Friday, September 13, 2024

সিরিয়ায় ইরানের গোপন অস্ত্রাগারে ইসরায়েলি হামলা, নথি লুট

সিরিয়ায় ইরানের গোপন অস্ত্রাগারে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির এলিট ফোর্সের সেনারা এ হামলা চালিয়েছে। এতে কারাখানাটি ধ্বংস হয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টম্বর) ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম এক্সিওস জানিয়েছে, গোপন ওই কারখানায় নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হয়। গত সপ্তাহে এ অভিযান চালানো হয়।

সিরিয়ার ভূখণ্ডের ভেতর প্রবেশ করে ইরানের তৈরি করা একটি গোপন ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা ধ্বংস করেছে দখলদার ইসরায়েলের এলিট ফোর্সের সেনারা। গত সপ্তাহে তারা এই অভিযান চালায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোপন এ কারখানায় ইসরায়েলি জাসলা ইরান ও লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা হিজবুল্লাহর জন্য বড় ধাক্কা। কেননা সিরিয়ায় তৈরি এসব ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মিত্রগোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া ইরানের লক্ষ্য ছিল।

ইসরায়েল এর আগেও সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা ধ্বংস করেছে। ফলে মাটির নিচে কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করে ইরান। এ পরিকল্পনা অনুসারে এটি মাটির নিচে স্থাপন করা হয়। কারখানাটি মাটির এতোই গভীরে স্থাপন করা হয়েছিল যে বিমান হামলার মাধ্যমে এটিকে ধ্বংস করা সম্ভবপর ছিল না। ফলে স্থল হামলা চালিয়ে এটিকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হয়। এ জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের স্পেশাল ফোর্সের সেনারা গত সপ্তাহে হেলিকপ্টারে করে এলাকাটিতে যায়। এ সময় সিরিয়ার সেনাদের ঠেকাতে সেখানে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়।

সংবাদমাধ্যম এক্সিওস জানিয়েছে, কারখানাটি থেকে গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এরপর বিস্ফোরক দিয়ে কারখানাটি ধ্বংস করে দেয় তারা। এ সময় কারখানায় থাকা সিরিয়ান গার্ডদের কয়েকজনকে হত্যা করে তারা।

টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা কয়েকজন ইরানিকে আটক করেছে। তবে আটকদের সর্বশেষ অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানাটি এর আগেও দুবার হামলার পরিকল্পনা করেছিল ইসরায়েল। তবে বিষয়টি অতি ঝূঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেসব পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। 

ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান। পুরোনো ছবি
ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান। পুরোনো ছবি

বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার পথেই থাকুক ভারত, চায় যুক্তরাষ্ট্র

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আগামীকাল শনিবার ঢাকায় আসছে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলটির নেতৃত্ব দেবেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও অর্থ দপ্তরের আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যান। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জরুরি চাহিদা এবং দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে এই সফরে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সংস্কারে কীভাবে সহায়তা করা যায়, তাতে গুরুত্ব দেবে।

ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের সন্ধিক্ষণে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সংস্কারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এক দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে নেওয়ার পথ উন্মোচিত হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কারে যেখানে যেখানে সহযোগিতার সুযোগ আছে, সেখানেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র।

ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদলের এবারের বাংলাদেশ সফরে অর্থনীতিতে অগ্রাধিকার থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাজনীতি দুই দেশের সম্পর্কে বড় নিয়ামক হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য হিসেবে কাল দুপুরে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। আলবেনিয়া আর কিরগিজস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন শেষে তিনি ২০২১ সালে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ডোনাল্ড লু এই দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তাঁকে নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এবার ওয়াশিংটন থেকে দিল্লি হয়ে তিনি ঢাকায় আসছেন। দিল্লিতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন তিনি। ফলে ঢাকায় আসার আগে তাঁর দিল্লি সফর নিয়ে বাংলাদেশে কৌতূহলের কারণ রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একধরনের অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক।

ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। তবে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভারত যেভাবে দেখছে, একইভাবে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে চায়। ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা, ঢাকার সঙ্গে সহযোগিতার পথেই হাঁটবে দিল্লি। বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বার্তা ভারতকে দিয়েছে। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সুসম্পর্কের স্বার্থে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ ও কথাবার্তা নিয়মিতভাবে চালু থাকাটা জরুরি বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ হোক।

    কাল ঢাকায় আসছে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল

    দিল্লিতে বৈঠক করে আসবেন ডোনাল্ড লু

    ওয়াশিংটন সম্প্রতি বার্তা দিয়েছে দিল্লিকে

যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও অর্থ দপ্তরের আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলে ডোনাল্ড লু ছাড়াও রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার (ইউএসএআইডি) উপসহকারী প্রশাসক অঞ্জলি কাউর, যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চ।

জানা গেছে, এই সফরের সময় বাংলাদেশকে ইউএসএআইডির ২০০ কোটি ডলারের আর্থিক খাতে কারিগরি সহযোগিতার বিষয়ে একটি চুক্তি সই হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা কাল শনিবার আলাদা আলাদাভাবে ওয়াশিংটন ও দিল্লি থেকে ঢাকায় আসবেন। কাল বিকেলে তাঁরা একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। প্রতিনিধিদলটি আগামী রোববার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবে। দুপুরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। ওই দিন বিকেলে প্রতিনিধিদলের নেতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব দপ্তরের ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
সংস্কারে সহযোগিতা ও বিনিয়োগের উন্নতি

বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনাটা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার পাশাপাশি পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে সহায়তা করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করে নতুন বিনিয়োগের পথ সুগম করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই সহযোগিতার ৭০ শতাংশে অবদান শেভরন আর এক্সিলারেট এনার্জির। এই মুহূর্তে শেভরনের ২০ কোটি ডলার বাকি রয়ে গেছে। কীভাবে এই টাকা পরিশোধ করা হবে, সেটা জরুরি। তাই ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের স্বার্থে বকেয়া টাকা পরিশোধ ও লভ্যাংশ ফেরতের মতো বিষয়গুলোর সুরাহা হওয়াটা জরুরি।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও অর্থ বিভাগ বাংলাদেশের আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনতে বিষয়ে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশে উন্নতি ও দুর্নীতি দমনে সহায়তা দিতে আগ্রহী।

বাজেট–সহায়তা বা ঋণ নয়, আর্থিক খাতে কারিগরি–সহায়তা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতায় গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে বাজেট–সহায়তা বা ঋণের বিষয়টি এসেই যায়। কিন্তু দুই দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এটা মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে, বাংলাদেশের রিজার্ভে ঘাটতি আর আর্থিক সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এই মুহূর্তে ঋণ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর প্রক্রিয়াগতভাবে কংগ্রেসের অনুমোদনসহ নানা কারণে সেটি সম্ভবও নয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কংগ্রেসের অনুমোদনের পর ইউক্রেনকে বড় আকারে ঋণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ঢাকার এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, প্রক্রিয়াগত কারণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মানুযায়ী ঋণ পাওয়ার সুযোগ নেই। আবার যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের বছরে তা প্রায় অসম্ভব। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশকে সহায়তা করার সুযোগ আছে যুক্তরাষ্ট্রের।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই কূটনীতিক এই প্রতিবেদককে বলেছেন, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, পাচার হওয়া টাকার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আর্থিক খাতে নজরদারির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও অর্থ বিভাগের বিশেষায়িত জ্ঞান রয়েছে। এ বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র কারিগরি সহযোগিতা দিতে তৈরি আছে।

ওয়াশিংটনের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলাদা একটি বৈঠক করে কোথায় কোথায় সহযোগিতা দরকার, তা জানবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও অর্থ দপ্তরের আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যান এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু
যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও অর্থ দপ্তরের আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক সহকারী আন্ডার সেক্রেটারি ব্রেন্ট নেইম্যান এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুফাইল ছবি

আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার আরাফাতকে নিয়ে গ্রামে ক্ষোভ-বিস্ময়

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার পুলিশ পরিদর্শক আরাফাত হোসেনকে নিয়ে বরিশালের হিজলা উপজেলায় তাঁর নিজ গ্রামে বেশ কয়েক দিন থেকেই কানাঘুষা চলছিল। এ নিয়ে এলাকার লোকজন নানা প্রশ্ন করতেন, জানতে চাইতেন স্বজনদের কাছে। মানুষ মুঠোফোনে ভিডিও দেখে বলতেন, আরাফতের মতো একজনের চেহারা। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, আবার অবিশ্বাসও করা যাচ্ছে না।

সম্প্রতি আরাফাতের এক স্বজন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের কাছে এই অভিজ্ঞতার কথা জানান। হত্যাকাণ্ড ও লাশ পোড়ানোর কাজে আরাফাত হোসেনের জড়িত থাকার বিষয় নিয়ে ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তাঁর গ্রামের মানুষ।
আশুলিয়া থানা এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গুলি করে মানুষ হত্যার পর লাশ ভ্যানে তোলার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আরাফাতের সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর পর থেকেই আরাফাতের খোঁজখবর পাচ্ছিলেন না গ্রামের স্বজনেরা। এ নিয়ে ধূম্রজালের মধ্যে ছিলেন গ্রামের লোকজন। আজ শুক্রবার র‍্যাব-৩ এক খুদে বার্তায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় ‘সম্পৃক্ত’ আরাফাতকে গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করে। তাঁকে ঢাকার আফতাবনগর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে ওই বার্তায় জানানো হয়।

আরাফাত হোসেন হিজলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের পূর্বকান্দি গ্রামের আরিফ হোসেন সিকদারের ছেলে। আরিফ হোসেন বদরটুনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তিনি হিজলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও হরিনাথপুর ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি। এলাকায় সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি আছে তাঁর।
আরাফাত ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ৭ সেপ্টেম্বর পূর্বকান্দি গ্রামে আরাফত হোসেনের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে তাঁদের সেমিপাকা দোতলা টিনের ঘর থাকলেও সেখানে মূল দরজায় তালা ঝুলছে। বাড়িতে স্বজনদের আরও তিনটি ঘর আছে।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আরাফাত সবার বড়। অবসর গ্রহণের পর আরাফাতের মা–বাবা ঢাকায় থাকতেন। বাড়িতে খুব একটা আসেন না তাঁরা। আরাফাত বদরটুনি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাস করেন। পরে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। সেখান থেকে ২০০১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর ভূগোল বিষয়ে ভর্তি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা শেষ করে যোগ দেন পুলিশে।

আরাফাতের বিষয়ে কথা হয় তাঁর মামাতো ভাইয়ের ছেলে নাসির মুনসির সঙ্গে। একই বাড়িতে ভিন্ন ঘরে বাস তাঁদের। আশুলিয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে নাসির মুনসি বললেন, ‘ভিডিওতে যা দেখেছি, এটা সত্যি হলে, ঘটনাটি খুবই নিষ্ঠুর, পাশবিক কাজ হয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, অনেক সময় চাকরির সুবাদে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেক নির্মম কাজও করতে হয়। জানি না কী পরিস্থিতিতে তিনি এমন কাজ করেছেন।’

ওই বাড়ির বাসিন্দা ও সম্পর্কে আরাফাতের নানি সুফিয়া বেগম বলেন, ‘আরাফাত আমাগো ধারে আরজু নামে পরিচিত। ছোটবেলা হইতে গোনে আরজুরে (আরাফাত) দেইখ্যা আইছি। কইতে গেলে আমাগো কোলেই বড় হইছে। কিন্তু হ্যারে কোনো দিন খারাপ কাজ করতে দেহি নাই। এহন যা হুনি, খুবই অবাক লাগে, ভিডিওতে যা দেহি, কইতে পারি না, সে এমন কাজ ক্যামনে করল।’

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, মাথায় পুলিশের হেলমেট। সাদা পোশাকের ওপর পুলিশের ভেস্ট পরা এক ব্যক্তি আরেকজনের সহায়তায় চ্যাংদোলা করে নিথর এক যুবককে দুই হাত ধরে ভ্যানের ওপর তুলছেন। ভ্যানের ওপর আরও কয়েকটি নিথর দেহ স্তূপ করে রাখা। দেহগুলো থেকে ঝরে পড়া রক্তে ভিজে গেছে সড়কের কিছু অংশ। বিছানার চাদরের মতো একটি চাদর দিয়ে তাঁদের ঢেকে রাখা হয়েছে। পাশেই পুলিশের হেলমেট, ভেস্ট পরা আরও কয়েকজন।

গ্রামের বাসিন্দা নুর মোহম্মদ বলেন, ‘পুলিশের চাকরি নেওয়ার পর আরাফাত গ্রামের বাড়িতে খুব কম আসতেন। তাঁকে জড়িয়ে আশুলিয়া থানা এলাকায় ভ্যানে লাশ ওঠানো নিয়ে নানা কথা শোনা যাচ্ছিল। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কারণ, তাঁকে ছোটবেলা থেকে কখনো উগ্র স্বভাবের দেখিনি। তাঁর বাবাও অত্যন্ত সজ্জন ও ভালো মানুষ। পরে ভিডিও দেখে নিজের কাছেই খারাপ লেগেছিল। আরিফ স্যারের ছেলে হয়ে এমন কাজ কীভাবে তিনি করলেন? এমন নৃসংশতায় শুধু এই এলাকার মানুষ নয়; পুরো হিজলা উপজেলার মানুষই লজ্জিত।’

গ্রেপ্তার আরাফাত হোসেন
গ্রেপ্তার আরাফাত হোসেন ছবি: র‍্যাবের সৌজন্যে

দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ায় হামলা চালানো হলে তা হবে রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর যুদ্ধ: পুতিন

পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ায় হামলা চালানোর অনুমতি দিলে তা তাঁর দেশের সঙ্গে ন্যাটোর যুদ্ধে জড়ানোর শামিল হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

রাশিয়ায় দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনের হামলা প্রসঙ্গে স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে পুতিন বলেন, ‘এতে এই সংঘাতের মূল ধরনে বড় ধরনের বদল আসবে। এর অর্থ হবে, ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলো অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে। আর এটা হলে সংঘাতের ধারণাই বদলে যাবে। তখন আমাদের জন্য যে হুমকি তৈরি হবে, তার ভিত্তিতে আমরা যথাযথ সিদ্ধান্ত নেব।’

যুক্তরাষ্ট্রের সময় আজ শুক্রবার ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। জানা যায়, এই বৈঠক থেকেই তাঁরা দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালাতে ইউক্রেনকে অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করবেন। সেই বৈঠকের আগেই ইউক্রেনসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে সতর্ক করে এমন হুমকি দিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন।

পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে যেসব অস্ত্র দিয়েছে বা দিচ্ছে, সেসব অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভেতরে হামলা না চালানোর শর্ত রয়েছে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ শর্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, পশ্চিমা দেশগুলো এই শর্ত তুলে নিলে ইউক্রেন দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভেতরে বিমানঘাঁটি, অস্ত্র-গোলাবারুদের গুদাম ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারবে।

বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকের আগে ইউক্রেনকে দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ায় হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই সংঘাত রাশিয়া শুরু করেছে। রাশিয়া বেআইনিভাবে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়েছে। রাশিয়াই এই সংঘাতের সমাপ্তি টানতে পারে। আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে ইউক্রেনের।’

