Showing posts with label দক্ষিণ কোরিয়া. Show all posts
Showing posts with label দক্ষিণ কোরিয়া. Show all posts

Tuesday, September 15, 2026

কিমের কি গোপন কোনো ছেলে আছে, খুঁজছেন দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দারা

দ্য ইনডিপেনডেন্টঃ উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের গোপন কোনো ছেলে আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছেন দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দারা। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এনআইএস) এ তথ্য জানিয়েছে।

২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর পর উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায় আসেন কিম। এনআইএসের সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, কিমের পর সম্ভবত দেশটির দায়িত্ব নেবেন তাঁর মেয়ে। ধারণা করা হয়, ওই মেয়ের বয়স বর্তমানে প্রায় ১৩ বছর। তাঁর নাম কিম জু এ।

বিবৃতিতে এনআইএস বলেছে, কিম জুর কোনো বড় ভাই আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে তারা। তবে কিমের কোনো ছেলেসন্তান থাকলেও, সে হয়তো তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার অবস্থায় নেই। এ ছাড়া কিমের আরেকটি ছোট সন্তান রয়েছে। তবে সে ছেলে নাকি মেয়ে, তা নিশ্চিত নয়।

এর আগে ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার এক আইনপ্রণেতা বলেছিলেন, সংসদীয় কমিটিকে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে এনআইএস জানিয়েছিল, কিম জু এর একজন বড় ভাই আছে। তবে সেবারও পরে গোয়েন্দা সংস্থাটি জানিয়ে দেয়, উত্তর কোরিয়ার নেতার ছেলে আছে—এমন প্রতিবেদন তারা এখনো যাচাই করে দেখছে।

কিমের কোনো ছেলে আছে কি না, তা উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিকতা। ১৯৪৮ সালে উত্তর কোরিয়া প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির তিনজন নেতাই কিম পরিবারের পুরুষ সদস্য।

সে হিসেবে কিমের উত্তরসূরি তাঁর মেয়ে হতে যাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে কিছু বিশেষজ্ঞের সন্দেহ রয়েছে। তাঁদের মতে, উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা একজন নারীর নেতৃত্ব মেনে না–ও নিতে পারেন। এ ছাড়া কিম জু এ যদি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাও পান, তাহলে দেশটির শাসনভার তাঁর পরিবারের হাত থেকে চলে যেতে পারে। কারণ, কিম জু এ যদি বিয়ে করেন এবং তাঁদের সন্তান যদি পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হন, তাহলে কিম পরিবারের বাইরে ক্ষমতা চলে যাবে।

মেয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন
মেয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Tuesday, September 8, 2026

ইরান যুদ্ধে জড়ালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপদ কেন বাড়তে পারে

মিডলইস্ট আইঃ দক্ষিণ কোরিয়া যদি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে যোগ দেয়, তাহলে তেহরান দেশটিকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে তেহরান হামলা চালাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইরানি শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ মারানদি।

লেবাননভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল মায়াদিনের ‘দ্য গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডঅফ’ অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় মারানদি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নির্বিঘ্ন করার প্রচেষ্টায় দক্ষিণ কোরিয়া যুক্ত হলে ওই অঞ্চলে দেশটির সম্পদ ও স্থাপনা ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়বে। ইরান সেগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করবে।

তিনি আরও বলেন, লক্ষ্যবস্তু সব সময় সামরিক স্থাপনাই হবে, এমনটা না–ও হতে পারে। সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

মারানদি বলেন, ‘তাই ইরানের সামনে কোরীয়রা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ইরান তাদের বড় ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম।’

হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল পুনরায় অবাধ করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে দক্ষিণ কোরিয়া সেখানে নিজেদের নৌবাহিনী পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে দেশটির গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে। হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ।

এ বিষয়ে গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে বলা হয়, সামরিক সহায়তার বিষয়ে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ, যুদ্ধবহির্ভূত ভূমিকা এবং অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনার মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত। তবে প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিউল ওই অঞ্চলে সামরিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিবেচনায় থাকা বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পি-৮ পোসেইডন সামুদ্রিক টহল বিমান এবং রসদ সরবরাহে সহায়তার জন্য একটি জাহাজ পাঠানো।

দক্ষিণ কোরিয়ার সম্প্রচারমাধ্যমগুলোও জানিয়েছে, নৌবাহিনীর একটি বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ দলও এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, সামরিক সদস্যদের নতুন কোথাও মোতায়েনের যেকোনো সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে পর্যালোচনা করতে হবে। এরপর মন্ত্রিসভার একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে তা অনুমোদিত হতে হবে। সবশেষে জাতীয় পরিষদের অনুমোদন নিতে হবে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিভিন্ন প্রচেষ্টায় যোগ দিতে ওয়াশিংটন থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে সমর্থন না দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিউলের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং এই বিরোধকে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের বৃহত্তর টানাপোড়েনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

নিজেদের জ্বালানি সরবরাহের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গত বছর দেশটির আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬১ শতাংশ এবং ন্যাফথার ৫৪ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে এসেছে।

ন্যাফথা হলো পেট্রোলিয়াম শোধনের সময় পাওয়া একটি হালকা তরল হাইড্রোকার্বনজাত পদার্থ। এটি এক ধরনের জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হয় এটি। বিশেষ করে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও অন্যান্য পণ্য তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ন্যাফথা ব্যবহার হয়।

মারানদি বলেন, (দক্ষিণ কোরিয়ার) সম্ভাব্য এই সহায়তা যুদ্ধে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার মতো সামরিক সক্ষমতা দক্ষিণ কোরিয়ার খুব বেশি নেই বলেও তাঁর মত।

মারানদি বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়ার একটি-দুটি জাহাজ কী-ই বা করতে পারবে? এটা নিছকই বোকামি।’ তবে দক্ষিণ কোরিয়া যদি সত্যি ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে এর পরিণতি মারাত্মক হবে বলে সতর্ক করেছেন এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, ‘ইরান শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সরঞ্জাম বা স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে না, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোও ইরান সহজেই ধ্বংস করতে সক্ষম।’

ওয়াশিংটনের চাপে দক্ষিণ কোরিয়া ২০১৯ সালে সোমালিয়া থেকে জলদস্যুবিরোধী নৌবাহিনীর একটি ইউনিটের মোতায়েন হরমুজ প্রণালির আশপাশের জলসীমা পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্চ মাসে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে ওই ইউনিটের দায়িত্বে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনতে হলে সংসদের অনুমোদন নিতে হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ং থেকে একটি সামরিক শিবিরে মার্কিন সেনাবাহিনীর এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার। ২১ আগস্ট ২০২৬
দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ং থেকে একটি সামরিক শিবিরে মার্কিন সেনাবাহিনীর এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার। ২১ আগস্ট ২০২৬ ছবি: এএফপি

Friday, September 4, 2026

হরমুজ প্রণালিতে সেনা পাঠাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এসব সরঞ্জাম সেখানে পাঠানো হতে পারে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি ও সামরিক সূত্রের বরাতে দেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের জন্য আইনসভার অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। মন্ত্রিসভার পর্যালোচনার পর চলতি মাসেই আইনসভায় সম্মতি প্রস্তাব জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

সরকারের বিবেচনায় রয়েছে তিন ধরনের সামরিক সহায়তা। এর মধ্যে একটি সামুদ্রিক টহল বিমান, একটি রসদ সরবরাহকারী জাহাজ অথবা মাইন শনাক্ত ও অপসারণকারী একটি ইউনিট মোতায়েনের বিকল্প রয়েছে।

সম্ভাব্য সহায়তার ধরন ও পরিসর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার আলোচনা চলছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তবে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের বিষয়ে সরকার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছে প্রেসিডেন্ট কার্যালয় ব্লু হাউস।

ব্লু হাউস বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কীভাবে সহায়তা করা যায়, তা নিয়ে সিউল আলোচনা করছে। কিন্তু সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের বিষয়ে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন খবর ‘তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’।

এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা না করায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার আকার আংশিক কমিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।

হরমুজ প্রণালিতে সেনা পাঠাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া
ছবি: সংগৃহীত

Monday, February 23, 2026

অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়োলের মৃত্যুদণ্ড নয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়োলের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড নয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। কঠোর নিরাপত্তায় তাকে আদালতে হাজির করা হয় বৃহস্পতিবার। এ সময় পথে পথে, আদালতের বাইরে হাজার হাজার সমর্থক তার পক্ষে স্লোগান দিতে থাকেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সামরিক শাসন জারি করার মধ্য দিয়ে তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন বলে অভিযোগ। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকালে এই মামলার রায় দেয়া হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয় প্রসিকিউটররা ইয়োলের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সামরিক শাসন জারি করার সিদ্ধান্তের নেপথ্যে তিনিই মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। যদিও দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় না, তাই এমন রায় হলে তা কার্যত আজীবন কারাদণ্ডে পরিণত হবে বলে রিপোর্টে বলা হয়। ইয়ুন সুক ইয়োলের জারি করা সামরিক শাসনের আদেশ মাত্র ছয় ঘণ্টা স্থায়ী হয়। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সময়েই তা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। সরকার কার্যত অচল হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী নির্বাচনে তার দল পরাজিত হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটি গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

ইয়ুন ইতিমধ্যেই ব্যর্থ সামরিক আইন জারির আরেক মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাভোগ করছেন। তার বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আজকের রায় দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সিউলের একটি আদালত আজ স্থানীয় সময় বিকেলে ৩টায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়োলের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিদ্রোহ মামলার দেয়া শুরু হবে। শেষে রায় ঘোষণা করবে। এই রায় দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এ অবস্থায় সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বাইরে ডজনখানেক পুলিশ বাস দিয়ে নিরাপত্তা বলয় গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রায় ১০০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি মূলত শান্ত থাকলেও ইয়ুন-সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে ছোটখাটো ধস্তাধস্তির খবর পাওয়া গেছে। ইয়ুন সমর্থকরা আদালতকে আজ ‘অভিযোগ খারিজ’ করার আহ্বান জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, বিরোধী বিক্ষোভকারীরা বিদ্রোহের নেতা ইয়ুনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দাবি তুলেছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার ফৌজদারি আইনে বিদ্রোহ বলতে বোঝায়, সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় অঙ্গকে উৎখাত করা বা তাদের কার্যক্রম বলপ্রয়োগে অকার্যকর করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত দাঙ্গা বা সহিংস কর্মকাণ্ড। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টরা সাধারণত ফৌজদারি মামলায় দায়মুক্ত থাকেন। তবে বিদ্রোহ ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের ক্ষেত্রে এই দায়মুক্তি প্রযোজ্য নয়।

এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত

সিউল সংবাদদাতা জেক কোয়নের মতে, আজকের রায় দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এক বিশাল ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ইয়ুন ইতিমধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামরিক আইন জারির অপচেষ্টার দায়ে দণ্ডিত হয়ে কারাভোগ করছেন। তবে বিদ্রোহের অভিযোগ সবচেয়ে গুরুতর। প্রসিকিউটরদের মতে, কঠোর শাস্তি না দিলে ভবিষ্যতে কেউ সামরিক শাসন জারির মতো পদক্ষেপ নেয়ার সাহস পেতে পারে। ইয়ুনকে সেই একই আদালতকক্ষে রায় শোনানো হবে, যেখানে প্রায় ৩০ বছর আগে সাবেক সামরিক শাসক চুন ডু-হওয়ান’কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। পরে তাকে দুই বছর কারাভোগের পর ক্ষমা করা হয়।

বিভক্ত দেশ

ইয়ুনের সামরিক আইন জারি মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু তা দেশকে গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলে। নেতৃত্বের শূন্যতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ এখনো কাটেনি। সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ২০-৩০ ভাগ ভোটার মনে করেন ইয়ুন বিদ্রোহে দোষী নন। ফলে রায় যা-ই হোক না কেন, দেশকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়োলের মৃত্যুদণ্ড নয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

Sunday, January 4, 2026

বিশ্বের কোন দেশে কে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হবেন, ট্রাম্প কি সেটারও নিয়ন্ত্রক হতে চান

বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রপ্রধানই সাধারণত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না করার কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলেন। যদিও কয়েক দশক ধরে পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক খেলা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একজন নেতা, যিনি এসব রাখঢাক বা ভণিতার ধার ধারেন না।

রিপাবলিকান পার্টিকে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আদর্শে রূপান্তর করা ট্রাম্পের কাছে রাজনীতি মানেই হলো প্রভাব খাটানোর এক মোক্ষম হাতিয়ার। আর এই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা তিনি কেবল নিজ দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ রাখছেন না।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথা ভাঙার আরও একটি নজির গড়ে ট্রাম্প এখন প্রকাশ্যে তাঁর পছন্দের প্রার্থীদের সমর্থন দিচ্ছেন। এমনকি তাঁদের অনুকূলে সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক ও বিচারব্যবস্থাকে নমনীয় করার চেষ্টাও করছেন।

ট্রাম্পের এমন সমর্থন যে কেবল মৌখিক নয়, তার প্রমাণ মেলে হোয়াইট হাউসের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে। সেখানে নথিপত্রেই মিত্রদেশের নেতাদের হটিয়ে কট্টর ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী নেতাদের ক্ষমতায় আনার প্রচ্ছন্ন সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প যেন এক বিশ্বজনীন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, হন্ডুরাস, দক্ষিণ কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আটলান্টিকের ওপারের দেশগুলোর রাজনীতিকেও তিনি নিজের ছাঁচে গড়তে চাইছেন।

মূলত যেসব নেতা তাঁর মতো জনতুষ্টিবাদী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, যাঁরা তাঁর স্তুতি করেন কিংবা যাঁরা তাঁর মতোই আইনি লড়াইয়ে জর্জরিত, তাঁদের ভাগ্য বদলাতেই ট্রাম্প বেশি আগ্রহী।

গত সোমবার ট্রাম্প আবারও ইসরায়েলের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। দেশটিতে তিনি বেশ জনপ্রিয় এবং আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনের আগে সেখানে তাঁর ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বর্তমানে ঘুষ ও জালিয়াতির অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, নেতানিয়াহুর জন্য তিনি যে ক্ষমাপ্রার্থনা অনুরোধ করেছেন, সেটি ‘প্রক্রিয়াধীন’। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের সঙ্গে তাঁর এ বিষয়ে কথা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ট্রাম্পের ভাষায়, তিনি (যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ওঠা নেতানিয়াহু) একজন যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বীর। তাঁকে কেন ক্ষমা করা হবে না?

