Tuesday, December 3, 2013

তবুও দেশে শান্তি আসুক by ফকির ইলিয়াস

প্রতিটি রাজনৈতিক দলেই কিছু সুবিধাবাদী থাকে। তারা কখনোই গণমানুষের স্বার্থ দেখে না। তাদের দল ক্ষমতায় গেলে নিজেরা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। বাংলাদেশে অবরোধের নামে যা ঘটছে, এর মূল পরিকল্পকও এরাই। কোনো রাষ্ট্রে যখন রাজনৈতিক গৃহবিবাদ শুরু হয়, তখন অবৈধ অস্ত্রধারীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তারাই এখন সক্রিয়। এই চরম ক্রান্তিকালের সব কুফল ভোগ করছে দেশের নিুবিত্ত মানুষ। তাদের যাওয়ার জায়গা নেই। তারা যাবে কোথায়? তাদের নিজস্ব গাড়ি নেই। তাই বাস-রিকশাই ভরসা। আর পোড়ানো হচ্ছে মূলত বাস-টেম্পো-রিকশাই। যাদের পোড়ানো হয়েছে, তাদের দেখতে গিয়েছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। ওরা যা বলেছে, তা মিডিয়ায় আমরা পড়েছি, দেখেছি। এ কাজ কোনো মানবতাবাদী মানুষ করতে পারে না। তাহলে যারা করছে, তারা কার স্বার্থে করছে? আমরা আবারও পড়তে পারি একজন গীতা সরকারের বক্তব্য। তিনি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, ‘আমরা আপনাদের তৈরি করছি, আপনারা আমাদের তৈরি করেননি। আমরা আমাদের স্বামীরটা খাই। আপনারা আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। ... আমরা ভালো সরকার চাই। ... আমরা অসুস্থ সরকার চাই না।’ তিনি বলেছেন, ‘ওরা যে বোমাগুলো মারে বা যাই মারে, ওদের শনাক্ত করুন এবং যারা অর্ডার দেয়, তাদের পরিবারের লোককে ধরে ধরে আপনারা আগুনে পুড়িয়ে দেন। ওরা অর্ডার দিতে পারে, আমাদের তো রক্ষা করতে পারে না। আমাদের জন্য আপনারা সরকার।’
মানুষ কতটা অসহায় হলে এমন কথা বলতে পারে! এই যে অবরোধ চলছে, এর শেষ কোথায়? ট্রেন চলছে না। বিমানের ফ্লাইট ছেড়ে আসতে পারছে না। কারণ মানুষ ঢাকা আসতে পারছেন না। সবকিছু এখন নষ্টদের দখলে। এই যে ফ্রাংকেনস্টাইন রাজনীতিকরা তৈরি করেছেন, এদের রুখবে কে?
প্রধানমন্ত্রী মিডিয়ার সাহায্য চেয়েছেন। আমরা বিভিন্ন চ্যানেলের টিভি ফুটেজে দেখেছি কারা আগুন লাগিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। এদের শনাক্ত করা গোয়েন্দাদের দায়িত্ব। মিডিয়া কিংবা সাধারণ মানুষ তা পারবে না। এর মাঝে আমরা পড়েছি আরও কিছু অদ্ভুত সংবাদ। কোথায় ককটেল মারা হবে, কোথায় শিবির মিছিল করবে তা নাকি আগেভাগেই জানেন কিছু সাংবাদিক! জানানো হয়, ওই স্থানে যান এখনই ককটেল ফুটবে কিংবা এখনই মিছিল হবে। ক্যামেরা রেডি- মোবাইলে জানাতেই ককটেল বিস্ফোরণ। কিংবা মিছিল।
সাংবাদিকতায় এটি নাকি এখন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। হেফাজতের আন্দোলনের সময় এপিসি দিয়ে গুলির ফুটেজ না পেয়ে পুলিশকে অনুরোধ করলে অযথাই গুলি ফুটানো হতো। ঠিক এমনই একটি ঘটনায় আটক হয়েছেন একটি বেসরকারি টিভির এক সাংবাদিক ও এক ক্যামেরাম্যান। বিরোধী দলের অবরোধ চলাকালে ককটেল হামলার প্ররোচনার অভিযোগে আটক দু’জনকে চারদিনের রিমান্ড দিয়েছেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তারেক মঈনুল ইসলাম ভূঁইয়ার আদালত। এর আগে সকালে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে ককটেল হামলার ছবি সংগ্রহের সময় তাদের আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয় স্থানীয় জনতা। কোথায় যাচ্ছে দেশ? এসব সংবাদের শিরোনাম হবেন সাংবাদিকরা? কী জঘন্য ক্রান্তিকাল!
অন্যদিকে যারা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন, তাদের কেউ কেউ নাকি নিজ এলাকায়ই যেতে পারছেন না। এটা কেমন রাজনীতি? নেতা এলাকায়ই যেতে পারবেন না! কী করেছেন অতীতে তারা? কেন তারা গণরোষের শিকার? খবর বেরিয়েছে, দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পরও প্রতিরোধের মুখে যেসব প্রার্থী নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারছেন না, তাদের মনোনয়ন বাতিলের চিন্তাভাবনা করছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।
দলীয় মনোনয়ন ঘোষণা ও মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হলেও এখনও অনেক প্রার্থী ঢাকায় বসে আছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে এলাকায় বিক্ষোভ, ভাংচুর, সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ সমাবেশ হচ্ছে। কোনো কোনো প্রার্থীকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন অর্ধশত প্রার্থীর একটি তালিকা তৈরি করেছে। মনোনয়ন যারা পেয়েছেন তাদের পক্ষে-বিপক্ষে মারামারি, আনন্দ উল্লাস শুরু হয়েছে রীতিমতো। এটা কেমন গণতান্ত্রিক আচরণ?
আমরা বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে দেখি, নির্বাচনী বোর্ড মনোনয়ন ফাইনাল করার পর ওই প্রার্থীর পক্ষেই সবাইকে খাটতে হয়। অথচ আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিতরা নিজ নিজ দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করে ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী হওয়ার লাইন দীর্ঘ করছেন। কী বিচিত্র মানসিকতা! কী অভিনব ক্ষমতার খায়েশ!
বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষক দল যাবে কি-না তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে। জাতিসংঘ এই নির্বাচনে কোনো ভূমিকা রাখবে কি-না, কিংবা রাখতে পারবে কি-না- প্রশ্ন আসছে তা নিয়েও। আপাতদৃষ্টিতে বিদেশে বসে আমরা পর্যবেক্ষক হিসেবে যা ধারণা করছি, তার কিছু চুম্বক অংশ পাঠককে শেয়ার করতে চাই। দৃশ্যগুলো (আমার ব্যক্তিগত মতে) এ রকম।
রাজনৈতিক সমঝোতা শেষ পর্যন্ত হবে না। একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দশম জাতীয় সংসদ শপথ নেয়ার পর ওই সংসদের নেপথ্য প্রহরী হিসেবে দেশে জরুরি অবস্থাকালীন একটা পরিস্থিতি তৈরি হবে। সামরিক বাহিনী নির্বাচনের আগেই যদি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাস দমন ও জানমালের নিরাপত্তার জন্য দায়িত্বে আসে, তাদের মেয়াদকাল কিছুটা দীর্ঘই হতে পারে। এই ক্রান্তিকালে জাতিসংঘ বাংলাদেশের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কোনো সুযোগ-সুবিধা কাটডাউন করে কি-না তা দেখার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এ অবস্থার মধ্য দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ যদি দুই থেকে তিন বছর ক্ষমতায় থাকতে পারে, তাহলে ওই সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা কেমন হবে, তা এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তারপরও বলি, আমার এ ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হোক। রাজনৈতিক সমঝোতা হোক। অবরোধ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাক বাংলাদেশ। এটা বিজয়ের মাস। এ মাসে বাঙালি জাতি বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। আমরা কি প্রজন্মের জন্য এ বিজয়কে চিরস্থায়ী শান্তিতে পরিণত করে যেতে পারব না? আমরা কি পারব না মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত হতে?
না, ঐক্যের নামে আলবদর-রাজাকার শক্তির আস্ফালনকে মেনে নেয়া যায় না। যারা এদেশের শিল্প-সংস্কৃতি-জাতীয় সঙ্গীত-জাতীয় স্মৃতিসৌধকে সম্মান করে না, তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য হতে পারে না। বিজয়ের মাসে আমাদের অগ্রসরমান প্রজন্মের মননে এই চেতনা জাগ্রত হোক।
ফকির ইলিয়াস :
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক

