Showing posts with label অরণ্যে রোদন. Show all posts
Showing posts with label অরণ্যে রোদন. Show all posts

Wednesday, June 16, 2010

আমার মতন সুখী কে আছে by আনিসুল হক

সেদিন সকালবেলা বিবিসি বাংলা শুনছিলাম রেডিওতে। সেদিনের পত্রিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচকেরা কথা বলছিলেন ব্রিটিশ কাউন্সিল পরিচালিত বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম শীর্ষক জরিপ নিয়ে। ওই জরিপে বলা হয়েছে, ৮৮ ভাগ তরুণ নিজেদের মনে করে সুখী বা খুব সুখী। আবার ৪১ শতাংশ তরুণ বিদেশে যেতে চায়। বিদেশে যেতে চাওয়ার কারণ, বিদেশে বেশি আয় বা শিক্ষার সুযোগ আছে আর তার বিপরীতে দেশে রয়েছে চাকরি-স্বল্পতা। আলোচকদের চিন্তা ছিল, সুখীই যদি হবে, তবে তারা বিদেশে যেতে চায় কেন?
সুখী মানুষেরা বিদেশে যেতে চাইতে পারবে না, সে কথা অবশ্য কোনো পুস্তকে লেখা আছে বলে আমার জানা নেই। বরং বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নটা হূদয়ে ধারণ করার সুযোগ থাকাটাও হয়তো ওই ৪১ ভাগের অনেকের সুখের কারণ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিদেশে যেতে চায় না, এ রকম একটা বিরাট অংশও সুখী। অন্যদিকে ৫৯ ভাগ তরুণ তো বিদেশেও যেতে চায় না।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের জরিপের ফল সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে। বাংলাদেশের তারুণ্যের ওপর পরিচালিত এই জরিপের ফল অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হলেও আমার কাছে মোটেও অভাবনীয় কিছু বলে মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে, অনেক ইতিবাচক, দারুণ আশাপ্রদ।
প্রথম কথা, এই তরুণেরা অসুখী নয়। নিশ্চয়ই এই সুখের পেছনে কাজ করে বিরাট আশাবাদ যে, বাংলাদেশটার হবে। কিছুই হবে না, এটা বৃদ্ধদের মুখে শোনা যেতে পারে, তরুণেরা কেন এই রকম বলবে বা ভাববে? কিছুই হবে না, এই রকম পরিস্থিতিতে তারা বলবে, আপনাআপনিই কিছুই হবে না, না হোক, আমরা না-টাকে হ্যাঁ বানিয়ে ফেলব। এই কারণেই তো আমরা তরুণ।
আর এই আশাবাদ, এই ইতিবাচকতা যাদের মধ্যে আছে, তারা তো সুখীই হবে। ইতিবাচক মানুষ কেন অসুখী হবে? তারা অসন্তুষ্ট হতে পারে, বিক্ষুব্ধ হতে পারে, কিন্তু তারা অসুখী হয় না। পথে-প্রান্তরে মুক্তির সংগ্রামে স্টেনগানে হাতরাখা তরুণও অসুখী নয়, দাবি আদায়ের মিছিলে সোচ্চার মানুষটিও নিজেকে অসুখী ভাবে না।
এই জরিপ থেকেই দেখা যাচ্ছে, ৭০ ভাগ তরুণ মনে করে, দেশ ঠিক পথেই এগোচ্ছে। সার্বিক দিক থেকে দেখলে, দেশ অবশ্যই ঠিক পথে এগোচ্ছে। প্রথম কথা, বাংলাদেশ একটা গণতান্ত্রিক দেশ। নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও গণতন্ত্রের পথ থেকে এই দেশ সরে যায়নি। গণতন্ত্রের প্রতি এই দেশের মানুষের যে অঙ্গীকার, তা নানা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত। ৬৪ শতাংশ তরুণ মনে করে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের মৌলবাদী রাষ্ট্র হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আমরাও মনে করি, অদূর ভবিষ্যতেও এই দেশের মৌলবাদী হয়ে পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ এই দেশের মানুষ মোটের ওপর মধ্যপন্থী, নরম প্রকৃতির, পরমতসহিষ্ণু। তারা সহজেই নতুনকে গ্রহণ করতে পারে। সহজে খাপ খাইয়েও নিতে পারে। জরিপ থেকে দেখছি, ৭৩ ভাগ তরুণ-তরুণীর হাতে মুঠোফোন আছে, আর ইন্টারনেট ব্যবহার করে ১৫ ভাগ। সাড়ে পাঁচ কোটির ১৫ ভাগ কিন্তু সংখ্যায় কম নয়। আমরা যদি আমাদের প্রতিদিনের ছোটখাটো রাজনৈতিক বাগিবতণ্ডা ভুলত্রুটির হিসাব না কষে বড় একটা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে বাংলাদেশ অবশ্যই সঠিক পথেই আছে। থাকার মতো কতগুলো প্রাকৃতিক সুবিধাও আছে। আগেই বলেছি, এই দেশের মানুষ নরম, উদার, আধুনিক, সমন্বয়বাদী ও মুক্তমনা। সংকীর্ণতার মধ্যে তারা নেই, ডান বা বাম কোনো চরম পন্থার সঙ্গেই তারা