Showing posts with label আইন আদালত. Show all posts
Showing posts with label আইন আদালত. Show all posts

Thursday, March 26, 2026

বাংলাদেশে এআইভিত্তিক আইনি প্ল্যাটফর্ম ফাইন্ড মাই অ্যাডভোকেট চালু by রাহিতুল ইসলাম

সমস্যার ধরন অনুযায়ী সঠিক আইনি পরামর্শ ও আইনজীবীর সহায়তা নেওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করতে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) ডিজিটাল আইনি প্ল্যাটফর্ম ‘ফাইন্ডমাইঅ্যাডভোকেট’। নতুন এ প্ল্যাটফর্মে এআই প্রযুক্তি যুক্ত থাকায় ঘরে বসেই দেশের যেকোনো প্রান্তে থাকা বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করার সুযোগ মিলে থাকে।

প্ল্যাটফর্মটি মূলত বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের মধ্যে একটি ডিজিটাল সেতু হিসেবে কাজ করছে। প্ল্যাটফর্মটির বিশেষত্ব হলো ‘এআই-পাওয়ার্ড সার্চিং অ্যান্ড চ্যাটিং’ সিস্টেম, যা ব্যবহারকারীদের আইনি সমস্যার ধরন বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপযুক্ত আইনজীবীর সন্ধান দিয়ে থাকে। শুধু তা–ই নয়, প্ল্যাটফর্মটিতে সার্বক্ষণিক চালু থাকা ‘এআই লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’ কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক আইনি পরামর্শও জানা যায়।

ফাইন্ডমাইঅ্যাডভোকেট প্ল্যাটফর্মের তথ্যভান্ডারে বর্তমানে দেশের সব জেলায় আইনি সেবা দেওয়া নিবন্ধিত আইনজীবীদের তথ্য রয়েছে। ফলে ঘরে বসে সহজেই দেওয়ানি, ফৌজদারি, কর ও ভ্যাট, দলিল লেখক, বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারসহ সাইবার অপরাধবিষয়ক আইনি সহায়তা পেতে আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ পাওয়া যাবে। প্ল্যাটফর্মটিতে আইনজীবীদের অভিজ্ঞতা, রেটিং ও অবস্থানের তথ্য যুক্ত থাকায় ব্যবহারকারীরা স্বচ্ছন্দে সঠিক আইনজীবী নির্বাচনের সুযোগ পেয়ে থাকেন।

ফাইন্ডমাইঅ্যাডভোকেট প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. হায়দার তানভীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রয়োজনের সময় আইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে ঝামেলাপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ। একাধিকবার আইনজীবীর চেম্বারে যেতে হয়, তারপর নির্ধারিত তারিখ পাওয়া যায়—এভাবে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ ও হয়রানিমূলক প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি দিতেই চালু করা হয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।’

ফাইন্ডমাইঅ্যাডভোকেট প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের ইহান চৌধুরীর তৈরি ‘সাইট্যাক্স এআই’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটিতে আইনজীবীর সন্ধান পাওয়ার পাশাপাশি মুঠোফোনেই আইনি পরামর্শ—ভিডিও কল, চেম্বার সাক্ষাৎ ও বাসায় আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করা যায়। আইনজীবীদের জন্যও প্ল্যাটফর্মটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে। নতুন ও অভিজ্ঞ আইনজীবীরা এখানে প্রোফাইল তৈরি করে অনলাইনে তাঁদের প্র্যাকটিস পরিচালনার পাশাপাশি সময়সূচি ব্যবস্থাপনা করতে পারছেন।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি। গ্রাফিকস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি

Friday, March 6, 2026

শুল্ক বাতিল: আদালত কি ট্রাম্প ও তাঁর দলকে বাঁচিয়ে দিলেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গত শুক্রবার সম্ভবত তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। প্রেসিডেন্টের নিয়োগ দেওয়া দুজনসহ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা তাঁর বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে আদালতের এ রায় ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিছু রিপাবলিকান প্রকাশ্যেই এই রায়ের প্রশংসা করছেন। পর্দার আড়ালে আরও অনেকেই এতে খুশি হয়েছেন।

আদালতের সিদ্ধান্তটি ট্রাম্পের এজেন্ডার জন্য বড় ধাক্কা হলেও এটি তাঁর হাত থেকে এমন কিছু হাতিয়ার কেড়ে নিয়েছে, যা দেশের জন্য স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একই সঙ্গে ট্রাম্পের দলের জন্যও তা স্পষ্ট রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হচ্ছিল।

শুল্ক নিয়ে এই গল্পের এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্প দ্রুতই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি ভিন্ন একটি ক্ষমতার অধীনে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করছেন। এমনকি শুক্রবার তিনি দাবি করেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে তাঁর ক্ষমতা আরও ‘শক্তিশালী’ হয়েছে; কিন্তু বিষয়টি আসলে সত্য নয়। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।

সংবিধানে কংগ্রেসকে দেওয়া ক্ষমতাগুলো যখন ট্রাম্প নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তখনো রিপাবলিকানরা তাঁকে তা করতে দিয়ে খুশিই ছিলেন। তবে আদালতের রায়ের ধাক্কাটি রিপাবলিকান শিবিরে একটি আত্মোপলব্ধির জন্ম দিতে পারে। তারা ট্রাম্পের বাণিজ্যিক চালগুলো আর মেনে নেবে কি না, সে প্রশ্ন উঠতে পারে।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার আগে ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ২০১৬ সালের পর ২০২৫ সালটি জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন খারাপ বছরে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরটি গত কয়েক দশকের মধ্যে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও অন্যতম দুর্বল বছর ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি। সহজ কথায়, পুঁজিবাজারের হিসাব বাদ দিলে মার্কিন অর্থনীতি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।

এই স্থবিরতার পেছনে সুনির্দিষ্টভাবে শুল্কের দায় কতটুকু, তা পরিষ্কার নয়। তবে শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং এর ফলে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত খরচ স্পষ্টতই অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যে অর্থনীতি আগে থেকেই নড়বড়ে ছিল। এই শুল্ক আমেরিকানদের কাছে অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য ট্রাম্পকে সরাসরি অভিযুক্ত করার একটি সুযোগ করে দিয়েছে।

ট্রাম্পকে মূল্য দিতে হচ্ছে

ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের শুল্ক নিয়ে বাড়াবাড়ির মূল্য তাঁদের দিতেও হয়েছে। গত ২ এপ্রিল ট্রাম্প বৈশ্বিক শুল্কের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে নেট সিলভারের গড় সমীক্ষায় অর্থনীতিতে তাঁর জনপ্রিয়তার রেটিং ‘প্লাস-৬’ থেকে ‘মাইনাস-১২’-তে নেমে এসেছে। গত মাসে সিএনএনের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ আমেরিকান শুল্কনীতিতে ট্রাম্পের ওপর অসন্তুষ্ট, বিপরীতে সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩৭ শতাংশ। এমনকি রিপাবলিকানপন্থী ভোটারদেরও ২৫ শতাংশ এটি পছন্দ করেননি।

রিপাবলিকানদের দিকে চোখ

যেসব রিপাবলিকান সমর্থক শুল্কনীতি নিয়ে সন্দিহান হওয়া সত্ত্বেও এত দিন চুপ ছিলেন এবং এখন এই অধ্যায়ের ইতি টানতে চান, তাঁদের দিকে এখন চোখ থাকবে। এক বছর ধরে অনেক রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিষয়টি অনেকটা ‘নাক ও মুখ বুজে’ সহ্য করেছেন। কারণ, এই শুল্কনীতি রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের মুক্তবাজার অর্থনীতি ও মুক্ত বাণিজ্যের আদর্শের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ছিল।

কিন্তু ট্রাম্পের এই ‘একলা চলো’ নীতির জন্য আদালতের রায়টি একটি বড় ধাক্কা, যা তাঁর অন্যান্য প্রচেষ্টাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বিচারপতি নিল গোরসাচ তাঁর সহমত পোষণকারী বক্তব্যে অনেকটা অনুরোধের সুরেই কংগ্রেসকে বলেন, যেন তাঁরা এই বিষয়গুলো এখন থেকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা শুরু করেন।

এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই শুল্কনীতির সম্ভাব্য রাজনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রথম দফার শুল্ক বাতিল করার আগেই ট্রাম্পের এই এজেন্ডার প্রতি অনেকের ধৈর্যচ্যুতির লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। এই রিপাবলিকানদের কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, তাঁরা ট্রাম্পকে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন সময় এসেছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার।

প্রকৃতপক্ষে শুক্রবার ট্রাম্পের মতো খুব কম রিপাবলিকানকেই আদালতের সমালোচনা করতে দেখা গেছে। এর মানে এই নয় যে তাঁরা হঠাৎ করেই এ ইস্যুতে দলবদ্ধভাবে ট্রাম্পের সঙ্গ ত্যাগ করবেন। আর ট্রাম্পও সুপ্রিম কোর্ট বা নিজের দলের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন—এমনটা দেখাতে চাইবেন না। তবে ট্রাম্প যদি বড় আকারে শুল্ক আরোপের চেষ্টা চালিয়ে যান, তবে তিনি সম্ভবত রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করবেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

Friday, January 30, 2026

কারাগারে দুই খুনির প্রেম, বিয়ে করতে পাচ্ছেন প্যারোলে মুক্তি

খুনের দায়ে কারাগারে সাজা খাটতে গিয়ে দুজনের জানাশোনা, তারপর শুরু হয় প্রেম। এতটুকুতেই শেষ নয়। রীতিমতো বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। বিয়ে সারতে কারাগার থেকে সাময়িক সময়ের জন্য মুক্তিও পাচ্ছেন এ যুগল।

শুনতে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের মতো মনে হলেও ভারতের রাজস্থান রাজ্যের আলওয়ারে ঘটেছে এমন ঘটনা।

প্রিয়া শেঠ (আরেক নাম নেহা শেঠ) নামের এক নারী এবং তাঁর হবু বর হনুমান প্রসাদ বিয়ের জন্য রাজস্থানের হাইকোর্ট থেকে ১৫ দিনের জরুরি প্যারোল পেয়েছেন। আজ শুক্রবার আলওয়ারের বারোদামেভে তাঁদের গাঁটছড়া বাঁধার কথা।

প্রিয়া যেভাবে খুনে জড়ান

প্রিয়া শেঠ পেশায় মডেল ছিলেন। দুশ্যন্ত শর্মা নামের এক তরুণকে খুনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে তাঁর। সাঙ্গানের ওপেন জেল নামে এক উন্মুক্ত কারাগারে সাজা ভোগ করছেন প্রিয়া। এ কারাগারটি প্রচলিত কারাগারের তুলনায় খোলামেলা এবং বন্দীরা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনতা পেয়ে থাকেন। ছয় মাস আগে একই কারাগারে প্রসাদের সঙ্গে প্রিয়ার পরিচয় হয় এবং তাঁরা প্রেমে পড়েন।

যে খুনের মামলায় প্রিয়া শেঠ দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তা ২০১৮ সালের ঘটনা। ওই বছরের ২ মে প্রিয়া শেঠ তাঁর প্রেমিক দীক্ষান্ত কামরা এবং অপর এক ব্যক্তির সঙ্গে মিলে দুশ্যন্তকে হত্যা করেন। দুশ্যন্তের সঙ্গে তাঁর ডেটিং অ্যাপে পরিচয় হয়েছিল।

প্রিয়ার পরিকল্পনা ছিল দুশ্যন্তকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা এবং সে অর্থ দিয়ে তাঁর প্রেমিক দীক্ষান্ত কামরার ঋণ পরিশোধ করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ডেটিং অ্যাপে দুশ্যন্তের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন প্রিয়া। এরপর তাঁকে বাজাজ নগরের একটি ফ্ল্যাটে ডেকে নেন এবং তাঁর বাবার কাছ থেকে ১০ লাখ রুপি মুক্তিপণ দাবি করেন।

দুশ্যন্তের বাবা তিন লাখ রুপি পাঠাতে পেরেছিলেন। তবে একপর্যায়ে প্রিয়া এবং তাঁর প্রেমিক দীক্ষান্তের মনে হলো, তাঁরা দুশ্যন্তকে ছেড়ে দিলে তিনি তাঁদের পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারেন।

গ্রেপ্তার এড়াতে প্রিয়া শেঠ, কামরা ও তাঁর বন্ধু লক্ষ্য ওয়ালিয়া মিলে দুশ্যন্তকে হত্যা করেন। তাঁরা মরদেহ স্যুটকেসে ভরে একটি পাহাড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। দুশ্যন্তকে যেন না চেনা যায়, তা নিশ্চিত করতে তাঁরা তাঁর মুখ ছুরি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিলেন। প্রমাণ ধ্বংসের জন্য ফ্ল্যাটটিও পরিষ্কার করেছিলেন তাঁরা।

পরদিন ৩ মে রাতে পাহাড় থেকে দুশ্যন্তের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শেষ পর্যন্ত প্রিয়া, দীক্ষান্ত ও ওয়ালিয়া ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার হন।

পাঁচ হত্যাকাণ্ডের পেছনে হনুমান প্রসাদ

হনুমান প্রসাদ তাঁর প্রেমিকার স্বামী ও সন্তানদের হত্যার দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। আলওয়ারের তায়কোয়ান্দো খেলোয়াড় সন্তোষ ছিলেন তাঁর প্রেমিকা। ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর রাতে সন্তোষ তাঁর স্বামীকে হত্যা করতে হনুমানকে তাঁর বাড়িতে ডেকেছিলেন। হনুমান একজন সহযোগীকে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। পশু জবাইয়ের জন্য ব্যবহৃত ছুরি দিয়ে সন্তোষের স্বামী বনওয়ারী লালকে খুন করেন তিনি।

সন্তোষের তিন সন্তান ও তাঁদের সঙ্গে থাকা এক ভাতিজা জেগে ওঠে এবং খুনের ঘটনা দেখে ফেলে। ধরা পড়ার ভয়ে সন্তোষ তাঁর সন্তান ও ভাতিজাকেও হত্যা করতে বলেন। হনুমান প্রসাদও তা–ই করেন। সেই রাতে চার শিশু ও এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছিল। এটি আলওয়ারের কুখ্যাত হত্যা মামলাগুলোর একটি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-23%2Flu2zccar%2FUntitled-1.png?rect=53%2C0%2C564%2C376&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বিয়ের প্রতীকী ছবি। ছবি: এএনআই

Thursday, January 8, 2026

সংবাদ সম্মেলনে মাহদী দিলেন তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা, সুরভী জানালেন কারা অভিজ্ঞতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে আজ বুধবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ‘জুলাই যোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী ও সংগঠনটির হবিগঞ্জ জেলার সদস্যসচিব মাহদী হাসান।

সেখানে মাহদী হাসান সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে ব্যাখ্যা দেন। অন্যদিকে তাহরিমা সুরভি তার কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

চাঁদাবাজির একটি মামলায় গত ২৫ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে টঙ্গী পূর্ব থানার গোপালপুরের টেকপাড়া এলাকায় নিজ বাসা থেকে তাহরিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৫ জানুয়ারি তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেওয়া  হয়েছিল। এর দুই ঘণ্টা পর তাঁর জামিন মঞ্জুর হয়।

আজ নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তাহরিমা বলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক দলের না। আমি একদমই অরাজনৈতিক, আমি অরাজনৈতিকভাবেই সব সময় আন্দোলন করেছি। দেশের জন্য এতটুকু করার পরও আমাকে এই ১১ দিন যে পরিমাণ নির্যাতন করা হইছে…আমার ফ্যামিলির (পরিবার) সঙ্গে আমি একটা মিনিটের জন্য কথা বলতে পারতাম না। আমার সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়া হইছে। আমি বাইরে কী হইতেছে, আমার মা কার কাছে যাইতেছে, কিচ্ছু জানি না।’
একজনকে অনেক অনুরোধ করে মায়ের দেখা পেয়েছিলেন জানিয়ে তাহরিমা বলেন, ‘ওইখানে একজন স্যার আছে, উনার পায়েটায়ে ধরে আমার মার সাথে আমি এক দিন দেখা করতে পারছি। সেদিন আমার মাকে আমি একটা কথা বলছিলাম, “আম্মু, এটা দুনিয়ার জাহান্নাম।”’

‘আমরা’ মানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব অংশীজন

সুরভীর অভিজ্ঞতা শোনে মাহদী হাসান এ ঘটনার কুশীলবদের জাতির কাছে উন্মোচন করার আহ্বান জানান। তিনি সুরভীর কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৭ বছরের মেয়েকে ২১ বছর বানিয়ে নিকৃষ্টতম অন্যায় করা হয়েছে। সুরভীকে মুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু তার পেছনে যারা এই ১৭ বছরকে ২১ বছর বানিয়েছিল, যারা ৫০ হাজারকে ৫০ কোটি বানিয়েছিল, এই কুশীলবদের বাংলাদেশের জাতির কাছে উন্মোচন করতে হবে।

হবিগঞ্জে ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম’ বলে আলোচনায় আসেন মাহদী হাসান। ৩ জানুয়ারি তাঁকে আটক করা হয়েছিল। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক এবং হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র। তাঁর বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভাদৈ এলাকায়। ৪ জানুয়ারি তিনি জামিন পান।

