Tuesday, May 14, 2013

দেখার কেউ নেই

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশের শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে। প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও বেশি গতিশীল, বাস্তববাদী ও সৃজনশীল করতে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকেরা যথাসময়ে বিদ্যালয়ে আসেন না, বিদ্যালয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ একটি ক্লাস করান, মাঝেমধ্যে করান না, অফিসের কাজের নামে বাড়িতে চলে যান, বিদ্যালয়ে না এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন।
২০১৩ সালে সরকার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্লিপ কমিটির নামে ৩০ হাজার টাকা ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীর জন্য উপকরণ বাবদ পাঁচ হাজার টাকাসহ মোট ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এগুলো মূলত দেওয়া হয় শিক্ষা উপকরণ, শ্রেণীকক্ষের বোর্ড, বেঞ্চ, টেবিল মেরামতের জন্য।
এমতাবস্থায় সরেজমিনে তদন্ত করে, প্রয়োজনে সহকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা উচিত।
তাজল বেপারী
চাঁদপুর।

নিয়োগ পরীক্ষা

বর্তমানে চাকরির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক গৃহীত নিয়োগ পরীক্ষায় হাজার হাজার পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। শুধু বিপিএসসি কর্তৃক গৃহীত বিসিএস ও প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ব্যতীত অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষাগুলোর ৯৯ শতাংশই ঢাকা শহরে অনুষ্ঠিত হয়, যা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। ঢাকা শহরে যেকোনো পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে একজন প্রার্থীকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, দীর্ঘ সময় ব্যয় করে ঢাকায় পৌঁছাতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এতে  ঢাকা শহরে অবস্থানকারী পরীক্ষার্থীরাও নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারেন না। ঢাকা শহরে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় পরীক্ষার্থীরা ফরম পূরণ করার পরও পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন না। এখানে আসা-যাওয়া, পরীক্ষাকালীন অবস্থান করা—এসবের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা একজন বেকারের পক্ষে জোগাড় করা খুবই কঠিন।
এমন পরিস্থিতিতে সব নিয়োগ পরীক্ষা ঢাকায় গ্রহণ করা একটি অমানবিক সিদ্ধান্ত। যদি নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গ্রহণ করা হয়, তবে হাজার হাজার পরীক্ষার্থী অহেতুক বিড়ম্বনা থেকে রক্ষা পাবেন।
তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বিকেন্দ্রীকরণে ব্যবস্থা নিন।
মোসা. রহিমা রওনাক
বহরমপুর, রাজশাহী।

হে কবিতা, দুধভাত, তুমি ফিরে এসো

উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা, হে দুধভাত, তুমি ফিরে এসো...তুমি ফের ঘুরে ঘুরে ডাকো সুসময়।
কবি আবুল হাসানের কবিতা।
আজ সারাটাক্ষণ এই কথাটাই বলি। সুসময় ফিরে আসুক। কবিতা পড়ার মতো সুসময়। আমাদের সন্তানেরা যেন দুধে-ভাতে সুখে থাকে।
আমরা যেন সকালবেলার সংবাদপত্রে সুখবর পড়তে পারি।
দুঃসংবাদ শুনতে আর ভালো লাগে না। দুঃসংবাদ পড়তে আর ভালো লাগে না।
একটা সুসংবাদ চাই। অন্তত একটা সুখবর দাও, প্রভু।
শেষতক বাংলাদেশ একটা টি-টোয়েন্টি জিতল। সাকিব আল হাসান ম্যাচসেরা হলেন। জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে। তবুও তো জয়। জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে বলেই জয় ছাড়া অন্য কিছু নিতে পারি না। এরই মধ্যে আরেকটা সুখবর এল। রেশমার অক্ষত অবস্থায় ১৬ দিন পরে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ফিরে আসা। আমাদের মনে হলো, রেশমার সঙ্গে যেন আমরা সবাই বেঁচে উঠলাম। যেমন প্রতিবার প্রতিটি অপঘাত মৃত্যুর খবরে এক-একবার করে মরে যাচ্ছিলাম। ভেতরে-বাইরে। রেশমা বেঁচে থেকে যেন বলে উঠলেন, আমরা মরিনি, আমরা মরি না।
আবুল হাসানেরই কবিতার লাইন বিড়বিড় করে বলি:
‘মারী ও মড়কে যার মৃত্যু হয় হোক, আমি মরি নাই, শোনো, কেউ কোনোদিন কোনো অস্ত্রে আমার আত্মাকে দীর্ণ মারতে পারবে না।’ কিংবা ‘আমার অনলে আজ জাগো তবে হে জীবন, জয়শ্রী জীব একজন বললেন, শাহীনাও বাংলাদেশ, রেশমাও বাংলাদেশ। শাহীনাকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। এটা যেমন সত্য, রেশমা বেঁচে আছেন, আর তাঁকে উদ্ধার করা গেছে, এটাও সত্য। এই দুই সত্য মিলেও বাংলাদেশ।
আরেকজন বললেন, না, রেশমাই বাংলাদেশ। আমরা মরি না। আমরা বেঁচে থাকি।
কী জানি, এসবই তো কাব্য করে বলা কথা।
এই রকম অসহায় মৃত্যু তো আগেও দেখেছি মানুষের। হয়তো এই রকম হাজারে হাজারে নয়। কিন্তু দেখেছি তো!
একবার এক রাশান সাবমেরিনে অনেক কজন নাবিক আটকা পড়েছিলেন। সারা পৃথিবী জানল ওঁরা মারা যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের উদ্ধার করা গেল না। ১১৮ জন নাবিক মারা গেলেন। সেটা এই সহস্রাব্দেরই কথা।
মানুষের ক্ষমতা কত সীমিত। ধ্বংসের ক্ষমতা অপরিসীম, রক্ষা করার ক্ষমতা আছে সামান্যই। নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার পর উদ্ধারকর্মীরা গিয়েছিলেন সেই ভবনে ছুটে, তাঁরাও মারা পড়েছিলেন।
একটা মানুষকেও বাঁচানো কত কঠিন। একটা প্রাণেরও কত মূল্য। শাহীনাকে যখন বাঁচানো গেল না, উদ্ধারকর্মীরা কীভাবে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।
আবার একটা মানুষ বেঁচে উঠলে যেন সমগ্র মানবতাই বেঁচে ওঠে। জেগে ওঠে। রেশমার সঙ্গে সঙ্গে যেন আমরা সকলেই বেঁচে উঠলাম।
তার পরেও কেন আমরা এত মানুষ মারার জন্য উঠে পড়ে লেগেছি। কীভাবে, কত অবলীলায় আমরা মানুষকে মারছি।
ইশ্। কেমন করে একজন মানুষ পারে আরেকজন মানুষকে আঘাত করতে। কেমন করে একজন মানুষ পারে আরেকজন মানুষকে হত্যা করতে!
বারবার করে বলি, হিংসা নয়, আসুন, ভালোবাসার কথা বলি। নির্মলেন্দু গুণের ভাষায় বলি, আজ আমি কারো রক্ত চাইতে আসিনি, আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছি। শেষ পর্যন্ত ভালোবাসারই জয় হবে। হতে যে হবেই।
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ তাঁর নোবেল পুরস্কার ভাষণে যা বলেছিলেন তাঁর গুরু উইলিয়াম ফকনারকে উদ্ধৃত করে, নিজেকে সেটাই যেন বারবার করে বলি: “জুলুম নির্যাতন নির্বাসন সত্ত্বেও আমাদের জবাব হচ্ছে ‘জীবন’। বন্যা, মহামারি, দুর্ভিক্ষ, দুর্যোগ, এমনকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ—কোনো কিছুই মৃত্যুর ওপরে জীবনের সুবিধার প্রাধান্যকে দমাতে পারেনি। এ এমন এক সুবিধা, যা দ্রুত বাড়ে আর গতিপ্রাপ্ত হয়। প্রতি বছর সাত কোটি ৪০ লাখ জন বেশি জন্মায় মৃতের সংখ্যার চেয়ে, যা নিউইয়র্কের জনসংখ্যার সাত গুণ। এসব জন্মের বেশির ভাগই ঘটে কম সম্পদের দেশগুলোতে, অবশ্যই যার মধ্যে লাতিন আমেরিকা অন্যতম। অন্যদিকে সম্পদশালী দেশগুলো এমন সব অস্ত্রভান্ডার গড়ে তুলেছে, যা কেবল সব মানুষকে ১০০ বার মারতে পারে তা-ই না, এই পৃথিবীর সব প্রাণীকুলকেই ধ্বংস করতে পারে। এমনি এক দিনে আমার গুরু উইলিয়াম ফকনার বলেছিলেন, আমি মানুষের অবসান মেনে নিতে অস্বীকার করি।” মার্কেজ তাঁর ভাষণে একটা বিকল্প ইউটোপিয়া নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছিলেন এইভাবে, ‘একটা নতুন এবং যুগান্তকারী জীবনের কল্পরাজ্য, যেখানে কেউ ধার্য করে দেবে না যে অন্যেরা কীভাবে মারা যাবে, যেখানে ভালোবাসা প্রমাণিত হবে সত্য বলে এবং সুখ হয়ে উঠবে সম্ভবপর, যেখানে শত বছরের নির্জনতার শাস্তিপ্রাপ্ত মানবজাতি শেষবারের মতো এবং চিরকালের মতো পৃথিবীতে বেঁচে থাকার একটা দ্বিতীয় সুযোগ পাবে।’ বাংলাদেশের মানুষেরও মৃত্যু নেই। আমাদের দরকার এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে কেউ ঠিক করে দেবে না অন্যে কীভাবে মারা যাবে। ভালোবাসা যেখানে সত্য হয়ে উঠবে, সুখ হয়ে উঠবে সম্ভবপর।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ওসাংবাদিক।