নেই। গোষ্ঠীগত জাতিগত প্রদেশগত দাঙ্গাহাঙ্গামার অবকাশ এই দেশে নেই। আজকে মাওবাদী বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমস্যায় আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘুম হারাম, পাকিস্তানে রোজ বোমা ফুটছে। নেপাল বা শ্রীলঙ্কা যেকোনো দেশের তুলনায়ই আমরা রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে ভালো আছি। সত্য বটে, তরুণদের ৬০ ভাগ মনে করে, আগামী পাঁচ বছরে দুর্নীতি আরও বাড়তে পারে। সেটা না মনে করার মতো কোনো কারণ তো ঘটেনি। এই জায়গায় সরকারের করণীয় আছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি তাই সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
তরুণদের মধ্যে ইতিবাচক যে জিনিসটা আমাদের সবচেয়ে অনুপ্রাণিত করে, তা হলো, ৯৮ ভাগ মনে করে তাদের সমাজসেবা করা উচিত। ৯৫ ভাগ তরুণ নিজের এলাকা আর স্থানীয় অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কাজ করতে চায়। ৭৯ ভাগ তরুণ উন্নয়নের বিষয়ে আগ্রহী। ৭৬.৫ ভাগ তরুণ মনে করে, স্থানীয় এলাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা আরও বড় হওয়া উচিত। তার মানে এই তরুণেরা একদম ঠিক লাইনে চিন্তা করছে। তারা ইতিবাচকভাবে ভাবছে, কাজে অংশ নিতে চাইছে। কিন্তু তাদের সামনে করণীয় কিছু নেই। ৯৪ ভাগ তরুণ-তরুণী বলছে, তরুণদের দ্বারা পরিচালিত বা তরুণদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনের নাম তারা জানে না।
এই শূন্যতাটা যে আছে, সেটা আমরা বারবার বলছি। আমাদের তারুণ্যে যেন পাহাড় থেকে নেমে আসা এক অমিত বৈভবসম্পন্ন শক্তি। এই বাঁধভাঙা তারুণ্য সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে, আবার বহু অসাধ্য সাধন করতে পারে। বহু কিছু গড়ে তুলতে পারে। সেই স্বপ্নটা সেই কাজটা সেই সংগঠনটা তাদের দিতে হবে।
সরকারি ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা যে টেন্ডারবাজি অস্ত্রবাজি চাঁদাবাজি করে, তার মূলেও আছে, তাদের সামনে বড় স্বপ্ন সৃষ্টি না করা। তাদের দেশ গঠনে সমাজ গঠনে বড় কোনো কাজে উদ্বুদ্ধ করতে না পারা। তাদের কোনো কাজ নেই। কী করবে তারা? কাজেই অপকর্ম করে।
এই জায়গাতেই আমরা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বা মুহম্মদ জাফর ইকবালদের মতো মানুষের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। একজন তরুণদের উদ্বুদ্ধ করছেন বই পড়তে, আরেকজন গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির পক্ষ থেকে অন্যদের সঙ্গে মিলে উদ্বুদ্ধ করছেন গণিত চর্চা করতে আর বড় স্বপ্ন দেখতে।
প্রথম আলো বন্ধুসভার মাধ্যমেও আমরা তরুণদের সামাজিক মানবিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। চেষ্টা করে যাচ্ছি নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে একটা জাগরণ তৈরি করতে।
আমাদের তরুণদের স্বরূপ নির্ধারণ করছে কোন দুটো জিনিস? ছেলেরা বলেছে, জাতীয় ও পেশাগত ব্যাপার নিয়ে তারা ভাবিত। আর মেয়েরা বলেছে, তাদের স্বরূপ নির্ধারিত হয় পরিবার দিয়ে আর জাতীয়তা দিয়ে। তরুণ-তরুণী নির্বিশেষে তাদের ভাবনার মধ্যে একটা সাধারণ বিষয় রেখেছে, সেটা তার দেশ, তার জাতীয়তা।
রাজনীতি নিয়ে হ্যাঁ আর না-র পাল্লা দেখা যাচ্ছে সমানে সমান। ৩০.৫ শতাংশ মনে করে, তাদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া কিছুতেই উচিত নয়, ৩০.৫ শতাংশ মনে করে, তাদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়া উচিত। এর ব্যাখ্যা কোনো কোনো কাগজে দেখলাম, বলা হচ্ছে তরুণেরা রাজনীতিবিমুখ। আমার মনে হয় না, ৩০ ভাগের বেশি মানুষের সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার অবকাশ আছে। বরং ওই সংখ্যাটাও অনেক বড়। সবাই রাজনীতি করবে নাকি একটা দেশে? তবে ৭৪ ভাগ তরুণ রাজনীতিবিমুখ, এই তথ্যটাও উঠে আসছে জরিপে। খুব হতাশার কথা কি এটা? আমাদের প্রজন্মের সঙ্গে এই প্রজন্মের এই পার্থক্যটা তো থাকবেই। ভাষা আন্দোলনের কাল, স্বাধীনতা সংগ্রামের কাল গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের কাল আমরা অতিক্রম করে এসেছি। এখন একটু থিতু তো হতে হবে, নাকি? কিন্তু দরকার হলে আজকের তারুণ্যও যে রাজপথে নেমে আসতে পারে, সে বিষয়ে যেন কারও মনে কোনো সন্দেহ না থাকে।
