Monday, November 27, 2017

রোহিঙ্গা সংকটে সমঝোতা: চীনের হাত স্পষ্ট, হাত কামড়াচ্ছে ভারত

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো নিয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে যে সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে স্পষ্টই চীনের ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ দেখতে পাচ্ছে ভারত। একইসঙ্গে তারা কিছুটা হাতও কামড়াচ্ছে!
ভারতের আফসোসের কারণ— প্রায় তিন মাস সময় পাওয়ার পরও রোহিঙ্গা প্রশ্নে দিল্লি কোনও নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারলো না। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চীন হয়তো নাক গলাবে না, ভারতের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। কারণ চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পেশ করা ফর্মুলার বেশকিছুটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মেনে নিলো মিয়ানমার ও বাংলাদেশ।
গত ২৩ নভেম্বর নেপিদোতে ওই দলিল স্বাক্ষরিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বিকালে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এই সমঝোতার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়। তখন মুখপাত্র রবীশ কুমার নিজের অস্বস্তি গোপন করতে না পেরে বলে ফেলেন, ‘যেটা এখন ঘটছে সে বিষয়ে কী মন্তব্য করবো বলুন তো? আর রাখাইন প্রদেশের বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিয়ে কী করা উচিত, তা আমরা আগে অনেকবারই বলেছি। মনে হয় না এর পুনরাবৃত্তির কোনও প্রয়োজন আছে।’
ভারতে তখন বেজেছে বিকাল সাড়ে ৪টা।
নেপিদোতে সই-সাবুদ শেষ হয়ে গেছে এর বেশ আগেই। ঘটনা হলো, তারপর প্রায় সাড়ে তিন দিন কেটে গেলেও ভারত এই সমঝোতা নিয়ে এখনও কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া দেয়নি। না গণমাধ্যমে, না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে।
এদিকে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে কথা মুখ ফুটে বলতে পারছে না, তা সরাসরি বলে দিলো দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র ‘দ্য হিন্দু’র সম্পাদকীয়। সেখানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতাকে ‘চায়না প্ল্যান’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। চীনের মধ্যস্থতাতেই যে মূলত দুই দেশ মুখোমুখি আলোচনার টেবিলে বসে দলিলে স্বাক্ষর করেছে তা পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে জানানো হয়েছে দ্ব্যর্থহীন ভাষায়।
ভারতের কূটনৈতিক মহলের আক্ষেপ ঠিক এই জায়গাতেই— যে কাজটা আগে উদ্যোগ নিলে হয়তো দিল্লি করতে পারতো, শেষবেলায় এসে চীন কিনা বাজিমাত করে দিলো!
মিয়ানমারে ভারতের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন এমন এক সাবেক কূটনীতিক রবিবার (২৬ নভেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, ‘মিয়ানমার ও বাংলাদেশ উভয়ে আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ। কাজেই রোহিঙ্গা সমস্যা আমাদের জন্য এক উভয় সংকট। অতএব কিভাবে ভারসাম্য রাখা উচিত গত তিন মাস ধরে আমরা শুধু সেসবই ভেবে গেলাম। অথচ চীনের জন্যও পরিস্থিতি একই রকম ছিল। কিন্তু তারা ঠিক মোক্ষম সময়ে এসে একটা নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়ে গেলো।’
দিনকয়েক আগেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং উই বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরে এসে তার তিন দফা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ফর্মুলা পেশ করেন। পরে বেইজিংয়ের দাবি ছিল— দুই দেশই তা মেনে নিয়েছে।
অথচ গত সেপ্টেম্বরে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও ঢাকায় গিয়েছিলেন। এমনকি রোহিঙ্গা সংকটের একেবারে শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও মিয়ানমার সফরে গিয়েছিলেন। মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে সুষমা স্বরাজ ও শেখ হাসিনার কথাবার্তা হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবরাও গত তিন মাসে নিউ ইয়র্ক, কলম্বো, এমনকি দিল্লিতেও একাধিকবার নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছেন। কিন্তু সেগুলো মোটেও ফলপ্রসূ হয়নি।
