Sunday, February 18, 2018

জটিলতা ঘিরে ধরেছে ট্রাম্পকে

একের পর এক জটিলতা ঘিরে ধরছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে। মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় কমপক্ষে দু’জন নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন পর্নো তারকা। অন্যজন প্লেবয় মডেল। দু’জনকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে অর্থের বিনিময়ে মুখ বন্ধ করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এ ছাড়া এফবিআই ট্রাম্প টিমের রাশিয়া কানেকশন নিয়ে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
তাতে কমপক্ষে ১৩ জন রাশিয়ানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা ট্রাম্পকে বিজয়ী করতে ভূমিকা পালন করেছে। প্রচারণায় অর্থ খরচ করেছে। গোপন বৈঠক হয়েছে। সাইবার জালিয়াতি হয়েছে। এ ছাড়া অভিবাসন বিষয়ক সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গৃহীত একটি বিল বাতিল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। শিশু অবস্থায় যেসব অভিবাসী অবৈধ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন তাদেরকে বৈধতা দিয়েছিলেন ওবামা। এ রকম অভিবাসীদের বলা হয় ‘ড্রিমার’। তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দিতে চাইছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তাতে বাদা হয়ে দাঁড়িয়েছে আদালত। এরই মধ্যে ফ্লোরিডায় একটি স্কুলে হত্যাকা- ঘটানো হয়েছে। হোয়াইট হাউজের স্টাফ বিষয়ক সেক্রেটারি রব পর্টারের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন তার সাবেক দু’স্ত্রী। এ জন্য তিনি পদত্যাগ করেছেন। ওদিকে মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার পরেও একজন পর্নো তারকা ও একজন প্লেবয় মডেলের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের খবরে মেলানিয়া ও ট্রাম্পের মধ্যে টান টান সম্পর্ক বিদ্যমান বলে খবর দিচ্ছে পশ্চিমা মিডিয়া। একটি ঝামেলা কাটিয়ে ওঠার পরই নতুন আরেকটি এসে হাজরি হচ্ছে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজের সামনে। এর ফলে এক রকম অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে আস্থায় সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কথা লিখেছে অনলাইন সিএনএন। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন একটি সপ্তাহ শুরু হচ্ছে স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট মুয়েলারের রিপোর্টকে সামনে রেখে। ওই রিপোর্টে তিনি ১৩ রাশিয়ানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেছেন, তারা ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। এটা ক্রেমলিনের টার্গেট ছিল। এর লক্ষ্য ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে পরাজিত করা ও ট্রাম্পকে জিততে সহায়তা করা। এমন রিপোর্টে নিশ্চয়ই হোয়াইট হাউজের আইনজীবীরা উদ্বিগ্ন হবেন। মুয়েলারের রিপোর্টের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টুইট করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন, নির্বাচনের ফলের ওপর কোনো প্রভাব পড়েনি। ট্রাম্প টিম কোনো অন্যায় করে নি। কোনো সমঝোতাও হয় নি। উল্লেখ্য, মুয়েলার তার রিপোর্টে ট্রাম্পের স্টাফ ও রাশিয়ার কোনো এজেন্টের সরাসরি লিয়াজোঁ থাকার বিষয়ে রেফারেন্স দেন নি। তবে তিনি বলেছেন নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ একটি ক্রিমিনাল বিষয়। ফলে এতে কারো বিচার হবে কিনা বা হলে কিভাবে হবে তা স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পও এখন আরো জোরালোভাবে বলবেন, নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ একটি বড় ধরনের এক ধাপ্পাবাজি। তবে মুয়েলারের তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রকৃত হুমকি বেরিয়ে এসেছে। এখন যদি রবার্ট মুয়েলারকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরখাস্ত করেন তাহলে ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্রয় দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে রিপাবলিকানদের জন্য। এমনিতেই নির্বাচনী স্ক্যান্ডালকে কেন্দ্র করে মস্কোর বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের দাবি জোরালো হয়েছে প্রশাসনের ওপর। ওয়াশিংটন ও ক্রেমলিনের মধ্যে সম্পর্কও অনেকটা তিক্ত হয়েছে। এ অবস্থায় রাশিয়ার স্পর্শকাতর তৎপরতার যে ছবি রবার্ট মুয়েলার তার রিপোর্টে এঁকেছেন তাতে রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ভাবমূর্তি বাড়বে নিঃসন্দেহে। তাকে দেখা হবে গুপ্তচরবৃত্তির একজন মাস্টার হিসেবে, যদিও রাশিয়া এমন অভিযোগ অস্বীকার করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের আইনজীবী মাইকেল কোহেন স্বীকার করেছেন ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে পর্নো তারকা স্টর্মি ডানিয়েলকে মুখ বন্ধ রাখতে এক লাখ ৩০ হাজার ডলার দিয়েছিলেন। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে অর্থের বিনিময়ে মাইকেল কোহেন ওই পর্নো তারকার মুখ বন্ধ রেখেছিলেন, এতে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন হয়েছে কিনা? ওদিকে দ্য নিউ ইয়র্কার এক নতুন রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, প্লেবয়ের সাবেক মডেল কারেন ম্যাকডগালের সঙ্গে ২০০৬ ও ২০০৭ সালে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন ট্রাম্প। এসব রিপোর্ট প্রকাশের পর ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে তার তখনকার বৈবাহিক অবস্থা নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা ছড়িয়ে পড়ে।

ইরানের ব্যাপারে এজন্য দিশেহারা হয়ে পড়েছে আমেরিকা!

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচ. আর ম্যাকমাস্টারের বক্তব্যকে বিশ্বের জাতিগুলোর বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রকাশ্য হুমকি বলে মন্তব্য করেছে ইরান। তেহরান বলেছে, এ বক্তব্য পাশ্চাত্যের সঙ্গে ইরানের স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতারও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ম্যাকমাস্টার শনিবার মিউনিখে ৫৪তম নিরাপত্তা সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে কথিত হস্তক্ষেপের জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। ইরান এর আগে এ অভিযোগ বহুবার অস্বীকার করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি ম্যাকমাস্টারের ওই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একের পর এক ব্যর্থতা মার্কিন সরকারকে উন্মাদ করে ফেলেছে। আর এ কারণে পরমাণু সমঝোতায় নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করতেও দ্বিধা করছে না ওয়াশিংটন। কাসেমি বলেন, পরমাণু সমঝোতা বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর ইরানে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের ঢল নামায় মার্কিন প্রশাসন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ওই সমঝোতার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করে যখন বিশ্বের বহু দেশ লাভবান হচ্ছিল তখন সে বাণিজ্য বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে মার্কিন সরকার কার্যত সব দেশের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছে বলেও কাসেমি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, পরমাণু সমঝোতায় ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পাশাপাশি দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নতুন করে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করবে না বলে ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ম্যাকমাস্টারের বক্তব্যে আরেকবার প্রমাণিত হলো, আমেরিকা কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি মানে না এবং তার ওপর আস্থা রাখা যায় না।

মধ্যপ্রাচ্যে ঘাঁটি করার অনুমতি পাবে না ন্যাটো

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আলী আকবর বেলায়েতি বলেছেন, এ অঞ্চলের প্রতিরোধ ফ্রন্টগুলো মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটকে মধ্যপ্রাচ্যে ঘাঁটি করার সুযোগ দেবে না। ইরাকের ভাইস প্রেসিডেন্ট নূরি আল-মালিকির সঙ্গে শনিবার বাগদাদে এক বৈঠকে তিনি একথা বলেন। ড. বেলায়েতি বলেন, ফোরাত নদীর পূর্ব উপকূলে মার্কিন সেনাদেরকে কোনোমতেই মোতায়েনের সুযোগ দেয়া উচিত হবে না।
তিনি বলেন, ইরান শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইরাকের জনগণ ও সরকারের পাশে থাকবে এবং উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশের পতনের পর আমাদেরেকে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হবে। বৈঠকে ইরাকের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরাকের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হোক তা দেখতে দেশের জনগণ প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, প্রতিরোধ ফ্রন্টগুলোর মতো ইরাক সরকারও মনে করে ফোরাত নদীর পূর্ব উপকূলে মার্কিন সেনাদের থাকা উচিত নয়। তিনি আরো বলেন, সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার ফলে এ এলাকায় নতুন করে সন্ত্রাসবাদ আাঘাত হানতে পারে এবং তাকফিরি ধারাকে শক্তিশালী করতে পারে যার মূল লক্ষ্য থাকবে প্রতিরোধকামী শক্তিগুলোকে বিশেষ করে ইরানকে দুর্বল করা। এদিকে, ড. বেলায়েতির সঙ্গে আলাদা বৈঠকে ইরাকের জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার হুমাম হামুদি একই ধরনের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরাকে বিদেশি সেনা উপস্থিতির আর কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, ইরাকে বিদেশি সেনা থাকবে কিনা তা একমাত্র জাতীয় সংসদই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

নেপালের নির্বাচন by এম সাখাওয়াত হোসেন

নেপালে ২৪০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান হয় এপ্রিল ১০, ২০০৮ সালে। ওই বছরই নেপালের ইতিহাসে প্রথম বহুদলীয় গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নতুন প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি সংসদীয় গণতন্ত্রের সংবিধান রচনায় গণপরিষদ গঠনের জন্য। নির্বাচন হয়েছিল ৫৭৫টি আসনে। এ উপমহাদেশে নেপালই প্রথম দেশ যেখানে মিশ্র নির্বাচনীপ্রক্রিয়া তথা মিক্সড ইলেক্টোরাল সিস্টেম, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট এবং আনুপাতিক হারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যে নির্বাচনীব্যবস্থা এখন নেপালে সাংবিধানিকভাবে অনুসৃত। ওই গণপরিষদের মেয়াদ বাড়ানোর পরও নানা কারণে সংবিধানের কাজ শেষ না হওয়াতে চার বছর পর ২০১২ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো গণপরিষদ নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গণপরিষদের জন্য ২৬টি আসনে সরকারের বিশেষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছিল সরকার। ২০০৮ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় একদিনে, যা পর্যবেক্ষণ করতে আমি আর ছহুল হোসেন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছিলাম। যদিও নেপালের নির্বাচন কমিশন ১৯৫১ সালে গঠিত হয়েছিল, তবে বিশুদ্ধ সংসদীয় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ২০০৮ সালেই প্রথম। ওই নির্বাচন কমিশনের প্রধান ছিলেন সাবেক সচিব ভোঙ্গরাজ পোখারেল। ওই নির্বাচন ছিল ‘পোস্ট-কনফিল্কট’ তথা সঙ্ঘাত-উত্তর সময়ের নির্বাচন। নেপালের ২০ বছরের মাওবাদী ‘ইনসারজেন্সি’ পরবর্তী নির্বাচন। ওই নির্বাচনে ‘মাওবাদী’ নেতা, এককালের গেরিলা নেতা পুষ্প কমল দাহাল ‘প্রচন্ড’ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিলেন। প্রথম গণপরিষদে প্রায় ২৬টি দলের উপস্থিতি ছিল। এত বড় সংখ্যক দলের সংসদে থাকার কারণ ছিল মিশ্র নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা। যেখানে ছোট ছোট দল আনুপাতিক হারে আসন পেয়েছিল। দ্বিতীয় গণপরিষদ নির্বাচনেও প্রায় একই রকম ফলাফল হয়। তবে ২০১৩ সালের ওই নির্বাচনে নেপালি কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং মাওবাদীরা তৃতীয় বৃহত্তর দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দ্বিতীয় গণপরিষদে ২৯ দল আসন পায়। বেশির ভাগ দলই একটি করে আসন পাওয়াতে সংবিধান রচনায় এবং সরকারের স্থিতিশীলতায় দারুণ সমস্যার সৃষ্টি হওয়া সত্তে¡ও ২০১৫ সালে সংবিধান রচনা শেষ করে কার্যকর করা হয়। এরই প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অতীতের দু’টি গণপরিষদ নির্বাচন একদিনে অনুষ্ঠিত করতে নেপালের নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থাপনায় যে জটিল অভিজ্ঞতা অর্জন করে, সে প্রেক্ষাপটে হালের নির্বাচন দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত হয় নতুন সৃষ্ট প্রাদেশিক নির্বাচনও। এটাও একটি কারণ ছিল দুই পর্বে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পেছনে। নেপালের সংবিধানে দুই কক্ষের বিধান রয়েছে। এর একটি হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ অন্যটি ফেডারেল পার্লামেন্ট বা ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি। হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ২৭৫টি আসন। এর মধ্যে সংবিধানের ৮৪ ধারার পরিপ্রেক্ষিতে ১৬৫টি আসন সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সরাসরি- (FPTP), ১৬৫ সংসদীয় নির্বাচন আসন থেকে এবং ১১০টি আসনে আনুপাতিক হারে নির্বাচনের বিধান করা হয়েছে। আনুপাতিক হারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য সমগ্র দেশটিকে একক নির্বাচনী এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মানে এ যে, ১১০ জন সংসদ সদস্য পার্টিভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন, তবে কোনো বিশেষ সংসদীয় এলাকাকে প্রতিনিধিত্ব করবেন না, যেমনটা করবেন ১৬৫ জন। নেপালে মিশ্র নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিধান রাখার কারণ যাতে বহুজাতিক দেশটির পিছিয়ে পড়া জাতি-গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে পারেন। এ বিষয়টি সংবিধানের ৮৪(২) এ নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে ‘দলিত’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, খাস আরিয়া (খাস আরিয়া মানে, Ksheri, ব্রাহ্মণ, ঠাকুর, সন্ন্যাসী) মাদহেসি থারু মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত রাখা অপরিহার্য। অপর দিকে, মুসলিম এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হয়েছে আনুপাতিক হারের ১১০ জন সদস্য নির্বাচনে। এদের সদস্য নির্ভর করবে জনসংখ্যা অনুপাতে। আনুপাতিক হারের নির্বাচনে প্রতিবন্ধীদের সদস্য করার বিধানও রাখা হয়েছে। নেপালের সংবিধানের ৮৪(৬) ধারা মোতাবেক একজন প্রার্থীর একাধিক সংসদীয় আসনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রত্যেক পার্টি থেকে এক তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধির মনোনয়ন দেয়া বাধ্যতামূলক। নেপালের উচ্চকক্ষ মোট ৫৬ জন নির্বাচিত সদস্য নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে অবশ্যই একজন দলিত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং প্রতিবন্ধী নারী থাকার বিধান রয়েছে।
এ উচ্চকক্ষ নির্বাচিত হবে ইলেক্টোরাল কলেজের মাধ্যমে। যার ভোটার হবেন প্রভিনশিয়াল অ্যাসেম্বলির সদস্য, চেয়ার ও ভাইস চেয়ারপারসন গ্রাম বোর্ড এবং পৌরসভার মেয়র ও উপমেয়ররা। নেপালের প্রথম গণপরিষদ নির্বাচন ‘পোস্ট কনফিলক্ট’ বা ‘সঙ্ঘাত উত্তর’ নির্বাচন হিসেবে যথেষ্ট স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য ছিল। দ্বিতীয় গণপরিষদ নির্বাচনের (২০১৩) ফলাফল নিয়ে মাওবাদীরা আন্দোলন করে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করলেও পরে তা গ্রহণ করেছিল। ওই নির্বাচনে মাওবাদীরা তৃতীয় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে একপর্যায়ে জোট হিসেবে ‘প্রচন্ড’ প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে তিনি আমাকে বলেছিলেন, যদিও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মাওবাদীদের আপত্তি ছিল, তবুও নেপালের গণতন্ত্রের স্বার্থে তিনি ফলাফল মেনে নিয়েছিলেন। ওই সময়ে তিনি গঠিত জোটের প্রধানমন্ত্রী। বিগত দু’টি গণপরিষদে এত সংখ্যক দলের উপস্থিতি নেপালের সরকার গঠন এবং স্থিতিশীলতা নিয়ে যথেষ্ট সমস্যা হয়েছিল। এ সমস্যা দূর করতে আনুপাতিক হারের (ক্লোজড লিস্ট পিআর : Closed List) নির্বাচনে ৩ শতাংশ ন্যূনতম প্রাপ্ত ভোট নির্ধারণ করে ২০১৭ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ একটি দলকে আনুপাতিক হারের নির্বাচনে একটি আসন পেতে হলে ন্যূনতম পক্ষে মোট প্রদত্ত ভোটের তিন শতাংশ ভোট পেতে হবে। এ ‘ন্যূনতম ভোট প্রাপ্তি’ মূলত দু’টি কারণে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত : সংসদে স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে এবং দ্বিতীয়ত : ন্যূনতম একটি আসন প্রাপ্ত দলকে জাতীয়পর্যায়ের দল হিসেবে নিবন্ধিত করার জন্য। প্রায় আনুপাতিক হারের এ পদ্ধতিও খুব সহজ নয়। এই ‘ক্লোজড লিস্ট’ পদ্ধতিতে প্রত্যেক দলকে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীর ক্রমানুসারে আগেই নির্বাচন কমিশনে দাখিল করতে হয় এবং ওই তালিকা থেকেই ক্রমানুসারে প্রার্থী নির্বাচিত হয়। তবে ভোটারেরা শুধু পার্টিকেই তাদের ভোট দেন। নেপালের মিশ্র পদ্ধতির নির্বাচনে একজন ভোটারকে একাধারে দু’টি ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে হয়েছে। আনুপাতিক হারের ব্যালট সঙ্গতকারণেই বেশ বড় এবং শুধু পার্টির নির্বাচনী মার্কা থাকে। যে কারণে ভোটাররা প্রার্থীর নামও জানতে পারেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত ফলাফল ঘোষিত না হয়। ক্লোজড লিস্ট আনুপাতিক হারের এ ব্যবস্থা নেপালে এখনো সমস্যার সৃষ্টি করেনি তবে এ ধরনের আনুপাতিক হারের অন্যতম নেতিবাচক দিক হলো, চূড়ান্ত সদস্য নির্বাচন দলের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের পছন্দ অপছন্দের ওপরে বর্তায়। এ ধরনের প্রার্থী নির্বাচনে তৃণমূলপর্যায় হতে প্রাথমিক নির্বাচনের মাধ্যমে দলগুলো প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত করলে ক্লোজড লিস্ট আনুপাতিক হার প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ করা যায়। নেপালের রাজনৈতিক দলগুলো এখনো সে পদ্ধতি ধারণ করেনি। নেপালের নির্বাচন কমিশনের কাজ এই উপমহাদেশের যেকোনো নির্বাচন কমিশনের চাইতে পদ্ধতিগত কারণে জটিল। ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক আঙ্গিকেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা সহজ নয়। নেপালে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার অভিজ্ঞতা বেশি দিনের নয়, ফলে ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত যে কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে নেপালে এবং নেপালের বাইরেও যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছে। স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ধারাবাহিকতার কারণে নেপাল বহুজাতিক দেশ এবং বিগত ২০ বছরের সঙ্ঘাতের তিক্ত অভিজ্ঞতা উৎরিয়ে একটি কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে অন্তত এ পর্যন্ত সক্ষম হয়েছে। নেপালের সংবিধানোত্তর প্রথম নির্বাচনও যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছে। ২০১৭ সালে নির্বাচনে মোট তিনটি জোট, মাওবাদী দল কেপি শর্মা ওলির মার্কিস্ট-লেনিনিস্ট কমিউনিস্ট পার্টির সাথে জোট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অপর দু’টি জোট নেপালি কংগ্রেসের সাথে দক্ষিণপন্থী কয়েকটি জোট দল নিয়ে জোট এবং বাবুরাম ভট্টরাইয়ের, এককালের মাওবাদী নেতা, নেতৃত্বে ‘নয়া শক্তি’ পার্টির সাথে ডেমোক্র্যাটিক গোর্খা দলের। তবে বামপন্থী জোট মাওবাদী ও মার্কিস্ট-লেনিনিস্টরাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কে পি শর্মা ওলি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এ জোটের অন্যতম শরিক মার্কসিস্ট লেনিনিস্টরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছে এবং মাওবাদীরা রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। অপর দিকে, নেপালি কংগ্রেস বেশ পেছনে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে বিরোধী দল হয়ে থাকবে। এ দুই জোটই নির্বাচনের উভয় ব্যবস্থাপনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অপর দিকে, পিআর পদ্ধতিতে ‘ওয়াটার মার্ক’ একটি দলের সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা পূর্বনির্ধারণ পদ্ধতি এবং ন্যূনতম ভোটের শতাংশ নির্ধারণ করায় ১১০টি পিআর সংসদীয় পদের জন্য মাত্র ৪৫টি দল নিবন্ধন করেছিল, যা বিগত দু’টি গণপরিষদ নির্বাচন থেকে অনেক কম। সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট প্রায় দুই মাস অপেক্ষায় থাকার পর ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। এত দেরি হওয়া সত্ত্বেও নেপাল শান্ত এবং রাজনীতিবিদরাও তাদের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করেন। ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে কোনো উদ্বেগ ছিল না। নেপাল অবশ্যই অনেক উঠতি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য উদাহরণ হতে পারে। যেমনটা আগেই বলেছি, নেপালের নির্বাচনী পদ্ধতি উপমহাদেশের অন্যান্য দেশগুলোর চাইতে বেশ জটিল। অবশ্য এর প্রধান কারণ নেপালের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সংসদগুলোতে বহুজাতীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা। ভৌগোলিক বিন্যাসের কারণেও প্রশাসনিক দিক থেকেও নেপালের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা বেশ কঠিন যদিও রেজিস্টার্ড ভোটার মাত্র ১৫ মিলিয়ন। যা হোক, উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ নেপাল, যেটি উত্তরে চীন এবং তিন দিকে ভারতবেষ্টিত। নেপালের বিগত নির্বাচনগুলো ছিল সর্বদলীয়, যা বহুদলীয় গণতন্ত্রে অন্যতম শর্ত। অতীতের দু’টি এবং ২০১৭ সালের গণতান্ত্রিক সংবিধানের আওতায় প্রথম জাতীয় এবং প্রাদেশিক সংসদীয় নির্বাচন যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ অনুষ্ঠিত করার জন্য নেপালের নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং জনগণকে অভিনন্দন। আশা করা যায়, এ নির্বাচনের মাধ্যমে আগামী নেপাল সরকারে স্থিতিশীলতা অর্জন করবে, যা সহায়ক হবে নেপালের গণতন্ত্রের ভিত শক্ত হতে। নেপালের ২০ বছরের রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতপরবর্তী নির্বাচনগুলো থেকে উঠতি গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অনেক শিক্ষণীয় রয়েছে।
লেখক : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:), সাবেক নির্বাচন কমিশনার
hhintlbd@yahoo.com

