Saturday, October 17, 2015

ফিলিস্তিনি-ইসরাইলি সহিংসতা : শান্ত থাকার আহবান ওবামার

ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনীদের মধ্যে ভয়াবহ সহিংসতা শুক্রবার আরো বেড়েছে। এদিন পশ্চিম তীরে ইহুদিদের একটি পবিত্র স্থানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এতে ‘খুবই উদ্বিগ্ন’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উভয়পক্ষকে শান্ত থাকার আহবান জানিয়েছেন।
দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা সহিংসতার কারণে পুরো মাত্রায় অভ্যুত্থানের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং ওবামা ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি নেতাদের উস্কানিমূলক বাগাড়ম্বর বন্ধের আহবান জানিয়েছেন।
পশ্চিম তীরের নাবলুসে জোসেফের সমাধিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘শুক্রবার বিপ্লবের’ ডাক দেয়। এদিকে গাজা উপত্যাকার সীমান্ত বরাবর সংঘর্ষ হয়েছে। ইসরাইলিদের গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত ও ৯৮ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে নাবলুসের কাছে বেইত ফুরিকে সংঘর্ষে আরো এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া পশ্চিম তীরে এক ইহুদি স্থাপনার বাইরে এক আলোকচিত্রীর ছদ্মবেশে এক ফিলিস্তিনি এক ইসরাইলি সৈন্যকে ছুরিকাঘাত করে আহত করে। অবশ্য ওই ফিলিস্তিনি পরে গুলিতে নিহত হন।
সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৩৭ ফিলিস্তিনি ও সাত ইসরাইলি নিহত এবং বেশ কয়েকজন ইসরাইলি ও কয়েকশ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।
১৯৮৭-১৯৯৩ ও ২০০০-২০০৫ সালের ফিলিস্তিনি অভ্যুত্থানের সময় প্রায় প্রতিদিনের সংঘর্ষে কয়েক হাজার লোক নিহত ও আরো অনেকে আহত হন। জেরুজালেম ও ইসরাইলে দুই সপ্তাহের হামলার পর জেরুজালেমে ব্যাপকভাবে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস জোসেফের সমাধিতে অগ্নিসংযোগের দ্রুত নিন্দা জানিয়েছেন। মাহমুদ আব্বাসের সাম্প্রতিক কয়েকটি মন্তব্য সহিংসতায় উস্কানি হিসেবে কাজ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে তার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জোসেফের সমাধি ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেখানে ইসরাইলিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আছে। শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর এস্কর্টে ওই সমাধি পরিদর্শন করতে পারে ইসরাইলিরা।
ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে ওবামা বলেন, ‘সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার খবরে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এবং ক্ষমতাধর পদে থাকা ব্যক্তিদের উস্কানিমূলক বাগাড়ম্বর যা সহিংসতা, ক্ষোভ ও ভুল বোঝাবোঝি বাড়াতে পারে সেগুলো বাদ দেয়া গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘ইসরাইল ও ফিলিস্তিন যদি শান্তি ও নিরাপদে পাশাপাশি বসবাস করতে চায়, তাহলে ইসরাইলকে সত্যিকারের নিরাপদ করে গড়ে তুলতে হবে এবং ফিলিস্তিনকে তাদের জনগণের আকাক্ষা পূরণ করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, এই মুহূর্তে নিরাপরাধ লোক যাতে মারা না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি সাম্প্রতিক সহিংসতা বন্ধের সর্বোত্তম উপায় নিয়ে আলোচনার জন্য নেতানিয়াহুর প্রতি আহবান জানিয়েছেন এবং অবিলম্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার প্রস্তাব দেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলে কর্মকর্তারা জানান, নেতানিয়াহু ও কেরি আগামী সপ্তাহে বার্লিনে বৈঠকের পরিকল্পনা করছেন। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