তবে হ্যাঁ, রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে হবে, মেধাবীদের, শিক্ষিতদের, সৎ ও সাহসীদের আসতে হবে রাজনীতিতে।
সবটা মিলিয়ে এই জরিপের ফল আমাদের তরুণদের সম্পর্কে আমাদের আশাবাদকে জোরদার করেছে। তারা লেখাপড়া করতে চায়, তারা বিদেশে যেতে চায়, তাদের প্রায় সবাই সমাজের কাজে লাগতে চায়। তাদের প্রায় সবাই মনে করে, তাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে তাদের জাতীয়তা। এ রকম একটা দেশপ্রেমিক কর্মোদ্যোগী তরুণ প্রজন্ম আগামী ১০ বছর পরে এই দেশটাকে চালাবে। তখন দেশটা নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর হবে, উন্নত হবে।
আমাদের তারুণ্যের সৃজনশীলতা এই জরিপের আওতায় ছিল না। কিন্তু কত কী করছে তারা। কত বিচিত্রমুখী উদ্যোগই না তারা গ্রহণ করছে। কিন্তু উদ্যোক্তা বলতে যা বোঝায়, সেটা কিন্তু এই জরিপই বলছে, আমাদের তরুণদের মধ্যে এখনো কম। শ্রমবাজারে মাত্র এক ভাগ তরুণ ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা। আমাদের উদ্যোক্তা দরকার। কেবল চাকরি খোঁজা তরুণ দিয়ে আর চলবে না। আমাদের অর্থনীতির একটা বড় শক্তি আমাদের প্রবাসী জনশক্তি। আমাদের তরুণেরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে, এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে এ থেকে জাতীয়ভাবে আমরা কীভাবে সর্বাধিক লাভবান হতে পারি, সে বিষয়ে সরকারের অতি অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আমাদের বহির্মুখী জনশক্তির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, অদক্ষ জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার বাস্তব উদ্যোগ চাই। সেই উদ্যোগের অভাবের কথাও এই জরিপে ফুটে উঠেছে।
আমাদের অপরাজেয় তারুণ্যকে আরেকবার সালাম দিই। এরাই বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছে, এরাই অর্থনৈতিক বাধা প্রাকৃতিক বাধা অতিক্রম করে এভারেস্টে উঠেছে। বাংলাদেশের ব্যাপারে যে বৃদ্ধরা বা অকালবৃদ্ধরা ‘কিছুই হবে না’ বলে চোখের পানি ফেলছেন, তাঁদের এই তরুণেরা এই বলে কাছে ডাকতে পারে:
আমার মতন সুখী কে আছে। আয় সখী আয় আমার কাছে—
সুখী হূদয়ের সুখের গান শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ।
প্রতিদিন যদি কাঁদিবি কেবল একদিন নয় হাসিবি তোরা—
একদিন নয় বিষাদ ভুলিয়া সকলে মিলিয়া গাহিব মোরা\
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Saturday, May 29, 2010

কেন রুখে দাঁড়াতে হয় by আনিসুল হক

গত ১৪ মে ২০১০ ডেইলি স্টার-এর ম্যাগাজিনে আনুশকা ইউসুফের একটা লেখা ছাপা হয়েছে ‘মি মোই আমি’ শিরোনামে। তিনি শুরু করেছেন এইভাবে, ‘আমার মা এসেছেন ফ্রান্সের একটা চমৎকার ছোট্ট শহর থেকে, আর আমার বাবা এসেছেন বাংলাদেশের জনবহুল রাজধানী থেকে। এবং আমি জন্মেছি আমেরিকান হয়ে।’ তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছে, তিনি কোন সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি বলছেন, ‘কোনটা আমি? যে ইউরোপীয় ফরাসি মেয়েটি সকালবেলা ক্রয়সাঁ খায়, যে বাংলাদেশি মেয়েটি সপ্তাহান্তে ভারতীয় ছবি দেখে, নাকি ওই সর্ব-আমেরিকান কিশোরী যে স্কুল শেষে ম্যাগনোল্ডসে যায়?’ তিনটা দেশের তিনটা ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির চিহ্ন হিসেবে লেখিকা তিনটা জিনিসকে বেছে নিয়েছেন, ফরাসি সংস্কৃতি থেকে নিয়েছেন ক্রয়সাঁ, আমেরিকা থেকে নিয়েছেন ম্যাকডোনাল্ডস, আর বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে ধরে নিয়েছেন তিনি ভারতীয় ছবিকে।
