Saturday, October 10, 2015

উগ্রপন্থার দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ -আউটলুক ইন্ডিয়ার নিবন্ধ

সহিংসতা প্রায়ই বাংলাদেশে ঘুরে ফিরে আসে। ৭১ এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশটির জন্ম। রাজপথে দীর্ঘ দিনের আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় বর্বরতা, গণহত্যার পর দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করেছে। স্বাধীনতার আগে প্রত্যক্ষ করেছে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। এরপর পূর্বপাকিস্তানের ধংসাবশেষ থেকে উত্থাণ হয়েছে নতুন এক রাষ্ট্রের। কিন্তু সহিংসতা সেখানে থেমে থাকে নি। গত সাড়ে চার দশকে প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর মতো বাংলাদেশ তাদের দুজন প্রেসিডেন্টের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছে। এছাড়া একাধিক রাজনৈতিক নেতা আর শ’ শ’ নাগরিকের সহিংস মৃত্যুর স্বাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। তবে, দেশটিকে সফররত ও কর্মরত বিদেশীরা বহুলাংশে নিরাপদ ও অক্ষত থেকেছেন। কিন্তু সেটা এখন পাল্টে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ভারতের আউটলুক ম্যাগাজিনের সিনিয়র এডিটর প্রণয় শর্মা এক নিবন্ধে এসব কথা লিখেছেন। ‘এ রাশ অব ব্লাড, টু ফরেইনার্স আর কিলড; বাংলাদেশ ক্রিপস টুয়ার্ডস এ র‌্যাডিক্যাল ব্রিঙ্ক’ শীর্ষক ওই নিবন্ধে তিনি সম্প্রতি দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা ও খিষ্ট্রান যাজকের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, এসব হামলা বাংলাদেশী ও বাংলাদেশে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক বিদেশীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। বিদেশী দুই নাগরিক হত্যার দায় দ্রুতই স্বীকার করে আইসিস। জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর অনলাইন তৎপরতা পর্যবেক্ষনকারী মার্কিন ভিত্তিক সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপও একই কথা বলেছে। কিন্তু অনেকেই আইসিসের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দিহান। আর এ সন্দেহপ্রকাশে সবথেকে জোরালো বক্তব্য বাংলাদেশ সরকারের। তারা দায় চাপিয়েছে বিরোধী বিএনপি ও তদের জোটশরিক জামাতে ইসলামির ওপর। বিএনপি এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এসব হামলার জন্য কাকে দোষারোপ করা যায় বা হামলার সম্ভাব্য হেতু কি তা নিয়ে মানুষ নিশ্চিত না হলেও, ঢাকার আকাশে বাতাসে ষঢ়যন্ত্রের নানা মতবাদ ঘুরপাক খাচ্ছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাক চক্রবর্তী বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকারের তরফ থেকে অব্যাহত চাপের মুখে থাকা ইসলামপন্থী মৌলবাদিরা হয়তো এসব হামলার মধ্য দিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা করছে।’ এ কথা বলেই আবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি যোগ করেন, ‘তবে এটা অনুমান। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না, যেহেতু তদন্ত এখনও চলছে।’ ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের নির্মন হত্যাকা-ের কয়েকটি ঘটনায় বাংলদেশে উগ্রপন্থী দলগুলোর উত্থানের ইঙ্গিত মেলে। এরপরই দুই বিদেশী হত্যা ও খ্রিষ্টান এক যাজকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলো। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উদারমনা ভাবমূর্তি কঠিন পরীক্ষার মুখে। সবথেকে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এসব হত্যাকান্ড প্রত্যন্ত কোন গ্রামে গভীর রাতের ঘটনা নয়। বেশিরভাগ জনবহুল শহরগুলোতে জনসমক্ষে সংঘটিত হয়েছে। সাম্প্রতিক এসব হত্যাকান্ডে শুধু হামলাকারীদের দুসাহসের ওপর মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছে তা নয়, এমন ঘটনায় হস্তক্ষেপ আর বন্ধ করতে সংখ্যাগরিষ্ঠের নিরুৎসাহিতা ফুটে উঠেছে। আর রাজনৈতিক পরিসরে এসব নিয়মিত হামলার ঘটনা এমন সময় ঘটছে যখন ক্ষমতাসীন আওয়ামি লীগ কট্টরপন্থীদের ওপর কঠোর অভিযান শুরু করেছে। জামাতে ইসলামির কেন্দ্রীয় নির্বাহি কমিটির সদস্য হামিদুর রহমান বলেন, ‘সাম্প্রতিক বিদেশী নাগরিক হত্যাকান্ডে জামাতে ইসলামির কোন সম্পৃক্ততা নেই। হত্যাকা-গুলোর পরপরই জামাত সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।’ তিনি বরং জোর দিয়ে বলেন, ‘বিদেশীদের হত্যাকান্ডে আরও একবার নাগরিকদের জানমাল রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতা উন্মোচিত হয়েছে।’ মজার বিষয় হলো, বহির্বিশ্বের বিশেষজ্ঞরা এখনই আইসিসের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তবে বাংলাদেশ সরকার আর বেশিরভাগ বাংলাদেশী নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এটাকে দেখছেন প্রকৃত দোষীদের থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট বলছেন, ‘তার সরকার আইসিসের দায় স্বীকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে আর আসব দাবি সত্যি কি না তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে। মঙ্গলবার ঢাকায় বিদেশী, কুটনীতিক, জাতিসংঘ কর্মকর্তা আর অন্যান্য এজেন্সির প্রতিনিধিদের এক বৈঠকে সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে আস্বস্ত করেন। দুই বিদেশী নাগরিক হত্যায় অবধারিতভাবে বিদেশীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দর ইতিমধ্যে তাদের বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছে। উগ্রপন্থীদের প্রভাব বিস্তার হতে থাকা এ পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতেও প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে অর্থনীতিতে। সবথেকে বড় উদ্বেগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দেশে ২৫০০ কোটি ডলারের অধিক সমমূল্যের গার্মেন্ট শিল্প যা দেশটির অর্থনীতির শক্তিশালী স্তম্ভ। ইতিমধ্যে ইঙ্গিত মিলেছে, বছরের এ সময়টাতে যেসব বিদেশী ক্রেতা বাংলাদেশ সফর করে থাকেন তারা সফর বাতিল করেছেন। একইভাবে সফর বাতিল করেছেন বা অনিদৃষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দিয়েছেন অনেক পর্যটক। ক্ষমতাসীন আওয়ামি লীগ এবং তাদের বিরোধী বিএনপি ও জামাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই যখন ক্ষীপ্রগতিতে চলছে তখন ভারতের প্রতিবেশী ও বিশ্বের অন্যতম বড় মুসলিম রাষ্ট্রটি যে তীব্র মাত্রায় মৌলবাদ প্রত্যক্ষ করছে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ সামান্যই।

মেসেজ পরিষ্কার by সাজেদুল হক

জোয়ার-ভাটার এই দেশ। অতীতে বহু সংকট মোকাবিলা করেছে সাহসিকতার সঙ্গে। বিরুদ্ধ প্রকৃতির সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের লড়াই প্রশংসিত হয়েছে বারবার। মানবসৃষ্ট দুর্যোগও কম মোকাবিলা করিনি আমরা।
এই সত্য অস্বীকার করার জো নেই, বাংলাদেশ একটি সংকটময় সময় অতিক্রম করছে। যদিও এ সংকট এসেছে অনেকটা হুট করেই। সবকিছু ঠিকঠাক মতোই চলছিল। ২৮শে সেপ্টেম্বর সিজার তাভেলার দুঃখজনক হত্যাকাণ্ড ওলট-পালট করে দেয় পরিস্থিতি। এক সপ্তাহের মধ্যে জাপানি নাগরিকের হত্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর বাতিলের মতো দুঃসংবাদও আমরা পেয়েছি।
এসব হত্যাকা-ের পর পশ্চিমা দুনিয়া যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তা নিয়ে নানান আলোচনা চলছে। সর্বশেষ যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে পশ্চিমা নাগরিকদের ওপর আরও নির্বিচার হামলার শঙ্কা প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও তা যে এখনও খুব বেশি কাজে দেয়নি যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ বার্তাই তার প্রমাণ। ঢাকায় নিযুক্ত ওআইসিভুক্ত এক রাষ্ট্রদূতের বরাতে একটি সহযোগী দৈনিক দুটি বিষয়ের ওপর দৃষ্টিপাত করেছে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন বাংলাদেশে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যায় আইএস জড়িত। যদিও বাংলাদেশ সরকার সুস্পষ্ট ভাষাতেই জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশে আইএসের কোন অস্তিত্ব নেই। দ্বিতীয়ত, এসব হত্যাকা-ে বিএনপি-জামায়াতকে জড়ানোর চেষ্টা ভাল চোখে দেখছে না, পশ্চিমা কূটনীতিকদের একটি অংশ।
গত দুই সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ সরকার দুটি বিষয়ে তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে। ১. এসব হত্যাকা-ে আইএস জড়িত নয়। বাংলাদেশে আইএসের কোন অস্তিত্ব নেই। ২. বিএনপি-জামায়াতের মদতে এ হত্যাকা- হয়েছে। তবে আজই একটি সহযোগী দৈনিকে খবর বেরিয়েছে, যাত্রাবাড়ী থানায় করা একটি মামলায় {নম্বর-৪৩(১) ২০১৫} দীর্ঘ তদন্ত শেষে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক এ কে এম কামরুল আহসান গত ১৫ই মে অভিযোগপত্র জমা দেন। আদালত ইতিমধ্যে এ অভিযোগপত্র আমলে নিয়েছেন। শাফায়াতুল কবির, আনোয়ার হোসেন, মো. রবিউল ইসলাম ও নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এ চার্জশিট দেয়া হয়। ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে গোপনে অর্থ ও কর্মী সংগ্রহ, সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনার মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর হামলা করে ক্ষতিসাধন ও হুমকির সৃষ্টি, সন্ত্রাসী কর্মকা-ের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও যোগদানের অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।’ মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘গত ১৮ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানার খানবাড়ী চৌরাস্তায় মৃত মো. খানের বাড়িতে জেএমবির আঞ্চলিক সমন্বয়ক শাফায়াতুল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএসের দিকনির্দেশনা মোতাবেক সদস্য সংগ্রহের জন্য গোপনে বৈঠক করছিলেন। ওই বাসা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে আইএসআইএস-সম্পর্কিত জেহাদি প্রচারপত্র, তার ল্যাপটপে আইএস-সংক্রান্ত প্রচুর ভিডিও জব্দ করা হয়।’
দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার এতদিন পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিষ্কার করে বলেনি এসব হত্যায় কারা জড়িত। ঢাকার আকাশে নানা কথা উড়ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব হত্যার রহস্য উদঘাটনে আর বেশি সময় লাগবে না। গতকাল অন্তত তিনজন মন্ত্রী বিদেশী নাগরিক হত্যায় বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ করে বক্তব্য দিয়েছেন। গত কয়েক দিনে এ ধরনের একটি থিওরিও দাঁড় করানো হয়েছে। দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার পর প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া জামায়াত এবং ঘুমন্ত বিএনপিকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। এ আলোচনা কতদূর যায় তাই এখন দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ: ছোট আকারের হামলার হুমকি by জাস্টিন রোওল্যাট