নওয়াজ শরিফের জন্য মুখিয়ে থাকা সমস্যাগুলো

রথমবারের মতো একটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদপূর্তি এবং একই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়াটা পাকিস্তানের মতো একটি দেশের জন্য আশা-জাগানিয়া। পাকিস্তান পিপলস পার্টির  (পিপিপি) পরাজয়, নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগের জয়লাভ কিংবা ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টির উত্থান গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রথমবারের মতো সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করে নিয়মিত বিরতির নির্বাচন হতে পারাটা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণতম। তবে কথা হচ্ছে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাড়ে ছয় দশকের বেশি সময় পরে প্রশংসা করার মতো সাফল্যটি এলেও, এ নিয়ে আদিখ্যেতা করার সময় হাতে থাকছে না নতুন শাসকদের। পাকিস্তানে মূলধারার রাজনীতিকেরা বলতে গেলে এক একটি ‘রত্ন’! ক্ষমতাহারা পিপিপি-প্রধান আসিফ আলী জারিদারির কথা ধরা যাক; সেই কবে থেকে ‘মিস্টার টেন পার্সেন্ট’ নাম নিয়ে বসে আছেন। নতুন করে বিজয়ী নওয়াজ শরিফ? তাঁর অতীত শাসনামলগুলো মনে আছে অনেকের, নিদারুণ দুর্নীতিতে ভরপুর। বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় দুর্নীতি অবধারিত নাকি দুর্নীতির কারণেই বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় নানা রকমের সংকট দেখা দেওয়া—সব নিয়ে নানামুখী কথাবার্তা আছে। অনেকে মনে করেন, বুর্জোয়া ব্যবস্থা বিকাশের জন্য দুর্নীতিটা লাগে! এসব তর্ক-বিতর্ক সত্ত্বেও এটুকু মানতে হয় যে উচ্চপর্যায়ের নানামুখী দুর্নীতির চোটে উত্তর-ঔপনিবেশিক অনেক রাষ্ট্রের মতো পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাসিন্দাদেরও প্রাণ ওষ্ঠাগত। পিপিপির জায়গায় শরিফের মুসলিম লিগ সরকার আসছে। সন্দেহ নেই, এদের ব্যাপারেও জনগণের মধ্যে পিছলা স্মৃতিগুলো কাজ করবে। জনগণের কাছ থেকে এরা বেশি ভোট পেয়েছে বটে, তার মানে এই নয় যে জনগণ নতুন শাসকদের ব্যাপারে সশ্রদ্ধ। আর এ কারণে শরিফের সরকার শুরু থেকেই একটা আস্থার সংকটের মধ্যে থাকবে বলে মনে হয়। এমন একটা পরিস্থিতি থেকে উত্তরিত হয়ে জনমনে নিজেদের জন্য সম্মাননার বোধ তৈরি করতে পারাটা হবে নতুন সরকারের জন্য সাংঘাতিক এক চ্যালেঞ্জ। এবার আসা যাক, দায়িত্ব নেওয়ার মুহূর্ত থেকে যেসব বাস্তবতা তাড়া করতে থাকবে, সেগুলোর দিকে। প্রথম চ্যালেঞ্জটি হবে ধর্মীয় উগ্রবাদের ব্যাপারে অবস্থান গ্রহণ। ধর্মীয় উগ্রবাদ পাকিস্তানে প্রচণ্ড শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে চলেছে অনেক দিন থেকে; এটাই তার কৌশল। পাকিস্তানি বাস্তবতায় নিজেদের মতো করে একধরনের সেক্যুলার দলগুলোর ওপর এবারের নির্বাচন মৌসুমে তাণ্ডব চালিয়ে তাদের একেবারে কোণঠাসা করে দিয়েছে এরা। পিপিপি, আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি, মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট ছিল মূল লক্ষ্য। শরিফরা এসব হামলার বিরুদ্ধে কথাবার্তা বলেছিলেন বলে জানা যায় না। এখন কী হবে? শরিফের সরকার যদি ভাবে, পিপিপির জায়গায় তারা ক্ষমতায় আসায় ধর্মীয় উগ্রবাদ ঠান্ডা মেরে যাবে, তাহলে ভুল হবে। কেননা একটি ধর্মবাদী পাকিস্তান কায়েম করার জন্যই লড়াইটি চালানো হচ্ছে। পিপিপিকে শায়েস্তা হতে দেখে মজা লাগলেও এবার ধর্মীয় উগ্রবাদের প্রকোপ নিয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত নিতে হবে শরিফকে। অবশ্য তলে তলে কিছু থাকলে ভিন্নকথা। সন্ত্রাসবাদী দমনের অজুহাতে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রধান সাম্রাজ্যবাদী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলা অব্যাহত আছে। পিপিপির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। ভোটের আগের দিনও শরিফ জানান যে ক্ষমতায় গেলে ড্রোন হামলা করতে দেওয়া হবে না। এত দিন পিপিপিকে গালাগাল করে পার পাওয়া গিয়েছিল। এবার দেখা যাবে মুসলিম লিগ কী করে। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে নিজেকে মার্কিন-মুঠির বাইরে প্রমাণের ক্ষমতা শরিফের দলের আছে কি না, তা কিছুদিনের মধ্যে দেখা যাবে। প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন হবে আরেকটি শক্ত কাজ। বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকাজুড়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের মোকাবিলায় ইসলামাবাদ-কাবুল দৃঢ় সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বাস্তবতা একেবারে উল্টো। দুই দেশ পরস্পরকে ধর্মীয় উগ্রবাদী চালান দেওয়ার দোষে অভিযুক্ত করে চলেছে। এ ছাড়া ইসলামাবাদ আবার কাবুলের সঙ্গে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ‘ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া’ ধরে নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। শরিফ সরকারের আমলে পাকিস্তান-আফগান সম্পর্কে নতুন কোনো মাত্রা দেখা যাবে কি? মনে রাখতে হবে, এটা আচমকা শুভেচ্ছা দেখিয়ে ঝটপট কিছু করার বিষয় নয়। পিপিপিকে হঠানোর জন্য শরিফ সাহেব যাঁদের মন রক্ষা করেছেন, তাঁদের মধ্যে ধর্মীয় উগ্রবাদের সমর্থকেরাও আছেন; আচমকা তাঁদের আশা-ভরসা ভাঙা এত সহজ নয়। আরেকটা কথা হচ্ছে, শরিফের নিজের দলটিও ঠিক লিবারেল নয়। মনে হয়, পাকিস্তান-আফগান সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে তিক্তই থাকবে, যা থেকে লাভবান হতে থাকবে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে কী করবেন নওয়াজ শরিফ? সমস্যা জিইয়ে রাখবেন? ভারতের সঙ্গে প্র্রয়োজনে লড়াই করবেন? ঠিক কোন জায়গায় পিপিপির সঙ্গে পার্থক্যটা দেখাবেন? শরিফ কাশ্মীর নিয়ে ভালো বিপাকে পড়বেন বলেই মনে হয়। ভারতের সঙ্গে সামগ্রিক সম্পর্ক নিয়েও শরিফের পদক্ষেপগুলো হবে দেখার মতো। একদিকে আছে ভোটব্যাংক, যেখানে ভারত-বিরোধিতা অত্যন্ত ফলদায়ী হয়। অন্যদিকে, ভারতের মাটিতে সহিংসতায় মদদ দানসংক্রান্ত নয়াদিল্লির কড়া অভিযোগ। একই প্রসঙ্গে পুরোনো মিত্র যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের দিক থেকে আসা বেশুমার সমালোচনা-সতর্কতাগুলোও শরিফের ওপর চাপ হিসেবে থাকবে। ভোটব্যাংক বনাম সীমানার ওপার তথা বহির্বিশ্বের চাপ—শরিফের সরকারের কঠিন পরীক্ষা হয়ে যাবে। জাতীয় সংহতির ক্ষেত্রে পাকিস্তান সমস্যায় ভুগছে শুরু থেকে। ১৯৭১ সালে অঙ্গহানি হয়ে যাওয়ার পরেও দেশটি পুরোনো সমস্যা থেকে বের হতে পারেনি। এখনো পাঞ্জাবি আধিপত্য নিয়ে অন্যদের মধ্যে রয়ে গেছে ব্যাপক ক্ষোভ। আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় প্রদেশ বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের রমরমা পাকিস্তানে জাতীয় সংহতির সমস্যার পরিচায়ক। সিন্ধু প্রদেশের ক্ষেত্রেও এ বক্তব্য কিছু মাত্রায় হলেও প্রযোজ্য। নিজস্ব ভোটব্যাংককে ক্ষুব্ধ করে হলেও, তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে পাঞ্জাবের শরিফ অন্যান্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের মন থেকে পাঞ্জাবি আধিপত্যের ক্ষোভটি নিরাময় করতে কিছু করেন কি না, তার ওপর পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকটা নির্ভর করবে বলে মনে হয়। তবে সব কথার আসল কথাটি, অর্থাৎ নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক, এবার বলা দরকার। জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত পাকিস্তানে অর্ধেকের বেশি সময় ক্ষমতায় থেকেছে সামরিক বাহিনী। ক্ষমতায় না থাকলেও দোর্দণ্ড প্রতাপসম্পন্ন এই প্রতিষ্ঠান—নির্বাচিত সরকারকে যখন-তখন বকে দেওয়া, হুমকি দেওয়া, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নিয়ে ওঠবস করানোর ক্ষমতা রাখে এই প্রতিষ্ঠান। কেবল রাজনীতি বা রাষ্ট্রক্ষমতা নয়, দেশের অর্থনীতিতেও প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে সামরিক বাহিনীর লোকজনের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা সুগভীর। আয়েশা সিদ্দিকার মতো গবেষক মিলিটারি ইনক (২০০৭) গবেষণাগ্রন্থে এ কথা হাতেনাতে প্রমাণ করে দিয়েছেন। মনে হয় যে শরিফের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করবে সিভিল স্বার্থের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর স্বার্থ বা ইচ্ছার ভারসাম্য ঘটানোর ওপর। ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ কর্তৃক ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হওয়ার কথা কী করে ভুলে থাকবেন নওয়াজ শরিফ? ‘ঘরপোড়া গরু’ হয়ে ‘সিঁদুর দেখে ডরায়’ অবস্থার মধ্যে পড়ে গেলে আর কোনো কথাই নেই। অবশ্য তা না হলেও, সর্বস্তরের এবং সব অঞ্চলের জনগণের কাছ থেকে তেমন বিপ্লবী ম্যান্ডেট না নিয়ে আসা শরিফ-সরকারের পক্ষে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে শুধু জনগণের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়া ব্যাপারটি একেবারেই সম্ভব হবে না। এখন খালি দেখার বিষয় টালমাটাল পাকিস্তানে কতটা ভারসাম্য রক্ষা করতে চলতে পারে শরিফ-সরকার। শান্তনু মজুমদার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগেরশিক্ষক।