তিনি লিখেছেন, ‘আমি আবিষ্কার করেছি যে বাঙালি জীবনচর্যা একজন বালিকার জন্য অনেক উদ্দীপনাময়।...সব সময় টেলিভিশনে একটা বলিউডের ছবির আনন্দপূর্ণ মিউজিক ভিডিও চলবে, মহিলারা পরচর্চা করবে, ডাল ঘোঁটার শব্দ ভেসে আসবে, একজনের কথার ওপরে গলা চড়িয়ে চুটকি বলবে আরেকজন। এটার সঙ্গে নির্ভুলভাবে আমাকে মানিয়ে নিতে হবে, তাই তো?’ মানিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি কষ্ট স্বীকার করলেন। সেটা কী? ‘আমি আমার ভারতীয় বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে ভারতীয় নাচ শিখতে শুরু করলাম এবং নিয়মিতভাবে হিন্দি সিনেমা দেখা শুরু করলাম।...বিয়ের আগের অনুষ্ঠানে বলিউড নাচে অংশ নেওয়ার জন্য অনুশীলন করতে শুরু করলাম।’
বাংলাদেশের সংস্কৃতি হিসেবে, বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে তিনি যা কষ্ট করে শিখেছেন তা হলো বলিউডের নাচ। বিয়ের আগে বলিউডের নাচকেই তিনি ভাবছেন বাংলাদেশের বাঙালির সংস্কৃতি। আনুশকাকে দোষ দেব না। এটাই এখন প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। সারা বিশ্বভুবনে হিন্দি সংস্কৃতির কাছে বাঙালি সংস্কৃতির চিহ্নগুলো অপসারিত হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও বহু জায়গায় বহুভাবে এটা ঘটেছে। ঘটানোর জন্য বাস্তব চেষ্টা চলছে।
ভারত নামের বিশাল বহুভাষী রাষ্ট্রের সংহতির জন্য, ঐক্যের জন্য হিন্দির বন্ধন দরকার। তারা চাইবেই সারা ভারতের সব মানুষ, সে বাঙালি কিংবা তামিল যেই হোক না কেন, হিন্দি সংস্কৃতির দ্বারা আবিষ্ট হোক। বাঙালি সংস্কৃতি অনেক শক্তিশালী, তার শেকড় বহু গভীরে প্রোথিত। কিন্তু হিন্দির সঙ্গে বাংলার জনপ্রিয় সংস্কৃতির যে লড়াইটা, তা অসম। কারণ ভারতের জনসংখ্যা এক শ কোটির বেশি। হিন্দি জনপ্রিয় সংস্কৃতির পণ্যগুলো নির্মিত হয় সেই বিশাল বাজারের জন্য, ফলে তার পেছনে কেবল ভারত রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা থাকে না, থাকে বিশাল অঙ্কের পুঁজি। তাই তার সঙ্গে একটা ১০ বা ১৫ কোটি ভোক্তার জন্য বানানো জিনিসের প্রতিযোগিতাটা অসম হতে বাধ্য। ভারত একটা বৃহৎ শক্তি, হিন্দিও একটা বৃহৎ শক্তি। তার কাছে পশ্চিমবঙ্গের লেখক-সাহিত্যিকেরা তাঁদের অসহায়ত্ব নানা লেখায়, নানা সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করে চলেছেন। তাঁরা বলছেন, বাঙালি সংস্কৃতি যদি বেঁচে থাকে, যদি আলো-হাওয়া-জল দিয়ে পরিপুষ্ট হয়, তবে তা হবে বাংলাদেশে। কলকাতার মধ্যবিত্ত ছাত্রটি ইংরেজি শিখছে-বিশ্বনাগরিক হওয়ার জন্য, হিন্দিতে চোশত হচ্ছে-সর্বভারতীয় হওয়ার জন্য। বাংলাদেশে এই হুমকির কোনো কারণ ছিল না। বাংলাদেশের বাংলা মাধ্যম থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ ছেলেমেয়ে বেরোচ্ছে মাধ্যমিক স্তর পেরিয়ে, যারা বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, আমাদের রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শরৎচন্দ্র-জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান-হুমায়ূন আহমেদ-প্রথম আলোকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করছে, ধারণ করছে, চর্চা করছে।
কিন্তু মুম্বাইয়া সংস্কৃতির পণ্যগুলোর পেছনে আছে বড় বাজেট, আছে বাজারজাত করার আধুনিকতম সব উপায় ও আয়োজন। বাংলাদেশে আমরা হিন্দি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে অবাধ করে দিয়েছি। বাসার ছোট্ট মেয়েটি হিন্দি চ্যানেলে কেশ-প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে—লম্বি লম্বি বাল হ্যায় আচ্ছি আচ্ছি বাল হ্যায়। সুন্দর বাংলা শব্দ ‘ঐশ্বযর্’ তার কাছে ‘ঐশ্বরিয়া’। ‘অভিজিৎ’ তার কাছে ‘আবহিজিৎ’। এমনকি ‘মন্ত্র’র মতো সুন্দর শব্দ তার কাছে ‘মান্ত্রা’। বাংলা শব্দ তার কাছ থেকে অপসারিত হয়ে যাচ্ছে হিন্দি শব্দ ও উচ্চারণ দ্বারা। তবু আরেকটা ভাষা, সে হিন্দিই হোক, উর্দুই হোক, শেখাটা যে কারোর জন্যই ভালো। কিন্তু সংস্কৃতির চিহ্নগুলো যদি অপসারিত হয়ে যায়?
