Saturday, June 18, 2022
গুপ্তচর হিসেবে কাজ করবে জলজ প্রাণী!
এমনটি অবশ্য যতটা নতুন মনে হচ্ছে আসলে তা নয়। ১৯৬০ এর দশকেই মার্কিন নৌবাহিনী ডলফিনকে প্রশিক্ষণ দিতো সমুদ্রে মাইন শনাক্ত করা এবং ডুবে যাওয়া নৌ সদস্যদের উদ্ধারে। রাশিয়াও একই ধরনের কাজ করতো। এছাড়া, হাঙ্গর, ইঁদুর এবং কবুতরও বহু বছর ধরে এধরনের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউএস ডিফেন্স এডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি বা ডারপা সমুদ্রের বড় মাছ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র প্রাণী- সবকিছুকে পানির নিচের সতর্কতা বৃদ্ধির কাজে লাগানোর ওপর গবেষণা করছে।
পার্সিসটেন্ট অ্যাকুয়াটিক লিভিং সেন্সর প্রোজেক্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. লরি অ্যাডোর্নাটো বলেন, "সমুদ্র তলদেশে কোন বাহন চলাচল করলে এসব সামুদ্রিক জীবগুলোর প্রতিক্রিয়া কী হয় - আমরা সেটাই বোঝার চেষ্টা করছি।"
ডারপা'র গবেষণায় দেখা গেছে এমনও কিছু সামুদ্রিক প্রাণী রয়েছে যাদের শরীর থেকে এক ধরনের আলোর বিচ্ছুরণ হয় কোন কিছুর আগমন ঘটলে। তবে তারা সামুদ্রিক জীবের বিভিন্ন পরিবর্তন আরো ভালোভাবে বোঝার জন্যে সাবমেরিন এবং সমুদ্রে নিচে চলার উপযোগী ড্রোন ব্যবহার করেছে।
এমনই একটি প্রোজেক্টের সহ সভাপতি ভার্ন বয়েল বলেন, "আমরা এসব জীবের বিভিন্ন আচরণের পরিবর্তন বুঝতে চাই প্রাকৃতিক কারণ ও মানব সৃষ্ট কারণের মাঝে।"
আর এর জন্যে খুবই উন্নত যন্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাগরের তলদেশের গোলিয়াথ গ্রুপ- যেগুলো ২.৫ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যে বাড়তে পারে- তারা একধরনের শব্দ সৃষ্টি করে যখন ডুবুরিরা নিজেদের মধ্যে কোন যোগাযোগ করে। কিংবা নতুন কোন বস্তু তাদের আবাসস্থলে ঢোকার চেষ্টা করলেও তারা কৌতূহল দেখায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এমন অনেক প্রজাতির মাছ আছে যারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টির জন্যে কিংবা বাইরের কোন বিপদের আশঙ্কা থাকলে শব্দ সৃষ্টি করে।
এই প্রকল্পটির অংশীদার রেদন বিবিএন টেকনোলজির অ্যালিসন লাফেরিয়র বলেন, "যদি কোন নৌযান এসব প্রাণীগুলোর কাছাকাছি আসে, তাহলে মনে করা হচ্ছে যে তারা তাদের আচরণ পরিবর্তন করবে এবং সেটি আমরা পরিমাপ করতে পারবো।"
লাফেরিয়র বলেন যে তারা এখনো এই গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে আছেন। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ডে চালানো পরীক্ষার তথ্য উপাত্ত তারা বিশ্লেষণ করছেন। তাদের মতে, সামুদ্রিক জীবের আচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে।
ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এর গবেষক ড. হেলেন বেইলি বলেন, "আমরা বেশকিছু সেন্সর কিছু মাছের শরীরে লাগিয়ে দিয়েছি। সুতরাং এখন আমরা তাদের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করতে পারছি।"
তিনি বলেন যে, সাগরে প্রতিপক্ষের ডুবোজাহাজের বিপক্ষে গড়ে তোলা সতর্ক ব্যবস্থাকে কম খরচে করা সম্ভব নয়। উড়োজাহাজ, নৌযান, হাইড্রোফোন প্রযুক্তি, তদারকি প্রযুক্তি এর সবই খুবই ব্যয়বহুল এবং এসব দিয়ে সমুদ্রের খুব অল্প অংশেই নজরদারি রাখা সম্ভব।
আর এর পরিবর্তে সাগরতলের কোন নৌযানের উপস্থিতি টের পেতে সমুদ্রের জীবগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে বিশাল অঞ্চলকে তদারকির মধ্যে রাখা যায় বলে মনে করেন লাফেরিয়র।
ধরা যাক অল্প গভীরের চিংড়ির কথা। তারা অনবরত তাদের দুটি দাঁড়া খুলে এবং বন্ধ করে একধরনের শব্দ করতে থাকে। আর বিশেষ লয়ে তৈরি করা এই শব্দ কাছের কোন বস্তুতে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবারো ফিরে আসে।
প্রচলিত শোনার সিস্টেমের মতো, শব্দ সংকেত ফিরে আসার সময় পরিমাপ করে বস্তুটির দূরত্ব আকার ইত্যাদি পরিমাপ করা যায়। পরোক্ষভাবে এমন করেও শত্রু পক্ষের ওপর নজরদারি রাখা যায় বলে মনে করেন লাফেরিয়র।
সুতরাং যদি চিংড়ির একটি বিশাল ঝাঁক থাকে তাহলে কেন আর অনেক অর্থ ব্যয় করে শত্রুর ডুবোজাহাজ শনাক্তের ব্যবস্থা করা?
কিন্তু এইসব প্রকল্প কি আদৌ বাস্তবসম্মত?
গবেষকরা বলছেন যে, বিশ্বব্যাপীই প্রাণীদের এই সংকেত আদান-প্রদান বা তাদের আচরণ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা চলছে। তাদের আচরণের পরিবর্তন আমাদের সংকেত দেয়। গৃহপালিত কুকুর বা ক্যানারি পাখির সাহায্যে যা বহু আগে থেকেই হয়ে আসছে।
তাদের মতে, প্রাণী ও উদ্ভিদ জগত মানুষের তথ্যের ভাণ্ডারে এনে দিতে পারে এক বিশাল বিপ্লব। সূত্র : বিবিসি।
![]() |
| গুপ্তচর, অস্ত্র পরিবহন বা সতর্কতা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রাণীদের ব্যবহারের ইতিহাস পুরনো - সংগৃহীত |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Wednesday, June 15, 2022
ইতিহাসের ভয়ংকর ৫ বন্দিশালা, এখন জাদুঘর
টাওয়ার অফ লন্ডন
![]() |
| টাওয়ার অফ লন্ডন |
রোবেন আইল্যান্ড, আফ্রিকা
![]() |
| রোবেন আইল্যান্ড বন্দিশালা |
আলকাট্রাজ ফেডারেল পেনিটেনশিয়ারি, সানফ্রানসিসকো
![]() |
| আলকাট্রাজ ফেডারেল পেনিটেনশিয়ারি বন্দিশালা |
ডেভিলস আইল্যান্ড, ফ্রান্স
![]() |
| ফ্রান্সে অবস্থিত ডেভিলস আইল্যান্ড বন্দিশালা |
টুল স্লেং জেনোসাইড, কম্ববোডিয়া
![]() |
| কম্ববোডিয়ার টুল স্লেং জেনোসাইড বন্দিশালা |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গল্প- অপূর্ব এক গোধূলিবেলা by ইমদাদুল হক মিলন

অনেক দূরের ওই যে আকাশ নীল হলো
আজ তোমার সাথে আমার আঁখির মিল হলো …
তোমার সঙ্গে আমার আঁখির মিল হয়েছিল কবে, মায়া?
ওই যে বিকালবেলা তুমি আমাকে পুকুরঘাটে ডেকে আনলে, তার আগে বললে, বাচ্চুকে পছন্দ করে বকুল, শুনে আমি কিন্তু খুব অবাক হইনি। আমি তো বোকা নই। বুদ্ধিসুদ্ধি কিছুটা আছে। লেখাপড়া করেছি। শিক্ষিত বাবার ছেলে। আমি কি খেয়াল করিনি স্বর্ণগ্রামের বাড়িতে, দীননাথ সেন রোডের বাড়িতে বাচ্চু এলেই তার চোখ এদিক-ওদিক ঘুরতো। কাকে খুঁজতো সেই চোখ সেটুকু বোঝার ক্ষমতা কি আমার ছিল না?
ছিল।
আমি বুঝতাম।
আমি সবই বুঝতাম।
বকুলের চঞ্চলতাও আমি বুঝতাম। বাচ্চুকে দেখলেই বোনটির মুখটা কেমন উজ্জ্বল হয়। চোখদুটো আনন্দে নাচে। হাসির শব্দও যেন বদলে যায়। বাচ্চুর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য একটু যেন জোরেই কথা বলে, একটু যেন বেশিই হাসে।
এই বয়সী ছেলেমেয়েদের কেন এমন হয়, আমি কি বুঝি না!
তবে সম্পর্ক ওদের তেমন গভীর হতে পারেনি। ওই ভালো লাগা পর্যন্তই। দুজন দুজনকে ভালোবাসে, দুজন দুজনকে চায় – সেসব মুখে কেউ কাউকে বলতে পেরেছে কিনা, বা চিঠি লেখালেখি হয়েছে কিনা জানি না।
আহা রে, আহা।
বাচ্চু জানেই না, তার বন্ধুর বোনটি, তার পছন্দের মেয়েটি, যাকে নিয়ে সে হয়তো স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, দেশ স্বাধীন হবে, যুদ্ধ শেষ করে ফিরে এসে সে বকুলের সামনে দাঁড়াবে, হয়তো সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে বলবে, তোমাকে আমি চাই।
বকুল হয়তো সেই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিল।
বাচ্চু এখন বিলোনিয়ার ওদিকটায় যুদ্ধ করছে। জানেও না তার স্বপ্ন কীভাবে চুরমার হয়ে গেছে, ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার বোনটি হয়তো ভোরবেলার ওই সময়টায় স্বপ্ন দেখছিল তার মনের কোণে লুকিয়ে থাকা মানুষটির। হয়তো সেই মানুষটির মুখ তখন স্বপ্নের ভেতরে ছিল বকুলের চোখ জুড়ে।
আহা রে, আহা?
বাচ্চু আর আমি ছেলেবেলার বন্ধু। একই বয়সের। তাও বাচ্চুর আগে আমার সবকিছু হয়ে গিয়েছিল। খালাতো বোনের সঙ্গে প্রেম। ধুমধাম করে বিয়ে। গভীর ভালোবাসায় ডুবে সন্তানের পিতা হওয়া। সবকিছু, সবকিছুই তাড়াতাড়ি হলো। এক বন্ধু বাবা হতে চললো আরেক বন্ধু হয়তো তখনো তার ভালো লাগার মানুষটিকে, মনের মানুষটিকে বলতেই পারেনি, তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে চাই। এসো, আমার হাত ধরো!
বকুল কি নীল কাগজে গোলাপ পাপড়ি ছড়ানো চিঠি লিখতে পেরেছিল বাচ্চুকে? তুমি যেভাবে আমাকে লিখেছিলে? যেভাবে আমাকে লিখতে?
আমি লিখেছি।
আমিও তোমাকে অনেক চিঠি লিখেছি।
একই বাড়িতে থেকেও চিঠি লেখালেখি? অদ্ভুত না!
তুমি বলতে, চিঠি পড়ার আনন্দ অতুলনীয়। আমি যখন তোমাদের বাড়িতে না থাকি, তোমার চোখের সামনে না থাকি, তখন দোতলার খাটে শুয়ে শুয়ে তুমি আমার চিঠি পড়ো। একই চিঠি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বহুবার পড়ো। প্রথমে তোমার গ্রামোফোন, পরে চেঞ্জার, সেখানে গান বাজছে, লতা মুঙ্গেশকরের গান –
প্রেম একবার এসেছিল নীরবে
আমার এ দুয়ারও প্রামেত্ম
সে তো হায়, মৃদু পায় …
আমাদের প্রেম কি নীরবে এসেছিল, মায়া?
না। নীরবে আসেনি। মোটামুটি জানান দিয়েই এসেছিল। বাচ্চু আর বকুলের কথা বলতে বলতে তুমি আমাকে নিয়ে গেলে পুকুরঘাটে।
মনে আছে?
সেই অবিস্মরণীয় বিকালবেলাটির কথা তোমার মনে আছে?
