Thursday, May 7, 2026

প্রজেক্ট ফ্রিডম: মার্কিন বিমানকে নিজ আকাশসীমা ব্যবহারের ‘অনুমতি দেয়নি’ সৌদি আরব ও কুয়েত

সৌদি আরব ও কুয়েত তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ পাহারার পরিকল্পিত নৌ-অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি ব্যবহার কিংবা সৌদি আরবের আকাশসীমা দিয়ে মার্কিন বিমান ওড়ার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সৌদি আরব।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, গত রোববার ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ঘোষণার সিদ্ধান্তে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেও ওই বিষয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি।

সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে বলেছেন, ‘সমস্যা হলো, সবকিছু খুব দ্রুত ঘটছে।’ তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সৌদি আরব সমর্থন করছে।

অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, আঞ্চলিক মিত্রদের আগে থেকেই এ অভিযান সম্পর্কে জানানো হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের একজন কূটনীতিক জানান, ট্রাম্পের প্রকাশ্য ঘোষণার পর শুধু ওমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এই কূটনীতিক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আগে ঘোষণা দিয়েছে, পরে আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করেছে। তবে এতে আমরা ক্ষুব্ধ নই।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আকস্মিক ঘোষণা সৌদি আরবের নেতৃত্বকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। এর পরপরই দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেয় যে, তারা এ পরিকল্পনায় সমর্থন দেবে না।

ইতিমধ্যে, মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, সৌদি আরবের পাশাপাশি কুয়েতও তাদের দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও আকাশসীমা ওই অভিযানে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দেয়।

ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত করার এক দিন পরই ইরানও এ ইস্যুতে তাদের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছে। ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থা বৃহস্পতিবার জানায়, হরমুজ প্রণালি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে তারা কারিগরি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

ইরান জানিয়েছে, তাদের জলসীমার কাছে থাকা জাহাজগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা নিতে পারবে।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই ও গালফ নিউজ

সুয়েজ খাল অতিক্রম করছে ফ্রান্সের রণতরি শার্ল দ্য গল। হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করার সম্ভাব্য অভিযানে অংশ নিতে রণতরিটিকে লোহিত সাগরের দক্ষিণে মোতায়েন করা হচ্ছে। ৬ মে ছবিটি প্রকাশ করে ফরাসি নৌবাহিনী
সুয়েজ খাল অতিক্রম করছে ফ্রান্সের রণতরি শার্ল দ্য গল। হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করার সম্ভাব্য অভিযানে অংশ নিতে রণতরিটিকে লোহিত সাগরের দক্ষিণে মোতায়েন করা হচ্ছে। ৬ মে ছবিটি প্রকাশ করে ফরাসি নৌবাহিনী। ছবি: এএফপি

লেবাননে যিশুর পর এবার মাতা মেরির মূর্তি অবমাননা ইসরায়েলি সেনার, ছবি ভাইরাল, ক্ষোভ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন ইসরায়েলি সেনা লেবাননে মাতা মেরির একটি মূর্তির পাশে বসে ‘অবমাননাকর’ আচরণ করছেন। ছবিটি প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়েছে।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের খ্রিস্টান শহর দেবলে ছবিটি তোলা। ছবিতে মুখে সিগারেট নিয়ে একজন ইসরায়েলি সেনাকে মাতা মেরির মূর্তির পাশে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তাঁর হাতে আরেকটি সিগারেট। ওই সেনা সেটি মাতা মেরির মূর্তির মুখের কাছে ধরে আছেন।

গত মাসে লেবাননের একই শহরে অভিযানের সময় ইসরায়েলি সেনারা যিশুর একটি মূর্তি ভাঙচুর করেছিলেন। ওই ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে ক্ষোভের মুখে দুজন ইসরায়েলি সেনাকে শাস্তি দেওয়া হয়।