অবশ্য হারজোগের দপ্তর দ্রুতই এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে এমন কোনো আলাপ হয়নি এবং যেকোনো সিদ্ধান্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনেই নেওয়া হবে।

নেতানিয়াহুকে যদি ফৌজদারি বিচার থেকে রক্ষা করা যায়, তবে সেটি তাঁর ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা লাঘবের পাশাপাশি নির্বাচনী বৈতরণী পার হতেও সাহায্য করবে। বিনিময়ে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কাছে ব্যক্তিগতভাবে ঋণী হয়ে থাকবেন।

ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো রিসোর্টে গত সোমবার নেতানিয়াহুর দেওয়া স্তুতির জবাবে ট্রাম্পও যেভাবে তাঁর প্রশংসা করেছেন, তাতে এই সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনার সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ। এটি আমার হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে আসা।’ সেই সঙ্গে যুদ্ধবাজ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ট্রাম্পই প্রথম বিদেশি হিসেবে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘ইসরায়েল প্রাইজ’ পেতে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ‘শান্তি’ বিভাগে এই পুরস্কার ট্রাম্পের জন্যই প্রথমবারের মতো প্রবর্তন করা হয়েছে।

ট্রাম্পকে খুশি করার কৌশলে নেতানিয়াহু বেশ পারদর্শী। এর আগে এক সফরে তিনি ট্রাম্পের বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘নোবেল শান্তি পুরস্কারের’ জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন।

যদিও গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে ইসরায়েলের গড়িমসিতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজনেরা নেতানিয়াহুর ওপর কিছুটা বিরক্ত বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য সমর্থন নেতানিয়াহুর জন্য এক অমূল্য রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
ট্রাম্পের ভাষায়, নেতানিয়াহুর জায়গায় অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রী থাকলে ইসরায়েল হয়তো আজ অস্তিত্ব হারাত। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে ইসরায়েলকে টেনে তুলতে তাঁর মতো একজন বিশেষ মানুষেরই প্রয়োজন ছিল। মাত্র কয়েক বাক্যে ট্রাম্প যেন নেতানিয়াহুর পরবর্তী নির্বাচনের প্রচারপত্রই লিখে দিলেন।

কূটনৈতিক শিষ্টাচার

ঐতিহাসিকভাবেই মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বিদেশি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধাবোধ করেন। প্রথমত এটি একধরনের ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার’। কোনো প্রেসিডেন্টই চাইবেন না, অন্য দেশ এসে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সাহায্য করে সেই শিষ্টাচার লঙ্ঘনের প্রতিশোধ নিক।

এটি গণতন্ত্রের এক মৌলিক নীতি যে ভোটাররাই ঠিক করবেন তাঁদের নেতা কে হবেন। (যদিও ২০২০ সালের পরাজয় মেনে নিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্বীকৃতিই বলে দেয় যে তিনি এই নীতিতে কতটা বিশ্বাসী)।

এ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো নেতাকে সমর্থন দেওয়ার নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশে মার্কিনবিরোধী মনোভাব তৈরি হতে পারে কিংবা নতুন কোনো নেতা ক্ষমতায় এলে শুরুতেই তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিদেশি রাজনীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা থেকে খুব কমই বিরত থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, গত সপ্তাহে হন্ডুরাসের রক্ষণশীল ন্যাশনাল পার্টির প্রার্থী নাসরি আসফুরাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ ভোট গণনার পর আসফুরা জয়ী না হলে এর ফল ‘খুবই ভয়াবহ’ হবে বলে আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিলেন ট্রাম্প।

পরাজিত মধ্য ডানপন্থী প্রার্থী সালভাদর নাসরল্লার দাবি, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপই তাঁর পরাজয়ের মূল কারণ। এর মধ্যে মাদক পাচারের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫ বছরের জেল খাটা হন্ডুরাসের এক সাবেক প্রেসিডেন্টকে ট্রাম্পের ক্ষমা করে দেওয়ার ঘটনাটিও অন্তর্ভুক্ত।

পশ্চিম গোলার্ধের রাজনীতিকে নিজের ভাবমূর্তিতে ঢেলে সাজাতে ট্রাম্প বারবার মার্কিন ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। বন্ধু ও ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার অভিযোগে বিচার শুরু হওয়ায় ব্রাজিলীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প।

এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ট্রাম্প আমদানি শুল্ককে কেবল বাণিজ্যের অনুষঙ্গ নয়; বরং পররাষ্ট্রনীতির ‘অস্ত্র’ হিসেবেও ব্যবহার করছেন।

বর্তমানে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিশাল এক নৌবহর মোতায়েন করে চাপ প্রয়োগ করছেন। যদিও এর প্রকাশ্য অজুহাত হলো মাদক ব্যবসা বন্ধ করা। মাদুরোর বিদায় হয়তো দারিদ্র্যপীড়িত লাখ লাখ ভেনেজুয়েলানের জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আসল উদ্দেশ্য কারাকাসে নিজের আদর্শের অনুসারী সরকার বসিয়ে ক্ষমতা বাড়ানো।

আগামী বছর কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ওপরও ট্রাম্পের কড়া নজর রয়েছে। ক্রিসমাসের ছুটিতে তিনি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সোজাসাপটা ভাষায় ‘সাবধান’ হওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। পেত্রো অবশ্য সিএনএনকে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার ওপর ট্রাম্পের এই চাপ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য নয়; বরং তেলের নিয়ন্ত্রণের জন্য।

আর্জেন্টিনার রাজনীতিতেও ট্রাম্প তাঁর অর্থনৈতিক প্রভাব খাটাচ্ছেন। দেশটির ২০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সহায়তা প্যাকেজের শর্ত হিসেবে তিনি তাঁর বন্ধু ও ‘মাগা হিরো’ হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করতে চান।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ কোরিয়া

ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দাবার চাল কেবল পশ্চিম গোলার্ধেই সীমাবদ্ধ নয়। গত মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা যখন ওভাল অফিসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন ট্রাম্প একটি বিতর্কিত ভিডিও দেখিয়ে তাঁকে নিজ দেশেই অস্বস্তিতে ফেলার চেষ্টা করেন।

ভিডিওটিতে দাবি করা হয়েছিল যে দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গরা গণহত্যার শিকার হচ্ছে, যা দেশটিতে বর্ণবাদী উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালার শামিল ছিল।

একইভাবে আগস্ট মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ুং যখন ওভাল অফিসে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি উসকানিমূলক বার্তা দিয়ে বসেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় গির্জায় তল্লাশির অভিযোগ তুলে তিনি দেশটিকে অস্থিতিশীল বলে ইঙ্গিত দেন।

যদিও লি জে মিয়ুং চাতুর্যের সঙ্গে ট্রাম্পকে দুটি ‘মাগা’ কাউবয় হ্যাট এবং একটি ব্যক্তিগত গলফ পুটার উপহার দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। তবে এই ঘটনা ছিল এক সতর্কবার্তা। অন্য নেতাদের মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করতে ট্রাম্প যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে পারেন, এটি তারই প্রমাণ।

ইউরোপের স্থিতিশীলতায় হানা

ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইউরোপের মধ্যপন্থী ও মধ্য বামপন্থী সরকারগুলোকে অস্থিতিশীল করতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছে। নতুন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, মুসলিম অভিবাসনের কারণে ইউরোপীয় সংস্কৃতি তার নিজস্ব অস্তিত্ব হারানোর হুমকিতে রয়েছে।

এই কৌশল ইউরোপের তথাকথিত ‘দেশপ্রেমিক দলগুলো’র (কট্টর ডানপন্থী) ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সমর্থন করে। মার্কিন নীতির লক্ষ্য এখন ইউরোপীয় দেশগুলোর বর্তমান ধারার বিরুদ্ধে একটি ‘প্রতিরোধ’গড়ে তোলা।

ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের নেতারা মনে করেন, ট্রাম্প–সমর্থিত কট্টর ডানপন্থী দলগুলো, যেমন ফ্রান্সের ন্যাশনাল র‍্যালি, জার্মানির এএফডি এবং যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে-উদারনৈতিক গণতন্ত্রের কাঠামোর জন্য বড় হুমকি।

৮০ বছর ধরে যারা ইউরোপের স্বাধীনতার গ্যারান্টার ছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্রই এখন তাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।

হস্তক্ষেপের পুরোনো খাসলত

অবশ্য অন্য দেশের রাজনীতিতে নাক গলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পই একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই কাজ করে আসছে, যদিও আগে তা করা হতো গোপনে বা অন্য কোনো ছদ্মবেশে। ট্রাম্পের সমর্থকেরা ১৯৮০-র দশকে রোনাল্ড রিগ্যান এবং মার্গারেট থেচারের মধ্যকার সেই আদর্শিক বন্ধুত্বের উদাহরণ দিতে পারেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতিহাস অনেক সময় ছিল বেশ কলঙ্কিত। ১৯৫৩ সালে ইরানে সিআইএয়ের মদদে অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৬১ সালে কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোকে হটাতে ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ আক্রমণ—সবই ছিল সেই ছক।

লাতিন আমেরিকার চিলি, নিকারাগুয়া, পানামা ও গুয়াতেমালায় যুক্তরাষ্ট্র বারবার শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়েছে, যার অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত সামরিক একনায়কতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। এমনকি ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র না পেয়ে সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে তথাকথিত ‘ফ্রিডম এজেন্ডা’ চালানো হয়েছিল।

সম্প্রতি বারাক ওবামাকেও এই খেলায় দেখা গেছে। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট ভোটের আগে তিনি ব্রিটিশদের সতর্ক করেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়লে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যকে ‘পেছনের সারিতে’ অপেক্ষা করতে হবে। ওবামার সেই মন্তব্য হিতে বিপরীত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ব্রেক্সিট জয়ী হয়, যা ছিল ট্রাম্পের পরবর্তী জয়েরই এক আগাম সংকেত।

ওবামাসহ আগের অনেক প্রেসিডেন্টই বিদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছেন, তবে ট্রাম্পের মতো এত প্রকাশ্য কেউ ছিলেন না। পূর্বসূরিদের শুরু করা নীতিকেই ট্রাম্প এক চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সবখানে একই সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারের এই কৌশল তাঁর কর্তৃত্ববাদী চরিত্র এবং তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলনের বিশ্বজয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষাই প্রতিফলিত করে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-22%2F3x14yy0u%2Fdonaldtrumpafp.jpg?rect=0%2C0%2C1433%2C955&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ট্রাম্প বরাবরই প্রকাশ্যে বর্ণবাদী কথা বলেছেন। এতে অনেক শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান নিজেদের বর্ণবাদী মনোভাব প্রকাশে সাহস পেয়েছে। ছবি: এএফপি

Thursday, December 25, 2025

ওড়ার পরপরই শক্তিশালী রকেটের বিস্ফোরণ

আকাশের বুক চিরে মহাকাশের দিকে ধেয়ে যাচ্ছিল শক্তিশালী এক রকেট। সবকিছু ঠিকঠাকই মনে হচ্ছিল। কিন্তু উড্ডয়নের ঠিক পরমুহূর্তেই ঘটল এক কাণ্ড! কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাঝ-আকাশ থেকে ধেয়ে এলো আগুনের গোলা। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আছড়ে পড়ল কিম জং উনের পাশের দেশের রকেট।

সোমবার রাতের এই দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেল দক্ষিণ কোরিয়ার স্টার্টআপ সংস্থা ইনোস্পেসের তৈরি হ্যানবিট-ন্যানো রকেটটি। ৫টি ছোট উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট নিয়ে রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়। কিন্তু উড্ডয়নের মাত্র এক মিনিটের মাথায় হঠাৎই রকেটটিতে আগুন ধরে যায়।

দক্ষিণ কোরিয়ার এই উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টটি মাত্র ৬০ সেকেন্ডের মধ্যেই ধুলোয় মিশে যায়। ৫৭ ফুট লম্বা রকেটটি রাত ৮টা ১৩ মিনিটে ব্রাজিলের আলকানতরা স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় বলে জানা গেছে। হানবিট-ন্যানো হলো ছোট উপগ্রহ উৎক্ষেপণ যান। রকেটটি ৫টি ছোট উপগ্রহ ও ৩টি পরীক্ষামূলক যন্ত্র বহন করে কক্ষপথে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এই উৎক্ষেপণটি দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বেসরকারি সংস্থা ও ব্রাজিলের বায়ুসেনার যৌথ পরিকল্পনা ছিল।