তার আগে প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে আমরা একটু হাসি-আনন্দ করলাম, মজা করলাম।
এই যে চাঁদের এক টুকরো মোহন আলো এসে এখন তোমার মুখে পড়েছে, সেই বিকালে, গোধূলিবেলায় তোমার মুখে এসে পড়েছিল অসামান্য এক টুকরো আলো। ওই আলোকেই কি ‘কনে দেখা আলো’ বলে?
কনে দেখা নাকি প্রেমিকা দেখা আলো?
গভীর ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে থাকা কোনো মুখ দেখা আলো!
কী নাম সেই আলোর?
আল্লাহপাক মানুষের পবিত্রতম মুহূর্তের জন্য কি তৈরি করেছেন ওই আলো। ঠিক ওই মুহূর্তেই কি তিনি তাঁর ওই মহান আলোটুকু পাঠান কারো জন্য? একজনের মুখে সেই আলো পড়ে, আরেকজন আলোয় ভাসা মুখখানি দেখে বুঝে যায়, এই মুহূর্তে এ-জীবন অন্যরকম হয়ে গেল। তার জন্য যে-মানুষটি নির্বাচন করা হয়েছে, এতকাল মনের রহস্যময় অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা মানুষটি এই মাত্র তার সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে। এই তো এক মানুষ খুঁজে পেয়েছে আরেক মানুষকে। যার আসার কথা ছিল, এই তো সে এসেছে। স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা। আর রাজকন্যার কাছে তার স্বপ্নে দেখা রাজপুত্র।
তুমি এমন করে আমার দিকে তাকালে, এমন করে তাকিয়ে থাকলে, তোমার চোখে পলক পড়ে না, তোমার চোখের তারা একটুও কাঁপে না, নাকি কাঁপে, সেই মহান আলোয় তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমিও গেছি বিহবল হয়ে। আমিও তাকিয়ে আছি তোমার মতো করেই। গোধূলিবেলার আলোয় মগ্ন দুটি মানুষ, অনেক দূরের আকাশ সেদিন নীল, গভীর নীল। হাওয়ায় সবুজ পাতার গন্ধ, নাকি বিকালবেলায় ফুটে ওঠা কোনো ফুলের গন্ধ, গন্ধ নাকি সুবাস, পুকুরজলে আলো-ছায়ার ঝিলিমিলি খেলা। এক ঘোরলাগা প্রকৃতি। লিচুগাছগুলোর ওদিকটায় ডাকছিল দিনশেষের পাখি। দুজন মানুষ, দুজনে মগ্ন হয়ে বসে আছে মুখোমুখি।
আমি বুঝে গেলাম, আমি বুঝে গেলাম মায়া, আমার শরীর-মন বলে দিলো, তুমি আমার, আমার!
সন্ধ্যা হয়ে এলো। ফেরার সময় তুমি শুধু একটা কথা বললে, আমাকে আর তুই করে বলবে না।
পরদিন নীল কাগজে গোলাপ পাপড়ি-ছড়ানো চিঠি। সে ছিল এক অদ্ভুত চিঠি। শুধু একটি শব্দ লেখা। ভালোবাসি।
পুরো পৃষ্ঠায় শুধু ওই একটি শব্দ।
একশ একবার লেখা। ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি …
এক অনন্ত ভালোবাসায় আমরা ডুবে গেলাম।
তোমাদের বাড়ির কাজের বুয়া চিঠিটা এনে দিয়েছিল। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। রাতের বেলা। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে যাবো, তখন। বললাম, কী?
তা তো জানি না। আফায় দিছে।
ঠিক আছে, তুমি যাও।
বুয়া চলে যাওয়ার পর খুললাম চিঠি। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলাম। সারারাত কত স্বপ্ন তোমাকে নিয়ে। শুধু তোমার মুখটাই চোখ জুড়ে সারারাত। আমার হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় রবীন্দ্রনাথের গান –
ভালোবাসি, ভালোবাসি –
এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি
আমার জলে-স্থলে, আকাশে-বাতাসে, গাছের পাতায় পাতায়, আলো অন্ধকারে সর্বত্র তখন শুধু ওই একটি মাত্র শব্দ, ভালোবাসি, ভালোবাসি।
পাখির ডাকে, জোনাকির আলোয়, ভ্রমর গুঞ্জনে শুধু ওই একটিই শব্দ, ভালোবাসি, ভালোবাসি।
ঘুমে জাগরণে, স্বপ্নে স্বপ্নে শুধু ওই একটিই শব্দ, ভালোবাসি, ভালোবাসি।
আমার বেঁচে থাকায়, আমার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে ওই একটিই শব্দ, ভালোবাসি, ভালোবাসি।
আমরা বদলে গেলাম। ওই এক গোধূলিবেলা আমাদের বদলে দিলো। আমার জীবন বদলে দিলো, স্বপ্ন কল্পনা, অতীত হয়ে বর্তমানে আসা, বর্তমানে থেকে যাত্রা ভবিষ্যতে, এক মায়াবী যাত্রা শুরু হলো আমাদের। এক মায়াবী ভ্রমণ। একই বাড়ির মধ্যে থেকে, এই ঘর আর ওই ঘরের দূরত্ব, শুরু হলো আমাদের মানসভ্রমণ।
আমিও তোমাকে চিঠি লিখলাম। এক পৃষ্ঠায় বড় করে একটি মাত্র শব্দ ‘ভালোবাসি’।
বুয়াই পৌঁছে দিলো তোমাকে।
আমি বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি, তুমি আমার মুখোমুখি পড়ে গেলে। চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে, মুখের অদ্ভুত সুন্দর এক ভঙ্গি করে শুধু একটাই শব্দ বললে, কিপ্টা।
কেন বলেছিলে?
কয়েকদিন পর প্রশ্নের জবাব দিলে। আমি একশ একবার লিখেছি আর তুমি শুধু একবার।
ওই একবারই অনেক বড়।
ছাই বড়।
মনে আছে, মায়া?
তোমার এসব মনে আছে?
এত কিছুর মধ্যে থেকেও আমার তখন দিনগুলো কাটতে চায় না, রাতগুলো কাটতে চায় না। দিনের বেলা ইউনিভার্সিটি, ছাত্ররাজনীতি, স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকি। চারদিকে বন্ধুবান্ধব, রাজনৈতিক কর্মী, নেতারা। কত কাজ। ভোরবেলা বেরিয়ে ফিরি রাত করে। সবকিছুর মধ্যে থেকেও তোমার কথা ভেবে হঠাৎ হঠাৎ আনমনা হই। মনে হয় এক দৌড়ে চলে আসি বাড়িতে, তোমাকে একপলক দেখে যাই। দুয়েকদিন তোমার কলেজের ওখানে চলে গেছি। আমাকে দেখলেই তোমার চোখদুটো যে কী উজ্জ্বল হতো!
প্রেম, আমার প্রেম।
ভালোবাসা, আমার ভালোবাসা।
তারপর আমরা দুজন এমন বদলালাম, এমন হলাম একজন আরেকজনের জন্য, বাইরে আমার মন টেকে না। বন্ধুবান্ধব লেখাপড়া রাজনীতি, কিচ্ছু ভালো লাগে না। আমার সারাক্ষণ থাকতে ইচ্ছা করে তোমাদের বাড়িতে। কোনো না কোনোভাবে দেখতে ইচ্ছা করে তোমাকে। রাতে ঘুম আসে না। স্বপ্ন দেখি শুধু তোমাকে। ভাবি শুধু তোমার কথা। স্বপ্ন জাগরণ যা-ই বলো, সর্বত্র তুমি। তুমি।
তোমার অবস্থাও দেখছি তাই।
কোনো না কোনোভাবে আমার কাছাকাছি আসা। আমার দিকে তাকিয়ে থাকা, আমাকে একপলক দেখা। আর দুজন দুজনার দিকে তাকালেই কোথাও যেন বেজে ওঠে এক মোহন বাঁশি, হাওয়া যেন একটুখানি উতলা হয়, সুবাসিত হয়, আলো যেন একটু বেশি প্রখর হয়, আকাশ যেন একটু বেশি নীল, ‘অনেকদূরের ওই যে আকাশ নীল হলো, আজ তোমার সাথে আমার আঁখির মিল হলো’। গাছের পাতা যেন হয়ে ওঠে একটু বেশি সবুজ, ঘাসে যেন গ্রীষ্মকালেও পড়ে থাকে হালকা শিশির, যেন বা বেশি সতেজ হয় পায়ের তলার ঘাস। পুকুরজলে যেন হাওয়া ছাড়াই ঢেউ ওঠে। জলতরঙ্গের মতো টুংটাং শব্দ হয় কোথায়। সন্ধ্যাবেলাই যেন চাঁদ উঠে যায় পুব আকাশে। বিশাল চাঁদ। প্রখর জ্যোৎস্নায় ঝিমঝিম করে চারদিক। অন্ধকার নেই, কোথাও অন্ধকার নেই। তবু জোনাকপোকাগুলো জ্বলতে থাকে। রাতপাখি ডেকে যায় এদিক-ওদিক। আর ডাকে এক দুরন্ত কোকিল। তোমার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়, ঠিক তখুনি যেন জেগে ওঠে ঘুমন্ত কোকিল। তখুনি যেন শুরু করে ডাক।
কেন এমন হচ্ছিল?
কেন বলো তো?
প্রকৃতি যেন দুজন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের অন্তর আলোকিত করছে, ভাসিয়ে নিচ্ছে ভালোবাসার তীব্র স্রোতে।
দিনের বেলা চঞ্চল পায়ে মুহূর্তের জন্য তুমি এলে আমার ঘরে। নাকি আমি গেলাম তোমার ঘরে। একটুখানির জন্য তোমাকে দেখা। তুমি একদিন আমার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে …’
আমার সবদিকে তখন তোমার চোখ। আমার নাশতা খাওয়া, গোসল ঘুম সব লক্ষ করছো তুমি। আমার কখন এক কাপ চা লাগতে পারে, তুমি যেন টের পাচ্ছো। ঠিক এক কাপ চা এনে দিলে আমাকে। খালার চোখ এড়িয়ে সিগ্রেট খেতে যাই লিচুতলার দিকে, ঠিক তুমি খেয়াল করছো।
একদিন বললে, যে-জিনিস লুকিয়ে খেতে হয় তা খাওয়ার দরকার কী?
আমি হাসলাম।
শুনেছি সিগ্রেটের শেষটান নাকি প্রেমিকাকে চুমু খাওয়ার চেয়েও আনন্দের।
সঙ্গে সঙ্গে হাতের সিগ্রেট ফেলে দিলাম। শেষটান আমি দেবো না, চুমু খেতে দাও।
তুমি এমন লজ্জা পেলে, দৌড়ে চলে গেলে উঠোনের দিকে।
সেই রাতে ঘটলো এক অদ্ভুত ঘটনা।
মায়া, কোথাও কি একটা পাখি ডাকলো?
ঘুমভাঙা পাখি?
কোনো গাছের ডালে, পাতার আড়ালে বসে একটুখানি কি ডাকলো?
আমি যেন শুনতে পেলাম!
গত ভোর থেকে, পাকিস্তানি … গুলো আর তাদের এদেশীয় চাকরবাকরগুলো, … গুলো যখন হত্যা করলো আমার
বাবাকে-মাকে, বোনকে, স্ত্রীকে, পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় থাকা আমার সন্তানকে, পারুল কদম বারেকের মা কোথায় গেল, বল্টু কুকুরটা, মিনি বিড়ালটা, আমাদের কবুতরগুলো …। সন্ধ্যারাতের দিকে একবার যেন কাছে কোনো গাছের ডালে, নাকি দালানের কোনো আড়ালে থেকে একবার যেন, একবার যেন মৃদু একটুখানি শব্দ শুনেছিলাম কবুতরের। নাকি সেটা ছিল আমার মনের ভুল? বিভ্রম! আসলে কবুতর ডাকেনি। আমার মনে হয়েছিল ডাকছে।
হায়রে আমার মন!
হায়রে আমার দিশেহারা তছনছ হয়ে যাওয়া অন্তর!