এদিকে দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালাতে ইউক্রেন যে অনুরোধ জানিয়েছে, তা নিয়ে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সম্প্রতি ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফরে গিয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ও ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি। কিয়েভে গিয়ে ইউক্রেনকে নতুন করে আরও ১৫০ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন তাঁরা।

জো বাইডেন অবশ্য ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার সীমান্ত এলাকায় হামলা চালানোর অনুমতি দিয়েছেন। তবে রাশিয়ার ভেতরে কতদূর পর্যন্ত হামলা চালানো যাবে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র শর্তও দিয়ে রেখেছে। ইউক্রেন যেসব অনুরোধ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (অ্যাটাকমস) দিয়ে রাশিয়ার ভেতরে হামলা চালানোর অনুমতি।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

ভারী বর্ষণে ডুবেছে শহর: কক্সবাজারে হোটেলে আটকা ২৫ হাজার পর্যটক by আব্দুল কুদ্দুস

টানা ২০ ঘণ্টার ভারী বর্ষণে ডুবেছে কক্সবাজার শহর। সৈকত এলাকার হোটেল-রিসোর্ট, কটেজ জোনে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন পর্যটকেরা। আজ শুক্রবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত অন্তত ২৫ হাজার পর্যটক আটকা পড়েছেন হোটেলকক্ষে। জলাবদ্ধতার কারণে তাঁরা কোথাও বের হতে পারছেন না। সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে লাল নিশানা উড়িয়ে পর্যটকদের সমুদ্রে নামতে নিষেধ করা হচ্ছে।

গত ৫০ বছরে শহরজুড়ে এমন জলাবদ্ধতা দেখেননি জানিয়ে কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, অপরিকল্পিত সড়ক উন্নয়ন, ঠিকমতো নালা পরিষ্কার না করা এবং শহরের পাহাড় নিধন বন্ধ না হওয়ায় এমন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

হোটেলমালিক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীরা জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় বৃষ্টিপাত শুরু হলেও ভারী বর্ষণ শুরু হয় দুপুর সাড়ে ১২টায়। এরপর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টার ভারী বর্ষণে পুরো শহরের ৮ লাখ মানুষের জীবন অনেকটা থেমে যায়।

আজ সকাল ১০টায় আবার ভারী বর্ষণ শুরু হয়, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত আরও কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণে শহরের প্রধান সড়ক, কলাতলী সৈকত সড়কসহ অন্তত ৩৫টি উপসড়ক ডুবে গেছে। বন্ধ রয়েছে যানবাহন চলাচল।

কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ এ বি হান্নান বলেন, গতকাল বেলা ৩টা থেকে আজ বেলা ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ৫০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চলমান মৌসুমে এটি এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড। ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। বাতাসের তীব্রতাও বেশি থাকবে, যা দমকা ও ঝোড়ো হাওয়া আকারে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে বৃদ্ধি পেতে পারে।

হোটেলে আটকা পর্যটকেরা

আজ বেলা সাড়ে ১১টা। কলাতলী সৈকতের একটি গেস্টহাউস থেকে নারী-পুরুষের পাঁচজনের একটি দল সড়কে নেমে সমুদ্রসৈকতের দিকে রওনা দেয়। কিছু দূর হাঁটার পর সামনে পড়ে চার লেনের কলাতলী সৈকতসড়ক। পুরো সড়ক তখন বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে। যানবাহনের চলাচল নেই। চলছে ঝোড়ো হাওয়াসহ ভারী বৃষ্টি। সবাই আশ্রয় নেন একটি দোকানের ভেতর।

দলের একজন সোহেল আহমদ (৩৪) বলেন, গতকাল সকালে তাঁরা ঢাকা থেকে কক্সবাজার ভ্রমণে আসেন। তাঁরা গাড়ি থেকে নামার পর বৃষ্টির শুরু হয়। এরপর হোটেলে উঠে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে বিকেল পাঁচটার দিকে সুগন্ধা সৈকতে নামেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে গোসল করা হয়নি কারও। আজকের অবস্থা আরও ভয়াবহ। বৃষ্টির থামাথামি নেই।

আরেক পর্যটক সাইফুর রহিম বলেন, পর্যটন শহরের এমন জলাবদ্ধতা কল্পনা করা যায় না। বৃষ্টির পানি নামার কোনো পথই নেই। সড়কের পাশের নালাগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরা। যে কারণে বৃষ্টির পানি সড়কের ওপর জমে আছে। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটকদের চরম দুর্ভোগ যাচ্ছে।

দেখা গেছে, সকাল সাতটা থেকে হোটেল–মোটেল জোনের পাঁচ শতাধিক হোটেল, গেস্টহাউস, কটেজ-রিসোর্ট বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। কলাতলী সড়ক, সুগন্ধা সড়ক, সিগাল সড়ক পানিতে সয়লাব। এই তিন সড়কের দুই পাশসহ ঝিনুক মার্কেটের তিন হাজার দোকানপাট পানিতে নিমজ্জিত। ভারী বর্ষণে টিকতে না পেরে সৈকতে থাকা ৩৫টির বেশি ঘোড়া এদিক-সেদিক ছুটছে। কিছু ঘোড়া দোকানপাট ও রেস্তোরাঁয় আশ্রয় নিয়েছে।

জলাবদ্ধতার কারণে হোটেল–মোটেল জোনের ১৮টি সড়ক ডুবে গেছে জানিয়ে কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান প্রথম আলোকে বলেন, আজ ৫ শতাধিক হোটেলে অন্তত ২৫ হাজার পর্যটক অলস বসে থেকে সময় কাটাচ্ছেন। ভারী বর্ষণের কারণে তাঁরা হোটেল থেকে কোথাও যেতে পারছেন না। অনেকে হোটেল বুকিং বাতিল করে গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছেন। নানা কারণে তিন মাস ধরে পর্যটকের আগমন কমেছে, এ কারণে হোটেল ব্যবসাও জমছে না।

গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, ভারী বর্ষণ হলেই হোটেল–মোটেল জোনে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। তখন পর্যটকদের ওপর দুর্ভোগ নেমে আসে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দেয়। গত জুলাই মাসেও কয়েক দফায় শহরজুড়ে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল জানিয়ে সেলিম নেওয়াজ বলেন, তখন পৌরসভার মেয়র-কাউন্সিলররা জরুরি ভিত্তিতে নালা পরিষ্কার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে মেয়রসহ বেশির ভাগ কাউন্সিলর আত্মগোপন করেন। এখন জলাবদ্ধতা নিরসনের তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

দীর্ঘ ৫৩ দিন পর ১০ সেপ্টেম্বর থেকে সৈকতে পর্যটকের সমাগম ঘটছে। আজ অন্তত এক লাখ সমাগমের আশা ছিল জানিয়ে হোটেলমালিকেরা জানান, বৈরী পরিবেশে অধিকাংশ পর্যটক বুকিং বাতিল করেন।

ভারী বর্ষণে ডুবেছে কক্সবাজার শহর। কলাতলী হোটেল–মোটেল জোন  সড়ক ডুবে থাকায় দুর্ভোগে পড়েন পর্যটকেরা। আজ দুপুরে
ভারী বর্ষণে ডুবেছে কক্সবাজার শহর। কলাতলী হোটেল–মোটেল জোন সড়ক ডুবে থাকায় দুর্ভোগে পড়েন পর্যটকেরা। আজ দুপুরেছবি: প্রথম আলো

ডুবে আছে কক্সবাজার শহরের কলাতলীর হোটেল- মোটেল জোন। আজ বিকেলে
ডুবে আছে কক্সবাজার শহরের কলাতলীর হোটেল- মোটেল জোন। আজ বিকেলেছবি: প্রথম আলো

'ওরা বিচার নয়, চেয়ার চায়' by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

অপেক্ষা করছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের প্রশাসনিক ভবন নবান্নের দুয়ারে চলে এসেছিলেন জুনিয়র ডাক্তাররা। শেষ পর্যন্ত লাইভ স্ট্রিমিং না হওয়ায় বৈঠক হল না। বার বার জুনিয়র ডাক্তারদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন প্রশাসনিক কর্তারা। কিন্তু সুরাহা মেলেনি। নবান্নের তরফে বার বার আলোচনার টেবিলে ডেকেও লাভ হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মনে করিয়ে দিয়ে ফের চিকিৎসকদের কাজে যোগ দেওয়ার কথা বললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ওরা কাজে যোগ দিন। আমি জানি, অনেকে আলোচনায় রাজি ছিলেন। দু-একজনের জন্য বৈঠক হচ্ছে না, বাইরে থেকে তাদের কাছে নির্দেশ আসছে। প্রথমদিন থেকে চেষ্টা করেছি, পশ্চিমবঙ্গের  জনগণ আমায় ক্ষমা করবেন। আমাদের অনেক অসম্মান করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ জানতেন না এর মধ্যে রং আছে। মানুষ এসেছিলেন বিচার চাইতে তিলোত্তমার। আশা করি মানুষ বুঝতে পারছেন ওরা বিচার চায় না, চায় চেয়ার।’

লাইভ স্ট্রিমিংয়ে কী সমস্যা ছিল তা জানিয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন,  '২ ঘণ্টা ১০ মিনিট অপেক্ষা করছিলাম, ভেবেছিলাম ডাক্তার ভাইবোনেদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আমরা বলেছিলাম, খোলা মনে আলোচনায় আসুন। টেলিকাস্টের ব্যাপারে ওপেন মাইন্ডেড আমরা। কিন্তু বিচারাধীন বিষয়ে কিছু জিনিস মাথায় রাখতে হয়। সুপ্রিম কোর্টের মামলা নিয়ে যদি আমরা হঠাৎ করে টেলিকাস্ট করি, কেউ যদি হঠাৎ কোনও মন্তব্য করেন যা আগে প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে মন্তব্যের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে তাহলে আমার কি দায়বদ্ধতা থাকবে না? আমাদের অফিসারদের কি দায়বদ্ধতা থাকবে না? আমরা এমন কিছু করতে চাইনি যাতে অচলাবস্থা দূর না হয়।'

এই মুহূর্তে রাজ্য প্রশাসনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য, জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতির পথ থেকে সরিয়ে চিকিৎসা পরিষেবায় ফিরিয়ে আনে। আর সেই কাজ কতটা কঠিন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বোঝা গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অপেক্ষার পরও খোলা মনে আলোচনার রাস্তায় আন্দোলনকারীরা না হাঁটায় কার্যত হতাশ মুখ্যমন্ত্রী। তার মতে, চাইলে তিনি পদত্যাগ করতে রাজি, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি বিচার পাওয়া। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মানুষের স্বার্থে পদত্যাগ করতে রাজি আছি। আমার মুখ্যমন্ত্রীর পদ চাই না। আমি চাই তিলোত্তমার বিচার পাক।  সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাক।’
mzamin

পড়ে ছিল অযত্নে, সেই পাথরের দাম উঠলো ১ মিলিয়ন ডলার

রোমানিয়ার একটি ছোট গ্রামে একাই থাকতেন এক বৃদ্ধা। ডোরস্টপ হিসাবে একটা পাথর ব্যবহার করতেন তিনি। অনেকটা বাদামি রঙের। সেটির মূল্য সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। পাথরটির  ওজন ৩.৫ কিলোগ্রাম (৭.৭ পাউন্ড)। সেটা আসলে অ্যাম্বার নাগেট। আনুমানিক মূল্য ১ মিলিয়ন ডলার। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এল পাইস-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুজাউ- এর আঞ্চলিক যাদুঘরের ডিরেক্টর ড্যানিয়েল কস্তাচে প্রথম পরীক্ষা করে দেখেন অ্যাম্বার নাগেটটি। এটাই এখনও পর্যন্ত আবিষ্কার হওয়া সবচেয়ে বৃহত্তম নাগেট। এটি পাঠানো হয় পোল্যান্ডের ক্রকোতে। সেখানে বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, নাগেটটি ৭০ মিলিয়ন বছরের পুরনো।

নদীর ধার থেকে অ্যাম্বার নাগেটটি কুড়িয়ে পেয়েছিলেন বৃদ্ধা। তারপর থেকে ডোরস্টপ হিসাবে ব্যবহার করতেন। ১৯৯১ সালে মৃত্যু হয় তার। পাথরটি অন্যরকমের দেখতে হওয়ায় বৃদ্ধার আত্মীয়দের সন্দেহ হয়েছিল। তারা যত্ন করে রেখে দেন । সম্প্রতি রোমানিয়ান সরকারের কাছে নাগেটটি বিক্রি করার কথা ভেবেছিলেন বৃদ্ধার আত্মীয়। তখনই আসল ঘটনা সামনে আসে।

ড্যানিয়েল কস্তাচে বলেন, “বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তো বটেই, নৃতাত্ত্বিক দিক থেকেও এই আবিষ্কারেরে বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।’’

ওই নারীর আত্মীয়রা জানিয়েছেন, বাড়িতে একবার চোর ঢুকেছিল। তারাও পাথরটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। কয়েক গাছা সোনার গয়না নিয়েই চম্পট দেয়। গোটা বিশ্বের মধ্যে রোমানিয়াতেই সবচেয়ে বেশি অ্যাম্বার পাওয়া যায়। বিশেষ করে বুজাউ কাউন্টিতে। ভূতাত্ত্বিক অস্কার হেলম এর নাম দিয়েছেন,  ‘বুজাউ অ্যাম্বার’। এই অঞ্চল থেকে এর আগেও বহু মূল্যবান অ্যাম্বার পাওয়া গিয়েছে। একসময় এখানে স্ট্র্যাম্বা অ্যাম্বারের খনি ছিল। বিপুল দামে বিক্রি হত। পরবর্তীকালে দাম পড়ে যায়। রোমানিয়ার সরকারও খনি বন্ধ করে দেয়।

সূত্র : সায়েন্স এলার্ট
mzamin

জামিন পেলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল

আবগারি দুর্নীতি মামলায় জামিন পেলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। সিবিআই-এর দায়ের করা দিল্লির আবগারি নীতি ‘কেলেঙ্কারি’ মামলায় শুক্রবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীকে জামিন দিল সুপ্রিম কোর্টের  বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি উজ্জল ভূঁইয়ার বেঞ্চ। আবগারি মামলায় সিবিআইয়ের গ্রেফতারিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আর্জি জানিয়েছিলেন কেজরি । জামিন চেয়ে প্রথমে তিনি দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। পরে সুপ্রিম কোর্টে মামলা যায়। গত ৫ সেপ্টেম্বর সেই সংক্রান্ত শুনানি শেষ হয় সুপ্রিম কোর্টে । তার পর রায় স্থগিত রাখা হয়েছিল। শুক্রবার সেই রায় ঘোষণা হল। যেহেতু, এই মামলায় বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলবে, তাই আপ প্রধানের জামিন মঞ্জুর করল আদালত।

