Sunday, October 13, 2019

প্রেসিডেন্ট রুহানির সঙ্গে বৈঠক করলেন ইমরান খান: -ফলপ্রসূ আলোচনার দাবি

ইমরান খান ও হাসান রুহানির বৈঠক
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানির সঙ্গে রাজধানী তেহরানে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে ইমরান খান একে ফলপ্রসূ আলোচনা বলে আখ্যা দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট রুহানির সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেন, “পাকিস্তান চায় না সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে কোনো রকমের সংঘাত বাধুক। তেহরান এবং রিয়াদের মধ্যে আলোচনার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পেরে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই খুশি। প্রেসিডেন্ট রুহানির সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার পর আমি এ ব্যাপারে অনেক আশাবাদী।”

ইমরান খান বলেন, সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে পাকিস্তান তার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে।

সংবাদ সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেন, “যেকোনো সদিচ্ছাকে ইরান স্বাগত জানায়। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে বৈঠকে আমরা একমত হয়েছি যে, আঞ্চলিক ইস্যুগুলো কূটনীতি এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত।”

প্রেসিডেন্ট রুহানির সঙ্গে বৈঠকের পর পাক প্রধানমন্ত্রী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর তিনি আগামীকাল (মঙ্গলবার) সৌদি আরব যাবেন।

এ সফরে ইমরান খানের সঙ্গে তার সহকারি সাইয়েদ জুলফিকার বুখারি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি রয়েছেন। এর আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ইমরান খানের সফরে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যখন সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে তখন ইমরান খান ইরান সফর করছেন। চলতি বছরে তিনি এ নিয়ে দুইবার ইরান সফর করলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ইমরান খান (বামে) ও প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি

জ্বলছে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল

জ্বলছে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল। একদিকে লাশ আর লাশ। অন্যদিকে অবকাঠামোতে বোমার আগুন। ধোয়ায় কালো হয়ে যাচ্ছে আকাশ। মানুষের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলে কুর্দিদের অবস্থানস্থল লক্ষ্য করে তুরস্কের হামলায় এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে তারা সিরিয়ার রাস আল আইন শহর দখল করে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এমন অবস্থায় কুর্দিদের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা স্থগিত রাখতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগানের প্রতি ফোন করে আহ্বান জানিয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।
এ সময় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জানিয়েছেন, তুরস্কের এমন লড়াইয়ে সিরিয়ার মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই তিনি যুদ্ধিবিরতিতে পৌঁছার জন্য এরদোগানকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। এরই মধ্যে এই কুর্দিদের সঙ্গে তুরস্কের এই যুদ্ধে কুর্দি যোদ্ধাগোষ্ঠী ওয়াইপিজির সদস্য ও বেসামরিক মিলে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। বৃটেনের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে এ কথা বলা হয়েছে।
এমন অবস্থায় এরদোগানকে ফোন করে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, বৃটেনের গুরুত্বপূর্ণ একজন অংশীদার তুরস্ক। একই সঙ্গে তারা ন্যাটো জোটেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এ সময় তিনি দায়েস বা আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তুরস্কের অগ্রণী ভূমিকা স্বীকার করে নেন। তবে বরিস জনসন পরিষ্কার করে বলেন, তুরস্কের এই সামরিক অভিযান সমর্থন করতে পারে না বৃটেন। তাই তিনি এরদোগানকে অপারেশন বন্ধ করে আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি আরো জানিয়েছেন অস্ত্রবিরতিতে মধ্যস্থতা করতে বৃটেন ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা প্রস্তুত রয়েছে।
সিরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তারপরই সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে কুর্দিদের অবস্থানস্থলে হামলা চালানো শুরু করে তুরস্ক। তবে এর ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির মুখে এরই মধ্যে কুর্দিদের কাছে আটক থাকা আইএসের ৫ জন বন্দি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। শনিবার সকালে তুরস্ক দখল করে নিয়েছে সিরিয়ার রাস আল আইন শহর। সেখানে আবাসিক এলাকাগুলোতে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা। তবে কুর্দিরা তুরস্কের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এডিএফ) বলেছে, রাস আল আইন শহরে এখনও তারা প্রতিরোধ গড়ে রেখেছে। তুর্কি সেনাদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ চলছেই।
মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ সিরিয়ান অবজার্ভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলছে, তুরস্কের প্রধান টার্গেট হলো রাস আল আইন। এখনও তারা ওই শহর পুরোপুরিভাবে দখলে নিতে পারে নি। তবে তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী টুইটে বলেছেন, রাস আল আইন আবাসিক এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে সফল অভিযানের মাধ্যমে। বুধবার সিরিয়ার ভিতর প্রবেশ করে হামলা শুরু করে তুরস্ক। ফলে এরই মধ্যে একটি শহর দখল করে নেয়াকে তুরস্কের বড় অর্জন বলে দেখা হচ্ছে। তবে এই দখল নেয়ার পর তারা ওই শহরটি সিরিয়ার কাছে হস্তান্তর করবে নাকি তুরস্কের মানচিত্রের সঙ্গে যোগ হবে সে বিষয়ে কিছু বলে নি।

উত্তর সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে যুক্তি দেখালেন ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে সাফাই গেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উত্তর সিরিয়া থেকে যখন মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে নানারকম সমালোচনা হচ্ছে তখন তিনি এই সাফাই গাইলেন।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করার পর তুরস্কের সামরিক বাহিনী সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে কুর্দি গেরিলা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। সমালোচকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকায় কুর্দিদের সমর্থন দিয়ে এলেও এখন তারা কুর্দিদেরকে তুরস্কের সামরিক অভিযানের মুখে একা ফেলে গেছে। সিরিয়ার ওয়াইপিজি গেরিলা গোষ্ঠীকে তুরস্কের সরকার সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করে।

শনিবার এক সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত খুব জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয় তবুও তিনি এ কাজ করেছেন এই কারণে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সীমাহীন যুদ্ধে আর মার্কিন সেনাদেরকে তিনি অংশগ্রহণ করতে দিতে চান না।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আমি মনে করি আমাদের সেনারা তুরস্ক এবং সিরিয়ার সীমান্ত পাহারা দেয়ার জন্য আরও ৫০ বছরের জন্য সেখানে অপেক্ষা করবে না, যেখানে আমরা আমাদের নিজেদের সীমান্ত ঠিকমতো পাহারা দিতে পারি না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো বলেন, মার্কিন সরকার গত কয়েক বছর ধরে কুর্দিদের পেছনে বহু অর্থ খরচ করেছে। কিন্তু আপনারা ভুলে যাবেন না তারা তাদের মাতৃভূমি রক্ষার জন্য লড়াই করছে; তারা আমাদের ভূমি রক্ষার জন্য লড়াই করছে না।
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে আমেরিকা

শুরু হচ্ছে ইমরান খানের নতুন মিশন

আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে নতুন এক ইনিংস শুরু করতে যাচ্ছেন পাকিস্তান ক্রিকেটের বিশ্বকাপ জয়ী সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পারস্য উপসাগরে ইরানের সঙ্গে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে মিশন শুরু করছেন তিনি। এ উদ্দেশে আজ রোববার তার ইরানের উদ্দেশে উড়াল দেয়ার কথা। গত মাসে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তাকে এই মধ্যস্থতার জন্য আমন্ত্রণ জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সেখান থেকেই তিনি প্রাথমিকভাবে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে। তবে আজ রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে সেই মিশন শুরু হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।
সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা অনেক পুরনো।
কিন্তু তা আরো তীব্র হয়েছে গত মাসে। এ সময়ে ইয়েমেন থেকে হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেলক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এ হামলার জন্য হুতিরা দায় স্বীকার করলেও সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা অনেক দেশ মনে করে, এর সঙ্গে জড়িত ইরান। ফলে ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের দা-কুমড়ো সম্পর্ক দাঁড়ায়। যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে বসে জাতিসংঘের অধিবেশন। সেখানে মধ্যস্থতা করার জন্য ইমরানকে দায়িত্ব দেন ট্রাম্প।
সেই মিশন নিয়ে ইরানে গিয়ে তিনি সাক্ষাত করবেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ও প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে। এসব বৈঠকে ইমরান খান পারস্য উপসাগরের শান্তি ও নিরাপত্তার ইস্যুগুলোতে গুরুত্ব দেবেন। এ ছাড়া তিনি দ্বিপক্ষীয় বিষয়ও তুলে ধরবেন। কাশ্মীরের পরিস্থিতির মতো আঞ্চলিক বিষয়গুলো উঠে আসবে তার আলোচনায়। শনিবার রাতেই তার তেহরানের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা পরিবর্তন করে রোববার সকালে যাত্রা করার কথা বলা হয়। তিনি সৌদি আরব যেতে করতে পারেন বলে বলা হয়েছিল। কিন্তু তা হচ্ছে না। তার পরিবর্তে তিনি একই দিনে অর্থাৎ রোববারই দেশে ফিরে আসবেন। এর কারণ, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সোমবার সৌদি আরব যাচ্ছেন। তাকে অভ্যর্থনা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে রিয়াদ। ফলে ইমরান খান পরের সপ্তাহে কোনো এক সময়ে রিয়াদ সফরে যাবেন। একটি সূত্র বলেছেন, তার এই সফর হতে পারে মঙ্গলবার।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী ইমরান খান তার তেহরান সফরকে নিয়েছেন আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে সামনে এগিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ হিসেবে। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস ও আরো কিছু মিডিয়া বিষয়ক সংগঠন আগেভাগে দাবি করেছে, ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের যুদ্ধ এড়াতে মধ্যস্থতা করার জন্য ইমরান খানকে অনুরোধ করেছেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। ওদিকে ২৪ শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে সংবাদ সম্মেলন করেন ইমরান খান। সেখানে তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা নিরসনে তার সহযোগিতা চেয়েছেন ট্রাম্প। তার পরে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতও করেছেন।
ইমরান খানের এ উদ্যোগের প্রশংসা করেছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ও ইরান উভয়েই পাকিস্তানের ভ্রাতৃসুলভ দেশ। তাদের মধ্যে একটি সম্ভাব্য আলোচনার উদ্যোগ হলো ইমরান খানের আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। তবে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ মধ্যস্থতা করার জন্য ইমরানকে অনুরোধ করেছেন বলে যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে ওই বিবৃতিতে তা অস্বীকার করা হয়েছে।
এরই মধ্যে ইরান বার বার বলেছে তারা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে প্রস্তুত। মধ্যস্থতার জন্য তারা উন্মুক্ত। সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চায়। ইমরান খানের মধ্যস্থতার বিষয়ে টিআরটি’কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ বলেছেন, আমরা কোনো মধ্যস্থতাকে কখনোই প্রত্যাখ্যান করি না। আমরা এ জন্য সব সময় উন্মুক্ত। এই আলোচনাকে তিনি সমস্যা সমাধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের কোনো পছন্দনীয় ইস্যু নেই। তবে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে চাই।

বৃহৎ শক্তি হিসেবে ইরানের প্রতি সম্মান দেখান: -প্রেসিডেন্ট পুতিনের আহ্বান

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি বৃহৎ শক্তি হিসেবে ইরানের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য বিশ্বের সব দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।তিনি শনিবার রাশিয়ার নিউজ চ্যানেল ‘রাশা টুডে’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “নিঃসন্দেহে ইরানের মতো শত শত বছরের পুরনো বৃহৎ শক্তির নিজস্ব কিছু স্বার্থ রয়েছে এবং তার প্রতি সকল দেশের সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।”

রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিতে সব দেশের মনযোগী হওয়া উচিত।

ভ্লাদিমির পুতিন ওই সাক্ষাৎকারে পূর্ব দিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর বিস্তারের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এ বিষয়টিকে রাশিয়া নিজের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি বলে মনে করে।

পুতিন এমন সময় ইরানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানালেন যখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন, হয় এ অঞ্চলের সমস্ত দেশ এই নিরাপত্তা থেকে লাভবান হবে, তা না হলে কেউ নিরাপত্তা পাবে না।

তিনি সম্প্রতি কুয়েতের আল-রাই পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অপরিহার্য এবং বহু শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক দেশগুলোই রক্ষা করেছে।

কম পাবার বিনিময়ে ভারতকে অনেক বেশি দেয়ায় সমালোচিত হাসিনা by পারুল চন্দ্র

পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভারসাম্য বিপজ্জনক হতে পারে। যখন তার সাম্প্রতিক ভারত সফরে ‘স্বল্প-পরিবর্তন’ (শর্ট চেঞ্জড) নিয়ে বিরোধী পক্ষ, নাগরিক সমাজ এমনকি মিডিয়ার সমালোচনার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন তখন এ বিষয়টি খুব ভালভাবেই জানেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

উদ্বেগের বড় কারণটি হলো তার দেশে প্রধান প্রকৌশল বিষয়ক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্র হত্যা। তার দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্যরা ওই ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। নিহত ওই ছাত্রের নাম আবরার ফাহাদ। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। নয়া দিল্লির অনুরোধে ফেনি নদীর পানি দেয়ার বিষয়ে ফেসবুকে শেখ হাসিনার সমালোচনা করে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন ফাহাদ।

