Saturday, October 17, 2009

দুই বাংলাতেই তিনি ছিলেন খ্যাতিমান লেখক -স্মরণ by আলপনা বেগম

তিনি বাংলা একাডেমীর পুরস্কার পেয়েছিলেন। খ্যাতিমান ছিলেন প্রাবন্ধিক, গল্পকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক হিসেবে। তিনি লোকসাহিত্যের সংগ্রাহক, সাহিত্যপত্র-এর সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ। বলা হচ্ছে খালেকদাদ চৌধুরীর কথা। তবে বাংলা সাহিত্যে তাঁর যে অবদান, তা হারিয়ে যেতে বসেছে। কারণ তাঁর লেখা বইয়ের পুনর্মুদ্রণ যেমন করা হচ্ছে না, তেমনি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রকাশের কোনো উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে না। নতুন প্রজন্ম পরিচিত হতে পারছে না খালেকদাদ চৌধুরীর জীবন ও কর্মের সঙ্গে। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী।
খালেকদাদ চৌধুরী ১৯০৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার চানগাঁও গ্রামে তাঁর নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। নওয়াব আলী চৌধুরী ও নজমুননেছা চৌধুরীর আট ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে খালেকদাদ চৌধুরী ছিলেন সবার বড়। তাঁর গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলার সোনাজোড় গ্রামে। ১৯১১ সালে নাজিরগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির মধ্য দিয়ে খালেকদাদ চৌধুরীর শিক্ষাজীবন শুরু। ১৯১৬ সালে মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। এর পরের বছর তিনি জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দত্ত হাইস্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই ১৯২৪ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় লর্ড রিপন কলেজে ভর্তি হন। পরে কলকাতারই ইসলামিয়া কলেজে ইংরেজি বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ভর্তি হন।
১৯২৭ সালে অক্টোবর মাসে খালাতো বোন হামিদা চৌধুরীকে বিয়ে করে সংসারজীবন শুরু করেন। বিয়ের মাত্র চার দিন পর বাবা নওয়াব আলী চৌধুরীর মৃত্যু হলে সংসারের সব দায়-দায়িত্ব এসে পড়ে বড় ছেলে খালেকদাদ চৌধুরীর ওপর। সংসারের প্রয়োজনে লেখাপড়া শেষ না করেই নেত্রকোনা চলে আসেন তিনি। ১৯২৯ সালে কলকাতা মিডল্যান্ড ব্যাংকের নেত্রকোনা শাখায় সুপারভাইজার হিসেবে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন।
ব্যাংকের কাজ ভালো লাগেনি খালেকদাদ চৌধুরীর। বরং তিনি লেখালেখিতেই বেশি আনন্দ পেতে থাকেন। তাঁর কবিতা প্রথম ছাপা হয় কলকাতা থেকে প্রকাশিত কবি বন্দে আলী মিয়া বিকাশ পত্রিকায়। কবি আব্দুল কাদির ও আবুল কালাম শামসুদ্দিনের অনুপ্রেরণায় তাঁর লেখালেখি আরও গতি পায়। ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ১৯৩০ সালে কলকাতা করপোরেশনের একটি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বাড়তি আয়ের জন্য আবুল মনসুর আহম্মদ সম্পাদিত দৈনিক কৃষক-এর কিশোর সাহিত্যপাতা ‘চাঁদের হাট’ শাহাদাত চৌধুরী ছদ্মনামে পরিচালনা করতেন। তখন সবার কাছেই তিনি মামা নামে পরিচিত ছিলেন।
১৯৪১ সালে সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান। নজরুলের সাহিত্য আড্ডাগুলোয় নিয়মিত যোগ দিতেন খালেকদাদ চৌধুরী। নজরুল সম্পাদিত দৈনিক নবযুগ-এ তিনি সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ‘আগুনের ফুলকি’ নামে কিশোর পাতা আতশবাজ ছদ্মনামে পরিচালনা করেন। এ সময়টায় তিনি বেশ পরিচিতি পান। ১৯৪৪ সালে তিনি জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসাবে সরকারী চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনা সুনামগঞ্জ ও সিলেটে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পরে নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক উত্তর আকাশ ও সাহিত্য সাময়িকী সৃজনী সম্পাদনা ও নিয়মিত প্রকাশ করে নবীন লেখকদের উত্সাহ দিতে থাকেন। উত্তর আকাশ ও সৃজনী সাহিত্যপত্রিকায় লিখতেন নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, জীবন চৌধুরী, শান্তিময় বিশ্বাষ, হেলাল হাফিজের মতো অনেকেই।
খালেকদাদ চৌধুরীর সাহিত্যকর্মে ফুটে উঠেছে নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চলের সংগ্রামী মানুষের চিত্র। গ্রামবাংলার চিরদুঃখী মানুষের অশ্রুসজল কাহিনী নিয়ে রচিত বাস্তবভিত্তিক উপন্যাস হচ্ছে একটি আত্মার অপমৃত্যু। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে একটি আত্মার অপমৃত্যু, রক্তাক্ত অধ্যায়, চাঁদ বেগের গড়, শাপ মারির অভিশাপ এবং এ মাটি রক্তে রাঙ্গা। অনুবাদ গ্রন্থ হচ্ছে মরু সাহারা, বাহার-ই-স্থান-ই গায়েবী, আল বকর দ্বীপ ও বিশ্ব সাহিত্য পরিচয়। নাটক অভিশপ্ত মসনদ। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ শতাব্দীর দুই দিগন্ত।
খালেকদাদ চৌধুরী শুধু একজন সাহিত্যিকই ছিলেন না, তিনি দীর্ঘদিন আদর্শ শিশুকিশোর সংগঠন নেত্রকোনা মধুমাছি কঁচি-কাচার মেলার পরিচালক ও আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন করেন। তিনি নেত্রকোনায় সাধারণ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৩ সালে খালেকদাদ চৌধুরীকে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। ১৯৮৫ সালের ১৬ অক্টোবর ৭৮ বছর বয়সে এই বরেণ্য সাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে এবং স্মৃতি রক্ষার্থে নেত্রকোনা সাহিত্যসমাজ ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতিবছরই পয়লা ফাল্গুনে দেশবরেণ্য একজন কবি বা সাহিত্যিককে খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে আসছে।

সময় হয়েছে ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে নেওয়ার -সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ by ফরিদা আখতার

কোনো রকম ভনিতা না করেই বলছি, ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে নিতে হবে, অর্থাত্ আগে যে নিয়মে আমরা চলতাম, তা-ই করতে হবে। গত ১৯ জুন রাত ১১টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে রাজউকের ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা বাড়িয়ে দিয়ে ১২টায় নিয়ে দিনের সূত্রপাত করা হয়েছিল। এখন আবার রাজউকের ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দিয়ে আগের অবস্থায় আনার সময় হয়েছে। এটাই কথা ছিল।
তখন বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু যুক্তি দিয়েছিলেন, এতে বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে ২০০ মেগাওয়াট। প্রাথমিকভাবে চার মাসের জন্য এ ব্যবস্থার প্রবর্তন করার কথা বলে শুরু হয়েছিল। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাস হয়ে যাচ্ছে; অতএব, মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, আপনি দয়া করে আপনার কথা রক্ষা করুন। বিদ্যুতের সাশ্রয় হয়নি, কিন্তু মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। কাজেই ফলাফল ভালো নয়। অতএব, ভুক্তভোগীদের কথা শুনুন। ঘড়ির কাঁটা ঠিক করে দিন।
ইংরেজিতে একে বলা হয় ডে লাইট সেভিং টাইম বা ডিএসটি। অর্থাত্ এই চর্চা বিদেশে আছে, বিশেষ করে যেসব দেশে দিনের আলো কম-বেশি হওয়ার ব্যাপারটা অনেক তাত্পর্যপূর্ণ। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সেটা খুব কার্যকর নয়। তবু যখন ঘরির কাঁটা আগানো হয়েছিল (অর্থাত্ জুন মাসে), তখন ছিল দিন বড়। প্রায় সাতটায় সূর্য ডুবত। সকালও হতো আগে। ভোর পাঁচটার মধ্যে আলো হয়ে যেত। কাজেই ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে নেওয়ার কারণে যারা ঘুম থেকে ছয়টায় উঠত, তারা নতুন নিয়মে পাঁচটায় উঠেছে। দিন বড় হওয়ার কারণে সকাল বেলাটা খুব বোঝা না গেলেও সন্ধ্যায় এসে ধাক্কা খেয়েছে অনেকে। নামাজের সময়সূচি সূর্যের নিয়মে চলেছে। আসরের নামাজের আজান দিচ্ছে; প্রায় ছয়টা, সাতটা, সাড়ে সাতটা বেজে গেছে, কিন্তু সূর্য ডুবছে না। বড় যন্ত্রণা। রোজার দিনে বেশ অসুবিধা হয়েছে সবার। বাচ্চাদের নিয়ে মায়েরা পড়েছেন বিপদে। সকালে বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার সময় বিছানা থেকে টেনে তুলতে হয়েছে, এখন আরও বেশি হচ্ছে। কারণ অন্ধকার থাকতেই তুলতে হচ্ছে। স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে বলে ঠিকমতো নাশতাও খেতে পারছে না। অন্যদিকে ছেলেমেয়েরা রাত নয়টায়ও যদি ঘরে না ফেরে, বলার কিছু নেই। কিছু বললে তারা বলে, এটা তো আসলে আটটা মাত্র।
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে নেওয়ার প্রথম দিকে বেশ অসুবিধা হয়েছিল, এটা সবাই মানে। পত্রিকার খবর থেকেই কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। জাতীয় সংসদের স্পিকারই বোধহয় ঘড়ির কাঁটা বদলাননি, তাই তিনি এক ঘণ্টা দেরিতে একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। বাতিল হয়ে গিয়েছিল নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাত্ (সমকাল ২১ জুন, ২০০৯)। কারণ সময় নিয়ে বিভ্রাট। এমনি অনেক ঘটনা আছে। কোনো সভা-সেমিনার করলে প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে অংশগ্রহণকারীদের আসার সময় নিয়ে একটা সমস্যা ঘটে। যারা প্রায় এক ঘণ্টা দেরি করে আসেন তাঁরা বলেন, ‘ডিজিটাল টাইম মনে ছিল না, অ্যানালগ টাইমে এসেছি।’ এটা অনেক সময় দেরির অজুহাত হিসেবে ভালোই কাজে লাগে। ঠিক যেমন যানজটের দোহাই প্রায় সবাই দেয়। মফস্বল শহরগুলোতে এখনো এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। গ্রামে তো নয়ই।
কথা হচ্ছে, বিদ্যুত্ কি সাশ্রয় হয়েছে? হয়নি, হবেও না। বরং হিসাব করলে দেখা যাবে আরও বেড়েছে। আমার এক সহকর্মী তাঁর সকালবেলার সময়ের হিসাব দিয়ে বলল, ‘এক ঘণ্টা আগে উঠে আমি রুমের লাইট, পাকঘরের লাইট, বাথরুমের লাইট, করিডরের লাইট সবই জ্বালাই। এটা আমি এক ঘণ্টা পরে উঠলে জ্বালাতে হতো না।’ অর্থাত্ সকালবেলা এক ঘণ্টা বেশি সময় বিদ্যুত্ ব্যবহার করা হচ্ছে।
সূর্য তো তার নিয়েমেই উঠছে। এখন অর্থাত্ অক্টোবর মাসে দিন ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে। সকাল হচ্ছে দেরিতে, বর্তমান ঘড়ির কাঁটায় ছয়টা ৫৪ মিনিটে (১৩ অক্টোবর)। আর সন্ধ্যাও হচ্ছে তাড়াতাড়ি (ছয়টা ৩৬ মিনিটে)। তাহলে ঘড়ির এই সময় থাকার অর্থ হচ্ছে, অন্ধকার থাকতেই আমাদের ঘুম থেকে উঠতে হচ্ছে। অর্থাত্ এই সময়ে অযথা বিদ্যুত্ খরচ করছি। রাতের কাজ যেমন ছিল, তেমনই থাকছে। যারা রাত ১২টায় ঘুমাত, তারা এখন রাত একটায় ঘুমাচ্ছে। তাতে রাতের বাতি নিভছে না। স্কুল-অফিস আটটা ও নয়টায় শুরু হলে সময় একেবারেই কম। অথচ ঘড়ির কাঁটা পেছালে হাতে এক ঘণ্টা সময় বেশি থাকত।
সরকার ঘড়ির কাঁটা ফেরানোর কোনো পরিকল্পনা করছে বলে মনে হচ্ছে না। তারা বলছে, মানুষ নাকি অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এর চেয়ে মিথ্যা কথা আর কিছু নেই। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেই এমন কথা বলা যায়। আসলে মানুষ মনের কাঁটা আর ঘড়ির কাঁটা দুটি দিয়েই চলছে। অ্যানালগ টাইম, নাকি ডিজিটাল টাইম জিজ্ঞেস করে তবে কাজের পরিকল্পনা করতে হয়। মফস্বল শহরে সরকারি অফিস ছাড়া অন্যরা আগের নিয়মেই চলছে। আর গ্রামের জন্য সবচেয়ে বড় ঘড়ি তো সূর্য নিজেই। সেখানে দিন বড় থাকলে দিনে বেশি কাজ হয়, আর রাত বড় হলে গানবাজনা শুনে রাত কাটিয়ে দেয়। সে কারণে গ্রামগঞ্জে শীতের সময় রাতভর পালাগানের নিয়ম চলে আসছে। সারা রাত গান শুনে ভোরে ঘরে ফিরে যায়। আমাদের গ্রামগঞ্জের সংস্কৃতি মৌসুম মেনে চলে। এর সঙ্গে কৃষিকাজের বিষয়, ফসল তোলা, বৃষ্টি হওয়া না-হওয়া এবং সর্বোপরি রাতের অবসরে ভাবগান শুনে কাটানোর রীতি চলে আসছে। এখানে হাতের ঘড়ি দিয়ে জীবন নির্ধারণ করা যাবে না। পাখিগুলো তাদের নিয়ম মেনে নীড়ে ফিরে আসে, গরু-ছাগলকে সূর্য ডোবার আগে গোয়ালঘরে ঢোকায়—সাধ্য কার? সরকার শুধু মানুষ নামের এই প্রাণীকেই পারছে ইচ্ছেমতো ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে আগে-পিছে ঘোরাতে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে নারীদের। যেকোনো পরিবারে সংসারের দায়িত্ব যাঁরা পালন করেন—এমন নারীরা পরিবারের অন্য সদস্যদের চেয়ে একটু হলেও আগে ঘুম থেকে ওঠেন। ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে যাবে, স্বামী অফিসে যাবেন—এই সব আয়োজন তো নারীরই। তাঁর ঘড়ির কাঁটা এমনিতেই এগিয়ে থাকে। এমন অবস্থায় সরকারের নির্দেশিত ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে, তাঁর কাজের চাপ আরও বেড়ে যাওয়া। তিনি এক ঘণ্টা পরে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে পারতেন, সেটা এক ঘণ্টা আগে পাঠাতে হচ্ছে। স্বামী এক ঘণ্টা আগেই অফিসে যাওয়ার তাড়া করছেন। এই তাড়ার চাপ তাঁকেই সইতে হয়। সকাল হলে হুলস্থুল করে কাজ সেরে নিতে হচ্ছে। আর যদি এই নারী নিজেই কর্মজীবী হন, তো কথাই নেই। তাঁর ছুটোছুটি দেখে কে! তাঁর অফিসও তো এক ঘণ্টা আগেই শুরু হচ্ছে। হন্তদন্ত হয়ে অফিসে গিয়ে কাজ শুরু করতে হচ্ছে। আমাদের জাতীয় সংসদে সাংসদেরা কেন এ বিষয় নিয়ে কথা বলেন না? বিশেষ করে মহিলা সাংসদেরা তো এই প্রশ্ন তুলতে পারেন।
গার্মেন্ট শ্রমিকেরা প্রথম থেকেই বলেছিল যে তাদের জন্য এই ব্যবস্থা সুবিধার নয়। সকাল বেলা তাদের অসম্ভব কষ্ট করতে হয়। তাদের রান্নাবান্নার কাজ সেরে তবে ফ্যাক্টরিতে যেতে হয়। রাতে এক ঘণ্টা আগে সবাই ফিরতে পারছে না, ওভারটাইম খাটছে অনেকেই। কাজেই এক ঘণ্টা ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে নিয়ে এক ঘণ্টা বেশি খাটুনির ব্যবস্থা হয়েছে। এর বেশি আর কিছুই হয়নি। রাতে ভালো করে এক ঘণ্টা আগে ঘুমাবে, তার উপায় নেই। লোডশেডিং ঠিকই চলছে। ছোট ছোট ঘরে যারা থাকে, ফ্যান অফ হয়ে গেলে কী অসহ্য গরম হয়, তা আমাদের বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী হয়তো বুঝতেই পারবেন না। এতে ঘুমটাও ঠিকমতো কারও হয় না। আবার ঠিকই এক ঘণ্টা আগে উঠে যেতে হয়।
বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের কথা বলে দিনের আলো সঞ্চয় করার কথা ছিল। এখন দিনের আলো কমে আসছে, সঞ্চয়ের প্রশ্ন আর নেই। রাতে বাতি এমনিতেই জ্বলবে। তবে শীতকাল এগিয়ে আসছে বলে মধ্যবিত্তদের বাড়িতে এসির ব্যবহার কমবে কিছুটা আশা করা যায়। বিদ্যুত্ যারা বেশি ব্যবহার করে, অর্থাত্ ধনীরা, তাদের বেলায় বিদ্যুত্ ব্যবহারের নিয়ম বেঁধে দিলেই হবে। সেই সাহস কি সরকারের আছে? গরিবকে কষ্ট দিয়ে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে নিলে কারোরই লাভ হবে না। গ্রামের গরিব মানুষ বহু দিন আগে থেকেই জ্বালানি সাশ্রয়ের নিয়ম পালন করে আসছে। তারা কুপিবাতির তেলের খরচ বাঁচানোর জন্য রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। শহরের গরিবেরা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হতে গিয়ে লোডশেডিংয়ে অভ্যস্ত হচ্ছে আর মোমবাতির ব্যবহার বাড়ছে। অথচ রাস্তাঘাটের লাইট সকাল ১০টা পর্যন্ত নেভানো হচ্ছে না। কাজেই আর বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের দোহাই দেবেন না দয়া করে।
শেষ কথা হচ্ছে, এই নিয়মে মানুষ অভ্যস্ত হয়নি, প্রতিদিন বিরক্তি বাড়ছে। কাজেই আর দেরি নয়, ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দেওয়া হোক।
ফরিদা আখতার: উন্নয়নকর্মী।

