Friday, April 3, 2015

ঐতিহাসিক মুহূর্ত, তবে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে

ইরানের সঙ্গে পরমাণু বিরোধে আপোশ মধ্যপ্রাচ্য তথা সারা বিশ্বের পক্ষে ভালো খবর৷ তবে তাতে সমস্যার সমাধান হবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়, বলে ডয়চে ভেলে-র জামশিদ ফারুগি মনে করেন৷ চুক্তি হবে, কিংবা হবে না বারো বছর ধরে এই নিয়ে টানাপড়েন৷ কাজেই এবারেও জগতের চোখ ছিল লোসান-এর ওপর, তার সঙ্গে ছিল আশা-নিরাশার দোলা, সাফল্য আর অসাফল্যের মধ্যে ফারাকটা এতোই সামান্য হতে পারত৷ অবশেষে সুখবরটা এলো বিশ্বের এমন একটি অঞ্চলের জন্য সুখবর, যেখানকার মানুষ সুখবরে খুব একটা বেশি অভ্যস্ত নন৷ নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, শুধুমাত্র ইরান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রসমাজের জন্য৷ তবুও লোসান-এর আপোশ সম্পর্কে কিছুটা দ্বিধা পোষণ করলে দোষ নেই৷
বাস্তববুদ্ধির জয়
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বৈঠক এর আগেও হয়েছে যেন তাসের খেলা৷ টেবিলের ওপর দুধরনের তাস: হয় দুপক্ষেরই জিত, নয়তো দুপক্ষেরই হার৷ জিতল শেষ অবধি বাস্তববুদ্ধি৷ লোসান-এর তাসের বাজি যখন শুরু হয়, তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও তাঁর ইরানি সতীর্থ মহম্মদ জাভাদ জরিফ, দুজনেই জানতেন যে, তাঁরা খালি হাতে দেশে ফিরতে পারবেন না৷ যতক্ষণ অবধি না ঐকমত্য অর্জিত হয়, ততোক্ষণ অবধি আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে৷ তাঁরা কি এই বাজি জিতলেন, না হারলেন? জিতলেন এ কথা নিশ্চয় করে বলা যায়৷
ইরানের পক্ষে জীবন-মরণের প্রশ্ন
ইরানের অর্থনীতি পশ্চিমের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চাপে কাতরাচ্ছে৷ মুদ্রার বিনিময়মূল্য পড়েছে৷ ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করেছে৷ বেকারত্ব ও আশাহীনতা যুব সম্প্রদায়কে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিয়েছে৷ তবে ইরানকে শেষমেষ হ্যাঁ বলতে হয়েছে, কেননা সৌদি আরবের নেতৃত্বে বিভিন্ন আরব দেশের একটি জোট তাদের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হতে পারে, এমন বিপদ দেখা দিয়েছিল৷ ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের উপর বিমান আক্রমণের পর সৌদি আরব আর ইরানের মধ্যে পরোক্ষ যুদ্ধ একটি নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে৷ ইয়েমেনে এই আধিপত্যের লড়াই গোটা অঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড ঘটানোর ক্ষমতা রাখে৷
এবার আসল কাজ
লোসান-এর আলাপ-আলোচনা ব্যর্থ হলে যে বিপক্ষের হাত শক্ত হবে, সেটা ইরান সরকার, এমনকি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনেই-এর আশেপাশের অতি-রক্ষণশীল মহলেরও অজ্ঞাত ছিল না৷ অপরদিকে ইরানের সঙ্গে পরমাণু বিরোধের অন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা-র পক্ষেও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তাঁর বৃহত্তম সাফল্য বলে পরিগণিত হবে৷ লোসান-চুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবত ইরানের সঙ্গে পরমাণু বিরোধের অন্ত ঘটল তবে শুধুই সম্ভবত৷ নিশ্চয় করে কিছু বলার আগে অনেক কাজ বাকি কেননা সব কিছু আবার বিনষ্ট করার জন্য চুক্তি-বিরোধীদের হাতে এখনও তিন মাস সময় থাকছে৷ বিরোধীদের মধ্যে সর্বাগ্রে নাম করতে হবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-র বিশেষ করে মার্কিন কংগ্রেসে যখন তাঁর সমর্থকের অভাব নেই৷ স্মরণ করা যেতে পারে, ৪৭ জন মার্কিন সেনেটর তেহরান সরকারকে লেখা চিঠিতে হুমকি দিয়েছেন, ওবামা-শাসনের অন্ত ঘটলেই এই চুক্তিরও অন্ত ঘটবে৷ আঞ্চলিক শক্তিদের মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশর ইরানের সঙ্গে আপোশের চরম বিরোধী সেই সঙ্গে স্বয়ং ইরানের কট্টরপন্থিরা, কেননা পরমাণু বিরোধের অন্তের ফলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব কমতে পারে, এমনকি ইরান আবার আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রসমাজে প্রত্যাবর্তন করতে পারে, যা কট্টরপন্থিদের স্বভাবতই কাম্য নয়৷
-dw

৩০ বছর পর ‘নির্দোষ’ প্রমাণিত, মুক্তি পাচ্ছেন ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী’

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা অঙ্গরাজ্যের অ্যান্থনি রেই হিনটন দীর্ঘ ৩ দশক মৃত্যুদ- কার্যকরের প্রতীক্ষায় প্রহর গুণেছেন। হত্যাকা- ও ডাকাতির অভিযোগে জেলের রুদ্ধ প্রকোষ্ঠে জীবনের ৩০টি বসন্ত পার করার পর তার মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে আদালত। গ্রেপ্তারের সময় তার বয়স ছিল ২৯ বছর। যৌবন পেরিয়ে আজ তিনি প্রবীণ। তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ তুলে নেয়া হয়েছে। ‘নির্দোষ’ প্রমাণিত হয়েছেন তিনি। অচিরেই মুক্তি দেয়া হবে অ্যান্থনিকে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। ১৯৮৫ সালে ২ জনকে হত্যা ও পৃথক ঘটনায় ২টি রেস্টুরেন্টে ডাকাতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল অ্যান্থনিকে। জেফারসন কাউন্টি সার্কিট আদালতের বিচারক লরা পেট্রো অ্যান্থনির বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন। তার বিরুদ্ধে অপরাধের কোন তথ্য-প্রমাণ নেই বলে যুক্তি উপস্থাপন করেন অ্যান্থনির প্রধান আইনজীবী ব্রায়ান স্টিভেনসন। এরপর তাকে মুক্তি দেয় আদালত। স্টিভেনসন বলেন, শেষ পর্যন্ত অ্যান্থনিকে মুক্তি দেয়া হবে ভেবে আমরা রোমাঞ্চ অনুভব করছি। কারণ, বিনা দোষে মৃত্যুদ- কার্যকরের অপেক্ষা করছিলেন অ্যান্থনি রেই হিনটন। তিনি আরও বলেন, অ্যান্থনি যে নির্দোষ, তার সাক্ষ্য-প্রমাণ সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অ্যালবামার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় মৃত্যুদন্ডের প্রতীক্ষায় থাকা এবং একই সঙ্গে প্রতীক্ষায় থাকার পর মুক্তি পাওয়ার বিরল ঘটনার অন্যতম এটি। অ্যালাবামার বার্মিংহামের একটি ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্টে ডাকাতির সময় ওই রেস্টুরেন্টের ২ ম্যানেজারকে গুলি করে হত্যা করে দুষ্কৃতকারী। ওই ঘটনার কোন প্রত্যক্ষদর্শী বা আঙুল ছাপের কোন প্রমাণ পায়নি পুলিশ। ওই একই বছর আরেকটি রেস্টুরেন্টে ডাকাতির ঘটনা ঘটে এবং সেই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারকেও গুলি করা হয়। তিনি গুরুতর আহত হন এবং অ্যান্থনিকে সন্দেহভাজন অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করেন ওই ম্যানেজার। কিন্তু, অ্যান্থনির বক্তব্য অনুযায়ী, ডাকাতির সময় তিনি ১৫ মাইল দূরে কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পুলিশ অ্যান্থনির মায়ের পিস্তলটি জব্দ করে এবং ৩টি অপরাধের ক্ষেত্রেই পিস্তলটি ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ আনে। স্টিভেনসন বলেন, ‘কৃষ্ণাঙ্গ’ অ্যান্থনিকে ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদ-ের রায় দেয়া হয়েছিল। এর একটি কারণ তিনি কৃষ্ণাঙ্গ। অ্যান্থনি দীর্ঘ ৩০টি বছর নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এসেছেন। কিন্তু, তাতে কোন ফল হয়নি। অবশেষে তিনি তার অধিকার ফিরে পেয়েছেন। এমনকি ওই পিস্তলটি যে অপরাধগুলো ঘটার সময় ব্যবহৃত হয়নি, সেটাও বেরিয়ে এসেছিল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক এক এফবিআই প্রতিনিধির পরিচালিত ফরেনসিক রিপোর্টে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ১৯৭৩ সালের পর ১৫২তম এবং ২০১৫ সালে ‘দ্বিতীয়’ ব্যক্তি হিসেবে অ্যান্থনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেন।

যৌতুকের বলি ওয়াহিদা সিফাত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর ওয়াহিদা সিফাত (২৭) পাঁচ বছর আগে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন রাজশাহী নগরীর আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন রমজানের বেকার ছেলে আসিফকে। কিন্তু বিয়ের পর পাল্টে যেতে থাকে আসিফ। ব্যবসা করার জন্য বাবার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা যৌতুক এনে দিতে সিফাতকে প্রায় চাপ দিতো। এতে সিফাত রাজি না হওয়ায় দিনের পর দিন তার ওপর চলতে থাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। আর শেষ পর্যন্ত এ যৌতুকের কারণেই সিফাতকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
গতকাল সকালে নগরীর রাজপাড়া থানায় করা মামলায় এমনই অভিযোগ করেন ওয়াহিদা সিফাতের চাচা মিজানুর রহমান খন্দকার। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন যৌতুকের দাবিতে হত্যা ও সহায়তা করার অপরাধে করা মামলায় সিফাতের স্বামী মো. আসিফসহ তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলো সিফাতের শ্বশুর মোহাম্মদ হোসেন রমজান ও শাশুড়ি নাজমুন নাহার নাজলী।
মামলায় অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনধারী সিফাত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গাজীপুরে চাকরির জন্য আবেদন করেন এবং নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকার পল্লবীতে পিতার বাসায় যাওয়ার জন্য ২৯শে মার্চ রাত ১১টা ২০ মিনিটে ধূমকেতু ট্রেনের টিকিট কাটেন। হঠাৎ ওই দিন রাত সোয়া ১০টায় সিফাতের শ্বশুর মোহাম্মদ হোসেন রমজান মোবাইল ফোনে সিফাতের ভাই আসিফুল ইসলামকে জানান, সিফাত মুমূর্ষু অবস্থায় তার ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। এর ৫ মিনিট পর রমজান আবারও মোবাইল ফোনে জানান, সিফাত গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে এবং তাকে রাজশাহী মেডিক্যালে কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর সে মারা গেছে।
সূত্র মতে, রোববার রাত ৯টা ২৫ মিনিটে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় গৃহবধূ ওয়াহিদা সিফাতকে। তার দেড় বছরের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। এদিকে হাসপাতালে সিফাতের সুরতহাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, তার থুঁতনির নিচে এক ইঞ্চি পরিমাণ লালচে জখম ছিল। এ ছাড়া রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের দেয়া ময়নাতদন্ত রিপোর্টেও সিফাতের মাথায় জখমের প্রমাণ মিলেছে। সিফাতের গ্রামের বাড়ি রংপুর। তার পিতা আমিনুল ইসলাম খন্দকার বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক।
মামলায় সিফাতের চাচা মিজানুর রহমান খন্দকার বলেন, সিফাতের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি মোহাম্মদ হোসেন রমজানকে রাত ১২টার দিকে ফোন দেন। ফোনে রমজান জানান, সিফাতকে তার স্বামী মাঝে মধ্যে মারপিট করতো। তিনি তা মীমাংসা করে দিতেন। বৃহস্পতিবারও মারপিট করেছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ৩০শে মার্চ সকাল সাড়ে ৭টায় পরিবারের লোকজন ঢাকা থেকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আসেন। এ সময় তারা দেখেন সিফাতের মৃতদেহের মাথা ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন এবং নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়েছে। এ ছাড়া মাথার ডান দিকে চোখের পাশে রক্ত জমাট বাঁধা আছে। মামলায় দাবি করা হয়, যৌতুরে জন্যই সিফাতকে হত্যা করা হয়েছে। এখন হত্যার ঘটনাকে আড়াল করতে আত্মহত্যা হিসেবে চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, গৃহবধূ ওয়াহিদা সিফাতের মৃত্যুর ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে থানায় মামলা হয়েছে। ওই মামলায় সিফাতের মৃত্যুর পরদিন আটক তার স্বামী আসিফকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

প্রধানমন্ত্রীকে ‘বিশ্বনেতা’ বললেন আইজিপি

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারে পুলিশ লাইন-১ রিজার্ভ রেঞ্জের
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে ‘বিশ্বনেতা’ অভিহিত করে বক্তব্য রাখছেন
পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুল হক। ছবি: ফোকাস বাংলা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বনেতা’ বলে অভিহিত করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহিদুল হক। আইজিপি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নন, তাঁর কর্মে তিনি এখন বিশ্বনেতা।’ আজ শুক্রবার সিলেটের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারে পুলিশ লাইন-১ রিজার্ভ রেঞ্জের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। এর আগেও বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে বিএনপি জোটের ডাকা অবরোধে গাড়ি পোড়ানো, পেট্রলবোমায় মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়েও মন্তব্য করেন আইজিপি। জনগণের সহযোগিতায় দেশ থেকে জঙ্গিবাদ, গুম, খুন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নির্মূল সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করে আইজিপি আরও বলেন, ‘২০১৩ সালে দেশব্যাপী জঙ্গি তৎপরতা চালানো হয়েছিল। ১৮ জন পুলিশকে মারা হয়েছিল। ৩০০ পুলিশকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল। তিন হাজার পুলিশ সদস্যকে আহত করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে আড়াই মাসব্যাপী পেট্রলবোমা, ককটেল, গাড়ি ও ট্রেনে আগুন দিয়ে সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল।’
পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করতেই এসব করা হয়েছিল উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, ‘তারা পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পুলিশের মনোবল ভেঙে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এ দেশের মানুষ জঙ্গিবাদকে সমর্থন করেনি। জনগণ গত আড়াই মাসে ৬০০ হামলাকারীকে পেট্রলবোমাসহ ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।’
নিখোঁজ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিনকে খুঁজে বের করতে পুলিশ তৎপর আছে বলে জানিয়েছেন এ কে এম শহিদুল হক। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেউ নিখোঁজ হলে তাঁকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব পুলিশের। এ ক্ষেত্রে সব চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সিটি করপোরেশন নির্বাচন করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে যে সহযোগিতা করার দরকার, আমরা নির্বাচন কমিশনকে সেই সহযোগিতা করব।’
সিলেটের আরআরএফ কমান্ড্যান্ট আনসার উদ্দিন খান পাঠানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন, পুলিশের সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মিজানুর রহমান, মহানগর পুলিশ কমিশনার কামরুল আহসান, সিলেটের জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম, গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান আবু জাহিদ প্রমুখ।