নিম্ন আদালতে না গিয়ে প্রথমেই কেন দিল্লি হাই কোর্টে গিয়েছেন কেজরি, সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় সেই প্রশ্ন তোলেন সলিসিটর জেনারেল। ওই যুক্তিতেই দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর জামিনের বিরোধিতা করা হয়েছিল সিবিআইয়ের তরফে। তবে কেজরির জামিন আটকাল না। কেজরির গ্রেপ্তারি প্রসঙ্গে সিবিআইয়ের অতিসক্রিয়তাকে এদিন তোপ দেগেছে সুপ্রিম কোর্ট। কেজরির মুক্তির পরে আপের বার্তা, 'হি ইজ ব্যাক'। তবে বেশ কয়েকটি শর্তে কেজরি -কে জামিন দেওয়া হয়েছে। জেল থেকে বেরোনোর পর তিনি কোনও ফাইলে সই করতে পারবেন না। নিজের দফতরেও যেতে পারবেন না। এ ছাড়া, প্রকাশ্যে এই সংক্রান্ত কোনও মন্তব্য করতে পারবেন না দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী।ইডির হেফাজতে থাকাকালীনই, ২৬ জুন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছিল সিবিআই। এর আগে ১২ জুলাই দিল্লির আবগারি নীতি কেলেঙ্কারির অভিযোগের প্রেক্ষিতে, ইডি যে মামলা দায়ের করেছিল, সেই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পেয়েছিলেন কেজরিওয়াল।  গত ২১ মার্চ লোকসভা ভোটের ঠিক আগে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীকে তার বাসভবন থেকেই গ্রেপ্তার করে ইডি। এদিন সিবিআই-এর মামলাতেও জামিন পাওয়ায় ছয় মাস পর অবশেষে জেল থেকে বের হচ্ছেন আপ প্রধান।

সূত্র : এনডিটিভি

mzamin

ইউক্রেনে যুদ্ধ থামাতে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল কনস্টান্টিনোভস্কি প্রাসাদে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির  ইউক্রেন সফরের আড়াই সপ্তাহ পর রাশিয়া সফরে গেছেন অজিত দোভাল। শোনা যাচ্ছে, তার পকেটে রয়েছে ইউক্রেন শান্তি পরিকল্পনা। ভারতে  অবস্থিত রুশ দূতাবাসের তরফে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হয়েছে বৈঠকের ছবি ও ভিডিও। ছবিতে ভ্লাদিমির পুতিন এবং অজিত দোভালকে হাত মেলাতে দেখা গেছে। ঠিক কী কী কথা হয়েছে তাদের মধ্যে তা বিশদে জানা না গেলেও জানা গেছে, পুতিন জানিয়েছেন তিনি এবছরের শেষে কাজানে হতে চলা ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় রয়েছেন। বৈঠকের ফাঁকেই আগামী ২২ অক্টোবর দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার আশা ব্যক্ত করেছেন তিনি। এর আগে, প্রধানমন্ত্রী মোদির মস্কো সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেগুলি বাস্তবায়নের কাজ কতদূর এগোলো এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরি করা হবে অক্টোবরের বৈঠকে, এমনটাই জানিয়েছে রাশিয়ান দূতাবাস। পুতিনকে উদ্ধৃত করে রুশ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, “আমরা আমাদের ভালো বন্ধু নরেন্দ্র মোদির জন্য অপেক্ষা করছি এবং তাকে স্বাগত জানাচ্ছি।”

সূত্রের খবর, অজিত দোভালের এই রুশ সফরের লক্ষ্যই হল রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব নিরসন। প্রধানমন্ত্রী মোদির  শান্তি পরিকল্পনা নিয়েই তিনি প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন বলে জানা গেছে। শুধু পুতিনের সঙ্গেই নয়, বুধবার সেন্ট পিটার্সবার্গে রুশ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সের্গেই শোইগুর সঙ্গে বৈঠক করেন অজিত দোভাল।

‘পারস্পরিক স্বার্থের’ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দুজনে আলোচনা করেছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির যে আলোচনা হয়েছিল, তা নিয়ে দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। গত আগস্ট মাসেই ইউক্রেন সফরে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যুদ্ধ থামাতে মস্কোর সঙ্গে বৈঠকে বসার জন্য কিয়েভকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।

সূত্র : হিন্দুস্থান টাইমস
mzamin

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ ও সংবিধান সংশোধন: প্রসাঙ্গিক ভাবনা by ড. মো. সফিকুল ইসলাম

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বর্তমান বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধন একটি আলোচিত বিষয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এটি একটি অত্যাবশকীয় দায়িত্ব হয়ে দাড়িয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ বিভিন্ন সেমিনার, গোল টেবিল বৈঠক ও আলোচনা সভার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা ও বিষয়বস্তু তুলে ধরেছেন। আমি মনে করি, সরকার ও এ ব্যাপারে সচেতন এবং সচেষ্ট। তবে যত দ্রুত এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া যায় ততই দেশের জন্য মঙ্গল। কেননা, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করবার জন্য সংবিধানকে তার দল ও পরিবারের স্বার্থ সংরক্ষণের দলিলে পরিণত করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে ভয়াবহ নিপীড়নমূলক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। ব্যাপক দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, আক্রমণাত্মক বক্তব্য, মিথ্যা, প্রতারণা ও অপকৌশলের একটি রাষ্ট্রীয় রূপ দান করেছে যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থক এবং বিরোধী মতের লোকদেরকে গুম, খুন ও নির্যাতনের সকল সীমা অতিক্রম করেছিল। এমতাবস্থায় অকুতোভয় ছাত্রদের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের অবসান হয়। এজন্য প্রায় সহস্রাধিক ছাত্র-জনতাকে জীবন দিতে হয়েছে যা দেশে-বিদেশে জুলাই ম্যাচাকার নামে পরিচিত। এ গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা হচ্ছে বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ যেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। সেজন্য আওয়ামী সংবিধান সংশোধন করে সংবিধানকে গণতান্ত্রিকীকরণ ও জনআকাঙক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা প্রয়োজন। যাহোক, সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন কোন বিষয়গুলো প্রথমেই বিবেচনায় নেওয়া উচিত সে বিষয়ে মতামত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি।

আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরে হীন দলীয় স্বার্থে সংবিধানের পঞ্চদশ, ষোড়শ, সপ্তদশ সংশোধনীসমূহ সম্পাদন করেছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ষোড়শ সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ফিরিয়ে নিয়েছিল। যাহোক, এর মধ্যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে। এ সংশোধনী সবচেয়ে বিতর্কিত, গণতন্ত্র, জনগণের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থি। বিশেষ করে, এ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫০টির বেশী অনুচ্ছেদকে, যার মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টাঙ্গানোর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত, সংশোধনের অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। সংবিধানে জাতীয় সংসদকে সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিফলন। একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক। অথচ পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের একটি বড় অংশ সংশোধন অযোগ্য ঘোষণা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সার্বভৌমত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে যা অসাংবিধানিক। এটি মানবাধিকারের পরিপন্থি। কেননা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করতে চাইতে পারে। এটি কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যে পরিবর্তন করা যাবে না। এছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত ৭ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী: “(১) কোন ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোন অসাংবিধানিক পন্থায়” (ক) এই সংবিধান বা ইহার কোনো অনুচ্ছেদ রদ, বাতিল বা স্থগিত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে; কিংবা (খ) এই সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে” তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবে। (২) কোন ব্যক্তি (১) দফায় বর্ণিত” (ক) কোন কার্য করিতে সহযোগিতা বা উসকানি প্রদান করিলে; কিংবা (খ) কার্য অনুমোদন, মার্জনা, সমর্থন বা অনুসমর্থন করিলে” তাহার এইরূপ কার্যও একই অপরাধ হইবে। (৩) এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধে দোষী ব্যক্তি প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।” এই অনুচ্ছেদ পাকিস্তানের ১৯৭৩ সালের সংবিধানের ৬(১) অনুচ্ছেদেরই অনেকটা প্রতিস্থাপন। পাকিস্তানের এ সংবিধানের ৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ”যদি কোনো ব্যক্তি সংবিধানকে ক্ষমতাবলে বাতিল করে, পরিবর্তন করে, অথবা জোর করে বা শক্তি প্রদর্শন করে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন করার প্রচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র করে, সে ব্যক্তি চরম দেশদ্রোহীতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হবে। (২) কোনো ব্যক্তি (১) ধারায় উল্লিখিত কার্যক্রমের সহায়তা বা উৎসাহ প্রদান করলে, সে ব্যক্তি ও একইভাবে চরম দেশদ্রোহীতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হবে। (৩) সংসদ আইনের মাধ্যমে চরম দেশদ্রোহীদের শাস্তি নির্ধারণ করবে।” কিন্তু, ১৯৭৩ সালের সংবিধান রচনার পর পাকিস্তানে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউল হকের মৃত্যুদণ্ড হয়নি। বরং মৃত্যুদণ্ড হয়েছে সংবিধান প্রণয়নকারী জনাব ভুট্টোর। নিয়তির কী পরিহাস! সুতরাং দেখা যায়, কঠোর শাস্তির বিধান করে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঠেকানো যায় না। একইভাবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। পঞ্চদশ সংশোধনীর পূর্বে জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান ছিল। জাতীয় সংসদের সদস্যগণ স্বপদে বহাল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী করার বিধান নজিরবিহীন। এতে নির্বাচনে যেসব প্রতিদ্বন্দ্বী সংসদ সদস্য নয় তারা বৈষম্যের স্বীকার হয়। সুতরাং, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জরুরি ভিত্তিতে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল বা সংশোধন করা উচিত।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে। কিন্তু, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় তখন ও প্রকাশিতই হয়নি। সংক্ষিপ্ত ও বিভক্ত আদেশে আদালত বলেছিলেন: ”(১) সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী ভবিষ্যতের জন্য বাতিল ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করা হলো। (২) যা সাধারণত আইনসিদ্ধ নয়, প্রয়োজন তাকে আইনসিদ্ধ করে, জনগণের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন, এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন ‘এ সকল সনাতন তত্ত্বের¡র ভিত্তিতে দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন পূর্বে উল্লিখিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।” অন্যভাবে বলা যায়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ‘প্রসপেকটিভলি’ বা ভবিষ্যতের জন্য অবৈধ ঘোষণা করে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার খাতিরে এটি আরও দুই টার্ম রাখার পক্ষে সর্বোচ্চ আদালত মত প্রকাশ করেছেন। তাই আদালতের এ রায়ের অজুহাত দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া দুরূহ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাতিল আমাদেরকে এক ভয়াবহ সংকটে মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন ছিল রাজনৈতিক দলের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের এবং দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়’ জনগণের এমন ধারণারই ফসল। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নজির নেই বললেই চলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে তা সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত না হলেও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা চলে। আওয়ামী লীগ এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ত্রুটি বিচ্যুতি ও অগণতান্ত্রিক অভিযোগ তুলে বাতিল করলেও তাদের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের উদাহরণ তো সৃষ্টি করতে পারেইনি বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচন ব্যবস্থাকে সবচেয়ে বেশী কলুষিত করেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের এ তিনটি নির্বাচন বাংলাদেশে ইতিহাসে সবচেয়ে জাল-জালাতিপূর্ণ ছিল। যাহোক, এ ব্যবস্থার যে সব ত্রুটিবিচ্যুতি সে সময়কালে দৃশ্যমান হচ্ছিল রাজনৈতিক দলগুলো তারা প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ না করে, উল্টো এর ফাঁক-ফোকর ব্যবহার করে দলীয় স্বার্থ হাসিল করার প্রতিযোগিতার কারণে এ ব্যবস্থাটির যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন তোলার পরিবেশ তৈরি হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কিছু লোকের বক্তব্য ছিল নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। তাই শুধু নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করলেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব। বাস্তবতা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন দলীয় সরকারের অধীনে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কাজ করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশনকে সরকারি দলের অঘোষিত নির্দেশনা মেনে কাজ করতে হয়। এর ফলে নির্বাচন পক্ষপাতমুক্ত হয় না। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন হবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা। কিন্তু, বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রাতিষ্ঠানিকরণ (ওহংঃরঃঁঃরড়হধষরুধঃরড়হ) হয়নি। প্রতিষ্ঠানসমূহ আইন ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব স্বাধীন ও যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম নয়। তাদেরকে সরকারি দলের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়। তা না হলে এসব প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি থেকে বঞ্চিতকরণ ও বরখাস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের ক্ষমতার পরিধির মধ্যে আইন ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ সরকারি দলের অনুকূলে কাজ করা স্বাভাবিক রীতিতে বা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তাই সরকারি দলের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সকল দল ও প্রার্থীদের জন্য লেবেল প্রেলিং ফিল্ড (খবনবষ চষধুরহম ঋরবষফ) তৈরি হওয়ার সম্ভবনা নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান সুবিধা হলো এর নির্দলীয় চরিত্র। এ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাগণ দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তিত্ব না হওয়ায় তারা কোনো বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করেন না। তাদের কাছে সব দলই সমান। সব দলের প্রতি এ সরকার সমান আচরণ করতে পারে। নির্বাচনি প্রচারণা, নির্বাচনি আচরণবিধি এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কাজগুলো এ সরকার পক্ষপাতিত্ব পরিহার করে পেশাদারিত্বের সঙ্গে করতে পারে। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ সরকারের অধীনে স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে। তাই আমার প্রস্তাব হচ্ছে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান সংবিধানে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাকে সময়োপযোগী করতে হবে। যেহেতু অতীতে সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ অবসর প্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হওয়ার বিধান থাকায় উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল সে কারণে উচ্চ আদালতকে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টাদের বিজ্ঞ/বিশিষ্ট ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ করার বিধান করা যেতে পারে। তাছাড়া বর্তমানে সরকারের কাজের পরিধি ও মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই উপদেষ্টাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।

সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ বজায় রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি “সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং “সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র” বাদ দিয়ে শুধু সমাজতন্ত্র যুক্ত করা হয়। কিন্তু, পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্ধারিত সংবিধানের মূলনীতিসমূহ অনেক বেশী অর্থপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য ছিল। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সংহতি পূর্ণ। তাই পঞ্চদশ সংশোধনী সংশোধন করে সংবিধানের পূর্বের মূলনীতি বহাল রাখা যুক্তিযুক্ত। আইন উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে জানা যায় যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতোমধ্যে সংবিধান সংশোধন নিয়ে কাজ শুরু করেছে এবং ’সাংবিধানিক সংস্কার’ কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু, সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার বিধান সংবিধানে অন্তভর্’ক্তকরণ এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দরকার। কেননা এ সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করলে ও পরবর্তীতে নির্বাচিত আইনসভার অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি.এন.পি) ইতোমধ্যে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখা ঘোষণা করে এ বিষয়েসমূহে তাদের প্রতিশ্রুতিুতি ব্যক্ত করেছে। তারপর ও আমি মনে করি এ সরকার বি.এন.পি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্বান্ত নিলে এর একটি স্থায়ী সমাধান হবে।

লেখক: অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

mzamin

ইঞ্জিন তৈরিতে পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ তুরস্কের

বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিখাতে ব্যবহৃত যেসব জিনিস উৎপাদন করা কঠিন ও কষ্টসাধ্য তার মধ্যে অন্যতম উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ইঞ্জিন। উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ইঞ্জিন বলতে মূলত জঙ্গিবিমান ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বিমানে ব্যবহৃত ইঞ্জিনকে বুঝানো হয়।

সাধারণত স্থল, আকাশ বা জলপথে যেসব শক্তিশালী যান চলাচল করে তাতে যেসব ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয় সেগুলো এক হাজার হর্সপাওয়ারের হয়ে থাকে। বিশেষভাবে বলতে গেলে এফ-১৬ জঙ্গিবিমান, বোয়িং ৭৩৭ ও সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ বিভাগের ব্যবহৃত হাউইটজারে ব্যবহার করা হয় এক হাজার হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন।

