Showing posts with label আসাম. Show all posts
Showing posts with label আসাম. Show all posts

Friday, January 16, 2026

আসামের ‘দেশহীন’ মানুষরা: ২৪ ঘণ্টার নোটিশে ভারত ছাড়তে বলা হয়

স্ক্রলের প্রতিবেদনঃ পিতা তাহের আলিকে নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন হাসান আলি। ৫৮ বছর বয়সী এই মানুষটি এখন কেমন আছেন? বিদেশের মাটিতে কীভাবে বেঁচে আছেন? জানুয়ারির কনকনে ঠাণ্ডায় তিনি কী করছেন? কী ধরনের বিপদের মুখোমুখি হচ্ছেন? এই প্রশ্নগুলোই প্রতিদিন তাড়া করে বেড়াচ্ছে হাসান আলিকে। গত আট মাসে আসামের নগাঁও জেলার কৃষক তাহের আলিকে শুধু একবার নয়, তিনবার ভারত থেকে বের করে বাংলাদেশ সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ ঠেলে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দু’বার বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে বলে জানান ৩১ বছর বয়সী সবজি বিক্রেতা হাসান আলি। এ নিয়ে তিনি ভারতের অনলাইন স্ক্রলের সঙ্গে কথা বলেছেন।

তাহের আলি একজন ‘ঘোষিত বিদেশি’। অর্থাৎ সারাজীবন আসামেই বসবাস করা সত্ত্বেও তিনি রাজ্যের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল হলো আধা-আদালতসদৃশ প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার হাজার আসামবাসীকে নাগরিকত্বহীন ঘোষণা করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য না শুনেই একতরফা আদেশ দেয়া হয়েছে। তাহের আলির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। যারা ট্রাইব্যুনালে মামলায় হেরে যান, তাদের উচ্চ আদালতে আপিল করার অধিকার রয়েছে। অনেককে রাজ্যের ডিটেনশন বা হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানো হয়। কিন্তু গত বছরের মে মাসের আগে পর্যন্ত সাধারণত তাদের বাংলাদেশে ‘ডিপোর্ট’ করা হতো না। কারণ ট্রাইব্যুনালের রায় মানেই তারা অন্য দেশের নাগরিক- এমন প্রমাণ নয়।

কিন্তু মে মাসের পর থেকে বিজেপিশাসিত আসাম সরকার আইনি ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে ‘ঘোষিত বিদেশি’দের রাতের অন্ধকারে বন্দুকের মুখে সীমান্ত পার করিয়ে দিচ্ছে- যাকে বলা হচ্ছে ‘পুশব্যাক’। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই জোরপূর্বক বহিষ্কারকে বৈধতা দিতে ১৯৫০ সালের একটি আইন ব্যবহার করছেন। নভেম্বর থেকে রাজ্য সরকার কমপক্ষে ২২ জন ঘোষিত বিদেশিকে নির্দেশ দিয়েছে- ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে যেতে হবে’। ফলে তাদের আদালতে যাওয়ার কোনো সুযোগই থাকছে না। কিন্তু বাংলাদেশ যখন তাদের ঢুকতে দিচ্ছে না, তখন তাহের আলির মতো মানুষরা আটকে পড়ছেন এক নিষ্ঠুর চক্রে- বারবার ঠেলে দেয়া আর আবার ফিরিয়ে আনার মধ্যে।
তাহের আলি একা নন। স্ক্রলের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯ ডিসেম্বরের পর কমপক্ষে সাতজন আসামবাসীকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের ঢুকতে না দিলে তারা ফিরে যান। কিন্তু আবারও জোর করে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়। এর মধ্যে চারজন বর্তমানে বাংলাদেশের পুলিশ হেফাজতে আছেন বলে সে দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাহের আলি ছাড়াও কমপক্ষে আরেকজনকে তিনবার জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।
স্ক্রল সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মুখপাত্র এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছে- ১৯৫০ সালের আইনে বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের কি বারবার বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হচ্ছে এবং তাদের নাগরিকত্ব যাচাই করা হয়েছে কি না। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উত্তর পাওয়া যায়নি। উত্তর পেলে প্রতিবেদন হালনাগাদ করার কথা জানানোর কথা। আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকদের মতে, আসাম সরকারের এই নতুন নীতি আন্তর্জাতিক আইন ও ভারতের সংবিধানের পরিপন্থী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাগরিকত্ব বিষয়ে গবেষক অভিষেক সাহা বলেন, এটা রাষ্ট্রহীনতা তৈরি করার প্রক্রিয়া। ভারত এই মানুষগুলোকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, বাংলাদেশ আবার তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। দুই দেশের মাঝে এদের টেনিস বলের মতো ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

দিল্লিভিত্তিক আইনজীবী উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি বলেন, এই ধরনের হঠাৎ ও খামখেয়ালি বহিষ্কার ভারতের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি বলেন, যে কোনো ডিপোর্টেশনের আগে নাগরিকত্ব যাচাই বাধ্যতামূলক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। এখানে সেই প্রক্রিয়ার কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না।

হাসান আলি প্রশ্ন করেন, কেন তার পিতাকে দুই দেশের মধ্যে এভাবে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার দেশ বলছে আমার পিতা বাংলাদেশের বিদেশি। কিন্তু বাংলাদেশ তো তাকে দু’বার ফিরিয়ে দিয়েছে। তাহলে আমাদের দেশ কোনটা? আমাদের কি আদৌ কোনো দেশ আছে?

২০০৯ সালের ডিসেম্বরে নগাঁও জেলার একটি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাহের আলিকে একতরফা রায়ে নাগরিক নন বলে ঘোষণা করে। ২০১৫ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি তেজপুর ডিটেনশন সেন্টারে চার বছর কাটান। ২০২৫ সালের মে মাসে পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার পর আসাম সরকার ঘোষিত বিদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে তাহের আলিকে তার গ্রাম গোরইমারি থেকে তুলে নিয়ে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। স্ক্রলের আগের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শত শত ঘোষিত বিদেশিকে পুলিশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়, যারা বন্দুকের মুখে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। তাহের আলিও সেই ১০৯ জনের মধ্যে ছিলেন, যাদের মাটিয়া ট্রানজিট ক্যাম্পে নেয়া হয়। এটি ভারতের সবচেয়ে বড় ডিটেনশন সেন্টার। মে মাসে তাহের আলি ফোন করে ছেলেকে জানান, তাকে জোর করে সীমান্ত পার করানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে ঢুকতে দেয়নি। তাকে আবার ভারতে ফিরিয়ে এনে কোকরাঝাড় হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়। হাসান আলি বলেন, আমরা তখন স্বস্তি পেয়েছিলাম।
এরপর আইনি লড়াই, নতুন করে গ্রেপ্তার, আবার পুশব্যাক- এভাবেই চলতে থাকে নিষ্ঠুর চক্র।

mzamin

Sunday, December 28, 2025

ভারতের আসামে বাংলাদেশ মিশন ঘিরে বিক্ষোভ

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারতে বাংলাদেশ মিশনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ অব্যাহত আছে। গতকাল শনিবার ভারতের আসাম রাজ্যে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেছে হিন্দুত্ববাদী চারটি সংগঠন।

এদিকে গত কয়েক দিনে টানা বিক্ষোভের পর গতকাল ভারতের দিল্লি, কলকাতা, আগরতলা ও মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ মিশন ঘিরে কোনো বিক্ষোভ হয়নি। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আজ রোববারও বাংলাদেশের সব মিশনে ভিসা সেবা বন্ধ থাকছে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ বারবার নাকচ করে আসছে সরকার। বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে উল্লেখ না করতেও বলা হয়েছে দিল্লিকে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন ব্যবস্থাও নিচ্ছে সরকার।

আসামে বিক্ষোভ

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের কাছে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দুরাষ্ট্র দাবি সমিতি, হিন্দু যুব-ছাত্র পরিষদ, আসাম রাষ্ট্রীয় হিন্দু ফ্রন্ট ও আসাম হিন্দু ঐক্য মঞ্চের সমর্থকেরা।

ঢাকা ও আসামের কূটনৈতিক সূত্রগুলো গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে জানায়, হিন্দুত্ববাদী চার সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা গতকাল গুয়াহাটির বাংলাদেশ মিশনের সামনে টানা দ্বিতীয় দিন বিক্ষোভ করেন। গতকালের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৭৫ জনের মতো। তবে বিক্ষোভের আগে থেকে বাংলাদেশ মিশন স্থানীয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছিল। ওই অনুরোধে সাড়া দিয়ে গতকাল সকাল থেকে বাংলাদেশ মিশনের কাছে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভকারীরা মিশন অভিমুখে এলে মিশন থেকে ১০০ মিটারের কম দূরত্বে তাঁদের আটকে দেয় পুলিশ। পরে বিক্ষোভকারীদের একটি দল মিশনে গিয়ে ‘বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ’ জানিয়ে একটি স্মারকলিপি দেয়।

এর আগে গত শুক্রবার বিক্ষোভকারীরা গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের গেটের কাছে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। সেখানে তাঁরা প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে অবস্থান নিয়ে ময়মনসিংহের দীপু দাসের হত্যাকাণ্ডসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের নানা অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। পরে বিক্ষোভকারীদের একটি প্রতিনিধিদল মিশনে গিয়ে স্মারকলিপি দেয়।

এদিকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের বিক্ষোভ হলেও গতকাল দিল্লি, কলকাতা, আগরতলা ও মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ মিশন ঘিরে কোনো বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি।

দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের উদ্ভূত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিল্লি, আগরতলা ও শিলিগুড়ি মিশনে ভিসা সেবা বন্ধ থাকবে। ঢাকা থেকে পরবর্তী নির্দেশ পাওয়ার পর এসব মিশনে ভিসা সেবা চালু হবে। তবে আগামীকাল সোমবার থেকে মুম্বাই মিশনে ভিসা সেবা আবার চালু হবে।

২৯০০ সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের আগের অবস্থানের যে পরিবর্তন হয়নি, সেটি গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। ব্রিফিংয়ে জয়সোয়াল দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৯০০টির বেশি সহিংসতার ঘটনা স্বাধীনভাবে নথিভুক্ত হয়েছে, যেগুলোকে শুধুই ‘মিডিয়া অতিরঞ্জন’ বা ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আমরা কীভাবে দেখি, সে বিষয়ে আমাদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট।’

বাংলাদেশের কূটনীতিকদের কাছে জানতে চাইলে তাঁদের বেশ কয়েকজন ওই সংখ্যা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। এত বিপুল সংখ্যায় সহিংসতার ঘটনা আদৌ ঘটেছে কি না আর কীভাবে সেই সংখ্যা নথিভুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে তাঁরা সন্দিহান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কূটনীতিক এই প্রতিবেদককে বলেন, হুট করে ২ হাজার ৯০০ সংখ্যাটি কেন, কীভাবে এল! যদি সহিংসতার ঘটনা ঘটেই থাকে, তবে আগে কেন ভারত সে কথা বলেনি।

গতকাল আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশ মিশন অভিমুখে হিন্দুত্ববাদী চার সংগঠনের নেতা–কর্মীদের মিছিল আটকে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা
গতকাল আসামের গুয়াহাটিতে বাংলাদেশ মিশন অভিমুখে হিন্দুত্ববাদী চার সংগঠনের নেতা–কর্মীদের মিছিল আটকে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

Thursday, December 25, 2025

আসামে আদিবাসীদের সঙ্গে বাঙালি-বিহারীদের সংঘর্ষে দুজন নিহত

ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মধ্য–দক্ষিণাঞ্চলীয় স্বায়ত্ত্বশাসিত কার্বি আংলং জেলায় কয়েক দিনের সহিংসতায় অন্তত দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ৫০ জন, যাঁদের অধিকাংশই আসাম পুলিশের সদস্য।

মৃত দুজনের একজন আদিবাসী আথিক তাইমুং এবং অন্যজন হিন্দু বাঙালি সুরেশ দে (২৫) বলে জানা গেছে। সুরেশ দে শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে তালিকাভুক্ত।

চলতি সপ্তাহের গোড়ার থেকে আদিবাসী ও আদিবাসী নন, এ রকম দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। সোমবার বিক্ষোভকারীরা স্বায়ত্বশাসিত কার্বি আংলং পরিষদের প্রধান ব্যবস্থাপক ও বিজেপি নেতা তুলিরাম রংহাঙ্গের পৈতৃক বাড়ি জ্বালিয়ে দেন।

গতকাল মঙ্গলবার লড়াই তীব্র আকার ধারণ করে। ওই অঞ্চলের খেরোনি বাজারে আগুন ধরিয়ে পুরো বাজার ও আশপাশের বহু বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। একাধিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল পুড়ে যায়। কারফিউ জারি থাকলেও দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ওই অঞ্চলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয়েছে।

এ লড়াই হচ্ছে মূলত আদিবাসীদের সঙ্গে বাঙালি ও বিহারীদের। স্থানীয় মানুষের বক্তব্য, বাঙালিদের বাংলাদেশি বলে যে প্রচার গোটা পূর্ব ভারতে চলেছে, তার ফলেই হামলার তীব্রতা বেড়েছে। অঞ্চলের বিহারি শ্রমিকদেরও বক্তব্য, তাঁদের ওপরও কয়েক মাস ধরে হামলা চলছে।

এই বিহারি শ্রমিকেরা বেশ কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলে রয়েছেন। এখানে তাঁরা এখন স্থায়ী বাসিন্দা বলা যায়।

আদিবাসীদের বক্তব্য, তাঁদের সম্প্রদায়ভিত্তিক যে জমি রয়েছে, তাতে বাইরে থেকে এসে লোকজন বসছেন। এর ফলে তাঁদের সম্প্রদায়ভিত্তিক জায়গাজমি বহিরাগতদের হাতে চলে যাচ্ছে। যেখানে এ ঘটনা ঘটেছে, তা পশ্চিম কার্বি আংলংয়ের আদিবাসী–অধ্যুষিত পার্বত্য জেলা। অঞ্চলটি দক্ষিণ আসামের বাঙালি–অধ্যুষিত তিন জেলা হাইলাকান্দি, শ্রীভূমি (করিমপুর) এবং কাছাড়ের ঠিক উত্তরে অবস্থিত। এই অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্তে বাংলাদেশ সীমান্ত।

জেলার ফেলাঙ্গপি নামক এলাকায় দুই সপ্তাহ ধরে নয়জন আদিবাসী অনশন করছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, বাইরে থেকে এসে যাঁরা বসেছেন, বিশেষ করে সম্প্রদায়ের গরু, মহিষ ইত্যাদি চরানোর জমিতে—তাঁদের সেখান থেকে অবিলম্বে উচ্ছেদ করতে হবে।

গত সোমবার অনশনকারী ব্যক্তিদের অনশনস্থল থেকে সরিয়ে গৌহাটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বশাসিত এই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে রয়েছেন মহাপরিদর্শক অখিলেশ সিং। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, অনশনরত ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করতে তাঁদের গৌহাটিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

তবে ওই অঞ্চলের মানুষের অভিযোগ, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপরই সহিংসতা শুরু হয় এবং অঞ্চলটির মুখ্য ব্যবস্থাপকের বাড়িতে হামলা হয়। এরপর আদিবাসীরা মূলত আক্রমণ করেন ওই অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের ওপর। এতে দুজনের মৃত্যু হয়। তবে কে বা কারা এই হত্যার জন্য দায়ী, সে সম্পর্কে এখনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজ বুধবার পরিস্থিতি থমথমে। তবে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। আধা সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য ওই অঞ্চলে মোতায়ন করা হয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-24%2Fw41y23t5%2Fassam.jpg?rect=68%2C0%2C696%2C464&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আসামের কার্বি আংলংয়ে আদিবাসীদের সঙ্গে বাঙালি–বিহারিদের সংঘর্ষের সময় বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, কার্বি আংলং। ছবি: এএনআই