ভাইকে গিফট দেয়া হলো না তামান্নার by আল আমিন

‘পিতা চিকিৎসক। একমাত্র ভাইও চিকিৎসক। বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল একমাত্র মেয়ে তামান্না রহমান হৃদিও চিকিৎসক হবে। দুঃখী মানুষের সেবা করবে। কিন্তু ছোট থেকেই হৃদির স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার। মুক্ত আকাশে ডানা মেলে বিচরণ করার। কিন্তু তামান্নার সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে পরিপূর্ণ পাইলট হওয়ার আগেই তার প্রশিক্ষণের বিমান আছড়ে পড়লো রানওয়ের পাশে। মৃত্যু হলো তার। শুধু প্রাণের নয়, স্বপ্নেরও। কথাগুলো কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন তামান্নার মা রেহানা ইয়াসমিন ডলি।
বুধবার দুপুরে রাজশাহীর শাহ মখদুম (র.) বিমানবন্দরে একটি প্রশিক্ষণ বিমান রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে। এতে দগ্ধ হয়ে মারা যান ওই বিমানের প্রশিক্ষণরত পাইলট তামান্না। এতে আহত হয়েছেন প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেন শাহেদ কামাল। তামান্নার পরিবারের অভিযোগ, ওই প্রশিক্ষণ বিমান থেকে শাহেদ কামাল কাচ ভেঙে বের হয়েছেন। তামান্না অনেকক্ষণ ধরে বাঁচার জন্য আকুতি জানিয়েছিল। প্রায় ২০ মিনিট ধরে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেননি। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত গেলে তামান্নাকে বাঁচানো যেত। গতকাল সকালে খিলক্ষেত থানাধীন নিকুঞ্জ-২-এর আবাসিক এলাকার ১২ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তামান্নার লাশ বাড়ির নিচতলায় রাখা। বাড়িটির সামনে নিহতের আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের ভিড়। সবাই নির্বিকার, নিস্তব্ধ। বাড়ির নিচতলায় তামান্নার লাশের কফিন ধরে তার বাবা, মা, একমাত্র ভাই আহাজারি করছেন। তাদের আহাজারিতে সেখানকার পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। তাদের কান্না দেখে অন্য স্বজনরা আবেগ-আপ্লুত হয়ে ওঠেন।
নিহতের মা রেহানা ইয়াসমিন ডলি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নানারবাড়ি গাজীপুরের জয়দেবপুরের কানাইয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করে তামান্না। জন্মের পর থেকেই ঢাকায় বেড়ে উঠেছে সে। প্রায় ১০ বছর ধরে নিকুঞ্জের নিজ বাড়িতে আমরা বসবাস করে আসছি। তিনি আরও জানান, খুব ছোট থেকেই তার বিমান সম্পর্কে জানার আগ্রহটা ছিল অনেক বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহলও ছিল। পাশেই বিমানবন্দর। সেখান থেকে উড়ে যাওয়া বিমানগুলো দেখার জন্য বাড়ির ছাদে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো। তখন থেকেই তামান্না বাবা ও মাকে বলতো সে পাইলট হবে। ২০১২ সালে উত্তরার একটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল থেকে তামান্না ও-লেবেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। পরে ২০১৪ সালে এ-লেবেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এরপর তার স্বপ্নকে বাস্তবায়নে রূপ দিতে যোগ দেয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফ্লাই একাডেমি অ্যান্ড সিভিল এভিয়েশনে। ২ বছরের কোর্স। সেখানে পড়াটা খুব ব্যয়বহুল। তামান্নার আগ্রহ দেখে তাকে সেখানে ভর্তি করা হয়। এরপর প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য সে রাজশাহীতে চলে যায়। প্রায় ৬ মাস ধরে সেখানে সে অবস্থান করছিল। দুই মাস আগে সে একবার বাড়িতে এসেছিল। এরপর থেকে মোবাইলে যোগাযোগ হতো। নিহতের পিতা স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান আবেগ-আপ্লুত হয়ে জানান, আমি একজন চিকিৎসক। আমার দুই সন্তান। আসিফ রহমান ও তামান্না। আসিফ ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পথে। তামান্নাকে চিকিৎসক করার ইচ্ছা ছিল আমাদের। কিন্তু তার পাইলট হওয়ার ইচ্ছা অনেক দিনের। একপ্রকারের জেদও ছিল। ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হওয়ার কারণে আমরা কেউ রাজি ছিলাম না। তার স্বপ্ন বিমানের আগুনে পুড়ে গেল। আমার একমাত্র মেয়েটি এভাবে পুড়ে মারা গেল। এখন কি নিয়ে বাঁচবো? নিহতের বড় ভাই ডা. আসিফ রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, গত কয়েক দিন আগে তামান্নার সঙ্গে মোবাইলে তার কথা হয়েছিল। সে আমাকে বলেছিল সফলতার সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে আমাকে একটি বড় ধরনের গিফট দেবে? সেই গিফট আর পাওয়া হলো না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেই প্রতিষ্ঠানে আমার বোন ফ্লাইংয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল, ওই প্রতিষ্ঠানের এয়ার কার্পটগুলো পুরনো। লক্কর-ঝক্কর। সেগুলোকে সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো না বলে আমাদের কাছে জানিয়েছিল। তামান্নার মৃত্যুর পর আমার মা সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন। মাকে নিয়ে আমরা চিন্তিত। কেননা তার কিছুদিন আগে হার্টের অপারেশন হয়েছে।
নিহতের সহকর্মী অপর্ণা গোমেজ জানান, আমরা একসঙ্গে রাজশাহীতে প্রশিক্ষণরত ছিলাম। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফ্লাই একাডেমি অ্যান্ড সিভিল এভিয়েশনের ঢাকায় ফ্লাইংয়ের কোন অনুমতি না থাকায় আমাদের রাজশাহীতে থাকতে হয়েছে। বিমানবন্দরের পাশেই একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। তামান্না খুব প্রাণোচ্ছল একটি মেয়ে ছিল। রাজশাহী বিমানবন্দরে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। তামান্নার প্রশিক্ষণের বিমানটির ইঞ্জিনটিতে আগুন ধরে গিয়ে রানওয়ের পাশে বিধ্বস্ত হওয়ার পর প্রায় ২০ মিনিট পর ফায়ার সার্ভিসের একটি মাত্র ইউনিট আসে। খবর পাওয়া মাত্র ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট এলে ওই বিমান থেকে তামান্নাকে উদ্ধার করা যেত। ফায়ার সার্ভিস আসতে আসতে ততক্ষণে সেখানে এমনিতেই আগুন নিভে যায়। বিমানবন্দরে জরুরি কোন ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট নেই, যা প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। নিহত তামান্নার জানাজা গতকাল দুপুরে নিকুঞ্জ-২-এর ৫ নম্বর রোডের মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়।

জওয়ানদের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা যায় না -রাজনাথের হুঁশিয়ারি

ভারতীয় জওয়ানদের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশীদের প্রতি হুমকি দিয়েছেন। বলেছেন, গরু পাচার বন্ধ করে বাংলাদেশীদের গরুর মাংস থেকে বঞ্চিত রাখুন। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের প্রতি এক নির্দেশনায় তিনি এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এ খবর দিয়েছে ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই। রাজনাথ সিং দু’দিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসেছেন। তিনি সীমান্ত রক্ষার জন্য কি দরকার এমন প্রশ্ন রাখেন। তারপর বলেন, আমাদের জওয়ানদের ওপর আক্রমণ হবে এটা তো মেনে নিতে পারি না। তারা আত্মরক্ষার জন্যও গুলি করতে পারে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আমাদের প্রতিবেশী দেশ। তাদের সঙ্গে রয়েছে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আমরা চাই ভবিষ্যতেও আমাদের সেই সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ থাকুক। তবে সেই সম্পর্ক আমাদের জওয়ানদের প্রাণের বিনিময়ে হতে পারে না। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার একটি ভাসমান সীমান্ত চৌকি পরিদর্শনকালে তিনি এসব মন্তব্য করেন। ইউপিএ সরকারের সময়ে বিএসএফ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণহানি কমানোর জন্য প্রাণঘাতী এমন অস্ত্রের ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। তবে বাংলাদেশ সরকারে উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় না থাকার বিষয়ে বক্তব্য রেখেছেন রাজনাথ। তার কথায়, সীমান্ত তো রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন আছে। বিএসএফের হিসাবে গত তিন বছরে কমপক্ষে ৩ জন জওয়ান নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫০০। এটা ঘটেছে সীমান্তে পাচারকারীদের হামলায়। ওদিকে তার পশ্চিমবঙ্গ সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর জবাবে রাজনাথ বলেছেন, তার এ সফর সরকারি পর্যায়ের। মমতা বলেছেন, এটা কি সরকারি সফর নাকি রাজনৈতিক সফর। রাজনাথ তারই জবাবে ওই কথা বলেন। তিনি বিএসএফকে নির্দেশ দেন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কড়া প্রহরা বসাতে, যাতে ভারতের কোন গরু বাংলাদেশে না যায়। এতে বাংলাদেশের মানুষ গরুর মাংস খাওয়া বাদ দেবে। তিনি বলেন, আমাকে সম্প্রতি বলা হয়েছে, সীমান্তে গরু পাচারের বিরুদ্ধে বিএসএফ কড়া নজরদারি করার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম শতকরা ৩০ ভাগ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, তাই আমি আপনাদেরকে অনুরোধ করবো নজরদারি আরও কঠোর করতে, যাতে বাংলাদেশে কোন গরু পাচার হয়ে না যায়। এতে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম বৃদ্ধি পাবে শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ। এটা হলে বাংলাদেশের মানুষ গরুর মাংস খাওয়া ছেড়ে দেবে। সরকারি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে ভারত থেকে ১৭ লাখ গবাদি পশু পাচার হয়ে এসেছে বাংলাদেশে। এ ছাড়া গত রোববার তিনি বলেছেন, এনডিএ সরকার দেশজুড়ে গরু জবাই নিষিদ্ধ করার দিকে এগুবে। তিনি বলেন, ভারতে গরু জবাইকে মেনে নেয়া যায় না। আমরা গরু জবাই পুরোপুরি বন্ধে সচেষ্ট হবো। এজন্য জনমত গড়ে তুলব।

সালাহউদ্দিনকে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুলিশের প্রতিবেদন