রিমান্ডে শারীরিক নির্যাতন কতটা আইনসিদ্ধ by ইকতেদার আহমেদ

আমাদের দেশে সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ কম বেশি ‘রিমান্ড’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। এ শব্দটি ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে আসামি সংশ্লেষে ব্যবহৃত হয়। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর দুটি ধারায় ‘রিমান্ড’ শব্দের উল্লেখ থাকলেও কার্যবিধির কোথাও রিমান্ড শব্দটির সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। ধারা দুটি হল- ১৬৭ ও ৩৪৪। ধারা নং ১৬৭ তে রিমান্ড বিষয়ে বলা হয়েছে- একজন ব্যক্তি পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত কার্য সমাপ্ত না হলে এবং ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বস্তুনিষ্ঠ বিবেচিত হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিকটবর্তী আদালতের ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রিমান্ড প্রার্থনা করতে পারেন যা একসঙ্গে ১৫ দিনের অধিক হবে না। ধারা নং ৩৪৪-এ রিমান্ড বিষয়ে বলা হয়েছে- আসামির অপরাধ সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য পাওয়ার পর যদি প্রতীয়মান হয় রিমান্ডের মাধ্যমে অধিকতর সাক্ষ্যপ্রাপ্তি সম্ভব, সেক্ষেত্রে একটি মামলার তদন্ত বা বিচার চলাকালীন আদালত একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারেন। ধারা নং ১৬৭-এর অধীন রিমান্ডের ক্ষেত্রে পুলিশি হেফাজত হতে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপনপূর্বক রিমান্ড চাওয়া হয়, অপরদিকে ধারা নং ৩৪৪-এর রিমান্ডের ক্ষেত্রে একজন আসামি বিচারিক হেফাজতে থাকাকালীন আদালতের কাছে রিমান্ড চাওয়া হয়। একজন আসামির আদালতের নির্দেশনায় কারাগারে অবস্থানকে বিচারিক হেফাজত বলা হয়। ধারা নং ৩৪৪-এ আদালত বলতে ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়রা আদালতগুলোকে বোঝানো হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ও সরকার কর্তৃক দ্বিতীয় শ্রেণীর বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ব্যতীত অপর কোনো ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড আদেশ প্রদানের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত নন। উল্লেখ্য, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সবসময় একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে থাকেন।
ইংরেজি ‘রিমান্ড’ শব্দটির অর্থ আসামিকে পুলিশি হেফাজতে পুনঃপ্রেরণ। বাংলায় এ শব্দটির অর্থ ও প্রায়োগিক দিক বিবেচনায় সঠিক কোনো শব্দ ব্যবহৃত না হওয়ায় ‘রিমান্ড’ শব্দটি বিদেশী শব্দ হিসেবে বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা নং ১৬৭ ও ৩৪৪-এর সংমিশ্রণে ‘রিমান্ড’ শব্দটির ব্যাখ্যা করলে যে অর্থ দাঁড়ায় তা হল- ‘রিমান্ড’ বলতে একজন আসামিকে ম্যাজিস্ট্রেট বা আদালতের বিচারিক আদেশের মাধ্যমে পুলিশি হেফাজত হতে পুনঃপুলিশি হেফাজতে অথবা বিচারিক হেফাজত থেকে পুলিশি হেফাজতে প্রেরণ বোঝায়। মামলা প্রমাণের জন্য প্রাপ্ত সাক্ষ্য অপর্যাপ্ত বিবেচিত হলে রিমান্ড চাওয়া যেতে পারে। তবে রিমান্ডে থাকাকালীন শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন আইন দ্বারা সমর্থিত নয়। রিমান্ডের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অধিকতর সাক্ষ্য প্রাপ্তির জন্য নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের সময় এক আসামির সঙ্গে অপর আসামির মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদসহ বিভিন্নভাবে প্রশ্ন পাল্টা-প্রশ্ন করে সঠিক তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হয়।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৩৩(২) এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা নং ৬১-এর বিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার পরবর্তী যাতায়াতের সময় ব্যতিরেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটবর্তী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করতে হয়। ২৪ ঘণ্টার অতিরিক্ত সময় পুলিশি হেফাজতে রাখতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারিক আদেশের প্রয়োজন রয়েছে।
সম্প্রতি রিমান্ডে নেয়ার ঘটনা একদিকে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, অপরদিকে রিমান্ডে নেয়ার পর পুলিশ কর্তৃক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। স্বভাবতই জনমনে প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে- অধিকতর সাক্ষ্যপ্রাপ্তির অভিপ্রায়ে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন আইনসিদ্ধ কিনা?
এ বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৩৫-এর দফা (৫) ও (৬)-এর বিধানাবলী প্রণিধানযোগ্য। উক্ত দফাদ্বয়ে বলা হয়েছে- প্রচলিত আইনের নির্দিষ্ট দণ্ডের বাইরে কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারও সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না।
দণ্ডবিধিতে আদালতকে ৫ ধরনের দণ্ডারোপের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ ৫ ধরনের দণ্ড হল (১) মৃত্যুদণ্ড, (২) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, (৩) সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড (৪) সম্পতির বাজেয়াপ্তি এবং (৫) অর্থদণ্ড।
বর্তমানে বলবৎ দণ্ডবিধিটি ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণীত হয়। দণ্ডবিধি প্রণয়নকালে বেত্রাঘাত সাজা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা ১৯৪৯ সালে অবলুপ্ত হয়। উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে প্রণীত জাতিসংঘ সর্বজনীন মানবাধিকার সনদের অনুচ্ছেদ নং ৫ আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৩৫(৫)-এর অনুরূপ। জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদে যেসব দেশ স্বাক্ষর প্রদান করেছে সেসব দেশ সনদের বিধানাবলীর সঙ্গে দেশে কার্যকর আইনের সামঞ্জস্য করার অভিপ্রায়ে শারীরিক নির্যাতনকে দণ্ডের প্রকারভেদ থেকে অবলুপ্ত করেছে।
আইনের বিধান অনুযায়ী আদালত ব্যতীত অপর কোনো কর্তৃপক্ষ দণ্ড প্রদানের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত নন। স্পষ্টত শারীরিক নির্যাতন দণ্ড নয়। শারীরিক নির্যাতন সংবিধানের ধারা নং ৩৫-এর দফা (৫) ও (৬)-এর পরিপন্থী। আর পরিপন্থী হলে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নব সন্নিবেশিত অনুচ্ছেদ নং ৭ক (১)(খ)-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অনুচ্ছেদ নং ৭ক (১)(খ) তে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায় এ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করলে কিংবা উহা করবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলে তার এ কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে এবং ওই ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হবে। এ অনুচ্ছেদটির (২) নং দফায় এ কার্যের সহযোগিতা প্রদানকে একই অপরাধ গণ্য করা হয়েছে। অনুচ্ছেদটির দফা নং (৩)-এ সাজার ব্যাপারে বলা হয়েছে, এ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধে দোষী ব্যক্তি প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের মধ্যে নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদ অবলোকনে প্রতীয়মান হয় শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ রদ, রহিত বা বাতিল বা স্থগিত করাসহ অসাংবিধানিক পন্থায় এ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করলে তা রাষ্ট্রদ্রোহ হবে এবং সহায়তাকারী ব্যক্তিও রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে অপরাধী হবে।
সংবিধানে নব সন্নিবেশিত ৭ক অনুচ্ছেদে কোন ধরনের কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য হবে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকায় রাষ্ট্রদ্রোহিতা বিষয়ে দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারায় যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা সংবিধানের অধীনে কৃত রাষ্ট্রদ্রোহিতার ক্ষেত্রে আকৃষ্ট হবে না। তাছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের সাজা নির্ণয়ার্থে দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারায় যে সাজার কথা বলা হয়েছে সংবিধানের অধীনে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ সংঘটিত হলে প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডের বিষয় উল্লেখ থাকায় সে সাজার পরিবর্তে দণ্ডবিধির অধীনে সর্বোচ্চ সাজা অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।
সম্প্রতি ‘অধিকার’ নামক মানবাধিকার সংগঠনের মহাসচিব সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আদিলুর রহমান শুভ্র-এর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করলে হাইকোর্ট বিভাগের একটি অবকাশকালীন দ্বৈত বেঞ্চ রুল ইস্যুপূর্বক রিমান্ড আদেশটি স্থগিত করত জেল গেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশনা দিয়ে কেন আদেশটি বাতিল করা হবে না সে বিষয়ে কারণ দর্শাতে বলে। অতঃপর বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য ও শীর্ষ তিন নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এমকে আনোয়ার ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এফবিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু ও চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাসের ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক রিমান্ড মঞ্জুর করা হলে হাইকোর্টের অপর একটি দ্বৈত বেঞ্চ রিমান্ড আদেশ বাতিল করে জেল গেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশনা দেন। এর পর দেখা গেল বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য ব্রিগেডিয়ার অবসরপ্রাপ্ত হান্নাহ শাহের গ্রেফতারের অব্যবহিত পর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপনপূর্বক রিমান্ড চাওয়া হলে দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। হাইকোর্ট বিভাগের উপরোক্ত দুটি আদেশ দ্বারা দেশবাসী আশ্বস্ত হয়েছে যে, দুটি মামলার ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অধিকার সম্পাদক আদিলুর রহমান শুভ্রকে এবং বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এমকে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, আবদুল আউয়াল মিন্টু ও শিমুল বিশ্বাসকে পুলিশি রিমান্ডে নিয়ে নিপীড়নের আশংকা থেকে মুক্ত হওয়া গেছে। কিন্তু দেশবাসীর প্রশ্ন এ দুটি আদেশ প্রায়শই বিভিন্ন মামলা সংশ্লেষ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের যে নিপীড়নের শিকার হতে হয় তা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার নজির সৃষ্টি করবে কি?
রিমান্ডে নেয়ার পর আসামি নিপীড়নের শিকার হলে রিমান্ড আবেদনকারী পুলিশ কর্মকর্তা অথবা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এর দায় এড়াতে পারেন না। তাছাড়া রিমান্ডের আদেশ প্রদানকারী ম্যাজিস্ট্রেট ও আদালতেরও দায়িত্ব রয়েছে। হাইকোর্টে যাওয়া আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই রিমান্ড প্রদানের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট ও আদালত উভয়কে দায়িত্বশীলতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।
ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক রাজনৈতিক নেতাদের এভাবে ঢালাওভাবে রিমান্ড মঞ্জুর অপ্রত্যাশিত এবং রিমান্ড সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধানের পরিপন্থী। এ বিষয়ে একাধিক বিশিষ্ট আইনজ্ঞের অভিমত, প্রশাসনের কর্মকর্তারা ম্যাজিস্ট্রের বিচারিক দায়িত্বরত থাকাবস্থায় ঢালাওভাবে এ ধরনের রিমান্ড মঞ্জুরের ঘটনা বিরল ছিল। তাই তাদের প্রশ্ন- বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব বিচারকদের দেয়ার অর্জন কি আইন ও বিধিবিধানের উপেক্ষায় নির্বাহী কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় রিমান্ড মঞ্জুর?
পুলিশি রিমান্ডে নেয়ার পর সঠিক তথ্য উদ্ঘাটনের নামে মামলা সংশ্লিষ্ট আসামিরা যে শারীরিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন এ বিষয়টি আজ আর কারও অজানা নয়। শারীরিক নিপীড়ন বিষয়ে পুলিশের জনৈক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন- রিমান্ডে নিয়ে নিপীড়ন না করে তাদের আদর সোহাগ করলে তথ্য উদ্ঘাটিত হবে না। পুলিশ কর্মকর্তার এ বক্তব্য আইন দ্বারা সমর্থিত নয়। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এ ধরনের বক্তব্য প্রদান ও মানসিকতা পোষণ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে তথ্য উদ্ঘাটনে নিপীড়নকে অবলম্বন হিসেবে ব্যবহারে উৎসাহিত করবে। রিমান্ডে নেয়ার পর তথ্য উদ্ঘাটনের নামে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে যেহেতু সংবিধানসহ দেশের প্রচলিত আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে সেহেতু জেল গেটে জিজ্ঞাসার অনুমতি দেয়া হলে আইনের অপপ্রয়োগ রোধ ও হয়রানির অবসান হবে।
একজন আসামিকে একাদিক্রমে ১৫ দিন অতিক্রান্তের পূর্বক্ষণে পুনঃম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বা আদালতে উপস্থাপনপূর্বক একাধিকবার রিমান্ডে নেয়ার নজির রয়েছে।
মামলার আসামি শিশু বা কিশোর হলে বিচার পদ্ধতি ভিন্নতর হয়। কিশোর অপরাধীকে পুলিশি হেফাজতে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো সুযোগ নেই। কিশোর অপরাধীকে সেফ হোম বা কারেকশনাল সেন্টার বা রিফরমেটরি স্কুলে সমাজকল্যাণ বা প্রবেশন অফিসারের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। আইনের বিধানকে উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করে কিশোর অপরাধীকে রিমান্ডে নেয়া হলে তার অপরাধ প্রশমনের চেয়ে অপরাধপ্রবণ হওয়ার আশংকাই বেড়ে যায়। শিশু ও কিশোররা জাতির ভবিষ্যৎ বিধায় এ বিষয়ে পুলিশের কাছ থেকে আইনানুগ ও যথাবিহিত আচরণ প্রত্যাশিত।
রিমান্ডে নেয়ার পর নিপীড়ন সংবিধান ও আইন উভয়ের লংঘন। কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের লংঘন কাম্য নয়। ফৌজদারি অপরাধ অপরাধীর মৃত্যু ব্যতীত সময় দ্বারা বারিত নয়। রিমান্ডে নিয়ে নিপীড়ন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অবকাশ আছে। রিমান্ডে নিপীড়নের শিকার অনেকে হয়তো সময় ও সুযোগ প্রতিকূল বিবেচনায় প্রতিকার প্রার্থনায় উদ্যোগী হচ্ছেন না। তবে সময় ও সুযোগ অনুকূল হলে প্রতিকার প্রার্থনায় উদ্যোগী যে হবেন না সে নিশ্চয়তা কেউ কি দিতে পারবে? আর উদ্যোগী হওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধান ও আইন উভয়ই যে নিপীড়িতের পক্ষে সে বিষয়ে আইন প্রয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতাই হতে পারে অপপ্রয়োগের হাত থেকে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার রক্ষাকবচ।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