বিস্ফোরণের সেই শিউরে ওঠা ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে গেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, উড়ন্ত রকেটটি হঠাৎই একটা বিশাল আগুনের বলের মতো ফেটে পড়ছে এবং তার ধ্বংসাবশেষ বৃষ্টির মতো আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে। স্পেস অরবিটের ট্র্যাকিং অনুসারে, উড়ানের পর পরই রকেটে একটি সমস্যা দেখা দেয়।

সেটি পৃথিবীতে ফিরে আসে। দক্ষিণ কোরীয় সংস্থা ইনোস্পেস সমস্যার কথা স্বীকার করেছে। কিন্তু এই দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এখনো প্রকাশ করেনি। 

ছবি : সংগৃহীত

Sunday, December 14, 2025

দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন: পানির নিচে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা এশিয়ায়

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনের পর দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন সংগ্রহের উদ্যোগ গতি পেয়েছে। এর মাধ্যমে কয়েক দশকজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিরোধিতা ছিল, তার অবসান হলো। এ পদক্ষেপ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির চিত্র বদলে দিতে পারে এবং পানির নিচে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করতে পারে।

উত্তর কোরিয়ার মোকাবিলায় পারমাণবিক সাবমেরিন পরিচালনাকারী অভিজাত দেশগুলোর কাতারে অন্তর্ভুক্ত হতে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করে আসছে সিউল। দুই দেশের মধ্যে থাকা পারমাণবিক চুক্তির আওতায় জ্বালানির প্রবেশাধিকার অনুমোদনের মাধ্যমে ট্রাম্পের সম্মতি সেই পথে একটি বড় বাধা সরিয়ে দিয়েছে।

তবু বিশ্লেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার দ্রুত অগ্রসরমাণ এই কর্মসূচি চীনকে অসন্তুষ্ট করতে পারে এবং জাপানকেও অনুরূপ সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাপের মুখে ফেলতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সাবমেরিন ক্যাপ্টেন চই ইল বলেন, সাবমেরিন অত্যন্ত কার্যকর আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা। এই অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা অনিবার্য।

সিউলের যুক্তি, সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ উত্তর কোরিয়ার পানির নিচের হুমকি মোকাবিলায় পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দেশটি বারবার বলেছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না এবং পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধব্যবস্থাকে সম্মান করে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর এই চুক্তিকে একটি বড় অর্জন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এতে নিরাপত্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও প্রতিরক্ষা স্বায়ত্তশাসন আরও শক্তিশালী হবে।

উত্তর কোরিয়াও দাবি করেছে, তারা একই ধরনের সক্ষমতা উন্নয়ন করছে। মার্চ মাসে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নেতা কিম জং-উনকে একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন পরিদর্শন করতে দেখা যায় বলে প্রচার করা হয়।

তবে তাদের কর্মসূচি আসলে কতটা অগ্রসর, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, পিয়ংইয়ং এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার সহায়তা পাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া দুই দেশই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের কথা বললেও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।

চীনকে মোকাবিলা

দক্ষিণ কোরিয়ার সংসদ সদস্য ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ইউ ইয়ং-ওন বলেন, পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন ডিজেলচালিত সাবমেরিনের তুলনায় দ্রুতগামী এবং অনেক বেশি সময় পানির নিচে থাকতে পারে। ফলে এগুলো উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিন নজরদারিতে সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।

সিউলের এই সক্ষমতা অর্জন জাপানকেও তাদের অবস্থান নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন ইউ।

সরকারি আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়, ট্রাম্পের সিউলের কর্মসূচির প্রতি সমর্থনের খবর শুনে টোকিও বিস্মিত হয়। জাপানের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি এ অঞ্চলে এ ধরনের উদ্যোগে সমর্থন দেয়, তবে দক্ষিণ কোরিয়ার আগে জাপানই এগিয়ে থাকবে।

জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সম্প্রতি দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেছেন, পারমাণবিক শক্তিতে রূপান্তর একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে, যদিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে—এ মুহূর্তে এ নিয়ে কোনো গবেষণা চলছে না। এক জাপানি কর্মকর্তা জানান, টোকিও যদি সত্যিই পারমাণবিক সাবমেরিনের পথে এগোয়, তবে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আবেদন করবে।

টোকিওভিত্তিক এক নৌ-বিশেষজ্ঞ বলেন, জাপানের তুলনামূলক ছোট ডিজেলচালিত সাবমেরিনগুলো অগভীর পানিতে কার্যকর হলেও পারমাণবিক সাবমেরিন প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত কার্যক্রম সম্প্রসারণে সক্ষম হবে এবং ভবিষ্যতে প্রতিশোধমূলক সক্ষমতার পথও তৈরি করতে পারে। সংবেদনশীলতার কারণে তিনি অন্য সূত্রগুলোর মতোই নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব কথা বলেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা চীনের সামরিক প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান (চিফ অব নেভাল অপারেশনস) অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল চীনকে একটি ‘পেসিং থ্রেট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সম্প্রতি সিউলে বলেন, ভবিষ্যতে আঞ্চলিক প্রতিরোধে দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করছেন।

হুঁশিয়ারি উত্তর কোরিয়ার

দক্ষিণ কোরিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে চীনের প্রতিক্রিয়া আপাতত নরম হলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ৩৮ নর্থ।

দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উই সুং-লাকের বরাতে জানা গেছে, গত মাসে প্রেসিডেন্ট লি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে আশ্বস্ত করেছেন যে সাবমেরিনগুলো হবে প্রতিরক্ষামূলক এবং উত্তর কোরিয়াকে নিবৃত্ত করাই এর উদ্দেশ্য।

উই বলেন, ‘সব দেশ হয়তো বিষয়টি স্বাগত জানাবে না, কিন্তু আমাদের অবস্থান আছে। আমরা ব্যাখ্যা করতে ও বোঝাতে পারব।’

এদিকে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সাবমেরিন পরিকল্পনা একটি ‘পারমাণবিক ডোমিনো’ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।

ডোমিনো প্রভাব হলো একটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র বা পারমাণবিক সামরিক সক্ষমতা অর্জন করলে তার প্রতিক্রিয়ায় আশপাশের অন্য দেশগুলোও একই পথে এগিয়ে যেতে পারে। ঠিক ডোমিনো খেলার মতো একটির পর একটি দেশ পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে ওঠার প্রবণতাকেই পারমাণবিক ডোমিনো প্রভাব বলা হয়।

সেজং ইনস্টিটিউটের গবেষক চিয়ং সঙ-চ্যাং মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে পারমাণবিক সাবমেরিন উন্নয়নে এগোতে পারে, যা ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দীর্ঘদিনের স্বপ্ন

বর্তমানে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ভারত ও যুক্তরাজ্যের কাছেই পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন রয়েছে। ২০২১ সালের অকাস চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় অস্ট্রেলিয়াও এ ধরনের একটি বহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।

সেজং ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া প্রথম ১৯৯৪ সালে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে সৃষ্ট সংকটের সময় এ ধারণা নিয়ে ভাবতে শুরু করে। তবে কারিগরি জটিলতার কারণে তখন অগ্রগতি থেমে যায়।

২০১৭ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন পারমাণবিক সাবমেরিনের জন্য ট্রাম্পের সমর্থন চেয়েছিলেন, যা তিনি ব্যক্তিগতভাবে দিয়েছেন বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তার বিরোধিতার কারণে সেই সমর্থন বাস্তব রূপ পায়নি বলে সূত্রগুলো জানায়।

মুন সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চোই জং-কুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি বিভাগের মতো সংস্থাগুলো পারমাণবিক বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

ট্রেন ইতিমধ্যে চলতে শুরু করেছে

বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়া স্বাধীনভাবেই অগ্রগতি সাধন করেছে এবং মৌলিক সাবমেরিন নকশা তৈরি করেছে বলে অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর কর্নেল মুন কুন-সিক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানান।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহন গিউ-ব্যাক বলেন, রিয়্যাক্টর সংযোজন এখন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, সিউল ১০ বছরের মধ্যে একটি পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণ করতে পারে এবং অন্তত চারটি ৫ হাজার টন ক্ষমতার পারমাণবিক সাবমেরিন প্রয়োজন হবে।

১৪ নভেম্বর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ একটি তথ্যমূলক নথিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, পারমাণবিক জ্বালানি সংগ্রহে ওয়াশিংটন সহযোগিতায় সম্মত হয়েছে।

আহন সংসদে বলেন, ‘এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের “অনুমোদন” বলার চেয়ে বলা যায় পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ আমরা আগেই প্রস্তুত করে ফেলেছিলাম, শুধু জ্বালানিটুকুই ছিল শেষ অংশ।’

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে জানিয়েছে, পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন নির্মাণ-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে অর্জন করে চলেছে।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মিত্রতা রেখে দেশটির জন্য হুমকি প্রতিরোধ এবং দায়িত্ব ভাগাভাগি বাড়ানোর লক্ষ্যে পারমাণবিক শক্তিচালিত আক্রমণাত্মক সাবমেরিন উন্নয়নসহ সিউলের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে।

সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চোই জানান, অস্ট্রেলিয়ার অকাস চুক্তি সিউলের জন্য প্রতিবন্ধকতা কমাতে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, ট্রেন ইতিমধ্যে চলতে শুরু করেছে, দরজা খোলা রয়েছে—অর্থাৎ আরও কিছু কাজ বাকি আছে, তবে যাত্রা শুরু হয়ে গেছে।

পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন লং মার্চ
পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন লং মার্চ। ফাইল ছবি রয়টার্স

Friday, March 28, 2025

দক্ষিণ কোরিয়ার দাবানল কেন এত ভয়াবহ রূপ নিল

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলে জ্বলছে দক্ষিণ কোরিয়া। আগুনে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ৮৮ হাজার ৫০০ একর এলাকা পুড়ে গেছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের আয়তনের প্রায় অর্ধেক। দাবানলে এখন পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এলাকা ছেড়েছেন হাজার হাজার মানুষ।

দক্ষিণ কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবসৃষ্ট কোনো দুর্ঘটনা থেকে এই দাবানলের সূত্রপাত হয়েছে। তবে বিস্তর এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। সেগুলো হলো ঝোড়ো বাতাস ও শুষ্ক আবহাওয়া। এ ছাড়া দেশটির উত্তর গিয়েওংসাং প্রদেশে পাইনগাছের ঘন জঙ্গল আগুন ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট সায়েন্সের বিশেষজ্ঞ লি বিয়ুং-ডো বলেন, পাইনগাছে রেসিন নামে এক ধরনের উপাদান থাকে। রেসিন জ্বালানি তেলের মতো কাজ করে। এটি আগুনকে আরও তীব্র করে তোলে। এর কারণে দাবানল আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, শক্তিশালী রূপ নেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকে।

দাবানল সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে আনডং শহরে। সেখানে পাইনের জঙ্গল রয়েছে। জঙ্গলগুলো স্থানীয় বন্য প্রাণীর জন্য আশ্রয় হিসেবে কাজ করে, সেগুলোর খাবার জোগায়। কখনো কখনো বাতাসের গতি কমাতেও সহায়তা করে এই জঙ্গল। তবে দাবানলের সময় সেগুলো সমস্যা হয়েছে ওঠে বলে জানান লি বিয়ুং–ডো।

এ ছাড়া শীতকালেও পাইনগাছের পাতা ঝরে না। ফলে দাবানলের সময় এক গাছ থেকে আরেক গাছে আগুন ছড়িয়ে পড়ার বড় ঝুঁকি থাকে। গত সপ্তাহজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় যে দ্রুততা ও তীব্রতার সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে বড় ভূমিকা রেখেছে পাইনগাছের চিরহরিৎ বৈশিষ্ট্য।

প্রতিবেশী দেশ চীন ও উত্তর কোরিয়ার তুলনায় বিগত বছরগুলোয় দক্ষিণ কোরিয়ায় বনাঞ্চল বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটির কানওং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির দুর্যোগ প্রতিরোধবিশেষজ্ঞ বায়েক মিন–হো বলেন, বেশির ভাগ পর্বত এখন ঝরে যাওয়া পাতা ও পাইনগাছে ঢেকে আছে। দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ এই পাতা ও পাইনগাছ।

আগুন ছড়িয়ে পড়ার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকেও দুষছেন বিশেষজ্ঞরা। দক্ষিণ কোরিয়ার দুর্যোগ ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান লি হ্যান–কিউং বৃহস্পতিবার বলেন, ‘এই দাবানল আমাদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতা আবার তুলে ধরেছে। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের আগে কখনো হয়নি।’

এবারের ভয়াবহ দাবানলের পরিবেশ বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরেই তৈরি হচ্ছিল। তাপমাত্রা উঠেছিল ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি। এই তাপমাত্রা দক্ষিণ কোরিয়ার বসন্তকালের জন্য অস্বাভাবিক রকমের বেশি। বাড়তি তাপমাত্রার কারণে শুষ্ক হয়ে যায় মাটি ও বাতাস। এর সঙ্গে ঝোড়ো বাতাস যুক্ত হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে।  

গাছের ঘন জঙ্গলের কারণে আগুন নেভাতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও। বুধবার উইসেওং এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ৭৩ বছর বয়সী একজন পাইলট নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আগুন নেভাতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের অন্তত তিনজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

আগুনে যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগেরই বয়স ষাট ও সত্তরের কোঠায়। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের বয়স অন্তত ৬৫ বছর। আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করা উত্তর গিয়েওংসাং প্রদেশে বিপুলসংখ্যক বৃদ্ধ বাসিন্দা রয়েছেন। সর্বোচ্চ বৃদ্ধ বাসিন্দার তালিকায় এই প্রদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দুর্যোগের মধ্যে বৃদ্ধদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন।

