Sunday, October 20, 2019

ভোলার ঘটনায় দেশবাসীকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ভোলা ইস্যুতে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ধৈর্য ধারণ ও গুজবে কান না দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। যুবলীগের কাউন্সিলের প্রাক্কালে সংগঠনের ৩৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল আজ রোববার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি মহল অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে ফেসবুক ব্যবহার করে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ তিনি এ ব্যাপারে (ভোলা ইস্যু) ধৈর্য ধারণ করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, একজন হিন্দু ব্যক্তির ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, পুলিশ ওই হিন্দু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। সেই ব্যক্তি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে বলেছেন, তাঁর ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে মুসলিম ছেলেটি এ কাজ করেছে, তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হবে। পাশাপাশি যারা এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে। ভোলার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যখনই দেশ অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, তখনই একশ্রেণির লোক সব সময় দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়।

প্রধানমন্ত্রী কোনো গুজবে কান না দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে বিভিন্নভাবে সমাজ বিপদে পড়তে পারে। তাই প্রত্যেককে প্রকৃত ঘটনা জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি কেউ যাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার করতে না পারে, সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করতে সহায়তার পরিবর্তে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে-এমন ধরনের বিষয় প্রচার না করার জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, কোনো ধর্মের লোকজনের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, সরকার চায় ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করবে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষ লড়াই করেছে।

প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, একজন মুসলমান কীভাবে ফেসবুকে হিন্দুর আইডি ব্যবহার করে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করতে পারে। তিনি এটাকে খুবই দুঃখজনক বিষয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ ঘটনার পেছনে উদ্দেশ্য কী? কেন লোকজন সমবেত হয়েছে এবং পুলিশের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে?

এ সময় মঞ্চে আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের উপস্থিত ছিলেন। যুবলীগ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎকে নিয়ে বিজেপি’র লাগামহীন কুৎসা

অমর্ত্য সেনের পর বাঙালি অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সস্ত্রীক নোবেল প্রাপ্তির খবরে বাঙালি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অভিনন্দন এবং উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভাসছেন। সেখানে এই ভারতীয়ের নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে বিজেপি’র মন্ত্রী ও নেতারা লাগামহীন কুৎসায় মেতে রয়েছেন। অভিজিৎয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি একজন বামপন্থি। আসলে মোদি সরকারের অর্থনীতির প্রবল সমালোচনা করে আসছেন অভিজিৎ। নোবেল পাওয়ার ক’দিন আগেও ভারতের অর্থনীতি ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রভাব নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন অভিজিৎ। এমনকি নোবেল পাওয়ার পরও তিনি বলেছেন, ভারতীয় অর্থনীতির হাল খুব খারাপ। অর্থনীতির গতি দ্রুত হারে শ্লথ হচ্ছে। সরকারও সেটা বুঝছে।
গত নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের ন্যায় প্রকল্পের খসড়াও তিনিই করে দিয়েছিলেন। আর এতেই ক্ষিপ্ত বিজেপি নেতা ও মন্ত্রীরা। নোবেল ঘোষণার চার ঘণ্টা পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিজিৎকে অভিনন্দন জানালেও তার দলের নেতারা গত দু’তিন দিন ধরে লাগাতার কুৎসা করে চলেছেন। ব্যক্তিগত আক্রমণ করতেও তারা দ্বিধা করছেন না। গত শুক্রবার রাতেই অভিজিৎ সস্ত্রীক দিল্লি পৌঁছেন। আর সে দিনই ভারতের রেলমন্ত্রী পীযূস গোয়েল বলেছেন, অভিজিতের তত্ত্ব অচল। দেশের মানুষ গত নির্বাচনে সেই তত্ত্বকে খারিজ করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে তার সংযোজন, অভিজিৎ বামপন্থি। এদিনই বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সম্পাদক রাহুল সিনহা বলেছেন, যাদের দ্বিতীয় স্ত্রী বিদেশিনী তারাই দেখি নোবেল পাচ্ছেন। নোবেল পাওয়ার জন্য এটা কোনও  কোয়ালিফিকেশন কিনা তা আমার জানা নেই। আবার বিজেপি’র পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সভাপতি দিলীপ ঘোষের মতে, আমেরিকার জামাই হলে নোবেল পেতে সুবিধা হয়। অভিজিতের পরিবারের পক্ষ থেকে অবশ্য এসব কুৎসার কোনও জবার দেয়া হয়নি। তার ভাই এবং মা নীরবতাই সেরা অস্ত্র বলে মনে করেছেন। তবে কলকাতার নাগরিক সমাজ এই কুৎসার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অমল মুখোপাধ্যায় বলেছেন, বিজেপি’র নীতির সঙ্গে না মিললেই সেই অর্থনৈতিক তত্ত্বকে বামপন্থি বা ভারত বিরোধী তকমা দেবার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, যারা এই ধরনের মন্তব্য করে তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং যুক্তি নিয়ে আমার প্রবল সন্দেহ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় বিজেপি নেতাদের মন্তব্যকে সরাসরি নোংরা বলে অভিহিত করে বলেছেন, এরা সবাই নিম্ন রুচির পরিচয় দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও চলছে অভিজিতের  ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসা। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে ভুয়া টুইটার হ্যান্ডল বানিয়ে সেখান থেকে মনমোহন সিংয়ের নামে প্রশংসা টুইট করার অভিযোগ উঠেছে বিজেপি  শিবিরের বিরুদ্ধে। টুইটার হ্যান্ডলটির ডিসপ্লে নাম ছিল ‘নট দ্যাট স্বরাজ’। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নোবেল পুরস্কার দেয়ার কথা ঘোষিত হওয়ার পরে ডিসপ্লে নাম বদলে করা হয় ‘অভিজিৎ ব্যানার্জি’। ডিসপ্লে পিকচার থেকে মহাত্মা গান্ধী ও সুষমা স্বরাজের মুখের কোলাজ সরিয়ে অভিজিৎ বিনায়কের মুখের ছবি দেয়া হয়।  নোবেল কমিটি অভিজিতের যে ছবি  সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিল, সেই ছবিটিকেই এই টুইটার হ্যান্ডলের ডিসপ্লেতে লাগানো হয়। আর হ্যান্ডল থেকে ‘প্যারডি’ শব্দটি সরিয়ে লেখা হয় ‘ইকনমিস্ট’। তবে হ্যান্ডল নাম যা ছিল, তাই রেখে দেয়া হয়, ‘পলিটিক্স’। কিন্তু টুইটারে কাউকে চিহ্নিত করার জন্য মূলত ডিসপ্লে পিকচার এবং ডিসপ্লে নাম-ই দেখেন সকলে। হ্যান্ডল নাম কেউ সেভাবে খেয়াল করেন না। ফলে গত কয়েক দিনে অনেকেই ওই টুইটার হ্যান্ডলকেই অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হ্যান্ডল ভাবছিলেন। কখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনন্দন বার্তা পোস্ট করা হচ্ছিল সে হ্যান্ডলে, কখনও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের অভিনন্দন বার্তা। সে সব বার্তার জবাবে ‘ধন্যবাদ’ও জানানো হচ্ছিল। অভিজিতের নামে ফেক টুইটও করা হচ্ছিল। অচিরেই জানা গিয়েছে, ওই টুইটার হ্যান্ডল নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের নয়। তার পরেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে বিভিন্ন মহলে। তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং বামদের অভিযোগ, এই কুৎসা চালাচ্ছিলেন গেরুয়া শিবিরের সমর্থকরাই।

জেলখানায় প্রেম, সমকামিতা

বৃটেনের জঘন্যতম ভালবাসার কাহিনী বলা হয় একে। সিরিয়াল কিলার হিসেবে পরিচিত রোজ ওয়েস্ট ও মিরা হিন্ডলের মধ্যে জেলখানায় গড়ে উঠেছিল প্রেম। দুই নারীর সেই সম্পর্ক গড়ায় শারীরিক সম্পর্কে। সমকামিতায় লিপ্ত হন তারা জেলের ভিতরেই। তবে খুব বেশি দিন তাদের এই সম্পর্ক টিকে থাকে নি। কয়েক মাস। তারপর হিন্ডলে’কে ত্যাগ করেন রোজ ওয়েস্ট। কারণ, তিনি নাকি খুব বেশি বিপজ্জনক আর ধান্দাবাজ।
এমন দাবি করেছেন রোজ ওয়েস্টের সাবেক আইনজীবী লিও গোটলে। তার আইনজীবী হওয়ার কারণে তিনি বহুবার রোজ ওয়েস্টের সঙ্গে সাক্ষাত করতে জেলে গিয়েছেন। সেখানে গিয়ে জানতে পেরেছেন সব। বলেছেন, রোজ ওয়েস্টের এখন বয়স ৬৫ বছর। তিনি জেলের জীবনকেই বেছে নিয়েছেন। সেখান থেকে মুক্ত হতে চান না।
ঘটনাটি ১৯৯৫ সালের দিকের। ওই সময় সিরিয়াল কিলার বা ধারাবাহিক হত্যার অভিযোগে জেল দেয়া হয় এই দুই নারীকে। কিন্তু জেলখানার ভিতর তাদের সাক্ষাত হয়ে যায়। পরিচয় হয়। আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। সেই ঘনিষ্ঠতা এক পর্যায়ে সমকামিতায় রূপ নেয়। ডারহাম জেলখানায় রোজ ওয়েস্টের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতেন তার আইনজীবী লিও গোটলে। সেই সময়কার কাহিনী নিয়ে তিনি একটি বই লিখেছেন। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং ফ্রেড অ্যান্ড রোজ ওয়েস্ট’। এতে তিনি তুলে ধরছেন বৃটেনের দুই জঘন্য নারীর জেলখানার ব্যতিক্রমধর্মী প্রণয়লীলা। এতে আরো বর্ণনা করেছেন রোজ ওয়েস্ট ও তার স্বামী ফ্রেড মিলে কিভাবে ভয়াবহ সহ হত্যাকান্ড ঘটাতেন। রোজের বিরুদ্ধে ১০ জন বালিকা ও যুবতীকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার বিচারে ১২ বছর প্রতিনিধিত্ব করেন আইনজীবী লিও গোটলে।
এক পর্যায়ে জেলখানার ভিতরে রোজ ওয়েস্টের স্বামী ফ্রেড আত্মহত্যা করেন। সেই আত্মহত্যার ২৫তম বার্ষিকীকে সামনে রেখে বই প্রকাশ করেছেন লিও গোটলে। রোজ ওয়েস্টের যৌনজীবন এবং তার হত্যাযজ্ঞ নিয়ে তার কোনোই সন্দেহ নেই। এসব হত্যাকান্ড বৃটেনকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। রোজ ওয়েস্টের বয়স যখন মাত্র ১৪ বছর তখন তার স্বামী ফ্রেডের সঙ্গে মিলে স্কুলছাত্রী মেরি ব্যাসথেমকে হত্যা করে। ওই ছাত্রী ১৯৬৮ সালে ১৫ বছর বয়সে নিখোঁজ হয়ে যান। এখন রোজ ওয়েস্টের বয়স ৬৫ বছর। কিন্তু তিনিই ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি জেলখানায় যে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন বলে দাবি করেছেন লিও গোটলে, তা এখন সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি করবে।
১৯৬৬ সালে প্রেমিক ইয়ান ব্রাডির সঙ্গে মুরস মার্ডারের জন্য অভিযুক্ত হয়ে শাস্তি পান হিন্ডলে। তাকে ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাঠানো হয় ডারহাম জেলে। একই সময় সেখানে ছিলেন রোজ ওয়েস্ট।  মুরস মার্ডার বৃটেনকে নাড়িয়ে দেয়। তাকে ওই সময় বৃটেনের সবচেয়ে নিকৃষ্ট নারী খুনি হিসেবে অভিহিত করা হয়। ডারহাম জেলের ভিতরেই রোজ ওয়েস্টের সঙ্গে হিন্ডলের ঘনিষ্ঠতা। সেখানেই তারা সমকামিতায় লিপ্ত হন।
গোটলে তার বইয়ে সমাবেশ ঘটিয়েছেন রোজ ওয়েস্টের ১২ বছরের চিঠি, সাক্ষাতকার ও তার সঙ্গে লিও গোটলের ভিজিটের বর্ণনা। তিনি বলেছেন, অনেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কের একটি ছিল হিন্ডলের সঙ্গের সম্পর্ক। যাবজ্জীবন জেলের শুরু থেকেই রোজ ওয়েস্ট এ সম্পর্ক উপভোগ করতে থাকেন। তাদের এই সম্পর্ক ছিল প্রকৃতপক্ষেই সাপোর্টিভ এবং মাঝে মধ্যেই তা শারীরিক সম্পর্কে গড়াতো। তারা বেদিশা হয়ে যেতেন।

হুন্ডি, স্বর্ণ আর মোবাইল ডিলাররা ডলার পৌঁছে দিতো ক্যাসিনোতে by মিজানুর রহমান

সিঙ্গাপুরজুড়ে এখন একটাই আলোচনা-ক্যাসিনো অব্দি ডলার পৌঁছে দেয়া চিহ্নিত হুন্ডি-কারবারি, স্বর্ণ ব্যবসায়ী আর মোবাইল চোরাকারবারিদের এখন কী হবে? তারা কি ধরা পড়বে? ক্যাসিনোতে ঢাকা থেকে দলে দলে লোক যাওয়ার সুবাদে মাফিয়া ডনরা তাদের ওই অবৈধ ব্যবসাও নির্বিঘ্ন-নির্ঝঞ্ঝাট করে ফেলেছিলো! একাধিক কারবারি, ভুক্তভোগী আর ডলার, স্বর্ণ ও মোবাইল বহনকারী বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে মাফিয়া গ্যাংদের কর্ম-কৌশলের চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দেয়া তথ্যের সূত্র ধরে অনুসন্ধানেও অনেক ঘটনার সত্যতা মিলেছে। চাঙ্গি এয়ারপোর্ট আর ‘বাঙালিপাড়া’ সরজমিন বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। সূত্র মতে, হুন্ডির কারবার আর স্বর্ণ চোরাচালানের মধ্যে যোগসূত্র অনেক পুরনো। কিন্তু ওই সূত্রের সঙ্গে মোবাইল চোরাকারবারীদের সম্পৃক্ততা নতুন ঘটনা। ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে ওই চক্র বাংলাদেশে লাখ টাকার ওপরের দামি মোবাইল সেট সরবরাহ করে। আর এতে ব্যবহার করা হয় সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে ট্যুরিস্ট এবং মেডিকেল অ্যাটেন্ডেন্টস হিসেবে আসা- যাওয়া করা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বাংলাদেশিদের। অবশ্য ‘ফিটিং খাওয়া’ বাহকদের এজন্য পারিশ্রমিক দেয়া হয়।
বিমানবন্দর টু বিমানবন্দর কন্ট্রাক্টে তাদের ব্যবহার করা হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে অর্থাৎ মাফিয়া সিন্ডিকেটের নির্দেশনা মতো কাজ না করলে বাহককে দেশে এবং সিঙ্গাপুরে নির্যাতনসহ চড়া মূল্য দিতে হয়। এমনও ঘটনা আছে শাহ্‌জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাল ডেলিভারি না করে এক পল্টিবাজ বাহক ড্রেস পাল্টে ডমেস্টিক টার্মিনাল হয়ে ফ্লাইটে যশোর চলে গিয়েছিল।