টিকফা এবং ওয়ার্ল্ড এক্সপো ২০২০ by ড. মোকাম্মেল এইচ ভূঁইয়া

টিকফা চুক্তি হয়ে গেল ভালোভাবেই, কোনো বাদ-প্রতিবাদ ছাড়া। যা কিছু প্রতিবাদ করার, করেছে কয়েকটি বাম সংগঠন। আর তথাকথিত বামেদের মুখে রা নেই। তারা ক্ষমতার সুরা পানে নিমগ্ন। টিফা’র অন্য রূপ টিকফা- যেমন নতুন বোতলে পুরনো মদ। মাঝখানে একটু ‘কো-অপারেশন’ যোগ করা হয়েছে আইওয়াশের জন্য। ফলে টিকফা হয়েছে- ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট। বাংলাদেশ কীভাবে কো-অপারেট করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হয়ে! এই চুক্তির কথা প্রথম শোনা যায় ২০০১ সালে ‘ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ (টিফা) নামে। প্রথম খসড়ায় ১৩টি ধারা ও ৯টি প্রস্তাবনা ছিল। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে এই খসড়ায় আরও পরিবর্তন আনা হয়। তৎকালীন সরকার নানা বাদ-প্রতিবাদের মুখে চুক্তি সম্পাদনের পথে এগোয়নি। এ ধরনের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রয়েছে নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, সৌদি আরব, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, ইরাক, উরুগুয়েসহ ত্রিশটিরও বেশি দেশের সঙ্গে। লক্ষণীয়, এ দেশগুলোর প্রায় সবই উন্নয়নশীল ও দুর্বল গণতান্ত্রিক কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যেখানে গণমানুষের চাওয়া-পাওয়া গুরুত্বহীন।
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদারনীতি গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের উদারতার অর্থ হচ্ছে অবাধে মার্কিন বাণিজ্যিক আধিপত্য কোনো রকম সুরক্ষা ছাড়া মেনে নেয়া। এর আগে বাংলাদেশ এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যেসব ছাড় বা সুবিধা পাচ্ছিল, তা থেকে বঞ্চিত হওয়া। এছাড়া বাংলাদেশ এলডিসি দেশগুলোর নেতা হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও অন্যান্য ফোরামে যেভাবে ভূমিকা পালন করছিল, তা এই চুক্তির মাধ্যমে অনেকটাই টেনে ধরল বিশ্ব-মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র। তারা বাংলাদেশের ভয়েসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এ দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে। বাংলাদেশের বাজারকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিতে হবে, সেই সঙ্গে মার্কিন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সুরক্ষা দিতে হবে। মার্কিন বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা বা পুঁজির ওপর করারোপ করতে পারবে না সরকার, সেই সঙ্গে কোনো মার্কিন কোম্পানি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনিতে বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিককৃত হয়ে গেছে পা থেকে মাথা পর্যন্ত। ফলে সরকার অনেক ক্ষেত্রেই প্রাপ্য কর দেশীয় কোনো কোনো কোম্পানি বা ব্যক্তির কাছ থেকে আদায় করতে পারে না কিংবা অন্যভাবে ম্যানেজড হয়ে যায়। সেখানে বিদেশী কর্পোরেট জায়ান্টদের করমুক্ত করার চুক্তি কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আমাদের সক্ষমদের ওপর আরও করারোপ করা উচিত। সেখানে কর অবকাশ দেশের কোন উন্নতিতে সাহায্য করবে, তা বোধগম্য নয়। দেশীয় কোম্পানিগুলো এ চুক্তির ফলে কোনো সুরক্ষা পাবে না। ফলে এক অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে এবং দেশীয় শিল্প বিকাশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে কর্মসংস্থানের ওপর তৈরি হবে চাপ, বাড়বে বেকারত্ব।
এমনিতেই বাংলাদেশ দোহা ঘোষণা অনুযায়ী কৃষি খাতে ৫ শতাংশের বেশি ভর্তুকি দিতে পারে না, তার ওপর টিকফা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে এক্ষেত্রে সবরকম ভর্তুকি তুলে নিতে হবে। এগ্রোবেজড প্রোডাক্টে কয়েক বছর ধরে বেশকিছু দেশীয় উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল এবং কিছু কোম্পানি ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে এ সেক্টরে ভালো করছিল। ফলে কর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। এগ্রোনির্ভর মশলা তৈরির শিল্পও এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট এগিয়েছিল। টিকফা চুক্তির ফলে উদীয়মান এই এগ্রো শিল্প হুমকির সম্মুখীন হবে এবং কৃষি পণ্যের দামও বাড়বে। তবে মজার ব্যাপার হল, টিকফার মাধ্যমে আমাদের কৃষি খাতে ভর্র্তুকি প্রত্যাহারে বাধ্য করার সুযোগ পেলেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রই কৃষি খাতে ১৯ শতাংশেরও বেশি ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে কৃষি খাত ও এগ্রোবেজড শিল্পকে সুরক্ষা করে যাচ্ছে। অথচ আমাদের ওপর উল্টো ব্যবস্থা চাপিয়ে দিচ্ছে। তাহলে আমরা কেন এই অসম চুক্তিতে সই করলাম, তাও আবার এই অসময়ে, যখন নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্তই নেয়ার কথা নয়?
এ চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে পেটেন্ট আইনের আওতায় আমাদের দেশীয় ওষুধ, কম্পিউটার সফটওয়্যার, কৃষিপণ্যসহ আরও অনেক কিছুকে নকল প্রোডাক্ট হিসেবে বিক্রয়-নিষিদ্ধ করতে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে। দোহা ডিক্লারেশন ২০০০ অনুযায়ী এলডিসি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৬ সাল পর্যন্ত মেধাস্বত্ব আইন থেকে প্রাপ্ত ছাড় অনুযায়ী বিভিন্ন পেটেন্ট ওষুধ উৎপাদন ও রফতানি করছে বিভিন্ন দেশে। কিন্তু টিকফাতে কোনো রক্ষাকবচ না থাকায় তা বাধাগ্রস্ত হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ গার্মেন্টের পর ওষুধ রফতানি থেকে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। বাংলাদেশের ওষুধনীতি ভারতের চেয়েও ভালো, কিন্তু এ চুক্তির ফলে হয় অনেক ওষুধ বাংলাদেশী কোম্পানি তৈরি করতে পারবে না, অথবা বিপুল রয়্যালটি প্রদানের ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে বেশি দামে বিদেশী ওষুধ কিনে খেতে হবে দেশবাসীকে। এতে জনস্বাস্থ্য হবে হুমকির সম্মুখীন। এছাড়া মেধাস্বত্ব আইনের ফলে কেবল উদীয়মান তথ্যপ্রযুক্তি খাতেই লাইসেন্স বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হবে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশসহ পৃথিবীর নানা দেশের ফ্লোরা-ফনার বিভিন্ন প্রজাতি নিজ নামে পেটেন্ট করে রেখেছে। একটি উদাহরণে বিষয়টি স্পষ্ট হবে- আমাদের অতি পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী ঔষধি গাছ ‘নিমে’র পেটেন্ট আছে যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে নিম গাছ থেকে উৎপাদিত সব পণ্যের ওপর টিকফা অনুযায়ী রয়্যালটি দাবি করতে পারবে তারা। এছাড়াও হয়তো এমন আরও অনেক কিছুর পেটেন্ট থাকতে পারে মার্কিনিদের, যা আমাদের মতো দেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের চিন্তার বাইরেই রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট আইন তার কোম্পানিগুলোকে দায়মুক্তি দিয়েছে। যদি কোনো কোম্পানি টাকার জোরে বৈধ বা অবৈধ উপায়ে অন্য দেশের উৎপাদন পদ্ধতি, জীববৈচিত্র্য কিংবা শস্যবীজ পেটেন্ট করিয়ে নেয়, তবে তার নৈতিক ভিত্তি খুঁজে দেখবে না যুক্তরাষ্ট্রের আইন। ফলে আমাদের মতো স্বল্পোন্নত গরিব দেশ, যেখানে দুর্নীতি সর্বগ্রাসী, সেখানে যে কোনো কৃষিবীজ যেমন ধরা যাক কোনো ধান কিংবা ডাল বীজ যদি পেটেন্ট করিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানি, তাহলে কৃষক তার বীজ উৎপাদন কিংবা সংরক্ষণের যে পদ্ধতি ঐতিহ্যগতভাবে ও বংশপরম্পরায় ব্যবহার করছে তার অধিকার হারাবে এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানি কিংবা তার নির্ধারিত আমদানিকারক কিংবা ডিলারই হবে বৈধ অধিকারী। প্রয়োজনে জেনেটিক কোড পরিবর্তন করে বীজ উৎপাদন একচেটিয়াভাবে সংরক্ষণ করতে পারবে পেটেন্টকারী প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে কেবল বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ মনে হলেও ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যে কোনো প্রকার অসন্তোষ ও কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরির মাধ্যমে অবাধ্য সরকারকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা পরিবর্তনের ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে পারে কর্পোরেট হাউসগুলো। গার্মেন্ট সেক্টর থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টর এই পেটেন্ট-কপিরাইট-ট্রেডমার্কের চোরাবালিতে আটকে যাবে। এভাবে বিদেশী কর্পোরেট রাজনীতির ক্রীড়নকে পরিণত হতে পারে দুর্বল গণতন্ত্র ও ব্যাপক দুর্নীতির বাংলাদেশ।
এদিকে টিকফা চুক্তির পর বাংলাদেশ আরেক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। প্রথম আলোর সংবাদ অনুযায়ী ওয়ার্ল্ড এক্সপো ২০২০-এর স্থান নির্ধারণে আরব আমিরাতের পরিবর্তে রাশিয়াকে সমর্থন করার কথা ভাবছে বাংলাদেশ। যেখানে আরব আমিরাতের জেতার সম্ভাবনা প্রবল এবং দেশটিতে আমাদের প্রচুর শ্রমিক কাজ করে এবং নিয়মিত রেমিটেন্সের জোগান দিচ্ছে, সেখানে এহেন সিদ্ধান্ত কোনো যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ইতিমধ্যে নেপাল আমিরাতকে আগাম সমর্থন দানের মাধ্যমে তিন বছরে তিন লাখ জনশক্তি রফতানির বিষয় চূড়ান্ত করেছে। সেখানে বাংলাদেশ অদ্ভুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এগিয়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাদী রাশিয়া বাংলাদেশকে কোন খাতে সাহায্য করবে, আর রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বাংলাদেশ সফর করলেইবা কী লাভ হবে? সরকার টিকফার মতো চুক্তিটি এ সময়ে না করে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারত। সংসদে স্বাভাবিক অধিবেশনের সময় আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে পারত। যখন দেশে একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ও অসন্তোষ বিরাজ করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র মোক্ষম সময়টি বেছে নিয়েছে। কিন্তু চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করা উচিত হয়নি সরকারের। আর যে আশায় এটি করা হল, সেটি কাজে নাও লাগতে পারে। একটি-দুটি চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন হয়ে যাবে সেটা ভাবা ঠিক নয়। কারণ আমেরিকা চলে তার পলিসির ওপর আর আমাদের দেশ চলে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। ফলে ব্যক্তির পরিবর্তনে আমাদের নীতি পরিবর্তিত হয় আর আমেরিকার নীতি ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, যার প্রমাণ এত বছর পরও টিকফা চুক্তি সম্পাদন।
ড. মোকাম্মেল এইচ ভূঁইয়া : অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতিবন্ধীদের অধিকার সংরক্ষণ করুন by ডা. মোঃ শহীদুর রহমান