Tuesday, September 30, 2025

আসামে দেশভাগ যুগের আইন পুনরুজ্জীবিত: সন্দেহভাজনকে নাগরিকত্ব প্রমাণে সময় ১০ দিন, ব্যর্থ হলেই বহিষ্কার

আসামে সন্দেহভাজন ‘অবৈধ অভিবাসী’দের মাত্র ১০ দিন সময় দেয়া হবে। এ সময়ের মধ্যে তাকে বা তাদেরকে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। ব্যর্থ হলে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বহিষ্কার করা হবে। এমনই ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (এসওপি) অনুমোদন করেছে হিমান্ত বিশ্ব শর্মা নেতৃত্বাধীন রাজ্য মন্ত্রিসভা। এই নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে ইমিগ্র্যান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট, ১৯৫০ অনুযায়ী। এটি এমন এক আইন যা মূলত দেশভাগ-পরবর্তী অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয়।

সমালোচকরা বলছেন, আসাম সরকার এই আইনকে ব্যবহার করে মানুষকে যথাযথ আইনি সুযোগ না দিয়ে জোরপূর্বক বহিষ্কার করছে। এ খবর দিয়েছে ভারতের অনলাইন স্ক্রল। এতে আরও বলা হয়, এতদিন আসামে সন্দেহভাজন বিদেশিদের মামলা যেত ফরেনার্স ট্রাইবুনালে। যদিও এই ট্রাইবুনালগুলো প্রায়শই এলোমেলো রায় দিয়ে মানুষকে বিদেশি ঘোষণা করেছে, ভুক্তভোগীরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারতেন। এর বাইরে ভারতের কেন্দ্রীয় নীতিমালা অনুযায়ী বহিষ্কারের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রত্যাশিত জন্মভূমি দেশের সঙ্গে জাতীয়তা যাচাই করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু মে মাস থেকে দেখা যায় আসাম পুলিশ আদালতে বিচারাধীন মানুষদেরও ধরে এনে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক সময় বন্দুকের মুখে তাদেরকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। দুই সপ্তাহে ৩ শতাধিক মানুষকে এভাবে তাড়ানো হয়। তাদের প্রায় সবাই বাঙালি মুসলিম বংশোদ্ভূত।

নতুন নিয়মের সরকারি সারাংশ অনুযায়ী, জেলা কমিশনার যদি কোনো সূত্র থেকে তথ্য পান যে কেউ ‘অবৈধ অভিবাসী’, তবে তিনি সেই ব্যক্তিকে ১০ দিনের মধ্যে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বলবেন। প্রমাণ সন্তোষজনক না হলে জেলা কমিশনার লিখিতভাবে তাকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ ঘোষণা করবেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বহিষ্কারের নির্দেশ দেবেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১০ দিন প্রমাণ জোগাড়ের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। ভোটার তালিকা বা জমির খতিয়ান তুলতে কয়েক সপ্তাহ লাগে। ২০১৯ সালের এনআরসি আপডেটের সময়ও লাখো মানুষ নাগরিকত্ব প্রমাণে হিমশিম খায়। এই প্রক্রিয়া কার্যত জেলা প্রশাসনকে ‘বিচারিক, জুরি ও জল্লাদ’ বানিয়ে দিচ্ছে।

১৯৫০ সালের আইনে দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে আসামের নেতারা আশঙ্কা করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে ব্যাপক অনুপ্রবেশ হবে। তাই নেহরু সরকার ইমিগ্র্যান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট, ১৯৫০ চালু করে। তবে একই বছরে নেহরু-লিয়াকত চুক্তির পর আইনের প্রয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৪ সালে গড়ে ওঠে ফরেনার্স ট্রাইবুনাল। এতদিনে ট্রাইবুনালগুলো ৪.৩৬ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করেছে, যার মধ্যে ১.৩২ লাখ মানুষকে ভারতীয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এসওডিতে জেলা কমিশনাররা ‘যত বেশি সম্ভব বিদেশি চিহ্নিত করার প্রতিযোগিতায়’ নামবেন। এর শিকার হবেন মূলত বাঙালি মুসলিম সংখ্যালঘুরা। আসাম হাইকোর্টের আইনজীবীরা প্রশ্ন তুলছেন- কেন্দ্রীয় আইন থাকা সত্ত্বেও কি রাজ্য মন্ত্রিসভা এমন নির্দেশনা দিতে পারে? বিরোধী নেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকার দ্বিচারিতা করছে। একদিকে ২০১৯ সালের সিএএ’র মাধ্যমে হিন্দু অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে মুসলিমদের নিশানা বানাচ্ছে।

mzamin

Thursday, July 24, 2025

শত শত মুসলিমকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে বিতাড়ন করেছে ভারত

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট: সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ শত শত জাতিগত বাঙালি মুসলিমকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে প্রক্রিয়াগত আইন মানা ছাড়াই বাংলাদেশে বিতাড়ন করেছে। তাদের অনেকেই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর ভারতীয় নাগরিক। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার জাতিগত বাঙালি মুসলিমদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার অপারেশন তীব্র করেছে। বিশেষত আইনি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ভারতে প্রবেশ বন্ধ করার জন্য এটা করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘ এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে। তারা ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া এভাবে বেআইনিভাবি লোকজনকে অন্য দেশে ঠেলে দেয়া অবশ্যই বন্ধ করতে হবে সরকারকে।

পরিবর্তে খেয়ালখুশিমতো আটক ও দেশ থেকে বের করে দেয়ার বিরুদ্ধে যথাযথ সুরক্ষামুলক ব্যবস্থা প্রতিজনের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ইলেন পিয়ারসন বলেন, ভারতীয় নাগরিকসহ দেশ থেকে বাঙালি মুসলিমদের খেয়ালখুশিমতো বের করে দেয়ার মাধ্যমে ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার বৈষম্যে ইন্ধন দিচ্ছে। তাদের দাবি যে তারা কেবল অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করছে। এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ তারা প্রক্রিয়াগত অধিকার, দেশীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডকে উপেক্ষা করছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে এসব বিষয়ে ১৮ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এর মধ্যে আছেন ৯টি ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা ও তাদের পরিবার। এর মধ্যে আছেন ওইসব ভারতীয় নাগরিক, যাদেরকে বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল, পরে তারা ভারতে ফিরেছেন। এছাড়া আছেন যেসব ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে তাদের পরিবারের সদস্য। ওই আটক ব্যক্তিরা এখনও নিখোঁজ।

এ নিয়ে ৮ই জুলাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের অনুসন্ধান সম্পর্কে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখে। তবে তারা কোনো জবাব দেয়নি। রিপোর্টে আরও বলা হয়, ভারত সরকার এখনো বিতাড়িতদের কোনো সরকারি সংখ্যা জানায়নি। তবে বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড জানিয়েছে, ৭ মে থেকে ১৫ জুনের মধ্যে ভারত ১৫ শতাধিক মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ১০০ জন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী। আটক এসব মুসলিমের বেশির ভাগই দরিদ্র শ্রমিক। আসাম, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, ওড়িশা ও রাজস্থানের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে পুলিশ সেই মুসলিমদের আটক করে সীমান্তরক্ষীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। সীমান্তরক্ষীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা আটক ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাই না করেই মারধর ও হুমকি দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। পরে প্রমাণিত ভারতীয় নাগরিকদের অনেককেই ফের দেশে নিতে হয়েছে। এ অভিযান শুরু হয় এ বছর এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরে হিন্দু পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলার পর। এরপর পুলিশ মুসলিমদের হয়রানি শুরু করে, নাগরিকত্ব দাবি অগ্রাহ্য করে, ফোন, নথি ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করে। ফলে তারা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হারায়।

আসামের বাসিন্দা ৫১ বছর বয়সী সাবেক শিক্ষক খায়রুল ইসলাম জানান, ২৬ মে বিএসএফ তার হাত বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে ১৪ জনের সঙ্গে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায়। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশে যেতে অস্বীকার করলে বিএসএফ কর্মকর্তা আমাকে পেটায়। চারবার রাবার বুলেট ছোড়ে। দুই সপ্তাহ পর তিনি ভারতে ফিরতে সক্ষম হন। বিজেপি নেতারা বহুবার বাংলাদেশের অভিবাসীদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিহিত করেছেন এবং একই শব্দ ব্যবহার করে ভারতের মুসলিমদেরও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হেয় করেছেন। মে মাসে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজ্যগুলোকে নির্দেশ দেয় ৩০ দিনের মধ্যে ‘অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত ও বিতাড়ন’ করতে এবং প্রত্যেক জেলায় আটককেন্দ্র গড়ে তুলতে। এরই মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের কাছে ২৩৬০ জনের নাম পাঠিয়েছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৮ই মে ভারতকে চিঠি দিয়ে এই ‘পুশ-ইন’ বা গণবিতাড়নকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দেয় এবং জানায়, তারা কেবল নিশ্চিত বাংলাদেশি নাগরিকদের সঠিক প্রক্রিয়ায় নেবে। এছাড়াও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ১০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আসাম থেকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয় এবং আরও ৪০ জনকে মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে ভাসিয়ে দেয়। তাদেরকে বলে, সাঁতরে তীরে পৌঁছাতে। মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিউর টম অ্যানড্রুজ বলেন, এটা ভয়াবহভাবে আইনের লঙ্ঘন। তিনি একে মানবিকতার পরিপন্থী ও আন্তর্জাতিক ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতির লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বিতাড়ন করা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। সরকারকে অবশ্যই বিতাড়নের কারণ জানানো, আইনগত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ, আপিলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে এবং আটক ব্যক্তিদের খাবার, চিকিৎসা, আশ্রয় ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের (নারী, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী) জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে।

ইলেন পিয়ারসন বলেন, ভারত সরকার অবৈধ অভিবাসন রোধের নামে হাজারো অসহায় মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি প্রয়োগ করে তারা ভারতের দীর্ঘদিনের শরণার্থী রক্ষার ইতিহাসকে ধ্বংস করছে। ইন্টারন্যাশনাল কোভ্যানেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস এবং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন দ্য ইলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব রেসিয়াল ডিসক্রিমিনেশনের অধীনে প্রতিজন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আছে ভারতের। একই সঙ্গে বর্ণ, গোত্র, জাতীয়তা, বংশগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো মানুষকে নাগরিকত্ব বঞ্চিত করা প্রতিরোধ করার বাধ্যবাধকতা আছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া যেকোনো ব্যক্তিকে ভারতের আটক ও তাকে বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন। এক্ষেত্রে তাদেরকে পুরোপুরি আইনি প্রক্রিয়া মেনে চলা উচিত। কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে যে, নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা এবং সীমান্তরক্ষীরা যেন অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করে। যারা শক্তির অপব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ আছে, তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বহীন তদন্ত করতে হবে। যারা এর জন্য দায়ী হবেন তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শৃংখলা ভঙ্গের শাস্তি দিতে হবে অথবা বিচার করতে হবে। যেসব মানুষকে বহিষ্কারের জন্য আটক রাখা হয়েছে তাদেরকে পর্যাপ্ত খাবার, আশ্রয় ও মেডিকেল সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং পঙ্গুসহ প্রান্তিক পর্যায়ে থাকা মানুষদের বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে সরকারকে।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে প্রবেশ করা লোকজনকে বিতাড়ন করছে। যদিও বিতাড়িতদের মধ্যে কয়েক ডজন বলেছেন তারা বাংলাদেশি নাগরিক, অনেকেই জোর দিয়ে বলেছেন তারা নন। প্রক্রিয়াগত আইন না মানায় বহু ভারতীয় নাগরিক- যাদের বেশির ভাগই বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম, অবৈধভাবে তারা বিতাড়িত হয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার বারবার বলেছে, ভারতের এ একতরফা পদক্ষেপ বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করছে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ‘আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী স্বচ্ছ, যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করে এসব ঘটনা মোকাবিলা করে। বিতাড়িতদের মধ্যে কমপক্ষে ৩০০ জন আসাম রাজ্যের বাসিন্দা। সেখানে ২০১৯ সালে বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। বাকি বিতাড়িতদের অনেকেই বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম। তারা কাজের সন্ধানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে গুজরাট, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা ও দিল্লিতে গিয়েছিলেন।

আসামের ত্রুটিপূর্ণ নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া
আসামে দীর্ঘদিন ধরে যেসব বাঙালিকে ‘অ-আদিবাসী’ বা ‘অ-প্রকৃত’ বাসিন্দা সন্দেহ করা হয়, তারা পক্ষপাতদুষ্ট নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার শিকার হয়ে আসছেন। ১৯৬৪ সাল থেকে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়গুলো নির্ধারণ করছে ফরেনার্স ট্রাইবুনালস- যা আধা-বিচারিক আদালত হিসেবে কাজ করে। রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এসব ট্রাইবুনাল ১,৬৫,৯৯২ জনকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ট্রাইবুনালের কাজকর্ম অস্বচ্ছ।

প্রায়শই বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক এবং প্রক্রিয়াগত অধিকার লঙ্ঘনকারী তারা। একবার কোনো ট্রাইবুনাল কাউকে নির্দোষ ঘোষণা করলেও, আবার একই বা ভিন্ন ট্রাইবুনালে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। এমনকি নথিতে নামের বানান সামান্য অমিল, লিখিত বিবৃতিতে কিছু তথ্য বাদ পড়া, বা সাক্ষ্যে ছোটখাটো অসঙ্গতি থাকলেও নাগরিকত্ব দাবি খারিজ হয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগও দেয়া হয় না। তাদের অনুপস্থিতিতেই রায় দিয়ে দেয়া হয়। আসামের আইনজীবীরা বলছেন, এটি মূলত হয় কারণ সীমান্ত পুলিশ যথাযথ তদন্ত করে না এবং ভুক্তভোগীদের সময়মতো নোটিশ দেয় না। ১৯৮৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত এ ধরনের প্রক্রিয়ায় ৬৩,৯৫৯ জনকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়েছে।

২০১৯ সালের আগস্টে আসামে পরিচালিত ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) নামক বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক যাচাই প্রক্রিয়া থেকে ১৯ লাখেরও বেশি মানুষ বাদ পড়েন- অনেকেই যারা বহু বছর, এমনকি সারাজীবন ভারতে বসবাস করেছেন আছেন তারাও। বাদ পড়াদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হয় ফরেনার্স ট্রাইবুনালের মাধ্যমে। মে মাসে আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা স্বীকার করেন, কর্তৃপক্ষ ৩৩০ জন সন্দেহভাজন ‘অবৈধ অভিবাসী’কে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে রাজ্য ফরেনার্স ট্রাইবুনাল ছাড়াই মানুষকে বিতাড়ন করবে, এমনকি তাদের নাম যদি এনআরসি তালিকায় থাকে তবুও। তিনি বলেন, পুশব্যাক চলতেই থাকবে এবং বিদেশি শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া, যা এনআরসি-র কারণে থেমে ছিল, আবার দ্রুত শুরু হবে। এবার যদি কাউকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, আমরা তাকে ট্রাইবুনালে পাঠাব না; সরাসরি ঠেলে দেব। প্রস্তুতি চলছে।

