Saturday, July 4, 2026
চা–শিল্প বিকাশের পথে চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় by মামুন রশীদ
বাংলাদেশে প্রায় দেড় শ বছরেরও বেশি সময় ধরে চা চাষ হচ্ছে। বর্তমানে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, পঞ্চগড় ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৬৮টি বাণিজ্যিক চা–বাগান প্রায় আড়াই লাখ একরের বেশি জমিতে বিস্তৃত। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নবম বৃহত্তম চা উৎপাদক এবং বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ আসে আমাদের দেশ থেকে।
কিন্তু এত বড় উৎপাদন সত্ত্বেও বাংলাদেশের চা–শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আজও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। দেশে উৎপাদিত চায়ের প্রায় পুরোটাই অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহৃত হয়। বছরে প্রায় ৯ থেকে ৯.৫ কোটি কেজি চা দেশেই ভোগ করা হয়। অন্যদিকে বিশেষ মানের ব্লেন্ড তৈরির জন্য কিছু চা আমদানিও করতে হয়। অথচ ২০০২ সালে যেখানে ১ কোটি ৩৬ লাখ কেজির বেশি চা রপ্তানি হয়েছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২২ লাখ কেজিতে। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানিতে আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই এ জন্য অপরাপর দেশের তুলনায় আমাদের চায়ের বেশি দামকে দায়ী করেন।
বাংলাদেশের চা–শিল্প মূলত বেসরকারি উদ্যোক্তা ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের একটি মিশ্র কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইস্পাহানি, জেমস ফিনলে, আবুল খায়ের গ্রুপ, কাজী অ্যান্ড কাজী, ডানকান ব্রাদার্স, ট্রান্সকম, হালদা ভ্যালি ও ওরিয়নের মতো প্রতিষ্ঠান বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে অধিকাংশ সরকারি মালিকানায় রয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত- ন্যাশনাল টি কোম্পানি। বাংলাদেশ চা বোর্ড নিলাম ব্যবস্থা, কারখানার লাইসেন্সিং ও রপ্তানি তদারকির দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু এই কাঠামো এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খুব একটা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।
চা–শিল্পের অন্যতম বড় সমস্যা এর বিপণনকাঠামো। অধিকাংশ চা এখনো চট্টগ্রামের নিলাম ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্রি হয়। ফলে উৎপাদকেরা বিদেশি ক্রেতা কিংবা বড় আন্তর্জাতিক বিপণন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পান না। একই সঙ্গে ব্র্যান্ডিং, আধুনিক প্যাকেজিং এবং মূল্য সংযোজনের অভাবে বাংলাদেশের চা এখনো মূলত বাল্ক পণ্য হিসেবেই বিক্রি হয়।
অর্থায়নও একটি বড় বাধা। চা–শিল্পকে এখনো শিল্প খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে উদ্যোক্তাদের ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। এটিকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। এতে পুনঃ রোপণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ সহজ হবে। সবুজ হলেও চা–শিল্প সবুজ অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত।
বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ৯০০ কেজি চা উৎপাদিত হয়। অথচ কেনিয়ায় এই হার প্রায় ২ হাজার কেজি এবং মালাউইয়ে আড়াই হাজার কেজিরও বেশি। একইভাবে শ্রীলঙ্কার রপ্তানিকারকেরা প্রতি কেজি চায়ের জন্য যে মূল্য পান, বাংলাদেশের উৎপাদকেরা তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম আয় করেন। অর্থাৎ উৎপাদনের চেয়ে মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রেই আমাদের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। বাগানের অতিরিক্ত জমিতে নতুন করে চাষ, উন্নত মানের ফলের চাষসহ সোলার এনার্জি প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শ্রমব্যবস্থা। বহু চা–বাগানে এখনো কয়েক দশক আগের জনবলকাঠামো বহাল রয়েছে। শ্রমিকদের মৌলিক মজুরি সীমিত হলেও অনেকেই উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনার মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় করেন। বাগানগুলোয় আবাসন, রেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধায় এখনো ঘাটতি রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা নিয়ে। তাই শ্রমিক কল্যাণ ও উৎপাদনশীলতাকে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে।