সিঙ্গাপুরে বসে এক সিন্ডিকেট তাকে যশোর বিমানবন্দর থেকে আটক এবং প্রশাসনের সহায়তায় পণ্য উদ্ধারে সক্ষম হয়। তারা এতটাই যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। চাঙ্গি বিমানবন্দরের নব প্রতিষ্ঠিত টার্মিনাল-৪ এ চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের বাংলাদেশি এজেন্টরা রীতিমতো অফিস খোলে ফেলেছে। সেখান থেকে তারা অন্য টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ করে। সরজমিন দেখা যায়, ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দরে যারাই প্রবেশ করেছেন তাদেরই টার্গেট করছে একাধিক এজেন্ট। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার লোকজনের চেহারায় সাযুজ্যতা থাকায় অনেক ইন্ডিয়ানকেও তারা প্রস্তাব করে বসে চোরাই পণ্য বহনে, যা ওই নাগরিকের জন্য বিব্রতকর আর বাংলাদেশের জন্য চরম লজ্জার। সরজমিন বাহনে রাজি হওয়া যাত্রীকে অতিরিক্ত মালামাল বহনে এজেন্টের চাপাচাপি এবং এ নিয়ে দরকষাকষির নির্লজ্জ চিত্র পাওয়া যায়। এ-ও জানা যায় ঢাকায় ক্যাসিনো বিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের কাছাকাছি সময়ে চাঙ্গি বিমানবন্দরে সিঙ্গাপুর পুলিশের ঝটিকা অভিযানে ৪২ জন আটক হন। এর মধ্যে ১২ জন ছিলেন নির্দোষ। তারা তাদের বন্ধু-স্বজনকে বিদায় জানাতে গিয়ে অভিযানের মুখে পড়ে যান। আইনের শাসনের কঠোর প্রয়োগে বিশ্বাসী সিঙ্গাপুর পুলিশ তাদের তাৎক্ষণিক মুক্ত করে দেয়। বাকি ৩০ জনকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় আরও ২০ জনকে। কিন্তু কে জানতো এটা যে ফাঁদ! ছেড়ে দেয়া বাংলাদেশিরা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় লেনদেন করছে সেটি ফলো করে পরের দিনই অভিযান হয়।

তাতে আরও বেশ ক’জন ধরা পড়েন। বলাবলি আছে পরবর্তীতে ধরা পড়া লোকজনের ফাইল এখন দেশটির মিনিস্ট্রি অব ম্যানপাওয়ার সার্ভিস সেন্টারে (এমওএম)। তাদের দেশে ফেরত এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। চাঙ্গি বিমানবন্দরে সরজমিন দেখা যায়, ময়মনসিংহের একজন ভ্রমণকারী (নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন) বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে ঢাকা ফিরছিলেন। তেমন বাজার সদাই করেননি তিনি। সম্ভবত কোনো রোগীর সঙ্গে এসেছেন, (ভ্রমণের উদ্দেশ্যের বিস্তারিত বলতে রাজি হননি) বিমানবন্দরে পৌঁছার পর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর নামের এক চোরাকারবারি-এজেন্ট তাকে ৩টি মোবাইল বহনের প্রস্তাব করে। অনুনয়বিনয় করে সে তার পরিবার-স্বজনদের জন্য মোবাইলগুলো পাঠানোর কথা বলে তাকে রাজি করায়। প্রাথমিক সম্মতি পাওয়ার পর শুরু হয় জোরাজুরি। এজেন্ট তার পরিবারের জন্য কিছু স্বর্ণও পাঠাতে চায়। কিন্তু ওই যাত্রী তা বহনে কোনো অবস্থাতেই রাজি হচ্ছেন না। শুরুতেই তাকে অফার করা হয় ১০ হাজার টাকা। চাপাচাপির এক পর্যায়ে ১২ হাজার এবং সর্বশেষ ১৫ হাজার টাকার প্রস্তাবেও যখন তিনি রাজি হচ্ছেন না তখন শুরু হয় হুমকি-ধমকি। মাল না নিলে অসুবিধা হবে, কীভাবে ঢাকায় যাবেন দেখে নোবো, বাড়ি পৌঁছাতে পারবেন না- ইত্যাদি, আরও কত কী। উভয়ের গলার আওয়াজে উত্তাপ ছিল। কেউ কাউকে কথা বলতে একটুও ছাড়ছিলেন না। কথা বাড়ছিলো। আচমকা সোহেল নামে একজন এলেন। সম্ভবত এজেন্ট জাহাঙ্গীরের ফোন পেয়ে এসেছেন তিনি। তার আচরণে বিনয়-ভদ্রতার কোনো কমতি নেই। সোহেল পোশাক-আশাকেও বেশ মার্জিত, স্মার্ট। কথাবার্তার সূচনা থেকেই তিনি ইতিবাচক। মনে হয় অনেকটা যাত্রীর পক্ষেই কথা বলছেন। টার্গেট কোনোভাবে মালটা বহনে রাজি করানো। তা-ই হলো। মধ্যস্থতাকারী ভদ্রলোকের কথা ফেলতে পারলেন না যাত্রী। বিদায় বেলা তা-ই বলে গেলেন। অবশ্য এজন্য ঢাকায় পৌঁছে, মাল হস্তান্তরের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা পাবেন তিনি। বিমানবন্দরেই মাল হস্তান্তর হবে। সূত্র মতে, সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় যায় স্বর্ণ আর দামি মোবাইল সেট। এখানে আসে ডলার। সূত্র এটি নিশ্চিত করেছে যে, ঢাকার বেশ ক’জন স্বর্ণ কারবারি সিঙ্গাপুরেই পড়ে থাকেন। তাদের দলনেতা ঢাকা মহানগরীর শাসক দলের এক নেতা। মূলত তিনিই সবকিছু ম্যানেজ করেন। বলাবলি আছে ছাত্র জমানায় তিনি না-কী খন্দকার মোশ্‌তাকের জনসভায় সাপ ছেড়ে দিয়ে সভা ভণ্ডুল করে সেই সময়ের রাজনীতিতে নাম ডাক অর্জন করেছিলেন।

তাঁতীবাজারসহ ঢাকাজুড়ে থাকা ওই স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে এখানকার হুন্ডি-কারবারিদের লিংক। স্বর্ণ পৌঁছে যায় নির্ধারিত স্থানে। প্রতিদিন সিভিল কন্ট্রাক্টে অর্থাৎ যাত্রী মারফত  যায় গড়ে প্রায় ৫০০ কেজি। একজন যাত্রী নিজের জন্য সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম স্বর্ণ বহন করতে পারে। বাংলাদেশের আইনে এই সুযোগ রয়েছে। খুচরা চোরাকারবারিরা বা এজেন্টরা এ সুযোগ নিয়ে থাকে। সূত্র মতে, প্যানিসোলা প্লাজায় এমন বড় সিন্ডিকেটও আছে যাদের যাত্রী বা এজেন্ট নিয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। তারা সরাসরি বিমানবন্দর টু বিমানবন্দর কন্ট্রাক্টে যায়। সিঙ্গাপুরের আইনে স্বর্ণ বিক্রির কোনো লিমিট নেই, এমনটাই জানা গেছে। সমস্যা হয় বাংলাদেশে ঢুকতে। কাস্টমসের ঘাট পার হতে। কিন্তু সেটাও সহজ হয়ে যায় রাজনৈতিক প্রভাব এবং বখরা দিলে। বিমানবন্দরে তথা কথিত ভিআইপিদের স্ত্রীদের ব্যাগেও কেজি কজি স্বর্ণ যায় এমটাও জানিয়েছেন এক কারবারি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, বৃহত্তর কুমিল্লার একজন, বৃহত্তর বরিশালের ২ জন  এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের একজন এমপি আছেন যাদের সিঙ্গাপুরে বাড়িঘর। ক্যাসিনো সম্রাট এবং তার জুনিয়র সহযোগীরা তো আছেনই। তারা এখানে যা করেন তার পেট্রোন হচ্ছেন নানা রকম কারবারি। এমপি-প্রভাবশালীরা মাঠ প্রশাসনকে ম্যানেজ করেন, রুটটা নিরাপদ করেন। বাকিটা কারবারিদের দায়িত্ব। যথাস্থানে, যথা সময়ে তারা বখরা- হয় টাকায় না হয় ডলারে পৌঁছে দেন।

জেলা-বিভাগ ধরে হুন্ডি বুকিং, ডায়েরিই বড় প্রমাণ:
প্রতি শনি ও রোববার হুন্ডি-কারবারি এজেন্টদের হাট বসে মোস্তাফা সেন্টার সংলগ্ন বাঙালি পাড়ায়। ওই এলকায় জেলা-বিভাগ ধরে হুন্ডির টাকা বুকিং হয়। প্রত্যেক এজেন্টের হাতে ডায়েরি থাকে। এতে নোট করা মানে বুকিং হয়ে গেল। অনেকটা ফ্লেক্সিলোড পয়েন্টের মতো। তবে হুন্ডি বুকিং পয়েন্টগুলোর নামকরণ হয়েছে গাছ এবং হোটেলের নামে। যেমন তেঁতুলতলা, আমতলা, শাপলা হোটেল, ম্যাশ ক্যাফে ইত্যাদি। ওপেন সিক্রেট ওই অবৈধ লেনদেনে নানা ঘটনা ঘটে। যা পুলিশের নোটিশেও রয়েছে। হুন্ডি-কারবারিদের কাণ্ডকারখানায় এলাকাটা এমনভাবে চিহ্নিত যে, সময়ে-অসময়ে বাঙালিপাড়ার মাঠে সিঙ্গাপুর পুলিশ রীতিমতো চেকপোস্ট বসিয়ে চেক করে। প্রথমদিন ওই মাঠে অপেক্ষায় থেকে প্রতিবেদক নিজেই পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন। অবশ্য তাদের বক্তব্য বসবাসরত এবং ভিজিট ভিসায় আসা বাংলাদশিদের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দুষ্টরা চতুর। তবে বেশির ভাগ বাংলাদেশি সরল।

