Monday, December 7, 2009

মনমোহনের কাছে তৃণমূল ও বাম নেতাদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত শুক্রবার দুপুরে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে দেখা করেছেন। ওই সময় তিনি গত লোকসভা নির্বাচনোত্তর সংঘর্ষে বামপন্থীদের হাতে নিহত তাঁদের দলের ১৩৫ জনের একটি তালিকাও প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। একই সঙ্গে মমতা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির জন্য বামপন্থীদের দায়ী করেন।
ওই সাক্ষাতের আধঘণ্টা আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বেলা সাড়ে ১১টায় দেখা করেন বাম দলের সাংসদেরাও। ওই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সিপিএমের নেতা ও সাংসদ সীতারাম ইয়েচুরি। তিনিও লোকসভা নির্বাচনের পর মাওবাদী ও তৃণমূলের হাতে নিহত হওয়া ১৩০ জন বাম নেতা-কর্মীর নামের একটি তালিকা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।

বুশ-ব্লেয়ারের সমালোচনা করলেন জাতিসংঘের সাবেক অস্ত্রপরিদর্শক

জাতিসংঘের সাবেক অস্ত্রপরিবদর্শক হ্যান্স ব্লিকস বলেছেন, ইরাক যুদ্ধের সময় তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার নিজেদের ভুল পথে নিয়ে গেছেন এবং তারপর তাঁরা জনগণকেও বিভ্রান্ত করেছেন। গতকাল শনিবার ডেইলি মেইল পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি এ কথা বলেন।
জাতিসংঘের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়াই ইরাকে আগ্রাসন চালায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী। ইরাকের হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে—এমন ধুয়া তুলে ইরাকে হামলা করা হয়। কিন্তু ইরাক অভিযানের আগে হ্যান্স ব্লিকসের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের অস্ত্রপরিদর্শক দল ইরাকে কোনো ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সন্ধান পায়নি। কিংবা যুদ্ধের পরও সেখানে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সন্ধান মেলেনি।
ব্লিকস বলেন, তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন, ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে। তাঁরা প্রমাণ খুঁজলেন এবং কোনো রকম বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই সেটা বিশ্বাস করলেন।
তিনি বলেন, ‘আমি বলছি না যে, তাঁরা প্রতারণার উদ্দেশে এ কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁরা খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ নিয়ে কিঞ্চিত্ পরিমাণ চিন্তা করলেও তাঁরা ইরাকের ওই অস্ত্র নিয়ে সংশয়বাদী হতে পারতেন।’
জাতিসংঘের সাবেক এই অস্ত্রপরিদর্শক বলেন, ‘আপনি যখন একটি যুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছেন। যার মূল্য হতে পারে হাজারো জীবন। সেখানে আপনাকে এমনতরো অস্ত্রের ব্যাপারে আরও সন্দেহাতীত হতে হবে।’
ব্লিকস আরও বলেন, ইরাকে আগ্রাসন না চালানোর জন্য তিনি ব্লেয়ারকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। ব্রিটেন যদি ইরাক আগ্রাসনের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকত, তাহলে তাদের সামরিক প্রস্তুতি হতো আরও ধীরগতিতে।

কাল শুরু হচ্ছে জলবায়ু সম্মেলন -বারাক ওবামার কর্মসূচিতে পরিবর্তন

ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে কাল সোমবার শুরু হচ্ছে জলবায়ু সম্মেলন। ওই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর কর্মসূচি পরিবর্তন করেছেন। সম্মেলনের শুরুর দিকে নয়, শেষ দিনে যোগ দেবেন তিনি। হোয়াইট হাউস আশা করছে, সম্মেলন ফলপ্রসূ হবে।
বিশ্বের শতাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা কোপেনহেগেন সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। কাল শুরু হয়ে সম্মেলন শেষ হবে ১৮ ডিসেম্বর। এর আগে ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, বারাক ওবামা ৯ ডিসেম্বর সম্মেলনে যোগ দেবেন। ওবামার ওই সিদ্ধান্তে ইউরোপের অনেক নেতা ও পরিবেশবাদী অবাক হয়েছিলেন। গত সপ্তাহে ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, কোনো নেতা শুরুর দিকে এবং কেউ কেউ শেষ দিকে সম্মেলনে যোগ দিলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানান, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মনে করছেন ৯ ডিসেম্বরের বদলে সম্মেলনের শেষ দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ সম্মেলনকে আরও ফলপ্রসূ করে তুলবে। সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে ওবামা নরওয়ে গিয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করবেন। নরওয়ের অসলোতে ১০ ডিসেম্বর নোবেল পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন ওবামা।
হোয়াইট হাউস আশা করছে, কোপেনহেগেন সম্মেলনে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সম্মেলনে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে গত কয়েক মাসের কূটনীতিক তত্পরতায় অগ্রগতির লক্ষণ ধরা পড়েছে।
সম্মেলনের শেষ দিনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ওবামার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনাল। সংগঠনটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্বনেতাদের দাবির মুখে ওবামা শেষমেশ তাঁর মতো পাল্টেছেন। এটা একটা ভালো লক্ষণ।
ওই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত শেষ দিনে আসার কথা। আর ওই দিনে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ওবামাকে স্বাগত জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওবামার সিদ্ধান্তে ফরাসি প্রেসিডেন্ট উত্ফুল্ল। তিনি মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে আগামী প্রজন্ম ও পৃথিবীকে রক্ষা করতে বিশ্বনেতারা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন বলেছেন, বিশ্বনেতাদের এখন আর তত্ত্ববাগিশদের দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া ঠিক হবে না। ওই তাত্ত্বিকেরা মনে করেন, বিশ্ব উষ্ণায়নে মানুষের কোনো হাত নেই। ব্রাউন বলেন, ‘আমরা এখন বিজ্ঞান জানি। আমরা স্পষ্টভাবে জানি কী করণীয়। আমাদের অবশ্যই গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে হবে।’ ব্রিটিশ সরকারের এক উপদেষ্টা বলেছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের হাত থেকে বাঁচতে বায়ুমণ্ডল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এক হাজার কোটি টন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে হবে।
১৯৯৭ সালে সই করা কিয়োটো প্রটোকল চুক্তি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বিষয়ে কোপেনহেগেন সম্মেলনে নতুন একটি চুক্তি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওশান কনটেইনার্সের সঙ্গে সিডিবিএলের চুক্তি স্বাক্ষর

সামিট গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ওশান কনটেইনার্স লিমিটেড (ওসিএল) শেয়ার অজড়োকরণ বা ডিমেট করার জন্য সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) সঙ্গে সম্প্রতি চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
ওসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এ জে রিজভী এবং সিডিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এইচ সামাদ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। এ সময় উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ওসিএল দেশের প্রথম কোম্পানি হিসেবে বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সরাসরি তালিকাভুক্ত হওয়ার অনুমোদন পেয়েছে।

চট্টগ্রামে বেসিক ব্যাংকের গ্রাহক সমাবেশ

চট্টগ্রামের একটি হোটেলে সম্প্রতি বেসিক ব্যাংক এক গ্রাহক সমাবেশের আয়োজন করে।
সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। এতে অন্যান্যের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের পরিচালক জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিম, কাজী আখতার হোসেন ও মো. আনোয়ারুল ইসলাম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাজেদুর রহমান বক্তব্য দেন।
ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মঞ্জুর মোর্শেদসহ মহাব্যবস্থাপকেরা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শাখার ব্যবস্থাপকেরা এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণীর শিল্পোদ্যোক্তারা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে চট্টগ্রামের শিল্পোদ্যোক্তারা বেসিক ব্যাংকের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতায় সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বাণিজ্যিক নগর চট্টগ্রামে ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রসারণের বিষয়ে বেশ কিছু পরামর্শ দেন।

রাজবাড়ী অঞ্চলে ছয়টি রেলস্টেশন বন্ধ -সরকার হাজার হাজার টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে by রাশেদ রায়হান,

চলতি বছরের কয়েক মাসের মধ্যে রাজবাড়ী অঞ্চলের ছয়টি রেলস্টেশনের সব ধরনের অফিশিয়াল কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে করে দেওয়া হয়েছে। জনবল সংকটের কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব স্টেশনের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় বলে জানা গেছে।
এদিকে স্টেশনগুলোতে রেল কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যক্রম না থাকায় প্রতিদিন শত শত মানুষ বিনা টিকিটে ভ্রমণ ও বিভিন্ন মালামাল বহন করছে, যে কারণে সরকার প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গোয়ালন্দ ঘাট-পোড়াদহ রুটে মোট ১৪টি স্টেশনের মধ্যে ছয়টির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে। স্টেশনগুলো হচ্ছে—পাঁচুরিয়া, সূর্যনগর, মাছপাড়া, চড়াইকোল, জগতী ও বেলগাছি। আরও কিছু স্টেশনেও লোকবল সংকটের কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান রেলের কর্মকর্তারা।
রেলস্টেশনগুলো বন্ধ করায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চলে উত্পাদিত ফুলকপি, বাঁধাকপি, কালিজিরা, ধনে, গুয়ামুড়ি, গুড় প্রভৃতি কৃষিপণ্য ঠিকমতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, এসব স্টেশনে মাস্টার, সহকারী স্টেশনমাস্টার ও বুকিং ক্লার্ক না থাকায় টিকিট বিক্রিসহ মালামাল বুকিংয়ের কাজ বন্ধ রয়েছে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাট ও ফরিদপুর লাইনের জমজমাট স্টেশন পাঁচুরিয়া থেকে স্টেশনমাস্টারসহ তিনজন কর্মকর্তাকে অন্যত্র প্রত্যাহার করে এটিকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
রাজবাড়ীতে ট্রেনের কোচ ও মালগাড়ি ধোয়ামোছাসহ সাময়িক মেরামতের জন্য ক্যারেজ-ইয়ার্ড থাকলেও এতে ফোরম্যান ও রানার (শান্টিংম্যান) না থাকায় জরুরি প্রয়োজনেও কোনো কাজ হচ্ছে না। রাজবাড়ীর ক্যারেজ ও ওয়াগন অফিসেরও একই দশা।
রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ ঘাট থেকে প্রতিদিন পোড়াদহ জংশন হয়ে খুলনা ও রাজশাহীর উদ্দেশে পাঁচটি ট্রেন ছেড়ে যায়। অনুরূপভাবে ট্রেনগুলো দৌলতদিয়ায় ফিরে আসে। ট্রেনগুলো হচ্ছে মধুমতী ৭৫৬/৭৫৫, শাটল ৫০৫/৫১৪, শাটল ৫১৩/৫০৬, লোকাল ৫১৫/৫১ ও নকশিকাঁথা ২৫/২৬। স্বল্প খরচ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা, উত্তরাঞ্চল ও ঢাকামুখী যাত্রীরা এ রুট দিয়ে চলাচল করে থাকে। এর মধ্যে আন্তনগর মধুমতী এক্সপ্রেস ছাড়া বাকি পাঁচটি ট্রেন সবগুলো স্টেশনে থামে। কিন্তু স্টেশনগুলোতে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীরা এখন বিনা ভাড়ায় চলাচল করে।
রেলওয়ের রাজবাড়ীর স্টেশনমাস্টার দেওয়ান নিজাম উদ্দিনও প্রথম আলোকে জানান, বন্ধ হওয়া স্টেশনগুলোয় সব অবকাঠামো থাকার পরও জনবল প্রত্যাহার করায় এসব স্টেশন থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ বিনা টিকিটেই ট্রেন ভ্রমণ করছে। এ ছাড়া স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য মালামাল বুকিং করতে না পারায় নানা সমস্যার মধ্যে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে অফিস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো লোক না থাকায় রেলের মালপত্র চুরির আশঙ্কা যেমন বেড়েছে, তেমনি লাখ লাখ টাকার সম্পদের ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।

