Monday, February 19, 2018

মঙ্গলগ্রহে মিশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইল

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর বা গাজা নয়, এবার সরাসরি মঙ্গল গ্রহের দিকে চোখ দিয়েছে ইসরাইল। তারা মঙ্গলগ্রহেও ভবিষ্যতে সফরে যেতে চায়। সফরে যাওয়া মানে মহাকাশ গবেষণায় নিজেদের আধিপত্য জানানা দেয়া। এ জন্য তারা কয়েকজন বিজ্ঞানীকে চার দিনের একটি মিশন প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বেছে নেয়া হয় নেগেভ মরুভূমি। তার ভিতরেই ওই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
মিটজপে র‌্যামন এলাকার ওই মরুভূমিটি অনেকটাই মঙ্গলগ্রহের মতো দেখতে। মঙ্গলে বসবাসের পরিবেশ কেমন হতে পারে, জীবন ধারণ কেমন হতে পারে এমন সব বিষয়ে সেখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ইসরাইলের ৬ বিজ্ঞানীর একটি দল। এ তথ্য জানিয়েছে ইসরাইলের বিজ্ঞান ও প্রযুুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, ওই মরুভূমির ভূপ্রকৃতি ও প্রাসঙ্গিক সব কিছুই মঙ্গলগ্রহের মতো। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে অনুসন্ধান করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা যাচাই করে দেখেছেন সেখানকার স্যাটেলাইট যোগাযোগ। নিঃসঙ্গ অবস্থায় মানসিক প্রতিক্রিয়া কি হয়। তেজষ্ক্রিয়তার পরিমাণ কি ও তার প্রতিক্রিয়া কেমন হয়। মাটিতে জীবনের অস্তিত্ব কিভাবে খোঁজা হয়। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রফেসর গাউ রন বলেন, মঙ্গল গ্রহে ভবিষ্যত মিশনের ধরণ সম্পর্কে জানাই তাদের উদ্দেশ্য নয়। এক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করাও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তৈরি পোশাক শিল্পে স্বয়ংক্রিয় রোবটের হানা

ঢাকার মোহাম্মদি ফ্যাশন সোয়েটার্স লিমিটেডের কারখানা। অনবরত কালো সোয়েটার বুনন করে চলছে ১৭৩টি জার্মানিতে নির্মিত মেশিন। পাশে দাঁড়িয়ে দেখছেন কয়েক ডজন কর্মী। মাঝেমাঝে মেশিন পরিষ্কার করছেন কর্মীরা। কিন্তু এর বাইরে করার মতো তাদের কোনো কাজ নেই বললেই চলে।
কয়েক বছর আগের তুলনায় এই পরিবর্তনকে বড়ই বলতে হবে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা করে এই সোয়েটার বুননের কাজ করতো কয়েকশ’ শ্রমিক।
কিন্তু ২০১২ সালের পর থেকেই মোহাম্মদি গ্রুপের মালিকগোষ্ঠী কর্মী ছাঁটাই শুরু করলেন। তাদের পরিবর্তে এই কাজ করতে লাগলো মেশিন। গত বছর নাগাদ দেখা গেল বুননের পুরো কাজই করছে স্বয়ংক্রিয় মেশিন।
এইচঅ্যান্ডঅ্যাম ও জারার মতো পশ্চিমা ব্রান্ডের জন্য সোয়েটার বানায় মোহাম্মদি গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক বলেন, ‘নিজেদেরকে শ্লথ করার বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি প্রয়োগ না করার কোনো কারণ দেখি না।’ তিনি জানান, প্রায় পাঁচশ’ শ্রমিককে ছাঁটাই করে মেশিন বসানো হয়েছে তার কারখানায়। কিনতে পারেন আরও মেশিন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে এই স্বয়ংক্রিয়তা বা অটোমেশনের প্রভাব নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের শিরোনামেই বলে দেয়া আছে সবকিছু। ‘দ্য রোবটস আর কামিং ফর গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স। দ্যট’স গুড ফর দ্য ইউএস, ব্যাড ফর পুর কান্ট্রিজ’ (গার্মেন্ট শ্রমিকদের হটাতে আসছে রোবট। এটা আমেরিকার জন্য ভালো, কিন্তু গরীব দেশগুলোর জন্য খারাপ।)
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বল্পমজুরির শ্রমিকরাও অটোমেশনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নন। কারণ, এখন মেশিন ও রোবট এমন সব শিল্পে পৌঁছে গেছে, যেগুলোকে আগে অটোমেশনের ধরাছোঁয়ার বাইরে ভাবা হতো। তৈরি পোশাক শিল্প কিন্তু গাড়ি বা ইলেক্ট্রনিকস নির্মান শিল্পের মতো নয়। ফলে এই শিল্প অটোমেশন থেকে সুরক্ষিত বলে মনে হতো। কাপড় নিয়ে যেকোনো কাজই বেশ কঠিন। ফলে মেশিনের চেয়ে মানুষের হাতেই এসব কাজ ভালো হতো। এছাড়া বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও চীনে এই শিল্পে এত বেশি সস্তা মজুরির শ্রমিক কাজ করতো যে, তৈরি পোশাক কারখানায় স্বয়ংক্রিয়তার ছোঁয়া আনার তাগিদ অত বোধ হতো না।
কিন্তু শ্রমিকের ব্যয় বাড়ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও। অপরদিকে প্রযুক্তি এত অগ্রসর হচ্ছে যে, মেশিনও এখন অনেক কঠিন কাজ করতে শিখে গেছে। নরম কাপড়ের ওপর কাজ করা, পকেট সেলাই করা, প্যান্টে বেল্ট লুপ যুক্ত করার মতো কাজ এখন মেশিন দিয়ে করা সম্ভব। ফলে তৈরি পোশাক শিল্পের অর্থনীতিই উলটপালট হয়ে যাচ্ছে। বহু গরিব দেশের (বিশেষ করে এশিয়ার) অর্থনীতিতে এই শিল্পই প্রধান ভূমিকা রেখে আসছে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) একটি গবেষণায় অনুমান করা হয়, অটোমেশন যে হারে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে এশিয়ার কিছু দেশে বস্ত্র, বয়ন ও তৈরি পোশাক সংশ্লিষ্ট উৎপাদন খাতের ৮০ শতাংশেরও বেশি কর্মসংস্থান হারিয়ে যাবে।
আমেরিকার প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি’র এমআইটি ইনিশিয়েটিভ অন দ্য ডিজিটাল ইকোনমি’র পরিচালক এরিক ব্রায়ানজোলফসন বলেন, ‘আমি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিয়ে চিন্তিত। এই অটোমেশন বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এসব দেশ।’ কারণ, দরিদ্র দেশে অবস্থিত কারখানায় পুনরাবৃত্তিমূলক যেসব কাজ শ্রমিকরা করতো এতদিন, তা করা শিখছে রোবট। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে বেশিরভাগ চাকরি পেতে হলে খুবই উচ্চমানের দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। এসব জায়গায় উন্নত দেশগুলোই ভালো করবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সমস্যার রূপ পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, বাংলাদেশে যে হারে শ্রমিক বাড়ছে, সেই হিসাবে তাল মেলাতে হলে প্রতি বছর ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে দেশটিকে। আর এক্ষেত্রে বস্ত্রখাতই সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী, গার্মেন্ট ও বস্ত্র খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সংখ্যা বছরপ্রতি ৬০ হাজারে নেমে এসেছে। অথচ, ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্তও প্রতি বছর ৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এই শিল্প। সরকারী পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই শিল্পের বড় অংশ মৌলিক বস্ত্র উৎপাদন খাতে ইতিমধ্যেই কর্মসংস্থান কমা শুরু হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের তৈরি পোশাক উৎপাদন কিন্তু কমেনি, বরং বাড়ছে ক্রমাগত। স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, অটোমেশনই শ্রমিকদের স্থান পূরন করছে। ফলে কমছে না উৎপাদন। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যভাগে, বাংলাদেশের বার্ষিক তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১৯.৫ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এই সময়ে চাকরি বেড়েছে মাত্র ৪.৫ শতাংশ।
বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আপনি যদি তরুণদেরকে উৎপাদনশীল কর্মে সম্পৃক্ত করাতে না পারেন, তারা কিছু একটা করবে। আর তারা যা করবে সেটা হয়তো সামাজিকভাবে সুখকর হবে না। সমাজের জন্য এটা একটা টাইম বোমা।’
তবে অটোমেশনের উপকারী দিক অবশ্যই আছে। কিন্তু তা শুধু ধনী দেশগুলোর জন্য। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি হওয়ায়, জিন্স ও অন্যান্য ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ পণ্যের দাম আরও সস্তা হবে। এমনকি তৈরি পোশাক শিল্পের উৎপাদন খাতের কিছু অংশ ফের চলে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র সহ ব্যয়বহুল শ্রমবাজারে।
পোশাক কারখানার জন্য বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় মেশিন তৈরি করে আমেরিকার আটলান্টা-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার অটোমেশন। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তাদের ‘সিউবোট’ বা সেলাই করার মেশিন আগামী মাসেই ব্যবহৃত হবে আরকানসাসের লিটল রকে অবস্থিত চীনের বস্ত্র উৎপাদক প্রতিষ্ঠান তিনইয়ুয়ান গার্মেন্টসের একটি কারখানায়। বিশ্ববিখ্যাত জুতো ও ক্রীড়া পোশাক তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস সম্প্রতি জার্মানিতে ‘স্পিডফ্যাক্টরি’ একটি জুতা কারখানা খুলেছে। এই কারখানায় স্বল্প মজুরির শ্রমিক নয়, ব্যবহৃত হবে কম্পিউটার চালিত স্বয়ংক্রিয় বুনন প্রযুক্তি।
অটোমেশনে উন্নয়ন দেশগুলো সুবিধা পেলেও, কপাল পুড়ছে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র্য দেশের শ্রমিকদের। নাজমা আক্তার নামে বাংলাদেশের একজন ইউনিয়ন নেতা বলেন, অটোমেশনের ফলে যেই টাকা বেঁচে যাচ্ছে, তার কারণেই কারখানা মালিকরা শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি অগ্রাহ্য করার সাহস পাচ্ছেন। তিনি একটি সাম্প্রতিক ঘটনা উদ্ধৃত করে বলেন, একটি কারখানায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলন করলে, মালিকরা হুমকি দেন যে, তাদের পরিকল্পনামত কাজ না করলে, তারা স্রেফ স্বয়ংক্রিয় মেশিন নিয়ে আসবেন। সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট নাজমা আক্তার আরও বলেন, ‘যেসব কারখানায় আগে ৩০০ শ্রমিক ছিল এখন সেগুলোতে ১০০ জন হয়তো আছে।’
কিন্তু দেশের বড় বড় পোশাক কারখানার মালিকরা বলছেন, ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায়, অটোমেশনের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া তাদের বিকল্প কিছু করার নেই।
২০১৩ সালে রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে বাংলাদেশে, তৈরি পোশাক কারখানার নিরাপত্তার ওপর বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিতের খরচ পোশাকের দাম বৃদ্ধি করে পোষানোর চেষ্টা হলেও, সস্তা ফ্যাশনে অভ্যস্ত ক্রেতারা তা মানেননি। তার ওপর, সস্তা মজুরির শ্রমিক সমেত নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোর আবির্ভাবও বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
জারা সহ বড় ফ্যাশন ব্রান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করে বাংলাদেশের ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি প্রধান নির্বাহী মোস্তাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আপনি যদি নিজেকে না পাল্টান, তাহলে আপনি পুরো ব্যবসাই হারাবেন।’ বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তার বহুতলা কারখানায় ব্যবহার করা হয় স্পেনে নির্মিত ফিনিশিং মেশিন। এই মেশিন দেড় ডলারেই পাওয়া যায়। এই মেশিনের মাধ্যমে জিন্সের মধ্যে নজরকাড়া ছিদ্র সৃষ্টি করা যায়। পাশের কারখানায় কয়েক ডজন শ্রমিক এই কাজ করেন। অথচ, তাদের সবার চেয়ে অনেক নিখুঁতভাবে একই পরিমাণ কাজ করে দেয় এই মেশিন। মোস্তাফিজ আরও বলেন, ফিনিশিং দিতে গিয়ে যেসব জিন্স নষ্ট হয়, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেলাই করে দেয়ার জন্য তার কারখানায় আছে আরও ৪টি মেশিন। একটি মেশিন যে পরিমাণ সেলাই করতে পারে, তা ম্যানুয়ালি করতে লাগে ১২ জন মানুষ। তিনি বলেন, ‘মেশিন সবই করতে পারে। আপনি শুধু একে নির্দেশনা দেবেন।’ অটোমেশনের ফলে শ্রমিকরা কর্মসংস্থান হারাচ্ছে, এই অভিযোগ শুনতে অভ্যস্ত তিনি। তার মন্তব্য, ‘আমরা যদি ব্যবসাই বাঁচাতে না পারি, তাহলে বেতন আসবে কোথা থেকে?’
অটোমেশনের ফলে বাংলাদেশ এখনও সস্তা মূল্যে পোশাক রপ্তানি করতে পারছে। প্রতিদ্বন্দ্বীতা গড়ে তুলতে পারছে অন্যান্য দেশের সঙ্গে। যেমন, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ছেলেদের ট্রাউজারের দাম বাংলাদেশের কারখানায় ১২ শতাংশ কমে গেছে। মার্কিন উপাত্ত ব্যবহার করে এই তথ্য দিলেন পেনসিলভানিয়া রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক আনার।
ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে এক সাবেক গার্মেন্ট শ্রমিকের কাহিনীও তুলে দেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদ আবদুল হালিম (৪১) নামে ওই শ্রমিক গত বছর চাকরি হারান। দায়ী সেই মেশিন! পরে কিছুদিন অন্য চাকরি খুঁজলেও, অবশেষে রিকসা চালানো শুরু করেছেন তিনি।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য সমাধান হতে পারে তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে গিয়ে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা। যাতে করে উৎপাদন খাতের শ্রমিকরা এ ধরণের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কবলে পড়ে কর্মবিহীন থাকতে হয়। অন্য দেশগুলো এই পথে সফল হয়েছে। কিন্তু সমস্যা একটাই। অন্য বিকল্প খাতেও এখন অটোমেশন চলছে। মোহাম্মদি গ্রুপের রুবানা হক বলেন, ‘আমরা শুধু এই গার্মেন্টসটাই করেছি, আর কিছু না। এখান থেকে কই যাবো আমরা?’