গুজবের মনস্তত্ত্ব ও সমাজতত্ত্ব

গুজব এক অতি অদ্ভুত মজাদার, মুখরোচক ও শ্রুতিমধুর জিনিস। তবে গুজবের দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক তাৎপর্যও রয়েছে। গুজবের দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো সম্পর্কে যদি কেউ জানতে চান, তাঁকে আমি অনুরোধ করব দুটি বই পড়তে। একটি গর্ডন অলপোর্ট এবং লিও পোস্টম্যানের দ্য সাইকোলজি অব রিউমার (নিউইয়র্ক ১৯৪৭) এবং অন্যটি মুলেন গোয়েথাল্স ও জর্জ গোয়েথাল্স সম্পাদিত থিওরিজ অব গ্রুপবিহেভিয়ার (স্প্রিংগার-ফার্লাক, ১৯৪৭)। এই বই দুটি থেকে যা জানতে পেরেছি তা হলো গুজবের জন্য ডিএনএ দায়ী। গুজবপসারিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, দোষ যদি দিতেই হয় তাহলে তাঁর ডিএনএকেই দিতে হয়। যেসব জাতির গুজবে পরম আস্থা এবং গুজবে অভ্যস্ত, তাদের জিন বা বংশগতির নিয়ন্ত্রক উপাদান খুঁজে দেখতে হবে কোন্ প্রজাতি থেকে তাদের উৎপত্তি। কোনো জাতির যৌথ আচরণ নিয়ে গবেষণা করতে হলে তার চরিত্রের আদি নিয়ন্ত্রক উপাদানের সন্ধান করা প্রয়োজন। পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠী একই বৈশিষ্ট্য পায়নি। যেমন মার্কিনরা যদি বানরের বৈশিষ্ট্য বেশি পেয়ে থাকে, তো ব্রিটিশরা পেয়েছে গরিলার স্বভাব। হয়তো ফরাসিরা শিম্পাঞ্জির স্বভাবের উত্তরাধিকারী। ওসব বইতে নেই, তবে অনুমান করি, বাঙালি পেয়েছে উল্লুকের স্বভাব। বাঙালির জীবকোষের সংকেত বিশ্লেষণ করলে, তার ডিএনএ পরীক্ষা করলে দেখা যাবে তার পূর্বপুরুষ ছিল খাঁটি উল্লুক। কোনো জাতির সব মানুষই কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। কলাম লেখক ও কেরানি, ব্যবসায়ী, পুলিশ ও পোশাকমালিক, রাজনীতিক ও রঙের মিস্ত্রি, সাংবাদিক ও সাংসদ, আমলা ও আমের আড়তদার—সবার মধ্যে বাইরে যত পার্থক্যই থাকুক, কোনো একটি মৌলিক জায়গায় তারা সবাই এক। তাদের চিন্তা-চেতনা, স্বভাব-চরিত্র ও ধর্মে-কর্মে একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকেই। কোনো জাতির সবচেয়ে মেধাবী মানুষটি এবং সবচেয়ে নির্বোধের মধ্যেও একটি মিল থাকে। গুজব নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন তাঁরা প্রথমেই জনগোষ্ঠীর সমাজতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন। কোনো কোনো সমাজের মানুষের গুজব তৈরি করে এবং গুজব প্রচার করে অপার আনন্দ। গুজব উপভোগ করার আনন্দ আরও বেশি। যে সমাজে সাধুসন্ত ও পীর-ফকিরের প্রাধান্য, সেখানে গুজব যে অতি সহজেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে, তাতে সন্দেহ কি? মওলানা ভাসানী নৌকা না পেলে যমুনা নদীর ওপর দিয়ে হেঁটে এপার থেকে ওপার যেতে পারতেন—এ কথা বিশ্বাস করার মতো মানুষ বাংলার মাটিতে বিরল নয়। শেরেবাংলা ফজলুল হক একবারে ৮০টি ফজলি আম খেতে পারতেন—এ কথা উচ্চারিত হয়েছে উচ্চশিক্ষিত বাঙালির মুখ থেকেই। ৮০টি ফজলি আমের ওজন ৬০ কেজির কম নয়। যেহেতু তিনি বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বড় নেতা, সুতরাং দেড় মণ আম ধারণ করার মতো পাকস্থলী তাঁর না থেকেই পারে না। তবে অতিরঞ্জন আর গুজব জ্ঞাতি ভাই হলেও ঠিক একই জিনিস নয়। অতিরঞ্জনের কোনো উদ্দেশ্য নাও থাকতে পারে, কিন্তু গুজব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তা ছাড়া গুজব সৃষ্টির একটি পটভূমি থাকে। যে সমাজে সত্য অনুপস্থিত এবং মিথ্যার প্রাধান্য, অথবা সত্য গোপন করার প্রবণতা খুব বেশি, সেখানে সাধারণ মানুষের গুজবই ভরসা। শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবির অপারেশনে মধ্যরাতের অন্ধকারে কতজন নিহত হয়েছেন, তার সঠিক সংখ্যা সরকারের দিক থেকে জানানো হয়নি। হেফাজতের দিক থেকেও নামধামসহ তালিকা সরবরাহ করা হয়নি। সুতরাং এক ধাক্কায় সংখ্যাটা আড়াই হাজারে পৌঁছে দেওয়া কঠিন ব্যাপার ছিল না। এবং তা অনেকের পক্ষে বিশ্বাস করা দোষেরও নয়। গুজব তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটটি তৈরি করা ছিল। ঘটনাটি দিনদুপুরে হলে গুজব রচয়িতারা সংখ্যাটা অত দূর পর্যন্ত নিতে পারতেন না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদপত্রে বলা হয়েছে, সেদিন অপারেশনে এক লাখ ৫৫ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ খরচ হয়েছে। ‘অবরোধের দিন দুপুর থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার টিয়ার শেল, ৬০ হাজার রাবার বুলেট, ১৫ হাজার শটগানের গুলি এবং ১২ হাজার সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহূত হয়। এর বাইরে পিস্তল এবং রিভলবার জাতীয় ক্ষুদ্র অস্ত্রের গুলি খরচ হয়েছে মাত্র সাড়ে ৩০০ রাউন্ড। ...অবৈধ জমায়েতকে ভয় দেখাতে এবং তাদের মনোবল ভেঙে দিতে মূলত এই অপারেশনে হ্যান্ড গ্রেনেড এবং রাবার বুলেটের ব্যবহার ছিল সবচেয়ে বেশি। রাত ২টা ৩১ মিনিটে মূল অপারেশন শুরু হলেও রাত ১০টার পর থেকেই মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তিন দিক থেকে ধীরে ধীরে শাপলা চত্বরের দিকে এগুতে থাকে। পুলিশের পক্ষ থেকে ওই অভিযানের নাম দেওয়া হয় “অপারেশন সিকিউরড শাপলা”। র‌্যাবের সাংকেতিক নাম ছিল “অপারেশন ফ্লাশ আউট”। অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ওই অপারেশনের নাম দেয় “অপারেশন ক্যাপচার শাপলা”।’ [যুগান্তর, ১২ মে] যে অভিযানে সাত হাজার ৫৮৮ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অংশ নেন এবং দেড় লাখের বেশি গোলাবারুদ ব্যবহূত হয়, সেখানে নিহতের ও আহতের সংখ্যা নিয়ে গুজব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বরং গুজব প্রচারিত না হলেই ধারণা করা যেত যে বাঙালি তার সৃষ্টিশীল প্রতিভা হারিয়েছে। তার কল্পনাশক্তিতে দেখা দিয়েছে সাংঘাতিক ঘাটতি। আমার সঙ্গে তিন পক্ষের আত্মনিয়োজিত মুখপাত্ররা একমত হবেন না, তা সত্ত্বেও বলব, শাপলা চত্বর নাটকে একই সঙ্গে ভুল করেছে তিন পক্ষ: হেফাজত, মহাজোট সরকার এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট। ওই চত্বর থেকে সবচেয়ে সুবিধা নিতে চেয়েছিল যারা, সেই জামায়াতে ইসলামীর লাভও হয়নি লোকসানও হয়নি। তিন পক্ষের ভুলের যোগফল শাপলা চত্বর নাটক। সেই ভুলের মাশুল হেফাজত, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে আলাদা আলাদাভাবে দিতে হবে ভবিষ্যতে বহুদিন। পরাজয়ের পরিণতি তিন পক্ষকেই ভোগ করতে হবে। হেফাজতের নেতারা সেদিন যে বোকামি ও গোঁয়ার্তুমির পরিচয় দিয়েছেন, তেমনটি দেড় হাজার বছরের মুসলমানদের ইতিহাসে দু-তিনবারের বেশি হতে দেখা যায়নি। যে গোত্রের নিজের মুরোদ মাপার যোগ্যতা নেই এবং নিজের ভুল বোঝার ক্ষমতা নেই, তাদের বিপর্যয় বিধাতাও রোধ করতে পারেন না। সমাজে আলেমদের শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। সেই জিনিসটি তাঁরা স্রেফ নিজেদের হঠকারিতার কারণে খোয়ালেন। হেফাজতি অবরোধ ও মহাসমাবেশের দুই দিন আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পাদক ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে যে বক্তব্য দেন, তা ছিল যুক্তিপূর্ণ ও সমঝোতামূলক। সে বক্তব্যের হেফাজত নেতারা মূল্য দিলেন না। তাঁর মূল্যায়ন করলেন না। বরং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরদিন তা প্রত্যাখ্যান করে তাঁরা বক্তব্য দেন। সে বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ অবিবেচনাপ্রসূত ও হঠকারী। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে মর্যাদা দিলে এই অঘটন ঘটত না। তাতে হেফাজতও বাঁচত, সরকারও বাঁচত এবং বাঁচতেন তাঁরা, যাঁরা ওই চত্বরে প্রাণ দিয়েছেন। বিএনপির নেতৃত্বের মেধা প্রচুর, কিন্তু তাঁদের স্মৃতিশক্তি খুব কম। তাঁরা জলিল সাহেবের ‘ট্রাম্পকার্ড’ নাটক থেকে শিক্ষা নেননি। তাঁরা হেফাজত থেকে অতি বোকামিপূর্ণভাবে ফায়দা নিতে চেয়েছিলেন। ওভাবে ফায়দা নিতে চাওয়াটা একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনের নেতৃত্বের চরম দেউলিয়াত্বের প্রকাশ। সে জন্য তাৎক্ষণিক খেসারতটা দিতে হলো তাকেই। রাষ্ট্রে যে যা-ই করুক, ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব সরকারের। আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী জোটের নেতারা সুবুদ্ধি ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেননি। তা দিলে সংঘাত হতো না। প্রাণহানি ঘটত না। শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হতো সমাবেশ এবং বিএনপিও একটি নীরব শিক্ষা পেত। মাওলানা শফী সাহেবকে মঞ্চে ভূমিকা পালন করতে দেওয়া উচিত ছিল। দল থেকে ছয়টা পর্যন্ত সময় বেঁধে না দিয়ে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে রাত আটটা-নয়টা পর্যন্ত একটি সময় বেঁধে দিতে পারতেন। সে আদেশ অমান্য করলে রাত অতটা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সরানোর অভিযান শুরু করবে, তা টেলিভিশনে ঘোষণা করা যেত। দেশবাসীর কাছে সরকার স্বচ্ছ থাকত। সেদিন আমি বিকেল চারটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত আওয়ামী লীগপন্থী একটি টিভি চ্যানেলের সামনে বসা ছিলাম। এ যুগে কোনো কিছু খুব বেশি গোপন করা সম্ভব নয়। সন্ধ্যার আগে দেখলাম, বিজয়নগর ও নয়াপল্টন এলাকায় জিয়া, খালেদা ও তারেকের ছবিসংবলিত ডিজিটাল ব্যানারগুলো স্তূপ করে পোড়ানো হচ্ছে। প্লাস্টিকে ও কাঠের ফ্রেমে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। যারা আগুন দিচ্ছে, তারা অনেকেই দীর্ঘ কুর্তা পরা ও মাথায় তাদের টুপি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা কাছেই দাঁড়িয়ে তা উপভোগ করছেন। ওসব আগুনের খেলা যে হেফাজতের লোকরা করছে—তা আওয়ামী লীগের অবিচল ভোটদাতাও বিশ্বাস করবেন না। সব দোষ হেফাজতের লোকের ঘাড়ে চাপানো হবে মারাত্মক ভুল। নীতিনির্ধারকেরা আর যে ভুলটি করেছেন তা হলো, হেফাজতকারীদের কান ধরে ও হাত উঁচু করে তাড়ানো। ওই সমাবেশে যাঁরা এসেছিলেন জেহাদি জোশ নিয়ে তাঁরাই শুধু হেফাজতের সমর্থক নন। সারা দেশে ঘরে ঘরে বসে ছিলেন আরও বেশি হেফাজত-সমর্থক মানুষ। এখন টেলিভিশন প্রত্যন্ত গ্রামেও আছে। বড় বড় গাছ পাঁচ মিনিটে কাটা যায় না। হেফাজতিরা আর যা-ই আনুক, নিশ্চয়ই করাত নিয়ে আসেনি। তাই বলেছি, বাঙালির গত ১০০ বছরের ইতিহাসে একটি ঘটনা থেকে সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হলো। গুজব তৈরি হয় সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে। শাপলা চত্বরে মানুষ মারা গেছে বলে মৃতের সংখ্যা নিয়ে গুজববাজেরা গুজব রটাচ্ছে। অন্যদিকে গুজবের কারণেও বাংলাদেশে মানুষ মারা যায় কুড়ি কুড়ি। আজ বাংলার মানুষ চরম বিশ্বাসী। যে যা শোনে তা-ই বিশ্বাস করে। যদি কোনো সূত্র থেকে রটিয়ে দেওয়া হয় যে মঙ্গল গ্রহ থেকে ভালুকের মতো দেখতে বিয়াল্লিশটি প্রাণী গত অমাবস্যার রাতে ভাওয়াল গড়ে নেমে এসেছিল। এসেই শালবনের গাছের মধ্যে মিশে যায়। মানুষ তা বিশ্বাস করবে। প্রশ্ন করবে না, কালো প্রাণীগুলো এল অমাবস্যার অন্ধকারে, কেমন করে তা দেখা গেল? একটুও ভিন্নমত দিয়ে কোনো টক শো থেকে যে সন্দেহ পোষণ করা হবে, গুনে দেখা যেহেতু অন্ধকারে সম্ভব হয়নি, তাই ৪২টি নাও হতে পারে, ৩২টি হওয়া সম্ভব, তাও নয়। জাতির চিন্তাশক্তি ও বিচার-বিবেচনা আজ এই পর্যায়ে এসেছে। এক রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পরেই তাঁর মুখ দেখা গেল চাঁদে। ৭০টি বছর চাঁদমামা ওই মুখ তার বুকে ধারণ করল না। তার বুকজুড়ে দেখা গেল ওই মুখ, যেদিন তার ফাঁসির হুকুম হলো। অর্থাৎ চাঁদও দুঃখে কাতর! ওই গুজব (অথবা অতি খাঁটি সত্য) যারা প্রচার করেছে, তাদের প্রতিভার প্রশংসা করি। কী মোক্ষম অস্ত্র! এক গুজবে ফাঁসির আগেই ৮০ জন শহীদ। কিন্তু কয়েকটি দিন ওই গুজবকে কেন্দ্র করে (অবশ্য নিন্দা করেই) টক শোতে যে তুমুল বিতর্ক হয়, তা স্কুল ছাত্রছাত্রীদের বিতর্ক প্রতিযোগিতাগুলোকে হার মানায়। কোনো দরকার ছিল কি ওই প্রসঙ্গে অত কথা বলার? যে সমাজে উঁচু চিন্তা ও গঠনমূলক কাজের মূল্য নেই, যেখানে সত্যকে মিথ্যা দিয়ে আড়াল করার উপকারিতা অশেষ, যেখানে গুজব খুবই ফলপ্রসূ এবং গুজববাজেরা অতি সফল; সেখানে সত্য নয়, গুজবই গুরুত্ব পাবে। যে-সমাজে গুজব ও মিথ্যা প্রাধান্য পায় সে-সমাজের মুখ অন্ধকারের দিকে—আলোর দিকে নয়। সবার আগে দরকার সমাজ পরিবর্তনের সাধনা করা। পশ্চাৎপদ চিন্তা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রতিহত করার শ্রেষ্ঠ উপায় যুক্তিবাদিতা ও প্রগতিশীল ধ্যানধারণার প্রসার ঘটানো। যারা পেছনে পড়ে রয়েছে অজ্ঞতার অন্ধকারে, তাদের স্নেহ-মমতা দিয়ে একটু সামনে নিয়ে আসা। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে, মানুষকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে সমাজকে একচুলও প্রগতির দিকে নেওয়া সম্ভব নয়।সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামলেখক।