মাহদী নিজের আলোচিত বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, ৫ আগস্ট সারা দেশে যে বিধ্বস্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাঁরা নিহত বা শহীদ হয়েছিলেন, সেই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে মানুষ ১৭ বছরের নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। সেই ক্ষোভই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি থানা ও জেলায় আমরা তার স্ফুলিঙ্গ ও বিস্ফোরণ দেখতে পাই।’

মাহদী আরও বলেন, ‘ওই জায়গা থেকে আমি একটা কথা বারবার বলেছি, একবারও আমি বলি নাই যে আমি করেছি। এই কথার মাধ্যমে আমি “আমরা” দ্বারা সমস্ত আন্দোলনকারী সত্তাকে বুঝিয়েছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই আমাদের অস্তিত্ব। এখানে আমি মাহদী কিংবা আমাদের ব্যক্তিগত কোনো পারপাস (উদ্দেশ্য) ছিল না। “আমরা” মানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব অংশীজন, সব জুলাই যোদ্ধা যাঁরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁরা আমাদের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন।’  
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ, মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামসহ অন্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে তাহরিমা সুরভি তার কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ৭ জানুয়ারি
সংবাদ সম্মেলনে তাহরিমা সুরভি তার কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ৭ জানুয়ারি। ছবি: প্রথম আলো

Saturday, April 19, 2025

ভারতের মুসলিমরা রাজনৈতিকভাবে কেন ‘এতিম’ হয়ে গেল by জাকিয়া সোমান

সরকার যে মুসলমানদের কল্যাণের কথা বলে ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থার সংস্কার করছে—দাবিটা সন্দেহজনক মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। গত ১০ বছরে সরকার যেভাবে মুসলমানদের নিয়ে নির্লিপ্ত থেকেছে, তাতে এ দাবি বিশ্বাসযোগ্য হয় না; বরং এটাকে রাজনৈতিক ধোঁকাবাজির আরও একটি দৃষ্টান্ত বলা চলে।

সম্প্রতি সংসদের উভয় কক্ষে তুমুল বিতর্কের পর ওয়াক্‌ফ (সংশোধনী) বিল পাস হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এটিকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে এক ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে কংগ্রেস এই বিলকে সংবিধানের মূলনীতি, ধারা ও চর্চার ওপর আঘাত বলে নিন্দা করেছে। সেই সঙ্গে তারা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, এই বিল পাস হতো না, যদি না তথাকথিত মুসলিম-সমর্থক রাজনীতিবিদ চন্দ্রবাবু নাইডু, নীতীশ কুমার ও জয়ন্ত চৌধুরীর মতো নেতারা সমর্থন দিতেন। ফলে এটা স্পষ্ট, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রে মুসলমানরা আজ পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে অনাথ। বিচার চাওয়ার মতো আর কোনো নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি তাদের পাশে নেই।

যেসব দল নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বলে দাবি করে, তারাও অনেক সময় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে পরোক্ষভাবে এগিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্যকে আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করার পথ সুগম হয়েছে। এটি ভারতের সংবিধানিক অভিযাত্রার পথে এক অন্ধকার অধ্যায়।

ওয়াক্‌ফ হলো ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী একটি ধর্মীয় দানব্যবস্থা। কোনো ব্যক্তি তাঁর সম্পত্তি দরিদ্রদের কল্যাণে দান করেন। এরপর সেটি আর ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকে না। সেই সম্পত্তি আল্লাহর নামে দান করা হয়। এই সম্পত্তির মাধ্যমে মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, স্কুল, হাসপাতাল ইত্যাদি পরিচালিত হয়। ১৯৯৫ সালের ওয়াক্ফ আইন অনুযায়ী এগুলো চলে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের ওয়াক্‌ফ বোর্ডের মাধ্যমে এগুলোর তদারকি হয়। রাজ্য সরকারগুলো এই সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো সমস্যা হলে তা ওয়াক্‌ফ ট্রাইব্যুনালে ওঠে।

স্বীকার করতে হবে, অনেক ওয়াক্‌ফ বোর্ডই দুর্নীতিগ্রস্ত বা অকার্যকর। অনেক জায়গায় বেসরকারি দখলদারি বা জমি জবরদখলের অভিযোগও রয়েছে। তবে এ রকম সমস্যা ভারতের সাধারণ জমি, জলাশয় বা বনভূমিতেও দেখা যায়। এই দখলদারির কারণে দরিদ্রদের পক্ষে ওয়াক্‌ফের সুবিধা পাওয়া কঠিন করে তোলে। ফলে ওয়াক্‌ফের মূল উদ্দেশ্যটাই বাধাগ্রস্ত হয়। তাই একটা সার্বিক সংস্কার দরকার। এই সংস্কার ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে দাবি করেছেন অনেক সচেতন নাগরিক ও সংগঠন।

কিন্তু বর্তমান সরকার হঠাৎ মুসলমানদের কল্যাণের কথা বলে এত বড় উদ্যোগ নিচ্ছে—এটা সন্দেহজনক। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার মুসলিম সমাজকে না জানিয়ে, আলোচনায় না বসেই করা হলে, সেটাকে নিছক হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু এর আড়ালে আরও গভীর শঙ্কা লুকিয়ে আছে। বাস্তবতা হলো, গত দশ বছরে সরকারের কোনো কার্যকলাপে মুসলমানদের প্রতি আন্তরিকতা দেখা যায়নি; বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে ঘৃণা, বিদ্বেষ আর বিভাজনের রাজনীতি।

গরু রক্ষার নামে গণপিটুনি, লাভ জিহাদ বা করোনা জিহাদের মতো কাল্পনিক ধোঁয়া তুলে মুসলমানদের হয়রানি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সরকার বরাবর নীরব থেকেছে। উত্তর প্রদেশে বুলডোজার এখন সরকারিভাবে শাস্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। মসজিদের নিচে মন্দির খোঁজার নামে হিন্দুত্ববাদী বাহিনীরা প্রশাসনের প্রশ্রয়ে যা খুশি তা–ই করছে। নির্বাচনের সময় মুসলিমবিদ্বেষী ভাষা ব্যবহার এখন যেন স্বাভাবিক ব্যাপার।

মোগল, মাছ-মাংস এসব শব্দই এখন মুসলমানদের বিপক্ষে ইঙ্গিত হয়ে উঠেছে। সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের জন্য চালু থাকা বৃত্তি প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফুটপাতের মুসলমান ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। পার্কে শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ পড়লেও পুলিশ গ্রেপ্তার করছে। এমনকি ঈদের নামাজ রাস্তায় পড়াও অনেক জায়গায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এই বাস্তবতায় সরকার দাবি করছে, ওয়াক্‌ফ আইন সংশোধন করছে মুসলমানদের মঙ্গলের জন্য। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য হলো, হিন্দু-মুসলিম বিভেদকে আরও উসকে দেওয়া। বিলটি পাস করানোর আগে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচার চলেছে, মুসলমানরা নাকি হিন্দুদের জমি দখল করে নেবে ওয়াক্‌ফের নামে। এনডিএ জোট এই মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে বিহার নির্বাচনে সুবিধা নিতে চায়। এই বিল জমি ও সম্পত্তির ওপর বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারও হতে পারে। কারণ, এই খাতে ইতিমধ্যেই বড় ধরনের দুর্নীতি বিদ্যমান।

এই ওয়াক্‌ফ সংশোধন বিল সরাসরি সংবিধানের মূল চেতনার ওপর আঘাত করেছে। এটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘন করে। সংখ্যালঘুদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যে সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে, সেটিও এতে খর্ব হয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, ওয়াক্‌ফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্য রাখতে হবে। এই সিদ্ধান্ত একটা নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলক হস্তক্ষেপ। সরকার যদি সত্যিই বৈচিত্র্য ও সমান অধিকার চায়, তাহলে তিরুপতি দেবস্থানম বোর্ডে কি মুসলমান, খ্রিষ্টান বা পার্সিদের নিয়োগ করবে? যদি সত্যিই সব ধর্মের জন্য এক আইন দরকার হয়, তাহলে তা হোক ইউনিফর্ম সিভিল কোডের আওতায়। সব ধর্মস্থলের জন্য এক নিয়ম হোক।

নতুন আইন অনুযায়ী, কেউ ওয়াক্‌ফ করতে চাইলে তাঁকে আগে কমপক্ষে পাঁচ বছর ধরে মুসলমান থাকতে হবে। এই বিধান করে ওয়াক্‌ফকে একধরনের বেসরকারি প্রকল্পের মতো সাজানো হয়েছে।

এই বিল আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে আসল লড়াইটা সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে হওয়া দরকার। যাঁরা ভারতীয় গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করেন, তাঁদের এক হয়ে ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই এখন জরুরি। মুসলমানরাও তাঁদের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। গণতান্ত্রিক চেতনায় দৃঢ় কোনো নেতৃত্ব মুসলিম সমাজে এখন চোখে পড়ে না। এই দুর্বল নেতৃত্বই পুরো সম্প্রদায়ের এক বড় সমস্যা।

অবশ্য দমন-পীড়নের মুখে থাকা একটি জাতিগোষ্ঠীর কাছে সব সময়ে নেতৃত্বের দাবি তোলা অন্যায্যও বটে; কিন্তু পবিত্র কোরআনের বাণী মনে রাখতে হবে—আল্লাহ তাদেরই সাহায্য করেন, যারা নিজেরা নিজেদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। ভারতীয় সংবিধান এখনো আমাদের আশার জায়গা, যেখানে একতা ও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।

আমাদের দরকার এমন একটি বৃহত্তর গণ–আন্দোলন, যেখানে ধর্মের বিভাজন পেরিয়ে সবাই মিলে ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়বে। যেমনটা আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দেখেছি। সিএএ-এনআরসি, লাভ জিহাদ আইন, আর এখন এই নতুন ওয়াক্‌ফ আইন—সবই দেখিয়ে দিচ্ছে যে এখন সময় হয়েছে মুসলমানদের মধ্যে এক শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক চেতনার নেতৃত্ব গড়ে তোলার। নেতৃত্ব হোক মুসলিম, হোক বা অমুসলিম—যাঁরা আমাদের সংবিধান, সাম্য আর সহাবস্থানের পক্ষে কথা বলবেন, তাঁরাই হোক আমাদের ভরসা।

* জাকিয়া সোমান সহপ্রতিষ্ঠাতা, ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন
- দ্য ওয়্যার থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ

ভারতের জলন্ধরে প্রতিবাদ
ভারতের জলন্ধরে প্রতিবাদ। ছবি: এএফপি

Saturday, April 12, 2025

কেন আটক মেঘনা আলম?

মডেল ও মিস আর্থ বাংলাদেশ-২০২০ বিজয়ী মেঘনা আলমের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশ জানিয়েছে, অপহরণ নয় মেঘনা আলমকে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্কে মিথ্যাচার ছড়ানো, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এজন্য তাকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে  হেফাজতে রাখা হয়েছে। এর আগে, বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে মেঘনা আলম অভিযোগ করেন পুলিশ পরিচয়ধারীরা তার বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। লাইভটি প্রায় ১২ মিনিট চলার পর বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে সেটি ডিলিটও হয়ে যায়। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মডেল মেঘনার বাসা থেকে বুধবার রাতে তাকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মেঘনা আলমকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। আদালত বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩(১) ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে তাকে ৩০ দিনের জন্য কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আটকের আগে বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে মেঘনা অভিযোগ করেছিলেন, ভাটারা থানা পুলিশ পরিচয়ে কিছু লোক তার বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছে। তিনি লাইভে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ পরিচয়ধারীরা প্রথমে পরিচয় গোপন করে বাসায় প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু দরজা না খোলায় একপর্যায়ে তারা নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে তার বাসায় মাদক আছে বলে দাবি করে। এ কথা শুনে তিনি আতঙ্কিত হয়ে বলেন, আমি কখনো মাদক নেই না। আমাকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে। একপর্যায়ে লাইভে থাকা অবস্থাতেই মেঘনা তার আইনজীবীকে ফোন করেন। পরে আইনজীবীর পরামর্শে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করেন। সেই কল শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করছে বলে লাইভে জানান মেঘনা। এরপর অন্য একটি কক্ষে গিয়ে তিনি দরজা বন্ধ করে দেন। সেটিও ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে কয়েকজন। তবে দরজা ভেঙে কারা ভেতরে ঢুকেছে, তা লাইভে দেখা যায়নি। ভেতরে ঢুকেই একজন নারী মেঘনার হাত থেকে তার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন। এরপরই লাইভটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে মেঘনার বোন তাসিন আফরিন দিয়ানা ফেসবুকে দেয়া এক পোস্ট করে বলেন, আমার বোনকে অপহরণ করা হয়েছে। দুই ঘণ্টা ধরে মিসিং।

গতকাল ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাকে অপহরণ করার অভিযোগ সঠিক নয়। সব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে। তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্ক মিথ্যাচার ছড়ানোর মাধ্যমে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক অবনতির অপচেষ্টা করা এবং দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, মডেল মেঘনাকে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটক করা হয়েছে। আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, ক্ষতিকর কাজ থেকে নিবৃত রাখার জন্য সরকার যেকোনো ব্যক্তিকে আটক রাখার আদেশ দিতে পারবেন। আবার এই আইনের ৩(২) ধারা অনুযায়ী, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যদি সন্তুষ্ট হন যে, এই আইনের নির্দিষ্ট ধারার ক্ষতিকর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কেউ জড়িত, তাহলে ওই ব্যক্তিকে আটক রাখার আদেশ দেবেন। এই আইনে অনুযায়ী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বা প্রতিরক্ষার ক্ষতি করা, বাংলাদেশের সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সংরক্ষণের ক্ষতি করা, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বা জননিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার ক্ষতি করা, বিভিন্ন সমপ্রদায়, শ্রেণি বা গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণাবোধ বা উত্তেজনা সৃষ্টি করা, আইনের শাসন বা আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা বা উৎসাহ প্রদান করা বা উত্তেজিত করার কাজে যুক্ত ব্যক্তিকে আটকাদেশ দেয়া যায়। এছাড়া জনসাধারণের জন্য অত্যাবশ্যক সেবা বা অত্যাবশ্যক দ্রব্যাদি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করা, জনসাধারণ বা কোনো সমপ্রদায়ের মধ্যে ভীতি বা আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বা আর্থিক ক্ষতি করার কাজে যুক্তকে এই আইনে আটকে রাখা যায়। ২০২০ সালের ৫ই অক্টোবর মেঘনা আলম ‘মিস আর্থ বাংলাদেশ’- প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার এবং নারীদের স্বাবলম্বী করতে নারী উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগের জন্য এই পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

mzamin

Wednesday, September 25, 2024

সাংবিধানিক আদালত গঠন বাধ্যতামূলক: বিলাওয়াল

সাংবিধানিক আদালত গঠন করা বাধ্যতামূলক বলে সরাসরি মন্তব্য করেছেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। মঙ্গলবার সিন্ধু হাইকোর্ট বার সমিতিতে বক্তব্যকালে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের হুমকির পর চাপের মুখে সচল করা হয়েছিল ১৯তম সংবিধান সংশোধন। গণতন্ত্রের সনদের ধারা অনুযায়ী বিচার বিভাগকে সংস্কার করা হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ। এ বছর অক্টোবরে অবসরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি কাজী ফয়েজ ইশা। তার আগেই নানা জল্পনার মাঝে সরকার সাংবিধানিক প্যাকেজ সামনে ঠেলে দেয়। এই ঘটনার আগে গত মাসে নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের নোটিফিকেশন নিশ্চিত করার অনুরোধ জানায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই)। বিলাওয়াল ভুট্টো বলেন, ১৮তম সংশোধনীর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত আইনের অধীনে বিচারকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া চালায় পার্লামেন্ট। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে সব বিচারক নিয়োগ হয় পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে। এ জন্য সেখানে কখনো কোনো সামরিক আইন আসেনি।

তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর মৃত্যুদণ্ডকে বিচারিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেন। বিলাওয়াল বলেন, একটি সাংবিধানিক আদালত গঠন করা জরুরি এবং আমাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয়, যাতে আর কোনো প্রধানমন্ত্রীকে ফাঁসি দেয়া না যায়। জনগণ সুবিচার পায়। এ সময় তিনি সামরিক শাসকদের কড়া সমালোচনা করেন। বলেন, তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো দেখেছেন সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল জিয়াউল হকের যুগ। ওই সময় রাজনৈতিক সব নেতাকর্মীকে নিষ্ঠুর নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শহীদ বেনজির জানতেন আমাদের ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ওই সময় সাবেক প্রধান বিচারপতি ইফতিখার চৌধুরী কোনো বিপ্লবী ছিলেন না। সাবেক প্রধান বিচারপতি মিয়া সাকিব নিসারের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, তখন কোনো দমওয়ালা বিচারকও ছিলেন না।

mzamin


Friday, September 20, 2024

ক্যাম্পাসে নৃশংসতায় কারা? সাবেক ছাত্রলীগ নেতাসহ ৪ জন আটক

পর পর দু’টি ঘটনা। দু’টিই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। দু’জনকে পিটিয়ে বর্বর কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে। এই দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তোলপাড় চলছে দেশ জুড়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কাঠগড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যদিও দু’টি ঘটনায় দ্রুতই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের নেতারা। এ ছাড়া বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনও ঘটনা দু’টির প্রতিবাদ এবং দায়ীদের বিচার দাবি করেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন আইন কারও হাতে তুলে নেয়ার সুযোগ নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের পর আইন বিচার, সংসদ বিষয়ক এবং প্রবাসী কল্যাণ ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, বিচারবিহর্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড গ্রহণযোগ্য হবে না। যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হলটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তঃবিভাগ খেলা চলছিল। বুধবার ক্রিকেট খেলার সময় একটি ব্যাগে থাকা ৬টি মোবাইল হারিয়ে যায়। এ নিয়ে দিনভর উত্তপ্ত ছিল হলের পরিবেশ। হলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সতর্ক করে দেন শিক্ষার্থীরা। এরপর রাত ৮টার দিকে ফুটবল খেলা চলছিল। সে সময় বহিরাগত তোফাজ্জল হলের ভেতরে ঘোরাফেরা করছিলেন। এ দেখে শিক্ষার্থীদের সন্দেহ হয়। তিনি বিভিন্ন জায়গায় হাঁটাচলা করতে থাকেন। তার বেশভূষা দেখে সন্দেহ হয় প্রথম বর্ষের কিছু শিক্ষার্থীর। তারা একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা রুমে নিয়ে ফোনের বিষয়ে জানতে চাই, সার্চ করি। কিজন্য এসেছে এখানে সেটাও জানতে চাই। তিনি অযাচিত কথা বলছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম নেশাগ্রস্ত। তাকে হালকা চড় থাপ্পড় দেয়া হয়। তাকে মারলেও খুব একটা রিঅ্যাকশন দেখাতো না। নাম্বার চাইলে পরিবারের কয়েকজনের নাম্বার মুখস্ত বলেন তিনি। সেই নম্বরে কল দিয়ে জানতে পারি মানসিক ভারসাম্যহীন। একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, একটা পর্যায়ে তোফাজ্জল বলতে শুরু করেন খিদা লাগছে ভাত খাবো। তখন তাকে ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া হয়।
ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছিলেন আসিফ হাসান। তিনি বলেন, ক্যান্টিনে নিয়ে তাকে খেতে দিতে বলি। এরপর মুরগি ও সবজি দিতে বলি। তিনি এমনভাবে খাচ্ছিলেন দেখে মনে হচ্ছিল না খুব একটা ক্ষুধার্থ। এরপর নিজের থেকে মাছ খেতে চায়। তার জন্য শোল মাছ অর্ডার করা হয়। খাওয়ার সময় খুব নিশ্চিত মনে কথা না বলে খাচ্ছিলেন। তাকে যে চুরির দায় দেয়া হচ্ছে এনিয়ে কোনো চিন্তাই যেন নেই তার। সুন্দরমতো ভাত খেলেন।
প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, খাওয়া শেষে চুপ করে চেয়েছিলেন তোফাজ্জল। এই খাওয়ার সময়েই হলের নিজস্ব গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে মোবাইল চোর ধরা পড়েছে। ততক্ষণে ক্যান্টিনে বড় ভাইয়েরা চলে আসে। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হলের আরেকটি কক্ষে। এরপর সেখানে ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। আর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা রুমের বাইরে ছিলেন। মারার সময় খুব বারবার চুরি করেনি বলে মাপ চেয়েছিল। আর নির্যাতন করার সময় খুব একটা চিৎকার, কান্না না করায় আরও বেশি মারা হয়েছে। তিনি বলেন, একপর্যায়ে তার হাতের উপর লাঠি রেখে দুপাশে কয়েকজন করে দাঁড়িয়ে নির্যাতন করে। হাতের ও পায়ের আঙ্গুলগুলো থেতলে যেতে থাকে। বারবার বলা হচ্ছিল- বল তুই চুরি করেছিস? ফোনগুলো কোথায়? তিনি বারবার বলছিলেন- আমি মোবাইল চুরি করি নাই।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, মারধরের সময় পরিবারের বেশ কয়েকজনের ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। ধারাবাহিক নির্যাতনের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত শিক্ষার্থীরা কথা বলেন তার মামার সঙ্গে। তার মাধ্যমে মানসিক ভারসাম্যহীন জানার পরেও তাকে ছাড়েননি অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম, সিনিয়র শিক্ষার্থীরা তাদের নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে জানান, তোফাজ্জলকে সবচেয়ে বেশি মারধর করেছেন ছাত্রলীগের সদ্য পদত্যাগ করা উপ-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জালাল আহমেদ, মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সুমন, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের ফিরোজ, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের আব্দুস সামাদ, ফার্মেসি বিভাগের মোহাম্মদ ইয়ামুজ জামান এবং পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনিস্টিউটের মোত্তাকিন সাকিন। নির্যাতন করা শিক্ষার্থীদের সবাই ফজলুল হক মুসলিম হলের শিক্ষার্থী।
প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সুলতান প্রথমে চোর সন্দেহে তাকে ধরে গেস্টরুমে নিয়ে আসেন। সূত্রটির তথ্যমতে, মারধরে জড়িত ছিলেন- মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিভাগের রাশেদ কামাল অনিক, গণিত বিভাগের রাব্বি এবং সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের ওয়াজিবুল। তারা সবাই ওই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
হলের প্রত্যক্ষদর্শী একজন শিক্ষার্থী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি হল গ্রুপে ৮টার সময় দেখি হলে চোর ধরা পড়েছে। হলের গেস্ট রুমে, গিয়ে দেখি চোর বসা। রুমে তখন প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা ছিলেন। গেস্টরুমে তাকে বেশি মারা হয়নি। ওখানে হালকা মারার পরে ক্যান্টিনে নিয়ে আসে খাওয়ানোর জন্য। তারপর শুনি তাকে এক্সটেনশন বিল্ডিং’র গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি তখন ওখানে গিয়ে দেখি ২০-২১, ২১-২২ ও ২২-২৩ সেশনের ব্যাচ। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ছিল, ওরা মারে নাই। ২০-২১ আর ২১-২২ সেশনের ওরা খুব বেশি মেরেছে। নির্যাতনের একপর্যায়ে তার মামাকে ফোন দিয়ে জানানো হয় ৩৫ হাজার টাকা পাঠাতে। তার মামা অপারগতা শিকার করলে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন পেটানোর নেতৃত্ব দেয়া তিন চারজন। তারা বলেন, ও নাকি মানসিক ভারসাম্যহীন। তাহলে এতগুলো নম্বর মুখস্ত থাকে কীভাবে। আবার আরেকটি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শোনা যায় দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল।
তিনি আরও জানান, দুই-তিনজন মিলেই ওরে ওখানে মেরে ফেলছে। এরা হলেন- মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের ২০-২১ সেশনের মোহাম্মদ সুমন, ওয়াজিবুল, ফিরোজ ও জালাল। এদের মধ্যে সুমন, ফিরোজ এবং জালাল সবচেয়ে বেশি মেরেছে। গেস্টরুমে হাত বেঁধেছে জালাল। সুমন চোখ বন্ধ করে মেরেছে, মারতে মারতে পড়ে যায়। এরপরে পানি এনে তাকে পানি খাওয়ানো হলে সে উঠে বসে। এরপর আবার শুরু হয় পেটানো। এই দফায়ও সবচেয়ে বেশি মেরেছে ফিরোজ। পরে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ১৮-১৯ সেশনের জালাল আসে। জালাল এসে আরও মারতে উৎসাহ দেয়। বলে ‘মার, ইচ্ছামতো মার; মাইরা ফেলিস না একবারে’। এ সময় গ্যাস লাইট দিয়ে পায়ে আগুনও ধরিয়ে দেয়। পরে সুমন এসে তোফাজ্জলের ভ্রু ও চুল কেটে দেয়।
ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, পরে ওখানে স্যার (হলের আবাসিক শিক্ষক) আসেন। আমি ওদেরকে অনেক ফেরানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু ওরা মানেনি। এক্সটেনশন বিল্ডিং এর গেস্টরুম থেকে যখন তাকে বের করা হয় তখন স্যার এসে পড়েছেন। মারধরে তোফাজ্জলের ডান হাত এবং বাম পায়ের মাংসের কিছুটা অংশ খুলে পড়ে যায়। অনেকে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। আমি বলি কাপড় আনো, ওর পা বেঁধে দেই। কারণ ব্লিডিং হইলে তো সেন্সলেস হয়ে যাবে। পরে কাপড় এনে একটা জুনিয়র পা বেঁধে দেয়।
একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শিক্ষার্থীরাই ঢাকা মেডিকেলে কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর পরপরই লাশ রেখে শিক্ষার্থীরা হাসপাতাল থেকে যে যার মতো চলে যান।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জালাল অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমি স্যারের সঙ্গে ছিলাম। প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মে পেটানোর বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তৃতীয় টার্মে যখন যাই একটা স্টাম্প টেনে নেই। কিন্তু ভিডিওতে মনে হচ্ছে আমি পিটাইছি। আমি যদি পেটাতাম তাহলে আমি পালিয়ে যেতাম, ইন্টারভিউও দিতাম না।
জানা যায়, তোফাজ্জল হোসেন, বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মা হারিয়েছেন আট বছর আগে। পরে প্রেমসংক্রান্ত বিষয়ে আঘাত পেয়ে হয়ে পড়েছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। পুরো ঘটনা কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চললেও ঘটনাস্থলে যাননি হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক শাহ মোহাম্মদ মাসুম। তাকে বারবার ফোন দিয়েও ঘটনার সময় পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরও প্রভোস্টকে ফোনে পাননি। যদিও রাতে ‘ঘুমিয়েছিলেন’ বলে  সকালে গণমাধ্যমকর্মীদের জানান। সদ্য নিয়োগ পাওয়া প্রভোস্টের নির্লিপ্ততার সমালোচনা করছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। তিনি প্রথমেই শক্তভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেতো বলে তাদের অভিমত।
এই ঘটনায় মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিক্ষোভ মিছিল করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঘটনার বিচার চেয়ে মিছিল, প্রতিবাদ ও স্লোগান ও সমাবেশে গতকাল সারা দিন উত্তাল ছিল ঢাবি। এ ঘটনায় গতকাল সকাল থেকে তৎপর ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- মো. জালাল মিয়া, সুমন মিয়া, মো. মোত্তাকিন সাকিন, আল হুসাইন সাজ্জাদ ও আহসানউল্লাহ। জালাল মিয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপ-সম্পাদক। কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে তিনি ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন।
ঢাবি প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, তোফাজ্জল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করে ঢাবি প্রশাসন। মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়েছে। শাহবাগ থানার ওসি শাহাবুদ্দিন শাহীন মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ আটক ও মামলার বিষয় নিশ্চিত করে বলেন, ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে।
যা ঘটেছিল জাহাঙ্গীরনগরে: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ই জুলাই রাতে ভিসি’র বাসভবনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লাকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তিনি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
বুধবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গণধোলাইয়ের পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেয় শিক্ষার্থীরা। সেখানে তালা ভেঙে তাকে মারধর করা হয়। পরে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেট সংলগ্ন একটি দোকানে অবস্থান করছিলেন শামীম মোল্লা। তার অবস্থানের খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে তাকে আটক করে গণধোলাই দেয়। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম উপস্থিত হয়। একপর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় তাকে নিরাপত্তা শাখায় নিয়ে আসা হয়। সেখানেও ছাত্রদলের একটি টিম কেচিগেইটের তালা ভেঙে তাকে বেধড়ক মারধর করে। ফলে শামীম মোল্লা মারা যেতে পারে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় একটি ভিডিও থেকে প্রাথমিকভাবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে। তারা হলেন- সাঈদ হোসেন ভূঁইয়া, রাজু আহমেদ এবং রাজন হাসান, হামিদুল্লাহ সালমান এবং এমএন সোহাগ, ইংরেজি বিভাগের ৫০ ব্যাচের মাহমুদুল হাসান রায়হান, ইতিহাস বিভাগের ৪২ ব্যাচের জোবায়ের।
তবে প্রান্তিক গেইটের ঘটনায় আহসান লাবিব ও আতিক নামে দু’জন জড়িত। তবে তারা নিরাপত্তা শাখায় শামীম মোল্লাকে তুলে দেয়। পরে একদল ছাত্রদলকর্মী তালা ভেঙে তাকে মারধর করেন। সাঈদ হোসেন ভূঁইয়া ৩৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া রাজু আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও রাজন হাসান ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী, হামিদুল্লাহ সালমান ইংরেজি ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও এমএন সোহাগ কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। নিরাপত্তা কার্যালয়ের ভেতরে চেক শার্ট পরিহিত অবস্থায় শামীমকে পেটায় আরেকজন। এ সময় তার হাতে গাছের ডাল দেখা গেছে। এ দিয়েই পিটিয়েছেন তিনি। তাকে রাজু আহমেদ বলে শনাক্ত করা গেছে।
মারধরের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সাঈদ বলেন, কেউই হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে মারধর করেনি। একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আমি দেখতে গিয়েছিলাম। আর একজন মানুষ যিনি হেঁটে পুলিশের গাড়িতে গেছে আর কিছুক্ষণের মধ্যে মারা গেছেন এর রহস্য উদ্‌ঘাটন করা জরুরি।
এ বিষয়ে রাজু আহমেদ বলেন, আমি সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে শোনার পর সেখানে গেছিলাম। সেখানে গিয়ে আমি শামীমকে ধমক দিই, তাকে মারধর করিনি। রাজন হাসান বলেন, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম কিন্তু মারার জন্য সেখানে যায়নি। যারা তালা ভাঙার চেষ্টা করছিল তাদের আমি নিষেধ করেছিলাম। হামিদুল্লাহ সালমান বলেন, আমি সন্ধ্যায় হলে ছিলাম। পরে খবর পেয়ে প্রক্টর অফিসে যাই কিন্তু শামীম মোল্লাকে মারধর করিনি। সোহাগ বলেন, আমি টিউশন থেকে ফেরার পথে হইচই দেখে সেখানে গিয়েছিলাম কিন্তু মারধর করিনি।
শিক্ষার্থীরা জানায়, শামীম মোল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের জুয়েল-চঞ্চল কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। শামীম বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশেপাশের এলাকায় মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, জমিদখল, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত। এছাড়া তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। গত ১৫ই জুলাই রাতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় সে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে।
এ ঘটনার পর প্রক্টরিয়াল টিমের খবরে আশুলিয়া থানা পুলিশের একটি দল নিরাপত্তা শাখায় আসে। এ সময় পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল টিম শামীমকে ১৫ই জুলাই রাতে ভিসি’র বাসভবনে হামলার ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় শামীম মোল্লা হামলার ঘটনায় নিজের অংশগ্রহণ ও ঘটনাস্থলে হামলাকারীদের সঙ্গে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক মেহেদী ইকবাল উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করে।
শামীম মোল্লা জানান, ১৫ই জুলাই রাতে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকা থেকে হামলা করতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারেক ও মিজান নামে সাবেক দুই ছাত্রলীগ নেতা তাকে বঙ্গবন্ধু হলে নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্রলীগ সভাপতি সোহেলের নেতৃত্বে পেট্রোল বোমা তৈরি করা হচ্ছিল এবং হামলার জন্য দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র প্রস্তুত করা হচ্ছিল। প্রস্তুতি শেষে ভিসি’র বাসভবনে হামলা করতে যাওয়া হয়। হামলার সময় তারেক এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে জানায়।
এদিকে, সন্ধ্যা ৭টায় প্রক্টর অফিসে আসেন ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। তিনি উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তার শাস্তি নিশ্চিতের আশ্বাস দেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম বলেন, ১৫ই জুলাই ভিসি’র বাসভবনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতাকে শিক্ষার্থীরা আটক করে প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেয়। আমরা আশুলিয়া থানায় অবহিত করলে পুলিশের একটি টিম আসে। ওই ছাত্রলীগ নেতার নামে আগেও বেশ কয়েকটি মামলা আছে। তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।
তবে তিনি গণধোলাইয়ে মৃত্যুর বিষয়টিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে বলেন, তাকে শিক্ষার্থীরা আটকের পর মারধর করে প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেয়। পরে আমরা আশুলিয়া থানায় অবহিত করলে পুলিশের একটি টিম এসে তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর পুলিশে সোপর্দ করলে তিনি নিজে হেঁটে পুলিশের গাড়িতে ওঠেন। তখন তাকে দেখে আশঙ্কাজনক মনে হয়নি। পরবর্তীতে পুলিশের গাড়িতে মৃত্যুর বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বিষয়টি ভালোভাবে না জেনে মন্তব্য করতে পারছি না। 

mzamin

ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর: দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা, তীব্র ক্ষোভ

ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দিনে দুজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম (এফ এইচ) হলে চোর সন্দেহে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেন একদল শিক্ষার্থী। আর জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে কয়েক দফা মারধর করে হত্যা করা হয়। এ দুটি ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার শাহবাগ থানায় মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়টির ছয় শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের একজন ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগী নেতা, অন্যদের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক সমন্বয়ক ও ছাত্রদলের চার নেতা-কর্মীসহ কিছু শিক্ষার্থী জড়িত বলে জানা গেছে। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আহসান লাবিবকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে এবং ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

এদিকে খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে মোহাম্মদ মামুন নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার ভোরের এ ঘটনার জের ধরে গতকাল দীঘিনালায় পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন জায়গায় ‘মব জাস্টিস’ (উচ্ছৃঙ্খল জনগোষ্ঠীর বিচার) চলতে দেখা যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ড

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বুধবার দুপুরে এফ এইচ হলের মাঠে শিক্ষার্থীদের খেলা চলাকালে কয়েকজনের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ চুরি হয়। পরে রাত আটটার দিকে তোফাজ্জল হোসেন নামের এক যুবক মাঠে ঢুকলে তাঁকে চোর সন্দেহে ধরে হলের অতিথিকক্ষে নিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে শুরু হয় মারধর। পরে ওই যুবককে হলের ক্যানটিনে রাতের খাবার খাওয়ানো হয়। এরপর আবার আরেকটি অতিথিকক্ষে নিয়ে পেটানো হয়। মারধরের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

মারধরের খবর পেয়ে হলের আবাসিক শিক্ষকেরা রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গেলেও তোফাজ্জলকে উদ্ধার করতে পারেননি। গুরুতর আহত অবস্থায় রাত ১২টার পর তোফাজ্জলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান কয়েকজন শিক্ষার্থী। রাত পৌনে একটার দিকে ওই যুবককে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

গতকাল বিকেলে ছয় শিক্ষার্থীকে এফ এইচ হল থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাঁরা হলেন জালাল মিয়া, মোহাম্মদ সুমন, মোত্তাকিন সাকিন, আল হোসাইন সাজ্জাদ, আহসানউল্লাহ ও ওয়াজিবুল আলম। তাঁরা সবাই এফ এইচ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। জালাল মিয়া হল শাখা ছাত্রলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপসম্পাদক ছিলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে তিনি ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগে করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে সক্রিয় হন।

গ্রেপ্তারের আগে জালাল মিয়া প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, জুনিয়র কিছু শিক্ষার্থী সন্দেহের বশে ওই যুবককে হলের অতিথিকক্ষে ধরে এনে স্টাম্প দিয়ে মারধর করেন। শিক্ষকেরা ডাকলে তিনি সেখানে যান। তবে তিনি কাউকে মারধর করেননি। তিনি জুনিয়রদের বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

ঘটনা তদন্তে এফ এইচ হলের আবাসিক শিক্ষক আলমগীর কবিরকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে এফ এইচ হলের চার শিক্ষার্থীকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি শুক্রবার সকালে প্রতিবেদন দেবে।

জানা গেছে, নিহত তোফাজ্জলের (৩২) গ্রামের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নে। তাঁর আসল নাম মাসুদ কামাল। একসময় কাঁঠালতলী ইউনিয়ন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। তোফাজ্জলের ভাবি শরীফা আক্তার প্রথম আলোর পাথরঘাটা প্রতিনিধিকে বলেন, বাবা, মা ও একমাত্র বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তোফাজ্জল মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন।

বিক্ষোভ, প্রতিবাদ

তোফাজ্জলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বুধবার রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গতকাল ভোরে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ করেন কিছু শিক্ষার্থী। সকালে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ মিছিলের পর এফ এইচ হলের প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনেও বিক্ষোভ করেন ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফেডারেশনসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মী। বিকেলের দিকে ‘গণতন্ত্রকামী শিক্ষার্থীবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’–এর ব্যানারে ক্যাম্পাসে আরেকটি বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়। এসব কর্মসূচি থেকে যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে ‘মব জাস্টিস’ আখ্যা দিয়ে বিচারবহির্ভূত এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা-প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করা হয়।

জাহাঙ্গীরনগরে হত্যা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিটুনিতে নিহত শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত বুধবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় বাংলা ফটকের একটি সেলুনের সামনে পরিচিত একজনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন শামীম। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী সেখানে শামীমকে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা তাঁকে টেনে ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়ে আরও কয়েকজন মিলে মারধর করেন।

সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম এবং নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। তাঁরা শামীমকে প্রক্টর কার্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার করিডরে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা–কর্মী সেখানে গিয়ে শামীমকে আবার মারধর করেন।

প্রক্টরিয়াল টিম তাঁকে উদ্ধার করে নিরাপত্তা শাখার করিডরে রেখে ফটকে তালা দেয়। এরপর ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা–কর্মী তালা ভেঙে শামীমকে বেধড়ক মারধর করেন।

বুধবার রাত সোয়া আটটার দিকে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা গুরুতর আহত শামীমকে আশুলিয়া থানা–পুলিশের কাছে সোপর্দ করলে পুলিশ রাত নয়টার দিকে সাভারের গণ স্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন।

আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে শামীম মোল্লার মরদেহ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ অভিযোগ করলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, গত ১৫ জুলাই রাতে ছাত্র আন্দোলনের সময় শামীমসহ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান। এই অভিযোগে বুধবার তাঁকে মারধর করা হয়। শামীমের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও তুচ্ছ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগও ছিল।

মারধরে জড়িত যাঁরা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯তম ব্যাচের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শামীম মোল্লার মৃত্যুর ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্ত আট শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা হলেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের মোহাম্মদ রাজন মিয়া, একই বিভাগের রাজু আহমেদ, ইংরেজি বিভাগের হামিদুল্লাহ সালমান, একই বিভাগের মাহমুদুল হাসান রায়হান, ইতিহাস বিভাগের জুবায়ের আহমেদ, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের আতিকুজ্জামান, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সোহাগ মিয়া এবং বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আহসান লাবিব।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে আহসান লাবিব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাহাঙ্গীরনগর শাখার সমন্বয়ক। রাজু, রাজন ও হামিদুল্লাহ ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ ভুঁইয়াও এ ঘটনায় জড়িত বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাবিবের অব্যাহতি বহাল থাকবে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, যে ঘটনা ঘটেছে, তা ন্যক্কারজনক। একটি তদন্ত কমিটি করার প্রস্তুতি শেষের দিকে। তাৎক্ষণিকভাবে উপাচার্যের যতটুকু এখতিয়ার, তা করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সাময়িক বহিষ্কার এবং তদন্ত সাপেক্ষে পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনভর বিক্ষোভ

শামীম মোল্লার মৃত্যুর ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে দিনভর বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বুধবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে বিক্ষোভ করেন একদল শিক্ষার্থী। গতকাল বেলা ১১টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে দুপুরে শিক্ষার্থীদের আরেকটি দলও একই দাবিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন। ঘটনার বিচার নিশ্চিতসহ চার দফা দাবি জানিয়ে বিবৃতি দেয় প্রগতিশীল শিক্ষকদের একটি দল।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন প্রতিবেদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিনিধি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই -ঢাবি-জাবিতে হত্যা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘একজন অন্যায় করলে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই জনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কার্যালয়ে এক মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তিনি।

মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, এটি কীভাবে রোধ করা যায়—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। কাল দেখলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যা হয়েছে। তারা তো সবচেয়ে শিক্ষিত, তাদের সচেতনতা আসতে হবে। একজন অন্যায় করলে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।’

মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘একজন অন্যায় করলে আইনের হাতে তাকে তুলে দেন। নিরপরাধ লোক যেন কোনো অবস্থায় হেনস্তা না হয় জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।’

এছাড়া, শুধুমাত্র ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নাম মামলায় দেয়ার অনুরোধ করে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ শুধু যারা দোষী তাদের নাম দেন। অন্যদের নাম দিয়েন না। অন্যদের নাম দিলে তদন্ত করতে সময় বেশি যাচ্ছে এবং অনেক সময় নিরীহ লোকও যেন হেনস্তা না হয় এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’

সাম্প্রতিক সময়ে দায়ের করা মামলাগুলোয় বিপুল সংখ্যক আসামি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘এখন পুলিশ মামলা করছে না, করছে সাধারণ জনগণ।’

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আগে পুলিশ মামলা দিতো, এই সময়ে কোনো পুলিশ একটা মামলা দিয়েছে? আগে পুলিশ ১০ জনের নাম দিয়ে ১০০ জনের নাম দিতো অজ্ঞাত। আজ পর্যন্ত কিন্তু পুলিশ (মামলা) দিচ্ছে না। এটা কিন্তু সাধারণ পাবলিকরা দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মিডিয়াতেও বলছি, পেপারে দিয়েছি যে সাধারণ লোক যেন হেনস্তা না হয়। তদন্ত ছাড়া কাউকে এরেস্ট করা হবে না। ডিবিকে আজকেই নির্দেশনা দিয়েছি। পরিচয় তারা নিজেরা দেবে, তারপর ধরবে। এখানে ধরার কথা শুধু অপরাধীদের সাধারণ মানুষদেরকে তো ধরবে না।’

mzamin


Friday, September 13, 2024

মামলা থেকে বাদ দিতে দুই লাখ টাকা দাবি

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে কথিত হত্যা ও অস্ত্র মামলা থেকে নাম বাদ দিতে স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতার কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে কৃষকদল নেতার বিরুদ্ধে। এ সংক্রান্ত একটি কথোপকথনের মোবাইল কল রেকর্ড স্থানীয়ভাবে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ছে।

অভিযুক্তের নাম জসিম চৌধুরী। তিনি রায়পুর উপজেলার বামনি ইউনিয়ন কৃষকদলের সদস্য সচিব। চাঁদা দাবি করা হয় জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক জহির উদ্দিন লিটনের কাছে।

বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টায় জসিমকে কারণ দর্শানো (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রায়পুর উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক কাউসার মোল্লা।

তিনি বলেন, দুদিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার জন্য জসিমকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির আলোকে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালবেলা প্রতিবেদকের হাতে ৩ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের ওই অডিও এসেছে। এতে লিটনকে উদ্দেশ্য করে জসিম বলতে শোনা যায়, সবুজ ভূঁইয়া বাদী হয়ে হত্যা ও অস্ত্র মামলা জমা দিয়েছে। তবে পুরো ডিলিংস, ব্যাকআপ দেবে লক্ষ্মীপুরের নেতারা। মামলা সাবমিট করা হয়েছে। সকাল পর্যন্ত সময় আছে। ওই মামলায় সালাহ উদ্দিন টিপু ১ নম্বর আসামি, আপনি ২৮ নম্বরে আছেন। টেনশন করিয়েন না। আপনার নাম আমি স্পেশালি বলছি, সে (বাদী) বলছে কম নেই। ২ এর নিচে কম নেই, আড়াই বলছে আমাকে। এটাই শেষ কথা। আর কোনো রাস্তা খোলা পাবেন না।

এক পর্যায়ে জসিম বলেন, আপনি আমার জমি বিক্রি করে দেন। আপনি আমার ভাই। জমি বিক্রির টাকা দিয়ে সারেন। সকাল ৮টায় পর্যন্ত সময় আছে।

জসিমের বাড়ি রায়পুর উপজেলার বামনীর কলাকোপা গ্রামে। লিটনের বাড়ি সদর উপজেলার উত্তর হামছাদীর চৌধুরী বাজার এলাকায়।

তবে কৃষকদল নেতা জসিম চৌধুরী দাবি করেন, অডিওটি এডিট করা। তিনি দলের নেতাদের বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি লিটনের কাছে চাঁদা চাননি। শোকজ নোটিশ পেয়েছেন এবং সেটির জবাব দেবেন বলে জানান।

স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা জহির উদ্দিন লিটন সাংবাদিকদের বলেন, আমি কোনো অপকর্ম করিনি। জসিম ফোন করে হত্যা ও অস্ত্র মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অজুহাত দেখিয়ে আমার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করেছে। একপর্যায়ে সে বলেছে, প্রয়োজনে জমি বিক্রি করে আমি টাকা নিয়ে তাকে দিতাম।

রায়পুর উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক কাউসার মোল্লা বলেন, অডিও রেকর্ডটি শোনার পর জসিমকে শোকজ করা হয়েছে। 

বাঁ থেকে- স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা জহির উদ্দিন লিটন ও কৃষকদল নেতা জসিম চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত
বাঁ থেকে- স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা জহির উদ্দিন লিটন ও কৃষকদল নেতা জসিম চৌধুরী। ছবি : কালবেলা

Thursday, September 12, 2024

সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, দুদক, পুলিশ, প্রশাসন সংস্কারে ৬ কমিশন: কাজ বড় কঠিন, ব্যর্থ হওয়ার অবকাশ নেই

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দাবির প্রেক্ষিতে সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারে ছয়টি কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তিনি এই ঘোষণা দেন। আধাঘণ্টার বেশি সময় স্থায়ী প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়। ভাষণে ড. ইউনূস চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া, শিল্প-কারখানার বর্তমান পরিস্থিতি, নিত্যপণ্যের দাম কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আর্থিক খাত, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।

তিনি বলেন, শিল্প-কারখানা বন্ধ হলে অর্থনীতিতে বিরাট আঘাত পড়বে, সমস্যার সমাধান বের করবো, কারখানা খোলা রেখে অর্থনীতির চাকা সচল রাখুন। ন্যায্যতা এবং সমতার ভিত্তিতে ভারতসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আমাদের দেশ যেন বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়, কোনো নেতা বা দল নয়, দেশের পরিকল্পনা যেন মানুষকেন্দ্রিক হয়। দেশের মানুষকে আর ফাঁকি দেয়া চলবে না। কর্মসংস্থান তৈরি করবে এমন প্রকল্পগুলোকে সরকার অগ্রাধিকার দেবে। লুটপাট ও পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্যের দাম কমাতে শুল্কহার হ্রাসে এনবিআর’কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ভাষণে আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়ারও আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা।

বক্তব্যের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা জুলাই-আগস্ট মাসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।  
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণ-অভ্যুথানে শহীদদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। আহত শিক্ষার্থী, শ্রমিক, জনতার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে। এই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে সরকার ‘জুলাই গণহত্যা স্মৃতি ফাউন্ডেশন’- প্রতিষ্ঠা করেছে। সকল শহীদ পরিবার এবং আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসাসহ তাদের পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এই ফাউন্ডেশন গ্রহণ করছে।

ফেনীসহ কয়েকটি জেলায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা নিয়ে তিনি বলেন, গত মাসে কুমিল্লা-নোয়াখালী সিলেট অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা এসব এলাকার মানুষকে হতভম্ব করে দিয়েছে। এখানে বেশির ভাগ এলাকায় কোনোদিন বন্যা হয়নি। তারা বন্যা মোকাবিলা করায় অভ্যস্ত নন। দেশপ্রেমিক সশস্ত্রবাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে বন্যা আক্রান্ত সবাইকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে। ফলে মানুষের দুর্ভোগ কম হয়েছে। এর পরপরই এনজিও এবং সাধারণ মানুষ দেশের সকল অঞ্চল থেকে দলে দলে এগিয়ে এসেছে। আমি বিশেষ করে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে আবারো ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দেশের সকল দুর্যোগকালে তারা সবসময় আন্তরিকভাবে এগিয়ে এসেছে। বিশেষ করে বন্যা ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে তাদের সৈনিক এবং অফিসাররা দিনের পরদিন যেভাবে দায়িত্ব পালন করেছে তার কোনো তুলনা হয় না। জনজীবনে স্বস্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাদের ভূমিকা অনন্য। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্যকে আমি ধন্যবাদ জানাই তাদের সততা, ত্যাগ ও অসীম দেশপ্রেমের জন্য। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বন্যা, খরা, ঝড়, বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় সহ সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগে আপনারা সকলের শেষ ভরসার স্থান। দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে আপনারা দেশের মানুষের পাশে থেকেছেন। দেশের স্বাধীনতার পক্ষে, সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দেশ গঠনেও আপনারা সবার আগে এগিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, বন্যা এখন চলে গেছে। কিন্তু পুনর্বাসনের কঠিন কাজ আমাদের সামনে রয়ে গেছে। সকলের সহযেগিতায় আমরা পুনর্বাসনের কাজটি সফলভাবে সমাধান করতে চাই।  

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যেসব ভাই-বোনেরা তাদের গত ১৬ বছরের বেদনা জানিয়ে তার প্রতিকার পাওয়ার কর্মসূচি দিচ্ছেন আমি কথা দিচ্ছি আপনাদের ন্যায্য আবেদনের কথা ভুলে যাবো না। আমরা সকল অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আমাদের দায়িত্বকালে যথাসম্ভব সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবো। আমি আবারও অনুরোধ করছি আপনার যাতায়াতে ব্যাঘাত সৃষ্টি থেকে বিরত থাকুন। জাতি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।