চা–শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নীতিগত সংস্কারের ওপর। প্রথমত, কৃষি খাতের মতো স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিলাম ব্যবস্থার পাশাপাশি উৎপাদকদের সরাসরি রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে হবে। পাকিস্তান, মিসর, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের চায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জৈব ও বিশেষায়িত চায়ের বাজার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে ব্র্যান্ডভিত্তিক রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগও কাজে লাগাতে হবে। চা–শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করতে হবে।
সুশাসন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্পও নেই। ডিজিটাল পে রোল বা বেতন প্রদান, জিপিএস-নির্ভর সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ব্যবস্থা চা–শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন (ইএসজি) মানদণ্ড অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর-সুবিধা ও সহজ অর্থায়নের আওতায় আনলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে।
বাংলাদেশের চা–শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি এর দীর্ঘ ঐতিহ্য, অনুকূল জলবায়ু এবং ঐতিহ্যবাহী শ্রমশক্তি। দুর্বলতা মূলত নীতিমালা, অর্থায়ন, বাজারব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায়। তাই এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন সংস্কার নয়; প্রয়োজন একটি সমন্বিত রূপান্তর পরিকল্পনা। স্বল্প সুদে অর্থায়ন, বাজার উদারীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং মূল্য সংযোজনভিত্তিক রপ্তানি কৌশল বাস্তবায়ন করা গেলে চা–শিল্প আবারও দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের চা–শিল্পের শিকড় যেমন গভীরে প্রোথিত, তেমনি সঠিক নীতি ও সংস্কারের মাধ্যমে এর সম্ভাবনার ডালপালাও আরও অনেক দূর বিস্তৃত হতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের অপরাপর অংশ এ পথে ভাবছে বলে ভালো লাগছে। নীতিমালা গ্রহণ করে সেগুলোর ত্বরিত বাস্তবায়ন হলে আরও ভালো লাগবে।
* মামুন রশীদ, অর্থনীতি বিশ্লেষক
| চা বাগানে কাজ করছেন এক শ্রমিক। ছবি: প্রথম আলো |
Saturday, September 20, 2025
দুর্নীতি দূর না করতে পারলে দারিদ্র্য হটবে না by মামুন রশীদ
এটির কারণ হিসেবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভূরাজনৈতিক কারণকে দায়ী করা হলেও অনেকেই জোরেশোরে বলছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য না এলে দারিদ্র্য হ্রাসের প্রক্রিয়া টেকসই হবে না। সরকারের সাহায্য বা সুযোগ বণ্টনে বৈষম্য বরং দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।
সংগত কারণেই গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে অনেক সরকার এসেছে, অনেক সরকার বিদায় নিয়েছে। এঁদের মধ্যে কেউ বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, কেউবা এশিয়ার উদীয়মান শক্তি হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মৌলিক যে অধিকার—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়নি।
দেশের ব্যক্তি খাতের আপাতবিকাশ ও সাফল্যে শহর-নগরে কোথাও কোথাও গতি, প্রবৃদ্ধি আর সেবার মান বাড়লেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষণীয় নয়। তদুপরি অধিক জনসংখ্যা, দুর্বল সড়ক-জনপথ পরিকল্পনা, জমির ব্যবহার নীতির দুর্বলতা আর বিচার না পাওয়ার সংস্কৃতি মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়তই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এখনো দেশের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। একটি বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে এখন দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ৯৩ বা প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবেই ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭। দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই িচত্র আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। সম্প্রতি পিপিআরসি পরিচালিত ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউসহোল্ড লেভেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, দারিদ্র্যের পাশাপাশি অতিদারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬। তিন বছর পর এসে অতিদারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫-এ।