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও প্রতিবছর ৩ ডিসেম্বর বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস পালন করে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সেই ১৯৯৮ সাল থেকে গুরুত্ব সহকারে দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে তা পালন করছে। বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ, যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ, কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী এবং তাদের বেশিরভাগই উন্নয়নশীল বিশ্বের। বিশ্বব্যাপী প্রতিবন্ধী লোকেরা প্রতিনিয়তই শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে অবজ্ঞার সম্মুখীন হচ্ছেন, যা তাদের সমাজের অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা করে রাখে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চাকরি এবং অন্যান্য সামাজিক কর্মকাণ্ডে তারা ভীষণভাবে বৈষম্যের শিকার। তাই উন্নয়নের মূল স্রোতে তারা প্রায়ই অনুপস্থিত।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে শতাব্দী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রতিবন্ধীদের অধিকার সংরক্ষণ এবং সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিবন্ধীদের বিশ্ব জনস্বাস্থ্য এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকার ইস্যু বলে মনে করে। কারণ স্বাভাবিক শিক্ষা, চাকরি, আয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং চিকিৎসা খরচের কারণে প্রতিবন্ধীদের দরিদ্রতা বাড়িয়ে দেয়।
শত কোটি প্রতিবন্ধীর মধ্যে প্রায় দু’শ কোটি বয়স্ক প্রতিবন্ধী কর্মক্ষম নয়, যাদের অধিকাংশের জীবনমান অমানবিক। তারা উন্নয়নের প্রতিবন্ধক এবং সমাজের বোঝা। প্রতিবন্ধিত্ব আনুপাতিক হারে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী যেমন মহিলা, বৃদ্ধ ও দরিদ্রদের বেশি মাত্রায় ভোগায়। দরিদ্র ঘরের শিশু, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুরা বৈষম্যমূলক আচরণের জন্য বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বেশি আয়ের দেশ থেকে স্বল্প আয়ের দেশের লোকেরা বেশি প্রতিবন্ধিত্বের শিকার হয়ে থাকে। জাতিসংঘের ৬৬তম অধিবেশনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট প্রস্তাবাকারে গ্রহণ করা হয় এবং সেই অনুসারে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা বলা হয়। ওই কর্মপরিকল্পনার স্লোগান হল ‘প্রতিবন্ধীদের জন্য উন্নততর স্বাস্থ্য’।
বাংলাদেশেও প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমান উন্নয়নের চিত্র খুব একটা সুখকর নয়। সরকারি পরিকল্পনা চমৎকার হলেও বাস্তবতার সঙ্গে তার খুব একটা মিল নেই। সমাজভিত্তিক পুনর্বাসনের ধারণাটা ব্যাপ্তি লাভ করেনি। দরিদ্র প্রতিবন্ধীদের একটা বিরাট অংশ ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন কাটায়। এদেশে এখনও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি এবং অন্যান্য সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধীরা প্রাধিকারপ্রাপ্ত নয়। সমাজ এখনও তাদের অবজ্ঞা ও করুণার চোখে দেখে। সমাজকে সচেতন করার জন্য, সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এবারের প্রতিবন্ধী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘ভাঙ্গো বাধা খোল দ্বার, সমাজে সবার জন্য সবকিছু’। সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবন্ধীদের আলাদা ও অগ্রাধিকারমূলক সেবা নেয়ার ব্যবস্থা নেই। বিপণি বিতানে হুইল চেয়ারের জন্য র‌্যাম্প নেই, গণপরিবহনে আলাদা সিট নেই। পাবলিক টয়লেটে আলাদা ব্যবস্থা নেই। টিকিট কেনায় আলাদা লাইন নেই। সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়ে বাধ্যতামূলকভাবে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিবন্ধীদের প্রাধিকার প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের আরও এগোতে হবে। গণমাধ্যমগুলোও এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডা. মোঃ শহীদুর রহমান : সহযোগী অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