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে সৈয়দ শামসুল হক একটা চমৎকার প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যেটা প্রচারপত্রের আকারে হাতে হাতে বিলি হয়েছিল। লেখাটার শিরোনাম ছিল, ‘কেন রুখে দাঁড়াতে হয়’। সৈয়দ শামসুল হকের উদ্বেগ ছিল, আমাদের সংস্কৃতির চিহ্নগুলো, আমাদের শাড়ি, মেয়েদের কপালের টিপ যেন অপসারিত না হয়ে যায়! আমরা যে হাত দিয়ে ভাত খাই, ওই ভাতই আমাদের সংস্কৃতি, যেমন আনুশকা ইউসুফের ফরাসি মায়ের কাছে ক্রয়সাঁ, আমেরিকান কিশোরীর জন্য ম্যাগডোনাল্ডস, আমার কাছে তেমনি ভাত। ওটা আমি দোসা দিয়ে, ইদলি দিয়ে অপসারিত হতে দিতে পারি না।
সেই কবে শরৎচন্দ্র খোট্টা বেটাদের নিয়ে রসিকতা করেছেন (খোট্টা শালার ব্যাটারা আমাকে কিলায়া কাঁঠাল পাকায়া দিয়া)। জীবনানন্দ দাশ কিছু দিন দিল্লিতে ছিলেন মাস্টারি চাকরি নিয়ে, তাঁর জীবন শুকিয়ে এসেছিল। কলকাতার কৌতুকাভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌতুক আছে, সকালবেলা ফোন গেছে একটা মেড়োর কাছে, সে কিছুতেই ভানুর কথা বুঝছে না, তাকে তিনি গালি দিচ্ছেন, ওপাশ থেকে বলছে, কী, হামকো গালি দিয়া? ভানু বলছেন, না তোমারে গালি দিব না, চুমা দিব, শালা হিন্দুস্তানি মাউড়া, বোঝে না কিছু।
আমি জাতিবৈর নই। ভাষাবৈরও নই। হিন্দি ভাষা শিখতে আমার আপত্তি নেই। আমি নিজে ‘স্বপ্ন নিয়ে’ পাতায় ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিটা দেখতে বলেছি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের। তবু নিজের সংস্কৃতি—আমাদের ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি, আমাদের রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ দাশের জন্য খুব মায়া হয়! এর আগে এই প্রথম আলোতেই আমি লিখেছি, হিন্দির সঙ্গে বাংলার লড়াইয়ে আমরা হেরে গেছি। আমি পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছি। আমাদের বানানো টিভি অনুষ্ঠান আর কেউ দেখে না। কেবল গরিব মানুষ, গ্রামগঞ্জে যেখানে স্যাটেলাইট নেই, তারা দেখে। তবু সেই সংখ্যাটা অনেক বেশি। ছয় কোটি লোক বিটিভি দেখে, এক কোটি দেখে স্যাটেলাইট। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, বাংলা ভাষাটা বাঁচায়া রাখছে কৃষক-শ্রমিক সাধারণ মানুষরা, কারণ তারা বাংলায় কথা কয়। এখন আমরা এই কৃষক-শ্রমিকদের মুখেও হিন্দি তুলে দিতে চাইছি, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক যে কৃষক-শ্রমিককে কৃতিত্ব দিয়েছেন এই ভাষাটা বাঁচায়া রাখার। যাদের হিন্দি টিভি চ্যানেল বা ভিসিআর দেখার সুযোগ নেই, তাদের জন্য কাঁধে বয়ে বয়ে হিন্দি ফিল্ম নিয়ে যাওয়ার জন্য বায়না শোনা যাচ্ছে!
কী লাভ বা ক্ষতি হবে তাতে? রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর, তখন তিনি ঢাকাই শাড়ির বিজ্ঞাপন করেন। আর যখন দিল্লি ৬ ছবিতে মাসাক কালির কথা বলা হয়, আর আমাদের ঈদের মার্কেট ভেসে যায় মাসাক কালি শাড়িতে, তখন আমরা সরাসরি ভারতীয় পোশাকের বিজ্ঞাপন করি। আজকে লেহেংগা এসে শাড়িকে প্রতিস্থাপিত করতে চায়। তাতে আমরা কেবল আমাদের সংস্কৃতির চিহ্নই হারাই না, আমরা অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হই। আমার ঢাকাই শাড়ির কারিগরটাকে বঞ্চিত করি। সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য কেবল সংস্কৃতির জন্য দরকার হয় না, সেটা অর্থনীতির জন্যও দরকার, সেটাই এই সময়ে বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্তা। নইলে বড়লোক দেশগুলো সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বানায় ও পোষে কি নিতান্তই শখে? সেদিন টেলিভিশনে শিল্পী আনুশেহ একটা অনুষ্ঠানে সরাসরি সংগীত পরিবেশন করছিলেন, অনুষ্ঠানটার নাম ছিল ‘আমার পণ্য আমার দেশ’। তাঁর মা, শিল্পী লুবনা মরিয়ম ফোন করে বললেন, ‘আমি বলব, আমার সংস্কৃতি আমার দেশ’। দুটোই সত্য। আমার পণ্যই আমার দেশ, আমার সংস্কৃতিও আমার দেশ। কথাটা যেন আমরা ভুলে না যাই।
সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, একদল মানুষ যেন বলতে চাইছে, আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণী হিন্দি ছবি দেখে, গরিব মানুষ দেখার সুযোগ পায় না, হিন্দি ছবি দেখার মৌলিক অধিকার থেকে গরিব মানুষকে বঞ্চিত রাখা রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ অন্যায়। বাংলাদেশের নির্মাতারা যদি গরিব মানুষকে ভালো ছবি দেখাতে না পারে, তাহলে আমরা কেন তাদের হিন্দি ছবি দেখতে দেব না? তারা চাইছেন, এখন একই সঙ্গে বোম্বে, মাদ্রাজ, ভুবনেশ্বর, কলকাতা, গুয়াহাটি, জয়পুর ও আগ্রার সঙ্গে ঢাকা, খুলনা, গলাচিপায় হিন্দি ছবি মুক্তি পাক। শাহরুখ খান-ঐশ্বরিয়া আসবেন তাঁদের ছবির প্রচারণার কাজে। ওই বিজ্ঞ মানুষদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, হিন্দি ছবি হচ্ছে সর্বভারতীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে উন্নত সৃষ্টি, যেটা না দেখলে মানবজনমই বৃথা! এমন মানবজনম আর কি হবে! ওরে মরার আগে সব বাঙালি প্রতি বছরে গোটা ৫২ হিন্দি ছবি দেখে নিয়ে তারপর চোখ বুজিস। নইলে মরার পরে কী বলবি, জীবনে কী দেখেছিস!