যদিও তিনি আশ্বাস দেন যে যাদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আপিল ট্রাইবুনাল বা আদালতে মুলতবি আছে, তাদের বিতাড়ন করা হবে না, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে অনেক মুলতবি আপিল থাকা সত্ত্বেও লোকজনকে আটক করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। বারপেটা জেলার ৫১ বছর বয়সী এক দিনমজুরকে ২০১৪ সালে তার অনুপস্থিতিতে রায় দিয়ে ‘অবৈধ অভিবাসী’ ঘোষণা করা হয়, যদিও তার পরিবারের বাকিরা নয়। তার আপিল সুপ্রিম কোর্টে মুলতবি, তবুও ২৪ মে কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে। দুই দিন পর গভীর রাতে বিএসএফ তাকে বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে জোর করে পাঠিয়ে দেয়। তিনি বলেন, আমি মৃত মানুষের মতো বাংলাদেশে ঢুকলাম। ভেবেছিলাম তারা (বিএসএফ) আমাকে গুলি করে মেরে ফেলবে, কেউ জানবেও না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটার পর তিনি ও আরও পাঁচজন স্থানীয় গ্রামবাসীদের সহায়তায় একটি নদী দ্বীপের মাধ্যমে ভারতে ফেরত আসেন। তিনি দাবি করেন, ভারতীয় বিএসএফ সৈন্যদের উপস্থিতিতে তারা প্রবেশ করলেও কেউ তাদের আটকায়নি। তার আইনজীবী বলেন, এটি সুপ্রিম কোর্টের আদেশের স্পষ্ট লঙ্ঘন। আইনজীবী বলেন, আদালতের আদেশ যাচাইয়ের কোনো পদ্ধতি ছিল না। তিনি জামিনের কোনো শর্ত লঙ্ঘন করেননি।

খায়রুল ইসলামকেও অবৈধভাবে বাংলাদেশে পাঠানো হয়, যদিও তার নাগরিকত্ব সংক্রান্ত মামলা সুপ্রিম কোর্টে মুলতবি। ২০১৬ সালে ফরেনার্স ট্রাইবুনাল তাকে অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করে। ২৩ মে রাতে স্থানীয় পুলিশ মরিগাঁও জেলার বাড়ি থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তিনি জানান, তিনি দুই দিন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ‘নো-ম্যানস-ল্যান্ড’-এ কাটিয়েছেন। তার স্ত্রী বলেন, এক বাংলাদেশি সাংবাদিকের তোলা ভিডিও দেখে তিনি জানতে পারেন তার স্বামী বাংলাদেশে রয়েছেন।

প্রক্রিয়াগত অধিকার লঙ্ঘনের ফলে আসামের বহু পরিবার এখন অসহায়। কারবি আংলং জেলায় ২৩ মে রাতে পুলিশ ৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে আটক করে। তার পরিবার জানায়, কোনো কারণ জানানো হয়নি। পরিবারটি জানায়, জানুয়ারি ২০২৪-এ ফরেনার্স ট্রাইবুনাল তার পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু তারা যখন ট্রাইবুনালে যান, জানতে পারেন এপ্রিল মাসে তার অনুপস্থিতিতেই নতুন রায় দিয়ে অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবারটি তার অবস্থান জানে না এবং জুনে গৌহাটি হাইকোর্টে আবেদন করেছে।

২৪ মে বারপেটায় পুলিশ মালেকা খাতুনকে (৬৭) আটক করে। তার ছেলে ইমরান আলী খান বলেন, আমি জানি না কীভাবে তাকে ফেরত আনব। তিনি জানান, মালেকা খাতুন চলাফেরায় অক্ষম এবং দৃষ্টিশক্তি দুর্বল। একা অবস্থায় ২৭ মে রাত ৩টার দিকে বিএসএফ তাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। ২৯ মে তিনি বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার কিছু গ্রামবাসীর ফোন ব্যবহার করে ছেলেকে ফোন করেন। তিনি জানান, প্রায় ছয় বছর তিনি কোকরাঝাড় আটককেন্দ্রে কাটিয়েছেন। ২০২৪ সালে জামিনে মুক্তি পান। নয় ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র তাকেই অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করা হয়। তার মামলাও গৌহাটি হাইকোর্টে চলছে।

২৫ মে বারপেটায় ৪৪ বছর বয়সী আরেকজনকে আটক করে পরদিন বাংলাদেশে পাঠানো হয়। তার ছেলে জানান, ৩০ মে তিনি বাংলাদেশের জামালপুর জেলা থেকে ফোন করেন, বিএসএফ তাকে বলেছিল, যদি সীমান্ত পেরিয়ে ফেরত আসতে চেষ্টা করে, গুলি করবে। তার ছেলে জানান, তার বাবা তিন দিন হেঁটে রাস্তায় শুয়ে ছিলেন। পরে একটি মসজিদে আশ্রয় পান। পরিবারের একমাত্র সদস্য হিসেবে তাকেই অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করা হয়েছে। তার মামলাও গৌহাটি হাইকোর্টে আপিলাধীন। আসামের আইনজীবীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বহু মানুষকে নির্বিচারে আটক করা হয়েছে। আইনজীবী আমান ওয়াদুদ বলেন, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য একটি সঠিক আইনি প্রক্রিয়া আছে, যেখানে উৎস দেশকে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু এখানে মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর কেউ জানে না তারা কোথায় আছে।

২৭ মে ওয়াদুদ ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দায়ের করলেও এখনো কোনো সাড়া পাননি। ৫ জুন, ১০০-র বেশি কর্মী, আইনজীবী ও শিক্ষাবিদ ভারত সরকারকে উন্মুক্ত চিঠিতে আহ্বান জানান যে, আসামে এসব বিতাড়ন বন্ধ করতে হবে, কারণ এগুলো জীবন ও সমতার অধিকার লঙ্ঘন করছে। তারা লিখেছেন, পুশব্যাকের ফলে মানুষ চরম বিপদের মুখে পড়ছে। কারণ এতে তারা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের গুলির মুখে বা অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়ছে।

বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম অভিবাসী শ্রমিকদের লক্ষ্য করে দমননীতি
বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্য দরিদ্রতায় বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর দমননীতি বাড়িয়েছে, তাদের নাগরিকত্ব যাচাই না করেই। মহারাষ্ট্রে, কর্তৃপক্ষ পশ্চিমবঙ্গ (যা বাংলাদেশের সীমানা সংলগ্ন) থেকে আসা অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের আটক ও বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। মুম্বইয়ে অন্তত সাতজন পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিককে আটক ও বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল, যাদের ফিরিয়ে আনা হয় শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার পর। ৩৪ বছর বয়সী নাজিমউদ্দিন শেখ, পশ্চিমবঙ্গের এক রাজমিস্ত্রি, পাঁচ বছর মুম্বইয়ে কাজ করার পর ৯ জুন আটক হন এবং বাংলাদেশে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে নেয় এবং নাগরিকত্ব প্রমাণকারী নথি ছিড়ে ফেলে। এরপর তাকে আরও শতাধিক লোকের সঙ্গে বিএসএফ বিমানে করে ত্রিপুরা (বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন) নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, আমরা ভারতীয় বললেও (বিএসএফ) শুনছিল না। বেশি কথা বললে তারা মারছিল। পিঠ ও হাতে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছিল। আমাদের মারধর করে বলছিল, আমরা যেন নিজেদের বাংলাদেশি বলি। নাজিমউদ্দিন শেখ জানান, তাকে আটজনের সঙ্গে বাংলাদেশে ঢুকতে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশের এক গ্রামে পৌঁছে স্থানীয়রা তাকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে সাহায্য করে এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) কাছে নিয়ে যায়। ১৫ জুন, বিজিবি তাকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোর সমালোচনা করে বলেন, বাংলা ভাষায় কথা বলা কি অপরাধ? এভাবে আপনি বাংলা ভাষাভাষী সবাইকে বাংলাদেশি বলে প্রমাণ করছেন, লজ্জা হওয়া উচিত।

গুজরাটে, এপ্রিল-মে মাসে সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, আহমেদাবাদের চান্দোলা লেক ও সিয়াসাত নগর এলাকায় কর্তৃপক্ষ ১০,০০০-এর বেশি স্থাপনা-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ধ্বংস করেছে কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই। কর্তৃপক্ষ দাবি করে, এগুলো ছিল ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ বসতি। এসব ভাঙচুর ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় লঙ্ঘন করে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ভাঙচুরের আগে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

জুনে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এসব ভাঙচুরের নিন্দা করে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা বা বিদেশি নাগরিকত্ব কখনোই কোনো আইনি সুরক্ষা ছাড়া জোরপূর্বক উচ্ছেদের অজুহাত হতে পারে না।

এই অভিযানের অংশ হিসেবে আহমেদাবাদে ৮৯০ জনকে আটক করা হয়, যার মধ্যে ২১৯ জন নারী ও ২১৪ জন শিশু। তাদের শহরের রাস্তায় চার কিলোমিটার হাঁটিয়ে প্রকাশ্যে শোভাযাত্রা করানো হয়। গুজরাট কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা রাজ্যজুড়ে প্রায় ৬,৫০০ জনকে আটক করেছে এবং সতর্ক করে দেয়, যে কেউ অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় বা সহায়তা দেবে, কঠোর শাস্তির মুখে পড়বে।

৩ মে, পশ্চিমবঙ্গ অভিবাসী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের সভাপতি ও সংসদ সদস্য সমীরুল ইসলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি দিয়ে লেখেন, ‘বহু ক্ষেত্রে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাসিন্দাদের গুজরাটে বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও আটক করা হচ্ছে। আরও ভয়াবহ হলো, সম্পূর্ণ বাংলা ভাষাভাষী বসতিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে, পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ নথি ধ্বংস হচ্ছে এবং পরিবারগুলো জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।’

mzamin

Thursday, June 12, 2025

আসামে মন্দিরে কারা রেখে গেল গরুর মাংস, এ নিয়ে দুই পক্ষে ঘিরে উত্তেজনা

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের পশ্চিম অংশের ধুবড়ি জেলায় একটি মন্দিরের চত্বরে পশুর মাংস পড়ে থাকা নিয়ে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এ ঘটনার পর সেখানে মানুষের জমায়েত এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, এই মাংস গরুর। এ ঘটনার জেরে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গত রোববার সকালে ধুবড়ি শহরের একটি হনুমান মন্দির চত্বরে পশুর মাংস পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর গত সোমবার সকাল থেকে এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। মন্দির–সংলগ্ন একটি রাস্তা অবরোধ করেন বাসিন্দারা। তাঁরা স্লোগান দেন এবং টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখান।

স্থানীয় প্রশাসন প্রাণীর দেহাবশেষ সরাতে গেলে তাদের বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। বিক্ষোভকারীরা দাবি করেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত দেহাবশেষ সরাতে দেওয়া হবে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, এ নিয়ে তৃতীয়বার ওই মন্দিরে এমন ঘটনা ঘটল। আসাম বিজেপিশাসিত রাজ্য।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনের ঘোষণা দিয়েছে, ওই এলাকায় সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ধুবড়ি টাউনে সব দোকানপাট বন্ধ থাকবে। কেবল চিকিৎসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দমকল ও জরুরি পরিষেবা প্রভৃতি খোলা থাকবে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, আধা–সামরিক বাহিনী এবং নিরাপত্তাবিষয়ক অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের ছাড় দেওয়া হবে।

ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’–কে ধুবড়ির জেলা শাসক দিবাকর নাথ বলেছেন, সন্দেহ করা হচ্ছে, স্থানীয় হনুমান মন্দিরের কাছে গরুর দেহাবশেষ পাওয়া যায়। এর জেরে সোমবার থেকে সেখানে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও গতকাল রাতে উত্তেজনা অনেকটাই কমে এসেছে। সব সম্প্রদায়কে নিয়ে শান্তি কমিটি গঠন করার পাশাপাশি এলাকায় পুলিশ এবং আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা আজ বুধবার এই বিষয়ে উসকানিমূলক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুসলিমরা গরুর মাংস খায়, হিন্দু এলাকায় ফেলে দেয়, হিন্দুদের তাড়িয়ে দেয়, তারপর জায়গা দখল করে। গরুর মাংসকে একটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা আমরা সহ্য করব না। আমরা এটা কখনই হতে দেব না।’

হিমন্তের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্সে’ প্রকাশ করেছেন আসামের স্বাস্থ্য, পরিবার কল্যাণ এবং সেচ মন্ত্রকের দায়িত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী অশোক সিংঘল।

অশোক ঘটনার সময় থেকে ধারাবাহিকভাবে উত্তেজনায় মদদ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি ধারাবাহিকভাবে ‘এক্সে’ যা লিখছেন, তার বিষয়বস্তু নিয়ে সর্বভারতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

সিংঘল রোববার থেকে নিয়মিত যা লিখছেন, তার মোটামুটি বিষয়বস্তু হলো—ধুবড়িতে যে ঘটনা ঘটছে, তা হঠাৎ ঘটছে না। তা দীর্ঘদিন ধরে চলা কংগ্রেসের রাজনীতির ফল। এখন মুসলিম সম্প্রদায় গরু খেয়ে তার দেহাবশেষ হিন্দুদের মন্দিরে ফেলছে। সিংঘলের মতে, এর কারণ ধুবড়ির হিন্দু জনসংখ্যা ক্রমশ কমছে।

আসামে কাদের লক্ষ্য করে আদিবাসী, মূল নিবাসীদের আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি দিল হিমান্তের সরকার
- ৩০ মে ২০২৫

ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় বিজেপিশাসিত আসাম রাজ্যের মন্ত্রিসভা গত বুধবার একটি প্রস্তাব পাস করেছে। এতে বলা হয়েছে, রাজ্যের আদিবাসী, মূল নিবাসী এবং উপজাতি জনজাতিকে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার বিশেষ অনুমতি দেওয়া হবে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই ঘোষণাকে ‘বিপজ্জনক পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীরা।

মূলত বাংলাদেশি বলে রাজ্যের মুসলিমদের চাপে রাখতে বিজেপি–দলীয় মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত শর্মার সরকার এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।

রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি গৌরব গগৈ গতকাল বৃহস্পতিবার হিমান্ত শর্মার সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক’ উল্লেখ করে এর নিন্দা জানান। তিনি বলেন, আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি ভবিষ্যতে আসামে সহিংসতা বৃদ্ধি করবে।

বিশ্বশর্মা গত বুধবার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘আসাম রাজ্যে ধুবড়ি, বরপেটা, নগাঁও, মরিগাঁও, দক্ষিণ শালমারা, গোয়ালপাড়ার মতো এমন অনেক জেলা রয়েছে, যেখানে আমাদের মূল নিবাসী আদিবাসীরা সংখ্যালঘু। তারা নিরাপত্তার অভাবে ভুগছেন। বিশেষত, সম্প্রতি বাংলাদেশের ঘটনার পরে তাঁরা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, সীমান্তের ওপার থেকে তাঁদের ওপর হামলা হতে পারে বা তাঁদের গ্রামেও হামলা হতে পারে। এই পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখে মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আসামের এসব অঞ্চলে মূল নিবাসী আদিবাসীদের আগ্নেয়াস্ত্রের অনুমতি দেওয়া হবে। আমরা তাঁদের লাইসেন্স দেব।’

হিমন্ত শর্মা যে ছয়টি জেলার কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোতে মুসলিমদের বসবাস বেশি। যেমন ২০১১ সালের শেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, বরপেটা জেলায় মুসলমান জনসংখ্যা ৭৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ধুবড়িতে ৭৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ, নগাঁও জেলায় ৫৬ দশমিক ২০ শতাংশ, মরিগাঁওতে ৫২ দশমিক ৫৬ শতাংশ, দক্ষিণ শালমারায় ৯৫ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং গোয়ালপাড়া জেলায় ৫৭ দশমিক ৫২ শতাংশ।