ওই ঘটনায় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, যে সেনা মূর্তি ভাঙচুর করেছেন ও যিনি ছবি তুলেছেন—উভয়কে ৩০ দিনের সামরিক আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননে মাতা মেরির মূর্তি অবমাননা করে তোলা ইসরায়েলি সেনার এই ছবিটি। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করে ছবিটির অংশবিশেষ অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননে মাতা মেরির মূর্তি অবমাননা করে তোলা ইসরায়েলি সেনার এই ছবিটি। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করে ছবিটির অংশবিশেষ অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

লেবাননে ইসরায়েলি সেনার যিশুর মূর্তি ভাঙচুর, স্বীকার করল নেতানিয়াহু সরকার

দক্ষিণ লেবাননে এক ইসরায়েলি সেনা যিশুখ্রিষ্টের মূর্তি ভাঙচুর করছে—এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পরে ছবিটি সত্য কি না, তা যাচাইয়ে ইসরায়েল সেনাবাহিনী তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তদন্ত শেষে ইসরায়েল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ছবিটি আসল। ছবিতে তাদেরই একজন সেনাকে দেখা যাচ্ছে।

ওই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন ইসরায়েলি সেনা বড় আকারের একটি ভারী হাতুড়ি দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তির মাথায় আঘাত করছে। মূর্তিটি ক্রুশ থেকে খুলে পড়ে গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আজ সোমবার একটি পোস্টে ইসরায়েল সেনাবাহিনী বলেছে, তারা ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে’ দেখছে।

পোস্টে আরও বলা হয়, ‘ওই সেনার আচরণ তাদের সৈন্যদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।’

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, সেনাবাহিনীর নর্দান কমান্ড ঘটনাটি তদন্ত করেছে। বর্তমানে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সমাধান করা হচ্ছে।

আরব সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে এনডিটিভি বলেছে, যিশুর মূর্তি ভাঙার ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল সীমান্তবর্তী গ্রাম দেবলে। গ্রামটি খ্রিষ্টান–অধ্যুষিত।

দেবল পৌরসভা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলা হয়েছিল, যিশুর মূর্তিটি তাদের গ্রামেই অবস্থিত। তবে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা তারা নিশ্চিত করেনি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন শুরুর পর লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে আবারও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।

ইরানের সমর্থনে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালানোর পর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান শুরু করে। সেখানে এখন ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলছে।

তবে গত শুক্রবার যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ইসরায়েলি সেনারা এখনো দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করছে এবং সেখানে তারা প্রচুর বাড়িঘর গুড়িয়ে দিচ্ছে।

বড় একটি হাতুড়ি দিয়ে যিশুর মূর্তির মাথায় আঘাত করা হচ্ছে
বড় একটি হাতুড়ি দিয়ে যিশুর মূর্তির মাথায় আঘাত করা হচ্ছে। ছবি: ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিস তিরাভির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

যেভাবে হাতে হাতে পৌঁছে গেল রিদ্মিক কি-বোর্ড

সমাজ ও দেশের নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখা তরুণদের সম্মাননা জানানোর উদ্যোগ ‘স্টারশিপ ইন্সপায়ারিং টেন’। গত সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ১০ তরুণকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। ‘সফটওয়্যার প্রযুক্তি’ শাখায় সম্মাননাটি পেয়েছেন রিদ্মিক কি-বোর্ডের উদ্ভাবক মো. শামীম হাসনাত। তিনি লিখেছেন রিদ্মিক কি-বোর্ডের যাত্রার গল্প।

২০১২ সাল। ঈদুল ফিতরের ছুটি চলছে। তখন আমি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ছুটিতে হাতে অনেক সময়, কিন্তু করার কিছু নেই। কম্পিউটারের সামনে বসে পর্দায় চোখ রেখে মনে হলো, এভাবে সময় নষ্ট না করে নতুন কিছু শেখা দরকার।

সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে জাভা প্রোগ্রামিং শেখানো হচ্ছিল। অনুশীলন শুরু করলাম। প্রতিদিন কম্পিউটার খুলে কোড লিখতাম, ছোট ছোট প্রোগ্রাম, অন্য ভাষায় করা কোড আবার জাভায় করা ইত্যাদি।