নূরকে ফেরত দিচ্ছে ভারত

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন ভারতের একটি আদালত। শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত বিচারিক হাকিমের আদালত এ আদেশ দেন। বারাসাতের ভারপ্রাপ্ত জেলা দায়রা বিচারক সন্দীপ চক্রবর্তীর আতদালত শুনানি শেষে রায়ে বলেন, ‘আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বন্দি প্রত্যপর্ণ চুক্তি অনুযায়ী নূর হোসেনকে ফেরত দিতে হবে।’ ১৬ ডিসেম্বর গোটা প্রক্রিয়াটি নিয়ে আদালতে রিপোর্ট দেয়ার আদেশও দেন আদালত। আদালতের ওই নির্দেশের পর ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে নূর হোসনকে নারায়ণগঞ্জের সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করা হচ্ছে- এখন এটা একরকম নিশ্চিত করেই বলা যায়। এর আগে বাংলাদেশের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেছিল ভারত সরকার।
নূর হোসেনকে ফিরিয়ে দেয়া বারাসাত আদালতের নির্দেশের খবর শুক্রবার বিকালে পেয়েছে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছে, ‘নূরকে হাতে পেলেই সাত খুনের মামলার তদন্তে নতুন মোড় নেবে। মিলবে অনেক অজানা তথ্য। এদিকে নূর হোসেনকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে- এমন খবরে পুরো নারায়ণগঞ্জে আলোচনার ঝড় বইছে। বিশেষ করে নূর হোসেনের নিজ এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জে চলছে সাত খুন আর নূরের উত্থান-পতন নিয়ে নানা মুখরোচক আলোচনা। নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাত খুনের ঘটনায় নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শুক্রবার রাতে টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কয়েক দফা চিঠিও দেয়া হয়েছে। তবে আজই (শুক্রবার) ভারতের আদালতে তাকে ফিরিয়ে দিতে আদেশ দিয়েছেন। এখনও ভারত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, ভারত সরকার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানাবে। সেখান থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘নোট ভারবাল’ পাঠানো হবে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
যুগান্তরের কলকাতা প্রতিনিধি কৃষ্ণকুমার দাস জানান, নারায়ণগঞ্জ সাত খুনের মামলার আসামি নূর হোসেনকে শুক্রবার বারাসাত বিচারিক হাকিমের আদালতে হাজির করা হয়নি। তবে আদালতে হাজির করা না হলেও এদিন সরকারি আইনজীবীর আবেদনক্রমে নূর হোসেনের ওপর থেকে বিদেশী অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪ ধারার মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। তবে বিচারক সাত খুনের মামলার আসামি নূর হোসেনের ওপর থেকে মামলা প্রত্যাহার করলেও জামিনে থাকা তার অন্য দুই সহযোগী খান সুমন ও ওয়াদুল জামাল শামিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ বহাল রয়েছে।
বিচারকের রায়ের পর সরকারি আইনজীবী বিকাশরঞ্জন দে জানান, ‘বাংলাদেশ সরকারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকারের নির্দেশে শুধু নূর হোসেনের মামলা প্রত্যাহার করে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা হল।’ তবে এদিন রায়ের সময় বিএসএফ না পুলিশের মাধ্যমে নূর হোসেনকে ফেরত পাঠাতে হবে সে বিষয়টি বিচারক স্পষ্ট করেননি। তবে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলোচনা করেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।
ওই আইনজীবী বলেন, বাংলাদেশ সরকার যদিও দ্রুত নূর হোসেনকে হাতে পেতে চাইছে। তবে শনিবার থেকেই পশ্চিমবঙ্গে ১০ দিনের পুজোর ছুটি শুরু হয়েছে। ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি কাজকর্ম বন্ধ। তাই কিভাবে নূর হোসনকে প্রত্যপর্ণ করা হবে তা নিয়ে একটু জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা চাইলে বিশেষ মামলা হিসেবে নূর হোসেনকে পুজোর ছুটির মধ্যেও হস্তান্তর করতে পারেন। তবে আদালতে নির্দেশনা অনুযায়ী দুই মাসের মধ্যেই (১৫ ডিসেম্বর) নূর হোসেনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে হবে। ২০১৪ সালের ১৫ জুন গ্রেফতারের ১৪ দিন পর থেকেই দমদম জেলে বন্দি রয়েছেন বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি রাজু আহমেদ জানান, নূর হোসেনকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে- এমন সংবাদে পুরো নারায়ণগঞ্জেই চলছে আলোচনার ঝড়। বিশেষ করে নূরের নিজ এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জে চলছে সাত খুন আর নূরের উত্থান-পতন নিয়ে নানা মুখরোচক আলোচনা।
কে এই নূর হোসেন : নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ছিলেন নূর হোসেন। কিন্তু এলাকার লোকের কাছে তিনি এখনও হোসেন চেয়ারম্যান নামে পরিচিত। ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। মূলত সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ায় তার পরিচয় হয় হোসেন চেয়ারম্যান হিসেবে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউপি চেয়ারম্যান থাকাকালে এলাকার স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি, রাস্তায় ইট বিছানোর নামে পরিষদের তহবিল তছরুপ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পাঠানো অর্থ ও ত্রাণসামগ্রীর আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এজন্য অন্তত অর্ধশতবার তদন্ত হয়েছে। তদন্তে অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। তাতে অবশ্য কিছুই হয়নি নূর হোসেনের।
যেভাবে উত্থান : স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ১৯৮৫ বা ১৯৮৬ সালের ঘটনা। সিদ্ধিরগঞ্জ পুল এলাকায় ইকবাল গ্রুপের ট্রাকের হেলপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন নূর হোসেন। পরে গাড়ি চালনা শিখে একটি গ্রুপে চাকরি করেছেন। ১৯৮৮ সালের দিকে শিমরাইলে আন্তঃজেলা ট্রাকচালক শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রম চালু করেন দাইমুদ্দিন নামের এক ট্রাক ড্রাইভার। তার হাত ধরেই নূর হোসেন হেলপার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ইকবাল গ্রুপে। ১৯৮৯ সালের দিকে দাইমুদ্দিনকে বের করে দিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের দখল নেন নূর হোসেন। যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। কিন্তু ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে হয়ে যান বিএনপির নেতা। গঠন করেন সন্ত্রাসী বাহিনী। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নূর হোসেন চলে আসেন আওয়ামী লীগের বলয়ে।
১৭ বছরের বিরোধেই সাত খুন : গডফাদার নূর হোসেনের সঙ্গে নিহত (সাত খুনের একজন) প্যানেল মেয়র নজরুলের কোন্দল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে অনেক হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছেন সিদ্ধিরগঞ্জের মানুষ। নজরুল ও হোসেনের কোন্দলের সূত্রপাত সেই ১৯৯৭ সালের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়ে। দু’জনই ছিলেন ওই নির্বাচনের চেয়ারম্যান প্রার্থী। ওই নির্বাচনে দুটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত হলে নূর হোসেন গ্রেফতার হয়ে ৭ দিন কারাভোগ করেন। এরপর হাইকোর্টের নির্দেশে ফের ভোট গ্রহণ হলে জয়ী হন নূর হোসেন। এরপর দু’জনই দু’জনকে মেরে ফেলতে কয়েক দফায় আক্রমণ চালিয়েছেন কিলার দিয়ে। ১৯৯৮ সালে নজরুলের কিলারের গুলিতে আহত হয়েছিলেন নূর হোসেন। ওই যাত্রায় বেঁচে গিয়ে ২০০০ সালে নূর হোসেনও স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসে নজরুল ইসলামের ওপর হামলা চালায় হোসেনের ক্যাডার বাহিনী। ওই ঘটনায় মতিন নামে এক যুবক নিহত হন। গত ১৭ বছরে দু’জন দু’জনার এলাকায় প্রবেশ না করলেও ২০১২ সালে নজরুল ইসলামের আয়োজনে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়ে হাজির হয়েছিলেন নূর হোসেন। যদিও একই বছর নূর হোসেনের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে ছিলেন না নজরুল ইসলাম। আর এই বিরোধের শেষ পরিণতি ছিল ৭ খুনের ঘটনা।
সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে হোসেন চিশতী সিপলু জানান, ভারতে কারাবন্দি সেভেন মার্ডার মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের আদালতের নির্দেশনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনরা। পাশাপাশি তারা নূর হোসেনকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন।
ওই ঘটনায় নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের ছোট ভাই মিজানুর রহমান রিপন বলেছেন, নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর তার কণ্ঠেই আমরা শুনতে চাই, কারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। নেপথ্যে কারা কাজ করেছে। কী কারণে সাতজনকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনাটি আড়াল করতে নূর হোসেনকে মেরেও ফেলা হতে পারে বলে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। ৩০ এপ্রিল বিকালে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার ১১ মাস পর গত ৮ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সংস্থা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দুটি মামলায় নূর হোসেন, তিন র‌্যাব কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়। এদের মধ্যে ২২ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছে। আর ওই মামলায় নূর হোসেনসহ ১৩ জন পলাতক আছেন। তবে নূর হোসেন ও তার দুই সঙ্গী গত বছর ১৪ জুন কলকাতা বিমানবন্দরের কাছে কৈখালী থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ: আইএস বনাম জামায়াত-শিবির by মইনুল ইসলাম

বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গি আছে কি নেই, তা নিয়ে একটা বেফজুল বিতর্ক চলছে। যত দিন জামায়াত-শিবিরের কিলিং স্কোয়াড এ দেশে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে, তত দিন জঙ্গিবাদ বহাল তবিয়তেই থাকবে। এই সত্যটা মেনে নিলে এই বেফজুল বিতর্কটা যে অর্থহীন, তা বুঝতে অসুবিধা হবে না। বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের ২০১৩-১৪ সালের আন্দোলনে ধ্বংসাত্মক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং জামায়াত-শিবিরের কথিত ‘গৃহযুদ্ধের’ ঘোষণা জাতি নিশ্চয়ই ভোলেনি। ২০১৫ সালের প্রথম ৯২ দিন আবারও বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের মানুষ পোড়ানোর তাণ্ডব আমাদের দেখতে হয়েছে।
তারপর গত ছয় মাস তাদের রহস্যজনক নীরবতা দেখে কেউ যদি ভেবে থাকেন যে জামায়াত-শিবির তাদের কৌশল পাল্টেছে, তবে মারাত্মক ভুল হবে। কারণ, তারা শক্তি সঞ্চয়ের জন্যই এই ছয় মাস তাদের কর্মকাণ্ড কিছুটা কমিয়ে দিয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি জোরদার করেছে। জামায়াত নেতাদের ফাঁসির রায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় দলটির প্রকাশ্য তৎপরতা কমে যায়। গত ছয় মাসে বিএনপির যাবতীয় নর্তন-কুর্দন-আন্দোলন-সংগ্রাম যে মাঠে মারা গেছে, তা এত দিনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। অতএব, ক্ষমতাসীন জোটের সাময়িক জয় হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি তাণ্ডবের ওপর ভর করে মহাজোট সরকারকে উৎখাতের যে খোয়াব দেখেছিলেন, তা আপাতত ভেস্তে গেছে।
কিন্তু যখন আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় বাস্তবায়নের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে, তখন জামায়াত-শিবিরের ‘গৃহযুদ্ধ’ও যে আবার পুরোদমে চাঙা হবে, তাতে সন্দেহ নেই। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সের গোয়েন্দা এজেন্সিগুলোর কাছে জামায়াত-শিবিরের এই আসন্ন তাণ্ডবের অশনিসংকেত ঠিকই পৌঁছে গেছে এবং ওই সংকেত পেয়েই অস্ট্রেলিয়া তাদের ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর নিরাপত্তার আশঙ্কায় স্থগিত করেছে। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকাও তাদের নারী ক্রিকেট দলের সফর বাতিল করেছে।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফর চলাকালে একজন নিরীহ ইতালীয় নাগরিক সিজার তাবেলাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে বিশ্বের প্রচারমাধ্যমগুলোতে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছে ঘাতক বাহিনী। আর আইএসের নামে ত্বরিতগতিতে ওই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র বলে মার্কা মেরে দিয়েছে তারা। এর কয়েক দিন যেতে না যেতেই রংপুরে নিহত হলেন জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি। এই দুজন নিরীহ, নির্বিরোধী এবং এ দেশের জনগণের উন্নয়ন প্রয়াসে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিকে হত্যা করা যে কত পৈশাচিক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আসলে এই দুটো হত্যাকাণ্ডের জন্য যতই আইএস জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হোক না কেন, এই হত্যাকাণ্ডগুলো জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব পুনরারম্ভের আলামতই তুলে ধরছে। আমার মনে হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যতই এগিয়ে আসবে, ততই দলটির তাণ্ডব জনজীবনকে পর্যুদস্ত করে দিতে চাইবে। প্রধানমন্ত্রীও বিদেশভ্রমণ থেকে ফিরে তাঁর সংবাদ সম্মেলনে এ আশঙ্কাই ব্যক্ত করেছেন।
বিগত ছয় মাস রাজনৈতিক অঙ্গনে যে তুলনামূলক স্থিতি বিরাজ করছিল, তাতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কিছুটা স্বস্তি অনুভব করতে পারেন। আমার আশঙ্কা, অচিরেই আবার পূর্ণোদ্যমে জামায়াত-শিবির মাঠে নামবে, দেশের সংঘাতমূলক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আবার বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। এই অবস্থাকে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহরিয়ার কবির গত বছর ‘টম অ্যান্ড জেরি শো’ অভিহিত করে হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে তারা খুনখারাবি শুরু করে দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী মহোদয়। মাঝেমধ্যে মন্ত্রীরা জামায়াত-শিবিরের ব্যাপারে গরম-গরম কথা বললেও এদের যে নিষিদ্ধ করা হবে না, সেটা বোঝা যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস, জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ না করে একটা ঐতিহাসিক ভুল করছে ক্ষমতাসীন জোট। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে জামায়াত-শিবির আজও স্বীকার করেনি। পাকিস্তানের দখলদার সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দলের পূর্বসূরি জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মী-ক্যাডাররা যে গণহত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগ-ধর্মান্তরিতকরণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল, তার জন্য এখনো তারা অনুশোচনা করেনি, জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনাও করেনি। তাই এই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির এ দেশে রাজনীতি করার অধিকার আছে বলে মনে করি না। এদের সঙ্গে ‘টম অ্যান্ড জেরি শো’ খেলাও মহাবিপদ ডেকে আনবে বলে মনে করি।
দেশবাসীকে আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই, জামায়াত-শিবির একটি ফ্যাসিবাদী সংগঠন। তারা ধর্মকে পুঁজি করে এ দেশের রাজনীতিতে সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলের উন্মত্ত ও প্রাণঘাতী অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় হওয়ার পর টিভি ক্যামেরার সামনে সাংবাদিকদের উদ্দেশে জামায়াতের একাধিক নেতা দম্ভভরে এই ‘গৃহযুদ্ধ’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। (এই হুমকির দায়ে ২০১৩ সালের ৯ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াতের নেতা রফিকুল ইসলাম খান ও সাংসদ হামিদুর রহমান আযাদকে তিন মাসের কারাদণ্ড ও তিন হাজার টাকা জরিমানা করেছিলেন। সূত্র: প্রথম আলো, ১০ জুন, ২০১৩)।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একটি সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছেন: জামায়াত-শিবির আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী মৌলবাদী সংগঠনের বাংলাদেশি চ্যাপ্টার। মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড, ইন্দোনেশিয়ার জামাহ ইসলামিয়া, পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী, আফগানিস্তানের তালেবান, সৌদি আরব ও আফগানিস্তান থেকে উত্থিত আল-কায়েদা, সাম্প্রতিক কালের ইরাক ও সিরিয়ায় ‘ইসলামিক স্টেট’ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধরত ও ভিডিও ক্যামেরার সামনে মানুষের শিরশ্ছেদ বা মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো নারকীয় নিষ্ঠুরতার জন্মদাতা আইএস, আফ্রিকার আল-শাবাব ও বোকো হারাম—এগুলোর যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, সেটাই জামায়াত-শিবিরেরও অভিন্ন নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে জেএমবি, হুজি, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), আনসারুল্লাহ, হিযবুত তাহ্রীর, হিযবুত তাওহীদ, আল-কায়েদা ইন্ডিয়ান কমান্ড, তালেবান দক্ষিণ এশিয়া কমান্ড ও এবারের আইএস—এ ধরনের হরেক কিসিমের নাম নিয়ে একেক সময় একেক জঙ্গিগোষ্ঠীর যে তাণ্ডব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে, সেগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন সংগঠনের আলাদা আলাদা অপারেশন হিসেবে বিবেচনা করা হলে মারাত্মক ভুল হবে।
এগুলো একই বৃক্ষের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বৈ তো নয়, কথায় বলে, ‘রসুনের কোয়া অনেকগুলো হলেও গোড়া একটাই’! প্রয়োজনমাফিক এসব ‘পকেট সংগঠনের’ জন্ম দিতেই থাকবে জামায়াত-শিবির ও তাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরই যাবতীয় জঙ্গি সংগঠন ও জঙ্গিগোষ্ঠীর সূতিকাগার। অতএব যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে জামায়াত-শিবিরকে মডারেট মুসলিম রাজনৈতিক দলের ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে এর পক্ষে ওকালতি করে, তখন আমাদের সাবধান হতে হবে। মনে রাখতে হবে, জামায়াতে ইসলামীর জন্মই হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে। আর আমেরিকার সিআইএ জামায়াত-শিবিরকে আশির দশকে আফগানিস্তানে সরাসরি ব্যবহার করেছে। তালেবানও সৃষ্টি করেছে পাকিস্তানের আইএসআই। এমনকি আইএসকেও যুক্তরাষ্ট্রই সৃষ্টি করেছে। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত এদের মদদদাতা।
এটা পরিষ্কার যে বিদেশি হত্যার মাধ্যমে দেশে আবারও ‘গৃহযুদ্ধ’ শুরু করার পাঁয়তারা চলছে। প্রতিপক্ষের হাত-পায়ের রগ কাটা বা হাতের কবজি কেটে নেওয়া, কাটা কবজি ছুরির আগায় গেঁথে বিজয় মিছিল করা, গলা কেটে মানুষ খুন করা, পুলিশের কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে নেওয়া, ফ্লাইং কিক মারা, বোমা বানানো, গ্রেনেড ছুড়ে শত শত মানুষকে খুন-জখম করা, দেশের ৬৫টি স্থানে একই সঙ্গে বোমা ফাটানো, রেলের ফিশপ্লেট অপসারণ করে ট্রেন লাইনচ্যুত করা, ট্রেনের বগি পোড়ানো, হাজার হাজার গাছ নির্বিচারে ধ্বংস করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ব্রাশফায়ার করা কিংবা শিক্ষক বাসে বোমাবাজি করে শিক্ষকদের জখম করা, বাসে পেট্রলবোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে মারা—এসব বর্বরতার রেকর্ড জামায়াত–শিবির, বিএনপি ও তাদের সহযোগীরা সৃষ্টি করেছে। এসব কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে জামায়াত–শিবির ক্যাডারদের পদোন্নতি মেলে, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি হয়, সুযোগ-সুবিধা বাড়ে। গ্রেপ্তার হলে পরিবারের দেখভাল করা হয়, বাজার পর্যন্ত করে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। মামলা চালানোর পুরো খরচ বহন করা হয়। কোনো ক্যাডার নিহত হলে পরিবারকে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, আহত হলেও চিকিৎসার খরচ ও ভাতা দেওয়া হয়। মানে এটা পুরোদস্তুর একটা সিভিল বাহিনী।
আওয়ামী লীগ যদি এহেন একটি বিপজ্জনক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনকে শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেয়, তাহলে তাদের কপালে দুঃখ আছে, জাতির কপালেও দুঃখ আছে। আমি আবারও বলছি, এই ঘাতক অপশক্তিকে এ দেশের রাজনীতি থেকে উৎখাত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করার বিকল্প নেই।
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সিরিয়ায় বাশারের পক্ষে সেনা পাঠাচ্ছে ইরান!