নিখোঁজ সালাহউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। গত ২৩শে মার্চ এ প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে পাঠিয়েছেন পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইজি (রাজনৈতিক/ছাত্র-শ্রম) মাহবুব হোসেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৬ই জানুয়ারি থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি আহ্বান করেন। এরপর থেকে তা অব্যাহত রয়েছে। রুহুল কবির রিজভী গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ দলের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সালাহউদ্দিন আহমেদ বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে আত্মগোপনে অজ্ঞাত স্থান থেকে বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের পক্ষে কর্মসূচি ঘোষণা ও বিবৃতি দিয়ে আসছিলেন। গত ১১ই মার্চ রাত পৌনে ১১টায় সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ উত্তরা পশ্চিম থানায় হাজির হয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানান, ১০ই মার্চ আনুমানিক নয়টা থেকে ১০টার মধ্যে উত্তরা ৩নং সেক্টরস্থ ১৩বি রোডের ৪৯/বি বাড়ির ২য় তলা থেকে তার স্বামী সালাহউদ্দিন আহমেদকে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।
ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে: উত্তরা পশ্চিম থানায় ১১ই মার্চ রাতে হাসিনা আহমেদের কাছ থেকে গত ১০ই মার্চ তার স্বামী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ উত্তরা থেকে নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়। হাসিনা আহমেদ ওসি উত্তর পশ্চিম থানাকে জানান, দুবাই থেকে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি তাকে ফোনে জানিয়েছে, উত্তরা ৩নং সেক্টরস্থ ১৩বি রোডের ৪৯/বি বাড়ির ২য় তলা থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদকে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে গিয়েছে। হাসিনা আহমেদ উত্তরার ওই ঠিকানার বাড়িতে বসবাস করেন না এবং ঘটনার সময়ে তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাধারণ ডাইরি নং-৬৩৪ তারিখ ১১-০৩-১৫ মোতাবেক হাসিনা আহমেদের মৌখিক বক্তব্য নোট করে সালাহউদ্দিন আহমেদের নিখোঁজ সংক্রান্তে তদন্তের জন্য ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তথ্য সংগ্রহকালে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ৩নং সেক্টরস্থ ১৩ বি রোডের ৪৯/বি ৩ তলা বাড়ির প্রকৃত মালিক মৃত ড. সিরাজ-উদ্দৌলা। বর্তমানে তার মেয়ের পক্ষে ধানমন্ডি নিবাসী জনৈক রেজা (০১৭১৫০৪৪৮৫৫) তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে বাসাটির ভাড়া প্রদানসহ দেখাশুনা করেন। ওই বাসার নিচতলার পশ্চিম পার্শ্বে গ্যারেজ, পূর্ব পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া জনৈক আহসানের গোডাউন এবং সেখানে ডেলিভারিম্যান সাইফুল (০১৮৪০৭৩৭৭৩০) বসবাস করেন। ২য় তলার পূর্ব পার্শ্বে ভাড়াটিয়া ড. সুকান্ত করিম বসবাস করেন। ২য় তলার পশ্চিম পার্শ্বে ভাড়াটিয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের ডিএমডি হাবিব হাসনাত (০১৭১৩০৪২৪৮২) এবং তার স্ত্রী সুমনা (০১৭১১৫২২৫৮২) বসবাস করেন। ৩য় তলার পূর্ব পার্শ্বে ভাড়াটিয়া জনৈক খসরু (০১৬৭৮০৩০৬৩৩) এবং পশ্চিম পার্শ্বের ফ্ল্যাটে মেজর (অব.) হাসিব (০১৭৩০৩৫২৭৬৫) বসবাস করেন। বাড়ির নিচতলায় আশরাফুল ও আক্তার নামে ২ জন দারোয়ান আছে। বাসার ২য় তলার পশ্চিম পার্শ্বে ফ্ল্যাটের দরজা তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ঘটনাস্থল বাড়ির দারোয়ান আক্তার জানান, পশ্চিম পার্শ্বের ভাড়াটিয়া হাবিব হাসনাত ৪ দিন আগে সস্ত্রীক বাসা ছেড়ে চলে যান এবং যাওয়ার সময় রায়হান নামে একজন মেহমানকে বাসায় রেখে যান। দারোয়ান আক্তার আরও জানান, বিভিন্ন সময়ে ২য় তলায় পশ্চিম ফ্ল্যাটে থাকা মেহমানের কাছে গাড়ি নিয়ে অন্য মেহমানদের আসা যাওয়া ছিল। গত ১০ই মার্চ রাত আনুমানিক ৯টার দিকে ৪/৫ জন মেহমান হাসনাত সাহেবের বাসায় আসেন। অনুমান আধাঘণ্টা পর রায়হান নামীয় মেহমান বাসায় আসা লোকদের সঙ্গে নিচে নেমে গাড়িতে করে চলে যান। বাসায় আগত লোকদের মধ্যে কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক পরিহিত ছিল না। বাসা থেকে কাউকে জোর করে বা হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যেতে সে দেখেনি বলে জানায়। অন্য ভাড়াটিয়ারা ঘটনার বিষয়ে কিছু জানে না বলে জানায়। এমনকি পাশের ফ্ল্যাটে বসবাসরত ড. সুকাস্তা করিম উল্লিখিত সময়ে বাসায় অবস্থান করলেও তার পাশের ফ্ল্যাটে জোরপূর্বক দরজা খোলার শব্দ বা কোন ব্যক্তির আগমন বা প্রত্যাগমনের কোন আভাস পাননি বলে জানান। সালাহউদ্দিন আহমেদ উত্তরার বর্ণিত বাড়িতে অবস্থান করছিলেন এবং তাকে সেখান থেকে কেউ গ্রেপ্তার বা অপহরণ করেছে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে না পারায় উত্তরা পশ্চম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনার বিষয়ে উত্তর পশ্চিম থানার জিডি নম্বর-৬৮৭ তারিখ ১২-০৩-১৫ লিপিবদ্ধ করেন। তথ্যানুসন্ধান কালে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সালাহউদ্দিন আহমেদকে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কোন সদস্য কর্তৃক গ্রেপ্তার করার তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে ‘প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে যা বলা হয়েছে: বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার হওয়ার পর তা সারা দেশে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাতের আঁধারে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদকে তুলে নেয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি এ ঘটনায় ক্ষোভ ও তীব্র নিন্দা জানিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এক বিজ্ঞপ্তিতে সালাহউদ্দিন আহমেদকে আদালতে হজির না করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক তাকে গ্রেপ্তারের কথা প্রকাশ না করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিএনপির বর্তমান মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লাহ বুলু এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, সরকারের নিষ্ঠুরতার সর্বশেষ শিকার সালাহউদ্দিন আহমেদ। তাকে নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নিষ্ঠুর পরিহাসমূলক বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে অভিযোগ করেছেন যে, সালাহউদ্দিনকে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া অধ্যাপক ডা. এমএ মাজেদসহ ১১০১ চিকিৎসক সালাহউদ্দিন আহমেদের নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন।
সালাহউদ্দিনকে নিয়ে হাইকোর্টে মিস কেস সংক্রান্ত বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ গত ১২ই মার্চ সালাহউদ্দিন আহমেদকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন। আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও বিচারপতি গোবিন্দা চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রুল দেন। আদালত জানতে চান সালাহউদ্দিনকে কেন খুঁজে বের করে ১৫ই মার্চ সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে আদালতে হাজির করা হবে না। এ সংক্রান্তে সুপ্রিম কোর্ট বিভাগের ক্রিমিন্যাল মিসসিলেনিয়াস কেস নম্বর ৯৯৩২ অব ২০১৫ তারিখ ১২-০৩-১৫ দায়ের করা হয়েছে। আবেদনকারী হাসিনা আহমেদ এবং রেসপনডেন্ট হিসেবে রয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিবসহ মোট ৮ জন। গত ১৫ই মার্চ যথাসময়ে সকল রেসপনডেন্টগণ হাইকোর্টে জবাব দাখিল করেছেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে রুজুকৃত মামলার বিবরণ: পুলিশের প্রতিবেদনে সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ১৭টি মামলার বিবরণ দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অনুসন্ধানকালে রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ১. তেজগাঁও থানার মামলা নং ১৮(২)১৩ তারিখ ১০-০২-১৩, ২. মতিঝিল থানার মামলা নং-৩৫(৩)১৫ তারিখ ২৫-০৩-১৩, ৩. পল্টন থানার মামলা নং-০২(৪) ১৩, তারিখ ০২-০৪-১৩, ৪. সবুজবাগ থানার মামলা নং ৭(৪)১৩ তারিখ ০২-৪-১৩, ৫. মতিঝিল থানার মামলা নং ০৬(৪)১৩ তারিখ ০১-০৪-১৩, ৬. তেজগাঁও শেরে বাংলা নগর থানার মামলা নং-০৯(১২)১২, তারিখ ০৩-১২-১২, ৭. গুলশান থানার মামলা নং-৩৫(৬)০৭ তারিখ ১৪-০৬-০৭, ৮. চকোরিয়া থানার মামলা নং-০৯(৫)০৭ তারিখ ০১-০৫-০৭, ৯. গুলশান থানার মামলা নং-০২(৪)০৭, তারিখ ০১-০৪-০৭, ১০. চকোরিয়া থানার মামলা নং ১৯(৪)০৭ তারিখ ০৪-০১-০৭, ১১. চকোরিয়া থানার মামলা নং-১৩(২)০৭, তারিখ ০১-০২-০৭, ১২. চকোরিয়া থানার মামলা নং-১৭(২)০৭, ১৩. চকোরিয়া থানার মামলা নং-১৮(০২)০৭, ১৪. চকোরিয়া থানার মামলা নং-২৩(০২)০৭, ১৫. শাহবাগ থানার মামলা নং-৬০(৫)০৭, ১৬. গুলশান থানার মামলা নং-২৫(২)১৫, তারিখ ১৬-০২-১৫ এবং ১৭. ভাটারা থানার মামলা নং-১১(২)১৫ মামলাগুলোর তথ্য পাওয়া গেছে।
সালাহউদ্দিনের নিখোঁজ নিয়ে পর্যালোচনা: সালাহউদ্দিনের নিখোঁজ নিয়ে একটি পর্যালোচনা দেয়া হয়েছে পুলিশের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় অজ্ঞাত স্থান থেকে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং বিবৃতি দিয়ে আসছিলেন। তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। হাসিনা আহমেদ তার স্বামী নিখোঁজ হওয়ার যে সময় বলেছেন তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেননি। উত্তরার যে বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদকে অপহরণ করা হয় বলে হাসিনা আহমেদ উল্লেখ করেছেন সেখানে হাসিনা আহমেদ কোন দিন যাননি। এমনকি ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পরও তিনি ঘটনা জানতে উত্তরার বাসায় যাননি। ওই বাসার কোন ভাড়াটিয়া অপহরণের ঘটনার বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি। তবে কথিত ঘটনাস্থল বাড়ির দারোয়ান আক্তার জানিয়েছে, ওই বাসার ভাড়াটিয়া হাবিব হাসনাত ৪ দিন পূর্বে তার বাসায় রায়হান নামীয় একজন মেহমানকে রেখে সস্ত্রীক অন্যত্র চলে যান এবং ১০ই মার্চ বর্ণিত ফ্ল্যাটে ০৪/০৫ জন ব্যক্তি এলে ওই ফ্ল্যাটে আগে থেকে অবস্থানরত মেহমানটি তাদের সঙ্গে গাড়িযোগে চলে যান যা রহস্যজনক। দারোয়ান আক্তার আরও জানান, সালাহউদ্দিন আহমেদ নামে কাউকে সে চিনে না। এমন অবস্থায় সালাহউদ্দিন আহমেদের উত্তরায় হাবিব হাসনাতের বাসা থেকে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি রহস্যময় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে ‘নিখোঁজ’ নিয়ে মতামত বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের নিখোঁজ নিয়ে প্রতিবেদনে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছে পুলিশ। এতে বলা হয়, সালাহউদ্দিন আহমেদ বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ গত ১১ই মার্চ রাতে উত্তরা পশ্চিম থানায় হাজির হয়ে জানান, তার স্বামীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে উত্তরার এক বাসা থেকে গত ১০ই মার্চ রাতে তুলে নিয়ে গেছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সালাহউদ্দিন আহমদের কথিত অপহরণের বিষয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারকে চাপের মধ্যে ফেলতে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করতে কোন স্বার্থান্বেষী মহল দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর নাম দিয়ে এ ঘটনা ঘটাতে পারে বলে অনেকের ধারণা। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিখোঁজ সালাহউদ্দিন আহমদের সন্ধানে তৎপরতা আছে। তবে এই ধূম্রজাল ভেদ করে ঘটনর প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, পুলিশ প্রতিবেদনের সঙ্গে দুইটি জিডির কপি এবং আইন কর্মকর্তার প্রতিবেদন যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।

‘বাবুজি ভোট না আইলে দেশে শান্তি আইবো না?’ by ইমাদ উদ দীন

‘ভোট লইয়া আর কতদিন মারামারি হইব। দেশে কি নৌকা আর ধান ছড়ার ভোট আইবো না। বাবুজি ভোট না আইলে বুজি দেশে শান্তি আইবো না?’।
গত ২৯শে মার্চ জেলার জুড়ী উপজেলা উপনির্বাচনে বাগান এলাকার ভোটকেন্দ্রে সংবাদকর্মীদের কাছে দেশের চলমান অস্থিরতার খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে এভাবেই প্রশ্ন রাখেন চা শ্রমিকরা। জেলার ৯২টি চা বাগানের মধ্যে জুড়ীতে রয়েছে ৯টি চা বাগান। এখন অবাধ তথ্য-প্রযুক্তির সুবাদে তারাও কাজের ফাঁকে দেশ-দুনিয়ার খবর রাখার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেকেই জানান, সন্ধ্যার পর স্থানীয় বাজারগুলোতে বসেই টিভিতে সংবাদ দেখেই দেশ-দুনিয়ার খবর নেন। তথ্য এখন তাদের হাতের নাগালেই। তারা আরও জানালেন তাদের দৈনিক হাজিরা না বাড়লেও কষ্ট করে হলেও তাদের সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। লেখাপড়া না শিখলে বাবুজি না খাইয়া মরতে হয়। বাবুজি আমরা মরছি আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যাতে না মরে সে জন্য সরকারের কাছে বাগান এলাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল চাই। দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে প্রতিটি খাতে। চা ও রাবার শিল্পের রাজধানী হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজারের এ শিল্পগুলোতেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। চা-পাতা ও রাবার সময়মতো ঢাকা ও চট্টগ্রামে না পাঠাতে পারায় অধিকাংশ বাগানের কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে। গত ৩ মাস ধরে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মালিকরা। শুষ্ক মওসুমে বাগানগুলোতে পাতা উত্তোলন কম হয় তারপরও যা সংগ্রহ হচ্ছে ও আগের স্টকে ছিল সেগুলোও ঢাকা ও চট্টগ্রামে না পাঠাতে পারায় আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আর আগত বর্ষা মওসুমেও দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যদি উৎপাদিত কাঁচামালগুলো চট্টগ্রাম ও ঢাকায় না পাঠানো যায় তাহলে বাগানগুলোও অচল হয়ে পড়বে। কারণ বর্ষা মওসুমই চা পাতা ও রাবারের কাঁচা মাল উৎপাদনের উৎকৃষ্ট সময়। নির্বাচনের দিন শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপে এমনটি জানালেন তারা। নির্বাচন না হলে যে, দেশে শান্তি আসবে না আর চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতাও কমবে না এটা বুঝতে পেরেই তারা নির্বাচনের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। কারণ হরতাল-অবরোধের কারণেই তাদের আদি পেশার এ শিল্পটি প্রতিদিনই ক্ষতির শিকার হচ্ছে। জুড়ী উপজেলা উপনির্বাচনে বাগান এলাকার কেন্দ্রগুলোতেই ভোটারদের সরব উপস্থিতি দেখা গেলেও বস্তি বা শহর এলাকায় চোখে পড়ার মতো ভোটাররা একসঙ্গে ভোটকেন্দ্রে আসেননি। চা শ্রমিকরা যে উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিয়েছেন কিংবা ভোটকেন্দ্রে এসেছেন সেটা বাগান এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও তেমন পরিলক্ষিত হয়নি। এমন কারণ জানতে অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়। তারা অনেকেই জানালেন দেশের  চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কোন সুন্দর সমাধান না হওয়ায় তারা রাজনীতি, রাজনীতিবীদ ও ভোটের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না। এজন্য আগের মতো ভোটের প্রতিও মানুষের আগ্রহ থাকছে না। তারা মনে করেন, ভোট দিলেও যা, না দিলেও তা।  জুড়ীর মানিক সিং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩৮৯১ জন ভোটারের মধ্যে সকাল ৮ থেকে ৯টা ৫ মিনিট পর্যন্ত ভোট পড়ে মাত্র ১৫৫টি। এর কারণ হিসেবে এ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা হামিদপুর গ্রামের বয়োবৃদ্ধ সাবেক ইউপি সদস্য হাজী মো. রেজান আলী বলেন, দেশে হানাহানি, মারামারি, খুন, গুম আর হরতাল-অবরোধ থামাতে সকলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচনের প্রয়োজন। এ সময় তার কথার সঙ্গে সায় দিলেন আরও অনেকেই। সৈকত সিংহ পাল বলেন, সকলের  অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন না হলে দেশে বয়ে চলা অশান্তি দূর হবে না। আমরা বাগান এলাকার লোকজন সবসময়ই শান্তিপ্রিয়, তাই আমরা শান্তির পক্ষে। আমরা ভোট পছন্দ করি, তাই এই উপনির্বাচনে বাগানের বেশির ভাগ ভোটার তাদের ভোট দিচ্ছেন। তাদের সরব উপস্থিতিও লক্ষ্যণীয়। এ সময় তার কথার সঙ্গে সায় দিলেন অঙ্গন নায়েক, রাজকুমারসহ অনেকেই। জুড়ী উপজেলা উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ভোটের আগে যে রকম উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল ভোটের দিন ভোটারের উপস্থিতি সে রকম লক্ষ্য করা যায়নি। জুড়ী উপজেলা উপনির্বাচনে প্রয়াত চেয়ারম্যান এমএ মুহিত আসুকের স্ত্রী গুলশানআরা মিলি ২২ হাজার ৪৫৫ ভোট পেয়ে সিলেট বিভাগের প্রথম মহিলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। জুড়ী উপজেলার দুইবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা এমএ মুহিত আসুকের মৃতুতে আসনটি শূন্য হয়।

চার দিনেও গ্রেপ্তার হয়নি কাবেরির হত্যাকারী

রাজধানীর মিশন ইন্টারন্যাশনাল কলেজের প্রভাষক কৃষ্ণা কাবেরি মণ্ডল হত্যার চার দিন অতিবাহিত হলেও চিহ্নিত আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ নিয়ে নিহতের পরিবারের সদস্যরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের ধারণা, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় রয়েছে আসামি কেএম জহিরুল ইসলাম ওরফে পলাশ। পুলিশ জানিয়েছে, জহিরুলকে গ্রেপ্তার করতে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও ডিবি পুলিশ এ বিষয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে। যে কোন সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) উপপরিচালক শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের বাসায় হামলা ও তার স্ত্রী কৃষ্ণাকে হত্যা মামলার একমাত্র আসামি কেএম জহিরুল ইসলাম। সে শেয়ার লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজ লিমিটেডের গুলশান শাখার ব্যবস্থাপক। ঘটনার পরদিন ৩১শে মার্চ সকালে গুলশান-১ ওই ব্রোকার হাউজে ছিল সে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার এক সহকর্মী জানিয়েছেন, এ সময় তাকে অন্যমনস্ক মনে হয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টার পরে হঠাৎ একটি কল আসে তার ফোনে। এ সময় বনানীতে যাচ্ছেন বলে বের হয়ে যায় জহিরুল। তারপর থেকেই সে লাপাত্তা। জহিরুল বের হয়ে যাওয়ার কিছু সময় পরেই তার খোঁজ নিতে ওই প্রতিষ্ঠানে যায় পুলিশ। কিন্তু তাকে আর পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপ-পরিদর্শক মাহাবুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডে জহিরুলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করতে বিভিন্নস্থানে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। তার পল্লবীর বাসায় অভিযান চালালেও সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। এ ঘটনার চারদিন অতিবাহিত হলেও আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শীতাংশুর ভাই হিমাংশু শেখর বিশ্বাস। বরিশাল বিএম কলেজের শিক্ষক হিমাংশু বলেন, হত্যাকারীর নাম, ঠিকানা সবই দেয়া হয়েছে পুলিশকে। তার পরও চারদিন চলে গেছে রহস্যজনকভাবে তাকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না। পুলিশ জানিয়েছে, এই মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে পুলিশ। কিন্তু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শীতাংশু শেখর বিশ্বাস ও তার দুই কন্যা শ্রাবণী বিশ্বাস শ্রুতি ও অদ্রিতা বিশ্বাস অদৃতি অসুস্থ থাকায় তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেয়া যায়নি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (তেজগাঁও জোন) উপকমিশনার (তেজগাঁও) বিপ্লব কুমার বিশ্বাস বলেন, জহিরুলকে গ্রেপ্তার করতে তার বাসাসহ বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে শীতাংশু বিশ্বাস ও তার দুই মেয়ের কাছ থেকে আরও তথ্য প্রয়োজন। কিন্তু অসুস্থ থাকার কারণে তাদের কাছ থেকে সেভাবে তথ্য নেয়া যায়নি বলে জানান তিনি। শীতাংশুর স্বজনরা জানান, ঘটনার পর থেকে শীতাংশুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শ্রাবণী বিশ্বাস শ্রুতি এ বিষয়ে পুলিশসহ স্বজনদের তথ্য দিয়েছে। এমনকি শীতাংশুর সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ। তবে অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ সময় কথা বলতে পারেননি তারা। বুধবার রাতে শীতাংশু ও শ্রুতির মাথায় অস্ত্রোপচার করেছেন চিকিৎসকরা। শেষ রাতে জ্ঞান ফিরে শীতাংশু ও শ্রুতির। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তারা এখন আশঙ্কামুক্ত। শীতাংশুর স্ত্রী নিহত কৃষ্ণা কাবেরী মণ্ডলের বোন দীপা মল্লিক জানান, অসুস্থ থাকার কারণে কৃষ্ণার মৃত্যুর সংবাদ জানানো হয়নি শীতাংশু ও তার দুই কন্যাকে। যে কারণে কৃষ্ণার লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের মরচ্যুয়ারিতে রাখা হয়েছে। দীপা বলেন, দাদা (শীতাংশু) আরেকটু সুস্থ হলেই তাকে এ বিষয়ে জানানো হবে। তার ইচ্ছানুসারেই কৃষ্ণার শেষকৃত্য হবে বলে জানান তিনি। স্ত্রী কৃষ্ণা কাবেরী মণ্ডল ও দুই কন্যা শ্রুতি এবং অদ্রিতাকে নিয়ে ইকবাল রোডের ৩/১২ নম্বর পাঁচতলা বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাটে থাকেন বিআরটিএ’র উপপরিচালক শীতাংশু শেখর বিশ্বাস। তার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি থানার ডহর গ্রামে। তার পিতার নাম যতীন্দ্র নাথ বিশ্বাস। গত ৩০শে মার্চ রাতে ওই বাসাতেই হত্যা করা হয় শীতাংশুর স্ত্রী কৃষ্ণা কাবেরী মণ্ডলকে। এ ঘটনায় আহত শীতাংশু ও তার দুই কন্যা মেট্রোপলিটন মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার একমাত্র আসামি কেএম জহিরুল ইসলাম ওরফে পলাশ। সে পল্লবীর ১৪ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় থাকতো। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহী জেলার বোয়ালিয়া থানার রামচন্দ্রপুরের ২৩০ স্কাইভিউ সাধুরনীড়। তার পিতার নাম কেএম শহীদুল ইসলাম।

