Friday, May 10, 2013

নারীদের সহায়তার পথ ধরতে হবে by সাজিয়া ওমর

সমাজে অতিদরিদ্রদের অবস্থা এমনিতেই নাজুক। এই অতিদরিদ্রদের মধ্যে মেয়েদের অবস্থাটি যে আরও নাজুক, তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে জীবনের তিনটি পর্যায় আছে, যখন মেয়েরা হয়ে পড়ে একেবারেই ক্ষমতাহীন; বয়ঃসন্ধি, বিবাহ প্রারম্ভে ও বিধবা অবস্থায়। বয়ঃসন্ধির সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতিদরিদ্র মেয়েরা কোনো দক্ষতা অর্জন বা বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না। তারা এই বিশ্বাসে বেড়ে ওঠে যে তারা হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক এবং বিয়ে হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে গৃহস্থালি কাজকর্ম। বিয়েতে যৌতুক দিতে হবে—এই চাপ বাড়িতে মেয়েদের দুর্বল অবস্থানে ফেলে দেয়। অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের আসন্ন যৌতুকের এই চাপ অনুভব করানো হয়, যাতে খাদ্যসহ গৃহস্থালির যে সামান্য সম্পদ রয়েছে, তাতে ভাগ বসানোর ব্যাপারে তারা সংযমী হয়। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবাকে যৌতুকের চাপ থেকে মুক্তি দিতে তরুণীরা আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। বয়সভেদে যৌতুকেরও হেরফের হয়। মেয়ের বয়স যত কম, যৌতুকের চাহিদাও তত কম। আর পুরুষ যত বেশি বয়স্ক বা অক্ষম, তার যৌতুকের চাহিদাও তত কম। অল্প বয়স্ক কনেরা শ্বশুরবাড়িতে নতুন একগুচ্ছ পিতৃতান্ত্রিক ঝুঁকির সামনে অরক্ষিত থাকে। বিয়ের পর তারা তাদের আচার-ব্যবহার পরিবর্তন করে তাদের স্বামীদের খুশি করার কৌশল রপ্ত করে। অল্প বয়সী এই বধূদের কম খাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাংলাদেশ সরকার ও যুক্তরাজ্যের একটি যৌথ বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন অল্প বয়স্ক বধূর চারজন বলেছে, স্বামীর খাদ্য গ্রহণের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তারা তা-ই খায়। তিনজন বলেছে, তারা তাদের স্বামীর সঙ্গে খায় এবং তারা যখন গর্ভবতী হয়, তখন তাদের স্বামীরা কখনো নিজের খাবার থেকে স্ত্রীদের দেওয়ার প্রস্তাব করে। তারা প্রত্যেকেই বলেছে, সব সময়ই তারা সেই খাবার ফিরিয়ে দিয়েছে। কারণ, তারা ভালো স্ত্রী হতে চায়। তাদের ভালো স্ত্রী হওয়া দরকার, যাতে তারা কখনো পরিত্যক্ত বা বিতাড়িত না হয়। কারণ, তাদের বাবা-মা আবার যৌতুক দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন না। যত দিন তাদের সন্তান বড় না হয়, তত দিন পর্যন্ত তারা অধিকারহীন এক নাজুক অবস্থার মধ্যেই থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই যৌতুকের অর্থ বা সম্পদ পুরোটা একবারে দেওয়া হলেও তা বর বা তার পরিবারের কাছে যথেষ্ট বলে মনে হয় না। ফলে মেয়েদের বাবা বা পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা আদায়ের চেষ্টা হিসেবে মেয়েটির প্রতি শুরু হয় নির্যাতন ও সহিংসতা। এত কিছুর পরও আরও যৌতুক না মিললে মেয়েকে বাপের বাড়ি পাঠানো বা মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মেয়েটি তার শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার এই সময়টিতে হয় ছোট ছোট সন্তানের মা অথবা সন্তানসম্ভবা। সে তার শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয় যৌতুকের সম্পত্তিতে কোনো ধরনের অধিকার ছাড়া, সন্তানের বাবা থেকে তার প্রতিপালনের কোনো বরাদ্দ ছাড়া এবং কোনো ধরনের দক্ষতা ছাড়া। যদি মেয়েটিকে ফিরে যেতে হয় অর্থাৎ মা-বাবা বা ভাইয়ের কাছে, তবে তাঁরা কখনোই মেয়েটিকে হাসিমুখে গ্রহণ করেন না। কারণ, তাঁরা নিজেরাই রয়েছেন চরম অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে। তার সন্তানেরাও অনাহূত অতিথির মতো ব্যবহার পেয়ে থাকে। বোঝা হতে চায় না বলে মেয়েটিও কম খায়। সন্তানসম্ভবা হলেও কম খেয়েই তাকে বাঁচতে হয়।
একপর্যায়ে এই নারীকে কোনো না কোনো উপার্জনের পথ বেছে নিতে হয়। তাকে হয়তো প্রথমে গৃহস্থালি শ্রম, এরপর মাঠের কাজ (যেখানে সে পুরুষের অর্ধেক মজুরি পায়)। প্রায়ই গৃহস্থালি শ্রম পরিশোধিত হয় খাবার বা ভাতে, যা তাকে তার বাসায় নিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয়। এই নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুর্বল, অপুষ্টির শিকার, রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাহীন। ফলে তারা বেশি বেতনে কাজও পায় না। এই নারীদের সামান্য একটি অংশ আবার বিয়ে করতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বিয়েগুলো হয় মানসিক বা শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ বা বয়স্ক লোকদের সঙ্গে। সম্ভাব্য ফল: তারা পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হিসেবেই থাকে অথবা খুব দ্রুতই বিধবা হয়ে যায়। ক্রমবর্ধমান পিতৃতান্ত্রিক ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র সুযোগ, যদি কোনো নারীর একটি ছেলেসন্তান থাকে। যেসব নারীর ছেলেসন্তান আছে, তারা তাদের সবকিছু ব্যয় করে ছেলেটির পেছনে। কিন্তু এর পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মা যখন বয়স্ক হয়ে যায়, তখন এই ছেলেরাই তাদের দেখভাল করতে চায় না। যখন এই ছেলেরা বিয়ে করে, তখন তারা তাদের মা ও অল্প বয়স্ক ভাইবোনদের পরিত্যাগ করার জন্য তাদের স্ত্রীদের চাপে থাকে। তারা তাদের মাকে ভালোবাসলেও আর্থিক চাপের কা তা পরাজিত হয়। যেসব বেসরকারি সংস্থা ও দাতাদের অর্থায়িত প্রকল্পগুলো অতিদরিদ্রদের সাহায্য করতে চায়, তাদের সাহায্য ও  উদ্যোগগুলো স্বামীর বাড়িতে অবস্থানকারী নারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত। এটা কিছু মাত্রায় হলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। যখন কার্যক্রমগুলো নারীদের নিজেদের সম্পদ সৃষ্টির পরিস্থিতি বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়, তখন আমরা দেখি যে তাদের স্বামী ও সন্তানেরা সেই সম্পদ বিক্রি করে দেয় এবং তাদের পরিত্যাগ করে। কখনো আমরা নারীদের দেখি এমন অবস্থায়, যেখানে তারা তাদের নিজেদের জমিতে বা ব্যবসা করে কিছু উৎপাদন করলেও তা বিপণন করে স্বামী এবং আয়ের অর্থ নিজের কাছে রেখে দেয়। নারীরা বিনিয়োগ এবং নতুন সম্পদসংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং তারা যদি বাড়ি থেকে বিতাড়িত বা বিধবা হয়, তাহলে তাদের ওই সব সম্পদের ওপর কোনো অধিকার থাকে না। কার্যক্রমগুলো বাড়ির পুরুষপ্রধানদের সহায়তা দিলে লিঙ্গবৈষম্য দৃঢ়তর হয় এবং অসমতা ও নারীর নাজুকতা বাড়ে। নারীদের সরাসরি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করা গেলে সামাজিক পরিবর্তন আনা যায়।
সাজিয়া ওমর: উন্নয়নকর্মী।

উইকিলিকসে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা by সিদ্দিকুর রহমান খান

বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসায় সেক্যুলার শিক্ষাক্রম চালু এবং মাদ্রাসাগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের লাগাম টেনে ধরতে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের নানামুখী উদ্যোগের তথ্য জানা গেছে উইকিলিকসের ফাঁস করা তারবার্তায়। কওমি বিষয়ে মার্কিন সরকারের অর্থসহ নানামুখী সহায়তা, সুপারিশ, পর্যবেক্ষণ এবং রাজশাহী অঞ্চলকে ইসলামি চরমপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করে ২০০৯ সালের ৩ মার্চ ওয়াশিংটনে তারবার্তা পাঠিয়েছেন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাক্রম সংস্কার বিষয়ে মার্কিন সরকারের অর্থসাহায্যের প্রস্তাবে রাজশাহী অঞ্চলকে বিশেষ বিবেচনায় রাখার সুপারিশ করেন রাষ্ট্রদূত। মরিয়ার্টির মন্তব্য, ‘কওমি মাদ্রাসায় সন্দেহজনক উৎসের অর্থায়ন, উসকানি ও প্ররোচনামূলক শিক্ষা উপকরণ এবং মূলগত সংরক্ষণবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ প্রমাণ করে, বাংলাদেশ সরকার কওমি মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।’ ‘শিক্ষার শূন্যতা পূরণ করছে কওমি মাদ্রাসা’ উপশিরোনামে পাঠানো বার্তায় উল্লেখ করেছেন, কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ২৩ থেকে ৫৭ হাজার। এবং দারিদ্র্যপীড়িত দেশটির অনেক অভিভাবক বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়া ও টিউশন ফির আশায় সন্তানদের এসব মাদ্রাসায় পাঠান। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহীর তিনটি কওমি মাদ্রাসা পরিদর্শনকালে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা নেন দূতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তা। যুগের চাহিদার সঙ্গে সংগতিহীন দুর্বল শিক্ষাক্রম ও শিক্ষার মান নিয়ে সন্দিগ্ধ মরিয়ার্টি উল্লেখ করেন, জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার
পঞ্চম শ্রেণীর ইংরেজি বই ‘ঔপনিবেশিক যুগের তালগোল পাকানো ব্যাকরণ ও যতিচিহ্ন রীতিতে ভরপুর’। আল-কাদেরিয়া মাদ্রাসার ১২ বছর বয়সী একজন শিক্ষার্থীর দাবি, তার প্রিয় বিষয় ইংরেজি। কিন্তু একটি সাধারণ বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি ছাত্রটি। এমনকি ইংরেজিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারেনি। রাজনৈতিক কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান বিষয়ে রাষ্ট্রদূত রাজশাহীর তিনটি কওমি মাদ্রাসা সম্পর্কে ওয়াশিংটনকে জানান, ধীরে বয়ে চলা পদ্মার পারে জামিয়া ইসলামিয়া শাহ মখদুম মাদ্রাসায় সাক্ষাৎ হয় এতিম ও দরিদ্র পরিবারের ২৩২ ছাত্রের সঙ্গে। এলাকাবাসীর অনুদান এবং সংলগ্ন একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের চাঁদায় পরিচালিত হয় এ মাদ্রাসা। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদানকারী মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ দূতাবাস কর্মকর্তাকে জানান, পাঠান্তে তাঁর মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সামনে ধর্ম শিক্ষক হওয়া এবং অন্য মাদ্রাসায় চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। দ্বিতীয়টি রাজশাহী দারুল উলুম মাদ্রাসা। ৩০০ ছাত্র ছিল মাদ্রাসাটিতে, কিন্তু স্থানীয় অর্থ জোগানদাতাদের অর্থসংকটের কারণে অল্প কয়েক মাসের ব্যবধানে ছাত্রসংখ্যা ৩২-এ নেমে আসে।  তৃতীয় মাদ্রাসাটির নাম কাদেরিয়া বকসিয়া আনওয়ারুল উলুম। শিশুপার্ক-সংলগ্ন ক্যাম্পাসটিতে ছাত্রসংখ্যা ১৫০। ক্যাম্পাসে অবস্থিত একজন ইসলাম ধর্ম সাধকের মাজারের স্থানীয় কিছু ভক্ত ছাড়াও ভারত ও পাকিস্তান থেকেও সাহায্য আসে। মাসে ছয় ডলারে খাওয়া ও টিউশন ফি। মাদ্রাসাপ্রধানেরা দূতাবাস কর্মকর্তাকে জানান, অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের কওমি মাদ্রাসায় পাঠানোর আগ্রহ হারিয়েছেন। কারণ হিসেবে চাকরির সুযোগ কম বলে উল্লেখ করেন। তিনটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষই রাষ্ট্রীয় দেখভালের অধীনে যেতে এবং সরকার-নির্ধারিত শিক্ষাক্রম গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে তাঁদের আশঙ্কাও রয়েছে যে এতে করে ধর্মশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলাম ধর্ম শিক্ষাটা সংকুচিত হতে পারে। তবে রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষের সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণে বিস্ময় প্রকাশ করে কর্মকর্তার মন্তব্য, ‘অন্তত এই একটি মাদ্রাসা মার্কিন অর্থসহায়তায় সেক্যুলার কারিকুলাম চালু করতে রাজি হতে পারে।’ ২০০৯ সালের ৫ মার্চে ওয়াশিংটনে পাঠানো অপর এক তারবার্তায় রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি উল্লেখ করেন, নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ৩ মার্চ রাষ্ট্রদূতকে জানান, সরকার-নিয়ন্ত্রিত আলিয়া ও অপরাপর সেক্যুলার স্কুলের পাশাপাশি কওমিদেরও মূলধারায় যুক্ত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে কওমি নেতাদের কাছে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছেন। মার্কিন দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদল মুফতি ফজলুল হক আমিনীর ঢাকার লালবাগের কওমি মাদ্রাসায় সাক্ষাতে যান। সম্পূর্ণ আরবি উচ্চারণে অনুষ্ঠিত সভায় আমিনীর আরও চার সহযোগী উপস্থিত ছিলেন। আমিনীর সুন্দর আরবি উচ্চারণের প্রশংসা করে মরিয়ার্টি বলেন, আমিনী দূতাবাস কর্মকর্তাদের বলেছেন, সরকারের তরফ থেকে শিক্ষাক্রমের বিষয়ে তিনি অথবা তাঁর প্রতিনিধিরা কখনো প্রস্তাবই পাননি। সংবাদমাধ্যমে একীভূত শিক্ষাক্রমের কথা শুনেছেন। আমিনীর ভাষ্যে, সরকার যা কিছুই করুক, ‘ধর্মভিত্তিক কওমি শিক্ষাক্রমের বিষয়ে’ কোনো আপস নেই। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সম্পর্কে রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য, ইসলামি পণ্ডিত ও মাদ্রাসার নেতাদের সাবেক কমিউনিস্ট ও বামপন্থী নাহিদের আহ্বানের সাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা কম। মরিয়ার্টি আরও বলেন, সারা দেশে সাত-আটটি বোর্ডে বিভক্ত কওমি মাদ্রাসা বোর্ডগুলো নিজেদের মধ্যে কলহে লিপ্ত।
সিদ্দিকুর রহমান খান: সাংবাদিক।