দামেস্কের জোবার এলাকায় বিদ্রোহীদের অবস্থানে সরকারি
বাহিনীর বোমাবর্ষণের পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। এএফপি
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষে লড়াই করতে দেশটিতে সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে ইরান। দামেস্ক অনুরোধ করলেই সেনা পাঠাবে তেহরান। ইরান ইতিমধ্যে সিরিয়া এবং ইরাকে অস্ত্র ও সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সিরিয়া সফরের সময় ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এসব কথা বলেন। খবর এএফপির। রাশিয়ার পর ইরানই সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশারের সবচেয়ে বড় মিত্র। রাশিয়া ইতিমধ্যে বাশারের পক্ষে সিরিয়ায় অভিযান শুরু করেছে। বিভিন্ন সময় ইরানের বিরুদ্ধে গোপনে সিরিয়ায় সেনা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম পাঠানোর অভিযোগ উঠলেও গতকালের মতো সরাসরি বক্তব্য এর আগে ইরান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কখনোই আসেনি। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান আলাদিন বোরোউজার্দি গতকাল বলেন, ‘সিরিয়া যদি সেনা চেয়ে অনুরোধ জানায়, তাহলে আমরা সেই অনুরোধ বিবেচনা করব এবং একটা সিদ্ধান্ত নেব।’ তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ব্যাপারে আন্তরিক। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সিরিয়া ও ইরাকে অস্ত্র সরবরাহ করেছি এবং সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছি।’ মস্কোর অভিযানের কথা উল্লেখ করে আলাদিন বোরোউজার্দি বলেন, সিরিয়ায় চলমান ‘সামরিক অভিযান’ দেশটিতে ‘একটি রাজনৈতিক সমাধান ও শান্তি প্রতিষ্ঠার’ প্রতি সমর্থন জানাতেই পরিচালিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেও দেশটি সিরিয়ায় ব্যর্থ হয়েছে।
সিরিয়ার সামরিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হাজার হাজার ইরানি সেনা যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়ে সিরিয়ার লাতাকিয়ায় সামরিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছে। তারা তেহরান-সমর্থিত লেবাননের কট্টরপন্থী সংগঠন হিজবুল্লাহর সঙ্গে এক হয়ে প্রেসিডেন্ট বাশারের শক্তি বৃদ্ধি করবে। হোমস শহরে ফের অভিযান: রাশিয়ার বিমান হামলার সহায়তা নিয়ে হোমস প্রদেশে গতকাল নতুন করে অভিযান শুরু করেছে বাশার বাহিনী। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়, হোমস প্রদেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে। টেলিভিশনে দাবি করা হয়, সরকারি বাহিনী ওই এলাকার দুটি গ্রামের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, রুশ হামলায় হোমসে ৬ জন বিদ্রোহীসহ অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে। রাশিয়া হোমসে অন্তত ১৫টি হামলা চালিয়েছে। মস্কো-ওয়াশিংটন আলোচনা: সিরিয়ার আকাশে নিজেদের বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে কয়েক দফা আলোচনার পর একটি সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। মার্কিন প্রতিরক্ষাবিষয়ক কর্মকর্তারা জানান, গত বুধবার এ বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। এতে দুই পক্ষ অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনায় পুতিন: সিরিয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে ‘ধ্বংসপ্রবণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গতকাল কাজাখস্তান সফরের সময় তিনি এই মন্তব্য করেন। সিরিয়া ইস্যুতে মস্কোর সঙ্গে আলোচনার আয়োজন করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে পুতিন ওই মন্তব্য করেন। এদিকে রয়টার্সের খবরে বলা হয়, রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালেক্সি মেসকভ বলেছেন, আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কুর্দিসহ ‘গঠনমূলক সব পক্ষের’ সঙ্গে সহযোগিতা করতে রাজি আছে মস্কো।

চাপের মুখে মেরকেল

ঠিক বিক্ষোভের মতো নয়। সমাবেশে অনেকের মুখে হাসি। গায়ে সাধারণ পোশাক। তাঁরা মধ্যবিত্ত জার্মান নাগরিক। আছে শিশুরাও। কারও সঙ্গে রয়েছে পোষা কুকুর। ঘটনাস্থল হামবুর্গের একটি পার্ক। কাছেই নির্মাণাধীন একটি শরণার্থীশিবির। সেটি বন্ধ করার দাবিতেই গত রোববার ওই নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। আন্দোলনকারীরা জোর দিয়ে বলছেন, তাঁরা অভিবাসী বা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে নন। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করার পক্ষপাতী। এখানেই শেষ নয়। হামবুর্গের ওই সমাবেশে বলা হয়, জার্মানির নাগরিকেরাই থাকার জায়গা পাচ্ছে না। হামবুর্গে আবাসন-সংকট এখন চরমে। সেখানে হাজার হাজার শরণার্থী এলে সমস্যা তো আরও বাড়বে। চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল সম্ভবত জানেন না, তিনি কী শুরু করেছেন। জার্মানির অধিকাংশ মানুষ শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা করার বিরুদ্ধে নয়।
কিন্তু বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর আগমনে তাঁরা ভয় পাচ্ছেন। দেশটিতে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ১০ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু জার্মান চ্যান্সেলর এসব শরণার্থীকে জায়গা দেওয়ার ব্যাপারে বারবার বলছেন, ‘আমরা এটা করতে পারব। কিন্তু কীভাবে? জার্মানির প্রতি তিনজনের একজন মেরকেলের নীতির সঙ্গে একমত। পাশাপাশি তাঁর জনপ্রিয়তাও ক্রমে কমছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, জার্মানদের কাছে গত ১০ বছরে মেরকেলের একটি শক্তিশালী ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। এখন শরণার্থী সংকট নিয়ে তাঁর সরকারের নীতি ব্যর্থ হলে, সেই ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়বে। বিপুলসংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীর আগমনে জার্মানির অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রেও সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মেরকেলের সমর্থক রক্ষণশীল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ইতিমধ্যে ভাঙন ধরেছে। জার্মানদের অধিকাংশ মনে করেন, শরণার্থী সংকট নিরসন করাটা জার্মানির একার দায়িত্ব নয়। তাই চাপের মধ্যেই রয়েছেন মেরকেল। সূত্র: বিবিসি

