Sunday, April 12, 2015

ছিনতাই-অপহরণের নেতৃত্বে র‌্যাব-পুলিশের চাকরিচ্যুতরা

পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত কিছু বিপথগামী সদস্য রাজধানীতে ছিনতাই, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত কিছু সদস্যও এসব অপরাধে নেতৃত্বে দিচ্ছে। এ ধরনের কমপক্ষে ১০টির বেশি গ্রুপ রাজধানীতে সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি গ্রুপেই চাকরিচ্যুত সদস্যদের পাশাপাশি পেশাদার কিছু অপরাধীও জড়িত রয়েছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্রে ওই তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ আরও জানায়, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাব থেকে নানা অভিযোগে চাকরিচ্যুত সদস্যরাই অপরাধীগ্রুপের নেতৃত্ব ও নির্দেশনা দিচ্ছে। মোবাইল ট্রাকিংসহ প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও আইনের ফাঁকফোকর জানা থাকায় তাদের পাকড়াও করাও পুলিশের পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়েছে। এমনই একটি গ্রুপকে শুক্রবার রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
ডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক মাসে রাজধানীর বনশ্রী থেকে রেজাউল ইসলাম ওরফে মাসুদ, খিলগাঁও থেকে শাহজাদা হোসেন, সেগুন বাগিচা থেকে আছাদুজ্জামান আসাদ, সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে আবুল কালাম আজাদ, কাফরুলে আলী সিদ্দিক, উত্তরার আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজী হেলাল উদ্দিন, আবু বকর সিদ্দিক, রিপন মিয়া, আবদুল বারেক, টিটু মিয়া, মকবুল ঢালী ও মারুফ হোসেন, যাত্রাবাড়ী থেকে জাকির হোসেন সুমন, আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে রনি, আল আমিন ও ইকবালকে গ্রেফতার করা হয়। তারা কখনো পুলিশের এসপি, কখনো এডিশনাল এসপি, কখনো ওসি এবং সার্জেন্ট পরিচয় দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা, অপহরণ, ছিনতাই ও জিম্মি করে অর্থ আদায় করে আসছিল। এছাড়া সিরাজুল হক চৌধুরী ও সোহেল রানাসহ বিভিন্ন সময়ে মেজর পরিচয় দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে বেশকয়েককে গ্রেফতার করেছে ডিবি।
শনিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, গত কয়েক বছরে এ ধরনের অন্তত ৬টি গ্রুপকে আটক করেছে ডিবি। কিন্তু আদালতে তথ্য প্রমাণের অভাবে তাদের সাজা হয়নি। কিছুদিন পর আদালত থেকে জামিন পেয়ে তারা আবার একই ধরনের অপরাধ করছে। তেজগাঁও থেকে আটক ৮ ভুয়া ডিবি পুলিশ সম্পর্কে মনিরুল ইসলাম জানান, আটক ৮ জনের নেতৃত্বে ছিল সেনাবাহিনীর সৈনিক পদ থেকে ২০০৫ সালে চাকরিচ্যুত আবদুস সামাদ। তার সহযোগী ছিল সিরাজ হাওলাদার, আবুল হোসেন, শাহাবউদ্দিন, ফরহাদ গাজী, নান্নু মিয়া, তারা মিয়া ও মো. আরিফ। আটকের সময় তারা উল্টো পুলিশকে মারধর শুরু করে। তারা সাদা মাইক্রোবাস ব্যবহার করত। তাতে ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি কাজে নিয়োজিত’ লেখা ও অপর মাইক্রোতে ‘ডিবি পুলিশ’ লেখা ছিল। ওই দুইটি মাইক্রোবাসে পুলিশের ব্যবহৃত হাতকড়া, ওয়াকিটকি, লাঠি, ক্যাপ, ব্যাজ ও পোশাক ছিল।
পুলিশ জানায়, তারা মতিঝিল, গুলশান, উত্তরা, কাওরানবাজার, ধানমণ্ডি, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি ব্যাংকের গ্রাহকদের টার্গেট করে। ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ‘ম্যানেজ’ করে তারা ব্যাংকে যারা টাকা তুলতে আসতেন তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ব্যাংকের সামনে গাড়ি নিয়ে অবস্থান করে। টাকা তুলে বের হলেই তাদের ডিবি পরিচয় দিয়ে গাড়িতে রাখত। গাড়িতে মারধর করে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে রাস্তায় ফেলে দিত।
রিমান্ডে ৮ ভুয়া পুলিশ সদস্য জানিয়েছে, ৭ এপ্রিল কাকলী এলাকার একটি ব্যাংক থেকে এক ব্যক্তি দেড় লাখ টাকা তুলে বাসায় ফিরছিল। তাকে ডিবি পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে ছিনতাই করা হয়।

দৃশ্যপটের বাইরে তারা by সিরাজুস সালেকিন

নগরপিতা হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাদের। নাগরিকদের সমস্যা নিয়ে সরব ছিলেন মিডিয়ায় ও মাঠে। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা চারজনই বাধ্য হলেন দৃশ্যপটের বাইরে চলে যেতে। তারা হলেন- বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, আওয়ামী লীগ নেতা হাজী মোহাম্মদ সেলিম ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. তুহিন মালিক।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে আগে মাহমুদুর রহমান মান্নার ঠিকানা হয়েছে কারাগার। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি করা হয়েছে। একই ধরনের মামলার আসামি হয়ে ড. তুহিন মালিক এখন দেশান্তরি। দৃশ্যত ক্ষমতাসীনদের চাপের মুখে সিটি নির্বাচন থেকে সরে গেছেন হাজী সেলিম। আর মনোনয়নপত্রে ত্রুটির জন্য ছিটকে পড়েছেন আবদুল আউয়াল মিন্টু। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। মনোনয়নপত্রে সমর্থক ওই সিটি করপোরেশনের ভোটার না হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং অফিসার। আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলে শুনানি শেষে আপিল খারিজ হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলেও প্রার্থী হতে পারেননি মিন্টু। মিন্টুর আইনজীবীরা দাবি করেছেন, নির্বাচন কমিশনের তাড়াহুড়ার কারণে মিন্টুর সমর্থক ভোটার হতে পারেননি। যদিও তিনি নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে নিয়মিত কর পরিশোধ করেন। অথচ তিন সিটি করপোরেশনের মধ্যে ঢাকা উত্তরেই প্রার্থী নিয়ে কোন চিন্তা ছিল না বিএনপির। দীর্ঘ দিন থেকেই মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন তিনি। এমনকি এটাও বলাবলি আছে, ঢাকার মেয়র হওয়ার জন্যই বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন আবদুল আউয়াল মিন্টু।
ঢাকাকে দুই ভাগ করার পর ২০১২ সালে দুই সিটির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। তখন আওয়ামী লীগ থেকে বিদায় নেয়া মাহমুুদুর রহমান মান্না নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভোটারদের মধ্যে প্রচারণা শুরু করেছিলেন মান্না। বেশ কয়েকটি সভা-সমাবেশ করে জনগণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন। ওই নির্বাচন স্থগিত হলে মান্না নাগরিক ঐক্য নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনের ব্যানারে নাগরিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে কাজ শুরু করেন। চলতি বছরে সিটি নির্বাচনের আভাস পেয়ে মান্না ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। সিটি নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালে মান্নার দুটি ফোনালাপের রেকর্ড প্রকাশ হয়। সেখানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতায় উসকানি দেয়ার অভিযোগ উঠে মান্নার বিরুদ্ধে। ২৪শে ফেব্রুয়ারি মান্নাকে রাজধানীর বনানী থেকে আটক করে র‌্যাব। এরপর গুলশান থানায় তার বিরুদ্ধে সেনা বিদ্রোহে উসকানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের দুটি মামলা দিয়ে ২০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। মান্না কারাগারে থেকেই নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কারাবন্দি মান্নার স্বাক্ষর সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করা সম্ভব না হওয়ায় মনোনয়নপত্র জমা দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও অন্যান্য সহযোগিতার অভাব এবং তার শারীরিক সমস্যা প্রধান বাধা হিসাবে দায়ী করেন নাগরিক ঐক্যের নেতারা।
ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ার আগ থেকেই মাঠে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তুহিন মালিক। ঢাকা দক্ষিণের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন তিনি। সেই ২০০৭ সাল থেকে নিজের নাম আর ছবিসহ নানা সচেতনতামূলক পোস্টারিং ও দেয়াল লিখন করে আসছিলেন। ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন ভাগ হওয়ার পর তার প্রচারণায় পায় ভিন্ন মাত্রা। নিজেকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে নতুন করে প্রচারণা শুরু করেন। ‘ঢাকায় বাঁচতে ঢাকাকে বাঁচাতে’ শীর্ষক প্রচারণা তার সম্পর্কে নগরবাসীকে উৎসুক করে তোলে। কোন দলীয় রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলেও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন তিনি। ঢাকাকে দক্ষিণ এশিয়ার মডেল করার স্বপ্ন ছিল তার। অনেকটা দ্রুত মিডিয়ায় জায়গা করে নিয়েছিলেন তুহিন মালিক। গত বছরের ৯ই ডিসেম্বর আদালতে সংবিধান নিয়ে কটূক্তি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও মানহানির অভিযোগ দায়ের করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-সম্পাদক গোলাম রব্বানী। ২০১৪ সালের ৩০শে নভেম্বর পূর্ব লন্ডনের ওয়াটার লিলি গার্ডেন মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ নিয়ে কটূক্তি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও মানহানিকর বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে এ মামলা হয়। এরপর একই অভিযোগে তুহিন মালিকের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক মামলা করা হয়। একপর্যায়ে অনেক নীরবে দেশ ছাড়েন তিনি। নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে লড়তে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে আসছিলেন। তফসিল ঘোষণার পর তিনি জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন। কিন্তু এ সিটিতে সাঈদ খোকন দলীয় সমর্থন পাওয়ায় দলের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। নির্বাচনে অংশ নিতে সংসদ সদস্য পদ ত্যাগ করার চেষ্টা করলেও তিনি সফল হননি। এ কারণে মনোনয়নপত্র তুললেও শেষ পর্যন্ত তিনি তা জমা দেননি।

যুক্তরাষ্ট্র আর নাক গলাবে না, ওবামা–রাউল ঐতিহাসিক বৈঠক

ক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও কিউবার নেতা রাউল কাস্ত্রোর মধ্যে ঐতিহাসিক বৈঠকটি হলো গতকাল শনিবার। পানামার রাজধানী পানামা সিটিতে গতকাল উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলনের (এসওএস-সামিট অব দি আমেরিকাস) দ্বিতীয় দিনের আলোচনার এক ফাঁকে দুই নেতা মুখোমুখি বৈঠকে মিলিত হন। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের পর চিরবৈরী দুটি দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের প্রথম বৈঠক এটি।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এই বৈঠক দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। দুই নেতা গত বছরের ডিসেম্বরে দীর্ঘদিনের বৈরিতা অবসানের পথে যে যাত্রা শুরু করেছেন, তাতে এক বড় পদক্ষেপ এই বৈঠক।
এর আগে গত শুক্রবার কিউবার নেতা রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে ঐতিহাসিক করমর্দন হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার। বহুল প্রত্যাশিত গতকালের বৈঠকের আগে ওবামা বলেন, লাতিন আমেরিকায় নাক গলানো আর নয়। খবর এএফপি, বিবিসি ও রয়টার্সের।
দুই নেতা বৈঠকের পর বারাক ওবামা প্রথম কথা বলেন। তিনি মুক্তমনা মানসিকতার জন্য রাউল কাস্ত্রোর প্রশংসা করেন। এ সময় রাউল কাস্ত্রো বলেন, কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার আলোচনায় দরকার আরও বেশি ধৈর্য। রাউল বলেন, ‘আমরা সবকিছু নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। কিন্তু আমাদের খুবই ধৈর্য ধরতে হবে।’

ওবামা ও কাস্ত্রো শুক্রবার সম্মেলনের উদ্বোধনের আগেই করমর্দন করেছেন, করেছেন কুশল বিনিময়। পর্যবেক্ষকেরা বলেছেন, এতে ছিল নানা ধরনের সূক্ষ্ম সংকেত। এর আগে কেবল একবারই দুই নেতা করমর্দন করেছেন—২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় দেশটির কিংবদন্তি নেতা প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলার এক স্মরণসভায়। পাঁচ দশকের শীতলতার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার পক্ষ থেকে সম্পর্ক উন্নয়নে গত ১৮ ডিসেম্বর যে আকস্মিক ঘোষণা এসেছিল, ওবামা-রাউল বৈঠক তাকে একধরনের সম্পূর্ণতা দেবে। ওই ঘোষণাটা আকস্মিক হলেও তা ছিল ১৮ মাস ধরে গোপন আলোচনার ফসল।
মাদুরো বললেন: গতকালের সম্মেলনে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি আপনাকে (ওবামা) সম্মান করি। কিন্তু আপনাকে বিশ্বাস করি না।’ তারপরও উত্তেজনা প্রশমনের স্বার্থে তিনি ওবামার সঙ্গে বৈঠক করতে আগ্রহী বলে জানান। মাদুরোর বক্তব্যের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামা উপস্থিত ছিলেন না। ওবামা কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করার জন্য উঠে যান।
নাক গলানো আর নয়: সম্মেলনের ফাঁকে ওবামা শুক্রবার একটি আঞ্চলিক সুশীল সমাজ ফোরামে বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি বলেন, অতীতে যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকার বিষয়গুলোতে অবাধে নাক গলিয়েছে। তবে তা এখন অতীত। ওবামা লাতিন আমেরিকার নেতাদের উদ্দেশে বলেন, একটা সময় ছিল, যখন মনে করা হতো এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করেও দায়মুক্তি পেয়ে যাবে। সেসব দিন এখন অতীত হয়ে গেছে।
অনিষ্পন্ন ছয় ইস্যু: যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দীর্ঘ পথে কমবেশি ছয়টি বিষয়কে মোকাবিলা করতে হবে কূটনীতিকদের। এগুলো হচ্ছে:
অর্থনীতি: সমাজতন্ত্রী কিউবায় এখনো কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। তারা চীনা ধাঁচের পুঁজিবাদের দিকে ঝুঁকবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
জাতীয়করণকৃত সম্পদ: যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য, সম্পদ ফেলে পালিয়ে যাওয়া কিউবান-আমেরিকান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কিউবা ৭০০ কোটি ডলার ঋণী।
দূতাবাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা: দুই দেশকে এখন পরস্পরের দূতাবাস প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রদূতসহ অন্য কর্মকর্তা বিনিময় করতে হবে।
সন্ত্রাসবাদ: যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা সন্ত্রাসবাদবিষয়ক দেশের তালিকায় এখনো কিউবার নাম রয়েছে। অবশ্য, তা বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
অবরোধ: কিউবা চায় দ্রুত তার ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার হোক। তবে ওয়াশিংটন বলছে, আইনে পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে।
গুয়ানতানামো বে কারাগার: কিউবার ভেতরে অবস্থিত গুয়ানতানামো বেতে অবস্থিত নৌ ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাসদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি হাভানার। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা এ জন্য কিউবাকে ভাড়া দিয়ে আসছে।

