Wednesday, August 13, 2025

ইসরায়েলি সেনাপ্রধানই কি নেতানিয়াহুর লাগাম টেনে ধরবেন

ওয়াশিংটন পোস্টের বিশেষ প্রতিবেদনঃ গত সপ্তাহে এক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা বৈঠকের আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র হয়। তখন তাঁদের সামনে ছিল একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা—গাজা উপত্যকা পুনর্দখল করা হবে, নাকি বর্তমান কৌশলেই এগোনো হবে।

বর্তমান ও সাবেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা এবং সরকারি উপদেষ্টারা নিশ্চিত করেছেন, গত শুক্রবার ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গাজা সিটিতে ঢুকবে। এটি গাজার শেষ বড় শহর; যা এখনো ইসরায়েলের দখলে নেই। গাজা সিটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মাধ্যমে তারা উপত্যকাটির আরও ১০ শতাংশ এলাকা দখল করবে এবং সমগ্র জনসংখ্যাকে অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ জমিতে ঠেলে দেবে। আইডিএফ বর্তমানে গাজার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

পরিকল্পনাসংক্রান্ত গোপন আলোচনার কারণে কিছু কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।

গাজা সিটিতে ঢোকার ওই পরিকল্পনা ছিল আইডিএফের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রস্তাবের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী। তাঁরা গাজা সিটি ঘিরে রাখা ও সেখানে বাইরে থেকে হামলা চালানোর প্রস্তাব দেন। তবে এটি ছিল নেতানিয়াহু ও তাঁর রাজনৈতিক মিত্রদের পছন্দের পুরো গাজা দখলের পরিকল্পনার তুলনায় সীমিত পরিসরের।

পুরো গাজা দখলে যেখানে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর পাঁচটি ডিভিশন দরকার; সেখানে সেনা কর্মকর্তাদের প্রস্তাবিত পরিকল্পনামাফিক তথা পর্যায়ক্রমিক অভিযানে তার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার হবে। এ স্থল অভিযানে সেনারা ধীরে ধীরে অগ্রসর হবেন। আর তা হবে শুধু তখনই, যখন আগামী মাসের মধ্যে গাজা সিটির প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দাকে (যাঁদের অনেকেই বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন) সরিয়ে নেওয়া হবে। যদিও যাওয়ার মতো জায়গা তখন প্রায় থাকবে না তাঁদের।

সেনা কর্মকর্তাদের এ সিদ্ধান্ত আসে বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজে নেতানিয়াহুর দেওয়া সাক্ষাৎকারে গাজা পুরোপুরি দখল করার অভিপ্রায় জানানোর ১২ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে। এ সিদ্ধান্তে তাঁর অতিদক্ষিণপন্থী মিত্ররা বিরক্ত হলেও বিষয়টি দেখিয়েছে যে শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা নেতানিয়াহু ও তাঁর বেসামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এখনো অবস্থান নিতে সক্ষম। ইসরায়েলের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন নেতানিয়াহু এবং জেনারেলদের সঙ্গে সবচেয়ে তীব্র দ্বন্দ্বেও জড়িয়েছেন তিনিই।

ইতিপূর্বে ১৯৬৭ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত গাজা দখল করে রেখেছিল ইসরায়েল।

‘যদি মন্ত্রিসভা জামিরের ওপর পুরো গাজা দখলের বিষয়কে চাপিয়ে দিত, তবে সেটি হতো নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বসম্মত মতকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপেক্ষা করার প্রথম ঘটনা’, বলেন ইসরায়েলের একসময়ের প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেজের উপদেষ্টা নিমরোদ নভিক। তিনি বর্তমানে নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইসরায়েল পলিসি ফোরামের জ্যেষ্ঠ ফেলো। নভিক বলেন, ‘নিরাপত্তা মহল প্রধানমন্ত্রীকে পরিকল্পনার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে বাধ্য করেছে।’

