী) পাশাপাশি ‘অভিনেত্রী’ বলেও পরিচয় করান। এরপরই মঞ্চে উঠে ‘অভিনেত্রী’ পরিচয় নিয়ে ব্যাখ্যা দেন রূপা। বলেন, ‘‘অভিনয় ছেড়ে দিয়েছি। একবছর এবং আরও কয়েকটা দিন হয়ে গিয়েছে আমি বিজেপি’তে এসেছি। আমি বিজেপি কর্মী হিসাবেই কাজ করছি। এই একবছর ধরে বিভিন্নভাবে আমি আমার অভিনেত্রী পরিচয় ঝেড়ে ফেলার জন্য যে প্রচেষ্টা করেছি, আশা করি তা ঝেড়ে ফেলতে পেরেছি। আমি সারা জীবন বিজেপি’ই করব।’’
বিজেপি’র অন্দরের খবর, রূপা চেষ্টা করছেন বটে। কিন্তু ‘অভিনেত্রী’ তকমা ঘুচিয়ে ফেলতে হলে এখনও অনেকটা পথ পেরোতে হবে। যদিও আরেক অংশের বক্তব্য, রূপা যেভাবে গুরুত্ব সহকারে দলীয় দায়িত্ব পালন করেন, তাতে অভিনেত্রী তকমায় তাঁর ক্ষোভ হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ প্রসঙ্গে এদিনের সভার সঞ্চালক তথা বিজেপি’র রাজ্য সম্পাদক রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘রূপা যে দলীয় পদে রয়েছেন আমি তা উল্লেখ করেছি। কিন্তু রূপার শিল্পীসত্তার কথা মাথায় রেখেই আমি অভিনেত্রী পরিচয় দিয়েছি।’’ তবে দৃশ্যত ‘ক্রুদ্ধ’ রূপা সভায় বলেন, ‘‘আশা করি বিজেপি’র মঞ্চ হোক কিংবা অন্য কোথাও আমায় আর কেউ অভিনেত্রী বলে পরিচয় দেবেন না।’’ যদিও পরে ফোনে ‘এবেলা’কে রূপা বলেন, ‘‘আমি তো রেগে যাইনি।’’ 
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৭ জানুয়ারি হাওড়ারই শরৎ সদনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অরুণ জেটলির উপস্থিতিতে রূপা যোগ দিয়েছিলেন বিজেপি’তে। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি কামদুনি থেকে রূপার নেতৃত্বে পদযাত্রা করবে রাজ্য বিজেপি’র মহিলা মোর্চা। তার জন্য এদিন সন্ধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার একটি মল থেকে স্নির্কাস কেনেন রূপা।
সুত্রঃ এবেলা

একজন মিলিয়নিয়ারের যৌন কেলেঙ্কারি

তিনি মিলিয়নিয়ার। ‘ড্রাগনস ডেন’ তারকা। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সাবেক উপদেষ্টা। কিন্তু তিনি অর্থের জোরে ১৩ বছর বয়সী এক বালিকার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। এ অভিযোগে বৃটেনের একটি আদালতে মামলা হয়েছে। অভিযোগ আছে, তার নাম ডগ রিচার্ড। তার যৌন লালসার শিকার বালিকা স্কুল পড়ুয়া। একটি রগরগে ওয়েবসাইটে ওই বালিকার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারপর অর্থের লোভ দেখিয়ে তিনি ভাড়া করা একটি বাসায় নিয়ে যান তাকে। সেখানেই ওই বালিকার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হন। আদালতের শুনানিতে বলা হয়েছে, এর বিনিময়ে তিনি ওই বালিকা ও তার ১৫ বছর বয়সী এক বন্ধুকে ৪৮০ পাউন্ড নগদ দিয়েছেন। এ ছাড়া অর্থ দিয়েছেন পেপলের মাধ্যমে। এর মধ্যে রয়েছে নরউইচ থেকে লন্ডনের রেল ভাড়া। এ জন্য তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো একটি শিশুকে যৌন কর্মকান্ডে লিপ্ত করা। অন্যটি হলো অর্থের বিনিময়ে যৌন কর্মকান্ডে লিপ্ত হওয়া। আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডগ রিচার্ড। তিনি দাবি করেছেন, ওই বালিকার সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল বোঝাপড়ার মাধ্যমে। তিনি বলেন, ওই বালিকার বয়স ১৬ বছর বা তারও বেশি বিশ্বাস করার জন্য যথেষ্ট কারণ আছে। তাকে যে অর্থ দেয়া হয়েছিল সেটা তার আসা যাওয়ার খরচ হিসেবে, অবশ্যই শারীরিক সম্পর্কের পারিশ্রমিক নয়। প্রসিকিউটর গিনো ক্যানোর বলেছে, একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ওই বালিকার সঙ্গে জানাশোনা হয় রিচার্ডসের। সেখানে রিচার্ড পরিচিত ছিল ‘সুগার ড্যাডি’ নামে। আদালতে বলা হয়েছে, যখন ১৩ বছর বয়সী ওই বালিকা তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে লন্ডন যায় তখন তার সঙ্গে ছিল ১৫ বছর বয়সী এক বন্ধু। তবে ১৫ বছর বয়সী বালিকা এক বিবৃতিতে বলেছেন, তার বান্ধবীকে শারীরিক সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করেন রিচার্ড। কিন্তু এতে সাড়া দেয় নি তার বান্ধবী। বিভিন্নভাবে রিচার্ড তাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে।

ধামা দিয়ে চাপা দেয়া দু’টি ঐতিহাসিক সত্য by মিনার রশীদ

বিশেষ ধামা দিয়ে চাপা দেয়া দু’টি ঐতিহাসিক সত্য এ সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছে। এই পরম সত্যের একটি বলেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় পার্টির প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অন্যটি বলেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
এরশাদ শেষমেশ স্বীকার করে ফেলেছেন যে, তার কোনো ছেলেসন্তান নেই! ১৯৮২ সালে বন্দুকের নল দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করে এ দেশের বাদশাহ বনে যান তিনি। তারপর আঁটকুড়ে বাদশাহর অপবাদ ঘুচাতে সুস্থ সবল ও বয়স্কা স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে সন্তান জন্মদানের নাটক সাজান। পুরো ঘটনাটিই ছিল একটি মহাপ্রতারণা। তজ্জন্য শিল্পী কামরুল হাসান তাকে যে বিশ্ববেহায়া উপাধি দিয়েছিলেন, তার যথার্থতায় অনেকে আস্থা আনবেন। তার পরম অনুগত ও ব্যক্তিত্বহীন সেই স্ত্রীই হয়েছেন আজ বিরোধীদলীয় নেত্রী। ছাই ফেলতে যেন ভাঙা কুলাই ব্যবহৃত হয়েছে।
অন্য দিকে বাংলাদেশের ২১তম বিচারপতি তার দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বাণীতে বলেন, ‘কোনো কোনো বিচারপতি রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন। আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের দীর্ঘ দিন পর পর্যন্ত রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধানপরিপন্থী।’
তার এই বক্তব্যের পর সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে বর্তমান সরকার যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছিল তা ছিল অবৈধ। তার ফলে সরকারের বৈধতাও মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই ঘটনার পরে আবারো প্রমাণ হলো যে, সত্য কোনো দিন চাপা থাকে না। কোনো না কোনোভাবে, কারো না কারো মুখ দিয়ে তা বেরিয়ে পড়ে। সত্যপন্থীদের জন্য এটাই পরম সান্ত্বনা।
প্রধান বিচারপতি নিঃসন্দেহে একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। বিচারপতিদের অবসরের পর রায় লেখা নিয়ে তার এই বক্তব্যটি কোনো সমাবেশে উচ্চারণ করেননি যে স্লিপ অব দ্য টাং হয়ে পড়বে। তার এ বক্তব্যটি এসেছে লিখিত আকারে। অনেক ভাবনাচিন্তার পর। তার সেই বক্তব্যটি একটি বহুল পঠিত বাংলা দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ্যে এনেছে। পত্রিকাটি প্রধান বিচারপতি কিংবা সরকারের এত বড় ক্ষতি করবে, তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়!
অনুমিত হচ্ছে, এটা একটা সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার ফসল। দেশী-বিদেশী চাপের মুখে সরকার সম্ভবত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটা নির্বাচন দিতে রাজি হয়ে পড়বে। এর ফলে উচ্ছ্বসিত বিএনপি কিংবা ২০ দলীয় জোটের কাছে সম্ভাব্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিশেষ ব্যক্তির একটা গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়ে পড়বে। সদ্য অবসরে যাওয়া বিচারপতি মানিকের মুখে বর্তমান প্রধান বিচারপতির নিন্দা এবং এরশাদ দম্পতির সাম্প্রতিক ঝগড়া একই জায়গা ও একই ভাবনা থেকে শুরু হতে পারে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটি হলো, আদালত দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা দূর করতে গিয়ে আদালতকেও রাজনৈতিক কূটকৌশলে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। সদ্য অবসরে যাওয়া বিচারপতি রাজনৈতিক সমাবেশে যোগদান করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য দেন, প্রধান বিচারপতির প্রকাশ্য সমালোচনা করেন।
গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম দীর্ঘ হবেই। কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। তজ্জন্য দম ফুরিয়ে গেলে চলবে না। অনেক লম্বা দম নিতে হবে। মাগো, কুত্তা সামলান আর ভিক্ষা যা দেয়ার দিয়ে দেন। বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের অবস্থা এমন যেন হয়ে না পড়ে।
দেশ ও জাতির স্বার্থে তাই জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে সামনের পাঁচটি সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলাম। যারা এই জাতির প্রকৃত মঙ্গল চান ও জাতির বিবেক হিসেবে গণ্য তাদেরকে বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখার অনুরোধ করছি। সরকার যতই ছলচাতুরী করুক না কেন, তাদেরকে এই বাঘের পিঠ থেকে একদিন না একদিন নামতেই হবে। সেই নামার কাজটি যত তাড়াতাড়ি হবে, ততই তাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে এবং আমাদের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল ও টিকে থাকতে গিয়ে সমাজের পেশিশক্তির ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এরা জনগণের ওপর যে নির্যাতন করেছে, তাতে এদের ওপর জনগণের প্রচণ্ড ক্ষোভ জমা হয়েছে। কাজেই এই ক্ষোভ ও আক্রোশ থেকে বাঁচাতেও জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে এবং আমাদের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া দরকার।
এই বিবেচনা থেকেই সামনের সম্ভাব্য সঙ্ঘাত থেকে প্রিয় জন্মভূমিকে রক্ষার্থে এ প্রস্তাবটি রেখেছি। এটা শুধু কোনো দলের জন্য নয়, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী দিয়ে পর পর পাঁচটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সম্ভাব্য নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যে কারণে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া হয়ে ওঠে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা তা থেকে কিছুটা হলেও টেনশনমুক্ত করবে। জাতিসঙ্ঘের ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী একটা হতাশা থাকলেও বিশ্বের দেশগুলোর ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল সমস্যা সমাধানে এর বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে আমাদের নিজেদের সেনাবাহিনীই মূল দায়িত্বে থাকবে বলে এটাকে অন্য দেশের হস্তক্ষেপও বলা যাবে না। নির্বাচনকালীন সময়ে সব দলের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারে। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে আমরা বারবার যে সঙ্কটে পড়েছি, এ ব্যবস্থায় সেই জটিলতাও থাকবে না।