বুহারি নিজের পথ ঠিক করে ফেলেছেন by অ্যাডাম নসিটার

নাইজেরিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদু বুহারি গত বুধবার অভ্যর্থনা বক্তব্য দেন, সে সময় তাঁর মুখে হাসি দেখা যায়নি। বোধগম্যভাবেই সন্ত্রাসবাদ ও দুর্নীতির প্রসঙ্গই তাঁর বক্তৃতায় উঠে এসেছে। ভোটের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মধ্য দিয়ে বুহারি নাইজেরিয়ার জন্য অসাধারণ নজির স্থাপন করলেন: ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর। যদিও এই বুহারি একসময় সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন।
সেই বক্তৃতায় বুহারি বলেছেন, কাগজে-কলমে ও বাস্তবে উভয় ক্ষেত্রেই নাইজেরিয়া এখন গণতান্ত্রিক দেশ। কারণ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ঠিকঠাক কাজ করেছে বলেই তিনি এই বক্তৃতা দিতে পেরেছেন।
আবার দেশটির রাজধানী আবুজায় দেওয়া সেই বক্তৃতায় বুহারি নাইজেরিয়ার মতো বিশাল গণতান্ত্রিক দেশে দুটি বিষফোড়ার কথা উল্লেখ করেছেন: জঙ্গি সংগঠন বোকো হারামের নির্মম সহিংসতা ও তাঁর ভাষায় ‘দুর্নীতির দুষ্ট ক্ষত’। বুধবারের সেই বক্তৃতায় তিনি বোকো হারামের চেয়ে দুর্নীতিতেই বেশি জোর দিয়েছেন। এর মধ্যে সম্ভবত বোকো হারাম যে সামরিক হুমকি হয়ে উঠছে, সেই সত্যের প্রতি এক যুদ্ধপ্রবীণ ব্যক্তির তাচ্ছিল্যের ভাব রয়েছে।
যদিও বোকো হারাম হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে এবং দেশের বিশাল ভূমি দখল করেছে, বুহারি গত জানুয়ারিতে নির্বাচনী প্রচারণাপর্বে এক সাক্ষাৎকারে খোলাখুলিভাবে ওই সংগঠনসংক্রান্ত সব শঙ্কা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। এমনকি তিনি এই সংগঠনের লড়াইয়ের সক্ষমতা নিয়েও তাচ্ছিল্য করেছেন। বক্তৃতায় বুহারি বলেছেন, ‘বোকো হারাম খুব শিগগির আমাদের সম্মিলিত ইচ্ছার শক্তি সম্পর্কে জানতে পারবে। তাদের না হারানো পর্যন্ত আমরা থামব না। যা করা দরকার, সবই করব।’ বাস্তবে বোকো হারাম ইসলামিক স্টেটের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করলেও এই জানুয়ারিতে তারা যতটা ভয়ংকর ছিল, এখন আর ততটা নয়।
অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি শক্তির সম্মিলিত অভিযানে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বোকো হারামের যে দখল ছিল, তা অনেকাংশে কমে গেছে। চাদের সেনাবাহিনী বোকো হারামের দখলে থাকা বেশ কয়েকটি সীমান্ত শহর পুনর্দখল করেছে, আর নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী দক্ষিণ আফ্রিকার ভাড়াটে বাহিনীর সহায়তায় আরও কিছু শহর নিজেদের দখলে এনেছে।
নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী দাবি করছে, বোকো হারাম অধিকৃত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সব অঞ্চলই—স্থানীয় সরকারের অঞ্চল—তারা নিজেদের দখলে এনেছে। তাদের এ দাবির সত্যতা নিরূপণ করা কঠিন। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতে গাওজাসহ আরও অনেক এলাকাই মাসের পর মাস বোকো হারামের দখলে ছিল।
কিন্তু বুহারির জন্য আরও চ্যালেঞ্জের কারণ হচ্ছে, সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রবাহিত ক্ষয়িষ্ণু ধারা: উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতি, নৈতিকতার নিম্নমান, প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র না থাকা। কারণ, ছয় বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেটের সিংহভাগই ভিন্ন খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যে কারণে বোকো হারামের উত্থান হয়েছে।
আবুজায় এক কূটনীতিক বলেছেন, ‘তাঁদের সমস্যা প্রাতিষ্ঠানিক, এটা ঠিক করতে অনেক সময় লেগে যাবে।’ যদিও তাঁর কথা বলার এখতিয়ার ছিল না। বোকো হারামকে পরাজিত করতে ভাড়াটে সৈন্য নিয়োগ করা আসলে ‘স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি সমাধান, যতক্ষণ না তারা অন্য বিষয়গুলো আমলে নিতে পারছে’। সেই কূটনীতিক বলেছেন।
সাক্ষাৎকারে বুহারি বোকো হারামবিরোধী অভিযানে বিদেশি সেনা ব্যবহারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁর হাতে আর বিকল্প নেই। তবে সেনাবাহিনীতে কমান্ড ঘাটতি দূর করাই তাঁর জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে। এ কারণে মাঠে বোকো হারামের সঙ্গে লড়াইয়ে নাইজেরিয়া প্রভূত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বোকো হারামের সঙ্গে চলমান লড়াইয়ের বয়স প্রায় ছয় বছর।
আবার নাইজেরীয় সেনাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এজমালি অভিযোগ আছে। সেনারা ব্যাপক হারে নাগরিকদের হত্যা ও বন্দী করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে লন্ডনের চিন্তক প্রতিষ্ঠান চ্যাটহ্যাম হাউসে বুহারি বলেছেন, ‘এ লড়াইয়ে আমাদের যে নেতৃত্ব প্রয়োজন, সেটাই আমাদের নেই।’ তবে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের সরানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করবেন বলেই তিনি জানিয়েছেন। এই বোকো হারামের কারণেই বুধবারের বক্তৃতায় বুহারি দুর্নীতির সমস্যায় নজর ফিরিয়েছেন, তাঁর ভাষায় ‘দুর্নীতি আমাদের জাতীয় চরিত্রকে ছিন্নভিন্ন’ এবং ‘আমাদের অর্থনীতি বিকৃত করেছে’।
বুহারি পরিষ্কার করে বলেছেন, তেলের পড়তি দামের পাশাপাশি দুর্নীতিও সে দেশের শীর্ষ অর্থনৈতিক সমস্যা: ‘দুর্নীতি এক অবৈধ কিন্তু বলশালী শক্তি, এটা শিগগিরই আমাদের গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করবে।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘আমাদের দেশের অর্থনৈকি উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের জীবনের জন্য এই হুমকি নস্যাৎ করা হবে।’
চ্যাটহ্যাম হাউসে বুহারি প্রস্তাব দিয়েছেন, তিনি যেটাকে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, সেটাই হবে দেশের তীব্র অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলার প্রথম পদক্ষেপ। সরকারের রাজস্বের ৭০ শতাংশই আসে তেল থেকে, সেই তেলের দাম পড়ে গেছে। ডলারের বিপরীতে গত ছয় মাসে নাইজেরিয়ার মুদ্রার মান পড়েছে ২০ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে টান পড়েছে, আর আপৎকালীন সময়ের জন্য তেলের টাকা থেকে যে তহবিল তৈরি করা হয়েছিল, সেটাও নয়ছয় করা হয়েছে।
‘রাজস্ব কমতে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে নাইজেরিয়ার অর্থনীতিকে নতুন জায়গায় দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে দুটি দুষ্ট ক্ষতের উপশম করতে হবে, যা বর্তমান প্রশাসনের জামানায় ফুলেফেঁপে উঠেছে: অপচয় ও দুর্নীতি।’ চ্যাটহ্যাম হাউসে বুহারি এ কথাই বলেছেন। অনেক অর্থনীতিবিদই বলেছেন, প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এটা ঠিক আছে। লাগোসের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ প্যাট উতোমির কথা হচ্ছে, ‘দুর্নীতি কমাতে পারলে কাজ করা সম্ভব। আমাদের এবারের বাজেটে প্রেসিডেন্টের জন্য জেট বিমান কেনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নাইজেরিয়ার অনেক বিমান সংস্থার কাছেই প্রেসিডেন্টের বহরের সমান জেট বিমান নেই।’
আরেক অর্থনীতিবিদ বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক পত্রে নাইজেরিয়া সম্বন্ধে বলা হয়েছে, ‘দেশটি গভীরভাবে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত’। ফলে সেখানে বুহারির এই দুর্নীতিবিরোধী ডাকে সাড়া পাওয়া কঠিন হবে। নতুন প্রেসিডেন্ট যে ‘জবাবদিহি, অখণ্ডতা ও সততার’ ওপর জোর দিয়েছেন, এর ফলে নাইজেরিয়ার অর্থনীতিতে যে জিনিসটির অভাব ছিল, সেটাও পূরণ হয়ে যাবে।
হ্যাঁ, নাইজেরিয়ার রাজনীতিকেরা দুর্নীতি বন্ধের আহ্বান আগেও জানিয়েছেন। হয় তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন বা পরবর্তীকালে নিজেরাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়েছেন। বুহারি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন, এমনটা ভাবার কিছু কারণও হয়তো আছে। ১৯৮৪-৮৫ সালে সামরিক শাসক থাকার সময় তিনি ধনী হননি। আর যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, তাঁদের তিনি দৌড়ের ওপর রেখেছেন।
‘এই প্রশাসন দুর্নীতি সহ্য করবে না, দুর্নীতি আমাদের দেশের জন্য সম্মানের ব্যাপার নয়, এটা থাকতে দেওয়া হবে না।’ বুধবার তিনি এ কথা বলেছেন।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
অ্যাডাম নসিটার: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস–এর পশ্চিম আফ্রিকা ব্যুরো–প্রধান।

কামারুজ্জামানের কবরে হাজারো মানুষের ঢল

কামারুজ্জামানের কবরে হাজারো মানুষের ঢল
এখানেই দাফন করা হয় কামারুজ্জামানকে
আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর করা নিরাপত্তাবেষ্টনি
কান্নায় ভেঙে পড়েন গ্রাম পুলিশের এক সদস্য
মুনাজাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন দুই যুবক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের দাফনের পর আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কড়াকড়ি শিথিল করলে তার কবরের পাশে মানুষের ঢল নামে। তারা কামারুজ্জামানের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। এ সময় শোকাতুর এলাকাবাসীর আহাজারিতে সেখানে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এলাকাবাসীর মাতম দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যের চোখও অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।
এর আগে আজ রোববার সকাল ৫টা ২০ মিনিটে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত শেরপুর সদর উপজেলার কুমরী বাজিতখিলা এতিমখানার পাশের জমিতে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে রোববার ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে এতিমখানা মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কামারুজ্জামানের ৪/৫জন আত্মীয়সহ শতাধিক মানুষ অংশ নেন। এ সময় আশেপাশে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হলেও আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা বেষ্টনির কারণে তারা জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। দাফনস্থলে গণমাধ্যম কর্মীসহ স্থানীয়দেরকে যেতে দেয়া হয়নি।
শনিবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে জেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে কুমরী বাজিতখিলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে। তিনস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়। রোববার ভোর ৪টা ১৬ মিনিটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কামারুজ্জামানের লাশ কুমরী বাজিতখিলা গ্রামে এসে পৌঁছে। এ সময় তাঁর বড় ভাই মো. কফিল উদ্দিন প্রশাসনের নিকট থেকে লাশ গ্রহণ করেন। পরে কুমরী বাজিতখিলা এতিমখানা মাঠে অনুষ্ঠিত নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন বাজিতখিলা দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার ও কামারুজ্জামানের ভাগ্নি জামাই মাওলানা আব্দুল হামিদ।
রোববার ভোর ছয়টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কড়াকড়ি শিথিল করলে কামারুজ্জামানের কবরস্থানে হাজার হাজার নারী-পুরুষের ঢল নামে। তারা কামারুজ্জামানের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। এ সময় শোকাতুর এলাকাবাসীর আহাজারিতে সেখানে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এলাকাবাসীর মাতম দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যের চোখও অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।
বাজিতখিলা ইউনিয়নের মধ্যকুমরী গ্রামের মজিবর রহমান (৪০) ও আব্দুল কুদ্দুস বলেন, তারা নামাজে জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য অজু করে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনুমতি না দেয়ায় জানাযায় অংশ নিতে পারেননি।
বাজিতখিলা গ্রামের কামরুল ইসলাম বলেন, কামারুজ্জামানের জানাজায় অংশ নিতে কয়েক হাজার মানুষ এতিমখানার আশপাশে সমবেত হয়েছিলেন কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের জানাজাস্থলে আসতে দেয়নি।
কুমরী বাজিতখিলা এতিমখানার পরিচালক নূরুল আমিন জানিয়েছেন, জানাজায় শতাধিক মানুষ অংশ নিয়েছেন।
কামারুজ্জামানের বড় ভাই আলমাছ আলী (৬৮) কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘আমার ভাই কামারুজ্জামান ছিলেন নিরপরাধ ও নির্দোষ। বিচারের নামে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এজন্য যারা দায়ী আল্লাহর কাছে তাঁদের বিচার চাই।’
কামারুজ্জামানের আরেক বড় ভাই মো. কফিল উদ্দিন বলেন, তার (কামারুজ্জামানের) শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ কুমরী বাজিতখিলা এতিমখানার পাশে দাফন করা হয়।
এদিকে রোববার ভোর থেকে এ রিপোর্ট (সকাল সাড়ে ৮টা) লিখা পর্যন্ত বাজিতখিলা ইউনিয়নের বিভিন্নস্থানে ৯টি গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এসব জানাজায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জতউল্লাহ, ড. ছামিউল হক ফারুকী, শেরপুর জেলা আমির ডা. মোহাম্মদ শাহাদত হোসাইন, জেলা সেক্রেটারি মাওলানা মো: হাফিজুর রহমানসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন।
দাফনস্থলে কর্তব্যরত গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে জানতে চাইলে শেরপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে নিরাপত্তাজনিত কারণে সাময়িকভাবে সেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