শ্রীলংকায় নতুন রাজনৈতিক সঙ্কটের আশঙ্কা

শ্রীলংকায় স্থানীয় নির্বাচনের তাৎপর্য তেমন অর্থপূর্ণ নয়। তবে তা থেকেও দেশটির ভবিষ্যত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অনিশ্চয়তা ভর করেছে। বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসের নেতৃত্বে নতুন গড়ে তোলা দল ব্যাপক বিজয়ের পর এ আলোচনা জোরালো হয়েছে। দু’বারের সাবেক একই প্রেসিডেন্টের এভাবে ফিরে আসা এক বিস্ময়কর বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও যুদ্ধ অপরাধের অভিযোগে ২০১৫ সালে তাকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। ৭২ বছর বয়সী রাজাপাকসে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ২০০৫ সালে।
এরপর ২০১০ সালে আবার। এর এক বছর পরে তামিল বিদ্রোহীদের দমন করে তার সরকার। এর মধ্য দিয়ে শ্রীলংকায় ২৫ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। নির্বাচনের ফল প্রকাশের প্রাক্কালে তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অনলাইন সিএনএনে এসব কথা লিখেছেন সাংবাদিক মানভীনা সুরি ও স্টিভ জর্জ। গত রোববার সেখানকার স্থানীয় নির্বাচনে তার দল বিস্ময়কর বিজয় অর্জন করে। এর মধ্য দিয়ে বছরের পর বছর সংঘাত ও অস্থিতিশীলতায় আঘাতপ্রাপ্ত সেখানকার ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেন আবার হুমকিতে পড়লো। নিজের ফেসবুক পেজে একটি বার্তা পোস্ট দিয়েছেন রাজাপাকসে। এতে তিনি বলেছেন, নির্বাচনে আমাদের বিজয় এটা পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তোলে যে, নিষ্ক্রিয়তায় শ্রীলংকানরা হতাশ। তারা নতুন করে শ্রীলংকাকে গড়ে তুলতে চান। এর মধ্য দিয়ে তিনি স্থানীয় এই নির্বাচনকে একটি গণভোটের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সরকার বিরোধী তার যে আন্দোলন তাতে তিনি মূল ভূমিকায় উঠে এসেছেন। তার প্রচারণা থেকে টার্গেট করা হয়েছে, সরকারের অর্থনীতি, উচ্চ হারে ট্যাক্স আরোপ। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা জাতীয় সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছেন বলেও তার সমর্থকরা অভিযোগ করছেন। তারা বলছেন, হ্যামবানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য চীনের কাছে লিজ দিয়েছে সরকার। এ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। শ্রীলংকায় আগামী দু’বছরের মধ্যে পার্লামেন্ট নির্বাচনের শিডিউল নেই। তবু স্থানীয় নির্বাচনে রাজাপাকসে যতটা ভাল করেছেন তা সরকারের জন্য একটি বড় আঘাত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা ২০১৫ সালে সরকার গঠন করেন। তার সঙ্গেী হয় কতগুলো সংখ্যালঘু গ্রুপ। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিকেন্দ্রীকরণে, সরকার গঠনে স্বচ্ছতায়। সেখানে স্থানীয় নির্বাচনে মাহিন্দ রাজাপাকুসের দল পোডুজানা পেরামুনা, যা পিপলস ফ্রন্ট নামে পরিচিত, তারা পেয়েছে শতকরা ৪৪.৬৫ ভাগ আসন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমেসিংঘের ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি। তারা পেয়েছে শতকরা ৩২.৬৩ ভাগ আসন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম এলায়েন্স রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। তারা পেয়েছে মাত্র ৮.৯৪ ভাগ সমর্থন।

ত্রিপুরায় রচিত হবে এক নতুন ইতিহাস

ত্রিপুরায় আজ নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। সেখানে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জিতলেও ইতিহাস সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে তাদের বিরোধী পক্ষ জিতলেও এক নতুন ইতিহাস হবে। সেখানে টানা চারবারের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। তার বাম ফ্রন্ট সেখানে ক্ষমতায় টানা ২৫ বছর। যদি মানিক সরকার আজকের নির্বাচনে বিজয়ী হন তাহলে পঞ্চম মেয়াদে তিনি হবেন ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।
এটি হবে নতুন রেকর্ড। অন্যদিকে যদি বিজেপি বিজয়ী হয় তাহলে ২৫ বছর ক্ষমতায় থাকা বাম ফ্রন্টকে হটানোর রেকর্ড গড়বে তারা। ফলে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেখা দিয়েছে টান টান উত্তেজনা। স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। এখানে বিধানসভার মোট ৬০টি আসনের মধ্যে ৫৯টিতে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এতে বাম ফ্রন্টের সরাসরি মুখোমুখি বিজেপি। তারা বিজয় কেড়ে নিতে জোট করেছে ইন্ডিজিনাস পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরার (আইপিএফটি) সঙ্গে। এই দলটি ত্রিপুরার কাছ থেকে উপজাতিদের জন্য একটি আলাদা রাজ্য দাবি করে। রাজ্যে উপজাতিদের ভোট রয়েছে শতকরা ৩২ ভাগ। সেই ভোটকে টার্গেট করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি তাদেরকে নিয়ে জোট করেছে। ফলে শক্ত এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হচ্ছেন মানিক সরকার। ভোট কেন্দ্র খোলার আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ‘ত্রিপুরার ভাই ও বোন’ আখ্যায়িত করে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে রেকর্ড সংখ্যক ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। এরই মধ্যে আগরতলায় একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। ওদিকে সিপিএমের প্রার্থী রমেন্দ্র নারায়ণ দেববর্মা মারা যাওয়ায় চারিলাম আসনে ভোট বন্ধ রয়েছে। সেখানে ভোট হবে ১২ই মার্চ। আজকের এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ২৯২ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ২৩ জন নারী। নির্বাচনে প্রতিটি আসনে প্রার্থী রয়েছে বাম ফ্রন্ট ও বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের। একটি বাদে সব আসনে প্রার্থী দিয়েছে কংগ্রেস। দলের প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী নির্বাচনের শেষ দিনগুলোতে সফর করেছেন ত্রিপুরা। এর আগের নির্বাচনে তার দল এ রাজ্যে জিতেছিল ১০টি আসন। তারপর গত বছর দলটির এ রাজ্যের শীর্ষ কয়েকজন নেতা যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। ত্রিপুরায় ভোটার প্রায় ২৬ লাখ। এর প্রায় অর্ধেকই নারী। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ১১ জন। নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য কেন্দ্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর ৩০০ কোম্পানি মোতায়েন করা হয়েছে।

নির্বাচনের বছরে আতঙ্কের সংস্কৃতি -এশিয়া টাইমস

গত ছয় মাসে একজন শিক্ষাবিদ, একজন সাংবাদিক ও সাবেক একজন কূটনীতিক নিখোঁজ হন। এর মধ্যে সাবেক ওই কূটনীতিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভিন্নমতাবলম্বীরা যে ‘ডেঞ্জার’ মোকাবিলা করছেন তা এতে আরো একবার জোরালো হয়ে দেখা দিয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্কের এমন সংস্কৃতি। ‘বাংলাদেশী গভর্নমেন্ট ইউজিং এনফোর্সড ডিজঅ্যাপেয়ারেন্সেস টু সাইলেন্স ক্রিটিকস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ সব কথা লিখেছে অনলাইন এশিয়া টাইমস। এতে আরো বলা হয়েছে, জাতিসংঘ জোরপূর্বক গুম ও অনিচ্ছাকৃত নিখোঁজকে মানবাধিকারের ভয়াবহ লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে।
তবে বিষয়টি বাংলাদেশে একটি অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ঐতিহাসিক ড. আনোয়ার হোসেনের মতে, বেশির ভাগ জোরপূর্বক গুমের জন্য সন্দেহ করা হয় রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্টদের। এ বিষয়টি যাতে প্রকাশ না পায় সেটাই স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করে সরকার। বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকের সাবেক প্রধান সম্পাদক ড. আনোয়ার হোসেন। তিনি এশিয়া টাইমসের সঙ্গে এসব কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, গুমের বিষয়ে রিপোর্ট কভার করার ক্ষেত্রে স্থানীয় মিডিয়ার ওপর রয়েছে সরকারের বিধিনিষেধ ও সেলফ সেন্সরশিপ। তিনি বলেন, এখানকার মিডিয়ার সব আছে। কিন্তু নেই স্বাধীনতা। এ জন্যই আমি পদত্যাগ করেছি। ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়, গত ছয় মাসে আরো ১৫ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে একজন শিক্ষাবিদ, একজন সাংবাদিক ও সাবেক একজন কূটনীতিকের নিখোঁজ ঘটনা। কারণ, তারা সবাই সুপরিচিত পরিবারের এবং তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। এর মধ্যে শিক্ষাবিদ মুবাশ্বার হাসান রাজনীতিতে ইসলাম ও জঙ্গিবাদ নিয়ে কিছু ভাল মানের লেখা লিখেছেন। সাংবাদিক উৎপল দাস বাংলাদেশের একটি বাহিনী সম্পর্কে রিপোর্ট লিখেছিলেন। সাবেক কূটনীতিক মারুফ জামান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সমালোচক। তিনি ফেসবুকে অন্যদের সরকার বিরোধী কিছু পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। এর মধ্যে মুবাশ্বার হাসান ও উৎপল দাস যথাক্রমে ৪৪ ও ৭১ দিন নিখোঁজ ছিলেন। তারপর ডিসেম্বরের শেষের দিকে তাদের খোঁজ মেলে। তারপর তারা দু’জনেই একই রকম তথ্য দেন। দু’জনেই বলেছেন, তাদেরকে চার থেকে পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তি ঢাকা থেকে তুলে নেয়। প্রকাশ্যে দিনের আলোতে তাদেরকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রাখা হয় নিঃসঙ্গ অবস্থায় বন্দি। পরে তাদেরকে চোখ বেঁধে মহাসড়কের পাশে ফেলে যায় অপহরণকারীরা। তবে মারুফ জামান এখনও নিখোঁজ। তার মেয়ে শবনম জামান এশিয়া টাইমসকে বলেছেন, তার পিতার নিখোঁজ নিয়ে প্রথম দিকে মিডিয়ায় লেখালেখি হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এ নিয়ে কোনো খবরই প্রকাশ হচ্ছে না।
এশিয়া টাইমস আরো লিখেছে, যখন একটি নিখোঁজের ঘটনা ঘটে তখনই বাংলাদেশের বেশির ভাগ মিডিয়া এ নিয়ে রিপোর্ট করে বা উচ্চবাচ্য করে। কিনতউ তারা কঠোর করে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। ওদিকে ভারতের দ্য ওয়্যার ওয়েবসাইট মুবাশ্বার হাসান নিখোঁজ নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। তাতে তারা বলেছিল, মুবাশ্বার হাসানকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল রাষ্ট্রীয় একটি এজেন্সি। এরপর একদিনের মাথায় ওই ওয়েবসাইটটি ব্লক হয়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার। এশিয়া টাইমস আরো লিখেছে, বিদেশী ওয়েবসাইট ব্লক করে দেয়ার ঘটনা বর্তমান সরকারের জন্য এটাই প্রথম নয়। ২০১৭ সালের মে মাসে সুইডিশ রেডিও ওয়েবসাইট ব্লক করে দেয়া হয়েছিল। কারণ, তারা র‌্যাবের সিনিয়র এক কর্তকর্তার বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। তাতে ওই কর্মকর্তা বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- নিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছিলেন।
সরকার মিডিয়ার ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করার অভিযোগ অস্বীকার করবে এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, বাংলাদেশের মিডিয়া অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে। সরকার তাদের কর্মকান্ডে কোনো হস্তক্ষেপ করে না। তবে ২০১৭ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬ নম্বরে। বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুম নিয়ে বেশ কয়েক বছর তদন্ত করেছেন বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। তিনি গবেষণা করে ৮২ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট লিখেছেন। এর শিরোনাম ‘উই ডোন্ট হ্যাভ হিম’। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জন্য এ রিপোর্টটি প্রণয়ন করা হয়। এতে দাবি করা হয, ২০১৩ সাল থেকে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে আটকে রেখেছে শত শত মানুষকে। ২০১৬ সালেই শুধু জোরপূর্বক গুম হয়েছেন ৯০ জন।

ইয়েমেন পরিস্থিতির জন্য আসলে কে দায়ী?

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মওলুদ চাভুসওগ্লু বলেছেন, সৌদি আরব ও তার মিত্র দেশগুলোর হামলার কারণে ইয়েমেনে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মিউনিখে নিরাপত্তা সম্মেলনের অবকাশে তিনি এ কথা বলেন। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন, ইয়েমেন সঙ্কট সমাধানের জন্য চেষ্টা চালাতে হবে।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন। ইয়েমেনে হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক সমাজের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। ২০১৫ সালের মার্চ থেকে দারিদ্রপীড়িত ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে আসছে সৌদি আরব ও তার মিত্র দেশগুলো। এর ফলে হাজার হাজার ইয়েমেনি হতাহত হয়েছেন। মওলুদ চাভুসওগ্লু কুর্দি গেরিলা গোষ্ঠী পিকেকে ও ওয়াইপিজি সম্পর্কে বলেছেন, এসব গেরিলা সিরিয়ার ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক এবং তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তিনি বলেন, সিরিয়া সঙ্কট সমাধানের ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি হয়েছে এবং সিরিয়ার পরিস্থিতি এখন আগের চেয়ে ভালো।

ইরানকে ইসরাইলের হুমকি

ইরানের বিরুদ্ধে 'সরাসরি ব্যবস্থা' নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইরানি ড্রোনের কথিত একটি অংশ দেখিয়ে এ হুমকি দেন তিনি। মিউনিক নিরাপত্তা সম্মেলনে রোববার ভাষণ দেয়ার সময়ে ঘন সবুজ রংয়ের একটি আয়তক্ষেত্র ধাতব খণ্ড দেখান নেতানিয়াহু।
তিনি একে ইরানি ড্রোনের অংশ বিশেষ বলে উল্লেখ করে দাবি করেন, গুলি করে ভূপাতিত করার করার পর ইরানি ড্রোনের এ ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। তিনি দাবি করেন, তার ভাষায়, প্রয়োজন হলে ইরানের হয়ে যারা লড়াই করেছে কেবলমাত্র তাদের বিরুদ্ধে নয় বরং খোদ ইরানের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ইসরাইল। ইসরাইলের ধৈর্য পরীক্ষা না করার জন্যও ইরানের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এক সপ্তাহের বেশি আগে ইরানের ড্রোন কথিত ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী। সিরিয়ায় ইসরাইলের এফ-১৬ জঙ্গি বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর এ দাবি করা হলেও তেহরান তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।

আফরিন নিয়ে তুরস্ক-সিরিয়া কি বিরোধে জড়িয়ে যাচ্ছে?

সিরিয়ার আফরিন এলাকায় তুর্কি সেনাবাহিনীর অভিযান যৌথভাবে প্রতিহত করতে সম্মত হয়েছে কুর্দি গেরিলা গোষ্ঠী-ওয়াইপিজি ও সিরিয়ার সেনাবাহিনী। সিরিয়ার গণমাধ্যম রোববার এ খবর জানিয়ে বলেছে, আজ সোমবার থেকে সিরিয়ার সেনাবাহিনী সরাসরি তুর্কি বাহিনীকে প্রতিহত করবে।
ওয়াইপিজি-কে নির্মূল করার লক্ষ্যে তুরস্ক গত ২০ জানুয়ারি থেকে সিরিয়ার আফরিনে সেনা অভিযান শুরু করেছে। শুরু থেকেই তুর্কি বাহিনীর এ অভিযানকে নিজের ভৌগলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে সিরিয়া সরকার। আফরিনে তুর্কি বাহিনী অভিযান শুরু করার পর থেকেই সিরিয়ার সেনাবাহিনী এ অভিযান প্রতিহত করতে ওয়াইপিজি’কে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত ওয়াইপিজি তাতে সম্মত হয়েছে। আফরিনে চালানো অভিযানে তুরস্কের ৬ হাজারের বেশি সেনা অংশ নিচ্ছে। সিরিয়ার কুর্দি গেরিলাদেরকে তুরস্ক সন্ত্রাসী হিসেবে মনে করে এবং তুর্কি গেরিলা গোষ্ঠী পিকেকে’র সঙ্গে এদের সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে।

পাশ্চাত্যের ওপর আস্থা রেখে লাভ হয়নি: খামেনেয়ী



ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, পরমাণু আলোচনা ও পরমাণু সমঝোতায় পাশ্চাত্যের ওপর আস্থা রেখে তার দেশের কোনো লাভ হয়নি। তিনি বলেছেন, আমরা পরমাণু সমঝোতার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের ওপর আস্থা রাখার ফল প্রত্যক্ষ করেছি। আস্থা রেখেছি কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তিনি রোববার তেহরানে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবরিজ শহরের হাজার হাজার মানুষের এক সমাবেশে একথা বলেন। সর্বোচ্চ নেতা পরমাণু সমঝোতার ক্ষেত্রে আমেরিকার নোংরা আচরণ এবং ইউরোপীয়দের দ্বিমুখী চরিত্রের ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফের কূটনৈতিক তৎপরতার ভুয়সী প্রশংসা করে বলেন,
এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন, পাশ্চাত্যের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে হবে কিন্তু তার ওপর আস্থা রাখা বা নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। কারণ, সেক্ষেত্রে তারা ইরানের ওপর নানা দিক দিয়ে চেপে বসবে। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের এ ব্যাপারে সার্বক্ষণিক সজাগ দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান তিনি। যেসব শক্তির কাছে বিশ্ব মানবতাকে ধ্বংস করে দেয়ার মতো অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিরোধিতা করে তাদের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সর্বোচ্চ নেতা বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কথা বলার কোনো অধিকার তাদের নেই। তারা চায় ইরানের কাছে আত্মরক্ষার মতো সমরাস্ত্র না থাকুক যাতে তারা তেহরানের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করতে পারে। আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন, পরমাণু অস্ত্রসহ সব ধরনের মারণাস্ত্রকে আমরা হারাম বা নিষিদ্ধ মনে করি। কিন্তু এর বাইরের যেকোনো প্রচলিত অস্ত্র যত বেশি প্রয়োজন আমরা তৈরি ও নিজেদের শক্তিশালী করব।