প্রধান বিচারপতির বক্তব্য ও বিতর্ক by ফরহাদ মজহার

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দুর্দশা নতুন কোনো খবর নয়, তবে সম্প্রতি বিচারকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব যেভাবে প্রকাশ হয়েছে তাতে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সঙ্কট আরো তীব্র হতে পারে। কিছু দিন আগে অবসর নেয়া সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী যেভাবে প্রধান বিচারপতিকে ঘায়েল করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন পৃথিবীর আর কোথাও এই প্রকার আচরণের কোনো নজির আছে কি না আমার জানা নেই। সাবেক এই বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক নামে পরিচিত। ব্যক্তিগত ও সঙ্কীর্ণ পেশাগত দ্বন্দ্বকে তিনি প্রকাশ্য করে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে যেখানে নামিয়ে এনেছেন তাকে অবিশ্বাস্যই বলতে হবে। বিষয়টি স্রেফ বিস্ময়ের বিষয় হলে অসুবিধা ছিল না। কিন্তু সাবেক এই বিচারপতির আচরণ, উচ্চারণ এবং প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে তার ভূমিকা স্র্রেফ বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা সজ্ঞানে বিনষ্ট করার শামিল। তার মন্তব্য ‘আদালত অবমাননা’র পর্যায়ে পড়ে। প্রধান বিচারপতিকে ঘায়েল করতে গিয়ে তিনি নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করবার মহৎ কাজে লিপ্ত হয়েছেন। বিচারব্যবস্থার বিপর্যয় এতে আরো ত্বরান্বিত হওয়ার ও ভেঙে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এই বিষয়টিকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।
কিছু দিন আগে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বলেছিলেন, ‘বিচার বিভাগের ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাইছে নির্বাহী বিভাগ’। বিচার বিভাগের দিক থেকে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ গুরুতর। মনে রাখা দরকার মাহমুদুর রহমান উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত চেম্বার জজ স্থগিত করে দিত বলে একই সারকথা বলেছিলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রতিনিধি। দেখা গেছে, হাইকোর্ট যখন কোনো মামলায় রায় দেন, অ্যাটর্নি জেনারেল তার স্থগিতাদেশ চেয়ে চেম্বার জজের কাছে আবেদন করেন। আদালতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিনিধি অর্থাৎ অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদন অনুযায়ী চেম্বার জজ স্থগিতাদেশ মঞ্জুর করেন। নিয়মিত এই ঘটনা চলতে থাকলে সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাবেক বিচারপতি টি এইচ খান দৈনিক আমার দেশকে বলেছিলেন, হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে দেয়াই যেন চেম্বার জজ আদালতের মূল কাজ। আর ঠিক এই কথাকেই দৈনিক আমার দেশ বলেছিল, ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’। অথচ এই কথা বলার জন্য আদালত মাহমুদুর রহমানকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন।
মাহমুদুর রহমান তার বক্তব্যের জন্য আদালতের কাছে ক্ষমা চাননি। চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা ছাড়াও সত্য প্রকাশের দৃঢ়তার জন্য মাহমুদুর রহমান সাংবাদিকতার ইতিহাসে বিশাল উদাহরণ হয়ে থাকবেন। কিন্তু এখন প্রধান বিচারপতি সারমর্মের ভাষায় একই কথাই বলছেন: নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাইছে। নির্বাহী বিভাগ কেড়ে নেয়ার কাজটি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের মাধ্যমে চেম্বার জজের মাধ্যমে সম্পন্ন করছিল দৈনিক আমার দেশের এই অভিযোগ তাহলে মিথ্যা নয়। মাহমুদুর রহমানকে শাস্তি দেয়ার বেঞ্চে এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীসহ বিচারপতি এস কে সিনহাও ছিলেন। ইতিহাস এক প্রহসন বটে!
সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি সিনহা আবার বলেছেন, অবসর গ্রহণের পর বিচারপতিদের রায় লেখা আইন ও সংবিধানপরিপন্থী। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি একুশতম। গত ১৭ জানুয়ারি বিচারপতি হিসেবে তার এক বছর পূর্ণ হলো। প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে তিনি একটি ‘বাণী’ দিয়েছেন। সেখানেই তিনি এই বোমাটি ফাটালেন।
এই কথার পর পরই তার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের সাঙ্গপাঙ্গরা আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে। ফলে তিনি ঠিক কী বলেছেন সেটা আমাদের জানা দরকার। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বলছেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট এর বিচারপতিগণ বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের সংরক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ গ্রহণ করেন। কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না। আদালতের নথি সরকারি দলিল। একজন বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর আদালতের নথি নিজের নিকট সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে দস্তখত করার অধিকার হারান, আশা করি বিচারকগণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এমন বেআইনি কাজ থেকে বিরত থাকবেন।’ (দেখুন সুপ্রিম কোর্ট ওয়েবসাইট)।
সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বিচারপতি হিসেবে অবসর নেয়ার আগে থেকেই প্রধান বিচারপতিকে পর্যুদস্ত ও অপদস্থ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে, অবসরের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক মাত্র। যেভাবে তিনি আদালতকেও পর্যুদস্ত ও অপদস্থ করে চলেছেন তা ঘোরতর আদালত অবমাননা। মাহমুদুর রহমান ছয় মাস অন্যায়ভাবে শাস্তি ভোগ করে আসবেন আর শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না, বিচার বিভাগ এই দ্বৈত নীতি গ্রহণ করতে পারে না। টেলিভিশনেও এই সাবেক বিচারপতি বিতর্কিত বক্তব্য রেখেছেন। বিতর্কিত বক্তব্য রাখা অসুবিধা নয়; টেলিভিশনে অনেকেই অনেক স্টুপিড মন্তব্য করে থাকেন। শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও করতে পারেন, সেটা তার মতপ্রকাশের অধিকার। কিন্তু যে বক্তব্য প্রধান বিচারপতিকে জনসমক্ষে অপদস্থ করে ও জনগণকে বিচারব্যবস্থার প্রতি সামগ্রিকভাবে তুমুল অবিশ্বাসী করে তোলে সেটা অবশ্যই আদালত অবমাননা। মাহমুদুর রহমান ও বাংলাদেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকের ক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা এক রকম আর সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর জন্য তো সেটা ভিন্ন হতে পারে না।
দুই
জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের দিক থেকে তাকালে ক্ষমতাসীনদের বরকন্দাজ বিভিন্ন রঙ ও পোশাকের সুবিধাবাদী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অন্তর্দ্বন্দ্ব বিচারব্যবস্থার জন্য অবমাননাকর হলেও এসব কিছুতে শেষমেশ বাংলাদেশের জনগণের লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। বিচার ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে যেসব সমালোচনা এত দিন করা হয়েছে তার ক্ষত ও দুর্গন্ধই আসলে এখন ছড়াতে শুরু করেছে। যতই তা প্রকাশ্য হতে থাকবে ততই জনগণ বুঝতে পারবে বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে সংস্কারের সুযোগ নেই বললেই চলে। এ দিক থেকে এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি এস কে সিনহার দ্বন্দ্ব আমাদের জন্য বিচারব্যবস্থা, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিষয়টা শুধু আদালত অবমাননা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের সম্পর্ক এবং সামগ্রিকভাবে বিচারব্যবস্থার ক্ষয়ের বিচারের প্রশ্ন নয়। দু-একজন বিচারকের নীতিনৈতিকতার প্রশ্নও বটে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে একটি প্রশ্ন করি। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। কিন্তু সেই দেশের সুপ্রিম কোর্টে কেউ যদি তার বিদেশী নাগরিকত্ব লুকিয়ে রেখে অতিশয় প্রভাবশালী বিচারক হয়ে বসেন তাহলে তার কী শাস্তি হওয়া উচিত? কোনো দেশ কি তা বরদাশত করবে? কোনো দেশ কি তার সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিদেশী বিচারক মেনে নেবে? অবশ্যই না।
এখন ধরা যাক, কোনো একজন বিচারক সম্পর্কে এই ধরনের অভিযোগ উঠল। সুবিচারের খাতিরে আমরা ধরে নিচ্ছি এই অভিযোগ মিথ্যাও হতে পারে। তাহলে এই ক্ষেত্রে সরকার, বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা কী হতে পারে? অবশ্যই এই অভিযোগের সত্য-মিথ্যা যাচাই করা। সত্যতাসাপেক্ষে তাকে দ্রুত অপসারণ করা। যদি কেউ সত্য গোপন রেখে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হয়ে থাকেন তার শাস্তির ব্যবস্থা করা।
কিন্তু বাংলাদেশ বিচিত্র দেশ। সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সম্পর্কে এসব গুরুতর অভিযোগ উঠার পরও তার কোনো তদন্ত হয়নি। দৈনিক পত্রিকা আমার দেশে এ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। বিলাতে তার বাড়ি ও দুর্নীতি সম্পর্কে কিছু তথ্য তারা প্রকাশ করেছিল। রাজনৈতিক বিরোধ ও বিদ্বেষ ছাড়াও এসব কারণে দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। তাকে আদালত অবমাননার দায়ে যে বেঞ্চ শাস্তি দিয়েছিল সেখানে সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও ছিলেন।
বাংলাদেশে ‘আদালত অবমাননা’ সংক্রান্ত কোনো আইন নেই। সে দিক থেকে ঔপনিবেশিক আইনের ভিত্তিতে আদালত অবমাননার বিচার চলতে পারে না। ঔপনিবেশিক আইন চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করে না, বরং তা দমন করার কাজেই ব্যবহার করা হতো। সেই আইন দিয়ে একটি স্বাধীন দেশে চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশসংক্রান্ত মামলার সিদ্ধান্ত কিভাবে বিচারকেরা নিচ্ছেন? তাহলে তর্ক করা যায় ঔপনিবেশিক আইনের অধীনে স্বাধীন দেশের নাগরিকদের যে বিচার বিচারকেরা করেছেন তা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চেতনার বিরোধী। ঔপনিবেশিক আইনের অধীনে যেসব রায় হয়েছে তা অবৈধ। অভিযুক্তকে ‘পরাধীন’ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, স্বাধীন দেশের চিন্তা ও বিবেকসম্পন্ন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। লিগ্যাল সাবজেক্ট হিসেবে নাগরিকদের যে স্তরে বিচারকেরা পর্যবসিত করেছেন তারা কি তা করতে পারেন?
এ ছাড়াও আরেকটি গুরুতর আইনি বা সাংবিধানিক তর্ক মাহমুদুর রহমানসংক্রান্ত আদালত অবমাননার রায়ে উঠেছে। অপরাধের শাস্তি কী হবে তা নির্ধারণ বিচারকের এখতিয়ার নয়। আইনের অনুপস্থিতিতে যদি শাস্তি সুনির্দিষ্ট না থাকে তাহলে বিচারপ্রক্রিয়া বিচারকদের বৈচারিক স্বেচ্ছাচারে পর্যবসিত হতে পারে না। এ ছাড়া অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কোন অপরাধে কতটা শাস্তি হবে সেটা নির্ণয়ের অধিকারও বাংলাদেশের সংবিধান বিচারকদের দেয়নি। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে আনা অভিযোগে যে রায় দেয়া হয়েছিল তা বিচারকদের ব্যক্তিগত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ কি না তা তর্ক আকারে যেমন রয়ে গিয়েছে তেমনি মাহমুদুর রহমানের রায়ে বিচার বিভাগ সংবিধানে দেয়া ক্ষমতার বাইরে কাজ করেছেন কি না সেটাও অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তর্ক আকারে রয়ে গিয়েছে। আমরা তা উপেক্ষা করতে পারি না। ইনসাফ নিশ্চিত করা না হলে তুষের আগুনের মতো তা থেকে যাবে। এজলাসে বসে রায় দিলেই তার জের শেষ হয় না। আইন কিংবা বিচার সমাজ ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। একজন নাগরিককে শাস্তি দিতে গিয়ে ন্যায়বিচার বিঘিœত হলে তা দ্বিগুণ শক্তি হয়ে বেইনসাফির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রায়ের জেরও বাংলাদেশে কাটেনি। আদালত অবমাননার প্রসঙ্গ যেহেতু নাগরিকদের মানবিক অধিকারের প্রশ্নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত তাই এই রায়টি বারবারই ইতিহাসের কাঠগড়ায় উঠে দাঁড়াবে এবং আবার ইনসাফ নিশ্চিত করার জন্য ফরিয়াদ জানাতে থাকবে।