এর বাইরেও একাধিক জেলা রয়েছে যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। যেমন পশ্চিম আসামের বঙ্গাইগাঁও, দক্ষিণ আসামে করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি, মধ্য আসামে হোজাই এবং দারাং। তবে সেসব জেলায় আগ্নেয়াস্ত্রের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আসাম সরকার অতীত ও বর্তমানের বক্তব্য অনুসারে এসব জেলায় মুসলিমদের মধ্যে প্রধানত রয়েছেন বাঙালি মুসলমান। যদিও মুসলিম সম্প্রদায়ে বড় অংশ এই বক্তব্যকে অস্বীকার করে বলেন, তাঁরা ওই রাজ্যেই জন্মেছেন। তাঁরা বাঙালি নন, আসামের মুসলিম। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, ‘আমরা দেখেছি এখানে উপজাতি সম্প্রদায় চূড়ান্ত ভয়ের মধ্যে রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিশেষত বর্তমানে ‘বাংলাদেশি নাগরিকদের’ ফেরত পাঠানোর যে প্রক্রিয়া চলছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে মূল নিবাসী মানুষের নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে। কিছু কিছু গ্রামে মূল নিবাসী মানুষ চূড়ান্তভাবে সংখ্যালঘু।’

বড়পেটা জেলার উদাহরণ দিয়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মা দাবি করেন, ‘বাঘাবার-জনিয়া নামের এক অঞ্চলে কী হচ্ছে, আমি নিজে তা জানি। সেখানকর গ্রামে উপজাতিদের ৫০০টি পরিবার রয়েছে। তাদের আশপাশে আর কেউ নেই। এই অঞ্চল থেকে কেউ আগ্নেয়াস্ত্র রাখার আবেদন জানালে আমরা নিশ্চিতভাবে তাঁকে বন্দুক রাখার অনুমতি দেব।’

কংগ্রেসের বিরোধিতা

আসামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও সমাজের বড় অংশের মানুষ বলেছেন, এর ফলে রাজ্যে ও অঞ্চলে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

আসামের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি গৌরব গগৈ এই সিদ্ধান্তের প্রবল বিরোধিতা করে বলেন, ‘আসামের মানুষের যেটা প্রয়োজন সেটা হলো চাকরি, কম খরচের স্বাস্থ্য পরিষেবা ও শিক্ষা। বন্দুকের প্রয়োজন তাদের নেই। কিন্তু সরকার এখন পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে শক্তিশালী না করে বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রতি সহানুভূতিশীলদের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র বিতরণ করতে চাইছে, যা স্থানীয় অপরাধ চক্রের হাতে পৌঁছাবে। এতে ব্যক্তিগত আক্রোশের ভিত্তিতে বিভিন্ন উপদলের মধ্যে সহিংসতা ও অপরাধ বাড়বে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হেনস্তা করা হবে।’

গৌরব গগৈ আরও বলেন, এটা সুশাসন নয় বরং অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি পদক্ষেপ, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে এবং জঙ্গলের রাজত্বে তৈরি হবে।

কংগ্রেস নেতা বলেন, এই সিদ্ধান্ত মানুষের কল্যাণে করা হয়নি। নির্বাচন নিয়ে যে উদ্বেগ, তা মাথায় রেখে করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

আসামের পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে সীমান্ত অঞ্চলে বাংলাদেশের সঙ্গে আসাম তথা ভারতের সম্পর্কের আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। ছবি: এএনআই

Sunday, April 27, 2025

কাশ্মীর হামলাকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলায় গ্রেপ্তার বিধায়ক

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলার নেপথ্যে নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মন্তব্য করে গ্রেপ্তার হয়েছেন আসাম রাজ্যের একজন বিধায়ক।

বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্য থেকে বিরোধী দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (এআইইউডিএফ) বিধায়ক আমিনুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলওয়ামা হামলা (২০১৯) এবং সদ্য ঘটে যাওয়া পেহেলগাম হামলাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক মন্তব্যে আমিনুল ইসলাম এসব অভিযোগ তোলেন।

তার ওই ভিডিও ভাইরাল হলে আসাম পুলিশ তদন্তে নামে এবং বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে সে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আসাম পুলিশের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানানো হয়, ধিং আসনের বিধায়ক আমিনুল ইসলামের মন্তব্যে জনমনে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা ছড়াতে পারে- এমন আশঙ্কায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী হামলার পরে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাকিস্তানকে রক্ষার চেষ্টা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। বিধায়ক আমিনুল ইসলামের বক্তব্য পাকিস্তানপন্থি মনোভাব প্রকাশ করে, তাই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গ্রেপ্তার হওয়া বিধায়ক আমিনুল ইসলামের দল এআইইউডিএফের প্রধান মাওলানা বদরউদ্দিন আজমল বলেছেন, আমিনুলের মন্তব্য দলের বক্তব্য নয়। তিনি জানান, সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নেই। যারা সন্ত্রাস ছড়ায় তারা ইসলাম ও মুসলমানদের অপমান করে। আমরা সরকারের পাশে আছি এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একত্রিত।

এছাড়া ভারতের নাগরিক সায়ক ঘোষ চৌধুরীও সামাজিক মাধ্যমে নিজের পোস্টে দাবি করেন, কাশ্মীর হামলার পেছনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের হাত থাকতে পারে। তিনি লেখেন, বর্তমান প্রযুক্তির যুগে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির পরও কিভাবে জঙ্গিরা প্রবেশ করে হামলা চালাতে পারে, তা প্রশ্নবিদ্ধ।

সায়ক ঘোষের মন্তব্যের পাশাপাশি আরও অনেক ভারতীয় নাগরিকও হামলার ঘটনাকে পরিকল্পিত এবং সরকারের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা বলে উল্লেখ করেছেন। অনেকে দাবি করেছেন, ভারতের ভেতরেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংঘর্ষ উসকে দেওয়া হতে পারে।

প্রসঙ্গত, কাশ্মীর অঞ্চল নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। উভয় দেশই পুরো কাশ্মীরকে নিজেদের অংশ দাবি করে, তবে তা তারা আংশিকভাবে শাসন করে আসছে।

জম্মু-কাশ্মীরের ‘বৈসরান’ এলাকাটিকে স্থানীয়রা ভালোবেসে বলেন ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’। এলাকাটি পেহেলগাম থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার ওপরে অবস্থিত একটি মনোরম উপত্যকা। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে এই এলাকা ভরে ওঠে দেশি-বিদেশি পর্যটকে।

কাশ্মীর হামলা নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর বিধায়ক আমিনুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবি : সংগৃহীত
কাশ্মীর হামলা নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর বিধায়ক আমিনুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবি : সংগৃহীত



Saturday, February 22, 2025

৯০ বছরের নিয়মে ইতি, জুম্মার নামাজে আর বিরতি নয় আসাম বিধানসভায়!

৯০ বছরের রীতির অবসান। আসাম বিধানসভা অধিবেশনে জুম্মার নামাজের সময়ে প্রচলিত  দু'ঘণ্টার বিরতি তুলে দেওয়া হল। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে গেল আসাম  বিধানসভায়। শুক্রবার আসামের  মুসলিম বিধায়করা জুম্মার নামাজের জন্য দু’ঘণ্টার বিরতি পেলেন না। বিধানসভায় গত আগস্টে পাশ হওয়া একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ বলে খবর। আসামের  মুখ্যমন্ত্রী   সমাজমাধ্যমে এই বিষয় নিয়ে আগেই একটি পোস্ট করেছিলেন। তাতে লিখছিলেন ‘‘আমরা কাজকে অগ্রাধিকার দিতে চাই। তাই আসাম বিধানসভায় জুম্মার নামাজের দু’ঘণ্টার বিরতির প্রথা তুলে দেওয়া হচ্ছে। মুছে ফেলা হচ্ছে ঔপনিবেশিকতার আরও একটি চিহ্ন।

১৯৩৭ সালে মুসলিম লিগের সৈয়দ সাদউল্লা এই প্রথা চালু করেছিলেন। হিমন্তর ইচ্ছামতোই ৭ সদস্যের কমিটি গড়া হয়, এই নিয়মের কোনও প্রয়োজন রয়েছে কিনা খতিয়ে দেখার জন্য। শুক্রবার বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে অবলুপ্ত করা হয় এই নিয়ম। জানানো হয়, লোকসভা ও রাজ্যসভা কোনও জায়গাতেই এমন নিয়ম নেই তাই আসামেও  এই নিয়ম গুরুত্বহীন। ওই ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপে’ সহায়তার জন্য আসাম  বিধানসভার স্পিকার বিশ্বজিৎ দইমারিসহ শাসক শিবিরের বিধায়কদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছিলেন বিজেপি নেতা হিমন্ত। স্বাভাবিকভাবেই এই সিদ্ধান্তে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট এআইইউডিএফ বিধায়ক রফিকুল ইসলাম। তাঁর দাবি, বিষয়টি সংখ্যাগরিষ্ঠের অজুহাতে সংখ্যালঘুদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হল।

তিনি বলেছেন, "বিধানসভায় প্রায় ৩০ জন মুসলিম বিধায়ক আছেন। আমরা এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করেছি। কিন্তু তাদের (বিজেপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে এবং সেই ভিত্তিতেই এটা চাপিয়ে দিচ্ছে।" কংগ্রেসের পরিষদীয় নেতা দেবব্রত সাইকিয়া বলেন, শুক্রবার বিধানসভার কোনও কাছাকাছি স্থানে মুসলিম বিধায়কদের 'নামাজ' পড়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাঁর কথায়, "আমার দলের বেশ কয়েকজন সহকর্মী এবং এআইইউডিএফ বিধায়ক নামাজ পড়তে যাওয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিতে পারেননি। যেহেতু এটি শুধুমাত্র শুক্রবারের জন্য একটি বিশেষ প্রার্থনার বাধ্যবাধকতা, তাই আমার মনে হয় কাছাকাছি  এর জন্য একটি ব্যবস্থা করা যেতেই পারে।"

সূত্র : দ্য উইক

mzamin

Thursday, December 12, 2024

মন্দির সংস্কারে বাধা দিতে বিজিবি ভারতে প্রবেশ করেনি: বিএসএফ

আসামের সীমান্তে একটি মন্দির সংস্কারের কাজে বাধা দিতে বিজিবির সদস্যরা ভারতে প্রবেশ করেছিল বলে ভারতীয় মিডিয়াতে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং স্থানীয় স্তরে যে রটনার জেরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল তাকে অস্বীকার করেছে বিএসএফ। গত সপ্তাহে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্তে একটি মন্দির সংস্কারের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছিল বিজিবির বিরুদ্ধে।

এই নিয়ে সমাজমাধ্যমেও রটনা হয়েছিল যে, বিজিবি ভারতের মধ্যে প্রবেশ করেছিল এবং মন্দির সংস্কারের কাজে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু বিএসএফ-র এক ঊর্ধ্বতন কর্তা এই রটনাকে খারিজ করে দিয়ে জানিয়েছেন, বিজিবির কোনও সদস্যের ভারতে কোনও অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি। তিনি আরও বলেন, বিজিবি আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রটোকল ভঙ্গ করার মত কাজ করে না বলেই তাদের বিশ্বাস।

বিএসএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সীমান্তের কাছে থাকা একটি মন্দির সংস্কারের জন্য পর্দা টাঙানো হয়েছিল। সেটি নিয়ে বিজিবি তাদের উদ্বেগ জানিয়েছিল। বিএসএফের পক্ষ থেকে সীমান্তের দায়িত্বে থাকা বিজিবি কর্মকর্তাদের জানানো হয় যে, এটি সাময়িক ভবে টাঙানো হয়েছে। মন্দির সংস্কারের কাজ হয়ে গেলেই খুলে ফেলা হবে। পরে সেটি খুলে ফেলা হলে বিজিবি কোনও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হচ্ছে না- বুঝতে পেরে আর কোনও আপত্তি জানায়নি।

mzamin

Thursday, September 5, 2024

আসামে বিদেশী চিহ্নিত করে বন্দী শিবিরে পাঠানো হলো ৪০ মুসলমানকে

নয়া দিগন্তঃ ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের ৪০ জন বাংলাভাষী মুসলমানকে ‘বিদেশী’ বলে চিহ্নিত করে বন্দী শিবিরে পাঠানো হয়েছে। গত প্রায় এক মাসে, তিন দফায় বরপেটা জেলার ওই বাসিন্দাদের বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করেছে ওই রাজ্যের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল।

এদের মধ্যে নয়জন নারী আছেন। এর একজনের সন্ধান পেয়েছে বিবিসি বাংলা, যার পরিবার দাবি করছে যে তার নাম জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। অর্থাৎ তিনি যে ভারতেরই নাগরিক, তা এক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পরে ভারত সরকারের স্বীকৃতি পেয়েছে।

অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, আগস্টের ৮, ৯ তারিখে ২২ জনকে আর ২ সেপ্টেম্বর আরো ২৮ জনকে এভাবে থানায় ডেকে নিয়ে গিয়ে হেফাজতে নেয়া হয়েছে। বিদেশী চিহ্নিতকরণের যে ট্রাইব্যুনাল আছে আসামে, সেখানে হাজির করানোর পরে তাদের সবাইকে গোয়ালপাড়ার মাতিয়ায় চিহ্নিত হওয়া বিদেশীদের জন্য যে ট্রানজিট ক্যাম্প আছে, সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ওই ট্রানজিট ক্যাম্পটি ভারতের সবথেকে বড় ডিটেনশান সেন্টার, যদিও এটির নাম পরিবর্তন করে এখন ট্রানজিট ক্যাম্প রাখা হয়েছে।

শিবিরে পথে বাসে কান্নাকাটি নারী-পুরুষদের
বরপেটার পুলিশ সুপারের অফিস থেকে ওই নারী-পুরুষদের একটি বাসে কড়া নিরাপত্তা দিয়ে গোয়ালপাড়ার ট্রানজিট ক্যাম্পে যখন নিয়ে যাওয়া হয়, ওই সময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

সেটিতে দেখা যাচ্ছে, চিহ্নিত হওয়া ‘বিদেশী’দের পরিবার-পরিজন যেমন কান্নাকাটি করছেন, তেমনই বাসের ভেতরে বসা চিহ্নিত হওয়া ‘বিদেশী’রাও চিৎকার করে কাঁদছেন। আত্মীয় পরিজনদের কেউ কেউ রাস্তায় শুয়ে পড়েও কান্নাকাটি করছেন, এমনটাও দেখা গেছে ওই ভিডিওতে।

বরপেটার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারিন্টেডেন্ট বিদ্যুৎ বিকাশ বরা ভুইঞা বার্তাসংস্থা এএনআইকে জানান, ‘জেলার সীমান্ত পুলিশ সোমবার বরপেটার বিভিন্ন থানায় বসবাসকারী ২৮ জন চিহ্নিত বিদেশীকে আটক করেছে। বিদেশী ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে বিদেশী বলে চিহ্নিত হওয়ার পরেই এদের গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে নয়জন নারী ও ১৯ জন পুরুষ আছেন। সব আনুষ্ঠানিকতার শেষে এদের গোয়ালপাড়ার শিবিরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। গত মাসেও একইভাবে ২২ জন চিহ্নিত হওয়া বিদেশীকে আটক করা হয়েছিল।’