গবেষণামতে, মূলত ২০২০-২০২২ সালের করোনা মহামারি, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। করোনার প্রভাব অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার এখনো অনেক বেশি। অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে, অথচ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। শিক্ষার মানের অধোগমনও এখানে প্রভাব ফেলছে।
বিগত সরকারের শেষ সময়ে অর্থনীতিতে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা ও লুটপাট চলছিল, তা জনজীবনে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও সার্বিক পরিস্থিতি এখনো ভালো বলা যাবে না। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ মূল্যস্ফীতি কমাতে পারলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি। যেখানে সাধারণ মানুষকে খাদ্যপণ্যের পেছনে আয়ের ৫৫ শতাংশ ব্যয় করতে হয়, সেখানে তাঁদের পক্ষে বেঁচে থাকার অন্যান্য উপকরণের জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। খাদ্যপণ্যের মতো পরিবহন, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে; যদিও সেই অনুপাতে আয় বাড়েনি।
স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার দারিদ্র্যের হার কমাতে টেকসই পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু গত এক বছরে তাদের নীতি-পরিকল্পনায় সে রকম ছাপ দেখা যায়নি। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো গতানুগতিকভাবে চলছে। জুলাই অভ্যুত্থানের আগে থেকে চলে আসা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি চলে গেছে, তা বলার মোটেই সুযোগ নেই।
অনেকেই বলেছেন, দারিদ্র্য বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ কম কিংবা উদ্যোগ থাকলেও সাধ্য নেই। তদুপরি সামাজিক সুরক্ষায় যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা-ও সব সময় উপযুক্ত ব্যক্তি পান না। স্বার্থান্বেষী মহল হাতিয়ে নেয়। প্রচুর দুর্নীতি হয়। গরিবের হক ধনীরা মেরে খায়।
অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করেছে। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে সংশয় আছে। কিন্তু সরকার অন্তত স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারত, যাতে দারিদ্র্যের হার কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। দলগুলোর নেতৃত্ব রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে মাসের পর মাস দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলেও জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যার বিষয়ে সীমাহীন উদাসীনতা দেখিয়ে আসছেন। রয়েছে চিন্তার সক্ষমতার বিষয়টিও। দারিদ্র্য বিমোচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ও নীতি-পরিকল্পনা কী, সেটা জানার অধিকার নিশ্চয়ই নাগরিকদের আছে।
সেই সঙ্গে আরও দুঃখজনক হলো দুর্নীতি দূরীকরণে কাউকে এখন পর্যন্ত জোরে শব্দ করতে শোনা যায়নি। বাংলাদেশে দুর্নীতি কমানো সম্ভব—এটা অনেকে সম্ভবত বিশ্বাসও করেন না। সাঁড়াশি অভিযানের জোর সম্ভবত ভোঁতা হয়ে গেছে কিংবা কাজ করানোতে কারও উৎসাহ নেই। অথচ আমরা জানি, দুর্নীতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র জনগোষ্ঠী।
উপরিউক্ত গবেষণাতেই বলা হয়েছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা পুষ্টিতে পিছিয়ে পড়ছে দরিদ্র মানুষ। তাদের জন্য বরাদ্দ অর্থের অনেকটাই তাদের কাছে পৌঁছায় না। অন্যদিকে সরকারের আয় কম বলে বরাদ্দও কম। রাজনৈতিক বন্দোবস্তও তাদের পক্ষে নয় বা থাকে না। অধিকতর আয়বৈষম্য তাদের ওপর করালগ্রাস হিসেবে কাজ করে। তাই বলাই যায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই টেকসই না হলে দারিদ্র্য হ্রাসও দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