ঠিক। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার ওপরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী শাস্তি অসাংবিধানিক। আদালত অবমাননার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার বিচারকদের আছে। অবশ্যই। কিন্তু অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নির্ণয়ের অধিকার তাদের নেই। কিসের ভিত্তিতে মাহমুদুর রহমানের ছয় মাসের কারাদণ্ড হলো? অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা নির্ণয়ের অধিকার এখতিয়ার একান্তই জাতীয় সংসদ বা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নী বিভাগের। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ তো কোনো আইনই প্রণয়ন করেনি। কিন্তু বিচারকেরা প্রায়ই নিজেদের জাতীয় সংসদের ঊর্ধ্বে ভাবতে পছন্দ করেন। সংবিধানে ‘ইনহেরেন্ট পাওয়ার’ নামক একটি ধারণা আছে বলে অনেকে মনে করেন। এই ইনহেরেন্ট পাওয়ার খোদায়ী ক্ষমতার সমতুল্য। বিচারক যা খুশি তাই শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু ইনহেরেন্ট পাওয়ারের অর্থ এমন নয় যে, কোনো আইন না থাকলে আদালত নিজেই নিজের ক্ষমতাবলে যা খুশি আইন তৈরি করতে পারে। সওয়াল জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা উচ্চ আদালতের। কোর্ট অব রেকর্ড হিসেবে যা থেকে যায়। আইনের ব্যাখ্যা হিসেবে আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে ‘আইন’ হয়ে হাজির থাকে। যাকে কেইস ল, প্রিসিডেন্স ইত্যাদি নানান নামে অভিহিত করা হয়। বিভিন্ন আইনের মধ্যে সমন্বয় বা বিরোধ থাকলে এবং তা আদালতে মীমাংসার সুযোগ থাকলে বৈচারিক ক্ষমতাবলে তা মীমাংসার ক্ষমতাকেও অনেকে আদালতের ইনহেরেন্ট পাওয়ার বলে মানেন। এত দূরই বড়জোর। ইনহেরেন্ট পাওয়ার নিয়ে অন্যত্র ভিন্নভাবে আমরা বিস্তৃত আলোচনা করতে পারি।
কিন্তু আদালত অবমাননার অজুহাতে কোনো আইন না থাকা অবস্থায় কাউকে ছয় মাসের শাস্তি দেয়ার ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে। অথচ ইনহেরেন্ট পাওয়ারের অজুহাত দিয়ে বিচারক সেই শাস্তি দিতে পারেন না। এটা তার এখতিয়ারের জায়গা নয়। যেহেতু বাংলাদেশে বৈচারিক যুক্তিবিদ্যা (jurisprudence), দর্শন কিংবা রাষ্ট্রনীতি নিয়ে শক্তিশালী সামাজিক-রাজনৈতিক বিতর্ক নেই, বহু গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় অস্পষ্ট ও অপরিচ্ছন্ন রয়ে গিয়েছে। কিছু বিচারক তার সুযোগ গ্রহণ করতে পারছেন। মাহমুদুর রহমানকে শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি কিভাবে ব্যক্তিগত ক্রোধ বিচারপ্রক্রিয়াকে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত করে। কিছু বিচারক তাকে ‘চান্স এডিটর’ মন্তব্য করেছিলেন এবং আদালত অবমাননার জন্য দীর্ঘ দিন কারাগারে পচতে পাঠিয়েছিলেন। বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ বা তথাকথিত সিভিল সোসাইটি নামক কিছু যে নেই সেটা তখন থেকেই আরো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কারণ এই অন্যায়ের প্রতিবাদ যেভাবে হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হয়নি। মাহমুদুর রহমান ‘ইসলামপন্থী’ এই অভিযোগে সংবিধান, আইন ও বিচারব্যবস্থার এই সব নানাবিধ ঘাটতি উপেক্ষা করা হয়েছে। তাকে শাস্তি দেয়ার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের আনন্দ আমরা তখন প্রত্যক্ষ করেছি। যে তলোয়ার অন্যের মাথা কাটে, একদিন তার কোপ আমার ঘাড়েও পড়তে পারে এই সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের প্রকট অভাব দেখে অবাক হয়েছি। কিন্তু এটাই বাংলাদেশ। আজ দেখছি, যেসব বিচারক মাহমুদুর রহমানকে শাস্তি দিয়ে পুলকিত হয়েছিলেন আজ তারাই পরস্পরের সাতে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। প্রহসন বটে!
আদালত অবমাননা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশেষত যারা সাংবাদিক ও লেখালিখির সাথে জড়িত তাদের জন্য সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের দিক থেকে চিন্তা ও মতপ্রকাশের সীমা ও সম্ভাবনা পরিষ্কার করা সংসদ ও বিচার বিভাগ উভয়েরই কর্তব্য। আদালত অবমাননা মামলায় মাহমুদুর রহমানের শাস্তি বাংলাদেশের আইন ও বিচার বিভাগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রসঙ্গটি আবার সে কারণেই এখন তুলেছি। সেই মামলার বেঞ্চে বর্তমান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাও হাজির ছিলেন। তিনিও এই দায়ের বাইরে নন। এখন বিচারকদের সংবিধান বিরোধী কাজের কথা যদি তিনি তুলেই থাকেন তাহলে তিনিও বা দায় এড়াবেন কিভাবে? এই প্রশ্নটুকু প্রধান বিচারপতির বিবেকের কাছে পেশ রাখছি। এর বেশি কথা বাড়াতে চাই না। কারণ তিনি যদি আন্তরিক উপলব্ধি থেকে এখনকার কথাগুলো উচ্চারণ করে থাকেন তাহলে তাকে শক্তভাবে সমর্থন করা আমি আমার নাগরিক কর্তব্য বলে মনে করি।
তিন
অবসর গ্রহণ করার পর পরই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ সাধারণ নাগরিক হয়ে যান এবং তারা আর শপথের অধীন থাকেন না। তাই অবসর গ্রহণের পর আদালতের নথি নিজের নিকট সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে দস্তখত করার অধিকার তারা হারান। সে কারণে অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখাকে প্রধান বিচারপতি অসাংবিধানিক বলেছেন। তার এই সঠিক অবস্থানের যারা সমালোচনা করছেন তাদের যুক্তি একটাই। বিচারক যখন রায় দিয়েছিলেন তখন তিনি শপথের অধীনে ছিলেন। অতএব এরপর অবসরে গিয়ে রায় লিখলে তা অসাংবিধানিক হবে না। কিন্তু প্রধান বিচারপতি তো তা নিয়ে তর্ক করছেন না। শপথের অধীনে দেয়া সংক্ষিপ্ত রায়কে তিনি অসাংবিধানিক বলছেন না। তিনি বলছেন, আদালতের নথি সরকারি দলিল, অবসরে যাওয়া বিচারক নিজের বাড়িতে রাখেন কোন অধিকারে? এগুলো পাবলিক ডকুমেন্ট। কিংবা তার পর্যালোচনা করতে পারছেনই বা কিভাবে? এবং শপথের বাইরে থেকে রায়ও বা লিখছেন কোন সাংবিধানিক বা আইনি অধিকারে? বিশেষত এমন সময় যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষণের শপথ থেকে তিনি মুক্ত। এই ব্যাপারে তার আর কোনো দায় থাকে না। যারা অন্য দেশের উদাহরণ দিচ্ছেন তারা সুনির্দিষ্টভাবে কোন দেশে কোথায় বিচারপতিরা অবসরে যাবার পরে কিভাবে রায় লিখেছেন তার কোনো উদাহরণ দেননি। বাংলাদেশে এর আগের বিভিন্ন বিচারপতি ও এই কাজ করেছেন বলা হচ্ছে। আগের বিচারপতিরা অসাংবিধানিক কাজ করেছেন বলে তা স্র্রেফ বিচারপতিদের স্বেচ্ছাচার হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বক্তব্য এতে এক তিলও বাতিল হয় না। আগের বিচারপতিরা ভুল করলে আমাদের সেই ভুল করে যেতে হবে তার কোনো যুক্তি নেই। কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না। তো তিনি যখন রায় দিয়েছিলেন তখন তিনি শপথের অধীন ছিলেন তাই অবসরে অসম্পূর্ণ রায় লিখবেন এই যুক্তি যারা দিচ্ছেন তাদের যুক্তি কাণ্ডজ্ঞানপ্রসূত মনে হচ্ছে না।
ধরুন তর্কের খাতিরে মানা গেল যে তারা অবসরে গেলে রায় লিখতে পারবেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বিচারপতিদের স্বাক্ষর করা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। বাড়িতে বসে অবসরে লেখা রায়ে যখন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক স্বাক্ষর করেছিলেন তখন কি তিনি শপথের অধীন? নাকি অধীন নন? স্বাক্ষরের তারিখ তিনি কী দেবেন? শপথ থেকে অবমুক্ত হওয়ার পরের তারিখ নাকি যখন তিনি শপথের অধীনে ছিলেন সেই তারিখ? যদি শেষেরটা করেন সেটা হবে শুধু অসাংবিধানিক নয়, একইভাবে দুই নম্বরি কাজ। কিভাবে একজন সাধারণ নাগরিক রায়ে স্বাক্ষর দিচ্ছেন? আর তা রাষ্ট্রের কাছে বলবৎযোগ্য বলে গৃহীত হচ্ছে? কাণ্ডজ্ঞানেই বোঝা যায় প্রধান বিচারপতি সঠিক বলেছেন।
এতে কি বৈচারিক বা আইনি জটিলতা তৈরি হবে? অবশ্যই হবে। কিন্তু সেটা ভিন্ন তর্ক। আর সেই তর্ক ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। কী ধরনের জটিলতা তৈরি হবে কিংবা ইতোমধ্যে হয়েছে সেই তর্কে আমি এখন এখানে যাচ্ছি না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত রায় এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশ হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়। এই রায়টি লিখেছিলেন বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। অবসরে যাওয়া বিচারপতির রায় লেখা নিয়ে সেই সময় দৈনিক আমার দেশ প্রশ্ন তোলে। তখন দৈনিক আমার দেশের সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান সিনিয়র আইনজীবী বিচারপতি টি এইচ খানের বরাতে জানিয়েছিলেন, এটা অবৈধ কাজ। বিচারপতিরা দায়িত্ব গ্রহণের আগে শপথ নেন। এই শপথ নেয়া হয় সংবিধানের আলোকে। যত দিন দায়িত্বে থাকেন তত দিন শপথের আওতায় তাদের কাজ করতে হয়। অবসরে চলে যাওয়ার পর তারা শপথের আওতামুক্ত। তখন তিনি সাধারণ নাগরিক। সুতরাং শপথের আওতামুক্ত কোনো ব্যক্তি রায় লিখতে পারেন না। কারণ তিনি আর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকেন না।
তবে সাংবিধানিক বা আইনি জটিলতা তৈরি হবে বলে ক্ষমতাসীনদের বরকন্দাজরা যেসব কূটতর্ক করছে আসলে তার কোনো ভিত্তি নেই। কারণ একটি নির্বাচিত সংসদ অনায়াসেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতির ভিত্তিতে বিতর্কিত বিষয় সমাধান করতে পারে। কিন্তু তারা জানে বর্তমান সংসদ অনির্বাচিত। এর নৈতিক বা আইনি ভিত্তি নেই। যে রায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতাসীনেরা ক্ষমতায় এসেছে সেটাই প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে প্রশ্নবোধক ও অসাংবিধানিক হয়ে পড়েছে। এদের তেলেবেগুনে গোস্বা হওয়ার কারণ এটাই। তারা বিতর্কিত সংসদে এর সমাধান দিলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
প্রধান বিচারপতি এখন যা বলছেন তা আসলে নতুন কিছু নয়। তার বলাটাই নতুন। জানি না তিনি তার বিবেকের তাগিদ থেকে কথাগুলো বলছেন কি না। যদি বলে থাকেন তাহলে তার উচিত বিচার বিভাগীয় উদ্যোগে মাহমুদুর রহমানের জামিন কেন হচ্ছে না তার খোঁজ নেয়া। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হোক অসুবিধা নেই। কিন্তু কোনো বিচারপতির ব্যক্তিগত ক্রোধের কারণে যদি নাগরিকদের ওপর অন্যায় করা হয় তাহলে তা প্রশমনের দায় প্রধান বিচারপতিরও বটে।
প্রধান বিচারপতির উদ্যোগ নেয়ার মধ্য দিয়েই আমরা বুঝব তিনি আইন বা সাংবিধানিক বৈধতা বা অবৈধতার তর্ক ছাড়াও নীতি ও ইনসাফের প্রশ্নে আন্তরিক। সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য যা জরুরি।
২২ জানুয়ারি, ২০১৬। ৯ মাঘ, ১৪২২। আরশিনগর।