শেষ ঠিকানা by হামিদ মীর

লজ্জা ও দুঃখে আমার মাথা নত হয়ে গেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি। চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলাম, যদি ওই হিরো ভুল সময়ে বিয়ে না করতেন, তাহলে ইতিহাসে তিনি হিরো থেকে জিরো হতেন না। ওই ব্যক্তির নাম মেজর খুরশিদ আনোয়ার। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রথম সিনিয়র মিলিটারি সেক্রেটারি মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আকবর খানের ‘মেরি আখেরি মানযিল’ (আমার শেষ ঠিকানা) গ্রন্থে বারবার খুরশিদ আনোয়ারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে ওই গোত্রীয় উপজাতীয় সৈন্যদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, যারা মুজাফফরাবাদকে কাশ্মির রাজার ডোগরা বাহিনীর কাছ থেকে স্বাধীন করার পর শ্রীনগরের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু এ বাহিনী বারামুলায় অকারণে থেমে যায়। ততক্ষণে ভারতীয় বাহিনী রাজধানী শ্রীনগর পৌঁছে যায়। মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আকবর খান ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির সবচেয়ে সিনিয়র মুসলিম অফিসার এবং কায়েদে আজমের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি তার গ্রন্থে লিখেছেন, লর্ড মাউন্টব্যাটেন যেকোনো মূল্যে জম্মু-কাশ্মিরকে ভারতের অংশ বানাতে চাচ্ছিলেন। আর পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অঘোষিতভাবে এতে মদদ জোগাচ্ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান কায়েদে আজমের সাথে পরামর্শ না করেই কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ প্রদান করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাওয়ালপিন্ডিতে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো, যেখানে অর্থমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ, মিয়া ইফতিখারুদ্দীন, জামান কিয়ানি, সরদার শওকত হায়াত, কর্নেল আকবর খান ও খুরশিদ আনোয়ার উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর তারা সবাই নিজ নিজ পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বানিয়ে নেন। মূল পরিকল্পনার তত্ত¡াবধায়ক বানানো হয় সরদার শওকত হায়াতকে, যিনি আজাদ কাশ্মিরের সেনাবাহিনীর মাধ্যমে অগ্রসর হতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু খুরশীদ আনোয়ার গোত্রীয় উপজাতীয় সৈন্যসহ বারামুলা ও উরি পৌঁছে গেলেন। মেজর জেনারেল আকবর খান প্রকাশ করেন, ২১ অক্টোবর, ১৯৪৭ সালে গোত্রীয় উপজাতীয় সৈন্য সম্পর্কে সেনাসদর রাওয়ালপিন্ডি থেকে দিল্লির আর্মি হেডকোয়ার্টারকে তারবার্তার মাধ্যমে তথ্য পাঠানো হয়। এ তথ্য জেনারেল গ্রেসি মাউন্ট ব্যাটেনকে প্রেরণ করেন এবং এরপর মাউন্ট ব্যাটেন ভারতের সেনাবাহিনীকে শ্রীনগর পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। মেজর জেনারেল আকবর খান লিখেছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল ইসকান্দার মির্জার কাছে এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কায়েদে আজমের পরিবর্তে লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের প্রতি অনুগত ছিল। এরপর কী যে হলো, খুরশিদ আনোয়ার গোত্রীয় উপজাতীয় সৈন্যদের ছেড়ে দিয়ে পেশোয়ার ফিরে আসেন। আকবর খান লিখেছেন, খুরশিদ আনোয়ার কর্নেল আকবর খানের কয়েকটি কথা মানেননি। তবে আর কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা লিখেননি। আরো বিস্তারিত তথ্য আমি পেলাম সরদার শওকত হায়াতের গ্রন্থ ‘গুম গাশতা কওম’ (হারিয়ে যাওয়া জাতি)-এ। খুরশিদ আনোয়ার মুসলিম লীগের ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান ছিলেন এবং তিনি নিজের নামের সাথে ‘মেজর’ও ব্যবহার করেছিলেন। অর্থমন্ত্রী গোলাম মোহম্মদ তার এ কাকাজাই আত্মীয়কে জোরপূর্বক কাশ্মির অপারেশনে শামিল করেছিলেন। সরদার শওকত হায়াত লিখেছেন, আমরা জম্মু-কাশ্মির থেকে দুই দিক দিয়ে হামলা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এক দিক থেকে কাঠুয়া রোড দখল করার কথা ছিল, আরেক দিক থেকে মুজাফফরাবাদের রাস্তা হয়ে শ্রীনগর যাওয়ার কথা। পরিকল্পনার মধ্যে গোত্রীয় উপজাতীয় সৈন্যরা অন্তর্ভুক্ত ছিল না, যাতে গোপনীয়তা বজায় থাকে। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে এ হামলা করার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ খুরশিদ আনোয়ার গায়েব হয়ে যান। তিনি পেশোয়ারে মুসলিম লীগের এক মহিলাকে বিয়ে করেন এবং হানিমুনের জন্য গায়েব হয়ে গেলেন। ওই বিয়ের কারণে হামলা করতে দেরি হয়ে যায়। আর যখন হামলা শুরু হয়, তখন খুরশিদ হাইকমান্ডের নির্দেশের বিরোধিতা করে গোত্রীয় উপজাতীয় সৈন্যদের নিয়ে হাজির হন। বারামুলায় গোত্রীয় উপজাতীয়রা খুরশিদ আনোয়ারের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করে বসে। ফলে তিনি পেশোয়ার ফিরে আসেন এবং ভারত নিজের সৈন্যদের শ্রীনগর পৌঁছানোর সুযোগ পেয়ে যায়। যদি হামলা অক্টোবরের পরিবর্তে সেপ্টেম্বরে করা হতো, তাহলে জম্মু ও শ্রীনগর স্বাধীন হয়ে যেত। কিন্তু খুরশিদ আনোয়ার নিজের বিয়েটাকে বেশি জরুরি মনে করলেন এবং ওই কারণে জম্মু-কাশ্মিরে হামলা করতে এক মাস দেরি হয়ে যায়। শ্রীনগরে ভারতীয় সৈন্যের দখলদারিত্ব থাকা সত্তে¡ও মুজাহিদদের মনোবল চাঙ্গা ছিল। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে গুলাব খান মেহসুদের নেতৃত্বে গোত্রীয় উপজাতীয় সৈন্যরা উরিতে ভারতীয় সৈন্যদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। অপর দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইংরেজ অফিসারেরা প্রতিরক্ষা সচিব ইস্কান্দার মির্জার সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে অস্ত্রবিরতিতে রাজি করিয়ে নিলেন। আর এভাবেই জম্মু ও কাশ্মিরের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার স্বপ্ন পূর্ণ হতে পারেনি। প্রতি বছর যখনই আমরা কাশ্মিরিদের সাথে একাত্মতার নামে ৫ ফেব্রুয়ারি ছুটি দিয়ে ঘরে বসে থাকি, তখন আমাদের এটা অবশ্যই ভাবা উচিত- ঘরে বসে থেকে এ ছুটি পালন করা কি নীতিগতভাবে ঠিক? আপনিও কি কাশ্মিরিদের সাথে ওটাই করছেন না, যা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বারবার তাদের সাথে করেছে? পাকিস্তানের শাসকেরা নিজেদের ভুলে কমপক্ষে পাঁচবার জম্মু-কাশ্মিরের স্বাধীনতার সুযোগ নষ্ট করেছেন। প্রথম সুযোগটা হাতছাড়া হয়েছে ১৯৪৭ সালে খুরশিদ আনোয়ারের অসময়ে বিয়ে করার কারণে। দ্বিতীয় সুযোগ এসেছিল ১৯৬২ সালে, যখন চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।
সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি কুদরতুল্লাহ শিহাব তার ‘শিহাবনামা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ১৯৬২ সালের অক্টোবরের এক রাতে আড়াইটার সময় আমাকে একজন চীনা নাগরিক জাগিয়ে বললেন, চীন ভারতে হামলা করেছে। পাকিস্তান সুযোগের সদ্ব্যবহার করে কাশ্মির স্বাধীন করাতে পারে।’ কুদরতুল্লাহ শিহাব দৌড়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে পৌঁছেন এবং জেনারেল আইয়ুব খানকে জাগিয়ে তুলে চীনের সে সংবাদ পৌঁছান। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বললেন, যাও, গিয়ে আরামে ঘুমিয়ে পড়ো। শিহাব সাহেবের ধারণামতে, প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান কাশ্মির স্বাধীন করার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে দিয়েছেন। এমন পরামর্শ জুলফিকার আলী ভুট্টোও আইয়ুব খানকে দিয়েছিলেন, কিন্তু আইয়ুব চীনের সাথে জোট বেঁধে আমেরিকাকে অসন্তুষ্ট করতে চাননি। তৃতীয় সুযোগ এসেছিল ১৯৬৫ সালে। জেনারেল আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে ফাতেমা জিন্নাহকে ‘পরাজিত’ করেছিলেন এবং ছোট ছোট শিশুরাও তাকে গালি দিচ্ছিল। নিজের সম্মান বাঁচানোর জন্য তার কাশ্মিরবিজেতা হওয়ার খেয়াল চাপে। তিনি ১৯৬৫ সালের মে মাসে অপারেশন জিব্রাল্টারের অনুমতি দিলেন। এ অপারেশনে নিয়মিত সেনাদের মুজাহিদের রূপ দিয়ে কাশ্মির পাঠানো হলো। ভারত এর জবাবে আন্তর্জাতিক সীমান্তে হামলা করে বসল। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। যুদ্ধে পাকিস্তানের পাল্লা ভারী ছিল। পাকিস্তানি সেনারা আখনুরের কাছে পৌঁছে যায়। চীন, ইরান ও ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি মুসলিম দেশ পাকিস্তানকে সহায়তা করছিল। কিন্তু আইয়ুব আমেরিকার চাপে পড়ে যান এবং তিনি অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করেন। এরপর জেতা যুদ্ধকে তাশখন্দ চুক্তির মাধ্যমে পরাজয়ের কারণ বানানোর চেষ্টা করা হলো। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সরকার থেকে বেরিয়ে যান এবং এভাবে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে এমন আন্দোলন শুরু হয়, যা এই সেনাশাসকের বিদায়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জম্মু-কাশ্মিরের স্বাধীনতার চতুর্থ সুযোগ এসেছিল ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে। ওই সময় স্বাধীনতা আন্দোলনের কারণে অধিকৃত রাজ্যে সরকারি মিশনারি পঙ্গু হয়ে পড়েছিল এবং মুজাহিদেরা শ্রীনগরে নর্দার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার দখলের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরীফের রাজনৈতিক লড়াই এবং কিছু রাষ্ট্রীয় সংস্থার রাজনীতিতে নাক গলানোর কারণে কাশ্মির থেকে মনোযোগ সরে গিয়েছিল। ফলে এ সুযোগটাও নষ্ট হয়ে যায়। ১৯৯৯ সালে কারগিল অপারেশন হলো। ভুল পরিকল্পনার কারণে এ অপারেশন উপকারের পরিবর্তে কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদি সব রাষ্ট্রীয় সংস্থা মিলে এ পরিকল্পনা তৈরি করত, তাহলে সাফল্যের সম্ভাবনা উজ্জ্বল ছিল। ওই অপারেশনের ব্যর্থতার পর জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ক্ষমতা দখল করেন। ২০০৭ সালে তিনি ব্যাকডোর ডিপ্লোম্যাসি বা গোপন ক‚টনীতির মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে কাশ্মির নিয়ে হেরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো যে, মোশাররফ কাশ্মিরে সারেন্ডার করতে পারলেন না। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ রাশিয়ার উফা শহরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতের পর যে ঘোষণা প্রচার করা হয়, তাতে ‘কাশ্মির’ শব্দটি গায়েব ছিল। উফা ঘোষণার পর নওয়াজ শরীফ সামলাতে পারেননি। যে শাসকই কাশ্মিরিদের আশা-আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার পরিণাম হয়েছে খারাপ। আজও কাশ্মিরিরা পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বস্ত; কিন্তু আপনার বিবেককে একটু জিজ্ঞাসা করুন, আপনি কাশ্মিরিদের প্রতি কতটুকু বিশ্বস্ত? আপনি কি নিজ দেশের জন্য ওই আত্মত্যাগ করতে পারবেন, যা কাশ্মিরিরা করছে? কাশ্মিরিদের শেষ ঠিকানা পাকিস্তান। কাশ্মিরিদের নামে ছুটি পালন করার সময় নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনার শেষ ঠিকানা কোনটা?
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং থেকে
ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
* হামিদ মীর : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক

বলিউডের ব্লকবাস্টার মুভি ‘পদ্মাবত’ by মো: বজলুর রশীদ

বলিউডের বিগ বাজেট ছবি ‘পদ্মাবত’, যেটি পদ্মাবতী নামেও পরিচিত, গত ২৫ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েই হিট করেছে। রাজস্থান, হরিয়ানা, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশ ছাড়া পুরো ভারতে ছবিটি মুক্তি পেয়ে প্রথম দিনে ২৪ কোটি ও দ্বিতীয় দিন ৩২ কোটি রুপি ব্যবসা করেছে। সে হিসাবে ‘বাহুবলি’-২-কে ছাড়িয়ে গেছে। ছবিটি তৈরি করতে ২০০ কোটি রুপি খরচ হলেও মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সমুদয় পুঁজি ঘরে তুলছেন বানসালি। শুরুতেই বলিউডের বøকবাস্টার ছবিতে পরিণত হয়েছে পদ্মাবত। যারা ছবির বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন তারাই বলছেন, ছবিতে রাজপুতদের ‘অনুশাসন’ তুলে ধরা হয়েছে। অতএব, কোনো ভাঙচুর-বিক্ষোভ নয়। পাকিস্তানে কোনো ‘কাট’ ছাড়া ছবিটি মুক্তি পেলেও দিল্লির অতীতকালের শাসক আলাউদ্দিন খিলজিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের জন্য ছবিটি নিষিদ্ধ করেছে মালয়েশিয়া। পদ্মাবত ছবির গল্প একজন রাজপুত রানী ও একজন মুসলিম সম্রাটকে নিয়ে। হিন্দু রাজপুত রানী পদ্মাবতীর রূপে আকৃষ্ট হয়ে দিল্লির তৎকালীন সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি ওই রাজ্য আক্রমণ করেন। অভিযোগ করা হয়েছে, খিলজির সাথে রানী পদ্মাবতীর ঘনিষ্ঠ রোমান্টিক সিকোয়েন্স রয়েছে, যা পরিচালক বানসালি অস্বীকার করেছেন। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগেই গুজরাট ও হরিয়ানা রাজ্যে জ্বালাও-পোড়াও শুরু হয়ে যায়।এই ছবি নিয়ে কিছু উগ্র হিন্দু ও রাজপুত লোকজন ক্ষেপেছে। ভারতের উগ্র হিন্দুবাদীরা সহিংসতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। গত জানুয়ারিতে শুটিং চলার সময় ‘কার্নি সেনা’র রাজপুতরা সেট ভাঙচুর করে পরিচালককে মারধর করে। কানপুরের একটি সংগঠন পদ্মাবতী চরিত্রে অভিনয় করা দীপিকা পাডুকোনের নাক কাটার হুমকি দিয়েছে, যেভাবে রামায়ণে বলা হয়েছে, রাবণের বোন শূর্পণখার নাক কেটে দেয়া হয়েছিল। কানপুর ক্ষত্রিয় মহাসভার প্রেসিডেন্ট গজেন্দ্র সিংহ রাজাওয়াত বলেছেন, ‘আমরা কানপুরের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করেছি। যিনি দীপিকার নাক কাটতে পারবেন, তাকে ওই টাকা পুরস্কার দেবো।’ আরো ঘোষণা দেয়া হয়, যে বানসালি এবং দীপিকা পাডুকোনের মাথা কেটে আনতে পারবে, তাকে ১৫ লাখ ডলার পুরস্কার দেয়া হবে। কার্নি সেনার সদস্যরা গুরুগ্রামের জিডি গোয়েঙ্কা স্কুলের বাসে হামলা চালায়। ফলে কয়েক দিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে ওই শহরের কয়েকটি স্কুল। বিক্ষোভকারীরা রাস্তা আটকে বাসে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। মথুরায় বিক্ষোভকারীরা আটকে দেয় ট্রেন। পদ্মাবতের কারণে বন্ধ করা হয় চিতোর দুর্গ। সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত এই দুর্গেই পদ্মাবতী কাহিনীর জন্ম। দুর্গটি ইউনেস্কো ঘোষিত ‘বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনা’গুলোর অন্যতম। চলচ্চিত্রটি রাজস্থানে দেখানো হলে ১৫০ জন রাজপুত নারী ওই দুর্গে গিয়ে আত্মাহুতি দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। পদ্মাবত চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া কার্নি সেনারা দুর্গটিতে প্রবেশের চেষ্টা করার পর সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন দল ও রাজপুতরা মনে করেছেন, এই মুভিতে রাজপুত রানীর ইমেজকে হেয় করা হয়েছে। পুরনো পদ্মাবতীর বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি রয়েছে যেমন- কাইতি, নাগরি ও নাস্তালিক বা ফার্সি। মোহাম্মদ শাকির ১৬৭৫ সালে আমরোহ ভাষায় তা কপি করেছিলেন। কাইতি পাণ্ডুলিপিতে অনেক অতিরিক্ত কবিতার লাইন জুড়ে দেয়া হয়েছে, যা অসম্পূর্ণ ও দুর্বল। মাতাপ্রসাদগুপ্ত সব পাণ্ডুলিপি মিলিয়ে সপ্তদশ শতাব্দীতে অপার এক পাণ্ডুলিপি বানান। ১৫৯০ সালে বিজাপুর সালতানাতের ইব্রাহিম শাহের রাজকবি হংস বাবু ‘প্রেমনামা’ নামে পদ্মাবতীর আরেকটি সংস্করণ বের করেন। ফার্সি ও উর্দুতে পদ্মাবতীর ১২টি সংস্করণ আছে। এগুলোর মধ্যে প্রসিদ্ধ হলো- ‘রত-পদম’ ও ‘শামা ওয়া পরওয়ানা’। ১৬ শতাব্দীতে এই মহাকাব্য বাংলায় অনূদিত হয়। বাংলাতে ১৯০৬ সালে ক্ষিরোদ প্রাসাদের হাতে এবং ১৯০৯ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে বাংলা রূপপরিগ্রহ করে। পদ্মাবতীকে নিয়ে ১৯৬৩ সালে তামিল মুভি ‘চিতোর রানী পদ্মিনী’, ১৯৬৪ সালে হিন্দিতে ‘মহারানী পদ্মিনী’ নিজস্ব ঘরানায় ও ভিন্নরূপে চিত্রায়িত হয়েছে। ‘চিতোর কি রানী পদ্মিনী কা জহর’ নামে সনি টেলিভিশন (ভারত) পদ্মিনীর ওপর ২৫ মে ২০০৯ থেকে ১০৪ পর্বের ড্রামা সিরিয়াল প্রচার করেছে। পরিচালক ছিলেন নীতিন চন্দ্রকান্ত দেশাই। কিন্তু ৪৮ পর্বের পরই সিরিয়ালটি ফ্লপ করে, ফলে প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। মধ্যযুগের ঐতিহাসিক ফিরিস্তা ও হাজী উদ্দাবীর পদ্মাবতীকে ইতিহাসের সাথে মেলাতে চেষ্টা করেছিলেন। এ দু’জনের প্রচেষ্টায় কোনো ঐক্য ছিল না। রাজপুতরাও নিজস্ব চিন্তাধারায় পদ্মাবতীর কাহিনী সাজিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৫৮৯ সালের বাবু হেম রতনের ‘গোরা বাদল পদ্মিনী’। ঐতিহাসিক কিশোর শরন লাল পদ্মাবত কাহিনীতে অনেক বড় অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ- রতন সিং ১৩০১ সালে সিংহাসন লাভ করে আলাউদ্দিনের কাছে ১৩০৩ সালে পরাজিত হন। কিন্তু পদ্মাবতে বলা আছে- রতন সিং ১২ বছর পদ্মাবতীর সন্ধানে ছিলেন এবং আট বছর আলাউদ্দিনের সাথে বিরোধে কাটিয়েছেন। শরন লাল বলেছেন, মূল লেখক জয়সি নিজেই বলেছেন- পদ্মাবত একটি রূপকাহিনী, ইতিহাসের কোনো বিবরণী নয়। সুফি কবি জয়সি ভূমিকায় বলেছেন, চিতোর দিয়ে মানবশরীরকে, রতন সেনকে দিয়ে মন, সিংহল দিয়ে হৃদয়, পদ্মাবতীকে দিয়ে প্রজ্ঞা এবং আলাউদ্দিনকে দিয়ে ক্রোধ বুঝানো হয়েছে। তিনি মনে করেন, ইতিহাস শুধু এতটুকুই যে, আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর জয় করেছিলেন এবং দুর্গের ভেতরে মহিলারা ‘জহরব্রত’ পালন করেছিলেন। সেখানে রতন সিংয়ের স্ত্রীও ছিলেন। তিনি পদ্মাবতীর কোনো উল্লেখ করেননি। ঐতিহাসিক বানারসী প্রসাদ সাকসেনা বিশ্বাস করেন, জহরব্রত পালন করার ঘটনা ভুয়া ও জাল। ঐতিহাসিক আমির খসরুও এমন বিষয়ের কোনো উল্লেখ করেননি। জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আদিত্য মুখার্জি বলেন, সমসাময়িক ইতিহাসে এমন কোনো ঘটনা ও চরিত্র খুঁজে পাওয়া যায় না।
এটি কবির কল্পনাপ্রসূত। সুতরাং পদ্মাবত একটি ‘লিজেন্ড’ ও ‘ফিকশন’। পদ্মাবতী কাহিনী নেয়া হয়েছে মালিক মোহাম্মদ জয়সির ফার্সি ভাষায় লেখা ‘পদ্মাবত’ বা পদুমাবৎ মহাকাব্য থেকে। যেটি ১৫৪০ সালে লেখা হয়; অর্থাৎ খিলজির চিতোর জয়ের ৩০০ বছর পর। তার উল্লেখযোগ্য অপর কাব্য হলো ‘আখেরি কালাম’। এ ছাড়াও তিনি কৃষ্ণের ওপর রচনা করেছেন ‘কানহাবত’। তার কাব্য গ্রন্থের সংখ্যা ২৫। জয়সি একজন সুফি কবি ও পীর ছিলেন। তার এক চোখ অন্ধ এবং বসন্তের দাগে চেহারা ভরপুর ছিল। সাত সন্তানের মৃত্যুর পর জয়সি ফকিরি জীবন বেছে নিয়ে আমেথির জঙ্গলে অবস্থান করতেন। কথিত আছে, জয়সি প্রায় সময় বাঘের বেশ ধরে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। পদ্মাবতী বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এর পুরনো ১২টি সংস্করণ পাওয়া যায়। তবে সংস্করণগুলো পরস্পরবিরোধী বলে জানা গেছে। এ দেশে অনেক মহাকাব্য সাহিত্যপ্রেমীদের সমাদর পেয়েছে। যেমন- বাল্মিকীর রামায়ণ, বেদব্যাসের মহাভারত, ইসমাইল হোসেন সিরাজীর স্পেন বিজয় কাব্য, রবীন চন্দ্রের কুরুক্ষেত্র, হেম চন্দ্রের বৃত্র সংহার, হামিদ আলীর কাসেমবধ কাব্য, যোগীন্দ্র বসুর পৃথ্বীরাজ ও শিবাজী, শিরি ফরহাদ, লাইলি-মজনু, আলিফ লায়লা, মেঘনাদবধ, মহাশ্মশান, বেহুলা সুন্দরী প্রভৃতি। পশ্চিমা এপিকের আদলে বীরত্বগাথা এসব মহাকাব্যে তুলে ধরা হলেও এগুলো বেশির ভাগই মহাকবিদের কল্পনাপ্রসূত। কিছু গল্পকথা এবং ঐতিহাসিক কোনো সূত্রকে অবলম্বন করে মহাকাব্যের বিভিন্ন কল্পিত চরিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। তেমনি একটি হলো, জয়সির পদ্মাবতী। মনে রাখতে হবে- মহাকাব্য ইতিহাস নয়। আলাউদ্দিন ছিলেন খিলজি রাজবংশের প্রচণ্ড শক্তিধর শাসক। ভারতবর্ষের বিরাট অংশ তিনি শাসন করেছেন। ১৩০৩ সালে তিনি চিতোর জয় করেন। খিলজির প্রথম স্ত্রী, সুলতান জালালুদ্দিনের কন্যা মালিকা-ই জাহান অত্যন্ত বদমেজাজি ছিলেন। এরপর মাহরু নামে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করেন। খিলজির চিতোর বিজয় তার বিভিন্ন রাজ্য বিজয়ের একটি অংশ মাত্র। অনেকে বলেন, সুন্দরী রানীকে পাওয়ার জন্য তিনি চিতোর আক্রমণ করেছিলেন। কোনো ঐতিহাসিক এটা বিশ্বাস করেন না। কেননা দিল্লির সাথে চিতোরের বিরোধ ছিল আট বছরের। ইতঃপূর্বে পদ্মাবতী নিয়ে ভারতে আরো ছবি নির্মিত হয়েছে। ১৯৬৩ সালে ‘চিতোর রানী পদ্মিনী’ ছবি মুক্তি পেয়েছিল। সেখানে খিলজি চিতোর রাজা রতন সিংকে যুদ্ধে পরাজয়ের পর বন্দী করে দিল্লি নিয়ে আসার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। রতন সিংয়ের প্রাসাদে তিনি ভোজ উপভোগ করেছেন। সেখানে পদ্মাবতী দোতলা থেকে খিলজিকে দেখেছেন এবং খিলজিও তাকে দেখেছেন। এর বাইরে কোনো দৃশ্য দেখানো হয়নি ছবিটিতে। খিলজি নারীলোলুপ ছিলেন, এমন কোনো তথ্য ইতিহাসে নেই। তিনি তার সাম্রাজ্য বাড়ানোর জন্য রাজ্যের পর রাজ্য জয় করেছেন। অনেক হিন্দু রাজ্যের খিলজির অভিযানে পতন হয়, ইতিহাস এসব তথ্যেই ভরপুর। খিলজি একজন যোদ্ধা, বীর ও বুদ্ধিমান শাসক ছিলেন। তিনি যেদিকে গিয়েছেন, সেদিক থেকেই জয় ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। খিলজি ঐতিহাসিক চরিত্র হলেও ইতিহাসবিদরা বিশ্বাস করেন, পদ্মাবতী কাল্পনিক চরিত্র। ষোড়শ শতাব্দীর মুসলিম কবি মালিক মোহাম্মদ জয়সির কাব্যে পদ্মাবতীর কাল্পনিক চরিত্র আঁকা হয়েছে। এই কাব্যে আরো লেখা আছে, সম্ভ্রম রক্ষায় রানী পদ্মাবতী চিতায় উঠে আত্মহত্যা করেছিলেন। আসলে কবি জয়সি হিন্দু রমণীদের এমন ত্যাগকে বীরগাথায় পরিণত করার জন্য পদ্মাবতীকে ‘সৃষ্টি’ করেছেন কি না- বোধগম্য নয়। তিনি নিজেই বিষয়টি রূপক বলে মন্তব্য করেছেন, যা এর আগে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি ৭০০ বছর আগের ঘটনা। আর কাব্য লেখা হয়েছে খিলজির অভিযানের ৩০০ বছর পর। ইতিহাস থেকে জানা যায়, রানী পদ্মাবতী বলতে আসলে কোনো চরিত্র নেই। এটা নিছক মিথ বা কল্পনা। মোগল-ই আজম থেকে ‘যোধা আকবর’ ছায়াছবি কতটুকু ইতিহাসনির্ভর সেটি এখনো প্রমাণসাপেক্ষ। আনারকলি চরিত্র কতটুকু সত্য তা-ও বিবেচনার বিষয়। এখন এমন কথাও বলা হচ্ছে, যোধার সাথে জাহাঙ্গীরের বিয়ে হয়েছিল আকবরের সাথে নয়! এমন প্রেক্ষাপটে সঞ্জয়লীলা বানসালির ছায়াছবি পদ্মাবতের জন্ম। রাজস্থানের চিতোরে পাঁচটি সার ও অ্যাগ্রোকেমিক্যাল কারখানা, তিনটি ফ্যাব্রিক্স ও ব্যাগের কারখানা, তিনটি পাওয়ার প্লান্ট, পাঁচটি মিনারেল কারখানা, দু’টি টেক্সটাইল ইউনিট। এসব ইন্ডাস্ট্রির অনেকগুলোতে বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রের নাম ব্যবহার করা হলেও ছোট-বড় কোনো কারখানায় পদ্মাবতী নাম ব্যবহার করা হয়নি। পদ্মাবত তৈরি করতে যে কোম্পানি পয়সা খরচ করেছে, সেটি বিখ্যাত শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির। তারা কিভাবে টাকা কামাতে হয়, সে জাদু জানে। মুকেশ আম্বানি মোদি সরকারের খুব কাছের লোক। তারা এ ব্যাপারে কোনো মুখ খোলেননি। বিজেপি সরকারের পক্ষে বছর ধরে কর্নি সেনার যে হইচই, তা বন্ধ করা কোনো ব্যাপার নয়। সিনেমা না দেখেই কোনো হইচই করা আসলে ব্যবসায়িক চালবাজি কিনা তা এখনো বলার সময় আসেনি। কলকাতার বহুলপ্রচারিত দৈনিক আজকালের সম্পাদকীয় কলামে ২৬ জানুয়ারি বলা হয়েছেÑ ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর হাসি, জ্বলন্ত দুই চোখ আর পেটানো চেহারা নিয়ে ‘পদ্মাবত’ ছবিতে হাজির আলাউদ্দিন খিলজি। সঞ্জয় লীলা বানসালি তাকে ‘বর্বর’ চেহারাতেই এঁকেছেন। কিন্তু ইতিহাস তাকে বর্বর বলতে একেবারেই রাজি নয়। ঐতিহাসিক রানা সাফাভির মতে, আলাউদ্দিন খিলজি আর যাই হোন, বর্বর ছিলেন না। তিনি নিজের সাম্রাজ্যে পারস্যের শাসনব্যবস্থা চালু করেছিলেন, যা ছিল প্রাচীনতম সভ্য এবং সেই সময়ের উন্নততম শাসনব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় সরকার ও জনগণের মধ্যে যে যোগাযোগ চালু ছিল, সেটাই আলাউদ্দিন চালু করেছিলেন দিল্লিতে। অন্য দিকে, আলাউদ্দিনের সমসাময়িক বিখ্যাত কবি আমির খসরুর লেখায় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আলাউদ্দিনের আমলের যুদ্ধ, রাজ্যজয় ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে যে বিস্তারিত লেখা পাওয়া গেছে, তাতেও বর্বর শাসকের চেহারায় আলাউদ্দিনকে দেখা যায় না। ইতিহাস বলছে, আলাউদ্দিন যুদ্ধবাজ, পররাজ্যলোভী ও খিলজি সাম্রাজ্যের বিস্তারে তৎপর ছিলেনÑ এসবই ঠিক কথা এবং সেসব ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর। কিন্তু মহিলাদের প্রতি অসভ্য আচরণের কোনো নজির সেই নিষ্ঠুরতার মধ্যে ছিল না। বরং যেটুকু মনে হয়, প্রশাসক আলাউদ্দিন খিলজি মহিলাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিয়েছেন বরাবর। পদ্মাবত ছবিতে আলাউদ্দিন যতখানি অসভ্য বা বর্বর, ঠিক ততটাই সভ্যরূপে দেখানো হয়েছে রতন সিংকে। এই প্রসঙ্গে রানা সাফাভির মন্তব্য, ‘এই ছবির মুখ্য উদ্দেশ্য সম্ভাবত ছিল আলাউদ্দিনের চরিত্রটি যতখানি সম্ভব কালো করে আঁকা।’  সাফাভি জানিয়েছেন, ‘ধর্মাচরণেও আলাউদ্দিন উদার ছিলেন। তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন, বা খুব গোঁড়া ছিলেন এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি। আসলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মুসলিম শাসকদের ভিলেন হিসেবে দেখানো হয়। সেখানে আসল ঐতিহাসিক সত্যের কোনো ছোঁয়া নেই; কিন্তু এভাবে ইতিহাসের অবমাননা করা যায় না।’
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ সরকার ও গ্রন্থকার