ভারত নেপালের উৎসব ম্লান করে দিয়েছে by অস্টিন মেয়ার

জ্বালানি সংগ্রহের জন্য নেপালিদের দীর্ঘ লাইন
১৩ অক্টোবর থেকে নেপালের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ছুটি শুরু হয়, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে দাশিয়ান। এই পক্ষকালব্যাপী উৎসব শুরু হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের খুশি থাকার কথা, কিন্তু এবার ব্যাপারটা তেমন নয়। বহু নেপালিই ১৩ অক্টোবর গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে সারা দিন কাবার করে দিয়েছেন।
ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর ওপর অঘোষিত অবরোধ আরোপ করায় নেপালের জ্বালানি সরবরাহ কমে গেছে, অথচ বছরের এ সময়টি নেপালিদের উৎসবের পক্ষ। ফলে এবার এই দাশিয়ানের সময়টা নেপালিদের জীবনে এক ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে এসেছে। কাঠমান্ডুর চক্ষু চিকিৎসক সন্দুক রুইত বলেছেন, ‘আমরা দেখেছি, ভূমিকম্পের পর কিছু পুনর্বাসন কার্যক্রম হয়েছে, কিন্তু এবার আমরা আরও পিছিয়ে গেলাম। অর্থনীতি পিছিয়ে পড়েছে, মানুষ কষ্ট পাচ্ছে।’
নেপালের সড়কে ঘোরাঘুরি করলে দেখবেন, গাড়ি-ঘোড়া খুবই কম। যানবাহনগুলো গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, কখনো কখনো ২৭ ঘণ্টা পর্যন্তও দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। আর লাইনগুলো অবিশ্বাস্য রকম লম্বা। আপনি যদি গাড়ি নিয়ে শহরে ঘোরেন, তাহলে দেখবেন, মানুষ হাত নেড়ে লিফট চাইছে। নেপালে প্রায় সব ধরনের জ্বালানি ভারত থেকে আসে—বিমানের জ্বালানি, পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস সবই।
ছানির অস্ত্রোপচার নেপালিদের জীবন বদলে দিচ্ছে, সেটা দেখার জন্য আমি নেপালে এসেছিলাম, তখন বেশ আনন্দই পেয়েছিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মানুষ অন্ধত্বের দশা থেকে ২০/২০ দৃষ্টিশক্তি লাভ করেছে, তারা ধ্বংস থেকে পুনরুত্থানের দিকে ধাবিত হয়েছে। যে বিধ্বংসী ভূমিকম্পে নেপাল ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, এটা ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা, যার মধ্যে পরিত্রাণের ব্যাপারও ছিল। ওই ভূমিকম্পে নেপাল ধ্বংস হয়ে গেছে; দেশটির অবকঠামো, অর্থনীতি ও জনগণ বহুদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে।
যে হাসপাতালে দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারের মতো অলৌকিক ব্যাপার ঘটছিল, সেখানেও অবরোধের চাপ অনুভূত হয়েছে। ২১ বছর বয়সী নেপালি নাগরিক অমিত লামা বলেছেন, ‘ভারতের ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হলে এখানে থাকা সহজ নয়। সবকিছুর দামই এখন বেড়ে গেছে—সবজি, ফল থেকে শুরু করে পেট্রল পর্যন্ত।’ ছানির সার্জন রুইত ও জিওফ্রে তেবিনের ভাষ্য হচ্ছে, তাঁরা যত মানুষকে তাঁদের হিমালয়ান ক্যাটার্যাক্ট প্রকল্পে আশা করেছিলেন, তত মানুষ সেখানে ছানির চিকিৎসা করাতে আসছেন না। এর কারণ হিসেবে তাঁরা বলেন, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মতো পেট্রল মানুষের হাতে নেই।
ভারত ও নেপালের বন্ধুত্ব শতাব্দীপ্রাচীন, ভারতীয়দের দেবতা রাম ও দেবী সীতার বিয়ে হয়েছিল নেপালে, গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল এই নেপালে। ১৯৫০ সালে দেশ দুটির মধ্যে শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি হয়েছে, আবার ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশের শ্রমিকেরা সারা নেপালময় কাজ করেন। এসব তথ্য দেওয়ার কারণ হচ্ছে, দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্ক যে বেশ প্রাচীন, সেটা বোঝানো।
কিন্তু এই হঠাৎ শত্রুতা ও অবরোধের কারণ কী? এই সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে নেপাল নতুন এক সংবিধান গ্রহণ করেছে, যে কারণে সেখানে নানা রকম হাঙ্গামা সৃষ্টি হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার এটি পছন্দ করেনি। কারণ হিন্দু-অধ্যুষিত নেপাল একটি ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান গ্রহণ করেছে। নেপালের দক্ষিণের সমতলের মদেশি অধিবাসীরা আবার এতে সন্তুষ্ট নয়। তারা মনে করছে, এই সংবিধানে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়নি। এ অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত আছে, আবার এই মদেশিদের সঙ্গে ভারতের পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে।
ভারত দৃশ্যত নেপালের ওপর প্রতিশোধ নিতে দেশটিতে বাণিজ্যিক যানবাহন ঢোকা সীমিত করে দিয়েছে। অন্যদিকে মদেশিরা সীমান্তে এই সংবিধানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে, ফলে গত কয়েক সপ্তাহে সেখানে কয়েক ডজন মানুষ মারা গেছে। ভারত এই অবরোধ আরোপের কথা অস্বীকার করেছে, তারা বলছে, নেপাল সীমান্তের ভেতরে বিপদের কারণে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে গেছে।
রুইত বলেছেন, ‘এটা নেপালের ইতিহাসের ভিন্ন এক অধ্যায়, যেখানে আমরা ভারতকেও ভিন্ন আচরণ করতে দেখছি। ভারতের এই আচরণের কারণে বিপুলসংখ্যক নেপালি আঘাত পেয়েছে, যেটা বহুকাল তাদের মনে থেকে যাবে।’ নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বন্ধন ছিঁড়ে যাচ্ছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এই পাহাড়ি দেশটির প্রায় তিন কোটি মানুষের মধ্যে যে সংহতি দেখা যাচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। নেপালের অন্যতম বৃহৎ সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রধান সুভাষ ঘিমাইর বলেন, ‘মানুষ মনে করে, দক্ষিণের একটি বিশাল দেশ আমাদের ওপর বলপ্রয়োগ করছে। আমজনতা মনে করে, আমাদের ভারতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত। এ ব্যাপারে মানুষ একমত।’
নেপালে পেট্রলের ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ার পর দেশটিতে কারপুল কাঠমান্ডু নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ গড়ে উঠেছে। এই গ্রুপের সদস্যসংখ্যা প্রায় এক লাখ, তারা সবাই এখন নিজেদের বাহনে অন্য মানুষদের লিফট দিচ্ছে। কারপুল কাঠমান্ডুর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মনিশ শ্রেষ্ঠা বলেছেন, ‘আমি সতিই বিশ্বাস করি, গত কয়েক দিনে আমরা একটি উন্নততর সমাজে রূপান্তরিত হয়েছি, প্রয়োজনের সময় আমরা একদম অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও আতিথেয়তা করেছি, তাদের সঙ্গে আমাদের ব্যবহারও ছিল মধুর।’
দাশিয়ান উৎসবের দুটি রাত পেরিয়ে গেছে। তবু বহু মানুষ কাঠমান্ডুতে রয়ে গেছে, তারা বাড়ি যেতে পারছে না। যে দেশটি কিছু উদ্যাপন করার জন্য অত্যন্ত মুখিয়ে আছে, সেখান থেকে অবরোধ উঠে যাক, এটাই আমার প্রত্যাশা।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
অস্টিন মেয়ার: নিকোলাস ক্রিস্টফের ২০১৫ উইন-এ-ট্রিপ প্রতিযোগিতার বিজয়ী।

ফুল- সাগরকলমি by সৌরভ মাহমুদ

সাগরের বেলাভূমিতে সাগরকলমি। কুয়াকাটা
সমুদ্রসৈকত থেকে তোলা ছবি l লেখক
সাগরের বেলাভূমিতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ মানুষের মনকে ভাবনায় ফেলে দেয়। দূর থেকে দূরতর আকাশের নীলের আভায়, সাগরের বিশাল জলরাশির নীলিমায় আত্মহারা হয়ে যায় মন। বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্ত ছুঁয়ে বঙ্গোপসাগরের যে বেলাভূমি আছে, তাতে নানা ধরনের গাছপালার সমাবেশ ঘটেছে। এসব গাছ নোনাজলে ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে। এসব গাছপালার মধ্যে সাগরকলমি সহজদৃষ্ট এক বনফুলের লতা। সাগরের বেলাভূমির গা বেয়ে যে লতার বেড়ে ওঠা। পৃথিবীতে এ লতা সমুদ্রপথে অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ, এ লতার বীজ লোনাজল সহনীয় এবং জলে ভেসে থাকে। মহাসাগরীয় বিস্তার যেসব উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ঘটেছে, সাগরকলমি তার মধ্যে অন্যতম। আটলান্টিক, প্রশান্ত, ভারত মহাসাগর, নিউসাউথ ওয়েলস, কুইন্সল্যান্ড উপকূল, হাওয়াই দ্বীপ, মেক্সিকো, আফ্রিকা, ফ্লোরিডা উপকূলে আছে এটি!
অনেক সময় এ লতার ঝোপ বেলাভূমির অনেক জায়গা নিয়ে বেড়ে ওঠে। লতা প্রায় ৭ থেকে ১৫ ফুট লম্বায় বাড়ে এবং প্রায় পাঁচ বছর বেঁচে থাকতে পারে। লতা যখন গোলাপি রঙের ফুলে ভরে যায়, সে দৃশ্য কখনো ভোলার নয়। সাধারণত সকালে রোদের আলোয় ফুল ফোটে। বিকেলের দিকে ফুল নেতিয়ে পড়ে এবং পরের দিন লতা থেকে ফুল ঝরে পড়ে। তবে ছায়া পেলে দিনের শেষ ভাগ পর্যন্ত সজীব থাকে গোলাপি রঙের ফুল।
এ লতার পাতার অবয়ব ছাগলের পায়ের খুরের আকৃতি, এ জন্য এ লতার অপর নাম ছাগলখুর। শুধু সাগরের বালুকাময় ভূমিতে এ কলমি জন্মে বলে নাম হয়েছে সাগরকলমি। সাগর কলমি ক্রিপিং লতা। পাতা পুরো, উজ্জ্বল সবুজ। ফল বড়, মাইকের মতো। প্রায় সারা বছর ফুল ফোটে। কুয়াকাটা, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত (হিমছড়ি থেকে টেকনাফ), সেন্ট মার্টিন দ্বীপে গেলে এ লতা সহজদৃষ্ট।
কাণ্ড কাটিং ও বীজের মাধ্যমে বংশ বিস্তার ঘটে। বেলাভূমির ভূমি ক্ষয়রোধ করে এবং বেলাভূমির মাটিকে স্থায়ী করে এ লতা। এ লতার বৈজ্ঞানিক নাম Ipomoea pes-caprae, পরিবার Convolvulaceae, ইংরেজি নাম Bayhops, Beach morning glory, Goat’s foot।