* মামুন রশীদ, অর্থনীতি বিশ্লেষক

Monday, March 23, 2015
হাসিনাকে রেখে জাতিসংঘের অধীনে নির্বাচন হতে পারে -মামুন রশীদ
মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বিশিষ্ট ব্যাংকার ও বিশ্লেষক মামুন রশীদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছে অর্থনৈতিক রিপোর্টার হামিদ বিশ্বাস
Tuesday, February 17, 2015
ভালো করে বাংলা বলি by মামুন রশীদ
আমরা আশা করব, প্রজাতন্ত্রের সব শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি, কর্মকর্তা এবং কুশীলবরা শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ করবেন, ভালো বাংলায় কথা বলবেন ও লেখার চেষ্টা করবেন। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বিপিএটিসি, সামরিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্টাফ কলেজ এবং পুলিশ একাডেমিতে সঠিক বাংলা উচ্চারণ ও শুদ্ধ বাংলায় কথোপকথন দৈনন্দিন প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। চলুন, আমরা সবাই ভালো করে বাংলা বলি। বাংলা শুধু আমাদের মায়ের ভাষা নয়, অদূর ভবিষ্যতের একটি সমৃদ্ধ জাতির যোগাযোগের মাধ্যমও।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তা
Thursday, September 5, 2013
পোশাক শিল্পে ন্যূনতম মজুরি by মামুন রশীদ
বাংলাদেশ মজুরি বোর্ড কর্তৃক ১৯৯৪ সালে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য সর্বনিু মজুরি ধার্য করা হয়েছিল ৯৩০ টাকা। এর ১২ বছর পর ২০০৬ সালে এটি ১৬৬২ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। এরও অনেক পরে ২০১০ সালে এসে এটি ৩০০০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি হতাশাজনক। কেননা বর্তমান জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে এটি খাপ খায় না। যার ফলে প্রায়ই তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা বিক্ষোভ আন্দোলনে নেমে পড়েন।
কিছুদিন আগে ন্যূনতম মজুরি ৮১১৪ টাকা নির্ধারণকল্পে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা-নেত্রীরা দাবি তোলেন। পক্ষান্তরে গার্মেন্ট মালিকরা বর্তমান ন্যূনতম মজুরির ৫০ ভাগ বৃদ্ধি করে তথা ৩০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫০০ টাকা করা বিষয়টি বিবেচনায় আনেন।
পণ্যের অনুকূল মূল্য নির্ধারণ বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য সর্বদাই চ্যালেঞ্জস্বরূপ। পণ্যের নিুমূল্য নির্ধারণ পণ্যের উৎপাদন ও গ্রাহকের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিকে প্রভাবিত করে। আবার উচ্চমূল্য পণ্যের গ্রহীতা বা বিক্রয় কমিয়ে দেয়। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমাদের এগোতে হবে। আমাদের দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান অবস্থার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ থেকে এটা বেশ স্পষ্ট যে, পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে সেটা হতে হবে মালিক, শ্রমিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থাÑ প্রত্যেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য। কোনো পক্ষকেই এতে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। এক্ষেত্রে এটি এখনই চীনের মতো ২০০ ডলার বা এমনকি ভারতের মতো ১০০ ডলার করার পর্যায়ে হয়তো আসেনি। আসেনি এজন্যই যে, বাংলাদেশে ৫৫০০ তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে মাত্র ৩০০০টি সরাসরি রফতানি অর্ডার পেয়ে তৈরি পোশাক রফতানি করে। বাকিরা সবাই স্বল্প লাভে সাব-কন্ট্রাক্ট করে থাকে।
আমরা জানি, তাজরিন ফ্যাশন ও রানা প্লাজার ঘটনা পুরো বিশ্বকে নেতিবাচকভাবে নাড়া দিয়েছে। এতে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। এতে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে নেতিবাচক অবস্থার শিকার হন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। তবে এটাও মানতে হবে, রানা প্লাজা ও তাজরিন ফ্যাশনের ঘটনা শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। ছিল কারখানার নিরাপত্তা, শ্রমিক নিরাপত্তা তথা সামাজিকভাবে শ্রম অধিকারের সঙ্গে জড়িত। অপরদিকে এটাও সত্য যে, তাজরিন ফ্যাশন ও সাভার ট্রাজেডির মতো বিভিন্ন দুর্ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে চাপের মুখে ফেলে বিদেশী ক্রেতারা আদায় করে নিচ্ছেন বাড়তি সুবিধা।