তুরস্কের আগ্রাসন প্রতিহতের হুমকি

সিরিয়ার আফরিন এলাকায় তুর্কি সেনাবাহিনীর আগ্রাসন যৌথভাবে প্রতিহত করতে সম্মত হয়েছে কুর্দি গেরিলা গোষ্ঠী-ওয়াইপিজি ও সিরিয়ার সেনাবাহিনী। সিরিয়ার গণমধ্যাম রোববার এ খবর জানিয়ে বলেছে, সোমবার থেকে সিরিয়ার সেনাবাহিনী সরাসরি তুর্কি বাহিনীর আগ্রাসন প্রতিহত করবে।
ওয়াইপিজি-কে নির্মূল করার লক্ষ্যে তুরস্ক গত ২০ জানুয়ারি থেকে সিরিয়ার আফরিনে সেনা অভিযান শুরু করেছে। শুরু থেকেই তুর্কি বাহিনীর এ অভিযানকে নিজের ভৌগলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে সিরিয়া সরকার। আফরিনে তুর্কি বাহিনী অভিযান শুরু করার পর থেকেই সিরিয়ার সেনাবাহিনী এ আগ্রাসন প্রতিহত করতে ওয়াইপিজি’কে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত ওয়াইপিজি তাতে সম্মত হয়েছে। আফরিনে চালানো অভিযানে তুরস্কের ৬ হাজারের বেশি সেনা অংশ নিচ্ছে। সিরিয়ার কুর্দি গেরিলাদেরকে তুরস্ক সন্ত্রাসী হিসেবে মনে করে এবং তুর্কি গেরিলা গোষ্ঠী পিকেকে’র সঙ্গে এদের সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে।

তেল আবিবে সন্ত্রাসী হামলা : ইসরাইল-পোল্যান্ড সম্পর্কে টানাপড়েন

ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিবে অবস্থিত পোল্যান্ডের দূতাবাসে হামলা করেছে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়েছে পোলিশ সরকার। কথিত হলোকাস্ট বা ইহুদি নিধনযজ্ঞ সম্পর্কিত বক্তব্যের জের ধরে যখন পোল্যান্ড ও ইসরাইলের মধ্যে টানাপড়েন চলছে তখন এই হামলার ঘটনা ঘটল। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিভাগের প্রধান আর্থার লোমপার্ট জানান, রোববার কিছু অচেনা লোক দূতাবাস ভবনে হামলা চালায় এবং ভবনের গেইটে একটি স্বস্তিকা বা নাৎসীবাদের প্রতীক ছুঁড়ি মারে। এ ধরনের ঘটনা কেন ঘটেছে তার ব্যাখ্যা চেয়েছে পোল্যান্ড। পাশাপাশি দূতাবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তেল আবিবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে এরইমধ্যে ইসরাইলি পুলিশ তদন্তে নেমেছে বলে জানান লোমপার্ট। এর আগের দিন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাতেউজ মোরাউইকি বলেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে কথিত হলোকাস্ট বা ইহুদি নিধনযজ্ঞ চলেছে তাতে খোদ ইহুদিরা জড়িত ছিল। ইসরাইলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা করেছেন। গত সপ্তাহে পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেজ দুগা বলেছিলেন, তিনি একটি আইনে সই করবেন যা হলোকাস্টের পক্ষে বক্তব্য দেয়াকে অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করবে। পাশাপাশি ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদী আদর্শের পক্ষে প্রচারণা চালানোকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করবে এই আইন। এ আইনের আওতায় অপরাধীদের জরিমানা ও সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়া যাবে। আইনের বিলটি এরইমধ্যে পোল্যান্ডের সিনেটে পাস হয়েছে। সম্ভাব্য এ আইনের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছে ইসরাইল, আমেরিকা ও ইউক্রেন।

শ্মশানও কি বাদ যাবে না? by গওহার নঈম ওয়ারা

নদীর বালু, পাথর, খাল ও নদীপাড়ের মাটি, পাহাড়-টিলা হাপিস করতে করতে এখন শ্মশান-গোরস্থানে হাত পড়েছে। জুয়াড়িদের এমন হয় সঙ্গে আনা টাকাপয়সা, বিড়ি-সিগারেট শেষ হয়ে গেলে পোড়া বিড়ি-সিগারেটের খণ্ডিত অংশে আগুন দিয়ে সুখটান দেয়। কিছুই ফেলার নয়, বাদ দেওয়া যাবে না কিছুই। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে যেমন বলা হয় কাউকে পেছনে ফেলে নয়! জমিখোর-মাটিখোর এখন সেই একইভাবে সামাজিক ভূমি, দেবোত্তর সম্পত্তি কিছুই বাদ দিতে রাজি নয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এসব লাগোয়া জমির পত্তনি নিয়ে এবং একসনা লিজ নিয়ে, কখনোবা সঠিক বা বেঠিক পথে দলিল তৈরি করে তারপর আস্তে-ধীরে গ্রাসের কাজ চলছে প্রায় সারা দেশে। কোথাও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এসব দখল-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে, দাবিনামা, মানববন্ধন, ধরনা, আন্দোলন করে সফল হচ্ছে। স্থিতাবস্থার কাগজ আদেশ পাচ্ছে, কোথাও দেরি হয়ে যাচ্ছে-আদেশের কাগজ হাতে পাওয়ার আগেই জবরদখলের প্রক্রিয়া রাতারাতি শেষ করছে জমিখোর-ভূমিখোরদের দল। রায়ের অবিকল নকল পেতে যে দেশে বছর কেটে যায়, সেখানে উচিত সিদ্ধান্ত, উচিত জায়গায় পৌঁছানোর আগেই কেল্লাফতে করার সব উপাচার সাঙ্গ করার লোকের অভাব নেই। বিলম্বিত নকল নিয়ে ঘাটে ঘাটে ফিরতে হয় বাদীকে। যাদের সংগঠন নেই, দল-দালালি নেই, তাদের সামাজিক ভূমি রক্ষা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কুল্ল্যা ইউনিয়নের বেতনা নদীর ধারে ‘মুচিপোঁতা’ শ্মশানের মাটি জোর করে কেটে নিয়ে যাচ্ছে ইটভাটার মালিকেরা। ‘মুচিপোঁতা’ নামকরণ থেকে বোঝা যায়, এই শ্মশান বা সমাধিক্ষেত্র তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের-চর্মকার বা কথ্য ভাষায় যাদের মুচি বলি, তাদের মরদেহ রক্ষার জায়গা।
প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো এই সমাধিক্ষেত্রটি তৎকালীন জমিদারেরা তাদের পালকি বাহক এবং চটি জুতা বা ধামা-কাঠা (বেতের পাত্র), কুলা, ঝাড়ু তৈরিতে নিয়োজিত কাহার সম্প্রদায়ের মরদেহ রক্ষার জন্য পাঁচ বিঘা জমি নির্দিষ্ট করে দেয়। বুধহাটা ঋষিপাড়া শ্মশান কমিটির সভাপতি বাবুল দাস ও সাধারণ সম্পাদক কার্তিক দাস সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শ্মশানের উত্তর দিকের ১ একর ১০ শতাংশ জমি জনৈক আনোয়ার হোসেন (বলা বাহুল্য বড় রাজনৈতিক পরিচিতিও আছে তাঁর) প্রশাসনের কাছ থেকে একসনা বন্দোবস্ত নিয়ে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে, সেখানে ভাঙার (উঁচু জায়গা) পরিবর্তে জলাশয় বানানোর জন্য ভাটার মালিকের কাছে মাটি বিক্রি শুরু করেন। ১০ ফুট গভীর করে মাটি কেটে ভাটায় নিয়ে যাওয়ায় ঋষি বা চর্মকার সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের মৃতদেহ সৎকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্ষায় সেটা বন্ধই হয়ে যাবে। বলে রাখা ভালো, ঋষি সম্প্রদায় মূলধারার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতো মৃতদেহ দাহ করে না। তারা সাধারণত মাটির নিচে সমাধিস্থ করে। মাটি কাটার প্রক্রিয়ায় অনেক সমাধিস্থ দেহের কঙ্কাল এবং হাড়গোড় উঠে এলেও মাটি কাটা বন্ধ হয়নি। আশার কথা, ঋষি সম্প্রদায় একজোট হয়েছে এবং আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছে। আন্দোলনের মুখে কুল্ল্যা ইউনিয়নের ভূমি কর্মকর্তা গত ২৮ জানুয়ারি মাটি কাটার কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আশাশুনির সহকারী ভূমি কমিশনারের দেওয়া একসনা বন্দোবস্ত এখনো বহাল আছে। প্রায় একই ধরনের খবর এসেছে উখিয়া থেকে। সেখানকার বৌদ্ধ শ্মশানের জমি জবরদখল করে মাটি কেটে বিক্রি এবং খেতখামার বানানোর অভিযোগ উঠেছে। উখিয়া উপজেলার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের পশ্চিম মরিচ্যাপালং সর্বজনীন বৌদ্ধ শ্মশানের মাটি কেটে রাস্তা নির্মাণ এবং শ্মশানের ওপর বেগুন চাষের ভয়ংকর খবর উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দেয়। শ্মশান কমিটির সভাপতি বাবুলাল বড়ুয়া বাদী হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ দাখিল করেছেন। এই শ্মশানটিও প্রায় দুই শ বছরের পুরোনো। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এই শ্মশান উদ্ধারের জন্য অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় একজোট হয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক রাস্তার কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শুখানপুকুরী ইউনিয়নের তরুকপোতা বাজারে শ্মশানের জমি দখল করে রাতারাতি দোকানঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পান্ডল ইউনিয়নের মালতিবাড়ি গ্রামের শ্মশানে লাশের সৎকার বন্ধ করে দিয়েছেন ধর্মীয় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা। এই গ্রামের বর্মণবাড়ির লোকজন তাদের ২৬ শতাংশ জমি দেবোত্তর ঘোষণা করে শ্মশানের নামে ছেড়ে দেয়। বছরখানেক আগে জমিদানকারী যুধিষ্ঠির বর্মণ ভারতে চলে গেলে স্থানীয় সামাদ মোক্তার শ্মশানের জমির দখল নিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন। যুধিষ্ঠিরের বড় বোন চিন্তামনি বড়ই দুশ্চিন্তায় আছেন, ‘গ্রামোত মরা পুড়বার জায়গা নাই, মইলে পুড়বে কোঠে? হামরাগুলা তো কিছু কবার সাহস পাই না।’ নেত্রকোনার সদর উপজেলার বাংলা ইউনিয়নের বাংলা গ্রামের শ্মশানঘাটটি সম্প্রতি বেদখল হয়ে গেছে। শ্মশান হারিয়ে মানুষজন এখন দরখাস্তের দ্বিতীয় পাতায় স্বাক্ষর করে তা ফিরে পেতে চেষ্টা করছে। শুধু যে গ্রামেগঞ্জের কোনাকাঞ্চিতে এ রকম অনাচার চলছে তা নয়। বরিশালের বানারীপাড়ার পৌর এলাকায় (৪ নম্বর ওয়ার্ড) শ্মশানের জায়গা দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করার অভিযোগ উঠেছে। ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জেএল ৪২ নম্বর মৌজায় ১৯২ নম্বর খতিয়ানের ৬১৪ ও ৬১৫ নম্বর দাগের ১৩ শতক জমি শ্মশানের নামে রেকর্ড করা। এই সম্পত্তির একাংশ দখল করে নির্মাণকাজ শুরু করেছেন জনৈক মোজাম্মেল হোসেন। প্রশাসন জানিয়েছে, জমির রেকর্ডপত্র যাচাই-বাছাই করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে, শ্মশান এলাকায় যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য বানারীপাড়ার পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া আছে। সব ধর্মের মানুষ যাতে নির্ভয়ে নিজেদের ধর্মচর্চা করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। গণতন্ত্র আছে কি নেই, তার স্বাস্থ্য খারাপ না ভালো, তাকে নিবিড় পরিচর্যায় বা আইসিইউতে রাখতে হবে কি না-এই সবকিছু মাপার কতিপয় পরিমাপক আছে। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক হচ্ছে যারা সংখ্যায় কম, তারা কেমন আছে। তাদের পরিসর বা স্পেস কি সংকুচিত হচ্ছে, না তারা নির্ভয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছে। আমাদের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কি আমাদের দিকে আস্থার নজরে তাকায়, না সব সময় কোনো কিছু হারানোর ভয়ে থাকে। তাদের অভয় দিতে না পারলে এই স্বাধীনতার মানে কী?
গওহার নঈম ওয়ারা: ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী। শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ত্বকেই ফুটবে সুখ–অসুখের বার্তা

চিকিৎসকেরা হাত দেখে বা নাড়ি টিপে বুঝে নিতে পারেন রোগীর সুস্থতা-অসুস্থতার অনেক ইঙ্গিত। পাঁচজন সাধারণ মানুষও যদি তেমনটা পারেন, তবে তা দারুণ হয়। আর যদি হাতের ত্বকেই ফুটে ওঠে এসব তথ্য, তবে তো তা আরও অসাধারণ। তেমন কাজই করেছেন জাপানের এক দল বিজ্ঞানী। তাঁরা উদ্ভাবন করেছেন হাতে স্থাপনযোগ্য বার্তাবাহী বিশেষ ত্বক। অত্যন্ত পাতলা এই ত্বকে যেমন ভেসে উঠবে প্রিয়জনের পাঠানো বার্তা, একইভাবে তা স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবরও রাখবে। আরও মজার বিষয় হলো, ত্বকটি স্থাপনের পর মনেই হবে না যে অতিরিক্ত কিছু লেগে আছে হাতে।
জাপানের দাই নিপ্পন প্রিন্টিংয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ত্বকটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাকাও সোমেয়া। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বার্ষিক সম্মেলনে ত্বকটি দেখানো হবে। সম্প্রসারণ ও সংকোচনযোগ্য এই ত্বক কাটা-ছড়ায় লাগানো ব্যান্ড এইডের মতো করেই হাতে স্থাপন করা যায়। এক মিলিমিটার প্রশস্ত ত্বকটিতে লেড ডিসপ্লে, হালকা ওজনের সেনসর আর তারহীন মডিউল রয়েছে। বার্তা আদান-প্রদান আর স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর এগুলোর মাধ্যমেই সম্পন্ন করে এটি। অধ্যাপক তাকাও সোমেয়া বলেন, তাঁদের উদ্ভাবিত এই গৌণ ত্বক চিকিৎসায় ভালো কাজে আসবে। অনেক রোগীই নড়তে-চড়তে পারেন না। তাঁদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি-অবনতির খবর এই যন্ত্রের মাধ্যমে রাখা সম্ভব। সার্বক্ষণিক কাছাকাছি না থেকেও চিকিৎসক ঠিকই রোগীর সব খোঁজ রাখতে পারবেন। প্রয়োজনে দ্রুত ছুটে আসতে পারবেন রোগীর কাছে। ঘরে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ থাকলে দূর থেকে তাঁর খোঁজ রাখা সম্ভব এই ত্বকের মাধ্যমে। এ ছাড়া ত্বকের ব্যবহারকারী প্রত্যন্ত এলাকায় থাকলে এর মাধ্যমে তিনি তাঁর চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। রোগীর ওষুধ সেবনের কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে পারবে এটি। হাতের তালু বা উল্টো পিঠে এই ত্বক স্থাপন করা যায়। তাকাও সোমেয়া বলেন, ‘ধরুন, আপনি দূরে আছেন।
দাদা-দাদি, নানা-নানির মতো বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ ঘরে রয়েছেন। তাঁর হাতে থাকা গৌণ ত্বকটিতে যখন “আমি তোমাকে ভালোবাসি”-এর মতো বার্তা ভেসে উঠবে, তখন ওই বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির মনে হবে, আপনি যেন তাঁর কাছেই আছেন। তাঁর স্বাস্থ্যেরও খোঁজ রাখা সম্ভব এর মাধ্যমে।’ তাকাও সোমেয়া বলেন, ডিভাইসটি সম্প্রসারণ করা যায়। কাজেই ত্বকের মতো জটিল অবকাঠামোর ওপর এটি সহজেই স্থাপন করা সম্ভব। এক সপ্তাহ ধরে এটি দেহে লাগানো থাকলেও ত্বকে কোনো প্রদাহের সৃষ্টি হবে না বলে জানান তিনি। শুধু তা-ই নয়, এই ত্বক এতটাই হালকা যে, স্থাপনের পর ব্যবহারকারী এর কথা ভুলেই যাবেন। এই বিজ্ঞানী আরও বলেন, প্রাতর্ভ্রমণের সময় পরা থাকলে হৃদ্‌স্পন্দনের গতি প্রদর্শন করবে এটি। কতখানি দৌড়ানো হলো, সেটাও জানিয়ে দেবে এই ত্বক। এ ছাড়া শ্রমজীবীদেরও কাজে আসবে যন্ত্রটি।

বয়স হয়ে যাচ্ছে মেয়ের, বর কোথায়?