মূল্যবোধের অবক্ষয়ে ভোগান্তি বাড়ছে by হারুন-আর-রশিদ

আমরা যাদের দেশ গড়ার কারিগর বলি- তারা আজ নিতান্ত অসহায়, তাদের নামনিশানা মুছে ফেলতে চাইছে ক্ষমতাধরেরা। ৪৭ বছর তারা শুধু দিয়ে গেছে, বিনিময়ে কিছুই পায়নি। এই শ্রেণীটি না পারে উপরে উঠতে না পারে নিচে নামতে। মানসম্মান বোধটাই এই শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য। এরাই সরকার গঠন করে আবার এরাই শোষিত হয়। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। গত ৪৭ বছরে উন্নয়ন হয়েছে দেশের ২০ থেকে ২৫ লাখ ক্ষমতাধর মানুষের। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিবার থেকে ৪৭ বছর ধরে কোনো সরকারের জন্ম হয়নি। পারিবারিক উত্তরাধিকারী সূত্র ধরে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি বড় দুটি দল। ৪৭ বছরের মধ্যে প্রায় ৩৮ বছর এই দুটি পরিবার ক্ষমতায় আসে পালাক্রমে। মাঝখানে সাড়ে নয় বছর চলেছিল স্বৈরশাসন। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি চারটি বিতর্কিত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে। এখন দেশে চলছে বিতর্কিত গণতন্ত্র। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে কয়টি নির্বাচন হয়েছিল, তা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল দেশ বিদেশের পর্যবেক্ষক মহলের কাছে।  ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ১৬ কোটি ৭৫ লাখ মানুষকে শোষণ করেছে ২৫ লাখ মানুষকে। দেশের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ক্ষমতাহীন, তারা শোষিত, বঞ্চিত সব সুযোগ-সুবিধা থেকে। বিগত ৪৭ বছরে দেশের বৈদেশিক সাহায্য এসেছে কয়েক লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ওই ২৫ লাখ দুর্বৃত্ত লুণ্ঠন করেছে ৭৫ শতাংশ। দুষ্টচক্রের কারণে বছরে সৃষ্টি হচ্ছে কয়েক লাখ কোটি কালো টাকা, যা জাতীয় আয়ের তিন ভাগের এক ভাগ। এর সাথে আরো যুক্ত হয়েছে এক লাখ টাকার উপরে ব্যাংক খেলাপি ঋণ। এরাই বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার দুর্নীতির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। পুঁজিবাজার থেকে বিগত ৪৭ বছরে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। ৩৩ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর অর্থ লুণ্ঠন করে পথে বসিয়েছে নব্যবণিকরা। দেশে বিদেশে রয়েছে এদের একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি। এদের সন্তানেরা পড়াশোনা করে বিদেশে। এদের রয়েছে একাধিক গাড়ি, যার কারণে ঢাকার যানজটের স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। যত দিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকে মনে করে বাংলাদেশের মালিক শুধু তারাই। অন্যরা নিম্নশ্রেণীর প্রজা। স্বাধীন বাংলাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবিকল ছায়া দেখছি বিগত ৪৭ বছর ধরে। এক দল বা এক মতের আদর্শের রাজনীতির জন্য তো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। বহু দল বহু মতের আদর্শ প্রচারের জন্যই বাংলাদেশ স্বাধীন করা হয়েছিল। ঘরে বাইরে সব জায়গায় থাকবে সরকারি দলের পদচারণা। বিরোধী দল থাকবে শুধু অন্দর মহলে বা হোটেলে অথবা পার্টি অফিসে। এর নাম কী করে গণতন্ত্র হয় সেটা বুঝে আসে না। এখন অনেক কিছুই মেলাতে পারি না নিজের সাথে। বাসে উঠতে কষ্ট, রাস্তা পারাপারে কষ্ট, ফুটপাথে হাঁটতেও কষ্ট। কষ্ট নেই এমন কোনো জায়গা বাংলাদেশে আছে বলে মনে হয় না। ঢাকা শহরটাকে আমরা বস্তি বানিয়ে ফেলেছি গাড়ি কিনে আর বাড়ি বানিয়ে। সব কিছুই আবার অপরিকল্পিত। প্রকৃতি এখন মানুষের শত্রু, সেজন্য নির্বিচারে গাছ কাটছে দখল করছে নদী খাল বিল হাওর বাঁওড় সবকিছু। খালি রাখা যাবে না কোনো কিছু। পাহাড় পর্বত দখল করে কেটে ইটভাটা নির্মাণ করা হচ্ছে। মহাসড়কের গাছ সাবাড়, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের সড়কপথে গাছপালা কমে গেছে। প্রায় সময় বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতে নদী দখলের সচিত্র প্রতিবেদন দেখানো হয়। এসব ব্যাপারে প্রশাসন নীরব, কারণ শাসক দলের লোকজনই এসব করছে। ঢাকার মতিঝিল, দিলকুশা, পুরানা পল্টন এক কথায় শহরের ফুটপাথ এখন কৃষিজাত পণ্যের বাজার ও গাড়ি পার্কিংয়ের রমরমা বাণিজ্য। সড়কপথের ৩০ থেকে ৪০ ফুট রাস্তা খেয়ে ফেলেছে নব্যবণিকদের গাড়ি।
রাস্তা ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছে। কারণ, মূল সড়কেও ব্যবসায়ের পসরা নিয়ে বসেছে হকারেরা। সড়কপথে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির বাণিজ্য চলছে। নৈতিক মূল্যবোধ দেশে আছে বলে মনে হয় না। অথচ নৈতিক মূল্যবোধ মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অলঙ্কার। শ্রেষ্ঠ নীতির সঠিক মূল্য সম্পর্কে অটল থাকাই হচ্ছে নৈতিক মূল্যবোধ। নৈতিক মূল্যবোধই মানুষ ও পশুর মাঝে পার্থক্যের নির্দেশক। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ যা খুশি তা করতে পারে না। কিন্তু আজ এই মানুষ মূল্যবোধ হারিয়ে পশুসুলভ কাজগুলো দেদার করছে। লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। মানুষের লোভ এত বেশি হয়ে গেছে যে, ক্ষমতায় একবার এলে আর যেতে চায় না। এ কারণে ক্ষমতায় থেকে নানারকম নীতিমালা তৈরি করে। প্রশাসনের প্রতিটি জায়গায় নিজের পছন্দনীয় লোক বসানো হয়। বিচার বিভাগও এর বাইরে নয়। ক্ষমতার লোভে বাইরে থাকা বড় বিরোধী দলকে রাস্তায় মিটিং মিছিল করতে দেয়া হয় না। বলা হয় এসব করলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে। কিন্তু সরকারি দল প্রতিদিন দলীয় প্রোগ্রাম-নির্বাচনী প্রোগ্রাম নিয়ে গোটা বাংলাদেশ চষে বেড়ালেও জনজীবনে ব্যাঘাত ঘটে না। আসলে ক্ষমতার লোভ এমন স্তরে পৌঁছে গেলেই মানুষ নীতিহীন কর্মকাণ্ডগুলো করে। লাঠিয়াল বাহিনী, দলীয় বাহিনী, পুলিশ প্রশাসন সবকিছুই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। বলা হয় সংবিধানের বাইরে একচুল পরিমাণে যাওয়া যাবে না। অথচ ৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনের আগে সরকারি দল বিরোধী দলকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেয়ার কথা বলেছিল- সবাই মিলে সরকার গঠনের কথাও বলা হয়েছিল। তখন এই সংবিধানই ছিল। তখন যদি এসব কথা বলা যায়, তাহলে ২০১৮ সালে নির্বাচনে এসব কথা বলা যাবে না কেন? ক্ষমতার লোভ যখন অতিমাত্রায় ভর করে তখন আবোলতাবল কথাবার্তা আমরা আমজনতা রাষ্ট্রের মুখ থেকে অহরই শুনতে পাই। এবার আসুন বাড়ি গাড়ি একটি হলে চলবে না। একাধিক থাকতে হবে। এ হলো আরেক ধরনের লোভ, যার কোনো শেষ নেই। অর্থনীতির ভাষায় বলা যায় wants are unlimited অর্থাৎ চাহিদার শেষ নেই। কিন্তু ধর্মে বলা হয়েছে- তোমার যা আছে তা নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট থাকো, তাহলে মনে শান্তি পাবে। টাকা পয়সা ধন সম্পত্তি বেশি হলে মনের শান্তি উদাও হয়ে যায়। তখন মানুষের মধ্য থেকে মূল্যবোধ হারিয়ে যায়। আমরা আজ এ ধরনের একটি সময়ের মধ্যে পথ চলছি। মানুষ অমানুষের পর্যায়ে ধাবিত হচ্ছে। ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয়, ইরাক ও লিবিয়ার লৌহ মানবদের দিকে তাকালে তা অনুধাবন করা সহজ হবে। বাংলাদেশে ৪৭ বছরের সরকারগুলোর পতনের দিকে তাকালেও এর সত্যতা বোঝা সহজ হবে। ক্ষমতা কার কিভাবে চলে যাবে বিশ্ব ইতিহাসের ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপ্রধানগুলোর দৃষ্টান্ত থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি।
লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক
harunrashidar@gmamil.com

আন্দোলন কৌশল by ড. আবদুল লতিফ মাসুম

যেকোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আগে থেকেই রণকৌশল নির্ধারণের প্রয়োজন হয়। রাজনৈতিক দলগুলো কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠনতন্ত্র, ঘোষণাপত্র এবং নির্বাচনের পূর্বক্ষণে মেনিফেস্টো প্রকাশ করে থাকে। যেসব রাজনৈতিক দল আদর্শভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে তাদের রণকৌশল প্রায় একই রকম ছকে বাঁধা থাকে সবসময়। অন্য দিকে, যেসব রাজনৈতিক দল পপুলিজম বা লোকরঞ্জন নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তারা ‘অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা’ নেয়। জনগণের ‘নাড়ির টান’ বুঝে তারা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষের চাওয়া-পাওয়া, সুখ-সুবিধা ও সমস্যাকেন্দ্রিক কর্মসূচি প্রণয়ন করে এসব দল। সে ক্ষেত্রে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের তেমন পার্থক্য নেই। পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার কারণ ছিল তদানীন্তন পূর্ব বাংলার জনগণের আশা আকাক্সক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কর্মসূচি প্রণয়ন করা। অপর দিকে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান জনগণের নাড়ির টান বুঝে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে বিএনপি অবশ্য একটি স্বতন্ত্র স্বকীয়তা বা ‘ইউনিকনেস’ এর দাবি করতে পারে। আর তা হলো, জনগণকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করা। বিএনপি ক্ষমতাবলয়ের বাইরে এসে নতুন ধারায় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। স্বৈরাচারী শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা যখন একটি কঠিন বিষয়, তখন বেগম খালেদা জিয়া তার দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে, বিশেষত তরুণ ছাত্র-যুবাদের নিয়ে আন্দোলন পরিচালনায় সক্ষম হন। যারা বিএনপিকে ‘সামরিক ছাউনির দল’ মনে করেন তারা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করেছিলেন, বিএনপি দেশের বৃহত্তম গণভিত্তিক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর রওনক জাহান স্বীকার করেছেন, বেগম খালেদা জিয়া বিএনপিকে একটি সত্যিকার রাজনৈতিক দলে রুপান্তরে সক্ষম হন (রওনক জাহান : ২০১৫:৩১)। গণতান্ত্রিক এবং নিয়মতান্ত্রিক পথেই যে বিএনপির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে, তার প্রমাণ বিগত ৪০ বছরের রাজনীতি। ক্ষমতায় থাকতে বর্তমান শাসক দলের মতো বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিচালনা করেনি। তারা যাই বলুক না কেন, ক্ষমতার বাইরে গিয়েও বিএনপি কখনোই গণতান্ত্রিক রীতি-পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হয়নি। বিএনপির গঠনতন্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অংশে ‘জ’ ধারায় বলা হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক জীবনধারা ও গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার রক্ষাকবচ হিসেবে গণনির্বাচিত জাতীয় সংসদের ভিত্তি দৃঢ়ভাবে স্থাপন করা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা।’ সন্ত্রাসের বিভীষিকা যখন পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করেনি, তখন বিএনপি ঘোষণা করেছে, ‘রাজনৈতিক গোপন সংগঠনের তৎপরতা এবং কোনো সশস্ত্র ক্যাডার, দল বা এজেন্সি গঠনে অস্বীকৃতি জানানো ও তার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা।’ বিগত দশ বছরে বিএনপি এ ধরনের ঘোষণার ব্যতিক্রম করেনি, কিন্তু বিএনপির কর্মসূচিকে সন্ত্রাসী তৎপরতায় পরিণত করার জন্য ক্ষমতাসীনদের চেষ্টার কোনো ত্রæটি ছিল না। বিশ্ব বাজারে সন্ত্রাস নামক বিষয়টি যখন পাশ্চাত্যের কাছে বিরাট এক অস্ত্র, তখন তাদের সাথে সুর মিলিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন বা সন্ত্রাসের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছেন তারা। বিএনপি গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনৈতিক পরিবর্তনে বিশ^াসী। তাই তারা গত ১০ বছরে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিল। শঠতা, প্রতারণা ও অপকৌশল দিয়ে ওই নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করা হয়েছে। সামনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। শাসক দলের সাধারণ সম্পাদক ১৩ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘প্রতিদ্ব›িদ্বতামূলক নির্বাচনের জন্য বিএনপিকে দরকার।’ সত্য কথা বলেছেন ওবায়দুল কাদের। হাত-পা বেঁধে যদি কাউকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে বলা হয়, সেটি যেমন হাস্যকর, তার আবেদনও সেরকম হাস্যকর। বাংলাদেশের একজন নাবালকও বোঝে, বেগম জিয়াকে কেন কারাগারে নেয়া হয়েছে। বিগত জাতীয় নির্বাচনে খালি মাঠে গোল দিয়ে যে বদনাম হাসিল করেছে আওয়ামী লীগ, সে অভিজ্ঞতা থেকে তারা এখন গা বাঁচাতে চাচ্ছেন। দেশের মানুষের আতঙ্ক এবং বিদেশীদের আশঙ্কা দূর করার জন্য এবার দৌড়ে বিএনপিকে তাদের প্রয়োজন। শুধু একজনে তো আর দৌড় প্রতিযোগিতা হয় না! তাহলে মানুষ হাসবে। প্রতিযোগিতার জন্য কমপক্ষে তিনটি নাম দরকার। প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে অনেক সময় লোকেরা নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে আরো দু’জন দরখাস্তকারী জোটায় নিজের চাকরিকে ‘জায়েজ’ করার জন্য। সেরকম অর্থেই নির্বাচনে বিএনপিকে দরকার। কিন্তু অলিখিত শর্ত এই যে, তাকে পরাজিত হতে হবে। মূলত এতে রাজি করানোর জন্য ইতোমধ্যেই ১৫ লাখ মানুষের নামে মামলা করা হয়েছে। নিত্যদিন গণগ্রেফতারি চলছে। নির্বাচনী স্বচ্ছতা! এর ‘প্রমাণ’ একজন মামলার পর মামলা অবশেষে জেলে অন্তরীণ, অপরজন নির্বাচনী জনসভা করে বেড়াচ্ছেন। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার, বিএনপিকে রাজধানীতে কোথাও নির্বিঘ্নে কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না সরকার। বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলোর কর্মসূচিতে লাঠিপেটা করা হচ্ছে। এ ধরনের নিপীড়ন সত্তে¡ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের মানববন্ধন মানবতরঙ্গে পরিণত হয়েছে। যেখানে কর্মসূচি দেয়া হচ্ছে, সেখানেই মানুষের ঢল নামছে। তবে এসব কর্মসূচির অভিন্ন চরিত্র দৃশ্যমান। শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পথে কর্মসূচির পর কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। আন্দোলনে যাতে নাশকতার সৃষ্টি না হয়, শান্তিপূর্ণ পথে তা পরিচালিত হয়, সেজন্য গ্রেফতারের আগে বেগম জিয়া কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। কারাগারে যাওয়ার পথে হাজার হাজার মানুষ তার অনুগমন করলেও কোথাও তেমন শান্তিভঙ্গ হয়নি। আন্দোলনের নামে জনগণের জানমালের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিতে খালেদা জিয়া নেতাদের নির্দেশ দেন। কর্মসূচি চলার সময়ে কেউ যেন গাড়িতে একটি ঢিলও না ছোড়ে, সে ব্যাপারে নেতাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো অনুপ্রবেশকারী যাতে নাশকতা সৃষ্টি করে দলকে বেকায়দায় ফেলতে না পারে, সে ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সর্বোচ্চ মাত্রায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। উল্লেখ্য, মামলার চূড়ান্ত রায়ের দু-একদিন আগে পুলিশ ভ্যান থেকে দু’জন নেতাকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে পুলিশ ভ্যান ভাঙচুর করা হয়। বিএনপি নেতৃত্ব মনে করে, সরকারি এজেন্টরা সুপরিকল্পিত ইন্ধনের মাধ্যমে এ ঘটনা ঘটায়। সরকার এ ঘটনাকে শত শত নেতাকর্মী গ্রেফতারের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে। যখন গণগ্রেফতার চলছে পুলিশ বলছে তারা ছবি দেখে দেখে আটক করছে। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, পুলিশ একজন সাধারণ পথচারীকে গ্রেফতার করছেন, আর তিনি আইডি কার্ড দেখিয়ে অব্যাহতি পেতে চাচ্ছেন। এ রকম অনেক ছবি নির্মম সত্যি কথা বলছে। এমন কোনো অজুহাত যাতে পুলিশ না পায়, সেজন্য সারা দেশে নেতাকর্মীদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের দায়-দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে।
বেগম জিয়া আরো নির্দেশ দিয়েছেন, আন্দোলনের সময়ে কোথাও কোনো হামলা বা নাশকতার ঘটনা ঘটলে দলীয়ভাবে দ্রæত তদন্ত করে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে, যাতে দলের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ না হয়। নেত্রী আরো সতর্ক করেন যে, ‘কোনোভাবেই আন্দোলন যেন সহিংস রূপ না নেয়।’ মনে করা হচ্ছে, সরকার নানাভাবে চেষ্টা চালাবে বিএনপিকে উসকে দেয়ার জন্য; কিন্তু তাতে আন্দোলনকারীদের পা দেয়া চলবে না। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ৯ ফেব্রুয়ারি দলের নীতিনির্ধারকসহ ৫ জন আইনজীবী কারাগারে দেখা করতে গেলে বেগম জিয়া এসব সতর্কতার কথা বলেন। তিনি আগামী দিনের আন্দোলনের করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট ও অনশনের মতো সহজ-সরল ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেয়া হচ্ছে। এ ধরনের কর্মসূচির পরে ক্রমান্বয়ে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি আসতে পারে। সবকিছু নির্ভর করছে পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, বিএনপি অনুসৃত বর্তমান কর্মসূচিই সঠিক। নেতারা কর্মীদের ক্ষোভকে সঞ্চয় করে করে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছার সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। গৃহীত নতুন রণকৌশল ইংরেজি প্রবাদ- ‘স্লো বাট স্টিডি উইনস দ্য রেস’ এর প্রতিফলন ঘটাতে চাচ্ছে। এ কর্মসূচিকে অতীতের ভুলত্রুটি সংশোধন করে সামনে এগোনোর বাস্তব কর্মসূচি বলে মনে করা হচ্ছে। আন্দোলনের কর্মসূচিতে বিএনপি নেতাদের উপস্থিতি-অনুপস্থিতি নিয়ে সরব-নীরব বিতর্ক আছে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞমহল মনে করে, অতীতে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতাদের অসহযোগিতা এবং অনুপস্থিতির কারণে আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার নজির রয়েছে। নানা দল থেকে বিভিন্ন আদর্শ ও পেশার মানুষ বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে থাকায় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। তবে দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের কারো কারো ‘সুবিধাবাদী চরিত্র’কে ব্যর্থতার কারণ বলে মনে করেন। এবারে এসব নেতানেত্রী যাতে রাজপথমুখী হন সেই তাগাদা দেয়া এবং যোগাযোগ করা হচ্ছে। বিএনপি নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করে ‘আগে যেখানে তাদের নামানো যেত না, এখন তারা রাজপথে নামছেন।’ বিএনপির প্রতি শুভেচ্ছা পোষণ করেন- সিভিল সোসাইটির এমন সদস্যরা দলের নেতাকর্মীদের বিদ্বেষ, কোন্দল ও আঞ্চলিকতা পরিহার করে দুঃসময়ে এক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আশার কথা, বিএনপি চেয়ারপারসনের জেলে যাওয়ার পর কেন্দ্রীয় নেতারা অধিকতর ঐক্য, সংহতি ও সক্রিয়তা প্রদর্শন করছেন। যারা মামলা, ভয়-ভীতি ও শত্রæতার অথবা সুবিধাবাদী হওয়ার কারণে আত্মগোপন করে আছেন, তাদের উচিত এখন প্রকাশ্যে ভ‚মিকা পালন করা। পদ, ক্ষমতা ও সুবিধার তোয়াক্কা না করে সবাই মিলে আন্দোলন সফল করার সময় এখন। আরেকটি বিষয় হলো, দলের ভাঙন ঠেকানো। সরকারি দল বিএনপিতে ফাটল ধরানোর অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছে। দৃশ্যত মনে হচ্ছে, এখন বিএনপি ‘মোনাফেকমুক্ত’। বেগম জিয়ার প্রতি আবেগময় ভালোবাসার কারণে দল আজ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘চেয়ারপারসনের কারামুক্তিকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরা আরো ঐক্যবদ্ধ। সাধারণ মানুষকে এ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করতে নেতাকর্মীরা কাজ করছেন। নেতাকর্মীদের চাঙ্গা ভাব ও সক্রিয়তা নিঃসন্দেহে আগামী দিনের আন্দোলনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিরোধী গোষ্ঠী বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠিয়ে হয়তো ভাবছে, জনতার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু জনতার শক্তিই যদি শেষ কথা হয়, তাহলে গণতন্ত্রের জন্য জনতার বিপ্লব অনিবার্য।হ
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মিশন by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