এরকম দৃশ্য দেখার পর আমি যে বেঁচে আছি, এখনো শ্বাস নিচ্ছি, উঠোনে কবর খুঁড়ে বাবা মা বোনকে কবর দিয়েছি প্রকৃত ইসলামি নিয়মে, তিন কবরের কাজ শেষ করে, মায়া, মায়া, তোমার কবর খোঁড়ার অর্ধেক কাজ শেষ করে ক্লান্ত বিধ্বস্ত দেহমনে তোমার পাশে বসেছি একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য, তোমাকে একটু আদর করার জন্য, একটু কথা বলা তোমার সঙ্গে, তোমার গালে-মুখে একটুখানি হাত বুলানো, অনেকদিন পর তোমাকে একটুখানি ছুঁয়ে দেখা, এ কেমন করে সম্ভব হচ্ছে মায়া? কেমন করে সম্ভব হচ্ছে?
শেষ বিকালে বাড়ি ঢুকে, ক্লান্ত বিপর্যস্ত শরীর, তার ওপর এরকম দৃশ্য, আমার সব শেষ, তারপরও আমি বেঁচে আছি কেমন করে?
আমার তো দম বন্ধ হয়ে মরে যাওয়ার কথা!
আমার মাথা তো পুরো খারাপ হয়ে যাওয়ার কথা!
বাবা মা বোন, ল-ভ- তুমি আর আমার সন্তান, আমার তো হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। হার্ট ফেইল করে আমার তো লুটিয়ে পড়ার কথা তোমার পাশে! আমার তো উঠে দাঁড়াবার কথা না! আমি এসব করেছি কী করে?
আমার হাত উঠে যায় মাথার কাছে। সেখানে বাঁধা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এই পতাকা আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। এই পতাকা আমাকে প্রকৃত যোদ্ধার শক্তি দিয়েছে। যখনই আমি একদম ভেঙে পড়ছিলাম, শরীর মনের শক্তি হারিয়ে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম তোমাদের পাশে, তখনই আমার হাত উঠে গেছে মাথায়। স্পর্শ করেছি আমার পতাকা। মুহূর্তে শরীরে ফিরে এসেছে শক্তি, মন ঝেড়ে ফেলেছে সব আবেগ।
শেষ করতে হবে।
কাজটা আমাকে শেষ করতে হবে।
ফিরে যেতে হবে যুদ্ধক্ষেত্রে।
রাত পোহাবার কত দেরি?
কিসের শব্দ বলো তো? বাড়ির চারদিকে বর্ষার পানি। কচুরিপানা ঝোপজঙ্গল। বড় মাছ ঘাই দিলো? বোয়াল কিংবা গজার। নাকি শোল?
এই মাছগুলো তক্কে তক্কে থাকে। পাড়ের কাছে এসে ওুতপেতে থাকে। ইঁদুর কিংবা ব্যাঙ পেলেই ‘খাবলা’ দিয়ে ধরে।
তেমন কোনো মাছ ঘাই দিলো?
নাকি ইঁদুর কিংবা ব্যাঙ ধরল?
আকাশে অতিধীরে চলা চাঁদ, হাওয়া নেই, গাছপালা নিঃসাড়, সাদা মেঘ ভেসে যায় চাঁদের তলা দিয়ে। ও মেঘ, তুমি কোথায় যাও? কোন অচিন দেশে?
কীটপতঙ্গ ডাকছে। ঝিঁঝি ডাকছে। এই শব্দ আসলে শব্দ না। এই শব্দ আসলে চূড়ান্ত নৈঃশব্দ্য। চূড়ান্ত নৈঃশব্দ্যে এক যোদ্ধা তার কাজ শেষ করার অপেক্ষায়।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
দ্বিজেন শর্মা : কবি ও বিজ্ঞানী by মশিউল আলম
খোকা একটু বড় হয়ে দিদির কাছে শুনবে, দোলনা দুলত আর হাওয়ায় দোল খেত নানা রঙের রুমালগুলি, তাই দেখে শূন্যে হাত-পা নাচাত খোকা। তার কচি মুখখানা সব সময় অনাবিল হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকত।
পরে দিদি আরো বলবে, জন্মের সময় খোকা কাঁদেনি। পৃথিবীতে তার প্রথম চিৎকার ছিল আনন্দধ্বনি।
এসব কথা শুনে খোকা শুধু আপনমনে হাসবে, কিছু বলবে না।
তার দিদি আরো পরে বলবে, খোকা স্বপ্নের মধ্যে হেঁটে বেড়াত। শীতের এক পূর্ণিমা রাতে স্বপ্নের ঘোরে সে হেঁটে হেঁটে গিয়েছিল নদী দেখতে।
খোকা ভেবে দেখবে, দিদির ভুল হয়েছে; স্বপ্নের ঘোরে হেঁটে বেড়ানোর অভ্যাস ছিল বড় দাদা প্রভাতের। খোকার এই ভাইটি নিকড়ি নদীটিকে খুব ভালোবাসত। শীতকালের নিকড়ি ছিল তার বিশেষ প্রিয়। রাতের এক প্রহর ঘুমিয়ে সে উঠে পড়ত, তারপর ভূতগ্রসেত্মর মতো ছুটে যেত নদীকে দেখতে।
বাবা বলতেন, ‘প্রভাত, রাতের বেলা ঘোরাঘুরি করিও না। সাপে কাটিবে।’
বাবা ছিলেন বিখ্যাত কবিরাজ, অখ্যাত কবি। চন্দ্রকান্ত শর্মা ছিল তাঁর নাম, লম্বা দাড়ি ছিল মুখে। নিজেকে নিয়ে তিনি এরকম পদ্য রচনা করেছিলেন :
চন্দ্রকান্ত কবিরাজ মুখে লম্বা দাড়ি
ঔষধের ডিবি লৈয়া বেড়াইন বাড়ি বাড়ি।
পান-তামাক দিলে তিনি কিছু নাহি খাইন
সুন্দরী রমণী দেখলে আড়নয়ানে চাইন \
বাবার ছিল ছটি ছেলেমেয়ে আর ছিল অনেক ফুলগাছ, আম-কাঁঠালের গাছ আর বনৌষধি। লোকে বলত কবিরাজ ঠাকুর। পৌষ-মাঘের শীতে খালি গায়ে ঘুরে বেড়াতেন; খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ছেলেমেয়েদের ডাকতেন, ‘এই উঠো উঠো, গাছে জল দাও।’
গাছগুলো ছিল নবীন, গরু-ছাগলের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের ঘিরে রাখা হতো ‘হুপি’ দিয়ে; চিকন চোঙের মতো হুপিগুলো ছিল খোকার চেয়ে লম্বা, খোকা বদনা ভরে জল নিয়ে জলচৌকির ওপর দাঁড়িয়ে তাদের গায়ে জল ঢেলে দিত।
গাছের চারাদের গায়ে জল ঢেলে দিতে দিতে খোকা বড় হবে, পাঠশালায় যাবে; কিন্তু বশোই খোকার মতো পাঠশালা যাবার বয়েসি হয়েও পাঠশালা যাবে না, সে চুরি করে আনবে মরিচমার্কা সিগারেট। খড়ের গাদার আড়ালে বসে বসে তারা মরিচমার্কা সিগারেটে আগুন ধরাবে, খোকা দুই টান দিয়ে বেদম কাশবে আর বলবে, বশোই, এটা ভালো না, সিগারেট খেতে নেই। কিন্তু বশোই জামগাছে উঠে মরিচমার্কা সিগারেট খেতে খেতে বড় হয়ে যাবে, তারপর শিমুলগাছে চড়ে পাখির বাচ্চা ধরে নিয়ে আসবে, সেই পাখির বাচ্চার গায়ে সাদরে হাত বোলাতে বোলাতে খোকা বলবে, ‘তুই বড় হ, ওই আকাশে উড়ে চলে যা…।’
স্থবির গাছেদের দেখে খোকার মনে বিস্ময় জাগেনি, প্রথম জেগেছিল পাখি দেখে।
পাখি নিয়ে তাঁর মা এই ছড়াটি বলতেন :
কাঁঠালগাছে দেখছি দুটো হলদে
পাখির ছানা
মায়ের মুখে খাচ্ছে আধার নাড়িয়ে
দুটি দানা।
সেই থেকে খোকা হলদে পাখির ছানা খুঁজে খুঁজে হয়রান। সঙ্গে বশোই, যে বশোই খুব দুষ্টু, যে মরিচমার্কা সিগারেট চুরি করে এনেছিল। তারপর ছেলেবেলার সেই খেলার সাথি কখন অজান্তে হারিয়ে গেছে, কিন্তু অশীতিপর বয়সেও সেই হারিয়ে যাওয়া কৈশোর মাঝে মাঝেই ফিরে আসত। তিনি আমাকে সেসব গল্প বলতেন, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর খন্দকারের গলির ভাড়া বাসায়। গত শতকের ষাট দশক থেকে তাঁর কেটেছে এই খন্দকারের গলিতেই, প্রথমে খন্দকার মঞ্জিল নামের এক দোতলা বাড়িতে, তারপর ক্রিস্টাল গার্ডেন নামের বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ভাড়া বাসায়।
------দুই------
তাঁর জন্ম ব্রিটিশ ভারতের সিলেট জেলার মৌলভীবাজারের বড়লেখার শিমুলিয়া গ্রামে, ১৯২৯ সালের ২৯ মে। নাম রাখা হয় দ্বিজেন্দ্র শর্মা। বাবা চন্দ্রকান্ত শর্মা ছিলেন ওই অঞ্চলের বিখ্যাত ভিষক, তাঁর বাড়িটি আজো কবিরাজ বাড়ি বলে পরিচিত। মায়ের নাম ছিল মগ্নময়ী দেবী। তাঁদের সন্তান ছিল ছয়জন : প্রভাতকুমার শর্মা, মৃণালিনী দেবী, বলরাম শর্মা, প্রভাবতী দেবী (মিঠু), দ্বিজেন্দ্র শর্মা (খোকা) ও সন্ধ্যারানী দেবী (খুকি)। দ্বিজেন্দ্র ছিলেন তাঁদের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র।
খোকার পড়াশোনা শুরু হয় গ্রামের পাঠশালায়, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন সেখানকার পিসি হাইস্কুলে। নবম শ্রেণিতে উঠে ভর্তি হন করিমগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলে, সে-সময় করিমগঞ্জ ছিল আসামের একটি মহকুমা। ভারতবিভাগের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে সেই স্কুল থেকেই তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তারপর করিমগঞ্জ কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। কলেজটি তাঁর ভালো লেগে যায়; কিন্তু গুরুতর সমস্যা দেখা দেয় উচ্চতর গণিত নিয়ে। এই বিষয়টার মাথামুণ্ডু কিছুই তাঁর মাথায় ঢোকে না। কিন্তু গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত করিমগঞ্জ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চতর গণিত বাধ্যতামূলক। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখলেন, ত্রিপুরার আগরতলায় মহারাজা বীরবিক্রম কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চতর গণিত বাধ্যতামূলক নয়। ওই কলেজ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। তিনি করিমগঞ্জ কলেজ থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে আগরতলায় গিয়ে মহারাজা বীরবিক্রম কলেজে ভর্তি হলেন। সেখান থেকেই ১৯৪৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর মা তাঁকে বললেন, ‘কলকাতা যাও, ডাক্তারিতে ভর্তি হও।’
বহু বছর পরে সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দ্বিজেন শর্মা আমাকে বলেন, ‘আমার পিতামহ, পিতা, অগ্রজ সকলেই ছিলেন প্রখ্যাত ভিষক। আমারও তা-ই হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমার মা সেটা চাননি। তিনি আমাকে আধুনিক চিকিৎসক বানাতে চেয়েছিলেন।’
মায়ের আদেশে তিনি কলকাতা গিয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন কলকাতা পৌঁছেন তার আগের দিনই মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার শেষ সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়া তাঁর হলো না। ভর্তি হলেন বিএসসিতে, তা-ও নামী কোনো কলেজে নয়, কলকাতা সিটি কলেজে, এবং অনার্স ছাড়াই। এই প্রসঙ্গে তাঁর খেদোক্তি : ‘অনার্স যে নেওয়া যায়, আমার সে বুদ্ধিও ছিল না। গ্রাম থেকে কলকাতা গেছি, প্রেসিডেন্সি কলেজের নাম জানতাম না, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের নাম পর্যন্ত জানতাম না, এমনই গেঁয়ো ছিলাম।’
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভর্তি হতে পারেননি বলে তাঁর কোনো আফসোস ছিল না। তিনি নিজের মুখেই বরং আমাকে বলেন, ‘ভালো যে ডাক্তারিতে ভর্তি হইনি। ভর্তি হলে সর্বনাশ হতো।’ কারণ, কলকাতায় চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার আর্থিক সামর্থ্য তাঁর পরিবারের ছিল না, ভর্তি হতে পারলেও মাঝখানে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হতো। সিটি কলেজে পড়ার সময় তাঁর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ভালো ছিল না, কারণ মূলত আর্থিক। কলকাতায় তাঁর ভালো লাগত না, সবুজ রঙের ট্রেন পূর্ববঙ্গের দিকে যাচ্ছে – এমন দৃশ্য দেখলেই তাঁর বাড়ির কথা মনে পড়ত, আর বাড়ির কথা মনে পড়লে তিনি বিষণ্ণ হয়ে পড়তেন।
সিটি কলেজ থেকে ১৯৫২ সালে বিএসসি পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কলকাতা ত্যাগ করেন। বাড়ি ফিরে যান, তখন করিমগঞ্জ কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞানের একজন ডেমোন্স্ট্রেটর প্রয়োজন ছিল। তিনি সেই চাকরিটা পান। কিন্তু দেড় বছর চাকরি করার পর তাঁর একঘেয়ে বোধ হয়, তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মার্কসবাদী বইপত্র পড়া শুরু করেন। অবশ্য তাঁর মার্কসবাদের দীক্ষা ঘটে কলকাতা সিটি কলেজে পড়ার সময়ই। তখন বামপন্থি বইপত্র পড়েছিলেন প্রচুর। বাম রাজনীতির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পরিচয় ও মেলামেশাও হয় অনেক। গড়ের মাঠে দাঁড়িয়ে নেতাদের বক্তৃতা শুনতেন। একদিন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তৃতা শুনেছিলেন।
------তিন-----