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক দুই বিদেশী হত্যাকাণ্ডে দেখিয়েছে, ছোটখাট আকারের হামলা ভয় ছড়ানো ও দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত করতে কতটা কার্যকরী হতে পারে। ২৮ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়, ৫০ বছর বয়সী ইতালিয়ান সহায়তাকর্মী সিজার তাভেলা ঢাকার গুলশান এলাকায় রাস্তার পাশ ঘেঁষে জগিং করছিলেন। গুলশান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকা। এখানেই দূতাবাস, অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁর দেখা মিলে। মোটরসাইকেলে চেপে তিন ব্যাক্তি তাভেলাকে পেছন দিক দিয়ে খুব কাছ থেকে ৩ বার গুলি করে। গুলি করেই রাতের আঁধারে মিলিয়ে যায় খুনীরা। তাভেলা মারা যান। ৫ দিন পর, আরেক বিদেশীকে টার্গেট করা হয়। ওই ব্যাক্তির নাম কুনিও হোশি। জাপানি নাগরিক হোশি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুরে একটি কৃষি প্রকল্প পরিচালনা করতেন। রিকসায় করে যাওয়ার সময় তাকে গুলি করে হত্যা করে কয়েকজন মুখোস-পরিহিত মোটরসাইকেল আরোহী।
ব্যাপকভাবে বলা হচ্ছে যে, জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস দাবি করেছে তারা হামলা চালিয়েছে। যদিও এ দাবির সত্যতা এখনও যাচাই করা যায়নি। কিন্তু উগ্রপন্থী ইসলামী গোষ্ঠিগুলোর সাম্প্রতিক এ উত্থান মোকাবিলায় বাংলাদেশ বহুদিন ধরে লড়ছে। এ বছর নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হয় চার বাংলাদেশী ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারকে। কিন্তু সর্বশেষে দুই বিদেশীর ওপর হামলার ঘটনা বাংলাদেশের অর্থনীতির আরও অনেক বেশি ক্ষতি করতে পারে। কেননা, এবার যথেচ্ছভাবে নিশানা তাক করা হয়েছে বিদেশীদের দিকে। এর অর্থ হলো, যে-ই বাংলাদেশ ভ্রমণে যাবে, তারই টার্গেটে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিশ্চিতভাবেই, তাভেলার ওপর হামলার কয়েক ঘন্টা পরই বিদেশী দূতাবাসগুলো উচ্চ সতর্কাবস্থায় চলে যায় এবং ভ্রমণ সতর্কতা জারি করা হয়।
প্রতিবেদন রয়েছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যটকের বুকিং বাতিল করা হয়েছে। এনজিওগুলোও নিজেদের কর্মীদের চলাচলে বাধানিষেধ আরোপ করেছে। সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ গার্মেন্ট বাণিজ্যের বিদেশী ক্রেতারা ভীষণ আতঙ্কে পড়ে গেছে। অনেকেই বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছে। তবে এ সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দলের পরিকল্পিত বাংলাদেশ সফর বাতিল করার বিষয়টি।
আতঙ্ক আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল ৫ই অক্টোবর, যখন তৃতীয় হামলার খবর এল। তবে খুব সম্ভবত ওই হামলার সঙ্গে আগের ২ বিদেশীর ওপর হামলার স¤পর্ক নেই। তিন ব্যাক্তি পাবনায় এক ব্যাপ্টিস্ট পাস্তুরের গলা কেটে দেয়ার চেষ্টা চালায়। লুক সরকার নামে ওই ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান গুরুতরভাবে আহত হলেও প্রাণে বেঁচে গেছেন, তার স্ত্রী চিৎকার শুরু করায়। পুলিশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠনের এক সদস্যকে হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করেছে।
বড় ও সুপরিকল্পিত হামলার চেয়ে ছোট কমান্ডো-স্টাইলে অভিযান চালানোর যে প্রবণতা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে মিল দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের হত্যাকা- দু’টিতে। চিন্তা করুন ফরাসি বিদ্রƒপাত্মক ম্যাগাজিন চার্লি এদবো কার্যালয়ে হামলার ঘটনাটি। অথবা লন্ডনের ফুসিলিয়ের লি রিগবির হামলাটি। সারাবিশ্বের সরকারগুলোই এ ধরণের হামলা বৃদ্ধির ঘটনা দেখতে পাচ্ছে। চার্লি এদবোর ঘটনার পর, বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইফাইভ সতর্ক করে দেয় যে, ‘প্যারিস স্টাইলে’ হামলা হওয়ার অনেক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বৃটেন।
এ বিষয়টি বিশ্বজুড়ে কর্তৃপক্ষের জন্য বড় ধরণের এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরণের হামলা ঠেকানো অনেক বেশি কঠিন। কেননা, এসব হামলা চালানো খুবই সোজা। যে লোকগুলো লি রিগবিকে হামলা চালিয়েছিল, তারা বন্দুকের বদলে ছুরি ব্যবহার করেছিল। তাদের সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সরাসরি কোনো স¤পর্কও ছিল না। সবচেয়ে বড় বিষয় যেটি বাংলাদেশে দেখা গেছে তা হলো, হামলাকারীরা ‘শহীদ’ হতে চায়নি। কাজ সেরেই সোজা রাতের আঁধারে পালিয়ে গেছে। হয়তো আরও হামলা চালানোর পরিকল্পনা আঁটতে।
প্রমাণ রয়েছে, কমান্ডো স্টাইলে হামলা আরও সাধারণ হয়ে উঠছে। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, আফগানিস্তানের সংঘাতে বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান কারণ হলো, তালিবান বড় আকারে বোমা হামলা চালানো থেকে দূরে সরে এসেছে। তার পরিবর্তে তারা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বন্দুকযুদ্ধ বাঁধিয়ে হামলা চালাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকার দেশটিতে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস-এর উপস্থিতি অস্বীকার করেছে। বরং যুক্তি দেখিয়েছে যে, ওই হত্যাকা-ের সঙ্গে জঙ্গিগোষ্ঠীটির সংযোগ প্রমাণিত নয়। কিন্তু যে-ই এসবের জন্য দায়ী হয়ে থাকুক, ওই হামলাগুলো বাংলাদেশের সুনামের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ধর্ম-নিরপেক্ষ দেশ বাংলাদেশ। এ বছরের আগ পর্যন্ত জঙ্গিবাদী সহিংসতা থেকে অনেকটাই দূরে ছিল দেশটি। শঙ্কা আছে দেশটিকে এখন থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো বিবেচনা করা শুরু হবে। দেশটির বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির জন্য এর প্রভাব হবে মারাত্মক।
তবে পরিষ্কার হওয়া যাক, কমান্ডো স্টাইলের যে হামলার ঘটনা ঘটছে, তা কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এটা এমন একটি জিনিস, যা নিয়ে আমাদের সবারই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। ঝুঁকিটা হলো, বাংলাদেশে এসব ছোট আকারের হামলার কার্যকরিতা কেমন ছিল, তা পর্যবেক্ষণ করবে অনেকে। এরপর একই ধরণের হামলা ছড়িয়ে দেবে বিশ্বব্যাপী।
[লেখক: জাস্টিন রোওল্যাট সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি।]

‘মৃত্যুদণ্ড অমানবিক ও অবমাননাকর শাস্তি’

সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান পূনর্ব্যক্ত করেছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন ও কাউন্সিল অব ইউরোপ। আজ মৃত্যুদণ্ড বিরোধী ইউরোপিয়ান ও আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি ফেডেরিকা মোঘারিন ও কাউন্সিল অব ইউরোপের মহাসচিব থোরবোর্ণ জাগল্যান্ড এক যৌথ বিবৃতিতে এ কথা বলেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ড একটি অমানবিক ও অবমাননাকর শাস্তি। এতে অপরাধ নিরুৎসাহিত করার উল্লেখযোগ্য প্রভাবের কোন প্রমাণ নেই। আর এক্ষেত্রে বিচারিক ভূলত্রুটি পাল্টানোর কোন সুযোগ থাকে না।  বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইইউ সদস্যরাষ্ট্রগুলোতে ১৮ বছর ধরে কোন মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় নি। মৃত্যুদণ্ড রদ করার লক্ষ্যে ইউরোপিয় ইউনিয়নের মানবাধিকার বিষয়ক চুক্তির বিধান অনুমোদন দিতে ইইউভূক্ত রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বেলারুসে অব্যাহতভাবে মৃত্যুদন্ডের ব্যবহার নিয়ে নিন্দা জানিয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি লঘু করার জোরালো আহ্বান জানানো হয়। মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি রহিত করার লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অবিলম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয় দেশটির প্রতি। যেসব দেশগুলোতে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির বিধান রয়েছে এমন কয়েকটি দেশে গত বছর মাদক সংক্রান্ত মামলায় কয়েকটি মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কাউন্সিল অব ইউরোপ ও ইউরোপিয় ইউনিয়ন। এসব ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাগুলোতে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন তারা যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ২০১৪ সালের ১৮ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত মৃত্যুদন্ডের ব্যবহার স্থগিতকরণ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে কাউন্সির অব ইউরোপ ও ইইউ।

ফেসবুকে ‘লাইক’ দিলেও হতে পারে জেল

সামাজিক যোগাযোগের সাইট ফেসবুকে পোস্টিং-এর জন্য সম্প্রতি বাংলাদেশে বেশ কিছু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ এবং সেটা করা হয়েছে ‘৫৭ ধারার’ আওতায়৷ ব্লগারদের মতে, এটা বাকস্বাধীনতাকে খর্ব করার একটা প্রচেষ্টা মাত্র৷
গত ৩০শে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ পুলিশ ‘‘ইসলামের বিরুদ্ধে অপ্রীতিকর মন্তব্য করার দায়ে মাগুরার এক স্কুলের ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে৷ ১৫ বয়স বছরের কিশোরটি নবম শ্রেণিতে পড়ে৷ তাকে যে আইনে গ্রেপ্তার করা হয়, সেটি প্রণীত হয় ২০০৬ সালে এবং সংশোধিত হয় ২০১৩ সালে৷
সংশ্লিষ্ট আইনের এক্তিয়ারে প্রথম গ্রেপ্তারির ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালে৷ সেবছরের এপ্রিল মাসে চারজন ব্লগারকে আটক করা হয় একটি ধর্মের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচারের দায়ে৷ ইতিপূর্বে মৌলবাদীরা নাস্তিক ব্লগারদের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন করেছিল৷ সেযাবৎ একশর বেশি মানুষকে ঐ আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷
১৪ বছরের কারাদণ্ড, কিংবা জরিমানা
২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন বা আইসিটি অ্যাক্ট দুবার সংশোধন করা হয়েছে৷ এই আইনের ৫৭ ধারাটি বিশেষভাবে বিতর্কিত৷ সেই ধারা অনুযায়ী যদি কেউ ইন্টারনেটে বা ডিজিটাল উপায়ে কোনো ‘‘ভুল বা অশ্লীল লেখা প্রকাশ করে, তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে৷ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে, কিংবা রাষ্ট্র তথা কোনো ব্যক্তির ভাবমূর্তির ক্ষতি করতে পারে, কিংবা কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে, এমন সব লেখাও এই আইনের আওতায় পড়ে৷
 ব্লগাররা এই ধারার অপসারণ দাবি করে আসছেন; যেমন ২০১৩ সালে গ্রেপ্তারকৃত চারজন ব্লগারদের মধ্যে যে তিনজন আজ বিদেশে বাস করছেন৷ তাঁদের একজন, সুব্রত শুভ, আজ সুইডেনে বাস করেন৷ সুব্রত ডিডাব্লিউ-কে বলেন যে, ৫৭ ধারার কারণে আজ অনেকে ফেসবুকে পোস্ট করা বন্ধ করে দিয়েছেন; ফলে সরকারের বিরুদ্ধে আর কেউ কিছু লিখতে সাহস পাচ্ছেন না৷ ফেসবুকে একটি মামুলি ‘‘লাইক দেবার অপরাধেই সাত থেকে ১৪ বছরের কারদণ্ড কিংবা এক কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে, বলেন সুব্রত৷
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের হয়রান করার পন্থা?
রাসেল পারভেজ-ও ২০১৩ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন৷ তাঁর মতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আইনটির অপব্যবহার করা হচ্ছে৷ যেমন কিছু মানুষকেআটক করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করার দায়ে৷ গতবছর এক তরুণকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় শেখ মুজিব ও তাঁর কন্যা সম্পর্কে একটি ব্যঙ্গাত্মক গান শেয়ার করার অপরাধে৷ গতমাসে এক সাবেক মেয়রকে গ্রেপ্তার করা হয় শেখসাহেবের বিরুদ্ধে ‘‘অবমাননাকর মন্তব্য করার দায়ে৷ পারভেজ বলেন, ‘‘বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইন্টারনেটের উপর নজর রাখার জন্য বিশেষভাবে তৈরি৷ ফলে শাসকদলের সদস্যরা তাদের অপছন্দের লোকেদের বিরুদ্ধে মামলা করেন আর পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে৷
ঢাকার আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া একাধিক ব্লগারের কৌঁসুলি ছিলেন৷ আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারা বাতিল করা উচিত, বলে তিনি মনে করেন৷ বড়ুয়া জনস্বার্থে এই ধারার সাংবিধানিকতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছেন এবং ইতিবাচক ফল পাবার আশা রাখেন, বলে ডিডাব্লিউ-কে জানান৷
বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী ৫৭ ধারা বাতিল করার আহ্বান নাকচ করলেও, আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ ডয়চে ভলের ঢাকাস্থ প্রতিনিধি হারুন উর রশীদ স্বপনকে একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, সরকার ৫৭ ধারা পুনর্বিবেচনা করবেন৷ ‘‘যে সব আন্দোলনকারী এই ধারা বাকস্বাধীনতা খর্ব করছে বলে মনে করেন, আমরা তাঁদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলব, তাঁদের উদ্বেগ বোঝার চেষ্টা করব৷ তবে তিনি আশু পরিবর্তনের কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি৷
সুত্রঃ ডয়েচে ভেলে

অবশেষে গজদন্তের রানী গ্রেফতার

তাকে বলা হয় ‘গজদন্তের রানী’। তিনি হলেন ৬৬ বছর বয়সী ইয়াং ফেং গ্লান নামক একজন চাইনিজ নারী। যিনি আফ্রিকায় অবৈধ বন্যপশু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বৃহস্পতিবার কর্মকর্তারা জানান, ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ৭০০-এরও বেশি হাতির দাঁত আফ্রিকার বাহিরে পাঠাতে সহায়তা করেছেন। কিন্তু পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। বৃহস্পতিবার তানজানিয়ার রাজধানী দারুস সালামের কাছে পুলিশের একটি দল তাকে ধাওয়া করে এবং আটক করতে সক্ষম হয়। তানজানিয়ার কর্মকর্তারা বলেন, তিনি একটি নামকরা চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মালিক। খাটো ও চশমা পরিহিত তাকে দেখলে মনেই হয় না তিনি চোরাকারবারি সাম্রাজ্যের রানী। খবর এএফপি সিনহুয়ার।
কর্মকর্তারা বলেন, ইয়াং চীনা ও তানজানিয়ান প্রভাবশালীদের সহায়তায় সারা বিশ্বে হাতির দাঁত সরবারহের অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার উপার্জন করেছেন। হাতির দাঁত পাচারের ফলে তানজানিয়ার বন্যপশু সম্পদের মারাÍক ক্ষতি হয়েছে। ২০০৯-২০১৪ সালের মধ্যে বন্যহাতির সংখ্যা ১ লাখ ৯ হাজার ৫১ থেকে কমে ৪৩ হাজার ৩৩০ টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকাভিত্তিক পরিবেশ সংগঠন এলিফেন্ট অ্যাকশন লীগের পরিচালক আন্দ্রে কস্তা বলেন, ‘হাতি হত্যার মূল হোতা ইয়াং।’ প্রসঙ্গত, আফ্রিকায় চোরাকারবারিতে চীনের ভূমিকা এখন গোপন নয়। প্রত্যেক বছর চীন বিপুল পরিমাণ হাতির দাঁত ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে। ইয়াং মূলত চীনে এসব দাঁত পাচার করতেন। চীনে বিভিন্ন সংলাপের আলোচক হিসেবে সুপরিচিত ও বিখ্যাত ইয়াং তানজানিয়ার একটি আদালতে বিচারের মুখোমুখি হবেন। তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হলে হাতির দাঁত পাচার নিয়ে মানুষের ধারণাই বদলে যাবে। তদন্তে জানা যায়, ইয়াং ১৯৭০ সালে তানজানিয়ায় সোয়াহিলি ভাষার অনুবাদক হয়ে একটি চীনা দলের সঙ্গে এসেছিলেন। পরে তিনি পূর্ব আফ্রিকায় চলে যান এবং বেইজিং গ্রেট ওয়াল নামক একটি কোম্পানি গড়ে তোলেন।

আইএস বর্বরতা

জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের এই অতিকায় জল্লাদ এক বন্দির শিরশ্ছেদ করছে। এই নারকীয় দৃশ্য দেখাতে পাশে জড়ো করা হয়েছে শিশু-কিশোরদের।
শারীরিকভাবে শক্তিশালী এই জঙ্গি ৫২ কেজি পাথর বহন করার পর ‘বুলডোজার জল্লাদ’ নামে কুখ্যাতি লাভ করেছে বলে জানিয়েছে, বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া সিরীয় বালক ওমার। তবে ওই জল্লাদের নাম পরিচয় কখনও প্রকাশ করা হয়নি। আইএসের একটি ভিডিও থেকে ছবিটি শুক্রবার প্রকাশ করা হয়েছে -রয়টার্স