গরু ও আমরা by মাহবুব তালুকদার

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজানাথ সিং সম্প্রতি বাংলাদেশীদের গরু খাওয়া থেকে বিরত রাখতে এক মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে একটি ভাসমান চৌকি পরিদর্শনকালে তিনি বলেছেন, গরু পাচার বন্ধ করে বাংলাদেশীদের গরুর মাংস খাওয়া থেকে বঞ্চিত রাখলে সে দেশে গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এহেন পররাষ্ট্রবিষয়ক নীতির সংবাদটি উভয় দেশের পত্রপত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কে অসংখ্য ধন্যবাদ। তার নীতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের মানুষ অচিরেই তৃণভোজী গরু বাদ দিয়ে নিজেরাই তৃণভোজী হয়ে যাবে। ব্যক্তিগতভাবে গরুর ব্যাপারে আমার একটি মর্মপীড়াদায়ক স্মৃতি আছে। স্কুলে পড়ার সময় আমাদের ষাণ্মাসিক পরীক্ষায় বাংলা রচনা এসেছিল ‘গরু’। বাংলা শিক্ষক ছিলেন অত্যন্ত দুর্মুখ একজন। তিনি গাধা বলে সর্বদাই আমাদের সম্বোধন করতেন। গরু বিষয়ক রচনা লিখতে গিয়ে আমি লিখেছিলাম ‘গরু অতিশয় উপকারী জন্তু। উহার চামড়া দিয়া জুতা তৈরি করা যায় এবং গরুর দুধ হইতে মিষ্টান্ন তৈরি হয়। অতীব দুঃখের বিষয়, আমাদের বাংলা শিক্ষক আমাদেরকে গরু না বলিয়া গাধা বলেন। আমাদেরকে গরুর ন্যায় উপকারী জন্তুরূপে আখ্যায়িত করা হইলে সম্মানজনক হইতো।’
বলা বাহুল্য, পরীক্ষার খাতাটি হাতে করে একদিন তিনি আমাকে ক্লাসে দাঁড় করিয়ে বললেন, এই যে গাধা, সম্মান চাস! তোকে সম্মানার্জনী দিয়ে সম্মান করা হবে। তোর ভাগ্য ভাল যে, অফিসে কোনো ঝাঁটা পেলাম না। তার বদলে বেত নিয়ে এসেছি। পরীক্ষার খাতায় আমার কথা তুলে আমাকে অপমান!
এরপর কি ঘটনা ঘটেছিল, তা আর কহতব্য নয়।
আমাকে নিবিষ্টচিত্তে পত্রিকা পড়তে দেখে চাচা বললেন, কি পড়ছো?
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা। তিনি বলেছেন, সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার বন্ধ করে বাংলাদেশের মানুষকে গরু খাওয়া ভুলিয়ে দিতে। এছাড়া মন্ত্রী বলেছেন, তার সরকার ভারতজুড়ে গরু জবাই নিষিদ্ধ করতে জনমত গড়ে তুলবে।
চাচা বললেন, তার আসল খবর কিন্তু ওটা নয়।
আসল খবরটা কি?
চাচা জানালেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের পক্ষে রাজানাথ সিং বলেন, ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না এমন কোন বিষয় নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে হবে। এমন পরিস্থিতি আমি কখনো চাইব না, যার ফলে আমাদের জওয়ানরা হামলার শিকার হয়। আত্মরক্ষার্থে তারা গুলি চালাবে না, তা হয় না।’ অবশ্য একথা বলে বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে ২০১১ সালে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার চুক্তিকে অবজ্ঞা করেছেন রাজানাথ।
আমি জানতে চাইলাম, সরকার পরিবর্তন হলে কি দুদেশের চুক্তি বাতিল হয়ে যায়?
আমার কথার উত্তর না দিয়ে চাচা জানালেন, রাজানাথ আরও বলেছেন, গত তিন বছরে বিএসএফের তিনজন জওয়ান নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে পাঁচশত। জওয়ানদের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা যায় না বলে রাজানাথ হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।
চাচা! গত তিন বছরে কতজন বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফের হাতে প্রাণ দিয়েছে, তার হিসাব কি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আছে? তার এমন কঠোর কথা বলা উচিত হয়নি। আমি বললাম।
আমিও সে কথাই বলতে চাচ্ছিলাম। চাচা জানালেন।
গরুর খবর এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশে গরু না এলে বছরে ৩১ হাজার কোটি রুপি ক্ষতি হবে ভারতের। ভারতের ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজানাথের নির্দেশ কঠোরভাবে পালিত হলে বছরে সোয়া কোটি গরু গোয়ালেই থেকে যাবে। গরুর গড় আয়ু ১৫ থেকে ২০ বছর। মারা যাওয়ার পাঁচ বছর আগে দুধ দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দুধ না দেয়া সোয়া কোটি গরু পোষার বার্ষিক খরচ হবে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। চাচাকে এসব কথা বললাম আমি।
কি ব্যাপার! তুমি আজ হঠাৎ গরু নিয়ে পড়লে কেন? গরু নিয়ে কোনো বই লিখছ নাকি?
গরু নিয়ে বই! আমি বললাম, স্কুলে এক রচনা লিখেই আমি বাংলা স্যারের বেত্রাঘাত পেয়েছিলাম। এখন গরু নিয়ে বেশি কিছু লিখলে আমার কি দশা হবে কে জানে?
কি বলছ তুমি? গরু লিখলে তোমার ক্ষতি হতে পারে।
হ্যাঁ, পারে। গরু এখন অতি স্পর্শকাতর জন্তু।
এর মানে কি? গরুকে স্পর্শ করলে সে কাতর হয়ে যায়?
না, আমি তা বলছি না। গরু নিয়ে ভারতে এখন তোলপাড় শুরু হয়েছে।
মানে?
এবারে গরুকে ‘রাষ্ট্রমাতা’ স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন বিজেপি’র এমপি যোগী আদিত্যনাথ। তিনি পুরো ভারতে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করার দাবি করেছেন। শুধু তাই নয়, যারা গরুকে ‘রাষ্ট্রমাতা’ হিসেবে তাকে সমর্থন জানাবেন, তাদেরকে একটি মোবাইল নম্বরে মিসকল দেয়ারও আহ্বান জানান তিনি। তাতে বোঝা যাবে কত লোক তাকে সমর্থন দিচ্ছে।
চাচা বললেন, ভারতে গরুভক্তি নতুন নয়। অনেক স্থানে গরুকে পূজা করা হয়। ধর্মপালনের এই বিষয়টি নিয়ে কারও বলার কিছু নেই।
আমি তা অস্বীকার করি না। কিন্তু গরুকে মাতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সবাই গরুর সন্তান হতে চাইতে কিনা সন্দেহ। তবে গরু সম্পর্কিত অনেক চিত্তাকর্ষক তথ্য আমরা জানতে পেরেছি।
কেমন তথ্য?
মহারাষ্ট্রের মালেগাঁও জেলার সব গরুর ছবি তুলে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন সহকারী পুলিশ সুপার মহেশ সাবাই। মালিকদের বলা হয়েছে, গরুর রেকর্ড রাখার স্বার্থে তার শনাক্তকরণ চিহ্নগুলো সম্পর্কে তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করতে হবে। চিহ্নগুলো হচ্ছে- রঙ, বয়স, লেজের দৈর্ঘ্য ইত্যাদি। গো-হত্যা বন্ধে এই রেকর্ড রাখা প্রয়োজন। মহারাষ্ট্রে গো-হত্যা জামিন অযোগ্য অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার রুপি জরিমানার বিধান আছে।
এসব কথা জানতাম না তো! চাচা বললেন।
আরও কথা আছে। ক্ষমতাসীন দলের দুজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গরুর বহুমাত্রিক ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করছেন।
গরু হত্যা না করে বহুমাত্রিক ব্যবহার? চাচা প্রশ্ন করলেন।
ঠিক তাই। আমি বললাম, একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ফিনাইলের বদলে গরুর মূত্র দিয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সেকি! চাচা বিস্মিত হলেন।
বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। আরেকজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অ্যালোপেথিক ওষুধ ছেড়ে গো-মূত্র ও গোবরের সমন্বয়ে তৈরি আয়ুর্বেদিক ওষুধকে সব রোগের প্রতিষেধক বলে দাবি করেছেন।
এটা সম্ভবত নতুন কিছু নয়। প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে গোবর খাওয়ার বিধান আগে থেকেই ছিল। তবে মনুষ্য-মূত্রও স্বাস্থ্যগত কারণে পান করার কথা জানা যায়।
সেকি! এবার আমার বিস্মিত হওয়ার পালা।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই নিজের মূত্র পান করে স্বাস্থ্য রক্ষা করতেন। চাচা জানালেন।
আমাদের আলোচনার এই পর্যায়ে চাচি ঘরে ঢুকলেন। বললেন, কি নিয়ে আলোচনা চলছে।
গরু! চাচা জানান দিলেন।
গরু! চাচি বললেন, আর বলো না। আজ আমাদের কাজের লোকটা বাজার থেকে যে মাংস কিনে এনেছে, তার দাম নিয়েছে একশ’ টাকা বেশি। এটা কি কোনো কথা হলো? এক লাফে মাংসের দাম ২৮০ টাকা থেকে ৩৮০ টাকা হতে পারে? ব্যাটা নির্ঘাৎ ওখান থেকে ৫০ টাকা সরিয়েছে।
আমার মনে হয় কাজের লোক টাকা সরায়নি। টাকা সরিয়েছে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। চাচার মন্তব্য।
মানে?
মানে, ভারতের সঙ্গে আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের খেসারত দিচ্ছি আমরা। সেই সম্পর্কের কারণে গরুর মাংসের কেজি পাঁচশ’ টাকা হলেও আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।
তোমার হঠাৎ এই ভারত বিদ্বেষের কারণ?
বিদ্বেষ নয়। এটা হচ্ছে ভারত-প্রেমকথা। সম্পর্ক যত নিবিড় হবে গরুর মাংসের দাম তত বাড়বে।
হ্যাঁ। ভালো কথা। চাচি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ দুপুরে তুমি আমাদের এখানে খেয়ে যাবে। গরুর মাংস রান্না করেছি তো।
আজ ওর এখানে দুপুরের ভোজন হবে না। চাচা বললেন।
কেন?
গরু নিয়ে আমাদের এত কিছু আলোচনা হলো, তারপর আর আজ গরুর মাংস খাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
তুমিও কি তাই বলো? চাচি আমার মুখের ওপর দৃষ্টি রাখলেন।
ব্যাপারটা তাই। আমি বললাম, ভারত আমাদেরকে গরু খাওয়া নিষিদ্ধ করতে বলেনি। কিন্তু এমন কৌশল এঁটেছে, যাতে আমরা গরু খাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হই। তাদের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমরা না হয় আজকের দিনটা গরুর কাছ থেকে দূরে সরে থাকলাম।
চাচি উত্তর দিলেন না। সবিস্ময়ে আমার কথায় কর্ণপাত করে থাকলেন।
আমি আবার বললাম, চাচি, আমাদের দেশে গরু ও চতুষ্পদ প্রাণীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে আমরা অচিরেই গরুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারি। আমাদের রাজনীতিতেও গরুর অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না।

আ.লীগ প্রার্থীর পক্ষে নেই নেতারা

ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্পাদক ইকবাল হোসেন গতকাল বিকেলে
ওয়াক আপ কলোনিতে গণসংযোগ করেন l প্রথম আলো
আহম্মদনগরে নির্বাচনী কার্যালয়ে গতকাল মতবিনিময় করেন
আ.লীগ–সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী শিরিন রুখসানা l প্রথম আলো
দলবল নিয়ে রাজধানীর টোলারবাগ এলাকায় গতকাল শনিবার সকালে গণসংযোগ করছিলেন মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। দলের সমর্থন পাননি, তবু নির্বাচন করছেন। এই ওয়ার্ডে দলের সমর্থন পাওয়া শিরিন রুখসানার অভিযোগ, ‘ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কোনো নেতা আমাকে সহায়তা করছেন না।’
ইকবাল হোসেন ছাড়াও আওয়ামী লীগের সমর্থন না পাওয়া আরও দুই প্রার্থীও লড়ছেন ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে। সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে তাঁরা এলাকায় এলাকায় গিয়ে গণসংযোগ চালাচ্ছেন।
গণসংযোগ চালানোর সময় কথা হয় ইকবাল হোসেনের সঙ্গে। দল-সমর্থিত প্রার্থী শিরিন রুখসানা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘ওই মহিলার সঙ্গে কেউ নেই। আমার এলাকায় হুট করে একজনকে দিলে কেন মেনে নেব।’ ইকবাল হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের ইফেক্ট পড়ে না। এটা তো আওয়ামী লীগ-ধানের শীষ না।’
সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর (সংরক্ষিত) শিরিন রুখসানা এবার সরাসরি কাউন্সিলর পদে লড়ছেন। তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে গণসংযোগ শুরু করেননি। তাঁর নির্বাচনী প্রতীক ‘রেডিও’। আহম্মদনগর এলাকায় নিজের নির্বাচনী কার্যালয়ে বসে গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তাঁরা কেউ (ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতারা) আমার পক্ষে আসেননি। দলের প্রতি আনুগত্য যদি থাকে, দল-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।’
ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতাদের অন্য প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার বিষয়ে শিরিন রুখসানার মন্তব্য, বিএনপি প্রতিযোগিতায় থাকবে। আওয়ামী লীগের লোকজন দলের নির্দেশনা উপেক্ষা করে অন্য প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন, এটা ঠিক নয়।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিমাংশু কিশোর দত্ত ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা মো. খোরশেদ আলম দলীয় সমর্থন না পেলেও এই ওয়ার্ড থেকে নির্বাচন করছেন। গতকাল মুঠোফোনে হিমাংশু কিশোর বলেন, ‘৩১ বছর ধরে রাজনীতি করি। মামলা-নির্যাতন সহ্য করেছি। দেখি, এলাকার লোকজন কী চায়।’ দল-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন কি না—জানতে চাইলে খোরশেদ আলম বলেন, ‘নিজেই দাঁড়িয়ে গেছি। কীভাবে কাজ করি, বলেন।’
গত শুক্রবার এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. বাবুল আকতারকে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গণসংযোগ শুরুও করেছেন। নিজের পক্ষে জনসমর্থনের বিষয়ে বাবুল আকতার বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা। সামাজিক কর্মকাণ্ড করি। এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসে।’
টোলারবাগ, আনসার ক্যাম্প, বিশিল, আহম্মদনগর ও শাহ আলীবাগ নিয়ে গঠিত ১ দশমিক ৬৯৭ বর্গকিলোমিটারের এই ওয়ার্ড। ওয়ার্ডের মোট ভোটার ৮২ হাজার ৫৯৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪২ হাজার ৯৮৬ জন আর নারী ৩৯ হাজার ৬১১ জন।
গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, টোলারবাগ আবাসিক এলাকা থেকে মিরপুর ১ নম্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাত দখল করে অসংখ্য দোকান গড়ে উঠেছে। টোলারবাগ আবাসিক এলাকা, আনসার ক্যাম্প, সরকারি এ-টাইপ কলোনি, ওয়াক-আপ কলোনি এলাকার ফুটপাতে গড়ে ওঠা দোকানের কারণে পথচারীদের মূল সড়কেই হাঁটতে হচ্ছে।
সরকারি এ-টাইপ কলোনির সামনে প্রধান সড়কের প্রায় ১০০ গজ জায়গাজুড়ে ময়লা রাখার স্থান। আশপাশের এলাকা থেকে ময়লা এখানে ফেলা হয়। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি এসে পরিষ্কার করার আগ পর্যন্ত এখানেই পড়ে থাকে। একটিমাত্র ময়লার কনটেইনার থাকায় বেশির ভাগ ময়লাই বাইরে পড়ে থাকে।
কলোনির বাসিন্দা মো. ফারহান বললেন, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চলছে। দুর্গন্ধ ঘরের ভেতর পর্যন্ত চলে আসে। বহুবার সিটি করপোরেশনে জানানোর পর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অফিস হয়েছে, কিন্তু অবস্থা বদলায়নি।
এই ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকার সড়কের বেহাল দশা। আনসার ক্যাম্প বাসস্ট্যান্ড থেকে ছাপাখানা মোড় পর্যন্ত সড়ক, দক্ষিণ বিশিল থেকে ১ নম্বর কো-অপারেটিভ মার্কেট পর্যন্ত সড়ক, শাহ আলীবাগের ধানখেতের মোড় ও আশপাশের কিছু সড়ক, কলওয়ালাপাড়ার ভেতরের সড়কগুলো এবড়োখেবড়ো, ভাঙাচোরা।
গতকাল এই ওয়ার্ডের অন্তত ৪০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের অধিকাংশই জানান, এলাকায় মশার উপদ্রব প্রকট। মাঝেমধ্যেই গ্যাস ও পানির সংকট দেখা দেয়। দুর্গন্ধযুক্ত পানি আসে ওয়াসার পানির লাইনে।
এই ওয়ার্ডের কিছু জায়গায় রয়েছে অস্থায়ী জলাবদ্ধতার সমস্যা। পূর্ব আহম্মদনগরের কিছু সড়ক, জোনাকী রোড, হাবুলের পুকুরপাড়, কলওয়ালাপাড়া, ধানখেতের মোড়ে অল্প সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হয় জলাবদ্ধতার।