সই করতে ডাকা হয়
বরপেটা জেলার কলগাছিয়া থানা এলাকার ডিমাপুর গ্রামের বাসিন্দা নুরজাহান খাতুনের স্বামী জাহেদুল ইসলামকে পুলিশ থানায় দেখা করতে বলেছিল কিছু সই-সাবুদ করার জন্য।

নুরজাহান খাতুন বলেন, ‘থানা থেকে বলেছিল যে কিছু কাগজপত্র নিয়ে দেখা করতে, সই করতে হবে। সেই মোতাবেক আমার স্বামী থানায় যায়। কিন্তু সেখান থেকে পুলিশ সুপারের অফিসে পাঠানো হয়, আর তারপরেই গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।’

ওই নারীর সাথে যে অ্যাক্টিভিস্টের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া গেছে, সেই ফারুক খান বলছিলেন, ‘আমরা কাগজপত্র সব পরীক্ষা করে দেখতে পাই যে ২০০৪ সালে থানা থেকে একটি রিপোর্ট দেয়া হয় যে জাহেদুল ইসলাম নাকি বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন। এর ভিত্তিতে তার ট্রাইব্যুনালে গিয়ে মামলা লড়া দরকার ছিল কিন্তু তার যুক্তি ছিল যে মিথ্যা অভিযোগের মামলা কেন লড়ব, কেন ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও সেটা প্রমাণ করতে হবে! তবে জাহেদুল ইসলাম ছাড়া বাকিরা কিন্তু ট্রাইব্যুনালে গিয়েছিলেন। তাদেরও একই পরিণতি হয়েছে।’

জাহেদুল ইসলামের স্ত্রী নুরজাহান খাতুনের কথায়, ‘আমার স্বামীর এনআরসি-তে নাম আছে, তার নাম ডি-ভোটার তালিকাতেও ছিল না। সে জন্যই নিশ্চিন্ত ছিলাম আমরা। তবে সেই পুরনো রিপোর্টের ভিত্তিতে এখন তাকে বিদেশী বলে দেয়া হলো।’

তার দাবির সমর্থনে বেশ কিছু নথি বিবিসি বাংলাকে পাঠিয়েছেন নুরজাহান খাতুন।

ডি-ভোটার, বিদেশী ট্রাইব্যুনাল
আসামে ডি-ভোটার অথবা ডাউটফুল, অর্থাৎ সন্দেহজনক ভোটারদের চিহ্নিত করার নিয়ম চালু হয় ৯০ দশকের শেষ দিক থেকে। এর উদ্দেশ্য ছিল কথিত বাংলাদেশীদের ভোটার তালিকায় চিহ্নিত করে তাদের ভোটদান থেকে বিরত রাখা।

প্রথমের দিকে কয়েক লাখ ডি-ভোটারকে চিহ্নিত করা হলেও পরে ধীরে ধীরে সই সংখ্যা কমতে থাকে। সম্প্রতি আসাম সরকার রাজ্য বিধানসভায় জানিয়েছে, এই মুহূর্তে সেখানে এক লাখ ১৯ হাজার ৫৭০ জন ডি-ভোটার আছেন।

অন্যদিকে ডি-ভোটার বলে চিহ্নিত করার পরে এক ব্যক্তিকে বিদেশী ট্রাইব্যুনালে যেতে হয় নিজেকে ভারতীয় বলে প্রমাণ করতে।

এই ট্রাইব্যুনালগুলো আধা-বিচারালয় এবং এখানে বিচারকাজ পরিচালনা করেন যে ট্রাইব্যুনাল সদস্যরা, তারা আদতে বিচারক নন। আসাম সরকার এদের চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ করে।

প্রায় ১০০টি এমন ট্রাইব্যুনাল আসামে কাজ করে।

ওই ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলা লড়েন যেসব উকিল, তারাও মক্কেলদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ নিয়েও যথার্থভাবে মামলা উপস্থাপন করেন না বলে অভিযোগ ওঠে। নানা সময়ে মক্কেলদের সঠিক শুনানির তারিখ বা ট্রাইব্যুনালের নির্দেশও পাঠান না, এমন অভিযোগও শোনা গেছে।

ট্রাইব্যুনালে বিদেশী বলে চিহ্নিত হলে গুয়াহাটি হাইকোর্টে আবেদন করা যায়। হাইকোর্ট আর সুপ্রিমকোর্টে আবেদন করে বহু চিহ্নিত হওয়া ‘বিদেশী’ ছাড় পেয়েছেন।

একই গ্রামের তিন নারী আটক
বরপেটা জেলার অন্তর্গত হাওলি থানার কালাজার গ্রামের তিন নারীকে ২ সেপ্টেম্বর একইভাবে আটক করা হয়।

বুধবার ওই গ্রামে গিয়েছিলেন আসামের রাজ্যভিত্তিক দল, ‘রাইজর দল’-এর সম্পাদক ও অ্যাক্টিভিস্ট মনিরুজ্জামান।

সেখানে তাদের পরিবারের সাথে কথা বলেন তিনি।

মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এখানে জবেদা খাতুন, সুফিয়া খাতুন ও রায়জান বেগম নামের তিন নারীকে আটক করে ট্রানজিট ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। তাদের নথিপত্র সব আমি দেখলাম। এদের মধ্যে জবেদা খাতুনের ব্যাপারটা হলো ২০১৬-১৭ সালে মামলা দেয়া হয়েছিল তার নামে। ট্রাইব্যুনালে পর্যাপ্ত নথি দিতে পারেননি বলে বিদেশী বলে চিহ্নিত হয়ে যান তিনি। সেটা ২০১৯ সালের ঘটনা। তবে তার উকিল সেই নির্দেশের কথা জানাননি জবেদা খাতুনকে। ওই নির্দেশের ব্যাপারে সময়মতো জানা গেলে গুয়াহাটি হাইকোর্টে যাওয়া যেত। অন্যদের ক্ষেত্রেও দেখতে পাচ্ছি ট্রাইব্যুনালের উকিলদের একই রকম খামখেয়ালিপনা ছিল।’

তিনি বলেন, ‘এমন অনেক ঘটনাই সামনে আসে, যেখানে উকিলরা অর্থ নিয়েও মক্কেলদের সঠিক পরামর্শ বা শুনানির দিন সম্বন্ধে জানান না। যার ফলে একতরফা অর্ডার দিয়ে দেয় ট্রাইব্যুনাল। ভুগতে হয় এমন সাধারণ গরীব মানুষকে।’
সূত্র : বিবিসি

Tuesday, September 3, 2024

‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ গান গেয়ে আসামে গ্রেপ্তার সংগীতশিল্পী

বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলন চলাকালে যে গান প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল, সেই ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ ভালোভাবেই ছড়িয়েছে ভারতে; বিশেষ করে পূর্ব ভারতে। পশ্চিমবঙ্গে যে গণ-আন্দোলন চলছে, সেখানে গানটি গাইছেন সাধারণ মানুষ, গানটি বাজানো হচ্ছে লাউডস্পিকারে। অনেক সময় প্রথম লাইনটি অবিকৃত রেখে কথা বা সুর পরিবর্তন করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকার এ গান গাওয়ার জন্য এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।

তবে আসামে গানটির প্রথম লাইন অবিকৃত রেখে গাওয়ার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে রাজ্যের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আলতাপ হুসেনকে। অভিযোগ, তাঁর গান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আঘাত হেনেছে। গানটির কারণে রাজ্যে হিন্দু-মুসলমান বিবাদ বাড়বে।

‘অহম তোমার বাপের নাকি, মিয়া খেদিব খুজা’—হলো গানের প্রথম দুই লাইন। বাংলা করলে এমন হয়—আসাম কারও বাপের নাকি, খুঁজে খুঁজে মিয়া বা বাঙালি মুসলমানকে চিহ্নিত করে তাদের বিদায় করার এই প্রক্রিয়া আর কত দিন চলবে।

স্পষ্টভাবেই এ গানে নাম না করে সমালোচনা করা হয়েছে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বাঙালি মুসলমান নীতির। তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে বাঙালি মুসলমানবিরোধী তাঁর যে রাজনৈতিক বয়ান, তা আবার সামনে এনেছেন।

বাঙালি মুসলমানবিরোধী অবস্থান বিশ্বশর্মার


বিধানসভায় দিন কয়েক আগে মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন, বাঙালি মুসলমানের সংখ্যা আসামে দ্রুত বাড়ছে। এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যাবে না। আসামকে তিনি মুসলমানপ্রধান রাজ্য হতে দেবেন না।

বিধানসভায় বিশ্বশর্মার করা মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসসহ একাধিক বিরোধী দল থানায় অভিযোগ করে। অতীতে কংগ্রেস মুসলমানদের সমর্থনে বিশ্বশর্মার বিরুদ্ধে মামলা করেনি এই ভয়ে যে তাদের হিন্দু ভোট ভাগ হয়ে যাবে। এবার তারা সেটা করল।

ধারণা করা হচ্ছে, আসামে বাঙালি মুসলমানপ্রধান দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের জনপ্রিয়তা মুসলমান সমাজে কমার সঙ্গে সঙ্গে আবার নতুন করে কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছে। সেটা মাথায় রেখে মুসলমান সমাজের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে মুসলমানের পক্ষ নিয়ে বিশ্বশর্মা আসামে ধীরে ধীরে মাঠে নামছে কংগ্রেস।

শুধু এ ঘটনা নয়, মুসলমানদের বিরুদ্ধে কয়েক দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে কথা বলছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। দিন কয়েক আগে তিনি মন্তব্য করেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে আসাম মুসলমানপ্রধান রাজ্যে পরিণত হবে।

বাঙালি মুসলমানরা মূলত আসামের দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশে বসবাস করেন। কাজের জন্য তাঁরা ‘আপার’ বা উজান আসামেও যান। মুখ্যমন্ত্রী তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, বাঙালি মুসলমানরা কেন দলে দলে উজান আসামে কাজ করতে যাবেন? এই কাজের সুযোগে তাঁরা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এ ছাড়া আসাম বিধানসভায় সম্প্রতি নামাজের বিরতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চলছে।

তবে শুধু আসাম নয়, পাশের রাজ্য মেঘালয়ের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (ইউএসটিএম) প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাহবুবুল হককেও বিপদে ফেলেছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। বেশ কিছুদিন ধরেই মাহবুবুল হক সম্পর্কে মন্তব্য করার পরে জনপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও সরাসরি মন্তব্য করেছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা।

অধ্যাপক মাহবুবুল হক সংবাদমাধ্যমকে জানান, ইউএসটিএমের ছাত্রদের আসামে সরকারি চাকরি থেকে নিষিদ্ধ করা হতে পারে বলে হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্তব্যের পরে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ভর্তি ব্যাপক পরিমাণে কমে গেছে।

আসামে প্রায় ৩৫ শতাংশ মুসলমান, যাঁদের মধ্যে বড় সংখ্যায় বাঙালি মুসলমান। আসামে মুসলমান জনসংখ্যার বিষয়টি স্বাধীনতার সময় থেকে এমন একটি ইস্যু, যা নিয়ে কথা বললেই রাজ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং অন্যান্য বিষয় চাপা পড়ে যায়। সেটা মাথায় রেখেই বাঙালি মুসলমান ইস্যু নিয়ে মাঝেমধ্যেই সরব হন আসামের মুখ্যমন্ত্রী।

আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বাঙালি মুসলমান সমাজের বিরুদ্ধে নতুন করে যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, সে পরিপ্রেক্ষিতেই আলতাপ হুসেন তাঁর গান বেঁধেছেন। আসামের নিজস্ব বিহুনাচের সঙ্গে গানটি বেঁধেছেন তিনি। গানটি কয়েক দিনে প্রবল জনপ্রিয় হয়। এরপরই তাঁকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে গ্রেপ্তার করে আসাম পুলিশ।

আলতাপকে গ্রেপ্তারের সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী গানের সঙ্গে বিহুনাচ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁর আপত্তির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আসামে কোনো অবস্থাতেই ‘মিয়া বিহু’ চালু করতে দেওয়া হবে না।

Thursday, July 23, 2020

হিউম্যানস অব আসাম- পর্ব ১

জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) প্রক্রিয়ার কথা শুনে বেশ খুশিই হয়েছিলেন আব্দুল জুব্বা। ভেবেছিলেন এই নিবন্ধনের মাধ্যমে নিজের নামের সাথে থাকা ‘অভিবাসী’ তকমা মুছে ফেলতে পারবেন। তার মতো বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে অবৈধ অভিবাসী হিসেবেই দেখে আসছে আসামের সবাই। সারাজীবন তাকে এ অভিযোগ সহ্য করে যেতে হয়েছে। কিন্তু তিনি জানতেন না, এই এনআরসি তার পরিচয় নিয়ে ফের প্রশ্ন তুলবে, তাকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করবে।

১৯৫১ সালের পর এই প্রথম ভারতে এনআরসি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য, ভারতকে অবৈধ অভিবাসী মুক্ত করা। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর বাংলাদেশ থেকে যারা অবৈধভাবে শরণার্থী হিসেবে হিসেবে ভারতে অভিবাসন করেছিলেন তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওইসব অভিবাসীদের বিতাড়িত করাটা এই এনআরসি প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্যগুলোর একটি।

আসামের বাংলাভাষীদের প্রায় আজীবনই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। যদিও তাদের অনেকেই গত কয়েক দশক ধরে সেখানে বাস করছেন। জুব্বা বলেন, সারাজীবন এখানকার সবাই আমাদের বাংলাদেশী নামে ডেকে এসেছে। মনে হয় এটা গলায় বিধে থাকা কোনো কাটা, সবসময় যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছে।

৩৩ বছর বয়সী জুবা আসামের দারাং জেলার বিলপারের বাসিন্দা। গৃহস্থ পরিবারের এই সদস্য এনআরসি শুরু হওয়ার খবরে বেজায় খুশি হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, এবার এতদিন ধরে না পাওয়া সম্মান অর্জন করতে যাচ্ছেন তিনি। কেননা, তার পূর্বপুরুষরা যে ১৯৭১ সালের আগেই আসামি গিয়েছিল। তার কাছে সে বিষয়ক সকল নথিপত্র রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম এনআরসি’র মাধ্যমে আমাদের পরিচয় থেকে বাংলাদেশী তকমা অবশেষে মুছতে যাছে।
তবে জুব্বার আশানুযায়ী ঘটেনি কোনকিছুই।  ২০১৮ সালের জুলাই মাসে পাস হওয়া এনআরসি’র খসড়া তালিকায় নাম ওঠলেও গত মাসে তাকে বলা হয়, তার নথিপত্রে ভুল রয়েছে। ২৬ জুন তালিকা থেকে নতুন করে বাদ দেয়া ১ লাখ ২ হাজার মানুষের নামের সাথে জুড়ে যায় তার নামও।

জুব্বাকে বলা হয়, তার পূর্বপুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য নয়। তার দাদাই ছিলেন আসামে অভিবাসন করা প্রথম ব্যক্তি। ১৯৭১ সালের আগেই সেখানে যান তিনি। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় তার নাম রয়েছে। তবে এনআসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দাদার সঙ্গে জুব্বার সম্পর্ক বিশ্বাসযোগ্য নয়। নিজের দাদার সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে তিনি তার স্কুলের পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও তার দাদার নির্বাচনি পরিচয়পত্রও জমা দেন। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি।

২০১৮ সালের খসড়া তালিকায় জুব্বার নাম ওঠার মানে হচ্ছে, তখনই তার জমা দেয়া সকল নথিপত্রের সত্যতা যাচাই করেছিল এনআরসি কর্তৃপক্ষ। কেবল যাচাই নয়, সেগুলো যথাযথ হিসেবে বিবেচনাও করেছিল তারা। তাহলে আচমকা পূর্বপুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রমাণ অগ্রহণযোগ্য হয়ে গেল কিভাবে?