দেশের অর্থনীতি কোন পথে? by এমাজউদ্দীন আহমদ

মাত্র কিছু দিন আগেও অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকেই (Economic Growth) বলা হতো অর্থনৈতিক উন্নয়ন (Economic Development)। GNP (Gross National Product) ক্ষেত্রে অগ্রগতি এবং কোনো কোনো সময় মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিকেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলে চিহ্নিত করা হতো। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ বলেছেন, একটি দেশ উন্নত হয় যখন দেশটির তার নিজের উদ্যোগেই এক উন্নত পর্যায়ে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। জাতিসঙ্ঘ পর্যন্ত তার দ্বিতীয় উন্নয়ন দশকের (Second Development Decade) প্রস্তাবে মাথাপিছু আয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করেছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন হিসেবে। ওই সময়ে অর্থনীতিবিদদের ধারণা বা প্রতীতি ছিল ‘উন্নত জীবনের সূচনা হয় উন্নত পর্যায়ের মাথাপিছু আয়ের বিশ্বে’ (Real life begins at a higher level of per capital income), কেননা অর্থনৈতিক বৃদ্ধি তখন নিচের দিকে চুঁইয়ে পড়ে (Filter down) এবং দেশে দরিদ্রদের জীবনমান উন্নত করে। অর্থনীতিবিদদের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। উচ্চতর মাথাপিছু আয়ের পেছনে ছুটতে যাওয়াটা শেষ পর্যন্ত অলীক প্রমাণিত হয়েছে। এই ধরনের অর্থনীতির দেশের এক দিকে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে আয়ের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য, দারিদ্র্য, অপুষ্টি-ব্যাধি-অশিক্ষা-নিরক্ষরতা-অস্বাস্থ্যকর অবস্থানে বসবাস, তেমনি বেড়েছে বেকারত্ব, আধা-বেকারত্ব এবং জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ যা চূড়ান্তপর্যায়ে রূপ গ্রহণ করতে পারে বিস্ফোরণধর্মী রাজনীতিতে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ হওয়া উচিত দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে ওইসব ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধের উন্মেষ ঘটানো, আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে নিজের ভাগ্য রচনায় উদ্যোগী করানো, সম্মানজনক কর্মের জন্য প্রণোদিতকরণ, বিশেষ করে সমাজব্যাপী এমন রাজনৈতিক আবহ সৃষ্টি করা যাতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুষম বণ্টন ত্বরান্বিত হতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষেত্রে সব ধরনের বৈষম্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ক্ষেত্রে সকলের সমান অধিকার সুনিশ্চিত হতে পারে। এ জন্য সব ধরনের সামন্তবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে সমাজে গণতন্ত্রের শিকড়কে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের (Participatory) মানসিকতা সুদৃঢ় করা একান্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এই ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি, কেননা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে প্রায় সব নাগরিকের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে, সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে। বাংলাদেশে ছোটখাটো বৈষম্য বিপ্লবাত্মক হয়ে উঠতে পারে। কেননা জনগণ এসব বিষয়ে ভীষণ সচেতন। তা ছাড়া, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অনুপস্থিতি তথা কার্যত একদলীয় শাসন এবং দলীয় নেতাদের উচ্চবাচ্য ও পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ পরিবেশকে উত্তপ্ত করতে পারে।
২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় পেশকৃত বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয়েছে জনগণের মাথাপিছু আয় ১৪৬ ডলার বৃদ্ধি পেয়ে এ বছরে তা হয়েছে এক হাজার ১৯০ মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ হয়েছে ২১ হাজার ৫০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা অনেকে আশাও করি, দু-চার বছরের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। এসবই ভালো কথা। আশার কথা। কিন্তু অন্য দিকে দৃষ্টি দিলে ভীত হই। দেশে প্রতি বছর যে সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে তা কুক্ষিগত হচ্ছে অল্পসংখ্যক ব্যক্তির হাতে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের শীর্ষ ধনীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, মাত্র ১৬ ব্যক্তির মালিকানায় রয়েছে দেশের মোট সম্পদের সাড়ে ১০ শতাংশের অধিক। আবার আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট (Ultra Wealth Report) অনুযায়ী মাত্র ৯০ জনের মালিকানায় রয়েছে দেশের ১১ শতাংশ সম্পদ। এই ক’জন ব্যক্তির সম্পদ ১৬ কোটি মানুষের মাথায় ফেলে মাথাপিছু আয় হিসাব করা হচ্ছে। করারোপের মাধ্যমে সরকার সম্পদ বণ্টনের চেষ্টা করলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। কর ফাঁকির মাধ্যমে তা অকার্যকর থেকেই যাচ্ছে। রাজস্ব বোর্ডের এক হিসাবে দেখা যায়, শীর্ষ করদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৫টি রাজস্ব খেলাপি। বিশ্ব আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৩ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৫০ কোটি টাকা সম্পদের মালিকদের সংখ্যা ৯৫। তাদের কাছে গচ্ছিত মোট সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা যা মোট জিডিপির ১১ শতাংশ। এক বছর আগে এমন ধনীর সংখ্যা ছিল ৮৫ জন। তাদের কাছে গচ্ছিত সম্পদ ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। অন্য কথায়, এক বছরের ব্যবধানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির তুলনায় ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার আড়াই গুণ। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৬ হলেও কিছু সম্পদ কুক্ষিগতকারীর প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের বেশি। ২০০৯ সালে ২৫০ কোটি টাকার মালিকদের সংখ্যা ছিল ৫০ জনের মতো।
২০১৫ সালের অর্থনৈতিক খাতে আলোচিত ঘটনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচারের কাহিনী। ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিএফআই (Global Financial Integrity-GFI) ২০০৪-২০১৩ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে এক বছরেই প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা পাচারের সংবাদ প্রকাশ করে তার ৮ ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদন- 'Illicit Financial close from Developing countries'এ। প্রতিবেদন মতে ২০০৯-২০১৩ সময়কালে পাচার হয়েছে দুই লক্ষ ২৬ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন সময়ে ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাচারের অভিযোগ পাওয়া যায়। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচারের তথ্য পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন পাঁচটি ব্যাংকের তথ্য দিয়ে দুদককে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু দুঃখের বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশন এসব বিষয়ে চুপ করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কোনো দৃশ্যমান বিনিয়োগ না থাকলেও গত অর্থবছরের ১০ মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতির প্রবৃদ্ধি দেখানো হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। আর আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধি দেখানো হয় ১৫ শতাংশ। যন্ত্রপাতি ভর্তি কনটেইনারে পাওয়া গেছে ছাই, ইট, বালু ও পাথর। শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে খালি কনটেইনারও পাওয়া গেছে। শুধু আমদানির নামে টাকা পাচার হচ্ছে তা-ই নয়, রফতানি নামেও টাকা পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সমাজের উঁচু স্তরের ব্যক্তিরা টাকা পাচার করেছেন, বিশেষ করে প্রভাবশালী রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, এনজিও ব্যক্তিত্ব। এই টাকা দিয়ে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশে তারা বাড়ি বানিয়েছেন অথবা ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন।
খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত সম্পদশালীদের ‘লুটেরা’ উল্লেখ করে বলেন, ‘এই দুর্বৃত্তরা’ কোনো সম্পদ সৃষ্টি করে না, বরং অন্যের বিত্ত ‘দখল-হরণ ও আত্মসাৎ’ করে নিজেরা বিত্তশালী হয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা এখন জনসমষ্টির ওপর তলার ১ (এক) শতাংশ লোক যারা দেশের বেশির ভাগ সম্পদের মালিক। অধ্যাপক বারকাত তার লোক বক্তৃতা ২০১৪ তে বলেছেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামো বিকাশ প্রবণতা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, গত ২৪ বছরে ‘সার্বিক দারিদ্র্য-বৈষম্য-অসমতা’ অবস্থার অধোগতি হয়েছে। অন্য কথায়, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দারিদ্রের হার গতিধারা সুস্পষ্ট। এক দিকে এই গণ-দরিদ্র এবং ব্যাপক অসমতা আর অন্য দিকে মধ্যবিত্তের অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা এবং নগণ্য সংখ্যক ব্যক্তির হাতে অঢেল সম্পদ সমগ্র সমাজব্যাপী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে যা কালে বিস্ফোরণধর্মী রাজনীতির জন্ম দেবে। তাই বলি, এখনো সময় আছে, সমবণ্টন, দারিদ্র্যদূরীকরণ ও বিত্তশালীদের ওপর উচ্চহারে কর আরোপের মাধ্যমে দেশে সামগ্রিকভাবে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধান অপরিহার্য। এর কোনো বিকল্প নেই।