একদিন ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে একটি ওয়েবসাইট চোখে পড়ল। সেখানে যেকোনো ভাষার শব্দ টাইপ করলে ইউনিকোড, কোডপয়েন্ট, অন্যান্য ফরম্যাটসহ নানা আকারে দেখা যায়। এসব আমার কাছে একেবারেই নতুন। আগে ভাবতাম, বর্ণ মানে শুধুই বর্ণ। কিন্তু ওয়েবসাইটটি ঘাঁটাঘাঁটি করে বুঝতে পারলাম, প্রতিটি বর্ণের পেছনে লুকিয়ে আছে একটি কোড, একটি সংখ্যা।

প্রথমবার উপলব্ধি করলাম, ভাষা আর প্রযুক্তি একে অপর থেকে আলাদা নয়। যেখানে একটি বর্ণও কোডে রূপান্তরিত হয়, তারপর ফন্টের মাধ্যমে আবার চোখের সামনে ফিরে আসে।

সেখান থেকেই শুরু হলো ফোনেটিক কনভার্শনের জন্য কোড লেখা। বিষয়টা হলো কেউ যদি ইংরেজিতে ‘ami’ লেখেন, সেটা বাংলায় ‘আমি’ হয়ে যায়। প্রথম দিকে খুব সহজ কোড হলেও এরপর আসে যুক্তবর্ণ, রেফ, তিন বর্ণের যুক্তবর্ণ, র-এর সঙ্গে য-ফলা লেখার বিশেষ পদ্ধতি ছিল বেশ জটিল।

কখনো এক অক্ষর ঠিকভাবে পরিবর্তন হচ্ছিল না, কখনো পুরো শব্দ উল্টো দেখাচ্ছিল। কিন্তু প্রতিটি সমস্যার সমাধান মানে ছিল নতুন শেখা। ছোট ছোট সেই সাফল্যই আমাকে আরও গভীরে টেনে নিয়ে গেছে।

অ্যান্ড্রয়েডে নিজের কি-বোর্ড

২০১২ সালে হঠাৎ একদিন মনে হলো, এটি দিয়ে তো একটি অ্যান্ড্রয়েড কি-বোর্ড তৈরি করা যায়। তখন স্মার্টফোন সবে জনপ্রিয় হচ্ছে। মাসখানেক হয় আমিও ব্যবহার করছি। তাই অ্যান্ড্রয়েড ডেভেলপমেন্টের অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে কয়েক মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যান্ড্রয়েড ডেভেলপমেন্ট নিয়ে সেমিনার হয়েছিল। সেই ভিডিও ছুটির আগে ডাউনলোড করে রেখেছিলাম। ভিডিও দেখেই অ্যান্ড্রয়েড ডেভেলপমেন্টের জন্য ‘কোড এডিটর’ সেটআপ করে নিই।

এভাবেই শুরু হয় আমার কি-বোর্ড তৈরির কাজ। শুরুতে নিজে ব্যবহার করার জন্যই তৈরি করছিলাম। এ কারণে শুধু ফোনেটিক ইনপুট ছিল। পরে ভাবলাম, গুছিয়ে নিলে প্লে স্টোরে প্রকাশ করা যাবে। সবাই ফোনেটিকে অভ্যস্ত নয়, তাই ইউনিজয় ও একই জাতীয় লে–আউট যোগ করে দিলাম।

একাধিক লে–আউট থাকায় তা বদলানোর জন্য একটা বাটন দরকার হলো। স্পেস বাটনের প্রতিসাম্য রক্ষা করতে স্পেস বাটনে ‘সোয়াইপ’ করে ভাষা পরিবর্তনের পদ্ধতি আনলাম। পরে ইমোজির জন্যও বাটন দরকার হলো, আবার প্রতিসাম্য রক্ষা করতে স্পেস বাটনে দীর্ঘ চাপ দিলে ইমোজি দেখাবে, এমন পদ্ধতি ব্যবহার করলাম। এভাবেই তৈরি হলো অ্যান্ড্রয়েড কি-বোর্ড।