এখন সম্ভবত কারো মনে কোনো সংশয় নেই যে, নুরুল ইসলাম নাহিদের মতো একজন ব্যক্তি শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হওয়াকে ত্বরান্বিতই করেছেন। এটি একেবারে শুরু থেকেই সত্য। তিনি মন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। কত যে ‘রঙ তামাশা’ তিনি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে করেছেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। একেবারে কোমলমতি শিশু থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত খোলনলচে তিনি বদলে দেয়ার চেষ্টা করেন এবং এখন বলা যায় সে ক্ষেত্রে তিনি বহুলাংশে সফলও হয়েছেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বই নিয়ে এমন সব মশকারা করা হয়েছে, যেগুলো জাতির দৃষ্টিতে ক্ষমার অযোগ্য। প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখা ওলটপালট করে দেয়া হলেও তা দেখার বা তার ওপর নজরদারির কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ছাপার ভুল, বানান ভুল, ভুল কবিতা- এসব সংযোজন করে বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য লেখকদের সাথে ইয়ার্কি করতে মন্ত্রণালয় কসুর করেনি। ফলে একেবারেই প্রাথমিক স্তর থেকে শিক্ষার্থীরা ভুল ও মতলবি শিক্ষা নিয়ে অগ্রসর হতে বাধ্য হয়েছে। এমন অবস্থা অতীতে বাংলাদেশে তো বটেই, পাকিস্তান আমলেও কখনো তৈরি হয়নি। এখানেই শেষ নয়, এই মন্ত্রীর আমলে শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্লাসরুম থেকে বের করে কোচিং সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোচিং সেন্টার আগেও ছিল, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা এতটা কোচিংনির্ভর আগে কখনো ছিল না। এর কারণ, পরীক্ষা। পঞ্চম শ্রেণীতে একটি সার্টিফিকেট পরীক্ষা, অষ্টম শ্রেণীতে একটি সার্টিফিকেট পরীক্ষা, দশম শ্রেণীতে একটি সার্টিফিকেট পরীক্ষা। এত পরীক্ষার ফলে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ার আনন্দ ভুলে গেছে। তাই এখন লেখাপড়ার মানে দাঁড়াচ্ছে শুধু পরীক্ষা। অভিভাবকেরা সারা দিন শিশুদের হাত ধরে এ কোচিং সেন্টার থেকে সে কোচিং সেন্টারে ছোটাছুটি করছেন। তাতে শিক্ষার মান কিছু অর্জিত হচ্ছে না, বরং অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপে শিক্ষার্থীদের জীবনে পড়াশোনার ভীতি ঢুকে গেছে। এতে নষ্ট হচ্ছে সৃষ্টিশীলতা, নষ্ট হচ্ছে স্কুলে যাওয়ার আনন্দ এবং শিক্ষার্থীর জীবন। পাসই শিক্ষাজীবনের মূল কথা বা চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, আসল কথা হলো- জ্ঞান অর্জন। শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ তার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। শিক্ষা থেকে জ্ঞান এখন বহুদূরে। আমরাও তো স্কুল-কলেজে পড়েছি, সেখানে স্কুলে যাওয়ার আনন্দই ভিন্ন ছিল। প্রাইভেট যে পড়িনি এমন নয়, ছাত্ররা যে বিষয়ে দুর্বল শুধু সে বিষয়ে প্রাইভেট পড়েছে। অষ্টম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষার আগে স্কুলগুলো প্রতিযোগিতার কারণে বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের হোস্টেলে এনে রাখত। সেখানে তাদের বিশেষভাবে লেখাপড়া করানো হতো। যে স্কুলের বেশি ছাত্র যত বৃত্তি পেত, সে স্কুলের তত বেশি সম্মান হতো। এমনিভাবে এসএসসি পরীক্ষায় যে স্কুলের ছেলেমেয়েরা ফার্স্ট ডিভিশন বেশি পেত, সে স্কুলের মর্যাদা অনেক বেশি হতো। ছাত্রসংখ্যাও বাড়ত। এ ছাড়া ছিল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, দেয়াল পত্রিকা বের করা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠান, নাটক মঞ্চস্থ করা, লাইব্রেরিতে পড়াশোনা- এসব মিলে আমরা একটা আনন্দময় জীবন কাটিয়েছি। স্কুলে যাওয়ার জন্য কত যে পরিশ্রম আমাদের শৈশবে করতে হয়েছে, তার শেষ নেই। কখনো নদী সাঁতরেছি, খাল সাঁতরেছি, অতিরিক্ত কাপড় পরে ভেজা কাপড় স্কুলের মাঠে শুকাতে দিয়ে তারপর ক্লাসরুমে ঢুকেছি। প্রতিদিনের পড়া তৈরি করতে রাত জেগেছি। প্রতিযোগিতা ছিল, যেন শিক্ষকেরা প্রশ্ন করলে সব প্রশ্নের জবাব দিতে পারি। এখনকার আমলে সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। এমনকি, ক্লাসরুম থেকেও উঠে গেছে পড়াশোনা। শিক্ষকেরা কোচিংকে বাণিজ্য হিসেবে নিয়েছেন। বহু শিক্ষক স্কুলের আশপাশে বাড়ি ভাড়া করে কোচিং সেন্টার চালাচ্ছেন। কারণ, সেটাই লাভজনক। কিন্তু এর ফলে যা হয়েছে, তা হলোÑ শিক্ষা থেকে জ্ঞান মুছে গেছে। এখন নিছক পরীক্ষা পাসের প্রতিযোগিতা। সে প্রতিযোগিতায় মদদ দিতে গিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরেক দফা শিক্ষার দফারফা করেছে। পাসের হার নাকি বাড়িয়ে দেখাতে হবে। এ জন্য এমন সব মন্দ পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে, যা শিক্ষার জন্য সর্বনাশ ডেকে এনেছে। এসএসসি পরীক্ষায় ‘শতভাগ পাস’ দেখানোর জন্য করা হয়েছে অমন বাজে ব্যবস্থা। সরকারের তরফ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে পরীক্ষকদের বলা হয়েছে, কেউ যেন ফেল না করে। যেখানে ন্যূনতম পাস মার্ক ১০০-তে ৩৩, সেখানে ২৪ পেলে পাস করানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে বিবেকের তাড়নায় বহু শিক্ষক-শিক্ষিকা পরীক্ষকের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। যদি কেউ ফেল করে, তাহলে সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুসারে এ জন্য পরীক্ষককেই লিখিতভাবে জবাবদিহি করতে হবে। এ কেমন হীরক রাজার রাজত্ব? কোনো স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া করানো হয়নি, ক্লাসরুমের পড়াশোনা ঠিকমতো হয়নি, শিক্ষক ঠিকমতো ক্লাস নেননি কিংবা শিক্ষকের অভাব রয়েছে; সে দায়িত্ব কেন দূরবর্তী কোনো স্কুলের পরীক্ষক গ্রহণ করবেন? কিন্তু এ মন্ত্রী সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই বাধ্য করেছেন। তার পর হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে বলেছেন, আমাদের আমলে শিক্ষার এতটাই উন্নতি হয়েছে যে, প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীই পাস করছে। পাস তো করিয়েই দিলেন, কিন্তু তারপর এরা যাবে কোথায়? জ্ঞান তো তাদের নেই। ছাত্রদের জ্ঞানার্জনের জন্য কী ব্যবস্থা সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়েছে? যা হয়েছে তা হলো জিপিএ ৫-এর ঢল নেমেছে। কিন্তু তারাই যখন বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে, তখন দেখা গেছে জিপিএ ৫ বা গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থী পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাস মার্ক পর্যন্ত তুলতে পারেনি। যতই জিপিএ ৫, গোল্ডেন জিপিএ ৫ হোক না কেন, আউট। অর্থাৎ হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে তাদের যোগ্যতার অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে ‘পাস’ করিয়ে রাস্তায় ঠেলে দিয়েছেন এই মন্ত্রী। ওই পরীক্ষার্থীরা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। তারা সার্টিফিকেট বিক্রেতা নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আবারো প্রতারণার শিকার হয়েছে। সার্টিফিকেট হয়তো কিনল, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়েই থাকল। বরং যারা জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করেছে, শেষ পর্যন্ত জিপিএ ৫ বা গোল্ডেন জিপিএ ৫ পাক বা না পাক, তারাই টিকে থেকেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সাধারণ স্কুল-হাইস্কুলের বা কলেজের শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা অধিক জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছে। তাতে স্পষ্টতই বোঝা যায়, মাদরাসায় বরং শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকখানি ক্লাসরুমমুখী। যদিও মন্ত্রী সাহেব ও তার সহযোগী বুদ্ধিজীবীরা এতে ‘গেল গেল’ বলে শোর তুলেছেন। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি কিছুই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তো এই অবস্থা দেখে বলেই ফেললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন একটি বড় ধরনের মাদরাসা। এই শিক্ষকের লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল যে, তার সহযোগীরা কলেজগুলোতে কী পড়ান, যার জন্য সেখানে শিক্ষার মান কেবলই পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে খেয়াল করেননি মন্ত্রী থেকে শুরু করে ওই শিক্ষকদের কেউ। আর পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে একেবারেই পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে। যেখানে পরীক্ষাই সব, সেখানে নকল হওয়ার প্রবণতা তো থাকবেই।
সুতরাং প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস করছেন বহু ক্ষেত্রে শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা, ছাপাখানার কর্মচারী-কর্মকর্তারা এবং সরকারের আপনজন ছাত্রলীগ। ফাঁস হতে হতে এমন কোনো পাবলিক পরীক্ষা নেই, যার প্রশ্নপত্র এখন আর ফাঁস হয় না। এখন এসএসসি পরীক্ষা চলছে। প্রতিদিন প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। মন্ত্রী কিছু দিন তড়বড় করলেন। ‘প্রশ্ন ফাঁস হলেই পরীক্ষা বন্ধ। ধরিয়ে দিতে পারলে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার।’ তারপর একেবারে চুপ মেরে গেছেন। এখন বলছেন, ‘প্রশ্নফাঁস ঠেকানো যাবে না’। কেন যাবে না? এ বিষয়ে তার কাছে কোনো জবাব নেই। তার সচিব বলে বসলেন, প্রশ্নফাঁস যখন ঠেকানো যাবে না, বই খুলে পরীক্ষা দেয়ার বিধান করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এসব শুনে বলতে হয়, অশিক্ষিত গাছে ধরে না, এটাও অশিক্ষারই ফল। সরকার প্রশ্নফাঁসের আসল কারিগরদের ধরতে পারেনি কিংবা ধরতে চাইছে না। অথবা ধরার সাধ্য তাদের নেই। এরা একটি শক্তিশালী চক্র এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে, সে চক্রের অংশীদার। ফলে এই মন্ত্রণালয় এখন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়ে উঠেছে। যদি কোনো শিক্ষার্থীর কাছে ফাঁসকৃত প্রশ্ন পাওয়া যায়, তবে তাকে গ্রেফতার করা শুরু হয়েছে। যদি কোনো শিক্ষার্থী শোনে যে, প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, তাহলে কৌত‚হলবশত সেই ফাঁসকৃত প্রশ্নটি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করবে। তখন তাকে খপ করে ধরে ফেলা হবে। এটা যেন গোদের উপর বিষফোঁড়া। এই শিক্ষার্থী কৌত‚হলবশত ফাঁসকৃত প্রশ্ন দেখতে গিয়েছিল, কিন্তু অদ্ভুত সরকার আটক করে জেলে পুরে এই শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে একটি বছর কেড়ে নিয়েছে। এর জবাবদিহিতা কে করবে? এর পেছনে যুক্তি কী? যে চক্র প্রশ্ন ফাঁস করছে, তারা নাহিদ সাহেবদের আদরের দুলাল। অতএব, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভোগান্তি যত সাধারণ শিক্ষার্থীর। এটা কোনো ন্যায়বিচার নয়। এ দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঠিকই আঁচ করতে পেরেছে, এভাবে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়ার জন্য একদিন তাদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হতে পারে। আর সেজন্যই তারা প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি চেয়েছে। অবাক কাণ্ড! তারা বুঝতে পেরেছে, প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি একটি অপরাধ; কিন্তু এ অপরাধ যেন তাদের স্পর্শ করতে না পারে তার আগাম দায়মুক্তির প্রার্থনা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে যেকোনো সময় দায়মুক্তি দিয়ে দেয়া হতেও পারে। র‌্যাব পুলিশ যদি তাদের অপরাধের জন্য দায়মুক্তি পায়, তাহলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী দোষ করেছে? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা অনুযায়ী সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে। সংবাদপত্রগুলো তাদের দুর্নীতির কোনো খবর আর প্রকাশ করতে পারবে না। যদি প্রকাশ করে তবে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কঠোর দণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বত্রই সরকার নিজে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নানা ধরনের দায়মুক্তি দিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় সাহস পেয়েছে এই দায়মুক্তি চাইবার। তবে অবাক কাণ্ড হচ্ছে, এই বাংলাদেশে শত শত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ‘এ’ লেভেল, ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা হচ্ছে। তার প্রশ্ন কোনো দিন ফাঁস হয়নি। ফাঁস করার কথা কেউ কল্পনাও করেনি। সেটা কিভাবে সম্ভব? দেশের উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা ‘এ’ লেভেল, ‘ও’ লেভেলে পড়ে। তাদের শিক্ষা মোটামুটি মানসম্মতভাবেই প্রসারিত হচ্ছে এবং ধারণা করা যায়, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে মেধার ক্ষেত্রে তারাই সামনে থাকবে। থাকবে উন্নতমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনের সারিতে। অথবা তারা পড়তে যাবে বিদেশে। বিদেশী ডিগ্রি নিয়ে এসে প্রশ্নফাঁসের শিক্ষার্থীদের দু’পায়ে গুটিয়ে দেবে। সরকার এমন আয়োজনই করেছে, যাতে সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষা একেবারে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এর একটা বিহিত হওয়া প্রয়োজন। বুদ্ধিজীবীরা প্রশ্নফাঁসের মহোৎসব দেখে বলতে শুরু করেছেন, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পরীক্ষার বোঝা দূর করে ক্লাসরুমের পড়াশোনাকে আনন্দময় করে তোলা হোক; যাতে কোচিং সেন্টারের দিকে না দৌড়ে ক্লাসরুমের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দিতে থাকবে।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