নয়া দিল্লি ও ঢাকা সম্পাদিত ৭টি চুক্তির ঘোষণা দেয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই তিনি ওই পোস্ট আপলোড করেছিলেন।
এতে তিনি ভারতে এলপিজি রপ্তানি ও মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতকে অনুমোদন দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেছিলেন।

বাংলাদেশের বহু মানুষের অনুভূতি আবরারের মধ্য দিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এসব মানুষ দীর্ঘদিন তিস্তার পানির জন্য অপেক্ষায় আছেন। ফলে তারা মনে করেন, নয়া দিল্লির সঙ্গে চুক্তি করে ঢাকা বড় মাপের ‘লুজারে’ পরিণত হয়েছে। কিন্তু ফাহাদ সম্ভবত ধারণা করতে পারেন নি তার ওই পোস্টের কারণে কি সহিংস প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

রিপোর্ট অনুযায়ী তার ওপর হামলা করেছিল ছাত্রলীগের বুয়েট ইউনিটের সদস্যরা। তারা তাকে প্রহার করেছিল। তারা বিশ্বাস করতো আবরার ইসলামপন্থি বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত। এই ছাত্রশিবির হলো জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন। এ দলটি গত বছর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেরা প্রার্থী দিতে সক্ষম হয়নি। কারণ, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন বাতিল করেছে। শেখ হাসিনা জামায়াতপন্থিদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন চালিয়েছেন।

ওদিকে, প্রহারের ফলে ২২ বছর বয়সী ফাহাদ মারা যান। এতে দেশে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তরফ থেকে তীব্র সমালোচনা আসছে। সেই সমালোচনা শুধু এই হত্যাকা- নিয়ে নয়। একই সঙ্গে ভারতকে অনেক বেশি দিয়ে সামান্য পাওয়ার অভিযোগেও হচ্ছে সমালোচনা। এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে হাসিনাকে। নিকট প্রতিবেশী ভারতের কাছে সব সময়ই একজন বন্ধু শেখ হাসিনা। ভারতের বর্তমান ও অতীত নেতারা সব সময়ই ‘চীনা কার্ড’ ব্যবহার করেছেন সক্রিয়ভাবে ।

শেখ হাসিনা বর্তমানে তার দেশে টানা তৃতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী। তিনি ভারতের প্রত্যাশা অব্যাহতভাবে পূরণ করেছেন। সেটা হোক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন অথবা ইসলামপন্থি উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় তিনি কি দেশের ভিতর তার সুনাম হারাচ্ছেন?

আসামের এনআরসি ইস্যু এবং ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অনুপ্রবেশকারীদের (বাংলাদেশী) ঘুনপোকা বলে আখ্যায়িত করায় বাংলাদেশের অনেকের মনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা সরকারিভাবে স্বীকার করেছে তারা এনআরসি প্রক্রিয়ার ওপর দৃষ্টি রাখছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুও ঢাকায় বুদবুদ তুলছে। এর ফলে তাদেরকে ফেরত নেয়ার জন্য মিয়ানমারের ওপর ভারত চাপ সৃষ্টি করুক এমনটা চায় ঢাকা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ককে ‘সোনালী অধ্যায়’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে শেখ হাসিনার জন্য এর অর্থ সামান্যই। কারণ, তারা অপেক্ষা করেন ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নের জন্য।

শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সফরে আলোচনায় আসেনি বহুল প্রতিক্ষীত তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তির কার্ড। এই চুক্তিটি বাস্তবায়ন করতে নয়া দিল্লির রয়েছে নিজস্ব আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই চুক্তি না হওয়ায় উত্তাপের মুখে রয়েছেন শেখ হাসিনা।

ঢাকায় একটি ইংরেজি পত্রিকার শিরোনাম ‘ফেনি নদীর পানি দেয়া হয়েছে, তিস্তার জন্য অপেক্ষা’। এখানে শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতির দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। তিনি এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রতিবেশী ত্রিপুরার সাব্রুম শহরে বসবাসকারীদের জন্য ফেনি নদী থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়ে। ডেইলি স্টার পত্রিকায় সুপরিচিত অর্থনীতিবিদ নজরুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, পানির এই পরিমাণ অল্প। কিন্তু তিনি পয়েন্ট আউট করেন যে, প্রতীকী অর্থে এর পরিমাণ বিশাল। অভিন্ন নদী নিয়ে যখন উদ্বেগ রয়েছে তখন ভারত যা চাইছে তখন তারা তাই পাচ্ছে, যখন ঢাকা শুধু দাবিই জানিয়ে আসছে। পানি ভাগাভাগির বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়ে খুব সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে।

তিনি এতে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির বিষয়ে বোঝাতে চেয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারণে থমকে আছে এই চুক্তি। নজরুল ইসলাম আরো লিখেছেন, তিস্তা নদীর পানি বন্টনের চুক্তির বিষয়ে নিশ্চয়তা বা আশ্বাসের মূল্য যথেষ্ট নয়। কারণ, বছরের পর বছর এমন আশ্বাস পেয়ে আসছে বাংলাদেশ। অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ সময়ের মধ্যে যদি এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছা যায়, তাহলে তখন তিস্তা নদীতে গজলডোবা ব্যারেজের কারণে শীতকালে প্রবাহ থাকবে খুবই সামান্য।

ভারতের কাছে এলপিজি রপ্তানির সিদ্ধান্তও তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশে। এমন আশঙ্কায় এ সমালোচনা যে, মনে করা হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি করা হবে। তবে শেখ হাসিনা এ বিষয়ে পরিষ্কার করেছেন তার সংবাদ সম্মেলনে। তিনি বলেছেন, বিপুল পরিমাণে আমদানি থেকে এলপিজি ভারতে রপ্তানি করা হবে।

আরো একটি আবেগি ইস্যু হলো ফেনি নদীর পানি শেয়ার করা। শেখ হাসিনা একে মানবিক কারণে দেয়ার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো তাকে উদ্ধৃত করে বলেছে, যদি কেউ খাবার উদ্দেশে পানি চান এবং আমরা যদি তা না দেই তাহলে তা ভাল দেখায় না। তিনি আরো বলেছেন, ফেনি নদী থেকে যে পানি দেয়া হবে তা তত বেশি নয়।

শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন। কিন্তু যখন সেন্টিমেন্ট এবং আবেগ চলে আসে তখন সব কারণ এবং যুক্তি ম্লান হয়ে যায়। বাংলাদেশ থেকে এখনও অনেক দূরে সরে যায়নি ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট। হাসিনা এটাকে চেকে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু ভারতের অন্যায় আবদার যত দীর্ঘায়িত হবে, তত বেশি দিল্লির প্রতিবেশীদের মধ্যে হাসিনা শ্রেষ্ঠ বন্ধু হওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতার মুখোমুখি হবেন।

(লেখক: ভারতের স্ট্রাটেজিক নিউজ ইন্টারন্যাশনালের ডেপুটি এডিটর। তার লেখাটি ওই সাইট থেকে নেয়া)

সিরিয়ায় তুরস্কের অভিযানের ফলে কি ইসলামিক স্টেট ফিরে আসতে পারে?

সিরিয়ায় ঢুকে পড়েছে তুর্কী বাহিনী, কুর্দি অবস্থানগুলোর ওপর আকাশ থেকে বোমা ফেলছে তাদের যুদ্ধ বিমানগুলো।
ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর ওপর বোমা পড়ছে, ধোঁয়ার কুন্ডলী উঠে আকাশে। ইতিমধ্যেই খবর আসছে শিশুসহ বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছে এসব আক্রমণে।
পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। কারণ এখানে পেছন থেকে খেলছে অনেক রকম শক্তি। তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে পরস্পরবিরোধী স্বার্থ।
উত্তরপূর্ব সিরিয়ায় কুর্দি অবস্থানগুলোর ওপর তুর্কি বাহিনীর বোমাবর্ষণ
তুরস্কের প্রকাশ্যে ঘোষিত লক্ষ্য: উত্তর-পূর্ব সিরিয়া থেকে কুর্দি যোদ্ধাদের তাড়ানো এবং সেখানে তাদের ভাষায় একটা 'নিরাপদ এলাকা' প্রতিষ্ঠা - যেখানে বাস্তুচ্যুত সিরিয়ানদের বসতি প্রতিষ্ঠা করা যায়।
কিন্তু মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনী যখন সিরিয়ার মাটিতে নেমে জিহাদি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল, তখন তাদের সহযোগী ছিল এই কুর্দি যোদ্ধারাই।
অনেকের আশংকা, তুরস্ক যেভাবে অভিযান চালিয়ে কুর্দি মিলিশিয়াদের তাড়িয়ে দিচ্ছে - তাতে হয়তো সিরিয়ায় জিহাদি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের নতুন করে উত্থান ঘটতে পারে।

সত্যি কি তাই হতে পারে?

বিবিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফ্র্যাংক গার্ডনার লিখছেন, হ্যাঁ, এটা খুবই সম্ভব। অন্তত সীমিত অর্থে হলেও ইসলামিক স্টেট বা আল-কায়েদার মতো সংগঠনের পুনরুত্থান হতেই পারে।
এটা মনে করার কারণ হলো: ইসলামিক স্টেট বা আল-কায়েদার মতো সংগঠনগুলো বিকশিত হয় বিশৃঙ্খলা এবং গোলমালের মধ্যে।
উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় তুরস্কের অভিযান একটি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় ঠিক একরমই একটা পরিস্থিতির ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তবে এরকম ঝুঁকি বাস্তবে পরিণত হবে কিনা তা নির্ভর করে তিনটি ব্যাপারের ওপর। এক. সিরিয়ায় তুরস্কের অভিযান কত ব্যাপক হয়। দুই. অভিযান কতদিন ধরে চলে, এবং তিন. তার তীব্রতা কতটা হয়।
জিহাদি বাহিনী আইএস এবং তাদের স্বঘোষিত খেলাফত কার্যত: সম্পূর্ণ উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল এ বছরই। মার্চ মাসে বাঘুজের যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাদের নিয়ন্ত্রিত সর্বশেষ যে ভূখন্ডটিও হারায়।
কিন্তু তাদের হাজার হাজার যোদ্ধা এখনো জীবিত, এবং তাদের সবাই যে প্রতিপক্ষের হাতে বন্দী - তাও নয়।
ইরাক ও সিরিয়ার অনেকগুলো শহর দখল করে নিয়েছিল ইসলামিক স্টেট
আইএস বলেছিল, তারা দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে যাবে, এবং একের পর এক চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে তাদের শত্রুদের পরাজিত করবে।
এমনি একটি বোমা হামলাই তারা চালিয়েছে তাদের এক সময়ের 'রাজধানী' রাক্কা শহরে, এ সপ্তাহেই।

ইসলামিক স্টেটকে ঠেকিয়ে রেখেছিল আমেরিকানরা এবং কুর্দি যোদ্ধারা

উত্তর পূর্ব সিরিয়া এক সময় ছিল আইএসের শক্ত ঘাঁটি।
কিন্তু তাদের উত্থানকে ঠেকিয়ে রেখেছিল কুর্দিপ্রধান সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস বা এসডিএফ মিলিশিয়া, এবং তাদের সমর্থন দানকারী মার্কিন বিশেষ বাহিনী।
তখন তাদের হাতে ছিল বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র।
শুধু তাই নয়, আইএসের পরাজয়ের পর তাদের প্রায় হাজার হাজার যোদ্ধা এবং তাদের পরিবারকে যেসব শিবিরে আটকে রাখা হয়েছে - সেগুলো পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণও করে এই কুর্দি মিলিশিয়ারা।
এখানে বহু দেশ থেকে আসা আইএস যোদ্ধারা আটক আছে - যাদের ফেরত নিতে ওই সব দেশ একেবারেই অনাগ্রহী।
কিন্তু তুরস্কের বাহিনীর আক্রমণের মুখে কুর্দি যোদ্ধাদের প্রধান কাজ হবে আত্মরক্ষা এবং পাল্টা আক্রমণ। আইএস যোদ্ধাদের কারাগার পাহারা দেয়াটা তাদের একটা গৌণ কাজ হয়ে পড়বে।
ফলে এখানে এখন দু'রকম ঘটনা ঘটতে পারে।

কারা বিদ্রোহ?