তিনি বলেন, তৈরি পোশাক, ঔষধশিল্প এসব এলাকায় শ্রমিক ভাইবোনেরা তাদের অভিযোগ জানানোর জন্য ক্রমাগতভাবে এই শিল্পের কার্যক্রম পরিচালনা বন্ধ রাখতে বাধ্য করছেন। এটা আমাদের অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে সেটা মোটেই কাম্য নয়। এমনিতেই ছাত্র-শ্রমিক-জনতার বিপ্লবের পর যে অর্থনীতি আমরা পেয়েছি সেটা নিয়ম-নীতিবিহীন দ্রুত ক্ষীয়মাণ একটা অর্থনীতি। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। আমরা এই অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চারের চেষ্টা করছি। আমাদের উদ্যোগে সাড়াও পাচ্ছি। ঠিক এই সময়ে আমাদের শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ ও অকার্যকর হয়ে গেলে দেশের অর্থনীতিতে বিরাট আঘাত পড়বে। শ্রমিক ভাইবোনদের অনেক দুঃখ আছে। কিন্তু সেই দুঃখ প্রকাশ করতে গিয়ে আপনাদের মূল জীবিকাই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে সেটা ঠিক হবে না। শ্রমিক-মালিক উভয়পক্ষের সঙ্গে আলাপ করে এসব সমস্যার সমাধান আমরা অবশ্যই বের করবো। আপনারা কারখানা খোলা রাখুন। অর্থনীতির চাকা সচল রাখুন। দেশের অর্থনীতিকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দিন। আমরা আপনাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান বের করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করবো। মালিকপক্ষের কাছে আমাদের আবেদন, আপনারা শ্রমিকদের সঙ্গে বোঝাপড়া করুন। কারখানা সচল রাখুন। অর্থনীতির দুর্বল স্বাস্থ্যকে সবল করে তুলুন।  

তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্ব অনেক। ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজ গড়ে তোলার জন্য একসঙ্গে অনেকগুলো কাজে আমাদের হাত দিতে হবে। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগের বড় সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে। যোগ্যতম ব্যক্তিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়াতে মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাস দমন আইন ও ডিজিটাল/সাইবার নিরাপত্তা আইনে দায়েরকৃত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ বাংলাদেশে বিদ্যমান সকল কালো আইনের তালিকা করা হয়েছে। অতি সত্বর এ সকল কালো আইন বাতিল ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশোধন করা হবে। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ বহুল আলোচিত ৫টি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ও দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির জন্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সমপ্রতি আমরা বলপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন সনদে স্বাক্ষর করেছি। ফলে স্বৈরাচার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘গুম সংস্কৃতি’র সমাপ্তি ঘটানোর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম। এছাড়া আমরা ফ্যাসিবাদী শাসনের ১৫ বছরে গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করার জন্য পৃথক একটি কমিশন গঠন করছি। আয়নাঘরগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এবং সেই সঙ্গে বের হয়ে আসছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের গুমের শিকার ভাইবোনদের কষ্ট ও যন্ত্রণা গাথা।

তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যত যেন উজ্জ্বল হয় সেটা নিশ্চিত করতে শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে আমাদের পূর্ণ নজর রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বর্তমানের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা হয়েছে। বই সংশোধন এবং পরিমার্জনের কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উচ্চ প্রশাসনিক পদগুলো পূরণ করে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা বোর্ডে দখলদারিত্বের রাজনীতি বন্ধ করার ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে মন্তব্য করে সরকার প্রধান বলেন, আপনারা মন খুলে আমাদের সমালোচনা করেন। মিডিয়া যাতে কোনো রকম বাধা বিপত্তি ছাড়া নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করতে পারে সেজন্য একটি মিডিয়া কমিশন গঠন করা সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন। আরও যেসব কমিশন সরকারসহ অন্য সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে, আমরা তাদের পুনর্গঠন ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি যাতে তারা আরও শক্তিশালী হয়, জনকল্যাণে কাজ করে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনারবৃন্দ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির আশ্বাস দিয়েছেন। আমার অনুরোধে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫৭ জন বাংলাদেশি যারা ফ্যাসিবাদ বিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন সে দেশের সরকার। ইতিমধ্যে তাদের কয়েকজন দেশে ফিরে এসেছেন। এই ক্ষমা প্রদর্শন ছিল অতি বিরল একটি ঘটনা।
ড. ইউনূস বলেন, আমরা ভারত এবং অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে ন্যায্যতা এবং সমতার ভিত্তিতে। ভারতের সঙ্গে আমরা ইতিমধ্যে বন্যা মোকাবিলায় উচ্চ পর্যায়ের  দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার আলোচনা শুরু করেছি। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমি সার্ক রাষ্ট্র গোষ্ঠী পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের দেশ যেন গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে সম্মানের সঙ্গে পরিচিত হয়। দেশের পরিকল্পনা যেন দেশের মানুষ কেন্দ্রিক হয়, কোনো নেতা বা দল কেন্দ্রিক নয়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের অহেতুক কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে দেখেছি যেগুলো কখনোই দেশের মানুষের জন্য ছিল না, বরং এর সঙ্গে জড়িত ছিল কুৎসিত আমিত্ব এবং বিশাল আকারের চুরি। চলমান এবং প্রস্তাবিত সকল উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর যাচাই-বাছাই করার কাজ শুরু করেছি। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায় বিবেচনা করে বাকি কাজে ব্যয়ের সাশ্রয় এমনকি প্রয়োজনবোধে তা বাতিল করার কথা বিবেচনা করা হবে। দেশের মানুষকে আর ফাঁকি দেয়া চলবে না। কর্মসংস্থান তৈরি করবে এমন প্রকল্পগুলোকে আমরা অগ্রাধিকার দেবো।  

তিনি বলেন, লুটপাট ও পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটা ব্যাংকিং কমিশনও গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে এই একমাসে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। ফ্যাসিবাদী সরকার লুটপাট করার জন্য নতুন করে ষাট হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার কারণে মুদ্রাস্ফীতির শিকার হয়েছে দেশের মানুষ। এই অতুলনীয় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় যৌক্তিক পরিমাণে হ্রাস করার জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য সার আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। কালো টাকা সাদা করার অনৈতিক অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সাপোর্ট চাওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্ব ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, জাইকা থেকে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদানের অনুরোধ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পাইপলাইনে থাকা ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মেগাপ্রকল্পের নামে লুটপাট বন্ধের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়া এবং চীন থেকে প্রাপ্ত ঋণের সুদের হার কমানো এবং ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। সকল উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সকল অর্থনৈতিক সূচক এবং পরিসংখ্যানের প্রকৃত মান বা সংখ্যা প্রকাশের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রকৃত রপ্তানি আয় নিরূপণ এবং প্রকাশের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অটোমাইজেশনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। পুঁজি বাজারকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন পুনর্গঠন করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার নিমিত্তে ব্যবসায়ী, শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে সভা করা হয়েছে এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্যাদি, যেমন পিয়াজ, আলু এসবের দাম আরও কমানোর জন্য বিদ্যমান শুল্কহার হ্রাসের বিষয়ে এনবিআরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ড. ইউনূস বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় হতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইনের অধীন চলমান সকল প্রকার নেগোসিয়েশন, প্রকল্প বাছাই এবং ক্রয় প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। গত দেড় দশকে এই আইন ব্যবহার করে লক্ষ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এ খাতে অধিকতর সক্ষমতা, গতিশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞগণের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সহনশীল রাখতে অকটেন ও পেট্রোলের দাম ৬ টাকা এবং ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১.২৫ টাকা কমানো হয়েছে। ৩৭ দিন বন্ধ থাকার পর গত ২৫শে আগস্ট হতে মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশন ছাড়া বাকি সব স্টেশনে মেট্রোরেল পুনরায় চালু করা হয়েছে।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে বলেন,  মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের বয়স সাড়ে বারো বছরের কম ছিল, তাদের মুক্তিযোদ্ধা তালিকা হতে বাতিলের জন্য সুপ্রিম কোর্টে লিভ টু আপিলের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাধীন বেদখলকৃত স্থাবর সম্পত্তি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।  

একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আর যেন আমাদের কোনো স্বৈরাচারের হাতে পড়তে না হয়, আমরা যাতে বলতে পারি আমরা একটি গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করি। তিনি বলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করলে তাকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবো। আমরা একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এমন কোনো কাজ কেউ করবেন না।

সরকার প্রধান বলেন, ধ্বংস হয়ে পড়া একটা জনপ্রশাসনকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। জনপ্রশাসনকে নতুন করে দাঁড় করানোই ছিল আমাদের কঠিনতম সময়। সকল সমস্যা সমাধান করে একটি নতুন জনপ্রশাসন কাঠামো দাঁড় করাতে পেরেছি এটাই আমাদের প্রথম মাসের সবচাইতে বড় অর্জন। আমার বিশ্বাস এই জনপ্রশাসন জনগণের ইচ্ছা পূরণে সর্বোচ্চ অবদান রাখতে পারবে। তিনি বলেন, গত একমাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১৯৮টি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ড. ইউনূস বলেন, ছাত্র, শ্রমিক, জনতার বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল গণভবন। এটা ছিল স্বৈরাচারের কেন্দ্রবিন্দু। এই সরকার বিপ্লবের প্রতি সম্মান দেখিয়ে গণভবনকে বিপ্লবের জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। ছাত্র-জনতার ক্ষোভকে স্থায়ীভাবে তুলে ধরার জন্য গণভবনের আর কোনো সংস্কার করা হবে না। ছাত্র-জনতার ক্ষোভের মুখে তা যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল সে অবস্থায় তাকে রাখা হবে।

তিনি বলেন, আমরা নতুন বাংলাদেশকে পরিবেশবান্ধব এবং জীব বৈচিত্র্যময় দেশ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। এটি তরুণদের আকাঙ্ক্ষা। আমাদের সবারই আকাঙ্ক্ষা। সেই লক্ষ্যে আমি প্রথমেই একটি ক্ষুদ্র পদক্ষেপ নিয়েছি। আমার বাসভবন ও সমগ্র সচিবালয়ে প্লাস্টিকের পানির বোতল ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছি। ইতিমধ্যে সুপার শপগুলোতে পলিথিনের শপিং ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত কয়েক দশকে যে পরিমাণ নদী দূষণ হয়েছে, আমরা তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি।

সরকারপ্রধান বলেন, আমরা সংস্কার চাই। আমাদের একান্ত অনুরোধ, আমাদের ওপর যে সংস্কারের গুরু দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই  দায়িত্ব দিয়ে আপনারা দর্শকের গ্যালারিতে চলে যাবেন না। আপনারা আমাদের সঙ্গে থাকুন। আমরা একসঙ্গে সংস্কার করবো। এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। আপনারা নিজ নিজ জগতে সংস্কার আনুন। একটা জাতির সংস্কার শুধুমাত্র সরকারের সংস্কার হলে হয় না। এই সংস্কারের মাধ্যমে আমরা জাতি হিসেবে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করতে চাই। আমাদের এই যাত্রা আমাদের পৃথিবীর একটি সম্মানিত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুক এটাই আমাদের সবার কাম্য।

তিনি বলেন, বিগত মাসে আমি বেশকিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পৃথকভাবে বসেছি। তাদের সঙ্গে মতামত বিনিময় করেছি। তারা আমাদের উৎসাহিত করেছেন। ছাত্র, শ্রমিক, জনতার বিপ্লবের লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। সংস্কারের কাজে পূর্ণ সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আমি দেশের বিশিষ্ট সম্পাদকবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। তারাও সংস্কারের কাজে পূর্ণ সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন। সবার পরামর্শ নিয়ে এখন আমাদের অগ্রসর হওয়ার পালা।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে ফ্যাসিজম বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রোধ এবং জনমালিকানা ভিত্তিক, কল্যাণমুখী ও জনস্বার্থে নিবেদিত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে কিছু জাতীয়ভিত্তিক সংস্কার সম্পন্ন করা জরুরি। উক্ত সংস্কার ভাবনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। আমরা যেহেতু জনগণের ভোটাধিকার ও জনগণের মালিকানায় বিশ্বাস করি, সেহেতু নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়নে আমাদের সংস্কার ভাবনায় গুরুত্ব পেয়েছে। আমরা মনে করি নির্বাচনের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠতার একাধিপত্য ও দুঃশাসন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া বা এর মাধ্যমে এক ব্যক্তি বা পরিবার বা কোনো গোষ্ঠীর কাছে সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব আশঙ্কা রোধ করার জন্য নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের কথা আমরা ভাবছি। নির্বাচন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, বিচার প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এই চারটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার করা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। এসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কার জনমালিকানা ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায়ও অবদান রাখবে বলে বিশ্বাস করি। সমাজের সকল স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্তাকে প্রতিফলিত করার জন্য সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজন আমরা অনুভব করছি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এসব বিষয়ে সংস্কার করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আমরা প্রাথমিকভাবে ছয়টি কমিশন গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এসব কমিশনের কাজ পরিচালনার জন্য বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে ছয়জন বিশিষ্ট নাগরিককে এই কমিশনগুলো পরিচালনা করার দায়িত্ব দিয়েছি। এরপর আরও বিভিন্ন বিষয়ে কমিশন গঠন প্রক্রিয়া আমরা অব্যাহত রাখবো।

তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ড. বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে কাজ করবেন সফর রাজ হোসেন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ড. ইফতেখারুজ্জামান, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে ড. শাহদীন মালিক দায়িত্ব পালন করবেন। এসব কমিশনের অন্য সদস্যদের নাম কমিশন প্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা হবে। কমিশনগুলোর আলোচনা ও পরামর্শ সভায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ছাত্র, শ্রমিক, জনতা আন্দোলনের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ সভার আয়োজন করবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ছাত্র সমাজ, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলের  প্রতিনিধি, সরকারের প্রতিনিধি নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক তিন থেকে সাত দিনব্যাপী একটি পরামর্শ সভার ভিত্তিতে সংস্কার ভাবনার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। এতে এই রূপরেখা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তার একটি ধারণাও দেয়া হবে।
তিনি বলেন, আমাদের সামনে অনেক কাজ। সবাই মিলে একই লক্ষ্যে আমরা অগ্রসর হতে চাই। আমাদের মধ্যে, বিশেষ করে আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা লুকিয়ে আছে সেটা যেন বিনা বাধায়, রাষ্ট্রের এবং সমাজের সহযোগিতায় প্রকাশ করতে পারি সেই সুযোগের কাঠামো তৈরি করতে চাই।

সরকারপ্রধান বলেন, আমাদের কাজ বড় কঠিন, কিন্তু জাতি হিসেবে এবার ব্যর্থ হওয়ার কোনো অবকাশ আমাদের নেই। আমাদের সফল হতেই হবে। এই সাফল্য আপনাদের কারণেই আসবে। আপনার সহযোগিতার কারণে আসবে। আমাদের কাজ হবে আপনার, আমার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করা। এখন আমরা দ্বিতীয় মাস শুরু করছি। আমাদের দ্বিতীয় মাসে যেন আপনাদের মনে দৃঢ় আস্থা সৃষ্টি করতে পারি সে চেষ্টা করে যাবো।

তিনি বলেন, ধৈর্য ধরুন এই কথাটি আমি মোটেই আপনাদের বলবো না। আমরা সবাই অধৈর্য হয়ে পড়েছি এতসব কাজ কখন যে শেষ হবে এটা চিন্তা করে। আমরা অধৈর্য হবো। কেন হবো না? কিন্তু সঠিকভাবে কাজ করবো। কাজে কোনো অধৈর্যের চিহ্ন রাখবো না।

mzamin

Sunday, August 18, 2024

আদালত থেকে সরছে লোহার খাঁচা by রাশিম মোল্লা

আদালত থেকে লোহার খাঁচা সরানোর উদ্যোগকে বিচার বিভাগের সংস্কার এবং সভ্য সমাজে পদার্পণ বলে মন্তব্য করেছেন আইনজ্ঞরা। গত শুক্রবার ঢাকার চিফ  মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (সিএমএম) থেকে লোহার খাঁচা সরানো হয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, নিম্ন আদালতে লোহার খাঁচা ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছিল। এমনকি জামিনে থাকা আসামিদের হাজিরার জন্যও এই খাঁচা ব্যবহার করা হতো। লোহার খাঁচা অপসারণের ফলে এ থেকে খুব শিগগিরই মুক্তি মিলবে। সরকারের এমন উদ্যোগ আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের অংশবিশেষ মনে করেন তারা। এবার ডাণ্ডাবেড়ি প্রথারও অপসারণ চান। গত বৃহস্পতিবার  সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতকে আদালতে হাজির করা হয়। তবে  সেদিন এজলাসে থাকা লোহার খাঁচায় কাউকেই ঢোকানো হয়নি। এজলাস কক্ষ থেকে লোহার খাঁচা সরানোর এ উদ্যোগকে নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন লোহার খাঁচা সরানোর রিটকারী আইনজীবী শিশির মনির।