বাম জাগছে: সত্যি না কল্পনা? by হাসান ফেরদৌস

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কয়েক দিনের জন্য নিউইয়র্কে এসেছিলেন। মেয়েকে কলেজে ভর্তি করানোর কাজ ছিল, সেটা সেরে প্রবাসের বাঙালিদের সঙ্গে বার দুয়েক মতবিনিময়ে অংশ নিলেন। সেখানেই শুনলাম, সিপিবি এখন দুর্দান্ত অবস্থায় রয়েছে। দেশের প্রতিটি আন্দোলনের নেতৃত্বেই তারা। সুন্দরবনের কাছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে শুরু করে গণজাগরণ মঞ্চ—সর্বত্রই কমিউনিস্ট নেতৃত্ব। সে কথা শুনে আমরা কেউ কেউ ঢোঁক গিলছি, তা ঠাহর করায় সেলিম ভাই বোঝালেন: চুলায় ভাত রান্না হচ্ছে, কিন্তু এখনো পুরোপুরি সেদ্ধ হয়নি। হলেই সে খবর আপনারা জানতে পারবেন।
আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি জানালেন। বঙ্গবন্ধু নাকি একসময় সেলিম ভাইকেই সরাসরি বলেছিলেন, তোদের, অর্থাৎ কমিউনিস্টদের বুদ্ধি আছে, কিন্তু আক্কেল নেই। ‘এখন আমরা আক্কেলমন্দ হওয়ার পথে আছি।’ বললেন সেলিম ভাই।
চলতি রাজনীতি নিয়েও কিছু কথা বললেন। আওয়ামী লীগকে গণতন্ত্রের পথে আসার বুদ্ধি দিলেন, বিএনপিকে বললেন জামায়াত ছাড়ো। বামপন্থী বিভিন্ন দলকে এক হওয়ার আহ্বান জানালেন, কিন্তু এক হওয়ার ডাক প্রকাশ্যে কেন দিচ্ছেন না, সে কথার ব্যাখ্যা অবশ্য খুব স্পষ্ট হলো না। আশ্বাস দিলেন, খুব শিগগির দেশের মানুষ জেগে উঠবে, দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে। তবে আর যা-ই হোক, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের গাঁটছড়া বাঁধার সম্ভাবনা নেই।
বাম জাগরণের এ কথা কতটা সত্যি, কতটা কল্পনা, সে বিতর্কে যাব না। সেলিম ভাই ছাত্রজীবনে আমার নেতা ছিলেন, তাঁর প্রতিটি কথা হাঁ করে গিলতাম। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, তিনি কান্ডারি হয়ে এগিয়ে এসেছেন। তাঁর চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান সতীর্থরা অবশ্য সুযোগ বুঝে কেটে পড়েছেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন মন্ত্রী বাহাদুর। অনুমান করি, চাইলে তিনিও সে কোটায় ঢুকে পড়তে পারতেন।
একসময় কমিউনিস্টরা আমাদের নতুন বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ত্যাগী, আদর্শবান নেতা-কর্মীর অভাব ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর যে দেশেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দেখল করেছে, সেখানে নতুন বিশ্ব গড়ার বদলে নিজেদের পকেট ভরেছে, আর বিরোধী সবাইকে হয় গুলির সামনে পাঠিয়েছে, অথবা জেলে পুরেছে। আমি শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা বলছি না, সে দেশের কথা সবাই জানেন। চীন থেকে কিউবা, ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেন, সর্বত্র একই দৃশ্য। আর আঙুল ফুলে কলাগাছ? একসময়ের মহা বাম নিকারাগুয়ার দানিয়েল অরতেগা এখন সে দেশের নব্য ধনীদের শিরোমণি। প্রমাণের জন্য অত দূর নয়, পাশের বাড়ির বাম নেতা জ্যোতি বসুর সুযোগ্য পুত্র চন্দন বসুর আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার উদাহরণটা মনে রাখলেই চলবে। বস্তুত, ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেন—যেখানেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করেছে, দেশটা চিড়ে-ছিবড়ে খেয়ে তারপর মানুষের দাবড়ানি খেয়ে ইঁদুরের গর্তে ঢুকেছে।
ইউরোপের বাইরে লাতিন আমেরিকায় একটি শক্ত বাম হাওয়া বইছে দীর্ঘদিন থেকেই। ব্রাজিল, বলিভিয়া ও ভেনেজুয়েলায় সরকার জনগণতন্ত্রী রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্য দারিদ্র্য অবলুপ্তি ও বৈষম্য হ্রাস কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হয়তো হয়েছে, কিন্তু বিশ্বকে বদলানোর যে কথা একসময় কমিউনিস্টরা বলতেন, তা যে উবে গেছে, তা মোটেই নয়। কমিউনিস্ট শব্দটা এখন আর তেমন সম্মানজনক নয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনের রাজা-বাদশাহদের হাতের রক্ত বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্টের হাতেও লেগে রয়েছে। বিলম্বে হলেও নিজেদের পাপমুক্ত করতে পৃথিবীর অনেক দেশেই কমিউনিস্ট পার্টির বদলে গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নতুন ধাঁচের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি। বিপ্লবের বদলে তারা এখন পরিবর্তনের কথা বলে, যে পরিবর্তনের লক্ষ্য নাগরিক অধিকারের সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক অসাম্যের অবসান। কমিউনিস্টরা এই পরিবর্তনটাই চাইত, কিন্তু কোথাও তারা সেই স্বপ্ন পূরণে যোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারেনি। আশার কথা, কমিউনিস্টদের সেই স্বপ্ন পূরণে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছে এক ‘নতুন বাম’।
আমেরিকার কথা ভাবুন। লেনিন আমেরিকার কথা মাথায় রেখেই সাম্রাজ্যবাদকে ধনতন্ত্রের শেষ পর্যায় বলে চিহ্নিত করেছিলেন। সেই আমেরিকায় এখন যে লোকটি দেশের মানুষকে এক ভিন্ন ধরনের গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তিনি নিজেকে কোনো রাখঢাক ছাড়াই ‘সমাজতন্ত্রী’ হিসেবে পরিচিত করান। ভারমন্টের প্রবীণ স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এ দেশের ‘বিলিয়নিয়ার ক্লাস’-এর বিরুদ্ধে তাঁর নিজস্ব ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেছেন। এ দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ওয়ালস্ট্রিটের ধনকুবেরদের আধিপত্য ভেঙে দেওয়ার জন্য তিনি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। অসাম্যের শিকার দরিদ্র শ্রেণি এবং বৈষম্যের শিকার অবৈধ অভিবাসীদের পক্ষে জনমত গড়ার এক কঠিন লড়াইয়ে অংশ নিতে দেশের মানুষকে ডাক দিয়েছেন। আমেরিকার আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থিতার জন্য লড়াই করছেন। তিনি সেই মনোনয়ন পান অথবা না পান, তাঁর জনপ্রিয়তার কারণেই দলের প্রধান প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন নিজের এজেন্ডা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন, অসাম্য হ্রাসের পক্ষে ও অভিবাসী অধিকারের সমর্থনে নিজেকে যুক্ত করেছেন।
রাজনৈতিক কর্মসূচি ও রণকৌশলের দিক দিয়ে গ্রিসের সিরিজা পার্টি কোনো রাখঢাক ছাড়াই বামপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেছে। অথবা স্পেনে পদেমোস পার্টি তাত্ত্বিক শুদ্ধতার কথা ভেবে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তবর্তী মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সিরিজার প্রধান এলেক্সি সিপরাস ও পদেমোসের প্রধান পাবলো ইগ্লেশিয়াস একসময় যাঁর যাঁর দেশের যুব কমিউনিস্ট লিগের সদস্য ছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ব্যয় সংকোচন’ নীতির চাপে চিড়ে-চ্যাপটা হয়ে আসা প্রান্তবর্তী মানুষের সংখ্যা এ দুই দেশে ক্রমেই বাড়ছে। তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে সরকারি খাত সংকোচনের বদলে তা সম্প্রসারণের পক্ষে তাঁরা। তাঁরা উভয়েই সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমার পক্ষে, সবার ওপর সম্পত্তি কর আরোপের বদলে শুধু ধনিক শ্রেণি, বিশেষত যাঁদের একাধিক বাড়ি আছে, তাঁদের ওপর ধার্য করার নীতি তাঁরা প্রস্তাব করেছেন। এই নীতিকে যদি কেউ কমিউনিস্ট বলে, তাতে ক্ষতি নেই। চীনা নেতা দেং শিয়াও পিংই তো বলেছিলেন, বিড়ালটা কালো না সাদা সেটা বড় প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হলো তা ইঁদুর ধরতে পারে কি না।
সবচেয়ে বিস্ময়কর খবর এসেছে আমেরিকার ‘ছোট ভাই’ ব্রিটেন থেকে। সেখানে প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন জেরেমি করবিন। তিনি এ দলের সবচেয়ে পরিচিত, সবচেয়ে পরীক্ষিত বাম নেতা। সিরিজা ও পদেমোসের মতো তিনিও সরকারি খাতের সম্প্রসারণ চান, অভাবীদের জন্য ‘সামাজিক নিরাপত্তা জাল’ বাড়াতে চান এবং চলতি রক্ষণশীল সরকারের ‘ব্যয় সংকোচন’ নীতি আমূল বদলে দিতে চান। এমনকি তিনি ব্রিটেনের প্রধান শিল্পসমূহের রাষ্ট্রীয়করণ ও আণবিক অস্ত্রভান্ডার পুরোপুরি বাতিল করতে চান। এর চেয়ে অধিক বামপন্থী—কারও কারও ভাষ্যে কমিউনিস্ট—কর্মসূচি আর কী হতে পারে? আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালেও বামপন্থীরা জনমত জরিপে এগিয়ে।
ইউরোপের বাইরে লাতিন আমেরিকায় একটি শক্ত বাম হাওয়া বইছে দীর্ঘদিন থেকেই। ব্রাজিল, বলিভিয়া ও ভেনেজুয়েলায় সরকার জনগণতন্ত্রী রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্য দারিদ্র্য অবলুপ্তি ও বৈষম্য হ্রাস। তবে এ কথাও যোগ করা ভালো, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে এসব দেশে একনায়কতন্ত্রী একটি লক্ষণ ফুটে উঠছে। বাড়ির পাশে পশ্চিম বাংলায় বামপন্থীদের পতনের সেটি ছিল অন্যতম কারণ।
বামপন্থীদের এই উত্থান, যা মোটেই কল্পনা নয়, তাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? আসলে তথাকথিত বিশ্বায়নের চাপে সর্বত্রই ক্ষমতার মেরুকরণ ঘটছে। প্রতিটি দেশেই মাত্র ১-২ শতাংশ মানুষের হাতে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদই নয়, সব রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। অক্সফামের হিসাব অনুসারে, ২০১৬ সালের মধ্যে বিশ্বের সব সম্পদের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করবে এই ১ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্বের ৮০ শতাংশ মানুষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পদ। বাংলাদেশের চিত্র যে এ থেকে ভিন্ন নয়, সে কথা আমাদের চেয়ে ভালো আর কে জানে?
এই পাহাড়সমান অসাম্যের কারণেই একসময় ফ্রান্সে বিপ্লব হয়েছিল। বিপ্লব হয়েছিল রাশিয়ায় ও চীনে। তথাকথিত মূলধারার দলসমূহ—যেমন: আমেরিকার রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টি, ব্রিটেনের লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টি বা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—তারা বরাবরই ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেছে, ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের পকেট ভারী করেছে। এই অবস্থায় অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশের পক্ষে যারা, অবাক কী, দেশের মানুষ তাদের দিকেই ঝুঁকবে।
সেলিম ভাই ভাত সেদ্ধ হওয়ার যে উপমাটি ব্যবহার করেছেন, এই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা মাথায় রাখলে তার অর্থ পরিষ্কার হয়। দেশের মানুষ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা ও ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে রণকৌশল। সিরিজা ও পদেমোসের সাফল্যের সেটিই কারণ। তারা উভয়েই নিজেদের কর্মসূচির সপক্ষে রাজনৈতিক জোট গড়তে সক্ষম হয়েছে।
নিজের শত্রু-মিত্র সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তেমন ইস্যুভিত্তিক কোয়ালিশন বাংলাদেশের বামেরাই বা পারবে না কেন? ভাত যদি সেদ্ধ হতে হয়, তাহলে চুলায় হাঁড়ি বসানোর আগে এই জোগাড়যন্ত্রটুকু অত্যন্ত জরুরি। তবে এর জন্য যে আক্কেল দরকার, সন্দেহ হয়, আমাদের কমিউনিস্টদের তা এখনো হয়নি।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

