Wednesday, February 20, 2019

সৌদি যুবরাজকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন মোদি

এক দিনের সফরে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এখন ভারতে। আজ বুধবার টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছান সৌদি যুবরাজ। বিমানবন্দরে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উড়োজাহাজ থেকে নামতেই মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিজের চওড়া বুকে জড়িয়ে ধরেন মোদি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পিঠ চাপড়ে দেন সৌদি যুবরাজ।
এক টুইট বার্তায় মোদি বলেন, ‘সৌদি যুবরাজকে আনন্দের সঙ্গে স্বাগত জানিয়েছি আমরা।’
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক টুইটে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো। প্রটোকল ভেঙে প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজে বিমানবন্দরে হাজির হয়ে সৌদি যুবরাজকে অভ্যর্থনা জানান। এটিই যুবরাজের প্রথম ভারত সফর। প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে যুবরাজের বৈঠকে বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপারে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ভারত সফরে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে একাধিক মন্ত্রী ও বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল রয়েছে।
আজ নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে মোহাম্মদ বিন সালমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
দুই নেতার মধ্যকার বৈঠক শেষে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দেশ দুটির পক্ষ থেকে জোরালো বিবৃতি আসতে পারে।
সফর শেষে আজ রাতেই সৌদি যুবরাজ ভারত ছাড়বেন।
ভারত সফরের আগে সৌদি যুবরাজ পাকিস্তান সফর করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ‘ফলপ্রসূ’ বৈঠক করেন তিনি। সৌদি যুবরাজের পাকিস্তান সফরকালে ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুই দিনের পাকিস্তান সফর শেষে সোমবার দেশে ফিরে যান সৌদি যুবরাজ। গতকাল তিনি ভারত সফরে যান। তাঁর চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সৌদি যুবরাজের এশিয়া সফর শেষ হবে।

পাকিস্তানকে ভেঙে ৩ টুকরো করার পরামর্শ রামদেবের, বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের অস্ত্র দেয়ার আহ্বান

পালওয়ামায় সন্ত্রাসী হামলার জবাবে পাকিস্তানকে ভেঙে তিন টুকরো করার পরামর্শ দিয়েছেন ভারতের যোগগুরু বাবা রামদেব। এ জন্য তিনি পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের পরামর্শ দেয়ার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, এটা হবে ভারত সরকারের প্রতিশোধ। বার্তা সংস্থা পিটিআইকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন জি নিউজ।
রামদেব মঙ্গলবার বলেন, পাকিস্তানকে একটি শিক্ষা দেয়ার জন্য তাদের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ করার জন্য এটা হলো ভারতের জন্য উত্তম সময়। তিনি আরো বলেন, বেলুচিস্তানে স্বাধীনতার জন্য যারা লড়াই করছে তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দেয়া উচিত ভারতের। একই সঙ্গে তাদেরকে অস্ত্র দিয়েও সহায়তা করা উচিত। বেলুচিস্তানকে স্বাধীন করতে প্রতিটি পদক্ষেপে সাহায্য করা উচিত ভারতের।
এক্ষেত্রে পাকিস্তান ও সন্ত্রাসীদের একটি উপযুক্ত জবাব দিতে হবে। এ জন্য প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত, পাকিস্তানকে ভেঙে তিন টুকরো করে দেয়া। গত বৃহস্পতিবার কাশ্মিরের পালওয়ামায় আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়। এতে ভারতের কমপক্ষে ৪০ সিআরপিএফ জওয়ান নিহত হন। হামলার দায় স্বীকার করে পাকিস্তান ভিত্তিক সন্ত্রাসী দল জৈশ ই মোহাম্মদ। এ বিষয়ে রামদেব বলেন, এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ফলে ৫০ হাজারের বেশি সেনা ও বেসামরিক মানুষ তাাদের প্রাণ হারিয়েছেন। পাকিস্তানকে তাই একটি শিক্ষা এখন আমাদের দিতে হবে। আমাদেরকে একটি যুদ্ধ করতেই হবে। প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহানোর চেয়ে একটি যুদ্ধ করা ভাল। আর তার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানকে একটি শিক্ষা দেয়া উচিত, যাতে তারা আগামী ৫০ বছরের মধ্যে আর উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা না রাখে। তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিক কাশ্মিরের ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত। পাকিস্তান দখলীকৃত কাশ্মিরে সব সন্ত্রাসীর ক্যাম্প ধ্বংস করে দেয়া উচিত। একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়ার উচিত ভারতের বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এটা করতে হবে এ জন্য যে, যাতে তারা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।

আতার্তুক থেকে ‘এরদোয়ান’- ‘বদলে যাওয়া তুরষ্কের ১০০ বছর’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন আগামীকাল

সারা পৃথিবীর চোখ এখন তুরস্কে। এক নতুন তুরস্ক দেখছে বিশ্ব। 'ইউরোপের রুগ্ন দেশ' হিসেবে খ্যাত তুরষ্ক এখন আঞ্চলিক রাজনীতির নেতৃত্ব থেকে ধীরে ধীরে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রভাবক। তুরষ্কের সম সাময়িক ও অতীত ১০০ বছরের রাজনীতি নিয়ে বই লেখেছেন তুরষ্কের আঙ্কারায় গাজী বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক মোস্তফা ফয়সাল পারভেজ। বইটি প্রকাশ করেছে গার্ডিয়ান প্রকাশনী। আগামীকাল থেকে বইমেলায় ৪৭০নং স্টলে বইটি পাওয়া যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সাবেক শিক্ষার্থী ফয়সাল বইটির ব্যাপারে বলেন, কামাল আতার্তুক পূর্ব তুরষ্ক তথা উসমানি খিলাফতের গৌরবজ্জ্বল অধ্যায় এবং শেষ সময়ে পশ্চিমা প্রভাবকে সংক্ষেপে এনেছি। যাতে আতার্তুক, তার অনুসারী এবং একবিংশ শতাব্দীর নতুন তুরষ্কের রূপকার এরদোয়ানের সঙ্গে সহজেই তুলনা করা যায়। বৃহৎ পরিসরে আতাতুর্ক থেকে এরদোয়ান পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিক্রমাকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।
বইটি পড়ে পাঠকরা তুরষ্কের ৬৩৬ বছরের অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস ঐতিহ্য আর ইসলামি সংস্কৃতি থেকে কীভাবে তুরস্ক কট্টর সেক্যুলার সমাজ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়লো তা জানতে পারবে।
আতাতুর্কের সংস্কারগুলো সমাজে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে-কীভাবে অটোমান চেতনা নিয়ে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মিশন শুরু হলো। রাজনৈতিক বিচক্ষণতা আর ইসলামি আন্দোলনের স্বভাব পথচলা কি একই জিনিস। আজকের তুরস্ক কতটা প্রাসঙ্গিক। এতো কিছুর পরেও বর্তমান তুরষ্কে কামাল আতার্তুক কিভাবে সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বাম, ডান, সেক্যুলার কিংবা ইসলামিস্ট সকলের জনপ্রিয় ব্যক্তিতে পরিনত হয়েছে। লেখকের বিশ্বাস, আজকের বাংলাদেশে ‘আতার্তুক থেকে ‘এরদোয়ান’ পাঠ খুব বেশি প্রাসঙ্গিক। পাঠকরা ৫৬ হাজার বর্গমাইল দুরে বাংলাদেশে বসে তুরস্কের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে নিতে পারবেন। তুমুল অন্ধকারে আলোর রেখা খুঁজে পাওয়াটা যে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কম খরচে ট্রেনে চড়ে দারুণ খুশি তারা

* ২০০৬ সালে বন্ধ হওয়ার পর আবার চালু রেলপথ।
* ট্রেনের ভাড়া মাত্র ৫০ সেন্ট।
* কোম্বিসের (বাস) ন্যূনতম ভাড়া দুই ডলার।

কাউড্রাই পার্ক থেকে বুলাওয়ে। সূর্যোদয়ের সময় জিম্বাবুয়ের একমাত্র কমিউটার ট্রেন ছুটে চলে হাজার দুয়েক যাত্রী নিয়ে। বিস্তীর্ণ ভুট্টাখেত বনবাদাড় পেরিয়ে ছুটে চলে ট্রেনটি। খাদের তলানিতে থাকা অর্থনীতির দেশটিতে জনগণের আশার একমাত্র সলতে এখন রেল। ট্রেনের ইঞ্জিনেই অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর স্বপ্ন এখন সরকারের চোখেও।
কাউড্রাই পার্ক শহরের দুই প্রান্ত থেকে বুলাওয়ের পথে আগে দুটি রেললাইন ছিল। রাজধানী হারারেতে আসার রেলপথ ছিল তিনটি। ভাড়া কম হওয়ায় ট্রেনগুলোকে তখন বলা হতো ‘ফ্রিডম (স্বাধীনতা) ট্রেন’। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে তৈরি এই রেল পরিষেবা ২০০৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়। রবার্ট মুগাবে তখন দেশটির প্রেসিডেন্ট। প্রায় ৪০ বছর জিম্বাবুয়ে শাসন করা মুগাবের সময়েই দক্ষিণ আফ্রিকার এই দেশের অর্থনীতির রেকর্ডে ধস নামে। ২০১৭ সালে ক্ষমতা থেকে উৎখাত হন মুগাবে। মন্দ অর্থনীতির ধাক্কা সামলে উঠতে বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমারসন মানাঙ্গাগুয়ারও নাকাল দশা।