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আইএস যোদ্ধারা একটা কারা-বিদ্রোহ ঘটিয়ে ফেলতে পারে, জেল ভেঙে বেরিয়ে যেতে পারে।
এসডিএফের পরিচালিত কারাগারগুলোয় আটক আছে আনুমানিক ১২,০০০ ইসলামিক স্টেট যোদ্ধা। এদের অনেকেই হয়তো নিজ হাতে শিরশ্ছেদ করেছে, লোকজনকে ক্রুশবিদ্ধ করেছে, অনেকের হাত-পা কেটে দিয়েছে। অন্যরা নিজে এসব না করলেও তা নিজের চোখে দেখেছে।
অনেকেই আছে যারা সামরিক আক্রমণ পরিকল্পনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
সিরিয়ার কোন এলাকা এখন কার নিয়ন্ত্রণে
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশংকা, এই আইএস যোদ্ধারা আটকাবস্থা থেকে বেরুতে পারলে তাদের অনেকে হয়তো নানা পথ দিয়ে ইউরোপে বা অন্যত্র তাদের মূল দেশে চলে আসবে - এবং লন্ডন, প্যারিস বা বার্সেলোনার ঘটনার মতো বড় আকারের আক্রমণের পরিকল্পনা শুরু করবে।
এখন এ জন্য পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে দোষারোপ করতে পারে না।
কারণ, ২০১৪-২০১৯ সালে ৭০টি দেশকে নিয়ে গঠিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন এক কঠিন যুদ্ধের পর ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছিল। কিন্তু বন্দী যোদ্ধাদের কিভাবে বিচার করা হবে তার জন্য কোন আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত পন্থা নেই।
অবশ্য তুরস্ক সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেবার পরই কিছু বন্দীকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের জিম্মায় নিয়ে গেছে । এর মধ্যে আছে আল-শফি আল-শেখ এবং আলেক্সান্ডর কোটে - যারা ব্রিটিশ এবং এ কারণে তাদের বিটলস বলে ডাকা হতো আইএসের মধ্যে।
অন্যদিকে, নারীদের শিবিরগুলো ভর্তি হয়ে আছে আইএস সমর্থক এবং 'নৈতিকতা রক্ষক' বাহিনী 'হিসবাহ'-র সাবেক সদস্যদের দিয়ে।
তারা বন্দী শিবিরের মধ্যেই তাদের প্রিয়ভাজন নয় এমন লোকদেরকে নিয়মিত চাবুক মারা এবং তাঁবু পুড়িয়ে দেয়ার মতো কঠোর শাস্তি দিচ্ছে।
আল-হলের শিবির: বহু আইএস যোদ্ধার পরিবার আছে এই শিবিরে
এই শিবিরগুলোর অবস্থান হচ্ছে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে, সিরিয়ার ঠিক ভেতরে। তুরস্ক ঠিক এই জায়গাটিই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়।
এ ছাড়া আইএস যোদ্ধাদের পরিবারের সদস্য আছে প্রায় ৭০ হাজার - যাদের রাখা হয়েছে অন্য অনেকগুলো শিবিরে - যার একটি আছে আল-হলে।

দ্বিতীয় ভয়: আইএসের পুনরুত্থান?

ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে সবচেয়ে তীব্র যুদ্ধ চালিয়েছে প্রধানত এসডিএফের কুর্দি যোদ্ধারা।
এ ছাড়াও উত্তর সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের পাঁচ বছরব্যাপী খেলাফত অবসানের পেছনে আরো অনেকের ভুমিকা আছে, যার মধ্যে আছে পশ্চিমা বিশেষ বাহিনী এবং এমনকি ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়ারা।
কিন্তু এখন উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় তুরস্ক যদি সামরিক অভিযান চালিয়ে কুর্দিদের তাড়িয়ে দেয়, তাহলে বন্দী আইএস যোদ্ধাদের পাহারা দেবে কে?
কারণ কুর্দিরা এখন তুর্কি বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধ এবং তাদের বিমান হামলা থেকে আত্মরক্ষাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তারা আর আইএসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন শক্তি হয়ে উঠতে পারবে না। পশ্চিমারাও তার জায়গা নিতে অনিচ্ছুক।
আইএস-বিরোধী যুদ্ধে এসডিএফের যোদ্ধারা
ফলে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর জন্য এটা এক সুবর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
তাদের পলাতক নেতৃত্ব এতদিন মাঝে মাঝে পুনরুত্থানের ঘোষণা দিত। প্রতিবেশী ইরাকে গত বেশ কিছুকাল ধরেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে আইএস নতুন করে আবার সংগঠিত হচ্ছে এবং ইরাকি সরকারের ওপর ছোটখাটো আক্রমণ চালাচ্ছে।
কোন এলাকায় যখন সরকার বা প্রশাসন ভেঙে পড়ে বা দুর্বল হয়ে যায় - তখনই জিহাদি গোষ্ঠীগুলো সেখানে তাদের তৎপরতা বাড়াতে পারে। সোমালিয়া, ইয়েমেন, পশ্চিম আফ্রিকা, এবং ইরাক ও সিরিয়ার কিছু অংশে তাই হয়েছে।
সিরিয়া-ইরাক ও তুরস্ক সীমান্তের এই জায়গাটিতে অস্থিতিশীল অবস্থা আগামী বেশ কিছুকাল জারি থাকবে বলেই মনে হয়।

আইএসের পুনরুত্থান: কতটা সম্ভব?

একটা কথা বলা দরকার, আইএসের পুনরুত্থানের যে কথা বলা হচ্ছে তা হয়তো না-ও হতে পারে।
তুরস্কে সিরিয়ার ভেতরে অভিযান শুরুর পর থেকেই হোয়াইট হাউজ থেকে নানা রকম বার্তা আসছে।
হয়তো এটা তুরস্ককে সিরিয়ার খুব বেশি ভেতর পর্যন্ত অভিযান চালানো থেকে বিরত রাখতে পারে।
হয়তো তার অভিযান হবে সীমিত আকারের।
হাজার হাজার আইএস যোদ্ধা কুর্দি মিলিশিয়াদের হাতে বন্দী
হয়তো, প্রাথমিক উত্তেজনা কেটে যাবার পর দেখা যাবে, এ অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই কোণাটিতে একটা নতুন বাস্তবতার উন্মেষ ঘটবে।

কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় জাতিগত শুদ্ধি অভিযান?

মার্কিন বাহিনীর সুরক্ষা নিয়ে এই সেদিন পর্যন্ত এই পুরো এলাকাটিই নিয়ন্ত্রণ করতো কুর্দি যোদ্ধারা।
তাদেরকে তুরস্কের বিশাল সামরিক বাহিনীর আক্রমণের মুখে ফেলে রেখে মার্কিন সৈন্যদের প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি চান না যে আমেরিকান সৈন্যরা দেশের বাইরে কোন 'অন্তহীন' 'অপ্রয়োজনীয়' যুদ্ধে জড়িত থাকুক।
২০১৮ সালে তুরস্ক যখন পশ্চিমদিকের কুর্দিপ্রধান এলাকা আফরিনে অভিযান চালিয়েছিল, তখন বাস্তুচ্যুত হয়েছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার লোক। গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া অভিযানেও ঠিক একইভাবে সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তবর্তী শহরগুলো থেকে হাজার হাজার লোক পালাতে শুরু করছে।
কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কী জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালানো হতে পারে?
বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা পল এ্যাডামস বলছেন, সেরকম সম্ভাবনা সত্যি আছে।
কেন? তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলছেন, উত্তর পূর্ব সিরিয়া জনগোষ্ঠীগতভাবে মিশ্র একটি এলাকা।
এখানে কিছু এলাকায় কুর্দিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্য কিছু এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে সুন্নি আরবদের। আর অন্য কিছু এলাকাও আছে যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকেরা হচ্ছে খ্রীষ্টান।
এখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়েপ এরদোয়ান চাইছেন, সীমান্ত থেকে সিরিয়ার ভেতরে ২০ মাইল পর্যন্ত এলাকা থেকে কুর্দিদের তাড়িয়ে সিরিয়ান বাস্তুচ্যুত লোকদের বসতি গড়ে তুলতে।
তিনি যদি সত্যি ২০ লাখ পর্যন্ত সিরিয়ান শরণার্থীকে এখানে বসতি স্থাপন করাতে সক্ষম হন - তাহলে এই এলাকার জনসংখ্যার অনুপাতই বদলে যাবে।
বাগুজে লড়াইয়ের পর ধরা পড়া আইএস যোদ্ধাদের একটি দল
মি. এরদোয়ান বলেন, এই অভিযানের উদ্দেশ্য হচ্ছে এ অঞ্চলের জনসংখ্যার অনুপাত আগে যে রকম ছিল - তা পুন:প্রতিষ্ঠা করতে, যাতে তুরস্কে আশ্রয় নেয়া সিরিয়ানদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়।

এই ওয়াইপিজি তাহলে কারা?

ওয়াইপিজি হচ্ছে সিরিয়ার বিদ্রোহী গ্রুপ এসডিএফ অর্থাৎ সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স নামে একটি মিলিশিয়া জোটের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য।
এসডিএফ জোটে কুর্দি এবং আরব উভয় ধরণের মিলিশিয়া গোষ্ঠীই আছে।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনী যখন সিরিয়ার মাটিতে নেমে জিহাদি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল - তখন তাদের তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিল এই এসডিএফ।
কিন্তু তুরস্কের বিশাল সশস্ত্রবাহিনীর মোকাবিলা করার মতো ভারী মেশিনগান, বিমান-বিধ্বংসী কামান বা ট্যাংক ধ্বংসকারী অস্ত্র তাদের নেই।
মি. এরদোয়ানের হিসেবটা হচ্ছে, সীমান্তে সিরিয়ান কুর্দি ওয়াইপিজি সংগঠনের মিলিশিয়ারা আছে তাদের দূরে ঠেলে দেয়া - কারণ ওয়াইপিজি তার চোখে কুর্দি স্বায়ত্বশাসনের সমর্থক পিকেকের একটা শাখা।
মনে রাখতে হবে, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন - সবাই পিকেকে-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ওয়াইপিজি অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে।
তারা এরদোয়ানকেও একজন 'মিথ্যেবাদী' মনে করে। তাদের মতে মি. এরদোয়ানের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে কুর্দিদের নিশ্চিহ্ন করা।

বন্দী আইএস যোদ্ধাদের নিজ দেশে নেয়া হচ্ছে না কেন?

সোজা উত্তর: আইএস যোদ্ধাদের নিজ নিজ দেশগুলোই তাদের নিতে চায় না।
বিবিসির নিরাপত্তা সংবাদদাতা গর্ডন কোরেরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই ইউরোপিয়ান দেশগুলোকে চাপ দিচ্ছে - যেন তারা ইউরোপ থেকে আসা আইএস যোদ্ধাদের নিয়ে যায়।
রাস আল-আইন থেকে পালাচ্ছেন কুর্দিরা
কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলো অনিচ্ছুক, কারণ এদের দেশে নিয়ে গিয়ে বিচার করার অনেক সমস্যা আছে। আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে এমন সাক্ষ্যপ্রমাণ অনেক ক্ষেত্রেই নেই।
ভয় হলো, তখন হয়তো বাধ্য হয়ে তাদের ছেড়ে দিতে হবে।

মি. ট্রাম্প যে কুর্দিদের পরিত্যাগ করছেন, এরই বা কারণ কী?

বিবিসির পল এ্যাডামস বলছেন, মি. ট্রাম্পের হিসেবটা খুবই সোজা।
তার কথা অনুযায়ী, মার্কিন-কুর্দি জোট গঠিত হয়েছিল আইএসকে পরাজিত করার জন্য। সে কাজ হয়ে গেছে, এবং উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় আমেরিকার আর কোন কাজ নেই।
অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু জেনারেলও এ ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়েপ এরদোয়ান
কুর্দিরা ছড়িয়ে আছে সিরিয়া, তুরস্ক, ইরাক ও ইরান - এই চারটি দেশে। কুর্দি নেতারাও এটা বোঝেন যে এই দেশ চারটির রাজনীতি এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর নিজস্ব হিসেব-নিকেশের কাছে অবধারিতভাবেই কুর্দিদের স্বার্থ উপেক্ষিত হবে।

আইএসের পুনরুত্থান ঘটলে তার দায় কে নেবে?

তাহলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সুযোগ এখন যদি সিরিয়ায় আইএস নতুন করে সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে - তাহলে তার দায় কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই বর্তায় না?
পল এ্যাডামস বলছেন, এ কথা কুর্দিরাও তুলছে, তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাব্লিকান পার্টির অনেক নেতাও।
কিন্তু মি. ট্রাম্প মনে করেন, আইএস 'শেষ হয়ে গেছে।' যদিও খুব কম লোকই তার সাথে একমত।
প্রশ্ন ওঠে, ইসলামিক স্টেটের মতো একটি ধর্মীয় আদর্শভিত্তিক দল বা একটি আদর্শ কি একটা যুদ্ধে হারলেই 'শেষ হয়ে' যেতে পারে?
এর কোনো সহজ উত্তর নেই।
কিন্তু এটা ঠিক যে আইএস যদি সত্যিই আবার ফিরে আসতে পারে - তাহলে ডোনাল্ড ট্রাস্প এর জন্য ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হবেন।
তুরস্কের সেনা অভিযানের প্রতিবাদে কুর্দিদের বিক্ষোভ

ছাত্ররাজনীতির লাগাম টানার পক্ষে বিশিষ্টজনরা by মরিয়ম চম্পা

শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনার জেরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে দেশের বিশিষ্টজনরা বলছেন, এভাবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ বা নিষিদ্ধ করে এসব অনাকাঙ্খিত হত্যাকাণ্ড এবং দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা সম্ভব নয়। বরং আইন প্রয়োগের কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ম শৃঙ্খলা পালনে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এড়ানো গেলে পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে। অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নি:সন্দেহে আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় নির্দেশ করে। তরুণদের মধ্যে মূল্যবোধ জাগ্রত করবে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক মানুষেরা। যতক্ষণ পর্যন্ত না এই মানবিক গুণ তাদের মধ্যে সঞ্চার করা যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কোনো উন্নতির আশা করি না। যেটা খুবই কঠিন কাজ মনে হয়। আমি মনে করি না যে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা দরকার।
কারণ খুন-যখম করা তো ছাত্ররাজনীতি না। টেন্ডারবাজিতো ছাত্ররাজনীতি না। রাজনীতির নামে এগুলো হচ্ছে। রাজনীতি মানেই সুস্থ্য রাজনীতি। গুন্ডামি বা অসুস্থ্যতা চলে না রাজনীতিতে।

ইমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা না। কথা হল রাজনীতির যে অধ:পতন হয়েছে ওটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। কতগুলো লোক দুর্বৃত্তায়ন, সন্ত্রাস করছে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনাটা কর্তব্য। এখন এখানে রাজনীতি বলতে তারা কি বোঝায় সেটাওতো তারা বলছে না। রাজনীতি বলতে মানুষ কি রাজনৈতিক আলোচনা করবে না। রাজনীতির চিন্তা থাকবে না। রাষ্ট্র আছে। এর বাইরে রাজনৈতিক দল আছে, অন্য রাজনৈতিক দল আছে। বুয়েটে যেটা ঘটেছে সেটা হল এক দলীয় নির্যাতন। সরকার সমর্থক একটি মাত্র দল ওখানে আছে। তারা অন্য সকল মতের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, নির্যাতন করে, মানুষ মেরে ফেলে সেটা এখন বন্ধ করা দরকার। এখন মাথায় ব্যাথা হয়েছে বলে মাথাই কেটে ফেলতে হবে এটা তো কোনো কথা হল না। এটা করলেই তো রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে না। গোপনে চলবে। এটাতে মৌলবাদীদের খুব সুবিধা হবে। ওরা তৎপরতা চালাবে। ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। মসজিদে আলোচনা করবে। এতে করে ওদেরই সুবিধা হবে। আর যারা গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল রাজনীতি করে তারা মুখ থুবড়ে পড়বে। গোপন রাজনীতি তো চলবে। মৌলবাদী রাজনীতি গোপনে চলবে। এটা না বুঝে ঢালাওভাবে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা ঠিক না। অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে। তাদের শাস্তি দিলেই তো বোঝা যাবে অপরাধ করা চলবে না।

গণসাক্ষরতা অভিযানের পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, এই ধরনের ঘটনা ঘটার পেছনে একটি কারণ হিসেবে তো চিহ্নিত। কিন্তু এখন আরেকটি দিক আছে যেটা হল মাথা ব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলবে কি না। না কি এটার চিকিৎসা করবে। মূল কারণটি আবিষ্কার করতে হবে। কারণ দূর করার জন্য মনে করা হচ্ছে এটি একটি পন্থা। কিন্তু এটা যে অন্যরূপে আবার দেখা দিবে না তার নিশ্চয়তা কি। এক্ষেত্রে যাতে কোনোভাবেই এটা ক্যাম্পাসকে কুলসিত না করতে পারে। ছাত্রদের মন মানসিকতাকে যাতে নিকৃষ্ট পর্যায়ে নিয়ে যেতে না পারে সেই জায়গাটিতে হাত দেয়া খুব প্রয়োজন। বুয়েট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক হয়তো এটাকে একটি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী একটি ব্যবস্থা নিতে হবে। যেটার ফলাফল আরো ভালো হবে।

অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ছাত্ররাজনীতি আর সরকারি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতিতো এক কথা না। ছাত্র রাজনীতি আর সন্ত্রাস এক কথা না। আবরার হত্যাকাণ্ডের পরে যে ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ করেছে এই প্রতিবাদের কারণেই কিন্তু এখন আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচারের অগ্রগতি হচ্ছে। এবং নির্যাতনের যে ঘটনাগুলো সেগুলো প্রকাশিত হচ্ছে। এই প্রতিবাদের কারণেই নির্যাতন নিয়ে নির্যাতন বিরোধী একটি সামাজিক জনমত তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা আজকে যে আন্দোলনটা করছে এটা হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া মানে হচ্ছে এই ধরণের প্রতিবাদ করা যাবে না। রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া মানে হচ্ছে স্ট্যাটাসকো। স্ট্যাটাসকো মানে হচ্ছে ক্ষমতাবানদের যে আধিপত্য সেটাকে প্রশ্ন করার যে রাজনীতি সে রাজনীতি। সে রাজনীতিটা থাকতে হবে। এটা হচ্ছে একটি বিপদজনক পরিস্থিতি। তিনি বলেন, প্রশাসনে শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি গণতান্ত্রিক সম্পর্ক বিকশিত হবে এটাই হচ্ছে সমাধান। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আরো ক্ষমতায়ন করা। প্রশাসনের সঙ্গে আরো বেশি যুক্ত করা। প্রশাসনকে স্বচ্ছ করা। হলগুলোতে যে ভয়ের রাজনীতি তৈরি হয়েছে সেটা থেকে শিক্ষার্থী, প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করা। এটাই হচ্ছে পথ। সেই পথটিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে আমরা এই অরাজক পরিস্থিতি থেকে মুক্ত পেতে পারি।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, বুয়েটে রাজনীতি ছিলোই না। বুয়েটে এতদিন পর্যন্ত একটি দলের কিছু গুন্ডাপান্ডা ছিল। কিন্তু অন্য কোনো দল ওখানে যেতে পারত না। বুয়েটে রাজনীতি এমনিতেই ছিল না। রাজনীতি নামক যে জিনিসটি সেটা এমনিতেই বন্ধ ছিল। রাজনীতি বন্ধ মানে হচ্ছে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ভিক্তিক ছাত্ররাজনীতিক দল তাদের রাজনীতি বন্ধ। তারা এখানে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। রাজনীতি জিনিসটি এমন এটা কেউ বন্ধ করে রাখতে পারে না। রাজনীতি এখানে বেরিয়ে আসেই। এখানে যদি বলে যে ছাত্ররাজনীতি নামক যে প্রতিষ্ঠানগুলো সেগুলো রাজনীতির চেয়ে গুন্ডামি খুন-খারাবি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এগুলো করছে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা দিতে হবে কতটুকু করতে পারবে আর পারবে না। আমাদের এখানে ছাত্ররাজনীতি বলতে যেটা আছে সেটা কোনো রাজনীতি না। এটা খুন-খারাবি। ক্যাম্পাস পলিটিকস-এ অংশগ্রহণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্নরকম ভাবে আছে। এবং সেজন্য রাজনীতি কেউ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না। রাজনীতি তার নিজস্ব পথে বিকাশিত হয়। কিন্তু এখানে বুয়েট কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা উচিৎ যে তারা কি এটা মিন করছেন।

তিনি বলেন, যখন ছাত্রদের আঠারো বছর বয়স হবে তারা দেশের ভোটার হবে। তাদের পছন্দমত রাজনৈতিক দলে যোগদান করতে পারবে। সেখানে তারা রাজনীতি করবে। কাজেই ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলের হয়ে পার্টি করতে হবে, দলের হয়ে মারামারি করবে এটা কোনো প্রয়োজন নেই। যারা রাজনীতি করার তারা করবেই। সংগঠন করুণ। কিন্তু কোনো সংগঠনের কাজ ক্যাম্পাসে করতে পারবে না। ক্যাম্পাসের খাতিরে এতটুকু সীমাবদ্ধতা মানতে হবে। যেটা হয়েছে সেটা ক্যাম্পাসের শান্তি ভঙ্গকারী কর্মকাণ্ড হয়েছে। এটাকে রাজনীতি বলা হয় না।

বায়ু দূষণ কমানো গেলে কীভাবে উপকৃত হবে বাংলাদেশ? by সায়েদুল ইসলাম

৪ এপ্রিল ২০১৯, বিবিসি বাংলা, ঢাকা: বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার একটি গ্রাম কল্যাণপুরের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, যে গ্রামটিতে বিদ্যুৎ এসেছে কিছুদিন আগে।
এই গ্রামের একজন বাসিন্দা মোঃ হারুন অর রশিদ বলছেন, পাঁচ বছর আগেও যেখানে তাদের গ্রামের বাতাস অনেকটা পরিষ্কার বলে মনে হতো, সেখানে কয়েক বছর আগে আশেপাশে কয়েকটি ইটভাটা তৈরি হওয়ার পর থেকে যেন বাতাস অনেকটা বদলে গেছে।
তিনি বলছেন, আশেপাশে ইটের ভাটা হওয়ার পর ভাটাওয়ালারা মাটি কিনে নিয়ে যাচ্ছে, আবার তারা যে ইট পোড়ায় তাতে কালো ধোঁয়া বের হয়।
"এসব ভাটায় সারাক্ষণ ইঞ্জিনের গাড়ি যাতায়াত করে, সেগুলো থেকেও সারাক্ষণ ধোঁয়া বের হয়, শব্দ হয়। আমাদের গ্রামের বাতাসটা যেন মনে হয় আগের চেয়ে ভারী হয়ে যাচ্ছে।"
তিনি জানান, গ্রামের মানুষের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার কষ্ট বা কাশি বাড়ার মতো সমস্যাও দেখা যাচ্ছে।
শুধু গ্রামেই নয়, বায়ু দূষণের এই সমস্যা এখন সমগ্র বাংলাদেশের।
বায়ু দূষণ নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংস্থা 'স্টেট অফ গ্লোবাল এয়ার' তাদের প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে।
সেখানে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বাসিন্দাদের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ কোন না কোন ভাবে বায়ু দূষণের মধ্যে বাস করছে।
এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ কোন দূষিত এলাকায় বাস করে।
বায়ু দূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর মারা যাচ্ছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ আর ভারত ও চীনে মারা গেছে ১২ লাখ মানুষ।
সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে বলছে, ২০১৭ সালের হিসাবে প্রতি ১০জনের মধ্যে একজন বায়ুদূষণের কারণে মারা যাচ্ছে।
বায়ু দূষণের স্বীকার হয়ে যে দশটি দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে, সেসব দেশের মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।
সংস্থাটি বলছে, সড়ক দুর্ঘটনা বা ধূমপানের কারণে মৃত্যুর হারের তুলনায় ২০১৭ সালে বায়ুদূষণের ফলে বেশি মানুষ মারা গেছে।
এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।
বায়ু দূষণের স্বীকার হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় প্রতিটি শিশুর ৩০মাস করে আয়ু কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি, যদিও উন্নত দেশগুলোয় এই হার গড়ে পাঁচ মাসের কম।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শিকার
দূষিত বাতাসের কারণে যেসব রোগ হতে পারে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বায়ুতে ক্ষতিকর বস্তুকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেয়া সীমার দশগুণের বেশি।
ঢাকার একজন বাসিন্দা নেওয়াজ চৌধুরী বলছেন, সবসময়ে ধোঁয়া, ধুলার ভেতর দিতে যাতায়াত করার কারণে তার মাঝে মাঝে শ্বাসকষ্ট হয়।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসের মধ্যে থাকলে যেসব রোগ হতে পারে, তার মধ্যে আছে -
  • হৃদরোগ
  • কাশি, নিউমোনিয়াসহ ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগ
  • ফুসফুসের সংক্রমণ
  • ফুসফুসের ক্যান্সার
  • ডায়াবেটিস
  • অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্ট জনিত নানা রোগ
  • স্ট্রোক
  • চোখে ছানি পড়া
  • শিশু ও গর্ভবতী নারীদের সমস্যা
বায়ু দূষণের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক দেখতে পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি প্রজন্ম যদি দীর্ঘসময় বায়ুদূষণের মধ্যে কাটিয়ে দেয়, তার মারাত্মক প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর।
বায়ু দূষণ কমানো গেলে ৫ ভাবে উপকৃত হবে বাংলাদেশ
বায়ু দূষণ রোধ করা গেলে মোটামুটি পাঁচটি উপায়ে উপকৃত হবে বাংলাদেশ।
১. গড় আয়ু বাড়বে।
স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার বলছে, বায়ু দূষণ রোধ করতে পারলে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়বে এক বছর তিন মাসের বেশি।
২. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা।
এদিকে অধ্যাপক আবদুস সালাম বলছেন, বায়ু দূষণ রোধ করা গেলে সবচেয়ে বড় যে উপকারটি হবে সেটি হবে 'জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহায়তা'। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রকোপ রোধে বায়ু দূষণ রোধ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৩. রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা।
বায়ু দূষণের জন্য মানুষের শরীরে যেসব রোগের সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে, সেগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে যদি দূষণ রোধ করা যায়।
ড. সালাম বলেন, "মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা কমিয়ে দেবে। ফুসফুসের সমস্যা, হৃদরোগ, চর্মরোগসহ অনেক রোগ কমে যাবে।"
৪. প্রতিবন্ধী সমস্যা।
প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেয়ার সংখ্যা কমে যাবে, তেমনি শিশু ও মানুষের গড় আয়ু বাড়বে।
মি. সালাম বলছেন, একটি প্রজন্ম যদি দীর্ঘসময় ধরে বায়ু দূষণের ভেতর দিয়ে যায়, তাহলে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম অনেক ক্ষতির মুখোমুখি হবে। সেটা কাটিয়ে ওঠা যাবে দূষণ রোধ করতে পারলে।
৫. অর্থনৈতিক সুবিধা।
বায়ু দূষণ কমানো গেলে একদিকে যেমন মানুষের অসুস্থতা কমবে, গড় আয়ু বাড়বে, সময় সাশ্রয় হবে, পাশাপাশি বেড়ে যাবে জিডিপিও।
ড. সালাম বলছেন, ' নিজেদের আর্থিক সাশ্রয় যেমন হবে, তেমনি জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে।''
যেসব কারণে বাংলাদেশে বায়ু দূষণ এতো বেশি?
বায়ু দূষণ নিয়ে গবেষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম।
তিনি বলছেন, গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের দেশ হওয়ায় শীতের সময়ে হিমালয়ের পরের সব দূষণ এদিকে চলে আসে।
"কিন্তু তার সঙ্গে যোগ হয় আমাদের নিজেদের অনেক দূষণ।"
বাংলাদেশের শহরগুলোর যানজটের কারণে বায়ুদূষণ বাড়ছে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
দূষণ রোধে কর্তৃপক্ষের জোরালো পদক্ষেপের অভাবে বায়ু দূষণের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা, ঢাকার মতো বড় শহরের চারপাশে ইটভাটা, শহরের মধ্যে নানা কারখানা স্থাপন তো বায়ু দূষণের একটি কারণ।
''সেই সঙ্গে শহরের প্রচুর ধুলা এবং নির্মাণ কাজের বায়ু দূষণ হচ্ছে। ট্রাফিক জ্যামের কারণে গাড়িগুলো রাস্তায় অতিরিক্ত সময় ধরে চলছে, সেগুলো অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করছে, এসবও বায়ু দূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।''
তিনি বলছেন, বায়ু দূষণের কারণে পরিবেশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে, সেই গরম ঠাণ্ডা করার জন্য মানুষ অতিরিক্ত এসি ব্যবহার করছে, আবার তাতে বায়ু দূষণ আরো বাড়ছে।
বায়ুদূষণ কীভাবে কমানো যেতে পারে?
ড. আবদুস সালাম বলছেন, বায়ু দূষণ কমাতে প্রত্যক্ষ আর অপ্রত্যক্ষ ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাগুলো হলো রাস্তায় পানি দিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বা ময়লাগুলো পুড়িয়ে ফেলার মতো নানা ব্যবস্থা।
বায়ু দূষণের দিক থেকে শীর্ষ পাঁচটি দেশের একটি বাংলাদেশ।
  • পরিকল্পিতভাবে কারখানাগুলোর ধোঁয়া কমিয়ে আনা।
  • কারখানাগুলো শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়া।
  • ট্রাফিক জ্যামের সমাধান।
  • উন্নত জ্বালানি ব্যবহার করা।
  • এয়ার কন্ডিশনার কম ব্যবহার করা।
অপ্রত্যক্ষ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে:
  • প্রচুর বনায়ন করা, কারণ গাছ বায়ুদূষণ প্রতিরোধে জোরালো ভূমিকা রাখে।
  • বাড়িঘর ও আবাসিক এলাকাগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা, যেখানে উদ্যান ও পুকুর থাকবে।
  • নির্মাণ কাজগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে করা, যাতে সেটি দূষণের কারণ না হয়।
বিশ্বজুড়ে বায়ু দূষণের চিত্র
*বায়ু দূষণের কারণে প্রতি বছর ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।
*পৃথিবীর ৯১ শতাংশ মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করে যেখানে বায়ু দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি।
*পৃথিবীর যে ২০টি শহর সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষণের মধ্যে আছে তার মধ্যে ভারতের ১৪টি শহর রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কানপুর শহর এ তালিকায় সবচেয়ে উপরে।
*বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০জনের মধ্যে নয়জন দূষিত বায়ু গ্রহণ করে।
গবেষকরা বলছেন, যেসব বয়স্ক মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম তারা সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষণের ঝুঁকিতে আছেন। কারণ তারা প্রায়ই ঘরের বাইরে নানা ধরণের কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন।
বায়ু দূষণের কারণেও অসুস্থ হয়ে পড়ছে মানুষ।