কোন পথে টেকসই সামাজিক সম্প্রীতি? by বদিউল আলম মজুমদার

গত ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মৃত্যুর মিছিল দিনে দিনে ভারী হচ্ছে। এ পর্যন্ত সারা দেশে ১৩১ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যার মধ্যে ৭০ জন হয়েছে পেট্রলবোমা হামলার শিকার। পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যা ঘৃণ্যতম অপরাধ, যার অবসান হওয়া দরকার। একই সঙ্গে অবসান হওয়া দরকার বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গ্রেপ্তার-বাণিজ্যের।
সরকারেরই দায়িত্ব শান্তি–শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আশা করি, সরকার বর্তমান সহিংসতার চক্র ভেঙে শিগগিরই সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। তবে টেকসইভাবে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে এর উৎস ও কারণ সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে হবে। অন্যথায় রোগের পরিবর্তে রোগের উপসর্গেরই চিকিৎসা করা হবে। সম্প্রীতিহীনতার ফলে সমাজে অস্থিরতা, অনৈক্য ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। আর দ্বন্দ্ব থেকেই সূত্রপাত হয় সহিংসতার এবং অব্যাহত সহিংসতা জাতিকে চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পক্ষান্তরে সামাজিক সম্প্রীতির মাধ্যমে ‘সামাজিক পুঁজি’ সৃষ্টি হয়। সামাজিক পুঁজি আর্থিক পুঁজি থেকে ভিন্ন এবং এটি সৃষ্টি হয় যখন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। সামাজিক পুঁজি আর্থিক পুঁজির অপ্রতুলতা দূর করতে পারে। সমাজের সকল স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে ‘সামাজিক আন্দোলন’ ও ‘সামাজিক প্রতিরোধ’ গড়ে তোলা গেলে অনেক সামাজিক সমস্যারই অর্থকড়ি ছাড়াই সমাধান সম্ভব হয়। তাই অর্থনৈতিক দিক থেকে দরিদ্র দেশগুলোয় সামাজিক সম্প্রীতিই বড় পুঁজি হিসেবে দেখা দেয়।
সমাজে সম্প্রীতিহীনতা, দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার উৎস সাধারণত দুটি: ‘আইডেনটিটি-বেইজড প্রিজুডিস’ বা পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষাত্মক মনোভাব এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও দলাদলি। একটি সমাজে সাধারণত ভিন্ন ও স্বতন্ত্র ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতিসত্তা ও ভাষাভাষী মানুষ বসবাস করে। সমাজে এ ধরনের ভিন্নতাই ‘প্লুরালিজম’ বা বহুত্ববাদের ভিত্তি। বহুত্ববাদী সমাজে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন সমাজে পরিচয়ভিত্তিক ভিন্নদের সম্পর্কে বিরাজমান ও সম্ভাব্য পূর্ব ধারণা বা বিদ্বেষাত্মক মনোভাবের অবসান ঘটিয়ে সবার জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা। আর ‘ইনক্লুসিভনেস’ বা সামাজিক আত্মীকরণের মাধ্যমেই এমন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।
যেকোনো সমাজেই পরিচয়ভিত্তিক বৈচিত্র্য বা ‘ডাইভারসিটি’ একটি বাস্তবতা। এমনি বাস্তবতায় প্রয়োজন পূর্বধারণাগত বিদ্বেষ দূরীকরণের লক্ষ্যে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তোলার ‘চ্যাম্পিয়ন’ বা প্রবক্তা সৃষ্টি করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ। আরও প্রয়োজন পরিচয়ভিত্তিক ভিন্ন মতাদর্শীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তকরণ। বঞ্চিতদের জন্য ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা প্রদান হতে হবে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মার্টিন লুথার কিংয়ের ভাষায়, ‘শান্তি সহিংসতার অনুপস্থিতি নয়, বরং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা।’
ক্ষমতার রাজনীতি ও পরিচয়ভিত্তিক ভিন্ন মতাদর্শীদের প্রতি সহিংসতার মধ্যে যোগসূত্র প্রায়শই দৃশ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ ও শাসকশ্রেণিকে তাদের নিজস্ব হীন স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষের মধ্যকার পরিচয়ভিত্তিক ভিন্নতাকে কাজে লাগাতে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরাজমান ধর্মীয় ভিন্নতাকে উসকে দিয়ে এবং পরস্পরের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে তাদের শাসনকালকে দীর্ঘায়িত করতে সক্ষম হয়। অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধরকে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদ ও সহিংসতা সৃষ্টি করে দুর্বলদের জায়গা-জমি দখল করতে দেখা যায়। সামাজিক বিভিন্নতাকে পুঁজি করে সৃষ্ট সহিংসতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ফায়দা লুটের বহু নজির বাংলাদেশে রয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা দূর করতে হলে নীতি ও মৌলিক বিষয়ের পার্থক্য অনুধাবন করা আবশ্যক। এটা স্বাভাবিক যে রাজনৈতিক দলের মধ্যে নীতির ক্ষেত্রে পার্থক্য বিরাজ করবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দলের মধ্যে ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। আর এই ভিন্নতা বহুত্ববাদেরই প্রতিফলন।
তবে কিছু মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য থাকা জরুরি। আর এ ঐকমত্য হতে পারে ন্যূনতম বিষয়ে অথবা বৃহত্তর পরিসরে। বৃহত্তর পরিসরের ঐক্য বৈচিত্র্যের মধ্যে একতা সৃষ্টিতে সহায়তা করে। একটি রাষ্ট্রের সংবিধান হলো জাতির বৃহত্তর পরিসরের ঐকমত্যের প্রতীক।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা হওয়া প্রয়োজন। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতা প্রতিপক্ষের মধ্যে মতবিনিময়ের দ্বার খোলা রাখে এবং আলাপ-আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে দুরূহ সংকট সমাধানের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে দলের মধ্যকার সমঝোতাকামীরা দ্বন্দ্ব ও সহিংসতা এড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, যেখানে যৌক্তিক কণ্ঠ কোনো রূপ ভূমিকা রাখতে অপারগ, সেখানে উগ্র মতামতই সর্বাধিক সরব। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক রীতিনীতি চর্চার অভাব প্রকট। এর ফলে একের ওপর অন্যের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার, এমনকি একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টায় তারা লিপ্ত, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
যে সমাজে ঐকমত্যের ক্ষেত্র যত বিস্তৃত, সে সমাজের খুঁটি তত শক্ত এবং সে সমাজে আত্মঘাতী দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার মাধ্যমে গোটা জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কাও তত কম। তাই রাজনৈতিক দলসমূহের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা হওয়া উচিত নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যের ক্ষেত্র বিস্তৃত করা। এর জন্য প্রয়োজন মৌলিক বিষয়ে নতুন করে ঐকমত্য সৃষ্টি করা।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বারবার কাটাছেঁড়ার কারণে আমাদের ১৯৭২-এর মূল সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ঐকমত্যের ক্ষেত্রগুলো আজ প্রায় নির্বাসিত। বিশেষ করে একতরফাভাবে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস, যে সংশোধনীর মাধ্যমে ‘মৌলিক কাঠামো’সহ সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বদলে ফেলা হয়েছে। বস্তুত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বিলুপ্তির মাধ্যমে পঞ্চদশ সংশোধনী আমাদের দেশে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পথকেই রুদ্ধ করে ফেলেছে। আর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পথ রুদ্ধ হলে দেশে অদূর ভবিষ্যতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই টেকসইভাবে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য আজ আমাদের প্রয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পদ্ধতিসহ আরও অনেকগুলো বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা।
প্রসঙ্গত, ‘পার্টিয়ার্কি’ বা দলতন্ত্র—সর্বক্ষেত্রে দলের প্রাধান্যও—আমাদের বিরাজমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও হানাহানির আরেকটি কারণ। গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক দল অপরিহার্য, কিন্তু দলবাজি ও দলাদলি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। কিন্তু পক্ষপাতদুষ্টভাবে অদক্ষ ও অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের কারণে আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠান ন্যায় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে দলীয় বিবেচনায় অন্যায়কেই অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্রয় দিচ্ছে, যা সমাজে অস্থিরতা ও হানাহানির সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া নগ্ন দলবাজির কারণে আমাদের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এখন দ্বন্দ্বের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাই সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সর্বক্ষেত্রে আজ দলবাজির অবসান করতে হবে।
মনে রাখা প্রয়োজন, দারিদ্র্য ও সহিংসতার মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোতেই সহিংসতা ব্যাপক এবং দরিদ্ররাই প্রধানত এর শিকার হয়। বস্তুত, দারিদ্র্য ও সহিংসতা একে অপরের প্রভাবক। তাই গেরি হিউগটন ও ভিক্টর বুয়োট্রস তাঁদের সাম্প্রতিক বহু সমাদৃত লোকাস এফেক্ট নামক বইতে লিখেছেন, দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সহিংসতার অবসান।
আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেও দেখা যায়, আর্থসামাজিক উন্নয়ন সহিংসতা নিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পূর্ব বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত সহিংস সময় এবং পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু আমরা সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে যে ১১০টি ইউনিয়নে কাজ করেছি, সেগুলোতে এ সময়ে কোনো ধরনের সহিংসতা ঘটেনি। অর্থাৎ সামাজিক আত্মীকরণ ও ব্যাপকভিত্তিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন সমাজে পরিচয়ভিত্তিক ভিন্নতা ও বিদ্বেষের সমস্যাকে কাটিয়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
পরিশেষে, আইডেনটিটি-বেইজড বা পরিচয়ভিত্তিক সামাজিক বিদ্বেষ বাংলাদেশে প্রকট সমস্যা নয়। তা সত্ত্বেও সময়ে সময়ে আমাদের দেশে পরিচয়ভিত্তিক ভিন্নরা সহিংসতার শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই মূলত এগুলো ঘটেছে। বস্তুত, রাজনৈতিক সহিংসতা আমাদের দেশে ব্যাপক, যা বর্তমানে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অব্যাহত সহিংসতার কারণে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও এখন চরম ঝুঁকির সম্মুখীন। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং টেকসইভাবে সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে হলে আজ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা সৃষ্টি ও সংলাপের আয়োজন করতে হবে, যাতে তারা অনেকগুলো মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক।

নবগঙ্গা নদী ভরাট করে গুচ্ছগ্রাম

লোহাগড়ায় নবগঙ্গা নদী ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে গুচ্ছগ্রা
পঞ্চাশ-ষাটের দশকেও পানি থইথই করত। সারা বছর চলত স্টিমারসহ বড় নৌযান। ব্যস্ত নৌপথ ছিল এটি। এখন ভরাট করে গড়ে উঠেছে গুচ্ছগ্রামসহ বিভিন্ন কাঁচা-পাকা স্থাপনা। দখল করে চলছে চাষাবাদ। ময়লা-আবর্জনাও ফেলা হচ্ছে। দখল-দূষণের কবলে মৃতপ্রায় নদীটি।
এই চিত্র নবগঙ্গা নদীর নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা অংশের। এ নদীর মোট দৈর্ঘ্য ২৩০ কিলোমিটার। চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা মোহনা থেকে শুরু হয়ে ঝিনাইদহ ও মাগুরা হয়ে নড়াইলের ওপর দিয়ে লোহাগড়ার শেষপ্রান্ত মহাজন বাজারে মধুমতী নদীতে মিশেছে নবগঙ্গা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বিবেচনায় নিয়ে নবগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে এর পাড়ে গড়ে ওঠে উপজেলার লোহাগড়া, লক্ষ্মীপাশা, দীঘলিয়া, মিঠাপুর ও নলদী বাজার। এ ছাড়া লোহাগড়া থানা, হাসপাতাল, অন্যান্য প্রশাসনিক ভবনসহ নদীর উভয় পাড়ে গড়ে ওঠে ঘনবসতি। এখনো বর্ষাকালে ঢাকা, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোহাগড়া বাজারসহ অন্য বাজারে এই নদী দিয়ে মালামাল পরিবহন করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদী ভরাট করে কুন্দশীতে গড়ে উঠেছে সরকারি গুচ্ছগ্রাম। নদী শাসন করে অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর ভেতরে গড়ে তোলা হয়েছে বসতবাড়িসহ কাঁচা-পাকা বিভিন্ন স্থাপনা। নদীর মাঝখান পর্যন্ত বাঁধ দিয়ে নদী থেকে মাটি কেটে ভরাট করে চাষাবাদ করা হচ্ছে। প্রভাবশালীরা ঘের বানিয়ে করছেন মাছ চাষ। এ অবস্থায় উপজেলা সদরের লক্ষ্মীপাশা থেকে দক্ষিণে মহাজন বাজার পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার নদীটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে।
এ ছাড়া নদীতে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। নদীর তীরে নির্মাণ করা হয়েছে বসতবাড়ির কাঁচা শৌচাগার। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এ নদীতে দুর্গন্ধ বাড়ছে। বাড়ছে মশা-মাছির উৎপাত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দখল-দূষণ আর ভরাটের কবলে পড়া মৃতপ্রায় এ নদীটি রক্ষার উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
নড়াইল জেলা নদী বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন বলেন, এই নদী না বাঁচলে নৌপথ বন্ধ হবে। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বেশি ক্ষতি হবে কৃষির। ধ্বংস হবে মৎস্য সম্পদ। একই সঙ্গে পরিবেশও বিপন্ন হবে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এভাবে নদী দখল হওয়া দুঃখজনক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের এপ্রিল-মে মাসে মধুমতী নদীর সংযোগস্থল উপজেলার মহাজন থেকে দীঘলিয়া পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার অংশ খনন করা হয়। এ জন্য বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় খনন প্রকল্পটির তত্ত্বাবধান করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সময় দু-এক কোদাল মাটি কেটে নদী খননের নামে প্রায় পুরো টাকা লুটপাট করা হয়েছে। নদী খননের কোনো চিহ্নও এখন নেই।
জানতে চাইলে সদ্য বদলি হওয়া নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) লোহাগড়া উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘ওই এলাকা দেখে মনে হয়নি যে নদী খনন করা হয়েছে। সে জন্য লক্ষ্মীপাশা থেকে মহাজন পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার অংশ পুরোটা খননের জন্য প্রায় এক বছর আগে পাউবোতে প্রকল্প দেওয়া আছে। এখনো অর্থ বরাদ্দ হয়নি।’
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তুষার কুমার পাল বলেন, নবগঙ্গা নদীর অবৈধ দখল চিহ্নিত করতে স্থানীয় নায়েবদের দিয়ে তদন্ত চলছে। এরপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পানামায় ইতিহাস গড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা- ৫০ বছরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে প্রথম বৈঠক