তিনি একা by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

তার আশপাশে তখন অনেক মানুষ। কেউ প্রয়োজনে, কেউবা অপ্রয়োজনে। কেউই কাছ-ছাড়া হতে চান না। থাকতে চান কাছে কাছেই। কিন্তু আজ তিনি বড় একা। কেউ নেই তার পাশে। কেমন আছেন খোঁজ নিতে চান না কেউই। ভাল নেই তিনি। দিন কাটছে হাসপাতালের বেডে শুয়ে। তাও কারাবন্দি হিসেবে। তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। সাময়িকভাবে পদহারা। তাই বোধহয় সঙ্গীহারাও।
সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই যেন আরিফুল হক চৌধুরীর দুঃসময়ের শুরু। তখন মেয়র পদে থাকলেও চলে গিয়েছিলেন আত্মগোপনে। খুব ঘনিষ্ঠজন ছাড়া কেউ তার সাক্ষাৎ পাননি। অবশ্য তখন থেকে সাক্ষাৎপ্রার্থীর সংখ্যাও কমে যেতে থাকে। ‘ডুবন্ত নৌকা’য় পা দিয়ে কে আর ‘ডুবতে’ চায়। কমতে শুরু করে মেয়র আরিফের শুভাকাঙ্ক্ষীর সংখ্যা। সিলেট নগরীর কুমারপাড়াস্থ যে বাসা গমগম করতো ‘শুভার্থী’দের পদভারে, ক্রমেই সেখান থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে তাদের পদচিহ্নগুলো।
সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জশিট গৃহীত হওয়ার পর ২০১৪ সালের ৩০শে ডিসেম্বর হবিগঞ্জ আদালতে উপস্থিত হয়ে নিজেকে আইনের হাতে সমর্পণ করেন আরিফুল হক চৌধুরী। জামিন শুনানি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। শুরু হয় আরিফের বন্দিজীবন। হবিগঞ্জ কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে ৩১শে ডিসেম্বর গভীর রাতে তাকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। প্রায় আড়াই মাস হাসপাতালের ১০০১ নম্বর ভিআইপি কেবিনে থাকার পর গত ৭ই মার্চ তাকে আবার পাঠানো হয় কারাগারে। তবে এ যাত্রায় আর তাকে হবিগঞ্জ ফিরিয়ে আনা হয়নি। বন্দি হন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে, ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুর সঙ্গে একই সেলে। পরিবারের অভিযোগ, পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই তাকে জোর করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। এমন অভিযোগে ২৩শে মার্চ হাইকোর্টে রিট করেন আরিফুল হক চৌধুরী। এমন অবস্থায় আরিফুল হকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ২৮শে মার্চ বিকালে তাকে কারা কর্তৃপক্ষ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। প্রথমে হাসপাতালের ১০৫ নম্বর ভিআইপি কেবিনে ভর্তি করা হলেও এখন আছেন ৪৭ নম্বর জেনারেল কেবিনে।
আরিফুল হক চৌধুরী মামলায় জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা সরে পড়তে থাকেন। এমনকি তার পারিষদের সদস্যরাও তার পক্ষে জোর গলায় কথা বলেননি। ‘পক্ষকালব্যাপী’ কর্মসূচি ঘোষণা করলেও তা ছিল অনেকটা দায়সারা। ‘গণস্বাক্ষর’ ‘কর্মবিরতি’র মতো ঢিলেঢালা কর্মসূচির মাধ্যমেই তার পারিষদ তাদের দায়িত্ব শেষ করেন। আর আরিফ যখন কারাগারে, তখন তো তাকে ভুলে কাউন্সিলররা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তার রেখে যাওয়া চেয়ারের দখলের লড়াইয়ে। মেয়র প্যানেলের দুই সদস্যের পক্ষ হয়ে তারা ভাগ হয়ে পড়েন দুই দলে। সে লড়াই এখন হাইকোর্টে মীমাংসার অপেক্ষায়।
আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র থাকাকালে তার চারপাশে লোকজনের অভাব ছিল না। কাজে-অকাজে ছিলেন। তার কাছাকাছি থাকা মুখগুলোর অনেকগুলোই সিলেটের চেনাজানা মুখ। ব্যবসায়ী মিজান আজিজ চৌধুরী সুইট, ইশতিয়াক সিদ্দিকী, মাহবুবুল হক চৌধুরী, জুরেজ আবদুল্লাহ গুলজার, মঈন উদ্দিন সুহেল। ছিলেন আরও অনেকে। তালিকায় আছে অসংখ্য নাম। কথা হয়, বিএনপি নেতা মাহবুবুল হক চৌধুরী ও জুরেজ আবদুল্লাহ গুলজারের সঙ্গে। তারা দুজনই হাল নাগাদ তথ্য দিলেন। বললেন, ‘যতদূর পারি চেষ্টা করি আরিফ ভাইয়ের খবর রাখতে।’
আরিফুল হক চৌধুরীর শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ী মিজান আজিজ চৌধুরী সুইটও বললেন তিনিও নিয়মিত খবর রাখছেন আরিফুল হক চৌধুরীর। হাসপাতালেও বেশ কয়েকবার দেখতে গেছেন তাকে। মিজান আজিজ মানবজমিনকে তথ্য দেন, শুরু থেকেই হাসপাতালে আছেন আরিফুল হক। তবে মাঝে ফিরে গিয়ে ২১ দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন আরিফুল এ খবর নেই তার কাছে। আরিফ প্রসঙ্গে অবশ্য তিনি ফোনে আর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি। সামনাসামনি কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করে মিজান আজিজ বলেন, ‘আপনার ফোনও রেকর্ড হয় আমার ফোনও রেকর্ড  হয়।’ মিজান আজিজের মতো সতর্কতার সুর শোনা যায় আরিফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আরও অনেকের কণ্ঠেও। তবে তারা প্রত্যেকেই বলছেন নিজেদের জন্য নয় তারা সতর্ক মেয়র আরিফের জন্যই। 

প্রার্থী নিয়ে নানা সমীকরণ বিএনপিতে- নতুন প্ল্যাটফরম ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’ by কাফি কামাল

ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীর সমর্থন নিয়ে নানা সমীকরণ চলছে বিএনপিতে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে এমন পরিস্থিতি। এদিকে বিএনপিপন্থি বিশিষ্ট নাগরিকদের সংগঠন ‘শত নাগরিক’-এর উদ্যোগে বিএনপির নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’ নামে নতুন প্ল্যাটফর্ম। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা এই ব্যানারেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। ওদিকে দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আবদুল আউয়াল মিন্টু। বারবার নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়া এবং ঢাকা সিটিকে দ্বিখণ্ডিত করার ঘটনায় কিছুটা হতাশাও ছিল তার। সরকার তিন সিটি নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়ার পর ঢাকা উত্তর থেকে ভোটযুদ্ধে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ঢাকা উত্তরে তিনিই ছিলেন বিএনপির মূল এবং একক প্রার্থী। যে কারণে অন্য কেউ ওই এলাকা থেকে মনোনয়নপত্র পর্যন্ত নেননি। বরং ঢাকা দক্ষিণ নিয়ে জটিলতার মধ্যে ছিলেন শীর্ষ নেতৃত্ব। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের প্রার্থী বাছাইয়ের দিন পাল্টে গেছে পরিবেশ। ছোট্ট একটি ভুলের কারণে বাতিল হয়ে গেছে মিন্টুর মনোনয়নপত্র। তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ায় নির্বাচনের আগেই বড় একটি ধাক্কা খেয়েছে বিএনপি। এ ভুল নিয়ে রীতিমতো বিব্রতকর এক পরিস্থিতি পড়েছেন বিরোধী জোটের সবাই। তবে মিন্টুর মনোনয়ন নিয়ে হাল ছাড়ছে না বিএনপি। এখন আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র নিয়ে আপিলের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে দলটির নেতারা। তারা মনে করেন, প্রার্থীর সমর্থনকারী নির্বাচনী এলাকার ভোটার না হওয়ায় কমিশন মিন্টুর মনোনয়ন বাতিল করলেও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিলের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পাবেন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশী চারজনের মধ্যে তিনজনই বাছাইপর্ব উতরে যান। বিরোধী জোটের জন্য স্বস্তির বিষয় হচ্ছে দক্ষিণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ তিনপ্রার্থীই বাছাইপর্বে টিকে গেছেন। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হিসেবে কারাগারে থাকায় সেটা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলছে না। বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা ও ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপির পক্ষে কাজ করা বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে আলাপে এমন তথ্য জানা গেছে। এ ব্যাপারে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ মানবজমিনকে বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলাপের সময় তারা আমাদের ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। কিন্তু প্রশাসনকে তারা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং প্রশাসন তাদের কতটুকু সহযোগিতা করছে তা ওপর নির্ভর করবে সবকিছু। যদিও এখন পর্যন্ত ইতিবাচক কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল জটিলতার ব্যাপারে তিনি বলেন, নির্বাচনকে অর্থবহ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে চাইলে কমিশনকে তার প্রমাণ নিতে হবে। তুচ্ছ একটি কারণে একজন হেভিওয়েট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হবে। মিন্টু আপিল করেছেন, আশা করছি তার মনোনয়নপত্র বৈধ বিবেচিত হবে। আর যদি সেটা না হয় তবে সরকার যে প্রার্থিতা থেকে বঞ্চিত করছে তা দেশবাসী দেখতে পাবে। হান্নান শাহ বলেন, ঢাকা উত্তরে মিন্টুই সবচেয়ে আলোচিত এবং শক্তিশালী প্রার্থী। আপিল নিষ্পত্তির পরপরই আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব। তার মনোনয়নপত্র যদি বৈধ না হয় তবে আমাদের তাৎক্ষনিকভাবে বিকল্প সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নতুন ব্যানার ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’
এদিকে জাতীয়তাবাদী ঘরানার বিশিষ্ট নাগরিকদের সংগঠন ‘শত নাগরিক’-এর ব্যানারেই নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেছিল বিএনপি। দলের নেতারা জানিয়েছিলেন, শত নাগরিক সমর্থিত প্রার্থীই পাবে তাদের সমর্থন। তবে ‘শত নাগরিক’-এর নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপি-জামায়াতপন্থি পেশাজীবী সংগঠন ‘বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ’-এর নেতাদের মধ্যে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদী ঘরানার সকল পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’- শীর্ষক নতুন প্ল্যাটফর্ম। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা এ ব্যানারেই নির্বাচনে অংশ নেবেন। নতুন এ প্ল্যাটফর্ম গঠনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শত নাগরিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বাধীন শিক্ষক প্রধান একটি সংগঠন। অন্যদিকে সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনগুলো ‘স্বল্প পরিসরের’ একটি সংগঠনের নেতৃত্বে কাজ করার ক্ষেত্রে সাংগঠনিক জটিলতা রয়েছে। এছাড়া বিএনপির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন সংগ্রামে পেশাজীবীদের যে সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে তার প্রেক্ষিতে শত নাগরিকের নেতৃত্বে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের বিষয়টি তারা মেনে নিতে পারছিলেন না। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রথম দিকে শত নাগরিক-এর সঙ্গে থাকলেও পরে সরে যান। এমন পরিস্থিতি সবার সমন্বয়ে একটি সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম গঠনের নির্দেশনা দেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। যদিও নতুন প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্ব দেবেন প্রফেসর এমাজউদ্দীনই। এ ব্যাপারে এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ঢাকা সিটি নির্বাচন পরিচালনার মতো সাংগঠনিক কাঠামো শত নাগরিকের নেই। এ জন্য নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে এমাজউদ্দীন আহমেদ নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের বিষয়টি জানিয়ে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সবার সমন্বয়ে ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’ প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়েছে। এটারও নেতৃত্ব আমিই দেবে।
নির্বাচন পরিচালনায় দ্বিমুখী তৎপরতা
দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপিপন্থি বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদের প্ল্যাটফর্ম ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’-এর পাশাপাশি দলের নেতারাও নেপথ্যে নির্বাচন পরিচালনায় অংশ নেবেন। ‘বাসযোগ্য ঢাকা চাই’ ব্যানারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই তারা সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে তৎপরতা চালাবেন। সূত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণের দলীয় কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল, যুগ্ম আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন আহমেদ ও আবু সাঈদ খোকনসহ কয়েকজন। অন্যদিকে ঢাকা উত্তরের কমিটিতে নেতৃত্বে থাকবেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লাহ বুলু, নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এমএ কাইয়ুম ও এসএ খালেকসহ কয়েকজন। এদিকে মেয়র পদে সমর্থনের পাশাপাশি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়টিও। বিরোধী জোট নেতারা জানান, কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভাল করতে পারলে তার ইতিবাচক রেশ পড়বে মেয়র পদে। এছাড়া মেয়রের পাশাপাশি সর্বাধিক কাউন্সিলর পদে বিজয় পেলে মহানগর রাজনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে। ভবিষ্যৎ আন্দোলন সংগ্রামে তাদের সক্রিয় ভূমিকা আদায় করা যাবে। আর এ জন্যই ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটিতে কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থন চূড়ান্ত করতেও সংশ্লিষ্ট কিছু নেতা কাজ করছেন। তৃণমূল নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার বিচারে তারা দলের সমর্থন পাবেন। এছাড়া জোটের শরিকদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা বিচার করে কাউন্সিলর পদে তাদের ছাড় দেয়া হবে।
উত্তরে বিকল্প কে: তাবিথ না মাহী
আপিলের ইতিবাচক নিষ্পত্তির মাধ্যমে আবদুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষিত হলে বিএনপি-সমর্থিত একক প্রার্থী হিসেবে তিনিই মাঠে থাকবেন সেটা নিশ্চিত। সেটা না হলে সমর্থন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বিএনপিকে। সেক্ষেত্রে দলের একটি অংশ থেকে আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়ালকে বিকল্প হিসেবে প্রস্তাব এসেছে। তবে এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে তাবিথ আউয়ালের সক্রিয় রাজনীতিতে অনভিজ্ঞতা ও পরিচয়হীনতা। কেবল বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা মিন্টুর ছেলে এবং একজন তরুণ ব্যবসায়ী হিসেবেই তাকে সমর্থন দিতে হবে। ওদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটে না থাকলেও সমমনা দল হিসেবে পরিচিত বিকল্প ধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী ঢাকা উত্তর থেকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে টিকে আছেন। তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব বর্তমানে বিকল্পধারার সভাপতি এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে। মাহী নিজেও বিএনপি-দলীয় এমপি ছিলেন। তাই এখন বিএনপির কেউ কেউ বিকল্পধারার মাহিকে বিকল্প হিসেবে দেখছেন। তারা যুক্তি দেখিয়ে বলছেন, মাহীকে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেয়া হলে ব্যক্তিগত পরিচিতির কারণে আনিসুল হকের সঙ্গে সমানভাবে লড়তে পারবেন। এছাড়া মাহীকে সমর্থন দিলে সমমনা অন্য দলগুলোও সক্রিয়ভাবে বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটি পথ তৈরি হবে।
দক্ষিণে প্রার্থী সমর্থন প্রায় চূড়ান্ত
এদিকে বিরোধী জোটের একাধিক নেতা জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের তিন বৈধ মেয়র প্রার্থীর মধ্য নিঃসন্দেহে সবার থেকে এগিয়ে থাকবেন ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস। অবিভক্ত ডিসিসি’র সাবেক মেয়র, রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনের একাধিকবারের এমপি হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং সিনিয়র রাজনীতিক নেতা হিসেবে তিনি এখন পর্যন্ত প্রথম পছন্দ। তবে মহানগর বিএনপির রাজনীতি নিয়ে ঢাকা দক্ষিণে তিনি শক্ত বিরোধিতার মধ্যে রয়েছেন। সাবেক মেয়র ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা নিজে নির্বাচন না করলেও তার বসবাস ঢাকা দক্ষিণে। এছাড়া সেখানে তার পছন্দের প্রার্থী সাবেক ডেপুটি মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। এছাড়া অপেক্ষাকৃত তরুণ ও গ্রহণযোগ্য নেতা ড. আসাদুজ্জামান রিপনও বাছাইপর্ব ডিঙিয়েছেন। মির্জা আব্বাস মনোনয়নপত্র সংগ্রহের আগপর্যন্ত আবদুস সালাম এবং ড. রিপনই ছিলেন দক্ষিণের বিএনপি সমর্থক আলোচিত প্রার্থী। তবে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী সাঈদ খোকনের বিপরীতে ভোটের লড়াইয়ে তাদের সামর্থ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে তৃণমূলে। ফলে মহানগর কেন্দ্রিক রাজনীতির কোন্দলকে চাপা দিয়ে ঢাকা দক্ষিণে সমর্থন চূড়ান্তকরণেও রয়েছে জটিলতা। ফলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২০ দল প্রার্থী সমর্থনের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করবে। তবে রাজনীতির বৃহত্তর স্বার্থে মির্জা আব্বাসের প্রতি সমর্থন চূড়ান্ত হলে অন্য দুইজনকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশনা দেবে শীর্ষ নেতৃত্ব।
আতঙ্ক-আশঙ্কা
ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে প্রথম থেকে চলমান আন্দোলন কর্মসূচিকে ব্যাহত করার সরকারি উদ্যোগ হিসেবে দেখেছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। গুরুত্বপূর্ণ তিন সিটিতে নির্বাচন দিয়ে সরকার বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন ব্যাহত করতে চায় এমন আশঙ্কার মধ্যেও ‘ফাঁকা মাঠে গোল’ দিতে না দেয়ার নীতিতে নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্ত আসে শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে। সেই সঙ্গে নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারে বিরোধী জোটের তরফে চলমান আন্দোলনের রুটিন কর্মসূচি হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয় ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরকে। সরকারের প্রতি নিজেদের ইতিবাচক বার্তা দিতে শত নাগরিক ও দলের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির কিছু দাবিও জানানো হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন, সরকার ও প্রশাসনের তরফে তার সাড়া মেলেনি। এদিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে গত তিন মাসে হরতাল-অবরোধে হামলাকার?ী ও অর্থ যোগানদাতাদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সাঁড়াশি অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ এমপি। গতকাল রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমীতে ‘প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ৭১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে’ বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে বিএনপিতে। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনেও এ পরিবেশ নিয়েই উদ্বিগ্ন বিরোধী জোটের নেতারা। জোটের নেতাকর্মীদের নামে মামলা থাকায় তারা ভোটের গণসংযোগে নামতে পারবেন কিনা, নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে পারবেন কিনা এ নিয়ে আশঙ্কা কমছে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, উচ্চ আদালত থেকে স্বল্প সময়ের মধ্যে তারা জামিন পাবেন কিনা এটাও ভাবাচ্ছে তাদের। ফলে গ্রেপ্তারি আতঙ্ক নিয়ে কতটুকু তারা সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারবেন তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