প্রযুক্তির এই খাতে এবার নজরকাড়া সাফল্য দেখিয়েছে তুরস্ক। এরই মধ্যে পশ্চিমা নির্ভরশীলতা কমিয়ে বেশ কয়েকটি ইঞ্জিন উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে দেশটি।

বলা হয়ে থাকে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন তৈরি করা একটি পরমাণু বোমা তৈরির চেয়েও কঠিন বিষয়। এটা এতটাই কঠিন যে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেন যখন টর্নেডো জেটের জন্য ইঞ্জিন তৈরির উদ্যোগ নেয় তখন তারা ভাবতে পারিনি যে এতে ১৭ বছর লাগবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও ফ্রান্স এককভাবে জেট ইঞ্জিন তৈরি করতে পারে।

জার্মানি ও জাপানের উৎপাদন সক্ষমতা ও সম্ভাবনা থাকলেও এখনও কোনো সাফল্য আসেনি। অন্যদিকে চীন রাশিয়া ও ইউক্রেনের সহায়তায় জেট ইঞ্জিন তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত এ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে তা বাদ দেয়। তবে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প ইঞ্জিন তৈরিতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এ চেষ্টার অংশ হিসেবে বেশ কয়েকটি ইঞ্জিন তৈরি করেছে তুরস্ক। এছাড়াও আরও বিভিন্ন ধরণের ইঞ্জিন উন্নয়ন ও পরীক্ষার জন্য অপেক্ষমান রয়েছে। 

কুচকাওয়াজে তুর্কি সামরিক বাহিনী। ছবি : সংগৃহীত

আসুন নতুন বাংলাদেশ গড়তে একসাথে কাজ করি : ব্যবসায়ীদের প্রতি ড. ইউনূস

সরকারের সাথে একসাথে কাজ করতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি বলেন, ‘ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান আমাদের নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। আসুন আমরা নতুন তরতাজা বাংলাদেশ গড়তে একসাথে কাজ করি।’

বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত ন্যাশনাল বিজনেস সংলাপে তিনি এ আহ্বান জানান। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) এবং জাতীয় পর্যায়ের ১৫টি বাণিজ্যিক সংগঠন এ সংলাপের আয়োজন করে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের সমাজে যে পচন ধরেছিল, ছাত্রদের আন্দোলন ছাড়া সেখান থেকে মুক্তির কোনো উপায় ছিল না। আর পচন নয়, আমরা সুস্থ-সবল জাতি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

সবাই মিলে একজোট হয়ে কাজ করলে তরুণদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা অব্যসম্ভাবী এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস বলেন,‘আমরা যে বড় কিছু করতে পারি তার প্রমাণ হলো ব্যবসায়ীরা। বিরাট দুঃসাহস নিয়ে আপনারা উদ্যোক্তা হয়েছেন। বাংলাদেশীদের কাছে শিল্পপতি হওয়া দুঃস্বপ্ন ছিল, কিন্তু আপনার সেটা করতে পেরেছেন। আপনারা বিশ্বমানের উদ্যোক্তা। যুবকরা যে সুযোগ এনে দিয়েছে তা কাজে লাগিয়ে আপনারা স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবেন।’

তিনি বলেন, যুবকরা প্রাণের বিনিময়ে যে সুযোগ এনে দিয়েছে, তা জাতির জীবনে বারবার আসে না। নতুন করে যে স্বপ্ন আপনাদের মনে তারা জাগিয়ে দিয়েছে, সে স্বপ্ন যদি আপনার জীবনে রেখাপাত করে তাহলে সেই স্বপ্ন পূরণে আপনিও শরিক হবেন।

নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এ সুযোগ আর কখনো আসবে কি না জানি না। এই সুযোগ যেন হারিয়ে না যায়। এই সুযোগ হারিয়ে ফেললে জাতির কাছে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ পারস্পারিকভাবে পরিচিত এবং একজনের সাথে আরেকজনের যোগসূত্র রয়েছে। দুনিয়ায় এমন কোনো দেশ পাওয়া যাবে না যেখানে পরস্পর পরস্পরের এমন ঘনিষ্ঠ। এখানে হয়তো কেই সরকারে আছেন, কেইবা সরকারের বাইরে আছেন বা ব্যবসা করছেন। অথবা কেউ আছেন বিদেশে। কিন্তু আমাদের সবার সাথে একটা যোগসূত্র আছে। পারস্পারিক এই যোগসূত্রই আমাদের বড় শক্তি যা আমাদের স্বপ্ন পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তরুণদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস বলেন,‘যে কয়টা দিন সরকারে থাকি আমরা একসাথে কাজ করতে চাই। আমাদের অঙ্গীকার হলো নতুন বাংলাদেশের জন্য যা আছে তা করবো। যেন বলে যেতে পারি এই দেশ আমাদেরকে একটা সুযোগ দিয়েছিল, আমরা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছি।’

স্বৈরাচার হঠাতে ছাত্রদের এবারের আন্দোলন কোনো প্রথাগত আন্দোলন ছিল না উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন,‘এটা সাধারণ কোনো আন্দোলন ছিল না। যারা শহিদ হয়েছেন তারা ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অনেকে শেষ বিদায় নিয়ে এসেছেন। তারা মনস্থির করেছিল যে উদ্দেশে রাস্তায় নেমেছে, সে উদ্দেশে প্রাণ দিতে তারা তৈরি আছে। রাস্তায় নেমেছে তাতে প্রাণ গেলে যবে, কিন্তু যে লক্ষ্য নিয়ে রাস্তায় নেমেছে সে লক্ষ্য অর্জন করবেই করবে।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তরুণরা প্রাণ দিয়েছে। যে বাংলাদেশে তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা তা অসহ্য হয়ে উঠেছিল। এ কারণে যখন ছাত্রদের প্রাণ ঝরছিল, তখন সারাদেশের মানুষ তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে এমন কোনো মানুষ ছিল না তাদের সমর্থন করিনি। তাদের প্রাণের ফলে আমরা একটা নতুন সুযোগ পেয়েছি।

তিনি উল্লেখ করেন বাংলাদেশে যে পচন ধরেছিল, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছাড়া সেই পচন থেকে মুক্তির কোনো উপায় ছিল না। ছাত্রদের আন্দোলন হঠাৎ করে সেই অবস্থা বদলে দিয়েছে। আর কোনো পচন নয়, আমরা সুস্থ, সবল জাতি হিসেবে দাঁড়াতে চাই।

ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে ড. ইউনসূ বলেন, সংস্কার কেবল সরকারের ওপর ছেড়ে দেবেন না। আসুন সবাই মিলে সংস্কার করি। যেখানে ভুল দেখবেন, আত্মজিজ্ঞাসা করবেন সেখান থেকে বেরিয় আসার। ছেলেদের আত্মাহুতির দিকে তাকিয়ে ভুলপথ পরিহার করুন।

শ্রমিক-মালিকের মধ্যে সরকার সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের মেয়াদেকালে আমরা শ্রমিক-মালিকের সম্পর্ক সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে চাই। আমরা এখনো জেনেভা কনভেনশনে যোগ দিতে পারিনি। আমাদেরকে সাহস দিন, এগিয়ে আসুন, আমরা সবাই মিলে আইএলও কনভেনশনে স্বাক্ষর করি।’

তিনি শ্রমিকদের যা প্রাপ্য, মালিকদের তাতে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনায় অনেক বাধা রয়ে গেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন,‘ব্যবসায় বাধার কোনো সীমা নেই। ব্যবসা করা এক মহা সংগ্রাম। তবে আমরা এসব বাধা পেরিয়ে যেতে আজ একযোগে সরকার, সরকারের বাইরে সবাই এক পরিবারের সদস্য হিসেবে কাজ করে যাবো।’

তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, বাংলাদেশ নিম্ন মধ্য-আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হলে রফতানির ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা হরাবে। কিন্তু আমাদের প্রতিযোগিতায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

দেশের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যবসায়ীদের সামাজিক ব্যবসা চালুর আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন,‘আপনার গ্রাম, উপজেলা কিংবা আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এলাকায় সামাজিক ব্যবসা গড়ে তুলুন। বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা ও পরিবেশ উন্নয়নমূলক সামাজিক ব্যবসা করা যেতে পারে। আপনি বিনিয়োগ করবেন মুনাফার জন্য নয়, অন্যের সহায়তা বা সুবিধার জন্য।’

সংলাপে অর্থ উপদেষ্টা ড, সালেহউদ্দিন আহমেদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই)’র সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বক্তব্য রাখেন।

সূত্র : বাসস

খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা: এবার বন্ধ হলো ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার উৎপাদন

 - আগেই বন্ধ হয়েছে আরো তিনটি চালু থাকল শুধু ঘোড়াশাল
- ডিসেম্বর পর্যন্ত আছে সারের মজুদ। বোরো ও সরিষা মৌসুম নিয়ে শঙ্কা

অন্তর্বর্তী সরকার কি খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে যাচ্ছে? একের পর এক সারকারখানা বন্ধ, ডলার সঙ্কটে সার আমদানির জন্য এলসি খুলতে না পারায় এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সারের যে মজুদ রয়েছে তা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। এই সার দিয়ে চলমান আমন, আউশসহ অন্যান্য ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কৃষক। কিন্তু ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া দেশের সবচেয়ে বড় রবি মৌসুমে সারের সঙ্কট দেখা দিতে পারে। সে সময় সারের চাহিদা থাকে বেশি। সেই চাহিদা মেটাতে জরুরি ভিত্তিতে ইউরিয়া ও নন ইউরিয়া সার আমদানি করতে হবে। কিন্তু পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যে লুটপাট হয়েছে তাতে দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায়। পাচার হয়েছে অন্তত ১৮ লাখ কোটি টাকা। রিজার্ভ ঘাটতির কারণে ডলার সঙ্কটে ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে পারছে না। এতে কয়েক মাস ধরে বন্ধ আছে সার আমদানি।

এ আশঙ্কার মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের হজরত শাহজালাল সারকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম। এ অবস্থায় আগামী বোরো ও সরিষা মৌসুম নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে খাত সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, এমনিতেই চলমান বন্যায় এবার আউশ ও আমন মিলে প্রায় সাত-আট লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন কম হবে। এ ঘাটতি মেটানোর লক্ষ্যে আগামী বোরো মৌসুমকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল; কিন্তু এলসি সমস্যার সমাধান না হওয়া এবং ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ায় দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে হুমকি দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে যতগুলো সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, যদি সময় মতো সার আমদানি করা না যায়, দেশে উৎপাদন বাড়ানো না যায়, তাহলে কৃষি উৎপাদনে বড় সমস্যা হবে। দেশের খাদ্যনিররাপত্তা হুমকিতে পড়বে।

এ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক কৃষিসেবা বিভাগের ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার (ইউএসডিএ) চলতি মাসের গ্লোবাল অ্যাগ্রিকালচারাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের (গেইন) ‘গ্রেইন অ্যান্ড আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার বন্যায় বাংলাদেশের ২৪টি জেলার প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমির আউশ ও আমন আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার এই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের চাল উৎপাদনে। এবার আউশ মৌসুমে তিন লাখ টন এবং আমন মৌসুমে চার লাখ টন, সব মিলিয়ে চালের উৎপাদন কম হতে পারে সাত লাখ টন। এতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় পাঁচ লাখ টন চাল আমদানি করা লাগতে পারে।

মার্কিন কৃষি বিভাগ বলছে, গত অর্থবছরে এক কোটি ৪৬ লাখ টন আমন চাল উৎপাদন হলেও চলতি অর্থবছরে তা এক কোটি ৪২ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। এ ছাড়া আউশের উৎপাদন ২৪ লাখ টন থেকে ২১ লাখ টনে নামতে পারে। সবমিলিয়ে এ দুই মৌসুমে চালের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে সুখবর থাকবে আগামী বোরো মৌসুমে। বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন পাঁচ লাখ টন বাড়তে পারে। এ মৌসুমে মোট চালের উৎপাদন দুই কোটি টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দুই কোটি পাঁচ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে। সবমিলিয়ে আগামী মৌসুমে চালের উৎপাদন হতে পারে তিন কোটি ৬৮ লাখ টন; গত অর্থবছরে যা ছিল তিন কোটি ৭০ লাখ টন। ফলে তিন মৌসুম মিলিয়ে দেশে চালের উৎপাদন কমতে পারে দুই লাখ টন।

বন্ধ হলো ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানার উৎপাদন : জানা যায়, একসময় নিজস্ব উৎপাদিত ইউরিয়া সার দিয়েই দেশে কৃষি আবাদের চাহিদা মিটতো। আমদানি করতে হতো শুধু নন ইউরিয়া সার। কিন্তু গ্যাস সঙ্কটের কারণে গত ছয় মাসে দেশের পাঁচটি সারকারখানার মধ্যে তিনটিই বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ গতকাল সকালে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয় সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের হজরত শাহজালাল সারকারখানা। বিসিআইসি’র পরিচালক (উৎপাদন) শাহীন কামাল জানান, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হন তারা। এই কারখানা থেকে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টন ইউরিয়া সার উৎপান হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। প্রায় ছয় মাস আগে বন্ধ হয়ে যায় জামালপুরের সরিষাবাড়ি যমুনা সারকারখানার উৎপাদন। প্রায় একই সময়ে বন্ধ হয়ে যায় আশুগঞ্জ সারকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম। তার আগে বন্ধ হয় চট্টগ্রামের সিইউএল সারকারখানার উৎপাদন। এখন শুধু চালু আছে ঘোড়াশাল (পলাশ) সারকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম।

বিসিআইসি সূত্রে জানা যায়, পাঁচটি সারকারখানা থেকে প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার ৫০০ টন থেকে সাত হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদন হতো; কিন্তু বন্ধ হতে হতে দেশের ইউরিয়া সার এখন নন ইউরিয়ার মতোই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

বিসিআইসি ও বিএডিসি সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে চার লাখ ৩৫ হাজার টন ইউরিয়া সার মজুদ রয়েছে। নন ইউরিয়ার মধ্যে টিএসপি প্রায় তিন লাখ টন, ডিএপি সাড়ে তিন লাখ টন এবং এমওপি মজুদ আছে প্রায় চার লাখ টন। মজুদ থাকা ইউরিয়া ও নন ইউরিয়া দিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন কৃষি সচিব ড. মো: এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। গত ৮ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে নিজ কক্ষে বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচার রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএআরএফ) কার্যনির্বাহী কমিটির সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, ‘সারের বর্তমান মজুদ দিয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো যাবে। তবে সার আমদানির এলসি খোলার ক্ষেত্রে এখনো কিছুটা সঙ্কট রয়েছে, যেটা আমরা সমাধানে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি।’

বন্যার কারণে দেশ খাদ্যঘাটতিতে পড়বে কি না- জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘আগামী মৌসুমে বোরো উৎপাদনে কোনো সমস্যা না হলে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কোনো সঙ্কট হবে না। তাই এখন আমাদের টার্গেট, আগামী বোরো মৌসুমে ভালো উৎপাদন করা।’