তাজরিন ফ্যাশন ও রানা প্লাজার ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি না পাওয়ার বিষয়টি, সেই সঙ্গে দালানের নিরাপত্তা কমপ্লায়েন্স না থাকা, শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল না থাকা সর্বোপরি শ্রমিকদের সামান্যতম জীবন-মানের তত্ত্বাবধান না থাকার বিষয়টি নিয়ে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। আন্তর্জাতিক মানে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি পোশাক শিল্পের নির্মাণ অবকাঠামো সুদৃঢ় করতে হবে। নিুমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে ভবন তৈরি করে নিরীহ শ্রমিকদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা অবশ্যই জোরদার করতে হবে। আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেকটাই অচল। সেই সঙ্গে আগুন লাগলে পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট (পিএ) সিস্টেম না থাকায় এবং ফ্লোর ম্যানেজারের অসতর্কতায় আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশেই বেড়ে যায়।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রায় ২০০০ ফ্যাক্টরিতে নিরাপত্তা নিরীক্ষার কোনো ব্যবস্থাই নেই। অবশ্যই এ বিষয়গুলো আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। একজন ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টরকে নিশ্চিত হতে হবে, ফ্যাক্টরিতে বা ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্টে ন্যূনতম মান অনুসরণ করা হচ্ছে। আমাদের ফায়ার ব্রিগেডকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে হবে।
চীনের পোশাক শিল্পে মাসিক মজুরি ২০০ ডলারেরও বেশি। তবে চীনা শ্রমিকরা ২০০ ডলারের বেশি মজুরি নিয়ে যা উৎপাদন করছে, আমাদের শ্রমিকদের একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করতে লাগছে প্রায় ২০০ ডলার। সেক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি কম নয়। যেখানে বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি ৪০ ডলারের নিচে, সেখানে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে ন্যূনতম মজুরি ১১৩ ডলার, পাকিস্তানে ন্যূনতম মজুরি ১১৮ ডলার এবং ভিয়েতনামে ন্যূনতম মজুরি ১২০ ডলার। দেশের পোশাক খাতের মজুরি নিয়ে প্রশ্ন সেখানেই। আবার এটাও সত্য যে, সদ্য যোগদানকারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই শুধু ন্যূনতম মজুরির বিষয়টি প্রাসঙ্গিক কিংবা বড়জোর ৬ মাস একজন শ্রমিককে এই বেতনে রাখা যায়। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের মাসিক আয় প্রায় ৭০০০ টাকা বলে পত্রিকান্তরে জানা গেছে।
নিরাপদ ভবন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, জ্বালানি সমস্যার সমাধান, উপযুক্ত অবকাঠামো, কমপ্লায়েন্স ডেভেলপমেন্ট এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। এ ব্যাপারে আমেরিকা, ইউরোপ ও জাপান থেকেও আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। কেননা সেখানে শুধু শ্রমিকদের মজুরিই নয়, তাদের নিরাপত্তা, জীবনমান উন্নয়ন, উন্নত কর্মপরিবেশ ইত্যাদি সবকিছু নিয়েই চিন্তাভাবনা রয়েছে তাদের। শ্রমিকরাও কেবল বেতনের দিকে মুখিয়ে থাকেন না। আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু অদ্যাবধি এর প্রতি গুরুত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এই শিল্পে যেসব অভাব-অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর সমাধানকল্পে আমাদের প্রয়োজন পূর্ব পরিকল্পনা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কেননা পথ কণ্টকাকীর্ণ হলেও সম্ভাবনা প্রচুর।
মামুন রশীদ : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
Tuesday, July 23, 2013
কী হবে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক এজেন্ডা by মামুন রশীদ
আগামী জাতীয় নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ছয় মাস পরই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে অবশ্যই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল জয়লাভ করে সরকার গঠন করবে। যেহেতু দেশের অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয় রাষ্ট্র পরিচালনায় ফ্রন্টলাইনে চলে এসেছে, সেহেতু নতুন সরকারের অর্থনৈতিক এজেন্ডা কী হতে পারে, সে বিষয়ে কিছুটা আলোচনা করার চেষ্টা করছি।