বিয়ের বয়স হয়েছে তো সেই কবেই। কিন্তু অনামিকা ফাঁকা। কে দেবে বিয়ের আংটি? ৩০ বছর বয়সী নূর শুধু একা নন, তাঁর মতো অনেক নারীরই অনামিকায় এমন আংটি জোটেনি। চারদিকে কেবল মেয়ে আর মেয়ে। এর মধ্যে বর হওয়ার মতো ছেলে কোথায়? এ দৃশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার। আজ সোমবার এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১১ সাল থেকে চলমান এ যুদ্ধে ৩ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ছেড়েছে হাজারো মানুষ। যুদ্ধের আগে দেশের জনসংখ্যা ছিল ২ কোটি ৩০ লাখ। এর মধ্যে ৫০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছে বা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০১১ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন নূর দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে স্নাতকের চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরই মধ্যে নূর স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এখন তিনি বিয়ে করতে চান। কিন্তু ছেলে কোথায়? তবে নূর হাল ছাড়েননি। তাঁর আশা, একদিন তাঁর অনামিকায়ও আংটি উঠবে। বিয়ের হতাশায় ডুবে যাওয়া নূর নিজেকে ব্যস্ত রাখতে এখন আবার সাহিত্য বিষয়ে ভর্তি হয়েছেন। আগে সপ্তাহে তাঁর অনেকগুলো বিয়ের প্রস্তাব আসত উল্লেখ করে নূর বলেন, কিন্তু এখন কোনো প্রস্তাব আসে না বললেই চলে। এখন যদি পারিবারিকভাবে বিয়ে করতে যান, দেখবেন, ইতিমধ্যে যাঁরা বিবাহিত অথবা বয়স্ক, তাঁরাই পাত্র। নূর বলেন, ‘আমার এখন সময় কাটানোর কিছু নেই। কোনো বন্ধু নেই, ভালোবাসার মানুষ নেই, স্বামী নেই। আমি ভয় পাচ্ছি, বিয়ের আগে আমার মাথায় একটিও ধূসর চুল থাকবে কি না। বিয়ে নিয়ে আমার আর কোনো আশা নেই।’ সিরিয়ার সমাজ খুব রক্ষণশীল। সেখানে মেয়েদের বয়স বিশের ঘরে পৌঁছালেই তাঁদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু উপযুক্ত পাত্রের অভাবে সেই নিয়ম অনেকটাই শিথিল। দামেস্কে মনোবিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক সালাম কাশেম বলেন, পাত্রসংকটের কারণে ৩২ বছর বয়সে মেয়ের বিয়ে হওয়াটা এখন স্বাভাবিক।
কেউ আর এটাকে বেশি বয়সে বিয়ে বলে না। কাশেম বলেন, এখন মা-বাবারা তাঁদের ছেলেমেয়ের জন্য উপযুক্ত সঙ্গীর খোঁজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আশ্রয় নিচ্ছেন। আগে প্রতিবেশীরা সবাই সবাইকে জানতেন। এভাবে খুব সহজেই খোঁজখবর নিতে পারতেন। কিন্তু এখন পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রদেশ বা ভিন্ন দেশের পাত্রপাত্রীর অনেকে আবার স্কাইপের মাধ্যমে বিয়ে করছেন। তৃতীয় কোনো পক্ষ তাঁদের বিয়ের লাইসেন্সে সই করে।  ৩১ বছর বয়সী ইয়ুসরা বলেন, তাঁর মা-বাবা সারাক্ষণই বলতে থাকেন যে তিনি বিয়ের ট্রেন মিস করেছেন। তাঁর মা তাঁকে বারবার বলেন, ‘আমি চাই না তুমি কুমারী থাকো। কাউকে পছন্দ করতে চারপাশে চোখ রাখো।’ ইয়ুসরা সরকারি ভাষান্তরের কাজ করেন। তিনি বলেন, প্রত্যেকে জানেন, এখানে যা ঘটেছে, এর জন্য সিরিয়ার তরুণ প্রজন্মকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে। কেউ দেশ ছেড়েছে, কেউ যুদ্ধে গেছে। আবার অনেকে অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে বিয়ের কথা মাথাতেই আনেন না। এই যুদ্ধের কারণে দেশটিতে এখন মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী, বেকারত্ব সীমাহীন আর অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ২২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। এ অবস্থায় বাত তুমা শহরের ৩৭ বছরের ফাইরাস বলেন, দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যয়ের কারণে বিয়ের বিষয়টি অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। তিনি ওয়াশিং মেশিন মেরামতকারী একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। বলেন, ‘আমি আমার ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে পারি না। আল্লাহ জানেন, আমি কাল বাঁচব কি না? এই পরিস্থিতিতে যে বিয়ে করবে, সে পাগল। যেখানে আমার জীবনের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে আমি আমার স্ত্রী-সন্তানের নিরাপত্তা কীভাবে দেব?’

কৃত্রিম চাঁদের আলোয় আলোকিত ভিক্টোরিয়া



ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ঐতিহাসিক স্থাপত্য ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে স্থাপন করা হয়েছে বিশাল আকৃতির কৃত্রিম চাঁদ। শ্বেত পাথরের তৈরি এই সৌধ তাজমহলের আদলে গড়া। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের আকর্ষণ বাড়াতে এবার এই স্মৃতিসৌধের সামনে গতকাল শনিবার লাগানো হয়েছে একটি কৃত্রিম চাঁদ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের অবস্থান কলকাতার কেন্দ্রে কলকাতা ময়দান বা গড়ের মাঠের কাছে। কলকাতার পর্যটকদের আকর্ষণের প্রধান কেন্দ্র এ স্থান। গতকাল কৃত্রিম চাঁদের আলোয় আলোকিত হয় সে স্থান। কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের উদ্যোগে এই কৃত্রিম চাঁদটি স্থাপনের দিনে গতকাল সন্ধ্যায় একটি কনসার্টেরও আয়োজন করা হয়। এই কনসার্টে অংশ নেন ব্রিটিশ কম্পোজার ড্যান জোন্স। আজ রোববারও প্রদর্শিত হবে এই কৃত্রিম চাঁদটি। কৃত্রিম চাঁদটির নকশা করেছেন ব্রিটিশ শিল্পী লিউক জেরম। নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিউজিয়াম অব দ্য মুন’। পূর্ণিমার রাতের মতো ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল উদ্ভাসিত হবে এই কৃত্রিম চাঁদের আলোয়। নাসার ছবি ব্যবহার করে তৈরি ২৩ ফুট ব্যাসের এই চাঁদটি আনা হয় লন্ডনের একটি জাদুঘর থেকে। রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতির উদ্দেশে গড়ে তোলা হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।
রানি ভিক্টোরিয়া সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন ১৮৩৭ সালে। প্রয়াত হন ১৯০১ সালে। আর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে এটি নির্মিত হয় ১৯২১ সালে। এটি নির্মাণ করেছিলেন প্রিন্স অব ওয়েলস (পঞ্চম জর্জ)। সেদিন কলকাতা ময়দানের (গড়ের মাঠ) দক্ষিণ প্রান্তে ক্যাথিড্রাল অ্যাভিনিউর কাছে একটি বিশাল অঞ্চল নিয়ে গড়ে তোলা হয় এই স্মৃতিসৌধ। এর আগে সেখানে একটি কারাগার ছিল। পরে সেই কারাগার সরিয়ে নেওয়া হয় আলীপুরে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ৬৪ একর জমির ওপর নির্মিত। এটি দৈর্ঘ্যে ৩৯৬ ফুট আর প্রস্থে ২২৮ ফুট। রয়েছে সুউচ্চ চারটি স্তম্ভ। এটি ইংরেজি এইচ প্যাটার্নে নির্মিত। সৌধের উচ্চতা ২০০ ফুট। প্রধান গম্বুজের উচ্চতা ১৮৪ ফুট। গম্বুজের ওপর রয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি একটি পরি মূর্তি। মূর্তিটির ওজন তিন টন। আর পুরো ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ওজন ৮০ হাজার টন। এখানে রয়েছে একটি বিশাল জাদুঘর।

মিয়ানমারের সঙ্গে ইইউর সম্পর্ক বিবেচনার আহ্বান

মিয়ানমারের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদল। মিয়ানমার সফর শেষে ফিরে গিয়ে এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানিয়েছে প্রতিনিধিদলটি। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এই প্রতিনিধিদল প্রথমে বাংলাদেশ সফর করে। ১১ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই সফরে তারা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলনও করে তারা। এরপর ১৪ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা মিয়ানমার সফর করে। এ দলে ছিলেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকারবিষয়ক উপকমিটির (ডিআরওআই) সদস্যরা। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক ও বাণিজ্যবিষয়ক কমিটির সদস্যরাও ছিলেন প্রতিনিধিদলটিতে। এ ছাড়া তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন আসিয়ানের একটি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। বিবৃতিতে প্রতিনিধিদলটি বলেছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা গণহারে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতির উন্নয়নে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করা ইইউর জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ব্যাপারে প্রতিটি খাতে নতুন করে নীতিও প্রণয়ন করতে হবে। বিবৃতিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদলটি বলেছে, ‘আমাদের দৃষ্টিতে মিয়ানমারের স্বার্থে জনগণের কল্যাণে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের গতি দ্রুততর করতে হবে।’ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গত ২৩ নভেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে দলটি। একই সঙ্গে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।
রাখাইন রাজ্যে গত আগস্টের পর থেকে যে নৃশংস ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলোর স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তেরও আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদলটি। প্রতিনিধিদলটির প্রধান পিয়ের আন্তোনিও পানজেরি বলেন, মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট উদ্বিগ্ন। ওই সফরের পরও উদ্বেগ রয়ে গেছে। কারণ, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় মানবাধিকার সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও জাতিগত নৃগোষ্ঠী এতে আক্রান্ত হচ্ছে। মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকেরাও রেহাই পাচ্ছেন না। মিয়ানমার সফরে গিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদলটি সেখানকার নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন এবং ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। এ সময় মিয়ানমার গণতন্ত্রে উত্তরণের ক্ষেত্রে যেসব জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, তা উঠে আসে। প্রতিনিধিদলটি মিয়ানমারের প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও পার্লামেন্টের সদস্যদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে। প্রতিনিধিদলটি বলেছে, মিয়ানমারের বর্তমান অবস্থা সেখানে গণতন্ত্রে উত্তরণের বিষয়ে তাদের আত্মবিশ্বাসী করতে ব্যর্থ হয়েছে। চলমান প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে এসেছে বলে তাঁরা লক্ষ করেছেন।

জাহাজের জন্য ১৮ দিন অপেক্ষা by মাসুদ মিলাদ

•১৮ দিন পর জাহাজ বন্দরের জেটিতে ভেড়ানো হয়।
•২১৮টি প্রতিষ্ঠানের পণ্য বুঝে পেতে দেরি হয়।
শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর থেকে ‘এমভি থরস্কাই’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছায় গত ৩১ জানুয়ারি। ১৮ দিন পর গতকাল রোববার জাহাজটি বন্দরের জেটিতে ভেড়ানো হয়। ফলে পণ্য হাতে পেতে দেরি হয় দেশের ২১৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও আমদানিকারকের। বন্দরের জাহাজজটে সাধারণত চার-পাঁচ দিন দেরিতে পণ্য হাতে পান ব্যবসায়ীরা। তবে এবার বন্দরের জাহাজজটে নয়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি জাহাজ কোম্পানির বাংলাদেশের এজেন্সি পরিচালনা কাজ হস্তান্তর নিয়ে জটিলতায় এত দিন জাহাজটি জেটিতে ভেড়ানো হয়নি। ঠিক সময়ে কাঁচামাল হাতে না পাওয়ায় কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। এমভি থরস্কাইতে করে ৩০টি কনটেইনারে ভিয়েতনাম থেকে সিদ্ধ চাল আমদানি করেছে বিএসএম গ্রুপ। একই গ্রুপের মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজের ৩০ কনটেইনার কাঁচামালও রয়েছে জাহাজটিতে। জানতে চাইলে বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, সময়মতো কাঁচামাল হাতে না পেলে উৎপাদন ব্যাহত হয় কারখানায়। ভারত থেকে ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করেছে চট্টগ্রামের অ্যালবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড। গ্রুপের চেয়ারম্যান রইসুল উদ্দিন বলেন, কাঁচামাল হাতে পেতে সময় লাগায় উৎপাদনে ব্যাঘাত হচ্ছিল। এই দুটি কোম্পানির মতো ইউনিলিভার, স্কয়ার গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাভানা, প্রাণ-আরএফএল, আবুল খায়ের গ্রুপ, পারটেক্স, পিএইচপি ফ্যামিলি, জিপিএইচ, গ্লাক্সোস্মিথক্লাইন, যমুনা গ্রুপ, বার্জার পেইন্টস, গ্রেটওয়াল সিরামিক, এনভয় টেক্সটাইলসহ ২১৮ প্রতিষ্ঠানের পণ্য হাতে পেতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণ সময় লেগেছে। এজেন্সি পরিচালনা হস্তান্তর নিয়ে যে দুটি প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্ব চলছে তার একটি হলো এসএইচআর গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেসার্স সি মেরিন শিপিং লাইনস লিমিটেড। এই গ্রুপের চেয়ারম্যান শেখ হাফিজুর রহমান। অপরদিকে মার্কো শিপিং কোম্পানি হলো কর্ণফুলী গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। এই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ফার শিপিং লাইনস লিমিটেডের বাংলাদেশের এজেন্ট ছিল সি মেরিন।
৩১ জানুয়ারি সি মেরিন শিপিং লাইনস লিমিটেডের সঙ্গে ফার শিপিং কোম্পানির এজেন্সি পরিচালনা চুক্তি শেষ হয়। এরপরই বিদেশি কোম্পানিটি সি মেরিনকে বাদ দিয়ে মার্কো শিপিংকে এজেন্সি পরিচালনার জন্য নিয়োগ দেয়। নিয়োগ পাওয়ার পর ফার শিপিংয়ের পক্ষে বন্দরে আসা জাহাজের কাজ করার অনুমতি চেয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে মার্কো শিপিং। নিয়মানুযায়ী, এজেন্সি হস্তান্তর করতে হলে আগের কোম্পানির সঙ্গে দেনা-পাওনা পরিশোধের সমঝোতা করতে হয়। এরপর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দুই পক্ষের উপস্থিতিতে যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানকে এজেন্সি পরিচালনার অনুমতি দেয়। এই নিয়মানুযায়ী, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যৌথ ঘোষণাপত্র প্রদানের জন্য চিঠি দেয় দুই পক্ষকেই। চিঠি পেয়ে সি মেরিন শিপিং লাইনস লিমিটেড মার্কো শিপিং কোম্পানির সঙ্গে বৈঠকে আগ্রহী নয় বলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়। এ অবস্থায় ফার শিপিং কোম্পানিটির পক্ষে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের দায়দেনা গ্রহণসংক্রান্ত অঙ্গীকারনামা কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে প্রদান করে মার্কো শিপিং কোম্পানি। ১৩ ফেব্রুয়ারি ফার শিপিং লাইনস প্রাইভেট লিমিটেড, সিঙ্গাপুরের পক্ষে বন্দরে সাময়িকভাবে কাজ করার জন্য মার্কো শিপিংকে শর্ত সাপেক্ষে অনুমতি প্রদান করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এরপর পাল্টা চিঠি দিয়ে এই অনুমতির আদেশ স্থগিত করার আবেদন জানায় সি মেরিন। এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষও অনুমতি দেয় মার্কো শিপিংকে। বন্দরসচিব ওমর ফারুক গতকাল বলেন, এজেন্সি হস্তান্তর নিয়ে কাস্টমস অনুমোদনসহ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর এমভি থরস্কাই জাহাজটি ভেড়ানো হয়েছে।