যশোরে চামড়ার দাম ভালো -ভারতে পাচারের আশঙ্কা by মাসুদ আলম,

সারা দেশে কোরবানির পশুর চামড়ার যে দরদাম, যশোরের রাজারহাটে ঠিক তার বিপরীত চিত্র। দেশের অন্যতম বৃহত্তম এই চামড়ার বাজারে গত মঙ্গলবার ট্যানারির মালিক ও ব্যবসায়ীদের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে।
এর আগে ট্যানারির মালিকেরা ঢাকার বাইরে গরুর চামড়ার সর্বোচ্চ দর প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২৫ টাকা এবং খাসির চামড়ার দর ২০ টাকা নির্ধারণ করেন। কিন্তু রাজারহাটে গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৬০ টাকা এবং খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
রাজারহাট বাজার ঘুরে চামড়ার ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার চামড়ার যে দাম তাতে তাঁরা খুশি।
ব্যবসায়ীরা জানান, তাঁরা গড়ে ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা করে কেনা গরুর চামড়া এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি করেছেন।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ আলাউদ্দিন মুকুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার কম দাম নির্ধারণ করেছে। কিন্তু নির্ধারিত ওই দামের চেয়ে বেশি দামে এখানে চামড়া বিক্রি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভারতে দাম বেশি থাকায় এখানকার চামড়ার একটি অংশ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার হচ্ছে।’
সমিতির সভাপতি ফরহাদ করিম মুরাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ব মন্দার কারণে গত বছর কোরবানি ঈদের পর চামড়ার দাম অনেক কমে গিয়েছিল। এখন দাম সেই আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে।’
তিনি অভিযোগ করেন যে ট্যানারির মালিকেরা চামড়ার ব্যবসা কুক্ষিগত করে রেখেছেন। ন্যায্য দাম দিচ্ছেন না। ভারতে চামড়া পাচারের আশঙ্কা করেন তিনি।

ডলার আবার শক্তিশালী, স্বর্ণের দরপতন

ডলার ক্রমেই দুর্বল হচ্ছিল। আর বিপরীতে বেড়ে চলছিল স্বর্ণের দর। ১ ডিসেম্বর বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দর প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স এক হাজার ২০০ ডলার অতিক্রম করে। পরের দুই দিনও এ প্রবণতা অব্যাহত ছিল।
কিন্তু গত শুক্রবার ঘটে উল্টো ঘটনা। প্রতি আউন্স স্বর্ণের দর এক ধাক্কায় এক হাজার ২২৬ ডলার ৫৬ সেন্ট থেকে নেমে আসে এক হাজার ১৬১ ডলার ৪০ সেন্টে।
কারণটা হলো, মার্কিন ডলার আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠা। মার্কিন ডলারের দর এদিন জাপানি ইয়েনের বিপরীতে দুই শতাংশ এবং ইউরোর বিপরীতে ১ দশমিক ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
তবে মার্কিন ডলার এমনি এমনি শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। শক্তিশালী হয়েছে আমেরিকার অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠার একটি সংবাদে। সংবাদটি হলো, দেশটির বেকারত্বের হার অক্টোবর মাসের তুলনায় নভেম্বর মাসে হ্রাস পেয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অক্টোবর মাসে আমেরিকায় বেকারত্বের হার ছিল ১০ দশমিক ২০ শতাংশ, যা নভেম্বর মাসে কমে হয়েছে ১০ শতাংশ। পরিমাণগত হিসাবে নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১১ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছে।
মন্দা শুরু হওয়ার পর ২০০৭ সালের ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত এটাই কোনো এক মাসে কাজ হারানোর সবচেয়ে কম সংখ্যা।
এর আগে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, নভেম্বর মাসে এক লাখ ৩০ হাজার মানুষ কাজ হারাতে পারে। বাস্তবে এর চেয়ে অনেক কম মানুষ কাজ হারিয়েছে। আর এটাই মার্কিন অর্থনীতির শক্তিমত্তার অন্যতম প্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।
নভেম্বরের বেকারত্বের সংখ্যাটি অবশ্য প্রাথমিক হিসাব। পরবর্তী সময়ে এটি আরও সংশোধিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম অধিদপ্তর অক্টোবর মাসে বেকারের সংখ্যা সংশোধন করে এক লাখ ১০ হাজার নির্ধারণ করেছে, যা প্রাথমিকভাবে ছিল এক লাখ ৯০ হাজার।
একইভাবে সেপ্টেম্বর মাসেও বেকারের সংখ্যা দুই লাখ ১৯ হাজার থেকে কমিয়ে এক লাখ ৩৯ হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে।
নভেম্বরের এত কম বেকারের সংখ্যাটি সবাইকে বিস্মিত করেছে। পাশাপাশি মার্কিন নীতিনির্ধারকেরাও এতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।
তথ্যটি জানার পর এক বিবৃতিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘এটা আমাদের জন্য একটা ভালো খবর, যা আমরা আশা করছিলাম। তবে আমাদের আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে।’
স্বর্ণের দর: কয়েক সপ্তাহ ধরে স্বর্ণের দর বেড়ে চলছিল। বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণ হলো সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ। ডলার দুর্বল হয়ে পড়ায় এই নিরাপদ উত্সটির প্রতি নির্ভরতা আরও বেড়ে যায় বিনিয়োগকারীদের।
তাঁরা আরও বলছেন, অনিশ্চয়তার সময় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকেই বেছে নেন। গত সপ্তাহে দুবাই ঋণ-সংকটের জের ধরে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলে নিয়ে স্বর্ণ কিনতে শুরু করেন।
বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ যেসব প্রতিষ্ঠান অধিকহারে ডলার ধরে রেখেছিল, তারাও সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেছে। চীন, ভারত ও রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় রক্ষাকবচ হিসেবে স্বর্ণে বিনিয়োগকে অধিক নিরাপদ হিসেবে গণ্য করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সুদের হার কিছুদিন পর্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারের আকর্ষণ কিছুটা হ্রাস পায়। অনেকে ডলার থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে অন্য প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলার দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকেরা অবশ্য এ-ও বলছেন, এই দুটি কারণ ছাড়াও ফাটকাবাজিজনিত কারণও স্বর্ণের দর বাড়িয়ে দেয়। অনেকেই মনে করতে থাকেন, স্বর্ণের দর আরও বাড়বে। সে কারণে তাঁরাও স্বর্ণ কিনতে এগিয়ে আসেন। এর ফলে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যায়, যার ফলে দাম বেড়ে যায়।

এবার ১৫ কোটি টাকার পুরোনো কাপড় আমদানির সিদ্ধান্ত -৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে হবে

সরকার চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরে তিন হাজার আমদানিকারকের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে পুরোনো কাপড় আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে একজন আমদানিকারক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের পুরোনো কাপড় আমদানি করতে পারবেন। তাই পুরোনো কাপড় আমদানি ১৫ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। সরকার এ ব্যাপারে একটি গণবিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে।
এতে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন ও আগ্রহী আমদানিকারকদের নিজ নিজ জেলা প্রশাসকের দপ্তরে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
জানা গেছে, আমদানিকারকেরা বিভিন্ন দেশ থেকে পুরোনো সোয়েটার, লেডিস কার্ডিগান, জিপার জ্যাকেটসহ পুরুষদের জ্যাকেট, ট্রাউজার, কম্বল, সিনথেটিক ও ব্লেন্ডেড কাপড়ের শার্ট আমদানি করতে পারবেন। অন্য কোনো প্রকার পুরোনো কাপড় আমদানি করা যাবে না।
আমদানিকারকেরা এই ছয় ধরনের পণ্যের মধ্যে এক বা একাধিক পণ্য আমদানি করতে পারবেন। তবে তাঁদের ৫০ হাজার টাকার মধ্যেই আমদানি সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
এ ছাড়া একজন আমদানিকারক নির্ধারিত টাকার মধ্যে সর্বোচ্চ চার টন করে সোয়েটার, মেয়েদের কার্ডিগান, জিপার জ্যাকেটসহ পুরুষদের জ্যাকেট ও ট্রাউজার; দেড় টন কম্বল এবং এক টন সিনথেটিক ও ব্লেন্ডেড কাপড়ের শার্ট আমদানি করতে পারবেন।
সূত্রমতে, এসব পণ্য আমদানির জন্য জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রকাশ্য লটারির মাধ্যমে সারা দেশে জেলা কোটায় তিন হাজার আমদানিকারককে নির্বাচিত করা হবে। তবে শিল্প খাতে নিবন্ধিত আমদানিকারকেরা পুরোনো কাপড় আমদানির জন্য বিবেচিত হবেন না।
আগ্রহী ব্যক্তিদের নিজ নিজ জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করতে হবে। প্রাপ্ত আবেদনপত্র থেকে জেলা কমিটি বাছাই করে বৈধ আবেদনপত্রগুলোর মধ্যে প্রকাশ্য লটারির মাধ্যমে প্রয়োজনীয়সংখ্যক আমদানিকারক নির্বাচন করবে। কেবল নগদ বৈদেশিক মুদ্রার মাধ্যমেই কাপড় আমদানি করা যাবে।
জানা গেছে, পুরোনো বা পরিত্যক্ত কাপড় আমদানির মাধ্যমে যাতে করে কোনো প্রকার রোগজীবাণু না আসে সেই লক্ষ্যে আমদানি করা পুরোনো কাপড় রোগজীবাণুমুক্ত—এ সংক্রান্ত রপ্তানিকারক দেশের সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষের দেওয়া সনদ বাধ্যতামূলকভাবে শুল্ক কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করতে হবে।
লটারিতে মনোনীত হওয়ার পর আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এ ব্যাপারে আমদানি ঋণপত্র খুলতে হবে এবং ২৯ এপ্রিল ২০১০-এর মধ্যে পণ্য জাহাজীকরণ করতে হবে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্বাচিত সব আমদানিকারক আমদানি করা কাপড় নিজ নিজ জেলায় বিক্রি করতে বাধ্য থাকবেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে নিশ্চিত করতে হবে। যদি কোনো আমদানিকারক বা ঋণপত্র প্রদানকারী ব্যাংক তথ্য গোপন করে অন্য কোনো কাপড় কিংবা পণ্য আমদানি করে, তাহলে শুল্ক কর্তৃপক্ষ বেআইনিভাবে আমদানি করা পণ্য বাজেয়াপ্ত করবে।
এ জন্য দায়ী আমদানিকারক ও যে ব্যাংকে ঋণপত্র খোলা হয় তাদের বিরুদ্ধেও সরকার আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সাধারণত, শীতকালে গরম শীতবস্ত্র হিসেবে নিম্ন আয়ের মানুষ এসব পুরোনো কাপড়ের প্রধান ক্রেতা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এবং জেলা শহর ছাড়াও গ্রামের হাটবাজারে এসব পুরোনো কাপড় বিক্রি হয়ে থাকে।

ব্যাংক খাতে পৌনে ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ শোধ করেছে সরকার

চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের সাড়ে চার মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ করেছে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ পরিশোধ করেছে। যার কারণে গত ৩০ জুনের তুলনায় ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ সাত হাজার ৭৪৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা কমে গেছে।
গত ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের ঋণের সার্বিক স্থিতি হয়েছে ৪৮ হাজার ৯৮৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের শেষদিন অর্থাত্ ৩০ জুন এর পরিমাণ ছিল ৫৬ হাজার ৭৩০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এদিকে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) দেশে কার্যত কোনো বাজেট ঘাটতি অর্থায়ন করতে হয়নি। ফলে সরকার এই বিপুল পরিমাণ ব্যাংক ঋণ ফেরত দিতে পেরেছে। এখন বাজেট উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে।
হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত না থাকায় অর্থবছরের তিন বা চার মাসের ঘাটতি অর্থায়নের অবস্থা জানা যায়নি। অর্থ মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংক—কেউই এ সংক্রান্ত হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।
জাতীয় বাজেটে চলতি অর্থবছর ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের মোট ১৬ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা ঋণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংকব্যবস্থায় ঋণ কমলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকার ব্যাংকবহির্ভূত উত্স বিশেষত, সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করেছে। তিন মাসে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ হয়েছে দুই হাজার ৮০৯ কোটি ৯৬ টাকা।
এ নিয়ে সেপ্টেম্বর শেষে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি গিয়ে ঠেকেছে ৫২ হাজার ৬০০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
২০০৮-০৯ গোটা অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৬৩৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ফলে গত ৩০ জুন এসে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে মোট ঋণের স্থিতি হয় ৪৯ হাজার ৭৯০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
ব্যাংকে আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন শেয়ারবাজারের বাইরে নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকে আছে। যে কারণে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকার বেশি অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে।
এদিকে ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের ঋণ কমে আসা এবং দেশে বিশেষত, বিদ্যুত্-গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় শিল্প-বিনিয়োগে এক ধরনের মন্থর গতি তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ পড়ে থাকলেও তা খাটানো যাচ্ছে না।
আর এ কারণে গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা বিধিবদ্ধ জমার বাইরে ব্যাংক খাতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত তহবিল পড়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশি ঋণ বাবদ সরকার পেয়েছে মাত্র ১৫৪ কোটি ১১ লাখ টাকা। আর গত অর্থবছরের একই সময় বিদেশি ঋণ বাবদ প্রকৃত প্রাপ্তি ছিল এক হাজার ৫৭০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেশি-বিদেশি উত্স থেকে ঋণ নেওয়া ও ঋণ ফেরত দেওয়া সমন্বয় করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময়কালে সরকারের হাতে দুই হাজার ৮৩ কোটি ৪০ লাখ টাকার উদ্বৃত্ত রয়েছে।
অন্যদিকে গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়কালে ঘাটতি বাবদ অর্থায়ন করতে হয়েছিল প্রায় এক হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা।
মূলত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় করতে না পারাই সরকারের ঘাটতি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছে। গাণিতিক হিসেবে সরকারের এখন তাই বাজেট উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে।
এই সময়কালে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সরকারকে তেমন কোনো অর্থ ব্যয়ই করতে হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়কালে এডিপি বাবদ এক হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অথচ একই সময় ছাড় করা হয়েছে তিন হাজার ২৯৩ কোটি টাকা।
তবে এটি কোনো সন্তোষজনক পরিস্থিতি বলে পরিগণিত হতে পারে না। বরং এর মাধ্যমে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই ফুটে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের সাড়ে চার মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ করেছে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ পরিশোধ করেছে। যার কারণে গত ৩০ জুনের তুলনায় ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ সাত হাজার ৭৪৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা কমে গেছে।
গত ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের ঋণের সার্বিক স্থিতি হয়েছে ৪৮ হাজার ৯৮৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের শেষদিন অর্থাত্ ৩০ জুন এর পরিমাণ ছিল ৫৬ হাজার ৭৩০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এদিকে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) দেশে কার্যত কোনো বাজেট ঘাটতি অর্থায়ন করতে হয়নি। ফলে সরকার এই বিপুল পরিমাণ ব্যাংক ঋণ ফেরত দিতে পেরেছে। এখন বাজেট উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে।
হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত না থাকায় অর্থবছরের তিন বা চার মাসের ঘাটতি অর্থায়নের অবস্থা জানা যায়নি। অর্থ মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংক—কেউই এ সংক্রান্ত হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।
জাতীয় বাজেটে চলতি অর্থবছর ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের মোট ১৬ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা ঋণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংকব্যবস্থায় ঋণ কমলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকার ব্যাংকবহির্ভূত উত্স বিশেষত, সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করেছে। তিন মাসে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ হয়েছে দুই হাজার ৮০৯ কোটি ৯৬ টাকা।
এ নিয়ে সেপ্টেম্বর শেষে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি গিয়ে ঠেকেছে ৫২ হাজার ৬০০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
২০০৮-০৯ গোটা অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৬৩৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ফলে গত ৩০ জুন এসে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে মোট ঋণের স্থিতি হয় ৪৯ হাজার ৭৯০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
ব্যাংকে আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন শেয়ারবাজারের বাইরে নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকে আছে। যে কারণে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকার বেশি অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে।
এদিকে ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের ঋণ কমে আসা এবং দেশে বিশেষত, বিদ্যুত্-গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় শিল্প-বিনিয়োগে এক ধরনের মন্থর গতি তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ পড়ে থাকলেও তা খাটানো যাচ্ছে না।
আর এ কারণে গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা বিধিবদ্ধ জমার বাইরে ব্যাংক খাতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত তহবিল পড়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশি ঋণ বাবদ সরকার পেয়েছে মাত্র ১৫৪ কোটি ১১ লাখ টাকা। আর গত অর্থবছরের একই সময় বিদেশি ঋণ বাবদ প্রকৃত প্রাপ্তি ছিল এক হাজার ৫৭০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেশি-বিদেশি উত্স থেকে ঋণ নেওয়া ও ঋণ ফেরত দেওয়া সমন্বয় করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময়কালে সরকারের হাতে দুই হাজার ৮৩ কোটি ৪০ লাখ টাকার উদ্বৃত্ত রয়েছে।
অন্যদিকে গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়কালে ঘাটতি বাবদ অর্থায়ন করতে হয়েছিল প্রায় এক হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা।
মূলত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় করতে না পারাই সরকারের ঘাটতি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছে। গাণিতিক হিসেবে সরকারের এখন তাই বাজেট উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে।
এই সময়কালে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সরকারকে তেমন কোনো অর্থ ব্যয়ই করতে হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়কালে এডিপি বাবদ এক হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অথচ একই সময় ছাড় করা হয়েছে তিন হাজার ২৯৩ কোটি টাকা।
তবে এটি কোনো সন্তোষজনক পরিস্থিতি বলে পরিগণিত হতে পারে না। বরং এর মাধ্যমে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই ফুটে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বলের নাম জাবুলানি

জাবুলানি—এই জুলু শব্দটির মানে ‘উদ্যাপন করা’। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের খেলাটা হবে যে বলে, সেটির নাম এই জাবুলানি। পরশু কেপটাউনে ড্র অনুষ্ঠান শুরুর ঘণ্টাখানেক আগেই উন্মোচন করা হয়েছে ২০১০ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল।
ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার, কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারসহ সাবেক এবং বতর্মান খেলোয়াড়দের অনেকেই বলটি নিয়ে পায়ের কারুকাজ করে দেখেছেন। সবাই একমত, অ্যাডিডাসের তৈরি বলটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোত্তম।
বলটি খেলে দেখার দলে ছিলেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ডেভিড বেকহাম, জার্মানি অধিনায়ক মাইকেল বালাক ও ব্রাজিলিয়ান প্লে-মেকার কাকাও। সবাই বলটির প্রশংসা করেছেন। ‘যেকোনো ভালো খেলোয়াড়ই যেকোনো বল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে একটু সাহায্য পেলে তো ভালোই হয়’—বলেছেন বেকহাম। আর কাকার অনুভূতি, ‘আমার কাছে বলের সঙ্গে সংযোগটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর এটা এই বলটির সঙ্গে দারুণ হয়।’ বালাক তো রায় দিয়ে দিয়েছেন ‘দারুণ’ বলে।
গুণগত মানে যেমন অনন্য, তেমনি অন্য দিক দিয়েও আছে এর ভিন্নতা। দক্ষিণ আফ্রিকার ১১টি ভাষা আর দলের ১১ জন খেলোয়াড়ের সঙ্গে মিলিয়ে বলটিতে রঙের সমাহার ঘটানো হয়েছে ১১টি।

ভারতের কষ্টের জয়

ম্যাচের পর ভারতীয় কোচ সুখবিন্দর সিংকে মনে হলো খুব সুখী মানুষ। অনূর্ধ্ব-২৩ বছর বয়সী খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলটি নিয়েই সাফের বৈতরণী পেরোতে এসেছেন চার বছর পর আবারও জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়া সুখবিন্দর। এই তরুণেরাই তাঁকে প্রথম ম্যাচটা পার করে দিল। দুর্বল আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয়টা যদিও খুব কষ্টে পাওয়া। জে জে লালপেখুলার গোল তাদের দিয়েছে মূল্যবান ৩টি পয়েন্ট।
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিগুলো কাল বলতে গেলে শূন্যই ছিল। দর্শক ছিল হাজারখানেক। তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত নয়, এই দর্শকের চোখ টেনেছে কিন্তু আফগানিস্তানের খেলা।
ম্যাচজুড়ে ভালো খেলা আফগানিস্তানকে দুর্ভাগ্য ছোবল দেয় ম্যাচের ৮৫ মিনিটে। আচমকা এক আক্রমণে বক্সের সামান্য বাইরের জটলায় পাওয়া বলটি কোনাকুনি প্লেসিং শটে জড়িয়ে দেন লালপেখুলা।
প্রথমার্ধে আফগানিস্তানের আক্রমণ ঠেকাতেই তটস্থ থাকতে হয় ভারতকে। যদিও পাল্টা আক্রমণে গোলের সুযোগ পেয়েছিল ভারতও। ম্যাচের ৩৮ মিনিটে জোয়াকিমের থ্রো থেকে চোংথাম সিংয়ের হেডে গোল হতে পারত। গোলকিপার হামিদুল্লার নৈপুণ্যে সে যাত্রা রক্ষা পায় আফগানিস্তান। দ্বিতীয়ার্ধে আফগানিস্তানও পেয়েছিল দারুণ দুটো সুযোগ। ৫৭ মিনিটে জোহিব ইসলাম ভারতের গোলকিপার অরিন্দম ভট্টাচার্যকে একা পেয়েও উড়িয়ে মারেন বল। এর দুই মিনিট পর হাসমতউল্লাহ বারকেজির হেড কর্নার করে বাঁচান অরিন্দম।
ম্যাচের পর ভারতের কোচ সুখবিন্দর জয়টাকেই দেখলেন বড় করে, ‘নতুন দলের প্রথম ম্যাচ এটি। ৩ পয়েন্ট পেয়েই আমি সন্তুষ্ট।’ আর নিজেদের দুষলেন আফগান কোচ ইউসুফ কারাগার, ‘প্রাপ্ত সুযোগ ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারিনি আমরা।’

‘কোনো গ্রুপই সহজ নয়’

ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটারের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফিটা তুলে দিলেন ইতালির এক ফুটবল কর্তা। ড্র অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা কৌতুক করেই একটি প্রশ্ন করলেন তাঁকে—চার বছর নিজেদের কাছে রাখার পর ট্রফিটা ফেরত দিতে খারাপ লাগছে না? ‘তা লাগবে কেন? আবার তো আমরাই পেতে যাচ্ছি এটা’—উল্টো দিক থেকে ঝটপট উত্তর।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইতালি পড়েছে তুলনামূলক সহজ গ্রুপে। ‘এফ’ গ্রুপে প্যারাগুয়ে, নিউজিল্যান্ড ও স্লোভাকিয়া তাদের প্রতিপক্ষ। এই গ্রুপ থেকে সহজেই দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার কথা। ট্রফি ফেরত দিতে আসা ওই ফুটবল কর্তা যত দ্রুত আরেকটা বিশ্বকাপ জয়ের কথা বলে দিলেন, ইতালিকে ২০০৬ বিশ্বকাপ জেতানো লিপ্পি তা বলতে পারলেন না। তাঁর মুখে দার্শনিক সুলভ উত্তর, ‘একটি গ্রুপকে আপনি যতটা সহজ ভাববেন, সেটি ততটাই কঠিন হবে। আমি সন্তুষ্ট নই, আবার হতাশও না।’
ব্রাজিল কোচ কার্লোস দুঙ্গার অবশ্য তা বলার উপায় নেই। এবার ‘ডেথ গ্রুপে’ পড়েছে ব্রাজিল। কিন্তু পাঁচবার বিশ্বকাপজয়ী দলের কোচের কি আর ‘কঠিন গ্রুপে পড়েছি’ বলা সাজে! তাই পর্তুগাল, উত্তর কোরিয়া ও আইভরিকোস্টের যে গ্রুপে পড়েছে ব্রাজিল, সেটিকে অ্যাখ্যা দিলেন আকর্ষণীয়, ‘এটা খুব মজার একটা গ্রুপ। পর্তুগালের খেলার স্টাইল ও খেলোয়াড়দের মান যেমন তাতে ওদের বিপক্ষে আমাদের ম্যাচটি হবে ব্রাজিল বনাম ব্রাজিল। আইভরিকোস্টও খুব শক্তিশালী দল।’
’৬৬টিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ইংল্যান্ড এবারই সবচেয়ে শক্তিশালী দল নিয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছে বলে মত ইংল্যান্ড সংবাদমাধ্যমের। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এবারই নাকি সবচেয়ে সহজ গ্রুপে পড়েছে ইংল্যান্ড। কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলোও জানেন এটা। তবে সবাইকে অতি উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে তিনি নিষেধ করছেন, ‘গ্রুপটি খারাপ হয়নি। অন্য অনেক গ্রুপ আমাদের চেয়ে কঠিন। তবে কখনো কখনো আপনি গ্রুপটাকে সহজ মনে করলেও সেটা সহজ থাকে না। আমি খেলোয়াড়দের এটাই বলছি।’
নিজেদের গ্রুপটা সহজ হয়েছে বলেই মনে করেন আর্জেন্টিনা কোচ ম্যারাডোনার পরামর্শক কার্লোস বিলার্দো। ‘গ্রুপটা সহজ হয়েছে, ডিয়েগোর খুশিই হওয়ার কথা’—বলেছেন বিলার্দো। ম্যারাডোনার তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কারণ বিশ্বকাপের আর ৩১টি দলের কোচ ড্র অনুষ্ঠানে গেলেও নিষেধাজ্ঞা মাথায় নিয়ে সেখানে যেতে পারেননি ম্যারাডোনা। তবে পরে বলেছেন, বিশ্বকাপে সহজ বলতে কোনো শব্দ নেই, ‘সেরা দলগুলোই বিশ্বকাপে এসেছে। এখানে কোনো সহজ প্রতিপক্ষ নেই।’
ফরাসি কোচ রেমন্ড ডমেনেখ এবং জার্মানির জোয়াকিম লোও সুর মিলিয়েছেন আর্জেন্টিনা কোচের সঙ্গে। বিশ্বকাপে সহজ বলে কোনো কথা নেই—বলে দিয়েছেন তাঁরা। একমাত্র অস্ট্রেলিয়ার কণ্ঠেই অন্যরকম সুর। এশিয়া অঞ্চল থেকে চূড়ান্ত পর্বে ওঠা অস্ট্রেলিয়ার পড়েছে জার্মানি, সার্বিয়া ও ঘানার গ্রুপে। অস্ট্রেলিয়া গোলরক্ষক মার্ক শোয়ার্জার এবং কোচ পিম ভারবেকের কথা—চাপ আসলে থাকবে জার্মানির ওপর। জার্মানির কোচ জোয়াকিম লোর কথা, ‘আমি বলতে পারছি না যে এই ড্রতে আমরা খুব ভাগ্যবান। এটা সহজ গ্রুপ নয়, তবে আমাদের পক্ষে এটি অনতিক্রম্যও নয়।’
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকাই চাপে থাকবে প্রচণ্ড। ‘এ’ গ্রুপে মেক্সিকো, উরুগুয়ে ও ফ্রান্স তাদের প্রতিপক্ষ। এই গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার দৌড়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকেই সবাই পেছনে রাখবে। এমন হতেই পারে যে, ৭৯ বছরের ইতিহাসে স্বাগতিকদের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেওয়া দেখবে বিশ্বকাপ। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রাজিলিয়ান কোচ কার্লোস আলবার্তো পাহেইরা ভয় পাচ্ছেন না, ‘আমরা নিজেদের প্রস্তুত করছি। আমরা ভয় পাই না।’

কোটানের জন্য আবেগের ম্যাচ

অনুশীলন শেষ করে হোটেলে ঢোকার সময় বিষণ্ন দেখাল জর্জ কোটানকে। আগের বিকেলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভালো খেলেও হেরে গেছে তাঁর দল। আজ বাংলাদেশের কাছে হারলে টুর্নামেন্টই শেষ। অস্ট্রিয়ান কোচের মনটা ভালো থাকে কী করে?
বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে কথা বলার পর অনিবার্যভাবেই চলে এল অন্য একটা প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের বিপক্ষে বাঁচা-মরার ম্যাচটা তো কোটানের জন্য বিশেষ ম্যাচও। ২০০৩ সালে যে বাংলাদেশ দলকে সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন করে গেছেন, সেই বাংলাদেশের বিপক্ষেই আজ তাঁর লড়াই। কোটানের কাছে এটা আবেগের ম্যাচও নয় কি?
পেশাদার কোচরা আবেগকে সন্তর্পণে মাটিচাপা দিয়ে কথা বলেন। কোটানও এর বাইরের দুনিয়ার কেউ নন, তবে স্বীকার করলেন, ‘হ্যাঁ, এটা আমার জন্য শুধুই একটা ম্যাচ নয়। বিশেষ একটা ম্যাচ। আমি অনেক কিছুই অনুভব করছি।’ কী সেটা, জানতে চাইলে আবার ঢুকে পড়লেন পেশাদারিত্বের খোলসেই, ‘এখন শুধু আমার দায়িত্ব নিয়েই ভাবা উচিত। আমার চাকরি এখন পাকিস্তানে।’
তা ঠিক, তারপরও নিজের সাবেক দলের বিপক্ষে একটুও কি আবেগ ছুঁয়ে যাবে না? মনে যা-ই থাক, মুখের কথায় কোটান নিজেকে একটা সীমারেখার মধ্যেই আটকে রাখলেন, ‘আবেগ প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না আমার। এখন আমার দলের প্রতিই সব মনোযোগ দিতে চাই।’ পাকিস্তানের কোচ না হলে বাংলাদেশ-পাকিস্তান লড়াইয়ে বাংলাদেশের পক্ষেই যে তাঁর অবস্থান হতো, সেটি কিন্তু জানাতে ভুললেন না, ‘অমন পরিস্থিতিতে অবশ্যই আমি বাংলাদেশের পাশেই থাকব।’ এই প্রথম কোটানের মুখে এক টুকরো হাসি।
এ-কথা ও-কথার পর এসে যায় বাংলাদেশের বর্তমান দলের সঙ্গে ২০০৩ সালের তাঁর দলটির তুলনা। কোটান রাখঢাক না রেখেই ২০০৩ সালের সাফজয়ী দলটিকেই এগিয়ে রাখেন, ‘আমার দলটি এই দলটির চেয়ে শক্তিশালী ছিল।’ পরশু ভুটানের বিপক্ষে বাংলাদেশ দলকে দেখার পর তাঁর কী মনে হয়েছে? কোটানের মূল্যায়ন, ‘এটি তরুণ দল। ভবিষ্যত্ ভালো। মাঝমাঠে একটা ছেলে খুব ভালো খেলেছে। গোটা দলেরই গতি আছে।’
বাংলাদেশ দল সাফ জিততে পারবে কি না—প্রশ্নে কোটানের মুখে সারাসরি না উত্তর শোনা যায়নি। তবে এটা বলেছেন, ‘আমি মনে করি না এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ সবচেয়ে শক্তিশালী।’ তাহলে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে কারা? কোটানের উত্তর, ‘বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান—এই চার দলের কারও জেতা উচিত।’

ব্রিটিশ ছাত্রী হত্যার দায়ে মার্কিন ছাত্রী ও তাঁর প্রেমিকের কারাদণ্ড

ব্রিটেনের শিক্ষার্থী মেরেডিথ কারচারকে হত্যার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্রী আমান্ডা নক্স ও তাঁর সাবেক প্রেমিককে কারাদণ্ড দিয়েছেন ইতালির একটি আদালত। খুন ও যৌন নির্যাতনের দায়ে আদালত নক্সকে ২৬ বছর এবং তাঁর প্রেমিক রাফায়েল সোলেসিতোকে ২৫ বছর কারাদণ্ড দেন।
বিবিসি অনলাইনের খবরে বলা হয়, আলোচিত ওই মামলার রায় ঘোষণার সময় নক্স মাথা নিচু করে ছিলেন। রায় ঘোষণার পর তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে রাফায়েলকে আদালতে সারাক্ষণ নির্বিকার দেখা যায়। ২০০৭ সালে ইতালির প্রেরুজিয়ায় একটি হোটেলে ব্রিটেনের সারে অঞ্চলের লিডস ইউনিভার্সিটির ছাত্রী কারচারের গলাকাটা লাশ পাওয়া যায়। কারচারের পরিবার জানায়, রাফায়েল ওই দিন কারচারকে ধরে রেখেছিলেন আর নক্স ছুরিকাঘাত করে তাঁকে হত্যা করেন।

হুররিয়াত নেতার ওপর হামলার প্রতিবাদে শ্রীনগরে বন্ধ্

ভারতশাসিত কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী হুররিয়াত কনফারেন্সের জ্যেষ্ঠ নেতা ফজল হক কুরেশির ওপর হামলার প্রতিবাদে শ্রীনগরে বন্ধ্ পালিত হয়েছে। বনেধর জেরে শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। আহত হুররিয়াত নেতার অবস্থা স্থিতিশীল, তবে আশঙ্কামুক্ত নয়। গত শুক্রবার নিজ বাড়ির সামনে অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের গুলিতে তিনি আহত হন।
শের-ই-কাশ্মীর মেডিকেল ইনস্টিটিউটে দীর্ঘ চার ঘণ্টাব্যাপী অস্ত্রোপচারের পর ফজল হক কুরেশিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটে রাখা হয়েছে। কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থায় তাঁকে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় নামাজ পড়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর চার বন্দুকধারী খুব কাছ থেকে তাঁর ওপর গুলি চালায়।

চলতি বছর ইরাকে ১২০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে

চলতি বছর ইরাকে ১২০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। আরও ৯০০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায়। গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কয়েকজনকে সম্ভবত পক্ষপাতদুষ্ট বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’ মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করার জন্যও বাগদাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।
লন্ডনভিত্তিক এ সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১২০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অভিযানের পর ২০০৪ সালে ইরাকে মৃত্যুদণ্ড পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। দেশটিতে সাধারণত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০০৮ সালে কমপক্ষে ২৮৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর কার্যকর করা হয়েছে ৩৪ জনের। ২০০৭ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় কমপক্ষে ১৯৯ জনকে। কার্যকর করা হয়েছে ৩৩ জনের।
ইরাকি প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকি মৃত্যুদণ্ডের জোর সমর্থক। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট জালাল তালাবানি মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী।

বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায় অনুতপ্ত নই: ভগবত

ভারতীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভগবত বলেছেন, ১৭ বছর আগে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায় সংঘের অনুতাপ করার প্রশ্নই আসে না। বরং ওই মসজিদের স্থানে রামমন্দির স্থাপনের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। গতকাল শনিবার ভারতীয় শহর চণ্ডীগরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।
সম্প্রতি বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায় গঠিত লিবারহান তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে অভিযোগ করা হয়েছে, উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত ছিল এবং এতে তত্কালীন রাজ্য সরকার, আরএসএস ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষনেতারা জড়িত। বিজেপি ও আরএসএসের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মোহন ভগবত বলেন, কোনো ষড়যন্ত্র নয়, বরং জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই বাবরি মসজিদের পতন হয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেক লোকও এতে জড়িত ছিলেন। যা কিছুই ঘটেছে, তা রামমন্দির নির্মাণ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই এ নিয়ে আরএসএসের অনুতপ্ত হওয়ার কিছু নেই। কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘যাদের আফসোস করার তারা আফসোস করুক।’
বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায় অংশগ্রহণকারী কয়েকজন মুসলিম নেতার নাম জানতে চাইলে আরএসএসের প্রধান জানান, ওই দিন প্রবীণ বিজেপি নেতা মুখতার আব্বাস নাকভি ও মুজাফফর হুসাইনের মতো মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকে উপস্থিত ছিলেন। রামমন্দির আন্দোলনে সংঘের সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানিয়ে মোহন ভগবত বলেন, সংঘ নিজস্ব নির্দেশনা অনুসারে কাজ করে যাচ্ছে। ‘সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বা আদালতের আদেশে অথবা জনগণের মতৈক্যের ভিত্তিতে—যেভাবেই হোক রামমন্দির নির্মাণ করার ব্যাপারে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
বাবরি মসজিদ ভাঙার পরে মুসলিম ও খ্রিষ্ট সম্প্রদায়সহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংঘের নৈকট্য বেড়েছে দাবি করে মোহন ভগবত বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই।’ বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা সংঘের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলেও দাবি করেন তিনি। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়।

জর্জ ওয়াশিংটনের চিঠি বিক্রি হলো ৩২ লাখ ডলারে

প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের একটি চিঠি রেকর্ড ৩২ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছে। গত শুক্রবার নিউইয়র্কে নিলামঘর ক্রিস্টি’স-এ আয়োজিত এক নিলাম অনুষ্ঠানে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছিল চিঠিটি। চার পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে জর্জ ওয়াশিংটন ওই সময় সে দেশের নতুন সংবিধানটি তাঁর ভাগ্নে বুশরোডকে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বুশরোড ছিলেন ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যএকত্রীকরণসম্মেলনের প্রতিনিধি।
উল্লেখ্য, জর্জ ওয়াশিংটনের চিঠি বিক্রির ক্ষেত্রে আগের রেকর্ডটি ছিল আট লাখ সাড়ে ৩৪ হাজার ডলারের।
রেকর্ড দামে বিক্রি হওয়া চিঠিটিতে তারিখ লেখা আছে ১৭৮৭ সালের ৯ নভেম্বর। ওই চিঠিতে জর্জ ওয়াশিংটন ভাগ্নে বুশরোডকে লিখেছিলেন, ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে নব্য স্বাধীনতা পাওয়া অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করতে নতুন সংবিধানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পাণ্ডুলিপি ও বই নিয়ে আয়োজিত এই নিলামে জর্জ ওয়াশিংটনের চিঠিটিই মূল আকর্ষণ ছিল। নিলামে প্রখ্যাত মার্কিন কবি এডগার এলান পোর ট্যামারলেন অ্যান্ড আদার পোয়েম নামের একটি বইও ছয় লাখ ৬২ হাজার ৫০০ ডলারে বিক্রি হয়েছে।
বর্তমান সময়ের ঔপন্যাসিক কোরম্যাক ম্যাককার্থির ব্যবহার করা একটি ‘অলিভেট্টি’ টাইপরাইটার বিক্রি হয়েছে দুই লাখ ৫৪ হাজার ডলারে।

প্রভাবশালী বলে তাঁদের শাস্তি হবে না -নগরদর্পণ: চট্টগ্রাম by বিশ্বজিত্ চৌধুরী

সীতাকুণ্ড থেকে আমার ঘনিষ্ঠ এক ভদ্রলোক ফোন করে বলেছিলেন, ‘আপনাকে একটা তথ্য দিই। আজ সন্ধ্যার পর সীতাকুণ্ড উপকূলের হাজারখানেক গাছ কাটা হবে। খবর পেলেও পুলিশ ওই সময় যাবে না, তারা যাবে গাছ কাটা শেষ হওয়ার পর। বন বিভাগও ব্যাপারটা জানে। বন কর্মকর্তারা কেউ অসহায়, কেউ ম্যানেজড; বনপ্রহরী বা বন বিটের দু-একজনকে পরিকল্পনামাফিক পিছমোড়া বেঁধে রাখার মতো নাটক হতে পারে, নাও হতে পারে। তবে আজ রাতের মধ্যেই গাছ কাটার কাজ যে শেষ হচ্ছে, তা নিশ্চিত।’
‘আপনি কী করে জানলেন?’
‘আমি কেন, এলাকার লোকজন প্রায় সবাই জানেন।’
কোরবানির ঈদ করার জন্য বাড়িতে এসেছিলেন ভদ্রলোক। ছুটি শেষে ঢাকায় কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার পথে গাড়িতে বসে গত ২৯ নভেম্বর রোববার সকালে ফোন করে এসব কথা জানিয়েছিলেন আমাকে। আমি তখন পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারিনি। কারণ, বিস্তারিত পরিকল্পনা যদি সবাই আগেভাগে জেনে যায়, তাহলে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কি সম্ভব?
পরদিন সকালে সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলোতে দেখলাম, সীতাকুণ্ড উপজেলার পাক্কা মসজিদ ও জোড় আমতলীর মধ্যবর্তী প্রায় এক কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকার দুই হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বোঝা গেল, যা কিছু রটে, তার সবটাই নির্বিবাদে ঘটে।
এর সঙ্গে যে প্রভাবশালী লোকজন জড়িত ছিলেন, বলাই বাহুল্য। কিন্তু তাঁদের টিকিটি স্পর্শ করার সাধ্য কারও নেই। বরং পুলিশ যথারীতি নির্দিষ্ট সময়ের পর উপস্থিত হয়েছে ঘটনাস্থলে। সোনা মিয়া, হারেছ মিয়া নামের কয়েকজন নিরীহ লোককে (কাঠের টুকরা কুড়িয়ে নেওয়া বা কামলা খাটার জন্য উপস্থিত ছিল ঘটনাস্থলে) গ্রেপ্তার করে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। এসব ক্ষেত্রে মামলাও হয় খুব হাস্যকর। অজ্ঞাত কয়েকজন লোককে বাদী করে মামলা হয়, তাতে নিরীহ লোকজনকে হয়রানি করার একটা লাইসেন্স পেয়ে যায় পুলিশ। হয়রানির হাত থেকে বাঁচার জন্য এসব লোক ছুটে যান স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে। প্রভাবশালীরা তখন ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। থানা-পুলিশ, দেনদরবার করে তাঁদের ছাড়িয়ে আনার মহত্ত্ব দেখান। অথচ কে না জানে, এসব মহান ত্রাতাই মূল অপরাধের হোতা!
এবার গাছ কাটার জন্য স্থানীয় সাংসদ আবুল কাশেম মাস্টারের ছেলে এস এম আল মামুন, নগর আওয়ামী লীগের নেতা আ জ ম নাছির উদ্দিন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা আ ম ম দিলশাদ এবং বিএনপির নেতা আসলাম চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজনের নাম এসেছে। আওয়ামী-বিএনপি নেতাদের এই যৌথ অভিযানের ফলে প্রমাণিত হলো, ব্যক্তিগত স্বার্থের ক্ষেত্রে কোনো বিরোধ নেই—ভাগাভাগি করে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুটে নিতে মতৈক্য প্রতিষ্ঠা অনেক সহজ।
জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য শিপইয়ার্ড তৈরির নামে উপকূলে গাছ কাটার উত্সব চলছে অনেক দিন ধরে। গত এক বছরে সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি এলাকায় ১২৫ একর সবুজ বেষ্টনী উজাড় করা হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে পত্রপত্রিকায়। প্রতিবারই একই নাটক অভিনীত হয়েছে। পুলিশ এসেছে ধ্বংসযজ্ঞের পর, লোক দেখানো কিছু গ্রেপ্তার হয়েছে। বন কর্মকর্তা, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন জনকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছে। ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বক্তব্যও এসেছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। মামলা হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। সচেতন নাগরিকেরা এসব অপতত্পরতার বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ করেছেন, মানববন্ধন হয়েছে। কিন্তু যাঁরা দায়ী, তাঁরা আড়ালে মুখ টিপে হেসেছেন—শিপইয়ার্ড তৈরির কাজ একধাপ এগিয়েছে বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।
প্রসঙ্গক্রমে বলি, সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পের ভয়াবহ পরিবেশদূষণ নিয়ে বাদ-প্রতিবাদ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। পরিবেশবাদীরা এই শিল্পের কারণে সমুদ্রদূষণ, এলাকাবাসীর স্বাস্থ্য সমস্যা, শ্রমিকদের মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আন্দোলন করে আসছেন। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গোলটেবিল বৈঠক করে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য প্রকাশ করে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের কাছে বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। ‘বেলা’, ‘ইপ্সা’সহ কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নানা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে শিল্পোদ্যোক্তা ও সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে দেনদরবার করছে দীর্ঘকাল ধরে। কিন্তু কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙেনি। নতুন নতুন শিপইয়ার্ড তৈরি হয়েছে। গাছ কাটাসহ পরিবেশদূষণের সব আলামত রয়েছে অব্যাহত।
জাহাজভাঙা ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বারবার দাবি করে আসছেন, এই শিল্প আমাদের লৌহজাত কাঁচামালের প্রধান জোগানদাতা। এটি হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান করছে বলেও উল্লেখ করেছেন তাঁরা।
কিন্তু পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা যেসব তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন, তাতে এসব দাবি ধোপে টেকে না।
যত দূর মনে পড়ে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একবার রড ও অন্যান্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দেশে যখন অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং নির্দিষ্ট একটি সিন্ডিকেটকে দায়ী করা হয় এর জন্য, তখন জাহাজভাঙা শিল্পের উদ্যোক্তারা জানিয়েছিলেন, এই তত্পরতার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন তাঁরা। কেননা, দেশের লোহার চাহিদার মাত্র ২৫—৩০ শতাংশ পূরণ করে থাকে এই শিল্প।
বলা হয়, আড়াই লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয় এই শিল্পে। কিন্তু দেশে যদি ৭০টি (যদিও ৪০—৪৫টির বেশি শিপইয়ার্ডের অস্তিত্ব নেই) জাহাজভাঙা শিল্পও চালু থাকে, তাতে প্রতিটিতে শ্রমিক থাকার কথা গড়ে ২০০ জন। অর্থাত্ এই শিল্পে মোট শ্রমিকের সংখ্যা ১০—১৫ হাজারের বেশি হওয়ার কথা নয়। তার মানে, এই শিল্পের গুরুত্বের কথা যতটা প্রচার করা হয়, আদপে ঠিক ততটা গুরুত্ব তা বহন করে না।
এসব দিক তুলে ধরে পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করে জাহাজভাঙা শিল্প বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
আমরা এ মুহূর্তে এটিকে ঠিক পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলি না। বরং পরিবেশ রক্ষা করে, শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি হ্রাস করে, আহত শ্রমিকদের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করে এই শিল্প চালু রাখাই হবে যুক্তিসংগত।
দেখা যাচ্ছে, জাহাজভাঙা শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও মালিকেরা তা করেননি। ২০০৯ সালের মার্চে আদালত পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য দুই সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন উদ্যোক্তাদের। অন্যথায় কাজ বন্ধ করতে হবে বলেও নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। পরে সময় বাড়ানোর জন্য শিল্পমালিকেরা আবেদন করলে তার সুরাহা এখনো হয়নি।
সারা বিশ্বে মাত্র গুটিকয়েক দেশে জাহাজভাঙা শিল্প চালু আছে। এর মধ্যে তুরস্ক ও চীনে পৃথক ডকইয়ার্ড করে জাহাজভাঙার কাজ করা হয়। ভারতের গুজরাটে জনবসতি থেকে অনেক দূরে এলাং গ্রামে এই শিল্পের কাজ চলে। এর পরও এসব দেশে পরিবেশবাদীরা সোচ্চার। অথচ আমাদের দেশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে জনবহুল সীতাকুণ্ড উপজেলার উপকূলে জাহাজভাঙার কাজ চলছে। পৃথক ডকইয়ার্ড করে এই কাজটি করার দাবি জানিয়ে আসছেন পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু ব্যয়বহুল বলে তাঁদের এই দাবিও উপেক্ষিত হয়েছে।
এই যখন অবস্থা, তখন কী বিবেচনায় উপজেলা প্রশাসন নতুন করে শিপইয়ার্ড স্থাপনের অনুমতি দিচ্ছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। উপজেলা প্রশাসন বলছে, যেখানে সবুজ বেষ্টনী নেই, কেবল সেখানেই শিপইয়ার্ড তৈরির অনুমতি দিয়েছে তারা। কিন্তু এই নিয়ম যে কতটা বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোর মতো, তা প্রমাণ করেছেন নতুন উদ্যোক্তারা। তাঁরা আগে সবুজ বেষ্টনী লোপাট করে দিয়ে তারপর যাচ্ছেন শিপইয়ার্ডের অনুমতির জন্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সিডর, নার্গিস, আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ছোবল যখন উপকূলীয় মানুষের নিয়তি হয়ে উঠেছে, তখন হাজার হাজার গাছ কেটে মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলছে কিছু অর্থলোভী মানুষ।
একজন মানুষকে কেউ খুন করলে তার ফাঁসি হয়, হাজার হাজার গাছ খুন করে লাখো মানুষের জীবন বিপন্ন করার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কোনো শাস্তি হবে না? শুধু তাঁরা ক্ষমতাবলয়ের কাছাকাছি থাকেন বলে? প্রভাবশালী বলে?
বিশ্বজিত্ চৌধুরী: লেখক, সাংবাদিক।
Email : bishwa_chy@yahoo.com