প্রথমেই যে বিষয়টি এসে যায় সেটি হচ্ছে বিদ্যুৎ। বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট চেষ্টা চালিয়েও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। তারপরও জাতীয় গ্রিডে আশাব্যঞ্জক পরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ খরচও যথেষ্ট বেড়েছে বলে প্রতীয়মান। বিদ্যুতের খরচ বাড়লেও এর চাহিদা কোনো অংশেই কমছে না, বরং বাড়ছে। দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। বিদ্যুতের চেয়েও আরও একটি বড় সমস্যা হচ্ছে গ্যাস সংকট। কেননা গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না, কল-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন কল-কারখানা বাস্তবায়নের মুখ দেখছে না। সুতরাং গ্যাস সংকট উত্তরণেও আমাদের বিশেষ নজর দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। গ্যাস সংকট সমাধানে সরকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেই চেষ্টা তেমন একটা ফলদায়ক হয়নি। গ্যাস উত্তোলনে সরকার সঠিক সময়ে টেন্ডার দিতে পারেনি। যেসব প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের অভিযোগ, তাদের ঠিক সময়ে জায়গা বুঝিয়ে দেয়া হয়নি, কন্ট্রাক্ট কনফারমেশন করা হয়নি। যার ফলে এনার্জি সেক্টরে সমস্যার সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘকালীন সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। এলএনজি বা লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস প্রকল্প স্থাপনের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এলেও তারও অগ্রগতি হয়নি। বিদেশী দু’-একটি এনার্জি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে বলেছিল, তারা বঙ্গোপসাগরে একটি প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের মাধ্যমে এলএনজি জাতীয় গ্রিডে দেবে, এর বিনিময়ে পেট্রোবাংলা ওই প্রতিষ্ঠানকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টোল দিয়ে যাবে। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে টেন্ডার ডাকা হয়েছিল এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজটি বুঝিয়ে দেয়ার কথাও হয়। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের অনমনীয় শর্তের কারণে কাজটি বেশিদূর এগোতে পারেনি। ফলে এনার্জি সংকটের বিষয়টি সংকটের আবর্তেই রয়ে গেছে।
এনার্জি সেক্টরের আরেকটি বিষয় হচ্ছে কয়লা। আমাদের দেশের কয়লার মান যথেষ্ট ভালো। কিন্তু সরকারের কয়লানীতি অনুমোদনের জটিলতার কারণে সেটিও মুখথুবড়ে পড়ে রয়েছে। কোল কর্পোরেশন গঠন করার যে পদক্ষেপ নেয়ার কথা ছিল, সেটিও বাস্তবতার মুখ দেখেনি। সুতরাং যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এ বিষয়গুলো সরকারের প্রধান পরিকল্পনার মধ্যে রাখা উচিত বলে আমি মনে করি।
আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে দেশের বন্দর ও পোতাশ্রয়ের বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। আমাদের যে প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর রয়েছে সেখানে যথেষ্ট পরিমাণ খাঁড়ি বা গভীরতা নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভারি জাহাজ সেখানে নোঙর করতে পারে না। যার কারণে পণ্য বোঝাই বা পণ্য খালাস করতে যথেষ্ট ঝামেলা পোহাতে হয় এবং এতে অনেকটা সময়ও ব্যয় হয়। এটা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি প্রধান অন্তরায়। আমরা শুনেছিলাম, আমাদের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশী এক্সপার্টদের সহায়তায় দ্রুত শেষ করা হবে। এ ব্যাপারে সরকার কিছুটা এগিয়েছে। কিন্তু এভাবে ধীর পদক্ষেপে এগোতে থাকলে ২০১৮ সালের পর পণ্য লোড-আনলোড ক্যাপাসিটি একটি সংকটের আবর্তে পড়বে বলে অনেকে মনে করছেন। সুতরাং যেভাবেই হোক, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে এবং সমুদ্রবন্দরগুলোকে যুগোপযোগী করতে হবে। সেই সঙ্গে বন্দরে দুর্নীতি কমাতে হবে। এর সঙ্গে প্রধান যে সমস্যা পোতাশ্রয়ের গভীরতা, সেটি দূর করতে