ঠিকানায় নেই অভিযুক্তরা

পানামা, অফশোর ও প্যারাডাইস পেপারসে বিভিন্ন সময়ে নাম আসা বাংলাদেশি নাগরিকেরা অর্থ পাচারের সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করছেন না। কর ফাঁকির স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অফশোর কোম্পানি খুলতে বাংলাদেশি নাগরিকেরা এ দেশের যে ঠিকানা দিয়েছেন, সেখানে গিয়ে অধিকাংশ ব্যক্তিকে পাওয়া যায়নি। যে দু-একজনকে পাওয়া গেছে তাঁদের ভাষ্য, কোনোভাবেই তাঁরা অর্থ পাচারের মতো কাজের সঙ্গে যুক্ত নন। প্যারাডাইস পেপারসের মাল্টা কেলেঙ্কারিতে নতুন করে আসা ২০ জন বাংলাদেশির ঠিকানা ধরে গত তিন দিন তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে প্রথম আলো। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামের নয়জন ব্যক্তির ঠিকানায় সরাসরি যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ঢাকায় ও চট্টগ্রামের দুই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়। বাকি সাতজনকে তাঁদের ঠিকানায় পাওয়া যায়নি। এই সাত ব্যক্তি হলেন মাহতাবা রহমান, ফারহান আকিবুর রহমান, খন্দকার আসাদুল ইসলাম, আমানুল্লাহ চাগলা, ফজলে এলাহী চৌধুরী, জুলফিকার আহমেদ, এরিক জোহান এনডারস উইলসন। তালিকায় নাম থাকা বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের বিরুদ্ধে সন্দেহজনক লেনদেনের জন্য তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন দেশে এসব তালিকায় যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে অনেক ক্ষেত্রেই দোষ প্রমাণিত হয়েছে। তালিকায় নাম আসা বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার তাই যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। শাহদীন মালিক আরও বলেন, যারাই করুক,
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার যে হচ্ছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে, সরকার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে পারে। কিন্তু এসবের কোনোটাই করা হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের জোট দ্য ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) ‘প্যারাডাইস পেপারস’ কেলেঙ্কারির সাম্প্রতিক তথ্যে ২০ বাংলাদেশি নাগরিকের নাম আসে। এসব ব্যক্তির কেউ নিজের নামে, কেউ ভিনদেশির নামে, কেউ আবার দেশ-বিদেশের একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে মাল্টায় কোম্পানি খুলেছেন। তাঁরা শিপিং, বস্ত্র, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও শেয়ারবাজার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আইসিআইজের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৯৯৩ থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে দক্ষিণ ইউরোপের দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টায় কোম্পানিগুলো খোলা হয়। মূলত অর্থ পাচারের জন্যই এভাবে কোম্পানি খোলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ও সুইডেনের নাম উল্লেখ করে প্যারাডাইস পেপারসে নাম আসা এরিক জোহান এনডারস উইলসনের খোঁজ জানতে গতকাল রোববার ঢাকার উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর সড়কের একটি বাসায় যান এ প্রতিবেদক। ওই বাসায় গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। বাড়িটির প্রহরী মকবুল হোসেন জানান, এরিক জোহান এনডারস উইলসন এই বাসায় ভাড়া থাকতেন। পাঁচ থেকে ছয় বছর আগেই এরিক জোহান এই বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। ডব্লিউএমজি লিমিটেড নামের মাল্টায় নিবন্ধিত একটি কোম্পানির শেয়ারধারী হিসেবে এরিক জোহানের নাম আইসিআইজের তালিকায় এসেছে। ২০০৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এ কোম্পানির নিবন্ধন করা হয়।

আজ থেকে ফোর-জির যুগ

দেশে আজ সোমবার থেকে চালু হচ্ছে চতুর্থ প্রজন্মের (ফোর-জি) টেলিযোগাযোগ সেবা। তিন বেসরকারি অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক আজ সন্ধ্যায় এ সেবা চালুর লাইসেন্স পাবে। এর পরপরই তারা সেবাটি চালু করবে। অবশ্য সরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক এখনো ফোর-জি চালুর নির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ ঠিক করতে পারেনি। ফোর-জি চালুর মধ্য দিয়ে টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। ২০১২ সালে দেশে থ্রি-জির মাধ্যমে দ্রুতগতির মোবাইল ইন্টারনেট চালু হয়। ফোর-জির মাধ্যমে সেই ইন্টারনেটের গতি আরও বাড়বে। অবশ্য অবকাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে দেশে ফোর-জি চালু হচ্ছে। ফলে দেশে কতটা ভালো মানের ফোর-জি সেবা দেওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। ফোর-জি চালু করতে আজ সন্ধ্যায় ঢাকা ক্লাবে চার মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা, বাংলালিংক ও টেলিটকের হাতে লাইসেন্স তুলে দেবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। ইতিমধ্যে ফোর-জি লাইসেন্সের নির্ধারিত ফি ১০ কোটি টাকা বিটিআরসিকে পরিশোধ করেছে   চার অপারেটর। মোবাইল ফোন অপারেটর সূত্রে জানা গেছে, আজ রাত থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকেরা ফোর-জি সেবা পাবেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনার মতো বড় শহরেও সেবাটি চালু হবে। এ জন্য কারিগরি প্রস্তুতির কাজ গুছিয়ে আনা হয়েছে। রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে গতকাল গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইকেল ফোলি ফোর-জি লাইসেন্স হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেবাটি চালুর কথা জানান। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে গ্রাহকদেরও নতুন পথে চলা শুরু হবে। একই কথা বলেন রবি আজিয়াটার সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে জানান, লাইসেন্স পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে ফোর-জি সেবা চালু করবে রবি। অপারেটরটির সূত্রে জানা গেছে, তারা প্রথম দিন থেকে সবচেয়ে বড় পরিসরে ফোর-জি নেটওয়ার্ক দেওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলালিংক সূত্রে জানা গেছে, তারাও আজ থেকেই গ্রাহকদের ফোর-জি সেবা দেবে। রাজধানীর পাশাপাশি খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে বাংলালিংক গ্রাহকেরা সেবাটি সবার আগে পাবেন। টেলিটক আজ লাইসেন্স নিলেও সেবাটি চালু করতে তাদের দেরি হবে। কিন্তু কত দেরি হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে দায়িত্বশীল কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। জানতে চাইলে টেলিটকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগসচিব শ্যামসুন্দর সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, টেলিটক যাতে দ্রুত অর্থ পায়, এ জন্য কাজ চলছে।
দ্রুতগতির ফোর-জি সেবা পেতে হলে নেটওয়ার্কের পাশাপাশি শক্তিশালী ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো দরকার। সেটি দেশে নেই। টেলিযোগাযোগ-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার জ্যেষ্ঠ গবেষক আবু সাইদ খান বলেন, দ্রুতগতির ফোর-জির জন্য ব্যান্ডউইথ সরবরাহের অবকাঠামো এখনো খুবই দুর্বল। বিটিআরসির অবকাঠামো ভাগাভাগি নীতিমালা অনুযায়ী এনটিটিএন (নেশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক) অপারেটর ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠান সারা দেশে ফাইবার অপটিক ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারে না। অবশ্য এনটিটিএন অপারেটরেরা দাবি করেছে, দ্রুতগতির ফোর-জি সেবার জন্য যে মানের ফাইবার অপটিক অবকাঠামো থাকা প্রয়োজন, তা দেশের উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আছে। বেসরকারি এনটিটিএন প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোমের হেড অব গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স আব্বাস ফারুক বলেন, সারা দেশে বর্তমানে দুই বেসরকারি এনটিটিএনের ৬০ হাজার কিলোমিটারের বেশি ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের উপজেলা পর্যন্ত দ্রুতগতির ট্রান্সমিশন সেবা দিতে এনটিটিএন অপারেটরেরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ফোর-জি সেবা পেতে হলে সিম কার্ড ও হ্যান্ডসেটটি এ প্রযুক্তির উপযোগী হতে হবে। আপনার সিমটি ফোর-জি কি না, সেটি বিনা মূল্যে জানার সুযোগ আছে। গ্রামীণফোন ব্যবহারকারীরা মোবাইল ফোন থেকে *১২১*৩২৩২# ডায়াল করলেই ফিরতি বার্তায় সিমটি ফোর-জি কি না, তা জানতে পারবেন। রবির গ্রাহকদের এ জন্য ডায়াল করতে হবে *১২৩*৪৪ #। আর বাংলালিংকের গ্রাহকেরা মোবাইল ফোন থেকে 4G লিখে ৫০০০ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠালে ফিরতি বার্তায় ফোর-জি সিমের বিষয়ে তথ্য পাবেন। টেলিটক তাদের ব্যবহারকারীদের জন্য এখনো এ ধরনের কোনো সেবা চালু করেনি। সিমটি যদি ফোর-জি না হয়, তাহলে সেটি সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোন অপারেটরের গ্রাহক সেবাকেন্দ্র থেকে পরিবর্তন করে নিতে হবে। সিম পরিবর্তন করতে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি ও আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন) দিতে হবে।

গণপরিবহনে নারী নিরাপত্তা

গণপরিবহনে যাতায়াত করাটা নারীদের জন্য যে আর নিরাপদ নয়, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংগঠনের পরিসংখ্যানেও বিষয়টি স্পষ্ট। সর্বশেষ যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ মাসে গণপরিবহনে ২১ জন নারী ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। দেশে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর পদচারণ বেড়েছে।
তাঁদের প্রতিদিন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কর্মস্থলে যেতে হয়। এ ছাড়া সংসারের নানা ধরনের প্রয়োজনে নারীদের ঘরের বাইরে বের হতে হয়। তাঁদের অনেকের যাতায়াতের জন্য গণপরিবহনই ভরসা। অথচ গণপরিবহনে যাতায়াত করতে গিয়ে তঁারা প্রতিনিয়ত হেনস্তা ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পুরুষ যাত্রীরা তো আছেনই, পাশাপাশি চালক ও সহকারীরাও এ ধরনের অপকর্মে অংশ নিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে কোনো তরুণী বাসে একা হলেই তিনি ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। আমরা রূপার বেলায়ও তা-ই দেখেছি। এ রকম চলতে থাকলে এ দেশের নারীরা গণপরিবহনে কীভাবে যাতায়াত করবেন? সম্প্রতি রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চারজনকে ফাঁসির আদেশ ও একজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই রায়ের মধ্য দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলেও তা গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করবে এমন কথা হলফ করে বলা যায় না। গণপরিবহনে নারীরা যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারেন, সে জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। দেখা যায়, গণপরিবহনে কোনো নারী যৌন হয়রানির শিকার হলেও তিনি কোথায় অভিযোগ করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না৷ অভিযোগ জানানোর বিষয়টি সহজ করতে হবে৷ এ জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু করা যেতে পারে। রুট অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালতের ফোন নম্বর গণপরিবহনের প্রকাশ্য স্থানে লিখে রাখা যেতে পারে৷
আমাদের দেশে গণপরিবহনে চালক ও সহকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন কোনো নিয়ম মানা হয় না। মালিকপক্ষ তাদের ইচ্ছামতো পরিবহনশ্রমিক নিয়োগ করে। গাড়িতে চালক ও সহকারী নিয়োগের বিষয়টি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। তাঁদের নিয়োগপত্র দিতে হবে, যাতে বিভিন্ন শর্তের উল্লেখ থাকবে। তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে এবং অতীতের কর্মকাণ্ড যাচাই করে ছবি ও দরকারি সব তথ্য নিয়ে তবেই নিয়োগ দিতে হবে, যাতে কোনো অপরাধ করলে তাঁদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়। এ ছাড়া মালিকদের উচিত যাত্রীদের সঙ্গে তাঁদের আচরণ কেমন হবে, সে ব্যাপারে বাসের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া৷ তবে এ ব্যাপারে সরকারের তরফে করণীয় ঠিক করা জরুরি। গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সব পক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

শোচনীয় বায়ুদূষণ

যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা ইপিএর প্রতিবেদনে বিশ্বের দূষিত বায়ুর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের যে অবস্থানের কথা বলা হয়েছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাতাস দূষিত এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত এক যুগে ৫৪ ধাপ নিচে নেমেছে। শুধু ইপিএর প্রতিবেদনেই নয়, অন্যান্য সংস্থার করা জরিপ বা গবেষণার ফলাফলে বাংলাদেশের বায়ু পরিস্থিতির প্রায় একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। বোস্টনভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউটের বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি ২০১৭ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার স্থান দ্বিতীয়। এতেই বোঝা যায়, বায়ুদূষণ নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা থাকলে দেশের বায়ুদূষণের মাত্রা এতটা খারাপ পর্যায়ে পৌঁছাত না। পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, ঢাকার আশপাশসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ইটভাটা। এসব ইটভাটা বায়ুদূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ফসলি জমি ও আবাসিক এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে এসব ইটভাটা। ইটভাটাগুলোতে বেআইনিভাবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ফলে দূষিত হচ্ছে বায়ু। ছাড়পত্রবিহীন এসব ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সে অর্থে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। বায়ুদূষণের কারণগুলোর মধ্যে ইটভাটার পরই রয়েছে ধুলাবালি। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ভবন। কিন্তু এসব স্থাপনা তৈরির সময় মানা হচ্ছে না ইমারত নির্মাণবিধি। ভবন তৈরির সময় সেগুলো কোনো কিছু দিয়ে ঢেকে দেওয়া বা পানি ছিটিয়ে কাজ করার প্রবণতা একদম নেই। এসব তদারকের কার্যকরী ব্যবস্থা বা নীতিমালার অভাবও লক্ষণীয়। ফলে ধুলা উড়ছে বাতাসে। দূষিত হচ্ছে বায়ু। এ ছাড়া ফুটপাতের উন্নয়ন, ইউলুপ ও উড়ালসেতু নির্মাণ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য খোঁড়াখুঁড়ি তো চলছেই। এসব উন্নয়ন প্রত্যাশিত হলেও দেখা যায় কোনো কাজই নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। ফলে বায়ু দূষিত হচ্ছে।
ঢাকা শহরসহ অন্যান্য বড় শহরে অনেক সময় দেখা যায়, ড্রেনের ময়লাগুলো রাস্তার পাশে জমিয়ে রাখা হয়। একসময় এগুলো শুকিয়ে ধূলিকণায় পরিণত হয় এবং পরিবেশ দূষিত করে। আবার সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো ময়লা বহনের সময় অধিকাংশ সময় না ঢেকেই বহন করে, ফলে বায়ুদূষণ হয়। বোঝাই যাচ্ছে বায়ুদূষণের পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। ফলে এই সমস্যা সমাধানে একটি সামগ্রিক চিন্তা ও পরিকল্পনা জরুরি। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কোনো উদ্যোগ নিতে না পারলে পরিস্থিতি সামনের দিনগুলোতে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। দূষিত বায়ু জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ধূলিকণা মানবদেহের ভেতরে ঢুকে ফুসফুসে গেঁথে থাকে এবং একনাগাড়ে এসব উপাদানের ভেতর দিয়ে চলাচল করলে হৃদ্‌রোগ, হাঁপানি ও ফুসফুসের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বায়ুদূষণ রোধসহ পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিবেশ অধিদপ্তর ‘নির্মল বায়ু এবং টেকসই পরিবেশ প্রকল্প’ বাস্তবায়নের পথে থাকলে শুধু এই প্রকল্প দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। যেসব সুনির্দিষ্ট কারণে বায়ুর দূষণ হচ্ছে সরকারকে সেসব দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সনাতন পদ্ধতির ইটভাটাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইটভাটায় রূপান্তর করা গেলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ দূষণ কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতামত, জনগণকে সম্পৃক্ত করে সুপারিশমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করলে এ দেশের বায়ু দূষণমুক্ত হবেই হবে। এ জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