কলম্বো লেবু by মনিরুজ্জামান

বিশ্ববাজারে খ্যাতি কুড়ানো নরসিংদীর কলম্বো জাতের সুগন্ধি
লেবু। আকারে কিছুটা বড়, পুরু বাকল ও ঘন সবুজ রং।
ছবিটি সম্প্রতি শিবপুর উপজেলার দত্তেরগাঁও ভিটিপাড়া
এলাকার এক বাগান থেকে তোলা l প্রথম আলো
কাপড় ও সবজির কল্যাণে যে নরসিংদীর খ্যাতি দেশজুড়ে, তা এখন কলম্বো লেবুর গুণেই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশে পরিচিতি পেতে শুরু করেছে। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা এখানকার কলম্বো জাতের বিশেষ সুগন্ধযুক্ত লেবু রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কলম্বো জাতের এই লেবু যে শুধু ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানিই হচ্ছে তা নয়, সেখানে এটি ব্যাপক খ্যাতিও কুড়িয়েছে। লেবুটি বাণিজ্যিকভাবে শুধু এ জেলাতেই উৎপাদন হয়। আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণে সারা বছর নরসিংদীতে প্রচুর লেবু চাষ হয়, কিন্তু কলম্বো জাতের লেবুটি ভিন্নরকম। এটি আকারে বড়, বেশি রসালো ও সুগন্ধিযুক্ত। এ ছাড়া এর বাকল পুরু ও ঘন সবুজ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নরসিংদী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ছয় উপজেলার মধ্যে শিবপুর, রায়পুরা, মনোহরদী ও বেলাবতে বাণিজ্যিকভাবে কলম্বো লেবুর চাষ হয়। এসব উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় ১ চাজার ৮০০ লেবুর বাগান রয়েছে। প্রায় দেড় হাজার চাষি এর সঙ্গে জড়িত। অধিদপ্তরের সহযোগিতায় স্থানীয়ভাবে চাষিরা লেবু উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা নিয়ে সিআইজি নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। তাঁদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা লেবু কিনে দেশের বাইরে রপ্তানি করে থাকেন।
অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে দুই হাজার টন কলম্বো লেবু রপ্তানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতালি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, নরওয়ে, ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের ১০টি দেশে ১ হাজার ৩০০ টন এবং সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও মালয়েশিয়ায় গেছে ৭০০ টন। এই লেবুর কেজি গড়ে ২০০ টাকার কিছু বেশি।
চাষিদের কথা: কথা হয় সিআইজির সভাপতি ও শিবপুরের দত্তেরগাঁও ভিটিপাড়া এলাকার চাষি খন্দকার মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। জানালেন, ২০০৩ সালে লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পাচ্ছিলেন না। তখন এলাকায় এক আত্মীয়ের পরামর্শে এক বিঘা জমিতে ২০ টাকা দরে ১০০ লেবুগাছ কিনে লাগান। ছয় মাস না যেতেই ঢাকা থেকে এক পাইকার এসে বাগান থেকে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ পোন (২০ হালিতে ১ পোন) লেবু কেনেন।
মাহবুব জানান, ওই সময়ই ১৫০ টাকা হালি হিসেবে দেড় লক্ষাধিক টাকার লেবু বিক্রি করেন। পরে তাঁকে দেখে অনেকেই এ লেবু চাষের দিকে ঝোঁকেন। এখন তাঁর সাড়ে পাঁচ বিঘা জমির ওপর পাঁচটি বাগান রয়েছে। ৩০-৪০ হাজার টাকা খরচ করে ৬-৭ লাখ টাকা লাভ হচ্ছে।
রায়পুরার লক্ষ্মীপুর গ্রামের চাষি বাবুল চৌধুরী বলেন, ‘আমি পাঁচ বছর আগে প্রথমে এক বিঘা জমির ওপর লেবুর বাগান করি। সবজি চাষের তুলনায় পরিশ্রম কম করে লেবু চাষে অনেক লাভ। ওই বাগানের লেবু বিক্রির টাকায় প্রায় ১৩ বিঘা জমি কিনে লেবুর চাষ করছি। বাগানে বছরে মোট ৫ লাখ টাকা খরচ হয়। লাভ হয় ১৫ লাখ টাকা।’
এই লেবুর গুণ ও সম্ভাবনা: নরসিংদী সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মো. আবদুল কাফির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, লেবুর রসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। এ ছাড়া অল্প পরিমাণে কোলেস্টেরল, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে। কলম্বো জাতের এই সুগন্ধ লেবু শরীর বৃদ্ধি ও গঠনে বেশ কার্যকর। এ ছাড়া খনিজ লবণের চাহিদা মিটিয়ে ঠান্ডা-সর্দিতে বেশ উপকারী। পাশাপাশি এই লেবুর বাকল হজমশক্তিতে বেশ কাজ করে।
এই লেবুর সুগন্ধযুক্ত ছাল প্রক্রিয়াজাত করে উদ্বায়ী তেল তৈরি করা যায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইতালি, স্পেন, সিসিলি, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণে এই তেল বাণিজ্যিকভাবে উৎপন্ন করা হয়। ওষুধে সুগন্ধি উপাদান হিসেবে এবং সুগন্ধি প্রসাধনী তৈরিতেও ব্যবহার করা হয় এই তেল।
এর বাজার সম্পর্কে আশাবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অ্যান্ড ফ্রুটস এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মো. আরিফ উল্লাহ বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি রপ্তানি করে ভবিষ্যতে আমরা আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আনতে পারব।’