ঘূর্ণিঝড় মহাসেন

ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের এখন পর্যন্ত যে গতিপ্রকৃতি জানা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের উপকূল ভাগে আঘাত হানার আশঙ্কাই বেশি। মাঝারি মাত্রার ঘূর্ণিঝড়টি শক্তি অর্জন করে যেমন ধ্বংসাত্মক ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তেমনি দুর্বল হয়ে যাওয়া বা গতিপথও পরিবর্তন করতে পারে। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় হচ্ছে, এর গতিপ্রকৃতির দিকে গভীর মনোযোগ রাখা এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সব প্রস্তুতি রাখা। ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। অতীতে এ দেশটি এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহ শিকার হয়েছে। ব্যাপক প্রাণহানিসহ ধ্বসংসযজ্ঞ ও সম্পদহানির ঘটনা ঘটেছে। ’৭০ ও ’৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় দুটি শুধু এ অঞ্চল নয়, প্রাণহানি ও সম্পদ ক্ষয়ের দিক দিয়ে বৈশ্বিকভাবেও শোচনীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত। ২০০৭ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতের দুই বছরের মাথায় ২০০৯ সালে আঘাত হেনেছিল আইলা। এই দুটি ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত উপকূলীয় অঞ্চল ও সেখানকার অনেক মানুষকে এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।  প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের হাত নেই। ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের গতিপ্রকৃতিও হয়তো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। তবে প্রয়োজনীয় ও যথাযথ আগাম প্রস্তুতি এ ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে যেসব মানুষ বসবাস করে, তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রে যেসব জেলে মাছ ধরতে যান, তাঁদের জন্য সতর্কতা ও নিরাপদে ফিরে আসার জন্য আগাম ঘোষণা, বন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সম্পদ রক্ষার যথাযথ উদ্যোগ নিলে জান ও মাল—দুই ক্ষেত্রেই ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এ ছাড়া এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর চিকিৎসাসেবা বা খাদ্য ও পানীয় জোগান দেওয়াসহ যেসব জরুরি করণীয় থাকে, সে ব্যাপারে আগাম প্রস্তুতি থাকলে সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার অভিযান ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় নেমে পড়া যায়। প্রয়োজনে উপকূলীয় এলাকার লোকজনকে যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া যায়, সে জন্যও প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দক্ষতার সুনাম রয়েছে। আশা করব, এ ক্ষেত্রেও তা বজায় থাকবে।

পাকিস্তানে গণতন্ত্রের জয়

পাকিস্তানে ১১ মের নির্বাচনটি ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই প্রথম দেশটিতে কোনো নির্বাচিত সরকার মেয়াদ শেষ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পেরেছে। এবারই পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এমনকি নির্বাচনের পর কোনো দল ‘মানি না মানব না’ বলে শোরগোল না তুলে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে।  নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগ যে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতাসীন হতে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। এতে প্রমাণিত হয়েছে সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতি দিতে না পারলে এবং দুর্নীতি কমাতে না পারলে কোনো দলের পক্ষেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়াত বেনজির ভুট্টোর প্রতি জনগণের আবেগকে পুঁজি করে পিপিপি ক্ষমতায় এলেও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। জাতি-গোষ্ঠীগত সহিংসতা ও অব্যাহত তালেবানি সন্ত্রাসের পাশাপাশি বিদ্যুতের তীব্র সংকট পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করলেও পিপিপি সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এমনকি মেয়াদের শেষ দিকে এসে সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের সঙ্গে বিরোধে জড়ানো ছিল তার রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রকাশ। নির্বাচনের সময় দলটির নেতৃত্বের সংকট আরও প্রকট হয়ে ধরা পড়ে। নির্বাচনে সেই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে কিছুটা ডানের দিকে ঝুঁকে থাকা নওয়াজের মুসলিম লিগ। এই বিজয়ের পেছনে দল হিসেবে মুসলিম লিগের কৃতিত্বের চেয়েও ক্ষমতাসীন পিপিপির ব্যর্থতাই নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে, যদিও বৃহত্তম প্রদেশ পাঞ্জাবে দলটির শক্ত ভিত বরাবরই ছিল। এই নির্বাচনের তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। দলটি নতুন ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। দ্বিদলীয় ব্যবস্থার বাইরে এসে তাঁদের এই সমর্থন পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনেরই পূর্বাভাস। বিজয়ী নওয়াজ শরিফের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তিনি পুরোনো পদ্ধতিই অনুসরণ করবেন, না অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্নীতিমুক্ত এবং দেশ পরিচালনায় দক্ষ একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। এর আগে দুই দফায় দুর্নীতি ও অযোগ্যতার অভিযোগে তাঁর সরকারকে অকালে বিদায় নিতে হয়েছে। তাঁর দল কেন্দ্র ও পাঞ্জাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বটে, কিন্তু বাকি তিনটি প্রদেশেই বিরোধী দলের আসনে বসতে হবে। পাকিস্তানে কেন্দ্রের একাধিপত্য কেবল সুশাসন ও গণতন্ত্রের অন্তরায় নয়, বিচ্ছিন্নতাবাদও উসকে দেয়। নওয়াজ শরিফের সামনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিবেশী ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন। বিশেষ করে ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর কীভাবে তালেবান জঙ্গিদের মোকাবিলা করা হবে, অনেকটা তার ওপরই পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতি নির্ভর করছে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপটে আমরা নওয়াজ শরিফের বিজয়কে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে পাকিস্তানের এই নির্বাচনকে আমরা ইতিহাসের অর্ধেক সময় ধরে সেনাশাসনে পীড়িত দেশটির গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবেও বিবেচনা করি।