মজুরি শ্রমিকেরন্যায্যপ্রাপ্য by মুহাম্মদ আবদুল মুনিমখান

ইসলাম শ্রমিক ও মালিকের ওপর পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় শ্রমনীতি প্রণয়ন করেছে। মালিকের প্রধান কর্তব্য হলো কর্মক্ষম, সুদক্ষ, শক্তি-সামর্থ্যবান, আমানতদার ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে কাজে নিয়োজিত করা এবং সময়, কার্যকাল ও ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করে শ্রমিককে কারখানায় নিয়োগ করা। শ্রমিকের বেতন-ভাতা যতক্ষণ পর্যন্ত স্থির করা না হবে, এবং সন্তুষ্ট মনে সে তা গ্রহণ না করবে, ততক্ষণ জোর করে বা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে কাজে নিযুক্ত করা ইসলামসম্মত নয়। ন্যূনতম মজুরি প্রত্যেক শ্রমিকের প্রয়োজন ও কর্ম অনুসারে নির্ধারিত হবে। শ্রমিককে কমপক্ষে এমন মজুরি দিতে হবে, যাতে সে এর দ্বারা তার ন্যায়ানুগ ও দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ করতে পারে। শ্রমিকের ন্যায্যপ্রাপ্য মজুরি পরিশোধের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশনা প্রদান করে বলেছেন, ‘শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও।’ (ইবনে মাজা) কাজ সম্পাদন করা মাত্রই শ্রমিককে তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক প্রদান করা মালিকের প্রাথমিক দায়িত্ব। তবে অগ্রিম বা অন্য কোনো রকম শর্ত থাকলে ভিন্ন কথা। মূলত শ্রমিক-মজুরেরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে উৎপাদনের কাজ সম্পাদন করে থাকে। তারা নিজের ও পরিবারের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের জন্য কঠিন শ্রম দেয় এবং স্বল্প মজুরিই তাদের একমাত্র অবলম্বন। তাই নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘শ্রমিকের কাজ বা কাজের মেয়াদ শেষ হলেই তার মজুরি পুরোপুরি দিতে হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)
মেহনতি শ্রমিকেরা যদি নামমাত্র মজুরি পায় বা প্রয়োজন অপেক্ষা কম পায় বা নির্দিষ্ট সময়মতো ন্যায্যপ্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তাদের দুঃখ-দুর্দশার সীমা থাকে না। এতে হতাশায় ভারাক্রান্ত হয়ে শ্রমের প্রতি তাদের বীতশ্রদ্ধা ও বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হতে পারে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘তারা (মজুর, শ্রমিক ও অধীনস্থ বেতনভোগী কর্মচারীরা) তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাআলা তাদের দায়িত্ব তোমাদের ওপর অর্পণ করেছেন। মালিকেরা যা খাবে, তা শ্রমিকদেরকেও খাওয়াবে এবং মালিকেরা যে পোশাক পরবে, তা শ্রমিকদেরকেও পরতে দেবে। যে কাজ করা তাদের পক্ষে কষ্টকর, সাধ্যাতীত, তা করার জন্য তাদেরকে কখনো বাধ্য করবে না।’ (বুখারি)
শ্রমের ব্যাপারে শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে শর্ত সাপেক্ষে লিখিত চুক্তি সম্পাদন করে নেওয়া উচিত। তাহলে শ্রমিক থেকে কাজ উসুল করে নেওয়ার পূর্ণ অধিকার মালিকের থাকবে এবং শ্রমিক মালিকের কাছে কাজের জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। এ ক্ষেত্রে কাজে কোনো রূপ শৈথিল্য, উদাসীনতা বা গাফিলতি গ্রহণযোগ্য হবে না। শ্রমিকের তত্ত্বাবধানে যেসব প্রতিষ্ঠান বা কারখানার মূল্যবান আসবাব দেওয়া হয়, তা আমানতস্বরূপ ব্যবহার করবে এবং সেই সম্পদগুলো তুচ্ছ মনে করে চুরি, অবৈধ ব্যবহার, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা অন্য কোনো ধ্বংসাত্মক পন্থায় কখনোই বিনষ্ট করা যাবে না।
কোনো শ্রমিককে এক কাজের জন্য চুক্তি করে তার সম্মতি ছাড়া অন্য কাজে জবরদস্তিমূলক নিয়োগ বা বদলি করাও জায়েজ নয়। শ্রমিকদের রক্ষণাবেক্ষণ, তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করার দায়িত্ব মালিকদের। মালিকপক্ষ তার অধীনস্থদের নিরাপত্তা, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ও দুঃখ-দুর্দশা নিরসনে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হবে, শ্রমিকদের ওপর কোনো রকম অন্যায়, অত্যাচার, দমন-নিপীড়ন বা নির্যাতন করতে পারবে না। শ্রমিক-মালিকের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি ঘটলে শ্রমিকেরা মালিক কর্তৃক শোষিত, নির্যাতিত-নিপীড়িত হলে ভয়াবহ সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। শ্রমিকদের ওপর জুলুম বা নির্যাতন করলে তার কঠোর শাস্তি রয়েছে। ইসলামের বিধান অনুসারে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা কিংবা দৈহিক ক্ষতিপূরণ প্রত্যেককেই তার ন্যায্যপ্রাপ্য কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব করে দিতে হবে। যারা শ্রমিকের পারিশ্রমিক ঠিকমতো আদায় করে না, তাদের সম্পর্কে মহানবী (সা.) সাবধানবাণী ঘোষণা করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হব। তন্মধ্যে একজন হচ্ছে, যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করে তার কাজ আদায় করে বটে, কিন্তু তার মজুরি পরিশোধ করে না।’ (বুখারি)
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে শ্রমিকদের সব সমস্যার সার্বিক ও ন্যায়ানুগ সমাধানের দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। ইসলাম চায় এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে, শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার সৌহার্দ্যমূলক পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এমন এক জীবনবিধানের প্রচলন করতে, যেখানে শোষণ-নিপীড়ন থাকবে না। যেহেতু সম্পদ ব্যবস্থাপনায় মালিকপক্ষ বা পুঁজিপতি তার মূলধন খাটানোর কারণে এবং শ্রমিক তার শ্রমের বিনিময়ে লাভের হকদার হয়ে থাকে, সেহেতু নবী করিম (সা.) শ্রমিককে মজুরি দান করার পরেও তাকে লাভের অংশ দেওয়ার জন্য উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘শ্রমিকদের তাদের শ্রমার্জিত সম্পদের লভ্যাংশ দাও, কেননা আল্লাহর শ্রমিককে বঞ্চিত করা যায় না।’ (মুসনাদে আহমাদ)
সুতরাং ভবনধসে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের দেশে প্রচলিত রীতি অনুসারে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং তাদের পরিবারের ওপর সামর্থ্য অনুযায়ী কাজের দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে। মজুরির পরিমাণ এমন হতে হবে যেন তা কোনো দেশ ও যুগের স্বাভাবিক অবস্থা ও চাহিদা অনুসারে যুক্তিসংগত হয় এবং উপার্জনকারী শ্রমিক তার পারিশ্রমিক দ্বারা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মানবিক, মৌলিক অধিকার ও জীবনধারণের অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। মালিকপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেবে অথবা এমন ক্ষতিপূরণ দেবে, যাতে তাদের পরিবারের প্রয়োজন মিটে যায়। শ্রমিকের দক্ষতা, যোগ্যতা, পরিবেশ, চাহিদা, জীবনযাত্রা প্রভৃতি পর্যালোচনা করে সর্বাবস্থায় ন্যায্য মজুরি ও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করাই বাঞ্ছনীয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