নওয়াজ শরিফ ও মোদির নতুন পরীক্ষা by হামিদ মীর

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন। উভয়ে ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ লাহোরে পাক-ভারত আলোচনা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ২ জানুয়ারি ২০১৬ পাঠানকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে হামলার পর আলোচনার ভবিষ্যতের ওপর শঙ্কার ছায়া ছেয়ে পড়ছে। ভারত সরকার পাঠানকোট হামলার জন্য কিছু পাকিস্তানিকে দায়ী করলেও পাকিস্তান সরকারকে দায়ী করেনি। পাকিস্তান সরকার ভারতের অভিযোগ তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যানের পরিবর্তে ওই অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। পাঠানকোট হামলার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ যে সঙ্কট ও শঙ্কার মুখোমুখি হয়েছেন তা ওই সব ব্যক্তিও অনুভব করছেন, যারা নওয়াজ শরিফের সাম্প্রতিক শ্রীলঙ্কা সফরে তার সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। ওই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের কাছ থেকে জেএফ থান্ডার বিমান ক্রয়ের ব্যাপারে শ্রীলঙ্কার সাথে চুক্তি করা। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকারকে ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে আতঙ্কগ্রস্ত মনে হলো। এক দিকে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাকিস্তানের সহযোগিতার জন্য বারবার শুকরিয়া জানাচ্ছিলেন। অপর দিকে, বড় অসহায়ভাবে এটাও বলছিলেন যে, ভারত হুমকি দিয়েছে, পাকিস্তানের কাছ থেকে জেএফ থান্ডার কেনা যাবে না। তা না হলে আপনাদের ঋণ ও সাহায্য সহযোগিতা বন্ধ করে দেবো। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা উৎপাদনমন্ত্রী রানা তানভীর অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে মেজবানদের কাছে স্পষ্ট করে দেন, যদি আপনাদের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাহলে এখনই নিতে হবে। কেননা মিয়ানমার, নাইজেরিয়া ও মিসরও জেএফ থান্ডার বিমান ক্রয়ের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদি তারা আগে অর্ডার দেয়, তাহলে ডেলিভারিও তাদের আগে দেয়া হবে। আর আপনারা বিমান পাবেন অনেক দেরিতে। তার কথা শুনে শ্রীলঙ্কান মেজবানরা চুক্তির জন্য রাজি হয়ে যান তবে আবেদন করেন, ওই চুক্তির কথা যেন প্রকাশ করা না হয়। শ্রীলঙ্কা সরকারের এ আচরণ এমন কিছু বাস্তবতাকে সামনে এনে হাজির করছিল, যা মেনে নিতে আমরা প্রস্তুত নই।
শ্রীলঙ্কান সাধারণ নাগরিকেরা মনে করেন, তাদের দেশকে গৃহযুদ্ধ থেকে বের করে আনতে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তা সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কায় ভারতের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেশি। আফগানিস্তানের সাথে ভারতের কোনো সীমান্ত সম্পর্ক নেই। তবুও আফগানিস্তানেও পাকিস্তানের চেয়ে ভারতের প্রভাব বেশি। অথচ আফগানিস্তান একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। বাংলাদেশও একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। তথাপি সেখানেও ভারতের প্রভাব বেশি। ইরানের সাথে পাকিস্তানের সীমান্ত সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তান কখনো ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক যড়যন্ত্রে উৎসাহ জোগায়নি। গত কয়েক দশকে ইরান ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মাঝে উষ্ণসম্পর্ক বিদ্যমান সত্ত্বেও পাকিস্তান ইরান ও সৌদি আরবের টানাপড়েনে কোনো এক পক্ষ গ্রহণ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখে। তারপরেও ইরানে ভারতের প্রভাব বেশি।
চীন ছাড়া এ অঞ্চলের সব গুরুত্বপূর্ণ দেশের সাথে পাকিস্তানের তুলনায় ভারতের সম্পর্ক বেশ ভালো। এটা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা নয় কি? এই ব্যর্থতার জন্য কি তারা দায়ী নন, যারা মূলত পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার জন্য বেশ আগ্রহী? এমন কোনো বাহাদুর নেই, যে কমপক্ষে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করবেন। এ কারণে স্বদেশের বাহাদুর কলমবাজরাও ওই ব্যর্থতার দায়ভার অন্য কারো ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের বিশ্বাসের ঝান্ডা উত্তোলন করছেন। যদি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ একজন নিয়মতান্ত্রিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্ধারণ করতেন তাহলে দুর্বল রাজনীতিবিদদের ওপর ক্রমাগত আক্রমণকারী কলামিস্ট ও টিভি ব্যক্তিত্বদের এই আপত্তি তো শেষ হতো যে, যে দেশে কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেই, ওই দেশের পররাষ্ট্রনীতি কিভাবে সফল হবে?
কিছু দিন আগে প্রধানমন্ত্রী কোয়েটার সাবেক কোর কমান্ডার নাসির খান জানজুয়াকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিযুক্ত করেন। আশা করা হয়, জানজুয়া রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করে কমপক্ষে আফগানিস্তান ও ভারতের সাথে বিবাদ মিটাতে এক প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা পালন করবেন। নাসির খান জানজুয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হওয়ার পর তার ব্যাপারে কানাঘুষার মাধ্যমে অনেক গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। তবে কানাঘুষাকারী নিজে সামনে আসার জন্য প্রস্তুত নয়। নাসির খান জানজুয়ার প্রথম পরীক্ষা ছিল ব্যাংককে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত কুমার দোভালের সাথে তার চার ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠক। ওই বৈঠকে একজন সাদাসিধা সামরিক লোকের সামনে এমন এক পুলিশ অফিসার ছিলেন যার সারা জীবন কেটেছে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে। তবে উভয়ের বৈঠক শেষে যে যৌথ ঘোষণা সামনে আসে তাতে কাশ্মিরের কথা বিদ্যমান ছিল। উফার (রাশিয়ার বাশকোরতোস্তান স্টেটের রাজধানী) যৌথ ঘোষণায় কাশ্মির ছিল না। তবে ব্যাংককের যৌথ ঘোষণায় কাশ্মির ফিরে আসার মর্ম হচ্ছে নাসির খান জানজুয়া তার সাদাসিধা ও সরল কথা দিয়ে অজিত দোভালকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করেছেন।
মোদি নওয়াজ শরিফকে প্যারিসেই উভয় দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রথমে এ বৈঠক সিঙ্গাপুরে হওয়ার কথা ছিল, পরে ব্যাংককে এ বৈঠকের জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়। ওই বৈঠকের ফলস্বরূপ সুষমা স্বরাজ ইসলামাবাদ এবং নরেন্দ্র মোদি লাহোর আসেন। ভারতে বিরোধী দল কংগ্রেস ও পাকিস্তানে তেহরিকে ইনসাফের নেতৃবৃন্দের দাবি, নওয়াজ শরিফ ও মোদির মাঝে গোপন সম্পর্কের দায়িত্ব পালন করেন ভারতীয় শিল্পপতি সাজন জিনদাল। নওয়াজ শরিফ ২০১৪ সালে মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে দিল্লি যান। তিনি ওই সময় জিনদালের বাসায় চা পান করেছিলেন। ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ মোদি লাহোর আসেন। ওই সময় জিনদাল আগে থেকেই লাহোরে অবস্থান করছিলেন। তবে নওয়াজ শরিফ ও মোদির বৈঠকের সময় তাকে দেখা যায়নি।
ভারত ও পাকিস্তানের মিডিয়া জিনদালের ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চেপে গেছে। জিনদালের পরিবারের সম্পর্ক সর্বদা কংগ্রেসের সাথে। তার ভাই ও বিজনেস পার্টনার নবীন জিনদাল কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচনে লড়াই করেছেন। তাহলে জিনদাল মনমোহন সিং ও নওয়াজ শরিফকে কাছে আনতে গোপন কূটনীতি কেন করেননি? নওয়াজ শরিফ জিনদালকে বেশ কয়েক বছর ধরে জানেন। তবে ২০১৪ সালে নওয়াজ শরিফকে মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তাব অজিত দোভাল করেছিলেন, জিনদাল করেননি। জিনদাল নিজেই স্পষ্ট বাক্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তিনি কখনো নেপাল বা পাকিস্তানে মোদি ও নওয়াজ শরিফের বৈঠকের ব্যাপারে কোনো ভূমিকা পালন করেননি। এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, পারভেজ মোশাররফ যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন তার সাথেও জিনদালের সম্পর্ক ছিল। কেননা জিনদাল রাজস্থানের পথ দিয়ে পাকিস্তানের কাছে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রয় করতে আগ্রহী ছিলেন।
মূল কথা হচ্ছে, পাক-ভারত বিবাদ নিরসনে শুধু এক সাজন জিনদালের উপকার হবে না বরং পুরো অঞ্চলের উপকার হবে। পাঠানকোট হামলার পর পাকিস্তানের কাছে দাবি করা হয়েছে, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একটি গ্র“প হামলার দায় স্বীকার করেছে, কিন্তু ভারত প্রশাসন ওই দায় স্বীকারকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কেননা হামলাকারীদের ফোনকল হামলার আগে ট্রেস করা হয়েছিল। তবে ভারতের পুলিশ ও ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলো তাদের অযোগ্যতার কারণে হামলা প্রতিরোধ করতে পারেনি। অবশ্য ভারত প্রশাসন হামলার আগে পাকিস্তানকে হামলার আশঙ্কার ব্যাপারে সতর্ক করেছিল।
এটা বেশ ভালো সংবাদ যে, প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বে পাঠানকোটের ঘটনা নিয়ে চিন্তাভাবনার জন্য যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় তাতে আর্মি চিফ এবং আইএসআইয়ের ডিজিও উপস্থিত ছিলেন। পাঠানকোটে হামলার ঘটনা মোদি সরকারের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। কেননা এ নিয়ে তার সমালোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করো না। তবে যদি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃবৃন্দ পাঠানকোট ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নেয়, তাহলে পাক-ভারত আলোচনার কার্যক্রম সঠিক দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে। পাকিস্তান তার রাজনৈতিক উত্তম চরিত্র গঠন করে বিশ্বের সামনে এ দাবি তুলে ধরতে পারবে, পাকিস্তান ও ভারতের মূল বিবাদ জম্মু কাশ্মির। যতক্ষণ পর্যন্ত কাশ্মিরিদের সাথে নিয়ে এ সমস্যা সমাধান না হবে, ততক্ষণ এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের উচিত, তিনি কাশ্মির নিয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরি করবেন এবং পার্লামেন্টকে সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবেন। তা না হলে পাঠানকোটের মতো সমস্যা বন্ধ হবে না।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ১১ জানুয়ারি ২০১৬
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব ahmadimtiajdr@gmail.com
* হামিদ মীর : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক

প্রকৌশলীদের কাছে প্রত্যাশা by আনিসুজ্জামান

ড. রশীদ স্মারক বক্তৃতা প্রদানের আহ্বান জানিয়ে আমাকে যে-সম্মান দেওয়া হয়েছে, তার জন্য ড. রশীদ ফাউন্ডেশনকে, বিশেষ করে এর চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক খালেদা একরাম এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. রশীদ চেয়ার অধ্যাপক আবদুল মতিনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের ছাত্রজীবন থেকে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থী বন্ধুদের কাছে ড. মোহাম্মদ আবদুর রশীদের সুনাম শুনে এসেছি। বুয়েট-প্রতিষ্ঠার পর এর উপাচার্যরূপে তাঁর কাজকর্ম তাঁর সে-সুনামকে বোধ হয় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তাঁর কঠোর শৃঙ্খলাবোধ, সব ধরনের নিয়মানুবর্তিতা, সহকর্মীদের প্রতি সৌজন্যবোধ, ছাত্রদের প্রতি ভালোবাসা, তাঁর বিদ্যানুরাগ, পূর্ব বাংলায় প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারে তাঁর ভূমিকা—এসবই প্রবাদপ্রতিম হয়ে ওঠে। ব্যক্তির সীমা ছাড়িয়ে তিনি হয়ে ওঠেন একটি প্রতিষ্ঠান। আমি তাঁকে দূর থেকে দেখেছি এবং মনে মনে শ্রদ্ধা জানিয়েছি।
অবশ্য একবার তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। বোধ হয় ১৯৭৮ সালে, ভূমিধসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী নিহত হন এবং সম্পদেরও বেশ হানি ঘটে। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টারূপে ড. রশীদ সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখতে আসেন। তিনি এসেছিলেন হেলিকপ্টারে করে, তবে তাঁর পায়ে ছিল এক জোড়া কেডস। বোঝাই যাচ্ছিল যে, অমসৃণ জায়গায় নেমে পড়ার জন্য তিনি তৈরি হয়ে এসেছিলেন। হলোও তাই। চলতে চলতে হঠাৎ তিনি এক লাফে সমতল থেকে অনেকটা নেমে গিয়ে কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করলেন। ক্যাম্পাসে একটি পাহাড়ি ঝরনার ধারাকে কৃত্রিম খালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল, দুর্ঘটনার দিনে ঝরনাটি সেই খালের শাসন অমান্য করে বেরিয়ে এসেছিল। খালের নকশা যিনি করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন বুয়েটেরই ছাত্র। সে কথা জেনে ড. রশীদ তাঁকে বললেন, ‘আপনার ডিগ্রি কেড়ে নেওয়া উচিত।’ চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঝরনার বেগ ও খালটির এলাকার মাটির প্রকৃতি সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে ড. রশীদ তাঁকে বুঝিয়ে দেন, কেন ওই নকশা সেখানে অচল। তাঁর সেই ভৎ৴সনা ক্ষমতাসীনের হুংকার ছিল না, ছিল শিক্ষকের হতাশাজনিত তিরস্কার ও যথার্থ জ্ঞানদান-প্রবৃত্তির মিশ্র অভিব্যক্তি। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ সেদিন প্রবল হয়েছিল।
সেই অনুভূতি থেকেই আমি সাগ্রহে ড. রশীদের নামাঙ্কিত স্মারক বক্তৃতা প্রদান করতে সম্মত হই। যে-বিষয়ে আমাকে বলতে বলা হয়েছে, সে-সম্পর্কে আমার ধারণার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতাও আমাকে এ-কাজ থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি।
দুই
সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই, মনে হয়, কোনো না কোনো রূপে প্রকৌশলবিদ্যার চর্চা শুরু হয়েছে। মানুষের প্রয়োজনবোধ ও স্বভাবজাত উদ্ভাবন নৈপুণ্য থেকে ব্যক্তি বা সমষ্টির উদ্যোগে তা সম্পন্ন হয়েছিল। যাঁরা চাকা আবিষ্কার করেছিলেন, তাঁদের নিশ্চয় অধীত বিদ্যা বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। কিন্তু এক চাকাই সভ্যতাকে কী অপরিসীম অগ্রগতি দান করেছিল!
বইপত্রে দেখি, ইঞ্জিনিয়ার শব্দের মূল অর্থ ছিল ইঞ্জিনচালক এবং এখানে ইঞ্জিন বলতে বোঝানো হয়েছিল সামরিক কোনো যন্ত্র। ইঞ্জিন শব্দের সেই অর্থ এখন আর প্রচলিত নেই, কিন্তু সেই সূত্রে ইঞ্জিনিয়ার মানে ছিল সামরিক যন্ত্রবিদ্। অর্থাৎ সামরিক যন্ত্রকৌশল হিসেবেই ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দের আদি ব্যবহার, পরে, এর প্রতিতুলনায়, ভবন ও সেতুর মতো বেসামরিক নির্মাণের ধারাটি পরিচিতি পায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বলে।
তবে এটা খুব ন্যায়সংগত মনে হয় না। মিসর ও মেক্সিকোর পিরামিড, ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান কিংবা চীনের প্রাচীরের মতো কাজ মানব মনীষার সেরা নিদর্শন বলে গণ্য। এসব অসাধারণ উদ্ভাবন কেন সামরিক প্রকৌশলের অনুবর্তী বলে বিবেচিত হবে? এসবের সঙ্গে সামরিক প্রকৌশলের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এর ধারাবাহিকতায় আজও মানুষের উদ্ভাবনী প্রতিভা নতুন নতুন সৃষ্টিসম্ভার আমাদের উপহার দিচ্ছে। অবশ্য সামরিক প্রকৌশলেরও চোখ-ধাঁধানো বিকাশ আমরা লক্ষ করেছি—বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পারস্পরিক সহযোগে মারণাস্ত্র-নির্মাণে মানুষের অগ্রগতির পরিণাম সভ্যতা বিধ্বংসী পারমাণবিক অস্ত্রের আবিষ্কার। জাপানে আণবিক বোমার ভয়াবহ ধ্বংসলীলা তার উদ্ভাবকদের অনুশোচনার কারণ হয়েছিল। তার ফলে পুরো পঞ্চাশ দশক ধরে অ্যাটম ফর পিস বা শান্তির জন্য পরমাণুর কথা আমরা শুনেছি। পরমাণুর শান্তিপূর্ণ ব্যবহার যে সম্ভব হয়নি, তা নয়। তবে মারণাস্ত্রের যে-মজুত মানুষের আছে—তার কিছু কিছু ধ্বংস করার পরও—তা মানবসভ্যতাকে কয়েকবার ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের কারণে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদের অপরাধবোধ তাঁদের সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে। এই দায়বদ্ধতা উদ্ভাবন ও নির্মাণের সকল স্তরেই বিদ্যমান। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাবিজ্ঞান-বিষয়ের এক স্প্যানিশ শিক্ষিকা কথায় কথায় আমাকে একবার বলেছিলেন, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে কয়েকটি ধনী দেশের যৌথ অর্থসাহায্যে আফ্রিকার একটি দরিদ্র দেশে নদীর ওপরে একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা হয় এবং তার নকশা প্রণয়ন করতে ওই শিক্ষিকার পিতাকে আহ্বান জানানো হয়। ভদ্রলোক সে দেশে গিয়ে সরেজমিনে সবকিছু দেখে এসে এই কাজের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন। কেননা, তাঁর মতে, সেখানে যে-ধরনের সেতু নির্মাণ করতে হবে, তার রক্ষণাবেক্ষণের সামর্থ্য ওই দেশের নেই। দাতারা সেতু তৈরি করে দেবেন বটে, কিন্তু তারপর তো ওই সেতুর বিষয়ে তাঁদের কোনো দায়িত্ব থাকবে না। তখন সেতুটি সে-দেশের সম্পদ না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আমার কাছে ওই ঘটনাটি সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলে মনে হয়। তিনি এত কিছু না ভেবে কাজটি করে দিতে পারতেন, ফল যাদের ভোগ করার কথা, তারা তা করত।
বস্তুত, প্রত্যেক উদ্ভাবন ও নির্মাণের সামাজিক প্রতিক্রিয়া আছে। আমাদের দেশেই দেখা যায়, একটি রাস্তা বা সেতু তৈরি হলে তার চারপাশের জনজীবনে পরিবর্তনের একটা হাওয়া বয়ে যায়। প্রতিক্রিয়া যে সব সময়ে ইতিবাচক হয়, তা তো নয়। কোনো কাজের ফলে পরিবেশ দূষিত হয়। কোথাও বা প্রকৃতিকে বেশি শাসন করতে গিয়ে তার প্রতিশোধ ডেকে আনা হয়। ভালো মনে করে যে-প্রকল্প হাতে নেওয়া
যায়, তার ফল অনেক সময়ে ভালো হয় না। ভালোর সঙ্গে মন্দের এই যোগের কথা মনে রেখেই এর মূল্য নিরূপণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের দায়িত্ব খুব বড়। তাঁরা সে-দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাঁদেরই মুখ ফুটে এই ভালোমন্দ প্রতিক্রিয়ার কথা প্রকল্পের প্রস্তাবকদের বুঝিয়ে দিতে হবে। এই সামাজিক দায়িত্ববোধ তাঁদের পেশায় অঙ্গীভূত করে দেখা দরকার।
এসব কথা মাথায় রেখে অনেক দেশের প্রকৌশলী সমিতি সদস্যদের জন্য পেশাগত ও নৈতিক মূল্যবোধগত নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন এবং দেশের জনসাধারণকেও তা জানিয়ে দিয়েছেন। আমাদের দেশের প্রকৌশলীরাও হয়তো এ-ধরনের নীতিমালা তৈরি করেছেন, তবে জনসাধারণ সে-সম্পর্কে অবহিত বলে মনে হয় না। জনসাধারণকে এসব নীতিমালা জানিয়ে দেওয়াও প্রকৌশলীদের সামাজিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য এ কথাও মানতে হবে যে, জনসাধারণের শিক্ষার স্তর ও মান উন্নত না হলে এসব অবহিতকরণ ফলপ্রসূ হয় না। তবু জনসাধারণকে তা জানানো দরকার। আজ যদি দশজন তা হৃদয়ঙ্গম করে, কাল এক শ জন তা বুঝতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী তাদের প্রত্যাশা বাড়বে।
নীতির সঙ্গে দুর্নীতির কথাও এসে পড়ে। বাংলাদেশে দুর্নীতি এত ব্যাপক যে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কয়েকবার আমরা প্রথম স্থান অধিকার করেছি। এই হিসাব যদি গ্রাহ্য নাও করি, তাহলেও নিজেদের অভিজ্ঞতায় দেখতে পাই, দুর্নীতি সকল ক্ষেত্র গ্রাস করেছে। কেউ দুর্নীতি করে অভাবে পড়ে, কেউ লোভে পড়ে। অভাবগ্রস্তদের দুর্নীতির চেয়ে লোভীর দুর্নীতি নানা দিক দিয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হয়। এ ক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের যে কিছু দুর্নাম রয়েছে, তা বোধ হয় অস্বীকার করার উপায় নেই। সব পেশার মতো, এখানেও সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত নন এবং চারপাশের দুর্নীতির মধ্যে অনেকেই সততাকে আঁকড়ে থাকেন শেষ পর্যন্ত। প্রকৌশলীদের দুর্নামের জন্য আমরা অধিক বিচলিত হই এ-কারণে যে, দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররাই প্রকৌশলী হয়। বুয়েটে আশির দশকে ছাত্র ছিলেন, এমন একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক ও সাহিত্যিক একবার আমাকে বলেছিলেন যে, তাঁর ছাত্রাবস্থায় এখানকার ছাত্রদের মধ্যে দুবার জরিপ চালানো হয়েছিল। দুবারই দেখা গিয়েছিল, আশি শতাংশ ছাত্র বলেছেন, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সুযোগ পেলে তাঁরা উৎকোচ গ্রহণ করবেন। আমার তথ্যদাতা আমার সঙ্গে রহস্য করছিলেন না, এ-বিষয়ে আমি নিশ্চিত; আমাকে ভুল তথ্য দেওয়ারও কোনো কারণ তাঁর ছিল না। বলা বাহুল্য, এ-কথা শুনে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আশা করি, অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এবং সততার পক্ষে থাকার লোক বেড়েছে। অবশ্য কেউ যদি বলেন, আমার উদ্ধৃত তথ্য ভুল, তাহলে আমি সবচেয়ে খুশি হব।
তবে দেশের উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় আমাদের প্রকৌশলী ও স্থপতিদের সফল ভূমিকার কথা আনন্দের সঙ্গে উল্লেখ করতে হবে। আজ দেশের সর্বত্র উন্নয়নের যে-পালা চলছে, তার প্রতিফলন দেখতে পাই পথ-ঘাট, কালভার্ট-সেতু, ভবন-স্থাপনা নির্মাণে। এসবের মধ্যে প্রকৌশলী ও স্থপতিদের হাতের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। প্রকৌশলবিদ্যার নানা শাখা-প্রশাখার পঠন-পাঠন যেমন বিকশিত হচ্ছে, আমাদের প্রকৌশলীরা তেমনি সেসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে বিশ্বের অধুনাতম অগ্রগতির সঙ্গে তাঁরা পরিচিত এবং তার একটা সুবিধা আমরা সবাই মিলে ভোগ করছি।
প্রকৌশলীদের কাছে আমার আরেকটি প্রত্যাশা আছে, তবে তা পূরণ করা তাঁদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে না। তা হলো, দেশের পরিকল্পনা-প্রণয়নে অংশগ্রহণ। বেসরকারি খাতের অধিকতর সমাদর সত্ত্বেও বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশন এখনো গুরুত্বহীন হয়ে পড়েনি। বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনে যত সদস্য এ-পর্যন্ত নিয়োগ পেয়েছেন, মোট সদস্যের তুলনায় প্রকৌশলীর সংখ্যা তাতে খুব কম। অথচ দেশের সার্বিক পরিকল্পনা-প্রণয়নে প্রকৌশলীদের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। অবকাঠামো-নির্মাণ, উৎপাদন-প্রক্রিয়া-নির্ণয়, বৈজ্ঞানিক নীতির প্রয়োগ, পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন-ব্যবস্থার সাড়া সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিশেষ মূল্যবান। তা থেকে দেশবাসীকে বঞ্চিত করা সংগত নয়। নীতিনির্ধারকদের কাছে এই আমার নিবেদন।
তিন
বুয়েটের বা তার পূর্বসূরি আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রদের মধ্যে উত্তর জীবনে যাঁরা আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী হয়েছেন, তাঁদের একটি তালিকা আমার হাতে এসেছে। এতে যেসব নাম আছে, এখন আমি তা পড়ে শোনাচ্ছি: মরহুম ফজলুর রহমান খান, পুরকৌশলী ও স্থপতি; নাসিরউদ্দীন আহমদ, প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অব অটোয়া; আজিজুর রহমান, ফেলো, রয়াল সোসাইটি অব কানাডা; ফজলে হোসেন, প্রেসিডেন্ট’স ডিস্টিংগুইশ্ড চেয়ার, টেক্সাস টেক এবং ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউএস; তারিক দুররানী, প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর, স্ট্রাথক্লাইড ইউনিভার্সিটি এবং ফেলো, রয়াল অ্যাকাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউকে; রফিকুল গনি, প্রফেসর, ডেনমার্ক টেক, এবং প্রেসিডেন্ট, ইউরোপিয়ান ফেডারেশন অব কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং; সাইফুর রহমান, জোসেফ আর লোরিং প্রফেসর, ভার্জিনিয়া টেক, এবং আইইইই পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট-ইলেকট; তাহের শরীফ, গাটসগেল প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়; কাশেফ চৌধুরী, স্থপতি, আর্কিটেকচারাল রিভিউর এআর+ডি ইমার্জিং আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড ২০১২তে ভূষিত; রফিক আজম, স্থপতি।
এ-তালিকা হয়তো অসম্পূর্ণ। স্বদেশে খ্যাতিমান এমন অনেক কৃতী প্রকৌশলী ও স্থপতির নাম এ-সঙ্গে আসতে পারে। কিন্তু যে-কথা আমি বলতে চাই, তার জন্য এই দশটি নাম যথেষ্ট। বুয়েট শুধু বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যায়তন নয়, বুয়েট সারা পৃথিবীতে নিজের জায়গা করে নিয়েছে তার কৃতী ছাত্রদের বদৌলতে। এখানকার ছাত্র হওয়া এবং শিক্ষক হতে পারা তাই বিশেষ গৌরবের বিষয়। আর খ্যাতির এই পথনির্মাণে ড. রশীদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
গত ১৫ জানুয়ারি (২০১৬) বুয়েট মিলনায়তনে দেওয়া ড. রশীদ মেমোরিয়াল লেকচার
আনিসুজ্জামান: লেখক ও শিক্ষাবিদ। ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রধান বিচারপতিকে সংযত হয়ে কথা বলার পরামর্শ দিলেন সুরঞ্জিত