হবে। পর্যাপ্ত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পোতাশ্রয়ের গভীরতা বাড়ানো সম্ভব। সেটি সরকার ইচ্ছে করলেই করতে পারে। দেশের নৌ-বন্দরগুলোরও গভীরতা কম থাকার কারণে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য অগ্রসর হতে পারছে না। নৌ-পথে ট্রান্সপোর্ট ব্যয় কম থাকার কারণে পণ্য পরিবহনের বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে যদি বন্দর ও নদীগুলোর গভীরতা বাড়াতে পারি, তাহলে পণ্য পরিবহনের দ্বার খুলে যাবে। যার ফলে নদীর উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বিভিন্ন প্লান্ট, কল-কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। এতে করে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বিনিয়োগ বাড়বে, দারিদ্র্য হ্রাস পাবে, সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটবে। সুতরাং নতুন সরকারকে ড্রেজিংয়ের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যৌথ দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে একটি প্রাইভেট পোর্ট প্রতিষ্ঠার কথাও ভাবা যেতে পারে। এমনকি কুয়াকাটার সন্নিকটে রামনাবাদ চ্যানেলে গড়ে উঠতে পারে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর। পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পোর্টগুলো হয়ে উঠবে আরও সহায়ক ও দক্ষ।
দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন করা উচিত। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের যে প্রক্রিয়া চলছে, সেটি খুবই শম্বুকগতিতে চলছে। এ প্রক্রিয়াকে কিভাবে দ্রুত এগিয়ে নেয়া যায় সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন সরকারের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আলোচনা-সমালোচনা থাকবে। এটা গণতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু দ্বান্দ্বিকতাকে কেন্দ্র করে বসে থাকা চলবে না। এগিয়ে যেতে হবে। সেটি আলোচনার মাধ্যমেই হোক বা সমঝোতার মাধ্যমেই হোক। এ ব্যাপারে দুর্নীতিকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। আমাদের দেশে বিভিন্ন সরকারি বা সামরিক প্রতিষ্ঠানে অনেক মেধাবী প্রকৌশলী, প্রকল্পবিদ ও ব্যবস্থাপক রয়েছে। পদ্মা সেতুর ব্যাপারে তাদের কাজে লাগানো উচিত বলে আমি মনে করি।
কৃষিতে আমাদের অগ্রসরতা এখনও কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছেনি। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তারা তাদের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে কৃষিতে যথেষ্ট অগ্রগতি লাভ করছে। এর ফলে তারা কৃষিপণ্য বিশ্ববাজারে রফতানি করে অর্থনীতি সচল রাখতে পারছে। যেটি আমাদের দেশে সম্ভব হয়ে উঠছে না। জিডিপিতে দেশের কৃষির অবদান ১৮ শতাংশের মতো। কিন্তু কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমশক্তি প্রায় ৪৫ শতাংশ। অবশ্যই এর পরিমাণ আমাদের বাড়াতে হবে। ধান গবেষণায় আমাদের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। ইরি ও বোরো সে গবেষণারই ফল। কিন্তু ইরি ও বোরো চাষাবাদে আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ পানি খরচ হয়। সুতরাং অল্প পানির সাহায্যে কিভাবে উন্নত ধান চাষ করা যায়, সেটি আমাদের গবেষণায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে কৃষক যাতে দামে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সরকারের বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন।
কৃষককে প্রণোদনার মাধ্যমে হোক, সহযোগিতার মাধ্যমে হোক, কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে উৎপাদিত পণ্য বিশেষ করে চাল বিদেশে রফতানি করার প্রক্রিয়াটি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। সুতরাং কৃষি ও খাদ্য গবেষণায় আমাদের আরও জোর দিতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত যদি এ ব্যাপারে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না? প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে গাটছড়া বাঁধতে হবে।