বাড়িতে নিয়মিত পত্রপত্রিকা পড়া হতো। তাঁর বাবা ও বড় ভাই ছিলেন একাধিক সাময়িকপত্রের গ্রাহক। একদিন আজাদ পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন তাঁর চোখে পড়ে : বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ উদ্ভিদবিজ্ঞানের একজন ডেমোন্স্ট্রেটর চায়। তখন তিনি জানতেন না বরিশাল কোথায়। কোনো দিন বাংলার মানচিত্র খুলে দেখেননি। তাঁরা দেখতেন আসামের মানচিত্র। পত্রিকায় সেই বিজ্ঞাপন পড়ার পর খুলে বসলেন বেঙ্গলের ম্যাপ। দেখলেন, বরিশাল বঙ্গোপসাগরের কাছে। পাহাড়ের সন্তান কোনো দিন সমুদ্র দেখেননি। তাই ভীষণ উৎসাহের সঙ্গে দরখাস্ত পাঠিয়ে দিলেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টেলিগ্রাম চলে এলো : ‘আপনি অবিলম্বে এসে কাজে যোগদান করুন।’ তিনি বরিশাল গিয়ে সমুদ্র খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কোথায় সমুদ্র? বঙ্গোপসাগর বরিশাল থেকে অনেক দূরে। তবু তিনি আর বরিশাল থেকে ফিরে এলেন না। বরং জীবনানন্দ দাশের ওই শহরের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য গড়ে উঠল। ১৯৫৪ সালে ব্রজমোহন কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ডেমোন্স্ট্রেটর হিসেবে যোগ দিলেন।
কিন্তু ডেমোন্স্ট্রেটরের কাজে তাঁর মন ভরেনি। যদিও হাতেকলমে উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়াতে তাঁর ভালো লাগত, তবু শুধু ব্যবহারিক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা একধরনের অসম্পূর্ণ কাজ বলে তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না। তাঁর ইচ্ছে ক্লাসে লেকচার দেওয়ার। কিন্তু ডেমোন্স্ট্রেটরদের দায়িত্বের মধ্যে সেটা নেই। কলেজের প্রভাষক হতে হলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির অধিকারী হতে হবে। তাই করিমগঞ্জ কলেজ ও বরিশালের বিএম কলেজে মোট চার বছর ডেমোন্স্ট্রেটরের চাকরি করার পর তিনি ঢাকা এসে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন, ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে। কিন্তু বিএম কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে চিরতরে হারাতে চায় না। তারা তাঁকে বলল, তিনি যেন মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করার পরে আবার ওই কলেজে ফিরে যান। তাঁকে ফিরে পাওয়ার জন্য তারা একটা কৌশলও অবলম্বন করল : দ্বিজেন শর্মা যতদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবেন, ততদিন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ৫০ টাকা মাসোহারা দেবে।
১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর কোর্সে পড়াশোনা শুরু করার পর তাঁর মনোজগতে বিরাট পরিবর্তন ঘটে যায়। উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে তাঁর নতুন উপলব্ধি জাগে। এই প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেন, ‘বিএসসি পাশ করার পর চার বছর চাকরি করে আমার ধারণা জন্মেছিল, আমি তো প্রচুর পড়াশোনা করেছি, আমি অনেক কিছু জানি, আর বিশেষ কিছু জানার দরকার নাই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে প্রথম জানলাম যে আমি কিছুই জানি না। শুধু বায়োলজি কেন, মার্কসবাদ, ইতিহাস, অর্থনীতি, সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি নানা বিষয়ে যে পড়াশোনা করেছি সেসব কিছুই নয়। এ ধরনের পড়া কোনো কাজেই লাগে না। ইউনিভার্সিটি এডুকেশন ইজ এ মাস্ট। তোমাকে অবশ্যই সিস্টেম্যাটিক্যালি পড়াশোনা করতে হবে, কোনো ডিসিপিস্ননে যেতে হবে।’
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু করেন সত্যিকার অর্থে সিস্টেম্যাটিক পড়াশোনা। সে-সময় ঢাকায় অনেক বিদেশি বইপত্র পাওয়া যেত। একদিন তাঁর হাতে আসে এক্সপেরিমেন্টাল ট্যাক্সোনমি বিষয়ে আইরিশ এক ভদ্রলোকের লেখা ছোট্ট একটা বই। হ্যাসলফ হ্যারিসন নামের সেই ভদ্রলোক তখন ডাবলিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। বইটি পড়ে দ্বিজেন শর্মা বেশ আলোড়িত হন। এক্সপেরিমেন্টাল ট্যাক্সোনমি বিবর্তনবাদকে বর্তমান ধারায় প্রতিষ্ঠা করার একটা পদ্ধতি। তিনি আমাকে বলেন, ‘এটা আমাকে হন্ট করতে লাগল। আমি আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিতে হ্যারিসনের কাছে চিঠি লিখলাম। তিনি পাল্টা চিঠিতে আমাকে লিখলেন, তুমি এখানে চলে এসো। তখন আমি ঠিক করি, এক্সপেরিমেন্টাল ট্যাক্সোনমি পড়ব, আমি বিজ্ঞানী হব।’
তিনি মাস্টার্স শেষ করার পর আয়ারল্যান্ডে পিএইচ.ডি করতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকের সঙ্গে বিভাগীয় প্রধানের দ্বন্দ্বের ফলে তিনি এমএসসিতে দ্বিতীয় শ্রেণি পেলেন। ফলে পিএইচ.ডি করার জন্য তাঁর আর বিদেশ যাওয়া হলো না। এ-বিষয়ে তাঁর খেদোক্তি : ‘এটাই আমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিল।’
এ নিয়ে তাঁর মনে গভীর দুঃখ ছিল। আলাপের সময় কখনো কখনো সেই দুঃখ প্রকাশ পেত। তাঁর একাধিক লেখায়ও এই দুঃখের আভাস আছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোনোর প্রায় দুই দশক পরে আশির দশকে মস্কো বসবাসকালে তিনি লন্ডন বেড়াতে যান। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ন্যাচারাল হিস্ট্রি বিভাগের হলঘরে ঢুকেই স্যার রিচার্ড ওয়েনের আবক্ষ মূর্তি দেখে মনে পড়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের কথা, এবং তিনি বিরক্ত হন। ‘গল্পবিজ্ঞান’ নামের ছোট্ট একটি লেখায় এই প্রসঙ্গটা আছে; নিজের দুর্ভাগ্য সম্পর্কে তৃতীয় পুরুষে তিনি লিখেছেন :
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে থিসিসের মালমশলা সংগ্রহকালে অমত্ম্যজ উদ্ভিদবর্গের একটি নতুন প্রজাতি সে খুঁজে পেয়েছিল। তার তত্ত্বাবধায়ক এই সাফল্যে শোরগোল তোলেন, বিভাগে হইচই পড়ে যায় এবং পরীক্ষা শেষে একটি প্রথম শ্রেণি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে সে স্বগ্রামে ফেরে। অতঃপর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও গবেষণার স্বপ্নে মশগুল থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল এবং এই সুবাদে নিজেকে প্রাণের উৎসসন্ধানী এক বিজ্ঞানী বানিয়ে একটি চটকদার গল্পও লিখে ফেলেছিল। কাগজে গল্পটি ছাপা হলেও তার স্বপ্ন সফল হয়নি। তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে রেষারেষি কিংবা অবোধ্যতর কোনো কারণে বিভাগীয় প্রধান তার গলায় দ্বিতীয় শ্রেণির যে ঘণ্টিটি ঝুলিয়ে দেন, তাতে মধ্যযুগীয় কুষ্ঠরোগীর মতো গুহাবাস তার নিয়তি হয়ে ওঠে এবং মফস্বলের কলেজের বিবর্ণ প্রাত্যহিকতায় কালাতিপাত ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।
এই প্রসঙ্গে আমি একবার তাঁকে বলেছিলাম, ‘আপনি যদি পিএইচ.ডি করতে আয়ারল্যান্ড চলে যেতেন, তাহলে আমরা সম্ভবত আপনাকে আর ফিরে পেতাম না। বাংলাদেশ আপনাকে হারাত। কারণ বিদেশের যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি পিএইচ.ডি করতেন, তারা আপনার মেধা আর পড়াশোনা ও গবেষণায় একাগ্রতা দেখে আপনাকে আর ছাড়ত না। সারাজীবন আপনাকে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়েই অধ্যাপনা করতে হতো। আপনার আর শ্যামলী নিসর্গ লেখা হতো না, বাংলা ভাষায় হয়তো কোনো বই-ই আপনার লেখা হতো না। প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদক হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়া, সমাজতন্ত্রে বসবাস করা এবং সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লেখা হতো না। বই অনুবাদ করা হতো না, আপনার সুন্দর অনুবাদ থেকে বাংলা ভাষার পাঠকেরা বঞ্চিত হতো। তরুপলস্নবের মতো সংগঠন গড়ে তোলা হতো না।’
আমার কথা শুনে তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘তাই আমি আমার অতীত নিয়ে আফসোস করি না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর অনেক বন্ধুবান্ধব জুটে যায়। ওই সময় তিনি সিকান্দার আবু জাফর-সম্পাদিত সাময়িকপত্র সমকালে প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন ওই পত্রিকার সহকারী সম্পাদক, তাঁর সঙ্গে দ্বিজেন শর্মার গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। হাসান হাফিজুর রহমানের পীড়াপীড়ির ফলেই তিনি সমকালের জন্য প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘শেষ গোলাপগুচ্ছ’ নামের স্মৃতিচারণামূলক নিবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন : ‘তখন সমকাল পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে। হাসান সহকারী সম্পাদক। ইতিপূর্বে আমি উলেস্নখ্য কিছুই লিখিনি। হাসানের ঈর্ষণীয় বন্ধুপ্রীতি, অনমনীয় জবরদস্তি আর অহেতুক প্রশংসার কল্যাণেই সাহিত্যের অঙ্গনে আমি প্রবেশাধিকার পাই। বলতে দ্বিধা নেই, হাসানের হাত ধরেই এ পথে আমার যাত্রা শুরু।’
সমকাল পত্রিকায় যেসব প্রবন্ধ লেখেন সেগুলোর বিষয়বস্ত্ত ছিল বিচিত্র-সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে শুরু করে বিজ্ঞান পর্যন্ত। কয়েকটি প্রবন্ধের শিরোনাম উলেস্নখ করলেই তাঁর আগ্রহের বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে : ‘সংস্কৃতি বিচার’, ‘বঙ্কিম সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা’, ‘লিসেন্কোর বংশগতিতত্ত্ব’, ‘তমসার শেষ অঙ্কে’ ইত্যাদি।
স্বাধীনতার পরে হাসান হাফিজুর রহমান মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস অ্যাটাশে হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৭৪ সালে দ্বিজেন শর্মা প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদকের চাকরি নিয়ে মস্কো গেলে তাঁদের সখ্য আরো নিবিড় হয়।
১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার পর তিনি প্রতিশ্রম্নতি অনুযায়ী বরিশাল বিএম কলেজে ফিরে গিয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। দ্বিতীয় শ্রেণি পাওয়ায় পিএইচ.ডি করতে বিদেশ যাওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার ফলে তাঁর মন সে-সময় ভীষণ খারাপ ছিল। তবে তখনো সব আশা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। বরিশালে ফেরার পরেও তাঁর মনে আশা ছিল যে পিএইচ.ডি করার জন্য আয়ারল্যান্ডে অধ্যাপক হ্যারিসনের কাছে যাবেন।
কিন্তু গোল বাধাল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি : ইতিমধ্যে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পাকিস্তানের ক্ষমতার মসনদে বসেছেন। তারপর স্বৈরাচারী সরকার একটা শিক্ষানীতি ঘোষণা করে এবং সঙ্গে সঙ্গে সারা পূর্ববাংলাজুড়ে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের ঘোষিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রবল ছাত্র-আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। তিনি তখন বরিশাল বিএম কলেজের ছাত্র হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট, আন্দোলনরত ছাত্রদের সহযোগিতা করছেন এই অভিযোগে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে ধরতে যায়। তিনি পালিয়ে বরিশাল থেকে চলে যান মৌলভীবাজারের বড়লেখায় নিজের গ্রামে। সেখানে ও ময়মনসিংহের আত্মীয়বাড়িতে মাসতিনেক লুকিয়ে থাকার পর পরিস্থিতি থিতু হয়েছে ভেবে কলেজে ফিরে কাজে যোগদান করেন এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তার ও কারাগারে নিক্ষেপ্ত হন। ফলে উচ্চতর শিক্ষার জন্য তাঁর বিদেশ যাওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