ভেজাল সারে বিপন্ন প -দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক

চলতি মৌসুমে যখন ধানের বাম্পার ফলন হচ্ছে তখন বাজারে ভেজাল সার বিক্রির খবরটি উদ্বেগজনক। প্রথম আলোর লক্ষ্মীপুরের রায়পুর প্রতিনিধির পাঠানো খবরে জানা গেছে, ভেজাল সারের কারণে স্থানীয় সয়াবিন কৃষকেরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলায় প্রতিবছর ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার সয়াবিন উত্পাদিত হলেও গত বছর অনেক কৃষক লাভ করা দূরে থাক, খরচই তুলে আনতে পারেননি। বাজার থেকে টিএসপি ও এমওপি নামের যে সার তাঁরা কিনেছেন, তা ছিল ভেজাল।
একশ্রেণীর সার ব্যবসায়ী বাড়তি মুনাফার জন্য এমওপি বা মিউরেট অব পটাশ সারে ইটের গুঁড়ো, বালু ও রং মিশিয়ে থাকে। লাল দানাযুক্ত এই সারে ভেজাল দেওয়া সহজ। তা ছাড়া টিএসপি সারের সঙ্গে কম দামের এফএমপি সার মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপির দাম ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা, অন্যদিকে প্রতি বস্তা এফএমপি বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। এই অপতত্পরতা বন্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এফএমপি আমদানি বন্ধ করলেও এখনো প্রচুর সার আছে গুদামে। অসাধু ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে টিএসপি সারের সঙ্গে সেই সার মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করে থাকে। সাধারণ কৃষকের পক্ষে এই ছলচাতুরী ধরা কঠিন। ভারত থেকে চোরাই পথে আসা টিএসপির সঙ্গে ভেজাল মেশানোর ঘটনায় ডিলারদের সরাসরি দায়ীও করা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে সার নিয়ে রমরমা ভেজাল-বাণিজ্য চললেও এর প্রতিকারে কেউ এগিয়ে আসছে না। কৃষি কর্মকর্তারা সারের নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে কর্তব্য শেষ করেন। তাঁদের অজানা নয় যে, ভেজালকারীদের হাত অনেক লম্বা। ফলে যেকোনো ‘পরীক্ষায়’ পাস করে যায় তারা।
জমিতে ভেজাল সার কৃষক ও জমি উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে কৃষি অধিদপ্তর, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীরবতা রহস্যজনক। কৃষি ও কৃষকের জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলা চলতে পারে না। সারে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশে যেন কোনো ভেজাল সার বিক্রি হতে পারে, তা নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের গণজামিন -প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ কাম্য

প্রতি মিনিটে অন্তত একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জামিন প্রদানের ঘটনায় আমরা স্তম্ভিত। এ বিষয়ে যদিও প্রথম আলোতে ২ ডিসেম্বর শীর্ষ প্রতিবেদন এবং সেদিনই বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা, অ্যাটর্নি জেনারেল প্রমুখ বৈঠক করেন এবং বৈঠকের পর অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন যে তিনি ওই সব জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি এমনকি ওই আদালতে আইন কর্মকর্তাদের সংখ্যা বাড়ানোর কথাও বলেছেন। কিন্তু আমরা মনে করি, বিষয়টি এতটাই অস্বাভাবিক, গুরুতর ও ব্যাপক যে এ ক্ষেত্রে প্রতিকারের আটপৌরে চিন্তাই শেষ কথা হতে পারে না।
হাইকোর্ট বিভাগের কোনো আদেশের বিরুদ্ধে যে-কেউ আপিল বিভাগে প্রতিকার চাইতে পারেন। এটা একটি রুটিন বিষয়। কিন্তু কখনো সময় আসে যখন অসাধারণ পরিস্থিতি অসাধারণ প্রতিকারের দাবি রাখে। গত ১৮ ও ১৯ নভেম্বরেই কেবল নয়, হাইকোর্ট বিভাগের আলোচ্য দ্বৈত বেঞ্চ নভেম্বর মাসজুড়ে যে পরিমাণ মোট জামিন আবেদন নিষ্পত্তি করেছেন তা দৃশ্যত বড়ই অস্বাভাবিক।
কোনো সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের সব নাগরিক দ্রুত বিচারের অধিকার রাখেন। এটা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। দোষী ব্যক্তির অপরাধ যতই গুরুতর হোক, যখন তাঁর এই অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তখন তিনি আসলে ওই সাংবিধানিক অধিকার থেকেই বঞ্চিত হন। সুতরাং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির জামিন লাভের কারণে আমাদের বক্তব্য নেই। আমরা সবিনয়ে প্রশ্ন তুলছি বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। কী করে দুই দিনে অন্তত সাত শ জামিনের পৃথক আবেদন হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ নিষ্পত্তি করতে পারলেন। মানুষের ক্ষমতা তো অসীম নয়। এই ক্ষমতার প্রয়োগ আমাদের সাধারণ বিবেচনাবোধের বাইরে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের আগে পেন্ডিং ফৌজদারি আপিলের ততটা চাপ ছিল না। ওই সময়ে যেসব অপরাধী তিন থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পেতেন, তাঁরা তাঁদের আপিল চলাকালে যদিও বা জামিনের জন্য দরখাস্ত করতেন, কিন্তু আদালত তাঁদের জামিন দিতেন না। এমনকি উচ্চ আদালতও তাঁদের সহানুভূতি দেখাতেন না। স্বাধীনতা লাভের পরও যাঁরা পাঁচ বছরের বেশি দণ্ড পেতেন তাঁদের জামিন দিতেন না উচ্চ আদালত। ধীরে ধীরে পেন্ডিং ফৌজদারি আপিলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে উচ্চ আদালত শিথিল মনোভাব নিতে শুরু করেন। প্রথমে পাঁচ বছরের বেশি এবং সম্ভবত ১৯৯০ সালের পরে সীমিতভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের আদালত জামিন প্রদানের নীতি নেন। তবে জামিন প্রদান সাধারণভাবে সব সময়ই আদালতের ডিসক্রিশন বা বিশেষ অধিকার। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর উচ্চ আদালত জামিন প্রদানে মোটামুটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে থাকেন।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দোষী ব্যক্তিদের আপিলের আবেদন ঝুলে থাকাকালে জামিন প্রদানে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়টি একটি সর্বজনীন নীতি। আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধিতেও সে কারণে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে চলতে আদালতের ওপর একটা বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। জামিন প্রদান বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ও ৪৯৭ ধারায় আদালতকে প্রকারান্তরে একটি গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত, এমনকি যাঁরাই অজামিনযোগ্য ধারায় অভিযুক্ত হবেন তাঁদের জামিন দিতে হলে নানা বিচার-বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে, জামিন প্রদানের কারণ নির্দিষ্টভাবে লিখতে হবে। কিন্তু প্রথম আলোর সীমিত অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, জামিন আদেশগুলো গত্বাঁধা। তাতে কারণ লেখা হয়নি। সুতরাং আমরা মনে করি, বিচারিক যথার্থতার প্রশ্ন ছাড়াও এখানে অন্য কোনো অনিয়মের বিষয় থাকতে পারে। তাই এখানে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির একটি যথোচিত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জরুরি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। জনমনে আস্থাই বিচার বিভাগের প্রাণ। সেই আস্থা বজায় রাখার স্বার্থেই যথা পদক্ষেপ অপরিহার্য।