করাচির পুঁজিবাজারে সর্বকালের তেজিভাব

নওয়াজ শরিফের বিজয়ের পর করাচির পুঁজিবাজারে গতকাল সর্বকালের সর্বোচ্চ তেজিভাব দেখা গেছে। দলটির বাণিজ্যবান্ধব কর্মসূচি দেশের অর্থনীতিকে ফের চাঙা করতে পারে, এমন আশার সৃষ্টি হয়েছে।  শীর্ষ ১০০ শেয়ারের মূল্যসূচক রাতারাতি ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ২৩২ পয়েন্ট। মূল্যসূচক এবারই প্রথম ২০ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করল।

নওয়াজের সামনে যতচ্যালেঞ্জ

১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো নওয়াজ শরিফ ১৪ বছর পর আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছন। দেশটির ইতিহাসে নওয়াজই প্রথম ব্যক্তি, যিনি তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর নওয়াজকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কারণ, লাগাতার বিদ্যুৎ-বিভ্রাট থেকে শুরু করে তালেবান তৎপরতাসহ নানা সমস্যা সামনে নিয়ে ক্ষমতায় ফিরছেন তিনি। এ ছাড়া অর্থনৈতিক দুরবস্থা তো আছেই। নওয়াজ বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধে সহায়তা বন্ধ করবেন। পাশাপাশি আল-কায়েদা ও তালেবানের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইও অব্যাহত রাখবেন। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সব দলকে নিয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে ঝামেলা এড়াতে আমরা কাউকেই কখনো আমাদের মাটি ব্যবহার করতে দেব না।’ নির্বাচনে জয়ের আভাস পেয়ে শনিবার গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নওয়াজ বলেছিলেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে নয়াদিল্লির সঙ্গে বিদ্যমান বিবাদ নিরসনে কঠোর পরিশ্রম করেছেন তিনি। নওয়াজ বলেন, ‘আমরা যেখানে শেষ করেছি, সেখান থেকেই শুরু করব। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাশ্মীরসহ দুই দেশের মধ্যে বিবদমান অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধানে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।’ তিনি বলেন, তাঁর সরকার ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে এবং তাঁর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। শাসনক্ষমতায় এসব চ্যালেঞ্জ ছাড়াও নওয়াজের সামনে রয়েছে বেলুচিস্তান সংকটসহ দেশটির বিপর্যস্ত জ্বালানি খাত। তা ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে জেঁকে বসেছে দুর্নীতি। তাই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং দুর্বল অর্থনীতিকে চাঙা করতে একগাদা সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিতে হবে নওয়াজকে। নিতে হতে পারে সরকারের ব্যয় কাটছাঁটের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপও। নওয়াজ গতকাল সোমবার তাঁর বাসভবনে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সেই ইঙ্গিতই দিলেন। তিনি বলেন, তাঁর সরকারের প্রধান কাজই হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। তাঁর আমলেই পাকিস্তান হবে এশীয় বাঘ। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলার ব্যাপারে নওয়াজ বলেন, ড্রোন হামলা বন্ধে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানোর চেষ্টা করবেন। তাঁর সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ওপর জোর দেবে। তা ছাড়া আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারেও তাঁর সরকার সহায়তা করবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

সরকার গঠনে ব্যস্ত নওয়াজ

নির্বাচনে জয়লাভের পর পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) নেতা নওয়াজ শরিফ সরকার গঠন নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। এ ছাড়া মন্ত্রিসভায় কারা থাকবেন, তা নিয়েও কাজ শুরু করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের বেসরকারি ফল বলছে, পিএমএল-এন সহজেই জয়লাভ করছে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না-ও পেতে পারে দলটি। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিশ্চয়তা পাকাপাকি করতে নওয়াজ বিশেষ করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন। নওয়াজ শরিফ এর আগে ১৯৯৯ সালে সেনাবাহিনীর প্রধান পারভেজ মোশাররফের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নওয়াজ শরিফের সরকার সদ্য বিদায়ী পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) সরকারের চেয়ে অনেকটা শক্তিশালী হবে। কারণ, স্বতন্ত্র বা ছোট দু-একটি দলের নির্বাচিতদের সমর্থন নিয়েও যদি নওয়াজকে সরকার গঠন করতে হয়, তবে তার পরও তাঁর দল পিএমএল-এন জাতীয় পরিষদে নারী ও অমুসলিম সংখ্যালঘু ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত  ৭০টি আসনের মধ্যে বেশিরভাগই  পাবে। এদিকে নওয়াজ শরিফ তাঁর অর্থমন্ত্রী কে হবেন, তা এরই মধ্যে ঠিক করে ফেলেছেন। তিনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে এই পদে এর আগে দুবার দায়িত্ব পালনকারী ইশাক দারকে বেছে নিয়েছেন। মূলত নওয়াজ শরিফের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা।পিএমএল-এনের মুখপাত্র সিদ্দিকুল হক গতকাল সোমবার বলেন, তাঁদের দল জাতীয় পর্যায়ে ‘সুবিধাজনক সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ এবং পাঞ্জাব প্রদেশে ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ অর্জন করেছে। আর নওয়াজ শরিফের দ্বিতীয় মেয়াদে এবং ২০০৮ সালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ইশাক দার নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। ‘সমান অংশীদার হিসেবে কাজ করতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত’: মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ইসলামাবাদের সঙ্গে ‘সমান অংশীদার হিসেবে’ কাজ করতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত রয়েছে। পাকিস্তানে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালাবদলকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।‘পাকিস্তানের উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রকে বিবেচনায় নিতে হবে’: এদিকে নওয়াজ শরিফ বলেছেন, তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের ভঙ্গুর সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে আগ্রহী। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, পাকিস্তানে মার্কিন চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, ওয়াশিংটনকে তা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। লাহোরে নিজ বাড়ির বাইরে গতকাল বিদেশি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন নওয়াজ। মনমোহন সিং অংশ নিলে‘খুব খুশি’ হবেন নওয়াজ: পাকিস্তানে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে অনানুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নওয়াজ শরিফ। নওয়াজ শরিফ বলেছেন, দাওয়াত গ্রহণ করে মনমোহন যদি তাতে অংশ নেন, তবে তিনি ‘খুব খুশি’ হবেন। লাহোরে নিজ বাড়ির বাইরে গতকাল বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথন-কালে ভারতীয় একজন সাংবাদিকের জবাবে এ কথা জানিয়েছেন তিনি।