বিসিআইসি ও বিএডিসি সূত্রে জানা যায়, ডলার সঙ্কটের কারণে ব্যাংকে এলসি খোলা যাচ্ছে না। গত তিন মাস যাবৎ সার আমদানি বন্ধ আছে। প্রায় সাত-আট লাখ টন নন ইউরিয়া (টিএসপি, ডিএপি এমওপি) সার আমদানির জন্য টেন্ডার হলেও এলসি সমস্যার সমাধান না হওয়ায় আমদানিকারকদের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। আমদানির সাথে যুক্ত একজন জানান, এই মুহূর্তে যদি এলসি সমস্যার সমাধানও হয়, এরপরও রবি মৌসুমের শুরুতে সার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম গতকাল সন্ধায় নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার ইতোমধ্যে ৬০ হাজার টনের বেশি সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া সারও রয়েছে। আমদানি করতে হলে যে টাকা লাগে দেশে উৎপাদন করলে তা অনেক কমে করা যায়। তিনি বলেন, দেশের পাঁচটি সারকারখানা সচল রেখে ইউরিয়া সার পুরোদমে উৎপাদন করলে ৩০-৩২ লাখ টন উৎপাদন করা যায়। এটি হলে আর আমদানি করতে হয় না; কিন্তু এখন গ্যাস সরবরাহ না থাকায় পাঁচটি কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ হয়ে গেছে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত এই কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, একসময় ইউরিয়া সারের চাহিদার বেশির ভাগই আমরা উৎপাদন করতাম। এখন ৩০ শতাংশেরও কম উৎপাদন করতে পারি। তা-ও আবার আরেকটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। বিসিআইসি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ইউরিয়া উৎপাদন করতে। আমদানির জন্য তো বিসিআইসি প্রতিষ্ঠা হয়নি; কিন্তু এখন সেটিই হচ্ছে। এটা ভালো কথা নয়।

তিনি বলেন, যেখানে আমাদের সারকারখানা আছে। উৎপাদনে আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। গ্যাস ব্যবহার অন্য জায়গায় কমিয়ে সার উৎপাদন করতে হবে। উৎপাদন না করে কেন আমদানিতে বড় আকারের অর্থ খরচ করা হচ্ছে প্রশ্ন রাখেন তিনি।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সারের যে মজুদ আছে তা দিয়ে হয়তো এই সিজন চলবে; কিন্তু সামনে রবি মৌসুম। তিন মাস পরেই বোরো মৌসুম আসছে। সরিষাসহ অন্যান্য আবাদ রয়েছে এ মৌসুমে। এখন যদি সার উৎপাদনে নজর না দিই বা বিদেশ থেকে আমদানি না করি বা সঠিক সময়ে যদি চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া না যায় তাহলে উৎপাদন কমবে। দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটবে।

বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার পুনরায় করা সম্ভব?

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবারো ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের আলোচনা সামনে এসেছে। নতুনভাবে সামনে আসছে নানা অভিযোগ আর ষড়যন্ত্রের আলোচনা।

এই ঘটনায় রাজনৈতিক দোষারোপ আগেও হয়েছে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া অতীতে একাধিকবার এর পেছনে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছেন। একইভাবে শেখ হাসিনাও বারবার আঙুল তুলেছিলেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দিকে।

পিলখানা ঘটনার ১৫ বছর পেরিয়ে যাবার পর এখন পুনরায় তদন্তের দাবি আসছে বিভিন্ন তরফ থেকে। সে ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সেনা ও বিডিআর পরিবার তো বটেই, তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদও ভিডিও বার্তায় সেই দাবি তুলেছেন।

সেনাবাহিনীর তদন্ত আদালতে সরকারের সহযোগিতা না করার অভিযোগও করেছেন। যদিও তার বিরুদ্ধেও এ ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ করে এসেছে বিএনপিসহ বিভিন্ন মহল।

সেনাবাহিনী ও তৎকালীন বিডিআর সদস্যদের পরিবারগুলোর অনেকে ঘটনাটিকে‘বিডিআর বিদ্রোহ' বলতে চান না। তাদের মতে পুরো বিষয়টিই ছিল ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আসছে আওয়ামী লীগ সরকার এবং ভারতের নাম।

বিডিআর নায়েক শামছুল ইসলামের ছেলে জুয়েল আজিজ বলেন, ‘পিলখানার গণ্ডগোলটা যদি না হতো তাহলে এই সরকার এতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। কারণ পিলখানার ঘটনা দিয়েই সেনাবাহিনীকে দমন করে সরকার এতদিন ক্ষমতায় ছিল।’

বিডিআর পরিবারের আরেক সদস্য আইনজীবী আব্দুল আজিজ ভারতের দিকে ইঙ্গিত করে বলছিলেন, ‘বড়াইবাড়ি যুদ্ধে আমার আব্বু বাংলাদেশ রাইফেলসের প্রধান সহকারী ছিল বলে তাকে টার্গেট করা হয়।’

২০০১ সালে কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়ি গ্রামে (রৌমারী সীমান্তে) ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সাথে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ হয় যেখানে ১৬ জন বিএসএফ ও ২ জন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সেনা নিহত হয়।

আব্দুল আজিজের বাবা আব্দুর রহিম তৎকালীন বিডিআরের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে জানান আব্দুল আজিজ।

বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় তাকে আসামী করা হয় এবং কারা হেফাজতে তার মৃত্যু হয় ২০১০ সালে।

ওই ঘটনায় আগের অপমৃত্যুর মামলা থাকলেও এখন নতুন করে সিএমএম আদালতে একটি মামলা করেছেন আব্দুল আজিজ।

সেখানে অভিযুক্ত তালিকায় এসেছে শেখ হাসিনা, জেনারেল আজিজ আহমেদ, শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, হাসানুল হক ইনু, এমন বেশ কিছু নাম।

এছাড়াও তৎকালীন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মহাপরিদর্শক, জেল সুপার, দায়িত্বরত ডাক্তারসহ ২০০ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আব্দুল আজিজ জানান তার বাবার বিরুদ্ধে পোক্ত প্রমাণ না থাকায় তাকে রাজসাক্ষী করার চেষ্টা করা হয়।

আব্দুল আজিজ বলেন, ‘উনি রাজসাক্ষী হন নাই। ১৭ মাস তিনি কারাভোগ করার পরে পরবর্তীতে উনি অসুস্থ হয়। পায়ে এবং পেটে ব্যথা ছিল। আম্মু দেখতে গিয়ে জিজ্ঞেস করে কী চিকিৎসা দেয়া হয়েছে, আব্বু বলে যে আমাকে ইনজেকশন দেয়া হইসে। এই ইনজেকশন দেয়ার ১৮-২৪ ঘণ্টার ভেতর আমার আব্বু মারা যায়।’

তৎকালীন বিডিআর সদস্যদের পরিবারদের নানা ধরনের সামাজিক হেনস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমার বোন ও ভাইকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে বিদ্রোহীর সন্তান বলে, আমাদের লেখাপড়া থেকে প্রতিটা পদে পদে আমাদের বঞ্চনা করা হয়েছে।’

বিডিআর নায়েক শামছুল ইসলামের সন্তান জুয়েল আজিজও জানাচ্ছিলেন ক্ষোভের কথা।

জুয়েল আজিজ বলেন, নিজের চোখেই দেখলাম যে গোলাগুলি চলতেছে, সবাই এদিক ওদিক ছুটতেসে। অথচ আমার বাবা তার অফিসরুমে নামাজে দাঁড়ায় গেছে। আমার সেই নামাজরত বাবার তিন বছরের সাজা হইসে। টোটাল সাত বছর জেল খেটে বের হইসে।’

এরপর যতদিন তার বাবা বেঁচে ছিলেন ততদিন সবসময় খুব বিমর্ষ থাকতেন এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপবাদ মাথায় নিয়েই তার মৃত্যু হয়।

জুয়েল আজিজ জানান, তার বাবা বেঁচে থাকতে ‘দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতো সারাজীবন সততার সাথে চাকরি করে শেষ বয়সে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা মাথায় নিয়ে মারা যাওয়া যে কতটা কষ্টের বাবা তোরা বুঝবি না। সন্তান হিসেবে চাই আমার বাবা মরণোত্তর কলঙ্কমুক্ত হোক।’

আব্দুল আজিজ এবং জুয়েল আজিজ ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ঐক্য’ নামের সংগঠনের যথাক্রমে আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিব।

নয় দফা দাবি নিয়ে তারা ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ শুক্রবার বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানবন্ধনের ডাক দিয়েছেন।

পিলখানায় নিহত সেনাসদস্যদের পরিবারের তরফ থেকেও বেশ কিছু দাবি সামনে আনা হয়েছে। এর মাঝে আগের সব তদন্ত প্রতিবেদন বিস্তারিত প্রকাশ, ক্ষতিগ্রস্ত বা চাকরীচ্যুত পরিবারের ক্ষতিপূরণ, নির্দোষ বিডিআর সদস্যদের মুক্তির মতো বিষয়ও রয়েছে।

এর পাশাপাশি আগেকার তদন্তে যেসব নাম উঠে আসেনি সেগুলো সামনে আনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন সাকিব রহমান, যিনি প্রয়াত কর্নেল কুদরত ইলাহী রহমান শফিকের সন্তান ও আইনজীবী।

কুদরত ইলাহী রহমান বলেন, ‘আগেকার মামলায় যাদের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে তারা ‘হয়তো সেই অ্যাকশনের সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু এটার মাস্টারমাইন্ড যারা কিনা পর্দার আড়ালে রয়ে গেছে, তাদেরকে বের করাটাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।’

বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী অবশ্য পুনরায় তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। যিনি তৎকালীন সেনাবাহিনীর তদন্ত কমিটির দায়িত্বে ছিলেন।

সঠিকভাবে এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ তদন্ত ও ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া শিগগিরিই শুরু করা হবে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। ১৫ জনের মৃত্যু হওয়ায় উচ্চ আদালতে মোট ৮৩৫ আসামির শুনানি শুরু হয়।

২০১৭ সালে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় ২২৮ জনের। খালাস দেয়া হয় ২৮৩ জনকে। পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ হয়েছিল ২০২০ সালে।

এখনো আপিল বিভাগে ঝুলছে অনেকের আবেদন। ঝুলছে বিস্ফোরক মামলাও। তবে ১৫ বছর পর এসে নতুন করে তদন্ত বা বিচারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের জায়গা রয়েছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘এটার মামলা সংক্রান্ত বিভিন্ন আলামত, সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স, এবং ঐ সময়কার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সাক্ষ্যপ্রমাণের বিষয়গুলো হয়তো অনেক সময় এভেইলেবল থাকবে না।’

তবে আগের যেসব তথ্যপ্রমাণ রয়েছে সেগুলোর সাথে আগে হয়তো সাক্ষ্য দিতে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে, বা আগে দিতে পারেননি এমন হলে এখনও তদন্ত সম্ভব বলে জানান তিনি।

শিহাব উদ্দিন বলেন, যদি বিষয়টি এমন হয় যে পুনঃতদন্ত চাওয়া হচ্ছে এইজন্য যে যাদের সংযোগে হত্যাকাণ্ডটি হয়েছে বা কী কারণে সংগঠিত হয়েছে, মোটিফ কী ছিল, এই জায়গাগুলো বের হয়ে আসেনি সেটি আমার মনে হয় এই পর্যায়েও সফলভাবে করা সম্ভব।

আগের বিচারপ্রক্রিয়ায় যে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করার অভিযোগ এসেছে, পুনরায় তদন্তের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বিবেচনার যেন না আসে এবং আসলেই যারা পরিকল্পনার সাথে জড়িত সেটা সঠিকভাবে সামনে আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

পিলখানার ঘটনাটির পরিসর বেশ বড়। পূর্ণাঙ্গ বিচারও প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। ১৫ বছরে অনেকের সাজা ভোগ শেষ হয়েছে, অনেকে অপেক্ষায়, আবার অনেকে মারাও গেছেন। তবে এনিয়ে অনেক ধরনের আক্ষেপের জায়গাও রয়ে গেছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিতে এখন নতুন মাত্রা যুক্ত হবে কিনা সেদিকে নজর থাকবে সামনের দিনগুলোতে।

সূত্র : বিবিসি

বঙ্গোপসাগর হয়ে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গারা: ৫০ কিলোমিটার উপকূলীয় সীমান্ত অরক্ষিত

একের পর এক ঘাঁটি দখলে মরিয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সাথে দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ থামছেই না। ফলে রাখাইনে সহিংসতা থেমে নেই। এতে করে বন্ধ হচ্ছে না বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গাদের স্রোতও। নাফ নদ সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের টহল থাকলেও উপকূলীয় এলাকা অরক্ষিত। ১০০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে অর্ধেক উপকূলীয়। রোহিঙ্গারা এখন বঙ্গোপসাগর হয়ে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নেই। উপকূলেও দৃশ্যমান টহল নেই। ফলে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের খুরের মুখ থেকে শিলখালী পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ মাঠে নিস্ক্রিয় হওয়ায় সক্রিয় হয়ে উঠছে স্থানীয় দালালরা।

সীমান্তে দায়িত্বে থাকা বিজিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এত বড় সীমান্ত আসলে পুঙ্খানুপুঙ্খ টহল দেয়া কঠিন। তার ওপর টাকার বিনিময়ে স্থানীয় দালালরা রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসছে। বর্তমানে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি যাচ্ছে। তবে আমরা সীমান্তে টহল বৃদ্ধি করেছি।

বিজিবির টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা দালালদের তালিকা তৈরি করে তাদের ধরছি। গত মঙ্গলবারেও ১০ জন দালাল আটক করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা নাফ নদে টহলে কড়াকড়ি করেছি। উপকূল এলাকায়ও টহল জোরদার করব।

সীমান্তের বাসিন্দারা জানান, বিজিবি-কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল অপ্রতুল। তাই সুযোগ বুঝে স্থল ও জলপথ দিয়ে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছে। রাতের আঁধারে সাঁতরেও তারা বাংলাদেশে আসছে। তবে এটাও সত্য যে, বেশির ভাগই দালালদের মাধ্যমে এপারে ঢুকছে।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা জয়নাল বলেন, দালালরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে নৌকায় রোহিঙ্গাদের এপারে জলসীমায় নিয়ে এসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল নেই এমন জায়গায় তাদের নামিয়ে দেয়। এর পর তীরে ঝাউবনে লুকিয়ে রাখে। সেখান থেকে গন্তব্যে পাঠিয়ে দেয়। দালালদের সাথে কিছু মাছ ধরার নৌকাও জড়িত রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দালালরা ২০ হাজার থেকে লাখ টাকার বিনিময়ে উখিয়া-টেকনাফের সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে রোহিঙ্গাদের এ দেশে নিয়ে আসে। এ কাজে যুক্ত রোহিঙ্গাসহ বেশ কিছু দালাল সক্রিয় রয়েছে।
হ্নীলা সীমান্তের মাওলানা কলিম উল্লাহ জানান, সীমান্তে বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয়রাও রোহিঙ্গা ঠেকাতে সোচ্ছার হতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় তারা খুব সহজেই ঢুকে পড়ছে।

তিনি বলেন, টেকনাফে স্থানীয়দের চেয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বহু গুণ। ফলে স্থানীয় মানুষের বেকারত্ব বাড়ছে। অনেকেই নিরুপায় হয়ে মাননব পাচার, মাদক ও অস্ত্র বহনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

টেকনাফের ব্যবসায়ী জানে আলম বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অনেকটা অরক্ষিত হওয়ার কারণে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। তার ওপর দেশের কথা চিন্তা না করে অর্থের লোভে রোহিঙ্গা ঢোকাচ্ছে। ফলে স্থানীয়দের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো দরকার।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আদনান চৌধুরী বলেন, বিজিবি-কোস্টগার্ডের পাশাপাশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয়দের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এছাড়া রোহিঙ্গা পারাপারে জড়িত দালালদের ধরতে অভিযান চলছে। নাফ নদের পাশাপাশি উপকূলেও টহল জোরদার করা হবে। 