এ কারণে রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ দ্বিধাই শেষ পর্যন্ত কাল হলো। আর চীন এসে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলো এ ধরনের বিরাট সংকটে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ কার ওপর বেশি ভরসা রাখতে রাজি।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহল অবশ্য দাবি করছে, চীনের আগে প্রথমে তারা ভারতের ওপরেই ভরসা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের সিদ্ধান্তহীনতা আর দোলাচলই শেষ পর্যন্ত চীনের দিকে ঠেলে দিয়েছে তাদের। কারণ বাংলাদেশ একটা প্রত্যাবাসন সমঝোতা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। আর তাদের হাতে সময়ও ফুরিয়ে আসছিল দ্রুত। এই সমঝোতার বাস্তবায়ন কতটা ফলপ্রসূ হবে, কতজন রোহিঙ্গাকে কত দ্রুত ফেরানো যাবে সেগুলো অন্য প্রশ্ন। কিন্তু আপাতত চীনের মধ্যস্থতাতেই যে দুই দেশের মধ্যে একটা ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট’ সম্ভব হয়েছে তা নিয়ে কেউই সন্দেহ প্রকাশ করছেন না।
বাংলাদেশের একজন শীর্ষ কূটনীতিক হাসতে হাসতে এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, “এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল, তাই না? মিয়ানমারে চীনের লগ্নি ১০০ বিলিয়ন ডলার হলে সেই তুলনায় সেখানে ভারতের ১০ ভাগও বিনিয়োগ নেই। আমরা এখন বুঝে গেছি— মিয়ানমারের জন্য ভারত বা জাপান ‘বয়ফ্রেন্ড’ হতে পারে, কিন্তু তারা সংসার পেতেছে চীনের সঙ্গেই!”
সূত্র- বাংলা ট্রিবিউন

অর্থের বিনিময়ে ছাত্রীর সঙ্গে শিক্ষকের যৌন সম্পর্ক

অর্থের বিনিময়ে অপরিণত এক ছাত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন নিউ ইয়র্ক সিটির এক শিক্ষক। বিছানায় তার সঙ্গে এমন কোনো অশালীনতা নেই, যা তিনি করেন নি। এ অভিযোগে মামলা হয়েছে স্প্যানিশ ওই শিক্ষক মার্টিন হাউফিল্ড (৫৬)। তিনি আবার আইনজীবীও। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে পড়ার খরচ যোগাতে ছাত্রছাত্রীরা ‘সুগার ড্যাডি’দের দ্বারে ধরনা দেয়। সুগার ড্যাডি হলো একশ্রেণির পুরুষ, যারা ছাত্রছাত্রীদের মোটা অংকের অর্থ দেয়।
বিনিময়ে তাদেরকে তারা সফরসঙ্গী করে। তাদের সঙ্গে রাখে। বিভিন্ন কাজ করায়। আবার কেউ কেউ এসব ছাত্র বা ছাত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে। এমন একজন সুগার ড্যাডি হলেন মার্টিন হাউফিল্ড। অভিযোগ আছে, তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক ছাত্রীর সঙ্গে এমনই এক চুক্তিতে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলেন। গত বছর নর্থ কুইন্স কমিউনিটি হাই স্কুলে ওই বালিকার শ্রেষ্ঠ সম্পদ তিনি লুটে নেন। বিনিময়ে তাকে উপহারে ডুবিয়ে দেন। নগদ অর্থ তুলে দেন হাতে। গত ২৫ শে নভেম্বর এ বিষয়েটি রিপোর্ট করে দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট। এতে বলা হয়, সুগার ড্যাডির ফাঁদে ফেলে মার্টিন হাউফিল্ড ওই বালিকাকে ২০০০ ডলারের ইন্টার্নশিপের ফি পরিশোধ করেছেন। তা করেছেন নিউ ইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশন-এর মাধ্যমে। ওই বালিকার পড়ালেখা চালিয়ে নেয়ায় সহায়তা বাবদ তার আইনী প্রতিষ্ঠান ওই ফি পরিশোধ করে। কিন্তু এর বিনিময়ে ওই বালিকার কাছে তার একটিই চাওয়া ছিল। তা হলো তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা। এ বিষয়ে তদন্ত করেছে স্পেশাল কমিশনার অব ইনভেস্টিগেশনের অফিস। তাতে দেখা গেছে, ওই স্কুলে ওই ছাত্রীর দিকে কুদৃষ্টি নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন শিক্ষকরূপী মার্টিন। তাকে এক সময় প্রস্তাব দিয়েছেন, আমি কি তোমার সুগার ড্যাডি হতে পারি! এতে সম্মতি জানিয়েছে ওই বালিকা। ফলে প্রতি মাসে তিনি তাকে দিয়েছেন ৩০০ ডলার করে। বলেছেন, এই অর্থের বিনিময়ে আমি তোমাকে যা করতে বলবো তাই করতে হবে তোমাকে।
এরপর মার্টিনের সঙ্গে তাকে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেয়া হয়। তদন্তকারীদের কাছে এ কথা বলেছে ওই ছাত্রী। নিউ ইয়র্ক পোস্ট রিপোর্টে বলেছে, তদন্তে দেখা গেছে, মার্টিন হাউফিল্ড ওই ছাত্রীকে প্রস্তাব দেন তার ন্গ্ন ছবি পাঠাতে। নির্দেশ মতো ওই ছাত্রী তাই করে। সে আরো বলেছে, মার্টিন হাউফিল্ড তাকে শপিং মলে নিয়ে গিয়েছিলেন। এ সময় তাকে কিনে দিয়েছেন সবচেয়ে দামী একজোড়া স্নিকার্স ও ভিক্টোরিয়া সিক্রেট থেকে অন্তর্বাস। পুলিশ ও তদন্তকারীদেরকে ওই ছাত্রী আরো বলেছে, প্রথমেই চাদরের নিচে তাকে পাঁজাকোলা করে নিতেন মার্টিন। পরে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতেন। শপিং শেষে গাড়ির ভিতরে ওরাল সেক্সে মেতে উঠতেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, ফোন সেক্সেও বাধ্য করা হতো তাকে। নিজের নগ্ন ছবিও পাঠাতেন ওই ছাত্রীকে। এর প্রতিটি পর্বের জন্য তাকে অর্থ দিতেন ওই শিক্ষক।