মানাঙ্গাগুয়ার সরকার গত মাসে জ্বালানির মূল্য দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর ফলে সহিংস বিক্ষোভে নামে জনতা। কোম্বিসের (মিনিবাস) ভাড়া বেড়েছে কয়েক গুণ। এই অবস্থায় ১৩ বছর বন্ধ থাকার পর গত বছরের নভেম্বরে রেলসেবা চালু করেন মানাঙ্গাগুয়া। কাউড্রাই পার্ক থেকে জিম্বাবুয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বুলাওয়ে পর্যন্ত রেললাইন সংস্কারে এই আকালের মধ্যেও খরচ করতে হয়েছে ২৫ লাখ মার্কিন ডলার। সরকারের সেই বিনিয়োগ বৃথা যায়নি। জনগণ এখন দারুণ খুশি ট্রেনে চড়তে পেরে। কারণ, উচ্চ ভাড়ার কোম্বিসে চড়া এখন অনেকের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। কাউড্রাই পার্ক থেকে বুলাওয়ে পথে কোম্বিসের ন্যূনতম ভাড়া দুই ডলার। অথচ ট্রেনের ভাড়া মাত্র ৫০ সেন্ট।
কাউড্রাই পার্ক থেকে কমিউটার ট্রেনটি ছাড়ে সকাল ছয়টায়। তবে সেখানে প্ল্যাটফর্মসহ কোনো অবকাঠামো নেই। পুরোনো একটি বগিকে বানানো হয়েছে অস্থায়ী টিকিটঘর। কমিউটার ট্রেনটির অনেক বগিতে লেখা ‘আরআর’ (রোডেশিয়ান রেলওয়ে), যা মনে করিয়ে দেয় ১৯৮০ সালে পাওয়া স্বাধীনতার আগের স্মৃতি। কাউড্রাই থেকে বুলাওয়ের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। এই পথের একমাত্র ট্রেন হওয়ায় ২৪টি বগিতেই যাত্রী থাকে গাদাগাদি। এটি বুলাওয়েতে পৌঁছে সকাল সাতটার কিছু পর। যাত্রীদের কেউ শ্রমিক, কেউ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কেউ সওদা করতে বুলাওয়ে আসা।
জিম্বাবুয়েতে ট্রেনযাত্রা কম রোমাঞ্চকর নয়। জাম্বিয়ার ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের মধ্য দিয়ে গেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ে তৈরি রেললাইন। ১৯০৭ সালে চালু হওয়ার পর হারারে থেকে বুলাওয়ের ট্রেনগুলো একসময় বিদ্যুচ্চালিত ছিল। এখনকার ট্রেনগুলো ডিজেলচালিত। ধ্বংসপ্রায় সংকেতব্যবস্থার কারণে ট্রেনচালকেরা প্রায়ই মুঠোফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে লাইনসম্যানের সঙ্গে যোগাযোগে বাধ্য হন। রেলওয়ের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান নিয়াশা মারাভানিকা বলেন, ‘এখনই সময় বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে রেল পুনর্জাগরণের। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের জন্য এই রেল হৃৎস্পন্দনের মতো।’

গল্প: পরস্পর by আফসানা বেগম

লিটন কোত্থেকে একটা ডাব হাতে মন্টুর কাছে এসে বসে। তারপর ডাবটাকে হাঁ করিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে বলে, ‘নে, এইডা দিয়াই আইজকা রাইতটা পার করতে হইব। সবজি না পচলে আমাগোর কী দুষ?’ মন্টু ওপর-নিচে মাথা নাড়ে। সত্যি তো, এই যে ঠান্ডা বাতাস, গরমের নামগন্ধ নেই, বৃষ্টি নেই, আর সে কারণে সবজির দোকানের আশপাশের বাতাসে তাজা সবজির গন্ধে নাক বন্ধ হয়ে আসছে, তা কি তাদের দোষ? দোকানের কাছে গিয়ে দাঁড়ালে দোকানদার দাঁত কেলিয়ে হাসে, উঁচু করা বুড়ো আঙুল নাড়িয়ে বলে, ‘মাল তো পচে নাইক্কা, কী নিবি?’ লিটন তখন এক মুহূর্তে সবজির স্তূপে চোখ বোলায়। দোকানদার গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে সবজিতে আরেক প্রস্থ পানি ছেটায়। লিটন তা–ই দেখে মন্টুর হাত এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলে, ‘দ্যাশটা হালায় বড়ো লুকের ফিরিজ হইয়া গেল নিকি!’ মন্টুও হতাশ হয়। আজ সপ্তাহ দুয়েক ধরে এই অবস্থা। সবজি না পচলে তারা বেচবে কী আর খাবেই–বা কী! এই কাঁচাবাজারে বছরখানেক ধরে এটাই তাদের কাজ; সবজির দোকানের ফেলে দেওয়া সবজি জড়ো করে বাজারে ঢোকার মুখে বসে থাকা, আর নামমাত্র দামে বিক্রি করা। পচা সবজি গুছিয়ে নিতে গিয়ে দোকানদারের চোখের আড়ালে টুক করে একটা–দুটো তাজা সবজি তার মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে পারলে সেদিনটায় আয় ভালো হয়। দোকানদারেরা অবশ্য এমনিতে ওসব দেয় না। ট্রাকে মাল এলে নামানোর সময় একটু হাত লাগানো, দোকানে সবজি সাজাতে সাহায্য করা, এসব তারা নিজের আগ্রহেই করে। আগের দিন মন্টু কয়েকটা ঝুড়ি নামিয়ে দিয়ে টাকা চেয়েছিল দেখে এক সবজিওলা বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়েছে, ‘ক্যান, জিনিস দেই না তগোরে?’ তারপর সামান্য হেসে বলেছে, ‘এট্টু পচলেই তো পাইয়া যাবি। অহন যা দেহি, কাজ করতে দে।’