আইএস বিভ্রান্তি কাটছে না by মো. আসাদুজ্জামান

‘বিরাজমান গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থাকে উৎখাত করে খিলাফত রাষ্ট্র গঠনের’ লক্ষ্যে তৎপরতা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগ এনে সিরিয়া-ইরাকভিত্তিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ‘আইএসের সমন্বয়ক’ শাফায়াতুল কবীরসহ সংগঠনের চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
যাত্রাবাড়ী থানায় করা একটি মামলায় {নম্বর-৪৩(১) ২০১৫} দীর্ঘ তদন্ত শেষে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক এ কে এম কামরুল আহসান গত ১৫ মে এই অভিযোগপত্র জমা দেন। আদালত ইতিমধ্যে এই অভিযোগপত্র আমলে নিয়েছেন। বাকি তিন আসামি হলেন আনোয়ার হোসেন, মো. রবিউল ইসলাম ও নজরুল ইসলাম। আসামিরা সবাই কারাগারে আছেন।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ জব্দকৃত আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে যে, উল্লিখিত আসামিরা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সক্রিয় সদস্য। এক নম্বর আসামি শাফায়াতুল জেএমবির আঞ্চলিক সমন্বয়ক। সে পাকিস্তান হতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে জেএমবির পাশাপাশি আইএসআইএস-এর সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছে। তারা জেএমবি ও আইএসআইএসের মতাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে পরস্পর যোগসাজশে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গোপনে বিভিন্ন ভিডিও প্রদর্শন ও জিহাদি লিফলেট বিতরণ করেছে।’
দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে গোপনে অর্থ ও কর্মী সংগ্রহ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর হামলা করে ক্ষতিসাধন ও হুমকির সৃষ্টি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও যোগদানের অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।’
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৮ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানার খানবাড়ী চৌরাস্তায় মৃত মো. খানের বাড়িতে জেএমবির আঞ্চলিক সমন্বয়ক শাফায়াতুল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএসআইএসের দিকনির্দেশনা মোতাবেক সদস্য সংগ্রহের জন্য গোপনে বৈঠক করছিলেন। ওই বাসা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে আইএসআইএস-সম্পর্কিত জিহাদি প্রচারপত্র, তাঁর ল্যাপটপে আইএসআইএস-সংক্রান্ত প্রচুর ভিডিও জব্দ করা হয়।
* এক মামলায় আইএস ‘সমন্বয়ক’ ও ‘সক্রিয় সদস্য’ হিসেবে চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
* আরেক মামলার আসামিকে বলা হয়েছে আইএসের সমন্বয়ক
মামলাটি ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। অভিযোগ গঠনের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। গত ১৮ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানায় মামলাটি করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক মো. নজরুল ইসলাম।
অবশ্য এর আগে-পরে বিভিন্ন সময়ে পুলিশ বিভিন্ন ব্যক্তিকে আইএসে যুক্ত থাকার অভিযোগে বা আইএস সন্দেহে গ্রেপ্তার করেছিল, যা তখন সংবাদ ব্রিফিং করে ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল।
সম্প্রতি ঢাকায় ও রংপুরে দুই বিদেশি নাগরিক খুন হওয়া এবং তার পরপর আইএসআইএসের কথিত দায় স্বীকারের পর এ দেশে আইএসের অস্তিত্ব আছে কি না, এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে এ দেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই।
অথচ পাঁচ মাস আগে দেওয়া যাত্রাবাড়ী থানার ওই মামলার অভিযোগপত্রে পুলিশই বলেছে, আসামিরা আইএসে জড়িত তা তদন্তে প্রমাণ মিলেছে। এই অবস্থায় আইএসের অস্তিত্ব নিয়ে পুলিশের বক্তব্য কি—তা জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুনতাসীরুল ইসলাম গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভিযোগপত্রে আদৌ আসামিদের আইএসের সদস্য লেখা হয়েছে কি না, তা গণমাধ্যমে সঠিকভাবে, নির্ভুলভাবে উপস্থাপনের স্বার্থে আমার দেখে মন্তব্য করা প্রয়োজন। এ জন্য আমাকে জানতে হবে, পড়তে হবে।’
আর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (ডিবির পরিদর্শক) এ কে এম কামরুল আহসান বলেন, ‘পুরো ঘটনা আমার মনে নেই।’
আরও মামলা: গত মে মাসে আমিনুল ইসলাম বেগ, সাকিব বিন কামাল, ফিদা মুনতাসীর যাকের ও আবদুল্লাহ আল গালিব নামে চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন ডিবির পরিদর্শক মো. শাহাদত হোসেন খান। মামলার এজাহারে বলা হয়, ২৪ মে উত্তরা পশ্চিম মডেল থানার ১৪ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডের একটি বাসা থেকে আমিনুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন আমিনুল পুলিশকে জানান যে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে আইএসের বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে উত্তরার বাসায় বসে প্রশিক্ষণ দেন তিনি। তাঁর সঙ্গে লালমাটিয়ার সাকিব বিন কামাল, আতিক সরকার, সিফাত, আবদুল্লাহ, জাবেদ কায়সারসহ ১৫-২০ জন সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করে থাকেন।
পরে আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক মনির হোসেন মোল্লা আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার জন্য আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, আইএসের সমন্বয়ক হিসেবে সাকিব বিন কামাল দায়িত্ব পালন করছেন। আসামিরা (সাকিব ও আমিনুল) দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কর্মী সংগ্রহ করে আইএস সম্পর্কে ধারণা দিয়ে তাঁদের তুরস্কে পাঠান।
আসামিদের আইএস সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা মনির হোসেন মোল্লা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসামিদের একাধিকবার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। যা পেয়েছি তা আদালতকে প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানিয়েছি।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইএস আছে কি নেই, এ নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য আমরা দেখছি। একদিকে পুলিশ অভিযোগপত্র দিচ্ছে, আবার বলা হচ্ছে আইএস নাই। এটা বিভ্রান্তিকর। এটা কেবল আমাদের বিভ্রান্তিতে ফেলছে না, যাঁরা বিদেশি আছেন, তাঁদেরও বিভ্রান্ত করছে।’

অর্থনীতির জন্য নতুন বিপদ সংকেত by মিজান চৌধুরী

৬ দিনের ব্যবধানে সম্প্রতি দু’জন বিদেশী নাগরিক দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় সরকারের ওপর নানামুখী চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ ও দাতা সংস্থাগুলো বিষয়টি নিয়ে তাদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছে। কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের চলাফেরার ওপর সতর্কতা জারি করেছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হু গো সোয়ারে ৩ অক্টোবর তার পূর্বনির্ধারিত ঢাকা সফর বাতিল করেছেন। গার্মেন্টের বায়ার্স ফোরামের বৈঠকও বাতিল হয়েছে। বাতিল হয়েছে আলোচিত অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিমের বাংলাদেশ সফরও। বিদেশী অনেক পর্যটক এখানে তাদের সফরসূচি স্থগিত করেছেন। এর মধ্যে একের পর এক গ্রেনেড, বোমা ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ধরা পড়ার ঘটনাও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাত্রাকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব ইস্যুতে মহল বিশেষ বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
এদিকে যখন এ অবস্থা তখন অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, উদ্বেগজনক এ পরিস্থিতি সরকারকে দ্রুত শক্ত হাতে মোকাবেলা ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে শতভাগ আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু এমন প্রত্যাশা সহসা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে বহির্বিশ্বে সরকারের ইমেজ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নানামুখী প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে বাধার মুখে পড়বে বিদেশী বিনিয়োগ ও রফতানি প্রবাহ। পাশাপাশি ঢাকায় আসন্ন দাতা সংস্থাদের ‘উন্নয়ন ফোরাম’র বৈঠক করা নিয়েও নানা সংশয় ও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। আর মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণকারী সংস্থার (এপিজি) কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে বাংলাদেশকে। এ সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দলের আগামী সপ্তাহে ঢাকা সফরের কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, আমাদের রফতানি খাতের অবস্থা মোটেও সন্তোষজনক নয়। বিদেশী ক্রেতারা চায় নিরাপত্তা। তারা এ দেশে না এলে অবশ্যই সমস্যা হবে। তিনি আরও বলেন, বিদেশী বিনিয়োগের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। কিন্তু এর মধ্যে এসব বিষয় চলতে থাকলে নির্ঘাত বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নিরৎসাহিত হবেন। আর সে রকম পরিস্থিতিতে দেশী বিনিয়োগকারীদের অনেকে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করতে চাইবেন না। সব কিছু মিলে এটি অর্থনীতির জন্য শুভ কিছু নয়।
জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় নিরাপত্তার ইস্যুতে বিদেশী ক্রেতারা বাংলাদেশে সফর বাতিল করেছেন। ইতিমধ্যে পোশাক খাতের ক্রেতাদের সংগঠন বায়ারস ফোরামের বৈঠকও বাতিল হয়েছে। ৫ অক্টোবর পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ নেতাদের সঙ্গে এ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। ২৮ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা ইস্যুতে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিম প্রথম বাংলাদেশ সফর স্থগিত করে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার মহিলা ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফরও স্থগিত করে। ১৫ অক্টোবর ঢাকা সফরে আসার কথা ছিল এ দলটির।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রফতানিকারক অ্যসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা একটি ইমেজ সংকটে পড়েছি। এ মাসে বিদেশী অনেক ক্রেতার বৈঠক ও কারখানা পরিদর্শনের নির্ধারিত সময় ছিল। ক্রয়াদেশ দেয়ার মাসও বলা চলে। কিন্তু দু’জন বিদেশী নাগরিক খুনের ঘটনায় ক্রেতাদের সফরসূচি কিছুটা ওলটপালট হয়ে গেছে।’ তিনি নিজের গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘আমার একজন ক্রেতার ৫ অক্টোবর কারখানা পরিদর্শনে আসার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি তিনি বাতিল না করলেও অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে স্থানান্তর করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিগত আড়াই বছরের দুটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা শেষ হয়ে মাত্র ৫ মাস অতিক্রম হয়েছে। এরমধ্যে যখন আমরা একটু দাঁড়াতে চেষ্টা করছি, তখন দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একটু বিপাকে ফেলে দিয়েছে। তবে আশা করি এটি অতিক্রম করতে পারব।’
বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মহাসচিব এএইচএম রেজাউল কবির উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, এ ঘটনা দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও রফতানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় পোশাক খাতের অর্ডার পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যাওয়ার পথকে সুগম করবে। পাশাপাশি সামগ্রিক রফতানির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর বাস্তবে যদি তাই হয়, তাহলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভার্বমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হতে পারে। কিন্তু এমনটি কারও কাছে কাম্য নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সম্প্রতি দু’জন বিদেশী নাগরিক খুন হয়েছেন। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঘটনাটি দুঃখজনক। কিন্তু এর জন্য অর্থনীতিতে দ্রুত কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে তিনি মনে করেন না। তবে সরকারকে দ্রুত অনুসন্ধান করে প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন কিছুদিন অপেক্ষা করে দেখতে হবে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব পড়ে কিনা। তবে তার বিশ্বাস, সরকার যদি আইনশৃংখলা পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি করতে পারে তাহলে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে আসবে। যেসব বিদেশী নাগরিক ঢাকা সফর স্থগিত কিংবা বাতিল করেছেন তারা পুনরায় সফরসূচি ঠিক করে চলে আসবেন।
এদিকে বাংলাদেশের সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণে কতটুকু কাজ করেছে তা পর্যবেক্ষণে ১২ অক্টোবর এপিজির একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসছে। কিন্তু তাদের সফরে আসার আগেই বিদেশী দু’জন নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সরকারকে কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত যদি এটাই প্রতীয়মান হয় যে, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে জঙ্গিগোষ্ঠীর হাত রয়েছে তাহলে এ বৈঠকে বাংলাদেশকে যেমন কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে, তেমনি এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিচে নেমে যেতে পারে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এ প্রতিনিধি দলের কাছে যদি মনে হয়, বাংলাদেশে জঙ্গি অর্থায়ন অব্যাহত আছে বা বেড়ে গেছে এবং এ কাজে মানি লন্ডারিং হচ্ছে, তাহলে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশকে ‘ধূসর’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। আর সত্যিই যদি এ তালিকায় চলে যায় তবে এখানে বিদেশী বিনিয়োগ, বিদেশীদের সঙ্গে যৌথ ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে বাংলাদেশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এপিজি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে এসে পুরনো হিসাব-নিকাশ মেলানোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক বিষয়গুলোর প্রশ্ন তুলবে। কেননা দুই বিদেশী খুন এবং চট্টগ্রামে গ্রেনেডসহ জেএমবির একটি গ্রুপকে আটক করার ঘটনাগুলো তাদের আসার পূর্বমুহূর্তে ঘটেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে যুগান্তরকে বলেন, সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার কারণ বের না হওয়া পর্যন্ত এখানে সন্ত্রাসে অর্থায়ন হওয়ার বিষয়টি বলা যাবে না। তিনি জানান, এপিজি প্রতিনিধি দল আসবে। আমাদের প্রস্তুতিও ভালো। তারা ইতিপূর্বে যেসব প্রশ্ন জানতে চেয়েছে, আমরা সেগুলোর উত্তর দাখিল করেছি। নতুন করে খুব বেশি শংকার কারণ নেই।
এদিকে আগামী মাসে শুরু হচ্ছে দাতাদের সম্মেলন উন্নয়ন ফোরামের বৈঠক। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানেত্তি ডিক্সন এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়ানচাই জাংসহ ৩৬টি দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা ওই বৈঠকে অংশ নেয়ার কথা। তবে নিরাপত্তাজনিত ইস্যুতে এ বৈঠক নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দাতাসংস্থার প্রতিনিধিদের দেশে নিয়ে আসা, বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়াসহ সব ধরনের নিরাপত্তার প্রস্তুতি সরকার নিয়েছে। কারণ দাতা সংস্থার এ বৈঠক কোনো কারণে বানচাল হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। এ প্রসঙ্গে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মহাসচিব যুগান্তরকে বলেন, ‘বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে এমসিসিআই চিন্তিত। আমরা আশা করছি, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে।’ তবে তিনি মনে করেন, এ দুটি ঘটনায় অর্থনীতির ওপর দ্রুত প্রভাব পড়বে না। কিন্তু এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এর বিরূপ প্রভাব অবশ্যই পড়বে।’
২৮ সেপ্টেম্বর গুলশান কূটনীতিকপাড়ায় ইতালির নাগরিক সিজারি তাভেল্লাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে। ৩ অক্টোবর আরেক ঘটনায় রংপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি।