ভারতে এবার ৭ বছরের মুসলিম ছাত্রের টিফিন নিয়ে বিতর্ক

বছর সাতেকের এক ছাত্রের বিরুদ্ধে বোমা মেরে স্কুল উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ করে চলেছেন বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। পাশেই তার কথার সাথে সুর মেলানো শিক্ষকরা এবং বেশ কয়েকজন খুদে পড়ুয়া।

ছাত্রের মা তাদের সাথে সমানে তর্ক করে চলেছেন। অধ্যক্ষ ওই শিশুকে স্কুল থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছেন এবং অন্য শিক্ষকরা ছাত্রের মাকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছেন এই দৃশ্যগুলোই ফুটে উঠেছে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া দুটি ভিডিওতে।

ঘটনাটা উত্তর প্রদেশের আমরোহা জেলার একটা বেসরকারি স্কুলের। এই ভিডিও দুটো ভাইরাল হওয়ার পর একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আমরোহার হিল্টন সিনিয়র সেকেন্ডারি বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ অবনীশ শর্মা সাত বছরের ওই বালকের বিরুদ্ধে ‘স্কুলের ভবন বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা, টিফিনে আমিষ খাবার আনা এবং মন্দির ভেঙে দেওয়ার চিন্তা ভাবনা পোষণ করার’ মতো অভিযোগ করছেন।

ছাত্রের অভিভাবক অবশ্য এই সমস্ত অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন শিশুর সাথে ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করা হয়েছে।

অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গঠিত তিন সদস্যের একটা কমিটি এই ঘটনার তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

তদন্ত কমিটি জানিয়েছে যে স্কুলের অধ্যক্ষ ওই শিক্ষার্থী এবং তার মায়ের সাথে কথোপকথনের সময় যে ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তা ‘অনোপযুক্ত’ ছিল।

কিন্তু এখনো পর্যন্ত হিল্টন সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুল বা তার অধ্যক্ষ অবনীশ শর্মার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।

আমরোহার জেলা স্কুল ইন্সপেক্টর বিপি সিং বিবিসিকে জানিয়েছেন, স্কুলকে ‘শোকজ’ নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

একই সাথে স্কুলের ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে অনুরাগ সাইনি অধ্যক্ষকে ‘শো কজ’ নোটিশ পাঠিয়ে সাত দিনের মধ্যে তার জবাব দিতে বলেছেন।

উল্লেখ্য, হিল্টন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মঙ্গল সিং সাইনি বিজেপির মন্ত্রী ছিলেন। তার ছেলে অনুরাগ সাইনি অবশ্য কয়েক বছর আগে সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন।

তবে এই স্কুলকে কেন্দ্র করে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার মাঝেই গত ৯ সেপ্টেম্বর বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য?
যে খুদে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অধ্যক্ষকে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলতে দেখা গিয়েছিল ওই ভিডিওতে, তার বাড়ি স্কুল থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে।

সেখানে গিয়ে দেখা গেল, ঘিঞ্জি জায়গায় তৈরি একটা তিনতলা বাড়ির বাইরে বসে আছেন বহু স্থানীয় নেতা ও কর্মী। বাড়ির ছাদে ছাত্রের মা সাবরা বেগমকে ঘিরে রয়েছেন সাংবাদিক ও স্থানীয় রাজনীতিবিদরা।

অনেক নেতাই শিশুর সাথে দেখা করে কথা বলতে চাইছেন। এদিকে বছর সাতেকের ওই ছাত্র মায়ের আঁচলের তলায় লুকিয়ে কাঁদতে শুরু করে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার মা সাবরা বেগম বললেন, ‘কিচ্ছু হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

এরই মাঝে নেতারা ওই বালককে বারবার জিজ্ঞাসা করলে সে শুধু বলে, ‘আমি বড়ির (সোয়াবিন) বিরিয়ানি নিয়ে গিয়েছিলাম।’

এটুকু কথা বলেই চুপ করে যায় সে। স্থানীয় নেতারা মা ও শিশুর সাথে ছবি তুলে যাওয়ার সময় বলে যান, ‘ভয় পাবেন না, আমরা সবাই আপনাদের সাথে আছি।’

স্কুলের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরই স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ জন্মেছে। এই পরিবারের খবরাখবর নিতে এসেছিলেন দুই মুসলিম তরুণ।

তারা বলেন, ‘আমরোহা একটা মুসলিম জনসংখ্যা বহুল শহর। এখানে যদি কোনো মুসলমান শিশুকে এমন ঘটনার শিকার হতে হয় তাহলে অনুমান করা যায় যে যেখানে মুসলমানদের জনসংখ্যা কম সেখানে তাদের অবস্থা কী।’

একইসাথে ওই দুই তরুণ বলেছেন, 'আমরোহার স্কুলে একজন শিশুর প্রতি এই অবিচার বরদাস্ত করা হবে না।’

শিশুর মা কী বলছেন?
সাবরা বেগমের তিনজন সন্তানই হিল্টন সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে পড়ে। বড় ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যে শিশুকে দেখা গিয়েছে সে তৃতীয় শ্রেণিতে এবং তার ছোট ছেলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।

ওই ঘটনার পর থেকে তার তিনজন সন্তানই স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

সাবরা বেগম বলেন, 'সেদিন বাচ্চাকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে দেখলাম ওর মুখ লাল হয়ে আছে। ও কিছু বলছিল না। একটা ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল ওকে। আমি ওর ক্লাস টিচারের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছি কিন্তু উনি কিছু বলেননি।’

সাবরা বেগম জানিয়েছেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিও মধ্যে যেটা ক্লাসে রেকর্ড করা, সেটা ২ সেপ্টেম্বরের। আর অধ্যক্ষের সাথে তার তর্কাতর্কির ভিডিও পরদিন সকাল অর্থাৎ ৩ সেপ্টেম্বরের।

সাবরা বেগম বলেন, 'আমি যখন সন্তানের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে অধ্যক্ষকে জিজ্ঞাসা করি, তখন তিনি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং স্কুল থেকে সন্তানের নাম কেটে দেয়ার হুমকি দেন।’

ছাত্রের মা বলেন, 'ওরা বলছে আমার বাচ্চা স্কুল উড়িয়ে দেবে। ও নাকি হিন্দু বাচ্চাদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার কথা বলে। আমিষ খাবার নিয়ে আসে।’

'ওরা কীভাবে সাত বছরের একটা বাচ্চাকে নিয়ে এমন কথা বলতে পারে?’

সাবরা বেগম জানিয়েছেন, ক্লাসরুমে তার ছেলেকে অধ্যক্ষ যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন তার ভিডিও দেখে বুক কেঁপে উঠেছিল।

ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেছেন, 'একজন শিশুর বিরুদ্ধে কী করে এমন অভিযোগ উঠতে পারে? এত ছোট একটা বাচ্চাকে এই ধরনের প্রশ্ন কেউ কীভাবেই বা করতে পারে?’

দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা সাবরা বেগম তার সন্তানরা বড় হওয়ার পর এখন আবার পড়াশোনা শুরু করছেন। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নার্সিং কোর্স করছেন তিনি।

নার্স হওয়ার প্রস্তুতি নেয়া এই মা চান তার বড় ভবিষ্যতে ছেলে ডাক্তার হোক। ছেলেও একই স্বপ্ন দেখে।

তার কথায়, 'আমার ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। তাই এত ব্যয়বহুল একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে আমরা আমাদের তিন সন্তানকে পড়াচ্ছি। স্কুলের বেতন দেয়া আমাদের পক্ষে সহজ নয়, তা সত্ত্বেও আমরা সাহস দেখিয়ে এগিয়েছি। কিন্তু এখন এই স্কুলের পক্ষ থেকে আমার ছেলের বিরুদ্ধে একটা এত গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। আমার সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে।’

সাবরা বেগম আরো মনে করেন, মুসলমান বলেই তার সন্তানের সাথে এমন আচরণ করা হয়েছে।

তার অভিযোগ, 'যদি এটা যদি হিন্দু-মুসলিমের বিষয় না হয় তাহলে স্কুলের অধক্ষ্য এই ধরনের কথা কেন বলছেন? এর সহজ অর্থ হলো, ওরা নিজেরাই হিন্দু-মুসলমান (ভাগ) করছে।’

অধ্যক্ষ কী বলছেন?

ভাইরাল ভিডিওতে শিশুর প্রতি বিদ্যালয়ের অধক্ষ্য অবনীশ শর্মার যে আচরণ দেখা গিয়েছে সে তাকে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। শর্মা বলেছেন, 'আমার দুঃখ ও অনুশোচনা তো রয়েছে, কিন্তু ভিডিওতে যা দেখা যাচ্ছে সেটা ঘটনাক্রমের পুরোটা নয়।’

'ভাইরাল ভিডিও এডিট করা এবং ছেঁটে ফেলা হয়েছে। আমি কখনো কোনো শিশুকে আতঙ্কবাদী (সন্ত্রাসী) বলিনি।’

তৃতীয় শ্রেণির ওই ছাত্রের পরিবারের পক্ষ থেকে তোলা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, তিনি ধর্মের ভিত্তিতে কখনও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য করেননি।

অবনীশ শর্মা ব্যাখ্যা করেছেন গত ২৫ বছর ধরে তিনি শিক্ষার ক্ষেত্রের সাথে যুক্ত রয়েছেন এবং গত ১২ বছর ধরে এই স্কুলের অধ্যক্ষ পদে আছেন। ।

তার কথায়, 'আমি হিন্দু। আমি একজন হিন্দুত্ববাদীও, কিন্তু কারো সাথে বৈষম্য করি না। উল্টে সবার প্রতি ভালবাসা দেখাই। আমি যদি বৈষম্য করতাম বা বিদ্যালয়ে যদি কোনো ধরনের বৈষম্য থাকত, তাহলে স্কুলের ৪০ শতাংশ শিশু মুসলমান হতো না।’

যদিও যে এলাকায় এই স্কুল, সেটা মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল।

অবনীশ শর্মার দাবি, তার স্কুলের বিরুদ্ধে আগে কখনো এমন অভিযোগ ওঠেনি এবং বাকি মুসলিম ছাত্রদের অভিভাবকেরা এই বিদ্যালয় নিয়ে নিয়ে সন্তুষ্ট।

স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, এক ডজনেরও বেশি মুসলমান পড়ুয়ার অভিভাবক এই ঘটনার তদন্তের জন্য তৈরি কমিটির সামনে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তারা (অভিভাবকরা) জানিয়েছেন, তাদের সন্তানদের সাথে স্কুলে কখনো দুর্ব্যবহার করা হয়নি।

এই ঘটনায় বিবাদের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শর্মা জানিয়েছেন, ওই ছাত্রের ক্লাসের একাধিক সহপাঠীর বাবা-মা অভিযোগ করেছেন যে ছেলেটা স্কুলে আমিষ টিফিন নিয়ে আসে এবং ক্লাসের অন্য বাচ্চাদের ‘মুসলমান বানিয়ে দেয়ার’ কথা বলে।

তার কথায়, 'অন্য অভিভাবকদের তোলা এই অভিযোগগুলোর তদন্ত করার জন্য, আমি ক্লাসে গিয়েছিলাম এবং অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে কথা বলে অভিযোগের বিষয়টা নিশ্চিত করেছি। ক্লাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে ওই ছাত্র এইসব কথা বলে থাকে।’

স্কুলের অধ্যক্ষের দাবি খারিজ করে পড়ুয়ার মা সাবরা বেগম বলেন, তার সন্তান কখনো স্কুলে আমিষ খাবার নিয়ে যায়নি।

অন্যদিকে, অবনীশ শর্মা জানিয়েছেন, সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) বা কোনো রাজ্যের বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মের আওতায় কী ধরনের খাবার টিফিনে আনা উচিত বা উচিত নয়, সে বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধ না থাকলেও হিল্টন স্কুলের নিজস্ব নিয়ম নির্ধারণ করে বিদ্যালয়ে আমিষ খাবার আনা নিষিদ্ধ করেছে।

তার যুক্তি, 'বাচ্চারা বাড়িতে কী খাবে সেটা তাদের পছন্দ। তবে আমাদের স্কুলের নিজস্ব নিয়ম রয়েছে যা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা মেনে নিয়েছেন।’

আইন কী বলছে?
এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে বলছেন, 'সুপ্রিম কোর্ট বলছে যেকোনো ব্যক্তি কী পরিধান করবেন, কী খাবেন এবং কাকে ভালবাসেন সেটা তার মৌলিক অধিকার।’

‘শিশুরও সেই অধিকার রয়েছে। স্কুলের নিয়ম থাকলেও সেখানে আমিষ আনা যাবে না এই বিষয়টাকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।’

একই সাথে তিনি বলছেন, 'স্কুলের যদি (আমিষ এবং নিরামিষ সংক্রান্ত) এমন নিয়ম থাকে তাহলে এটাও থাকা উচিৎ কেউ আমিষ খাবার আনলে তার শাস্তি থাকবে, বা কোনো জরিমানা থাকবে। কিন্তু স্কুল থেকে বহিষ্কার করা একটা দাগের মতো। এটা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ভাল নয়।’

এই আইনজীবী যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন এই ঘটনাবলী ছাত্র বা স্কুল কারো পক্ষেই কিন্তু ভাল নয়।

সঞ্জয় হেগড়ে বলছেন, 'এই ধরনের অভিযোগ একেবারেই অন্যায়। এতে মিলে মিশে থাকা মানুষের সদ্ভাবের ওপর প্রভাব পড়বে।’

‘ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিৎ। সিবিএসই চাইলে তাদের নিয়ম অনুযায়ী এই স্কুলের স্বীকৃতিও বাতিল করতে পারে।’

আমরোহা জেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

আমরোহা মিশ্র জনসংখ্যার শহর এবং এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সব সময়েই দেখা গিয়েছে। উদাহরণ দিয়ে আমরোহার জেএস হিন্দু কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মহেশ শরণ জানিয়েছেন, আশেপাশের জেলাগুলোতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলেও আমরোহা বরাবরই শান্তিপূর্ণ থেকেছে।

তার কথায়, 'একজন শিক্ষকের কাছে প্রত্যেক শিশু সমান, তা সে হিন্দু, মুসলিম বা অন্য যেকোনো ধর্মের হোক না কেন। এই ধরনের ঘটনা অবমাননাকর এতে যে পরিবেশ তৈরি হয় তা শিশু ও সমাজকে নষ্ট করে।’

'এটা অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা। স্থানীয় প্রশাসনের একে গুরুত্ব সহকারে দেখা এবং এমন পদক্ষেপ নেয়া উচিত যাতে অন্য কোনো স্কুলে অন্য কোনো বাচ্চার সাথে এমন ঘটনা না ঘটে।’

রাজনৈতিক দোষারোপ

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহরে রাজনীতিও চরমে উঠেছে। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রের সাথে দেখা করতে আসা আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন-এর এক নেতা বলেন, 'আমাদের দল সঠিক স্তরে এই ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।’

একই সাথে নাগিনার সংসদ চন্দ্র শেখর আজাদের দলের কর্মীরা জেলা সদরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। স্কুলের অধ্যক্ষকে বরখাস্ত করার দাবিতে সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটা স্মারকলিপিও জমা দেন।