শান্তিতে নোবেল জয়ী কে এই আবি আহমেদ

এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। ইরিত্রিয়ার সঙ্গে এক যুগান্তকারী শান্তিচুক্তি করে এই সম্মানে ভূষিত হলেন তিনি। গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে চুক্তিটি হওয়ার আগ পর্যন্ত সংঘাতে জড়িয়ে ছিল দুই দেশ।
শান্তিতে নোবেল প্রদানকারী কমিটি বলেছে, শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অর্জনে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতের মীমাংসায় তার নিষ্পত্তিমূলক উদ্যোগের জন্য এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে তাকে। এছাড়া, ইথিওপিয়া এবং পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আফ্রিকান অঞ্চলগুলোতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বিবাদ মেটানোর কাজ করা প্রত্যেক অংশীদারকে স্বীকৃতি দেয়াও এই পুরস্কারের উদ্দেশ্য।
প্রসঙ্গত, এ বছরের পুরস্কার জিতে শান্তিতে শততম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল জিতেছেন আবি। এ বছর এই পুরস্কারটি জন্য মনোনয়ন জমা পড়েছিল ৩০১টি। এর মধ্যে ২২৩ জন্য ব্যক্তি ও ৭৮টি প্রতিষ্ঠান ছিল। অনেকের ফেভারিট ছিলেন, জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থানবার্গ ও নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন। নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তক আলফ্রেড নোবেলের উইল মেনে, ১৯০১ সাল থেকেই শান্তিতে পুরস্কার ঘোষণা করে আসছে নোবেল কমিটি।
তবে গত শতকে দুই বিশ্বযুদ্ধের সময়গুলো সহ মোট ১৯ বার পুরস্কার প্রদান বন্ধ থাকে। এখন পর্যন্ত ব্যক্তি ছাড়াও নোবেল জিতেছে ২৪টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল রেড ক্রস সর্বোচ্চ তিনবারের পুরস্কারজয়ী।
আবি আহমেদ ২০১৮ সালের এপ্রিলে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ক্ষমতায় আসার পরপরই ইথিওপিয়ায় ব্যাপক আকারে উদারমনা সংস্কার শুরু করেন। নিকট অতীতে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি দেশে তার এসব পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তিনি কয়েক হাজার বিরোধী কর্মীদের কারাবাস ও নির্বাসিত ভিন্নমতপোষণকারীদের বাড়ি ফেরার সুযোগ করে দেন। তার সংস্কারমুখী পদক্ষেপগুলো দেশটিতে ব্যাপক হারে জাতিগত উত্তেজনা কমিয়েছে। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে করা একটি শান্তিচুক্তি। সমপ্রতি আরো একটি বিশাল পদক্ষেপ নিয়েছেন আবি। তার সরকার দেশজুড়ে ৪০০ কোটি গাছ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে অন্তত ৪০টি গাছের বীজ বপনের জন্য উৎসাহিত করে যাচ্ছে সরকার।
আবি একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা। সাইবার গোয়েন্দাগিরিতে দক্ষ ছিলেন তিনি। ইরিত্রিয়ার সঙ্গে তার করা শান্তিচুক্তিতে দুই দেশের কয়েক লাখ মানুষকে উচ্ছ্বসিত করেছে। দুই দেশের মধ্যকার এই সংঘাতে বহু প্রাণ ও সমপদ হারিয়েছে উভয় পক্ষই। অঞ্চলটিতে উন্নয়নের রাস্তা খুলে দিয়েছে এই চুক্তি। আরো সমপ্রতি প্রতিবেশী সুদানে একটি রাজনৈতিক চুক্তির মধ্যস্থতা করেছেন আবি। তার ওই চুক্তি দেশটিতে সাবেক স্বৈরশাসক ওমর আল-বশিরের পতনের পর সৃষ্ট অস্থিরতা থামাতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।
দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, আবি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বদলে নিজের ব্যক্তিগত সাহসী উদ্যোগ ও প্রতিভা ব্যবহার করে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। তিনি ইথিওপিয়ার সর্ববৃহৎ ‘অরোমো’ সমপ্রদায় থেকে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট। তিনি বহু বছর ধরে দেশটির অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রান্তিকরণের সমালোচনা করেছেন। নিজের মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের নিয়োগ দিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন। কারাবন্দি থাকা সাংবাদিকদের মুক্তি দিয়েছেন। আগের প্রশাসনগুলোতে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেছেন।
এদিকে, সম্মানজনক এই পুরস্কার জেতার পর আবিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বহু বিশ্ব নেতা। এর মধ্যে রয়েছেন, জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টনিও গুঁতেরা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবদুল্লাহি মোহাম্মদসহ অনেকে। জাতিসংঘ মহাসচিব এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমি বলেছিলাম, আফ্রিকায় আশার বাতাস ইতিহাসে সবচেয়ে জোরে বইছে এখন। প্রধানমন্ত্রী আবি তার একটি প্রধান কারণ। তার দূরদর্শিতায় ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া একটি ঐতিহাসিক পুনর্মিলন অর্জন করতে পেরেছে। আমি গত বছর ওই অর্জনের শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়ে সম্মানিত বোধ করি।

দাবি পূরণের পরও বুয়েটে কেন আন্দোলন : -প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্ন

বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীদের সব দাবি কর্তৃপক্ষ মেনে নিলেও  আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সাধারণ ছাত্রদের ১০ দফা দাবিইতো মেনে নিয়েছেন ভিসি। তারপরও তারা কেন আন্দোলন করবে, আন্দোলনের কি যৌক্তিকতা থাকতে পারে। প্রধানমন্ত্রী গতকাল রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহিলা শ্রমিক লীগের কাউন্সিল-২০১৯’র উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন। শিক্ষাঙ্গনে অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখার জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে অন্যায়কারী যে কারো বিরুদ্ধেই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের কথা স্পষ্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ রাখতে হবে। কোন অন্যায় অবিচার আমরা সহ্য করি নাই, ভবিষ্যতেও করবো না। অপরাধী যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খুনিকে খুনি হিসেবেই দেখে সরকার।
বলেন, তিনি এক মিনিটও দেরি করেননি।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ এই ধরনের অন্যায় কখনোই মেনে নেয়া যায় না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কিন্তু পিছিয়ে থাকিনি, কোন দল করে সেটা দেখিনি। খুনিকে খুনি হিসেবে, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে, অন্যায়কারীকে অন্যায়কারী হিসেবেই দেখেছি। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খবরটা পাওয়ার সাথে সাথে আমি কারো আন্দোলন বা নির্দেশের অপেক্ষা করিনি। আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি- ওদেরকে গ্রেপ্তার করো। এই তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে সাধারণ তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পুলিশের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহের সময় তারা কেন বাধা দিয়েছিল আমি জানি না। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। মহিলা শ্রমিক লীগের সভাপতি রওশান জাহান সাথী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবং দলের সাধারণ সম্পাদক বেগম শামসুন্নাহার ভূইয়া এমপি সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন। দলের কার্যকরী সভাপতি এবং সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক সুরাইয়া আক্তার স্বাগত বক্তৃতা করেন এবং দলের সহ-সভাপতি সুলতানা আনোয়ার শোক প্রস্তাব পাঠ করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে মহিলা শ্রমিক লীগের কাউন্সিলের উদ্বোধন করেন এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়া, খালেদা জিয়া এবং এরশাদ আমলে একের পর এক ছাত্র হত্যার ঘটনা ঘটলেও একটিরও বিচার হয়নি, কেবল আওয়ামী লীগই বিচার করেছে। বুয়েটে ছাত্রদলের টগর ও মুকী গ্রুপের সংঘর্ষে সাবেকুন্নাহর সনি নিহত হলো তখন কে প্রতিবাদ করেছে। বুয়েটের অ্যালামনাই এসোসিয়েশন তারাও নামে নাই, তাদেরও তো কথা বলতে বা কোন প্রতিবাদ করতে দেখিনি। তিনি বলেন, হ্যাঁ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সবার কথা বলার অধিকার আছে, বলতে পারে। অন্তত সেই সুযোগটা আছে। কিন্তু যখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় ছিল-জাতির পিতা খুনীদের পুরস্কৃত করেছে, যুদ্ধাপরাধী এবং সাত খুনের আসামিকে ছেড়ে দিয়েছে- তার কে প্রতিবাদ করেছে। তখন মানবাধিকারের চিন্তা কোথায় ছিল।
তখন ন্যায়-নীতিবোধ কোথায় ছিল? তাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা। শেখ হাসিনা বলেন, সমাজকে পাল্টে ফেলে নারী-পুরুষের সমান অধিকার আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি। আর সুযোগ পেলে আমাদের নারীরা যে তাদের দক্ষতার প্রমাণ রাখতে পারে সেটা আজকে প্রমাণিত সত্য। সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনসহ পেশাগত বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের সাফল্যের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আমাদের অবস্থানটা যে জায়গায় জাতির পিতা নিতে চেয়েছিলেন সেটা আমরা করতে পেরেছি। যারা বিগত নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ২০০৮ সালেও বিএনপি ৩২টি আসন পেয়েছিল। আর ’৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী ভোটারবিহীন নির্বাচন করেছিল বলে খালেদা জিয়া দেড় মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। কাজেই বিগত নির্বাচনে তারা যে ভোট কারচুপির অভিযোগ করেন সেটা সত্য হলে তারাওতো আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিত। যেটা তারা পারেননি।
সম্মেলনে সুরাইয়া আক্তারকে সভাপতি ও কাজী রহিমা আক্তার সাথীকে সাধারণ সম্পাদক করে মহিলা শ্রমিক লীগের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