অস্ত্র ব্যবসা : কার বাড়ছে কার কমছে by আসিফ হাসান

অনেক দিক দিয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য কমছে। তবে বিশ্বজুড়ে অস্ত্র রফতানিতে দেশটির শীর্ষস্থান অব্যাহত রয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশটির ২০০৫-২০০৯ থেকে ২০১০-২০১৪ মেয়াদে প্রচলিত অস্ত্র রফতানি ১৫ শতাংশ বেড়েছে। সিপরির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫-২০০৯ থেকে ২০১০-২০১৪ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অস্ত্র রফতানি বেড়েছে ২৩ শতাংশ। ২০১০-১৪ সময়কালে আন্তর্জাতিক অস্ত্র রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল ৩১ শতাংশ, আর রাশিয়ার ২৭ শতাংশ। ২০০৫-২০০৯ থেকে ২০১০-২০১৪ সময়কালে রাশিয়ার অস্ত্র রফতানি বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। একই সময়ে চীনের প্রধান অস্ত্র রফতানি বেড়েছে ১৪৩ শতাংশ, এর ফলে ২০১০-১৪ সময়কালৈ দেশটি তৃতীয় বৃহত্তম রফতানিকারকে পরিণত হয়েছে। অবশ্য দেশটি এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে।
চীনা অস্ত্রের প্রধান তিন আমদানিকারক হচ্ছে পাকিস্তান (৪১%), বাংলাদেশ (১৬%) ও মিয়ানমার (১২%)। চীন ১৮টি আফ্রিকান দেশেও রফতানি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র রফতানি বাড়ার কারণও ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সিপরির অস্ত্র ও সামরিক ব্যয়বিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক ড. আউডি ফ্লর‌্যান্ট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ দিন ধরেই অস্ত্র রফতানিকে প্রধান পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তা হাতিয়ার বিবেচনা করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সামরিক ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র শিল্পের উৎপাদন বজায় রাখতে সহায়তার জন্য রফতানি ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ানোর দরকার দেখা দিয়েছে।’
কারা কিনছে অস্ত্র
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক। দেশটি পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এ খাতে নিজস্ব উৎপাদন শোচনীয় পর্যায়ে।
বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক হিসেবে বৈশ্বিক পর্যায়ে ভারত অব্যাহতভাবে লজ্জাজনক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, সেইসাথে দেশটিকে কৌশলগতভাবে অরক্ষিতও করে রেখেছে। সম্প্রতি বৈশ্বিক থিঙ্কট্যাংক স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) জানিয়েছে, দুই প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তান এবং সেইসাথে তেল-সমৃদ্ধ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের চেয়ে ভারত এখন তিন গুণ বেশি অস্ত্র আমদানি করে।
আন্তর্জাতিক অস্ত্র হস্তান্তরবিষয়ক স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ‘২০১০-১৪ সময়কালে ভারত বিশ্বের মোট অস্ত্র রফতানির ১৫ শতাংশ আমদানি করেছে। ২০০৫-০৯ এবং ২০১০-২০১৪ সময়কালে ভারতের অস্ত্র আমদানি বেড়েছে ১৪০ শতাংম। ২০০৫-২০০৯ সময়কালে ভারতের অস্ত্র আমদানি ছিল চীনের ২৩ শতাংশ কম এবং পাকিস্তানের দ্বিগুণের বেশি।’
ভারতের সামরিক হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের ৬৫ ভাগই আমদানি করা। গত পাঁচ বছরে ভারত বিদেশী অস্ত্র কোম্পানিগুলোকে সরাসরি ১,০৩,৫৩৬ কোটি রুপি (১৬.৭২ বিলিয়ন ডলার) প্রদান করেছে। আর একই সময় রফতানি করেছে মাত্র ২,৬৪৪ কোটি রুপির (৪২৬ মিলিয়ন ডলার) অস্ত্র।
গত ১৫ বছরে ভারতের অস্ত্র আমাদনিতে ব্যয় ১২০ বিলিয়ন ডলার। আগামী দশকে তাদের ব্যয় হবে আরো ১২০ বিলিয়ন ডলার। মোদি সরকার গত ১০ মাস ধরে গলা ফাটিয়ে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগান দিতে থাকলেও কাজের কাজ এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি।
সিপরির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাশিয়া ও ইসরাইল উভয়ের জন্যই ভারত বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক। ভারতের প্রধান তিন আমদানিকারক হচ্ছে রাশিয়া (৭০%), যুক্তরাষ্ট্র (১২%) ও ইসরাইল (৭%)। তবে সরকারি চিত্র দেখা যাচ্ছে, গত তিন বছরে প্রতিরক্ষা সরবরাহের দিক থেকে রাশিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া থেকে ২৫,৪৪৮ কোটি রুপির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হয়েছে ৩২,৬১৫ কোটি রুপির অস্ত্র।
বাড়ছে এশিয়ারও
২০১০-১৪ মেয়াদে প্রধান অস্ত্র আমদানিতে শীর্ষস্থানীয় ১০টি দেশের মধ্যে পাঁচটিই এশিয়ার : ভারত (বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানির ১৫ শতাংশ), চীন (৫ শতাংশ), পাকিস্তান (৪ শতাংশ), দক্ষিণ কোরিয়া (৩ শতাংশ) ও সিঙ্গাপুর (৩ শতাংশ)। এই পাঁচটি দেশ বিশ্বজুড়ে মোট অস্ত্রের ৩০ শতাংশ আমদানি করে। এশিয়ার ৩৪ শতাংশ অস্ত্র আমদানি করে ভারত, যা চীনের মোট আমদানির তিন গুণ। ২০০৫-২০০৯ ও ২০১০-১৪ মেয়াদে চীনের আমদানি ৪২ শতাংশ কমেছে। সিপরির অস্ত্র ও সামরিক ব্যয়বিষয়ক কর্মসূচির সিনিয়র গবেষক পিটার ওয়েজম্যানের মতে অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ধারণাপ্রসূত হুমকির কারণে এশিয়ার দেশগুলো অস্ত্র আমদানি বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, এশিয়ার দেশগুলো সাধারণভাবে আমদানি করা অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল এবং অদূর ভবিষ্যতেও তারা তা-ই থাকবে।
জিসিসিও পিছিয়ে নেই
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোতে ২০০৫-২০০৯ থেকে ২০১০-১৪ মেয়াদে অস্ত্র আমদানি ৭১ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০-১৪ সময়কালে মধ্যপ্রাচ্য আমদানি করেছে ৫৪ শতাংশ অস্ত্র। ২০০৫-২০০৯ সময়কালের তুলনায় ২০১০-১৪ সময়কালে সৌদি আরবের অস্ত্র আমদানি চারগুণ বাড়ায় তারা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারকে পরিণত হয়েছে।
সিপরির অস্ত্র ও সামরিক ব্যয়বিষয়ক কর্মসূচির সিনিয়র গবেষক পিটার ওয়েজম্যান বলেছেন, প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে অস্ত্র আমদানির মাধ্যমে জিসিসি দেশগুলো তাদের সামরিক বাহিনী সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করছে। জিসিসি এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যভুক্ত মিসর, ইরাক, ইসরাইল ও তুরস্ক আগামী বছরগুলোতে তাদের অস্ত্র আমদানি বাড়াতে যাচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা
২০০৫-২০০৯ থেকে ২০১০-২০১৪ সময়কালে ইউরোপের অস্ত্র আমদানি ৩৬ শতাংশ কমেছে। তবে ইউক্রেন ও রাশিয়ার ঘটনার কারণে এই প্রবণতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। রাশিয়া সীমান্তের বেশ কয়েকটি দেশ তাদের অস্ত্র আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০০৫-২০০৯ থেকে ২০১০-২০১৪ সময়কালে জার্মানির অস্ত্র রফতানি ৪৩ শতাংশ কমেছে। তবে তারা ২০১৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বেশ কিছু আমদানির চাহিদাপত্র পেয়েছে।
২০০৫-২০০৯ থেকে ২০১০-২০১৪ সময়কালে আজারবাইজানের অস্ত্র আমদানি বেড়েছে ২৪৯ শতাংশ।
একই সময়কালে আফ্রিকার আমদানি ৪৫ ভাগ বেড়েছে। এ সময় আফ্রিকার বৃহত্তম আমদানিকারক ছিল আলজেরিয়া। এরপর ছিল মরক্কো, এই দেশটির আমদানি বেড়েছে ১১ গুণ।
আইএসআইএসের মোকাবিলার জন্য ইরাক ২০১৪ সালে ইরান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিভিন্ন উৎস থেকে অস্ত্র আমদানি করেছে।
২০১০-১৪ সময়কালে ব্যালাস্টিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের সরবরাহ ও অর্ডার উভয়টাই বেড়েছে, বিশেষ করে জিসিসি ও উত্তর পূর্ব এশিয়ায়।

আতঙ্কে বিদেশীরা

রেস্তরাঁগুলো ফাঁকা। অতিথিদের আলাপচারিতায় মুখর চিরাচরিত হোটেলের লবিগুলো নীরব হয়ে গেছে। উঁচু দেয়ালবেষ্টিত দূতাবাস প্রাঙ্গণগুলোতে নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে আরও কঠোরভাবে। সম্প্রতি বাংলাদেশে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন বিদেশী পর্যটক আর অভিবাসীরা। দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মনিরপেক্ষ দেশটিতে উগ্রপন্থিরা শক্ত অবস্থান অর্জন করছে কিনা আর বিদেশীরা নিরাপদ কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বার্তা সংস্থা এপি’র এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। ‘এক্সপ্যাটস স্পুক্‌ড আফটার টু ফরেইনার্স গানড ডাউন ইন বাংলাদেশ’- শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একজন ইতালিয়ান ও একজন জাপানিজ নাগরিক- উভয় হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে। তারা বরং দোষারোপ করছে বিরোধীদের। তাদের অভিযোগ দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার ষড়যন্ত্রে সমর্থন রয়েছে বিরোধীদের। এমন অভিযোগ বিরোধীরা  প্রত্যাখ্যান করেছে। নিরাপত্তায় আস্থা কমে গেলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দেশটির অর্থনীতি অনেকাংশে বিদেশী সহায়তা এবং বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। ইতিমধ্যে হোটেল আর বিদেশী সম্প্রদায়ের জন্য খাদ্য সরবরাহকারী দোকানগুলো লোকসান দেখা শুরু করেছে। ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলের ব্যবস্থাপক বলেন, ‘এসব হত্যাকাণ্ড আমাদের ব্যবসায় প্রভাব ফেলছে। আমাদের কিছু বুকিং বাতিল করতে হয়েছে।’ ব্যবসায় আরও ক্ষতি হতে পারে সে আশঙ্কায় নিজের পরিচয় ও হোটেলের নাম গোপন রাখার অনুরোধ করেন তিনি। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে আরেকটি হোটেলে ব্যবস্থাপক জানান, তারা নিরাপত্তা কর্মী এবং ভিডিও নজরদারি বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোন সন্দেহমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, আমাদের নিরাপত্তা কর্মীরা হোটেলে বাইরে সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করছেন।’ গত সপ্তাহে একই রকম কায়দায় ইতালির নাগরিক সিজার তাভেলা ও জাপানের কুনিয়ো হোশিকে হত্যা করা হয়। হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে চলে যায়। দরিদ্রদের সহায়তার লক্ষ্যে কাজ করা কৃষি প্রকল্পে নিয়োজিত দুই বিদেশীকে টার্গেট করে হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশে অনেকে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। বাংলাদেশে বসবাসরত ২ লাখ ২৪ হাজার বিদেশী নাগরিকের বেশির ভাগই দূতাবাস, সহায়তা সংস্থা বা আন্তর্জাতিক পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেন। এসব পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ২৫০০ কোটি সমমূল্যের গার্মেন্ট শিল্পের অংশ। আর এ শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি স্তম্ভ। যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও স্পেনসহ কয়েকটি দেশ তাদের দূতাবাস কর্মীদের জনবহুল এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। এছাড়া চলাফেরার ক্ষেত্রে তাদের গাড়ি ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ সপ্তাহে বার্তা সংস্থা এপি ১২ জন বিদেশী নাগরিকের কাছে মন্তব্য চেয়েছিল। কিন্তু প্রত্যেকেই তাদের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ এড়াতে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বাংলাদেশী একজন ব্যবসা পরামর্শদাতা শোয়েব আজিব বলেন, তার জাপানি স্ত্রী জাপান থেকে ফেরার বিষয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে। আর জাপানি নানা প্রতিষ্ঠানসহ তার অনেক বিদেশী মক্কেল বাংলাদেশে পূর্ব-পরিকল্পিত সফরসূচি পিছিয়ে দিয়েছেন। মি. শোয়েব জানান, তাদের এখানে কারখানা রয়েছে। কিন্তু তারা অপেক্ষা করছেন আর সময়সূচি পাল্টাচ্ছেন। মেডিক্যাল সরঞ্জাম আমদানিকারক নূর মোহাম্মদ কাজের সুবাদে প্রায়ই বিদেশি ক্লাবগুলোতে যাতায়াত করেন। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন দূতাবাসের আমেরিকান ক্লাব। মি. নূর জানান, ‘সন্ধ্যার আগেই বিদেশীরা ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। কাজেই তাদের কাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে আগে ভাগে।’
সরকারের দাবি পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কূটনীতিকদের আশ্বস্ত করতে সরকার কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছেন। আরও জোরালো নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতির ওপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সুনাম প্রতিষ্ঠা করেছে। তার সরকার কট্টরপন্থি ছয়টি জঙ্গি গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করেছে। আর পুলিশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্তেহভাজক কয়েক ডজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। সরকার ধর্মনিরপেক্ষ আর ঐতিহ্যগতভাবে উদারপন্থি হলেও, ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর আবির্ভাবে উদারমনা আর উগ্রমনাদের মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক অস্থীতিশীলতায় তা অবদান রেখেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট এ সপ্তাহে বলেছেন, সরকারের আশ্বাসের পর দূতাবাস কর্মীরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বোধ করছেন। তিনি সন্ত্রাসবাদ নিয়ে হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রশংসা করেন। বাংলাদেশ সম্প্রতি উগ্রপন্থি ইসলামের উত্থান নিয়ে লড়াই করছে। এ বছর কমপক্ষে ৪ জন ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্টকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিষিদ্ধঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে সম্পৃক্ত দলগুলো এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে। এ সপ্তাহে একজন খ্রীষ্টান যাজক ছুরিকাঘাতের পর অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন। এ হামলাকেও উগ্রপন্থি জঙ্গিদের হামলা বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
ইসলামপন্থি উগ্রপন্থার লালনভূমি হওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের নেই। দেশটির অর্থনীতি গার্মেন্ট শিল্পের ওপর নির্ভরশীল যা আন্তর্জাতিক ক্লোদিং ব্র্যান্ডগুলোকে পণ্য সরবরাহ করে। অল্প অবকাঠামো আর সীমিত সম্পদের কারণে অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে দেশটিকে বেগ পেতে হয়েছে। ঢাকা ভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’-এর গবেষণা পরিচালক ফাহমিদা খাতুন স্থানীয় একটি ইংরেজি পত্রিকায় লেখা মতামত কলামে বলেন, বিদেশীদের হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে নিয়ে যাবে। কেননা, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভাবমূর্তি একটি গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গত বছরে শেখ হাসিনা বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন জাপান, চীন ও ভারতের সঙ্গে। দেশগুলো কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং এতে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা বেগবান হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এসআর মাসুম বলেন, ‘এটা উদ্বেগজনক। এসব হত্যাকাণ্ড বিদেশীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কি হচ্ছে মানুষ তা জানতে চায়। আমরা স্বস্তিতে নেই।’

ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন by মো: মিজানুর রহমান

কারো কারো মনে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিনিয়োগব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। কেউ বলেন, ইসলামি ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে শুধু লাভ নেয়; কিন্তু গ্রাহকের ব্যবসায় ক্ষতি হলে তা বহন করে না। আবার কেউ বলেন, ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে বিনিয়োগের বিপরীতে লাভ নিয়ে থাকে, যা সুদের নামান্তর। ইসলামি বিনিয়োগপদ্ধতি সম্পর্কে স্বল্প ধারণা বা নিছক অনুমানের ভিত্তিতেই অনেকে এজাতীয় নানা মন্তব্য করে থাকেন। ইসলামি ব্যাংকের বিনিয়োগপদ্ধতি প্রধানত তিনটি মূলনীতির ভিত্তিতে হয়ে থাকে। এগুলো হলো- ক্রয়-বিক্রয় নীতি, অংশীদারিত্বের নীতি এবং ভাড়াদান নীতি। ক্রয়-বিক্রয় নীতির আওতায় বাকি বিক্রি (বাই মুয়াজ্জাল), মুনাফার ভিত্তিতে বিক্রি (বাই মুরাবাহা), অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় (বাই সালাম ও বাই ইস্তিসনা) ইত্যাদি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই নীতির মূল কথা হলো, গ্রাহকের পক্ষে তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করে ক্রয়মূল্যের সাথে আনুষঙ্গিক খরচ, সেইসাথে যুক্তিসঙ্গত এবং ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারিত মুনাফা যোগ করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে তা গ্রাহকের কাছে বিক্রয় করা হয়। একজন খুচরা ব্যবসায়ী যখন কোনো পণ্য পাইকারি বিক্রেতার কাছ থেকে বাকিতে ক্রয় করে, তখন টাকা পরিশোধের একটা সময় নির্ধারণ করে দেয়। পরে খুচরা ব্যবসায়ী ওই পণ্য বিক্রি করে যদি ক্ষতির সম্মুখীন হন, তাহলে পাইকারি বিক্রেতা ওই ক্ষতির অংশ নিতে মোটেও বাধ্য নন। কারণ এখানে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে, লাভ-ক্ষতির অংশ নেয়ার কোনো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি এবং ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই তাদের মধ্যে দেনাদার ও পাওনাদারের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেহেতু ব্যাংক এখানে ক্রয়-বিক্রয় নীতি মেনে গ্রাহকের সাথে পণ্য কেনাবেচা করে, তাই তা মোটেও শরিয়াহপরিপন্থী হতে পারে না। ভাড়া বা ইজারা পদ্ধতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সম্পদের ভাড়া হিসেবে ব্যাংক মুনাফা নিয়ে থাকে বিধায় তা শরিয়াহপরিপন্থী নয়। শুধু অংশীদারিত্বের নীতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতি বণ্টন হয়ে থাকে; কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামি ব্যাংকগুলো মুশারাকা বা মুদারাবা ব্যবসায়ে এখনো বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে শুরু করেনি বলা যায়।
ব্যাংকিং লেনদেনের ধারণা প্রাচীন হলেও আধুনিক ব্যাংকিং ধারণার উদ্ভব মূলত দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ১১৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ভেনিসে প্রথম ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই সময়ের অর্থব্যবস্থা মূলত সুদভিত্তিক হওয়ার কারণে সুদভিত্তিক ব্যাংকব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অ্যাডাম স্মিথ, রিকার্ডো, উইলিয়াম সিনিয়রসহ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমান বিশ্বে ব্যাংকব্যবস্থা ছাড়া আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তির এ উৎকর্ষের যুগে অনলাইন ব্যাংকিং, প্লাস্টিক মানি, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের উদ্ভব হওয়ায় ব্যাংকব্যবস্থা ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অচল।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সুদ সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নিষিদ্ধ হওয়ায় মুসলমানেরা সুদভিত্তিক ব্যাংকব্যবস্থা মনেপ্রাণে কখনোই গ্রহণ করতে পারেনি। অপর দিকে, এর বিপরীতে শক্তিশালী কোনো বিকল্প তুলে ধরতেও পারেনি। বেশির ভাগ মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল বা দেশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকার কারণে মূলত স্বাধীনতা দাবির আন্দোলন মুখ্য হয়ে ওঠে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ইসলামি ব্যাংকিংব্যবস্থার ধারণা মুসলিম পণ্ডিতেরা কল্পনা করতে থাকেন এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে বিভিন্ন মুসলিম মনীষী ইসলামি ব্যাংকিংয়ের চিন্তা ও কাঠামোগত ধারণা পেশ করেন। ষাটের দশকে বেশির ভাগ মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা বা দেশ স্বাধীনতা লাভ করায় ইসলামি ব্যাংকের কাঠামোগত ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভের পথে অগ্রসর হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মিসরের ড. আহমাদ আল নাগগার প্রতিষ্ঠা করেন মিত্গামার ইসলামি সেভিংস ব্যাংক, মালয়েশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় তাবুং হাজী। মিসরের ব্যাংকটি ১৯৬৭ সালে বন্ধ হয়ে গেলেও থেমে যায়নি ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে গবেষণা। ১৯৭৪ সালে ইসলামি সম্মেলন সংস্থাভুক্ত দেশগুলো শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সনদ স্বাক্ষর করেছিল এবং ওই সনদের ভিত্তিতেই ১৯৭৫ সালে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক যাত্রা শুরু করে। ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন দেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং ধারার প্রচলন শুরু হয় এবং দেশে বর্তমানে আটটি ব্যাংক পূর্ণাঙ্গরূপে ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রিবা সম্পর্কিত, আল কুরআনের সূরা রুমের ৩৯ নম্বর আয়াতটি রাসূল সা:-এর হিজরতের পাঁচ বছর আগে মক্কায় নাজিল হয়- ‘মানুষের ধনস¤পদে তোমাদের ধনস¤পদ বৃদ্ধি পাবে, এই আশায় তোমরা সুদে যা কিছু দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পবিত্র অন্তরে যারা দান করে থাকে, তারাই আল্লাহর সমীপে বর্ধিত করতে থাকবে।’ এখানে আল্লাহ তায়ালা শুধু বলেছেন, সুদের কারণে সম্পদের বৃদ্ধি হয় না, যদিও মানুষ তা মনে করে। মদিনায় হিজরত করার পর ইহুদিরা যে অন্যায়ভাবে সুদ খাচ্ছে, সে ব্যাপারে বর্ণনা করা হয়। ‘আর এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের স¤পদ ভোগ করত অন্যায়ভাবে। বস্তুত, আমি কাফেরদের জন্য তৈরি করে রেখেছি বেদনাদায়ক আজাব’ (সূরা নিসা-১৬১)। উহুদ যুদ্ধের পর সুদ না খাওয়ার বিষয়ে প্রথম নির্দেশনা নাজিল হয়। ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারো’ (সূরা আল ইমরান-১৩০)। চতুর্থ ধাপে এসে সূরা বাকারার ২৭৫ও ২৭৬ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে সুদকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
ইসলামে দুই প্রকার রিবার কথা বলা হয়েছে। প্রথম প্রকার হলো, রিবা আন-নাসিয়াহ বা মেয়াদি সুদ। এটা হলো প্রকৃত সুদ বা প্রাথমিক সুদ। কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে এ ধরনের সুদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইমাম আবু বকর জাসসাস ও আল রাজি রিবা আন নাসিয়ার যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা হলো- যে ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদ দেয়া থাকে এবং মূলধনের অতিরিক্ত প্রদানের শর্ত থাকে, সেটাই রিবা আন-নাসিয়াহ। রিবা আল ফজল হারাম হওয়ার বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। প্রখ্যাত সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি রা: বলেন, একদা বিলাল রা: রাসূলে করিম সা:-এর সমীপে উন্নত মানের কিছু খেজুর নিয়ে হাজির হলেন। রাসূলুল্লাহ সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথা থেকে এ খেজুর আনলে? বিলাল রা: উত্তর দিলেন, আমাদের খেজুর নিকৃষ্ট মানের ছিল। আমি তার দুই সা’-এর বিনিময়ে এক সা’ উন্নত মানের বারমি খেজুর বদলিয়ে নিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ওহ! এত নির্ভেজাল সুদ। এরূপ কখনো করো না। তোমরা যদি উত্তম খেজুর পেতে চাও, তাহলে নিজের খেজুর বাজারে বিক্রি করবে, তারপর উন্নত মানের খেজুর কিনে নেবে। যেহেতু বর্তমান ব্যাংকিংয়ে ঋণের বিপরীতে সময় বেঁধে দিয়ে সুদ নেয়া হয়, সেহেতু তা রিবা আন-নাসিয়ার অন্তর্গত, যা কুরআনের আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়েছে।
আবার অনেকে মনে করেন, কুরআন ও হাদিসে যে রিবার উল্লেখ আছে, তার অর্থ ব্যক্তিগত পর্যায়ে পারিবারিক প্রয়োজন পূরণের জন্য দেয়া ঋণ, যাকে প্রচলিত ভাষায় মহাজনী সুদ বা উসারি বলা হয়; কিন্তু আজকের দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কর্তৃক প্রদেয় ঋণ উৎপাদন ও মুনাফাভিত্তিক খাতে দেয়া হয়। এখানে ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের টাকা দিয়ে ব্যবসায় করে নিজে লাভবান হন। তা ছাড়া এ জাতীয় সুদ হলো ব্যবসায়িক বা তেজারতি সুদ যা ব্যবসায়িক লেনদেনের মতোই উভয়ের সম্মতিক্রমে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, কোনো জবরদস্তি থাকে না, সুদের হার যথেষ্ট কম, এর মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, অর্থনীতির চাকা হয় গতিশীল। তাই এ জাতীয় সুদ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। তাদের এ যুক্তি একেবারেই অসার ও ভুল। কারণ, জাহেলি যুগে ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য রীতিমতো পুঁজি লগ্নি করা হতো এবং সে জন্য সুদ আদায় করা হতো। সে সময়ে অনেকেই আজকের মতো ফার্ম খুলে এজেন্ট নিয়োগ করে সুদে পুঁজি খাটাত। এদের মধ্যে রাসূল সা:-এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও বনু মুগিরার বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল। তাদের আদায়কৃত সুদকে আরবিতে রিবা বলা হতো। রাসূল সা: তাঁর চাচার সুদি কারবার বন্ধ করে দেন এবং খাতকের কাছে প্রাপ্য বকেয়া সুদ রহিত করে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং নিয়ে অনেকের মধ্যে আজো ভুল ধারণাই বেশি। বিশেষ করে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিরোধিতা করার জন্যই অনেক সময় অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিও দায়িত্বহীন মন্তব্য করে থাকেন। তারা এমন কথাও বলেছেন, ইসলামি ব্যাংকিং একটি প্রতারণা। প্রচলিত সুদ নাকি নিষিদ্ধ নয়, বরং চক্রবৃদ্ধি হারে যে সুদ হয়, তাই ইসলামে নিষিদ্ধ। আরবি ‘রিবা’ শব্দের অর্থ নাকি সুদ নয়। ইসলামি ব্যাংকিং হয়তো বা অনেকেই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছেন না।
তাই বলে একে প্রতারণা বলাটা শুধু হাস্যকর নয়, স্ববিরোধীও বটে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতোমধ্যে ইসলামি ব্যাংকিং গাইডলাইন প্রকাশ করা হয়েছে এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছেÑ কোনো ব্যাংক কোম্পানি, উহাকে প্রদত্ত বা উহা কর্তৃক রক্ষিত জামানত আদায়ের ক্ষেত্র ছাড়া, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো পণ্যের ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময় ব্যবসা করিবে না, অথবা আদায় বা কারবারের জন্য প্রাপ্ত বিনিময় বিলসংক্রান্ত কারণ ব্যতীত, অন্যের জন্য কোনো ব্যবসায় বা কোনো পণ্য ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময়ে লিপ্ত হইতে পারিবে না, তবে শর্ত থাকে যে, ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত ব্যাংক কোম্পানি কর্তৃক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বীকৃত ইসলামিপদ্ধতি অনুসরণপূর্বক মালামাল বা পণ্য ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময়ের ক্ষেত্রে এই ধারার কোনো কিছুই প্রযোজ্য হইবে না। অর্থাৎ বর্তমান ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আইনের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সুদমুক্ত জীবন যাপন করা মোটেও সম্ভব নয়। তাই প্রত্যেক মুসলমানকেই ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে হবে।
লেখক : সিনিয়র ব্যাংকার, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লি:
E-mail : mizandaibb@yahoo.com