সহিংস রাজনীতি অর্থনীতিকে গ্রাস করছে by ড. আর এম দেবনাথ

সহিংস রাজনীতি ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে গ্রাস করে ফেলছে। রাস্তা অবরোধ, হরতাল, রেললাইন উপড়ে ফেলা, ককটেল ফাটিয়ে নিরীহ মানুষের দেহ ঝলসে ফেলা, বাসে-ট্রাকে আগুন, টায়ারে আগুন দিয়ে খেলা করা, আইন-শৃংখলা বাহিনীর লোকদের পিটিয়ে হত্যা করা ইত্যাদি ধরনের সহিংসতার খবর আমরা প্রতিদিন কাগজে পাচ্ছি। পাচ্ছি অনেক দিন থেকেই। প্রথম প্রথম কেউ এর পরিণতি সম্যক বুঝতে পারেনি। মনে হয়েছিল, সময়ে সময়ে বাজারে জিনিসপত্রের দাম কিছুটা বাড়বে- এই যা। এটা হবে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে থাকায়। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, আসলে বিষয়টি এতেই সীমাবদ্ধ নয়। ধীরে ধীরে তা সমগ্র অর্থনীতিকে গ্রাস করে ফেলছে। জিডিপি (গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট) প্রবৃদ্ধি, আমদানি-রফতানি, রেমিটেন্স, রাজস্ব আয়-ব্যয়, কৃষি উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, পর্যটন ব্যবসা থেকে শুরু করে অর্থনীতির সব খাত ধীরে ধীরে আক্রান্ত। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার একটা খবর দেখলাম আমদানির ওপর। খবরটিতে বলা হয়েছে, জুলাই মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে ৮৯টি জাহাজ এসেছিল। আগস্ট মাসে আসে ৮৭টি। সেপ্টেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ৭৬টিতে। অক্টোবরে আরও হ্রাস পায়। সে মাসে আসে মাত্র ৬৯টি। নভেম্বরের ২৬ তারিখ পর্যন্ত এসেছে মাত্র ৬১টি। বিপরীতে গেল অর্থবছরের এই সময়ে প্রতি মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ভিড়েছিল গড়ে ১০০টি করে। এটা একটা বড় খবর। আরেকটা ছোট খবর দিই। সেটি গাঁদা ফুলের। গাঁদা ফুলের খবরে বলা হচ্ছে- যশোর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গায় ফুল চাষে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ১৫ লাখ টাকার। ঢাকার আশপাশ অঞ্চলে কপি, আলু, বরবটি, বেগুন, পটোল, কচু, ধনেপাতা, শসা, বাঁধাকপি, টমেটো, ঝিঙা, ঢেঁড়স, ডাঁটা ইত্যাদি শাক-সবজি চাষ হয়। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, সুনামগঞ্জ ইত্যাদি অঞ্চল থেকে আসে মাছ। আসে মোরগ-মুরগি। এসবের চাষীদের মাথায় হাত। পাইকাররা ওইসব অঞ্চলে যেতে পারছেন না। এই যে খবরটি দিলাম, এটাও টাকার অংকে ছোট খবর। খবর আছে চিনি শিল্পের। সয়াবিনের। জাহাজভাঙা শিল্পের। এসব শিল্প ও ব্যবসা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গার্মেন্ট খাতও ধীরে ধীরে হরতাল ও অবরোধের কুফল পেতে শুরু করেছে। পাটশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চা রফতানি নেই। সব কিছু মিলিয়ে এক ভীতিপ্রদ চিত্র।
এই চিত্র অর্থনীতির। এর তাৎক্ষণিক শিকার হচ্ছে ব্যাংকিং খাত, নন-ব্যাংক ফিনান্সিয়াল ইন্সটিটিউশন। এরা শিল্পে, ব্যবসায়, বাণিজ্যে, পর্যটনে অর্থের জোগান দেয়। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা সমানে আসছেন ব্যাংকে। তাদের ‘ঋণখেলাপি’ হয় হয় অবস্থা। ব্যাংকের টাকা দিতে পারছেন না। কিস্তি দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ‘ক্যাশ জেনারেশন’ নেই। ‘ফান্ড ফ্লো’ তাদের বিঘ্নিত। আমদানি বিঘ্নিত। রফতানি বিঘ্নিত। অভ্যন্তরীণ বেচাকেনা স্থবির। অনেক শিল্প বন্ধ হয় হয় অবস্থায়। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতেও অনেকে ব্যর্থ হচ্ছেন। আমি ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’দের কথা বলছি না। সাধারণ ব্যবসায়ীদেরও অবস্থা একই। উপায়ান্তর না দেখে তারা আসছেন ব্যাংকে। আসছেন ঋণ পুনঃতফসিল (রিসিডিউলিং) করাতে। সুদ মওকুফ করাতে। এটি করতে ‘ডাউন পেমেন্ট’ লাগে। সেই টাকাও অনেকের নেই। তাই পুনঃতফসিল করা যায় না। যেতে হবে কেন্দ্রীয় বাংকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও হাত-পা বাঁধা। নতুনভাবে সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনে অনেক কড়াকড়ি করা হয়েছে। পুনঃতফসিল আবার তিনবারের বেশি করা যাবে না। ইতিমধ্যেই অনেকে তা দুবার করে ফেলেছেন। হাতে আছে আর একবার মাত্র। ভবিষ্যৎ সেই অর্থে অন্ধকার। অনেকে আসছেন ব্যাংকে ‘ব্লক্ড অ্যাকাউন্ট’ করাতে, যাতে সুদারোপ আর না হয়। এসবই বড় ব্যবসায়ীদের সমস্যা।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা এখন সব ব্যাংকের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছেন। তাদের টাকা আটকে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো তাদের সমস্যা সমাধানে হিমশিম খাচ্ছে। মামলা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু মামলা করে ব্যাংকের টাকা আদায় করার উদাহরণ খুব কম। একটু সমস্যা হলেই গ্রাহক চলে যাচ্ছেন উচ্চ আদালতে। হচ্ছে ‘রিট’, যার থেকে মুক্তি পাওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আবার অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা ঠুকে দিচ্ছেন ক্ষতিপূরণ মামলা (কমপেনসেশন সুট)। এটা হচ্ছে ব্যাংকের ওপর বেশতি ঝামেলা বা চাপ। এ চাপ সৃষ্টি করে গ্রাহক ফায়দা লুটতে চাইছে। প্রায় সব ব্যাংকেই এসব ঘটনা ঘটছে। এদিকে সব ব্যাংকের মুনাফাতেই নেমেছে ধস। খুব কম ব্যাংকই ২০১৩ ক্যালেন্ডার বছরে ভালো মুনাফা দেখাতে পারবে। আমানত ২০১৩ সালে ছিল ব্যয়বহুল। সে তুলনায় ‘লেন্ডিং রেট’ ব্যাংকগুলো ‘অ্যাডজাস্ট’ করতে পারেনি। অনেক ব্যাংকে এসব কারণে মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অনেক ব্যাংক প্রভিশনিং ঘাটতিতে পড়েছে। আগামীতে আরও বেশি পড়ার আশংকা। কারণ বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা যদি চলতে থাকে, অব্যাহত থাকে অশান্তি তাহলে ব্যাংকের ব্যবসা বাড়ার কোনো কারণ নেই। ব্যাংকের সবচেয়ে বড় আয় আসে সুদ থেকে। এটা ঋণের ওপর সুদ। আর বেশকিছু আয় আসে আমদানি-রফতানি থেকে। এসব ব্যবসায় ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়। এতে ব্যাংকের বেশ ‘কমিশন’ আয় হয়। এ ছাড়া রয়েছে নানাবিধ আয়। এ অবস্থায় আমদানি-রফতানিতে টান পড়লে স্বাভাবিকভাবেই ওইসব আয়েও টান পড়বে। এর ফল একটি। পরিকল্পনা মোতাবেক ‘প্রফিট’ না হওয়া।
এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ব্যবস্থা কী? এ মুহূর্তে ব্যাংকগুলোর অবস্থা কী, বিশেষ করে সরকারি বড় ব্যাংকগুলোর। ব্যাংকগুলোতে এখন অনেক উদ্বৃত্ত টাকা আছে। একশ’ টাকার আমানতের বিপরীতে ১৯ টাকা ‘লিক্যুইডিটি’ হিসেবে রেখে ব্যাংকগুলো ৮১ টাকা ঋণ দিতে পারে। ব্যাংকে আমানত বাড়ছে। দেশে টাকা আছে। কিন্তু ঋণ সংকোচন নীতির ফলে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে পারছে না, বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলো। সরকারি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘সমঝোতা’ চুক্তি আছে, যা অবশ্য পালনীয়। এর অধীনে ব্যাংকগুলো কত ঋণ দিতে পারবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। এর বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়- তা হবে নিয়মভঙ্গ করা। এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক করেছে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের উদ্দেশ্যে। এই উদ্দেশ্য বেশ কিছুটা বাস্তবায়িত হয়েছে- এটা স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা কারও নেই। অতীতে ঋণ সম্প্রসারণ অনেক বেশি হয়েছে। অনেকেই ঋণের টাকা অন্য খাতে ডাইভার্টও করেছে। এর অনেক সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে। তাছাড়া আরও অনেক কারণ আছে, যার কারণে ঋণ সম্প্রসারণ বেশি হয়েছে। যা রোধ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথভাবেই ঋণপ্রবাহ কিছুটা সংকুচিত করার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এখন সমস্যা অন্যত্র। ব্যাংকে ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমছে। যদি এসব ‘ফান্ড’ ব্যবহার না করা যায়, তাহলে ব্যাংকের হাতে কাজ থাকে একটি- আর কোনো আমানত গ্রহণ না করা। এর ফল ব্যাংকিং খাতের জন্য হবে মারাত্মক, এমনকি অর্থনীতির জন্যও হবে মারাত্মক। ব্যাংকিং খাতে বরাবর এটা ঘটছে। কখনও কখনও প্রচুর আমানত পাওয়া যায় বাজারে। আবার কখনও কখনও আমানতের সংকট দেখা দেয়। দুটো সমস্যা দুই ধরনের। ব্যাংক কোনোদিন এ পরিস্থিতিতে চরম অবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না। অর্থাৎ ব্যাংক যখন আমানত বেশি করে পায়, তখন বলতে পারে না যে, আমরা আমানত নেব না। কারণ গ্রাহকদের একবার বিদায় করে দিলে আবার আনতে সময় লাগে। কাজেই ব্যাংককে গ্রহণ করতে হয় মধ্যপন্থা। এ অবস্থায় বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে ব্যাংক ‘আমানত’ বিদায় করে দিয়ে ভবিষ্যতে ঝুঁকিতে পড়ার মতো অবস্থায় যেতে পারে না।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ব্যাংক যদি ‘আমানত’ না নেয়, তাহলে টাকা যাবে কোথায়? টাকা যাওয়ার রাস্তা হচ্ছে শেয়ারবাজার অথবা সঞ্চয়পত্র। শেয়ারবাজারে যদি হঠাৎ বেশি বেশি টাকা যেতে শুরু করে, তাহলে দুই বছর আগের অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। শেয়ার কম অথচ ‘লিক্যুইডিটি’ বেশি। এতে শেয়ারের দামে ‘বাবল’ সৃষ্টি হবে। এ অবস্থা কাম্য নয়। এদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতেও যে হাওয়া লাগবে, তাও মনে হয় সম্ভব নয়। আর সঞ্চয়পত্রে সব লোক যাবে না। অতএব কী থাকে বিকল্প? বিকল্প থাকে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়, শিল্পের অবস্থা ভালো নয়, আমদানি-রফতানির অবস্থা ভালো নয়। এসবই সত্য কথা। কিন্তু এর মধ্যেই অনেকে ব্যবসা করতে চান, শিল্প করতে চান। তারা ব্যাংকে আসছেন। কিন্তু ঋণসীমা নির্ধারিত থাকায় সরকারি ব্যাংকগুলো কোনো ঋণ দিতে পারছে না। অথচ ঋণ বাড়াতে পারলে ব্যাংকের আয় বাড়বে। শ্রেণী বিন্যাসিত ঋণের শতাংশ হিসাব কমে।
ইদানীং দেখা দিচ্ছে আরেক সমস্যা। দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায় প্রত্যেকটি বড় ও নতুন ঋণের ক্ষেত্রে ‘চিফ ইন্টারনাল অডিটরের’ সার্টিফিকেট। এটা তো মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমনিতেই একটা ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন পর্যায়ে নিতে বেশ সময় লাগে। ঋণ প্রস্তাব বড় বড় ব্যাংকে প্রথমে ব্রাঞ্চে তৈরি হয়। তা যায় আঞ্চলিক অফিসে, তারপর যায় বিভাগীয় অফিসে। এরপর যায় প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যায় ক্রেডিট কমিটিতে, যেখানে ব্যাংকের সিনিয়ররা বসেন। তারপর যায় এমডি মহোদয়ের কাছে। এতসব করার পর যদি চিফ ইন্টারনাল অডিটরের সার্টিফিকেট দরকার হয়, তাহলে তো পুরো কার্যক্রমই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া চিফ ইন্টারনাল অডিটরের কাজ হচ্ছে ঋণ-পরবর্তী ঘটনা। তিনি দেখবেন ঋণ অনুমোদনে যেসব শর্ত দেয়া হয়েছে তা প্রতিপালিত হয়েছে কি-না, সব নিয়মনীতি মেনে ঋণটির কাজ চলছে কি-না, ঋণে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি-না, শর্তের বাইরে কিছু হচ্ছে কি-না ইত্যাদি। এখন যদি তাকে ‘ঋণ-পূর্ববর্তী’ পর্যায়ে জড়ানো হয়, তাহলে তো তার পরবর্তী কাজ বন্ধ করে দিতে হয়। একই ব্যক্তি দুই পর্যায়ের কাজে জড়িত হলে তা নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ে বাধা সৃষ্টি করবে। বস্তুত তিনি হয়ে উঠবেন সর্বোচ্চ ‘পাওয়ার সেন্টার’। তাই নয় কি? বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা দরকার বলে মনে করি।
ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক প্রফেসর, বিআইবিএম