দাবানলে বৃদ্ধদের মৃত্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হ্যান ডাক–সু। বৃহস্পতিবার তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উত্তর গিয়েওংসাং প্রদেশে গিয়ে ত্রাণসহায়তা কার্যক্রম দেখভালের নির্দেশ দিয়েছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ভয়াবহ দাবানলে জ্বলছে বিস্তীর্ণ এলাকা
দক্ষিণ কোরিয়ায় ভয়াবহ দাবানলে জ্বলছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ছবি: রয়টার্স

Monday, December 30, 2024

দক্ষিণ কোরিয়ায় বিমান ট্র্যাজেডি নিহত ১৭৯

দক্ষিণ কোরিয়া জুড়ে শোকের ছায়া। রোববার সকালটা বিষাদের এক খবরে মুষড়ে পড়ে দেশটি। ১৮১ আরোহী নিয়ে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তাতে আগুনের বলয় তৈরি হয়ে তা বিস্ফোরিত হয়। এতে কমপক্ষে ১৭৯ জন নিহত হয়েছেন। বিমানের ধ্বংসস্তূপ থেকে দুই জনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তবে তাদের অবস্থা কেমন তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি। এ ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ায় ঘোষণা করা হয়েছে সাতদিনের শোক। ওদিকে এ খবর পেয়ে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর সদস্য এবং তাদের বন্ধুরা ছুটে যান মুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে তারা অশ্রুসজল চোখে প্রিয়জনকে খুঁজে ফিরছিলেন। বিমানটির একজন যাত্রীর পরিবার বলেছে, তারা বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার আগে একজন যাত্রীর কাছ থেকে টেক্সট মেসেজ পেয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, ফ্লাইটের পাখায় একটি পাখির ধাক্কা লেগেছে। আরেকজন মেসেজ লিখেছেন, আমার শেষ কথা বলে দেয়া উচিত। স্থানীয় অনেক মানুষ বিমানটির জেট ইঞ্জিনে আগুনের বলয় দেখেছেন। শুনতে পেয়েছেন কয়েকদফা বিস্ফোরণের শব্দ। বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৪.৫ কিলোমিটার দূরে ছিলেন এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন- হঠাৎ দেখি বিমানটি ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। মনে করেছিলাম তা অবতরণ করছে। কিন্তু তারপরই দেখতে পাই আগুন জ্বলছে। এরপরই বিকট বিস্ফোরণ। বাতাসে ধোঁয়া উড়লো। ধারাবাহিকভাবে কতোগুলো বিস্ফোরণ হলো। এর ফলে যে প্রাণহানি হয়েছে তা বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ শোক প্রকাশ করছে নিহতদের জন্য। শোক জানিয়েছেন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি। শোক প্রকাশ করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও।

উল্লেখ্য, জেজু এয়ারের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমানটি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার মুয়ান যাচ্ছিল। স্থানীয় সময় রোববার সকাল ৯টার সামান্য পরেই তা অবতরণের চেষ্টা করে। কিন্তু অবতরণ নয়, তা একটি দেয়ালের ওপর বিধ্বস্ত হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমানটি রানওয়ে থেকে পিছলে যায়। তারপরই বিধ্বস্ত হয়। আগুন ধরে তা বিস্ফোরিত হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আকাশে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে দেয়। তবে ফ্লাইটের শুধু টেইলের বা পেছন দিকের একটি পোড়া অংশ পাওয়া গেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, ল্যান্ডিং গিয়ার পুরোপুরি প্রসারিত না হওয়া সত্ত্বেও বিমানটি ‘বেলি ল্যান্ডিং’ করার চেষ্টা করে। এখন তদন্তকারীরা যাচাই করে দেখছেন পাখির সঙ্গে ধাক্কা লেগে এ ঘটনা ঘটেছে, নাকি খারাপ আবহাওয়া এর কারণ। দুর্ঘটনার কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পরেও ঘটনাস্থল থেকে কালো ধোঁয়া উড়ছিল। অন্যদিকে চলছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিমানের বিধ্বস্ত অংশ সংগ্রহের কাজ। ঘটনাস্থলে যাত্রীদের পোশাক, লাগেজ, পানির বোতল- সবই রক্তে ভেজা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। স্থানীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, বিমানের দু’জন আরোহীকে উদ্ধার করা হয়েছে। ফ্লাইটে সবচেয়ে বেশি বয়সী ব্যক্তি ছিলেন ৭৮ বছর বয়সী একজন পুরুষ। আর সবচেয়ে কম বয়সী ছিল তিন বছর বয়সী একটি শিশু। বিমানটিতে দু’জন থাই যাত্রী ছিলেন বলে রিপোর্টে বলা হচ্ছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পায়েটংতার্ন শিনাওয়াত্রা এক্সে শোক জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি আমরা শোক প্রকাশ করছি। ওই বিমানে কোনো থাই যাত্রী আছেন কিনা তা যাচাই করতে জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের অবস্থা কী তাও তিনি জানতে চেয়েছেন।

ওদিকে খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছান দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট চোই সাং মোক। তিনি কর্মকর্তাদের জোরালো অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে যে, বিমান দুর্ঘটনার প্রতি সরকারি প্রতিক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি সভা আহ্বান করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিজে। উল্লেখ্য, জেজু এয়ার পরিচালিত ৭৩৭-৮০০ মডেলের ওই বিমানে ১৭৫ জন যাত্রী ও ৬ জন ক্রু ছিলেন। এ ঘটনায় বিবৃতি দিয়ে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে জেজু এয়ার। তাদের ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই দুর্ঘটনায় করণীয় সব কিছু করতে আমাদের শক্তি ব্যবহার করবে জেজু এয়ার। আতঙ্ক, ক্ষতির জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। বিমান সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিম ই-বায়ে টেলিভিশনে বলেছেন, বিমানটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। বিমানটির কোনো দুর্ঘটনায় পড়ার কোনো রেকর্ড নেই। আগে কোনো রকম ত্রুটির আলামত পাওয়া যায়নি এতে। তদন্তে সহযোগিতা করবে এই এয়ারলাইন। নিহতদের জন্য সমর্থন দেয়াকে শীর্ষ অগ্রাধিকার মনে করবে। ওদিকে মুয়ান বিমানবন্দরে সব রকম অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়া হয়।

মুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিবিসি’র সাংবাদিক জ্যাঁ ম্যাকেঞ্জি বলছেন, একটি কক্ষে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নিহতদের দেহ শনাক্ত করতে কয়েকশ’ পরিবার সেখানে অপেক্ষা করছেন। নিহতদের শরীরের ক্ষত এত বেশি যে, তারা ছেলে না মেয়ে তা চেনার উপায় নেই। কেউ স্বামীকে হারিয়েছেন। কেউ হারিয়েছেন স্ত্রীকে। কেউবা ছেলেমেয়ে, কেউবা নাতিপুতিকে হারিয়েছেন। অনেক পরিবার একাধিক সদস্যকে হারিয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই থাইল্যান্ডে বড়দিন উদ্‌যাপন করে ফিরছিলেন। মায়েং জি-সু (৭৮) বলেন, তার এক ভাতিজা ও ভাতিজার দুই সন্তান ছিল ফ্লাইটে। কিন্তু পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেছে। তিনি হাউমাউ ও চিৎকার করে বলেন, বিশ্বাস করতে পারছি না একটি পুরো পরিবার অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার হৃদয়ে খুব বেশি ব্যথা বোধ করছি।

mzamin

Thursday, December 5, 2024

বিক্ষোভে উত্তাল দ. কোরিয়া, অভিশংসনের মুখে প্রেসিডেন্ট

সামরিক আইন জারি করে পিছু হটার পর এবার অভিশংসনের মুখে পড়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল। ছয়টি দল নিয়ে গঠিত বিরোধী দলগুলোর একটি জোট বুধবার প্রেসিডেন্টের অভিশংসন চেয়ে পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে।

প্রস্তাবটি বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টের প্লেনারি অধিবেশনে উত্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বিরোধী দলগুলো। এ প্রস্তাবের ওপর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ভোটাভুটি হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে শুক্রবার বা শনিবার প্রস্তাবটির ওপর ভোটাভুটি হতে পারে।

প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আইনপ্রণেতার ভোট প্রয়োজন হবে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩০০ সদস্যের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ইউনের দলের নিয়ন্ত্রণে আছে ১০৮টি আসন।

পার্লামেন্টে অভিশংসনের প্রস্তাব পাস হওয়ার পর সেটি সাংবিধানিক আদালতে যাবে। সাংবিধানিক আদালতের ৯ বিচারপতির ৬ জন যদি অভিশংসনের পক্ষে সমর্থন দেন, তবে তা কার্যকর হবে।

এদিকে সামরিক আইন জারির সব দায়দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিম ইয়ং-হিউন। বুধবার এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভ্রান্তি ছাড়ানো এবং মানসিক চাপ তৈরি করায় জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।

সামরিক আইন জারি নিয়ে তুলকালাম

প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে আজও বিক্ষোভে উত্তাল ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। ভিডিওতে দেখা যায়, হাজারো বিক্ষোভকারী রাজধানী সিউলের কেন্দ্রস্থলে প্রেসিডেন্টের দপ্তরের দিকে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া পার্লামেন্ট চত্বরে সমাবেশের আয়োজন করে বিরোধী দলগুলো।

গত মঙ্গলবার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে হঠাৎ দেশে সামরিক আইন জারি করেন প্রেসিডেন্ট ইউন। সেনারা তখন পার্লামেন্ট ভবনেও ঢুকে পড়ছিলেন। তবে আইনপ্রণেতারা তাঁদের সেই চেষ্টা রুখে দেন। সামরিক আইন জারির কয়েক ঘণ্টা পর বিক্ষোভের মুখে তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ইউন।

সামরিক আইন জারির ঘোষণা দিয়ে ইউন বলেছিলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রের দেশ উত্তর কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়াপন্থী রাষ্ট্রবিরোধী বাহিনীগুলো থেকে দেশকে এবং অবাধ সাংবিধানিক শৃঙ্খলাকে সুরক্ষিত রাখতে সামরিক আইন জরুরি।’ তবে তিনি তখন সুনির্দিষ্ট করে কোনো হুমকির কথা উল্লেখ করেননি।

ইউনের এ ঘোষণার পরপরই সিউলে পার্লামেন্ট ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পার্লামেন্টের বাইরে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা। প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তারের দাবিতে তাঁদের স্লোগান দিতে শোনা যায়।

হেলমেট পরা সেনারা ভাঙা জানালা দিয়ে পার্লামেন্টে ঢুকে পড়লে এবং আকাশে সেনা হেলিকপ্টারের টহল শুরু হলে পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার পার্লামেন্ট সামরিক আইন প্রত্যাহার করার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব পাস করে। এ সময় পার্লামেন্টের ৩০০ সদস্যের মধ্যে ১৯০ জন উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ইউনের দলের ১৮ জন সদস্য ছিলেন। প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট সামরিক আইন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় আকস্মিক সামরিক আইন জারি করার প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাতে পার্লামেন্টের সামনে বিক্ষোভ করেন হাজারো মানুষ
দক্ষিণ কোরিয়ায় আকস্মিক সামরিক আইন জারি করার প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাতে পার্লামেন্টের সামনে বিক্ষোভ করেন হাজারো মানুষ ছবি: রয়টার্স

Wednesday, December 4, 2024

টালমাটাল দ. কোরিয়া, নাটকীয়তা, প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের প্রস্তুতি

টালমাটাল দক্ষিণ কোরিয়া। মুহূর্তে মুহূর্তে নতুন নতুন নাটকীয়তা। বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। মঙ্গলবার বেশ রাতে দেশে সামরিক আইন জারি করে বেকায়দায় প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োল। তার এ নির্দেশের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে পুরো দেশ। পার্লামেন্টের ভিতর আটকে পড়া এমপিরা সামরিক শাসনকে প্রত্যাখ্যান করে প্রস্তাব পাস করেন। দেশজুড়ে চলতে থাকে প্রেসিডেন্ট ইউন-বিরোধী বিক্ষোভ। পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে তিনি সামরিক শাসন তুলে নেন। ঘটনা সেখানে থেমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু না। তা যেন তুষের আগুনের মতো ভিতর থেকে জ্বলে উঠেছে। উল্টো এবার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োলের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এমপিরা। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো সহ আন্তর্জাতিক দুনিয়া কড়া দৃষ্টি রেখেছে দেশটির ওপর। মঙ্গলবার রাতে টেলিভিশন ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইউন জানান, উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট শক্তির কবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে এবং দেশের ভিতর থেকে রাষ্ট্রবিরোধীদের উৎখাতের জন্য প্রয়োজন সামরিক আইন। তিনি এক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার কাঁধে কাঁঠাল ভেঙে খেতে চাইলেও পরে জানা যায়, দেশের ভিতরেই তীব্র চাপে আছেন তিনি। ধারাবাহিক বেশ কিছু স্ক্যান্ডাল ঘিরে ধরেছে তাকে। এছাড়া পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, নিজস্ব রাজনৈতিক সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট। তার মধ্যে তিনি ক্ষমতাকে ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে তিনি সামরিক আইন ঘোষণা দেয়ার দুই ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এমপিরা জোর করে পার্লামেন্ট ভবনের ভিতরে প্রবেশ করেন এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে আটকে দিতে ভোট করেন। কোনো কোনো এমপি ব্যারিকেড ভেঙে পার্লামেন্টের ভিতরে প্রবেশ করেন। একজন এমপি বলেছেন, তিনি দেয়াল টপকে প্রবেশ করেছেন। পার্লামেন্টে তাদের ভোটের পর প্রেসিডেন্ট ইউন ইউটার্ন নেন। সামরিক আইন জারি সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসেন। এখন তার বিরুদ্ধে কয়েক দিনের মধ্যে অভিশংসন প্রস্তাবের ওপর ভোট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমপিরা। যদি তাদের ভোটে প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হন তাহলে সাংবিধানিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে প্রেসিডেন্ট ইউনকে। এমন পরিস্থিতিতে তালগোল পাকিয়ে গেছে দেশটির রাজনীতিতে।