সেই আছিরন এই আছিরন by আরিফুল হক

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার জয়রামপুর
গ্রামে আছিরন নেছার বাড়িতে পাটপণ্য তৈরি
করছেন নারীরা। কর্মীদের কাজ দেখিয়ে দিচ্ছেন
আছিরন (ডানে)। ছবি l প্রথম আলো
১৯৯২ সালে এই বাড়িতে এসেছিলেন চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন। এবার গেলাম আমি। মোনাজাত উদ্দিন লিখেছেন আছিরনের দৈন্য নিয়ে। আমি লিখব আছিরনের ‘বৈভব’ নিয়ে। মাঝখানের ২৩ বছরের জীবন আছিরনের নিজের হাতে গড়া।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বিখ্যাত পায়রাবন্দ ইউনিয়নের জয়রামপুর গ্রামের আছিরন নেছা (৪২) দুই মেয়েকে নিয়েই পাটজাত পণ্য তৈরি করেন। তিনি গ্রামের মহিলাদেরও প্রশিক্ষণ দেন। পায়রাবন্দসহ সাতটি গ্রামের ৬০০ মহিলাকে হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মমুখী করেছেন তিনি। নিজে হয়েছেন স্বাবলম্বী। এখন বাড়িতে দুটি ঘর, চারটি তাঁত আছে তাঁর। আছে পাটপণ্যের একটি শোরুম। পুকুরে মাছ চাষ করছেন। আট শতক জমি কিনে ছোট মেয়েকে বাড়ি করে দিয়েছেন।
নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার বাড়ি এই পায়রাবন্দে। সেই ইউনিয়নের আছিরন তাঁর সাত বছর বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন। সেই আলোচনার ঝড়ে বেরিয়ে এসেছিল, আছিরনেরও বিয়ে হয়েছিল মাত্র নয় বছর বয়সে। স্বামী খলিলুর রহমান ছিলেন দিনমজুর। এই দম্পতির দুটি কন্যাসন্তান হয়। নাম রাখা হয় কোহিনুর বেগম ও গোলেনুর বেগম।
সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন এই দম্পতির বড় মেয়ে কোহিনুরের বাল্যবিবাহ নিয়ে প্রতিবেদন করতে পায়রাবন্দে গিয়েছিলেন। আছিরন দম্পতির সঙ্গে আলাপের প্রসঙ্গ তুলে মোনাজাত উদ্দিন ১৯৯২ সালে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, ‘কথাবার্তায় বোঝা গেল: এই বাল্যবিবাহের বিষয়টি তাদের কাছে অস্বাভাবিক কোনো কিছু নয়। অল্প বয়সে ছেলেমেয়ে বিয়ে দেওয়া যে আইনসিদ্ধ নয়, এই খবরটুকুও জানে না তারা, কেউ বলেনি।’ ‘...ইচিরন জানায়, তার দুটি মেয়ে। এরপর ছেলে নেওয়ার আশা ছিল। কিন্তু হলো না। একদিন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের এক লোক এসে ফুসলিয়ে নিয়ে গেলো তাকে, নগদ টাকা আর শাড়ির লোভ দেখিয়ে “অপারেশন” করলো। এখন আর কী করা যাবে! ছেলের আশা বাদ দিতে হয়েছে। জামাই ঘরে এনে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হচ্ছে।’
এই খবর নজরে পড়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের। গ্রামের মানুষদের সচেতন করতে ঢাকা থেকে মালেকা বেগমসহ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা ছুটে আসেন। তাঁরা গ্রামের নারী-পুরুষদের নিয়ে বৈঠক করেন। বাল্যবিবাহের কুফল নিয়ে আলোচনা করেন।
ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বেগম রোকেয়ার স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের আত্মীয় রঞ্জিনা সাবের। তিনি প্রথম আলোকে বললেন, ‘ওই বৈঠকে লজ্জায় আছিরনের চোখ থেকে পানি ঝরতে দেখেছি। সেটাই হয়তো আছিরনকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।’
সম্প্রতি আছিরনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুটি দোচালা টিনের ঘর। একটি ঘরে চারটি তাঁত। অন্য একটি ঘরের অংশে দোকান ও প্রশিক্ষণের স্থান। বাড়ির আঙিনাতেও চলছে কাজ। আছিরন জানালেন, ৮ শতাংশ জমির ওপর তাঁর বসতভিটা। উপার্জনের টাকা দিয়ে ২০ শতাংশের একটি পুকুর কিনেছেন। তাতে মাছ চাষ হচ্ছে। ছোট মেয়ে গোলেনুর বেগমকে ৮ শতাংশ জমি কিনে বাড়ি করে দিয়েছেন। দুই মেয়েই আছেন মায়ের পাশে, কাজকর্মে-জীবনযাপনে।
বেগম রোকেয়া স্মৃতি পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা রফিকুল ইসলাম বললেন, আছিরন-খলিল দম্পতির একটি মাত্র খড়ের ঘর ছিল। তা-ও আবার ভাঙা। ঘরের ভেতর থেকে আকাশ দেখা যেত। বৃষ্টির পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ত। মাটিতে পাটি বিছিয়ে ঘুমাত। কিন্তু আছিরন দেখিয়ে দিলেন, কীভাবে বদলে যেতে হয়। কীভাবে গ্রামকে আলোকিত করা যায়। তিনি বলেন, তাঁর নাম আছিরন হলেও সংবাদ-এর প্রতিবেদনে ‘ইচিরন’ ছাপা হয়েছিল। লোকজন তাঁকে আছিরন নামেই ডাকে। তবে ওই প্রতিবেদনে দুই মেয়ে, স্বামী, গ্রামসহ অন্যান্য তথ্য ঠিক ছিল।
তবে আছিরনের এই যাত্রা সহজ ছিল না। স্বামী অসুস্থ। মেয়ের বাল্যবিবাহ নিয়ে হইচইয়ের কারণে সমাজে কোণঠাসা। কিন্তু আছিরনকে কিছু একটা করতেই হবে। চড়া সুদে চার হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন এক দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। কিনেছিলেন সেলাই মেশিন। কিন্তু রোজগার শুরুর আগেই স্বপ্ন ভেঙে খানখান। অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা করাতে দাদনের বাকি টাকা শেষ। সেলাই মেশিনটিও বিক্রি করে দিতে হলো।
কয়েক বছরে ঋণের চার হাজার টাকা সুদাসলে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজারে। টাকা পরিশোধে চাপ আসতে থাকে। দাদন ব্যবসায়ীর হাত থেকে বাঁচতে আছিরন ঢাকায় যান চাকরির আশায়। কিন্তু কিছু খুঁজে পেলেন না। এক মাস পর ফিরে আসেন গ্রামে।
শাশুড়ি খোদেজা বেগম নিজের একখণ্ড জমি বন্ধক রেখে ঋণের সব টাকা পরিশোধ করলেন। একটি সেলাই মেশিনও কিনে দিলেন আছিরনকে। এই সেলাই মেশিন দিয়ে টুকটাক কাজ শুরু হয়। দিনে ৪০-৫০ টাকা রোজগার হতে থাকে। একে একে ছয় হাজার টাকা সঞ্চয় করলেন। এ টাকা নিয়ে আবারও নতুন স্বপ্ন বুনতে লাগলেন আছিরন।
আছিরন জানালেন, ওই সময় গ্রামে অনেক পাট। দামও খুব কম। এই পাট দিয়ে পণ্য তৈরির চিন্তা মাথায় এল। প্রশিক্ষণ না থাকলেও বুননের কাজে তাঁর সহজাত দক্ষতা ছিল। পাট দিয়ে তৈরি করতে থাকেন পাপোশ, ছোট ব্যাগ, শিকা, কলমদানি, ছোটদের খেলনা পুতুল, কচ্ছপ, হরিণসহ নানা কিছু। এসব পণ্য নিয়ে যেতেন গ্রামের ছোট ছোট মেলায়। এতে আর্থিক লাভের পাশাপাশি প্রচারও পাওয়া যায়। পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে। দুই মেয়েসহ গ্রামের ১০ মহিলাকে কাজ শেখান। পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ দেন।
আছিরন বলেন, ‘২০০৭ সালে বগুড়ার নুনগোলার একটা বড় মেলায় অংশ নিই। কিন্তু দোকানের কোনো নাম দিবার পাই নাই। মেলার একজন মোর দোকানের নাম দেলে “অনেক আশা কুটির শিল্প”। সেটে পণ্য বিক্রি খুব ভালো হইল। ১২ হাজার টাকা লাভ হয়।’
ওই মেলা থেকে নতুন উদ্দীপনা পান আছিরন। এর দুই বছরের মধ্যে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মী বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ জনে। পণ্যের উৎপাদন বাড়তে থাকে। এসব পণ্য নিয়ে পর্যায়ক্রমে তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, নীলফামারীসহ আরও কিছু এলাকার মেলায় অংশ নেন। প্রতি মেলা থেকে আয় হতে থাকে ২০-২৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য সারা বছর পাটপণ্য তৈরি করেন আছিরন।
আছিরনের স্বামী খলিলুর রহমান বললেন, ‘একসময় না খায়া থাকতে থাকতে পেটোত ব্যথা আছলো। কাজ-কাম কইরবার গেইলে জ্ঞান হারে যাইতো। এলা অনেক গেরস্থের থাকিয়া ভালো আছি। পড়ালেখা না জানলেও বউয়ের সাথোত থাকিয়া কামের যোগারি দেও মুই।’
মানুষজন পরিদর্শনে এসে আছিরনের উৎপাদিত পণ্য যেন খুব সহজে দেখতে পান, সে জন্য একটি ছোট্ট শোরুমও দিয়েছেন আছিরন।
২০০৯ সালে বাড়িতে টিনের দুটি ঘরে তাঁত বসিয়ে গ্রামের মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন আছিরন। পায়রাবন্দ ইউনিয়নের জয়রামপুর, খোর্দ মুরাদপুর, তকেয়া, কেশবপুর, জোত ষষ্ঠি ও ইসলামপুর গ্রাম এবং কুড়িগ্রামের কিছু এলাকায় মহিলারা তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নেন। বর্তমানে ১৩টি গ্রুপে মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি। প্রতি গ্রুপে ২৫ জন করে সদস্য। গত ছয় বছরে আনুমানিক ৬০০ মহিলাকে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁরাও এখন নিজেদের মতো করে কাজ করছেন।
আছিরনের দুই মেয়েও আছেন মায়ের সঙ্গে। বড় মেয়ে কোহিনুর থাকেন মায়ের বাড়ির সামনে আলাদা বাড়িতে। তাঁকে নিয়ে ’৯২ সালে মোনাজাত উদ্দিন লিখেছিলেন, ‘আমরা যখন বিয়ের প্রসঙ্গে আলাপ করছিলাম, কোহিনুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে। সর্বাঙ্গে ধুলোমাখা, উদোম গা, মেয়েটি মিটমিট করে হাসছিল। মাঝে মাঝে লজ্জা পাবার ভান করছিল সে। আমি যখন ছবি তোলার কথা বললাম, তখন খুব খুশি। ছুটে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এলো, ফ্রক গায়ে চাপা চোখে কাজল টানলো এবং দাঁড়ালো ক্যামেরার সামনে। আমি বললাম, “কোহিনুর, হাসতো একটুখানি”।’
সেই কোহিনুর এখন তিন ছেলের মা। বড় ছেলে দশম শ্রেণিতে, মেজো ছেলে তৃতীয় আর ছোট ছেলে পড়ে শিশু শ্রেণিতে। স্বামীর একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আছে। আট শতকের বসতভিটা ছাড়া আবাদি জমি আছে ৪০ শতাংশ।
‘দিন ভালোই কাটছে’ বলে কোহিনুর আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, ‘আগের দিনের কথা কয়া আর কী হইবে। এলা হামরা অনেক ভালো আছি।’
সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন যখন আছিরনের বাড়িতে গিয়েছিলেন, তখন ছোট মেয়ে গোলেনুর বেগমের বয়স ছিল পাঁচ বছর। তাকে আঠারো বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছেন বলে জানালেন আছিরন। গোলেনুরের দুই ছেলে। তারাও স্কুলে পড়ছে। তাঁর স্বামী হাফিজার রহমানেরও অটোরিকশা আছে। গোলেনুরের বসতভিটা ছাড়াও ৮ শতাংশ আবাদি জমি ও দুটি টিনের ঘর আছে।
আছিরনের সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে পুরোনো দিনের কথা ঘুরেফিরে আসছিল। একপর্যায়ে আছিরন বলে উঠলেন, ‘ওই সময় কত কী না হইছে। এইগলা কথা এলা মনে পড়লে গাওখান ছমছম করি ওঠে।’
আছিরনের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া মরিয়ম বেগম, মনজিলা বেগম, পারভীন বেগম, নাজনীন আক্তার ও সায়দা বেগমরা যা বললেন তার সারমর্ম দাঁড়ায়, ‘মনোত জোর থাকলে যে অনেক কিছু করা যায়, তা হামার গ্রামের আছিরন বু (আপা) কইরে দেখাইছে।’

দ্বার খুললে বিনিয়োগ আসবে -সাক্ষাৎকারে জাহিদ হোসেন

সম্প্রতি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অনুমোদন হয়েছে। ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তিও হলো। এ দুটি বিষয়ের সঙ্গেই বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। একদিকে এসডিজি বাস্তবায়নের সক্ষমতার প্রশ্ন, অন্যদিকে রপ্তানি-বাণিজ্যের জন্য ঝুঁকি। এ অবস্থায় বাংলাদেশের করণীয় কী? এসব নিয়ে কথা বলেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন
প্রথম আলো: সম্প্রতি এসডিজি অনুমোদন হলো। এ বৈশ্বিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
জাহিদ হোসেন: এসডিজিতে আকাঙ্ক্ষা অনেক বেড়ে গেছে। এখানে ১৭টি লক্ষ্য রয়েছে, আর এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য রয়েছে ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট টার্গেট। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যে (এমডিজি) দারিদ্র্য বিমোচনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। আর এসডিজিতে বলা হচ্ছে, দারিদ্র্য বিমোচনই যথেষ্ট নয়। তাই নতুন কর্মসূচিতে প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। তাই বাস্তবায়নের সক্ষমতাই আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মতো সামাজিক খাতগুলোর উন্নয়নে দক্ষতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। এ দেশে যোগ্য লোকের অভাব নেই। তবে সমস্যা হলো, যোগ্য লোককে ব্যবহার করা হয় না। উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে, প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে নিবন্ধন হার, নারী-পুরুষের বৈষম্য হ্রাসের মতো প্রাথমিক কাজগুলো হয়ে গেছে। এখন শিক্ষার মানের দিকে নজর দিতে হবে। গ্রাম-শহরের মধ্যে ব্যবধান কমাতে হবে। এ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় বাড়াতে হবে। কাজটি করতে বেসরকারি সংস্থাকে (এনজিও) সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। এখন বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালাচ্ছে ব্র্যাক। তারা ভালোও করছে।
প্রথম আলো: এসডিজি বাস্তবায়নে অর্থ দিেত উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি নেই। তাহলে অর্থায়নের বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত হবে?
জাহিদ হোসেন: শুধু সাহায্যের বা অফিশিয়াল এইড-এর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুনছি, উন্নত দেশগুলো তাদের মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ দরিদ্র দেশগুলোকে দেবে। এখন পর্যন্ত শূন্য দশমিক ৩ শতাংশের বেশি পাওয়া যায়নি। উন্নত দেশগুলোর যে পরিমাণ সম্পদ আছে, তা থেকে ওরা আমাদের তেমন কিছু দিতে পারবে না। কারণ, অন্য অনেক ক্ষেত্রে তাদের সম্পদ দিতে হয়। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদাও রয়েছে। এ ছাড়া ইরাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে, সিরিয়ায় ড্রোন পাঠাতে হচ্ছে। সেগুলো ওদের উন্নয়নে কাজে আসছে না, কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য করতে হচ্ছে। তাই এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের মতো দেশকে সাহায্যনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) মতো ব্যাংককে এসডিজি বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত করা উচিত। এ ছাড়া উদ্ভাবনী উপায়ে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে ক্যাটালিস্টের ভূমিকা পালন করতে পারে বিশ্বব্যাংকসহ দাতারা। প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়িয়ে ও দুর্নীতি কমিয়ে বাংলাদেশে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
প্রথম আলো: বিশ্বব্যাংক এখানে কীভাবে সহায়তা করবে?
জাহিদ হোসেন: অনেকে বলছে, বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (আইডিএ) থেকে চাহিদা অনুযায়ী তহবিল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই আইডিএ প্লাস নামে নতুন ধারণা আসছে। আমাদের মতো দেশ আইডিএ থেকে অর্থ নেওয়ার বিপরীতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করছে। সেই অর্থকে সিকিউরিটাইজ করে বাজারে বন্ড ছাড়তে পারে বিশ্বব্যাংক। সেখান থেকে এসডিজি বাস্তবায়নে তহবিল আসতে পারে।
প্রথম আলো: এসডিজিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এটা কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব?
জাহিদ হোসেন: দুর্নীতি কমবেশি পৃথিবীর সব দেশেই রয়েছে। দুর্নীতি একেবারে নির্মূল করাও সম্ভব না। কিন্তু আমাদের দুর্নীতি হলো ফটকাবাজি। টাকা দিয়েও কাজ হয় না। ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে সার্ভিস-ডেলিভারি ভালো থাকায় বাংলাদেশের মতো এত দুর্নীতি নেই। তাই বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে জবাবদিহি ও নজরদারি বাড়াতে হবে।
প্রথম আলো: টিপিপি চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের জন্য হুমকি হেত পারে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ। এটি আপনি কীভাবে দেখছেন?
জাহিদ হোসেন: টিপিপি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন হুমকি। অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে ভিয়েতনাম। টিপিপি বাস্তবায়িত হলে ভিয়েতনামের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা আরও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্তভাবে ভিয়েতনামের তৈরি পোশাক ঢুকতে পারবে। তবে ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশে শ্রম সস্তা। কিন্তু টিপিপির কারণে বাংলাদেশের সস্তা শ্রমের সুবিধাটি শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে পুষিয়ে নেবে ভিয়েতনাম। তবে আশার কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন পর্যন্ত কেউই চুক্তিটি সমর্থন করছেন না। এ ছাড়া চাকরি হারানোর আশঙ্কা করে টিপিপি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংগঠনগুলো আপত্তি করে আসছে। তাই মার্কিন কংগ্রেসে এ চুক্তি পাস করাতে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই বছর লাগবে। এ সময়ে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা (জিএসপি) ফিরে পাওয়া, তৈরি পোশাকে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে বাংলাদেশ।
প্রথম আলো: সম্প্রতি বিনিয়োগ নিয়ে আপনি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেটি সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
জাহিদ হোসেন: স্ট্যাটাসটি এমন—মুরগি আগে, না ডিম? বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনটি আগে? ‘খোলো খোলো দ্বার’, নাকি ‘দাও সাড়া দাও’? সাড়া পেলে দ্বার খুলবে, নাকি দ্বার খুললে সাড়া মিলবে? দ্বার বলতে বোঝায় ব্যবসায় পরিবেশ, সাড়া হলো বিনিয়োগ। অনেকেই বলে, ‘ইফ ইউ বিল্ড, দে উইল কাম’, আবার কেউ বলে, ‘দে উইল বিল্ড, ইফ ইউ কাম’। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত, দ্বার খুললেই বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসবে। দ্বার খুললে সাড়া আসে, এর প্রমাণ ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া। ভিয়েতনামের অনেক জায়গায় দেখা যায়, বিনিয়োগকারীরা আসার আগেই বিদ্যুতের অবকাঠামো ও বিশাল বিশাল রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। শিল্পপ্লটগুলো খালি রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি ও সাড়া পাওয়ার জন্যই আগেভাগে এ অবকাঠামো তৈরি করে রেখেছে ভিয়েতনাম। তাই বিনিয়োগকারীদের চাহিদা পূরণ করতে পারলে, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যেও বিনিয়োগ আসবে। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তা যদি বদলে যায়, তবে আস্থা নষ্ট হয়। চট্টগ্রামের কোরিয়া ইপিজেডে জমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে স্যামসাং বিনিয়োগ করতে পারেনি। তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট দূর করতে হবে।
(সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাহাঙ্গীর শাহ)