কোটি মানুষের হাতে যেভাবে গেল

কি-বোর্ড তৈরি হওয়ার পর মনে হলো, এটা কি সত্যিই প্রকাশ করার মতো কিছু হয়েছে? নিজের জন্য করা, তাই প্রকাশে দ্বিধা ছিল অনেক। এরপরও অনেকেই সেটি প্লে স্টোরে প্রকাশে উৎসাহ দিয়েছিলেন।

কিন্তু প্লে স্টোরে প্রকাশের জন্য তো একটা নাম আর লোগো দরকার। বন্ধুদের দেওয়া নামগুলো পছন্দ করতে পারছিলাম না। তখন আরেক বন্ধু নাহিয়ান ইসলাম মেসেজ করে ‘Ridmik’ নামটি প্রস্তাব করে। সে সম্ভবত ‘rhythmic’ (রিদমিক) শব্দটাকে সংক্ষিপ্ত করে ‘Ridmik’ লিখেছিল। তবে এই রূপান্তরিত (মেটাপ্লাজম) শব্দ আমার বেশ পছন্দ হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশের হলে থাকা স্কুলবন্ধু নাঈম ইসলাম লোগো তৈরি করে দিল। এরপর ২০১৪ সালে কপিরাইট সমস্যার কারণে অ্যাপটিকে আবার নতুন করে প্রকাশ করার প্রয়োজন হয়। তখন লোগোর মূল ফাইল হারিয়ে যাওয়ায় নাঈম আবার নতুন লোগো তৈরি করে দেয়। পরে নতুন লোগো ও নাম দিয়ে কি-বোর্ডটি প্লে স্টোরে প্রকাশ করা হয়। এভাবেই শুরু হয় রিদ্মিক কি-বোর্ডের যাত্রা।

রিদ্মিক কি-বোর্ড কোনো ‘বড় প্রকল্প’ নয়। এটি ছিল এক তরুণ, মানে আমার শেখার গল্প মাত্র। সেটাই আজ কোটি মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের অংশ হয়ে গেছে। সেই অলস দুপুরে যদি না ভাবতাম ‘কিছু একটা শেখা দরকার’, তাহলে হয়তো এই গল্পটার জন্ম হতো না।

প্রযুক্তি শুধু সুবিধা নয়

ইন্টারনেটের সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০৭-০৮ সালে, মুঠোফোনের ছোট স্ক্রিন দিয়ে। তখন দেখেছি, দেশের তরুণেরা টু-জি ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিজ হাতে মুঠোফোন সাইট বানাচ্ছে—রিংটোন, ওয়ালপেপার, ছোট ছোট গেম শেয়ার করার জন্য। কেউ আবার মুঠোফোনে অনলাইন ফোরামও চালাচ্ছিল। এসব আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। আজকের প্রজন্ম আরও এগিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ফাঁকেই তাঁরা স্টার্টআপ, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, অ্যাপ ও গেম তৈরি করছেন, কোম্পানি পর্যন্ত খুলছেন।

সঠিকভাবে ব্যবহৃত প্রযুক্তি পারে বৈষম্যের দেয়াল ভাঙতে, সবাইকে একই সুযোগের পরিসরে আনতে। একসময় যে সুযোগ ছিল কেবল শহরের বা বিশেষ কিছু প্রতিষ্ঠানের মানুষের জন্য, স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের কল্যাণে আজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে সেই সুযোগ।

আজ ইউটিউবে যে কেউ পেতে পারে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, প্রোগ্রামিং শেখার টিউটোরিয়াল কিংবা ডিজাইন শেখার ভিডিও। একসময় যেসব বিষয় শেখা ছিল ব্যয়বহুল বা অপ্রাপ্য, এখন সেসব এক ক্লিক দূরত্বে। দ্রুতগতির ইন্টারনেট এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