সংবাদ শিরোনামে বাংলাদেশ এবংমানবাধিকার by কামাল আহমেদ

ব্রিটেনে অন্তত গত দুই দশকে যে রকমটি আর কখনো দেখা যায়নি, গত দুই সপ্তাহে সে রকমটিই দেখা গেল। ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলগুলোর জাতীয় শিরোনামে বাংলাদেশ হয় প্রথম, নয়তো দ্বিতীয় অবস্থানে। অন্যান্য দেশের জাতীয় সংবাদমাধ্যমে চিত্রটি কী ছিল জানি না, তবে, ইংরেজি ভাষার বৈশ্বিক সব সংবাদমাধ্যমে ঘুরেফিরে প্রতিদিনই বাংলাদেশ নামটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। তবে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এগুলোর সব কটিতেই মৃত্যু, মানবিক সংকট, আইন লঙ্ঘন, দলবাজি, শ্রমশোষণকে দাসব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা, ধর্মীয় উন্মত্ততা, নৃশংস রাজনৈতিক সহিংসতার কথা উঠে এসেছে। এমনকি, বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের বিদ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাণ্ডজ্ঞানহীন ভবনঝাঁকুনি তত্ত্ব এবং বুজুর্গ অর্থমন্ত্রীর ভবনধসের প্রভাব তেমন কিছু নয় মন্তব্যগুলোরও বিশ্লেষণ প্রচারিত হয়েছে।   
২ মে জেনেভায় জাতিসংঘ দপ্তরের একটি মিলনায়তনে ২০০-এর মতো দেশের কূটনীতিকদের কাছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির কাছ থেকে যখন শুনতে পাই যে তাঁর সরকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষায় চেষ্টার কোনো ত্রুটি করবে না—তখনই মনে খটকা লাগছিল যে এমন প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের পক্ষে কীভাবে দেওয়া সম্ভব? তিনি যেদিন এই দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেন, তার ঠিক দুই দিন আগে সাভারে মর্মান্তিক ভবনধসে নিহত ও নিখোঁজদের স্বজনদের বিক্ষোভ ঠেকাতে সেখানে পুলিশকে লাঠিপেটা করতে হয়েছে (এপ্রিল ৩০, ২০১৩)। পুলিশ বা তার অনুসৃত কৌশলের সমালোচনা নয়, বরং যে বিষয়টি এখানে মূল বিবেচ্য তা হলো, বাস্তবে এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের সামর্থ্য ও যোগ্যতার অভাব। যেখানে আপনজনকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মানুষের সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রাপ্য, সেখানে যে আচরণের শিকার হলেন তাঁরা, তাতে ‘নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষা’র অঙ্গীকার নিশ্চয়ই খুব তেতো শোনাবে।
হেফাজতে ইসলামের ঢাকা ঘেরাওকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা, মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে গেল, তাতে অধিকাংশ মানুষই হতবাক। কথা ছিল ঢাকার চারদিকে শান্তিপূর্ণ অবরোধ হবে। অবরোধ শুরুর পর তারা যখন ঢাকায় ঢুকে সমাবেশ করতে চাইল, তখন তাদেরকে অনুমতি দেওয়ার বিষয়টির যৌক্তিকতা প্রশ্নসাপেক্ষ। মাত্র ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র মতিঝিলে লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ সামাল দেওয়ার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, সময়স্বল্পতার জন্য যে তা সম্ভব নয়, সে কথা বলাই বাহুল্য। অনেকেই যুক্তি দিতে পারেন যে ঢাকায় ঢুকতে না দিলে সহিংসতা চারদিকে ছড়িয়ে যেত। কিন্তু, তাতে প্রশাসন অন্তত দুটো দিক দিয়ে সুবিধা পেত। প্রথমত, যেটা ঘটত তা ঢাকার প্রান্তসীমায়, আর দ্বিতীয়ত, প্রতিটা স্থানেই সহিংসতার মাত্রা অনেক কম হতো। কেননা তাদের ক্ষমতা তখন এতটা কেন্দ্রীভূত থাকত না।
হেফাজতের অবরোধ ও সমাবেশ ঘিরে যে সহিংসতা, অনেকেই তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক বলে বর্ণনা করেছেন। তাহলে, এর জন্য নিশ্চয়ই বড় ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাহলে কী করেছে? কেন তারা এ ক্ষেত্রে আগাম হুঁশিয়ারি দিতে ব্যর্থ হলো? গোয়েন্দা কার্যক্রমের এই ব্যর্থতা তো বিডিআর বিদ্রোহের সময় যেমনটি দেখা গেছে, তার সঙ্গে তুলনীয়।
হেফাজতের প্রথম সমাবেশ যেটি সরকার-সমর্থক পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের অসহযোগিতা সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সমাবেশের প্রাক্কালে সরকার বলেছিল, তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে যে জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকে নাশকতার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অথচ, যখন হাঙ্গামা হলো, তখন তাদের কাছে কোনো আভাস-ইঙ্গিত কেন এল না, সেটা বোঝা মুশকিল। তাহলে কি এটি সেই বাঘ আসার গল্পের মতো?
হেফাজতের কিছু নেতাকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে যে হেফাজতের কর্মী-সমর্থকেরা সহিংসতায় জড়িত নন। বিএনপির মঙ্গলবারের বিবৃতিতেও বলা হয়েছে যে হেফাজত এসব সহিংসতার জন্য দায়ী নয়। তাহলে দায়ী কারা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কোনো তদন্ত হবে কি না বা তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণনির্ভর ব্যাখ্যা মিলবে কি না, তার জন্য কত দিন অপেক্ষায় থাকতে হবে কে জানে। তবে, এই পটভূমিতে কতগুলো বিষয় আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই প্রতিবাদ বিক্ষোভের জন্য যেসব নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হয়, সে রকমটি আমাদেরও ভাবা প্রয়োজন।
প্রথমত, রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সবার জন্য উন্মুক্ত কোনো সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা, মিছিল ইত্যাদি যারা আয়োজন করবে, সেই কর্মসূচির নিরাপত্তাব্যবস্থার খুঁটিনাটি সব বিষয়ে পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে আয়োজকদের একটা সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। আয়োজকদের স্বেচ্ছাসেবকেরা তাঁদের দলীয় সদস্যদের পরিচয় নিশ্চিত করা, কোনো বিপদ বা দুর্ঘটনা ঘটলে সভায় আগতদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবেন।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বটাও তাঁদেরকেই নিতে হবে। সংগঠনগুলোর আকারভেদে এসব কর্মসূচিতে সহজেই চোখে পড়ে এ রকম জ্যাকেট বা টি-শার্ট পরিহিত শত শত স্টুয়ার্ট এ ধরনের সমাবেশ বা শোভাযাত্রাকে ঘিরে রেখে সেগুলোর শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সংগঠনগুলো এ রকম ব্যবস্থা নিলে তাদের কর্মসূচিতেও কথিত অনুপ্রবেশকারীদের নাশকতার ঝুঁকি কমে যাবে।
এখন উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেটা সম্ভব নয় বলে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে তা সম্ভব হবে না এমন নয়। মিছিল ও শোভাযাত্রার ক্ষেত্রেও পুলিশের সঙ্গে আগাম সমঝোতা হতে হবে। এর ভিত্তিতে মিছিলের গতিপথ ঠিক করে নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ রাখলে তাতে জনভোগান্তি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এতে করে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, যাত্রীদের জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার মতো নিষ্ঠুর ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা অবশ্য দলনিরপেক্ষভাবে কার্যকর করতে হবে। বিরোধী দলকে রাস্তায় নামতে অনুমতি দেওয়া হবে না, কিন্তু, সরকার-সমর্থকদের নানা অজুহাতে রাস্তায় নামতে দিলে এই ব্যবস্থায় ফল পাওয়া যাবে না।
কেউ আইন লঙ্ঘন করলে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, সেই আইনগত ব্যবস্থাও আইনসম্মত পন্থাতেই কার্যকর করার কথা। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নিলে আইনসম্মত ব্যবস্থা হিসেবে তা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। সম্প্রচার নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে যে দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তা সে জন্যই অগ্রহণযোগ্য। এই ঘটনা ঘটল বৈশ্বিক একটি চ্যানেলে প্রধানমন্ত্রীর এক সাক্ষাৎকারে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠার পর। বাংলাদেশের  কুটিল রাজনীতির জটিল সমীকরণ, তার ইতিহাস ইত্যাদি সম্পর্কে জানার অবকাশ বিদেশিদের থাকার কথা নয়। তাঁরা শুধু এটুকুই জানবেন যে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। এটা কোনোভাবে কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।
সিএনএনের ক্রিস্টিনা আমানপুর প্রধানমন্ত্রীকে বললেন যে সাংবাদিক হিসেবে ভিসার জন্য তাঁর কাছে ওয়েভার বা দায়মুক্তির একটি লিখিত ঘোষণা চাওয়া হয়েছিল, যেটি তাঁদের সম্পাদকীয় নীতিমালার জন্য তাঁর পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না। বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ দূতাবাসের ওয়েবসাইটে সাংবাদিকদের ভিসা আবেদনের নির্ধারিত ফরমটি দেখে অবাক হলাম। এটি তো সেই সামরিক শাসনামলের বিধান, যাতে আবেদনকারী সাংবাদিককে মুচলেকা দিতে হবে যে তিনি তাঁর কার্যক্রমের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার মহাপরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তাঁর তোলা ছবি ও রিপোর্ট কর্তৃপক্ষকে দেখাবেন এবং কোনো অংশ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে বলে প্রতীয়মান হলে সেটুকু সম্পাদন করতে তিনি সম্মত হবেন। আমি জানি না বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য অবশ্যপালনীয় হিসেবে এসব শর্ত, যিনি বা যাঁরা বহাল রেখেছেন, তাঁরা বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের মোড়ককে আসলে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন হিসেবে বিবেচনা করেন কি না। প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বিশ্বায়নের এই যুগে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিককে ঢুকতে না দিলেই কি ঘটনা-দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আড়াল করা যায়?
এর আগে, সূত্র হিসেবে খুবই অনির্ভরযোগ্য, ফেসবুকের কল্যাণে জানতে পারলাম যে ঢাকায় আল-জাজিরার সংবাদদাতা নিকোলাস হকের কাজ করার ওপর বিধিনিষেধ আরোপিত হয়েছে। জেনেভায় সুযোগ পেয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি তো আকাশ থেকে পড়লেন। তবে, সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা থেকে খবর নিয়ে জানালেন যে বিদেশি পাসপোর্টধারী নিকোলাসের ওয়ার্ক পারমিট নেই বলে তাঁকে সেই অনুমতি নিতে বলা হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি কাজ করতে পারবেন না। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো ব্যক্তি যাঁর বাংলাদেশে ঢুকতে ভিসা লাগে না, তাঁর কেন কাজ করার জন্য ওয়ার্ক পারমিট লাগবে? দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী বাংলাদেশিদের তো বাংলাদেশে কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য করতে আলাদা অনুমতি লাগে না। শ্রম ও মেধা বিনিয়োগে কেন আলাদা অনুমোদন লাগবে? আমাদের নীতিনির্ধারকেরা কবে বুঝবেন যে এসব ছোটখাটো নিষেধাজ্ঞা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার র‌্যাংকিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে? 
নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ আয়োজনের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যদের নিরাপত্তা ও জীবনের অধিকারের সমন্বয় ঘটানো যেখানে সম্ভব হয়নি, সেখানে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থায় বাংলাদেশ কীভাবে এ রকম জোরালো প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর লন্ডনপ্রতিনিধি।

মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে হলে...by আসিফ নজরুল

৬ মে থেকে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে গুজবের দেশে। এই গুজব ভয়াবহ, অবিশ্বাস্য এবং আতঙ্কজনক। বলা হচ্ছে যে ৫ মে মধ্যরাতের পর শাপলা চত্বরে যৌথ বাহিনীর আক্রমণে কয়েক হাজার হেফাজতের কর্মী নিহত হয়েছে। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়, বিএনপি ও হেফাজতে ইসলামের বক্তব্যেও এমন দাবি করা হয়েছে। সাধারণ যুক্তিতে দেখলে শাপলা চত্বরে সরকারের হত্যাযজ্ঞ চালানোর কোনো কারণ নেই। স্পষ্টত, সেদিন সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল হেফাজতের কর্মীদের শাপলা চত্বর থেকে বিতাড়িত করা। এ কাজটি করার জন্য বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালানোর প্রয়োজন পড়ে না। তবে কোনো আন্দোলনস্থল ত্যাগ না করার জন্য অনেক মানুষ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠলে সুকৌশলী অভিযান ছাড়া একদমই বিনা রক্তপাতে তাদের বিতাড়ন সব সময় সম্ভব হয় না। আমরা গত বছর থাইল্যান্ডে রেড শার্ট মুভমেন্ট দমন করার ক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ের ঘটনা দেখেছি। শাপলা চত্বরে তাই প্রাণহানির ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়। সমাবেশ উচ্ছেদ করতে গিয়ে কিছু প্রাণহানির খবর এমনকি ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যেও উঠে এসেছে।
শাপলা চত্বরে যৌথ বাহিনীর অভিযানের আগে-পরেও অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। আগে-পরের মুখোমুখি সংঘর্ষে সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছে, তার চেয়েও অনেক বেশি প্রাণ হারিয়েছে হেফাজতের কর্মীরা। কিন্তু শাপলা চত্বরে যৌথ বাহিনীর অভিযানটি ছিল একতরফা। পুলিশি কর্ডনের ভেতর থাকা স্লোগান বা জিকিররত মানুষকে মধ্যরাতে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে বিতাড়নকালে যে শক্তি প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে, তা বিরল এবং ভয়ংকর একটি ঘটনা। এ ঘটনায় সরকারের ভাষ্যমতে, তিনজন আর দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের ভাষ্যমতে, ২০ থেকে ৪০ জন নিহত হয়েছে। ঠিক কতজন মারা গেছে বা গুলিতে আহত হয়েছে, তা নির্ভুলভাবে আমাদের জানা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মধ্যরাতের এই অভিযানের স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা সম্পর্কে আলোচনা এবং গোটা ২০১৩ সালে বিপুলসংখ্যায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনের কারণ উপলব্ধি করা
২.
শাপলা চত্বরের অভিযানটি পরিচালিত হয় রাত আড়াইটার দিকে। অভিযানের রেকর্ডেড ভার্সন এই সরকারের সময় লাইসেন্স পাওয়া দুটো টিভি চ্যানেল (সময় ও ৭১) তাৎক্ষণিকভাবে প্রচার করে। আমার জানামতে, পুলিশি অভিযানটি লাইভ সমপ্রচার করে কেবল দিগন্ত টিভি, যার মালিক জামায়াতের একজন নেতা। দিগন্ত টিভির সমপ্রচারে অভিযানের ভয়াবহতা বেশি দৃশ্যমান ছিল এবং টিভিটির নেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকারে শত শত প্রাণহানির দাবি করা হয়েছিল। চ্যানেলটির সমপ্রচার প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে সরকার বন্ধ করে দেয়, অনুরূপ কারণে বন্ধ করে দেয় বিএনপিপন্থী চ্যানেল ইসলামিক টিভির সমপ্রচারও।
এই অভিযানের প্রকৃতি ঠিক কী রকম ছিল, তা আমাদের পক্ষে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে এই প্রশ্ন তোলা অবান্তর নয় যে শাপলা চত্বরের অভিযানটি যথাযথ ছিল কি না। শাপলা চত্বরের মানুষ মধ্যরাতে কি কারও জানমালের প্রতি তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি ছিল? তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগের সময় কি প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করা হয়নি? এই অভিযান ভোরের আলোয় সব গণমাধ্যমকে সামনে রেখে করা হলে কি প্রাণহানির আশঙ্কা এবং প্রাণহানিসংক্রান্ত গুজব হ্রাস করা যেত না? হেফাজতে ইসলাম, বিশেষ করে আল্লামা শফীর সঙ্গে আরও আলোচনা করে তাদের স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কি শাপলা চত্বর ত্যাগ করানোতে রাজি করা যেত না? মধ্যরাতের অভিযানটির বিকল্প কোনো কৌশলী পদক্ষেপ নেওয়ার যথেষ্ট চেষ্টা কি সরকার করেছিল?
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সকালে শাপলা চত্বরের সমাবেশ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ চালানোর আশঙ্কা ছিল। পুলিশের বক্তব্য এই রাষ্ট্রের চরিত্রের প্রতিফলন হিসেবে সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য নাও মনে হতে পারে। তবে এটি ঠিক যে হেফাজত অনুমোদিত সময়ের অতিরিক্ত সময় ধরে অবস্থান করার কারণে এবং ৫ মে শহরে বিভিন্নমুখী সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন ৬ মেতেও ঢাকার রাজপথে ব্যাপক গোলযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কা ছিল। ৬ মে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমাবেশ ডাকার কারণে এই আশঙ্কা আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। এসব বিবেচনায় শাপলা চত্বর হেফাজতের দখল থেকে মুক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে হয়তো আবশ্যক ছিল। কিন্তু তা গভীর রাতে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে শত শত বুলেট আর সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে কেন? কেন তা মিডিয়ার সীমাবদ্ধ উপস্থিতির মধ্যে? এই অভিযান প্রচারকারী বিরোধী দলপন্থী টিভি চ্যানেলগুলোকে কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান না করে?
শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড নিয়ে গুজবের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এসব কারণেই। সামপ্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিরোধী দলের কর্মীদের প্রতি পুলিশের নির্বিচারে শক্তি প্রয়োগের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। আত্মরক্ষার বা অন্যের জানমাল বাঁচানোর প্রয়োজন না হলে পুলিশের শক্তি প্রয়োগের কোনো আইনি অধিকার নেই। এই শক্তি প্রয়োগও করতে হয় যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই। শটগানের ছররা গুলি বা রাবার বুলেট লেথ্যাল উইপন নয়, কিন্তু যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করলে এগুলোও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। শাপলা চত্বরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সামপ্রতিক কালে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর এসব অস্ত্রে বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা যদি এই রাষ্ট্রের কাছে সহনীয় হয়ে ওঠে, তাহলে ভয়াবহ এক অন্ধকারের দিকে আমরা ধাবিত হব।
শাপলা চত্বরে অভিযানের আগে পল্টন ও আশপাশের এলাকায় সারা দিন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কি শুধু হেফাজতে ইসলাম জড়িত ছিল, তাদের ভেতর অবস্থান নিয়ে বিএনপি বা জামায়াত-শিবির কি এসব কাজ করেছিল, সংঘর্ষ উসকে দিতে আওয়ামী লীগের কর্মীরাও কি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল বা এ সময় পুলিশ আসলে কী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল—এ ধরনের নানা প্রশ্ন জনমনে রয়েছে। আমরা টেলিভিশনে দেখেছি যে পল্টন ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষের সময়ও শাপলা চত্বরে সমাবেশ শান্তিপূর্ণ ছিল। এসব সংঘর্ষের ঘটনা তাই গভীর রাতে শাপলা চত্বরে পুলিশি অভিযানের যৌক্তিকতা সৃষ্টি করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।
৩.
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরসহ নানা ঘটনায় বহু অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিল দেখছি আমরা। বছরের শুরু থেকে নানা কর্মসূচি পালনকালে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামি সংগঠনগুলোর কর্মীদের ওপর পুলিশের ব্যাপক গুলিবর্ষণের নানা ঘটনা ঘটেছে। এসব কর্মসূচি কখনো কখনো অত্যন্ত সহিংস ছিল, কর্মসূচি পালনকালে পুলিশের ওপর বর্বর আক্রমণের কিছু ঘটনাও ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে, কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রয়োজন ছাড়াই পুলিশি গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর বা ঢাকার শাপলা চত্বরের মতো কিছু ঘটনায় পুলিশি অভিযানের যৌক্তিকতা ও তীব্রতা নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
এসব ঘটনার সঙ্গে ভবিষ্যতে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার বা আসার লক্ষ্যে মাঠ পরিস্থিতির ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ রাখার রাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এমনকি সাভারে রানা প্লাজায় হূদয়বিদারক গণমৃত্যুর ঘটনাও হয়তো ঘটত না, যদি সেদিন সেখান থেকে হরতালবিরোধী মিছিলের আয়োজনের চিন্তা সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে কাজ না করত। কোনো না কোনোভাবে এসব মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য আগামী নির্বাচনকেন্দ্রিক  সরকার ও বিরোধী দলের বেপরোয়া ও সংঘাতমূলক রাজনীতি দায়ী। এই রাজনীতির উপসর্গই মৃত্যু, ধ্বংস, নৈরাজ্য ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা।
এই পরিস্থিতির আশু অবসান প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি যে দেশের দুটো প্রধান গণতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে আগামী নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বহুলাংশে দূর হবে। যুদ্ধাপরাধীদের জন্য সহায়ক আন্দোলন তাতে দুর্বল হয়ে যাবে, হেফাজতে ইসলামের মতো সংগঠনের পেছনে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক মদদও অনেকাংশে  হ্রাস পাবে। ক্রমাগত হরতাল ও পুলিশি অভিযানে ইতিমধ্যে সমাজে নানা অসন্তোষ, অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আগামী নির্বাচন নিয়ে সমঝোতা হলে হরতাল ও বিরোধী দলের প্রতি দমনমূলক কর্মকাণ্ডও হ্রাস পেতে বাধ্য।
সমঝোতার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে নির্বাচনকালে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব প্রশংসনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়। সর্বদলীয় সরকারের প্রধান কে হবেন, এ নিয়ে আলোচনার অবকাশ আছে কি না, তা আওয়ামী লীগকে আগে বলতে হবে। ১৯৯৬ সালে অনুরূপ পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত সর্বদলীয় সরকারের প্রধান হিসেবে বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়াকে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ মানতে রাজি হয়নি। কাজেই আওয়ামী লীগও এখন আশা করতে পারে না যে আগামী সর্বদলীয় সরকারের প্রধানহিসেবে শেখ হাসিনাকে মেনে নেবে বর্তমান বিরোধী দলগুলো।
তা ছাড়া বাংলাদেশে সরকার পদ্ধতি এমনই যে সরকারপ্রধান এখানে প্রায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এ পদে সর্বদলীয় সরকারের প্রধান হিসেবে দলীয় কোনো নেতা (বিশেষ করে হাসিনা বা খালেদার মতো পরাক্রমশালী কোনো নেতা) দায়িত্ব পালন করলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কাজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হলে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান প্রশ্নে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া সবচেয়ে জরুরি। তা না হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কোনো অবসান ঘটবে না দেশে।
রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হলে উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ক্ষমতার দ্বন্দ্বেও প্রাণ হারাচ্ছে বা সর্বস্বান্ত হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ, সমাজের ওপরতলার কেউ নয়। দেশের মানুষকে ও দেশকে ভালোবাসলে তাই আগামী নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির অবসান দল দুটোকে করতেই হবে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়। ��� X)� � �mn �s ��িত করার পাশাপাশি অন্যদের নিরাপত্তা ও জীবনের অধিকারের সমন্বয় ঘটানো যেখানে সম্ভব হয়নি, সেখানে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থায় বাংলাদেশ কীভাবে এ রকম জোরালো প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর লন্ডনপ্রতিনিধি।