মিয়ানমারের ভয়ঙ্কর বৌদ্ধ উইরাথু

মসজিদকে তিনি বর্ণনা করেন "শত্রুর ঘাঁটি" হিসেবে, তার কাছে মুসলিমরা হচ্ছে "পাগলা কুকুর", মুসলিমদের বিরুদ্ধে তার অভিযোগ "তারা চুরি করে ও বর্মী মহিলাদের ধর্ষণ করে" এবং "গণহারে জন্ম দিয়ে তারা খুব দ্রুত নিজেদের বিস্তার ঘটাচ্ছে।"
তার নাম আশিন উইরাথু। বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত বৌদ্ধ ভিক্ষু তিনি। মিয়ানমারে কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর ধরে তাকে রক্ষা করার পাশাপাশি তাকে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। আর একারণেই তিনি মুসলিমদের বিষয়ে দিনের পর দিন এরকম বিদ্রূপাত্মক ও নিন্দাজনক বক্তব্য দিতে সক্ষম হচ্ছেন।
কিন্তু সম্প্রতি তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার-জয়ী ও মিয়ানমারের ডিফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চিকে আক্রমণ করার পর দেশটির কর্তৃপক্ষ এই উপসংহারে পৌঁছেছে যে তিনি তার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন এবং এখন তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। কিন্তু বিতর্কিত এই বৌদ্ধ ভিক্ষু আসলে কে?
যেভাবে শুরু
আশিন উইরাথু প্রথম আলোচনায় আসেন ২০০১ সালে যখন তিনি মুসলিমদের মালিকানাধীন ব্যবসা ও দোকানপাট বয়কট করার জন্যে প্রচারণা শুরু করেন।
এরকম একটি প্রচারণা শুরু করার পর ২০০৩ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বিচারে তার ২৫ বছরের সাজা হয়েছিল। কিন্তু তাকে পুরো সাজা খাটতে হয়নি। সাত বছর পর সরকারের ঘোষিত সাধারণ ক্ষমায় তিনি ২০১০ সালে কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন।
কিন্তু উইরাথুর জেল-জীবন তার মধ্যে কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি, বরং মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিরুদ্ধে তিনি তার বিদ্বেষমূলক বক্তব্য অব্যাহত রাখেন।
আশিন উইরাথু তার বক্তব্য বিবৃতিতে বৌদ্ধদের শৌর্য বীর্যের কাহিনী তুলে ধরেন, তার সাথে মিশিয়ে দেন জাতীয়তাবাদের নেশাও।
সাংবাদিকদের সাথে যখন উইরাথু কথা বলেন তখন তিনি খুব শান্তভাবে তাদের প্রশ্নের জবাব দেন ঠিকই, কিন্তু তিনি যখন সভা সমাবেশে বা জনসভায় বক্তব্য রাখেন তখন তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ হয়ে উঠেন।
তার কথার প্রতিটি বাক্যে ছড়িয়ে থাকে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা। মিয়ানমারের বিদ্যমান মুসলিম-বিদ্বেষে তার এসব বক্তব্য আরো উস্কানি জোগাতে সাহায্য করে।
মুসলিম পুরুষরা যাতে বৌদ্ধ নারীদের বিয়ে করতে না পারে সেজন্যে একটি আইন তৈরিতেও অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন উইরাথু। ওই আইনে মুসলিম পুরুষের সাথে বৌদ্ধ নারীর বিয়ে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
"কোন সাপ ছোট হলেও সেটাকে খাটো করে দেখার কিছু নেই। মুসলিমরা ওই সাপের মতো," বলেন তিনি।
ফেসবুকে নিষিদ্ধ
মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে এক পর্যায়ে আশিন উইরাথু সোশাল মিডিয়াও ব্যবহার করতে শুরু করেন। তিনি বলতে থাকেন যে মিয়ানমারে মুসলিম জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকার কারণে বৌদ্ধ সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়েছে।
এরই একপর্যায়ে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তাকে নিষিদ্ধ করে। ফেসবুকের পক্ষ থেকে বলা হয় যে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করেই তার এসব বিদ্বেষমূলক পোস্ট।
উইরাথু তখন বিকল্প হিসেবে অন্যান্য সোশাল মিডিয়া ব্যবহারের কথা ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, "ফেসবুক যখন আমার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়, আমি তখন ইউটিউবের উপর নির্ভর করি। আবার ইউটিউব যেহেতু খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না, সেহেতু আমার জাতীয়তাবাদী কাজ অব্যাহত রাখার জন্যে আমি টুইটার ব্যবহার করবো।"
রুশ সোশাল মিডিয়া এবং নেটওয়ার্কিং সাইট ভিকের মাধ্যমেও তিনি তার অনেক ভিডিও শেয়ার করে থাকেন।
কিন্তু শুধু যে ফেসবুকই তাকে নিষিদ্ধ করেছে তা নয়, এবছরের এপ্রিলে প্রতিবেশী ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশ থাইল্যান্ডে তার ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু থাই কর্তৃপক্ষ তাতে বাধ সেধেছে।
ভুল বোঝাবুঝি
উল্কার মতো তার এই জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে ভুগতে হয়েছে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে। তাদের সংখ্যা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনেও উইরাথুকে চিত্রিত করা হয় একজন সন্ত্রাসী হিসেবে।
২০১৩ সালের জুলাই মাসে ম্যাগাজিনটির একটি সংখ্যার প্রচ্ছদে তার একটি ছবি ছাপিয়ে তাতে লেখা হয় : "এক বৌদ্ধ সন্ত্রাসীর মুখ।"
"ভুল বুঝে আমাকে আক্রমণ করা হচ্ছে। আমার মনে হয় এক দল লোক আছে যারা আমার বদনাম করার জন্যে মিডিয়াকে অর্থ দিচ্ছে। আর এটা তো নিশ্চিত যে মুসলিমরাই অনলাইন মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে," বিবিসিকে ২০১৩ সালে একথা বলেন তিনি।
আশিন উইরাথুর উপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হয় ২০১৫ সালে। ওই ডকুমেন্টারিতে তাকে বর্ণনা করা হয় একজন "বৌদ্ধ বিন লাদেন" হিসেবে।
কিছু কিছু পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমও খুব দ্রুতই তার এই নামটি লুফে নেয়। তবে উইরাথু বলেন, এরকম তুলনা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
আশ্বিন উইরাথু বলেন যে তিনি সহিংসতাকে ঘৃণা করেন। "আমি খুব খারাপভাবেও এর জবাব দিতে চাই না," বলেন তিনি।
জাতিসঙ্ঘের সাথে বিরোধ
একান্ন বছর বয়সী উইরাথু বিতর্কের মধ্যেই বেঁচে আছেন এবং বেশিরভাগ বিতর্ক তিনি নিজেই সৃষ্টি করেছেন।
মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিমদের দুঃখ দুর্দশা অনুসন্ধান করে দেখতে জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত ইয়াংগি লি-কে ২০১৫ সালে যখন সেদেশে পাঠানো হয়েছিল উইরাথু তখন তাকে একজন 'দুশ্চরিত্রা' ও 'বেশ্যা' হিসেবে গাল দিয়েছিলেন।
রাখাইনের গণহত্যায় সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় জেনারেলদের ভূমিকা কী ছিল সেটা খতিয়ে দেখতে গতবছরেই আহবান জানানো হয়েছিলে জাতিসঙ্ঘের একটি প্রতিবেদনে। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত বা আইসিসির পক্ষ থেকে প্রাথমিক এক তদন্তের সূচনা হওয়ার পরই এই আহবান জানানো হয়েছিল।
মিয়ানমার সরকার জাতিসঙ্ঘের এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু উইরাথু তখন পাল্টা আক্রমণ চালাতে শুরু করেন।
গত বছরের অক্টোবর মাসে তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, "আইসিসি যেদিন এখানে আসবে, সেদিনই উইরাথু বন্দুক হাতে তুলে নেবে।"
রোহিঙ্গা সঙ্কট
রাখাইন রাজ্যে ২০১২ সালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুরু হওয়ার জন্যে আশ্বিন উইরাথুর সমর্থকদের ব্যাপকভাবে দায়ী করা হয়।
এর পরই সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
এবিষয়ে ২০১৭ সালে ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে উইরাথু বলেছিলেন, "অং সান সু চি বাঙালিদের সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি তাকে বাধা দিয়েছি।"
বর্মী জাতীয়তাবাদীরা রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে প্রায়শই বাঙালি বলে উল্লেখ করে থাকে। রোহিঙ্গাদেরকে বহিরাগত বোঝাতেই তাদেরকে বাঙালি বলা হয়।
ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির বিরুদ্ধে উইরাথু অভিযোগ আনেন যে ওই দলটি গোপনে মুসলিম এজেন্ডাকে সমর্থন দিচ্ছে।
বৌদ্ধ ধর্ম
মিয়ানমারে কোন রাষ্ট্রীয় ধর্ম নেই। তবে দেশটিতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচণ্ড প্রভাব রয়েছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশই বৌদ্ধ।
দেশটিতে কর্তৃপক্ষ শতাব্দীর পর শতাব্দী কাল ধরে বৌদ্ধ আশ্রমকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছিল। কিন্তু এর অবসান ঘটে ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে।
ইরাবতী ও অন্যান্য নদীর কারণে অত্যন্ত উর্বর এই দেশের ভূমি। বৌদ্ধ আশ্রমগুলোও প্রচুর কৃষিজমির মালিক। ফলে দেশটিতে গড়ে উঠেছে অগণিত সুদৃশ্য বৌদ্ধ মন্দির।
মিয়ানমারের রয়েছে সামরিক শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস। দেশটির সৈন্য সংখ্যা চার লাখেরও বেশি।
কিন্তু বৌদ্ধ ভিক্ষুর সংখ্যা তার চাইতেও অনেক বেশি। ধারণা করা হয় তাদের সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ লাখ। সামাজিকভাবেও তাঁরা শক্তিশালী, কারণ তাদের রয়েছে সামাজিক প্রভাব, প্রতিপত্তি এবং মর্যাদা।
মা বা থা
মুসলিমবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী একটি দল গঠনের সাথেও জড়িত ছিলেন আশ্বিন উইরাথু। গ্রুপটির নাম ছিল ৯৬৯।
এই দলের সমর্থকরা বলছেন, নামের প্রথম ৯ হচ্ছে গৌতম বুদ্ধের নয়টি বিশেষ গুণ, ৬ হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মের ছ'টি বিশেষ অনুশিক্ষা এবং শেষ ৯ হচ্ছে সংঘের নয়টি বিশেষ গুণ।
কিন্তু বাস্তবে এই ৯৬৯ গ্রুপটি মুসলমানদের বিরুদ্ধেই প্রচারণা চালাতে থাকে।
পরে দলটি রাষ্ট্রীয়ভাবেও সমর্থন পেতে শুরু করে এবং ২০১৩ সালে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থিন সেইন প্রকাশ্যে এই গ্রুপটির আন্দোলন এবং ওই আন্দোলনের সবচেয়ে প্রখ্যাত নেতা উইরাথুকে সমর্থন দেন। উইরাথুকে তিনি উল্লেখ করেন "বুদ্ধের সন্তান" হিসেবে।
এর কিছুদিন পরেই উইরাথু মা বা থা নামের আরো একটি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন।
দলটির এই নামের অর্থ বার্মার দেশপ্রেমিক সমিতি। এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয় ২০১৪ সালে। তারপর হু হু করে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। এক সময় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে সংগঠনটি এবং এক পর্যায়ে ২০১৭ সালে এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু মান্দালায় মা সোয়ে ইয়েন আশ্রম থেকে উইরাথু কোন ধরনের বাধা ছাড়াই প্রচারণা অব্যাহত রাখেন।
তার অফিসে তিনি এমন কিছু ছবি স্থায়ীভাবে প্রদর্শন করতে থাকেন যেগুলোতে, তার ভাষায়, মুসলিমদের সহিংসতার কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গেরুয়া পোশাক পরিহিত উইরাথু বিবিসিকে ২০১৩ সালে যে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তাতে তিনি কখনো মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ব্যাপারে অনুশোচনা প্রকাশ করেন নি।
বরং তিনি বলেন, "মুসলিমরা যখন দুর্বল থাকে শুধু তখনই তারা ভালো আচরণ করে। কিন্তু যখন তারা শক্তিশালী হয়ে উঠে তখন তারা নেকড়ে কিম্বা শৃগাল হয়ে যায়, তার পর তারা দল বেঁধে অন্যান্য প্রাণীর উপর আক্রমণ করে।"
"মুসলিমরা নিজেদের ছাড়া আর কাউকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। তারা খ্রিস্টান ও হিন্দুদেরকেও আক্রমণ করে। আসলে তারা সবাইকে আক্রমণ করে। আপনি যদি এটা বিশ্বাস না করেন তাহলে আপনার পরমাণু প্রযুক্তি তালেবানকে দিয়ে দেখুন কী হয়, আপনার দেশ খুব শ্রীঘ্রই হারিয়ে যাবে," বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন তিনি।
ব্যাপক প্রভাব
উইরাথু প্রায়শই বিদেশে ভ্রমণ করেন এবং শ্রীলঙ্কায় বদু বালা সেনা বা বিএসএস নামের একটি গ্রুপের সাথে রয়েছে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংস প্রচারণা চালিয়ে এই গ্রুপটিও কুখ্যাতি অর্জন করেছে।
"আজ বৌদ্ধ ধর্ম বিপদে পড়েছে। আমরা যদি এই বিপদ সঙ্কেত শুনতে পাই তাহলে আমাদের সবাইকে একসাথে হাত ধরতে হবে," ২০১৪ সালে কলম্বোর এক সমাবেশে বলেছিলেন উইরাথু।
কিন্তু তার এই ব্যাপক জনপ্রিয়তা মিয়ানমারের আশ্রমগুলোতে তখন আর ভালোভাবে গৃহীত হয়নি। সরকার সমর্থিত সংঘ কাউন্সিল ২০১৭ সালে তার ধর্মীয় বক্তব্য রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
কিন্তু তিনি আসল বিপদে পড়তে শুরু করেন যখন তিনি মিয়ানমারের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিকে আক্রমণ করেন, তার পর থেকেই।
সু চি-কে আক্রমণ
"তিনি ফ্যাশনেবল কাপড় পরেন, মেকাপ দেন, হাই হিল জুতা পরেন এবং বিদেশিদের দিকে নিজের নিতম্ব নাড়িয়ে হেঁটে যান," মিয়ানমারের ডিফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চির দিকে ইঙ্গিত করে উইরাথু একথা বলেন এপ্রিল মাসের এক সমাবেশে।
এছাড়াও মে মাসে দেওয়া এক ভাষণে সরকারের এক সদস্যের বিষয়ে তিনি বলেন যে ওই ব্যক্তি "একজন বিদেশীর সাথে ঘুমাচ্ছেন।"
ব্রিটিশ একজন শিক্ষাবিদ মাইকেল এরিসের সাথে অং সান সু চি-র বিয়ে হয়েছিল। মিস সু চি যখন সামরিক বাহিনীর হাতে গৃহবন্দী তখন তার স্বামী ১৯৯৯ সালে ক্যান্সারে মারা যান।
"উইরাথু খুবই জনপ্রিয় একজন ভিক্ষু। তার অনুসারীর সংখ্যাও প্রচুর। তিনি যখন মুসলিমদের আক্রমণ করেন তখন তার অনুসারীরা খুশি হয়। কিন্তু এই উইরাথুই যখন অং সান সু চি-কে আক্রমণ করেন তখন তার জনপ্রিয়তাও ধাক্কা খায়," বলেন মিয়াত থু, ইয়াঙ্গুন স্কুল অফ পলিটিক্যাল সায়েন্স নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা অং সান সু চি মিয়ানমারে পরিচিত "দ্যা লেডি" হিসেবে। কার্যত তাকে দেশটির প্রধান বলেই মনে করা হয়।
তার আনুষ্ঠানিক পদের নাম স্টেট কাউন্সিলর। প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট তার ঘনিষ্ঠ মিত্র।
মিয়ানমারের সংবিধানের কারণে অং সান সু চি কখনো দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না কারণ তার সন্তানরা বিদেশি নাগরিক।
বেসামরিক সরকার মিস সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে এই বাধা সরিয়ে দিতে চায় কিন্তু ভিক্ষু আশ্বিন উইরাথু সংবিধানের এই পরিবর্তনের বিরোধী।
"লোকজনের কাছে অং সান সু চির জনপ্রিয়তা প্রচুর। এমনকি অনেক কট্টরপন্থী ভিক্ষু, যারা উইরাথুর সাথে আছেন, তারাও এখন তার এই সু চি-বিরোধী অবস্থান মেনে নিতে পারবেন না," বলেন মিয়াত থু।
"উইরাথু যদি শুধু সংবিধানের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কথা বলতেন তাহলে সরকারের পক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতো। কিন্তু তিনি তো অং সান সু চিকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন যা মানুষ ভালভাবে নেয় নি।"
তিনি বলেন, "এখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়ে গেছে।"
কিন্তু তারপরেও আশিন উইরাথু দমবার পাত্র নন। তিনি বলেন, "তারা যদি আমাকে গ্রেফতার করতে চায়, তারা সেটা করতে পারে।"
সূত্র : বিবিসি
মিয়ানমারের বিতর্কিত বৌদ্ধ ভিক্ষু ৫১ বছর বয়সী আশিন উইরাথু - সংগৃহীত

অভিযানে কাউন্সিলর রাজীবের বাসায় যা মিললো

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অবৈধ জমি দখলের অভিযোগে গ্রেপ্তার ডিএনসিসির কাউন্সিলর তারেকুজ্জামানের দুই বাসায় অভিযান চালিয়ে কোটি টাকার চেকসহ অস্ত্র উদ্ধার করেছে র‌্যাব। গতকাল রাত থেকে আজ ভোর পর্যন্ত রাজধানীর বসুন্ধরা ও মোহাম্মদপুরের অবস্থিত তার দুই বাসায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।

র‌্যাব সূত্র জানায়,  রাজীবের মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে ৫ কোটি টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই জব্দ করেছে র‌্যাব। একইসঙ্গে জমিজমার বিভিন্ন কাগজপত্রও জব্দ করা হয়েছে। একই সময় আলামত ধ্বংস এবং কাজে অসহযোগিতার কারণে রাজীবের সহযোগী (পিও) সাদেককে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
র‌্যাব জানায়, শনিবার দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে কাউন্সিলর রাজীবকে নিয়ে মোহাম্মদপুরে তার নিজ বাসায় অভিযান শুরু করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভোর চারটার দিকে বাসায় মোটামুটি অভিযান শেষ করে রাজীবকে নিয়ে তার অফিসে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে র‌্যাব-২ ছাড়াও র‌্যাব-১ এবং র‌্যাব সদর দফতরের একাধিক টিম কাজ করছে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে অন্যদিকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে রাজীবকে গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগজিন, ৭ বোতল বিদেশি মদ, একটি পাসপোর্ট ও ৩৩ হাজার নগদ টাকা জব্দ করা হয়।

তারেকুজ্জামান রাজিব ২০১৫ সালে কাউন্সিলর হওয়ার পরপরই সম্পূর্ণ বদলে যায় জীবন। চালচলনে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। হঠাৎ কেউ দেখলে মনে হবে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো রাজা, বাদশাহ বা সুলতান। কোথাও গেলে সঙ্গে থাকে গাড়ি আর মোটরবাইকের বহর। রাস্তা বন্ধ করে চলে এসব গাড়ি। রোদে গেলে আশেপাশের কেউ ধরে রাখে ছাতা। সঙ্গে ক্যাডার বাহিনী তো আছেই। মাত্র চার বছরে মালিক বনে গেছেন অঢেল সম্পত্তি, গাড়ি আর বাড়ির।

ইচ্ছে হলেই বদলান গাড়ি। রয়েছে মোটা অঙ্কের ব্যাংক ব্যালেন্স। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও দিয়েছেন বাড়ি-গাড়ি। এই কাউন্সিলর নিজের এলাকায় গড়ে তুলেছিলেন রাজত্ব। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, টেন্ডারবাজি, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ আর মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত করেছেন তার সাম্রাজ্য । মোহাম্মদপুরের বসিলা, ওয়াশপুর, কাটাসুর, গ্রাফিক্স আর্টস ও শারীরিক শিক্ষা কলেজ, মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটি এবং বাঁশবাড়ী এলাকায় তৈরি করেছেন একক আধিপত্য। ২০১৫ সালের কাউন্সিলর নির্বাচনে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী । বিভিন্ন কারসাজি করে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে হারান। অভিযোগ রয়েছে এরপর থেকেই এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করছেন না তিনি।

মোহাম্মদপুর এলাকায় যুবলীগের রাজনীতি দিয়েই শুরু হয় রাজীবের রাজনৈতিক জীবন। চালাক চতুর রাজীব অল্পদিনেই নেতাদের সান্নিধ্যে এসে মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ বাগিয়ে নেন। এই পদ পেয়েই থানা আওয়ামী লীগের এক নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে জুতা পিটাসহ লাঞ্ছিত করেন। সে সময় যুবলীগ থেকে তাকে বহিষ্কারও করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তারেকুজ্জামান রাজীব মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে উল্টো ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বনে যান। কেন্দ্রীয় যুবলীগের আলোচিত দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমানকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে এ পদ কেনেন রাজীব। যুবলীগের সাইনবোর্ড আর কাউন্সিলরের পদটি ব্যবহার করে এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, ডিশ ব্যবসাসহ নানা মাধ্যমে হয়ে উঠেন আরো দুধর্ষ ও বেপরোয়া।

ভোলায় পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে নিহত ৪, বিজিবি মোতায়েন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইসলাম নিয়ে কটূক্তিকর স্ট্যাটাসের প্রতিবাদে বাংলাদেশের ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় স্থানীয় জনতার মিছিলকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া, পুলিশসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে মাঠে নেমেছে বিজিবি। 

নিহতদের মধ্যে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র শাহীন এবং স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র মাহবুব পাটোয়ারীর লাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে। আর ভোলা সদর হাসপাতালে রয়েছে মিজান ও মাহফুজ নামে দুজনের লাশ।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের চন্দ্র মোহন বৈদ্দের ছেলে বিপ্লব চন্দ্র শুভ'র ফেসবুক আইডি থেকে তার বন্ধু তালিকার বেশ কয়েকজনের কাছে আল্লাহ এবং রাসূলকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ম্যাসেজ আসে। এই ম্যাসেজ আসাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মুসুল্লিরা ‘মুসলিম তাওহিদী জনতা’র  ব্যানারে আজ সকাল ১০টায় বিক্ষোভের ডাক দেন। সকাল থেকে বোরহানউদ্দিন উপজেলার গ্রামগঞ্জ থেকে মুসল্লিরা শহর অভিমুখে আসতে থাকে। এতে ভোলার পুলিশ সুপার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ মোতায়েন করেন। পুলিশ সভা সংক্ষিপ্ত করার জন্য নির্দেশ দেয়ার পর পরেই সংঘর্ষের শুরু হয়।