এই প্রসঙ্গে তিনি আমাকে বলেন, ‘বাষট্টি সালে বরিশালে আমাকে সিকিউরিটি প্রিজনার হিসেবে গ্রেপ্তার করে জেলে ঢুকিয়ে দিল। তারপর আইয়ুব খানের পাকিস্তানে আমার পক্ষে আর পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব ছিল না। আমি উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে ঠিক করলাম, বরিশালেই পিএইচডি করব বরিশাল ফ্লোরা (বরিশালের উদ্ভিদকুল) নিয়ে। কিন্তু সেখানে কোনো গাইড নাই। নিজেই নিজেই কিছু কাজ করলাম। জেল থেকে বেরিয়ে আমি আর বরিশালেই থাকিনি, ঢাকায় এসে নটর ডেম কলেজে যোগ দিলাম। ঢাকায় এসেই আমার ইচ্ছা হলো, ঢাকা শহরের গাছপালা নিয়ে লেখালেখি করব। মোটরসাইকেলে করে সারা ঢাকা চষে বেড়াতাম, গাছপালা দেখতাম।’
বরিশালে গ্রেপ্তার ও কারাবরণের আগে ১৯৬০ সালের ২৭ নভেম্বর তাঁর বিয়ে হয় বরিশালবাসী আইনজীবী সুধীর কুমার চক্রবর্তীর কন্যা দেবী চক্রবর্তীর সঙ্গে। দেবী চক্রবর্তী তখন বরিশাল বিএম কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। সেখানে ১৯৬১ সালে তাঁদের প্রথম সন্তান সুমিত্র শর্মার (টুটুল) জন্ম হয়। দ্বিতীয় সন্তান শ্রেয়সী শর্মা (মুন্নী) জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭১ সালে।
------চার-----
১৯৬২ সালে বরিশাল ছেড়ে ঢাকা চলে আসার পর দ্বিজেন শর্মা কিছু সময় কায়েদে আজম কলেজ, সেন্ট্রাল উইমেনস কলেজ ও বাংলা কলেজে শিক্ষকতা করেন। তারপর যোগ দেন নটর ডেম কলেজে। ওই কলেজের প্রাঙ্গণে অনেক গাছ লাগান, বাগান গড়ে তোলেন। তাঁর লাগানো কিছু গাছ এখনো ওই কলেজের প্রাঙ্গণে রয়ে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর প্রথম গ্রন্থ শ্যামলী নিসর্গ লেখেন। বাংলা ভাষায় এরকম বই এটাই প্রথম। এ-বইয়ের প্রকাশনা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আমাকে বলেন, ‘গাছপালার ছবি আঁকার জন্য পেয়ে গেলাম আঁকিয়ে গোপেশ মালাকারকে। বাংলা একাডেমীকে বললাম, তারা সঙ্গে সঙ্গে বইটা প্রকাশ করতে রাজি হয়ে গেল। শ্যামলী নিসর্গ-ই আমার প্রথম বই, এটাই এখনো পর্যন্ত আমার প্রধান বই, লোকে এখনও এটার কথা বলে।’ কিন্তু তিনি পাণ্ডুলিপি ১৯৬৫ সালে জমা দিলেও বাংলা একাডেমি বইটি প্রকাশ করে অনেক পরে, ১৯৮০ সালে।
শ্যামলী নিসর্গ লেখার সময়েই তিনি পপুলার সায়েন্সের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্পের আঙ্গিকে আরো দশ-বারোটা নিবন্ধ-প্রবন্ধ লেখেন। সে-লেখাগুলো নিয়ে আরো পরে প্রকাশিত হয় জীবনের শেষ নেই নামে আরেকটা বই।
ছাত্র পড়াতে তাঁর ভালো লাগত, বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল আরো বেশি। একবার তিনি আমাকে বলেন, ‘আমার মূল লক্ষ্য ছিল গাছপালা নিয়ে গবেষণা করব, বিজ্ঞানী হব, এবং এই ধারার লেখালেখি করব। তাই নটর ডেম কলেজে যোগ দেওয়ার কিছুকাল পরে অধ্যাপক নজরুল ইসলামের অধীনে ক্যারোফাইটা নিয়ে পিএইচ.ডি গবেষণা শুরু করি। মস্কো যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি সেটা চালিয়ে গেছি। আমি একজন বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলাম। এটাই ছিল আমার মনের গড়ন।’
রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়েও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। অবশ্য তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রবেশ করেননি, কিন্তু তাঁর বন্ধুবান্ধবদের অধিকাংশই ছিলেন বামপন্থি। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল।
কলেজে পড়ার সময় বামপন্থি বইপত্র পড়েছিলেন প্রচুর। বাম রাজনীতির নেতাকর্মীদের সঙ্গে মেলামেশাও হয়েছে কম নয়। সে-সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘ওটা ছিল বিদ্রোহের বয়স। তার ওপর দেশবিভাগের ফলে আমাদের পরিবারে দারিদ্র্য নেমে আসে। আমার সে সময়ের দারিদ্রে্যর অভিজ্ঞতা ভীষণ তিক্ত। ফলে আই ওয়াজ ভেরি অ্যাংরি। আমি প্রথম যে গল্পটা লিখেছিলাম, সেটার নাম ছিল কী, জানিস? ‘যে নদী মরুপথে’। এক গরিব ছাত্রের জীবনসংগ্রামের কাহিনি। যা হয় আর-কি। গল্পের আড়ালে নিজের দারিদ্রে্যর বয়ান। তার পরও কয়েকটা গল্প লিখেছিলাম। সেগুলো বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর কলকাতা পড়ার সময় আমি থাকতাম ব্যারাকপুরে। সেখানে বামপন্থিরা গল্প লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। আমি ‘সীমান্ত’ নামে একটা গল্প লিখি, সেটা ফার্স্ট প্রাইজ পেয়ে যায়। সো আই বিকেম পপুলার অ্যামং দেম। প্রচুর বন্ধুবান্ধব জুটে গেল।’
-----পাঁচ-----
১৯৭৪ সালে দ্বিজেন শর্মা সোভিয়েত ইউনিয়নের সুবৃহৎ পুস্তক প্রকাশনা সংস্থা প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদকের চাকরি নিয়ে সপরিবারে মস্কো চলে যান। ফলে অ্যাকাডেমিক জগতের সঙ্গে তাঁর চিরতরে বিচ্ছেদ ঘটে যায়। অনুবাদের কাজ তাঁর ভালো লাগেনি, কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এ-কাজটি তাঁকে করতে হয়েছে। প্রগতি প্রকাশনের জন্য তিনি প্রায় ৪০টি বই ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। অনুবাদ করতে ভালো না লাগলেও সোভিয়েত ইউনিয়নে তাঁর বসবাস আনন্দময় ছিল। তিনি মনে করতেন, তাঁর জীবনে এটা ছিল এক বিরাট সৌভাগ্যজনক ঘটনা। এ-কথা তিনি নিজ মুখেই আমাকে বলেছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘নটর ডেম কলেজে পিএইচ.ডি গবেষণা, উদ্ভিদবিদ্যা পড়ানো, ঢাকার গাছপালা নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি, অসংখ্য ভক্ত, বন্ধুবান্ধব – এইসব ছেড়েছুড়ে অনুবাদের মতো নিরানন্দ, একঘেয়ে, কষ্টকর কাজ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়াকে আপনি সৌভাগ্য বলছেন?’
উত্তরে তিনি বলেন, ‘সৌভাগ্য মানে? বিরাট সৌভাগ্য! সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়ে আমি এমন সমাজ দেখার সুযোগ পেয়েছি, যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আরো কত কিছু দেখার সুযোগ হয়েছে, কত দেশে গেছি, কত মানুষ দেখেছি, কত বই কিনতে পেরেছি, পড়তে পেরেছি। সোভিয়েত ইউনিয়নে না গেলে হয়তো মূর্খই থেকে যেতে হতো। পিএইচ.ডি হয়তো করে ফেলতাম। লিখতামও হয়তো, কিন্তু সেসব লেখা এ-রকম হতো না। আর জীবনটা সেখানে কী সুখেরই না ছিল। টাকা-পয়সার চিন্তা নাই, প্রাচুর্য নাই, প্রাচুর্যের চিন্তাই নাই, অভাবও তেমন নাই। কাজের অমানুষিক চাপ নাই। অদ্ভুত সমাজ ছিল সেটা। সোভিয়েত ইউনিয়নে থাকার সুবাদে ইউরোপ ভ্রমণে যেতে পেরেছি, কতকিছু দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমি তো বলি শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্য নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া উচিত। সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানো উচিত।’
২০০৬ সালের ২৯ মে তাঁর ৭৭তম জন্মদিনে তাঁর সঙ্গে আমার ওই আলাপচারিতায় তিনি আমাকে আরো বলেন, ‘ওই দেশটিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতায় এক অভূতপূর্ব পরীক্ষা হয়ে গেছে। পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিজয় প্রমাণিত হয়েছে, এটা যারা বলে, তারা ঠিক বলে না। এই পুঁজিবাদ শুধু মানুষের শোষণ-বঞ্চনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে মানবসভ্যতাকেই ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে সে। সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে উৎপাদন ও পরিভোগের এই ব্যবস্থা বদলাতে হবে। বদলাতে হবে সব বিষয়ে এথনোপোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। সবার ওপরে মানুষ সত্য নয়, পৃথিবীর ইকোসিস্টেমে একটি কীটস্ব কীটেরও ন্যায্য জায়গা রাখতে হবে। নোবেলবিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যান্ডিকো ফারমিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমাদের গ্যালাক্সির অন্যান্য গ্রহে কি সভ্যতা আছে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আছে, নিশ্চয়ই অনেক আছে। পরের প্রশ্ন, তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না কেন? এবার ফারমির উত্তর : সে-রকম প্রযুক্তি তৈরি করার আগে তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে ফেলে।’
১৯৯১ সালের ডিসেম্বরের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির সময় তিনি মস্কোতেই ছিলেন। তারপর প্রগতি প্রকাশনেরও বিলোপ ঘটে এবং তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফিরে আসেননি, ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত মস্কোই ছিল তাঁর আবাসস্থল। ওই বছর স্বদেশে ফেরেন বটে, তবে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই একবার করে মস্কো যেতেন এবং টানা কয়েক মাস সেখানে বাস করতেন। ২০০৫ সালের পর মস্কোর পাট পুরোপুরি গুটিয়ে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন। এই যাওয়া-আসার সময়েই তিনি ঢাকায় এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়া প্রকল্পের অন্যতম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাপিডিয়ার অনেক ভুক্তি নিজে অনুবাদও করেন। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ প্রকল্পের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
আমার মনে হয়, দ্বিজেন শর্মার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নে বসবাসের দুই দশক। এই পর্ব শেষ করে স্বদেশে ফিরে আসার পরে পত্রপত্রিকায় প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ে তাঁর অনেক লেখা প্রকাশিত হওয়া এবং এসব বিষয়ের প্রতি তরুণ সমাজের আগ্রহ বাড়ানোর লক্ষ্যে সাংগঠনিক সক্রিয়তার ফলে প্রকৃতিবিদ হিসেবে তাঁর পরিচয়টাই প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবনা, বিশেষত সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতার গুরুত্বও বিরাট বলে আমার মনে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি সমাজতন্ত্রে বসবাস নামে একটি বই লেখেন। ঢাকার প্রকাশনা সংস্থা ইউপিএল তা প্রকাশ করে ১৯৯৯ সালে। বইটিকে সংক্ষিপে স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের ইতিবৃত্ত বলা যেতে পারে। ২০০৪ সালের জুন মাসে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে বইটির বিষয়ে আমার একটি ছোট্ট আলোচনা প্রকাশিত হয়। আমি সেই আলোচনার এক জায়গায় লিখি : ‘দীর্ঘকাল মস্কোপ্রবাসী লেখক-অনুবাদক দ্বিজেন শর্মার সমাজতন্ত্রে বসবাস বইটি পাঠ করে মনে হয়েছে কিছুরই সুরাহা হলো না; লেখক তো জানালেন না এত বছর সমাজতন্ত্রে বসবাস করে এই ব্যবস্থাটি সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত কী দাঁড়াল। কেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে, কেন প্রথমে রাশিয়াতেই ঘটল, কী করে ৭০ বছর টিকে থাকল আর কেনই-বা ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো? সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ কি আসলেই সম্ভব? এমন ব্যবস্থা কি মানব প্রজাতির অন্তর্গত স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? নাকি সমাজতন্ত্র জবরদস্তি করে কৃত্রিম উপায়ে চাপিয়ে দেওয়া একটি ব্যবস্থা, যা চাপানো গেলেও এবং জোর করে কিছুকাল টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘকাল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়?’