পিকেটিংয়ে পথশিশু ব্যবহার

হরতালের পিকেটিংয়ে শিশুদের ব্যবহার করা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া কিছু নয়। পিকেটিংয়ের নামে অন্যের চলাচলের অধিকার লঙ্ঘন অন্যায় ও বেআইনি। এই বেআইনি কাজে পথশিশুদের নামানো অবশ্যই নিন্দনীয়।
রাজনীতির লড়াই চরম পর্যায়ে উন্নীত হলেই উভয় পক্ষ যার যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিরোধী দলের ক্ষমতা নেই, রাজপথ দখলে রাখার মতো যথেষ্টসংখ্যক কর্মী নেই; থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে তারা নামতে অপারগ। কিন্তু পথশিশুদের কিছু টাকা দেওয়া বা এক বেলা খিচুড়ি খাওয়ানোর মতো টাকা তাদের আছে। এমন অবস্থায় তাদেরই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে হরতাল বাস্তবায়নের! এমনকি কোনো কোনো জায়গায় ‘জাতীয়তাবাদী শিশুদলের’ ব্যানার নিয়ে শিশুদের মিছিলে নামানো হচ্ছে। এই শিশুদের কি রাজনীতি বোঝার বা পক্ষ নেওয়ার বয়স হয়েছে? কতটা অমানবিক হলে শিশুদের এ রকম রাজনৈতিক ব্যবহার কেউ করতে পারে! এর মাধ্যমে শিশুদের কেবল আইন ভাঙতেই শেখানো হচ্ছে না, তাদের অপরাধী করে তোলা হচ্ছে। বিরোধী দলের যেসব নেতা-কর্মী এই কাজে ইন্ধন দিচ্ছেন, নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁরা কি নিজেদের সন্তানদের দিয়ে পিকেটিং করাতে রাজি আছেন?
৫ মে হেফাজতে ইসলামের ডাকা অবরোধ ও শাপলা চত্বরের সমাবেশেও অজস্র শিশু-কিশোরকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ঢাকা অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচিতে যাঁরা কিশোর বয়সী মাদ্রাসাছাত্রদের নিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা আর কেউ নন, ওই কিশোরদের শিক্ষক ‘হুজুর’। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের পরের সহিংসতায় জামায়াত ও শিবির শিশু-কিশোরদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল। যে রাজনীতি শিশুদের জীবনের বিনিময়ে জয়ী হতে চায়, সেই রাজনীতি নিষ্ঠুর ও অমানবিক।
দেশে হরতাল-সহিংসতা সম্ভবত শিগগিরই বন্ধ হচ্ছে না, কিন্তু শিশুদের এমনভাবে ব্যবহারও আর চলতে পারে না। যদি চলে, যদি বিরোধী দলগুলোর উচ্চ স্তরের নেতারা তাঁদের কর্মীদের শিশুদের ব্যবহার করা বন্ধ করতে না পারেন; তাহলে তাঁরা নিজেরাও অমানবিক বলে চিহ্নিত হবেন। এ ব্যাপারে আইনি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। যেখানেই শিশুদের পিকেটিং করতে দেখা যাবে, সেখানেই তাদের বুঝিয়ে এই কাজ থেকে বিরত করতে হবে।

কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায়

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং দুটি অভিযোগে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। একাত্তরে ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর চতুর্থ এই রায়ের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বলে মনে করি।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী কিছু শক্তি এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এই অবস্থান শুধু রাজনৈতিক ছিল না, বরং হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হিসেবে তারা খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের মতো জঘন্য মানবতাবিরোধী অপকর্মে জড়িত ছিল। বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের অপরাধে জড়িত ছিল কুখ্যাত আলবদর বাহিনী। একজন চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এই বাহিনীর প্রধান সংগঠক হিসেবে কামারুজ্জামান একাত্তরে হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এই রায়ের মধ্য দিয়ে একাত্তরে কামারুজ্জামানের বর্বরতার শিকার পরিবারগুলো দীর্ঘদিন পর হলেও স্বস্তি পাবে।
রায় ঘোষণার পর কামারুজ্জামান একে ‘রং জাজমেন্ট’ বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। রায় সম্পর্কে মতামত দেওয়ার অধিকার তাঁদের আছে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি স্বাধীন আদালত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়মকানুন ও বিধিবিধান মেনেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর পরও যদি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও তাঁর স্বজনেরা মনে করে থাকেন, তাঁরা ন্যায়বিচার পাননি, সে ক্ষেত্রে এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যেহেতু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, তাই শুরু থেকেই এই বিচার-প্রক্রিয়া নস্যাৎ করার নানা চেষ্টা হয়েছে। এ জন্য সহিংস পথও বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি রায় ঘোষণার পরই জ্বালাও-পোড়াও নীতি নিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো। এতে বেশ কিছু প্রাণহানিসহ দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কোনো রায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আইনি প্রক্রিয়াকে আইনগতভাবে মোকাবিলা না করে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা যে ফল দেবে না, সেটা জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগীদের বুঝতে হবে।
একাত্তরে ঘটে যাওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। ইতিহাসের দায়মুক্তির স্বার্থে এটা যেমন জরুরি, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর রয়েছে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। তাই, সংঘাত ও সহিংসতা থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই। দেশবাসী বিচার-প্রক্রিয়া পুরো সম্পন্ন করে অবিলম্বে ইতিহাসের দায়মুক্তিই পেতে চায়।

ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হবে: বিলাওয়াল

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো বলেছেন, ‘পাকিস্তানের সাবেক স্বৈরশাসক জিয়াউল হকের সমর্থকেরা আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তবে ১১ মের ভোটের মাধ্যমে এই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যাবে।’ গত বৃহস্পতিবার পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডির গুজার খানে সমবেত মানুষের উদ্দেশে ভিডিওলিংকের মাধ্যমে দেওয়া ভাষণে পিপিপির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল এসব কথা বলেন। তবে ভাষণে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির ছেলের অপহরণের বিষয়ে কিছু বলেননি। ওই সমাবেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফের বক্তৃতা দেওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি সেখানে যাননি। বিলাওয়াল বলেন, ‘জিয়াউল হকের অনুগত লোকজন আমাদের প্রচারণায় বাধার সৃষ্টি করেছে।’

পরিবর্তনের ডাক ইমরানের

পরিবর্তনের জন্য দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ইমরান খান। তিনি গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এ আহ্বান জানান। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) এই নেতা গত মঙ্গলবার লাহোরে এক নির্বাচনী সমাবেশের মঞ্চ থেকে পড়ে আহত হয়ে রাজধানী ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ভিডিওলিংকের মাধ্যমে দেওয়া সর্বশেষ ওই ভাষণে ইমরান বলেন, ‘আল্লাহ আপনাদের সুবর্ণ সুযোগ দিয়েছেন। এ সুযোগকে হেলায় ফেলবেন না। আপনাদের পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, ‘একটি নতুন পাকিস্তান সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে এই পৃথিবী থেকে নেবেন না।’

জয়ে আশাবাদী নওয়াজ

নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নওয়াজ শরিফ। শেষ মুহূর্তে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতি জনসমর্থন বাড়ার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন পিএমএল-এন নেতা। পাঞ্জাবের উত্তর ও মধ্যাঞ্চল পিএমএল-এনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সেখানেই ইমরানের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন লক্ষ করা গেছে।
ডন-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নওয়াজ বলেন, ‘বেনজির ভুট্টো যখন মাঠে ছিলেন, তিনিও তখন ওই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম করতেন। ১৯৯৭ সালেও বড় বড় সমাবেশ করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেবার আমরা দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জয়ী হয়েছিলাম।’ পাল্টা প্রশ্ন করে নওয়াজ বলেন, ‘আপনারা কীভাবে বলেন, ভোটাররা আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট নয়। আমি অনেক সমাবেশ করেছি। লোকজনের কাছ থেকে খুবই সাড়া পাচ্ছি।’

ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হচ্ছে?