খাদ্যনিরাপত্তা ও ক্ষুধা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি -বিশ্ব খাদ্য দিবস by হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন

বিশ্বের ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনের জন্য প্রতি দিন খাদ্য উত্পাদন, ক্রয় বা বিক্রয় করার প্রচেষ্টা সুনির্দিষ্টভাবে এক সংগ্রাম। বিষয়টি আমাদের সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের সাধারণ ক্ষুদ্র এক কৃষকের প্রাত্যহিক জীবনের কথা ধরা যাক। সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা, এশিয়া অথবা লাতিন আমেরিকার কোনো এক পল্লীগ্রামে এক নারী কৃষক বাস করেন। তিনি একটুকরো জমি চাষ করেন, যা তাঁর নিজের নয়। তিনি সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে ওঠেন এবং কয়েক মাইল হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে যান; সারা দিন মাঠে কাজ করেন। মাঝেমধ্যে তাঁর শিশুটিকে পিঠের সঙ্গে বেঁধেও কাজ করতে হয়। খরা, ফসলের বিভিন্ন রোগ বা পোকামাকড় যদি তাঁর ফসল ধ্বংস করে না দেয় এবং তিনি তাঁর পরিবারকে খাওয়ানোর জন্য পর্যাপ্ত শস্য ফলাতে পারেন, তাহলে তিনি ভাগ্যবতী। অবশ্য কিছু শস্য তাঁর কাছে অবশিষ্ট থেকে যেতে পারে, কিন্তু তা বিক্রি করতে নিকটবর্তী বাজারে যাওয়ার জন্য সেখানে কোনো রাস্তা নেই অথবা তাঁর কাছ থেকে তা কেনার সামর্থ্যও কারও নেই।
এবার ওই কৃষকের কাছ থেকে ১০০ মাইল দূরবর্তী জনাকীর্ণ শহরের এক যুবকের জীবনের কথা ধরা যাক। তাঁর কোনো চাকরি নেই, অথবা তিনি অল্প বেতনের কোনো কাজ করেন। তিনি বাজারে গিয়ে দেখেন, খাদ্য পচে যাচ্ছে, অথবা সেই খাদ্য তাঁর ক্রয়সীমার বাইরে। তিনি ক্ষুধার্ত এবং এ জন্য প্রায়ই ক্ষুব্ধ থাকেন।
ওই কৃষকের বিক্রি করার জন্য অতিরিক্ত খাদ্য আছে এবং এ যুবক তা কিনতে চান; তবে তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কিছু জটিল অবস্থার কারণে এ সাধারণ লেনদেনের বিষয়টি ঘটতে পারে না।
বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই হচ্ছে মূল কথা, যাকে আমরা ‘খাদ্যনিরাপত্তা’ বলছি। এর অর্থ হচ্ছে জমিতে বীজ বপন ও পর্যাপ্ত ফসল ফলাতে বিশ্বব্যাপী কৃষকদের ক্ষমতায়ন, পশুসম্পদের কার্যকর পরিচর্যা অথবা মত্স্য আহরণ করে তাদের উত্পাদিত এ খাদ্য যেসব মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের কাছে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা।
খাদ্যনিরাপত্তা নিছক খাদ্য-সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়। এটি জটিল কিছু বিষয়ের একটি সমন্বিত রূপ। তা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট খরা ও বন্যা; বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতন, যা খাদ্যমূল্যকে প্রভাবিত করে ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের ভাগ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয় এবং জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, যা পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেয়।
খাদ্যনিরাপত্তা হচ্ছে নিরাপত্তা-সম্পর্কিত সবকিছুই। প্রলম্বিত ক্ষুধা সরকার, সমাজ ও দেশের সীমান্তের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। ক্ষুধার্ত অথবা পুষ্টিহীন মানুষ, যাদের কোনো উপার্জন নেই এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের যত্ন নিতে পারে না, তারা নিরাশা ও হতাশার অনুভূতিতে ভোগে। আর এ নিরাশাই তাদের উত্তেজনা, বিবাদ এমনকি সহিংসতার পথে নিয়ে যেতে পারে। গত ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬০টিরও বেশি দেশে খাদ্য নিয়ে দাঙ্গা হয়েছে।
উন্নয়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা খাদ্যনিরাপত্তা প্রয়াসকে আরও তথ্যসমৃদ্ধ করবে। আসলে স্থায়ী ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, এমন প্রকল্পের পেছনে আমরা অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় করে ফেলেছি। অবশ্য এসব প্রয়াস থেকে আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আমরা জানি, হাজার মাইল দূরের কোনো বিদেশি সরকার বা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং যারা সমস্যার সবচেয়ে কাছাকাছি রয়েছে তাদের কাছ থেকেই সমাধানের কার্যকর কৌশল বেরিয়ে আসে। আর আমরা এটাও জানি, উন্নয়নকে তখনই সবচেয়ে ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যখন এটাকে সহায়তা নয় বরং বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এসব অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা উদ্যোগটি পাঁচটি নীতির আলোকে পরিচালিত হবে, যা আমাদের সমস্যার মূলে পৌঁছাতে সহায়তা করে স্থায়ী পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রথমত, আমরা জানি, কৃষিক্ষেত্রে সর্বজনপ্রযোজ্য বলে একক কোনো মডেল নেই। এ জন্য অংশীদার দেশগুলোর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করে যাব।
দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র কৃষককে বাঁচাতে আমরা উন্নত মানের বীজ থেকে শুরু করে ঝুঁকি-বণ্টন কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করে ক্ষুধার মূল কারণগুলো মোকাবিলা করব। আর বিশ্বের অধিকাংশ কৃষক যেহেতু নারী, তাই কৃষিক্ষেত্রে আমাদের বিনিয়োগ যেন তাদের আকাঙ্ক্ষা ও দৃঢ়তাকে আরও সক্ষম করে তোলে সে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, কোনো নির্দিষ্ট কিছু এককভাবে ক্ষুধাকে সমূলে উত্পাটন করতে পারবে না। তবে সংশ্লিষ্টরা যদি রাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক পর্যায়ে সমন্বয় বজায় রেখে কাজ করে, তাহলে আমাদের কাজের প্রভাব অনেক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
চতুর্থত, কোনো একটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রসারিত হওয়ার মতো সম্পদ ও ব্যাপ্তি বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রয়েছে। তাদের প্রয়াসগুলোতে সহায়তা করার মাধ্যমে আমরা বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা থেকে লাভবান হতে পারি।
অবশেষে, আমরা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি ও জবাবদিহির অঙ্গীকার করছি। এর প্রমাণস্বরূপ আমরা এমন কিছু পরিকল্পনায় বিনিয়োগ করব, যাতে আমরা কী করছি তা জনগণ যাচাই ও মূল্যায়ন করতে পারে।
এ প্রয়াসের গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়তো বা অনেক বছর কিংবা অনেক যুগ লেগে যেতে পারে, তবু এ জন্য আমাদের সম্পূর্ণ সম্পদ ও শক্তি প্রয়োগ করার অঙ্গীকার করছি।
এ প্রয়াসের জন্য কাজ করে যাওয়ার পাশাপাশি জরুরি খাদ্যসহায়তা এবং দুর্যোগ ও বিপর্যয়কালে সাহায্যের আকুল আবেদনে সাড়া দেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকারও আমরা অক্ষুণ্ন রাখব। যেমন, বর্তমানে ‘হর্ন অব আফ্রিকা’য় বিপর্যয় চলছে, যেখানে অনাবৃষ্টি, ফসল নষ্ট এবং গৃহযুদ্ধের কারণে গত ১৮ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।
বিশ্বকৃষিকে উজ্জীবিত করে তোলাটা সহজ হবে না। সত্যিকার অর্থে এ উদ্যোগ আমাদের দেশের নেওয়া সর্বকালের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এবং সর্বজনীন কূটনৈতিক ও উন্নয়ন উদ্যোগগুলোর অন্যতম। তবে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভবপর ও যুক্তিসংগত। আর আমরা যদি এতে সাফল্য অর্জন করতে পারি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত্ অতীতের চেয়ে অনেক বেশি শান্তিময় ও সমৃদ্ধ হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

দখাদ্যপুষ্টি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা -ধর্ম by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

বিশ্বমানবতার কল্যাণময় জীবনব্যবস্থা ইসলামে মানুষের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণ পুষ্টিকর খাদ্য, পানীয় ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। বহু পুষ্টিকর ফল, ফসল ও শস্যের কথা পবিত্র কোরআনে উল্লিখিত হয়েছে। বিশেষত মধু, মাছ, যায়তুন, লৌহ, কালোজিরা, দুধ ইত্যাদির গুণাগুণ বর্ণনা করে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, ‘তিনিই সেই প্রভু যিনি সৃষ্টি করেছেন নানা রকমের বাগান গুল্মলতাবিশিষ্ট ও স্বীয় কাণ্ডে দণ্ডায়মান বৃক্ষসমূহ, আরও বিবিধ স্বাদের খেজুর ও ফসল। সৃষ্টি করেছেন যায়তুন ও আনার, যা পরস্পর সমস্বাদবিশিষ্ট এবং ভিন্ন স্বাদবিশিষ্ট। তোমরা তার উত্পাদন খাও যখন ফল আসে’— সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৪১)। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি জমিনে উত্পন্ন করেছি শস্য, আঙুর, শাকসবজি, যায়তুন ও খেজুর বৃক্ষ’— (সূরা আবাসা, আয়াত: ২৭)।
ইসলাম ধর্মপ্রাণ মানুষের আত্মিক উন্নতির পাশাপাশি দৈহিক উন্নতির প্রতিও যথেষ্ট যত্নশীল। সুস্থ-সবল দেহমন ছাড়া সঠিকভাবে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করা সম্ভব নয়। আর সুস্থ-সবল দেহ গঠনের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের একান্ত প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, সব ফলেই কমবেশি পুষ্টি রয়েছে। পুষ্টি মানবদেহের একটি অপরিহার্য অঙ্গ, যা দেহের তাপ ও শক্তি জোগায়, শরীরের বৃদ্ধি সাধন করে, ক্ষয়পূরণ করে, রোগ প্রতিরোধ করে এবং সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। মানবদেহের জন্য খাদ্য হিসেবে ফলমূল বিশেষ উপকারী, তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এটিকে বিশেষ নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য বৃষ্টি দ্বারা উত্পাদন করেন ফসল, যায়তুন, খেজুর, আঙুর এবং সর্বপ্রকার ফল, নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীলদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১১)
ইসলামের আবির্ভাবস্থল আরব দেশে খেজুর, আঙুর, যায়তুন, আনার বেশি উত্পন্ন হতো বলে আল্লাহ তাআলা এসবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। খেজুর সহজে হজম হয়। এতে প্রচুর প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও সব ধরনের ভিটামিন রয়েছে। খেজুর কেবল একটি পুষ্টিকর খাদ্যই নয়, এটা বহু রোগের প্রতিষেধকও বটে। খেজুর প্রসূতি মায়ের জন্য খুবই উপকারী। গর্ভবতীকে লৌহের স্বল্পতা পূরণের জন্য একটি করে খেজুর খাওয়ানো হলে তার সর্বাঙ্গে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, নবজাত শিশুর শারীরিক শক্তিও বৃদ্ধি পায়। খেজুর ভক্ষণে স্মৃতিশক্তি বাড়ে এবং কণ্ঠস্বর পরিষ্কার হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রসূতি অবস্থায় তোমরা স্ত্রীকে খেজুর খাওয়াবে। কেননা যখন বিবি মরিয়ম (আ.) থেকে হজরত ঈসা (আ.) ভূমিষ্ঠ হলেন তখন বিবি মরিয়মের খাদ্য ছিল খেজুর। যদি আল্লাহর ইলমে এর চেয়ে উত্তম আর কোনো খাবার থাকত, তাহলে তিনি তারই ব্যবস্থা করতেন।’ নবীজির কাছে মাখন মিশ্রিত খেজুর অত্যধিক প্রিয় ছিল। তাই তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যহ সকালে সাতটি করে ‘আজওয়া’ খেজুর খাবে, তাকে বিষ ও জাদু কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ (বুখারি)
পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মধুতে রয়েছে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, খনিজ, ভিটামিন ও পানি। এসব উপাদান মানবদেহের জন্য খুবই জরুরি। মধু জ্বর, কাশি প্রভৃতি রোগের জন্য উত্কৃষ্ট ওষুধ। মৌমাছিরা নানা গাছের ফুল থেকে এ পুষ্টিসমৃদ্ধ সুস্বাদু খাবার সংগ্রহ করে। পবিত্র কোরআনে মধুকে রোগনাশিনী ও আরোগ্যদায়ক ঘোষণা করে বলা হয়েছে, ‘তার (মৌমাছির) পেট থেকে নির্গত হয় বিভিন্ন রঙের পানীয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার’— (সূরা আন-নহল, আয়াত: ৬৯)। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক মাসে তিন দিন সকালে মধু খাবে, তার কোনো বড় ধরনের রোগ হবে না।’ (মিশকাত)
দুধ ও মধু হাজারো ফুল ও ফুলের নির্যাসের মাধ্যমে তৈরি। আল-কোরআনে গবাদিপশুর নানা উপকারিতা থেকে একটি বিশেষ পুষ্টিকর পানীয় দুধের সন্ধান দিয়ে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুর মাঝে রয়েছে বহু উপকারিতা ও পানীয় বস্তু।’ (সূরা ইয়াসিন, আয়াত: ৭৩)। দুধ কেবল একটি সুষম খাদ্যই নয়, এটি জান্নাতি খাবারও। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘বেহেশতে দুধের এমন নহর প্রবাহিত হবে, যার স্বাদ কখনো পরিবর্তন হবে না।’ (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১৫)। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘স্বচ্ছ নির্মল নির্ভেজাল খাঁটি দুধ পানকারীদের জন্য সুস্বাদু ও উপাদেয়।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৬৬)
দুধের উপকারিতা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, দুধ শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি করে, শরীরের শুষ্কতা বিদূরিত করে এবং শিগগিরই পরিপাক হয়ে খাদ্যের স্থলাভিষিক্ত হয়ে যায়। মুখের লাবণ্যতা বৃদ্ধি করে, দূষিত পদার্থ বের করে দেয় এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে। দুধ আদর্শ খাবার। এর পুষ্টিগুণ সত্যিই অতুলনীয়। হাদিস শরিফে উল্লেখ আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই গাভির দুধ পান করবে। কেননা এর মধ্যে শেফা রয়েছে।’
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সমুদ্র থেকে তাজা খাবার আহরণ করতে বলেছেন। সামুদ্রিক খাবারের মধ্যে মাছ অন্যতম পুষ্টিকর একটি খাদ্য।
কালোজিরাকে রান্নার কাজে ও ঔষধি ভেষজ হিসেবে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কালোজিরার সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিস বর্ণনা করেছেন, যা ভেষজ চিকিত্সা, বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও অনুসন্ধানের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা এই কালোজিরা ব্যবহার করবে, কেননা এতে একমাত্র মৃত্যুরোগ ব্যতীত সর্বরোগের শেফা বা আরোগ্য রয়েছে।’ (বুখারি ও মুসলিম)। নবী করিম (সা.) নিজে বেছে বেছে পুষ্টিকর খাবার খেয়েছেন, অন্যদের সেদিকে আকৃষ্ট করে নানাবিধ পুষ্টিকর খাদ্যের সন্ধান দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিটি সত্য সুন্দর কথাই অসাধারণ প্রজ্ঞা ও হিকমতে পরিপূর্ণ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর মুখনিঃসৃত অমিয়বাণীতে দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা জনসাধারণের কল্যাণে চিরশাশ্বত ও চিরকল্যাণকামী। সেই সূত্র ধরেই মহানবী (সা.)-এর চিকিত্সা পদ্ধতি জনসেবায় এক মহামূল্যবান রত্নভাণ্ডার হিসেবে সর্বত্র সমাদৃত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। এমনিভাবে নবীজি তাঁর অনুসারীদের বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে শেফা লাভের জন্য পবিত্র কোরআনের আলোকে খাদ্য-পুষ্টি, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পথ্যের মাধ্যমে চিকিত্সা করার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে মানবজাতি সুস্থ ও সুন্দরভাবে জীবিকা নির্বাহ করে দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করতে পারে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