সিরিয়ায় আমেরিকার দিন শেষ? by জেফরি ডি স্যাক্স

সাত বছর ধরে চলা গণহত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ গোটা সিরিয়াকে বিধ্বস্ত করে ফেলেছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের বেশির ভাগের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা। বর্তমানে সিরিয়া তুলনামূলকভাবে বেশ শান্ত। তবে আবার সেখানে বড় ধরনের লড়াই বাধার আশঙ্কা আছে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে নতুন করে রক্তপাত বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে।
সিরিয়া ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদ যে নতুন কৌশল-নীতি গ্রহণ করেছে, তার ভিত্তিতেই তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। আরব বসন্তের ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে সিরিয়ায়ও সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হলেও ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক ও ইসরায়েল বাশার আল-আসাদকে টেনে নামানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সিরিয়ার সরকারবিরোধী গ্রুপগুলোকে মদদ দিতে সিআইএকে কাজ শুরুর নির্দেশ দেন। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা আশা করেছিলেন, আরব বসন্তে মিসর ও তিউনিসিয়ায় যেভাবে দ্রুত সরকারের পতন হয়েছে, একইভাবে আসাদও ক্ষমতাচ্যুত হবেন। সিরিয়ার সংখ্যালঘু আলাবি শিয়া গোষ্ঠীর লোকজন নিয়েই মূলত আসাদ সরকার গঠিত। সে দেশে মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ আলাবি শিয়া, ৭৫ শতাংশ সুন্নি মুসলিম, খ্রিষ্টান ১০ শতাংশ এবং দ্রুজ সম্প্রদায়সহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের ৫ শতাংশ লোক আছে। আসাদ সরকারের পক্ষে রয়েছে ইরান ও রাশিয়া। আসাদকে সরিয়ে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও রাশিয়ার প্রভাব কমাতে চায়। তুরস্কের লক্ষ্য, তার এই সাবেক অটোমান সাম্রাজ্যভুক্ত এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চিরশত্রু কুর্দিদের দমন করা। সৌদির উদ্দেশ্য, সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব কমিয়ে আনা। ইসরায়েলও চায় ইরানকে এখানকার আধিপত্য থেকে সরিয়ে দিতে, যাতে লেবাননের হিজবুল্লাহকে শায়েস্তা করা সহজ হয়। আর কাতার চায় সিরিয়ায় শিয়া শাসনের পরিবর্তে ইসলামি শক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। তবে এই সম্মিলিত শক্তি শেষ পর্যন্ত বাশারকে গদি থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়েছে। মাঝখান থেকে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। বহু মানুষ ইউরোপে পালিয়ে গেছে। এতে ইউরোপে অভিবাসন-সংকট তৈরি হয়েছে এবং সেখানে অভিবাসনবিরোধী জনমত জোরালো হয়েছে। মূলত চারটি কারণে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট শক্তি আসাদকে উচ্ছেদে ব্যর্থ হয়েছে। প্রথমত, শুধু আলাবিরাই নয়, সুন্নি ইসলামপন্থীদের উত্থানের আশঙ্কায় সে দেশের খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীও আসাদকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ইরান ও রাশিয়ার ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। তৃতীয়ত, আইএস থেকে যেসব ছোট ছোট গ্রুপ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তাদের সামাল দিতে আসাদ উৎখাতে নিয়োজিত রসদ জোট বাহিনীকে আলাদাভাবে খরচ করতে হয়েছে। সর্বশেষ কারণ হলো আসাদবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বড় ধরনের কোন্দল রয়েছে। তারা নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে গিয়ে আসাদ উৎখাতে সম্মিলিত শক্তি প্রয়োগ করতে পারেনি। এখন বড় ধরনের যুদ্ধ থেমে আছে বটে, তবে রক্তপাতের ঘটনা ঘটেই চলেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা প্রথম থেকেই আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘনের বিষয়টি গোপন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা সেখানে রক্তপাতের জন্য ধারাবাহিকভাবে রাশিয়া ও ইরানকে দোষারোপ করলেও মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট যে সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব এখনো লঙ্ঘন করে চলেছে, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। গত বছরের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সিআইএর সহায়তা দেওয়ার অবসানের ঘোষণা দেন। তবে গত ডিসেম্বরে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে বলা হয়, মার্কিন বাহিনী সিরিয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবে এবং আসাদবিরোধীদের সহায়তা দিয়ে যাবে। এ কারণে সিরিয়ায় আবার যেকোনো সময় বড় আকারে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। সম্প্রতি আসাদ বাহিনী বিদ্রোহীদের ওপর অভিযান চালালে মার্কিন জোট পাল্টা বিমান হামলা চালায় এবং এতে প্রায় এক শ আসাদ অনুগত যোদ্ধা এবং অজ্ঞাত সংখ্যক রুশ সেনা নিহত হয়। এ ছাড়া ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরানি অবস্থানে সম্প্রতি হামলা চালিয়েছে। বিষয়টি রাশিয়া ও ইরান ভালোভাবে নেবে না। তারা যেকোনো সময় পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এ কারণে জাতিসংঘকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। সব মিলিয়ে এটি এখন স্পষ্ট, আসাদ সরকার থাকছে এবং ইরান ও রাশিয়া সিরিয়ায় তাদের প্রভাব ধরে রাখবে। কিন্তু মার্কিন নেতারা এখনো অলীক কল্পনার জগতে আছেন। তাঁরা এখনো মনে করছেন, সিরিয়ার গদিতে কে থাকবে, কে থাকবে না তা এখনো তাঁরা নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন না সে অবস্থা বহুদূরে চলে গেছে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জেফরি ডি স্যাক্স কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

কেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহামারি লেগেছে by আমিরুল আলম খান

সারা দেশে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এখন নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শিশু শ্রেণি থেকে শুরু করে বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পর্যন্ত ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। কঠোর শাস্তি, রিমান্ড, প্রশ্ন ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিলে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করেও কাজ হচ্ছে না। চলতি মাধ্যমিক পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি ও পদার্থবিদ্যা মিলে যে আটটি বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার সব প্রশ্নপত্রই ফাঁস করে দিয়ে দুর্বৃত্তরা সরকারকেই চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। এমনকি তারা ফেসবুকে আগাম বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে যথাসময়ে অন্য প্রশ্নও ফাঁস করবে।
বিচ্ছিন্নভাবে এর আগে কিছু প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের এমন ভয়াবহ রূপ আগে দেখা যায়নি। তাই সমগ্র জাতি সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে অনেক মানুষ জড়িত। প্রশ্ন প্রণয়নকারী, প্রশ্ন সমীক্ষক, বিজি প্রেস ও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারি ট্রেজারি, ব্যাংক বা থানায় পরীক্ষা-সংক্রান্ত কাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কোচিং সেন্টার ও পরীক্ষা গ্রহণকারী কর্মকর্তা-শিক্ষকেরা পর্যন্ত সন্দেহের তালিকায়। এঁদের মধ্যেই প্রশ্ন ফাঁসের রহস্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু তাঁরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছেন । প্রশ্ন ফাঁসকারী ও প্রশ্ন সংগ্রহকারীদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলা সহজ শুধু যদি বিষয়টা গোপনে সারা যায়, অর্থাৎ সরবরাহকারী ও গ্রহণকারী উভয়ে যদি নিজেদের আড়াল করে রাখতে পারে। কাজেই সেখানে চাহিদা ও সরবরাহের সূত্রটা বেশ লাগসই মনে হয়। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস এমন মহামারি আকার ধারণ করল কেন? সর্বকালেই তো পরীক্ষা হতো। আগে তো প্রশ্ন ফাঁসের এমন মহামারি দেখা যায়নি। প্রথমত, এখন শিক্ষার্থী কী শিখছে তার চেয়ে নজর বেশি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পাচ্ছে কি না। অর্থাৎ শিক্ষা হয়ে উঠেছে সার্টিফিকেট-সর্বস্ব। ভালো ফলের প্রতিযোগিতায় ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক, কোচিং সেন্টার, নোট-গাইড লেখক-প্রকাশক, প্রশাসক যেন এক কাতারে প্রশ্ন ফাঁসকারীদের সঙ্গে গড়ে তুলেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দ্বিতীয়ত, প্রতিবছর পরীক্ষার ফল প্রকাশে যে আত্মতুষ্টির প্রকাশ ঘটে, তা-ও কিছু দুর্বৃত্তকে এই অন্যায় কাজে প্রলুব্ধ করে থাকতে পারে। শিক্ষার চেয়ে জনতুষ্টিবাদ প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে শিক্ষা নয়, পরীক্ষায় ভালো ফল করাই হয়ে উঠেছে একমাত্র লক্ষ্য। প্রশ্ন ফাঁসের মতোই পরীক্ষার হলে বলে-কয়ে উত্তর লেখার দুর্নীতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। পরীক্ষার নামে কোমলমতি শিশুদের হাতে-কলমে দুর্নীতি শেখানো হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে দেশে মতৈক্য নেই। শিক্ষামন্ত্রী এর দায় চাপান শিক্ষকদের ঘাড়ে।
কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা অনুসন্ধানে সরকারের বিভিন্ন স্তরের নানা পেশার লোকদের সন্ধান পেয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী যদি শুধুই শিক্ষকদের প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য দায়ী করেন, তাহলে অন্য দুর্বৃত্তরা নিজেদের নিরাপদ ভাবে এবং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে আশকারা পায়। এই অবস্থা এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় কিন্তু অযোগ্য, অদক্ষ, দুর্নীতিবাজদের পদায়ন করে প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর ফলে যে যেখানে আছে সেখানেই মহাপরাক্রমশালী হয়ে উঠছে। তারা জানে, তাদের অপরাধের বিরুদ্ধে কেউ রা কাড়ার সাহস পাবে না। সমস্যার মূলে রয়েছে শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন এবং সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলায় শিক্ষার ভূমিকা সম্পর্কে শাসকগোষ্ঠীর ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে দুই বা তিনটি বিভাজন আছে। প্রথম দুই ভাগ হলো সৃজনশীল প্রশ্ন এবং বহুনির্বাচনী প্রশ্ন। বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর শতভাগ মুখস্থনির্ভর। অথচ ঢোল পিটিয়ে বলা হচ্ছে, ‘মুখস্থকে না বলো’। দ্বিতীয় ভাগে আছে সৃজনশীল প্রশ্ন। এই পদ্ধতির উদ্ভাবক বেঞ্জামিন স্যামুয়েল ব্লুম। তিনি প্রথমেই শিক্ষার্থীকে অসীম সৃজনশীল শিশু হিসেবে গণ্য করেন এবং শিশুর মধ্যে যে সৃজনশীলতা লুকিয়ে থাকে, তার বিকাশ সাধনে শিক্ষকের সহায়কের ভূমিকা পালনের ওপর জোর দেন। সেখানে শিক্ষার্থীর বয়স, রুচি ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রশ্নের মাধ্যমে অধিকতর জ্ঞান সন্ধানে শিক্ষার্থীকে প্রণোদিত করা হয়। এ জন্য প্রথমেই সৃজনশীল পাঠ্যবই রচনা করা দরকার হয়। তারপর দরকার শিক্ষককে সৃজনশীল পাঠদানে দক্ষ করে তোলা। আমাদের দেশে এর কোনোটাই করা হয়নি। প্রথম দুই জরুরি কাজ না করেই তৃতীয় ধাপ, অর্থাৎ সৃজনশীল প্রশ্নে পরীক্ষা গ্রহণের এক উদ্ভট নাটক মঞ্চস্থ করে চলেছে শাসকগোষ্ঠী। অর্থাৎ ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সর্বনাশ করা হচ্ছে। এর পেছনে মুখ্য কারণটি হলো, শাসকগোষ্ঠীর সন্তানেরা সাধারণত এই পদ্ধতিতে লেখাপড়া করে না। বাংলাদেশের মতো এত বৈষম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা বোধকরি দুনিয়ার অন্য কোথাও চালু নেই। সৃজনশীল প্রশ্নের নামে এমন সব নালায়েক প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের নাজেহাল করা হচ্ছে যে দুনিয়ায় এর কোনো নজির নেই। তৃতীয় ভাগটি হলো ব্যবহারিক পরীক্ষা। দেশে কোনো স্কুল-কলেজেই এখন ব্যবহারিক ক্লাস করানো হয় না;
কিন্তু সব পরীক্ষার্থীকেই ব্যবহারিকে শতভাগ নম্বর দেওয়ার রীতি গড়ে তোলা হয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই এই দুর্নীতির আসল কারণ। শাসকগোষ্ঠী যেন চাইছে, আমজনতার সন্তানেরা শুধু দেশকে শিক্ষার সূচকে এগিয়ে নিয়ে যাক, তাদের যেন কর্মসংস্থান না হয়। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষিত বেকারের হার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সৃজনশীল পদ্ধতি চালু ও চর্চার জন্য আদৌ প্রস্তুত নয়। সৃজনশীল পদ্ধতি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দেওয়ার অঙ্গীকার করে, অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যা কখনো কার্যকর করা সম্ভব নয়। একটি উদার, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক, সুশাসিত সমাজেই কেবল সৃজনশীল পদ্ধতি সফল হতে পারে। সৃজনশীল প্রশ্ন করে কক্সবাজারের বাঁশখালীর তেরোজন শিক্ষককে জেলে পাঠানো হয়েছে। অনেকে জেল খেটেছেন, কেউ চাকরিচ্যুত হয়েছেন, অনেকে নানা রকম ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক হেনস্তার শিকার হয়েছেন। গণতন্ত্র একটি ভালো ব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশে যেমন তার সঠিক চর্চা ও প্রয়োগ করা যাচ্ছে না, ঠিক তেমনি সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিও এ দেশে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এসব কারণে দেশে প্রশ্ন ফাঁসের মহামারি লেগেছে। একুশ শতকের সম্ভাবনাময় সময়ে বাংলাদেশের কোটি কোটি সন্তানের সুশিক্ষা প্রাপ্তি ও দক্ষ হয়ে মানবসমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পথে এটা বিরাট বাধা। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা বিধানে সরকারের ব্যর্থতা সুদূরপ্রসারী ক্ষতির কারণ হবে।
আমিরুল আলম খান: যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান
amirulkhan7@gmail.com

মোদি আসলে কার পক্ষে? by মাহফুজার রহমান

ফিলিস্তিন সংকট। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চলমান অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর একটি। বলা যায়, ইসরায়েলি দখলদারি আর যুক্তরাষ্ট্রের একচোখা নীতির কারণে জিইয়ে রয়েছে এই সংকট। এমন দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যে দেশ দখলদার ইসরায়েল ও নিপীড়িত ফিলিস্তিন—দুই পক্ষের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে ব্যস্ত। আপাতদৃষ্টিতে যেন সেই কাজই করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু কারও পক্ষে বিবদমান দুই গোষ্ঠীরই প্রকৃত বন্ধু হওয়া কি সম্ভব? গত সপ্তাহেই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিলিস্তিন সফর করেন মোদি। এই সফরে তিনি রামাল্লায় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেন। মোদিকে ‘মহান অতিথি’ হিসেবে অভিহিত করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে ভারতের সমর্থন চান আব্বাস। মোদিও ঘোষণা দেন, নয়াদিল্লি খুব শিগগির স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র দেখতে চায়। তিনি টুইট করেন, ‘ভারত-ফিলিস্তিনের বন্ধুত্ব সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। প্রযুক্তি, অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা খাতে ভারত-ফিলিস্তিনের পারস্পরিক যে সহযোগিতা চলছে, তাতে আমি আনন্দিত।’ এই মোদিই সাত মাস আগে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন। সেখানে দেওয়া ভাষণে মোদি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বন্ধু সম্বোধন করেন। বলেন, ‘বন্ধুত্ব শুধু আমাদের দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মোদি-নেতানিয়াহুরও রয়েছে বন্ধুত্বের সম্পর্ক।’ এর ধারাবাহিকতায় গত মাসে ভারত সফর করেন নেতানিয়াহু। তিনি ভারতকে ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ বলে অভিহিত করেন। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার জন্য সমঝোতা হয় ‘দুই বন্ধুর’।
১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ইসরায়েল। ওই বছরই আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডসহ বেশ কিছু আরবভূমি দখল করে নেয় ইসরায়েল। এরপর ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের প্রায় পুরোটাই ও মিসরে সিনাইয়ের কিছু ভূমিও দখল করে ইসরায়েল। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে সীমানা বরাদ্দ রেখেছিল, বর্তমানে তার অর্ধেকও ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে নেই। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের হটিয়ে তাদের জমির ওপর প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ইহুদি বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্রায় ৭০ বছরে ইসরায়েলি হামলায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছে। মোদির ভারত কীভাবে একই সঙ্গে এই নিপীড়িত ফিলিস্তিন আর দখলদার ইসরায়েলের বন্ধু হবে? ইতিহাস বলে, ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক বেশ পুরোনো। সেই ১৯৫১ সালেই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় ভারত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের সময় ভারতের সঙ্গে প্রকাশ্য সম্পর্ক ছিল না ইসরায়েলের। তবে গত প্রায় ২৫ বছরে ভারত-ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আর মোদি সরকারের সময় এই সম্পর্ক সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। কারও কারও মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে মোদির ভারতের বন্ধনের বিষয়টি আসলে ‘স্বাভাবিক’। কারণ, মোদির দল বিজেপি যেমন মুসলিমবিরোধী, ইসরায়েলও তা-ই। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যই মোদি-নেতানিয়াহুকে এত কাছাকাছি এনেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভবিষ্যতের পরাশক্তি হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় নামা ভারতের চাই আধুনিক অস্ত্র, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ নানা খাতে এগিয়ে যাওয়া। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) চলতি বছরের রিপোর্ট বলছে, এই মুহূর্তে সামরিক খাতে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রেখেছে ভারত। এ খাতে দেশটির বরাদ্দ পাঁচ হাজার কোটি ডলারের ওপরে। সুতরাং সামরিক বা প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের জন্য ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার বাইরের কারও কাছে যেতে হতো। এ ক্ষেত্রে ইসরায়েলই তাদের সবচেয়ে ভালো মিত্র। এই ইসরায়েলের সঙ্গে মিত্রতার পর ফিলিস্তিনের দিকে ঘেঁষছেন কেন মোদি? এ বিষয়টাও স্পষ্ট। ফিলিস্তিনিদের প্রতি আরব তথা মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সমর্থন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলোতে বিভিন্ন খাতে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক কাজ করছেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ প্রবাসী আয় পায় নয়াদিল্লি। জ্বালানি তেলের জন্যও ভারতের ভরসা মধ্যপ্রাচ্য। এসব বিষয় মাথায় রেখেই ফিলিস্তিন সফরের পাশাপাশি জর্ডান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন। আর মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তি ইরানের সঙ্গে আলাদা করে সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যস্ত মোদি সরকার। গত বৃহস্পতিবার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গিয়ে নয়টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি।
১০ বছরের মধ্যে কোনো ইরানি প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম ভারত সফর। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন বাড়ানোর বিকল্প কৌশল নেই মোদির। মোদির আগেও ভারতের বিভিন্ন সরকারের আমলে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার উদ্যোগ ছিল নয়াদিল্লির। আরব বিশ্বের বাইরে ভারতই প্রথম দেশ, যে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতি দেয়। এ ছাড়া গত ডিসেম্বরেও জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে দেখা গেছে ভারতকে। পবিত্র জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রত্যাহারের পক্ষে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব অনুমোদন হয়। ওই প্রস্তাব নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে ১২৮ সদস্য ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। যার একটি ছিল ভারত। ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পর ভারত ফিলিস্তিনকেও গুরুত্ব দিচ্ছে—এর আরেকটি কারণ হলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে ভারতের। এটা পেতে হলে জাতিসংঘের সংস্কার প্রয়োজন। এই সংস্কারের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন দরকার। এই সমর্থন পেতে নয়াদিল্লিকেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করতে হবে। এটাও প্রমাণ করতে হবে—আন্তর্জাতিক আইন-রীতির, শৃঙ্খলা, মানবিকতার প্রতি নয়াদিল্লির অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে। সেই দিক বিবেচনায় ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিতেই হবে মোদির। মোট কথা, ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের যতই মধুর সম্পর্ক হোক না কেন, ফিলিস্তিনকে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই নয়াদিল্লির। এ কারণেই প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করা মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিলিস্তিন সফর করলেন। ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থনও ঘোষণা করলেন।
মাহফুজার রহমান: সাংবাদিক
manik.mahfuz@gmail.com