আমার এই আলোচনার প্রতিক্রিয়ায় দ্বিজেন শর্মা প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতেই লেখেন, ‘মশিউল লিখেছেন, ‘লেখক তো জানালেন না এত বছর সমাজতন্ত্রে বসবাস করে ব্যবস্থাটি সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত কী দাঁড়াল।’ যথার্থ জিজ্ঞাসা। আমি যে বিভ্রান্ত তেমন সাক্ষ্য বইটিতেই আছে। অধিকন্তু এমন একটি জটিল বিষয় সম্পর্কে সুচিমিত্মত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো বিদ্যাও আমার নেই। এ ক্ষেত্রে প্রসাধারণীকরণের ঝুঁকি রয়েছে। গোটা বিশ্বের কত মনীষী, কত মহৎ ব্যক্তি সমাজতন্ত্রের জন্য প্রাণপাত করেছেন তা ভুলি কেমনে।
‘সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর প্রগতি প্রকাশনের সহকর্মীদের কেউ কেউ এ দেশ ছাড়ার সময় তাঁদের সংগৃহীত মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বইগুলো আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়ে যাচ্ছেন দেখে দুঃখ পেয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপুঞ্জ ভেঙে পড়া সত্ত্বেও আমি আজও সমাজতন্ত্রকে সর্বাধিকসংখ্যক মানুষের জন্য সর্বোত্তম রাষ্ট্রব্যবস্থা বলে মনে করি। তবে ইদানীং এমন একটি ভাবনা আমাকে সর্বদাই আলোড়িত করে এবং তা হলো, সমাজতন্ত্রের মতো একটি মানবিক ব্যবস্থায় উত্তরণ কি সহিংস শ্রেণিসংগ্রাম ও বিপুল রক্তপাতের মাধ্যমে সম্ভব? লেনিন মার্কসীয় তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে চেয়েছেন এবং তার অভিজ্ঞতাকে খুবই মূল্যবান মনে করি। যদিও তাঁর সমগ্র রচনা পাঠ আমার সাধ্যাতীত, যেটুকু পড়েছি তা সামান্য এবং অধিকাংশই অনুবাদ ও সম্পাদনার সুবাদে। লেনিনের কোনো কোনো লেখায় এমন ইংগিতও আছে যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শামিত্মপূর্ণ উপায়েও সম্পন্ন হতে পারে। রুশ বিপ্লবের পরিণতি দেখে এমন একটি চিন্তা অযৌক্তিক মনে হয় না যে, ধনতন্ত্র অপেক্ষা উন্নততর কোনো সভ্যতার জন্য অহিংসাই হবে মূল চালিকাশক্তি, অন্যথা উপায় ও লক্ষ্যের দ্বন্দ্ব নিরসন অসম্ভব হবে এবং বিপ্লবের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা বিপ্লবেরই উদরস্থ হবেন।’
‘সমাজতন্ত্র চিরতরে বিদায় নিয়েছে এমন ভাবনার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। সমাজ বিবর্তনের মার্কসীয় ধারণা, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ একটা পর্যায়ে পৌঁছালে উৎপাদন-সম্পর্কের পরিবর্তন অনিবার্য, তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। পুঁজিতন্ত্র এখনও তেমন কোনো ক্রামিত্মলগ্নে পৌঁছায়নি, সে নানা কৌশলে বা অপকৌশলে এই দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করতে সক্ষম, কিন্তু অনন্তকাল তা পারবে না।’ পুঁজিতন্ত্র মানবসভ্যতার সর্বোত্তম ও শেষ পর্যায় এমন ভাবনা অবশ্যই অযৌক্তিক, বিশেষত আমরা উন্নয়নশীল দেশের মানুষ তা মর্মে মর্মে অনুভব করি। পশ্চিমের কোনো কোনো পণ্ডত মনে করেন বর্তমান বিশ্বায়ন আসলে তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের ফল, অর্থাৎ নতুন উৎপাদিকা শক্তির উচ্ছ্রয়ের অভিঘাতের ফসল। বিশ্ব পুঁজিতন্ত্র বিশ্বায়নকে কতটা বিশ্বমানবের কল্যাণের উপযোগী করতে পারবে তার ওপর নির্ভর করছে এই ব্যবস্থার সাফল্য। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের তো এটা আরম্ভমাত্র, তার বিকাশ বিশ্ব পুঁজিতন্ত্রের বিপর্যয় ডেকে আনবে কি না তা এখনও কেউ জানে না। আরেকটি শক্তি-উৎসের উদ্ভাবনও আসন্ন আর সেটা হলো অ-ফসিল জ্বালানি আবিষ্কার। রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স একযোগে ফিউশন এনার্জি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে, তাতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হবে পানি এবং তাতে কোনো তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য থাকবে না, শক্তির পরিমাণও হবে বিপুল। এই প্রযুক্তি কি মুষ্টিমেয় পরাশক্তি দীর্ঘকাল তাদের একচেটিয়া দখলে রাখতে পারবে? অবশ্যই না। আমরা তখন বুঝতে পারব পৃথিবীর চেহারাটা অতঃপর কেমন হবে আর উৎপাদিকা শক্তির বৃদ্ধি সত্যিই উৎপাদন সম্পর্ক বদলায় কি না। সেই দিন কিন্তু বেশি দূরে নয়।
‘মশিউল আলম জানতে চেয়েছেন, ‘পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কেন প্রথম রাশিয়াতেই ঘটল, কী করে ৭০ বছর টিকে থাকল আর কেনইবা ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো?’
‘এ সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত’, তবে সবচেয়ে সহজ অনুমান : ইউরোপের সর্বাধিক দীর্ঘস্থায়ী সামন্ততন্ত্র ছিল রাশিয়ায় আর লেনিনের ভাষায় সে জন্য ‘বিশ্বপুঁজিতন্ত্রের দুর্বলতম গ্রন্থি’, যথাসময়ে সেখানে বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটেনি, যখন ঘটল তখন কমিউনিস্টরা তা ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন, তাঁরা সমাজ বিকাশের একটি অপরিহার্য পর্যায় পুঁজিতন্ত্র এড়াতে চাইলেন আর সে জন্যই শেষ পর্যন্ত টেকসই সমাজতন্ত্র নির্মাণে সফল হননি। ৭০ বছর রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র টিকে ছিল প্রথমে বিপ্লব থেকে উৎপাদিত শক্তি ও জনগণের প্রবল আশাবাদের কল্যাণে, শেষে রাষ্ট্রশক্তির কঠোরতম নিয়ন্ত্রণে। কালে কালে প্রথম দুটি উবে যায়, থাকে শুধু শেষেরটি। সমাজে ব্যাপক দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটে, আমলাতান্ত্রিকতার দরুন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিপ্লবের সুফল কুড়োতে ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে রাশিয়া ব্যর্থ হয়। টফলারের মতে, ‘সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন-সম্পর্ক উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে বাধা হয়ে ওঠে’, নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্টদের সঙ্গে পুরনোদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বৃদ্ধি পেতে থাকে, গর্বাচেভ সমাজতন্ত্র সংস্কারে উদ্যোগী হন; কিন্তু ততদিনে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষয়ে গিয়েছিল, তাই সংস্কার আর সম্পন্ন হলো না, ভেঙে পড়ল গোটা কাঠামো।
‘এভাবেই রাশিয়ায় পুঁজিতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ঘটল, যে-ব্যবস্থাকে এড়াতে চাওয়া হয়েছিল এবং ‘অপুঁজিতান্ত্রিক বিকাশের পথ’ নামে একটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে বিপুল শক্তি ও অর্থের অপচয় ঘটানো হয়েছিল, আমরা জানি পৃথিবীর কোথাও তা সফল হয়নি। এর বেশি কিছু বলার মতো জ্ঞানের পুঁজি আমার নেই। তবে এও বলা প্রয়োজন যে, রাশিয়া ব্যর্থ সমাজতন্ত্র আমাদের জন্য কিছু ইতিবাচক অবদানও রেখে গেছে; সাম্রাজ্যবাদের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার দ্রম্নত পতন, তৃতীয় দুনিয়ার
উত্থান (বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ঘটনা-পরম্পরাও প্রসঙ্গত স্মর্তব্য), সমতাভিত্তিক সমাজে জীবনযাত্রার কিছু মূল্যবান দৃষ্টান্ত যা অতীতে কোথাও ছিল না, আজও নেই।’
------ছয়-----
দ্বিজেন শর্মা বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলেন, তাঁর মনটা ছিল বিজ্ঞানীর মন। ভাগ্যচক্রে তা ঘটেনি, কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর চিন্তা, পড়াশোনা ও লেখালেখি কখনো থামেনি। এ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, তিনি এক বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ কামনা করতেন। বিজ্ঞান শিক্ষা ছিল তাঁর গভীর ভাবনার বিষয়গুলোর অন্যতম। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ার জন্য ছেলেমেয়েরা যে-বয়সে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ পায় তার অনেক আগে, কৈশোরের শুরুতেই বিজ্ঞানের রহস্যময় জগতের সঙ্গে তাদের একটি মধুময় সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।
কীভাবে তা গড়ে তোলা সম্ভব? বিজ্ঞান বিষয়ে সুখপাঠ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও সায়েন্স ফিকশন বা বিজ্ঞান-রহস্যোপন্যাস পড়া, বিজ্ঞানবিষয়ক চলচ্চিত্র, জাদুঘর, চিড়িয়াখানা ইত্যাদি দেখার মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের দেশে এসব উপকরণ ও উদ্যোগ অপ্রতুল। বিজ্ঞানবিষয়ক লেখালেখির পরিমাণ খুব কম এবং সেগুলো অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য সুখপাঠ্য ও প্রাঞ্জল নয়।
জীবনের শেষ নেই নামের বইয়ের ভূমিকায় দ্বিজেন শর্মা এসব কথা লিখেছেন। তাঁর মতে, ‘আমাদের কাছে বিজ্ঞানের পরিচয় ও প্রতিষ্ঠা অর্থকর বিদ্যা হিসেবেই গণ্য। অজানাকে জানার, প্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটনের প্রবল কৌতূহল থেকে আমরা বিজ্ঞান শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হই না। আমাদের দেশের বিজ্ঞানের সেরা ছাত্ররাও যে কর্মজীবনে সৃজনশীল বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জনে ব্যর্থ হন, এর মূলে পূর্বোক্ত কারণসমূহের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তা ছাড়া এ সত্য অত্যন্ত স্পষ্ট যে আমাদের সমাজমানস মূলত বিজ্ঞান-বিমুখ। আমাদের অর্থনীতি তথা সাংস্কৃতিক জীবনে মধ্যযুগের অস্তিত্ব আজও সুপ্রকট। আমরা যান্ত্রিক প্রগতির যা-কিছু জীবনের দায়ে গ্রহণ করেছি, তা আজও আমাদের সমাজের বহিরঙ্গেই পৃথকীকৃত হয়ে রয়েছে। আমাদের অন্তরের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র স্থাপিত হয়নি। তাই আমাদের দৈনন্দিন আলোচনা থেকে কলাকৃষ্টির বিসত্মৃততর পরিসরেও বিজ্ঞান নির্বিশেষে অনুপস্থিত। বিজ্ঞান যেন আমাদের ক্রীতদাস; তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হলেও সে অচ্ছুত, তার সখ্য অনাকাঙিক্ষত।