ঐতিহাসিক করমর্দন। পানামায় এসওএ শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি
অনুষ্ঠিত বৈঠকের সময় হাত মেলান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন
কেরি ও কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেস l ছবি: এএফপি
৫০ বছরের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে প্রথম বৈঠক করল যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা। মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায় আয়োজিত আমেরিকা মহাদেশের শীর্ষ সম্মেলনের অংশ হিসেবে এই ঐতিহাসিক বৈঠক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেস। খবর এএফপি, সিএনএন, বিবিসি ও রয়টার্সের।
পশ্চিম গোলার্ধের নেতারা জড়ো হয়েছেন মধ্য আমেরিকার দেশ পানামায়। সেখানে গতকাল শুক্রবার উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর দুই দিনব্যাপী শীর্ষ সম্মেলন (এসওএ—সামিট অব দি আমেরিকাস) শুরু হয়েছে। ৩০টি দেশের প্রেসিডেন্টরা যোগ দিয়েছেন এতে। তবে সবাই তাকিয়ে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর দিকে। কারণ, তাঁরা সম্মেলনে মুখোমুখি হবেন এবং এক ফাঁকে বৈঠকও করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি হলে তা হবে আরেক দফা ঐতিহাসিক ঘটনা। ওবামা-কাস্ত্রো আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ অনেকটাই গলতে পারে। এসওএ সম্মেলনে কমিউনিস্ট কিউবার অংশগ্রহণ এবারই প্রথম।
স্নায়ুযুদ্ধকালীন দীর্ঘ বৈরিতার ইতি টেনে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা গত জানুয়ারি থেকে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করে।
পানামা সিটিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে জন কেরি ও ব্রুনো রদ্রিগেস রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বলা হয়েছে, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ‘দীর্ঘ ও গঠনমূলক’ আলোচনা হয়েছে।
কাস্ত্রো এবং ওবামার মধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য দেখা হয়েছিল ২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে। তবে পানামায় তাঁদের সাক্ষাৎ আরও বেশিক্ষণ স্থায়ী ও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গতকাল রাতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র বেন রোডস বলেন, ‘আমরা নিশ্চিতভাবে প্রত্যাশা করতে পারি, সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন কাল (আজ শনিবার) তাঁদের একে অপরের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমরা তাঁদের মধ্যে একটি আলোচনারও প্রত্যাশা করি।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, গত বুধবার এই সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশে ওয়াশিংটন ছাড়ার আগে প্রেসিডেন্ট ওবামা রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, দুই নেতার নিছক করমর্দন বা স্বাভাবিক কুশল বিনিময়ও সবার নজর কাড়বে। একে দুই দেশের বৈরী অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবেই বিবেচনা করা হবে।
এদিকে এমন প্রেক্ষাপটে আরেক বড় ঘটনায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইতিমধ্যে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর তালিকা থেকে কিউবার নাম বাদ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছে। পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক মার্কিন সিনেট কমিটির সদস্য সিনেটর বেন কারডিন এ কথা জানিয়েছেন। কিউবাকে ওই তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা না-রাখার প্রশ্নে মার্কিন কংগ্রেস ৪৫ দিন সময় পাবে। আর বিষয়টি চূড়ান্ত হলে দুটি দেশের পারস্পরিক দূতাবাস আবার চালু করার পথ সুগম হবে। পাশাপাশি কিউবার ওপর থেকে বেশ কিছু অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়া সহজ হবে। মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও কিউবায় গিয়ে সহজে কাজ করতে পারবে।
কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল ১৯৫৯ সালে। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো এবং তখনকার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ওই আলোচনায় অংশ নেন। এর দুই বছর পরই দুটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। কয়েক দশক পর গত বছর বারাক ওবামা ও রাউল কাস্ত্রোর ঘোষণার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওবামা তখন বলেন, কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন রাখার নীতি অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

পা বাঁধা ওড়নায় রুনীর ডিএনএ! by নেসারুল হক খোকন ও ওবায়েদ অংশুমান

সাগর সরওয়ারের পা বাঁধা লাল ওড়নাতে শুধু রুনীর ডিএনএ পাওয়া গেছে। আর তার হাত বাঁধা টিয়া রঙের ওড়না ও টি-শার্টে মিলেছে অজ্ঞাত দুই পুরুষের ডিএনএ। অর্থাৎ সাগরকে খুন করার সময় কে বা কারা তার হাত-পা বেঁধেছে তা অনেকটা স্পষ্ট। যদিও এখন পর্যন্ত অজ্ঞাত ওই দু’জনের পরিচয় মেলাতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই (ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) পরিচালিত ল্যাব থেকে এ রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর র‌্যাবের নীতিনির্ধারণী পর্যায়কে ভীষণ ভাবিয়ে তোলে।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে র‌্যাবের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরের অনুসন্ধান টিমকে বলেন, তার ধারণা খুনের সঙ্গে অন্যতম সন্দেহভাজনদের ডিএনএ মেলাতে পারলে খুনিদের চিহ্নিত করাসহ পুরো রহস্যের জাল উন্মোচন হবে। এ জন্য এখন র‌্যাবের উচিত হবে একে একে সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করে তাদের ডিএনএ পরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাগরের পা বাঁধা ওড়নায় রুনীর ডিএনএ ছিল মানেই ধারণা করা যায়, সাগর খুন হওয়ার সময় রুনীর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। আর সাগর খুন হওয়ার পর রুনী খুন হন। এ কারণে রুনীর মৃত্যুর বিষয়টিও রহস্যে ঘেরা।
প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী র‌্যাবের সাবেক শীর্ষ এ কর্মকর্তা ঘটনার সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে আরও বলেন, তার মতে খুনের অনেক তথ্য জানে রুনীর মায়ের পরিবার। এবং আমি নিশ্চিত, চোর-ডাকাত সাগর-রুনীকে মারেনি। মনে রাখতে হবে, হাত বাঁধা ওড়না ও টি-শার্টে দুই পুরুষের ডিএনএ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ক্রাইম সিন বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রতীয়মান হবে যে, ওই দুই পুরুষকে হেল্প করেছে অন্য একজন। তিনি বলেন, তাই গ্রিল-ট্রিল ভাঙা এগুলোও ঠিক না। ওখান দিয়ে কোনো লোকজনের আসা-যাওয়াও সম্ভব না। এটা ইমপসিবল। আমি খুব ভালোভাবে ভেতরে ঢুকে পর্যবেক্ষণ করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। আসলে সাগরকে খুন করার পর দরজা খুলে দেয়ায় খুনি বের হয়ে যায়। কারণ একজন তো ভেতরে ছিল। দরজা ভেতর থেকেই বন্ধ করা ছিল।
মোবাইলের শেষ কল : ঘটনার পর রুনীর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ঘটনার দিন সকাল ৭টা ২১ মিনিটে রুনীর মোবাইল দিয়ে মেঘ তার নানীকে ফোন দেয়। কিন্তু বিষয়টি মানতে পারেননি ওই শীর্ষ র‌্যাব কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমার ধারণা, তার (রুনী) পরিবার দাবি করলেও ঘটনার দিন সকাল বেলা মেঘ কাউকে কল দেয়নি। এর কারণ, মা-বাবার লাশ দেখার পর ওই বয়সের একটি ছেলে (মেঘ) সাত-আট মিনিট ধরে কথা বলতে পারে না। আর মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পরপরই পাগলের মতো রুনীর মায়ের ওই বাসায় ছুটে আসার কথা। অথচ রুনীর মা ওই সকালে বাসায় কীভাবে এসেছিলেন তা কেউ টের পায়নি?
ফ্যামিলি সব জানে : পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবও ঘটনার পর সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রুনীর ঘনিষ্ঠজনদের সন্দেহের তালিকায় রাখে। এ বিষয়ে র‌্যাবের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার দাবি, হত্যার পর ঘটনাস্থলে অরিজিনাল যে ক্রাইম সিন ছিল তা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, আসলে ওই বাসার ড্রয়ার, আলমারি সব ঠিকঠাক ছিল। আর কাপড়-চোপড়ও ছড়ানো-ছিটানো ছিল না। এগুলো সব পরে করা। অন্যদিকে রুনীর মায়ের ‘আত্মহত্যা’ বলার বিষয়টি রহস্যজনক আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা (রুনীর মা, রোমান, রিমন) কিন্তু পুলিশকে খবর দেয়নি। ঘটনার পরপরই রুনীর মা ওই বাসায় এসে অবস্থান করেন। এরপর তিনি যুক্তি-পরামর্শ করতে তার ছেলেদের ফোন দিয়ে ডেকে আনেন। ছেলেরা আসার পর তিনি চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন, তার জামাই সাগর আর মেয়ে রুনী আত্মহত্যা করেছে। আমার প্রশ্ন, জামাই-মেয়ের এরকম লাশ দেখে কীভাবে তিনি বললেন, এটি আত্মহত্যা? র‌্যাবের এ শীর্ষ কর্মকর্তা আরও বলেন, আসলে এ ঘটনার সবই দেখেছে মেঘ। এ জন্য ঘটনার পর তাকে ভয় দেখানো হয়। এখনও সে ভয়ের মধ্যেই রয়েছে।
রহস্যে ঘেরা খুন : র‌্যাব কর্মকর্তার দাবি, ঘরের মধ্যে যে বা যারা ছিল (নাম উল্লেখ করলেও তা প্রকাশ করা হল না) তারা সাগরকে মেরেছে। সাগরকে আনাড়ি হাতে স্টেব করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, রুনীর মৃত্যুটা রহস্যের। রুনীর পেটে একটা মাত্র স্টেব। তাও আবার ডান দিকে। ধারাল ছুরির স্টেবের কারণে তার মেইন আর্টারি কেটে যায়। তা না হলে
একটা স্টেপে মারা যাওয়ার কথা না। স্টেপ দেয়ার সময় তার পরনে ছিল টি-শার্ট। কিন্তু সেই টি-শার্ট কাটেনি। এখানেই বড় রহস্যের জন্ম দিয়েছে। পরিচিত লোকের বাইরে কেউ এ খুন করেনি। কারণ অপরিচিত কেউ খুন করলে কিচেনের ছুরি, চাকু ও বঁটি দিয়ে আঘাত করার কথা নয়। সেখানে বাইরের জিনিস থাকার কথা। তা কিন্তু সেখানে ছিল না, যা দিয়ে খুন করা হয়েছে তা সবই ওই ঘরেরই জিনিস।’ সাগরকে টর্চার করে খুন করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘সাগরকে আনাড়িভাবে খুন করা হয়েছে। তার ঘাড়েও আঘাত আছে। আবার সামনেও আছে। যে ব্যক্তি বা যারা সাগরের শরীরে স্টেপ করেছে তারা কিন্তু আস্তে আস্তে স্টেপ করেনি। সে তার সর্বোচ্চ জোর দিয়ে আঘাত করেছে। ইচ্ছামতো করেছে। তার শক্তিতে এর বেশি করতে পারেনি। শেষ মুহূর্তে সাগরের শরীরে বড় যেসব স্টেপ করা হয়েছে সেখানে প্রথম ব্যক্তির সঙ্গে অন্যরা অংশ নিয়েছে বলে মনে হয়। কারণ সাগরের শরীরের শেষ স্টেপটা অনেক গভীরে ঢুকে যায়।’ সাগরের ওপরে অমানুষিক টর্চার হয়েছে এমন তথ্য জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘রুনীর শরীরের অন্য কোথাও কিন্তু কোনো প্রকারের টর্চার হয়নি। রুনীর পেটের ডানপাশে একটা মাত্র স্টেপ। তার শরীরে আর কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই।’
ডিএনএ পরীক্ষার আলামত : আলোচিত এ হত্যা রহস্য উদঘাটনের জন্য র‌্যাব ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবে পাঠায়। আলামত হিসেবে সাগর-রুনীর পরনের কাপড়, সাগরের হাত-পা বাঁধার দুটি ওড়না (লাল ও টিয়া রঙের), গ্রিলের অংশবিশেষ, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া চুল, গ্রিলের পাশে পাওয়া মোজা, দরজার লক, দরজার চেইন ও ছিটকানি পাঠানো হয়।
সাগরের প্রতি রুনীর ক্ষোভ : মৃত্যুর সাত দিন আগে রুনীর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নাদিরা কিরণসহ এটিএন বাংলার কয়েকজনকে সাগরের প্রতি তার এক ধরনের ক্ষোভের কথা জানিয়েছিলেন রুনী। তাদের রুনী বলেন, ‘সাগর চেঞ্জ হয়ে গেছে।’ এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক নাদিরা কিরণ যুগান্তরকে বলেন, ‘ ঘটনার সাত দিন আগে সাগরের প্রতি ক্ষোভ থাকার কথা জানিয়েছিলেন রুনী । আমিসহ এটিএন বাংলার আরও দুই-চারজনকে রুনী বলেছিল, ‘সাগর আমাকে ইগনর করবে সেটা ভাবতে পারি না। সাগর আগের মতো নেই। অনেক বদলে গেছে...।’ নাদিরা কিরণ বলেন, ‘তিনি রুনীকে বুঝিয়েছিলেন, সাগরের বিষয়টা তেমন কিছুই না।’ নাদিরার বাসায় রুনী : জার্মানি থেকে সাগর-রুনী ফিরে আসে ২০১১ সালের শেষের দিকে। এরপর খুনের ঘটনার কয়েক মাস আগে সাগরের ওপর রাগ করে দু’বার নাদিরার বাসায় যান রুনী। এ প্রসঙ্গে নাদিরা কিরণ যুগান্তরকে বলেন, ‘রুনী কিন্তু আমার বাসায় রাগ করে চলেও এসেছিল। সেদিন আমি রুনী-সাগর দু’জনকেই বুঝিয়েছিলাম।’
সেই সাংবাদিক যা বললেন : সাংবাদিক সাগর জার্মানিতে থাকাবস্থায় (২০০৮-১১) ঢাকার অপর এক নারী সাংবাদিক সেখানে রেডিও ডয়েস এভেলে চাকরি নেন। তিনি সেখানে নয় মাস ছিলেন। বেশকিছু তথ্য যাচাইয়ের জন্য যুগান্তর অনুসন্ধানী টিম ওই নারী সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়। ২০ মার্চ তার কর্মস্থলে গিয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাগর ও আরাফাত ভাই আগে থেকেই সেখানে কর্মরত ছিলেন। এর আগে সাগর ভাই ইত্তেফাকে আমার সহকর্মী ছিলেন। জার্মানি থেকে দেশে ফেরার পর রুনী আপার সঙ্গে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে। তিনি আমার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করেছেন।’ তিনি বলেন, আসলে জার্মানিতে থাকাবস্থায় স্নিগ্ধা নামের বাঙালি এক মেয়ে রুনী আপার কান ভারি করত।’
তুমুল ঝগড়া : র‌্যাব মামলাটি প্রায় তিন বছর ধরে তদন্ত করছে। তাদের তদন্তে পারিবারিক কলহের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এ বিষয়ে র‌্যাবের সদ্য বিদায়ী শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘সাগর রুনীকে সন্দেহের চোখে দেখত। তাদের মধ্যে প্রায় ঝগড়া হতো। ওই ফ্ল্যাটের আশপাশের লোকজন তা জানত। আর ঘটনার দিন রাতেও তাদের মধ্যে চিল্লা-পাল্লা হয়েছিল। আর তা পাশের ফ্ল্যাটের লোকজনও শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেননি। কারণ এ ধরনের ঘটনা প্রায় তাদের মধ্যে ঘটত।’
পাদটীকা : সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে দ্বিতীয় পর্যায়ের রিপোর্ট আজ শেষ হলেও যুগান্তর টিমের পরবর্তী অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। অনুসন্ধান শেষে তৃতীয় পর্যায়ের রিপোর্ট নিয়ে যুগান্তর পুনরায় পাঠকের সামনে হাজির হবে।