পাকিস্তানে আজ শনিবার সাধারণ নির্বাচন। শেষ মুহূর্তে সাবেক ক্রিকেটার ও তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খানের পক্ষে সমর্থন বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। অবশ্য মোটের ওপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) প্রধান নওয়াজ শরিফই এগিয়ে। তবে শেষ পর্যন্ত ঝুলন্ত পার্লামেন্টই হতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন। নানা কারণে প্রথম সারির দলগুলো নিজেদের পক্ষে ভোটারদের বড় অংশের সমর্থন টানতে ব্যর্থ হওয়ায় দুর্বল সরকার গঠিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। জাতীয় পরিষদের ৩৪২ আসনের মধ্যে ২৭২টিতে সরাসরি নির্বাচন হবে। বাকিগুলো সংরক্ষিত আসন। নওয়াজের দল বেশি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে ১৪ বছর পর ক্ষমতায় ফিরবেন তিনি। ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন নওয়াজ। তবে শেষ মুহূর্তে ইমরানের প্রতি সমর্থন বেড়ে গেছে বলে যে ধারণা করা হচ্ছে, তা ঝুলন্ত পার্লামেন্টের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে বিশাল সমাবেশ করেছে তেহরিক-ই-ইনসাফ। এতে অন্তত ৩৫ হাজার মানুষ যোগ দেয়। গত মঙ্গলবার লাহোরের এক সমাবেশে মঞ্চে ওঠার সময় পড়ে আহত ইমরান হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাই ইসলামাবাদের সমাবেশে যোগ দিতে পারেননি তিনি। তার পরও সমাবেশে এত মানুষের উপস্থিতিকে তাঁর প্রতি সমর্থন বাড়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক শামিলা চৌধুরী বলেন, শুরুর দিকে ইমরানের দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা চোখে পড়ছিল। তবে ধীরে ধীরে তা কাটিয়ে উঠেছে দলটি। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে। নির্বাচনে যে বিষয়টিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে—সেই সহিংসতা কিন্তু চলছে। গতকাল শুক্রবারও কোয়েটা ও পেশোয়ারে পৃথক বোমা বিস্ফোরণে পাঁচজন নিহত হয়েছে। তালেবান হুমকি দিয়েছে, নির্বাচনের দিনও আত্মঘাতী হামলা চালানো হবে। তারা নির্বাচনকে নাস্তিকদের ব্যবস্থা বলে মনে করে। তালেবানের হুমকি সত্ত্বেও এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ভোটার ওয়াক্কাস আলী বলেন, তিনি অবশ্যই ভোটকেন্দ্রে যাবেন। এবার ভোট দেবেন ইমরান খানকে। কারণ, তিনি পরিবর্তনের প্রতীক। এর আগে অন্যদের ভোট দিয়েছেন। কোনো লাভ হয়নি। এবারের নির্বাচনে ভোটারসংখ্যা আট কোটি ৬০ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে নারী ভোটার প্রায় তিন কোটি ৭০ লাখ, ভোটকেন্দ্র ৭০ হাজার। নির্বাচনে ছয় লাখ নিরাপত্তাকর্মী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৫০ হাজার সেনাসদস্য থাকবেন। নির্বাচনে বিদায়ী সরকারের প্রধান শরিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) অবস্থান হতাশাজনক। তালেবানের হুমকির কারণে প্রচারণায় নেতার অভাব ছিল লক্ষণীয়। টেলিভিশন বিজ্ঞাপন ও ব্যানারে প্রচারণা চালানো পিপিপি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান বেনজির ভুট্টোর ভাবমূর্তিকেই মূল পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে। প্রেসিডেন্ট পদে থাকায় পিপিপির কো-চেয়ারম্যান আসিফ আলী জারদারি প্রচারণায় নামতে পারেননি। অন্যদিকে জারদারি-বেনজির দম্পতির ছেলে দলের চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো বয়স কম হওয়ায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি। এসব কারণে পিপিপির ফল হতাশাজনক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রামাল্লার কাছে ৩০০ বাড়ি করবে ইসরায়েল

ফিলিস্তিনশাসিত পশ্চিম তীরের রামাল্লা নগরের কাছে বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নতুন প্রায় ৩০০ বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে ইসরায়েল। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা চাঙা করার উদ্যোগ নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নতুন বাড়ি তৈরির টেন্ডার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন—এ খবরের কয়েক দিনের মাথায় এ ঘটনা ঘটল। দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির চেষ্টাকে এগিয়ে নিতে নেতানিয়াহু ওই ঘোষণা দিয়েছিলেন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘বেসামরিক প্রশাসন বেইত ইলে ২৯৬টি বাড়ি স্থাপনের ব্যাপারে সবুজ সংকেত দিয়েছে।’ ফিলিস্তিনের প্রধান আলোচক সায়েব এরাকাত বলেন, ‘ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের কাছে এ বার্তাই পাঠাল যে, তারা স্থগিত শান্তি আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী নয়।’ ইসরায়েলের প্রধান আলোচক জিপি লিভনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি শুনেছে। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।’

সিন্ধুর নির্বাচনে একজন বিন্দিয়া

পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে বৈচিত্র্যতার শেষ নেই। ধর্মীয় নেতা, শ্রমিক নেতা থেকে শুরু করে ভাববাদীরা পর্যন্ত লড়াই করছেন নির্বাচনে। বাদ যাননি বিন্দিয়া রানাও। তাঁর মতো আরও কয়েকজন হিজড়া নির্বাচনে লড়াই করছেন। প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার পালাবদলের এই নির্বাচন হয়তো এ কারণেও পাকিস্তানিদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অথচ এই পাকিস্তানেই হিজড়ারা উপহাসের পাত্র। সমাজের অচ্ছুত লোক হিসেবে প্রায়ই হামলার শিকার হন তাঁরা। জনবহুল বন্দরনগর করাচির ছোট্ট একটি অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস বিন্দিয়ার। সিন্ধুর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী তিনি। বিন্দিয়া বলেন, ‘হিজড়ারা প্রথম পরিবার থেকেই বঞ্চনার শিকার হন। আসলে লোকজন আমাদের নিয়ে বাজে যেসব মন্তব্য করে তা সহ্য করা কঠিন।’ পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ২০১১ সালে ঘোষণা দেন, হিজড়ারাও জাতীয় পরিচয়পত্র পাবেন। এবার অন্তত চারজন হিজড়া নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পাকিস্তান ও প্রতিবেশী ভারতে হিজড়ারা প্রায়ই হামলা ও ধর্ষণের শিকার হন। এসব নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে চান বিন্দিয়া (৪৫)। আগে নর্তকী হিসেবে কাজ করলেও এখন সমাজকর্মী হিসেবে কাজ করছেন তিনি। পাঁচ বছর আগের একটি ছোট্ট ঘটনা বিন্দিয়ার জীবন বদলে দিয়েছে। ক্যানসারে আক্রান্ত এক হিজড়ার সাহায্যার্থে অর্থ তোলার উদ্দেশে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু তপ্ত গরমে সারা দিন সাহায্য চেয়েও মাত্র এক মার্কিন ডলার পান। নির্বাচনে বিন্দিয়ার জয়ের সম্ভাবনা কম। একদিকে পাকিস্তানে হিজড়াদের করুণ বাস্তবতা, অন্যদিকে নির্বাচনী তহবিলের অভাবে ঠিকঠাকমতো প্রচারণা চালাতে পারেননি তিনি। তা ছাড়া তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্টের সাবেক এক মন্ত্রীও আছেন।

গিলানির ছেলে অপহূত দেহরক্ষী নিহত

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির এক ছেলেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে অপহরণ করেছে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা। এ সময় বন্দুকধারীদের গুলিতে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ও এক দেহরক্ষী নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। পুলিশ এই তথ্য জানিয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর খবরে বলা হয়, মুলতানের উপকণ্ঠে মাতিতাল এলাকায় বন্দুকধারীদের গুলিতে আলী হায়দার গিলানির ব্যক্তিগত সহকারী ও এক দেহরক্ষী নিহত হন। আহত হন আরও পাঁচজন। এখনো কোনো পক্ষ এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেনি। তবে নিষিদ্ধঘোষিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান সম্প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল, নির্বাচন সামনে রেখে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ও আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির (ন্যাপ) মতো ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে তারা কোনো ছাড় দেবে না। পুলিশ কর্মকর্তা খুররাম শাকুর সাংবাদিকদের জানান, বন্দুকধারীরা মোটরসাইকেলে করে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে এবং ইউসুফ রাজা গিলানির ছেলে আলী হায়দার গিলানিকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। আলী হায়দার ওই সময় দলীয় সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন। বন্দুকধারীরা তাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা একটি গাড়িতে হায়দারকে উঠিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে চলে যায় পুলিশ কর্মকর্তা শাকুর বলেন, ‘আমরা ওই এলাকার সব রাস্তা বন্ধ করে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছি।’ টেলিভিশনে দেখা গেছে, ভাইকে হারিয়ে গিলানির আরেক ছেলে আলী মুসা গিলানি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি পিপিপির ক্ষুব্ধ সমর্থকদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন। সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি কাল প্রাদেশিক নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। গিলানির অপহূত ছেলে পিপিপির হয়ে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর অন্য দুই ভাই জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে লড়াই করছেন।

আফগানিস্তানে নয়টি ঘাঁটি রাখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র: কারজাই

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বলেছেন, তাঁর দেশে যুক্তরাষ্ট্র নয়টি ঘাঁটি রাখতে চায়। তবে এ বিষয়ে চুক্তি সইয়ের আগে তিনি ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বেশ কিছু সুবিধা আদায় করতে চান। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে কারজাই এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সঙ্গে একটি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করছে। তারা নিজেদের দাবি পেশ করেছে। আমরাও বেশ কিছু দাবির কথা বলেছি। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তানে নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান।’ ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হয়। ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী ন্যাটোর সব সেনা প্রত্যাহার করার কথা। তবে সীমিত পরিসরে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বজায় রাখার জন্য চুক্তি করতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে কাবুল।

বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে ব্যবস্থা: পুলিশ

মালয়েশিয়ায় ৫ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতারণার অভিযোগ এনে বিরোধীদলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। পুলিশ গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা বলেছে। পুলিশের ওই ঘোষণাকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক হুমকি’ বলে অভিযোগ করেছে আনোয়ারের দল। নির্বাচনে ‘ভোট চুরির’ প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন আনোয়ার। রাজধানীর কুয়ালালামপুর শহরতলির এক ফুটবল মাঠে গত বুধবার এক সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি লড়াই অব্যাহত রেখে কখনোই আত্মসমর্পণ না করার অঙ্গীকার করেন। তিনি অভিযোগ করেন, রোববারের নির্বাচনে ‘গণতন্ত্রের মৃত্যু’ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ‘উদ্ধত ও সাম্প্রদায়িক’ সরকার অবৈধভাবে’ ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছে। তাঁদের দাবি, ক্ষমতাসীন জোট গত রোববারের নির্বাচনে জালিয়াতির মাধ্যমে জয়ী হয়েছে। এখন বিরোধীদের চুপ রাখার উদ্দেশে হুমকি দেওয়া হয়েছে। কালো পোশাকধারী বিপুলসংখ্যক সমর্থক ওই সমাবেশে যোগ দেন। এ সময় দলীয় পতাকা উড়িয়ে এবং ‘ভুভুজেলা’ বাজিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী রাজাক অবশ্য বলেছেন, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিরোধী পক্ষ ওই সমাবেশের আয়োজন করেছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মুখপাত্র জো কার্নি মালোয়েশিয়ার নির্বাচনে জয়ী দলের নেতা নাজিব রাজাককে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্বেগও জানানো হয়।

পাকিস্তানি বন্দী সানাউল্লাহ মারা গেছেন

ভারতের জম্মু শহরের একটি কারাগারে হামলায় আহত পাকিস্তানি নাগরিক সানাউল্লাহ গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালে মারা গেছেন। গত শুক্রবার ওই কারাগারের এক বন্দীর হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। চণ্ডীগড়ের পিজিআইএমইআর হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, সানাউল্লাহ গতকাল ভোর ছয়টা ৫৬ মিনিটে মারা গেছেন। হাসপাতালের এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সানাউল্লাহকে বাঁচাতে চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছেন। চিকিৎসকেরা জানান, মৃত্যুর আগের দিন সকালে সানাউল্লাহর কিডনি অকেজো হয়ে পড়লে তাঁর ডায়ালাইসিস করা হয়। ৩ মে হামলার পর থেকেই তিনি গভীর নিদ্রাচ্ছন্ন (কোমা) ছিলেন। গতকাল সকালে তাঁর মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। চণ্ডীগড় প্রশাসকের উপদেষ্টা কে কে শর্মা বলেন, ‘সানাউল্লাহর মৃত্যুর খবর জম্মু ও কাশ্মীর সরকারকে জানানো হয়েছে। হাইকমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁর মরদেহ জম্মু ও কাশ্মীর বা পাকিস্তান পাঠানো হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমরা শিগগিরই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব। সানাউল্লাহ জম্মু ও কাশ্মীরের কারাগারে বন্দী। সেখানকার আইন অনুযায়ী তাঁর মরদেহ হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ড্রোন হামলাকে অবৈধ ঘোষণা করলেন আদালত

পাকিস্তানের উপজাতি-অধ্যুষিত অঞ্চলে মার্কিন চালকবিহীন বিমানের (ড্রোন) হামলাকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার দেওয়া ওই রায়ে আদালত ওই হামলার বিরুদ্ধে জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপনের উদ্যোগ নিতেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আদেশ দেন। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) পরিচালিত ওই গোয়েন্দা বিমানের হামলার বিরুদ্ধে দাখিল করা চারটি পিটিশনের জবাবে পেশোয়ার হাইকোর্ট এ রায় দেন। পিটিশনে অভিযোগ করা হয়, এ পর্যন্ত ড্রোন হামলায় বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়া ছাড়াও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের অংশ হিসেবে কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানে ড্রোন হামলা ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। পেশোয়ার হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি দোস্ত মোহাম্মদ খানের নেতৃত্বে একটি বেঞ্চ পিটিশনগুলোর শুনানি করেন। রায়ে বলা হয়, ‘ড্রোন হামলা অবৈধ, অমানবিক ও জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী।’ এ হামলায় নিরপরাধ মানুষ নিহত হওয়ার বিষয়টিকে যুদ্ধাপরাধ বলেও আখ্যা দেন আদালত। গত বুধবার পিএমএলের (এন) নেতা নওয়াজ শরিফ বলেন, তিনি জয়ীহলে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ-বিরোধীলড়াইয়ে সহযোগিতা বন্ধ করে দেবেন।

ভোটের দিন আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনাতালেবানের

পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিন আত্মঘাতী হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে তালেবান। কট্টরপন্থী এই গোষ্ঠীর নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদের এক চিঠি থেকে এই পরিকল্পনার কথা জানা যায়। তালেবান হামলা ঠেকাতে নির্বাচনের দিন সেনাবাহিনী ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবে বলে জানা গেছে। কাল শনিবার পাকিস্তানে ভোট গ্রহণ হবে। পাকিস্তানি তালেবানের প্রধান মেহসুদ সংগঠনটির মুখপাত্রের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে নির্বাচনের দিন হামলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এতে দেশের চারটি প্রদেশেই আত্মঘাতী হামলা চালানোর কথা বলা হয়। ওই চিঠি বার্তা সংস্থা রয়টার্স গতকাল বৃহস্পতিবার হাতে পেয়েছে। চিঠিতে মেহসুদ বলেন, ‘আমরা নাস্তিকদের গণতন্ত্র নামের এই ব্যবস্থা মানি না।’ চিঠিতে ১ মে তারিখ উল্লেখ রয়েছে। তালেবানের হুমকির কারণে পাকিস্তানের ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারেনি। বিশেষ করে বিদায়ী ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান শরিক পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ও তার সহযোগী দলগুলো তালেবান হামলার শিকার হয়েছে। গত এপ্রিলে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকে তালেবান হামলায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল পিপিপির নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির ছেলে আলী হায়দার গিলানিকে অপহরণ করা হয়। তাঁর নেতৃত্বে ছোট একটি সমাবেশ হচ্ছিল। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল মুসলিম লিগ (পিএমএল-এন) ও সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এবং ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রতি তালেবানের কোনো হুমকি ছিল না। নওয়াজ ও ইমরান দুজনই পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন (মানুষবিহীন বিমান) হামলার বিপক্ষে এবং তালেবানের সঙ্গে সরকারের আলোচনার পক্ষে। এটাই তাদের পক্ষে তালেবানের সহানুভূতির মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভোটের দিন তালেবানদের হামলা ঠেকাতে চার প্রদেশেই দায়িত্ব পালনের ঘোষণা দিয়েছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল অসীম বাজা গতকাল জানান, সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা রয়েছে পাঞ্জাব প্রদেশে। এখানে নির্বাচনের দিন তিন লাখ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে ৩২ হাজার সেনাসদস্য থাকবেন। পাকিস্তানে তালেবানের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত পাখতুনখাওয়া প্রদেশে নির্বাচনের দিন ৯৬ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন থাকবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় ছয় লাখ নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সেনাসদস্য থাকবেন মোট ৫০ হাজার।

বাশারকে অবশ্যই সরে যেতে হবে: জনকেরি

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, সিরিয়া সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের স্বার্থে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে অবশ্যই সরে যেতে হবে। সিরিয়ার রক্তপাত বন্ধে গতকাল বৃহস্পতিবার ইতালিতে জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের জুদেহের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্র এ কথা বলেন। রোমে বৈঠকে জন কেরি বলেন, সিরিয়ার সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মতৈক্যের ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের লক্ষ্যে সব পক্ষই কাজ করছে। এর পরিষ্কার অর্থ হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনায় বাশারের কোনো স্থান নেই। বৈঠকে কেরি বলেন, সিরিয়ার শরণার্থীদের জন্য ১০ কোটি ডলারের বাড়তি মানবিক সহায়তা দেওয়া হবে। আর এ সহায়তার অর্ধেক ব্যয় হবে জর্ডানে আশ্রয় নেওয়া সিরীয় শরণার্থীদের জন্য। সিরিয়ায় লড়াই শুরুর পর বহু শরণার্থী জর্ডানে আশ্রয় নেয়। ওয়াশিংটন সিরিয়ার জনগণের জন্য এখন মানবিক সহায়তা হিসেবে ৫১ কোটি ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এ ছাড়া বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে আরও ২৫ কোটি ডলার সহায়তা দেবে। তবে বৈঠকের শুরুতে জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিরিয়ার রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিদিন সিরিয়া থেকে প্রায় দুই হাজার মানুষ জর্ডানে আশ্রয় নিচ্ছে। বর্তমানে জর্ডানে প্রায় পাঁচ লাখ ২৫ হাজার সিরীয় শরণার্থী আছে। জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশই সিরীয় শরণার্থী। আর পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ আমাদের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই হবে সিরীয় শরণার্থী।’ এ ছাড়া এ ধরনের পরিস্থিতি কোনো দেশের পক্ষেই এককভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।
বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিরিয়া সংকটের সমাধান খুঁজে বের করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন করার কাজ অব্যাহত আছে। এর আগে গত মঙ্গলবার তিনি মস্কোয় রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠকে সিরিয়ার সংকট নিরসনে একযোগে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন সিরিয়ার সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্মেলন করার বিষয়ে আগ্রহী। কাজেই আমরা সব পক্ষকে নিয়ে শিগগিরই এই সম্মেলন করতে পারব বলে আশা করছি।’  মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে সিরিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট ফোর্ড অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। রোমের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি-প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়েও আলোচনা করেছেন। এ মাসের শেষ নাগাদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ইসরায়েল সফরের কথা রয়েছে।

সিনেট কমিটিতে অভিবাসন বিল