ডিসেম্বর ’৯০—ডিসেম্বর ২০১৩

আজ ৩ ডিসেম্বর। তিন দিন পর ৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশে সরকারে এবং বিরোধী দলে যাঁরা রাজনীতির কুশীলব, তাঁদের কোনো পক্ষেরই ডিসেম্বরের প্রথম ছয়টি দিনের কথা ভুলে যাওয়ার কথা নয়। আজ ৩ ডিসেম্বর দেশের যেসব কিশোরী ও কিশোর ১৩ বছর পূর্ণ করল, এখনো সাবালক হয়নি, যদিও তাদের অনেকের নৈতিকতাবোধ ও দেশাত্মবোধ প্রতিদিন মিডিয়ায় যাঁদের দেখা যায় তাঁদের অনেকের চেয়ে বেশি, তারা টিভি দেখে ও কাগজ পড়ে, তাদের মনে হতে পারে বাংলাদেশে এই নভেম্বর-ডিসেম্বরেই শুধু হরতাল-হাঙ্গামা হচ্ছে এবং মানুষ মরছে। অতীতে কোনো দিন বাংলার মাটিতে হরতাল-হাঙ্গামা-প্রাণহানি হয়নি। আজ যাঁরা ২৩ বছরে পড়লেন তাঁরা পরিপূর্ণ যুবক-যুবতী। অনেকে সন্তানের বাবা-মা পর্যন্ত হয়ে গেছেন এর মধ্যেই। অনেকে খেতখামারে বা কারখানায় কাজ করেন। যাঁদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। অনেকে পেটের ভাত জোগাতে হীন কায়িক শ্রম করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ দালালের মাধ্যমে ঘরবাড়ি বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন। যাঁদের বাবা-মা বড় কর্মকর্তা বা বিত্তবান তাঁরা আমেরিকা বা কানাডায় ‘উচ্চশিক্ষা’ নিতে গেছেন। তাঁদের বসবাস ও যাতায়াতের জন্য বাড়ি বা ফ্ল্যাট ও গাড়ি কিনে দেওয়া হয়েছে। সেই ২৩ বছর বয়স্করা, যদিও কিন্ডারগার্টেনে যাওয়ার সময় থেকেই হরতাল-অবরোধ দেখছেন, তবু জানেন না যে যেদিন তাঁদের জন্ম হয়, সেদিন—৩ ডিসেম্বর ১৯৯০—বাংলাদেশের অবস্থাটা কেমন ছিল। ২৩ বছর বয়স্ক অনেকেই আজ দায়িত্বশীল কর্মজীবন শুরু করেছেন।
দেশ তাঁদের থেকে অনেক কিছু আশা করে। কেউ বা সাংবাদিকতায়ও সম্ভাবনার পরিচয় দিচ্ছেন। কেউ হয়েছেন বড় কোনো দলের ক্যাডার। রোজগার হচ্ছে বেশ। গণতন্ত্রের অতন্দ্র সৈনিক। পেশির জোর অব্যাহত থাকলে একদিন এমপি-মন্ত্রী পর্যন্ত যেতে পারবেন। আমাদের স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ মিডিয়া হরতাল-অবরোধ-প্রাণহানি নিয়ে যেসব বৈষ্ণবীয় প্রতিবেদন করছে তাতে তাদের সায় আছে কি নেই, তা এই মুহূর্তে বলা যাবে না। দেশ এখন অন্য কোনো বিষয় নয়, গণতন্ত্রের জন্য পাগল। মানুষ পুড়ুক আর মানুষ মরুক, সবই গণতন্ত্রের জন্য। তবে আসামির কাঠগড়ায় কোনো মানুষ নয়, খাড়া করা হয়েছে বেচারা হরতালকে। যাদের বয়স আজ ১৩ বা ২৩, তাদের জানার কথাই নয়। যাদের বয়স ৩০-এর নিচে, তাদের ৪ ডিসেম্বর ১৯৯০-এর রাতটির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তখন এত টিভি চ্যানেল ছিল না। বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভিতে ৪ ডিসেম্বর মধ্যরাত থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত কিছুক্ষণ পর পর দুটি ভাষণ প্রচারিত হতে থাকে। ভাষণ দুটি ছিল মাত্র কয়েক মিনিটের। একটি ভাষণে বলা হয়েছিল: ‘শত শহীদের আত্মাহুতির বিনিময়ে অর্জিত বিজয়ের অগ্রযাত্রাকে... দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার আলোকে তিন জোট কর্তৃক ঘোষিত রূপরেখা অনুযায়ী নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর অবাধ ও মুক্ত পরিবেশে সার্বভৌম সংসদ নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হয় ও জনগণ যাতে তাদের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেই পরিবেশ আমরা সৃষ্টি করতে চাই।
আমি বিশ্বাস করি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সর্বাত্মকভাবে অংশগ্রহণ করে দেশবাসী যেমনিভাবে চলমান আন্দোলনকে বর্তমান পর্যায়ে এনে উপনীত করেছেন, তেমনিভাবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরা অতীতের ন্যায় দৃঢ় ভূমিকা পালন করবেন। শত শহীদের রক্তের প্রতি আমাদের এই অঙ্গীকার পালনে আমি দেশবাসীর সর্বাত্মক সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করছি।’ আর একটি আড়াই মিনিটের ভাষণে অন্যজন যা বলেছিলেন, তাতেও ছিল মূল্যবান কথা: ‘আপনাদের সকলের আন্দোলনের ফলে স্বৈরতন্ত্রের পতন হয়েছে, কিন্তু আন্দোলনের মূল লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি সুখী সমাজ গড়ে তোলার কাজ আমাদের শুরু করতে হবে। এই পথ দীর্ঘ ও বন্ধুর। আজ এ জন্য আমাদের সকলকে হতে হবে ধৈর্যশীল ও সংযমী। ভাবাবেগে জড়িত যেকোনো ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। পরিণামে দেশ ও জনগণের জীবনে নেমে আসবে হতাশা।’ প্রথম ভাষণটি দিয়েছিলেন ৮-দলীয় জোটের নেতা ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। দ্বিতীয় ভাষণটি দিয়েছিলেন ৭-দলীয় জোটের নেতা ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাঁদের দুজনের দুই পাশে তখন যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখনো তাঁদের পাশেই আছেন। তাঁরা তো আছেনই, তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আরও অনেক গণতন্ত্রের মানসসন্তান। মানুষ পুড়ুক বা মরুক, গণতন্ত্র তাঁদের চাই।
বাংলার মাটিতে গণতন্ত্রকে যদি গলায় গামছা দিয়ে টেনে আনতেও হয়, তাতেও তাঁরা প্রস্তুত। বঙ্গীয় গণতন্ত্রের অপর নাম ক্ষমতা, মন্ত্রিত্ব, এমপিত্ব ও প্রাপ্তি—বাড়ি-গাড়ি, রাজউকের প্লট, সরকারি খাসজমি, পাহাড়-বনভূমি, নদীর পাড়, নদীর বুকের ভেতরকার বালু—কী নয়? যার ওপর চোখ পড়বে, তাই পাওয়া যায় গণতন্ত্রচর্চায়। সেই গণতন্ত্র জিনিসটি আবার এমনি এমনি পাওয়া যায় না। তার জন্য মূল্য দিতে হয়। মূল্য মানে টাকা-রুপি-ডলার-পাউন্ড-ইউরো নয়। রক্ত ও জীবন। সে রক্ত ও জীবনও গণতন্ত্রের মানসসন্তানদের নয়—পথঘাটের আমজনতার। ওপরে উদ্ধৃত ভাষণ দুটিতে আমরা কয়েকটি শব্দ দেখতে পাই। সেই শব্দাবলির মধ্যে রয়েছে ‘শত শহীদের আত্মাহুতি’, ‘তিন জোটের ঘোষিত রূপরেখা অনুযায়ী নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর’, ‘অবাধ ও মুক্ত পরিবেশে নির্বাচন’, ‘ভোটের অধিকার প্রয়োগ’, ‘স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন’, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’, ‘শত শহীদের রক্তের প্রতি অঙ্গীকার’, ‘স্বৈরতন্ত্রের পতন’, ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’, ‘জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি’ প্রভৃতি। এই পদগুলোর যদি ভাব-সম্প্রসারণ করি, তা হলে বার-চৌদ্দ শ শব্দে কুলাবে না। প্রয়োজন পড়বে ২৫ ফর্মার একখানা বই লেখার। স্বৈরাচার—একটি বিশেষ্য পদ। কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর নাম। ওই ভাষণ দুটি থেকে ১৩ এবং ২৩ বছর বয়সীরা একটি কথা জানতে পারছে, তা হলো তাদের জন্মের আগে স্বৈরাচার নামক কিছু একটা ছিল। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে (সাড়ে আট বছরব্যাপী) তাঁরা সংগ্রাম করেছেন। তাতে শত শত মানুষ শহীদ হয়েছে (অর্থাৎ স্রেফ মরেছে)। সেই সংগ্রাম করেছিল তিনটি জোট।
তাদের লক্ষ্য ছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। যে গণতন্ত্রের কাজ ‘জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি সুখী সমাজ গড়ে তোলা’। এখন আমরা যেমন সুন্দর ও সুখী গণতান্ত্রিক সমাজে বাস করছি—সেই রকম একটি সুখী ও সুন্দর সমাজ। স্বৈরাচার শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো যে শাসক তাঁর নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী দেশ শাসন করেন—দেশের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী নয়। সেদিনের সেই স্বৈরাচার, যিনি ৪ নভেম্বর ঘোষণা দিয়েছিলেন ক্ষমতা থেকে সরে যাচ্ছেন এবং যে ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতেই দুই নেতা দিয়েছিলেন বেতার-টিভিতে ভাষণ, তিনি আজ কোথায়? অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা করেছিলেন বিপ্লবী দল জাসদের নেতা হাসানুল হক ইনু। যা ছিল তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ। এখন এই ২৩ নম্বর নভেম্বরে এসে শুনছি, টিভির পর্দা থেকে, তিনি এখন গণতন্ত্রী হয়ে গেছেন। কারণ তাঁরা উভয়েই একই নৌকার যাত্রী। একজন গলুইয়ের একদিকে, অন্যজন গলুইয়ের অন্যদিকে। এমনও দিন আসবে, এই বাংলাভাষী ভূখণ্ডে যেদিন কোনো বীর উত্তম বলবেন: টিক্কা খান, ফরমান আলী ও নিয়াজি মানুষ ভালো ছিলেন এবং ছিলেন তাঁরা গণতন্ত্রের মানসপুত্র। এক কথা মানুষ বেশি দিন মনে রাখে না এবং তা বিরক্তিকরও বটে।
‘তিন জোটের রূপরেখা’—কথাটার মানে কী? ২৩ বছর বয়সীদের অবগতির জন্য বলছি: ১৯৮৩ সালে ৮-দলীয় জোট, ৭-দলীয় জোট এবং ৫-দলীয় মোর্চা একটি পাঁচ দফা দাবিনামা তৈরি করেছিল। তার ভিত্তিতেই সাড়ে আট বছর আন্দোলন হয় এবং অন্তত সাড়ে ৮০০ মানুষ ‘আত্মাহুতি’ দেন বা বেঘোরে মারা যান। তাঁরা কেউ বিষ পান করে বা ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করেননি। অধিকাংশই মারা গেছেন পুলিশ-বিডিআরের বেয়নেট ও বুলেটের আঘাতে, কেউ সরকারি দলের ছাত্র-যুব সংগঠনের ক্যাডারদের হাতে, কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ট্রাকের চাকায় চাপা পড়ে, কেউ বোমা, কিরিচ (তখন চাপাতির ব্যবহার শুরু হয়েছিল কিন্তু তিন হাত লম্বা রামদার এস্তেমাল ছিল না) প্রভৃতির আঘাতে। তিন জোটের সংক্ষিপ্ত পাঁচ দফা রূপরেখার ৩ নম্বর দফায় ছিল: ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের তত্ত্বাবধানে দেশে অন্য কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই কেবলমাত্র সার্বভৌম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে এবং সংবিধানসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেবলমাত্র জনগণের নির্বাচিত সার্বভৌম জাতীয় সংসদেরই থাকবে। অন্য কারও নয়।’ অন্য কারও নয় বলতে বোঝানো হয়েছিল রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান বা সর্বোচ্চ আদালতও সংবিধানের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন না। সাড়ে আটটি বছর রাজনৈতিক দল ও জোট, ছাত্রসমাজ, আইনজীবী, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, চিকিৎসক, শিক্ষকসমাজ, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী প্রভৃতি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। লক্ষ্য একটাই, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন।
সার্বভৌম সংসদকে সব সিদ্ধান্তের অধিকার দেওয়া—কোনো ব্যক্তিকে নয়। সেদিনের সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। তিন জোটের রূপরেখাকে প্রথম বুড়ো আঙুল দেখাতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তিনি আর কোনো দলকে নয়, নিজেই আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। তিরাশি সালের রূপরেখা তিরানব্বই সাল নাগাদ কলার খোসায় পরিণত হয়। বিরোধী দলের আবার আন্দোলন। আবার রাজপথে লাশ। তখনো অবশ্য বিরোধী নেতাদের জেলে ঢোকানো হয়েছে, কিন্তু হুকুমের আসামি করে রিমান্ডে নেওয়া হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী জিনিস, তা বুঝতে চাইলেন না বেগম জিয়া। ১৯৯৫-৯৬তে এখনকার মতোই ভয়াবহ আকার ধারণ করল রাজনৈতিক সহিংসতা। তত্ত্বাবধায়ক তরিকা ফিরে এল। শেখ হাসিনা নির্বাচনে ভালো করলেন। অন্যদের নিয়ে ‘ঐকমত্য’ করে ক্ষমতায় গেলেন। তাঁরই আন্দোলনের ফলে সংবিধানে যে তত্ত্বাবধায়ক প্রথা লিপিবদ্ধ হলো, সেই প্রথার নির্বাচনেই ২০০১-এ তাঁর দল পরাজিত হয়। বস্তুত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য তাঁর দল পরাজিত হয়নি, কর্মফলে পরাজয় হয়। ফেনী, নারায়ণগঞ্জ, মোহাম্মদপুর, বরিশাল প্রভৃতি এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক বেগম জিয়া চাননি, তার অধীনে নির্বাচন করেই তিনি পুনর্বার প্রধানমন্ত্রী হন।
এবং ক্ষমতাকে বংশানুক্রমিকভাবে পাকা করতে বিচিত্র ফন্দি আঁটেন। গণতান্ত্রিক শাসনের সংস্কৃতিকে তরমুজের মতো ফালা ফালা করেন। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটাকে বুড়িগঙ্গার পানির মতো সম্পূর্ণ দূষিত করে ফেলেন। সেই সুযোগে অলৌকিক আশীর্বাদ নিয়ে উদ্দিনীয় প্রশাসনের আবির্ভাব। উদ্দিনদের আশা ছিল, উনিশ বছর ক্ষমতায় থাকবেন। নেতাদের ঘুষ দিয়ে দুটি প্রধান দলকে ভাঙবেন। দুই নেত্রীকে নির্বাসিত করবেন। অন্যতম উদ্দিন বখতিয়ার খিলজীর মতো ভারত থেকে ঘোড়া নিয়ে এলেন ছয়টি। খিলজীর ঘোড়া ছিল এগারোটি। তাই তিনি বা তাঁর লোকেরা ছয় শ বছর টিকে গিয়েছিলেন। মইনের পাঁচটি ঘোড়া কম থাকায় দুই বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হলো না। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার জন্য ঘোড়ার ওপর নির্ভর না করে নৌকার আশ্রয় নিলেন। ত্বরিতে পাড়ি দিলেন আটলান্টিক। ঘোড়ায় আটলান্টিকের তরঙ্গ পাড়ি দেওয়া যেত না। যে তত্ত্বাবধায়ক মহাজোটকে গদিনশিন করে, তার ওপরেই চাপাতি চালাল সরকার। বঙ্গীয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দরিদ্র ঘরের অবলা যুবতীর মতো। তাকে বড় রাজনৈতিক দলগুলো উপভোগ করার পর মুহূর্তেই আর তাকে স্বীকৃতি ও দাম দেয় না। বাংলার মাটিতে গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন করতে এক পায়ে খাড়া থাকা লোকের অভাব হয় না। একাত্তরে টিক্কারাও একটি নির্বাচন করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে তাঁরা জেলে যান।
প্রধান দল ছাড়া নির্বাচনে ’৮৬তেও লাভ হয়নি। ’৮৮-র নির্বাচন ছিল একটি কলঙ্ক। ’৯৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ছিল একটি জাতীয় লজ্জা। গণতন্ত্রকে পুড়িয়ে নিখাদ করতে প্রধান দল ছাড়া ভবিষ্যতেও যদি কোনো নির্বাচন হয়, তা হলে সেই সংসদের সম্ভাব্য বিরোধীদলীয় নেতার ভাষাতেই বলতে চাই—‘মানুষ থুতু দেবে’। এখন থুতু দিচ্ছে তাঁর কুশপুত্তলিকায়, তখন দেবে মুখমণ্ডলে। শুরু করেছিলাম ’৯০-এর নভেম্বর-ডিসেম্বর দিয়ে। আজ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মুখটি দেখতে পাচ্ছি মেডিকেল হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। নব্বইতেও তেমনটি দেখেছি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে জাফর, জয়নাল, দীপালিদের কথা মনে পড়ে। ফুলবাড়িয়ার ছাত্রমিছিলে সেলিম-দেলোয়ার ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজাহান সিরাজ বিডিআরের গুলিতে মারা যান এবং সেখানে পত্রিকার হকার আজিজ ও হলের বাবুর্চি আশরাফ গুলিতে প্রাণ হারান। মনে পড়ে সরকারি সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রউফুন বসুনিয়াকে। শেখ হাসিনার দ্বিতীয় জীবন। ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮।
চাটগাঁয় তাঁর মিছিলে বিডিআর-পুলিশ গুলি চালায়। তিনি বেঁচে যান। সরকারি হিসাবে ২১ জন, বেসরকারি হিসাবে প্রায় ৩০ জন মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান নিহত হন। অমন ধর্মনিরপেক্ষ হত্যাকাণ্ড ইতিহাসে কম ঘটেছে। ২৭ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাত দিনে ঢাকায় ৩৫ জন, চট্টগ্রামে ছয়, ময়মনসিংহে চার, রাজশাহীতে তিন, খুলনায় তিন, নারায়ণগঞ্জে দুজন নিহত হন। ২৭ নভেম্বর যখন ডাক্তার মিলন শহীদ হন, আমি ছিলাম রোকেয়া হলের সামনে। সেদিনের দৃশ্য ভোলার নয়। আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিই আমার বন্ধু অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও ড. শওকত আরা হোসেনের কোয়ার্টারে। নূর হোসেনের কথা কে না জানে? এসব তেইশ-পঁচিশ বছর আগের কথা। নেতাদের বয়স হয়েছে। তাই তাঁরা ভুলে গেছেন। আমরা সাধারণ মানুষ। গণতন্ত্রের জন্য নব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বরের আগের দিনগুলোতে যাঁরা ‘আত্মাহুতি’ দিয়েছেন, তাঁদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