সীমান্তে ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতি -বাংলাদেশ-মিয়ানমার by সৈয়দ আবুল মকসুুদ

ভারত ও মিয়ানমার বাংলাদেশের অব্যবহিত প্রতিবেশী ও বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে শুধু এই দুই রাষ্ট্রের সঙ্গেই বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে; সমুদ্রসীমানাও তাদের সঙ্গে। স্বাধীনতার পর থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, যা যেকোনো নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে হওয়া স্বাভাবিক নয়। একটি সমস্যা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু, অন্যটি বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাসকূপ খননকে কেন্দ্র করে। তবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যা বা বিরোধ মীমাংসায় বিশ্বাস করে বাংলাদেশ।
এর মধ্যে পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনে জানা গেছে, বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে মংদাউ থেকে পালেওয়া পর্যন্ত এলাকায় মিয়ানমার বিপুলসংখ্যক লাইট ব্যাটালিয়ন ও লাইট ইনফ্যানট্রি ব্যাটালিয়ন সেনাদল মোতায়েন করেছে। গত কয়েক দিনে ১০টি ফাইটার বিমান আনা হয়েছে সিতো (Sittowe) বা আকিয়াব বিমানঘাঁটিতে। ১২টি যুদ্ধজাহাজ মিয়ানমারের দুটি নদীর মোহনায় টহল দিচ্ছে। অর্থাত্ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে একটি যুদ্ধ-প্রস্তুতিমূলক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবরে আরও বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা তাদের দেশের নাগরিক ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর জন্য সীমান্ত এলাকায় জড়ো করেছে। এসব অবশ্যই উসকানিমূলক তত্পরতা। এর ফলে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের মানুষ গভীর উত্কণ্ঠার মধ্যে দিন যাপন করছে।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা কোনো দলীয় বিষয় নয়। এ প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ভিন্নমতের সুযোগ নেই। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কোনো নীতি-আদর্শেরও ব্যাপার নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন। একমাত্র রাষ্ট্রদ্রোহী ছাড়া এই প্রশ্নে কারও মতপার্থক্য নেই।
প্রতিরক্ষার বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও বিষয়। কোন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কেমন সম্পর্ক তা পররাষ্ট্র দপ্তরই ভালো অবগত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, এটা মিয়ানমারের রুটিন সামরিক মহড়া। বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত আমাদের পররাষ্ট্রসচিবকেও একই কথা বলেছেন। আমাদের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। সে জন্যই আমাদের উদ্বেগ।
গত এপ্রিলে সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা হয়েছে, তবে মীমাংসায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সমুদ্রসীমাসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ বাধ্য হয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটাই শান্তিপূর্ণ উপায়। বিরোধ নিষ্পত্তিতে বলপ্রয়োগে বাংলাদেশ বিশ্বাস করে না।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত থেকে যখন উত্তেজনার সংবাদ আসছে, তখন আমাদের জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলছে। সেখানে বিরোধী দল অনুপস্থিত। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যত মতপার্থক্যই থাকুক—আমাদের প্রত্যাশা, সরকারি দল ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কোনো সম্ভাব্য বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করা সরকারের একার কাজ নয়; তবে নেতৃত্ব দিতে হবে সরকারকেই।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

ক্যারল সালোমন: একটি বিলম্বিত শ্রদ্ধাঞ্জলি -খোলা চোখে by হাসান ফেরদৌস

ক্যারল সালোমন মারা গেছেন—এ খবরটা ঢাকা বা কলকাতার কোনো পত্রিকাতেই চোখে পড়েনি। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়াতেন, তাদের একটি ঘোষণা ইন্টারনেটে এসেছিল বটে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কারও তা জানার কথা নয়। পরে ইন্টারনেট ঘেটে দেখেছি, সিয়াটলের একটি স্থানীয় পত্রিকায় কয়েক লাইনের দুর্ঘটনার সংবাদ ছাপা হয়েছিল; কিন্তু ক্যারল সালোমন কে, কী তাঁর গুরুত্ব, এর বিন্দুমাত্র উল্লেখ সেখানে নেই। আমাদের পুরোনো বন্ধু, নাট্যকার ও অধ্যাপক সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় লন্ডন থেকে না জানালে তাঁর মৃত্যুর কথা হয়তো অজানাই থেকে যেত।
কী আশ্চর্য, বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার এমন এক পরম বন্ধু চলে গেলেন, তাঁকে নিয়ে কেউ একটি লাইনও লিখল না!
অধ্যাপক সালোমন ৩০ বছর ধরে লালন ফকিরের গান ও তাঁর জীবন নিয়ে কাজ করেছেন। সে উদ্দেশ্যে বারবার বাংলাদেশে, বিশেষ করে লালনের জন্মস্থান কুষ্টিয়ায় ফিরে গেছেন। সুদীপ্তের কাছে শুনেছি, তিনি চমত্কার বাংলা বলতেন। লালনের গানের অর্থ বোঝা খুব সহজ নয়। সারাটা জীবন তিনি কাটিয়ে দিলেন এই গানের মর্ম বুঝতে, তাঁর ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের কাছে সেই গানের গূঢ়ার্থ পৌঁছে দিতে। কথা ছিল, দিন কয়েকের মধ্যেই তিনি ফের বাংলাদেশে যাবেন। হলো না। সিয়াটলের শহরতলিতে তাঁর বাসা থেকে সাইকেলে চেপে আসার সময় পেছন থেকে ঘাতক গাড়ির আকস্মিক আক্রমণে প্রায় তাত্ক্ষণিকভাবে নিহত হন ক্যারল। তারিখটা ছিল ১৩ মার্চ ২০০৯।
ক্যারলের সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় ছিল না, যদিও তাঁর কথা বিস্তর শুনেছি, বিচ্ছিন্নভাবে তাঁর লেখাও পড়েছি। সুদীপ্ত নিজে লালন নিয়ে কাজ করছেন কম করে হলেও কুড়ি বছর, তাঁর কাছ থেকেই প্রথম ক্যারলের গল্প শোনা। লালনের জীবনভিত্তিক তাঁর একক অভিনীত নাটক মনের মানুষ তৈরির সময় ক্যারল তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। কুষ্টিয়ায় বিভিন্ন বাউলের গান রেকর্ড করে এনেছিলেন ক্যারল। বিনা আপত্তিতে সামান্য অনুরোধ করা মাত্রই সুদীপ্তের সঙ্গে সেসব দুর্লভ রেকর্ড ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন তিনি। দুর্ঘটনায় আকস্মিক মৃত্যুর পর ক্যারলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বিবরণ দিয়ে একটি ব্যক্তিগত রচনায় সুদীপ্ত এই ‘বিদেশি বাঙালি মায়ের’ সঙ্গে আমাদের বিস্তারিতভাবে পরিচয় ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাছ থেকেই জানলাম, কুষ্টিয়ায় ক্যারল শুধু লালনের গান খুঁজতে যেতেন না—সে কারণ তো ছিলই—কিন্তু যেসব লালনসাধকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, যাঁদের কারও কারও সঙ্গে তাঁর আমৃত্যু বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, তাঁদের টানও কম ছিল না। যখন যেভাবে পেরেছেন, তাঁদের টাকা-পয়সা দিয়েও সাহায্য করেছেন। নাম উল্লেখ না করে সুদীপ্ত এক লালনসাধক ও তাঁর স্ত্রীর কথা বলেছেন। ক্যারলের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, সে কথা স্মরণ করে ক্যারল ও রিচার্ডের একমাত্র পুত্রের নামানুসারে লালনসাধকদ্বয় তাঁদের পুত্রের নাম রেখেছেন জেসি। ২০০৮ সালে সুদীপ্ত নিজে কুষ্টিয়ায় গিয়েছিলেন লালনের ওপর তাঁর গবেষণার সূত্রে। ক্যারল সে কথা জানতে পেরে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, কিছু নগদ টাকা যেন তিনি সেই দুই সাধক-সাধিকার কাছে রেখে আসেন। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর কর্মস্থলে ফিরেই সুদীপ্ত দেখেন, তাঁর মেইলবক্সে ক্যারলের পাঠানো একটি চেক।
বাউলদের ব্যাপারে আমরা মধ্যবিত্ত শহুরে বাঙালিরা যে এক ধরনের দ্বিচারিতায় ভুগি, ক্যারল সে কথা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। বাউল গানের ওপর লেখা তাঁর একটি বহুল পঠিত প্রবন্ধ ‘বাউল সংস্’, তাতে কিঞ্চিত পরিহাসের সঙ্গে তিনি লিখেছেন, বাউল গান বাঙালি মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু এই বাউল ঐতিহ্যের ব্যাপারে কোথায় যেন একটা দ্বিধা তাদের মধ্যে কাজ করে। এক দিকে তারা বাউলদের মাথায় তুলে রাখে, তাদের সুফি সাধক বলে সম্মান করে। অন্য দিকে বাউলদের তান্ত্রিক জীবনচারিতা, বিশেষত তাঁদের যৌন আচার-আচরণ তারা ঘৃণার চোখে দেখে। রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে বাঙালি মধ্যবিত্ত বাউলদের সঙ্গে পরিচিত হয়, সম্ভবত সেটাও একটা কারণ বাউলদের নিয়ে একপেশে ও ভুল ধারণা গড়ে ওঠার। বাউল-দর্শনকে আমরা বিশ্ব মানবতার এক বিশেষ আয়নায় দেখার চেষ্টা করি। ক্যারলের বক্তব্য, এর ফলে বাউল গবেষণা একপেশে হয়ে পড়েছে। বাউল-দর্শনের নামে তাঁদের ধর্মচর্চার আসল চেহারাই ধামাচাপা পড়ে গেছে। বাউল, তা সে হিন্দু বা মুসলমান যাই হোক, তারা সবাই এক অভিন্ন যৌন জীবনচারিতায় অভ্যস্ত, যে জীবনচারিতা বাউল-দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় উপাদান। কিন্তু এ বিষয়টি লুকিয়ে রাখতেই আমাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
লালনের প্রতি ক্যারলের একটি অতিরিক্ত ভালোবাসা ছিল, এ কোনো গোপন কথা নয়। লালনের গানের অর্থ বোঝার জন্যই কুষ্টিয়ায় লালনের আখড়ায় তিনি দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন। গত ২০-২৫ বছরে তাঁর অনেক গান ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাঠক-গবেষকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। ক্যারলের অনুবাদের একটি প্রধান গুণ, যতটা সম্ভব অবিকৃতভাবে, সরল ভাষায় লালনের গানের মর্মার্থ পৌঁছে দেওয়া। লালনের বিখ্যাত গান ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত’, তাঁর এই অনুবাদটি লক্ষ করুন:
Everyone asks: ‘Lalan, what’s your religion in this world?
Lalan answers: ‘How does religion look?’
l’ve never laid eyes on it.
Some wear malas [Hindu rosaries] around their necks,
some tasbis [Muslim rosaries], and so people say
they’ve got different religions.
But do you bear the sign of your religion
when you come or when you go?
আমরা জানি, লালনের জীবনেতিহাস রহস্যাবৃত, তাঁর জাতপাত নিয়ে যে বিতর্ক, তার কারণও সেই রহস্যের আবরণ। লালন নিজে কেন তাঁর জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলে যাননি, তার ব্যাখ্যায় ক্যারল লিখেছেন, এর পেছনে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, বাউলমন্ত্রে দীক্ষা নেওয়ার পর লালন গৃহস্থালি, পরিবার ও প্রচলিত জীবনযাপন পরিত্যাগ করেন। ফলে জাতপাতের প্রমাণ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন তিনি দেখেননি। অন্য কারণ, তিনি বিশেষ কোনো ধর্মমত অনুসরণে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর কাছে ‘মানবধর্ম’ই ছিল সবচেয়ে বড় ধর্মবিশ্বাস। ক্যারলের বিবেচনায়, বাউলদের সঙ্গে সুফি ও বৈষ্ণবীয়দের স্পষ্ট নৈকট্য আছে। এদের মতো বাউলরাও ঈশ্বরসাধনায় মানবপ্রেমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন। বাউলদের কাছে প্রেম হলো ঈশ্বরের সন্ধানে ব্যক্তির আকুতির প্রকাশ। অনেক বাউল গানে এই প্রেমের প্রকাশ ঘটে বিরহ-বেদনার উচ্চারণে। যে অধরা ঈশ্বরকে বাউল খোঁজে, তাকে পাওয়া যায় অন্তরে, লালন যাকে বলেন ‘মনের মানুষ’। মনের ভেতরে সেই ঈশ্বরের বাস, তাকে দেখেও আমরা দেখি না, চিনেও আমরা চিনি না। সে কারণেই লালনের বিলাপ, ‘আমার আপন খবর আপনার হয় না’।
ক্যারল ও তাঁর অধ্যাপক স্বামী রিচার্ড সালোমন প্রাচ্যের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে ছাত্রজীবন থেকেই মেতে ছিলেন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্যারল পিএইচডি করেন বাংলা ভাষার ওপর, আর রিচার্ড করেন সংস্কৃত নিয়ে। দুজনেই ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই দুজনের উত্সাহেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগে নিয়মিত চায়ের আড্ডা বসত। সেই আড্ডায় ক্যারল অনেকবার তাঁর করা লালনের অনুবাদ পড়ে শুনিয়েছেন। বাংলা ভাষা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন, এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত লেখাটি হলো বাংলা ভাষায় লিঙ্গ ও ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে কীভাবে, তার ওপর। ভারতীয় ধর্মচর্চা, বিশেষত ভাষার ভেতর দিয়ে এর সাংস্কৃতিক প্রকাশ কীভাবে ঘটে—এমন একটি জটিল নৃতাত্ত্বিক বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন তিনি। মাত্র ছয় মাস আগে ক্যারল মার্কিন সরকারের কাছ থেকে একটি বড় ধরনের অনুদান পেয়েছিলেন ইন্টারনেটের উপযোগী বাংলা ভাষা শিক্ষার উপকরণ তৈরির জন্য। ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’ নামে অবাঙালিদের জন্য সহজ পদ্ধতিতে বাংলা শিক্ষার কিছু কিছু কাজ তিনি গুছিয়েও এনেছিলেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ ছিল লালনকে নিয়ে। কয়েক বছর ধরেই তিনি লালনের গানের একটি আকরগ্রন্থ লেখার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। সেই বইয়ের নামও ঠিক হয়েছিল সিটি অব মিররস: অ্যান এনোটেটেড ট্রানসলেশন অব সিলেক্টেড সংস অব লালন ফকির। এই আরশীনগর তাঁর লেখা শেষ হলো না।
বাঙালি না হয়েও বাংলা ভাষা ও বাঙালিদের ভালোবেসেছিলেন ক্যারল সালোমন। তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি থাকল বিলম্বিত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নিউইয়র্ক, ১১ অক্টোবর ২০০৯
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