লিটনের হাতের ডাবের লোভে মন্টু কোনোরকমে উঠে বসে। দুদিন ধরে শরীরটা জ্বর জ্বর। যে ঠান্ডায় সবজি পচে না, সেই ঠান্ডায় মন্টুর শরীরে জ্বর আসে। লিটন অবশ্য রাগ দেখিয়ে বলেছিল, ‘শালার খাওনই নাই, তুই আবার আলগা কাপড় কিনবি কইত্তে? ফুটানি বাদ দে, শীত সইহ্য কর।’ মন্টুর তখন একটু লজ্জা করছিল; জ্বর আসাটা উচিত হয়নি। বাজারের মাঝখানের ডাবওলাকে মাঝেমধ্যে দুই-তিন টাকা ধরিয়ে দিলে শাঁস খাওয়ার জন্য তিন-চারটা ডাবের খোল পাওয়া যায়। কোনোদিন ফাটালে দেখা যায় একটার মধ্যে শাঁস নেই। মন্টুর তখন কান্না পায়। আর লিটন রাগের চোটে সেটাকে এমন জোরে ছুঁড়ে মারে, যেন ওই ডাবটাই তার সমস্ত দুর্ভাগ্যের কারণ। সপ্তাহখানেক ধরে ডাবওলাকে টাকা দেওয়া হয়নি, অথচ আজকের ডাবটা কোথা থেকে এল—মন্টুর জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করে না। খোসার কাটা অংশ দিয়ে সে মোটা শাঁস চেঁছে নেয়। এত মোটা শাঁস থাকলে একটা ডাবেই দুজনের হয়ে যায়।
রাতের বাজার কবরের মতো শান্ত। দেখলে কে বলবে, ভোর হলে এখানে কেমন হুলুস্থুল শুরু হয়! বাজারের শেষ মাথায় সরকারি অফিসের লম্বা বারান্দা। সেখানকার দুই পিলারের মাঝখানে চওড়া একটা নীল পলিথিন ঝুলিয়ে দিলেই হলো। তারপর এক দিকের দেয়াল ঘেঁষে চ্যালাকাঠের মতো দুটো শরীর খোবড়ানো মেঝের ওপর পড়ে থাকে। শীতে জড়সড় হলে প্যাঁচানো হাত-পায়ের মধ্যে কোনটা কার, চট করে ধরা যায় না। গেল বর্ষায় বাজারের মাঝখানে প্যাতপেতে কাদার মধ্যে লুকিয়ে থাকা কাচের টুকরো লিটনের পায়ের পাতায় সোজাসুজি ঢুকে গিয়েছিল। রক্ত দেখে মন্টু চিৎকার করেছিল, কিন্তু হাত দিতে সাহস পায়নি। লিটন দাঁতে দাঁত চেপে তিন কোনা সবুজ কাচটা নিজেই টেনে বের করে এনেছিল। দিন দুয়েক পর বাজারের ডাক্তারের কাছে গেলেও চিকিৎসা কী হলো, কে জানে, সেই থেকে সে খুঁড়িয়ে হাঁটে। খোঁড়া পাটা মাঝেমধ্যে টনটন করে, তখন সেটা মন্টুর গায়ের ওপর চড়িয়ে দিলে আরাম লাগে। রাতে গায়ে পা ওঠালে মন্টু ঘুম ঘুম গলায় বলে, ‘ভাই, ক্যান জানি মার কথা মনে পড়তেছে।’ লিটন ধমকায়, ‘চুপ শালা। কোন মার কথা কস?’
‘মা তো মাইনষের একটাই থাকে!’
‘তরে কইছে। আমার আছিল তিনডা। বাপে তিনডা বিয়া করল না? দুই নম্বর বউয়ের ঘর থেইকা ট্যাকা চুরি করছিলাম বইলা বাপে দিল বাড়ি থেইকা বাইর কইরা।’
‘আরে ধুর, আমি কই আসল মার কথা।’
‘ওই মার কথা কস নিকি যে এক বুইড়া ব্যাডার লগে ভাগছিল?’
‘ভাগবই তো, বাপে খুব পিডাইত।’
‘আর তরে?’
‘আমারে আরও পিডাইত । একদিন ঘাড়ের মইদ্দে বিলাইয়ের লাহান ধইরা...’
কথার মাঝখানে মন্টুর গলা ঘুমে জড়িয়ে আসে; কোনোরকমে লিটনের গলার ওপর হাতটা উঠিয়ে দেয়। কানের কাছে মন্টুর ফোঁসফোঁস নিশ্বাস লিটনের ভালো লাগে না। পরদিন শুক্রবার ভোরবেলা মাছের চালানে হাত লাগিয়ে যদি দুইটা পয়সা কামানো যায়, সেই আশায় লিটন তাড়াতাড়ি ঘুমাতে চেয়েছিল। তবু কে জানে, কেন মন্টুকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে ইচ্ছা করে না। শুধু হালকা কুয়াশার ঘোলাটে হাত তাদের গায়ের ছেঁড়াফাঁড়া কাঁথাটাকে ধাক্কা দিতে থাকে। মন্টুসহ লিটন দেয়ালের দিকে আরও খানিকটা সেঁটে যায়।
ভোরে কাঁথায় টান পড়তেই মন্টুর ঘুম ভাঙে। তাকে ধড়ফড় করে উঠে বসতে দেখে লিটন বলে, ‘তুই ঘুমা, নাইলে জ্বর বাড়ব।’ মন্টু তার কথায় কান দেয় না। কাঁথা আর পলিথিন গুটিয়ে রেখে পেছন পেছন হাঁটতে থাকে। বলে, ‘জ্বর নাই, ভাই।’ তার কপালে হাত রাখার ভঙ্গি করে লিটন হাসে, বলে, ‘এইডা ঠিক, আমরার জ্বর অ্যামনেই আহে, অ্যামনেই ভালা হয়।’ মন্টুও হাসে। তারপর দ্রুত হেঁটে এগিয়ে যাওয়া লিটনকে ধরে ফেলে। বাজারে আজ ট্রাকের পরে ট্রাক। মুহূর্তে পুরো জায়গাটা লোকে লোকারণ্য আর মাছের ট্রাক থেকে চুঁইয়ে পড়া পানিতে শুকনো ধুলার মন নরম হয়ে কাদা। ঝাঁকা ধরতে ধরতে লিটন আর মন্টুর গা ভিজে সার। কয়েকটা বরফের চাক ধরার পর মন্টুর হাতে ঝিঁঝি ধরে যায়। কাশতে কাশতে সে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ট্রাক থেকে একটা মাছ নামতে দেখে তাকে এগিয়ে আসতে হয়, লিটনের কনুই ধরে বলে, ‘এইডা কী ভাই!’