পোড়া রোগীদের যন্ত্রণা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পোড়া রোগী
১৯৭৩ সালে এমবিবিএস পাস করে প্লাস্টিক সার্জারিতে একজন তরুণ ও নবীন চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলাম ১৯৭৫ সালে। পরে ১৯৮০ সালে আমি আমার শিক্ষাগুরু প্রয়াত অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ সাহেবের অধীনে যোগ দেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাজ করতে করতেই পোড়া রোগীদের চিকিৎসার দুরবস্থার বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। প্রয়াত অধ্যাপক শহীদুল্লাহ ও প্রয়াত অধ্যাপক মো. কবির উদ্দিন স্যারের নেতৃত্বে সেই ১৯৮৬ সালে প্রথম তৎকালীন সরকারের কাছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে আলাদা একটি স্বতন্ত্র বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট খোলার প্রস্তাব দিই। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় ২০০৩ সালে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট বার্ন ইউনিট একদম স্বতন্ত্র একটি ছয়তলা ভবনে কার্যক্রম শুরু করে। এখন ২০১৩ সাল। আমার ব্যক্তিগত ৩০ বছরের বেশি এবং বার্ন ইউনিটের ১০ বছরের বেশি, এই দুই মিলিয়ে আমার অনেক অভিজ্ঞতা। বর্তমানে আমি অবসরপ্রাপ্ত।
কিন্তু বার্ন ইউনিট থেকে অবসর নিতে পারিনি। অনেকটা আমার ব্যক্তিগত মনের তাগিদে। কারণ, এই হাসপাতাল আমার সন্তানের মতো। মানুষ বিভিন্ন কারণে অগ্নিদগ্ধ হয়। এর মধ্যে চুলার আগুন থেকে পোড়া, গরম পানিতে পোড়া ও বৈদ্যুতিক তারে পোড়া আমাদের দেশের অন্যতম কারণ। তবে যে কারণেই মানুষ পুড়ে যাক না কেন, পুড়ে যাওয়া মানুষের ভীষণ যন্ত্রণা হয়, যা আমি অনেক বছর ধরে দেখে আসছি। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য একটাই। পুড়ে যাওয়া রোগীদের দুঃসহ যন্ত্রণা আমি আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে নিজ চোখে দেখেছি। একটা আকুল আবেদন জানাতে চাই সবার কাছে, অসাবধানতার কারণেই হোক কিংবা অতিসাম্প্রতিক সহিংসতার কারণেই হোক, মানুষকে যেন কোনোভাবেই পুড়তে না হয়। এক মাস ধরে সহিংসতার শিকার হয়ে যেসব রোগী আমাদের হাসপাতালে আসছে, তাদের যন্ত্রণা অন্যান্য পোড়া রোগী থেকে ভয়াবহ। কারণ, এই রোগীদের বেশির ভাগেরই মুখমণ্ডল পুড়ে যাচ্ছে। এতে তাদের শ্বাসনালি পুড়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের বিঘ্ন ঘটছে। আর একজন মানুষ যদি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে না পারে, তাহলে কী যে কষ্ট, তা আশা করি অনুমান করা যায়। আমরা চিকিৎসাক্ষেত্রে অনেক সময় এই অসহায় রোগীদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ি। আমাদের কিছুই করার থাকে না। কোনো চিকিৎসকই তাঁর চোখের সামনে একজন রোগীকে এভাবে মারা যাওয়া মেনে নিতে পারেন না। আমরা চিকিৎসকেরা যখন কাউকে জরুরি চিকিৎসা দিচ্ছি,
তখন কিন্তু আমরা জানি না সেই রোগীর ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়। আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার কষ্ট লাঘব করা এবং তাকে সুস্থ করে তার প্রিয়জনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। সম্প্রতি আমি বলেছিলাম, আমাদের যেন আর কোনো অ্যাসিডে আক্রান্ত বা পোড়া মেয়েকে চিকিৎসা করতে না হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে আজও ঠিক একইভাবে বলছি, আমাদের যেন আর এই সহিংসতার কারণে কোনো Inhalation Burn Injury (শ্বাসনালির পোড়া) রোগীকে চিকিৎসা না করতে হয়। কারণ, এগুলো এত কষ্টের যে চিকিৎসকের বাইরে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এবং আমার শেষ জীবনে এই ঘটনাগুলো আমার জন্য চরম কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে। আমি আমার জীবন শুরু করেছিলাম একজন অনেক বড় প্লাস্টিক সার্জন হব এবং মানুষের চেহারার সৌন্দর্যবৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত থাকব বলে। কিন্তু বাংলাদেশের পোড়া রোগীদের দুরবস্থা দেখে গত ৩০ বছর আমি আমার ব্যক্তিগত কাজ ছেড়ে এই মানুষগুলোর মঙ্গলের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এদের কষ্ট আমাকে অনেক কষ্ট দেয়। আমাদের হাসপাতালে শাহবাগে বাসের আগুনে পোড়া রোগীরা যেদিন আসে, সেদিন আমি অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছি আমাদের চিকিৎসক, সেবক-সেবিকা ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী যেভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সেবা দিয়েছিলেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। সব শেষে আবারও একটি আকুল আবেদন, আর যেন এ ধরনের রোগীদের আমাদের চিকিৎসা না করতে হয়।
ডা. সামন্ত লাল সেন: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, বার্ন ইউনিট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