মেরে পা ভেঙে দিয়েছেন শাহাদাত

মাহফুজা আকতার
১১ বছর বয়সী গৃহকর্মী মাহফুজা আকতারের পা এবং হাতের আঙুল ভেঙে দিয়েছেন ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন ও তাঁর স্ত্রী জেসমিন জাহান। শিশুটি বাসা থেকে যাতে পালাতে না পারে, সে জন্য এক বছর ধরে তাকে বাথরুমে ঘুমাতে বাধ্য করেছেন তাঁরা। গতকাল শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নির্যাতিত শিশুটি প্রথম আলোর কাছে এমন অভিযোগ করে। এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকার মহানগর হাকিম স্নিগ্ধা রানী চক্রবর্তীর কাছে জবানবন্দি দিয়ে একই কথা জানায় ওই শিশু।
নির্যাতনের শিকার শিশুটি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি রয়েছে। সেন্টারের সমন্বয়ক বিলকিস বেগম প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটিকে সেখানে আনার পর তাঁরা এক্স-রে করেন। তাতে দেখা যায়, তার বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ ভাঙা। হাতের একটা আঙুল ভাঙা। তার পিঠে, হাতে-পায়ে, মুখে—সব জায়গায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। শিশুটির দুই চোখের আঘাত ছিল গুরুতর।
নির্যাতিত শিশুটি গতকাল প্রথম আলোকে বলে, এক বছর আগে সে ক্রিকেটার শাহাদাতের বাসায় কাজ শুরু করে। কাজে ভুল হলে প্রথম দিকে তাকে ধমক দেওয়া হতো। আস্তে আস্তে থাপড়, ঘুষি মারা শুরু হয়। সে জানায়, একজন তাকে ধরে রাখতেন, আরেকজন পেটাতেন। কখনো লাঠি দিয়ে, কখনো রুটি বানানোর বেলুন দিয়ে মারতেন। সে বলে, ‘একজন বলত, তুমি বাবুকে ধরো, আমি ওকে পেটাই।’
এদিকে বিচারকের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে শিশুটি বলেছে, ‘...মারতে মারতে চার-পাঁচটি ডাল ঘুটনি ভেঙেছে। ভাতের চামচ দিয়েও মারত। প্লাস্টিকের চামচও ভেঙেছে কয়েকটা। এমনকি প্রায় আমাকে রুটি বানানোর বেলুন দিয়ে মারত। একদিন আমি ওটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। তখন ওরা আমাকে বলে, আরও একটা বেলুন কিনে আনছে। শাহাদাত হোসেনের বউ কাঠের খুন্তি গরম তেল থেকে তুলে আমার হাঁটুতে ছ্যাঁকা দিত।’
নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গত ৬ সেপ্টেম্বর শাহাদাতের বাসা থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয় নির্যাতনের শিকার ওই শিশুটি। পরবর্তী সময়ে খন্দকার মোজাম্মেল হক নামের এক সাংবাদিক বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানায় শাহাদাত ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় শাহাদাত রিমান্ডে এবং তাঁর স্ত্রী কারাগারে আছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিরপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শাহাদাতকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, কেন শিশুটিকে নির্যাতন করেছেন। কীভাবে নির্যাতন করেছেন। যেসব জিনিস (বেলুন, খুন্তি ও লাঠি) দিয়ে শিশুটিকে নির্যাতন করা হয়েছে, তা মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা হবে।
মাহফুজা প্রথম আলোকে বলে, ‘আমাকে খুব জোরে গলা টিপে ধরত শাহাদাত। মারা যাওয়ার উপক্রম হইতাম। আমার চোখমুখ ঘোলা হয়ে আসত। তখন জোরে শ্বাস নিতে থাকতাম। এভাবে শ্বাস নেওয়ার কারণেও থাপড় দিত শাহাদাত। এখনো আমার গলায় দাগ আছে। তার স্ত্রীও আমাকে গলা টিপে ধরত। ওরা আমাকে মেরে পা ভেঙে দিয়েছে। আমার বাঁ হাতের একটা আঙুলও ভাঙা।’
নির্যাতিত ওই শিশু আরও বলে, ‘আমাকে মারার পর ওরা ভয় পাইত, আমি যদি গেট খুলে পালাই। এ জন্য বাথরুমে ছিটকিনি আটকায় রেখে বাথরুমে রাতে ঘুমাইতে দিত। আর সারা দিন আমাকে গান গাইতে বলত, যাতে মানুষজন বুঝতে পারে, আমি ঘরে আছি। প্রায় এক বছর আমাকে বাথরুমে ঘুমাইতে হইছে।’
নির্যাতনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে মাহফুজা বলে, ‘একদিন বাচ্চার (শাহাদাত দম্পতির নয় মাস বয়সী একটা শিশু আছে) সুজি রান্না করছিলাম। কিন্তু দেরি হয়েছে বলে শাহাদাতের বউ আমাকে মারতে শুরু করে। আর শাহাদাত রুটি বানানোর বেলুন নিয়ে এসে আমাকে মারধর শুরু করে। ডান পায়ের হাঁটুর নিচে বেলুনের লাঠির অংশ লেগে গর্ত হয়। রক্ত বের হয়। তারপর সেখানে ন্যাকড়া বেঁধে তাদের বাসায় কাজ করতে থাকি। এ ছাড়া শাহাদাত আমার চোখে ঘুষি দিত।’
শিশুটি জবানবন্দিতে বলে, ‘তাদের নির্যাতনে আমার বাঁ চোখ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শাহাদাতের বউ আমাকে মুখ চেপে ধরে মারত। তারা আমাকে ঠিকমতো খেতে দিত না। তাদের খাওয়া শেষে উচ্ছিষ্টগুলো আমাকে খেতে দিত। শেষ ঘটনার কয়েক দিন আগে শাহাদাতের দেশের বাড়িতে যাই। শাহাদাতের মায়ের কাছে নালিশ করি। তার মা আমাকে মারতে নিষেধ করে। নালিশ করার কারণে ঢাকায় আসার পথে শাহাদাত হোসেনের বউ আমাকে পানির বোতল দিয়ে মারে। গাড়িতে আমাকে মারার জন্য তিন-চারটা লাঠি ছিল। আমাকে পাড়া দিয়ে ধরেছিল শাহাদাতের বউ। আমি চিৎকার করি। শাহাদাতও পাড়া দিয়েছিল। তাদের মারের কারণে আমার বাঁ হাতের আঙুল ভেঙে গেছে।’
নির্যাতনের ভয়ে বাসা থেকে পালিয়ে আসে বলে শিশুটি বিচারকের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে। জবানবন্দিতে সে বলে, ‘প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একদিন দুপুরের দিকে বাচ্চার সুজির রং হলুদের কারণ জিজ্ঞাসা করে শাহাদাতের বউ। আমি ভয়ে মিথ্যা বলি। বলি, সুজিতে হলুদ মিশাইছি। শাহাদাত তখন প্র্যাকটিসে ছিল। তার বউ আমাকে পেটে ঘুষি মারে। সুজির ঘটনা ফোন করে জানায়। আমাকে মারার জন্য লাঠি কিনে আনতে বলে। ভয়ে আমি বাসার গেট খুলতে গিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আসি।’
শিশুটিকে আইনগত সহায়তা দিচ্ছেন জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ফাহমিদা আক্তার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, পৈশাচিক কায়দায় শিশুটিকে নির্যাতন করেছেন আসামি শাহাদাত ও তাঁর স্ত্রী। শাহাদাত দম্পতির আইনজীবী কাজী নজিবুল্লাহ আদালতকে বলেন, শিশুটির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে শাহাদাত নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন।

পোশাক শিল্পে একের পর এক ধাক্কা by এমএম মাসুদ

মেঘ কাটছে না রপ্তানিতে আশিভাগ অবদান রাখা দেশের পোশাক শিল্পের। একের পর এক ধাক্কায় অনিশ্চয়তা দানা বাঁধছে এ খাত ঘিরে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন দেশের সতর্কতা জারির পর ক্রেতা আসা কমে গেছে পোশাক শিল্পের। গত কয়েক বছরে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা ধস, ওয়েজবোর্ড নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ, জিএসপি সুবিধা স্থগিত, অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স দ্বারা ত্রুটিপূর্ণ কারখানা বন্ধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক অস্থিতিরতা ও সর্বশেষ হরতাল-অবরোধ কারণে পোশাক খাত বড় ধরনের ধকলের শিকার হয়। সাম্প্রতিককালে যোগ হয়েছে বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ড। এতে সমালোচনার ঝড় ওঠে বিশ্বজুড়ে। বেশ কয়েকটি দেশ সতর্কতাও জারি করে। এতে ইমেজ সংকটের প্রশ্নের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় তৈরী পোশাক শিল্পে ক্রেতাদের মুখ ফিরিয়ে নেয়া, ইমেজ সংকট ও নতুন বাজার তৈরিতেও বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়বে বাংলাদেশ। তারা জানান, রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে তৈরী পোশাক শিল্প। দেশে কোন সমস্যা দেখা দিলে প্রথমেই এ শিল্পের ওপর আঘাত পড়ে। ইমেজ সংকট দেখা দেয়। তাদের মতে, পোশাক শিল্পে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ধরনের আঘাতে বিশ্বজুড়ে যে ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে, তা পুনরুদ্ধার করতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বিজিএমইএ সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, পরপর দুজন বিদেশী নাগরিক হত্যা অনেক উদ্বেগের বিষয়। এ হত্যাকাণ্ডের ফলে পোশাক শিল্পের বিদেশী ক্রেতারা তাদের নির্ধারিত সফর, বৈঠক বাতিল ও স্থগিত করা শুরু করেছে। তিনি বলেন, যেসব দেশে আমাদের নতুন মার্কেট তৈরি হয়েছে, সেসব মার্কেটের জন্য সমস্যাটা বেশি। কেননা, দেশের এমন পরিস্থিতিতে তারা পিছু হটবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ল্যাটিন আমেরিকাসহ বেশকিছু অঞ্চলে আমাদের নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে সমস্যাটা বেশি হতে পারে। গত সপ্তাহে বিজিএমইএর সঙ্গে বায়ার্স ফোরামের মাসিক বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তা ইস্যুতে তা স্থগিত করা হয়। বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন দেশের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সংগঠন বায়ার্স ফোরাম ২ বিদেশী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, বর্তমানে অনেকগুলো মানুষ একসঙ্গে বৈঠক করা নিরাপদ নয়।
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, বিদেশী নাগরিক হত্যায় ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরমধ্যে বায়ার্স ফোরামের বৈঠক স্থগিত একটা অশনি সঙ্কেত। এ অবস্থা চলতে থাকলে আবারও পোশাক শিল্প সংকটের দিকে যাবে; যা পোশাক শিল্পের নতুন চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, বায়ারদের অর্ডার দেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। কিন্তু এ সময়ই তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটা আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য ভাল লক্ষণ নয়। আর এমন পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধিও কমবে।
জানা গেছে, রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক খাতের ইমেজ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশী পণ্যের জিএসপি সুবিধা বাতিল করে। এ ছাড়া গত বছরের শেষের দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতির সম্মুখীন হয় বাংলাদেশের বড় এ রপ্তানি খাত। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আবার বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডকে পোশাক খাতের জন্য অশনি সঙ্কেত মনে করছেন রপ্তানিকারকরা।
এদিকে বিদেশী হত্যার ঘটনায় দেশে বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং রপ্তানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ডিসিসিআই। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, এ ধরনের ঘটনায় তৈরী পোশাকসহ অন্য খাতের অর্ডার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশী হত্যার এ ঘটনা যাতে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ এবং রপ্তানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত  করতে না পারে, সেজন্য বিদেশী ক্রেতা ও নাগরিকদের দেশে অবস্থান, চলাচলের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে সংগঠনটি।
এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, পোশাক শিল্প বিশাল চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। একটার পর একটা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, পরপর দুটি ঘটনা আমরা ছোট করে দেখলেও এর বিশালতা আছে। বিদেশীরা গভীরভাবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছেন। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি ও রাজনৈতি অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ব্যবসায়ীদের আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।