তিনি মানবজমিনকে বলেন, আদালত থেকে লোহার খাঁচা সরানোর উদ্যোগকে বিচার বিভাগের সংস্কার হিসেবে মনে করি। নাগরিককে লোহার খাঁচায় ঢুকানো মানবাধিকারের চরম লংঘন। নিঃসন্দেহে অন্তর্বর্তী সরকারের একাজ  প্রশংসনীয়। দেশ-বিদেশেও এটি প্রশংসিত হবে।  কেননা, সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ, নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদসহ অন্যান্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দলিল এই ধরনের আচরণ অনুমোদন করে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুর্ধর্ষ, জঙ্গি আসামিদেরকে আদালতে না এনেও সাক্ষী নেয়ার বিধান রয়েছে। জেল কতৃপক্ষ যদি মনে করে তবে এসব আসামির সাক্ষী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নিতে পারে। এজলাসে আনা আসামি যাতে অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঘটনা ঘটাতে না পারে সেজন্য পুলিশকে সজাগ থাকতে হবে।
এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্রের চেয়ারপারসন ও সুপ্রিম কোর্টের  জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না মানবজমিনকে বলেন, একটি সভ্য রাষ্ট্রের আদালতে লোহার খাঁচা থাকতে পারে না। বর্তমান সরকার আদালত থেকে এই লোহার খাঁচা সরানোর কাজ শুরু করেছে। এটি একটি পজিটিভ দিক। ভালো দিক। সরকারের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আমাদের আশান্বিত করেছে। আদালতে আসামিকে  লোহার খাঁচায় রাখাকে সংবিধানের পরিপন্থি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারের মুখোমুখি কোনো আসামির সঙ্গে সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের চেতনার পরিপন্থি কোনো আচরণ সমর্থনযোগ্য নয়। একজন আসামিকে লোহার খাঁচায় ঢোকানো কিংবা ঢুকতে বাধ্য করা অমানবিক। লোহার খাঁচা সরানোর কার্যক্রম হাতে নেয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ডাণ্ডাবেড়ি পরানো প্রথা অপসারণ করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারও সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু এখনো আমাদের জেলখানাগুলোতে আসামিদের ডাণ্ডাবেড়ি পরানো হয়। এমনকী আদালতেও আসামিকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আনা হয়। এই সরকারের কাছে এই প্রথারও অপসারণ চাই।

সাবেক জেলা জজ ও রিটায়ার্ড জাজ এসোসিয়েশনের মহাসচিব ড. শাহজাহান সাজু মানবজমিনকে বলেন, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদের (ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস আইসিসিপিআর) ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাউকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি দেয়া যাবে না। আইসিসিপিআরের অনুচ্ছেদ ১৪(২) অনুযায়ী, ফৌজদারি অপরাধের জন্য অভিযুক্ত প্রত্যেকের আইন অনুযায়ী দোষী প্রমাণের আগ পর্যন্ত নির্দোষ বলে গণ্য হওয়ার অধিকার থাকবে। এসব বিধানের তোয়াক্কা না করে এত দিন পর্যন্ত নিম্ন আদালতে লোহার খাঁচায় সব আসামিকে ঢোকানো হতো।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী মোহাম্মদ ফারুক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, দেশের অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে এ ধরনের লোহার খাঁচা অতীতে ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী আনিসুল হক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আদালতে কাঠগড়ার পরিবর্তে লোহার খাঁচা স্থাপন করে। এ ধরনের খাঁচা ব্যবস্থা সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে বলা আছে, কারও সঙ্গে নিষ্ঠুর-অমানবিক আচরণ করা যাবে না। অথচ, এই খাঁচা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এত দিন পর্যন্ত নাগরিকদের সঙ্গে নিষ্ঠুর, অমানবিক ও বর্বর আচরণ করা হয়েছে। গত শুক্রবার দেখলাম আদালত থেকে এই লোহার খাঁচা সরানো হচ্ছে। এই আইনজীবীর মতে, এটি গণতান্ত্রিক সরকারের আলামত। সরকারের এমন উদ্যোগকে আমরা আইনজীবীরা স্বাগত জানাই। সরকারের এমন সংস্কার নাগরিকরাও সাধুবাদ জানাবে।

শুক্রবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের দু’জন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত কক্ষ থেকে লোহার খাঁচা সরানো হয়েছে। আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উচ্চপর্যায় থেকে লোহার খাঁচা সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা পাওয়ার পর শুক্রবার দুপুরের পর থেকে ঢাকার সিএমএম আদালতের কক্ষ থেকে লোহার খাঁচা সরানো হয়।

সিএমএম আদালতের এক কর্মকর্তা জানান, গণপূর্ত বিভাগের লোকজন লোহার খাঁচা সরানের কাজটি করেছেন। আমাদের ২৭টি কোর্টে লোহার খাঁচা রয়েছে।  এখন পর্যন্ত  ৪-৫টি এজলাসের খাঁচা অপসারণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব লোহার খাঁচাই সরিয়ে ফেলা হবে। শিশির মনিরসহ হাইকোর্টের ১০ আইনজীবী আদালত থেকে লোহার খাঁচা সরানোর জন্য রিট করেছিলেন। সেই রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দিয়েছিলেন। সারা দেশে অধস্তন আদালত কক্ষে কতোগুলো লোহার খাঁচা রয়েছে সে বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। সেইসঙ্গে হাইকোর্ট তার রুলে আদালত কক্ষে লোহার খাঁচার পরিবর্তে কাঠগড়া পুনঃস্থাপনের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়েছিলেন। এ ছাড়া আদালত কক্ষে লোহার খাঁচা বসানো কেন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১, ৩২ ও ৩৫ এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল।

গত ১২ই জুন ঢাকার আদালতের লোহার খাঁচা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আজকে আমরা অনেকক্ষণ খাঁচার (আসামির কাঠগড়া) মধ্যে ছিলাম। আমি যতদূর জানি, যত দিন আসামি অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত না হচ্ছে, তত দিন তিনি নিরপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবেন। একজন নিরপরাধ নাগরিককে শুনানির সময় লোহার খাঁচায় (আসামির কাঠগড়া) দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, এটা আমার কাছে অত্যন্ত অপমানজনক বলে মনে হয়েছে। এটা গর্হিত কাজ। এটা কারও ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। এটা পর্যালোচনা হোক। একটা সভ্য দেশে কেন একজন নাগরিককে শুনানির সময় পশুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে?

Wednesday, November 3, 2010

বিচার বিভাগ পৃথক্করণ

রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আংশিক পৃথক করার নিস্তরঙ্গ তিন বছর পার হলো। চুয়ান্নর ঐতিহাসিক ২১ দফার অন্যতম ছিল এ দাবি। তারও আগে ব্রিটিশ-ভারতের প্রাদেশিক পরিষদে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বিচার বিভাগ পৃথক করার দাবি তুলেছিলেন। সাতান্নতে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে এ বিষয়ে আইন হলেও তা শুধু প্রজ্ঞাপন জারির অভাবে কার্যকর হয়নি। আমলারা ঠেকিয়ে রাখেন। বাহাত্তরের সংবিধানে শেষ মুহূর্তে ‘আমলাতান্ত্রিক’ চাপেই ২২ অনুচ্ছেদের জন্ম নেয়। এতে বলা হলো, রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করা হবে। এত কাণ্ডের পরও সেই পৃথক্করণ আজও বারো আনার বেশি অধরা।
বহু টালবাহানার পর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ ক্ষেত্রে একটা বড় অগ্রগতি হলো। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিচারিক হাকিমের দায়িত্ব পালনে ক্ষান্ত দিলেন। বিচারকদের বদলি, কর্মস্থল নির্ধারণ, শৃঙ্খলাবিধানে সরকারি খবরদারি খর্ব হলো। কিন্তু সাংবিধানিক অর্থে বিচার বিভাগ পৃথক হলো না। সে কারণে ১০ বিচারকের মামলায় আপিল বিভাগ বললেন, সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদকে বাহাত্তরের মূল সংবিধানের (চতুর্থ ও পঞ্চম সংশোধনীতে এ দুটো অনুচ্ছেদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়) আদলে ফিরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত একটা ‘ক্রন্দন’ হয়ে থাকবে। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়েও আপিল বিভাগ আবার ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব’ এ দুটো অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিচার বিভাগ পৃথক্করণ সার্থক করতে নির্দিষ্টভাবে নির্দেশনা দেন। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে নীরবতা চলছে।
আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করি যে, বিচারিক ক্ষমতায় ভাগ বসাতে প্রশাসন ক্যাডারের অনভিপ্রেত বাসনা নানা অজুহাতে বাস্তবায়িত হতে চলেছে। মোবাইল কোর্ট আইনে নির্বাহী হাকিমদের বিচারিক ক্ষমতার সম্প্রসারণ ঘটছে। প্রশাসন ক্যাডার এতেও সন্তুষ্ট নয়। আমরা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের সপক্ষে গীত গাইব, আবার একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক বিচারের নামে প্রশাসন ক্যাডারের হাতে বিচারিক ক্ষমতা তুলে দেব, এটি স্ববিরোধিতা ছাড়া কিছু নয়। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রজাতন্ত্রের বিচারিক ক্ষমতা ভাগাভাগি হয় না।
বিচার বিভাগ পৃথক্করণের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে, তাকে সার্থক করে তুলতে সুপ্রিম কোর্টকে অবশ্যই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিচারকদের কর্মস্থলের মেয়াদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অভিযোগ থাকলে দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বদলিসর্বস্ব পুলিশি প্রশাসন আমরা বিচারাঙ্গনে চাই না। পৃথক করার ফলে প্রাপ্ত সুফল জনগণের কাছে এখনো স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে না।
আমরা অবিলম্বে বিচারকদের জন্য করা পে-কমিশনের বাস্তবায়ন চাই। আর সেই সঙ্গে বিচারকদের কর্মস্থলসংক্রান্ত একটি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা আশা করি। প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ে সম্মেলন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে আশা করব, এটা নিছক উপলক্ষকেন্দ্রিক হবে না। বিচারকদের খোলামেলা মতামতের আলোকে বিচার বিভাগ পৃথক্করণের বাস্তব বাধাগুলো অপসারণ করা হবে।

Monday, August 9, 2010

রায়ের সমালোচনা বাকস্বাধীনতার অংশ by মো. খুরশীদ আলম খান

বিচারকের রায়ের সমালোচনা করার অধিকার বাকস্বাধীনতার অংশ বলে আমি মনে করি। আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে সংবিধানে এই বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে’, উক্তিটি আমার নয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের। ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রদত্ত সংবর্ধনার জবাবে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ওই অভিমত দেন । তিনি আরও বলেছিলেন, ‘কোনো বিচারকই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। সভ্য জগতে ভব্য সমালোচনার একটা অবকাশ রয়েছে। বিচারকের রায়ের সমালোচনা করার অধিকার বাকস্বাধীনতার অংশ।’
১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ থেকে ৭ আগস্ট ২০১০—ঠিক ১৫ বছর ছয় মাস ছয় দিন পর সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী লিখলেন, ‘রায় নিয়ে লেখালেখি বন্ধ হোক।’ আমি গত ৭ আগস্ট ২০১০ তারিখে প্রথম আলোয় প্রকাশিত লেখার জবাবে দু-একটি কথা নিবেদন করতে চাই। প্রথম আলোয় আমার লেখাটির সূত্র ছিল, সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের ‘নীরব ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত দুদক’ শীর্ষক লেখাটি। আমার লেখার মূল বিষয় ছিল, বাংলাদেশ সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বাধ্যতামূলক কার্যকরতা সম্পর্কিত। সেখানে আমার লেখার অংশবিশেষ নিম্নরূপ—
‘...লিভ মঞ্জুরি একটি প্রাথমিক শুনানি, দুদকের আবেদন মঞ্জুর হলে অর্থাৎ বাছাইয়ে টিকে গেলে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ শুনানির সুযোগ সৃষ্টি হতো। আইনি ব্যাখ্যার উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি হতো। এখন আর শুনানি হবে না। বিষয়টি অত্যন্ত জনগুরুত্বসম্পন্ন। কারণ এর সঙ্গে দুদকের অস্তিত্ব জড়িত।’
এটা তো ধোঁয়া তোলার ব্যাপার নয় বা উচ্চতর আদালতকে প্রভাবিত করার ব্যাপার নয়। আমি একজন নাগরিক বা আইনজীবী হিসেবে এ সমালোচনার অধিকার আমার আছে। এটা আমার বাকস্বাধীনতা। আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে সংবিধান এ বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা আমাকে দিয়েছে। কার পেছনে কত টাকা খরচ করল, কাকে কতটা সুযোগ দেওয়া হলো, সেটা তো ইস্যু নয়। ইস্যু হলো সংবিধানের ১১১ ধারার অনুচ্ছেদের আলোকে আইনি ব্যাখ্যা। ৭ আগস্ট ২০১০ ইমরানুল কবির বার অ্যাট ল-এর লেখাটিতে এমন কিছু প্রসঙ্গ এসেছে, যা আমার লেখার প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এমন কিছু বিষয় আনা হয়েছে, যা অপ্রাসঙ্গিক এবং অবাস্তব। যেমন, ‘আইনবিষয়ক কলাম লেখকদের জন্য বার কাউন্সিলের সনদ থাকা অপরিহার্য হওয়া উচিত।’ এটা তো কণ্ঠরোধের মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনা। এ কেমন কথা? আইন বিষয়ে লিখতে হলে বার কাউন্সিলের সনদ থাকতে হবে? তাহলে হয়তো সাংবাদিকেরা বলবেন, সংবাদপত্রে নিবন্ধ লিখতে হলে প্রেস কাউন্সিলের মতো কোনো সংগঠনের মুচলেকা লাগবে? পঞ্চম সংশোধনীর রায় নিয়ে আমাদের গণমাধ্যমে বিস্তর লেখালেখি বা আলোচনা হয়েছে এবং প্রতিনিয়তই হচ্ছে। শুধু আইনজীবীসমাজ নয়, সুশীলসমাজ, সুধীসমাজ এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি বা আলোচনা করছে। লেখকের লেখা অনুযায়ী তাহলে তো যেসব লেখক আইনজীবী নন, তাঁদের লেখালেখি বন্ধ করা উচিত। এটা তো মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণের চিন্তাচেতনা। আজ যখন সারা দুনিয়াব্যাপী মানুষের চিন্তাচেতনার প্রসার ঘটছে, সেখানে মধ্যযুগীয় চিন্তাচেতনার অবকাশ কি আছে?
আমাদের দেশের অনেক রায়ের সমালোচনা হয়েছে, হচ্ছে। ভারত, ইংল্যান্ড, আমেরিকায়ও বিচার বিভাগ ও বিচারপতিদের রায়ের সমালোচনা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এটা অপরিহার্য। পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের ওপর দেশব্যাপী আলোচনা বা সমালোচনা হচ্ছে। কারণ এসবই বাকস্বাধীনতার অংশ। এই বাকস্বাধীনতা সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত। এটা হরণ করার দুঃসাহস যে যখনই দেখিয়েছে, তার পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
সুপ্রিম কোর্ট সংবিধান সংরক্ষণ করেন এবং নাগরিকের মানবাধিকার বলবৎ করেন। আদালত নিজের থেকে মোকদ্দমা রুজু করেন না, আদালতে মামলা রুজু করতে হয়। আদালত গায়ে পড়ে পরামর্শ বা ব্যাখ্যা দেন না, আদালতের কাছে পরামর্শ বা ব্যাখ্যা চাইতে হয়। আদালতের সামনে অশ্রুপাত করার কেউ অর্থাৎ বাদী-ফরিয়াদি না থাকলে বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদবে। সংবাদপত্র সমাজের আয়না। এতে জীবনচিত্র, সমাজচিত্র প্রতিফলিত হয়। আদালতের রায়ের প্রতিফলন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ায় স্বাভাবিক।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলায় অ্যাটর্নি জেনারেল যখন আদালতে বলেন যে, দুদকের মামলা করা ঠিকই আছে। একটি অনুমোদনপত্রই যথেষ্ট। তখন আদালতই পাল্টা প্রশ্ন করেন, এ বিষয়ে আমাদের তো ভিন্ন রকম রায় আছে। এসব যুক্তিতর্ক তো প্রকাশ্য আদালতে চলেছে। তাহলে এ কথা সংবাদপত্রে বললে কী করে ‘সরকারকে ব্লাকমেইল’ করা হয়? আসলে কার কাকে ব্লাকমেইল করা হলো? দুদক স্বাধীন সংস্থা কি না, সেটা এখানে তো অবান্তর। রাষ্ট্র স্বাধীনভাবে মত দিতে পারে। কিন্তু একই আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল একই আইনি ব্যাখ্যায় পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেওয়া তো যৌক্তিক হতে পারে না। জনাব কবির লিখেছেন, ‘যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়েছে, তাঁরা সবাই ধোয়া তুলসি পাতা নন। তাই বলে ওই ব্যক্তিদের শায়েস্তা করতে গিয়ে আইন ভাঙা হলে তা হবে আরেকটা বেআইনি কাজ।’ এটাও কিন্তু ধান ভানতে শিবের গীত হলো। কারণ প্রশ্নটা তো তুলসি পাতাসংক্রান্ত মোটেই নয়। কবির সাহেব আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের আগে কী করে বুঝে গেলেন যে দুদক আইন ভেঙেছে? মিজানুর রহমান খানের মতো আমারও লেখার মূল বিষয় ছিল, মামলা দায়ের করাসংক্রান্ত একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে। অনুমোদনপত্র কয়টি লাগবে? ওই প্রশ্ন সর্বাধিক জনগুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সঙ্গে হাজার মামলার ভাগ্য জড়িত। আপিল করার অনুমতি চাওয়ার অন্যতম যুক্তিও ছিল সেটি। সুতরাং যখন বিনা শর্তে লিভ টু আপিল খারিজ করা হলো, তখন সংগত কারণেই উদ্বিগ্ন হলাম।
মো. খুরশীদ আলম খান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