কেন তৃতীয় পক্ষ লাগবে?

নির্যাতন থেকে প্রাণে বাঁচতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সইকে ‘বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও স্থায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে ঢাকায় আয়োজিত দূত সম্মেলনের (এনভয় কনফারেন্স) উদ্বোধনীতে দেয়া বক্তৃতায় গতকাল প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে সমস্যা সমাধানে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার উপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তৃতায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে গত বৃহস্পতিবার নেপিডতে সই হওয়া ‘দ্বিপক্ষীয় অ্যারেঞ্জমেন্ট’ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা ’৯৮ সালের স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তি চুক্তির কথা স্মরণ করেন। বলেন, সেই সমস্যার সামরিক (মিলিটারিলি) সমাধানে না গিয়ে আমরা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করেছিলাম। সেই সময়ে ৬৪ হাজার শরণার্থী, যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের ফিরিয়ে এনেছিলাম। এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল।
আমরা সেখানে তৃতীয় কাউকে ডাকিনি। মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গেও আমরা দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চুক্তি করেছি। সেখানে তৃতীয় পক্ষকে কেন ডাকতে হবে? বাংলাদেশ মানবিক কারণে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে অনেক নারী, শিশু এবং বৃদ্ধ রয়েছেন। ’৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা এসেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তাদের ফেরাতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমরা অন্তত একটা সমঝোতা করতে পেরেছি, যার মাধ্যমে আমরা আশা করি মিয়ানমার নাগরিকদের তাদের বসতভিটায় ফেরত পাঠাতে পারব। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরও যেহেতু প্রতিবেশী দেশ, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমরা একটা ভালো সদ্ভাব রেখেই সমস্যাটির সমাধান করতে চাই। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা প্রশংসা করছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশ আমাদের সমর্থন দিয়েছে, সাধুবাদ জানিয়েছে। তারা জানতে চাচ্ছে- কী কী লাগবে। তারা সব করতে রাজি আছে। অতীতে বাংলাদেশ সম্ভবত এত বড় কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। রোহিঙ্গাসহ দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ইস্যুতেও কূটনীতিকদের বিশ্বাঙ্গনে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে আপনাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। বক্তৃতার শুরুতে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ডিপ্লোমেসিতে আগে পলিটিক্যাল বিষয়টা গুরুত্ব পেত। এখন ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি চালু হয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আপনাদের চেষ্টা আরো জোরদার করতে হবে। আমরা কীভাবে আমাদের পণ্য অন্য দেশে পাঠাতে পারি, সে দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। রপ্তানির নতুন বাজার সৃষ্টি, আর বেশি করে জনশক্তি প্রেরণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে দূতদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় অন্তত দু’দফায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়ে রাষ্ট্রদূতদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তারা আমার দেশের নাগরিক, তাদের ভালো মন্দ দেখা, তাদের সুযোগ-সুবিধা দেখা, অসুবিধাগুলো দূর করা- এটা কিন্তু আপনাদের কর্তব্য।’ রাষ্ট্রদূতদের অন্তত সপ্তাহ বা মাসে একটা দিন প্রবাসীদের সময় দেয়ার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের সমস্যাগুলো শুনবেন এবং সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। এটা ভুলে গেলে চলবে না তারাই কিন্তু মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থ উপার্জন করে এবং তারা যে টাকা পাঠায় সেটাই আমাদের রিজার্ভের একটা বড় অংশ। অর্থনীতিতে তারা বিরাট অবদান রাখছে। আর আমরা যে এতগুলো কূটনৈতিক মিশন চালাচ্ছি তার সিংহভাগ উপার্জন কিন্তু তারা করছে। কাজেই সেক্ষেত্রে তাদের একটা গুরুত্ব আমাদের কাছে রয়েছে। যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশি সংখ্যায় অনেকে রয়েছেন সেসব স্থানে স্কুল করা, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দেন তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দূতাবাসে কর্মরতদের সমস্যা প্রসঙ্গে বলেন, আমি জানি বিদেশে দূতাবাসে কাজ করতে প্রায়শই বিভিন্ন কারণে সমস্যাসঙ্কুল পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। আমার সরকার বিদেশে দূতাবাসের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে যৌক্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সব সময় চেষ্টা করে যাচ্ছে। আপনারা জানেন, আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছি। বৃদ্ধি করা হয়েছে নানা সুযোগ-সুবিধা। প্রশাসনের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে হয় এদিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে। বিভিন্ন পর্যায়ে ১১৬টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। ১২টি দেশে নতুন দূতাবাস স্থাপনসহ নতুন ১৭টি মিশন খোলা হয়েছে। ২০১২ সালে বৈদেশিক ভাতা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং সন্তানদের শিক্ষাভাতা বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষাভাতা প্রাপ্তির ঊর্ধ্বসীমা ২৩ বছর করা হয়েছে। রাষ্ট্রদূতদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশে আপনারা একেকজন একেকটি বাংলাদেশ। আপনাদের কাজ নিছক চাকরি করা নয়, আরো অনেক বড় এবং মহান কিছু। দেশের ১৬ কোটি মানুষের হয়ে আপনারা সেখানে প্রতিনিধিত্ব করছেন। ‘কাজেই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সব সময় দেশের স্বার্থে আপনাদের কাজ করতে হবে।’
বক্তৃতায় দেশের চলমান উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালে অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে। আমরা উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিয়ে চলেছি। আগামী দিনে জনগণ ভোট দিলে ক্ষমতায় আসবো, না দিলে আসবো না। নির্বাচনের ফল যাই হোক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় এমন কিছু যেন না হয়।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রশ্নে সরকারের জিরো টলারেন্সনীতির পুনরোল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এই মাটিতে কোনরকম জঙ্গিবাদ আমরা হতে দেব না। আমাদের ভূখণ্ডকে কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্যও আমরা ব্যবহার করতে দেব না। আমরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান চাই। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বড়াতে কূটনীতিকদের সর্বদা তৎপর থাকার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবার সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব হবে সমতার ভিত্তিতে। কারো মুখাপেক্ষী হয়ে না। ভিক্ষা নয়, আমরা মর্যাদার আসন চাই। বিশ্ব এখন বাংলাদেশকে সম্মানের চোখে দেখে বলেও মন্তব্য করেন সরকার প্রধান। প্রধানমন্ত্রী উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তঃসংযোগ বা কানেকটিভিটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অভিবাসন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা ইত্যাদি নিশ্চিত করার বিষয়েও রাষ্ট্রদূতদের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। যুদ্ধরাপরাধী এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার প্রসঙ্গে সরকার প্রধান বলেন, আপনারা জানেন, আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে জাতির পিতার খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল। এটা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার ও দুঃখজনক। এরচেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছু হয় না। কূটনৈতিক মিশনে চাকরি পাবার যোগ্যতার মাপকাঠি ছিল তারা জাতির পিতার হত্যাকারী। একটা দেশের রাষ্ট্রপতিকেই শুধু নয় তারা নিরপরাধ শিশু ও নারী হত্যাকারী। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করে সেই খুনিদের বিচার করে বিচারের রায় কার্যকর করেছি। তবে, এসব খুনি এখনও বিভিন্ন দেশে রয়ে গেছে (পলাতক)। তারা বসে নেই এখনও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। আর একাত্তরে গণহত্যাকারীরা বিভিন্ন দেশে যারা রয়ে গেছে তারা নানা ধরনের অপপ্রচার দেশের বিরুদ্ধে চালাচ্ছে। পাশাপাশি কিছু সংস্থাও আছে। এদের মধ্যে অনেকে পঁচাত্তরের পর দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় অনেক অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপপ্রচার যেন কোনোভাবেই আমাদের দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে না পারে সেজন্য বিশ্বের কাছে বাস্তব অবস্থা তুলে ধরতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার দীর্ঘ ৫৫ মিনিটের বক্তৃতায় বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন। এ সময় তিনি মোটাদাগে কয়েকটি অভিযোগও করেন। যার মধ্যে রয়েছে- ৭৫ পরবর্তী সময়ে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কাজ না হওয়া, বিভিন্ন বিদেশ মিশন বন্ধ করে দেয়া, জাতির জনকের বিদেশি মিশনে পোস্টিং দেয়া এবং আদালতের রায়ে একজন ব্যক্তির এমডি পদ হারানোর কারণে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন আটকে যাওয়া ইত্যাদি। এ সময় চ্যালেঞ্জ নিয়ে পদ্মা সেতুসহ জনগণের কল্যাণে তার সরকার গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেন। বক্তৃতার একেবারে সমাপনী লগ্নে প্রধানমন্ত্রী তার মা-বাবা ভাই-ভাবিসহ স্বজন হারানোর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আমি সব হারিয়েছি। সব শোককে ধারণ করে আমি দেশের মানুষকে নিয়ে একটি আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বক্তব্য দেন; পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী, এইচটি ইমাম, তৌফিক-ই-ইলাহী, ইকবাল সোবহান চৌধুরী, সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মণি, আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ফারুক খান ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমশের মবিন চৌধুরী এবং অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকরাও অংশ নেন।

দেশে জন্মগত হিমোগ্লোবিন ডিজঅর্ডারের বাহক ৮৪ লাখ

বাংলাদেশে বর্তমানে থ্যালাসেমিয়াসহ জন্মগত হিমোগ্লোবিন ডিজঅর্ডারের বাহক প্রায় ৮৪ লাখ মানুষ। এছাড়াও দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কোন না কোনভাবে রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। এর বাইরে হিমোফিলিয়া রোগীর সংখ্যাও আনুমানিক প্রায় ২০ হাজার। দিন দিন-এর ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শনিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মিলন হলে এক আন্তুর্জাতিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এই তথ্য জানিয়েছেন। হেমাটোলজি সোসাইটি অফ বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী ৩য় আন্তর্জাতিক এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, এমপি। সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসা সেবা নিয়েও বিশদভাবে আলোচনা করেন। দেশে বর্তমানে ৩টি প্রতিষ্ঠানে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের সুযোগ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টটেশন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যা শিগগিরই এ সরকারের মেয়াদে কার্যক্রম শুরু করবে। ৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে রক্তরোগ চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। ব্লাড ক্যানসার ও হিমোফিলিয়া রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা অধিকাংশ রোগীর পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না। এসব রোগের ব্যয়ভার সহনীয় করার জন্য কনফারেন্স হতে সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়। এছাড়া হেমাটোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেশে ক্রমবর্ধমান ভাবে বিভিন্ন রক্তরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ হেমাটোলজি ইনস্টিটিউট ও হেমাটোলজি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানানো হয়। অনুষ্ঠানে হেমাটোলজি সোসাইটি অফ বাংলাদেশ-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগমের সভাপতিত্বে আরো উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালিক, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, বিএসএমএমইউ’র ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ,সোসাইটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ খান, সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ভারত, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড-এর বিশিষ্ট রক্তরোগ বিশেষজ্ঞগণসহ প্রায় ২৫০ জন চিকিৎসক অংশগ্রহণ করেন।