রিদ্মিক ল্যাবস থেকে ২০২০ সালে আমরা নিজের লেখা বই প্রকাশ ও পড়ার জন্য ‘বইটই’ নামে একটি অ্যাপ চালু করেছি। টিকটক, রিলস বা ছোট ভিডিওর জোয়ারেও ঢাকার বাইরের নতুন–পুরোনো অনেক লেখক-লেখিকা বই প্রকাশ করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন। অনেকেই মুঠোফোনেই বই লিখে ঢাকার মাঝারি থেকে বড় চাকরির সমপরিমাণ আয় করছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাঠকেরাও সহজে বই পড়তে পারছেন। সঠিকভাবে ব্যবহার করা প্রযুক্তি যে বৈষম্য কমাতে, সবাইকে সমান সুযোগ দিতে এবং প্রতিভা প্রকাশের পথ খুলে দিতে পারে, এটাই তার উদাহরণ।

প্রযুক্তির এই গণতন্ত্রায়ণই তৈরি করছে এমন এক পৃথিবী, যেখানে প্রতিভা আর পরিশ্রমই হয়ে উঠছে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড। লিঙ্গ, জাতি, ভাষা বা অর্থনৈতিক অবস্থান নয়—যার মধ্যে আছে শেখার আগ্রহ, সে-ই এগিয়ে যাচ্ছে।

তরুণেরাই বদলে দেবে ভবিষ্যৎ

যদি কোনো কিছু সত্যিই ভালো লাগে, তবে সেখানে অসাধারণ কিছু করা যায়। নিজের আগ্রহ থেকেই আসে মনোযোগ আর ধৈর্য; যা শেখার পথকে সহজ করে। এমনকি এটি মানসিক শক্তিকেও দৃঢ় করে, চাপ বা ব্যর্থতার সময়ে এই প্রিয় কাজটাই হয়ে ওঠে আশ্রয়।

যাঁরা ভাবছেন, ‘আমি কী করতে পারি?’ তাঁদের বলব, বড় কিছু করতে ‘বড় কিছু’ লাগে না। দরকার কৌতূহল, শেখার আগ্রহ আর হাল না ছাড়া ধৈর্য। ভুল হবে, হতাশা আসবে, কেউ হয়তো গুরুত্ব দেবে না, কিন্তু প্রতিটি ভুলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে শেখার পথ।

তরুণ প্রজন্ম প্রমাণ করছে, বয়স কোনো বাধা নয়, বরং সাহস ও সৃষ্টিশীলতাই বড় শক্তি। যে কৌতূহল থেকে একদিন তৈরি হয়েছিল রিদ্মিক কি-বোর্ড, সেই একই কৌতূহল হাজারো তরুণকে অনুপ্রাণিত করছে নতুন কিছু করতে। সেই নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই তৈরি হবে আরও বড় গল্প; যা বদলে দেবে ভাষা, সমাজ আর আমাদের ভবিষ্যৎ।


রিদ্মিক কি-বোর্ডের উদ্ভাবক মো. শামীম হাসনাত
রিদ্মিক কি-বোর্ডের উদ্ভাবক মো. শামীম হাসনাত। ছবি: দীপু মালাকার

ভাঙাগড়ায় মেকানিক্সের দুই দশক

পথচলার দুই দশক পূর্ণ করেছে রক ব্যান্ড মেকানিক্স। এ উপলক্ষে দেশজুড়ে কনসার্টে ব্যস্ত আছে ব্যান্ডটি। মেকানিক্সের পথচলা ও পরিকল্পনা শুনেছেন নাজমুল হক