২০১৮ সালের খসড়া তালিকায় জুব্বার নাম ওঠলেও তার পরিবারের অন্যান্য অনেকের নামই ওঠেনি। তারা নিজেদের নাগরিকত্বের দাবি জানিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে তার ভিত্তিতে শুনানি শুরু হয়। তাদের পক্ষে এনাআরসি কর্তৃপক্ষের শুনানিতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন জুব্বা। এরকম এক শুনানিতে এনআরসির কোনো এক কর্তৃপক্ষ হয়তো কোনো অসামঞ্জস্যতা দেখেছিলেন জুব্বার নথিপত্রে। ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি নিজেকে যে ব্যক্তি হিসেবে দাবি করেন, আদতে সে ব্যক্তি নন।
কিন্তু জুব্বা দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, কোনো কর্মকর্তাই তাকে কোনরকমের অসামঞ্জস্যতার ব্যাপারে কিছু বলেনি। নিজের পরিচয় প্রমাণের জন্য তাকে কোনো অতিরিক্ত নথিপত্র জমা দিতেও বলেনি। তিনি জানান, তাকে তালিকা থেকে বাদ দেয়ার আগে তার কাছ থেকে কিছু জানতে চাওয়া হয়নি। এটা একটি নিয়মবহির্ভ’ত সিদ্ধান্ত ছিল।

এই ঘটনার পর এনআরসির প্রতি তার মনোভাব বেশ তিক্ত হয়ে গেছে।  জুব্বা বলেন, ধীরে ধীরে আমার মনে হচ্ছে, এটা সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করার একটি ষড়যন্ত্র। এখন সবকিছুতেই উত্তেজনা জড়িয়ে রয়েছে।
নিজের নাগরিকত্বের দাবি নিয়ে ফের নতুন অভিযোগ দায়ের করেছেন জুব্বা। এনাআরসির চ’ড়ান্ত তালিকায় যোগ হওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার। এইবার কোনো ফাঁক-ফোকর রাখবেন না তিনি। তিনি বলেন, এবার আমি আমার প্যান কার্ড, পাসপোর্ট ও ভোটার পরিচয়পত্রও জমা দেবো।

চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম ওঠেছে কিনা তা জুব্বা ৩১ জুলাইয়ের দিনই জানতে পারবেন। এর আগ পর্যন্ত তাকে বাঁচতে হবে একজন বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয় নিয়ে। যদিও তিনি ভেবেছিলেন, এই মিথ্যা পরিচয়ের খোলস তিনি ঝেড়ে ফেলতে যাচ্ছেন।
(‘হিউম্যানস অব আসাম’ হচ্ছে আসামে নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে থাকা মানুষের গল্প নিয়ে লেখা ‘স্ক্রল ডট ইন’ এর কয়েকটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন। এটি এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের ‘দ্য ফাইনাল কাউন্ট’ নামের একটি প্রকল্পের অংশ।)

Friday, October 18, 2019

এনআরসি: 'বাবার মৃতদেহ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিক সরকার, আমরা নেব না' by অমিতাভ ভট্টশালী

দুলাল পাল ও তার জামির দলিল
'বিদেশি' হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আটক-শিবিরে বন্দী আসামের এক প্রবীণ ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার পরিবার বলছে, তারা মৃতদেহ নিতে চান না।
"বাবাকে যখন বিদেশি বলেই ঘোষণা করা হয়েছে, তাহলে বাংলাদেশেই পাঠিয়ে দিক দেহ, আমরা নেব না," বলছিলেন দু'বছর আটক থেকে মারা যাওয়া দুলাল পালের ছেলে আশিস।
প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে মৃত ব্যক্তিকে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল বিদেশি বলে ঘোষণা করার পরেই তাকে আটক করে তেজপুর জেলের ভেতরে যে আটক-শিবির রয়েছে, সেখানে রাখা হয়েছিল।
শোনিতপুরের ডেপুটি কমিশনার মানবেন্দ্র প্রতাপ সিং বিবিসিকে জানিয়েছেন, "মাস-খানেক আগে মি. পাল আটক-শিবিরে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তার মানসিক ব্যাধি ছিলই, এর সঙ্গে যোগ হয় ডায়াবেটিসও। গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজে তার চিকিৎসা চলছিল। সেখানেই তিনি গত রবিবার মারা যান।"
শোনিতপুর জেলার আলিসিঙ্গা-রবারতলার বাসিন্দা দুলাল পাল যে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন, সেটা জানিয়েছে তার পরিবারও।
সেই অবস্থাতেই তাকে আটক করে রাখা হয়েছিল ২০১৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে।
"১৯৬৫ সালে জমি কেনার দলিল রয়েছে আমদের। সেটাই তো প্রমাণ যে আমার বাবা ৭১-এর আগে এসেছিলেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সেটা মানল না। বাবা বা আমাদের ভাইদের কারও নামই এনআরসিতে ওঠে নি," বলছিলেন আশিস পাল।
মি. পালের মা ঘরেই মাটির জিনিসপত্র তৈরি করেন, আর তিনি নিজে গ্যারেজে কাজ করেন।
জমি আর মায়ের সামান্য সোনার গয়না বিক্রি করে বাবাকে ভারতীয় বলে প্রমাণ করার জন্য মামলা লড়তে হয়েছে তাদের। কোনদিনই তিন-বেলা ভরপেট খেতে পারেন না তারা।
"কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে আমাদের। এত কিছু করেও বাবাকে ভারতীয় বলে প্রমাণ করতে পারি নি।"
জীবিত অবস্থায় যখন তাকে বিদেশি বলে ঘোষণা করা হয়েছে, তাহলে আমরা কেন দেহ নেব? আগে লিখিতভাবে প্রশাসন জানাক যে আমার বাবা ভারতীয় ছিলেন, তবেই দেহ নেব," ক্ষোভ আশিস পালের।
এ নিয়ে প্রশাসন পড়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে।
ডেপুটি কমিশনার মি. সিং বলছিলেন, "তাকে বিদেশি বলে ঘোষণা করেছিল ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। যে কোনও কারণেই হোক তিনি একবারও ভোট দেন নি। সে জন্যই তার নাম প্রথমে 'ডি-ভোটার' করা হয়েছিল, তারপরে ট্রাইব্যুনালেও তিনি প্রমাণ দিতে পারেন নি যে তিনি বিদেশি নন। সেক্ষেত্রে আমাদের তো করার কিছু নেই। আমরা তো ট্রাইব্যুনালের আদেশ বদলাতে পারি না।"
গত তিন দিন ধরে প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা আশিস পাল আর তার পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আইনি সহায়তা, মরদেহ গুয়াহাটি থেকে শোনিতপুরে নিয়ে আসার ব্যবস্থাসহ নানা সাহায্য করতেও তারা প্রস্তুত বলে জানাচ্ছেন প্রশাসনিক কর্তারা।
একই সঙ্গে কীভাবে আটক অবস্থাতেই মৃত্যু হল দুলাল পালের, তা তদন্ত করে দেখার নির্দেশ জারি করেছেন শোনিতপুরের ডেপুটি কমিশনার মানবেন্দ্র প্রতাপ সিং।
এখনও দুলাল পালের মৃতদেহ গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজের মর্গেই রাখা রয়েছে। আর ওদিকে তার বাড়িতে পরিবার পরিজন হিন্দু শাস্ত্র মতে অশৌচও পালন করতে পারছেন না দেহ সৎকার না হওয়ায়।
তার ছেলে বলছিলেন, "বাবাকে দাহ করা হয় নি, তাই আমরা শুধু ফলটল খেয়ে আছি।"
প্রয়াত দুলাল পালের পরিবারের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন স্থানীয় কর্মকর্তারা

Monday, October 14, 2019

আসামে এনআরসি: আত্মীয় স্বজনদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিলেটজুড়ে উদ্বেগ by মিলাদ জয়নুল

অন্তত ৬০ বছর আগের কথা। বিয়ের পর স্বামী তাকে নিয়ে চলে যান করিমগঞ্জে। সেখানে তার ৫ ছেলে, ৩ মেয়ে। সন্তানদের সবাই প্রতিষ্ঠিত, মেয়েরা ভালো চাকরি করছে। প্রতি ২ বছর পর পর একবার বাংলাদেশে আসতেন। এখানে তার বাপের বাড়ি-নাড়ির টান। ভাইবোনদের সবাই বাংলাদেশে বসবাস করছেন। এদেশে এলে কমপক্ষে তিন মাস তাকে থাকতে হতো।
এবাড়ি-ওবাড়ি ঘুরে সময় কাটাতেন সুফিয়া বেগম। এখন তার বয়স ৮০-এর কাছাকাছি। বয়স আর অসুখে কণ্ঠস্বর ক্ষিণ হয়ে এসেছে। মোবাইল ফোন ধরতে গেলে হাত কাঁপে। এরপরও প্রতিদিন ২-৩ বার ফোন করে ভাইবোনদের কাছে জানতে চান- ‘এখন আমার কিতা অইবো। ছেলেদের এত বিশাল ব্যবসা-বাণিজ্যের কী হবে? সত্যিই যদি তাদের বন্দিশালায় নিয়ে যায়, তবে ব্যবসা-সম্পত্তির দেখাশোনা করবে কে?’-এসব নানা প্রশ্ন করে কাঁদতে শুরু করেন সুফিয়া বেগম। তার বাপের বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলার মুল্লাগ্রামে।
সিলেট বিভাগীয় শহর থেকে করিমগঞ্জের দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটারের কম। বিয়ানীবাজার উপজেলা থেকে শেওলা-সূতারকান্দি চেকপোস্ট দিয়ে পার হলেই আসামের গ্রামগঞ্জ। আবার জকিগঞ্জ পৌরশহরের কাছাকাছি কুশিয়ারা নদী পাড়ি দিলেই করিমগঞ্জ জেলা শহর। নদীর ওপার থেকে ডাক দিলে এপারের লোক শুনতে পায়। শীতকালে পানি কমে গেলে নদীতে জেগে ওঠা দু’পারের বালুচরে আত্মীয়-স্বজনরা দেখা করতেন। গল্প করতেন সুখ-দুঃখের। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাধার দেয়াল তাদের ছুঁতে না দিলেও কাছ থেকে দেখা হতো-কথা হতো।
সিলেটের ১৩টি উপজেলার মধ্যে সীমান্তবর্তী থানাগুলো হচ্ছে, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট। এই উপজেলারগুলোর সীমান্তঘেঁষা এলাকা করিমগঞ্জ ও আসাম।
সম্প্রতি আসামের ১৯ লাখেরও বেশি মানুষের নাম জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি থেকে বাদ দেয়ার ঘটনায় সিলেটে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আসামের করিমগঞ্জ কিংবা বাংলাদেশের সিলেট, এই দুই এলাকায় খুব কম লোক পাওয়া যাবে- যাদের নিকটাত্মীয় এপারে-ওপারে নেই। সিলেট জেলা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আমান উদ্দিন বলেন, বিয়ানীবাজার, বড়লেখা, জকিগঞ্জ উপজেলার প্রায় সব ক’টি পরিবারের আত্মীয়-স্বজনরা করিমগঞ্জে বসবাস করেন। বিয়ানীবাজার পৌরশহরের কসবা গ্রামের প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল আজিজের নিজস্ব নামে করিমগঞ্জে এখনো বিপণিবিতান রয়েছে। জকিগঞ্জ পৌরশহরের ২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা নূর উদ্দিন বলেন, তার নানাবাড়ি, ভগ্নিপতিসহ অনেক আত্মীয়ের বাড়ি করিমগঞ্জে। এনআরসির পর থেকে নিকটাত্মীয়দের জন্য তিনিও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
বিবিসি বাংলার তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ করে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময় প্রশ্ন ওঠে আসামের অংশ সিলেটের ভাগ্যে কী হবে। সিদ্ধান্ত হলো গণভোট অনুষ্ঠানের। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ই জুলাই সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে মোট ভোটার ছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৫ জন। ভোট দিয়েছিল ৭৭ শতাংশ মানুষ। ২৩৯টি ভোট কেন্দ্রে বড় ধরনের কোনো ঝামেলা ছাড়া শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছিল জানা যায়। ওই ভোটে কংগ্রেসের মার্কা ছিল ঘর আর মুসলিম লীগের মার্কা ছিল কুড়াল। হিন্দুদের মধ্যে নমশূদ্ররা ছিল মুসলিম লীগের পক্ষে। আলেমদের একদল ছিল কংগ্রেসের সমর্থনে। ওই ভোটে ৭৮ ভোট বেশি পেয়ে মুসলিম লীগ জয়লাভ করে। তবে গণভোটের রায় না মেনে মানচিত্রে দাগ কেটে করিমগঞ্জের কিছু অংশ ভারতকে দিয়ে দেয়ায় সিলেটের মানুষের কাছে চির বিতর্কিত হয়ে যায় রেডক্লিফ লাইন। ভোটে করিমগঞ্জের মানুষও আসাম ছাড়ার পক্ষে রায় দিলে করিমগঞ্জের কিছু অংশ রেডক্লিফ লাইনে ভারতের আসামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
দুবাগ এলাকার আব্দুল লতিফ জানান, তার আপন ভাই করিমগঞ্জে বসবাস করেন বহু বছর থেকে। সেখানে আসামের এক নারীকে বিয়ে করে স্থায়ী হয়েছেন। কিন্তু এনআরসিতে তার সঙ্গে স্ত্রীও বাদ পড়েছেন। এখন করিমগঞ্জে ফোন করে ভাইকে তার ভাগের জমিজমা আলাদা করে রাখতে বলেছেন। এ নিয়ে টেলিফোনে দুই ভাইয়ের মধ্যে অনেকবার ঝগড়া হয়েছে। আব্দুল লতিফ বলেন, ভাই একা আসলে হয়তো তাকে গ্রহণ করবো। কিন্তু বউ-বাচ্ছাদের নিয়ে এলে জায়গা দিবো না।
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. তপোধীর ভট্টাচার্যের পৈতৃক বাড়ি অধুনালুপ্ত পঞ্চখণ্ড তথা বিয়ানীবাজার পৌরশহরের নয়াগ্রামে। প্রায় ৫ বছর আগে তিনি নিজ বাড়ি ঘুরে গেছেন। তিনি জানান, এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া লাখ লাখ মানুষকে অদূর ভবিষ্যতে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা হবে, সেই সম্ভাবনা খুব কম। তাই বলে বাংলাদেশ এই ইস্যুতে নিশ্চিন্ত হয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতেও পারবে না। মুখে তারা যতই এটাকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করুক, পর্দার আড়ালে তাদের এই চেষ্টাও প্রতিনিয়ত চালিয়ে যেতে হবে যে, এই মানুষগুলোকে কিছুতেই যেন জোর করে সীমান্ত পার করিয়ে দেয়ার চেষ্টা না হয়!
নাগরিকপঞ্জী থেকে বাদ পড়েছেন এমন একজন তৈয়বুর রহমান। করিমগঞ্জের বঙ্গারইরগাঁও গ্রামে তার বসবাস। তিনি তার এক নিকটাত্মীয়কে জানান, আমি ভারতীয় নাগরিক, এ নিয়ে আমার সব ডকুমেন্টস আছে, এখন এনআরসিতে আমার নাম ওঠানো হয়নি। তিনি বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছেন। কবি ও গবেষক ফজলুল হক বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আসামের রাষ্ট্রহীন মানুষগুলোকে নিয়ে ভাবছে। বিশেষ করে সিলেটবাসী বরাক উপত্যকার লোকজনকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। খাসা গ্রামের জমিদার বংশের মেয়ে মহিরূহ পাল চৌধুরী টেলিফোনে বলেন, তার বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। বাবার নাম উঠলেও তার নাম ওঠেনি এনআরসিতে, ছেলেমেয়ে কারও নাম নেই। বাবার ভোটার তালিকা দেখাতে না পারলে তো সবাইকে জেলে ধরে নিয়ে যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমার ঠাকুরদা, বা সব পূর্ব পুরুষরাই এখানকার বাসিন্দা। ইংরেজ আমলে সরকারি কর্মীও ছিলেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ। কিন্তু এত পুরনো কাগজপত্র খুঁজে পাচ্ছে না বলে জানান মহিরূহ চৌধুরী।
এদিকে, আসামে এনআরসি তালিকা ঘোষণার পরই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কড়া নজরদারি বৃদ্ধি করেছে বিজিবি। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৫২ ব্যাটালিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল ফয়জুর রহমান বলেন, ‘আসামের বিষয় মাথায় রেখেই বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার জন্য ইতিমধ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এমনকি আসামের পরিস্থিতি যদি কোনো সময় অবনতি হয় তাহলে সেদিকেও আমাদের নজরদারি আছে। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশের নাগরিকদের বলা আছে তারা যাতে সতর্ক থাকেন। ভারতীয় বিএসএফ এবং ভারতীয় নাগরিকদের কোনো তৎপরতা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজিবি ক্যাম্পকে অবহিত করার জন্য বলা হয়েছে।’