ওই ছাত্রের পরিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ জানালেও এখনো পর্যন্ত কোনো এফআইআর দায়ের করা হয়নি। পুলিশ সুপার কুনওয়ার অনুপম সিং এই নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।ঘটনাটাকে শিক্ষা বিভাগের বিষয় বলে অভিহিত করেন।

জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক বিভি সিং বলেন, 'আমরা তদন্ত করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট জমা দিয়েছি। পরবর্তী পদক্ষেপ তাদের নিতে হবে।’

এটা যেহেতু শিশু অধিকার সম্পর্কিত বিষয়, তাই বিবিসির পক্ষ থেকে জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের কাছেও জানতে চাওয়া হয়েছিল যে ঘটনা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ করছেন কি না।

তবে তাদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

‘ভলান্টিয়ার্স এগেনস্ট হেট’-এর আহ্বায়ক ডা. মেরাজ হুসেন বলছেন, 'এতদিনে এই ঘটনায় এফআইআর দায়ের করা উচিত ছিল। অধক্ষ্যকে গ্রেফতারও করা উচিত ছিল।’

তিনি বলেন, 'অধ্যক্ষ আদালতে তার পক্ষ উপস্থাপনের সুযোগ পেতেন। কিন্তু প্রশাসনের তরফে এখনো পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সংখ্যালঘু কমিশন ও শিশু কমিশনেরও বিষয়টাকে তাদের নজরে নেয়া উচিত ছিল, কিন্তু এখনো তা হয়নি।’

মেরাজ হুসেন প্রশ্ন করেন, 'যদি এই শিশু মুসলমান না হতো এবং শিক্ষক হিন্দু না হতেন তাহলে এতদিনে উত্তর প্রদেশের সরকার এই বিষয়ে এতদিনে পদক্ষেপ নিয়ে নিত।’

‘এটা ধর্মীয় বিষয় নয়, এটা একজন শিক্ষার্থীর অধিকারের প্রশ্ন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষায় এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে শাস্তি দিতে কেউ এগিয়ে আসেনি।’

ছাত্রের মা সাবরা বেগম এখন আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি জানিয়েছেন, 'প্রশাসন যদি আমার সন্তানের প্রতি সুবিচার না করে, তাহলে আমি আদালতে যাব। প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টেও যাব।’

‘এটা আর এখন শুধুমাত্র আমার সন্তানের বিষয় নয়, স্কুলে যাওয়া প্রত্যেকটা বাচ্চার বিষয়।’

এই সব কিছুর মধ্যে এখনো আতঙ্কে রয়েছে ওই খুদে ছাত্র। বারবার জিজ্ঞেস করে চলেছে তার পড়াশোনা আবার কবে শুরু হবে।

তার অন্য দুই ভাইও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

সূত্র : বিবিসি

প্রথম বিতর্কে ধরাশায়ী ট্রাম্প by হাসান ফেরদৌস

মুষ্টিযুদ্ধের সঙ্গে যদি তুলনা করি, তাহলে বলা যায়, তাঁদের প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে কমলা হ্যারিস সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নকআউটে ধরাশায়ী করেছেন। গত মঙ্গলবার রাতে এবিসি টিভি নেটওয়ার্কে প্রচারিত ৯০ মিনিটের বিতর্কে কমলা দক্ষ মৎস্যশিকারির মতো টোপ ছেড়েছিলেন। ক্রুদ্ধ ও অসহায় ট্রাম্প সহজেই সে টোপে ধরা দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক নাটকীয়তার জন্য যতটা পরিচিত, গুরুত্বপূর্ণ নীতি (পলিসি) প্রশ্নে অর্থপূর্ণ আলোচনার জন্য ততটা নয়। মঙ্গলবারের বিতর্ক আদৌ এই নিয়মের ব্যতিক্রম ছিল না। কমলা দক্ষ কৌঁসুলি। অন্যদিকে ট্রাম্প ঝানু ‘শো ম্যান,’ টেলিভিশন মাধ্যমটা তিনি খুব ভালো জানেন। কিন্তু নিজের মেজাজ সামলে প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়া তাঁর জন্য কঠিন। কমলার লক্ষ্য ছিল ট্রাম্প তাঁর মেজাজ হারান, এমন মন্তব্য ছুড়ে দেওয়া। ঠিক সে কাজটিই করেছেন তিনি।

বিতর্কে পাঁচ বিষয়

অর্থনীতি, অভিবাসন, গর্ভপাত, বর্ণবাদ ও গণতন্ত্রের ওপর হামলা—মোটের ওপর পাঁচটি বিষয়েই বিতর্ক আবর্তিত হয়। সঙ্গে ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ এবং স্বাস্থ্যবিমা প্রসঙ্গ বিতর্কে ঝাঁজ ও রস দুটিই সরবরাহ করে।

বিতর্কের প্রথম ১৫ মিনিট ট্রাম্প মোটের ওপর নিজেকে সামলে ছিলেন। অর্থনীতি প্রশ্নে অধিকাংশ মার্কিন ভোটার তাঁর নেতৃত্বের ওপর অধিক আস্থাবান। সে কথা মাথায় রেখে ট্রাম্প কমলাকে ভালোই ঠুকেছিলেন। তাঁর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এখনকার চেয়ে অনেক ভালো ছিল। কিন্তু অভিবাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই খেই হারিয়ে ফেলেন ট্রাম্প। তাঁর প্রচারশিবিরের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় অভিবাসন। নির্বাচিত হলে তিনি এক কোটির বেশির বহিরাগতকে জোর করে বহিষ্কার করবেন বলে ঘোষণাও দিয়েছেন। এত লোককে কীভাবে বহিষ্কার করবেন, এমন একটি প্রশ্নের কোনো উত্তরই তাঁর কাছে ছিল না। উল্টো ওহাইওতে অবৈধ বহিরাগতরা স্থানীয়দের কুকুর-বিড়াল চুরি করে খাচ্ছে, এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলেন। বিতর্কের সঞ্চালকদের একজন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন, তাঁরা খোঁজ নিয়ে দেখেছেন কথাটা মিথ্যা।

ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল, অবৈধ অভিবাসন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ বয়ে এনেছে, আর সে জন্য দায়ী কমলা ও বাইডেনের ব্যর্থ নেতৃত্ব। সে প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন কমলা। তিনি ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের জন্য কংগ্রেসে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকানদের যৌথ উদ্যোগে একটি আইন প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু ট্রাম্পের নির্দেশে রিপাবলিকান সদস্যরা শেষ মুহূর্তে সে প্রস্তাব সমর্থনে অস্বীকার করেন। কেন? শুধু এ জন্য যে এই প্রস্তাব গৃহীত হলে তিনি কমলাকে আক্রমণের সেরা হাতিয়ারটি হারাতেন। অন্য কথায়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নয়, শুধু নিজের স্বার্থই মাথায় রাখেন ট্রাম্প।

বিতর্কের আগে সাবেক ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন কমলাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘সুযোগ পেলেই ট্রাম্পকে উত্তেজিত করবে, তাতেই কাজ হবে।’ হলোও তা-ই। অপ্রাসঙ্গিক হলেও কমলা ট্রাম্পের সভার জনসমাগম নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। ক্যামেরায় চোখ রেখে বললেন, ‘আপনারা এক কাজ করুন। ট্রাম্পের কোনো নির্বাচনী সভায় একবার ঘুরে আসুন। দেখবেন তিনি একের পর এক অসংলগ্ন বিষয়ে কথা বলছেন। কাল্পনিক “সিরিয়াল কিলার” হ্যানিবাল লেকটারকে নিয়ে আবোলতাবোল কথা বলছেন। উইন্ডমিল বা বায়ুকল থেকে নাকি ক্যানসার হয়, এমন কথাও আপনারা শুনবেন। তারপর দেখবেন একসময় বিরক্ত হয়ে লোকজন সভা ছেড়ে চলে যাওয়া শুরু করেছে। সভায় তারা ট্রাম্পের এত এত কথা শুনবে, কিন্তু যা শুনবে না তা হলো আপনাদের জন্য তিনি কী করবেন।’

ব্যস, অমনি লালমুখো হয়ে ট্রাম্প বললেন, ‘সব মিথ্যা কথা। কেউ আমার সভা ছেড়ে যায় না। আমার সভা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সভা।’

কমলাকে আক্রমণের জন্য জুতসই ইষ্টকখণ্ড হাতের কাছে না পেয়ে ট্রাম্প বারবার প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কথায় চলে যান। বাইডেন অথর্ব, দিনভর কাজকর্ম না করে সমুদ্রস্নানে ব্যস্ত। তিনি ও তাঁর ছেলে কখনো চীন, কখনো মস্কোর কাছ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার উৎকোচ পেয়েছেন। একপর্যায়ে ট্রাম্প প্রায় চেঁচিয়ে বলে ওঠেন, ‘বাইডেন, আমাদের প্রেসিডেন্ট, তিনি এখন কোথায়? নেই, কোনো জায়গায় তাঁকে পাবেন না।’

মুখে বাঁকা হাসি, চোখের তারায় ঝিলিক দিয়ে কমলা স্মরণ করিয়ে দেন, ‘তিনি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, বাইডেন নন।’

বর্ণ প্রসঙ্গটিও আলোচনায় উঠে আসে। ইতিপূর্বে ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, কমলা একবার কালো মানুষ, একবার এশীয় হিসেবে নিজেকে পরিচিত করেন, যখন যেটা রাজনৈতিকভাবে তাঁর কাছে লাভজনক। মঙ্গলবারের বিতর্কে ট্রাম্প সে কথা পুনরাবৃত্তি করলে কমলা মন্তব্য করেন, ‘এটা দুর্ভাগ্যের বিষয় যে এমন একজন লোক দেশের প্রেসিডেন্ট হতে চান যে বারবার বর্ণবিভাজনকে রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শুধু এখন নয়, সারা জীবন ট্রাম্প এই কাজ করেছেন।’ কমলা স্মরণ করিয়ে দেন, অর্ধশতক আগে বাবার টাকার ব্যবসায় নেমে ভাড়ার জন্য যে বাড়ি তিনি বানিয়েছিলেন, তাতে কৃষ্ণকায়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।

সবচেয়ে হাস্যকর মুহূর্ত ছিল স্বাস্থ্যবিমা প্রশ্নে ট্রাম্পের উত্তর। আট বছর ধরে তিনি বলে আসছেন, ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচিটি বাতিল করে তিনি আরও ভালো, আরও দক্ষ একটি স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি চালু করবেন। কী সেই কর্মসূচি, এত দিনে কি সেই কর্মসূচি তিনি ভেবে উঠেছেন কি না, তা জানতে চাইলে ট্রাম্প জবাব দেন, একটা ধারণা (কনসেপ্ট) তাঁর মাথায় আছে। অর্থাৎ তিনি এখনো ভাবছেন।

কমলা মনে করিয়ে দেন, ৬ জানুয়ারির দাঙ্গার মাধ্যমে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ঠেকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আবার ক্ষমতা ফিরে পেলে একনায়ক হতে চাইবেন। কমলা মনে করিয়ে দেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সদস্যরাই তাঁকে অযোগ্য ও হাস্যকর বলে তিরস্কার করেছেন। বিশ্বনেতারা তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করেন। জবাবে ক্ষিপ্ত ট্রাম্প বলেন, মোটেই না, বিশ্বনেতারা তাঁকে মহান বলে অভিনন্দিত করেছেন। এই দাবির সমর্থনে একমাত্র যে বিশ্বনেতার নাম তিনি উল্লেখ করেন, তিনি হলেন হাঙ্গেরির কর্তৃত্ববাদী নেতা ভিক্টর অরবান।

বিতর্কের ফলাফল

অধিকাংশ ভাষ্যকার একমত, এই বিতর্কে হাসিখুশি ও চটপটে কমলার পাশে ট্রাম্পকে দেখাচ্ছিল ক্রুদ্ধ, বিরক্ত ও খুঁতখুঁতে এক বৃদ্ধ। সিএনএনের ভ্যান জোন্স মন্তব্য করেছেন, বলা যায়, কমলা তাঁর প্রতিপক্ষকে কশে বেত্রাঘাত করেছেন। ‘পলিটিকো’ একজন রিপাবলিকান নির্বাচনী বিশেষজ্ঞের কথা উদ্ধৃত করে লিখেছে, বিতর্কের জন্য ট্রাম্প মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। পুরোনো কথাগুলোই নতুন করিয়ে ঢেলে দিয়েছেন, কিন্তু হুল ফোটাতে পারেননি।

কমলা ও তাঁর প্রচারশিবির বিতর্কের ফলাফলে দারুণ খুশি। এতটাই খুশি যে তারা আরেক দফা বিতর্কের প্রস্তাব করেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, কমলা নয়, তিনিই জিতেছেন। কমলার হার হয়েছে বলেই তিনি এখন আরেক দফা বিতর্কের দাবি তুলেছেন।

এই বিতর্কের আগে অধিকাংশ জনমত জরিপে ট্রাম্প ও কমলার অবস্থান ছিল সমানে সমান। সে কারণেই সবাই এই বিতর্কের অপেক্ষায় ছিল। যে ১৫ শতাংশ ভোটার এখনো মনস্থির করে ওঠেননি, তাঁরা হয়তো এই বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তাঁরা কোন দিকে ঝুঁকছেন, কমলা না ট্রাম্প? সে জরিপ জানার জন্য আমাদের অবশ্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

তবে যাঁরা মনস্থির করে ফেলেছেন, তাঁদের একজন হলেন টেলর সুইফট, বিশ্বের এক নম্বর সেলিব্রিটি পপতারকা। বিতর্ক শেষ হওয়ামাত্রই ইনস্টাগ্রামে এক বার্তায় তিনি জানান, কমলার পক্ষেই তিনি ভোট দেবেন। সম্ভবত এটাই ছিল এই মুষ্টিযুদ্ধের সেরা ‘আপারকাট’।

প্রথম বিতর্কে ধরাশায়ী ট্রাম্প

ইউনূস-মোদি বৈঠক হবে কি?