সময়টা ২০০৫ সাল। ক্যারিয়ার ও জীবনের নানা বিষয় নিয়ে নিয়মিত আড্ডা দিতেন দুই বন্ধু আফতাবুজ্জামান ত্রিদিব ও শেখ রিয়াজ। আড্ডায় ঘুরেফিরে আসত সংগীতের কথা। একসময় তাঁরা ভাবলেন, এমন একটি ব্যান্ড গড়বেন, যেটি সমাজ ও দেশের কথা বলবে, যেখানে থাকবে তাঁদের জীবনধারা ও চিন্তাভাবনার প্রতিচ্ছবি।
সে বছরের ২৩ নভেম্বর ধানমন্ডির মিউজিক ম্যানিয়ায় প্রথম প্র্যাকটিস সেশন করেন তাঁরা। ত্রিদিব (ভোকাল), রিয়াজের (ড্রামস) সঙ্গে যোগ দেন রুশো খান (বেজ) ও তামজীদ খান (গিটার)। এক মাসের মধ্যেই ব্যান্ডে যোগ দেন গিটারিস্ট ইমরান আহমেদ—এভাবেই জন্ম নেয় মেকানিক্স।
প্রথম ছয় মাস টানা প্র্যাকটিসে কাটে। ব্যান্ডের সদস্যদের শপথ ছিল—নিজেদের শতভাগ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো কনসার্ট নয়। ত্রিদিব বলেন, ‘এই কঠিন সিদ্ধান্তের কারণেই আমাদের প্রথম শো থেকে আজ পর্যন্ত কখনো কনসার্ট খুঁজতে হয়নি, বরং কনসার্টই আমাদের খুঁজে নিয়েছে।’

পরিচিতি ‘ডি রকস্টার’ থেকে
২০০৭ সালে ডি রকস্টারের দ্বিতীয় সিজনে অংশ নেয় মেকানিক্স। সেমিফাইনালে থামলেও দেশজুড়ে পরিচিতি পায় তারা। ত্রিদিব বলেন, ‘শুরুতে আমাদের মধ্যে তেমন কোনো প্রত্যাশা ছিল না। ভাবতাম, এই ঘরানার গান হয়তো সাধারণ শ্রোতা নেবে না।’ অডিশন রাউন্ডে বিচারক শাফিন আহমেদ, এরশাদ জামান ও টনি (ব্ল্যাক) তাঁদের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন। ত্রিদিব স্মরণ করেন, ‘শাফিন ভাই স্টেজ থেকে নেমে এসে আমাদের সঙ্গে হাত মেলালেন। তখনই মনে হয়েছিল, উই ক্যান ডু ইট! পর্বটি প্রচারের পর দেখি, সারা দেশ আমাদের নিয়ে কথা বলছে।’ মূল প্রতিযোগিতায় বিচারক বেজবাবা সুমন ও পার্থ বড়ুয়া তাঁদের পাশে ছিলেন। সেই সময়ের ‘কালো বিক্ষোভ’ ও ‘অপরাজেয়’ গান দুটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া তোলে।

ভাঙাগড়ার গল্প
ব্যান্ডজগতে ভাঙা-গড়া স্বাভাবিক, তবে মেকানিক্সের জন্য সেটা ছিল কঠিন বাস্তবতা। ২০০৮ সালে প্রথম অ্যালবাম অপরাজেয়-র কাজ শুরুতেই ব্যান্ড ছাড়েন ইমরান আহমেদ। যোগ দেন জেহীন আহমেদ। পরের বছর ইকবাল আসিফ জুয়েল-এর মিক্সড অ্যালবাম রক ২০২-এ প্রকাশিত হয় মেকানিক্সের প্রথম গান ‘ধ্রুবসর’, যা এখনো ব্যান্ডটির সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর একটি।
২০১০ সালে প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য রুশো ব্যান্ড ছাড়েন। তাঁর জায়গায় বেজিস্ট হিসেবে যোগ দেন নাদভী ওয়ালিদ। এই লাইনআপ নিয়েই ২০১১ সালে প্রকাশিত হয় মেকানিক্সের প্রথম অ্যালবাম ‘অপরাজেয়’ ডেডলাইন মিউজিকের ব্যানারে।