প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে সংযত হতে এবং কম কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সোমবার এক অনুষ্ঠানে  এমন পরামর্শ দিয়ে আওয়ামী লীগের এ প্রবীণ নেতা বলেন, অবসরে যাওয়ার পর বিচারকদের রায় লেখা ‘সংবিধান পরিপন্থি’ বলে বক্তব্য দিয়ে প্রধান বিচারপতি অনধিকার চর্চা করেছেন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, সাংবিধানিকভাবে তিনি (প্রধান বিচারপতি) দেশের প্রধান তিনজনের একজন। প্রধান বিচারপতিরা প্রধান বিচার করেন, প্রধান প্রধান কথা বলেন না। এই পদে থেকে সাধারণত প্রধান কথা শোনা যায় না। এই পদে   থেকে তিনি এমন কিছু কথা বলে ফেলেছেন, যা জাতীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এভাবে কথা বলতে বলতে তিনি কোথায় চলে যাচ্ছেন, তার সীমানা থাকছে না।
সুরঞ্জিত বলেন, তিনি এমন কিছু কথা বলেছেন, যা সংবিধানের কোথাও নেই। সংবিধান রচনা করেছি আমি। সংবিধানের কোন জায়গায় লেখা আছে যে বিচারপতিরা অবসরে গেলে রায় লেখা যাবে না? এ কথা সংবিধানের কোথাও লেখা নেই। উনি যা বলেছেন, এটা তো কোনো আইন নয়। উনি যদি মনে করেন, শপথ শেষ হয়ে গেলে আর বিচার দেখতে দেব না, সেটা অবসরে যাওয়ার কতদিন আগ থেকে, জাজমেন্ট ঘোষণা করতে হবে? এটাও আইনে আনতে হবে।
প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনারা দুই বিচারপতির মধ্যে গোলমাল, আক্রোশ-বিক্রোশ, এটা বাইরে আসবে কেন? আমি এবং তুমি- এটা জনগণ জানবে কেন? আপনাদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে, আর আপনি সেটা নিয়ে পাবলিকলি কথা বলে অনেককে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন। নিজস্ব কোন্দলের জন্য জাতীয়ভাবে এত বড় একটা উত্তেজনা সৃষ্টি করবেন, এটা আমরা আশা করি না।
‘বিচার বিভাগের ক্ষমতা কেড়ে নিতে চায়’-প্রধান বিচারপতির এ বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে সুরঞ্জিত বলেন, আপনাকে প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দেয়ার পর রাগ-অভিমান-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে দেশের জন্য, জাতির জন্য কাজ করে যাওয়ার কথা। আর আপনি বলে উঠলেন, আপনার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হচ্ছে! আইনের শাসনের যুগ, আপনারা তো স্বাধীন আলাদা। সংবিধানে স্পষ্ট লেখা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি এই তিনটি অঙ্গনই একে অপরের পরিপূরক। প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনি কথাবার্তা আরও সংযত হয়ে বলুন। এমন কোনো কথা বলবেন না, যা জাতীয় জীবনে-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে, সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
যত কথা কম বলা যায়। একেবারে বাক সংযত। আপনার এখনও সময় আছে। প্রতিষ্ঠানটির কথা চিন্তা করুন।