Friday, September 20, 2019

এনআরসি নিয়ে অমিত শাহকে কী বললেন মমতা? by শুভজ্যোতি ঘোষ

দিল্লিতে মুখোমুখি অমিত শাহ ও মমতা
ভারতের আসামে যাদের নাম এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী থেকে বাদ পড়েছে, তাদের নাম ফের তালিকায় ঢোকানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে লিখিত দাবি জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
এদিন দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র সঙ্গে দেখা করে তিনি আরও জানান, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু করা নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে আজ কোনও কথা হয়নি ঠিকই - কিন্তু তার সরকার রাজ্যে কিছুতেই এনআরসি চালু করতে দেবে না।
বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য বলছে রাজ্য সরকার কী বলছে তাতে কিছু যায় আসে না - গোটা দেশের স্বার্থেই আসামের মতো পশ্চিমবঙ্গেও নাগরিক তালিকা তৈরি করা হবে।
একজন বলছেন পশ্চিমবঙ্গ-সহ গোটা দেশেই এবার এনআরসি চালু হবে, অন্যজনের হুমকি কিছুতেই পশ্চিমবঙ্গে নাগরিক তালিকা করতে দেব না।
সেই দুজন, যথাক্রমে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রথম কোনও সরকারি বৈঠক হয়েছে আজ (বৃহস্পতিবার) দিল্লিতে।
নর্থ ব্লকে সেই বৈঠক শেষে মিস ব্যানার্জি বলেন, "আসামে যেভাবে এনআরসি থেকে উনিশ লক্ষ লোকের নাম বাদ পড়েছে আমি একটা চিঠি দিয়ে ওনাকে বলেছি এটা মোটেও ঠিক হয়নি।"
"এদের মধ্যে অনেক বাঙালির নাম বাদ গেছে। বাংলাভাষীরা যেমন বাদ পড়েছেন, হিন্দিভাষী বা গোর্খারাও বাদ পড়েছেন। হিন্দুরাও আছেন, মুসলিমরাও আছেন।"
"এমন কী অসমিয়া অনেক লোকের নাম পর্যন্ত তালিকায় নেই।"
"কাজেই আমরা মনে করি এই লিস্টটা ভুলে ভরা। মন্ত্রীকে আমরা বলেছি যাদের নাম তালিকায় নেই তাদের নাম সেখানে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা হোক - কারণ এই ভারতীয়রা একটা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে!"
তবে তার নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু করা নিয়ে আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কোনও কথা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে পাশাপাশি মিস ব্যানার্জি একথাও বলতে ভোলেননি, "আমাদের অবস্থান তো সবারই জানা - যে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি-র কোনও প্রয়োজন নেই। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারও একই কথা বলছেন।"
"আমাদের বক্তব্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মন দিয়ে শুনেছেন, বিষয়টা দেখবেনও বলেছেন।"
মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে বৈঠকের পর অমিত শাহর মন্ত্রণালয় অবশ্য তা নিয়ে কোনও বিবৃতি জারি করেনি, ওই বৈঠকের আলোচনা নিয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনও বক্তব্যও মেলেনি।
তবে বিজেপির দাবি, এই বৈঠকের পরও এনআরসি নিয়ে তাদের অবস্থান বিন্দুমাত্র পাল্টাবে না।
পশ্চিমবঙ্গে দলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ভারতী ঘোষ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আমাদের বক্তব্য খুব পরিষ্কার - এদেশের কোনও বৈধ নাগরিকের সঙ্গে অন্যায় করা হবে না, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে না কিংবা নতুন আশ্রয়ও তাদের খুঁজতে হবে না।"
"এমন কী, প্রধানমন্ত্রী ও অমিত শাহ বারবার বলছেন বিদেশ থেকে আসা হিন্দুদের আমরা শরণার্থীর মর্যাদা দিই, তারাও এদেশে থাকতে পারবেন।"
তাহলে কি এনআরসি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার আমলই দিচ্ছে না?
ভারতী ঘোষের জবাব, "মমতা ব্যানার্জি কী বললেন তা নিয়ে বিজেপি বিন্দুমাত্র ভাবিত নয়। দেশের জন্য কোনটা ভাল তা সবাই জানে, আমরা সেটাই করব।"
"এই মমতা ব্যানার্জিই ২০০৪ সালে রাজ্যে এনআরসি চেয়ে পার্লামেন্টে হইচই বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, স্পিকারের দিকে একতাড়া কাগজ ছুঁড়ে মেরেছিলেন।"
"আর আজ রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য তিনি এনআরসি রুখতে চান। আসলে তিনি একজন চরম সুবিধাবাদী।"
মমতা ব্যানার্জি এদিন বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত আছে বলেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার বৈঠক খুব জরুরি।
বিজেপি আবার সেই সীমান্তের দিকে আঙুল তুলেই বলছে - সেই পথে যারা অনুপ্রবেশ করছেন তাদের নিয়ে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি বন্ধ করতেই পশ্চিমবঙ্গে অবিলম্বে এনআরসি চালু হবে।
পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি-র বিরুদ্ধে কলকাতায় মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে পদযাত্রা। ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

Thursday, September 19, 2019

এনআরসি’র নামে আসামে যা হচ্ছে তা বিপজ্জনক: -মানবজমিনকে শীর্ষেন্দু by কাজল ঘোষ

আসামের নাগরিক তালিকা বা এনআরসি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। বলেছেন, এনআরসি’র নামে আসামে যা হচ্ছে তা বিপজ্জনক। সরকার যেভাবে তাড়াতে চাইছে এটা সম্ভব নয়। শুধু এনআরসি নয়। খ্যাতনামা এই লেখক কথা বলেছেন তাঁর লেখালেখি, প্রেম, ভালোবাসা, চোর, ভূত প্রীতি, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর লেখক হওয়া নিয়ে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের শেকড় এদেশেই। টান অনুভব করেন জন্মভিটের জন্য।

বলেন, অনেক আগেই দেশ হারিয়ে গেছে। আমি এ দেশের লোক নই ভাবতে আমার কষ্ট হয়। আমার আইডেন্টিটি হারিয়ে গেছে। কিন্তু টানটা রয়ে গেছে। রাজনীতির কারণে যে দেশভাগ তার ফল আজও বইতে হচ্ছে। এ দেশে যতদিন ছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি আছি সেই দেশে। দ্যাটস নট এ হোম, জাস্ট হোম। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। শরতের সকালে এক চিলতে রোদ মাথায় নিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রশস্ত লাল দালানের উঁচুতলায় বাতিঘরে বসে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।
ছেলেবেলায় ময়মনসিংহের সময়কাল মনে করে খ্যাতনামা এই লেখক বলেন, এটা আমার জন্মভূমি। দেশভাগের বাস্তবতায় আজ ওপারে। তবুও পরিযায়ী পাখির মতো আমি এখানে ছুটে আসি। নিজের লেখক সত্তা নিয়ে নিজেরই প্রশ্ন। শীর্ষেন্দু মনে করেন, তিনি বাই চান্স লেখক। বলেন, লেখক হবো এমন চিন্তা মাথায় নিয়ে লিখেছি বিষয়টি তা নয়। আমি আসলে বাই চান্স লেখক। প্রথাগত লেখক সংজ্ঞার মধ্যে আমি পড়ি না।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২রা নভেম্বর ময়মনসিংহে। পিতা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। ছেলেবেলা কেটেছে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিভিন্ন অংশে। প্রথম চাকরি স্কুলশিক্ষক হিসেবে। পরে আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। যৌবনে ভয়ানকভাবে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন, জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং একসময় আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত মা-বাবা তাঁকে শ্রী শ্রী অনুকূলচন্দ্র ঠাকুরের কাছে নিয়ে যান। ঠাকুরের সান্নিধ্যে জীবন বদলে যায় মানুষটির।

নিজের লেখা প্রথম দুটি গল্প ফেরত এসেছিল দেশ পত্রিকার দপ্তর থেকে। তৃতীয়টি পাঠানোর পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যদি এটি ছাপা না হয়, তাহলে লেখালেখিই ছেড়ে দেবেন। ‘জলতরঙ্গ’ নামে সেই তৃতীয় গল্পটিই ছিল শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ছাপা হওয়া প্রথম লেখা। প্রথম উপন্যাস ঘুণপোকা লিখেছিলেন সাগরময় ঘোষের তাগাদায়। ঘুণপোকার শ্যামল চরিত্রটি অনেকটা তাঁর নিজের আদলেই গড়া।
আশি বছরের ঊর্ধ্ব এই লেখকের জীবনবোধ, সাহিত্য চর্চা, লেখক হওয়া, নানা বিশ্বাসে বন্দি জীবন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। পাঠকের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন ঢাকার বাতিঘরে। পাঠক আর লেখকের মেলবন্ধনে সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন বাতিঘর প্রধান দীপঙ্কর দাশ।

শীর্ষেন্দু বলেন, ছেলেবেলায় দুরন্ত ছিলাম। এতটাই দুরন্ত যে, আমার ডাক নাম হয়ে গেল দুষ্টুর সমার্থক। পাড়ার সকলে রুনু নামে ডাকতো। পাড়ায় কোনো দুষ্টু ছেলেমেয়ে দেখলে বলতো এটা রুনুর মতো হয়েছে। খেলাধুলা ছিল আমার পছন্দের বিষয়। আর বই পড়ার অভ্যেস ছিল। হাতের কাছে যা পেতাম তাই পড়তাম।
জীবনে প্রেম করতে পারিনি। কোনো প্রেমিকা ছিল না। আমার প্রেমগুলো ছিল একতরফা। একতরফা অনেককেই ভালোবেসেছিলাম। পরে একজনই আমাকে ভালোবেসেছিল। যাকে পেয়ে যাওয়ায় আর কাউকে খুঁজতে হয়নি।

ভারত সরকার এনআরসি’র নামে আসামে যা করতে চাইছে তা বিপজ্জনক। সরকার যেভাবে তাড়াতে চাইছে সেটা সম্ভব নয়। এতগুলো লোককে এভাবে তাড়ানো সম্ভব- এটা মনে হয় না। যদিও পশ্চিমবঙ্গের চিত্র ভিন্ন। সেখানে ব্যবসায়িক, চাকরিসহ নানা কারণে বহু ধরনের লোকের বাস। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
বাংলা ভাষা কি সংকটে আছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলা হচ্ছে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা। ভাবুন তো যদি এর সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হতো; বাংলাদেশ যদি আলাদা রাষ্ট্র না হতো তাহলে বাংলা হতো পুরো ভারতের বৃহত্তম রাষ্ট্রভাষা। কাজেই সব মিলিয়ে যে পরিস্থিতি তাতে বাংলা ভাষা কোনো ধরনের হুমকিতে আছে বলে আমার কাছে তা মনে হয় না।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অনেক লেখায় চোরদের প্রতি মমতার প্রকাশ রয়েছে। আবার ভূতদেরও তিনি তাঁর লেখায় এঁকেছেন মানবিকভাবে। বিজ্ঞানমনস্কতার এ যুগে এগুলো একধরনের রহস্যের জন্ম দেয়। শীর্ষেন্দুর সোজাসাপ্টা জবাব, চোরদের নিয়ে আমি নির্মম হতে পারি না। মনে হয়, চোর আমার বাসায় এলে তাকে কাছে বসিয়ে দু’চারটি কথা বলি। ভূত বিষয়ক অনেক লেখা পড়ে বাচ্চারা আমাকে ফোন করে বলে যে, সে আর ভূতকে ভয় পাচ্ছে না। তখন আমার ভালো লাগে। মনে হয়, যাক লেখাটি মনে ধরেছে।

প্রসঙ্গ যখন বাংলাদেশ
বাংলাদেশে এলে একটি বিষয় ভালো লাগে, তা হলো এখানে পাঠক বেড়েছে। একবার কোথাও যাচ্ছি লঞ্চে করে। হঠাৎ একটি ছেলে আমার বই নিয়ে এসে অটোগ্রাফ চাইলো। অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, তুমি এখানে বই পেলে কোথায়? বললো, লঞ্চের মধ্যেই আপনার বই বিক্রি হচ্ছে। বিস্মিত হয়েছিলাম। এখন সময় বদলেছে। একসময় বাংলাদেশ থেকে অনেক টাকা রয়্যালটি পেতাম। এখন তা কমছে। কারণ বই অনেক বেশি পাইরেসি হচ্ছে। ফলে আগের মতো রয়্যালটি পাই না।

লেখালেখির জগৎ
বই পড়তে পড়তেই একসময় ইচ্ছে জাগলো লিখতে পারি কিনা? ধীরে ধীরে গল্প, কবিতা এসবের চর্চা শুরু করি। প্রথমদিকে এসব লেখা কোথাও ছাপা হতো না। ষোল সতেরো বছর বয়স। খুব বিক্ষিপ্ত জীবন কেটেছে। আমাকে পড়াশুনার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হলো কুচবিহার। সেখানকার হোস্টেলে লম্বা সময় কেটেছে। এ সময় পরিবারের সঙ্গে তৈরি হয়েছে বিচ্ছিন্নতা। তখন থেকেই মাথায় লেখার ভূত চাপে। ১৯৬৭ সালের কথা। সে সময় দেশ পত্রিকায় একটি গল্প ছাপা হলো। প্রথম উপন্যাস বের হলো-ঘুণপোকা। তখন আমার লেখার পাঠক ছিল না। খুব কষ্ট পেতাম। এত কষ্ট করে লিখি কিন্তু পাঠক পড়ে না কেন? পাঠক আমার লেখা প্রত্যাখ্যান করে কেন? একবার প্রচার হয়েছিল একটি ছেলে সতেরবার ঘুণপোকা বইটি পড়ে আত্মহত্যা করেছিল। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার ভাগ্য ভালো, দীর্ঘদিন পর আমার সেই লেখাগুলোই এ প্রজন্মের পাঠকরা গ্রহণ করেছে। পড়তে শুরু করেছে। কপাল ভালো এখনকার পাঠক আমার লেখা বুঝতে পারে, এটাই আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি। পাঠকরা যখন আমার লেখা সাদরে গ্রহণ করতে শুরু করলো তখন মনে হলো আমি যেন কবর থেকে ওঠে এলাম।