আমি না হয় পাখিই হব by আনিসুল হক

দুটো কবিতা সারাক্ষণ মাথার ভেতরে ঘোরে—একটা রবীন্দ্রনাথের—মা, যদি হও রাজি, বড় হলে আমি হব খেয়াঘাটের মাঝি। আরেকটা আল মাহমুদের। ‘আম্মা বলেন পড়রে সোনা/ আব্বা বলেন, মন দে;/ পাঠে আমার মন বসে না/ কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।’ এই কবিতার শেষ দুটো লাইন মাথার মধ্যে জলের মতো পাক খায়—‘তোমরা যখন শিখছো পড়া/ মানুষ হওয়ার জন্য,/ আমি না হয় পাখিই হবো,/ পাখির মতো বন্য।’ এই রকম করে কোনো কিশোর কি এখন ভাবতে পারে। নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু বলতে পারবে? না। পারবে না। বাবা-মা বলবেন, ডাক্তার হও, ইঞ্জিনিয়ার হও। এমবিএ পড়ো, বিবিএ পড়ো। আচ্ছা সেসব পরে হবে, আগে ক্লাসে ফার্স্ট হও। সেকেন্ড কেন হয়েছ? এই জন্য তোমাকে টিউটর রেখে পড়াই? এক কোচিং সেন্টার থেকে নিয়ে আরেক কোচিং সেন্টারে দৌড়াই! তোমার কোচিং সেন্টারের সামনের ফুটপাতে দিবারাত্র বসে থাকি, কখনো-বা পত্রিকা বিছিয়ে! রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি! টাকা আনতে বাবার জিব বেরিয়ে যাচ্ছে! মা শরীরের হাড় কালি করছেন! নিজেদের কোনো সাধ-আহ্লাদ আছে! তুমি যা চাচ্ছো, তা-ই দেওয়ার চেষ্টা করছি। তারপরেও রেজাল্ট ভালো হবে না কেন? কেন তুমি অঙ্কে ৯৮ পাবে। আর ২ গেল কোথায়? তাহলে দীপু পেল কীভাবে? রাইনা কীভাবে সব সাবজেক্টে জিপিএ ফাইভ পায়? যাও, ওদের পা ধোয়া পানি খাও! উফ্ফ। চাপ আর চাপ। শুধু কি পড়া। বাবা-মায়ের আরও কত শখ থাকে! গান শেখো, নাচ শেখো, সাঁতারের ক্লাসে যাও, ছবি আঁকার ক্লাসে! এই টিচার বেরিয়ে গেল তো ওই ওস্তাদ এলেন। বাচ্চা কেমন করে বলে,
আমার যেতে ইচ্ছে করে
নদীটির ওই পারে
যেথায় ধারে ধারে
বাঁশের খোঁটায় ডিঙি নৌকো
বাঁধা সারে সারে।
কিংবা
আম্মা বলেন, পড়রে সোনা,
আব্বা বলেন, মন দে;
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।
সব সময় কি পড়তে ইচ্ছা করে? খেলার নিয়মই হলো, সবাই তো জয়লাভ করবে না। একটা যদি দৌড় প্রতিযোগিতা হয়, ১০০ জন অংশ নেয়, একজনই কেবল ফার্স্ট হবে। তিনজন পুরস্কার পাবে। ৯৭ জনই তো পাবে না। জিপিএ ফাইভও সবাই পাবে না। সবার সব বিষয় ভালো লাগবে না। কারও ভালো লাগে গণিত, কারও-বা সাহিত্য। কেউবা ভীষণ পড়াশোনা করে, কিন্তু স্কুলের বই না, বাইরের বই। ­আর স্কুলের পাঠ্যবইও এমন নীরস ভাষায়, এমন কঠিন গদ্যে লেখা, কেনই-বা পড়তে চাইবে বাচ্চারা!
আমার ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা আমাকে ঘিরে ধরল, পড়ো তুমি এই বই। একটা কৃষিবিজ্ঞানের বই—উফ্ফ কী বলব, একেবারে রবীন্দ্রনাথের তোতাকাহিনির উপযুক্ত বিদ্যা, এই বই জোর করে বাচ্চাদের গেলাতে হবে, এমনি না গিলতে পারলে এক গেলাস পানি দিয়ে চেষ্টা করা যায়! শুধু তত্ত্ব, মাটিভেদে বাংলাদেশকে কত ভাগে ভাগ করা যায়! কয়েক ভাগে ভাগ করে দিয়েছেন পর্যবেক্ষণশক্তির অধিকারী লেখক! এখন বাচ্চাদের কাজ হবে সেসব মুখস্থ করা। শুধু সংজ্ঞা, শুধুই প্রকারভেদ। সংজ্ঞা দিয়ে যে কোনো কিছুকে চেনা যায় না, তা আমরা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের দুধ চেনার গল্প থেকেই জানি। দুধ কেমন? সাদা। সাদা কেমন? বকের মতো। বক কেমন? কাস্তের মতো। কাস্তে কেমন? এই যে কাস্তে। ওমা, দুধ এই রকম? তাহলে খাব না।
তবু কেউ কেউ ভালো করবে। কারও কারও মুখস্থ করার শক্তি বেশি থাকে। আর অল্পস্বল্প মুখস্থ তো আমাদের করতেই হয়। তিন চারে বারো হয়, এটাকে বলে নামতা, এটা আমরা মুখস্থই করেছি।
রবীন্দ্রনাথের ভোলানাথ অবশ্য অন্য রকম করেছিল:
ভোলানাথ লিখেছিল,
তিন-চারে নব্বই—
গণিতের মার্কায়
কাটা গেল সর্বই।
তিন চারে বারো হয়,
মাস্টার তারে কয়;
‘লিখেছিনু ঢের বেশি’
এই তার গর্বই।
এই রকম ভোলানাথেরাও তো থাকবে সমাজে। এবং তারা জীবনে যে খারাপই করবে, এমন কোনো কথা নেই। আপনি আপনার স্কুলের বন্ধুদের কথা ভাবুন। কেউ ক্লাসে ফার্স্ট হতো, কেউ ভালো করতে পারত না। আজকে তাকিয়ে দেখুন, কে কী করছে? যে ফার্স্ট হয়েছে, সেই কি সবচেয়ে ভালো করছে? যে ছেলেটা স্কুল পালাত, সেও কি ভালো করছে না?
আমি বলি, জীবন সবার জন্য সোনার মেডেল রেখে দিয়েছে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, জীবন হলো একটা বাইসাইকেলের মতো, এটা সব সময় চালিয়ে যেতে হয়। আর কবি রবার্ট ফ্রস্ট বলেছেন, ‘জীবন কী, এটা আমি মাত্র তিনটা শব্দে বলে দিতে পারব—জীবন চলেই যায়।’ আর জীবনটা চালিয়ে নিয়ে গেলে, শেষ পর্যন্ত সবাই সোনার মেডেলই পায়।
এই বাংলাদেশে প্রায় বেশির ভাগ পরিবারেরই তো উন্নতি হচ্ছে। আপনি আপনার পরিবারের দিকে দেখুন, আত্মীয়স্বজনের দিকে দেখুন, ৩০ বছর আগে কে কী করত, এখন কে কী করছে। তাহলেই বুঝবেন, প্রায় সব পরিবারেই উন্নতি হয়েছে। এটা আপনি চারদিকে তাকিয়ে দেখে বলতে পারবেন। আর অর্থনীতিবিদেরা বলতে পারবেন পরিসংখ্যান দিয়ে। ১০ কোটির বেশি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন, ৯০ শতাংশ মানুষ স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করে, ৯৯ শতাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়! গরিব দেশটা আজকে নিম্ন–মধ্যম আয়ের দেশ। শুধু একটাই কিন্তু আছে। তার নাম মাদক। লাখ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, তাদের পরিবারে লেগেই আছে নানা অশান্তি। মাদক থেকে দূরে থাকতে পারলে লেখাপড়াতেও ভালো করা যাবে, খেলাধুলাতেও ভালো করা যাবে।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁদের পরিবারে বড়ই দুশ্চিন্তা ছিল, তাঁদের অভিভাবকদের চিঠিপত্র থেকে দেখা যায়—একটার পর একটা স্কুলে যাচ্ছেন, কোনোটাতেই মন বসাতে পারছেন না। তাঁকে মনে করা হতো প্রবলেম চাইল্ড। আইনস্টাইন কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। বিল গেটস হার্ভার্ডের পড়া শেষ করেননি। প্রচলিত আছে, বিল গেটস বলেছিলেন, আমি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটা সাবজেক্টে ফেল করেছিলাম, আমার একজন বন্ধু সব কটা সাবজেক্টে হাইয়েস্ট মার্কস পেয়েছিল, আমার সেই বন্ধু এখন মাইক্রোসফটে ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করে। তবে বিল গেটস এও বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই আমি প্রচুর স্বপ্ন দেখতাম। আর সেই সব স্বপ্ন আমি পেয়েছি বই থেকে।
এফ আর খান বা ফজলুর রহমান খান (১৯২৯-১৯৮২)। তাঁকে বলা হয়, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন। শিকাগোতে তাঁর নির্মিত সুউচ্চ ভবন সিয়ার্স টাওয়ারের নিচে আছে এফ আর খান লেন, তাতে তাঁর আবক্ষ মূর্তির সঙ্গে খোদিত আছে তাঁর একটা বাণী—‘The technical man must not be lost in his own technology; he must be able to appreciate life, and life is art, drama, music, and most importantly, people.’(‘প্রযুক্তিবিদ যেন অবশ্যই নিজের প্রযুক্তির মধ্যে হারিয়ে না যান, তাঁকে অবশ্যই জীবন উপলব্ধি করার মতো সক্ষম হতে হবে, জীবন হচ্ছে শিল্প, নাটক ও সংগীত; আর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে মানুষ’) <https://en. wikipedia.org/wiki/Fazlur_Rahman_Khan>
ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই প্রখ্যাত প্রকৌশলী বলছেন, প্রযুক্তিবিদের আপন প্রযুক্তিতে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়, তাঁকে অবশ্যই জীবনকে উপভোগ করতে জানতে হবে, এবং জীবন হলো—শিল্পকলা, নাটক, সংগীত এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ। আমরা এফ আর খানের একটা ছবি দেখি, তিনি হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন ঘরের মধ্যে আড্ডার মধ্যমণি হয়ে। আর এ কারণেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকায় তিনি বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে জনমত সংগ্রহের কাজে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন।
পরীক্ষায় ফল ভালো করলে ভালো। কিন্তু শুধু পরীক্ষার ফল ভালো করলেই সে বড় মানুষ হয় না। জীবন ও জীবিকায় ভালো করে না। ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়। ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করলেই সে পরবর্তী পরীক্ষায় ভালো করবে, তার নিশ্চয়তা নেই, আবার পরীক্ষায় ভালো করলেই সে ভালো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে, সে কথা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না। তেমনি ছাত্রজীবনে খুব ভালো না করেও পরবর্তী জীবনে খুব ভালো করেছে, এই উদাহরণ ভূরি ভূরি।
কাজেই আমাদের অভিভাবকদের বলব, আপনার ছেলেমেয়েকে সঠিক মূল্যবোধটা দিন। আর তাকে খেলার সময় খেলা, পড়ার সময় পড়া, বাকি সময় বই পড়া, সংস্কৃতিচর্চা করার সুযোগ দিন। আপনার অপূর্ণ স্বপ্ন তাকে দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করবেন না। বাণিজ্যের নোবেল পুরস্কার বলে গণ্য অসলো বিজনেস ফর পিস পুরস্কারপ্রাপ্ত লতিফুর রহমান আমাদের একটা কথা বলেছিলেন, কোনো বাবা-মাই তার ছেলেমেয়েকে খারাপ হওয়ার উপদেশ দেয় না। ছোটবেলায় ঘুষখোরও তাঁর সন্তানকে বলবেন না, বড় হয়ে ঘুষ খাবি। ডাকাতও বলবেন না, ডাকাত হবি। সবাই বলবেন, সত্য কথা বলো, মানুষ হও। অতটুকুন মেনে চললেই হয়। সত্য কথা বলা, সৎ পথে চলা। তারপর যার যেটা ভালো লাগে, সেটা খুব মন দিয়ে আন্তরিকভাবে করা।
কিন্তু সব সময় সব দেশেই পরবর্তী প্রজন্মের মন-মানসিকতা চিন্তার জগৎ আলাদা হয়ে থাকে।
কবি কহলিল জিবরানের ভাষায়—
‘তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়।
জীবনের নিজের প্রতি নিজের যে তৃষ্ণা, তারা হলো তারই পুত্র-কন্যা।
তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, তোমাদের থেকে নয়।
এবং যদিও তারা থাকে তোমাদের সঙ্গে, কিন্তু তাদের মালিক তোমরা নও।
তুমি তাদের দিতে পারো তোমার ভালোবাসা,
কিন্তু দিতে পারো না তোমার চিন্তা, কারণ তাদের নিজেদের চিন্তা আছে।’
কিন্তু আমরা অভিভাবকেরা এই কথাটা ভুলে যাই। আমরা চাপ দিতে থাকি। প্রত্যাশার চাপ। আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার জন্য আমি কত স্যাক্রিফাইস করছি, তার বিনিময়ে তুমি আমাকে দাও তোমার জীবনের সাফল্য। ডাক্তার হও। ইঞ্জিনিয়ার হও।
এটা ঠিক নয়। কেউ যদি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে দেখতে ভাবে—‘তোমরা যখন শিখছো পড়া মানুষ হওয়ার জন্য, আমি না হয় পাখিই হব, পাখির মতো বন্য।’—তাকে ভাবতে দিন। ওই হয়তো হবে লেওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো বড় শিল্পী, রাইট ভাইদের মতো বড় আবিষ্কারক। আইনস্টাইনই বলেছেন, জ্ঞানের চেয়ে কল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। আর সেসব কিছু যদি নাও হয়, সে একটা ভালো মানুষ হবে, হবে সুন্দর একটা মানুষ।
সুন্দর সুন্দর মানুষে ভরে যাক না আমাদের পৃথিবীটা!
এই স্বপ্ন নিয়েই আমরা কিশোর আলো নামের একটা পত্রিকা বের করি। আজ সেন্ট যোসেফ স্কুলে সকাল থেকে শুরু হয়ে গেছে তার দ্বিতীয় জন্মদিনের উৎসব—কিআনন্দ। সেখানে এলে দেখতে পাবেন, আমাদের সন্তানদের পৃথিবীটাও অনেক বড়।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