ঘটনাটি মনে করিয়ে দিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক অন্তর্দ্বন্দ্বের বিষয়টিকে। অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিশ্বাস, সামরিকভাবে আর কোনো বড় কৌশলগত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

২২ মাস পরও গাজায় ২০ জন জীবিত ইসরায়েলি জিম্মি রয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলের তাণ্ডবে গাজায় ৬১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গত মার্চ থেকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ত্রাণ অবরোধ শুরু হওয়ায় উপত্যকাটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক খাদ্যাভাব।

গত সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিন ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়া খবরে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ও তাঁর মন্ত্রীরা জামিরকে পুরো গাজা দখলের জন্য চাপ দিচ্ছেন, আর জামির মন্ত্রিসভাকে সতর্ক করছেন—এতে ইসরায়েলি সেনাদের বড় ঝুঁকি তৈরি হবে এবং গাজার শাসন সেনাবাহিনীর জন্য বিপজ্জনক হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতানিয়াহুর জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির জামিরকে সরকারের আদেশ মানার শপথ নিতে বলেন। নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ায়ির নেতানিয়াহু সেনাপ্রধানকে অভিযুক্ত করেন, তিনি নাকি ‘সত্তরের দশকের মধ্য আমেরিকার কোনো অস্থিতিশীল প্রজাতন্ত্রের মতো সামরিক অভ্যুত্থান’ ঘটানোর চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে, বৈঠকের কয়েক দিন আগে আইডিএফ, গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ বাহিনীর এক ডজনের বেশি সাবেক প্রধান এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানান। বৈঠকের ঘণ্টা কয়েক আগে সেনাবাহিনী জামিরের এক বক্তব্যের উদ্ধৃতি প্রকাশ করে। সেখানে তিনি বলেন, ‘বিতর্কের সংস্কৃতি ইহুদি জনগণের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আইডিএফ নির্ভয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে থাকবে।’

সেনাবাহিনীর আপত্তি সত্ত্বেও রোববার নেতানিয়াহু গাজা সিটিতে সেনা পাঠানো বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে বারবার সাফাই দেন। তিনি ইসরায়েলি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আইডিএফ, এর কমান্ডার ও আমাদের সৈনিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রাখি। কিন্তু আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আইডিএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতের বিপরীতে গিয়ে। আমরা একটি দেশ, যার একটি সেনাবাহিনী আছে; সেনাবাহিনীর একটি দেশ নই।’

পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি সাংবাদিকদের নেতানিয়াহু বলেন, ‘প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে শুধু ক্লান্তিকর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কৌশল সফল হয়নি। আমি মনে করি, এতে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে, কিন্তু শেষ হবে না।’

শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, গাজা সিটির মাত্র কয়েক মাইল দক্ষিণ-পূর্বে কারনি সীমান্ত ক্রসিংয়ে ডজনখানেক আইডিএফের যানবাহন জড়ো রয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের স্যাটেলাইট রাডার ও অপটিক্যাল চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত জুলাইয়ের শুরু থেকেই সেখানে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।

রোববার গভীর রাতে ইসরায়েল গাজা সিটিতে ‘ফায়ার বেল্ট’ বোমাবর্ষণ অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট এলাকা লক্ষ্য করে বোমা ফেলা শুরু করে। আল–জাজিরা সাংবাদিক আনাস আল–শরিফের পোস্ট করা ভিডিও ও তথ্যে এটি নিশ্চিত হয়। এর এক ঘণ্টার কম সময় পর আইডিএফ জানায়, শরিফকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি গাজায় ইসরায়েলের হামলায় নিহত কমপক্ষে ১৭৮ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিকের একজন বলে জানিয়েছে ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’।

অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নেতানিয়াহুর একজন উপদেষ্টা বলেন, গাজা সিটিতে হামলা চালানো জরুরি। কারণ, এতে জনগণের ওপর হামাসের নিয়ন্ত্রণ আরও দুর্বল হবে। তাঁর মতে, এতে ইসরায়েল ইজ্জ আদ-দীন আল-হাদ্দাদকে (হামাসের সর্বশেষ জীবিত শীর্ষ কমান্ডার) নিশানা করার সুযোগ পাবে। আর মধ্যমেয়াদে ইসরায়েল এমন কিছু স্থানীয় উপজাতি নেতাকে ক্ষমতায় বসাতে পারবে, যাঁদের ধাঁচ হবে ইয়াসের আবু শাবাবের মতো। এই বিতর্কিত ব্যক্তিকে ইসরায়েল অস্ত্র দিয়েছে এবং তিনি গাজায় ঢুকে মানবিক ত্রাণ লুট করেছেন বলে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি বিশ্লেষকেরা অভিযোগ করেন।

ছয় মাস আগে নেতানিয়াহু জামিরকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন এটি ভেবে যে তিনি গাজার প্রতি আরও আক্রমণাত্মক নীতি নেবেন। নেতানিয়াহুর ওই উপদেষ্টা বলেন, ‘শুরুতে মনে হয়েছিল, জামির সঠিক পথেই যাচ্ছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তিনি ছিলেন নতুন। আর তাঁর চারপাশে যে জেনারেলরা ছিলেন, তাঁরা একই রয়ে গেছেন এবং তাঁরা তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে এটি বেআইনি ও বিপজ্জনক।

ইসরায়েলে বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের সংঘাত—কখনো চিৎকার–চেঁচামেচিতেও গড়ায়। এটা অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় সেনা নেতৃত্বই জেতে।

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের আগে তরুণ জেনারেলরা প্রধানমন্ত্রী লেভি ইশকোলকে ইসরায়েলের আরব প্রতিবেশীদের ওপর আগাম হামলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদেরা একে কখনো কখনো ‘জেনারেলদের অভ্যুত্থান’ বলে বর্ণনা করেছেন। এক দশকের বেশি আগে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান ও আইডিএফের প্রধান ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় নেতানিয়াহুর হামলার প্রস্তাব ঠেকাতে সফল হন।

সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাক ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘শেষ পর্যন্ত আপনার সেনাপ্রধানকে দরকার হবে। আপনি মন্ত্রিসভায় যেতে পারবেন না, যখন সেনাপ্রধান আপনাকে বলেন, ‘‘দুঃখিত, আমি আপনাকে না বলেছি।”’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেতানিয়াহু ও শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে টানাপোড়েন বেড়েছে। দক্ষিণপন্থীরা প্রায়ই এই কর্মকর্তাদের মধ্য বা উদারপন্থী হিসেবে সমালোচনা করেন। ২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরুর আগে সাবেক গোয়েন্দা ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুর বিচারব্যবস্থা সংস্কারের বিরুদ্ধে গণ–আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ওই বছরের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর নেতানিয়াহু প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের পদচ্যুত করেন।

একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা বলেন, এবার যে বিষয়টি আলাদা, তা হলো—কিছু কর্মকর্তার মধ্যে ক্রমবর্ধমান এ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে স্থায়ী ক্ষতি করছে।

ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র জার্মানি গত সপ্তাহে ঘোষণা দেয়, গাজায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি বন্ধ করা হবে। এতে ইসরায়েলের মার্কাভা ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানবাহনের ইঞ্জিনও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাঁদের ধারণা, সেনাবাহিনী যতটা সম্ভব সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ মেনে চললেও কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

সাবেক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এর মানে এই নয় যে সেনাবাহিনী মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত মানবে না। তবে তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতা রয়েছে। সরকার বলতে পারে, আমরা চাই এ, বি ও সি। কিন্তু প্রতিটি খুঁটিনাটি নির্ধারণ করতে পারবে না তারা।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-12%2Fv1bsft40%2F1-1-TOPSHOTS-TOPSHOT-PALESTINIAN-ISRAEL-CONFLICT-102500.JPG?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলি বোমা হামলায় আহত এক শিশুকে কোলে করে সরিয়ে নিচ্ছেন এক ব্যক্তি। গতকাল গাজা সিটিতে। ছবি: এএফপি