সিনেমা যে কত বড় মাধ্যম, কত শক্তিশালী মাধ্যম, বড় পর্দার প্রভাব যে কত ব্যাপক ও কত গভীর, সেটাও যদি বলে বোঝাতে হয়! এখনই ঢাকার উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে হিন্দি নাচগানের আয়োজন করে, তখন যে কী হবে! আর আনুশকা ইউসুফ তো সেটাকেই বাংলাদেশি ও বাঙালি সংস্কৃতি বলে ধরে নিয়েছেন।
বাংলাদেশের হলে হলে হিন্দি ছবি দেখানোর দাবি যাঁরা করছেন, তাঁদের যুক্তিটা আমি বোঝার চেষ্টা করছি। তাঁরা বলছেন, যেহেতু এত দিন ধরে বাংলা ছবিকে সুরক্ষা দিয়ে কোনো লাভ হয়নি, আমরা ভালো ছবি ঢাকায় নির্মিত হতে দেখিনি, কারণ বাংলা ছবিওয়ালাদের কোনো প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়নি, তাই হিন্দি ছবি আনতে হবে, তাহলে প্রতিযোগিতা হবে, তখন বাংলাদেশের ছবির নির্মাতারা হিন্দি ছবির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এমন ছবি বানাতে বাধ্য হবেন। প্রটেকশন দিয়ে যদি অন্য কোনো লাভ হয়ে না থাকে, বাংলাদেশের সংস্কৃতির চিহ্নগুলো হিন্দি সংস্কৃতির চিহ্ন দ্বারা পুরোপুরি অপসারিত হয়ে যায়নি, এই একটা লাভ তো হয়েছে। আর সূর্য দীঘল বাড়ি কি দিল তো পাগল হ্যায়-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে? মাটির ময়না প্রতিযোগিতা করবে কুচ কুচ হোতা হ্যায়-এর সঙ্গে? এটাকে প্রতিযোগিতা বলে? সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছবিগুলো আনুন—ইরান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা এমনকি ভারতের, কোনোই আপত্তি নেই, তবে তা আন্তর্জাতিক বিচারে ভালো ছবি হতে হবে এবং ভারতে হলিউডি ছবির ক্ষেত্রে যে রকম স্থানীয় ভাষায় ডাবকৃত হওয়া বাধ্যতামূলক, আমাদের দেশেও তাই করতে হবে, এই দেশে বিদেশি ছবি অবশ্যই বাংলায় ডাব করে চালাতে হবে। আর একটা প্রশ্ন, আমরা কেন হিন্দি চ্যানেলগুলোকে এই দেশের টিভিতে এমন অবাধ করে দিয়েছি, যখন ভারতে আমাদের চ্যানেলগুলো দেখানো হয় না বললেই চলে! প্রতিটা হিন্দি চ্যানেলের জন্য বাড়ি-প্রতি অন্তত পাঁচ টাকা করে কর নিলেও তো সরকারের কোষাগারে কিছু জমা হয়!
আনিসুল হক: সাহিত্যিক, সাংবাদিক।

Wednesday, March 24, 2010

এই মার্চ ওরা কীভাবে পালন করছে by আনিসুল হক

সম্প্রতি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পলান সরকারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ সুধীজন পাঠাগার এই বইপ্রেমী মানুষটাকে সংবর্ধনা ও পদক দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করে এনেছিল। সেখানেই, এই মার্চ মাসেই দেখা পলান সরকারের সঙ্গে। বর্তমানে তাঁর বয়স নাকি ৯০ বছর। পলান সরকার তাঁর এলাকার মানুষদের হেঁটে হেঁটে বই বিতরণ করেন। হাঁটেন বলেই তাঁর শরীরটা ভালো আছে। রাজশাহী থেকে ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ এসেছেন, দিব্যি কথাবার্তা-চলাফেরায় বলিষ্ঠতা আছে।
একজন ৯০ বছরের মানুষ দিব্যি চলতে-ফিরতে পারছেন, দেখে ভালো লাগে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি বেঁচে থাকতেন, তাঁর বয়সও ৯০ বছর হতো। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছিল। এ বছর ১৭ মার্চ ছিল সরকারি ছুটির দিন। ১৭ মার্চের পত্রপত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ তাঁর জন্মদিনের খবর ছিল। ১৮ মার্চের পত্রিকায় ছিল তাঁর জন্মদিন পালনের খবর।
কিন্তু জন্মদিনের খবরের পাশেই ছিল ছাত্রলীগের আরও কিছু খবর। ১৭ মার্চের সংবাদপত্রের শিরোনাম: ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের দুই পক্ষে সংঘর্ষ। আহত ১০। ১০ জন আটক। ওই দিনের সব কাগজে ছিল আরেকটা খবর: এবার প্রথম হয়ে কাঁদালেন বকর। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলে আহত হয়েছিলেন আবু বকর। ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। তিনি কোনো দল করতেন না। নিম্নবিত্ত ঘরের এই ছেলের সাধনা ছিল লেখাপড়া। জীবনটা ছিল ঘামঝরা পরিশ্রমের। তিনি মারা গেছেন। এবার বেরিয়েছে তাঁর পরীক্ষার ফল। আবু বকর প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। ১৮ মার্চ তারিখের সংবাদপত্র আকীর্ণ ছিল ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সংঘর্ষ আর ৫৮ জন কর্মী গ্রেপ্তারের খবরে। প্রথম আলো আরেকটা খবরে ওই দিন লিখেছে: প্রান্ত থেকে কেন্দ্র একই অবস্থায় ছাত্রলীগ। ‘ইডেন কলেজে ভর্তি-বাণিজ্য, যশোর জেলা সম্মেলনে গুলি-বোমা, হবিগঞ্জে পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠন, ঢাকা কলেজে সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে আবারও উল্টো পথে ছাত্রলীগ।’ যশোরে ছাত্রলীগের নেতা হত্যা সম্পর্কিত খবরের বলা হয়েছে, ‘জড়িত পাঁচ ভাড়াটে খুনি, আ.লীগের দুই পক্ষ একে অপরকে দুষছে।’ ১২ মার্চের প্রথম আলোর খবর, চট্টগ্রাম মেডিকেল, দালালদের দৌরাত্ম্যের পেছনে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি। সারা দেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রলীগ নামধারীরা যা করছে, এই কটা খবর তার সামান্য নিদর্শন মাত্র। এবং এই যে ছাত্রলীগের কোন্দল, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, তার পেছনে আছে চাঁদাবাজি, ভর্তি-বাণিজ্য অর্থাৎ টাকার খেলা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে এই দুষ্কর্মগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই, বরং আছে দুস্তর ব্যবধান।
মার্চ মাস বঙ্গবন্ধুর জন্মমাস। মার্চ মাস বাংলাদেশেরও জন্মমাস। স্বাধীনতার মাস মার্চে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি বলে গণ্য ছাত্রলীগাররা, আওয়ামী লীগাররা যদি পত্রপত্রিকার পাতাকে দুঃসংবাদে কণ্টকিত-রক্তাক্ত করে রাখে, সেই দুঃখ কোথায় রাখি?