প্রেসিডেন্ট ইউনের সামরিক আইন জারির পরিকল্পনার সমর্থক ছিলেন তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিম ইয়োং-হিউন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বুধবার তিনি পদত্যাগ করেছেন। পরিস্থিতির জন্য তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন জাতির কাছে। বলেন, সামরিক আইন জারি করার পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব তিনি নেবেন। বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপের মতে, প্রেসিডেন্ট ইউনের পাশাপাশি প্রতিরক্ষামন্ত্রী কিম ইয়ং-হিউনের বিরুদ্ধেও অভিশংসন প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এমপিরা। কেন দেশটিতে এমন পরিস্থিতি হলো তার অনুসন্ধান করেছে বিবিসি। এতে বলা হয়, বেশ কিছু বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োলের স্ত্রী। অভিযোগ আছে তিনি বিলাসবহুল ডিয়র মডেলের একটি ব্যাগ গ্রহণ করেছেন। গত বছর কোরিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন একজন পাস্তুরের কাছ থেকে এই ব্যাগটি গ্রহণ করেন তার স্ত্রী। এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এর মধ্য দিয়ে উপহার নেয়া বিষয়ক আইন ভঙ্গ করেছেন। কিন্তু এর জবাবে প্রেসিডেন্ট ইউনের গৃহীত পদক্ষেপ তাকে আরো গরম পানিতে ফেলে। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ওই ভিডিও নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইউন বলেন, দেশটির পার্লামেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে তার দলের ক্ষতি করার জন্য এই ভিডিও বানানো হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন ডিয়র মডেলের ২২০০ ডলারের ওই ব্যাগটি আন্তরিকভাবে নিতে অস্বীকার করেছিলেন ফার্স্টলেডি। কিন্তু এপ্রিলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার দল মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। বাড়তে থাকে অসন্তোষ। অবশেষে এই স্ক্যান্ডাল ছড়িয়ে পড়ার পুরো এক বছর পরে গত মাসে স্ত্রীর পক্ষ হয়ে ক্ষমা চান প্রেসিডেন্ট ইউন। এ ঘটনায় কোনো রকম তদন্তের অনুমতি দেননি তিনি। এর পর থেকে জনক্ষোভ তীব্র থেকে তীব্র হতে থাকে। জনমত বলছে, শুধু এই একটি বিষয় নয়। আরও অনেক কারণে প্রেসিডেন্টের রেটিং কমে গেছে। প্রেসিডেন্ট মঙ্গলবার সামরিক আইন জারি করার পর উত্তাল হয়ে ওঠে দেশটির রাজনীতি। রাতের তাপমাত্রা নেমে যায় প্রায় শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সেই হিম ঠান্ডা উপেক্ষা করে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েন। তারা সমবেত হন গাংহামুন স্কয়ারে। সেখান থেকে প্রেসিডেন্ট ইউনের বিরুদ্ধে অভিশংসনের দাবি তোলা হয়। মঞ্চে উঠে জনতা গান গাইতে থাকে। উল্লাস করতে থাকে। তাদের হাতে ছিল প্রজ্বলিত মোমবাতি এবং ইউনিয়ন ফ্লাগ। অনেকে হাতে দেখা যায় ‘বিদ্রোহের অভিযোগ ইউন সুক ইয়োলকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে’ লেখা পতাকা। সেখানে উৎসবের এক আবহ ছড়িয়ে পড়ে।

ওদিকে কিছু রাজনীতিক প্রেসিডেন্ট ইউনের পক্ষ নিয়েছেন। তার মধ্যে আছেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোয়াং কিও-আহন। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্টকে অভিশংসিত করা উচিত হবে না। প্রেসিডেন্ট ইউনের সামরিক আইন জারির যৌক্তিকতাকে সমর্থন করেছেন। বলেছেন, প্রেসিডেন্টের সামরিক আইন জারির সিদ্ধান্তের পর এমপিদেরকে সমবেত করতে এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে আটকে দেয়ার আহ্বান জানান জাতীয় পরিষদের স্পিকার। এ জন্য তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত বলে তিনি দাবি করেন। বুসান সিটির কাউন্সিলম্যান পার্ক জং-চিওল বলেন, সামরিক আইন জারির ঘোষণাকে তিনি সক্রিয়ভাবে এবং সহানুভূতির সঙ্গে সমর্থন করেন। ডায়েগু শহরের মেয়র হং জুন-পিও তার ফেসবুকের পেস্টে অভিশংসনের পক্ষে অমত জানিয়েছেন।

mzamin

দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক শাসন জারি

জরুরি অবস্থা বা সামরিক শাসন জারি করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়োল। তার ক্ষমতাসীন পিপল পাওয়ার পার্টি ও প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে আগামী বছরের বাজেট বিষয়ক বিল নিয়ে অব্যাহত মতবিরোধের জের ধরে এই ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার রাতের গভীরে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট শক্তি থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখতে এবং রাষ্ট্রবিরোধীদের নির্মূলের জন্য প্রয়োজনীয় এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জরুরি অবস্থার অধীনে সেনাবাহিনীর আইন বহাল থাকবে। এ সময়ে নাগরিকদের স্বাভাবিক অধিকার থাকবে স্থগিত। প্রেসিডেন্ট সামরিক শাসন জারি করার পর দক্ষিণ কোরিয়ান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির বাইরে প্রথমবারের মতো বিপুলসংখ্যক সেনা জমায়েতের ছবি পাওয়া গেছে। পার্লামেন্টে প্রবেশের গেটে প্রহরা দিচ্ছে পুলিশ সদস্যরা। পার্লামেন্ট ভবনের গেট বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন।  যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক পরিষদের একজন মুখপাত্র সিবিএস’কে বলেছেন, দক্ষিণ কোরীয় সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত আছে বাইডেন প্রশাসনের। তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে সামরিক শাসন জারির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোনো মন্তব্য করেনি। এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি বলেছে, সামরিক শাসন লঙ্ঘন করলেই গ্রেপ্তার করা হবে। বার্তা সংস্থা ইয়োনহ্যাপের মতে, সামরিক আইন লঙ্ঘন করলেই পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করা যাবে। সব মিডিয়া এবং প্রকাশনা সংস্থাগুলো সামরিক আইনের কমান্ডের অধীনে থাকবে। একইসঙ্গে পার্লামেন্টের কর্মকাণ্ড থাকবে নিষিদ্ধ। ওদিকে রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পার্লামেন্ট ভবনের ভেতরে আটকা পড়েছিলেন বেশ কিছু এমপি ও স্টাফ। এর ছাদে অবতরণ করেছে একটি হেলিকপ্টার। ধারণা করা হয়, তা দিয়ে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করা হতে পারে।
mzamin

Thursday, November 28, 2024

বিয়ে ছাড়াই সন্তানের পিতা, প্রথম সারির অভিনেতার সমালোচনায় মুখর দ. কোরিয়া

বিয়ে করেননি এমন একজন নারীর গর্ভে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম শ্রেণির অভিনেতা ৫১ বছর বয়সী জাং উ-সাং এমন স্বীকারোক্তি দেয়ার পর দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সেলিব্রেটিদের আচরণ এবং প্রথার বাইরে গিয়ে পারিবারিক কাঠামো দাঁড় করানো নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় চলছে। দেশটির চলচ্চিত্র শিল্পের এই তারকা রোববার তার এজেন্সির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে, ৩৫ বছর বয়সী মডেল মুন গা-বি’র নবজাতক সন্তানের পিতা তিনি। পিতা হিসেবে তিনি দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করার অঙ্গীকার করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়া এখনও অনেকটা রক্ষণশীল। সেখানে তিনি মুন’কে বিয়ে করবেন কিনা এ পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি নীরব। সেখানে বিবাহবহির্ভূত সন্তান জন্ম দেয়াকে স্বাভাবিকভাবে নেয়া হয় না। এ নিয়েও তীব্র বিতর্ক চলছে। কিন্তু জাং উ-সাং এর পক্ষে কথা বলছেন কিছু প্রগতিশীল মানুষ। তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় পরিবারে বৈচিত্রের দিকে অগ্রগতির পক্ষে। এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি বলছে, শুক্রবার ইনস্টাগ্রামে সন্তান জন্ম দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মডেল মুন। তবে তার গর্ভে যে সন্তান জন্ম নিয়েছে তার পিতার নাম উল্লেখ করেননি তিনি। বলেছেন, অপ্রত্যাশিতভাবে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিলেন। আকস্মিক এই খবরের জন্য তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন না। এর দু’দিন পর জাং উ-সানের এজেন্সি আর্টিস্ট কোম্পানি একটি বিবৃতি দেয়। তারা নিশ্চিত করে মুনের গর্ভে যে সন্তান জন্ম হওয়ার কথা প্রকাশ হয়েছে সামাজিক মিডিয়ায়, তা জাং উ-সাং এর ছেলে। এতে আরও জানানো হয়, জাং এবং মুন দু’জনে এই ছেলেকে কিভাবে উত্তমরূপে বড় করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করছেন। এ খবর দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার পর ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলোতে মতামতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। অনলাইনে চলছে বিতর্ক। জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের কাছ থেকেও আসছে মন্তব্য। অনলাইনে যেসব মন্তব্য আসছে তার বেশির ভাগই জাং উ-সাং’কে সমালোচনামুলক। কারণ, তার চলচ্চিত্রের উচ্চ মাত্রার ক্যারিয়ার তাকে দক্ষিণ কোরিয়ার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু মন্তব্যে বলা হচ্ছে, একটি চমৎকার, পরিষ্কার নিজের ভাবমূর্তিকে এই তারকা শেষ করে দিয়েছেন।
mzamin

Wednesday, November 20, 2024

সীমান্তে ‘শব্দ বোমা’ দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে কিমের নতুন অস্ত্র

কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা যেন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তে এবার এক অভিনব অস্ত্র ব্যবহার করছে উত্তর কোরিয়া। সীমান্তে স্থাপন করা হয়েছে বিশাল সাউন্ডবক্স, যা অনবরত বিকট শব্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। কাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, রাতের ঘুমও হারাম হয়ে গেছে।

‘শব্দ বোমা’র অত্যাচার

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুসারে, দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে বসানো এই শব্দযন্ত্র দিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিরক্তিকর শব্দ উৎপাদন করা হচ্ছে। কখনো ভূতুড়ে চিৎকার, কখনো ভেঙে পড়ার বিকট শব্দ, যা স্থানীয়দের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ডাংসান এলাকার বাসিন্দারা একে বলছেন, ‘শব্দ বোমা।’

সীমান্তের গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেছেন, দিন-রাত একনাগাড়ে এই সাউন্ডবক্সগুলো চালানো হচ্ছে। ফলে নিদ্রাহীনতা, মাথাব্যথা এবং মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন অনেকে। কেউ কেউ বলছেন, এটি যেন কোনো গোলাবারুদ ছাড়াই আমাদের ওপর বোমা নিক্ষেপের মতো। এর ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

দুই কোরিয়ার সংঘাতের নতুন অধ্যায়

চলতি বছরের জুলাই থেকে উত্তর কোরিয়া সীমান্তের দিকে লাউডস্পিকার বসিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে এই ‘শব্দ যুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ, এটি কিম জং উনের একতরফা উসকানি। এর আগে মে মাসে কিমের দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে আবর্জনা ভর্তি বেলুন পাঠিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।

জবাবে দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তে লাউডস্পিকার স্থাপন করে কোরীয় পপ গান ও পিয়ংইয়ং-বিরোধী খবর সম্প্রচার শুরু করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিম এবার সেই কার্যক্রমের পাল্টা জবাব দিতে ‘শব্দ বোমা’ প্রয়োগ করছে।

উত্তেজনা যুদ্ধের দিকে?