গাজায় সাংবাদিক হত্যায় বিশ্বজুড়ে নিন্দা

সমস্ত আইনকানুনকে উপেক্ষা করে গাজায় আগ্রাসী হামলায় আল জাজিরার সাংবাদিক আনাস আল শরীফ ও তার চার সহকর্মীর মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় বইছে। রোববার নিহতদের জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর শত শত শোকসন্তপ্ত মানুষ তাদের মৃতদেহ কাঁধে তুলে গাজা সিটির রাস্তায় নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন গার্ডিয়ান। এভাবে সাংবাদিকদের হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। এর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া সাংবাদিকদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়ার ইসরাইলি প্রবণতা তাদের উদ্দেশ্য ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস আনাস আল শরীফ হত্যাকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর স্বীকারোক্তিমূলক হত্যা বলে এর নিন্দা জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।

বৃটিশ লেবার পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের এক মুখপাত্র বলেন, গাজায় সাংবাদিকদের উপর বারবার হামলায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সংঘাত কভার করা সাংবাদিকরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে সুরক্ষিত। জাতিসংঘ মানবাধিকার অফিস এই হামলাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
সোমবার আনাস আল শরীফের জানাজায় বন্ধু, সহকর্মী ও স্বজনরা তার মৃতদেহকে আলিঙ্গন করে হাউমাউ করে কেঁদেছেন। অন্য সাংবাদিকরা কাঁদতে কাঁদতে জানাজা ও সমাধিস্থল থেকে প্রতিবেদন করেছেন, কেউ ছবি তুলেছেন, কেউ সরাসরি সম্প্রচার করেছেন।

ফিলিস্তিন টিভি ও আরব চ্যানেলের সংবাদদাতা ইসলাম আল-জা’আনুন বলেন, এটি সাংবাদিকতার জগতে এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। আল জাজিরার উপস্থাপক বিলাল আবু খলিফা জানান, আনাস আল শরীফ তাকে চার দিন আগে বলেছেন তিনি বিপদে আছেন। কিন্তু গাজা ছাড়বেন না। তিনি বলেছেন, আমি জানি আমি হত্যার তালিকায় আছি। কিন্তু সত্য প্রকাশ করেই যাব। আল জাজিরা আনাস আল শরীফের মৃত্যুর পর তার ৬ এপ্রিলের লেখা শেষ বার্তা প্রকাশ করেছে। সেখানে তিনি লিখেছেন, আমি কখনও সত্য বিকৃত করিনি বা গোপন করিনি। আল্লাহ সাক্ষী থাকবেন তাদের বিরুদ্ধে যারা নীরব থেকেছে, আমাদের হত্যাকে মেনে নিয়েছে, আর আমাদের গণহত্যা ঠেকাতে কিছুই করেনি।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ইসরাইল আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ফলে যুদ্ধের কভারেজের দায়িত্ব মূলত ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের ওপর। তাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেকের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলি হামলায় ২৩৮ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সিপিজে জানিয়েছে, কমপক্ষে ১৮৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ওয়াটসন স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, যুগোস্লাভিয়া যুদ্ধ এবং আফগানিস্তানে মার্কিন যুদ্ধ- সব মিলিয়েও যত সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি। এতে বলা হয়, আল জাজিরার অন্যতম সুপরিচিত মুখ আনাস আল-শরীফ রবিবার রাতে গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের বাইরে সাংবাদিকদের জন্য নির্মিত একটি তাঁবুর ভেতরে অবস্থান করছিলেন। সেখানে ইসরাইলের হামলায় মোট সাতজন নিহত হন। এর মধ্যে আছেন আল জাজিরার প্রতিবেদক মোহাম্মদ কুরাইকে এবং ক্যামেরা অপারেটর ইব্রাহিম জাহের, মোহাম্মদ নুফাল ও মোয়ামেন আলিওয়া। হামলার সময় পাশের তাঁবুতে ছিলেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ওয়াদি আবু আল-সাউদ। তিনি জানান রাত ১১টা ২২ মিনিটে বিস্ফোরণটি ঘটে। আমি ফোন বের করতেই বিস্ফোরণ হলো। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম মানুষ আগুনে পুড়ছে। আমি তাদের আগুন নেভানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু আনাস এবং অন্যরা ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