এসব খবর পড়ে মনটা ভীষণ দমে যায়। বেশ কিছুদিন আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন ছাত্রলীগের নেতা নিহত হয়েছিলেন সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে, তার পেছনে ছিল মেডিকেল হাসপাতাল চত্বরে চাঁদাবাজির লাখ লাখ টাকার নিয়ন্ত্রণের লড়াই। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় খবরের কাগজের শিরোনাম হয়ে এসেছে, ক্যান্টিনের ইজারাদারের কাছে চাঁদা দাবি করায় ক্যান্টিন বন্ধ। কারা দাবি করেছে? ছাত্রলীগের নেতারা। আমি নিজে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। সেও যে খুব বেশি দিন আগে, তা নয়। আমাদের সময় এটা তো আমাদের চিন্তারও অতীত ছিল যে কেউ ক্যান্টিনের ম্যানেজারের কাছে গিয়ে চাঁদা দাবি করবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররা, তারা কেন এই রকম অবৈধ আয়ের পেছনে ছুটবে। রাজনীতি আমাদের কালে আমরা করতাম আদর্শের জন্য, একটা সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার বড় স্বপ্ন আমাদের ছাত্রকর্মী ও নেতাদের চোখমুখে টগবগ করত, একে মেরে ওকে ধরে দুটো টাকা পকেটে পোরার কথা তখন ছিল অকল্পনীয়।
এরা এতটা বিপথগামীই বা কেন হলো? আর এরা এতটা আশ্রয়-প্রশ্রয়ই বা পাচ্ছে কোথা থেকে? আমি বিশ্বাস করি না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চান যে সারা দেশে ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের কর্মীরা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, গুণ্ডামিতে জড়িয়ে পড়ুক। পত্রিকান্তরে পড়লাম, আওয়ামী লীগের নেতা ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ছাত্রলীগের এই দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পেছনে আছে বড় আওয়ামী লীগের নেতা ও কোনো কোনো মন্ত্রীর ইন্ধন। হায় হায়, এটা কী শুনলাম! অবশ্য খুব যে বিস্ময়কর খবর এটা, তা নয়। অতীতে এসব কাণ্ড এই দেশে বহু ঘটেছে। সেই রেওয়াজই চলছে আসলে। দিনবদল খুব সহজ কাজ নয়। এসব চাঁদাবাজি থেকে হাতবদল হয় লাখ লাখ টাকা, আর তার বখরা নাকি বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছায়।
মার্চ মাসে এসব খবর পড়তে ভালো লাগে না। টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারিত হচ্ছে। সাতই মার্চের ভাষণ যতবার প্রচারিত হয়, ততবারই থমকে দাঁড়াই। এতবার শোনা হলো, এত দিন পরও শরীর রোমাঞ্চিত হয়। কী এক মহান নেতাই না আমরা পেয়েছিলাম আমাদের ইতিহাসে! আজকে যারা হাঙ্গামা, চাঁদাবাজি, খুনোখুনি করে বেড়াচ্ছে, তাদের মুখে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণও কি বেমানান নয়?