Friday, February 12, 2010

বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী

নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি মো. ফজলুল করিম স্বচ্ছতার স্বার্থে উচ্চ আদালতের বিচারকদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশে যে গুরুত্ব আরোপ করেছেন, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। অনেক বিলম্বে হলেও এ রকম সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়ার জন্য প্রধান বিচারপতি ধন্যবাদপ্রাপ্য। তবে এখন দেখার বিষয় হলো, বিচারপতিরা জনগণের সামনে ঠিক কবে নাগাদ তাঁদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করেন।
জরুরি অবস্থার সময় অধস্তন আদালতের বিচারকদের কাছ থেকে সম্পদের বিবরণী নেওয়া হয়েছিল। এসব বিবরণী যাচাই ও মূল্যায়ন করার উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। বিচার বিভাগ পৃথক্করণের পরও সংবিধান অনুযায়ী বিষয়টি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার দায়িত্ব হাইকোর্ট বিভাগের। কিন্তু আমরা বেদনা ও পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ করি, এ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ নীরবতা পালন করে চলেছেন। প্রায় ৮০ জন বিচারপতি নিয়ে গঠিত ফুলকোর্টের সভার আলোচ্যসূচি হিসেবে এ বিষয়টি অবিলম্বে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
প্রতিবেশী ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা সম্প্রতি তাঁদের সম্পদ ও দায়-দেনার বিবরণ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে দিয়েছেন। লক্ষণীয় যে তা কেবল নিজেদেরই নয়, একই সঙ্গে তাঁরা তাঁদের পোষ্যদের সম্পদসংক্রান্ত তথ্যও প্রকাশ করেছেন। সেখানে আদালতের তরফে একটা প্রশ্ন তোলা হয়েছিল যে উচ্চ আদালতের বিচারকেরা এ তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করবেন কি না। সেই তর্কের একটা অবসান ঘটেছে। বিচারপতিরা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তাঁদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করছেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পর বিভিন্ন রাজ্যের হাইকোর্টগুলোর বিচারকেরা তাঁদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করছেন।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৯৬(৪) অনুচ্ছেদের আওতায় ২০০৩ সালে উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য পালনীয় আচরণবিধিতে প্রথমবারের মতো সম্পদের বিবরণীর কথা নির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত হয়। এতে বলা আছে, প্রধান বিচারপতি প্রয়োজন মনে করলে বিচারকদের তাঁদের সম্পদের বিবরণী জমা দিতে আহ্বান জানাবেন। আজ সাত বছর পেরিয়ে গেল, কিন্তু সম্পদের বিবরণী কোনো প্রধান বিচারপতিই চাইলেন না। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান প্রধান বিচারপতি শপথ নিয়েই সাংবাদিকদের কাছে সম্পদের বিবরণী প্রকাশের বিষয়টি তুলে ধরলেন। সুতরাং আমরা একান্তভাবে আশা করতে পারি, অবিলম্বে প্রধান বিচারপতি সংবিধান ও আইনে তাঁর ওপর দেওয়া অর্পিত কর্তব্যের ডাকে সাড়া দিয়ে বিচারকদের কাছে সম্পদের বিবরণী চাইবেন এবং যথাসময়ে তা জনগণের কাছে প্রকাশ করবেন।
বর্তমান জাতীয় সংসদে পাস হওয়া তথ্য অধিকার আইনের আওতায় এ ধরনের তথ্য জানার অধিকার নাগরিকেরা সংরক্ষণ করে। আমাদের জানামতে, কোনো কর্মরত প্রধান বিচারপতির তরফে সম্পদের বিবরণী প্রকাশসংক্রান্ত ঘোষণা এই প্রথম। আইন তাঁকেই তা বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়ে রেখেছে। আমরা প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে যথা উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকলাম।

Monday, February 8, 2010

সম্পর্ক জটিল হবে by এম হাফিজউদ্দিন খান

সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) নির্ধারণ করতে উচ্চ আদালত যে আটটি নির্দেশনা দিয়েছেন, তাতে জেলা জজের অবস্থান সচিব ও তিন বাহিনীর প্রধানের ওপরে বলে ঠিক করা হয়েছে।
এখানে এ বিষয়ে দুটি মতামত প্রকাশকরা হলো।
সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট সম্পূর্ণ প্রশাসনিক বিভাগের আওতাভুক্ত বিষয়ে একটি উল্লেখযোগ্য রায় দিয়েছেন। এই রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ক্রমিকে জেলা জজ ও সমপর্যায়ভুক্ত জজদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করেছেন। তাঁদের সরকারের সচিব এবং তিন বাহিনীর প্রধানের ওপর স্থান দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ রায়ের ফলে প্রশাসনে যে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হতে পারে, তা তুলে ধরা দোষের হবে না বলে মনে করি।
প্রথমেই উল্লেখ করা দরকার, বর্তমানে বলবত্ জেলা জজ ও সমপর্যায়ভুক্ত জজদের যে পদমর্যাদা রয়েছে, তা অবশ্যই নিন্দনীয়। তাঁরা বর্তমানে উপসচিবের পদমর্যাদা ভোগ করেন। বিসিএস জুডিশিয়াল ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ হলো জেলা জজ। সুতরাং তাঁদের উপসচিব পদমর্যাদা প্রদান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দেশের অন্যান্য ক্যাডারের (প্রশাসনিক ক্যাডার ব্যতীত) সর্বোচ্চ পদ সরকারি বেতনক্রমের দ্বিতীয় গ্রেডভুক্ত বা অতিরিক্ত সচিবের সমপর্যায়ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত বিভাগ, কৃষি বিভাগ, মত্স্য বিভাগ, নিরীক্ষা ও হিসাব ইত্যাদি বিভাগের সর্বোচ্চ পদ অতিরিক্ত সচিবের পর্যায়ভুক্ত। তবে সেসব বিভাগের দ্বিতীয় গ্রেডের ১০ শতাংশ পদকে প্রথম গ্রেড অর্থাত্ সচিবের সমপর্যায়ের মর্যাদা দেওয়া হয়ে থাকে। বেতনক্রমও সচিবদের সমান অর্থাত্ বেতনক্রমের প্রথম গ্রেডভুক্ত। সুতরাং সে বিচারে জেলা জজকে এত দিন যে পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে তা অসন্তোষজনক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে হাইকোর্টের রায়ে তাঁদের যে পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে, তা অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে অত্যন্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং আন্তক্যাডার জ্যেষ্ঠতা ও পদমর্যাদায় অনেক সমস্যা স্পষ্ট করবে বলে প্রতীয়মান হয়। আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত সব পদ বিসিএস জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের দ্বারা পূরণযোগ্য। জেলা জজরা ওই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন। অতঃপর পদোন্নতি পেয়ে ক্রমান্বয়ে যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। এ ক্ষেত্রে হাইকোর্টের রায় অনুসারে, জেলা জজরা সচিবের অনেক ঊর্ধ্বে অবস্থান করবেন। তাহলে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদগুলো কাদের দ্বারা পূরণ করা হবে, সে প্রশ্ন রয়ে গেল। যদি জেলা জজদের এসব পদে নিয়োগ করা হয়, তাহলে তাঁদের পদাবনতি হয়ে যাবে। এটা কী করে সম্ভব?
আমার মনে হয়, জেলা জজদের বর্তমান সমস্যার সর্বোচ্চ সমাধান হতো যদি বিসিএস জুডিশিয়াল ক্যাডারকে হাইকোর্টের বিচারকদের ফিডার পদ হিসেবে নির্ধারণ করা হতো এবং তত্সহ হাইকোর্টের বিচারকের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পদ ওই ক্যাডারের জন্য সংরক্ষিত থাকত। তাহলে জেলা জজদের উচ্চতর আদালতে যাওয়ার পথ সুগম হতো এবং এতে তাঁদের বর্তমান পদমর্যাদা নিয়ে যে অসন্তোষ বিরাজমান, তা কিছুটা উপশম হতো। এর ফলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে জেলা জজরা উচ্চতর আদালতে আসতে পারতেন এবং উচ্চতর আদালতের গুণগত মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারতেন। উচ্চতর আদালতে বিচারক নিয়োগে বর্তমানে যে রাজনৈতিক ও দলীয় বিবেচনা প্রবলভাবে বিদ্যমান, তা দূর করার একটি সুযোগ পাওয়া যেত।
সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুসারে, উচ্চতর আদালতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিসিএস জুডিশিয়াল ক্যাডারের যেকোনো কর্মকর্তা ১০ বছর চাকরি করলেই যোগ্যতা অর্জন করেন। কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, উচ্চ আদালতে অধিকাংশ বিচারক নিযুক্ত হন আইনজীবীদের মধ্য থেকে। কালেভদ্রে দুই-একজন জেলা জজ হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। সম্প্রতি হাইকোর্টে বিরাটসংখ্যক বিচারক নিয়োগ করা হয়। সেখানে মাত্র দুজন এসেছেন জেলা জজ থেকে।
পত্রিকান্তরে দেখতে পেলাম, সরকার এ বিষয়টি নিয়ে আপিল বিভাগে যাবে। কারণ, মনে হয় রায়ের ফলে প্রশাসনে যে অস্থিতিশীল অবস্থা ও আন্তক্যাডার অসন্তোষ সৃষ্টি হবে, তার নিরসন হওয়া দরকার। এমনিতেই আমাদের জন্য প্রশাসনে বহুবিদ জটিলতা রয়ে গেছে। প্রশাসন সার্বিকভাবে অদক্ষ ও স্থবির। হাইকোর্টের এ রায়ের ফলে সার্বিক পরিস্থিতি আরও জটিল হবে এবং প্রশাসনের অদক্ষতা ও স্থবিরতা আরও বেড়ে যাবে বলে অনুমিত হচ্ছে।
এম হাফিজউদ্দিন খান: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

Monday, January 11, 2010

প্রধান বিচারপতির পদক্ষেপ

দীর্ঘদিন পর সুপ্রিম কোর্টে পরিবর্তনের মৃদুমন্দ বাতাস বইতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলাম অনিয়ম দূর করতে ক্রমিক অনুসারে ফৌজদারি মামলার শুনানির যে প্রতিকারমূলক উদ্যোগ নিয়েছেন, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি নিরীহ উদ্যোগ মনে হলেও এর গুরুত্ব অসাধারণ এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ। এই একটি সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে সেটা মামলা ব্যবস্থাপনায় একটা বিরাট পরিবর্তন নিশ্চিত করবে। এ জন্য বিচারপ্রার্থী, আদালতের কর্মকর্তা বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের বড় ভূমিকা পালনের বিকল্প নেই।
প্রধান বিচারপতি তাঁর শপথ-পরবর্তী ভাষণে হাইকোর্টের কোনো কোনো একটি বেঞ্চে এক দিনে শুনানিযোগ্য মামলার দীর্ঘ তালিকার অসংগতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এটা একটা সত্যিই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। খালি চোখে জনগণ ইদানীং উচ্চ আদালতের মামলা ব্যবস্থাপনায় অনেক অস্বাভাবিক বিষয় অস্বস্তির সঙ্গে লক্ষ করছে। জামিন প্রদানের সম-এখতিয়ারসম্পন্ন একাধিক বেঞ্চ বহাল থাকতে কেন একটিমাত্র বিশেষ বেঞ্চে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন, তার কোনো সদুত্তর তাঁরা পান না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা পরে দায়ের করা নতুন মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি করে মক্কেলদের প্রতিকার দিতে পারছেন। এ জন্য অপেক্ষাকৃত তরুণ আইনজীবীরা জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মাধ্যমে প্রতিকার লাভের প্রবণতা দেখাচ্ছেন। এর ফলে পেশাদারি ও নৈতিকতা সমুন্নত বা উজ্জ্বল না হয়ে বরং নিষ্প্রভ হচ্ছে। আইনের চোখে সবাই সমান—সে নীতির ব্যত্যয় ঘটছে।
এ রকম একটা প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতির প্রতিকারমূলক উদ্যোগের সাফল্য বিশেষভাবে কাম্য। এ জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে সুপ্রিম কোর্ট বারের দায়িত্বশীল সদস্যদের কাছ থেকে আমরা সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা আশা করছি। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এফ এম মেজবাহ উদ্দিন বলেছেন, ‘নতুন মামলা দাখিল করার সময় সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ-কর্মকর্তাদের দুর্নীতি করার সুযোগ থাকে।’ মোশন অর্থাত্ নতুন মামলাগুলোর দ্রুত শুনানি অনুষ্ঠানে অনেক বেঞ্চ-কর্মকর্তাই বাস্তবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম থাকেন। এখন যে প্রজ্ঞাপন জারি হলো, তা কার্যকর হলে সে ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ আর বেঞ্চ-কর্মকর্তাদের থাকবে না। বিশেষ কারণে ক্রমিক সংখ্যার হেরফের ঘটা ন্যায়বিচারের স্বার্থে কখনো নিশ্চয় হতে পারবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আদালত প্রকাশ্যে ঘোষণা করবেন। আমাদের দেশে অনেক ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু অনেক সময় তা বাস্তবায়ন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। আমরা আশা করব, প্রধান বিচারপতির এ সিদ্ধান্ত যেন কিছুতেই অপাঙেক্তয় না হয়ে পড়ে।
প্রধান বিচারপতি সর্বোচ্চ আদালতের প্রশাসনে গতিসঞ্চারের জন্য যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে, তা বহুদিনের প্রতীক্ষিত। তিনি ইতিমধ্যেই দুজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটিকে অস্বাভাবিক গতিতে মামলা নিষ্পত্তির বিষয় খতিয়ে দেখতে আদেশ দিয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। এই কমিটি যথাসময়ে যথা প্রতিকারের সুপারিশ পেশ করবে এবং তা সমান গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়িত হবে বলে আমরা আশাবাদী।

Thursday, January 7, 2010

প্রযুক্তিনির্ভর আদালত-ব্যবস্থাপনা সময়ের দাবি -প্রধান বিচারপতিকে অভিনন্দন

নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলাম গত রোববার তাঁকে দেওয়া সংবর্ধনার জবাবে সুপ্রিম কোর্টের মামলা-ব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম রোধে কিছু সংস্কারধর্মী কাজ করার জন্য সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। আমরা জানতে পেরেছি, এ লক্ষ্যে তিনি এরই মধ্যে একটি বড় ধরনের সম্মেলন অনুষ্ঠানেরও উদ্যোগ নিয়েছেন। আইনমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে তাঁর কথাও হয়েছে। আমরা তাঁর এ কর্মপ্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই।
বার ও বেঞ্চ হলো এক ইগলের দুই ডানা। উভয়ের কর্মদক্ষতা ও নিষ্ঠার ধারাবাহিক অনুশীলন সুষ্ঠু বিচার ও বিচার-ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারে। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও একই অনুষ্ঠানে যৌক্তিক বক্তব্য দিয়েছেন। আইনানুগ পন্থায় কর্মসম্পাদনই যে আইনজীবীদের মুখ্য কাজ, যেকোনো পন্থায় মক্কেল জেতানো তাঁর কাজ নয়, এই উচ্চারণ বহুকাল পরে একটি উপযুক্ত ফোরামে ধ্বনিত হলো। বেঞ্চ কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার জন্যও তিনি যথার্থই বিচারকদের অদক্ষতা বা উদাসীনতাকে দায়ী করেন। এ ধরনের বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রধান বিচারপতির তরফে সে বিষয়ে প্রতিকারে সচেষ্ট হওয়ার যে দৃঢ়সংকল্প, তা একটি উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক অগ্রগতি। অতীতে অনেক প্রধান বিচারপতি বেঞ্চ কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করতেই অনাগ্রহী ছিলেন। প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘আদালতের বাইরে জনগণ আমাদের পর্যবেক্ষণ করেন। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে বিচারপতিরা সমালোচনার বাইরে থাকবেন না।’
প্রধান বিচারপতি তাঁর ৪৭ দিনের মেয়াদে যেসব বিষয় অগ্রাধিকার দেবেন, তার মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর একটি কেন্দ্রীয় মামলা দায়ের-ব্যবস্থার সূচনা ঘটানো অন্যতম। সব ধরনের মামলা একটি স্থানে দায়ের হবে এবং এরপর সব বিভাগ তা সমানভাবে জানতে পারবেন। মামলার সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কখনো কখনো মামলার হদিস পেতেই গলদঘর্ম হচ্ছেন। একই আইনের প্রশ্নে দায়ের করা শত শত মামলা বছরের পর বছর পড়ে থাকছে। অথচ সেই আইনের মীমাংসা আপিল বিভাগ হয়তো আগেই করে রেখেছেন। এ ধরনের জটিলতা নিরসনে প্রধান বিচারপতি আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আদালত-ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভরতার ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ, তিনি যেন সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের সম্মেলন ডেকে নিম্ন আদালতের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে একটি খোলামেলা সংলাপের আয়োজন করেন। বিচার বিভাগের আংশিক পৃথক্করণের পর বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসহ এমনকি তাঁদের বিচারের গুণগত মান নিশ্চিত করার দায় সুপ্রিম কোর্টের ওপর আরও উত্তমরূপে বর্তেছে। তা ছাড়া বিচার বিভাগের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের আলাপ-আলোচনা করাটাই স্বাভাবিক।
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পের আওতায় এর আগে পাঁচটি জেলায় কেন্দ্রীয় ফাইলিং ব্যবস্থা চালু করে সুফল মিলেছে। কিন্তু বর্তমানে তা বন্ধ। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কুমিল্লায় ১০০ মামলার ওপর ওই ব্যবস্থার ইতিবাচক প্রভাব প্রত্যক্ষ করেন। সমন জারির জন্য ৭৬ দিনের পরিবর্তে গড়ে ৪৬ দিন এবং জবাব দাখিলের জন্য ৬৫ দিনের পরিবর্তে প্রায় ৩৬ দিন লাগে। আমরা বিশ্বাস করি, সুপ্রিম কোর্টসহ সারা দেশে কেন্দ্রীয় ফাইলিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে তা হবে একটি বিরাট সংস্কার। মামলা তালিকার (কজ লিস্ট) ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডের মতো কিছু বিষয়ের আশু প্রবর্তন শুধু প্রধান বিচারপতির সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। আমরা প্রধান বিচারপতিকে অভিনন্দন জানাই এবং তাঁর সামনের কার্যদিবসগুলোর সাফল্য কামনা করি।