হার্ট অ্যাটাকের মুহূর্তে একা থাকলে কী করবেন?

বর্তমান সময়ে হৃদরোগ বা হার্টের অসুখে ভুগে মৃতের সংখ্যা সারা বিশ্বে অনেক বেশি। যত সময় যাচ্ছে, ততই বেশি করে হার্ট অ্যাটাক বা হার্টের অন্য সমস্যায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ না জানা থাকায় এবং সেই মুহূর্তে কী করণীয় সে সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অনেকেই এই সময়ের ধাক্কা সামলে উঠতে পারেন না।
বুকে ব্যথা, দীর্ঘশ্বাস ফেলা, মাত্রাতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া ইত্য়াদি হার্ট অ্যাটাকের সময়ে অত্যন্ত কমন ব্যাপার। তবে একলা থাকা অবস্থায় হার্ট অ্যাটাক হলে কী করবেন জানেন কি?
অ্যাটাকের সাধারণ লক্ষণ বুকের বাম দিকের একেবারে মাঝে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয় এই সময়ে। হার্ট অ্যাটাকের এটাই সবচেয়ে প্রাথমিক লক্ষণ। সাধারণভাবে প্রায় ২০ মিনিট ব্যথা থাকে। ধীরে ধীরে তা উপরে বাম দিকের হাত ও কাঁধের সংযোগস্থল, ঘাড় ও চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রচণ্ড ঘাম হওয়া এইসময়ে প্রচণ্ড ঘাম হয় ও ধীরে ধীরে চারিদিক অন্ধকার মনে হতে থাকে। একা থাকলে এমন লক্ষণ বুঝলে কখনই অবহেলা করবেন না।
প্রয়োজনীয় জায়গায় খবর দিন একা থাকলে এমন সময়ে পরিচিতদের খবর দিয়ে রাখুন। হার্টের রোগীরা সবসময় অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি পরিষেবার নম্বর হাতের কাছে রাখবেন। বাইরে রাস্তায় থাকলে সঙ্গে সঙ্গে পাশের কারো সাহায্য নিন। অ্যাসপিরিন সঙ্গে রাখুন হার্ট অ্যাটাকের সময়ে অ্যাসপিরিন নিলে অনেকটা উপকার হয়। একা থাকা অবস্থায় অ্যাসপিরিন নিলে প্রাথমিক অবস্থায় অনেকটা সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যায়।
জোরে শ্বাস নিন বহুকাল ধরেই এই ব্যাপারটি চলে আসছে। চিকিৎসকেরাও জানিয়েছেন, জোরে জোরে শ্বাস নিলে হার্ট অ্যাটাকের সময়ে অনেকটা উপকার হয়।
বুকে চাপ দিন হার্ট অ্যাটাকের সময়ে চিকিৎসকেরা অনেক সময়ে দুই হাত দিয়ে হার্টের উপরে চাপ দেন যাতে হৃকম্পনের স্বাভাবিক গতি ফিরে আসে। বাড়িতে একলা অবস্থায় নিজে থেকে এই পদ্ধতির ব্যবহার করা যেতে পারে।
কাশতে থাকা পুরনো হলেও এই টোটকা দারুণ কাজে দেয়। যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। তবে অনেক সময়ে হার্টের সমস্যায় জোরে জোরে কাশলে কোনো জায়গায় সামান্য ব্লক থাকলে তা খুলে যায়।