দক্ষিণ এশিয়ার ভাষা ও ভাষা সমস্যা by এবনে গোলাম সামাদ

১৯০১ সালে ব্রিটিশ ভারত সাম্রাজ্যে যে আদমশুমারি হয়, তার রিপোর্টে বলা হয়, বার্মাসহ ভারতের ভাষার সংখ্যা হলো ২২০টি। বার্মাকে বাদ দিলে ভারত সাম্রাজ্যের যে অংশ থাকে তার ভাষা সংখ্যা হলো ১৪৬টি। এ সময় ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন (১৮৫১-১৯৪১) তখনকার ভারতের ভাষাগুলোকে প্রধানত চারটি ভাষা পরিবারে স্থাপন করেন। এরা হলো : ১. আদি আর্যভাষা পারিবার, ২. দ্রাবিড়, ৩. কোল এবং ৪. চীনাভাষা পরিবার। গ্রিয়ার্সনের এই ভাষাবিভাগকে এখনো মোটামুটি স্বীকার করা হয়। বর্তমান ভারতে ভাষার মোট সংখ্যা কত, তা আমরা জানি না। কোনো নতুন ভাষা-জরিপ সম্ভবত এখনো করা হয়নি। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিক কাজকর্ম চলেছে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে। সৃষ্টি হয়নি সেভাবে কোনো ভাষা সমস্যার। ভাষা সমস্যার সৃষ্টি হয় ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শেষ ভাগে। ১৯৩৫ সালে পাস হয় ব্রিটিশ-ইন্ডয়া অ্যাক্ট। যাতে ব্রিটিশ-ভারতের প্রদেশগুলোকে দেয়া হয় যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন। এই অ্যাক্ট অনুসারে তদানীন্তন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৭ সালে। তখন ব্রিটিশ-ভারতের প্রদেশ সংখ্যা ছিল ১১টি। এর মধ্যে কংগ্রেস নির্বাচনে জেতে আটটি প্রদেশে। কংগ্রেস এসব প্রদেশে মন্ত্রিসভা গঠন করে ১৯৩৭ সালের জুলাই মাসে। এ সময় কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠন করলেও আসল ক্ষমতা থাকে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির হাতে। যাকে বলা হতো কংগ্রেস হাইকমান্ড। এই হাইকমান্ড আবার একটি সাবকমিটি গড়ে। যারা পরিচালনা করতে থাকে বিভিন্ন প্রদেশের কংগ্রেস-মন্ত্রিসভাকে। মাদ্রাজ প্রদেশে কংগ্রেসের মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন চক্রবর্তী রাজা গোপাল আচারি। যিনি একজন খুব বড় নেতা হলেও তাকে মেনে চলতে হতো কংগ্রেস হাইকমান্ডের নির্দেশ। তিনি ছিলেন তামিল ভাষার একজন সুলেখক। ধর্মে হিন্দু এবং ব্রাহ্মণ। মুখ্যমন্ত্রী রাজা গোপাল আচারি কংগ্রেসের হাইকমান্ডের নির্দেশে মাদ্রাজ প্রদেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর হিন্দিভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন। যেটা মাদ্রাজর তামিলভাষী মানুষ মেনে নিতে পারে না। তারা শুরু করে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন। প্রায় তিন বছর ধরে এই আন্দোলন চলে। ছাত্ররা করে সভা, বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট। এ সময় পুলিশের হাতে প্রতিবাদকারী দু’জন ছাত্রের মৃত্যু ঘটে, আটক অবস্থায়। এ সময় পুলিশের হাতে বন্দী হয় এক হাজার ১৯৮ জন ব্যক্তি। এই আন্দোলন যেমন হয়ে দাঁড়ায় হিন্দিবিরোধী, তেমনি আবার হয়ে দাঁড়ায় ব্রাহ্মণবিরোধী। কেননা মুখ্যমন্ত্রী রাজা গোপাল আচারি ছিলেন ব্রাহ্মণ। আর অনেক ব্রাহ্মণ ছিলেন তার সমর্থক। এই আন্দোলনে মাদ্রাজ প্রদেশে সব তামিলভাষী মুসলমান যোগ দেয় হিন্দি বিরোধীদের পক্ষে। অন্য দিকে উর্দুভাষী মুসলমানেরা যায় হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে। এ সময়ের মাদ্রাজ প্রদেশ ছিল পরবর্তী মাদ্রাজ প্রদেশের চেয়ে অনেক বড়। আর এখানে ছিল কিছু উর্দুভাষী মুসলমান। যদিও সংখ্যায় তারা খুব বেশি ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। কংগ্রেস চায় না বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনকে সহযোগিতা করতে। কংগ্রেস সদস্যরা আটটি প্রদেশের বিধানসভা থেকে পদত্যাগ করে। ১৯৩৯ সালে মাদ্রাজ প্রদেশে ক্ষমতা গ্রহণ করেন গভর্নর লর্ড এরসকিন (Lord Erskine)। তিনি ক্ষমতায় এসে মাধ্যমিক স্কুলে হিন্দি শেখার আইন বাতিল করেন। আমি এ সময়ের কথা বলছি, কারণ আমাদের দেশে অনেকে মনে করেন ভাষা নিয়ে আন্দোলন এই উপমহাদেশে প্রথম হয়েছে ঢাকায়, পাকিস্তান আমলে। এই উপমহাদেশের ইতিহাস অনুশীল করলে দেখা যাবে, ভাষা নিয়ে প্রথম বিরোধ সৃষ্টি হয় তামিলভাষী মাদ্রাজে। আর এতে প্রাণ যায় দু’জন তামিলভাষী ছাত্রের। অনেকে ভাবেন, পাকিস্তান না হলে ভাষা সমস্যার উদ্ভব হতো না। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার অনেক কয়েক বছর আগেই ব্রিটিশ ভারতের মাদ্রাজ প্রদেশে সৃষ্টি হতে পেরেছিল ভাষা সমস্যা। ১৯৪৯ সালে রচিত ভারতের সংবিধানে বলা হয়, ভারতে ১৯৬৫ সালের মধ্যে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হবে হিন্দিকে। কিন্তু এর বিরোধিতা শুরু করে দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়ভাষী লোকেরা। এই আন্দোল সবচেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে মাদ্রাজে। তামিলভাষী মাদ্রাজের অধিবাসীরা শুরু করে প্রচণ্ড বিক্ষোভ। তারা ট্রেনে ও সরকারি ভাবনে শুরু করে অগ্নিসংযোগ। পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। এতে ১৯৬৫ সালে সরকারি হিসাব অনুসারে দু’জন পুলিশসহ মারা যায় ৬০ ব্যক্তি। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে মারা যায় ৫০০ জন। ফলে হিন্দিকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার আইন মুলতবি করা হয়। প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী বেতারে ঘোষণা করেন, হিন্দির সঙ্গে অনির্দিষ্ট কালের জন্য সহযোগী রাষ্ট্রভাষা থাকবে ইংরেজি। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমেই গ্রহণ করা হবে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা, হিন্দি ভাষার মাধ্যমে নয়। এর ফলে বন্ধ হয় মাদ্রাজ প্রদেশে হিন্দিবিরোধী আন্দোলন। ১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ১৯৬৭ সালে আইন করেন, ইংরেজি ভাষা অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতের সহযোগী রাষ্ট্রভাষা হিসেবে থাকবে। অর্থাৎ কার্যত ইংরেজি ভাষাই এখনও সারা ভারতে চলেছে প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে। মাদ্রাজিরা ব্রিটিশ শাসনামলে যথেষ্ট ভালোভাবে শেখে ইংরেজি ভাষাকে। মাতৃভাষার মতোই অনেক তামিলভাষী বলতে পারে ইংরেজি। ইংরেজি ভাষা তাদের কাছে ঠিক বিদেশি ভাষা বলে বিবেচিত নয়।
মাদ্রাজ প্রদেশে কংগ্রেস ১৯৬৫ সালে পরাজিত হয় তামিল জাতীয়তাবাদী দল, দ্রাবিড় মুনাত্রা কাজাঘাম দলের কাছে। এই দল ১৯৬৯ সালের ১৪ জানুয়ারি মাদ্রাজ প্রদেশের নাম বদল করে রাখে, তামিলনাড়ু। তামিল ভাষায় ‘নাড়ু’ শব্দের অর্থ হলো দেশ। অর্থাৎ তামিলনাড়ু মানে হলো তামিলদের দেশ। ১৯৯৬ সালের পহেলা অক্টোবর তামিলনাড়ুর রাজধানী মাদ্রাজের নাম বদলে রাখা হয় চেন্নাই। তামিলরা এখন তাদের ভাষাকে বিশুদ্ধ তামিল করতে চাচ্ছে। এ জন্য তারা বাদ দিচ্ছে তাদের ভাষায় প্রবিষ্ট সংস্কৃত শব্দকে। যেহেতু তামিল ব্রাহ্মণরা ধর্মীয় কারণে সংস্কৃত শব্দ পছন্দ করে, তাই বিশুদ্ধ তামিল ভাষা প্রবর্তনের জন্য আন্দোলনকারীদের হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে ব্রাহ্মণবিরোধী। তামিলরা খুব কর্মঠ জাতি। তারা চেন্নাইতে প্রস্তুত করছে কেবলমাত্র তামিল ভাষার ছায়াছবি নয়, দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য দ্রাবিড় ভাষারও ছায়াছবি। চেন্নাই হয়ে উঠেছে ছায়াছাবি নির্মাণের ক্ষেত্রে মুম্বাইয়ের হিন্দি ছায়াছবির বিশেষ প্রতিদ্বন্দ্বী। আমরা সাবেক পাকিস্তানে আন্দোলন করেছিলাম বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য। এখন এটাকে বলা হচ্ছে মাতৃভাষার আন্দোলন। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আর মাতৃভাষা আন্দোলন সমার্থক নয়। আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করেছিলাম, মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন নয়। পাকিস্তান আমলে কখনই বলা হয়নি যে, পূর্ববঙ্গ প্রদেশে প্রাদেশিক সরকারের কাজকর্ম চালাতে হবে উর্দুভাষার মাধ্যমে। বাংলাভাষাকে জর্জ গ্রিয়ার্সন স্থাপন করেছেন আর্যভাষা পরিবারে। কিন্তু বাংলাভাষার অনেক বৈশিষ্ট্য আছে যা হলো দ্রাবিড় ভাষাগুলোরই মতো। যেমন বাংলা শব্দের আদিস্বরে শ্বাসাঘাত রীতি দ্রাবিড় ভাষার মতো। বাংলা ভাষায় বাক্যরচনা করতে হলে আমরা অনেক সময়ই ক্রিয়াপদের ব্যবহার করি না। যেমন আমরা বাংলাভাষায় বলতে পারি ‘তিনি একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক’। আমরা বলি না, ‘তিনি হন একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক’। বাংলার এই বাক্যগঠন প্রণালী হলো দ্রাবিড় ভাষার অনুরূপ। বাংলাদেশের অনেক জায়গার নামের শেষে থাকতে দেখা যায় ভিটা, হিটি, গড্ডা, গুড়ি, জোলা প্রভৃতি শব্দ যুক্ত থাকতে। এরও দৃষ্টান্ত মেলে দ্রাবিড় ভাষায়। আমরা জানি হিন্দি ও উর্দু ভাষার ব্যাকরণ হলো একই। উর্দু হলো আরবি-ফারসি শব্দবহুল হিন্দি ভাষা মাত্র। যা লেখা হয় ফারসি-আরবি অক্ষরে। আমরা উর্দুকে চাইনি সাবেক পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে। হতে পারে এর একটা কারণ হলো আমাদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকা আর্যবিরোধী দ্রাবিড় মনোভাব। ভারতে এখন ক্ষমতায় আছে বিজিপি দল। বিজিপির বুদ্ধিজীবীরা প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে, ভারতে আর্য ভাষায় কথা বলা মানুষ বাইরে থেকে এসেছিল না। আর্যভাষী জাতি ছিল উত্তর-ভারতে। উত্তর-ভারত থেকে তারা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে। গড়ে তোলে উন্নত সভ্যতা। কিন্তু সাধারণভাবে বেশিরভাগ পণ্ডিত মনে করেন, প্রাচীন যুগে হরপ্পা এবং মহেনজোদারো নগর সভ্যতা গড়ে তুলেছিল দ্রাবিড়ভাষী মানুষ। তাদের ছিল একটা লিখিত ভাষা। এই লিখিত ভাষার পাঠ উদ্ধার এখনো করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এই সভ্যতার যথেষ্ট মিল থাকতে দেখা যায় সুমেরীয় সভ্যতার সঙ্গে। সুমেরীয় ভাষা ও দ্রাবিড় ভাষার মধ্যে থাকতে দেখা যায় অনেক মিল। অনেকের মতে, সুমেরীয় ভাষা থেকেই উদ্ভব হয়েছে দ্রাবিড়ভাষাগুলোর। বিজিপির পণ্ডিতরা মানতে চাচ্ছেন না হরোপ্পা ও মহেনজোদারো সভ্যতাকে দ্রাবিড়ভাষীর সৃষ্ট সভ্যতা হিসেবে। বিজিপি প্রমাণ করতে চাচ্ছে যে, এসব সভ্যতা হলো আর্যদেরই সৃষ্টি। এসব সভ্যতা হলো আর্য তথা হিন্দু সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন। বিজিপির মতে, যেহেতু হিন্দি ভাষায় ভারতের সর্বাধিত সংখ্যক লোক কথা বলে এবং যেহেতু তা হলো একটি আর্য ভাষা, তাই তাকে করা যেতে পারে ভারতের একমাত্র সরকারি ভাষা। কিন্তু বিজিপি এটা করতে গেলে ভারতে সৃষ্টি হবে তীব্র দ্রাবিড়-আর্য সঙ্ঘাত। যার ফলে ভারতীয় ইউনিয়ন ভেঙে যেতেও পারে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

যৌতুকের লোভে পুরুষ সেজে বিয়ে!

তাঁর বেশভূষা পুরুষের মতো। পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে মোটরসাইকেল চালান, আড্ডা দেন। ধূমপান ও মদ্যপানও করেন। আচরণ ও কর্মকাণ্ডে তিনি নিজেকে পুরুষ হিসেবেই তুলে ধরেছেন সবার সামনে। তবে শেষ পর্যন্ত পুরুষের ছদ্মবেশে সহজ উপায়ে অর্থ আয়ের পথে পা বাড়ানোয় ধরা পড়লেন। বেরিয়ে এল তাঁর আসল পরিচয়। আজ শুক্রবার বিবিসি অনলাইনে এ খবর প্রকাশ হয়। যৌতুকের লোভে পুরুষ সেজে বিয়ে করেছেন তিনি। তাও দুটো বিয়ে। অত্যন্ত চতুর এই ব্যক্তি এতেও ধরা পড়েননি। শেষ পর্যন্ত যৌতুক চেয়ে স্ত্রী হয়রানির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশ জানতে পেরেছেন তিনি আসলে নারী। পুরুষ সেজে বিয়ে করা ওই নারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কৃষ্ণ সেন (২৬) নামের ওই নারীকে ভারতের উত্তরাঞ্চলের রাজ্য উত্তরাখন্ড থেকে যৌতুক দাবির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তখন পর্যন্ত পুলিশ জানত না তিনি পুরুষ নন নারী। পরে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে তাঁর এই প্রতারণার বিষয়টি। ২০১৪ সালে প্রথম বিয়ে করার সময় তিনি প্রথম পুরুষের ছদ্মবেশ ধরেন।
পুরুষের বেশ ধরার আগে তাঁর নাম ছিল সুইটি। জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানামিজে খান্দুরি বিবিসিকে বলেন, ‘প্রথমে আমরা বুঝতেই পারছিলাম না যে কৃষ্ণ কী বলছে! এরপর আমরা তাঁর মেডিকেল পরীক্ষার ব্যবস্থা করি এবং জানতে পারি তিনি একজন নারী।’ প্রথম বিয়ের পরপরই তিনি স্ত্রীর কাছ থেকে সরে যান এবং গত বছরের এপ্রিলে আরেক নারীকে বিয়ে করেন। তাঁর সাবেক শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে হয়রানির অভিযোগ করা হয় থানায়। তারা আরও অভিযোগ করেন, কৃষ্ণ শ্বশুরবাড়ি থেকে সাড়ে আট লাখ রুপি ধার হিসেবে নেন ব্যবসা করার জন্য। কিন্তু ওই টাকা আর কখনো ফেরত দেননি। শতাব্দী কাল ধরে যৌতুক দেওয়া-নেওয়ার প্রথা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। বিয়ের সময় কনের বাড়ি থেকে বরের পরিবারকে নগদ অর্থ, জামাকাপড় ও অলংকার উপহার দেওয়া হয়। ভারতে বিয়েতে যৌতুক দাবি করা অবৈধ হলেও সেখানে এই প্রথা চালু রয়েছে। কৃষ্ণ সেন পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি সব সময় ছেলে হতে চেয়েছেন। তিনি ‘পুরুষের জীবন’ যাপন করতে চেয়েছেন।
তবে এটা স্পষ্ট হয়নি যে কৃষ্ণর বাবা-মা তাঁর এমন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত আছেন কি না। পুলিশের ভাষ্য, যে দুজন নারীকে তিনি বিয়ে করেছেন, তাঁরা তাঁকে কখনো সন্দেহ করেননি। তিনি তাঁদের সামনে কখনো অনাবৃত হননি এবং তাঁদের সঙ্গে তাঁর কোনো যৌন সম্পর্কও ছিল না। তাঁর বেশির ভাগ বন্ধুই পুরুষ। তিনি পুরুষের টয়লেট ব্যবহার করতেন। পুরুষালি কণ্ঠে কথা বলতেন। তিনি ধূমপান ও মদ্যপান করতেন। পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে মোটরসাইকেল চালাতেন। তাঁর আচরণ ও কর্মকাণ্ডে এমন কিছু ছিল না যাতে তাঁকে নারী বলে সন্দেহ করা যায়। আরেক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘পুরুষের মতো চুল, পোশাক ও আচরণ নিয়ে কৃষ্ণ পুরুষের জীবন যাপন করতেন। কেউ কখনো তাঁকে সন্দেহ করেনি। এমনকি তিনি হাঁটেনও একজন ‘আত্মবিশ্বাসী পুরুষের’ মতো।