‘মাছই । তয় তর থেইকাও লাম্বা।’
মুহূর্তে আরও অনেক মানুষ এগিয়ে আসে। এমনটা তো সচরাচর দেখা যায় না! মানুষেরা বলাবলি করতে থাকে, কত কেজি হতে পারে, দামই–বা কেমন হবে। কেউ আন্দাজ করতে পারে, কেউ বলে, ‘আল্লায় জানে কত!’ ভিড়ের মাঝখান থেকে ফেরেশতার মতো চেহারার এক বাচ্চার হাত ধরে আসেন একজন। কাছে আসতেই মাছের গায়ে ছেটানো পানিতে তাদের গায়ে কাদা মাখে। বাচ্চাটা জুতার দিকে তাকিয়ে মনমরা হয়ে যায়। বাবা বলেন, ‘তোমাকে আগেই বলেছিলাম, জুতোর দরকার নেই, স্যান্ডেল পরে আসো।’ বাবার কথায় সে চুপসে যায়। লিটন আর মন্টু পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দেখে। বাবা হাসেন, ‘অসুবিধা নেই, দাগ না উঠলে এই জুতোটা আর পোরো না।’ বড় মাছটা ততক্ষণে গর্বিত বিক্রেতা সোজা করে রেখেছে। বাবা ছেলেকে মাছের পাশে দাঁড় করান, ‘তোমার চেয়েও লম্বা, দেখেছ?’ ছেলে জুতার আফসোস ভুলে মাছের দিকে তাকিয়ে হাসে, বলে, ‘এটাই নেব। এটাই।’ বাবা মানা করতে পারেন না। দামদর করতে করতে গিয়ে দাঁড়ায় চৌত্রিশ হাজার টাকা। লিটন দাঁত খুঁটতে খুঁটতে খোঁড়া পাটাকে একটু আরাম দেওয়ার জন্য মন্টুর গলা জড়িয়ে দাঁড়ায়, ফিসফিস করে বলে, ‘চৌত্রিশ হাজার ট্যাকা কত ট্যাকা হইবার পারে রে?’ মন্টু যেন লিটনের কথা শুনতেই পায় না, বাবা-ছেলের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। বাবা ছেলেকে বলেন, ‘বাসায় নিয়ে গেলে এই মাছ কেউ কাটতে পারবে না। ইস্ এত্ত বড় মাছটা তোমার মা দেখল না!’ শেষে ছেলেকে মাছের পাশে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কাদায় মাখামাখি জুতো নিয়ে ছেলের তখন লজ্জার শেষ নেই। মন্টুর হঠাৎ চেতনা ফিরে আসে, ছুটে গিয়ে কোত্থেকে কলাপাতার ছেঁড়া অংশ এনে জুতার কাদাটা মুছে দেয়। ছেলেটা যেন জানতই, মোছার জন্য পা বাড়িয়ে দেয়। ছবি তোলা হলে ‘তুমি কে’ দিয়ে শুরু করে সে, যেন মন্টুর সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করে। লিটন বিরক্ত হয়, কনুই দিয়ে গুঁতো দেয় মন্টুকে। না পেরে কানে কানে বলে, ‘ওই, তুই থামলি? এগো লগে এত কতা কিয়ের?’ ছেলেটা লিটনের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কী বললে ওকে? আচ্ছা, তুমি কি আমাদের চেয়ে বড়?’
‘হ, বহুত বড় । ওই মন্টুও তোমার চাইতে বড়। ঠিকমতো খাওন পাইলে...’
ছেলেটা চিন্তায় পড়ে যায়। মন্টুর দিকে এগিয়ে নিজের আর মন্টুর কাঁধ মাপতে থাকে; খানিক আগে যেমন মাপছিল মাছটার সঙ্গে। মাছটা ততক্ষণে রক্তারক্তি করে ছোট ছোট টুকরো হয়ে গেছে। একে একে অনেকগুলো ব্যাগ গাড়িতে ওঠে। লিটন অবাক হয়ে দেখে, ছেলেটার বাবার হাতের টাকা গোনা শেষই হয় না, গুনতে গুনতে যেন সকালটা দুপুর হয়ে যায়। আর তখন হয় এক অদ্ভুত ব্যাপার, ছেলেটা জেদ ধরে বসে, মন্টুকে না নিয়ে সে বাড়ি যাবে না। তাকে কিছুতে গাড়িতে ওঠানো যায় না। বাবার অবস্থা দেখে মনে হয় ছেলেকে কষে চড় লাগাতে পারলে ভালো লাগত, কিন্তু গালে আলতো করে হাত রেখে বলেন, ‘ওদের বাড়ি তো এখানে, বাবু, ওরা আমাদের সঙ্গে গিয়ে কী করবে?’ জেদি ছেলে চিৎকার করে বলে, ‘না... তুমি জানো না, ওদের বাড়ি নেই। ওই যে ও বলেছে।’ ছেলেটা আঙুল উঠিয়ে মন্টুকে দেখায়। রংজ্বলা হাফ প্যান্ট আর ঘাড়ের কাছে খানিকটা ফাটা শার্ট গায়ে নিজেরই ছেলের সমবয়সী নির্লিপ্ত ছেলেটির দিকে অস্বস্তি নিয়ে তাকান তিনি। ঘাড়ে হাত রেখে পাশে দাঁড়িয়ে কাত হয়ে দাঁড়ানো সামান্য বড় আরেকজন। কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁটছে আর বাজারে ঘিরে থাকা লোকদের মাঝখানে তার বিপদে পড়ার মজা তারিয়ে উপভোগ করছে। বাবা-ছেলের জেদাজেদি চলতে থাকে, দর্শকের জটলা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকে, মন্টুকে তিনি সঙ্গে নেবেন কি না।