‘তাই আমাদের ছেলেমেয়েরা শৈশব-কৈশোরে পারিবারিক সূত্রে বিজ্ঞানমুখী হবার অনুপ্রেরণা লাভে স্বাভাবিকভাবেই ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতা এবং পরবর্তীকালের ত্রম্নটিপূর্ণ বিজ্ঞান শিক্ষার যুগ্ম প্রতিক্রিয়ার ফলেই সম্ভবত আমাদের বিজ্ঞান বন্ধ্যা, নিষ্ফলা।’
দ্বিজেন শর্মা মনে করতেন, এই সমস্যার যে-কোনো সমাধান নেই তা নয়। তবে এজন্য ব্যাপক উদ্যোগ প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে সুখপাঠ্য ও প্রাঞ্জল বই লেখার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, এবং নিজে সেই চেষ্টা কিছুটা করে গেছেন। ডারউইন, বিবর্তনবাদ, উদ্ভিদজগৎ ও প্রকৃতি-পরিবেশ বিষয়ে তিনি প্রাঞ্জল ও সুখপাঠ্য ভাষায় অনেক লেখা লিখেছেন। অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ, প্রাবন্ধিক মফিদুল হকসহ অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশে বিজ্ঞান বিষয়ে সুন্দর ভাষায় লেখালেখিতে দ্বিজেন শর্মা ছিলেন অনন্য।
বিজ্ঞান শিক্ষা তো বটেই, সামগ্রিক শিক্ষা সম্পর্কেও দ্বিজেন শর্মা চিন্তাভাবনা করতেন। তিনি মনে করতেন, ‘আধুনিক শিক্ষা সর্বৈব শিল্পবিপ্লব-উত্তর ইউরোপের এবং সেজন্য তা নাগরিক পরিবেশের তথা শিক্ষিত পারিবারিক প্রতিবেশের অধিক উপযোগী। একটি গ্রামীণ শিশুমন প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে, সেখানকার জীবনধারা থেকে যে উদ্দীপনা ও অন্যান্য উপকরণ আত্তীকরণে লালিত হয়, তার সঙ্গে শিল্পপ্রধান সমাজের শিক্ষা-উপকরণের বৈপরীত্য আছে। তাই এ-শিক্ষা তার কাছে অনাকর্ষী ও পরকীয় হয়ে ওঠে (শিক্ষকদের উদ্যত বেতের কথা না-ই বা ধরা হলো)। তার জগতের লাগসই শিক্ষাদর্শীর অভাবে তার পাঠ্য বিষয়ে ‘গোবরেপোকা’ এত স্পষ্ট হয়ে ওঠে না, কোনো দিন ‘ব্যাঙের খাঁটি কথাটি’ কিংবা ‘নেড়ি কুকুরের ট্রাজেডি’ লেখা হয় না। যে শিশু দুপায়ে দাঁড়ানোর পরই উঠোনে কাদামাটি ছানে, ফড়িং ধরে, চাষবাসের ও মাছ ধরার উপকরণ দেখে, তার পক্ষে বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো, নদীতে মাছ ধরা, গাছের মগডালে পাখির বাচ্চা খোঁজার সঙ্গে স্কুলের বন্দি বেষ্টনীতে বইয়ের পাতার সজ্জাহীন নীরস তথ্যের বিমূর্ত বস্ত্ত থেকে জ্ঞানার্জনের বিরক্তিকর মলস্নযুদ্ধ কি তুলনীয়? এভাবেই আধুনিক শিক্ষার উপকরণ ও পদ্ধতি এ দুয়ের সঙ্গেই তার অন্তর্লীন এক বিরোধ গড়ে ওঠে এবং শেষাবধি তা শিক্ষাজীবনে ব্যর্থতা দেখা দেয়।’
দ্বিজেন শর্মা কবিতা লেখেননি, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ও মন কাব্যিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল। তাঁর বিজ্ঞানচিন্তায় ও পরিবেশ ভাবনায় সৌন্দর্যবোধের স্থানটি ছিল একদম কেন্দ্রে। প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে তিনি মূলত যা দেখতে পেয়েছেন তা হলো সৌন্দর্য। তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন নিসর্গশোভা। তাঁর দৃষ্টিতে জগতের কোনো গাছ, কোনো ফুল, কোনো নদী, কোনো প্রাণী অসুন্দর ছিল না। প্রাকৃতিক জঙ্গল যেমন, তেমনই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা উদ্যান বা বাগানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। উদ্যানের মধ্যে প্রাকৃতিক জঙ্গলের বিশৃঙ্খলা তাঁর ভালো লাগত না।
একই কথা প্রযোজ্য নগরের সৌন্দর্যায়ন কিংবা পথতরু রোপণের ক্ষেত্রেও। তিনি রমনা উদ্যানের অনেক গাছ কেটে ফেলার পরামর্শ দিতেন, কারণ সেগুলো উদ্যানের পরিপাটি সৌন্দর্যের পক্ষে বেমানান, কিংবা অন্যান্য গাছের জন্য ক্ষতিকর। নগরীর মধ্যে পথতরু লাগানোর ক্ষেত্রেও তিনি সুবিবেচিত পরিকল্পনার পক্ষে ছিলেন। কোথায় কোন গাছ লাগাতে হবে, কোন গাছের পাশে কোন গাছ লাগানো হলে সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে ইত্যাদি খুঁটিনাটি নানা বিষয়ের দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিল।
তাঁর সৌন্দর্যবোধ সর্বাঙ্গীনভাবে মানুষের উন্নততর জীবনের আকাঙক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের পক্ষে তাঁর জোরালো অবস্থানের পেছনে কোনো রোমান্টিকতা ছিল না, ছিল অতি জরুরি বাস্তববুদ্ধি। মানুষের দ্বারা প্রকৃতির যথেচ্ছ শোষণ ও দোহনের মধ্যে তিনি মানব জাতির অস্তিত্বের সংকট দেখতে পেতেন। এর পেছনের প্রধান শক্তি হিসেবে তিনি প্রথমে চিহ্নিত করেন পুঁজিতন্ত্রকে। তারপর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও দেখতে পেয়েছেন প্রকৃতির যথেচ্ছ দোহন ও শোষণ। তখন তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, বৈষয়িক উন্নতি তথা সীমাহীন ভোগবিলাসের লালসাই এই ক্ষেত্রে মূল সমস্যা। বৈষয়িক সম্পদ তথা আরাম-আয়েশের বৃদ্ধি ঘটাতে হলে প্রকৃতিকে যথেচ্ছ শোষণ ও দোহন ছাড়া গত্যন্তর নেই – মানুষের এই দুর্বুদ্ধিই তাকে তার অস্তিত্বের সংকটে উপনীত করেছে এবং সীমাহীন ভোগলালসার লাগাম টানার আগ পর্যন্ত এই সর্বনাশা প্রক্রিয়া থামার কোনো সম্ভাবনা নেই।
তিনি মানুষকে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতেন। প্রকৃতিকে জয় করা নয়, তাকে ভালোবেসে তার অংশ হয়ে স্নিগ্ধ সুন্দর জীবনযাপনের দিকে তিনি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। তাঁর খুব প্রিয় একটা বই ফরাসি লেখক অতোয়ান দো সাঁৎ একঝুপেরির ছোট রাজকুমার; এ-বইয়ের মূল বাণী ভালোবাসা। মানুষ ও প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা দ্বিজেন শর্মাকে সুন্দর মনের অধিকারী করেছিল।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
একজন লিয়ন ম্যাক্স ল্যাডেরম্যান এবং তার নোবেল পুরষ্কার বিক্রি করে দেওয়ার গল্প by রেজওয়ান হাসান
![]() |
| ডঃ লিয়ন ম্যাক্স ল্যাডেরম্যান |
কিন্তু, ঠিক এই ব্যতিক্রমটিই ঘটেছিলো ১৯৮৮ সালে নোবেল স্বর্ণপদক প্রাপ্ত ডঃ লিয়ন ম্যাক্স ল্যাডেরম্যান এর সাথে।
লিয়ন ম্যাক্স ল্যাডেরম্যান পেশায় একজন অবসরপ্রাপ্ত পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ। উনি উনার পদার্থবিজ্ঞানের দুনিয়ার মানুষজনের কাছে “লিয়ন এম ল্যাডেরম্যান” নামেই বেশি পরিচিত।
লিয়ন এম ল্যাডেরম্যান আরো দুইজন পদার্থবিদ যথাক্রমে ম্যালভিন সোয়ার্টজ এবং জ্যাক স্টেইনব্যার্গার এর সাথে ১৯৮৮ সালে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল স্বর্ণপদক লাভ করেন অতিপারমাণবিক কণা “মিউওন নিউট্রিনো” আবিষ্কারের জন্য।
সাধারনত ১৯৯৩ সালে গডস পার্টিকেল “হিগস বোসন” কণার খোঁজ নিয়ে প্রকাশিত হওয়া “The God Particle” বইয়ের লেখক হিসেবেই লিয়নকে পদার্থবিজ্ঞান দুনিয়ার লোকজন চিনে। প্রসঙ্গত অনেকের মতে এই হিগস বোসন কণাই মহাবিশ্বের বাকি সব কণাকে ভর দান করে।
যাই হোক, বয়স ৯০-এর কোঠায় আসার পর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি তার নোবেল পুরস্কার বিক্রি করে দিবেন। কারণটাও দায়সারা একদম, উনার মনে হয়েছে এটা অনাদরে অবহেলায় যুগ যুগ ধরে যেহেতু তাকে পড়ে আছে, সেহেতু সেটি বিক্রি করা দেয়াটাই যৌক্তিক মনে হয়েছে উনার কাছে। এবং যেই ভাবা সেই কাজ, নিলামে তুলে দিলেন সেই ২৪ ক্যারটের খাঁটি সোনার উপর প্লেট করা ১৮ ক্যারটের সবুজ সোনার তৈরী সেই মেডেলটি। এবং তা বিক্রিও হয়ে গেলো ৭,৬৫,০০০ ডলারের বিনিময়ে নিলামে উঠে বিক্রি হলো সেই নোবেল প্রাইজটি। ক্রেতার নাম গোপন রাখা হয়েছে নিলাম কমিটির থেকেই।
![]() |
| নোবেল পুরস্কারের এপিঠ |
![]() |
| নোবেল পুরস্কারের ওপিঠ |
- *“এটা খুবই কষ্টসাধ্য। এটি যদি অন্যভাবে হতো। সে যেখানে কুকুর এবং বিড়াল এবং ঘোড়ার সাথে থাকে, সেটা পছন্দ করে। তার কোন দুশ্চিন্তা নেই, এবং এটাইয় আমি খুশি হই যে সে এতো সন্তুষ্ট।”
আজ পর্যন্ত সবচেয়ে দাম দিয়ে যেই নোবেল পুরস্কারটি বিক্রি হয়েছে, তা ছিলো বিখ্যাত বায়োলজিস্ট জেমস ওয়াটসনের যিনি কিনা ডিএনএ-এর ডাবল হেলিক্স আবিস্কারের জন্য ১৯৬২ সালে নোবেল পেয়েছিলেন। তিনি তার নোবেল ৪.৭ মিলিয়নের বিনিময়ে বিক্রি করেছিলেন।
![]() |
| জেমস ওয়াটসন |
মজার ব্যাপার হচ্ছে এই নোবেল যে আসলেও কেউ কিনে নিবে সেটা তারা কেউই ভাবেননি। কারণ জিনিসটা একদমই অযত্নে সেলফে পড়েছিলো। লিয়ন দম্পতি বাচ্চাদের সেই নোবেল নিয়ে খেলতে পর্যন্ত দিতেন এবং সেই নোবেল পুরষ্কারের সাথে ছবিও তুলতে দিতেন যে কাউকে।
২০১২ সালে অবসরে যাবার আগ পযন্ত লিয়ন “ফারমি ন্যাশনাল এক্সেলেরেটর ল্যাবরেটরি” এর সাথে নিযুক্ত ছিলেন এবং পরে পশ্চিমের দিকে চলে যান স্বপরিবারে। ফারমি ল্যাবের ভাষ্যমতে, লিয়ন দম্পতি মনে করছেন যে এই নিলাম যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো পৃথিবীতে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে।
তবে ২০১৫ সালে নিজের পদকটি নিলামে তুললেও এরপর আর বেশিদিন বাঁচেননি লিয়ন ল্যাডেরম্যান। এই বছরেরই ৩ অক্টোবর বার্ধক্যজনিত কারণে ৯৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মেধাবী বিজ্ঞানী।
>>>>>>
তথ্যসুত্রঃ- Retired experimental physicist, 92, who found the God Particle sells his 1988 Nobel Prize for $765,000 to cover dementia treatment