হামলার পরের দৃশ্যের ভিডিওতে দেখা যায়, সাউদ নিহতদের মৃতদেহ বহন করছেন। তিনি জানান, এখন থেকে তিনি আর সংবাদ কভার করবেন না। কারণ ‘সত্যের মৃত্যু হয়েছে, কভারেজ শেষ।’ ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এই হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করেছে। তাদের দাবি আনাস আল-শরীফ হামাসের একটি সেলের নেতা। আল জাজিরা এবং আনাস আল শরীফ পূর্বেই এ অভিযোগ ‘অমূলক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। এটি প্রথমবার যে ইসরাইল কোনো সাংবাদিক নিহত হওয়ার পর এত দ্রুত দায় স্বীকার করল।

mzamin

প্রশান্ত মহাসাগরে চার মহাকাশচারীর সফল অবতরণ

পাঁচ মাসের সফল মিশন শেষে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) থেকে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন চার মহাকাশচারী। শনিবার স্পেসএক্সের ‘ড্রাগন’ ক্যাপসুলটি ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণ উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে প্যারাশুটের মাধ্যমে অবতরণ করে। তাদেরকে স্বাগতম জানিয়েছে মিশন কন্ট্রোল। বলা হয়, বাড়িতে স্বাগতম। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এতে বলা হয়, ফিরে আসা মহাকাশচারীরা হলেন- নাসার অ্যানে ম্যাকক্লেইন ও নিকোল আয়ার্স, জাপানের তাকুয়া ওনিশি এবং রাশিয়ার কিরিল পেস্কভ। তারা মার্চে বোয়িংয়ের স্টারলাইনারের আটকে পড়া পরীক্ষামূলক মিশনের পরিবর্তে মহাকাশে পাঠানো হয়।

স্টারলাইনারের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের বিভিন্ন ত্রুটির কারণে মহাকাশে আটকে পড়েন নাসার মহাকাশচারী বুচ উইলমোর ও সুনি উইলিয়ামস। এক সপ্তাহের পরিকল্পিত যাত্রা গড়িয়ে যায় নয় মাসে। পরে নিরাপত্তার কারণে নাসা সিদ্ধান্ত নেয়, ক্যাপসুলটি খালি অবস্থায় ফেরানো হবে এবং উক্ত দুই মহাকাশচারীকে স্পেসএক্সের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হবে।

বিদায়ের আগে আইএসএস থেকে অ্যানে ম্যাকক্লেইন বলেন, পৃথিবীতে এখন ঝড়ো মুহূর্ত চলছে, মানুষ সংগ্রাম করছে। আমরা চাই এই মিশন হোক একতা ও সহযোগিতার উদাহরণ। তিনি জানান, ফিরে গিয়ে তিনি হিউস্টনে কয়েকদিন বিশ্রামে কাটাতে চান। অপর সদস্যদের আকাক্সক্ষা ছিল গরম শাওয়ার আর এক থালা রসালো বার্গার।

এটি ছিল স্পেসএক্সের মানুষসহ তৃতীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অবতরণ। যা নাসার মহাকাশচারীদের জন্য গত ৫০ বছরের মধ্যে প্রথম। ১৯৭৫ সালের অ্যাপোলো-সয়ুজ মিশনের পর এই প্রথমবার কোনো নাসা দল প্রশান্ত মহাসাগরে ফিরল। স্পেসএক্স এই বছর ক্যাপসুল অবতরণের স্থান ফ্লোরিডা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থানান্তর করে, যাতে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ধ্বংসাবশেষের ঝুঁকি হ্রাস পায়।

mzamin

গাজায় ‘গণহত্যার’ প্রমাণ তুলে ধরার কারণেই কি সাংবাদিক আল-শরিফকে হত্যা করল ইসরায়েল

গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের ফটকে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান করছিলেন আল-জাজিরা আরবির গাজা প্রতিনিধি আনাস আল-শরিফ ও মোহাম্মদ কুরেইকেহ। এই দুই সাংবাদিকের সঙ্গে ছিলেন তাঁদের ক্যামেরাম্যান ইব্রাহিম জাহের, মোহাম্মদ নওফাল ও মোয়ামেন আলিওয়া।

গত রোববার রাতে ইসরায়েল আল-শিফা হাসপাতালের প্রধান ফটকের কাছে সাংবাদিকদের থাকার জন্য ব্যবহৃত একটি তাঁবুতে ড্রোন হামলা চালায়। হামলায় আল–জাজিরার পাঁচ সংবাদকর্মীসহ সাতজন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মোহাম্মদ আল-খালদি নামে আরেকজন স্থানীয় ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিকও রয়েছেন।

নিহত সাংবাদিকেরা ২২ মাস ধরে গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং সেখানকার বাসিন্দাদের ওপর যুদ্ধের কী প্রভাব পড়ছে, তার প্রামাণ্য দলিল সংগ্রহ করছিলেন। গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের সম্ভাব্য গণহত্যার প্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়েই এই সাংবাদিকদের প্রাণ হারাতে হয়েছে।

রোববার রাতের ওই হামলার পর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাবাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, আনাস আল-শরিফকে নিশানা করেই তারা ওই হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, হামাসের একটি সন্ত্রাসী সেলের প্রধান ছিলেন আল-শরিফ।

ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার কয়েক মিনিট আগে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ‘এক্স’–এ একটি পোস্ট দিয়েছিলেন আল-শরিফ। সর্বশেষ ওই পোস্টে তিনি বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে বলেছিলেন, গাজায় ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পরিকল্পনা অবরুদ্ধ এ অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

শরিফ লেখেন, ‘এই উন্মত্ততা যদি না থামে, গাজা পরিণত হবে ধ্বংসস্তূপে, এখানকার মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে, তাঁদের মুখগুলো মুছে যাবে আর ইতিহাস আপনাদের মনে রাখবে সেই নির্বাক সাক্ষী হিসেবে, যাঁরা এই গণহত্যা বন্ধ না করার সিদ্ধান্ত বেছে নিয়েছেন।’

২০২৪ সালের মার্চে আল-শিফা হাসপাতালে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার সময় মোহাম্মদ কুরেইকেহর মা নিহত হন। তিনি তাঁর মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন। কুরেইকেহ দুই সপ্তাহ খোঁজাখুঁজির পর হাসপাতালের একটি সিঁড়িতে পড়ে থাকা অবস্থায় মায়ের মৃতদেহ খুঁজে পান, তত দিনে সেটিতে পচন ধরে গিয়েছিল।

পরে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে কুরেইকেহ জানতে পারেন যে তাঁর মাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

ব্যক্তিগত শোক ও অসহনীয় পরিস্থিতি সত্ত্বেও আল-শরিফ ও কুরেইকেহ গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছিলেন। বিশ্বজুড়ে ক্রমেই এ যুদ্ধ গণহত্যা বলে বিবেচিত হওয়ার দাবি বাড়ছে।

ত্যাগ ও সাহস

গাজার বাকি সব ফিলিস্তিনির মতো আল-শরিফ ও কুরেইকেহ ইসরায়েলি দখলদারির মধ্যেই জন্ম নিয়েছিলেন এবং বেড়ে উঠেছিলেন। তাঁরা জীবনের বেশির ভাগ সময় দেখেছেন, ইসরায়েল গাজার স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথ সম্পূর্ণ অবরোধ করে রেখেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষায়, গাজা কার্যত খোলা আকাশের নিচে এক উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে।