একসময় জেদি ছেলেটি কান্না জুড়ে দেয়, মাছের দোকানের আশপাশে উন্মাদের মতো ছোটে। এ যেন কোনো খেলনার জন্য বায়না। দামি জুতা-জামা আরেক প্রস্থ কাদায় মাখামাখি হয়। নাটকের শেষ দৃশ্যে ছেঁড়াফাঁড়া কাপড় পরা ছোট ছেলেটার কাছে এসে ভদ্রলোক বিরক্তিভরা গলায় বলেন, ‘ওই, যা গাড়িতে ওঠ।’ চারদিকের দর্শক তালি বাজায়। কান্না থামিয়ে জেদি ছেলে ছুটে আসে, ‘তুমি ওকে তুই করে বলছ কেন? আগে থেকে চিনতে?’ পেছন থেকে ফাটা শার্টটা লিটন টেনে ধরলে আরেকটু ফেটে যায়, তাতেও মন্টুর কৌতূহল দমে না। লিটনের হাত টেনে ধরে সে গাড়ির কাছে যায়। দ্রুত উঠে গেলে লাফিয়ে গাড়িতে ওঠে ছেলেটা। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে লিটনও ওঠে দ্রুত। ভদ্রলোকের ছেলের কান্না থামে। মাঝখানে বসে দুজনের দুই ময়লা হাঁটুর ওপর হাত রাখে সে। ভাবলেশহীন ড্রাইভারের পাশে ভদ্রলোক নাক কুঁচকে বসে থাকেন। গাড়ির বুটে মাছের টুকরো থেকে গন্ধটা আসছে, নাকি এদের গা থেকে, বোঝার উপায় নেই। না চাইলেও লিটনকে যেতে হয়, কে জানে রাস্তায় যদি এরা মন্টুকে কোথাও নামিয়ে দেয়, সে কি আর রাস্তা চিনে বাজারে ফিরতে পারবে! ওদিকে ভোর থেকে মালে হাত লাগানোর বখশিশটা না নিয়ে হুট করে চলে আসাতে আফসোস লাগে, ফিরে এলে দোকানদার কি আর দেবে? বাকির নাম ফাঁকি।
বাড়িটা কত উঁচু—লিটন আর মন্টু গাড়ির ভেতর থেকে ঠাওর করতে পারে না। গাড়ি যখন ভেতরে এসে থামে, মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই যেন ঠান্ডা ছাদ দিয়ে ঢাকা। চোখ ছানাবড়া হলেও লিটনের মেজাজ খারাপ। মন্টুর কারণে দিনটাই নষ্ট। ছেলেটা তাদের হাত ধরে টানে। লিটন তার সঙ্গে পেরে ওঠে না। একে একে সব দেখতে হয়, ‘এই আমার ঘর, এ হলো আমাদের জিম, ওদিকটায় দেখো পার্ক, ওখানে পরে আমরা খেলতে যাব, কেমন?’ ঘরের সবকিছু এত স্থির, এত ঝকঝকে যে লিটন আর মন্টু গা বাঁচিয়ে চলে। কে জানে কিসে ধাক্কা লাগে। পৃথিবীতে এত পরিষ্কার জায়গাও থাকে যে নিজেদের শরীরটা জড়সড় করে রাখতে হয়! কোথায় দাঁড়াবে, ভেবে পায় না তারা। ওদিকে ছেলেটা হাত ধরে টেনে বিছানায় বসিয়ে দেয়, ‘এখানে আমি ঘুমাই।’ তার বাবা কাপড় বদলে ফিরে আসেন, সঙ্গে মা-ও। ঘরে ঢুকেই ছিটকে বেরিয়ে যান তিনি। ঘরের বাইরে তাদের আলাপ ঘরে বসেই শোনা যায়।
‘আশ্চর্য, এদেরকে তুলে নিয়ে এসেছ! তোমার বুদ্ধি দেখলে অবাক লাগে। ছেলে বলল আর দুটো রাস্তার ছেলেকে খালি পায়ে... মানা করতে পারোনি?’
‘তুমি তো আরিয়ানের জেদ জানো। বাজারের মধ্যে একটা হইচই বাঁধিয়ে ফেলল, তারপর...’
‘সামান্য জেদ ম্যানেজ করতে পারলে না? আগেই বলেছিলাম, ও এখনো দিন-দুনিয়ার কিছু বোঝে না, ওকে এসব জায়গায় নেওয়ার দরকার নেই, নাহ্, ওকে উনি মাছের বাজার দেখাবেন! এখন হলো!’
‘কী আর, ওদেরকে কিছু কাপড়চোপড় থাকে তো দাও, পরে ড্রাইভার গিয়ে নামিয়ে দিয়ে আসবে। ছেলেটা এত জেদ করল, আমি মানা করতে পারলাম না,’ কাঁচুমাচু মুখে ভদ্রলোক কথাগুলো বলতে বলতেই স্ত্রীর সামনে ফোন মেলে ধরেন, ‘এই দেখো, কী সাংঘাতিক বড় ছিল মাছটা, তুমি দেখলে...’ মহিলা ফোনের দিকে তাকান না। আগের চেয়েও বেশি বিরক্তি নিয়ে বলেন, ‘রাতে এতগুলো মেহমান আসবে, সেসব করব, নাকি এদের জন্য এখন কাপড় খুঁজতে যাব? যত্তসব!’ তাদের কথার মাঝখানে ছেলে বেরিয়ে আসে, ‘মা, আমার নতুন বন্ধুদের দেখেছ? ওরা এখন থেকে আমার সঙ্গে থাকবে।’ মা ছেলের গালে হাত বুলিয়ে আদর করেন। ছেলে নাচতে নাচতে চলে যায়। বাবা বলেন, ‘কই, তুমিও তো মানা করতে পারলে না?’