সমাজব্যবস্থা -শিক্ষা ও ব্যাধিগ্রস্ত সমাজ বিষয়ে খানিকটা

না, কথাগুলো ঠিক শিক্ষানীতি নিয়ে নয়। বরং বলা যায় আলোচনাটা গোটা সমাজের রীতিনীতি তথা সমাজব্যবস্থা নিয়েই। ওয়েবসাইটে শিক্ষানীতি আসার পর থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে নানা মতামত পাওয়া যাচ্ছে। এবং আমরা দেখছি, প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে শিক্ষা-দর্শন, সেক্যুলার শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিনির্ভর শিক্ষা, প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বস্তরে একই পদ্ধতির শিক্ষা, শিক্ষার ব্যয়ভার মেটাতে রাষ্ট্রীয় দায়সহ আরও কতিপয় ক্ষেত্রে গুরুতর সব বৈপরীত্য রয়েছে বলে অনেকেই মত দিচ্ছে। ধরে নেওয়া গেল, সবার মতামত সমন্বয় করে শেষ পর্যন্ত একটা ‘চলনসই’ শিক্ষানীতি গ্রহণ করা হলো। অবকাঠামো, লোকবল, প্রশাসনিক ও পদ্ধতিগত সংস্কার এবং অর্থের সমস্যার সমাধানও মেলানো গেল। কিন্তু তারপর কী হবে? শিক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জনে এককভাবে একটা ‘ভালো’ শিক্ষানীতির প্রভাব কতটা—এই প্রশ্ন কি সামনে চলে আসবে না?
‘খাপ খাওয়ানো’ বলে একটা কথা আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাত্ত্বিক পাঠদানের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের যে আদর্শ শিক্ষা দেওয়া হয়, সমাজের সামগ্রিক রীতিনীতি ও আচরণে সেই আদর্শের অনুশীলন বা প্রতিফলন না থাকলে শিক্ষার্থীরা বাস্তবতার সঙ্গে তাদের শিক্ষাকে মেলাতে পারে না। বেখাপ্পা এই বাস্তবতায় শিক্ষার উদ্দেশ্যই শুধু ব্যাহত হয় না; মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এতে যুবসমাজের মধ্যে হতাশাসহ নানা ধরনের মনোবৈকল্য দেখা দিতে পারে। এবং যার শেষ পরিণতি হলো ব্যাধিগ্রস্ত একটা সমাজকে আরও বেশি ব্যাধিগ্রস্ত করে তোলা। একটা উদাহরণের সাহায্য নিয়ে ব্যাপারটা বোঝা যেতে পারে। সীমান্তবর্তী অনেক এলাকা আছে, যেসব এলাকার বেশির ভাগ মানুষ চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত। মানুষের রুটিরুজির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ‘চোরাকারবার’ নামক অপকর্মটি এসব অঞ্চলে একটা ‘স্বাভাবিক কর্ম’ হিসেবেই বিবেচিত হয়। শিক্ষার আদর্শ হিসেবে তাত্ত্বিকভাবে এই এলাকার শিশু-কিশোরদের চোরাচালানকে যতই অপকর্ম বলে শেখানোর চেষ্টা করা হোক না কেন, সমাজের আদর্শে তা স্বাভাবিক কর্ম হওয়ায় তারা কিছুতেই এটাকে অপকর্ম হিসেবে গ্রহণ করতে চাইবে না। আমাদের সমাজে প্রায় সব অপকর্মই এখন স্বাভাবিক কর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বলা যায়, গোটা সমাজটাই ব্যাধিগ্রস্ত সমাজে পরিণত হয়েছে।
শিক্ষার ওপর পাঠ্যবইয়ে মুদ্রিত আদর্শের চেয়ে পরিবার ও সমাজে প্রচলিত আদর্শের প্রভাব অনেক বেশি। যা শিখি, সমাজের কাজকর্মের সঙ্গে তার কোনো মিল খুঁজে পাই না—খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে এমন ধাক্কার বিষয়টিই বর্তমানে শিক্ষা প্রশ্নে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত বলে যুক্তিযুক্ত মনে হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের সমাজ ব্যাধিগ্রস্ত কি না অথবা প্রশ্নটি এমনও হতে পারে যে, গোটা একটি সমাজ কি ব্যাধিগ্রস্ত হতে পারে? মনোবিজ্ঞানী বা আচরণবিজ্ঞানীরা ব্যাধিগ্রস্ত সমাজ সম্পর্কে যা বলেন তার সারাত্সার হলো, সমাজের বেশির ভাগ মানুষ যদি প্রচলিত আদর্শ বা কাম্য আদর্শের পরিপন্থী আচরণ করতে থাকে তবে সে সমাজকে ব্যাধিগ্রস্ত সমাজ বলা যায়। পুরো সমাজটাই বিকল হয়ে পড়েছে, ইতিহাসে এমন নজিরও রয়েছে অনেক। এসব ক্ষেত্রে সমাজে প্রচলিত আচরণবিধি ও রীতিনীতি সম্পূর্ণ অমানবিক ও অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোটা জার্মান সমাজব্যবস্থা নািসবাদের প্রভাবে অস্বভাবী হয়ে পড়েছিল এবং বেশির ভাগ মানুষ চরম মানবতাবিরোধী কার্যকলাপে নিয়োজিত হয়েছিল। রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী আদর্শহীনতা, অর্থনীতিতে চরম বৈষম্যের সুযোগ থাকা, নানা সামাজিক হিংস্রতা ও দুর্নীতি প্রভৃতি পুরো সমাজটাকেই একসময় গ্রাস করে ফেলে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমরা সমাজে যে আদর্শ স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা কেবল দ্রুত মিলিয়েই যায়নি; চরম একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা সমাজের তলানিতে যেটুকু ভালো আদর্শ অবশিষ্ট ছিল, তাকেও ধুয়েমুছে দিয়েছে। সমাজের জন্য প্রণিধানযোগ্য আদর্শগুলোর বর্তমান সুরতহাল বিবেচনায় নিলেই এ কথার প্রমাণ মিলবে।
‘সততা’ কথাটি যেকোনো সমাজে গ্রহণযোগ্য আদর্শগুলোর মধ্যে পয়লা নম্বরে পড়ে। নৈতিকতার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ফলে শিশু-কিশোরদের পাঠ্যসূচিতে ঘুরেফিরে নানাভাবে সততা ও নৈতিকতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সততা ও নৈতিকতার মাপকাঠি ঠিক কী—এ ব্যাপারে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকলেও আমাদের প্রচলিত শিক্ষাসূচিতে এটা বারবার উচ্চারিত হতে দেখা যাচ্ছে। আমরা যদি ধরে নেই, প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে সততা ও নৈতিকতার মাপকাঠি সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে—তাহলেই বা কী লাভ হবে? যে শিশুকে ছাপার হরফে সত্ হতে পরামর্শ দেওয়া হবে সে শিশু সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখবে যে, অসত্ ব্যক্তিরাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং এসব ব্যক্তিকে সমাজ মোটেই ঘৃণার চোখে দেখছে না, বরং উল্টো তাদেরই ‘আইকন’ হিসেবে গ্রহণ করছে।
আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারও শিক্ষার অন্তর্নিহিত অন্যতম আদর্শ। আইনের শাসন বিষয়ে ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের লালন’ এমন কথা পুঁথিগতভাবে আমাদের যতই শেখানো হোক, বাস্তবতা হলো আইন প্রকারান্তরে শিষ্টকেই দমন করছে এবং দুষ্টকে করছে পালন। আইনের আশ্রয় নিতে গেলে সাধারণ মানুষকে আজ হুমকি-ধমকির শিকার হওয়া থেকে শুরু করে, ভিটেবাড়ি থেকে উচ্ছেদ এমনকি প্রাণটা পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হচ্ছে। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে খুন এবং জেলখানায় চার নেতাকে হত্যা করার ঘটনার সময় থেকেই আমরা দেখে আসছি, রাষ্ট্র কীভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে পৃষ্টপোষকতা দিয়ে এসেছে। আজও ‘ক্রসফায়ারের’ নাম করে চলছে নির্লজ্জ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এবং মনে হচ্ছে সমাজ একে সাধারণভাবেই গ্রহণ করেছে। ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা’—বহুল প্রচলিত এ কথাটির মধ্যে আক্ষেপ থাকলেও সমাজ এর বিরুদ্ধে খুব একটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেনি।
‘আত্মনির্ভরতা’ এবং ‘ঐক্যই শক্তি’ কথা দুটিও শিক্ষার নীতিবাক্য। কিন্তু যে সমাজের ওপরতলা অন্যের অর্জনকে ব্যবহার এবং অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন-প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত, সে সমাজের মানুষ শুধু পাঠ্যবইয়ের তত্ত্বকথায় আত্মনির্ভর হবে কীভাবে? একইভাবে সমাজে ধনী-গরিবে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে এবং নারী-পুরুষে ভেদাভেদ জিইয়ে রেখে ঐক্যের জ্ঞানদানই বা কীভাবে লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে? শিক্ষার আদর্শ আর সমাজের আদর্শের মধ্যে বৈপরীত্যের তালিকা আর দীর্ঘ করার প্রয়োজন পড়ে না এ কারণে যে, সমাজের মানুষ প্রায় সবাই আজ এই বৈপরীত্যের অংশীদার।
শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষকে খাপ খাইয়ে চলতে শেখানো। তবে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি হতে হবে মানুষের জন্য মঙ্গলমুখী। কিন্তু আমাদের সমাজের পরিবর্তনগুলো হচ্ছে বিপরীতমুখী, যার সঙ্গে মানুষের মঙ্গলের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। বরং চরম অকল্যাণের অশনিসংকেত প্রতিনিয়ত পাওয়া যাচ্ছে এমন ধাঁচের পরিবর্তনের মাধ্যমে। আসলে শিক্ষার আদর্শগুলো তো কিছু কাগুজে কথা মাত্র। কাগুজে এই আদর্শগুলো সমাজের আদর্শের সঙ্গে না মিললে শিক্ষার উদ্দেশ্যই শুধু ব্যাহত হবে না, শিক্ষার্থীরাও মানসিক বৈকল্যের শিকার হবে।
একটা মঙ্গলমুখী ভালো শিক্ষানীতি কখনোই শুধু ‘শিক্ষার আওতার’ মধ্যে দৃষ্টি আটকে রেখে প্রণয়ন করা সম্ভব নয়। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিতে বৈষম্যহীন মাঙ্গলিক আদর্শের ভিত্তি স্থাপন করা না গেলে সে নীতি জগাখিচুড়ি হতে বাধ্য। আবার সব ক্ষেত্রে শুভমুখী আদর্শ স্থাপন করা গেলেও ব্যাধিগ্রস্ত সমাজের সঙ্গে সেই আদর্শকে মেলানো কঠিন। একদিকে আমাদের সংবিধানে রয়েছে একটা এককেন্দ্রিক বা একমুখী আদর্শের সংকট, অন্যদিকে রয়েছে একটা প্রায় ব্যাধিগ্রস্ত সমাজ। এই উভয়মুখী সংকট মোকাবিলা না করে শিক্ষানীতি এককভাবে এগিয়ে যাবে কী করে? প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে এ বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা থাকবে কি? আমরা অপেক্ষায় রইলাম।
মলয় ভৌমিক: শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; নাট্যকার।

গাছ নিধন

৩ অক্টোবরের প্রথম আলোর ‘বিশাল বাংলা’ পাতায় ‘বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে ৬৫টি গাছ কেটেছেন সিবিএ নেতা’ শিরোনামের লেখাটি পড়ে প্রশ্ন জাগল, দেশে আইন-কানুন বলতে কিছু আছে কি? আশ্চর্যের বিষয়, মেডিকেল কলেজের কর্মচারীদের যোগসাজশে একটি রাজনৈতিক দল সমর্থিত এ সিবিএ নেতা দিনেদুপুরে এতগুলো গাছ কেটে নিয়ে গেল, অথচ কেউ বাধা দিল না। আমরা আমাদের পরিবেশকে রক্ষার জন্য গাছ লাগানোর কথা বলি, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি করি, কোনো কারণে একটি গাছ কাটলে দুটি গাছ লাগানোর কথা বলি। কিন্তু তার পরও কেন নির্বিচারে গাছ নিধন প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হতে দেখা যায় না? ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে যে বা যারা এভাবে গাছ নিধনে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে, তাদের রুখতে না পারলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এভাবে আর একটি গাছও যাতে নিধন না হয় সে জন্য বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।
আবু সৈয়দ
আনোয়ারা, চট্টগ্রাম।

মন্ত্রীদের মানবাধিকার জ্ঞানে আমরা লজ্জিত -ক্রসফায়ার by হামিদা হোসেন, সুলতানা কামাল, শাহদীন মালিক, ইফতেখারুজ্জামান

৯ অক্টোবর ২০০৯ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ‘ক্রসফায়ার’ বিষয়ে দুজন মন্ত্রীর ভিন্ন ভিন্ন দুটি বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান নারায়ণগঞ্জে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এনকাউন্টারে সন্ত্রাসী নিহত হলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না।’ অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক ক্রসফায়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এবং আইনের শাসন অব্যাহত রাখতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইনানুযায়ী ক্ষমতা প্রয়োগ করবে, এটাই স্বাভাবিক।’
বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা ক্ষমতায় গেলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করবে। নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী তঁদের এই প্রতিশ্রুতি একাধিকবার পুনর্ব্যক্তও করেছেন। অথচ বর্তমান দুই প্রতিমন্ত্রীসহ ইতিপূর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইন প্রতিমন্ত্রীও ‘ক্রসফায়ার’-এর বৈধতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন।
আমরা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এ ধরনের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা ঠিক নিশ্চিত নই, মাননীয় মন্ত্রীরা কি বুঝেশুনেই এ কথাগুলো বলছেন, নাকি মানবাধিকার ও আইনের শাসন বিষয়ে এটাই তাঁদের ধারণা বা জানাশোনা। যদি সেটাই হয়ে থাকে, তবে বলতেই হচ্ছে, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক হিসেবে আমাদের দেশের মন্ত্রীদের মানবাধিকার, আইনের শাসনবিষয়ক জ্ঞানে আমরা যারপরনাই লজ্জিত।
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র; জাতিসংঘ সনদ; নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ; অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারসংক্রান্ত সনদ, নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদসহ প্রায় সব মানবাধিকার দলিলেই জীবনের অধিকারকে সর্বোচ্চ অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিচারিক পদ্ধতি অবলম্বন ব্যতীত এ অধিকার কোনোভাবেই লঙ্ঘন করা যাবে না। এ কারণেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকৃত। মানবাধিকার, আইনের শাসন ইত্যাদি প্রপঞ্চর একটি স্বীকৃত মানদণ্ড রয়েছে। এ বিষয়গুলো এখন আর তেমন নেই যে একজনের মতে মানবাধিকার, আইনের শাসন হবে এক রকম, অন্যজনের মতে তা হবে আরেক রকম। বাংলাদেশ এসব মানবাধিকার সনদ স্বাক্ষর বা অনুস্বাক্ষর করেছে। সুতরাং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কখনোই ক্রসফায়ার মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয় বলে দাবি করতে পারে না।
‘এনকাউন্টার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ অথবা ‘আত্মরক্ষার্থে গুলি’ যেভাবেই বলা হোক না কেন, ঘটনার পরম্পরা আর অন্যান্য অনুষঙ্গ বিশ্লেষণে এটা সবার কাছেই স্পষ্ট যে এগুলো ক্রসফায়ারেরই ভিন্ন নামকরণ, সেটাকে জায়েজ করার চেষ্টা। বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যেকোনো নাগরিকের অধিকার। ৩২ অনুচ্ছেদ অনুসারে, আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। আবার ৩৩ অনুচ্ছেদের বিধান হলো, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে যত শিগগির সম্ভব আদালেতের সামনে উপস্থিত করতে হবে। সংবিধানের এসব বিধান মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে উপরিউক্ত মন্ত্রীদ্বয়ের এ ধরনের বক্তব্য কি তাঁদের প্রতি অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্বেরও লঙ্ঘন নয়?
মানবাধিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মানবাধিকারকে সম্মান করা, সুরক্ষা দেওয়া ও সমুন্নত রাখা বা পরিপূর্ণ করা। সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তথাকথিত চরমপন্থীদের হাতে সাধারণ জনগণের প্রাণনাশের ঘটনা একদিকে প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন, অন্যদিকে মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন। ওই কথিত চরমপন্থীরা খুন, লুণ্ঠন, ডাকাতির মাধ্যমে দেশের প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করছে। আর তাদের দমন করতে না পারার কারণে রাষ্ট্রের ভূমিকা হয়ে দাঁড়াচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। অর্থাত্ এ ক্ষেত্রে চরমপন্থীরা হচ্ছে আইন লঙ্ঘনকারী, রাষ্ট্র হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। অন্যদিকে ওই কথিত চরমপন্থীদের কার্যকলাপ দমনের নামে তাদের বিচারবহির্ভূত পন্থায় হত্যা করা একই ঘটনায় রাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফা মানবাধিকার লঙ্ঘন। তা ছাড়া যেকোনো মানুষের মানবাধিকারকে সম্মান দেখানো এবং রাষ্ট্র নিজে মানবাধিকার লঙ্ঘন না করার জন্য সংবিধান, দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ। অথচ ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে সরকার সেই অঙ্গীকারের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে নিজেই মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।
এটা ঠিক যে প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় আস্থাহীন হয়ে পড়ায় জনগণের একটা অংশ এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন দেয়। কিন্তু আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল গণতান্ত্রিক সরকারের উচিত প্রচলিত বিচারব্যবস্থার সেই দুর্বলতা দূর করতে সচেষ্ট হওয়া, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আপাত জনসমর্থনকে অজুহাত হিসেবে নিয়ে বিচারবহির্ভূত পন্থা অবলম্বন করা নয়। আমরা সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়ায় সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ হতে পারে। হত্যার মতো একটি নিকৃষ্টতম অপরাধ রাষ্ট্রের প্রশ্রয়ে ঘটতে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ অপরাধের প্রতি ঘৃণার বোধ ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকবে; মানবতাবোধ হারিয়ে যাবে, প্রতিশোধপরায়ণতা উত্সাহিত হবে, যার ফলাফল ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়।
আমরা দেখেছি, সরকারের বাইরে থাকা অবস্থায় ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকলেও সরকারের দায়িত্ব নিয়ে সবাই এই ‘সংক্ষিপ্ত’ পদ্ধতি ব্যবহারের আপাত সুফল নিতে চায়। আমরা এই বৈপরিত্যের অবসান চাই। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার তাদের পূর্বসূরিদের অনুসরণের পথ নয়, বরং দিনবদলের স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে এ ক্ষেত্রেও সত্যিকারের দিনবদলের সূচনা করবে এবং জনগণ যে আশা নিয়ে তাদের নির্বাচিত করেছে, সে আশা ভঙ্গের কারণ ঘটাবে না।
হামিদা হোসেন
চেয়ারপারসন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র।
অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল
নির্বাহী পরিচালক, আসক।
শাহদীন মালিক
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
ইফতেখারুজ্জামান
নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি।
নগর দর্পণ: চট্টগ্রাম