পুলিশের দাবি- প্রথমে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে সাংবাদিক-পুলিশসহ আহত হন অর্ধশতাধিক। আহতদের বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভোলা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়।

বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক মো. শাহীন জানিয়েছেন, গুলিতে নিহত দুইজনের মৃতদেহ তার হাসপাতালে রয়েছে। আরও দুইজনকে মৃত অবস্থায় ভোলা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়েছে বলে জেলার সিভিল সার্জন রথীন্দ্রনাথ রায় জানিয়েছেন।

থানা শহর এলাকা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গ্রামগঞ্জে বিক্ষোভ চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভোলা সদর পুলিশ লাইন্স থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ডেকে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া, বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। শনিবার অভিযুক্ত যুবকসহ আরো একজনকে আটকও করে পুলিশ।
বোরহানউদ্দিনে ‘মুসলিম তাওহিদী জনতা’র ব্যানারে সমাবেশ

র‌্যাগিংয়ের নামে বুয়েটে যেভাবে নির্যাতন হতো by পিয়াস সরকার

আসাদুল হক আসাদ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)’র দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। থাকেন শের-ই-বাংলা হলে। আর্কিটেকচার বিভাগের এই শিক্ষার্থী হলের প্রথম রাতের কথা বলতে রীতিমতো কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই রাতে তার মোবাইল ফোন দিয়ে ছোট বোনের ফোন রিসিভ করে অশ্লীল বিভিন্ন কথা বলা হয়। তিনি বলেন, সেই সময় আমার মনে হচ্ছিল। আত্মহত্যা করি। ছোট বোনের সামনে মুখ দেখাবো কী করে? বাবা মাকেই কী বলব।
শুধু আসাদ নন, তার মতো আরও অনেকে বুয়েটে পড়তে এসে ছাত্রলীগের ‘বড় ভাইদের’ হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
পড়তে হয়েছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। নানা সময়ে র‌্যাগিং-এর শিকার হয়েছেন এমন অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে মানবজমিন এর। তাদের বয়ানে উঠে এসেছে নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র।

নিজের জীবনের বাজে মুহুর্তের বর্ণনা দিয়ে আসাদ বলেন, আমি গ্রামের ছেলে। লালমনিরহাটের প্রত্যন্ত এলাকায় লেখাপড়া করেছি। বুয়েটে পড়বার সুযোগ মেলায় এলাকায় ‘হিরো’ বনে যাই। ভর্তি হবার পর আমার এলাকার এক ভাইয়ের সঙ্গে হলে থাকতাম। ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, থাকেন জসীম উদ্দিন হলে। সেখানে মাসখানেক থাকবার পর হলে সিট পাই। প্রথম যেদিন হলে উঠি সেদিন আমার মতো আরো ৫ জন শিক্ষার্থী ছিলো। সবাই ছিলো আমার পরিচিত আর আমাদের রাখা হয় একই রুমে। আমাদের রুম গোছানো শেষ হয় প্রায় রাত ৮টায়। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেবার সময় ডাক পড়ে সকলের। সারাদিনের ব্যস্ততা কাটিয়ে বেশ ক্লান্ত আমরা। প্রথমে বড় ভাইদের রুমে ডেকে নিয়ে যাবার সঙ্গে প্রত্যেককে একটি করে চড় মেরে স্বাগত জানানো হয়। এরপর শেখানো হয় নিয়ম কানুন। তখন রাত প্রায় ১২টা। এরপর শুরু হয় মানসিক নির্যাতন। আমার হাতে ছিলো মোবাইল ফোন। প্রশ্ন করেন, হাতে কী? মোবাইল জবাব দেবার পর বলে এটা ক্যামেরা, এটা স্পিকার, এটা ব্যাটারী কিন্তু মোবাইল কোনটা। এভাবে হেনস্থার একপর্যায়ে আমার ছোট বোন ফোন করে। ফোন ধরে অনিক ভাই (বুয়েট ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, অনিক সরকার। বর্তমানে বহিষ্কৃত। আবরার ফাহাদ হত্যার আসামি, আটক অবস্থায় রয়েছেন) যেসব কথা বলে, সেসব কথা মুখে বলার মতো না। আমি তার পা ধরে অনুরোধ করি এসব কথা না বলতে। এরপর কিছু সময় পর মোবাইল কেটে দেয় বোন। এরপর ফের ফোন দেয়। আমার বোন ফোন না ধরে ও বন্ধ করে রাখে।

আসাদের চোখ তখন বেশ অশ্রুসিক্ত। কথা বলতে যেন গলা আটকে আসছিলো। এরপর তিনি বলেন, একটা বিষয় খেয়াল করি। আমার বোনের সঙ্গে এভাবে কথা বলায় অনেকেই বিব্রত হয়। সেসময় জিওন ভাই (মেফতাহুল ইসলাম জিওন, বহিষ্কৃত হবার আগে ছিলেন বুয়েট ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক। আবরার হত্যার আসামি, তিনিও গ্রেপ্তার) বলেই বসে, বেশি হয়ে গেলো না। এই বলে জিওন ভাই চলে যায় রুম থেকে। আমার কারণে জিওন ভাই রুম থেকে চলে যাওয়ায় আরো ক্ষিপ্ত হয় অনিক ভাই। প্রায় ১০ মিনিট ধরে আমাকে থাপড়াতে থাকে। আমার গাল ফেটে রক্ত বের হবার পর ছেড়ে দেয়। অনিক ভাইও রুম থেকে চলে যায়। এরপরেও বাকীরা ভোর পর্যন্ত আমাদের সকলের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। এরপর আমার বোনকে বলি, মোবাইল চুরি হয়ে গেছে। কে ফোন ধরেছে জানি না। এখন নতুন আরেকটা ফোন নিয়েছি। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, আমি কাজী নজরুল ইসলাম হলে থাকি। ছাত্রলীগের বড় ভাইয়েরা গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে বসে গাজা খাচ্ছিলেন। আর হলের বড় ভাই, ছাত্রলীগের নেতার র‌্যাগিংয়ের অংশ হিসেবেই সেখানে গিয়েছিলাম। কেন সেখানে এত রাতে আমরা। এই নিয়ে শুরু হয় নির্যাতন। আমার সঙ্গে থাকা ২ জনকে নিয়ে যাওয়া হয় তিতুমীর হলে। সেখানে তারা কোন কথা না শুনেই মারতে থাকে। বাঁশের লাঠি ও স্টিলের স্লেল এক করে পেটাতে থাকে।

আমারা বারবার বড় ভাইদের নির্দেশেই গিয়েছিলাম বললেও কোন কথার জবাব দেয়না তারা। আমাদের ৪ জন ধরে নিয়ে যাবার পর সেই রুমে মোট ৯ জন উপস্থিত হন। এরপর তারা ৯ জন আর আমরা ৩ জন। এই নিয়ে ৩’র ঘরের নামতা পড়তে পড়তে পিঠানো শুরু। প্রথমে একজন ৩ টি আঘাত, এরপরজন ৬টি এভাবে শেষজন একাই মারেন ২৭টি। এভাবে চলতে থাকায় ব্যথায় কাতরাচ্ছিলাম। একজন মার সহ্য করতে না পেরে বমি করে দেয়। বমি করায় তার ওপর নেমে আসে অবর্ননীয় নির্যাতন। সেখানে সেই অবস্থায় তাকে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নেয়া হয়। এরই মাঝে মাথা ঘুরে পড়ে যায় সে। এরপর তারাই একটি সিএনজি ডেকে আনে। আর তাতে আমাদের তুলে দিয়ে পাঠিয়ে দেয় ঢাকা মেডিকেলে। আমাদের হাতে দেয় ৫শ’ টাকা। সেখানে আমার বন্ধু চিকিৎসাধীন থাকে ৮দিন। এরপর সে আর হলে উঠে নি। মেসে থেকে লেখাপড়া করছে।

তিতুমীর হলে থাকেন মিনার মাহমুদ। তিনি চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এটি তার প্রথম বর্ষের শেষের দিকের ঘটনা। প্রথম বর্ষ প্রায় শেষ হওয়ায় র‌্যাগিংও প্রায় শেষ। এইসময় একদিন ক্যান্টিনে খেতে গিয়েছিলেন মিনার। হলের বড় ভাইয়ের একটি দল সেখানে খেতে আসে। তার কানে হেডফোন থাকায় বড় ভাইয়েরা উঠতে বলেছিলেন তা শুনতে পাননি। মিনার বলেন, খাওয়া অবস্থায় আমাকে প্রথমে লাথি মেরে ফেলে দেয়া হয়। এরপর সোজা চড়, কিল, ঘুষি মারতে মারতে নিয়ে যায় একটি রুমে। সেখানে উলঙ্গ করে মারতে থাকে। প্রায় ঘণ্টাখানেক মারার পর পানি খেতে চাই। তখন তারা বলে, পানি খাবি। আয় তোরে পানি খাওয়াই। এই বলে নিয়ে যাওয়া হয় বাথরুমে। সেখানে নিয়ে আটকে রাখে ৬ ঘণ্টা। আর কিছু সময় পর পর তারা এসে গান গাওয়ার জন্য বলে। উচ্চ শব্দে গান গাইতে হয়। হেড ফোন লাগিয়ে গান শুনছিলাম এই অপরাধেই গান গাইতে হয় আমাকে। আর মাঝে মধ্যে দরজা খুলে মারতে থাকে তারা।

বিএনপি’র হাতে সময় খুব কম :- কর্নেল (অব.) অলি by শাহনেওয়াজ বাবলু

কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। একজন রাজনীতিবিদ। রাজপথের লড়াকু সৈনিক । মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক। একাধিকবারের সংসদ সদস্য। ছিলেন মন্ত্রীও। খোলামেলা কথা বলতে পছন্দ করেন। এ খোলামেলা কথা বলা নিয়েই তার নিজ দল বিএনপির সঙ্গে শুরু হয় দূরত্ব।
একসময় হয়ে পড়েন বিচ্ছিন্ন। নিজে দল করেন। লিবারেল ডেমোক্রেট পার্টি। সংক্ষেপে এলডিপি। বর্তমানে দলটির চেয়ারম্যান তিনি। বিএনপি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এর সঙ্গে তিনি জড়িত। বিশেষ করে বিএনপি নামটিও তার দেয়া। এ কারণে যত দূরেই যান না কেন বিএনপি তার মনে প্রাণে। বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তার মুখে এখন হতাশার সুর। বলেন, আগেকার বিএনপি আর এখনকার বিএনপি এক নয়। তারপরও তিনি আশাবাদী। বলেন, সঠিক নেতৃত্ব পেলে বিএনপি আবারো ক্ষমতায় আসবে। এজন্য নেতাকর্মীদের সঠিক নেতা বেছে নিতে হবে বলে মন্তব্য তার।

তবে, তার কথা- বিএনপির হাতে সময় খুব কম। গতকাল এ রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সমসাময়িক বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। দীর্ঘ আলাপচারিতায় কখনো ফিরে যান অতীতে। কখনো ভবিষ্যৎ ভাবনায় তাড়িত হন। বিএনপির প্রসঙ্গ আসতেই বলেন, এ নামটিও আমার দেয়া। অতীতে ফিরে গিয়ে বলেন, ১৯৭৭ সালে এই নামটি একটি কাগজে আমিই লিখেছিলাম। ওই সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা তানভীর আহমেদ ও প্রফেসর আরিফ মঈনুদ্দিন। ওই কাগজটা এখনো আমার কাছে আছে। কর্নেল অলি বলেন, বিভিন্ন সময়ে সংগ্রাম এবং ক্ষমতায় থাকার কারণে বিএনপি একটি সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। সঠিক নেতৃত্ব পেলে বিএনপি টিকে থাকবে। ক্ষমতায় আসবে। ২০ দলীয় জোট প্রসঙ্গে অলির ভাষ্য জোটের মূল দায়িত্ব হচ্ছে বিএনপির। তারা কখনো ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে ব্যস্ত, আবার কখনো কখনো নিজেদের দলের জনসমাবেশ নিয়ে ব্যস্ত। ২৪ ঘণ্টার নোটিশে হঠাৎ হঠাৎ ২০ দলের বৈঠকও ডাকেন তারা।

অনেক সময় দেখা যায় বিএনপির সিনিয়র নেতারা ঢাকায় উপস্থিত থাকেন না বৈঠকের সময়। ২০ দলীয় জোট যে কার্যকর আছে সেটা বলা যাবে না। বিএনপি এখন ঐক্যফ্রন্টকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। আর তারা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বকেই পছন্দ করেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্ভাবনাময় এবং তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদদের নিয়ে একটি জাতীয় মুক্তি মঞ্চ গঠন করেছি। এই মঞ্চের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং পুনঃনির্বাচনে সরকারকে বাধ্য করা। কারণ গত জাতীয় নির্বাচন আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই পরবর্তীতে কোনো নির্বাচনে মঞ্চের কোনো সদস্য অংশ নেয়নি। অন্যদিকে বিএনপি বলেছিল, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও এর ফলাফল তাদের গ্রহণযোগ্য নয় এবং তারা সেটা প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন হয়নি। বিএনপির নির্বাচিত সদস্যরা সংসদে যোগদান করেছে এবং পরবর্তীতে প্রত্যেকটা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এ ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য ভিন্ন। এক কথায় বলতে গেলে জাতীয় মুক্তি মঞ্চের বক্তব্য হচ্ছে, জাতিকে মুক্ত করা এবং সরকারকে পুনর্নির্বাচনে বাধ্য করা।
২০ দলের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, ২০ দলের সঙ্গে জামায়াতের কি সমস্যা এ বিষয়ে আমার মন্তব্য করা উচিত হবে না। আমি শুধু বিশ্বাস করি জোটের সঙ্গে যে বা যারাই আছে, চিন্তা ভাবনা করেই তাদের অতীতের কর্মকাণ্ড, সামাজিক অবস্থান, দলের অবস্থান, জনগণের মতামত সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই জোটে বা ঐক্যজোটে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এটা কোনো ফুটপাথের দোকানিদের সংগঠন না। এটা একটা রাজনৈতিক দলের জোট। ২০ দলের সঙ্গে তার দলের সম্পর্ক নিয়ে বলেন, বহুদিন ধরে ২০ দলীয় নেতাদের সঙ্গে আমার দেখা বা কথা বলার সুযোগ হয়নি। আপাতত আমি জাতীয় মুক্তি মঞ্চ নিয়ে দেশকে মুক্ত করার কাজেই ব্যস্ত।

আর ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ২০ দলের কোনো সম্পর্ক নেই। উভয়ই নিজ নিজ কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রথম দিকে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন আমাকে এর দ্বিতীয় নেতা হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাতে আমি রাজি হইনি। কারণ একদিকে ২০ দল, অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্ট এতে করে জনমনে ভুল বোঝাবুঝি হওয়ার অবকাশ ছিল। মানুষ মনে করতো আসলে আমি কে বা কার লোক। সামনে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ২০ দলের যৌথ কর্মসূচির প্রসঙ্গ টানতেই বলেন, এখন আর সে সময় নাই।