‘শোনো, কিছু খাবার আর কাপড় দিচ্ছি, ড্রাইভারকে বোলো খাওয়ার পরে ওদের ছেড়ে আসতে। না হলে পরে ব্যাপারটা আরও কঠিন হবে।’
‘থাক না হয় এখানেই ওরা, বাচ্চাটা যখন চায়...’
‘মানে? ইউ মিন চাইল্ড লেবার! মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার। কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে বিদায় কোরো বলে দিলাম।’
লিটন মেঝেতে বসে দাঁত খোঁটে। মন্টুর আনন্দের শেষ নেই। ছেলেটা যা দেখায়, সে তা-ই মুগ্ধ হয়ে দেখে। ফাঁকে কখনো ছুটে এসে লিটনকেও দেখিয়ে যায়, বলে, ‘মাইনষের এত্ত জিনিস থাকে, ভাই!’ তার গায়ে ঝকঝকে শার্ট-প্যান্ট দেখে লিটন বলে, ‘তরে তো আর ছ্যারা লাগে না রে, বড়লুকের পোলার লাগান লাগে।’ মন্টু হাসে, ‘তোমারেও তো, ভাই।’ তারপর প্যান্টের পেছনে গুজে রাখা খেলনা পিস্তল লিটনের দিকে তাক করে বলে, ‘আমি রেব, আমি রেব, করোসফায়ার কইরা দিমু।’ লিটন হেসে বলে, ‘এইহানে কী দ্যাখতে আইছিলি তুই?’
‘এই বাড়িটা । আর দ্যাখতে চাইছিলাম, এইরাম পোলার মায়ে কেমুন অয়।’
‘হইছে দেখা?’
মন্টু উত্তর দেয় না।
‘নে, অহন চল।’
‘কই যামু?’
‘ক্যান, বাজার?’
‘হ্যায় যে কয় এইহানে থাকতে?’
‘না রে, পাগলা, এইটা তো আমগো বাড়ি না। আমগো বাড়ি হইল গিয়া বাজার।’
মন্টু অবিশ্বাস্য কিছু শোনার মতো করে তাকিয়ে থাকে। লিটন বলতে থাকে, ‘শোন, আমরা না গ্যালে হ্যারা আমগো নিয়া বাজারের মাইনষের সামনে ছাইড়া দিয়া আসব। আমগো একটা মান-সম্মান আছে না, কী কস?’
‘তা ঠিক, ভাই, মাইনষে ভাবব, বাড়িত রাখব না দেইখা ছাইড়া দিয়া গেল।’
‘হ। পোলাটা খাইয়া ঘুমাইছে। অহনই চল। গিয়া হগ্গলরে কমু, দাওয়াত খাইয়া আইলাম।’
পিস্তলটা মন্টুর হাত থেকে নামে না। লিটন জোর করে নামায়। বের হতে হবে খালি হাতে, না হলে বিপদ আছে, কিছু একটা যেন তাকে আগেভাগেই তা জানিয়ে দেয়। রাস্তায় নেমে বড় নিশ্বাস নেয় তারা। ‘হাঁইটা যাইতে মনে কয় রাইত নাইমা পড়ব,’ লিটন বলে। ‘তাতে কি, ভাই, ল্যাংড়া পা লইয়া তো আর উইড়া যাইতে পারবা না।’ লিটন মন্টুর মাথার পেছনে ছোট্ট ধাক্কা দেয়। তারপর রাস্তার চায়ের দোকান থেকে পানি চেয়ে খায়। আজকে কেন যেন তার চা খেতে মন চায়। ভোরে মাছের চালানে হাত লাগানোর টাকাটা আনলে এখন চা খাওয়া যেত। সারা দিন পর এই ভালো জামাকাপড় পরে দোকানদারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে কি আর সকালের টাকা পাওয়া যাবে? ভাবতেই অনিশ্চয়তা মনটা দখল করে ফেলে। তবে টাকা না পেলে কী, পেটে মোটেও খিদে নেই। খিদে না থাকাটা যেন কেমন, মনে হয়, খোঁড়া পায়ে হাঁটলেও হাঁটার কোনো কষ্ট নেই। বড়লোকেরা এত খাবার খেলে তারপর আবার কখন খায়? ভাবতে গিয়ে লিটন নিজের মনে হাসে। খানিক পরে মন্টু ক্লান্ত হয়ে পড়ে, বলে, ‘বড়লুকের পাড়া বহুত দূর। আমার ক্যান জানি আবার জ্বর জ্বর লাগতেছে, ভাই।’
‘চইলা আসছি, আরেট্টু কষ্ট কর । চল, আইজ রাইতে তোরে পুরা কাঁথাটাই ভাঁজ কইরা দিয়া দিমুনে।’
দুজন দুজনের ঘাড়ে হাত রাখে; কে কার ওপর ভর করে হাঁটে, ধরা যায় না।

খণ্ডিত চাঁদের ভেতর by আহমেদ খান

এখান থেকে আলতামির দুইটা পথ বেছে নিতে পারে—যেতে পারে ঢাকার দিকে—যে দিকটা সে তিনটা ঘণ্টা আগেও ফেলে আসতে চেয়েছিল। ঢাকা মানেই মৃত্যু হয়ে উঠেছিল আলতামিরের জন্য। শ্বাস নেওয়ার প্রতিটা সময় ছিল ভীতিকর। পেঁয়াজপট্টির ভেতর দিয়ে, মুখের ওপর গামছা চাপিয়ে, পদ্মর হাত ধরে যখন সে ছাড়ছিল কারওয়ান বাজার, মনে মনে খোদার কসম কেটেছিল আলতামির—জান থাকতে আর কোনোদিন ঢাকায় ফিরবে না সে। না, শুধু সে নয়। সে আর পদ্ম।
তা কাজটা তারা কম মন্দ তো করেনি।
সরদারের ডেরায় থেকে, সরদারেরই চোখের আড়ালে তারা প্রেম করেছে। এ যেন পানির ভেতর থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ। কিন্তু আলতামিরের এক গোঁ…যে কুমির, তার সঙ্গে বিবাদে ভয় নেই, যদি ডাঙা থাকে পায়ে!