কঠিন সময়ের লড়াই
২০১৩ সাল মেকানিক্সের জন্য ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়। ব্যক্তিগত কারণে ব্যান্ড ছাড়েন গিটারিস্ট তামজীদ, আর বিদেশে চলে যান নাদভী। ব্যান্ডের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। নতুন সদস্য হিসেবে যোগ দেন শাহেদ (গিটার) ও তানিম পাবেল (বেজ)। ২০১৪ সালে রক টেন মিক্সড অ্যালবামে প্রকাশিত হয় তাঁদের গান ‘এলিজি’, যা শ্রোতাদের মধ্যে প্রশংসা পায়।
কনসার্টে ব্যস্ত সময়েই অসুস্থ হয়ে পড়েন জেহীন আহমেদ। পাকস্থলীর জটিলতা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছিলেন তিনি। কিছুদিন গেস্ট মেম্বারদের নিয়ে পারফর্ম করে ব্যান্ড। পরে ২০১৬ সালে জেহীন কিছুটা সুস্থ হলে আবার মঞ্চে ফেরে মেকানিক্স। সেই সময় বেজে আবার যোগ দেন নাদভী, আর গিটারিস্ট শাহেদের জায়গায় আসেন সাফাত চৌধুরী। ত্রিদিব, জেহীন, রিয়াজ, সাফাত ও সালেক—এই পাঁচজন মিলে আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করেন।

জেহীনের চিরবিদায়
২০১৭ সালের ২২ জুলাই—মেকানিক্সের জন্য এক শোকের দিন। এদিন মারা যান গিটারিস্ট জেহীন আহমেদ। তখন ব্যান্ডের কার্যক্রম অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ত্রিদিব বলেন, ‘জেহীনের চলে যাওয়াতে আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। এও মনে হচ্ছিল, মেকানিক্স থেমে গেলে আমরা নিজেরাও হয়তো টিকে থাকতে পারব না। তখন আবার নতুন করে ব্যান্ডের কার্যক্রম শুরু করি।’
পরে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, জেহীনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আবার শুরু করবেন। নতুনভাবে ব্যান্ডে যোগ দেন গেস্ট মেম্বার শুভ্র। জেহীনসহ সাবেক সদস্যদের স্মরণ করে প্রকাশিত হয় গান ‘নিয়তি’, যা শ্রোতাদের কাছে গভীরভাবে পৌঁছায়।

সংকট কি শেষ হলো
নাহ, ভাঙা-গড়ার এ খেলা শেষ হয়নি। ২০১৮ সালের শেষের দিকে মেকানিক্স ছাড়েন সালেক। আর একক ক্যারিয়ারের মনোযোগ দিতে ব্যান্ড ছাড়েন শুভ্র। এরপর ২০১৮ সালের শেষের দিকে গিটারে সাইফ ইরফান এবং বেজিস্ট হিসেবে যোগ দেন সৌমিক ইসলাম। ত্রিদিব বলেন, ‘সাইফ আর সৌমিককে পেয়ে যেন আশার আলো দেখতে পাই। সাইফের সঙ্গে আমাদের কেমিস্ট্রি ছিল অনেক আগে থেকেই। সে একজন অসাধারণ গিটারিস্ট। আর সৌমিক অত্যন্ত দক্ষ মেটাল প্লেয়ার। এখন এই লাইনআপেই আছি আমরা। আমাদের ব্যবস্থাপক মিঠুন হাসানের কথা বলব, ২০১৫ সাল থেকে আমাদের এই জার্নিকে অনেক সহজ করেছেন তিনি।’

দুই দশকের উদ্‌যাপন
২০ বছর পূর্তিতে দেশজুড়ে চলছে মেকানিক্সের কনসার্ট ট্যুর। ইতিমধ্যে তারা পারফর্ম করেছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও যশোরে। আরও কয়েকটি জেলায় শো করার পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকায় একটি বড় কনসার্ট আয়োজনের পরিকল্পনা চলছে, যেখানে পুরোনো সদস্যদেরও দেখা যাবে মঞ্চে। ত্রিদিব বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, সংগীত পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে। মেকানিক্সকে আরও অনেক দূর নিয়ে যেতে চাই। যদি ওয়ারফেজের মতো ৪০ বছর ধরে টিকে থাকতে পারি, সেটাই হবে আমাদের সাফল্য। আসলে ব্যান্ডের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সেই বোঝাপড়া, যেখানে আমার মনের কথা না বললেও অন্যজন তা বুঝে নেয়। ২০ বছরের এই পথচলায় সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় জয়।’

‘মেকানিক্স’ এর সদস্যরা
‘মেকানিক্স’ এর সদস্যরা। ছবি: ব্যান্ডের সৌজন্যে