ব্যাংক খাতে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি

ব্যাংক খাতে এখন আতঙ্ক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরই এ কথা বললেন। আমানত তুলে নেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। আতঙ্কের কারণে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ব্যাংকাররা। আর এতে বিনিয়োগকারীরা হয়ে পড়েছেন বিভ্রান্ত। কারণ, সঠিক তথ্য কেউই দিচ্ছে না। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নতুন কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রাখার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ বোধ করছে না।
মূলত রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স পাওয়া নতুন ব্যাংকগুলোর প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই। পুরোনো বেসরকারি ব্যাংক থেকেও কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এতে তারল্যসংকটে পড়েছে ব্যাংকগুলো। তারা নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে, বাড়ছে সুদহার। যার প্রভাব পড়েছে পুরো অর্থনীতিতে। এ ঘটনায় ব্যাংকাররা যেমন উদ্বিগ্ন, একই উদ্বেগ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরেরও। পরিস্থিতি সামাল দিতে গতকাল শনিবার গভর্নর প্রকাশ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল অগ্রণী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে গভর্নর বলেন, ‘একটি বেসরকারি ব্যাংক খারাপ অবস্থায় পড়ে গেছে। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি ব্যাংক থেকে আমানত সরিয়ে নিতে চাইছে। একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এই আতঙ্ক আগে শেয়ারবাজারে ছিল, এখন ব্যাংকে চলে আসছে।’ সম্মেলনের প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে গভর্নর বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অহেতুক এটা করছে। তারা যাতে বেসরকারি ব্যাংক থেকে টাকা না সরিয়ে ফেলে। আপনি নিশ্চয়ই বিষয়টা দেখবেন।’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এ নিয়ে গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা ব্যাংকের ঘটনার কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠান কেন টাকা তুলে ফেলবে? বিশ্বের সব দেশের ব্যাংকেই দুর্ঘটনা ঘটে। এখন সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে টাকা তুলে না ফেলে। আর আমানতের নিরাপত্তা যে আছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা গ্রাহকদের আশ্বস্ত করতে পারে। দোষীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা–ও জানাতে পারে।’
আতঙ্ক: শুরুটা হয়েছিল বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনা থেকে। এই ব্যাংকে রাখা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না আমানতকারীরা। জলবায়ু তহবিল ৫০৮ কোটি টাকা ফেরত না পাওয়ার কথা আলোচনা হয় জাতীয় সংসদেও। এরপরই বেসরকারি ব্যাংক থেকে তহবিল সরিয়ে ফেলতে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তিনটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা তুলে সরকারি ব্যাংকে জমা করেছে। হঠাৎ করে বড় অঙ্কের টাকা তুলে ফেলায় কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে ব্যাংক তিনটি। ব্যাংকাররা জানান, বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংক এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে নতুন ব্যাংকগুলো। অগ্রণী ব্যাংকের ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির আরও বলেন, আমদানি যে হারে বাড়ছে, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় সে হারে আসছে না। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়েছে। দাম বেড়ে গেছে। চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ১৫০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। এর মাধ্যমে বাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে এসেছে। তবে তিনি তারল্যসংকটের কথা নাকচ করে দেন। তবে ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণপ্রবাহ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার কারণেও অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। অনেকে নির্ধারিত ঋণসীমার মধ্যে আসতে দেওয়া ঋণও ফেরত আনছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে সবাই আমানত সংগ্রহে জোর দিয়েছে। বাজারে নতুন আমানত কম, তাই এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে বেশি সুদে স্থানান্তর হচ্ছে। এ কারণে আমানত ও ঋণ উভয়ের সুদহার বাড়ছে।
উদ্বেগ: সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা উদ্বিগ্ন। কোনো অজানা কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠান টাকা তুলে নিচ্ছে। দেশের ব্যবসার ৭০ শতাংশই করছে এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলো। অথচ এই ব্যাংকগুলো সরকারি আমানত পাচ্ছে মাত্র ২৫ শতাংশ। আমরা সরকারি আমানত অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে রাখার দাবি জানাই।’ অগ্রণী ব্যাংকের সম্মেলনে অবশ্য গভর্নর বলেন, আমানতের সুদহার বাড়তে শুরু করেছে, এটা আমানতকারীদের জন্য ভালো। তবে ঋণের সুদহার বাড়াটা ভালো না। এটা স্বল্প সময়েই ঠিক হয়ে যাবে। তিনি বলেন, আগ্রাসী ঋণ বিতরণ বন্ধ, ঋণের মান ভালো ও ঋণশৃঙ্খলা নিশ্চিতে ঋণসীমা কমানো হয়েছে। তারল্যসংকটের কারণে গত নভেম্বর থেকে আমানতের সুদহার বাড়াতে শুরু করে ব্যাংক। এখন ৯ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে কয়েকটি ব্যাংক। ফলে বেড়ে গেছে ঋণের সুদহার। এ ছাড়া ডলার কিনতেও অনেক টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে ব্যাংকগুলোতে ৮৫ হাজার ৯১১ কোটি টাকার আমানত বাড়লেও ঋণ যায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৩২২ কোটি টাকা।
বিভ্রান্তি: ব্যাংকগুলোতে হঠাৎ করেই ঋণ দেওয়ার মতো অর্থের টান পড়েছে। বেশ কিছু ব্যাংক নতুন করে ব্যবসায়ীদের ঋণ দিচ্ছে না। প্রায় সব ব্যাংকই বাড়িয়েছে সুদের হার। এমনকি কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের দেওয়া ঋণের টাকা ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মাস দুয়েক আগেও ব্যাংকগুলো বড় গ্রাহকদের ৮ থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিত, যা এখন ২ থেকে ৩ শতাংশ বেশি দিতে হচ্ছে। একইভাবে বেড়ে গেছে ভোক্তা ও গৃহঋণের সুদের হারও। ব্যাংকাররা হঠাৎ এই সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ দেখছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাংকের আমানতের বিপরীতে ঋণ বিতরণের সীমা কমিয়ে দেওয়া। এ ছাড়া সুদের হার কম হওয়ায় ব্যাংকে আমানত কমে যাওয়া, ডলার বিক্রি করে ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়া এবং বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংকের সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারিও পরোক্ষভাবে এ সংকটে ঘি ঢেলেছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) একটি প্রতিনিধিদল গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একটি বৈঠক করে। এতে ব্যাংকের তারল্যসংকট এবং ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। জানতে চাইলে সংগঠনটির সভাপতি আবুল কাসেম খান গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘গভর্নর আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে ব্যাংকে তারল্যসংকট সাময়িক। এটা কিছু ব্যাংকের জন্য হচ্ছে, পুরো খাতের চিত্র নয়। তবে আমরা যখন ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলছি, তখন ঠিকই তাঁরা তারল্যসংকটের কথা বলছেন।’ ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন, ‘আমরা আসলে বিভ্রান্ত। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের উচিত হবে প্রকৃত পরিস্থিতি জানিয়ে বা তুলে ধরে বিবৃতি দেওয়া।’ তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারির প্রভাব পড়ছে ব্যাংক খাতে। আর এসব কেলেঙ্কারির শাস্তি হয় না বলেই সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি।

পড়তির মুখে চীনা স্মার্টফোনের বাজার

প্রথমবারের মতো পড়তির মুখে চীনের স্মার্টফোনের বাজার। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো কোনো প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি এই বাজার। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যানালিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে চীনের স্মার্টফোন ব্যবসা কমেছে ৪ শতাংশের মতো। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই মোবাইল ফোন বাজারের টানা আট বছরের প্রবৃদ্ধি ধাক্কা খেল। চীনের ফোনের বাজারে আধিপত্য করে মূলত স্মার্টফোন হুয়াওয়ে, অপো, ভিভো। ২০১৭ সালে সার্বিকভাবে বাজার কমলেও হুয়াওয়ে কিছুটা সফল ছিল। ক্যানালিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই অঙ্কের ঘরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে কোম্পানিটির। তবে অপো ও ভিভোর স্মার্টফোন সরবরাহ কমেছে যথাক্রমে ১৬ ও ৭ শতাংশ। ২০১৭ সালে অপো ১ কোটি ৯০ লাখ ইউনিট এবং ভিভো ১ কোটি ৭০ লাখ ইউনিট স্মার্টফোন সরবরাহ করে।
কীভাবে পরিবর্তন আসে স্মার্টফোনের বাজারে?
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের স্মার্টফোনের বাজার দখল করে রাখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল ও দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং। তবে গত দুই বছর, অর্থাৎ ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ছোট ছোট চীনা অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনের ব্র্যান্ড মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করে। মূলত দ্রুতগতির এন্ট্রি-লেভেল ফোন খুবই সুলভ মূল্যে দিচ্ছিল চীনা কোম্পানিগুলো। চীনের বড় বড় শহর যেমন বেইজিং ও সাংহাইয়ের মানুষ আইফোন ও গ্যালাক্সি ছাড়া ভাবতে না পারলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ দামের কারণে এসব ফোন কিনতে পারত না। আর যে কারণে এসব অঞ্চলে সাধারণ ফিচার ফোনের প্রচলনই ছিল বেশি। এমন অবস্থায় ভোক্তাদের সর্বোচ্চ প্রযুক্তির ফোন কম দামে দিতে বাজারে আসে অপো ও ভিভো। কম দামে ‘প্রিমিয়াম’ অভিজ্ঞতা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেয় তারা। ২০১৬ সাল নাগাদই তার ফল দেখা যায়। বেসিক ফোন থেকে প্রিমিয়াম স্মার্টফোনে চলে আসে বহুসংখ্যক মানুষ। এতে চীনের বাজারে ফোনের চাহিদার একটি পরিবর্তন হয়। কাউন্টার পয়েন্ট গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের আগস্ট নাগাদ অ্যাপলের সমপরিমাণ স্মার্টফোন বিক্রি করেছে হুয়াওয়ে। ২০১৬ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস ব্র্যান্ড স্যামসাংকে সিংহাসনচ্যুত করে হুয়াওয়ে।
কেন কমল চীনের স্মার্টফোনের চাহিদা?
এই প্রশ্ন এসেই যায়। ক্যানালিসের গবেষক মো. জিয়া বলছেন, চীনে স্মার্টফোন বিক্রি কমে যাওয়ার এটা কারণ হতে পারে যে ক্রেতারা ইতিমধ্যে বেসিক ফোন থেকে এন্ট্রি-লেভেল স্মার্টফোন নিয়ে ফেলেছেন। তাঁরা ভাবছেন, আপাতত তাঁদের আর প্রয়োজন নেই। গ্রাহকেরা বলছেন, তাঁদের এখন যে ফোনটি আছে, তা যথেষ্ট ভালো। আর এখন এই ফোনগুলোর আয়ুষ্কাল প্রায় ২৬ দশমিক ৮ মাস বলেও জানিয়েছে ক্যানালিস। তারা মনে করছে, ২০১৯ সালের আগে চীনের স্মার্টফোনের বাজার আর বিস্তার লাভ করবে না। ২০১৯ সালে পঞ্চম জেনারেশন (ফাইভ-জি) ডিভাইস বাজারে আসার আগ পর্যন্ত এই বাজার সম্প্রসারণ হবে না।
বাজার সম্প্রসারণের নীতি
ক্যানালিসের গবেষক মো. জিয়া বলেন, ফোন প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো এমন সব ফোন তৈরি করছে, যার ফিচারগুলো আইফোন ও স্যামসাংয়ের ফোনের সমতুল্য। যেমন হুয়াওয়ে মেট ১০ ও হুয়াওয়ে মেট ১০ প্রোকে আইফোন ৮ ও আইফোন ৮ প্লাসের সঙ্গে তুলনা করা যায়। অথচ গ্রাহক একই ধরনের ফিচার পাচ্ছেন ৩০ শতাংশ কম দামে। এ ছাড়া গত বছর গ্যালাক্সি নোট সেভেন কেলেঙ্কারিতে চীনের বাজারে সুনাম হারিয়েছে স্যামসাং। আর এ কারণে নতুন ফোনের প্রয়োজনে হুয়াওয়ে অপো বা ভিভোর দিকে নজর দিচ্ছেন ভোক্তা। তবে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা থাকলেও বিদেশের বাজার কিছুটা চ্যালেঞ্জিং চায়নিজ ব্র্যান্ডগুলোর জন্য। এ জন্য তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মো. জিয়া বলেন, অপো ও ভিভো রাশিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলোতে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাইছে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায়ও বাজার আরও গভীর করছে তারা। শাওমি ভালো করছে ভারত ও থাইল্যান্ডের বাজারে। সেখানে নতুন নতুন মডেলসহ নতুন স্টোর খুলছে তারা। আর হুয়াওয়ের নজর বাজেট স্মার্টফোনের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা এই ব্র্যান্ডটির কদর না থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই ফোনের চাহিদা বাড়ছে।

চায়ের উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা বাড়ছে বেশি

দেশে ২০১৬ সালে সাড়ে ৮ কোটি কেজি চা উৎপাদিত হয়। রেকর্ড পরিমাণ এই উৎপাদনের পরের বছরই উৎপাদন ৬১ লাখ কেজি কমে যায়। সব মিলিয়ে গত বছর উৎপাদন দাঁড়ায় ৭ কোটি ৮৯ লাখ কেজি। চা চাষের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদন। গত দুই বছর রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনের কারণে চা আমদানি কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি রপ্তানিও বেড়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের পরিসংখ্যান থেকে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। চা বোর্ডের হিসাবে, আমদানি ও উৎপাদন মিলে ২০১৬ সালে দেশের বাজারে চায়ের সরবরাহ ছিল সবচেয়ে বেশি, ৯ কোটি ৩৮ লাখ কেজি। ওই বছর দেশের মানুষ ৮ কোটি ১৬ লাখ কেজি চা পান করেছে। তবে ব্যবসায়ীরা জানান, মানুষ পান করেছে ৮ কোটি ৫০ লাখ কেজি চা। হিসাবটি আমলে নিলে ২০১৬ সালে চায়ের উদ্বৃত্ত ছিল ৮৮ লাখ কেজি। এ জন্য গত বছর চা আমদানি হয়েছে ৬২ লাখ কেজি, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আবার রপ্তানি বেড়েছেও আগের তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত বছর ২৫ লাখ কেজি চা রপ্তানি হয়। চা-বাগানমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এম শাহ আলম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর অতিবৃষ্টির কারণে চায়ের উৎপাদন কম হয়। তারপরও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে। বাগানের পুরোনো চারা উঠিয়ে নতুন চারা লাগানো হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে সংস্কার কার্যক্রম চলছে। ফলে আগামী দিনে চা উৎপাদন বাড়বে। সে ক্ষেত্রে আমদানি কমে আসবে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা দিয়ে সকাল শুরু করেন এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। সারা দিনে এক কাপ চা পান করেন না এমন লোকও পাওয়া দুষ্কর। দিন দিন চা পানের পরিমাণ বাড়ছে। উৎপাদনের চেয়ে এই চাহিদা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। চাহিদার তুলনায় কতটুকু চা উৎপাদিত হয়েছে, তা হিসাব করে প্রতিবছরই কম-বেশি পরিমাণ চা আমদানি করছেন ব্যবসায়ীরা। গত ১০ বছরের উৎপাদন ও চাহিদার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই সময়ের ব্যবধানে চায়ের উৎপাদন বেড়েছে দুই কোটি কেজি। অর্থাৎ বছরে গড়ে উৎপাদন বাড়ছে সাড়ে ৩ শতাংশ হারে। একই সময়ে চায়ের চাহিদা বেড়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ কেজি। বছরে চাহিদা বাড়ছে সাড়ে ৬ শতাংশ হারে। চায়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০১০ সাল থেকে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হয়। তখন থেকেই আমদানি শুরু হয়।
গত আট বছরে দেশে মোট চা আমদানি হয় ৫ কোটি ৯৫ লাখ কেজি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছিল ২০১৫ সালে, মোট ১ কোটি ৫৮ লাখ কেজি। ২০১৬ সালে ৮৭ লাখ কেজি এবং ২০১৭ সালে ৬২ লাখ কেজি চা আমদানি হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে থাকায় চায়ের রপ্তানি কমেছে। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বে চা রপ্তানির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। সবচেয়ে বেশি পরিমাণ চা রপ্তানি হয় সেই সময়। ১৯৮২ সালে চা রপ্তানি হয় ৩ কোটি ৪৪ লাখ কেজি। সবচেয়ে কম রপ্তানি হয় ২০১৬ সালে, ৪ লাখ ৭০ হাজার কেজি। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে থাকায় রপ্তানিও কমে গেছে। ২০১৬ সালের চা রপ্তানিতে বাংলাদেশ ছিল ৭৭তম। চা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, উৎপাদন বাড়িয়ে চাহিদা মেটানো ও রপ্তানি বাড়াতে ১৫ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনায় ২০২৫ সালে ১৪০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালিনীছড়া চা-বাগানের মাধ্যমে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয়। বর্তমানে নিবন্ধিত চা-বাগানের সংখ্যা ১৬৪। চা চাষের জমির পরিমাণ ২ লাখ ৭৫ হাজার ২১৭ একর। সবচেয়ে বেশি চা-বাগান রয়েছে মৌলভীবাজার জেলায়। এ ছাড়া হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড় ও রাঙামাটি এলাকায় চা চাষ হচ্ছে। রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় আজ রোববার থেকে তিন দিনব্যাপী চা প্রদর্শনী শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের আয়োজনে এই প্রদর্শনীতে দেশে-বিদেশে চা-প্রেমীদের কাছে চায়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরা হবে। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্লাস্টিকের বদলি কাগজের কাপ