আমাদের অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ব্যবসা-বাণিজ্যে যথেষ্ট উন্নতি করেছেন। এখন তাদের উচিত বিদেশে কিভাবে অর্থলগ্নি করা যায় সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা। আমাদের একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, সেটি হচ্ছে শিল্পের কারণে এবং আবাসনের কারণে আমাদের কৃষি জমি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বিশ্বের যেসব দেশ উর্বর জমি থাকা সত্ত্বেও জনবলের অভাবে কৃষি কাজ করতে পারছে না, সেসব দেশের পতিত জমিগুলো আমাদের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করে সেখানে কিভাবে কৃষি উৎপাদন করা যায়, সেসব বিষয় নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হতে পারে, সেখানে উৎপাদিত পণ্যের ৫০ শতাংশ আমাদের দেশের জন্য দিতে হবে। এ বিষয়টি যদি আমাদের মাথায় থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে কৃষি জমি কমে গেলেও দেশে খাদ্য ঘাটতির বিষয়টি থাকবে না।
দেশের প্রাইভেট সেক্টর নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত। বিগত ২২ বছরে প্রাইভেট সেক্টর দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। সুতরাং প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশকে আমাদের ত্বরান্বিত করতে হবে। প্রাইভেট সেক্টর নিয়ে যে আইন রয়েছে, সেগুলোকে যুগোপযোগী করতে হবে। ১৯৪৭ সালের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন আইনটি প্রাইভেট সেক্টর বিকাশের ক্ষেত্রে গলার কাঁটা হিসেবে বিঁধে রয়েছে। আমাদের এ স্বাধীন দেশে এখনও কেন ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া আইন অনুসরণ করতে হবে? যেহেতু দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি প্রাইভেট সেক্টর, সেহেতু এর অগ্রসরতার জন্য আইনকে যুগোপযোগী করা উচিত। আইন মন্ত্রণালয় শুধু বিরোধী দলকে ঠেঙ্গানোর জন্য আইন প্রণয়ন করবে না। দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য কিভাবে অগ্রসরমান হয়, সেদিকেই নজর দেবে। কোন কোন আইন উদ্যোক্তা তৈরিতে বাধা এবং কোন কোন মান্ধাতার আমলের আইন দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সহায়ক নয়, সেসব আইন যুগোপযোগী করা একান্ত প্রয়োজন। ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন আইনটি দিয়েই শুরু করা যেতে পারে।
নতুন সরকারের কাছে জাতির অনেক প্রত্যাশা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। জাতির এ প্রত্যাশাগুলো সরকার আমলে নিয়ে নব উদ্যমে দেশকে এগিয়ে নেবে, বিশেষ করে এ প্রবন্ধে আলোচ্য বিষয়গুলোকে নতুন সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মামুন রশীদ : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
Tuesday, February 5, 2013
প্রাকৃত থেকে বাংলা, তারপর... by মামুন রশীদ
Tuesday, January 22, 2013
প্রাকৃত থেকে বাংলা, তারপর... by মামুন রশীদ
Thursday, January 17, 2013
রাষ্ট্রের জমিতে ব্যবসা- * রাজধানীর ভাসানটেকে রাষ্ট্রের ৫০০ কোটি টাকার জমি নিয়ে ব্যবসা করছে নর্থ-সাউথ প্রপার্টি- * সরকারের সঙ্গে সব চুক্তি ভঙ্গ করা হয়েছে- * চুক্তিতে বসত্মিবাসী ও দরিদ্ররা ফ্যাট পাবে বলা হলেও তা মানা হয়নি by মামুন রশীদ
Tuesday, January 15, 2013
মেলায় লেখকদের নতুন বই by মামুন রশীদ
Friday, January 11, 2013
হাতের মুঠোয় শেয়ার বাজার by মামুন রশীদ
Thursday, January 10, 2013
হোসে মার্তি অশানত্ম কাগজের সমুদ্র by মামুন রশীদ
পোল্যান্ডের পাহাড়ে পুরনো পায়ের ছাপ by মামুন রশীদ
Wednesday, November 28, 2012
আমায় ক্ষমো হে-'ভারত সম্পর্কের' সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার by মামুন রশীদ
Tuesday, October 23, 2012
আমায় ক্ষমো হে-বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ by মামুন রশীদ
Friday, August 10, 2012
গ্রামীণ ব্যাংক-দারিদ্র্য জয়ের লড়াইয়ে সমঝোতা চাই by মামুন রশীদ
Sunday, August 5, 2012
আমায় ক্ষমো হে-স্থানীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ by মামুন রশীদ
Monday, July 16, 2012
আমায় ক্ষমো হে-আন্ডার-ইনভয়েসিং, ওভার-ইনভয়েসিং ও বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের দাম by মামুন রশীদ
Friday, June 29, 2012
হরতাল-অস্থিতিশীলতা বনাম অনিশ্চয়তা by মামুন রশীদ
Tuesday, June 19, 2012
অর্থনীতি-ব্যাংক খাতের চ্যালেঞ্জ by মামুন রশীদ
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...