প্রযুক্তি শিক্ষা

দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা ও কর্মসংস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ উন্নয়নে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো বিশাল অবদান রাখছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বর্তমানে ৫০টি সরকারি ও ১০৪টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দুই শিফট চালু রয়েছে। প্রতিবছর সরকারি পলিটেকনিকে প্রথম ও দ্বিতীয় শিফটে প্রায় ১৫ হাজার ৯০০ শিক্ষার্থী এবং বেসরকারি পলিটেকনিকে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এসব শিক্ষার্থী উচ্চতর শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত। গাজীপুরে অবস্থিত ডুয়েট ছাড়া অন্য কোনো সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নেই। ডুয়েটে আসনসংখ্যা মাত্র ৪৪০, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। এই স্বল্প আসন ও অন্য কোনো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন না থাকায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। যেখানে ১৯টি পলিটেকনিকের জন্য ডুয়েট প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, এখন ৫০টি পলিটেকনিকের জন্য সেটিই রয়ে গেছে। যে কারণে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের শিক্ষার্থীরা অনেক পরিশ্রম, সময় ও মেধা ব্যয় করে পরের ধাপে এই মেধাকে বিকশিত করার সুযোগ পাচ্ছে না। তাই পলিটেকনিক থেকে পাস করা ছাত্রদের জন্য সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনের ব্যবস্থা করতে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
মো. সবুজ মাহমুদ
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

এই আমাদের সামিন -চারদিক by তৌহিদা শিরোপা

আরে, এ তো সামিন! আমাদের সামিন! সেই সামিনের কথা বলছি, যার পদচারণে মুখর ছিল ঢাকার অলিগলি। ছুটে বেরিয়েছে এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে। তুলে এনেছে জীবনের গল্প। বিরামহীনভাবে তা লিখেছে পত্রিকার পাতায়। প্রথম আলোর নগর সাময়িকী ‘ঢাকায় থাকি’র অ্যাসাইনমেন্ট রিপোর্টার সাইফুল ইসলাম সামিন। অকস্মাত্ একটা দুর্ঘটনা যার জীবনে ছন্দপতন ঘটায়। কেড়ে নেয় ওর দুটি পা। সাময়িকভাবে থমকে গেছে ও। কিন্তু থেমে থাকেনি। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী সামিন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কাঁধে নিয়েছে দায়িত্ব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র সামিন। দুর্ঘটনার পরে যে সারা দিন বিছানায় শুয়ে কাটাত, এখন সে লিখছে। কখনো নিজের কথা, কখনো বা কবিতায় ভরে তুলছে ডায়েরির পাতাগুলো। লেখালেখির প্রতি ঝোঁক সেই ছোটবেলা থেকেই। কোনো রচনা প্রতিযোগিতা হলেই সে অংশ নিত। সেখান থেকে পুরস্কার জিতে আনা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। রচনা প্রতিযোগিতায় এ পর্যন্ত কত পুরস্কার যে পেয়েছে, তা গুনে শেষ করা যাবে না। এ রকমই একটি রচনা প্রতিযোগিতা সামিনকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। কর্মোদ্দীপনা খুঁজে পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল জেলা ৩১৫এ১ সেবা সপ্তাহের আয়োজন করে।
সামাজিক নানা সেবা কার্যক্রমের পাশাপাশি তারা রচনা প্রতিযোগিতারও আয়োজন করে। ‘থিংক গ্লোবালি অ্যাক্ট লোকালি’—অর্থাত্ বিশ্বায়নের এই যুগে ছুটে না বেড়িয়েও অন্যের সেবা করা যায়। স্থানীয়ভাবেই এটি করা সম্ভব। এ বিষয় নিয়েই সামিন লিখে পাঠায়। হাজারো লেখার ভিড়ে একটি লেখায় চোখ আটকে যায় বিচারকদের। এত সুন্দর বিশ্লেষণ, এত সুন্দর উপস্থাপন। মুগ্ধ হন বিচারকেরা। হঠাত্ একদিন ফোন আসে সামিনের কাছে। সরকারি বাঙলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রেহানা বেগম ফোন করেন। এই প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে তিনি ছিলেন। সামিনের সহজ-সাবলীল লেখাটি সেরা লেখা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রথম পুরস্কারটি এবারও তার। রেহানা বেগম অভিনন্দন জানাতে ফোন করেন তাকে। তখনো জানতেন না ওর দুর্ঘটনার কথা। ‘ওকে যখন আসতে বললাম তখন বলল, ওর পা নেই। কীভাবে আসবে। শুনে এত খারাপ লাগল! কিন্তু অবাক হলাম, এমন দুর্ঘটনার পরও মানুষ কীভাবে এত সুন্দর লিখতে পারে! অনুষ্ঠানে নিয়ে আসার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলাম।’ বলেন রেহানা বেগম। ৯ অক্টোবর এলজিইডি ভবনে সেবা সপ্তাহের সমাপনী অনুষ্ঠান হয়। এ অনুষ্ঠানে সামিনের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক যখন সামিনের কথা বলছিলেন, পুরো ঘরে তখন নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। পুরস্কার নেওয়ার সময় বিপুল করতালিতে সবাই ওকে অভিনন্দন জানায়। অনেকেই দাঁড়িয়ে যায় প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী এই যুবককে এক নজর দেখার জন্য। জীবনে অনেক পুরস্কার পেলেও এবারেরটা একেবারেই আলাদা। দুর্ঘটনার পরে এটাই যে ওর প্রথম সাফল্য। ‘প্রতিদিনই বেঁচে থাকার নতুন নতুন অর্থ খুঁজি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকার সময় ভাবতাম, অনার্সে নিশ্চয় ভালো করব। কিন্তু সামান্য কিছু নম্বরের জন্য দ্বিতীয় শ্রেণীতে দ্বিতীয় হলাম। এতেও ভেঙে পড়িনি। ভাবলাম, নতুন করে শুরু করব। তখনই এই রচনা প্রতিযোগিতার কথা শুনলাম। পাঠিয়ে দিলাম লেখা। এই পুরস্কার আমাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। মনে হচ্ছে আমি পারব, আমাকে পারতেই হবে।’ সারাক্ষণই নিজেকে কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত রাখে সামিন। ব্যস্ততা অবর্ণনীয় সেই কষ্টকে মনে করতে দেয় না। হুইল চেয়ারে বসেই সামিন আবার সাংবাদিকতা শুরু করেছে। তৈরি করছে নানা প্রতিবেদন। কে বলে দুর্ঘটনা মানুষের জীবনকে স্থবির করে দেয়? মানসিক শক্তি ও প্রতিভা কি তা হতে দেয়? প্রমাণ তো আমাদের সামিন।
মানুষের ভালোবাসাই তো ওকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। ‘চেনা-অচেনা কত মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি। ভালোবাসার প্রতিদানে আমারও তো কিছু করা উচিত। তাই তো সব কষ্ট-যন্ত্রণা ঝেড়ে ফেলে নতুন করে কাজ শুরু করেছি। সবার সহযোগিতা পেলে হুইল চেয়ারে বসেই সাংবাদিকতা করতে পারব। কিন্তু খুব কষ্ট হয়, যখন কেউ আমাকে প্রতিবন্ধী বলে। আমি তো ভাবতে পারি, স্বপ্ন দেখি, দেখাতে পারি, লিখতেও পারি। শুধু দুটো পা নেই বলেই কি এমন কথা শুনতে হবে?’ এ প্রশ্নের পর কোনো কথা খুঁজে পায় না এই সংগ্রামের আরেক যোদ্ধা সামিনের ছোট ভাই। ভাই কিংবা বন্ধু—সবই এখন ও। সামিনের দেখভাল সে-ই করে। তবে ওর অন্য বন্ধুরাও সব কাজে সহযোগিতা করে। মানসিক শক্তি কতটা জোরালো হলে মানুষ এভাবে উঠে আসতে পারে, তা সামিনকে দেখলেই বোঝা যায়। মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চায় ও, যেন কাজের মধ্যেই বেঁচে থাকতে পারে। মরে গেলেও সবাই যেন ওকে মনে রাখে। সামিনের চোখ-মুখের হাসিটা এ কথাই যেন বলে—
সূর্য আমি, অস্তমিত হব
তবু চিহ্ন রেখে যাব ধরনীর পরে।

প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা নিয়ে ভাবনা by দিবা হোসেন ও শাহরিয়ার হায়দার

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯-এর চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা আনন্দিত যে, সর্বসাধারণের জন্য এ খসড়া নীতির ওপর সুপারিশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে জনগণের মতের প্রতিফলন ঘটার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি যেকোনো সরকারের জন্যই একটি বড় প্রাপ্তি। জনগণকে নিয়ে জনগণেরই কল্যাণে নীতিমালা তৈরি করাটাই তো গণতন্ত্রের মূল কথা। বাংলাদেশ সে আদর্শ পথে চলতে শুরু করছে।
প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের সর্বস্তরের, বিশেষত শিক্ষা নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরা নানামুখী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। এই নিবন্ধ লেখার উদ্যোগ সেটারই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। আমরা খেয়াল করে দেখেছি, শিক্ষানীতি ২০০৯ নিয়ে নানামুখী আলোচনা হলেও প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা নিয়ে এ নীতিতে যা উল্লেখ করা হয়েছে, এর বিশ্লেষণ পত্রপত্রিকায় খুব একটা আসেনি। ফলে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা নিয়ে শিক্ষানীতিতে কী আছে, বা যা আছে তা কতটা বাস্তবসম্মত, বা আদৌ উপযুক্ত কি না, সেটার পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা সাধারণ মানুষ জানতে পারছে না। আমরা যাঁরা প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছি, তাঁদেরই কাজটি করতে হবে বলে আমাদের এই প্রয়াস।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯-এর খসড়া প্রতিবেদনটিতে ‘প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা’ বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে স্থান পেয়েছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, খসড়া নীতিতে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ২৩ নম্বর লক্ষ্যটি হলো ‘প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা’, যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। বলা বাহুল্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করেছে ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১’, অর্থাত্ এটি আইনের মাধ্যমে সিদ্ধ একটি অধিকার। শিক্ষানীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত, কীভাবে এ আইনসিদ্ধ অধিকার অর্জন করতে তাদের সহায়তা করা যাবে। এখানে আমাদের প্রস্তাব হলো—‘প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সমান অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং শিখনের জন্য উপযোগী অবকাঠামো উপকরণ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।’
অনেকে মনে করেন, সব প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হয়তো বিশেষ বা পৃথক স্কুলে লেখাপড়া করবে। কিন্তু ‘একীভূত শিক্ষা’ ধারণা থেকে আমরা বুঝি যে, মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার সব প্রতিবন্ধী শিশু/শিক্ষার্থী সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়তে পারবে। প্রয়োজন শুধু পাঠ্যক্রমে কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন। তবে এটা অনস্বীকার্য, গুরুতর মাত্রায় প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রে অবশ্যই ‘বিশেষ স্কুল’ থাকতে হবে। ‘প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা’ অধ্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা অংশে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের (যারা সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে সক্ষম হবে) জন্য পৃথকভাবে কৌশল নির্ধারণ করা রয়েছে। এ অধ্যায়ে ‘প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা’ অংশে একটি নতুন কৌশল সংযোজনের সুপারিশ করছি। গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে জানা যায়, প্রতিবন্ধী শিশুদের একটি বড় অংশ শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত হতে পারে, যদি সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বলা হয়েছে, ‘৫+ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে হবে।’ এ শিক্ষাস্তরে যদি তাদের প্রতিবন্ধিতা শনাক্ত ও চিহ্নিতকরণের ব্যবস্থা করা হয়, তবে অতি শৈশবেই তার প্রতিবন্ধিতা নির্ণয় করা সম্ভব হবে। তাই একটি নতুন কৌশল হতে পারে, ‘প্রাক-প্রাথমিক স্তরে শিশুদের ভর্তির সময়ই বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্তৃক প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।’ এতে যদি কোনো শিশুর প্রতিবন্ধিতার লক্ষণ পাওয়া যায়, তবে দ্রুত তাকে প্রাথমিক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরিবারকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে এবং এর মাধ্যমে ওই শিশুকে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধিতার হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়াস পাওয়া যাবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কীভাবে এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া চালাবেন। এখানে বলা যায়, ‘শিক্ষক প্রশিক্ষণ’ অধ্যায়ের অন্যতম একটি লক্ষ্য হলো, ‘...প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের বিশেষ শিখন চাহিদা অনুসারে শিখনসেবা দেওয়ার কলাকৌশল অর্জনে সহায়তা করা’ অর্থাত্ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ওই প্রশিক্ষণে শনাক্তকরণ বিষয়টি যুক্ত করলেই তাঁরা কাজটি করতে সমর্থ হবেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অংশে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির বয়স ৬+ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখানে একটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতিবন্ধিতার মাত্রা অনুযায়ী তাদের বিকাশে বিলম্ব হতে পারে। ফলে দেখা যায়, কোনো কোনো শিশু হয়তো আট বছর বা সাত বছর বয়সে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হতে সক্ষম হবে। আমাদের সুপারিশ হলো, প্রাথমিক স্তরে প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তির বয়সটা প্রয়োজনবোধে নমনীয় হওয়া উচিত। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধ্যায়গুলোতেও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কৌশলের উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। বিশেষত, প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের (দৃষ্টি, শ্রবণ, শারীরিক) ভর্তির প্রক্রিয়ায় তাদের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে কিছু নমনীয়তা রাখার সুপারিশ করছি।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা সাধারণ/একীভূত শিক্ষায় লেখাপড়া করবে, তাদের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন-ব্যবস্থায় বিশেষ বিবেচনা করা উচিত। এখানে পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। দৃষ্টি ও অন্যান্য প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়ছে, তারা এ পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়তে পারে। দৃষ্টিগত সমস্যার কারণে তারা অনেক প্রশ্নের উত্তর (যেমন জ্যামিতিবিষয়ক প্রশ্ন) করতে পারবে না। তাদের ক্ষেত্রে পরিপূরক কী ব্যবস্থা রাখা হবে, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একই কথা প্রযোজ্য মাধ্যমিক স্তরের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে চালু ‘সৃজনশীল প্রশ্ন’ পদ্ধতিতে যেখানে চিত্রসংবলিত প্রশ্ন বা যে প্রশ্নের উত্তর করার জন্য কোনো ডায়াগ্রাম বা মডেল প্রশ্নে দেওয়া থাকে, সে প্রশ্নের উত্তর তারা করতে পারে না। বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এখানে আমাদের প্রস্তাব হলো, পাবলিক পরীক্ষায় কতজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে, এর একটি রেকর্ড বোর্ডের কাছে থাকতে হবে এবং সে সংখ্যা অনুযায়ী বোর্ড প্রশ্নপত্রে ওই নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর জন্য বিকল্প প্রশ্ন রাখবে।
অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অধ্যায় ১৮-এর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অধ্যায় ১৮-তে রয়েছে—‘বিশেষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা, স্কাউট ও গার্ল গাইড এবং ব্রতচারী’। এ অধ্যায়টি সম্পূর্ণ আলাদাভাবে ‘বিশেষ শিক্ষা’ শিরোনামে আসতে হবে। কারণ, বিশেষ শিক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী শিক্ষাপদ্ধতি। এটা কখনোই অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে আসতে পারে না। এখানে তারাই অংশ নেবে, যারা গুরুতর প্রতিবন্ধিতার কারণে সাধারণ বিদ্যালয়ে অংশ নিতে পারছে না। এদের শিক্ষাব্যবস্থাটি হবে একই সঙ্গে আধুনিক ও প্রায়োগিক। ফলে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় হিসেবে এটিকে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।
বর্তমানে বাংলাদেশে একীভূত শিক্ষার প্রচলন হয়েছে। সরকার বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা ও শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বের সঙ্গে একীভূত শিক্ষাকে বিবেচনা করছে। ফলে বিশেষ শিক্ষার সঙ্গে একীভূত শিক্ষাকে সমন্বয় করেও ১৮ নম্বর অধ্যায়ের শিরোনাম হতে পারে ‘একীভূত শিক্ষা ও বিশেষ শিক্ষা’।
এ অধ্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী প্রয়োজন। এখানে অনেকবার ‘মানসিক সমস্যা’ কথাটি ব্যবহূত হয়েছে। ‘বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা’ ও ‘মানসিক সমস্যা’ কখনোই এক কথা নয়। এ কারণে ‘মানসিক সমস্যা’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা’ ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া এ অধ্যায়ে ‘সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা চালু’ করার কথা বলা হয়েছে; এর বদলে ‘একীভূত শিক্ষা’ শব্দগুলো ব্যবহার করাই শ্রেয়। ৫ নম্বর কৌশলে ‘বচন ও মানসিক প্রতিবন্ধী’ বলা হয়েছে; এর পরিবর্তে ‘ভাব প্রকাশ বা যোগাযোগ অক্ষমতা ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা’ ব্যবহারের প্রস্তাব করছি।
আমরা আশা করি, শিক্ষানীতির খসড়াটি চূড়ান্তভাবে গৃহীত হওয়ার আগে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার-বিষয়ক সনদ ২০০৬ (ইউএনসিআরপিডি) অন্যতম দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দিবা হোসেন ও শাহরিয়ার হায়দার: শিক্ষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিরোধের নেপথ্যে কি মেয়র নির্বাচন -নগর দর্পণ: চট্টগ্রাম by বিশ্বজিত্ চৌধুরী