নিখোঁজ এক বিরোধী রাজনীতিকের খোঁজে by এলেন ব্যারি

এলেন ব্যারি
রাস্তাজুড়ে এক ভীতিকর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এখান থেকেই সালাহউদ্দিন আহমেদকে এক মাস আগে অপহরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তিনি বাংলাদেশের বিরোধী দল বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা। সেদিন কয়েকজনকে বাড়ির ফটক খুলে দিয়েছিল এক কেয়ারটেকার। সে সাংবাদিকদের জানিয়েছিল, ওই লোকগুলো ছিল পুলিশের গোয়েন্দা। ওই কেয়ারটেকারকে এরপর আর কখনই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলে দিয়েছিল যে পরিচারিকা, তাকেও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাড়ির মালিককেও পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি একটি ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর। পাশের ভবনের দারোয়ান মোজাম্মেল জানায়, অবশ্যই কিছু একটা হয়েছে। তবে প্রত্যেকে চুপ থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করছে। ভবনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক ব্যক্তি। সালাহউদ্দিন আহমেদের ব্যাপারে তিনি কোন প্রশ্ন না করার অনুরোধ জানান সাংবাদিকদের। তিনি জানান, এর ফলে প্রতিবেশীরাও বিপদের মুখে রয়েছেন। ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, সবাই ভীত। নিজের নাম প্রকাশ না করে তিনি জানান, এমনকি আপনিও এ মুহূর্তে নজরদারির মধ্যে রয়েছেন। গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল মুখোমুখি অবস্থান থেকে সরে এসেছে। জানুয়ারি থেকে দেশটি প্রায় পঙ্গু হয়ে ছিল। তখন বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হরতাল ও অবরোধের ডাক দেন। তিনি আশা করেছিলেন, এর ফলে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য হবেন। সেই থেকে শতাধিক মানুষ পেট্রলবোমায় নিহত হয়েছে। বিএনপির ডজন ডজন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। রোববার উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়ে আসে বলে মনে হয়। সেদিনই বিএনপি প্রধান বেগম জিয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এর আগে তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এরপর আদালত তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ না দিয়ে জামিন মঞ্জুর করেন। এপ্রিলের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নিজ দলের প্রার্থীদের নির্দেশনা দিয়েছেন খালেদা। একই সঙ্গে জানিয়েছেন, আন্দোলন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। তবে সংকট  থেকে সরে যাওয়াটা এতটা সহজ-সরল হবে না। এর একটি কারণ, ১০ই মার্চ সালাহউদ্দিন আহমেদের গুম হয়ে যাওয়া। বিএনপি নেতারা ও সালাহউদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা নিশ্চিত যে, সরকারি সংস্থাই সালাহউদ্দিনকে অপহরণ করেছে। বহু বছর ধরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নির্যাতন, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাসমূহ নথিভুক্ত করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মতো অভিজাত সন্ত্রাসবাদবিরোধী স্কোয়াডের হাতে হওয়া ঘটনাসমূহও। এ স্কোয়াড যুক্তরাষ্ট্র থেকে অভ্যন্তরীণ  শাস্তিমূলক আচরণবিধির উপর প্রশিক্ষণ পায়। সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের ঘটনা অনেকের জন্যই উদ্বিগ্নের কারণ বলে জানিয়েছেন ঢাকাভিত্তিক দ্য ডেইলি স্টারের সমপাদক মাহফুজ আনাম। সালাহউদ্দিন দলের মুখপাত্র হিসেবে বেশ উঁচ্চস্তরের ভূমিকা পালন করতেন। মাহফুজ আনাম বলেন, বিষয়টা এরকম যে, সালাহউদ্দিন নিখোঁজ হয়ে গেলেন। কিন্তু কেউই দায়িত্ব নিচ্ছে না। আমার কাছে  এটি অত্যন্ত ভয়ানক একটি অবস্থা। যে কাউকেই রাতের অন্ধকারে তুলে নেয়া হতে পারে। কিন্তু সরকার এরপর বলবে, আমাদের কাছে কোন তথ্য নেই। বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সালাহউদ্দিন আহমেদকে যেখান থেকে তুলে নেয়া হয়েছে, সেখানে উপস্থিত ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে কেয়ারটেকার আখতার আলিসহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শীদের কোন খোঁজ পরবর্তীতে পাওয়া যায়নি। অনেকে পরসপরবিরোধী তথ্য দিয়েছেন। সে রাতে দুই ব্যক্তি দেখেছিলেন পুরো দৃশ্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, সে রাতে তারা সালাহউদ্দিনের বাড়ির সামনে তিন থেকে চারটি গাড়ি দেখেছেন। এদের একটি র‌্যাবের ছিল। সালাহউদ্দিন আহমেদের গাড়িচালকের স্ত্রী রেবেকা সুলতানা বলেন, তার স্বামীকে সাদা পোশাকে সশস্ত্র কয়েক ব্যক্তি আটক করে নিয়ে যায়। সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম হয়ে যাবার দুই দিন আগের ঘটনা এটি। এরপর কাছের একটি পুলিশ স্টেশনে তাকে আটকে রাখা হয়। এখনও ওই গাড়িচালক কারাগারেই রয়েছেন। বৃহসপতিবার শেষ হওয়া আদালতের একটি শুনানিতে সরকারি আইনজীবী জানিয়েছেন, সালাহউদ্দিন আহমেদকে রাষ্ট্রীয় কোন বাহিনী আটক করেনি। তাকে খোঁজার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পুলিশ ইঙ্গিত দিয়েছে, সালাহউদ্দিন ২০টি মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে নিজেই লুকিয়ে আছেন। কিংবা নিজ দলের প্রতি মানুষের সহানুভূতি সৃষ্টি করতে তিনি নিজ থেকেই লুকিয়ে আছেন। ঢাকার গোয়েন্দা ও অপরাধ-গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, আমরা নিশ্চিত নই, তাকে কেউ ধরে নিয়ে গিয়েছে কিনা। তাকে নিয়ে যাবার সময় কেউই কোন আওয়াজ শোনেনি। কেউ জানতোই না, সালাহউদ্দিন সেখানে থাকতো। মনিরুল ইসলাম জানান, যখন পুলিশ কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে তথ্যের জন্য গিয়েছিল, তখন তারা ‘কেবল অস্বীকারই করেছিল’। তিনি জানান, পেট্রলবোমার ভয়েই হয়তো তারা কেউ মুখ খুলছে না। তার ইঙ্গিত, বিরোধী দলই হয়তো প্রত্যক্ষদর্শীদের ভয় দেখাচ্ছে। সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ একজন সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, তিনি অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপর তিনি পরিষ্কার হয়ে গেছেন যে, সালাহউদ্দিনকে নিরাপত্তা বাহিনী আটক করেছে। বৃহসপতিবার আদালতের শুনানিতে সালাহউদ্দিনের পরিবারের আইনজীবী মওদুদ আহমেদ জানান, আমরা বলতে চাই তিনি জীবিত আছেন। তিনি অবশ্যই জীবিত আছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে সালাহউদ্দিনের নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। সে সময় পেট্রলবোমায় বহু সাধারণ মানুষ নিহত হচ্ছিল। এসব সম্ভবত বিরোধী নেতারাই নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিএনপির বেশির ভাগ জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ বা গাড়ি ভাঙচুরের মামলা রয়েছে। ডেইলি স্টারের মতে, দুজন যুগ্ম মহাসচিব, একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, একজন ভাইস চেয়ারম্যান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ আরও অনেকে কারাগারে রয়েছেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে উপ-যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন সালাহউদ্দিন। তিনি ছিলেন দলের একজন যুগ্ম সমপাদকও। জানুয়ারিতে তিনি সপর্শকাতর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সে সময় মুখপাত্র হিসেবে বিএনপির হরতাল ও অবরোধ তিনিই আহ্বান করতেন। তার ঠিক আগের দুজন মুখপাত্র গ্রেপ্তার হয়ে গিয়েছিলেন। তখনই দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। এ সময় লুকিয়ে যান সালাহউদ্দিন। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে স্থানান্তর হতেন নিয়মিত। পরিবারের সঙ্গে খুব কমই দেখা হতো তার। এসব জানিয়েছেন তার স্ত্রী। তার ১৭ বছর বয়সী কন্যা ফারিবা জানায়, কয়েক মাস ধরে বাবাকে দেখেনি সে। ২০১৩ সালের এপ্রিলে বিএনপির একজন সাংগঠনিক সমপাদক ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন। গত বছর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে পরের ১১টি ঘটনা নথিভুক্ত করে। সেগুলোতে দেখা যায়, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটকের পর সন্দেহজনক অবস্থায় বিরোধী নেতা বা কর্মীদের হত্যা করা হয়েছে। এগুলোর অনেকগুলোই ঘটেছে র‌্যাবের হাতে। এ সপ্তাহে সরকারি কৌঁসুলিরা র‌্যাবের সাবেক তিন ব্যাটালিয়ন কর্মকর্তা ও ২ ডজনেরও বেশি সদস্যর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। ২০১৪ সালের এপ্রিলে সাতজন মানুষকে চুক্তিভিত্তিক খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
এলেন ব্যারি নিউ ইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো চিফ।

প্রার্থীদের অঙ্গীকার ও ভোটারদের প্রত্যাশা by এস এম মাহফুজুর রহমান

২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট তোড়জোড় শুরু হয়েছে। নানা কার্যক্রমের মধ্যে নজরে পড়ার মতো একটি হচ্ছে ভোটারদের প্রত্যাশা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি ও মতামত প্রকাশ। প্রার্থীরা নিজেদের নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে যত ব্যস্ত, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এসব মতামত সম্পর্কে কি ততটা অবহিত? তাঁরা কি সময় নিয়ে এগুলো পড়েন? তাঁরা কি নিজ নিজ নির্বাচনী প্রচারণায় এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগ্রহী?
এসব প্রশ্নের একটি উত্তর এমন হতে পারে যে ভোটাররা যা চান, তার সবকিছুতেই তো প্রার্থীদের সম্মত হতে হবে, নতুন করে আবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কী আছে? আবার কোনো প্রার্থী বলতে পারেন, যা কিছু আলোচনায় আসছে, তার কোনোটিই কারও অজানা বিষয় নয়। তা ছাড়া আমরা শহরগুলোকে বিশ্বমানের নগরে রূপান্তরিত করব, এগুলো হবে তিলোত্তমা নগর, স্বপ্নের নগর, গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন সিটি ইত্যাদি প্রতিশ্রুতিই আমরা দিচ্ছি। এসবের মধ্যেই তো আছে ভোটারদের সব দাবি।
কিন্তু এ রকম উত্তরের সঙ্গে একমত হওয়ার সুযোগ বাস্তবে আছে কি? স্পষ্টতই বলা যায়, না, একমত হওয়ার সুযোগ নেই। ভোটারদের দাবি যেমন হতে হবে সুচিন্তিত ও বাস্তবসম্মত, তেমনি ভোটপ্রার্থীদের অঙ্গীকারও হতে হবে সুনির্দিষ্ট, নৈতিকতা ও বিশ্বাসপ্রসূত। বলা বাহুল্য, নির্বাচনের আওতাভুক্ত তিন সিটি করপোরেশনের রয়েছে পাহাড়সম নানা সমস্যা। সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করা যেতে পারে, তবে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সব সমস্যা দূর করা প্রায় অসম্ভব কাজ। তাই নির্বাচিত প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত কতটা কী করতে পারবেন, ভোটাররা তার চাইতে বেশি দেখতে চান অঙ্গীকারগুলো কেমন, সেগুলো বাস্তবায়নে তাঁরা কতটা দক্ষ এবং বাস্তব বিবেচনায় কতটা আন্তরিক।
এই তিন সিটি করপোরেশনের আওতায় বসবাসরত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের একেক অংশের প্রত্যাশা একেক ধরনের। কেউ চান বাধাবিঘ্নহীন ব্যবসা-বাণিজ্যের নিশ্চয়তা, কেউ চান স্বাভাবিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত বন্ধুসুলভ ও সুন্দর কাজের পরিবেশ। একটি বড় অংশের মানুষের প্রয়োজন স্বচ্ছন্দ ও নিরাপদ আবাসস্থল আর সাধারণভাবে সবার দরকার মশা, যানজট, কালো ধোঁয়া, ফরমালিন, আবর্জনা, জলাবদ্ধতা ইত্যাদি থেকে মুক্তি আর নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, রান্নার গ্যাস সরবরাহ। যাঁরা মেয়র ও কাউন্সিলর হবেন, তাঁদের নিজেদের এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে নগর ভবনসমূহেরও নিজস্ব কিছু বিষয় আছে। যেমন, নির্বাচিত মেয়র বা কাউন্সিলরদের ক্ষমতা, অধিকার, দায়িত্ব–কর্তব্য, বেতন-ভাতাসহ সুযোগ-সুবিধা, স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় সরকারের নানা অঙ্গ এবং ডেসা, ওয়াসা বা ইন্টারনেট সংযোগদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়, চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, সরকারি অর্থ ব্যয়ে শৃঙ্খলা ইত্যাদি।
প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের বসবাসের উপযোগিতা বিবেচনায় বিশ্বের খারাপ ও উত্তম শহরের যে তালিকা প্রতিবছর তৈরি হওয়ার একটি রীতি আছে, সেখানে শহরকে খারাপ বা উত্তম বিবেচনার মাপকাঠিগুলো কী কী কিংবা এসব মাপকাঠির কোনটি কী স্কেলে পরিমাপ করা হয়, মাপকাঠি অনুযায়ী প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রমিত মান কত—এসব বিষয়ে কি আমাদের মেয়র বা কাউন্সিলর পদে আগ্রহী প্রার্থীরা অবহিত? তাঁরা কি এসব বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেন? করলে তাঁদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে সেগুলো কীভাবে অন্তর্ভুক্ত? ভোটাররাই বা কীভাবে বুঝবেন যে মান অনুযায়ী এই তিন নগরের অবস্থান এসব মাপকাঠি অনুযায়ী উন্নীত করতে প্রার্থীদের মধ্যে কে কত বেশি উপযুক্ত বা আন্তরিক?
এবার তুলনামূলকভাবে ছোট ও সহজে সমাধানযোগ্য অথচ অনেকটাই স্থায়ীভাবে বিরাজমান একটি সমস্যার অবতারণা করছি। কিন্তু যখনই কেউ কোনো শহর ভালো লাগল কি না, তা নিয়ে মতামত দেয়, তখন বলে রাস্তাঘাট পরিষ্কার, শহরটি সবুজ ও প্রশস্ত, জঞ্জালমুক্ত, মানুষজন হাসিখুশি, কোনো অনিয়ম চোখে পড়ে না ইত্যাদি। আমাদের শহরগুলো সম্পর্কে কি এমনটি বলার সুযোগ আছে? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর, না। কারণ, যেকোনো রাস্তায় দাঁড়ান, ফুটপাত বলতে কিছু পাবেন না। যা আছে, তা হচ্ছে তিন প্রকারের দোকানের দখল: এক. স্থায়ী বা প্রায় স্থায়ী; দুই. বাঁশ বা সীমানাপ্রাচীরে ঝোলানো অথবা ফুটপাতে বিছানো মালামাল নিয়ে অস্থায়ী এবং তিন. ভ্যানমতো একটা কিছুতে বানানো হকারের ভিড়। আর এসব যদি না থাকে, তাহলে এখানে পাওয়া যাবে চাটাইঘেরা আড্ডাখানা অথবা ভাসমান মানুষের ঘেরাটোপ ঘর কিংবা মলমূত্র ত্যাগের উন্মুক্ত স্থান। এগুলো থেকে নিস্তার না পাওয়া নগরবাসীর অসহায়ত্ব, নাকি এসব আমাদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা? বিকল্প বের করার ঝামেলা এড়িয়ে আমাদের মেনে নেওয়ার মানসিকতা, আমাদের জাতিগত অভ্যাসের প্রতিফলন, নাকি এমন কিছু, যা থেকে গেলেই ভালো? এবং যা থেকে শহরকে পরিচ্ছন্ন করা মানে কিছু বিষয়ের সঙ্গে আপস না করলে যে ঝামেলা হতে পারে, সেগুলো এড়িয়ে চলা?
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কোনো প্রার্থী এসব বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা নেই। অথচ আন্তরিকতা নিয়ে এসব ক্ষেত্রে কাজ করলে নগরকে সুশৃঙ্খল ও সুন্দর করার কাজের ৫০ শতাংশেরও বেশি অর্জন করা সম্ভব। বিশৃঙ্খলার আরেক বিষয় রাস্তা দখল করে যেকোনো জায়গায় রিকশা, ঠেলাগাড়ি, ভ্যানগাড়ি, প্রাইভেট কার ইত্যাদি রাখা। এটি কি এমনই সমস্যা যে এর কোনো সমাধান নেই? আসলে এটা যে একটা সমস্যা, সে বিষয়টিই কর্তারা মাথায় নেন না। শোনা যায়, রিকশা বা অটোরিকশাজাতীয় পরিবহন থেকে নিয়মিত নগরভবনে চাঁদা যায়।
তিন নগরেই আছে বিপুলসংখ্যক মৌসুমি ও অভিবাসী রিকশাচালকের চাপ। এরা দু-তিন মাস বা কেউ কেউ তিন-চার সপ্তাহের জন্য ঢাকায় আসে, গ্রামে কাজ না থাকায় বেকার মৌসুমে সামান্য কিছু রোজগার করে আবার গ্রামে ফিরে যায়। এদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, এরা নিয়মকানুন যেমন জানে না, তেমনি শহরও তেমন ভালো চেনে না। ট্রাফিক বিশৃঙ্খলায় তাদেরও অবদান আছে। এ ছাড়া সব বড় দোকান, স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় একেবারে রাস্তার ওপরেই স্থাপন করতে হবে কেন? কেনই বা যথেষ্টসংখ্যক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা ছাড়া ভবন নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়?
ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, ওভারপাস, আন্ডারপাস—এগুলো যতই হোক, নাগরিক হিসেবে আমাদের অভ্যাসের পরিবর্তন না হলে যানজট বাড়বেই, শহরও সুন্দর হবে না। ফুটপাত ও রাস্তা চলাচলের জন্য অবাধ ও উন্মুক্ত না থাকলে কিংবা খোলা জায়গাগুলো নোংরা আবর্জনায় বা অপরিকল্পিতভাবে ও অস্থায়ী আবাসে ঘিঞ্জি করে রাখলে শহরকে তিলোত্তমা করা সম্ভব হবে না।
অবাক করার বিষয় যে মেয়র বা কাউন্সিলর পদের প্রার্থীরা এসব বিষয়ে উদাসীন। তাঁরা সব বড় বিষয়ে অঙ্গীকার করে চলেছেন। সেগুলোর বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ, কোনো কোনোটি আদৌ বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। অথচ যা সহজে সমাধানযোগ্য, তার প্রতি মনোযোগ ও সদিচ্ছা থাকলে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করলে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হতো, নগরের মানুষ একটু স্বস্তি পেত।
এস এম মাহফুজুর রহমান: অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
email: ibmahfuz@gmail.com

রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সম্মেলন, গোলাগুলি

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের কক্ষ ব্যবহার করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের নেত্রীবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মী সম্মেলন করেছেন। শনিবার ছাত্রলীগ সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমসহ কেন্দ্রীয় নেত্রীবৃন্দ এ কর্মী সম্মেলনে অংশ নেন। কেন্দ্রীয় নেত্রীবৃন্দদের সামনে নিজেদের অবস্থানকে জানান দিতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ সময় উভয় পক্ষই বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে একে অপরের দিকে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মাসুম ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজের মধ্যে র্দীঘ দিন ধরে চলছে নেতৃত্বের দেন দরবার। নেতৃত্ব দেয়াকে কেন্দ্র করে তাদের ও কর্মীদের মধ্যে বহু দিন ধরে চলছে রেষারেষি। রেষারেষির মাত্রা মাঝে মধ্যে স্বশস্ত্র সংঘর্ষের রুপ নিয়েছে। বিভিন্ন হল ও অনুষদের কমিটির দেয়াকে কেন্দ্র করে গত চার দিন ধরে মাসুম ও ইলিয়াস গ্রুপের কর্মীদের মধ্যে চলে আসছে উত্তেজনা। এরই মাঝে ছাত্রলীগের কর্মী সভায় যোগ দিতে শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন কেন্দ্রীয় নেতারা। কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে আগে থেকেই তৎপর থাকা উভয় গ্রুপই বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে স্বশস্ত্র ধাওযা-পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। 
প্রতক্ষ্যদর্শী অন্তত বিশ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে অবস্থান নেয় মাহমুদুর রহমান মাসুমের সমর্থকরা। এর পরপরই ক্যাস্পাসে অবস্থান নেয় ইলিয়াসের সমর্থকরা। দুই পক্ষই দেশীয় ও আগ্নেয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মারমুখি অবস্থান নেয়। এতে কেন্দ্রীয় নেত্রীবৃন্দ আসার আগেই দুই গ্রুপের মধ্যে স্বশস্ত্র ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বহিরাগত সন্ত্রসীদেরকে নিয়ে দুই গ্রুপই ক্যাস্পাসের ভিতরে অস্ত্রসহ অবস্থান নেয়। এ সময় একে অপরকে লক্ষ্য করে প্রায় দশ রাউন্ড গুলি করে। কুমিল্লা বিশ্বরোড়ের গাজী আহমদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী শহীদ উল্লাহ খান এ সময় বেশ কয়েকটি মটোর সাইকেল ও মাইক্রবাসের বহর নিয়ে ক্যাস্পাসে প্রবেশ করে।
এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে বাংলাদেশ রসায়ন সমিতির ৩৭তম বার্ষিক সম্মেলন। এ সম্মেলনে যোগ দিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকসহ রসায়নবিদরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। এরই মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের ৪১১ নং কক্ষে কর্মী সম্মেলন করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ছাত্র সংগঠনের এটিই প্রথম প্রশাসনিক ভবনের ভিতরে সম্মেলন। শিক্ষার্থীরা ভর্তির রেজিস্ট্রেশন ফরমে রাজনীতি মুক্ত ক্যাস্পাস গড়ার প্রত্যয়ে স্বাক্ষর করে ভর্তি হতে হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আলী আশরাফ বলেন, বাংলাদেশ রসায়ন সমিতির সম্মেলন থাকায় তাদেরকে এ দিন না আসতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা আমাদের কথা রাখেনি।
উল্লেখ্য, আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মাসুম চলতি মাসের ৭ তারিখ তিন মাসের জন্য ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ এবং ৮ তারিখ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করেন। পরামর্শ না করে কমিটি ঘোষণা করেছেন এমন অভিযোগ এনে শুক্রবার যুগ্ম-আহ্বায়ক আল আমিন অর্ণব ও সৈয়দ শাহরিয়া মাহমুদ এক বছরের জন্য দুই হল ও চারটি অনুষদের পাল্টা কমিটি ঘোষণা করেন।

কবে হবে ছাত্রসংসদ নির্বাচন by মামুনুর রশীদ

সবাই স্বীকার করেন বাংলাদেশের ইতিহাসে একদা ছাত্ররাজনীতি এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছে। ভাষা আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের নেতৃত্ব গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। সাধারণত নির্বাচিত ছাত্রসংসদের নেতৃত্ব এই ভূমিকা রেখেছে এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যায় ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পর ছাত্ররাজনীতির এক নেতিবাচক ভূমিকা লক্ষ করা যায়। কারণ, এই সময় থেকে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়নি। ফলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনটি ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। ছাত্রসংসদ নির্বাচন হলে ছাত্রদের মধ্যে একধরনের ইতিবাচক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। সাধারণ ছাত্রদের সমর্থন পাওয়ার জন্য ছাত্রসংগঠনগুলো কিছু কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসে। এই সময়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়, বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা শুরু হয় এবং ছাত্রনেতারা জাতীয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেন। আজকে যাঁরা জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত নেতা, তাঁদের অধিকাংশই ছাত্ররাজনীতি থেকে আসা। ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অভাবে নেতাদের ছাত্রজীবন প্রলম্বিত হচ্ছে। নিয়মিত ছাত্রসংসদ নির্বাচন হলে তাঁরা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন এবং একটা সময় ছাত্ররাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করে জাতীয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার জন্য একধরনের স্বীকৃতিও পেয়ে যান।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত শিক্ষকদের নির্বাচন হয়, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের নির্বাচন হয়, কিন্তু যাঁদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, সেই ছাত্রদের নির্বাচন হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু ভবন আছে, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েরও ছাত্রসংসদ ভবন আছে। এই ভবনগুলোতে বর্তমানে কী কাজ হয়, তা আমার জানা নেই। নির্বাচিত সংসদ থাকলে অবশ্যই কর্মচাঞ্চল্যে ভরা থাকত এই ভবনগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কারণে-অকারণে বন্ধ হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মাঝেমাঝেই টালমাটাল অবস্থায় পড়ে। নির্বাচিত ছাত্রসংসদ থাকলে ছাত্রনেতারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারত।
একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিপুল টাকা লগ্নি হলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা দেশের প্রশাসনে, শিক্ষায়, রাজনীতিতে, চিকিৎসাবিদ্যায়, প্রযুক্তিতে সর্বোপরি রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব সৃষ্টির প্রয়োজনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর সব রাজনৈতিক দলের যথার্থ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যদিও এ দেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা, মধ্য আয়ের যেকোনো মানুষ ছেলেমেয়েদের ইংরেজি স্কুল ও বিদেশে পাঠাতে প্রবল আগ্রহী। বিদেশে না পাঠাতে পারলে অন্ততপক্ষে দেশের যেকোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান, উদ্দেশ্য বিদেশযাত্রা। বিপুলসংখ্যক দায়িত্বশীল নাগরিক যদি শিক্ষাব্যবস্থাকে যথার্থ আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা না করে বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতিই বা কী করে হবে। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় সংকট দেখা যাচ্ছে। ছাত্ররা কোনো অবস্থাতেই যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযোগী হয়ে উঠছে না, এদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। বর্তমান পরীক্ষাপদ্ধতি নিয়েও নতুন ভাবনা অবশ্যই করতে হবে।
দেশটাকে গণতান্ত্রিক করতে হলে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি পরিবার থেকে সূচনা হলে সুবিধা হয়। ছাত্র নেতৃত্বের ক্ষেত্রে মেধাবী ছাত্রদের অগ্রাধিকার থাকা উচিত। যদিও মেধাবী ছাত্ররা রাজনীতিবিমুখ। সুস্থ রাজনীতি ছাড়া সমাজ এগোবে না, এ এক চিরন্তন সত্য। এই সত্যকে সামনে রেখে ছাত্ররাজনীতিতে সুস্থ ধারা অনুসরণ করার লক্ষ্যে রাজনীতিবিদ, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনমুখী। নির্বাচনকে তারা উৎসব বিবেচনা করে। বর্তমানে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভাসছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের নাগরিকেরা। রাজনীতির আকাশে মেঘ কিছুটা হালকা হয়েছে। নির্বাচনকে তারা আন্দোলন ভাবতে শুরু করেছে। নির্বাচন একধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে তেমনি একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে ছাত্ররাজনীতির নেতিবাচক দিকের হয়তো একটা অবসান হবে। কিন্তু এই পরিবেশ সৃষ্টি করাটাও খুব সহজ কাজ নয়।
কারণ, গত ২৪ বছর যে আবর্জনা জমেছে, তা রাতারাতি পরিষ্কার করা সম্ভব না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনোভাব ও সংস্কৃতিটাও প্রায় জরাজীর্ণ অবস্থায়। পরমতসহিষ্ণুতা নেই, অসহিষ্ণুতাই মুখ্য একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এখান থেকে উঠে আসার জন্য শিক্ষকদের একটা বড় ভূমিকা পালন করতে হয়।
কিন্তু শিক্ষকেরাও বিভক্ত নানা দলে। শিক্ষকদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যকই পাওয়া যাবে, যাঁরা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। একদা সিভিল সোসাইটির অগ্রভাগে ছিলেন শিক্ষকেরা, দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে তাঁরাই ছিলেন মুক্তবাক। তাঁদের কণ্ঠস্বরে শোনা যেত আমজনতার কণ্ঠ, যথার্থই সিভিল ভয়েস। শিক্ষকদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছাত্ররাজনীতি। তবু কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়, তাহলে আশা করা যায়, ছাত্ররাজনীতিতেও একটা সুবাতাস বইবে এবং ভবিষ্যতে তা জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব।