এই অবরোধ ফিলিস্তিনিদের জীবিকা, যাতায়াত, পারিবারিক সম্পর্কসহ জীবনের প্রতিটি দিককে প্রভাবিত করেছে। আল-শরিফ ও কুরেইকেহ ইসরায়েলের নির্মম দখলের অধীনে তাঁদের জনগণের জীবনসংগ্রামের গল্প বিশ্বকে জানাতে জীবন উৎসর্গ করেছেন।

আল-শরিফ গাজার আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া স্টাডিজে লেখাপড়া করেছিলেন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযান নিয়ে নিজের প্রতিবেদনের জন্য তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন। তিনি সেখানে যুদ্ধের মানবিক ও অসামরিক প্রভাব নিয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছিলেন।

গাজার ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইয়াসের আল-বান্না বলেন, যখন ইসরায়েল ২২ লাখ ফিলিস্তিনিকে গাজার দক্ষিণে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল, তখনো আল-শরিফ ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান ও কার্যক্রম নথিভুক্ত করতে গাজার উত্তরাঞ্চলে রয়ে যান।

আল-জাজিরাকে আল-বান্না আরও বলেন, (সে সময়ে উত্তরাঞ্চলে) ইসরায়েলি হামলার কারণে তাঁর জীবন ঝুঁকিতে ছিল। তবু তিনি ইসরায়েলের প্রতিটি হামলার পর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যেতেন, ইসরায়েলের অপরাধের মুখোশ উন্মোচন করার জন্য।

এ সাংবাদিক আরও বলেন, গত বছর থেকে তিনি কুরেইকেহর সঙ্গে একটি শক্তিশালী পেশাদারি সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

এ সময়ে আল-বান্না গাজার দক্ষিণাঞ্চলে ও কুরেইকেহ উত্তরাঞ্চলে কাজ করতেন। তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন ও তথ্য বিনিময় করতেন, যেন ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের ফলে গাজায় যে মানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে আরও বিশদ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা যায়।

কুরেইকেহ সম্পর্কে আল-বান্না আরও বলেন, ‘তিনি আমাকে বা যে কাউকে সাহায্য করতে কখনো একমুহূর্ত দেরি করতেন না। কুরেইকেহ সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন হচ্ছে, তিনি সব সময় ধৈর্যশীল ও শান্ত স্বভাবের ছিলেন।’

সহকর্মী ও বন্ধু

২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল দাবি করেছিল, ফিলিস্তিনি যে ছয়জন সাংবাদিক হামাসের একটি সেলের সঙ্গে সংযুক্ত, তাঁদের একজন আল-শরিফ। ইসরায়েলের এই ভিত্তিহীন দাবি বারবার অস্বীকার করেছে আল-জাজিরা।

আল-শরিফ তখন থেকেই জানতেন যে তাঁর জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে।

কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসহ (সিপিজে) কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন বলেছে, ইসরায়েল প্রায়ই ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের প্রমাণ ছাড়াই ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

জুলাইয়ে সিপিজেকে আল-শরিফ বলেছিলেন, ‘এই সবকিছু ঘটছে, কারণ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি দখলদারি নিয়ে আমার প্রতিবেদন তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং বিশ্বে তাদের যে ভাবমূর্তি রয়েছে, তা শেষ করে দিচ্ছে। তারা আমাকে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেছে, কারণ দখলদারেরা আমাকে নৈতিকভাবে হত্যা করতে চায়।’

ইসরায়েলি হুমকির কারণে গাজায় কেউ কেউ আল-শরিফকে সাক্ষাৎকার দিতে দ্বিধায় থাকতেন। তাঁদের ভয় ছিল যে ইসরায়েল যেকোনো সময় আল-শরিফের ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে ও তাঁর আশপাশের সবাইকে হত্যা করতে পারে।