ভোটে থাকতে আপিল মিন্টু-পিন্টুর

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের কাজ শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। বুধবার মেয়র পদপ্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর গতকাল কাউন্সিলর প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই শেষ হয়েছে। প্রাথমিক বাছাইয়ের পর  ১২১৪ জনকে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য যোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এরমধ্যে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিল পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ২৩৫ জন। যাচাই বাছাইয়ের শেষ দিনেও গতকাল সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া উত্তর সিটির রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে এক প্রার্থীকে আটক করেছে শেরেবাংলানগর থানা পুলিশ। অপরদিকে রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আওয়াল মিন্টু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন পিন্টুসহ ২২ জন। ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টু ঢাকা উত্তরের প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। আর নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু মনোনয়নপত্র দিয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণে। দক্ষিণে মেয়র পদে রেজাউল করিম চৌধুরীও তার প্রার্থিতা ফিরে পেতে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করেছেন। শনিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত আপিল গ্রহণ করা হবে। বিভাগীয় কমিশনারই ঢাকা সিটি নির্বাচনের আপিল কর্তৃপক্ষ। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম জানান, মেয়র পদে তিনজনসহ কাউন্সিলর পদের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া ২২ জন আপিল করেছেন। বিভাগীয় কমিশনার মো. জিল্লার রহমান আগামী ৪ঠা এপ্রিল বিকাল সাড়ে ৪টার পর আপিল শুনানি করবেন। মিন্টুর ছেলে তাফসির আউয়াল সাংবাদিকদের বলেন, বাবার পক্ষে আপিল আবেদন জমা দেয়া হয়েছে। শনিবার শুনানি হবে। বুধবার মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের প্রথম দিনে মিন্টুসহ দুই মেয়র পদপ্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন উত্তরের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শাহ আলম। প্রার্থীর সমর্থনকারী আব্দুর রাজ্জাক উত্তর সিটি করপোরেশনের ভোটার না হওয়ায় মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল করার কথা জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও উত্তরে তার বড় ছেলে তাবিথ আউয়ালের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল হয় মামলা সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য না দেয়ায়। আর আয়কর রিটার্নের নথি জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রেজাউল করিম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন দক্ষিণের রিটার্নিং কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদ। বাছাইয়ের পর মেয়র পদে ঢাকা উত্তরে ১৯ জন, দক্ষিণে ২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র  বৈধ করেছে রিটার্নিং কর্মকর্তা। নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, মনোনয়নপত্র বাতিল হলে বাছাইয়ের পর তিন দিনের মধ্যে আপিলের বিধান রয়েছে। আপিল কর্তৃপক্ষ তিন দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করবে। তফসিলে ৯ই এপ্রিল পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় রেখেছে নির্বাচন কমিশন। আপিল নিষ্পত্তি শেষে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে ২৮শে এপ্রিল ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটিতে ভোট হবে।
রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাতে জমাকৃত মনোনয়নপত্র বাছাই শেষ হয়েছে। আজ খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে।
উত্তর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কার্যালয় সূত্র জানায়, সিটি নির্বাচনে ৩৬টি সাধারণ ওয়ার্ডে ৪৯৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে ৪৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ১৩৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ২২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী কর্মকর্তা নওয়াবুল ইসলাম জানান, দক্ষিণ সিটিতে ৬৩৬ জন সাধারণ কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে ১০৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ১৫১ জনের মধ্যে ৩১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে রিটার্নিং অফিসার মিহির সারওয়ার মোর্শেদ বলেন, ব্যাংক, থানা, সিটি করপোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে প্রার্থীদের ব্যাপারে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে স্বচ্ছতার সঙ্গে আমরা বৈধ প্রার্থীদের নির্বাচনের জন্য যোগ্য ঘোষণা করেছি। ১০ই এপ্রিল তাদেরকে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। তিনি বলেন, অযোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য আগামী ৩ দিনের মধ্যে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার বরাবর আপিল করতে পারবেন। আপিলে যারা বৈধ বলে ঘোষিত হবেন তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।
এদিকে গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে এক কাউন্সিলর প্রার্থীকে আটক করেছে শেরেবাংলানগর থানা পুলিশ। আটককৃত ওই প্রার্থীর নাম সাইদুর রহমান। তিনি ঢাকা সিটি উত্তরের ২৮ নং ওয়ার্ডের জামায়াত সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী। গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা সিটি উত্তরের রিটার্নিং অফিসারের অস্থায়ী কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র বাছাই চলাকালে তাকে আটক করা হয়। পুলিশের দাবি, সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। তবে আটক কাউন্সিলর প্রার্থী সাইদুর রহমান তাৎক্ষণিক সাংবাদিকদের জানান, তার বিরুদ্ধে  কোন মামলা নেই। তার বিজয় নিশ্চিত জেনে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে ষড়যন্ত্র করছে। তার মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শাহ আলম জানান, বৈধ ঘোষিত প্রার্থীরা তিন দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন।
এদিকে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেছেন। কোন প্রার্থীকে বিশেষ সুবিধা দেয়া ছাড়াও গোপনে জমাকৃত কাগজের ভুল সংশোধনের সুযোগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।
দক্ষিণ সিটির ২২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী মো. মনিরুল হক বাবু জানান, মহানগর নাট্যমঞ্চের অডিটোরিয়ামে যাচাই বাছাইয়ের সময় অনেক প্রার্থীর কিছু মুদ্রণের ভুল সংশোধন, প্রার্থীর স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া হয়েছে। স্বাক্ষর ছাড়া জমা দেয়া কারও আবেদন বাতিল আবার কারও আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। বাবু আরো অভিযোগ করেন, প্রথম দিনে ইসি’র ওয়েব সাইটে দেয়া হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকলেও গতকাল স্বাক্ষর পাওয়া গেছে। ওয়েব সাইটের গরমিল সংক্রান্ত অভিযোগে তিনি বলেন, মূল কাগজে স্বাক্ষর দেখাচ্ছেন অথচ ফটোকপিতে স্বাক্ষর নেই। এতে প্রমাণিত হয় জমা দেয়ার সময় স্বাক্ষর ছিল না পরে স্বাক্ষর দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে।

ভাল নেই গ্রামীণ ব্যাংক by হামিদ বিশ্বাস

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পদ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে ২০১১ সালের ১১ই মে। ৬০ বছরের চাকরির বয়সসীমার বাধ্যবাধকতার অভিযোগ তুলে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। সে সময় সরকার বলেছিল, ৬০ বছর পূর্ণ হয়ে গেছে। মেয়াদ শেষ। ড. মুহাম্মদ ইউনূস আর গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকতে পারবেন না। এরই মধ্যে কেটে গেছে প্রায় চার বছর। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি ঘটনা- মান, অভিমান কিংবা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা অথবা যে কোন কারণেই হোক না কেন তিনি আর একবারের জন্যও গ্রামীণ ব্যাংকে ফিরে আসেননি। আরও বিস্ময়কর খবর হচ্ছে, দীর্ঘ চার বছরের বিষাদময় এ সময়ে তিনি একই ভবনের ১৬ তলায় অফিস করেন, যা ইউনূস সেন্টার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ২ থেকে ৮ তলায় তারই স্বপ্নের গ্রামীণ ব্যাংক। যা তিনি চট্টগ্রামের জোবরা গ্রাম থেকে তিলে তিলে তৈরি করেন। চলে আসার পর সেখানে তিনি ভুলেও আর পা রাখেননি। গ্রামীণ ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এএসএম মহিউদ্দিন বলেন, এমন অনেক দিন গেছে লিফটে দেখা হয়েছে। জানতে চেয়েছেন কেমন আছো কিন্তু কোন দিন অফিসে আসেননি। সোজা চলে গেছেন ১৬ তলায়। এ কথাগুলো যখন বলছেন তখন গ্রামীণ ব্যাংকের সিইও মহিউদ্দিনের দু’চোখ জলে টলমল। নিজেকে কিছুটা সংবরণ করে এএসএম মহিউদ্দিন বলেন, ব্যাংক তার নিজস্বগতিতে চলছে। তবে যা হারিয়েছি তা হয়তো জীবনেও আর ফিরে পাবো না। আদর, স্নেহ আর ভালবাসা। যে বটবৃক্ষের ছায়াতলে জীবনের অনেক বছর কাটিয়েছি, সে বটবৃক্ষ আজ থেকেও নেই। আছে তার স্মৃতি। রেখে যাওয়া আদর্শ। এখনও তার আদর্শ আঁকড়ে ধরে ভালোই আছি। তবে ভালো থাকতে হয়তোবা আর দেবে না। সংকোচিত হয়ে আসছে আদর্শের সে পথ। বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ। ড. আকবর আলি খান ও অধ্যাপক রেহমান সোবহানের মতো দেশের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদরা এক সময় গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমানে কেউ ব্যাংকটির দায়িত্ব নিতে চাচ্ছেন না। বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক। দায়িত্বের কিছু দিন পর অপারগতা প্রকাশ করে তিনি সরকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। কিন্তু সরকার তরফে বলা হয়েছে, ভালো কাউকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত তাকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার পর তিনি মাত্র ২টি বোর্ড মিটিংয়ে এসেছেন। বর্তমানে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। দীর্ঘ ৪ বছর পর্যন্ত সরকার গ্রামীণ ব্যাংকে এমডি নিয়োগ দিতে পারেনি। চলছে ভারপ্রাপ্ত এমডি দিয়ে। চেয়ারম্যান দিলেও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ে। এদিকে ৯ নারী পরিচালকের মেয়াদ চলতি বছরের ১৫ই ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। নির্বাচন তো দূরে থাক, আজ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনও গঠন করতে পারেনি সরকার। ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়া সরকারের হাতে নেয়া ঠিক হয়নি উল্লেখ করে মহিউদ্দিন বলেন, এর মাধ্যমে ব্যাংকে রাজনীতি ঢুকতে পারে। ৯ নারী নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক চাপের আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, একচেটিয়া কোন দলবিশেষের পরিচালক হলে বোর্ডের সিদ্ধান্ত একপেশে হতে পারে। এতে ব্যাংকের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবে। সব মিলিয়ে সরকারের হস্তক্ষেপে ব্যাংকটি এক ধরনের টানাপড়েনে আছে বলে তিনি মনে করেন। বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য ৮৬ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৬০ লাখ শেয়ার হোল্ডার। বাকি ২০ লাখ নতুন সদস্য। বিশাল সংখ্যক সদস্যের প্রায় ৪ শতাংশ পুরুষ সদস্য রয়েছে। বাকিরা নারী। বর্তমানে ব্যাংকের পরিশোধিত ৩০০ কোটি ও অপরিশোধিত ১০০০ কোটি টাকার মূলধন রয়েছে। মাসে এক হাজার থেকে এক হাজার দুই শ’ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ হচ্ছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ পর্যন্ত কতজন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করেছেন- এমন প্রশ্নে দীর্ঘ দিনের সহকর্মী মহিউদ্দিন বলেন, দেশের ৮৬ লাখ পরিবারের ৪ কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের উপর নির্ভরশীল। এরা সবাই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তৈরি করা উদ্যোক্তা। 
গ্রামীণ ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এটা দুর্ভাগ্য। সরকার গ্রামীণ ব্যাংককে কি করতে চায়-এখনও স্পষ্ট নয়। একদিকে ৯ নারী পরিচালক সরিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে নতুন পরিচালকও দিচ্ছে না। তাহলে কি বোর্ড শূন্য থাকবে? এভাবে চলতে থাকলে দুর্নীতি-অনিয়ম ঢুকে পড়বে। পরে অন্যান্য ব্যাংকের মতো গ্রামীণ ব্যাংকটিও ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়া এক জিনিস। আর শেষ করে দেয়া অন্য জিনিস। বিষয়টি স্পষ্ট নয়। যেহেতু নতুন পরিচালক আসেনি সেহেতু পুরোনোরাই আপদকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এছাড়া, মেয়াদ শেষ হলে আর কোন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবে না, এটি আইনের কোথাও আছে কিনা তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
জানা গেছে, গ্রামীণ ব্যাংকের ১২ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে গ্রামীণ দরিদ্র নারী বা গ্রাহকদের প্রতিনিধি ৯ জন। চেয়ারম্যানসহ বাকি ৩ জন সরকার মনোনীত। ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকদের প্রতিনিধি হিসেবে ৯ জনের মেয়াদ চলতি বছরের ১৫ই ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। নতুন পরিচালক নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে নিতে হবে সরকার মনোনীত ৩ সদস্যকেই। সূত্রমতে, নতুন পরিচালক নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত চেয়ারম্যান, অন্য ২ পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন। গ্রামীণ নারীদের প্রতিনিধি পরিচালকরা বলছেন, এতে গ্রামীণ ব্যাংক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দরিদ্র নারীরা ব্যাংকে তাদের প্রতিনিধিত্ব হারাবে। যদিও এতে কোন সমস্যা হবে না বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
গ্রামীণ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে সরকার মনোনীত তিন প্রতিনিধির মধ্যে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক। পরিচালক হিসেবে রয়েছেন পরিসংখ্যান বিভাগের সচিব সুরাইয়া বেগম ও আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার। ঋণগ্রহীতাদের পক্ষে সিলেট অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছেন মোসাম্মৎ সুলতানা, চট্টগ্রামের মোসাম্মৎ সাজেদা, কুমিল্লার রেহেনা আক্তার ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের তাহসীনা খাতুন। এছাড়া, গাজীপুর অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন সালেহা খাতুন, দিনাজপুরের পারুল বেগম, বগুড়ার মোসাম্মৎ মেরিনা, যশোরের শাহিদা বেগম ও পটুয়াখালীর মোমেলা বেগম।
গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই পরিচালক নির্বাচন করা উচিত। তা না করে সরকার মনোনীত পরিচালকদের দিয়ে ব্যাংক পরিচালনা করা হলে সেখানে দরিদ্র নারীদের প্রতিনিধিত্ব চিরদিনের জন্য হারাবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর। বিষয়টি অনেক আগেও বলেছি, কিন্তু সরকার তা শোনেনি।
গত বছরের এপ্রিলে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগের বিধিমালা করে সরকার; যেখানে নির্বাচন পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করার পর এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। পরে আবারও কিছু পরিবর্তন এনে গত বছরের ৩রা নভেম্বর সংশোধিত বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করা হয়। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশন গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন পরিচালনা করবে। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনা কমিশনের অন্য দুই সদস্যের মধ্যে একজন থাকবেন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। অন্যজন আসবেন পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন থেকে। কমিশনার পদে প্রতিষ্ঠানগুলোর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আগের বিধিমালায় গেজেট প্রকাশের ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছিল। সংশোধিত বিধিমালায় তা বাড়িয়ে করা হয়েছে এক বছর। সে অনুযায়ী আগামী ৩রা নভেম্বরের আগেই ৯ পরিচালক নির্বাচন করতে হবে।