দেশের সমসাময়িক ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? এ প্রশ্নের উত্তরে কর্নেল অলি বলেন, বর্তমানে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজগুলোতে লেখাপড়ার কোনো হদিস নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সন্ত্রাসী তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। আমরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কোমলমতি ছেলেমেয়েদের হাতে অবৈধ অস্ত্র তুলে দিচ্ছি। দেশকে মেধাশূন্য করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছি। এর জন্য রাজনীতিবিদরা যেভাবে দায়ী ঠিক তেমনি শিক্ষকরাও এর দায় এড়াতে পারে না। দেশে লেজুরভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন খুব জরুরি। কারণ তারাই আমাদের আগামীর জাতির মেরুদণ্ড। আর এই ছাত্রদের ন্যায় এবং সত্যের পথে নিয়ে যাওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কি করছেন? কর্নেল অলি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর প্রথম এলডিপির পক্ষ থেকে সরকারের সমালোচনা করে আমরা সংবাদ সম্মেলন করি। উনার মুক্তির দাবিতে প্রায় দশ দিন টানা কর্মসূচি পালন করেছি। আমি মনে করি কোনো যুক্তি সঙ্গত কারণ ছাড়াই প্রতিশোধের রাজনীতি চরিতার্থ করার জন্য এবং জাতীয়তাবাদী শক্তিকে আটকে রাখার জন্যই বেগম খালেদা জিয়াকে আটকে রাখা হয়েছে। জিয়া পরিবারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ১৯৭০ সাল থেকে। আমি মনে করি খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কাজ করা আমার পবিত্র দায়িত্ব। এই পবিত্র দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কখনোই পিছপা হবো না। কারো জ্ঞান শুনে আমি রাজনীতি করি না। স্বাধীনতা যুদ্ধে তরুণ একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে যুদ্ধ করেছি। এদেশকে আমরা ভালোবাসি। চোখের সামনে দেশটাকে ধ্বংস হতে দিতে পারি না। এই দেশ রক্ষায় শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

জাতীয় মুক্তি মঞ্চের ব্যাপারে তার কথা- মুক্তি মঞ্চ তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে। এটা কোনো ব্যক্তি, কোনো নেতা বা কোনো দলের ওপর নির্ভরশীল নয়। নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করে পুনঃনির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য জনমনে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে পশ্চিমাদেরকে কি ছাড়িয়ে গেছে চীন? by আফসান চৌধুরী

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত ঘৃণা এবং সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এর রাজনৈতিক রূপটি যদিও অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক এবং সেটার শুরু হয় ব্রিটিশ শাসনামলে, তবে এর মূল রয়ে গেছে আরও আগে, মুঘল আমলের মধ্যে। চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের মানুষেরা উভয়েই একে অন্যের এলাকায় বহু শতাব্দি ধরে অভিবাসিত হয়ে আসছে। শায়েস্তা খান যখন চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব নেন তখন সেটা মোং রাজাদের অধীনস্থ ছিল।

যাদেরকে রোহিঙ্গা বলা হচ্ছে, ইতিহাসে তাদের আগমণ সম্প্রতিকালে। এরা মূলত অভিবাসী শ্রমিক যারা জীবিকার জন্য বহু শতাব্দি ধরে নিজেদের কাছাকাছি এলাকায় অভিবাসন করে আসছে কিন্তু এখন ইতিহাসের খারাপ একটা মুহূর্তে এসে আটকা পড়ে গেছে। মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন শ্রেণী বেশ কিছুকাল ধরে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য অভিবাসী- বর্ণবাদী কার্ড ব্যবহার শুরু করেছে। ইঙ্গ-বার্মিজ যুদ্ধের পর এবং তারও পরে রোহিঙ্গা-বিরোধী মানসিকতা দেখা দিতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রোহিঙ্গারা ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত ছিল আর মিয়ানমারের জনগণ পক্ষ নিয়েছিল দখলদার জাপানিজদের।

খোলামেলা বর্ণবাদ ভাল কাজ দেয় মিয়ানমারে

বিংশ শতকের শুরুর দিকেও রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার আন্দোলন জোরদার ছিল এবং যুদ্ধের পর ভারতে নতুন রাজ্য সৃষ্ট হলে, রোহিঙ্গারা পাকিস্তানের সাথে যোগ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমার যেহেতু আলাদা উপনিবেশ ছিল এবং ভারতের অংশ ছিল না, তাই সেটা ঘটেনি। পরে, এই সম্পর্কের অবনতি অব্যাহত থাকে এবং এই কৃষি-নির্ভর চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠিটি ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হয়। ১৯৭৭-৭৮ সালে তাদেরকে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়া হয় কিন্তু পরে আন্তর্জাতিক চাপে তারা তাদেরকে ফেরত নিতে বাধ্য হয়।

১৯৮২ সালে রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিকত্বের স্ট্যাটাস হারায়। ১৯৯২ সালে আবারও তাদের বের করে দেয়া শুরু হয় এবং আবারও তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তবে, সবশেষ ২০১৭ সালে সবচেয়ে বড় সংখ্যায় রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা হয়েছে এবং তাদের ফিরিয়ে না নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার একটা শক্ত অবস্থান নিয়েছে।

মিয়ানমার একটা খোলামেলা বর্ণবাদী দেশ যেমনটা বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশে বর্ণবাদ যা আছে, তা গোপন রয়েছে যদিও সংখ্যালঘুরা এখানেও সমস্যায় পড়ছে। মিয়ানমারে এই সমস্যা অনেক তীব্র। রোহিঙ্গারা যেহেতু মোঙ্গল বংশোদ্ভূত নয় এবং তাদের ভাষা যেহেতু এক নয়, তাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলাটা তাই সহজ হয়েছে। এই জাতিগত বৈষম্য থেকে মিয়ানমার কি অর্জন করেছে, সেটা সবসময় স্পষ্ট হয়নি, কারণ রোহিঙ্গারা কখনই অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না এবং সেখানে কখনও ভূমির সঙ্কটও ছিল না।

তবে, সাধারণভাবে এই গ্রুপসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির বিরুদ্ধে সামাজিক ঘৃণা সবসময় সেখানকার মোঙ্গল বংশোদ্ভূত বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে সহায়তা করেছে। তারা যেটা দেখছে, সেটা সম্ভবত ভারতে মুসলিমদের অভিজ্ঞতার মতো একই রকম, বহিরাগত হিসেবে যাদেরকে দেখা হয়, হয় পাকিস্তানী, না হয় বাংলাদেশী। কিন্তু রোহিঙ্গাদের জন্য কোন কাশ্মীর নেই যেমন বাংলাদেশের এ অঞ্চলে কোন ভূ-কৌশলগত ভূমিকা নেই।

এই সঙ্কটের সাথে বহু মানুষ ও ক্ষমতা জড়িত কিন্তু এখানে একটা প্রধান ভূমিকা পালন করছে চীন।

চীনের অর্জনের জন্য আরসা কোন হুমকি নয়

অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ যথেষ্ট মিয়ানমারপন্থী ও সু চিপন্থী ছিল এবং রোহিঙ্গাদের ইস্যুটিকে বিশেষ করে গেরিলা রোহিঙ্গা সংগঠন আরসাকে তারা সম্ভাব্য ইসলামপন্থীদের ইস্যু হিসেবে দেখে এসেছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠেছে যে তাদের মতো দুর্বল একটি সংগঠন কিভাবে মিয়ানমারের আউটপোস্টে হামলা করলো? এখানে কি কোন বিদেশী ভূমিকা ছিল যে, এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার পাল্টা হামলা করলো এবং তার ফলশ্রুতিতে রোহিঙ্গাদের বের হয়ে যেতে হলো।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী আশা করেনি যে এই ঘটনার ফলশ্রুতিতে তাদের সুনামের এতটা ক্ষতি হবে কারণ মিডিয়া, মানবাধিকার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো তাদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যার উদ্দেশ্যে’ অভিযান চালানোর অভিযোগ এনেছে। এর অর্থ হলো মিয়ানমারের সাথে এখন ব্যবসা করাটা কিছুটা হলেও অনৈতিক। ইতোমধ্যে, সু চি’র যশ খ্যাতি বিলুপ্ত হয়েছে এবং সামরিক জেনারেলরা আরও প্রভাব অর্জন করেছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের চাবিকাঠি এখন তাদের হাতেই রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন সাধারণ জনগণের মধ্যে অজনপ্রিয় ছিল কিন্তু রোহিঙ্গাদের বের করে দেয়ায় তাদের জনপ্রিয়তা এখন বেড়েছে।

পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা সে সময় ধারণা করেছিলো যে মিয়ানমারে চীনের প্রভাব হ্রাস পেতে শুরু করেছে এবং মিয়ানমার এখন নিজেকে ধরে রাখতে সক্ষম। কিন্তু এক বছর পরেই, চীন এখনও সেখানে অজনপ্রিয় হলেও তাদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করে। চীনই এখন একমাত্র বড় দেশ যারা তাদের অর্থনৈতিক বিনিময় এবং তাদের প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি পেলে জাতিগত নিধনের বিষয়টিকে এড়িয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছে। পুরো বিশ্ব যেখানে কিছুটা পিছিয়ে এসেছে, সেখানে চীন আরও এগিয়ে গেছে এবং মিয়ানমারকে তাদের উপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।

ইতোমধ্যে আরসা কোন ধরনের ‘চরমপন্থী বিস্ফোরণ’ ঘটায়নি, যেটা সবাই ধারণা করেছিল এবং বাংলাদেশেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোন ধরনের সন্ত্রাসী হামলাও হয়নি যদিও আরসার সাথে সম্পৃক্ততার সন্দেহে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে, বাংলাদেশে নিজস্ব চরমপন্থী গ্রুপ রয়েছে কিন্তু আরসার সাথে তাদের সম্পর্কের কোন অগ্রগতি হয়নি।

বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ও চীন

রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। চীন মিয়ানমারের সাথে একটা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছিল, যেটা স্বাভাবিকভাবেই কাজ করেনি। বাংলাদেশের সরকারী বলয়ে এই ধারণাটা ক্রমেই বাড়ছে যে, রোহিঙ্গারা এখানে স্থায়ীভাবে থাকতেই এসেছে। তহবিল ঠিকঠাক মতো পাওয়া গেলে বাংলাদেশ এ বিষয়টি নিয়ে হয়তো অতটা তোড়জোড় করবে না।

এদিকে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য অগ্রাধিকার হওয়ায় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা একটা দ্বিমুখী প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ চায় শরণার্থীরা বাড়ি ফিরে যাক এবং এজন্য তারা চীনকে সহায়তা করার অনুরোধ করেছে। চীন প্রতিশ্রুতি দিলেও খুব বেশি বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে, বাণিজ্য সম্পর্ক যথেষ্ট ইতিবাচক গতিতে চলছে এবং চীনের সহায়তার কারণে ভারতের উপর বাংলাদেশের একক নির্ভরতার জায়গাটিতে কিছুটা হলেও ভারসাম্য এসেছে।

বাংলাদেশ খুব একটা তোড়জোড় করবে না এবং সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সামনে এগুবে। মিয়ানমারে দুটো জিনিস অর্জনে সক্ষম হয়েছে চীন। পশ্চিমাদের হুমকি থেকে মুক্ত হয়েছে তারা, যেটা মিয়ানমারে তাদের একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারতো আর নিজেদের প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে আরও বেশি প্রতিশ্রুতি পেয়েছে তারা। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে চলে আসার আগে মিয়ানমারের চীনকে যতটা প্রয়োজন ছিল, এখন তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন তাদের।

এই দুটো বিষয়ের মধ্যে কোন যোগাযোগ আছে কি না, সেটা জানা না গেলেও এতে কোন সন্দেহ নেই যে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সহায়তা করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের যে সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল, সেই জায়গাটা ভালোই সামলেছে তারা।

বাংলাদেশে জোরপূর্বক বিয়ে এবং একজন জাহানের পরিণতি -নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট

বাংলাদেশে জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা ব্যাপক। ইউনিসেফের মতে, এখানে ১৮ বছরের মধ্যে বিয়ে দেয়া হয় শতকরা ৫৯ ভাগ মেয়েকে। জোরপূর্বক বিয়ের পর এসব মেয়ের পরিণতি খুব একটা ভাল হয় না। নানা রকম অনিয়ম, নির্যাতনের শিকার হন তারা। কিন্তু মানসম্মান, পরিবারের কথা চিন্তা করে মুখ বুজে সয়ে যান তার সবটাই তারা। তারই একটি উদাহরণ তুলে ধরেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। এতে বাংলাদেশী একটি মেয়ে জাহানের দুর্দশার কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ঢাকায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসবাস করছিলেন তিনি।
পড়ছিলেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং। স্বপ্ন দেখতেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে আত্মনির্ভরশীল হবেন।  কিন্তু এর মধ্যে ব্যাঘাত ঘটে। তাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এক পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়। দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর দেখা দেয় নানা বিপত্তি। তার স্বামী চান তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে। অর্থাৎ তিনি যেমনটা বলবেন জাহানকে সেভাবেই চলতে হবে। এ নিয়ে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে রাস্তায় তাদের মধ্যে প্রচ- বাকবিতন্ডা হয়। ব্যস প্রকাশ হয়ে পড়ে সব কিছু।
সেটা ছিল গত বছরের মধ্য আগষ্ট। এদিন সরকারি স্কুলের থিরেটারের শিক্ষিকা ক্যারি এলম্যান লারসেন প্রসপেক্ট পার্কের পাশে এক প্রতিবশেীর বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখতে পান একজন পুরুষ এক যুবতীকে শক্ত করে চেপে ধরে আছে। আর ওই যুবতী তার কাছ থেকে ছোটার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তারা বাংলায় কথা বলছিলেন। ফলে এলম্যান লারসেন তাদের কথা বলতে পারছিলেন না। তবে তিনি এটুকু বুঝতে পেরেছেন যে কিছু একটা গ-গোল আছে। তিনি তাদের কাছে জানতে চান, সব ঠিকঠাক আছে? জবাবে পুরুষ ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মানসিক রোগি বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু তার উত্তরে সন্তষ্টু হতে পারেন নি এলম্যান লারসেন। লোকজন জড়ো হয়ে যায় তাদের পাশে। এলম্যান লারসেনকে তারা বলতে থাকেন, ওদেরকে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন। এটা একটি বাঙালি সমস্যা। আমরা তাদেরকে সাহায্য করবো।
কিন্তু সন্দেহ যায় না এলম্যান লারসেনের। তিনি ওই যুবতীর সঙ্গে কথা বলতে চান। শেষ পর্যন্ত ওই যুবতী তাকে ইংরেজিতে বলেন ‘ফোর্সড ম্যারিজ’। আমি নিরাপদ নই। দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন।
সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন প্রতিবেশী জরুরি নম্বর ৯১১-এ ফোন করেন। পুলিশ উপস্থিত হয় ঘটনাস্থলে। এলম্যান লারসেন তাদেরকে জানান, কিছু একটা ঘটেছে। যা আমি বুঝতে পারছি না।
জোরপূর্বক বিয়ের কাহিনী
ওই রাতে জানা যায়, ২০ বছর বয়সী ওই অভিবাসী যুবতীর নাম জাহান। তার পুরো নাম এখানে নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ করা হচ্ছে না। তিনিই তার কাহিনী জানিয়েছেন। তার মতো এমন অনেকে আছেন যারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেয়া হবে, পরিবারের মান সম্মানের কথা চিন্তা করে অনেক নির্যাতন সহ্য করে বসবাস করছেন। বসবাস করছেন ঝুঁকি নিয়ে। তাদের মধ্যে জাহান একজন। ব্রুকলিনের ওই ঘটনার মাত্র তিন মাস আগে তিনি নিউ ইয়র্কে গিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে তিনি সেখানে গিয়েছেন। কিভাবে তার বিয়ে হয়, কিভাবে নিউ ইয়র্ক যান তারও একটি বর্ণনা দিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
২০১৭ সালের কোনো এক বিকেল। জাহানের পিতামাতা তাকে বললেন, আত্মীয় আসবে। তিনি যেন ভালভাবে পোশাক পরে প্রস্তুত থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ৩০ বছর বয়সী এক যুবককে সঙ্গে নিয়ে জাহানদের বাসায় প্রবেশ করেন এক বয়স্ক দম্পতি। বলা হয়, অচেনা ওই যুবকের সঙ্গে জাহানের বিয়ে হবে। জাহান বলেন, এটা জানতে পেরে বিস্মিত হই। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকি।
এর আগেও তার বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। প্রতিবারই এমন ঘটনায় তিনি পালিয়েছেন অথবা খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। জাহান বলেন, পিতামাতাকে বলেছি, আমাকে এখন বিয়ে দিও না। আমাকে একটু সময় দাও। দুই-তিন বছরের মধ্যে বিয়ে করবো। কিন্তু এখন না, প্লিজ।
কিন্তু শেষ দফায় পিতামাতা তাকে বলে দিলেন, এখন সময় হয়ে গেছে। আর দেরি নয়। ব্যাস বিয়ে হয়ে যায়। দু’দিনের জন্য হানিমুনে যান তারা। সঙ্গে যায় তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন। বোনের বিপদআপদের কথা মাথায় রেখে সঙ্গে যান তার এক বড়ভাইও। সেই হানিমুনে গিয়ে ভোর ৪টার দিকে ভাইয়ের হোটেল কক্ষের দরজায় নক করেন জাহান। এ সম্পর্কে জাহানের ওই ভাই বলেছেন, দরজা খুলতেই জাহান আমাকে জড়িয়ে ধরলো। একটানা কেঁদে যেতে লাগলো। তিনি বাংলাদেশ থেকে টেলিফোনে এসব কথা জানিয়েছেন নিউ ইয়র্ক টাইমসকে। তিনি আরো বলেছেন, ওই সময় জাহান আমাকে বলেছিল ভাই আমাকে বাঁচাও।
হানিমুন শেষে জাহানের স্বামী ফিরে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে গিয়ে স্ত্রীর জন্য ভিসা আবেদন করেন। অন্যদিকে দেশে পরিবারের সদস্যদের কাছে জাহান কাকুতি জানান বিয়েটা বাতিল করে দিতে। এক পর্যায়ে তার পিতামাতা জানতে পারেন জাহান বিচ্ছেদ সম্পর্কিত একজন আইনজীবীর কাছে যোগাযোগ করছে। এটা জানতে পেরে তারা জাহানকে ‘পতিতা’ আখ্যা দেন। পড়াশোনা বন্ধ করে দেন। ঘরে আটকে রাখেন। তার বিরুদ্ধে নৃশংস হয়ে ওঠেন। এসব তথ্য দিয়েছেন জাহান।
তার ভাই বলেছেন, জাহান ভীষণ হতাশায় ভুগছিল। তাই তিনি বোনের পাশে দাঁড়ান। বলেন, ওই সময়ে জাহানের করার কিছুই ছিল না। ভাগ্যের ওপর নিজেকে ছেড়ে দেন জাহান। এক বছর পরে তার স্বামী বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তাদের সম্মানে পার্টি আয়োজন করা হয়। শুধু তখনই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলেন জাহান। এরপর তারা দু’জনে একসঙ্গে চলে যান নিউ ইয়র্কে।
প্রাধান্য বিস্তার করেন স্বামী
২০১৮ সালের মে মাস। কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন জাহান দম্পতি। নিউ ইয়র্কে তাদের প্রথম রাত। স্বামীর কাছে জাহান অনুরোধ করলেন, তাদের প্রথমে দু’জনকে ভালভাবে জানা উচিত। যদি তিনি তাকে বলিউডের কোনো ছবি দেখাতে নিয়ে যান অথবা শহরে ঘোরার সময় তার হাত ধরে রাখেনÑ তাতে খুশি হবেন জাহান। কিন্তু তার এসব কথায় সম্মত হলেন না তার স্বামী।
তার বালাদেশী ওই স্বামী মনে করেন তিনি যেটা বলবেন সেটা তার দাম্পত্য অধিকার। জাহান বলেন, আমি কাঁদতে থাকি। কিন্তু সে কেয়ার করে না তাতে। জাহানের হাতে নিজেই ক্ষত করেছেন। তাকে বলা হয়েছে, যদি তিনি তার স্বামীকে ছেড়ে দেন বা দেয়ার চেষ্টা করেন তাহলে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। নিউ ইয়র্কে পৌঁছার পর তার পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছেন তার স্বামী। তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কলেজে ভর্তি করে দেবেন। অথবা তাকে কাজ করতে বাধা দেবেন না। জাহান বলেন, আমার কাছে কোনো অর্থ ছিল না। বাসার কোনো চাবি পর্যন্ত আমাকে দেয়া হয় নি। সব কিছুতেই থাকতো তার প্রাধান্য।
এ বিষয়ে জাহানের স্বামীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস। এ সময় তিনি স্ত্রীর ওপর সহিংসতা বা নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। চ্যালেঞ্জ জানান। বলেন, তাদের বিয়ে জোরপূর্বক ছিল না। এ সময় তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, কিভাবে তার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। জবাবে তিনি বলেছেন, পারিবারিকভাবে। কিভাবে বিয়ে হয়েছে এ প্রশ্নের উত্তর দেন নি তিনি।
ব্রুকলিনে এক রোববারের রাতে বার্ষিক এক বাংলাদেশী মেলায় জাহানকে নিয়ে গিয়েছিলেন তার স্বামী। এ সময় তিনি তাকে হাসতে বলেন, যাতে মানুষজন দেখে ভাবে তাদের মধ্যে মধুর ভালবাসা। তার কথামতো কাজ করেছেন জাহান। কিন্তু ওই রাতে যখন তারা বাসায় ফিরছিলেন, তখন জাহানের মনে হলো এভাবে আর নয়। তাই তিনি দৌড়াতে শুরু করেন। দৌড়ে কোথায় যাবেনÑ সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না তার। কিন্তু পিছন থেকে তাকে ধরে ফেলেন তার স্বামী।
আর এই দৃশ্যই দেখতে পান এলম্যান লারসেন। তিনিই জাহানের সহায়তায় এগিয়ে যান। লারসেন বলেছেন, ওই মেয়েটির কোনো সাপোর্ট নেই। সে কাউকে চেনে না। আমরা তার একজন বন্ধু খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সে কাউকে চেনে না। তার কাছে ছিল না কিছুই। এ অবস্থায় বাংলাদেশে ফোন করলো পুলিশ। তার পিতা বললেন, স্বামীর সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া উচিত জাহানের। কারণ, স্বামীর সঙ্গেই তাকে থাকতে হবে।
এ অবস্থায় নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন এলম্যান লারসেন। তিনি নিজের ফেসবুকে একটি বার্তা পোস্ট করেন। তাতে লেখেনম ‘ঠিক এই মুহূর্তে একজন বাঙালি নারী আইনজীবী প্রয়োজন আমার’।
এই ম্যাসেজটি চোখে পড়লো বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন মুসলিম নারীবাদী শাহানা হানিফের। তিনি অবিলম্বে যোগাযোগ করলেন। জাহানকে কোথায় রাখা যায় তা খুঁজে পেতে চেষ্টা করলেন। কয়েক ঘন্টা চেষ্টা করে তিনি স্থানীয় একটি মসজিদ পেলেন। সেখানে অভিবাসী মুসলিম নারীরা নিরাপদে থাকেন। তারা জাহানের কাছে চলে গেলেন রাত ২টায়। এর তিন দিন পরে পুলিশে রিপোর্ট করেন জাহান।

আল্লামা ইকবাল : স্বাধীন কাশ্মির আন্দোলনের ‘ফাউন্ডার’ by জি. মুনীর

আল্লামা ইকবাল
একজন নেতা, লেখক কিংবা কবির জীবনে স্মরণীয় দিনটি আসে তখন, যখন তিনি দেখতে পান তার ধারণা বাস্তব রূপ নিয়েছে। মহাকবি ইকবাল সে দিনটি পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেননি, যেদিন দক্ষিণ-এশিয়ায় তার স্বপ্নের স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন বস্তবে রূপ নেয় ১৯৪৭ সালের ১ আগস্ট। তিনি মুসলিম লীগ নেতাদের গ্যালাক্সির কোনো অংশ ছিলেন না, যারা ১৯৩০ সালের ২৪ মার্চ লাহোরের মিন্টু পার্কে সমবেত হয়েছিলেন। সেখানে আগ্রহী জনতা সমবেত হয়েছিল ইকবালের ‘মুসলিম হোমল্যান্ড’ ধারণাকে স্বাগত জানাতে। এই ধারণা কবি ইকবাল দিয়েছিলেন ১৯৩০ সালের ৩০ ডিসেম্বর, এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে। তার এই ধারণা এই সম্মেলনে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। তার এই লাহোর প্রস্তাব এখন পাকিস্তানে বহুল পরিচিত। এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার দুই বছর আগেই তিনি এই জাগতিক দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। তার জীবনে একটি স্মরণীয় দিন ছিল সেটি, যখন জম্মু ও কাশ্মিরের জনগণ বিদ্রোহ করেছিল বর্বর সামন্ত স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। তিনি সেই দিনটিতে দেখতে পেয়েছিলেন, তার আলাদা ‘মুসলিম হোমল্যান্ডের’ স্বপ্ন একদিন বাস্তবায়িত হবে।

ড. মুমতাজ হাসান বলেছেন, একদিন তিনি আল্লামা ইকবালের সাথে বসে কাশ্মিরের রাজনৈতিক লড়াই নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন কথা হচ্ছিল ১৯২০ সালে কাশ্মিরের নিশারবাগে থাকাকালে তার লেখা ‘পয়াম-এ- মাশরিকির’ বইয়ের কবিতা ‘সাকি নামা’ নিয়ে। তখন আল্লামা ইকবাল তাকে বলেছিলেন, ‘এই কবিতার একটি পঙ্ক্তিতে আমি উল্লেখ করেছি সিল্ক কারখানা ও সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের সম্পর্কে। আমি অভিভূত হয়েছিলাম, কাশ্মিরের রাজনৈতিক লড়াই ১৯২৪ সালে সূচনা হয়েছিল এই রেশম কারখানার শ্রমিকদের এক বিদ্রোহের মাধ্যমে।’

ড. মুমতাজ জানিয়েছেন, তার কাছে ‘পয়াম-এ-মাশরিকি’র বইয়ের একটি কপি রয়েছে, যাতে আল্লামা ইকবালের স্বাক্ষর রয়েছে। এই কবিতার বইটি ছাপা হয়েছিল ১৯৩২ সালে। এর শুরুতেই রয়েছে ‘বারেশাম-কাবা’ নামের কবিতাটি। একই কবিতায় আল্লামা ইকবাল আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন : ‘Bring revolution in the hearts of Kashmiris, so that they can leave with honour in this world....(Rozgar-e- Fiqar, page 359)। আল্লামা ইকবাল এক চিঠির মাধ্যমে একই কথা জানিয়েছেন মৌলভী আবদুল হকের কাছে (Allama Iqbal aur Abdul HaQ, Letters, page56)। এক বছর আগে কাউন্টার কারেন্টে প্রকাশিত একটি লেখায় শ্রীনগরের লেখক ও কলামিস্ট জেড. জি মাহমুদ ১৯০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলনে ইকবালের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন, তার দৃষ্টিতে কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলনে নবযুগ সূচনাকারী কবি আল্লামা ইকবাল ‘ফাউন্ডারের’ ভূমিকা পালন করেন। অস্বীকার করার উপায় নেই এ ক্ষেত্রে ইকবাল ছিলেন ‘গাইডিং লাইট’। ইকবালকে এমনটিই অভিহিত করেছেন কাশ্মির কমিটির আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত স্কলার হাফিজ মালিক। আসলে ইকবাল ছিলেন কাশ্মিরের জনগণের পক্ষে জনমত গঠন ১৯৩১ সালের ১৪ আগস্টে ‘কাশ্মির ডে’ উদযাপনে এক প্রেরণাশক্তি।

তখন গোটা ভারত থেকে মুসলমানেরা সে দিবস উদযাপনে সমবেত হয়েছিল কাশ্মিরের প্রতি সমর্থন জানাতে। সেখানে ইকবাল একটি আহ্বান প্রকাশ করেন, যাতে অন্য আরো কয়েকজন স্বাক্ষর করেছিলেন। এই আহ্বানটি ছিল এরূপ : ‘‘After attacking repeatedly the enemy has deluded itself into believing that Muslims are dead nation. To refute this misbelief, you must make the Kashmir Day a resounding success, By actions, Muslims must demonstrate that they were not going to be willing victims of their enemies injustice and repression’.

‘জুলাই ম্যাসাকার’ ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল ইকবালের মনে। এটি তার হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। তিনি সন্ত্রাসের শিকার লোকদের জন্য সাহায্য সংগ্রহ করেন। তিনি সংগৃহীত অর্থ কাশ্মিরের নেতাদের কাছে পাঠান। সেই সাথে তিনি কিছু সুপরিচিত আইনজীবীদের কাশ্মির সফরের আহ্বান জানান। তিনি কারাগারে থাকা কাশ্মিরিদের আইনি সহায়তা দেয়ার আহ্বানও জানান। কর্তৃপক্ষ এসব নেতাদের বহিষ্কার করে। ড. ইকবালসহ আরো কিছু নেতাকে কাশ্মিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ড. হাফিজ মালিক তার লেখায় সবিশেষ উল্লেখ্য করেন- ‘ইকবালের কর্মতৎপরতার কারণে ব্রিটিশ সরকার নিয়োগ করেন গ্ল্যান্সি কমিশন। এই কমিশন এই রাজ্যে ব্যাপক তদন্তের পর বিভিন্ন ধরনের সাংবিধানিক সংস্কারের সুপারিশ করে।’

তখন ভারতের অনেক কাশ্মিরি বংশোদ্ভূত মুসলমান ছিল, যাদের কাশ্মির সম্পর্কে তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। এমনকি তাদের মধ্যেও ১৯৩১ সালের ১৪ আগস্টে কাশ্মির দিবসে মুসলমানদের সম্পর্কে ইকবালের ঝড় তোলা বক্তব্য এক জাগরণের সৃষ্টি করে। বিশেষত, জম্মু কাশ্মিরের মুসলমানদের ব্যাপারে পাঞ্জাবের মুসলমানদের সবচেয়ে বেশি জাগরণ দেখা দেয়।

ড. ইকবাল বেশ কিছু কুৎসিৎ উদ্যোগ নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কিছু মহল কাশ্মির কমিটিকে বিশেষ কোনো ধর্মীয় মতবাদ ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছিল, যা আসলে ইসলামের প্রকৃত ধর্মবিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এর ফলে কাশ্মিরি মুসলমানদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হতে পারত, যা ইতোমধ্যেই তিনটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। তিনি কাশ্মির আন্দোলনকে ১৯২০ সালের খিলাফত আন্দোলনের সাথে সমীকরণ করেন, যার ফলে বাস্তবে কাশ্মির আন্দোলন জোরদার হয়। কাশ্মিরের জনগণকে সহায়তা দেয়ার জন্য ১৯৩৩ সালের ৩০ জুন তিনি এবং মালিক বরকত আলী একটি আহ্বান প্রকাশ করেন কাশ্মিরের লোকদের সহায়তা করতে ও তহবিল সংগ্রহ করতে। তাদের আহ্বান ছিল : ‘Kashmiris are an inseparable part of the Muslim Nations, and to separate their fate from our national destiny amounts to cosign the entire nation to self-destruction.’
১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টা ইকবালের জীবনে ছিল একটি রগরগে সময়। এরই মধ্যে তিনি স্বীকৃতি পেয়ছেন মুসলমান নেতা ও চিন্তাবিদ হিসেবে। তা সত্ত্বেও, কাশ্মিরের বিষয়টি প্রাচ্যের এই দার্শনিক-কবির কাছে এতটাই প্রিয় ছিল যে, কাশ্মির নিয়ে কথা বলতে তিনি কখনোই ভোলেননি।

১৯৩২ সালে তিনি হন অল ইন্ডিয়া মুসলিম কনফারেন্সের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। লাহোরে এই কনফারেন্সে সভাপতির ভাষণে তিনি আভাস দেন, কতটুকু গভীরভাবে কাশ্মির সমস্যা তাকে ভাবিত করে তুলেছিল। কিন্তু কাশ্মিরের লোাকেরা আট দশক ধরে যার কবিতা বারবার পাঠ করছে, সেই কাশ্মিরিরা ১৯৩৩ সালের ৭ জুন দেয়া তার বিবৃতির সারবস্তুর প্রতি কোনো মনোযোগ দেয়নি। তখন তার বিবৃতিটি ছিল : ‘I appeal to Muslims of Kashmir to beware of the forces that are working against them and uniting their ranks. The time for two or three Muslims political parties has not yet come. The supreme need of the moment is a single party representing all Muslims in the State.’