আবারও খেয়ালখুশির নিয়োগ! by শাহদীন মালিক

পাঠক হয়তো ভাবছেন কে আবার নিয়োগ পেল, যা এই কলাম লেখকের অপছন্দ? না, নিয়োগ হয়নি। হবে হবে করছে। আদালতপাড়ায় বেশ কিছুদিন ধরে জল্পনা-কল্পনা-গুঞ্জন ও গুজব। উনি বিচারপতি হচ্ছেন আর অন্য কারও সম্পর্কে হয়তো বলা হচ্ছে যে তিনি হতে পারবেন না; কেউ বলছে, নতুন বিচারপতি হবেন ১০ জন; কারও মতে এক কুড়ি। আপিল বিভাগ নিয়েও গুঞ্জন আছে। ওখানে যাচ্ছেন ২,৩ অথবা ৫ জন। নানা মুনির নানা মত। তবে আমরা যারা আদালতের বারান্দা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করি, তাদের এসব হরেক গুজবে কান না দিয়ে উপায় নেই। মাঝেমধ্যে সাংবাদিকেরাও পাকড়াও করেন-স্যার, কিছু শুনলেন, কে কে হচ্ছেন? তাঁদের ধারণা, আদার ব্যাপারী বোধ হয় জাহাজের খবর রাখে। নিজে নিজের জন্যই দোয়া করি-ওদের ইচ্ছা বাস্তবায়িত হোক, জাহাজের খবর চলে আসুক। তবে অদ্যাবধি সেই খবর আসেনি। বিচারপতিদের নিয়োগ হয়ে গেলে আজকের শিরোনাম দিয়ে লিখলে নির্ঘাত বড় বিপদে পড়তে হতো। সদ্য নিয়োগ পাওয়া মাননীয় বিচারপতিদের সবাই না হলেও অন্তত তাঁদের দু-চারজন হয়তো ভাবতেন-ব্যাটার এত বড় সাহস, আমাদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে! নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনার কোনো মনোবাসনা এই অধমের নেই। তাই প্রকৃত নিয়োগের আগেই এই লেখা।
২. নিয়োগ-সংক্রান্ত আইন থাকলেই যে নিয়োগ অতি উত্তম হবে, কোনো ধানাইপানাই হবে না, তার শতভাগ নিশ্চয়তা নেই। পত্রপত্রিকায় দেখছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো উপাচার্য নাকি আজকাল পিয়ন-দপ্তরির বেলায়ও লাখ লাখ টাকার নিয়োগ-বাণিজ্য করেন। সুহৃদ পাঠকদের অনেকেই নিশ্চয় চাকরি করেন ব্যাংক, বিমা, প্রাইভেট কোম্পানি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে; হয়তো এনজিও বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অথবা সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে। ছোটখাটো প্রাইভেট কোম্পানি বাদ দিলে আজকাল প্রতিষ্ঠিত সব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ আইন আছে। অর্থাৎ চাকরিতে নিয়োগ পেতে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সেকেন্ড ডিভিশন বা ফার্স্ট ক্লাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাকি যেকোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হলেই চলবে অথবা পাক্কা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগবে-এসব কথাও বলা থাকতে পারে। আজকাল তো দেখছি কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের জন্য বলেই দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাজ্যের ডিগ্রি লাগবে। আসল কথা হলো, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা-সংক্রান্ত শর্ত ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হলে সেই নিয়োগ স্বেচ্ছাচারী হতে বাধ্য, যাতে ভাগনে বা ভাতিজা বা নিজের লোক না হয়ে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি নিয়োগ পায়। সে জন্যই বড় বড় প্রতিষ্ঠানের, সরকারের এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ-সংক্রান্ত বিধি বা আইন থাকে। পাড়ায় মুদিদোকানের পান-বিড়ি, দরজি, সেলুন বা মিষ্টির দোকানের নিয়োগবিধি আছে বলে শুনিনি। মুদির দোকানটা চলে ভাই, ভাতিজা, শ্যালক বা অন্য কোনো আপনজনের সাহায্যে। তাঁরা নিয়োগ পান নিয়োগবিধি ছাড়াই। অন্য কথায় যেখানে বিশেষ কোনো দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রয়োজন নেই, সেখানে ‘আপন লোক’ প্রয়োজন, সেটাই দক্ষতা। সেটাই যোগ্যতা। কিন্তু শুধু মুদির দোকান, সেলুন আর দরজির সেলাইখানা দিয়ে তো আর দেশ চলবে না। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য তো আছে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সরকারি কর্মকমিশন বা পাবলিক সার্ভিস কমিশন অথবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজই হলো সরকারের কর্মে নিয়োগ দেওয়া। তবে খোদ সরকারি কর্মকমিশনে কারা মেম্বার-চেয়ারম্যান হবেন, তার কোনো আইন নেই নির্বাচনের জন্য। আর বলা বাহুল্য, কোনো আইন নেই বিচারপতিদের জন্যও। ইদানীং নির্বাচন কমিশনের মেম্বার ও চেয়ারম্যান নিয়োগে কী যেন সার্চ কমিটি বা ওই গোছের কিছু একটা করা হয়েছিল। বদ নিয়ত। নিম্ন আদালতের প্রবেশপদ, অর্থাৎ সহকারী বিচারকদের নিয়োগের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতার বিধান আছে, তারপর এমসিকিউ, দশ না বারো পেপারে লিখিত পরীক্ষা, ইন্টারভিউ এবং সবশেষে স্বাস্থ্য ও গোয়েন্দা পরীক্ষা। সহকারী বিচারক নিয়োগ-সংক্রান্ত এসব কর্মীর জন্য আছে আলাদা প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন। সার্চ কমিটি কাদের নিয়ে গঠিত হবে, অর্থাৎ কারা পরীক্ষা নেবেন, সেটাও আইনে বলে দেওয়া আছে। যেহেতু আইনে বলে দেওয়া আছে, সেহেতু স্ট্যান্টবাজির দরকার নেই।
৩. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৫ (২) (গ)-তে বিচারপতিদের নিয়োগের জন্য আইন দ্বারা যোগ্যতা নির্ধারণের নির্দেশনা আছে। এই নিয়ে আলাপ-আলোচনা, লেখালেখি, সেমিনার-টক শো হচ্ছে বছরের পর বছর। সর্বশেষ দেখলাম মিজানুর রহমান খান লিখেছেন প্রথম আলোয় ‘সুপ্রিম কোর্টকেই নেতৃত্ব দিতে হবে’ এই শিরোনামে (প্রথম আলো, ১৪ ফেব্রুয়ারি, পৃষ্ঠা ১০)। মুখে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের কথা যতই ঘন ঘন বলা হোক না কেন, ক্ষমতাকে কেউ আইন দ্বারা সীমিত করতে চায় না। রাজা-বাদশাহদের সময় ওনাদের, অর্থাৎ জাহাঁপনাদের ক্ষমতা কোনো আইনের দ্বারা সীমিত ছিল না। কাকে কোন পদে বসাবেন, সেটা ছিল তাদের একচ্ছত্র এখতিয়ার। সেই যুগ আর নেই। বলা হয়, আমরা এখন প্রজাতন্ত্র, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের যুগে ঢুকে গেছি, কিন্তু ইচ্ছেমতো নিয়োগ দেওয়ার খায়েশটা ছাড়তে পারছি না। পূর্বপুরুষেরা জমিদার থাকুক না থাকুক। কোথায় যেন পড়েছিলাম বা শুনেছিলাম, পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো নাকি মৃত্যুর আগে উইল করে বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান হবেন তাঁর পুত্র। হয়েছিলও তা-ই, বেনজির ভুট্টো নিহত হওয়ার পর। তখন তাঁর পুত্রের বয়স ছিল ১৯ বা ২০। এখন দেখছি আমাদের বিএনপিও সেই পথে এগোচ্ছে। পার্টি নাকি চলছে সুদূর লন্ডন থেকে। ব্যক্তিবিশেষের খায়েশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রে স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ষোড়শ সংশোধনী মামলায় সাতজনের মধ্যে ছয়জনই ছোট-বড় আলাদা আলাদা রায় দিয়েছেন। ওই মামলায় বিচারপতি মির্জা হোসেন হায়দারের পৃথক রায়ের প্রায় পুরোটা জুড়েই বিচারপতি নিয়োগের আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। তাঁর মোদ্দা কথা হলো, বিচারপতি নিয়োগ-সংক্রান্ত আইন ছাড়া বিচার বিভাগ সঠিকভাবে স্বাধীন হয় না। বর্তমান সরকার বা তার আগের সরকার কেউই চায়নি যে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন হোক। আর তাই বিচারপতি নিয়োগে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা বহাল রাখতে এ-সংক্রান্ত আইন পাস হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’ স্লোগানটা বিচারপতি নিয়োগকে লক্ষ্য করে রচিত হয়নি।
ড. শাহদীন মালিক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইনের শিক্ষক।

কোটার অচলায়তন ভাঙতেই হবে by আলী ইমাম মজুমদার

জনপ্রশাসন রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনায় একটি অপরিহার্য অঙ্গ। তাদের দক্ষতার ওপর দেশের শাসনব্যবস্থার মান ওঠানামা সম্পর্কিত। স্বাধীনতার পর থেকে এর নিয়োগপ্রক্রিয়া, বিশেষ করে বৈষম্যমূলক কোটা-ব্যবস্থা সতত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সমাজে ক্ষোভ সৃষ্টিরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিক মেধাবীদের উপেক্ষা করে প্রাধিকার কোটায় কম মেধাবীদের নিয়োগের সুযোগ জনপ্রশাসনের দক্ষতা হ্রাসে ভূমিকা রাখছে বলে যৌক্তিকভাবে ধরে নেওয়া যায়। চাকরির সুযোগ লাভে সমতার যে সাংবিধানিক অঙ্গীকার, তার বিপরীতে যুগ যুগ ধরে ভিন্ন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। আর এর সম্প্রসারণ ঘটেছে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যও। এসব বিষয় নিয়ে সরকারিভাবে অনেক কমিটি-কমিশন হয়েছে। গবেষণা হয়েছে বেসরকারি পর্যায়েও। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এ বিষয়ে আগে কোটা-ব্যবস্থার বিপরীতে সোচ্চার অবস্থানে ছিল। এর প্রতিফলন ঘটত তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে। সংবাদপত্রের কলামে এ নিয়ে সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় অনেক লেখা হয়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও এসেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে, কিন্তু হেরফের হয়নি অবস্থার। বর্তমান সরকারের ২০০৯-এর নির্বাচনী অঙ্গীকার দিনবদলের সনদে মেধাকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রত্যয়টি উপেক্ষিত হচ্ছে। এমনকি ২০১২ সালে প্রণীত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে মেধাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কোটা-ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের অঙ্গীকার বাস্তবায়নেরও কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন। তাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সদা প্রাসঙ্গিক থাকছে। আমাদের সংবিধান বলছে, প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে সবার নিয়োগলাভের সমান অধিকার থাকবে। পাশাপাশি বাস্তবতা বিবেচনায় সংবিধানপ্রণেতারা সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির জন্য কোটা সংরক্ষণের বিধানও রেখেছেন। অথচ এখন উচ্চতর সিভিল সার্ভিসের মেধার মাধ্যমে নিয়োগ পান ৪৫ শতাংশ প্রার্থী। এভাবে নিয়োগ হচ্ছে জনপ্রশাসনের বিভিন্ন ক্যাডারে। এর মধ্যে আছে প্রশাসন, কূটনীতিক, পুলিশ থেকে সরকারি কলেজের শিক্ষক আর চিকিৎসক। একইভাবে নিয়োগ হয় নিম্ন আদালতের বিচারক পদেও। তবে সামরিক বাহিনীর কমিশন্ড অফিসার পদে কোনো ধরনের কোটাই নেই। মেধাই সে ক্ষেত্রে নিয়োগের মাপকাঠি। স্বাধীনতার পরপরই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে চালু হয় কোটা পদ্ধতি। কোটা আছে উপজাতি, মহিলা, জেলা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য। এর পরিমাণ ২৫ শতাংশ। আর মুক্তিযোদ্ধার পোষ্যদের প্রাধিকার কোটা ৩০ শতাংশ। স্বাধীনতার পরপর শিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়োগ দিতে কিছুকালের জন্য হয়তোবা এর যৌক্তিকতা ছিল। ছিল একটা আবেগাশ্রয়ী দিক। তবে একে স্থায়িত্ব দেওয়ার নৈতিক দিকটি প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁদের মধ্যে সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির কেউ কিংবা সংখ্যাটি যৌক্তিক হলে সেটা মেনে নেওয়া যেত। এখন পর্যন্ত যত মুক্তিযোদ্ধা নিবন্ধিত হয়েছেন, তাঁদের পোষ্যের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশ হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য ৩০ শতাংশ চাকরির প্রাধিকারকে কীভাবে যৌক্তিকতা দেওয়া যায়? কোনো স্বাধিকার কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না থাকলে পদ খালি রাখার নির্দয় ব্যবস্থাও প্রায়ই নেওয়া হয়। জেলা কোটাকে যেভাবে রাখা হয়েছে, তা অবাস্তব এবং নিয়োগদাতাদের কাজকে জটিল করে ফেলছে। সর্বশেষ জনগণনামতে, জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতি জেলায় কোটা ভাগ করা হয়।
এ ক্ষেত্রে উন্নত জেলাগুলো কেন এই সুবিধার আওতায় আসবে তা বোধগম্য নয়। দেশের বিভিন্ন জেলার আর্থসামাজিক দিক বিবেচনায় নিচের দিকে থাকা কয়েকটি জেলাকে অনগ্রসর অঞ্চল বলে একটি কোটা সংরক্ষণ করা যায়। মহিলা কোটা আরও কিছুকাল রাখার প্রয়োজন রয়েছে। উপজাতি কোটা দেশে তাদের সংখ্যানুপাতে অনেক বেশি। অন্যদিকে এর সুফল ভোগ করছে গোটা তিনেক তুলনামূলকভাবে উন্নত সম্প্রদায়। সাঁওতাল, মুন্ডার মতো সমতলের উপজাতিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব সিভিল সার্ভিসে দৃশ্যমান হয় না। তাই এই কোটার পরিমাণ ও বিন্যাস নিয়ে কিছু ভাবনার আছে। কোটা-ব্যবস্থাকে সমূলে তুলে দেওয়ার জন্য হয়তো কেউ বলবে না। এটা ছিল অবিভক্ত ভারতে। ছিল পাকিস্তান সময়কালেও। এখনো ভারত ও পাকিস্তানে আছে। তবে তাদের সমাজকাঠামোর সঙ্গে আমাদের পার্থক্য ব্যাপক। ভারত বিভিন্ন জাতপাতে বিভক্ত দেশ। সেখানেও অনগ্রসর শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত কোটার প্রয়োগ হয় সতর্কভাবে। সেই শ্রেণিগুলোর কোনো প্রার্থীর পিতা-মাতার সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান একটি নির্ধারিত মানের নিচে না থাকলে তাঁকে সেই সুযোগ দেওয়া হয় না। আর কোনো সদস্য এই কোটা-সুবিধা ভোগ করলে তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম এটা করতে পারে না। এ ছাড়া যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা নিয়েও আছে ব্যাপক ক্ষোভ। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে সংস্কার করা হয় সেখানে। বিশ্ব ছোট হয়ে আসছে। আমরা প্রায় প্রতিটি বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজের ভাগ বুঝে নিতে হলে মেধার দাপট প্রয়োজন। আর তা করতে হলে প্রতিটি চাকরিতে সর্বোচ্চ মেধাবীদের স্থান দেওয়ার দাবিই তো যৌক্তিক। পাশাপাশি তাঁদের প্রতি অব্যাহতভাবে অবিচার করে দূরে ঠেলে দিয়েই বহুমাত্রিক বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি করা হচ্ছে। বলা হতে পারে, শুধু মেধাবী হলেই তাঁরা ভবিষ্যতের ভালো কর্মকর্তা হবেন, এমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না। কথাটি সব ক্ষেত্রে অমূলক না-ও হতে পারে। নিয়োগের পর তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত স্থানে পদায়ন এবং প্রভাবমুক্ত পরিবেশে আইনানুগভাবে কাজ করার সুযোগ আর প্রয়োজনীয় তদারকি একজন দক্ষ কর্মকর্তা তৈরির জন্য নিয়ামক। তবে গোড়াতেই অধিকতর মেধাবীদের বাদ দিয়ে কম মেধাবীদের নিলে সমস্যার সূচনা এখান থেকেই হবে। আর তা-ই হয়ে চলেছে দীর্ঘকাল। ফলে গোটা বেসামরিক শাসনব্যবস্থার নিম্নমুখী মান লক্ষণীয়। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চলেছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো। প্রতিকার হিসেবে ব্যয়বহুল বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া হয়। সেই সব প্রশিক্ষণও কিছু কর্মকর্তার গ্রহণ করার সামর্থ্য নেই, এমনটাও দেখা যায়। এর প্রধান কারণ মেধার ঘাটতি। চলমান কোটা পদ্ধতি নিয়ে অনেক কমিশন-কমিটি কাজ করার বিষয়ে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বশেষ পিএসসি ২০০৮ সালে ইউএনডিপির আর্থিক সহায়তায় দুজন সাবেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তার মাধ্যমে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। তারা গোটা ব্যবস্থাটিকে অন্যায্য এবং জনপ্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর বলে মতামত দেয়। সুপারিশ রাখে প্রাধিকার কোটায় বড় ধরনের হ্রাসের। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইজিএস একটি গবেষণামূলক নিবন্ধেও অনুরূপ সুপারিশ রয়েছে। আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো কোটাই একেবারে বিলুপ্ত করা হয়তো সম্ভব হবে না। তবে সরকারের অঙ্গীকার অনুসারে মেধা কোটা যৌক্তিক পরিমাণে বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে পরিমাণটা কত হবে, তা নিয়ে বিতর্ক হবে। যদি বলা হয় সেটা শতকরা ৮০ হতে হবে, তাহলে আদৌ অন্যায্য হবে না। সব কোটাই সাকল্যে ২০ শতাংশে সীমাবদ্ধ করতে হবে। এটা সম্ভব ও সমীচীন। আমরা রাষ্ট্রের জনগণের করের টাকায় তাদের সিংহভাগকে চাকরির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে চলেছি। অধিকতর মেধাবীদের পাশে ফেলে টেনে তুলছি কম মেধাবীদের। এর পক্ষে কী যুক্তি আছে, তা কিন্তু কেউ জোর দিয়ে বলছেন না। আর বিপক্ষে যত যুক্তি-তর্ক থাকুক, তা হচ্ছে উপেক্ষিত। জনপ্রশাসনকে উপেক্ষার খেসারত রাষ্ট্র দিয়ে চলেছে। জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে যথোপযুক্ত তথ্যসমৃদ্ধ পরামর্শ প্রদান, তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অদক্ষতা স্পষ্ট দৃশ্যমান। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বিষয়াদিতে দর-কষাকষিতে আমরা কাম্য সাফল্যের ছাপ রাখতে পারছি না। এর অনেক কারণ আছে। প্রশাসনে ব্যাপক রাজনীতিকীকরণ তার মধ্যে একটি বড় নিয়ামক। পাশাপাশি জনপ্রশাসনে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধার মূল্যায়নও যথার্থভাবে হচ্ছে না; নিয়োগকালে তো নয়ই। এভাবে আর কতকাল চলবে তা বোধগম্য হচ্ছে না। তবে অচলায়তন একসময় ভাঙতেই হবে।
আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব
majumderali1950@gmail.com