একদিক থেকে দেখলে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন নিরুত্তাপ থাকার কথা। কারণ বিরোধী দল বিএনপি রাজপথে নামার মতো স্থানীয় কোনো ইস্যু তৈরি করতে পারেনি। ইস্যু তৈরি হলেও যে নামতে পারবে এমন সম্ভাবনা বা শঙ্কা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কেননা নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর তারা যেমন মনোবল হারিয়েছে, তেমনি অন্তর্দলীয় কোন্দলের কারণেও হয়ে পড়েছে হীনবল। অন্য দিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়ে নিরুদ্বিগ্ন থাকলেও নিজেরাই নিজেদের জন্য তৈরি করছে গর্ত, কে কাকে সেখানে ঠেলে ফেলতে পারে চলছে তার জোর প্রতিযোগিতা। ব্যাপারটা এত দূর গড়িয়েছে যে দলীয় নেতার কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর জন্য বাইরের কারও দায়িত্ব নিতে হয়নি, নেতাদের প্ররোচনায় সেটা করেছেন দলেরই একাংশের কর্মীরা।
আসলে গত সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগে নানা ধরনের বিভক্তি ও কোন্দল চলে আসছিল। নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী নগরের গুরুত্বপূর্ণ কোতোয়ালি আসনে নুরুল ইসলামের মনোনয়ন মেনে নিতে পারেননি। তাঁর নানা কর্মকাণ্ডে সেই মনোভাব প্রকাশিত হলেও নুরুল ইসলাম সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। এতে দলীয় কর্মীদের ওপর মেয়রের প্রভাব কিছুটা হলেও কমেছে। নগর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মধ্যে যাঁরা নানা কারণে বিরক্ত ছিলেন, মেয়রের ওপর তাঁরা প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের ক্ষোভ-দুঃখের কথাও বলতে শুরু করেছেন এ সময় থেকে।
একসময়কার ঘনিষ্ঠ সতীর্থ মঞ্জুরুল আলমের সঙ্গে মেয়রের মতান্তর ঘটেছে আরও আগে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কারাভোগের পর বেরিয়ে এসেই তিনি বিষোদ্গার করতে থাকেন ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালনরত মঞ্জুরুল আলমের ওপর।
নানাভাবে মেয়রের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে মঞ্জুরুল আলম দল ও নেতার (মহিউদ্দিন চৌধুরীর) ওপর থেকে আনুগত্য প্রত্যাহার করেন। এভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিঃসঙ্গ হতে শুরু করেন মহিউদ্দিন। এখন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগে মন্ত্রী আফসারুল আমীন ও সীতাকুণ্ডের সাংসদ আবুল কাশেম মাস্টার ছাড়া সিনিয়র নেতাদের মধ্যে তাঁকে সমর্থন করার প্রায় কেউ নেই বললেই চলে।
এর মধ্যে মেয়রের বাড়িতে বিএনপির দলীয় সাংসদ ও নানা কারণে বিতর্কিত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সদলবলে আতিথ্য গ্রহণ এবং গৃহকর্তার আন্তরিক মেহমানদারি উপদলীয় উত্তাপে আরও কিছুটা ঘি ঢেলেছে।
এ অবস্থায় পশ্চিম পটিয়ার পাঁচটি ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশন অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়ে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাংসদ আখতারুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে নতুন করে বিরোধে জড়িয়েছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। এর ফলে নতুন এক মেরুকরণ হয়েছে। ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’—এ নীতিতে নুরুল ইসলাম ও তাঁর সমমনাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে আখতারুজ্জামান চৌধুরীর। সদ্য প্রয়াত সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতা এম এ মান্নানের শোকসভা ও মেজবানের আয়োজন করা হয়েছে পৃথকভাবে। পরস্পরের অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন দুপক্ষের নেতা-কর্মীরা। এমনকি রাজপথেও পরস্পরের বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা দরকার, আখতারুজামান-মহিউদ্দিন বিরোধ এককালে এ অঞ্চলে বহুল আলোচিত একটি বিষয় ছিল। বহু সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এ বিরোধকে ঘিরে। পরবর্তীকালে হুমায়ুন জহির হত্যা মামলা ও ইউসিবিএল ব্যাংক দখলের ঘটনায় জড়িয়ে বেকায়দায় পড়েন আখতারুজ্জামান। সে সময় একদিকে সংসদ নির্বাচনে তাঁর পরাজয় ও অন্যদিকে বিরোধী দলে থেকেও মেয়র নির্বাচনে মহিউদ্দিনের বিরাট জয় তাঁকে প্রায় দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়। ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো আখতারুজ্জামানের সেনাপতি বলে কথিত আ জ ম নাসির দুর্দিনে তাঁকে ছেড়ে গেলে, বলা চলে অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে সমঝোতার পথ ধরেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী। লালদিঘির মাঠের জনসভায় আখতারুজ্জামান চৌধুরী মহিউদ্দিনকে তাঁর নেতা ঘোষণা করে দৃশ্যত বিরোধের অবসান ঘটান এবং কর্মী-সমর্থকদের উজ্জীবিত করে তোলেন।
সময় বদলেছে। গত সংসদ নির্বাচনে আনোয়ারা আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে আবার রাজনীতির মাঠে জায়গা করে নিয়েছেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী। ইতিমধ্যে মেয়র মহিউদ্দিনের সঙ্গে এখানকার অন্যান্য নেতার দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় নিজের অবস্থান আরও পোক্ত করার সুযোগও তৈরি হয়েছে তাঁর জন্য।
এখন এই এত বছর পর আবার এই দুই নেতার কর্মকাণ্ড কর্মী-সমর্থক, এমনকি এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মনেও তৈরি করেছে শঙ্কা। ঘরপোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
কিছুদিন আগে এক জনসভায় পশ্চিম পটিয়ার পাঁচটি ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিতে গেলে আখতারুজ্জামানের সমর্থকদের ক্ষোভের মুখে পড়েন মেয়র। সভাস্থলে চেয়ার ছুড়ে, স্লোগান দিয়ে মেয়রের এ উদ্যোগকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেন আখতারুজ্জামানের সমর্থকেরা। এর জের ধরে পক্ষে-বিপক্ষে সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন, মিছিল-মিটিং ইত্যাদি এখন চলছে প্রায় প্রতিদিনই।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্য, মূল শহর থেকে মাত্র একটি নদীর দূরত্বে (তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় সমাপ্তির পথে) থাকা একটি অঞ্চল এতটা অনুন্নত থাকতে পারে না। পশ্চিম পটিয়ায় এখন অনেক শিল্প-কারখানা হয়েছে। এসব অঞ্চল সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে এর দ্রুত উন্নয়ন হবে। এতে এলাকাবাসীর জীবনের মান যেমন বাড়বে তেমনি কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অন্যদিকে আখতারুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য, তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল এ এলাকাকে উপজেলা করা। হঠাত্ করে সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা চমক সৃষ্টির চেষ্টা ও হটকারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তা ছাড়া মহিউদ্দিনের এই উদ্যোগ আইনি জটিলতা সৃষ্টির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচন পেছানোর একটি চক্রান্ত বলে মনে করেন তিনি।
সরকারি দলের দুই নেতার টানাপোড়েনে এলাকাবাসীর এখন ত্রিশঙ্কু অবস্থা। তবে কর্মী-সমর্থকদের বাইরে সাধারণভাবে এ অঞ্চলের মানুষের ধারণা, সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে এসব এলাকার উন্নয়ন হবে। করপোরেশনের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর উন্নয়নের উদ্যোগ ও সাফল্য বিষয়ে এ অঞ্চলের মানুষের এক ধরনের আস্থা আছে বলেই মনে হয়। পক্ষান্তরে আখতারুজ্জামান চৌধুরী এলাকার উন্নয়নে কখনো জোরালো ভূমিকা রেখেছেন—এমন দৃষ্টান্ত তাঁদের সামনে নেই।
আসলে এসব বিরোধ-বিতর্কের আড়ালে আছে অন্য এক রাজনীতি। মাত্র আট মাস পরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়ার কথা। মহিউদ্দিন চৌধুরী চান তাঁর প্রভাবের পরিধি বাড়াতে। অন্যদিকে আখতারুজ্জামান চৌধুরীরও আছে রাজনৈতিক অভিলাষ। তাঁর ছেলে, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি সাইফুজ্জামান চৌধুরী মেয়র পদে দলের মনোনয়ন চান। মূল বিরোধটা এখানেই বলে মনে করেন অনেকে।
এ কথা আমরা বারবার বলি, মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য যেভাবে সোচ্চার ছিলেন, যত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তাঁর আমলে হয়েছে, ইতিপূর্বে কখনোই তা হয়নি। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে প্রশংসিত কর্মকাণ্ডের অনেকগুলোই এখন যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর (বিভিন্ন মাতৃসদন) কার্যক্রম হতাশাব্যঞ্জক, রাস্তাঘাটের অবস্থা করুণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সাফল্য দেখাতে পারছে না করপোরেশন। নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির চেষ্টার বদলে করপোরেশনের আয়-বৃদ্ধির ব্যাপারেই (যেমন—বহুতল ভবন নির্মাণ ও ফ্ল্যাট বিক্রি, জমি কিনে প্লট তৈরি করে বিক্রি, বিপণিকেন্দ্র তৈরি ইত্যাদি) তাঁর মনোযোগ বেশি নিবদ্ধ বলে মনে হয়। এ কথা সত্যি, সরকার চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে, ক্রমবর্ধমান এ নগরের চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। এ জন্য সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল তৈরির প্রয়োজন আছে। কিন্তু করপোরেশনের আয় বাড়াতে গিয়ে তাকে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের রূপ দেওয়া, উত্তরোত্তর মুনাফা অর্জনের চেষ্টায় সেবামূলক কার্যক্রমকে ব্যাহত করা এ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হতে পারে না। তৃতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর মহিউদ্দিনের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও একগুঁয়ে মনোভাব তাঁকে ক্রমেই দলের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। এখন ‘একলা চলো নীতিতে’ তিনি কতটা এগোতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়।
বিশ্বজিত্ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
Email : bishwa_chy@yahoo.com

খাদ্যের জনসংখ্যা তত্ত্ব যখন বৈষম্য লুকায়

৬ অক্টোবর প্রথম আলোয় এ জেড এম আবদুল আলীর জনসংখ্যা ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষণটি পড়ে কিছু প্রসঙ্গ তুলে ধরা জরুরি মনে হয়েছে। লেখাটিতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে। জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে আমরা খাদ্য সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি—এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিনি তথাকথিত উচ্চফলনশীল গমের উদ্ভাবক, নোবেলজয়ী নরম্যান বোরল্যগের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। তাঁর মতে, বোরল্যগের অবদানের কারণে পৃথিবীতে অনেক সময় দুর্ভিক্ষ আসেনি। তবে বোরল্যগের সঙ্গে একমত হয়ে তিনি দাবি করেছেন, জনসংখ্যা যদি বাড়তে থাকে, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা হাজারো প্রযুক্তি দিয়ে নিশ্চিত করা যাবে না। বোরল্যগের অবদান কিংবা আবদুল আলীর খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক আশঙ্কা, কোনোটি নিয়ে আমার সংশয় নেই। খাদ্য নিরাপত্তাকে তুলে ধরতে গিয়ে জনসংখ্যাকে যেভাবে সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে, তার ওপর আমার সংশয়। এমন সময়ে আবদুল আলী এটি লিখেছেন যখন বাজারে অন্য সব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েই চলছে। এ লেখা পড়ে মনে হতে পারে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে আর এ কারণেই বাড়তি দাম। অথচ চিনির মজুদবিষয়ক সামপ্রতিক সংবাদগুলো কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। একই সঙ্গে চাল-ডালের দাম বৃদ্ধির বিষয়টিও মজুদদারির সঙ্গে সম্পর্কিত।
খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষণে আবদুল আলীর জনসংখ্যা তত্ত্বের সমস্যা সম্পর্কে ধারণা পেতে অমর্ত্য সেনের কাজ আমাদের সহয়তা করতে পারে। অমর্ত্য সেন ও বোরল্যগের কাজের জায়গা ভিন্ন। কিন্তু তিনি খাদ্যের সংকটবিষয়ক যে তত্ত্ব দেন, তা আমাদের বুঝতে শেখায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য নিরাপত্তার সমস্যা তৈরি হয় না বরং খাদ্য ব্যবস্থাপনাই খাদ্য নিরাপত্তার প্রধানতম বিষয়। খাদ্য অব্যবস্থাপনার কারণে যথেষ্ট জোগান থাকা সত্ত্বেও দুর্ভিক্ষ হতে পারে, যার উদাহরণ তিনি তাঁর দুর্ভিক্ষবিষয়ক বিশ্লেষণগুলোতে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্ভিক্ষ তার একটি উদাহরণ। খাদ্যের উত্পাদন ও এর মোট চাহিদা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উত্পাদিত শস্য খাদ্য হিসেবে ব্যবহার না করে শস্য জ্বালানি উত্পাদনে ব্যবহার করলে তো সংকট বাড়তেই পারে। ২০০৭ সালে খাদ্যসংকটের একটি বড় কারণ ছিল খাদ্যশস্যকে জ্বালানির কাজে ব্যবহার। তখন খাদ্য উত্পাদন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের থেকে বেশি ছিল। অথচ আবদুল আলীর লেখাতে কেবল জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণকেই তুলে ধরা হয়েছে। তথাকথিত উন্নত বিশ্বের খাদ্যশস্য নিয়ে যথেচ্ছ ব্যবহারের কথা বলা হয়নি।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জনসংখ্যা তত্ত্ব সব ধরনের খাদ্য বাণিজ্য ও শোষণের বৈধতা দেয়। বোঝাতে চায়, জনগণ যে হারে বেড়েছে সে হারে খাবার বাড়েনি, এ কারণে সংকট। অথচ খাদ্যসংকট যখন দেখা দেয় তখন ঢাকার অভিজাত এলাকায় বসবাসকারী একজন মানুষ আর বস্তিতে বসবাসকারী একজন রিকশাওয়ালার কি একই সংকট হয়? জনসংখ্যা বাড়ার কারণেই যদি খাদ্যসংকট দেখা দেয়, তাহলে সব জনগণ সমান ভোগান্তিতে পড়ে না কেন? নাকি গরিবরাই কেবল জনসংখ্যা বাড়াচ্ছে এবং এ কারণেই ভোগান্তিটা তাদের? আসল কথা হচ্ছে, ব্যবস্থাপনা। আমরা কী কাজ করি এবং সেই কাজ কীভাবে আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ায়, তা-ই নির্ধারণ করে দেয় আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ধরন কী হবে। কেবল জনসংখ্যাকে দোষ দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা না করে, খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন। প্রয়োজন খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে দারিদ্র্য বিমোচন।
মুজীবুল আনাম লাবীব
সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক সংগঠন -শ্রমিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণহীন চলতে পারে না

সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের অভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে অপ্রয়োজনীয় শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ করা তিনটি শ্রমিক সংগঠনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর আবারও অস্থির হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ বন্দরে শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা ছোট-বড় মিলিয়ে ৩৫টি। নতুন তিনটি সংগঠনের মধ্যে একটি আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাংসদ এম আবদুল লতিফ এবং অপরটি চট্টগ্রাম সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সমর্থনপুষ্ট। এতগুলো শ্রমিক সংগঠনের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন সংগঠন থেকে বিক্ষিপ্তভাবে নানামুখী দাবিদাওয়া উত্থাপিত হয়েছে, যার ফলে শ্রমিকের স্বার্থরক্ষার চেয়ে বিশৃঙ্খলাই হয়েছে বেশি; বাধাগ্রস্ত হয়েছে বন্দরের কর্মকাণ্ড।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা দুটিতে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল, বিশৃঙ্খলা কমিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরকে গতিশীল করা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গত বছরের ৪ মে এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার অনুমোদন না দেওয়ায় অধ্যাদেশটি আর কার্যকর নেই। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। এ বন্দরে কর্মরত প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর স্বার্থে শ্রমিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা আমরা স্বীকার করি। তবে তা কোনোভাবেই লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে না।
শ্রমিক সংগঠনের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা বা কল্যাণসাধন। অতীতে সব সরকারের আমলে প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের স্বার্থে তল্পিবাহক নতুন নতুন শ্রমিক সংগঠন তৈরি করেছেন। ফলে ফিবছর শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা বেড়েই চলে, যেগুলো রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া শ্রমিকদের কল্যাণে কোনো ভূমিকা রাখেনি।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান বন্দর। জলপথে দেশের বেশির ভাগ আমদানি-রপ্তানির পণ্য ওঠানো-নামানো হয় এ বন্দরে। দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কোনো মহল যেন বন্দরকে জিম্মি করে কোনো সংকীর্ণ মতলব হাসিল করতে না পারে, সেটা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই নিশ্চিত করতে হবে। বন্দরকে গতিশীল করতে শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা কমিয়ে আনতে ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। আমরা সুস্থ একটি ট্রেড ইউনিয়ন দেখতে চাই, যেটি সর্বতোভাবে শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়েই কাজ করবে।

সরকারের বিদ্যুৎ উত্পাদন পরিকল্পনা -আশা কি দুরাশায় পরিণত হতে চলেছে?

আশার পেছনেই ছোটে জনগণ। আগের জোট সরকার জনগণকে বিদ্যুত্ দিতে পারেনি। মহাজোট ক্ষমতায় এলে বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধানে কাজের কাজ কিছু হবে, উত্পাদন বাড়বে—এ আশ্বাসে ভরসা রাখা ছাড়া জনগণের সামনে আর কোনো পথ ছিল না। জনগণ তাদের ক্ষমতায় এনেছে, সরকারও তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মাথায় একটি পরিকল্পনাও হাজির করেছে। আগামী সাড়ে চার বছরে চার হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের একটি পরিকল্পনার কথা গত জুলাই মাসে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। সবই আশার কথা। কিন্তু কাজের গতি আর ধারা বিবেচনায় নিলে মনে হবে, এ আশা দুরাশায় পরিণত হতে যাচ্ছে। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র নিয়ে যা ঘটছে, তাতে এমন মনে হওয়াই স্বাভাবিক। সিদ্ধিরগঞ্জের ৩০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্লান্টের জন্য দরপত্র চাওয়া হয়েছিল প্রায় মাস পাঁচেক আগে। এত সময় নিয়েও কারা কাজ পাবে, তা চূড়ান্ত করা যায়নি। কারণ কাজ পেতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে তদবিরে শক্তভাবে মাঠে রয়েছে ক্ষমতাবান আর প্রভাবশালী চক্র। এই সব চক্রের কমিশন ও ভাগবাটোয়ারার লড়াইয়ে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাকা কবে ঘুরবে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে ঝুলছে।
৩০ অক্টোবরের মধ্যে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র-প্রক্রিয়া শেষ করতে না পারলে নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার বাতিল হয়ে যাবে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত গত সোমবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সিনোহাইড্রোকে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব প্রস্তুত করতে যাচ্ছে পিডিবির অধীন ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (ইজিসিবি)। অথচ সিনোহাইড্রোর বিরুদ্ধে দরপত্রের সঙ্গে জাল সনদ ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে দুজন সদস্য এই কোম্পানিকে অযোগ্য ঘোষণা করে লিখিত আপত্তি দেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবেই যে একজনকে পরে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়, তা অনুমান করা যায়। এরপর গত বুধবার প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সদস্য অসভালডো এ জুভিয়ের লিখিত আপত্তি দিয়ে সিনোহাইড্রোকে কাজ দেওয়ার প্রস্তাবে সই করেন। এরপর তাঁকেও কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। এত কিছুর পরও যখন এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার তোড়জোড় চলছে, তখন বোঝা যায় যে এর পেছনে কোনো স্বার্থ কাজ করছে; আর যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরা কতটা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান।
সিদ্ধিরগঞ্জের এই বিদ্যুত্ উত্পাদন প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম বিদ্যুত্ খাতে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাংক। অর্থ জোগানদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাংক টেন্ডার-প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়টি ও নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতার বিষয়টি যাচাই করে দেখবে। এখন ইজিসিবি যদি জাল সনদ ও মিথ্যা তথ্য দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব চূড়ান্ত করে, তবে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে তা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দরপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর চারটি কোম্পানি সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান অযোগ্য বিবেচিত হলে পর্যায়ক্রমে পরবর্তী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একে একে বিবেচনায় নেওয়ার কথা। শেষ পর্যন্ত যদি সব কটি প্রতিষ্ঠানই অযোগ্য বিবেচিত হয়, তখন নতুন দরপত্র আহ্বানের প্রশ্ন আসতে পারে। কিন্তু একটি অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার খেসারত হিসেবে যদি দরপত্র বাতিল করে তা করতে হয়, সেটি এক বড় সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমান দরপত্র অনুযায়ী, কাজ পাওয়ার ২২ মাসের মধ্যে বিদ্যুেকন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। নতুন দরপত্র ডাকতে হলে এর সঙ্গে আরও ১২ মাস যোগ করতে হবে। ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য আরও অন্তত ৩৪ মাস অপেক্ষা করতে হবে।
ভাগবাটোয়ারার লড়াইয়ে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র-প্রক্রিয়া নিয়ে যা হচ্ছে, তাতে সরকার তার বিদ্যুত্ উত্পাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবে, সে আশায় ভরসা রাখা।

দেওয়ালি উদ্যাপন করলেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা

আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদীপ জ্বালিয়ে হোয়াইট হাউসে দীপাবলি বা দেওয়ালি উত্সব উদ্যাপন করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এ সময় বিশ্বশান্তি কামনায় প্রার্থনা করেন সমবেত ব্যক্তিরা। বারাক ওবামা প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ব্যক্তিগতভাবে এই উত্সবে যোগ দিলেন।
হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক ইস্ট রুমে এই দেওয়ালি উত্সব অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সমবেত লোকজনের উদ্দেশে প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, বিশ্বের কয়েকটি মহান ধর্ম বিশ্বাসের মানুষ মন্দের ওপর ভালোর বিজয় উদ্যাপন করছেন।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি হিন্দু, শিখ ও জৈন ধর্মাবলম্বী দিওয়ালি উত্সব পালন করে থাকেন।

চীনা সেনাদের ভয়ে ৪৭ বছর ঘরবন্দী!

চীনা সেনাদের ভয়ে প্রায় অর্ধশত বছর একটি ঘরে কাটিয়ে দিয়েছেন। ঘর থেকে একবারের জন্যও বাইরে পা রাখেননি। নাওয়া-খাওয়া সবই ওই ঘরের ভেতর। ভাবা যায়! আশ্চর্যজনক মনে হলেও ঘটনা সত্য। স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা এমন একজন মানুষের সন্ধান মিলেছে ভারতের আসাম রাজ্যে। তাঁর নাম থুলা বরা।
তখন ১৯৬২ সাল। চীন-ভারত যুদ্ধ চলছে। ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ঢুকে পড়েছে চীনের লাল ফৌজ। এ খবর পৌঁছে যায় আসামেও। এ-কান ও-কান ঘুরে তা পৌঁছে আসামের শোণিতপুর জেলার দেউটি গ্রামের ১৬ বছরের কিশোর থুলা বরার কানে। তাঁর দেউটি গ্রাম আসামের তেজপুর শহরের কাছেই। দু-এক দিনের মধ্যে চীনের সেনারা আসামে হানা দেবে—এ খবরে এলাকার মানুষজন ব্রহ্মপুত্র নদীর পাড় হয়ে ছুটতে থাকে আসামের রাজধানী গুয়াহাটির দিকে।
থুলা বরা তখন সবে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেছেন। পালাতে পারেনি তাঁর পরিবারের সদস্যরা। বাড়ির মধ্যে একটি কুঠুরিতে লুকিয়ে পড়েন থুলা। ওই কুঠুরিতেই পার হয়ে যায় ৪৭ বছর। এখন তাঁর বয়স ৬৩ বছর।
থুলার ভাই বলেন, ‘একবারের জন্যও ওই কুঠুরি থেকে বাইরে আসেননি থুলা। মায়ের মৃত্যুর খবরেও না। আমার বিয়ের দিনও না। তাঁর জন্য ওখানেই খাবার রেখে আসা হতো। ওখানেই তাঁর নাওয়া-খাওয়া, ঘুম যাওয়া, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া। তিনি কবিতা লিখতেন। এখন স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে। বেশ কয়েকবার চিকিত্সক দেখাতে চেয়েছি। তিনি একদম রাজি হননি।’
থুলা বরার স্বেচ্ছাবন্দিদশার খবর শুনে সত্যেন গোস্বামী নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা সম্প্রতি তাঁর বাড়িতে যান। চীনা লাল ফৌজ চলে গেছে সেই কবে—এ কথা তাঁকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিয়ে আসেন চার দেয়ালের বাইরে।

স্ট্যানচার্ট অগ্রাধিকার কেন্দ্র ধানমন্ডিতে নতুনভাবে চালু হলো

গ্রাহক ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সম্প্রতি ধানমন্ডি প্রায়োরিটি সেন্টার নতুনভাবে চালু করল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক।
নতুন এই কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের কনজ্যুমার ব্যাংকিং প্রধান সন্দ্বীপ বোস। ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চারটি প্রায়োরিটি ব্যাংকিং সেন্টার রয়েছে, যার তিনটি ঢাকায় (গুলশান, ধানমন্ডি ও উত্তরা) এবং একটি চট্টগ্রামে (নাসিরাবাদ) অবস্থিত।

আইসিবি সিকিউরিটিজের নবম এজিএম অনুষ্ঠিত

আইসিবি সিকিউরিটিজ ট্রেডিং কোম্পানির নবম বার্ষিক সাধারণ সভা কোম্পানির পর্ষদ কক্ষে গত সোমবার অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারপারসন দীনা আহসান। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী ছানাউল হক, পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডাররা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, কোম্পানি ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সাত হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সর্বমোট ৫২৪ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন করে। গত অর্থবছর কোম্পানি সর্বমোট ১৮ দশমিক ৭৯ কোটি টাকার নিট মুনাফা অর্জন করে, যা বিগত বছরের তুলনায় ১৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি।
সভায় শেয়ারহোল্ডাররা ২০০৮-০৯ অর্থবছরে কোম্পানির নিট অর্জিত মুনাফা ১৮ দশমিক ৭৯ কোটি টাকা থেকে লভ্যাংশ বাবদ ১০০ শতাংশ বোনাস শেয়ার অনুমোদন করেন।

কৃষিঋণ দেওয়া হবে প্রকাশ্যে -রাজশাহীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান বলেছেন, কৃষিঋণ দেওয়া হবে প্রকাশ্যে। কৃষকেরা এই ঋণ পেতে যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং এই ঋণের টাকা তাঁরা কীভাবে কোথায় খাটাচ্ছেন, তা দেখার জন্য তিন স্তরের তদারকির ব্যবস্থা করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজশাহী কার্যালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় আতিউর রহমান এসব কথা বলেন।
রাজশাহীকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এলাকা উল্লেখ করে আতিউর রহমান বলেন, রাজশাহীর মাটি কৃষির জন্য খুবই উর্বর। কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য রাজশাহী শক্তিশালী স্তম্ভ হতে পারে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ না থাকার কারণে এখানে বড় বিনিয়োগ সম্ভব হয় না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ‘কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। কৃষিতে সাফল্যের কারণে আমাদের খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে না। বিশ্বমন্দার মধ্যেও বাংলাদেশ টিকে আছে। দেশের ব্যাংকিং খাতগুলো স্থিতিশীল আছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নয় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।’
আতিউর রহমান আরও বলেন, এবার ঋণগ্রহীতা কৃষকদের মোবাইল নম্বর অবশ্যই জমা দিতে হবে। পরে সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখা হবে, তাঁরা এই ঋণের টাকা কীভাবে খাটাচ্ছেন।
কৃষিঋণ পেতে হয়রানি বন্ধের আশ্বাস দিয়ে আতিউর রহমান বলেন, এবার প্রকাশ্যে কৃষিঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে কৃষকের ঋণের টাকা অন্যের পকেটে না যায়। একবার কোনো কৃষক ঋণ পেলে ওই কাগজ দিয়েই তিনি তিন বছর পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন—এমন ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রশ্নে গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক শিগগিরই ই-ব্যাংকিং চালু করতে যাচ্ছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে অন্যদের মধ্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক এস এম মনিরুজ্জামান, উপমহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান এবং এস এম রবিউল হাসান।
পরে আতিউর রহমান রাজশাহী সিটি করপোরেশন আয়োজিত এক নাগরিক মতবিনিময় সভায় যোগ দেন। আজ শুক্রবার তাঁর নাটোরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গভর্নর গতকাল রাজশাহীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা কার্যালয় পরিদর্শন এবং অন্যান্য কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকালে কার্যালয় চত্বরে বৃক্ষ রোপণ করেন। এরপর তিনি রাজশাহী অফিসের বিভিন্ন শাখা পরিদর্শন করেন। তিনি ব্যাংকের সভাকক্ষে সর্বস্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সব সংগঠনের সভাপতি ও সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বেলা ১১টায় তিনি রাজশাহী শিল্প ও বণিক সমিতি এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এরপর রাজশাহী অঞ্চলের বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রধান ও ব্যাংকের প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী জাপানি শিল্পোদ্যোক্তারা- ঢাকায় তিন দিনের জাপান বাণিজ্য মেলা শুরু হয়েছে

বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন জাপানি শিল্পোদ্যোক্তারা। তাঁরা বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতেও আগ্রহী। এরই অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী জাপান বাণিজ্য মেলা।
শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া সকালে প্রধান অতিথি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করেন। মেলার আয়োজক জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সভাপতি আবদুল হক এতে সভাপতিত্ব করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত তামোতসু শিনোতসুকা, জাপান-বাংলাদেশ জয়েন্ট কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (জেবিসিসিইসি) চেয়ারম্যান তোশিহিতো তাম্বা এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি আনিসুল হক।
শিল্পমন্ত্রী বলেন, শিল্প খাতে উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করতে শিল্পনীতিতে সুযোগ রাখা হচ্ছে। তিনি দেশের জাহাজ নির্মাণ, সিরামিক, অটোমোবাইল, ওষুধ, প্লাস্টিক, পাট ও চামড়া খাতে বিনিয়োগ করার জন্য জাপানি বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানান।
এটি চতুর্থ জাপান বাণিজ্য মেলা। মেলা চলবে কাল শনিবার পর্যন্ত। মেলায় জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশি এজেন্ট এবং জাপানে পণ্য ও সেবা রপ্তানিকারক বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ ৩৫টি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করছে।
এর আগে গত বুধবার এফবিসিসিআই ও জেবিসিসিইসির যৌথ উদ্যোগে রাজধানীর একটি হোটেলে জেবিসিসিইসির ১৫তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে জাপানের শিল্পোদ্যোক্তারা অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হিসেবে অভিহিত করেন।
উদ্যোক্তারা পরিসংখ্যান দিয়ে বলেন, এ দেশে অফিস স্থাপন করতে নয়টি সংস্থা থেকে অনুমতি নিতে হয়। একটি ব্যাংক হিসাব খুলতে তিন মাস লাগে। ভিসা ও কাজের অনুমতি পেতে তিন মাস পর্যন্ত লাগে।
তবে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুত্ ও বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি অন্যান্য সমস্যার সমাধান করলে জাপান থেকে প্রচুর বিনিয়োগ আসবে বলেও উদ্যোক্তারা উল্লেখ করেন।
জাপানি উদ্যোক্তারা আরও জানান, বাংলাদেশে সস্তায় দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যায়। তাই এ দেশে শ্রমঘন শিল্প স্থাপনের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের শ্রমিকদের খুব সহজেই প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করা যায় বলে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি রয়েছে।
বাংলাদেশে শ্রমঘন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে জাপানি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী—এ কথা জানিয়ে আরও বলা হয়, বিদ্যুত্ ঘাটতি এ দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে।
বৈঠকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা আরও বলেন, জাপানের ভিসার জন্য নিরাপত্তা প্রত্যয়নপত্র পেতে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। যদিও এ জাতীয় কাগজপত্র ইস্যুর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া থাকলেও তা অনুসরণ করা হয় না। তাঁরা এ বিষয়ে সরকারকে দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানান।

দ্রাবিড় বাদ, প্রসাদ-রবিন বরখাস্ত

ফেরাটা যেমন চমকে দিয়েছিল, তেমনি বিস্ময় জাগাল রাহুল দ্রাবিড়ের আবার বাদ পড়াটাও। দক্ষিণ আফ্রিকার বাউন্সি উইকেটের কথা ভেবে প্রায় দুই বছর পর তাঁকে ওয়ানডে দলে নেওয়া হয়েছিল। এভাবে তাঁকে ফিরিয়ে আনায় অনেকেই তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন। দলে ফিরে ছয় ম্যাচের যে পাঁচ ইনিংসে ব্যাট করেছেন, তাতে রান করেছেন ১৪, ৪৭, ৩৯, ৭৬ ও ৪। এমন পারফরম্যান্সের পরও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচের ভারতীয় দলে রাখা হয়নি ‘দ্য ওয়াল’কে। ২৫ অক্টোবর শুরু হচ্ছে ৭ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ।
যে কারণে দলে ফিরেছিলেন, ধারণা করা হচ্ছে, সেই উইকেটের কারণেই আবার বাদ পড়লেন। ওয়ানডে সিরিজটি হবে ভারতের নিষ্প্রাণ ব্যাটিং উইকেটে। এ জন্য আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যানদেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দলে জায়গা হারিয়েছেন দিনেশ কার্তিক, রুদ্রপ্রতাপ সিং, ইউসুফ পাঠান ও অভিষেক নায়ার। দ্রাবিড় ও কার্তিকের জায়গায় ভারত ফিরে পেয়েছে ইনজুরি কাটিয়ে ওঠা যুবরাজ সিং ও বীরেন্দর শেবাগকে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক কোহলি টিকে গেছেন। ইউসুফের জায়গা নিয়েছেন আরেক স্পিনিং অলরাউন্ডার রবীন্দ্র জাদেজা, রুদ্রপ্রতাপ সিংয়েরটা মুনাফ প্যাটেল। আর নায়ারের বদলে প্রথমবারের মতো দলে ডাক পেয়েছেন উত্তর প্রদেশের ২২ বছর বয়সী পেসার সুদীপ তিয়াগি।
চমক ছিল আরও। বরখাস্ত হয়েছেন দলের বোলিং কোচ ভেঙ্কটেশ প্রসাদ ও ফিল্ডিং কোচ রবিন সিং।

পাকিস্তানে কয়েকটি পুলিশ স্থাপনায় সন্ত্রাসী হামলা, ২৬ জন নিহত

পাকিস্তানের লাহোর ও কোহাটে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয় ও তিনটি পুলিশ একাডেমিতে সন্ত্রাসী হামলায় কমপক্ষে ২৬ জন নিহত হয়েছে। খবর বিবিসি অনলাইনের।
সন্ত্রাসীরা এ হামলায় গ্রেনেড ব্যবহার করে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন পুলিশের একজন কর্মকর্তা। গোয়েন্দা সংস্থার এই কার্যালয়ে প্রায় ৫০০ জন লোক কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, ভবনের ভেতরের সবাই নিরপদে আছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার লাহোরের মানওয়ান ও বেদিয়া নামের দুটি পুলিশ একডেমিতে পৃথক হামলা চালানো হয়েছে। সন্ত্রাসীরা গ্রেনেড ও আস্ত্র নিয়ে এ দুটি পুলিশ একাডেমিতে হামলা চালায়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তারক্ষীরা এই হামলা দুটি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিল। এ তিনটি হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়।
কোহাটে আরেকটি পুলিশ একাডেমিতে গাড়িবোমা বিস্ফোরণে কমপক্ষে আটজন নিহত হয়েছে।
এখন পর্যন্ত কেউ এই হামলাগুলোর দায়দায়িত্ব স্বীকার করেনি। তবে এ হামলার পেছনে তালেবানদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন পাকিস্তানের গোয়েন্দারা। কারণ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে সেনা অভিযান বন্ধ না করলে নিরাপত্তারক্ষীদের ওপর হামলা করার হুমকি দিয়েছিল তালেবানরা।

আগ্রায় আজ ভারত-মার্কিন বিমান মহড়া

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের আগ্রায় আজ বৃহস্পতিবার থেকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১০ দিনব্যাপী ভারত-মার্কিন বিমান মহড়া ‘কোপ ইন্ডিয়া’। চলবে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত। গত মঙ্গলবার দিল্লিতে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টিমোথি জে রোমের এ কথা জানিয়েছেন। কীভাবে বিপর্যয় মোকাবিলা এবং মানবিক সাহায্য করা যায়, তাই নিয়ে এ বিমান মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে। এ মহড়ার মধ্য দিয়ে ভারত-মার্কিন বন্ধুত্ব আরও জোরদার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
এ বিমান মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর ১৫০ জন সদস্য যোগ দেবেন। এ ছাড়া এ মহড়ায় ব্যবহার করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩০-হারকিউলিস, গ্লোব মাস্টার-১১১ ও সি-১৩০ জে বিমান।
অন্যদিকে ভারতের পক্ষে অংশ নেবে আইএল-৭৬ গজরাজ, এএন সুতলেজ, এমআই-১৭ প্রতাপ ও চেতক হেলিকপ্টার।

দ. কোরিয়ায় একসঙ্গে সাড়ে সাত হাজার যুগলের বিয়ে

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে সাড়ে সাত হাজার যুগল গতকাল বুধবার একসঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ওই এলাকার বহুল আলোচিত একটি গির্জা এ গণবিয়ের আয়োজন করে। বিয়েতে অংশ নেওয়া বর-কনেরা সুদূর আমেরিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ, আফ্রিকা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ শতাধিক দেশের নাগরিক। বহু বছর ধরেই ওই গির্জা কর্তৃপক্ষ এমন বিয়ের আয়োজন করে আসছে। বর-কনেরা ওই গির্জা কর্তৃপক্ষের মতবাদে বিশ্বাসী।
৮৯ বছর বয়সী রেভারেন্ড সান মিয়ুং মুন ‘বিতর্কিত’ ওই গির্জার প্রতিষ্ঠাতা। গতকাল তাঁর তত্ত্বাবধানেই সিউলের দক্ষিণের আসান শহরের সান মুন বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাসে ওই বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়টিও ওই গির্জার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
গির্জা কর্তৃপক্ষ মনে করে, মুন এবং স্ত্রী হান হাক-জা হলেন এই বিশ্বে ‘মানবজাতির আসল অভিভাবক’। তাঁদের ভাষ্যমতে, মুন হলেন রাজাধিরাজ। গতকাল মুন এবং তাঁর স্ত্রী হান কয়েক ডজন বর-কনের ওপর পবিত্র পানি ছিটিয়ে দিয়ে তাঁদের আশীর্বাদ করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি ঘোষণা করছি, এই যুগলেরা পবিত্র বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।’ ৯০ মিনিটের ওই বিয়ের অনুষ্ঠানটি ইন্টারনেটে সম্প্রচার করা হয়েছে।
গতকাল অনুষ্ঠিত ওই গণবিয়েতে অংশ নেওয়া কনেরা পরেছিলেন সাদা পোশাক আর বরেরা পরেছিলেন কালো স্যুট ও সাদা শার্ট। অনেকে পরেছিলেন কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী জমকালো পোশাক।
১৯৫৪ সালে ওই গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই গির্জাটির নাম বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে শতাধিক দেশে ওই গির্জার কার্যক্রম চলছে। ষাটের দশকে মুন এসব গণবিয়ের আয়োজনে নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করেন। অতীতে বর-কনে বাছাইয়ের কাজও করতেন মুন নিজে। এখন অবশ্য বর-কনেরা নিজেরা পছন্দ করে সঙ্গী নির্বাচন করতে পারছেন।

২০১১ বিশ্বকাপের ফাইনাল মুম্বাইয়ে

২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক ভারত টুর্নামেন্টের ফাইনালসহ মোট ২৯টি ম্যাচ আয়োজন করবে ৮টি ভেন্যুতে। কাল বিশ্বকাপের আট ভেন্যুর নাম ঘোষণা করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। ফাইনাল হবে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। মুম্বাই ছাড়াও ভারতে হওয়া বিশ্বকাপের অন্য সাত ভেন্যু হলো মোহালি, আহমেদাবাদ, দিল্লি, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, নাগপুর ও কলকাতা।
ফাইনালসহ বিশ্বকাপের মোট তিনটি ম্যাচ হবে মুম্বাইয়ে। একটি সেমিফাইনালসহ তিন ম্যাচ হবে মোহালিতেও। আহমেদাবাদ আয়োজন করবে একটি কোয়ার্টার ফাইনালসহ তিন ম্যাচ। তবে যেসব ভেন্যু নকআউট পর্ব পাচ্ছে না তাদের একটি করে মোট চারটি ম্যাচ বেশি দেওয়া হয়েছে। অর্থাত্ চারটি করে ম্যাচ পাচ্ছে দিল্লি, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, নাগপুর ও কলকাতা।
ভারত ছাড়াও বিশ্বকাপের অন্য দুই সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ বিশ্বকাপের ১২ ও ৮টি ম্যাচের আয়োজক। আগামী ৯ নভেম্বর মুম্বাইয়ে ঘোষণা করা হবে ১৪ দেশের এই টুর্নামেন্টের সূচি।

আজ শুরু বয়সভিত্তিক সাঁতার

মিরপুর সুইমিং কমপ্লেক্সে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ২৫তম জাতীয় বয়সভিত্তিক সাঁতার। চলবে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত। কিন্তু হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে দায়সারা গোছেরই আয়োজন করতে যাচ্ছে সাঁতার ফেডারেশন। সাঁতার কমপ্লেক্সের সামনে একটা ব্যানার ছাড়া আর কোনো প্রচার-প্রচারণাই চোখে পড়েনি।
দেশের প্রতিটি জেলা ক্রীড়া সংস্থা, বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা, সুইমিং ক্লাব, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড ও অন্যান্য সার্ভিসেস দলের মোট ৬০০ জন সাঁতারু অংশ নিচ্ছেন এই প্রতিযোগিতায়।

হকি খেলোয়াড়দের অবসরের হুমকি

জার্মানি থেকে তাঁদের ফেরার কথা ছিল আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে। তবে শোনা যাচ্ছে, কোচ পিটার গেরহার্ডের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় আগেই দেশে ফিরে আসতে হয়েছে খন্দকার মাহমুদুল হাসান ও রিমন কুমারকে। গত ১২ অক্টোবর জার্মানি থেকে দেশে ফিরেছেন এই দুই হকি খেলোয়াড়।
দেশে ফিরেই জাতীয় দল থেকে অবসরের হুমকি দিয়ে বসেছেন হাসান ও রিমন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন জাহিদুল ইসলাম রাজনও। দক্ষিণ এশীয় গেমসে ভালো ফলের প্রত্যাশায় জাতীয় দলের ১৯ জন খেলোয়াড়ের জন্য দলবদলের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে ফেডারেশন। কিন্তু হাসানের অভিযোগ, ‘জার্মানিতে যাওয়ার আগে ফেডারেশন আমাদের কথা দিয়েছিল দলবদল করতে পারব। এখন দেখছি ঠিক উল্টো। এদিকে জার্মানিতেও আমরা যেসব ক্লাবে খেলেছি সেখান থেকে আশানুরূপ টাকা পাইনি। আবার দলবদলও যদি না করতে পারি, তাহলে দুদিক থেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হব। দু-একটা ক্লাব এরই মধ্যে আমার সঙ্গে কথাবার্তাও বলেছে। এখন আমি ভাবছি দলবদল না করতে পারলে অবসরই নেব।’
শোনা যাচ্ছে, জার্মানিতে অবস্থানরত শীর্ষ সারির অনেক খেলোয়াড়ই ফেডারেশনের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ। তাঁরাও দেশে ফিরে অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

গেইলরা ফিরছেন আগামী মাসে

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড (ডব্লুআইসিবি) আর তাদের খেলোয়াড়দের সংগঠনের (ডব্লুআইপিএ) মধ্যে দূরত্বটা বেড়ে যাচ্ছিল। এতটাই যে দুই পক্ষ এক হয়ে কোনো কাজ করতে পারে—কদিন আগেও এমনটা ভাবা ছিল দুরাশা। এই পরিস্থিতিতে যৌথ বিবৃতি দেওয়া নিঃসন্দেহে সুখবর। আরও সুখের খবর হলো, যৌথ বিবৃতিতে দুই পক্ষের মধ্যে চলমান সংকট নিরসনের আশাবাদ জানানো হয়েছে।
পরশু জানানো হয়েছে, তিন মাস ধরে চলা ক্রিকেটার বনাম বোর্ডের দ্বন্দ্ব সমাধানের পথে। আগামী মাসে অস্ট্রেলিয়া সফরেই ফিরবেন গেইল, চন্দরপলরা। এই সফরে তিনটি টেস্ট খেলবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এরপর ফেব্রুয়ারিতে আবারও ৫টি ওয়ানডে আর ২টি টি-টোয়েন্টি খেলতে যাবে তারা।
‘ডব্লুআইসিবি আর ডব্লুআইপিএ জানিয়েছে, চলমান বিতর্কের প্রায় সবগুলোই শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা হয়েছে। যে কটি বিষয় বাকি আছে সেগুলোও মিটিয়ে ফেলার প্রক্রিয়া চলছে। দুই পক্ষই সন্তুষ্ট যে এমন একটা ঐকমত্যে পৌঁছানো গেছে, যার ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য একসঙ্গে কাজ করার একটা কার্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে’—ওই বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
গত জুলাই থেকে গেইল, চন্দরপলসহ ওয়েস্ট ইন্ডিজের তারকা ক্রিকেটাররা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে বোর্ডের সঙ্গে দরকষাকষি করছেন। গেইলদের অনুপস্থিতিতে সফর করা বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টেস্ট-ওয়ানডে দুই সিরিজেই হোয়াইটওয়াশ করেছে। এর পর ফ্লয়েড রেইফারের নেতৃত্বেই খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজ খেলতে যায় চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে।
২৬ নভেম্বর ব্রিসবেনে শুরু হবে প্রথম টেস্ট। ওই টেস্টেই গেইলদের আবার দেখা যাবে বলে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে (সিএ) আশ্বস্ত করেছে ডব্লুআইসিবি। সমঝোতার প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়ে সিএর প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড বলেছেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটটাই সেরাদের সঙ্গে সেরাদের লড়াই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আমরা একটা দারুণ উত্তেজনাকর গ্রীষ্মের অপেক্ষায় আছি। এরপর দারুণ প্রতিভাবান পাকিস্তান দলও খেলবে আমাদের বিপক্ষে।’