বিজয়ের মাস -বিশ্বসভায় বাংলাদেশের প্রথম স্বীকৃতি by সিমিন হোসেন রিমি

১৯৭০-এর নির্বাচনে গাইবান্ধার একটি আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ওয়ালিউর রহমান রেজা। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই এর নানামুখী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি।
অক্টোবর মাসে তিনি ৬ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার্সে আসেন। সেখানে তাঁর দায়িত্ব ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজখবর রাখা। তাঁদের আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা করা ও ওষুধপত্র দেওয়া।
এরই মধ্যে একদিন তিনি জানতে পারলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এই এলাকায় আসছেন। যেদিন তাঁরা এলেন, সেদিন ওয়ালিউর রহমান তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার একটি বই পড়ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ বইটি দেখে জানতে চাইলেন কী বই। ওয়ালিউর রহমান বললেন, ‘দালাই লামার বইটা কিনেছি। কারণ, শিখতে হবে বিদেশের মাটিতে কীভাবে থাকতে হয়। দালাই লামা তো এ দেশেই আছেন। উনি যেভাবে আছেন, সে পদ্ধতিটা এই বই পড়ে শিখব। কারণ, আমরাও তো এই দেশে থাকব!’ এ কথা শুনে তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, ‘১৫ ডিসেম্বর আমরা ঢাকার মাটিতে জনসভা করব। আমাদের যুদ্ধের প্রথম অধ্যায় শেষ হয়েছে। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে এসে গেছি। আমরা ১৫ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মিটিং করব।’
২. যুদ্ধদিনের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে সুবিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করে চলেছেন তিনি অতি নিপুণভাবে। তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত যুদ্ধের রণকৌশলে, মুক্তিযোদ্ধার মাঝে, শরণার্থী শিবিরে, বাংলাদেশের ভেতরের মানুষে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। তাঁর দৃষ্টি প্রতি মুহূর্তের বিশ্ব কূটনৈতিক তত্পরতার ফলাফল থেকে উদ্ভূত নিত্যনতুন পরিস্থিতির বোঝাপড়ায়। এবং এ সবকিছুর ভেতর দিয়েই একমাত্র লক্ষ্য—যুদ্ধে জয়লাভ করা।
২৩ নভেম্বর, ১৯৭১ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেশবাসীর উদ্দেশে তাঁর ‘জয় আমাদের কবজায়’ শিরোনামের বেতার ভাষণে বলছেন, ‘মুক্তিবাহিনী এখন যেকোনো সময়ে যেকোনো জায়গায় শত্রুকে আঘাত করতে পারে; এমনকি শত্রুর নিরাপদ অবস্থানের কেন্দ্রে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে তাকে বিমূঢ় করে দিতে পারে। জলে-স্থলে চমকপ্রদ অগ্রগতি ঘটেছে মুক্তিবাহিনীর।...একদিকে রণক্ষেত্রে শত্রুর বিপর্যয় ঘটেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ইসলামাবাদের দুষ্কৃতিকারীরা আজ দিশেহারা ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।...এখন তারা চায় ভারতের সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে একটা আন্তর্জাতিক সংকট সৃষ্টি করতে। তারা আশা করে যে, এমন একটি যুদ্ধ হলে বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের থেকে পৃথিবীর দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ হবে, মুক্তিবাহিনীর হাতে তাদের পরাজয়ের গ্লানি গোপন করা যাবে এবং এমন একটা পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, যাতে তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাবে। কিন্তু আমি প্রত্যয়ের সঙ্গে বলছি যে, এর একটি উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হবে না। বরঞ্চ এতে তাদের ভ্রান্তি, অপরাধ ও আত্মঘাতের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে, শত্রু এবং পরিণামে তাদের আত্মবিনাশ সুনিশ্চিত হবে।’
এই একই ভাষণের শেষ অংশে প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘স্বাধীনতার ধারণা অশেষ অর্থবহ। স্বাধীনতার তাত্পর্য নির্ভর করে যুদ্ধাবস্থায় এর জন্য আমরা কী মূল্য দেই এবং শান্তির সময়ে এর কী ব্যবহার করি, তার উপরে। শত্রু সংহারের প্রতিজ্ঞা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে শহীদের রক্তের উপযুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিজ্ঞাও আমাদেরকে নতুন করে নিতে হবে।’
৩. প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ধীমান নেতৃত্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অবিস্মরণীয় সাফল্যমণ্ডিত ভূমিকা, অসীম সাহসী মুক্তিবাহিনীর হাতে পাকিস্তানি সেনাদের লজ্জাজনক পিছু হটা, পাকিস্তানি সামরিক শাসক গোষ্ঠীকে আরও বেশি দিশেহারা এবং ক্ষিপ্ত করে তোলে। সর্বোপরি ২৫ মার্চ রাত থেকে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর পাকিস্তানি সামরিক শক্তির চাপিয়ে দেওয়া একতরফা হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জনগণের ন্যায়সংগত সংগ্রামের প্রতি ভারতের আন্তরিকতাপূর্ণ সর্বোচ্চ সমর্থনদানের ফলে পাকিস্তান তার শেষ মরণ কামড় দেওয়ার চেষ্টা করে ভারতকে আক্রমণ করে। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান অতর্কিতে ভারতের পশ্চিমে সীমান্তে আক্রমণ শুরু করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই উপমহাদেশকে কেন্দ্র করে শুরু হয় নানামুখী কূটনৈতিক তত্পরতা। এমন এক উত্তেজনাকর অবস্থায় ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত সরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর স্বীকৃতিপত্রে লেখেন:
Dear Prime Minister,
My colleagues in the Government of India and I were deeply touched by the message which His Excellency the Acting President Syed Nazrul Islam and you sent to me on December 4. On its receipt, Government of India once again considered your request to accord recognition to the people’s republic of Bangladesh which you lead with such dedication. I am glad to inform you that in the light of the circumstances which prevail at present, government of India have decided to grant the recognition. This morning I made a statement on the subject in our Parliament......
ডিসেম্বরের ৮ তারিখ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে তাঁর ‘সোনার বাংলাকে গড়তে হবে’ শীর্ষক বেতার ভাষণে বলেন, “ভারতের জনসাধারণ অনেক আগেই আমাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছেন তাঁদের অন্তরে। এখন তাঁদের সরকার বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি জানিয়েছেন।...স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হিসেবে আমাদের কূটনৈতিক স্বীকৃতি লাভ আজ সম্ভব হলো অগণিত শহীদের রক্তের বিনিময়ে, মুক্তিবাহিনীর দুঃসাহসিক তত্পরতা, অপূর্ব আত্মত্যাগ ও দুর্ভেদ্য ঐক্যের ফলে।...স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদেরকে জগত্সভায় সর্বপ্রথম স্বাগত জানিয়েছে ভারত। এক কোটি ছিন্নমূল বাঙালির পরিচর্যার ক্লেশ স্বীকার এবং বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য যুদ্ধের আপদ বহন আর মানবতা ও স্বাধীনতার আদর্শের প্রতি যে সুগভীর নিষ্ঠার পরিচয় ভারত দিয়েছে, তা বর্তমানকালে এক আশ্চর্য ঘটনারূপে বিবেচিত হবে। ভারতের এই দৃঢ়তাপূর্ণ সিদ্ধান্তে আমরা আনন্দিত।...ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি হবে পরস্পরের জন্য মৈত্রী ও শ্রদ্ধাবোধ। ভারতের পর ভুটান স্বীকৃতি দিয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে। এর জন্য আমরা ভুটানের রাজা ও জনসাধারণের নিকট কৃতজ্ঞ।...বাংলাদেশের স্বপ্ন যখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাস্তবে রূপায়িত হলো, তখন সেই স্বপ্নের দ্রষ্টা, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শত্রুর কারাগারে বন্দী হয়ে আছেন। দেশবাসীর নিকটে অথবা দূরে যেখানেই থাকুন না কেন, বঙ্গবন্ধু সর্বদাই জাগরূক রয়েছেন তাদের অন্তরে। যে চেতনা আমাদের অতীতকে রূপায়িত করেছে, তিনি সেই চেতনার প্রতীক। যে রূপকাহিনী ভবিষ্যতে আমাদের জাতিকে জোগাবে ভাব ও চিন্তা, তিনি সেই কাহিনীর অংশ। তবু এই মুহূর্তে তাঁর অনুপস্থিতিতে আমরা সকলেই বেদনার্ত।
...যুদ্ধ জয়ের সঙ্গে সঙ্গে শান্তিকেও জয় করে আনতে হবে। নিষ্ঠুর যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের উপরে ‘সোনার বাংলার’ সৌধ নির্মাণ করতে হবে। পুনর্গঠন ও উন্নয়নের এই আনন্দদায়ক ও মহান কাজে অংশ নিতে হবে বাংলাদেশের প্রতিটি সন্তানকেই।”
৪. ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের ফলে মুক্তিযুদ্ধে নতুন মাত্রা সংযুক্ত হয়। মুক্তিবাহিনী মাত্র কয়েক মাসে গেরিলা কায়দায় আক্রমণ করে যেভাবে পাকিস্তান বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল, এবার মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ে যোগ দেয় ভারতীয় মিত্র বাহিনী। ১৩ দিনের টান টান উত্তেজনা ও যুদ্ধের ফলে পাকিস্তান বাহিনী পরাজয় মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করে। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় সূচিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ায়।
এই প্রসঙ্গে পরবর্তী সময়ে তাজউদ্দীন আহমদ যা বলেন, তা রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদর্শী উচ্চারণ হিসেবে একাত্তরেই ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে কারো ঘাঁটি হবে না। এমনকি যুদ্ধের দিনে সবচেয়ে বিপর্যয়ের সময়ে ভারতীয় বাহিনীকে বলেছি, শ্রীমতী গান্ধীকে বলেছি, বন্ধু রাষ্ট্র হিসাবে তুমি আমাদের দেশে যাবে। বন্ধু তখনই হবে, যখন তুমি আমাদের স্বীকৃতি দেবে। তার আগে সার্বভৌমত্বের বন্ধুত্ব হয় না। ৬ ডিসেম্বর স্বীকৃতি দিয়ে ভারতীয় বাহিনী আমাদের সাথে এসেছিল। কোন গোপন চুক্তি ভারতের সাথে হয় নাই। একটাই চুক্তি হয়েছে, সেই চুক্তি প্রকাশ্য এবং কিছুটা লিখিত, কিছুটা অলিখিত। সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আমি যুক্তভাবে সই করেছিলাম। সেখানে লেখা ছিল, আমাদের স্বীকৃতি দিয়ে সহায়ক বাহিনী হিসাবে তোমরা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। এবং যেদিন আমরা মনে করবো আমাদের দেশে আর তোমাদের থাকার দরকার নেই, সেই দিন তোমরা চলে যাবে। সেই চুক্তি অনুসারে যেদিন বঙ্গবন্ধু শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে বললেন, ৩০ মার্চের মধ্যে তোমাদের বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে যাবে, তখনই মিসেস গান্ধী ১৯৭২-এর ১৫ মার্চের মধ্যে সহায়ক বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে গেলেন।’ (এই অংশবিশেষ ১৯৭৪ সালের ২০ জানুয়ারি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ থেকে নেওয়া।)
বিশ্ব রাজনীতির দিকে দৃষ্টি ফেরালে আমরা সুদূর-নিকট সব অতীতেই দেখতে পাব, কখনো শান্তি রক্ষার নামে, কখনো রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় সহযোগিতার নামে, কিংবা আগ্রাসন রুখতে অথবা বিধ্বংসী অস্ত্র খোঁজার নামে কীভাবে দেশে দেশে অন্য দেশের ঘাঁটি হয়ে যায়। অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যায় মূল রাষ্ট্রেরই। সে অর্থে ১৯৭১ সালে বিদেশের মাটিতে বসে, এক কোটি শরণার্থীর ভার বইছে যে দেশ এবং সে দেশের সব সহযোগিতা নেওয়ার পরও একমাত্র নেতৃত্বের দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং প্রবল আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন দেশপ্রেমের ফলেই সম্ভব হয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল একটি সম্মানজনক সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন করা, যা আজও অনন্য এক উদাহরণ।
৫. মুক্তিযুদ্ধের প্রতিদিনের ঘটনা সৃষ্টি করেছে এক একটি নতুন ইতিহাসের। অমূল্য রতনখচিত সেই ইতিহাসের পথ ধরে খুঁজে বের করতে হবে ১৯৭১-কে। এ দায়িত্ব সবার।
সিমিন হোসেন রিমি: সমাজকর্মী।
simrim_71@hotmail.com