বিএনপির সমাবেশ: আবরারের রক্তে সরকার পতনের বীজ রোপিত হলো

নব্বই সালে শহীদ জেহাদের রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হয়েছে। ২০১৯ সালে আবরার ফাহাদের রক্তেই এই সরকারের পতনের বীজ বপন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। শনিবার দলীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশে  তিনি একথা বলেন। ভারতের সঙ্গে করা সাম্প্রতিক চুক্তি বাতিল ও বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের খুনিদের বিচার দাবিতে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ সমাবেশের আয়োজন করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মহানগর বিএনপি। সকাল থেকে সমাবেশে যোগ দিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেন দলের নেতাকর্মীরা। এর আগে সকাল ৯টা থেকে নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় পুলিশ। বেলা দেড়টার দিকে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের দু’দফা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। সকাল থেকে নেতাকর্মীরা নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে আসার সময় অনেকেই পুলিশের বাধার মুখে পড়েন।
সড়কের দুই পাশেই পুলিশ চেকপোস্ট বসায়। সমাবেশে আসার সময় বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবকদলের প্রায় ৫০জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দেশবিরোধী চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আবরার একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিল। এর জন্য তাকে প্রাণ দিতে হলো। এটা দেশের মানুষের প্রতিবাদ। আবরারের কথাটাই দেশের মানুষের কথা।

আবরারকে হত্যা করে দেশের জনগণের কণ্ঠকে হত্যা করা হয়েছে। ছাত্র সমাজ এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তার রক্ত জনগণ বৃথা যেতে দেবে না। শহীদ জেহাদের রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচার পতনের বীজ বপন হয়েছিল। তেমনি আবরারের রক্তের বিনিময়ে এই স্বৈরাচার সরকারের পতনের বীজ বপন হল। তিনি বলেন, ফেনী নদীর পানি উত্তোলনে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিয়েছেন, সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে সম্মতি দিয়েছেন, উপকূলে যৌথ নজরদারির নামে ভারতকে ২০টি রাডার প্রতিষ্ঠা করার অনুমতি দিয়েছেন। আমরা যে এলপিজি আমদানি করি তা ভারতে রপ্তানি করার অনুমতি দিয়েছেন। এসব চুক্তির প্রতিটি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। ফেনী নদীর পানি উত্তোলনের অনুমতি দিলেন কিন্তু তা কতখানি তারা উত্তোলন করবে তা পরিমাপ করার বিষয়ে চুক্তিতে কিছু নেই। এছাড়া ৩৬টি নদীর পানি ভারত জোর করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি।

মোশাররফ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সামান্য পানি নিবে ভারত। কিন্তু এর ফলে ফেনী নদীর পাশের লোকজনের কৃষিকাজ ব্যাহত হবে। মুহুরি প্রজেক্ট ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আপনি বলছেন, জাতীয় স্বার্থ ব্যাহত করেননি। সাবরুম শহরে তাহলে এতদিন তারা পানি পান করেছিল না? ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে এদেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে ভারতকে সুবিধা দেয়ার জন্যই এটা করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এমনিতেই সমুদ্র বন্দরে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ভারতের পণ্য বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরে খালাস হলে আমাদের ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যৌথ পর্যবেক্ষণের নামে বিদেশি রাডার স্থাপন হলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিঘ্নিত হবে, হুমকির মুখে পড়বে। আর এলপিজি আমদানি করে তা রপ্তানি করবেন। চারটি চুক্তি ভারতের স্বার্থে করা হয়েছে। এটা দেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি। বিএনপির এ নেতা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করেছিলেন, গ্যাস না দেয়ার জন্য ২০০১ সালে তিনি ক্ষমতায় আসতে পারেননি। তাহলে এবার কি তার খেসারত দিলেন? আসলে শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে তিনি চুক্তি করে এসেছেন। তাই আসুন এই স্বৈরাচার সরকারের পতনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হই। আর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে, জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করি। তাহলে দেশে গণতন্ত্র মুক্তি পাবে আর দেশের মানুষ মুক্ত হবে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, এই সরকার দুর্নীতিতে ডুবে গেছে। সবদিক দিয়ে খাদের কিনারায় চলে গেছে। এর থেকে তাদের বাঁচার কোন উপায় নেই। আবরারের হত্যাকাণ্ড এই দেশের মানুষকে অবাক করেছে। তাকে হত্যা করে কি লাভ হল? এই সরকারের প্রতিবাদে দেশে শত শত আবরার জন্মাবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গেলে সে দেশের একজন উপ মন্ত্রী উনাকে রিসিভ করেন। এটা আমরা এদেশের মানুষ হিসেবে খুব লজ্জাবোধ করি। আর উনি সেখানে গিয়ে ভারতকে সবকিছু একতরফা দান করে এসেছেন। উনার এই নতজানু পররাষ্ট্রনীতি যতদিন থাকবে ততদিন তিনি এই দেশের জনগণের জন্য কিছুই আনতে পারবেন না। তাই অবিলম্বে এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগের আহবান জানাচ্ছি।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলের সভাপতিত্বে জনসমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন, বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়া, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, বিএনপির সহ-প্রচার সম্পাদক শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, যুবদলের সভাপতি সাইফুল ইসলাম নিরব, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রমূখ। এসময় উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর আহমেদ রবিন, যুবদলের সিনিয়ার সহ-সভাপতি মুরতাজুল করিম বাদরু, মহানগর যুবদল নেতা ওমর ফারুক মুন্না, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল প্রমূখ।

আবরার হত্যায় অনিকের স্বীকারোক্তি মোয়াজ গ্রেপ্তার

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার আসামি অনিক সরকার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এর আগে দুইজন এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তি দেন। এ তিনজনের মুখেই আবরারকে পিটিয়ে হত্যার বর্ণনা এসেছে। গতকাল মহানগর হাকিম আতিকুল ইসলাম তার খাস কামরায় অনিকের জবানবন্দি নিয়েছেন। অনিক স্বীকার করেন, তিনি ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে আবরারকে পিটিয়েছেন। আবরারকে হত্যার পরের দিন বিকালে ছাত্রলীগের ১০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এই দশ জনের একজন অনিক সরকার। তিনি পাঁচ দিনের রিমান্ডে ছিলেন।
অনিক সরকার বুয়েট ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক। সে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পঞ্চদশ ব্যাচের শিক্ষার্থী। বৃস্পতিবার আসামি ইফতি মোশাররফ সকাল ও শুক্রবার মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন আদালতে জবানবন্দি দেন। এ তিনজনের জবানিতে উঠে এসেছে আবরারকে পিটিয়ে হত্যার ভয়ঙ্কর বর্ণনা। সূত্র জানায়, ঘটনার প্রায় অভিন্ন বিবরণ দিয়েছেন তিন জনই। তারা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে আনার পর দফায় দফায় আবরারকে পিটানো হয়। পিটুনিতে আবরার নেতিয়ে পড়লে কিছু সময় বিছানায় ফেলে রাখা হয়। পরে আবার একই কায়দায় পিটানো হয়। পিটুনিতে এক পর্যায়ে মুমূর্ষু হয়ে পড়েন আবরার। তিনি নিজেই হত্যাকারীদের উদ্দেশে বলেন, তার খুব খারাপ লাগছে। তিনি হয়তো মারা যাবেন।
এ সময় সেখানে থাকা একজন্য বলে ‘ও নাটক করছে’ আরও কয়েক ঘণ্টা পিটানো যাবে। আবরারকে বাইরে ফেলে দেয়ার আগে তিনি কয়েকবার বমি করেন। বাইরে ফেলে দেয়ার সময় তার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল। জবানবন্দিতে আবরারকে হত্যার আগে ফেসবুক মেসেঞ্জারে নিজেরা যোগাযোগ করেন বলেও তারা স্বীকার করেন। তাদের এ যোগাযোগের তথ্য আগেই গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। এদিকে আবরার হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মোয়াজ আবু হোরায়রাকে গ্রেপ্তার করেছে মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার (ডিবি) একটি টিম। গতকাল সকাল ১১টার দিকে ঢাকার উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের (ইইই) ১৭ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।
তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের ওসমানপুরে। মোয়াজকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ডিবি এখন পর্যন্ত এই মামলায় ১৯জনকে গ্রেপ্তার করলো। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি ১৫ জন আর এজাহার বহির্ভূত আসামি ৪ জন। এছাড়া আবরার হত্যা মামলার আরেক আসামি মাজেদুর রহমান নওরোজকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। গত ৬ই অক্টোবর রাত তিনটার দিকে বুয়েটের শেরে বাংলা হল থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিন রাতে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের নেতারা। এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে পরের দিন আবরারের বাবা বরকত উল্ল্যাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি মামলা করেন। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে বুয়েটসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বুয়েটে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ।