শহরাঞ্চলে ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন by শাহ্ আব্দুল হান্নান

বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোতে ছিন্নমূলদের সংখ্যা অনেক। বিশেষ করে ঢাকায়। এরা নানা ধরনের হয়ে থাকে- ১. ছিন্নমূল শিশু। ওরা পিতামাতার আশ্রয়ে নেই। রাস্তায় থাকে। এরা শেষ পর্যন্ত অপরাধীতে পরিণত হয়। ২. ছিন্নমূল নারী, যাদের সাথে শিশু থাকতে পারে, না-ও থাকতে পারে। তবে সাথে স্বামী নেই, এরাও রাস্তায় থাকে। কোনোভাবে ভিক্ষা করে জীবন যাপন করে। ৩. ছিন্নমূল পরিবার- স্বামী, স্ত্রী, শিশু। কোনো বাসস্থান নেই। রাস্তায় বা ঝুপরিতে থাকে। তাদেরও কোনো নিয়মিত রোজগার নেই। নানা স্থানে কাজ করে কিছু উপার্জন করে। ৪. বস্তিবাসী, যাদের থাকার ব্যবস্থা শোচনীয়। পানির অভাব এবং পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা খুব খারাপ।
প্রথম তিন ধরনের লোকেরা সাধারণত শহরে আসে নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে এবং মঙ্গা অঞ্চল থেকে, কাজ না পেয়ে। নদীভাঙনে প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার লোক সর্বস্ব হারায় এ দেশে। তারা বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারে না। তাদের পুনর্বাসনের যথাযথ ব্যবস্থা নেই। এদের বেশির ভাগ বড় বড় শহরে চলে আসে, বিশেষ করে ঢাকায়।
নদীভাঙনের শিকার মানুষের পুনর্বাসনের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা করতে হবে। ভূমি মন্ত্রণালয় এর মূল দায়িত্বে থাকবে। তাদেরকে সমন্বয় করতে হবে পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়, সমাজসেবা মন্ত্রণালয়, নারী মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে। তাদের উচিত একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে নদীভাঙনের শিকার লোকদের আর শহরে আসতে না হয়। তাদেরকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখতে হবে। পরে তাদের খাস জমিতে আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদেরকে কিছু আর্থিক সাহায্য দিতে হবে, যাতে তারা কোনো কাজ করে চলতে পারে।
সর্বপ্রথম উল্লিখিত পথশিশুদের শহরেই আশ্রয়কেন্দ্রে রাখতে হবে। সেখানে শিশুদের শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা পরবর্তীকালে কাজ করে খেতে পারে। সরকারও বড় বড় এনজিওকে এ কাজে সম্পৃক্ত করতে পারে এবং ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলকে ভাগ করে তাদের দায়িত্ব নিতে বলতে পারে। সরকার এনজিওগুলোকে সাহায্যও করতে পারে এ ক্ষেত্রে। এ ব্যবস্থা ঢাকা ছাড়া অন্যান্য প্রধান শহরেও করা যায়। জেলা ও উপজেলায় এ দায়িত্ব পৌরসভাকে দিতে হবে। সরকার তাদেরকে এ কাজে পর্যাপ্ত সাহায্য করা উচিত।
দুই নম্বরে উল্লিখিত নারীদের অবস্থা সবচেয়ে বিপজ্জনক। তারা রাস্তায় থাকার কারণে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। তাদের পুনর্বাসন খুব জরুরি। তাদেরকেও এনজিও, সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে বড় শহরগুলোতে পুনর্বাসন করতে হবে। তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। ছোট শহরগুলোতে পৌরসভার মাধ্যমে পুনর্বাসন করতে হবে। তাদের বিভিন্ন কাজ শিক্ষা দিতে হবে। আর্থিক সাহায্য দিতে হবে।
তৃতীয় নম্বরে উল্লিখিত পরিবারগুলোকে তাদের গ্রামে বা উপজেলায় পুনর্বাসন করতে হবে। এর দায়িত্ব থাকবে উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার ওপর। সরকার তাদেরকে সাহায্য করবে।
সর্বশেষ, বস্তিগুলোর সার্বিক উন্নয়ন করতে হবে। বিশেষ করে পানি, পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা ও প্রাইমারি শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রত্যেক বেকার পরিবারের একজনকে বেকারভাতা দিতে হবে।
বিষয়টি অনেক ব্যাপক ও অনেক গভীর। একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করা দরকার। আর অবহেলা করা উচিত হবে না। সরকার, সিটি করপোরেশন, এনজিও ও পৌরসভাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এ ব্যাপারে।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

উকিল পিতার অনৈতিক প্রস্তাব- গজারিয়ায় নব দম্পতির হৃদয়বিদারক পরিণতি

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার গোসাইর চর গ্রামে উকিল পিতার অনৈতিক প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় স্বামীকে মেরে ফেলার হুমকিতে বিষপানে আত্মহত্যা করেছে নব দম্পতি। নিহত দম্পতির নাম জাহিদ হাসান (২০) ও তার স্ত্রী ঊর্মি আক্তার (১৮)।
প্রতিবেশী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, নাজির চর গ্রামের সানাউল্লাহ্ মিয়ার ছেলে জাহিদ হোসেনের সাথে গোসাইর চর গ্রামের আমিরুল ইসলামের মেয়ে ঊর্মি আক্তারের প্রণয় ছিল। গত দুই মাস আগে পারিবারকভাবে তাদের বিয়ে হয়। তবে ঊর্মির মা মালেকা বেগম ছাড়া উভয় পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য মন থেকে এই বিয়ে মেনে নিতে পারেনি। বিয়ের পর থেকেই উভয় পক্ষের আত্মীয়রা নব দম্পতিকে বিয়ে বিচ্ছেদের জন্য বিভিন্ন উপায়ে চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। অন্যদিকে নিহত ঊর্মির সৎ খালু ও উকিল পিতা মিজানুর রহমান ঊর্মিকে বিরক্ত করতো, অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে উত্যক্ত করতো।
ঘটনার আগের দিন রাতে ও পরদিন সকালে মিজানুর রহমান ও তার মেয়ের জামাই মহিউদ্দিন মিয়ার অব্যাহত চাপ ও হুমকির কারণে গত শনিবার সকালে ঊর্মির নানার বাড়িতে নব দ¤পতি বিষ জাতীয় পদার্থ পান করে। সকাল পৌনে দশটায় প্রতিবেশীদের সহয়তায় আসংখ্যাজনক অবস্থায় তাদের প্রথমে গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে জাহিদ হাসান পরে ঊর্মি আক্তার মৃত্যু হয়।
নিহত ঊর্মির মা মালেকা বেগম জানান, তার সৎ বোনের স্বামী ও ঊর্মির উকিল পিতা মিজানুর রহমান ঊর্মিকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। সে তাকে বিয়ে করারও প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ঊর্মি রাজি না হওয়ায় মিজানুর রহমান ও মহিউদ্দিন মিয়া দ¤পতিকে মারধর, চাপ, হুমকি দেয়। গত কয়েকদিন আগে মিজান ও তার ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা ঊর্মির স্বামী জাহিদকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ঊর্মিকে তালাক দিতে বলে, অন্যথায় তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এ কারণেই উর্মি-জাহিদ বাধ্য হয়ে আত্মহত্যা করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে গজারিয়া থানার অফিসার্স ইনচার্জ মো: হেদায়েত উল ইসলাম ভূঁইয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসেছে এখনো পর্যন্ত আমরা কোন লিখিত অভিযোগ পাইনি।
ঘটনার পর থেকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়ে অভিযুক্ত মিজানুর রহমান ও মহিউদ্দিন মিয়া পলাতক রয়েছে।
এদিকে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স দুটি গোসাইর চর পৌছালে সেখানে এক হৃদয় বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নিহতদের স্বজন ও প্রতিবেশীরা। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মিজান ও মহিউদ্দিনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তারা।

রাজনীতিতে আসার খবর উড়িয়ে দিলেন সোহেল তাজ

প্রধানমন্ত্রীর সাথে আবেগঘন সাক্ষাতের পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয় ফের রাজনীতিতে আসছেন তানজীম আহমেদ সোহেল তাজ। তবে এ সম্ভবনা উড়িয়ে দিয়ে সোহেল তাজ জানিয়েছেন, তার রাজনীতিতে আসার খবর সত্য নয়।
শনিবার রাতে দুই বোনকে নিয়ে গণভবনে যান সোহেল তাজ। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কিছু সময় কাটান। পরে এই সময়ের কিছু ছবি ফেসবুকে দেন বোন মাহজাবিন আহমেদ মিমি। তার এ ছবি প্রকাশের পর আলোচনা শুরু হয় সোহেল তাজ ফের রাজনীতিতে আসছেন। তাকে আওয়ামী লীগে দায়িত্ব দেয়া হবে বলেও কেউ কেউ আলোচনা করেন। এ বিষয়ে সোমবার নিজের ফেসবুকে এক পোস্টে সোহেল তাজ লিখেছেন, বন্ধু আর শুভানুধ্যায়ীদের অবগতির জন্য বলছি, আমার রাজনীতিতে ফেরার যে খবর বেরিয়েছে তা পুরোপুরি অসত্য।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জানাতেই সেদিন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা গণভবনে গিয়েছিলেন।
স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, আমাদের মনে হয়েছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অমূল্য পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা এই ফাউন্ডেশনকে কার্যকর করতে সহায়ক হবে। তিনি কেবল বাংলাদেশের জনগণের অভিভাবক নন, বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রক্ষক। কজেই আমাদের এই উদ্যোগে আমরা তার সহযোগিতা ও আশির্বাদ চাইব- সেটাই স্বাভাবিক।
প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে সোহেল তাজ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে এমপি হন। পরে তাকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। তবে দায়িত্ব নেয়ার বছরেই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে সোহেল তাজ যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। ছেড়ে দেন সংসদ সদস্য পদও। পরে নিজের ছেড়ে দেয়া গাজীপুরের আসনে এমপি হন বোন সিমিন হোসেন রিমি।