রাজনীতিতে আসছেন বেনজির তনয়া

রাজনীতিতে আসছেন বেনজির তনয়া। রাজনীতির আঙিনায় মেয়ে বাখত্তাওয়ার ভুট্টোর অভিষেক নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট বাবা আসিফ আলি জারদারি। এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতির দুনিয়ায় পা রেখেছিলেন বেনজির-পুত্র বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বাবার সঙ্গে মতানৈক্য হয় তার। এরপরই রাজনীতি থেকে দুই বছরের ছুটি নিয়ে ব্রিটেনে পাড়ি দেন বিলাওয়াল। যদিও উচ্চশিক্ষার জন্যই তিনি লন্ডনে গিয়েছেন বলে দলীয় সূত্রের খবর। এখন তার অনুপস্থিতিতে দলের প্রয়োজন একজন ভুট্টোর,
যিনি সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেবেন। আর সে কারণেই মেয়ে বাখত্তাওয়ারকে রাজনীতিতে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জারদারি। আপাতত দলের অন্যান্য বর্ষীয়ান নেত্রীর কাছে রাজনীতির পাঠ নিচ্ছেন বাখত্তাওয়ার। ৪ এপ্রিল নানা জুলফিকার আলি ভুট্টোর মৃত্যুবার্ষিকীতেই বাখত্তাওয়ার তার প্রথম রাজনৈতিক বক্তৃতা দেয়ার কথা। ‘নানা’ জুলফিকারের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বিলাওয়ালকেও দেখা যাবে বলে আশায় রয়েছেন পিপিপির অধিকাংশ অনুগামীই। তবে বিলাওয়াল কিংবা বাখত্তাওয়ারকে ভালোবাসলেও ‘টেন পার্সেন্ট’ জারদারির কীর্তিকলাপে অখুশি পিপিপিরই অধিকাংশ নেতাকর্মী।

ইয়েমেনে এবার স্থলপথে বিদেশী সেনা অভিযান

অব্যাহত বিমান হামলার পর এবার স্থলপথে ইয়েমেনে প্রবেশ করেছে বিদেশী সেনারা। বিবিসি অনলাইনের এক খবরে বলা হয়েছে, হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ইয়েমেনের এডেন বন্দরে অবতরণ করেছে বিদেশী সেনারা। উল্লেখ্য, গত মাস থেকে ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে আসছে সৌদি সেনাবাহিনী নেতৃত্বাধীন নয়টি দেশ। এডেন বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে, কয়েক ডজন বিদেশী সেনা সেখানে অবতরণ করেছে। ৩১ মার্চ দেশটিতে স্থল অভিযান চালাতে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে অনুরোধ জানায় ইয়েমেন সরকার।
৩০০ বন্দিকে ছিনিয়ে নিল আল কায়দা ইয়েমেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি কারাগারের ফটক ভেঙে আল কায়দার একজন জ্যেষ্ঠ নেতাসহ তিন শতাধিক বন্দিকে ছিনিয়ে নিয়েছে জঙ্গিরা বলে দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আল কায়দার জঙ্গিদের হামলায় ওই কারাগারের দুজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছে। নিরাপত্তাকর্মীদের পাল্টা গুলিতে আল কায়দার পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। নাম প্রকাশ না করে একজন কর্মকর্তা জানান, আল কায়দার ওই নেতার নাম খালিদ বাতারফি। তিনি চার বছরের বেশি সময় ধরে ওই কারাগারে বন্দি ছিলেন। খালিদ বাতারফি আল কায়দার আরব উপদ্বীপ শাখা অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলার অন্যতম শীর্ষ আঞ্চলিক নেতা। ২০১১-১২ সালে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আল কায়দার সংঘর্ষের সময় তিনি নেতৃত্বে ছিলেন। ওই সময় জঙ্গিরা দেশটির দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের একটি বড় অংশ দখল করে নেয়। ইয়েমেনের বন্দর শহর এডেনে বিদেশী সেনারা অবস্থান নিয়েছে।
বিবিসি অনলাইনে জানানো হয়েছে, বিদেশী সেনাদের অবস্থান নেয়ার বিষয়টি নিরপেক্ষ সূত্র থেকে নিশ্চিত হতে পারেনি তারা। বিদেশী সেনারা কোন দেশের তাও জানা যায়নি। এডেন শহরের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে গেছে। তারা নতুন নতুন এলাকায় অগ্রসর হচ্ছে। এ অবস্থায় সেখানে বিদেশী সেনাদের উপস্থিতি যুদ্ধের ব্যাপকতা আরও বাড়িয়ে দেবে এটিই স্বাভাবিক। হুথিদের তাড়া খেয়ে এডেন ছেড়ে বিদেশে পালিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মানসুর হাদি। এরপর সানা ও এডেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুথিরা। হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এ হামলায় শতাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। সৌদি আরব আগেই জানিয়ে রেখেছে, বিমান হামলা চলবে। প্রয়োজনে স্থলপথে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। অবশেষে হয়তো সে পথেই হাঁটছে সৌদি আরব। সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে আমরাই ফেভারিট

‘বিশ্বকাপ থেকে ফিরে এসে বিশ্রামের খুব একটা সুযোগ পাননি। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার তাকে উড়ে যেতে হল কলকাতায়। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগে (আইপিএল) কলকাতা নাইটরাইডার্সের হয়ে যথারীতি খেলবেন সাকিব আল হাসান। তবে ৮ ও ১১ এপ্রিল দুটি ম্যাচে কেকেআরের হয়ে খেলার জন্য বিসিবি থেকে অনাপত্তিপত্র পেয়েছেন এই তারকা অলরাউন্ডার। এই দুটি ম্যাচ খেলে ফিরে আসতে হবে তাকে। ফিরে এসে যোগ দেবেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে। পাকিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন হোম সিরিজের জন্য বাংলাদেশ দলের ক্যাম্প শুরু হওয়ার কথা ১৩ এপ্রিল। ওইদিন পাকিস্তান দল ঢাকায় আসবে। সাকিবের দেশে ফেরার কথা ১২ এপ্রিল।
সাকিব আইপিএলের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন নাইটরাইডার্সের হয়ে ৮ এপ্রিল মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স এবং ১১ এপ্রিল রয়েল চ্যালেঞ্জার্স বাঙ্গালোরের বিপক্ষে খেলবেন। দুটি ম্যাচেই নাইটরাইডার্স খেলবে নিজেদের মাঠে, কলকাতার ইডেন গার্ডেনে। এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা ছাড়ার আগে সাকিব পাকিস্তান সিরিজ নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, যেহেতু বাংলাদেশের এটি হোম সিরিজ। তাই টাইগাররাই ফেভারিট। ‘পাকিস্তানকে হারানোর সুযোগ এবার আমাদের সামনে’, বলেছেন তিনি। তার দৃপ্ত উচ্চারণ, ‘এবার আমরা ওদের বিরুদ্ধে সিরিজ জিততে চাই।’ যাওয়ার আগে বনানীতে নিজের বাসায় সাকিব সাংবাদিকদের বলেন, ‘এবার নিজেদের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে আমরাই ফেভারিট।’ তার সংযোজন, ‘আইপিএলে খেলার অভিজ্ঞতা পাকিস্তান সিরিজে কাজে দেবে।’ তিনি বলেন,
‘বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রেলিয়ায় বিগ ব্যাশে খেলে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম, সেটি সতীর্থদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি। এবারও আইপিএলে খেলে এসে তাই করব।’ ঘরোয়া আলাপচারিতায় স্বভাবিকভাবে উঠে আসে আগের দিন আইসিসির সভাপতি হিসেবে মুস্তফা কামালের পদত্যাগের প্রসঙ্গ। এ বিষয়ে সাকিব কিছু বলতে রাজি হননি। তবে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে বিতর্কিত আম্পায়ারিং নিয়ে সাকিব বলেন, ‘সেদিন মাঠে কী হয়েছে তা সবাই দেখেছে। আমি শুধু বলব, ভুল মানুষেরই হয়। আম্পায়াররাও মানুষ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ওদের ক্রিস জর্ডানের রান আউটটা ছিল ফিফটি-ফিফটি। সেদিন তো আমাদের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন আম্পায়ার।’ একথা বলে সাকিব কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা বিশদ ব্যাখা করার প্রয়োজন নেই। বুদ্ধিমানের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট!

আট বছর পর তৌকীর

দীর্ঘ আট বছর বিরতির পর আবারও চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। চলচ্চিত্রের নাম ‘অজ্ঞাতনামা’। এর কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্যও করেছেন তিনি নিজেই। আসছে মে মাসের মাঝামাঝি সময় চলচ্চিত্রটির নির্মাণ কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। গেল তিন বছর তৌকীর আহমেদ তিনটি মঞ্চ নাটকের পাণ্ডুলিপি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এগুলো হচ্ছে ‘প্রতিসরণ’, ‘ইচ্ছা মৃত্যু’ ও ‘অজ্ঞাতনামা’।
এর মধ্যে ‘অজ্ঞাতনামা’রই চিত্রনাট্য তৈরি করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে যাচ্ছেন তিনি। ছবির জন্য শিল্পী নির্বাচন প্রক্রিয়া চলছে। দু-একদিনের মধ্যেই লোকেশন খুঁজতে বের হবেন। এ প্রসঙ্গে তৌকীর আহমেদ বলেন, ‘এই দীর্ঘ আট বছর কিন্তু আমি খুব ব্যস্ত সময় কাটিয়েছি। অনেকদিন ধরেই অজ্ঞাতনামার চিত্রনাট্য তৈরি করে অবশেষে চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পুরো প্রস্তুতি নিয়েছি। আশাকরি দর্শকের মনের মতো একটি চলচ্চিত্র উপহার দিতে পারব। শিল্পীদের সহযোগিতায় একটি ভালো চলচ্চিত্রই হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম।