খুন হওয়ার অপেক্ষায় প্রহর কাটাচ্ছেন আফগান নারী মেয়র

জারিফা ঘাফারির পূর্ণ বিশ্বাস, যেকোনোদিন খুন হতে চলেছেন তিনি। তবে সে ভয় তাকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখেনি। চুপচাপ ঘরে মুখ লুকিয়ে বসে থাকেননি তিনি। ২৬ বছর বয়সে আফগান শহর ময়দান শার এর প্রথম নারী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। পুরো আফগানিস্তানের প্রথম নারী মেয়রদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে। চলতি বছরের মার্চ মাসে মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই খুন হওয়ার ভয় চেপে রয়েছে মাথার ওপর।
ময়দান শার’র মোট জনসংখ্যা ৩৫ হাজারের মতো। ওয়ারদাক প্রদেশের রাজধানী শহরটির বেশিরভাগ জনসংখ্যাই পাশতুন সম্প্রদায়ের।
ক্ষমতায় আসার পর নিজের নাম ও লাল হিজাব পরা ছবিসহ একটি বিশাল ব্যানার তৈরি করেছেন তিনি। ব্যানারে লেখা, চলুন আমাদের শহর পরিষ্কার রাখি। শহরের যত্রতত্র আবর্জনা ফেলার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার প্রচারণার অংশ হিসেবেই এই ব্যানার তৈরি করা।
ঘাফারি বেশ ভালোভাবেই জানেন যে, আফগানিস্তানে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একেবারে সম্মুখভাগে রয়েছেন তিনি। তাও আবার এমন এক সময়ে সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাকে, যখন পুরো দেশের বেশিরভাগ অংশের দখল চলে গেছে জঙ্গি দল তালেবানের হাতে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দলটির সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি ভেস্তে যায়। কট্টর রক্ষণশীল তালেবানরা পুরো দেশের দখল নিয়ে নিলে সেখানে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নিমিষেই শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুকি রয়েছে। এসব জানা সত্ত্বেও ঘাফারি নিজের অবস্থান পরিষ্কার রেখেছেন। সম্প্রতি টুইটারে লিখেছেন, আমার কাজ হচ্ছে জনগণকে নারীদের অধিকার ও নারী ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করানো ।
আফগানিস্তানের পুরুষশাসিত সমাজে প্রশাসনিক কাজগুলো সাধারণত পুরুষরাই সামলিয়ে থাকে। সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ বেশ কঠোরভাবে দমিয়ে রাখা হয়। তা সত্ত্বেও কয়েকজন সাহসী নারী সে প্রথা ভেঙে সামনে এগিয়ে আসার চেষ্টা চালিয়ে যায়। ঘাফারি তাদেরই একজন। পুরো দেশে তার মতো প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা নারী আরো আছে। তবে অন্যকোনো নারীকে তার মতো কঠিন, অকল্পনীয় পদে দেখা যাওয়াটা এক প্রকার অসম্ভবই বলা যায়। ময়দান শার ছাড়া দাইকুন্দি ও বামিয়ান প্রদেশেও নারী গভর্নর থাকার ইতিহাস রয়েছে। দাইকুন্দির নীল শহরে দুই বছরের জন্য একজন নারী গভর্নর দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। দাইকুন্দি ও বামিয়ানের তুলনায় ওয়ারদাক অপেক্ষাকৃত বেশি রক্ষণশীল অঞ্চল। সেখানে তালেবানের প্রতি সমর্থন ব্যাপক বিস্তৃত। তাদের প্রভাব এতটাই বেশি যে, অঞ্চলটির হাইওয়েগুলোও সাধারণ নাগরিকদের জন্য নিরাপদ নয়।
ময়দানে ‘গার্লস স্কুল’ এর সংখ্যা মাত্র একটি। গত বছর ওই স্কুল থেকে পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কেবল ১৩ জন। ঘাফারি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে পুরো শহরে গার্লস স্কুলের শিক্ষিকারা ছাড়া সরকারি চাকরিরত একমাত্র নারী ছিলেন নারী মন্ত্রণালয়ের প্রধান। কিন্তু তিনিও শহরটিতে বাস করার সাহস করেননি। নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি থাকেন রাজধানী কাবুলে।
প্রাথমিকভাবে গত বছরের জুলাইয়ে ঘাফারিকে মেয়র হিসেবে নিয়োগ করেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি। মেয়র হিসেবে তার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা ছিল বেশ তিক্ত। নানা ঝামেলায় প্রথম দিন পার করার পর তার নিয়োগ বেশ কয়েক মাস পিছিয়ে দেয়া হয়। তিনি বলেন, গত বছর মেয়র হিসেবে প্রথম দিন কাজে যোগদানের কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্ষোভান্বিত দুর্বৃত্তরা তার কার্যালয়ে হামলা চালায়। লাঠি ও পাথর দিয়ে ভাংচুর চালানো হয় পুরো কার্যালয়জুড়ে। সেখান থেকে তাকে বের করে আনতে জাতীয় নিরাপত্তা পরিচালকের কার্যালয় থেকে গোয়েন্দা মোতায়েন করতে হয়েছিল। সেদিন সম্পর্কে ঘাফারির মন্তব্য, সেটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বাজে দিন।
তিনি যখন কার্যালয় থেকে গোয়েন্দাদের সহায়তায় বেরিয়ে আসার সময় একজন হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, এখানে আর ফিরে এসো না। ঘাফারি জানান, ওইসব দুর্বৃত্তদের মধ্যে ওয়ারদাকের গভর্নর মোহাম্মদ আরিফ শাহ জাহানের সমর্থক ও সহযোগীরাও ছিল। আরিফ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে নারী নিয়োগের বিরোধী ছিলেন। এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। তবে আরিফ সাড়া দেননি।
ঘাফারি সেদিন কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর শহর ছেড়ে যান। সোজা রাজধানী কাবুলস্থ প্রেসিডেন্ট ভবনে পৌছে যান। প্রেসিডেন্ট ভবনের কর্মকর্তাদের সাফ জানিয়ে দেন, তিনি অত সহজে হাল ছাড়বেন না। তিনি বলেন, আমি এত চিৎকার করেছিলাম যে, আমার গলা দিয়ে আর  আওয়াজ বের হচ্ছিল না। আমি তাদের বলেছিলাম, প্রয়োজনে ভবনের সামনে নিজের গায়ে আগুন জ্বালিয়ে হলেও আমি আমার কার্যালয়ের অধিকার নিশ্চিত করে ছাড়বো। এটা কোনো ফাঁকা বুলি ছিল না।
ওই ঘটনার নয় মাস পর ওয়ারদাকের গভর্নর জাহান পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পরপরই ফের মেয়রের দায়িত্ব পালনে ফিরে গেলেন ঘাফারি। দায়িত্বে যোগদানের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক হ্যাশট্যাগ বার্তায় লিখেন, আমি আমার অধিকারের জন্য লোড়ে যাবো। এর মানে এমন ছিল না যে, তার দুর্দিন শেষ হয়ে গেছে। বরং তা আরো বেশি পরিমাণে বেড়ে যায়। প্রতিদিনের নৈমিত্তিক কাজ করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তাকে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি টিম ঘাফারিকে সশরীরে দেখতে গিয়েছিলেন। তার কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছিল তাদের। ঘাফারির সঙ্গে সাক্ষাতের একটি বর্ণনা নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে তুলে ধরেন তারা। লিখেন, একটি রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যাপারে পৌরসভা কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক ডেকেছিলেন ঘাফারি। কর্মকর্তাদের সকলেই পুরুষ ছিলেন। বৈঠকে কয়েকজন আসেন দেরি করে। কেউ কেউ পুরো বৈঠকে তাদের মুঠোফোন নিয়েও মত্ত ছিলেন। মুঠোফোনের মনিটর থেকে চোখই তুলছিলেন না। আরো কয়েকজন নিজেদের মধ্যে খুশমনে আলাপ করছিলেন। ঘাফারির দিকে মনোযোগ দিচ্ছিলেন খুব কম সংখ্যক অংশগ্রহণকারী। এক পর্যায়ে চিৎকার করে ওঠেন ঘাফারি। বলেন, ‘এটা একটা আনুষ্ঠানিক বৈঠক। কারো যদি ব্যক্তিগত কাজ থাকে, তাহলে তারা চলে যেতে পারে।’ ঘাফারির ধমকে কিছুটা কাজ হয়। মিনিট কয়েকের জন্য চুপ হয়ে তার কথা শোনেন কর্মকর্তারা। ‘এখন যান ও নিজের কাজগুলো করুন’, বলে বৈঠক শেষ করেন ঘাফারি। তিনি চলে যাবার পরপরই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া কক্ষটি থেকে ভেসে আসে হাসির আওয়াজ।
মেয়র হওয়ার পর থেকে বেশকিছু প্রচারণা চালাচ্ছেন ঘাফারি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ক্লিন সিটি গ্রিন সিটি’ প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিজের সহযোগীদের একটি দল নিয়ে শহরজুড়ে ময়লা ফেলার জন্য প্লাস্টিক ব্যাগ বিতরণ করে থাকেন। এই প্রচারণার কাজে সঙ্গে সাংবাদিক নিতে অনেকটা অনাগ্রহী ছিলেন তিনি। কারণটা সহজেই বোঝা গেল। বাজারের দিকে এগুতেই একদল পুরুষ হাজির হলো। তার পাশেপাশে বেশ কাছাকাছি থেকে হাঁটতে লাগলো। উদ্দেশ্য একটাই, তাকে ভয় দেখানো। ঘাফারি বলেন, ‘আমার কোনো দেহরক্ষী নেই। যদিও নিয়ম অনুসারে আমার সঙ্গে সবসময় দুজন দেহরক্ষী থাকার কথা। এই শহরটা নিরাপদ নয়।’
বেশিরভাগ মানুষই প্রথমে ব্যাগ নিতে চাননি। পুরো রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আবর্জনার স্তুপ। কিন্তু ঘাফারি নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন। কখনো কখনো নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আগ্রাসীভাবে বলছিলেন, ‘এটা আমাদের শহর। আমাদের উচিৎ এটা পরিষ্কার রাখা। আপনারা আমায় সাহায্য না করলে আমি একা এই কাজ করতে পারবো না।’ কেউ কেউ এসব কথায় হেসেছিল। তবে বাকিরা ব্যাগ নিতে এগিয়ে এলেন। পুরো বাজারে মাত্র একজন নারী উপস্থিত ছিলেন, বাকিরা সবাই পুরুষ, বালক। ওই নারীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা ছিল বোরখায়।
প্রচারণা কাজ শেষে সাংবাদিকদের কাছে আগ্রাসী আচরণের জন্য মাফ চেয়ে নেন। বলেন, ‘এরকম রক্ষণশীল সমাজে কাজ করতে গেলে একজন আরীকে তার সত্যিকারের সত্ত্বাকে লুকিয়ে রাখতে হয়। তাকে কঠোর হতে হয়, নইলে কেউ তার কথা কানে নেয় না। তাদের কাছে আমায় প্রমাণ করতে হবে যে, নারীরা দুর্বল নয়।
ওয়ারদাকের বেশিরভাগ জনসংখ্যাই পাশতুন সম্প্রদায়ের। ঘাফারিও সে সম্প্রদায়েরই একজন। তার মা একজন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাবা আফগান স্পেশাল ফোর্সের একজন কর্নেল। তার বয়স ২৬। আফগান সমাজের প্রচলিত রীতি অনুসারে তার বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে বহু আগেই। কিন্তু এখনো বিয়ে করেননি ঘাফারি।
ময়দান শারের মেয়র জানান, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার তালেবান ও জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস’র কাছ থেকে মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন তিনি। কিন্তু আইএস, তালেবানের হাতে খুন হওয়ার ভয় অনেক আগেই পার করে এসেছেন এই নারী। তিনি বলেন, ‘আমি জানি আমাকে খুন করে ফেলা হবে, কিন্তু তাদের আমি ভয় পাই না। তাদের চেয়ে বেশি উদ্বেগ হয় সরকারের পক্ষে যুদ্ধ করা অপরাধীদের সিন্ডিকেটগুলো নিয়ে। তারা উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি ও জমি লেনদেনের ব্যবসায় যুক্ত।’  তিনি বলেন, এখানকার ভূমি মাফিয়াদেরই আমি বেশি ভয় পাই। তাদের একজন একদিন আমায় বলেছিল, আমি এখান থেকে চলে না গেলে সে আমার মাথায় একটি বুলেট ঠুকে দেবে।’
ঘাফারি কখনো সরকারের হয়ে কাজ করার প্রত্যাশা করেননি। তিনি ভারতে স্নাতক শেষ করেন। এরপর অর্থনীতিতে  স্নাতকোত্তর পড়া অবস্থায় গত বছর ছুটিতে বাড়ি আসেন। তখন পরিবারের সদস্যদের চাপে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দেন। ওই পরীক্ষার আয়োজন করেছিলেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। তার উদ্দেশ্য ছিল সরকারি পদে নিয়োগ দেয়ার জন্য মেধাবীদের খুঁজে বের করা। পড়াশোনার পাশাপাশি একজন উদ্যোক্তাও ছিলেন ঘাফারি। ছুটিতে বেশ জনপ্রিয় একটি রেডিও স্টেশন চালু করেছিলেন ওয়ারদাকে। ছুটি শেষে পড়াশোনা শেষ করতে ভারত ফের যান ঘাফারি। সেসময় এক বন্ধুর ফোন দিয়ে তাকে জানান, গনির কার্যালয় ফেসবুকে দেয়া এক ঘোষণায় ঘাফারিকে ময়দান শার এর মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করেছেন।
সেসময়কার বর্ণনা দিয়ে ঘাফারি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে, আমি কাজটা পেয়েছি। কারণ, আমার কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না, স্বর্ণও ছিল না। কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম, আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি কাজটা চাই। এই সমাজে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করতে চাই।’
ঘাফারির গোঁ ধরা স্বভাব অবজ্ঞগার পাশাপাশি তাকে সমাজে বেশ খানিকটা সম্মান এনে দিয়েছে। ওই পৌরসভা বৈঠকে অপমানিত হওয়ার পরও খুব একটা বিচলিত হননি।
তিনি বলেন, মাঝে মাঝে মনে হয় এখানে সবাই নারী বিরোধী। আর কোনো নারী যখন সমাজে সক্রিয় হয়ে ওঠে তখন তারা সহজেই তাকে দুশ্চরিত্রা আখ্যা দিয়ে দেয়া হয়।
পরবর্তীতে রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্পটি নিয়ে অপর এক বৈঠকে ঘাফারি আশার আলো দেখতে পান। তার পক্ষে অল্প হলেও সমর্থন দেখা যায়। বৈঠকটি ছিল একটি রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে। বৈঠকে একজন তার পক্ষ নিয়ে বলেন, তাকে কিছুটা কৃতিত্ব দাও। প্রকল্পটি ১২ বছর ধরে বন্ধ পড়ে ছিল। তিনি মেয়র হওয়ার এক মাসের মধ্যেই সেটি চালু করতে পেরেছেন। তিনি একজন নারী হতে পারেন, কিন্তু তার শক্তি আছে।

বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা বিভক্ত হবে? by শামিম হোসেন