শেয়ার ব্যবসা করে ভালোই উপার্জন হচ্ছে। তবু আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের অনেকেই জানতে চান, আর কী করা হয়? ফলে মনের মধ্যে একধরনের খচখচানি কাজ করে। মাকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরবে হজ করতে গিয়ে হঠাৎ করেই কাগজ বা পেপার কাপের সঙ্গে পরিচয়। আইডিয়াটা মনে ধরে। ইন্টারনেট ঘাঁটলেন। সেই রাতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। দেশে ফিরেই শেয়ারবাজার থেকে নিজের সব টাকা তুলে নিলেন। পেপার কাপের ব্যবসা বুঝতে গেলেন মালয়েশিয়া। চেষ্টা-তদবির করে একটি কারখানায় উৎপাদনপ্রক্রিয়াও দেখে নিলেন। তারপর যন্ত্রপাতির খোঁজে ছুটলেন চীনে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতি দেখার পাশাপাশি ১৫ দিনের প্রশিক্ষণও নিলেন। দেশে ফিরে ব্যাংকঋণের আবেদন করলেন। প্রথমবার ব্যর্থ। তবে দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় সফল হলেন। ঋণপত্র খুলে আমদানি করলেন যন্ত্রপাতি। তেজগাঁওয়ে ভাড়া করা ছোট কারখানায় যাত্রা শুরু করল কেপিসি ইন্ডাস্ট্রিজ। আর পেছনের মানুষটি হচ্ছেন তরুণ উদ্যোক্তা কাজী সাজেদুর রহমান। ২০১২ সালের মে মাসে কেপিসির উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে কেপিসির কারখানায় দিনে ৩ লাখ ৬০ হাজার পিস পেপার কাপ তৈরি হয়। কয়েকটি ব্র্যান্ড এসব কাপ চা-কফি, কোমল পানীয়, দই ও আইসক্রিম বিক্রিতে ব্যবহার করে। অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান নিজেদের কর্মী ও গ্রাহকদের চা-কফি ও পানি পরিবেশনের জন্য পেপার কাপ তৈরি করিয়ে নেয়। কেপিসির করপোরেট গ্রাহকের তালিকায় আছে পেপসি, প্রাণ, এসিআই, ইউনিলিভার, নেসলে, ইস্পাহানি, ইগলু, ডানো, বসুন্ধরা, শেভরন, অ্যাপোলো হাসপাতাল, সোনারগাঁও হোটেল, বেক্সিমকোর মতো ২৮০টি প্রতিষ্ঠান। খোলা বাজারেও পেপার কাপ বিক্রি করে তারা। সব মিলিয়ে মাসে ১ কোটি ২০ লাখ কাপ বিক্রি হয়। তবে ৯০ শতাংশই ব্র্যান্ড ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে যায়। শুরু থেকেই ভালো সাড়া পাচ্ছে কেপিসি। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কাজী সাজেদুর রহমান বলেন, ‘উৎপাদন শুরুর পরের মাসে পেপার কাপ নিয়ে আমরা আমেরিকান প্রতিষ্ঠান শেভরনের কার্যালয়ে গেলাম। আধা ঘণ্টা আলোচনার পর তারা প্রতি মাসে দুই লাখ পিস কাপের ক্রয়াদেশ দিয়ে দিল। প্রতি পিসের দাম ছিল ২ টাকা ২০ পয়সা। নিজেদের কর্মীদের পানি পানের জন্য এসব কাপের ক্রয়াদেশ দেয় শেভরন। সেদিনই আমরা পেপার কাপ নিয়ে গুলশান কাঁচাবাজারে গেলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ৩ হাজার কাপ বিক্রিও করে ফেললাম।’ কেপিসি বর্তমানে ১১ ধরনের কাগজের কাপের পাশাপাশি প্লেট বা থালা ও বাটি তৈরি করছে। আকার ও নকশাভেদে প্রতিটি কাপ ৮০ পয়সা থেকে ৮ টাকা দামে বিক্রি হয়। তা ছাড়া ২ থেকে ৪ টাকায় প্লেট এবং ৩ থেকে ৪ টাকায় বাটি বানিয়ে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। সাজেদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের পেপার কাপগুলো শতভাগ পরিবেশবান্ধব। কারণ, মাটিতে ফেলে দেওয়ার ২১ দিনের মধ্যে কাপগুলো পুরোপুরি পচে গিয়ে জৈব সারে পরিণত হয়।’ তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব হওয়ায় পেপার কাপের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। পরিসংখ্যানও সাজেদুরের পক্ষেই কথা বলছে। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১ কোটি টাকার পেপার কাপ বিক্রি করে কেপিসি ইন্ডাস্ট্রিজ। তার আগের অর্থবছর তাদের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭ কোটি টাকা। তার মানে গত অর্থবছরই কেপিসির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৭ শতাংশ। গত ৩১ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ে কেপিসির কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট কারখানায় পেপার কাপ উৎপাদনে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। চীন থেকে আমদানি করা কাগজের ওপর প্রথমে নকশা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লোগো (প্রয়োজন অনুযায়ী) ছাপানো হয়। তারপর নির্দিষ্ট কাপের আকার অনুযায়ী যন্ত্রে কাটা হয়। সেই কাগজ যন্ত্রের মাধ্যমে তাপ দিয়ে কাপের আকার দেওয়া হয়। কাগজের দুই অংশ জোড়া দিতে কোনো ধরনের আঠা বা অন্য কোনো উপাদান ব্যবহার করা হয় না। শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তা মিলে কিপিসিতে ৩৮ জন লোক কাজ করেন। এদিকে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কারখানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছেন কাজী সাজেদুর রহমান। পূর্বাচলে শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে ২৪ শতাংশ জায়গার ওপর ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে নতুন কারখানার নির্মাণকাজ চলছে। সেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই উৎপাদন শুরু হবে। পুরোনো কারখানার সাতটি যন্ত্র সেখানে যাবে। নতুন করে আসছে আরও সাতটি। বর্তমান কারখানায় দিনে ৩ লাখ ৬০ হাজার পিস কাপ উৎপাদন হয়। নতুন কারখানায় উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে হবে দৈনিক ৮ থেকে ১০ লাখ পিস। কেপিসি ছাড়া আরও ছয়টি কারখানা পেপার কাপ উৎপাদন করে। পেপার কাপের মূল কাঁচামাল কাগজ। সেই কাগজ আমদানিতে ৬১ শতাংশ শুল্ক ও কর দিতে হয়।
অন্যদিকে পেপার কাপ উৎপাদনে প্রচুর কাগজ অপচয় হয়। যাঁরা অপচয় বন্ধ করতে পারেন না, তাঁদের কারখানা বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। সে জন্যই সাতটির মধ্যে চারটি উৎপাদনে নেই বলে জানালেন কাজী সাজেদুর রহমান। পূর্বাচলের কারখানায় উৎপাদন শুরু হলে পেপার কাপ রপ্তানি শুরু করবে কেপিসি। ইতিমধ্যে বাহরাইন, নিউজিল্যান্ড, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের ক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। এমন তথ্য দিয়ে কাজী সাজেদুর রহমান বললেন, ‘সারা বিশ্বে পেপার কাপের ২৮ হাজার কোটি ডলারের বাজার আছে। যার বড় অংশই চীন, তুরস্ক ও ভারতের উদ্যোক্তাদের দখলে। ফলে ভালো সুযোগ আছে। সেটাই আমরা কাজে লাগাতে চাই। সেই পরিকল্পনা নিয়েই আমরা এগোচ্ছি।’ অবশ্য রপ্তানির চেয়ে দেশের বাজার নিয়ে বড় স্বপ্ন তরুণ এই উদ্যোক্তার। তিনি স্বপ্ন দেখেন দেশের মানুষ প্লাস্টিকের কাপের বদলে দেশের কারখানায় উৎপাদিত পরিবেশবান্ধব কাগজের কাপে চা খাবেন। তবে তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা ভারতের কাপ। এসব কাপ কাঁচামালের (কাগজ) মতো একই শুল্ক দিয়ে আমদানি হচ্ছে। তাতে দেশের উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। এ বিষয়ে নজর দিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি অনুরোধ জানালেন কেপিসির স্বত্বাধিকারী। একই সঙ্গে কাগজ আমদানির শুল্ক কমানোর দাবি তাঁর। কারণ হিসেবে তিনি বললেন, ভারতের উদ্যোক্তারা শূন্য শুল্কে পেপার কাপের কাগজ আমদানি করতে পারেন। নেপালে সাড়ে ৭ শতাংশ ও মধ্যপ্রাচ্যে ৫ শতাংশ শুল্কে কাগজ আমদানি করা যায়। আর বাংলাদেশে ৬১ শতাংশ শুল্ক। ২০১৬ সালে এসএমই ফাউন্ডেশনের বর্ষসেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পুরস্কার পান কাজী সাজেদুর রহমান। পুরস্কার নেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তখনই সফল হব যখন আরও মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারব।’ আর গত সপ্তাহে বললেন, ‘চলতি বছর কেপিসির জনবল বেড়ে ১০০ ছাড়িয়ে যাবে। তবে আমি আরও বড় স্বপ্ন দেখছি।’

৪৫ বছরের অর্জন এক হাজার টাকার পুঁজি

ইঁদুরের বংশ, মরে হবে ধ্বংস। এসেছে ইঁদুরের যম, পালাবার জায়গা নেই। এমন বয়ান দিতে দিতে এগিয়ে চলেন নিজাম উদ্দিন বিশ্বাস। পূর্বপরিচিত গ্রাহকেরা কণ্ঠ শুনেই চিনে ফেলেন। অন্যরা কথায় আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে আসেন। বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইঁদুরের উৎপাত বন্ধে দু-চার পাতা ওষুধ কিনে নেন।  এভাবেই ইঁদুর মারার ওষুধ বিক্রি করে ৪৫ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন ষাটোর্ধ্ব নিজাম। বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার অচিন্ত্যপুর গ্রামে। ছোটবেলাতেই এই পেশা বেছে নিয়েছিলেন নিজাম উদ্দিন। মাত্র ২০ টাকার পুঁজি নিয়ে। এখন দিনে ২০০-৩০০ টাকা আয় করেন। ব্যবসায় পুঁজি এক হাজার টাকা। নিজামের ভাষায় এটাই ‘অনেক’। বললেন, ‘মাত্র ২০ টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন আমার এই ব্যবসায় অনেক টাকা হয়েছে। বর্তমান পুঁজি এক হাজার টাকা!’ অথচ ‘অনেক’ শব্দটাকে লম্বা টানে উচ্চারণ করলেন। নিজাম উদ্দিনের বাবা মৃত তোরাফ আলী বিশ্বাস ছিলেন হতদরিদ্র। ফলে নিজামের পড়ালেখা বেশি দূর এগোয়নি। শৈলকুপা পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পাঠ না চুকাতেই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়। সেটা ১৯৭৩ সালের কথা। পুঁজি সেই ২০ টাকা। কিছুটা বাবার দেওয়া, কিছুটা ধার করে পাওয়া। তাই নিয়ে ইঁদুর মারার ওষুধ বিক্রি শুরু। এই পেশা বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করলেন নিজাম। বললেন, তখন মাঠগুলো বছরের বেশির ভাগ সময়ই শুকিয়ে থাকত। ফসলের খেতে ইঁদুরের উৎপাত ছিল বেশি। আবার মানুষের গোলাভরা ধান আর উঠানভরা শস্য থাকত।
সবই নষ্ট করে দিত এই প্রাণী। এ কারণে ইঁদুর মারার ওষুধের কদর ছিল। সত্তরের দশকে হেঁটে শহরে বা গ্রামগঞ্জে ইঁদুর মারার ওষুধ বিক্রি করতেন নিজাম উদ্দিন। ২০১৮ সালে এসেও তা-ই। গত শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে ওষুধ বিক্রি করছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। আলাপচারিতায় উঠে এল নিজাম উদ্দিনের ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিক্রি ও জীবন-সংসারের কঠিন সব গল্প। তিনি বাজার থেকে কীটনাশক কিনে আনেন। বাড়িতে বসে সেটা খাবারের সঙ্গে মেশান। এভাবেই তৈরি হয়ে যায় ইঁদুর মারার ওষুধ। মাসে কমবেশি ২০ দিন তা বিক্রির উদ্দেশ্যে বের হন। এখন কেবল শৈলকুপা, ঝিনাইদহ ও কালীগঞ্জ শহরে বিক্রি করেন। বাহন বলতে তাঁর দুই পা। নিজাম উদ্দিন বলেন, একটা সময় দিনে চার-পাঁচ টাকা আয় হতো। এখন হয় ২০০-৩০০ টাকা। এটা দিয়েই সংসার চলে। ব্যবসার এক হাজার টাকা পুঁজি ছাড়া কোনো সঞ্চয় নেই। বাড়ি, জঙ্গল আর চাষযোগ্য মিলিয়ে তাঁর দুই বিঘা জমি আছে। টিনের ছাউনির মাটির বাড়ি। ইচ্ছা ছিল বাড়িটা পাকা করবেন। সেটা করাও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। নিজাম উদ্দিনের পাঁচ সন্তান। বড় ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। মেজ ছেলে আছেন কৃষিকাজ নিয়ে। ছোট ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন আর ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। নিজাম উদ্দিন জোর দিয়ে বললেন, তাঁর তৈরি ওষুধ কিনে ৯০ শতাংশ মানুষ ইঁদুর নিধনে সফল হয়েছেন। মাঝেমধ্যে দু-চারজন বলেছেন কাজ হয়নি। তখনই তিনি বিনা পয়সায় তাঁকে আবার ওষুধ দিয়েছেন।

চাওয়ার চেয়ে বেশি পাচ্ছেন দরজিশ্রমিকেরা

দরজির দোকানের কারিগর বা শ্রমিকেরা একটি প্যান্ট সেলাইয়ে মজুরি পাবেন ১৬৫ টাকা। এ ছাড়া কোটে ৬০০, সেরওয়ানিতে ৭০০, সাফারিতে ৩০০, বোরকায় ২০০, পাঞ্জাবিতে ১২০, পায়জামায় ৮০, ব্লাউজে ৫০, সালোয়ারে ৭০, স্কুল ড্রেসে ২০০ এবং থ্রিপিসে ১৬০ টাকা মজুরি পাবেন তাঁরা। নিম্নতম মজুরি বোর্ড দরজিশ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরির এই ফোঁড়নভিত্তিক বা পিস রেট মজুরির খসড়া চূড়ান্ত করেছে। একই সঙ্গে খসড়ায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ের দরজিশ্রমিকদের জন্য মাসিক সর্বনিম্ন ৪ হাজার ৮৫০ টাকা মজুরি চূড়ান্ত করেছে বোর্ড। বিভাগীয় শহরের জন্য নিম্নতম মজুরি ৫ হাজার টাকা। বর্তমানে দরজিশ্রমিকদের নিম্নতম মাসিক মজুরি ২ হাজার ৩২৫ টাকা। এর মধ্যে মূল বেতন দেড় হাজার টাকা। অবশ্য এবারের বোর্ডে ৪ হাজার ৬৫০ টাকা মজুরি চেয়েছিল শ্রমিকপক্ষ। সেই হিসাবে চাওয়ার চেয়েও বেশি মজুরি পাচ্ছেন এই খাতের শ্রমিকেরা। বিষয়টি নিশ্চিত করে মজুরি বোর্ডের শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি ও ঢাকা মহানগর দরজিশ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি মো. আইয়ুব আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবারের মজুরি বোর্ডে গতবারের চেয়ে দ্বিগুণ মজুরি দাবি করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত তার চেয়েও বেশি মজুরি পাওয়া গেছে। তবে সারা দেশের ৯৫ শতাংশ দরজি জানেন না তাঁদের জন্য একটি নিম্নতম মজুরিকাঠামো আছে। এ বিষয়ে শ্রমিকদের সচেতন করতে হবে।’ খসড়া মজুরিকাঠামোটি গত ২৯ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয়। তাতে সুপারিশের বিষয়ে কারও কোনো আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে তা ১৪ দিনের মধ্যে মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে পাঠাতে অনুরোধ করা হয়। দরজিশ্রমিকদের জন্য গঠিত পাঁচ সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন সৈয়দ আমিনুল ইসলাম। এতে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন আবুল কালাম আজাদ।
মজুরি বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী, দরজি কারখানার সর্বনিম্ন বা পঞ্চম গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরি জেলা ও উপজেলা শহরে ৪ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বিভাগীয় শহরে ৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে মাসিক মূল মজুরি ৩ হাজার টাকা। চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতা যথাক্রমে ৫০০ ও ৩০০ টাকা। পঞ্চম গ্রেডে বাড়িভাড়া জেলা ও উপজেলায় ১ হাজার ৫০ ও বিভাগীয় শহরে ১ হাজার ২০০ টাকা। পঞ্চম গ্রেডের মধ্যে জেন্টস ও লেডিস কাজের হেলপার, রেডিমেড পোশাকের হেলপার, টি-বয় ও অন্যান্য কাজের হেলপার অন্তর্ভুক্ত আছেন। সব গ্রেডের শ্রমিকের জন্য চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতার একই হার সুপারিশ করা হয়েছে। চতুর্থ গ্রেডে (আধা দক্ষ) আছে ফিউজিং, ওভারলক ও আইলেট অপারেটর, সাধারণ সেলাই কারিগর ও নিরাপত্তাকর্মী। এই গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরি জেলা ও উপজেলা শহরে ৫ হাজার ৬৬০ টাকা এবং বিভাগীয় শহরে ৫ হাজার ৮৪০ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাসিক মূল মজুরি ৩ হাজার ৬০০ টাকা। বাড়িভাড়া জেলা ও উপজেলায় ১ হাজার ২৬০ এবং বিভাগীয় শহরে ১ হাজার ৪৪০ টাকা। তৃতীয় গ্রেডের (দক্ষ) শ্রমিকদের মজুরি জেলা ও উপজেলা শহরে ১১ হাজার ৮৭০ টাকা এবং বিভাগীয় শহরে ১২ হাজার ২৮০ টাকা। এর মধ্যে মাসিক মূল মজুরি ৮ হাজার ২০০ টাকা। বাড়িভাড়া জেলা ও উপজেলায় ২ হাজার ৮৭০ এবং বিভাগীয় শহরে ৩ হাজার ২৮০ টাকা। এই গ্রেডে আছেন শার্ট, পাঞ্জাবি, পায়জামা, স্কুল ড্রেস, ব্লাউজ, ফ্রক, কামিজ, সালোয়ার, থ্রিপিস সেলাইয়ের কারিগর। দ্বিতীয় গ্রেডে (উচ্চতর দক্ষ) আছেন হিসাবরক্ষক, বিক্রয়কর্মী, স্টোরম্যান, পুরুষদের কোট, প্যান্ট, সেরওয়ানি, সাফারি, ডাক্তারি অ্যাপ্রোন এবং নারীদের বোরকা, অ্যাপ্রোন, কোট, প্যান্ট, ম্যাক্সি সেলাইয়ের কারিগর। এই গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরি জেলা ও উপজেলা শহরে ১২ হাজার ৪১০ টাকা এবং বিভাগীয় শহরে ১২ হাজার ৮৪০ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাসিক মূল মজুরি ৮ হাজার ৬০০ টাকা। বাড়িভাড়া জেলা ও উপজেলায় ৩ হাজার ১০ এবং বিভাগীয় শহরে ৩ হাজার ৪৪০ টাকা। প্রথম গ্রেডের পুরুষ ও নারীদের পোশাকের কাটিংমাস্টারদের মজুরি জেলা ও উপজেলা শহরে ১৩ হাজার ২২০ টাকা এবং বিভাগীয় শহরে ১৩ হাজার ৬৮০ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাসিক মূল মজুরি ৯ হাজার ২০০ টাকা। বাড়িভাড়া জেলা ও উপজেলায় ৩ হাজার ২২০ এবং বিভাগীয় শহরে ৩ হাজার ৬৮০ টাকা। এ ছাড়া শিক্ষানবিশ শ্রমিকদের মজুরি ৩ হাজার টাকা সুপারিশ করেছে মজুরি বোর্ড। শিক্ষানবিশকাল হবে ছয় মাস। আর সব গ্রেডের শ্রমিকের মূল মজুরি বছরে ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। সারা দেশে দরজিশ্রমিকের সংখ্যা কত, সে বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ১ লাখের বেশি দরজিশ্রমিক আছেন বলে দাবি করেন আইয়ুব আলী। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ দরজিশ্রমিক বোর্ডের নির্ধারিত মজুরির চেয়ে কম পান। ফলে নতুন মজুরিকাঠামো বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।’