জানার অধিকার প্রতিষ্ঠায় রক্তাক্ত লড়াই by হামিদ মির

২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল পাকিস্তানের বন্দর শহর করাচিতে ঘাতকেরা আমার শরীরে ছয়টি বুলেট গেঁথে দেয়। আমার মনে হয়েছিল, মৃত্যুর সঙ্গে করমর্দন করলাম। সেও যেন তার দুনিয়ায় আমাকে স্বাগত জানাল। কিন্তু মানুষের বোধের অতীত এক কারণে আমি যেন জীবনের সীমানায় ফিরে এলাম। সেই দিনটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দিন। তার কিছুদিন আগেই আমি অনেক হুমকি পেয়েছি। ফলে সেদিন ইসলামাবাদ থেকে করাচি যাওয়ার ব্যাপারে আমি তেমন একটা আগ্রহী ছিলাম না। দিনটিও যেন কেমন নিরানন্দ ছিল। নিরাপত্তার কারণেই আমি এক মাসের ছুটিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম। আমার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকেও আমি এসব হুমকির ব্যাপারে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম।
জিয়ো নিউজের চলতি ঘটনাবলির পরিচালক খুব উদ্গ্রীব ছিলেন, আমি যেন আত্মঘাতী হামলার ব্যাপারে করাচি থেকে এক বিশেষ অনুষ্ঠান করি। বিশেষ করে মার্কিন ড্রোন হামলায় ১০০ দিনের বিরতি থাকলেও আত্মঘাতী হামলার পরিমাণ কমেনি কেন, সে বিষয়টি অনুসন্ধান করতে তিনি আমাকে বারবার তাগাদা দিয়েছেন। অনুষ্ঠানটি আমি ইসলামাবাদ থেকে করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে টিভি স্টেশনের কিছু প্রযুক্তিগত দুর্বলতা ছিল। আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম, করাচিতে আমার কোনো জ্যেষ্ঠ সহকর্মী কাজটা করতে পারেন। কিন্তু পরিচালক সাহেবের মনে অন্য চিন্তা ছিল। এমন একটি সংবেদনশীল বিষয় তিনি আমার অভিজ্ঞ হাতেই অর্পণ করতে চান। শেষমেশ, পেশাগত দক্ষতাই আমার হুমকি হয়ে উঠল।
জিয়ো নিউজ আটজন অতিথি নিয়ে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী এক টক শো করার পরিকল্পনা করছিল। আমি আমার অশুভ কামনাকারীদের চোখে ধুলো দিতে এক বেসরকারি এয়ারলাইনসে ইসলামাবাদ থেকে কোয়েটার টিকিট কিনি। শুধু ১৯ এপ্রিল সকালবেলায় আমি বিমান পরিবর্তন করি। আমি নিশ্চিত ছিলাম, আমার শত্রুরা আমার চেয়ে চৌকস। আমার চালাকিও শেষমেশ কাজ নাও করতে পারে। স্ত্রীকেও আমার এই আশঙ্কার কথা জানালাম। আমার যাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সে এক ছাগল সদকা দিল।
করাচি বিমানবন্দরে পৌঁছা মাত্র স্ত্রীকে খুদে বার্তা পাঠালাম। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল, ‘কোথাও যেন গড়বড় আছে’। অফিস চালকসহ এক গাড়ি পাঠিয়েছিল। চালককে জিজ্ঞেস করলাম, নিরাপত্তারক্ষী কোথায়? উত্তরে সে জানাল, তার কাছে পিস্তল থাকায় পুলিশ তাকে বিমানবন্দরে ঢুকতে দেয়নি। তাকে আমরা বিমানবন্দরের বাইরে থেকে তুলে নিলাম। ইতিমধ্যে অফিসেও জানিয়ে দিয়েছি যে আমি করাচিতে পৌঁছেছি। নাথা খান সেতুর কাছে আসার পর গুলির শব্দ পেলাম। পরক্ষণেই বুঝে গেলাম, আমিই এর লক্ষ্যবস্তু। বুলেট এসে লাগল আমার ডান কাঁধে। চালক ভয় পেয়ে গেল। আমার মনে আছে, চালককে দ্রুত পালিয়ে যেতে বলেছিলাম।
পশ্তু গাড়িচালকের স্নায়ুর প্রশংসা করতেই হবে। সে ভয়ে কাণ্ডজ্ঞান হারায়নি। হামলাকারীরা পেশাদার ছিল, প্রশিক্ষিতও বটে। এরপর শুরু হয় প্রতিযোগিতা। দুটি মোটরবাইক করাচির সড়কে এঁকেবেঁকে আমাদের ধাওয়া করছিল। ঠিক যেন মৌমাছির ঝাঁক শত্রুকে ধাওয়া করছে। আর গুলিও করছে, যাতে অন্তত একটা গুলি জায়গামতো লাগে। অনেকটা হলিউডের ছবির মতো। আরও কয়েকটা গুলি আমার শরীরের নিচের দিকে এসে লাগে, পিঠের নিচে এবং ডান ও বাম ঊরুতে। সহকর্মীদের ফোন করে বললাম, আমার ওপর আক্রমণ হয়েছে। তাঁরা আমাকে দ্রুত কোনো হাসপাতালে ঢুকে যেতে বললেন।
চালককে বললাম, ‘আমার রক্ত ঝরছে, হাসপাতালে নিয়ে চলো।’ সামনের আসনে যে বেলুচ রক্ষী ছিল, সে বলল, আগা খান হাসপাতালই নিরাপদ হবে। হামলাকারীরা মিনিট দশেক আমাদের ধাওয়া করেছে। এর মধ্যে সেই রক্ষী সামনের আসন থেকে উঠে পেছনের আসনে এসে হামলাকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করে। আগা খান হাসপাতালের কাছে এলে পাকস্থলীতে আরও কয়েকটা গুলি লাগে, আরেকটি গুলি আমার মূত্রথলি ছিদ্র করে দেয়। ফলে আমার ক্ষুদ্রান্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সে সময় ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী হয়েছে?’ উত্তরে তাঁকে বললাম, ‘আমার ওপর হামলা হয়েছে’। আগা খান হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছে আমি নিজেই গাড়ি থেকে নামার চেষ্টা করলাম। তখন বুঝলাম, আমার দুই পায়েই গুলি লেগেছে। মনে মনে ভাবলাম, মরতে যাচ্ছি। ‘কলেমা তাইেয়বা’ পড়তে শুরু করলাম। ভাবছিলাম, মেয়ে আমার মৃত্যুসংবাদ কীভাবে নেবে। আমি তার জন্য দোয়া করলাম। এর পরই জ্ঞান হারালাম।
পরের দিন খুব অল্প সময়ের জন্য জ্ঞান ফেরে আমার। মুখের ওপর অক্সিজেন মুখোশ লাগানো। চিকিৎসক মুখে হাসি নিয়ে বললেন, ‘এটা প্রায় অলৌকিক ঘটনা যে আপনি বেঁচে গেছেন। আপনি এখন ঠিক আছেন।’ তখন মনে হচ্ছিল, বেঁচে হয়তো গেছি। কিন্তু সব ঠিক নেই। সেই ঘটনার কিছুদিন আগে কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমাকে সতর্ক করেছিলেন, আমি যেন মামা কাদের বেলুচকে টক শোতে আমন্ত্রণ না জানাই। আর বেলুচিস্তানের গুম এবং পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে আনীত দেশদ্রোহ মামলার বিষয়ে যেন কিছু না বলি। কিন্তু পেশাদারি দায়িত্বের আলোকে আমি সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিলাম।
হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর ভাবছিলাম, আমার অপরাধ কী। সম্ভবত, এটাই আমার অপরাধ। হাসপাতালের শয্যায় পা নাড়ানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। আমি প্রচণ্ড আঘাত পাই। কথা বলার চেষ্টা করেও পারি না, আবার জ্ঞান হারাই। আমি জানতাম না, কিছু শক্তিশালী মানুষ এক শয্যাগত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুসংঘবদ্ধ প্রচারণা শুরু করেছে। আমি আক্রান্ত, অথচ তারা আমাকে দুষ্কৃতকারী বানাতে চেয়েছে। আমার বিরুদ্ধে সব জায়গায় ঘৃণা ছড়ানো শুরু হয়—সম্প্রচারমাধ্যম, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আমাকে ও আমার টিভি চ্যানেলকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ অভিধা দেওয়া হয়। টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়। ঘটনার তৃতীয় দিন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ আমাকে দেখতে এসে বলেন, আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে উদ্ঘাটিত করতে তিনি এক তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তাঁর মুখে চিন্তা, উত্তেজনা ও চাপের বলিরেখা ছিল স্পষ্ট।
এই হামলার পর কিছু সেনা কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক সরকারের মধ্যে শীতলযুদ্ধ শুরু হয়। কারণ, আমার পরিবারের ধারণা ছিল, আইএসআই আমার ওপর হামলা করেছে। আইএসআই কর্মকর্তারা শুধু আমার টিভি চ্যানেলের প্রতিই ক্ষুব্ধ ছিল না, তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিও ক্ষুব্ধ ছিল। কারণ, তিনি আমার মতো ‘বিশ্বাসঘাতক’কে দেখতে হাসপাতালে গেছেন। জাতিসংঘ কর্তৃক নিষিদ্ধ জিহাদিগোষ্ঠী এলইটি (এখন জামাতুল দাওয়াহ নামে কাজ করে) রাস্তায় নেমে জিয়ো টিভির বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। তাদের হাতে আইএসআই–প্রধানের ছবি ছিল, তারা তাঁর সপক্ষে বক্তৃতাও দেয়। অন্যদিকে সব প্রধান রাজনৈতিক দল এবং বেলুচিস্তান ও সিন্ধের রাজ্যসভায় আমার সপক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয়। সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজও আমার পক্ষে পথে নামে। ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে হাতে গোনা কয়েকজন শক্তিশালী মানুষের কাছে আমি দুষ্কৃতকারী আর ক্ষমতাহীন বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে আমি নায়কে পরিণত হই।
কিছুদিনের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতের তিনজন বিচারকের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁদের হাসপাতালে আসার অনুরোধ করলেও তাঁরা সেটা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমি না গেলে তাঁরা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করতে পারবেন না। ফলে সেই অবস্থায় এক হাতে দুটি মেডিকেল ব্যাগ ও আরেক হাতে আমার লিখিত বক্তব্যের কপি নিয়ে আমি তাঁদের সামনে হাজির হই। শরীরের প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে পরবর্তী তিন সপ্তাহের মধ্যে আমি আরও দুবার তাঁদের সামনে হাজির হই। এক প্রখ্যাত রাজনীতিক আমাকে দেখতে এসে যে কথা বলেছিলেন, তা আমার এখনো মনে আছে, ‘আপনার জন্য আমার দুঃখ হয়। কিন্তু আপনার চ্যানেল তো শেষ। সেনা কর্মকর্তা আমাকে বলেছে, তারা জিয়ো নিউজ চলতে দেবে না। মানুষ আপনার সঙ্গে আছে, আপনার চ্যানেলের সঙ্গে নয়। সে কারণে আপনি অন্য কোনো চ্যানেলে যোগ দিন।’ আমি তাঁকে বললাম, ‘আমার জাহাজ হয়তো ডুবছে, কিন্তু আমি এর সঙ্গেই ডুবব, ছেড়ে যাব না।’
চিকিৎসকেরা ছয় মাসের বিশ্রামের পরামর্শ দিলেও আমি তিন মাস পরে কাজে যোগ দিই। তখনো আমার শরীরে
দুটি বুলেট রয়ে গেছে। সব দিক থেকেই জিেয়া টিভির ওপর হামলা হচ্ছিল। কেব্ল অপারেটরদের চাপ দিয়ে পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল জিেয়া টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে চ্যানেল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। গত এক বছর আরও হুমকি সত্ত্বেও টিকে আছি, আপস করিনি। এদিকে আজ এক বছর অতিক্রান্ত হলেও তদন্তের ফল বেরোয়নি।
আমি বুঝতে পারি, পাকিস্তানের উচ্চ আদালতও সংবাদমাধ্যমের মতো চাপে আছেন। পাকিস্তান গণতান্ত্রিক দেশ হলেও সংসদ, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যম এখনো স্বাধীন নয়। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম এক বছর ধরে শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনীর অঘোষিত এক নিকৃষ্ট সেন্সরের মুখে রয়েছে। আমি জানি, কিছু নিরাপত্তা সংস্থাও সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়ছে। ফলে আমাদের সমালোচনায় সতর্ক হতে হবে। যে সেনারা সন্ত্রাসবাদ রুখতে জীবন দিচ্ছেন, তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। কিছু ব্যক্তির ভুলের দায় তাঁদের কাঁধে বর্তায় না। আমি আমার পেশা ও পাকিস্তান ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছি। অধিকাংশ মানুষ পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমকে বিশ্বাস করে। কারণ, আমরা জনস্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করেছি। আর আমার কাছে জনস্বার্থ মানেই জাতীয় স্বার্থ। আমি সাংবাদিক হিসেবে গর্বিত। কারণ, আমি জনগণের জানার অধিকারের দাবিতে লড়ছি।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
হামিদ মির: পাকিস্তানের জিয়ো টিভিতে কর্মরত সাংবাদিক।

এখন সরকারের দায়িত্ব বেশি by আব্দুল কাইয়ুম

বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আসার পর অবস্থা বদলে গেল। এখন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে, বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের অবাধে নির্বাচন করার পথে কোনো বাধা নেই। সবার জন্য সমান সুযোগ না থাকলে এর দায় গিয়ে পড়বে সরকারের ওপর।
কয়েক দিন আগে দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এই মুহূর্তে নির্বাচন দেওয়ার প্রয়োজন ছিল কি না—এ প্রশ্ন উঠলে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘নির্বাচন তো হারার জন্যও দিতে হয়।’ (প্রথম আলো, ২২ মার্চ, ২০১৫)। এর তাৎপর্য গভীর। নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের বিষয়টি তাঁদের একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হলে তিনি এ কথা বলতেন না। আগেও গাজীপুর, রাজশাহী, কুমিল্লা, সিলেট প্রভৃতি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রভাবশালী প্রার্থীদের হারিয়ে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা জিতে এসেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার জালিয়াতি করে জেতার চেষ্টা করেনি বা করলেও সফল হয়নি। অবশ্য শেষ মুহূর্তে এসে ঢাকার নির্বাচন ঠেকিয়ে রেখেছিল। এখন সেই নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
নির্বাচনে আসার জন্য বিএনপিকে সময় নিতে হয়েছে। কারণ, তাদের প্রায় সব মূল নেতাই জেলে অথবা হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। শত শত মামলা। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ। র্যা ব-পুলিশ নাকি সন্ধান পায় না। কোনো গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এটা যে কী সাংঘাতিক ব্যাপার, তা কাউকে বুঝিয়ে বলতে হয় না। এ অবস্থার মধ্যে বিএনপি কিছুটা ইতস্তত ভাব নিয়ে নির্বাচনে এসেছে।
বিএনপির এই সিদ্ধান্তের প্রতি ইতিবাচক সংকেত দেওয়ার জন্য সরকারের অন্তত কিছু পরিষ্কার ঘোষণা ও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। যেমন, মামলা-মোকদ্দমার লাগাম টেনে ধরা, ধরপাকড় বন্ধ প্রভৃতি। কিন্তু সরকার ঠিক উল্টো কাজটি করল। পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়ে দিলেন, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা থাকলে তিনি প্রকাশ্যে আসামাত্র গ্রেপ্তার করা হবে। আরে বাবা! সুষ্ঠু নির্বাচন হতে দেওয়ার চেয়ে বড় কাজ এখন আর কী আছে? গ্রেপ্তারের জন্য তো হাজার সময় পড়ে আছে। আগে নির্বাচন যাক। তারপর কথা।
এত দিন সরকার মাথা ঠুকে মরেছে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার জন্য। আর এখন সরকারের পুলিশ গ্রেপ্তারের ভয় দেখাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন যদি কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ বলে গ্রহণ করে, তাহলে তাঁর নির্বাচন করার সব সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা আছে কি নেই, সেটা পরের কথা। কমিশন সবকিছু দেখেশুনেই তাঁকে নির্বাচনের অনুমতি দেবে। পুলিশ সেখানে এককভাবে কিছু করতে গেলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা থাকবে না।
এখানে নির্বাচন কমিশনেরও অনেক কিছু করার আছে। পুলিশ কর্মকর্তার কথার প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক বললেন, ‘... এসব ক্ষেত্রে কমিশনের কিছু করার নেই। তবে কারও বিরুদ্ধে মামলা না থাকা সত্ত্বেও পুলিশ যদি তাঁকে হয়রানি করে, তাহলে কমিশন অবশ্যই ভূমিকা রাখবে।’ (প্রথম আলো, ২৯ মার্চ)। কমিশনার বলছেন ‘করার কিছু নেই’, অথচ হাইকোর্ট এক রায়ে বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের অগাধ ক্ষমতা রয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশন যদি তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ না করে, সেই সুযোগে যদি পুলিশ ছড়ি ঘুরিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনের মাঠছাড়া করে, তাহলে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। সেই দায় গিয়ে পড়বে সরকারের ওপর।
এর আগে শত নাগরিক কমিটি শুধু মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা মাত্র দু-তিন দিন পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার একক দায়িত্বে সেই অনুরোধ নাকচ করে দিয়ে জানিয়ে দিলেন, বিএনপির বিষয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। এই মুহূর্তে নির্বাচনে বিএনপিকে যে কত দরকার, সেটা যদি এখনো কমিশন না বোঝে, তাহলে কবে বুঝবে? আরেকবার ‘একতরফা’ নির্বাচনের চুনকালি গায়ে মাখার পর?
সরকার হয়তো বলবে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, কাউকে জামিন দেওয়া না-দেওয়া আদালতের এখতিয়ার, সেখানে সরকার কী করবে? ঠিক কথা। কিন্তু সরকার মামলাগুলো তুলে নিলে তো জামিনের প্রশ্ন আর থাকে না। তখন সবাই নির্বাচনের মোহনায় মহাসমারোহে মিলিত হবে।
নির্বাচনে বিএনপির দিক থেকে একটু ভাটার টান দেখা যাচ্ছে। প্রথমে উৎসাহ ছিল। শত নাগরিক কমিটি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে নির্বাচনের অচলায়তন ভাঙে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বারবার বলছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাঁদের দলের সমর্থন রয়েছে। গত রোববার বিএনপি হরতালের ডাকও দিল না। প্রায় আড়াই মাসের একটা প্রথা ভেঙে তারা ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু সরকারের দিক থেকে এগিয়ে আসার লক্ষণ না দেখে এবং গ্রেপ্তারের কথা শুনে হয়তো থমকে দাঁড়াল। মনোনয়নপত্র জমার তারিখও পেছানো হলো না। হয়তো এসব কারণে বিএনপি এক দিন পর আবার হরতাল ডেকে বসল। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বাদ রেখে আবার যথারীতি হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করল। বিএনপি এক কদম এগিয়ে এসে এভাবে আবার পিছিয়ে গিয়ে বুঝিয়ে দিল, তারা আস্থা পাচ্ছে না। সরকারকে এখন এগিয়ে এসে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রথম কাজটি হবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মুক্তি দেওয়া। এর সঙ্গে প্রথম সারির বাকি নেতাদেরও একে একে কারামুক্ত করা। বিএনপির উদ্যোগে বড় বড় সমাবেশ হোক। সেখানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রধান অতিথি হয়ে আসুন। তিনি তো এখন সাংসদও নন, তাই তাঁর নির্বাচনী প্রচারে বাধা নেই। এই সুযোগটি বিএনপিকে দিতে হবে। না হলে কিসের মেয়র নির্বাচন? নির্বাচনী আমেজই তো আসবে না।
আর এসব সুযোগ যদি নিশ্চিত হয়, তাহলে বিএনপিকেও ভেবে দেখতে হবে যে অচল অবরোধ-হরতাল তারা আর কত দিন চালাবে। আর কত অর্থহীন হরতাল করলে তাদের আন্দোলন একটি ‘যৌক্তিক পরিণতি’ পাবে।
কৌশলগত কারণে হলেও এখন তাদের সহিংস কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে। না হলে হয়তো বিএনপিকে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। হরতাল-অবরোধ থাকলে এখানে-সেখানে পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ হয়তো ঘটতেই থাকবে। বিএনপি নিজেরা হরতাল ডেকে কীভাবে নাশকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে? এ পরিস্থিতিতে তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা কোন মুখে ভোট চাইবেন? একদিকে নির্বাচন, অন্যদিকে মানুষ পুড়িয়ে মারা কোনো কাজের কথা নয়।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন সরকার, বিএনপি ও দেশের মানুষ—সবার জন্যই খুব দরকার। বিএনপিকে নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারলে সরকার অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে। যদি বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা জেতেন, তাহলেও লাভ। কারণ, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে, সেটা জোর গলায় তারা বলতে পারবে।
১৯৯১ সালে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর ১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ হানিফ মেয়র হয়েছিলেন। তাতে তো বিএনপির কোনো ক্ষতি হয়নি। গত বছর যে কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা একের পর এক মেয়র নির্বাচিত হলেন, তাতে কি আওয়ামী লীগ সরকারের গদিতে বিন্দুমাত্র চিড় ধরেছে? তাহলে?
নির্বাচনে বিএনপির লাভও কম নয়। তাদের সমর্থিত প্রার্থী যদি জেতেন, তাহলে তো পোয়াবারো। সামনের দিনগুলোতে দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি আরও জোরদার হবে। আর যদি না-ও জেতেন, তাহলেও বিএনপি স্বাভাবিক রাজনীতির ধারায় ফিরে আসার চমৎকার সুযোগ পাবে। তাদের আন্দোলন একটি ‘যৌক্তিক’ পরিণতি পাবে। আর মানুষও সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে পাবে, পেট্রলবোমায় অপমৃত্যুর ভয় কাটবে।
আমরা তাই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, একটি ভালো নির্বাচন হোক। বিএনপি সুস্থধারার রাজনীতিতে ফিরে আসুক। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু নির্বাচনের চেয়ে বড় কিছু এই মুহূর্তে আর হতে পারে না।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