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তের এই শব্দযুদ্ধ দুই কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা চরমে নিয়ে গেছে। সীমান্তে এমন পরিস্থিতি যেকোনো সময় বড় আকারের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। দুই কোরিয়ার এমন উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

প্রশান্ত মহাসাগরের এই দুই প্রতিবেশী দেশ কি এই উত্তেজনা পেরিয়ে নতুন কোনো সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে? না কি বৈশ্বিক কূটনীতির মাধ্যমে শান্তির পথে ফিরে আসবে—এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই বলে দেবে।

সীমান্তে স্থাপন করা হয়েছে বিশাল সাউন্ডবক্স, যা অনবরত বিকট শব্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত
সীমান্তে স্থাপন করা হয়েছে বিশাল সাউন্ডবক্স, যা অনবরত বিকট শব্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত



Saturday, November 16, 2024

যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার দিন আকাশও নীরব থাকে

১৪ নভেম্বর, দক্ষিণ কোরিয়ার আকাশও নীরব থাকে। রাস্তা সুনসান, শহর কোলাহলহীন। কারণ, এই দিনটি সুনেং দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ‘স্কলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্ট (সিএসএটি)’। যা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয় বরং পুরো জাতির জন্য এক বিশাল মাইলফলক।

সুনেংয়ের দিন, একদিনের জন্য পুরো দক্ষিণ কোরিয়া থেমে যায়। যাতে পরীক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মনোযোগ দিতে পারেন।

দক্ষিণ কোরীয় সমাজে সুনেং শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা নয়। এটি শিক্ষার্থীদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা তাদের ১৪ নভেম্বর, দক্ষিণ কোরিয়ার আকাশও নীরব থাকে। রাস্তা সুনসান, শহর কোলাহলহীন। কারণ, এই দিনটি সুনেং দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ‘স্কলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্ট (সিএসএটি)’। যা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয় বরং পুরো জাতির জন্য এক বিশাল মাইলফলক।

সুনেং এর দিন, একদিনের জন্য পুরো দক্ষিণ কোরিয়া থেমে যায়। যাতে পরীক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মনোযোগ দিতে পারেন।

দক্ষিণ কোরীয় সমাজে সুনেং শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা নয়। এটি শিক্ষার্থীদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের এক বিশেষ দিশা দেখায়। এ পরীক্ষা শুধু শিক্ষাজীবন নয়, চাকরি, আয়ের পথ এবং সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই, সুনেংয়ের দিন দেশটির সবকিছু থেমে যায় যেন কোনো রকম বিঘ্ন ঘটতে না পারে।

পরীক্ষা চলাসময়ে কেমন থাকে পরিবেশ

এদিন, পরীক্ষার্থীদের মনোযোগে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, তার জন্য একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দুপুর ১টা ৫ মিনিট থেকে ১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়, যাতে ইংরেজি শ্রবণ পরীক্ষার ২০ মিনিটের সময় সুনির্দিষ্ট নীরবতা বজায় থাকে। তাছাড়া, দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয় এবং যানবাহনের হর্ন বাজানো কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়।

বিশেষ সহায়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

এদিন শহরের রূপ বদলে যায়। দোকানপাট দেরিতে খোলে, স্টক মার্কেটও দেরিতে চালু হয়। যানজট এড়াতে অতিরিক্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং ১০ হাজারের বেশি পুলিশ কর্মকর্তা সড়কপথে মোতায়েন থাকে। দেরি করা পরীক্ষার্থীদের সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকে পুলিশ, দমকল বাহিনী এবং অ্যাম্বুলেন্স।

৮ ঘণ্টার ম্যারাথন পরীক্ষা

২০২৪ সালে সুনেং পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৫ লাখ ২২ হাজার ৬৭০ জন শিক্ষার্থী। যা গত বছরের তুলনায় ১৮ হাজার ৮২ জন বেশি। সারা দেশে ১ হাজার ২৮২টি কেন্দ্রে ৮ ঘণ্টার এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীরা ৫টি বাধ্যতামূলক বিষয়ে পরীক্ষা দেয় : কোরিয়ান ভাষা, অঙ্ক, ইংরেজি, কোরিয়ান ইতিহাস এবং সোশ্যাল স্টাডিজ। এ ছাড়াও, ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে রয়েছে ফরাসি, চীনা, জাপানি, রাশিয়ান ও আরবি ভাষা।

সুনেং : দক্ষিণ কোরীয় সংস্কৃতির প্রতীক

সুনেং শুধু একটি পরীক্ষা নয়; এটি দক্ষিণ কোরীয় শিক্ষার প্রতীক। দেশটির অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের জন্য ত্যাগের চিত্র। পরীক্ষায় সফল হলে শিক্ষার্থীরা এক নতুন জীবনের সূচনা করে। একজন সফল শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা জানি, আমাদের পরিশ্রমের মূল্য। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পারি।’

এই পরীক্ষা দক্ষিণ কোরীয়দের এক জাতি হিসেবে উত্থান এবং তাদের ভবিষ্যতের প্রতি এক অদম্য বিশ্বাসের প্রতীক। সুনেং, যা শুধু একটি পরীক্ষা নয়, এটি একটি জাতির শক্তি ও স্বপ্নের ঐতিহ্য।

পরীক্ষার্থীদের মনোযোগে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, তার জন্য কিছু সময় বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ছবি : সংগৃহীত।
পরীক্ষার্থীদের মনোযোগে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, তার জন্য কিছু সময় বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ছবি : সংগৃহীত।

Thursday, August 15, 2024

দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্ষমতাসীন দল-বিরোধীদের মধ্যে তুমুল হট্টগোল

দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীদের মধ্যে তুমুল হট্টগোল হয়েছে বুধবার। ফার্স্টলেডি কিম কিওন হি’র স্টক জালিয়াতির একটি অভিযোগে একজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাবের শুনানিতে পার্লামেন্টারি কমিটিতে এ ঘটনা ঘটে। সিউল নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটর অফিসের সিনিয়র প্রসিকিউটর কিম ইয়ং-চোল, অন্য প্রত্যক্ষদর্শী, ফার্স্টলেডি এদিন শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন না। এই শুনানি থেকে রাজনৈতিক সুফল পাওয়ার চেষ্টা করছে প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি (ডিপি) এমন সমালোচনা করেছে ক্ষমতাসীন পিপল পাওয়ার পার্টি (পিপিপি)। বার্তা সংস্থা ইয়োনহোপের রিপোর্টে আরও বলা হয়, পিপিপি’র প্রতিনিধি সং সিউওগ-জুন বলেছেন, অভিশংসন ছাড়া কি প্রসিকিউটরকে শাস্তি দেয়ার আর কোনো উপায় নেই? আমাদের তো অ্যাক্ট অন ডিসিপ্লিনারি অব প্রসিকিউটরস আছে। এই আইনের অধীনে একজন প্রসিকিউটরকে বরখাস্ত করা সহ নানাবিধ ব্যবস্থা নেয়া যায়। তিনি আরও বলেন, এই শুনানি করে এবং অভিশংসন প্রস্তাব সামনে এনে সময়ক্ষেপণ করে লেজিসলেশন এবং বিচারবিভাগ সময় নষ্ট কেন করছে তা বুঝতে পারছি না। পার্লামেন্টারি কমিটির চেয়ারম্যান চুং জুং-রাই জোর দিয়ে বলেন- জাতীয় পরিষদ আইন অনুযায়ী এটা একটা মানসম্মত প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে তিনি ফার্স্টলেডি এবং যেসব ব্যক্তি এই শুনানিতে উপস্থিত হননি তাদের সবার বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ ফাইল করার প্রতিশ্রুতি  দেন। শুনানিতে ২০ জন সদস্যকে তলব করা হয়েছিল।

তার মধ্যে শুধু লিম ইউন-জিওং, যিনি ডাইজিওন ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটরস অফিসের সিনিয়র প্রসিকিউটর, তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে যে, যেহেতু অভিযোগের সঙ্গে ফার্স্টলেডির যোগসূত্র আছে, তিনি ডয়েচ মটর্স এনকরপোরেশন ইনকরপোরেশনে ম্যানিপুলেট করেছেন- তাই যথাযথ তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন কিম।
কিম এবং অন্য তিনজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন করেছে ডিপি। দলটির সাবেক নেতা লি জায়ে-মিউংসহ অনেকের বিরুদ্ধে নানা রকম দুর্নীতির অভিযোগ আছে। ওই প্রস্তাবের ফলে এসব দুর্নীতি তদন্ত শুরু হয়। এ ছাড়া আছে বেআইনিভাবে উত্তর কোরিয়াকে আন্ডারওয়্যার প্রস্তুতকারক কোম্পানি সসাঙ্গবাঙ্গউল গ্রুপের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর অভিযোগ আছে। সম্প্রতি এন্টি করাপশন অ্যান্ড সিভিল রাইটস কমিশনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা মারা যান। তা নিয়েও দুই দল প্রচণ্ড হট্টগোল করে।


Friday, October 18, 2019

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কেন এই দ্বন্দ্ব?

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে যারা শান্তিতে একটু শপিং করতে চান, তাদের জন্য মুজি বা ইউনিকলোর যেকোনো শাখাই হবে দারুণ পছন্দ। সাধারণত, এই দুই প্রতিষ্ঠানে ক্রেতাদের ভিড় থাকে সবসময়ই। কিন্তু বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে সেখানে কোনো ক্রেতা সমাগম একদমই কমে গেছে। কারণ হলো, জুলাইয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর বিশেষ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাপান। এরপর থেকেই জাপানি পণ্য বয়কট করছেন ক্ষুব্ধ কোরিয়ানরা। পোশাক থেকে শুরু করে গৃহস্থালি জিনিসপত্র কিনছেন ঘরোয়া প্রতিষ্ঠান থেকে। অপরদিকে জাপানে ‘অবিশ্বস্ত’ কোরিয়ানদের নিয়ে পুরনো ধ্যানধারণা ফের জেগে উঠতে শুরু করেছে। প্রতিবেশী কোরিয়া এখনও পুরনো ইতিহাস পেছনে রাখতে পারছে না, এই অনুযোগ এখন জাপানের কূটনীতিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষদেরও।
অথচ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া- উভয়ই বেশ উদার গণতন্ত্রী রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্র। কিন্তু দুই দেশ কিছুতেই একসঙ্গে কাজ করতে পারছে না কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে দ্য ইকোনমিস্ট। ম্যাগাজিনটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বিবাদ শুরু হয়েছে গত বছরের অক্টোবর থেকে। ওই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সুপ্রিম কোর্ট একটি রায় প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যেসব জাপানি প্রতিষ্ঠান কোরিয়ানদের বলপূর্বক শ্রমে বাধ্য করেছিল, তারা এখন ভুক্তভোগী বিবাদীদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। জাপানের বক্তব্য হলো, এ ধরণের সকল দায়দাবি ১৯৬৫ সালে করা চুক্তির মাধ্যমে ফয়সালা হয়ে গেছে। কোরিয়ার সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের পর জাপান দাবি করেছে, কোরিয়া সরকারকে এই রায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়া এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বিচার ব্যবস্থায় সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের ফলে দায়ী জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপ নেয় দক্ষিণ কোরিয়ার কৌঁসুলিরা। এর পরপরই জাপান জুলাইয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি রাসায়নিক রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওই রাসায়নিক ব্যবহৃত হয় মেমোরি চিপ নির্মাণে, যা কিনা দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এর প্রতিক্রিয়ায় পরের মাসেই দক্ষিণ কোরিয়া দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে বিরোধ আরও উস্কে ওঠে।
তবে এই বিরোধ শুধু একটি রায়কে কেন্দ্র করেই নয়। গত কয়েক দশক ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইস্যুতে বার বার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে দুই দেশের সম্পর্কে। জাপান ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোরিয়াকে উপনিবেশ করে রেখেছিল। ওই সময় কোরিয়ায় জাপানি সৈন্যরা যে নৃশংসতা সংঘটিত করেছিল, তার দায় জাপান কখনই স্বীকার করেনি বা ক্ষমা চায়নি।
এ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ানদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। আবার এ-ও সত্য যে, দেশটির বিভিন্ন সময়ের সরকারই রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জাতীয়তাবাদী অনুভূতি উস্কে দিতে এই ইস্যু ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। তবে সব ইস্যুর মধ্যে উপনৈবেশিক আমলে জাপানি কোম্পানিতে বলপূর্বক শ্রমদানে বাধ্য হওয়া কোরিয়ান বা জাপানি সৈন্যদের জন্য নির্মিত পতিতালয়ে যেসব কোরিয়ান নারীকে যৌনদাসী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, তাদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের ইস্যু সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ।
বিভিন্ন কারণে দুই দেশ মোটামুটি মিত্র হলেও এসব ইস্যু শুধু বাণিজ্য ও জাতীয় নিরাপত্তা খাতে এতদিন প্রভাব ফেলেনি। এর একটি কারণ হলো সবসময়ই দুই দেশের অভিন্ন মিত্র যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নিরসনে ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার অভিন্ন হুমকিও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশকে এক রেখেছে।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মাথা ঘামাতে অতটা ইচ্ছুক নয়। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক কিম জং উনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করেছেন। ফলে তিনি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকিকে অত বড় সমস্যা মনে করেন না। ট্রাম্প বরং কোরিয়া ও জাপানে অবস্থানরত মার্কিন সৈন্যদের ব্যয় নিয়ে বেশি চিন্তিত। ফলে দৃশ্যত তিনি জাপান ও কোরিয়ার মধ্যকার বিরোধে হস্তক্ষেপ করতে অতটা আগ্রহী নন।
উপরন্তু, জাপান ও কোরিয়া- দুই দেশেই জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনা এখন তুঙ্গে। দুই দেশের নেতাই জাতীয়তাবাদী ঘরানার। ফলে কেউই কাউকে ছাড় দিতে রাজি নন। তাই দুই দেশের বর্তমানকে সমস্যার মুখে ফেলছে পুরনো অতীত।

Wednesday, September 25, 2019

দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ 'যৌনদাসী'রা জাপানের ক্ষতিপূরণ চুক্তিতে উপেক্ষিত

দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যাদের ''যৌনদাসী'' হিসাবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল জাপান তাদের ক্ষতিপূরণ দেবে বলে ২০১৫ সালে যে চুক্তি সই হয়েছিল তাতে ক্ষতিগ্রস্তদের কথা মাথায় রাখা হয় নি।
মন্ত্রণালয়ের এক প্যানেল বলছে যেসব নারী এখনও সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরেও বেঁচে আছেন, তাদের মতামত এই চুক্তিতে আমলে নেওয়া হয় নি ।
বিষয়টি নিয়ে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের যে কূটনৈতিক বিতণ্ডা রয়েছে তা অবসানের চেষ্টায় দক্ষিণ কোরিয়ার পূর্বতন সরকার এই চুক্তিতে সই করে।
দ: কোরিয়ায় বিষয়টি নিয়ে যারা আন্দোলন করছে তাদের হিসাব অনুযায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের সামরিক বাহিনীর গণিকালয়গুলোতে দুই লক্ষের মত কোরিয়ান মহিলাকে জোর করে যৌনদাসী হিসাবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তাদের বলা হতো ''কমফর্ট উইমেন''।
সমালোচকরা বলছেন যারা এখনও বেঁচে আছেন তাদের সঙ্গে কোনরকম আলোচনা ছাড়াই এই চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছিল। এই চুক্তিতে জাপানে এর জন্য আইনি দায়িত্ব স্বীকার করে নি এবং যাদের দিয়ে একাজ করানো হয়েছিল তাদের সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেবার কথাও বলা হয় নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ক্যাং কিয়াং হোয়া বলেছেন, দক্ষিণ কোরীয় সরকার এখন প্যানেলের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করবে এবং সেসময় গণিকালয়ে যারা কাজ করেছিলেন তাদের সঙ্গে কথা বলবে।
''এই চুক্তি, ওই ঘটনার শিকার হয়েছিলেন যারা, তাদের দাবি মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। মানবাধিকার ইস্যু সমাধানের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে ক্ষতিগ্রস্তদের কথাটা মাথায় রাখাই দস্তুর,'' তিনি বলেন।
তবে জাপান ও দ: কোরিয়া মধ্যে দুবছর আগে হওয়া এই চুক্তি প্রসঙ্গে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী টারো কানো বলেছেন, এই চুক্তিতে কোন পরিবর্তন আনার চেষ্টা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে জাপানের এই চুক্তিতে অনেক কিছু গোপন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

কী আছে দুবছর আগে সম্পাদিত চুক্তিতে

২০১৫-র চুক্তিতে জাপান ওই ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছিল এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য এক তহবিলে এক বিলিয়ন ইয়েন দিতে সম্মত হয়েছিল।
এতে ক্ষমা চেয়েছিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী এবং এর জন্য জাপান ''গভীরভাবে দায়িত্ববদ্ধ'' বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
দক্ষিণ কোরিয়া এর বদলে আশ্বাস দেয় সোলে জাপানী দূতাবাস এবং বুসানে জাপানী কনস্যুলেটের সামনে আন্দোলনকারীরা এই ''যৌনদাসীদের'' যে প্রতীকী মূর্তি বসিয়েছে তা তারা সরিয়ে নেবে।
আন্দোলনকারীরা এই নারীদের নিগ্রহের বিষয়টির প্রতি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে মূর্তিগুলো বসায়।
এই মূর্তিগুলো দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানী সৈন্যদের জন্য গণিকালয়ে এধরনের ''যৌনদাসী'' হিসাবে যেসব মেয়েরা কাজ করতেন তাদের বেশিরভাগই ছিলেন কোরীয়। এছাড়াও চীন, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া, এবং তাইওয়ানের মেয়েদেরও এসব গণিকালয়ে কাজ করতে বাধ্য করা হতো।
এদের কেউ হয়ত স্বেচ্ছায় একাজ করেছেন, কিন্তু বেশিরভাগকেই পাচিকা বা পরিচ্ছন্নকর্মী হিসাবে বেতন দিয়ে সেখানে পাঠানো হয়েছিল। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী এদের বেশিরভাগকেই জোর করে কাজে পাঠানো হয়।
তথাকথিত 'যৌনদাসী'দের প্রতীকী মূর্তি বসানো নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে বারবার কূটনৈতিক বিতণ্ডা হয়েছে।

Monday, September 23, 2019

দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজার: বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কি সংকুচিত হয়ে পড়ছে?

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর সরকারিভাবে কয়েক হাজার কর্মী কাজ করতে দক্ষিণ কোরিয়ায় যান।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যস্থতায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়, যার খরচও হয় অত্যন্ত কম, এক লাখ টাকার মধ্যে। অথচ সেখানে চাকরির বেতন হয় আশি হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত।
ফলে এই চাকরির প্রতি আগ্রহ রয়েছে বাংলাদেশের অনেক তরুণের।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী লি নাক-ইয়োন বর্তমানে বাংলাদেশ সফর করছেন। বাংলাদেশে সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সংস্কৃতি নিয়ে কয়েকটি চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অভিবাসনের বিষয়টি আলোচনা হবে কিনা এবিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় কাজের ক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থা কি? নতুন কোন সম্ভাবনা কি তৈরি হচ্ছে?

যেভাবে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী নিয়োগ হয়

একসময় বাংলাদেশের চারটি কোম্পানির মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী নিয়োগ হলেও, ২০০০ সালে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বিদেশি কর্মীদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে একসময় বাংলাদেশের কর্মীরা শীর্ষে থাকলেও এখন সেই স্থান নিয়েছে নেপাল ও ভিয়েতনামের কর্মীরা
পরবর্তীতে ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট (এইচআরডি) মাধ্যমে কোরিয়ার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এখন এই নিয়োগটি হয় রিক্রুটমেন্ট পয়েন্ট সিস্টেমের ভিত্তিতে।
অর্থাৎ আবেদনকারী কোরিয়ান ভাষা, কর্মদক্ষতা, শারীরিক যোগ্যতা বৃত্তিমূলক কাজের যোগ্যতা, প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ ও চাকরির অভিজ্ঞতা- ইত্যাদি বিষয় মূল্যায়নের ভিত্তিতে পয়েন্ট পান। সেসব পয়েন্টের ভিত্তিতে প্রথম দফা প্রার্থী বাছাই করা হয়।
এরপর কোরিয়ার কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে ইন্টারনেট ভিত্তিক দক্ষতা পরীক্ষার মাধ্যমে দ্বিতীয় দফার কর্মী বাছাই হয়। দুই রাউন্ড মিলিয়ে সর্বাধিক নম্বর পাওয়া ব্যক্তিদের চূড়ান্ত করা হয়।
কোরিয়ার নিয়োগ দাতাদের এসব তথ্য সরবরাহ করে উপযুক্ত কর্মী খুঁজে পেতে সহায়তা করা হয়।
পরীক্ষা, যাচাই বাছাইয়ের পরে কর্মীদের এই তালিকা দেয়া হয় দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়োগ দাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। সেখান থেকে তাদের চাহিদা মতো কর্মী বেছে নেন।
বাছাইকৃত কর্মীদের মেয়াদ থাকে দুই বছর। এর মধ্যে কোরিয়ান কোম্পানি তাদের বেছে না নিলে পুনরায় পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার কারখানায় বিভিন্ন দেশের অনেক শ্রমিক কাজ করেন, যাদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশিরাও
বাছাই হওয়ার পর বিমান ভাড়া, বোয়েসেলের ফিসহ সবমিলিয়ে একজন কর্মীর খরচ হয় ৮০ হাজার টাকা।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ২২১৫জন কর্মী, ২০১৮ অর্থবছরে ২০১২জন কর্মী দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়েছেন।
২০১৯ সালে তিন হাজার কর্মীর চাহিদার কথা জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা আশা করছেন, শেষপর্যন্ত কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী অন্তত দুই হাজার কর্মী পাঠানো যাবে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী নিয়োগের এখন কী অবস্থা?

দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ওমর ফারুক বিবিসি বাংলাকে বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়োগ দাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা কমছে।
তিনি জানাচ্ছেন, একসময় বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম দিকে থাকলেও এখন তাদের হটিয়ে নেপাল, ভিয়েতনাম, মিয়ানমারের কর্মীরা জায়গা দখল করে নিয়েছে।
ঢাকায় বাংলাদেশ কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কোরিয়ান ভাষার পাঠদান চলছে
এর কারণ হিসাবে তিনি বলছেন, বাংলাদেশিরা অল্প সময়ের মধ্যে ঘনঘন চাকরি পরিবর্তন করেন, ফলে অনেক নিয়োগদাতা খুশী নন। এছাড়া অনেক কর্মীর মালিকদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়া, খাবারের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সমস্যার সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে সার্টিফিকেট জালিয়াতির সমস্যা।
তিনি জানাচ্ছেন, পয়েন্ট সিস্টেমের কারণে পূর্বের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে কোরিয়ায় পরবর্তী ধাপের ভিসা পেতে সুবিধা হয়, যার ফলে দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করা যায়। এই সুযোগ নিতে বাংলাদেশি কিছু কর্মী দেশ থেকে ভুয়া সার্টিফিকেট তৈরি করে নিয়ে এসেছিলেন, যা কোরিয়ান ইমিগ্রেশনে ধরা পড়ে। এসব অভিযোগে ৪০জনের মতো কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এসব কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের ব্যাপারে দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু প্রতিষ্ঠান অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন বলে তিনি জানান।
ওমর ফারুক জানান, এখন খরচ কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তাদের কারখানা ভিয়েতনামে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ সেখানে উৎপাদন খরচ কম। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তার প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প খাতেও। এর ফলে এখানকার শ্রমবাজারে বিদেশী কর্মীদের চাহিদা কমেছে।
ফলে বাংলাদেশিসহ অনেক বিদেশী কর্মী এখন দক্ষিণ কোরিয়ায় বেকার রয়েছেন বলে তিনি জানান।

কী বলছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা?

বোয়েসেলের কর্মকর্তা নূর আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় কিছুদিন ধরে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সংখ্যা একটু কমে গেছে, নেপাল ও অন্য দেশের কর্মীদের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি, বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা আরো বাড়ানোর।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের সঙ্গে এমপ্লয়মেন্ট পয়েন্ট সিস্টেম নিয়ে মতবিনিময়ে করছেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা
দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশি কর্মীদের ব্যাপারে নিয়োগ দাতাদের অনাগ্রহের কথা প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, ''এরকম একটি কথা আমাদের কানেও এসেছে। আমরা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীদের নানাভাবে বোঝানো, পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে সেখানে বাংলাদেশ নিয়ে কোনরকম নেতিবাচক মনোভাব তৈরি না হয়।''
তবে বাংলাদেশী কর্মী বেশি নেয়া না নেয়ার বিষয়টি যেহেতু শেষপর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলোর ওপরেই নির্ভর করে, সুতরাং এক্ষেত্রে সরাসরি বাংলাদেশি কর্মকর্তা বা কোরীয় কর্মকর্তাদের কিছু করার সুযোগ নেই। বরং সেখানে বাংলাদেশি কর্মীরা দক্ষতা ও আচরণ দিয়ে তাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারলে বাংলাদেশের এই বাজারটি আরো বিস্তৃত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলছেন, খাবার নিয়ে কর্মীদের একটি অভিযোগ অনেকদিন ধরেই আসছে। কারণ সেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে থাকে। ফলে তাদের মতো খাবার বাংলাদেশি কর্মীরা খেতে পারেন না। এক্ষেত্রেও আমরা কর্মীদের বুঝিয়েছি যেন উন্নত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা নিজেদের মানিয়ে নেন।
বাংলাদেশের দূতাবাসের মাধ্যমে সেখানে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

Saturday, September 14, 2019

ব্রা পরার বিরুদ্ধে যেভাবে সোচ্চার হয়ে উঠছে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা by লারা ওয়েন ও জুলি ইয়োনয়াঙ

দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা ইদানিং ব্রা বা বক্ষবন্ধনী ছাড়াই পোশাক পরা ছবি অনলাইনে প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেশটির নারীদের মধ্যে ক্রমশঃই 'হ্যাশট্যাগ নো ব্রা' ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।
দেশটির জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও গায়িকা সিওলি ইনস্টাগ্রামে এমন একটি ছবি পোস্ট করার পর এই বক্ষবন্ধনী মুক্ত আন্দোলন বা ব্রালেস মুভমেন্ট দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ইনস্টাগ্রামে সিওলির রয়েছে মিলিয়ন মিলিয়ন অনুসারী।
এরপর থেকে সিওলি বক্ষবন্ধনীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছেন তিনি, যার মাধ্যমে নারীরা একটি বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান যে, ব্রা বা বক্ষবন্ধনী পরা না পরা একজন নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়।

বক্ষবন্ধনী মুক্ত আন্দোলন

তবে অনেকের সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও অনেক নারী ও পুরুষের কাছ থেকে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার শিকারও হয়েছেন সিওলি। সমালোচনাকারীরা তাকে 'মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টাকারী' এবং উসকানিদাতা বলে অভিযোগ করেন।
অনেকে মনে করেন, তিনি নিজের নামডাক কামানোর উদ্দেশ্যে নারী আন্দোলনকে ব্যবহার করছেন।
''আমি বুঝতে পারি যে, ব্রা পরা না পরার ব্যাপারটা আপনার ইচ্ছার ব্যাপার, কিন্তু তিনি সবসময়েই আটোসাঁটো জামা পরে ছবি তোলেন, সবসময়ে তিনি এটা না করলেও পারেন,'' একজন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী ইন্সটাগ্রামে লিখেছেন।
একজন লিখেছেন, ''ধিক্কার তোমাকে। তুমি কি এভাবে গির্জায় যেতে পারবে? তুমি কি তোমার বোনের স্বামী বা তোমার শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে যেতে পারবে? এতে শুধু পুরুষরাই নয়, নারীরাও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।'' একজন মন্তব্য করেছেন।
সম্প্রতি হাওয়াসা নামের আরেকজন বিখ্যাত গায়িকার ছবি এই হ্যাশট্যাগ নো ব্রা আন্দোলনকে আবার আলোচনায় তুলে এনেছে।