ইন্টারনেটের বর্তমান অখণ্ড রূপ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কিছু দেশ কয়েক বছর ধরে নিজস্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। সাইবার জগতে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে, এমন আশঙ্কা করে দেশগুলো ইন্টারনেটে সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কথা বলছে।
‘নিজস্ব ইন্টারনেট’ তৈরিতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছে রাশিয়া। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত মাসেই এমন ব্যবস্থা তৈরির জন্য নতুন আইন পাস করিয়েছেন। প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী ‘অয়ারড’ বলছে, রাশিয়ার পথে এগোচ্ছে ইরানও। গত মাসে ইরান ঘোষণা দিয়েছে, ‘জাতীয় তথ্য নেটওয়ার্ক’ প্রকল্পের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ করেছে দেশটি। প্রকল্পটি ইরানের ‘নিজস্ব ইন্টারনেট’ ব্যবস্থা গড়ার অংশ।
ইন্টারনেটে সার্বভৌম ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বিশ্বে নতুন নয়। এখন পর্যন্ত চীন এ পথে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে চীনের নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা এখন পরিচিত ‘দ্য গ্রেট ফায়ারওয়াল অব চায়না’ নামে। এটা এক বিশাল সেন্সরশিপ ব্যবস্থা। স্বাধীন মত প্রকাশে চীনের জনগণের ওপর এই সেন্সরশিপ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও প্রকল্পটির অর্থনৈতিক প্রভাব বেশ গভীর। এর আওতায় চীন ইন্টারনেটভিত্তিক শত কোটি ডলার মূল্যের কোম্পানি গড়তে পেরেছে।
সফটওয়্যারনির্ভর এই সেন্সরশিপ ব্যবস্থা দিয়ে চীন আসলে জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। জনগণ কোন তথ্য, আধেয় বা কোন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারবে, সেটা এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা ইন্টারনেটের উপরিতলের নিয়ন্ত্রণ। কারণ বিকল্প পদ্ধতি (ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা টর প্রজেক্ট) ব্যবহার করে চীনের এই সেন্সরশিপ সহজে পাশ কাটানো যায়।
তবে নিজস্ব ইন্টারনেট তৈরিতে রাশিয়া ভিন্ন কিছু ভাবছে। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘নিউ আমেরিকা ফাউন্ডেশনের’ সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক রবার্ট মোগেস বলেন, ইন্টারনেট নিয়ে রাশিয়ার আকাঙ্ক্ষা ভিন্ন। আরও গভীরভাবে ইন্টারনেটে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় রাশিয়া।
রাশিয়ার নিজস্ব ইন্টারনেট
পৃথিবীর কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলো ২০১০ সালের পরে বড় ধরনের ধাক্কা খায়। এ সময় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম থেকে সূচিত ‘আরব বসন্তের’ মতো আন্দোলনের ঢেউ দেশে দেশ ছড়িয়ে পড়ে। টলে যায় দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একনায়কদের মসনদ। ক্ষমতা হারান হোসনি মোবারক, বেন আলি ও গাদ্দাফির মতো শাসক। অন্যদিকে, ২০১১ থেকে ২০১২ সালে রাশিয়ায় ‘উইন্টার অব প্রোটেস্ট’ শীর্ষক এক আন্দোলনেও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম তথা ইন্টারনেটের ভূমিকা ছিল।
এসব আন্দোলনের পরে ইন্টারনেটে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রাশিয়া ও চীন খোলামেলা কথা বলতে শুরু করে। এই সময় রাশিয়ার নাগরিকদের ওপর ‘বিকৃত প্রভাব’ বিস্তার করা থেকে পশ্চিমাদের বিরত থাকার আহ্বান জানায় মস্কো।
আন্দোলনের পরে ইন্টারনেটে চীনের মতো ডিজিটাল সীমান্ত গড়ার কথা ভাবতে শুরু করে রাশিয়া। তবে চীনের দেখানো পদ্ধতিতে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করাটা রাশিয়ার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘দ্য কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনের’ সাইবার বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম সিগাল বলেন, চীনের নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি সাধারণত ইন্টারনেটের আধেয় (শব্দ, লেখা, ভিডিও, অডিও) নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এই পদ্ধতি রাশিয়াতে কাজ করত না।
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী পল বাফেডের তৈরি মানচিত্রের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগের পাইপলাইন বসানো হয়। বাফেড বলেন, রাশিয়ার মতো দেশ বাকি বিশ্বের সঙ্গে জটিল সংযোগ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ইন্টারনেটে যুক্ত। দেশটি নিজেও জানে না কতটি এবং কতভাবে তারা বৈশ্বিক ইন্টারনেটে যুক্ত। ফলে দেশের সংযোগের ওপর নজরদারি করে ইন্টারনেটে নিয়ন্ত্রণ করাটা রাশিয়ার জন্য সহজ নয়। তবে শুরুতে এ বিষয়ে নজর দেওয়ায় চীন এ ভাবেও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। বাধ্য হয়েই রাশিয়া ভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে।
ইন্টারনেটের একটি মৌলিক বিষয় হলো ডিএনএস। এটা বলে দেয় কীভাবে ইন্টারনেটের আইপি অ্যাড্রেসকে পাঠযোগ্য করতে হয়। যেমন, প্রথম আলোর আইপি অ্যাড্রেস 35.200.199.101। ডিএনএস এটাকে অনুবাদ করে পাঠযোগ্য www.prothomalo.com করে তোলে।
রাশিয়া এই ডিএনএস ব্যবস্থার (বর্তমান সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে) একটি নিজস্ব কপি তৈরি করেছে। এতে করে কেউ রাশিয়া থেকে গুগলের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে গেলে তিনি স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলে যাবেন দেশটির নিজস্ব সার্চইঞ্জিন ইয়ানডেস্কে। একইভাবে ফেসবুকে ঢুকতে গেলে চলে যাবেন রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিকেতে। গত এপ্রিলে এই বিষয়ে সফল পরীক্ষা চালিয়েছে রাশিয়া।
মোগেস বলেন, এই প্রকল্প সফল হলে রাশিয়ার আর সেন্সরশিপের প্রয়োজন হবে না। এমনকি রাশিয়ার ইন্টারনেট ট্রাফিক কখনোই বাইরে যাবে না। নাগরিকেরা দেশটির বাইরের কোনো তথ্যভান্ডারেও প্রবেশের সুযোগ পাবেন না।
রাশিয়ার প্রকল্পে সরকারের এতটাই গভীর নিয়ন্ত্রণ যে, কোনো ‘ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক’ অথবা ‘টর প্রজেক্টের’ মাধ্যমেও বিকল্প নেটওয়ার্ক তৈরি করে বৈশ্বিক ইন্টারনেটে প্রবেশ করা যাবে না। চীনে এখনো যেটা সম্ভব।
বৈশ্বিক মুক্ত ইন্টারনেটে সমস্যা কোথায়?
বৈশ্বিক ইন্টারনেট ও এর প্রযুক্তিগত গঠন প্রক্রিয়ার (যেমন-ডোমেইন সিস্টেম, কেবল) নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমাদের হাতে। এ নিয়ন্ত্রণে অনেক রাষ্ট্রই খুশি নয়।
অখুশি রাষ্ট্র যাদের কর্তৃত্ববাদীও বলা হয়, সেই দেশগুলো ইন্টারনেটের তথ্য প্রকাশ ব্যবস্থার ওপর অসন্তুষ্ট। বৈশ্বিক ইন্টারনেটে অবাধে তথ্য প্রকাশ করা যায়। তা যেকোনো তথ্যই হোক না কেন। ফলে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোকে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়।
অন্যদিকে, মুক্ত ইন্টারনেটে এমন কিছু সমস্যা আছে, যা সব দেশের জন্যই সমান গুরুতর। বর্তমান সাইবার দুনিয়ায় একটি দেশের সামরিক স্থাপনা কিংবা বিদ্যুৎ বা জরুরি পানি ব্যবস্থাপনার মতোই ঝুঁকিপূর্ণ।
মোগেস বলেন, বিশাল ও উন্মুক্ত তথ্য জগতে প্রবেশের সুযোগ মানুষকে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর প্রভাব রাখতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। অন্যদের তুলনায় বেশ আগেই এটা রাশিয়া ও চীন বুঝতে পেরেছে।
এ জন্য রাশিয়া ও চীনের দর্শন হলো, অন্য যেকোনো স্পর্শকাতর বিষয়ের মতো দেশের জনগণও গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক স্থাপনা যেভাবে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রক্ষার করতে হয়, একইভাবে জনগণকেও রক্ষা করা উচিত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লিঙ্কন পিগম্যানের মতে, ইন্টারনেট জগতে ‘ভুয়া সংবাদ’ বাস্তব পৃথিবীর ‘ভাইরাসের’ মতোই ক্ষতিকর।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এর মাধ্যমে চরবৃত্তিও চালাতে পারে। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের এমন কর্মকাণ্ড ফাঁস করে আলোড়ন তুলেছিল এডওয়ার্ড স্নোডেন। এ ছাড়া, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাইবার হামলাও উদ্বেগের কারণ। তবে নিজস্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা তৈরিতে বড় ধরনের ঝুঁকি আছে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ
নিজস্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা তৈরিতে রাশিয়া বা ইরানের মতো দেশের প্রধান ঝুঁকিটি হলো অর্থনৈতিক। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন এখন বৈশ্বিক ইন্টারনেটর ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবেও একঘরে হয়ে যেতে পারে।
তবে এই অবস্থা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পরে চীনের প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’। ‘একুশ শতকের সিল্করুট’ হিসেবে বিবেচিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন বাকি বিশ্বের সঙ্গে স্থলপথ, সমুদ্রবন্দর ও টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক স্থাপন করতে চায়।
বিবিসি বলছে, ৮০টিরও বেশি দেশের টেলিকমিউনিকেশন প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে চীন। কেবল বসানো থেকে শুরু করে মূল নেটওয়ার্ক তৈরিতেও চীন দেশগুলোকে সহায়তা করছে। এর মধ্য দিয়ে চীন বিকল্প বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
ভূরাজনীতি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান স্ট্রার্টফরের বিশেষজ্ঞ সিম ট্যাকের মতে, এই নেটওয়ার্ক প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়ে চীন ও রাশিয়া নিজেদের মতো একটা অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করতে পারবে। পশ্চিমাভিত্তিক ইন্টারনেট ও অর্থনৈতিক বলয় থেকে বের হয়ে টিকে থাকার এটাই বিকল্প পথ হতে পারে।
ট্যাকের মতে, একটি বিকল্প অর্থনৈতিক বলায় তৈরিতে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট আগ্রহী দেশ আছে।
রাজনৈতিক প্রভাব
নিজস্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা তৈরিতে রাশিয়া, ইরান ও চীনের মতো দেশের প্রচেষ্টার রাজনৈতিক প্রভাব গভীর হবে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। এ বিষয়ে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ একটি সম্পাদকীয় লিখেছে। সংবাদমাধ্যমটি আশঙ্কা করছে, খুব দ্রুতই বিশ্ব হয়তো কয়েক ভাগে বিভক্ত ইন্টারনেট ব্যবস্থা দেখতে চলেছে। তাদের আশঙ্কা, মুক্ত ইন্টারনেটের পরিবর্তে এই ধরনের ব্যবস্থা মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যবহার হতে পারে। ইন্টারনেটে সার্বভৌমত্ব অর্জন রাষ্ট্রগুলোকে একই সঙ্গে নাগরিকদের ওপর অতিমাত্রায় নজরদারি করার ক্ষমতা দেবে। এতে সংকুচিত হয়ে পড়বে নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা।
মুক্ত ইন্টারনেট ক্যাম্পিং প্রতিষ্ঠান ওপেন রাইট গ্রুপের মারিয়া ফ্যারেল বলেন, রাশিয়া ও চীনের এই পদক্ষেপে অন্যান্য দেশেও উদ্বুদ্ধ হবে। বিশেষত, জিম্বাবুয়ে, জিবুতি ও উগান্ডার মতো দেশগুলো এই প্রকল্পের অংশ হতে চাইবে।
নিউ আমেরিকা ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণায় ৫০টি রাষ্ট্রের কথা উঠে এসেছে যারা ইন্টারনেট নিয়ে বিকল্প কিছু করার কথা ভাবছে। এই রাষ্ট্রগুলোকে নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডিজিটাল ডিসাইডার’। এর মধ্য রয়েছে, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইসরায়েলের মতো দেশ। আগামীর ইন্টারনেট ব্যবস্থা নিয়ে এই দেশগুলোর সামনে এখন দুটো পথ আছে। একটি, বিদ্যমান বৈশ্বিক মুক্ত ইন্টারনেট। অন্যটি, সার্বভৌম ও নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট। মোগেস বলছেন, যদি রাশিয়া ও ইরান নিজস্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সফল হয়, তাহলে এই ‘ডিজিটাল ডিসাইডার’ রাষ্ট্রগুলো নিজস্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা গড়তে উদ্যোগী হতে পারে।
অয়ার্ড বলছে, যদি রাশিয়া ও ইরান তাদের চেষ্টায় সফল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন এক ইন্টারনেট ব্যবস্থা তৈরি হবে যেটার সঙ্গে বর্তমানের কোনো কিছুরই তুলনা চলে না। এই প্রচেষ্টটার পেছনে বিশাল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ আছে, আছে অনেক অর্থনৈতিক বিষয়, তবে নিজস্ব ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠার পথ একেবারে অসম্ভব নয়।
‘নিজস্ব ইন্টারনেট’ ব্যবস্থা গড়ার পদক্ষেপ নিচ্ছে রাশিয়া ও ইরান। এ কাজে দেশ দুটি সফল হলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক ইন্টারনেট বিভক্ত হয়ে পড়বে। ছবি: রয়টর্স