সিটি নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়ার নির্দেশ

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, হরতাল-অবরোধের নামে বিএনপি-জামায়াত জোট যে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তার বিরুদ্ধে জনগন ভোট দিতে প্রস্তুত। এজন্য জনগনকে সংগঠিত হতে হবে। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দল সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলদের বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। নিজের নির্বাচনী এলাকায় নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার জন্য সকল সংসদ সদস্যকে নির্দেশ দেন তিনি। গতকাল রাতে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় তিনি এই নির্দেশ দেন। অধিবেশন শেষে জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারী দলের সভাকক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সিনিয়র সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. আবদুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, হুইপ আতিউর রহমান আতিক, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস প্রমুূখ বক্তব্য রাখেন। দলীয় সূত্র জানায়, সভায় নেতাদের পুরো বক্তব্যেই ছিল আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে। এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের শান্তির পক্ষে ভোটযুদ্ধ। বিএনপি-জামায়াত জোট যে আন্দোলনের নামে সহিংসতা-নাশকতা-মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করছে, এসব বিষয়গুলো নির্বাচনী প্রচারে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। যাতে ভোটাররা সচেতন হয়ে সন্ত্রাসী-নাশকতাকারী ও খুনীদের ‘না’ বলে আমাদের পক্ষে অর্থাৎ শান্তি ও গণতন্ত্রের পক্ষে ভোট দেয়। একইসঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুত-পানি-গ্যাস সমস্যার সমাধান, হাতিরঝিলসহ রাজধানী ঢাকার বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধনের বিষয়গুলোও ঢাকার ভোটারদের সামনে তুলে ধরারও নির্দেশ দেন তিনি। বৈঠকে তিন সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি এলাকায় যে যে এলাকার জনগোষ্ঠী বেশি, সেই এলাকার এমপিদের ওই সব এলাকায় দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তরে ফারুক খান এবং দক্ষিণে ড. আবদুর রাজ্জাক নির্বাচন পরিচালনায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন। আর ঢাকা মহানগরীর ১৫টি নির্বাচনী এলাকায় ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যরা এসব টিমে বিভক্ত হয়ে প্রচার চালাবেন। আর কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতারা পুরো নির্বাচনগুলো মনিটরিং করবেন। তবে কোনভাবেই নির্বাচনী আচরণবিধি যাতে লঙ্ঘিত না হয় সেজন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদেরও সতর্ক করা হয়। একইসঙ্গে সিটি নির্বাচনকে নামনে রেখে বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসীরা কোন নাশকতা-সহিংসতা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্যও এমপিদের নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক অবস্থানে থাকারও নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে তোফায়েল আহমেদ বলেন, তিন সিটি করপোরেশন এলাকায় যে যে জেলার আঞ্চলিক জনসংখ্যা বেশি, ওই এলাকার সংসদ সদস্যদের সেখানে কাজ করতে হবে। নিজের এলাকার লোকদের সংগঠিত করে দলের প্রার্থীর পক্ষে ভোট আনতে হবে। সৈয়দ আশরাফ বলেন, তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিতে হবে। তাই এমপি-নেতাদের ঘরে বসে থাকলে চলবে না। প্রতিটি ভোটারের কাছে গিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের নৈরাজ্য এবং বর্তমান সরকারের উন্নয়ন-সাফল্যেগুলো তুলে ধরতে হবে। একাধিক প্রার্থীতা প্রসঙ্গে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, এক একটি ওয়ার্ডে ৮/১০ জন করে আমাদের দলীয় কাউন্সিলর প্রার্থী। সেক্ষেত্রে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত একক প্রার্থী নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে। ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বলেন, ঢাকা উত্তরের চাইতে দক্ষিণে দলের মেয়র প্রার্থীকে বিজয়ী করতে বেশি পরিশ্রম করতে হবে। এসময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, মানুষের আস্থা অর্জনে এলাকার জনগণের পাশে থাকতে হবে। জনগণের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকতে হবে। একইসঙ্গে সংগঠনকেও জোরদার করতে হবে, ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে।
খালেদা ব্যর্থ নেত্রী: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি নেত্রী হচ্ছেন ধ্বংসের রানী। তিনি শুধু ধ্বংস করতেই জানেন। আমরা সৃষ্টি করছি, তিনি ধ্বংসের খেলা খেলছেন। দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও সর্বনাশ করতে জানেন। মানুষের লাশের স্তূপের ওপর দিয়ে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় যেতে চান। কিন্তু দেশের জনগণ তা কোন দিনই হতে দেবে না। এ ধরনের অমানবিক কাজ যারা করতে পারে তাদের দেশের মানুষ মেনে নেবে না, বাংলাদেশের মাটিতে তাদের স্থান হবে না। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে ‘ব্যর্থ নেত্রী’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) সরকার পরিচালনা করতেও ব্যর্থ হয়েছেন, আন্দোলনেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। আর এ ব্যর্থতার আক্ষেপ থেকেই বিএনপি নেত্রী দেশের মানুষের বিরুদ্ধে জিঘাংসার পথ বেছে নিয়েছেন। জনসমর্থন না পাওয়ার আক্রোশ থেকেই তিনি দেশের মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করছেন। রাজনীতি যদি দেশের জনগণের কল্যাণে হয়, তবে তিনি সে দেশের মানুষকেই কিভাবে পুড়িয়ে হত্যা করতে পারেন? এটা কোন ধরনের রাজনীতি? খালেদা জিয়ার এ ধ্বংসাত্মক রাজনীতি দেশের জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল সংসদে প্রেসিডেন্টের ভাষণের ওপর সমাপনী বক্তব্যে রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিটের দীর্ঘ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দেশের সর্বশেষ রাজনীতি, বিএনপি-জামায়াত জোটের নাশকতা-সহিংসতার সমালোচনা এবং সরকারের সফলতার দিকটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। বিএনপি-জামায়াত জোটের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনীতির নামে যিনি দেশের মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেন, মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড করেন, সেই নেত্রীর (খালেদা জিয়া) সঙ্গে কোন বিবেকবান মানুষ থাকতে পারে না। শত নাগরিকের নামে যারা তৎপরতা চালাচ্ছেন তাদের হৃদয়ে এত দগ্ধ মানুষের আর্তনাদ, মৃত্যুও কি নাড়া দেয় না। তারা কিভাবে এভাবে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার জঘন্য রাজনীতিকে সমর্থন করেন? তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রীর আহ্বানে কেউ সাড়া দেয় না, ন্যূনতম জনসমর্থন নেই। বিএনপি নেত্রী হুকুম দেন, মন্ত্রীর লোভ দেখান- তবুও তার দল ও দলের নেতারা নড়ে না। এটা কার দোষ? জনগণ ও তার দলের নেতারাই বিএনপি নেতার নির্দেশ শুনে না, সেই আক্রোশ থেকেই জনগণের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব ক্ষেত্রেই ব্যর্থ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। সরকার থেকেও ব্যর্থ হয়েছেন, এখনও ব্যর্থ হয়েছেন। সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও তিনি (খালেদা জিয়া) সফল হয়েছেন হত্যা, দুর্নীতি, নিজের, পুত্র ও নেতাদের হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদ গড়ে তুলতে, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা, সারা দেশে বোমা ও গ্রেনেড হামলা, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি করতে। ক্ষমতায় থেকে মানুষের গ্রাস কেড়ে নিয়ে বিএনপি নেত্রী ও তার দুই পুত্র আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়েছেন। হাওয়া ভবন খুলে দুর্নীতি আর খোয়াব ভবন খুলে ফুর্তি করার ক্ষেত্রেও বিএনপি নেত্রীর দল সফল হয়েছেন। সংসদ নেতা বলেন, আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে অর্থনীতিসহ দেশের উন্নয়ন করে যাচ্ছি, সারাবিশ্বে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। আর দেশের এ উন্নয়নকে ধ্বংস করতেই ষড়যন্ত্রে নেমেছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, সৃষ্টির সেরা জীব হচ্ছেন মানুষ। সেই মানুষকে কেউ কি এমনভাবে গায়ে পেট্রল দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারতে পারে? এত মানুষকে হত্যা করেও বিএনপি নেত্রীর এতটুকু অনুতাপ বা দুঃখবোধ নেই। সংবাদ সম্মেলনেও এত পোড়া মানুষের কথা একবারও বললেন না। তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি নেত্রীসহ তার দলের নেতারা এতই অর্থ-সম্পদ গড়ে তুলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এফবিআই এজেন্টকে বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে ভাড়া করেছে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্র ধরা পড়েছে, মার্কিন আদালতে বিএনপি নেতার জেল হয়েছে। শুধু এখানেই নয়, এফবিআই সাক্ষী দিয়েছে বিএনপি নেত্রীর দুই পুত্র কত অর্থ-সম্পদ বিদেশে পাচার করেছে। দেশের ইতিহাসে আমরাই প্রথম সিঙ্গাপুর থেকে বিএনপি নেত্রীর পুত্রদের পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনেছি। এ প্রসঙ্গে ভারতের বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের সঙ্গে মিথ্যা ফোনালাপ এবং ছয় মার্কিন কংগ্রেসম্যানের ভুয়া বিবৃতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষকে ধোঁকা দিয়ে বিএনপি নেত্রী বোকা বানিয়েছে। কিন্তু শুধু দেশের মানুষই নয়, বিদেশীদের নিয়েও বিএনপি নেত্রী ধোঁকাবাজি-ভাঁওতাবাজি ধরা পড়েছে। বিএনপি নেত্রীকে নাকি ভারতের বিজেপি সভাপতি ফোন করেছে- এটা প্রচার করা হলো। কিন্তু বিজেপি সভাপতি তা অস্বীকার করলো। এমনকি মার্কিন ৬ কংগ্রেসম্যানের নামেও ভুয়া বিবৃতি দিলে ওই কংগ্রেসম্যানরা তা অস্বীকার করে নানা কথা বলেছেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের মাথা এসব ভাঁওতাবাজি করে নিচু ও হেঁট করার অধিকার বিএনপি নেত্রীকে কে দিয়েছে? বাংলাদেশের মানুষের মানসম্মান নিয়ে খেলার অধিকারইবা তিনি কোথায় পেলেন? দেশের জনগণ এসব আর মেনে নেবে না। বিভিন্ন ভূমি অফিসে হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি গোয়েন্দা সংস্থাদের নির্দেশ দিয়েছি কারা ভূমি অফিসে আগুন দিচ্ছে তাদের খুঁজে বের করতে। জড়িতদের কোন জমি থাকবে না, সরকার থেকে তাদের সব জমি অধিগ্রহণ করে জনগণের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া হবে। বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধের কারণে লাখো শিক্ষার্থীর জীবন ধ্বংস হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রীর যত ক্ষোভই যেন দেশের নিরীহ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের ওপর। আড়াইটি মাস শিশুরা স্কুলে যেতে পারেনি। বিএনপি নেত্রীর কারণে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেবেলের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পর্যন্ত দিতে পারেননি। এভাবে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের শিক্ষা জীবন ধ্বংস করে বিএনপি নেত্রী কি অর্জন করতে পেরেছেন? জনসমর্থনহীন সন্ত্রাস-নাশকতা, জ্বালাও-পোড়াও ও পুড়িয়ে মানুষ হত্যা কি ধরনের রাজনীতি? মানুষের কল্যাণে রাজনীতি হলে মানুষকে এভাবে পুড়িয়ে হত্যা কেন?