ইচ্ছার স্বাধীনতা

হংকংয়ের একটি কনসার্ট থেকে সোলে ফেরার পথে বক্ষবন্ধনী ছাড়া সাদা টি-শার্ট পরা অবস্থায় তার ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়।
এরপর থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ নারীদের মধ্যেও এই আন্দোলনটি ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে।
তবে দেশটির নারীদের মধ্যে ইচ্ছার স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামাজিক মাধ্যমে # নো ব্রা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে
২০১৮ সালে 'এস্কেপ দি কর্সেট' নামের আন্দোলন হয়েছিল দেশটিতে, যখন অনেক নারী তাদের লম্বা চুল কেটে ফেলেন এবং প্রসাধনী ছাড়া বাইরে বের হতে শুরু করেন। সেসব ছবিও তারা সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন।
এই আন্দোলনের মূল শ্লোগানটি এসেছিল নারীদের অবাস্তব সৌন্দর্য চর্চার বিরুদ্ধে, যে চর্চ্চা করতে গিয়ে নারীরা মেকআপের পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন।
অনেক নারী বিবিসিকে বলেছেন যে, তারা মনে করে, এই দুইটি আন্দোলনের মধ্যে অবশ্যই যোগসূত্র আছে এবং যেভাবে এই দুইটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, সেটা নতুন ধরণের আন্দোলনের সূচনা করছে।

গেজ রেপ বা চোখ দিয়ে ধর্ষণ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা পুরুষ আধিপত্যের সংস্কৃতি, যৌন সহিংসতা এবং বিশ্রামকক্ষ ও জনসমাগমের স্থানে গোপন ক্যামেরার ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে।
২০১৮ সালে দেশটিতে নারীদের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ ঘটে, যেখানে হাজার হাজার নারী সোলের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন এবং গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর দাবি জানান।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার কোন কোন নারী বিবিসিকে বলেছেন,তারা এখন বিষয়টি নিয়ে অনেকটা দ্বিধান্বিত।
কারণ তারা বক্ষবন্ধনী মুক্ত আন্দোলনকে সমর্থন করছেন, কিন্তু জনসম্মুখে নিজেরা বক্ষবন্ধনী ছাড়া যেতে সাহস পাচ্ছেন না। তাদের আশংকা মানুষজন হয়তো তাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে।
২৮ বছর বয়সী জিয়ঙ সিয়ঙ-ইয়ুন 'নো ব্রাব্লেম' নামে একটি তথ্যচিত্রের নির্মাণ দলের সদস্য ছিলেন। তথ্যচিত্রটি বক্ষবন্ধনী ছাড়া বাইরে যাওয়া নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল।
মিজ সিয়ঙ-ইয়ুন বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি এই প্রকল্পটি শুরু করেন, যেটি করার সময় তারা নারীদের প্রশ্ন করেছিলেন, ''কেন আমরা মনে করি যে, ব্রা পড়া স্বাভাবিক একটা ব্যাপার?"

পছন্দ করার অধিকার

যদিও তিনি মনে করেন, নারীদের এই বিষয়টি নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনা করার বিষয়টি ভালো। তবে তিনি এটাও বিশ্বাস করেন যে, বেশিরভাগ নারী এখনো এটা ভেবে লজ্জাবোধ করে যে জামার উপর দিয়ে তাদের স্তনবৃন্ত ফুটে উঠবে।
ষাটের দশকে 'ব্রা বার্নিং ফেমিনিস্ট' বাক্যটির জন্ম হয়
''তারা জানে যে, এখনো দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্রা ব্যবহার করাটা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে করা হয় এবং এ কারণেই তারা ব্রা পড়তে চায়।'' তিনি বলছেন।
২৪ বছর বয়সী পার্ক আই-সেউল দক্ষিণ কোরিয়ার একজন মডেল যিনি ইতিবাচক শারীরিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। গত বছর তিনি একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন, যেখানে তাকে কোন বক্ষবন্ধনী ছাড়া রাজধানী সোলে তিনদিন ধরে চলাফেরার করতে দেখা যায়। ওই ভিডিওটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, ২৬ হাজার মানুষ সেটি দেখেছেন।
তিনি বলছেন, তার অনেক অনুসারী এখন মধ্যবর্তী পন্থা হিসাবে ফিতা যুক্ত ব্রার পরিবর্তে নরম কাপ ব্রালেট ব্যবহার শুরু করেছেন।
''আমার একটি ভুল ধারণা ছিল যে, যদি আমরা ফিতা যুক্ত বক্ষবন্ধনী না পরি, তাহলে আমাদের স্তন ঝুলে যাবে এবং খারাপ দেখাবে। কিন্তু আমি ওই ভিডিওটি তৈরি করার পর থেকে আমি আর সেগুলো পরি না। এখন আমি গরমের দিনগুলোয় ব্রালেট পড়ি, আর শীতের দিনগুলোয় কোন বক্ষবন্ধনীই পরি না।''
তবে আন্দোলন শুধু মাত্র রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়।
এই আন্দোলন অনুপ্রাণিত করেছে ডেইগুর ২২ বছর বয়সী উদ্যোক্তা এবং ভিজুয়াল ডিজাইনার নাহয়ুন লিকেও ।
তিনি কেইমইয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স প্রজেক্টের অংশ হিসেবে ইয়াপ্পি নামের একটি পপ-আপ ব্রান্ড শুরু করেছিলেন। গত মে মাস থেকে তিনি এই ব্রান্ডের নামে স্তনবৃন্ত ঢেকে রাখার প্যাচ বিক্রি করতে শুরু করেছেন।
জেওল্লানাম-ডু প্রদেশের ২৮ বছর বয়সী ডা-কিয়ুং বলছেন, তিনি গায়িকা ও অভিনেত্রী সিওলির ছবি দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং শুধুমাত্র অফিসে যাবার সময় তিনি বক্ষবন্ধনী পরে যান, যখন বস সামনে থাকে। কিন্তু ছেলে বন্ধুর সামনে যাবার সময় আর সেটি পরেন না।
''আমার বয়ফ্রেন্ড বলেছে, যদি আমি বক্ষবন্ধনী পড়ে স্বস্তি বোধ না করি, তাহলে আর সেটি পরার দরকার নেই,'' তিনি বলছেন।
তাদের বক্তব্য হলো, নারীরা কি পরবেন আর পরবেন না, সেটা বাছাই করার স্বাধীনতা তাদেরই।

কিন্তু বক্ষবন্ধনী পরার ব্যাপারে গবেষণা কি বলছে?

বক্ষবন্ধনী ব্যবহার না করলে কি স্বাস্থ্যের সমস্যা হয়?
ড. ডেইড্রে ম্যাক গি একজন ফিজিওথেরাপিস্ট এবং ইউনিভার্সিটি অফ উলনগোং-এর ব্রেস্ট রিসার্চ অস্ট্রেলিয়ার সহ-পরিচালক।
'' আমি বিশ্বাস করি, নারীরা কি পরবেন, সেটা ঠিক করার অধিকার তাদের আছে। কিন্তু আপনার স্তন যদি অনেক ভারী হয়ে থাকে এবং সেজন্য শরীরে যদি যথেষ্ট সাপোর্ট না থাকে, তাহলে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সেটার প্রভাব পড়তে পারে, যার মধ্যে রয়েছে গলা এবং শরীরের পেছনের অংশ।'' তিনি বলছেন।
''বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের শারীরিক গঠনের পরিবর্তন হয়, চামড়ায় পরিবর্তন আসে এবং এ ধরণের প্রাকৃতিক সাপোর্টও কমে আসে।''
প্রসাধনী ছাড়া বাইরে বের হবার পর দক্ষিণ কোরিয়ার ইউটিউব স্টার লিনা বেই হত্যার হুমকিও পেয়েছেন
''যখন নারীরা এ জাতীয় সাপোর্ট ছাড়া ব্যায়াম করেন, তখন স্তন নড়াচড়া করে। তখন স্পোর্টস ব্রা ব্যবহার করলে স্তনের ব্যথা কমাতে পারে, সেই সঙ্গে তাদের পেছনে ও গলায় ব্যথা হওয়া ঠেকাতে পারে।'' তিনি বলছেন।
''একইভাবে, আপনার স্তন দেখতে কেমন দেখাচ্ছে বা নড়াচড়া করছে, এ নিয়ে যদি বিব্রত হন বা আত্মসচেতন হন, তাহলে আপনিও অসহায় আচরণের ভেতর দিয়ে যাবেন। যে নারীদের স্তন কেটে ফেলতে হয়েছে, তাদের অনেককে আমি পরামর্শ দেবো বক্ষবন্ধনী ব্যবহার করার জন্য, যাতে তাদের আচরণ আর আত্মবিশ্বাসে সমস্যা না হয়।''
''আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, এমনকি যে নারীদের স্তন থাকে না, যেমন ধরুন অপারেশন করে স্তন কেটে ফেলার মতো ঘটনার পরেও, অনেক নারী ওই জায়গাটি ঘিরে রাখতে চান, যেহেতু স্তন আমাদের লিঙ্গ পরিচয়েরও অন্যতম অংশ।''
ইউনিভার্সিটি অফ পোর্টসমাউথের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. জেনি বারবেজ বলছেন, বক্ষবন্ধনী ব্যবহার করে যে নারীরা অস্বস্তি বোধ করেন বা ব্যথা বোধ করেন, তার কারণ আসলে 'ঠিক মাপের বক্ষবন্ধনী' ব্যবহার না করা।
''আমাদের গবেষণা দল যতটা জানে, কোন গ্রহণযোগ্য বিজ্ঞানসম্মত গবেষণায় পাওয়া যায়নি যে, বক্ষবন্ধনী ব্যবহারের সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের সম্পর্ক আছে।'' তিনি বলছেন।
তবে এটাই প্রথম ঘটনা নয় যে, নারীরা বক্ষবন্ধনীর বিপক্ষে আন্দোলন করেছেন।
১৯৬৮ সালে মিস আমেরিকা সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে একটি বিক্ষোভের পর 'ব্রা বার্নিং ফেমিনিস্ট' বাক্যটির জন্ম হয়, যার মানে বক্ষবন্ধনী পোড়ানো নারীবাদীরা।
সেই আন্দোলনের সময় নারীরা যেসব জিনিস আবর্জনার বাক্সে ছুড়ে ফেলেন, তার মধ্যে ছিল বক্ষবন্ধনীও, যেটিকে তারা নারীদের দমন করার একটি প্রতীক বলে মনে করতেন। যদিও তারা আসলে কখনোই বক্ষবন্ধনী পোড়ান নি।
এরপর থেকে 'বক্ষবন্ধনী পোড়ানো' শব্দ দুইটি নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
এ বছর জুন মাসে, সুইজারল্যান্ডের কয়েক হাজার নারী বেতনের সমতা, যৌন হয়রানি আর সহিংসতার প্রতিবাদে আন্দোলনের অংশ হিসাবে তাদের অফিস থেকে বেরিয়ে আসেন, বক্ষবন্ধনী পোড়ান আর সড়ক অবরোধ করেন।
বিশ্বজুড়ে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ব্যাপারে সচেতনতা তৈরিতে ১৩ই অক্টোবর তারিখটিকে 'নো ব্রা' বা বক্ষবন্ধনীহীন দিবস বলে পালন করা হয়। কিন্তু গত বছর ফিলিপিন্সের নারীরা ওই দিনটিকে বৃহত্তর লিঙ্গ সমতার দিন হিসাবে পালনের আহবান জানান।
সাংবাদিক ভেনেসা আলমেদা বলছেন, 'নো ব্রা ডে' হচ্ছে আমাদের নারীত্ব এবং একজন নারী হিসাবে স্বীকৃতির দিবস।
''বক্ষবন্ধনী তুলে ধরছে কিভাবে নারীকে দাসত্বের মধ্যে আটকে রাখা হচ্ছে'' তিনি বলছেন।
আন্দোলনকারীরা এ বছর আরো একধাপ এগিয়ে স্তনবৃন্ত নিয়ে রাখঢাকের ব্যাপারে নারী ও পুরুষের মধ্যে দ্বিমুখী আচরণের বিষয়টি সামনে তুলে এনেছেন।
২০১৪ সালে নেটফ্লিক্স একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করে যার শিরোনাম ছিল 'ফ্রি দ্যা নিপল'। সেখানে দেখানো হয় নিউইয়র্কের একদল তরুণী নারীদের স্তন নিয়ে অপরাধ এবং রাখঢাকের ব্যাপারে আন্দোলন করছেন।
সেটা থেকেই বিশ্ব জুড়ে 'ফ্রি দ্যা নিপল' আন্দোলনটি ছড়িয়ে পড়ে।
মেয়েদের শরীর নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে বিধিনিষেধের কথা শোনা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক 'নো ব্রা' আন্দোলন সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে নিয়ে এসেছে। যে নারীরা এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি প্রমাণ করছে যে, দক্ষিণ কোরিয়ায় এখনো সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
দেশটির অনেক নারীর কাছে 'ব্যক্তি স্বাধীনতার' ব্যাপারটি এখন জরুরি একটা ব্যাপার।
দক্ষিণ কোরিয়ার নারীদের মধ্যে যেভাবে আন্দোলনটির বিস্তৃতি হচ্ছে, তাতে এই হ্যাশট্যাগের ব্যবহার হয়তো ততদিন পর্যন্ত কমবে না যতদিন পর্যন্ত 'নো ব্রা' বা বক্ষবন্ধনী ব্যবহার না করার ব্যাপারটি স্বাভাবিক একটি ঘটনায় পরিণত হবে।