Tuesday, November 17, 2009

আপিল বিভাগে এবার সচিবেরা কী বলবেন by মিজানুর রহমান খা

সরকারের ঘোষিত নতুন পে-স্কেলে জুডিশিয়াল পে কমিশনের সুপারিশ অগ্রাহ্য হয়েছে। তবে নিম্ন আদালতের বিচারকদের জন্য ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৩০ ভাগ ভাতা সংযোজন করা হয়েছে। তবে আপিল বিভাগের বিচারপতির নেতৃত্বাধীন নয় সদস্যের জুডিশিয়াল কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে; তার আইনানুগ অস্তিত্ব অস্বীকৃত হয়েছে। আগের মতো যুগ্ম সচিবদের সঙ্গে সমতা বজায় রেখে জেলা জজদের রাখা হলো তিন নম্বর গ্রেডেই। আসলে ৩০ ভাগ ভাতা যোগ করার মতো একটি সিদ্ধান্তের জন্য জুডিশিয়াল কমিশন গঠন ও তার কার্যক্রমের দরকার ছিল না।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ে বিচারকদের প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে না ভাবতে, তাদের সঙ্গে তুলনা না করতে এবং সুস্পষ্টভাবে বিচারকদের অন্য সুবিধাদি ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পেনশনের নিরাপত্তাকে বিচারিক স্বাধীনতার দ্বিতীয় প্রয়োজনীয় শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। নির্বাহী বিভাগ, বিশেষ করে আমাদের আমলাশাসিত রাজনীতিকদের মনোজগতে কখনো এর কোনো স্বীকৃতি দেখিনি। সে কারণেই দিনবদলের মন্ত্রিসভা প্রথমে জুডিশিয়াল পে-কমিশনের প্রস্তাব মতে বিচারকদের জন্য ১০০ ভাগ ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছিল। পরে তাদের পুনর্বিবেচনায় ৩০ ভাগ ভাতা উতরে যায়।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ের বাস্তবায়নে ঘোরতর অশ্রদ্ধা দেখানোর জন্য ২০০৪ সালে আদালত অবমাননার একটি মামলা হয়েছিল। এই মামলাটি ইতিমধ্যেই একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আমরা ক্ষমতার বিভিন্নমুখী পালাবদল প্রত্যক্ষ করেছি। জরুরি অবস্থায় বন্দুকের নলের ডগায় হামাগুড়ি দিয়ে আমরা আমাদের বহুপ্রত্যাশিত পৃথক্করণের একটা আংশিক অর্জন পেয়েছি। দেখার বিষয় হলো, অনির্বাচিত শাসকেরা দুবার বাজেট প্রদানের সুযোগ পেলেও অত্যন্ত সচেতনভাবে বিচারিক স্বাধীনতার ওই দ্বিতীয় প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করতে সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।
নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভা তাই যেদিন বিচারকদের ১০০ ভাগ ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব পুরোপুরি নাকচ করে, তখন সে খবরে অবাক হইনি। তবে আমরা ৩০ ভাগ ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টিকে ‘যাক, তবু হাত খুলেছে’ হিসেবে বিবেচনায় নিই। আর অনেক গুণ বেশি আগ্রহের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করব যে আমাদের আপিল বিভাগে মাসদার হোসেন মামলার রায় অগ্রাহ্য হওয়ার বিষয়টি কীভাবে পাক খেতে থাকে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ১১ সদস্যের ফুল কোর্টে ওই বিষয়টি সর্বশেষ আদালতে আসে ২২ অক্টোবর ২০০৯। একটি চিঠি অবিকল আদালতে তুলে ধরা হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আতোয়ার রহমানের সই করা ওই পত্রে বলা হয় : ‘‘১. মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ০৭/২০০৪ কনটেম্পট পিটিশনসহ ৭৯/১৯৯৯ নং সিভিল আপিলে ০৯.০৮.২০০৯ তারিখে যে নির্দেশনা প্রদান করে, এর মধ্যে নিম্নবর্ণিত নির্দেশনার সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে:
সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো, বিশেষ করে অর্থমন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এবং আইন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে ২০০৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধিমতে বিচারকদের বেতন, বাড়ি ভাড়া, অন্যান্য ভাতা, বয়সসীমা প্রভৃতি পুনর্নির্ধারণকল্পে গত ২ জুন ২০০৯ প্রদত্ত জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের সুপারিশ কার্যকর ও সন্তোষজনকভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশ দেওয়া হলো।বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উল্লিখিত সচিবেরা তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রের ‘এফিডেভিট অব কমপ্লায়েন্স’ আগামী তারিখের আগে বা পরে আদালতে পেশ করবেন। ২২ অক্টোবর পরবর্তী আদেশের জন্য পুনরায় কার্যতালিকায় আসবে। ২. জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশনের সুপারিশ সংবলিত একটি সার-সংক্ষেপ মন্ত্রিসভার জন্য অর্থ বিভাগ হতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করা হলে তা গত ১৮ মে ২০০৯ তারিখে মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপিত হয়। মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, সরকার কর্তৃক ঘোষিত নতুন জাতীয় বেতন স্কেল এবং ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরের বাজেটের সহিত সমন্বয় করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন কর্তৃক জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের জন্য সুপারিশকৃত ভাতাদি প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। মন্ত্রিসভার এ সিদ্ধান্তটি অর্থ বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে। এ পর্যায়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনিষ্পন্ন কোন কার্যক্রম নেই। ৩. মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ হতে গৃহীত কার্যক্রম মাননীয় সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগকে হলফনামার মাধ্যমে অবহিত করতে অনুরোধ করা হল।’’ অ্যাটর্নি জেনারেল এই সিদ্ধান্তই ২২ অক্টোবরে হলফনামার মাধ্যমে জানিয়ে দেন।
মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ওই আদেশে স্পষ্ট যে, আপিল বিভাগ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশনের প্রতিবেদনের ‘কার্যকর’ এবং ‘সন্তোষজনক’ বাস্তবায়ন চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মাসদার হোসেন মামলার বাদীপক্ষ অর্থাত্ বিচারকসমাজের রিট-সংক্রান্ত পরিহাস স্মরণ করা যেতে পারে। বিএনপির আইন ও বিচারমন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজ জেলা জজদের বেতন স্কেল অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন; কিন্তু তখন আমলাতন্ত্র যথারীতি গেল গেল বলে রব তোলে। অগত্যা তাদের খুশি করতে সেই বেতন স্কেল তাত্ক্ষণিক হরণ করা হয়। বিচারকেরা তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলেন। সেই রিটের ফসল মাসদার হোসেন মামলার আলোচিত রায় ও জরুরি অবস্থায় বিচার বিভাগ পৃথক্করণ প্রাপ্তি। কিন্তু বিচারকেরা লড়াই করেও যা পাননি, তা হলো বিচারকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল, আর্থিক স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে বিচারকের স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের সুযোগ। এ তো আসলে নেহাত রায় নয়, নির্বাহী বিভাগ নামের অনিচ্ছুক ঘোড়াকে পানি খাওয়ানোর প্রচেষ্টাও। মাসদার হোসেন মামলার ওই রায় মতে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে নয় সদস্যের কমিশন গঠিত হয়। বিচারপতি মো. ফজলুল করিম সভাপতি। হাইকোর্ট বিভাগ থেকে এলেন বিচারপতি নাজমুন আরা। সরকারের প্রতিনিধিত্ব সংখ্যালঘু বটে, তবে তারা প্রত্যেকে জবরদস্ত। আইন, সংস্থাপন, অর্থ এবং মন্ত্রিসভা বিভাগের সচিব। এ ছাড়া আছেন মহাহিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রার এবং ঢাকা মহানগর জেলা ও দায়রা জজ। খোঁজ নিয়ে জানলাম, গত ২১ জুনে সরকারের কাছে প্রেরিত প্রতিবেদনটি পে-কমিশন কিন্তু তৈরি করেছিল মতৈক্যের ভিত্তিতেই। মূল প্রস্তাব তিনটি: প্রথমত, বিচারকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল করা; দ্বিতীয়ত, জেলা জজদের মূল বেতন এক নম্বর গ্রেডভুক্ত করা; তৃতীয়ত, জুডিশিয়াল সার্ভিস সদস্যদের ভাতা ১০০ ভাগ করা। সরকারের নতুন বেতন স্কেলে এর একটিও বাস্তব রূপ নেয়নি।
জেলা ও দায়রা জজ জুডিশিয়াল ক্যাডার সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদ, এমনকি এক অর্থে সাংবিধানিক বললেও খুব রং চড়িয়ে বলা হয় না; কারণ জেলা জজ কথাটি সংবিধানে আছে। এ জন্য প্রথম গ্রেডের সমতায় এনে জেলা জজ পদের মূল বেতন ৪০ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়। ১৯৭৯ সালের দিকে জেলা জজরা যুগ্ম সচিবদের স্কেলে বেতন পেতে শুরু করেন।
৩০ বছর পর এবার মন্ত্রিসভার সামনে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বেতনকাঠামোতে বিরাট পরিবর্তন আনার দরকারি সুযোগটা আসে। আপাতত সেটি হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই সুযোগ অবশ্য শাসক-দলের জন্য কোনো নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয় ছিল না। এখানে কোনো বিচক্ষণ বা দূরদর্শী নেতা-নেত্রীর প্রজ্ঞা দেখানোর সুযোগের প্রশ্ন ছিল না, প্রশ্নটা ছিল শতভাগ বিশুদ্ধ সংবিধানসম্মত; সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বাস্তবায়নের প্রশ্ন, সংবিধান মেনে চলার শপথ রক্ষার প্রশ্ন। এখানে কারও ভালো লাগা বা মন্দ লাগার বিষয় ছিল না। কিন্তু এখন আমরা খালি চোখে দেখতে ও বুঝতে পারছি, জেলা জজদের আগের মতোই যুগ্ম সচিবের পদমর্যাদায় রাখা হয়েছে। শতভাগ ভাতার সুপারিশ ছেঁটে ফেলা হয়েছে। তাঁদের ৩০ ভাগ ভাতা দেওয়া হয়েছে। তাদের নবতর প্রাপ্তিযোগে আরও একটি যোগ অবশ্য আছে। আমাদের মন্ত্রিসভা সত্যিই একেবারে হাড়কিপটে নয়, তারা পোশাক ভাতাও বাড়িয়েছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সংগতি রেখে চলতে হিমশিম খাওয়া বিচারকদের ললাটের ভাঁজ এতে একটু হলেও মেলাতে পারে!
শুনেছিলাম, জুডিশিয়াল পে-কমিশনের সুপারিশ যাতে ‘কার্যকর’ ও ‘সন্তোষজনকভাবে’ বাস্তবায়িত না হয়, সে জন্য সুপরিচিত বিয়াম-বিদ্রোহীদের শক্তিমান গুরুরা গর্জন তুলেছিলেন। সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক এক একান্ত আলাপচারিতায় সম্প্রতি জুডিশিয়াল পে-কমিশনের সুপারিশ প্রসঙ্গে প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। অবশ্য একটু আশ্বস্ত হয়েছিলাম তাঁর কথা শুনেই। তিনি বললেন, ভারতে একটা ডেলিগেশন পাঠিয়েছি। তাঁরা সেখানকার বিচারকদের হাঁড়ির খবর আনবেন। ভাবি, তাহলে তো ভালোই হলো। আমাদের প্রধান বিচারপতির বেতন এখনো সাকল্যে ৩২ হাজার টাকা; আর ভারতের প্রধান বিচারপতির বেতন গত জানুয়ারিতে ৩৩ হাজার রুপি থেকে ১ লাখ রুপি করা হয়েছে। এরপর বিচারপতিদের সম্মিলনে তাঁদের বেতন-ভাতা আরও কয়েক গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে এবং তাতে সরকারের দ্বিমত জানা যায়নি। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালতের বিচারকদের বেতন বাড়াতে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে পে-কমিটি করেছে। জনপ্রশাসন ট্যারা চোখে তাকায়নি। ২৮ জুলাই ২০০৯ প্রদত্ত ওই কমিটির রিপোর্টে জেলা জজের বর্তমান মূল বেতন ২৩ হাজার ৮৫০ থেকে ৭৩ হাজার ৩৭০ রুপিতে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখন জ্যেষ্ঠ জেলা জজের মূল বেতন ১৬ হাজার ৮০০ টাকা।
পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতির বেতন দুই লাখ রুপির ওপরে। সেখানে জনপ্রশাসনের সর্বোচ্চ স্কেল ২৩ হাজার ৬৫ থেকে ৪৬ হাজার ২৩৫ রুপি। সচিবেরা এই স্কেলেই বেতন পান। পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সরকার জনপ্রশাসনের বেতন না বাড়িয়ে একটা বিপ্লব করে। তারা ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জেলা জজের মূল বেতন ২৮ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার রুপি করে। সেখানে কোনো আমলা-অসন্তোষ ঘটেনি। শ্রীলঙ্কায় জ্যেষ্ঠ জেলা জজের মূল বেতন ৫০ হাজার রুপির বেশি, সাকল্যে এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। তো প্রতিবেশীদের ঘরে যখন এই রকম পরিবর্তন, তখন দিনবদলের স্লোগানমুখর সরকার বিচারকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের সূচনা ঘটাতেই কার্পণ্য দেখাল। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে জুডিশিয়াল পে-কমিশনের বৈঠকের সুপারিশ কী করে সর্বসম্মত হতে পারল। কেবল অর্থসচিব শেষের এক বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন; কিন্তু তাই বলে তিনি ভিন্নমত দেননি। সর্বশেষ আপিল বিভাগের ১১ জন মাননীয় বিচারপতি পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সর্বসম্মত মত দিলেন। সেখানেও আমরা কোনো ভিন্নমত দেখি না।
মাসদার হোসেন মামলা থেকে উদ্ভূত ওই আদালত অবমাননার মামলার শুনানি আপিল বিভাগে আগামীকাল হওয়ার তারিখ আছে বলে শুনেছি। আমরা ঔত্সুক্য নিয়ে অপেক্ষা করব, জুডিশিয়াল পে-কমিশনের প্রতিবেদন অগ্রাহ্য করার বিষয়টিকে সরকার কীভাবে ব্যাখ্যা দিতে সচেষ্ট হয়। আমরা পে-কমিশনের সুপারিশপ্রণেতা-সদস্য হিসেবে কয়েকজন সচিবের নাম পাই; এবং একই সঙ্গে আপিল বিভাগের গত ৯ আগস্ট প্রদত্ত নির্দেশনায় নির্দিষ্টভাবে কয়েকজন সচিবের নাম পাই। সত্যি, এ বিষয়টি কৌতূহলোদ্দীপক বটে!
আজ বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহমেদ ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে জেলা জজদের অবস্থানবিষয়ক একটি রিটের শুনানি হতে পারে। বিদ্যমান ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে জেলা জজরা অপাঙেক্তয় অবস্থায় আছেন। জেলা প্রশাসক, লে. কর্নেল বা স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিংয়ের পরিচালকের মতো পদবিধারীদের কাতারে আছেন জ্যেষ্ঠ জেলা জজ। অন্যদিকে গতকাল জানলাম, প্রশাসন ক্যাডার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে খামচি মেরে যে বিচারিক ক্ষমতা হরণ করেছিল, তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেও একটি রিট হয়েছে। এই দুটি রিটই আসলে ওই মাসদার হোসেন মামলার রায়ের বিষয় এবং চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এর সবকিছুই তার সব বৈপরীত্য ও স্ববিরোধিতা নিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে একই সূত্রে গাঁথা।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com