বারবার মনে পড়ে বঙ্গবন্ধুর লেখা একটা চিঠির কথা। ১৯৫৮ সালের নভেম্বর মাসে শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা কারাগার থেকে এই চিঠিটা লিখেছিলেন তাঁর আব্বাকে। আইয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেছেন, সামরিক আইন জারি করা হয়েছে, দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতার নামে নানা ধরনের মামলা করা হচ্ছে। বেশির ভাগ নেতাই তখন কারাবন্দী। শেখ মুজিবুর রহমানের নামেও একটা দুর্নীতির মামলা করা হয়েছিল। চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। পরে আদালতের রায়ে শেখ মুজিব বেকসুর খালাস পান। ওই মামলা দেওয়ার পরে শেখ মুজিব তাঁর বাবাকে এই চিঠিটা লিখেছিলেন।
চিঠিটা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল, তাই এখনো সরকারি আর্কাইভে রয়ে গেছে।
ঢাকা জেল, ১২-১১-৫৮

আব্বা,
আমার ভক্তিপূর্ণ ছালাম গ্রহণ করবেন ও মাকে দিবেন। মা এবার খুব কষ্ট পেয়েছিলেন, কারণ এবার তাঁর সামনেই আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল। দোয়া করবেন মিথ্যা মামলায় আমার কিছুই করতে পারবে না। আমাকে ডাকাতি মামলার আসামিও একবার করেছিল। আল্লাহ আছে, সত্যের জয় হবেই। আপনি জানেন, বাসায় কিছুই নাই। দয়া করে ছেলেমেয়েদের দিকে খেয়াল রাখবেন। বাড়ি যেতে বলে দিতাম। কিন্তু ওদের লেখাপড়া নষ্ট হয়ে যাবে। আমাকে আবার রাজবন্দী করেছে, দরকার ছিল না। কারণ রাজনীতি আর নাই এবং আর রাজনীতি করব না। সরকার অনুমতি দিলেও করব না। যে দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে আমি ঘুষ খেতে পারি, সে দেশে কাজই করা উচিত না। এ দেশে ত্যাগ ও সাধনার কোনো দামই নাই। যদি কোনো দিন জেল হতে বের হতে পারি, তবে কোনো কিছু একটা করে ছেলেমেয়ে ও আপনাদের নিয়ে ভালোভাবে সংসার করব। নিজেও কষ্ট করেছি, আপনাদেরও দিয়েছি। বাড়ির সকলকে আমার ছালাম দিবেন। দোয়া করতে বলবেন। আপনার ও মায়ের শরীরের প্রতি যত্ন নিবেন। চিন্তা করে মন খারাপ করবেন না। মাকে কাঁদতে নিষেধ করবেন। আমি ভালো আছি।
আপনার স্নেহের মুজিব
শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ঝানু গোয়েন্দারা এর আগে অনেকবার কারাগারের ভেতরে চাপ দিয়েছেন, আর রাজনীতি করব না, এই মুচলেকায় সই করলে মুক্তি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছেন, কোনো দিনই তাঁকে নোয়াতে পারেননি। এই সরকারি গোয়েন্দারা তাঁদের প্রতিবেদনে বলেছেন, এই বন্দীর মনোবল খুব দৃঢ়, তাঁকে বশীভূত করা যায় না। সেই ইস্পাতদৃঢ় মানুষটা এই চিঠিতে কত অভিমানই না প্রকাশ করেছেন! কেন? হয়তো কারও কাছে শুনেছেন, কেউ বিশ্বাস করেছে যে শেখ মুজিব ঘুষ গ্রহণ করতে পারেন। যে দেশের মানুষ এ কথা বিশ্বাস করতে পারে, সেই দেশে তিনি রাজনীতি করতে চান না। কারণ তিনি সারাটা জীবন তো আত্মত্যাগ আর স্বার্থত্যাগই করেছেন।
সেই বঙ্গবন্ধুর নামে জয়ধ্বনি দিয়ে, সেই শেখ মুজিবের ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে চারদিকে এরা কী করছে? আর সেসব খবর পড়তে হচ্ছে ১৭ মার্চের সংবাদপত্রে? ১৮ মার্চের সংবাদপত্রে?
এর প্রতিবিধান কে করবে? শেখ হাসিনাকেই নির্দেশনা দিতে হবে। ছাত্রলীগকে অবশ্যই শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। ছাত্রদের সামনে অবশ্যই নগদ চাঁদার লোভ নয়, মহত্তর মানবিক স্বপ্ন ও আদর্শ তুলে ধরতে হবে, তাদের ব্যাপৃত করতে হবে দেশগড়ার কোনো একটা কর্মযজ্ঞে। মন্ত্রী, এমপি, নেতা, যুবনেতা, ছাত্রনেতা, তাঁদের আত্মীয়-পরিজন-ক্যাডারদের সংযত করতে হবে, আইনকানুনের আওতায় রাখতে হবে। দলীয়করণ, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ-বাণিজ্য-টেন্ডার প্রদান ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে। এটা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদাও বটে।
দেশে অনেক সমস্যা। গরম বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎ-সংকট, পানিসংকট। জনশক্তি রপ্তানির হার কমছে। দেশে বিনিয়োগ কম। বেকার সমস্যা প্রকট। তবু বলব, সরকার আওয়ামী লীগ খারাপ চালায় না। এবং আওয়ামী লীগের সরকারের নীতি ও পদক্ষেপের মধ্যে গ্রাম, কৃষক, গরিব মানুষ, খেটেখাওয়া মানুষের প্রতি পক্ষপাতও প্রকাশ পায়। এসবই ভালো। কিন্তু আওয়ামী লীগের সমস্যা তার আচরণে। দেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয় এই আচরণের অতি-আচারে। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দল-কর্মী-নেতাদের আচরণে লাগাম টেনে ধরার কাজটাও একটা বড় কাজ। এবং খুবই জরুরি কাজ। এটা কেবল প্রশাসনিক বা পুলিশি পদক্ষেপ দিয়ে সম্ভব নয়, এটা করতে হবে একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে। সরকারি দলের সেই রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই, সে ব্যাপারে কোনো উপলব্ধি নেই, কোনো গরজ নেই, এটাকে তারা প্রয়োজন বলে আদৌ মনেও করে কি না সন্দেহ। এ রকম চলতে থাকলে দল ও তার অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনগুলোর কারণেই সরকার দ্রুত তার জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলবে। দল সরকারের জন্য সম্পদ না হয়ে হয়ে উঠবে বিপদ। মার্চ মাসের সংবাদপত্রের পাতাগুলো সেই বিপদের সংকেতই যেন ঘোষণা করছে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।