প্রতিবন্ধীদের ভোটাধিকার

আজ আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। প্রতিবছর ৩ ডিসেম্বর বিশ্বের মোট ৭০০ কোটি জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ মানুষের অধিকার আদায়ে বিশ্বের প্রায় সব কটি দেশ দিবসটি পালন করে। দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘বাঁধ ভাঙো দুয়ার খোলো, একীভূত সমাজ গড়ো’। এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, সমাজে বসবাসরত ধনী-গরিব, বর্ণবৈষম্য, ধর্ম, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধী, অপ্রতিবন্ধী ও জাতিসত্তাভেদে সব মানুষের অংশগ্রহণে একটি সুন্দর সমাজ তথা সম-অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা; যেখানে সুনিশ্চিত হবে প্রত্যেক মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক তথা গণতান্ত্রিক অধিকার। এই গণতান্ত্রিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক সুশাসনব্যবস্থা। এই প্রক্রিয়া সমুন্নত হয় সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে। এই সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম শর্ত হলো সব ভোটারের বাধাহীনভাবে ভোটে অংশগ্রহণ। এই নিশ্চয়তা বিধান করবে রাষ্ট্র। ভোটার হওয়ার এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ করা সব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র এই নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে না পারলে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়।
কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়সহ সব স্তরের নির্বাচনে প্রতিবন্ধী নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগের পথ এখনো প্রত্যাশামতো নয়। এর মূল কারণ, ভোট প্রদানের পদ্ধতি, সুবিধাদি এবং উপকরণাদি; অনেকাংশে বাধাহীন, বোধগম্য ও অনায়াসে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহারোপযোগী নয়। ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০১১ অনুযায়ী, পৃথিবীর ১৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার শিকার। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ অর্থাৎ এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ প্রতিবন্ধী। সে হিসাবে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ লাখ ভোটার। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমান ভোটারসংখ্যা নয় কোটি ১৯ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬১ জন; যা মোট ভোটারের প্রতিবন্ধী ভোটার প্রায় ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভাবনার এবং একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং বিষয়ও বটে। কমিশনে থাকাকালীন (২০০৭-২০১২) বিভিন্ন প্রতিবন্ধী সংগঠন, বিশেষ করে এডিডি ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রতিবন্ধী নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিতকল্পে কিছু সুপারিশ পেশ করেছিল; যার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন প্রতিবন্ধী ভোটারের দ্রুত ভোট গ্রহণ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নিজস্ব সহকারী, নিচুতলায় ভোটকেন্দ্র স্থাপন, প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সচেতনতা সৃষ্টিসহ বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিষয়গুলোর আর কোনো ধরনের ফলোআপ বা নির্বাচনী আইন ও বিধিতে সংযোজন না করার কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অন্তরায়গুলো এখনো অনেকাংশে বিদ্যমান। বর্তমান ভোটার নিবন্ধন ফরমের ১২ নম্বরে ভোটার কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার শিকার কি না, তার ব্যবস্থা সংযোজন করা আছে; তথাপি বাংলাদেশে মোট প্রতিবন্ধী ভোটারের প্রকৃত সংখ্যা অজ্ঞাতই রয়ে গেছে। বর্তমান জাতীয় পরিচয়পত্রে ও ভোটার তালিকায় প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণের কোনো ধরনের চিহ্ন ব্যবহার করা হয়নি; যে কারণে ভোটকেন্দ্রে প্রতিবন্ধী ভোটার যে ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা, তা নিশ্চিত করা হয়নি। চিহ্ন না থাকার কারণে কোনো ভোটকেন্দ্রের অধীনে কতজন প্রতিবন্ধী ভোটার আছেন, তা জানা সম্ভব হয় না এবং সে কারণে ভোটকেন্দ্র প্রতিবন্ধীবান্ধব করাও অনেকাংশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্টেট অব নিউইয়র্ক নির্বাচনী আইন, ২০১১ অনুযায়ী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে টেকটাইল ব্যালট পেপার ব্যবহার করে থাকেন। অতি কম খরচে সহজেই প্রয়োগ করা যেতে পারে এ পদ্ধতি। সদ্য সংসদে পাস করা ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ (সংশোধিত) অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত, ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্ততা এবং প্রতিকূলতার ভিন্নতা বিবেচনায় অটিজম, শারীরিক, মানসিক, দৃষ্টি, বুদ্ধি, বাক, শ্রবণ, শ্রবণ-দৃষ্টি, সেরিব্রাল পালসি, বহুমাত্রিক এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধিতাসহ মোট আট ধরনের প্রতিবন্ধিতার কথা বলা হয়েছে। তথ্যমতে, বাংলাদেশে মোট প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩২ শতাংশ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাই ‘টেকটাইল’ হতে পারে তাদের ভোট প্রয়োগে সবচেয়ে সহজ উপায়।
যদিও আজারবাইজান, কসোভো, কানাডা, ঘানা, যুক্তরাজ্য এবং অধিকাংশ আফ্রিকান ও এশিয়ান দেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ভোট প্রদানে ব্রেইল পদ্ধতিটি প্রচলিত। আমাদের পাশের দেশ ভারতসহ আমেরিকা, জাপান, নেদারল্যান্ডস, স্লোভেনিয়া, আলবেনিয়ায় ভোট প্রদানে প্রতিবন্ধীবান্ধব ইভিএম মেশিন প্রচলিত আছে। ২০১৪ সাল থেকে নেপাল, ভুটান, নামিবিয়া ও কেনিয়ায়ও প্রতিবন্ধীবান্ধব ইভিএম মেশিন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের দেশে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২’-এ শুধু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সহযোগী ব্যবহারের বিধান রয়েছে কিন্তু অন্য ধরনের প্রতিবন্ধীদের ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার উল্লেখ নেই। এই বৃহৎ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী ভোটারের অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের গণতন্ত্র কখনো সুসংহত হতে পারে না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার বিষয়ে মূলত চারটি উপায়ে ওপরের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে: যেমন কিছু বিষয়ে নির্বাচন কমিশন পরিপত্র জারি করতে পারে, কোনোটাতে ভোটার নিবন্ধনবিধিতে পরিবর্তন আনতে পারে, কোনো বিষয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে প্রতিবন্ধী বিষয়ে সংশোধনীর প্রস্তাব আনতে পারে, এবং কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ বের করতে পারে। এই অল্প সময়ের মধ্যেও বর্তমান নির্বাচন কমিশন বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে; যা চরম প্রতিবন্ধী ভোটারও ভোট প্রয়োগে উৎসাহিত হবেন। তবে ভোটাধিকার প্রয়োগের পাশাপাশি তাঁদের নির্বাচনী কার্যক্রমে পূর্ণ অংশগ্রহণে আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, যেমন নির্বাচনে যাতে তাঁরা প্রার্থী, সমর্থক, প্রচারক ও নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারেন, তার জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশে প্রায় ৯০ লাখ প্রতিবন্ধী ভোটারের কোনো রূপ বাধাবিঘ্ন ছাড়া গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রয়োগ এবং নির্বাচনে পূর্ণমাত্রায় অংশগ্রহণ ব্যক্তিদের শুধু গণতান্ত্রিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে না; সঙ্গে সুসংহত হবে আমাদের গণতন্ত্রও।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক ও মো. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া: প্রশিক্ষক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী।

থাইল্যান্ডে গণঅভ্যুত্থান

থাইল্যান্ডে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন এখন নতুন মাত্রা নিয়েছে। বিক্ষোভের ৮ম দিনে সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান শুরু করেছে দেশটির হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। সরকারি ভবনগুলোতে ঢুকে পড়ে সরকারবিরোধী নাশকতা শুরু করেছে বিক্ষোভকারীরা। এদিকে এতদিন অবরোধ করে রাখা রাজধানী ব্যাংককে এবার সমবেত হয়েছে সরকারদলীয় সমর্থকরাও। ফলে, সরকার ও বিরোধী দলের সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত দু’জন নিহত ও ৪৫ জন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। রোববার বিক্ষোভের একপর্যায়ে ৩০ হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী পুলিশ হেড কোয়ার্টারে ঢুকে পড়লে সেখানে অবস্থানরত দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা শেষ পর্যন্ত পুলিশ সদর দফতর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এদিন সরকারি একটি গণমাধ্যমও নিজেদের দখলে আনে বিরোধীরা। অন্যদিকে, শনিবার রাজধানীতে অন্তত ৭০ হাজার সরকারি দলের সমর্থক জড়ো হন।
সরকারি দল সমর্থকদের গায়ে লাল শার্ট, বিরোধীদের গায়ে হলুদ, দুয়ে মিলে ব্যাংকক এখন হলুদ আর লালের শহর। সরকারের ইরাওয়ান ইমার্জেন্সি সেন্টার এ খবর দিয়েছে। ইংলাক সিনাওয়াত্রা সরকারের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনের ৭ম দিনে রাজধানীর রাজামঙ্গলা স্টেডিয়ামে সরকারবিরোধী ও সরকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে দু’জনের মৃত্যু হয়। একজন রামখমহেয়িং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। নিহত অপর জনের ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। শহরের একটি জরুরি বিভাগের কর্মকর্তারা রোববার এ তথ্য জানিয়েছেন। শহরের একটি স্টেডিয়াম এলাকায় সরকারবিরোধী ও সরকার সমর্থকরা বিক্ষোভ র‌্যালি বের করে। এ সময় সংঘর্ষে ওই ছাত্রের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পরপরই পরবর্তী বড় সহিংসতা এড়াতে রেড শার্ট গ্র“প তাদের র‌্যালির সমাপ্তি ঘোষণা করে। এদিকে, ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ দমাতে দাঙ্গা পুলিশকে সহযোগিতা করতে রাজধানীতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে সরকার। বিরোধীদের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অবরোধের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী নামানো হয়। তবে, দেশটির সেনা কর্মকর্তারা বিক্ষোভ দমাতে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ত থাকার ব্যাপারে অনিচ্ছুক। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দাঙ্গা পুলিশকে সহযোগিতা করতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তে তারা সম্মত হয়েছে। সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর কোনো অস্ত্র প্রয়োগ করবে না বলে জানা গেছে। সেনা সদর দফতর মুখপাত্র লে. জেনারেল প্যারাডন পাট্টানাথাবুট বলেন, বিক্ষুব্ধ জনতার আক্রোশ থেকে সরকারি দফতরগুলো রক্ষার্থেই কেবল রাজধানীতেই সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী ইংলাকের ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা ২০০৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যান। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে থাকসিনের দল ক্ষমতায় আসে এবং ইংলাক প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। গত মাসে ইংলাক থাকসিনকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন এবং থাকসিনকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা ও দায়মুক্তি দেয়ার পদক্ষেপ নেন। তার এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশটির বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সমর্থকরা বিক্ষোভ শুরু করে। তবে বিক্ষোভের সূত্রপাত হলে বিলটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখেন ইংলাক। কিন্তু তারপরও গত রোববার থেকে তার পদত্যাগের দাবিতে নতুন করে আন্দোলনে নামে বিরোধীরা। পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা ভোটেও জয়ী হন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা।
ধর্মঘটের আহ্বান : থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে চলমান সংঘর্ষের মধ্যেই সোমবার (আজ) থেকে দেশজুড়ে ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানিয়েছেন সরকারবিরোধী আন্দোলনের নেতা সুথেপ থাংসুবান। থাইল্যান্ডের সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী থাংসুবানের বক্তব্যটি দেশের প্রায় সবক’টি সম্প্রচার মাধ্যমেই দেখানো হয়েছে। সরকারকে অচল করে দিতে থাংসুবান সরকারি ও ব্যক্তিগত সব প্রতিষ্ঠানেই কাজ বন্ধ করে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছন। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীরা রোববারকে ‘ভি-ডে’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তারা এটাকে মনে করছে গণঅভ্যুত্থান। বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরা।

ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস তারকা পল ওয়াকার আর নেই

হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’-এর অন্যতম তারকা অভিনেতা পল ওয়াকার আর নেই। শনিবার সন্ধ্যায় লস এঞ্জেলেসের উত্তরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তার জনসংযোগ কর্মকর্তা অ্যামি ভ্যান আইডেন এ খবর জানিয়েছেন। এই তারকা অভিনেতার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লেখা হয়েছে, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আজ পল ওয়াকার মারা গেছেন। তার প্রতিষ্ঠান রিচ আউট ওয়ার্ল্ডওয়াইডের জন্য আয়োজিত একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওযার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।’
খবরে বলা হয়, ওয়াকারের বন্ধু তাদের পোর্শে গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। এ সময় রাস্তার পাশের একটি থামের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দ্রুত গতিতে চলমান গাড়িটি চূর্ণ হয়ে যায়। ৪০ বছর বয়সী ওয়াকার ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ সিনেমায় আন্ডার কভার এজেন্ট ব্রায়ান ও কনরের চরিত্রে অভিনয় করে সুখ্যাতি অর্জন করেন। তিনি এই সিনেমার সিরিজের একটি ছাড়া অন্য সবকটিতে অভিনয় করেন। মাত্র ৪০ বছর বয়সী ওয়াকার ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ ছবির সর্বশেস সংস্করণেও কাজ করছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা সান্তা ক্লারিটা ভ্যালি সিগন্যাল সংবাদপত্রকে জানিয়েছেন, লাল রঙের একটি পোর্শে গাড়ির চাকার পেছনে অভিনেতা ওয়াকারের দেহটি পড়েছিল। ঘটনাস্থলের ছবিতে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ধাতব বস্তুর ও ভাঙা জানালার অংশ দেখা গেছে।