বিমানবিলাস বাদ

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুক্তরাজ্য সফরের সময় উড়োজাহাজে তাঁর ঘুমানোর জন্য বিলাসবহুল আয়োজন করা হয়েছিল। এ খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন নেতানিয়াহু। এ সমালোচনার পর তিনি এ রকম বিলাস বর্জনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। ইসরায়েলের চ্যানেল টেন টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, নেতানিয়াহুর ওই অপ্রয়োজনীয় বিলাসের কারণে জনগণের এক লাখ ২৭ হাজার মার্কিন ডলার অর্থ ব্যয় হয়েছে।

‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ এমপিরা

আফগানিস্তানের অর্থমন্ত্রী ওমর জাখিলওয়াল গতকাল সোমবার সে দেশের পার্লামেন্টে বেশ কয়েকজন দুর্নীতিগ্রস্ত এমপির নাম তুলে ধরেছেন। এই এমপিরা অ্যালকোহল, জ্বালানিসংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ও গাড়ি চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত বলে তিনি অভিযোগ করেন। পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে ওমর দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে যাঁদের নাম উল্লেখ করেন, তাঁদের মধ্যে নাইম লালাই, জহির কাদের ও সামিমুল্লাহ অন্যতম।

ক্ষুধা মোকাবিলায় পোকামাকড়!

ক্ষুধা মোকাবিলায় পোকামাকড় খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে জাতিসংঘ। সাধারণ খাদ্যদ্রব্যের ওপর চাপ কমাতে সংস্থাটি বিশ্ববাসীকে বেশি বেশি পোকামাকড় খাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, পোকামাকড়ে পুষ্টিমান যেমন রয়েছে, তেমনি তা পরিবেশের দূষণ রোধেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইতিমধ্যে বিশ্বের অন্তত ২০০ কোটি লোক সহায়ক খাদ্য হিসেবে পোকামাকড় ভক্ষণ করছে। ভিমরুল, কাঁচপোকাসহ অন্যান্য পোকামাকড় বর্তমানে মানুষের খাদ্যের উপাদান ও জীবিকা হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। পোকামাকড় চাষ করার মাধ্যমে খাদ্যের চাহিদা ও নিরাপত্তা মেটানো সম্ভব। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সর্বত্রই পোকামাকড় পাওয়া যায় এবং দ্রুতই এরা বংশ বৃদ্ধি করে। তাদের জন্মহার ও খাদ্য রূপান্তরের হার অনেক বেশি। পরিবেশগত ক্ষতির মাত্রাও কম। কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, পোকামাকড়ে উচ্চমাত্রার প্রোটিনসহ অন্যান্য পুষ্টিগুণ যেমন চর্বি ও খনিজ উপাদান রয়েছে। তাঁরা বলেন, অপুষ্টিতে ভুগছে এমন শিশুদের জন্য পোকামাকড় হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সহায়ক খাবার। এফএও বলছে, সাধারণ খাবারকে ভোজ্য মাংসের মতো পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবারে রূপান্তরের ক্ষেত্রে পোকামাকড়ের ব্যবহার ‘খুবই কার্যকর’। যেমন: একই পরিমাণ প্রোটিন উৎপাদনের জন্য গবাদিপশুর চেয়ে ১২ গুণেরও কম ঝিঁঝিপোকার প্রয়োজন হয়। তা ছাড়া বেশির ভাগ পোকামাকড়ের ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা কম। যেমন: শূকরের মতো প্রচলিত প্রাণীগুলোর চেয়ে পোকামাকড় থেকে অনেক কম অ্যামোনিয়া উদ্গীরণ হয়।

অর্থবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তার দুর্নীতি তদন্ত করছে চীন

চীনের অর্থনীতিবিষয়ক একজন জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে গতকাল সোমবার এ কথা জানানো হয়েছে। লিউ তিয়েনান নামের ওই কর্মকর্তা চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের (এনডিআরসি) উপপ্রধান পদে রয়েছেন। লিউ ‘মারাত্মক শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ ঘটনায় সন্দেহভাজন বলে জানানো হয়েছে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার খবরে। লিউয়ের বিরুদ্ধে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে দুর্নীতির বেশ কিছু অভিযোগ ওঠে। সে সময় একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক তাঁর বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ তোলেন। দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শুরু করা উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে লিউয়ের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিনহুয়ার খবরে বলা হয়, ‘মারাত্মক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের উপপ্রধান লিউ তিয়েনানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা হচ্ছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) শৃঙ্খলা পরিদর্শনবিষয়ক কেন্দ্রীয় কমিশন গত রোববার এ কথা জানিয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবসের শোভাযাত্রায় গুলি আহত ১৯

যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের নিউ অরলিয়েন্স শহরে গত রোববার মা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক শোভাযাত্রায় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই শিশুসহ ১৯ জন আহত হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে খুঁজছে পুলিশ। স্থানীয় পুলিশের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, রোববার স্থানীয় সময় বেলা পৌনে দুইটার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০ জন পুরুষ, সাতজন নারী ও দুজন শিশু। হামলার সময় শোভাযাত্রাটি নর্থ ভিলার স্ট্রিট দিয়ে যাচ্ছিল। হামলাকারীরা শোভাযাত্রার ভেতরেই ছিল, নাকি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে শোভাযাত্রা দেখছিল—এ ব্যাপারে পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে এ হামলার সঙ্গে উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কোনো যোগসাজশ নেই বলে জানিয়েছে মার্কিন তদন্ত বিভাগ। নিউ অরলিয়েন্স এফবিআইয়ের মুখপাত্র মেরি বেথ বলেন, ‘আমরা আমাদের গোয়েন্দা সূত্রে জানতে পেরেছি, এটি কোনো সন্ত্রাসী হামলা নয়।’  পুলিশ কর্মকর্তা রোনাল সারপাসের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, ঘটনার পর তিনজনকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখেছে পুলিশ। তবে কাউকে আটক করা যায়নি। ওই তিনজনকেই এখন খোঁজা হচ্ছে। নিউ অরলিয়েন্সের মেয়র মিচ ল্যান্ড্রিউ এ ঘটনাকে একটি ‘নির্মম হত্যাকাণ্ড’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, সহিংসতার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে শহরটিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বোস্টন ম্যারাথনে সন্ত্রাসী হামলার এক মাসের কম সময়ের মধ্যে এ হামলার ঘটনা ঘটল। বোস্টন হামলায় তিনজন নিহত ও আড়াই শতাধিক লোক নিহত হয়।  এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নিউ অরলিয়েন্সের ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার এলাকার একটি নাইট ক্লাবের বাইরে এক অনুষ্ঠানে গুলিবর্ষণের ঘটনায় চারজন আহত হয়। এ ছাড়া গত ডিসেম্বরে কানেটিকাটে একটি স্কুলে বন্দুকধারীদের গুলিতে ২০ শিশুসহ ২৮ জন নিহত হয়।