নিজ আয়নায়
আমি আসলে অবৈজ্ঞানিক বা আনসায়েন্টিফিক লেখক। আমি আমার লেখার কথা নিজেই ভুলে যাই। হঠাৎ কোনো চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করলে সে বিষয়ে বলতে পারবো না। কারণ, যে লেখা বেরিয়েছে তা হয়তো আর পড়া হয়ে ওঠেনি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে হয়তো কোনো মারামারির দৃশ্য দেখছি কিছু না বুঝেই। নিজের পরিচয় দিতে আমি বরাবরই লজ্জাবোধ করি। আশেপাশের ভিড় থেকে কেউ এগিয়ে এসে হয়তো আমাকে বললো, আপনাকে দেখতে অনেকটা শীর্ষেন্দুর মতো মনে হচ্ছে। আমি লজ্জাবনত হয়ে বলি, লোকে তাই বলে। আমার লেখালেখি হাতে দলা পাকিয়ে সুতো কাটার মতো। একটি লাইন থেকেই আমার উপন্যাসের জন্ম। যেভাবে একটি দলা পাকাতে পাকাতে তা থেকে সুতো বের হয়। ঠিক তেমনি কোনো একটি লাইন আমি পেয়ে গেলে তা থেকেই বড় উপন্যাসের জন্ম। আমার মনে হয় উপন্যাসের চরিত্রগুলো আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে। মনে হয়, আমি নিজে চরিত্রগুলো সৃষ্টি করিনি, ওরাই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে। উপন্যাসে বাস্তবতাকে যেভাবে আঁকা যায় ছোট লেখায় তা হয় না।

সভ্যতার বর্তমান সংকট
পৃথিবীর অবস্থা খুব খারাপ হচ্ছে দিনকে দিন। পৃথিবী ধীর ধীরে ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স বা প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। আমার মনে হয়, পৃথিবীর ধ্বংস খুব বেশি দূরে নয়। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায় কিনা এটাই দেখার বিষয়। এই যে আমাজন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, তাতে আগুন লাগেনি; আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এটাও করা হয়েছে ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে। সেখানে পৃথিবীর বড় বড় কেম্পানিগুলো তাদের বিনিয়োগ চিন্তা নিয়ে এগুচ্ছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো মানতেই চাইছেন না জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির কথা। কাজেই উপমহাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংকট বাড়ছে। চারদিকে কেবল দালান ওঠছে। কৃষিজমি কমছে। পৃথিবীর বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বন্ধের জন্য যে ধরনের কাজ করা দরকার বড় দেশগুলো তা নিয়ে ভাবছে না। উল্টো তারা এ সমস্যায় আরো জল ঢেলে দিচ্ছে।

প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
ষোল সতেরো বছর বয়সেই মনে হয়েছিল কিছু করতে পারবো না। লেখালেখি করে জীবন কাটাবো। লেখার শুরুটা ছিল প্রত্যাখ্যানের। আমি লিখে খ্যাতি, পুরস্কার, অর্থ উপার্জন করতে চাইনি। চেয়েছি শুধু সাড়া মিলুক। নিজেকে সেলিব্রেটি ভাবতে অভ্যস্ত নই। সাদামাটা জীবন যাপন করি। বারবার যা চেয়েছি তা হলো, আমার লেখার তরঙ্গ যেন পাঠকের অন্তরকে স্পর্শ করে। যেকোনো বিশ্বাস আত্মীকরণ না হলে; অন্তয না হলে তা সুইসাইডাল হয়। আর একটি কথা, পাঠকের সঙ্গে আপস নয়। আমার লেখা আমি লিখবো। তা পাঠক নেবে কিনা সেটা সময় বলবে। কিন্তু পাঠকের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করলে লেখক হওয়া যাবে না।

Monday, September 9, 2019

আসামে ‘রাষ্ট্রহীন’দের হাতেই নির্মিত হচ্ছে তাদের আটক কেন্দ্র!

রাষ্ট্রহীনদের আটক কেন্দ্র
আসামে কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’দের জন্য নির্মাণাধীন একটি আটক কেন্দ্রের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের একটা বড় অংশই বাদ পড়েছেন এনআরসি তালিকা থেকে। এই শ্রমিকেরা জানেন, নিজেদের জন্যই তারা আটক কেন্দ্র বানাচ্ছেন। তবুও তাদের উপায় নেই। জীবিকার স্বার্থে এই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স-এর এক অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে।
৩১ আগস্ট (শনিবার) স্থানীয় সময় সকাল দশটায় অনলাইনে ও এনআরসি সেবাকেন্দ্রে প্রকাশিত হয় আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা (এনআরসি)। সে সময় এক বিবৃতিতে এনআরসি কর্তৃপক্ষ জানায়, চূড়ান্ত তালিকায় মোট আবেদনকারীদের মধ্যে ৩ কোটি ৩০ লাখের মধ্যে নাগরিক হিসেবে স্থান পেয়েছেন ৩ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৪ জন। তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন রাজ্যের প্রায় ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষ। বাদ পড়া বাসিন্দারা ১২০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ পাবেন। তবে এই আপিলে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারলে তারা সেখানকার অবৈধ অভিবাসী বলে বিবেচিত হবেন। তখন তাদের প্রাথমিক জায়গা হবে আটককেন্দ্রে।  এ নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যেই এ ডিটেনশন ক্যাম্প বা আটক কেন্দ্রগুলো বানানো হচ্ছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, আসামের গোয়ালপাড়া শহরের কাছে নদী তীরবর্তী দুর্গম এক এলাকায় ভারতে প্রথমবারের মতো গণআটক কেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। ঘন জঙ্গল কেটে প্রায় সাতটি ফুটবল মাঠের সমান জমি প্রস্তুত করে 'অবৈধ অধিবাসীদের' জন্য  ভবনগুলো নির্মিত হচ্ছে। আটক কেন্দ্র নির্মাণের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন এনআরসি থেকে বাদ পড়া অনেকেই। তারা বলছেন,  অর্থের জন্য বাধ্য হয়েই তারা এ ক্যাম্প বানাতে শ্রম দিচ্ছেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, আসামের এ ডিটেনশন ক্যাম্পের আশপাশে স্কুল, হাসপাতাল, বিনোদনের স্থান, নিরাপত্তারক্ষীদের বাসভবনের পাশাপাশি উঁচু সীমানা দেয়াল এবং ওয়াচ টাওয়ার থাকবে।   ক্যাম্পগুলো নির্মাণের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে এবং ক্যাম্পগুলোর লেআউট পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য জানতে সক্ষম হয়েছে রয়টার্স। ক্যাম্প নির্মাণে জড়িত শ্রমিকদের অনেকেই জানান, আসামে অবৈধ অধিবাসী চিহ্নিত করতে গত সপ্তাহে যে চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তাদের নাম নেই। তারা জানেন, ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে শেষ পর্যন্ত তাদেরও স্থান হতে পারে। তবুও কাজ না করে উপায় নেই তাদের।
শ্রমিকদের একজন শেফালি হাজং। নির্মাণস্থলের কাছাকাছি একটি গ্রাম তার আবাস। হাড্ডি-চর্মসার এ আদিবাসী নারীরও নাম ওঠেনি চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জিতে। আরও প্রায় ২০ লাখ মানুষের মতোই তাকে এখন জন্মসনদ কিংবা জমির মালিকানা সনদের মত নাগরিকত্বের প্রমাণ স্বরূপ কাগজপত্র দাখিল করতে হবে; ব্যর্থ হলে নিজের হাতে বানানো ক্যাম্পগুলোর মতো কোনও একটি ক্যাম্পে বন্দি হতে পারেন তিনি।
ভারত সরকারের দাবি, আসামে প্রতিবেশী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ থেকে আসা লাখ লাখ অবৈধ অধিবাসী বসবাস করছে। তবে ঢাকার দাবি অনুযায়ী, ভারতে কোনও বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী নেই। ভারত কাউকে অবৈধ অধিবাসী ঘোষণা করলে তাকে বাংলাদেশে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ঢাকা। এমন পরিস্থিতির কারণে চিন্তিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন আদিবাসী হাজং গোত্রের শেফালি। "কিন্তু আমার তো পেট চালাতে হবে," কংক্রিট মিক্সচারে পাথর ঢালতে ঢালতে স্থানীয় অহমীয়া উচ্চারণে বলেন এ নারী। অন্যান্য শ্রমিকদের মতো তিনিও ক্যাম্প বানানোর কাজে প্রতিদিন প্রায় চার ডলারের কাছাকাছি আয় করেন; তুলনামূলক দরিদ্র এলাকা হওয়ায় এ আয়কেই যথেষ্ট মনে করছেন অধিকাংশ শ্রমিক।
সঠিক জন্ম তারিখ না জানা শেফালির ধারণা তার বয়স ২৬ এর কাছাকাছি। গত সপ্তাহে প্রকাশিত নাগরিকপঞ্জিতে কেন নাম নেই তাও বলতে পারছেন না তিনি। "আমাদের কোনো জন্মসনদ নেই," বলেছেন শেফালির মা মালতি হাজং। তিনি নিজেও ক্যাম্পটির নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন।
শেফালী হাজং

আসামে নাগরিকত্ব হারানো চার হতভাগ্যের বয়ান বিবিসির কাছে by অমিতাভ ভট্টশালী

বরেপেটার বাসিন্দা শুকুর আলী
চূড়ান্ত নাগরিকত্বের তালিকায় নিজের বা ঘনিষ্ঠ স্বজনদের নাম না ওঠায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভারতের আসামের যে ১৯ লাখ হতভাগ্য মানুষ, তাদের মধ্যে চারজন বিবিসির কাছে তাদের ক্ষোভ এবং হতাশার কথা বলেছেন।
এই চারজনের দুজন মুসলিম এবং দুজন হিন্দু। তাদের নিজেদের মুখেই শুনুন সে কথা -

শুকুর আলী, বরপেটা জেলার বাসিন্দা

প্রথমবার যখন এনআরসি হয়েছিল আসামে, তখন আমার বয়স ছিল দুই বছর।
এবারের এনআরসি-তে নাম তোলার জন্য যখন লিগ্যাসি ডেটা বার করা হল, সেখানে দেখা গেল যে আমার নাম সেই প্রথম এনআরসিতে উঠেছিল।
সেটা কত সাল বলতে পারব না, কিন্তু আমার যে দুই বছর বয়স ছিল তখন, সেটা তো সরকারি কাগজেই প্রমাণ।
তবুও এবারের এনআরসি-তে আমার নাম নেই।
শুধু আমার না, ছেলে, নাতি-নাতনী কারোরই নাম নেই। তবে স্ত্রী আর দুই পুত্রবধূর নাম তালিকায় এসেছে।
খসড়া বেরনোর পরে চার বার আমাকে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল ৫০ কিলোমিটার দূরের একটা শিবিরে।
সেখানে অতবার গিয়েও নাম তুলতে পারলাম না!
এখন সবাই বলছে যে মামলা কর।
গুড়েশ্বরের রাণী পালের আদিবাস বিহারে।
কিন্তু তাতে তো পয়সা লাগবে! কোথায় পাব আমি অত পয়সা? আমার কি হাইকোর্ট - সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সামর্থ্য আছে?
মরে না যাওয়া ছাড়া তো আর কোনও উপায় দেখি না!

রাণী পাল, গুড়েশ্বর, বাকসা জেলা,

আমি ৬৫ সালে যে ভোট দিয়েছিলাম, সেই নথি জমা দিয়েছিলাম, তা সত্ত্বেও আমার নাম ওঠে নি এনআরসি-তে।
কেন যে উঠল না সেটা এখনও বুঝতে পারছি না।
আমার জন্ম এখানে হলেও আমাদের পরিবার আদতে বিহারের বাসিন্দা। আমাকে কীভাবে বাংলাদেশী মনে করতে পারে, সে তো বুঝতে পারলাম না।

বাপন মল্লিক, হাজলপাড়া, বাকসা জেলা

আমার ঠাকুরদা নীহার রঞ্জন মল্লিক আদতে ময়মনসিংহের বাসিন্দা ছিলেন।
১৯৬৪ সালের পয়লা জুলাই তিনি পরিবার সহ সীমানা পার করে ভারতে আসেন।
পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের গীতলদহ সীমানা চৌকি দিয়ে ভারতে এসে তিনি জলপাইগুড়ি জেলায় থাকতেন প্রথমে। তারপরে তিনি আসামে আসেন।
সেই 'মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট' জমা দিয়েছিলাম আমরা এটা প্রমাণ করতে যে ৭১-এর আগেই আমার পূর্বপুরুষ ভারতে বসবাস করতেন।
ওই সার্টিফিকেটে আমার বাবা সহ পরিবারের যতজন এসেছিলেন ভারতে, সকলের নাম রয়েছে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের পরিবারের সাতজন সদস্যের কারও নামই এনআরসি তে উঠল না।
অফিসাররা শুনানির সময়ে বলেছিলেন যে আমার টেনশনের কোনও কারণ নেই। আসল নথি আছে, তাই আমাদের নাম এসে যাবে।
তবে তালিকা বেরনোর পরে তো দেখছি নাম নেই।
আমাদের এলাকার মোটামুটি ৭০ শতাংশ মানুষেরই নাম ওঠে নি ।
বাঙালিরা যাতে আসামে না থাকতে পারে, সেজন্যই চক্রান্ত হচ্ছে।
যা ভোগান্তি হচ্ছে বাঙালিদের, যে অত্যাচার হচ্ছে, তার থেকে সরকার বলেই দিক যে বাঙালিরা আসামে থাকতে পারবে না!
হাজলপাড়ার বাপন মল্লিক বিবিসির সংবাদদাতার কাছে তার ঠাকুরদার মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট দেখাচ্ছেন
আমরা না হয় চলে যাব। অথবা মেরে ফেল আমাদের।
মানুষ নাওয়া খাওয়া ভুলে চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছে এর পর কী হবে, সেটা ভেবে!

মুকাদ্দেস আলি, বরপেটার বাসিন্দা

আমার নাম ঘটনাচক্রে এনআরসি-তে এসেছে, কিন্তু আমার স্ত্রী বা ছেলে-মেয়ে কারও নাম ওঠে নি।
কতো বড় অবাক কাণ্ড ভাবুন। আমি যদি ভারতীয় হই, তাহলে আমার ছেলে মেয়েরা কি বাংলাদেশী হবে?
আমার স্ত্রীর নামও নেই। তার জন্ম এখানেই, তার গোটা পরিবার এদেশেরই, কিন্তু তাকেও কী তাহলে এখন বিদেশী বলা হবে?
কেমন করে আমাদের পরিবারকে বিদেশী বানাবে?
গতবছরের খসড়া তালিকায় আমার নামও ছিল না। তারপরে সকলের নামেই নোটিস এল যখন, তখন বার বার শুনানিতে গেছি।
বহু দূরে দূরে যেতে হয়েছে গাড়ি ভাড়া করে।
সুদে দশ হাজার টাকা ধার করে নথি যোগাড় আর শুনানির জন্য গাড়ি ভাড়া করেছি আমরা।
এত করেও নাম তুলতে পারলাম না । এখন যে কী করব, জানি না।
সরকার নাকি বলছে কোর্টে যেতে হবে।
এমনিতেই এত টাকা ধার কর্জ হয়ে গেছে, এরপরে আবারও মামলা লড়তে হলে তো আমরা সর্বস্বান্ত হয়ে যাব!
আমাদের ক্ষমতা আছে নাকি হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার!
মুকাদ্দেস আলির নাম উঠেছে। ওঠেনি তার স্ত্রী (ডানে) ও ছেলেমেয়েদের