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের মতো বিতর্কিত বিষয় নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করতে রাজি  নন। দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ইস্যু’ হয়ে উঠেছে।  কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যেকোনো আলোচনার  জন্য ভারতকে আগে যে বিষয়ে ফোকাস করতে হবে তারা এই মুহূর্তে সেই বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইছে। তাদের মধ্যে প্রধান হলো বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে উপস্থিতি। কুগেলম্যান  উল্লেখ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের কথা বলেছিল। কিন্তু  দিল্লি তাকে ছাড়তে রাজি হয়নি দেশের অনেক নেতার সঙ্গে হাসিনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে। মোদি যদি ইউনূসের সঙ্গে দেখা করতেন, তাহলে এই ইস্যুতে আলোচনা এড়ানো তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। ভারতীয় মিডিয়া গত সপ্তাহে জানিয়েছে যে, দিল্লি এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি- তারা মোদি এবং ইউনূসের মধ্যে বৈঠকের জন্য ঢাকার অনুরোধে সাড়া দেবে কিনা। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য এই মাসের শেষের দিকে দু’জনেরই নিউ ইয়র্কে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। গত মাসে প্রথমে মোদির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ড. ইউনূস এবং তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে- অন্তর্বর্তী সরকার ‘বাংলাদেশের হিন্দু এবং সমস্ত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে’। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন রোববার বলেছেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে যেকোনো বৈঠক করার জন্য ‘নির্দিষ্ট পদ্ধতি’ অনুসরণ করতে হবে। কারণ এই ধরনের আলোচনা আগে থেকে পরিকল্পনা করা হয়নি।

ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহ শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনকে উৎখাত করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান, ড. ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব দেয়া হয়।  রোববার, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বলেছে, আগস্টে গণবিক্ষোভ দমনে কর্তৃপক্ষ যে মারাত্মক সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছিল সেই বিচারের মুখোমুখি হওয়ার জন্য হাসিনার  ভারত থেকে প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। হাসিনা প্রাথমিকভাবে অল্প সময়ের জন্য ভারতে থাকবেন বলে আশা করা হয়েছিল, কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে যে, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে আশ্রয় নেয়ার তার প্রচেষ্টা এখনো পর্যন্ত সফল হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘মোদি-ইউনূস বৈঠক যত তাড়াতাড়ি হবে তা দিল্লির জন্যই মঙ্গল। দিল্লিকে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে এবং ‘বাংলাদেশ ২.০’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে, যা ভারতের সমীকরণে কখনোই ছিল না।’ ইয়াসমিন মনে করেন, প্রথম বৈঠকের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘পরিবর্তিত বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেয়া এবং উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলানো। কারণ ভারত হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের উপর বাজি ধরেছিল এবং বাংলাদেশিদের ‘স্পন্দন বোঝার’ চেষ্টা করেনি।

ভারতের জন্য এটা উপলব্ধি করার সময় এসেছে যে, শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না। ভারতের ৫৩ বছরের বাংলাদেশ নীতিতে দূরদর্শিতার অভাব ছিল বলে উল্লেখ করে ইয়াসমিন জানাচ্ছেন, ‘ভারত এর বাইরে কিছু দেখতে চায়নি, তারা বাস্তবতা থেকে তাই অনেক দূরে ছিল।’ সামপ্রতিক ঘটনাগুলো ভারতের কাছে তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে একটি নতুন  দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্পর্ক স্থাপনের বার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। যদি ভারত একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আশা করে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়াকে ‘পরিচালনা’ করার পরিবর্তে, এই অঞ্চল থেকে ‘সম্মতির’ প্রয়োজন হবে ভারতের।

হাসিনা তার শাসনামলে ভারতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। জুলাই মাসে তার দিল্লি সফরের সময় সামুদ্রিক সহযোগিতা, ডিজিটাল অংশীদারিত্ব এবং মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে রেল সংযোগের ক্ষেত্রে দশটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে তার শাসনকালের সময়টি জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং বিরোধীদের দমনের অভিযোগের দ্বারা বিদ্ধ। তার বিরুদ্ধে দেশটির গত তিনটি সাধারণ নির্বাচনে কারচুপি করার অভিযোগও আনা হয়েছিল, যার মধ্যে সর্বশেষ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি  চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছিলেন। ভারত অবশ্য নির্বাচনের ফলাফলকে স্বাগত জানিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারাভিযান শুরু করতে প্ররোচিত করেছে। কারণ তারা দিল্লিকে নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য হাসিনাকে সমর্থন করার অভিযোগ তুলেছেন। ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সহযোগী ফেলো সোহিনী বোস বলেন, ‘দিল্লি যখন শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করেছিল, তখন সম্পর্কটি পারস্পরিক  নির্ভরতার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল। বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ভারতকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ‘অনিবার্যভাবে’ একটি কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।’ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত ‘সূক্ষ্ম’ একটি বিষয় হওয়ায়, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ‘তাড়াহুড়ো’ না করার পরামর্শ দিচ্ছেন সোহিনী বোস। তার মতে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করার সর্বোত্তম উপায় হলো সংযোগ এবং শক্তি প্রকল্পগুলোতে মনোনিবেশ করা। গত নভেম্বরে, দুই দেশ ভারতের সহায়তায় নির্মিত তিনটি প্রধান সংযোগ ও শক্তি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছে, যার মধ্যে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি রেললাইন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কুগেলম্যান বলছেন- ‘যদি দু’দেশের সম্পর্ক বরফ কঠিন হয়ে যায় তাহলে সীমান্ত নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা চালানো কঠিন হয়ে যাবে।’ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, অন্যদিকে ভারত এশিয়ায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে ১.৯৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যেখানে মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল ১৪.০১ বিলিয়ন ডলার। কুগেলম্যানের মতে, ভারত ও বাংলাদেশের নিজ নিজ রাষ্ট্রদূতদের অবিলম্বে তাদের স্বাগতিক সরকারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে, যাতে তারা ‘উচ্চ পর্যায়ের সংযোগের পথ প্রশস্ত’ করতে পারে। হাসিনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গভীর পরিবর্তন এসেছে  তার পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কতোদূর যেতে পারে তার সীমাবদ্ধতা থাকবে। অদূর ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগকে ‘আলোচনার বাইরে’ রেখে কুগেলম্যান বলছেন, যে বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলগুলো শূন্যস্থান পূরণ করবে তাদের  সমালোচনা, কিছুক্ষেত্রে শত্রুতারও সম্মুখীন হতে পারে ভারত। ঢাকা যুক্তি দিতে পারে যে, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক ‘উষ্ণ না হলেও’, দু’দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। কিন্তু কুগেলম্যান মনে করেন এটি ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হবে। হাসিনার যুগে ভারত যে গভীর, কৌশলগত অংশীদারিত্ব উপভোগ করেছিল, সেই সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। নতুন সম্পর্ক সম্ভবত আরও লেনদেনমূলক এবং কৌশলী হবে।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
mzamin

স্কুলে ইসরায়েলের বোমা হামলা, জাতিসংঘের ৬ কর্মী নিহত

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী মধ্য গাজায় জাতিসংঘ পরিচালিত আল-জাউনি স্কুলে বোমা হামলা চালিয়েছে। এতে কমপক্ষে ১৮ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ছয়জন জাতিসংঘের কর্মী। বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) আলজাজিরার প্রতিবেদনে এসব তথ্য বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কুলটিতে হামলায় নিহতদের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপকসহ ছয়জন ইউএনআরডব্লিউএর কর্মী। সংস্থাটি বলেছে, ১১ মাসের যুদ্ধে একক ঘটনায় এটিই তার কর্মীদের জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হামলায় নারী ও শিশুদের দেহ টুকরো টুকরো হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয় মানুষ সেসব কুড়িয়ে এক স্থানে জড়ো করেন।

স্কুলটি জাতিসংঘ পরিচালনা করছিল। সেখানে বেসামরিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। স্কুলে ইসরায়েলের হামলার পরের ফুটেজে দেখা গেছে, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে থাকা ইউএনআরডব্লিউএর লোগো পড়ে আছে। উদ্ধারকারীরা টুকরো মরদেহ খাবারের ব্যাগে করে সরিয়ে নিচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামীদের সংগঠন হামাস। দেশটির এ হামলার জবাবে পাল্টা হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এরপর থেকে এ যুদ্ধ শুরু হয়। ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ নেয় যুদ্ধ। এরপর থেকে গাজার ওপর বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এমনকি তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির, মসজিদসহ ধর্মীয় স্থাপনাও।

সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে গাজার ২০ লাখ বাসিন্দা তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। দেশটির হামলার কারণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইসরায়েলে হামলায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন গাজার ৮৫ শতাংশ বাসিন্দা। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি আর ওষুধের তীব্র সংকটের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তারা। এ ছাড়া ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ অবকাঠামো ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক আদালতে গাজায় গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে দেশটি। 

ইসরায়েলের হামলার পর ছিন্ন মরদেহের খোঁজে গাজার স্থানীয় মানুষ। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলের হামলার পর ছিন্ন মরদেহের খোঁজে গাজার স্থানীয় মানুষ। ছবি : সংগৃহীত

ভারতে বন্দী শিবিরে অনশনে শতাধিক রোহিঙ্গা

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যে অনশন করছেন শতাধিক রোহিঙ্গা। তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। একটি বন্দী শিবিরে আটকে রাখার প্রতিবাদে গত সোমবার থেকে চলছে তাঁদের এ অনশন। ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।

ওই বন্দী শিবিরের নাম মাটিয়া ট্রানজিট ক্যাম্প। সেখানে অনশনরতদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা এক রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রায় ১০৩ জন রোহিঙ্গা। এ ছাড়া ৩০ জন মিয়ানমারের চিন সম্প্রদায়ের শরণার্থী রয়েছে। তাঁদের অনেকের জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) দেওয়া শরণার্থী কার্ড রয়েছে।

ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ করা অভিবাসীদের আটক রাখার জন্য সবচেয়ে বড় বন্দী শিবির মাটিয়া ট্রানজিট ক্যাম্প। রয়টার্সের সঙ্গে কথা হওয়া ওই রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, অনশনরত অনেকের বন্দিত্বের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপরও তাঁদের আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি ৩৬ জন রোহিঙ্গার ইউএনএইচসিআরের শরণার্থী কার্ড রয়েছে।

ওই বন্দী শিবিরের পরিবেশ ভালো নয় এবং সেখানে বন্দীদের সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনের দেখা করতে দেওয়া হয় না বলে জানিয়েছেন ওই রোহিঙ্গা। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের দাবি, তাঁদের যেন ইউএনএইচসিআরের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো হয়। এ নিয়ে তাঁরা আসাম সরকারের কাছেও চিঠি লিখেছেন।

এ বিষয়ে আসামের সর্বজ্যেষ্ঠ আমলা রবি কোটা বলেছেন, আন্দোলনকারীরা মুক্তির দাবি করেছেন। তাঁদের সমস্যার বিষয়ে জানতে ওই বন্দী শিবিরে সরকারি কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছে রাজ্য সরকার। সার্বিক বোঝাপড়ার পর তাঁরা একটি প্রতিবেদন দেবেন। এই আন্দোলনকারীদের সবাইকে আদালতের একই নির্দেশে আটক রাখা হয়নি। তাঁদের বিরুদ্ধে দেওয়া আদালতের আদেশগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো কী কী এবং আইনগতভাবে তাঁরা কোন অবস্থায় আছেন তা-ও জানা হচ্ছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমনপীড়নের মুখে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমনপীড়নের মুখে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাছবি: প্রথম আলো

কমলার সঙ্গে আর বিতর্ক নয়: ট্রাম্প

আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে কমলা হ্যারিসের সঙ্গে আর কোনো টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন রিপাবলিকান দলের এই প্রার্থী।

ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘তৃতীয় কোনো বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে না।’ প্রথম বিতর্ক বলতে তিনি বুঝিয়েছেন গত জুন মাসে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে তাঁর বিতর্ককে। ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থিতা ছেড়ে দেওয়ার পর বাইডেনের জায়গায় আসেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। গত মঙ্গলবার তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বিতীয় বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয় এ বিতর্কের আয়োজন করেছিল টেলিভিশন চ্যানেল এবিসি নিউজ। ওই বিতর্ক টেলিভিশনে দেখেছেন ৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। বিতর্কের পরপরই কমলার প্রচার শিবির জানায়, আগামী অক্টোবরে ট্রাম্পের সঙ্গে আবার বিতর্কের মঞ্চে মুখোমুখি হতে চান কমলা। ট্রাম্পও বলেছিলেন, টেলিভিশন চ্যানেল এনবিসি ও ফক্সে বিতর্কের জন্য প্রস্তুত তিনি।

তবে বৃহস্পতিবার ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘জরিপে এটা স্পষ্ট যে, মঙ্গলবার রাতে ডেমোক্রেটিক দলের উগ্র-বামপন্থী প্রার্থী কমরেড কমলা হ্যারিসের বিরুদ্ধে আমি জিতেছি। আর তিনি এরপরই আবার বিতর্কের আহ্বান জানিয়েছেন। যখন কেউ লড়াইয়ে হেরে যায়, তখন তাঁর মুখ থেকে প্রথমেই বের হয়—“আমি আবার নতুন করে লড়াই করতে চাই।”’

মঙ্গলবারের বিতর্কে কমলার আক্রমণে অনেকটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে যান ট্রাম্প। সিএনএনের একটি জরিপ বলছে, বিতর্কে ট্রাম্পের তুলনায় বেশ ভালো করেছেন কমলা। জরিপে তাঁর পয়েন্ট ৬৩। অন্যদিকে ট্রাম্পের ৩৭। আর ইউগভের জরিপ অনুযায়ী, বিতর্কে কমলা ও ট্রাম্পের পয়েন্ট যথাক্রমে ৪৩ ও ৩২।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

আরেক মহামারি নিয়ে উদ্বেগে বিল গেটস

বিলিয়নিয়ার মানবহিতৈষী বিল গেটস জলবায়ু বিপর্যয় এবং বিধ্বংসী সাইবার আক্রমণের মতো জরুরি বিষয়ে জনসাধারণকে বারবার সতর্ক করেছেন। তবে যে দুটি সংকট তাঁকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে তা হলো,যুদ্ধ ও মহামারি।

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনবিসির মেক ইক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার ফলে সম্ভাব্য একটি বড় যুদ্ধ শুরু হতে পারে। এমনকি যদি বড় আকারের সংঘর্ষ এড়ানো যায়, তবে আরেকটি মহামারি হবে। আর তা হবে সম্ভবত আগামী ২৫ বছরের মধ্যে।

করোনা মহামারির সময় বিশ্ব যে পরিস্থিতিতে ছিল, তার তুলনায় ভবিষ্যৎ মহামারিতে বিশ্ব প্রস্তুত থাকতে সক্ষম হবে কি না এমন প্রশ্ন করা হয় বিল গেটসকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত করে তিনি উল্লেখ করেছেন, মহামারি মোকাবিলায় যে দেশটির নেতৃত্ব দেওয়ার এবং মডেল হওয়ার আশা করে বিশ্ব, সেই দেশটি প্রত্যাশার চেয়ে দূরে রয়েছে।

বিল গেটসের ২০২২ সালে লেখা হাউ টু প্রিভেন্ট দ্য নেক্স প্যান্ডেমিক নামের বইতে ২০২০ সালে মহামারি মোকাবিলায় ঘাটতির জন্য বিভিন্ন দেশের সরকারের সমালোচনা করা হয়েছে। তিনি বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর জন্য সুপারিশের রূপরেখা দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী সঙ্গনিরোধ (কোয়ারেন্টিন) ব্যবস্থা, বর্ধিত রোগ পর্যবেক্ষণ ও টিকা গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

করোনা মহামারি প্রসঙ্গে বিল গেটস বলেছেন, যদিও করোনাভাইরাস মহামারি থেকে কিছু শিক্ষা নেওয়া হয়েছে, তবে তা দুঃখজনকভাবে আমার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। আমরা কী ভালো করেছি বা কোথায় খারাপ করেছি, তার পুরোপুরি প্রতিফলন দেখা যায়নি। তবে আশা করি আগামী পাঁচ বছরে তা উন্নত হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটা আশ্চর্যের।

এর আগে মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস বলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান আগামী পাঁচ বছরে মানুষের জন্য রূপান্তরকারী হবে। সিএনএনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি যোগ করেছেন, আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে ভয় পাওয়ার দরকার নেই কারণ, এটি নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পর বিল গেটস এ মন্তব্য করেন। জর্জিয়েভা বলেন, উন্নত দেশগুলোতে ৬০ শতাংশ চাকরি এবং সারা বিশ্বে ৪০ শতাংশ চাকরিকে প্রভাবিত করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

বিল গেটস