সাক্ষাৎকার দিতে দ্বিধান্বিত হলেও বেশির ভাগ মানুষ আল-শরিফের সাহসের প্রশংসা করেছেন এবং ঝড়ের কেন্দ্রে (মূল যুদ্ধক্ষেত্রে) থেকে যুদ্ধের খবর মানুষের সামনে তুলে ধরার সাহস দেখানোর জন্য তাঁকে সমর্থন করে গেছেন।

আল-বান্না বলেন, কুরেইকেহ ঝুঁকির কথা জানতেন। তবু তিনি আল-শরিফের সঙ্গে কাজ চালিয়ে গেছেন। তাঁদের দুজনের সম্পর্ক খুব দৃঢ় ছিল।

শরিফ–কুরেইকেহ দুজনই জানতেন যে ইসরায়েলের বোমায় যেকোনো সময় তাঁরা প্রাণ হারাতে পারেন। এমনকি আল-শরিফকে যাঁরা চিনতেন, তাঁদের বেশির ভাগই এ ঝুঁকির বিষয়টি তাঁদের জানা ছিল বলে স্বীকার করেন।

আল-বান্না বলেন, ‘গাজার সাংবাদিকেরা আল-শরিফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন। একসঙ্গে বাঁচব, নাহয় একসঙ্গে মরব, এই সত্যকে আমরা স্বীকার করে নিয়েছিলাম।’

মশাল হাতে নেওয়া

কাতারের দোহার আল-জাজিরা স্টুডিও থেকে তাঁদের সহকর্মী তামের আলমিশাল বলেন, মৃত্যুর আগে নিরবচ্ছিন্নভাবে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আল-শরিফ ও কুরেইকেহ দুজনই মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা নিজেদের ফোন বন্ধ করার সুযোগ বলতে গেলে পেতেনই না। কারণ, ইসরায়েল এত এত মানুষকে হত্যা করছিল যে তাঁরা প্রতিমুহূর্তে সজাগ থেকে নিজেদের মানুষদের হত্যাযজ্ঞের খবর জানাতেন।

আলমিশাল বলেন, ‘এটাকেই সাংবাদিকতা বলে। তাঁরা সাংবাদিকতার আদর্শ। আনাসের মৃত্যুর পর আমি একটি অঙ্গীকার করছি, আমরা দায়িত্বশীলতা ও পূর্ণ পেশাদারত্বের সঙ্গে তাঁদের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া অব্যাহত রাখব।’

গাজার সব সাংবাদিক এ মনোভাব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁরা একাকী ইসরায়েলের গণহত্যা খবর বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বভার বহন করে যাচ্ছেন।

৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে এবং গাজায় প্রায় ২৭০ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে হত্যা করেছে।

গাজার ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সালেহ জাফর (২৮) তাঁর সহকর্মীদের স্মৃতিকে জীবিত রাখার প্রতিজ্ঞা করছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল সংবাদমাধ্যমকে তাদের লক্ষ্যবস্তু করছে, যাতে বিশ্ব গাজায় তাদের অপরাধ বিষয়ে কিছু জানতে না পারে।

কিন্তু ইসরায়েল কোনো দিন তাঁদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিতে পারবে না বলে শপথ করে সালেহ জাফর বলেন, ‘তারা আমাদের সবাইকে নীরব করতে পারবে না। গাজায় আনাসের মতো আরও ১০ লাখ কণ্ঠ আছে, মোহাম্মদের মতো ১০ লাখ কণ্ঠ আছে। ইসরায়েলের সন্ত্রাস ও হুমকির মুখেও আমরা আমাদের কণ্ঠস্বর ও ভিডিও প্রচার অব্যাহত রাখব।’

ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাংবাদিক আনাস আল-শরীফ
ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাংবাদিক আনাস আল-শরীফ। ছবি: শরীফের এক্স থেকে নেওয়া