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Friday, June 10, 2022
আকিকার গুরুত্ব ও নিয়ম কানুন by ফিরোজ আহমাদ

আকিকার সময় : নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার সপ্তম দিনে আকিকা করা উত্তম। হজরত রাসূল সা: নিজে সপ্তম দিনে আকিকা করেছেন। যদি কোনো কারণে সপ্তম দিনে আকিকা করা সম্ভব না হয়, তাহলে চতুর্দশতম দিনে আকিকা করতে হয়। তাও সম্ভব না হলে, একবিংশতম দিনে আকিকা করতে হয়। তাও সম্ভব না হলে, অন্য যেকোনো দিনে আদায় করে নিতে হবে। হজরত সামুরা ইবনে জুনদুব রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘প্রত্যেক শিশু তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধকস্বরূপ। কাজেই সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে জবাই করবে এবং তারা মাথা মুণ্ডন করে নাম রাখবে’ (সুনানে আবু দাউদ : ২/৩৯২)।
আকিকার পশু ও সংখ্যা : উট, গরু, মহিষ, ভেড়া বা ছাগল দিয়ে আকিকা করতে হবে। কোরবানির পশুর মতো আকিকার পশু সুস্থ, সবল ও ত্রুটিমুক্ত হতে হয়। হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: তাদেরকে ছেলে সন্তানের জন্য দুটি সমবয়সী ছাগল আর মেয়ে সন্তানের জন্য একটি ছাগল দিয়ে আকিকা করার জন্য নির্দেশ করেছেন। (তিরমিজি শরিফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৩; আবু দাউদ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৪)। হজরত উম্মে কুরজ রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘নবজাতক সন্তান ছেলে হলে দু’টি ছাগল আর মেয়ে হলে একটি ছাগল দিয়ে আকিকা করবে’ (তিরমিজি শরিফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৩; আবু দাউদ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৪)।
আকিকার গোশত বিতরণ : আকিকার গোশত ইচ্ছে হলে রান্না করে আত্মীয়-স্বজন ও গরিব-মিসকিনকে খাওয়ানো যাবে। তবে আকিকার পশুর গোশত তিন ভাগ করে এক-তৃতীয়াংশ নিজের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকিনদের জন্য সাদকা করে দিয়ে বাকি এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া সুন্নত। আকিকার গোশত সচ্ছল আত্মীয় স্বজনকেও দেয়া যায়।
আকিকার গোশত খাওয়া : আকিকার পশুর গোশত খেতে কারো কোনো বাধা নেই। আকিকার পশুর গোশত নিজেরা খেতে পারবে। অন্যদেরও খাওয়ানো যাবে।
আকিকার পশুর চামড়া : আকিকার পশুর চামড়া বাজারে বিক্রি করে, বিক্রিয়কৃত টাকা গরিব-মিসকিনের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে।
আকিকার কল্যাণসমূহ : আকিকার মাধ্যমে নবজাতক শিশুর বাবা-মায়ের দানশীলতা প্রকাশ পায়। গরিব, ইয়াতিম ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে গোশত বিলি-বণ্টনের মাধ্যমে আত্মীয়তার হক আদায় হয়। নবজাতক শিশুর জন্য সবাই দোয়া করেন। নতুন একটি প্রাণের আগমনকে কেন্দ্র করে আকিকা দেয়ার ফলে আল্লাহ তায়ালা নবজাতকের কাছে যত বালা-মুসিবত ছিল, সেগুলো উঠিয়ে নেন।
আকিকার কুসংস্কার : আকিকার পশু নানার বাড়ি থেকে দিতে হয়। আকিকার গোশত বাবা-মা, নানা-নানী ও দাদা-দাদীরা খেতে পারেন না। সন্তানের চুল মুণ্ডানোর সময় মাথার তালুর উপর ক্ষুর ধরে রেখে আকিকার পশু জবাই করতে হয় ইত্যাদি কুসংস্কার থেকে দূরে থাকতে হবে। আকিকা করতে হয় নবজাতকের কল্যাণের উদ্দেশ্যে। তাই আকিকার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অশ্লীল নাচ-গান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, আকিকার সাথে শিশুর নাম রাখার সম্পর্ক রয়েছে। আকিকার সাথে শিশুর বালা-মুসিবত দূর হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। আকিকার সাথে প্রথম চুল মুণ্ডানোর সম্পর্ক রয়েছে। তাই সামর্থ্য থাকলে দ্রুত আকিকা সম্পন্ন করা অপরিহার্য। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুক। আমিন।
>>>লেখক : প্রবন্ধকার
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Monday, June 6, 2022
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ৭ খাবার

এবার আসুন জেনে নেওয়া যাক কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পাওয়ার ৭ খাবার-
১) মধু
প্রতিদিন মধু খাওয়ার অভ্যাস করুন। তাহলেই দেখবেন কোষ্ঠকাঠিন্য এবং পেট পরিষ্কার না হাওয়ার মতো সমস্যা একেবারে কমে যাবে। আসলে এই প্রকৃতিক উপাদানটিতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বিশেষভাবে কাজ করে। ফলে মধু খাওয়া মাত্র পেট পরিষ্কার হতে শুরু করে দেয়। এক্ষেত্রে দিনে ৩ বার, এক গ্লাস গরম পানিতে ১ চামচ করে মধু এবং লেবুর রস মিশিয়ে খেতে হবে।
২)পালং শাক
প্রতিদিন এই শাকটি খেলে দারুন উপকার পাওয়া যায়। তাই যদি কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকে তাহলে হয় রান্না করে পালং শাক খাওয়া শুরু করে দিন। দেখবেন অল্প দিনেই কষ্ট কমে যাবে। প্রসঙ্গত, আরেক ভাবে পালং শাককে কাজে লাগানো যেতে পারে। এক গ্লাস পানির সঙ্গে ১ গ্লাস পালং শকের রস দিনে দুবার করে খেলে কনিস্টেপেশনের কোনও নাম গন্ধই থাকে না।
৩)আঙুর
এতে উপস্থিত অদ্রবণীয় ফাইবার, পেট পরিষ্কার হতে সাহায্য করে। তাই বাওয়েল মুভমেন্ট ঠিক না হলেই দিনে হাফ বাটি কাঁচা আঙুর অথবা আঙুরের রস খাওয়ার চেষ্টা করবেন।
৪) লেবু
এতে উপস্থিত লেমোনাস, হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটানোর পাশাপাশি পেট পরিষ্কার রাখতে দারুন কাজে আসে। তাই কখনও যদি দেখেন ১-২ দিন ধরে পটি ঠিক মতো হচ্ছে না তাহলে ঝটপট লেবুর রস খেয়ে নেবেন। দেখবেন সঙ্গে সঙ্গে ফল পাবেন। প্রসঙ্গত, গরম জলে লেবুর রস মিশিয়ে খেলে বেশি উপকার পাবেন।
৫) তিসি
এতে রয়েছে বিপুল পরিমাণে ফাইবার এবং ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, যা পেট পরিষ্কার রাখতে নানাদিক থেকে সাহায্য করে। তাই পটি পরিষ্কার হোক, বা না হোক, প্রতিদিন তিসি বীজ জলে গুলে পান করুন। দেখবেন দারুন উপকার পাবেন। প্রসঙ্গত, এক গ্লাস জলে ১ চামচ তিসি বীজ গুলে কম করে ২-৩ ঘন্টা রেখে দিন। রাতে শুতে য়াওয়ার আগে পান করুন সেই জল। দেখবেন সকালে উঠে পেট পরিষ্কার করে পটি হয়ে যাবে।
৬) আঁশ-জাতীয় খাবার
যেমন- পাতাবহুল সবজি খাবার তালিকায় রাখুন। স্বাভাবিকভাবে দেহের ময়লা বের করে দিয়ে এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শষ্য, বাদাম, ওটস ও ডাল-জাতীয় খাবার খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকলে তা কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে।
৭) তিলের বীজ
তিলের বীজ পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ। এতে আছে অত্যাবশ্যকীয় তেল যা শরীরের পক্ষে ভালো। এই বীজ পেট পরিষ্কার করে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করে।
সূত্র : বোল্ডস্কাই
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
Wednesday, June 1, 2022
বহু রোগের চিকিৎসায় উলটকম্বল by তারিফুল ইসলাম

উলটকম্বল দেশে জন্মানো ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে অন্যতম। যার ইংরেজি নাম ডেভিলস কটন। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকায় উলটকম্বল গাছের বিস্তৃতি রয়েছে। এ ছাড়া এশিয়ার প্রধান অঞ্চল এর আদি নিবাস। বাংলাদেশের সব জায়গাতেই উলটকম্বল গাছ দেখা যায়। ২-৩ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট গুল্মজাতীয় চিরহরিৎ গাছ এটি।
এ গাছের শাখার গোড়ার পাতা হৃৎপিণ্ডের মতো দেখায়, তবে পাতার সামনের দিকটা সরু, উজ্জ্বল সবুজ রঙের। পাতার বোঁটা ও কচি ডাল খয়েরি লাল, ডগার পাতাগুলো লম্বা আকৃতির। গাছের বাকল শক্ত আঁশযুক্ত, পানিতে ভেজালেও নষ্ট হয় না। নির্দিষ্ট বয়সে এ গাছে ফুল ফোটে। ফুলের রং খয়েরি। পাপড়ি পাঁচটি, গাছের কচি শাখায় ফুল ফোটে। ফুল দেখতে বেশ মনোরম।

গ্রীষ্ম থেকে ফুল ফোটা শুরু হয়ে শরৎকাল পর্যন্ত ফুল ফোটে এবং শীতকালেও গাছে ফুল দেখা যায়। ফুল শেষে গাছে ফল হয়। ফল পঞ্চকোণাকৃতির, প্রথমে সবুজ রং এবং পরে পরিপক্ব ফল কালো রং ধারণ করে। পরিপক্ব ফল ফেটে যায়। ফলের ভেতর কম্বলের মতো লোমশ অংশ থাকে। ফল পাঁচটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত এবং এর ভেতর কালিজিরার মতো ছোট ছোট বীজ থাকে।
সাধারণত সব ধরনের সুনিষ্কাশিত মাটিতে উলটকম্বল গাছ জন্মে। তবে দো-আঁশ মাটি হলে ভালো। এ গাছ ছায়া সহ্য করতে পারে। পাহাড়ি বনাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রাম, শহর, বিভিন্ন পারিবারিক বাগান, রাস্তার ধার, ভেষজ বাগানে উলটকম্বল গাছ রোপণ করতে দেখা যায়।
উলটকম্বল গাছের পাতা, ডাল, মূল, বাকল বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। গাছের বাকল ও ডাঁটা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে আঠালো পদার্থ বের হয় যা কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করে। পাতার ডাঁটা প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া উপশম, আমাশয় রোগের জন্য উপকারী। পাতা ও কাণ্ডের রস গনোরিয়া, ফোঁড়া ও স্ত্রী রোগে উপকারী। গবাদিপশুর পাতলা পায়খানা, বিলম্ব প্রজনন এবং হাঁস-মুরগির বিভিন্ন চিকিৎসায় উলটকম্বলের ব্যবহার রয়েছে।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1400)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...