তার কথা হচ্ছে, কাশ্মিরের নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক শত্রুতা দূর করতে না পারলে কাশ্মিরের মানুষের স্বার্থ কার্যকরভাবে আদায় করা যাবে না। কাশ্মির সম্পর্কে ড. ইকবালের এই সতর্কবার্তা আজকের দিনের কাশ্মিরের বিদ্যমান।

বিদেশের দুই ব্যাংকে সম্রাটের ৮০ কোটি টাকা by আল-আমিন

ক্যাসিনো ডন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট বিদেশের দুই ব্যাংকে অন্তত ৮০ কোটি টাকা জমা রেখেছেন। এছাড়া সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় তার রয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট দেশের ব্যাংকে অর্থ রেখেছেন কিনা এর সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সম্রাট এড়িয়ে যাচ্ছেন। দেশের ব্যাংকে অর্থ নেই এমন দাবিও তিনি করছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জার্মানির একটি ব্যাংকে ও সুইজারল্যান্ডের একটি কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে অর্থ জমা রেখেছেন সম্রাট। অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি যে বিপুল অর্র্থ আয় করতেন তার একটি অংশ এসব ব্যাংকে জমা রাখতেন।
এছাড়া সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে তিনি কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ উড়িয়েছেন।
সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে স্যান্ডস’র ক্যাসিনো স্বর্গে একমাত্র বাংলাদেশি পাইজা চেয়ারম্যান ছিলেন সম্রাট। হুন্ডিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অবৈধ আয়ের অর্থ সম্রাট বিদেশে পাচার করতেন। তদন্ত সূত্রের দাবি জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট বিদেশে অর্থ থাকার বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি কিভাবে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করতেন। কারা তা দেখভাল করতো এসবও স্বীকার করেছেন। তদন্ত সূত্র জানায়, সুইজারল্যান্ডে ওই টাকার দেখভাল করেন পল্টনের একসময়ের যুবলীগের নেতা সুইজারল্যান্ড প্রবাসী আশরাফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। আশরাফুল পল্টনের ওয়ার্ড কমিশনার মোস্তফা জামানের একসময়ের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। সম্রাটের সঙ্গে মোস্তফার সম্পর্কের সূত্র ধরেই আশরাফুল ওই টাকার দেখভাল করতেন। জিজ্ঞাসাবাদে ব্যাংক এশিয়াসহ দেশের মোট ৫ টি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলে সম্রাট জানান। ওই অ্যাকাউন্টগুলো তিনি তার স্ত্রী ও মায়ের নামে খুলেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে এখন পর্যন্ত ওই ৫ টি অ্যাকাউন্টে তার উল্লেখযোগ্য টাকা নেই বলে তিনি দাবি করেছেন। গোয়েন্দারাও কোন বড় অর্থের সন্ধান পাননি। সব অ্যাকাউন্টগুলোর লেনদেনের নথিগুলো পর্যালোচনা করছেন র‌্যাবের মাঠ পর্যায়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
এর আগে ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার খালেদ মাহমুদ ভূইয়া, আরমান, লোকমান হোসেন ভূইয়াও বিদেশে  কোটি কোটি টাকা পাচারের কথা স্বীকার করেন। সূত্র জানায়, র‌্যাবের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে রিমান্ডে থাকা সম্রাট ও আরমানকে মুখোমুখি করা হয়। এসময় তারা নিজেদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করেছেন।
গত ১৫ই অক্টোবর অস্ত্র ও মাদকদব্য নিয়ন্ত্রণ মামলায় ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ১০ দিন ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সভাপতি আরেক ক্যাসিনো কিং এনামুল হক আরমানকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়ার অনুমতি দেন আদালত। পরে মামলার তদন্তভার র‌্যাবে হস্তান্তর হলে তাদের র‌্যাব হেফাজতে নেয়া হয়। তাদের দুইজনকে র‌্যাবের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ওই সেলের কর্মকর্তারা পালাক্রমে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। সম্রাটের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক এবং র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম গতকাল দুপুরে মানবজমিনকে জানান, সম্রাটকে তার অতীতের সকল বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। তার তথ্যের সূত্র ধরেই তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট স্বাভাবিক রয়েছেন বলে তিনি জানান।
র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সম্রাটকে র‌্যাব-১ এর হেফাজতে নেয়ার পর গোয়েন্দারা তার আর্থিক বিষয়টি খোঁজ নেয়ার জন্য মাঠে কাজ করা শুরু করেন। বাংলাদেশের ব্যাংক এশিয়াসহ তার ৫ টি ব্যাংকে আক্যাউন্টের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু, এখন পর্যন্ত সেই ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য টাকা লেনদেনের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয় গোয়েন্দাদের। এ বিষয়টি সম্রাটকে জিজ্ঞাসা করেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তিনি একাধিকবার টাকা রাখার বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও একপর্যায়ে বিদেশের দুইটি ব্যাংকে তার টাকা রয়েছে বলে স্বীকার করেন।
সূত্র জানায়, জার্মানির একটি ব্যাংকে ৩৬ কোটি টাকা রেখেছেন সম্রাট। আর সুইজারল্যান্ডের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রেখেছেন ৪৪ কোটি টাকা। সুইস প্রতিষ্ঠানে রাখা অর্থ দেখভালের দায়িত্বে থাকা আশরাফুলের নামে পল্টন, মতিঝিল ও রমনা এলাকায় তার নামে হত্যাসহ ১২ টি মামলা রয়েছে। পুলিশি হয়রানি ও  মামলার ভয়ে তিনি ২০১২ সালের জুলাই মাসে দেশ ছেড়ে লিবিয়ায় শ্রমিক ভিসায় চলে যান। সেখান থেকে সাগরপথে ইতালি হয়ে সুইজারল্যান্ডে বসবাস করছেন। তিনি ওই দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছেন বলে র‌্যাব নিশ্চিত হয়েছে। র‌্যাবসহ আইন-শৃংখলা বাহিনীর শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পরই পল্টনের কাউন্সিলর মোস্তফা জামান গাঢাকা দিয়েছেন। 
সূত্র জানায়, সম্রাট বিদেশের ব্যাংকে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে হুন্ডি ও ওয়েস্টা ইউনিয়নের আশ্রয় নিয়েছেন। সম্রাটের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বেশী পাঠাতেন আরকে মিশন রোডের গোপীবাগের আকবর হোসেন। তিনি মতিঝিল থানার সেচ্ছাসেবক লীগের নেতা। মতিঝিলের ক্যাসিনো হাটে তার আনাগোনা ছিল। আকবরসহ মতিঝিল পাড়ায় অবৈধ একাধিক হুন্ডি ব্যবসায়ীর চক্র গড়ে উঠেছিল। তাদেরও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে র‌্যাব।
র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের সূত্রে জানায়, সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, ক্যাসিনো টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে আরমান ও খালেদের মধ্যে ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দুইজনই সম্রাটের আস্থাভাজন হওয়ার কারণে তিনি কোন পক্ষই নেননি।
সূত্র জানায়, প্রত্যেক মাসে একবার করে সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো খেলতে যেতেন সম্রাট। র‌্যাবকে তিনি জানিয়েছেন এটা তার নেশা ছিল। সিঙ্গাপুর শহরে তার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়াও মালেশিয়ার পূত্রাজায়ায় ‘কুইক রোডে’ তার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। সিঙ্গাপুরে বেশি যাওয়া আসা করায় প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের মালয়েশিয়ার ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দেয়ার চিন্তা করছিলেন সম্রাট।
এদিকে সম্রাট ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন অবৈধ পথে যে অর্থ আয় করতেন তা থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগসহ অনেকে ভাগ পেতেন। সম্রাট কাদের অর্থ দিতেন এ তথ্য তিনি প্রকাশ করছেন। এ পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কিছু নামও বলেছেন। এর মধ্য ঢাকার একজন সংসদ সদস্যকে মাসে চার লাখ টাকা করে দিতেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া নির্ধারিত এ অর্থ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে মোটা অংকের অর্থ নিতেন এ সংসদ সদস্য।

মানব পাচার: বিদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে ফিরে আসা এক নারী - 'আমি বেশ্যা, জেল খেটে আসছি, আমার মেয়ের বাপের পরিচয় নাই' by শারমিন রমা

"আমরা ১৫ জন মেয়ে ছিলাম, একবেলা খাবার দিতো, ক্ষুধা-পেটে মদ আর কী কী সব খাওয়ায় দিতো আমাদের! আমি সহ্য করতে পারতাম না, খালি বমি করতাম। রাতে ঘুমাইতে দিতো না, অনেক বেটা-ছেলে আসত ঘরে। ওদের কথা না শুনলে খুব মারধর করত।"
বিবিসিকে যৌন নিপীড়নের বিভীষিকার কথা বলছিলেন লিলি। এটি তার ছদ্মনাম, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বার্থেই এখানে মেয়েটির প্রকৃত নাম ব্যবহার করা হলো না।
ভাল কাজের লোভ দেখিয়ে জর্ডানের একটি পতিতালয়ে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের মেয়ে লিলিকে যখন মাদক খাইয়ে প্রতিদিন চার থেকে ছয় জন পুরুষের সঙ্গে থাকতে বাধ্য করা হতো, তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছরের কিছু বেশি।
প্রতিদিন ধর্ষণ আর নানা নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার এক পর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন লিলি।
তারপর একদিন সেই পতিতালয়ে পুলিশের অভিযান হলে সেখান থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
দুই মাস জেল খাটার পর, কয়েক হাত ঘুরে অবশেষে বাংলাদেশে ফেরে ছয় মাসের গর্ভবতী কিশোরীটি।
তবে পরিবার কিংবা সমাজ তাকে আর গ্রহণ করতে চায় না।
মানব পাচারের শিকার হয়ে কিংবা অভিবাসনের পর নানা নির্যাতনের মুখে পড়ে প্রতিদিনই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আসছে বাংলাদেশের বহু নারী।
"বাবা আমার বাচ্চা নষ্ট করতে চাইছে, কিন্তু ডাক্তার বলছে, ছয় মাস হয়ে গেছে, হবে না এখন," বলছিলেন তিনি।
নিজের দূরবস্হার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে লিলি বলছিলেন, "আত্মীয়স্বজন-পাড়ার লোক বলে আমি বেশ্যা, জেল খেটে আসছি, আমার মেয়ের বাপের পরিচয় নাই, তাই বাচ্চাটা বিক্রি করে দিতে চায় আমার বাবা।"
এদিকে অবিবাহিত মেয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফেরার পর থেকেই আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে নানাভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে লিলি'র পরিবার।
"সমাজ আমাগো চাপ দিছে, থাকতে দিবে না, তারা মুখ দেখাইতে পারে না," লিলির মা বিবিসিকে বলছিলেন। সমাজের চাপ ছাড়াও মেয়ে এবং নাতনীর অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে এখন আরও বেশি চিন্তিত তিনি।
অনেকেই তাকে শিশুটিকে বিক্রি করার পরামর্শ দিলেও মেয়েকে বিয়ে দিতে চান তিনি।
তবে তার শঙ্কা, কোনও 'ভাল ছেলে' বাচ্চাসহ বিয়ে করতে চাইবে না লিলিকে।
বাংলাদেশে লিলি'র মতো বিদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে ফিরে আসা নারীদের জীবন-যাপন করাটা বেশ কঠিন হয়ে যায় যখন পরিবার ও সমাজ তাদের সহজে মেনে নিতে পারে না।

রাষ্ট্র কী করছে?

নির্যাতনের শিকার এই নারীদের টিকে থাকার সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটা শুরু হয় দেশে ফেরার পর।
কারণ বিদেশ থেকে ফেরা এই নারীদের পুনর্বাসনে বেসরকারি কিছু উদ্যোগ থাকলেও সরকারের দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম বলে মনে করছেন, তাদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান বিবিসিকে বলছিলেন, নির্যাতিত হয়ে দেশে ফেরা নারীর প্রতি পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য রাষ্ট্রের অনেকটা দায় থেকে যায়।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের উপ-পরিচালক হালিমা আহমেদ
"অনেক মেয়েই বিমান বন্দরে এসে বলে যে, সে কোথায় যাবে জানে না। সমাজ কিন্তু তাকে বাঁকা চোখে দেখে, পরিবারই কিন্তু তাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, সহজে নিতে চাচ্ছে না।"
"পরিবারের এই যে আচরণ, কারণটা হচ্ছে সমাজ, সমাজের এই আচরণ, কারণটা হয়ত রাষ্ট্র।"
মি. হাসানের মতে, যেহেতু বিদেশে যাওয়াটা সরকারের একটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের কৌশল, সেহেতু কেউ বিদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে ফিরে এসে বিপদে পড়লে তাদের সাহায্যে দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়াটা খুব জরুরী।
এক্ষেত্রে যথেষ্ট পদক্ষেপ না থাকার বিষয়টা অবশ্য স্বীকার করে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের উপ-পরিচালক হালিমা আহমেদ বিবিসিকে বলেন, তারা এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অন্ততঃ একজন সদস্যকে পুনর্বাসনের একটি প্রস্তাব তারা চিন্তা-ভাবনা করছেন।
"সত্যিকার অর্থে তাদের দেশে আসার পর আবার একটা কাজের মধ্যে স্টেবল করে দেয়া বা কাজে ট্যাগ করে দেয়া, বড় পরিসরে সেটা আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে এখনও শুরু হয়নি," বলছিলেন মিস আহমেদ।

মানব পাচারের ঘটনায় বিচারের চিত্র

বাংলাদেশে মানব পাচারের মামলা নিষ্পত্তি বেশ সময়সাপেক্ষ।
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান বিবিসিকে জানান, এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত আইনে চার হাজার ৬৬৮টি মামলা হয়েছে, কিন্তু নিষ্পত্তি হয়েছে কেবল মাত্র ২৪৫টি মামলা।
এক্ষেত্রে, ২০১২ সালে জারি হওয়া মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান থাকার পরও ট্রাইব্যুনাল গঠন না করা অন্যতম একটি প্রধান কারণ বলে মনে করেন তিনি।

কোথায় পাচার হচ্ছে বাংলাদেশের নারীরা?

বাংলাদেশ পুলিশ ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছরই বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, লিবিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, থাইল্যান্ড, মালয়শিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে নারী ও শিশুদের।
মূলতঃ এসব দেশের বিভিন্ন জায়গায় পতিতালয়ে আটকে রেখে যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে তাদেরকে।

পাচার হওয়া নারীর সংখ্যা কত?