'কত টাকা পেয়েছেন ট্রাম্প?’

রাগে-দুঃখে চোখে পানি চলে আসছিল। তাকে এতটুকু প্রশ্রয় না দিয়ে দু’হাতে দ্রুত মুছে ফেলছিলেন অষ্টাদশী মেয়ে। ক্ষোভে ফুটতে ফুটতে কখনও কথা দিয়ে আঘাত করছিলেন প্রেসিডেন্টকে, কখনো বা মার্কিন জনপ্রতিনিধিদের। আর তার সুরে সুর মেলাচ্ছিলেন বড়রাও। অস্ত্র আইনে রাশ না টানা, ন্যাশনাল রাইফ্‌ল অ্যাসোসিয়েশন-(এনআরএ)-এর কাছ থেকে দানখয়রাতি হাত পেতে নেয়া— সব বিষয়েই নেতাদের চোখা চোখা শব্দে আক্রমণ করেছেন হাইস্কুলের ছাত্রী এমা গঞ্জালেস। শনিবার ফ্লরিডার ফোর্ট লডেরডেল-এ মারজরি স্টোনম্যান ডগলাস স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা অস্ত্রে নিষেধাজ্ঞার ডাক দিয়ে এক সভা করে। যে সব মার্কিন জনপ্রতিনিধি অস্ত্রে নিষেধ সমর্থন করেন না বা যারা এনআরএ-র কাছ থেকে টাকা নেন— তাদের ক্ষমতা থেকে সরানোর দাবি তুলেছে শিক্ষার্থীরা। এত প্রাণহানি সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র আইন নিয়ে টুঁ শব্দ শোনা যায় না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে। একটা করে হামলা হয়। আর তিনি নীরব। দোষ দেন বন্দুকবাজদের মানসিক সমস্যাকে। এমার বক্তৃতার ঝাঁঝ তাই পরোয়া করেনি প্রেসিডেন্টকেও। জোরালো গলায় সে বলেছে, ‘‘যদি প্রেসিডেন্ট আমার কাছে এসে মুখের উপরে বলেন, যে এটা মর্মান্তিক ঘটনা ছিল... কিন্তু এটা নিয়ে তেমন কিছুই করার নেই... তা হলে খুব হাসিহাসি মুখে আমি তাকে জিজ্ঞেস করব, এনআরএ-র কাছ থেকে কত টাকা পেয়েছেন উনি? যদিও সংখ্যাটা আমি জানি।
তিন কোটি ডলার! যে নেতাই এনআরএ-র কাছ থেকে টাকা নেন, তার লজ্জা হওয়া উচিত।’’ তার আশপাশে সবাই বলে ওঠেন, ‘‘শেম অন ইউ!’’ স্টোনম্যান স্কুলে ১৪ বছরের মেয়ে অ্যালিসাকে হারিয়ে মা লোরি আলহাডেফ দিন দুই আগে এমার মতোই প্রেসিডেন্টকে সক্রিয় হয়ে কিছু করার আর্জি জানিয়েছিলেন। এ বার সরব হলো শিক্ষার্থীরাও। অস্ত্র আইনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন এমা। সে দিন স্কুলে অডিটোরিয়ামে ঢুকে প্রাণ বেঁচেছে তার। বক্তৃতায় বলেছেন ‘‘কিছুতেই বুঝতে পারি না সপ্তাহান্তে বন্দুক কেনার চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মজা করাটা কি এত কঠিন?’’ এমার সাফ কথা, ‘‘বড়রা হয়তো এটা বলতেই অভ্যস্ত যে, এ সব হতেই থাকবে। কিন্তু আমরা, শিক্ষার্থীরা শিখেছি পড়াশোনা না করলে ব্যর্থ হতে হয়। এ ক্ষেত্রে যদি তুমি সক্রিয় ভাবে কিছু না কর, মানুষ মরতেই থাকবে।’’ স্কুলের শৌচাগারে লুকিয়ে বেঁচে যান রায়ান ডিচ। অস্ত্র আইনে নিয়ন্ত্রণ চেয়ে তার দাবি, ‘‘আইনসভার প্রতিনিধিরা ভোট দিন। আর কত খারাপ হবে?’’ ট্রাম্প অবশ্য বিতর্কে কান দিচ্ছেন না। এফবিআইকে দুষে তার টুইট, ‘‘দুঃখজনক ব্যাপার। এফবিআই ফ্লরিডার স্কুলের বন্দুকবাজকে নিয়ে সব তথ্য অবহেলা করেছে। ট্রাম্প শিবিরের সঙ্গে রুশ যোগাযোগের প্রমাণ খুঁজতেই ব্যস্ত ওরা। নিজেদের দায়িত্বটা ঠিক করে পালন করুন।’’ গোয়েন্দা সূত্রে খবর, মৃত্যুদণ্ড এড়াতে দোষ কবুল করে ক্ষমা চাইতে পারে বন্দুকবাজ নিকোলাস ক্রুজ।

স্বাধীনভাবে নিজস্ব ব্যবসা শুরুর অধিকার পেল সৌদি নারীরা

সৌদি আরবের নারীরা এখন থেকে স্বামী বা পুরুষ আত্মীয়ের অনুমতি ছাড়াই নিজের ব্যবসা শুরু করতে পারবে। সৌদি সরকার বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সৌদি আরবের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে জানায়, সৌদি নারীরা এখন থেকে পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি থাকার বিষয়টি প্রমাণ করা ছাড়াই তাদের নিজস্ব ব্যবসা শুরু করতে পারবে এবং সরকারের ই-সেবা থেকে লাভবান হতে পারবে।
মন্ত্রণালয় জানায়, সৌদি নারীরা এখন থেকে স্বাধীনভাবে তাদের নিজস্ব ব্যবসা শুরু করতে পারবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মুখপাত্র আবদুল রহমান আল-হুসাইন বৃহস্পতিবার এক টুইটে আরবি হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে এই ঘোষণা দেন। হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ‘নো নিড’ প্রচারাভিযানের উদ্যোগ নিয়ে এই শিথিলতা অর্জন করেছে বলে জানায় সৌদি আরবের সরকারি বার্তা সংস্থা। সৌদি আরব সম্প্রতি সরকারি চাকুরিতেও নারীদের নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া সৌদি আরবে কয়েক দশক ধরে নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিলো, তাও তুলে দেয়া হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও যুব সমাজের কাছে দেশের একটি আধুনিক ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ার লক্ষ্যে সৌদি আরবে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে গত অক্টোবরে ‘মধ্যমপন্থী ও মুক্ত’ সৌদি আরব গড়ার প্রত্যয়ে শুরু হওয়া ‘ভিশন-২০৩০’ সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশটি নারীর হার মোট কর্মজীবীর ২২ শতাংশ থেকে প্রায় এক তৃতীয়াংশে উন্নীত করতে চায়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার পেতে যা করছে কিশোর-কিশোরীরা

এমনিই সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলো এখন ল্যাপটপ, মোবাইলে ডুবিয়ে রেখেছে শিশু থেকে কিশোর ও যুব সম্প্রদায়কে। আর নতুন এক সমীক্ষা বলছে, বিশ্বের কিশোর-কিশোরীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের পরিচিতি আরো বাড়াতে নাকি রাত-দিন নানাভাবে কাঠখড় পুড়িয়ে চলেছে। কেমন ছবি দিলে তাতে লাইক বেশি পড়বে, কোন পোস্ট দিলে সেটা অন্য ইউজাররা পড়ে দেখবে এই সবই সারাক্ষণ ঘোরাফেরা করছে কিশোর-কিশোরীদের মনে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামই এখন তাদের সারাদিনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীরা মূলত প্রাথমিকভাবে খেয়াল রাখছে, কোন পোজে ছবি তুললে তা সোশ্যাল মিডিয়ার বন্ধুদের কাছে আকর্ষণীয় হবে, সেই সব বিষয়টিই তারা সবথেকে বেশি মাথায় রাখে। গবেষকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীরাই অন্য বন্ধুর মনে ছাপ ফেলতে সবথেকে বেশি ব্যস্ত থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরভিনে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জোয়ানা ইয়াউ বলেন, ‘কিশোর-কিশোরীরা অযত্নের সঙ্গে কোনো পোস্ট করে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা কী পোস্ট করছে, সে ব্যাপারে তারা আশ্চর্যজনকভাবে সচেতন থাকে।’ ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম সাধরণত যুব সম্প্রদায়কে গোটা বিশ্বের সঙ্গে তাদের ভাবনা আদান-প্রদান করার অনেক বড় সুযোগ করে দিয়েছে। যাদেরকে তারা ব্যক্তিগত ভাবে চেনে যেমন তাদের ক্লাসের বন্ধু তাদের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পরও যাতে যোগাযোগ রাখা যায়, সেটাই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত রেখেছে কিশোর-কিশোরীদের। অনলাইনে নিজেদের আরো সুন্দর করে প্রদর্শন করার সুযোগ করে দেয় এই সোশ্যাল মিডিয়াই। আর সেইসব কারণেই ধীরে ধীরে কিশোর-কিশোরীরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপরই সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। গবেষকরা বলছেন, কিশোরীদের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট আরো বেশি গুরুত্ব বহন করে। কীভাবে কোনও পোস্ট তারা করবে সে ব্যাপারে তারা অন্যদের কাছ থেকে পরামর্শও নেয়। ছবি পোস্ট করতে বেশি সময় লাগিয়ে দেয়। তারপর সেই ছবিতে ক্যাপশন দিয়ে সেটি বিশেষ বিশেষ বন্ধুদের কাছে শেয়ার করা। গোটা এই পদ্ধতিতে সময়ও লাগে অনেকটাই বেশি।
কারণ কিশোরীরা ফোটো ক্যাপশনে অনেক কিছু লিখে তারপর সেটি পোস্ট করে। এমনকী তাদের নিজেদের ফটোয় যাতে বন্ধুরা কমেন্ট বা লাইক করে সেই জন্য তারা অন্য বন্ধুদের নানা পোস্টেও খুঁজে খুঁজে লাইক করে। ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে এই ধরনের কিশোরীরা প্রায় সারাক্ষণই অনলাইন থাকে। যাতে তাদের লাইক ও কমেন্টের সংখ্যা আরও বাড়ে। এমনকী তারা নিজের ফোটোয় কমেন্ট বা লাইক করার জন্য বন্ধুদের অনুরোধও করে। কিশোররা অবশ্য ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে ব্যস্ত থাকলেও তারা নিজেদের পোস্টে কমেন্ট বা লাইক করার জন্য অন্য বন্ধুদের কাছে অনুরোধ করে না বলে সমীক্ষায় জানা গিয়েছে। গবেষক ইয়াউয়ের মতে, আমরা দেখেছি যে কিছু কিছু কিশোর-কিশোরী ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম নিয়ে এতটাই সতর্ক এবং পোস্ট নিয়ে এতটাই ভাবছে যে কিছু কিছু সময় তা আদতে তাদের হতাশ করে দেয়। ফলে সামনা সামনি কথা বলার বদলে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা বলছে বলে তাদের মধ্যে স্পর্শকাতরতা ও ভাবাবেগের বিষয়গুলিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ ফলে সাধারণ কোনও ইতিবাচক পোস্টকেও তারা ভুলভাবে নিয়ে ফেলছে। ইতিবাচক সাধারণ পোস্টের গুরুত্ব বুঝতে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বয়ঃসন্ধিকালের ৫১ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর সমীক্ষা চালানো হয়। তার মধ্যে ছিল ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সি ২৭ জন কিশোরী এবং ২৪ জন কিশোর। তারপর বয়স, তাদের ক্লাস এবং লিঙ্গ বেছে তিন থেকে আটজনের মধ্যে দল ভাগ করে ১০টি দলের ওপর সমীক্ষা চালানো হয়। শুধু কিশোর, শুধু কিশোরী এবং কিশোর-কিশোরী উভয় - এইভাবে দলগুলোকে ভাগ করা হয়। এবং সমীক্ষা চালানোর সময় কোনো প্রাপ্তবয়স্ককে সমীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়নি।