জলবায়ু পরিবর্তন -কোপেনহেগেন সম্মেলনে বাংলাদেশের কর্মকৌশল by ফাহমিদা খাতুন

জলবায়ু পরিবর্তন চলমান, এটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তসরকারি প্যানেল বা আইপিসিসি ২০০৭ সালে তাদের চতুর্থ মূল্যায়ন রিপোর্টে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিদ্যমান অনেকগুলো বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও প্রমাণাদি উপস্থাপন করে। আইপিসিসি দেখিয়েছে যে গত ১০০ বছরে বিশ্বের তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৭৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেড়েছে; সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৯৬১ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত এক দশমিক আট মিলিমিটার থেকে বেড়ে ১৯৯৩ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত সময়ে তিন দশমিক এক মিলিমিটার বেড়েছে; বেশি অঞ্চলজুড়ে এবং বেশি সময় ধরে খরার তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশের পরিস্থিতি অনেকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে করে কৃষি উত্পাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষি উত্পাদনে এই ক্ষতির পরিমাণ এশীয় দেশগুলোতে শতকরা ১০ ভাগ এবং সাব-সাহারার আফ্রিকায় শতকরা ১৭ ভাগ হতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান হারে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাড়তে থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গম উত্পাদন শতকরা ১২ ভাগ, ধান উত্পাদন শতকরা ১০ ভাগ এবং ভুট্টা উত্পাদন শতকরা ১৭ ভাগ কমে যেতে পারে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ১৬০ কোটি লোকের জন্য পানি এবং খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুধু ধনী এবং দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য বাড়বে না, দরিদ্র দেশের ভেতরেও বৈষম্য দেখা দেবে। দেশের ভেতরে আর্থসামাজিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল অংশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি।
২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার বালি শহরে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কনভেনশন কাঠামো বা ইউএনএফসিসির অধীনে বালি রোডম্যাপ গৃহীত হয়। এতে বিশ্বের দেশগুলো ২০১২ পর্যন্ত এবং তার পরেও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কার্যক্রম নিয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বালি রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে কোপেনহেগেন সম্মেলনে পাঁচটি বিষয়ে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য হওয়ার কথা। এগুলো হলো, (১) দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার জন্য অংশীদারিমূলক দৃষ্টিভঙ্গী, যার মধ্যে বিশ্বের কার্বনডাই অক্সাইড নির্গমনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা থাকবে, (২) জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করার জন্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশি করে কার্যক্রম গ্রহণ করা, (৩) জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য কার্যক্রম বৃদ্ধি করা, (৪) জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং ঝুঁকি মোকাবিলা করতে কার্যক্রম নেয়ার জন্য প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়া বর্ধিত করা, (৫) আর্থিক সহায়তা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো।
বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই দেখা গেছে, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত সময়কালে গড় তাপমাত্রা মে মাসে এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং নভেম্বর মাসে শূন্য দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেড়েছে। অন্যদিকে বাত্সরিক গড় বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে; ঘন ঘন এবং ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে; ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবগুলোর কারণে বাংলাদেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তাই শুধু বিঘ্নিত হবে না, যারা বেঁচে থাকবে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও হুমকির মুখে পড়বে। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। কেননা, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়া যে কার্বনডাই অক্সাইড নির্গমন করে তা খুবই নগণ্য। তাই বাংলাদেশের জন্য কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা নয়, এই প্রভাবের মাত্রা কমিয়ে প্রাকৃতিক এবং মনুষ্য পরিমণ্ডলে এর ঝুঁকি মোকাবিলার প্রচেষ্টাই মূল লক্ষ্য। যেমন কী করে জলবায়ুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষি উত্পাদন চালিয়ে যাওয়া যায়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, সেটি কোথায় পাওয়া যাবে? তা ছাড়াও প্রয়োজন প্রযুক্তি।
উন্নত দেশগুলোর কথা এবং কাজের মধ্যে মিল না থাকার কারণে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যক্রম তেমন এগোতে পারছে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কার্বনমুক্ত করতে হলে অর্থ ব্যয় করতে হয়। উন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করার এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য নিজেদের দেশে বিনিয়োগ বাড়িয়ে চললেও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সাহায্যে তেমনভাবে এগিয়ে আসছে না। চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলো যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তাতে প্রায় চার হাজার ১০০ বিলিয়ন ডলার দেয়া হয়েছে তাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য। এই বিপুল অর্থ মূলত উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনীতির জন্য ভর্তুকিস্বরূপ। এ ধরনের পদক্ষেপ অসম এবং বৈষম্যমূলক। কেননা, পরিবেশ রক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দে এ রকম উদারতা দেখা যায় না। ইউএনএফসিসি হিসাব করেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজন হবে ২৮ থেকে ৬৭ বিলিয়ন ডলার, যা কিনা তাদের মোট জাতীয় উত্পাদন বা জিডিপির শূন্য দশমিক ৬ থেকে শূন্য দশমিক ২১ ভাগ হবে। আন্তর্জাতিকভাবে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যক্তিখাতেও বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে। কেননা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বলেছে, এই খাতে ২২ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। অথচ ২০০৮ সালে বিনিয়োগ হয়েছে ১৪৮ বিলিয়ন ডলার।
বর্তমানে বাংলাদেশের জন্যও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কার্যক্রমের অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করার জন্য সামগ্রিক এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে এবং আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে পরিবেশ-বান্ধব বিনিয়োগ বহু গুণে বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ জলবাযু পরিবর্তনের জন্য যে কম্প্রিহেনসিভ অ্যাকশন প্ল্যান ঘোষণা করেছে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম পাঁচ বছরের জন্য পাঁচ বিলিয়ন ডলার অর্থ প্রয়োজন হবে। তবে অর্থায়নের ব্যাপারে আরেকটি বিষয় হলো, জলবায়ু সংক্রান্ত বর্ধিত অর্থ সাহায্য কিভাবে, কোন কাঠামোর অধীনে ব্যয় করা হবে। বাংলাদেশের মতো দেশে অর্থ জোগাড় করার চেয়ে অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করাটাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষতি ও ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই বিনিয়োগের একটা বড় অংশ এসেছে উন্নয়ন সহযোগী দেশ এবং দাতা গোষ্ঠীর কাছ থেকে। বাংলাদেশের জন্য সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হল, এই খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকিকে সামনে রেখে এই ঝুঁকি হ্রাসে যথাযথ সমন্বিতভাবে কাজ করে যাওয়া। ২০০৮ সালে সরকার বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কৌশলপত্র এবং কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এই কৌশলপত্র এবং কর্মপরিকল্পনা ছয়টি ভিত্তিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। (১) খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য, (২) সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, (৩) অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা, (৪) গবেষণা, (৫) জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনা এবং (৬) প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনাটি কিছু সংযোজন-বিয়োজন করে ২০০৯ এ পুনঃসংস্করণ করা হয়েছে। এতেও এই ছয়টি বিষয়েই গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কোপেনহেগেনে জলবায়ু সংক্রান্ত জাতিসংঘের সম্মেলনে বাংলাদেশের মানুষের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ঝুঁকি মোকাবিলায় কী কী প্রস্তুতি নেয়া জরুরি দরকার, সে সব বিষয়ে আলোচনার মূল নথিপত্র হবে এই কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনাটি।
তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সংক্রান্ত আলোচনায় দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টি কেন্দ্রস্থলে রয়েছে। কোন উত্স থেকে অর্থ আসবে, কোন শর্তে আসবে, কিভাবে তা ব্যয় হবে, প্রযুক্তি হস্তান্তর কিভাবে হবে, বাণিজ্য সংক্রান্ত মেধাস্বত্ব আইনের ব্যাপারে জটিলতা কিভাবে দূর করা হবে— এই বিষয়গুলো জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের কৌশলপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। বিশ্ববাসী ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত পেয়েছে, আগামী ৭-১৮ ডিসেম্বরে কোপেনহেগেন সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো তাদের কার্বন নির্গমন কমানোর ব্যাপারে কোনো ধরনের আইনগত চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না। তবে এ ধরনের চুক্তি হোক বা না হোক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোপেনহেগেন এবং তারপরেও বিশ্বসভায় দেনদরবারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ এবং জুতসই প্রযুক্তি আহরণ করা।
(অক্টোবর ২০০৯-এ যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের ওপর সেমিনারে উপস্থাপনার আলোকে রচিত)
ড. ফাহমিদা খাতুন : অর্থনীতিবিদ

সরকার ও বেসরকারি সংস্থার অংশীদারি বাড়াতে হবে -বেহাল প্রাথমিক শিক্ষা

দেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি মহলে আত্মতুষ্টি লক্ষ করা গেলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ঔদাসীন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক। গত বুধবার ‘বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা, অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জসমূহ’ শিরোনামে এডুকেশন ওয়াচ প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রাথমিক শিক্ষার করুণ চিত্রই উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ‘অর্জনের চেয়ে অপচয় বেশি’ বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এ মন্তব্যের সঙ্গে অনেকে একমত না হলেও প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এতে বলা হয়েছে, প্রথম শ্রেণীতে যত সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত যেতে তাদের অর্ধেকই ঝরে পড়ে। এ তথ্য উদ্বেগজনক। এটি শুধু সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের ক্ষতি নয়, জাতীয় অপচয়ও বটে।
সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার অর্থ হলো শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করা। সেই লক্ষ্য আজও অর্জিত হয়নি। কেন হয়নি, সে প্রশ্নের জবাব সরকার তথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই ভালো দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষক—কেউই দায় এড়াতে পারেন না। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে মাঝেমধ্যে আলোচনার টেবিলে ঝড় ওঠে, একমুখী শিক্ষা চালু নিয়ে গালভরা বুলিও কম শোনা যায়নি, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষায় যে দুরবস্থা চলছে, তা কাটাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। এডুকেশন ওয়াচের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার জন্য দারিদ্র্য ও বই কিনতে না পারাকে দায়ী করেছেন। দারিদ্র্য শিক্ষার অন্যতম বাধা হলেও একমাত্র নয়। প্রতিবছর পরীক্ষায় যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করে, সেটি যত না দারিদ্র্যের জন্য, তার চেয়ে বেশি শিক্ষকদের পাঠদানে অনীহার কারণে। সরকার বিনামূল্যে প্রাথমিক পর্যায়ে বই বিতরণ করছে। ঝরে পড়া কমাতে সময়মতো বই বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। অতএব, বই এ ক্ষেত্রে বাধা নয়।
এ বছর চালু হওয়া প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় প্রায় ২০ শতাংশেরও বেশি পরীক্ষার্থী গরহাজির ছিল। এর কারণ, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে পড়াশোনা না হওয়া। শিক্ষক যদি শ্রেণীকক্ষে না-ই পড়ান, তাহলে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, পরীক্ষাই বা দেবে কীভাবে? প্রাথমিক শিক্ষার মান ধরে রাখতে সমাপনী পরীক্ষা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে শিক্ষকেরা কিছুটা হলেও জবাবদিহির আওতায় আসবেন। তবে ঝরে পড়া পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে প্রথম শ্রেণী থেকেই পাঠদান ও পাঠ গ্রহণের বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষার মানোন্নয়নে অর্থমন্ত্রী সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর অংশীদারি বাড়ানোর কথা বলেছেন। এটিও উপেক্ষণীয় নয়।
এডুকেশন ওয়াচসহ যেসব বেসরকারি সংস্থা শিক্ষা নিয়ে কাজ করে, তাদের সঙ্গে শিক্ষা কর্মকর্তা, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের নিবিড় যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে একে অন্যকে প্রতিপক্ষ না ভেবে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। শিক্ষানীতি কমিটিও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। সরকার সুপারিশগুলো বিবেচনায় এনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করি। সর্বোপরি অভিভাবক, তথা স্থানীয় জনগণের অংশীদারি নিশ্চিত করা গেলে প্রাথমিক শিক্ষার মান যেমন বাড়বে, তেমনি কমবে ঝরে পড়ার হারও। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলো যে সেতুবন্ধের ভূমিকা পালন করতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।