পুলিশের হিসেবে, বাংলাদেশ থেকে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নারী পাচারের সংখ্যা ১,৪৩৭ জন।
তবে, নারী পাচারের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলেই মনে করছেন অভিবাসন কর্মসূচি সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ থেকে বছরে যে পরিমাণ মানব পাচার হয়, তার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ যে নারী ও শিশু, তার ধারণা পাওয়া যায় জাতিসংঘের একটি পরিসংখ্যান থেকে।
সেখানে বলা হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়ে, অর্থাৎ দেড় বছরে এদেশ থেকে পাচার হওয়াদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই ছিল নারী আর শিশু ১৫ শতাংশ।

শ্রম অভিবাসনের ওপর প্রভাব

পাচারের শিকার মানুষদের নিয়ে যারা কাজ করছেন, তাদের মতে এদেশ থেকে মানব পাচারের চিত্রটা এখন বেশ উদ্বেগের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান বিবিসিকে বলেন, "মানব পাচারের সংখ্যা আমাদের দিন দিন বাড়ছে এবং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবপাচার বিষয়ক যে প্রতিবেদন, তাতে বাংলাদেশকে তারা টানা তৃতীয়বারের মতো টায়ার-২ ওয়াচ লিস্টে রেখেছে।"
"এই তালিকায় রাখার অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশ মানব পাচারের ক্ষেত্রে ন্যুনতম যে মানদণ্ড, সেটাও রাখতে পারেনি। এরপর আমরা হয়ত এমন একটা তালিকার মধ্যে চলে যাব, যেখানে আমাদের স্বাভাবিক শ্রম অভিবাসন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।"
শ্রম অভিবাসন কিংবা পাচার—যেভাবেই এদেশ থেকে নারীরা চলে গিয়ে থাকুক, তারা যখন আবার নিজ দেশে ফিরে আসে, তখন সমাজ তাদেরকে অবজ্ঞার চোখে দেখে বলেই তারা আরও বেশি সংকটে পড়ে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এক্ষেত্রে পরিস্থিতি বদলাতে পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে এখনই এদের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের পদক্ষেপ নেয়াটা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান বিবিসিকে বলছিলেন, নির্যাতিত হয়ে দেশে ফেরা নারীর প্রতি পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য রাষ্ট্রের অনেকটা দায় থেকে যায়।

সাক্ষ্য দিয়ে বলছি জনগণ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি :- মেনন

বিগত নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, আমি সাক্ষ্য দিয়ে বলছি, এই নির্বাচনে আমিও নির্বাচিত হয়েছি। জনগণ নির্বাচনে ভোট দিতে পারে নাই। ইউনিয়ন পরিষদে পারে না, উপজেলা পরিষদে পারে নাই। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আমি আর আপনি মিলে ভোটের জন্য যে লড়াই করেছি, ঘেরাও করেছি, আজিজ কমিশনকে আমরা এক কোটি দশ লাখ ভূয়া ভোটারের সেই তালিকা ছিড়ে ফেলার জন্য নির্বাচন বর্জন করেছিলাম। আজকে কেন আমার দেশের মানুষ, আমার ইউনিয়ন পরিষদের মানুষ, আমার উপজেলার মানুষ, আমার দেশের মানুষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে আসবে না। তিনি বলেন, উন্নয়ন মানে গণতন্ত্র হরণ নয়। উন্নয়ন মানে ভিন্ন মতের সংকোচন নয়।
উন্নয়ন মানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ নয়। উন্নয়ন মানে গণতন্ত্রের স্পেস কমিয়ে দেয়া নয়। তিনি বলেন, ক্যানিসো মালিকদের ধরা হচ্ছে, দুর্নীতিবাজদের ধরা হচ্ছে। কিন্তু দুর্নীতির আসল জায়গাযেগুলো নির্বিঘ্ন আছে। আজকে যারা সেই দুর্নীতি করছে তাদের বিচার কবে হবে? তাদের সাজা কবে হবে? তাদের সম্পদ কবে বাজেয়াপ্ত হবে? 
শনিবার অশ্বিনী কুমার টাউন হলে আয়োজিত বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টির বরিশাল জেলা কমিটির সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। বরিশাল জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল হক নিলুর সভাপতিত্বে সম্মেলনে প্রধান বক্তা ছিলেন কেন্দ্রীয় পলিট ব্যুরো সদস্য কমরেড আনিছুর রহমান মল্লিক। আরো বক্তব্য রাখেন জেলা সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি এডভোকেট শেখ মোহাম্মদ টিপু সুলতান, কমরেড শান্তি দাশ, কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ বাড়ৈ, কমরেড টিএম শাহজাহান হাওলাদার, কমরেড আ. মন্নান, ফায়জুল হক বালী ফারহিন, সীমা রানী শীল ও শাহিন হোসেন।
মেনন বলেন- বিগত সরকারের প্রধান খালেদা জিয়া ও তার হাওয়া ভবনে বসে দুর্নীতি লুটপাট করার কারণে কেউ সাজা ভোগ করছে, অন্যরা পালিয়ে গেছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এখন সরকারে থেকে যারা দুর্নীতি লুঠপাটসহ বিদেশে অর্থ পাচার করছে তাদের বিচার করবে কে?
তিনি বলেন, আমাকে ১৪ দলের পক্ষ থেকে নৌকা প্রতীক দিয়েছে তাদের প্রয়োজনে। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে গণতন্ত্রের কথা বলে ক্ষমতায় গিয়ে তারাই আজ এদেশের গণতন্ত্রকে গলা কেটে হত্যা করেছে। সকাল ১১ টায় টাউন হল চত্বরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন রাশেদ খান মেনন এমপি ও স্থানী দলীয় নেতৃবৃন্দ। পরে জেলা সভাপতি ও জেলা সাধারণ সম্পাদক সহ দলীয় নেতা-কর্মীরা লাল পতাকা নিয়ে নগরীতে র‌্যালি বের করেন। র‌্যালিটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় টাউন হল চত্বরে এসে শেষ হয়।

হানজায় তাঁবু খাটিয়ে নাস্তার আয়োজন করতে নগরী ছেড়েছেন যে দম্পতি

কলেজ গ্রাজুয়েটিংয়ের পর যদি আপনার লক্ষ্য ছিলো পিঠে ঝোলা নিয়ে ইউরোপে ঘুরে বেড়ানো, তবে বিষয়টি নিয়ে আবার ভাবুন।
ইউরোপে যাওয়া যায় সহজেই (এমনকি পাকিস্তান থেকেও)। সুবিধামতো ফ্লাইট ধরে গেলেই চলে। হোটেল আর এয়ারবিএনবি বিকল্প আছে অনেক। তাছাড়া বিভিন্ন দেশ আর নগরীকে সংযুক্তকারী অসংখ্য ট্রেন আছে। কয়েক ঘন্টা পরপরই ছাড়ে। এগুলোর প্রায় সবই পর্যটকবান্ধব। আর কিছু মৌলিক শর্ত যদি মেনে চলেন, তবে ভিসা পাওয়া কোনো ব্যাপারই নয়। ফলে আইফেল টাওয়ার কিংবা সুইস আলপসের সামনে দাঁড়ানো খুব কঠিন কাজ নয়।

কিন্তু পাকিস্তানের উত্তরাংশে গিয়ে নতুন কিছু জানার অভিযান শুরু করা সত্যিই সাহসের ব্যাপার। ফ্লাইট প্রায়ই দেরি করে, রাস্তাগুলো দীর্ঘ আর অস্বস্তিকর। থাকা-খাওয়ার বিকল্প আছে সামান্য। আর ভালো যেগুলো, সেগুলো বিশ্বের অন্যান্য স্থানের তুলনায় খুবই ব্যয়বহুল।

এই কারণেই উত্তরে যাওয়াটা সবচেয়ে বেশি সাহসের দরকার হয়। আর যাদের এমন সাহস আছে তাদের দুজন হলেন আহমদ ও বানিন।

আহমদ ও বানিনের মাথা থেকেই এসেছে খানাবাদোশ বৈঠকের ধারণাটি। এটি আর কিছু নয়, স্রেফ একটি তাঁবু এবং নাস্তা নিয়ে শিগার ভ্যালি থেকে শুরু হয় এর যাত্রা। তারা পরের তিন বছর হানজার গুলকিনে থাকার জন্য নগরী ছাড়েন।
বানিন (বাঁয়ে) ও আহমদ, খানাবাদোশ বৈঠকের সহপ্রতিষ্ঠাতা
এই দম্পতি জানান, বৈঠক হলো খানাবাদোশ কলেকটিভের একটি অপেক্ষাকৃত বড় ভিশন। তবে সূচনা হয়েছিল অন্যভাবে। কয়েকজন বন্ধু প্রায়ই একটি স্থানে মিলিত হতেন। চা পানের ফাঁকে ফাঁকে তারা নানা বিষয়ে আলাপ করতেন, আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করতেন, বোঝার কথা স্বীকার করতেন। এ ধরনের এক বৈঠকে খানাবাদোশের নানা মত ও পথের লোকদের জন্য লাইটহাউস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ধীরে ধীরে এটি ইঞ্জিনিয়ার, থিয়েটার শিল্পী, ডিজাইনার, লেখক, সঙ্গীতজ্ঞ ইত্যাদি নানা ধরনের লোকের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়।

এই দম্পতি জানান, বৈঠক লোকালয়, শব্দ আর মাত্রাতিরিক্ত নগরজীবন থেকে দূরে বসবাসের প্রয়োজন থেকেই উদ্ভব ঘটে। আমরা সমাজের সফলতার সংজ্ঞা থেকে সরে যেতে চেয়েছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ, সৃষ্টিশীল, অর্থপূর্ণ জীবন যাপন করতে।

আহমদ বলেন, এই কাজে সাহসটাই ছিল আসল। তবে আরো সুদূরপ্রসারী ছিল এই যে আহমদ ও বানিন সফরে বের হয়ে পড়েন।

তাদের তাঁবু আর নাস্তার কল্যাণে সমগ্র পাকিস্তান থেকে লোকজন আসতে পারে খানাবাদোশ বৈঠকে। এখানে কেবল সাশ্রয়ে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে না, সেইসাথে স্থানীয়ভাবে পাওয়া অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার চেয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতা উপহার দেয়।

বানিন বলেন, তারা একটি ধারণার জন্ম দিয়েছেন। তিনি জানান, সফর আমাদের অনেক মাধ্যমের একটি মাত্র।
তাঁবু থেকে বাইরের দৃশ্য
আহমদ ব্যাখ্যা করেন বলেন, তারা বাণিজ্যিক দিকটি নিয়ে ভাবেন না। তারা পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে প্রতিযোগিতাও করছেন না। তিনি বলেন, নির্মাণ, যানবাহন, বর্জ্য, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আসলে আমরা উদ্বেগে থাকি।

দুজনই জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের ভ্রমণ শিল্পটি সম্প্রসারণ করার আগে পরিবেশগত চাহিদার বিষয়টির দিকে নজর দিতে হবে।

তবে এ ধরনের আইডিয়া জীবনে বাস্তবায়ন করাটা চ্যালেঞ্জিং ও আতঙ্কজনক। তবে দুজনের মনেই খানাবাদোশ গভীরভাবে সম্পৃক্ত থাকায় সেটাই রহমত হিসেবে দেখা দেয়।

তারা জানান যে সমসাময়িক শহরে জীবনযাত্রা ও পুঁজিবাদ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। সেইসাথে আছে সংস্কৃতি ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ।

খানাবাদোশ বৈঠকের মূল কথা হলো, এটি পর্যটকদের জন্য নয়। পর্যটকেরা তাদের সাথে থাকবে, এজন্য তারা এই কর্মসূচি প্রণয়ন করেননি। সেটা তো অনেক স্থানেই পাওয়া যায়। তারা নতুন জীবনের সন্ধান দিতে চান।

এই দম্পতি জানান, তারা মন্থরতা আর সময়কে উপভোগ করার বিলাসিতাকে গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, আরো বেশি হাঁটুন, টাটকা খান, যতটা সম্ভব স্থানীয়দের সাথে মিশুন। এটা পর্যটকদের জন্য নয়, বরং সংস্কৃতি, সমাজ আর জীবনযাত্রার সন্ধানে থাকা মুসাফিরদের জন্য।
শিগারের হেমন্তকাল
যারা তারকাখচিত আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করতে চান, তাদের জন্য আছে অবারিত সুযোগ।

আবার চা আর খাবার ছাড়া যেহেতু বৈঠক অসম্পূর্ণ থাকে, তাই খানাবাদোশ বৈঠকে একটি ছোট রান্নাঘর আছে, আছে নিজস্ব ফুড ল্যাবও।

মজার ব্যাপার হলো, নিয়মিত মেন্যুর মধ্যে আছে কেবল চা, কফি আর কিছু মৌলিক স্ন্যাকস। তবে এতে আপনার হতাশ হলে চলবে না। আরো অনেক কিছুই আছে। তবে তা নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর। একদিন হয়তো নাস্তায় পাবেন ছোট্ট প্যানকেক, অন্যদি হয়তো উপভোগ করবেন শাকশুকা।

খাদ্য তালিকায় যতটা সম্ভব প্রক্রিয়াজাত খাবার রাখা হয় ন্যূনতম মাত্রায়। আর স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত উপাদানের দিকে নজর দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি। আহমদ আর বানিন বলেন, আমাদের ফুড ল্যাব আমাদের এবং আমাদের অতিথিদের প্রতিদিনই চমকে দেয়।

খাবার পরিবেশনের পদ্ধতিটিও অভিনব। সবাইকে একসাথে খাবার গ্রহণ করতে হয় একই টেবিলে বসে। সবাই সবার সাথে পরিচিত হয়, সবাই কথা বলতে বলতেই খাবার গ্রহণ করেন। একসাথে বসে খাবার গ্রহণ কেবল সৌন্দর্যমণ্ডিতই নয়, এটা খাবারের স্বাদই বদলে দেয়, এমনকি আরো বেশি স্মরণীয় করে তোলে।

আবার বানিন ও আহমদ অতিথিদের বাইরে ক্যাফে কিংবা স্থানীয়দের খাবার গ্রহণকে উৎসাহিত করেন। স্থানীয়রাও সুস্বাদু খাবার তৈরি করেন। এই খাবারের মাধ্যমেই ওই এলাকাকে তারা চিনতে পারেন।
শিগারে নাস্তার জন্য ক্রিপেস
বৈঠক অনেকের কাছে বাড়ির মতো মনে হলেও নানা জনের অভিজ্ঞতা নানা রকম।

গত বছর সুপরিচিত আর্কিটেক, ডিজাইনার ও শিক্ষাবিদ জাইন মুস্তাফা শিগারে খানাবাদোশ বৈঠকে শিক্ষা সফর করেন। এতে অংশগ্রহণকারীরা স্থানীয় খানকাগুলো দেখার অবারিত সুযোগ পান।

তারা ইতিহাস জানেন। তারা সমসাময়িক অবস্থা বুঝতে পারেন।

এবার খানাবাদোশ কালেকটি গুলকিনের শিশুদের জন্য একটি থিয়েটার ওয়ার্কশপের আয়োজন করে।

চলতি গ্রীষ্মে করাচির লেখক নাতাশা জাপানওয়ালা খানাবাদোশ বৈঠকের সহযোগিতায় একটি লেখক শিবিরের ব্যবস্থা করেন।

সম্প্রতি বৈঠক শাহ জো রাগ মেলার আয়োজন করে। এতে শাহ আবদুল লতিফ ভাটাইয়ের ফকিরেরা অংশ নেন। তারা কালাম প্রচারের জন্য সিন্ধু থেকে আগমন করেন।

অংশগ্রহণকারীরা অভিনব এসব উপস্থাপনায় বেশ তৃপ্ত। মনেপ্রাণে যাযাবর আদনা নাসির বৈঠকের সাথে পরিচিত হন কাকতালীয়ভাবেই।
পাহাড়ের উপর যোগ ক্লাস
তিনি বলেন, আমি বানিন আপি আর আহমদ ভাইয়ের প্রথম সাক্ষাত পাই ইসলামাবাদের একটি ক্যাফেতে। মাত্র কয়েক মিনিটের আলাপেই আমি বুঝতে পারলাম, তাদের বৈঠকে যোগ দেয়া আমার দরকার।

তিনি জানান, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে তার তিন দিন বেশি থাকতে হয় বৈঠকে। কিন্তু এ জন্য তার কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো পয়সা গ্রহণ করা হয়নি।

তবে আহমদ আর বানিন সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চান তা হলো নিজ দেশকে মূল্যায়ন করা।

বানিন বলেন, দুবাই, থাইল্যান্ড বা সুইজারল্যান্ডে ব্যয়বহুল সফরের মতোই দেশকে জানার জন্য খোলা মনে চিন্তা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আহমদ অতিথিদের অপেক্ষাকৃত কম জানা স্থানগুলোকে চেনার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, বালুচিস্তান, থর কিংবা হানজা বা বাল্টিস্তান- সবখানেই যাবেন আপনারা। তবে সবসময় স্থানীয় লোকজন ও তাদের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাভাজন থাকবেন। তাদের এলাকার প্রতি স্পর্শকাতর থাকতে হবে আপনাকে।
>>>ডন