ফাঁসি কার্যকর by নুরুজ্জামান লাবু ও আল আমিন

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। গতকাল রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া দ্বিতীয় মৃত্যুদণ্ড হিসেবে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হলো। এর আগে ২০১৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের বিষয়ে গত দুই দিনে চলা নাটকীয়তার পর শুক্রবার রাতে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন শনিবারই কার্যকর হচ্ছে ফাঁসি। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তির মধ্যেই সরকার জামায়াতের এ নেতার ফাঁসি কার্যকর করলো।
এদিকে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের আগে বিকালে তার পরিবারের ২১ সদস্য তার সঙ্গে দেখা করেন। রাত ১০টা ১ মিনিটে ফাঁসি কার্যকরের পর ২০ মিনিট তাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ঢাকার সিভিল সার্জন তার মৃত্যু নিশ্চিত করার পর ময়নাতদন্ত শেষে লাশ কারাগার থেকে বের করা হয়। এর আগে বিকাল থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরকে সামনে রেখে গতকাল বিকাল থেকেই সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয় বিজিবি।
যেভাবে ফাঁসি কার্যকর: রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই ফাঁসি কার্যকর করতে ৩ জন জল্লাদ অংশ নেন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার ফরমান আলী ফাঁসি কার্যকর করতে লাল রুমালটি ব্যবহার করেন। তার হাত থেকে রুমালটি মাটিতে পড়তেই জল্লাদ ফাঁসির মঞ্চের হুইলটি টেনে দেন। এতে কামারুজ্জামানের পায়ের নিচ থেকে কাঠের পাটাতন সরে গেলে তিনি ফাঁসির দড়িতে ঝুলে পড়েন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাকে অন্তত ২০ মিনিট ঝুলন্ত অবস্থায় রাখা হয়। পরে মাটিতে নামানোর পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা মৃতদেহ পরীক্ষা করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এ সময় তার হাত-পায়ের রগ কেটে শতভাগ মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। পরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন চিকিৎসকরা। এরপর মুসলিম রীতি অনুযায়ী কামারুজ্জামানের মৃতদেহ গোসল করিয়ে কাফন পরানো হয়। এসবে নেতৃত্ব দেন কারা মসজিদের ইমাম। এরপর লাশটি কফিনে ঢুকিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী শেরপুরে লাশ দাফন হবে কামারুজ্জামানের।
কারা সূত্র জানায়, রাতে জেল সুপার কেন্দ্রীয় কারাগার মসজিদের ইমাম মনির হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে আট নম্বর কনডেম সেলে যান। জেল সুপার কামারুজ্জামানকে জানিয়ে দেন যে, এটাই আপনার শেষ রাত। রাতেই আপনার ফাঁসি কার্যকর করা হবে। এখন আপনাকে তওবা পড়তে হবে। এ সময় কামারুজ্জামান গোসল ও ওজু করেন। পরে ইমাম সাহেব তাকে তওবা পড়ান। এর আগেই খাওয়া-দাওয়াসহ অন্যসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হয়। কারা চিকিৎসকরা তার শরীরিক পরীক্ষার কাজও সম্পন্ন করেন। এরপর দুজন জল্লাদ প্রবেশ করেন কামারুজ্জামানের সেলে। তাকে পেছনমোড়া করে হাত বাঁধা হয়। তারপর তাকে ফাঁসির মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
মঞ্চের ওপরে ত্রিপল টাঙানো ও একপাশে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। জল্লাদরা কামারুজ্জামানকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যান। তাকে কালো জমটুপি (মুখমণ্ডল আবৃত) পরানো হয়। এসময় জেল সুপার রুমাল হাতে নিয়ে ফাঁসির মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জল্লাদের দৃষ্টি ছিল লাল রুমালের দিকে। আর জেল সুপারের দৃষ্টি ছিল ঘড়ির কাঁটার দিকে। ঠিক ১০টা ১ মিনিটে জেল সুপারের হাত থেকে লাল রুমাল পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন জল্লাদ ফাঁসির মঞ্চের হুইল টেনে দেন।
এদিকে ফাঁসির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সন্ধ্যায় আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন, অতিরিক্ত আইজি প্রিজন কর্নেল মুহাম্মদ ফজলুল কবির, ডিআইজি প্রিজন গোলাম হায়দার, ঢাকার জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, ঢাকার জেলা সিভিল সার্জন আবদুল মালেক ভুঁইয়া, ডিএমপি কমিশনারের একজন প্রতিনিধি, পুলিশের লালবাগ জোনের ডিসি মফিজ আহমেদ কারা অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এছাড়া ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী, জেলার নেছার আলম, কারা হাসপাতালের দুই চিকিৎসক ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস ও ডা. আহসান হাবীব আগে থেকেই কারা অভ্যন্তরে অবস্থান করছিলেন।
ভেতরে-বাইরে কঠোর নিরাপত্তা: কারাগারের যেখানে ফাঁসির মঞ্চ, তার পশ্চিম ও পূর্ব দিকের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানো ছিল সশস্ত্র কারারক্ষীরা। চারদিক থেকে জ্বালানো ছিল উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক বাতি। নাজিমউদ্দিন রোডে কারাগারের আশপাশের উঁচু বাড়ির ছাদে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক পাহারা। সন্ধ্যায় বাড়িওয়ালাদের মৌখিকভাবে কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়। আশপাশ ঘিরে গড়ে তোলা হয় তিন স্তরবিশিষ্ট কড়া নিরাপত্তা বলয়। দুপুরের পরপরই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে থেকে দর্শনার্থীদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। আশপাশের সব সড়কে ব্যারিকেড দেয়া হয়। কারাগার এলাকায় বসবাসকারী লোকজন ছাড়া কাউকেই ওই এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। কারাগারের আশপাশে প্রচুরসংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি সদস্য মোতায়েন রাখা হয়। সন্ধ্যায় কারাগারের চারপাশের রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। ডিএমপির লালবাগ জোনের উপকমিশনার (ডিসি) মফিজ আহমেদ জানান, জামায়াত-শিবিরের নাশকতার আশঙ্কায় রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রায় কার্যকর করা পর্যন্ত নিরাপত্তার স্বার্থে রাস্তা বন্ধ থাকবে।
ফাঁসির মহড়া: জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করতে প্রস্তুত রাখা হয় অন্তত ১০ জল্লাদকে। এরা হলো- রাজু, জনি, কক্সবাজারের বাবুল মিয়া ওরফে মুক্ত, সাভারের কালু মিয়া, ঢাকার ফারুক, মাসুম ও মনির হোসেন। শাহজাহানের একটু বয়স হওয়ায় তাকে এবার রাখা হয়নি। শাজাহানের নেতৃত্বেই ২০১৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। রাজু ও জনি এখন সবচেয়ে সুঠামদেহী। এ কারণে তাদের দিয়েই ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি নেয় কারা কর্তৃপক্ষ। কামারুজ্জামানের আপিলের রায় দেয়ার পরপরই তাদের কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। কারা সূত্র জানায়, ফাঁসি কার্যকরে তিনজন জল্লাদ মঞ্চে থাকেন। এই তিনজনকে ঠিক এক ঘণ্টা আগে ডেকে নেয়া হয়। আগে থেকে জল্লাদদেরও ফাঁসির কথা জানানো হয় না। জল্লাদ জনি তিনটি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামি। বাড়ি বৃহত্তর ময়মনসিংহে। কাশিমপুর কারাগারেই সেই দণ্ড খাটার সময় মিলেছে জল্লাদ প্রশিক্ষণ। রাজু নামের জল্লাদ কাদের মোল্লার ফাঁসির সময়ও প্যানেলে ছিলেন। কিন্তু সেবার অভিজ্ঞতা নেই বলে তার ডাক পড়েনি। এবার তার নেতৃত্বেই কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। এদিকে কারাসূত্র জানায়, গত কয়েক দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একাধিকবার ফাঁসির মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এতে জল্লাদদের প্রত্যেকেই অংশ নেন।
গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়া: ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগের মামলায় ২০১০ সালের ২৯শে জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরই ২রা আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক খান কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত করেন। তদন্ত শেষে তিনি ২০১১ সালের ৩০শে অক্টোবর প্রসিকিউশনের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই বছর ৫ই ডিসেম্বর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে জমা দেন প্রসিকিউশন। তবে সেটি সঠিকভাবে বিন্যস্ত না হওয়ায় আমলে নেয়ার পরিবর্তে ফিরিয়ে দেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ২০১২ সালের ১২ই জানুয়ারি প্রসিকিউশন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পুনরায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। ৩১শে জানুয়ারি ৮৪ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি আমলে নেন ট্রাইব্যনাল-১। ওই বছরের ১৬ই এপ্রিল চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কামারুজ্জামানের মামলাটি প্রথম ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ১৬ই মে আসামিপক্ষ এবং ২০শে মে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করেন। ২০১২ সালের ৪ঠা জুন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তার বিরুদ্ধে একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি অভিযোগ আনা হয়। ২রা জুলাই কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৮১ পৃষ্ঠার ওপেনিং স্টেটমেন্ট (সূচনা বক্তব্য) উত্থাপন করেন প্রসিকিউটর একেএম সাইফুল ইসলাম ও নূরজাহান বেগম মুক্তা। ২০১২ সালের ১৫ই জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আবদুুর রাজ্জাক খানসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। তাদের মধ্যে ১৫ জন ঘটনার সাক্ষী হচ্ছেন- ১৯৭১ সালে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি হামিদুল হক, শেরপুরে কামারুজ্জামানের স্থাপন করা আলবদর ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্রের দারোয়ান মনোয়ার হোসেন খান মোহন, বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সী বীরপ্রতীক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির আবদুল মান্নান, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ গোলাম মোস্তফা হোসেন তালুকদারের ছোট ভাই মোশাররফ হোসেন তালুকদার, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামানের বড় ভাই ডা. মো. হাসানুজ্জামান, লিয়াকত আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদের পুত্র জিয়াউল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সন্তান জালাল উদ্দিন, শেরপুর জেলার ‘বিধবাপল্লী’ নামে খ্যাত সোহাগপুর গ্রামের নির্যাতিত (ভিকটিম) তিন নারী সাক্ষী (ক্যামেরা ট্রায়াল), মুজিবুর রহমান খান পান্নু এবং দবির হোসেন ভূঁইয়া। আর জব্দ তালিকার প্রথম সাক্ষী হলেন- বাংলা একাডেমির সহকারী গ্রন্থাগারিক এজাব উদ্দিন মিয়া ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তথ্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা আমেনা খাতুন। আসামিপক্ষ তাদের জেরা সম্পন্ন করেন।
অন্যদিকে কামারুজ্জামানের পক্ষে ২০১৩ সালের ৬ই থেকে ২৪শে মার্চ পর্যন্ত মোট ৫ জন সাফাই সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। তারা হচ্ছেন- মো. আরশেদ আলী, আশকর আলী, কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল, বড় ভাই কফিল উদ্দিন এবং আবদুর রহিম। তাদের জেরা সম্পন্ন করেন রাষ্ট্রপক্ষ। এর আগে ২০১৩ সালের ২রা জানুয়ারি মামলাটির পুনর্বিচারের আবেদন জানান কামারুজ্জামানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। ওই বছরের ৩রা জানুয়ারি আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন কামারুজ্জামানের আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী। বিপক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর এ কে এম সাইফুল ইসলাম। ৭রা জানুয়ারি এ আবেদন খারিজ করে দেন দুটি ট্রাইব্যুনাল। ওই বছরের ১০ই জানুয়ারি এসব খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করেন। ১৫-১৬ই জানুয়ারি শুনানি শেষে ২১শে জানুয়ারি সেসব আবেদনও ট্রাইব্যুনাল খারিজ করে দেয়ায় মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রমের সব প্রতিবন্ধকতা দূর হয়।
২০১৩ সালের ২৪শে মার্চ থেকে ৩১শে মার্চ পর্যন্ত এবং ১৬ই এপ্রিল ৫ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এ কে এম সাইফুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট নুরজাহান বেগম মুক্তা। অন্যদিকে ৩ থেকে ১৬ই এপ্রিল ৪ কার্যদিবসে আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন কামারুজ্জামানের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ও আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী।
২০১৩ সালের ১৬ই এপ্রিল বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। ৯ই মে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কামারুজ্জামানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে এবং বিচারক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও শাহিনুর ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল ২১৫ পৃষ্ঠার রায়টি ঘোষণা করেন।
আপিল মামলার কার্যক্রম: ট্রাইব্যুনালের ফাঁসির আদেশ থেকে খালাস চেয়ে ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ৬ই জুন আপিল বিভাগে আপিল করেন কামারুজ্জামান। তবে সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় কামারুজ্জামানের দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেননি রাষ্ট্রপক্ষ। ১২৪টি যুক্তিতে আপিল করেন আসামিপক্ষ। তাদের মূল আবেদন ১০৫ পৃষ্ঠার। আর এর সঙ্গে ২ হাজার ৫শ’ ৬৪ পৃষ্ঠার আনুষঙ্গিক কাগজপত্র জমা দেয়া হয়। ২০১৩ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর আপিলের সার-সংক্ষেপ জমা দেন আসামিপক্ষ। সে সময়কার প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন নিজে এ আপিল মামলার শুনানিতে না থেকে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি (বর্তমান প্রধান বিচারপতি) এস কে সিনহার নেতৃত্বে ৪ সদস্যের পৃথক আপিল বেঞ্চ গঠন করে দেন। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হচ্ছেন বিচারপতি আবদুল ওহাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। এ বেঞ্চে গত বছরের ৫ই জুন থেকে আপিল শুনানি শুরু হয়। ওই দিন থেকে মোট ১৭ কার্যদিবসে আপিল শুনানি শেষ হয়। এর মধ্যে গত বছরের ৯ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ও ১৭ই সেপ্টেম্বর ১৫ কার্যদিবসে আসামিপক্ষে শুনানি করেন কামারুজ্জামানের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহাবুব হোসেন, এসএম শাহজাহান ও অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম। অন্যদিকে গত বছরের ৯ই সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষে ৪ কার্যদিবস শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আপিল শুনানি শেষ হওয়ায় গত বছরের ১৭ই সেপ্টেম্বর আপিল মামলাটির রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন আপিল বিভাগ। ৩রা নভেম্বর কামারুজ্জামানকে ট্রাইব্যুনাল-২ এর দেয়া মৃতুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে চূড়ান্ত রায় সংক্ষিপ্ত আকারে দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ।
গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি কামারুজ্জামানের এ ফাঁসির রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। ওইদিন দুপুরে চার বিচারপতি রায়ে স্বাক্ষর দেয়া শেষ করলে ৫৭৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়।
লাল কাপড়ে মোড়ানো মৃত্যু পরোয়ানা: পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাতেই আপিল বিভাগ থেকে ফাঁসির রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পৌঁছে দেয়া হয় বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মোস্তাফিজুর রহমান পূর্ণাঙ্গ রায় গ্রহণ করে মৃত্যু পরোয়ানা জারির প্রক্রিয়া শুরু করেন। পরদিন ১৯শে ফেব্রুয়ারি চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ ট্রাইব্যুনাল-২ এর ৩ বিচারপতি মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করেন। এরপর লাল কাপড়ে মোড়ানো মৃত্যু পরোয়ানা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মৃত্যু পরোয়ানার সঙ্গে আপিল মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপিও পাঠান ট্রাইব্যুনাল। কারাগারে পৌঁছানোর পর কামারুজ্জামানকে মৃত্যুপরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়। তিনি আইনজীবীর সঙ্গে আলাপ করে রিভিউ আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন।
রিভিউ মামলার কার্যক্রম: আইন অনুসারে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের দিন থেকে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করার জন্য ১৫ দিনের সময় পান আসামিপক্ষ। সে অনুসারে গত ৫ই মার্চ আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিভিউ আবেদন দাখিল করেন কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা। পরে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার বিচারপতির আদালতে শুনানির দিন ধার্যের আবেদন জানান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ঠা মার্চ চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রিভিউ আবেদনটি শুনানির জন্য পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। মোট ৭০৫ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে ৪৪টি যুক্তি দেখিয়ে কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ বাতিল ও তার খালাস চান আসামিপক্ষ। আসামিপক্ষের সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দফায় পিছিয়েছে শুনানির দিন। গত ৯ই মার্চ শুনানির জন্য কার্যতালিকায় এলে প্রথমবার চার সপ্তাহের সময়ের আবেদন জানান আসামিপক্ষ। এর কারণ হিসেবে খন্দকার মাহবুব হোসেনের ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা বলা হয়েছিল। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি পিছিয়ে গত ১লা এপ্রিল পুনর্নির্ধারণ করেন সর্বোচ্চ আদালত। ১লা এপ্রিল কামারুজ্জামানের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন অসুস্থ বলে উল্লেখ করে ফের চার সপ্তাহের সময়ের আবেদন জানানো হয়। ওই দিন চার দিন পিছিয়ে রোববার (৫ই এপ্রিল) দিন পুনর্নির্ধারণ করেন আপিল বিভাগ। অবশেষে ৫ই এপ্রিল সকালে শুনানি শেষ হলে ৬ই এপ্রিল রায়ের দিন ধার্য করেন সর্বোচ্চ আদালত। আসামিপক্ষে কামারুজ্জামানের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানি করেন। ৬ই এপ্রিলের রায়ে আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয়ায় কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় চূড়ান্তভাবে বহাল থাকে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন- বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। ৭ই এপ্রিল চূড়ান্ত এ রায়ের খসড়া লেখা শেষ করেন বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। ৮ই এপ্রিল দুপুর নাগাদ চার বিচারপতি মিলে সেটি চূড়ান্ত করে ৩৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেন। এরপর সেটি যায় ট্রাইব্যুনাল হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।