ডাঙা এখন আলতামির আর পদ্ম দুজনেরই পায়ের তলায়। প্রায় ১৭ কিলোমিটার উড়ে এসে এই যে ব্রিজের ওপর উত্তর-দক্ষিণের দুটো পথ…একটা ঢাকা—মৃত্যুর, অন্যটা উন্মুক্ত—জীবনের! তবে তাতেও সন্দেহ হয় আলতামিরের। তার ধূর্ত চোখ বুঝে গেছে ওপাশেও হেডলাইট জ্বেলে দাঁড়িয়ে আছে সরদারের আজ্ঞাবাহী ছায়ারা। সরদার শুধু কারওয়ান বাজারের ওপর যে ছড়ি ঘোরায় তা নয়, বরং তার লোক ছড়িয়ে আছে দশ দিকে। কুলিগিরি করতে গিয়েই তো পদ্মর চোখে মজেছিল আলতামির, কাজল না দেওয়া ডাগর চোখে কী যে হাতছানি! বাজার থেকে কাঁচা সুপারির খদ্দের পদ্ম, প্রতিদিন আলতামিরকে কাছে আসার সুযোগ দিত ভিড়ের মধ্যে। কোনো কোনো দিন যেন তাড়াহুড়ো করেই সন্ধ্যা নেমে যেত। সেদিন...আরও অনেক দিন...একদিন হাত ছুঁয়ে একদিন কাঁধ, আলতামির বুঝেছিল ঢাকার বস্তিঘর ছেড়ে তাকে কোনো জঙ্গলে যেতে হবে। যদি পদ্মর প্রশ্রয় থাকে।
প্রশ্রয় তো ছিলই! না থাকলে সরদারের বউ হয়েও কেন পদ্ম এমন মোহন হাসে? সন্ধ্যার মুখে পটল কেনার নামে পানির ট্যাংকের পেছনে উদ্গ্রীব কেন চলে আসে? আর একাও যে আসে তা তো না…কত আবদার আর খুনসুটি থাকে সঙ্গে!
এক রাতে সরদার যখন বাংলা মদ গিলছিল, তখন আলতামির শক্ত করে ধরে পদ্মর হাত। ঢাকাকে বিদায় দিয়ে পৌঁছাতে চায় জঙ্গলে, ডাঙায়। কিন্তু রাতের এই স্তব্ধ ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে সে গুমগুম শোনে মোটরসাইকেলের শব্দ—দুপাশ থেকেই। উত্তরে ঢাকা—যেখানে কোনোদিন ফিরবে না তারা; আর দক্ষিণে পৃথিবী—যেদিকে কথা ছিল প্রেম আলিঙ্গন করবে তাদের। কিন্তু সরদারের শক্তিবলয় এখন দুপাশ থেকে ইঞ্জিনের শব্দ তুলে অপেক্ষমাণ। তাই দক্ষিণে গিয়েই ফিরে আসতে হয় তাদের, মৃত্যুর মুখ এমন কালো হয় কেন? এরচেয়ে কি ভালো ঢাকার সরদার…ক্ষমাও যদি মিলে যায়! কিন্তু ভালোবাসা নিয়ে ক্ষমাই বা চায় কীভাবে মানুষ?
তাহলে পথ নেই কোনো!
একটা বিন্দুর মতো চাঁদ অনেক নিচের সরু এক সুতানদীতে নিজেকে আছড়ে রেখেছে। আলতামিরের হাসি পায় এই দুর্যোগেও। পথ না থাকলে চাঁদের আলো কোন কাজে আসে? উত্তরে ফেরা যায় না এ আলোয়…দক্ষিণ থেকে হা রে রে রে করে ছুটে আসতে থাকা কালো মৃত্যুর মুখেও এ আলো ভীষণ অকার্যকর!
অথচ দুটো বন্ধ পথকে তীব্রভাবে ভেঙিয়ে পদ্ম আর আলতামির পরস্পরকে প্রবলভাবে জড়িয়ে ধরতেই তাদের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে তৃতীয় পথ। চাঁদ তাদের সাহায্য করে হয়তো। অথবা কবেকার শোনা পালাগান, আরব্য রজনী বা পাখিরা হয়তো তাদের মাথার ভেতর ডেকে ওঠে হঠাৎ করেই। তারা দুজন দুজনাকে ধরে তৃতীয় অতিকায় এক পথ সৃষ্টি করে লাফিয়ে পড়ে ব্রিজ থেকে।
তারা পাখি নয় বলে উড়ে যেতে পারে না। তারা মায়াবী নয় বলে মিলিয়ে যেতে পারে না বাতাসে। তবে অনেক নিচের চাঁদকে তারা দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে। লোকে বলে, ভালোবেসে এর আগেও অনেকেই চাঁদকে এমন দ্বিখণ্ডিত করে গেছে!